ইসলাম পরিচিতি

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ইসলাম পরিচিতি

সাইয়েদ বুল আ’লা মওদূদী

অনুবাদঃ সৈয়দ আবদুল মান্নান


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

ইসলাম

ইসলাম নামকরণ কেন

দুনিয়ায় যত রকম ধর্ম রয়েছে তার প্রত্যেকটির নামকরণ হয়েছে কোন বিশেষ ব্যক্তির নামে। অথবা যে জাতির মধ্যে তার জন্ম হয়েছে তার নামে। যেমন, ঈসায়ী ধর্মের নাম রাখা হয়েছে তার প্রচারক হযরত ঈসা (আ)- এর নামে। বৌদ্ধ ধর্ম মতের নাম রাখা হয়েছে তার প্রতিষ্ঠাতা মহাত্মা বুদ্ধের নামে। জরদশতি ধর্মের নামও হয়েছে তেমনি তার প্রতিষ্ঠাতা জরদশতের নামে। আবার ইয়াহুদী ধর্ম জম্ম নিয়েছিল ইয়াহুদা নামে বিশেষ গোষ্ঠীর মধ্য। দুনিয়ায় আরো যেসব ধর্ম রয়েছে, তাদেরর নামকরণ হয়েছে এমনিভাবে। অবশ্য নামের দিক দিয়ে ইসলামের রয়েছে একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। কোন বিশেষ ব্যক্তি অথবা জাতির সাথে তার নামের সংযোগ নেই। বরং ‘ইসলাম’ শব্দটির অর্থের মধ্যের আমরা একটি বিশেষ গুণের পরিচয় পাই, সেই গুণই প্রকাশ পাচ্ছে এ নামে। নাম থেকেই বুঝা যায় যে, ইসলাম কোন এক ব্যক্তির আবিষ্কার নয়, কোন এক জাতির মধ্যে এ ধর্ম সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম কোন বিশেষ ব্যক্তি, দেশ অথবা জাতির সম্পত্তি নয়। তার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইসলামের গুণরাজি সৃষ্টি করা। প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক কওমের যেসব খাঁটি ও সৎলোকের মধ্যে এসব গুণ পাওয়া গেছে, তারা ছিলেন ‘মুসলিম’। এ ধরনের লোক আজো রয়েছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন।

ইসলাম শব্দটির অর্থ

আরবী ভাষায় ‘ইসলাম’ বলতে বুঝায় আনুগত্য ও বাধ্যতা। আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও তার বাধ্যতা স্বীকার করে নেয়া এ ধর্মের লক্ষ্য বলেই এর নাম হয়েছে ‘ইসলাম’।

ইসলামের তাৎপর্য

সকলেই দেখতে পাচ্ছে যে, চন্দ্র, সূর্য, তারা এবং বিশ্বের যাবতীয় সৃষ্টি চলছে এক অপরিবর্তনীয় বিধান মেনে। সেই বিধানের বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম হবার উপায় নেই। দুনিয়া এক নির্দিষ্ট গতিতে ঘুরে চলছে এক নির্দিষ্ট পথ অতিক্রম করে। তার চলার জন্য যে সময়, যে গতি ও পথ নির্ধারিত রয়েছে, তার কোন পরিবর্তন নেই কখনো। পানি আর হাওয়া, তাপ আর আলো-সব বিছুই কাজ করে যাচ্ছে এক সঠিক নিয়মের অধীন হয়ে। জড়, গাছপালা, পশু-পাখীর রাজ্যেরও রয়েছে তাদের নিজস্ব নিয়ম। সেই নিয়ম মুতাবিক তারা পয়দা হয়, বেড়ে ওঠে, ক্ষয় হয়, বাঁচে ও মরে। মানুষের অবস্থা চিন্তা করলে দেখতে পাই যে, সেও এক বিশেষ প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন। এক নির্দিষ্ট জীবতাত্ত্বিক বিধান অনুযায়ী সে জম্মে, শ্বাস গ্রহণ করে, পানি, খাদ্য, তাপ ও আলো আত্মস্থ করে বেঁচে থাকে। তার হৃৎপিন্ডের গতি, তার দেহের রক্তপ্রবাহ, তার শ্বাস-প্রশ্বাস একই বাঁধাধরা নিয়মের অধীন হয়ে চলছে। তার মস্তিষ্ক, পাকস্থলী, শিরা-উপশিরা, পেশীসমূহ, হাত, পা, জিভ, কান, নাক– এক কথায় তার দেহের প্রতিটি অংগ- প্রত্যংগ কাজ করে যাচ্ছে সেই একই পদ্ধতিতে যা তাদের প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত হয়েছে।

যে শক্তশালী বিধানের অধীনে চলতে হচ্ছে দুনিয়া জাহানের বৃহত্তম নক্ষত্র থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রতম কণিকা পর্যন্ত সবকিছু, তা হচ্ছে এক মহাশক্তিমান বিধানকর্তার সৃষ্টি। সমগ্র সৃষ্টি এবং সৃষ্টির প্রতিটি পদার্থ এ বিধানকর্তার আনুগত্য স্বীকার করে এবং সবাই মেনে চলে তাঁরই দেয়া নিয়ম। আগেই আমি বলেছি যে, দুনিয়া-জাহানের প্রভু আল্লাহ তা’য়ালার আনুগত্য ও তারই নিকট আত্মসমর্পণের নামই ইসলাম, তাই এদিক দিয়ে সমগ্র সৃষ্টির ধর্মই হচ্ছে ইসলাম। চন্দ্র, সূর্য, তারা গাছপালা, পাথর ও জীব-জানোয়ার সবাই মুসলিম! যে মানুষ আল্লাহকে চেনে না, যে তাঁকে অস্বীকার করে, যে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে পূজা করে এবং যে আল্লাহর কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে অংশীদার করে, স্বভাব-প্রকৃতির দিক দিয়ে সেও মুসলিম, কারণ তার জীবন-মৃত্যু সব কিছুই আল্লাহর বিধানের অনুসারী। তার প্রতিটি অংগ-প্রত্যংগ, তার দেহের প্রতিটি অণু ইসলাম মেনে চলে কারণ তার সৃষ্টি, বৃদ্ধি ও গতি সবকিছুই আল্লাহর দেয়া নিয়মের অধীন। মূর্খতাবশত যে জিহবা দিয়ে সে শির্ক ও কুফরের কথা বলছে, প্রকৃতির দিক দিয়ে তাও মুসলিম। যে মাথাকে জোরপূর্বক আল্লাহ ছাড়া অপরের সামনে অবনত করছে, সেও জম্মগতভাবে মুসলিম, অজ্ঞতার বশে যে হৃদয় মধ্যে সে অপরের প্রতি সম্মান ও ভালবাসা পোষণ করে, তাও সহজাত প্রকৃতিতে মুসলিম। তারা সবাই আল্লাহর নিয়মের অনুগত এবং তাদের সব কাজ চলছে এ নিয়মের অনুসরণ করে।

এবার আর এক আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপারটি বিবেচনা করে দেখা যাক।

প্রকৃতির লীলাখেলার মধ্যে মানুষের অস্তিত্বের রয়েছে দু’টি দিক। এক দিকে সে অন্যান্য সৃষ্টির মতোই জীব-জগতের নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা রয়েছে। তাকে মেনে চলতে হয় সেই নিয়ম। অপরদিকে, তার রয়েছে জ্ঞানের অধিকার, চিন্তা করে বুঝে কোন বিশেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছাবার ছাবার ক্ষমতা তার করায়ত্ত। নিজের ইখতিয়ার অনুযায়ী কোন বিশেষ মতকে সে মেনে চলে, আবার কোন বিশেষ মতকে সে অমান্য করে কোন পদ্ধতি সে পছন্দ করে, কোন বিশেষ পদ্ধতিকে আবার পছন্দ করে না। জীবনের কার্যকলাপের ক্ষেত্রে কখনো কোন নিয়ম-নীতিকে সে স্বেচ্ছায় তৈরী করে নেয়, কখনো বা অপরের তৈরী নিয়ম-নীতিকে নিজের করে নেয়। এদিক দিয়ে সে দুনিয়ার অন্যবিধ সৃষ্ট পদার্থের মতো একই ধরাবাঁধা নিয়মের অধীন নয়, বরং তাকে দেয়া হয়েছে নিজস্ব চিন্তা, মতামত ও কর্মের স্বাধীনতা।

মানবজীবনে এ দু’টি দিকেরই রয়েছে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব। প্রথম বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে মানুষ দুনিয়ার অপর সব পদার্থের মতই জম্মগত মুসলিম এবং আমি আগে যা বলেছি সেই অনুসারে মুসলিম হতে সে বাধ্য। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে মুসলিম হওয়া বা না হওয়ার উভয়বিধ ক্ষমতা তার মধ্য রয়েছে এবং এ নির্বাচন ক্ষমতার প্রভাবেই মানুষ বিভক্ত হয়েছে দু’টি শ্রেণীতে।

এক শ্রেনীর মানুষ হচ্ছে তারা, যারা তাদের স্রষ্টাকে চিনেছে, তাকেই তাদের একমাত্র মনিব ও মালিক বলে মেনে নিয়েছে এবং যে ব্যাপারে তাদেরকে নির্বাচনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, সেখানেও তারই নির্ধারিত কানুন মেনে চলবার পথই তারা বেছে নিয়েছে, তারা হয়েছে পরিপূর্ণ মুসলিম। তাদের ইসলাম হয়েছে পূর্ণাঙ্গ। কারণ তাদের জীবনই পরিপূর্ণরূপে আল্লাহতে সমর্পিত। না জেনে-শুনে যার নিয়মের আনুগত্য তারা করছে জেনে-শুনেও তারই আনুগত্যের পথই তারা অবলম্বন করেছে। অনিচ্ছায় তারা আল্লাহর বাধ্যতার পথে চলেছিল, স্বেচ্ছায়ও তারই বাধ্যতার পথ তারা বেছে নিয়েছে। তারা হয়েছে এখন সত্যিকার জ্ঞানের অধিকারী। কারণ যে আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছেন জানবার ও শিখবার ক্ষমতা, সেই আল্লাহকেই তারা জেনেছে। এখন তারা হয়েছে সঠিক যুক্তি ও বিচার ক্ষমতার অধিকারী। কারণ, যে আল্লাহ তাদেরকে চিন্তা করবার, বুঝবার ও সঠিক সিদ্ধান্ত কায়েম করবার যোগ্যতা দিয়েছে, চিন্তা করে ও বুঝে তারা সেই আল্লাহরই আনুগত্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তাদের জিহবা হয়েছে সত্যভাষী, কেননা সেই প্রভুত্বের স্বীকৃতি ঘোষণা করেছে তারা, যিনি তাদেরকে দিয়েছেন কথা বলার শক্তি। এখন তদের পরিপূর্ণ জীবনই হয়েছে পূর্ণ সত্যাশ্রয়ী। কারণ ইচ্ছা-অনিচ্ছায় উভয় অবস্থায়ই তারা হয়েছে একমাত্র আল্লাহর বিধানের অনুসারী। সমগ্র সৃষ্টির সাথেই তাদের মিতালী। কারণ সৃষ্টির সকল পদার্থ যার দাসত্ব করে যাচ্ছে, তারাও করেছে তারই দাসত্ব। দুনিয়ার বুকে তারা হচ্ছে আল্লাহর খলীফা (প্রতিনিধি) সারা দুনিয়া এখন তাদেরই এবং তারা হচ্ছে আল্লাহর।

কুফরের তাৎপর্য

যে মানুষের কথা উপরে বলা হলো, তার মুকাবিলায় রয়েছে আর এক শ্রেনীর মানুষ। সে মুসলিম হয়েই পয়দা হয়েছে এবং না জেনে, না বুঝে জীবনভর মুসলিম হয়েই থেকেছে। কিন্তু নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সে আল্লাহকে চেনেনি এবং নিজের নির্বাচন ক্ষমতার সীমানার মধ্যে সে আল্লাহর আনুগত্য করতে অস্বীকার করেছে। এ ধরনের লোক হচ্ছে কাফের। ‘কুফর’ শব্দটির আসল অর্থ হচ্ছে কোন কিছু ঢেকে রাখা বা গোপন করা। এ ধরনের লোকে ‘কাফের’ (গোপনকারী) বলা হয়, কারণ সে তার আপন স্বভাবের উপর ফেলেছে অজ্ঞতার পর্দা। সে পয়দা হয়েছে ইসলামী স্বভাব নিয়ে। তার সারা দেহ ও দেহের প্রতিটি অংগ কাজ করে যাচ্ছে ইসলামী স্বভাবেরই উপর তার পারিপার্শ্বিক সারা দুনিয়ার এবং তার নিজের সহজাত প্রকৃতি সরে গেছে তার দৃষ্টি থেকে। সে এ প্রকৃতির বিপরীত চিন্তা করেছে। তার বিপরীতমুখী হয়ে চলবার চেষ্টা করেছে।

এখন বুঝা গেল, যে মানুষ কাফের, সে কত বড় বিভ্রান্তিতে ডুবে আছে।

কুফরের অনিষ্টকারিতা

‘কুফর’ হচ্ছে এক ধরনের মূর্খতা, বরং কুফরই হচ্ছে আসল মূর্খতা। মানুষ আল্লাহকে না চিনে অজ্ঞ হয়ে থাকলে তার চায়ে বড় মূর্খতা আর কি হতে পারে? এক ব্যক্তি দিন-রাত দেখেছে, সৃষ্টির এত বড় বিরাট কারখানা চলেছে, অথচ সে জানে না, কে এ কারখানার স্রষ্টা ও চালক। কে সে কারিগর, যিনি কয়লা, লোহা, ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম ও আরো কয়েকটি পদার্থ মিলিয়ে অস্তিত্বে এনেছেন মানুষের মত অসংখ্য অতুলনীয় সৃষ্টিকে? মানুষ দুনিয়ার চারিদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে পাচ্ছে এমন সব বস্তু ও কার্যকলাপ, যার ভিতরে রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং, গণিতবিদ্যা, রসায়ন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অপূর্ব পূর্ণতার নিদর্শন; কিন্তু সে জানে না, অসাধারণ সীমাহীন জ্ঞান- বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ কোন্ সে সত্তা চালিয়ে যাচ্ছেন সৃস্টির এসব কার্যকলাপ। ভাবা দরকার যে মানুষ জ্ঞানের প্রাথমিক স্তরের খবরও জানে না, কি করে তার দৃষ্টির সামনে উম্মুক্ত হবে সত্যিকার জ্ঞানের তোরণদ্বার? যতই চিন্তা-ভাবনা করুক, যতই অনুসন্ধান করুক, সে কোন দিকেই পাবে না সরল- সঠিক নির্ভরযোগ্য পথ, কেননা তার প্রচেষ্টার প্রারম্ভ ও সমাপ্তি সব স্তরেই দেখা যাবে অজ্ঞতার অন্ধকার।

কুফর একটি যুলুম, বরং সবচেয়ে বড় যুলুমই হচ্ছে এ কুফর। যুলুম কাকে বলে? যুলুম হচ্ছে কোন জিনিস থেকে তার সহজাত প্রকৃতির খেলাপ কাজ যবরদস্তি করে আদায় করে নেয়া? আগেই জানা গেছে যে, দুনিয়ায় যত জিনিস রয়েছে, সবাই আল্লাহর ফরমানের অনুসারী এবং তাদের সহজাত প্রকৃতি (ফিতরাত) হচ্ছে ‘ইসলাম’ অর্থাৎ আল্লাহর বিধানের আনুগত্য। মানুষের দেহ ও তার প্রত্যেকটি অংশ এ প্রকৃতির উপর জম্ম নিয়েছে। অবশ্যি আল্লাহ এসব জিনিসকে পরিচালনা করবার কিছুটা স্বাধীনতা মানুষকে দিয়েছেন, কিন্তু প্রত্যেকটি জিনিসের সহজাত প্রকৃতির দাবী হচ্ছে এই যে, আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে যেন কাজে লাগানো হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি ‘কুফর’ করছে সে তাকে লাগাচ্ছে তার প্রকৃতি বিরোধী কাজে। সে নিজের দিলের মধ্যে অপরের শ্রেষ্ঠত্ব, প্রেম ও ভীতি পোষণ করছে অথচ তার দিলের প্রকৃতি দাবী করছে যে, সে তার মধ্যে একমাত্র আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রেম ও ভীতি পোষণ করবে। সে তার অংগ-প্রত্যংগ আর দুনিয়ায় তার আধিপত্যের অধীন সব জিনিসকে কাজে লাগাচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা বিরোধী উদ্দেশ্য সাধনের জন্য, অথচ তাদের প্রকৃতির দাবী হচ্ছে তাদের কাছ থেকে আল্লাহর বিধান মুতাবিক কাজ আদায় করা। এমনি করে যে লোক জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রত্যেকটি জিনিসের উপর এমন কি, নিজের অস্তিত্বের উপর ক্রমাগত যুলুম করে যাচ্ছে, তার চেয়ে বড় যালেম আর কে হতে পারে?

‘কুফর’ কেবল যুলুমই নয়, বিদ্রোহ, অকৃতজ্ঞতা ও নেমকহারামিও বটে। ভেবে দেখা যাক, মানুষের আপন বলতে কি জিনিস আছে। নিজের মস্তিষ্ক সে নিজেই পয়দা করে নিয়েছে না আল্লাহ পয়দা করেছেন? নিজের দিল, চোখ, জিভ, হাত-পা, আর সব অংগ-প্রত্যংগ- সবকিছুর স্রষ্টা মানুষ না আল্লাহ? তার চারপাশে যত জিনিস রয়েছে, তার স্রষ্টা মানুষ না আল্লাহ এসব জিনিস মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ও কার্যকরী করে তৈরী করা এবং মানুষকে তা কাজে লাগাবার শক্তি দান করা কি মানুষের নিজের না আল্লাহর কাজ? সকলেই বলবে, আল্লাহরই এসব জিনিস, তিনিই এগুলো পয়দা করেছেন, তিনিই সব কিছুর মালিক এবং আল্লাহর দান হিসেবেই মানুষ আধিপত্য লাভ করেছে এসব জিনিসের উপর। আসল ব্যাপার যখন এই তখন যে লোক আল্লাহর দেয়া মস্তিষ্ক থেকে আল্লাহরই ইচ্ছার বিপরীত চিন্তা করার সুবিধা আদায় করে নেয়, তার চেয়ে বড় বিদ্রোহী আর কে? আল্লাহ তাকে চোখ, জিভ, হাত-পা, এবং আরো কত জিনিস দান করেছেন, তা সবকিছুই সে ব্যবহার করেছে আল্লাহর পছন্দ ও ইচ্ছা বিরোধী কাজে। যদি কোন ভৃত্ব তার মনিবের নেমক খেয়ে তার বিশ্বাসের প্রতিকূল কাজ করে যায়, তবে তাকে সকলেই বলবে নেমকহারাম। কোন সরকারী অফিসার যদি সরকারের দেয়া ক্ষমতা সরকারের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে থাকে, তাকে বলা হবে বিদ্রোহী। যদি কোন ব্যক্তি তার উপকারী বন্ধুর সাথে প্রতারণা করে সকলেই বিনা দ্বিধায় তাকে বলবে অকৃতজ্ঞ। কিন্তু মানুষের সাথে মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা ও অকৃতজ্ঞতার বাস্তবতা কতখানি? মানুষ মানুষকে আহার দিচ্ছে কোত্থেকে? সে তো আল্লাহরই দেয়া আহার। সরকার তার কর্মচারীদেরকে যে ক্ষমতা অর্পণ করে, সে ক্ষমতা এলো কোত্থেকে? আল্লাহই তো তাকে রাজ্য পরিচালনার শক্তি দিয়েছেন। কোন উপকারী ব্যক্তি অপরের উপকার করছে কোত্থেকে? সবকিছুই তো আল্লাহর দান। মানুষের উপর সবচেয়ে বড় হক বাপ-মার অন্তরে সন্তান বাৎসল্য উৎসারিত করেছেন কে? মায়ের বুকে স্তন দান করেছেন কে? বাপের অন্তরে কে এমন মনোভাব সঞ্চার করেছেন, যার ফলে তিনি নিজের কঠিন মেহনতের ধন সানন্দে একটা নিষ্ক্রিয় মাংসপিন্ডের জন্য লুটিয়ে দিচ্ছেন এবং তার লালন-পালন ও শিক্ষার জন্য নিজের সময়, অর্থ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কুরবান করে দিচ্ছেন? যে আল্লাহ মানুষের আসল কল্যাণকারী, প্রকৃত বাদশাহ, সবার বড় পরওয়ারদিগার, মানুষ যদি তার প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করে, তাকে আল্লাহ বলে না মানে, তার দাসত্ব অস্বীকার করে, আর তার আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে গুরুতর বিদ্রোহ, অকৃতজ্ঞতা ও নেমকহারামী আর কি হতে পারে।

কখনো মনে করা যেতে পারে না যে, কুফরি করে মানুষ আল্লাহর কোন অনিষ্ট করতে পারছে। যে বাদশাহর সাম্রাজ্য এত বিপুল-বিরাট যে, বৃহত্তম দূরবীন লাগয়েও আমরা আজো স্থির করতে পারিনি কোথায় তার শুরু আর কোথায় শেষ। যে বাদশাহ এমন প্রবল প্রতাপশালী যে, তার ইশারায় আমাদের এ পৃথিবী, সূর্য, মঙ্গলগ্রহ এবং আরো কোটি কোটি গ্রহ-উপগ্রহ বলের মতো চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যে বাদশাহ এমন অফুরন্ত সম্পদশালী যে, সারা সৃষ্টির আধিপত্যে কেহ তার অংশীদার নেই, যে বাদশাহ এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল যে, সবকিছুই তার মুখাপেক্ষী অথচ তিনি কারুর মুখাপেক্ষী নন, মানুষের এমন কি অস্তিত্ব আছে যে তাকে মেনে বা না মেনে সেই বাদশাহর কোন অনিষ্ট করবে? কুফর ও বিদ্রোহের পথ ধরে মানুষ তার কোন ক্ষতি করতে পারে না, বরং নিজেই নিজের ধ্বংসের পথ খোলাসা করে।

কুফর ও নাফরমানীর অবশ্যম্ভাবী ফল হচ্ছে এই যে, এর ফলে মানুষ চিরকালের জন্য ব্যর্থ ও হতাশ হয়ে যায়। এ ধরনের লোক জ্ঞানের সহজ পথ কখনো পাবে না, কারণ যে জ্ঞান আপন স্রষ্টাকে জানে না, তার পক্ষে আর কোন জিনিসের সত্যিকার পরিচয় লাভ অসম্ভব। তার বুদ্ধি সর্বদা চালিত হয় বাঁকা পথ ধরে, কারণ সে তার স্রষ্টার পরিচয় লাভ করতে গিয়ে ভুল করে, আর কোন জিনিসকেও সে বুঝতে পারে না নির্ভুলভাবে। নিজের জীবনের প্রত্যেকটি কার্যকলাপে তার ব্যর্থতার পর ব্যর্থতা অবধারিত। তার নীতিবোধ, তার কৃষ্টি, তার সমাজ ব্যবস্থা, তার জীবিকা অর্জন পদ্ধতি, তার শাসন-পরিচালনা ব্যবস্থা ও রাজনীতি, এক কথায় তার জীবনের সর্ববিধ কার্যকলাপ বিকৃতির পথে চালিত হতে বাধ্য। দুনিয়ার বুকে সে বিশৃংখলা সৃষ্টি করবে, খুন-খারাবি করবে, অপরের অধিকার হরণ করবে, অত্যাচার উৎপীড়ন করবে। বদখেয়াল, অন্যায়- অনাচার ও দুষ্কৃতি দিয়ে তার নিজের জীবনকেই করে তুলবে তিক্ত-বিস্বাদ। তারপর এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে সে যখন আখেরাতের দুনিয়ায় পৌঁছবে, তখন জীবনভর যেসব জিনিসের উপর সে যুলুম করে এসেছে, তারা তার বিরুদ্ধে নালিশ করবে। তার মস্তিষ্ক, তার দিল, তার চোখ, তার কান, তার হাত-পা এক কথায় তার সব অংগ-প্রত্যংগ আল্লাহর আদালতে অভিযোগ করে বলবেঃ এ আল্লাহদ্রোহী যালেম তার বিদ্রোহের পথে জবরদস্তি করে আমাদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিয়েছে। যে দুনিয়ার বুকে সে নাফরমানীর সাথে চলেছে ও হারাম পথে রোযগার করে হারামের পথে ব্যয় করেছে, অবাধ্যতার ভিতর দিয়ে যেসব জিনিস সে জবরদখল করেছে, যেসব জিনিস সে তার বিদ্রোহের পথে কাজে লাগিয়েছে, তার সবকিছুই ফরিয়াদী হয়ে হাযির হবে তার সামনে এবং প্রকৃত ন্যায় বিচারক আল্লাহ সেদিন মযলুমদের প্রতি অন্যায়ের প্রতিকারে বিদ্রোহীকে দিবেন অপমানকর শাস্তি।

ইসলামের কল্যাণ

এতো গেলো কুফরের অনিষ্টকারিতা। এবার আমরা দেখবো ইসলামের পথ ধরলে কি কি কল্যাণ লাভ করা যায়।

উপরের বর্ণনা থেকে জানা গেছে যে, এ দুনিয়ার প্রত্যেক দিকে ছড়িয়ে রয়েছে আল্লাহর কর্তৃত্বের অসংখ্য নিদর্শন। সৃষ্টির এ বিপুল বিরাট যে কারখানা চলছে এক সুম্পন্ন বিধান ও অটল কানুনের অধীন হয়ে, তাই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, তার স্রষ্টা ও পরিচালক এক মহাশক্তিমান শাসক-যাঁর ব্যবস্থাপনায় কেউ অবাধ্য হয়ে থাকতে পারে না। সমগ্র সৃষ্টির মত মানুষেরও প্রকৃতি হচ্ছে তার আনুগত্য। কাজেই অচেতনভাবে সে রাত-দিন তারই আনুগত্য করে যাচ্ছে, কারণ তার প্রাকৃতিক নিয়মের প্রতিকূল আচরণ করে সে বেঁচেই থাকতে পারে না।

কিন্তু আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান আহরণের যোগ্যতা, চিন্তা ও উপলব্ধি করার শক্তি এবং সৎ ও অসতের পার্থক্য বুঝবার ক্ষমতা দিয়ে তাকে ইচ্ছাশক্তি ও নির্বাচন ক্ষমতার কিছুটা আযাদী দিয়েছেন। আসলে এ আযাদীর ভিতরেই মানুষের পরীক্ষা, তার জ্ঞানের পরীক্ষা, তার যুক্তির পরীক্ষা, তার পার্থক্য অনুভূতির পরীক্ষা। এছাড়া তাকে যে আযাদী দেয়া হয়েছে, কিভাবে সে তা ব্যবহার করছে, তারও পরীক্ষা এর মধ্যে। এ পরীক্ষায় কোন বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করতে মানুষকে বাধ্য করা হয়নি, কারণ বাধ্যতা আরোপ করলে পরীক্ষার উদ্দেশ্যই হয় ব্যাহত। এ কথা প্রত্যেকেই বুঝতে পারে যে, প্রশ্নপত্র হাতে দেয়ার পর যদি পরীক্ষার্থীকে কোন বিশেষ ধরনের জবাব দিতে বাধ্য করা হয়, তাহলে সে ধরনের পরীক্ষা ফলপ্রসূ হয় না। পরীক্ষার্থীর আসল যোগ্যতা তা কেবল তখনই প্রমাণিত হবে, যখন তাকে প্রত্যেক ধরনের জবাব পেশ করবার স্বাধীনতা দেয়। সে সঠিক জবাব দিতে পারলে হবে সফল এবং আগামী উন্নতির দরজা খুলে যাবে তার সামনে। আর ভুল জবাব দিলে হবে অকৃতকার্য এবং অযোগ্যতার দরুন নিজেই নিজের উন্নতির পথ করবে অবরুদ্ধ। ঠিক তেমনি করেই আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে এ পরীক্ষায় যে কোন পথ অবলম্বন করার স্বাধীনতা দিয়েছেন।

এ ক্ষেত্রে এখন এক ব্যক্তির কথা বলা যায়, যে নিজের ও সৃষ্টির সহজাত প্রকৃতি উপলব্ধ করেনি, স্রষ্টার সত্ত্বা ও গুণরাজি চিনতে যে ভুল করেছে এবং মুক্তবুদ্ধির যে স্বাধীনতা তাকে দেয়া হয়েছে, তার সাহায্যে না-ফরমানী ও অবাধ্যতার পথ অবলম্বন করে চলেছে। এ ব্যক্তি জ্ঞান, যুক্তি, পার্থক্য-অনুভূতি ও কর্তব্য নিষ্ঠার পরীক্ষায় ব্যর্থকাম হয়েছে। সে নিজেই প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সে প্রত্যেক দিক দিয়েই নিকৃষ্ট স্তরের লোক। তাই উপরে বর্ণিত পরিণামই তার জন্য প্রতীক্ষা করছে।

অন্যদিকে রয়েছে আর এক ব্যক্তি, যে এ পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করেছে সে জ্ঞান ও যুক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে আল্লাহকে জেনেছে ও মেনেছে, যদিও এ পথ ধরতে তাকে বাধ্য করা হয়নি। সৎ ও অসতের মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে সে ভুল করেনি এবং নিজস্ব স্বাধীন নির্বাচন ক্ষমতা দ্বারা সে সৎ পথই বেছে নিয়েছে, অথচ অসৎ পথের দিকে চালিত হবার স্বাধীনতা তার ছিল। সে আপন সহজাত প্রকৃতিকে উপলব্ধি করেছে, আল্লাহকে চিনেছে এবং না-ফরমানীর স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর আনুগত্যের পথ অবলম্বন করেছে। সে তার যুক্তিকে ঠিক পথে চালিত করেছে। চোখ দিয়ে ঠিক জিনিসই দেখেছে, কান দিয়ে ঠিক কথা শুনেছে, মস্তিষ্ক চালনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত করেছে বলেই পরীক্ষায় সে সাফল্য-গৌরবের অধিকারী হয়েছে। সত্যকে চিনে নিয়ে সে প্রমাণ করেছে যে, সত্য সাধক এবং সত্যের সামনে মস্তক অবনত করে দেখিয়েছিল যে, সে সত্যের পূজারী।

এ কথায় সন্দেহ নেই যে, যার মধ্যে এসব গুণরাজির সমাবেশ হয়, সে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় ক্ষেত্রেই সাফল্যের অধিকারী হয়ে থাকে।

এ শ্রেণীর লোক জ্ঞান ও যুক্তির প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সঠিক পথ অবলম্বন করবে, কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর সত্তাকে উপলব্ধি করেছে এবং তার গুণরাজির পরিচয় লাভ করেছে, সেই জ্ঞানের সূচনা থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত সবকিছুই জেনেছে এ ধরনের লোক কখনো বিভ্রান্তির পথে চলতে পারে না, কারণ শুরুতেই সে পদক্ষেপ করেছে সত্যের দিকে এবং তার সর্বশেষ গন্তব্য লক্ষ্যকেও সে জেনে নিয়েছে পূর্ণ বিশ্বাস সহকারে। এরপর সে দার্শনিক চিন্তা ও অনুসন্ধানের মারফতে সৃষ্টি রহস্য উদঘাটন করবার চেষ্টা করবে, কিন্তু কাফের দার্শনিকের মতো কখনো সংশয়-সন্দেহের বিভ্রান্তি-স্তূপের মধ্যে নিমজ্জিত হবে না। বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সে প্রাকৃতিক নিয়মকে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করবে, সৃষ্টির লুক্কায়িত ধনভান্ডারকে নিয়ে আসবে প্রকাশ্য আলোকে। দুনিয়ায় ও মানুষের দেহে আল্লাহ যে শক্তিসমূহ সৃষ্টি করে দিয়েছেন, তার সবকিছুরই সন্ধান করে সে জেনে নেবে। যমীন ও আসমানে যত পদার্থ রয়েছে, তার সব কিছুকেই কাজে লাগাবার সর্বোত্তম পন্থার সন্ধান সে করবে, কিন্তু আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠা তাকে প্রতি পদক্ষেপে ফিরিয়ে রাখবে বিজ্ঞানের অপব্যবহার থেকে। আমিই এসব জিনিসের মালিক, প্রকৃতিকে আমি জয় করেছি, নিজের লাভের জন্য আমি জ্ঞানকে কাজে লাগাব, দুনিয়ায় আনব ধ্বংস-তান্ডব, লুট-তরাজ ও খুন-খারাবী করে সারা দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠা করব আমার শক্তির আধিপত্য, এ জাতীয় বিভ্রান্তিকর চিন্তায় সে কখনো নিমজ্জিত হবে না। এ হচ্ছে কাফের বিজ্ঞানীর কাজ। মুসলিম বিজ্ঞানী যত বেশী করে বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব অর্জন করবে, ততোই বেরে যাবে আল্লাহর প্রতি তার বিশ্বাস এবং ততোই সে আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দায় পরিণত হবে। তার মনোভাব হবেঃ আমার মালিক আমায় যে শক্তি দিয়েছেন এবং যেভাবে আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিয়েছেন, তা থেকে আমার নিজের ও দুনিয়ার সকল মানুষের কল্যাণ সাধনের চেষ্টা আমি করবো। এ হচ্ছে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সঠিক পথ।

অনুরূপভাবে ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যবিধ শাখায় মুসলিম তার গবেষণা ও কর্মতৎপরতার দিক দিয়ে কাফেরের পিছনে পড়ে থাকবে না, কিন্তু দু’জনের দৃষ্টিভংগি হবে স্বতন্ত্র। মুসলিম প্রত্যেক জ্ঞানের চর্চা করবে নির্ভুল দৃষ্টিভংগি নিয়ে, তার সামনে থাকবে এক নির্ভুল লক্ষ্য এবং সে পৌঁছবে এক নির্ভুল সিদ্ধান্তে। ইতিহাসে মানব জাতির অতীত দিনের পরীক্ষা থেকে সে গ্রহণ করবে শিক্ষা, খুঁজে বের করবে জাতিসমূহের উত্থান-পতনের সঠিক কারণ, অনুসন্ধান করবে তাদের তাহযীব তামাদ্দুনের কল্যাণকর দিক। ইতিহাসে বিবৃত সৎ মানুষের অবস্থা আলোচনা করে সে উপকৃত হবে। যেসব কারণে অতীতের বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে, তা থেকে বেচে থাকবে। অর্থনীতি ক্ষেত্রে অর্থ উপার্জন ও ব্যয়ের এমন অভিনব পন্থা সে খুঁজে বের করবে, যাতে সকল মানুষের কল্যাণ হতে পারে, কেবল একজনের কল্যাণ ও অসংখ্য মানুষের অকল্যাণ তার লক্ষ্য হবে না। রাজনীতি ক্ষেত্রে তার পরিপূর্ণ মনোযোগ থাকবে এমন এক লক্ষ্য অর্জনের দিকে যাতে দুনিয়ায় শান্তি, ন্যায়-বিচার, সততা ও মহত্বের রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কোন ব্যক্তি বা দল আল্লাহর বান্দাহদেরকে নিজের বান্দায় পরিণত করতে না পারে, শাসন ক্ষমতা ও সম্পূর্ন শক্তিকে আল্লাহর আমানত মনে করা হয় এবং তা ব্যবহার করা হয় আল্লাহর বান্দাদের কল্যাণে। আইনের ক্ষেত্রে সে বিবেচনা করবে, যাতে ন্যায় ও সুবিচারের সাথে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা যায় এবং কোন প্রকারে কারুর উপর যুলুম হতে না পারে।

মুসলিম চরিত্রে থাকবে আল্লাহ ভীতি, সত্যনিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়নতা। সবকিছুরই মালিক আল্লাহ, এ ধারণা নিয়ে সে বাস করবে দুনিয়ার বুকে। আমার ও দুনিয়ায় মানুষের দখলে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর দান। কোন জিনিসের এমন কি আমার নিজের দেহের ও দেহের শক্তির মালিকও আমি নিজে নই। সবকিছুই আল্লাহর আমানত এবং এ আমানত থেকে ব্যয় করবার যে স্বাধীনতা আমায় দেয়া হয়েছে, আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী তা প্রয়োগ করাই হচ্ছে আমার কর্তব্য। একদিন আল্লাহ তা’আলা আমার কাছ থেকে এ আমানত ফেরত নেবেন এবং সেদিন প্রত্যেকটি জিনিসের হিসেব দিতে হবে।

এ ধারণা নিয়ে যে ব্যক্তি দুনিয়ায় বেঁচে থাকে, তার চরিত্র সহজেই অনুমান করা যায়। কুচিন্তা থেকে সে তার মনকে মুক্ত রাখবে, মস্তিষ্ককে দুষ্কৃতির চিন্তা থেকে বাঁচিয়ে রাখবে, কানকে সংরক্ষণ করবে অসৎ আলোচনা শ্রবণ থেকে, কারোর প্রতি কুদৃষ্টি দেয়া থেকে চোখকে সংরক্ষণ করবে, জিহবাকে সংরক্ষণ করবে অসত্য উচ্চারণ থেকে। হারাম জিনিস দিয়ে পেট ভরার চেয়ে উপবাসী থাকাই হবে তার কাম্য। যুলুম করার জন্য সে কখনো তুলবে না তার হাত। সে কখনো তার পা চালাবে না অন্যায়ের পথে। মাথা কাটা গেলেও সে তার মাথা নত করবে না মিথ্যার সামনে। যুলুম ও অসত্যের পথে সে তার কোন আকাংখা ও প্রয়োজন মিটাবে না। তার ভিতর হবে সততা ও মহত্বের সমাবেশ। সত্য ও ন্যায়কে সে দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে অধিকতর প্রিয় মনে করবে এবং তার জন্য সে তার সকল স্বার্থ ও অন্তরের আকাংখা, এমন কি নিজস্ব সত্তাকে পর্যন্ত কুরবান করে দেবে। যুলুম ও অন্যায়কে সে ঘৃণা করবে সবচেয়ে বেশী এবং কোন ক্ষতির আশংকায় অথবা লাভের লোভে তার সমর্থন করতে অগ্রসর হবে না। দুনুয়ার সাফল্যও এ শ্রেণীর লোকই অর্জন করিতে পারে।

যার শির আল্লাহ ছাড়া আর কারুর কাছে অবনত হয় না, যার হাত আল্লাহ ছাড়া আর কারুর সামনে প্রসারিত হয় না, তার চেয়ে বেশী সম্মনের অধিকারী, তার চেয়ে বেশী সম্ভ্রান্ত আর কে হতে পারে? অপমান কি করে তার কাছে ঘেষবে?

যার দিলে আল্লাহ ছাড়া আর কারুর ভীতি স্থান পায় না, আল্লাহ ছাড়া আর কারুর কাছে সে পুরস্কারের ও ইনামের প্রত্যাশা করে না, তার চেয়ে বড় শক্তিমান আর কে? কোন শক্তি তাকে বিচ্যুত করতে পারে সত্য-ন্যায়ের পথ থেকে, কোন সম্পদ খরিদ করতে পারে তার ঈমানকে?

আরাম-পূজারী যে নয়, ইন্দ্রিয়পরতার দাসত্ব যে করে না, বল্গাহারা লোভী জীবন যার নয়, নিজ সৎ পরিশ্রম লব্ধ উপার্জনে যে খুশী, অবৈধ সম্পদের স্তুপ যার সামনে এলে সে ঘ্রীনাভরে উপেক্ষা করে, মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ শান্তি ও সন্তোষ যে লাভ করেছে, দুনিয়ায় তার চেয়ে বড় ধনী, তার চেয়ে বড় সম্পদশালী আর কে?

যে ব্যক্তি পত্যেক মানুষের অধিকার স্বীকার করে নেয়, কাউকে বঞ্চিত করে না তার ন্যায্য অধিকারে; প্রত্যেক মানুষের সাথে যে করে সদাচরণ, অসদাচরণ করে না কারুর সাথে, বরং প্রত্যেকেরই কল্যাণ প্রচেষ্টা যার কাম্য, অথচ তার প্রতিদানে সে কিছু চায় না, তার চেয়ে বড় বন্ধু ও সর্বজন প্রিয় আর কে হতে পারে? মানুষের মন আপনা থেকেই ঝুঁকে পড়ে তার দিকে, প্রত্যেকটি মানুষই বাধ্য হয় তাকে সম্মান ও প্রীতি দিয়ে কাছে টেনে নিতে।

তার চেয়ে বেশী বিশ্বস্ত দুনিয়ায় আর কেউ হতে পারে না, কারণ সে কারুর আমানত বিনষ্ট করে না, ন্যায়ের পথ থেকে মুখ ফিরায় না। প্রতিশ্রুতি পালন করে এবং আচরণের সততা প্রদর্শন করে, আর কেউ দেখুক আর না দেখুক আল্লাহ তো সবকিছুই দেখছেন, এ ধারণা নিয়ে সে সবকিছুই করে যাচ্ছে ঈমানদারীর সাথে। এমন লোকের বিশ্বস্ততা সম্পর্কে কে প্রশ্ন তুলবে, কে তার উপর ভরসা না করবে?

মুসলিম চরিত্র ভাল করে বুঝতে পারলেই বিশ্বাস করা যেতে পারে যে, দুনিয়ায় মুসলিম কখনো অপমানিত, বিজিত ও অপরের হুকুমের তাবেদার হয়ে থাকতে পারে না। সবসময়েই সে থাকবে বিজয়ী ও নেতা হয়ে, কারণ ইসলাম তার ভিতর যে গুণের জম্ম দিয়েছে তার উপর কোনো শক্তিই বিজয়ী হতে পারে না।

এমনি করে দুনিয়ায় ইজ্জত ও সম্মানের সাথে জীবন অতিবাহিত করে যখন সে তার প্রভুর সামনে হাযির হবে, তখন তার উপর বর্ষিত হবে আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ ও রহমাত, কারণ যে আমানত আল্লাহ তার নিকট সোপর্দ করেছিলেন, সে তার পরিপূর্ণ হক আদায় করেছে এবং আল্লাহ যে পরীক্ষায় তাকে ফেলেছেন, সে কৃতিত্বের সাথে তাতে পরিপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। এ হচ্ছে চিরন্তন সাফল্য যার ধারাবাহিক চলে আসে দুনিয়া থেকে আখেরাতের জীবন পর্যন্ত এবরং তার ধারা কখনো হারিয়ে যায় না।

এ হচ্ছে ইসলাম–মানুষের স্বাভাবধর্ম। কোন জাতি বা দেশের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নয় এ বিধান। সকল যুগে সকল জাতির মধ্যে ও সকল দেশ যেসব আল্লাহ পরস্ত ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ অতীত হয়ে গেছেন, তাদের ধর্ম– তাদের আদর্শ ছিলো ইসলাম। তারা ছিলেন মুসলিম- হয়তো তাদের ভাষায় সে ধর্মের নাম ইসলাম অথবা অপর কিছু ছিলো।

 

Top