হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ – ১ম খন্ড

Slide145

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ – ১ম খন্ড

শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহঃ)

অনুবাদঃ অধ্যাপক আখতার ফারুক

এম, এম, এম, এ


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

সূচীপত্র

বিষয়ঃ

(ক) গ্রন্থকার পরিচিতি

(খ) গ্রন্থের উদ্দেশ্য

১। প্রাক-প্রারম্ভিকা

২। প্রারম্ভিকা

৩। প্রথম খণ্ডঃ প্রথম পরিচ্ছেদ

৪। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ, আলম-ই মিছাল

৫। তৃতীয় পরিচ্ছেদ, মালা-ই আলা

৬। চতুর্থ পরিচ্ছেদ, আল্লাহর অনড় বিধান

৭। পঞ্চম পরিচ্ছেদ, প্রাণের রহস্য

৮। দায়িত্ব তত্ত্ব

৯। দায়িত্ব মানুষের বিধি লিপি

১০। দায়িত্বই প্রতিদান চায়

১১। বিভিন্ন স্বভাবের বিচিত্র মানুষ

১২। কর্ম প্রেরণার উৎস

১৩। যার কাজ তার সাথেই থাকে

১৪। কাজের সাথে স্বভাবের সংযোগ

১৫। শাস্তি ও পুরস্কারের কারণ

১৬। পার্থিব ও অপার্থিব শাস্তি-পুরস্কারের রূপরেখা

১৭। পার্থিব শাস্তি ও পুরস্কার

১৮। মৃত্যু রহস্য

১৯। কবরে মানুষের অবস্থা

২০। বিচার জগতের তত্ত্বকথা

২১। মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন

২২। সংগঠন উদ্ভাবন পদ্ধতি

২৩। প্রথম সংগঠন

২৪। জীবিকা পদ্ধতি ত

২৫। পারিবারিক ব্যবস্থা

২৬। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

২৭। রাজনীতি

২৮। রাষ্ট্রপতিগণের চরিত্র ও গুণাবলী

২৯। পরামর্শ পরিষদ ও কর্মককর্তাদের গুণাবলী ও দায়িত্ব

৩০। আন্তঃরাষ্ট্রিক নীতিমালা

৩১। সার্বজনীন মানবিক মৌলনীতি

৩২। মানব সমাজে প্রচলিত রীতি-নীতি

৩৩। মানবিক বৈশিষ্ট্য, বৈশিষ্ট্যের তাৎপর্য

৩৪। মানবিক বৈশিষ্ট্যের তারতম্য

৩৫। বৈশিষ্ট্য অর্জনে মানবের বিভিন্ন পদ্ধতি

৩৬। বৈশিষ্ট্যের দ্বিতীয় পদ্ধতি অর্জনের নীতিমালা

৩৭। স্বভাব চতুষ্টয় অর্জন, অপূর্ণত্ব পূর্ণ করা ও হৃত বস্তু উদ্ধার করার পদ্ধতি

৩৮। মানবিকতা বিকাশের অন্তরায়

৩৯। অন্তরায় দূর করার পথ

৪০। পাপ-পূণ্যের বিবরণ

৪১। তওহীদ

৪২। শিরকের হাকীকত

৪৩। শিরকের প্রকারভেদ

৪৪। আল্লাহর গুণাবলীর ওপর ঈমান

৪৫। তাকদীরে বিশ্বাস

৪৬। ইবাদতের উপর ঈমান

৪৭। আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন

৪৮। ওযু ও গোসলের রহস্য

৪৯। নামাযের হাকীকত

৫০। যাকাতের হাকীকত

৫১। রোজার হাকীকত

৫২। হজ্জের হাকীকত

৫৩। বিভিন্ন পূণ্যের হাকীকত

৫৪। পাপের বিভিন্ন স্তর

৫৫। পাপের কুফল

৫৬। ব্যক্তিগত পাপ

৫৭। সামাজিক পাপ

৫৮। জাতি-ধর্মের ব্যবস্থাপনা, ধর্মীয় সম্প্রদায় ও ধর্মন্যায়কদের প্রয়োজন ও গুরুত্ব

৫৯। নবুওয়াতের হাকীকত

৬০। দ্বীন এক, শরীয়ত বিভিন্ন

৬১। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন জাতির কাছে ভিন্ন ভিন্ন শরীয়ত প্রেরণের রহস্য

৬২। শরীয়তের জন্যে জবাবদিহির কারণ

৬৩। কলা-কৌশল ও কার্যকারণ রহস্য

অনুবাদকের আরজ

ইসলামী দুনিয়ার একটি অবিস্মরণীয় নাম হচ্ছে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী। আর ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ হল তাঁর এক অবিনশ্বর কীর্তি। এ মহাগ্রন্থ শুধু মুসলিম জাহানেই নয়, সারা বিশ্বে এক মহা বিস্ময় হয়ে আছে। এ মহাগ্রন্থের মহান গ্রন্থকার কে ছিলেন তা বলা সহজ, কিন্তু কি ছিলেন তা অনুধাবন করা এ অধম তো দূরে, কোন উত্তমের পক্ষেও নিতান্তই দুরূহ ব্যাপার। তাই তাঁর গ্রন্থের ভাষান্তর ব্রতটি যে স্বতঃসিদ্ধ এক দুঃসাধ্য সাধনা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

আল্লাহ পাকের লাখ লাখ শুকরিয়া যে, তিনি এ অধম বান্দাকে  সেই দুঃসাধ্য সাধনার দুঃসাহস দান করেছেন আর তাওফিক দিয়েছেন তার পয়লা পর্ব সমাপ্ত করার। তাই তাঁরই সমীপে এ অধমের ঐকান্তিক প্রার্থনা, যেন তিনি এর দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত করার তাওফিকও এ অধমকে এনায়েত করেন।

ওয়ামা তাওফিকী ইল্লা বিল্লাহ।

অসংখ্যদরূদ ও সালাম সেই মহানবী (সঃ)-এর উদ্দেশ্যে যে মহাজ্যোতিস্কের অপূর্ব জ্যোতি প্রভায় উপ-মহাদেশে এ বিস্ময়কর জ্যোতিষ্কের আবির্ভাব ঘটেছে। মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর আল-আসহাবের ওপরও এ অধমের দরূদ ও ছালাম পৌঁছে দিন। আমীন।

বস্তুতঃ ‘ফালিল্লাহিল হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতিটি বাণী ও বিধানই যে অকাট্য দলীল-প্রমাণ ধ্বারা প্রতিষ্ঠিত তাঁর জ্বলন্ত স্বাক্ষর বয়ে চলছে হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ। তাঁর লৌকিক কি পারলৌকিক, জৈবিক কি আত্মিক কোন বাণী ও বিধানই যে অযৌক্তিক ও অবাস্তব নয় এ মহা গ্রন্থের প্রতিটি পাতায় তার বলিষ্ঠ প্রমাণ যথার্থ ঈমানদার, আমলদার, এমন কি সম্ভবতঃ আল্লাহ ওয়ালায় পরিণত করতে সক্ষম।

তবে কথা হচ্ছে, লাখো গুরুর যিনি গুরু তাঁর গ্রন্থ স্বভাবতঃই গুরুজনদের জন্যে লিখেছেন যেন গুরুজনরা তা অনুধাবন করে লঘুজনদের পথনির্দেশ  করেন। তাই লঘুজনরা যে সরাসরি এ গ্রন্থ হজম করতে পারবেন তা আশা করাই বাতুলতা মাত্র। এ কারণেই আশা করি লঘুজনরা  গুরুজনদের মাধ্যম ছাড়া কখনও এ গ্রন্থ  গলাধঃকরণ করতে গিয়ে জটিলতার শিকার হবেন না।

আধুনিক বিশ্বের এটাই বিস্ময় যে, দু’শ বছর আগের এক জ্ঞানতাপস কি করে একালের জটিল সমাজ বিজ্ঞান, রাষ্ট্র বিজ্ঞান ও অর্থনীতির এরূপ অত্যাধুনিক বিশ্লেষণ ও নীতিমালা দিয়ে গেলেন। আর কি করেই বা তিনি একালের প্রাত্যাহিক জটিল সমস্যাগুলোর এরূপ স্থায়ী  সমাধান আবিস্কার করলেন। জ্ঞানের জগতে এরূপ অভাবনীয় দূরদর্শিতার নজীর তাদের সামজে আজও অনুপস্থিত।

শরীয়তের ছোট-বড় প্রতিটি বিধানই যে মানবকুলের জন্যে অশেষ কল্যাণপ্রদ ও তাদের সকল ব্যাধি নিরসনের অমোঘ বিধান তা এত অকাট্যভাবে এ গ্রন্থে উপস্থাপন করা হয়েছে যা এ কালের তর্কশাস্ত্রের মহাপণ্ডিতরাও খণ্ডন করতে পারবেন না। আল্লাহর দ্বীন কবুল করার তাওফিক যার হয়নি তাকেও এ গ্রন্থ মানিয়ে ছাড়বে যে, মূলতঃ এ দ্বীনই সত্য দ্বীন। হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগার এটাই শ্রেষ্ঠতম সাফল্য।

মালা-এ-আ’লার সর্বোচ্চপরিমণ্ডল পরিবৃত্ত অবস্থায় যে মহাগ্রন্থ রচিত হয়েছে মালা-এ আসফালের সর্বনিম্ন পরিমণ্ডলের এ অধম বাসিন্দা তার কতটুকু মর্ম উদ্ধার করতে পেরেছে তা আল্লাহই ভাল জানেন। তবে সান্ত্বনা এই যে, যথাসাধ্য চেষ্টার ত্রুটি হয়নি। তাই বলছি, এক মহামানবের এ মহান গ্রন্থের কিছুমাত্র মর্ম উদ্ধার করে ও যদি জাতিকে উপহার দিতে সমর্থ হয়ে থাকি, তার সব কৃতিত্বই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের। পক্ষান্তরে এ ক্ষেত্রে যা কিছু ব্যর্থতা ও ভুল-ভ্রান্তি তার সব দায়-দায়িত্ব একান্তই আমার, তাই অনুরোধ, কোন সহৃদয় গুরুজন যদি এ ক্ষেত্রে আমাকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন তা হলে সানন্দে ও সকৃতজ্ঞ চিত্তে তা গ্রহণ করা হবে।

আল্লাহ পাক এ গ্রন্থকেও মূল গ্রন্থের কমবুলিয়াত ও বরকত দান করুন এটাই আমার একমাত্র প্রার্থনা। আমীন।

আহকার

আখতার ফারুক

 

গ্রন্থকার পরিচিতি

পটভূমিঃ

খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেই ইসলামের আওয়াজ ভারত উপমহাদেশে পৌঁছেছিল।

প্রাচীনকাল থেকেই আরব ব্যবসায়ীগণ ভারত উপমহাদেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখত। বিশেষতঃ শ্রীলঙ্কা ও উপমহাদেশের পশ্চিম উপকূলীয় এলাকাগুলোর সাথে আরবদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। এ পথেই সুদূর চীন পর্যন্ত তাদের বাণিজ্যিক নৌবহর যাতায়াত করত।

উপমহাদেশে শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্কের মাধ্যমেই ইসলাম আসেনি; বরং হযরত উমর ফারুক (রাঃ)-এর যুগেই এদেশে মুসলমানদের সামরিক অভিযান শুরু হয়। অতঃপর ৯২ হিজরীতে মুহাম্মদ ইবনে কাসিম সিন্ধু জয় করে উমাইয়া খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত করেন। উমাইয়া ও আব্বাসীয় খেলাফতের সময়ে উপমহাদেশের পশ্চিম অঞ্চলের সিন্ধু, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশ পর্যন্ত মুসলমানদের সামরিক তৎপরতা সীমাবদ্ধ ছিল। আব্বাসীয় খেলাফতের শেষভাগে সুলতান মাহমুদ বারংবার অভিযান চালিয়ে পশ্চিম ও উত্তর ভারতের বিশাল এলাকা দখল করেন।

মাহমুদ গজনভীর শাসন কালের পর মুহাম্মদ ঘোরীর শাসন শুরু হয়। মুহাম্মদ ঘোরী বারংবার অভিযান চালিয়ে উপমহাদেশের অধিকাংশ এলাকা জয় করেন। অতঃপর দাস, খিলজী ও লোদী বংশের শাসনামলে সর্ব ভারতে মুসলিম শাসনের জয় ডংকা নিনাদিত হয়। পরিশেষে মোঘল শাসনামলে গোটা উপমহাদেশ ইসলামী শাসনের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। অবশেষে সম্রাজ আলমগীরের সময়ে সাম্রাজ্যের চরম বিস্তৃতি ঘটে। কিন্তু তাঁর পরবর্তী সম্রাটদের দুর্বলতার কারণে মোঘল শাসনের পতন শুরু হয়। এমনকি শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহের হাত থেকে শাসন ক্ষমতা ইংরেজের হাতে চলে যায়।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভী (রঃ) মোগল সম্রাটদের এই পতনকলের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তখন চারদিকে বিদ্রোহ ও হাংগামা চলছিল। রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাঙ্গনের সর্বত্রই এক নৈরাজ্যকর অবস্থা চলছিল। চারদিকে জুলুম, শোষণ ও অস্থিরতা বিরাজ করছিল। ঠিক এমনি এক মুহুর্তে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভী (রঃ) এক প্রভাতী সূর্যের ন্যায় আবির্ভূত হলেন। তিনি ইসলামকে বিকৃতির হাত থেকে মুক্ত করলেন। রাজনীতিকে ইসলামের সেবক ও ইসলামপন্থীদের শৌর্যের প্রতীকরূপে প্রতীয়মান করালেন।

নামঃ

হুজ্জাতুল ইসলাম শায়েখ কুতুবুদ্দিন আহমত ওরফে মাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভী ইবনে শায়েখ আবদুর রহীম ইবনে শায়েখ ওয়াজিহ উদ্দীন ইবনে শায়েখ মুয়াজ্জিম ইবনে শায়েখ মানসুর ইবনে শায়েখ কামালুদ্দিন ছানী ইবনে শায়েখ কাজী কাসেম ইবনে শায়েখ কাজী বুধা ইবনে শায়েখ আবদুল মালেক ইবনে শায়েখ কুতুবুদ্দীন ইবনে শায়েখ কামালুদ্দিন (আউয়াল) ইবনে শায়েখ শামসুদ্দীন মুফতী ইবনে শের মালিক ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবুল ফাতাহ ইবনে উমর ইবনে আদিল ইবনে ফারূক ইবনে জার্জিস ইবনে আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে উসমান ইবনে মাহান ইবনে হুমায়ুন ইবনে কুরায়েশ ইবনে সুলায়মান ইবনে আফফান ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে খাত্তাব আল কুরায়শী।

শাহ সাহেব (রাঃ) তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ “তাফহীমাতে এলাহীয়ার” দ্বিতীয় খণ্ডে বলেনঃ

আমার মুহতারাম আব্বা (শায়েখ আবদুর রহীম) ছিলেন জাহেরী ও বাতেনী ইলমে পরিপূর্ণ। তিনি ছিলেন এক আরিফ বিল্লাহ ওলী। ঘটনাক্রমে তিনি একবার শায়েখ কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রাঃ)-এর মাজার জিয়ারত করতে গেলেন। শয়েখ বখতিয়ার কাকী (রাঃ) তাঁর সাথে কথাবার্তা বললেন। তিনি আব্বাকে একটি সন্তানের সুসংবাদ দিলেন। সন্তানটি তাঁর ঘরেই জন্ম নেবে। তিনি তাঁকে নির্দেশ দিলেন ছেলের নাম রাখবে কুতুবুদ্দীন। অতঃপর যখন আমার জন্ম হল, আল্লাহ পাক তাঁকে কুতুবুদ্দিন নাম রাখার ব্যাপারটি ভুলিয়ে দিলেন। ওয়ালিউল্লাহ। পরে অবশ্য কুতুবুদ্দীন নামও রেখেছিলেন। শাহ সাহেব (রঃ) ফারূকী খান্দানের লোখ। তাই ইসলামের শুরু থেকেই তারা ইসলামী শিক্ষা ও রাজনীতির সমন্বয়কারী হিসেবে চলে আসছেন। তাঁদের বংশে বীরত্ব, বদান্যতা, জ্ঞান ও মর্যাদায় খ্যাতিমান বহু ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে।

তাঁর খান্দানের ভেতর সর্বপ্রথম উপমহাদেশে আগমন করেন শায়েখ শামসুদ্দীন মুফতী। তিনি দিল্লী থেকে ত্রিশ মাইল দূরে অবস্থিত এক ক্ষুদ্র শহরে এসে অবস্থান নেন। তিনি অত্যন্ত উঁচু দরের আলেম, জাহেদ ও পরহেজগার বুযুর্গ ছিলেন। ইসলামের প্রচার-প্রসার কল্পে তিনি সেখানে একটি দ্বীনি মাদ্রাসা কায়েম করেন এবং দ্বীনের প্রচার কার্যে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর সময়ে দিল্লী ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় তাঁকেই সবাই ধর্মীয় ও রাজণৈতিক পথপ্রদর্শক ভাবত। ফলে পার্থিব ঝগড়া-বিবাদের কাজী ও দ্বীনি মাসায়েলের মুফতী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করতেন।

তাঁর পর থেকে শায়েখ ‌মাহমুদ ইবনে কাওয়ামুদ্দীন পর্যন্ত কাজীর দায়িত্বভার তাঁদের হাতেই ছিল। তবে শায়খ মাহমুদ তা পরিত্যাগ করে সেনা বিভাগে যোগ দেন। শাহ সাহেব (রঃ)-এর দাদা পর্যন্ত তাঁর পূর্বপুরুষজরা জেহাদের ময়দানেই দ্বীনের শান-শওকত বৃদ্ধির কাজে নিয়োজিত থাকেন। কাফের-মোশরেকের বিরুদ্ধে জেহাদে লিপ্ত থাকাকেই তাঁরা পেশা করে নিয়েছিলেন। তাঁর দাদা শায়েখ ওয়াজিহুদ্দীন আজীবন রণাঙ্গণে কাটিয়েছেন। এমনকি মোগল সম্রাট মহিউদ্দীন মুহাম্মদ আলমগীরের সময়ে তিনি জেহাদের ময়দানে শাহাদাত বরণ করেন।

শায়েখ ওয়াজিহুদ্দীনের তিন ছেলে ছিল, তারা হলেন শায়েখ আবু রেজা মুহাম্মদ, শায়েক আব্দুল হাকীম ও শায়েখ আবদুর রহীম। শাহসাহেবের পিতা শায়েখ আবদুল হাকীম ও শায়েখ আবদুর রহীম। শাহ সাহেবের পিতা শায়েখ আবদুর রহীম ১০৬৪ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কুরআন শরীফ, নাহু, সরফ ও অন্যান্য প্রারম্ভিক শিক্ষার কিতাবাদি তার বড় ভাই শায়েখ আবু রেজা মুহাম্মদের কাছে পড়েন। পরবর্তী স্তরে তিনি আল্লামা মীর মোহাম্মদ জাহেদের কাছে জ্ঞানার্জন করেন। এমনকি কিতাবী ও তাত্ত্বিক জ্ঞানে তিনি এরূপ পারদর্শী হলেন যে, তিনি অনতিকালের ভেতর এ উভয়বিধ জ্ঞান বিতরণের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ালেন। সম্রাট-আলমগীর জিন্দাপীরের উদ্যোগে প্রণীত “ফতোয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের তিনি সম্পাদনতা ও শুদ্ধিকরণের দায়িত্ব পালন করেন। বাদশাহ আলমগীর তাঁর প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ ছিলেন।

শরীয়ী মাজহাদের দিক থেকে তিনি হানাফী ছিলেন। তাসাওফের ক্ষেত্রে তিনি নকশবন্দী তরীকার অনুসারী ছিলেন। অবশ্য দলীলের শক্তি ও প্রাধান্যের কারণে কখনও হানাফী মজহাবের বাইরেও ফতোয়া দিতেন। ১১৩১ খৃষ্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন।

জন্মঃ

শাহ ওয়ালীউল্লাহ মোহাদ্দেসে দেহলভী (রঃ) ১১৬৪ হিজরীর ১৪ই শাওয়াল বুধবার দিল্লীতে জন্ম গ্রহণ করেন। অর্থাৎ ১৭০৪ খৃষ্টাব্দে তাঁর জন্ম হয়। শায়েখ আবদুর রহীম (রঃ)-এর জীবনচরিত “বাওয়ারিফুল মারিফাত” গ্রন্থে শাহওয়ালিউল্লাহ (রঃ)-এর জন্মকাল ও তার প্রাক্কালের এমনসব ঘটনাবলীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যাতে তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের লক্ষণ প্রকাশ পায়।

শিক্ষা জীবনঃ

পাঁচ বছর বয়সেই কুরআন শিক্ষার জন্যে তাঁকে মকতবে ভর্তি করা হয়। সাত বছর হতেই তিনি কুরআনের হাফেজ হলেন। সে বছরেই তাঁর আব্বা তাঁকে রোযা রাখার নির্দেশ দেন। এমনকি ইসলামের অন্যান্য বিধি-বিধানও যথাযথভাবে আমল করার জন্যে উপদেশ দেন।

সাত বছর বয়স থেকেই তিনি ফার্সী কিতাব অনায়াসে পড়ার যোগ্যতা হাসিল করেন। এক বছরে ফার্সী শেষ করে নাহু, সরফ সম্পর্কিত গ্রন্থাদি পড়া শুরু করেন। দশ বছর বয়সে তিনি শরহে মোল্লা জামী আয়ত্ত করেন। মোটকথা মাত্র তিন বছরে তিনি নাহু-সরফে এরূপ পারদর্শী হলেন যে, উক্ত বিষয়ের বিশেষজ্ঞগণ পর্যন্ত তাঁর সামনে এসে মাথা নত করতে বাধ্য হতেন।

তিনি লোগাত, তফসীর, হাদীস, ফিকাহ, তাসাওফ, আকায়েদ, মানতেক, চিকিৎসা শাস্ত্র, দর্শন, অংক শাস্ত্র, জ্যোতি বিজ্ঞান ইত্যাদি শিখেন। মাত্র পনের বছর বয়সে তিনি এসব কেতাব শেষ করেন। পুথিগত ও জ্ঞানগত সকল বিদ্যা শেষ করে তিনি তাঁর আব্বার হাতে আধ্যাত্মিক জ্ঞানার্জনের জন্যে বাইয়াত নেন। অতঃপর তিনি নকশবন্দীয়া তরীকার সুফীদের বিভিন্ন স্তর আয়ত্ত করেন। তিনি আধ্যাত্ম চর্চার ক্ষেত্রেও এরূপ দক্ষতা অর্জন করলেন যে, অল্পসময়ের ভেতরে তিনি সে জগতেও যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করলেন। সলুক সম্পর্কিত তালীম শেষ হলে তাঁর আব্বা শায়েখ আবদুর রহীম তাঁর মাথায় মর্যাদার পাগড়ী বেঁধে দেন এবং তাঁকে শিক্ষা দান করার অনুমতি প্রদান করেন। এ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান করা হয়। তাতে দিল্লীর ওলামায়ে কেরাম, বুযুর্গানে দ্বীন, কাজীবৃন্দ ও অন্যান্য আমীর-উমারা উপস্থিত হন। সকলের উপস্থিতিতে শায়েখ আবদুর রহীম তাঁর ভাগ্যবান মহা মর্যাদাবান পুত্র শাহ ওয়ালিউল্লাহকে জাহের ও বাতেনী দ্বীনী ইলম শিক্ষা দানের অনুমতি দান করেন। পরন্তু তিনি নিজ পুত্রের ইলম ও হায়াত দারাজীর জন্যে দোয়া করেন। গোটা মজলিস আমীন, আমীন বলে দোয়ায় শরীক হন এবং এক যোগে তাকে মোবারকবাদ জানান।।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভী (রঃ) তাঁর আব্বা ও শায়েখ মুহাম্মদ আফজল শিয়ালকুটির কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন।

বিবাহঃ

শাহ সাহেব (রঃ)-এর বয়স যখন চৌদ্দ বছর, তখনই তাঁর পিতা তাঁকে বিয়ে করাবার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও সংসারের অন্য সবাই বিয়ের প্রস্তুতি নেই বলে ওজর পেশ করেন, তথাপি তাঁর পিতা সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি বরং অতি ক্ষিপ্রতার সাথে এ কাজ সম্পন্ন করার জন্য উদগ্রীব হলেন। তিনি লিখে পাঠালেনঃ কেন আমি এ ব্যাপারে তাড়াহুড়া করছি তা তোমরা অচিরেই বুঝতে পারবে। এ চিঠি পেয়ে সবাই রাজী হয়ে গেলেন এবং বিয়ে সম্পন্ন হল।

বিয়ের পর পরই তাঁর কজন নিকটাত্মীয় ইন্তেকাল করেন। কদিন না যেতেই শায়েখ আবু রেজার ছেলে আবদুর রশীদ মারা যান। তার কিছুদিন পর শাহ সাহেবের মাতা ইন্তেকাল করেন। তারপর স্বয়ং তাঁর আব্বা শায়েখ আবদুর রহীমও ইন্তেকাল করেন। এটাই ছিল শাহ সাহেবের বিবাহের ব্যাপারে তার পিতার তাড়াহুড়ার মূল রহস্য।

পর পর এতগুলো আঘাত স্বভাবতঃই তার ওপর প্রভাব ফেলেছিল। তথাপি তিনি তাঁর জাহেরী ও বাতেনী ইলমের জোরে এসব বিপদাপদ সহজেই কাটিয়ে উঠেন।

হারামাইনের সফরঃ

১১৩১ হিজরীতে তার আব্বার ইন্তিকালের পর তিনি রহীমিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। তারপর একযুগ শিক্ষকতার মাধ্যমে তিনি আরব-আজমের সর্বত্র স্বীয় শিক্ষাগত যোগ্যতার বিরাট খ্যাতি অর্জন করেন। চারদিক থেকে ছাত্ররা ছুটে আসছিল তাঁর কাছে জ্ঞানার্জনের জন্যে। তারা জাহেরী ও বাতেনী জ্ঞানে পরিপূর্ণ হয়ে তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিলেন। বার বছর শিক্ষকতার পর তিনি হজ্জের নিয়তে হারামাইন শরীফাইনে যাবার উদ্যোগ নেন এবং ১১৪৩ হিজরীতে তিনি হেজাজে তশরীফ নেন। অতঃপর ১১৪৫ হিজরীতে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। প্রায় দু’বছর তিনি মক্কা ও মদীনায় কাটান। সেখানকার ওলামায়ে কেরামের সাথে মিলিত হন। সেখানকার হাদীসবেত্তাদের থেকে তিনি হাদীসের সনদ নেন। বিশেষতঃ শায়েখ ওবায়দুল্লাহ ইবনে শায়েখ মোহাম্মদ ইবনে সুলায়মান আল-মাগরেবীর কাছ থেকে তিনি বিশেষভাবে হাদীসের সনদ গ্রহণ করেণ। তাছাড়া সেকালের হারামাইনের সেরা আলেম, ফকীহ ও মুহাদ্দেস শায়েখ আবু তাহের মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম আল-মাদানী থেকেও তিনি হাদীসের সনদ নেন। এ সম্পর্কে তিনি স্বয়ং বলেনঃ

“আমি হারামাইন শরীফাইনের অধিকাংশ বুযুর্গের সাথে দেখা করেছি। সেখানকার অধিকাংশ সর্বজ্ঞাতা পারদর্শী সম্মানিত লোকদের সাথে মেলামেশা করেছি। কিন্তু তাদের কাউকেই সর্বজ্ঞাতা পারদর্শী হয়েও উত্তম চরিত্রে বিমণ্ডিত রূপে দেখতে পাইনি। শুধুমাত্র শায়েখ আবু তাহের আল-মাদানীকে আমি সেরূপ পেয়েছি। তাঁর দূরদর্শিতা ও অগাধপাণ্ডিত্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমি আমার গ্রন্থরাজির বিভিন্ন স্থানে তা উল্লেখ করেছি”।

শাহ সাহেব (রঃ) তাঁর সান্নিধ্যে যথেষ্ট সময় কাটিয়েছেন। তাঁর কাছে হাদীসের বর্ণনা শুনেছেন। মোটকথা শায়েখ আবু তাহের আল-মাদানী তাঁকে শুধু সনদ দেননি, তাঁর নিজস্ব খিরকাও শাহ সাহেবকে দান করেন। সে খিরকা জাহেরী ও বাতেরনী সকল প্রকার ইলম ও ফায়েজের আধার ছিল।

হারামইনে থাকা কালে তিনি শায়েখ তাজুদ্দীন হানাফীর খেদমতেও হাজির হন। তাঁর কাছ থেকেও তিনি সনদ হাসিল করেন। তাছাড়াও তিনি সেখান থেকে শায়েখ আহমদ থানাভী, শায়েখ আহমদ কাশানী, সাইয়েদ আবদুর রহমান ইদরিসী, শায়েখ শামসুদ্দীন মোহাম্মদ, শায়েখ ঈসা জাযরী, শায়েখ হাসান আজমী, শায়েখ আহমদ আলী, শায়েখ আবদুল্লাহ ইবনে সালেহ প্রমুখ থেকেও সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে সনদ হাসিল করেন। শায়েখ আবদুল্লাহ ইবনে সালেম আল বাসরী ওয়াল মক্কী সবচেয়ে উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন মুহাদ্দেস ও আলিম ছিলেন।

দেশে প্রত্যাবর্তনঃ

হারামইন শরীফাইনের বুযুর্গ ওলামায়ে কেরামের কাছ থেকে জাহেরী ও বাতেনী ইলমে ভরপুর হয়ে শাহ সাহেব উপমহাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১১৪৫ হিজরীর ১৪ই রজব তিনি দিল্লী পৌঁছেন এবং নিজ পৈত্রিক আলয়ে অবস্থান করেন। কিছুদিন তিনি বিশ্রাম নেন। এ ফাঁকে দিল্লীর ওলামা-মাশায়েখদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করেন। তারপর রহীমিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষা দানের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। শত শত হাদীস শিক্ষার্থী সেখানে ছুটে এসে তাঁর কাছ থেকে হাদীসের সনদ হাসিল করে চললেন। আশে-পাশের রাজ্যগুলোয়ও অনতিকালের ভেতর হাদীস চর্চা ছড়িয়ে পড়ল।

শাহ সাহেবের যুগে মুসলমান হাদীস সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েছিল। তারা ফিকাহ শাস্ত্রকেই ইলমের জন্যে যথেষ্ট ভাবত। শাহ সাহেবই হাদীসের গুরুত্ব সুস্পষ্ট করে তুলে ধরলেন। তিনি লোকদের কোরআন ও হাদীসের গভীর অধ্যয়ন এবং এ দুটোকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়ার ও সব মতভেদের বিষয়গুলোর মীমাংসা কোরআন ও হাদীস থেকে আহরণের জন্যে উদ্ধুদ্ধ করেন। এমনকি এ ক্ষেত্রে তিনি আশাতীত সাফল্যও লাভ করেন।

মছলকঃ

শাহ সাহেবের অনুসৃত পন্থা ছিল সম্পূর্ণ ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যপন্থা। তিনি বিশুদ্ধ বর্ণনা ও যুক্তি-প্রমাণ এক করে ফকীহদের রাস্তায় চলতেন এবং অধিকাংশ ওলামা ও ফোকাহাদের মতৈক্যের ভিত্তিতে তিনি রায় দিতেন। মতভেদের বিষয়গুলোয় তিনি বিশুদ্ধ হাদীস অনুসরণ করতেন। দ্বীনী ইলমের ক্ষেত্রে তিনি ইজতিহাদের যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। তিনি হানাফী ও শাফেয়ী মজহাবকে প্রাধান্য দিয়ে পড়াতেন। উপমহাদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী যেহেতু হানাফী মজহাবের অনুসারী তাই তিনি সে মজহাবের বিরোধিতা করতেন না।

প্রায় সমগ্র উম্মতই চারটি প্রণীত মজহাবের সাথে জড়িত হয়ে গেছে। তাই আমাদের যুগে তাদের তাকদীল করা বৈধ হয়ে গেছে। তার ভেতরে কয়েকটি কল্যাণকর দিক রয়েছে আর তা অস্পষ্টও নয়। যে যুগে মানুষের হিম্মত কমে গেছে আর মানুষের অন্তরগুলো বাসনা-কামনায় ভরপুর হয়ে গেছে, সে যুগে এ ছাড়া আর করারই বা কি আছে?

মতভেদের বিষয়গুলোয় তিনি বিশুদ্ধ হাদীস অনুসরণ করতেন। দ্বীনী ইলমের ক্ষেত্রে তিনি ইজতিহাদের যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। তিনি হানাফী ও শাফেয়ী মজহাবকে প্রাধান্য দিয়ে পড়াতেন। উপমহাদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী যেহেতু হানাফী মজহাবের অনুসারী তাই তিনি সে মজহাবের বিরোধিতা করতেন না।

প্রায় সমগ্র উম্মতই চারটি প্রণীত মজহাবের সাথে জড়িত হয়ে গেছে। তাই আমাদের যুগে তাদের তাকদীল করা বৈধ হয়ে গেছে। তার ভেতরে কয়েকটি কল্যাণকর দিক রয়েছে আর তা অস্পষ্টও নয়। যে যুগে মানুষের হিম্মত কমে গেছে আর মানুষের অন্তরগুলো বাসনা-কামনায় ভরপুর হয়ে গেছে, সে যুগে এ ছাড়া আর করারই বা কি আছে?

ছাত্রবৃন্দঃ

শাহ সাহেবের অসংখ্য ছাত্র ছিলেন। তাদের ভেতরে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন তাঁর চার ছেলে যথাক্রমেঃ শাহ আবদুল আসীফ, শাহ রফিউদ্দীন, শাহ আবদুল কাদের ও শাহ আবদুল গণী। অন্যান্যরা হলেনঃ শায়েখ মুহাম্মদ আশেক দেহলভী, শায়েখ মুহাম্মদ আমীন কাশ্মীরী, সাইয়্যেদ মুর্তজা বিলগ্রামী, শায়েখ জাফরুল্লাহ ইবনে আবদুর রহীম লাহোরী, শায়েখ মুহাম্মদ আবু সাঈদ বেরেলভী, শায়েখ রফিউদ্দীন মুরাদাবাদী, শায়েখ মুহাম্মদ আবুল ফাতাহ বিলগ্রামী, শায়েখ মুহাম্মদ মুঈন সিন্ধী, কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী প্রমুখ।

রচনাবলীঃ

শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভী (রঃ) শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার ভেতরে প্রায় পঞ্চাশখানার খোঁজ পাওয়া গেছে। তিনি তফসীর, হাদীস, তাসাওফ অন্যান্য ইসলামী বিষয়াবলীর ওপর এমন সব গ্রন্থ রচনা করেন যা দেখে জাহেরী বাতেনী ইলমের ধারক ও বাহকগণ তাঁকে এক বাক্যে ইমাম হিসেবে মেনে নেন। তিনি কিছু গ্রন্থ আরবী ভাষায় ও কতিপয় গ্রন্থ ফার্সী ভাষায় রচনা করেন। তাঁর যুগে ফার্সী ছিল সরকারী ভাষা। তাই দেশব্যাপী এ ভাষায় বহুল প্রচলন ছিল। শাহ সাহেবের প্রণীত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থের পরিচয় নিম্নে প্রদত্ত হলঃ

১। ফৎহুল রহমান বতরজামাতুল কুরআনঃ

এটি হচ্ছে কুরআন পাকের ফার্সী অনুবাদ। আজ থেকে দেড়শ বছর আগে এ অনুবাদ কার্যটি সম্পন্ন হয়েছে। তথাপি আজও এর কল্যাণকারিতা ও গুরুত্ব সমানেই অনুভূত হচ্ছে। শাহ সাহেব তাঁর অনুবাদে গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম বিষয়গুলো সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।

২। আয যুহরাবীন ফি তাফসীরে সূরা বাকরা ওয়া আলে ইমরানঃ

এটা সূরা বাকারা ও আলে ইমরানের ফার্সী বিশ্লেষণ।

৩। আল-ফাউযুল কাবীরঃ

তফসীর শাস্ত্রের নীতিমালা সম্পর্কিত এ গ্রন্থখানি শাহ সাহেবের একটি মূল্যবান অবদান। এর মধ্যে তিনি কুরআন পাকের মূল পাঁচটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছেন। এতে তিনি কুরআনের ব্যাখ্যা ও তার রীতি-নীতি সম্পর্কে অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ ও মূল্যবান আলোচনা করেছেন। মোটকথা শাহ সাহেবের এ ক্ষুদ্রাকৃতির গ্রন্থটি এ বিষয়ের ওপর রচিত বিরাট বিরাট গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা মিটিয়ে দিয়েছে। কুরআন হরফের মুকাত্তায়াত ও অন্যান্য সূক্ষাতিসূক্ষ্ম বিষয় তিনি এতে সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

৪। ফতহুল কবীরঃ

এতে কুরআনেরক ঠিন ও দুর্লভ শব্দ ও পরিভাষার সহজ ও সুন্দর সমাধান রয়েছে। কিতাবটি আরবী ভাষায় লিখিত। কুরআনের আয়াত ও বিশুদ্ধ হাদীসের সাহায্যে তিনি বিভিন্ন শব্দ ও পরিভাষার বিশ্লেষণ করেছেন।

৫। আল মুনাওয়া মিন আহাদীসিল মুয়াত্তাঃ

ইমাম মালিকের হাদীস সংকলন “আল মুয়াত্তার” এক বিস্ময়কর আরবী ভাষ্য। শাহ সাহেব ফেকহী দৃষ্টিকোণ থেকে আর অধ্যায়গুলো সজ্জিত করেছেন। এ গ্রন্থে তিনি ইমাম মালেকের সেসব মতামত বাদ দিয়েছেন বা অন্যান্য সকল মুজতাহিদের পরিপন্থী। তার বিন্যস্ত প্রতিটি অধ্যায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট কুরআনের আয়াতের তিনি সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। এ গ্রন্থটি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি অর্জন করায় এর বহু সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৩৫১ হিজরীতে মক্কা শরীফের “আল মাকতাবাতুস সালাফিয়া” থেকেও এটা অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশ করা হয়।

৬। আল সুসাফফা শরহে মুয়াত্তাঃ

এটি মুয়াত্তার ফার্সী ভাষ্য। সংক্ষিপ্ত হলেও ভাষ্যটি খুবই উপাদেয়। এতে তিনি মুজতাহিদ সুলভ পর্যালোচনা করেছেন। এতে তার ইজতিহাদ ও ইস্তেখরাজের যোগ্যতা প্রামণিত হয়েছে।

৭। আল আরবাঈনঃ

শাহ সাহেব এতে চল্লিশটি হাদীসের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। হাদীসগুলো স্বল্প কথায় অথচ ব্যাপক তাৎপর্যপূর্ণ। হাদীসগুলো তিনি তাঁর শায়েখ আবু তাহের (রঃ)-এর সনদে হজরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন।

৮। মুসাল সিলাতঃ

এটি একটি ক্ষুদ্রকায় আরবী কেতাব। সনদ সম্পর্কিত অতি মূল্যবান তথ্য এতে সন্নিবেশিত হয়েছে।

৯। হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহঃ আরবী ভাষায় রচিত শাহ সাহেবের এ গ্রন্থটি একটি অমূল্য সম্পদ। এতে শরীয়তের বিধি-নিষেধগুলোর গূঢ় রহস্যাবলী তুলে ধরা হয়েছে। পরন্তু এ কালের আধুনিক মন-মানসের শরীয়ত সম্পর্কিত বিভিন্ন জিজ্ঞাসার চমৎকার জবাব দান করা হয়েছে। মোটকথা এ গ্রন্থটি একটি অদ্বিতীয় ও অতুলনীয় গ্রন্থ। প্রাচীন ও নবীন সবার জন্যেই এটি সমান উপাদেয়।

১০। আকদুল জীদ ফিল ইজতিহাদ ওয়াত তাকলীদঃ

ইজতিহাদ ও তাকলীদের ওপর লিখিত একটি বিরল আরবী গ্রন্থ।

১১। আল ইরশাদ ইলা মুহিম্মাতে ইলমিল ইসনাদঃ

এটি আরবী ভাষায় লেখা সনদ সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কিতাব।

১২। আল ইনসাফ ফী-বয়ানে সাববিল ইখতিলাফঃ

এটি আরবী ভাষায় লেখা একটি উত্তম কিতাব। এতে ফকিহ ও মুহাদ্দেসের মতভেদের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। তাছাড়া তাকদীল করা বা না করার ব্যাপারেও এতে মনোজ্ঞ আলোচনা করা হয়েছে। শাহ সাহেব তাঁর আলোচনায় সকল সংকীর্ণতার অবসান ঘটিয়েছেন।

১৩। আল ইস্তিবাহ ফী-সালাসিলে আওলিয়া আল্লাহঃ

গ্রন্থটি ফার্সী ভাষায় রচিত। পয়লা খণ্ডে খ্যাতনামা আওলিয়ায়ে কেরামের সিলসিলার সবিস্তার বর্ণনা রয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে রয়েছে হাদীসের সনদসমূহ ও ফিকাহ শাস্ত্র সম্পর্কিত মূল্যবান তথ্যাবলী। হাদীস ও ফিকাহের ওপর শাহ সাহেব এ গ্রন্থটিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন।

১৪। তারাজিমু আবওয়াবিল বুখারীঃ

এটি আরবী ভাষায় একটি মূল্যবান গ্রন্থ। হায়দরাবাদে এটি ছাপা হয়।

১৫। ইযালাতিলখাফা আন খিলাফাতিল খুলাফাঃ

শাহ সাহেব (রঃ)-এর যুগে রাফেজীদের উৎপাত বেড়ে গিয়েছিল। শাহ সাহেব তাদের যাবতীয় প্রশ্নাবলীর জবাব দিয়ে এ গ্রন্থটি লিখেন। এতে তিনি খোলাফায়ে রাশেদীনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সকল প্রশ্নের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেন। পরন্তু ইসলামী হুকুমতের তাৎপর্য কি তাও তিনি তাতে সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। এমনকি ইসলামী হুকুমতের রূপরেখাও পেশ করেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি খোলাফায়ে রাশেদীনের গুণাবলী ও তাঁদের খেলাফতের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস এবং ইসলামী রাজনীতির নীতিমালাগুলো সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। এ কিতাবের বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে।

১৬। কুররাতুল আইনাইন ফী তাফাসিলিশ শায়খাইনঃ

এটি একটি ফার্সী গ্রন্থ। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) ও হযরত উমর ফারুক (রাঃ)-এর গুণাবলী ও মর্যাদার বিভিন্ন দিক তিনি এতে তুলে ধরেছেন। এ গ্রন্থে দলীয় প্রমাণ ও যুক্তি বুদ্ধি দ্বারা তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তাঁরা দুজন উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাতে হযরত উসমান (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ)-এর বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা বর্ণনা করে রাফেজীদের সমালোচনার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছিলেন।

১৭। কিতাবুল ওয়াসিয়াতঃ

এটি একটি ফার্সী পুস্তিকা। এতে শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে তিনি পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন।

১৮। রিসালায়ে দানেশমন্দীঃ

এটিও একটি কল্যাণপ্রদ ফার্সী পুস্তিকা। এতে শিক্ষাদানের পদ্ধতি নিয়ে লিখেছেন।

১৯। আল কাওলুল জামীলঃ

শাহ সাহেব (রঃ) তাসাওফ তত্ত্বের ওপর সংক্ষেপে অথচ সামগ্রিকভাবে অত্যন্ত তথ্যপূর্ণ এ গ্রন্থটি আরবী ভাষায় রচনা করেন। তাসাওফের চার তরীকার সিলসিলাগুলো এতে সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে। এ চার তরীকাই উপমহাদেশে চালু রয়েছে। এতে তিনি তাঁর পিতা শাহ আবদুর রহীম ও অন্যান্য বুযুর্গতের ওজিফা ও দোয়া-দরূদ লিপিবদ্ধ করেছেন।

২০। সাতাআত, ২১। হামাআত, ২২। লামাহাতঃ

এ তিনটি পুস্তিকাও তাসাওফের ওপর লেখা হয়েছে।

২৩। আলতাফুল কুদসঃ

এটি ফার্সী ভাষায় লিখিত তাসাওফ সংবলিত অত্যন্ত মূল্যবান একটি পুস্তিকা।

২৪। তা’বীলুল আহাদীসঃ

এটি আরবী ভাষায় লেখা একটি কল্যাণপ্রদ গ্রন্থ। কুরআন পাকে যে সব আম্বিয়ায়ে কেরামের উল্লেখ রয়েছে, এ গ্রন্থে তাদের ঘটনাবলীর সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে। হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে নবী করীম (সঃ) পর্যন্ত নবুয়তের যে ক্রমবিকাশ ও পূর্ণতা ঘটেছে তার রহস্য ও ব্যবস্থাপনা সংক্ষেপে ও সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে কিতাবটি স্বভাবতঃই জটিল ও আয়াশলব্ধ।

২৫। আল খায়রুল কাসীরঃ

এ কিতাবটিও আরবী ভাষায় রচিত। এটা সৃষ্টি জগতের রহস্য ও কলাকৌশলের বর্ণনায় পরিপূর্ণ। এ বিষয়ের ওপর এটা এক অনন্য গ্রন্থ।

২৬। আত তাফহীমাতে এলাহিয়্যাঃ

এ গ্রন্থটি দু’খণ্ডে লিখিত। এর কিছু অংশ আরবী ও ফার্সিতে লেখা হয়েছে। এতে বিভিন্ন শ্রেণীর মাকালাত ও রিসালাত জমা করা হয়েছে। শরীয়ত ও যুক্তিবুদ্ধির বিভিন্ন সমস্যা এতে আলোচিত হয়েছে এবং ইলহামীপন্থায় তা উপস্থাপন করা হয়েছে। শাহ ওয়ালিউল্লাহ একাডেমী থেকে নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

২৭। আল বদুরুল বালেগাহঃ

তাসাওফ শাস্ত্রের ওপর লেখা শাহ সাহেবের এ গ্রন্থখানি অনন্য। এ গ্রন্থটি অধ্যয়ন করলে শাহ সাহেবের অন্যান্য গ্রন্থ বুঝা সহজ হয়ে যায়। সত্য কথা এই যে, কিতাবটি শাহ সাহেবের অন্যান্য কিতাবের সারমর্ম। এ কিতাবটিও শাহ ওয়ালিউল্লাহ একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়।

২৮। ফুঁয়ূজ্বল হারামাইনঃ

এ গ্রন্থটিতে শাহ সাহেব সেই সমস্ত ব্যাপার সন্নিবেশিত করেছেন যা তিনি মদীনা মুনাওয়ারায় অবস্থান কালে হযরত (সঃ)-এর রূহানী ফয়েযের মাধ্যমে হাসিল করেছেন। সংক্ষিপ্ত হলেও কিতাবটি অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ ও কল্যাণকর।

২৯। আদদুররুস সামীন ফী মুবাশশিরাতে নবায়্যেল আমীনঃ

এ কিতাবে শাহ সাহেব তাঁর পিতা শায়েখ আবদুর রহীম ও জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শায়েখ আবুর রিজা মুহাম্মদের বিশেষ বিশেষ অবস্থা বর্ণনা করেছেন।

৩০। হুসনুল আকীদাঃ

আরবী ভাষায় লিখিত এ গ্রন্থটিতে আকায়েদ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

৩১। ইনসানুল আইন ফী মাশায়েখিল হারামাইনঃ

ফার্সী ভাষায় এ গ্রন্থটিতে শাহ সাহেব ইতিহাস সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যাপার নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন।

৩২। আল মুকাদ্দামাতুস সুন্নিয়াত ফী ইনতিসারে ফিরকাতুস সুন্নিয়াহঃ

এ গ্রন্থটিতে আরবী ভাষায় আকায়েদ সম্পর্কে লেখা হয়েছে। এ গ্রন্থটি এ বিষয়ে অনন্য।

৩৩। আল মাকতুবুল সাদানীঃ

এটি তাওহীদের হাকীকত সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি। তিনি ইসমাইল ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে রূমীর কাছে এ চিঠি লিখেছিলেন।

৩৪। আল হাওয়ামেহ ফী শরহে হিজবিল বাহরঃ

এটি হিজবুল বাহর কিতাবের এক অতুলনীয় ভাষ্য।

৩৫। শেফাউল কুলুবঃ

এটি ফার্সী ভাষায় তাসাওফের ওপর লেখা একটি অতি উত্তম গ্রন্থ।

৩৬। সারূরুল মাখযানঃ

শায়েখ কবীরজান জানান দেহলভী (রঃ)-এর নির্দেশে শাহ সাহেব ফার্সী ভাষায় এ জ্ঞানগর্ভ কিতাবটি রচনা করেন।

৩৭। শায়েখ আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল বাকীর প্রশ্নাবলীর জবাবঃ

৩৮। তাইয়েবুন নগমা ফী মহ সাইয়্যেদিল আরবে ওয়াল আজমঃ

এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম-এর প্রশংসাপূর্ণ একটি আরবী কাব্যগ্রন্থ।

৩৯। মজমুয়ায়ে আশআরঃ

শাহ সাহেবের লিখিত বিভিন্ন কবিতার সংকলন গ্রন্থঃ

৪০। ফাতহুল ওয়াদুদ ওয়া মারিফাতিল জুনুদঃ

এ সংক্ষিপ্ত আরবী রিসালায় শাহ সাহেব সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন।

৪১। আওয়ারিফঃ

আরবী ভাষায় লেখা এ পুস্তিকাটিতে তাসাওফ তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

৪২। শরহে রুবাইয়্যাতাইনঃ

খাজা বাকী বিল্লাহ (রঃ)-এর দুটি রুবাইয়্যাতের ব্যাখ্যা।

৪৩। আনফালুল আরেফীনঃ

এটি শাহ সাহেবের রচিত একটি উৎকৃষ্ট গ্রন্থ। এতে তিনি তাঁর দাদা ও বংশের অন্যান্য বুযুর্গদের জীবনালেখ্য ও উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী সন্নিবেশিত করেছেন। তাঁদের জাহেরী ও বাতেনী ইলম ও আধ্যাত্মিক গুণাবলীর এতে সবিস্তারে আলোচনা রয়েছে।

ইন্তেকালঃ শাহ সাহেব (রঃ) ১১১৪ হিজরীর ৪ঠা শাওয়াল সূর্যোদয়ের মুহুর্তে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ৬৩ বছর বয়সে ১১৭৬ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। মাত্র অল্প ক’দিন তিনি হাল্কা রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তারপর তিনি দুনিয়া ছেড়ে রাব্বুল আলামীনের দরবারে চলে যান। ইন্নালিল্লাহি….রাজিউন। পুরাতন দিল্লীর শাহজাহানাবাদের দক্ষিণ ভাগে তাঁকে দাফন করা হয়। সে কবরস্থানকে মুহাদ্দেসীনের কবরস্থান বলা হয়।

সন্তান-সন্ততিঃ শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রঃ)-এর পাঁচটি ছেলে জন্ম নিয়েছিল। এক ছেলে যৌবনে পদার্পণ করেই মারা যান। তাই তার সম্পর্কে তাঁর জীবনী গ্রন্থে তেমন কিছু লেখা হয়নি। অবশিষ্ট চার ছেলে যথাযোগ্য শিক্ষা-দীক্ষা নিয়ে তাঁর বংশকে সমুজ্জ্বল করেছেন। তাঁর জ্যৈষ্ঠ ও শ্রেষ্ঠ সন্তান শাহ আবদুল আযীয (রঃ) ১১৫৯ হিজরীতে জন্ম নেন এবং তাঁর সতের বছর বয়সে শাহ সাহেব ইন্তেকাল করেন। তাঁর শৈশবের লেখাপড়া পিতার কাছেই সম্পন্ন হয়।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি কোরআন পড়া শুরু করেন এবং তের বছর বয়সে তিনি নহু, ছরফ, ফিকাহ, মান্তেক, ইলমুল কালাম, আকায়েদ ইত্যাদি বিষয়ের কিতাবসমূহ আয়ত্ত করেন। অতঃপর পনের বছর বয়সে রহীমিয়া মাদ্রাসায় তাঁর পিতার মসনদে বসে শিক্ষা দানে ব্রতী হন। তাঁর গোটা জীবন শিক্ষা দানে ও কিতাব রচনায় ব্যয়িত হয়। তাঁর যুগে রাফেজী ও অন্যান্য বাতিল পন্থীদের প্রভাব অত্যধিক বেড়ে গিয়েছিল। তাই তিনি তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালো কিতাব লিখেন। তাঁর রচিত তফসীরে আযীয ও তোহফায়ে ইসনা আশারিয়ায় তিনি রাফেজীদের বাতিল ধ্যান-ধারণার মূলোৎপাটন ঘটিয়েছেন। তাছাড়া মুহাদ্দেসদের অবস্থা ও হাদীস সংকলনসমূহের ওপর তিনি বুস্তানুল মুহাদ্দেসীন নামে এক তথ্য বহুল গ্রন্থ রচনা করেন। পরন্তু তিনি শরহে মিযানুল মান্তেক ও আযীযুল ইকতেবাস ফী ফাযায়েলে আখবারিন্নাস নামে আকায়েদের এক মূল্যবান ভাষ্য রচনা করেন। তার দ্বিতীয় সন্তানের নাম শাহ রফিউদ্দীন। তিনিও তাঁর পিতার কাছে শিক্ষা-দীক্ষা লাভ করেন। শাহ রফিউদ্দিন কোরআন মজীদের সহজ উর্দু অনুবাদ করেন। সেটি অত্যন্ত কল্যাণপ্রদ ও জনপ্রিয় হয়েছে।

শাহ সাহেবের তৃতীয় ছেলের নাম শাহ আবদুল কাদের। তিনি তফসীর শাস্ত্রে পরম ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। তিনি অত্যন্ত সরল ও একান্ত নিঃসঙ্গ জীবন যাপন পছন্দ করতেন। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি আকবরাবাদ মাজে মসজিদের এক হুজরায় কাটিয়ে গেছেন। তিনি কোরআনের এরূপ উত্তম অনুবাদ করে গেছেন যা বড় বড় তফসীরের কাজ দেয়। এ অনুবাদ ছিল ইলহামী অনুবাদ। উপমহাদেশের উলামায়ে কেরাম এক বাক্যে সেটাকে সর্বোত্তম অনুবাদ বলে গ্রহণ করেছেন।

তাঁর চতুর্থ ছেলের নাম শাহ আবদুল গনী। তিনি ইলমে তাসাওফে যথেষ্ট পারদর্শীতা অর্জণ করেন। তিনিও তার পিতার কাছে হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। খোদা নির্ভরতা ও স্বল্পে তুষ্টির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। তাঁরই পুত্র হলেন বালাকোটের শহীদ শাহ ইসমাঈল (রঃ)। তিনি পাঞ্জাব ও সীমান্তে কিছু এলাকা দখল করে ইসলামী হুকুমত কায়েম করেছিলেন। তাঁর “তাকবিয়াতুল ঈমান” ও “আল আবাকাত” কিতাবদ্বয় দেশ-বিদেশে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

সাজরা

শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রঃ)

শাহ আঃ আযীয (রঃ)       শাহ রফিউদ্দীন (রঃ)      শাহ আঃ কাদের (রঃ)     শাহ আঃ গণী

মোঃ মূসা              মোঃ ঈসা             মোঃ মাখসুস উল্লাহ               হাসান জান

 

                                               মোঃ ইসমাঈল শহীদ (রঃ)

গ্রন্থের উদ্দেশ্য

বর্ণনামূলক ও জ্ঞানগত বিদ্যার ওপর সেকালে ও একালে বহু বই লেখা হয়েছে। প্রত্যেক মনীষীই জ্ঞান-গবেষণার ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় অবদান রেখেছেন। সে যুগে বর্ণনামূলক বিদ্যারই সর্বাধিক চর্চা চলছিল এবং এটাকেই তখন যথেষ্ট মনে করা হত। মুসলিম জাহান তখন রাসূলে করীম (সঃ)-এর কাছাকাছি যমানায় লালিত হচ্ছিল। তাই রাসূল (সঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের ফয়েজ ও বরকতের প্রভাবে হাজারো দর্শনের দার্শনিক মার প্যাঁচ তাদের প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়নি। তবে যতই ইসলামী দুনিয়ার প্রসারতা বেড়ে চলল আর এমনকি ইরান, হিন্দুস্তান ও পাশ্চাত্য জগতের বিভিন্ন এলাকায় যখন তা ছড়িয়ে পড়ল, তখন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দার্শনিকদের দুষ্ট প্রভাব মুসলমানদের সহজ সরল ঈমান ও আকায়েদের মজবুত ভিত্তিকে দুর্বল করে দিল। ফলে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের দ্বীন ও ঈমানের হেফাজতের জন্যে এমন ব্যক্তিত্বের এ পৃথিবীতে আবির্ভাব ঘটালেন যাঁরা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দার্শনিকদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে তাদের স্তব্ধ করে দিলেন। তারা শুধু ইসলামের জন্যেই প্রাচীর হয়ে দাঁড়ালেন না, পরন্তু দার্শনিকদের ভ্রান্ত চিন্তাধরার কল্পনার ফানুস ছিন্ন ভিন্ন করে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন। ইসলামের ওপর বারংবার হামলা করেছে। কিন্তু তাদের ভাগ্যে লাঞ্ছনাকর পরাজয় ভিন্ন আর কিছুই জোটেনি। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মোহাদ্দেসে দেহলভী (রঃ) ও তাঁর হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগার আবির্ভাব ও সৃষ্টির পেছনে আল্লাহ পাকের সেই মর্জিই সক্রিয় ছিল।

শাহ সাহেব (রঃ) এ গ্রন্থটিতে শরীয়তের রহস্যাবলী তুলে ধরেছেন। পূর্বসূরীদের কেউই এ বিসয়ের ওপর কলম ধরেননি। শাহ সাহেব (রঃ) শরীয়তের মূলনীতি দাঁড় করেছেন, তার শাখা-প্রশাখা বর্ণনা করেছেন। যদিও গ্রন্থখানি শরীয়তের রহস্যাবলীর ওপর তিনি লিখেছেন, তথাপি তিনি তাতে হাদীস, ফিকাহ, আখলাক, তাসাওফ ও দর্শনের সমারোহ ঘটিয়েছেন। উম্মতের ভেতর তিনিই প্রথম বর্ণনামূলক ও জ্ঞানগত বিদ্যার বিশেষজ্ঞ, যিনি শরীয়তের রহস্য বর্ণনা করতে গিয়ে শুধু জ্ঞানানুসন্ধানের পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি কিতাব ও সুন্নাতের প্রতিটি নির্দেশের এরূপ অনড় কারণ খুঁজে বের করেছেনযা কোন যুগেই কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। গ্রন্থটি পাঠ করতে গিয়ে মনে হয় জ্ঞান ও যুক্তি শাস্ত্রের সকল স্তর আয়ত্তকারী এক বিশাল ব্যক্তিত্ব কথা বলেছেন। কখনও মনে হয়, মালায়ে আলার ইলহাম পেয়ে আধ্যাত্মিকতার বর্ণনা দিচ্ছেন। কখনও দেখা যায় যে, এক মুজতাহিদ এমন ভাবে মসআলা পেশ করছেন যাতে চার মজহাবের সমন্বয় ঘটে যাচ্ছে। এমনকি কিতাব ও সুন্নাতের বক্তব্যের সাথে তা হুবহু মিলে যাচ্ছে।

আল্লামা আবু তাইয়্যেবা (রঃ) “হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ” সম্পর্কে বলেনঃ

“যদিও গ্রন্থটি ইলমে হাদীস নয়, তথাপি তাতে হাদীসের প্রচুর ব্যাখ্যা মিলে। এমনকি তাতে বিভিন্ন হাদীসের তত্ত্ব ও রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। সে যাক, পূর্ববর্তী বার শতকে আরব-আজমের কোন আলেম এরূপ মহামূল্যবান গ্রন্থ রচনা করে যাননি। গ্রন্থটি এ বিষয়ে অনন্য। মোটকথা, গ্রন্থকারের এটা শুধু শ্রেষ্ঠ গ্রন্থই নয়, সর্বকালের একটি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ”।

শাহ সাহেব (রঃ) তাঁর গ্রন্থটিকে দু’খণ্ডে বিভক্ত করেছেন। পয়লা খণ্ডটি সাত অধ্যায়ে বিভক্ত করেছেন। প্রতিটি অধ্যায় কয়েকটি পরিচ্ছেদে ভাগ করেছেন।

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী