ইসলামী জাগরণের তিন পথিকৃৎ

ইসলামী জাগরণের তিন পথিকৃৎ

এ.কে.এম. নাজির আহমদ


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

চলমান পেজের সূচীপত্র

ভূমিকা

বিংশ শতাব্দীতে ইসলামী জাগরণের জন্য যাঁরা বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছেন তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হচ্ছেন শায়খ হাসানুল বান্না (রহ), বাদীউয্‌যামান সাঈদ নুরসী (রহ) ও সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী (রহ)। নাস্তিকতাবাদ, অংশীবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ-সৃষ্ট তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি দূরকরণে তাঁরা মূল্যবান অবদান রেখেছেন। সৃষ্টি করেছেন ইসলামী জাগরণ।

ইউরো-আমেরিকান জীবন দর্শনে বিশ্বাসী শাসকগোষ্ঠী তাঁদেরকে স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি। বারবার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে তাঁদের চলার পথে। বারবার তাঁদেরকে পাঠানো হয়েছে কারাগারে। আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ তাওয়াক্কুল রেখে, উচ্চমানের ছবর অবলম্বন করে, নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় তাঁরা প্রতিটি বাধার মুকাবিলা করেছেন অকুতোভয় বীরের মতো।

তাঁরা ছিলেন ইসলামী জাগরণের পথিকৃৎ। তাঁদের জীবন থেকে অনেক কিছু শেখার রয়েছে আমাদের। তাঁদের জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো অতিসংক্ষেপে এই বইতে তুলে ধরেছি সম্মানিত পাঠকদের জন্য।

একবিংশ শতাব্দীতে যাঁরা ইসলামের বিজয় প্রত্যাশী তাঁদের জন্য মূল্যবান পাথেয় রয়েছে এই তিনজন মহানায়কের অনুসৃত কর্ম-কৌশলে।

.কে.এম. নাজির আহমদ


শায়খ হাসানুল বান্না (রহ)

জন্ম

১৯০৬ সনে শায়খ হাসানুল বান্না মিসরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আব্বা আবদুর রাহমান আল বান্না একজন উঁচু মাপের ইসলামী ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

শিক্ষা জীবন

আট বছর বয়সে শায়খ হাসানুল বান্নার আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় মাদরাসা আর রাশাদ আদ দীনিয়াহ নামক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। একই সাথে তিনি আল কুরআন হিফয করতে থাকেন।

কিছুকাল পর তিনি মাহমুদিয়ার মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্র হন। বছর খানেকের মধ্যেই শায়খ হাসানুল বান্না দামানহুর টিচার্স ট্রেনিং স্কুলে ভর্তি হবার সুযোগ পান। এই স্কুলে লেখাপড়া কালে তিনি দামানহুরের বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিদের নিকট যাতায়াত করতেন। তাঁদের কাছ থেকে তিনি দীনের তালিম হাছিল করেন। এই সময় ব্যাপকভাবে ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়নের দিকেও তিনি মনোযোগ দেন।

টিচার্স ট্রেনিং ডিপ্লোমা পরীক্ষায় তিনি তাঁর স্কুলে প্রথম ও সারাদেশে পঞ্চম স্থান অধিকার করেন।

অতপর তিনি কায়রো যান এবং আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দারুল উলুমে ভর্তি হন। এই সময় তাঁর আব্বা সপরিবারে মাহমুদিয়া থেকে কায়রোতে স্থানন্তরিত হন।

কায়রোতে অবস্থানকালে শায়খ হাসানুল বান্না মিসরের অন্যতম সেরা ইসলামী ব্যক্তিত্ব শায়খ মাহমুদ কর্তৃক পরিচালিত জামিয়াতুল মাকারিমিল আখলাক আল ইসলামিয়াহ নামক সংস্থার সদস্য হন। এখানে তার আমর বিল মা’রূফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) তৎপরতার হাতেখড়ি।

১৯২৭ সনের জুলাই মাসে দারুল উলুম থেকে তিনি ডিপ্লোমা লাভ করেন। এখানেই তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি ঘটে।

কর্মজীবন শুরু

১৯২৭ সনের সেপ্টেম্বর মাসে শায়খ হাসানুল বান্না সরকারী স্কুলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। তাঁকে পোস্টিং দেয়া হয় ইসমাঈলিয়াতে।

ইসমাঈলিয়া সুয়েজখালের সাথে সংযুক্ত তিমসাহ ঝিলের সন্নিকটে অবস্থিত একটি শহর। স্কুলের শিক্ষক হিসেবে তিনি কর্তব্য পালন করতে থাকেন। আর সময় সুযোগ মতো তিনি নিকটবর্তী ক্লাব ও কফি হাউসে গিয়ে দীনী বক্তব্য পেশ করা শুরু করেন।

আল ইখওয়ানুল মুসলিমূন গঠন

শায়খ হাসানুল বান্নার সংক্ষিপ্ত অথচ জ্ঞানগর্ভ ইসলামী ভাষণ চিন্তাশীল লোকদেরকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। ১৯২৮ সনের মার্চ মাসে ছয়জন ব্যক্তি তাঁর বাসায় আসেন তাঁর সাথে আলাপ করতে।

শায়খ হাসানুল বান্না তাঁদের সামনের তাঁর চিন্তাধারা পেশ করেন এবং সমাজ অংগনের সর্বত্র ইসলামের প্রধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংগঠিত প্রয়াসের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। দীর্ঘক্ষণ আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে।

এই মিটিংয়ে আগত  ছয়জন ব্যক্তি হচ্ছেন-

১. হাফিয আবদুল হামীদ, ২. আহমাদ আল হাসরী, ৩. ফুয়াদ ইবরাহীম, ৪. আবদুর রাহমান হাসবুল্লাহ, ৫. ইসমাইল ইযয ও ৬. যাকী আল মাগরিবী।

শায়খ হাসানুল বান্না চাইলে তখনই আরো অনেককে ডেকে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রতিটি গঠনমূলক আন্দোলনের শুরুতে থাকেন মাত্র একজন লোক। তারপর আরো কিছুসংখ্যক সমমনা লোক যুক্ত হয়ে সংগঠিত তৎপরতা শুরু করেন। গোড়ার দিক কার এই ব্যক্তিদের চিন্তার ঐক্য সংগঠনের ভিতকে দৃঢ়তা দান করে। তাঁদের অভিন্ন বক্তব্য পরবর্তীতে যারা সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত হয় তাদের চিন্তার ঐক্য নিশ্চিত করে। আর চিন্তার ঐক্যই যদি না থাকে একটি প্লাটফরমে অসংখ্য লোকের ভীড় জমিয়েও কোন সুফল আশা করা যায় না।

আলোচনান্তে একটি সংগঠন কায়েমের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘আল ইখওয়ানুল মুসলিমূন’। আর এর আলমুরশিদুল আম নির্বাচিত হন শায়খ হাসানুল বান্না। এইভাবে ১৯২৮ সনের মার্চ মাসে মিসরের অন্যতম শহর ইসমাঈলিয়াতে সাতজন সদস্য নিয়ে আল ইখওয়ানুল মুসলিমূন গঠিত হয়। উল্লেখ্য যে তখন শায়খ হাসানুল বান্না ছিলেন ২২ বছরের একজন দীপ্তিমান যুবক।

শায়খ হাসানুল বান্না ভালো করেই জানতেন যে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আল জিহাদু ফিল ইসলাম বা ইসলামী আন্দোলনের প্রধান কাজ হচ্ছে আদ্‌দা’ওয়াতু ইলাল্লাহ বা আল্লাহর দিকে লোকদেরকে ডাকা। এই কাজ করতে হলে লোকদের সামনে প্রথমেই তুলে ধরতে হয় আল্লাহর পরিচয়, তারপর আল্লাহর পথের তথা ইসলামের পরিচয়। এরপর তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে হয় ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর বিধান অনুসরণের সাথে সাথে সামষ্টিক জীবনে আল্লাহর বিধান কায়েম করার সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করতে।

আল ইখওয়ানুল মুসলিমূনের সাংগঠনিক বিস্তৃতি

শায়খ হাসানুল বান্না ইসমাঈলিয়া শহর চষে বেড়াতে থাকেন। তিনি বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে লোকদের সাথে আলাপ করতেন ও ইসলামের আলো ছড়াতেন। এইভাবে কাজ চলে তিনটি বছর। বেশ কিছু লোক তাঁর ডাকে সাড়া দেয়।

আল ইখওয়ানের সদস্যগণ তাঁদের নেতার অনুকরণে লোকদের বাড়িতে বাড়িতে যেতেন। বিশিষ্ট সদস্যগণ মাসজিদে সমবেত লোকদের সামনে বক্তব্য পেশ করতেন। তাঁরা কফি-খানাতেও যেতেন। উপস্থিত লেকাদেরকে নিজেদের বক্তব্য শুনাতেন। সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে তাঁরা যেতেন, তাদের সাথে মিশতেন, তাদের কথা শুনতেন ও তাদেরকে দীনের কথা শুনাতেন।

মাত্র চার বছরের মধ্যেই আল ইখওয়ান খুবই পরিচিত একটি সংগঠনে পরিণত হয়। ইসমাঈলিয়াতে অনেকগুলো শাখা কায়েম হয়। আর নিকটবর্তী শহর পোর্ট সাঈদ, সুয়েজ, আবু সুয়াইর ও সুবরাখিতেও শাখা সংগঠন কায়েম হয়। তখন ইসমাঈলিয়াতেই অবস্থিত ছিলো আল ইখওয়ানুল মুসলিমূনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়।

এখানে নির্মাণ করা হয় একটি মাসজিদ। কিছুকাল পর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশে বালকদের জন্য একটি ও বালিকাদের জন্য আরেকটি স্কুল স্থাপিত হয়। এই স্কুল গুলোতে এমন শিক্ষাপদ্ধতি চালু করা হয় যাতে একজন শিক্ষার্থী পার্থিব বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জনের সাথে সাথে ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে গড়ে উঠে। আরো কিছুকাল পর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সন্নিকটে গড়ে তোলা হয় ক্লাব। এই ক্লাবে শরীর চর্চা ও নির্মল আনন্দদানের বিভিন্ন আয়োজন ছিলো। লোকদের কর্মসংস্থানের জন্য নিকটেই গড়ে তোলা হয় কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান।

কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিলো মডেল। শাখা-সংগঠনগুলো শক্তিশালী হতেই মাসজিদ নির্মাণ, শিক্ষালয় স্থাপন, ক্লাব গঠন ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতো।

শায়খ হাসানুল বান্নার বিরুদ্ধে অভিযোগ

এই সময় মিসরের মসনদে আসীন ছিলেন কিং ফুয়াদ। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইসমাঈল সিদকী পাশা। আল ইখওয়ান তখনো কোন শক্তিধর সংগঠন ছিলো না। তথাপিও প্রধানমন্ত্রী ইসমাঈল সিদকী পাশা এইটিকে বাঁকা চোখে দেখতেন।

শায়খ হাসানুল বান্না একটি সরকারী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা শরু হলো এই বলে যে তিনি সরকারী টাকা খরচ করে দল গঠন করেছেন। তাঁরা কার্যাবলী পরীক্ষা করার জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়। কমিটি তদন্ত করে আপত্তিকর কিছুই পেলোনা। আসলে তাঁকে হয়রানি করার ছিলো এই অভিযোগের আসল উদ্দেশ্য।

সরকারী মহল থেকে প্রচারণা শরু হলো যে হাসানুল বান্না কিং ফুয়াদকে ক্ষমতাচ্যুত করা ও রাজতন্ত্র খতম করার জন্য এই সংগঠন গড়ে তুলেছেন।

শায়খ হাসানুল বান্না কায়রোতে বদলি

১৯৩২ সনের অক্টোবর মাসে শায়খ হাসানুল বান্না কায়রোতে বদলি হন। এই বদলি আল ইখওয়ানের জন্য কল্যাণকর হয়েছিলো। আল ইখওয়ানের কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থানান্তরিত হয় কায়রোতে। এখানে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু হয়। বুঝা যাচ্ছিলো, আগামী দিনগুলোতে আল ইখওয়ান একটি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

উল্লেখ্য যে কায়রোতে বদলি হওয়ার পর শায়খ হাসানুল বান্না বিয়ে করেন। একটি মাসজিদে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়।

প্রধানমন্ত্রী ইসমাঈল সিদকী পাশা আল ইখওয়ানের ওপর বিশেষ দৃষ্টি রাখছিলেন। কিন্তু তিনি আল ইখওয়ানকে ভালো চোখে দেখতেন না। তবে নৈতিক ভাবে দুর্বল করে ফেলার জন্য তিনি আল ইখওয়ানকে অর্থ সাহায্যের প্রস্তাব করেন। বিচক্ষণ শায়খ হাসানুল বান্না এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

শায়খ হাসানুল বান্না কেন্দ্রীয় কার্যালয়টিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন। স্কুলে যাবার আগে তিনি কার্যালয়ে আসতেন। সেই দিনের করণীয় কাজের ফিরিস্তি তৈরী করে সহকারীদের হাতে দিয়ে যেতেন। স্কুল থেকে ফেরার পথে তিনি আবার আসতেন কার্যালয়ে। বিকালের সময়টাতে সাধারণত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হতো। এই সভায় তিনি আল কুরআনে উপস্থাপিত বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে বক্তব্য রাখতেন।

আল আখাওয়াত আলমুসলিমাত গঠন

শায়খ হাসানুল বান্না মহিলাদেরকে স্বতন্ত্রভাবে সংগঠিত করা ও তাদের মাধ্যমে মহিলা অংগনে দীনের মর্মবাণী পৌঁছিয়ে দেয়ার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। আল ইখওয়ানের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিকটে স্থাপিত উম্মাহাতুল মুমিনীন মাদরাসার শিক্ষিকাদেরকে নিয়ে তিনি আল ইখওয়ানের মহিলা শাখা গঠন করেন। এর নাম রাখা হয় ‘আল আখাওয়াত আল মুসলিমাত’। মহিলাদের মধ্যে কিভাবে ও কি কি উপকরণ ব্যবহার করে দাওয়াত সম্প্রসারিত করতে হবে, তাও নির্ধারিত করে দেয়া হয়।

আল ইখওয়ানের সাধারণ সম্মেলন

১৯৩৩ সনে শায়খ হাসানুল বান্নার আহ্‌বানে কায়রোতে অনুষ্ঠিত হয় আল ইখওয়ানের প্রথম সাধারণ সম্মেলন। মিসরে তখন খৃস্টান মিশনারীদের ব্যাপক তৎপরতা চলছিলো। এই সম্মেলনে এই বিষয়ে বিশেষভাবে আলোচনা হয়। সম্মেলন শেষে কিং ফুয়াদকে একটি চিঠির মাধ্যমে খৃস্টান মিশনারীদের তৎপরতা সম্পর্কে অবহিত করা হয়।

এই সনের শেষের দিকে আরেকটি সাধারণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে দাওয়াত সম্প্রসারণের উপায় নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় একটি প্রিন্টিং প্রেস স্থাপনের।

এই সম্মেলনের পর আল ইখওয়ানের সাপ্তাহিত পত্রিকা ‘মাজাল্লাতুল ইখওয়ানুল মুসলিমূন’ প্রকাশনা শুরু হয়। শায়খ হাসানুল বান্নার বক্তব্য মুদ্রিত হয়ে একের পর এক আত্মপ্রকাশ করতে থাকে।

শায়খ হাসানুল বান্না দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রবন্ধ লিখতেন। সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য পরিবেশিত হতো। শায়খ হাসানুল বান্না শাখা সংগঠনগুলো সাপ্তাহিক আলোচনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতেন।

১৯৩৫ সনে শায়খ হাসানুল বান্নার আহ্‌বানে আল ইখওয়ানুল মুসলিমূনের তৃতীয় সাধারণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সাংগঠনিক বিষয়াদি আলোচনা প্রাধান্য পায়। সদস্যদের মান, বৈশিষ্ট্য, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। রোভার স্কাউট গঠনের সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়।

১৯৩৭ সনে মিসরের মসনদে বসেন কিং ফারুক। তরুণ ফারুক একজন ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন। আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকটার মুসতাফা আল মারাগীর প্রভাব ছিলো তাঁর ওপর। তাঁর শাসনকালে মিসরে ইসলামের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে, এটাই ছিলো সকলের আশা। এই আশা নিয়েই আল ইখওয়ানুল মুসলিমূন কিং ফারুকের অভিষেক উৎসব পালন করে। এই উৎসব পালন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয় আল ইখওয়ানের চতুর্থ সাধারণ সম্মেলন। উল্লেখ্য যে, পরবর্তী সময়ে কিং ফারুক দীনের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন।

আলী মাহির পাশার সরকারের প্রতি সমর্থন

কিং ফারুক প্রধানমন্ত্রী বানান আলী মাহির পাশাকে। আলী মাহির পাশা আল ইখওয়ানের বর্ধিষ্ণু শক্তি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন। তিনি তাঁর পরিচালিত সরকারের প্রতি আল ইখওয়ানের সমর্থন চান। আলী মাহির পাশা ইসলামের প্রতি খুবই অনুরাগী ছিলেন। তাঁকে সমর্থন দেয়ার অর্থ ছিলো সরকারের ইসলাম প্রিয় অংশটিকে শক্তিশালী করা। শায়খ হাসানুল বান্না পরামর্শ পরিষদে বিষয়টি তোলেন। দীর্ঘ আলোচনার পর আলী মাহির পাশার সরকারের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিছু সংখ্যক সদস্য এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেন নি। তাঁরা তাদের ভিন্নমত ব্যক্ত করেন। তাঁরা শায়খ হাসানুল বান্নার সহকারী আহমাদ আশ্‌শুককারীর পদত্যাগ দাবি করেন। তাঁদের ধারণা ছিলো যে এই ব্যক্তিটিই সরকারের সাথে আল ইখওয়ানের সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম। শায়খ হাসানুল বান্না আহমাদ আশ শুককারীর বরখাস্তের দাবী মেনে নেননি। এতে উক্ত সদস্যগণ নাখোশ হন।

১৯৩৯ সনের জানুয়ারী মাসে শায়খ হাসানুল বান্নার আহ্‌বানে আল ইখওয়ানের পঞ্চম সাধারণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কায়রোতে।

ইতোমধ্যে আল ইখওয়ান সারাদেশে বিপুল সাংগঠনিক সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়। আল ইখওয়ান মিসরের রাজনীতিতে একটি গণ্য শক্তিতে পরিণতে হয়। নতুন সদস্যগণ যাতে আল ইখওয়ান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পেতে পারে সেই জন্য তিনি এই সম্মেলনে তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন,

‘‘আল ইখওয়ানুল মুসলিমূন একটি সালাফীয়া আহ্‌বান, একটি সুন্নীপথ, একটি সুফী বাস্তবতা, একটি রাজনৈতিক দল, একটি ক্রীড়া সংস্থা, একটি শিক্ষা-সংস্কৃতি পরিষদ, একটি অর্থনৈতিক সংগঠন ও একটি সমাজ দর্শন’’।

ত্বরাপ্রবণ কিছু লোকের ভূমিকা

ইতোমধ্যে আল ইখওয়ানের একটি অতি উৎসাহী গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠে। এরা ছিলো রোভার স্কাউটদেরই একটি অংশ। এরা মনে করলো যে বিপ্লবের সময় এসে গেছে। এখন দেরি করা কাপুরুষতার নামান্তর। ক্ষমতা দখল করে নিলেই হয়। তারা যুক্তি দেখালো যে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘‘যদি তোমাদের কেউ কোন গর্হিত কাজ হতে দেখে তবে সে তার হাত দ্বারা তার প্রতিরোধ করবে, যদি তা করতে সক্ষম না হয় তবে জবান দ্বারা তার প্রতিবাদ করবে, যদি তাও করা সম্ভব না হয় তা হলে হৃদয়ে তার প্রতিরোধের চিন্তা-ভাবনা করবে। অবশ্য শেষটি হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতম পর্যায়।’’

এদের বক্তব্যের জবাবে শায়খ হাসানুল বান্না আল কুরআনের আয়াত বিশেষের দিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আল্লাহ বলেন, ‘‘তুমি লোকদেরকে তোমার রবের পথে ডাক হিকমাহ ও সুন্দর বক্তব্য সহকারে। আর তাদের সাথে আলাপ কর অতীব সুন্দর পদ্ধতিতে। তোমার রব জানেন কে তাঁর পথ ছেড়ে বিভ্রান্ত হয়েছে, আর জানেন কে হিদায়াত অনুসরণ করে চলেছে।’’

এই আয়াত উদ্ধৃতির মাধ্যমে শায়খ হাসানুল বান্না ইসলামী বিপ্লবের সুস্থ ও স্বাভাবিক পদ্ধতি কী তা তাদের সামনে তুলে ধরেন।

শায়খ হাসানুল বান্না হাওয়ার দোলায় আন্দোলিত হবার মতো ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি স্রোতের সাথে ভেসে যাবার পাত্র ছিলেন না। হঠকারিতার পরিণতি কী হতে পারে তাও তিনি বুঝতেন। তাই তিনি স্বীয় মতে অটল থাকেন।

কিছু লোক সংগঠন ছেড়ে চলে যায়।

সরকারের ওপর ইংরেজদের আল ইখওয়ানের চাপ

১৯৩৯ সনে শুরু হয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। গ্রেট বৃটেন চাচ্ছিলো মিসর তার পক্ষাবলম্বন করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করুক। অথচ গ্রেট বৃটেনের পক্ষাবলম্বন করার মানে ছিলো তুর্কীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা। অর্থাৎ মুসলিম সৈন্যগণ মুসলিম সৈন্যদেরকে আহত ও নিহত করা। এমন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সহজ ব্যাপার ছিলো না। শায়খ হাসানুল বান্না এই বিষয়ে সরকারকে পূর্বাহ্নে হুঁশিয়ার করে দেন।

প্রধানমন্ত্রী আলী মাহির পাশা ও প্রধান সেনাপতি জেনারেল আযীয আলী আল মিসরীও ইংরেজ তোষণ নীতি গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন না।

ইংরেজদের বিরাট স্বার্থ তখন সুয়েজে। মিসরের স্বাধীনচেতা সরকার গ্রেট বৃটেনের স্বার্থ বিরোধী পদক্ষেপ নিতে পারে, এই আশংকা তাদেরকে পেয়ে বসে। ইংরেজগণ গোপনে কিং ফারুকের ওপর কুটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। দুঃখের বিষয়, কিং ফারুক ইংরেজদের চাপের মুখে নতি স্বীকার করেন।

১৯৪০ সনে কিং ফারুক প্রধান সেনাপতি জেনারেল আযীয আলী আল মিসরীকে দীর্ঘ ছুটিতে পাঠিয়ে দেন। এই ছুটি আর কোনদিন শেষ হয়নি।

কিছুদিন পরে আলী মাহির পাশাকেও পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। মিসরে ইংরেজদের কূটনীতি বিজয় লাভ করে।

১৯৪০ সনের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন হাসান সাবরী পাশা। তাঁর নেতৃত্বে মিসর আফ্রিকার রণাঙ্গনে গ্রেট বৃটেনের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ঐ বছরের নভেম্বর মাসে হাসান সাবরী পাশা মৃত্যুবরণ করলে নতুন প্রধানমন্ত্রী হন হুসাইন সিররী পাশা।

১৯৪১ সনে শায়খ হাসানুল বান্না আল ইখওয়ানের ষষ্ঠ সাধারণ সম্মেলন আহ্‌বান করেন। এই সম্মেলন কায়রোতে অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে আগামীতে জাতীয় নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

আগেই বলেছি, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আলী মাহির পাশা ও প্রাক্তন প্রধান সেনাপতি আযীয আলী আল মিসরী গ্রেট বৃটেনের তাবেদারী করতে প্রস্তুত ছিলেন না। জনগণের ওপর তাঁদের বেশ প্রভাব ছিলো। পাছে শায়খ হাসানুল বান্না তাঁদের সাথে মিলিত হয়ে সরকার বিরোধী কোন মোর্চা গড়ে তোলেন এই আশংকায় শায়খ হাসানুল বান্নাকে অন্যত্র বদলি করা হয়। গৃহবন্দী করা হয় আলী মাহির পাশাকে। আর গ্রেফতার করা হয় আযীয আলী আল মিসরীকে।

Top