বাইয়াতের হাকিকাত

বাইয়াতের হাকিকাত

অধ্যাপক গোলাম আযম


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

বাইয়াতের হাকিকাত


বাইয়াত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা।সাহাবায়ে ক্যারাম রাসুল সাঃ এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরাম আবু বকর রাঃ এর নিকট বাইয়াত হয়েছেন। মুসলমানদের সামস্টিক পরিচালনার দায়িত্ব যার উপর ন্যস্ত হয়েছে তার নিকট বাইয়াত হওয়ার এ তরিকা ইসলামের ইতিহাসে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। প্রথম চার খলিফার পরও বাইয়াতের এ ধারা জারি ছিল। এমনকি যে খানে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যাবস্থা নেই সেখানেও দীনি মহলে বাইয়াত শব্দটি বেশ প্রচলিত আছে।

আমাদের দেশে পীর-মুরীদীর বেলায়ই এ পরিভাষাটি বিশেষ ভাবে ব্যবহৃত হয়। যিনি মুরিদ হতে চান তাঁকে পীর সাহেবের নিকট বাইয়াত হতে হয়। দেশে বেশ সংখ্যাক পীর সাহেবান আছেন বলে এ পরিভাষাটি ব্যাপকভাবে পরিচিত। কিন্তু অনেকেই ইসলামের বাইয়াত পরিভাষাটির সঠিক তাতপরজ(হাকিকত) জানেননা। অথচ এ বিষয়টি ইসলামের সমাজ ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ সম্পর্কে আলোচনা করার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে।

বাইয়াতের শাব্দিক অর্থ


বাইয়াত শব্দটি আরবি- শব্দ থেকে গথিত। ‘বাইয়’ অর্থ বেচা-কেনা,লেন-দেন, বিক্রি করা-খরিদ করা। এ শব্দটি বিক্রয় ও খরিদ উভয় অর্থেই ব্যবহার করা হয়। তবে এর আসল অর্থ বিক্রয়য়। জিনিস দিয়ে দাম নেয়ার নাম আরবি এভাবেই আরবি অর্থ বিক্রি ও আরবি অর্থ ক্রয়য়। যেহেতু বিক্রয় ছাড়া ক্রয় হতে পারেনা, এবং ক্রয় ছাড়া বিক্রয় হতে পারে না সেহেতু এ দু’টো শব্দই উভয় অর্থেই বাইয়াত ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অবশ্য বিক্রয়ের কাজটাকেই বাইয়াত বলা হয়। আরবি শব্দের মূল অর্থ বিক্রয় বটে, কিন্তু এর গৌণ (secondary) অর্থ হলো চুক্তি,শপথ, অংগীকার। বেচা-কেনার ব্যাপারে ক্রেতার ও বিক্রেতার মধ্যে যেসব শর্ত(terms) ঠিক করা হয় তা মেনে নেয়ার চুক্তির ভিত্তিতেই লেন-দেন হয়ে থাকে। এভাবেই বাইয়াত শব্দটি চুক্তি,শপথ,অঙ্গীকার শ্রদ্ধা প্রদর্শন আনুগত্য স্বীকার ইত্যাদি অর্থে ব্যবহার করা হয়।

আরবি শব্দের ক্রিয়া-বাচক শব্দ হলো আরবি এর অর্থ শুধু বিক্রয় শব্দেই সীমাবদ্ধ নয়। এর অর্থ হয় চুক্তি করা, সম্মান প্রদর্শন করা, নেতৃত্ব মেনে নেয়া, আনুগত্যের শপথ করা, বিক্রয়ের জন্য পেশ করা, চুক্তি চূড়ান্ত করা এবং ব্যবসায় লেন-দেন করা ইত্যাদি।

বিখ্যাত আরবি-ইংরেজি অভিধান আরবি যার সংকলক MILTON COWAN, তাতে আরবি অর্থ লিখা হয়েছেঃ

To sell, to make a contract, to pay homage, to acknowledge as sovereign or leader, to pledge allegiance, to offer for sale, to agree on the term of a sell, to buy, to purchase etc.

এ অভিধানে আরবি অর্থ লিখা হয়েছে- agreement, arrangement, business deal, commercial transaction, bargain, sale, purchase, homage etc.

কুরআনে এ পরিভাষার ব্যবহার


কুরআন মজীদে বাইয় শব্দটি বেচা-কেনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রুজি রোজগারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন রকম কাজে লেগে থাকার অর্থে কয়েকটি সূরায় ব্যবহার করা হয়েছে।

আরবি

‘জুমআর দিনে যখন নামাজের জন্য ডাকা হয় তখন আল্লাহ্‌র যিকরের দিকে দৌড়াও এবং বেচা-কেনা বাদ দাও।’ সূরা জুমআঃ৯ আয়াত)

আরবি

সেসব লোক যাদেরকে ব্যবসা,বেচা কেনা ও কাজ কারবার ইত্যাদি কোন কিছুই আল্লাহ্‌র যিকর থেকে গাফেল করে দেয় না।

  সূরা নুরঃ ৩৭

এ দুটো আয়াতে জীবিকা অর্জনের সব রকম ব্যাবস্থাকেই বাইয় শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে।

সূরা তাওবা,সুরা ফাতহ, সূরা মুমতাহিনায় বাইয় শব্দটি রুপকভাবে বিক্রয় অর্থেই ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এখানে বিক্রয় মানে নিজের সত্তা ও জান-মালকে কোন মহান উদ্দেশ্য আল্লাহ্‌ ও রাসুলের নিকট সমর্পণ করার চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া বা ওয়াদা করা।

আরবি

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ মুমিনদের জান ও মাল বেহেশতের বদলে কিনে নিয়েছেন। তার আল্লাহ্‌র পথে লড়াই করে,(দুশমনকে) মারে এবং নিজেরাও নিহত হয়।তাওরাত,ইঞ্জিল, ও কুরআনে তাদের জন্ন(বেহসত দেয়ার এ ওয়াদা) আল্লাহ্‌র দায়িত্ব একটা পাকা ওয়াদা, আল্লাহ্‌র চেয়ে বেশী ওয়াদা পূরণকারী আর কে আছে? সুতরাং তোমরা যে বাইয়াত করেছ সে বিসয়ে তোমরা সন্তুষ্ট থাক। এটাই সবচেয়ে বড় কামিয়াবি।’ সূরা তাবা ১১১

আরবি

‘হে রাসুল! যেসব লোক আপনার নিকট বাইয়াত হচ্ছিল। তাদের হাতের উপর আল্লাহ্‌র কুদরতের হাত ছিল। সূরা ফাতহ ১৮

আরবি

‘হে নবী! আপনার নিকট যদি মেয়েরা এ কথার উপর বাইয়াত হবার জন্য আসে যে তারা আল্লাহ্‌র সাথে কাউকে শরিক করবেনা, চুরি করবেনা,যিনা করবেনা, তাদের সন্তান হত্যা করবেনা, নিজেরা কোন অপবাদ রচনা করে আনবে না ও ন্যায্য ব্যাপারে আপনার অবাধ্য হবে না, তা হলে আপনি তাদের বাইয়াত কবুল করুন। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ অতি ক্ষমাশীল ও দয়াবান।’ সূরা মুমতাহিনা ১২

এ কয়টি আয়াতে বাইয়াত শব্দটি নির্দিষ্ট অর্থে ইসলামী পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সূরা তওবাতে জান ও মাল আল্লাহ্‌র নিকট সমর্পণ করার অর্থে, সূরা ফাতহে রাসুলের নির্দেশে মৃত্যুবরণ করার অর্থে এবং সূরা মুমাতাহিনায় আল্লাহ্‌ ও রাসুলের সাথে নাফরমানি না করার ওয়াদার অর্থে বাইয়াত কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ্‌ ও রাসুলের পূর্ণ আনুগত্যের শপথই এসব বাইয়াতের আসল উদ্দেশ্য।

সূরা তাওবাতে বাইয়াতে মানে মুমিনদের জান ও মালকে আল্লাহ্‌র মরজি মতো কাজে লাগাবার এবং নিজেদের খেয়াল এবং খুশি মতো ব্যবহার না করার ওয়াদা। সূরা ফাতহে বাইয়াত মানে রাসুল সাঃ এর নির্দেশে জীবন দেয়ার শপথ করা।হুদাইবিয়ার সন্ধির পূর্বে হযরত ওসমান রাঃ কে মক্কাবাসীরা হত্যা করেছে বলে গুজব শুনে কুরাইশদের বিরুদ্ধে নিরস্ত্র অবস্থায়ও উপস্থিত সকল সাহাবা যুদ্ধ করতে প্রস্তুত বলে ঐ শপথ করেছিলেন। আর সূরা মুমতাহিনাতে আল্লাহ্‌ ও রাসুলের অবাধ্য না হওয়ার ওয়াদাই বায়াতের উদ্দেশ্য। সুতরাং এসব কয়টি আয়াতেই বাইয়াতের সারমর্ম হল মুমিনের জান মাল,ইচ্ছা- বাসনা,রথাত পূর্ব সত্তাকে আল্লাহ্‌র মর্জির নিকট সমর্পণ করা। এটাই ইসলাম কবুলের মর্মকথা। ইসলাম শব্দের অর্থও আত্নশমর্পন। বাইয়াতের মাধ্যমে আত্নশমর্পনের বাহ্যিকরূপ প্রকাশ পায়।

বাইয়াতের ব্যাখ্যা


সূরা তাওবাতে ১১১ নং আয়াতে আল্লাহ্‌ পাক নিজেই ঘোষণা করেছেন যে, তিনি মুমিনদের জান অমাল খরিদ করে নিয়েছেন। আল্লাহ তায়লা একথা বলেননি যে, মুমিনরা তাদের জান ও মাল তার কাছে বিক্রয় করেছে। কিন্তু মালের মালিক যদি তার মাল নিজের ইচ্ছায় বিক্রয় না করে তাহলে সে মাল কেউ খরিদ করতে পারে না।কারন জোর করে নিলে তা কেনা হয়েছে বলে গণন হয় না।

সব মুমিনই আল্লাহ্‌র নিকট তাদের জান ও মাল বিক্রয় করে না। যারা বিক্রয় করে তারাই সত্যিকারের মুমিন। তাই এ আয়াতে আল্লাহ্‌ একথাই বলতে চেয়েছেন যে, যারা নিজ ইচ্ছায় তাদের জান মাল বিক্রয় করেছেন তাদের কাছ থেকেই তিনি কিনেছেন। অর্থাৎ যাদের জান-মাল তিনি কিনেছেন তারা সন্তুষ্ট চিত্তেই বেচতে রাজী হয়েছে। তাদের কাছ থেকে জোর করে কেনা হয়নি বা তাদেরকে বেচতে বাধ্য করা হয়নি।

কোন জিনিস কারো কাছ থেকে কিনলে বিক্রেতাকে অবশ্যই তার দাম দিতে হয়। তা নাহলে কেনার দায়িত্ব পালন করা হয় না। দাম না দিয়ে জিনিস নিলে বুঝা যায় যে মালের মালিক তার মাল কাউকে দান করেছে, বিক্রয় করেনি। তাই আল্লাহ পাক মুমিনের জান-মাল কিনে নিয়েছেন বলার সাহথে সাথেই দামের কোথাও উল্লেখ করেছেন। যে দাম তিনি দিতে চান তা দুনিয়ার কোন জিনিস নয়। তিনি এত বিরাট মূল্য দিতে চান যা দুনিয়ার কোথাও পাওয়া যায় না।

মুমিনের জান-মালের বদলে তিনি বেশেস্ত দেবার কথা ঘোষণা করেছেন। যেহেতু বেহেস্ত দুনিয়ার জিবিনে পাওয়ার উপায় নেই, সেহেতু এখানে নগদ দাম পরিশোধ করাও শভব নয়। অর্থাৎ আল্লাহ্‌ পাক বাকিতেই মুমিনের জান-মাল কিনে নিয়েছেন। আল্লাহ্‌ নগদ দাম নিচ্ছেন না বলে মুমনের জান-মাল বিক্রয় করার সাথে সাথেই নিয়ে নেন না। বরং মুমিনের জান-মাল তার কাছেই আমানত রাখেন। যদি কেনার সময় জান-মাল আল্লাহ্‌র নিজের হাতেই নিয়ে নিতেন তাহলে ঝামেলা চুকে যেতো। কিন্তু আল্লাহ পাক কিনে নেয়ার ঘোষণা স্বীকার করেও মুমিনের জান মাল তার কাছেই আমানত রেখেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ পাক বলতে চান যে, হে মুমিন তোমার জান-মাল আমার কাছে বক্রয় করেছ বলে তুমি দাবী করছ তা তোমাকে বাস্তব প্রমাণ করে দেকাহতে হবে। তোমার জান ও মাল আর তোমার মালিকানায় নেই। তোমার বাকি জীবনে এ জান মাল যদি সম্পূর্ণরূপে আমার মরজি মত ব্যবহার কর তাহলে আমি স্বীকার করবো যএ তুমি তা সত্যি আমার কাছে বেচেছ। এ প্রমাণ দিতে পারলে মৃত্যুর পরপারে ের দাম হিসেবে বেহেস্ত অবশ্যই পাবে।

রাসুলের নিকট বাইয়াত অর্থ কি?


কোন মাল কারো কাছে একবার বিক্রয় করার পর ের মালিকানা ষত্ব ক্রেতার হাতে চলে যায়। বিক্রেতা এ মাল আবার অন্য কারো কাছে বেচতে পারে না। কারন এক মাল একি ব্যক্তি কেমন করে বার বার বিক্রয় করবে?

মুমিন তার জান-মাল আল্লাহ্‌র কাছে বিক্রয় করার পর এর মালিকানার সত্ব ক্রেতার হাতে চলে গেছে। প্তহচ শাবায়ে ক্যারাম রাসুল সাঃ ের কাছে বাইয়াত হয়েছেন বলে কুরআন ও হাদিসে প্রমাণিত। তাই প্রশ্ন জাগে যে, রাসুল সাঃ এর কাছে বাইয়াত হওয়ার মানে কি? একবার আল্লাহ্‌র কাছে জান-মাল্বিক্রয় করা হয়েছে। রাসুল সাঃ ের নিকট আবার কি বিক্রয় করা হলো? এ প্রশ্নের সঠিক জবাব পেলেই বাইয়াতের হাকিকত বুঝাজাবে।

আগেই বলে হয়েছে যে, আল্লাহ পাক মুমিনের জান-মাল কিনে তারই হাতে আমানত রেখে দেন। সচেতন মুমিন একথা ভালভাবেই জানে যে। তার যে জান ও মাল আল্লাহ্‌র মালিকানায় দিয়ে দেওয়া হয়েছে তা আল্লাহ্‌র মর্জি মতো কাজে লাগানোই সঠিক দায়িত্ব। শয়তানের ওয়াসওয়াসায় ও নফসের ধোঁকায় পরে, পরিবার পরিজনের দাবিতে এবং আন্তীয় ও বন্ধু-বান্ধবের চাপে পরে আল্লাহ্‌র মর্জির খেলাফ জান ও মাল খরচ করে ফেলার আশঙ্কা অবশ্যই রয়েছে। তাই আল্লাহ্‌র এ আমানত সঠিকভাবে আল্লাহ্‌র মর্জি মত ব্যবহার করার উদ্দেশ্যই সাহাবায়ে ক্যারাম রাসুল সাঃ এর নিকট বাইয়াত হয়েছেন।

আল্লাহ্‌র নিকট জান মাল বিক্রয় করা মানে যাবতীয় শক্তি সামর্থ্ এবং সময়, সম্পদ ও শ্রম আল্লাহ্‌র আনুগত্তের অধীনে ব্যবহার করার ওয়াদায় আবদ্ধ হওয়া। এ ওয়াদা এমন ব্যপক যে ইচ্ছা শক্তি, চিন্তা শক্তি মনন শক্তি বং বুদ্ধিব্রত্তিকেও আল্লাহ্‌র মর্জির অধীন করা বুঝায়। এইরূপ পুরনাঙ্গ দাবী পূরণ করতে হলে আল্লাহ্‌র সাথে গোপনে চুক্তিবদ্ধ হওয়াই যথেষ্ট নয়। মানুষ যেভাবে শয়তানের ওয়াসওয়াসায়, নফসের ধোঁকা দুনিয়ার মোহ, অন্য মানুষের প্রচনা ইত্যাদি দ্বারা ঘেরাও হয়ে আছে তাতে সাংগঠনিক ব্যবস্থা ছাড়া আল্লাহ্‌র পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য করা বাস্তবে সম্ভব হয় না। একারনেই আল্লাহ্‌র রাসুলের দিনই দাওয়াত যারা কবুল করেছেন তাদেরকে রাসুলের নেতৃত্ব মেনে জামায়াতবদ্ধ হবার তাগিদ আল্লাহ্‌ দিয়েছেন। এ জাতিয় সাংগঠনিক বন্ধন ছাড়া আল্লাহ্‌র পুরনাঙ্গ আনুগতের পথে অগণিত বাঁধা দূর করা সম্ভব নয়। যার শ্নগথনিক শৃঙ্খলা কবুল করে রাসুলের জাম্যাতের শরিক হতে রাজী হয়েছেন তার আল্লাহ্‌র পুরনাঙ্গ আনুগত্তের উদ্দেশে সংগঠনের নির্দেশ পালন করতে অয়াদাবদ্ধ হয়েছেন, যাতে সকল প্রকার ধোঁকার থেকে বেঁচে থাকতে পারেন। ইসলামী জামায়াতের আনুগত্যের মাধ্যমেই আল্লাহ্‌র আনুগত্য বাস্তবে সহজ ও সম্ভব হয়। জামায়াতের আনুগত্যের এ শপথই ইসলামী পরিভাষায় বাইয়াত নামে পরিচিত। সাহাবায়ে কেরাম রাসুল সাঃ এর নিকটে যে বাইয়াত হন তা এ আনুগত্যেরই শপথ। সাহাবায়ে কেরাম বাস্তব জীবনই এর সাক্ষী যে তারাবাইয়াতের তাৎপর্য অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। এ বাইয়াতের দাবী হলো রাসুলের পূর্ণ আনুগত্য। তাই দেখা যায় যে রাসুল সাঃ কোন কাজের নির্দেশ দিলে বিনা অজরে সাহাবায়ে কেরাম তা পালন করতেন। যারা অজর পেশ করতো তাদেরকে কুরআনে মুনাফিক বলা হয়েছে।

একবার রসুল সাঃ সবাইকে যুদ্ধে যাবার হুকুম দিলেন। এক সাহাবির মা মৃত্যু শয্যায় থাকা স্বতেও তিনি যুদ্ধে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে যথা সময়ে হাজির হয়ে গেলেন। তিনি রাসুল সাঃ কে মায়ের অবস্থাটা জানালেন। ওজর পেশ করে না যাওয়ার উদ্দেশ্য অবশ্যই ছিল না। কিন্তু অবস্থা জেনে রাসুল সাঃ তাঁকে মায়ের খেদমতে পাঠিয়ে দিলেন।

এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্য করার বিষয় যে, ঐ সাহাবি মাকে এ অবস্থায় ফেলে যাওয়া সম্ভব নয় বলে নিজেই যুদ্ধে না যাবার সিদ্ধান্ত নেননি। কারন বাইয়াতের দরুন এমন সিদ্ধান্ত নেবার কোন ইখতিয়ারই নেই বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রসূলের হাতে তুলে দিয়েছেন বাইয়াতের মাধ্যমে। তাই কোন ওযর আপত্তি দেখিয়ে রাসুলের আদেশ পালন না করার সিদ্ধান্ত নেননি। যদি তিনি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তরি হয়ে রাসুলের নিকট হাজির না হতেন এবং নিজেই না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেন তাহলে তা বাইয়াতের খেলাফ হতো।

রাসুল সাঃ অবস্থা জেনে তাঁকে মায়ের খেদমত করার অনুমতিদেয়ার ফলে তিনি যুদ্ধে না যেও যুদ্ধে যাবার সওয়াব পেলেন। কিন্তু যদি তিনি নিজে এ সিদ্ধান্ত নিতেন তাহলে রাসুল সাঃ এর আদেশ অমান্য করার মত বড় অন্যায় হয়ে যেতো।

রাসুলের নির্দেশে তাবুক যুদ্ধে যেতে রাজী হয়েও বিলম্ব করে ফেলার কারনে ৩জন সাহাবিকে ৫০ দ্বীন পর্যন্ত এক ঘরে করে রাকাহ হয়েছিল। আল্লাহ পাক নিজে তাদের তাওবা কবুল হওয়ার কথা ঘোষণা না করা পর্যন্ত তাদের সামাজিক ভাবে বয়কট করা হয়েছিল। বাইয়াতের মর্যাদা রক্ষার গুরুত্ব কতটুকু তা এ ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট।

এ বাইয়াত কি শুধু রাসুলের কাছেই হতে হয়?


সাহাবায়ে কেরাম সরাসরি রাসুল সাঃ এর নিকট বাইয়াত হয়েছিলেন।রাসুল সাঃ এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন মানবসত্তা নেই। অথচ রাসুল সাঃ দুনিয়া থেকে চলে যাবার পর সাহাবাগন হযরত আবুবকরের রাঃ নিকট আবার বাইয়াত হলেন। এভাবেই পরবর্তী খলিফাগণের নিকট বাইয়াত হতে হয়েছে। এ দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয় যে, ইসলামে বাইয়াত এমন এক জরুরি নিয়ম যা রাসুলের পরও চালু রাখতে হয়েছে এবং উম্মতের মধ্যে এ নিয়ম চিরদিনই চালু থাকা উচিত।

অবশ্য রাসুল সাঃ এর নিকট বাইয়াত ও পরবর্তী কারো নিকট বাইয়াতের মধ্যে আনুগত্তের ব্যাপারে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। সর্বাবস্থায় বিনা শরতে আল্লাহ রাসুলের আনুগত্য করতে হয়, কিন্তু রাসুল ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য অন্ধভাবে করা চলে বনা, কুরআন সুন্নাহ্র অধীনে তাদের আনুগত্য করতে হয়। রাসুলের আনুগত্য নিরুঙ্কুস ও নিঃশর্ত অন্যের বেলায় তা শর্তাধীন। এখন প্রশ্ন হল ইসলামী বিধান অনুযায়ী এ বাইয়াত কার নিকট হওয়া উচিত? ইতিহাস থেকে একথাই প্রমাণিত হয় যে, মুসলমানদের জামায়াতে বা অন্য সংগঠনের দায়িত্বশীলদের নিকট বাইয়াত হতে হয়। যতদিন রাসুল সাঃ নিজে এ জামায়াতের দায়িত্বশীল ছিলেন ততদিন তারি নিকট বা তার নিযুক্ত কোন ব্যক্তির নিকট বাইয়াত হতে হয়েছে। দুনিয়া থেকে তার বিদায় হবার পর ঐ জামায়াতেরদায়িত্ব যার উপর পরেছে তারই নিকট বাইয়াত হতে হয়েছে। অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরামের সময় থেকেই এ বিরাট শিক্ষা চলে এসেছে যে, মুসলমানদেরকে জামায়াতবদ্ধহয়ে থাকতে হবে এবং যিনিই ঐ জামায়াতের নেতা নির্বাচিত হন তাঁরই কাছে বাইয়াত হতে হবে। জামায়াতবিহীন অবস্থায় থাকা মুসলমানদের উচিত নয় এবং জামায়াতবদ্ধ হবার প্রমাণই হল জামায়াতের আমিরের নিকট বাইয়াত হওয়া।

বর্তমানে সারাদুনিয়ার এক্স পঁচিশ কোটি মুসলমান এক জামায়াতবদ্ধ অবস্থায় নেই। তাই গোতা উম্মতের কোন একজন নেতা বা আমীর নেই। এমনকি কোন এক দেশের সব মুসলমানও এক জামায়াতবদ্ধ নয়। প্রকৃত অবস্থা এই যে, বর্তমানে মুসলিমদের মধ্যে জামায়াতবদ্ধ হওয়ার চেতনাই দুর্বল হয়ে গেছে। এমনকি ওলামায়ে কেরামের মধ্যে এ চেতনা ব্যাপক নয়। এ কারনেই মুসলিমদের জীবনেই ইসলামের প্রভাব এত কমে গেছে।

প্রচলিত বাইয়াত


সাহাবায়ে কেরামের যুগে যে উদ্দেশ্যে বাইয়াত প্রচলন হয়েছিল বর্তমানে ঐ মহান উদ্দেশ্য চালু না থাকলেও বাইয়াতের পরিভাষা সমাজে এখনো প্রচিলত আছে।

বেশ কয়েকটি আরব দেশের বাদশাহগণ সরকারী দায়িত্ব গ্রহণের অংশ হিসেবে দেশের নাগরিকদের বাইয়াত গ্রহণ করেন। এ বাইয়াত দ্বারা বাদশাহর নেতৃত্ব পরিচালিত সরকারের প্রতি নাগরিকদের আনুগত্য প্রকাশ করাই আসল উদ্দেশ্য। আমাদের দেশে পীর সাহেবান তাদের মুরিদদের বাইয়াত গ্রহণ করেন। দিনের ব্যাপারে পির সাহেবের হেদায়েত অনুযায়ী চলবার ওয়াদাই এ বাইয়াতের উদ্দেশ্য।

বাইয়াতের আসল উদ্দেশ্য


রাসুল সাঃ এর নিকট সাহাবায়ে কেরাম যে উদ্দেশ্য বাইয়াত হতেন। সেটাই হলো আসল উদ্দেশ্য। ঐ উদ্দেশ্য বাইয়াত এর পদ্ধতি চালু করতে হলে কয়েকটি শর্ত পূরণ হতে হবে।

১। রাসুল সাঃ ইকামাতের দিনের যে আন্দোলন করেছিলেন সে আন্দোলনের দাওয়াত সমাজে পেশ করতে হবে।

২। এ দাওয়াতে সারা দিয়ে যারা আন্দোলনে শরিক হতে আগ্রহী তাদেরকে সংগঠিত করতে হবে।

৩। তাদের মন-মগজ ও চরিত্রকে ইকামাতে দিনের উদ্দেশ্য গড়ে তুলতে হবে।

৪। যারা ইকামতে দীনের বিরাট দায়িত্ব ভালভাবে বুঝে নিয়ে তাদের জান ও মাল আল্লাহ্‌র দ্বীনকে বিজয়ী করার উদ্দেশ্যে কাজে লাগাতে আগ্রহী তাদের নিকট থেকে বাইয়াত নিতে হবে।

৫। ইকামতে দীনের উদ্দেশ্যে গঠিত জামায়াতের সদস্যদের দ্বারা যিনি জামায়াতের আমীর নির্বাচিত হন্তারই নিকট বাইয়াত হতে হবে। এ নিয়মে যদি বাইয়াত হতে হবে। এ নিয়মে যদি বাইয়াত চালু হয় তাহলে তা প্রকৃতপক্ষে কোন ব্যক্তির নিকট বাইয়াত হওয়া বুঝায় না বরং ইসলামী জামায়াত বা সংগঠনের নিকটই বাইয়াত হওয়া বুঝায়।

মূলত বাইয়াত ব্যক্তি বিশেষের নিকট নয়, ইসলামী সংগঠনের নিকট হওয়াই যুক্তিযুক্তও। অবশ্য কোন ব্যক্তির নিকটই বাইয়াতের শপথনামা পেশ করতে হয়। কেননা সংগঠন জীবন সত্তা নয় যার নিকট তা পেশ করা যায়। রাই সংগঠনের দায়িত্বশীলের মাধ্যমে ইসলামী সংগঠনের নিকট বাইয়াত হতে হয়।

ইখওয়ানুল মুসলিমুন ও জামায়াতে ইসলামীর মতো যেসব সংগঠন ইকামাতে দীনের উদ্দেশ্যে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে তাদের মধ্যে বাইয়াতের ধারনাই চালু রয়েছে। যারা জামায়াতে ইসলামীর রুকন(সদস্য) হন, তারা শপথের গ্রহণের মাধ্যমে সংগঠনের মাধ্যমে সংগঠনের নিকট বাইয়াত হন। জামায়াতের গঠনতন্ত্রে ৮ নং ধারা অনুযায়ী আমিরে জামায়াত বা তাঁর কোন প্রতিনিধি সামনে রুকনিয়াতের শপথ গ্রহণ করতে হয় এ শপথই বাইয়াত হিসেবে গণ্য।

বাইয়াতের দাবী


ইকামাতে দীনের মহান লক্ষে পরিচালিত কোন ইসলামী সংগঠনের নিকট যে ব্যক্তি বাইয়াত হন তাঁর নিয়ত এ বাইয়াতের দাবী নিম্নরূপঃ

১। এই বাইয়াতের মাধ্যমে ব্যক্তির জান ও মাল অর্থাৎ গোটা সত্তা, যা আল্লাহ্‌র নিকট বিক্রয় করা হয়েছে, তা সাংগঠনিক পদ্ধতিতে ইকামাতে দীনের উদ্দেশ্য ব্যবহার করার শপথই নেয়া হলো। তাই এ নিয়মেই জান ও মাল আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করতে হবে।

২। ইসলামী সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে যে কোন নির্দেশ বা দায়িত্ব দেয়া হবে, তা কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধী না হলে বিনা দ্বিধায় পালন করতে হবে এবং এ ব্যাপারে দুনিয়ার কোন রকম ক্ষয়-ক্ষতির পরওয়া করা চলবে না।

৩। যদি সংগঠনের কোন দায়িত্বশীলদের নির্দেশ সঠিক নয় বলে কারো মনে হয়, তাহলে, তাহলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সাথে আলোচনা করে মিমাংসায় পৌছাতে হবে। আলোচনা ছারাই নির্দেশ পালনে অবহেলা করা হলে বাইয়াতের খেলাফ হবে বলে এ বিষয়ে সাবধান হতে হবে।

৪। কোন বিশেষ অসুবিধা বা ওযরের কারনে যদি কোন নির্দেশ পালন করা অসম্ভব মনে হয়, তাহলে ঐ দায়িত্বশীলের নিকট ওযর পেশ করতে হবে। সংগঠন যে সিদ্ধান্ত দেয় তাই চূড়ান্ত বিবেচনা করতে হবে। সংগঠনের কোন সিদ্ধান্ত ছাড়া নিজের কোন ওযরের অজুহাতে নির্দেশ পালন নাকরলে বাইয়াতের খেলাফ কাজ হয়েছে বলে গণ্য হবে।

সব আন্দোলনেই শপথের রীতি আছে


বাইয়াতের মরম কথা হলো আনুগত্যের ধপথ। যারা কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য হাসিলের জন্য দৃঢ়সংকল্প নিয়ে আন্দোলন করে, তারা স্বাভাবিক কারনেই সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষ ধরনের শপথের মাধ্যমে তাদের নিরুংকুস আনুগত্যের ব্যবস্থা করে। ইসলামী আন্দোলন ছাড়াও সবরকমের আন্দোলনেই এ জাতীয় শপথের রীতি আছে। লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে জীবন বিসর্জনের যে শপথ নেয়া হয় তা অগ্নি শপথ বা রক্ত-শপথ বা দ্রিপ্ত-শপথ ইত্যাদি নামে পরিচিত। এমনকি নিজ দেহের রক্ত দিয়ে শপথ নামায় দরখাস্ত করার রীতিও চালু রয়েছে। কিন্তু ইসলামে একমাত্র আল্লাহ্‌র নাম নিয়েই শপথা নেয়া হয়।

 

Top