আমরা সেই সে জাতি – ১ম খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

মহানবীর (সা) দূত মাথাঃয় এক টুকুর মাটি নিয়ে ফিরলেন

পারস্য সম্রাট খসরু তখন সিংহাসনে সমাসীন। তাঁর প্রতাপে চারদিক প্রকম্পিত। ভান্ডারে তাঁর অফুরন্ত হীরা, জহরত, মনিমুক্তা।

গর্বিত সম্রাট ভাবেন, তাঁর সম্রাজ্য যেমন অজয় অক্ষয়, তেমনি তাঁর সম্পদের কোন শেষ নেই। এই সম্রাট খসরুর কাছেই গেলেন রাসূলুল্লাহ (সা) এর দূত। রাসূল (সা) এর একটি পত্র ছিল তার সাথে । পত্রে রাসূল (সা) সম্রাট খসরুকে আহবান জানিয়েছিলেন সত্যের দিকে। সম্রাট খসরু মহানবীর সে চিঠি পাঠ করলেন। পাঠ করে ক্রোধে ফেটে পড়লেন। বললেন, “তোমাদের এত বড় স্পর্ধা। পারস্যের একচ্ছত্র অধিপতি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সম্রাট খসরুর দরবারে ধর্ম কথা নিয়ে আসতে সাহস করেছো? তোমরা তো অত্যন্ত ঘৃণিত ও নীচ লোক।”

দূত সহস্যে বললেন, “নিশ্চয়ই আমরা অত্যন্ত নীচ ও ঘৃণিত ছিলাম। অতঃপর আমাদের মাঝে এলেন একজন মহামানব মহানবী। তিন আমাদের সত্যের সন্ধান দিলেন। আমরা উন্নত হয়ে উঠলাম। আপনি যদি তাঁর শিক্ষা, তাঁর ধর্মমত গ্রহণ করেন, তবে আমরা ভাই ভাই। নচেৎ অসত্যের সাধে সত্যের দ্বন্দ্ব অনিবার্য।”

গর্বিত সম্রাট খসরু মহানবীর দূতের এই কথা শুনে বারুদের ন্যায় জ্বলে উঠলেন। বললেন, “ওহে কে আছ, এর মাথায় পারস্যের এক টুকরি মাটি উঠিয়ে দাও। সম্রাট খসরুর দরবারে এসে এমন ভালো লোখ খালি হাতে ফিরে যাবে, তা বড়ই অশোভন।”

অবিলম্বে এক টুকরি মাটি এনে পারসিকেরা মহানবীর দূতের মাথায় চাপিয়ে দিল। সকৌতুকে সম্রাট খসরু বললেন, “যাও, এ ভাবেই তোমরা পারসিকদের দাসত্ব করবে।”

সাহাবা সে মাটির টুকরি আর মাথা থেকে নামালেন না। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পারস্য থেকে হিজাযে উপস্থিত হলেন। মাথায় টুকুরি, পারিশ্রান্ত দেহ। কিন্তু মুখে প্রসন্ন হাসি। তিনি হাজির হলেন মহানবীর নিকট। বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা), আমি পারসিকদের নিজহাতে দেয়া মাটি মাথায় তুলে নিয়ে এসেছি।”

শুনে মহানবীর মুখমন্ডল স্বর্গীয় হাসিতে দীপ্ত হয়ে উঠল। বললেন তিনি. “উত্তম, ইনশায়াল্লাহ এটাই হবে। অচিরেই সে দেশের মাটি ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেবে।”

মহানবীর এ ভবিষ্যতবাণী অতি অল্প দিনেই অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবরূপ লাভ করলো। বিশাল পারস্য সাম্রাজ্য নিঃশেষে মুসলমানদের করতলগত হলো। আর সম্রাট খসরুর বংশের সর্বশেষ্ঠ প্রতাপশালী সম্রাট ইয়াজদগির্দ কপর্দকশূন্য কাংগাল সেজে রাজ-প্রাসাদ থেকে পথে গিয়ে দাঁড়ালেন।

‘একদিন যিনি এতগুলো সৎকাজ করেছেন তিনি নিশ্চয়ই জান্নাতে প্রবেশ করবেন’

একদিন মহানবী (সা) তাঁর সামনে ‍উপস্থিত সাহাবাদের লক্ষ্য করে বললেন, “তোমাদের মধ্যে এমন কে আছ যে আজ রোযা রেখেছ?” হযরত আবুবকর (রা) বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি রোযা রেখেছি।” নবী (সা) বললেন, “এমন কে আছ যে, আজ কোন শাবাধারের সাধে গমন করে জানাযার নামায পড়েছ?” আবুবকর (রা) বললেন, “এইমাত্র আমি একাজ সমাধা করে এখানে এসেছি।” মহানবীর (সা) কণ্ঠ থেকে আবার ঘোষিত হলো, “আচ্ছা এমন ব্যক্তি কে আছ যে আজ কোন পীড়িতের সেবা করেছ? হযরত আবুবরক বললেন, “আজ আমি এক পীড়িত ব্যক্তির সেবা করেছি।” মহানবী (সা) আবারও বললেন, “আজ কিছু দান করেছ, এমন ব্যক্তি এই মজলিসে কেউ আছ?” সলজ্জভাবে হযরত আবুবকর উত্তরে বললেন, “এক অতিথিকে আমি সামান্য কিছু অর্থ সাহায্য করতে পেরেছি।” অবশেষে বিশ্বনবী (সা) বললেন,“একদিনে যিনি এতগুলো সৎকাজ করেছেন নিশ্চয় তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন।”

একটি হাদীস এবং আববকর (রা)

এই হাদীস শুনানোর পরবর্তীকালে হযরত উমার (রা) বলেছিলেন, “সত্যই জগতে এমন কোন উত্তম কাজ নেই, যা আবুবকর (রা) সর্বাগ্রে ‍সুসম্পন্ন না করেন। এটা আমার অনুমান নয়, অভিজ্ঞতার কথা। একদিন আমি অশীতিপর এক বৃদ্ধার উপবাসের কথা শুনে কিছু খাবার নিয়ে তার বাড়ীতে গিয়ে উপস্থি হলাম। কিন্তু গিয়েই শুনলাম, কে একজন দয়ালু ব্যক্তি অল্পক্ষণ আগে আহার করিয়ে গেছেন। আমি সেদিন ফিরে এসে পরের দিন একই ভাবে কিচু আহার নিয়ে তার কাছে গেলাম। কিন্তু একই ঘটনা প্রত্যক্ষ করলাম, কে একজন আমর যাওয়ার পূর্বেই তাকে আহার করিয়ে গেছে। কে এই দয়ালূ ব্যাক্তি, কে এমন নিয়ম বেঁধে তাকে আহার করিয়ে যায়, তা জানবার জন্য আমার জিদ চেপে গেল। পরের দিন সকাল সকাল আমি বৃদ্ধার বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম। আমার আজকের শপথ, বৃদ্ধাকে আজ আমার আহার করাতেই হবে, সে ব্যক্তিকে আজ আমাকে দেখতেই হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, বৃদ্ধার গৃহমধ্যে ঢুকতে যাচ্ছি এমন সময় দেখলাম, শূণ্য বাসন পেয়ালা নিয়ে আবু বকর (রা) বের হয়ে আসছেন। আমি তাঁকে সালাম জানিয়ে বললাম. ‘বন্ধবর’ আমিও এটাই অনুমান করেছিলাম। তিনি নীরব হাস্যে আমাকে প্রতিসালাম জানিয়ে করমর্দন করে বাড়ীর পথ ধরলেন।”

‘আবুবকর পরবর্তী খলীফাদের বড় মুস্কিলে ফেলে গেলেন’

হযরতহ আবুবকর ছিদ্দীক (রা) মুসলিম জাহানের খলীফা হয়েছেন। অলফা নির্বাচিত হবার ক‘দিন পরের ঘটনা। নতুন চাদরের একটি বোঝা নিয়ে খলীফা বাজারে চলেছেন বিক্রি করার জন্য। উমার (রা) পড়লেন পথে। তিনি বললেন, “কোথায় চললেন?”

আবু বকর (রা) বললেন, “বাজারে যাচ্ছি”। হযরত উমার (রা) বুঝলেন, খলীফা হওয়ার আগে হযরত আবু বকর কাপড়ের যে ব্যবসা করতেন, তা এখনও ছাড়েননি। উমার বললেন, “ব্যবসায় মগ্ন থাকলে খিলাফাতের কাজ চলবে কেমন করে?”

হযরত আবু বকর বললেন, “ব্যবসা না করলে পরিবার-পরিজনদের ভরণ পোষণ করব কি দিয়ে?” উত্তরে হযরত উমার বললেন, “বাইতুল মালের খাজাঞ্চি আবু উবাইদার কাছে চলুন, তিনি আপনার জন্য একটা ভাতা নির্দিষ্ট করে দেবেন”, বলে হযরত আবুবকরকে টেনে নিয়ে আবু উবাইদার কাছে গেলেন।

আলোচনার পর অন্যান্য মুহাজিরকে যে হারে ভাতা দেয়া হয় সে পরিমাণের একটি ভাতা খলীফা হযরত আবু বকরের জন্য নির্দিষ্ট হলো। ভাতা নির্দিষ্ট হবার পর খলীফা এ কথাটি জনসাধারণ্যে প্রকাশ করার প্রয়োজন মনে করলেন। তিনি মদীনায় সকল লোককে ডেকে বললেন, “তোমরা জান যে, ব্যবসা দ্বারা আমি জীবিকা নির্বাহ করতাম। এখন তোমাদের খলীফা হবার ফলে সারাটা দিনই খিলাফতের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়, ব্যবসা দেখাশুনা করতে পারিনা। সে জন্য বাইতুল মাল থেকে আমাকে ভাতা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে।”

হযরত আবু বকর (রা) বেঁচে থাকার প্রয়োজনে যেটুকু ভাতা গ্রহণ করতেন, জনসাধারণের কাছ থেকে এই ভাবে তা তিনি মঞ্জুর করিয়ে নিলেন।

মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে তিনি হযরত আয়িশাকে (রা) বললে, “আমার মৃত্যুর পর আমর প্রয়োজনার্থে আনা বাইতুল মালের যাবতীয় জিনিস আমার পরবর্তী খলীফার নিকট পাঠিয়ে দিও।” তাঁর মৃত্যুর পর কোন টাকা পয়সাই তাঁর কাছে পাওয়া যায়নি। মাত্র একটি দুগ্ধবতী উট, একটি পেয়ালা, একটি চাদর ও একটি বিছানাই তাঁর সম্পদ ছিল। এ জিনিসগুলো মৃত খলীফার নির্দেশ মুতাবিক খলীফা উমারের (রা) কাছে পাঠিয়ে দেয়া হলো। এসব দেখে খলীফা উমার (রা) অশ্রুসজল চোখে বললেন, “আল্লাহ আবুবকরের উপর রহম করুন। তিনি তাঁর পরবর্তী খলীফাদের বড় মুস্কিলে ফেলে গেলেন।’

মুরতাদ প্রশ্নে আবুবকরের দৃঢ়তা

ভন্ড মহিলা নবী সাজাহ- এর মিত্র ও সাহায্যকারী মালিক ইবনে নুয়াইরা মুসলিম সেনাধ্যক্ষ খলীফাদের হাতে যুদ্ধে পরাজিত ও বন্দী হলেন। মালিক ইবনে নুয়াইরা যাকাত দেয়া বন্ধ করেছিল। অনেকের মতে মাগরিব ও এশার নামায পড়া বন্ধ করে দিয়েছিল সে। সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে হযরত খালিদ মালিককে সাহাবী হযরত যিরার ইবনে আওয়ার (রাঃ) এর দায়িত্বে সোপর্দ করেছিলেন। পরে সে নিহত হয়ে ছিল।

এ খবর মদীনায় পৌঁছালে হযরত উমার (রাঃ) হযরত যিরার (রাঃ) ও হযরত খালিদ (রাঃ) এর বিরুদ্ধে মালিক হত্যার অভিযোগ আনলেন। হযরত উমার (রা) পরিস্থতিগত কারনে যাকাত অস্বীকারকারীদেরকেও সাময়িক ভাবে মুসলমান বলে মনে করার পক্ষপাতি ছিলেন। উমার ফারুক (রাঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) এর কাছে অভিযোগ করে বলেছিলেন, “খালিদ মালিককে হত্যা করে কিতাবুল্লাহের বিরুদ্ধাচারণ করেছে।”

কিন্তু হযরত আবু বকর তাঁর সাথে এক মত হলেন না। মুরতাদদের জন্য খলীফা হযরত আবু বকর (রাঃ) এর বিন্দুমাত্র দরদ ও ছিল না। মুরতাদদের প্রতি হযরত উমার (রাঃ) এর শৈথিল্য প্রস্তাবের উত্তরে খলীফা আবু বকর (রাঃ) বলেছিলেন, “আমি নামায, যাকাত প্রভৃতি কোন ফরয সমন্ধে সামান্য শৈথল্য প্রদর্শন করতে পারি না। আল্লাহুর ফরয হিসাবে নামায ও যাকাতের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই। আজ যাকাত সম্বন্ধে শৈথিল্য দেখালে কাল নামায রোযা সম্বন্ধেও কিছুটা ঢিল দিতে হবে। আল্লাহুর শপথ করে বলছি, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে যারা একটি মেষ শাবক যাকাত দিত, আমি সেই মেষ শাবক পর্যন্ত লোকের ভয়ের খাতিরে বাদ দিতে পারব না। আল্লাহ এবং আল্লাহুর রাসূল (সাঃ) এর হুকুমের সকল অবাধ্য লোককে অবনত করতে আমি একা হলেও যুদ্ধ করে যাব।”

আপনি আচরি ধর্ম অপরে শিখাও

হযরত উমার (রা) তখন খলীফা। খলীফা উমার (রা) এর বাড়ী থেকে বেশ কিছু দূরে একটি পনির কুপ। খলীফার সাক্ষাতপ্রার্থী একজন লোক দেখলেন, খলীফা কূপ থেকে পানি তুলছেন। শুধু পানি তোলা নয় আগন্তুক বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলেন, পৃথিবীর শাসক উমার, পারস্য ও রোম সাম্রাজ্য পদাতনকারী উমার (রা) সেই পানি ভরা কলসি কাঁধে তুলে নিলেন। আগন্তুক আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি দ্রুত খলীফার নিকটে গেলেন। একজন অপরিচিত লোককে দেখে হযরত উমার (রা) বললেন, “ভাই, আপনার কি কোন কথা আছে, বলবেন আমাকে?”

লোকটি বললেন, “হে আমীরুল মুমিনীন, যদি কলসটি দয়া করে আমার কাঁধে দিতেন।”

হযরত উমার (রা) যেতে যেতেই বললেন, “আমার ছেলে-মেয়ের খাদ্য পানীয় সংগ্রহের মাধ্যমে পুণ্য সঞ্চয় করা কি আমার উচিত নয়? আচ্ছা, এ ছাড়া কি আপনি আর কিছু বলবেন?”

আগন্তুক লোকটি বললেন, “আপনার এই অবস্থায় বলার মত কোন কথা আমার মনে আসছেনা। আগ বাড়ী চলুন। তারপর বলব। আমি আপনাকে অপেক্ষা করতে বলব, আপনি কাঁধে বোঝা নিয়ে আমার কথা শুনবেন, এটা হতে পারে না।”

আগন্তুকের কথা শুনে হযরত উমার থমকে দাঁড়ালেন। বোধ হয় ভাবলেন, ‘আমি আমার নিজের কাজ করছি, এ কাজের অজুহাতে আগন্তুককে দাঁড় করিয়ে রাখা ঠিক হবে না।’ তিনি কাঁধ থেক কলসি নামিয়ে জানুর উপর রাখলেন। তারপর বললেন, “বলুন, আপনার কথা।”

আগন্তুক ভীষণ বিব্রত বোধ করলেন। তার কথা শুনার জন্য আমীরাল মুমিনীন এ ভাবে কষ্ট করবেন। কলসটি মাটিতে নামিয়ে রাখলে তবু কিচুটা কষ্টের লাঘব হয় তাঁর। তিনি খলীফাকে নিবেদান করলেন, “জানুর উপর কলস রেখে কথা শুনতে আপনার কষ্ট হবে। কলসটি দয়া করে মাটিতে রাখুন।”

খলীফা বললেন, “তা কি করে হয় ভাই? কলসির তলা ভিজা এ জমিটি আমার নয়। ভিজা কলসির তলায় লেগে অন্যের জমি আমার বাড়িতে চলে গেলে, আকি কি জওয়াবদিহি করব?”

লোকটি বলল, “আমার জিজ্ঞাসার জবাব আমি পেয়ে গেছি, আপনি দয়া করে যান।”

উমার (রা) বললেন, “বুঝলাম না, বুঝিয়ে বলুন।”

লোকটি বলল, “ইয়া আমীরুল মুমিনীন, আমি জিজ্ঞাসা করতে এসেছিলাম বর্তমান জরীপে অন্যের জমির কতকাংশ আমার জমির সাথে উঠে এসেছে। তা আমার জন্য হালাল কিনা?”

উমারের (রা) ভাতা বৃদ্ধির চেষ্টা

উমারের (রা) খিলাফত। খীলফা হওয়ারা পূর্বে উমার ব্যবসা করে পরিবার চালাতেন। যখন খলীফা নিযুক্ত হলেন, তখন জনসাধারণের ধনাগার (বাইতুলমাল) থেকে অতি সাধারণভাবে জীবন ধাণের উপযুক্ত অর্থ তাঁকে ও তাঁর পরিবারের জন্য দেয়া হলো। বছরে মাত্র দু‘প্রস্থ পোশাক। পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যের শক্তি যাঁর কাকছে নত, সেই দোর্দন্ড প্রতাপ খলীফা উমার সামান্য অর্থ পান জীবনধারণের জন্য।

হযরত আলী, উসমান ও তালহা ঠিক করলেন খলীফার এ মাসোহারা যথোপযুক্ত নয়, আরও কিছু অর্থ বাড়িয়ে দেয়া হোক। কিন্তু কে এই প্রস্তাপব খলীফা উমারের কাছে পেশ করবে। অবশেষে উমারের কন্যা ও রাসূলের (রা) স্ত্রী হাফসাকে (রা) তাঁর কাছে এই প্রস্তাব উত্থাপন করার জন্য অনুরোধ করা হলো। হাফসা (রা) পিতার নিকট এই প্রস্তাব তুলতেই খলীফা উমার তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। রুক্ষস্বরে তিনি প্রশ্ন করলেন, “কারা এই প্রস্তাব করেছে?” হাফসা নিরুত্তর। পিতাকে তিনি কি উত্তর দেবেন? সাহস হলোনা। খলীফা বললেন, “যদি জানতাম কারা এই প্রস্তাব তোমার মারফতে পাঠিয়েছে। তবে তাদের পিটিয়ে আমি নীল করে দিতাম। বেটি, তুমিতো জান, কি পোশাক রাসূল (সা) পরিধান করতেন, কিরূপ খাদ্য তিনি গ্রহণ করতেন, কি শয্যায় তিনি শয়ন করতেন। বলত, আমার পোশাক, আমার খাদ্য, আমার শয্যা কি তার চাইতে নিকৃষ্ট?”

হাফসা উত্তর দিলেন, “না”। খলীফা বললেন, “তবে যারা এই প্রস্তাব করে পাঠিয়েছে, তাদের বলো, আমাদের নবী জীবনের যে আদর্শ স্থাপন করে গেছেন তাত থেকে আমি এক চুলও বিচ্যুত হবে না।” সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে—

সহজ অনাড়ম্বর ও নিঃস্বার্থ জীবন যাপন সত্যিকার মানুষের আদর্শ——সংযত ও সুনিয়ন্ত্রিত যার জীবন নয়, সে কি করে শহীদের রক্তাক্ষরে লেখা সত্যের জীবনকে গ্রহণ করবে? খলীফা উমারও এক দিন আততায়ীর হস্তে নিহত হন। সত্যের পথে, ন্যায়ের পথে চলেছিলেন এই তাঁর অপরাধ। খলীফা উমার শহীদ হয়েছেন কবে, কিন্তু সত্যের নির্ভীক সাধক শহীদ উমার আজও বেঁচে আছেন দেশ ও জাতির দিগদর্শরূপে।

উমারের (রা) ছেলের কান্না

মক্তব থেকে এসে খলীফা উমারের ছেলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। উমার (রা) তাকে টেনে জিজ্ঞাসা করলেন, “কাঁদছ কেন বৎস?”

ছেলে উত্তর দিল, “সবাই আমাকে টিটকারী দেয়।” বলে, “দেখনা জামার ছিরি, চৌদ্দ জায়গায় তালি। বাপ নাকি আবার মুসলিম জাহানের শাসনকর্তা।” বলে ছেলেটি তার কান্নার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিল।

ছেলে কথা শুনে উমার (রা) ভাবলেন কিছুক্ষন।তারপর বাইতুল মা’লের কোষাধ্যক্ষকে লিখে পাঠালেন, “আমাকে আগামী মাসের ভাতা থেকে চার দিরহাম ধার দেবেন।” উত্তরে কোষাধ্যক্ষ তাঁকে লিখে জানালেন, “আপনি ধার নিতে পারেন। কিন্তু কাল যদি আপনি মারা যান তাহলে কে আপনার ধার শোধবে?”

উমার (রা) ছেলের গা-মাথা নেড়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “যাও বাবা, যা আছে তা পরেই মক্তবে যাবে। আমাদের তো আর অনেক টাকা পয়সা নেই। আমি খলীফা সত্য, কিন্তু ধন সম্পদ তো সবই জন সাধারণের।”

উসমান (রা) কিভাবে খলীফা হলেন

দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার ফারূকের শাহাদাত প্রাপ্তির পর খলীফা নির্বাচন নিয়ে মতানৈক্যের সৃষ্টি হলো। শাহাদাতের পূর্বে হযরত উমারকে (রা) ভাবি খলীফা নির্বাচন সম্পর্কে তাঁর মতামত জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। হযরত উমার (রা) কোন বিশেষ একজনের নাম না করে হযরত আলী (রা), হযরত উসমান (রা), হযরত আবদুর রহমান (রা), হযরত সা‘দ (রা), হযরত তালহা (রা) ও হযরত যুবাইর (রা) এ ছয় জনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্ত ‍নির্বাচন সভায় তাদের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচন করতে গিয়ে বিভিন্ন মত এমনকি ছয় জনকে নিয়ে ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন ভাগেরই সৃষ্টি হয়ে গেল। আলোচনায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হলো। অবশেষে যুবাইর বললেন, ‘আমি হযরত আলীর স্বপক্ষে আমার দবী পরিত্যাগ করলাম’। হযরত তালহা দাঁড়িয়ে বললেন, ‘খিলাফাতের দায়িত্ব মাথায় নিতে আমি একেবারে অক্ষম। সুতরাং আমার দাবী আমি হযরত উসমান গনির (রা) উপর অর্পন করলাম।’ হযরত সা‘দ (রা) দন্ডায়মান হয়ে বললেন, ‘আমার মতে খিলাফতের যোগ্য ব্যক্তি হযরত আবদুর রহমান ইবন আউফ। সুতরাং আমি আমার দাবী পরিত্যাগ করে হযরত আব্দুর রহমান ইবন আউফকে সমর্থন করছি।”

অতঃপর সমস্যা ছয় থেকে তিনে এসে দাঁড়াল। সেদিনকার মত সভা ভেঙ্গে গেল। মীমাংসা হলোনা। বাড়ী গিয়ে হযরত আব্দুল রহমান ইবন আউফ চিন্তা করলেন, হযরত আলী ও হযরত উসমানের মতো যোগ্য ব্যক্তি উপস্থিত থাকতে খিলাফত পদ আমার জন্য সাজে না। বিষয়ট চিন্তা করেই হযরত আবদুর রহমান ইবন আউফ হযরত আলীর কাছে উপস্থি হয়ে বললেন, “আমি আদৌ খলীফা হতে চাইনে, আর এইভাবে খলীফাহীন অবস্থায় মুসলিম জাহান একদিনও থাকা উচিত নয়। এজন্য আমি চাই, সত্বরই একটি সভা আহবান করে আপনাকে খলীফা হিসেবে ঘোষণা করি। সম্মান ও সম্পদের প্রতি চির বীতশ্রদ্ধ হযরত আলী বললেন, “উত্তম, আমিও খলীফা নির্বাচন ব্যাপারে বিলম্ব পছন্দ করিনা। আর খিলাফতের দায়িত্বকে গুরুতর বোঝা মনে করি। অতপর আসুন কালই আমরা হযরত উসমানকে (রা) খলীফা পতে বরণ করি।’ হযরত আলীর প্রস্তাব অনুসারেই কাজ হলো। পরবর্তী দিনের সভায় হযরত উসমান (রা) খলীফা নির্বাচিত হলেন।

সা’দের প্রাসাদে আগুন

সেনাপতি সা’দ। মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক সা’দ পারস্য জয় করেছেন। বিজয়ের পর হযরত উমার তাঁকে কুফার শাসনকর্তা নিযুক্ত করলেন। সেনাপতি সা’দ তাঁর বিজয় অভিযান কালে পারস্য সম্রাটের বিলাসব্যসন ও আরাম আয়েশের অফুরান নজীর দেখেছেন। কুফা নগরী সাজাবার সময় বোধ হয় তাঁর সেসব কথা মনে পড়েছিল। তিনি নিজের জন্যও তাই সেখানে একটি প্রাসাদ তৈরী করলেন এবং সম্রাট খসরুর প্রাসাদের একটি তোরণ এনে তাঁর প্রাসাদে সংযুক্ত করলেন। বোধ হয় বিজেতা সা‘দের মনে আয়েশের কিঞ্চিত আমেজ এসে বাসা বেঁধেছিল। এনিষ্কলুষ ভোগ তাঁর কাছে কোন খারাপ বিষয় বলেও বোধ হয়নি।

কিন্তু খবরটা খলীফা উমারের কাছে পৌঁছতেই তিনি বারুদের মত জ্বলে উঠলেন। সেনাপতি সা’দের মতি বিভ্রম ঘটেছে কিনা তিনি ভেবে পেলেন না। হযরত উমার (রা) ত্বরিত একজন দূতকে সা‘দের নামে একটি চিঠি দিয়ে বললেন, “শোন, পৌঁছেই তুমি সা‘দের প্রাসাদে আগুন ধরিয়ে দেবে। সা’দ তোমাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেই তাকে এ চিঠিখানা দেবে।” দূত ছুটল কুফার দিকে। হযরত উমারের যা নির্দেশ ছিল, তাই করল সে। সা’দের প্রাসাদে আগুণ ধরিয়ে দিলো। স্তম্ভিত সা’দ খলীফার দূতের এ কান্ড দেখে তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। দূত বিনা বাক্য ব্যয়ে খলীফার চিঠি তাঁর হাতে তুলে দিল। সা’দ চিঠিটা তাঁর চোখের সামনে মেলে ধরলেন। তাতে লিখা ছিলঃ “শুনতে পেলাম, নিজের আরাম-আয়েশের জন্য খসরুর প্রাসাদের মত তুমি এক প্রাসাদ গড়েছো। শুনেছি, খসরুর প্রাসাদের একটি কবাটও এনে তোমার প্রাসাদে লাগিয়েছ। দারোয়ান, সিপাইও রেখেছ। এতে প্রজাদের অভাব অভিযোগ জানাতে অসুবিধা হবে। তা বোধ হয় তুমি নিশ্চয় ভাবনি। নবীর পথ পরিত্যাগ করে খসরুর পথ ধরেছো। ভুলোনা, প্রাসাদে বাস করেও খসরুদের দেহ কবরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আর নবী সামান্য কুটিরে বাস করেও বর্বোচ্চ জান্নাতে উন্নীত হয়েছেন। মাসলামকে তোমার প্রাসাদ পুড়িয়ে ফেলবার জন্য পাঠালাম। বাস করার জন্য একটি কুটির এবং একটি খাজাঞ্চি খানাই যথেষ্ট।” সা’দ নত মস্তকে, অশ্রুসিক্ত নয়নে খলীফার নির্দেশ মেনে নিলেন।

জর্দানের রোমান শাসকের দরবারে মুয়াজ

জর্দানের সুন্দর ‘ফাহল’ নগরী। ইরাক-জর্দান এলাকায় এটা রোমানদের শেষ দুর্গ। নিরুপায় রোমক বাহিনী মুসলিম সেনাপতি আবু উবাইদার কাছে সন্ধির প্রস্তাব দিল। সন্ধি সম্বন্ধে আলোচনার জন্য সেনাপতি আবু উবাইদাহ (রা) মুয়াজ ইবন জাবাল (রা)-কে পাঠালেন রোমক শাসক সাকলাবের দরবারে।

মুয়াজ দরবারে পৌঁছলে সাকলাব তাঁকে পরম সমাদরে একটি কারুকার্যখচিত আসনে বসবার জন্য অনুরোধ করলেন।

কিন্তু মুয়াজ দরবারের মাটির আসনেই বসে পড়লেন। সাকলাব বললেন, “আমরা আপনাকে মর্যাদা দিতে চাই, কিন্তু নিজেই আপনি আপনার সম্মান নষ্ট করেছেন।”

মুয়াজ বললেন, “যে আসন দরিদ্র প্রজাদের বক্ষরক্তে চারু চিত্রের রূপ ধারণ করেছে, সে আসনকে আমরা ঘৃণা করি।” সাকলাব বললেন, “এই আসন দরিদ্র প্রজাদের অর্থে নির্মিত তা আপনি কেমন করে বুঝলেন?”

মুয়াজ বললেন, “আপনার জৌলুসপূর্ণ বেশ-ভূষা আর আপনার সৈন্যদের বেশ দেখেই এটা আমি বুঝেছি।”

রোমান শাসক সাকলাব বললেন, “আপনাদের উর্ধ্বতন কর্মচারী ও আপনাদের প্রভুও কি এরূপ আসনে বসেন না?”

মুয়াজ বললেন, “না, আমীরুল মুমিনীনও এরূপ আসনে উপবিষ্ট হন না। আমাদের প্রভুর কথা বলছেন? একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আমরা কাউকেও প্রভু বলে সম্বোধন করি না। আমরা নিজেকে কখনও কোন মানবের দাস বলে ভাবি না। মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্ব চালিয়ে যাওয়াকে আমরা মানব ধর্মের বহির্ভূত কাজ বলে মনে করি।”

রোমান শাসকের চোখ দু’টিতে নিঃসীম বিস্ময় ঝরে পড়ল। একটু সময় নিয়ে তিনি বললেন, “আপনারা যদি এমন ন্যায়নিষ্ঠ হন, তাহলে পররাজ্য অধিকারে আসেন কেন?” মুয়াজ বললেন, “আমরা পররাজ্য অধিকার করি ঠিক, কিন্তু কোন ন্যায় পরায়ন ও সত্য নিষ্ঠের রাজ্য আমরা দখল করি না। দখল করি আপনাদের মত স্বার্থপরের রাজ্য। তারপর সেখানকার মৃতপ্রায় মানুষকে নতুন জীবন দান করি- প্রত্যেকটি মানুষকে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকবার জন্য উদ্বুদ্ধ করি।”

সর্বশেষে সাকলাব বললেন, “আমরা আপনাদেরকে বালকা জিলাসহ জর্দানের কিয়দংশ দিয়ে দেব, আপনারা আমাদের সাথে সন্ধি করুন।” মুয়াজ বললেন, “না, আমরা ধন বা রাজ্যলোভে যুদ্ধ করি না। আমরা সাম্য মৈত্রী ও স্বাধীনতার ধর্ম প্রচার করি। হয় আপনারা ইসলামের সত্য ও ন্যায়ের পথ অনুসরণ করুন, নতুবা জিযিয়া দিন। এ দু’টির কোনটিই গৃহীত না হলে যুদ্ধ অনিবার্য।”

দুর্বিনীত রোমক শাসক যুদ্ধের পথই অনুসরণ করল। কিন্তু যুদ্ধ ডেকে আনল তার জন্য চরম পরাজয়। আর মুসলমানদের হাতে তুলে দিল ফাহল, বেসান, আম্মান, জিরাশ, মায়াব প্রভৃতি নগরীসহ গোটা জর্দান প্রদেশ।

আমীরুল মুমিনীন কৈফিয়ত দিলেন

শুক্রবার। জামার নামায। ইমামের আসনে হযরত উমার। খোতবাদানের জন্য তিনি মিম্বারে দাঁড়িয়েছেন। চারদিকে নিঃশব্দ নীরবতা। সকলের চোখ খলীফা উমারের দিকে। হঠাৎ মসজিদের অভ্যন্তর থেকে একজন লোক উঠে দাঁড়াল। সে বলল, “উপস্থিত ভ্রাতৃগণ! গতকাল আমরা বাইতুল মাল থেকে এক টুকরা করে কাপড় পেয়েছি। কিন্তু খলীফা আজ যে নতুন জামাটি গায়ে দিয়েছেন, তা তৈরী করতে অন্ততঃ তিন টুকরা কাপড়ের প্রয়োজন। তিনি আমাদের খলীফা, এই জন্যই কি আরও টুকরা কাপড় বেশী নিয়েছেন?”

খলীফার পুত্র দাঁড়িয়ে বললেন, “আব্বাজানের পুরোনো জামাখানা গায়ে দেয়ার অযোগ্য হয়ে গেছে। এজন্য আমার অংশের টুকরাটি আব্বাজানকে দিয়েছি।”

এরপর খলীফার চাকর উঠে বলল, “আমার টুকরাটিও অনেক সাধা-সাধি করে খলীফাকে দিয়েছি। তাই দিয়েই জামা তৈরী হয়েছে।”

এই বার খলীফা সেই জিজ্ঞাসাকারী ব্যক্তিকে কৃত্রিম রোষে বললেন, “দেখুন সাহেব, কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন?”

লোকটি বলল, “নিশ্চয় আমি বর্তমান বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শাসক আমীরুল মুমিনীন সম্বন্ধে অভিযোগ করেছি।”

খলীফা পুনরায় বললেন, “আচ্ছা সত্যই যদি আমি এমন কাজ করতাম, আপনি কি করতেন।?”

খলীফার কথা শেষ হবার সংগে সংগেই লোকটি সরোষে বলল, “তরবারি দিয়ে আপনার মস্তক দুইখন্ড করে ফেলতাম।”

লোকটির এ ধৃষ্টতা দর্শনে জামাতের সকলেরই মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেল। কিন্তু খলীফা হাত উঠিয়ে হাসি ও খুশী ভরা গদগদ কণ্ঠে মুনাজাত করলেন, “ইয়া আল্লাহ, আপনার শুকরিয়া যে, আপনার প্রিয় নবীর বিধান রক্ষার্থে নামাযের জামাতে বসেও এমন বিশ্ব ভীতি উমারকে তলোয়ার দেখাবার মুসলমানের অভাব নেই।”

শুক্রবার। জামআর নামায পড়তে খলীফা মসজিদে গেছেন। সামনে পিছনে তালি দেয়া একটি কামিছ তাঁর গায়ে। একজন অনুযোগ করে বলল, “ আল্লাহ আপনাকে প্রচুর দিয়েছেন, আপনি অন্ততঃ একটু ভালভাবে পোষাক পরিধান করুন।” খলীফা কিছুক্ষণ নীরী থেকে বললেন, “প্রাচুর্যের মধ্যে সংযম পালন ও শক্তিমানের পক্ষে ক্ষমা প্রদর্শন অতীব প্রশংসনীয়।” উৎসর্গীকৃত জীবন যাদের, আড়ম্বর- বিলাস, সুখাদ্য গ্রহণ, পোশাক পরিচ্ছদ প্রভৃতির দিকে লক্ষ্য দেয়ার সময় তাদের কোথায়?

আইনের চোখে সবাই সমান

হজ্জ করবার সময় ভিড়ের মধ্যে আরবের পার্শ্ববর্তী এক রাজার চাদর এক দাসের পায়ে জড়িয়ে যায়। বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ হয়ে রাজা জাবালা সেই দাসের গালে চড় বসিয়ে দিলেন। লোকটি খলীফা উমর (রা)-এর নিকট সুবিচার প্রার্থনা করে নালিশ করে। জাবালাকে তৎক্ষনাৎ ডেকে পাঠানো হলো। অভিযোগ সত্য কিনা জিজ্ঞাসা করায় জাবালা রূঢ় ভাষায় উত্তর দিলেন, “অভিযোগ সত্য। এই লোকটি আমার চাদর মাড়িয়ে যায় কাবা ঘরের চত্বরে।” “কিন্তু কাজটি তার ইচ্ছাকৃত নয়, ঘটনাক্রমে হয়ে গেছে”- রুক্ষ স্বরে বাধা দিয়ে বললেন খলীফা। উদ্ধতভাবে জাবালা বললেন, “তাতে কিছু আসে যায় না- এ মাসটা যদি পবিত্র হজ্জের মাস না হতো তবে আমি লোকটিকে মেরেই ফেলতাম।” জাবালা ছিলেন ইসলামী সাম্রাজ্যের একজন শক্তিশালী মিত্র ও খলীফার ব্যক্তিগত বন্ধু। খলীফা কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন, তারপর অতি শান্ত ও দৃঢ় স্বরে বললেন, “জাবালা, তুমি তোমার দোষ স্বীকার করেছ। ফরিয়াদী যদি তোমাকে ক্ষমা না করে তবে আইনানুসারে চড়ের পরিবর্তে সে তোমাকে চড় লাগাবে।” গর্বিত সুরে উত্তর দিলেন জাবালা, “কিন্তু আমি যে রাজা আর ও যে একজন দাস।” উত্তরে উমর (রা) বললেন, “তোমরা দু’জনেই মুসলমান এবং আল্লাহর চোখে দু’জনেই সমান।” গর্বিত রাজার অহংকার চূর্ণ হয়ে গেল। গর্ব, অহংকার, মদমত্ততা মানুষের ধর্ম নয়। সে নির্ভীক, নির্বিকার ও নির্মম। কিন্তু

শান্ত, সংযত ও সুন্দর সে। সত্যের বাণী যারা অন্তর দিয়ে গ্রহণ করেছেন, মানব গোষ্ঠীর প্রতি তাঁদের দায়িত্ববোধ অসীম। মানুষের সেবা, সৃষ্ট জীবের সেবা করেই তাঁরা এই দায়িত্ব থেকে মুক্ত হন। মানব সেবার এই গুরুদায়িত্ব ভার গ্রহণ করে খলীফা উমারের আর স্বস্তি নেই। কর্তব্যের যদি ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে যায়, যদি তার তিলমাত্র অবহেলায় কেউ কষ্ট পায়, তবে আল্লাহর কাছে যে তার প্রত্যেকটির জন্য জবাবদিহি করতে হবে। তাই উমারের (রা) চোখে ঘুম নেই। রাতের অন্ধকারে তিনি ঘুরে বেড়ান। কে কোথায় কি করছে, কে রোগ যন্ত্রণায় বা ক্ষুধায় কাঁদছে, কে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে অন্ধকারে, কে শোকে মুহ্যমান হয়ে আর্তনাদ করছে। তা তিনি খুঁটে খুঁটে দেখেন। আল্লাহ নেতৃত্ব যার হাতে দেন, তিনি আসলে জনসেবক। অসীম বেদনাবোধ, বিপুল দায়িত্বভার তাঁর। এই বেদনা ও দায়িত্বভারেই খলীফা উমর (রা) অস্থির থাকতেন। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও নিঝুমনিশীতে স্বীয় দায়িত্বের কথা স্মরণ করে উমর (রা) অঝোরে কাঁদতেন।