উসমানী খিলাফতের ইতিকথা

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

১৬. দ্বিতীয় উসমান


১. সুলতান ও খালীফা পদে দ্বিতীয় উসমান

১৬১৮ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে প্রথম মুস্তাফার ভাতিজা দ্বিতীয় উসমান কনস্ট্যান্টিনোপলের মসনদে বসেন। তখন তাঁর বয়স চৌদ্দ বছর।

২. দ্বিতীয় উসমান যেমন ছিলেন

দ্বিতীয় উসমান শাসনকার্যে কিছুটা যোগ্যতার পরিচয় দেন। তবে তিনি স্বার্থপর প্রকৃতির লক ছিলেন। তাঁর খামখেয়ালীপনা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর ছিল।  তিনি জাননিসার বাহিনীর ক্ষমতা খর্ব করার উদ্যোগ নেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা দেয়।

৩. দ্বিতীয় উসমানের পদচ্যুতি

১৬২২ খৃষ্টাব্দে বিদ্রোহী সৈন্যগণ দ্বিতীয় উসমানকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করে। বিদ্রোহীগণ আবার প্রথম মুস্তাফাকে ক্ষমতার মসনদে বসায়। তিনি এবারও শাসনকার্য চালাতে ব্যর্থ হন। ফলে কয়েক মাস পরে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

১৭. চতুর্থ মুরাদ


১. সুলতান ও খালীফা পদে চতুর্থ মুরাদ

১৬২৩ খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয় উসমানের পুত্র চতুর্থ মুরাদকে মসনদে বসানো হয়। তখন তাঁর বয়স এগারো বছর।

২. চতুর্থ মুরাদ যেমন ছিলেন

পতনোন্মুখ উসমানী খিলাফাতের ইতিহাসে চতুর্থ মুরাদ কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী আমেজ দিতে সক্ষম হন। বয়সে তরুণ হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি যথেষ্ট যোগ্যতার পরিচয় দেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে উসমানী খিলাফাতের হারানো গৌরব পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়। খালীফা হয়ে তিনি দেখলেন যে ঘুষ, দুর্নীতি, লুটতরাজ, রাহাজানি, বিভেদ বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যাবহারে জনগন অতিষ্ঠ, পুর্ববর্তী বিলাসী সুলতানদের অপব্যয়ের ফলে রাষ্ট্রীয় তহবিল শূন্য, জাননিসার সোইন্যদল অবাধ্য ও উচ্ছৃংখল। চতুর্থ মুরাদ অতিগোপলে একটি নতুন সেনাদল গড়ে তোলেন। ছয় স্কোয়াড্রন অশ্বারোহী যোদ্ধা স্বেচ্ছায় এই বাহিনীতে যোগ দেয়। নতুন সৈন্যদের দ্বারা তিনি অবাধ্য ও উছৃংখল সৈন্যদেরকে শায়েস্তা করেন।

তিনি দুর্নীতিপরায়ন কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করেন। অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন। অচিরেই আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

৩. রণাংগনে চতুর্থ মুরাদ

১৬৩৫ খৃষ্টাব্দে চতুর্থ মুরাদ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে তাব্রিজ দখল করেন। ইতিমধ্যে ইরানীগণ বাগদাদ জয় করেন। বাগদাদ জয় করেন। বাগদাদ জয় ছিল চতুর্থ মুরাদের শাসনকালের শ্রেষ্ঠ ঘটনা।

৪. চতুর্থ মুরাদের ইন্তিকাল

১৬৪০ খৃষ্টাব্দে চতুর্থ মুরাদ ইন্তিকাল করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৮ বছর।

১৮. প্রথম ইবরাহীম


১. সুলতান ও খালীফা পদে প্রথম ইবরাহীম

চতুর্থ মুরাদের কোন পুত্র সন্তান ছিলো না। ১৬৪০ খৃষ্টাব্দে তাঁর ভাই প্রথম ইবরাহীম কনস্ট্যান্টিনোপলের মসনদে বসেন।

২. প্রথম ইবরাহীম যেমন ছিলেন

প্রথম ইবরাহীম ছিলেন একজন অপদার্থ সুলতান। তবে উযীরে আযম কারা মুস্তাফা ছিলেন একজন যোগ্য শাসক। কিন্তু প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারনে তিনি প্রাণ হারান। ফলে রাষ্ট্র আবার দুর্নীতি ও অরাজকতার অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হয়। প্রথম ইবরাহীম বিলাস দ্রব্য আর নারীদের মাঝে ডুবে থাকেন। তাঁর বিলাসিতার অর্থ সংগ্রহের জন্য জনগনের ওপর নানবিধ কর চাপানো হয়।

৩. প্রথম ইবরাহীমের হত্যা

প্রথম ইবরাহীম এবং তাঁর নতুন উযীরে আযমের গণবিরোধী কার্যকলাপের দরুন রাষ্ট্রে বিদ্রোহ দেখা দেয়। বিদ্রোহীরা উযীরে আযমকে হত্যা করে। ১৬৪৮ খৃষ্টাব্দে প্রথম ইবরাহীম বিদ্রোহীদের হাতে প্রাণ হারান।

১৯. চতুর্থ মুহাম্মাদ


১. সুলতান ও খালীফা পদে চতুর্থ মুহাম্মাদ

১৬৪৮ খৃষ্টাব্দে প্রথম ইবরাহীম নিহত হলে তাঁর পুত্র চতুর্থ মুহাম্মাদ কনস্ট্যান্টিনোপলের মসনদে বসেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র সাত বছর।

২. চতুর্থ মুহাম্মাদ যেমন ছিলেন

বালক চতুর্থ মুহাম্মাদের পক্ষে শাসনকার্য পরিচালনা করা সম্ভব ছিলোনা। দেশ দুর্নীতিতে ছেয়ে যায়। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র চরম আকার ধারন করে। দিকে দিকে বিদ্রোহের পতাকা উড্ডীন হয়। সৌভাগ্যক্রমে চতুর্থ মুহাম্মাদ উযীরে আযম নিযুক্ত করেন মুহাম্মাদ কুপ্রিলীকে। তিনি একজন সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি কনস্ট্যান্টিনোপলের গ্রীক অর্থোডক্স চার্চের অনুসারী খৃষ্টানদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করেন। জাননিসার বাহিনীতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনেন। পাঁচ বছর শাসনকার্য চালাবার পর তিনি ইন্তিকাল করেন। চতুর্থ মুহাম্মাদ প্রাক্তন উযীরে আযম মুহাম্মাদ কুপ্রিলীর সুযোগ্য পুত্র আহমাদ কুপ্রিলীকে উযীরে আযম নিযুক্ত করেন। আহমাদ কুপ্রিলীর হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দিয়ে চতুর্থ মুহাম্মাদ প্রাসাদ অভ্যন্তরে দাবা খেলায় ডুবে যান।

৩. রণাংগনে চতুর্থ মুহাম্মাদ

আভ্যন্তুরীন শাসনের সাথে সাথে যুদ্ধ বিগ্রহও সামলাতে হতো আহমাদ কুপ্রিলীকে। ১৬৬৪ খৃষ্টাব্দে তিনি ইউরোপীয় খৃষ্টান বাহিনীর সাথে সেন্ট গোথার্ড নামক স্থানে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধে আহমাদ কুপ্রিলী পরাজিত হয়। সন্ধির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান হয়। সন্ধির শর্ত অনুযায়ী অষ্ট্রিয়া তার বহু হারানো অঞ্চল ফিরে পায়।

পোল্যান্ড বার বার উসমানী খিলাফাতের ওপর যুদ্ধে চাপিয়ে দেন।

১৬৭৬ খৃষতাব্দে আহমাদ কুপ্রিলী ইন্তিকাল করেন। এবার উযীরে আযম নিযুক্ত হন কারা মুস্তাফা। তিনি ছিলেন বড্ড অদূরদর্শী। তাঁর সময়ে রাশিয়া এবং ভিয়েনার সাথে যুদ্ধে নেমে মুসলিম সৈন্যদল পরাজিত হয়।

১৬৮১ খৃষ্টাব্দে কারা মুস্তারা রাশিয়াকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন এলাকা ছেড়ে দিয়ে সন্ধি করেন।

১৬৮৩ খৃষ্টাব্দে কারা মুস্তাফা সসৈন্যে অষ্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার দিকে অগ্রসর হন। যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন।

পূর্বে উসমানী খিলাফাত ছিলো ইউরোপের আতংক। ভিয়েনা অবরোধ ব্যর্থ হওয়ায় ইউরোপের খৃষ্টান শক্তিগুলো বুঝতে পারে যে মুসলিমদের অতীতের শক্তি আর নেই। অষ্ট্রিয়া, হাংগেরী ও অন্যান্য দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে উসমানী খিলাফাতের ইউরোপীয় প্রদেশগুলোর ওপর বার বার হামলা চালাতে থাকে। উসমানী সৈন্যগণও বার বার পরাজিত হতে থাকে।

১৬৮৪ খৃষ্টাব্দে অষ্ট্রিয়া বাহিনী ক্রোশীয়া থেকে মুসলিম সৈন্যদেরকে হটিয়ে দেয়। অষ্ট্রিয়া বুদাপেষ্ট দখন করে নেয়।

১৬৮৫ খৃষ্টাব্দে হাংগেরী উসমানী খিলাফাতের হাত থেকে নিউহোসেল কেড়ে নেয়।

ভেনিস কেড়ে নেয় কোরিস্থ, মোরিয়া, এথেন্স, নাভারিনো প্রভৃতি এলাকা।

১৬৮৭ খৃষ্টাব্দে পোল্যান্ড মোহাকস প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করে।

যেই উসমানী খিলাফাত এক সময় অপরাজেয় শক্তি বলে গণ্য হতো সেই খিলাফাত এখন প্রায় প্রতিটি রণাংগনেই পরাজয় বরণ করতে থাকে।

৪. চতুর্থ মুহাম্মাদের পদচ্যুতি

চতুর্থ মুহাম্মাদ আটত্রিশ বছর খালীফা ছিলেন। তাঁর অযোগ্যতার কারনে খিলাফাতের দুর্দিন ঘনিয়ে আসে। দেশে দারুণ অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। বিদ্রোহ দেখা দেয়। ১৬৮৭ খৃষ্টাব্দে চতুর্থ মুহাম্মাদ পদচ্যুত হয়ন।

২০. দ্বিতীয় সুলাইমান


১. সুলতান ও খালীফা পদে দ্বিতীয় সুলাইমান

১৬৮৭ খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয় সুলাইমান কনস্ট্যান্টিনোপলের মসনদে বসেন।

২. দ্বিতীয় সুলাইমান যেমন ছিলেন

দ্বিতীয় সুলাইমান সুলতান হওয়ার আগে দীর্ঘ দিন কারাগারে ছিলেন। ফলে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কিংবা সামরিক প্রশিক্ষন লাভের কোন সুযোগ তিনি পাননি। রাষ্ট্রে তখন চলছিলো অরাজকতা। বাইরে শত্রুদের প্রবল চাপ। জাননিসার সৈন্যরা রাজধানীতে হত্যাকান্ড হত্যাকান্ড ঘটায়। তারা উযীরে আযমকেও হত্যা করে। দ্বিতীয় সুলাইমান ধৈর্য ও বিচক্ষনতার সাথে পরিস্থিতি মুকাবিলা করেন।

৩. রণাংগনে দ্বিতীয় সুলাইমান

১৬৮৮ খৃষ্টাব্দে অষ্ট্রিয়া উসমানী সৈন্যদের হাত থেকে বেলগ্রেড কেরে নেয়। বোসনিয়া-হারজেগোভিনা এবং ট্রানসিলভানিয়াতেও অষ্ট্রিয়া বাহিনী বিরাট সাফল্য অর্জন করে। ১৬৮৯ খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয় সুলাইমান সসৈন্যে অষ্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পরাজিত হন।

খিলাফাতের এই দুর্দিনে দ্বিতীয় সুলাইমান মুহাম্মাদ কুপ্রিলীর দ্বিতীয় পুত্র মুস্তাফা কুপ্রিলীকে উযীরে আযম নিযুক্ত করেন। তিনি ছিলেন যোগ্য ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তিনি অযোগ্য কর্মচারীদের বরখাস্ত করেন। সেনাবাহিনী পুনর্গঠিত করেন।

মুস্তাফা কুপ্রিলী একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ। তিনি উঁচু মানের সামরিক প্রতিভাও ছিলেন।

১৬৯০ খৃষ্টাব্দে মুস্তাফা কুপ্রিলী অষ্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বেশ কয়েকটি ছিনিয়ে নেয়া অঞ্চল পুনরুদ্ধার করেন। তিনি বেলগ্রেডও পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। ট্রানসিলভানিয়া আবার মুসলিম দখলে আসে। এইভাবে রণাংগনে পরাজয়ের গ্লানি কিছুটা মুছে ফেলা সম্ভব হয়।

৪. দ্বিতীয় সুলাইমানের ইন্তিকাল

১৬৯১ খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয় সুলাইমান ইন্তিকাল করেন।

 

About এ. কে. এম. নাজির আহমদ