উসমানী খিলাফতের ইতিকথা

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

৩১. প্রথম আবদুল মজিদ


১. সুলতান ও খালীফা পদে প্রথম আবদুল মজিদ

১৮৩৯ খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয় মাহমুদের পুত্র প্রথম আবদুল মজিদ কনস্ট্যান্টিনোপলের মসনদে বসেন।

২. প্রথম আবদুল মজিদ যেমন ছিলেন

প্রথম আবদুল মজিদ ইউরোপীয় চিন্তাধারায় উজ্জীবিত ছিলেন। রশীদ পাশা, আলী ফুয়াদ পাশা প্রমুখ রাজনীতিবিদগণ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিক্ষা লাভ করেন।

তাঁরা ইউরোপীয় ভাবধারায় অনুপ্রানিত ছিলেন। তাঁরা খালীফা প্রথম আবদুল মজিদকে তাঁদের ভাবধারায় দীক্ষিত করেন। তিনি ‘খাত্তি শরীফ’ ও ‘খাত্তি হুমায়ুন’ নামে রাজকীয় ফরমান জারি করে তানযিমাত বা সংস্কার প্র্যাস চালান। তাঁর লক্ষ্য ছিলো উসমানী খিলাফাতকে ইউরোপীয় কায়দায় গরে তোলা।

তানযিমাতের কতগুলো দফা ছিলো প্রশংসনীয়। আবার কতগুলো দফা ছিলো ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই এইগুলো সাধারণ স্বীকৃতি লাভ করেনি। আলেম সমাজ এইগুলোর চরম বিরোধিতা করে।

৩. রণাংগনে প্রথম আবদুল মজিদ

১৮৫৪ খৃষ্টাব্দে সংঘটিত হয় ক্রিমিয়া যুদ্ধ। ইংল্যান্ডের রাণী ভিকটোরিয়া এক সময় বলেছিলেন, “জার নিকোলাস এবং তাঁর অনুচরদের উচ্চাকাংখার জন্যই এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।”

উনবিংশ শতাব্দীতে রাশিয়ার জার নিকোলাস উসমানী খিলাফাতকে ইউরোপের রুগ্ন ব্যক্তি মনে করে তা গ্রাস করার জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ইংল্যান্ডের অমতে তা করা সম্ভব নয় বলে তিনি গোপনে ইংল্যান্ডের কাছে উসমানী খিলাফাত ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়ার প্রস্তাব পাঠান। ইংল্যান্ড দেখলো যে কৃষ্ণ সাগর, বসফোরাস এবং দার্দানেলিসের ওপর রাশিয়ার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে তার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে। তাই আপন স্বার্থের খাতিরেই ইংল্যান্ড উসমানী খিলাফাতের নিরাপত্তা বিধানের নীতি গ্রহণ করে।

১৮৪৮ খৃষ্টাব্দে রাশিয়া উসমানী খিলাফাত থেকে মোলডানিয়া ও ওয়ালাচিয়া কেড়ে নেয়। কুটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে তা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা চালানো হয় খিলাফাতের পক্ষ থেকে। কোন ফলোদয় হয়নি।

তাই ১৮৫৪ খৃষ্টাব্দে প্রথম আবদুল মজিদ রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন। এইভাবে শুরু হয় ক্রিমিয়া যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স উসমানী খিলাফাতের পক্ষ সমর্থন করে। ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দে প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে ক্রিমিয়া যুদ্ধ শেষ হয়।

প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী স্থির হলো যে কৃষ্ণ সাগর সকল জাতির বাণিজ্য জাহাজের জন্য খোলা থাকবে এবং কোন জাতির যুদ্ধজাহাজ এই সাগরে চলাচল করতে পারতে পারবেনা। কৃষ্ণ সাগর এবং দার্দানেলিস উপকূলে রাশিয়া এবং উসমানী খিলাফাতের কোন সামরিক ঘাঁটি থাকবে না। রাশিয়া মোলডানিয়া ও ওয়ালাচিয়ার কর্তৃত্ব ত্যাগ করবে। এই দুইটি অঞ্চল উসমানী খিলাফাতের অধীনে স্বায়ত্ব শাসন লাভ করবে। ড্যানিউব আন্তর্জাতিক নদীর মর্যাদা পাবে। এতে সকল দেশের জাহাজ চলাচল করবে। রাশিয়া উসমানী খিলাফাতকে বেসারভিয়া ফেরত দেবে। উসমানী খিলাফাতের অধীন খৃষ্টান নাগরিকদের অভিভাবকত্ব রাশিয়ার ওপর থাকবে না। সার্বিয়া স্বায়ত্বশাসন পাবে।

প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়ার প্রাধান্য প্রতিহত করা হয়। কিন্তু উসমানী খিলাফাতের ওপর ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের প্রভাব বৃদ্ধি পায়।

৪. প্রথম আবদুল মজিদের ইন্তিকাল

১৮৬১ খৃষ্টাব্দে প্রথম আবদুল মজিদ ইন্তিকাল করেন।

৩২. আবদুল আযীয


১. সুলতান ও খলীফা পদে আবদুল আযীয

১৮৬১ খ্রষ্টাব্দে আবদুল আযীয কন্সস্ট্যান্টিনোপলের মসনদে বসেন।

২. আবদুল আযীয যেমন ছিলেন

খলীফা আবদুল আযীয “ইয়াং তুর্কস” আন্দোলনের লোকদের পছন্দ করতেন না।

তাদের প্রতি তিনি দমন নীতি অবলম্বন করেন।

৩. আবদুল আযীযের ইন্তিকাল

১৮৭১ খ্রষ্টাব্দে আবদুল আযীয ইন্তিকাল করেন।

৩৩. পঞ্চম মুরাদ


১. সুলতান ও খলীফা পদে পঞ্চম মুরাদ

১৮৭১ খ্রষ্টাব্দে পঞ্চম মুরাদ কন্সস্ট্যান্টিনোপলের মসনদে বসেন।

২. পঞ্চম মুরাদ যেমন ছিলেন

সুলতান পঞ্চম মুরাদ “ইয়াং তুর্কস” আন্দোলন পছন্দ করতেন না। তিনিও তাদের ওপর দমন নীতি চালান।

৩. পঞ্চম মুরাদের ইন্তিকাল

১৮৭৬ খ্রষ্টাব্দে পঞ্চম মুরাদ ইন্তিকাল করেন।

৩৪. দ্বিতীয় আবদুল হামিদ


১. সুলতান ও খলীফা পদে দ্বিতীয় আবদুল হামিদ

১৮৭৬ খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয় আবদুল হামিদ কনষ্ট্যান্টিনোপলের মসনদে বসেন।

ইয়াং তুর্কস

উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মুহাম্মদ বে এবং নামিক কামালের নেতৃত্বে শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিতে ইয়াং তুর্কস নামে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিক্ষাপ্রাপ্ত এবং ইউরোপীয় চিন্তাধারায় উজ্জীবিত এইসব তরুণ উসমানী খিলাফাতের মূল ভূ-খন্ড তুর্কীতে ইউরোপীয় ধাচের একটি দেশে পরিণত করার প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। খলীফা আবদুল আযীয শাসনকার্যে এদের হস্তক্ষেপ সহ্য করেন নি। তিনি তাদের প্রতি দমননীতি অবলম্বন করেন। তার কঠোর নীতির ফলে ইয়াং তুর্কস বিদেশে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। আবদুল আযীযের পর পঞ্চম মুরাদ খালীফা হন। তিনিও ইয়াং তুর্কসকে ভালো চোখে দেখতেন না। তার সময়েও তারা বিদেশই অবস্থান করতে থাকে। খালীফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদের সময় তারা কনষ্ট্যান্টিনোপল ফিরে আসে। তারা রাজধানীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রভাবশালী ব্যক্তির সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয়।

এই সময় ইয়াং তুর্কস মিদহাত পাশার নেতৃত্বে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মিদহাত পাশা একজন যোগ্য সংগঠক ছিলেন। তাকেই ইয়াং তুর্কস-এর প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। দ্বিতীয় আবদুল হামিদের সাথে ইয়াং তুর্কস-এর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি মিদহাত পাশাকে উযীরে আযম নিযুক্ত করেন। কিছুকাল পর মিদহাত পাশার সাথে খালীফার সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। খালীফা মিদহাত পাশাকে উযীরে আযম পদ থেকে বরখাস্ত করেন। শাসনতন্ত্র মুলতবী হয়ে যায়। ইয়াং তুর্কস আত্মগোপন করে। তারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গিয়ে তাদের অনুকূলে জনমত গঠনের প্রচেষ্টা চালাতে থাকে।

২. রণাংগনে দ্বিতীয় আবদুল হামিদ

১৮৭৬ খৃষ্টাব্দে উসমানী খিলাফাতের অন্যতম অঞ্চল বুলগেরিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ কঠোর হস্তে এই বিদ্রোহ দমন করেন। এতে বহু বুলগার প্রান হারায়। ১৮৭৭ খৃষ্টাব্দে রাশিয়া বুলগেরিয়ার ঘটনাকে অজুহাত বানিয়ে উসমানী খিলাফাতের বিরুদ্বে যুদ্ব ঘষণা করে। রাশিয়ায় সর্বাত্মক আক্রমণের মুখে উসমানী সৈন্যগণ ময়দানে টিকতে পারলো না। ১৮৭৮ খৃষ্টাব্দে উসমানী খিলাফাত রাশিয়ার সাথে স্যান স্টিফানো চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া দবরুজা অঞ্চলসহ প্রচুর ক্ষতিপূরণ আদায় করে। ড্যানিউব অঞ্চলে উসমানী দুর্গগুলো ভেংগে ফেলতে হয়। রাশিয়া এশিয়া ভূ-খন্ডের বার্টুম, কারস, আরদাহান, বায়েজিদ প্রভৃতি অঞ্চল লাভ করে। বুলগেরিয়াকে স্বায়ত্বশাসিত করদ রাজ্যের মর্যাদা দেয়া হয়। আলবেনিয়া পর্যন্ত বুলগেরিয়ার সীমানা সম্প্রসারিত করা হয়। সার্বিয়ার স্বাধীনতা আবারো স্বীকৃত হয়। মন্টিনেগ্রোর সীমান্ত পর্যন্ত সার্বিয়ার সীমানা সম্প্রসারিত হয়। রুমানিয়ার স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়। বোসনিয়া-হারজেগোভিনাকে একজন খৃষ্টান গভর্ণর জেনারেলের অধীনে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়। স্যান স্টিফানো চুক্তি পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্বি করে। উসমানী খিলাফাতের হাতে থাকে কেবল স্যালোনিকা, থেসলী, এপিরাস, আলবেনিয়া এবং বোসনিয়া-হারজেগোভিনা। পূর্ব এউরোপে রাশিয়ার প্রভাব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ইউরোপের অন্যান্য শক্তিগুলো শংকিত হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ডই উদ্বিগ্ন হয় সবচে বেশি। অত্র অঞ্চলে সম্প্রসারণের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অষ্ট্রিয়াও নাখোশ হয়। ইংল্যান্ড এবং অষ্ট্রিয়া দাবি তুললো যে যেহেতু প্রাচ্য সমস্যা ইউরোপের আন্তঃরাষ্ট্র সমস্যা, সেহেতু রাশিয়া এককভাবে এই অঞ্চলে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনা। তাই স্যান স্টিফানো চুক্তি পুনর্বিবেচনার জন্য ইউরোপীয় শক্তিগুলোর একটি সম্মেলনে পেশ করতে হবে। ইংল্যান্ড এবং অষ্ট্রিয়া যুদ্বের হুমকিও দেয়। ফলে রাশিয়া স্যান স্টিফানো চুক্তি পুনর্বিবেচনার জন্য রাজি হয়। ১৮৭৮ খৃষ্টাব্দের ১৬ই জুন জার্মেনীর রাজধানী বার্লিনে বিসমার্কের সভাপতিত্বে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সম্মেলন শুরু হয়। বহু আলোচনার পর স্যান স্টিফানো চুক্তি সংশোধন করে স্বাক্ষরিত হয় বার্লিন চুক্তি। এই চুক্তি অনুযায়ী রুমানিয়া, সার্বিয়া এবং মন্টিনেগ্রো স্বাধীনতা লাভ করে। বৃহত্তর বুলগেরিয়াকে তিন ভাগ করে মেসিডোনিয়া  দেয়া হলো উসমানী খিলাফতের প্রত্যক্ষ শাসনে। দক্ষিনাংশ পূর্ব রুমানিয়া নামে স্ব-শাসিত রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়। অবশিষ্ট অংশ বুলগেরিয়া নামে পরিচিত হয়।

প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় শক্তিগুলো উসমানী খিলাফাতের অখন্ডতা সংরক্ষণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলো, কিন্তু সেই শক্তিগুলোই বার্লিন চুক্তির মাধ্যমে উসমানী খিলাফাতের অংগচ্ছেদ করলো। বার্লিন চুক্তি ইউরোপীয় শক্তিগুলোর স্বার্থপরতার উজ্বল প্রমান।

৩. কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস

১৯০৬ খৃষ্টাব্দে স্যালোনিকায় আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে গঠিত হয় কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস। তাঁর প্রধান সহযোগী ছিলেন তালাত পাশা এবং জামাল পাশা। এই কমিটি ইয়াং তুর্কস-এর সাথে মিলিত হয়ে কাজ করতে থাকে। তুর্কীকে ইউরোপীয় ধাঁচে গঠন, শাসনতান্ত্রিক সংস্কার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ঘোষনা, প্রগতিশীল রাষ্ট্রগুলোর সাথে সহযোগিতা ইত্যাদি ছিলো কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস-এর কর্মসূচী।

১৯০৮ খৃষ্টাব্দে কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস-এর পক্ষ থেকে আনোয়ার পাশা মেসিডোনিয়ায় একটি শাসনতন্ত্র ঘোষণা করেন। সেনাবাহিনীর বিরাট অংশ আনোয়ার পাশার সমর্থনে এগিয়ে আসে। খালীফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদ কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস-এর সাথে সমঝোতায় পৌছান। তিনি শাসনতন্ত্র অনুমোদন করেন। তিনি হন রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক প্রধান। কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস মনোনীত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত হয় উযীর পরিষদ।

ইসলামী ব্যক্তিত্বগণ কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস সরকারকে মেনে নিতে পারেননি। এই সরকারের কার্যক্রমের মাঝে তাঁর ইসলামের পতন দেখতে পান। তাঁরা সরকার বিরোধী তৎপরতা শুরু করেন। কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস ক্ষমতায় আসার পরও উসমানী খিলাফাতের দুরবস্থা অব্যাহত থাকে। রণাংগনে সৈন্যবাহিনী পরাজিত হতে থাকে। একের পর এক অঞ্চল খিলাফাতের হাতছাড়া হয়। কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস-এর সমর্থিত পত্রিকাগুলো খালীফাকে আক্রমন করে বিভিন্ন লেখা ছাপতে থাকে। খালীফার বিরুদ্বে এই ধরনের লেখালেখি বহু লোককে মানসিকভাবে আহত করে। খালীফার বিশ্বস্ত বেশ কয়েকজন ব্যক্তি এই সময় আততায়ীর হাতে প্রান হারান।

কমিটি সরকার প্রশাসনের পুরোনো অফিসারদেরকে চাকুরিচ্যত করে শূন্যপদে নিজেদের লোক বসাতে শুরু করে। একই নীতি অনুসরণ করা হয় সেনাবাহিনীতে। ব্যাপকহারে পদচ্যুত অফিসারগণ বিক্ষুব্দ হয়। নব নিযুক্ত অফিসারদের অনেকেই ইসলাম সম্পর্কে বিদ্রুপাত্বক মন্তব্য করতে থাকে এবং সাধারণ সৈনিকদেরকে ধর্মীয় কাজ থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করে। কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস-এর নেতৃবৃন্দ ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার প্রতি উদাসীন ছিলেন। এতে সাধারণ লোকদের মনেও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

১৯০৯ খ্রষ্টাব্দের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে কনস্ট্যান্টিনোপলের সৈন্যরা অফিসারদেরকে তাদের কক্ষে তালাবদ্ধ করে ক্যান্টনমেন্টের নিয়ন্ত্রন হাতে তুলে নেয়। তারা আয়া সোফিয়া মাসজিদ এবং পালর্ামেন্টের নিয়ন্ত্রন হাতে তুলে নেয়। তারা আয়া সোফিয়া মাসজিদ এবং পার্লামেন্ট ভবনের দিকে অগ্রসর হয়। পথিমধ্যে তাদের সাথে যোগ দেয় অসংখ্য মানুষ। তারা শারীয়ার পক্ষে শ্লোগান দিতে থাকে। কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। সাধারণ সৈনিকদের হাতে তাদের অনেকে প্রাণ হারায়। কমিটির নেতৃবৃন্দ পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করে।

স্যালোনিকাতে কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস-এর মজবুত ঘাঁটি ছিলো। সাখানকার সেনাবাহিনী কমিটির অনুগত ছিলো। কনস্ট্যান্টিনোপলে কমিটি সরকারের বিপর্যয়ের খবর পেয়ে মাহমুদ শাওকাত পাশার নেতৃত্বে একদল সৈন্য রাজধানী অভিমুখে রওয়ানা হয়। ১৯০৯ খৃষ্টাব্দের ২৪ এপ্রিল তারা কনষ্ট্যান্টিনোপল পৌছে তা দখল করে নেয়। কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস সরকার আবার ক্ষমতাসীন হয়। মার্শাল ল জারি করা হয়। কমিটি ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস সরকার আবার ক্ষমতাসীন হয়। মার্শাল ল জারি করা হয়। কমিটি ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়। ইত্তিহাদ-ই-মুহাম্মদী জামিয়াতি নামক সংস্থাটিও বেআইনী ঘোষিত হয়। বহু বিদগ্ধ ব্যক্তিকে সামরিক আদালতে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। উসমানী খিলাফাতের অন্যতম ইসলামী তারকা বাদীউজ্জামান সাঈদ নূরসীকেও বন্দী করে সামরিক আদালতে পেশ করা হয়। এইভাবে নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়ে কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস সরকার দেশে এক অসহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

৩. দ্বিতীয় আবদুল হামিদের পদচ্যুতি

১৯০৯ খৃষ্টাব্দের ২৭শে এপ্রিল কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস সুলতান ও খলীফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদকে পদচ্যুত করে।

৩৫. পঞ্চম মুহাম্মদ


১. সুলতান ও খলীফা পদে পঞ্চম মুহাম্মদ

১৯০৯ খৃষ্টাব্দে কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস দ্বিতীয় আবদুল হামিদের ভাই পঞ্চম মুহাম্মদকে কষ্ট্যান্টিনোপলের মসনদে বসায়।

২. কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস-এর শাসনকাল

কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস নানা ধরনের ব্যক্তিদের সমন্বয় গঠিত ছিলো। এতে বাদীউজ্জামান সাঈদ নূরসীর মতো ইসলামী ব্যক্তিত্বও ছিলেন। তবে অধীকাংশ সদস্যই ছিলো জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসী। কিছু সংখ্যক নাস্তিকও ছিলো এর সদস্য। তদুপরি এর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য ছিলো খৃষ্টান এবং ইয়াহুদী। এই কমিটি ক্ষমতা লাভ করে শাসনতান্ত্রিক সরকার গঠন করে। সুলতান ও খলীফা হন শাসনতান্ত্রিক প্রধান। সরকারী সকল ক্ষমতা ছিলো উযীর পরিষদের হাতে।

দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইন পরিষদ গঠিত হয়। ক্যাপিচুলেশান প্রথা বাতিল হয়। সকল পর্যায়ে তুর্কী ভাষায় প্রচলন বাধ্যতামূলক করা হয়। বানিজ্যিক ও কারিগরি শিক্ষার জন্য বহু সংখ্য্ক স্কুল-কলেজ স্থাপিত হয়। কারিগরি ট্রেনিংয়ের জন্য বহু সংখ্যক যুবককে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রেরন করা হয়। ডেভিড বে নামক একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী চার্লস লরেন্টের সহায়তায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন করেন।

আনোয়ার পাশা সেনাবাহিনীর সংস্কারে মনোযোগ দেন। তিনি একদল জার্মেন সামরিক বিশেষজ্ঞ এনে সেনাবাহিনীকে নতুনভাবে সাজান। আনোয়ার পাশা জার্মেন পদ্ধতির নৌবহরের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি নিজে বার্লিনের শিক্ষালাভ করেন। উসমানী নৌবাহিনীকে পুনর্গঠিত করার জন্য কাউন্ট রুবিলান্ট, এডমিরাল গ্যাম্বল এবং পরবর্তীকালে এডমিরাল লিম্পসের সহযোগিতা নেয়া হয়।

উচ্চ শিক্ষার জন্য বহু তরুণকে পাঠানো হয় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। দেশে বহু সংখ্যক সেকুলার স্কুল এবং কলেজ স্থাপন করা হয়। বিজ্ঞান, সাহিত্য ও ইতিহাস বিষয়ক বহু গ্রন্থ তুর্কী ভাষায় অনুবাদ করা হয়। সহশিক্ষা চালু করা হয়। শরীয়া কোর্টগুলোর স্বাতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয়।

৩. রণাংগনে কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস সরকার

(ক) বলকান যুদ্ধ

রাশিয়ার প্ররোচনায় সার্বিয়া, বুলগেরিয়া, গ্রীস এবং মন্টিনেগ্রো ‘দ্যা বলকান লীগ’ নামে একটি সামরিক জোট গঠন করে উসমানী খিলাফাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। ১৯১২ খৃষ্টাব্দে ‘দ্যা বলকান লীগ’ খিলাফাতের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। এই যুদ্ধকে বলা হয় প্রথম বলকান যুদ্ধ। লন্ডন চুক্তির মাধ্যমে এই যুদ্ধ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী খিলাফাত গ্রীসকে ক্রীট দ্বীপ ছেড়ে দিতে হয়। রাজধানী কনষ্ট্যান্টিনোপল ছাড়া ইউরোপের আর অংশই উসমানীদের হাতে রইলো না।

১৯১৩ খৃষ্টাব্দে উসমানী খিলাফাত থেকে ছিনিয়ে নেয়া এলাকাগুলোর ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ‘দ্যা বলকান লীগের’ অন্তর্ভক্ত দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধকে বলা হয় দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধ। কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস সরকার কিছু পাওয়ার আশায় এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। বুখারেষ্ট চুক্তির মাধ্যমে দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধের অবসান ঘটে। এই যুদ্ধে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বুলগেরিয়া। আড্রিয়ানোপল এবং থ্রেসের কিছু অংশ উসমানী খিলাফাতের অধীনে আসে।

বলকান যুদ্ধের ফলে বলকান উপদ্বীপে খৃষ্টান শক্তিগুলোর বিস্তৃতি ঘটে। উসমানী খিলাফাতের প্রাধান্য ও কর্তৃত্ব আরো সংকুচিত হয়।

(খ) প্রথম মহাযুদ্ধ

১৯১৪ খৃষ্টাব্দের ২৮শে জুন অষ্ট্রেয়ার যুবরাজ ফ্রাঞ্জ ফার্ন্ডিনান্ড বোসনিয়া-হারজেগোভিনার রাজধানী সারায়েভো সফরে এসে সার্বিয়ার নিযুক্ত আতাতায়ীদের হাতে সস্ত্রীক নিহত হন। ফলে অষ্ট্রিয়া সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সার্বিয়ার পক্ষে যুদ্ধে নামে রাশিয়া। পরে ফ্রান্স। আরো পরে ইংল্যান্ড। অনশেষে জাপান, ইতালী, চীন এবং ইউএসএ সার্বিয়ার পক্ষাবলম্বন করে যুদ্ধে অবতীর্ন হয়। অষ্ট্রিয়ার পক্ষে যুদ্ধে নামে জার্মেনী। এই মহাযুদ্ধে গোড়ার দিকে উসমানী খিলাফাত নিরপেক্ষ থাকে। কিন্তু কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস-এর চরমপন্থী গ্রুপের নেতা আনোয়ার পাশার চাপে কমিটি সরকার জার্মেনীর পক্ষাবলম্বন করে যুদ্ধে নামে।

এই মহাযুদ্ধে অষ্ট্রিয়া-জার্মেনী-উসমানী খিলাফাত পরাজিত হয়।

১৯১৮ খৃষ্টাব্দের ১১ই নভেম্বর জার্মেনী যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে।

১৯১৯ খৃষ্টাব্দের ২৮শে জুন প্যারিসের ভার্সাই প্রাসাদে জার্মেনীর ওপর একটি অপমানকর চুক্তি চাপিয়ে দয়া হয়। এটিকেই বলা হয় ভার্সাই চুক্তি।

প্রথম মহাযুদ্ধে উসমানী খিলাফাত দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খিলাফাতের সর্বত্র এমন কি রাজধানী কনষ্ট্যান্টিনোপলেও মিত্র শক্তির সৈন্যগণ অবস্থান গ্রহন করে। খালীফা পঞ্চম মহাম্মদ দখলদার শক্তির হাতের পুতুলে পরিণত হণ। তিনি তখন জাতীয় পরিষদ ভেংগে দেন। কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস সরকারের পতন ঘটে। খালীফা নিজের হাতে ক্ষমতা তুলে নিয়ে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। অপসারিত সরকারের বহু লোক বন্দী ও নির্বাসিত হয়।

৪. পঞ্চম মুহাম্মদের ইন্তিকাল

১৯১৮ খৃষ্টাব্দে পঞ্চম মুহাম্মদের ইন্তিকাল করেন।

৩৬. ষষ্ঠ মুহাম্মদ


১. সুলতান ও খলীফা পদে ষষ্ঠ মুহাম্মদ

১৯১৮ খৃষ্টাব্দে ষষ্ঠ মুহাম্মদ কনষ্ট্যান্টিনোপলের মসনদে বসেন।

২. রণাংগনে ষষ্ঠ মুহাম্মদ

১৯১৯ খৃষ্টাব্দের মে মাসে গ্রীস উসমানী খিলাফাতের অন্তর্গত স্মার্ণা দখল করে ব্যাপক হত্যাকান্ড ও লুটতরাজ চালায়।

১৯২০ খৃষ্টাব্দে ১০ই আগষ্ট বিজয়ী মিত্রশক্তি সেভার্স চুক্তির মাধ্যমে উসমানী খিলাফাতের ওপর চরম আঘাত হানে।

সেভার্স চুক্তি অনুযায়ী ঈজিয়ান সাগরের কয়েকটি দ্বীপ এবং থ্রেস উসমানী খিলাফাতের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে গ্রীসকে দেয়া হয়। মিসর, সুদান, সাইপ্রাস, ইরাক, ফিলিস্তিন এবং আরব উপদ্বীপ ইংল্যান্ডের কর্তৃত্বাধীনে দেয়া হয়। লেবানন, সিরিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়া প্রভৃতি পেলো ফ্রান্স। কনষ্ট্যান্টিনোপল, আলেকজান্দ্রিয়া প্রভৃতি উসমানী নৌ-বন্দরগুলো আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রনে নেয়া হয়। উসমানী খিলাফাতের বিমান বহর মিত্র শক্তির হাতে চলে যায়।

খালীফা ষষ্ঠ মুহাম্মদের হাতে অবশিষ্ট থাকলো রাজধানী কনষ্ট্যান্টিনোপল এবং পার্বত্য আনাতোলিয়া।

এক কালের এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপের বিশাল এলাকা জড়ে বিস্তৃত উসমানী খিলাফাত সব হারিয়ে কনষ্ট্যান্টিনোপল আর আনাতেলিয়ায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে আনাতোলিয়ায় ‘ইয়াং তুর্কস’ ইউরোপীয় শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় এবং গ্রীসের আক্রমন থেকে স্মার্ণা রক্ষা করতে না পারাY ষষ্ঠ মুহাম্মাদের কড়া সমালোচনা করে। তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রিফাত রউফ বে এবং আলী ফুয়াদ পাশা।

মুস্তাফা কামাল পাশা তখন সামরিক বাহিনীর একজন অফিসার। খালীফা ষষ্ঠ মুহাম্মদ তাঁকে সামরিক ইনস্পেক্টর জেনারেল হিসেবে আনাতোলিয়া পাঠান ‘ইয়াং তুর্কস’-এর বিদ্রোহ দমন করতে। সেখানে গিয়ে মস্তাফা কামাল পাশা বিদ্রোহীদের দলে ভিড়ে যান।

১৯১৯ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে ‘ইয়াং তুর্কস’ আনাতোলিয়াতে একটি নির্বাহী পরিষদ গঠন করে। এই পরিষদের চেয়ারম্যান হন মুস্তাফা কামাল পাশা এবং মেম্বার ছিলেন রিফাত রউফ বে, বেকীর সামী বে, রুস্তম বে, মাজাহার বে এবং হায়দার বে। এই নির্বাহী পরিষদ আনাতোলিয়ার শাসনভার গ্রহন করে এবং আংকারাতে রাজধানী স্থাপন করে কার্যক্রম শুরু করে।

অবস্থার নাজুকতা উপলব্ধি করে খালীফা ষষ্ঠ মুহাম্মাদ দেশে সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করেন। এই নির্বাচনে জাতীয়তাবাদীগণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। আলীরেজার নেতৃত্ব গঠিত হয় উযীর পরিষদ।

১৯২০ খৃষ্টাব্দের ২৮শে জানুয়ারী উযীর পরিষদ মুস্তফা কামাল পাশার ‘জাতীয় চুক্তি’ অনুমোদন করে। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিলো তুর্ক জাতীয় স্বাধীনতার ঘোষণা।

ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স এই ঘোষণা মেনে নিতে পারেনি। জেনারেল মিলানের নেতৃত্বে মিত্রশক্তিগুলোর সৈন্যগণ ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে রাজধানী কনষ্ট্যান্টিনোপল দখল করে। কনষ্ট্যান্টিনোপলে মার্শাল L ঘোষণা করা হয়। চল্লিশ জন জাতীয়তাবাদী নেতাকে বন্দী করে মাল্টায় নির্বাসনে পাঠানো হয়।

১৯২০ খৃষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে মুস্তাফা কামাল পাশা আংকারাতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন। এই পরিষদের নাম দেয়া হয় গ্য্রান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলী। মস্তফা কামাল পাশা হন এই এসেম্বলীর সভাপতি। এইভাবে আংকারাতে কনষ্ট্যান্টিনোপলের সমান্তরাল সরকার কায়েম হয়। আংকারা সরকার ঘোষণা করে যে বিদেশী সৈন্যদের হাতে বন্দী খালীফা ষষ্ঠ মুহাম্মাদ কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তিগুলোও গ্রহনযোগ্য নয়। এতদসত্বেও ১৯২০ খৃষ্টাব্দের ১০ই আগষ্ট খালীফা ষষ্ঠ মুহাম্মাদ মিত্র শক্তির চাপের নিকট নতি স্বীকার করে সেভার্স চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

১৯২০ খৃষ্টাব্দে আংকারা সরকারের সৈন্যগণ মুস্তাফা কামাল পাশার নেতৃত্বে ইনইনুর যুদ্ধে গ্রীক বাহিনীকে পরাজিত করে তাদেরকে স্মার্ণা থেকে তাড়িয়ে দেয়। ১৯২১ খৃষ্টাব্দে মুস্তাফা কামাল পাশার নেতৃত্বে তুর্ক বাহিনী সাকারিয়া প্রান্তরে গ্রীকদের বিরুদ্ধে আরেকটি বিজয় অর্জন করে।

এই দুইটি সামরিক বিজয় আংকারা সরকারের ভাবমুর্তি বৃদ্ধি করে। কমিউনিষ্ট রাশিয়া আংকারা সরকারকে প্রথম স্বীকৃতি দেয়। ফ্রান্স এই সরকারকে স্বীকৃতি দিয়ে সিলিসিয়া থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয়। ইতালীও আংকারা সরকারকে স্বীকৃতি দিয়ে আদালিয়া ছেড়ে দেয়।

১৯২২ খৃষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে গ্রীস আংকারা সরকারের সাথে মুদানিয়া চুক্তি স্বাক্ষর করে স্মার্ণা এবং পূর্ব থ্রেসের ওপর তার দাবি পরিত্যাগ করে। ১৯২২ খৃষ্টাব্দে আংকারা সরকার এক ঘোষণার মাধ্যমে ‘সুলতান’ পদ বিলুপ্ত করে।

৩. ষষ্ঠ মুহাম্মাদের পদত্যাগ

১৯২২ খৃষ্টাব্দে আংকারা সরকার কর্তৃক ‘সুলতান’ পদ বিলুপ্তির ঘোষণা দেওয়ার পর ষষ্ঠ মুহাম্মাদ ক্ষমতা ছেড়ে ইংল্যান্ড চলে যান।

৩৭. দ্বিতীয় আবদুল মজিদ


১. খালীফা পদে দ্বিতীয় আবদুল মজিদ

১৯২২ খৃষ্টাব্দে আংকারা সরকার দ্বিতীয় আবদুল মজিদকে খালীফা বলে ঘোষণা করে। রিফাত পাশা আংকারা সরকারের পক্ষে কনষ্ট্যান্টিনোপলের শাসনভার গ্রহন করেন।

১৯২৩ খৃষ্টাব্দে জুলাই মাসে আংকারা সরকারের চাপে সেভার্স চুক্তি বাতিল করে লুজেন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

ইংল্যান্ড মেনে নেয় যে কনষ্ট্যান্টিনোপল, আনাতোলিয়া এবং পূর্ব থ্রেস তুর্কীর অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এইভাবে ইংল্যান্ড ও ইউরোপীয় শক্তিগুলো উসমানী খিলাফাতের অবশিষ্টাংশ অর্থাৎ তুর্কীর অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা মেনে নেয়।

১৯২৩ খৃষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে তুর্কীকে একটি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করে মুস্তফা কামাল পাশা হন এর প্রেসিডেন্ট এবং ইসমত ইনুনু হন এর প্রাইম মিনিষ্টার। খালীফা পদ তখনো প্রতীকী পদ হিসেবে অবশিষ্ট ছিলো।

২. দ্বিতীয় আবদুল মজিদের পদচ্যুত হন

১৯২৪ খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয় আবদুল মজিদ পদচ্যুত হন।


উসমানী খিলাফাতের বিলুপ্তি


১৯২৪ খৃষ্টাব্দে মুস্তাফা কামাল পাশা একটি আইনের মাধ্যমে খিলাফাতের উচ্ছেদ সাধন করেন। তিনি তুর্কীকে একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করেন। তুর্কীর রাজধানী কনষ্ট্যান্টিনোপল থেকে আংকারা সরিয়ে আনেন।

মুস্তাফা কামাল পাশা চরম ইসলামী বিদ্বেষী ছিলেন। যা কিছু ইসলামী আইন তখনো প্রচলিত ছিলো সেইগুলো বাদ দিয়ে তিনি সুইস কোড (Swiss Code) প্রবর্তন করেন।

তিনি পর্দা প্রথার বিলোপ সাধন করেন। একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সহ শিক্ষা প্রবর্তন করেন। ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। দেশের সর্বত্র সেকুলার স্কুল-কলেজ স্থাপিত হয়। আরবীতে আযান দেয়া নিষিদ্ধ হয়। আরবী বর্ণমালার পরিবর্তে ল্যাটিন বর্ণমালা চালু করা হয়। পাগড়ি বা ফেজটুপি পরা নিষিদ্ধ হয়। হ্যাট পরিধান করা বাধ্যতামুলক করা হয়। সালাম পরিত্যক্ত হয়।

দেশে সেকুলার পত্রপত্রিকার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। সেকুলার ও সমাজতান্ত্রিক বই-পুস্তক ব্যাপক হারে প্রকাশিত হয়। যুব সমাজ উচ্ছৃংখল হয়ে ওঠে। বেহায়াপনা উলংপনা বৃদ্ধি পায়। মদখোরের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। ইসলামকে নিয়ে বিদ্রূপ হতে থাকে। আলেম সমাজ ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়। বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিদেরকে নানাভাবে নাজেহাল ও নির্যাতন করা হয়। মুস্তাফা কামাল পাশা রিপাবলিকান পিপলস পার্টি গঠন করেন। বহুকাল পর্যন্ত এটিই ছিলো তুর্কীর একমাত্র রাজনৈতিক দল।

ছয়শত ছত্রিশ বছর উসমানী খিলাফাত ছিলো মুসলিম উম্মার শক্তিকেন্দ্র। ১৯২৪ খৃষ্টাব্দে এই শক্তি কেন্দ্রর পতন ঘটে। এটা সত্য যে উসমানী খালীফাগণ খুলাফায়ে রাশিদীনের মতো আল্লাহর রাসূলের (সা) হাতে গড়া লোক ছিলেন না। খুলাফায়ে রাশিদীনের মতো তাঁরা নির্বাচিত খালীফাও ছিলেন না। তবুও এই কথা অনস্বীকার্য যে প্রথম দিককার উসমানী খালীফাগণ নিষ্ঠাবান মুসলিম ছিলেন। তাঁরা ব্যক্তিগণ জীবনে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলতেন। খিলাফাতের সর্বত্র যাতে ছালাত কায়েম থাকে সেই জন্য স্থানে স্থানে তাঁরা বহু সংখ্যক মসজিদ নির্মান করেন। ইসলাম সম্পর্কে ভতিষ্যত জেনারেশনকে জ্ঞান দেবার জন্য তাঁরা ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। কাযীগন ইসলামী শারীয়া অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করতেন। যাতে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোন আইন তৈরী না হয় সেই দিকে নজর রাখার জন্য শাইখুল ইসলামের ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়। জনগনের স্বাস্থ্য-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য সর্বত্র হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। স্থানে স্থানে গোসলখানা তৈরী করা হয়। বহু সংখ্যক রাস্তাঘাট, সেতু ইত্যাদি তৈরী করা হয়। যাকাত ও উশর আদায় করে দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করা হয়। মসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জান, মাল ও ইযযতের নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা করা হয়। বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা প্রতিরোধ করা হয়।

তাঁরা সাদাসিধা জীবন যাপন করতেন। বিলাসিতা পরিহার করে চলতেন। তাঁরা একদিকে ছিলেন সৎ, অন্য দিকে ছিলেন যোগ্যতাসম্পন্ন। প্রিশাসন চালাতে তাঁরা হিমসিম খেতেন না। শাসনকার্য পরিচালনায় তাঁরা ব্যর্থতার পরিচয় দিতেন না। তাঁরা প্রতিভার কদর করতেন। যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদেরকে সরকারী পদসমূহে নিয়োগ করতেন।

আল্লাহর পথে জিহাদকে তাঁরা অতিশয় গুরুত্ব দিতেন। তাঁরা নিজেরাই ছিলেন মুজাহিদ। যুদ্ধের ময়দানে তাঁরা নিজেরাই সেনাপতিত্ব করতেন। প্রায় তিনশত বছর উসমানী খিলাফাত এই ধরনের সুলতান ও খালীফা লাভ করে ধন্য হয়েছিলো। তাঁদের আচরণ এবং অনুসৃত সুনীতিতে মুগ্ধ হয়ে বহু সংখ্যক অমুসলিম মুসলিম হয়েছিলো। পূর্ব ইউরোপের খৃষ্টান রাজাগণ খালীফাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতো কিন্তু তাদের প্রজাদের মাঝে খালীফাদের প্রতি নমনীয় মনোভাব পরিলক্ষিত হতো।

পূর্ব ইউরোপের খৃষ্টান শক্তি উসমানী খিলাফাতের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে চেয়েছিলো, কিন্তু বারবারই উসমানী খিলাফাত এক অপরাজেয় শক্তি প্রমাণিত হয়েছে। পরর্রতী সোয়া তিনশত বছরে যাঁরা খালীফা হয়েছিলেন তাঁরা প্রথম দিককার খালীফাদের মতো ছিলেন না। ইসলামের অনুসরণের ক্ষেত্রে তাঁদের নিষ্ঠার অভাব ছিলো। তাঁরা ছিলেন বিলাসী। তাঁদের অনেকেই নারী আর মদের নেশায় মত্ত হয়ে পড়েন। শাসক হিসেবে তাঁরা ছিলেন অযোগ্য। যোদ্ধা হিসেবে তাঁরা ছিলেন নিম্নমানের। আল্লাহর পথে জিহাদের গুরুত্ব তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন। গুণীব্যক্তিদের কদর করতে পারননি তাঁদের অনেকেই। ফলে প্রশাসনে অযোগ্য ও দুর্নীতিপরায়ণ লোকদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

শেষ দিকে যাঁরা খালীফা হন তাঁদের কেউ কেউ তো ইসলামী জীবনদর্শন এবং বিধানকেই ভুলে বসেছিলেন। ইউরোপের ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ তাঁদের চিন্তাচেতনা আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো। এক দিকে চৈন্তিক ফ্রন্টে, অপরদিকে সামরিক ফ্রন্টে তাঁরা ইউরোপীয়দের নিকট নতি স্বীকার করেন।

ইসলামী শিক্ষার প্রসার ঘটানো, আল কুরআন ও আল হাদীসে যুগজিজ্ঞাসার জবাব অন্বেষণ এবং যুগোপযোগী সামরিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের প্রতি তাঁদের উদাসীনতা শেষাবধি তাঁদেরকে ইউরোপীয় শক্তির বশংবদে পরিণত করে। তাঁর ইউরোপীয়দের চিন্তাধারা প্রবেশের জন্য খিলাফাতের দ্বার খুলে দেন। ইউরোপের ভালোমন্দ সব কিছুই বন্যার পানির মতো খিলাফাতের ভেতরে ঢুকে পড়ে। মুসলিমদের ঘরেই ইসলাম এবং মসলিমদের দুশমন তৈরি হতে থাকে। শেষ পর্যায়ে এরাই উসমানী খিলাফাতের বিলুপ্তি এবং ইসলামের উচ্ছেদ সাধন করে।

তথ্যসুত্র


১. আধুনিক ইউরোপের পরিচয়/কে. আলী

২. মুসলিম ও আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস/কে.আলী

৩. History of Modern Europe Since 1789/V.D. Mahajan

৪. Badiuzzaman Said Nursi/Sukran Bahide

৫. First World War/A.J.P. Taylor

৬. ইসলামের ইতিহাস/কাযী আকরাম হোসাইন

About এ. কে. এম. নাজির আহমদ