ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি

মৌলিক মানবীয় চরিত্র ও ইসলামী নৈতিক শক্তির তারতম্য

জাগতিক জড়শক্তি এবং নৈতিক শক্তির তারতম্য সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসের গভীরতর অধ্যয়নের পর আল্লাহর এই সুন্নাত বা রীতি আমি বুঝতে পেরেছি যে, সেখানে নৈতিক শক্তি বলতে কেবল মাত্র মৌলিক মানবীয় চরিত্রই হবে, সেখানে জাগতিক উপায়-উপাদন ও জড়শক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। এমনকি, একটি বৈষয়িক জড়শক্তি যদি বিপুল পরিমাণে বর্তমান থাকে তবে সামান্য নৈতিক শক্তির সাহায্যেই সে সারাটি দুনিয়া গ্রাস করতে পারে। আর অপর দল নৈতিক শক্তিতে শ্রেষ্ঠতর হয়েও কেবলমাত্র বৈষয়িক শক্তির অভাব হেতু সে পশ্চাৎপদ হয়ে থাকবে। কিন্তু যেখানে নৈতিক শক্তি বলতে ইসলামী নৈতিকতা ও মৌলিক মানবীয় চরিত্র উভয়ের প্রবল শক্তির সমন্বয় হবে, সেখানে বৈষয়িক জড়শক্তির সাংঘাতিক পরিমাণ অভাব হলেও নৈতিক শক্তিই জয়লাভ করবে এবং নিছক মৌলিক মানবীয় চরিত্র ও বৈষয়িক জড়শক্তির ভিত্তিতে যে শক্তিসমূহ মস্তক উত্তোলন করবে তা নিশ্চিতরূপেই পরাজিত হবে। সুস্পষ্টরূপে বুঝার জন্য একটি হিসেবের অবতারণা করা যেতে পারে। মৌলিক মানবীয় চরিত্রের সাথে যদি একশত ভাগ বৈষয়িক জড়শক্তি অপরিহার্য হয় তবে ইসলামী নৈতিকতা ও মৌলিক মানবীয় চরিত্রের পূর্ণ সমন্বয় হওয়ার পর মাত্র ২৫ ভাগ বৈষয়িক জড়শক্তি উদ্দেশ্য লাভের জন্য যথেষ্ট হবে। অবশিষ্ট ৭৫ ভাগ জড়শক্তির অভাব কেবল ইসলামী নৈতিকতাই পূরণ করে দেবে। উপরন্তু নবী করীমের (সা) জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা হতে জানা যায় যে, রসূলে করীম (সা) এবং তার আসহাবদের সমপরিমাণ ইসলামী নৈতিকতা হতে মাত্র শতকরা পাঁচ ভাগ জড়শক্তিই উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য যথেষ্ট হতে পারে। এই নিগূঢ় তত্ত্ব ও সত্য বলা হয়েছে কুরআন মজীদের নিম্নলিখিত আয়াতেঃ

ان يكن منكم عشرون صابرون يغلبوا مائتين

“তোমাদের মধ্যে যদি বিশজন পরম ধৈর্যশীল লোক হয় তবে তারা দু’শ জনের উপর জয়ী হতে পারবে।”

এই শেষোক্ত কথাটিকে নিছক ‘অন্ধভক্তি ভিত্তিক ধারণা’ মনে করা ভুল হবে। আর আমি যে কোনো মো’জেযা বা কেরামতির কথা বলছি, তাও মনে করবেন না। বস্তুত এটা এক বাস্তব এবং সম্পূর্ণ স্বাভাবিক কথা সন্দেহ নেই। এই সত্য তত্ত্ব কার্যকারণ পরম্পরা অনুযায়ী এই দুনিয়াতেই পরিস্ফুট হয় সকল সময় এটা পরিস্ফূট হতে পারে। এর কারণ যদি বর্তমান থাকে, তবে তা নিশ্চয়ই বাস্তবে রূপায়িত হবে।

কিন্তু ইসলামী নৈতিকতা যার মধ্যে মৌলিক মানবীয় চরিত্রও ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত রয়েছে বৈষয়িক জড়শক্তির শতকরা ৭৫ ভাগ বরং ৫০ ভাগ অভাব কিরূপে পূরণ করে; তা একটি নিগূঢ় রহস্য বটে। কাজেই সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে এর বিশ্লেষণ হওয়া একান্ত আবশ্যক।

এই রহস্য হৃদয়ংগম করার জন্য সমসাময়িককালের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করাই যথেষ্ট। বিগত মহাযুদ্ধের সর্বাত্মক বিপর্যয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে জাপান ও জার্মানীর পরাজয় ঘটে। মৌলিক মানবীয় চরিত্রের দিক দিয়ে এই বিপর্যয়ের সংশ্লিষ্ট উভয় দলই প্রায় সমান। বরং সত্য কথা এই যে, কোনো দিক দিয়ে জার্মান ও জাপান মিত্র পক্ষের মোকাবিলায় অধিকতর মৌলিক মানবীয় চরিত্রের প্রমাণও উপস্থিত করেছে। জড়বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং এর বাস্তব প্রয়োজনের ব্যাপারেও উভয় পক্ষই সমান ছিলো। বরং সত্য কথা এই যে, এই ক্ষেত্রে জার্মানীর শ্রেষ্ঠত্ব সর্বজন বিদিত। কিন্তু এতদসত্বেও কেবল একটি ব্যাপারেই এক পক্ষ অপর পক্ষ হতে অনেকটা অগ্রসর আর তা হচ্ছে বৈষয়িক কার্যকারণের আনুকুল্য। এই জনশক্তির অপরাপর সকল পক্ষ অপেক্ষাই অনেকগুণ বেশি। বৈষয়িক জড় উপায়-উপাদান তারা সর্বাপেক্ষা অধিক রয়েছে। এর ভৌগলিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ এবং এর ঐতিহাসিক কার্যকারণ অপরাপর পক্ষের তুলনায় বহুগুণ বেশি অনুকূল পরিস্থিতির উদ্‌ভব করে নিয়েছিল। ঠিক এজন্য মিত্রপক্ষ বিজয় মাল্যে ভূষিত হয়। আর এজন্যই যে জাতির জনসংখ্যা অপর্যাপ্ত, বৈষয়িক জড় উপায়-উপাদান যার নিকট কম, তার পক্ষে অধিক জনসংখ্যা সমন্বিত ও বিপুল জাগতিক উপায়-উপাদান বিশিষ্ট জাতির মোকাবিলায় মস্তকোত্তলন করে দণ্ডায়মান হওয়া প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। মৌলিক মানবীয় চরিত্র ও জড়বিজ্ঞান ব্যবহারের দিক দিয়ে খুব বেশি অগ্রসর হলেও এর ব্যতিক্রম হতে পারে না। কারণ মৌলিক মানবীয় চরিত্র প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ভিত্তিতে উত্থিত জাতি হয় জাতীয়তাবাদী হবে এবং পৃথিবীর অন্যান্য অংশও অধিকার করতে প্রয়াসী হবে, নতুবা তা এক সার্বজনীন আদর্শ ও নিয়ম বিধানের সমর্থক হবে এবং তা গ্রহণ করার জন্য দুনিয়ার অন্যান্য জাতিসমূহকেও আহবান জানাবে। সে জাতির এ দু’টির যে কোনো এক অবস্থা নিশ্চয়ই হবে। প্রথম অবস্থা হলো বৈষয়িক জড়শক্তি ও জাগতিক উপায়-উপাদানের দিক দিয়ে অন্যান্য জাতি অপেক্ষা তার শ্রেষ্ঠ ও অগ্রসর হওয়া ভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করার দ্বিতীয় কোনো পন্থা আদৌ থাকতে পারে না। এর কারণ এই যে, যেসব জাতিকে সে প্রভুত্ব ও ক্ষমতা লিপ্সার অগ্নিযজ্ঞে আত্মাহুতি দিতে কৃত সংকল্প হয়েছে তারা অত্যন্ত তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে তার প্রতিরোধ করবে এবং তার পথরোধ করতে নিজেদের সমগ্র শক্তি নিয়োজিত করবে। কাজেই তখন আক্রমণকারী জাতির পরাজয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি। কিন্তু উক্ত জাতির যদি দ্বিতীয় অবস্থা হয় যদি উহা কোনো সার্বজনীন আদর্শের নিশান বরদার হয়, ও মস্তিষ্ক প্রভাবান্বিত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তখন জাতিকে প্রতিবন্ধকতার পথ হতে অপসৃত করতে খুব বেশি শক্তি প্রয়োগ করার আবশ্যক হবে না। কিন্তু এখানে ভুললে চলবে না যে, মুষ্টিমেয় কয়েকটি মানোমুগ্ধকর নীতি-আদর্শই কখনো মানুষের মন ও মস্তিষ্ক প্রভাবান্বিত করতে পারে না। সে জন্য সত্যিকার সদিচ্ছা, সহানুভূতি, হিতাকাঙ্খা, সততা, সত্যবাদিতা, নিঃস্বার্থতা, উদারতা, বদান্যতা, সৌজন্য ও ভদ্রতা এবং নিরপেক্ষ সুবিচার নীতি একান্ত অপরিহার্য। শুধু তাই নয়, এই মহৎ গুণগুলোকে যুদ্ধ-সন্ধি, জয়-পরাজয়, বন্ধুতা-শত্রুতা এই সকল প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই কঠিন পরীক্ষায় অত্যন্ত খাঁটি অকৃত্রিম ও নিষ্কলুষ প্রমাণিত হতে হবে। কিন্তু এরূপ ভাবধারার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে উন্নত চরিত্রের উচ্চতম ধাপের সাথে এবং তার স্থান মৌলিক মানবীয় চরিত্রের অনেক ঊর্ধে। ঠিক এ কারণেই নিছক মৌলিক মানবীয় চরিত্র ও বৈষয়িক শক্তির ভিত্তিতে উত্থিত জাতি প্রকাশ্যভাবে জাতীয়তাবাদীই হোক কি গোপন জাতীয়তাবাদের সাথে কিছুটা সার্বজনীন আদর্শের প্রচার ও সমর্থন করার ছদ্মবেশই ধারণ করুক- একান্ত ব্যক্তিগত কিংবা শ্রেণীগত অথবা জাতীয় স্বার্থ লাভ করাই হয় তার যাবতীয় চেষ্টা-সাধনা ও দ্বন্দ্ব-সংগ্রামের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। বর্তমান সময় আমেরিকা, বৃটেন, রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে ঠিক এই ভাবধারাই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই ধরনের যুদ্ধ-সংগ্রামের ক্ষেত্রে অতি স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যেকটি জাতি প্রতিপক্ষের সামনে এক দুর্জয় দুর্গের ন্যায় হয়ে দাঁড়ায় এবং তার প্রতিরোধে স্বীয় সমগ্র নৈতিক ও বৈষয়িক শক্তি প্রয়োগ করে। তখন আক্রমণকারী জাতির শ্রেষ্ঠতর জড়শক্তির আক্রমণে শত্রু পক্ষকে সে নিজ দেশের চতুর্সীমার মধ্যে কিছুতেই প্রবেশ করতে দিবে না।

কিন্তু এই সময় এরূপ পরিবেশের মধ্যে এমন একটা মানবগোষ্ঠী যদি বর্তমান থাকে প্রথমত তা একটি জাতির লোকদের সমন্বয়ে গঠিত হয়ে থাকলেও কোনো দোষ নেই যদি তা একই জাতি হিসেবে না উঠে একটি আদর্শবাদী জামায়াত হিসেবে দণ্ডায়মান হয়, যা সকল প্রকার ব্যক্তিগত, শ্রেণীগত ও জাতীয় স্বার্থপরতার বহু উর্ধে থেকে বিশ্বমানবতাকে আমন্ত্রণ জানাবে যার সমগ্র চেষ্টা-সাধনার চরম লক্ষ্য হবে নির্দিষ্ট কতোকগুলো আদর্শের অনুসরণের মধ্য দিয়ে বিশ্বমানবতার মুক্তিসাধন এবং সেই আদর্শ ও নীতিসমূহের ভিত্তিতে মানব জীবনের গোটা ব্যবস্থার পুনপ্রতিষ্ঠা সাধন। ঐসব নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে এই দল যে জাতি গঠন করবে, তাতে জাতীয়, ভৌগলিক, শ্রেণীগত ও বংশীয় বা গোত্রীয় বৈষম্যের নামগন্ধও থাকবে না। সকল মানুষই তাতে সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে প্রবেশ করতে পারবে এবং সকলেই সমান সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে পারবে। এই নবপ্রতিষ্ঠিত জাতির মধ্যে নেতৃত্ব পথ নির্দেশকারী মর্যাদা কেবল সেই ব্যক্তি বা সেই মানব সমষ্টিই লাভ করতে পারবে, যারা সেই আদর্শ ও নীতির অনুসরণ করে চলার দিক দিয়ে সর্বাপেক্ষা অগ্রসর ও শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হবে। তখন তার বংশ মর্যাদা বা আঞ্চলিক জাতীয়তার কোনো তারতম্য বিচার হবে না এমনকি, এই নতুন সমাজে এতোদুরও হতে পারে যে, বিজিত জাতির লোক ঈমান এনে নিজেকে অন্যান্যের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আদর্শানুসরণে এবং যোগ্যতার প্রমাণ করতে পারলে বিজয়ী তার সকল চেষ্টা ও যুদ্ধ সংগ্রাম লব্ধ যাবতীয় ‘ফল’ তার পদতলে এনে ঢেলে দিবে এবং তাকে ‘নেতা’ রূপে স্বীকার করে নিজে ‘অনুসারী’ হয়ে কাজ করতে প্রস্তুত হবে।

এমন একটি আদর্শবাদী দল যখন নিজেদের আদর্শ প্রচার করতে শুরু করে, তখন এই আদর্শের বিরোধী লোকগণ তাদের প্রতিরোধ করতে উদ্যত হয়। ফলে উভয় দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। কিন্তু এই দ্বন্দ্বের তীব্রতা যতোই বৃদ্ধি পায় আদর্শবাদী দল বিরুদ্ধবাদীদের মোকাবিলায় ততোই উন্নত চরিত্র ও মহান মানবিক গুণ মহাত্মের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে থাকে। সে তার কর্মনীতি দ্বারা প্রমাণ করে যে, মানব সমষ্টি তথা গোটা সৃষ্টিজগতের কল্যাণ সাধন ভিন্ন তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। বিরুদ্ধবাদীদের ব্যক্তি সত্ত্বা কিংবা তাদের জাতীয়তার সাথে এর কোনো শত্রুতা নেই। শত্রুতা আছে শুধু তাদের গৃহীত জীবনধারা ও চিন্তা মতবাদের সাথে। তা পরিত্যাগ করলেই তার রক্ত পিপাসু শত্রুকেও প্রাণভরা ভালবাসা দান করতে পারে বুকের সঙ্গে মিলাতে পারে। পরন্তু সে আরও প্রমাণ করবে যে, বিরুদ্ধ পক্ষের ধন-দৌলত কিংবা তাদের ব্যবসায় ও শিল্পপণ্যের প্রতিও তার কোনো লালসা নেই, তাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কল্যাণ সাধনই তার একমাত্র কাম্য। তা লাভ হলেই যথেষ্ট। তাদের ধন-দৌলত তাদেরই সৌভাগ্যের কারণ হবে। কঠিন কঠোরতম পরীক্ষার সময়ও এই দল কোনোরূপ মিথ্যা, প্রতারণা ও শঠতার আশ্রয় নেবে না। কুটিলতা ষড়যন্ত্রের প্রত্যুত্তরে তারা সহজ-সরল কর্মনীতিই অনুসরণ করবে। প্রতিশোধ গ্রহণের তীব্র উত্তেজনার সময়ও অত্যাচার-অবিচার, উৎপীড়নের নির্মমতায় মেতে উঠবে না। যুদ্ধের প্রবল সংঘর্ষের কঠিন মুহুর্তেও তারা নিজেদের নীতি আদর্শ পরিত্যাগ করবে না। কারণ সেই আদর্শের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্যই তো তার জন্ম। এজন্য সততা, সত্যবাদিতা, প্রতিশ্রুতি পূরণ, নির্মল আচার-ব্যবহার ও নিঃশ্বার্থ কর্মনীতির উপর তারা দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে থাকে। নিরপেক্ষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রথমত আদর্শ হিসেবে সততা ও ন্যায়বাদের যে মানদণ্ড বিশ্ববাসীর সামনে পেশ করেছিল, নিজেকে এর কষ্টিপাথরে যাচাই করে সত্য এবং খাঁটি বলে প্রমাণ করে দেয়। শত্রু পক্ষের ব্যভিচারী, মদ্যপায়ী, জুয়াড়ী, নিষ্ঠুর ও নির্দয় সৈন্যদের সাথে এই দলের আল্লাহভীরু, পবিত্র চরিত্র, মহান আত্মা-দয়ার্দ্র হৃদয় ও উদার উন্নত মনোবৃত্তি সম্পন্ন মুজাহিদদের প্রবল মোকাবিলা হয়, তখন এই দলের প্রত্যেক ব্যক্তিরই ব্যক্তিগত মানবিক ও গুণ-গরিমা প্রতিপক্ষের পাশবিক ও বর্বরতার উপর উজ্জ্বল উদ্‌ভাসিত হয়ে লোকচক্ষুর সামনে প্রকটিত হতে থাকে। শত্রু পক্ষের লোক আহত বা বন্দী হয়ে আসলে চতুর্দিকে ভদ্রতা, সৌজন্য, পবিত্রতা ও নির্মল মানসিক চরিত্রের রাজত্ব বিরাজমান দেখতে পায় এবং তা দেখে তাদের কলুষিত আত্মাও পবিত্র ভাবধারার সংস্পর্শে কলুষমুত্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে এই দলের লোক যদি বন্দী হয়ে শত্রু পক্ষে শিবিরে চলে যায়, সেখানকার অন্ধকারাচ্ছন্ন পূতিগন্ধময় পরিবেশে এদের মনুষ্যত্বের মহিমা আরো উজ্জল ও চাকচিক্যপূর্ণ হয়ে উঠে। এরা কোনো দেশ জয় করলে বিজিত জনগণ প্রতিশোধের নির্মম আঘাতের পরিবর্তে ক্ষমা করুণা পায়, কঠোরতা নির্মমতার পরিবর্তে সহানুভূতি; গর্ব অহংকার ও ঘৃণার পরিবর্তে পায় সহিষ্ণুতা ও বিনয়; ভৎসনার পরিবর্তে পায় সাদর সম্ভাষণ এবং মিথ্যা প্রচারণার পরিবর্তে সত্যের মূলনীতিসমূহের বৈজ্ঞানিক প্রচার। আর এসব দেখে খুশিতে তাদের হৃদয় মন ভরে উঠে। তারা দেখতে পায় যে, বিজয়ী সৈনিকরা তাদের নিকট নারীদেহের দাবি করে না, গোপনে লোকচক্ষুর অন্তরালে ধন-সম্পত্তি খোঁজ করে বেড়ায় না, তাদের শৈল্পিক গোপন রহস্যের সন্ধান করার জন্যও এরা উদগ্রীব নয়, তাদের অর্থনৈতিক শক্তি সম্পদকে ধ্বংস করার চিন্তাও এদের নেই। তাদের জাতীয় সংস্কৃতি ও সম্মান মর্যাদার উপরও এরা হস্তক্ষেপ করে না। বিজিত জনতা শুধু দেখতে পায়, এরা এক গভীর চিন্তায় নিমগ্ন এই জন্য যে বিজিত দেশের একটি মানুষেরও সম্মান বা সতীত্ব যেনো নষ্ট না হয়, কারো ধনমাল যেনো ধ্বংস না হয়, কেউ যেনো সংগত অধিকার হতে বঞ্চিত না থেকে যায়, কোনোরূপ অসচ্চরিত্রতা তাদের মধ্যে যেনো ফুটে না উঠে এবং সামগ্রিক জুলুম-পীড়ন যেনো কোনোরূপেই অনুষ্ঠিত হতে না পারে।

পক্ষান্তরে শত্রু পক্ষ যখন কোনো দেশে প্রবেশ করে, তখন সে দেশের সমগ্র অদিবাসী তাদের অত্যাচার, নির্মমতা ও অমানুষিক ধ্বংসলীলায় আর্তনাদ করে উঠে একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারা যায়, এই ধরনের আদর্শবাদী জিহাদের সাথে জাতীয়তাবাদী যুদ্ধ সংগ্রামের কতো আকাশ স্পর্শী পার্থক্য হয়ে থকে। এই ধরনের লড়াইয়ে উচ্চতর মানবিকতা নগণ্য বৈষয়িক শক্তি সামর্থ সহকারে ও শত্রুপক্ষের লৌহবর্ম রক্ষিত পাশবিকতাকে যে অতি সহজেই প্রথম আক্রমণেই পরাজিত করবে তাতে আর সন্দেহ কি? বস্তুত উন্নত নির্মল নৈতিকতার হাতিয়ার বন্দুক-কামানের গোলাগুলি অপেক্ষাও দূর পাল্লায় গিয়ে লক্ষ্যভেদ করবে। প্রচন্ড লড়াইয়ে কঠিন মুহূর্তেও শত্রুরা বন্ধুতে পরিণত হবে। দেশের পূর্বে মানুষের হৃদয়-মন বিজিত হবে, দেশের পর দেশ-জনপদের পর জনপদ বিনাযুদ্ধেই পরাজয় স্বীকার করে মুক্তির চিরন্তন স্বাদ গ্রহণ করবে। ওদিকে এই সত্যনিষ্ঠ আদর্শবাদী দল যখন নিজেদের মুষ্টিমেয় জনসংখ্যা অত্যল্প উপায়-উপাদান সহকারে গঠনমূলক কাজ শুরু করবে, তখন সেনাপতি, সৈনিক, যোদ্ধা, বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী, অস্ত্রশস্ত্র, রসদ এবং যুদ্ধের অন্যান্য প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জাম সবকিছুই ধীরে ধীরে বিরোধী শিবির হতে পাওয়া যাবে, তাতে সন্দেহ নেই।

আবার এই উক্তি নিছক কল্পনা-ধারণা এবং আন্দাজ অনুমানের উপরই ভিত্তিশীল নয়, নবী করীম (সা) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সোনালী যুগের ঐতিহাসিক উদাহরণসমূহ হতে একথা প্রমাণিত হয় যে, ইতিপূর্বেও এরূপ ঘটনা ঘটেছে এবং আজও এরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। অবশ্য সেজন্য শর্ত এই যে, এরূপ অভিজ্ঞতালাভের জন্য পরিপূর্ণ প্রস্তুতি ও সৎ সহাস নিয়ে কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

আমি আশা করি, আমার উপরোক্ত বিস্তারিত আলোচনা হতে আমার একথা সুষ্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রকৃতপক্ষে নৈতিক শক্তিই হচ্ছে শক্তির আসল উৎস। কাজেই দুনিয়ার কোনো মানব সমষ্টি যদি মৌলিক মানবীয় চরিত্রের সঙ্গে ইসলামী নৈতিকতারও আধার হয় তখন তার বর্তমানে অন্য কোনো দলের পক্ষে দুনিয়ার নেতৃত্ব এবং কতৃত্বের অধিকারী হয়ে থাকা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে কঠিন এবং স্বভাবতই তা অসম্ভব। দ্বিতীয়ত মুসলমানদের বর্তমান অধপতনের মূলীভূত কারণ কি উপরের আলোচনা হতে তাও আশা করি সুষ্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যারা না বৈষয়িক উপায়-উপাদান প্রয়োগ করবে, না মৌলিক মানবীয় চরিত্রে ভূষিত হবে, আর না সমষ্টিগতভাবে ইসলামী নৈতিকতার অস্তিত্বই তাদের মধ্যে থাকবে, তারা যে দুনিয়ার নেতৃত্বের আসনে কিছুতেই অধিষ্ঠিত থাকতে পারে না, এটা সর্বজন বিদিত সত্য। এমতাবস্থায় এমনসব কাফের লোকদেরই কর্তৃত্ব দান করা আল্লাহর স্থায়ী রীতি, যাদের ইসলামী নৈতিকতা না থাকলেও মৌলিক মানবীয় চরিত্র তো রয়েছে, আর জাগতিক জড় উপায়-উপাদান ব্যবহার এবং শাসন শৃংখলা রক্ষার দিক দিয়ে নিজেদেরকে অন্যের তুলনায় শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করেছে। এই ক্ষেত্রে মুসলমানদের কোনো অভিযোগ করার থাকলে তা তাদের নিজেদের বিরুদ্ধেই হতে পারে, এ ব্যাপারে আল্লাহর স্থায়ী নিয়ম-বিধানের আদৌ কোনো ত্রুটি নেই। আর নিজেদের বিরুদ্ধে যদি বাস্তবিকই কোনো অভিযোগ জাগে, তাদের অনিবার্য ফলে নিজেদের যাবতীয় দোষ-ত্রুটি সংশোধন করার জন্য যত্নবান হওয়া এবং যে কারণে মুসলমান নেতৃত্বের আসন হতে বিচ্যুত হয়ে অনুগত হতে বাধ্য হয়েছে সেই কারণ দূর করতে বদ্ধপরিকর হওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়।

অতপর সুষ্পষ্ট ভাষায় ইসলামী নৈতিকতার মূল ভিত্তিসমূহের পুংখানুপুংখ বিশ্লেষণ করা একান্ত আবশ্যক। কারণ, আমি জানি এ ব্যাপারে মুসলমানদের ধারণা নিতান্ত অবাঞ্ছিতভাবে অস্পষ্ট এবং বিশিষ্ট হয়ে রয়েছে। এই অস্পষ্টতা ও অসংঘবদ্ধতার কারণেই ইসলামী নৈতিকতা আসলে যে কি জিনিস এবং এদিক দিয়ে মানুষের চরিত্র গঠন ও পূর্ণতা সাধনের জন্য কোন্‌ জিনিস কোন্‌ শ্রেণী পরম্পরা ও ক্রমিক ধারা অনুযায়ী তার মধ্যে লালিত-পালিত করা অপরিহার্য তা খুব কম লোকই জানতে পেরেছে।

ইসলামের নৈতিকতার চার পর্যায়

ইসলামী নৈতিকতা বলতে আমরা যা বুঝে থাকি, কুরআন ও হাদিসের শিক্ষানুযায়ী এর চারটি ক্রমিক পর্যায় রয়েছে। প্রথম ঈমান, দ্বিতীয় ইসলাম, তৃতীয় তাকওয়া এবং চতুর্থ ইহসান। বস্তুত এ চারটি পর্যায় পরস্পর এমন স্বাভাবিক শ্রেণী পরম্পরা অনুযায়ী সুসংবদ্ধ হয়ে আছে যে, প্রত্যেকটি পরবর্তী পর্যায়ই পূর্ববর্তী পর্যায় হতে উদ্‌ভুত এবং অনিবার্যরূপে এরই উপর প্রতিষ্ঠিত। এজন্য নিম্নবর্তী পর্যায় যতোক্ষণ না দৃঢ় পরিপক্ক হবে ততোক্ষণ পর্যন্ত এর উপরের পর্যায়ের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে কল্পনাও করা যায় না। এই সমগ্র ইমারতের মধ্যে ঈমান হচ্ছে প্রাথমিক ভিত্তিপ্রস্তর। এরই উপর ইসলামের স্তর রচিত হয়, তার উপর ‘তাকওয়া’ এবং সকল পর্যায়ের উপরে হয় ‘ইহসানের’ প্রতিষ্ঠা। ঈমান না হলে ইসলামে তাকওয়া কিংবা ইহসান লাভ করার কোনো সম্ভাবনাই হতে পারে না। ঈমান দূর্বল হলে তার উপর উচ্চতর পর্যায়সমূহের দুর্বহ বোঝা চাপিয়ে দিলেও তা অতিশয় কাঁচা, শিথিল ও অন্তসারশূন্য হয়ে পড়বে। এই ঈমান সংকীর্ণ হলে যতোখানি তার ব্যপ্তি হবে, ইসলাম এবং ইহসান ঠিক ততোখানি সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ হবে, তাতে সন্দেহ নেই। অতএব ঈমান যতোক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণরূপে বিশুদ্ধ সুদৃঢ় ও সম্প্রসারিত না হবে, দীন ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানসম্পন্ন কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তিই তার উপর ইসলাম, তাকওয়া কি ইহসান প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তাও করতে পারে না। অনুরূপভাবে ‘তাকওয়ার’ পূর্বে ‘ইসলাম’ এবং ইহসানের পূর্বে ‘তাকওয়া’ বিশুদ্ধকরণ সুষ্ঠুতা বিধান এবং সম্প্রসারিতকরণ অপরিহার্য। কিন্তু সাধারণত আমরা এটাই দেখতে পাই যে, এই স্বাভাবিক ও নীতিগত শ্রেণী পরম্পরার প্রতি চরম উপক্ষে প্রদর্শন করা হয় এবং ঈমান ও ইসলামের পর্যায়ে পূর্ণতা সাধন ছাড়াই তাকওয়া ও ইহসানের আলোচনা শুরু করে দেয়া হয়। এটা অপেক্ষাও দুঃখের বিষয় এই যে, সাধারণত লোকদের মনে ঈমান ইসলাম সম্পর্কে অত্যন্ত সংকীর্ণ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে রয়েছে। এজন্যই শুধু বাহ্যিক বেশ-ভূষা, পোশাক-পরিচ্ছদ উঠা-বসা, চলা-ফেরা, খানা-পিনা, প্রভৃতি বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানসমূহ নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে করতে পারলেই ‘তাকওয়ার’ পূর্ণতা সাধন হয়ে গেল। আর ইবাদতের মধ্যে নফল নামায, দরূদ, অজিফা পাঠ এই ধরনের কয়েকটি বিশেষ কাজ করলেই ইহসানের উচ্চতম অধ্যায় লাভ হয় বলে ধারণা করে। অথচ এ ধরনের তাকওয়া ও ইহসানের সংগে সংগে লোকদের জীবনের এমন অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শনও পাওয়া যায় যার ভিত্তিতে অনায়াসে বলা চলে যে, তাকওয়া ও ইসলাম তো দূরের কথা, আসল ঈমানই এখন পর্যন্ত তার মধ্যে পরিপক্কতা ও সুষ্ঠুতা লাভ করেনি। এরূপ ভুল ধারণা ও ভুল দীক্ষার পদ্ধতি আমাদের মধ্যে যতোদিন বর্তমান থাকবে ততোদিন পর্যন্ত আমরা ইসলামী নৈতিকতার অপরিহার্য অধ্যায়সমূহ কখনো অতিক্রম করতে পারবো বলে আশা করা যায় না। এজন্যই ঈমান, ইসলাম, তাকওয়া, ইহসান এই চারটি অধ্যায় সম্পর্কে পূর্ণ সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা এবং সেই সংগে এদের স্বাভাবিক ও ক্রমিক শ্রেণী পরম্পরাও অনুধাবন করা একান্তই অপরিহার্য।

ঈমান

সর্বপ্রথম ঈমান সম্পর্কেই আলোচনা করা যাক। কারণ, এটা ইসলামী জিন্দেগীর প্রাথমিক ভিত্তিপ্রস্তর। তাওহীদ ও রিসালাত আল্লাহর একত্ব ও হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে রসূলরূপে স্বীকার করে নেয়াই এক ব্যক্তির ইসলামের পরিসীমায় অনুপ্রবেশ লাভের জন্য যথেষ্ট। তখন তার সাথে ঠিক একজন মুসলমানেরই ন্যায় আচরণ করা আবশ্যক তখন এরূপ আচরণ ও ব্যবহার পাবার তার অধিকারও হয়। কিন্তু সাধারণ স্বীকারোক্তি এমনি আইনগত প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য যথেষ্ট হলেও ইসলামী জিন্দেগীর সমগ্র ‘ত্রিতল বিশিষ্ট উচ্চ প্রাসাদের’ ভিত্তিপ্রস্তর হওয়ার জন্যও কি এটা যথেষ্ট হতে পারে? সাধারণ লোকেরা এরূপই ধারণা করে। আর এজন্য যেখানেই এই স্বীকারোক্তিটুকু পাওয়া যায়, সেখানেই বাস্তবিকভাবে ইসলাম, তাকওয়া ও ইহসানের উচ্চতলসমূহ তৈরি করার কাজ শুরু করে দেয়া হয়। ফলে সাধারণত এটা হাওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত প্রাসাদেরই (?) অনুরূপ ক্ষণভঙ্গুর ও ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ে। বস্তুত একটি পরিপূর্ণ ইসলামী জিন্দেগী গঠনের জন্য সুবিস্তারিত সম্প্রসারিত, ব্যাপক গভীর ও সুদৃঢ় ঈমান একান্তই অপরিহার্য। ঈমানের বিস্তৃতি ও ব্যাপকতা হতে জীবনের কোনো একটি দিক বা বিভাগও যদি বাইরে পড়ে থাকে, তবে ইসলামী জিন্দেগীর সেই দিকটিই পুণর্গঠন লাভ হতে বঞ্চিত থেকে যাবে এবং তার গভীরতায় যতোটুক অভাবই থাকবে, ইসলামী জিন্দিগীর প্রাসাদ সেখানেই দুর্বল ও শিথিল হয়ে থাকবে, এ কথায় কোনোই সন্দেহ নেই।

উদাহরণ স্বরূপ “আল্লাহর প্রতি ঈমানের” উল্লেখ করা যেতে পারে। বস্তুত আল্লাহর প্রতি ঈমান দীন ইসলামের প্রাথমিক ভিত্তিপ্রস্তর। একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারা যাবে যে, আল্লাহকে স্বীকার করার উক্তিটুকু সাদাসিধে পর্যায় অতিক্রম করে বিস্তারিত ও সম্প্রসারিত ক্ষেত্রে প্রবেশ করার পর এর বিভিন্ন রূপ দেখতে পাওয়া যায়। কোথাও “আল্লাহর প্রতি ঈমান” একথা বলে শেষ করা যায় যে, আল্লাহ বর্তমান আছেন। সন্দেহ নেই, পৃথিবীর তিনি সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি এক ও অদ্বিতীয়, এটাও সত্য কথা। কোথাও আরও একটু অগ্রসর হয়ে আল্লাহকে মা’বুদ স্বীকার করা হয় এবং তার উপাসনা করার প্রয়োজনীয়তাও মেনে নেয়া হয়। কোথাও আল্লাহর গুণ এবং তাঁর অধিকার ও ক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত ও ব্যাপক ধারণাও শুধু এতোটুকু হয় যে, আলেমুল গায়েব, সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রোষ্টা, প্রার্থনা শ্রবণকারী, অভাব ও প্রয়োজন পূরণকারী তিনি এবং ইবাদাতের সকল খুঁটিনাটি রূপ একমাত্র তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট করা বাঞ্ছনীয়। এখানে কেউ তার শরীক নেই। আর “ধর্মীয় ব্যাপারসমূহে” চূড়ান্ত দলীল হিসেবে আল্লাহর কিতাবকেও স্বীকার করা হয়। কিন্তু এরূপ বিভিন্ন ধারণা বিশ্বাসের পরিণামে যে একই ধরণের জীবনব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে না, তা সুস্পষ্ট কথা। বরং যে ধারণা যতোখানি সীমাবদ্ধ, কর্মজীবনে ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে ইসলামী বৈশিষ্ট্য অনিবার্যরূপে ততোখানি সংকীর্ণ হওয়াই দেখা দিবে এমনকি যেখানে সাধারণ ধর্মীয় ধারণা অনুযায়ী “আল্লাহর প্রতি ঈমান” অপেক্ষাকৃতভাবে অতীব ব্যাপক ও সম্প্রসারিত হবে, সেখানেও ইসলামী জিন্দেগীর বাস্তবরূপ এই হবে যে, একদিকে আল্লাহর দুশমনদের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা করা হবে এবং অন্যদিকে আল্লাহর “আনুগত্য” করার কাজও সেই সংগেই সম্পন্ন করা হবে কিংবা ইসলামী নেজাম ও কাফেরী নেজাম মিলিয়ে একটি জগাখিচুরী তৈরি করা হবে।

এভাবে “আল্লাহর প্রতি ঈমান” এর গভীরতার মাপকাঠিও বিভিন্ন। কেউ আল্লাহকে স্বীকার করা সত্ত্বেও সাধারণ জিনিসকেও আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয় না। কেউ আল্লাহর কোনো কোনো জিনিস অপরাপর জিনিস অপেক্ষা ‘অধিক প্রিয়’ বলে মনে করে। আবার অনেক জিনিসকে আল্লাহর অপেক্ষাও প্রিয়তর হিসেবে গ্রহণ করে; কেউ নিজের জান-মাল পর্যন্ত আল্লাহর জন্য কুরবানী করতে প্রস্তুত হয়। কিন্তু নিজের মনের ঝোঁক-প্রবণতা, নিজের মতবাদ ও চিন্তাধারা কিংবা নিজের খ্যাতি ও প্রসিদ্ধিকে বিন্দুমাত্র ব্যাহত করতে প্রস্তুত হয় না। ঠিক এই হার অনুসারেই ইসলামী জিন্দেগীর স্থায়িত্ব ও ভঙ্গুরতা নির্ধারিত হয়ে থাকে। আর যেখানেই ঈমানের বুনিয়াদ দুর্বল থেকে যায়, ঠিক সেখানেই মানুষের ইসলামী নৈতিকতা নির্মমভাবে প্রতারিত হয়।

বস্তুত ইসলামী জিন্দেগীর একটি বিরাট প্রসাদ একমাত্র সেই তাওহীদ স্বীকারের উপরই স্থাপিত হতে পারে, যা মানুষের গোটা ব্যক্তি ও সমষ্টিগত জীবনের উপর সম্প্রসারিত হবে, যার দুরুন প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজেকে এবং নিজের প্রত্যেকটি বস্তুতেই, “আল্লাহর মালিকানা” বলে মনে করবে প্রত্যেকটি মানুষ সেই এক আল্লাহকেই নিজের এবং সমগ্র পৃথিবীর একই সংগত মালিক, মাবুদ, প্রভু অনুসরণযোগ্য এবং আদেশ-নিষেধের নিরংকুশ অধিকারী বলে মেনে নিবে। মানব জীবনের জন্য অপরিহার্য জীবনব্যবস্থার উৎস একমাত্র তাঁকেই স্বীকার করবে এবং আল্লাহর আনুগত্য বিমূখতা কিংবা তাঁর জীবন বিধান উপক্ষা করা অথবা আল্লাহর নিজ সত্তা ও গুণ-গরিমা এবং অধিকার ও ক্ষমতায় অন্যের অংশীদারিত্ব যেদিক দিয়ে এবং যেরূপেই রয়েছে, তা মারাত্মক ভ্রান্তি ও গোমরাহী হবে এই নিগৃঢ় সত্যে সুদৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। এই প্রাসাদ অত্যধিক সুদৃঢ় হওয়া ঠিক তখনই সম্ভব, যখন কোনো ব্যক্তি পরিপূর্ণ চেতনা ও ইচ্ছা সহকারে তার নিজ সত্তা, যাবতীয় ধনপ্রাণ নিঃশেষ আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত করবে। নিজের মনগড়া-ভালো মন্দের মানদণ্ড চুর্ণ করে সর্বোতভাবে ও সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তোষ ও অসন্তোষকেই একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করবে। নিজের স্বেচ্ছাচারিতা ত্যাগ করে নিজস্ব মতবাদ, চিন্তাধারা, মনোবাসনা, মানসিক ভাবধারা ও চিন্তাপদ্ধতিকে একমাত্র আল্লাহর দেয়া জ্ঞানের (কুরআনের) আদর্শে ঢেলে গঠন করবে। যেসব কাজ সুসম্পন্ন করার মারফত আল্লাহর আনুগত্য করা হয় না, বরং যাতে আল্লাহর নাফরমানী করা হয় তা সবকিছুই পরিত্যাগ করবে। নিজের হৃদয়-মনের সর্বোচ্চ স্থানে অভিষিক্ত করবে আল্লাহর প্রেম আল্লাহর ভালবাসাকে এবং মনের মণিকোঠা হতে আল্লাহ অপেক্ষা প্রিয়তর ‘ভূত’ যেখানে যেখানে আছে, তা আতিপাতি করে খুঁজে বের করবে এবং তাকে চূর্ণ করবে। নিজের প্রেম-ভালবাসা, নিজের বন্ধুত্ব ও শত্রুতা, নিজের আগ্রহ ও ঘৃণা, নিজের সন্ধি ও যুদ্ধ সবকিছুকেই আ‌ল্লাহর মর্জির অধীন করে দিবে ফলে মন শুধু তাই পেতে চাইবে যা আল্লাহ পছন্দ করেন, তা হতে মন দূরে পলায়ন করতে চেষ্টা করবে। বস্তুত আল্লাহর প্রতি ঈমানের এটাই হচ্ছে নিগূঢ় অর্থ। অতএব যেখানে ঈমানই এই সকল দিক দিয়ে গভীর, ব্যাপক ও সুদৃঢ় এবং পরিপক্ক না হবে, সেখানে তাকওয়া ও ইসলাম যে হতেই পারে না তা সকলেই বুঝতে পারেন। কিন্তু জিজ্ঞেস করি, দাড়ির দৈর্ঘ্য এবং পোশাকের কাটছাট অথবা তসবীহ পাঠ ও তাহাজ্জুদ নামায ইত্যাদি দ্বারা ঐরূপ ঈমানের অভাব কি কখনো পূর্ণ হতে পারে ? এই দৃষ্টিতে ঈমানের অন্যান্য দিকগুলো সম্পর্কেও চিন্তা করে দেখা যেতে পারে। মানুষ যতোক্ষণ পর্যন্ত জীবনের সমগ্র ক্ষেত্রে ও ব্যাপারেই নবীকে একমাত্র নেতা ও পথপ্রদর্শকরূপে মেনে না নিবে এবং তাঁর নেতৃত্ব বিরোধী কিংবা এর প্রভাব মুক্ত যত নেতৃত্বই দুনিয়াতে প্রচলিত হবে, তার সবগুলোকেই যতোক্ষণ পর্যন্ত প্রত্যাহার না করবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত রসূলের প্রতি ঈমান কিছুতেই পূর্ণ হতে পারে না। আল্লাহর কিতাব প্রদত্ত জীবনব্যবস্থা ও নীতিসমূহ ছাড়া অন্য কোনো আদর্শের প্রতিষ্ঠায় সন্তুষ্ট হওয়ার এক বিন্দুভাব বর্তমান থাকলে কিংবা আল্লাহর নাযিলকৃত ব্যবস্থাকে নিজের ও সমগ্র পৃথিবীর জীবন বিধানরূপে প্রতিষ্ঠিত দেখার জন্য মনের ব্যাকুলতার কিছুমাত্র অভাব পরিলক্ষিত হলে আল্লাহর কিতাবের প্রতি ঈমান আনা হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে না, সে ঈমান বাস্তবিকই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। অনুরূপভাবে পরকালের প্রতি ঈমান ও পূর্ণতা লাভ করতে পারে না যতোক্ষণ না মানুষের মন অকুণ্ঠভাবে পরকালকে ইহকালের উপর প্রাধান্য ও গুরুত্ব দান করবে। পরকালীন কল্যাণের মূল্যমানকে ইহকালীন কল্যাণের মূল্যমান অপেক্ষা অধিকতর গ্রহণযোগ্য শেষোক্তটিকে প্রথমটির মোকাবিলায় প্রত্যাখ্যান যোগ্য বলে মনে করবে এবং যতোক্ষণ পর্যন্ত না পরকালে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করার বিশ্বাস তার জীবনের প্রত্যেক পদক্ষেপেই তাকে ভাবতে ও সংযত করে তুলবে। বস্তুত এই মূল ভিত্তিসমূহই যেখানে পূর্ণ হবে না, সুদৃঢ় ও ব্যাপক হবে না, সেখানে ইসলামী জিন্দেগীর বিরাট প্রাসাদ কিসের উপর দাঁড় করানো যেতে পারে, তা কি একবারও চিন্তা করে দেখেছেন? কিন্তু কিছু সংখ্যক লোক যখন এই ভিত্তিসমূহের পূর্ণতা ব্যাপকতা ও পক্কতা সাধন ছাড়াই ইসলামী নৈতিকতার প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে মনে করলো, তখন ইসলামী সমাজে মারাত্মক বিপর্যয় দেখা গেল। দেখা গেল আল্লাহর কিতাবের সম্পূর্ণ বিপরীত রায় দানকারী বিচারপতি; শরীয়াত বিরোধী আইনের ভিত্তিতে ব্যবসায়ী ও উকিল; কাফেরী সমাজব্যবস্থা অনুযায়ী জীবনের কাজ-কর্মসম্পন্নকারী কর্মী; কাফেরী আদর্শের তমদ্দুন ও রাষ্ট্রব্যবস্থানুযায়ী জীবনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টানুবর্তী নেতা ও জনতা সকলের জন্যই তাকওয়া ও ইহসানের উচ্চতম পর্যায়সমূহ হাসিল করা একেবারে সহজ হয়ে গেল। সকলেরই জন্য এর দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেল। আর তাদের জীবনের বাহ্যিক বেশ-ভূষা ধরণ-ধারণ ও আচার-অনুষ্ঠানকে একটি বিশেষ ধরনে গঠণ করা এবং কিছু নফল নামায, রোযা ও জেকের-আজকারের অভ্যাস করাই সেজন্য যথেষ্ট বলে মনে করা হলো।

ইসলাম

ঈমানের উপোরক্ত ভিত্তিসমূহ যখন বাস্তবিকই পরিপূর্ণ ও দৃঢ়রূপে স্থাপিত হয়। তখনই তার উপর ইসলামের দ্বিতীয় অধ্যায় রচনা করার কাজ শুরু হয়। বস্তুত ইসলাম হচ্ছে ঈমানেরই বাস্তব অভিব্যক্তি ঈমানেরই কর্মরূপ। ঈমান ও ইসলামের পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক বীজ ও বৃক্ষের পারস্পরিক সম্পর্কের অনুরূপ। বীজের মধ্যে যা কিছু যেভাবে বর্তমান থাকে, তাই বৃক্ষের রূপে আত্মপ্রকাশ করে। এমনকি, বৃক্ষের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে বীজের মধ্যে কি ছিলো, আর কি ছিলো না, তা অতি সহজেই অনুমান করা যায়। বীজ না হওয়া সত্ত্বেও বৃক্ষের অস্তিত্ব যেমন কেউ ধারণা করতে পারে না, অনুরূপভাবে এটাও ধারণা করা যায় না যে, জমি বন্ধ্যা ও অনুর্বর নয় এমন জমিতে বীজ বপন করলে বৃক্ষ অংকুরিত হবে না। প্রকৃতপক্ষে ঈমান ও ইসলামের অবস্থা ঠিক এরূপ। যেখানে বস্তুতই ঈমানের অস্তিত্ব থাকবে, সেখানে ব্যক্তির বাস্তব জীবনে, কর্মজীবনে, নৈতিকতায়, গতিবিধিতে, রুচি ও মানসিক ঝোঁক-প্রবণতায় স্বভাব-প্রকৃতিতে, দুঃখ-কষ্ট ও পরিশ্রম স্বীকারের দিকে ও পথে, সময়, শক্তি এবং যোগ্যতার বিনিয়োগ জীবনের প্রতিটি দিকে ও বিভাগে, প্রতিটি খুঁটিনাটি ব্যাপারেই এর বাস্তব অভিব্যক্তি ও বহিঃপ্রকাশ হবেই হবে। উল্লেখিত দিক সমূহের মধ্যে কোনো একটি দিকেও যদি ইসলামের পরিবর্তে ইসলাম বিরোধী কার্যক্রম ও ভাবধারা প্রকাশ হতে দেখা যায়, তবে নিঃসন্দেহে মনে করতে হবে যে, সেই দিকটি ঈমান শূন্য অথবা তা থাকলেও একেবারে নিঃসার, নিস্তেজ ও অচেতন হয়ে রয়েছে যা থাকা বা না থাকা উভয়ই সম্পূর্ণ সমান। আর বাস্তব কর্মজীবন যদি সম্পূর্ণরূপে অমুসলিমদের ধারা-পদ্ধতিতে যাপিত হয়, তবে তার মনে ঈমানের অস্তিত্ব নেই। কিংবা থাকলেও তার ক্ষেত্র অত্যন্ত অনুর্বর ও উৎপাদন শক্তিহীন হওয়ার কারণে ঈমানের বীজই তথায় অংকুরিত হতে পারেনি বলে মনে করতে হবে। যা হোক, আমি কুরআন ও হাদিস যতোদুর বুঝতে পেরেছি তার উপরে নির্ভর করে বলতে পারি যে, মনের মধ্যে ঈমান বর্তমান থাকা এবং কর্মজীবনে ইসলামের বাস্তব প্রকাশ না হওয়া একেবারেই অসম্ভব ও অস্বাভাবিক।

(এই সময় একজন শ্রোতা দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন যে, ঈমান ও আমলকে কি আপনি একই জিনিস বলে মনে করেন? অথবা এই দু’টির মধ্যে আপনার দৃষ্টিতে কোনো পাথর্ক্য আছে? এই প্রশ্নের উত্তরে মাওলানা মওদুদী বলেন)

এ সম্পর্কে ফিকাহ শাস্তকার ও কালাম শাস্তবিদদের উত্থাপিত বির্তক অল্প সময়ের জন্য মন হতে দূরে রেখে সরাসরিভাবে কুরআন মজীদ হতে এই প্রশ্নের উত্তর পেতে চেষ্টা করুন। কুরআন হতে সুস্পষ্টরূপে জানতে পারা যায় যে, বিশ্বাসগত ঈমান ও বাস্তব কর্মজীবনের ইসলাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আল্লাহ তায়ালা কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে ঈমান ও সৎকাজের (আমলে সালেহ) একই সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সকল ভালো ভালো প্রতিশ্রুতি কেবল সেই বান্দাদের জন্য যারা বিশ্বাসের দিক দিয়ে ঈমানদার এবং বাস্তব কর্মের দিক দিয়ে পূর্ণরূপে ‘মুসলিম’ পক্ষান্তরে আল্লাহ তায়ালা যেসব লোককে ‘মুনাফিক, বলে নির্দিষ্টি করেছেন তাদের বাস্তব কর্মের দোষ-ত্রুটির ভিত্তিতেই তাদের ঈমানের অন্তসারশূন্যতা প্রমাণ করেছেন এবং বাস্তব কর্মগত ইসলামকেই প্রকৃত ঈমানের লক্ষণ বলে নির্দিষ্ট করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, আইনত কাউকে ‘কাফের’ ঘোষণা করা এবং মুসলিম জাতির সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যাপার সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং সে ব্যাপারে অতিশয় সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য। কিন্তু পৃথিবীতে শাস্ত্রীয় আইন প্রযুক্ত হতে পারে যে ঈমান ও ইসলামের উপর, এখানে আমি সেই ঈমান ও ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা করছি না। বরং যে ঈমান আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য এবং পরকালীন ফলাফল যার ভিত্তিতেই মীমাংসিত হবে, এখানে আমি কেবল সেই ঈমান সম্পর্কেই বলছি। আইনগত দৃষ্টিভংগী পরিত্যাগ করে প্রকৃত ব্যাপার ও নিগূঢ় সত্যটি যদি আপনি জানতে চেষ্টা করেন, তবে নিশ্চিতরূপেই দেখতে পাবেন যে, কার্যত যেখানে সামনে আত্মসমর্পণ, আত্মোৎসর্গ ও পরিপূর্ণরূপে আত্মাহুতির অভাব রয়েছে, যেখানে নিজ মনের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়নি- পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে, যেখানে আল্লাহর আনুগত্য করে চলার সংগে সংগে কার্যত ‘অন্য শক্তির’ ও আনুগত্য করা হচ্ছে, যেখানে আল্লাহর দীন ইসলাম কায়েম করার উদ্দেশ্যে চেষ্টা সাধনার পরিবর্তে অন্যান্য কাজের দিকেই মনের ঝোঁক ও আন্তরিক নিষ্ঠা রয়েছে, যেখানে আল্লাহর নির্দিষ্ট পথে চেষ্টা-সাধনা এবং দুঃখ-কষ্ট স্বীকার করা হচ্ছে না, বরং এ সবকিছুই হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে- ভিন্ন উদ্দেশ্যে, সেখানে যে ঈমানের মৌলিক ত্রুটি রয়েছে তাতে কোনোই সন্দেহ থাকতে পারে না। আর অসম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ ঈমানের উপর তাকওয়া ও ইহসানের অধ্যায় যে রচিত হতে পারে না তা বলাই বাহুল্য। বাহ্যিক বেশ-ভুষার তাকওয়া কিংবা ইহসানের কৃত্রিম অনুকরণের চেষ্টা করলেও এর প্রকৃত ভাবধারা লাভ করা সম্ভব নয়। বাহ্যিক বেশ-ভূষা ও কৃত্রিম আচার-অনুষ্ঠান সাধারণত অন্তসারশূন্য হলে এবং অন্তর্নিহিত ভাবধারার সাথে বাহ্যিক বেশ-ভুষার সামঞ্জস্য না হলে তা একটি সুশ্রী ও সুঠাম মৃতদেহের অনুরূপ হয়ে থাকে। এর বাহ্যিক আকার-আকৃতি ও বেশ-ভূষা যতোই সুন্দর ও উত্তম হোক না কেন, তা প্রাণশূন্য বলে জনগণ তা দেখে প্রতারিত হতে পারে মাত্র। এই বাহ্যিক বেশ ভূষা ও সুঠাম দেহের প্রতি কোনো কাজের আশা করে থাকলে বাস্তব ঘটনাই তার ব্যর্থতা প্রমাণ করবে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা হতে নিঃসন্দেহে জানতে পারা যাবে যে, একটি কুৎসিত জীবিত মানুষ একটি সুশ্রী লাশ অপেক্ষা অধিক কার্যকরী হয়ে থাকে। প্রকাশ্য বেশ-ভূষার দ্বারা নিজেকে সান্ত্বনা দেয়া ও আত্মপ্রতারণা করা সহজ বা সম্ভব, কিন্তু বাস্তব পরীক্ষায় এর কোনো মূল্যই প্রমাণিত হয় না আল্লাহর নিকট এর একবিন্দু মূল্য হওয়া তো দুরের কথা। অতএব বাহ্যিক নয়, প্রকৃত ও আন্তরিক নিষ্ঠাপূর্ণ তাকওয়া ও ইহসান লাভ করতে হলে আর এটা ছাড়া দুনিয়ার বুকে আল্লাহর দীনের প্রতিষ্ঠা এবং পরকালীন কল্যাণ লাভ মাত্রই সম্ভব নয় আমার একথা মনের পৃষ্ঠায় বদ্ধমূল করে নিন যে, উপরের এ দু’টি পর্যায় কিছুতেই গড়ে উঠতে পারে না, যতোক্ষণ না ঈমানের ভিত্তিমূল সুদৃঢ় হবে। আর যতোক্ষণ পর্যন্ত কর্মগত ইসলাম কার্যত আল্লাহর আনুগত্য ও অনুসরণের ভিতর দিয়ে নিঃসন্দেহে বাস্তব প্রমাণ পাওয়া না যাবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের ভিত্তি মজবুত হতে পারে না।

তাকওয়া

তাকওয়া সম্পর্কে আলোচনা শুরু করার পূর্বে ‘তাকওয়া’ কাকে বলে তা জেনে নেয়া আবশ্যক। তাকওয়া কোনো বাহ্যিক ধরণ-ধারণ এবং বিশেষ কোনো সামাজিক আচার অনুষ্ঠানের নাম নয়। তাকওয়া মূলত মানব মনের সেই অবস্থাকেই বলা হয় যা আল্লাহর গভীর ভীতি ও প্রবল দায়িত্বানুভূতির দরুন সৃষ্টি হয় এবং জীবনের প্রত্যেকটি দিকে স্বতস্ফূর্তভাবে আত্মপ্রকাশ করে। মানুষের মনে আল্লাহর ভয় হবে, নিজে আল্লাহর দাসানুদাস এই চেতনা জাগ্রত থাকবে, আল্লাহর সামনে নিজের দায়িত্ব ও জবাবদিহি করার কথা স্মরণ থাকবে এবং এই একটি পরীক্ষাগার, আল্লাহ জীবনের একটি নির্দিষ্ট আয়ুদান করে এখানে পাঠিয়েছেন, এই খেয়াল তীব্রভাবে বর্তমান থাকবে। পরকালে ভবিষ্যতের ফায়সালা এই দৃষ্টিতে হবে যে, এই নির্দিষ্ট অবসরকালের মধ্যে এই পরীক্ষাগারে নিজের শক্তি, সামর্থ্য ও যোগ্যতা কিভাবে প্রয়োগ করেছে, আল্লাহর ইচ্ছানুক্রমে যেসব দ্রব্যসামগ্রী লাভ করতে পেরেছে, তার ব্যবহার কিভাবে করেছে এবং আল্লাহর নিজস্ব বিধান অনুযায়ী জীবনকে বিভিন্ন দিক দিয়ে যেসব মানুষের সাথে বিজড়িত করেছে, তাদের সাথে কিরূপ কাজ-কর্ম ও লেন-দেন করা হয়েছে একথাটিও মনের মধ্যে জাগরুক থাকবে।

বস্তুত এরূপ অনুভূতি ও চেতনা যার মধ্যে তীব্রভাবে বর্তমান থাকবে, তার হৃদয় মন জাগ্রত হবে, তার ইসলামী চেতনা তেজস্বী হবে, আল্লাহর মর্জির বিপরীত প্রত্যেকটি বস্তুই তার মনে খটকার সৃষ্টি করবে, আল্লাহর মনোনীত প্রত্যেকটি জিনিসই তার রুচিতে অসহ্য হয়ে উঠবে, তখন সে নিজেই নিজের যাচাই করবে। তার কোন্‌ ধরনের ঝোঁক ও ভাবধারা লালিত-পালিত হচ্ছে নিজেই তার জরীপ করবে। সে কোন্‌ সব কাজ-কর্মে নিজের সময় ও শক্তি ব্যয় করছে তার হিসেব সে নিজেই করতে শুরু করবে। তখন সুস্পষ্টরূপে নিষিদ্ধ কোনো কাজ করা দূরের কথা সংশয়পূর্ণ কোনো কাজেও লিপ্ত হতে সে নিজে ইতস্তত করবে। তার অন্তর্নিহিত কর্তব্যজ্ঞানই তাকে আল্লাহর সকল নির্দেশ পূর্ণ আনুগত্যের সাথে পালন করতে বাধ্য করবে। যেখানেই আল্লাহর নির্দিষ্ট সীমালংঘন হওয়ার আশংকা হবে, সেখানেই তার অন্তর্নিহিত আল্লাহভীতি তার পদযুগলে প্রবল কম্পন সৃষ্টি করবে চলৎশক্তি রহিত করে দিবে। আল্লাহর হক ও মানুষের হক রক্ষা করা স্বতস্ফূর্ত রূপেই তার স্বভাবে পরিণত হবে। কোথাও সত্যের বিপরীত কোনো কথা বা কাজ তার দ্বারা না হয়ে পড়ে সেই ভয়ে তার মন সতত কম্পমান থাকবে। এরূপ অবস্থা বিশেষ কোনো ধরণে কিংবা বিশেষ কোনো পরিধির মধ্যে পরিলক্ষিত হবে না, ব্যক্তির সমগ্র চিন্তা-পদ্ধতি এবং তার সমগ্র জীবনের কর্মধারাই এর বাস্তব অভিব্যক্তি হবে। এর অনিবার্য প্রভাবে এমন এক সুসংবদ্ধ সহজ, ঋজু এবং একই ভাবধারা বিশিষ্ট ও পরম সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রকৃতি গঠিত হবে, যাতে সকল দিক দিয়েই একই প্রকারের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা ফুটে উঠবে। পক্ষান্তরে কেবল বাহ্যিক আকার-আকৃতি ও কয়েকটি নির্দিষ্ট পথের অনুসরণ এবং নিজেকে কৃত্রিমভাবে কোনো পরিমাপযোগ্য ছাঁচে ঢেলে নেয়াকেই যেখানে তাকওয়া বলে ধরে নেয়া হয়েছে, সেখানে শিখিয়ে দেয়া কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ ধরণ ও পদ্ধতিতে ‘তাকওয়া’ পালন হতে দেখা যাবে, কিন্তু সেই সঙ্গে জীবনের অন্যান্য দিকে ও বিভাগে এমনসব চরিত্র, চিন্তা-পদ্ধতি ও কর্মনীতি পরিলক্ষিত হবে, যা ‘তাকওয়া’ তো দূরের কথা ঈমানের প্রাথমিক স্তরের সাথেও এর কোনো সামঞ্জস্য হবে না। এটাকেই হযরত ঈসা (আ) উদাহরণের ভাষায় বলেছেনঃ “এক দিকে মাছি বলে বাহির কর আর অন্যদিকে বড় বড় উট অবলীলাক্রমে গলধকরণ কর।”

প্রকৃত তাকওয়া এবং কৃত্রিম তাকওয়ার পারস্পরিক পাথর্ক্য অন্য একভাবেও বুঝতে পারা যায়। যে ব্যক্তির মধ্যে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার একটি তীব্র ও জাগ্রত রুচি অনুভূতি বর্তমান রয়েছে সে নিজেই অপবিত্রতা ও পংকিলতাকে ঘৃণা করবে তা যে আকারেই হোক না কেন এবং পবিত্রতাকে পূর্ণরূপে ও স্থায়ীভাবে গ্রহণ করবে। তার বাহ্যিক অনুষ্ঠান যথাযথভাবে প্রতিপালিত না হলেও কোনো আপত্তি থাকবে না। অপর ব্যক্তির আচরণ এর বিপরীত হবে। কারণ, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার কোনো স্বতস্ফূর্ত চেতনা তার মধ্যে নেই বরং ময়লা ও অপবিত্রতার একটি তালিকা কোথা হতে লিখে নিয়ে সবসময়ই সঙ্গে রেখে চলে, ফলে এই ব্যক্তি তার তালিকায় উল্লেখিত ময়লাগুলো হতে নিশ্চয় আত্মরক্ষা করবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও উহা অপেক্ষা অধিক জঘন্য ও ঘৃণিত বহু প্রকার পংকিলতার মধ্যে সে অজ্ঞাতসারেই লিপ্ত হয়ে পড়বে, তা নিঃসন্দেহে। কারণ, তালিকায় অনুল্লেখিত পংকিলতা যে কোনোরূপ পংকিল বা ঘৃণিত হতে পারে এটা সে মাত্রই বুঝতে পারে না। এই পার্থক্য কেবল নীতিগত ব্যাপারেই নয়, চারদিকে যাদের তাকওয়ার একেবারে ধুম পড়ে গেছে তাদের জীবনে এই পার্থক্য সুষ্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। তারা একদিকে শরীয়াতে খুঁটিনাটি বিষয়ে খুবই কড়াকড়ি করে থাকে, এমনকি দাড়ির দৈর্ঘ্য একটি বিষেশ পরিমাপ হতে একটু কম হলেই তাকে জাহান্নামী হওয়ার ‘সুসংবাদ’ শুনিয়ে দিতে সঙ্কোচবোধ করে না এবং ফিকাহর শাস্ত্রীয় মত হতে কোথাও সমাজ বিচ্যুতিকেও তারা দীন ইসলামের সীমালংঘন করার সমান মনে করে। কিন্তু অন্যদিকে ইসলামের মূলনীতি ও বুনিয়াদী আদর্শকে তারা চরমভাবে উপেক্ষা করে চলে। গোটা জীবনের ভিত্তি তারা স্থাপিত করেছে ‘রোখছত’ অনুমতি ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদী নীতির উপর। আল্লাহর দীন ইসলাম কায়েম করার জন্য চেষ্টা-সাধনা ও সংগ্রাম করার দায়িত্ব এড়ানোর জন্য তারা বহু সুযোগের পথ আবিষ্কার করে নিয়েছে। কাফেরী রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনে তারা ইসলামী জিন্দেগী যাপনের প্রস্তুতি করার জন্যই সকল চেষ্টা ও সাধনা নিযুক্ত করে রেখেছে। শুধু তা ই নয়, তাদেরই ভুল নেতৃত্ব মুসলমানদেরকে একথা বুঝিয়েছে যে, এক ইসলাম বিরোধী সমাজব্যবস্থার অধীন থেকে বরং এর ‘খিদমত’ করেও সীমাবদ্ধ গণ্ডীর মধ্যে ধর্মীয় জীবনযাপন করা যায় এবং তাতেই দীন ইসলামের যাবতীয় নির্দেশ প্রতিপালিত হয়ে যায় অতপর ইসলামের জন্য তাদেরকে আর কোনো চেষ্টা-সাধনা বা কষ্ট স্বীকার আদৌ করতে হবে না। এটা অপেক্ষাও অধিকতর দুঃখের কথা এই যে, তাদের সামনে দীন ইসলামের মূল দাবি যেমন পেশ করা হয় এবং দীন (ইসলামী নেজাম) কায়েম করার চেষ্টা সাধনা ও আন্দোলনের দিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়, তখন তারা এর প্রতি শুধু চরম উপেক্ষাই প্রদর্শন করে না, এটা হতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এবং অন্যান্য মুসলমানকেও তা হতে বিরত রাখার জন্যে শত রকমের কৌশলের আশ্রয় নেয়। আর এতোসব সত্ত্বেও তাদের ‘তাকওয়া’ ক্ষুন্ন হয় না; আর ধর্মীয় মনোবৃত্তি সম্পন্ন লোকদের মনে তাদের ‘তাকওয়ার’ অন্তসারশূন্যতা সম্পর্কে সন্দেহ মাত্র জাগ্রত হয় না। এভাবেই প্রকৃত ও নিষ্ঠাপূর্ণ ‘তাকওয়া’ এবং কৃত্রিম ও অন্তসারশূন্য ‘তাকওয়ার’ পারস্পরিক পাথর্ক্য বিভিন্নরূপে সুস্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। কিন্তু তা অনুভব করার জন্য ‘তাকওয়ার’ প্রকৃত ধারণা মনের মধ্যে পূর্বেই বদ্ধমুল হওয়া অপরিহার্য।

কিন্তু পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাচল, উঠাবসা ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের বাহিক্যরূপ যা হাদিস হতে প্রমাণিত হয়েছে তাকে আমি হীন ও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করি, আমার পূর্বোক্ত আলোচনা হতে সেরূপ ধারণা করা মারাত্মক ভুল হবে সন্দেহ নেই। এরূপ কথা আমি কল্পনাও করতে পারি না। বস্তুত আমি শুধু একথাই বুঝাতে চাই যে, প্রকৃত তাকওয়াই হচ্ছে আসল গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, তার বাহ্যিক প্রকাশ মূখ্য নয়, গৌণ। আর প্রকৃত ‘তাকওয়ার’ মহিমা দীপ্তি যার মধ্যে স্বতস্ফূর্ত হয়ে উঠবে, তার সমগ্র জীবনই পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যের সাথে খাঁটি ‘ইসলামী’ জীবন-রূপেই গড়ে উঠবে এবং তার চিন্তাধারায়, মতবাদে, তার হৃদয়াবেগ ও মনের ঝোঁক প্রবণতায়, তার স্বভাবগত রুচি তার সময় বন্টন ও শক্তিনিচয়ের ব্যয়-ব্যবহার তার চেষ্টা-সাধনার পথে পন্থায়, তার জীবনধারায় ও সমাজ পদ্ধতিতে, তার আয়-ব্যয়ের ব্যাপারে, তার সমগ্র পার্থিব ও বৈষয়িক জীবনের প্রত্যেকটি দিকে ও বিভাগে পূর্ণ ব্যাপকতা ও সামগ্রিকতার সাথে ইসলাম রূপায়িত হতে থাকবে। কিন্তু আসল তাকওয়া অপেক্ষা তার বাহ্যিক বেশ- ভূষাকেই যদি প্রাধান্য দেয়া হয় তার উপরই যদি অযথা গুরুত্ব আরোপ করা হয় এবং প্রকৃত তাকওয়ার বীজ বপন ও তার পরিবর্ধনের জন্য যত্ন না নিয়ে যদি কৃত্রিম উপায়ে কয়েকটি বাহ্যিক হুকুম-আহকাম পালন করানো হয়, তবে বর্ণিত রূপেই যে এর পরিণাম ফল প্রকাশিত হবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। প্রথমোক্ত কাজ অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ, সেই জন্য অসীম ধৈর্য্যের আবশ্যক; ক্রমবিকাশের নীতি অনুসারেই তা বিকশিত হয়ে এবং দীর্ঘ সময়ের সাধনার পরই তা সুশোভিত হয়ে থাকে ঠিক যেমন একটি বীজ হতে বৃক্ষ সৃষ্টি এবং তাতে ফুল এবং ফল ধারণে স্বভাবতই বহু সময়ের আবশ্যক হয়। এ কারণেই স্থুল ও অস্থির স্বভাবের লোক ঐরূপ তাকওয়া লাভ করার জন্য চেষ্টা করতে সাধারণত প্রস্তুত হয় না। দ্বিতীয় প্রকার তাকওয়া, তাকওয়ার বাহ্যিক বেশ ভুষা, সহজলভ্য, অল্প সময় সাপেক্ষ। যেমন একটি কাষ্ঠখণ্ডের পত্র ও ফুল ফল বেঁধে “ফল ফুলে শোভিত একটি বৃক্ষ” দাঁড় করা হয়ত বা সহজ; কিন্তু মূলত তা কৃত্রিম, প্রতারণামূলক এবং ক্ষণস্থায়ী। এজন্যই আজ শেষোক্ত প্রকারের তাকওয়াই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। কিন্তু একটি স্বাভাবিক বৃক্ষ হতে যা কিছু লাভ করার আশা করা যায়; একটি কৃত্রিম বৃক্ষ হতে তা কিছুতেই সম্ভব নয়, এটা সর্বজনবিদিত সত্য।

ইহসান

এখন ‘ইহসান’ সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই। পূর্বেই বলা হয়েছে, এটা ইসলামী জীবন প্রাসাদের সর্বোচ্চ মঞ্জিল সর্বোচ্চ পর্যায়। মুলতঃ ‘ইহসান’ বলা হয়ঃ আল্লাহ তাঁর রসূল এবং তাঁর ইসলামের সাথে মনের এমন গভীরতম ভালবাসা, দুশ্‌ছেদ্যবন্ধন ও আত্মহারা প্রেম পাগল ভাবধারাকে, যা একজন মুসলমানকে ‘ফানা ফিল ইসলাম’ ‘ইসলামের জন্য আত্মোৎসর্গীকৃত প্রাণ’ করে দিবে। তাকওয়ার মূল কথা হচ্ছে আল্লাহর ভয়, যা আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ হতে দূরে সরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। আর ইহসানের মূলকথা হচ্ছে আল্লাহর প্রেম আল্লাহর ভালবাসা। এটা মানুষকে আল্লাহর সন্তোষ লাভ করার জন্য সক্রিয় করে তোলে। এ দু’টি জিনিসের পারস্পরিক পাথর্ক্য একটি উদাহরণ হতে বুঝা যায়। সরকারি চাকুরীজীবিদের মধ্যে এমন কিছু সংখ্যক লোক থাকে, যারা নিজ নিজ নির্দিষ্ট দায়িত্ব, কর্তব্য অনুভূতি ও আগ্রহ উৎসাহের সাথে যথাযথভাবে আঞ্জাম দেয়। সমগ্র নিয়ম-কানুন ও শৃঙ্খলা রক্ষা করে তারা চলে এবং সরকারের দৃষ্টিতে আপত্তিকর কোনো কাজই তারা কখনো করে না। এ ছাড়া আর এক ধরনের লোক থাকে, যারা ঐকান্তিক নিষ্ঠা, আন্তরিক ব্যগ্রতা ও তিতিক্ষা এবং আত্মোৎসর্গপূর্ণ ভাবধারার সাথেই সরকারের কল্যাণ কামনা করে। তাদের উপর যেসব কাজ ও দায়িত্ব অর্পিত হয়, তারা কেবল তাই সম্পন্ন করে না, যেসব কাজে রাষ্ট্রের কল্যাণ ও উন্নতি হতে পারে আন্তরিকতার সাথে সেইসব কাজও তারা আঞ্জাম দেবার জন্য যত্নবান হয় এবং এজন্য তারা আসল কর্তব্য ও দায়িত্ব অপেক্ষা অনেক বেশি কাজ করে থাকে। রাষ্ট্রের ক্ষতিকর কোনো ঘটনা ঘটে বসলেই তারা নিজেদের জানমাল ও সন্তান সবকিছুই উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুত হয়। কোথাও আইন-শৃঙ্খলা লংঘিত হতে দেখলে তাদের মনে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। কোথাও রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও বিদ্রোহ ঘোষণার লক্ষণ দৃষ্টিগোচর হলে তা অস্থির হয়ে পড়ে এবং তা দমন করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে। নিজে সচেতনভাবে রাষ্ট্রের ক্ষতি করা তো দূরের কথা তার স্বার্থে সামান্য আঘাত লাগতে দেয়া তাদের পক্ষে সহ্যাতীত হয়ে পড়ে এবং সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি দূর করার ব্যাপারে সাধ্যানুসারে চেষ্টার বিন্দুমাত্র ত্রুটি করে না। পৃথিবীর সর্বত্র একমাত্র তাদের রাষ্ট্রের জয়জয়কার হোক এবং সর্বত্রই এরই বিজয় পতাকা উড্ডীন হয়ে পত পত করতে থাকুক এটাই হয় এই শ্রেণীর সরকারি কর্মচারীদের মনের বাসনা। এই দু’য়ের মধ্যে প্রথমোক্ত কর্মচারীগণ হয় রাষ্ট্রের ‘মুত্তাকী’ আর শেষোক্ত কর্মচারীগণ হয় ‘মুহসীন’ উন্নতি এবং উচ্চপদ মুত্তাকীরাও লাভ করে থাকে, বরং যোগ্যতম কর্মচারীদের তালিকায় তাদেরই নাম বিশেষভাবে লিখিত থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ‘মুহসিনদের’ জন্য সরকারের নিকট যে সম্মান ও মযার্দা হয়ে থাকে, তাতে অন্য কারোই অংশ থাকতে পারে না। ইসলামে ‘মুত্তাকী’ ও ‘মুহসীনদের’ পারস্পরিক পার্থক্য উক্ত উদাহরণ হতে সুস্পষ্টরূপে বুঝতে পারা যায়। ইসলামে মুত্তাকীদেরও যথেষ্ট সম্মান রয়েছে। তারাও শ্রদ্ধাভাজন সন্দেহ নেই কিন্তু ইসলামের আসল শক্তি হচ্ছে মুহসিনগণ। আর পৃথিবীতে ইসলামের মূল উদ্দেশ্য একমাত্র ‘মুহসিনদের’ দ্বারাই সুস্পন্ন হতে পারে।

ইহসান এর নিগূঢ় তত্ত্ব জেনে নেয়ার পর প্রত্যেক পাঠকই অনুমান করতে পারেন যে, যারা আল্লাহর দীন ইসলামকে কুফরের অধীন কুফর কর্তৃক প্রভাবান্বিত দেখতে পায়, যাদের সামনে আল্লাহ নির্ধারিত সীমালংঘিত পর্যুদস্তই শুধু নয় নিঃশেষে ধ্বংস করার ব্যবস্থা করা হয়, আল্লাহর বিধান কেবল কার্যতই নয় সর্বতোভাবেই বাতিল করে দেয়া হয়, আল্লাহর পৃথিবীতে আল্লাহর পরিবর্তে আল্লাহদ্রোহীদের ‘রাজত্ব’ ও প্রভাব স্থাপিত হয়, কাফেরী ব্যবস্থার আধিপত্যে কেবল জনসমাজেই নৈতিক ও তামাদ্দুনিক বিপর্যয় উদ্‌ভুত হয় না, স্বয়ং মুসলিম জাতিও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নৈতিক ও বাস্তব (কর্মগত) ভুলভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, সেখানে এসব প্রত্যক্ষ করার পরও যাদের মনে একটু ব্যাথা দুঃখ বা চিন্তা জেগে ওঠে না, এই অবস্থার পরিবর্তন সাধনের জন্য উদ্যম ও প্রয়োজনীয়তাবোধই যাদের মধ্যে জাগ্রত হয় না, বরং যারা নিজেদের মনকে এবং মুসলমান জনসাধারণকে ইসলাম বিরোধী জীবনব্যবস্থার প্রাধান্য ও প্রতিষ্ঠাকে নীতিগত ও কার্যত বরদাশত করার জন্য সান্ত্বনা দেয়; এই শ্রেণীর লোকদেরকে ‘মুহসিন’ বলে কিরূপে মনে করা যেতে পারে, তা বুঝতে পারি না। আরো আশ্চার্যের বিষয় এই মারাত্মক অপরাধ ও গোনাহ করা সত্ত্বেও কেবল চাশত, এশরাক ও তাহাজ্জুদ প্রভৃতি নফল নামাজ পড়ার দরুন, জেকের-আজকার, মোরাকাবা-মুশাহিদা, হাদিস-কুরআনের অধ্যাপনা, খুঁটিনাটি সুন্নাত পালনের দ্বারা মানুষ ইহসানের উচ্চতর পর্যায়ে পৌছতে পারে বলে মনে করা হয়।

سرداد نداد دست در دست يزيد

“মস্তক দিয়েছি, কিন্তু ইয়াজীদের হাতে হাত মিলাতে প্রস্তুত হইনি।”

এরূপ বিপ্লবী ও ঐকান্তিক নিষ্ঠা এবং আত্মোৎসর্গীভাব কোনো লোকের মধ্যেই ওঠেনি। এজন্যই بازى اكرجه بانه سكا سرتو كهوسكا “জয়লাভ হয় তো করিনি, নিজের মস্তক তো উৎসর্গ করতে পেরেছি।” বলে নিজেকে সত্যিকারভাবে একমাত্র আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করতে পারিনি।

দুনিয়ার বৈষয়িক রাষ্ট্র এবং জাতিসমূহের মধ্যেও নিষ্ঠাবান, অনুগত এবং অবাধ্য কর্মচারীদের মধ্যে বাস্তবক্ষেত্রে যথেষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। দেশে বিদ্রোহ ঘোষিত হলে কিংবা দেশের কোনো অংশের উপর শত্রুপক্ষের আধিপত্য স্থাপিত হলে তখন যারা বিদ্রোহ ও শত্রুদের এই অন্যায় পদক্ষেপকে সংগত বলে মনে করে, অথবা এতে সন্তোষ প্রকাশ করে এবং তাদের সাথে বিজিতের ন্যায় আচরণ করতে শুরু করে, কিংবা তাদের প্রভুত্বাধীন এমন এক সমাজব্যবস্থা গঠন করে যার কর্তৃত্বের সকল চাবিকাঠি শত্রুদের নিকট থাকবে, আর কিছু ছোটখাটো ব্যাপারের আবিষ্কার ও ক্ষমতা তারা নিজেরা লাভ করবে কোনো রাষ্ট্র কিংবা জাতিই এই শ্রেণীর লোকদেরকে অনুগত বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য নাগরিকরূপে গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয় না। জাতীয় পোশাক ও বাহ্যিক চালচলন কঠোরভাবে অনুসরণ করে চললেও এবং খুঁটিনাটি ব্যাপারে জাতীয় আইন দৃঢ়তার সাথে পালন করে চললেও এর কোনো মূল্যই দেয়া হয় না, বর্তমান যুগের কতো ঘটনাকেই এর উজ্জল উদাহরণ হিসেবে পেশ করা যেতে পারে।

বিগত মহাযুদ্ধের প্রথম অধ্যায়ে জার্মানী বহু দেশ দখল করেছিল এবং সেই বিজিত দেশসমূহের অধিবাসীদের মধ্যে অনেক লোকই তাদের সাথে সহযোগিতা করেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে এই দেশগুলো যখন জার্মান প্রভুত্ব হতে মুক্তিলাভ করলো তখন জার্মান প্রভুত্বের সাথে সহযোগিতাকারীদের প্রতি নির্মম ব্যবহার করা হয়েছিল। এসব রাষ্ট্র ও জাতির নিকট নিষ্ঠাপূর্ণ আনুগত্য যাচাই করার একটি মাত্র মাপকাঠি রয়েছে। শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ শত্রুপক্ষের প্রভুত্ব বিলুপ্তির জন্য কে কতোখানি কাজ করেছে এবং যার প্রভুত্ব সে স্বীকার করে বলে দাবী করে, তাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কে কতোখানি চেষ্টা ও সাধনা করেছে নিষ্ঠাপূর্ণ আনুগত্য যাচাই করার এটাই হচ্ছে একমাত্র মানদণ্ড। দুনিয়ার রাষ্ট্রগুলোরই যখন এরূপ অবস্থা সকল প্রকার আনুগত্যকে এই তীব্র শাণিত মানদণ্ডে যাচাই করে নেয়াই যখন এদের রীতি দুনিয়ার কমবুদ্ধির মানুষের ন্যায় নিজের নিষ্ঠাবান আনুগত্য ও অবাধ্যতাকে পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহর নিকট কি কোনো মানদণ্ড নেই? আল্লাহ তায়ালা কি শুধু শ্মশ্রুর দৈর্ঘ, লংগী-পায়জামার উর্ধস্থতা, তসবীহ পাঠ এবং দরূদ, অজীফা, নফল এবং মোরাকাবা প্রভৃতি কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজ-কর্ম দেখে প্রতারিত হবেন, আর নিজেরা খাঁটি ও নিষ্ঠাবান বান্দাহ বলে মনে করবেন? আল্লাহ সম্পর্কে এতো হীন ধারণা করা কি কোনরূপেই সমীচীন হতে পারে?

ভুল ধারণার অপনোদন

উপসংহারের কয়েকটি জরুরি কথা বলে আমার বক্তব্য শেষ করছি। দীর্ঘকালের ভুল ধারণার কারণে সাধারণ মুসলমানের মনে খুঁটিনাটি কাজ ও বাহ্যিক অনুষ্ঠানসমূহের গুরুত্ববোধ তীব্র হয়ে রয়েছে। দীন ইসলামের মূলনীতি ও সামগ্রিক তথ্য এবং দীনদারী ও ইসলামী নৈতিকতার নিগূঢ় ভাবধারার দিকে অসংখ্যবার তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও তারা এর গুরুত্ব অনুভব করতে পারে না। লোকদের মন-মস্তিষ্কে ঘুরে-ফিরে সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজ ও সামান্য সামান্য বাহ্যানুষ্ঠানের গুরুত্বই তীব্র হয়ে ওঠে। তাদের দৃষ্টি এতো ক্ষুদ্র ও গুরুত্বহীন কাজগুলোর অন্তরালে গভীর সত্য পর্যন্ত পৌছায় না, বস্তুত ছোট ছোট ও ক্ষুদ্র কাজগুলোকেই দীন ইসলামের মূলভিত্তি বলে গণ্য করা হয়েছে। জামায়াতের বহু সদস্য এবং সমর্থকদের উপরও এই ভুল ধারণার মারাত্মক প্রভাব থাকতে পারে। দীন ইসলামের মূল তত্ত্ব ও প্রকৃত নিগূঢ় সত্য কি, তাতে সর্বাপেক্ষা অধিক গুরুত্ব কোন্‌ জিনিসের এবং কোন্‌টি মূখ্য আর কোন্‌টি গৌণ এসব কথা সঠিকরূপে বুঝাবার জন্য আমি পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করেছি। কিন্তু এতদসত্ত্বেও অনেকের মধ্যে সেই বাহ্যিক অনুষ্ঠান প্রিয়তা এবং মূলনীতি অপেক্ষা খুঁটিনাটি ব্যাপারে গুরুত্বদানের সংক্রামক ব্যাধি তাদেরকে জর্জরিত করে দিয়েছে। জামায়াতের লোকদের দাড়ির দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করার জন্য, পায়ের গিটের উপরে উঠিয়ে পায়জামা পরার জন্য এবং এই ধরনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে চাপ দেয়ার জন্য আমাকে বারবার বলা হচ্ছে। কোনো কোনো লোক আবার ‘জামায়াতে ইসলামীতে’ ‘মারেফাতের’ অভাব অনুভব করছেন। কিন্তু মূলত মারেফাত কি জিনিস তারা নিজেরা হয়তো তা জানেন না। এজন্যই তারা আসল লক্ষ্য ও কর্মনীতি জামায়াতে ইসলামীরই ঠিক রেখে কোনো খানকাহ হতে আত্মশুদ্ধি সাধন ও আধ্যাত্মিক দীক্ষাদানের কার্যসূচী গ্রহণ করার প্রস্তাবও করছেন। এ দৃষ্টে মনে হয়, দীন ইসলামের প্রকৃত ধারণা এদের মনে আদৌ বর্তমান নেই।

একটু পূর্বেই আমি ঈমান, ইসলাম, তাকওয়া ও ইহসানের ব্যাখ্যা করেছি। এই ব্যাপারে কুরআন-হাদিসের বিপরীত কোনো কথা যদি আমি বলে থাকি, তবে অকুণ্ঠভাবে এর প্রতি অংগুলি নির্দেশ করুন। কিন্তু আপনি যদি স্বীকার করেন যে, কুরআন ও হাদিস অনুযায়ী উক্ত চারটি জিনিসের মূলতত্ত্ব বর্ণিত রূপ ভিন্ন আর কিছু নয়, তবে যেখানে ঈমান তার যাবতীয় ব্যাপকতা ও গভীরতা সহকারে ফুটে ওঠেনি এবং যেখানে তাকওয়া ও ইহসানের মূল শিকড়ই বর্তমান নেই সেখানে কোনো প্রকারেই ‘মারেফাত’ (আধ্যাত্মিকতা) সন্ধান করে পাওয়া যেতে পারে না, তা আপনাদের নিজেদেরই চিন্তা করা উচিত। আর যেসব খুঁটিনাটি ও গৌণ বিষয়কে দীন ইসলামের প্রাথমিক ও মৌলিক দাবি বলে আপনারা ধরে নিয়েছেন সেগুলোর নিগূঢ় তত্ত্ব পুণরায় আমি আপনাদেরকে বলে দিচ্ছি। আমি এই দিক দিয়ে আমার সমগ্র দায়িত্বই পূর্ণরূপে পালন করতে চাই।

সর্বপ্রথম শান্ত মনে এই প্রশ্নের জবাব নির্ধারণ করুন যে, আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে নবী কেন প্রেরণ করেন? দুনিয়াতে কোন্‌ বস্তুর অভাব রয়েছে, এখানে কোন্‌ ত্রুটি ও দোষ রয়ে গিয়েছিল, যা দূরিভূত করার জন্য আল্লাহ নবীদের প্রেরণ করার প্রয়োজনীতা বোধ করলেন। দুনিয়ার অধিবাসীগণ দাড়ি রাখত না, তা রাখার জন্য কি আল্লাহ তায়ালা নবী পাঠিয়েছেন? কিংবা সব লোক পায়ের তালু পর্যন্ত ঝুলিয়ে পায়জামা বা লুঙ্গি পরিধান করত বলে এটা বন্ধ করার জন্য আল্লাহ তায়ালা নবী পাঠিয়েছেন? অথবা যেসব ‘সুন্নাত’ দেশময় প্রচলিত করার জন্য আপনারা ব্যস্ত হয়েছেন, তা যথাযথভাবে প্রতিপালিত করার জন্যই দুনিয়াতে নবীর আবির্ভাব অপরিহার্য হয়েছিল? এসব প্রশ্ন সম্পর্কে একটু গভীর দৃষ্টিতে চিন্তা করলে আপনারা সকলেই স্বীকার করবেন যে, বস্তুত এটা কোনো মৌলিক দোষ-ত্রুটি নয়, নবী আগমনেরও এটা মূল উদ্দেশ্য হতে পারে না। তবে কোন্‌ মূল দোষ-ত্রুটির জন্য নবী আগমনের প্রয়োজনীয়তা হয়েছিল? এই প্রশ্নের একটিমাত্র উত্তর হতে পারে এবং তা এই যে, আল্লাহর দাসত্ব বিমুখতা, ধর্মহীনতা, আল্লাহর আনুগত্য করে চলার প্রতি উপেক্ষা, নিজেদের মনগড়া নিয়ম-বিধানের অনুসরণ এবং আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করার অনিবার্যতা সম্পর্কে অবিশ্বাস এগুলোই ছিলো দুনিয়ার মূলগত দোষ-ত্রুটি। এ কারণেই মানুষের নৈতিক চরিত্রে চরম ভাঙ্গন ও বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। জীবনযাপনের জন্য ভ্রান্ত রীতিনীতির প্রচলন হয়েছিল, গোটা পৃথিবী চরম ধ্বংসের মুখে চলে গিয়েছিল। বস্তুত মানুষের মধ্যে আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্য করে চলার অকৃত্রিম নিষ্ঠা এবং আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করার প্রতি সন্দেহাতীত বিশ্বাস সৃষ্টি করার জন্যই দুনিয়াতে আম্বিয়ায়ে কেরাম এসেছিলেন। উন্নত নৈতিক চরিত্রের বিকাশ সাধন এবং সুষ্ঠু মূলনীতির ভিত্তিতে মানব জীবনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করা, মঙ্গল ও কল্যাণের স্বতস্ফূর্ত ফল্‌গুধারা প্রবাহিত করা এবং অন্যায় ও পাপের সকল উৎস বন্ধ করাই তাদের মূল লক্ষ্য ছিলো। বস্তুত দুনিয়াতে নবীদের আগমনের এটাই ছিলো একমাত্র উদ্দেশ্য এবং সর্বশেষ এই বিরাট মহান উদ্দেশ্যের জন্যই এসেছিলেন সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)। এখন নবী করীমের (সা) কর্মনীতি ও পদ্ধতি যাচাই করে দেখতে হবে, দেখতে হবে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে তিনি কোন্‌ ক্রমিক ও পর্যায়মূলক নীতি গ্রহণ করেছিলেন। সকলেই জানেন সর্বপ্রথম তিনি ঈমানের দাওয়াত পেশ করেছেন। অতপর এই ঈমানের অনিবার্য দাবি ও পরিণতি অনুযায়ী ক্রমশ শিক্ষা-দীক্ষাদানের সাহায্যে ঈমানদার লোকদের মধ্যে বাস্তব আনুগত্য অনুসরণ (অর্থাৎ ইসলাম), নৈতিক পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতা (অর্থাৎ তাকওয়া এবং আল্লাহর প্রতি গভীর ভালবাসা ও অকৃত্রিম নিষ্ঠা (অর্থাৎ ইহসান ইত্যাদি) গুণাবলী ফুটিয়ে তুলেছেন। এরপরই এই নিষ্ঠাবান ঈমানদার লোকদের সংগঠিত চেষ্টা ও সাধনার সাহায্যে প্রাচীন জাহেলী যুগের অস্বাভাবিক ও ক্ষয়িষ্ণু জীবন-ব্যবস্থাকে নির্মূল করে তদস্থলে আল্লাহর বিধানের নৈতিক ও তামাদ্দুনিক মূলনীতিসমূহের ভিত্তিতে এক নির্মল সুষ্ঠু ও সত্যতাপূর্ণ জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এভাবে এসব লোকই যখন নিজেদের মন, মস্তিষ্ক, নৈতিক চরিত্র, চিন্তাধারা ও কাজ-কর্ম সকল দিক দিয়েই প্রকৃত মুসলিম, মুত্তাকী ও মুহসিন হলো এবং আল্লাহ খাঁটি নিষ্ঠাবান বান্দাহদের প্রকৃতিই যে কতর্ব্য পালন করা উচিত তাতে নিযুক্ত হলো তারপরই বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান, কাটছাঁট পোশাক পরিচ্ছদ উঠাবসা, চলাফিরা এবং এভাবে অন্যান্য বাহ্যিক কাজ-কর্মসমূহের মধ্যে মুত্তাকীদের শোভাবর্ধক ভদ্রতামূলক নিয়মনীতির শিক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন। অন্য কথায় সর্বপ্রথম তিনি কাঁচা তামাকে উজ্জল বিশুদ্ধ স্বর্ণে পরিণত করেছেন, তারপর তার ‘আশরাফীর’ (আরবিয় স্বর্ণ মুদ্রা) ছাঁচ বা নকশা অংকিত করেছেন) প্রথমে খাঁটি যোদ্ধা ও বীর সৈনিক তৈয়ার করেছেন, তারপরই তাকে পোশাক পরতে দিয়েছেন। বস্তুত কুরআন-হাদিসের গভীর ও সুক্ষ অধ্যয়ন করার পর নিঃসন্দেহে জানা যায় যে, ইসলামী আন্দোলনের এটাই একমাত্র সঠিক পন্থা এটাই হচ্ছে এ কাজের পর্যায়মূলক ক্রমিক ধারা। নবী করীম (সা) আল্লাহ তায়ালার মর্জি অনুযায়ী যে পন্থায় কাজ করেছিলেন সেই পন্থা অনুসরণকেই যদি ‘সুন্নাত’ পালন মনে করা হয় তবে উক্ত কর্মনীতি অনুযায়ী কাজ করাই সুন্নাত বলতে হবে এবং এ জন্যই লোকদেরকে প্রকৃত মু’মিন, মুসলিম, মুত্তাকী মুহসীন এ পরিণত না করে তাদেরকে মুত্তাকীদের বাহ্যিক পোশাক ও চাল-চলন অনুসারী এবং মুহসীনদের কতোকগুলো প্রসিদ্ধ ও সর্বজনপ্রিয় কাজের অনুকরণকারী বানাতে চেষ্টা করা কোনোক্রমেই ‘সুন্নাত’ হতে পারে না। শুধু তাই নয়, এটা সুন্নাতের স্পষ্ট বিরোধীতা, ‘সুন্নাতের’ নামে মনগড়া নীতির প্রচার; তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এটা ঠিক সীসা ও তামা খণ্ডের উপর ‘আশরাফীর’ নকশা অংকিত করে বাজারে চালাবার অপচেষ্টা এবং সৈনিকতা, নিষ্ঠা, আত্মোৎসর্গীকৃত মনোভাব সৃষ্টি না করেই নিছক উর্দী পরা কৃত্রিম যোদ্ধাকে যুদ্ধের ময়দানে দাঁড় করানোর অনুরূপ নির্বুদ্ধিতামূলক কাজ। আমার মতে এটা প্রকাশ্য জাল ও প্রতারণামূলক কৃত্রিমতা ভিন্ন আর কিছুই নয়। আর বস্তুত পক্ষে এই জাল ও কৃত্রিমতার ফলেই বাজারেও যেমন এই কৃত্রিম মুদ্রার কোনোই মূল্য নেই, যুদ্ধক্ষেত্রেও এই কৃত্রিম ও প্রদর্শনীমূলক সৈনিক দ্বারা কোনো কঠিন সংগ্রাম পরিচালনা করাও মাত্রই সম্ভব হচ্ছে না।

বস্তুত আল্লাহর নিকট যে কোনো বস্তুটির প্রকৃত মূল্য কি হবে তাও চিন্তা করে দেখতে হবে। মনে করুনঃ এক ব্যক্তির অকৃত্রিম ঈমান আছে, কর্তব্যজ্ঞান আছে, উন্নত নির্মল চরিত্রের গুণে সে গুণান্বিত, আল্লাহর নির্ধারিত সীমাসমূহ রক্ষা করে চলে, আল্লাহর আনুগত্য ও ঐকান্ত্রিক নিষ্ঠার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে; কিন্তু বাহ্যিক বেশ-ভুষার দিক দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ এবং বাহ্যিক সভ্যতার মানদণ্ডে পূর্ণরূপে উত্তীর্ণ হতে পারে না। এটাকে খুববেশি খারাপ বললেও শুধু এতোটুকু বলা যেতে পারে যে “চাকরটি আসলে ভালো, কিন্তু একটু অসভ্য এই যা।” তার এই ‘অসভ্যতা’র দরুন হয়তো সে উচ্চতম মর্যাদা লাভ করতে পারবে না। কিন্তু শুধু এতোটুকু অপরাধের দরুনই কি তার সকল নিষ্ঠা ও আনুগত্য নিষ্ফল হয়ে যাবে? এবং কেবল উত্তম বেশ-ভূষায় সম্পন্ন না হওয়ার অপরাধেই তার মনিব তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে? এটাকি কোনো মতেই বিশ্বাস করা যায়? মনে করুনঃ অন্য এক ব্যক্তির কথা, সে সবসময়ই শরীয়তী পোশাক পরিধান করে থাকে এবং সভ্যতার আচার অনুষ্ঠান ও আদব-কায়দা যারপরনাই সতর্কতা ও দৃঢ়তার সাথে পালন করে চলে, কিন্তু তার নিষ্ঠা ও আনুগত্যের বিশেষ অভাব রয়েছে তার কর্তব্যজ্ঞান জাগ্রত নয়, তার ঈমানী মর্যাদাবোধেও তেজস্বী নয় এমতাবস্থায় তার এই আভ্যন্তরীণ দোষ-ত্রুটির বর্তমানে আল্লাহর নিকট তার বাহ্যিক বেশ-ভূষার কতোখানি মূল্য হতে পারে। বস্তুত এটা জটিল ও গভীর আইনগত ব্যাপার নয়, যা বুঝার জন্য বড় বড় কিতাব সন্ধান করে বেড়াতে হবে। প্রত্যেকটি মানুষ নিজেই সাধারণ জ্ঞান দ্বারাই বুঝতে পারে, এ দু’টি জিনিসের মধ্যে প্রকৃত মর্যাদা কোন্‌টি হতে পারে ? দুনিয়ার কম বুদ্ধিমান লোকদের মধ্যেও একটা জ্ঞান থাকে এবং প্রকৃতপক্ষে যে জিনিসটি সন্ধান পাওয়ার যোগ্য, আর যেটির সৌন্দর্য মৌলিক নয় এই দু’টির মধ্যে তারাও পার্থক্য করতে পারে। ভারতের অধুনালুপ্ত ইংরেজ সরকার এই ব্যাপারে একটি চমৎকার উদাহরণ। এরা যে কতো বাবু ও ফেশনপ্রিয় এবং বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের জন্য এরা যে কতো প্রাণ দিয়ে থাকে তা সর্বজনবিদিত, কিন্তু তাদের নিকট প্রকৃত মূল্য ও মর্যাদা কোন জিনিসটি পেয়ে থাকে, তা ভেবে দেখেছেন কি? যে সামরিক কর্মচারী তাদের রাষ্ট্রের বিজয় পতাকা উড্ডীন রাখার জন্য নিজের মন, মস্তিষ্ক ও দেহ-প্রাণের সকল শক্তি ব্যয় করতো এবং আসল সংকট সময়ে সে জন্য কোনোরূপ আত্মদানে কুণ্ঠিত হতো না, ঠিক তাকেই তার মর্যাদা দান করতো উচ্চতম পদে তাকেই অভিষিক্ত করতো। বাহ্য দৃষ্টিতে সে শত অসভ্য গোঁয়ার, অমুন্ডিতশ্মশ্রু বিশিষ্ট, বেকায়দায় পোশাক পরিহিত পানাহারে অনিয়মিত ও কৃতকার্যে অপটু হোক না কেন, তাতে তার পদোন্নতির কোনোরূপ বাধার সৃষ্টি হতো না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি বিলাসপ্রিয়, সভ্যতা এবং সমাজের সর্বজনপ্রিয় রীতিনীতিগুলোর পূর্ণমাত্রায় অনুসরণকারী কিন্তু আনুগত্য ও আত্মোৎসর্গের ব্যাপারে পশ্চাদপদ এবং আসল কাজের সময় নিজের সুযোগ-সুবিধাগুলোর প্রতিই বিশেষ লক্ষ্য রাখে, ইংরেজগণ তাকে কোনো সম্মানিত পদ দেয়া তো দুরের কথা, তাকে কোট মার্শাল করতেও দ্বিধাবোধ করতো না। দুনিয়ার সামান্য বুদ্ধিবিশিষ্ট লোকদের যখন এরূপ অবস্থা তখন আল্লাহ সম্পর্কে কি ধারণা করা যায়? তিনি স্বর্ণ ও তামার পার্থক্য না করে শুধু বাহ্যিক নকশা ছাঁচ দেখে এতে স্বর্ণ মুদ্রার মূল্য দান করবেন? আল্লাহ সম্পর্কে এরূপ ধারণা করা কি কোনো মতেই সমীচীন হতে পারে?

আমি আবার বলব, আমার একথা হতে মনে করবেন না যে, আমি মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে চাচ্ছি, কিংবা মানব জীবনের বাহ্যিক দিকসমূহের সংশোধন ও সুষ্ঠুতা বিধানের জন্য প্রবর্তিত বিধি-নিষেধসমূহ পালন করা অপ্রয়োজনীয় প্রমাণ করতে চাচ্ছি এটা মাত্রই সত্য নয়। আমি বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ ও রসূলের প্রত্যেকটি হুকুমই যথাযথ ভাবে পালন করা প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তিরই অবশ্য কতর্ব্য। আর দীন ইসলাম মানুষের আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় দিককেই সুন্দর ও সুষ্ঠু করে গঠন করতে চায়, তাও আমি পূর্ণরূপে স্বীকার করি কিন্তু এটা সত্ত্বেও আমি শুধু একথাই আপনাদের বুঝাতে চেষ্টা করছি যে, মানুষের আভ্যন্তরীণ দিকই মূখ্য ও সংস্কারযোগ্য বাহ্যিক দিক সেরূপ নয়। প্রথমে মানুষের মূল সত্যের মণিমঞ্জুষা সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে হবে তারপর এই আভ্যন্তরীণ দিক অনুসারেই তার বাহ্যিক দিককেও গঠন করতে হবে। আল্লাহর নিকট যেসব গুণের প্রকৃত মূল্য রয়েছে এবং যে গুণাবলীর উৎকর্ষ সাধন ও ক্রমবিকাশ দানই ছিলো আম্বিয়ায়ে কেরামের আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য, সর্বপ্রথম সেগুলোর দিকেই দৃষ্টি নিবন্ধ করতে হবে এবং সর্বাগ্রে তা অর্জন করতে হবে। পরন্তু বাহ্যিক দিকের সংস্কার প্রথমত উক্ত গুণাবলীর অনিবার্য পরিণাম স্বভাবতই সম্পন্ন হবে তার পরও কোনো অসম্পূর্ণতা থাকলে ক্রমিক অধ্যায়সমূহ অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গেই তা পূর্ণতা লাভ করবে, তাতে সন্দেহ নেই।

শারীরিক অসুস্থতা ও দুর্বলতা সত্ত্বেও আমি এই দীর্ঘ বক্তৃতা আপনাদের সামনে করলাম শুধু এ জন্যই যে, প্রকৃত সত্য কথা পরিপূর্ণতা ও ব্যাপকতার সাথে আপনাদের সামনে সুস্পষ্টরূপে পেশ করে আল্লাহর নিকট আমি সকল দায়িত্ব হতে মুক্তিলাভ করতে চাই। জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই কার আয়ূ কখন শেষ সীমান্তে এসে পৌঁছবে, তা কেউ জানে না, কেউ বলতেও পারে না। এজন্য সত্যের বাণী পৌঁছাবার যতোখানি দায়িত্ব আমার উপর রয়েছে, আমি তা যথাযথভাবে পৌছাতে চাই। এখনো কোনো কথা অস্পষ্ট বা বিশ্লেষণ সাপেক্ষ থেকে গেলে জিজ্ঞেস করে নিন এবং সত্যের বিপরীত কোনো কথা আমি বলে থাকলে আপনারা তার প্রতিবাদ করুন। আর প্রকৃত সত্য কথা যথাযথভাবে আপনাদের নিকট যদি আমি পৌছিয়ে থাকি, তবে আপনারা তার সাক্ষ্য দিন। (সভাস্থল হতে ধ্বনি উঠলোঃ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি) আমার এই দায়িত্ব পালনের আপনারাও সাক্ষী থাকুন আল্লাহও যেন সাক্ষী থাকেন। আমি দোয়া করছি। আল্লাহ আপনাদেরকেও আমাকে দীন ইসলামের নিগূঢ় সত্য হৃদয়ঙ্গম করার তওফীক দিন এবং জ্ঞান অনুযায়ী দীন ইসলামের সমগ্র দাবি পূরণের তদনুযায়ী জীবন ও যাবতীয় কাজ আঞ্জাম দেয়ার ক্ষমতাও দান করুন। আমীন।

— সমাপ্ত —

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.