দাওয়াতে দীন ও তার কর্মপন্থা

১৫

হকের দাওয়াতের পর্যায়সমূহ

প্রতিটি হকের দাওয়াতকে সাফল্যের সর্বশেষ মঞ্জিল পর্যন্ত পৌছার জন্য সাধারণত [এই “সাধারণত“ শব্দটিকে বিশেষভাবে দৃষ্টির সামনে রাখাতে হবে। প্রতিটি হকের দাওয়াতকে সাফল্যের শীর্ষে পৌছার জন্য এই তিনটি পর্যায় অতিক্রম করা অত্যাবশ্যকীয় নয়। উদ্দেশ্য কেবল এই যে, সাধারণ ভাবে এই তিনটি পর্যায় এসে থাকে। অন্যথায় গণতন্ত্রের এই যুগে শুধু প্রথম পর্যায়ই হকের দাওয়াতকে সফলতার পর্যায়ে পৌছে দিতে পারে- এরূপ সম্ভাবনাও আছে] তিনটি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়:
দাওয়াত
হিজরাত
জিহাদ
বর্তমান যুগে লোকেরা বেশীরভাগ ইউরোপ, আমেরিকা, রাশিয়া, তুরস্ক প্রভৃতি দেশের বিপ্লব সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। এ কারণে তারা মনে করে এসব বিপ্লবের ক্ষেত্রে যেসব পর্যায় এসেছে তা প্রতিটি বিপ্লবের ক্ষেত্রেই অতিক্রম করতে হবে। এসব বিপ্লব সংঘটনের জন্য যে পন্থায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে তাই যে কোন আন্দোলনের জন্য কার্যকর হতে পারে। এটা একটা ভুল ধারণা। শুধু এই কারণে তারা এই ভ্রান্তিতে লিপ্ত রয়েছে যে ইসলামী পদ্ধতির কোন বিপ্লবের ইতিহাস তাদের সামনে বর্তমান নেই। অন্যথায় তারা জানতে পারত আম্বিয়ায়ে কেরাম অথবা তাঁদের পন্থা অনুযায়ী আমলকারীদের নির্দেশনায় যে বিপ্লব সাধিত হয় তার বৈশিষ্ঠ্য সমূহ থেকে সম্পুর্ণ পৃথক। এই ভূল ধারণা দুরীভুত করার জন্য প্রতিটি পর্যায়ের বিশেষত্ব ও দাবী সমূহের ওপর এখানে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব।
প্রথম পর্যায়- দাওয়াত
প্রথম পর্যায় বা স্তর হচ্ছে দাওয়াতের স্তর। প্রথম যে স্তরের লোকদের দাওয়াত দেয়া হয় তারা হচ্ছে ক্ষমতশীন ও সমাজের নেতৃত্বশীল লোক। কিন্তু এই শ্রেণীর লোকের নিজেদের অবস্থার ওপর সম্পুর্ণ নিশ্চিত থাকে এবং নিজেদের আনন্দ ও ভোগবিলাসিতার মধ্যে মগ্ন থাকে। আহবানকারী প্রতিটি দিক থেকে সমসাময়িক চিন্তা পদ্ধতি, নৈতিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং সমাজ ব্যবস্থার ত্রুটি সমূহ চিহ্নিত করে বাতিল ব্যবস্থাকে শেষ পর্যন্ত যে পরিনতির সম্মখীন হতে হবে তা সামনে তুলে ধরে। কিন্তু প্রকাশ্যত বাতিলের গাড়ী দ্রুতবেগে চলতে থাকে, এ কারণে সমসাময়িক ব্যক্তিদের পক্ষে এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে, এই গাড়ীর দেহ জীর্ণশীর্ণ এবং তা শীঘ্রই কোন খাদে পতিত হবে। যখন প্রকাশ্য অবস্থা অনুকুল থাকে তখন অমনোযোগী লোকদেরকে কোন ব্যবস্থার আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা সম্পর্কে সতর্ক করা কোন সহজ কাজ নয়। তারা নিজেদের অমনোযোগীতা ও উন্মত্ততার কারণে শুধু নিজেদের দুর্বলতা ও দুস্কৃতির দিকেই দৃষ্টি দেয়না তা নয়- বরং এই দুর্বলতা ও দুস্কৃতিকেই তারা সৌন্দর্য এবং পুর্ণতা বলে প্রমাণ করে এবং যেসব লোক এগুলোকে খারাপ ও দুস্কৃর্ম আখ্যা দেয় এরা তাদেরকে আহাম্মক এবং নির্বোধ বলে গালিদেয়।
এই লোকেরা যে দর্শনের অনুসারী তা কোন জিনিসের জন্য কোন নৈতিক ভিত্তি মোটেই স্বীকার করেনা। তাদের মতে গোটা দুনিয়া হয় দুর্ঘটনার ফল অথবা কেবল শক্তির মেরুদন্ডে ঘুর্পাক খাচ্ছে। এ কারণে তাদের সামনে হকের আহবানকারীর পেশকৃত উপদেশ ও নসীহতসমুহ অর্থহীন মনে হয়। তাদের সুউচ্চ অট্টালিকার ওপরতালায় প্রথমত একজন গরীব আহবানকারীর আওয়াজ পৌছতেই পারেনা। যদিও বা পৌছতে পারে তাহলে এটাকে অসময়ের ডাক সাব্যস্ত করে শুনেও না শুনার ভান করে এবং যথারীতি নিজেদের কল্পনা বিলাসে মগ্ন হয়ে পড়ে। তারা নিজেদের চিন্তার মধ্যেও কোন ত্রুটি দেখতে পায়না এবং নিজেদের জীবন ব্যবস্থার মধ্যে কোন ত্রুটি দেখতে পায় না, এবং নিজেদের জীবন ব্যবস্থার মধ্যে কোন শূন্যতা অনুভব করেনা। অনেক ডাকাডাকির পর যদিও তাদের কেউ নিজের গভীর নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয় এবং আহবানকারীর কোন কথা তার কাছে আবেদন সৃষ্টি করতে পারে তাহলে হয় অহংকার ও দাম্ভিকতার নেশা তাকে সত্যকে স্বীকার করে নিতে বাধা দেবে অথবা স্বার্থপুজা ও আত্মকেন্দ্রীকতার পরিনামদর্শিতা প্রভাবশীল হয়ে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। অবশ্য সুস্থ প্রকৃতির লোকেরা এই ডাকাডাকিতে অবশ্যই প্রভাবিত হয় এবং সমসাময়িক বাতিল ব্যবস্থার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যায় অথবা কমপক্ষে এর সাথে কোন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সম্পর্ক রাখেনা। এই লোকেরা দীনের দাওয়াত কবুল করে নেয়ার জন্য অগ্রসর হয়। এদের অধিকাংশই আর্থিক দিক থেকে অস্বচ্ছল হয়ে থাকে। তারা নেতৃত্বের চিন্তায় নিমগ্ন হয়না, তাদের সামনে স্বার্থ সংরক্ষনের প্রশ্নও থাকেনা। সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থার সহায়তার জন্য তাদের মধ্যে কোন অযথা গোড়ামীও থাকেনা। যেসব উপায়-উপকরণ ফিতনা ফাসাদে লিপ্ত করতে পারে তা থেকে তারা অনেকটা বর্ধিত বলা যায়। এজন্য তাদের হৃদয় মৃতবৎ হয়ে যায়না, বরং কিছুটা নিশ্বা:স বাকি থাকে এবং সামান্য ধাক্কায় তার মধ্যে জীবনের স্পন্দন শুরু হয়ে যায়। এই পর্যায়ের লোকদের মধ্যে সর্বপ্রথম যুবক বয়সী উদ্যমশীল লোকেরাই দাওয়াতের দিকে অগ্রসর হয়।
হযরত মুসা আলাইহিস সালামের সম্পর্কে কুরআন মজীদে উল্লেখ আছে যে, তাঁর দাওয়াতের ওপর সর্ব প্রথম তাঁর জাতির একদল যুবক ঈমান আনে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতেও কমবেশী একই অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। তাঁর নবুওয়াতের প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব লোক ঈমান আনে তাদের অধিকাংশ ছল যুবক। তার কারণ এই যে, যুবকদের রক্তে আছে উত্তেজনা এবং তাদের চরিত্রে রয়েছে বীরত্ব ও সাহসিকতা। তাদের সুক্ষ্ম আত্মমর্যাদাবোধ কিছুটা স্বভাবগত ভাবেই জাগ্রত থাকে এবং এর কিছুটা সহজেই জাগ্রত করা যায়। এরা বিরোধিতা দ্বারা খুব কমই প্রভাবিত হয় এবং স্বার্থকে খুব কমই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এরা যখনকোন কথার সত্যতা অনুভব করতে পারে তখন তারা পককে প্রহণ করার কারণে সম্ভাব্য বিপদ ও জান মালের ক্ষতি হওয়ার আশংকাকে মোটেই পরোয়া করে না। তারা এসব আশংকাকে উপেক্ষা করে হককে কবুল করে নেয়। এবং বিপদের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাদের উদ্যমকে শীতল করে দেয়ার পরিবর্তে আরো অধিক গরম করে দেয়।
দাওয়াতের এই প্রাথমিক পর্যায়ে হকপন্থীদের যেসব পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় তা সমসাময়িক ক্ষমতাশীন ব্যক্তিদের দ্বারা সৃষ্টি নয়। ক্ষমতাশীন ব্যক্তিরা প্রথম দিকে দাওয়াত এবং দাওয়াত দানকারীকে মোটেই পাত্তা দেয়না। এই প্রাথমিক পর্যায়ের সমস্ত বাধা বিপত্তি দাওয়াত দানকারীর নিকটস্থ পরিবেশ থেকে মাথা উত্তোলন করে। এই পর্যায়ে পিতা-পুত্র, মাতা-কন্যা, ভাই-ভাই, চাচা-ভাতিজা, মামা-ভাগ্নে, স্বামী-স্ত্রী, মনিব-গোলাম, ও ছাত্র-শিক্ষকের সংঘাত মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। পিতা পুত্রকে হক গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখার জন্য নরম গরম যাবতীয় ব্যবস্থা অবলম্বন করে থাকে। তাকে নিজের অধিকার এবং অতীত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নিজের আর্থিক অনটন ও বার্ধক্যের কথা উল্লেখ করে। পুত্রের নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সমূহ সামনে তুরে ধরতে থাকে। এই পথে বিপদাপদ এক এক গুণে গুণে তুলে ধরে। পরিবারের সমূহ ক্ষতির কথা উল্লেখ করে কাঁদতে থাকে। আশা-ভরসা শেষ হয়ে যাওয়ার শোকগাথাঁ গাইতে থাকে। সবচেয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়ার এবং ধনসম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দেয়। এভাবে শুরু হয়ে যায় নির্যাতনের পালা।
এসব কিছু কেন করা হয়? এজন্য যে, পুত্র যদি হককে কবুল করার সংকল্প নিয়ে থাকে তাহলে তাকে যেন তা থেকে ফিরিয়ে আনা যায়। আর যদি তা কবুল করে থাকে তাহলে তা থেকে যেন পশ্চাত্গামী হয়ে যায়। মা কন্যার সাথে, ভাই ভাইয়ের সাথে, চাচা ভাতিজার সাথে, মামা ভাগ্নের সাথে, স্ত্রী স্বামীর সাথে, মালিক গোলামের সাথে এবং শিক্ষক ছাত্রের সাথে ঠিক একই ধরণের দৃষ্টি ভঙ্গী পোষণ করে থাকে। যে যেদিক থেকে অন্যের ওপর কর্তৃত্বের অধিকারী সে সেদিক দিয়ে হককে গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখার জন্য তা ব্যবহার করে থাকে। এবং অন্যের ওপর নিজেদের বংশীয় আইনগত এবং নৈতিক অধিকার সমূহের মূল্য শুধু এই দাবী করে যে, এর বিনিময়ে হক গ্রহণকারী তাদের অবলম্বন করা বাতিলের পুজা করবে এবং তাদের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য সর্বাপেক্ষা বড় অধিকারীর (আল্লহ) সাথে বিদ্রোহ করবে।
এই যুগের বাধা-বিপত্তি ও বিপদ-মসীবতের কথা কুরআন মজীদের সূরা আনকাবুতে বর্ণিত হয়েছে এবং সাথে সাথে তার সমাধানের জন্য যে মৌলিক পথনির্দেশনার পয়োজন রয়েছে তাও বলে দেয়া হয়েছে। আমাদের জন্য বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। এজন্য শুধু প্রয়োজন পরিমাণ ইংগিত করেই শেষ করব। এ ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম মৌলিক কথা এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করার জন্য এই বিধান নির্দিষ্ট করেছেন যে, হক পন্থিদের বিভিন্ন রকম পরীক্ষার সম্মুখীন করে যাচাই করা হবে তারা নিজেদের হকপন্থি হওয়ার দাবীতে সত্যবাদী না মিথ্যাবাদী। এজন্য তারা যেন ঈমানী পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে বিরক্ত এবং সন্দেহ প্রবন হয়ে না পড়ে বরং হাসিমুখে এবং ধৈর্য সহকারে তার মোকাবেলা করবে। তাদের নিশ্চিত থাকা উচিৎ যে, পরীক্ষার এই পর্যায় অতিক্রম করতে পারলে তারা অবশ্যেই সফলকাম হবে।
الم () أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ () وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ
“আলীফ-লাম-মীম। লোকেরা কি এই করে নিয়েছে যে, আমরা ঈমান এনেছি এতটুকু বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে আর তাদের পরীক্ষা করা হবেনা? অথচ আমরা তো এদের পূর্বেকার লোকদের পরীক্ষা করেছি। আল্লহকে তো অবশ্যই দেখে নিতে হবে কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী।“(সূরা আন-কাবুত: ১-৩)
এরপর পিতা-মাতার পক্ষ থেকে হকপন্থিদের যে বাধা প্রতিবন্ধকতার সম্মখীন হতে হয় সে সম্পর্কে মৌলিক পথনির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই হেদায়াত সেইসব ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে যেখানে হকের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করীর পিতামাতার সমপর্যায়ের।
وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا وَإِنْ جَاهَدَاكَ لِتُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا
“আমরা লোকদেরকে পিতা-মাতার সাথে ভাল ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি। কিন্তু তারা যদি আমার সাথে এমন কোন (মা‘বুদকে) শরীক বানাবার জন্য তোমার উপর চাপ দেয়- যাকে তুমি (শরীক বলে) জাননা-তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করবেনা।“-(সূরা আন-কাবুত: ৮)
অর্থাৎ আল্লহর অধিকার যেহেতু পিতা-মাতার অধিকারের তুলনায় অধিক অগ্রগন্য, এজন্য আল্লহর আনুগত্য করার ব্যাপারে পিতা-মাতার কান বাধা প্রতিরোদের পরোয়া করা জায়েজ নয়। এ প্রসংগে পিতা-মাতা এবং বুজুর্গ আকাবেরদের আবেগাপ্লুত আবদারও জবাব দিয়ে দেয়া হয়েছে যা সাধারণত যুবকদের কাছে করে থাকে। “তোমরা আমাদের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে থাক। তোমরা যদি এটাকে ভ্রান্ত মনে কর তাহলে শাস্তি এবং সওয়াব আমরা মাথা পেতে নেব। শাস্তি এবং সওয়াবের কোন দায়িত্ব তোমাদের বহন করতে হবেনা।“
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا اتَّبِعُوا سَبِيلَنَا وَلْنَحْمِلْ خَطَايَاكُمْ وَمَا هُمْ بِحَامِلِينَ مِنْ خَطَايَاهُمْ مِنْ شَيْءٍ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ (12) وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَعَ أَثْقَالِهِمْ وَلَيُسْأَلُنَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَمَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ
“এই কাফেররা ঈমানদার লোকদের বলে, তোমরা আমাদের রীতিনীতি মেনে চল-তোমাদের ত্রুটি বিচ্যুতির বোঝা আমরা বহন করব। অথচ তাদের ত্রুটি বিচ্যুতির কোন অংশই তারা বহন করতে প্রস্তুত হবেনা। তারা নি:সন্দেহে মিথ্যা কথা বলে। তবে তারা নিজেদের পাপের বোঝা অবশ্যই বহন করবে, আর নিজেদের বোঝার সাথে আরো অনেক বোঝাও। কিয়ামতের দিন তাদের এসব মিথ্যা রচনা সম্পর্কে নিশ্চিতই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে- যা এখন তারা করছে।“-(সূরা আন-কাবুত: ১২, ১৩)
এই মৌলিক হেদায়াত দান করার পর তিনজন দৃঢ়সংকল্পের অধিকারী নবী হযরত নুহ, হযরত ইবরাহীম এবং হযরত লত আলাইহিমুস সালামের দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে। একজন হকপন্থী বান্দাহকে নিজের নিকটতম ও প্রিয়তম আত্মীয় স্বজনের বাধা প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলায় কি ধরণের দৃষ্টিভংগী গ্রহণ করতে হবে তা তাদের বাস্তব কর্মের নমুনা থেকে পরিস্কারভাবে জানা যায়। হকের স্বার্থে আত্মীয় সম্পর্কের ভালবাসা ও স্বজনপ্রীতি থেকে কিভাবে মুখাপেক্ষীহীন হতে হবে তাও এখান থেকে জানা যায়। সর্বাধিক প্রিয় আত্মীয় হচ্ছে তিনজন। পুত্রের সম্পর্ক, পিতা-মাতার সম্পর্ক এবং স্ত্রীর সম্পর্ক। হযরত নূহ আলাইহিস সালাম হকের স্বার্থে পুত্রের মত প্রিয় জিনিসের জন্য নিজের কলিজাকে পাথর বানিয়ে নিয়েছেন। হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এই হকের খাতিরে পিতার মত স্নেহপরায়ন এবং সন্মানিত ব্যক্তিত্বের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছেন। হযরত লৎ আলাইহিস সালাম এই হকের জন্যই স্ত্রীর মত প্রাণপ্রিয় ব্যক্তিকে পরিত্যাগ করেছেন। অবশিষ্ট সমস্ত আত্মীয়-সম্পর্ক এই তিনটি সম্পর্কের অধীনে এবং ভালবাসা ও সম্মানের দিক থেকে এর চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের। তাহলে হকের খাতিরে যকন এ ধরণের সম্পর্ক ছিন্ন করার হুকুম এসেছে এবং আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দারা তাতে মোটেই পরিতাপ করেননি- সেক্ষেত্রে অন্যান্য আত্মীয়-সম্পর্কের কি উল্লেখ করা যায়।
এসব উদাহারণ পেশ করার পর একথাও পরিষ্কার করে বলে দেয়া হয়েছে যে, যদিও রক্ত সম্পর্কিত এসব আত্মীয়-সম্পর্ক ছিন্ন করার অর্থ হচ্ছে নিজের পরিপূর্ণ সংসারকে নিজের হাতে বিরান করে দেয়া কিন্তু যে ব্যক্তি হকের ভালবাসার এই বাজী খেলার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায় এবং জীবনকে বাজি রেখে খেলে যায় আল্লাহ তাআলা তার বিরান সংসারকে পুনরায় ভর্তি করে দেন। সে যা কিছু হারায় তিনি এ দুনিয়ায় তাকে তার কয়েকগুণ বেশী দান করেন এবং আখেরাতেও তার জন্য অফুরন্ত নিআমতের ব্যবস্থা করা হয়। অতএব আল্লাহ তাআলা হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের হিজরাতের কথা উল্লেখ পুর্বক তার কল্যাণের কথা নিম্নোক্ত ভাষায় ব্যক্ত করেছেন :
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَجَعَلْنَا فِي ذُرِّيَّتِهِ النُّبُوَّةَ وَالْكِتَابَ وَآتَيْنَاهُ أَجْرَهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ
“আর আমরা তাকে ইসহাক ও ইয়াকুব দান করেছি এবং তার বংশে নবুওয়াত ও কিতাব রেখে দিয়েছি। তাকে দুনিয়ায় এর প্রতিফল দান করেছি এবং আখেরাতে সে নিশ্চিতই সত্কর্মশীল লোকদের মধ্যে শামিল হবে।“-(সূরা আন-কাবুত : ২৭)
সবচেয়ে বড় যে জিনিসটি কোন ব্যক্তিকে তার নিকটের পরিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রম করার ব্যাপারে কাপুরুষ বানিয়ে দেয় তা হচ্ছে তার আর্থিক দুরাবস্থা। হকের খাতিরে ভালবাসার সম্পর্ক ছন্ন করাটাও খুবই বীরত্বপূর্ণ কাজ, কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি সাহসের সাথে এই ঘাটি অতিক্রম করতেও পারে তবে এরপর তাকে নিজের এই পরিবেশ থেকে আঁচল ঝেড়ে উঠে দাঁড়ানো কোন সহজ কাজ মনে হয় না- যার আর্থিক উপায় উপকরণের ওপর এখন পর্যন্ত সে নির্ভরশীল এবং যার আওতার বাইরের পৃথিবী তার কাছে সম্পুর্ণ অপরিচিত। এই সংশয় দূর করার জন্য কুরআন মজীদের সূরা আনকাবুতেই এই শিক্ষা দিয়েছে যে, আল্লাহর ইবাদতের হক যেমন করেই হোক আদায় করতে হবে, এজন্য মনুষকে ঘরবাড়ি সবকিছু পরিত্যাগ করে হলেও। যে ব্যক্তি আল্লাহর বন্দেগী তাঁর আনুগত্যের আবেগে ঘরবাড়ি শূন্য হয়ে পড়বে- আল্লাহর প্রশস্ত দুনিয়া তার জন্য সংকীর্ণ প্রমাণিত হবে না। যদি এ পথে তার মৃত্যু এসে যায় (এবং মৃত্যু সবার কাছে আসবেই) তাহলে তার জন্য খোদার বেহেশতের অফুরন্ত নিয়ামত এবং কল্যাণ রয়েছে। যদি সে জীবিত থাকে তাহলে এটা কেন চিন্তা করবে যে, সে কি খাবে? জমিনের বুকে এমন কোন জীব রয়েছে যা নিজের আহার নিজের সাথে বেধে নিয়ে বেড়ায়? কিন্তু এরপরও সে যেখানেই যায়- আল্লাহ তার ভাগের রিযিক তাকে পৌছিয়ে দেন। তাহলে মানুষতো এসব জীব জন্তুর তুলনায় আল্লাহর কাছে অনেক মূল্য ও মর্যাদা রাখে। তাহলে শেষ পর্যন্ত তিনি কেন তাকে রিযিক থেকে বঞ্চিত রাখবেন?
يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ أَرْضِي وَاسِعَةٌ فَإِيَّايَ فَاعْبُدُونِ () كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ () وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَنُبَوِّئَنَّهُمْ مِنَ الْجَنَّةِ غُرَفًا تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا نِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ () الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ () وَكَأَيِّنْ مِنْ دَابَّةٍ لَا تَحْمِلُ رِزْقَهَا اللَّهُ يَرْزُقُهَا وَإِيَّاكُمْ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ () وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ () اللَّهُ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَهُ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
“হে আমার বান্দাগণ যারা ঈমান এনেছ- আমার পৃথিবী তো বিশাল বিস্তীর্ণ। অতএব তোমরা কেবল আমারই ইবাদত কর। প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। পরে তোমরা সকলেই আমার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে। যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তাদেরকে আমার জন্নাতের সুউচ্চ অট্টালিকাসমূহে স্থান দেব, যার তলদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত থাকবে। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। ভালকাজ সম্পাদনকারীদের জন্য এটা কতই না উত্তম প্রতিদান। সেই লোকদের জন্য- যারা ধৈর্য ধারণ করেছে এবং নিজেদের প্রতিপালকের উপর ভরসা রাখে। কত জীবজন্তু এমন আছে যারা নিজেদের রিযিক বহন করে চলেনা, আল্লাহ তাদের রিযিক দান করেন। আর তোমাদের রিযিক দাতাও তিনিই। তিনি সবকিছুই শুনেন এবং জানেন। তুমি যদি এদের কাছে জিজ্ঞেস কর, আসমান ও জমিন কে সৃষ্টি করেছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে কে নিয়ন্ত্রিত করে রেখেছেন- তাহলে তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ। তাহলে তারা কোনদিন থেকে ধোঁকা খাচ্ছে? আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিযিক প্রশস্ত করে দেন আর যার জন্য ইচ্ছা সংকীর্ণ করে দেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুই জানেন।“(সূরা আনকাবুত: ৫৬-৬২)
যে সব লোক নিজেদের চারপাশের পরিবেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধে দৃঢ় এবং অবিচল প্রমাণিত হয় এবং হকের খাতিরে নিজেদের রক্ত সম্পর্কিত এবং বংশীয় আত্মীয় সম্পর্কের কোনই পরোয়া করেনা তারা স্বাভাবিকভাবেই এমন লোকদের মধ্যে নিজেদের হৃদয়ের সম্পর্ক ও সংযোগ খুজে বেড়ায় যারা রক্ত বংশের দিক থেকে যদিও তাদের সাথে শরীক নয়- কিন্তু চিন্তা ও কর্মের দিক থেকে একই মতের অনুসারী এবং তাদের মতই হকের খাতিরে নিজেদের পরিবেশের সাথে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে। প্রকৃতিগতভাবে মানুষের গঠন এমন যে, সে একাকি জীবন যাপন করতে পারে না। এ কারণে সে যখন নিজের পূর্বেকার সম্পর্কের বিছানা গুটিয়ে নেয় তখন নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। এটা তার একটি প্রকৃতিগত প্রয়োজন। এছাড়া তার জীবনে সঠিক উন্নতি সম্ভব নয়। এ কারণে হক পন্থীদের যুদ্ধ নিজেদের নিকট পরিবেশের সাথে যতই তীব্র হতে থাকে তাদের মধ্যকার সম্পর্কও ততই মজবুত এবং সুদৃঢ় হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তারা সমাজের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র সমাজ এবং পরিবারের মর্যাদা লাভ করতে থাকে এবং ধীরে ধীরে এতটা প্রতীয়মান হয়ে উঠে যে, তাদের অস্তিত্ব একটি সংগঠন হিসাবে অনুভূত হতে থাকে। এবং সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থা তাদের প্রভাবে প্রভাবিত হওয়া শুরু করে।
হকের আহবানকারীরা যখন এই পর্যায়ে পৌছে যায়, তখন সমসাময়িক যুগের ক্ষমতাসীন ব্যক্তিগণ যারা এ পর্যন্ত এদিকে ভ্রুক্ষেপ করেনি, অনুভব করতে থাকে যে, এ পর্যন্ত তারা যে জিনিসটিকে মুষ্টিমেয় ব্যক্তির প্রতারণা ও পাগলামী বলে ধারণা করে আসছিল- তা একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য। এখন যদি তারা এ সম্পর্কে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা না নেয় তাহলে এটা তাদের অনুসৃত ব্যবস্থার জন্য মোটেই কল্যাণকর নয়- যার পতাকাবাহী তারা নিজেরাই এবং যার প্রাণবায়ুর ওপর তাদের সমস্ত প্রভাব-প্রতিপত্তি ও গৌরব অহংকার কায়েম রয়েছে। এই বিপদ অনুভব করেই তারা হকের দাওয়াতকে পরাভূত করার জন্য কোমর বাঁধতে থাকে এবং নির্বিচারে জুলুম-নির্যাতন শুরু করে দেয়। এই নির্যাতন যেহেতু ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে এজন্য তাতে নির্যাতনের যাবতীয় পন্থাই অনুসরণ করা হয় যা মানুষকে কষ্ট দেয়ার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। দুনিয়ার অতিত ইতিহাস সাক্ষ যে, হকপন্থীগণকে সমসাময়িক ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের হাতে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছে।, তরবারির অবিরত আঘাতে টুকরো টুকরো হতে হয়েছে, করাতের সাহয্যে দ্বিখন্ডিত করা হয়েছে, হিংস্র পশুর দ্বারা ছিন্নভিন্ন করা হয়েছে, মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর উপর শুইয়ে রাখা হয়েছে, জিন্দান খানায় বন্দী করা হয়েছে, নিজেদের সন্মভূমি থেকে বিতারিত করা হয়েছে। বর্তমান বিশ্ব যদিও নীতিগতভাবে চিন্তার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে, কিন্তু দীনের যে দাওয়াত জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগকে শয়তানের অধীনতা থেকে বের করে এনে আল্লাহর আনুগত্যের অধীনে নিয়ে আসতে চাচ্ছে তার পতাকাবাহীদের জন্য আজো দুনিয়ার ইতিহাস খুব সম্ভব পরিবর্তত হয়নি। পূর্বকালে হকপন্থীদেরকে যেসব কঠিন বিপদ-মসীবতের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে আজও হকপন্থীদের সে সব অবস্থার মধ্য দিয়ে অতক্রম করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُمْ مَثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِكُمْ مَسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ
“তোমরা কি মনে করেছ যে, অতি সহজেই তোমরা জন্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি পাবে? অথচ এখন পর্যন্ত তোমাদের ওপর তোমাদের পূর্ববর্তীদের ন্যায় (বিপদাপদ) আপতিত হয়নি। তাদের ওপর বহু কষ্ট, কঠিন বিপদ এসেছে, তাদেরকে অত্যাচারে জর্জরিত করে দেয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তদানীন্তন রসূল এবং তার সাথীরা আর্তনাদ করে উঠেছে- আল্লাহর সাহায্য কবে আসবে? তখন তাদের সান্তনা দিয়ে বলা হয়েছে আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটে।“(সূরা বাকারা : ২১৪)
এই যুগটি যদিও হক পন্থীদের জন্য খুবই কঠিন হয়ে থাকে, কিন্তু তারা যদি তাতে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে পারে এবং ক্ষমতাসীনদের যাবতীয় অত্যাচার সত্বেও নিজেদের দাওয়াত এবং নিজেদের মতামতের ওপর অবিচল থাকতে পারে- তাহলে তাদের নৈতিক শক্তির প্রভাবে তাদের বিরোধী পক্ষের অন্তরের মধ্যেও বসে যায়। তাদের সংগঠন এবং তাদের মতবাদের জন্য সমসাময়িক চিন্তাধারা এবং ব্যবস্থায় এতটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় যে, যেসব লোক কখনো এই দাওয়াতের নামও শুনতে প্রস্তুত ছিল না তারাও সমঝোতার জন্য এমন কোন মধ্য পথ খুঁজে বের করার জন্য চেষ্টা শুরু করে দেয়-যার ওপর উভয় দল সম্মত হতে পারে এবং যে কোনভাবে এই ঝগড়ার পরিসমাপ্তি ঘটানো যেতে পারে। কিন্তু মূলনীতির ক্ষেত্রে কোন সমঝোতার প্রশ্নই হতে পারে না। এ কারণে হকপন্থীরা যেভাবে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর অবর্ণনীয় যুলুম-অত্যাচারের মোকাবিলা করেছে, অনুরূপভাবে তাদরে এই বাতিল আকাংখার মোকাবিলা করতেও বাধ্য হয় এবং তারা প্রমাণ করে দেয় যে, তারা যে মতবাদের প্রচারক তা থেকে ইঞ্চি পরিমানও সরে দাঁড়াতে তারা প্রস্তুত নয়। এই পর্যায়ে হকপন্থীদের দিকে নির্দেশনার জন্য নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয়:
وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ قَالَ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا ائْتِ بِقُرْآنٍ غَيْرِ هَذَا أَوْ بَدِّلْهُ قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِنْ تِلْقَاءِ نَفْسِي إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ إِنِّي أَخَافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ
“আমাদের সুস্পষ্ট কথাগুলো যখন তাদের পড়ে শুনানো হয়- তখন যাদের মনে আমাদের সাক্ষাতের আশা নাই তারা বলে, এর পরিবর্তে অপর কোন কুরআন নিয়ে আস অথবা এতে কোনরূপ পরিবর্তন আনয়ন কর। (হে মুহাম্মদ) তাদের বলে দাও, আমার কি অধিকার আছে যে, আমি নিজের পক্ষ থেকে এর মধ্যে কোন পরিবর্তন আনয়ন করব? আমি তো কেবল সে কথারই অনুসরণ করি যা আল্লাহর তরফ থেকে আমার কাছে অহী করা হয়। আমি যদি আমার প্রভুর অবাধ্যাচরণ করি তাহলে আমার এক অতি ভয়ংকর দিনের সম্মুখীন হওয়ার ভয় আছে।“(সূরা ইউনুস:১৫)
বাতিল পন্থীদের এই আকাংখার শিকড় কেটে দেয়ার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে আবার নতুন করে হকের মতবাদের পরিষ্কার বিবরণ দেয়া হয়েছে- যাতে সমঝোতর সম্ভাবনা সম্পুর্ণরূপে শেষ হয়ে যায়:
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنْ كُنْتُمْ فِي شَكٍّ مِنْ دِينِي فَلَا أَعْبُدُ الَّذِينَ تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلَكِنْ أَعْبُدُ اللَّهَ الَّذِي يَتَوَفَّاكُمْ وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ () وَأَنْ أَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا وَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُشْرِكِينَ
“(হে নবী) বল, হে লোকেরা! তোমরা যদি আমার দ্বীন সম্পর্কে তোমাদের কোনরূপ সন্দেহ থেকে থাকে তাহলে শুনে রাখ- তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর যাদের দাসত্ব কর- আমি তাদের দাসত্ব করি না। বরং আমি তো কেবর সেই আল্লাহর ইবাদত কারি যিনি তোমাদের মৃত্যু দান করেন। আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, যেসব লোক ঈমান এনেছে আমি তাদের মধ্যে একজন হব। (আমাকে আরো নির্দেশ দেয়া হয়েছে) তুমি একনিষ্ঠ হয়ে যথাযথভাবে নিজেকে এই দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত করে দাও। আর কষ্মিনকালেও মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত হবে না।“ (সুরা ইউনুস: ১০৪, ১০৫)
এই ধারণের সমঝোতার প্রস্তাব অনেক সময় হকপন্থীদের মধ্যেও কোন কোন ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে দেয়। সেও কোন ভুর ধারণার বশবর্তী হয়ে নরম-গরম সমঝোতা হয়ে যাওয়ার মধ্যেই কল্যাণ দেখতে পায়। তাদের এই দুর্বরতার প্রতিকারের জন্য নিম্নোক্ত উপদেশ দেয়া হয়েছে:
فَلَعَلَّكَ تَارِكٌ بَعْضَ مَا يُوحَى إِلَيْكَ وَضَائِقٌ بِهِ صَدْرُكَ أَنْ يَقُولُوا لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ كَنْزٌ أَوْ جَاءَ مَعَهُ مَلَكٌ إِنَّمَا أَنْتَ نَذِيرٌ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ ()أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ () فَإِلَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّمَا أُنْزِلَ بِعِلْمِ اللَّهِ وَأَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَهَلْ أَنْتُمْ مُسْلِمُونَ () مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ
“যেভাবে তুমি নির্দেশ পেয়েছ সেভাবে সুদৃঢ় থাক এবং সেই লোকেরাও যারা তোমার সাথে তওবা করেছে। দাসত্বের সীমা লংঘন করনা। তোমরা যা কিছু করছ তিনি তার প্রতি পূর্ণ দৃষ্টি রাখছেন। এই যালেমদের প্রতি এতটুও ঝুকবেনা- অন্যথায় জাহান্নামের আওতায় পড়ে যাবে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের জন্য কোন অভিভাবক পাবেনা। অতপর তোমাদের কোনরূপ সাহায্য করা হবেনা। নামায কায়েম কর দিনের দুই প্রান্তে এবং রাতের কিছু অংশে। নিশ্চিতই ন্যায় কাজসমূহ অন্যায় কাজকে দুরীভূত করে দেয়। খোদার স্মরণকারীদের জন্য এটা একটা মহাস্মারক। আর ধৈর্য ধারণ কর, আল্লাহ সত্কর্মশীল লোকদের কর্মফল কখনো বিনষ্ট করেন না।“(সূরা হুদ: ১১২-১১৫)
হকপন্থীরা যখন সফলতার সাথে এই পর্যায় অতিক্রম করে যায় এবং বিরুদ্ধবাদীদের ভয় ও তাদের সন্ধীর প্রস্তাবে প্রভাবিত হয়ে দাওয়াতের কাজে কোনরূপ পরিবর্তন পরিবর্ধনে রাজী না হয়, বরং নিজেদের পূর্ণ দাওয়াতের কাজ কোনরূপ পরিবর্তনছাড়া সম্পুর্ণ নির্ভয়ে চালিয়ে যায়- তখন ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী তাদের পরাভূত করার জন্য এক নতুন ফন্দি আঁটে। এখন তারা যে কোনভাবে দাওয়াতের নেতাদের প্রলোভনের জালে শিকার করার চেষ্টা করে। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তারা আহবানকারীর সামনে উদার মনে এমন সব জিনিসের প্রস্তাব করে, এই পার্থিব জীবনে যা পাবার আকাংখা করা হয়। সম্পদের প্রাচুর্য, নেতৃত্বের বড় বড় পদ, সমসাময়িক স্বার্থে পূর্ণ অংশীদারিত্ব ইত্যাদী। এর বিনিময়ে তারা শুধু এই দাবী করে যে, যারা দাওয়াত তাদের আরাম-আয়েশ ও প্রশান্তি নষ্ট করে দিচ্ছে তাতে তারা কিছুটা পরিবর্তন আনয়ন করতে সম্মত হয়ে যায়।
হকপন্থীদের জন্য এই চাকচিক্যময় ও প্রলোভনীয় বিপদ অতীতের সমস্ত ভয়ংকর বিপদের তুলনায় অধিক মারাত্মক। অতএব “খালকে কুরআন“ মতবাদের ক্ষেত্রে সমসাময়িক বাদশার পক্ষ থেকে যখন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহ আলাইহিকে নির্মমভাবে বেত্রাঘাত করা হয়, তখন তিনি এই বেত্রাঘাতকে মোটেই পরোয়া করেননি। এই বেত্রাঘাত সম্পর্কে বিভিন্ন পুস্তকে এভাবে বর্ণনা এসেছে যে, এত পরিমাণ বেত্রঘাত যদি কোন হাতীকেও করা হতো তাহলে সে বিকট শব্দে চিত্কার দিয়ে উঠতো। বেত্রাঘাতের বৃষ্টি হয়েছে কিন্তু ঈমামের মুখ দিয়ে উহ!! শব্দটিও বের হয়নি। কিন্তু এরপর বাদশা তখন ইমাম সাহেবের অবিচলতার কাছে পরাজয় বরণ করে নীতির পরিবর্তন করে নিলেন এবং বেত্রাঘাতের পরিবর্তে তাঁর ওপর উপঢৌকন ও সম্মানের বৃষ্টি বর্ষণ শুরু করলেন তখন তিনি চিত্কার দিয়ে উঠলেন, আল্লাহর শপথ! আমার কাছে এই পুরষ্কার ও উপঢৌকন বেত্রাঘাতের চেয়েও কঠিন মনে হচ্ছে।“
হকের দাওয়াতের জন্য এই যুগটি খবই পরীক্ষার যুগ হয়ে থাকে। অমনোপূত মৃত্যুর বিপর্যয়ের তুলনায় দুনিয়ার মহরত কয়েকগুণ কঠিন এবং শক্ত হয়ে থাকে। বড় বড় নেতা যারা লোহার জিঞ্জিরকে নিজেদের একটি মাত্র চাপে টুকরা টুকরা করে দেয়, সোনা এবং রূপার জিঞ্জির আগ্রহের অতিশয্যে অলংকারের মত পরিধান করে নেয় এবং কখনো তা থেকে মুক্ত হবার জন্য অন্তরে চিন্তাও করে না। বিপদের ভূত যেসব লোকদের প্রভাবিত হরতে অক্ষম, তাদেরকে লালসা ও প্রলোভনের শয়তান এতটা সহজে বিক্ষিপ্ত করে দেয় যেন মনে হয় এরা আগে থেকেই শক্তি সাহস হারিয়ে বসে থেকে ছিল।
এই যুগের পরীক্ষার জন্য হকের ইতিহাস বর্বোত্তম অনুসারণীয় আদর্শ হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন চরিত্র। কোরাইশরা তাকে এবং তার সাথীদের কঠিন থেকে কঠিনতর বিপদে নিক্ষেপ করে যখন দেখল এরা নিজেদের দাওয়াত থেকে বিরত থাকার নয় এবং এতে কোনরূপ পরিবর্তন আনতেও সম্মত নয়- তখন তাঁর কাছে গিয়ে তারা আবেদন করল, আপনি কি চান? ধন সম্পদ? যদি আপনি তা চান তাহলে আমরা আপনার দাবীর চেয়েও অনেকগুণ বেশী দিতে প্রস্তুত। কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা বিয়ে করতে চান? যদি আপনি তাই চান তাহলে আমরা আপনার এই আকাংখা পূরণ করার জন্যও প্রস্তুত আছি। আপনি কি জাতির নেতৃত্ব চান? তাহলে আপনার এই দাওয়াতের কাজ বন্ধ করুন এবং বাপ দাদার ধর্মকে পরিবর্তন করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকুন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এই সমস্ত লোভনীয় প্রস্তাবের জবাবে একটি কথাও বললেন না, বরং কুরআন মজীদের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনিয়ে দিলেন। যে উদ্দেশ্যের দিকে দাওয়াত দেয়ার জন্য তিনি কোরাইশদের হাতে অকথ্য নির্যাতন ভোগ করছিলেন, এই আয়াতগ্রলোতে প্রভাবশালী বাক্যে সেই উদ্দেশ্যেরই পুনরুক্তি ছিল। কোরাইশরা তার এই জবাব শুনে একেবারেই নিরাশ হয়ে পড়ল।
হকের আহবানকারীরা যখন এই মঞ্জিলও আল্লাহর অনুগ্রহ অতিক্রম করে যায়, তখন একদিকে হকের দাওয়াত এবং চূড়ান্ত প্রমাণ পেশের কাজ শেষ পর্যায়ে পৌছে যায়, এমনকি যাদের মধ্যে সমান্য পরিমাণও নৈতিক অনুভুতি অবশিষ্ট থাকে- তারা হয় সত্যকে গ্রহণ করার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে হকপন্থীদের মধ্যে শামিল হয়ে যায়, অথবা অন্তত পক্ষে মনে মনে সত্যকে গ্রহণ করে নেয় এবং তা প্রকাশ করে দেয়ার জন্য অনুকূল মুহূর্তের অপেক্ষা করতে থাকে। অপরদিকে হক বিরোধীরা হকের দাওয়াতকে দমিয়ে দেয়ার যাবতীয় প্রচেষ্টা থেকে নিরাশ হয়ে তাকে একদম শেষ করে দেয়ার জন্য চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় এবং যে কোন সম্ভাব্য পরিণতি থেকে বেপরোয়া হয়ে আহবানকারী এবং দাওয়াত সবকিছুই নির্মূল করে দিতে চায়।
এই পর্যায়ে পৌছেই হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছে, হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে, হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে শূলে চড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে কোরাইশ বংশের সমস্ত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা “দারুণ-নদওয়া“ নামক মিলন কেন্দে একত্র হয়ে বিভিন্ন ধরণের প্রস্তাব পেশ করে। কেউ বলল, তার পায়ে বেড়ি পরিয়ে কোন অবরুদ্ধ কক্ষে বন্দী করে রাখা হোক। কেউ প্রস্তাব দিল তাঁকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হোক। পরিশেষে সবাই আবু জাহেলের এই প্রস্তাবে একমত হল যে, কোরাইশের প্রতিটি গোত্র থেকে এক এক ব্যক্তি প্রস্তুত থাকবে এবং সবাই মিলে এক সাথে তাঁর ওপর আঘাত হানবে। তাহলে হাশেম গোত্র তাঁর হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারবে না।
যখন ব্যাপার এই পর্যায়ে পৌছে যায় যে, নিজের জাতির মধ্যেই হকের আহবানকারীদের জীবনের নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থা থাকে না, তখন দাওয়াত সম্পর্কচ্ছেদ এবং হিজরতের স্তরে প্রবেশ করে।
দ্বিতীয় পর্যায় – সম্পর্কচ্ছেদ এবং হিজরত
হকের দাওয়াতের দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে সম্পর্কচ্ছেদ এবং হিজরত। এই সময়টা তখনই আসে যখন হকের আহবানকারীরা নিজেদের পরিবেশকে দুধের মত ঘেটে তার মাখন বের করে নিয়ে নেয়ি এবং সমসাময়িক সমাজ নৈতিক বৈশিষ্টের দিক থেকে শুধু দুধের ঘোলের মত থেকে যায়। যেসব লোকের মধ্যে সামন্য পরিমান যোগ্যতাও থাকে তারা হকের অনুসারী হয়ে যায় এবং যাদের অন্তর সম্পূর্ণ মৃতবৎ হয়ে যায় তারা দাওয়াতের বিরোধিতায় ক্রোধ এবং ঘৃনার সর্বশেষ সীমায় পৌছে যায়। এমন কি দাওয়াতকে দাবিয়ে দেয়া অথবা তার সাথে সমঝোতা করার যাবতীয় সম্ভাবনা থেকে নিরাশ কয়ে দাওয়াত দানকারী এবং দাওয়াতকে কবুল সমূলে উত্পাটিত করে নিক্ষেপ করার জন্য কোমর বেধে লেগে যায়। যখন এই সময় এসে যায় এবং হকের আহ্বানকারীরা অনুভব করে যে, এই পরিবেশে দাওয়াতের কাজ পরিচালানা করা তো দূরের কথা, তাদের জন্য নি:শ্বাস নেয়াটাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে, তখন তারা বাধ্য হয়ে নিজেদের পরিবেশের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষাণা দেয় এবং এই স্থান পরিত্যাগ করে এমন এক পরিবেশে স্থানান্তরিত হয়, যেখানে তারা নিজেদের মতবাদ অনুযায়ী জীবন যাপন করার আশা করতে পারে অথবা অন্ততপক্ষে ঈমানের সাথে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়।
আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালামের ক্ষেত্রে এই হিজরতের সময় এবং এর স্থান উভয়টি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। আল্লাহ তাআলা সরাসরি স্বপ্ন অথবা অহীর মাধ্যমে তাদেরকে সঠিক সময়ে নির্দেশ দান করেন যে, এখন দাওয়াতের কাজের হক আদায় হয়েছে এবং তোমাকে অমুক সময়ে এখান থেকে বের হয়ে অমুক স্থানে চলে যেতে হবে। আম্বিয়ায়ে কেরামের প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে রিসালাতের তাবলীগ এবং চূড়ান্তভাভে প্রমাণ পেশ। এ করণে জাতির মধ্যে যতক্ষণ তাদের উপস্থিত থাকা প্রয়োজন ততক্ষণে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জাতির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখেন- যাতে তাবলীগের হক পূর্ণরূপে আদায় হয়ে যায় এবং চূড়ান্ত প্রমাণ পেশ করার ক্ষেত্রে কোনরূপ ত্রুটি না থেকে যায়। যখন এই হক আদায় হয়ে যায় তখন তাঁরা হিজরতের অনুমতি পান। এই অনুমতি ব্যতিরেকে জাতিকে পরিত্যাগ করে চলে যাওয়া তাদের জন্য জায়েয নয়। কেননা কোন কোন অবস্থায় এরূপ ঘটার সম্ভবনা রয়েছে যে, ব্যক্তিত্ব বোধের তীব্রতা অথবা হকের সাহায্যের প্রাবল্য অথবা অন্য কোন কারণে তাঁর নিজ জাতিকে পরিত্যাগ করে চলে যেতে পারেন এবং চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপন ও তাবলীগের দায়িত্ব তখনো পূর্ণ নাও হয়ে থাকতে পারে। হযরত ইউনুছ আলাইহিস সাল্লামের দ্বারা এই ধরণের ত্রুটি হয়ে গিয়েছিল। তিনি হকের সাহায্য-সহযোগিতার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে নিজ জাতিকে পরিত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন। একারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর অসন্তোষ্ট প্রকাশ করেন এবং দীনের প্রচারের দায়িত্ব পূর্ণ করার জন্য তাঁকে পুনরায় তাদের কাছে ফেরত পাঠান। এবারকার দাওয়াতে তাঁর জাতির অধিকাংশ লোক ইসলাম গ্রহণ করে।
নবী-রসূলগণ ব্যতীত হকের অন্যান্য আহবানকারীদের এই হিজরতের সময় নিজের ইজতিহাদের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হয় এবং এই ইজতিহাদের ক্ষেত্রে মূলনীতি হিসেবে কয়েকটি কথা দৃষ্টির সামনে রাখতে হয়।
এক: যে কোন হকের দাওয়াতের জন্য হিজরত অত্যাবশ্যকীয় শর্ত নয়, বরং প্রয়োজন এবং পরিস্থিতির আওতাধীন। হকের আহবানকারীদের আসল কর্তব্য হচ্ছে তারা দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে জনগনকে হকের ব্যবস্থার অনুসারী বানাবে। তারা যখন েএর অনুসারী হয়ে যাবে তখন আহবানকারীরা তাদের সম্মিলিত শক্তির সাহায্যে হকের এই ব্যবস্থাকে বাস্তব ক্ষেত্রে কার্যকর করবে। অতপর যতক্ষণ পর্যন্ত তারা কোন এলাকার লোকদের কাছে কোনরূপ বাধা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই গোটা দীনের দাওয়াত পেশ করতে পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত সেখান থেকে হিজরত করা তাদের জন্য জায়েয নয়, যদিও একাজে তাদের গোটা জীবনটাই নি:শেষ হয়ে যায়, যদিও তাদের দাওয়াত কেউ কবুল নাও করে এবং নিজেদের মতবাদ অনুসারী কোন জীবন ব্যবস্থা কায়েম করার সুযোগ না পেয়েও থাকে। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম হকের কাজে গোটা জিন্দেগী শেষ করে দিলেন। কিন্তু যেহেতু তার কাজে তত্কালীন বাদশাহ নিরপেক্ষতার কারণে তার সামনে এমন কোন কার্যকর প্রতিবন্ধকতা আসেনি যা তাঁর দাওয়াতকে একেবারে অকেজো করে দিতে পারে-তাই তিনি জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত নিজের দাওয়াতের কাজে সশগুল থাকন। যদিও মিসরে তিনি এত পরিমাণ লোক সংগ্রহ করতে পারেননি যাদের সহযোগিতায় তিনি সেখানে সঠিক ইসলামী নীতির ভিত্তিতে কোন সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করে তা পরিচালনা করতে পারতেন।
দুই: সাধারণ পর্যায়ের প্রতিবন্ধকতা ও বিরোধিতা কোন পরিবেশ থেকে হিজরত করার জন্য যথেষ্ট কারণ হতে পারেনা। এমন এক দাওয়াত যা প্রতিটি দিক থেকে সমসাময়িক চিন্তা ও বিশ্বাস এবং যুগের সামাজিক ও রাজনৈতিক মূলনীতি থেকে স্বতন্ত্র-তার প্রতি সাধারণ লোকদের অসন্তুষ্ট এবং অপরিচিত থাকাটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। এই অসন্তেুাষ ও অপরিচিতির কারণে সন্ধিদ্ধ হয়ে নিজের পরিবেশ থেকে পালিয়ে যাবার ব্যাপারে হকের আহবানকারীর জন্য যথেষ্ট কারণ হতে পারেনা। িএই ধরণের বিরোধিতার দাবীর মুখে নবী-রসূলগণ কোনরূপ সংশয় এবং হতাশার শিকার না হয়ে সবসময় নিজেদের কাজ অব্যাহত রেখেছেন। এই ধরণের বিরোধিতার মুখে ধৈর্য ধারণ করা অবিচল থাকা বিরুদ্ধবাদীদের ওপর চূড়ান্ত প্রমাণ সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজন এবং হকের আহবানকারীদের সংকল্প পরীক্ষা করার জন্যও আবশ্যক। এই জিনিসটি যাচাই করা ব্যতীত আল্লাহ তাআলার কাছে হকপন্থীরাও তাদের সত্য প্রীতির প্রতিদান পেতে পারেনা, আর বাতিলপন্থীদের ওপর তাদের বাতিল প্রীতির কোন শাস্তি আসতে পারেনা এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হকপন্থীদের জন্য নির্দিষ্ট করা একটি প্রশিক্ষণ কোর্স। এই কোর্স তাদেরকে যে কোন ভাবেই অতিক্রম করতে হবে এবং তা অতিক্রম করার পরই তারা সাফল্যের সনদ লাভ করতে পারে।
অবশ্য জাতির বিরোধীতা যখন বৃদ্ধি পেতে পেতে এই সীমা অতক্রম করে যে, তারা নিজেদের মধ্যে হকপন্থীদের অস্তিত্বকে মোটেই সহী করতে প্রস্তুত নয় এবং সম্মিলিতভাবে তাদের মূলোচ্ছেদ করার জন্য সিদ্ধান্ত করে নেয়- এসময় তাদের প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত করে তাদের থেকে পৃথক হওয়ার ঘোষণা দেয়া এবং সেখান থেকে হিজরত করা হকপন্থীদের জন্য জায়েয হয়ে যায়। কুরআন মজিদে যতজন নবীর হিজরতের কথা উল্লেখ করা আছে তাদের প্রত্যেকের ঘটনা থেকে এই সত্য প্রতিভাত হয় যে, জাতির লোকেরা যখন তাদেরকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা, অথবা দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়ার সর্বশেষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন তারা সম্পর্কচ্ছেদ ও হিজরত করার ঘোষণা দিয়েছেন। বিরুদ্ধবাদীদের পক্ষ থেকে এই ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বে কোন নবীই হিজরত করেননি।
তিন: হযরত আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং হকের আহবানকারীদের হিজরত এবং এক জাতির বাড়াবাড়ি ও নির্যাতনের ভয়ে অন্য জাতির লোকদের পলায়ণ –এদুটি জিনিস সম্পূর্ণ পৃথক ধরণের। এই পলায়ন একজাতি থেকে অন্য জাতির দিকে হয়ে থাকে। আর হকের আহবানকারীদের হিজরত বতিল থেকে হকের দিকে হয়ে থাকে। এজন্য হিজরতের পূর্বে হকের আহবানকারীদের দুটি জিনিসের মূল্যায়ন করা প্রয়োজন হয়। এক, যে লোকদের মধ্য থেকে তারা হিজরত করতে যাচ্ছে, সত্যকে গ্রহণ করার দিক থেকে তাদের অবস্থা কি? দুই, যেলোকদের কাছে তারা হিজরত করতে যাচ্ছে সত্যপ্রীতির দিক থেকে তাদের অবস্থা কোন পর্যায়ে রয়েছে?
এই মূল্যায়নের জন্য তাদেরকে নিজেদের পরিবেশেস যোগ্যতার সঠিক অনুমান করতে হবে যে, হকের বীজ বপন করার জন্য এই যমীনের মধ্যে কোন যোগ্যতা অবশিষ্ট আছে কি না? যদি তারা এর মধ্যে যোগ্যতা দেখেতে পায় তাহলে তারা নিজেদের কল্যাণ প্রচেষ্টার সর্বাধিক হকদার এই পরিবেশকেই মনে করে এবং নিজেদের সর্বশক্তি তর সংশোধন ও প্রশিক্ষণের জন্য ব্যয় করে থাকে। হাঁ, যদি পূর্ণরূপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর তার মধ্যে এই যোগ্যতা না পাওয়া যায় তাহলে তারা বাইরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। যে যমীনকে একাজের জন্য উপযুক্ত মনে হয় তারা সেখানে গিয়ে তাবু ফেলে এবং নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করতে থাকে।
নবী-রসূলগণ ব্যতীত হকের সাধারণ আহবানকারীদের যেভাবে নিজেদের ইজতেহাদের মাধ্যমে হিজরতের সময় নির্ধারণ করতে হয়, অনরূপ ভাবে হিজরতের স্থান ও তাদেরকে ইজতেহাদের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হয়। এই ইজতেহাদের ক্ষেত্রে তাদেরকে মূলনীতি হিসাবে যে জিনিসগুলো সামনে রাখতে হয় তা হচ্ছে এই যে, হিজরতের স্থান, দাওয়াত এবং দাওয়াতের উদ্দেশ্যের দিক থেকে অনুকুল হতে হবে। অন্য দিক থেকে তার কোন গুরুত্ব থাক বা না থাক। এই দারুল হিজরত একটি প্রস্তরময় জনশূন্য মরুভূমিও হতে পারে। যেমন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম হেজাজের মরুভূমিতে হিজরত করেছিলেন। দারুল হিজরত দুধ এবং মধুতে সমৃদ্ধ উর্বর জমিও হতে পারে। যেমন, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম নিজের জাতিকে সিরিয়ায় নিয়ে আসেন। দারুল হিজরত অন্বেষণ করার জন্য কখনো নিজের দেশ থেকে বাইরে যাবার প্রয়োজনও হতে পারে। যেমন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এবং হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে বের হতে হয়েছিল। আবার কখনো এরূপও হয়ে থাকে যে, যে দেশে হকের দাওয়াত আত্মপ্রকাশ করেছে, আল্লাহ তাআলা সেই দেশের কোন অংশকে হকের দাওয়াতের জন্য অনগ্রহশীল এবং অনুকুল বানিয়ে দেন। যেমন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষেত্রে হয়ে ছিল।
কোন আয়াত সম্পর্কে প্রথম পদক্ষেপেই এই ফয়সালা করা অত্যন্ত কষ্টকর যে, যে যমীনে এই বীজ বপন করা হচ্ছে- সেই যমীনেই তার ফসল উত্পাদিত হবে, অথবা বীজ তো কোন যমিন বপন করা হচ্ছে, কিন্তু ফসল অন্য কোন যমীনে কাটা হবে? সেই যমীনটা কি রকম যমীন হবে? দেশের ভেতরে হবে না দেশের বাইরে? কোন লবনাক্ত ও অনুর্বর ভূমি হবে অথবা কোন জনবহুল ও উর্বর যমী? যেসব লোক হকের বীজ বপন করার জন্য অগ্রসর হয়, এ ব্যাপারে তাদের নিজেদের অনুমান ও পরিমাণ বিবেচ্য বিষয় নয়। বরং সেই মহান সত্তাই কেবল তাদের পথ প্রদর্শন করেন যাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাংখায় তারা নিজেদের ঝোলায় সামান্য পরিমাণ রসদ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। অবশ্য এতটুকু কথা চূড়ান্ত ভাবেই বলা যায় হকের বীজ বপনকারীরা যদি নিজেদের চোখের পানি এবং শরীরের রক্ত দিয়ে তাতে পানি সিঞ্চন করার জন্য তৈরী থাকে তাহলে তা বেকার যেতে পারেনা। যমিনের েএকটি অংশ যদি তার প্রতিপালন করতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে অন্য কোন অংশ তার লালন পালনের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। যদি পূর্বাঞ্চলে তার চাষাবাদ সবুজ-শ্যামল না হয়ে ওঠে তাহলে পশ্চিমাঞ্চলে তার ফসল প্রষ্ফুটিত হয়ে উঠে। অতপর এমন একদিন এসে যায় যে, সঞ্চায়কারী তা দিয়ে নিজের গোলা পরিপূর্ণ করে নয় এবং গোটা দুনিয়া তার দ্বারা পরিতৃপ্ত হয়ে যায়।
এই হিজরতের উদ্দেশ্য কেবল বিরুদ্ধবাদীদের নির্যাতন থেকে পালায়ন নয় বরং এর দ্বারা হকের দাওয়াতের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়। এর কতিপয় উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমরা এখানে আলোচনা করব।
এর প্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে- হকপন্থীদের আকীদা-বিশ্বাসগত এবং মানসিক দাবীসমুহ বাস্তবে পূর্ণকরা। তারা যেদিন থেকে হকের স্বাদের সাথে পরিচিত হয় সেদিন থেকেই সংকল্প এবং নিয়াতের দিক থেকে মুহাজির হয়ে যায়। তারা নিজেদের সমসাময়িক আকীদা-বিশ্বাস ও কার্যকলাপের উপর অসন্তুষ্ট থাকে এবং যে কোন ভাবেই তা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে। তারা নিজেদের যুগের সমাজ থেকে পালিয়ে থাকে এবং নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও পরিতৃপ্তির জন্য কোন সুষ্ঠু সমাজ খুজে বেড়ায়। তারা নিজেদের সমসাময়িক যুগের সমাজ ব্যবস্থাকে বাতিলের একটি শাখার করাতে মনে করে এবং তা থেকে যে কোনভাবে মুক্তি পাবার আকাংখা করে। তাদের বাতেনী শক্তির ঘ্রণ জাগ্রহ হয়ে যায় এবং চারপাশের পরিবেশ থেকে তারা দুর্গন্ধ অনুভব করে। এজন্য প্রতিটি মুহুর্তে তারা এমন পরিবেশ অন্বেষণ করে যার মধ্যে তারা স্বাধীনভাবে নিশ্বাস নিতে পারবে। এবং এই দুর্গন্ধ থেকে আশ্রয় পাবে। তারা এই পরিবেশে যতটুকু সময়ই অতিবাহিত করে তা কেবল দীন প্রচারের দায়িত্ব পালনের জন্যই অতিবাহিত করে। এই দায়িত্ব পালন হয়ে যাবার পর এই পরিবেশ থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া এবং যে জিনিসেকে তারা আন্তরীক ভাবে পরিত্যাগ করেছে তা প্রকাশ্য ভাবেও পরিত্যাগ করা তাদের একটি প্রকৃতিগত প্রয়োজনে পরিণত হয়। এ হচ্ছে হিজরতের আসল রহস্য এবং এই রহস্যের দৃষ্টিতে বাস্তব হিজরত হচ্ছে কেবল সেই লোকদের হিজরত যাদের দেহ-মন উভয়ই মুহাজির। যাদের দেহ হিজরত করে গেছে কিন্তু মন হিজরতের স্থানে আটকা রয়েছে- তাদের হিজরত আসল হিজরত নয়।
এর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, যেসব লোকের হৃদয়ে জীবনের কোন স্পন্দন অবশিষ্ট আছে তাকে কর্মতত্পর করার জন্য সর্বশেষ চেষ্টা করতে হবে। যখন সমাজের সর্বোত্তম ব্যক্তিগণ যাদের সর্বোত্তম হওয়াটা তাদের শত্রুরাও স্বীকার করে-যাদের কল্যাণকামিতা ও সহানুভুতির ওপর বিরুদ্ধবাদীদেরও আস্থা রয়েছে, যাদের সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার সাক্ষ্য তাদের দুশমনরাও দিয়ে থাকে, যাদের সত্যপ্রীতি এবং খোদাভীতির ওপর তাদের বিদ্রুপ কারীরাও মনে মনে হিংসা পোষণ করে-নিজেদের সমাজকে, এর সাথের দীর্ঘকালীন সম্পর্ককে, এর মধ্যেকার নিজেদের যাবতীয় অধিকারকে, নিজেদের ঘরবাড়ী, সহায়-সম্পদ, এমনকি নিজের প্রিয়তম বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যাগ করে এবং এমনভাবে পরিত্যাগ করে যে, তাদের অন্তরে ক্ষোভের পরিবর্তে সাহনুভুতি এবং ঘৃণার পরিবর্তে মমতা ও সমবেদনা বিরাজিত থাকে। তাদের মধ্যে আল্লাহর বন্দেগীর ভাবধারা ব্যতীত অন্যকোন প্রকারের ব্যক্তিগত ক্রোধ, অসন্তোষ, ঈর্ষা ও দু:খ-বেদনার সামান্যতম মলিনতাও থাকেনা। যে ব্যক্তির মধ্যে সামান্য অনুভুতিও বর্তমান রয়েছে সে এই দৃশ্য অবলোকন করে প্রভাবিত না হয়ে পারেনা। এই দৃশ্য দেখে পাষান হৃদয়, হতভাগ্য ও নির্মম শত্রু ছাড়া এমন সব লোকের মধ্যেই গতির সৃষ্টি হবে যাদের অন্তরের কোন স্থানে সত্যের প্রতি মর্যাদাবোধ বর্তমান রয়েছে। এদের মধ্যেকার উত্তম ব্যক্তিরা এই দৃশ্য দেখে এতটা প্রভাবিত হয়ে পড়ে যে, শেষ পর্যন্ত নিজের ভ্রান্ত জীবন পদ্ধতির ওপর ধৈর্য ধারণ করতে পারেনা এবং আল্লাহর নামে নিয়ে সত্য পথের প্রাণ উত্সর্গকারী সৈনিকদের মধ্যে শামিল হয়ে যায়। এটা হকের আহবানকারীদের পক্ষ থেকে নিজেদের জাতির প্রতি যেন শেষবারের মত ঝাঁকুনি দেয়া হচ্ছে-যার পর মৃতের মত নিদ্রামগ্ন ব্যক্তিরা ছাড়া আর সব লোক নিজেদের বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়েযায়।[হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহকে যেসব জিনিস ইসলাম গ্রহন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে তার মধ্যে তার বোন এবং ভগ্নিপতির ইসলাম গ্রহণকে যদিও সাধারণ ভাবে অন্যসব কিছুর ওপর অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে- কিন্তু ইতিহাস পাঠে জানা যায়, আবিসিনিয়ায় মুসলমানদের হিজরতই তাঁকে সর্বাধিক প্রভাবিত করেছে। তিনি যখন দেখলেন, অনেক ভালো ভালো লোক ইসলামের প্রেমে যে কোন প্রকারের দু:খ ও বিপদ-মুসীবত বরদাশত করছে, এমন কি ইসলামের জন্য তারা নিজেদের মাতৃভূমি পরিত্যাগ করতেও প্রস্তুত হয়ে গেছে এবং তাদের মধ্যে এমন কতক লোকও ছিল যারা স্বয়ং তাঁর অত্যাচারের শিকার হয়েছিল- তখন তাঁর মনের অবস্থা পরিবর্তিত হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের বোনের সত্যের ওপর অবিচলতা সর্বশেষ পর্দাও সরিয়ে দিল। সীরাতে ইবনে হিশামে এই ধরণের কতগুলি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় যা এই কথার সাক্ষ্য দেয় যে, হযরত উমরের (রা) মানসিক অবস্থার পরিবর্তনে হাবশার (ইথিওপিয়া) হিজরতের ঘটনারই অধিক দখল ছিল]
এই হিজরতের তৃতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে হকপন্থীদের আত্মশুদ্ধ করণ। হকের আহবানকারীদের জন্য যতক্ষণ হিজরতের পর্যায় না আসে ততক্ষন তাদের মধ্যেকার মোখলেস (একনিষ্ঠ) ও অ-মোখলেস লোকদের মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হয়না। অনেক লোক নিফাকের কদর্যতা নিয়ে হকের আহবানকারীদের কাতারে শামিল হয়ে যায় এবং নিজেদের কপটতাকে লুকাতে পূর্ণরূপে কামিয়াব হয়ে যায়। বহু লোক নিজেদের অন্তরে গোপন প্রকোষ্ঠে আল্লাহ ছাড়া নিজেদের বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজন অথবা নিজেদের ধনসম্পদের প্রতি কিছুটা যোগসূত্র রাখে। এই জিনিসগুলো এতটা গোপন থাকে যে, অন্তরের এ চোরের খবর তার নিজের কাছেও থাকেনা। এই লোকদের ক্ষেত্রে হিজরত একটি কষ্টি পাথরের কাজ দেয়। এরপর ভাল এবং মন্দের মধ্যে পূর্ণরূপে পার্থক্য সুচিত হয়। আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দারা একদিকে হয়ে যায়, আর যেসব লোক হকের বিরোধী অথবা অন্তরে কোন চোর লুকিয়ে রাখে তারা একদিকে হয়ে যায়। কিয়ামতের প্রসিদ্ধ পুলসিরাতের মত হিজরতের রাস্তাও চুলের চেয়ে অধিক সূক্ষ্ম এবং তরবারির চেয়ে অধিক ধারালো। যারা শতকরা একশ ভাগেই মুমিন এবং মোখলেস কেবল তারাই যারা এ পথ অতিক্রম করতে পারে। যদি নিফাক এবং দুনিয়ার মলিনতার সমান্য পরিমানও অন্তরের মধ্যে গোপন থাকে তাহলে অন্যান্য পরীক্ষায় হয়ত সফলকাম হওয়া সম্ভব, কিন্তু হিজরতের পরিক্ষায় অবশ্যই ধরা পড়ে যায়।
এই হিজরতের চতুর্থ উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, একটি স্বাধীন এবং পবিত্র পরিবেশে হকপন্থীদের প্রশিক্ষণ ও সংগঠনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে তারা বাতিলের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়া, একটি সত্কর্মশীল সভ্যতা-সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপন করা এবং দুনিয়ার নেতৃত্ব পদের দায়িত্ব শামলাবার জন্য তৈরী হতে পারবে। কুফরী পরিবেশ যেখানে কুফর ক্ষমতাসীন রয়েছে তা এই উদ্দেশের জন্য উপযুক্ত এবং অনুকুল হতে পারে না। হকের দাওয়াতের বৈশিষ্ট হচ্ছে যেন এমন একটি বীজ যা অংকুরিত হবার তা যেকোন যমিনেই অংকুরিত হতে পারে। কিন্তু তার প্রতিপালন ও পরিবর্ধন তখনই হয় যখন তাকে এখান থেকে তুলে নিয়ে এমন যমিনে রোপণ করা হয় যেখানে অন্য কোন বৃক্ষের ছায়া নেই। এসময় তার স্বভাবের যাবতীয় দাবী পূর্ন হয়। এই অবস্থায় তা নিজের স্বাভাবিক গতিতে বড় হতে থাকে এবং পত্রপল্লবে সুশোভিত হয় এমনি করে একদিন তার শিকড় পাতাল পর্যন্ত চলে যায় এবং তার শাখা-প্রশাখা শূন্যলোকে ছড়িয়ে যায়। যতক্ষণ এই শর্ত পূর্ণ না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত হকের দাওয়াতের শক্তি মূতবৎ এবং এর আসল যোগ্যতা পরাভূত অবস্থায় থেকে যায়। এর ভেদ আপনজনদের মধ্যেও সুপরিচিত থাকেনা এবং এর অলৌকিকত্ব অপরের সামনেও প্রতীয়মান হয়না।
কিছু বিচ্ছিন্ন মূলনীতি নিজ স্থানে যতই আকর্ষণীয় এবং ভারসাম্যপূর্ণ হোক তার আসল সৌন্দর্যের খোঁজ পাওয়া কখনো সম্ভব নয় যতক্ষণ তা একটি জীবন ব্যবস্থার কাঠামোতে দেখা না যাবে এবং যাচাই করা না হবে। একটি কুফরী জীবন ব্যবস্থার অধীনে তৌহীদ, আল্লাহর আনুগত্য, মানব জাতির অখন্ডতা এবং আখেরাত ভীতির ওয়াজ করা যেতে পারে এবং এই ওয়াজ অনেক সুস্থ বুদ্ধির অধিকারী লোকদের পরিবেশে একটি সামগ্রিক কাঠামো অস্তিত্ব লাভ করে, তার যাবতীয় বিভাগ স্তরে স্তরে মকুরিত হয়ে উঠে এবং নিজের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করতে থাকে, তখন আমরাও এর যোগ্যতা এবং কল্যাণকারিতা দেখে আশ্চার্যান্বিত হয়ে যাই এবং অন্যরাও এর শক্তি ও কর্মকুশলতা দেখে হতভম্ব হয়ে যায়।
যে হিজরত এসব উদ্দেশ্য ও শর্তবলীর অধীনে সংঘটিত হয় তা থেকে কয়েকটি অপরিহার্য ফলাফল সৃষ্টি হয়। এর প্রথম ফল এই পাওয়া যায় যে, হিজরতের পর হকের দাওয়াত পূর্ণ শক্তিতে ছড়িয়ে পড়তে এবং বিস্তারিত হতে থাকে। এর কারণে এই যে, হকের কালেমার মধ্যে পরিবৃদ্ধি এবং পরিব্যাপ্ত হওয়ার, বিজয়ী হওয়ার ও ছেয়ে যাওয়ার অসাধারণ যোগ্যতা ও শক্তি বর্তমান থাকে। মানব প্রকৃতি এবং এই বিশ্বের মেজাজের সাথে তার স্বাভাবিক পরিচিতি থাকে। এই দুটি জিনিসই তাকে লালন-পালন এবং উন্নতি বিধান করতে চায়। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত এর ওপর বাতিলের পর্দা পড়ে থাকে ততক্ষণ তার অবস্থা সেই চারাগাছের মতই ম্লান এবং বিশুষ্ক হয়ে থাকে যার ওপর কোন পরগাছা ছেয়ে আছে এবং তা এর রস চুষে খাচ্ছে। যখন তা পর গাছা যুক্ত হয়ে যায় এবং উর্বর যমীন ও স্বাধীন পরিবেশ পেয়ে যায় তখন তার সমস্ত চাপাপড়া শক্তি মুহুর্তের মধ্যে উথিত হয়ে আসে এবং ক্রমাগতভাবে তা একটি সম্ভাবনাময় ও উন্নতিশীল বৃক্ষের মত নিজের চার পাশের জমিন এবং নিজের ও পরের শূণ্যস্থানের শক্তিকে নিজের খাদ্যে পরিণত করা শুরু করে দেয়। দেখতে দেখতে তা এমন এক প্রকান্ড বৃক্ষে পরিণত হয়ে যায় যে, তার ছায়াতলে পরিব্রাজকদের কাফেলা আশ্রয় নেয় এবং লোকেরা তার ফল খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়।
দ্বিতীয় ফল এই হয় যে, বাতিল দ্রুত অথবা পর্যায়ক্রমে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এর কারণ এই যে, বাতিলের কোন মূল এবং ভিত্তি নেই। মানব প্রকৃতির সাথেও এর কোন সংযোগ নেই এবং বিশ্বব্যবস্থার সাথেও এর কোন মেজাজগত সমঞ্জস্য নেই। আল্লাহ তাআলা এই দুনিয়াকে একটি সৎ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর গোটা সৃষ্টি ব্যবস্থায় সত্যের প্রাণশক্তি কার্যকর রয়েছে। একারণে যে বাতিলের মধ্যে থেকে হকের সমস্ত অংশগুলো বের করে পৃথক করে নেয়া হয়েছে সেই বাতিলের লালন-পালন করা বিশ্বব্যবস্থার মেজাজের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তার মধ্যে যদি কোন বাতিল পাওয়া যায় তাহলে তা এই অবস্থায় পাওয়া যেতে পারে যে, তার মধ্যে হকেরও কিছু মিশ্রণ রয়েছে। কেননা এই বাতিল চারাগাছ অথবা কচি আগাছার মত এই হকের আশ্রয়ে জীবিত থাকে। হকের আশ্রয় যখন তার ওপর থেকে সম্পুর্ন সরে যায়- যেমনটা হকপন্থীদের হিজরতের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে-তখন বাতিলের জন্য জীবিত থাকাটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। যে দেহ থেকে প্রানবায়ু মধ্যে থেকে হকপন্থীরা সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিয়ে বিদায় নিয়েছে তারও বিলীন হয়ে যাওয়াটা নিশ্চিত। এ করণেই আমরা নবী-রাসূলদের জীবন-চরিতে পাঠ করে থাকি যে, তাঁদের হিজরতের পর আল্লাহ তাআলা তার জাতিকে অবকাশ দেননি, বরং তাদের সাথে দুই ধরণের ব্যবহর করা হয়েছে।
হিজরতকারী ঈমানদার সম্প্রদায়ের সংখ্যা যদি অতি নগন্য এবং বাতিল পন্থীদের সংখ্যা যদি অধিক থেকে থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা কোন যমিনী অথবা আসমানী আযাব পাঠিয়ে বাতিল পন্থীদের ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং হক পন্থীদের হতে পৃথিবীর উত্তরাধিকার অর্পন করেছেন। হিজরতকারী ঈমানদার সম্প্রদায়কে এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা বাতিরপন্থীদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে অবতীর্ণ হয়ে তাদেরকে হকের সামনে মাথা নত করে দিতে বাধ্য করবে।
এই দুই অবস্থায় হকের বিজয় এবং পরাজয় একেবারেই নিশ্চিত। আল্লাহর শাস্তি যেভাবে অবর্ণনীয় এবং তার মোকাবিলা করা যেতে পারেনা, অনুরূপভাবে হকপন্থী ও বাতিলপন্থীদের সংঘাতও অপরিহার্যরূপে হকের বিজয়ের মাধ্যমেই সমাপ্ত হয়। এই সংঘাত শুরু হয়ে যাবার পর বাতিলের পক্ষে অনেক দিন টিকে থাকাটা মোটেই সম্ভব নয়। আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং তাদের নেতৃত্বাধীনে পরিচালিত জামাআত সমূহ নিজ নিজ যুগের বাতিল পন্থীদের জন খোদায়ী আদালত হিসাবে কাজ করে। এবং তা হক ও বাতিলের মধ্যে পূর্ণ ইনসাফের সাথে ফয়সালা করে। বাতিল যতই শক্তিশালী হোক তাকে এই আদালতের ফয়সালা সামনে মাথা নত করতেই হয়।
নবী-রসূলদের হিজরতের পর এই দ্বিবিধ ফলাফল অপরিহার্যরূপে প্রকাশ পায়। বুদ্ধি-বিবেক এবং ঐশী জ্ঞানও একথার সাক্ষ্য দেয় যে, নবীদের এই পন্থায় সালেহীনদের কোন দল যখন আন্দোলন পরিচালনা করে তখনও এই একই ফলাফল প্রকাশ পায়। অবশ্য আম্বিয়ায়ে কেরাম নিজেদের পরিবেশে চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপনের দায়িত্ব যতটা পূর্ণাংগভাবে আদায় করতে পারেন, অন্যদের পক্ষে তদ্রুপ সম্ভব নয়। একারণে নবীদের নিজ জাতির মধ্য থেকে হিজরত করার পর তাদের ওপর আযাব আসা যেমন অপরিহার্য অন্যান্য হকপন্থী মুমিনদের হিজরত করার পর তাদের জাতির ওপর এ ধরনের আযাব আসা তেমনি অপরিহার্য নয়। তা সত্বেও হক এবং বাতিলের সংঘাতে হকপন্থীরা যদি হকের মস্তক উত্তোলন করার জন্য প্রয়োজনীয় দাবী পূরণ করতেপারে, তাহলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাদের সাহায্য করবেন এবং তাদের সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবেই।
এই হিজরতের পর হকের দাওয়াত তৃতীয় পর্যায় অর্থাৎ জিহাদ এবং যুদ্ধের পর্যায়ে প্রবেশ করে।
তৃতীয় পর্যায় –জিহাদ
হকের দাওয়াতের ক্ষেত্রে যুদ্ধের ডংকা তখনিই বেজে উঠে যখন তাবলীগ ও শাহাদাত আলান-নাস এবং হিজরতের পর্যায় অতিক্রান্ত হয়ে যায়। এর কারণ এই যে, ইসলামী যুদ্ধের জন্য কতিপয় জরুরী শর্ত রয়েছে। এই শর্ত যতক্ষণ পুর্ণ না হয়, হকপন্থীদের জন্য তরবারী ধারণ করা এবং যমিনের বুকে রক্তপাত করা জায়েয নয়। তারা যদি তাড়াহুড়া করে এইরূপ করে বসে তাহলে তাদের এই কাজ একটা বিপর্যয়মূলক কাজ হিসাবে গণ্য হবে। এর জন্য আল্লাহ কাছে সওয়াবের আশা করা তো দূরের কথা উল্টো জবাবদিহি এবং যমিনের বুকে বিপর্যয় সৃষ্টি করার অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে। এই শর্তেগুলো নিম্নরূপঃ
১. প্রথম শর্ত হচ্ছে এই যে, যাদের বিরুদ্দে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়া হবে, প্রথমে তাদের সামনে পূর্ণরূপে হকের প্রচার করতে হবে। হকের এই প্রচারের পূর্বে কোন জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়া জায়েয নয়। কিন্তু কেবল প্রতিরোধ মূলক যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ এই মূলনীতির উর্ধে। প্রতিরোধ মূলক যুদ্ধ যে কোন অবস্থায় করা যায়। এ যুদিধ ব্যক্তিও করতে পারে এবং ব্যক্তিদের জামাআতও করতে পারে। এ যুদ্ধ তাবলীগের শর্তের সাথে আবদ্ধ নয়। যখনই কারো জন-মাল ও ইজ্জতের ওপর কোন আক্রমন আসবে সে নিজের সর্বশক্তি নিয়োগ করে নিজের হেফাজতের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলে। এই রাস্তায় সে যদি নিহত হয় তাহলে সে শহীদ হিসাবে গণ্য হবে। আর যদি আক্রমনকারী দুশমন নিহত হয় তাহলে সে শহীদ হিসাবে গণ্য হবে। আর যদি আক্রমনকারী দুশমন নিহত হয় তাহলে তার দ্বিগুন গুনাহ হবে। এটি এজন্য যে, সে তার জীবনকে একটি অপরাধমূলক কাজ এবং অন্যের অধিকার আত্মস্ৎ করার পথে রক্তাপ্লুত করেছে। দ্বিতীয়ত, সে একজন সত্যপন্থী লোকের তরবারী রক্তে রঞ্জিত করিয়েছে। এখন তার আক্রমণাত্মক যুদ্ধ। এসম্পর্কে কথা হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাবলীগের উপরোক্ত শর্ত পূরণ না হবে ততক্ষণ এই যুদ্ধ শুরু করা জায়েয নয়। কিন্তু এই তাবলীগের দুটি পথ আছে এই দুই অবস্থয় যুদ্ধের নীতিমালার ধরণনও কিছুটা পার্থক্য হয়ে থাকে।
(ক) একটি পন্থা হচ্ছে এই , এই তাবলীগ নবীল মাধ্যমে হবে। নবী তাবলীগ একং প্রমান চুড়ান্তভাবে পেশ করার জন্য কাম=মেল এবং পূর্ণাংগ মাধ্যম। তাঁর মাধ্যমে প্রমান চুড়ান্তভাবে পেশ করার যাবতীয় শর্ত পূর্ণরূপে পালিত হয়। কার্যকারণের এই জগতে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে আশ্বস্ত করার জন্য যা কিছু করা সম্ভব তা একজন নবীই সর্বোত্তম পন্থায় পুরা করে দেন। এ উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাঁকে যাবতীয় উপায় –উপকরণের দ্বারা সুসজ্জিত করে পাঠান। তিনি জাতির মধ্যেকার সর্বোত্তম ব্যক্তি হয়ে থাকেন, সর্বোচ্চ আভিজাত্য নিয়ে আবির্ভূত হন,. তিনি নবুওয়াত লাভের পূর্বেও এবং নবুওয়াত লাভের পরেও পবিত্রতম চরিত্র-নৈতকতার প্রকাশ ঘটান, মিথ্যা কথন, অপবাদ, ষড়যন্ত্র, খারাপ আচরণ, অহংকার ভাব এবং মাতব্বরীর খাহেশ ইত্যাদি মলিনতা থেকে তিনি সম্পূর্ণ পরিত্র। তাঁর এই সৌন্দর্যেরে সাক্ষী যেভাবে তাঁর বন্ধু মহল দেয় অনুরূপ ভাবে তাঁর দুশমনরাও তাঁর উন্নত বৈশিষ্ট ও গুণাবলী অস্বীকার করতে পারেনা। তিনি সবচেয়ে মার্জিত ভাষায় এবং সর্বসাধারণের বোধগম্য করে নিজের দাওয়াত পেশ করে থাকেন। এই দাওয়াতকে জাতির শিশুদের পর্যন্তও পৌছছে দেয়া নিজের রাত-দিনকে এক করে দেন। তার শিক্ষা জ্ঞান ও যুক্তির দিক থেকে এতটা মজবুত এবং শক্তিশালী হয়ে থাকে যে, বিরোধীদের পক্ষে তার জবাব দান সম্ভব হয়না। তাঁর শিক্ষা ও সাহচর্যের প্রভাবে লোকদের জীবনধারা সম্পূর্ণ বদলে যায়- যালেম এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীরা হকপন্থ ও ন্যায় নিষ্ঠ হয়ে যায়, ডাকাত এবং লুণ্ঠনকারীরাও নেককার ও শান্তিপ্রিয় হয়ে যায়, ব্যভিচারী, লম্পট ও অসৎ ব্যক্তিরা পূণ্যবান এবং পবিত্র হয়ে যায়। মদখোর ও জুয়াড়ী পবিত্র ও খোদাভীরূ হয়ে যায়।
রসূল যা কিছু বলেন তা প্রথমে নিজের করিয়ে দেখান। তিনি যে বিধিবিধান ও জীবন-ব্যবসথার দাওয়াত দেন, তার সবচেয়ে বেশী ও অনুরাসী তিনি নিজেই হয়ে থাকেন। তিনি তাঁর সাথীদের জীবনেও তাঁর দাওয়াতের বাস্তব প্রকাশ ঘটান। তিনি লোকদের দাবী অনুযায়ী মু‘জিযাও দেখিয়ে থাকেন। এসব কারণে একজন নবীর দাওয়াত চূড়ান্ত প্রমান সম্পন্ন সর্বশেষ উপায়। যখন নবীল মাধ্যমে কোন জাতির সামনে চূড়ান্ত প্রমান পেশ সম্পন্ন হযো যায়, এরপর আল্লাহ তাআলা সেই জাতির মধ্যেকার হক প্রত্যাখ্যানকারীদের বেঁছে থাকার আর অবকাশ দেননা। বরং অপরিহার্যরূপে দুটি জিনিসের কোন একটি হয়ে থাকে। সতকে গ্রহণকারীদের সংখ্যা যদি নগণ্য হয়ে থাকে এবং জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সত্যের প্রত্যাখ্যানকারী এবং বিরোধী থেকে যায় তাহলে এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা ঈমানদার সম্প্রদায়কে পৃথক করে সরিয়ে নেন এবং হক প্রত্যাখ্যানকারী ও বিরোধীদের কোন আসমানী এবং যমিনী আযাব পাঠিয়ে ধ্বংস করে দেন। হযরত নূহ (আ) হযরত সালেহ (আ) হযরত শোআইব (আ) প্রমুখ নবীদের জাতির সাথে এই ব্যবহারই করা হয়েছে।
যদি হকপন্থীরেদ সংখ্যা হকবিরোধীদের মত উল্লেখযোগ্য পরিমান হয়ে থাকে, তাহলে এই অবস্থায় ঈমানদার সম্প্রদায়কে হক প্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এই হক প্রত্যাখ্যানকারীরা যতক্ষণ তওবা করে আল্লাহর দীনকে কবুল করে না নেয় অথবা তাদের পবিত্রতা থেকে খোদার যমিন যতক্ষণ পাকপবিত্র না হয়ে যায়- ততক্ষণ এই যুদ্ধ চলতে থাকে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চূড়ান্ত ভাবে প্রমাণ পেশ করার পর বণী ইসরাঈলের বিরুদ্ধে এই ধারণেল যুদ্ধের ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এই বিধান যে নীতির ওপর ভিত্তিশীল তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহর রসূল তাঁর লুপ্ত বিধানের প্রকাশকারী হয়ে থাকেন। তিনি যমিনের বুকে আল্লাহর আদালত হয়ে আসেন। তাঁর প্রেরণের একটি অপরিহার্য ফল হচ্ছে যে, হক ও বাতিলের মধ্যে চূড়ান্তি ফয়সালা হয়ে যাবে। হকপন্থীরা জয়জুক্ত হবে এবং বাতিলপন্থীরা পরাজিত হবে। যেহেতু এধরনের শাস্তি ও প্রতিফল পাবার জন্য শাস্তির উপযুক্ত লোকরেদ সামনে আল্লাহর প্রমান চূড়ান্তভাবে পেশ করা জরুরী, এজন্য আম্বিয়ায়ে কেরামদের প্রমান চুড়ান্ত করণের যাবতীয় উপায়-উপকরণ সহ পাঠানে হয়। এই শর্ত যখন পূর্ণ হয়ো যায়, তখন আল্লাহর আমোঘ বিধান হক প্রত্যাখ্যানকারী ও আল্লাহর যমিনে বিপর্যয় সৃষ্টিকারীরেদ আর বেঁচে থাকার সুযোগ দেননা। এই শাস্তি যেহেতু চূড়ান্ত প্রমান পেশ করার পর পাঠানো হয় যার- পরে চূড়ান্ত প্রমাণ পেশ করার আর কোন পর্যায় অবশিষ্ট থাকেনা-একারণে এই শাস্তিকে বলপ্রয়োগে জোরপূর্বক দেয়া হয়েছে এরূপ বলা যায়না। বরং আদল ইনসাফের একান্ত দাবীই হচ্ছে তাই।
আম্বিয়ায়ে কেরামরেদ মাধ্যমে প্রমান চূড়ান্ত হওয়অর পর যেসব লোক আল্লাহর দীনকে কবুল করেনা- তাদের জন্য যদি আরো কিছু অবশিষ্ট থেকে থাকে তাহলে তা শুধু এই যে, অদৃশ্য জগতের পর্দা তুলে নেয়া হবে আর তারা যাবতীয় রহস্য সচক্ষে দেখে নেবে। কিন্তু এই ধরনের পর্দা উত্তোলন আল্লাহ তাআলার প্রাকৃতিক বিধানের পরিপন্থী যা এই দুনিয়ায় কার্যকর রয়েছে। এই দুনিয়ায় আমাদের কাছে ঈমান ও ইসলাম গ্রহণের দাবী জ্ঞানবুদ্ধি, পজ্ঞা ও যুক্তির ভিত্তিতে করা হয়েছে, পর্যবেক্ষন ও প্রত্যক্ষ দর্শনের ভিত্তিতে নয়। এজন্য জ্ঞান ও যুক্তির জন্য যা কিছু প্রয়োজন যখন তা নবীদের মাধ্যমে পাওয়া যায় তখন অবকাশ দেয়ার কোন অর্থ হয়না এবং এরপর শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রেও অযৌক্তিকতার প্রশ্ন উঠতে পারেনা।
(খ) দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে এই যে, নেককার লোকদের মাধ্যমে তাবলীগ হবে। নবীদের মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপন করার কাজ যেরূপ পূর্ণাংগভাবে হয়ে থাকে নেককার লোকদের দ্বারা তদ্রুপ সম্ভব নয়। নবীদের কাছে যে উপায়-উপকরণ থাকে তাও তাদের কাছে পরিপূর্ণরূপে থাকেনা। নেককার লেকদের মানসিক এবং আন্তরীক অবস্থাও আম্বিয়ায়ে কেরামদের সমপর্যায়ে উন্নতি হতে পারে না। উপরন্তু মাসুম নবীগণ যেভাবে সংশয়-সন্দেহ এবং কুধারণার উর্ধে অবস্থান করেন, নেককার লোকদের তা থেকে এরূপ মুক্ত হওয়াটা সম্ভব নয়। এজন্য হকের প্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে নেককার লোকেরা যে যুদ্ধ পরিচালনা করে থাকে তার উদ্দেশ্য কেবল ন্যায় ইনসাফ ও শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্টা করা। তাদের কেবল এই অধিকার আছে যে, যেসব লোক আল্লাহর দীন কবুল করবেনা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের হাত থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে হবে। কারণ এ ক্ষমতাই তাদের ব্যাধিকে আল্লাহর অন্যান্য বান্দাদের আক্রান্ত করতে পারেব। যে পর্যায়ে পৌঁছে তাদের এই উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যাবে সেই সীমায় তাদের থেমে যেতে হবে। এই সীমা অতিক্রম করে সামনে অগ্রসর হওয়ার অনুমতি নেই। যদি তারা এই নির্দিষ্ট সীমা লংঘণ করে এক কদমও সামনে অগ্রসর হয় তাহলে এজন্য তারা আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য হবে।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে সাহাবায়ে কেরামের যুগে এধরণের ‍যুদ্ধই হযেছে। সাহাবাগণ নিজেদের বিপক্ষ জাতির সামনে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব পেশ করতেন। এক. ইসলাম গ্রহণ কর এবং ইসলাম গ্রহণ করে প্রতিটি জিনিসে আমাদের সমান অংশীদার হয়ে যাও। দু. ইসলামী রাষ্ট্রের প্রজা হয়ে যাও এবং একটি নির্দিষ্ট কর প্রদান করে তোমাদের ব্যক্তিগত আইন (Personal Law) ছাড়া অন্য যাবতীয় ব্যাপারে আমারেদ সমাজ ব্যবস্থার অনুগত্য কর। তিন. আমাদের যুদ্ধের ঘোষণাকে গ্রহণ কর। এই অবস্থায় যদিও মনে হয় যে, সাহাবাদের এই তাবলীগ খুবই সংক্ষিপ্ত ছিল এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেরূপ ব্যাপ ও বিস্তারিত ভাবে ইসলামের দাওয়াত পেশ করতেন-সাহাবাগণ লোকদের সামনে অনুরূপভাবে দাওয়াত পেশ করতেন না অথবা দাওয়াতকে মনোপুত করার জন্য যতটা আকর্ষনীয় ভাবে পেশ করা দরকার তারা ততটা করেননি।
এই ধারণা সঠিক নয়। আসল কথা হচ্ছে এই যে, সাহাবাদের যুগে হকের একটি সমাজ ব্যবস্থা কার্যত কায়েম হয়ে গিয়েছিল যা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতী যুগে বরতমান ছিলনা। একারণে সাহাবাগণ ইসলামকে হৃদয়ংগ করানোর জন্য বিস্তারিত ও ব্যাপক প্রচারের মুখাপেক্ষী ছিলেননা। তাদের প্রতিষ্ঠিত হকের ব্যবস্থা স্বয়ং এই সত্যকে প্রকাশ করার জন্য যথেষ্ট ছিল যে, ইসলাম কি তা আল্লাহর বান্দাদের কাছে তাদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিগত জীবনে কোন জিনিসের দাবী করে। এই বাস্তব ও কার্যকর সমাজ ব্যবস্থার কারণে তাদের যুগে প্রতিটি সত্য সুষ্পষ্ট এবং প্রতিটি কথা পরিষ্কার ছিল। আকীদা- বিশ্বাস হোক অথবা কাজকর্ম, সমাজ হোক অথবা রাজনীত-প্রতিটি জিনিস একটি পূর্ণাংগ ও সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি আকারে বিশ্ববাসীর দৃষ্টির সামনে বর্তমান ছিল। একটি ব্যক্তি তা স্বচক্ষে দেখে অনুমান করতে পারত যে, ইসলামের ভেতর এবং বাহির কি, কোন দিক থেকে তা দুনিয়ার অন্যান্য সমাজ ব্যবস্থার তুলনায় শ্রেষ্ঠ এবং কেন শুধু এই ব্যাবস্থারই টিকে থাকার অধিকার রয়েছে এবং এছাড়া অন্যান্য ব্যবস্থাকে ধ্বংস হয়ে যেতে হবে।
এই ধরনের সমাজ ব্যবস্থা যখন কায়েম থাকে তখন তা হকপন্থীদেরকে বিস্তারিত ভাবে দাওয়াত করার দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয়। শুধু এই ব্যবস্থা কায়েম থাকার কারণেই হকপন্থীদের এই অধিকার থাকবে যে, তারা এই ব্যবস্থার আনুগত্য করার জন্য লোকদের কাছে দাবী জানাবে। লোকেরা যদি এই দাবী মেনে নিতে অস্বীকার করে তাহলে তারা এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এই দাবী মেনে নিতে বাধ্য করবো। অ-নবীদের বেলায় চূড়ান্ত প্রমান সমাপ্ত না হওয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম মানুষের এই ব্যক্তিগত অধিকার স্বীকার করে যে, সে যে ধরনের আকীদা বিশ্বাসের ওপর কায়েম থাকতে পারে, কিন্তু ইসলাম কোন দলের এই অধিকার স্বীকার করেনা যে, তারা কোন অবিচার পূর্ণ-জীবন ব্যবস্থাকে জনগণের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে রাখবে।
২. দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে এই যে, এই যুদ্ধ নেককার লোকদের নেতৃত্বে পরিচালিত হতে হবে। কেননা ইসলামী জিহাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে দুনিয়াকে বিপর্যয়, বিশৃংখলা ও বিকৃতি থেকে পবিত্র করা। এজন্য যেসব লোক বিকৃতি ও বিপর্যয়ে লিপ্ত রয়েছে তাদের দ্বারা এই যুদ্ধপরিচালিত হওয়ার কোন অর্থ নেই। যে উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য আল্লাহ তাআলা জিহাদ করার নির্দেশ দিয়েছেন, সেই উদ্দেশ্যের ওপর যেসব লোকের শতকরা একশোভাগ ঈমান রয়েছে- এই জিহাদ কেবল তাদেরই কাজ এবং কেবল তারাই এই জিহাদ করতে পারে। এই ধরণের লোকদের জন্যই তরবারী ধারণ করা জায়েয এবং তাদে যুদ্ধকেই ‘আলজিহাদু ফী সাবীলিল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর পথে জিহাদ’ পরিভাষার মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে। তারা যদি ফিরে আসে তাহলে গাজী অর্থাৎ আল্লাহর পথের সৈনিক উপাধি পাবার অধিকারী হয়। যে সত্য ও ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেই সত্যের প্রতি যাদের ঈমান নেই ইসলাম তাদেরকে কোন একটি লোকেরও রক্তপাত করার অধিকার দেয়না। যদি তারা কোন ব্যক্তির রক্তপাত ঘটায় তাহলে তাদের এই কাজ একটি বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কাজ হিসাবে গণ্য হবে এবং এজন্য তাদেরকে পাকড়াও করা হবে।
ভাড়াকরা লোকদের নিয়ে ইসলামী ফৌজ গঠিত হতে পারেনা। বরং তা এমন লোকদের সমন্বয়ে গঠিত হয় যারা ইসলামের ওপর ঈমান রাখে এবং তার জন্যই যুদ্ধ করে, মৃত্যু বরণ করে। ইসলামী ব্যবস্থার প্রকৃতিগত দাবীই হচ্ছে তা কেবল তার অনুসারীদের দ্বারাই প্রসারিত হবে এবং যেসব লোক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও হকের প্রতিষ্ঠার খাতিরে ইসলাম প্রচারের জন্য চেষ্টা করে কেবল তারাই এটা প্রচার করবে। তাদের প্রচেষ্টার মধ্যে যদি আল্লাহ সন্তুষ্টি অর্জন এবং সত্যের প্রতিষ্ঠিা পবিত্রতম উদ্দেশ্য ছাড়া কোন আগে শামিল হয়ে যায়, তাহলে তাদের এই প্রচেষ্টা ইসলামের দষ্টিতে কেবল মূল্যহীনই নয়, বরং তারা এজন্য যে রক্তপাত ঘটিয়েছে তার শাস্তি তাদেরকে ভোগ করতে হবে।
একারণেই আম্বিয়ায়ে কেরাম জিহাদের ঘোষণা দেয়ার পূর্বে এই ফরজ আদায় করার জন্য নেককার লোকদের নিয়ে দল গঠন করেছেন। তারী ভাড়াকরা লোকদের নিয়ে কোন সেনাবাহিনী গঠন করেননি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধের ব্যাপারে কোন কোন সময় এমনও হয়েছে যে, যেসব লোক ইসলামের ওপর ঈমান রাখতনা এবং শুধু বংশ, গোত্র, ভাষা ও বর্ণভিত্তিক জাতিত্ববোধে অনুপ্রাণিত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহায্য করতে চাইত তারা মুসলমানদেরপক্ষ হয়ে যুদ্ধ করার জন্য নিজেদের খেদমতে পেশ করত। তিনি তাদের এই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি এবং পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, যে উদ্দেশ্য এই যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে সেই উদ্দেশ্যের প্রতি যাদের ঈমান নেই আমি এ কাজে তাদের সাহয্য গ্রহণ করতে পারিনা। হযরত মূসা (আ), হযরত দাউদ (আ), হযরত সুলায়মান (রা) প্রমুখ নবীগণ যেসব যুদ্ধ করেছেন তা সবই ঈমানদার নেককার লোকদের সাহায্য নিয়ে করেছেন।
সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের দ্বারাও প্রমাণিত যে, তাঁদের যুগেও যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে তার সবই এমন লোকদের দ্বারাই হয়েছে যারা বিশ্বাসে ও কর্মে ইসলামের প্রতি অনুগত ছিল। যে জিনিসের প্রচারের জন্য তাদেরকে তরবারী ধারণের অধিকার দেয়া হয়েছে তার প্রতি ছিল তাদের অবিচল ঈমান। তাদের প্রভাব এত বিস্তৃত ছিল যে, ইচ্ছা করলে তারা সহজেই ভাড়াকরা লোকের সাহয্যে সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে পারতেন। শুধু তাই নয় তারা নিজেদের লোকদের নিয়েও বেতনভুক্ত সেনাবাহিনী গঠন করেননি। যখন যুদ্ধের মূহুর্ত সামনে এসে যেত প্রতিটি ব্যক্তি নিজের রসদ এবং নিজের বাহন নিয়ে বেরিয়ে পড়ত এবং শুধু ইকামতে দীনের খাতিরেই জিহাদ করত। তাদের সতর্কতা ও তাকওয়ার মান এতটা উন্ন ছিল যে, শত্রুর সামনা সামনি হওয়ার ঠিক মূহুর্ত যদি কারো অন্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আবেগ ছাড়া অন্য কোন দুনিয়াবী আকর্ষণ এসে যেত তাহলে সাথে সাথে তারা নিজেদের তরবারী কোষবদ্ধ করে নিতেন। তাদের ভয় ছিল নিজেদের ব্যক্তিগত খাহেশের বশবতী হয়ে যেন তাদের হাতে অন্যের রক্তপাত না ঘটে।[ইসলামী রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিকরা কোন কোন অবস্থায় ইসলামী জিহাদের অংশ গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু তার শর্তাবলী এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধরনের। এখানে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ নেই। আমার অন্য পুস্তকে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।]
৩. তৃতীয় শর্ত হচ্ছে এই যে, এ যুদ্ধে একজন ক্ষমতাসীন ও কর্তৃত্বের অধিকারী আমীরের নেতৃত্বে পরিচালিত হতে হবে। কর্তত্বসম্পন্ন ও ক্ষমতাসীন আমীর বলতে নিজের জামাআতের ওপর তার আইনানুগ ক্ষমতা ও কর্তত্ব কায়েম থাকতে হবে, তিনি লোকরেদ ওপর শরীআতের আইন জারি করে এর আনুগত্য করতে তারদের বাধ্য করতে পারেন। এবং তিনি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন শক্তির অধনস্ত হবেন না। এই শর্তের সবচেয়ে পরিষ্কার প্রমান হচ্ছে এই যে, নবী-রসূলদের কেউই যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের অনুসারীদের নিয়ে হিজরত করে কোন মুক্ত এলাকায় সুসংগঠিত হতে পারেননি ততক্ষণ পর্যন্ত কোন যুদ্ধের ষোঘণা দেননি। হযরত মূসা আলাইহিস সালামের জীবন চরিত থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায় এবং মহনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন থেকেও এর সাক্ষ্য পাওয়া যায়। পর্বর্তীকালেও যারা আম্বিয়ায়ে কেরামের পন্থা অনুযায়ী এই ফলজ আঞ্জাম দেয়ার চেষ্টা করেছেন- যেমন হযরত সাইয়েদ আহম শহীদ এবং মাওলানা ইসমাঈল শহীদ- তারাও এ জিনিসটিকে দৃষ্টির সামনে রেখেছেন। তারঁরা একটি মুক্ত এলাকায় পৌঁছে প্রথমে নিজেদের স্বার্বভোম রাষ্ট্র কায়েম করেছেন এবং নিজেদের জামাআতকে সুসংগঠিত করে তাদের মধ্যে ইসলামী শরীআতের যাবতীয় আইন কানুনও কার্যকর করেছেন।
এই দুটি কারণ রয়েছে।
প্রথম কারণ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাআলা কোন বাতিল ব্যবস্থাকে উৎখাৎ করাটা ততক্ষণ পর্যন্ত পছন্দ করেন না।
যতক্ষণ এই সম্ভাবনা না থাকে যে, যেসব লোক এই বাতিল ব্যবস্থাকে উৎখাতে লিপ্ত আছে তারা এর পরিবর্তে কোন হকের ব্যবস্থা কায়েম করতে পারবে। নৈরাজ্য ও বিশৃংখল অবস্থা হচ্ছে একটি অপ্রাকৃতিক অবস্থা। বরং এটা মানব প্রকৃতির এতটা পরিপন্থী যে, একট অবিচারমূলক ব্যবস্থাও এর পরিবর্তে অগ্রাধিকার পেতে পারে। একারণে আল্লহ তাআলা এমন কোন দলকে যুদ্ধ বাধার অধিকার দেননি বা সম্পূর্ণ অপরিচিত, যার শক্তি ও ক্ষমতা অজ্ঞাত ও সংশয়পূর্ণ, যার ওপর কোন ক্ষমতাশালী আমীরের কর্তৃত্ব কায়েম নেই, যার আনুগত্য ‍ও বিশ্বস্ততার পরীক্ষ হয়নি, যার জনশক্তি বিক্ষিপ্ত ও বিশৃংখল অবস্থায় রয়ে গেছে, যা কোন ব্যবস্থাকে উলোটপালট করে দিতে পারে সত্য কিন্তু তদস্থলে এই বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত ব্যবস্থাকে সুসংহত করতে সক্ষম-এরূপ প্রমাণ পেশ করতে পরেনি। এই ভরসা কেবল এমন একটি জামাআতের ওপরই করা যায়-যারা কার্যত একটি রাজনৈতিক দলের আকার ধারণ করেছে এবং নিজের গণ্ডির মধ্যে এমন ভাবে সুশৃংখল সুসংগঠিত যে, তার ওপর আল-জামাআত’ পরিভাষা প্রযোজ্য হতে পারে। এই ধরণের বৈশিষ্ট ও মর্যাদা অর্জন করার পূর্বে কোন জামাআতকে ‘আল-জামাআত’ হওয়ার চেষ্টা করার অধিকার নেই। তবে তাদের এই প্রচেষ্ঠা জিহাদের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু সশস্ত্র জিহাদ করার জন্য পদক্ষেপ শুরু করার অধিকার তাদের নেই।
(খ) দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে এই যে, জনগণেল ওপর যুদ্ধে লিপ্ত কোন আমাআতের যে কর্তৃত্ব কায়েম হয় তা এতটা অসাধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ যে, এমন কোন জামাআত তা আয়ত্বে রাখতে পারেনা- যার ওপর তার নেতার নৈতিক পর্যায়ের কর্তৃত্ব স্বীকৃত। নৈতিক পর্যায়ের কর্তত্ব লোকদের যমিনের বুকে বিশৃংখলা সৃষ্টি থেকে বিরত রাখতে সক্ষম নয়। এ কারণে শুধু নৈতিক কর্তত্বের ওপর ভরসা করে কোন ইসলামী দলের নেতার পক্ষে তার অনুসারীদের তরবারী ধারণের অনুমতি দেয়া জায়েয নয়। অন্যথায় একবার তরবারী যখন চমকে উঠবে তখন তা হালাল- হারামের সীমার অনুগত না থাকার যথেষ্ট আশংকা রয়েছে। তাদের দ্বারা এমন সবকাজ হবে যার উৎখাতের জন্যই তরবারী ব্যবহার করা হয়েছিল।
সাধারণ বিপ্লবী দলগুলো- যার শুধু একটি বিপ্লব ঘটাতে চায় এবং যাদের দৃষ্টির সামনে এর বেশী কিছু থাকেনা যে, তারা বর্তমান ব্যবস্থাকে ওলোটপালট করে দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের কর্তৃত্ব খতম করে তদস্থলে নিজেদের কর্তত্ব কায়েম করবে- এ ধরণের বাজি খেলে এবং খেলতে পারেব। তাদের দৃষ্টিতে কোন ব্যবস্থার ভেংগে পড়াটাও কোন দুর্ঘটনা নয় এবং জুলুম অত্যাচারের আশ্রয় নেয়াটাও কোন অপরাধ নয়। এ কারণে তাদের জন্য সবকিছুই জায়েয।
কিন্তু একটি ন্যায়নিষ্ঠ ও সত্যপ্রিয় দলের নেতাদের অবশ্যই দেখতে হয় যে, তারা যে ব্যবস্থা থেকে আল্লাহর বান্দাদের বঞ্চিত করছে- তার চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা তাদের জন্য কায়েম করার যোগ্যতা তাদের আছে কি না? যে জুলুম অত্যাচারকে তারা ‍নির্মুল করার পদক্ষেপ নিচ্ছে- নিজেদের লোকদেরকেও এই ধরণের অত্যাচার থেকে বিরত রাখতে তারা সক্ষম কি না? যদি তা না হয় তাহলে যে বিপর্যয়ের মুখ বন্ধ করার জন্য তরবারী ধারণ করেছিল সেই বিপর্যয় নিজেরাই সৃষ্টি করে বসবে।
৪. চতুর্থ শর্ত হচ্ছে শক্তি অর্জন। কিন্তু নেককার লোকদের সংগঠনকে এজন্য আলাদা কোন বন্দোবস্ত করার প্রয়োজন নেই। ওপর যে তিনটি শর্ত বর্ণনা করা হয়েছে তা যথাযথভাবে পূর্ণ করতে পারল প্রয়োজনীয় শক্তি আপনা আপনি এসে যায়। একটি সঠিক দাওয়াত বিভিন্ন ধরণের শক্তি ও যোগ্যতা সম্পন্ন লোকরেদ নিজের চারপাশে সংঘবদ্ধ করে নেয় এবং তাদের মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় পুঁজিও সরবরাহ হয়ে যায় এবং কাজের প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ অথবা তা ‍সৃষ্টি করার যোগ্যতাও তাদের মধ্যে পাওয়া যায়। অতপর যখন তা সংগঠনের আকার ধারণ করে এবং একটি স্বাধীন পরিবেশে নিজেকে একটি আনুগত্যের অধীন করে নেয়- তখন তার নৈতকি এবং আধ্যাত্মিক শক্তিও দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং বস্তুগত উপায়-উপকরণ সরবরাহ ও সৃষ্টি করার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। অতএব শক্তি অর্জনের বিষয়টি মূলত উল্লেখিত শর্তসমূহ পূরণ করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। শক্তি অর্জনের জন্য এর থেকে ভিন্নতর কোন বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়না। তবুও আক্রমনাত্মক যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহও একটি অপরিহার্য শর্ত। এই শক্তি অর্জনের পূর্বে যদি কোন জামাআত যুদ্ধের ষোঘণা দেয় তাহলে সে নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করার অপরাধী সাব্যস্ত হবে।
এই সব শর্তের ধরণ ও স্বরূপ সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করার পর আপনা আপনিই এই সত্য প্রতিভাত হয়ে উঠে যে, কোন হকের দাওয়াতের ক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রসংগটি দাওয়াত ও হিজরতের পর্যায় অতিক্রম করার পর কেন আসে? মূলত এই দুটি পর্যায় অতিক্রম করার পরই-যাদের বিরুদ্ধে ইসলাম যুদ্ধ করার অনুমতি দিয়েছে- তারা সুনির্দিষ্ট ভাবে সামনে এসে যায়। আর এই দুটি পর্যায় অতিক্রম করার পরই কোন সংগঠন সঠিক অর্থে আপন সত্তার প্রতিভাত হয়- তরবারীর সাহায্যে ন্যায়- ইনসাফ ও শক্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করার যার অধিকার রয়েছে। যেসব লোক আম্বিয়ায়ে কেরারমের কাজের এই পারস্পর্য সম্পর্কে অবহিত নয় এবং শুধু সাধারণ বিপ্লবী সংগঠণ সমূহের কর্মপন্থার দ্বারা প্রবাবিত, তাদের এই সব পর্যায়ের উপকারিতা ও পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা উচিৎ।

-:সমাপ্ত:-

About মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী