দাওয়াতে দীন ও তার কর্মপন্থা

তাবলীগের প্রচলিত পন্থায় বাস্তব কর্মগত ত্রুটি

তাবলীগের প্রচলিত পন্থায় কর্মগত দিক থেকেও ভ্রান্তি কম নয়। এর কতিপয় ভ্রান্তির দিকে আমরা ইংগিত করব।
প্রথমত ত্রুটিঃ প্রথম বাস্তব কর্মগত ভ্রান্তি হচ্ছে মুসলমানদের দ্বিমুখী নীতি। অর্থাৎ একদিকে তারা একটি মৌলিক জামাআত হওয়ার দাবী করছে- যা ইসলাম ঈমানের মূলনীতির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। কিন্তু অপরদিকে তারা নিজেদের মধ্যে এমন বৈশিষ্ট জমা করেছে যেগুলো বংশ- গোত্র, আঞ্চলিকতা ও ভাষার ভিত্তিতে গড়ে উঠা কোন জাতির মধ্যে পাওয়া যায়। একদিকে তারা বলছে, মুসলমান সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ, তাঁর রসূল, তাঁর কিতা এবং আখেরাতের ওপর ঈমান এনেছে এবং যাবতীয় কাজকর্ম, সামজিকতা ইত্যাদি সার্বিক ক্ষেত্রে আল্লাহ এবং তাঁর রসূলদের বাতানো পন্থায় অনুসরণ করে। অপরদিকে তাদের মধ্যে এমন অসংখ্য লোক রয়েছে, যাদের শুধু মুসলমান নামটাই অবশিষ্ট আছে এবং তারা মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে। এছাড়া কোন দিক থেকেই ইসলামের সাতে তাদের কোন সামঞ্জস্য নেই।
একদিকে তাদে দাবী হচ্ছে- জীবনের প্রতিটি দিকে ও বিভাগে তাদের পথপ্রদর্শক হচ্ছেন মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ (সা)। অপর দিকে তারা নিজেদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের বাগডোর এমন লোকদের হাতে তুলে দিয়েছে- যারা জ্ঞান ও কর্ম উভয় দিক থেকে আল্লাহ রসূলে হেদায়াত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। একদিকে তারা নৈতিকতা ও কর্মের একটি পূর্ণাং বিধান পেশ করে এবং দাবী করে যে, এ থেকে বিচ্যুত হয়ে কেউ মুসলমান থাকতে পারেনা। অপর দিকে দুশ্চরিত্র ও দুষ্কর্মের যত রকম ও প্রকার অন্য জাতির মধ্যে পাওয়া যায়, তার সবগুলোর নমুনা তারা নিজেরাই পেশ করছে। এবং এতে তাদের মুসলমানিত্বের কোনরূপ ক্ষতি হয়ন। এ দিকে তারা একটি সত্য দীনের সাথে নিজেদের যাবতীয় সম্পর্ প্রমাণ করছে এবং দাবী করছে যে, এ থেকে মুখ ফিরিয়ে পলায়ন করা জায়েয নয়। কিন্তু অপর দিকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে মুস্তফা কালাম (তুরস্ক) পর্যন্ত গোটা ইতহাসকে ইসলামের ইতিহাস বলে চালিয়ে দিচ্ছে। অথচ এই ইতিহাসের একটা বিরাট অংশের সাথে ইসলামের সত্য জীবন বিধানে সামন্যতম সামঞ্জস্যও নেই।
একদিকে তারা দাবী করছে, ইসলাম একটি স্বয়ং সম্পীর্ণ জীবন-বিধান এবং আজ যদি কোন বিধানে দুনিয়ার মুক্তি থেকে থাকে তাহলে তা এই বিধান গ্রহণ করার মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু অপর দিকে তার ইউরোপ আমেরিকা সফর করে দেখতে চেষ্টা করছে যে, ইংরেজদের ব্যবস্থা অধিক ইসলামী না আমেরিকান ব্যবস্থা?
মুসলমানরা তাদের এই দ্বিমুখী নীতি উপলব্ধি করতে পারুক বা না পারুক, কিন্তু অন্য জাতির লোকদের তা অনুধাবন করতে কষ্ট হওয়ার কোন কারণ নেই। তারা মুসলমানদের কথা ও কাজের মধ্যেকার বৈপরিত্য দেখে হতবুদ্ধি হয়ে যায়। এরপর যদি তাদের মধ্যেকার কোন ব্যক্তির ইসলামের প্রতি আকর্ষণ থেকেও থাকে তাহলে এই বৈপরিত্য দেখে থেমে যায় এবং সে মনে করে মুসলমানরাও তাদের মতই একটি জাতি। অতএব এ ধরণের এক জাতিকে পরিত্যাগ করে আরেক জাতির অন্তর্বূক্ত হওয়ার কি অর্থ থাকতে পারে?
আমাদের এই দ্বিমুখীপনা সত্ত্বেও যদি কোন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেও থাকে তাহলে বিশ্বাস করা উচিৎ যে, সে আমাদের দাওয়াত পেয়ে ইসলাম গ্রহণ করেনি। বরং আল্লাহ তায়ালা তার সামনে তার ধর্মের ভ্রান্তি তুলে ধরার সাথে সাথে মুসলমানদের ভ্রান্তিও তার সামনে পরিস্কার করে তুলে ধরেছেন। সে ইসলাকে মুসলমানদের থেকে স্বতন্ত্র করে দেখে থাকে।
দ্বিতীয় ত্রুটিঃ দ্বিতীয় বাস্তব কর্মগত ভ্রান্তি হচ্ছে এই যে, মুসলমানরাও খৃষ্টান মিশনারীদের দেখাদেখি তাবলীগের জন্য সব সময় সমাজের নিম্ন শ্রেণীর লোকদের ওপরই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে। অথচ এই পন্থা সম্পূণ্য ভ্রান্ত। দীনের দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথমত সেই শ্রেণীর লোকদের সম্বোধন করা উচিত যাদের চিন্তা ও দর্শনের নেতৃত্বে সমাজের ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে। এই শ্রেণীর লোকেরাই মূলত কোন জাতিকে গড়ে তুলে বা তার পতন ঘটায়। যদি তাদেরকে সৎপথে নিয়ে আসা যায় তাহলে গোটা ব্যবস্থাপনা আপনা আপনি সৎপথে চলে আসবে। যদি তারা ভ্রান্ত পথে থেকে যায় তাহলে প্রথমত নিম্ন শ্রেণীর লোকদের মধ্যে এমন কোন যোগ্যতা বর্তমান নেই যা তাদের সংশোধন করতে পারে। যদিওবা এ ধরনেরে যোগ্যতা তাদের মাঝে থেকে থাকে তাহলে সেটা একটা ব্যতিক্রম মাত্র। বরং তাদের পরাজিত মনোবৃত্তি খুব দ্রুত বুদ্ধিজীবি শ্রেণীর ভ্রান্তিকে গ্রহণ করে নেয়। এর দৃষ্টান্ত অনেকটা হৃদয় এবং অংগ-প্রত্যংগের মত। যদি অন্তরের সংশোধন হয়ে যায় তাহলে গোটা দেহ আপনা-আপনি সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু যদি অন্তরে রোগ বর্তমান থাকে তাহলে অংগ-প্রত্যংগে তৈল মালিশ করে কোন ফায়দা নেই।
খৃষ্টান মিশনারীদের সামনে শুধু নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধির প্রশ্নই ‍ছিল। অতিএব তাদের জন্য এই পন্থা ফলপ্রসু হতে পারে। কিন্তু মুসলমানদের জন্য শুধু সংখ্যা বৃদ্দির উদ্দেশ্য নিয়ে তাবলীগ করা জায়েয হতে পারেনা। তাদের কাজ হচ্ছে পথহারা লোকগুলোকে সঠিক পথে নিয়ে এসে আল্লাহর সাথে তাদের সম্পর্ক জুড়ে দেয়া, সঠিক দিক থেকে তাদের জীবনকে পুনর্গঠিত করা। গোটা সমাজকে পুর্গঠিত করতে পারলেই ব্যক্তির পুনর্গঠন সম্ভব। সমাজের নেতৃস্থানীয় লোকেরা যখন সংশোধন কার্যক্রমকে গ্রহণ করবে তখনই সমাজের পুনর্গঠন আশা করা যেতে পারে। যারা সমাজ ও সংগঠনের কমবেশী ‍দৃষ্টি রাখে তার এই সত্যকে অস্বীকার করতে পারেনা যে, গণবিপ্লব ও বৈপ্লবিক আন্দোলন নীচ থেকে শুরু হয়ে উর্ধতন ব্যবস্থাপনাকে বিশৃংখল করে দিতে পারে। কিন্তু সংশোধন মূলক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়াত কেবল তখনই শিখড় মজবুত করতে পারে যখন তা উপর থেকে নীচের স্তরের দিকে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।
মুসলমানদের মধ্যে যারাই দাওয়াতের কাজ করেছে- তা মুসলমানদের মধ্যেই হোক অথবা তাদের বাইরে- তারা সাধারণতভাবে যে ভুল করেছে তা হচ্ছে- তাদের দৃষ্টি সব সময় নিম্ন শ্রেণীর লোকদের ওপরই পতিত হয়েছে। তারা তাদেরকে শুধু কালেমা পড়িয়ে অথবা নামায শিখিয়ে মনে করে বসেছে যে, এখন তাদের সংশোধন হয়ে গেছে। নিসন্দেহে এভাবে কিছুটা আংশিক সংশোধন হতে পারে। কিন্তু সামগ্রিক জীবনে এভাবে কোন পরিবর্তন আসতে পারেনা। সামগ্রিক পরিবেশ যখন খারাপ থাকে তখন রোগের চিকিৎসার পরিবর্তে বরং রোগরে কারণ সমূহের মূলোৎপাটন করার চেষ্টা করা উচিৎ। যেসব আবর্জনাপূর্ণ নালা জীবনু ছড়ায় এবং বাতাসকে দুষিত করে সেগুলো মাটি দিয়ে ভরে ফেলার চেষ্টা করা উচিৎ। এছাড়া যে সংশোধন প্রক্রিয়া চালানো হবে তা কোন ব্যক্তিকে মহামারী-পূর্ণ এলাকায় আটকে রেখে টিকা-ইনজেকশন দেয়ার মতই হবে। এতে সাময়িক ভাবে মহামারীর আক্রমণ প্রতিহত করা যেতে পারে হয়ত, কিন্তু স্থায়ী ফল লাভ করা সম্ভব নয়।
এ কারণেই নবী-রসূলগণ প্রথমে সাধারণ লোকদের সম্বোদন করার পরিবর্তে সমাজের নেতৃস্থানীয় লোকদের মন-মানসিকতায় পরির্তন আনয়নের চেষ্টা করেছেন এবং তাদের সংশোধনকে জনসাধারণের সংশোধনের মাধ্যম বানিয়েছেন।
তৃতীয় ত্রুটিঃ বাস্তব কর্মগত তৃতীয় ভ্রান্তি হচ্ছে এই যে, মুসলমানরা কেবল মৌখিক উপদেশকেই তাবলীগের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। প্রকৃত ইসলামী জিন্দেগীর বাস্তব নমুনা পেশ করার চেষ্টা করেনি। অথচ একক ভাবে ইসলামের মূলনীতি সমূহের সৌন্দর্য অবলোকন করে খুব কম সংখ্যক বুদ্ধিমান এবং অসাধারণ নৈতিক যোগ্যতা সম্পন্ন লোকই ইসলাম গ্রহণ করতে পারে। দুনিয়ার বিরাট সংখ্যক লোক কেবল তখনই এসব মূলনীতির সত্যতা স্বীকার করবে যখন তারা বাস্বত জীবনে তার কার্যকরিতা এবং উত্তম ফল সৃষ্টি করতে দেখতে পাবে। কিন্তু আমাদের এখানে ইসলামের তাবলীগের নামে যে চেষ্টা সাধণা চালানো হচ্ছে তার রহস্য কেবল এতটুকু যে- বক্তাগণ সুললিত কণ্ঠে, প্রচারকগণ আবেগ-উত্তেজনা সহকারে এবং লেখকগণ দুনিয়ার মানুষকে ইসলামী জীবন-পদ্ধতির কাল্পনিক বেহেশতে পরিভ্রমন করাচ্ছেন। আরো মজার কথা হচ্ছে এই যে, একদিকে তারা ইসলামের সামাজিক- সাংস্কৃতিক কল্যাণের প্রশংসায় আসমান ও জবীনের মধ্যবর্তী স্থানকে মুখরিত করছে, অপর দিকে গোটা মুসলম সমাজ নিজেদের জাহেলিয়াতের যাবতীয় নোংরামী পুঞ্জিভুত করে তাদের দাবীকে মিথ্যা প্রমাণ করছে। কর্মের নিরব ভাষা দাবীর সকল ভাষার তুলনায় অধিক প্রভাবশালীর। এ কারণে এইসব ওয়াজ-নসীহত শূন্যে বিলীন হয়ে গেছে এবং দুনিয়ার বুকে এর কোন স্থায়ী প্রভাব অবশিষ্ট থাকেনি।
অতএব, শুধু মৌখিক বক্তব্যের পরিবর্তে যদি কিছু সংখ্যক আল্লাহর বান্দা যেসব মূলনীতির ওপর ঈমান এনেছে তার ভিত্তিতে একটি সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করার চেষ্টা করত এবং এই প্রচেষ্টায় তারা যদি সফলকাম নাও হত-তবু তারা অধিক কর্যকর খেধমত আঞ্জাম দিতে পারত- বক্তাগণ নিজেদের ওয়াজ-নসীহতে সফল হয়েও যে খদমত আঞ্জাম দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামকে সারা দুনিয়ার মানুরে জন্য কল্যাণকর প্রমাণ করার জন্য শুধু অথীতের কিছু বিষ্ময়কর ইতিহাস বর্ণনা করাই যথেষ্ট হতে পারেনা। ইসলাম বর্তমানও মানব জাতির জন্য অতীতের সেই কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসতে পারে- একথার সমর্থনে শুধু প্রবন্ধ রচনা করা ও বক্তৃতা বিবৃতি দেয়ায়ও কোন ফায়দা নেই। এর একমাত্র পন্থা হচ্ছে এই যে, ইসলামের মৌলনীতির ওপর ঈমান আনয়নকারী জামায়াত একতাবদ্ধ হয়ে এসব মূলনীতির বাস্তব উদাহরণ পেশ করবে। দুঃখের বিষয় সবকিছুই হয়েছে কিন্তু শুধু এটাই হয়নি।
চতুর্থ ত্রুটিঃ চতুর্থ ভ্রান্তি হচ্ছে এই যে, মুসলমনরাও ইসলামের প্রচারের ক্ষেত্রে খ্রীষ্টান মিশনারীদের মত কতিপয় খোলঅ পন্থা অবলম্বন করেছে। খ্রীষ্টানরা দুনিয়ার পতিত শ্রেণীকে যেসব লোভ-লালসা ও স্বার্থের টো দেখিয়ে খ্রীষ্টান বানিয়েছে, মুসলমানরাও সে সব পন্থা অবলম্বন করতে চাচ্ছে। ব্রাহ্মণ সমাজ নিজেদের স্বার্থে যেসব টোপ ব্যবহার করছে, মুসলমানরাও তাই ব্যবহার করতে চাচ্ছে। বিতর্কের ক্ষেত্রে অন্যরা যে বাড়াবাড়ি, যে বক্র পন্থা এবং যে উদ্যত মুষ্ঠি ব্যবহার করছে, মুসলমানরাও তাতে মোটেই পিছিয়ে নেই। মুসলমানদের মধ্যে কোন ব্যক্তি লালসার শিকার হয়ে অথবা কোন ভ্রান্তির শিকার হয়ে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করলে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা নিজেদের বিজয়ঢংকা বাজাতে থাকে। অনুরূপ ভাবে কোন হিন্দু ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করি দিলেই মুসলমানরা তাকে আসমানে তোলার চেষ্টা করে।
নির্বোধ কিশোরদের ফুসলিযে বিপথগামী করা অন্যদের কাছে যেমন ধর্ম প্রচারের কর্মসূচীর একটি গুরুত্ব পূর্ণ অংশ ছিল, অনুরূপ ভাবে মুসলমানদের মধ্যেও এরূপ পন্থাকে বৈধ মনে করা হল। মানসিক উত্তেজনার বশতবর্তী হয়ে যদি কোন হিন্দু নারী কোন বল্গাহীন মুসলমানের হাত ধরে পলায়ন করে তাহলে এটাকে ইসলারেম প্রচার কার্যেরে এক বিরাট বিজয় মনে করা হত। এ ধরনের নির্লজ্জতা ও লামপট্য ধ্মকে সহায়তা করা উপাদানে পরিণত হল। এর ফলে অসংখ্য ভ্রষ্টা নারী এবং লম্পট পুরুষ ধর্মান্তরকে একটা পেশায় পরিণত করে নিয়েছে। সকাল বেলা নিজেকে মুসলমান বলে জাহির কর মুসলমানদের কাঁধে সওয়ার হত এবং বিকেল বেলা নিজেকে হিন্দু অথবা খ্রীষ্টান বলে ঘোষণা করে তাদের কাছ থেকে টাকা পয়সা লাভ করত।
যে যুগে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় শুদ্ধি সংগঠনের খুব প্রভাব ছিল, এক মুসলমান বুযর্গ দিল্লীর মুসলমান পতীতাদের কাছে আবেদন করল- তার যেন তাদের অমুসলিম খদ্দেরদের কাছে ইসলামের তাবলীগ করে। এর ফলে অমুসলিমদের দৃষ্টিতে ইসলাম একটি মূল্যহীন বস্তুতে পরিণত হল। তারা মনে করে বসল, ইসলাম হচ্ছে একটা ব্যবস্থা, যা নিজ জাতির সংখ্যা বৃদ্ধির একটি উপায় মাত্র। সাধারণ লোকদের ধোকা দেয়ার জন্য মুসলমানরা এটাকে আল্লাহর দীন বলে তাদের সামনে পেশ করে থাকে। এরূপ ধারণা করাটা তাদের জন্য সম্পূর্ণ সংগত ছিল। কেননা যে উদ্দেশ্যে এবং ডেয পন্থায় অমুসলিমরা নিজেদের ধর্মকে ব্যবহার করছিল, ঠিক সেই উদ্দেশ্যে এবং সেই একই পন্থায় যখন তারা মুসলমানদেরও তাদের ধর্মকে ব্যবহার করতে দেখল তখন তাদের অন্তরে ইসলামের শ্রেষ্টত্বের ছার কি করে পড়তে পারে?
পঞ্চম ত্রুটিঃ পঞ্চম বাস্তব কর্মগত ভ্রান্তি হচ্ছে এই যে, মুসলমানরা দুনিয়ার যে কোন কাজের জন্য কোন না কোন যোগ্যতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। কিন্তু দুটি কাজের জন্য কোন যোগ্যতার প্রয়োজন আছে বলে তারা মনে করেনা। মসজিদের ইমামতী ও দীনের তাবলীগ। এমন এক যুগ ছিল যখন নামাযের ইমামতী করত ইসলামী রাষ্ট্রের আমীর অথবা তার প্রতিনিধি। আর আজকে দিনে যে ব্যক্তি দুনিয়ার কোন কাজ আঞ্জাম দেয়ার যোগ্যতহা রাখেনা মুসলমানরা নিজেদের মসজিদের ইমাম নিযুক্ত করার জন্য তাকে খুজে বেড়ায়। এক কল্যাণময় যুগের মুসলমানরা মনে করত আল্লাহর রসুল যে দায়িত্বানুভুতি, কর্মতৎপরতা ও মনোনিবেশ সহকারে এই দীনকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন ঠিক সেই দায়িত্বানূভূতি, কর্মতৎপরতা ও মনোনেবেশ সহকার এই দীনকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যই আল্লাহ তায়ালা এই উম্মাতকে মনোনীত করেছেন। আর ইসলামী খিলাফত তার সর্বিক বিভাগ ও কর্মচারীদের নিয়ে রিসালাতের এই দায়িত্বই পালন করার একটি মাধ্যম ছিল। এদায়িত্ব আল্লাহর রসূলে পক্ষ থেকে এই উম্মাতের ওপর অর্পিত হয়েছিল। আর আজকের অবস্থা হচ্ছে এই যে, গোটা মুসলিম সমাজ তার সমস্ত বুদ্ধিমান ও কর্মতৎপর সদস্যদের নিয়ে একটি জাহেলী ব্যবস্থার খেদমতে নিয়েচিত রয়েছে।
প্রচলিত তাবলীগের পন্থার মধ্যে যেসব মোটা মোটা বুদ্ধিবৃত্তিক এবং কর্মগত ভ্রান্তি রয়েছে আমরা সেদিকে ইংগিত করলাম। এগুলোর সার্বিক মূল্যায়ন রলে আরো অনেক ভ্রান্তি পরিলক্ষিত হবে। কিন্তু আমরা আলোচনাকে আর দীর্ঘায়িত করতে চাইনা। এই ভ্রান্তিগুলোর উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, নবী-রসূলগণ যে পন্থায় দীনের প্রচারকার্য চালিয়েছেন তার সাথে বর্তমানে প্রচলিত পন্থায় কোন দুরতম সম্পর্কও নেই। নবীদের সামনে যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল, এদের সামনে সে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অনুপস্থি। তাঁদের যে কর্মপন্থা ছিল তার সাথে এদের কর্মপন্থায় কোন যোগসূত্র নেই। এদের উদ্দেশ্য-লক্ষ এবং কর্মপন্থায় অমুসলিম সংগঠন সমুহের অনুকরণ বিস্তার লাভ করেছে। এজন্য আমরা বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করতে চাই যে, নবী-রসূলগণ কি উদ্দেশ্যে তাবলীগ করেছেন এবং কিভাবে তাবলীগ করেছেন। এজন্য তাঁরা কি কি উপায় উপকরণ এবং কি পন্থা অবলম্বন করেছেন তাও আমরা উল্লেখ করব। প্রচারকার্যে তাঁদের কোন কোন স্তর অতিক্রম করতে হয়েছে। প্রতিটি স্তরের দাবী এবং যিম্মাদারী তারা কিভাবে পূরণ করেছেন এবং তাঁদের এই সংগ্রামের ফলে দুনিয়া কি কি কল্যাণ লাভ করেছে- আমরা তাও আলোচনা করব।

About মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী