দাওয়াতে দীন ও তার কর্মপন্থা

নবী-রসূলগণ প্রথমে কাদের সম্বোধন করতেন

আম্বিয়অয়ে কিরাম আলাইহিমুস সালাম নিজেদের উদ্দেশ্যের প্রচারের জন্য সর্বপ্রথম কোন লোকদের সম্বোধন করতেন এবং কিভাবে সম্বোধন করতেন?
প্রশ্নের প্রথম অংশের অর্থ হচ্ছে এই যে, এমনি তো নবীদেরকে গোটা জাতির কাছে পাঠানো হয়, কিন্তু তাঁরা কি কাজের সূচনাতেই জাতির সব লোকদের আহ্বান জানাতেন অথবা প্রাথমিক পর্যায়ে জাতির বিশেষ স্তরের লোকদের সম্বোধন করতেন? যদি বিশেষ পর্যায়ের লোকদের আগে সম্বোধন করে থাকেন তাহলে তারা কোন্‌ পর্যায়ের লোক? সাধারণ পর্যায়ের লোকদের না যারা সর্ব সাধারণের নেতৃত্ব দান করত তাদের সর্পপ্রথম দাওয়াত দিতেন?
প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, এটা একটা বাস্তব ব্যাপার যে, প্রত্যেক নবীর উম্মতের কাছে প্রাথমি পর্যায়ে তাঁর দাওয়াত অপরিচিত বলে মনে হত, বরং তারা এর চরম বিরোধিকা করত। অতপর নবীগণ কি তাদের সবাইকে কাফের অথবা প্রত্যাখ্যানকারী মনে করে নিয়ে নিজেদের দাওয়াতের সূচনা এভাবে করতেন যে, হে কাফেরগণ! ঈমান আন, হে মুশরিকগণ! আল্লাহকে এক বলে মেনে নাও, অথবা তাদের সম্বোধনের ধরন ভিন্নরূপ ছিল?
এ দুটি প্রশ্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা সঠিক ভাবে উপলব্ধি করতে না পারার কারণে লোকেরা দাওয়াতের সূচনাবিন্দু নির্ধারণ করতে গিয়েও ভুল করে বসেছে। উপরন্তু তারা নিজেদের এবং নিজেদের সম্বোধিত ব্যক্তিদের সঠিক পজিশন অনুধাবন করতে গিয়েও বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়েছে। এর ফলে হয় গোটা দাওয়াত একটি ভ্রান্ত বিন্দু থেকে শুরু হওয়ার কারণে প্রভাবশূণ্য হয়ে থেকে গেছে, অথবা আহ্বানকরী এবং আহ্বানকৃত ব্যক্তির সঠিক অবস্থান নির্ধারিত না হওয়ার কারণে তারা এটি ফিৎনার রূপ ধারণ করে নেয় এবং সংশোধনের পরিবর্তে এর মাধ্যমে বিরাট বিরাট বিপর্যয় মাথা চাড়া দিয়ে উঠে।
নবীগণ সমসাময়িক নেতাদের সম্বোধন করেছেন
এই অনুচ্ছেদে আমরা প্রশ্নের প্রথমাংশের জবাব দেয়ার চ্টো করব। কুরআনের পেশকৃত ইতহাসের আলোকে আমাদের মতে এ প্রশ্নের জবাব হচ্ছে যে, আম্বিয়িা আলাইহিমুস সালাম সর্ব প্রথমে জাতির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আল্লাহর দীনকে কবূল করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা এদের সংশোধনকে জনসাধারণের সংশোধনের উপায় বানাতেন। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সর্বপ্রথম নিজ বংশের লোকদের কাছে দীনের দাওয়াত পেশ করেন। সে সময় তারাই জনগণের ধর্মীয় নেকার পদে সমাসীন ছিল। অতপর তিনি সমসাময়িক বাদশার কাছে দীনের দাওয়াত পেশ করেন- যার হাতে জাতির রাজনৈতক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল এবং যে নিজেকে লোকদের জীবন মৃত্যুর মালিক বলে মনে করে নিয়েছিল। (আরবী**************)
“তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখনি, যে ইবরাহীমের সাথে তার রব সম্পর্কে বক্র বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল? তা হয়েছিল এই জন্য যে, আল্লাহ তাকে রাজত্ব দান করেছিলেন।” –(সূরা বাকারাঃ২৫৭)
আল্লাহ তায়ালা হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন সর্বপ্রথম ফিরাউনকে তার দীনের দিকে আহ্বান জানান। (আরবী********************************)
“তুমি ফিরাউনের কাছে যাও। সে সীমা লংঘন করেছে। তাকে জিজ্ঞাসা কর, তুমি পবিত্রতা অর্জন করতে প্রস্তুত আছ? আমি কি তোমাকে তোমার রবের দিকে পথ দেখাব যাতে তুমি তাঁকে ভয় করতে পার।” –সূরা নাযিআতঃ১৭-১৯)
হযরত দানিয়াল আলাইহিস সালাম তাঁর সমসাময়িক প্রভাবশালী বাদশা নবুখায নসরক সর্ব প্রথম দীনের দাওয়াত দেন। ইরমিয়া নবী শামালের বাদশাদরে সামনে তাঁর নবুয়াতর দাবী পেশ করেন। মসীহ আলাইহিস সালাম সর্পপ্রথম ইহুদী আলেমদের সম্বোধন করেন। অনুরূপভাবে নূহ আলাইহিস সালাম, হুদ আলাইহিস সালাম, লূত আলাইহিস সালাম, শুআইব আলাইহিস সালাম সবার দাওয়াত কুরআন মজীদে উল্লেখিত আছে। তাদের প্রত্যেক সমসাময়িক যুগের সমাজপতি ও গর্ব-অহংকারে ফেটে পড়া লোকদের সর্বপ্রথম আল্লাহর দীনের দিকে আহ্বান জানান এবং তাদের চিন্তাধারা ও মতবাদের ওপর আঘাত হানেন। সবশেষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব ঘটে। তাকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, নিজের কোরাইশ বংশীয় আত্মীয়-স্বজনদের শাস্তির ভয় দেখাও। এই লোকেরা আরবদের ধর্মীয় এবং গোষ্ঠীপতি-শাসিত রাষ্ট্রের কর্ণধার ছিল। তিনি তাদের মাধ্যমে গোটা আরবের নৈতিক এবং রাজনৈতকি পথ প্রদর্শকের কাজ করিয়াছেন।
আরব বিশ্ব ছাড়া অবশিষ্ট দুনিয়ায় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য তিনি মধ্যপন্থী উম্মাতকে যে পন্থা শিখিয়েছেন তা হচ্ছে এই যে, তিনি দুনিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রধানদের কাছে চিঠি লিখেছেন এবং সর্বপ্রথম তাদের সামনে ইসলামকে তুলে ধরেছেন। তিনি তাদের কাছে দাবী করলেন “তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, শান্তিতে থাকতে পারবে। অন্যথায় তোমাদের এবং তোমাদের অধীনস্তদের পথভ্রষ্টতার দায়দায়িত্ব তোমাদেরই বহন করতে হবে।” উম্মাদের নেতৃবৃন্দও যেন সাধারণ ভাবে দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য এই পন্থার অনুসরণ করে। উল্লেখিত বক্তব্য যেদিকে ইংগিত করছে। খেলাফতে রাশেদার গোটা ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম সাধারণ জাতির ওপর ‘সাক্ষী’ হওয়ার দিক থেকে আল্লাহ এবং তাঁর রসুল তাঁদের সাধারণ দাওয়াতের যে দায়িত্ব ভার অর্পণ করেন তা তাঁরা রসূলের প্রদর্শিত পন্থায়ই আঞ্জাম দেন।
হযরত ঈসার আহবান
একটি বাস্তব সত্য হচ্ছে এই যে, যাদের দরজায় সর্বপ্রথম হেদায়াতের সূর্য আলো বিচ্ছুরণ করে তারাই আল্লাহর দীনকে গ্রহণ করার ব্যাপারে সবচেয়ে পেছনে থেকে গেছে। যারা নবীদের ইতিহাস সম্পর্কে খোজ রাখে তারা এসত্যকে অস্বীকার করতে পারেনা। আবিসিনিয়ার বিলাল (রা), এশিয়া মাইনরের সুহাইব (রা), পারস্যের সালমান (রা) এবং মদীনার কৃষিজীবী মানুষেরাই দূরদুরান্ত থেকে আসতেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে চলে যেতেন। কিন্তু কুরাইশ নেতা আবু লাহাব, আবু জাহল, উমাইয়া ইবনে খালফ প্রমুখ এবং তায়েফের যেসব সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের সামনে আল্লাহর রসূল রাতদিন হকের দাওয়াত দিয়েছেন, তারা এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থেকে গেল। আরবের সাধারণ লোকেরাই বরং এই দাওয়াতের কল্যাণ লাভ করে ধন্য হল। অথচ তখনো তাদের কাছে সরাসরি দাওয়াত পৌঁছেনি, পরক্ষভাবে পৌঁছে ছিল।
যেসব লোক প্রথমে দাওয়াত পায় তারা দাওয়াত গ্রহণের বেলায় পেছনে পড়ে থাকে। আর যারা দাওয়াত পরে পায় তারা দাওয়াত কবুল করার বেলায় সবার আগে থাকে। হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের কথা সত্য প্রমানিত হয়েছে।
তিনি বলেছেন, “কত লোক অগ্রবর্তী হয়ে আছে তারা পেছনে থেকে যাবে। আর কত লোক আছে যারা পেছনে রয়েছে, তারা সামনে এসে যাবে।”
কিন্তু তা সত্বেও নবী রসূলগণ তাঁদের দাওয়াদের ক্রমিক ধারা পরিবর্তন করেননি। তাঁরা প্রথমে সমাজের প্রতিপত্তিশালী লোকদের সামনে দাওয়াত পেশ করতেন। এদের বাড়াবাড়ি এবং একগুয়েমী যখন তাদে নিরাশ করে দিত তখন তাঁরা সাধারণ মানুষের কাছে দাওয়াত নিয়ে উপস্থিত হতেন। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম নবুওয়াত প্রাপ্তির পর থেকে অনবরত ইহুদী আলেমদের অনমনীয়তার ওপর আঘাত করতে থাকেন। কিন্তু একটা উল্লেখযোগ্য ধরে চেষ্টা-সাধনার পরও যখন তাদের গর্ব-অহংকার এবং ঔদ্ধত্যপূণর্ধ কুটনীতির প্রস্তর ভেংগে দেয়া সম্ভব হয়নি, তখন তিনি তাদেরকে পরিত্যাগ করে ঝিলের পাড়ের জেলেদের কাছে চলে গেলেন। তিনি তাদের ডেকে বললেন,“হে মাছ শিকারীগণ! এসো আমি তোমাদের মানুষ শিকারী বানিয়ে দেই ।” আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্য থেকে এমন একটি ঈমানদার সম্প্রদায় দান করলেন যারা তাঁর নামে প্রসিদ্ধিলাভ করে।
(আরবী**************************)
“ঈসা যখন তাদের (ইহুদী আলেম) কুফরীর ওপর অবিচল থাকার ব্যাপারটি অনুভব করল, তখন (সাধারণ লোকরেদ উদ্দেশ্য করে) বলল, আমরা আল্লাহর সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহর ওপর ঈমান আনলাম। আপনি সাক্ষী থাকুন, আমরা তাঁ অনুগত হয়ে গেলাম।” –(সূরা আলে ইমরানঃ১৫২)
উল্লেখিত আয়াতে ঈসা আলাইহিস সালামের সাধারণ আহবানের দিকে ইংগিত করা হয়েছে- যখন তিনি সাধারণ ভাবে দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং যখন তিনি সমসাময়িক ধর্মীয় নেতা ও সমাজপতিদের সত্যকে গ্রহণ করার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গিয়েছিলেন। এ সময় তিনি গরীব শ্রেণী এবং সাধারণ লোকদের সামনে দীনের দাওয়াত পেশ করেন। তিনি আবেগময় ভংগীতে দাওয়াত পেশ করলেন, ফলে তা নদীর পাড়ের জেলেদের মনকে মোমের মত গলিয়ে দিল। কিন্তু এই দাওয়াত জেরুজালেমের কেতাদুরস্ত ধর্মীয় নেতাদের মন গলাতে পারলনা। অবশেষে এই সাধারণ লোকদের মধ্য থেকেই হকের পতাকাবাহী এমন একদল খাদেম সৃষ্টি হল- যারা ঈমানের বিরাট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আল্লাহর দীনকে এই দুনিয়ায় বিজয়ী করেছে। (সূরা সফ- এ এই সত্যের দিকেই ইংগিত করা হয়েছে।)
(আরবী******************************)
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর সাহায্যকারী হয়ে যাও, যেমন ঈসা ইবনে মরিয়ম হাওয়ারীদের বলেছিল, আল্লাহর রাস্তায় কে আমার সাহায্যকারী হবে। হাওয়ারীগণ বলল, আমরা আল্লাহর সাহায্যকারী। অতএব বণী ইসরাঈলের সমাজপতিগণ) কুফরীর পথ অবলম্বন করল। অতপর আমরা ঈমানদার লোকদের তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য করলাম। অতএব তারা জয়যুক্ত হল।” –(সূরা সফঃ১৪)
হযরত ঈসা মসীহ আলাইহিস সালাম হেদায়াত এবং গোমরাহির প্রসংগে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং পশ্চাদবর্তী ব্যক্তি সামনে এসে যাবে।” আল্লাহর দীনকে আপন করে নেয়ার ক্ষেত্রে যদিও সাধারণ লোকেরাই সর্বপ্রথম এগিয়ে এসেছে, কিন্তু তা সত্বেও নবী রসূলগণ যতক্ষণ সমসাময়িক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ব্যাপারে নিরাশ না হতেন- ততক্ষণ সাধারণ লোকদের সরাসরি সম্বোধন করেতেন না।
রসূলুল্লাহর আহ্বান
গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলে ঠিক এই অবস্থা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি য়ো সাল্লামের দাওয়াতের মধ্যেও দৃষ্টিগোটর হবে। তিনি আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী সর্বপ্রথম কুরাইশ গোত্রের লোকদের কাছে আল্লাহর দীনের দাওয়াত পেশ করেন। তারা সে সময় গোটা আরব জাহানের ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতা ছিল। কুরাইশ গোত্রের প্রতিটি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির সামনে তিনি এক এক করে দাওয়াত পেশ করেন। তাদের পক্ষ থেকে যখন ঘৃণা বিদ্বেষ, বিরোধিতা প্রকাশ পেল, তখন তিনি তাদের হেদায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়াও করেছিলেন। তাদের মধ্যে যারা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিল-তিনি তাদের কতেকের নাম ধরেও দোয়া করেছেন। যেমন বর্ণিত আছে যে, তিনি দোয়া করেছিলেন, “হে আল্লাহ, উমর অথবা আবু জাহলকে হেদায়াত দান করে ইসলামে শক্তি বৃদ্ধি করে দিন।”
এই লোকদের হেদায়াতের জন্য তিনি এতটা উদগ্রীব ছিলেন, অনেক সময় তিনি নিজের আরাম-আয়াশের প্রতিও লক্ষ রাখতেন না এবং নিজের ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার খেয়ালও করতেন না। এজন্য কোন সময় এমনও হত যে, ইতপিূর্বে যেসব লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মুখাপেক্ষী-তাদেরকেও সময়মত শিক্ষা-প্রশিক্ষণ দেয়ার অবসর পেতেন না। এসব সত্বেও তিনি একটি উল্লেখযোগ্য সময় পর্যন্ত এসব লোকদের নিয়ে ব্যস্ত থাকেন এবং তাদের যে কোন ধরণের তিরষ্কার, উপহাস, ঘৃণা, বিদ্বেষ ও বিরোধিতা সহ্য করতে থাকেন। এমনকি যখন প্রমাণ চূড়ান্ত করার হক আদায় হয়ে গেল, তখন আল্লাহ তায়ালা তাকে এদের পেছনে সময় নষ্ট করতে নিষেধ করে দিলেন এবং যাদের সম্পর্কে ঈমান আনার আশা করা যায়, তাদের দিকে মনোযোগ দেয়ার নির্দেশ দিলেন। কারণ এরা নেতৃত্বের বিশেষ রোগ থেকে মুক্ত ছিল। এজন্য আশা করা যাচ্ছিল যে, হকের উপদেশ দিলে তারা তা শুনবে এবং মানবে। এই স্থানে পৌঁছে আল্লাহ তাআলা তার নবীকে গর্ব অহংকারে ফেটে পড়া লোকদের উপেক্ষা করার নির্দেশ দেন। (আরবী******************************)
“অতএব তুমি তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। এজন্য তুমি তিরষ্কৃত হবেনা। তুমি নসীহত করতে থাক। কেননা নসীহত ঈমানদার লোকদের জন্য উপকারী।” –(সূরা যারিয়াতঃ ৫৪, ৫৫) (আরবী***************************)
সে ভ্রু কুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। এইজন্য যে, তার কাছে অন্ধ ব্যক্তি এসছে। তুমি কি জান হয়ত সে পবিত্রতা অর্জন করবে, অথবা নসীহত গ্রহণ করবে এবং তা তার উপকারে আসবে। যে লোক উন্নসিকতা দেখায়, তুমি তার পেছনে লেগে গেছ। অথচ সে যদি পবিত্রতা অর্জন না করে, তাহলে তোমার ওপর কোন অভিযোগ নেই। আর যে ব্যক্তি তোমার কাছে আগ্রহ সহকারে আসে এবং সে খোদাকেও ভয় করে তার প্রতি তুমি অনীহা প্রদর্শন করছ। কক্ষণও নয়। (এই অহংকারীদের এতটা পরোয়অ করার প্রয়োজন নেই) এতো এক উপদেশ মাত্র। যার ইচ্ছা তা গ্রহণ করবে। তা এমন এক সহীফার লিপিবদ্ধ যা সম্মানিত, উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন এবং পবিত্র। তা মর্যাদাবান এবং পূণ্যবান লেখকদের হাতে থাকে।” –(সরা আবাসাঃ১-১৬)
(আরবী*******************************)
“তুমি দুনিয়ার এই দ্রব্যসামগ্রীর প্রতি চোখ তুলে তাকাবেনা যা আমরা কাফেরদের কোন কোন দলকে দিয়েছি। তাদের দুর্ভাগ্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করনা। নিজের দয়া-অনুগ্রহের ডানা মুমিনদের ওপর প্রসারিত করে রাখ।” (সূরা হিজরঃ৮৮)
এই পন্থায় দাওয়াত দেয়ার কারণ
নবী রসূলদের দাওয়াতহ পেশ করার এই ক্রমিক ধারা অবলম্বন করাটা কোন আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং এর কতগুলো বিশেষ কারণ রয়েছে। এর কতিপয় কারণ আমরা এখানে উল্লেখ করব।
প্রথম কারণঃ এর সবচেয়ে বড় এবং সর্বাধিক সুস্পষ্ট কারণ হচ্ছে এই যে, সাধারণ লোকেরা জ্ঞান ও কর্মে এবং চরিত্র নৈতিকতার ক্ষেত্রে সমাজের প্রভাবশালী এবং কর্তত্ব সম্পন্ন লোকদের অনুসারী হয়ে থাকে। প্রবাদ আছে যে,
“প্রজা চলে রাজা চালে।” এজন্য সমাজের ও রাষ্ট্রের কর্ণধারগণ যদি সংশোধন কর্মসূচীকে গ্রহণ কর নেয়, তাহলে সাধারণ লোকেরা আপনা আপনী সংশোধন হয়ে যাবে। যদি তারা এ পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়ায়, তাহলে সাধারণ লোকেরা প্রথমে কোন কার্যক্রম গ্রহণ করেনা। যদিও বা কবুল করে তাহলে এর প্রভাব অতি দ্রুত খতম হয়ে যায়।
দ্বিতীয় কারণঃ নবী-রসূলগণ সমাজের বিশিষ্ট শ্রেণীর বিরুদ্ধে না কোন রাজনৈতিক অথবা অর্থনৈতিক প্রতিহিংসায় লিপ্ত হন, আর না পতিত শ্রেণীর জন্য তাদের অন্তরে কোন অনর্থক পক্ষপাতিত্ব থাকে। তাঁরা কখনো নিম্ন শ্রেণীর লোকদেরকে উচ্চ শ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রেণী সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার জন্য উত্তেজিত করেননা এবং এই উচ্চ শ্রেণীকে নিম্নস্তরে ঠেলে দেয়ার এবং নিম্ন শ্রেণীকে উচ্চ স্তরে তুলে দেয়ার চেষ্টাও করেন না। তাঁরা যে মিশন নিয়ে দুনিয়ায় এসেছেন, কোন বিপর্যয় ও দুষ্কৃতিকে অন্য কোন বিপর্যয় ও দুষ্কর্মের সাহায্যে পরিবর্তন করে দেয়ার মাধ্যমে তা সফল হতে পারেনা। বরং গোটা সমাজকে খোদাভীতি, আত্মীয়-সম্পর্কে এবং আখেরাত ভীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমেই এই মিশন সফল হতে পারেব। এজন্য সাধারণ এবং বিশেষ উভয় শ্রেণীকেই তাঁরা সমান ভালবাসা ও সহানুষূতির দৃষ্টিতে দেখে থাকেনা। উভয়ই যাতে নিজ নিজ রোগ থেকে মুক্ত হয়ে সুস্থতাকে গ্রহণ করতে পারে সেজন্য তাঁরা সমানভাবে চেষ্টা করে যান। অবশ্য এই সংশোধন প্রচেষ্টায় তাঁরা বিশেষ শ্রেণীর সংশোধনকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। এর কারণ হচ্ছে এই যে, সমাজের মধ্যে মূলত তারাই রোগাক্রান্ত হয়ে থাকে এবং তাদের স্পর্শে অবশিষ্টরা রোগাক্রান্ত হয়। এজন্য তারা প্রথমে এদের চিকিৎসার চিন্তা করে থাকেন। তাদের সুস্থ্য করে তুলতে পারলে অন্যদের সুস্থ করতে তেমন বেগ পেতে হয়না।
অপরদিকে যেসব লোক উচ্চ শ্রেণীর বিরুদ্ধে এক ধরণেল অর্থনৈতিক প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধের আবেগ দ্বারা তাড়িত, তাদের কর্মপন্থা নবীদের কর্মপন্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। এরা সাধারণ মানুষকে পুজিগতিদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে শ্রেণী সংগ্রাম বাধিয়ে দেয়। এর পরিনতিতে তাদের মতানুযায়ী সএমন গণ-একনায়কতন্ত্র কায়েম হয় যা তাদের ধারণায় যাবতীয় কল্যাণ ও মুক্তির চাবিকাঠি। আসলে এই খুন-খারী ও রক্তপাতে পরিনতি এছাড়া আর কিছুই হয়না যে, পুরানো পুঁজিপতিদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব খতম হয়ে যায় এবং নতুন পুঁজিপতিদের একনায়ত্ব তাদের স্থান দখল করে নেয়। যুলুম, নির্যাতন ও অন্যায় অবিচারের ইজারা যা এতদিন গুটিকয়েক পুরানো পুঁজিপতি পরিবারের হাতে ছিল, তা গুটিকয়েক নতুন পরিবারে দখলে চলে যায়। এই বিপ্লবের দ্বারা দুনিয়ার যদি কোন উপকার হয়েও থাকে তা শুধু এই যে, একদলের প্রতিশোধের আগুন নির্বাপিত হয়ে যায় এবং যুলুম-নির্যাতন, অন্যায়-অবিচার চালানো এবং শক্তি ও ক্ষমতা প্রদর্শেনের যে খায়েশ তারা এ পর্যন্ত দাবিয়ে রেখেছে এবং যা প্রকাশ করার যুযোগ এ পর্যন্ত পাওয়া যায়ঢনি তা প্রকাশ করার এবং নতুন খেলা শুরু করার রাস্তা খুলে যায়। যাদের দৃষ্টিসীমা কেবল এধরণের সংশোধনের দিকে নিবদ্ধ- তারা নিসন্দেহে জনগণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে পারে।
কিন্তু নবী-রসূলগণ যে বিপ্লব সাধনের জন্যূ আসেন- তা কেবল জারকে স্টালেন এবং লেলিনের মাধ্যমে পরিবর্তন করে দেয়ার মাধ্যমে পূর্ণ হতে পারেনা। বরং তা বড় এবং ছোট সবার মধ্য থেকে যুলমনির্যাতন এবং অন্যায়-অবিচারের প্রবণতাকে খতম করে দেয়ার মাধ্যমে পূর্ণ হতে পারে। একারণে এই ধরণের হৈহুলোড় ও দাংগাবাজী তাদের উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
তৃতীয় কারণঃ তৃতীয় কারণ হচ্ছে এই যে, জাতির মধ্যে যেসব লোক উচ্চ পর্যায়ে হয়ে থাকে, তারা সাধারণত বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকেও উন্নতর হয়ে থাকে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাধান্যই মূলত তাদেরকে নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করে। একারণে যে দাওয়াতের উদ্দেশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাগত ও কর্মত বিপ্লব সাধন তা তাদেরকে উপেক্ষা করেতে পারেনা। এই লোকেরা যদি কোন নির্ভুল চিন্তাধারাকে গ্রহণ করে নেয়, তাহলে এর ভিত্তিতে তার কোন বৃহৎ থেকে বৃহত্তর ব্যবস্থাকে পরিচালিত করতে পারে। এদিক থেকে তাদের একটা বিশেষ মূল্য রয়েছে। তাদের বিনষ্ট করলে ক্ষতি তাদের হয়না, বরং যে সমাজ থেকে তাদের শেষ করে দেয়া হয় সেই সমাজেরই ক্ষতি হয়। গনবিপ্লব সাধনের মাধ্যমে যদি তাদের শেষ করে দেয়া হয়, তাহলে গোটা সমাজ মাখন তোলা দুধের সমতুল্য হয়ে যায়। এই সমাজ যখন বিপ্লবের প্রচণ্ডতা থেকে অবসর হয়ে জীবনের পুনর্গঠনের নতুন নকসা প্রনয়ন করে, তখন সে নিজেরে দেউলিয়ত্ব অনুভব করতে পারে। এসময় সে পরিষ্কার দেখতে পায় সামনের কাজের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক এবং চিন্তাগত যোগ্যতার খুবই প্রয়োজন। কিন্তু যোগ্যতা তাদের বাহিনী সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছে।
রুশ বিপ্লবের প্রথম পর্যায় অতিক্রম হওয়ার পর এই অবস্থাই সৃষ্টি হয়েছিল। বিপ্লব শেষ হওয়ার পর যাদের হাতে ক্ষমতা আসে তার মোটেই জানতনা যে, নিজেদের মতাদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা কিভাবে চালাতে হবে। ফল হল এই যে, আগন এবং রক্তের হোলিখেলা করে তারা যে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করেছে তা নিজেরা সামলাতে পারলনা। বরং তা সামলানোর জন্য সেই লোকদের ওপর ন্যস্ত করতে হল, যাদের কাছ থেকে তা ছিনিয়ে আনা হয়েছিল। এই গ্রুপটি জনতার হট্টগোলে প্রভাবিত হয়ে এই নতুন মতবাদের সামনে মাথা নত করে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিজেদের মনের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন ঘৃণা এবং শত্রুতা লুকিয়ে রেখেছিল। একারণে তারা এই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে মোনাফিকী পন্থায় ব্যবহার করেছিল এবং তাদের হাতে এই সর্বপ্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সেই পরিণতিই হল- যা কোন বিপ্লবকে মোনফিকী পন্থায় অবলম্বনকারীদের হাতে হয়ে থাকে।
নবীদের দাওয়াতের পদ্ধতি এ ধরণের ভ্রান্তি থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তাঁরা নিজেদের দাওয়াতের পদ্ধতি এ ধরনের ভ্রান্তি থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তাঁরা নিজেদের দাওয়াত সর্বপ্রথম প্রতিভাবান সম্প্রদায়ের কাছে পেশ করেছেন। এই স্তরের যেসব লোক প্রজ্ঞার সাথে সাথে ব্যক্তিগত চরিত্রের দিক থেকে উন্ন ছিল, তারা দাওয়াত কবুল করার সাথে সাথে তাদের সহায়তায় দাওয়াতের শক্তিও বেড়ে যেত।
خياركم في الجاهلية خياركم في الاسلام .
“জাহেলী যুগে তোমাদের মধ্যে যারা উত্তম ছিল, ইসলামেও তারা উত্তম প্রমানিত হবে- যখন তারা দীনের জ্ঞান লাভ করবে।”
এ হাদীসে সেই সত্যের দিকেই ইংগিত করা হয়ছে। এটা দাওয়াতের সেই পন্থারই বরকত যে, ইসলাম হযরত আবুবকর (রা) ও হযরত উমরের (রা) মত লোক পেয়ে গেল। একদিকে তারা নিজেদের প্রতিভাবলে দাওয়াতের প্রাণ সত্তাকে নিজেদের মধ্যে এমন ভাবে শুষে নিলেন যে, তাঁরা নিজেরাই দাওয়াতের তাত্ত্বিক ব্যখ্যাকার হয় গেলেন। অপরদিকে নিজেদের উন্নত নৈতিক ও চারিত্রিক যোগ্যতার কারণে তারা এতটা শক্তির অধিকারী ছিলেন যে, এই দাওয়াতের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাংগ সমাজ-ব্যবস্থা গঠন করে তা পরিচালনা করেছেন এবং দুনিয়াকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ইসলাম বাস্তব দিক থেকে এসব কিছুই করতে চায়।
চতুর্থ কারণঃ চতুর্থ কারণ এই যে, এই শ্রেণীর লোকেরা বস্তুগত দিক থেকেও শ্রেষ্ঠ হয়ে থাকে এই বস্তুগত শ্রেষ্ঠত স্বয়ং কোন কারপ জিনিস নয় যে, তাকে অবশ্যই ঘৃণা করতে হবে। এর মধ্যে যদি কোন খারপ দিক থেকে থাকে তাহলে এটা কেব তখনই হতে পারে, যখন তা বাতিলের সমর্থন ও শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিণতি হয়। তা যদি বাতিলের সমর্থন ও শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিণত হয়। তা যদি বাতিলের পরিবর্তে হকের সাহায্য সমর্থণ ও শক্তি বৃদ্ধির উপায়ে পরিনত হয়- তাহলে সুলায়মান আলাইহিস সালামের শানশওকত এবং যুল কারনাইনের রাজত্ব যেভাবে একটি বিরাট নিআমত ও বরকত ছিল, অনুরূপ ভাবে প্রত্যেক বস্তুগত প্রাধান্যও আল্লাহ তাআলার এক বিরাট নিআমত ও বরকত ছিল, অনুরূপ ভাবে প্রত্যেক বস্তযুগত প্রাধান্যও আল্লাহ তাআলার এক বিরাট নিআমত। কুরাইশ নেতাদের দাওয়াত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে এতটা ব্যতিব্যস্ত ছিলেন, তাতে তাঁর দৃষ্টির সামনে অন্য যেসব ছিল যে, এসব লোক যদি দাওয়াত কবুল করে নেয়, হাতলে যে বস্তুগত উপায় উপকরণ তাদের অধিকারে রয়েছে তাও ইসলামের সাহায্য- সহযোগিতায় আপনা আপনি উৎসর্কৃত হবে। এর ফলে একদিকে যেমন বাতিলের হাত থেকে এক বিরাট শক্তি খসে পড়বে, অপরদিকে এই শক্তি দীনে হকের হাতে এসে বাতিলের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী তরবারিতে পরিণত হবে।
প্রতিটি হকের দাওয়াতের সূচনা সহায় সম্বলহীন অবস্থায় হয়ে থাকে। অতপর তা ধীরে ধীরে সমসাময়িক বস্তুগত উপায়-উপাদানকে হস্তগত করে এবং আবিষ্কার উদ্ভাবন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের শক্তিকে অধীন করে নেয়। পরে সুযোগ মত তা বাতিলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। এই জিনিসটা দুনিয়ার অন্য আন্দোলনের নেতারা যেমন আশা করে থাকে অনুরূপ ভাবে আম্বিয়িায়ে কেরামগণও তা চান। কিন্তু অন্যদের চাওয়ার মধ্যে এবং নবীদের চাওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাঁদের কাছে এই বৈষয়িক উপায়-উপকরণ এতটা গুরুত্ব লাভ করতে পারেনা যে, এর সামনে আসল উদ্দেশ্য গুরুত্বহীন হয়ে থেকে যাবে। এ কারণে যে স্তরে বৈধয়িক উপায়-উপরণের আকংখা নির্দিষ্ট সীমা লংঘন করতে যায় সেখানেই আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীদের থামিয়ে দেন। তিনি নির্দেশ দেন, তোমরা কাফেরদের বিষয় সম্পদের দিকে দৃষ্টি দিওনা। তোমাদের দাওয়াত তার পাথেয় ও বাহন এবং তার নিরাপত্তা ও উন্নতির উপায়-উপকরণ তার নিজের সাথেই রাখে। আল্লাহ তাআলা নিজের তোমাদের এবং আমাদের দাওয়াতের পৃষ্ঠপোষক।
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى
“আর এই কাফেরদের মধ্যে যেসব লোকদের পরীক্ষার সম্মুখীন করার জন্য আমরা বৈষয়িক সম্পদের চাকচিক্য দান করেছি-তুমি সেদিকে চোখ তুলে তাকাবেনা। তোমার প্রভুর রেযেক অধিক উত্তম এবং স্থায়ী। তুমি নিজের ঘরের লোকদের নামায পড়ার নির্দেশ দাও এবং এর ওপর অবিচল থাক। আমরা তোমার কাছে রেযেক চাচ্ছিনা। আমরাই তোমাকে রেযেক দান করছি। আর পরিনামে তাকওয়ারই কল্যাণ হয়ে থাকে।” –(সূরা তা হাঃ ১৩১, ১৩২)
পঞ্চম কারণঃ পঞ্চম কারণ হচ্ছে এই যে, আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালাম এমন একটি সত্য জীবন বিধান কায়েম করার জন্য দুনিয়ায় এসেছেন, যার ভিত্তি আল্লাহর বন্দেগী, ঈমানদার সুলভ পর্যালোচনা, নিরপেক্ষ সমালোচনা, গবেষনা এবং পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে যাবতীয় কাজ আঞ্জাম দেয়ার (শূরা) নীতির ওপর রাখা হয়েছে। এখানে ব্যক্তি পূজার কোন স্থান নেই। এ কারণে তাঁরা স্বাভাবিক ভাবেই সর্বপ্রথম এমন লোকদের পেঝনে চলার পরিবর্তে নিজের চিন্তাধারা ও সিদ্ধান্তের অনুসরণ করতে পারে। যেসব লোকের মধ্যে এই সৌন্দর্য বর্তমান নেই তারা নবীদের মিশন সফল করার জন্য মোটেই যোগ্য নয়। এই ধরনের যোগ্যতা সম্পন্ন লোক এমনিতেই যে কোন স্তরের লোকদের মধ্যেই থাকতে পারে এবং আছে। কিন্তু মনিমুক্তর অন্বেষন প্রথমে খনিতেই করা হয়, আবর্জনার মধ্যে নয়। এজন্য নবী-রসূলগণ শ্রেণীকে সম্বোধন করে থাকেন। যতক্ষন তাদের ব্যাপারে নিরাশ না হন ততক্ষণ অন্যদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেন না।
পক্ষান্তরে যেসব লোক মূলনীতি ও উদ্দেশ্যের পরিবর্তে নিজেদের ব্যক্তিত্বের পূজা করতে চায়,তারা সর্বদা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীকে এড়িয়ে সর্বসাধারণের মধ্যে নিজেদের আন্দোলন পরিচালনা করে থাকে। এ ধরণের লোকদের মধ্যে যদি রাজনৈতিক যোগ্যতা ও শক্তি থেকে থাকে তাহলে তারা নিজেদের ডিকটেটরশীপ কায়েম করে। যদি তাদের মধ্যে রাজনৈতিক যোগ্যতা না থেকে থাকে, অথবা যোগ্যতা তো আছে কিন্তু এজন যে শক্তির প্রয়োজন তা নেই তাহলে এরা সাধারণ নেতা হয়েই থেকে যায়। আবর যদি তার ধর্মীয় ব্যাপারে প্রতারণা ভন্ডামী ও ছলচাতুরির আশ্রয় নিতে সিদ্ধাহস্ত হয়ে থাকে তাহলে পীর-মুরিদীর ব্যবসা ফেঁদে বরে। এ ধরনের লোকেরা প্রতিভাবান শ্রেণীকে এতটা ভয় করে- দিনের আলোকে চোর যতটা ভয় করে থাকে। তাদের যাবতীয় খেলা অন্ধকারেই ভাল জমে থাকে। এজন্য তারা অন্ধকারকেই পছন্দ করে।
ষষ্ঠ কারণঃ ষষ্ঠ কারণ হচ্ছে এই যে, যদি কোন সমাজের প্রতিভাবান স্তরকে বাদ দিয়ে সাধারণ লোকদের মাধ্যমে কোন আন্দোলন শুরু করা হয়, তাহলে সাধারণের মধ্যে যেসব লোক এ আন্দোলনকে কবুল করে নেয়-তারা সংশয়-সন্দেহের শিকারে পরিনত হয়। বরং তারা একধরণের হীনমন্যতার রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং যতক্ষণ সমাজের উচ্চ শ্রেণীর কিছু লোক এই আন্দোলনের অনুসারী না হয়ে যায়, ততক্ষণ তাদের মধ্যে এতটা আত্মপ্রত্যয় সৃষ্টি হতে পারেনা যার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে তারা বিপ্লবের জন্য বাজি লড়তে পারে। এর মনস্তাত্বিক কারণ সস্পষ্ট। তা হচ্ছে এই যে, তারা যদিও মনেপ্রাণে আন্দোলনকে কবুল করে নিয়েছে, কিন্তু সাথে সাথে তারা এও দেখতে পাচ্ছে যে, যেসব লোকের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং বস্তুগত প্রাধান্য তারা এ পর্যন্ত স্বীকার করে আসছে আন্দোলনকে যারা কবুল করেনি এটা তাদেরই ত্রুটি। আবার কখনো এইমনে করে থাকে যে, খুব সম্ভব আন্দোলনের দর্শনের মধ্যেই কোন দুর্বলতা রয়েছে- যা তাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছেম কিন্তু এদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছেনা। এই দোটানা রোগ তাদেরকে আন্দোলনের জন্য সম্পূর্ণ অযোগ্য বানিয়ে রেখে দেয় এবং তার আন্দোলনকে স্বীকার করে নিয়েও যেন প্রত্যাখ্যান কারীদের কাতারেই থেকে যাচ্ছে।
আম্বিয়ায়ে কেরামদের কর্মপন্থা এই ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তাঁরা প্রথমেই সেইসব লোকদের চিন্তাধারা ও মতবাদের ওপর আঘাত হানেন, যাদের নেতৃত্বে সমাজব্যবস্থা পরিচালিত হয়। কিছুকাল ধর দ্বন্দ্ব সংঘাত চলার পর একদিকে তাঁরা সমসাময়িক নৈতিক, রাজনৈতিক এবং অধিভৌতিক দর্শনের মূল্যৎপাটন করে রেখে দেন, অপর দিকে যেসব লোক ভ্রান্ত দর্শনের ওপর সমাজব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করে তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলেন। এসময় সাধারণ লোকেরা নিরপেক্ষ থেকে এই যুদ্ধে কোন পক্ষে সত্য রয়েছে। চিন্তাশীল লোকেরা প্রথম পর্যায়ই বুযঝতে সক্ষম হয় যে, বনীদের সাথেই সত্য রয়েছে এবং তারা তা কবুলও করে নেয়। কিন্তু যারা প্রখর অধিকারী নয় তারা কিচুকাল দোটানা অবস্থায় পড়ে থাকে। কিন্তু হক বাতিলের এই সংঘাত যখন এমন স্তরে পৌঁছে যায় যেখানে বাতিল তার নিজের সাহায্যের জন্য এবং হককে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য খেলো হাতিয়ার ব্যবহারে অবতীর্ণ হয়- তখন তাদের সামনেও হক সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে ধরা পড়ে এবং তারাও সত্যের সামনে মাথা নত করে দেয়।
সাধারণ লোকদের এই দুটি দল হককে গ্রহণ করার ব্যাপারে কিছুটা অগ্রগামী এবং পশ্চাদগামী হয়ে থাকে কিন্তু উভয়ই তাকে সুদুরপ্রসারী দৃষ্টিভংগী নিয়ে গ্রহণ করে থাকে। একারণে তারা পূর্বে উল্লেখিত দলের ন্যায় হীনমান্যতার শিকার হওয়া থেকে নিরাপদ থাকে। এদের অন্তর থেক হকের বিরোধিতকারীদের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে মুছে যায়। তারা দেখতে পেয়েছে যে, নিজেরেদ দৃষ্টিভংগীকে বৈধ করার জন্য এদের কাছে হঠকারিতা, একগুঁয়েমী এবং জেদ ছাড়া আর কোন প্রমাণ নেই। এদের প্রতারনা, স্বার্থপরতা এবং কৃত্রিমতাও তাদের সমনে প্রকাশি হয়ে পড়ে। এজন্য তাদের প্রাচীন নেতৃত্ব ও প্রভাব প্রতিপত্তির প্রতি শদ্ধাবোধ তাদের অন্তর থেকে বিলীন হয়ে যায়। এই পর্যবেক্ষণ তাদের মধ্যে হীনমন্যতার পবিবর্তে শ্রেষ্ঠত্ববোধ সৃষ্টি করে। তারা ‘বড়দের’ বিরোধিতায় সংশয়-সন্দেহ এবং ভয়-ভীতির শিকার হওয়ার পরিবর্তে সত্যর সাহায্য করতে করতে নিজেদের মধ্যে এক অসাধারণ সম্মান ও উচ্চতা অনুভব করতে থাকে। এ জিনিসগুলো তাদেরকে মানসিক এবং নৈতিক দিক থেকে এতটা উচ্চস্তরে পৌছে দেয় যে, তাদের সংখ্যাশক্তি যতই কম হোক না কেন, উপায় উপকরণ যত সামান্যই হোক না কেন, তাদে তরবাসী যত জীর্ণশীর্ণই হোক না কেন- তাদের বিরাট বিরাট বাহিনীর সামনে দাঁড় করিয়ে দিলে তারা এদদেরকে পরাভূত করে দিত।
সপ্তম কারণঃ সম্পতম কারণ হচ্ছে এই যে, কোন দাওয়াতের স্থায়িত্বের জন্য সর্বাধিক প্রয়োজন হচ্ছে, প্রতিভাবান এবং উচ্চ শ্রেণীনর লোকদের মধ্য থেকে এর জন্য কর্মী সংগ্রহ করা।যতি তা সম্ভব না হয় তাহলে এই দাওয়াত স্থায়িত্বলাভ করতে পারেনা এবং বিদআত পন্থীরা অচিরেই তার মধ্যে ফাঁক সৃষ্টি করে গোটা দাওয়াতকে (এখানে একটি শব্দ বুঝা যাচ্ছেনা ৫৭ পৃ. সপ্তম কারণ) করে ফেলে। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বণী ইসরাঈলের আলেম সম্প্রদায় এবং সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের কেউ তাঁর দাওয়াত কবুল করেনি। কেবল সাধারণ স্তরের কিছু সংখ্যক অনুসারী তিনি সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। এই অনুসারীদের নিষ্ঠা, খোভীত এবং দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। তারা এই দাওয়াতকে প্রসারিত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। কিন্তু তা সত্বেও সেন্টপল অচিরেই ঈসার (আ) ধর্মকে বিকৃত করে দেয়। সে এই বিকৃতি সাধনে যে জিনিসটিকে সবচেয়ে বেশী কাজে লাগিয়েছে- তা ছিল এই অপপ্রচার যে, ঈসার অনুসারীগণ ছিল অশিক্ষিত সাধারণ লোক। এ কারণে তারা ঈসার (আ) শিক্ষার ভেদ ও তাৎপর্য অনুধাবনে সক্ষম ছিলনা। সে নিজে ছিল গ্রীক দর্শন ও তাসাউফের বিশেষজ্ঞ। তার দাবী ছিল এই যে, যারা মসীহ আলাইহিস সালামের সাক্ষাত অনুসারী ছিল তাদের তুলনায় সে তাঁর শিক্ষার তাৎপর্য অধিক ভাল বোঝে। এ কারণে সাধারণের ওপর তার যাদু খেলে গেল এবং তার অপপ্রচার এতটো প্রভাবশীল হল যে, তার মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি। এবং ঈসার (আ) ধর্ম অতি দ্রুত সম্পূর্ণ ভিন্ন আকার রূপ ধারণ করল।
পক্ষান্তরে ইসলাম গ্রহণকারীগণের মধ্যে যেমন হযরত আবুবকর (রা) ও উমারের (রা) মত প্রতিবাবান লোক ছিল- এজন্য বিদাআত পন্থীরা অত সহজে ইসলামের মধ্যে ছিদ্র সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়নি। ইসলামের আসল দাওয়াত সম্পর্কে বলা যায়, হাজারো বিপ্লব, হাজারো বিবর্তন এবং বিদআতপন্থীদের চরম আক্রমন সত্বেও আজ পর্যন্ত তা অবিকল রয়ে গেছে।
উপসংহার
এসব কারণে আম্বিয়ায় কেরামদের দাওয়াতের পদ্ধতি সব সময় এই ছিল যে, তাঁরা সর্বপ্রথম প্রতিভাবান সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাতেন। যেসব ক্ষেত্রে আংশিক সংশোধনের পরিবর্তে সার্বিক সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয় সেখানে এই পন্থাই ফলপ্রসু হতে পারে। যদি কোথাও ইসলামী ব্যবস্থা কায়েম হয়ে যায় এর্ তার মধ্যে কোন আংশিক বিকৃতি সৃষ্টি হয়, তা সংশোধন করতে হলে এক্ষেত্রে বেকল বিকৃতির জন্য দায়ী ব্যব্কিদের সম্বোধন করতে হবে। কিন্তু যেখানে ইসলামী ব্যবস্থা আদৌ কায়েম নেই এবং আংশিক সংশোধনের পরিবর্তে পূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন- সেখানে অবশ্যই নবীদের দাওয়াতের কর্মপন্থা অনুযায়ী সাধারণ ভাবে দাওয়াত পেশ করতে হবে এবং এই দাওয়াতের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম দেশের বুদ্ধিজীবী এবং কর্তত্বশীল শ্রেণীকৈ আহ্বান করতে হবে। চাই তাদে সমর্ক মুসলিম জাতির সাথেই থাকুক অথবা অমুসলিম জাতির সাথে। এ ছিল প্রশ্নের প্রথম জবাব। এখন আমরা প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশ নিয়ে আলাপ করব।

About মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী