দাওয়াতে দীন ও তার কর্মপন্থা

দাওয়াতের ভাষা এবং হকের আহ্বানকারীদের প্রকাশভংগী

এখন আমরা দাওয়াতের ভাষা এবং নবীদের বাকরীতির সম্পর্কে আলোচনা করব। কোন আহ্বানকারীর উদ্দেশ্য কেবল একটা সত্যকে প্রকাশ করে দেয়াই নয়। বরং সত্যকে পূর্ণরূপে প্রতিভাত করে তেলাও তার উদ্দ্যে-যাতে বিশিষ্ট লোকেরাও তা উত্তমরূপে বুঝে নিতে পারে এবং সাধারণ লোকদের জন্যও তা হৃগয়ংগম করার ব্যাপারে কোন অসুবিধা বাকি না থেকে যায়। অনন্তর সত্রকে অতীব সুন্দর পদ্ধতিতে তুলে ধরতে হবে- যাতে শ্রোতাদের মধ্যে যাদের অন্তরে সত্যকে গ্রহণ করার মত কিছুটা যোগ্যতা এখনো অবশিষ্ট আছে- তারা তা গ্রহণ করে নিতে পারে এবং সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের কাছে তা অমান্য করার জন্য তাদের কুরুচি এবং হঠকারিতা ছাড়া আরো কারণ বাকি না থাকতে পারে। এই উদ্দেশ্যের অত্যাবশ্যকীয় দাবী হচ্ছে এই যে, দাওয়াতের ভাষা অত্যন্ত প্রভাবশালী হতে হবে এবং আহ্বানকারীল বাকরীতি স্বভাব সুলভ ও হৃদয়গ্রাহী হতে হবে। কিনতু আকর্ষণ এবং প্রভাব সৃষ্টি করার অনেক কৃত্রিম এবং স্বভাব বিরুদ্ধ পন্থাও আছে। এর সাহায্যে বক্তব্যের মধ্যে প্রকাশ্যত আকর্ষণ এবং হৃদয়গ্রাহীতা সৃষ্টি করা যেতে পারে। যেমন জাহেলী আরবের গণক ঠাকুররা ছন্দবদ্ধ কবিতার মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্যের মধ্যে আকর্ষণ সৃষ্টি করার চেষ্টা করত। বক্তাগণ নিজেদের বাক্যবিন্যাস এবং অনলবর্ষী বক্তৃতার মাধ্যমে তাদের বক্তব্যের জোর ও প্রভাব বৃদ্ধি করে থাকত।
অনুরূপভাবে বর্তমান যুগেও বক্তাগণ কবিতা ও কিচ্ছা-কাহিনীর সাহায্যে নিজেদের বক্তব্যের মধ্যে প্রভাব সৃষ্টি করার চেষ্টা করে থাকেন। সাংবাদিক এবং ধোকাবাজ রাজনীতিবিদগণ মিথ্যা ও অতিশযোক্তির মাধ্যমে নিজেদের ব্যবসা চালিয়ে থাকে। সাইনবোর্ড সর্বস্ব ডাক্তগণ মিথ্যা শপতের মাধ্যমে নিজেদের নিরভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করে থাকে। এসব জিনিসের মাধ্যমে বক্তব্যের মধ্যে এক ধরণের প্রভাব অবশ্যই সৃষ্টি হয়, কিন্তু তা কৃত্রিম প্রলেপের অধিক কিছু নয়। একারনে যেসব লোক দুনিয়াতে হকের প্রচারের জন্য উত্থিক হয়- সত্যের ছাঁচে ঢালাই মিথ্যার সাহয্যে নিজেরেদ দাওয়াতের জাকজমক বৃদ্ধি করা কখনো তাদে কর্মপন্থা হতে পারেনা। তারা নিজেদের জবান এবং নিজেদের কথাকেও এধরনের মিথ্যা দিয়ে কলূষিত করতে পারেনা। এই মিথ্রা এবং কৃত্রিম জিনিসের পরিবর্তে তারা নিজেরেদ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ভিন্ন জিনিস অবলম্বন করে। তা কেবল বৈধ এবং নির্ভুলই নয় বরং মানব প্রকৃতির সাথে তার গভীর মিলও রয়েছে। একারণে এই জিনিসের মাধ্যমে যে প্রভাব প্রতিফিলিত হয়, তা মিথ্যা এবং কৃত্রিমতার মত এক ঘর্ষণেই নিশ্চিত হয়ে যায়না। বরং পরীক্ষার গরম পাত্রে উত্তপ্ত হওয়ার পর তা চাকচিক্য আরো অধিক উজ্জ্বল হয়ে সামনে আসে।
আহ্বানকারীর কাজের ধরন
দাওয়াতের কাজ কেবল এলমী এবং বৈঠকী আলোচনার জন্য উপযুক্ত প্রকাশ ভংগী ও বক্তব্যের মাধ্যমেই চলতে পারেনা। ব্যাপারটা এত সুস্পুষ্ট যে, তা বুঠিয়ে বলার অপেক্ষা রাখেনা। হকের আহ্বানকারীর কাজ ঘটনাবলী বর্ণনাকারী ঐতিহাসিক, আইনের ধারাসমূহ বর্ণাকারী আইনবিদ এবং দর্শণ ও গণিত শাস্ত্রের সূত্র বর্ণনাকারী দার্শণিক ও গণিতজ্ঞের কাজ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। তার বিষয়বস্তু এত ব্যাপক যে, গোটা মানবীয় জীবন এর আওতায় এসে যায়, অপরদিকেত সে যাদের কাছে দাওয়াত পেশ করে তারা মেজাজ প্রকৃতির দিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এমং মনসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকেও তাদের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। উপরন্তু সেমিনারের প্রবন্ধের সাথে প্রবন্ধ রচয়িতার যেরূপ সম্বন্ধ থাকে, অথবা কোন মামলার সাথে উকিলের যেরূপ সম্পর্ক থাকে দাওয়াতের মিশনের সাথে দীনের হকের আহ্বানকারীর সম্পর্কটা তদ্রুপ নয় বরং সে এই মিশনের জন্য জীবন-মৃত্যুর সওদা হয়ে থাকে। মিশনকে চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছানোর জন্য তার জীবনকে বাজি রাখতে হয়। এরূপ কথায় সে কখনো সন্তুষ্ট হতে পারেনা, আর সে যে কথা বলতে চাচ্ছে তা সুস্পষ্টভাবে এবং সুন্দরভাবে তাকে বলতে হবে- যাতে এর কোন দিক অস্পষ্ট থেকে যেতে না পারে। তার নিজের বক্তব্য এতটা প্রভাবশালী এবং হৃদয়গ্রাহী ভংগীতে পেশ করতে হবে, যাতে হকের আহ্বান শুনার মত সামান্য যোগ্যতাও যার মধ্যে রয়েছে- তার অন্তরে তা অনুপ্রবেশ করতে পারে। অতএব, এই আবেগ সহকারে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার কাছে এই দোয়া করেনঃ
قَالَ رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي (25) وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي (26) وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي (27) يَفْقَهُوا قَوْلِي
“হে প্রভু! আমার বক্ষ উন্মুক্ত করে দাও, আমার কাজকে (হকের দাওয়াতের কাজ) সহজ করে দাও এবং আমার মুখের জড়তা দূর করে দাও যাতে লোকেরা আমার কথা ভালভাবে বুঝতে পারে।” –(সূরা তা-হাঃ ২৫-২৮)
অনন্তর তিনি হযরত হারুন আলাইহিস সালামের জন্য দোয়া করলেন তাঁকেও যেন আমার কাজে শরীক করা হয় যাতে তিনি নিজের বাকপটুতার মাধ্যমে আমার বক্তব্যের ত্রুটিকে দূর করে দিতে পারেন এবং আমার ওপর আরোপিত দাওয়াতের এই কাজ অপূর্ণ না থেকে যায়।
হকের আহ্বানকারীদের কথার বৈশিষ্ট
এখানে আমরা সংক্ষিপ্ত ভাবে নবী-রসূল এবং ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের কথা বৈশিষ্ট সম্পর্কে আলোচনা কর। এই বৈশিষ্ট সমূহই তাদের বক্তব্যকে প্রভাবশালি করে তুলে। কোন যুগেই ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের বক্তব্যে এসব বৈশিষ্ট অনুপস্থিত থাকতে পারেনা। নবীদের উন্নত জীবনচারিত এবং নিষ্কুলুষ শিক্ষার পর অন্য যে কোন জিনিরেস তুলনায় এই বৈশিষ্ট সমূহ হকের আহ্বান কারীদের বক্তব্যকে অধিকতর প্রভাবশালী করে তোলে।
প্রথম বৈশিষ্টঃ সর্বকালে এবং সর্বযুগে নবী-রসূল এবং হরেক আহ্বানকারীদের বকর্তব্যের সর্বপ্রথম বৈশিষ্ট এই ছিল যে, তারা যে জাতির সামনে দীনের দাওয়াত পেশ করেছেন- তাদে ভাষায়ই পেশ করেছেন- যাতে প্রতিটি সম্প্রদায় এবং প্রতিটি স্তরের লোকদের ওপর আল্লাহর চূড়ান্ত প্রমাণ পূর্ণতা লাভ করতে পারে।
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ
“আমরা যখনই কোন রসূল পাঠিয়েছি-সি নিজ জাতির জনগনের ভাষায়ই পয়গাম পৌঁছিয়েছে- যেন সে তাদের পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারে।” –(সূরা ইরাহীমঃ৪)
হকের আব্হানকারীর দাওয়াতের আসল ক্ষেত্র তার নিজের জাতির মধ্যেই হওয়া উচিৎ। এটাই স্বাভাবিক এবং যুক্তিসংগত কথা। নিজের জাতিকে গোমরাহীর মধ্যে রেখে অন্য জাতিকে হেদায়াত করার জন্য জল-স্থলে সফর করে বেড়ানো তার জন্য শোভনীয় নয়। অনন্তর হকের আহ্বানকারীকে নিজ জাতির মধ্যে, দাওয়াত পেশ করার জন্য তাদের ভাষাকেই মাধ্যম বানানো উচিৎ। এটাই স্বভাব সুলভ এবং যুক্তিগ্রাহ্য পন্থা। যে ব্যক্তি এই পন্থার বিরোধিতা করে, সে আল হকদারদের হক নষ্ট করছে এবং নিজের কর্মক্ষমতাকে ধ্বংস করছে। এজন্য তাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কোন ব্যক্তি যে জাতির মধ্যে জন্মগ্রহণ করে, সে সেই জাতির মধ্যে যতটা সুন্দরভাবে কাজ করতে করতে পারে, অন্য কোন জাতির মধ্যে ততটা সৌন্দর্যের সাথে কাজ করতে পারেনা। নিজের ভাষায় তার দাওয়াতহ যতটা শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী হতে পারে, অন্য ভাষায় তা হতে পারেনা। এজন্য ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি কর্মীর জন্য সঠিক কর্মপন্থ হচ্ছে এই যে, সে তার নিজ জাতির ভাষাকেই নিজের দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যম বানাবে। অন্য কোন জাতির ভাষা তার নিজের ভাষার তুলনায় যত অধিক উন্নত এবং ব্যাপকই হোকনা কেন, এই ভাষায় বক্তৃতা দিলে বা প্রবন্ধ রচনা করলে অধিক সংখ্যক লোকের কাছে তার মতামত পৌঁছার উপায় হোকনা কেন এবং তা অধিক সম্মান ও সুখ্যাতি লাভ করার মাধ্যমই হোক না কেন- তার সেদিকে মোটেই ভ্রুক্ষেপ করা উচিৎ নয়। হকের আহ্বানকারীর সর্বপ্রথম বিবেচ্য বিষয় এটা নয় যে, সে যে দাওয়াত নিয়ে উঠেছে তা অপেক্ষাকৃত অধিক কান পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার উপায় কি হতে পারে। বরং তাকে সর্বপ্রথম দেখতে হবে, যে লোকের পথ প্রদর্শণ ও খেদমতের জন্য সে আল্লাহ এবং প্রকৃতির পক্ষ থেকে নিযুক্ত হয়েছে, তাদের অন্তরে প্রবেশ করার সবচেয়ে কার্যকর এবং নিকটতর উপায় কি হতে পারে। মাধ্যম যদি সংকীর্ণ এবং সীমিত হয়ে থাকে এবং তা অবলম্বন করাতে তার ব্যক্তিত্ব, সুনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে, তবুও সে এ দিকে ভ্রুক্ষেপ করবেনা। বরং এটাই সে গ্রহণ করবে। কেননা তার সামনে যে উদ্দেশ্য রয়েছে তা অর্জণ করার এটাই হচ্ছে উপায়। যে কৃষকের ঝোলায় মাত্র কয়েকটি বীজ রয়েছে এবং সে তা নিজের ক্ষুদ্র জমি খন্ডের বপন করতে চায়- বিরাট ভূস্বামীদের সাথে তার হিংসায় লিপ্ত হওয়া উচিৎ নয়। বরং তার ভাগে যে ক্ষুদ্র জমি খন্ড পড়েছে এর ওপরই তার দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত হওয়া উচিৎ। হযরত ঈসা মাসীহ (আ) বলেছেনঃ
“আমার কাছে যে পরিমান রুটি রয়েছে তা বাচ্চাদের জন্যই যথেষ্ট। আমি এগুলোকে কুকুরদের সামনে ঢেলে দিয়ে শিশুদের ক্ষুধার্ত রাখতে পারিনা।”
হযরত ঈসার (আ) এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে একদল লোক নির্বুদ্ধিতার শিকার হয়ে আপত্তি তুলেছে এবং এর ওপর (নাউযুবিল্ল) সংকীর্ণ দৃষ্টিভংগীর অপবাদ আরোপ করেছে। অথচ তিনি যে কথা বলেছেন তা সম্পূর্ণ বাস্তব। প্রত্যেক ব্যক্তির কাজ করার একটি প্রাকৃতিক গন্ডী রয়েছে। সে যতক্ষণ নিজের যাবতীয় চেষ্টাসাধনা এই গন্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে, ততক্ষণই সঠিক এবং ফলপ্রসূ কাজ করতে সক্ষম হবে। যদি সে এই গন্ডী অতিক্রম করে নিজের হাত-পা ‍ছুড়তে চেষ্টা করে তাহলে সে হয়ত এই ভুলের শিকার হচ্ছে যে, তার অনুশীলনের ক্ষেত্র পূর্বেরে চেয়ে অনেক প্রশস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে সে নিজের শক্তি ও শ্রমকে বিনষ্ট করছে।
দ্বিতীয় বৈশিষ্টঃ নবী-রসূল এবং হকের আহ্বাণকারীদের কথার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট হচ্ছে এইযে, তাঁদের বক্তব্য হয়ে থাকে সুস্পষ্ট। সুস্পষ্ট বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে এই যে, আহ্বাণকারী নিজের সময়ে প্রচলিতি কথ্য ভাষায় তার বক্তব্য পেশ করেন, যাতে তার সম্প্রদায়ের প্রতিটি লোকের কাছে তার বক্তব্য পৌঁছাতে সক্ষম হয়। তার ভাষা হয়ে থাকে অত্যন্ত মার্র্জিত পরিচ্ছন্ন এবং সৌন্দর্য মন্ডিত। তা অস্পষ্টও নয় এবং একেবারেই সংক্ষিপ্তও নয়। বিনা প্রয়োজনে তা দীর্ঘায়িত হয়না, রূপক ভাষায়ও ভারাক্রান্ত থাকেনা এবং তাতে উপমার আধিক্যও থাকেনা। জ্ঞানবুদ্ধিকে জটিলতায় নিক্ষেপ করা মত রূপকের আধিক্য নেই, কঠিন এবং অপরিচিত শব্দে ভরপুর থাকেনা, বিশ্রী এবং ঘৃণ্য উক্তি থেকে তা সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে।
এর পরিবর্তে প্রাঞ্জল ভাষা, সরল সহজ উপমা, বাস্তব সত্যকে পরোক্ষভাবে উপস্থাপনকরী উপমা ও দৃষ্টান্ত ব্যবহার করা হয়। উপরন্তু তাদের বক্তব্যে থাকে ক্রোধের পরিবর্তে আন্তরিকতা, কঠোরতার পরির্তে নম্রতা এবং কৃত্রিম অলংকরণের পরিবর্তে সরলতা এবং পরিচ্ছন্নতা। আহ্বাণকারী তার সমসাময়িক যুগে প্রচলিত বিভিন্ন পদ্ধতির (Style) মধ্যে কেবল সেই পদ্ধতি গ্রহণ করে, যা গাম্ভীর্য, প্রভাবশালীতা এবং উদ্দেশ্যের ব্যাখ্যার জন্য সর্বাধিক উপযোগী এবং উন্নত। নিজের উন্নত ব্যক্তিত্ব, দাওয়াতের কাজে উদ্যমশীলতা ও একাগ্রতা, ঈমান ও আত্মপ্রত্যয় সৃষ্টিকারী জ্ঞান, উপরন্তু নিজের বক্তব্যকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার ঐকান্তিক আগ্রহ এই পদ্ধতিকে এতটা উন্নত করে তোলে যে, তার নিজেরই একটা নতুন স্টাইল সৃষ্টি হয়ে যায়। এবং তা অনুরসণ করার মত একটা নমুনা এবং দৃষ্টান্তের কাজ দিতে থাকে। এই পদ্ধতির আসল বৈশিষ্ট তার একাগ্রতা এবং হৃদয়ংগম করার যোগ্যতা। বরং এর সাথে সাথে তার গতিশীলতা ও একাগ্রতা এবং হৃদয়ংগ করার যোগ্যতা। বরং এর সাথে সাথে তার গতিশীলতা ও একনিষ্ঠতার কারণে তার মধ্যে এমন সাহিত্যিক সৌন্দর্যবোধ সৃষ্টি হয়ে যায় যে, তার সামনে নামী দামী সাহিত্যেকদের কথাও সম্পূর্ণ নিষ্প্রান মনে হতে থাকে। তার প্রতিটি শব্দ থেকে ফোটায় ফোটায় রস ঝরতে থাকে তার প্রতিটি বাক্যের মধ্যে আত্মার খোরাক পাওয়া যায়। এর প্রভাবে শুধু কিচু সংখ্যক লোকেই নয়, বরং গোটা জাতির জীবন ধারা পরিবর্তিত হয়ে যায়। হকের আহ্বাণকরীর হাতে এটা এমন এক শক্তি, সজ্জিত সেনাবাহিনীও যার মোকাবিলা করতে সক্ষম নয়।
একারণেই নবী-রসূলগণ বক্তব্য পেশ করার উপযুক্ত পন্থার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। কিন্তু আমাদের দেশের দীনের দাওয়াতের এই নির্যাতিত অবস্থার জন্য ভীত-সন্ত্রস্ত হতে হয় যে, এখানে যেসব লোক, অর্থাৎ আলেম সজাম এই ফরজকে আঞ্জাম দিকে পারত, তারা হামেশা নিজেদের বক্র বিবৃতির জন্য বদনাম কুড়িয়ে আসেছেন। প্রথমত এখানে যে ভাষা “জাতীয় ভাষা” হিসাবে মর্যাদা লাভ করেছিল, আলেম সমাজ সেই ভাষায় লিখতে ও বলতে অক্ষম মনে হতে থাকে। দ্বিতীয়ত যদিও তারা এই ভাষায় লেখা এবং কথা বলা শুরযু করেছিল, তখন তা তাদের একটি বিশেষ ভাষায় পরিনত হল। এই ভাষা কঠিন, রসকষহীণ সংক্ষিপ্ত হওয়অর কারণে সহজবোধ্য নয়। এমনকি কোন বই সম্পর্কে লোকদের মধ্যে বিরূপ ধারণা সৃষ্টির জন্য একটি কথাই যথেষ্ট যে,ম এভাষার বর্ণণাভংগী সম্পূর্ণ ‘মৌলভীয়ানা।’ এই অবস্থাটা ছিল একান্তই বিরক্তিকর। আরো দুঃখের বিষয় হচ্ছে এই যে, আলেমগণ এই কঠিন ভাষার জন্য শুধু বদনামই কুড়ালো এবং যেসব লোক ধর্মেরন সাথে সম্পর্কহীন, অথবা ধর্মবিরোধী ছিল- তার ‘জাতির ভাষা’ দখল করে নিল। আর আজ পর্যন্ত ওপর প্রকাশ্যত তাদেরই দখল চলে আসছে।
তৃতীয় বৈশিষ্টঃ নবীদের এবং হরেক আহ্বানকারীদের বক্তব্যের তৃতীয় বৈশিষ্ট হচ্ছে এই যে, তাঁরা নিজেদের একই উদ্দেশ্যের দিকে বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে এসে থাকেন। কুরআন মজীদের পরিভাষায় এটাকে ‘তাসীরুল আয়াত’ (আয়াতের অবস্থান্তর) বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ, যার কাছে দীনে দাওয়াত পেশ করা হয় তাকে বিভিন্ন পন্থায় এবং বিভিন্ন কায়দায় বুঝানোর চেষ্টা করা।
মীর আনীস মরহুমের ভাষায়ঃ (ফারসী*****************)
“একটি ফুলের বর্ণনা
ব্যক্ত করি শত শব্দে”
আহ্বানকারীর বক্তব্যের মধ্যে এই বিচিত্র বৈশিষ্ট বর্তমান থাকা তার আসল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ বক্তব্যকে হৃদয়ংগম করানো এবং প্রমান চুড়ান্ত করার জন্য একান্ত প্রয়োজন। যে কথা এক পন্থায় বুঝে আসেনা, তা অন্য পন্থায় পেশ করা হলে এমন ভাবে মনের গভীরে বদ্ধমূল হয়ে যায়- যেন তা দাওয়অত কৃত ব্যক্তিরই মনের কথা। মানুষের বিচিত্র রুচি এবং স্বভাব-প্রকৃতির বিভিন্নমুখী ঝোঁক-প্রবণতার মত তার মন মস্তিষ্কের পরিমান ক্ষমতাও বিভিন্ন হয়ে থাকে। পরিবেশ পরিস্থিতির বিভিন্নতার কারণে তার দৃষ্টিভংগীও পরিবর্তিত হতে থাকে। যে ব্যক্তি দাওয়াতকৃত ব্যক্তির অন্তরে কোন কথা জীবন যাপনের নির্দেশনা হিসাবে বদ্ধমূল করার আগ্রহ পোষন করে, সে তার মেধাশক্তির বিভিন্নতা এবং দৃষ্টিভংগীর পরিবর্তনের দিকে খেয়াল রেখে বিভিন্ন দিক থেকে তার কাছে দাওয়াত পেশ করবে। সে যদি একই পথে এবং একই রংএ টার্গেটকৃত ব্যক্তির কাছে আসে তাহলে একজন আহ্বানকারী হিসাবে সে তার উদ্দেশ্য সাধনে সম্পূর্ণ ব্রর্থ হবে। কেননা তার একদেশদর্শী নীতি নিরন্তর পরিবর্তনশীল এবং বিচিত্রমুখী স্বভাবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। যে ব্যক্তি আহ্বাণকারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যের ধরন এবং মানব প্রকৃতির এই অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল নয়, তার সামনে যখন দাওয়াতী বক্তব্য আসে তখন সে ভ্রুকুঞ্চিত করে মন্তব্য করতে থাকে, বক্তব্য নিষ্প্রয়েঅজনে দীর্ঘ করা হয়েছে। একই কথা পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে, এটা অত্যন্ত বিরক্তিকর, ক্লান্তিকর ইত্যাদি সে একথা চিন্তা করেন যে, একজন আহ্বাণারীর কাজ একজন সুলভ প্রবন্ধ রচনাকারীর তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্নতর। প্রবন্ধকারের দুষ্টি কেবল কয়েক ব্যক্তির সামনে নিজের মতামত প্রকাশ করার দিকেই নিবদ্ধ থাকে। অপরদিকে হকের আহ্বানকারীকে বিচিত্র মেজাজ, বিচিত্র প্রকৃতিট এবং বিভিন্নমুখী যোগ্যতার অধিকারী লোকদের মধ্যে নিজের বক্তব্য পেশ করার জন্য যত্নবান হতে হয়। প্রবন্ধকোরের সাফল্যের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার বক্তব্যকে অতীব সুন্দর পন্থায় উপস্থাপন করতে পেরেছে। অপরদিকে হকের আহ্বাণকারীর সাফল্যের জন্য শর্ত হচ্ছে এই যে, শত্রুমিত্র সবাই সমন্বয়ে আওয়াজ তুলবে, তুমি দাওয়াত পৌছানের হক আদায় করেছ।
وَكَذَلِكَ نُصَرِّفُ الْآيَاتِ وَلِيَقُولُوا دَرَسْتَ وَلِنُبَيِّنَهُ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ
“এমনিভাবে আমরা দলীলসমূহ বিভিন্ন ঢংএ বর্ণনা করে থাকি যাতে তারা ভালভাবে বুঝে নিতে পারে এবং বলে উঠে, তুমি শনিয়ে দেয়ার হক আদায় করেছ। আর যেসব লোক জ্ঞান অর্জন করার ইচ্ছা রাখে তাদের জন্যেও আমরা দলীল সমূহ পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করে দেই।” (সূরা আনআমঃ১০৫)
চতুর্থ বৈশিষ্টঃ হকের আহ্বাণকরীদের বক্তব্যের চতিুর্থ বৈশিষ্ট এই যে, তাদের বক্তব্য যেভাবে অকাট্য দলীল প্রমাণে সমৃদ্ধ থাকে, অনুরূপভাবে তা আবেগ ও উদ্দীপনায়ও ভরপুর থাকে। তারা নিরস দার্শনিকদের মত কেবল বুদ্ধিমেই সম্বোধন করেনা, বরং মানুষের উন্নত আবেগের কাছেও আবেদন জানায়। আবেগের কাছে আবেদন করা কোন খারাপ কাজ নয়। ক্ষতিকর যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে সেটা হচ্ছে মানুষের পাশবিক আবেগের কাছে আবেদন করা। হক পন্থীগণ চিরকালই এ থেকে বিরত রয়েছেন। মানুষের মধ্যে আন্দোলন সৃষ্টিকারী আসল শক্তি তার জ্ঞান নয়, বরং আবেগ। একারণে হকের যে কোন আহ্বাণকারী যে জীবন ব্যবস্থা পরিবর্তন সাধনের দাওয়াত নিয়ে উঠেছে, অথবা জীবন-ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে ঢালাই কর নতুন ভিত্তির ওপর কায়েম করতে চায়। মানুষের আবেগকে উত্তেজিত করা ছাড়া নিজের লক্ষ্য পথে এক কদমও অগ্রসর হতে পারেনা। যেসব লোক নিজেদের এলমী গবেষনার অসাধারণত্ব এবং সৌন্দর্য বর্ণনা করে অন্যদের উৎফুল্ল করে দিতে এবং নিজেদের আত্মতৃপ্তি লাভকে জীবনের উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়েছে- সে এই আহ্বায়ক সূলভ রংকে দাবীদার সূলভ রং মনে করে থাকে। অথচ একজন আহ্বানকারীর বক্তব্যের মধ্যে যে জোশ ও জযবা পাওয়া যায় তা তার দাবীর ফলশ্রুতি নয়, বরং তা হয় তার অবিচল ঈমানের ফলশ্রুতি –যা তার হৃদয়ের মধ্যে উদ্বেলিত হতে থাকে, অথবা সেই সহানুভূতি ও একাগ্রতার প্রভাব যার প্রজ্জলিত শিখা তার ‍বুকের মধ্যে দীপ্তিমান হয়ে আছে।
যে ব্যক্তি একজন আহ্বানকারীর বিশেষ অবস্থা সম্পর্কে অবহিত নয় এবং শুধু কাগজ কলম নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে এটাকেও নিজের একটি অভিন্ন পেশা মনে করে বসে- সে যখন দেখতে পায় যে, তার বক্তব্য প্রবন্ধকারের বক্তব্যের মত নিষ্প্রাণ নং বরং জীবিত এবং জীবনদানয়ীনী – তখন তার আবেগকে তার অহংকার এবং দাবীর সাথে সংযুক্ত করে। অথচ এই ধারণা ঠিক নয়। আকার –আকৃতির মিল থাকা সত্বেও স্বভাব-প্রকৃতি ভিন্নতর হয়ে থাকে। প্রতিটি সাদা জিনিসকে চর্বিই হতে হবে এমন কোন বাধ্যবাদকতা নেই। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে রেওয়াতে এসেছে। (আরবী******************)
“রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি যখন ভাষন দিতেন তাঁর চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করত, কণ্ঠস্বর গম্ভীর হয়ে যেত, আবেগ-উত্তেজনা বৃদ্ধি পেত। এমনকি মনে হত তিনি যেন কোন শত্রুবাহিনীর আসন্ন আক্রমন সম্পর্কে সাবধান করছেন। তিনি যেন বলছেন, তারা ভোরবেলা অথবা সন্ধাবেলা তোমাদের ওপর ঝাপিয়ে পড়বে।” –(মুসলিম, কিতাব জুমআ)
একথা সুষ্পষ্ট যে, তাঁর আত্মবিশ্বাস এবং জাতির প্রতি তাঁর সহানুভূতি সুলভ আবেগ থেকেই তাঁর বক্তব্যের মধ্যে এই উষ্ণতা সৃষ্টি হতে। সত্যিকার অর্থে প্রতিটি আহ্বানকারীর মধ্যে এ ধরণের অবস্থা প্রভাবশীল হতে পারে। এতে সন্দেহ নেই যে, কতিপয় লোক সম্পূর্ণ কৃত্রিম উপায়ে আবেগ-উত্তেজনার প্রদর্শনি করতে পারে। বরং কোন কোন সময় সে বাজে কথা ও অর্থহীন প্রলাপও বকতে পারে। কিন্তু সেজন্য প্রত্যেক ব্যক্তিই যে এরূপ তা নয়। যারা মিথ্যাবাদী তারা কুব বেশী দিন নিজেদের মিথ্যাকে ধামাচাপা দিয়ে রাখতে পারেনা। কালের প্রবাহ খাঁটি এবং অখাঁটির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেই ছাড়ে। কাক আর কতদিন কৃত্রিম পালকে ময়ূর সেজে নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখতে পারেঃ
পঞ্চম বৈশিষ্টঃ হকের আহ্বানকারীদের বক্তব্যের পঞ্চম বৈশিষ্ট হচ্ছে এই যে, তাদের বক্তব্যের রং এক বং এর মধ্যে রয়েছে উদ্দেশের ঐক্য। তারা নিজেদের তুণীরের প্রতিটি তীর একই লক্ষ্যের ওপর নিক্ষেপ করে। পেশাদার লেখক এবং বক্তাদের মত তাদের অবস্থঅ এই নয় যে, ইচ্ছা করলে যে কেন মঞ্চে তাদের দিয়ে বক্তৃতা করিয়ে নেয়া যাবে, যে বিষয়বস্তুর ‍ওপর ইচ্ছা প্রবন্ধ রচনা করিয়ে নেয়া যাবে এবং যে কোন সভারই সভাপতির কাজ করিয়ে নেয়া যাবে। তারা নিজেদের প্রতিটি লেখা এবং বক্তব্যের ধ্যে একই প্রতিধ্বণি শুনা যাবে। অন্য বিষয়বস্তু যতই চিত্তাকর্ষকজ হোক না কেন, তার ওপর বক্তৃতা ও প্রবন্ধ রচনা করে যত বড় সম্মান এবং সুখ্যাতি যুযোগ থাকেনা কেন, বাহ্যত তার মধ্যে ধর্মীয় এবং জাতীয় স্বার্থের কোন দিক দৃষ্টি গোচরই হোক না কেন- কিন্তু তারা কোন অপ্রাসংগিক অথবা আনুষংগিক বিষয়ের ওপর নিজেদের মুখ এবং কলমের শক্তি অপচয় করেনা। এ জিনিসটিকে কুরআন মজীদে (আরবী*****************) (প্রতিটি প্রান্তরে বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে মরে”-সূরা শুআরাঃ২২৫) বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং নবী-রসূল ও নেককার লোকদের এ থেকে মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। দুনিয়ার গোটা ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, এই দুনিয়ায় যদি ভাল অথবা মন্দ যে কোন ধরেনে বিপ্লব সৃষ্টি হয়ে থাকে তাহলে সেই লোকদের কলম ও মুখের দ্বারাই তা সাথিত হয়েছে- যারা নিজেদের সমস্ত শক্তি কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যের জন্য ব্যয় করেছে। তারা কখনেরা উদ্দেশ্যহীন ভাবে শূণ্যগর্ভে তীর নিক্ষেপ করেনি।
ষষ্ঠ বৈশিষ্টঃ নবী-রসূল ও হকের আহ্বানকারীদের বক্তব্যের ষষ্ঠ বৈশিষ্ট এই ছিল যে, তারা নিজেদের বক্তব্যকে এমন প্রতিটি জিনিস থেকে পাক রাখতেন যা শ্রোতার মধ্যে হঠকারীতা এবং বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে। কেননা এটা তাদের উদ্দেশের সম্পূর্ণ পরিপন্থ। যেমন, উদ্ধিষ্ট ব্যক্তির সাথে আলাপ-আলোচনা করার সময় নিজের শ্রেষ্ঠত্বও প্রকাশ করবেনা এবং প্রতিপক্ষের ভ্রান্ত জীবন ব্যবস্থাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বল্গাহীন সমালোচনা ও করবেনা। বরং যা কিছু বলবে নম্রতহা ও সহানুভূতির সাথে বলবে।
اذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى (43) فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيِّنًا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى
“তোমরা দুজনে ফিরাউনের নিকট যাও। কেননা সে অহংকারী-বিদ্রোহী হয়ে গেছে। তার সাথে নম্রভাবে কথা বলবে। সম্ভবত মে নসীহত কবুল করতে কিংবা ভয় পেতে পারে।” (সূরা তাহাঃ ৫৩-৪৪)
অনুরূপভাবে তাঁরা নিজেদের মুখ দিয়ে এমন কথা বের করেননা যার দ্বারা আহ্বানকৃত ব্যক্তির ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগাতে পারে যুক্তি প্রমানের মাধ্যমে। তার ভ্রান্ত ধারণার জোরালো প্রতিবাদ করেন ঠিকই, কিন্তু অযথা অসৌজন্যমূলক শব্দ ব্যবহার করে নিজের হাতেহই নিজের উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেন না।
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ
“(হে ঈমানদার লোকেরা) এই লোকেরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ইবাদত করে তোমরা তাদের গালি দিওনা। কারণ তারা মূর্খতা বশত শত্রুতার বশবর্তী হয়ে আল্লাহকে গালি দিয়ে বসতে পারে।” –(সূরা আনআমঃ১০৮)
আহ্বানকৃত ব্যক্তির অভদ্র ব্যবহার ও কর্কশ ভাষার জবাব তাঁরা সুমধুর বাক্যে দিয়ে থাকেন। কেননা এটাই হচ্ছে হকের আহ্বানকারীর জন্য টার্গেটকৃত ব্যক্তির অন্তরে প্রবেশ করার পথ।
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ () وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ () وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
“ভাল এবং মন্দ সমান হতে পারেনা। তোমরা উত্তম জিনিসের মাধ্যমে মন্দকে দূরীভূত কর। তোমরা দেখতে পাবে যে, তোমাদের সাথে যাদের শত্রুতা ছিল তারা প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে। এই গুণ কেবল তাদের ভাগ্যেই জুটে থাকে যারা ধৈর্য ধারণ করে। এই মর্যাদা কেবল তারাই লাভ করতে পারে যারা বড়ই ভাগ্যবান। তোমরা যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোন রূপ প্ররোচনা অনুভব কতে পারো, তাহলে আল্লাহর আশ্রয় চাও। তিনি সবকিছু শুনেন এবং জানেন।” –(সরা হা-মীম সিজদাঃ ৩৪-৩৬)
তাঁরা বিতর্কযুদ্ধ লিপ্ত হওয়া থেকে সবসময়ই দূরে থাকতেন। এমনকি আহ্বানকৃত ব্যক্তি সম্পর্কে যদি অনুমান হয়ে যায় যে, সে বিতর্কে জড়াতে চায়, তাহলে হকের আহ্বানকারী আসসালামু আলাইকুম বলে সেখান থেকে সরে পড়তেন। কেননা বিতর্কযুদধ এবং হকের দাওয়াতের মধ্যে বৈপরিত্ব বিদ্যমান রয়েছে।
فَلَا يُنَازِعُنَّكَ فِي الْأَمْرِ وَادْعُ إِلَى رَبِّكَ إِنَّكَ لَعَلَى هُدًى مُسْتَقِيمٍ (67) وَإِنْ جَادَلُوكَ فَقُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا تَعْمَلُونَ (68) اللَّهُ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيمَا كُنْتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ
“অতএব তারা যেন এ ব্যাপারে তোমার সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত না হয়। তুমি তোমার প্রভুর দিকে দাওয়াত দাও। নিসন্দেহে তুমিই সঠিক পথে রয়েছ। তারা যদি তোমার সাথে ঝগড়া করে তবে তুমি বলে দাও, তোমরা যা কিচু করছ তা আল্লাহ খুব ভাল করেই জানেন। তোমরা যেসব বিষয় নিয়ে পরস্পরের সথে মতবিরোথধে লিপ্ত হচ্ছ- আল্লাহ কিয়ামতের দিন সেসেব বিষয়ে তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন”- (সূরা হাজ্জাঃ ৬৭-৬৯)
যদি কখনো তারা বিতর্কে লিপ্ত হন, তাহলে উত্তম এবং মার্জিত পন্থায়। অর্থাৎ নিজের এবং দাওয়াতকৃত ব্যক্তির যেসব বিষয়ে ঐক্যমত রয়েছে- তা অনুসন্ধান করে বের করে তার অবশ্যম্ভাবী পরিনতির দিকে দাওয়াত দেন।
فَلَا يُنَازِعُنَّكَ فِي الْأَمْرِ وَادْعُ إِلَى رَبِّكَ إِنَّكَ لَعَلَى هُدًى مُسْتَقِيمٍ (67) وَإِنْ جَادَلُوكَ فَقُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا تَعْمَلُونَ (68) اللَّهُ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيمَا كُنْتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ
“আর উত্তম রীতি ও পন্থা ব্যতীত আহলে কিতাবদের সাথে বিতর্ক করনা- সেই লোকদের ছাড়া যারা তাদে মধ্যে যালেম।তাদেরকে বল, আমরা ঈমান এনেছি সেই জিনিসের ওপর যা আমাদের কাছে নাযিল করা হয়েছে এবং যা তোমাদের ওপর নাযিল হয়েছে। আমাদের ইলাহ এবং তোমাদের ইলাহ একই এবং আমরা তাঁরই অনুগত।” –(সূরা আনকাবুতঃ৪৬)
সপ্তম বৈশিষ্টঃ হকের আহ্বানকারীর বক্তব্যের বৈশিষ্ট হচ্ছে- তিনি শব্দ এবং অর্থ দীর্ঘতা, সংক্ষিপ্ততা, প্রকাশভংগী ইত্যাদির ক্ষেত্রে শ্রোতার মনমানসিকতার দিকে লক্ষ্য রেখে কতা বলে। যেমন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সুসংবাদ দাও, লোকদের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি করনা।” অনুরূপভাবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, “যখন উপদেশ দেবে, বক্তব্য সংক্ষেপ করবে।” তিনি সংক্ষেপে বক্তব্য উপস্থাপন করার যোগ্যতাকে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক বলে অবভিহিত করেছেন। (আরবী******)
“তিনি বলতেন, কোন ব্যক্তির নামায দীর্ঘ হওয়া এবং ভাষণ সংক্ষিপ্ত হওয়াটা তার বু্দ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। অতএব নামায দীর্য় কর এবং বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত কর। কোন কোন বক্তৃতায় যাদুকরী প্রবাব রয়েছৈ।” –(মুসলিম কিতাবুল জুমআ)
শ্রোতা যদি স্বল্প জ্ঞানের অধিকারী হয় অথবা কথা যদি সূক্ষ্ম হয় তাহলে কথার পুনরাবৃত্তি করতে হবে যাতে শ্রোতা ভালভাবে তা শুনতে পারে এবং বুঝতে পারে। (আরবী************************************)
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোন কথা বলতেন- তিনবার তার পুনরাবৃত্তি করতেন- যাতে লোকেরা ভালভাবে বুঝতে পারে।”

About মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী