দাওয়াতে দীন ও তার কর্মপন্থা

আম্বিয়ায়ে কেরামের যুক্তি-পদ্ধতি

নবী-রসূল এবং হকের আহ্বানকারীগণ যে উদ্দেশ্য বাস্তাবায়নের জন্য আসেন তা হচ্ছে ঈমানের দাওয়াত। ঈমান কোন নীতিবাচক জিনিস নয়, বরং একটি ইতিবাচক সত্য। এর আসল উপকারিতা কেবল তখনই অর্জন করা যায় যখন তা পূর্ণরূপে এবং দৃঢ়ভাবে হৃদয়ের মধ্যে বসে যায়। ঈমানের এই দৃঢ়তা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন হচ্ছে- তার ভিত্তি অবশ্যই মজবুত দলীলের ওপর হতে হবে। ঈমানের মধ্যে মজবুতী না থাকলে তা জীবনের জন্য কোন অনুপ্রেরণাদায়ক বস্তুও হতে পারে না, এর দারা দীনের বিশ্বাসগত এবং কর্মগত যাবতীয় দিকগুলোও বাস্তবায়িত হতে পারেনা এবং তা জীবনের প্রশস্ত কর্মক্ষেত্রে মানুষের তত্ত্বাবধানও করতে পারেনা। এ করণে হকের আহ্বানকারীদের কাজ কেবল শক্তি প্রয়োগেও চলতে পারেনা, প্রতারণার মাধ্যমেও তারা নিজেরদ লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনা, দলিলেও তাদের কোন কাজে আসতে পারেনা, কবিসুলভ এবং বক্তাসুলভ যে যুক্তি স্বভাব-প্রকৃতি এবং বোধশক্তির মধ্যে নিজের কোন ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম নয়- তাও তাদের উদ্দেশ্য পূর্ণ করতে পারে না।
শ্রোতাকে নিরুত্তর করে দিয়ে অথবা তাকে বিভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষেপ করে যারা নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে চায়, উল্লেখিত ধরনের যুক্তির মাধ্যমে কেবল তারাই নিজেদের কাজ চালাতে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তি শ্রোতাকে নিরুত্তর করে দিতে চায়না বরং তার সার্বিক শক্তি এবং যোগ্যতাকে সঠিক রাস্তায় চলার জন্য সজাগ করে দিতে চায়, সে লোকদেরকে যাদু করে অথবা প্রভাবিত করে কোন রাস্তায় হাকিয়ে দিতে চায়না, বরং তাদের স্বভাব-প্রকৃতি এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে এমনভাবে জাগ্রত করে তুলতে চায় যে, কঠিন থেকে কঠিনতর অবস্থায়ও প্রতিটি ব্যক্তি নিজেকে সিরাতে মুস্তাকীমে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়- সে প্রথমত এই ধরনের দলীল-প্রমাণের ওপর হাতই লাগায়না, যদিও বা লাগায় তাহলে সে সবসময় দৃষ্টি রাখে যে, একটি পবিত্র এবং উন্নত লক্ষ্য অর্জনের জন্য তার উপায়-উপরকরণও অতীব পাক এবং উন্নত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। এই জিনিসটিই আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং হকের আহ্বানকারীদের যুক্তির পদ্ধতিকে অন্যান্যদের যুক্তির পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র করে দিয়েছে। এর কতিপয় সুষ্পষ্ট বৈশিষ্টের দিকে আমরা এখানে ইংগিত করব।
যু্ক্তির সাধারণত্ব
যুক্তি এবং দলীল-প্রমান বাতাস এবং পানির মত একটি সাধারণ প্রয়োজনীয় জিনিস। প্রতিটি মানুষ সঠিক পন্থায় জীবন যাপন করার জন্য ঈমানের মুখাপেক্ষী। মজবুত ঈমান শক্তিশালী দলীল ছাড়া অর্জিত হতে পারেনা। এজন্য দলীল-প্রমাণেল জন্য দুটি জিনিসের প্রয়োজন।
এক. দলীল-প্রমাণের পদ্ধতি এতটা স্বভাব-সুলভ এবং সহজ-সরল হতে হবে যে প্রতিটি ব্যক্তি যেভাবে নিজের প্রয়োজন মাফিক যমীন এবং শূণ্যলোকের সম্পদ আবহাওয়া থেকে বাতাস এবং পানি সংগ্রহ করতে পারে এবং এতে তার কোন বিশেষ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়না, অনুরূপভাবে প্রতিটি ব্যক্তির যমীন ও আসমানের নিদর্শন সমূহ থেকে নিজের হৃদয়ের প্রশান্তির জন্য যত পরিমাণ ইচ্ছা দলীল-প্রমাণ খুজে নেবে এবং এ প্রসংগে তাকে চিন্তা-গবেষণা ছাড়া অন্য কোন জিনিসের মুখাপেক্ষী হতে হবে না।
দুই. মানুষের শারীরিক সুস্থতার জন্য যেভাবে তার পানের পানি নির্মল হাওয়া এবং যে বাতাসে সে নিঃশ্বাস নিচ্ছে তা বিশুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন, অনুরূপভাবে তার বুদ্ধিবৃত্তিক সুস্থতার জন্য সে যে দলীল থেকে জীবন যাপরেনর মূলনীতি লাভ করছে তা সম্পূর্ণ নির্ভেজাল এবং পাক হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
এই দুটি জিনিস অর্জন করার জন্য আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং হকের আহ্বানকারীগণের পন্থা এই ছিল যে, তাঁরা এক দিকে যুক্তিপ্রমানের কৃত্রিম পন্থা থেকে কূরে থেকে নিজেরেদ স্বতন্ত্র পন্থা বের করে নিয়েছেন। কোন জাতি জ্ঞান বিজ্ঞানের দিক থেকে উন্নত হয়ে গেলে তাদের মধ্যে দলীল-প্রমাণেল যে কৃত্রিম পন্থা সৃষ্টি হয় এবং একটি বিশেষ পেশাদার গোষ্ঠী ছাড়া অন্যরা তা থেকে কোন ফায়দা উঠাতে পারেনা, নবীগণ এবং হকের আহ্বানকরীগণ এধরনের কৃত্রিম পন্থা থেকে দূরে থেকেছেন। অপরদিকে যেসব জিনিস দলীল-প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করা হয়, তাঁরা এগুলোর মূল্যায়ন করেছেন। এর মধ্যে যেগুলো অবাস্তব জিনিসের সংমিশ্রন থেকে মুক্ত প্রমাণিত হয়েছে, কেবল সে-গুলোকে তাঁরা দলীল-প্রমাণের কাজে ব্যবহার করার জন্য বেছে নিয়েছেন।
এই ধরনের প্রমাণ পদ্ধতির প্রথম উপকারিতা হচ্ছে এই যে, ইতিপূর্বে মানব জাতির এক বিরাট সংখ্যক লোককে সম্পূর্ণ অন্ধ-বধিরের মত হাতে গোনা কয়েকটি লোকের পেছনে ছুটে বেড়াতে হত, তারা অচিরেই নিজেদের চোখে দেখতে এবং নিজেদের কানে শুনতে সক্ষম হয়ে গেল। এর দ্বিতীয় উপকারিতা হচ্ছে এই যে, এ পর্যন্ত দলীল-প্রমাণের ভেজাল মিশ্রিত যে স্তুপ গলাধকরণ করার ফলে হৃদয় এবং আত্মার ওপর মৃত্যুর যে লক্ষণ বিরাজ করছিল, দলীল-প্রমাণের এই নির্ভেজাল ভান্ডারের কয়েক গ্রাস কন্ঠনালী অতিক্রম করার সাথে সাথে মৃত্যুর সেই লক্ষণ দূর হয়ে যায় এবং ভোজনকারী নিজেজে সম্পূর্ণ সুস্থ, সতেজ এবং সক্রিয় অনুভব করতে থাকে।
হকের আহ্বানকারী এবং আম্বিয়ায়ে কেরামদের প্রমাণ-পদ্ধতির এই বৈশিষ্টের কারণেই মানব জ্ঞান তাদের যুগে পার্শ পরিবর্তন করে এবং প্রতিটি স্তরে একটি সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তি জাগরণ দেখা দেয়। এমনকি এই সাধারণ স্তরে একটা গতির সৃষ্টি হয়ে যায়, যেখান থেকে কোন ভাল সংবাদ কখনো আশা করা যেতনা। প্রতিটি স্তরে সমালোচনা ও যাচাই বাছাইয়ের দৃষ্টি খুলে যায়। প্রতিটি চোখ দেখতে এবং প্রতিটি মুখ বলতে শুরু করে দেয়। চিন্তা-গবেষণা ও দলীল প্রমাণের যে সব পদ্ধতি তখন পর্যন্ত অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল তা ক্ষয়প্রাপ্ত এবং অতি সেকেলে মনে হতে থাকে। অনেক মতবাদ যা অহী এবং ইলহামের মর্যাদাকে দখল করে নিয়েছিল তা সম্পূর্ণ মূল্যহীন এবং গুরুত্বহীন হয়ে যায়। যেসব লোক নিজেদের পুরাতন মতবাদকে হকের চেয়েও অধিক প্রিয় মনে করত তাদের কাছে এই মানসিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিতক স্বাধীনতা সৃষ্টি হয়েছে তা যেন সঠিক খাতে প্রবাহিত হতে পারে। তার মধ্যে যেন ভারসাম্যহীনতা এবং বল্গাহীনতা সৃষ্টি হতে না পারে। এ দায়িত্ব সম্পর্কে হকের আহ্বানকারী যেন ভালভাবেই সতর্ক থাকে। তারা সব সময় খেয়অল রাখে যে, জনগণকে তার চিন্তার যে স্বাধীনতা দান করছে তা যেন তাদের জন্য মুক্তির উপায় হয়, ধ্বংসের কারণ না হয়।
শ্রোতার মধ্যে সঠিক চিন্তার বীজ বপন
আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং হকের আহ্বানকারীদের যুক্তি-পদ্ধতির দ্বিতীয় বৈশিষ্ট হচ্ছে এই যে, তারা কেবল দলীল-প্রমান পেশ করে ক্ষান্ত হননা, বরং শ্রোতার মধ্যেও দলীল-প্রমান উপস্থাপনা করার যোগ্যতা সৃষ্টি করেন। তারা ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত জীবনে যে সর্বাত্মক বিপ্লবের আহ্বান নিয়ে আগমন করেন, তা যতক্ষণ মানুষের চিন্তাগত এবং মতাদর্শগত যোগ্যতাকে পূর্ণরূপে জাগ্রত করতে না পারবে, ততক্ষণ এই বিপ্লব স্থায় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা। জীবনটা কোন বিচ্ছিন্ন বা অবিমিশ্র জিনিস নয় যে, তাকে সঠিক ভাবে পরিচালিত করার জন্য হাতে গোনা কয়েকটি মূলনীতি শিখিয়ে দিলেই যথেষ্ট হতে পারে। জীবনটা হচ্ছে অসংখ্য প্রকাশ্য ও গোপন দাবীর সমষ্টি, অসংখ্য ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত সংযোগ-সম্পর্কের বন্ধন, বেশুমার ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সমষ্টিগত অধিকার ও কর্তব্যের একটি ভান্ডর। জীবনের প্রতিটি দিক আমাদের দৃষ্টির সামনে পূর্ণরূপে কর্তব্যের একটি ভান্ডর। জীবনের প্রতিটি দিক আমাদের দৃষ্টির সামনে পূর্ণরূপে বর্তমান থাকেনা। এজন্য প্রতিটি দিক আমাদের দৃষ্টির সামনে পূর্ণরূপে বর্তমান থাকেনা। এজন্য প্রতিটি লোককে তার প্রতিটি অবস্থার জন্য পূর্ব থেকে একটি করে হুকুমও নির্দিষ্ট নেই। বরং তার অতীত এবং ভবিষ্যৎ উভয়ই অদৃশ্যের অন্তরালে লুকিয়ে আছে। কেবল সামান্যই তার সামনে আছে, যার ইংগিতের ওপর নির্ভর করে তার অতীতকেও বুঝতে হয় এবং এর আলোকেই তার ভবিষ্যৎকেও নির্ধারণ করতে হয়। এই অবস্থায় জীবওেনর পথ প্রদর্শনের জন্য নাইন-বিধানের কেবল নির্ধারিত এবং সীমিত ব্যবস্থাই যথেষ্ঠ হতে পারেনা। বরং এই আইন ব্যবস্থার সাথে সাথে মানুষের মধ্যে সুষ্ঠু চিন্তার এমন একটি অনির্বান শিখাও থাকা অত্যাবশ্যক যা জীবনের এই গোপন অংশও তার পথ প্রদর্শন করতে পারে- যেখানে পথনির্দেশনা লাভ করার মত অন্য কোন ব্যবস্থা তার কাছে নেই। নবী-রসূল এবং হকের আহ্বানকারীদের যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করার পদ্ধতি থেকেই শ্রোতার মধ্যে এই সুষ্ঠু চিন্তার যোগ্যতার সৃষ্টি হয়। নবীগণ যখন তাদে মৌলিক বিষয়ের শিক্ষাদান শুরু করেন, তখন তা শিক্ষার্থীর মধ্যে এমনভাবে প্রবিষ্ট করেন যে, সুষ্ঠু চিন্তার বীজ বপনের জন্য অন্তর এবং আত্মার মধ্যে যমীন সমতল হয়ে যায় এবং তার বীজও অংকুরিত হয়ে যায়। এমনকি তারা যখন নিজেরেদ কাজ থেকে অবসর হন, তখন একদিকে শরীআতের একটি সবুজ-শ্যমল বাগান দৃষ্টিগোচর হয়, অপর দিকে প্রতিটি সুস্থ আত্মার মধ্যে হিকমত ও প্রজ্ঞার একটি উদ্যান রচিত হয়ে যায়। তা যদিও দৃষ্টির সামনে উপস্তিত থাকেনা কিন্তু তার বসন্তকাল সব সময় বিরাজিত থাকে এবং তার শাখা-প্রশাখা সব ঋতুতেই ফলে পরিপূর্ণ থাকে।
নবীদের মূল শিক্ষার মোকাবিলায় এটাকে আনুসংগিক চাষাবাদ ও উপজাত (BY-Product) বলা যেতে পারে। কিন্তু নিজের মর্যাদা ও মূল্য এবং অপরিসীম উপকারিতার দিক থেকে তা আসলের সমান স্থান লাভ করে। এদিকে ইংগিত করেই নবী সাল্লাল্লাগু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ (আরবী*************)
“জেনে রাখ আমাকে কুরআন দেয়া হয়েছে এবং কুরআনের সাথে এ অনুরূপ আরো একটি জিনিস।” (আবু দাউদ, ইবনে মাজা, দারেমী)
এটা হচ্ছে সেই কল্যাণময় বৃক্ষের ফুল এবং ফল যা আমরা হাদীসের আকারে পেয়েছি। এই সেই জিনিস, যেদিকে কুরআন মজীদ ইংগিত করেছে- “যে ব্যক্তি এই জিনিস লাভ করতে পেরেছে সে কল্যাণের অফুরন্ত ভান্ডার লাভ করেছে।” এটাকে কোন কোন হাদীসে এমন ভান্ডারের সাথে তুলনা করা হয়েছে যা কখনো শেষ হবার নয়।
তর্ক-শাস্ত্রের কায়দায় দলীল পেশ
এই সৃজনশীল বৈশিষ্ট কেবল আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং হকপন্থীদের প্রমাণ- পদ্ধতির সাথেই নির্দিষ্ট খুজে পাওয়া যাবেনা। আমাদে আলেম সমাজ মানতেকী পন্থায় যুক্তি-প্রমাণকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু মানতেকী পন্থায় যুক্তি-প্রমাণ এদিক থেকে সর্বাধিক ত্রুটিপূর্ণ। মানতেককে সর্বাধিক যতটুকু সম্মান দেয়া যেতে পারে তা হচেছ এই যে, কোন যুক্তিকে নিজের কষ্টিপাথরে যাচাই করে সে বলতে পারে যে, তা সঠিক কি না। যুক্তি উপস্থাপনের যোগ্যতা সৃষ্টি করা তর্কেশাস্ত্রের ক্ষমতার বাইরে। একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্তই তর্কশাস্ত্রের দ্বারা এ কাজ নেয়া যেতে পারে। কুরআন মজীদ এবং নবীদের বক্তব্যের মধ্যে হালকা প্রকৃতির যুক্তি-প্রমাণও পাওয়া যায়- যাকে তর্কশাস্ত্রের তুলাদন্ডে হিরার মধ্যেমে ওজন করা যায়না। কিনউত আমদের কালাম শাস্ত্রবিদদের মধ্যে যারা তর্কশাস্ত্রকে তার প্রাপ্যের অধিক মর্যাদা দিয়েছেন, তারা কয়লা মাপার এই তুলাদন্ডে কুরআনের স্বরণমুদ্রাকেও ওজহন করতে চাইল। ফলে তার এই স্বর্ণমুদ্রাকে কয়লার চেয়েও কম মূল্যবান সাব্যস্ত করে বসল।
এখন থাকল দার্শনিকদের প্রসংগ। এতে সন্দেহ নেই যে, তারা অকশ্যই মানবীয় চিন্তাকে এমন ভাবে প্রশিক্ষণ দেন যাতে তা যুক্তি প্রমাণ উদ্ভাবন ও উপস্থাপন করার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তেজস্বিতার প্রদর্শন করতে পারে। কিন্তু তারা নিজেদের যুক্তি-প্রমাণের বিষয়বস্তু, যুক্তি পেশের পদ্ধতি এং যুক্তির উপায়-উপকরণ-তিনটি জিনিসকেই আদ্র-শুষ্কের সমষ্টিতে পরিণত করে রেখেছে। একারণে তাদের পন্থায় চিন্তা করতে গিয়ে কোন ব্যক্তি হতবুদ্ধি ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। তাদের পথনির্দেশনায় লোকেরা যদি সঠিক রাস্তায় কয়েক কদম অগ্রসর হতেও পারে, তাহলে সাথে সাথে ভ্রান্ত পথেও কয়েক কদম অগ্রসর হতে বাধ্য হয়। এর ফল দাঁড়ায় এই যে, মানুষের গোটা জীবন বিভিন্ন প্রান্তরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরপাক খেতে এবং আন্দাজ- অনুমানের তীর নিক্ষেপ করতে করতে শেষ হয়ে যায়। কতিপয় পরস্পরক বিরোধী জটিল চিন্তা ছাড়া তার ভাগ্যে আর কিছুই জোটেনা। এ ব্যাপারে প্রাচীন দর্শন এবং আধুনিক দর্শন উভয়ের অবস্থাই এক। সবাইর চিন্তর মূলনীতিতে রয়েছে জটিলতা এবং প্রত্যেকের চিন্তার ফলাফলের মধ্যে বিরাজ করতে অস্থিরতা। আর এখন বিজ্ঞানে উন্নতি সবকিছুর কেন্রবিন্দু পরীক্ষা-নিরিক্ষা ও পর্যবেক্ষরে ওপর স্থাপন করেছে এবং মানুষ এই বোকামীর শিকার হয়ে পড়েছে যে, সে তার চর্মচোখে কোন জিনিস না দেখে তা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। এর ফল এই দাঁড়িয়েছে যে, মানুষের একটি কদমও সহজ সরল পথে পতিত হওয়ার কোন সম্ভাবনাই আর বাকি থাকলনা। বর্তমানকাল পর্যন্ত যেসব মূলনীতির ওপর দর্শনে র ভিত্তি স্থাপিত ছিল তার কতিপয় মূলনীতি ভ্রান্ত হলেও কতিপয় সঠিক ছিল। একারণে তার অস্তির স্বপ্নগুলোর মধ্যে কতগুলো সত্য স্বপ্নও বেরিয়ে আসত। এক্ষেত্রে মানুষের জন্য কেবল সত্য ও মিথ্যার তধ্যে পার্থক্য করার সমস্যাই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এখনতো গোটা অবলম্বনই ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও পর্যবেক্ষণের ওপর রয়ে গেল। আর ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও পর্যবেক্ষণের ব্যাপকতক যে কতটুকা তা জানাই আছে। এই জড়বাদী দর্শন ছাড়া আজ যদি দর্শনের নামে কোন জিনিস বর্তমান থাকে তাহলে তা সংশয়বাদীদের দর্শণই রয়েছে। এর গোটা ভিত্তি ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও পজ্ঞার অনির্ভরযোগ্যতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। পরিষ্কার কথা হচ্ছে এটা কোন দর্শনই নয়, বরং সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং দর্শনকে তা সম্পূর্ণরূপে নীতিবাচক করে দিচ্ছে। দুনিয়া তার কাছ থেকে অস্থিরতা ছাড়া আর কিছুউ পায়নি।
নবীদের যুক্তিপ্রমান পদ্ধতি তর্কশাস্ত্রবিদদের পদ্ধতির মত বন্ধ্যাও ছিলনা এবং দর্শন শাস্ত্রবিদদে পদ্ধতির মত অস্থির প্রকৃতিরও ছিলনা। বরং তারা মানবীয় চিন্তাকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেন যে, তা নিজে নিজেই সঠিক পথে অগ্রসর হতে থাকে এবং মঞ্জিলে-মকছুদের নির্ধারণ তার মধ্যে এমন আত্মপ্রত্য সৃষ্টি করে যে, সে যে পথ অনুসরন করছে তা সঠিক এবং নির্ভুল। তাঁরা প্রথমে স্বীকৃতি দলীল-প্রমাণেল দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অর্থাৎ উন্মুক্ত ও বিস্তৃত মহাশণ্য এবং মানুষের নিজের মধ্যে নিহিত প্রমাণ সমূহের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করনে। মহাশূণ্য বলতে বিশ্ব-ব্যবস্থাপনার নিদর্শনসমূহ এবং আইন-বিধানকে বুঝানো হয়েছে যা প্রতিটি মানুষ সাধারণভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই উপলব্ধি করতে পারে। মানুষের নিজের মধ্যকার প্রমান বলতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই উপলব্ধি করতে পারে। মানুষের নিজের মধ্যেকার প্রমান বলতে সে যে শক্তি, যোগ্যতা, ও ক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসের অধিকারী তার দিকে ইংগিত করা হয়েছে। এগুলো প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজের মধ্যে দেখতে পায় এবং অনুভব করতে পারে। নবীগণ এসব নিদর্শণের প্রতি অংগুলি নির্দেশ করেন এবং এ অবশ্যম্ভাবী পরিণতিকে সামনে তুলে ধরেন। এই প্রমানের মাধ্যমে কখনো পুরা বক্তব্য দিবালোকের মত উদ্ভাসিত হয়ে সামনে এসে যায়। আবার কখনো প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে অবশ্যম্ভাবী পরিণতির দিকে শুধু ইশারা করেই ছেড়ে দেয়া হয়, যাতে দাওয়াতকৃত ব্যক্তি নিজেই পরিণতির দিকে অগ্রসহ হতে পারে।
এর একটি উপকারিতা হচ্ছে এই যে, দাওয়াতকৃত ব্যক্তির মধ্যে সঠিক ফলাফল নির্ণয়ের যোগ্যতা সৃষ্টি হয়ে যায়, যা তার জীবনের পরিভ্রমন পথের প্রতিটি মঞ্জিলে তার উপকারে আসে। এর দ্বিতীয় উপকারিতা হচ্ছে এই যে, সে দাওয়াতকে অন্যের বক্তব্য মনে করে অন্যের বক্তব্য মনে করে সাথে সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেনা। বরং এটাকে নিজের চিন্তার ফল মনে করে তা গ্রহণ করার দিকে অগ্রসর হয়। তৃতীয় উপকারিতা হচ্ছে এই যে, এই পন্থায় সম্বোধনকারী সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। ফলে সম্বোধিত ব্যক্তির মাঝে এইরূপ হীনমন্যতাবোধ সৃষ্টি হতে পারেনা যে, সে অন্যের হাত ধরে ফলাফল পর্যন্ত পৌছছেছে। বরং সে চিন্তা করে, আমাদে উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই সঠিক ফলাফল পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব হয়েছে।
একথা খুলে বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, বিশ্বপ্রকৃতি এবং মানুষের মধ্যে বিরাজিত নিদর্শণসমূহ থেকে যুক্তিপ্রমাণ পেশ করার পদ্ধতিই মানুষের স্ববাবে- প্রকৃতির সাথে সবচেয়ে বেশী সামঞ্জস্যশীল। এজন্য নবী-রসূল এবং হকের আহ্বানকারীগণ এই পদ্ধতিই বেশী অনুসরণ করতেন। মানুষ যখন উম্মুক্ত বিশ্বচরাচরে কোন জিনিস পর্যবেক্ষণ করে অথবা তার নিজের স্বভাবের মাঝে এ সেম্পর্কে আত্মপ্রত্যয় অনুভব করে, তখন তার অবশ্যম্ভাবী ফলাফলকে সে অস্বীকার করতে পারেনা। তবে শর্ত হচ্ছে এসব প্রমাণ সঠিক ক্রমানুসারে তার সামনে উপস্থাপন করতে হবে। এরপর সে যদি তা অস্বীকার করে তাহলে কেবল মুখেই অস্বীকার করতে পারবে, কিন্তু তার অন্তর এই অস্বীকৃতির সমর্থন করবে। যদি স হঠকারী এবং একগুয়ে হয়ে থাকে তাহলেই কেবল এই অস্বীকৃতির ওপর অটল থাকতে পারে। কোন জিনিসের অবশ্যম্ভাবী ফলাফলের অর্থ হচ্ছে। বিষয়টি পূর্বে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে, এখন তা বিস্তারিত বর্ণনা করা হচ্ছে। কোন ব্যক্তির মধ্যে সত্যের অনুরসণ এবং সমর্থনের সামান্যতম যোগ্যতা বাকি থাকলেও তার সম্পর্কে আশা করা যায় যে, সে মৌলিক ভাবে যে বিষয়ের ওপর ঈমান এনেছে তার বিস্তারিত রূপ এবং ফলাফলকে মেনে নিতেও সে পশ্চাদপদ হবেনা। যেসব লোক কুরআন মজীদের যুক্তি-প্রমাণের ওপর গভীর ভাবে চিন্তা করেছে তারা আমাদের এ কথার সত্যতা স্বীকার করবে যে, কুরআনের অধিকাংশ যুক্তি-প্রমানের ধরণ এরূপই। একারণ যে ব্যক্তি অনাবিল মন নিয়ে কুরআন মজীদ অধ্যয়ণ করবে, সে অনুভব করতে পারবে যে, সে নিজেই কিতাবই পাঠ করছে। এর প্রতিটি আহ্বান নিজেরই আহ্বান মনে হতে থাকবে।
ভুল সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি রাখা নিষেধ
আম্বিয়ায়ে কেরা এবং হকপন্থীদের যুক্তি-প্রমাণ পদ্ধতির তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট হচ্ছে যে, তারা সাধারণ তর্কবিশারদদের মত দাওয়াতের ব্যাপার ব্যক্তির কোন ভুল সিদ্ধান্তকে যুক্তির ভিত্তি বানাতেন না। যদি কোন ব্যক্তি কোন ভ্রান্ত আকীদা পোষণ করে থাকে তাহলে এর সংশোধন করার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু তার একটি ভ্রান্তির কারণে তাকে আরো কতগুলি ভ্রান্তি স্বীকার করে নিতে বাধ্য করা যেতে পারেনা। যে ব্যক্তি নিজের সম্বোধিত ব্যক্তিরকে নিরুত্তর কারিয়ে দিতে চায়, অথবা তাকে নিজের কথার সামনে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে চায়, অথবা তাকে কোন ভ্রান্তিতে নিক্ষেপ করতে চায়- তার যুক্তির পন্থার মধ্যে অনেকাংশে এই উপাদান পাওয়া যায়। কিন্তু হকপন্থীরা কখনো এই ভ্রান্ত পদ্ধতি অনুসরণ করেনা। সম্বোধনকৃত ব্যক্তির কোন ভুল সিদ্ধান্তের ওপর তারা নিজেদের কোন হককে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পেলেও তারা তা গ্রহণ করেননা। যে হকের ভিত্তি বাতিলের ওপর স্থাপিত তাদের দৃষ্টিতে এই হকের কোন গুরুত্ব নেই। এ ধরনের অন্তসারশুণ্য এবং ভিত্তিহীন এক পেশাদার তার্কিকদের কাছেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তা কিছুক্ষণের জন্য নিজের জৌলূসও দেখাতে পারেব। কিন্তু জীবন-সংগ্রামে তা কোন কাজেই আসতে পারেনা। জীবন-যুদ্ধে কেবল হকই কাজে আসতে পারে যার শিকড় মানব-প্রকুতির মধ্যে দূরদূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিস্তৃতি গোটা পরিবেশকে নিজের ছায়াতলে নিয়ে নেয়।
আমাদের কালাম শাস্ত্রবিদগণ সাধারণত যে ভুল করেছেন তা হচ্ছে- ইসলামের কোন মূলনীতির সত্যতা প্রমানের জন্য তারা যখন নিজেরেদ কোন ভিত্তি কায়েম করতে পারেননি, তখন অন্যদের কোন মতবাদ ও ধারণাকে ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করে তার ওপর নিজেদের কল্পনার প্রাসাদ নির্মান করেছেন। এধরনের ভ্রান্ত ওকালতির ফলে ইসলামের যে ক্ষতি হয়েছে, ইসলাম বিরোধীদের বিরোধিতার ফলে তার এতটা ক্ষতি হয়নি। ইসলামের কোন মূলনীতি সঠিক বুদ্ধিবৃত্তিক এবং প্রাকৃতিক যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করা যাচ্ছেনা এর কারণ এই নয় যে, খোদা-নাখাস্তা ইসলামরে মূলনীতি সমূহের সত্যতার স্বপক্ষে কোন বুদবৃত্তিক এবং প্রাকৃতিক যুক্তিই বর্তমান নেই। বরং এর কারন শুধু এই যে, পেশাদার তার্কিকগণ অপ্রকৃতিক বুদ্ধিবৃত্তির দ্বারা নিজেদের রুচিকে এতটা বিকৃত করে ফেলেছে যে, তারা ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তির মূল্য ও মর্যাদা অনুধাবন করতেই ব্যর্থ হয়েছে। এই অবস্থায় তাদে জন্য সঠিক পথ এই ছিল যে, ইসলামের পক্ষে ওকালতি করার দায়িত্ব নেয়ার পরিবর্তে নিজেদের পূর্বেকার ধান্দায় মশগুল থাকা। কিন্তু পৈত্রিক ধর্ম হিসাবে ইসলামের জন্য তাদের অন্তরে যে টান ছিল- তা তাদেরকে উষ্কানি দিতে থাকল যে, তারা যে ধর্মের নাম নিচ্ছে তার সত্যতাকে বুদ্ধিবৃত্তিক মূলনীতির ওপর দাঁড় করাতেই হবে। তাদে বিকৃত রুচি এবং কুরআনের আলা থেকে বঞ্চিত থাকার কারণে ইসলামে বুদ্ধবৃত্তি তাদের অন্তরে আবেদন সৃষ্টি করেনা। এজন্য তাদের যুগে যে বুদ্ধিবৃত্তি সাধারণ-বিশেষ নির্বিশেষে সবার কাঠে গ্রহণযোগ্য ছিল তার মানদণ্ডে তারা ইসলামের সত্যতাকে প্রমাণ করে দেখাতে চাচ্ছিল। তাদে এই ভ্রান্ত প্রচেষ্টার ফল এই দাঁড়ায় যে, তারা ইসলামের সুদৃঢ় এবং সঠিক শিক্ষার গোটা ইমারতকে তার শক্তিশালী ভিত্তি থেকে সরিয়ে নিয়ে একেবারে দুর্বল এবং ভংকগুর ভিত্তির ওপর স্থাপন করে। তারা যতটা সৎ উদ্দেশ্য প্রনোদিত হয়েই একাজ করুক না কেন, কিন্তু তার পরিনাম হয়েছে অত্যন্ত ভয়াবহ। যুগের পরিক্রমা এবং বিজ্ঞানের আবিষ্কার যখন গতকাল পর্যন্তও সাধারণভাবে সমাদৃত মতবাদকে ভিত্তি হীন প্রমাণ করে দিল, তখন তার আঘাত ইসলামের সেই সব মূলনীতির ওপর এসে পড়ল যেগুলোকে ভ্রান্ত মতবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এ কারণে ইসলামের সাথে সম্পর্কিত অনেক লোকের মনে এই ধারনার সৃষ্টি হল যে, এই মতবাদ যেভাবে পুরাতন হয়ে গেছে, অনুরূপভাবে ইসলামও পুরাতন হয়ে গেছে। এই খারাপ ধারণা সৃষিট করার ক্ষেত্রে আমাদে প্রাচীনপন্থী কালাম শাস্ত্রবিদগণও যেরূপ অংশ গ্রহণ করেছে, অনুরূপ ভাবে আমাদের বর্তমান কালের কলাম শাস্ত্রবিদগণও অংশ গ্রহণ করছেন। এই দুই দলের সম্মিলিত ভ্রান্তি হচ্ছে এই যে, হকের সাহায্যের জন্য তারা হককে যথেষ্ট মনে করেনি, বরং তার জন বাতিলের সাহায্যও জরুরী মনে করে। অথচ হকের অর্থ এই যে, তা সুপ্রতিষ্ঠিত, স্বপ্রমাণিত এবং দৃঢ়। জ্ঞান ও স্বভাবের মধ্যে তার শিকড় অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
কিন্তু আমাদে কালাম শাস্ত্রবিদগণ গ্রীক দার্শণিকদের দেখানো চিন্তার ও যুক্তির পদ্ধতি অনুসরণে এতটা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে, তারা কুরআনে যুক্তি-প্রমাণ পদ্ধতির সূক্ষতা এবং সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। অথচ তারা যদি যুক্তি-প্রমাণের স্বভাববিরুদ্ধ পন্থাকে পরিহার করে কুরআন এবং নবীদে প্রজ্ঞাপূর্ণ যুক্তির পদ্ধতি অনুধাবন করার চেষ্টা করত, তাহলে তারা জনতে পারত যে, কুরআনের প্রতিটি দাবীর ভিত্তি এতটা মজবুত দলীলৈর ওপর প্রতিষ্ঠিত যা সময় এবং স্থানের যাবতীয় সীমাবদ্ধতা থেকে এবং চিন্তার বিপ্লবের যাবতীয় প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
ঐক্যসূত্র অন্বেষণ
হকের আহ্বানকারীদের যুক্তি-পদ্ধতির চতুর্থ বৈশিষ্ট হচ্ছে এই যে, তারা নিজেদের এবং আহ্বানকৃত ব্যক্তির মধ্যে ঐক্যসূত্র অন্বেষণ করে তাকে আলোচনা ও যুক্তির ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করে। তারা প্রকিটি ক্ষেত্রে অযথা নিজেদের একাকিত্ব ও স্বাতন্ত্র প্রকাশ করার চেষ্টা করেননা। মানব জাতি নিজেদের বাহ্যিক স্বানন্ত্রের দিক থেকে যতই অমিল এবং বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিগোচর হোক না কেন, কিন্তু তাদের এই অমিল এবং বিক্ষিপ্ততার গভীরে এমন অসংখ্য মূলনীতি ও আকীদা-বিশ্বাস পাওয়া যাবে যেখানে সকলের ঐক্যমত রয়েছে। বিশ্ব-প্রকুতির নিয়ম-বিধান, ইতিহাসের সিদ্ধান্ত-মূহ, স্বভাব-প্রকুতির বিশ্বাস এবং নৈতিকতার মৌলিক বিধানের মধ্যে এমন অনেক জিনিস রয়েছে যে সম্পর্কে, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য এবং আরব-অনারব সবাই একই দৃষ্টিভংগী পোষন করে। যদি এগুলোকে যুক্তির ভিত্তি বানিয়ে আলোচনায় অগ্রসর হওয়া যায়, তাহলে ধীরস্থির প্রকৃতির লোকেরা এর অবশ্যম্ভাবী ফলাফল স্বীকার করে নিতে ইতস্তত করবেনা। জীবনের যেসব নীতিমালায় উভয়ের অংশীদারিত্ব রয়েছে তার আুসংগিক বিষয়ে যেসব মতবিরোধ দেখা দেয় তার অধিকাংশই কুবুদ্ধি এবং গোঁড়ামীল কারণে সৃষ্টি হয। আন্তরিক প্রচেষ্টা মাধ্যমে যদি এসব বিরোধ দূর করা যায় তাহলে প্রতিটি ব্যক্তি এসব মূলনীতিকে সম-অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সম্মান ও মর্যাদর চোখে দেখতে থাকবে।
নবী-রসূলগণ সব সময় এই পদ্ধতিকেই যুক্তি-প্রমান পেশের জন্য অবলম্বন করে আসছেন। আরব মুশরিক এবং আহলে কিতাবদের সামনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযা সাল্লাম যে ভাবে যুক্তি-প্রমান উপস্থাপন করছেন তার বিস্তারিত বর্ণনা কুরআন মজীদে বর্তমান রয়েছে। এগুলো অধ্যয়ন করলে কোথাও এমন ধারণা পাওয়া যাবেনা যে, তাদের কাছে এমন কিছু দাবী করা হয়েছে যা তাদে কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত এবং অভিনব। তাদের ইতিহাস, তাদের রীতি-নীতি,তাদের ন্যা-অন্যায়বোধ এবং তাদের আকীদা-বিশ্বাস ও নৈতিকতায় এর মূল নিহিত ছিল। যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হত তা কেবল এই মূলের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং এর শাখা-প্রশাখাই পরিলক্ষিত হত। এজন্য রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাবী ছিল, মূল এবং তার আনুসংগিক বিষয়ের মধ্যে যে বিরোধ সৃষ্টি হয়ে গেছে লোকেরা দূর করে নেবে। কুরআন যা বলছে তা যদি সঠিক হয় তাহলে তাঁরা এটা মেনে নেবে, আর তারা যার দাবীদার তা যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে তাকে সঠিক বলে প্রমাণ করে দেখাক। এই পন্থায় যুক্তি পেশ করার উপকারিতা হচ্ছে এই যে, আহ্বানকারী সম্পর্কে এই ভুল ধারণা সৃষ্টি হতে পারেনা যে, সে এমন কে ব্যক্তি, যে নিজের একাকিত্বের ধারনায় গোটা অতীতকে অস্বীকার করতে চায় এবং নিজের ব্যক্তিত্বের প্রভাব বিস্তার করার চিন্তায় মশগুল আছে। বরং তার সম্পর্কে এই ধারণা পোষণ করা হয় যে, সে আমাদে পূর্ববর্তী পৈত্রিক সম্পদকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্যিই এসেছে। যদি কিছু লোক নিজেদের দুষ্ট প্রকৃতির বশবর্তী হয়ে তাদে বিরুদ্ধে বুল ধারণা প্রচার করতে চায় তাহলে তারা এটা বেশীদিন ছড়াতে পারবেনা। প্রকৃত সত্যের সূর্য উদিত হয়ে অতি দ্রুত অন্ধকার দূর করে দেবে।
যেসব লোক হকপন্থীদের এই পন্থায় যুক্তি পেশের উপকারিতা এবং সৌন্দর্য সম্পর্কে অবহিত নয় তাদের কর্মপন্থা সাধারণত হকপন্থীদের সম্পূর্ণ উল্টা হয়ে তাকে। তারা কোন ঐক্যসূত্র খুঁজেইনা বরং যদিও কোন ঐক্যসূত্র পেয়ে যায় তাহলে তাকেও মতবিরোধের সূত্র বানিয়ে রাখে। তাদে মতে তাদের যুক্তি এবং দাওয়াতের আসল সৌন্দ্য হচ্ছে যে, তারা প্রমাণ করে দেখাতে চায় যে, তারা যা বলছে তা ইতিপূর্বে মাটির ওপর এবং আসমানের নীচে কেউ বলেনি। আমাদের যেসব তার্কিক ইসলামের দাওয়াতের সঠিক মেজাজের সাথে পরিচিত নয় তারা সাধারণত এ ধরনের বিকৃতিতে নিমজ্জিত রয়েছে। তারা যখনই ইসলামের কোন সত্যকে উপস্থাপন করে তখন তাকে একটি বিরল সত্য হিসাবে প্রমাণ করে দেখানোর মধ্যেই নিজের কৃতিত্ব নিহিত আছে বলে মনে করে। এই ব্যাপারটি স্বভাবের মধ্যে ভালবাসা সৃষ্টির পরিবর্তে ঘৃণার সৃষ্টি করে এবং লোকেরা এটাকে নিজের জিনিস মনে করে গ্রহণ করার পরিবর্তে আজগুবী জিনিস মনে করে তা পরিহার করতে থাকে।
প্রতিবাদমূলক যুক্তি-পদ্ধতি পরিহার
হকের আহ্বানকারীদের যুক্তি-পদ্ধতির পঞ্চম বৈশিষ্ট হচ্ছে এই যে, তারা যুক্তি এবং জবাবদানের প্রতিবাদ-মূলক পন্থা কখনো গ্রহণ করেনা। এর উদাহরণ হচ্ছে এই যে, যেখানে কোন ধর্মের শিক্ষার মধ্য থেকেও অনুরূপ ধরনের আপত্তি তুলে ধরা। আমাদে তার্কিক এবং দার্শনিকগণ এ ধরনের পন্থা অবলম্বন করে মনে করেন তারা ইসলামকে অভিযোগের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। মূলত এধরনের জবাব নীতিগতভাবে ভুল। অন্যের কোন ভ্রান্তির কারণে আমাদের কোন ভ্রান্তি সত্যে পরিনত হওয়অ তো দূরের কথা আমাদের কোন সত্যের হওয়াটাও সন্দেহযুক্ত হয়ে যায়। এই পন্থায় যুক্তি পেশ করে যদি কোন ফায়দা পাওয়া যায় তাহলে শুধু এতটুকু যে, অভিযোগ বা প্রতিবাদকারীর মুখ বন্ধ করে দেয়া যায় এবং এর দ্বারা আমাদে অহংকারী আত্মা শান্তনা লাভ করে। কিন্তু এর দ্বারা প্রতিপক্ষও ইসলামের সত্যতার প্রমান পেতে পারেনা এবং নিজেদের হৃদয়ও উম্মুক্ত হতে পারেনা। রবং এটা আমাদের নিজেদের দুর্বলতারই প্রমাণ বহন করে যা আমরা নিজেরাই অপরের কাছে তুলে ধরছি।
প্রতিটি সত্যই তার নিজের মধ্যে নিজের সত্যতার প্রমাণ বহন করে। অন্যের কো বাতিলের মধ্যে তার প্রমাণ নিহিত থাকতে পারেনা। এ কারণে সঠিক পন্থা হচ্ছে কেবল এই যে, সত্যের স্বপক্ষের প্রমাণও তার মধ্য থেকেই পেশ করতে হবে। এ ব্যপারে আমাদে কালাম শাস্ত্রবিদদের পদ্ধতি দুটি কারণে ভূল। প্রথম কারণ হচ্ছে এই যে, বিরুদ্ধবাদীদের অপপ্রজারে প্রভাবিত হয়ে পড়ার ফলে অনেক সময় ইসলামের কোন কোন সঠিক মূলনীরিত সত্যতা তাদের নিজেদের চোখেই সংশয়পূর্ণ হয়ে দেখা দিল। এজন্য বিরুদ্ধবাদীদের প্রতিবাদমূলক জবাব দান করে তাদেরকে নিরুত্তর করে দেয়া ছাড়া তাদের জন্য অন্য কোন উপায় ছিলনা। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে এই যে, এই লোকেরা নিজেদের ওকালতী এবং সাহয্য –সহায়তা করা দায়িত্ব ইসলারেম গন্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেনি। বরং জাতীয় অন্ধপ্রীতির শিকার হয়ে তার মুসলিম উম্মাহর গোটা ইতিহাসের সাহায্য করাটাকেও নিজেদের ঘাড়ে নিয়ে নেয়। একারণে তাদের যুদ্ধক্ষেত্র অনেক প্রশস্ত হয়ে যায়। তাদেককে এমন অনেক জিনিসের সত্য হওয়াও প্রমান করতে হয় যাকে সত্য প্রমাণ করা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব ছিলনা যতক্ষণ তারা অন্যের অসংখ্য বাতিলকেও সত্য প্রমাণ করতে না পারে।
আমাদে কালাম শাস্ত্রবিদদের গত অর্ধ শতাব্দীর রচনাবলী-যার মধ্যে জিহাদ, দাসপ্রথা, বহুবিবাহ, তালাক এবং মুসলিম রাজা-বাদশাদের কার্যকলাপের বৈধতা ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে- এর সবকিছুই উপরোল্লিখিত ব্যক্তব্যের সাক্ষ্য বহন করছে। এগুলো পাঠ করে কখনো তাদে অসহায় এবং প্রভাবিত অবস্থার জন্য করুনার উদ্রেব হয়, আবার কখনো তাদের ভ্রান্ত পদক্ষেপের জন্য মাথা কুটে মরতে ইচ্ছা হয়। অথচ তারা যদি অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হত এবং অপরের ঝগড়া নিজেদের মাথায় তুলে না নিত, বরং নিজেদের সহযোগিতা শুধু ইসলামের গন্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখত তাহলে অনেক অর্থহীন জিনিস থেকে নিরাপদ থাকা যেত।

About মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী