হাদীছের তত্ত্ব ও ইতিহাস

চতুর্থ অধ্যায়

হাদীছ জাল ও তার প্রতিকার

রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর ছাহাবীগণ রছূলুল্লাহর নামে হাদীছ জাল করিয়া বর্ণনা করা তো দূরের কথা, তাঁহাদের জানা হাদীছ বর্ণনা করিতেও ভয় করিতেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁহার বান্দাদের মধ্য হইতে যাঁহাদিগকে তাঁহার রছুলের সাহচর্যের জন্য মনোনিত করিয়াছিলেন এবং যাঁহারা আল্লাহর দ্বীনের খাতিরে নিজেদের যথাসর্বস্ব ত্যাগ করিয়া রছূলের পিছনে রছুলের পিছনে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন তাঁহারাই রছূলের নামে মিথ্যা হাদিছ গড়িয়া সেই দ্বীনের ভিত্তিমূলকে ধ্বংস করিয়া দিবেন ইহা কল্পনা করাও অসম্ভব।

মোছলেম প্রভৃতি ছহীহ কিতাবে ‘মোতাওয়াতের’ হাদীছ রহিয়াছেঃ “যে ব্যক্তি মিথ্যা আরোপ করিয়াছে সে যেন তাহার স্থান দোজখে প্রস্তুত করিয়া লয়”। ইহাতে ছাহাবীগণ এতই ভীত হইয়া পড়িয়াছিলেন যে, ভুলক্রমে কোথাও মিথ্যা আরোপিত হওয়ার ভয়ে কোন কোন ছাহাবী রছূলুল্লাহর নাম করিয়া সহজে কোন কথাই বলিতে চাহিতেন না। সমস্ত ‘রেজাল’ ও ‘তারীখের’ কিতাব খুঁজিয়া কাহারো পক্ষে এরূপ একটি দৃষ্টান্ত বাহির করা সম্ভবপর হইবে না যাহাতে কোন ছাহাবী রছূলুল্লাহর নামে মিথ্যা কথা রচনা করিয়াছেন বলিয়া উল্লেখ রহিয়াছে। ছাহাবীগণ নিঃসঙ্কোচে একে অন্যের সমালোচনা করিয়াছেন; এমন কি, স্বয়ং খলীফা ও আমীর ওমারাদের সমালোচনা করিতেও দ্বিধাবোধ করেন নাই। কিন্তু তাঁহাদের কাহাকেও কখনো একথা বলিয়া কাহারো সমালোচনা করিতে দেখা যায় নাই যে, অমুক ব্যক্তি (ছাহাবী) রছূলুল্লাহর নামে মিথ্যা হাদীছ রচনা করিয়াছেন; বরং দীর্ঘজীবী ছাহাবী হজরত আনাছ (যিনি ছাহাবীদের যুগের শেষের দিকে ৯৩ হিজরীতে এন্তেকাল করিয়াছেন) বলেনঃ (আরবী***************************************)

‘আমরা একে অন্যের প্রতি (মিথ্যার) সন্দেহ করিতাম না। অর্থাৎ, আমাদের কেহ এ ব্যাপারে সন্দেহের পাত্র ছিলেন না’। -তাদবীন ৪৩৭ পৃঃ। হজরত আয়েশা ছিদ্দীকা (রাঃ) অধিক হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে হজরত আবু হুরাইরা রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর নামে মিথ্যা হাদিছ রচনা করিয়াছেন। খলীফা হজরত আবু বকর ও ওমর (রাজিয়াল্লাহু আনহুম) অনেক ছাহাবীর নিকট তাঁহার হাদীছ সম্পর্কে সাক্ষ্য তলব করিয়াছেন, কিন্তু কখনো এ সন্দেহের প্রকাশ করেন নাই যে, বর্ণনাকারী রছূলুল্লাহর নামে মিথ্যা হাদীছ রচনা করিয়াছেন। তাঁহাদের সন্দেহের বিষয়বস্তু ছিল তাঁহাকে বর্ণনার সময় পর্যন্ত হুবহু তাহা ইয়াদ মর্ম সঠিকভাবে উপলব্ধি করিতে পারিয়াছেন কি না এবং বর্ণনার সময় পর্যন্ত হুবহু তাহা ইয়াদ রাখিতে পারিয়াছেন কি না –ইহা প্রমাণ করার জন্যই তাঁহারা অপর ব্যক্তির সাক্ষ্য তলব করিতেন, মিথ্যার সন্দেহে নহে। খলীফা হজরত ওমরের নিকট ফাতেমা বিনতে কায়েছ (রাঃ) যখন এমন একটি হাদীছ বর্ণনা করিলেন যাহা তাঁহার মতে কোরআন ও ছুন্নাহর বিপরীত, তখন তিনি উহা শুধু এই বলিয়াই প্রত্যাখ্যান করিলেন যে-

(আরবী*******************************)

‘আমি এমন একটি মেয়েলোকের কথায় আল্লাহর কিতাব এবং তাঁহার নবীর ছুন্নাহকে বাদ দিতে পারি না যার সম্পর্কে আমার জানা নাই যে, সে রছুলুল্লাহর কথা ঠিকভাবে স্মরণ রাখিতে পারিয়াছে কি ভুলিয়া গিয়াছে’।

হজরত আবু মূছা আশআরী (যিনি দীর্ঘদিন কুফার শাসনকর্তা ছিলেন এবং যিনি ছিফফীনের যুদ্ধে হজরত আলীর পক্ষে সালিস নিযুক্ত হইয়াছিলেন) একবার হজরত ওমরের বাড়ীতে গেলেন এবং বাড়ীর দরজায় দাঁড়াইয়া তিনবার ছালাম জানাইলেন। অন্দর হইতে প্রবেশের অনুমতিসূচক কোন উত্তর আসিল না, তিনি প্রত্যাবর্তন করিলেন। অতঃপর হজরত ওমর তাঁহাকে ডাকিয়া  পাঠাইলেন এবং প্রত্যাবর্তনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। উত্তরে হজরত আবু মূছা বলিলেনঃ ‘রছুলুল্লাহ (ছঃ) বলিয়াছেনঃ (অনুমতির প্রার্থনাসূচক) তিনবার ছালাম জানাইবার পরও যদি প্রবেশের অনুমতি না পাওয়া যায় তা হইলে বাড়ীতে প্রবেশ না করিয়া প্রত্যাবর্তন করিবে’। ইহা শুনিয়া হজরত ওমর তাঁহাকে বলিলেনঃ (আরবী*******************)

‘ইহা যদি আপনি রছুলুল্লাহর নিকট শুনিয়া ঠিকভাবে স্মরণ রাখিয়া থাকেন তবে তো ভালো, নতুবা আমি আপনাকে এমন কঠোর শাস্তি দিব যাহা অন্যের জন্য শিক্ষার বস্তু হয়’। -জামউল ফাওয়ায়েদ ১৪৪ পৃঃ

অতঃপর হজরত আবু মূছা যখন ছাহাবী আবু ছাঈদ খুদরীকে সাক্ষীস্বরূপ উপস্থিত করিলেন তখন হজরত ওমর তাঁহাকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেনঃ (আরবী****************************************)

‘আবু মূছা! আমি আপনার প্রতি মিথ্যার সন্দেহ করি নাই। আমি এজন্য ইহা করিয়াছি –যাহাতে অপর (অ-ছাহাবী) লোকের রছুলুল্লাহ (ছঃ)-এর নামে মিথ্যা হাদীছ গড়ার সাহস না করে’। -জামউল ফাওয়ায়েদ ১৪৪ পৃঃ

হজরত ওমরের কার্যের তাৎপর্য এই যে, হাদীছ বর্ণনাকারী যে পর্যন্ত না সম্পূর্ণরূপে নিঃসন্দেহ হয় যে, তিনি যাহা বর্ণনা করিতেছেন তাহা ঠিক রছূলুল্লাহরই হাদীছ, সে পর্যন্ত তাহার পক্ষে উহার সহিত রছূলুল্লাহর নাম ব্যবহার করা জায়েজ নহে। এরূপ করা রছূলুল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করারই শামিল। এ কারণেই দেখা যায়, কোন কোন ছাহাবী হাদীছ জানা সত্ত্বেও উহার বর্ণনার বিরত থাকিতেন। একবার হজরত আবদুল্লাহ তাঁহার পিতা জুবায়রকে (হুজুরের ফুফাত ভাই) বলিলেনঃ ‘আব্বা! আপনি হুজুরের হাদীছ বর্ণনা করেন না কেন?’ উত্তরে হজরত জুবায়র বলিলেনঃ ‘বাবা! আমি যে হুজুরের খেদমতে ছিলাম না বা তাঁহার হাদীছ আমার জানা নাই তাহা নহে। ব্যাপার এই যে, আমি ভয় করি, ভুলে যেন তাঁহার প্রতি মিথ্যা আরোপিত হইয়া না যায়। কেননা, তিনি বলিয়াছেনঃ ‘যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা আরোপ করিয়াছে, সে যেন তাহার স্থান দোজখে তৈয়ার করিয়া লয়’।

হজরত আয়েশা ছিদ্দীকার নিকট যখন বলা হইল যে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর বলেনঃ ‘রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম বলিয়াছেনঃ ‘জীবিতদের ক্রন্দনের দরুন মৃত ব্যক্তির আজব হইয়া থাকে’। তিনি (আয়েশা) ইহার কঠোর প্রতিবাদ করিলেন, কিন্তু এই কথা বলিয়া প্রতিবাদ করিলেনঃ (আরবী***********************************)

‘আল্লাহ আবু আবদুর রহমানকে (ইবনে ওমরকে) মাফ করুন। অবশ্য তিনি মিথ্যা বলিতেছেন না। তবে তিনি ভুলিয়া গিয়াছেন অথবা রছুলুল্লাহর কথা ঠিকভাবে বুঝিয়া উঠিতে পারেন নাই। আসল ব্যাপার হইতেছে এই যে, রছুলুল্লাহ (ছঃ) একটি (সদ্য দাফনকৃত) ইহুদী মেয়েলোকের কবরের নিকট দিয়া যাইবার কালে বলিয়াছিলেন যে, মেয়েলোকটি কবরে আজাব ভোগ করিতেছে আর তাহার পরিবারের লোকেরা তাহার জন্য কাঁদিতেছে’। -মেশকাত, বোখারী ও মোছলেম।

এক কথায় রছূলুল্লাহর ছাহাবীদের মধ্যে কেহ কখনো তাঁহার নামে হাদীছ জাল করেন নাই। জানা যায়, রছূলুল্লাহ জীবনে মাত্র এক ব্যক্তিই রছূলুল্লাহর নাম করিয়া একটি মিথ্যা কথা বলিয়াছিলেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর বলেনঃ (আরবী********************************************)

‘এক ব্যক্তি রছূলুল্লাহর লেবাছের ন্যায় লেবাছ পরিয়া মদীনার একটি বাড়ীতে উপস্থিত হয় এবং বলে যে, রছূলুল্লাহ আমাকে বলিয়াছেনঃ ‘তুমি যে বাড়ীতে ইচ্ছা প্রবেশ করিয়া দেখিতে পার’। ইহা শুনিয়া তাহারা বলিলেনঃ ‘আমরা রছূলুল্লাহর চরিত্র অবগত আছি; রছূলু্ল্লাহ (ছঃ) কখনো এরূপ অনাচারের হুকুম দিতে পারেন না’। অতঃপর তাহারা তাহাকে একটা ঘরে আবদ্ধ রাখিয়া রছূলুল্লাহর নিকট সংবাদ দেন। সংবাদ পাইয়া রছূলুল্লাহ (ছঃ) হজরত আবু বকর ও ওমরকে বলিলেনঃ ‘তোমরা তাহার নিকট যাইয়া দেখ; জীবিত পাইলে হত্যা করিবে এবং লাশ আগুন লাগাইয়া পোড়াইয়া দিবে’। অপর এক বর্ণনায় আছেঃ রছূলুল্লাহ (ছঃ) তাঁহাদিগকে ইহাও বলিয়াছিলেনঃ ‘তোমরা যাইয়া সম্ভবতঃ তাহাকে জীবিত পাইবে না’। বস্তুতঃ তাহাই হইয়াছিল। তাঁহারা তথায় পৌঁছিবার পূর্বেই সাপের দংশনে সে জাহান্নামবাসী হইয়াছিল। -জামউল ফাওয়ায়েধ ২৭ পৃঃ

রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর আমলেও কোন অ-ছাহাবী পর্যন্ত হাদীছ জাল করার দুঃসাহস করিতে পারে নাই। তাঁহারা এ সম্পর্কে এত কড়া নজর রাখিতেন যে, ছাহাবীদের নিকট পর্যন্ত তাঁহারা সাক্ষ্য তলব করিতেন। হজরত মুগীরা ইবনে শো’বা (রাঃ) নানীর পক্ষে নাতির মীরাছ লাভের হাদীছ বর্ণনা করিলে হজরত ছিদ্দীক তাঁহার নিকট সাক্ষ্য তলব করেন। এভাবে হজরত আবু মূছা আশআরী অনুমতির জন্য ছালাম সংক্রান্ত হাদীছ বলিলে হজরত ওমর ফারূক তাঁহাকে প্রমাণ উপস্থিত করিবার নির্দেশ দেন। (ইহা পূর্বে বলা হইয়াছে।)

রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর নামে হাদীছ জালের অপচেষ্টা প্রথমতঃ আরম্ভ হয় হজরত ওছমান গনীর আমলে ইসলামের পরম শত্রু ইহুদীদের দ্বারাই। ইহুদীরা প্রথমে কোরাইশদের সহিত মিলিত হইয়া ইসলামের মূলোচ্ছেদ করিতে চেষ্টা করে। ইহাতে অকৃতকার্য হইয়া তাহারা হাদীছ জাল করার এ ঘৃণিত পন্থা অবলম্বন করে। ইহার খোলাসা এই যে, দক্ষিণ আরবের ইয়ামানবাসী আবদুল্লাহ ইবনে ছাবা নামক এক শিক্ষিত ধুরন্ধর ইহুদী হজরত ওছমান গনীর নিকট আসিয়া বাহ্যতঃ ইসলাম গ্রহণ করে এবং গোপনে ইসলামকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এক বিরাট ষড়যন্ত্র আরম্ভ করে। সে এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তিনটি পন্থা অবলম্বন করে। (১) রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর নামে মিথ্যা হাদীছ রচনা করিয়া ইসলামের পবিত্রতা নষ্ট করা। (২) মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ সৃষ্টি করিয়া তাহাদের অগ্রগতিকে ব্যাহত করা এবং (৩) ছাহাবীদের নামে দুর্নাম রটনা করিয়া ইসলামের প্রতি মানুষের আকর্ষণকে বিনষ্ট করা। কেননা, পরবর্তী অ-ছাহাবী লোকদের পক্ষে ইসলাম লাভের একমাত্র মাধ্যম হইতেছেন ছাহাবীগণই; সুতরাং ছাহাবীগণের প্রতি আস্থাহীন করিতে পারিলে কাহারো পক্ষে ইসলামের প্রতি আকর্ষণের কোন সূত্রই থাকিবে না।

আবদুল্লাহ ইবনে ছাবার দৃষ্টিতে ছিল খেলাফতের কেন্দ্র মদীনা হইতে দূরে অবস্থিত মুসলমানদের প্রধান প্রধান সেনানিবাসঃ বছরা, কুফা ও মিছরই ছিল তার কার্যের পক্ষে উপযুক্ত ক্ষেত্র। কারণ, এ সকল স্থান একদিকে যেমন ছিল খলীফার দৃষ্টি হইতে বহু দূরে অবস্থিত, তেমনই সে সকল স্থানের সৈন্যরা ছিল অধিকাংশ অ-ছাহাবী নও-মুসলমান তরুণ –যাহাদের পক্ষে রছূলুল্লাহর সাহচর্য লাভ করিয়া ইসলাম সম্পর্কে পরিপক্ক হওয়ার বা সরাসরিভারে রছূলুল্লাহর নিকট হইতে হাদীছ লাভের কোন সুযোগ ঘটে নাই। এভাবে তাহার দৃষ্টিতে হজরত আলী মোরতাজাই ছিলেন উপযুক্ত পাত্র যাহার নাম করিয়া মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা অত্যন্ত সহজ। কেননা, তিনি হইতেছেন রছূলুল্লাহর নিকট-আত্মীয় এবং হজরত ফাতেমা জাহরার স্বামী। আবদুল্লাহ ইবনে ছাবা তাই মদীনা হইতে বছরা গমন করে এবং বলিতে থাকে যে, হযরত আলী মোরতাজা রছূলুল্লাহ-এর নিকট হইতে কোরআনের এলম ছাড়াও এক বিশেষ এলমপ্রাপ্ত হইয়াছেন এবং তিনি হইতেছেন রছূলুল্লাহর উদ্দেশ্যের বিপরীত কাজ করিয়াছেন এবং ওছমান এ ব্যাপারে তাহাদের অনুসরণ করিতেছেন। এতদ্ব্যতীত সে ইহাও বলিতে যে, আবু বকর, ওমর ও ওছমানের প্রতি হজরত মোরতাজা নারাজ, কিন্তু কোন মছলাহাতে তিনি ইহা প্রকাশ করিতেছেন না। অবশেষে সে ইহাও জানিতে পারেন নাই। আর সে ধুরন্ধরও ইহার গোপনীয়তার জন্য সকলের প্রতিই কড়া নির্দেশ দিয়া রাখিয়াছিলেন। -তোহফায়ে ইছনা আশারিয়া

বছরার শাসনকর্তা আবদুল্লাহ ইবনে আমের তাহার আচরণে সন্দেহ করিয়া তাহাকে বছরা ত্যাড় করিতে নির্দেশ দেন। বছরা ত্যাগ করিয়া সে মুসলমানদের দ্বিতীয় সেনানিবাস কুফায় প্রবেশ করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণ সৈন্যগণকে হাত করিয়া লয়। অতঃপর সে কুফা হইতে বিতাড়িত হইয়া মিছর উপস্থিত হয় এবং মিছরকে কেন্দ্র করিয়া চারিদিকে তার ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করিতে থাকে। অল্প দিনের মধ্যেই সে আশাতীত সফলতা লাভ করে এবং তৃতীয় খলীফা হজরত ওছমান গনীকে শহীদ করাইতে সমর্থ হয়।

অবশেষে হজরত আলী মোরতাজা (রাঃ) তাঁহার খেলাফতকালে আবদুল্লাহর ষড়যন্ত্রের কথা অবগত হইতে পারিয়া তাহার অনুচরদেরসহ তাহাকে আগুনে পোড়াইয়া মারেন। ইমাম জাহবী বলেনঃ (আরবী**************************************)

‘আমি মনে করি, হজরত আলী (রাঃ) তাহাকে (আবদুল্লাহ ইবনে ছাবাকে) আগুনে পোড়াইয়া মারিয়াছিলেন’। -তাদবীন ৪৪৯ পৃঃ

আর ইহাই হইল হাদীছ জালকারীদের জন্য রছূলুল্লাহ (ছঃ) কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি। [ছাবায়ী ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত বিবরণ জানার জন্য ‘তারীখে তাবারী’ এবং শাহ আবদুল আজীজ দেহলবী (রঃ)-এর ‘তোহফায়ে ইছনা আশারিয়া’ দ্রষ্টব্য।]

হজরত আলী মোরতাজা ছাবায়ীদের নির্মূল করিলেন সত্য, কিন্তু তাহারা যে হাদীছ জাল করার কু-আদর্শ স্থাপন করিল তাহার প্রতিকার সহজে সম্ভবপর হইল না। তাহাদের এই জঘন্য আদর্শ অনুসরণ করিয়া উমাইয়াদের আমলে, অতঃপর আব্বাছীয়াদের আমলেও অনেকে হাদীছ জাল করিল। কেহ এইরূপে ইসলামকে ধ্বংস করার মানসে, কেহ তাহার রাজনৈতিক মতলব হাছিলের উদ্দেশ্যে, আর কেহ তাহার ধর্মীয় মতবাদের সাহায্যার্থে, কেহ বা আমীর-ওমারাদের সন্তুষ্টি বিধানের গরজে হাদীছ জাল করিল। এমন কি এক শ্রেণীর অপরিণামদর্শী ছুফীরাও জনসাধারণকে ধর্মের প্রতি অধিক আকৃষ্ট করার খেয়ালে হাদীছ গড়িয়া লইল। ফলে ওছমানী খেলাফতের শেষের দিক হইতে আরম্ভ করিয়া আব্বাছীয়াদের প্রথম ভাগ পর্যন্ত শতাধিক বৎসরে বাজারে বহু জাল হাদীছ চালু হইয়া গেল।

তবে আমাদের মোহাদ্দেছগণের আপ্রাণ চেষ্টা ও তদবীরের ফলে শেষ পর্যন্ত এ অপচেষ্টা বন্ধ হইয়া যায় এবং সমস্ত আসল ও জাল হাদীছ আলো-অন্ধকারের ন্যায় সম্পূর্ণ পৃথক হইয়া পড়ে। আজ দুনিয়ায় এমন কোন হাদীছ নাই যার সম্পর্কে বলা যায় না যে, উহা আসল কি নকল, ছহীহ কি গায়র ছহীহ। মোহাদ্দেছগণ আমাদের হাতে আসল-নকল পৃথক করার এমন এক কষ্টিপাথর দিয়া গিয়াছেন যদ্দ্বারা আমরা যখন ইচ্ছা কোন হাদীছকে পরীক্ষা করিয়া দেখিতে পারি।

জাল প্রতিরোধের ব্যবস্থাঃ

হাদীছ জাল প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়, যথা- (১) জালকারীকে শাস্তি দেওয়া, (২) বর্ণনাকারীর নিকট সাক্ষ্য তলব করা, (৩) বর্ণনাকারীর নিকট হইতে হলফ গ্রহণ করা, (৪) হাদীছের ছনদ বর্ণণা করিতে বাধ্য করা এবং (৫) ছনদ পরীক্ষা করা। নীচে ইহার প্রত্যেকটি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা গেল।

(১) শাস্তিদানঃ

হাদীছ জাল প্রতিরোধের প্রাথমিক ব্যবস্থা হিসাবে জালকারীর প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা করা হইয়াছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমরের পূর্বোক্ত বর্ণনা হইতে বোঝা যায়, এ ব্যবস্থা স্বয়ং রছূলুল্লাহ (ছঃ)-ই প্রবর্তন করিয়াছিলেন। হজরত আলী মোরতাজা কর্তৃক ছাবায়ীদের আগুনে পোড়াইয়া মারাও এ কথারই সাক্ষ্য দেয়। এভাবে খেলাফতে রাশেদার পরও যখনই কোন ব্যক্তি সম্পর্কে হাদীছ জালের কথা প্রমাণিত হইয়াছে তখনই তাহার প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা করা হইয়াছে। হারেস ইবনে ছাঈদ কাজ্জাবকে খলীফা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান এবং গায়লান দেমাশকীকে খলীফা হিশাম ইবনে আবদুল মালেক এ অপরাধেই কতল করিয়াছিলেন। অতঃপর খলীফা মানছূর আব্বাছী রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর নামে মিথ্যা আরোপকারী মোহাম্মদ ইবনে ছাঈদ মাছলুবকে এজন্যই ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাইয়াছিলেন। এভাবে বনি উমাইয়াদের গভর্ণর খালেদ ইবনে আবদুল্লাহ কাছরী মিথ্যা হাদীছ রচনাকারী বয়ান ইবনে জুরাইককে এবং বছরার আব্বাছীয় গভর্ণর মোহাম্মদ ইবনে ছোলাইমান কুখ্যাত হাদীছ জালকারী আবদুল করীম আবিল আওজাকে প্রণদণ্ডে দণ্ডিত করিয়াছিলেন।

(২) সাক্ষ্য তলবঃ

রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর হাদীছকে ভেজালমুক্ত রাখার জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে হজরত আবু বকর ছিদ্দীক (রাঃ) বর্ণনাকারীর নিকট হইতে সাক্ষ্য তলব করার নিয়ম প্রবর্তন করেন। নানীর পক্ষে নাতির মীরাছ লাভ সংক্রান্ত হাদীছে তিনি হজরত মুগীরা ইবনে শো’বার নিকট সাক্ষ্য তলব করিয়াছিলেন।

অতঃপর হজরত ওমর ফারূকও ইহারই অনুসরণ করেন। ছালাম সম্পর্কীয় হাদীছে তাঁহার হজরত আবু মূছা আশআরীকে প্রমাণ উপস্থিত করিতে বলা ইহার প্রমাণ।

(৩) হলফ গ্রহণঃ

ছাবায়ীদের হাদীছ জালের অবস্থা দেখিয়া হজরত আলী মোরতাজা (রাঃ) প্রমাণ অভাবে বর্ণনাকারীর নিকট হইতে হলফ গ্রহণের ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। অবশ্য এ ব্যবস্থা পরবর্তী যুগে আর চালু ছিল না। কারণ, যে ব্যক্তি রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর নামে মিথ্যা কথা বলিতে পারে তাহার পক্ষে মিথ্যা হলফ করা দুঃসাধ্যের ব্যাপার কিছুই ছিল না।

(৪) ছনদ বর্ণনাঃ

হজরত আলী মোরতাজা (রাঃ) একদিকে যেমন হাদীছ বর্ণনাকারীর নিকট হইতে হলফ গ্রহণ করার ব্যবস্থা করেন অপরদিকে তিনি (অ-ছাহাবীদের) ছনদ ব্যতিরেকে হাদীছ বর্ণনা করিতেও নিষেধ করেন। ‘শরহে মাওয়াহিবে’ রহিয়াছেঃ (আরবী***********************)

‘হজরত আলী (রাঃ) হাদীছ শিক্ষার্থীগণকে ছনদ ব্যতীত হাদছি না লিখিতে নির্দেশ দিয়াছেন’। -তারীখুল হাদীছ ৯৩ পৃঃ

অতঃপর জনসাধারণ ছনদ ব্যতীত হাদীছ গ্রহণ করিতে দ্বিধাবোধ করিতে থাকে, ফলে বলা ও লেখা উভয় ক্ষেত্রেই ছনদ বর্ণনা হাদীছের এক জরুরী অংগ হইয়া পড়ে এবং আলেমগণ ইহাকে দ্বীনের অংগ বলিয়াই অভিহিত করেন। যাবৎ না পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত হাদীছ কিতাবে লিপিবদ্ধ হইয়া যায় তাবৎ তাঁহারা ছনদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।

এখানে বোধ হয় একথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না যে, আমাদের আলেমগণ শুধু যে হাদীছের ব্যাপারেই ছনদ বর্ণনার কড়াকড়ি ব্যবস্থা করিয়াছেন তাহা নহে; বরং অভ্যস্ত হইয়া পড়ার দরুন সাধারণ ইতিহাসেও তাঁহারা পূর্ণ ছনদ বর্ণনা করিয়াছেন যার নজীর দুনিয়ার কোন জাতিই পেশ করিতে সক্ষম নহে। ইমাম ইবনে হাজম সত্যই বলিয়াছেনঃ ‘ছনদ আল্লাহর একটি বিশেষ দান যাহা তিনি শুধু এই জাতিকেই দান করিয়াছেন’।

(৫) ছনদ পরীক্ষা

এ কথা সত্য যে, ছনদ প্রবর্তন দ্বারা বেপরোয়াভাবে হাদীছ জাল করার পথ অনেকটা রুদ্ধ হইয়া যায়; কিন্তু উহা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হইয়া যায় নাই। কারণ, যাহারা হাদীছ জাল করিতে পারে তাহাদের পক্ষে ছনদ জাল করা অসাধ্যের ব্যাপার কিছুই নহে। অতএব, এ পথ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার এবং জাল ও আসল হাদীছকে পৃথক করার জন্য আমাদের মনীষীবৃন্দ ছনদের ‘জারহ ও তা’দীল’ বা রাবীদের দোষ-গুণ বিচারের ব্যবস্থা প্রতর্বন করেন এবং এ উদ্দেশ্যে ‘আছমাউর রেজাল’ নামে লক্ষ লক্ষ রাবীদের জীবনী সংগ্রহের এন্তেজাম করেন। ইহাতে তাঁহারা ছনদের প্রতিটি ব্যক্তি বা রাবীর পূর্ণ জীবনী সংগ্রহের এন্তেজাম করেন। ইহাতে তাঁহারা ছনদের প্রতিটি ব্যক্তি বা রাবীর পূর্ণ জীবনী অর্থাৎ, তিনি কবে, কোথায়, কোন বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন? কবে, কোথায়, কত বয়সে এন্তেকাল করিয়াছেন? তাঁহার নাম, লকব –[লকব –স্থান, বংশ বা বৃত্তি প্রভৃতিগত নাম; যথা –মদনী, কোরাইশী, হালওয়ায়ী। কুনিয়াত –‘অমুকের পিতা’ বা ‘অমুকের পুত্র’রূপ নাম। যথা আবু হানীফা (হানীফার পিতা), ইবনে হাম্বল (হাম্বলের পুত্র)।] বা কুনিয়াত কি ছিল এবং কাহাকে হাদীছ শিক্ষা দিয়াছিলেন, তাঁহার আদালত ও জবত কেমন ছিল ইত্যাদি আলোচনা করেন।

এক কথায় রাবীর জীবনের এমন কোন ক্ষুদ্র হইতে ক্ষুদ্রতর দিকও নাই, যে সম্পর্কে আমাদের মনীষীবৃন্দ অনুসন্ধান করেন নাই বা তাহারা দোষ-গুণ জাহির করিয়া দেন নাই। ইহার ফলে একদিকে যেমন এক একটি জাল হাদীছ পৃথক হইয়া পড়ে অপরদিকে জাল করার নূতন চেষ্টাও সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হইয়া যায়। কারণ, ইহাতে দুষ্কৃতকারীদের হাতে-নাতে ধরা পড়ার এবং চরমভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার আশংকা বর্তমান।

জারহ ও তা’দীলকারী কতিপয় প্রসিদ্ধ ইমাম

ছাহাবীদের মধ্যেঃ

১। হজরত আবু বকর ছিদ্দীক (রাঃ) (মৃঃ ১৩ হিঃ)

২। হজরত ওমর ফারূক (রাঃ) (মৃঃ ২৩ হিঃ)

৩। হজরত ওছমান গনী (রাঃ) (মৃঃ ৩৫ হিঃ)

৪। হজরত আলী মোরতাজা (রাঃ) (মৃঃ ৪০ হিঃ)

৫। হজরত আয়েশা (রাঃ) (মৃঃ ৫৭ হিঃ)

৬। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ (রাঃ) (মৃঃ ৬৮ হিঃ)

[ছাহাবীগণের জারহ ও তা’দীল করার স্বরূপ বোঝার জন্য দেরায়থগত পরীক্ষার ভূমিকা দেখুন।]

তাবেয়ীনদের মধ্যেঃ

১। হজরত ছাঈদ ইবনে মুছাইয়াব (মৃঃ ৯৫ হিঃ)

২। হজরত আ’মাশ (মৃঃ ১৪৮ হিঃ)

৩। হজরত ইমাম আবু হানীফা (মৃঃ ১৫০ হিঃ)

তাঁহারা রাবীদের ‘জারহ-তা’দীল করিয়াছিলেন। অথচ ঐ যুগে জঈফ রাবীর সংখ্যা খুব কমই ছিল।

তাবে’-তাবেয়ীনদের মধ্যেঃ

১। হজরত মা’মার ইবনে রাশেদ (মৃঃ ১৫৩ হিঃ)

২। হিশাম দস্তওয়ায়ী (মৃঃ ১৫৪ হিঃ)

৩। ইমাম আওজায়ী (মৃঃ ১৫৬ হিঃ)

৪। ইমাম শো’বা ইবনে হাজ্জাজ (মৃঃ ১৬০ হিঃ)

[ইনিই সর্বপ্রথম ‘জারহ ও তা’দীল’ সম্পর্কে নিয়ম-কানুন প্রবর্তন করেন]

৫। ইমাম ছুফইয়অন ছওরী (মৃঃ ১৬১ হিঃ)

৬। হজরত হাম্মাদ ইবনে ছালামাহ (মৃঃ ১৬৭ হিঃ)

৭। ইমাম লাইছ ইবনে ছা’দ (মৃঃ ১৭৫ হিঃ)

৮।ইমাম মালেক (মৃঃ ১৭৯ হিঃ)

৯।ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক (মৃঃ ১৮১ হিঃ)

১০। আবু ইছহাক ফাজারী (মৃঃ ১৮৫ হিঃ)

১১। মোহাম্মদ ইবনে ইমরান (মৃঃ ১৮৫ হিঃ)

১২। বিশর ইবনে মোফাজ্জল (মৃঃ ১৮৬ হিঃ)

১৩। হুশাইম ইবনে বশীর (মৃঃ ১৮৮ হিঃ)

১৪।ইবনে উলাইয়াহ (আরবী******) (মৃঃ ১৯৩ হিঃ)

১৫। ইবনে ওহাব (মৃঃ ১৯৭ হিঃ)

১৬।ইমাম ওয়াকী ইবনে জাররাহ (মৃঃ ১৯৭ হিঃ)

১৭। ইমাম ছুফইয়ান ইবনে উয়াইনাহ (মৃঃ ১৯৮ হিঃ)

এই তাবে’-তাবেয়ীনদের শেষ যুগেই এ সম্পর্কে নিয়মিতভাবে কিতাব লেখা আরম্ভ হয় এবং ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে ছাঈদ কাত্তান (মৃঃ ১৯৮ হিঃ) প্রথম এ বিষঙেয় কিতাব লেখেন। তাঁহার অনুসরণ করেন আবদুর রহমান ইবনে মাহদী (মৃঃ ১৯৮ হিঃ), মোহাম্মদ ইবনে ছা’দ কাতেবে ওয়াকেদী (মৃঃ ২৩০ হিঃ), ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (মৃঃ ২৩৩ হিঃ),আলী ইবনে মাদানী (মৃঃ ২৩৪ হিঃ) এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (মৃঃ ২৪১ হিঃ)। ইঁহারাই হইলেন এ বিষয়ের ইমাম ও অগ্রণী। অতঃপর যাঁহারা লিখিয়াছেন তাঁহারা ইঁহাদের উপরই অধিকতর নির্ভর করিয়াছেন।

ইঁহারা ছাড়া এ যুগে বা পরবর্তী যুগে যাঁহারা রাবীদের ‘জারহ-তা’দীল’ করিয়াছেন। নীচে তাঁহাদের কতিপয় মশহুর ব্যক্তির নাম দেওয়া গেলঃ

১। আবু দাঊদ তায়ালছী (মৃঃ ২০৪ হিঃ)

২। ইয়াজীদ ইবনে হারূন (মৃঃ ২০৬ হিঃ)

৩। আবদুর রাজ্জাক ইবনে হাম্মাম (মৃঃ ২১১ হিঃ)

৪। আবু আছিম জাহহাক (মৃঃ ২১২ হিঃ)

৫।ইবনুল মাজুশুন (মৃঃ ২০৩ হিঃ)

৬। আবু খাইছামা জুহাইর ইবনে হরব (মৃঃ ২৩৪ হিঃ)

৭। আবু জা’ফর আবদুল্লাহ নবীল (জোরজাহ)

৮। মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ নুমাইর (মৃঃ ২৩৪ হিঃ)

৯। আবু বকর ইবনে আবি শাইবাহ (মৃঃ ২৩৫ হিঃ)

১০। আবদুল্লাহ ইবনে আমর কাওয়ারীরী (মৃঃ ২৩৫ হিঃ)

১১। ইমাম ইছহাক (মৃঃ ২৩৭ হিঃ)

১২। হাফেজ আবু জা’ফর মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আম্মার মুছেলী (মৃঃ ২৪২ হিঃ)

১৩। আহমদ ইবনে ছালেহ (মৃঃ ২৪৮ হিঃ)

১৪। হারূন ইবনে আবদুল্লাহ হাম্মাল (মৃঃ ২৪৩ হিঃ)

১৫। ইছহাক কুছাজ (মৃঃ ২৫১ হিঃ)

১৬। ইমাম দারেমী (মৃঃ ২৫৫ হিঃ)

১৭। ইমাম বোখারী (মৃঃ ২৫৬ হিঃ)

১৮। ইমাম মোছলিম (মৃঃ ২৬১ হিঃ)

১৯। আজালী (ইজলীর) (মৃঃ ২৬১ হিঃ)

২০। ইমাম আবু জুরআ রাজী (মৃঃ ২৬৪ হিঃ)

২১। ইমাম আবু দাঊদ (মৃঃ ২৭৫ হিঃ)

২২। বাকী ইবনে মাখলাদ (মৃঃ ২৭৬ হিঃ)

২৩। আবু হাতেম রাজী (মৃঃ ২৭৭ হিঃ)

২৪। আবু জুরআ দেমাশকী (মৃঃ ২৮১ হিঃ)

২৫। আবদুর রহমান ইবনে ইউছুফ বাগদাদী (মৃঃ ২৮৩ হিঃ)

২৬। ইব্রাহীম ইবনে ইছহাক (মৃঃ ২৮৫ হিঃ)

২৭। মোহাম্মদ ইবনে আওজায়ী হাফেজে কর্ডোভা (মৃঃ ২৮৯ হিঃ)

২৮। আবু বকর ইবনে আবু আছেম (মৃঃ ২৮৭ হিঃ)

২৯। আবদুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমদ (মৃঃ ২৯০ হিঃ)

৩০। ছালেহ জুরজাহ (মৃঃ ২৯৩ হিঃ)

৩১। আবু বকর বাজ্জার (মৃঃ ২৯২ হিঃ)

৩২। মোহাম্মদ নাছর মারওয়া (মৃঃ ২৯৪ হিঃ)

৩৩। মোহাম্মদ ইবনে ওছমান ইবনে আবু শাইবাহ (মৃঃ ২৯৭ হিঃ)

৩৪। আবু বকর ফারইয়াবী

৩৫। ইমাম নাছায়ী (মৃঃ ৩০৩ হিঃ)

৩৬। ছাজী (মৃঃ ৩০৭ হিঃ)

৩৭। আবু ইয়া’লা মুছেলী (মৃঃ ৩০৭ হিঃ)

৩৮। আবুল হাছান ছুফইয়ান

৩৯। ইবনে খোজাইমা (মৃঃ ৩১১ হিঃ)

৪০। ইবনে জারীর তাবারী (মৃঃ ৩১০ হিঃ)

৪১। আবু জা’ফর তাহাবী (মৃঃ ৩২১ হিঃ)

৪২। আবুল বাশার দুওলাবী (মৃঃ ৩১১ হিঃ)

৪৩। আবু আরূবা হাররানী (মৃঃ ৩১৮ হিঃ)

৪৪। আবুল হাছান আহমদ ইবনে ওমাইর

৪৫। আবু জা’ফর ওকাইলী (মৃঃ ৩২২ হিঃ)

৪৬।ইবনে আবু হাতেম রাজী (মৃঃ ৩২৭ হিঃ)

৪৭। আহমদ ইবনে নাছার বাগদাদী (মৃঃ ৩২৩ হিঃ)

৪৮। আবু হাতিম ইবনে হিব্বান বুস্তী (মৃঃ ৩৫৪ হিঃ)

৪৯। তবরানী (মৃঃ ৩৬০ হিঃ)

৫০। আবদুল্লাহ ইবনে আদী জুরজানী (মৃঃ ৩৬৫ হিঃ)

৫১। আবু আলী হুছাইন ইবনে মোহাম্মদ নিশাপুরী (মৃঃ ৩৬৫ হিঃ)

৫২। আবুশ শায়খ ইবনে হাইয়ান (মৃঃ ৩৬৯ হিঃ)

৫৩। আবু বকর ইছমাঈলী (মৃঃ ৩৭১ হিঃ)

৫৪। আল হাকেম আবু আহমদ (মৃঃ ৩৭৮ হিঃ)

৫৫। ইমাম দারা কুতনী (মৃঃ ৩৮৫ হিঃ)

৫৬। ইবনে শাহীন (মৃঃ ৩৮৫ হিঃ)

৫৭। ইবনে মন্দাহ –আবু আবদুল্লাহ (মৃঃ ৩৯৫ হিঃ)

৫৮। হাকেম আবু আবদুল্লাহ (মৃঃ ৪০৫ হিঃ)

৫৯। আবু নছর কালাবাজী (মৃঃ ৩৯৮ হিঃ)

৬০। আবদুর রহমান ইবনে ফাতীছ (আরবী****) (মৃঃ ৪০২ হিঃ)

৬১। আবদুল গনী ইবনে ছাঈদ (মৃঃ ৪০৯ হিঃ)

৬২। আবু বকর ইবনে মারদুইয়াহ (মৃঃ ৪১৬ হিঃ)

৬৩। মোহাম্মদ ইবনে আবুল ফাওয়ারেছ বাগদাদী (মৃঃ ৪১২ হিঃ)

৬৪। আবু বকর বেরকানী (মৃঃ ৪২৫ হিঃ)

৬৫। আবু হাকিম আবদারী

৬৬। খালাফ ইবনে মোহাম্মদ ওয়াছেতী (মৃঃ ৪০১ হিঃ)

৬৭। আবু মাছউদ দেমাশকী (মৃঃ ৪০০ হিঃ)

৬৮। আবুল ফজল ফালাকী (মৃঃ ৪৩৮ হিঃ)

৬৯। হাছান ইবনে মোহাম্মদ খালাল বাগদাদী (মৃঃ ৪৩৯ হিঃ)

৭০। আবু ইয়া’লা খলীলী (মৃঃ ৪৪৬ হিঃ)

৭১। ইমাম ইবনে আবদুল বার (মৃঃ ৪৬৩ হিঃ)

৭২। ইবনে হাজম জাহিরী (মৃঃ ৪৫৬ হিঃ)

৭৩। ইমাম বায়হাকী (মৃঃ ৪৫৮ হিঃ)

৭৪। খতীব বাগদাদী আবু বকর (মৃঃ ৪৬৩ হিঃ)

৭৫। ইবনে মা’কুলা (মৃঃ ৪৭৫ হিঃ)

৭৬। আবুল ওয়ালীদ বা’জী (মৃঃ ৪৭৪ হিঃ)

৭৭। আবু আবদুল্লাহ  হোমাইদী (মৃঃ ৪৮৮ হিঃ)

৭৮। জুহলী (মৃঃ ৫০৭ হিঃ)

৭৯। আবুল ফজল ইবনে তাহের মাকদেছী (মৃঃ ৫০৭ হিঃ)

৮০। মু’তামিন ইবনে আহমদ (মৃঃ ৫০৭ হিঃ)

৮১। শিরুইয়াহ দায়লামী (মৃঃ ৫২২ হিঃ)

৮২। ছামআনী (মৃঃ ৫৬২ হিঃ)

৮৩। আবু মূছা মাদীনী (মৃঃ ৫৮১ হিঃ)

৮৪। আবুল ফারজ ইবনে জাওজী (মৃঃ ৫৭৭ হিঃ)

৮৫। ইবনে আছাকের আবুল কাছিম (মৃঃ ৫৭১ হিঃ)

৮৬। ইবনে বাশকুয়াল (মৃঃ ৫৭৮ হিঃ)

৮৭। আবু বকর হাজিমী (মৃঃ ৫৮৪ হিঃ)

৮৮। আবদুল গনী মাকদেছী (মৃঃ ৬০০ হিঃ)

৮৯। রোহাবী (আরবী******)

৯০। ইবনুল মোফাজ্জাল মাকদেছী (মৃঃ ৬১৬ হিঃ)

৯১। আবুল হাছান –ইবনে কাত্তান (মৃঃ ৬৩৮ হিঃ)

৯২। ইবনুল আনমাতী (মৃঃ ৬১৯ হিঃ)

৯৩। ইবনে লোকতাহ (মৃঃ ৬২৯ হিঃ)

৯৪। হাফেজ ইবনুছ ছালাহ (মৃঃ ৬৪৩ হিঃ)

৯৫। আবদুল আজীম মুনজেরী (মৃঃ ৫৬৫ হিঃ)

৯৬। আবু আবদুল্লাহ বারজালী (মৃঃ ৬৩৬ হিঃ)

৯৭। ইবনুল আবার

৯৮। আবু শামাহ (মৃঃ ৬২৫ হিঃ)

৯৯। ইবনে দুবাইছী (মৃঃ ৬৩৭ হিঃ)

১০০। ইবনে নাজজার (মৃঃ ৬৪৩ হিঃ)

১০১। ইবনে দাকীকুল ঈদ (মৃঃ ৭০২ হিঃ)

১০২। শারফো মাদুমী

১০৩। দেমইয়াতী –আবু মোহাম্মদ (মৃঃ ৭০৭ হিঃ)

১০৪। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (মৃঃ ৭২৮ হিঃ)

১০৫। মেজজী –আবুল হাজ্জাজ (মৃঃ ৭৪২ হিঃ)

১০৬। ইবনে ছাইয়েদুন-নাছ (মৃঃ ৭৫৯ হিঃ)

১০৭। আবু আবদুল্লাহ ইবনে আইবক

১০৮। ইমাম জাহবী –শামছুদ্দীন (মৃঃ ৭৪৮ হিঃ)

১০৯। শিহাব ইবনে ফজলুল্লাহ (মৃঃ ৭৪৯ হিঃ)

১১০। আলাউদ্দীন মোগলতায়ী (মৃঃ ৭৬৩ হিঃ)

১১১। আলাউদ্দীন তুরকেমানী (মৃঃ ৭৬৩ হিঃ)

১১২। শারীফুল হোছানী দেমাশকী

১১৩। জায়নুদ্দীন ইরাকী (মৃঃ ৮০৬ হিঃ)

১১৪। ওলীউদ্দীন ইরাকী

১১৫। নূরুদ্দীন হায়ছামী (মৃঃ ৮০৭ হিঃ)

১১৬। বুরহানুদ্দীন হালাবী (মৃঃ ১৩ হিঃ)

১১৭। ইবনে হাজার আছকালানী (মৃঃ ৮৫২ হিঃ)

১১৮। বদরুদ্দীন আইনী (মৃঃ ৮৫৫ হিঃ)

১১৯। ইবনে কুতলুবাগা (মৃঃ ৮৭৯ হিঃ)

১২০। ইমাম ছাখাবী (মৃঃ ৯০২ হিঃ)

-মিফতাহ-১৪৭ পৃঃ

জারহ-তা’দীল সম্পর্কীয় কিতাব

‘জারহ-তা’দীল’ বা ‘আছমাউর রেজাল’ সম্পর্কীয় কিতাব বিভিন্ন প্রকারের। সাধারণ কিতাবঃ যাহাতে ছাহাবী অ-ছাহাবী, ছেকাহ ও জঈফ সকল শ্রেণীর রাবীর সকল দিক আলোচনা করা হইয়াছে। বিশেষ কিতাবঃ যাহাতে শুধু এক শ্রেণীর রাবীর যথা –ছাহাবী, ছেকাহ, জঈফ বা জালকারীদের জীবনী আলোচনা করা হইয়াছে অথবা রাবীদের জীবনের কোন একটি বিশেষ দিক সম্পর্কে আলোচনা করা হইয়াছে; যথা –রাবীদের শুধু জন্ম-মৃত্যুর তারিখ। কোন কোন কিতাবে কেবল রাবীদের জন্ম-মৃত্যুর তারিখেরই বিশেষ অনুসন্ধান করা হইয়াছে। অথবা কোন কোন কিতাবে শুধু রাবীদের নাম, লকব ও কুনিয়াতেরই বিশেষভাবে তাহকীক করা হইয়াছে। এছাড়া কোন কোন কিতাবে কেবল কোন কোন বিশেষ কিতাবের জারহ-তা’দীল করা হইয়াছে।

সাধারণ কিতাবঃ

১। আততাবাকাতুল কুবরা –মোহাম্মদ ইবনে ছা’দ (মৃঃ ২৩০ হিঃ)। ইহা ‘তাবাকাতে ইবনে ছা’দ’ নামে প্রসিদ্ধ। ইহা এ বিষয়ের সর্ববৃহৎ এবং সর্বপ্রথম কিতাব। ইহা হালে প্রকাশিত হইয়াছে। জালালুদ্দীন ছুয়ুতী ‘ইনজাজুল ওয়াদেল মোন্তাকা’ নামক কিতাবে ইহার সংক্ষেপ করিয়াছেন।

২। কিতাবুত তাবাকাত –আলী ইবুনল মাদানী (মৃঃ ২৩৪ হিঃ)

৩। কিতাবুত তাবাকাত –খলীফা ‘ইবনে খাইয়াত’ (মৃঃ ২৪০ হিঃ)

৪। তারীখে কবীর –ইমাম বোখারী (মৃঃ ২৫৬ হিঃ)। ইহা বর্ণনাক্রমিক কিতাব। মোছলেম ইবনে কাছেম ইহার এক পরিশিষ্ট লিখিয়াছেন। এছাড়া ‘তারীখে আওছাত’ এবং ‘তারীখে ছগীর’ নামে ইমাম বোখারীর আরো দুইটি কিতাব রহিয়াছে। ‘আওছাত’ সন অনুপাতে লেখা হইয়াছে। ইবনে আবু হাতিম (মৃঃ ৩২৭ হিঃ) এগুলিক আলোচনা করিয়া এক বিরাট কিতাব লিখিয়াছেন।

৫। রুয়াতুল ই’তেবার –ইমাম মোছলেম (মৃঃ ২৬১ হিঃ)। ইহা একটি উত্তম কিতাব।

৬। কিতাবুত তারীখ –ইবনে আবু খাইছমাহ (মৃঃ ২৭৯ হিঃ)। ইহা একটি উত্তম কিতাব।

৭। কিতাবুত তারীখ –ইবনে খুররম হুছাইন ইবনে ইদরীছ (মৃঃ ৩০১ হিঃ)। ইহা বোখারীর ‘তারীখে কবীরের’ ন্যায় বর্ণনাক্রমিক কিতাব।

৮। আততাময়ীজ –ইমাম নাছায়ী (মৃঃ ৩০৩ হিঃ)

৯। কিতাবুল জারহ ওয়াততা’দীল (আরবী*********)-ইবনুল জারূদ (মৃঃ ৩০৭ হিঃ)।

১০। কিতাবুল জারহ ওয়াততা’দীল –ইবনে আবু হাতিম রাজী (মৃঃ ৩২৭ হিঃ)।

১১। কিতাবুল আওহাম ওয়াল ঈহাম –ইবনে হিব্বান বুস্তী (মৃঃ ৩৫৪ হিঃ)। ইহা ১০ খণ্ডে সমাপ্ত।

১২। আল ইরশাদ –আবু ইয়া’লা খলীলী (মৃঃ ৪৪৬ হিঃ)।

১৩। মীজানুল ই’তেদাল –ইমাম জাহবী (মৃঃ ৭৪৮ হিঃ)। ইহা একটি মূল্যবান ও প্রসিদ্ধ কিতাব। এছাড়া এ বিষয়ে তাঁহার একটি তারীখও রহিয়াছে।

১৪। আততাকমীল (আরবী*****************) –ইমাদুদ্দীন ইছমাঈল ইবনে কাছীর (মৃঃ ৭৭৪ হিঃ)। ইহাতে তিনি মেজজীর ‘তাহজীব’ ও জাহবীর ‘মীজানের’ সহিত আরো কিছু তথ্যের সমাবেশ করিয়াছেন। ইহা এ বিষয়ের একটি উত্তম কিতাব।

১৫। আততাকমেলাহ (আরবী************) –ঐ।

১৬। তাবাকাতুল মোহাদ্দেছীন –ইবনে মুলাক্কেন –ওমর ইবনে আলী (মৃঃ ৮০৪ হিঃ)। এছাড়া তাঁহার ‘আল কামাল’ নামেও একটি কিতাব রহিয়াছে।

১৭। তাহজীবুল কালাম –ইমাম মেজজী (মৃঃ ৭৪২ হিঃ)। ইহাতে তিনি আবদুল গনী মাকদেছীর প্রসিদ্ধ কিতাব ‘আল-কামাল’কে উত্তমরূপে সাজাইয়াছেন।

১৮। আল মুগনী –শায়খ মোহাম্মদ তাহের পাট্টনী সিন্ধী (মৃঃ ৯৮৬ হিঃ)। ইহা রাবীগণের নামের ‘জবত’ [জের জবরের উল্লেখ করিয়া নামের পঠনকে নির্ভুল করা] বিষয়ক একটি উত্তম কিতাব বলিয়া শায়খ দেহলবী মত প্রকাশ করিয়াছেন। -আখবারুল আখইয়ার

 

About মাওলানা নূর মোহাম্মদ আ’জমী (রঃ)