হাদীছের তত্ত্ব ও ইতিহাস

দেরায়াতগত পরীক্ষা

আমাদের মোহাদ্দেছগণ শুধু যে হাদীছের রেওয়ায়াত বা বর্ণনাগত পরীক্ষাই করিয়াছেন তাহা নহে; বরং তাঁহারা হাদীছের দেরায়াত (বা শব্দ ও অর্থ)-গত পরীক্ষাও যথাযথভাবে করিয়াছেন। রেওয়ায়াতগত পরীক্ষা অতি দুরূহ ব্যাপার বলিয়া লোকেরা ইহা হইতে বিরত থাকিতে পারে এই আশংকায়ই তাঁহারা উহার প্রতি অধিক জোর দিয়াছেন। কারণ, রেওয়ায়াতগত পরীক্ষার জন্য হাজার হাজার রাবীর জীবনচরিত পুংখানুপুংখরূপে জানা আবশ্যক, যাহা সকলের পক্ষে কোন মতেই সম্ভবপর নহে।

দেরায়াতগত পরীক্ষার সূচনা স্বয়ং ছাহাবীদের আমলেই হয়। হজরত ওমর ফারূকের নিকট যখন ফাতেমা বিনতে কায়ছ ইদ্দতকালীন খোরপেষ সর্ম্পীয় হাদীছটি বর্ণনা করেন তখন তিনি এই বলিয়া উহা প্রত্যাখ্যান করেন যে, হাদীছটি কোরআন এবং অপর প্রসিদ্ধ হাদীছের খেলাফ। সম্ভবতঃ ফাতেমা উহা ঠিকভাবে ইয়াদ রাখিতে পারেন নাই। এভাবে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর যখন এ হাদীছটি  বলিলেনঃ

“মৃত ব্যক্তির জন্য পরিবারস্থ লোকের ক্রন্বদের দরুন কবরে তাহার আজাব হইয়া থাকে”। তখন হজরত আয়েশা (রাঃ) বলিলেনঃ “তাহা হইতে পারে না। কোরআনে রহিয়াছেঃ একের গোনাহর বোঝা অন্যে বহন করে না”। সুতরাং রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর কথা আবদুল্লাহ বুঝিতে পারেন নাই। একবার হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলিলেনঃ হুজুর বলিয়াছেনঃ ‘আগুনে পাক করা জিনিস খাইলে ওজু নষ্ট হইয়া যায়’। ইহা শুনিয়া হজরত ইবনে আব্বাছ বলিলেনঃ ‘তাহা হইলে গরম পানি খাইলেও তো ওজু যাইবার কথা, অথচ তাহা কেহ বলে না; আপনি হয়তো হুজুরের কথা বুঝেন নাই অথবা তাহা ঠিকভাবে স্মরণ রাখিতে পারেন নাই সুতরাং ইহা গ্রহণযোগ্য নহে। এভাবে ছাহাবী হজরত ছাবেত যখন মে’রাজ সম্পর্কীয় হাদীছে বলিলেনঃ ‘হুজুর বলিয়াছেনঃ ‘আমি বোরাককে মাকদেছের কড়ার সহিত বাধিঁয়াছিলাম’ তখন ছাহাবী হজরত হোজাইফা বলিলেনঃ ‘কেন’ বোরাকের পালাইবার ভয়ে? তাহা হইতে পারে না; সে রাত্রে সমস্ত জিনিসকেই হুজুরের হুকুমের অধীণ করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। অতএব, আপনি হুজুরের কথা ঠিকভাবে বুঝিতে পারেননাই। অথবা স্মরণ রাখিতে পারেন নাই’। এ ধরনের আরো বহু ঘটনা রহিয়াছে।

ছাহাবীগণের এ সূত্র ধরিয়া পরবর্তী মনীষীগণ ইহার বিস্তারিত নিয়ম-কানুন নির্ধারণ করিয়াছেন। নিম্নে ইবনে জাওজী ও মোল্লা আলী ক্বারী কর্তৃক নির্ধারিত কতিপয় নিয়ম বা ধারা উদ্ধৃত করা গেলঃ

১। যে হাদীছ ভাষাগত দোষে দুষ্ট তাহা হুজুরের হাদীছ নহে বলিয়া মনে করিতে হইবে। কারণ, রছূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম ছিলেন আরবী সাহিত্যে অদ্বিতীয় জ্ঞানী।

২। যে হাদীছ শরীয়তের কোন সুস্পষ্ট উছুল বা নীতির বিপরীত।

৩। আকল বা বুদ্ধি সম্পর্কীয় সমস্ত হাদীছ

৪। যে হাদীছ বাস্তব অভিজ্ঞতার বিপরীত। যথা- ‘বেগুন সর্বরোগের নাশক’ হাদীছ।

৫। যে হাদীছ কোরআনের স্পষ্ট অর্থের বিপরীত।

৬। যে হাদীছ অপর প্রসিদ্ধ হাদীছের বিপরীত।

৭। যে হাদীছ এজমায়ে উম্মতের খেলাফ।

৮। যে হাদীছে সামান্য আমলের জন্য মহাপুরস্কারের ঘোষণঅ রহিয়াছে।

৯। যে হাদীছে লঘু অপরাধে গুরুদণ্ডের ব্যবস্থা রহিয়াছে।

১০। যে হাদীছের অর্থ নেহাত হীন। যথা –‘জবহে করা ব্যতীত কদু খাইও না’।

১১। যে হাদীছের রাবী এমন লোকের নিকট হইতে বর্ণনা করিতেছেন যাঁহার সহিত রাবীর সাক্ষাৎ হয় নাই। অপর দিকে এ হাদীছ তাঁহার নিকট হইতে অপর কোন রাবীও বর্ণনা করেন নাই।

১২। যে হাদীছে এমন বিষয় রহিয়াছে যাহা অবগত হওয়া সকল মুসলমানের পক্ষে আবশ্যক, অথচ হাদীছটি এ (এক) রাবী ছাড়া অপর কেহ অবগত নহে।

১৩। যে হাদীছে এমন কথা রহিয়াছে যাহা বাস্তবে ঘটিলে বহু লোকই তাহা অবগত হইত, অথচ এ রাবী ছাড়া অপর কেহ তাহা অবগত নহে।

১৪। যে হাদীছের বর্ণনা অতিরঞ্জিত।

১৫। যে হাদীছের কথা নবীগণের কথার অনুরূপ নহে।

১৬। যে হাদীছের ভবিষ্যদ্বাণীতে কোন সুনির্দিষ্ট তারিখের উল্লেখ রহিয়াছে।

১৭। যে হাদীছের কথা কোন চিকিৎসকের কথা হওয়াই অধিক সঙ্গত।

১৮। যে হাদীছের অসম্ভাব্যতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান রহিয়াছে; যথা- উজ ইবনে ওনক সম্পর্কীয় (তিন হাজার হাত বা অপর বর্ণনা, ৭০ হাত লম্বা ছিল) সংক্রান্ত হাদীছ।

ইহাতে দেখা গেল যে, আমাদের মোহাদ্দেছগণ হাদীছ বিচারের কত সূক্ষ্ম এবং কত যুক্তিগত ব্যবস্থা করিয়াছেন। -মাওজুআতে কবীর ও ফাহমে কোরআন

ইমামগণের হাদীছ বাছাই

হাদীছের ইমামগণ রেওয়ায়াত ও দেরায়াতের এ সকল সূত্র অনুসারেই হাদীছ বাছাই করিয়াছেন এবং লক্ষ লক্ষ [মোহাদ্দেছগণ একটি হাদীছের যতটি ছনদ রহিয়াছে তাহাকে তত হাদীছ বলিয়াই গণ্য করেন। সুতরাং লক্ষ লক্ষ হাদীছ যাচাই করার অর্ত লক্ষ লক্ষ ছনদ পরীক্ষা করা।] হাদীছ হইতে কঠোরভাবে পরীক্ষা করিয়া উহা হইতে মাত্র কয়েক হাজার হাদীছকে তাঁহাদের কিতাবের জন্য মনোনিত করিয়াছেন। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, ইমাম মালেম (রঃ) প্রথমে এক লক্ষ হাদীছ বাছাই করিয়া দশ হাজার হাদীছ তাঁহার কিতাবে লেখেন; অতঃপর উহা হইতে বাছাই করিতে করিতে শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৭২০টি হাদীছকে অবশিষ্ট রাখেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রঃ) সাড়ে সাত লক্ষ হাদীছ সংগ্রহ করিয়া উহা হইতে মাত্র ৩০ (ত্রিশ) হাজার হাদীছকে তাঁঞার কিতাবে স্থান দেন। এভাবে ইমাম বোখারী ৬ (ছয়) লক্ষ হাদীছ হইতে বাছাই করিয়া মাত্র আড়াই হাজার (২৪৬০টি) হাদীছ তাঁহার ‘জামেয়ে ছহীহ’তে গ্রহণ করেন। ইমাম মোছলেম তিন লক্ষ হাদীছ হইতে ছাঁটিয়া মাত্র চারি হাজার হাদীছ তাঁহার কিতাবে লিপিবদ্ধ করেন। ইমাম আবু দাঊদ ৫ লক্ষ হাদীছ বাছাই করিয়া মাত্র পাঁচ হাজার হাদীছকে তাঁর ছুনানে গ্রহণ করেন। এভাবে ইমাম নাছায়ী, তিরমিজী এবং ইবনে মাজাহও লক্ষ লক্ষ রেওয়ায়াত হইতে বাছিয়া অতি অল্প সংখ্যক রেওয়ায়াতই তাঁহাদের কিতাবের জন্য ইনতেখাব করিয়াছেন। ইমাম দারেমী এবং অন্যান্য ছহীহ কিতাবের রচয়িতাগণও এরূপ করিয়াছেন।

এতদসত্ত্বেও পরবর্তী হাদীছ সমালোচক (নাকেদীনে হাদীছ) ইমামগণ এ সকল কিতাবের এর এক এক হাদীছকে পুনরায় কষ্টিপাথরে যাচাই করিয়া দেখিয়াছেন। সুতরাং কোনো হাদীছের ছহীছ হওয়ার অর্ত হইল মহা অগ্নি-পরীক্ষার ভিতর দিয়া উহার উত্তীর্ণ হওয়া।

সত্য কথা এই যে, আমাদের  মোহাদ্দেছগণ আমাদের রছূলের হাদীছের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য যাহা করিয়াছেন অন্য কোন জাতি তাহাদের আল্লাহর কিতাবের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্যও ইহার শতাংশের একাংশ পর্যন্ত করিতে পারে নাই। প্রাচ্য বিদ্যা বিশারদ ডঃ মাগেলিউথ ঠিকই বলিয়াছেনঃ ‘হাদীছের জন্য মুসলমানরা যত ইচ্ছা গর্ব করিতে পারে; ইহা তাহাদের পক্ষে শোভা পায়’।

হাদীছ রেওয়ায়তে বিশ্বস্ততার প্রমাণ

হাদীছের ইমামগণের পরীক্ষায় যে সকল হাদীছ ‘ছহীহ’ বলিয়া সাব্যস্ত হইয়াছে সে সকল হাদীছ যে সত্যই রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর হাদীছ ইহার বহু বাহ্যিক প্রমাণও রহিয়াছে। নিম্নে ইহার কতিপয়ের উল্লেখ করা গেলঃ

১। মকাওকিছের নামে লিখিত পত্রঃ

৬ষ্ট হিজরীতে হোদায়বিয়ার সন্ধি হওয়ার পর রছূলে করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম আরবের চতুর্দিকের রাজা-বাদশাহদের নিকট ইসলামের প্রতি ‘দাওয়াত’ দিয়া বহু ‘দাওয়াতনামা’ প্রেরণ করেন। এ সকল ‘দাওয়াতনামা’র বিবরণ হাদীছ, ছীরাত ও তারীখের বিভিন্ন কিতাবে লিপিবদ্ধ রহিয়াছে। এসময় রছূলে করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম মিছরের কিবতী বংশীয় খৃষ্টান শাসনকর্তা ‘মকাওকিছ’-এর নিকটও একখানা দাওয়াতনামা প্রেরণ করিয়াছিলেন। ইহার বিবরণ সমস্ত কিতাবেই রহিয়াছে। দাওয়াতনামাখানি ১৮৫০ সালে মিছরের এক গির্জা হইতে ফরাসী পণ্ডিত মঁসিয়ে বারতেলমী কর্তৃক আবিষ্কৃত হইয়াছে এবং বিশেষজ্ঞগণের পরীক্ষায় তাহা রছূলে করীমের সেই আসল দাওয়াতনামা বলিয়াই সাব্যস্ত হইয়াছে। দাওয়াতনামাখানি বর্তমানে কনষ্টান্টিনোপলে রক্ষিত আছে। প্রাপ্ত দাওয়াতনামার বিবরণ এই- (আরবী************************************)

‘বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আল্লাহর বান্দা ও তাঁহার রছূল মোহাম্মদ বনাম কিবতীদের নেতা মকাওকিছ। যে ব্যক্তি সত্যের অনুসরণ করিয়াছে তাহার প্রতি ছালাম। ইতঃপর –আমি আপনাকে ইসলামের ডাকে সাড়া দিতে আহবান জানাইতেছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপদে থাকিবেন। (ইহাতে) আল্লাহ আপনাকে দুই গুণ ছওয়াব দিবেন। যদি আপনি পশ্চাদপসরণ করেন তাহা হইলে আপনার উপর কিবতীদের গোনাহও বর্তাইবে। [হে গ্রন্থধারীগণ! আস, এমন একটি কথার দিকে যাহা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান। আমরা যেন আল্লাহ ব্যতীত কাহারও উপাসনা না করি এবং তাঁহার সহিত কাহাকেও শরীক কা করি, পরস্তু আমাদের কেহ যেন আল্লাহ ব্যতীত একে অন্যকে প্রভু না বানায়। যদি তাহারা পশ্চাদপসরণ করে তা হইলে (হে মু’মিনগণ,) তোমরা বল এবং ঘোষণা কর, আমরা নিশ্চয়ই আল্লাহর অনুগত।]-[বন্ধনীর মধ্যকার বাক্যসমূহ কোরআনের আয়াত। রছূলে করীম পত্রে উহার উদ্ধৃতি দিয়াছেন।]

-রছূলে আকরাম কী ছিয়াছী জিন্দেগী ১৩৬ পৃঃ

এখন দেখা যাইতেছে যে, পত্রের বিবরণ (এবারত) এবং হাদীছ ও ছীরাতের কিতাবের বিবরণের মধ্যে কোথাও কোন গরমিল নাই। উভয়ই হুবহু এক। একটি শব্দের মধ্যে যে সামান্য বেশ-কম পরিলক্ষিত হয় তাহাও অর্থের দিক দিয়া নহে, অর্থ একই, পত্রে রহিয়াছে ‘দেআয়াহ’আর কিতাবে রহিয়াছে ‘দাইয়াহ’।

এখানে একটি কথা প্রণিধানযোগ্য যে, মোছলেম শরীফের এক হাদীছে আছেঃ হজরত আনাছ (রাঃ) বলেনঃ নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম যখন কিছরা, কাইজার ও নাজ্জাশী প্রমুখের নিকট পত্র লিখিতে ইচ্ছা করিলেন তখন তাঁহাকে বলা হইল যে, তাঁহারা সীল-মোহর ব্যতীত কোন পত্র গ্রহণ করেন না। সুতরাং হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম সীল-মোহর করার জন্য একটি রূপার আংটি তৈয়ার করাইলেন যাহাতে ‘মোহাম্মদুর রাছুলুল্লাহ’ বাক্য খোদাই করা হইয়াছিল। বোখারীর বর্ণনায় ইহাও রহিয়াছে যে, এই বাক্যটি তিন সারিতে (ছতরে) খোদাই করা হইয়াছিল। নীচের দিক হইতে প্রথম সারিতে ‘মোহাম্মদ’ উহার উপর দ্বিতীয় সারিতে ‘রাছূল’ এবং উহার উপর তৃতীয় সারিতে ‘আল্লাহ’ শব্দ।

এখন দেখা যাইতেছে মিছরে প্রাপ্ত পত্রে  সীল-মোহরও রহিয়াছে এবং উহার রূপও হুবহু হাদীছে বর্ণিত রূপই। ইহা অপেক্ষা মোহাদ্দেছগণের হাদীছ রেওয়ায়তে বিশ্বস্তার বড় প্রমাণ আর কি হইতে পারে?

২। মুনজির ইবনে ছাওয়ার নামে লিখিত পত্রঃ

ইবনুল; কাইয়্যেমের ‘জাদুল মা’দ এবং কাস্তালানীর ‘মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া’ প্রভৃতি কিতাবে রহিয়াছে; নবী করিম (ছঃ) বাহরাইনের ইরানী শাসনকর্তা মুনজির ইবনে ছাওয়ার নিকট তাঁহার ইসলাম গ্রহণ করার পর তাঁহাকে পূর্বপদে বহাল রাখিয়া নিম্নলিখিতরূপ একখানা পত্র লিথিয়াছিলেনঃ

( আরবী**************************************)

‘বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আল্লাহর রছুল মোহাম্মদ-এর পক্ষ হইতে মনজির ইবনে ছাওয়ার নামে। আপনার প্রতি ছালাম হউক। অতঃপর আমি আপনার নিকট আল্লাহর প্রশংসা করিতেছি যিনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নাই এবং আমি ঘোষণা করিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নাই এবং মোহাম্মদ আল্লাহর বান্দা এবং তাঁহার রছূল। ইতঃপর- আমি আপনাকে আল্লাহ (আ’জ্জা ও জাল্লা)-এর নামে স্মরণ করাইয়া বলিতেছি যে, যে ব্যক্তি ভাল কাজ করিবে সে নিজের জন্যই তাহা করিবে এবং যে ব্যক্ত আমার প্রেরিত লোকজনের অনুগত থাকিবে এবং তাহাদের কথা মানিয়া চলিবে সে আমার অনুগত রহিল আর যে তাহদের কল্যাণ কামনা করিবে সে আমার কল্যাণ কামনা করিল। জানিয়া রাখিবেন যে, আমার (পূর্বে) প্রেরিত দুতগণ আপনার প্রশংসা করিয়াছেন। আম আপনার কওম সম্পর্কে আপনার সুপারিশ কবুল করিলাম। সুতরাং যাহারা যে সম্পদ লইয়া মুসলমান হইয়াছে তাহাদিগকে মাফ করিয়া দিন। আর আপনি যতদিন ভালভাল চলিবেন আমি আপনকে আপনার পদ হইতে কখনও অপসারিত করিব না। আর যে ইহুদী আপন ইহুদী মতের উপর এবং যে মাজনু ( আগ্নিপুজক) আপন মাজুছী মতের উপর অবস্থান করিতে চাহিবে ( সে তাহা করিতে পারিবে) তবে জিজিয়া দিতে বাধ্য থাকিবে।;

রছুল আকরাম কী……….১৫১ পৃঃ

হুজুরের প্রেরিত এই আসল পত্রখানিই ১৮৬২ সালে দামেশকে পাওয়া গিয়াছে। ইহার বিবরণ ও কিতাবের বিবরণ মধ্যে বাস্তবে কোন গরমিল নাই। এক জায়গায় যে সামান্য গরমিল দেখা যায় তাহা অর্থের দিক দিয়া নহে। অর্থ রহিয়াছে (আরবী) আর কিতাবে রহিয়াছে (আরবী)

৩। নাজ্জাশীর নাম লিখিত পত্রঃ

১৯৩৮ সালে দামেশকে নবী করীম (ছঃ) বনাম নাজ্জাশী (সম্ভবতঃ আছহেমার পরবর্তী নাজ্জাশী) একখানি পত্র পাওয়া গিয়াছে। পত্রখানি ১৩/১-২ ইঞ্চি লম্বা এবং ৯ ইঞ্চি চওড়া একটা

কোমল চাওড়ায় (ঝিল্লিতে) ১৭ লাইনে লেখা। ইহার নীচে নবঅ করিমের সীল-মোহরও রহিয়াছে। ইহার বিবরণ নিম্নরূপঃ

(আরবী***************************************)

এই পত্রখানির বিবরণ এবং ‘ছীরাতে হালাবিয়াহ’ কিতাবের বিবরণ সম্পর্ণ এক। ইহাতে কি আমাদের ছীরাত লেখক ও হাদীছ সংকলন মোহাদ্দেছগণের সাধুতা এবং হাদীছ রেওয়ায়তে তাঁহাদের বিশ্বস্তাতার প্রমাণ পাওয়া যায় না?

৪। ইরান-সম্রাটের নামে লিখিত পত্রঃ

রছূলে আকরাম (ছঃ) তৎকালীন। ইরানের সম্রাট (কিছরা) খসরু পারবেজের নামেও একখানি ‘ইসলামের দাওয়াতনামা’ প্রেরণ করিয়াছিলেন। রছূলে আকরামের দূত আবদুল্লাহ ইবনে হোজাফা (রাঃ) উহা খসরুর নিকট পৌছিইলে খসরু রাগে উহা ফারিয়া ফেলেন। ইহা হাদীছ ও ছীরাতের কিতাবসমূহে রহিয়াছে।

কুদরতের লীলা-খেলা-এই ফাঁড়া চিঠিখানিও ১৯৬২ সালের নভেম্বর মাসে লেবাননের প্রাত্তন উজীর মিঃ হেনরী লুজের ব্যাক্তিগত পাঠাগরে পাওয়া গিয়াছে এবং বিশেষজ্ঞগণের পরীক্ষায় উহা হুজুরের সেই আসল চিঠি বলিয়াই প্রমাণিত হইয়াছে। ইহা ৮-১৫ ইঞ্চি একটি অতি কোমল চামড়ায় তৎকালে আরবে প্রচলিত কুফার লিপি পদ্ধতিতে (কুফী রছমুল খতে) লেখা। ইহার নীচে হুজুরের সেই সীলমোহরও রহিয়াছে। ইহার মধ্যভাগ ফাঁড়া। লাহোর হইতে প্রকাশিত ২১ শে জুন ১৯৬৩ সালের ‘কুহিস্তান’ পত্রিকায় পূর্ণ বিবরণসহ ইহার ছবি প্রকাশিত হইয়াছে। রছূলে করীম ছাল্লাল্লহু আলাইহে ওয়াছাল্লামের এ ধরনের প্রায় আড়াই দাওয়াতনামা, সন্ধিপত্র ও নির্দেশনামা প্রভৃতির বিবরণ বিভিন্ন কিতাবে লিপিবদ্ধ রহিয়াছে।কালের গর্ভ হইতে এ সকলের আর কোনটা যে প্রকাশ পাইবে না আর আমাদের সমস্ত দ্বিধা-সন্দেহের অবসান ঘটাইবে না তাহা কে বলিতে পারে?

৫। হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) তাঁহার শাগরিদ হাম্মাম ইবনে মুনাব্বেহকে শতাধিক হাদীছ লেখাইয়া দিয়াছিলেন। ইহা ‘ছহীফায়ে হাম্মাম’ নামে প্রসিদ্ধ। ইহার সমস্ত হাদীছকেই ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রাঃ) তাঁহার ‘মোছনাদে’ গ্রহণ করিয়াছেন। এই ছহীফার দুইটি প্রাচিন পাণ্ডুলিপি অতি হালে আবিষ্কৃত হইয়াছে এবং ডঃ হামীদুল্লাহর সম্পাদনায় প্রকাশিত হইয়াছে-ইহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। এখানেও দেখা যাইতেছে যে, ছহীফায়ে হাম্মামে যে হাদীছ যে ভাবে রহিয়াছে ‘মোছনাদে’ আহমদেও সে হাদীছ ঠিক সেই ভাবেই রহিয়াছে। ইহার অর্থ কি এই দাঁড়ায় না যে, আমাদের ইমামগণ হাদীছ রেওয়ায়তে অতুলনীয় বিশ্বস্তার পরিচয় পরিয়াছেন?

৬। হেজাজের আগুনঃ

বোখারী ও মোছলেমে রহিয়াছেঃ হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম বলিয়াছেনঃ ‘সে পর্যন্ত কেয়ামত কায়েম হইবে না যে পর্যন্ত না হেজাজ হইতে একটি আগুন জাহির হয় যাহা দ্বারা শামের অন্তগর্ত বুছরার ছোট ছোট পর্বতমালা পর্যন্ত দেখা যাইবে।

কোরতবী প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ লিখিয়াছেন যে, ৬৫৪ হিঃ অর্থাৎ, হাদীছটি কিতাবে লিপিবদ্ধ হওয়ার সাড়ে তিন শতাধিক বৎসর পর মদীনার নিকটবর্তী এক স্থান হইতে এরূপ একটি আগুন জাহির হয় এবং সমগ্র দেশে আতংকের সৃষ্ট করে।

৭। বাগদাদের পতন ও কনস্টান্টিনোল বিজয়ঃ

এভাবে যে সকল হাদীছে তুর্কীদের হাতে বাগদাদের পতন এবং মসলমানদের দ্বারা ‘কনস্টান্টিনোপল’ বিজয়ের সংবাদ রহিয়াছে, হাদীছ লেখার বহু সতাব্দী পর (৬৫৬ হিজরীতে) হালাকু খাঁ কর্তৃক কনস্টান্টিনোল বিজয় দ্বারা হাতা পূর্ণ হইয়া সে সকল হাদীছের সত্যাতার প্রমাণ করিয়া দিয়াছে। এ সকল হাদীছ বোখারী, মোছলেম, আবু দাউদ ও নাছয়ীতে রহিয়াছে আর এ সকল কিতাব হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েই লেখা হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত যে সকল হাদীছে শেষ জমানার লোকের পিতা-মাতার প্রতি উপেক্ষা, বন্ধু-বান্ধবের প্রতি আগ্রত স্ত্রীর প্রতি এবং অযোগ্য লোকের ক্ষমতা দখল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বণী রহিয়অছে, আজ  কি সে সকল হাদীছরে সত্যতা দিবালোকের মত স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে না?

 

About মাওলানা নূর মোহাম্মদ আ’জমী (রঃ)