হাদীছের তত্ত্ব ও ইতিহাস

চতুর্থ যুগ

[ইমামে রব্বানী ও শায়খ দেহলবীর যুগ]

এ যুগ একাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় পাদ হইতে দ্বাদশ শতাব্দীর তৃতীয় পাদ পর্যন্ত অর্থাৎ, ইমামে রব্বানী মুজাদ্দেদে আলফে  ছানী শায়খ আহমদ সারাহিন্দী ও শায়খ আবদুল হক মোহাদ্দেছ দেহলবী হইতে শাহ ওলীউল্লাহ দেহলবী (মৃঃ ১১৭৬ হিঃ মোঃ ১৭৬২ ইং ) পর্যন্ত প্রায় দেড় শতাব্দীর যুগ। এ যুগে হাদীছ ওলামা ও ছুফীদের মাদ্রাছা ও খানকাহ হইতে জনসাধারণের অন্তঃপুরে যাইয়া পৌছিতে সমর্থ হয়। এ যুগে একদিকে যেমন ইমামে রব্বানী ও তাহার আওলাদ এবং অনুসারীগণ শিক্ষা ও প্রচারের মাধ্যমে হাদীছকে জনসাধারণের বাস্তব জীবনে রুপায়িত করার জন্য জনসাধারণকে অনুপ্রাণিত করেন, অপর দিকে শায়খ আবদুল হক মোহাম্মদ দেহলবী (মৃঃ ১০৫২ হিঃ মোঃ ১৬৪২ ইং) এবং তাহার বংশধর ও শাগরিদগণ তৎকালে বহুল প্রচারিত সরল ও রাজকীয় ফারছী ভাষায় হাদীছের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কিতাবের তরজমা ও ব্যাখ্যার মারফতে উহাকে আরবী উচ্চ শিক্ষিতদের গবেষণার বস্ত হইতে নামাইয়া সাধারণ ফারছি শিক্ষিতদেরও বোধগম্য বিষয় করিয়া তোলেন।

ইমামে রব্বানীর পূত্র-পৌত্রাদির মধ্যে খাজা ছাঈদ ‘খাজিনুর রহমত’ (মৃঃ১০৭০ হিঃ), খাজা মা’ছুম ওরওয়াতুল উছকা (মৃঃ ১১১৪ হিঃ), শাহ আবু ছাঈদ মুজাদ্দেদী দেহলবী (মৃঃ ১২৫০ হিঃ) ও শাহ আবদুল গণী মুজাদ্দেদী দেহলবী (মৃঃ১২৯৬ হিঃ)। অপর দিকে শায়খ দেহলবীর বংশধরগণের মধ্যে শায়খ নূরুল হক দেহলবী (মুঃ ১০৭৩ হিঃ), শায়খ ছায়ফুল্লাহ দেহলবী, শায়খ মুহিববুল্লাহ দেহলবী, হাফেজ ফখরুদ্দীন দেহলবী (মৃঃ ১১৫০ হিঃ), শায়খুল ইছলাম দেহলবী (মৃঃ ১১৮০ হিঃ) ও শায়খ ছালামুল্লাহ দেহলবী রামপুরী (মৃঃ ১২২৯ হিঃ) প্রমুখ মনীষীগণ এ যুগে নানাভাবে হাদীছের প্রভৃত খেদমত করেন।

এতদ্ব্যতীত তাহার শাগরিদ, দর-শাগরিদগণের মধ্যে খাজা হায়দার (মৃঃ ১০৫৭ হিঃ), খাজা খাওন্দ (মৃঃ ১০৮৫ হিঃ), বাবা দাঊদ মেশকাতী (মৃঃ ১০৯৭ হিঃ) মীর ছৈয়দ আবদুল জলীল বিলগ্রামী (মৃঃ ১১৩৭ হিঃ), মীর ছৈয়দ মোবারক বিরগ্রামী (মৃঃ১১১৫ হিঃ), শায়খ এনায়েতুল্লাহ কাশ্মীরী (মৃঃ ১১৮৫ হিঃ) ও মীর ছৈয়দ আজাদ বিলগ্রামী (মৃঃ ১২০০ হিঃ) প্রমুখের খেদমতও অবিস্মরণীয়।

ইমামে রব্বানী

[মৃঃ ১০৩৪ হিঃ মোঃ ১৬২৪ ইং]

১।ইমাম রববানী মুজাদ্দেদ আলফে ছানী আহমদ ইবনে আবদুল্লা ফুরূকী সারহিন্দী (মৃঃ ১০৩৪ হিঃ মোঃ ১৬২৪ ইং)। তিনি ৯৭১ হিঃ মোঃ ১৫৬৪ ইং পূর্ব পঞ্জাবের অম্তগর্ত সারহিন্দ (সাহরান্দ) নাম স্থানে করেন। প্রাথমিক শিক্ষা স্বীয় পিতার নিকট লাভ করার পর তিনি প্রথমে সিয়ালকোটে, পরে কাশ্মীরে গমন করেন এবং মোল্লা কামালুদ্দীন কাশ্মীরী (মৃঃ ১০১৭ হিঃ) ও শায়খ ইয়াকুব ছরফী (মৃঃ ১০০৩ হিঃ)_এর নিকট হইতে হাদীছ, তফছীর ও মান্তেক-হিকমত প্রভৃতি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর তিনি আবদুর রহমান ইবনে কাহফের শাগরিদ কাজী বাহলুল বদশীর নিকট হইতেও হাদীছের এজাজত লাভ করেন।‘তাছাওফে’ তিনি হজরত খাজা বাকী বিল্লাহ নকশবন্দ-এর (মৃঃ ১০১২ হিঃ) খলীফা ছিলেন। তাঁহার বিরাট সংস্কারমূলক কার্যের দরুন দুনিয়া তাঁহাকে (প্রথম এক হাজার বৎসরের পর ) দ্বিতীয় হাজারের জন্য ‘মুজাদ্দেদ’রূপে মানিয়া লয়। তাঁহার সংস্কারকার্যের বিবরণ এখানে দেওয়া যেমন অপ্রাসঙ্গিক তেমন অসম্ভবও। তাঁহার সংস্কারকার্যে

না হইলে আকবারের এলহাদের দরুন ও উপমহাদেশ হইতে ইসালাম তখনই বিদায় গ্রহণ করিত।

শায়খ দেহলবী

[মৃঃ ১০৫২ হিঃ মোঃ ১৬৪২ ইং]

২। শায়খ আবদুল হক ইবনে ছায়ফুদ্দীন মোহ্দ্দেছ দেহলবী (মৃঃ ১০৫২ হিঃ মোঃ ১৬৪২ ইং) তিনি ৯৫৪ হিঃ দিল্লীর এক প্রসিদ্ধ ছূফী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার উর্ধ্বতন পুরুষ আগা মোহাম্মদ তুর্ক বোখারা হইতে ভারতে আগমন করেন। তিনি ফারছী-আরবী, মা’কুলাত ও মানকুলাত প্রভৃতি যাবতীয় এলম তাঁহার পিতা ও দেশের কতিপয় বিশিষ্ট আলেমের নিকট শিক্ষা করনে। অতঃপর মক্কা শরীফ যাইয়া ৯৯৬-১০০০ হিঃ চারি বৎসরকাল শায়খ আলী মোত্তাকীর বিশিষ্ট শাগরিদ ও খলীফা শায়খ আবদুল ওহাহব মোত্তাকী বোরহানপুরী মক্কার (মৃঃ ১০১০ হিঃ) নিকট হাদীছ ও তাছাওফের উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন। হাদীছ, তফছীর ও তারীখ প্রভৃতি বিষয়ে তাঁহার শতের মত কিতাব রহিয়াছে।– আবজাদ। নীচে তাঁহার কতিপয় কিতাবের নাম দেওয়া গেল। (ক) ‘আত তরীকুল কাইয়েম শরহে ছিফরুছ ছাআদাত।‘ (প্রকাশিত) (খ) ‘লমআতুত তানকীহ শরহে মেশকাতুল মাছাবীহ। আরবীতে ইহা মেশকাত শরীফের একটি বিস্তারিত শরাহ (ঝাঁকিপুরে ইহার কপি বিদ্যমান আছে এবং ঢাকা মাদ্রাছায়ও আছে।) (গ) ‘আশেআতুল লুমআত’। ইহা মেশকাত শরীফের ফারছী অনুবাদসহ সংক্ষিপ্ত অথচ অতি মূল্যবান শরাহ। (মেশকাতরে ব্ঙ্গানুবাদ আমি ইহারই অনুসরণ করিয়াছি।) (ঘ) ‘জামেউল বারাকাতুল মোন্তাখাব। ইহাতে তিনি মেশকাত শরীফের প্রত্যেক অধ্যায়ের কতিপয় হাদীছ নির্বাচান করিয়া অতঃপর উহার এমনভাবে শরাহ করিয়াছেন যাহাতে সমস্ত অধ্যায়ের বিবরণ জানা যায়। (ইহার কপিও ঝাকিপুরে আছে।)(ঙ) ‘মা ছাবাতা বিছছুন্নাহ’। ইহতে মাস ও দিনের ফজীলত সম্পর্কেয় হাদীছ জমা করা হইয়োছে। ইহা প্রকাশিত হইয়াছে। (চ) ‘আল আরবাঈন ফী ওলুমিদ্দীন’ (JAR.SB NO-21) (ছ) ‘তরজমায়ে আরবাঈন’। ইহাতে শাসনকর্তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে চল্লিশ হাদীছ সংগ্রহ করিয়া উহার ফারছী অনুবাদ করিয়াছেনে। (জ) ‘কাশকুল এখতেবাস ফী আহকামিম লেবাস’। ইহাতে রছূলুল্লাহ ছাল্লল্লাহু আইলাইহে ওয়াছাল্লাম –এর লেবাছ সম্পর্কীয় হাদীছসমূহ এক্র করা হইয়াছে। (ঝ) ‘জিকরে এজাজাতুল হাদীছ ফিল কাদীমে ওয়ালহাদীছ’। (ঞ) ‘মাদারিজুন নবুওত’, ফারছীতে রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম  (ছঃ)-এর বিরাট জীবনী গ্রন্হ।(প্রকাশিত)

৩। মাওলানা মোহাম্মদ ইবনে ছিদ্দীক লাহোরী (মৃঃ  অনুঃ ১০৪০ হিঃ)। তিনি ‘নুজুমুল মেশকাত’ নামে মেশকাত শরীফের এক শরাহ করেন। এছাড়া ইবনে হাজার মক্কীর ‘আজ জাওয়াজের’ কিতাবেরও তাঁহার এক শরাহ রহিয়াছে।

৪। শায়খ হাবীবুল্লাহ কন্নুজী (মৃঃ ১০৪১ হিঃ) তিনি ‘রাওজাতুন নবী’ নামে ছীরাতের এ কিতাব লিখিয়াছেন।

৫। শায়খ হোছাইনী লাহোরী (মৃঃ ১০৪৫ হিঃ)

৬। খাজা হায়দর পতলু ইবনে ফিরোজ কাশ্মীরী (মৃঃ ১০৫৭ হিঃ)। তিনি প্রথমে কাশ্মীরে বাব জহরনাথ কাশ্মীরীর এবং পরে দিল্লীতে শায়খ আবদুল হক মোহদ্দেছ দেহলবীর নিকট হাদীছ শিক্ষা করেন।

৭।খাজা ছাঈদ ইবনে ইমামে রব্বানী ওরফে খাজিনুর রহমত (মৃঃ ১০৭০ হিঃ)। তিনি তাঁহার পিতা ইমামে রব্বানী ও আবদুর রহমান রুমীর নিকট হাদীছ শিক্ষা করেন। হারামাইন রওনা হইবার পূর্ব পর্যন্ত (মৃঃ ১০৩৪  হিঃ) তিনি তাঁহার পিতার খানকায় হাদীছ-তফছীর প্রভৃতি এলম শিক্ষা দিতে থাকেন। হাদীছে তাঁহার মেশকাত শরীফের এক শরাহ রহিয়াছে।

৮। শায়খ নরুল হক দেহলবী ইবনে শায়খ আবদুল হক দেহলবী (মৃঃ ১০৭৩ হিঃ)। তিনি হাদীছসহ যাবতীয় এলম তাঁহার পিতা শায়ক দেহলবীর নিকট শিক্ষা কেরন। তিনি পাক-ভারতীয় মোহাদ্দেছগণের মধ্যে প্রথম শ্রেণীর মোহাদ্দেছ। হাদীছে তাঁহার ‘তাইছীরুল করী’ নামে বোখরী শরীফেরর এক বিস্তারিত ফারছী শরাহ এবং ‘শামায়িলে তিরমিজী’র অপর এক শরাহ রহিয়াছে।

৯। মোল্লা ছোলাইমান আহমদাবাদী। তিনি শায়খ দেহলবীর শাগরিদ ছিলেন।আহমদাবাদে এখনও তাঁহার হাদীছের ছিলছিল জারি রহিয়াছে।– তারীখুল হাদীছ

১০। শায়খ মোহাম্মদ হোছাইন খানী। তিনি শায়ক দেহলবীর শাগরিদ ছিলেন।

১১।খাজাহ মা’ছুম ইবনে ইমামে রব্বানী ওরফে ওরওয়াতুল ওছকা (মৃঃ ১০৮০ হিঃ)। তিনি হাদীছ প্রথমে দেশে তাঁহার পিতা এবং পরে হারামাইন অবস্থানকালে তথাকার মোহাদ্দেছগণের নিকট শিক্ষা করেন। তিনি ইমামে রব্বানীর দ্বিতীয় পুত্র এবং সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের (মৃঃ ১১১৯ হিঃ) পীর ছিলেন। তাঁহার ৯ লক্ষ মুরীদ ছিল বলিয়া কথিত আছে।

১২।ছৈয়দ জা’ফর বদলে আলম আহমদাবাদী (মৃঃ ১০৮৫ হিঃ)। তিনি তাঁহার পিতা ছৈয় জালালের নিকট হাদীছ শিক্ষা করেন। ৫৪ ঘন্টায় তিনি পুর্ণ কোরআন পাক লিখিতে পারেতেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁহাকে গর্ভণর পদ দিতে চাহিলে তিনি তাহা অস্বঅকার করেন। হাদীছে তাঁহার ‘আল ফয়জুত তারী’নামে বোখারী শরীফের এক শরাহ এবং ‘রওজতুলশাশহ’ নামে অপর এক বিরাট কিতাব রহিয়াছে।

১৩। খাজা খাওদ মুঈনুদ্দীন ওরফে ‘হজরতে ‘ইশা’ কাশ্মীরী  (মৃঃ১০৮৫ হিঃ)। তিনি হাদীছ, তফছীর, ফেকাহ প্রভৃতি এলম শায়খ দেহলবীর নিকট শিক্ষা করেন।

১৪। বাবা দাউদ মেশকাতী (মৃঃ ১০৯৭ হিঃ)। তিনি হাদীছ খাজা হায়দর কাশ্মীরী ও তাছাওফ খাজা খাওন্দের নিকট শিক্ষা করেন। মেশকাত শরীফ তাঁহার মুখস্থ ছিল বলিয়া তাঁহাকে মেশকাত বলা হয়।

১৫। শায়খ ‘আবতু ইউছুফ’ ইয়াকুব বানানী লাহোরী (মৃঃ ১০৯৮হিঃ)। তিনি শাহজাহা নিয়া মাদ্রাছার অধ্যাপক’ শাহজাহানী আমলে (মৃঃ১০৩৭-৬৯ হিঃ)। মীরে আদল এবং আলমগীরের সময় (মৃঃ১০৬১-১১১৯ হিঃ) ‘নাজিরুল মাহাকেম’ ছিলেন। হাদীছে তাঁহার তিনটি মূল্যবান কিতাব রহিয়াছে। (ক) ‘আলখায়রুল জারী ফী শরহিল বোখারী।( আরবী****************) (খ) ‘আলমু’লিন ফী শরহিল মোছলেম।( আরবী***) (গ) ‘আল মুছাফফা ফী শরহিল মোআত্ত’। ( আরবী****)

১৬। মির্জা জান আওহাদুদ্দীন বারকী জলন্দরী (মৃঃ অনুঃ ১০০ হিঃ )। তিনি ‘নজমুদদুরারে ওয়াল মারজান’ ( আরবী***********) নামে ছীরাতুন্নবী সম্পর্কে এক কিতাব লিখিয়াছন।

১৭। মাহবুবে আলম ইবনে জা’ফর বদরে আলম আহমদাবাদী (মৃঃ ১১১১ হিঃ)। তিনি তাঁহার পিতা জা’ফর বদরে আলমের নিকট হাদীছ শিক্ষা করেন এবং ‘জিনাতুন নোকাত’ নামে মেশকান শরীফের এক শরাহে লিখেন। এছাড়া তিনি আরবী ও ফারাছীতে কোরআন পাকের দুইটি তফছীরও লিখেন।

১৮। হাফেজ ফরনোখ শাহ ইবনে খাজিনুর রহমত ইবনে ইমাম রব্বানী (মৃঃ ১১১২ হিঃ) ছানদসহ তাঁহার ৭০ হাজার হাদীছ মুখস্থ ছিল।

১৯। মীর ছৈয়দ মোবারক বিলগ্রামী (মৃঃ ১১১৫ হিঃ)। তিনি শায়খ নূরল হক দেহলবীর নিকট হাদীছ শিক্ষা করেন। হাদীছে তাঁহার অগাধ জ্ঞানের দরুন তিনি ‘কুততুল মোহাদ্দেছীন’ উপাধিতে ভুষিত হন।

২০। মাওলানা নায়ীম ছিদ্দীকী জৌনপুরী (মৃঃ ১১২০ হিঃ)।তিনি তর্কশাস্ত্রে ‘মোনাজারায়ে রশীদিয়া’ (আরবী****) প্রণেতা মাওলানা আবদুর রশীদ জৌরপুরী (মৃঃ ১০৮৩হিঃ) শাগরিদ ছিলেন। হাদীছে তাঁহার মেশকাত শরীফের এক শরাহ রহিয়াছে।

২১। শায়খ ইনায়েতল্লাহা কাশ্মীরী (মৃঃ ১১৮৫ হিঃ)। তিনি খাজা হায়দরের এক পত্রের নিকট হাদীছ শিক্ষা করেন এবং ৩৬ বৎসর যাবৎ কাশ্মীরে হাদীছ শিক্ষা দেন।

২২। শায়খ  মুহিববুল্লাহ ইবনে নুরল্লাহ ইবনে নুরল হক দেহলবী (মৃঃ অনুঃ ১১২৫ হিঃ)। তিনি তাঁহার দাদা শায়খ নুরুল হক দেহলবীর নিকট হাদীছ শিক্ষা করেন। তিনি ‘মাম্বাউল এলম’ নামে মোছলেম শরীফের এক শরাহ করেন। তাঁহার পুত্র হাফেজ ফখরুদ্দীন ইহাকে সাজাইয়া লিখেন, ফলে ইহা তাঁহার নামে প্রসিদ্ধ হাইয়া যায়।

২৩। শায়খ মোহাম্মদ আকরাম ইবনে আবদুর রহমান সিন্ধী (মৃঃ ১১৩০ হিঃ)। তিনি ‘ইম আনুন নজর নামে ‘নোখবাতুল ফিকর-এর এক বিস্তারিত শরাহ করেন। ইহা লক্ষ্ণৌর আবদুল হাই মনহুমের লাইব্রেরীতে বিদ্যমান আছে।

২৪। মীর ছৈয়দ আবদুল জলীল বিলগ্রামী (মৃঃ ১১৩৮ হিঃ)।তিনি বিলগ্রামের মীর ছৈয়দ মোবারক, মীর ছা’দুল্লাহ, মীর তোফায়ল এবং লক্ষ্ণৌর মাওলানা গোলাম নকশবন্দ প্রমুখ মনীষীর নিকট হাদীছ শিক্ষা করেন। বিখ্যাত সাহত্যিক ও মোহাদ্দেছ মীর আজাদ বিলগ্রামী তাঁহার দৌহিত্র।

২৫। শায়খ ইয়াহইয়া ইবনে আমীন আব্বাছী ওরফে খুবুল্লাহ এলাহাবাদী (মৃঃ ১১৪৪ হিঃ)। তিনি তাঁহার চাচা বা মামা আফজাল ইবনে আবদুর রহমান এলাহাবাদীর নিকট হাদীছ শিক্ষা করেন। হাদীছে তাঁহার এসকল কিতাব রহিয়াছেঃ (ক) ‘ইনায়েতুল কারী শরহে ছোলাছিয়াতুল বোখারী’। (আরবী***********) (খ) ‘আরবাউন’ (৪০ হাদীছ)। (গ) ‘তাজকেরাতুল আছহাব’। (ঘ) মা’খাজুল ই’তেকাদ’ (আরবী*****)। (ঙ) শরহে হাদীছে ছালাতুত তাছবীহ’ ( আরবী**************)। (চ) তরজুমায়ে ওজায়েফুন নবী।

২৬।মাওলানা আমীনুদ্দীন ইবনে মাহমুদ ওমরী জৌনপুরী (মৃঃ ১১৪৫হিঃ)। তিনি মাওলানা আরশাদ ইবনে আবদুর রশীদ জৌনপুরী ছাত্র ছিলেন। তিনি শায়খ দেহলবীর ‘আশেআতুল লুমআত’কে সংক্ষেপ করিয়াছেন।

২৭। হাজী আফজাল সিয়ালকোটী (মৃঃ ১১৪৬হিঃ)। তিনি খাজিনুর রহমতের পুত্র খাজা আবদুল আহাদ সারহিন্দীর নিকট হাদীছের এজাজত লাভ করেন।– কাওলুল জামীল

২৮। হাফেজ ফখরুদ্দীন আবদুছ ছামাদ ইবনে মুহিববুল্লাহ দেহলবীর নিকট হাদছ শিক্ষা করেন এবং তাঁহার মোছলেম শরীফের শরাহ ‘মাম্বাউল এলম (আরবী*****************) কে সাজইয়া লিখেন।

২৯। মাওলানা নুরুদ্দীন ছালেহ আহমদাবাদী (মৃঃ ১১৫৫হিঃ)। তিনি হাদীছ মাওলানা মাহবুব আলম আহমদাবাদীর শাগরিদ ছিলেন। তিনি আহমদাবাদে ‘হেদায়েত বখশ’ নামে এক মাদ্রাছা স্থাপন করেন। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁহার দেড় শতের মত কিতাব রহিয়াছে। হাদীছে তাঁহার ‘নুরুল কারী’ নামে বোখারী শরীফের এক শরাহ রহিয়াছে।

৩০। শায়খ ছিবগাতুল্লাহ রেজবী (মৃঃ ১১৫৭ হিঃ)

৩১। শাহ ফাখির জায়ির এলাহাবাদী ইবনে শায়খ মোহাম্মদ ইয়াহইয়া এলাহাবাদী (মৃঃ ১১৬৪ হিঃ)। তিনি মদীনায় শায়খ হায়াত সিন্ধীর নিকট হাদীছ শিক্ষা করেন। কথিত আছে, শাহ ওলীউল্লাহ দেহলবীর সহিতও তাঁহার পরিচয় ছিল। তিনি একধারে মোহাদ্দেছ, কবি ও দরবেশ ছিলেন। হাদীছে তাঁহার ‘ইছবাতু রাফউল ইয়াদাইন’ (আরবী***********) ও ‘ছিফরুছ ছাআদতের’ পদ্যানুবাদ প্রসিদ্ধ।

৩২। শায়খুল ইছলাম ইবনে হাফেজে ফখরুদ্দীন দেহলবী (মৃঃ ১১৭৫ হিঃ)। তিনি তাঁহার পিতা হাফেজ ফখরুদ্দীন দেহলবীর নিকট হাদীছ শিক্ষা করেন। হাদীছে তাঁহার নিম্নলিখিত কিতাবেসমূহ রহিয়াছেঃ (ক) ‘শরহে বোখরী’ (ফারছী) ১৩০৫ হিঃ ইহা শায়খ নুরুল হক দেহলবীর তাই ছীরুল কারীর’ হাশিয়ার উপর লক্ষ্ণৌ হইতে প্রকাশিত হইয়াছে। (খ) ‘রেছালায়ে কাশফুল গেতা’ (আরবী…………………………………) (গ) ‘তারদুল-আওহাম’ (আরবী…………………………..) (India contri, তারীখুল হাদীছ, ওলামা কী শানদার মাজী)।

পঞ্চম যুগ

[ওলীউল্লাহী যুগ]

এ যুগের সূচনা হয় হিজরী দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ হইতে। এ যুগের প্রবর্তক হইতেছেন শাহ ওলীউল্লাহ মোহাম্মদ দেহলবী (মৃঃ ১১৭৬ হিঃ)। তিনি হারামাইন –মক্কা ও মদীনা হইতে হাদীছে উচ্চ জ্ঞান লাভ করিয়া ১১৪৫ হিঃ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন এবং দীর্ঘ ৩০ বৎসরকাল শিক্ষা ও রচনার মাধ্যমে উহার প্রচার করিতে থাকেন। অসংখ্য মোহাদ্দেছ তাঁহার নিকট হইতে হাদীছ শিক্ষা করিয়া দেশে ছড়াইয়া পড়েন এবং দেশকে হাদীছ দ্বারা উদ্ভাসিত করিয়া দেন। তাঁহার পর তাহার সুযোগ্য পুত্র শাহ আবদুল আজীজ দেহলবী (মৃঃ ১২৩৯ হিঃ) তাহার স্থলাভিষিক্ত হন এবং ৬০ বৎসরেরও অধিককাল হাদীছের শিক্ষায় ব্যাপৃত থাকেন। শাহ আবদুল আজীজ দেহলবীর পর তাহার দৌহিত্র শাহ মোহাম্মদ ইছহাক দেহলবী (মৃঃ ১২৬২ হিঃ) স্বীয় পিতামহের স্থান অধিকার করেন এবং (মক্কায় হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত) ২০ বৎসরকাল দিল্লীতে হাদীছ শেক্ষা দেন। শাহ ইছহাক দেহলবীর পর হাদীছ শিক্ষা আরও ব্যাপকতা লাভ করে। তাহার প্রসিদ্ধ শাগরিদ মাওলানা আবদুল গনী মুজাদ্দেদী (মৃঃ ১২৯৬ হিঃ) ও মিঞা ছাহেব ছৈয়দ নজীর হোছাইন দেহলবী (মৃঃ ১৩০২ হিঃ) দিল্লীতে দুই বিভিন্ন কেন্দ্র এবং মাওলানা আলম আলী নগীনবী রামপুরে ও মৌলনা কারী আব্দুর রহমান পানিপথী পানিপথী হাদীছ শিক্ষা দিতে আরম্ভ করেন।

শাহ আবদুল গনীর পর (বরং তাহার জীবনের শেষের দিকেই) হাদীছ শিক্ষা অধিকতর ব্যাপকতা লাভ করে। মাওলানা মাজহার নানুতবী (মৃঃ ১৩০২ হিঃ) সাহারপুর জিলার সদরে ‘মাজাহেরে উলুম’ নামে এবং মাওলানা মোহাম্মদ কাছেম নানুতবী (মৃঃ ১২৯৭ হিঃ ঐ জিলার) দেওবন্দে ‘দারুল উলুম’ নামে দুইটি নূতন কেন্দ্র স্থাপন করেন। এভাবে মাওলানা মশীদ আহমদ গঙ্গুহী (মৃঃ ১৩২৩ হিঃ ঐ জিলার) গঙ্গুহতে স্বীয় খানকার এবং মাওলানা আবদুল হাই লক্ষৌবী (মৃঃ ১৩০৪ হিঃ) লক্ষৌর ফিরিঙ্গী মহল্লায় পৃথকভাবে হাদীছ শিক্ষা দিতে আরম্ভ করেন। অতঃপর ক্রমে পাক-ভারতে হাদীছ শিক্ষার আরও কেন্দ্র স্থাপিত হয় এবং পাক-ভারত হাদীছ শিক্ষার ব্যাপারে বিশ্বে শীর্ষস্থান অধিকার করে।

এক কথায় এ যুগকে পাক-ভারতে এলমে হাদীসের স্বর্ণযুগ বলা যাইতে পারে। এ যুগে এলমে হাদীছ অপরাপর বিষয়বলীর উপর প্রাধান্য লাভ করে এবং উচ্চ শিক্ষার মাপকাঠি হিসাবে গৃহিত হয়।

এ যুগের পর পর কয়েকটি স্তরে ভাগ করা যাইতে পারেঃ

 

About মাওলানা নূর মোহাম্মদ আ’জমী (রঃ)