হাদীছের তত্ত্ব ও ইতিহাস

দ্বিতীয় অধ্যায়

বঙ্গে এলমে হাদীছ

বঙ্গে এলমে হাদীছ প্রথম করে, কাহার মারফত পৌঁছিয়াছিল তাহা সঠিকভাবে জানা যায় গেলেও ইখতিয়ারউদ্দীন মোহাম্মদ ইবনে বখতিয়ার খলজী কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ের (৬০০ হিঃ মোঃ ১২০৩ ইং) বহু পূর্বেই যে ইছলাম, তৎসঙ্গে কোরআন হাদীছও এখানে  পৌছিয়াছিল তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। কারণ, যে সকল পীর-আওলিয়া এখানে এসলাম প্রবার করিয়াছেন, তাঁহাদের প্রায় সকলেই ছিলেন আরব, ইরাক, ইরান ও খোরাছান প্রভৃতি পশ্চিমী দেশ হইতে আগত, সেখানে তখন এলমে হাদীছের বহুল প্রচার ছিল, আর তৎকালে পীর-আওলিয়াগণই বেশীর ভাগ হাদীছ চর্চা করিতেন। সুতরাং তাঁহাদের কেহ হাদীছ জানিতেন না বা এখানে হাদীছ চর্চা করেন নাই এরূপ ধারণা করা তাহাদের প্রতি অবিচার বৈ আর কিছুই নতে। এতদ্ব্যতীত বঙ্গে শাহী আমল ও নওয়াবী আমলে যে সকল আলেম-ফাজেল বিভিন্ন রাজকার্যে নিয়োজিত ছিলেন তাঁহাদের কেহও যে হাদীছ চর্চা করেন নাই এমন কথা বলাও সঙ্গ হইবে না। কেননা, তৎকালে সরকারী কর্ম-সময়ের বাহিরে সরকারী কর্মচারীগণের এবং ব্যবসায়ের ফাকেঁ ফাকেঁ ব্যবসায়ীগণের বিদ্যা শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপার ছিল অতি সাধারণ। বিধ্যা চর্চার জন্য সম্পূর্ণ পৃথক প্রতিষ্ঠার কায়েম করা বা উহার জন্য পৃথক সময় নির্ধারণ করার ব্যাপার হইল নেহায়েত আধুনিক। এছাড়া ১৭৮১ হইতে ১৮৩৩ ইং পর্যন্ত তো কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাছায়ই দরছে নেজামিয়ার পাঠ্যরূপে হাদীছের মেশকাত শরীফ শিক্ষা দেওয়া হইত এবং তৎকালে মেশকাত শরীফ পর্যন্ত হাদীছ জানা কম কথা ছিল না। উহাতে ছেহাহ ছেত্তার প্রায় সমস্ত হাদীছই সঙ্কলিত হইয়াছে।

অবশ্য বঙ্গের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে ‘ছেহাহ ছেত্তা’র শিক্ষা আরম্ভ হয় বর্তমানে শতাব্দী হিজরীর তৃতীয় দশক বা ইছায়ী বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক হইতে, যখন ১৩২৬ হিঃ মোঃ ১৯০৮ ইং চট্টগ্রাম হাটহাজারীর মুঈনুল ইছলাম মাদ্রাছায় দাওয়ারে হাদীছ এবং ১৩২৭ হিঃ মোঃ ১৯০৯ ইং কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাছায় টাইটেল ক্লাস খোলা হয়।

সুতরাং বাংলার হাদীছ শিক্ষার ক্রমবিকাশকালকে প্রধানতঃ দুই ভাগে ভাগ করা যাইতে পারে, হাটহাজারী ও আলিয়ার পূর্ব যুগ এবং ইহার পরযুগ।

প্রথম যুগ

এ যুগে বঙ্গে ইসলাম প্রচারের সূচনা হইতে ১৯০৮ ইং হাটহাজারী ও ১৯০৯ ইং কলিকাতা মাদ্রাছায় হাদীছ শিক্ষার ব্যবস্থা করা পর্যন্ত সুদীর্ঘ যুগ। এ যুগের আওলিয়া ও আলেমদের জীবনী ও শিক্ষা-দীক্ষার অবস্থা লিখিত নাহ হওয়ার কারণে সঠিকভাবে জানা যায় না, ইহাদের মধ্যে হাদীছ অভিজ্ঞ কাহারা ছিলেন। অনুসন্ধানে যে স্বল্প কয়েকজন সম্পর্কে হাদীছ অভিজ্ঞ ছিলেন বলিয়া জানা গিয়াছে অথবা আনুষঙ্গিক কারণে-

টীকা- যথা- কোন ব্যক্তির আরব, ইরান প্রভৃতি দেশের অধিবাসী হওয়া যথায় তৎকালে হাদীছের বহুল প্রচার ছিল। ওলীআল্লাহ হওয়া। কেননা, তৎকালে ওলীআল্লাহরাই বেশীর ভাগ হাদীছ চর্চা করিতেন। কোন ব্যক্তির কোন প্রসিদ্ধ মোহাদ্দেছের শাগরিদ হওয়া, যথা- হজরত শাহ্ ওলীউল্লাহ, শাহ্ আবদুল আজীজ, শাহ্ ইছহাক দেহলবী প্রমুখগণের শাগরিদ হওয়া। কেননা, তাঁহাদের দরছে সাধারণতঃ হাদীছই শিক্ষা দেওয়া হইত। হাদীছ অভিজ্ঞ ছিলেন বলিয়া ধারণা জন্মিয়াছে নিম্নে তাঁহাতের পরিচয় দেওয়া গেল।

১। হজরত শাহ্ জালাল তাবরেজী

[মৃঃ ৬৪২ হিঃ মোঃ ১২৪৪ ইং]

তিনি প্রথমে শাহ্ আবু ছাঈদ তাবরেজী পরে শায়খ শেহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর নিকট হইতে মা’রেফাতের খেলাফত লাভ করেন। তিনি হজরত শায়খ বাহাউদ্দীন জাকারিয়া মুলতানীর অন্তরঙ্গ বন্ধু ও খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী ও শায়খ ফরীদ গঞ্জে-শকরের সমসাময়িক ছিলেন। তিনি বহু দেশ সফর করিয়া অবশেষে দিল্লী এবং তথা হইতে বাঙলায় আগমন করেন। তিনি বিরাট আল্লামা ও বুজুর্গ ছিলেন। পশ্চিম বঙ্গের পাণ্ডুয়ায় ১৫০ বৎসর বয়সে তিনি এন্তেকাল করেন। (টীকা) মাথদুম তাবরেজী যখন পাণ্ডয়ায় আগমন করেন তখন গৌড়ে শেষ হিন্দু রাজা লক্ষণ সেন রাজত্ব করিতেছিলেন। রাজসভা পণ্ডিত হলায়ুধ মিশ্র এবং রাজা স্বয়ং তাঁহার নানা অলৌকিক ক্রিয়া দেখিয়া তৎপ্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। মাখদুম পাণ্ডুয়ায় একটি মসজিদ প্রস্তুত, একখানি উদ্যান রচনা ও একটি খানকাহ্ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁহার এই খানকাহতে প্রতিদিন বহু দরিদ্র, দুস্থ, নিরন্ন ও পরিব্রাজক তাহার পাইত। তিনি কিভাবে শত শত লোককে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করিয়াছিলেন তাহার বহু অপূর্ব কাহিনী ‘শেখ শুভোদয়’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে।

২। শায়খ শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামা

[মৃঃ ৭০০ জিঃ মোঃ ১৩০০ ইং]

আল্লাহ শায়খ শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামা ছোলতান গিয়াসুদ্দীন বলবন (১২২৮-১২৮১ইং)-এর রাজত্বকালে বর্তমান রাশিয়ার বোখারা প্রদেশ হইতে পাক-ভারতের তদানীন্তন রাজধানী দিল্লী আগমন করেন এবং তখায় শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার আলো বিস্তারে আত্মনিয়োগ করেন। হাদীছ, তফছীর, ফেকাহ ও ফনুনাতের বিষয়সমূহে তৎকালে তাঁহার সমকক্ষ কেহই ছিল না। মা’রেফাতের এলমেও ছিলেন তিনি একজন অদ্বিতীয় ব্যক্তি। ছোলতান তাঁহার প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রত্যক্ষ করিয়া ভীত হইয়া পড়িলেন এবং রাজ্যের নিরাপত্তা বিনষ্ট হইবে আশঙ্কায় তাঁহাকে বাংলার সোনারগায়েঁ চলিয়া যাইতে নির্দেশ দিলেন। পথিমধ্যে বিহারের (উত্তর কালের) প্রখ্যাত বুজুর্গ মাখদুম শায়খ শারফুদ্দীন আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া মানীরী তাঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং সোনার গাঁও সফরে তাঁহার সহযাত্রী হন। শায়খ তাওয়ামা ৬৬৮ হিঃ মোঃ ১২৭০ ইং সোনারগায়েঁ উপনীত হন এবং তথায় একটি মাদ্রাছা ও খানকাহ্ স্থাপন করেন। জীবনের শেষাবধি তিনি তথায় হাদীছ, তফছীর প্রভৃতি এলম ও মা’রেফাতের আলো বিস্তারে ব্রত থাকেন। তিনি তাঁহার শাগরিদ মাখদুম মানীরীর গুণে মুগ্ধ হইয়া তাঁহার নিকট আপন কন্যা বিবাহ দেন। মাখদুম মানীরী ওস্তাদের খেদমতে সুদীর্ঘ ২২ বৎসর কাল অবস্থান করিয়াছিলেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে বহু কিতাব রচনা করিয়াছিলেন। ১৮০ পংক্তিযুক্ত ‘মাছনবী বনামে হক’ তাঁহার ফেকাহ্ শাস্ত্র সম্পর্কীয় একটি কাব্য পুস্তক। -ছিলছিলায়ে ফিরদাউছিয়া-২৪০ পৃঃ

৩। আঁখি ছেরাজ বাঙ্গালী

[মৃঃ ৭৩০ হিঃ মোঃ ৩২৯ ইং]

হজরত শাহ্ ওছমান ওরফে আখিঁ ছেরাজ বাঙ্গালী ছোটকালেই লক্ষণাবর্তী হইতে হজরত খাজা নেজামুদ্দীন আওলিয়ার খেদমেত পৌছেন এবং তথা হইতে এলমে বাতেনের খেলাফত লাভ করেন। অতঃপর হজরত খাজার আদেশে তিনি আল্লামা ফখরুদ্দীন জররাদীর নিকট এলমে জাহের হাছিল  করেন। হজরত খাজা ছাহেবের হাদীছে ‘মাশারিকুল আনওয়ার’ মুখস্থ ছিল। তিনি তাঁহার খলীফাকে –যাহার উপর বাংলার হেদায়েতের ভার ন্যস্ত করা হইয়াছে –অন্ততঃ মাশারিক পড়িতে বলেন নাই, এমন ধারণা করা যায় না।

৪। হজরত আল্লামা আলাউল হক পাণ্ডুবী

[মৃঃ ৮০০ হিঃ মোঃ ১৩৯৭ ইং]

তিনি হজরত আখিঁ ছেরাজ পাণ্ডুবীর খলীফা ও জবরদস্ত আল্লামা ছিলেন। তাঁহার লঙ্গরখানার ব্যয তঃকালের গৌড় ত্যাগ করিতে বলেন। আল্লামা সোনারগায়েঁ আসিয়া ইহার ব্যয় দিগুণ করিয়া দেন। তাঁহার হেদায়েতের আলোকে তৎকালের বাংলা উদ্ভাসিত হইয়া গিয়াছিল।

৫। হজরত নূর কুতুবুল আলম পাণ্ডুবী

[মৃঃ ৮১৩ হিঃ মোঃ ১৪১০ ইং]

তিনি হজরত আলাউল হক পাণ্ডুবীর পত্র ও খলীফা ছিলেন। রাজা গণেশের পুত্র যদু তাঁহার হাতেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং জালালুদ্দীন নামে সিংহাসনে আরোহণ করেন।

৬। হজরত শাহ্ জালাল মুজাররাদ ইয়ামানী

[মৃঃ ৮১৫ হিঃ মোঃ ১৪১২ ইং]

তিনি আরবের ইয়ামান হইতে সিলেট আগমন করেন এবং ৩৬০ জন সহচর আওলিয়াসহ পূর্ববঙ্গে দ্বীন ও এলমে দ্বীন প্রচার করেন। তাঁহার মাজার সিলেট শহরে অবস্থিত। (তাঁহার জীবনী সম্পর্কে স্বতন্ত্র বই-পুত্র রহিয়াছে।)

৭। ছৈয়দ আহমদ তন্নুরী ওরফে মীরান শাহ্

হালাকু খাঁ কর্তৃক বাগদাদ ধ্বংসের সময় হজরত বড় পীর ছাহেবের পুত্র ছৈয়দ আজাল্ল ছাহেব দিল্লী আগমন করেন। তথায় তাঁহার ঔরসেই ছৈয়দ আহমদ তন্নুরীর জন্ম হয়। বাগদাদে শান্তি স্থাপিত হওয়ার পর ছৈয়দ আজাল্ল বাগদাদ প্রত্যাবর্তন করেন এবং তদীয় পুত্র ছৈয়দ আহমদ বাংলার হেদায়েত  উদ্দেশ্যে নোয়াখালীর কাঞ্চনপুরে আসিয়া বসতি স্থাপন করেন। তিনি হজরত শাহ্ জালাল ইয়ামানীর সমসাময়িক ছিলেন।

৮। শাহ্ বদরুতদ্দীন বদরে আলম জাহেদী

[মৃঃ ৮৪৪ হিঃ মোঃ ১৪৪০ ইং]

তিনি হজরত শেহাবুদ্দীন ইমাম মক্কীর বংশধর। ইমাম মক্কী ভারতে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আপন পুত্র ফখরুদ্দীনকে প্রেরণ করেন। ফখরুদ্দীন মীরাঠে অবস্থান করেন। তথায় তাঁহার পুত্র দ্বিতীয শেহাবুদ্দীন বাদশার হাতে শাহাদত বরণ করেন।

শেহাবুদ্দীনের শাহাদতের পর তাঁহার আসন্ন প্রসবা স্ত্রীর গর্ভে দ্বিতীয় ফখরুদ্দীন জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় ফখরুদ্দীন আপন পাৎচ পুত্রের মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ ছদরুদ্দীন ছদরে আলমের প্রতি জৌনপুরের এবং সর্বকনিষ্ঠ বদরুদ্দীন বদরে আলমের প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গের হেদায়েতের ভার অর্পণ করেন। বদরে আলম বহু দরবেশ-সহচরসহ চট্টগ্রাম আগমন করেন এবং তথায় ইসলামের আলো বিস্তার করিতে থাকেন। তিনি এলমে জাহের ও বাতেন উভয়ে কামেল ব্যক্তি ছিলেন। বর্ধমানের নওয়াব আব্দুল জব্বার মরহুম তাঁহার বংশধগণের অন্তর্গত।

৯। হজরত খানজাহান আলী

[মৃঃ ৮৬৩ হিঃ মোঃ ১৪৫৮ ইং]

তিনি দক্ষিণ বাংলার খুলনা অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন এবং খুলনার বাঘেরাহটে এন্তেকাল করেন। তিনি একজন বিরাট ওলী ও আলেম ছিলেন।

১০। ছৈয়দ আলী বাগদাদী

[মৃঃ ৯১৩ হিঃ মোঃ ১৫০৭ ইং]

তিনি একশত জন সহচর-দরবেশসহ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তোগলক রাজত্বের শেষের দিকে (৮৩৮ হিঃ মোঃ ১৪৩৪ ইং) বাগদাদ হইতে ভারতে আগমন করেন। তিনি কিছুকাল দিল্লী অবস্থান করেন এবং তথায় ছৈয়দ রাজস্ব আরম্ভ হইলে ছৈয়দ রাজবংশে এক বিবাহ করেন। রাজদরবার হইতে বাংলার ফরিদপুর জিলার ঢোল-সমুদ্র নামক স্থানে (গীর্দায়) ১২ হাজার বিঘা লা-খেরাজ জমিন প্রাপ্তি হইয়া তিনি বাংলায় আগমন করেন। দীর্ঘদিন ইসলাম প্রচারের পর তিনি ঢাকার মীরপুর এন্তেকাল করেন।

১১। শায়খ মোহাম্মদ ইবনে ইয়াজদান বখশ বাঙ্গালী

তিনি বাংলার কোন জিলার অধিবাসী ছিলেন তাহা জানা যায় নাই। তিনি ঢাকার একডালায় (ঘোড়াশাল ষ্টেশনের ৬ মাইল উত্তরে) বসিয়া পূর্ণ বোখারী মরীফ প্রতিলিপি করিয়াছিলেন এবং সোনারগায়ের তৎকালীন শাসক আলাউদ্দীনকে উপহার দিয়াছিলেন। আলাউদ্দীন ৯০৫-৯২৭ হিঃ মোঃ ১৪৯৯-১৫২০ ইং পর্যন্ত সোনারগায়ের শাসক ছিলেন। পাটনার বাঁকীপুর লাইব্রেরীতে উহা এখনও বিদ্যমান রহিয়াছে। -তারীখুল হাদীছ, মা’আরিফ হইতে।

১২। শায়খ ফরীদ বাঙ্গালী

তিনি সম্রাট আকবরের সমসাময়িক একজন জববরদস্ত আলেম ও মোহাদ্দেছ ছিলেন। আকবর ৯৬৩-১০১৪ হিঃ মোঃ ১৫৫৬-১৬০৫ ইং পর্যন্ত রাজত্ব করেন। ‘তাজকেরায়ে ওলামায়ে হিন্দ’ কিতাবে তাঁহাকে স্পষ্টভাবে মোহাদ্দেছ বলা হইয়াছে। -তাজকেরায়ে ওলামায়ে হিন্দ

১৩। শাহ নূরী বাঙ্গালী

তিনি ঢাকার অধিবাসী ছিলেন। ‘কিবরীতে আহমার’ (আরবী**************) নামে তাছাওফে তাঁহার একটি কিতাব রহিয়াছে।

১৪। মাওলানা মাজদুদ্দীন ওরফে মোল্লা মদন শাহজাহানপুরী

তিনি শাহ আবদুল আজীজ দেহলবীর সমসাময়িক ছিলেণ। তাঁহাকে কেন্দ্র করিয়াই ১৭৮১ ইং, মোঃ ১১৯৬ হিঃ কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাছা স্থাপিত হয়। মাদ্রাছা-সময়ের বাহিরে যে তিনি মেশকাত শরীফ ছাড়া হাদীছের অপর কোন কিতাব শিক্ষা দেন নাই তাহা বলা যায় না। কেননা, তৎকালে মাদ্রাছা-শিক্ষক কেন, অপরাপর সরকারী কর্মচারী পর্যন্ত সরকারী কর্ম-সময়ের বাহিরে এলমে দ্বীনের শিক্ষায় ব্যাপৃত থাকিতেন।

১৫। মোল্লা আবদুল আলী বাহরুর উলুম

[মৃঃ ১২২৫ হিঃ মোঃ ১৮১০ ইং]

তিনি বর্ধমান জিলাধীন বুহারের ধনী উকীল মুনসী ছদরুদ্দীন ছাহেবের মুনসী ছাহেব মাওলানার জন্য মাসিক ৪০০ এবং তাঁহার সহকারী মাওলানা ইজারুল হক ফিরিঙ্গী মহল্লীর জন্য মাসিক ১০০ টাকা নির্ধারণ করেন এবং একশত চাত্রের থাকা খাওয়া ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যয়ভার নিজ হস্তে গ্রহণ করেন। -নেজামে তা’লীম ও তরবিয়ত-২/২২ পৃঃ অনুরোধে বুহারে কিচুদিন হাদীছ, তফছীর ও মা’কুলাতে শিক্ষা দেন। (১৮২ পৃঃ দ্রঃ)

১৬। মাওলানা আমীনুল্লাহ আজীমাবাদী

[মৃঃ ১২৩৩ হিঃ মোঃ ১৮১৭ ইং]

তিনি আবদুল আজীজ দেহলবীর শাগরিদ ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ কলিকাতার আলিয়া মাদ্রাছায় অধ্যাপনার কাজ করেন এবং কলিকাতায়ই এন্তেকাল করেন। ‘কাছিদায়ে উজমা’ নামে তাঁহার রছুলে করীম (ছ)-এর তা’রীফে একটি কিতাব রহিয়াছে। -প্রকাশিত

১৭। মাওলানা কালীম ফারুকী সিলেটী

তিনি দিল্লীর হজরত মির্জা মাজহার জানে জানান (রঃ)-এর খলীফা এবং একজন বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। আর তৎকালের বুজুর্গরা প্রায় সকলই হাদীছ-অভিজ্ঞ হইতেন।

১৮। মাওলানা ইদ্রীস সিলেটী

তিনি মাওলানা কালীমের পৌত্র। তিনি তৎকালীন বাংলার ছদরুছছুদুর ছিলেন এবং ‘জামউল জাওয়ামে’র এর শরাহ লিখিয়াছিলেন।

১৯। মাওলানা মাদীনুল্লাহ আজীমাবাদী

আমীনুল্লাহ আজীমাবাদীর পুত্র ও শাগরিদ। তিনি আজীবন আলিয়া মাদ্রাছার আধ্যাপক ছিলেন।

২০। মাওলানা বুজুর্গ আলী

তিনি আবদুল আজীজ দেহলবীর শাগরিদ ছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে তিনি আলিয়া মাদ্রাছার অধ্যাপক ছিলেন।

২১। মাওলানা হাজী শরীয়তুল্লাহ ফরিদপুরী

[মৃঃ ১২৫৬ হিঃ মোঃ ১৮৪০ ইং]

তিনি ফরিদপুর জিলার মাদারীপুরে শিবচর থানার অন্তর্গত শামাইল নামক গ্রামে ১১৭৮ হিঃ মোঃ ১৭৬৪ ইং এক তালুকদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮ বৎসর বয়সেই তিনি মক্কা চলিয়া যান। তথায তিনি হজরত শায়খ তাহের সম্ভলের নিকট হাদীছ, তফছীর ও ফেকাহ শস্ত্রের শিক্ষা এবং এলমে মা’রেফাতের দীক্ষালাভ করেন। দীর্ঘকাল অবস্থানের পর তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। অতঃপর পুনরায় তিনি মক্কা-মদীনা গমন করেন এবং আরও কয়েক বৎসর তথায় অবস্থান করেন। বাড়ী ফিরিয়া তিনি কোরআন-হাদীছের চর্চা ও মা’রেফাতের শিক্ষায় আত্মনিয়োগ করেন। ১২২৭ বাং তিনি ফারায়েজী আন্দোলন আরম্ভ করেন এবং নামের মুছলমানদিগকে কামের মুছলমান করিতে চেষ্টা করেন। এজন্যই দক্ষিণ বাঙলার মুছলমানগণকে সাঁড়াশে মুছলমান বলা হয়। তিনি বাহাদুরপুরে এন্তেকাল করেন। পীর মুহছেন্দ্দীন ওরফে দুদু মিঞা ছাহেব তাঁহার অধঃস্তন পুরুষ।

২২। মাওলানা আবদুল কাদের সিলেটী

মাওলানা ইদ্রীছ সিলেটীর পুত্র। তিনি একজন বিখ্যাত আলেম ছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁহার বহু কিতাব রহিয়াছে।

(আরবী টীকা*******************)

২৩। কাজী গোলাম সুবহান ভাগলপুরী

তিনি মাওলানা আবদুল আলী বাহরুল উলুমের শাগরিদ মাওলানা মুআজ্জেমুদ্দীন ছাহেবের শাগরিদ ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ আমলের প্রথম দিকে বাংলা ‘কাজিউলকোজাত’ ছিলেন।

২৪। মাওলানা ইমামুদ্দীন হাজীপুরী

[মৃঃ ১২৭৪ হিঃ মোঃ ১৮৫৭ ইং]

তিনি শাহ আবদুল আজীজ দেহলবীর শাগরিদ ও হজরত ছৈয়দ আহমদ শহীদ বেরেলবীর খলীফা ছিলেন। তিনি ছৈয়দ ছাহেবের সহিত পেশওয়ার জেহাদে যোগদান করেন। এবং ছৈয়দ চাহেবের শাহাদতের পর রামপুর হইয়া নিজ জিলা নোয়াখালীতে প্রত্যাবর্তন করেন। এখানে তিনি জীবনের বাকী অংশ কোরআন-হাদীছের প্রচারে ব্যয় করেন। দ্বিতীয়বার হজ্জ করিতে যাইয়া ফিরিবার পথে তিনি আরব সাগরে ইন্তেকাল করেন।

২৫। মাওলানা ছুফী নূর মোহাম্মদ নেজামপুরী

[মৃঃ ১২৭৫ হিঃ মোঃ ১৮৫৮ইং]

তিনি কলিকাতায় এলম শিক্ষা করেন এবং কলিকাতা এলাকা ও চট্টগ্রামে উহা প্রচার করেন। তিনি ছৈয়দ শহীদ বেরেলবীর খলীফা ও পেশওয়ার জেহাদে তাঁহার সহচর ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের নেজামপুরে এন্তেকাল করেন।

২৬। মাওলানা আবুল হাছান

[মৃঃ ১২৮২ হিঃ মোঃ ১৮৬৫ ইং

তিনি চট্টগ্রাম জিলার চানগাঁও এলাকার ফরিদর পাড়ায় ১৮০১ ইং এক সম্ভ্রান্ত কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতা নাম মুকীম মিঞাজী। তিনি ঢাকা মোহছিনিয়া, অতঃপর কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাছা হইতে উলা পাস করিয়া হিন্দুস্থানে গমন করেন এবং তথায় ৭ বৎসর হাদীছ-তফছীরসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানলাভ করিয়া স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি একজন বিরাট আলেম ও জবরদস্ত ওলী ছিলেন। -তাজকেরায়ে আওলিয়ায়ে বাঙ্গাল।

২৭। মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী

[মৃঃ ১২৯০ হিঃ মোঃ ১৮৭৩ ইং]

তিনি ১২১৫ হিঃ মোঃ ১৮০০ ইং জৌনপুরের এক সম্ভ্রান্ত ছিদ্দিকী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। হাদীছ তিনি মাওলানা আহমদুল্লাহ আমানীর নিকট এবং অন্যান্য এলম মাওলানা সাখাওয়াত আলী জৌনপুরী, মাওলানা কুদরতুল্লাহ রুদলবী ও মাওলানা আহমদুল্লাহ চড়য়াকোটীর নিকট শিক্ষা করেন। মা’রেফাত তিনি হজরত ছৈয়দ শহীদ বেরেলবী হইতে লাভ করেন। ছৈয়দ শহীদের আদেশে তিনি বঙ্গে দ্বীনচ ও এলমে দ্বীন প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি তাঁহার বোটে সব সময় শিক্ষাদান কর্য অব্যাহত রাখিয়াছিলেন। প্রায় একান্ন বৎসরকাল এই কার্যে ব্যাপৃত থাকিয়া তিনি উত্তর বঙ্গের রংপুরে এন্তেকাল করেন।

সত্য কথা এই যে, হাজী শরীয়তুল্লাহ, মাওলানা ইমামুদ্দীন, ছূফী নূর মোহাম্মদ ও মাওলানা কারামত আলী ছাহেবের প্রচেষ্ঠা না হইলে শেষ যুগে বাংলা হইতে ইসলামের নাম পর্যন্ত মুছিয়া যাইত। হিন্দুয়ানী শিরক ও কুফরী এবং নানারূপ বেদ’আরত, বে-দ্বীনী হইতে ইসলামকে মুক্ত করার ব্যাপারে ইঁহাদের দান অতি বিরাট।

মাওলানা কারামত আলী ছাহেব বিভিন্ন বিষয়ে বহু কিতাব লিখিয়াছেন। ৪১টি কিতাবের নাম ‘ছীরাতে কারামত আলী জৌনপুরী’তে উল্লেখ রহিয়াছে।

(আরবী টীকা********************)

২৮। হাফেজ জামালুদ্দীন আহমদ

[মৃঃ ১৩০৩ হিঃ মোঃ ১৮৮৫ ইং]

তিনি মুঙ্গের জিলার শেখপুরার অধিবাসী ছিলেন, পরে কলিকাতার সুন্দরিয়া পট্টিতে বসবাস এখতেয়ার করেন। তথায় তিনি এক মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন, যাহা পরবর্তীকালে তাঁহার নাম অনুসারে হাফেজ জামালুদ্দীনের মসজিদ নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করে। তিনি তাঁহার মসজিদেই মাওলানা আহমদ আলী সাহারনপুরীর নিকট হাদীছ শিক্ষা করেন। তিনি একজন বড় বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন এবং সময়ের বেশীর ভাগ তিনি মসজিদের হুজরায় আল্লাহর এবাদতেই কাটাইতেন।

-তাজকেরায়ে আওলিয়ায়ে বাঙ্গাল

৩০। মাওলানা আরজান আলী সিলেটী

তিনি মাওলানা হাবীবুল্লাহ ছাহেবের সমসাময়িক ছিলেন।

৩১। মাওলানা নজীফ আলী, বাগবাড়ী সিলেট

তিনি হিজরী ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষের দিকের লোক ছিলেন।

৩২। মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল বারী খাঁ গাজী

[মৃঃ ১২৯৬ বাং মোঃ ১৮৮৯ ইং]

তিনি চব্বিশ পরগনা জিলার বশিরগাট মহকুমাধীন হাকিমপুর গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তাঁহার পিতার নাম তোরাব খাঁ। তিনি গৃহ শিক্ষকের নিকট প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর ১০/১২ বৎসর বয়সেই হজরত ছৈয়দ শহীদ বেরেলবী কতৃক প্রবর্তিত শিখ-ইংরাজ বিরোধী জেহাদে শরীক হওয়ার জন্য জেহাদী কাফেলার সহিত সীমান্তে চলিয়া যান এবং কাফেলার আলেমদের নিকট কতিপয় বিষয় শিক্ষা করেন। প্রত্যাবর্তনের পথে তিনি প্রথমে লাহোরে জনৈক বিখ্যাত আলেমের নিকট ফনুনাতের বিষয়াবলী শিক্ষা করেন, তৎপর দিল্লীতে হজরত ‘মিঞা ছাহেব’ সৈছদ নজীর হোছাইন দেহলবীর নিকট চেঞাহ ছেত্তার ছয় কিতাব ছয় বৎসরে নেহাত তাহকীকের সহিত অধ্যয়ন করেন। অতঃপর তিনি জীবনের শেষাবধি চব্বিশ পরগনা, যশোর, খুলনা ও নদীয়া জিলায় দ্বীন ও এলমে দ্বীন প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন এবং ঈছাইয়ত ও শিরক-বিদআতের বিরুদ্ধে জেহাদ করিতে থাকেন।

তিনি ছেহাহ ছেত্তার এক একটি বিষয়ের সমস্ত হাদীছকে এক একটি হাদীছরূপে তারতীব দিয়া (সাজাইয়া) একটি অতি মূল্যবান কিতাব লিখিয়াছিলেন। কিতাবটির সন্ধ্যান পরেন পাওয়া যায় নাই। বিখ্যাত আলেম, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ তাঁহারই পুত্র।

৩৩। মাওলানা হাফেজ আহমদ জৌনপুরী

[মৃঃ ১৩১৬ হিঃ ১৮৯৮ ইং]

তিনি মাওলানা কারামত আলী ছাহেবের বাংলা সফরকালে ১২৫০ হিঃ কলিকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার সমগ্র জীবন বাংলায় ইসলাম ও কোরআন-হাদীছ প্রচারে ব্যয়িত হয়। তিনি একজন জবরদস্ত আলেম ও আরেফবিল্লাহ ছিলেন। ঢাকা চকবাজার মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বে তাঁহার মাজার।

৩৪। মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল ঞাই ছাহেব

তিনি হুগলী জিলার বাওনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন, অতঃপর কলিকাতায় বসবাস এখতেয়ার করেন। তিনি প্রথম হইতে শেষ শিক্ষা পর্যন্ত কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাছায় সমাপ্ত করেন। ১৮৭৫-৯১ ইং তিনি কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাছার প্রধান অধ্যাফক ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম ইবনে হাজার আছকালানীর ‘এছাবাহ’ (আরবী*************) নামক কিতাব সংশোধন করিয়া প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। তিনি একজন আবেদন, বিশিষ্ট আলেম ও মাওলানা আবদুল হই লক্ষ্মৌবীর সমসাময়িক ছিলেন।

৩৫। মাওলানা মোহাম্মদ মংগলকোটী বর্ধমানী

[মৃঃ ১৩২৫ হিঃ মোঃ ১৯০৭ ইং]

তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা তাঁহার পিতা মাওলানা জিল্লুর রহীম ছাহেবের নিকট এবং ফনুনাতের উচ্চ শিক্ষা বিহারে মাওলানা ছাআদত হোছাইন বিহারী এবং জৌনপুরে মাওলানা হেদায়েত উল্লাহ রামপুরীর নিকট লাভ করেন। হাদীছ তিনি ছৈয়দ নজীর হোছাইন ওরফে ‘মিঞা ছাহেব’ দেহলবীর নিকট শিক্ষা করেন। তিনি একজন জবরদস্ত আলেম ছিলেন। তিনি ঘরে বসিয়া তিব্বি ব্যবসা করিতেন এবং অবসর সময় এলম শিক্ষা দিতেন। মাওলানা ইছহাক বর্ধমানী ও মাওলানা বেলায়েত হোছাইন বীরভূমির ন্যায় আলেমগণও তাঁহার শাগরিদ। তাঁহার এন্তেকালের পর তাঁহার ব্যক্তিগত লাইব্রেরীর একাংশ কলিকাতা বর্তমানে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাছায় স্থানান্তরিত হয়। ইহাতে বহু দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি রহিয়াছে।

৩৬। মাওলানা আবদুল ওয়াহেদ চাটগামী

[মৃঃ ১৩২৮ হিঃ মোঃ ১৯১০ ইং]

তিনি চট্টগ্রামের খরন্দীপে (হাওলায়) এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। হাদীছ প্রভৃতি এলম তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম যুগে মাওলানা ইয়াকুব নানুতবী প্রমুখ মোহাদ্দেছগনের নিকট শিক্ষা করেন এবং এলমে মা’অরেফাত হজরত মাওলানা ফজলুর রহমান গঞ্জে মুরাদাবাদী হইতে লাভ করেন। দেশে আসিয়া প্রথমে তিনি কিছুকাল চট্টগ্রাম শহরে টুপির ব্যবসা করেন। অতঃপর মাওলানা আবদুল হামিদ প্রমুখ কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তির সহযোগিতায় ১৩২০ হিঃ মোঃ ১৯০১ ইং তিনি হাটহাজারীতে ‘মুঈনুল ইছলাম’ নামে এক কওমী মাদ্রাছার ভিত্তি স্থাপন করেন। মাদ্রাছায় তিনি বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দেন এবং ১৯০৮ ইং সালে তথায় ছেহাহ ছেত্তা শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

দ্বিতীয় যুগ

এ যুগ আরম্ভ হয় ১৯০৮ ইং হাটহাজারীর মুঈনুল ইসলামে এবং ১৯০৯ ইং কলিকাতার আলিয়া মাদ্রাছায় হাদীছ শিক্ষার ব্যবস্থা করা হইতে। কলিকাতার নুতন আলিয়া মাদ্রাছা ও পশ্চিম বঙ্গের অপরাপর মাদ্রাছা ব্যতীত কেবল পাক-বাংলাতেই বর্তমানে ৫১টি মাদ্রাছায় (২৪টি সরকারী ও ২৭ টি কওমী মাদ্রাছায়) হাদীছের ‘ছেহাহ ছেত্তা’ শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা রহিয়াছে। বর্তমান বৎসর (১৯৬৪ ইং) ২৩ টি সরকারী মাদ্রাছা হইতে ৫২২ জন পরীক্ষার্থী হাদীছ কোর্স পাস করিয়া বাহির হইয়াছেন। কওমী মাদ্রাছা হইতেও ঐ পরিমাণ ছাত্র বাহির হইয়াছেন বলিয়া অনুমান করা যাইতে পারে। সুতরাং এ বৎসরই প্রায় এক হাজার আলেম হাদীছের জ্ঞান লাব করিয়া পাক বাংলায় বাহির হইলেন।

এ যুগের পরলোকগত মোহাদ্দেছীন

এ যুগের পরলোকগত মোহাদ্দেছগনের জীবনী সম্পর্কে সংবাদপত্রের আবেদন জানাইয়া, মাদ্রাছাসমূহে চিঠিপত্র লিখিয়া এবং আলেমদের সহিত আলোচনা করিয়া যাঁহাদের নাম বা যে পরিমাণ বিবরণ জানিতে পারিয়াছি তাহা এখানে সন্নিবেশিত হইল।

টীকা- ইহার অধিক কাহারও নিকট কিছু জানা এমদাদিয়া লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা –ঠিকানায় লিখকের নামে প্রেরণ করিলে শোকরিয়ার সহিত গ্রহন করা হইবে এবং পরবর্তী এডিশনে ইনশাআল্লাহ প্রকাশের চেস্টা করা হইবে।

০১। মাওলানা ছুফী গোলাম ছালমানী

ড়মৃঃ ১৩৩০ হিঃ মোঃ ১৯১২ ইং]

তিনি পশ্চিম বঙ্গের হুগলী জিলার অধিবাসী ছিলেন। তিনি প্রথমে হুগলী, অতঃপর কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাছায় উচ্চ শিক্ষা লাব করেন এবং কলিকাতায়ই মাওলানা আহমদ আলী সাহারনপুরীর নিকট হাদীছ অধ্যয়ন করেন।

তিনি প্রথমে হুগলী মোহছিনিয়া মাদ্রাছায়, অতঃপর কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাছায় মোদাররেছ নিযুক্ত হন। ১৯১১ ইং তিনি হুগলী মোহছিনিয়া মাদ্রাছায় সহকারী সুপারেন্টেনডেন্ট পদ লাভ করেন। তিনি বাংলার প্রসিদ্ধ বুজুর্গ ছুফী ফতেহ আলী রাহেমাহুল্লাহর খলীফা ছিলেন। তিনি সর্বদা আল্লাহর এবাদত ও ধ্যানে মগ্ন থাকিতে ভালবাসিতেন এবং যশঃ ও খ্যাতি কখনও পছন্দ করিতেন না।

২। মাওলানা আবদুল্লাহ রায়পুরী

[মৃঃ ১৩৩২ হিঃ মোঃ ১৯১৩ ইং]

তিনি নোয়াকালী জিলার রায়পুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম রহমত উল্লাহ পাটওয়ারী। তিনি দারুল উলুম  দেওবন্দের তৎকালীন মোহাদ্দেছীনগনের নিকট হাদীছ শিক্ষা করেন। তিনি একজন খাতনামা আলেম ছিলেন।

৩। মাওলানা ওজীহুল্লাহ সন্দ্বীপী

তিনি নোয়াখালী জিলার (বর্তমানে চট্টগ্রাম জিলার) সন্দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দেওবন্দে মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরীর সহিত হাদীছ প্রভৃতি এলম শিক্ষা করেন এবং পরীক্ষায় প্রথমস্থান অধিকার করেন। শায়খুল হিন্দ মরহুম তাঁহার হাদীছের বিশিষ্ট ওস্তাদ। তিনি অল্প কিচু দিন নোয়াখালী আহমদিয়া মাদ্রাছায় শিক্ষকতা করা ছাড়া সমগ্র জীবন ওয়াজ-নছীহত করিয়া কাটান। তিনি একজন অসাধারণ মেধাসম্পন্ন ও হাদীছ অভিজ্ঞ আলেম ছিলেন। ১৯২০ সালের কাছাকাছি তিনি এন্তেকাল করেন।

৪। মাওলানা আবদুল হামীদ

[মৃঃ ১৩৩৮ হিঃ মোঃ ১৯১৯ ইং]

তিনি আনুমানিক ১২৮৬ হিঃ চট্টগ্রাম জিলার হাটহাজারী থানার অন্তর্গত মাদার শাহ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম মুনসী রোস্তম আলী। তিনি চট্টগ্রামে মোহছিনিয়া মাদ্রাছা হইতে শেষ শিক্ষা গ্রহণ করেন। মাওলানা জুলফিকার আলী প্রমুখ ওস্তাদগণের নিকট তিনি হাদীছ অধ্যয়ন করেন। তিনি হাটহাজারী মাদ্রাছা স্থাপন ব্যাপারে মাওলানা আবদুল ওয়াহেদ ছাহেবের সক্রিয় সহযোগী ছিলেন। আজীবন তিনি মাদ্রাছা ও কওমের খেদমত করিয়া গিয়াছেন। মাদ্রাছার নিকটবর্তী ফতেহপুরে তাঁহার সমাধি।

৫। মাওলানা মোহাম্মদ হাছান ওরফে ‘মোহাদ্দেছ ছাহেব’

(মৃঃ ১৩৩৯ হিঃ মোঃ ১৯২০ ইং]

তিনি অনুমান ১৮৫০ ইং চট্টগ্রাম জিলার ——– গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হাদীছসহ যাবতীয় এলম সাহারনপুর মাজাহেরে উলুম মাদ্রাছায় শিক্ষা করেন। মাওলানা আহমদ আলী সাহারনপুরী তাঁহার হাদীছের বিশিষ্ট ওস্তাদ। তিনি দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম মোহছিনিয়া মাদ্রাছায় এলমে দ্বীনে শিক্ষা দেন। তিনি একজন বিরাট আলেম ও বড় বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। মৌলবী খলীলুর রহমান মরহুম একদা আমাকে বলিলেনঃ ‘সকারে বখশির হাট হইতে ফিরিবার পথে আমি হজরত মোহাদ্দেছ ছাহেব মরহুমের মাজারের নিকট দাঁড়াইয়া তাঁহাকে সালাম জানাইলাম। মাজার হইতে শব্দ হইলঃ ‘লাড়কা বড়া বে-আদব হায়’ তৎক্ষণাৎ আমি বসিয়া গেলাম এবং হুজুরের নিকট ক্ষমা চাহিলাম। তিনি চট্টগ্রামের প্রথম মোহাদ্দেছ বলিয়া কথিত এবং সাধারণতঃ ‘মোহাদ্দেছ ছাহেব’ নামেই প্রসিদ্ধ ছিলেন। মাওলানা মোহাম্মদ নাজের চাহেব, ফখরে বাংলা মাওলানা আবদুল হামীদ ছাহেব ও মৌলবী খলীলুর রহমান ছাহেব (গাজীপাড়া) তাঁহার শাগরিদ ছিলেন। ১৯১৮ইং একবার আমি তাঁহার দর্শনের সৌভাগ্য লাভ করিয়াছিলেন। তিনি সাধারণতঃ বাংলা মিশাল উর্দুতেই কতা বলিতেন। তাঁহার মাজার চট্টগ্রাম কদম মোবারক মসজিদের নিকট অবস্থিত।

৬। মাওলানা হাফেজ আবদুল আওয়াল জৌনপুরী

[মৃঃ ১৩৩৯ হিঃ মোঃ ১৯২০ ইং]

তিনি হজরত মাওলানা কারামত আল জৌনপুরীর বাংলা সফরকালে ১২৮৩ হিঃ সন্দ্বীপে বোটের উপর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা মাওলানা মোছলেহুদ্দীন ও মাওলানা হামেদ ভবানীগঞ্জী, মাধ্যমিক শিক্ষা মাওলানা নেজামুদ্দীন ও মাওলানা আবদুল হাই লক্ষ্মৌবীর নিকট এবং উচ্চ শিক্ষা মক্কা মরীফে ছৌলতীয়া মাদ্রাছার ওস্তাদগণের নিকট লাভ করেন। হাদীছ তিনি মাওলানা আবদুল হক এলাহাবাদী মুহাজিরে মক্কীর নিকট শিক্ষা করেন। তিনি একজন বিরাট আলেম ও বুজুর্গ ছিলেন। ৩৩ বৎসরকাল তিনি বঙ্গে কোরআন-হাদীছ তথা দ্বীন ও এলমে-দ্বীন প্রচারে ব্যয় করেন। তিনি ছোট বড় ১২১টি কিতাব লিখিয়াছেন। ইহার মধ্যে ১০টি হাদীছ সম্পর্কীয়। ৮৮টি প্রকাশিত হইয়াছে। ১৩৩৯ হিঃ তিনি কলিকাতার মানিকতলায় এন্তেকাল করেন। -ছীরাতে আবদুল আওয়াল

৭। শামচুল ওলামা লুৎপুর রহমান বর্ধমানী

[মৃঃ ১৯২০-২১ ইং]

তিনি বর্ধমানের অধিবাসী ছিলেন। মঙ্গলকোটে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর তিনি হিন্দুস্থানের বিভিন্ন মাদ্রছায় উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন। তিনি হেদায়েত উল্লাহ খান রামপুরী ও লুৎফুল্লাহ আলীগড়ীর নিকট ফনুনাত এবং মাওলানা ছৈয়দ নজীর হোছাইন দেহলবীর নিকট হাদীছ শিক্ষা করেন।

১৮৮২ ইং তিনি জৌনপুর ইছলামিয়া মাদ্রাছায় শিক্ষকতা আরম্ভ করেন। অতঃপর কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাছায় কিচুদিন কাজ করার পর তিনি ভূপালের শিক্ষা ডাইরেকটর নিযুক্ত হন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে তিনি বাড়ী ফিরিয়া আসেন এবং মঙ্গলকোটের সন্নিকটে ঝলু নামক স্থানে এক মাদ্রাছা প্রতিষ্ঠা করিয়া তথায় শিক্ষাদানে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯০৯ ইং তিনি পুনরায় কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাছার অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ১৯১৭ ইং তিনি অবসর গ্রহণ করেন এবং ইহার তিন বৎসর পর ইহলীলা ত্যাগ করেন।

ফারছী ভাষায় তিনি একজন সুসাহিত্যিক এবং মা’কুলাতে সুপণ্ডিত ছিলেন। ‘জাওয়াহিরে মুজিয়াহ’ নামে এক গ্রন্থে তাঁহার ফারছী রচনাবলী প্রকাশিত হইয়াছে। তিনি শাফা-কিতাবের একাংশের শরাহ্ করিয়াছিলেন। এছাড়া তিনি ভূপাল থাকাকালে হজরত শাহ্ আবদুল আজীজ দেহলবীর অসমাপ্ত তফছীরে ‘ফতহুল আজীজ’-এর কিছুটা সমাপ্তি কার্য করিয়াছিলেন বলিয়াও শোনা যায়।

About মাওলানা নূর মোহাম্মদ আ’জমী (রঃ)