হাদীছের তত্ত্ব ও ইতিহাস

তৃতীয় অধ্যায়

হাদীছের হেফাজত ও প্রচারে উম্মতীগণ

এখন দেখা যাক যে, রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর নিদের্শকে (হাদীছের হেফাজত ও প্রচারের নিদের্শকে) তাঁহার উম্মতীগণ কিতাবে গ্রহণ করিয়াছেন এবং যুগে যেগে ইহার জন্য কি কি উপায় অবলম্ব করিয়াছেন। উম্মতীগন ইহার জন্য প্রধানতঃ চারটি উপায় অবলম্ব করিয়াছেনঃ হাদীছের শিক্ষাকরণ ও হেফাজকরণ, উহার লিখন, উহার শিক্ষা দান এবং উহার মোতাবেক আমলকরণ। প্রত্যে যুগেই উম্মতীগণ তাঁহাদের প্রিয় রছূলের জীবনের প্রতিটি ঘাটনাকে জানিতে ও বুঝতে চেষ্টা করিয়াছেন। অতঃপর উহা অপরকে জানাইতে ও বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছেন। ছাহাবীগণের যুগে হইতে এযাবৎ শিক্ষার ও ধারা অব্যাহত রহিয়াছে। উম্মতীগণের এমন কোন যুগ ছিল না।– যে যুগে তাঁহাদের এক বিরাট জামাআত এজন্য নিজেদের জীবনকে ওয়াকফ করিয়া দেন নাই। আজ ধর্মীয় শিক্ষার এ দুর্দিনেও দুনিয়ায় শত সহস্র হাদীছ শিক্ষার কেন্দ্র বিদ্যমান রহিয়াছেন এবং লক্ষ লক্ষ আশেকে রছূল দুনিয়ার লোভ ত্যাগ করিয়া ইহতে লাগিয়া রহিয়াছেন। ছাহাবীগণ রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-কে যাহা কিছু করিতে বা বলিতে দেখিয়াছেন সংগে উহার অনুসরণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। অতঃপর তাবেয়ীগণ তাঁহাদের আমলের নমুনা গ্রহণ করিয়াছেন। এইরূপে উম্মতীগণের প্রতিটি যুগেই উহার পূর্ববর্তী যুগের অনুসরণ করিয়া আসিয়াছে ও আসিতেছে।

প্রথমে ছাহাবীগণ রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর কথাকে নিজেদের স্মৃতিপটে জাগরিত রাখার চেষ্ট করিয়াছেন। অতঃপর যে পযর্ন্ত না তৃতীয়-চুতুর্থ শতব্দাতে সমস্ত ছূন্নাহ কিতাবে লিপিবদ্ধ হইয়া যায় সে পযর্ন্ত  এ দায়িত্ব তাবেয়ীগণ পালন করিয়াছেন।এ সময় উম্মতীদের মধ্যে এমন হাজার হাজার ধীশক্তি-সম্পন্ন ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেন যাঁহারা ছুন্নাহর এক একটি শব্দকে শত শত ছন্দ সহকারে কণ্ঠস্থ রাখিয়াছেন।

এতদভিন্ন উম্মতীগণ বিশেষ সতর্কতা হিসাবে আল্লাহর কিতাবের ন্যায় রছূলের ছুন্নাহকেও কিতাবে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিতে প্রয়াস পাইয়াছন। ছাহাবীগণ রছূল্লাহ (ছঃ)-এর সম্মুখেই ইহার সূচনা করিয়াছেন; তাবেয়ীগণ আরো বহুদুর অগ্রসর হইয়াছেন এবং তাবে’ তাবেয়ীন ও তৎপরবর্তীগণ ইহাকে চরমে পৌছাইয়াছেন। আজ দুনিয়ায় রছূলুল্লাহ ছুন্নহর এমন কোন অংশ বকী রহিয়াছে বলিয়াছে বলিয়া অনুমান করা যায় না যাহা না যাহা কোন না কোন কিতাবে লিপিবদ্ধ হয় নাই।পরবর্তী অধ্যায়সমুহে আমরা এ সকল বিষয় যুগওয়ারী কিছুটা বিস্তারিত বিবরণ দিতে চেষ্ট করিব।

প্রথম যুগ

প্রথম যুগ বলিতে এখানে আমরা রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর নুবুওতের প্রথম হইতে হজরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজের খেলাফত লাভ (৯৯ হিঃ) পযর্ন্ত মোট ১১২ বৎসর কালকেই বুঝাইতেছি। ইহা ছাহাবা এবং প্রবীণ তাবেয়ীনদের যুগ। এই যুগের শেষ পযর্ন্তই ছাহাবীগণ বাঁচিয়াছিলেন। হজরত আনাছ ইবনে মালেক (রঃ) ৯৩ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।এ যুগে হাদীছের হেফাজত ও প্রচারের জন্য পূর্বোক্ত চারটি উপায় অবলম্বন করা হয়। উম্মতীদের প্রথম শ্রেণী ছাহাবীগণ রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর ছূন্নাহর হেফাজত ও প্রচারের নির্দেশকে কিভাবে গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা উপলদ্ধি করার জন্য প্রথমে জানা আরশ্যক যে, রছূলুল্লাহর প্রতি ছাহাবীগণের ভক্তি-শ্রদ্ধা কেমন ছিল।

রছূলুল্লাহর প্রতি তাহার ছাহাবীগণের ভক্তি-শ্রদ্ধা কেমন ছিল তাহার দুনিয়ার ইতিহাসে তালাশ করা বৃথা । ছাহাবীগণ তাহাদের প্রিয় রছূলের সামান্যতম ইশারায় তাহাদের জান-মাল ও প্রিয়জন-এক কথায় যথাসর্বস্ব কোরআন করিতে সর্বক্ষণ প্রস্তুত ছিলন। এবং ইহা করিয়াও দেখাইয়াছেন। ওহুদের যুদ্ধে যখন মুসলমানদের প্রতি শত্রুদের তীর বৃষ্টির ন্যায় বর্ষিত হইতেছিল, তখন ছাহাবীগেণে তাহাদের প্রিয় রছুলকে ব্যুহ রচনা করিয়া বেষ্টন করিয়া রাখিয়াছিলেন। যাহার ফলে শক্রদের তীরে কোন কোন ছাহাবীদের শরীর ক্ষত-বিক্ষত হইয়া গিয়াছিল।হিজরতের সময় ছওর গিরি-গুহায় রছূলকে রক্ষা বরার উদ্দেশ্য হজরত আবু বকর ছিদ্দী (রাঃ) সাপের গর্ত নিজের পায়ের দ্বারা বন্ধ করায়া রাখিয়াছিলেন। সাপের দংশনে হজরত ছিদ্দীক কাতর হইয়া পড়িলেন, তথাপি প্রিয় রছূলের নিদ্রা ভংগের আশংকায় তাহার শির মোবারক অপন ক্রোড় হইতে সরাইলেন না। যে রাত্রে রছূলুল্লাহ (ছঃ)-কে হত্যা করার জন্য কোরাইশগণ স্থির করিল, সেই রাত্রে হজরত আলী মোরতাজা নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করিয়া রছূলের বিছানায় শয়ন করিলেন এবং এইরূপে প্রিয় রছূলকে হিজরতের সুযোগ দিলেন।

কোরাইশ-দুত ওরওয়ান ইবনে মাছউদ ছকফী তাঁহার মুসলান হওয়ার পূর্বে হোদায়বিয়ার সন্ধিকালে কোরাইশদের নিকট যাইয়া রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু  আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর প্রতি ছাহাবী গণের ভক্তি-শ্রদ্ধার যে ছবি আকিঁয়াছিলেন তাহা এখানে তাহার ভাষায় ব্যক্ত করা যাইতেছে তিনি বলেন বলেনঃ

(আরবী*******************************)

‘হে আমার জাতি খোদার কছম, আমি তোমাদের দুত হিসাব, রোমের সম্রাট, ইরানের শাহানশাহ এবং আসাবিসিনিয়ার রাজার দরকার গিয়াছি; খোদার কছম, কোন রাজা- বাদশাহর প্রতি তাঁহার প্রজা বা সভাসদগণকে এরূপ ভক্তি-শ্রদ্ধা করিতে দেখি নাই যেরূপ মোহাম্মদের ছাহাবীগণ কাহার আগে কে করিবে তাহ লইয়া কাড়াকাড়ি করিতে আরম্ভ করে, আর যখন তিনি কথা বলেন, তাহার চুপ করিয়া থাকে। তাঁহার চুপ করিয়া থাকে। তাহার সম্ভ্রমে তাহার প্রতি পূর্ণ দৃষ্টি করিতেও সাহস করে না-বোখারী

এমতাবস্থায় ছাহাবীগণ যখন আল্লাহ তা’আলা ও তাহাদের প্রিয় রছূলের পক্ষ হইতে ছুন্নাহর হেফজত ওপ্রচারের জন্য নিদের্শপ্রাপ্ত হইলেন, তখন অবস্থা কিরূপ হইয়াছিল তাহ সহজেই অনুমেয়।

                                                  ছাহাবীদের হাদীছ শিক্ষাকরণ

রছূলুল্লহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম- এর ছুন্নাহ অবগত হওয়ার জন্য ছাহাবীগণের আগ্রহাতিয্যের অবধি ছিল না, অনেকে তো ইহার জন্য নিজেদের জীবনকেই ওয়াকফ করিয়া দিয়াছিলেন। যথা-আছহাবে ছোফফা, আর যাহারা অন্যান্য দায়িত্ব দরুন সর্বক্ষণ হুজুরের খেদমতে হাজির থাকিতেন না, তাঁহারা যখনই সুযোগ পাইতেন হুজুরের খেদমতে হাজির হইতে চেষ্টা করিতেন বা অন্যের নিকট হুজুরের দরবারে কখন কি ঘটিয়াছে তাহা জানিয়া লইতে চেষ্টা করিতেন। কেহ তো ইহার জন্য অন্যের সহিত পালা ঠিক করিয়া লইয়াছিলেন। হজরত ওমর ফরূ (রাঃ) বলেনঃ

[আরবী*****************************]

‘আমি ও আমার এক আনছারী প্রতিবেশী (আতবান ইবনে মালেক সমজিদে নববী হইতে ৩/৪ মাইল দুরে অবস্থি )

‘আওয়ালী এলাকায়া বাস করিতেন; সুতরাং আমরা হুজুরের খেদমতে হাজির হওয়া জন্য পালা ঠিক করিয়া লইয়াছিলাম। তিনি একদিন হুজুরের খেদমতে হাজির হইতেন আর আমি একদিন হাজির হইতাম। যে দিন আমি হাজির হইতাম সে দিনের ওহী এবং অন্যান্য বিষয়ের খবর আমি তাঁহাকে দিতাম এবং তিনি যেদিন হাজির হইতেন সে দিন তিনি ঐরূপ করিতেন। বোখারী শরীফ

ছাহাবীগণ শুধু যে রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর জীবনকালেই তাঁহার হাদীছের হেফাজত ও প্রচারে তৎপর ছিলেনে তাহা নহে; বরং তাঁহার এন্তেকালেই পর তাঁহাদের এ তৎপরতা আরো বাড়িয়া যায়। হুজুরের এন্তেকালের পর কোন কোন ছাহাবী অপর ছাহাবীর নিকট হইতে হাদীছ সংগ্রহ করার জন্য শত শত মাইল সফরের  কষ্ট স্বীকার করেন। অথচ সেকালের সফর আজকালের ন্যায় এত সহজসধ্য ছিল না। হজরত আবু আইয়ুব আনছারীর ন্যায় একজন প্রবীণ ও মর্যাদাবান ছাহাবী একটি মাত্র হাদীছের জন্য মদীনা হইতে মিছর পযর্ন্ত সফর করিয়াছিলেন এবং উকবাহ ইবনে আমেরর নিকট উহা দরইয়াফত করিয়াছিলেন।

[তারীখুল হাদীছ ১৩ পৃঃ।] হজরত আনাস (রাঃ) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উনাইছের নিকট হইতে একটি হাদীছ সংগ্রহ করার জন্য এক মাসের পথ সফর করিয়াছিলেন।

 [তারীখুল হাদীছ ১৩ পৃঃ] [সম্ভবত ইহা শামের (সিরিয়ার) সফর; কেননা, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উনাইছ (রাঃ) তখন শামে অবস্থান করিতেন।] অপর এক ছাহাবী হজরত ফাজালা ইবনে উবাইদের নিকট হাদীছ জিজ্ঞাসা করার জন্য মিছর গমন করিয়াছিলেন।

[দারেমী ১২৭ পৃঃ] হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উনাইছের নিকট হইতে হাদীছ লাভ করার উদ্দেশ্যে শাম (সিরিয়া) গমন করিয়াছিলেন [বোখারী কিতাবুল এলম] এবং হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হাদীছ সংগ্রহ করার জন্য প্রবীণ ছাহাবীদের দ্বারে দ্বারে যাইয়া পড়িয়া থাকিতেন। [দারেমী ১২৬ পৃঃ]

ছাহাবীগণের হাদীছ হেফজকরণ

ছাহাবীগণ আল্লাহর কিতাবের যেরূপ হেফজ ও আলোচনা করিতেন রছুলুল্লাহ (ছঃ)-এর হাদীছেরও সেইরূপ হেফজ ও আলোচনা করিতেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ (রাঃ) বলেনঃ ‘আমরা হুজুরের সময় হাদীছ হেফজ করিতাম।‘–মোছলেম, তাদবীন

হজরত আনাছ (রাঃ) বলেনঃ (আরবী****************************************************)

‘আমরা-পরবর্তী রাবী বলেন, আমার মনে হয় তিনি ৬০ জনই বলিয়াছেন-নবীয়ে করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর নিকট চলিয়া যাইতেনঃ আর আমরা বসিয়া উহা একটার পর একটা পুনঃ পুনঃ আলোচনা করিতাম। ইহার পর আমরা যখন মজলিস ত্যাগ করিতাম, তখন হাদীছ আমাদের অন্তরে এমনভাবে বদ্ধমূল হইয়া যাইত যেন উহা আমাদের অন্তরে রোপণ করা হইয়াছে।‘

                                                                                                    মাজমা ১৬১ পৃঃ

হজরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেনঃ ‘একদিন আমরা নবীয়ে করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর সহিত ছিলাম, এমন সময় তিনি মসজিদে প্রবেশ করিলেন। দেখেলেন, তথায় কতিপয় লোক বসিয়া আছে। হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম জিজ্ঞাসা করিলেনঃ ‘তোমরা এখানে বসিয়া আছ কেন?’ তাঁহারা উত্তর করিলেনঃ আমরা ফরজ নামাজ পড়িয়াছি; অতঃপর এখানে বসিয়া আল্লাহর কিতাব এবং তাঁহার রছূলের ছুন্নাহ আলোচনা করিতেছি।‘

                                                                                                     -মুস্তাদরাক, তাদবীন

এক কথায় রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর জীবনের এমন কোন ঘটনা নাই যাহার অনুসন্ধান ছাহাবীগণ করেন নাই এবং উহা হেফজ করিয়া রাখেন নাই । আর ইহা তাঁহাদের আগ্রহ ও স্মরণশক্তির তুলনায় কঠিন ব্যাপার কিছুই ছিল না। আরবের এক একজন সাধারণ লোক পর্যন্ত শত শত কবিতা, বক্তৃতা এবং বিরাট বিরাট নছবনামা (কুল-পঞ্জিকা) হেফজ করিয়া রাখিত। ইসলাম-পূর্ব যুগের কবিদের কবিতা, বাগ্নী বক্তাদের বক্তৃতা এবং সমস্ত আরব গোত্রের নছবনামা আমরা এ সুত্রেই লাভ করিয়াছি।

ইবনে আবদুল বার বলেনঃ

(আরবী*****************************************)

‘আরবগণ প্রকৃতিগতভাবেই স্মরণশক্তিসম্পন্ন ছিল এবং ইহা তাহাদের বৈশিষ্ট্যও বটে।

                                                                                                                     জামে’ ৩৫ পৃঃ

ছাহাবীদের মধ্যে কে কত হাদীছ হেফজ করিয়াছেলেন ও শিক্ষা দিয়াছিলেন তাহার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা পরবর্তী ‘হাদীছ শিক্ষাদান’ পরিচ্ছেদে দেওয়া হইল।

ছাহাবীদের হাদীছ লিখনঃ

(এ সম্পর্কীয় বিস্তারীত বিবরণ ‘প্রথম যুগে হাদীছ লিখন’ পরিচ্ছেদে আসিতেছে।)

ছাহাবীগণের হাদীছ শিক্ষাদান

ছাহাবীগণ নিজেরা যেভাবে হাদীছ জ্ঞান অর্জন করাকে জরুরী বলিয়া মনে করিয়াছেন সেভাবে অন্যের নিকট উহা প্রচার করাকেও অবশ্য কর্তব্য বলিয়া বিবেচনা করিয়াছেন। রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর এন্তেকালের পর ছাহাবীগণের এক বিরাট জামাআত (প্রায় দুই হাজার) এ কর্তব্য সম্পাদনে ঝাঁপাইয়া পড়েন এবং সমগ্র আরব ভূমিকে হাদীছের এলমে উদ্ভসিত করিয়া দেন। মদীনায় হজরত আয়েশা (রাঃ), হজরত ইবনে ওমর (রাঃ) ও হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) প্রমখের দরছ চলিতে থাকে। মক্কা হজরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হাদীছ শিক্ষার এক বিরাট কেন্দ্র স্থাপন করেন।

কুফায় হজরত আলী মোরতাজ (রাঃ), ইবনে মাছউদ (রাঃ) ও হজরত আনাছ ইবনে মালেক (রাঃ) প্রমুখ বিশিষ্ট ছাহাবীগণ ইহতে আন্মনিয়োগ করেন। বছরায় হজরত আবু মাছা আশ আরী (রাঃ) শাসনকার্য পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে হাদীছের দরছও অব্যাহত রাখেনে এবং শামে হজরত আবু ছাঈদ খুদরী এবং মিছরে হজরত আমার ইবনুল আছ (রাঃ) ইহার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এতদ্ব্যতীত অন্যান্য ছাহাবীগণের মধ্যে যিনি যেস্থনে গিয়াছেন হাদীছের শিক্ষাদানকে সমস্ত করণীয় কার্যের মধ্যে অগ্রধিকার দান করিয়াছেন।

তবে হাদীছের সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও শিক্ষাদান ব্যাপরে সকল ছাহাবীর সমান সুযোগ ছিল না, তাই সকলের পক্ষে সমপরিমাণ হাদীছ শিক্ষা দেওয়া বা রেওয়ায়ত করা সম্ভবপর হয় নাই। যাঁহারা এক হাজার বা ততোধিক হাদীছ শিক্ষা দিয়াছেন মোহাদ্দেছগণ তাঁহাদের বলেন, ‘মুকছিরীন’;যাঁহারা পাঁচ শত হইতে হাজারের কমসংখ্যক হাদীছ শিক্ষা দিয়াছেনে তাঁহাদের বলেন, ‘মুতাওচ্ছেতীন’;যাঁহার চল্লিশ হইতে পাঁচ শত পযর্ন্ত হাদীছ শিক্ষা দিয়াছেন তাঁহাদের বলেন, ‘মুকিল্লীন’ আর যাঁহারা চল্লিশের কম হাদীছ শিক্ষা দিয়াছেন তাঁহাদের বলেন, ‘আকাল্লীন’।

                                                                                                       ইজালাতুল খাফা-২১৪ পৃঃ

নীচে প্রথম তিন শ্রেণীর ছাহাবীর নাম এবং তাঁহাদের বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা দেওয়া গেল।আকাল্লীনদের সংখ্যা অত্যধিক বলিয়া তাঁহাদের নাম এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নহে।

                                                                 মুকছিরীনঃ [কিরমানী –শরহে বোখারী]

১। হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ)    (মৃঃ ৫৭ হিঃ)৫৩৬৪

২। হজরত আনাছ ইবনে মালেক (রাঃ)    (মৃঃ ৯৩ হিঃ)     ২২৩৬

৩। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ (রাঃ) (মৃঃ ৬৮ হিঃ)    ১৬৬০

৪। হজরত আবদুল্লহ ইবনে ওমর (রাঃ)    (মৃঃ ৭৩ হিঃ)    ১৬৩০

৫।হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ)   (মৃঃ ৭৪ হিঃ)    ১৫৪০

৬। হজরত আয়েশা আয়েশা ছিদ্দিকা (রাঃ)(মৃঃ ৫৭ হিঃ)১২১০

৭। হজরত আবু ছাঈদ খুদরী (রাঃ) মৃঃ ৭৪ হিঃ)১১৭০

                                                                মুতাওচ্ছোতীনঃ [কিরমানী –শরহে বোখারী]

১। হজরত আবদুল্লহ ইবনে মাছউদ (রাঃ)  (মৃঃ ৩২ হিঃ)৮৪৮

 ২। হজরত আবদুল্লহ ইবনে আমরা ইবনুল আছ (রাঃ)    (মৃঃ ৬৩ হিঃ)     ৭০০

৩। হজরত আলী তোরতাজা (রাঃ)(মৃঃ ৪০ হিঃ)৫৮৬

৪। হজরত ওমর ফারূক (রাঃ)    (মৃঃ ২৩ হিঃ)৫৩৯

                                                                   মুকিল্লীন

১। উম্মুল ম’মিনীন হজরত উম্মে ছালমা (রাঃ)   (মৃঃ ৫৯হিঃ)৩৭৮

২। হজরত আবু মুছা আশ’আরী (রাঃ)    (মৃঃ ৫৪ হিঃ)৩৬০

৩। হজরত বারা ইবনে আজেব (রাঃ)    (মৃঃ ৭২ হিঃ)৩০৫

৪। হজরত আবু জর গেফারী (রাঃ)(মৃঃ ৩২ হিঃ)২৮১

৫। হজরত ছ’দ ইবনে আবি ওক্কাছ (রাঃ)  (মৃঃ ৫৫ হিঃ)২১৫

৬। হজরত ছাহল আনছারী (জুন্দব ইবনে কায়ছ রাঃ)    (মৃঃ ৯১ হিঃ)১৮৮

৭। হজরত উবাদা ইবনে ছামেত আনছারী (রাঃ)   (মৃঃ ৩৪ হিঃ)১৮১

৮। হজরত আবুদ্দারদা (রাঃ)(মৃঃ ৩২ হিঃ)১৭৯

৯। হজরত আবু কাতাদাহ আনছারী (রাঃ)  (মৃঃ ৫৪ হিঃ)১৭০

১০ হজরত উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ)(মৃঃ ২১ হিঃ)১৬৪

১১। হজরত বোরাইদা ইবনে হাছীব (রাঃ)  (মৃঃ ৬৩ হিঃ)     ১৬৪

১২। হজরত মোআজ ইবনে জাবাল (রাঃ)  (মৃঃ ১৮ হিঃ)     ১৭৫

১৩। হজরত আবু আইয়ুব আনছারী (রাঃ)  (মৃঃ ৫২ হিঃ)১৫০

১৪। হজরত আবু আইয়ুব আনছারী (রাঃ)  (মৃঃ ৩৫ হিঃ)১৪৬

১৫। হজরত জাবের ইবনে ছামুরাহ (রাঃ)  (মৃঃ ৭৪ হিঃ)১৪৬

১৬। হজরত আবু বকর ছিদ্দীক (রাঃ)    (মৃঃ ১৩ হিঃ)১৪২

১৭। হজরত মুগীরাহ ইবনে শো’অবা (রা)  (মৃঃ ৫০ হিঃ)১৩৬

১৮। হজরত আবু বাকরাহ (রাঃ)  (মৃঃ ৫২ হিঃ)১৩০

১৯। হজরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ)  (মৃঃ ৫২ হিঃ)১৩০

২০। হজরত মুআবিয়া ইবনে আবু ছুফইয়ান (রাঃ)  (মৃঃ ৬০ হিঃ)     ১৩০

২১। হজরত ওছমান ইবনে জায়দ (রাঃ)   (মৃঃ ৫৪ হিঃ)১২৮

২২। হজরত ছাওবান (রাঃ)(মৃঃ ৫৪ হিঃ)১২৭

২৩। হজরত নো’মান ইবনে বশীর (রাঃ)   (মৃঃ ৬৫ হিঃ)     ১২৪

২৪। হজরত ছামুরা ইবনে জুন্দুব (রাঃ)    (মৃঃ ৫৮ হিঃ)     ১২৩

২৫। হজরত আবু মাছউদ আনছারী (রাঃ)  (মৃঃ ৪০ হিঃ)১০২

২৬। হজরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ বাজালী (রাঃ)(মৃঃ ১৭৬ হিঃ)    ১০০

২৭। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু আওফা (রাঃ)   (মৃঃ ৫১ হিঃ)৯৫

২৮। হজরত জায়দ ইবনে ছাবেত আনছারী (রাঃ)  (মৃঃ ৮৭ হিঃ)৯২

২৯। হজরত আবু তালহা (রাঃ)   (মৃঃ ৪৮ হিঃ)৯০

৩০। হজরত জায়দ ইবনে আরকাম (রাঃ)  (মৃঃ ৩৪ হিঃ)৯০

৩১। হজরত জায়দ ইবনে খালেদ (রাঃ)   (মৃঃ ৬৮ হিঃ)     ৮১

৩২। হজরত কা’ব ইবনে মালেক (রাঃ)    (মৃঃ ৭৮ হিঃ)৮০

৩৩। হজরত রাফে’ ইবনে খাদীজ (রাঃ)   (মৃঃ ৫০ হিঃ)৭৮

৩৪। হজরত ছালমা ইবনে আকওয়া (রাঃ)  (মৃঃ ৭৪ হিঃ)৭৭

৩৫। হজরত আবু রাফে’ (রাঃ)    (মৃঃ ৭৪ হিঃ)৬৮

৩৬। হজরত আওফ ইবনে মালেক (রাঃ)  (মৃঃ ৩৫ হিঃ)৬৭

৩৭। হজরত আদীয় ইবনে হাতেম তায়ী (রাঃ)    (মৃঃ ৭৩ হিঃ)৬৬

৩৮। হজরত আবদুর রহমান ইবনে আবি আওফা (রাঃ)   (মৃঃ ৬৮ হিঃ)     ৬৫

৩৯। (উম্মুল মু’মীনীন) হজরত উম্মে হাবীবাহ (রাঃ)    (মৃঃ ৪৪ হিঃ)৬৫

৪০। হজরত ছালমান ফাছেরী (রাঃ)(মৃঃ ৩৪ হিঃ)৬৪

৪১। হজরত আম্মান ইবনে ইয়াছির (রাঃ)  (মৃঃ ৩৭ হিঃ)৬২

৪২। (উম্মুল মু’মীনীন) হজরত হাফছা (রাঃ)    (মৃঃ ৪৫ হিঃ)৬৪

৪৩। হজরত জোবাইর ইবনে মোতয়েম (রাঃ)     (মৃঃ ৫৮ হিঃ)     ৬০

৪৪। হজরত শাদ্দাদ ইবনে আওছ (রাঃ)    (মৃঃ ৬০ হিঃ)     ৬০

৪৫। হজরত আছমা বিনতে আবু বকর (রাঃ)    (মৃঃ ৭৪ হিঃ)৫৬

৪৬। হজরত ওয়াছেলা ইবনে আছকা (রাঃ)(মৃঃ ৮৫ হিঃ)     ৫৬

৪৭। হজরত ওকবাহ ইবনে আমের (রাঃ)   (মৃঃ ৬০ হিঃ)     ৫৫

৪৮। হজরত ওমর ইবনে ওতবাহ (রাঃ)             ৪৮

৪৯। হজরত কা’ব ইবনে আমর (রাঃ)    (মৃঃ ৫৫ হিঃ)৪৭

৫০। হজতর ফাজালা ইবনে উবায়দ আছলামী (রাঃ)(মৃঃ ৫৮ হিঃ)     ৪৬

৫১। (উম্মুল মু’মিনীন) হজরত মাইমুনাহ (রাঃ)   (মৃঃ ৫১ হিঃ)৪৬

৫২। হজরত উম্মে হানী (হজরত আলী ভগ্নী) (রাঃ)    (মৃঃ ৫০ হিঃ)৪৬

৫৩। হজরত আবু জোহাইফা (রাঃ)(মৃঃ ৭৪ হিঃ)৪৫

৫৪। হজরত বেলাল মোয়াজ্জেনে রছুল (ছঃ) (রাঃ)(মৃঃ ১৮ হিঃ)     ৪৪

৫৫। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রাঃ)    (মৃঃ ৫৭ হিঃ)৪৩

৫৬। হজরত মিকদাদ ইবনে আছওয়াদ (রাঃ)     (মৃঃ ৩৩ হিঃ)     ৪৩

৫৭। হজরত উম্মে আতীয়াহ আনছারী (রাঃ)     ৪১

৫৮। হজরত হাকিম ইবনে হেজাম (রাঃ)   (মৃঃ ৫৪ হিঃ)৪০

৫৯। হজরত ছালমা ইবনে হানীফ (রাঃ)   ৪০

ছাহাবীগণরে হাদীছ অনুযায়ী আমলকরণ

ছাহাবীগণ যখনই রছূলুল্লাহ ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লামকে কোন কাজ অথবা কোন কথা বলিতে দেখিয়াছেন তখনই তাঁহার অনুসরণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। তাঁহার শুধু যে শরীয়ত সম্পর্কীয় ব্যাপারেই রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর অনুসরণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন তাহা নহে; বরং যে সকল কাজ তিনি নিছক ব্যক্তিগত আদত-অভ্যাস অনুসারে করিয়াছেন তাঁহারা সে সকল বিষয়েও তাঁহার অনুকরণ করার চেষ্টা করিয়াছেন। রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম কোন কথা বলার বা কোন কাজ করার সময় কোন বিশেষ স্বরভংগি বা অংগভংগি করিয়া থাকিলে ছাহাবীগন সেই কথা বলার বা সেই কাজ করার সময় ঠিক সেইরূপ স্বরভংগি বা অংগভংগি করারও চেষ্টা করিয়াছেন। (হাদীছে ইহাকে রেওয়ায়তে মোছালছাল বলে।) এভাবে রছুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম কোন স্থলে গমন কালে যে পথ অবলম্বন করিয়াছেন এবং ঐ পথের যে যে স্থানে যে যে কাজ করিয়াছেন ছাহাবীগণ সেই স্থানে গমনকালে সেই পথ করিয়াছেন এবং সেই সেই স্থানে সেই সেই কাজ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমন (রাঃ) মদীনা-মক্কার মধ্যে গমনাগমন কালে পায়খানা-পেশাবের হাজত না হইলেও নিছক অনুকরণের খেয়ালেই সেই সেই স্থানে খানিকটা সমীয় বসিয়া থাকিতেন যে যে স্থানে হুজুর (ছঃ) পায়খানা-পেশাবের জন্য বসিয়াছিলেন।

ছাহাবীগণ রছুলুল্লাহ  (ছঃ)-এর কার্যের অনুকরণ করার ব্যাপারে কার্যের উদ্দেশ্য বুঝার অপেক্ষাও করিতেন না। হজরত ওমরের মত ব্যক্তি ‘হাজারে আছওয়াদকে’ চুম্বন করিয়াছেন।‘ এভাবে তিনি খানায়ে কা’বার তাওয়াফে ‘রমল’

[তাওয়াফ করার কালে বীরের ন্যায় সজোরে পদক্ষেপ করাকে ‘রমল’ বলে।] কারার কালে বলিয়াছিলেনঃ ‘মক্কার কাফের-দিগকে মদীনার মুসলমারদের বলবীর্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম ‘রমল’ করিয়াছিলেন। আমরা মতে এখন আর ইহার কোন প্রয়োজন নাই। তথাপি আমি ইহা এজন্য করিতেছি যে, হয়ত এ কাজের মধ্যে রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লামের অন্য কোন উদ্দেশ নিহিত থাকিতে পারে।

এক কথায় রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লামের যাবতীয় এবাদত, মোআমালাত, কথা-বার্তা, লেবাছ-পোশাক, খাওয়া, পরা, উঠা-বসা, শয়ন-বিচরণ এমন কোন বিষয় নাই, যে বিষয়ে ছাহাবীগণ উহার অনুকরণ করার চেষ্টা করেন নাই। অতঃপর ছাহাবীগণের অনুসরণ করিয়াছন তাবেয়ীগণ । তাবেয়ীগণের; অনুসরণ  করিয়াছেন তবে’ তাবেয়ীগণ; আর তবে’- তাবয়ীদের অনুসরণ করিয়াছেন তাঁহাদের পরিবর্তীগণ।মোটকথা,  এ ব্যাপারে উম্মতীদের যুগ পরম্পরা বরাবর একে  অন্যেরর অনুসরণ করিয়া আসিয়াছেন ও আসিতেছেন। আজ রছূলের অনুসরণের শিথিলতার যুগেও উম্মতীগণ ওজু-গোসল, নামাজ- রোজা, হজ্জ-জাকাত প্রভৃতি এবাদত ঠিক সেই পদ্ধতিতেই সম্পাদ করিতেছেন যে পদ্ধতিতে প্রায় ১৪ শত বৎছর পূর্বে রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম সম্পাদন করিয়াছিলেন; অধিকন্তু তাহারা রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওছাল্লাল্লামের ব্যাক্তি আদত-অভ্যাসেরও অনুসরণ করিতেছে। তাহাজ্জুদের পর ফজরের ছুন্নাত পড়িয়া ক্লান্ত দুর করার উদ্দেশ্য রছূলুল্লাহ (ছঃ) খানিকটা সময় বিশ্রাম করিতেন। উম্মতীদের বিশিষ্ট ব্যাক্তিগণ আজও উহার অনুসরণ করিয়া থাকেন’। রছূলুল্লাহ (ছঃ) হাতে কাঠের ছড়ি ব্যবহার করিতেন, এজন্য তাহারা কাঠের ছড়ি ব্যবহার করিতেই ভালবালসেন। তাই বলিতেছিলাম যে, উম্মতীগণের আমল রছূলুল্লাহ  (ছঃ)- এর ছুন্নাহ রক্ষার একটি মস্ত বড় উপায়।ঐ উপায় রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর সমস্ত ছুন্নাহই রক্ষা পাইয়াছে।

                                               তাবেয়ীনদের প্রতি ছাহাবীগণের নির্দেশ

ছাহাবীগণ শুদু যে নিজেরাই হাদীছের হেফাজত ও প্রচারে আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন তাহা নহে; বরং তাহারদের শাগরিদ তাবেয়ীনদের প্রতিও তাঁহার এ নির্দেশ দিয়াছিলেন। হজরত আলী (রাঃ) তাঁহার শাগরিদগণকে বলিতেনঃ

(আরবী******************************)

‘তোমর পরস্পর মিলিত হইবে এবং বেশী করিয়া হাদীছ আলোচনা করিবে; অন্যথায় হাদীছ তোমাদের অন্তর হইতে মুছিয়া যাইবে।–দারেমী-১/১৫০ পৃঃ

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাছউদ (রাঃ) বলিতেনঃ

(আরবী******************************)

তোমরা পরস্পর হাদীছ আলোচনা করিতে থাকিবে। কেননা, আলোচনাতেই হাদীছের জীবন।‘- দারেমী ১৫০পৃঃ হজরত আবু ছাঈদ খদরী বলেনঃ

(আরবী******************************)

‘তোমরা পরস্পর হাদীছ আলোচনা করিবে, আলোচনাই স্মরণ করাইয়া দেয়।‘ দারেমী-১/১৬৪ পৃঃ

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ (ছঃ) তাহার শাগরিদগণের বলিতেন

(আরবী******************************)

‘আমাদের নিকট তোমরা যখন কোন হাদীছ শুনিবে; পরস্পরে উহা পুনঃ পুনঃ আলোচনা করিবে। দারেমী-১/১৫৮ পৃঃ তিনি ইহাও বলিতেন যে,

(আরবী******************************)

;তোমরা পরস্পর পুঃ পুঃ তাহীছ আলোচনা করিতে থাকিবে: যাহাতে উহা তোমাদের অন্তর হইতে অন্তর্হিত হইতে না পারে। কেননা উহা কোরআনের ন্যায় (কিতাব আকারে) এক জায়গায় সুরক্ষিত নহে। সুতরাং যদি তোমাদের উহার আলোচনা হইতে গাফেল থাক,তাহা হইলে উহা অন্তর্হিত হইয়া যাইবে। তোমাদের কেহ যেন একথা না বলে যে কাল আলোচনা করিয়াছি আজ আর করিব না; বরং কাল করিয়াছ, আজও কর এবং আগামীকালও করিবে।          দারেমী-১/১৪৭, পৃঃ

হাদীছ লেখার ক্রমবিকাশঃ

 হাদীছ লেখার ইতিহাস আলোচনা করিলে দেখা যায়, উহা তিনটি স্তর অতক্রম করিয়া আসিয়াছেঃ কিতাবাঃ, তাদবীন ও তাছনীফ। ছাহারা ও প্রবীণ তাবেয়ীনদের সময় রছূলুল্লা ছাল্লাল্লাহু ওয়াছাল্লাম সমস্ত হাদীছ সামগ্রিকভাবে একত্র করা হয় নাই। তাঁহাদের মধ্যে যিনি যে বিষয়ের যে হাদীছকে অত্যন্ত জরুরী বলিয়া মনে করিয়াছিলেন তাহা লিখিয়া লইয়াছিলেন হুজুরের সম্যক হাদীছ নহে।এরূপ লেখার জন্য তখন আরবীর সাধারণ শব্দ ‘কিতাবাৎ’ বা ‘কিতাব’ (লিখন) ই ব্যবহারে করা হইত। অতঃপর প্রথম শতাব্দীর শেষের দিকে স্বনামখ্যাত তাবেয়ী ইমাম ইবনে শেহব জোহরীই প্রথম রছূলুল্লাহু ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লামের হাদীছসমূহকে সামগ্রিকভাবে একত্র করার চেষ্টা করেন। তাঁর সমসাময়িক তাবেয়ী আবুজ জেনাদের কথায় ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়।তিনি বলেনঃ

(আরবী******************************)

‘আমরা কেবল হালাল-হারাম সম্পর্কীয় হাদীছসমূহই লিখিয়া লইতাম; কিন্তু ইবনে শেহাব যাঁহার নিকট যাহা শূনিতেন তাহা সম্পূর্ণই লিখিয়া লইতেন।পরে যখন লোকের সকল প্রকার হাদীছের প্রতিই আবশ্যকতা দেখা দেয় তখন বুঝিলাম যে ইবনে শেহাবের নিকটই আমাদের সকলেন অপেক্ষা অধীক এলম রহিয়াছে। জামে’-৩৭ পৃঃ

আর এরূপ লেখাকে তখন ‘তাদবীন’নামে অভিহিত করা হয়। আবদুল আজীজ দারাওয়ারদীর একটি কথা হইতে ইহা বুঝা যায়; তিনি বলেনঃ

(আরবী******************************)

‘সর্বপ্রথম যিনি এলমের (অর্থাৎ হাদীছের) তাদবীন করিয়াছেন এবং উহাকে (সামগ্রিকভাবে) লিখিয়াছেন তিনি হইতেছেন ইবনে শেহাব।‘-জামে’ ৩৭ পৃঃ

তবে ইহাতেও (অর্থাৎ তাদবীনেও) হাদীছসমূহকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয় অনুসারে অধ্যায়, উজ-অধ্যায়ে সাজাইবার ব্যবস্থ করা হয় নাই। এ চেষ্টা প্রথম আরম্ভ হয় হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এবং ইহার নাম দওয়া হয় ‘তাছনীফ’। হাফেজ ইবনে হাজারের একটি উক্তি হইতে ইহা স্পষ্টাভাবে বুঝা যায়। তিনি বলেনঃ

(আরবী******************************)

‘সর্বপ্রথম যিনি প্রথম শতাব্দীর মাথায় খলীফা ওমর ইবনে আবদুল আজীজের আদেশে হাদীছ

‘তাদবীন’ করেন তিনি হইলেন ইবনে শেহাব জোহরী। অতঃপর উহা ছাড়াইয়া পড়ে। ইহার পর আরম্ভ হয় ‘তাছনীফ”যদ্দ্বারা বহু কল্যাণ সাধিত হয়।– ফাতহুল বারী-১/১৬৮ পৃঃ

‘তাছনীফ’ যে ‘তাদবীনে’র পরে আরম্ভ হইয়াছে একথা তিনি স্পষ্টভাবেই বলিয়া দিলেন। তবে এই ‘তাছনীফ’ সর্বপ্রথম কে করিয়াছিলেন তাহা অবশ্য সঠিকভাবে নির্ধাণ করা যায় না। অনেকের মতে ইবনে জোরাইজই (মৃঃ ১৫০ হিঃ) সর্বপ্রথম তাছনীফ করেন। এখানে বলা আবশ্যক যে, হাদীছ লেখার এই তিনটি স্তরের প্রতি দৃষ্টি না রাখার ফলে সাধারণভাবে মনে করা হইয়া থাকে যে,প্রথম শতাব্দীতে হাদীছ লেখা হয় নাই। প্রথম শতাব্দীতে হাদীছের ‘তাদবীন বা ‘তাছনীফ’ হয় নাই একথা তো সত্য; কিন্তু হাদীছ একেবারেই লেখা হয় নাই একথা সত্য নহে। কারণ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে, প্রথম শতাব্দীতে স্বয়ং রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম, ছাহাবা, এবং প্রবীণ তাবেয়ীগণ কতৃক বহু হাদীছ লেখা হইয়াছিল- যদিও ‘তাদবীন’ বা ‘তাছনীফ রূপ নহে। নীচে এরূপ কতিপয় লেখার পরিচয়  দেওয়া গেল

রছূলুল্লাহু (ছঃ)-এর সময়ে সরকারী কার্যের মাধ্যমে হাদীছ লেখানঃ

একাদশ হিজরীর প্রথম দিকে রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লামের একান্তকাল পর্যন্ত ইয়ামান ও বাহরাইন হইতে সিরিয়াল সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় দশ লক্ষ বর্গমাইল আরব ভূমির উপর ইসলামের আধিপত্য স্থাপিত হয়। এই বিরাট রাষ্ট্রে শাসন উপলক্ষে রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর বহু সময় বহু কার্য লিখিতভাবে সম্পাদন করিতে হয়। পার্শ্ববর্তী রাজা-বাদশাহদের সহিত পত্র বিনিময় করিতে হয় এবং বিভিন্ন গোত্রের সহিত বিভিন্ন চুক্তিও সম্পাদন করিতে হয়।

                                                             (ক)

১। মদীনা পৌছিয়াই রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছল্লাম প্রথমে মুহাজির, আনছার, তথাকার ইহুদী এবং অন্যান্য আরবীদের লইয়া একটি সম্মিলিত নাগরিক রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন। অতঃপর ইহার জন্য ৫২ দফা সম্বলিত একটি শাসনতন্ত্র রচনা করেন।এই শাসনতন্ত্র নিয়মিতভাবে লিখিত হইয়াছিল। (সম্ভবতঃ ইহাই পৃথিবীর প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র)-ছীরাতে ইবনে হিশাম এবং আবু ওবাইদ-এর কিতাবুল প্রভৃতিতে ইহার পূর্ণ বিবরণ রহিয়াছেন।

[আরবী******************************]

আল্লাহর নবী ও রছূল মোহাম্মদ (ছঃ)-এর পক্ষ হইতে ইহা একটি দলীল যাহা কোরাইশের ম’মিন-মুসলমান ও ইয়াছরাব (মদীনা)-বাসী এবং যাহারা তাহাদের অনুসরণ করিবে ও তাহাদের সহিত যুক্ত হইবে তাহাদের মধ্যে সম্পাদিত হইল।আমওয়াল-১২৫ পৃঃ

২। এতদ্ব্যতীত এই নাগরিক রাষ্ট্রের একটি সীমানাও চিহ্নত করা হইয়াছিল এবং শাসনতন্ত্রের পরিশষ্টরূপে ইহাও স্বতন্ত্রভাবে লিখিত হইয়াছিল। ছাহাবী রাফে’ ইবনে খাদীজ বলেনঃ

[আরবী******************************]

‘(মক্ক শরীফের ন্যায়) মদীনাও একটি রহম।রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম ইহাকে হরম সাব্যস্ত করিয়া গিয়াছেন। ইহা আমাদের নিকট খাওলানী চর্মে লিখিত হরিয়াছে।

মোছনাদে আহমদ, খণ্ডঃ ৪

                                                               (খ)

৩। মদীনা পৌছিয়া রছূলূল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম লোক গণনা করিয়াছিলেন (সম্ভবতঃ ষষ্ঠ হিজরীতে) এবং লিখিতভাবে উহার বিবরণ দান করিতে পতিপয় ছাহাবীর প্রতি নির্দেশ দিয়াছিলেন। ছাহাবী হজরত হোজইফা (রাঃ) বলেনেঃ রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম আমাদের প্রতি এরূপ নির্দেশ দিয়াছিলনঃ

[আরবী******************************]

‘এ যাবৎ যে সকল লোক মুসলমান হইয়াছে তাহাদের একটি লিখিত ফিরিস্তি তোমরা আমার নিকট দাখিল কর। সুতরাং আমরা ১৫ শত লোকের ফিরিস্তি তাহাদের নিকট দাখিল করি।

                                                                                                         বোখরী কিতাবুল জিহাদ

                                                              (গ)

রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম আরবের বিভিন্ন গোত্রের সহিত যে সকল সন্ধি করিয়াছিলেন, সে সকলও নিয়মিতভাবে লিখিত হইয়াছিল। তারীখ ( ইতিহাস) ও ছীরাতের (নবী চরিতের) কিতাবসমুহে এরূপ বহু চুক্তির উল্লেখ রহিয়াছে।

৪। হুদায়বিয়ার সন্ধি যে লিখিতভাবে সম্পাদিত হইয়াছিল তাহা একটি ইতিহাস প্রসিদ্ধ কথা

৫। দ্বিতীয় হিজরীতে বনু জামরার সহিত যে চুক্তি করা হইয়াছিল তাহা নিম্নরূপে আরম্ভ করা হয়

আল্লাহ রছূল মোহাম্মদ (ছঃ)-এর পক্ষ হইতে বনু জামরার জন্য ইহা একটি দীলল।

                                                                                                         ছহীফায়ে হাম্মাম ১৬ পৃঃ

৬। খন্দক যুদ্ধের সময়ে বনু ফাজারাহ ও গাতফান গোত্রের সহিত যখন সন্ধি হয় তখনও একটি সন্ধিপত্র লিখিত হইয়াছিল। (যদিও পরে উহা বিনষ্ট করিয়া দেওয়া হয়।)                                                                                                          ছহীফায়ে হাম্মম ১৭ পৃঃ

৭। নবম হিজরীতে দুমাতুল জান্দলেন শাসনকর্তা উকইদির ইবনে আবদুল মালেক হজরত খালেদ ইবনে ওলীদের বশ্যতা স্বীকার করিলে রছূলুল্লা (ছঃ) তাহাকে একটি স্মরকলিপি লিখিয়া দেন। আবু উবায়দ বলেনঃ [আরবী******************************]

‘এই লিপি আমি পাঠ করিয়াছি। তথাকার এক বৃদ্ধ ইহা আমাকে দেন। ইহা একটি শ্বেতচর্মে লিখিত ছহীফা। আমি ইহাকে অক্ষরে প্রতিলিপি করিয়া রাখিয়াছি। অতঃপর আবু উবায়াদ ইহার সমস্ত পাঠ তাঁহার কিতাবে উদ্ধত করেন।_আমওয়াল ১৯৪ পৃঃ

৮। রছূলুল্লাহ (ছঃ) নাজরানের খৃষ্টানদিগকে একটি চুক্তিপত্র লিখিয়া দিয়াছিলেন। তাহা আরম্ভ করা হয় নিম্নরূপেঃ

[আরবী******************************]

‘ইহা একটি দলীল যাহা আল্লাহর নবী ও রছুল মোহাম্মদ নাজরানবাসীদের জন্য লিখিলেন। -আমওয়াল-১৮৮ পৃঃ। আবু উবায়দ ইহারও পূর্ণ বিবরণ তাঁহার কিতাবে দান করিয়াছেন।

৯। রছূলুল্লহ (ছঃ) বনু ছকীফদেরও একটি চুক্তিপত্র লিখিয়া দেন। তাহা নিম্নরূপে আরম্ভ করা হইয়াছেঃ

[আরবী******************************]

‘আল্লাহর নবী ও রছূল মোহাম্মদ বনাম ছকীফ ইহা একটি সনদ! –আমওয়াল-১৯০ পৃঃ

*-

+-*/১০ এইরূপে রছূলুল্লাহ (ছঃ) এবং হাজার-বাসীদের মধ্যেও একটি সন্ধিপত্র লেখা হইয়াছিল। হজরত ওরওয়াহ ইবনে জোবাইর বলেনঃ ‘বিছমিল্লাহ’র পর ইহা এইভাবে আরম্ভ করা হইয়াছেঃ

[আরবী******************************]

আল্লাহর নবী ও রছূল মোহাম্মদ বনাম আহলে হাজর ইহা একটি সন্ধিপত্র।

                                                                                                               আমওয়াল-১১২ পৃঃ

১১। হজরত ওরয়াহ ইবনে জুবায়র (রাঃ) আরো বলেনঃ রছূলুল্লহ (ছঃ) আয়লাবাসীদের একটি নিরাপত্তাপত্র লিখিয়া দিয়াছিলেন। ‘বিছমিল্লাহ’ অন্তে ইহা নিম্নরূপ আরম্ভ করা হইয়াছেঃ

[আরবী******************************]

‘ইহা আল্লাহ এবং আল্লাহর রছূল মোহাম্মদ-এর পক্ষ হইতে ইউহন্নাহ ইবনে রূবাহ ও আয়লাবাসীদের জন্য একটি নিরাপত্তাপত্র। পত্রের শেষের দিকে রহিয়াছে, ইহা জোতইম ইবনে ছালাতের কলমে লিখিত।– কিতাবুল আমওয়াল-৫১৫ পৃঃ

১২। আবু উবায়দ তাহার কিতাবে পূর্ণ বিবরণসহ ইহাও উল্লেখ করিয়াছেন যে, রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম খোজাআহ গোত্রকেও একটি আমান পত্র লিখিয়া দিয়াছিলেন।

                                                                                                -কিতাবুল আমওয়াল-২০০ পৃঃ

(ঘ) রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম কোন ব্যক্তি বিশেষকেও আমাননামা লিখিয়া দিয়াছিলেন।

১৪। বোখারী ও ছীরাতে ইবনে হিশামে এ কথার উল্লেখ রহিয়াছে যে, হিজরতের পথে রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম ছোরাকা ইবনে মালেককে একটি আমাননামা লিখিয়া দিয়াছিলেন।–ছহীফায়ে হাম্মাম-১৮ পৃঃ

(ঙ) রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম তাঁহার কোন কোন ছাহাবীকে সরকারী ভূমী দান করিয়াছিলেন এবং উহার নিদর্শনস্বরূপ তাঁহাকে ভূমিদানপত্র লিখিয়া দিয়াছিলেন।

১৫। কিতাবুল আমওয়াল আবু দাঊদ শরীফে রহিয়াছে যে, রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম বেলাল ইবনে হারেছ মুজানীকে ‘কাবালিয়াহ’ নামক একখণ্ড ভূমীদান করিয়াছিলেন এবং ইহার জন্য নিন্মরূপ একটি ভূমিদানপত্র লিখিয়া দিয়াছিলেনঃ

(আরবী***********************************************************)

‘মোহাম্মদ রছুলুল্লাহ বেলাল ইবনে হারেছ মুজানীকে যে ভূমিদান করিলেন ইহা তাহার নিদর্শনপত্র। তিনি তাহাকে ‘কাবালিয়াহ’ নামক খনি ভূমিদান করিলেন।‘

                                                                  -কিতাবূল আমওয়াল-২৭৩ পৃঃ ও আবু দাঊদ-২-৭৯ পৃঃ

   ১৬। আবু কেলাবা বলেনঃ ‘একদিন ছাহাবী হজরত আবু ছা’লাবা খুশানী (রাঃ) বলিলেনঃ ‘হুজুর ! আমার নামে অমুক অমুক ভূমিখণ্ড লিখিয়া দিন।‘রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম তাহার নামে উহা লিখিয়া দিলেন এবং উবাই ইবনে কা’বের হাতে উহা লিখাইয়া লইলেন।–কিতাবুল আমওয়াল-১৭৪ পৃঃ

১৭। এভাবে ছাহাবী হজরত তামীম দারী (রাঃ) একদিন বলিলেনঃ‘হুজুর! আল্লাহ আপনাকে সমস্ত ভুমির মালিকানা দান করিবেন; ফিলিস্তিন ইসলামী রাষ্ট্রের শামিল হইলে বেতেলহামের আমার স্বীয় গ্রামটি আমার হইবে এইরূপ একটি দানপত্র আমাকে লিখিয়া দিন। হজরত ইকরাম (রাঃ) বলেনঃ হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম তাহাকে এরূপ একটি দানপত্র লিখিয়া দিয়াছিলেন। অতঃপর খলীফা হজরত ওমরের সময় ফিলিস্তিন বিজিত হইলে তামীম দারী (রাঃ) উহা খলিফার নিকট পেশ করেন এবং খলীফা উহা বহাল রাখেন।‘

                                                                                               -কিতাবুল আমাওয়াল-১৭৪ পৃঃ

(তাকরীবুত তাহজীবের হাশিয়া ‘তা’কীবে’ উল্লেখ রহিয়াছে যে, উহা এযাবৎ তামীম দারীর (রাঃ) বংশধরদের নিকট বর্তমান আছে)

১৮। এইরূপে ছাহাবী হজরত ছিরাজ ইবনে মুজ্জাআর অনুরোধে রছূলুল্লাহ (ছঃ) তাঁহাকে ‘গাওরাহ’,’গোরাবাহ’ ও’হুবুল’ নাম তিন খণ্ড ভুমি সম্পর্কে একটি দানপ্র লিখিয়া দিয়াছিলেন। কিতাবুল আমওয়াল-২৮১ পৃঃ

                                                                 (চ)

রছূলুল্লাহ তৎকালীন রাজা-বাদশাহগণের নিকট তাহাদিকে ইসলামের প্রতি আহবান জানাইয়া যে সকল পত্র লিখিয়াছিলেন সে সকলের কথা সর্বজনবিদিত।

১৯। মিছরের শাসনকর্তা মকাওকিছের নিকট লিখিত আসল পত্রখানিই ১৮৫০ খৃষ্টাব্দে মিছরের এক গির্জার মোতাওয়াল্লীর নিকট পাওয়া গিয়াছে এবং বিশেষজ্ঞাগণের পরীক্ষায় উহা হুজুরের আসল পত্র বলিয়াই সাব্যস্ত হইয়াছে। ডক্টর হামীদুল্লাহ ছাহেব তাঁহার ‘আল ওছায়েকুছ ছিয়াছিয়াহ’ (আরবী) নামক কিতাবে ইহার প্রতিলিপি প্রকাশ করিয়াছেন।

২০। আবিসিনিয়ার শাসনকর্তা নাজ্জাশীর নিকট প্রেরিত পত্রখানিও পাওয়া গিয়াছে এবং ১৯৪০ খৃষ্টাব্দে ‘জি আর এস, লণ্ডন’ কর্তৃক প্রকাশিত হইয়াছে। ‘ছহীফায়ে হাম্মামের’২০ পৃষ্ঠায় ইহার নকল বা প্রতিলিপি রহিয়াছে।

২১। কাইজারের নিকট লিখিত পত্রখানিও এই সেদিন পযর্ন্ত বিদ্যমান ছিল বলিয়া ডক্টর হাদীদুল্লাহ ছাহেব ‘রছূল আকরম কী ছিয়াছী জিন্দেগী’ (আরবী) নামক কিতাবে উল্লেখ করিয়াছেন।

২২। ইরানের সম্রাট কেছরার (আরবী) নিকটও এরূপ একখানা পত্র লেখা হইয়াছিল বলিয়া সমস্ত ‘তারীখ’ও ‘ছীরাতের’ কিতাবে উল্লেখ রহিয়াছে। আবু উবায়দ বলেনঃ

(আরবী***********************************************************)

‘রছূলুল্লাহ (ছঃ) ইরানের কেছরার নিকট একখানি পত্র লিখিয়াছেন এবং বাহরাইনের ইরানীয় শাসনকর্তার মারফতে উহা পৌছাত (বাহককে) বলিয়াছেন।শাসনকর্তা উহা কেছারার নিকট পেশ করেন। কেছার যখন উহা পাঠ করিল, ক্রধে উহা ছিড়িয়া ফেলিল।‘ কিতাবুল আমওয়াল ২৩ পৃঃ

এই পত্রখানিও হালে (১৯৬২) সালের সভেম্বর মাসে) ইঞ্চি লম্বা ও ৮ ইঞ্চি চওড়া একটি কোমল চামড়ায় লেখ। নীচে হুজুরের সীলমোহরও রহিয়াছে। উহার মধ্যভাগ ছিড়া।

                                                                            -দৈনিক কুহিস্তান লাহোর, ২১শে জুন ১৯৬৩ ইং

২৩। রছূলল্লাহ (ছঃ) আল মুনজির ইবনে ছাওয়ার নিকটও একখানি পত্র লিখিয়াছিলেন। আবু উবায়দ বলেনঃ

(আরবী***********************************************************)

রছূলল্লাহ (ছঃ) আল মুনজির ইবনে ছাওয়ার নিকট লিখিয়াছিলেনঃ আপনি শান্তির সহিত থাকুন। আমি আপনার নিকট আল্লাহর তারীফ করিতেছি যিনি ব্যতীত কোন মা’বুদ নাই। অতঃপর আপনাকে বলার কথঅ এই যে যে ব্যাক্তি আমাদের নামাজের ন্যায় নামাজ পড়িবে, আমাদের কেবলা (কা’বা)-কে কেবলা স্বীকার করিবে এবং আমাদের জবেহ করা গোশত খাইবে সে ব্যাক্তি মুসলমান, যাহার দায়িত্ব আল্লাহ ও তাঁহার রছূল গ্রহণ করিয়াছেন। এইরূপে মাজুছীদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইহা পছন্দ করিবে সে নিরাপদে থাকিবে আর যে ব্যক্তি উহা অস্বীকার করিবে তাহার উপর জিযিয়া (দেশরক্ষা কর) ধার্য করা হইবে।– কিতাবুল আমওয়াল-২০ পৃঃ

২৪। ওমান ও বাহরাইনের শাসনকর্তাদেরও তিনি ইসলামের প্রতি আহবান জানাইয়া পত্র লিখিয়াছেন।আবু উবায়দ বলেনঃ রছূলুল্লাহ (ছঃ) ইমানবসীদের নিকট নিম্নরূপ পত্র লিখিয়াছেনঃ ইহুদী ও খৃষ্টানদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করিবে সে মু’মিন। তাহার জন্য সে সকল অধিকার ও দায়িত্ব রহিয়াছেন যাহা একজন ম’মিনের জন্য রহিয়াছে। আর যে ব্যক্তি ইহুদী ও নাছরানী মতের উপর স্থির থাকিবে তাহাকে উহা হইতে বিরত করা হইবে না। তবে তাহার পক্ষে জিযিয়া দেওয়া অপরিহার্য হইবে।

                                                                                                    -কিতাবুল আমওয়াল-২১ পৃঃ

২৬। ইরানের শাসনকর্তা হারিছ ইবনে আবদে কোলাল, শরাইহ ইবনে কোলাল ও নোয়াইম ইবনে আবদে কোলাল-এর নিকটও তিনি ইসলামের দাওয়াতনামা পাঠাইয়াছিলেন।

                                                                                                     কিতাবুল আমওয়াল ২১ পৃঃ

২৭। এইরূপ রছূলুল্লাহ (ছঃ) রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকটও ইসলামের প্রতি দাওয়াত দিয়া পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন। আবু উবায়দের কিতাবুল আলওয়াল এবং ছিরাত ও তারীখের কিতাবে এ সকল পত্রের পূর্ণ বিবরণ রহিয়াছে। কিতাবের কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় এখানে সে সকলেন নকল দেওয়া গেল না।

                                                               (ছঃ)

২৮। রছূলুল্লাহ (ছঃ) আমরা ইবনে হাজাম প্রমুখ শাসনকর্তাদের নিকট ছদকা (রাজস্ব) উছূলেন নিয়ম এবং বিভিন্ন ফরজ, ছুন্নতসমুহ সম্পর্কে নির্দেশনামা লিখিয়ছিলেন।

                                                                                                                     জামে’ ৩৬ পৃঃ

২৯। আবু দাউদ ও তিরমিজী শরীফের ‘জাকাত’ অধ্যায় আছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর বলেনঃ

(আরবী***********************************************************)

রছূলুল্লাহ (ছঃ) জাকাতের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে একটি ফরমান লিপিবদ্ধ করান। কিন্তু উহা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের নিকট প্রেরণ করিবার পূর্বেই তিনি এন্তেকাল করেন।অতঃপর উহা তাঁহার তরবারির খাপে রাখিয়া দেওয়া হয়। খলীফা আবু বকর ছিদ্দীক (রাঃ) জাকাত উছুলের ব্যাপারে তাহার এন্তেকালে পযর্ন্ত ইহা অনুসরণ আমল করেন।অতঃপর খলীফা ওমর ফারূক (রাঃ) ও তাঁহার শাহাদাৎ পযর্ন্ত ইহার অনুসরণ করেন। আবু দাউদ আবু দাউদ শরীফ ইহাও রহিয়াছে  যে ইমাম জোহরী (রঃ) বলেনঃ এ লেখাটি আমার পড়ার  সুযোগ ঘটিয়াছে। ইহা হজরত ওমর ফারূকের আওলাদের নিকট ছিল এবং খলীফা ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (রঃ) ইহার কপি করাইয়াছিলেন।

৩০। রছূলুল্লাহ (ছঃ) তাঁহার এক সেনাপতির নিকট নিদের্শনামা লিখিয়াছেন এবং বলিয়াছিলেন যে, অমুক জায়গায় পৌছায় পূর্বে উহা পাঠ করিবে না ।সেনাপতি যখন পৌছেন তখন উহা পাঠ করনে এবং রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর হুকম সম্পর্কে সকলকে অবহিত করেন।– বোখারী কিতাবুল এলম

(জ)

রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম কোন কোন সাধারণ ব্যাপারে ও তাহার উম্মতীদের নিকট লিখিত হেদায়তনামা প্রেরণ করিয়াছিলেন।

৩১। দারেমীতে রহিয়াছেঃ

(আরবী*************************************************************************)

‘রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম ইয়ামীনবাসীদের নিকট লিখিয়া পাঠাইছিলেনঃ পাক ব্যক্তি ব্যতীত কেহ কোরআন শরীফ স্পর্শ করিতে পারিবে না; বিবাহের পূর্বে তালাক দেওয়া চলে না এবং খরিদ করার পূর্বে দাস ও আজাদ করা যাইতে পারে না।‘ দারেমী ২৯৩ পৃঃ

৩২। হজরত ইমাম জাফর ইবনে আলী (রাঃ) বলেনঃ

(আরবী*********************************************************************)

রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর এক তরবারির কোষে একটি ছহীফা পাওয়া গিয়াছে; তাহাতে লেখা রহিয়াছেঃ “যে ব্যক্তি কোন অন্ধকে পথভ্রষ্ট করিয়াছে সে ব্যক্তি অভিশপ্ত (মালউন), যে ব্যক্তি জমিনের সীমানা রদবদল করিয়াছে সেও অভিশপ্ত। এছাড়া যে ব্যক্তি নিজের আসল মুনিবকে অস্বীকার করিয়া অপরকে মুবিন বলিয়া স্বীকার করিয়াছে  সেও অভিশপ্ত।“

                                                                                                  জামে’ বায়ানুল এলম ৩৬ পৃঃ

৩৩। ছাহাবী মুগীরা ইবনে শো’বা (রাঃ) বলেনঃ

“রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম জাহহাকের নিকট লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেনঃ

আশইয়াম যেবাবীর ‘দিয়ত’ যেন তাহার স্ত্রীকে দেওয়া হয়।–এছাবা-১-৬৭ পৃঃ

৩৪। বোখারী শরীফে আছে, মক্কা বিজয়ের দিনে দণ্ডবিধি ও মানব অধিকার সম্পর্কে রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম এক খোৎবা দান করেন। খোৎবা শুনিয়অ ইয়ামানের আবুশাহ নামক জনৈক ছাহাবী বলিয়া উঠেনঃ ‘হুজুর! ইহা আমাকে লিখিয়া দিন।‘ তখন হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম অপর ছাহাবীদের বলিলেনঃ (আরবী*******************) ‘তোমরা উহা আবু শাহকে লিখিয়া দাও।‘

৩৫। তবরানী ছগীরে রহিয়াছে, ছাহাবী ওয়াইল ইবনে হোজর (রাঃ) মুসলমান হইয়া কিছুদিন যাবৎ হুজুরের খেদমতে মদীনায় অবস্থান করেন। পরে বাড়ী ফিরিবার সময় রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম তাহাকে নামাজ, রোজা, শরাব ও সূদ সম্পর্কীয় মাছায়েল লিখাইয়া দেন।

                                                                                                         তাদবীনে হাদীছ ৭১ পৃঃ

মোটকথা, রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর জামানায় সরকারীভাবে যে সকল দা’ওয়াতনামা, হেদায়তনামা, নির্দেশপত্র, চুক্তিপত্র ইত্যাদি লেখা হইয়াছিল তাহার সংখ্যা নগণ্য নহে। ডক্টর হামীদুল্লাহ তাহার ‘আল ওছায়েকুছ ছিয়াছিয়াহ’ নামক কিতাবে (দ্বিতীয় এডিশন) এ জাতীয় ১৪১ টি লেখার দান করিয়াছেন। ইহার সবগুলিই রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর হাদীছের অন্তর্ভূক্ত।

ছাহাবীদের হাদীছ লিখনঃ

ছাহাবীদের এক অংশও যে রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর অনুমতিক্রমে তাহার হাদীছ লিখিয়া লইয়াছিলেন তাহারও যথেষ্ট প্রমাণ রহিয়াছে।

১। দারেমীতে রহীয়াছেঃ হজরত আবদূল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) রছুলুল্লাহ (ছঃ) এর নিকট হাদীছ লেখার অনুমতি চাহীয়া বলিলেনঃ

(আরবী*****************************************************)

‘হুজুর! আমি আপনার হাদীছ বর্ণনা ও প্রচার করার ইচ্ছা রাখি’ অতএব, আমি আমার অন্তরের হেফজের সহিত হাতের লেখার সাহায্য লইতে চাই-যদি হুজুরের অনুমতি হয়।‘

হুজুর বলিলেনঃ ‘যে আমার হাদীছ হয় তাহা হইলে অন্তরের হেফজের সহিত হাতের সাহায্যেও গ্রহণ করিতে পারে।‘-দারামী-১-১১৬ পৃঃ

হজরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ

(আরবী*********************************************)

‘আমি হুজুরের মুখে যাহা শুনিতাম হেফজ করার উদ্দেশ্যে তাহাই লিখিয়া লইতাম। কোরাইশ (মুহাজিরগণ) আমাকে এরূপ করিতে নিষেধ করিলেন এবং বলিলেনঃ তুমি কি হুজুরের সব কথাই লিখিতেছ? অথচ হুজুর (ছঃ) একজন মানুষঃ কখনও স্বাভাবিক অবস্থায় কথা বলিয়া থাকেন আর কখনো ক্রোধ অবস্থায়। (ক্রোধ অবস্থার কথা কি লেখা উচিত?) ইহাতে আমি বিরত হইয়া গেলাম এবং ব্যাপারটি সম্পর্কে হুজুরকে অবহিত করিলাম। ইহা শুনিয়া হুজুর (ছঃ) অঙ্গুলি দ্বারা স্বীয় জবানের প্রতি ইঙ্গীত করিয়া বলিলেনঃ তুমি লিখিতে থাক। জানিয়া রাখ যে, যে-পাক জাতের হস্তে আমার প্রাণ রহিয়াছে তাহার কছম, এ মুখ দিয়া কোন অবস্থায়ই না-হক কথা বাহির হয় না।‘-দারেমী-১-১৬৭ পৃঃ

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) যে হাদীছ লিখিতেন ইহার সমর্থন হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর কথায়ও পাওয়া যায়। হযরত আবু হুরায়রা বলেনঃ

(আরবী*************************************************)

‘আবদুল্লাহ ইবনে আমর ব্যতীত রছুলুল্লাহ (ছঃ) এর কোন ছাহাবীই আমার অপেক্ষা অধিক হাদীছ অবগত নহেন। কেননা, তিনি লিখিতেন, আর আমি লিখিতাম না।‘——বোখারী

হজরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তাহার এই লেখা খাতাটির নাম রাখিয়াছিলেন ‘ছহীফায়ে ছাদেকাহ’ তিনি এ প্রসংগে একবার বলিয়াছিলেনঃ

(আরবী****************************************************)

‘দুইটি জিনিসের উৎসাহ না থাকিলে আমার দুনিয়ায় বাচিয়া থাকার কোন স্বাদ ছিল না। ইহার একটি হইতাছে ‘ছাদেকাহ’ আর অপরটি হইতেছে ‘ওহাজ’। ‘ছাদেকায়’ আমি রছুলুল্লাহর হাদীছ লিখিয়াছি। আর ‘ওহাজ’ একখণ্ড ভূমি যাহা আমার পিতা আমারকে দান করা হইয়াছিল এবং তিনি উহা তত্ত্বাবধান করিতেন।‘

 –দারেমী-১-১২৭ পৃঃ

এখানে ইহাও উল্লেখযোগ্য যে, ইমাম আহমদ (রাঃ) এই পূর্ণ ছহীফাটিকে তাহার ‘মোছনাদের’ অন্তরর্ভূক্ত করিয়াছেন।

২। হজরত আলী (রাঃ)-ও রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর কিছুসংখ্যক হাদীীছ লিখিয়া লইয়াছিলেন।

তাবেয়ী আবু জোহাফা (রাঃ) বলেনঃ

(আরবী******************************************************)

‘আমি হজরত আলী ইবনে আবুতালেব (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করিলামঃ কোরআন ব্যতীত রছুলুল্লাহ (ছঃ) এর পক্ষ হইতে আপনার নিকট আর জিনিস আছে কি? তিনি উত্তর করিলেনঃ কোনআন বুঝিবার ‘সমঝ’-যাহা আল্লাহ তাহার বান্দাদিগকে দান করেন এবং এই ছহীফায় যাহা আছে তাহা ব্যতীত আমার নিকট আর কিছূই নাই।‘

                                                                                      মোখতাছার জামে’ ৩৬ পৃঃ ও মেশকাত

৩। হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) তাহার এই হাদীছসমুহ লিখিয়া লইয়াছিলেন। [পরবর্তী অধ্যায়ে দ্রষ্টব্য।]

৪। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাছউদ (রাঃ) ও রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর কিছূসংখ্যক হাদীছ লিখিয়া লইয়াছিলেন। তাবেয়ী হজরত মা’আন বলেনঃ

(আরবী***********************************)

‘হজরত আবদুল্লাহর পুত্র আবদুর রহমান (রাঃ) আমার নিকট একটি কিতাব বাহির করিয়া আনিলেন এবং শপথ করিয়া বলিলেন যে, ইহা তাহার পিতার নিজ হাতেরই লেখা।‘

                                                                                                      মোখতাছার জামে’ ৩৭ পৃঃ

৫। হজরত আনাছ (রাঃ) ও কিছু হাদীছ লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়। হাকেমের ‘মুস্তাদরাকে’ রহিয়াছেঃ

(আরবী**********************************************)

‘হজরত ছাঈদ বিন হেলাল বলেনঃ আমরা যখন হজরত আনাছ ইবনে মালেককে অধিক পীড়াপীড়ি করিলাম তখন তিনি আমাদের নিকট একটি চোঙ্গা বাহির করিয়া আনিলেন এবং বলিলেন যে, ইহা আমি রছুলুল্লা ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম এর নিকট শুনিয়াছি এবং লিখিয়া লইয়াছি। অধিকন্ত্ত আমি ইহা রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লামকে দেখাইয়া মঞ্জুরীও লাভ করিয়াছি’ –তাদবীনে হাদীছ ৬৭ পৃঃ

৬। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু আওফা (রাঃ) ও রছূলুল্লাহ (ছঃ) এর কিছু হাদীছ লিখিয়া লইয়াছিলেন বলিয়া বোখারী শরীফের একটি হাদীছ হইতে জানা যায়।–বোখারী

৭। হজরত ছামুরাহ ইবনে জুনদুব (রাঃ) ও কিছু হাদীছ লিখিয়াছিলেনঃ হাফজ ইবনে হাজার তাহার ‘তাহজীবে’ ছুলাইমান ইবনে ছামুরার জীবনী আলোচনা করিতে যাইয়া বলিয়াছেনঃ

(আরবী************************************)

‘তিনি তাহার পিতার নিকট হইতে একটি বিরাট নোছখা (কপি) রেওয়াত করিয়াছেন।‘

                                                                              তাহজীব-৪-১৯৮ পৃঃ, তাদবীনে হাদীছ ৭২ পৃঃ

৮। মশহুর ছাহাবী খাজরাজ নেতা হজরত ছা’দ ইবনে উবাদার নিকটও একটি ‘ছহীফা’ ছিল বলিয়া ‘তিরমিজী’ শরীফের হাদীছ হইতে বোঝা যায়। হজরত ছা’দের পুত্র ইহা হইতে কোন কোন হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। —তাদবীনে হাদীছ ৭২ পৃঃ

৯। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ (রাঃ) ও হাদীছ লিখিয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়।তিরমিজী শরীফে হজরত আবদুল্লাহর শাগরিক ইকরামাহ হইতে বর্ণিত আছে যে, তায়েফের কতক লোক আসিয়া তাহার কিতাবসমুহ নকল করিতে চাহিলে তিনি উহা তাহাদের নিকট ‘ইমলা’ করেন (লেখার জন্য পড়িয়া শোনান)।

এছাড়া আবু দাঊদ শরীফে আছেঃ হজরত ইবনে আবি মলাইকা বলেন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ আমার নিকট এই হাদীছটি লিখিয়া পাঠাইছিলেন—রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম বলেনঃ ‘মোকদ্দামায় বিবাদীকেই হলফ করাইতে হইবে’।

                                                                                                          আবু দাউদ-২/১৫৪ পৃঃ

দারেমী প্রভৃতিতে ইহাও রহিয়াছে  যে, ইবনে আব্বাছ (রাঃ) তাঁহার এন্তেকালের সময় প্রায় এক উটের বোঝাই পরিমাণ কিতাব রাখিয়া গিয়াছিলেন। -ছহীফায়ে হাম্মাম-৪০ পৃঃ

১০। হজরত মুগীরা ইবনে শো’বা হজরত মুআবিয়ার অনুরোধে তাঁহার কিছু হাদীছ লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন। বোখারী শরীফের একটি হাদীছ হইতে ইহা জানা যায়।–

(আরবী*********) –ছহীফায়ে হাম্মাম ৪২ পৃঃ

১১। ছাহাবী হজরত আবু বাকরাহ (রাঃ) তাঁহার নিকট একটি হাদীছ লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন। আবু দাঊদ শরীফে (আরবী***************) ইহার উল্লেখ রহিয়াছে। হজরত আবু বাকরাহর পুত্র আবুদর রহমান বলেনঃ ‘আমার পিতা আমার নিকট লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন যে, রছুলুল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম বলিয়াছিলেনঃ ‘কোব বিচারক যেন রাগন্বিত অবস্থায় বিচার না করেন’। -ছহীফায়ে হাম্মাম ৪২ পৃঃ

১২। হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) রছুলুল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর সময়ে হাদীছ না লিখিলেও রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর ওফাতের পর যে তাঁহার নিকট শ্রুত হাদীছসমূহ তিনি লিখিয়া বা লেখাইয়া লইয়াছিলেন তাহার উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁহার শাগরিদ হাছান ইবনে আমর জামরী বলেনঃ

(আরবী***********************************)

‘হজরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-এর নিকক আমি একটি হাদীছ বর্ণনা করিলাম, কিন্তু তিনি উহা চিনিতে পারিলেন না। আমি বলিলামঃ হুজুর! ইহা আমি আপনার নিকটই শুনিয়াছি’। ইহা শুনিয়া তিনি বলিলেনঃ ‘যদি আমার নিকটই শুনিয়া থাক তাহা হইলে উহা আমার নিকট কিতাবে লেখা রহিয়াছে’। এই বলিয়া তিনি আমার হাত ধরিয়া তাঁহার ঘরে লইয়া গেলেন এবং আমাকে রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর হাদীছ লেখা অনেক কিতাব (খাতা) দেখাইলেন, উহাতে এই হাদীছটিও পাওয়া গেল। অতঃপর তিনি বলিলেনঃ আমি কি তোমাকে বলি নাই যে, যদি উহা আমিই বলিয়া থাকি তাহা হইলে উহা আমার নিকট কিতাবে লেখা রহিয়াছে? [এরূপ ভুলিয়া যাওয়ার ব্যাপার তাঁহার বৃদ্ধাবস্থায়ই ঘটিয়াছিল্য।] –জামে’ বয়ানুল এলম, তাদবীনে হাদীছ-৬৪ পৃঃ

১৩। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) নিজে হাদীছ লিখিয়াছিলেন বলিয়া প্রমাণ পাওয়া না গেলেও তিনি যে তাঁহার শাগরিদদিগকে লেখাইয়া দিয়াছিলেন তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। ‘তাবাকাতে ইবনে ছা’দ’-এ রহিয়াছেঃ হজরত ছালমান ইবনে মূছা বলেন, আমি দেখিয়াছি যে, হজরত ইবনে ওমর তাঁহার শাগরিদ নাফে’কে ইমলা করিতেছেন আর নাফে’ উহা লিখিয়া লইতেছেন। -ছহীফায়ে হাম্মাম ৪০ পৃঃ

১৪। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ (রাঃ) তাঁহার শাগরিদ ছাঈদ জুবায়রকে হাদীছ লেখাইয়া দিয়াছিলেন। দারেমী ও ‘তাবাকাতে ইবনে ছা’দ’ হইতে ইহা জানা যায়।

এছাড়া অন্য কোন ছাহাবী যে হাদীছ লেখেন নাই এমন কথা বলা চলে না। অনুসন্ধান কার্য চালাইয়া গেলে আরো কোন ছাহাবীর হাদীছ লেখার কথাও জানা যাইতে পারে। হজরত আবুল্লাহ ইবনে আমরের (রাঃ) একটি হইতে বোঝা যায় যে, অনেক ছাহাবীই হাদীছ লিখিয়াছিলেন। ‘তবরানীতে’ রহিয়াছেঃ [আরবী*****************************]

‘হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেনঃ এক সময় ছাহাবীদের মধ্য হইতে কতক লোক রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর নিকট ছিলেন এবং আমিও তাঁহাদের সহিত ছিলাম। আর আমি তাঁহাদের মধ্যে সকলের ছোট ছিলাম। তখন নবী করীম (ছঃ) বলিলেনঃ

‘যে ব্যক্তি ইচ্ছা করিয়া আমার নামে মিথ্যা কথা বলিবে সে যেন তাহার স্থান দোজখে ঠিক করিয়া লয়’। অতঃপর সকলে যখন হুজুরের নিকট বাহির হইয়া আসিলেন আমি তাঁহাদেরে বলিলামঃ ‘আপনারা কিরূপে রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম যাহা বলিলেন তাহা তো আপনারা শুনিলেন’। আমার কথা শুনিয়া তাঁহারা হাসিয়া বলিলেনঃ প্রিয় বৎস! আমরা যাহা কিছু শুনিয়াছি তাহা আমাদের নিকট লিখিতভাবে রক্ষিত আছে। (সুতরাং ভুল হইবার আশংকা নাই।)’ –তাদবীনে হাদীছ ২৪৭ পৃঃ

প্রবীণ তাবেয়ীদের হাদীছ লেখন

অনুসন্ধানে জানা যায়, কিছুসংখ্যক প্রবীণ তাবেয়ীও তাঁহাদের ওস্তাদ ছাহাবীগণের সম্মুখেই তাঁহাদের হাদীছ লিখিয়া লইয়াছিলেন। সুতরাং ইহাও প্রথম শতাব্দীতেই সম্পাদিত হইয়াছিল। ছাহাবীগণ প্রথম শতাব্দী পর্যন্তই জীবিত ছিলেন।

১। হজরত বশীর ইবনে নাহীক তাঁহার উস্তাদ হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর নিকট শ্রুত হাদীছসমূহ লিখিয়া লইয়াছিলেন এবং তাঁহার নিকট হইতে উহার বিশুদ্ধতার স্বীকৃতিও আদায় করিয়াছিলেন। দারেমীতে আছেঃ (আরবীঃঃঃঃঃঃঃঃ)

‘হজরত বশীর ইবনে নাহীক বলেনঃ আমি হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর নিকট যে সকল হাদীছ শুনিতাম তাহা লিখিয়া লইতাম। যখন আমি তাঁহার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিতে ইচ্ছা করিলাম তখন সে সকল লেখা তাঁহার নিকট হাজির করিলাম। অতঃপর আমি উহা তাঁহাকে পড়িয়া শুনাইলাম এবং বলিলামঃ আমি আপনার নিটক যাহা শুনিয়াছি তাহা এই। শুনিয়া তিনি বলিলেন হাঁ, ঠিক আছে’। -দারেমী-১/১২৭ পৃঃ

২। হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) এই পূর্ণ ছহীফাটিকে তাঁহার মোছনাদের অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইয়াছেন। হালে বার্লিন ও দেমাস্কে ইহার দুইটি প্রাচীণ কপি পাওয়া গিয়াছে। ডঃ হামীদুল্লাহ কর্তৃক উহা সম্পাদিত হইয়া (উর্দু তরজমাসহ) লাহোর হইতে প্রকাশিত হইয়াছে এবং সকল সন্দেহের অবসান ঘটাইয়াছে। ইহাতে মোট ১৩৮টি হাদীছ লিখিয়া লন নাই এমন কথা বলা যায় না।

৩। প্রসিদ্ধ তাবেয়ী হজরত ছাঈদ ইবনে জুবায়র (মৃঃ ৯৫ হিঃ) তাঁহার ওস্তাদ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর এবং হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ (রাঃ)-এর কিছু হাদীছ লিখিয়া লইয়াছিলেন। দারেমীতে আছেঃ (আরবী*********************)

‘হজরত ছাঈদ বলেনঃ আমি রাত্রে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর এবং আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছের নিকট হাদীছ শুনিতাম এবং উহা উটের কাঠে লিখিয়া লইতাম।‘ অপর এক সূত্রে জানা  যায় যে,হজরত ছাইদ (রঃ) খলিফা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ানের আদেশে একটি তফছীর লিখিয়াছেন। সম্ভবতঃ উহা তাঁহার ওস্তাদ ছাহাবীদ্ধয়ের নিকট তফছীর সম্পর্কে শ্রুত হাদীছসমূহেরই সমষ্টি। [জাহাবীর মীজানে আতা ইবনে দীরারের জীবনী দ্রষ্টব্য]

৪। তাবেয়ী হজরত আবু আস্তারা (রঃ) তাঁহার ওস্তাদ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছের কিছু হাদীছ লিখিয়া লইয়াছিলেন। দারেমীতে আছেঃ

(আরবী*********************)

হজরত আবু আন্তারা (রঃ) বলেনঃ একবার হজরত ইবনে আব্বাছ (রাঃ) আমাকে একটি হাদীছ বর্ণনা করিলেন। আমি বলিলামঃ হুজুর! আমি কি ইহা আপনার নাম করিয়া লিখিয়া লইতে পারি? অতঃপর আবু আন্তারা বলেনঃ তিনি আমাকে উহা লিখার অনুমতি দিলেন বটে কিন্তু তিনি যেন তাহা দিতে চাহিতে ছিলেন না। -দারিমী-১/১২৮ পৃঃ

৫। হজরত ওরওয়াহ ইবনে জুবায়ার (রাঃ)  তাঁহার খালা হজরত আয়েশা ছিদ্দীকা (রাঃ) –এর নিকট শ্রুত  হাদীছসমূহ লিখিয়াছিলেন, কিন্তু কোন কারণে তিনি উহা ‘হাররার’অগ্নিকাণ্ডে নিজেই জ্বালাইয়া দেন। অবশ্য পরে তিনি উহার জন্য আক্ষেপ করেন এবং বলেনঃ (আরবী*****************)

‘আহা, আমি যদি আমার সমস্ত মাল-সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের বিনিময়েও উহা রক্ষা করিতাম’। -তাহজীব-৭/১৮২ পৃঃ

৬। তারেয়ী হজরত আবান ইবনে ছালেহ (মৃঃ ১১৫ হিঃ) তাঁহার ওস্তাদ হজরত আনাছ ইবনে মালেক (রাঃ)-এর কিছু হাদীছ লিখিয়া লইয়াছিলেন। ছালেমাহ আলাবী বলেন-

(আরবী********************)

‘আমি আবানকে হজরত আনাছ (রাঃ)-এর নিকট ফলকে লিখিতে দেখিয়াছি’। -দারেমী-১/১২৭ পৃঃ

এছাড়া হজরত আনাছ তাঁহার সন্তানদিগকেও হাদীছ লেখার জন্য তাকীদ করিতেন। তাঁহার পৌত্র ছামামা ইবনে আবদুল্লাহ বলেনঃ (আরবী********************)

‘আমার দাদা হজরত আনাছ (রাঃ) তাঁহার সন্তাতদের বলিতেনঃ ‘বাবারা’ তোমরা এই এলম (হাদীছ)-কে লেখায় আবদ্ধ কর’। -দারেমী-১/১২৬ পৃঃ

৭। তাবেয়ী হজরত ওহাব ইবনে মুনাব্বেহ (রঃ) তাঁহার ওস্তাদ হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর নিকট শ্রুত হাদীছসমূহ লিখিয়া লইয়াছিলেন।–তাদবীনে হাদীছ

৮। তাবেয়ী ছালমান ইবনে কায়ছ ইয়াস্কুরী (রঃ) তাঁহার ওস্তাদ হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রঃ)-এর নিকট শ্রুত হাদীছসমূহ লিখিয়া লইয়াছিলেন। ইহা ‘ছহীফায়ে জাবের’ নামে প্রসিদ্ধ। ইমাম শা’বী (রঃ) এবং হজরত ছুফইয়ান ছওরী (রঃ) ইহা ছালমানের নিকট ছবক হিসাবে পড়িয়াছিলেন। -[তাদবীনে হাদীছ ৬৮ পৃঃ] ইমাম আহদম ইবনে হাম্বল (রঃ) হজরত কাতাদা (রঃ)-এর স্মরণশক্তির তারীফ করিতে যাইয়া বলেনঃ (আরবী********************)

‘তাঁহার নিকট একবারমাত্র ‘ছহীফায়ে জাবের’ পড়া হইলে তিনি উহা হেফজ করিয়া লন’। -তাজকেরাতুল  হোফফাজ-১/১০৪ পৃঃ

৯। হজরত আবু বোরাদা বলেনঃ (আরবী********************)

‘আমি আমার পিতা হজরত আবু মূছা আশয়ারী (রাঃ)-এর নিকট যখন কোন হাদীছ শুনিতাম তখন উহা লিখিয়া লইতাম। একবার তিনি বলিলেনঃ বাবা! তুমি কি করিতেছ? আমি বলিলামঃ আমি যাহা আপনার নিকট শুনিতেছি লিখিয়া লইতেছি। তিনি বলিলেনঃ দেখি, আমার নিকট আন। অতঃপর আমি উহা তাঁহাকে পড়িয়া শুনাইলাম। শুনিয়া তিনি বলিলেনঃ হাঁ, ঠিক হইয়াছে; আমি রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর নিকট এইরূপই শুনিয়াছি। আশংকা হয়, পাছে বেশ কম না হইয়া যায়, তাই দেখিলাম’। -মাজমাউজ জাওয়ায়েদ-১/১৫১ পৃঃ

১০। ইমাম মালেক (রঃ)-এর ওস্তাদ, বিখ্যাত তাবেয়ী হজরত নাফে’ তাঁহার ওস্তাদ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমরের (রাঃ) হাদীছ লিখিয়াছেন বলিয়া জানা যায়। ‘তাবাকাতে ইবনে ছা’দে রহিয়াছেঃ হজরত ছালমান ইবনে মূছা (রঃ) বলেনঃ ‘আমি দেখিয়াছি হজরত ইবনে ওমর (রাঃ) তাঁহার শাগরিতদ নাফে’কে হাদীছ বলিতেছেন এবং নাফে উহা লিখিয়া লইতেছেন। -ছহীফায়ে হাম্মাম-৪০ পৃঃ

১১। ইমাম মুজাহিদ ইবনে জাবর (১০৪ হিঃ) তাঁহার ওস্তাদ হজরত ইবনে আব্বাছের (রাঃ) নিকট শ্রুত হাদীছসমূহ লিখিয়া লইয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়।

১২। হজরত ওমর ফারূকের (রাঃ) পৌত্র, প্রসিদ্ধ তাবেয়ী হজরত ছালেম ইবনে আবদুল্লাহ (রঃ)-ও হাদীছ লিখিয়াছিলেন। তাঁহার ও ইমাম নাখায়ীর শাগরিদ মানছুর বলেনঃ ‘শেষ বয়সে ইমাম নাখায়ীর স্মরণশক্তি হ্রাস পায় এংব তাঁহার বর্ণনায় হাদীছের কোন কোন অংশ বাদ পড়িতে থাকে। একদা আমি তাঁহাকে বলিলামঃ ‘এ হাদীছকে তো হজরত ছালেম এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন’ তখন হজরত নাখায়ী বলিলেনঃ ‘ছালেম হাদীছ লিখিত আর আমি লিখিতাম না। (তাই তিনি কিতাব দেখিয়া উহা পূর্ণরূপে ইয়াদ রাখিয়াছেন।) –জামে বয়ানুল এলম-৩৩ পৃঃ

১৩। স্বনামখ্যাত ইমাম হজরত হাছান বছরী (রঃ)-ও হাদীছ লিখিয়াছিলেন। হজরত আ’মাশ বলেনঃ ‘হাছান বছরী বলিয়াছেন, আমার নিকট হাদীছ লিখিত কিতাবসমূহ রহিয়াছে; আমি ইহা বরাবর দেখিয়া থাকি’। -জামে’ ৩৩ পৃঃ

হাদীছ লিখিতে নিষেধ ও তাহার কারণ

(ক)

উপরের সুদীর্ঘ আলোচনা হইতে নিঃসন্দেহে বুঝা গেল যে, রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম তাঁহার উম্মতীগণকে হাদীছ লিখিতে অনুমতি দিয়াছিলেন এবং তাঁহার ছাহাবীগণ সম্যক না হইলেও তাঁহার অনেক হাদীছই লিখিয়া লইয়াছিলেন, কিন্তু, ‘মোছলেম শরীফ’ ও ‘মোছনাদে আহমদে’ এরূপ হাদীছ রহিয়াছে যাহা হইতে বুঝা যায় যে, রছুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর হাদীছ লেখার ব্যাপারে তাঁহার অনুমতি ছিল না; বরং তিনি এইরূপ করিতে নিষেধই করিয়াছিলেন। মোছলেম শরীফে রহিয়াছেঃ (আরবী********************)

‘আমার নিকট হইতে কোরআন ব্যতীত তোমরা অন্য কিছু লিখিবে না। যে ব্যক্তি আমার নিকট হইতে কোরআন ব্যতীত অন্য কিছু লিখিয়াছে সে যেন উহা মুছিয়া ফেলে’। -মোছলেম, মোকাদ্দমা ১৮৮ পৃঃ

মোছনাদেত আহমদে রহিয়াছেঃ হজরত আবু ছাঈদ খুদরী বলেনঃ (আরবী********************)

‘আমরা রছুলুল্লাহ (ছঃ)-এর নিকট বসিয়া যাহা শুনিতাম তাহা লিখিয়া লইতাম। এই অবস্থায় একদিন হুজুর (ছঃ) আমাদের নিকট উপনীত হইলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেনঃ ‘তোমরা ইহা কি লিখিতেছ?’ আমরা বলিলামঃ ‘যাহা আমরা আপনার নিকট শুনিতেছি তাহাই লিখিতেছি’। ইহা শুনিয়া রছুলুল্লাহ (ছঃ) বলিলেনঃ আল্লাহর কিতাবের সহিত আবার কিতাব? আল্লাহর কিতাবকে অমিশ্র রাখ। অতঃপর (আবু ছাঈদ খুদরী রাঃ বলেন,) ইহা শুনিয়া আমরা যাহা লিখিয়াছিলাম তাহা এক জায়গায় করিলাম এবং সমস্ত জ্বালাইয়া দিলাম। তারপর জিজ্ঞাসা করিলামঃ হুজুর! আমরা কি আপনার হাদীছ মুখে বর্ণনা করিতে পারি?’ হুজুর (ছঃ) বলিলেনঃ হাঁ, মুখে বর্ণনা করিতে পার। ইহাতে কোন আপত্তি নাই। তবে মনে রাখিও, যে ব্যক্তি ইচ্ছা করিয়া আমার নামে মিথ্যা কথা বলিবে সে যেন তাহার স্থান দোজখে তৈয়ার করিয়া লয়’। -মাজমাউজ জাওয়ায়েদ-১/১৫০ পৃঃ

আমাদের মোহাদ্দেছগণ এই উভয় প্রকার বর্ণনার (পক্ষীয় ও বিপক্ষীয়) নিম্নরূপ মীমাংসা করিয়াছেন। হাফেজ ইবনে হাজার বলেনঃ  মোছলেম শরীফের হাদীছটিকে যদি রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর হাদীছ বলিয়া স্বীকারও করা যায় তাহা হইলেও উভয় প্রকার হাদীছের মধ্যে বাস্তবে কোন বিরোধ নাই। কারণ-

(আরবী********************)

১। ‘যাহাতে কোরআন ও হাদীছ মিশ্রিত হইয়া বিভ্রান্তির সৃষ্টি না করে, সে জন্য যখন কোরআন নাজিল হইতেছিল (এবং নিয়মিতভাবে লেখা হইতেছিল) তখন উহা (শুধু তখনকার জন্য) নিষেধ করা হইয়াছিল। এতদ্ব্যতীত অপর সময়ের জন্য অনুমতি ছিল।

২। ইহাও হইতে পারে যে, হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম তাঁহার হাদীছকে কোরআন এর সহিত একই সাথে লিখিতে নিষেধ করিয়াছিলেন। ভিন্নভাবে লিখিতে তাঁহার কোন আপত্তি ছিল না। অথবা-

৩। ইহাও হইতে পারে যে, নিষেধ প্রথমে করা হইয়াছিল পরে উহা রহিত করা হইয়াছে এবং লেখার অনুমতি দেওয়া হইয়াছে। আমার মতে প্রথম দুই কথা হইতে ইহাই উত্তম।

৪। আবার কেহ কেহ (যথা –ইবনে আবদুল বার) ইহাও বলিয়াছেন যে, লেখার নিষেধ করার আশংকা ছিল। আর অনুমতি সে সকল লোকের জন্য ছিল যাহাদের পক্ষে এরূপ আশংকা ছিল না।

৫। এতদ্বতীত ইমাম বোখারী প্রমুখ ইমামগণের মতে আবু ছাঈদ খুদরী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত (প্রথম) হাদীছটি রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর হাদীছই নহে; উহা স্বয়ং আবু ছাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর উক্তি’। [অন্য কথায় ইহা হাদীছে মাওকুফ।] –ফাতহুল বারী-১/১৬৮ পৃঃ

ইমাম ইবনুছ ছালাহ বলেনঃ (আরবী********************)

১। ‘লেখার অনুমতি সম্ভবতঃ হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম সে সকল লোকের জন্যই দিয়াছিলেন যাহাদের পক্ষে ভুলিয়া যাওয়ার আশংকা ছিল এবং নিষেধ সে সকল লোকের পক্ষে ছিল যাহাদের স্মরণশক্তির উপর ভরসা করা যাইত –যাহাতে তাহারা লেখার উপর নির্ভর করিয়া স্মরণশক্তি হারাইয়া না ফেলে। অথবা-

২। হুজুর (ছঃ) হাদীছ লেখার নিষেধ সে সময়ের জন্য করিয়াছিলেন যে সময় উহার কোরআনের ছহীফার সহিত মিলিয়া যাইবার আশংকা ছিল’। -মোকাদ্দমা ১৮৮ পৃঃ

এছাড়া ইহাও হইতে পারে যে, হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম সম্যকভাবে ও নিয়মিতভাবে তাঁহার হাদীছ লিখিতে নিষেধ করিয়াছিলেন। কারণ, তিনি তাঁহার পয়গম্বরী দূরদৃষ্টিতে দেখিতে পাইয়াছিলেন যে, যদি তাঁহার জমানায় তাঁহার হাদীছসমূহ কোরআনের ন্যায় সম্যকভাবে এবং সমান গুরুত্ব সহকারে কিতাবে লেখা হয় তাহা হইলে পরবর্তী সময়ে উম্মতীগণ উহাকে কোরআনের মর্যাদাই দান করিবে। হজরত রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর বাক্য (আরবী********************)

 (আল্লাহর কিতাবের সহিত আবার অন্য কিতাব?) –হইতেও ইহাই  বোঝা যায়। মাওলানা মানাজের আহছান গিলানী তাঁহার ‘তাদবীনে হাদীছ’ নামক কিতাবে ইহার উপরই অধিক জোর দিয়াছেন।

(খ)

১। হজরত ওরওয়াহ ইবনে জোবাইর (রঃ) বলেনঃ (আরবী********************)

একবার হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) রছূলুল্লাহ (দঃ)-এর ছুন্নাহ লিখিতে ইচ্ছা করিলেন এবং এ ব্যাপারে অন্যান্য ছাহাবীগণের মতামত জানিতে চাহিলেন। তাঁহারা সকলেই লেখার পক্ষে মত প্রকাশ করিলেন, তথাটি তিনি এক মাস যাবৎ আল্লাহর নিকট ইহার ভাল-মন্দের জ্ঞান দানের জন্য দো’আ (এস্তেখারা) করিতে রহিলেন, ফলে আল্লাহ তা’আলা তাঁহাকে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছিতে তৌফিক দিলেন। অতঃপর একদিন তিনি সকালে উঠিয়া বলিলেনঃ

অবশ্য আমি ছূন্নাহ লিখিতে ইচ্ছা করিয়াছিলাম, কিন্তু তোমাদের পূর্বেকার যুগের এমন একটি জাতির কথা স্মরণ হইল, যাহারা নিজেরা কিতাবসমূহ লিখিয়অ সে সকলের প্রতিই ঝুঁকিয়া পড়িয়াছিল, অবশেষে আল্লাহর কিতাবকে ত্যাগ করিয়া বসিয়াছিল। অতএব, খোদার কছম, আমি আল্লাহর কিতাবকে অপর কিছুর সহিত মিশ্রিত করিব না’। -জামে’ ৩৩ পৃঃ

২। হজরত আলী মোরতাজা (রাঃ) একবার তাঁহার ওয়াজে বলিয়াছিলেনঃ (আরবী********************)

‘যাহাদের নিকট কোন লিখিত বিষয় রহিয়াছে তাহাদিগকে আমি আল্লাহর কছম দিয়া বলিতেছিঃ তাহারা বাড়ী ফিরিয়া যেন উহা মুছিয়া ফেলে। কেননা ইহার পূর্বে লোক এ কারণেই হালাক হইয়াছে যে, তাহাদের পণ্ডিত, পুরোহিতদের কথার তাবেদারীতে তাহারা আল্লাহর কিতাবকে ত্যাগ করিয়াছিল’। -জামে’ ২৩ পৃঃ

৩। হজরত আবুল্লাহ ইবনে আব্বাছ (রাঃ) বলেনঃ (আরবী********************)

‘আমরা (নিজেরা) হাদীছ লিখি না এবং (অপরকে) লেখাইও না’। -জামে’ ৩৩ পৃঃ

৪। হজরত আবু নুজরা (রঃ) বলেনঃ আমি হজরত আবু ছাঈদ খুদরীকে জিজ্ঞাসা করিলামঃ (আরবী********************)

‘আপনি কি আমাদিগকে লেখাইয়া দিবেন না? কেননা, আমরা সুখস্থ রাখিতে পারি না। তিনি উত্তর করিলেনঃ না, আমি কখনো তোমাদের লেখাইব না এবং উহাকে কোরআনে পরিণত করিব না। আমরা যেভাবে রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর নিকট হইতে হেফজ করিয়া রাখিয়াছি, তোমরাও সেভাবে হেফজ করিয়া রাখিবে’। -দারেমী-১/১২২ পৃঃ

এরূপে তাবেয়ীনদের মধ্যে ইমাম জোহরী, শা’বী, নাখায়ী, কাতাদা প্রমুখ ইমামগণ হাদীছ লেখার পক্ষে ছিলেন না বলিয়া কোন কোন রেওয়ায়তে দেখিতে পাওয়া যায়।

ইমাম ইবনে আবদুল বার এ সকল বিষয়ের উল্লেক করিয়া তদুত্তরে বলেনঃ এলম (এলমে হাদীছ) লেখা যাঁহারা অপছন্দ করিয়াছেন, তাঁহারা দুই কারণে এরূপ করিয়াছেন। -(১) কোন লেখাকে যেন কোরআনের সমমর্যাদা দান করা না হয় এবং (২) লেখার উপর নির্ভর করিয়া আরবরা যেন তাহাদের স্মরণশক্তি হারাইয়া না ফেলে। এখানে যাঁহাদের কথা বলা হইয়াছে তাঁহারা সকলেই ছিলেন আরব –স্মরণশক্তি ছিল তাঁহাদের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। তাঁহারা তাঁহাদের এ প্রকৃতির কথাই বলিয়াছেন। প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক ও ব্যাকরণবিদ খলীল বলেনঃ (আরবী********************)

‘কাগজ যাহা রক্ষা করিয়াছে, তাহা জ্ঞান নহে –অন্তর যাহা রক্ষা করিয়াছে তাহাই জ্ঞান’। এক বেদুইন কবি বলেন- (আরবী********************)

‘(মানুষ) জ্ঞানকে কাগজে আমানত রাখিয়া নষ্ট করিয়া দিয়াছে। কাগজ জ্ঞানের জন্য কেমন অপপাত্র’।

অতঃপর ইবনে আবদুল বার হজরত ইবনে আব্বাছ (রাঃ), শা’বী, জোহরী, নাখায়ী ও কাতাদা প্রমুখের স্মরণশক্তির কথা উল্লেখ করিয়া বলেনঃ তাঁহারা একবার যাহা শুনিতেন, তাহা কখনো ভুলিতেন না। হজরত ইবনে আব্বাছ (রাঃ) ওমর ইবনে রবীয়ার একটি সুদীর্ঘ কবিতা একবার মাত্র শুনিয়া মুখস্থ করিয়া ফেলেন। ইবনে শেহাব জোহরী বাজে কথা কানে আসিয়া ইয়াদ হইয়া যাওয়ার ভয়ে রাস্তায় চলিতে কানে আংগুল দিয়া রাখিতেন। শা’বী বলেনঃ আমি জীবনে কখনো কোন ওস্তাদকে কোন হাদীছ পুনঃ বলিতে অনুরোধ করি নাই। -জামে’ বয়ানুল এলম ৩১ পৃঃ

৫। হাকেম আবু আবদুল্লাহ বর্ণনা করিয়াছেনঃ (আরবী********************)

‘হজরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমার পিতা (হজরত আবু বকর [রাঃ]) রছূলুল্লাহ (ছঃ)-এর পাঁচ শত হাদীছ লিখিয়া লইয়াছিলেন। অতঃপর তিনি এক রাত্রে খুব অস্থিরতা প্রকাশ করিতে লাগিলেন। ইহাতে আমি চিন্তিত হইয়া পড়িলাম এবং জিজ্ঞাসা করিলামঃ আব্বাজান! আপনি এরূপ করিতেছেন কেন? কোনরূপ শারীরিক অসুবিধা দেখা দিয়াছে, না কোন দিক হইতে কোন দুঃসংবাদ আসিয়াছে? (তিনি কোন উত্তর করিলেন না) যখন ভোর হইল, আমায় ডাকিয়া বলিলেনঃ ‘মা! তোমার নিকট যে হাদীছগুলি রাখা হইয়াছে, উহা আন দেখি’। আমি উহা উপস্থিত করিলাম। তিনি আগুন আনাইয়া উহা পুড়াইয়া ফেলিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলামঃ আব্বা! এরূপ করিলেন কেন? তিনি উত্তর করিলেনঃ ইহা ঘরে রাকিয়া আমি মরিতে চাহি না। কারণ, ইহাতে কতক অন্যের নিকট হইতে শোন হাদীছও রহিয়াছে, তাহার উপর বিশ্বাস ও নির্ভর করিয়া আমি উহা লিখিয়া লইয়াছি, কিন্তু এমনও তো হইতে পারে যে, তিনি যেরূপ বলিয়াছেন, বস্তুতঃ হাদীছ সেরূপ নহে’। (অর্থাৎ তিনি রছূলুল্লাহ [ছঃ]-এর কথা ঠিকভাবে বুঝিতে কারেন নাই বা উহা ঠিকভাবে ইয়াদ রাখিতে পারেন নাই।) –কানজুল উম্মাল-১/২৩৭ পৃঃ

হাফেজ জাহী তাঁহার তাজকেরাতুল হোফফাজে এই রেওয়ায়তের উল্লেখ করিয়া বলেন যে, (আরবী*********) ‘ইহা ছহীহ নহে’। -তাজকেরাহ-১/৫ পৃঃ

হাফেজ ইবনে কাছীর বলেন, ‘এই রেওয়ায়তের রাবী আলী ইবনে ছালেহর পরিচয় জানা যায় না’। (অর্থাৎ তিনি মোবহাম।) –কানজ-১/২৩৭ পৃঃ। আর মোহাদ্দেছগণের সর্ববাদিসম্মত মতে অ-ছাহাবী মোবহাম (অজ্ঞাত পরিচয়) ব্যক্তির রেওয়ায়ত গ্রহণযোগ্য নহে।

এক কথায় হাদীছ লেখা হইতে ইহাদের বিরত থাকার অর্থ এই নহে যে, হাদীছ লেখাকে তাঁহারা নাজায়েজ মনে করিতেন বা রছূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম-এর এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অমত রহিয়াছে বলিয়া জানিতেন। ব্যাপার যদি তাহাই হইত, তাহা হইলে হজরত ওমর ফারূকের পক্ষে ইহার জন্য পরামর্শ করার এবং ছাহাবায়ে কেরামের পক্ষে ইহার অনুকূল সম্মতি দেওয়ার কল্পনা করাও ছিল অসম্ভব; বরং ইহার বিপরীত আমরা ইহাও জানিতে পারিতেছি যে, হজরত ওমর ফারূক শেষের দিকে হাদীছ লেখার জন্য অন্য সকলকে তাকীদই করিয়াছিলেন। দারেমীতে রহিয়াছেঃ (আরবী********************)

‘আমর ইবনে আবু ছুফইয়ান বলেনঃ আমি হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাবকে বলিতে শুনিয়াছি; তিনি বলিতেনঃ (হাদীছকে) লিপিতে আবদ্ধ কর’। -দারেমী-১/১২৭ পৃঃ

এভাবে ইমাম ইবনে শেহাব জোহরী –যিনি প্রথমে হাদীছ লেখাকে অপছন্দ করিতেন, পরে তিনিই সামগ্রিকভাবে হাদীছ লেখার জন্য আগ্রহী হন।

‘‘জামে’ বয়ানুল এলমে’’  রহিয়াছেঃ জোহরী বলেন, আমরা (হাদীছ) লেখাকে অপছন্দ করিতাম; কর্তৃপক্ষ (খলীফা ওমর ইবনে আবদুল আজীজ) আমাদের এজন্য বাধ্য করেন। এখন আমি নিজেই মনে করিতেছি যে, হাদীছ লিখাতে কাহাকেও বাধা দেওয়া উচিত নহে।

এছাড়া তাবেয়ী হজরত জাহহাক বলিতেনঃ ‘যখন কিছু শুনিবে, লিখিয়া লইবে। লেকার জন্য কিছু না পাওয়া গেলে দেওয়ালের গায়ে হইলেও লিখিয়া লইবে’। -জামে’। হজরত ছাবেত ইবনে কোররাহ তো এ পর্যন্ত বলিতেন যে, যাহারা এলম (হাদীছ) লেখে না, তাহাদিগকে আলেমই মনে করিবে না। -জামে’। হজরত ছাঈদ ইবনে ইব্রাহীম বলেনঃ ‘হজরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (রঃ) আমাদিগকে হাদীছ লিখিতে আদেশ দেন। আমরা বহু কিতাব লিখিয়া লই। অতঃপর উহা তিনি রাজ্যের বিভিন্ন কেন্দ্রে পাঠাইয়া দেন’। -জামে’

এখানে একথা মনে রাখা আবশ্যক যে, এলম অর্থে তৎকালে হাদীছকেই বুঝাইত।

 

About মাওলানা নূর মোহাম্মদ আ’জমী (রঃ)