হাদীসের পরিচয়

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

হাদীসে কুদসী

হাদীসের ভেতর সবচেয়ে গুরুত্বের দাবীদার এই হাদিসে কুদসী। এ হাদীসের মূল বক্তব্য সরাসরি আল্লাহর তরফ থেকে প্রাপ্ত।কুদসী পদটি আরবী ‘কুদুস’ থেকে আগত,যার অরত্থ পবিত্রতা,মহানত্ম।

সংজ্ঞাঃ যে হাদীসের মূল কথা সরাসরি আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে এসেছে সেই হাদীসকেই ‘হাদীসে কুদসী’ বলে। আল্লাহ তা’য়ালা তার নবীকে ‘ইলহাম’ কিংবা স্বপ্ন যোগে এই মূল কথাগুলি জানিয়ে দিয়েছেন।

প্রখ্যাত হাদীস ব্যাখ্যাতা মুল্লা আলী আল-কারী ‘হাদীসে কুদসী’র সংজ্ঞা দান প্রসংগে বলেছেন-‘হাদীসে কুদসী’ সে সব হাদীস যা শ্রেষ্ঠ বর্ণনাকারী পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল পরম নির্ভরযোগ্য হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) আল্লাহর নিকট থেকে বর্ণনা করেন কখনো জিবরাইল (আঃ) এর মাধ্যমে জেনে কখনো সরাসরি অহী কিংবা ইলহাম বা স্বপ্ন যোগে লাভ করেন,যে কোন প্রকারের ভাষার সাহায্যে এটা প্রকাশ করার দায়িত্ব রাসূলের উপর অর্পিত হয়ে থাকে।“(হাদীস সংকলনের ইতিহাস পৃঃ৩৩)

এ সম্মন্ধে আল্লামা বাকী তার ‘কুল্লিয়াত’ গ্রন্থে লিখেছেন- ‘কোরআনের শব্দ,ভাষা,অর্থ,ভাব ও কথা সবই আল্লাহর নিকট থেকে সুস্পষ্ট ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ; আর ‘হাদীসে কুদসীর’র শব্দ ও ভাষা রাসূলের; কিন্তু উহার অর্থ,ভাব ও কথা,আল্লাহর নিকট হতে ইলহাম কিংবা স্বপ্ন যোগ প্রাপ্ত।“

এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারা গেল যে হাদিসে কুদসী ও কোরআনের মধ্যে পার্থক্য কি?? তবুও কিছু অস্পষ্টতা থেকে যাচ্ছে,ছকের সাহায্য নিলে মনে হয় আমাদের জন্যে বুঝতে সুবিধা হবে।

কোরআন ও হাদীসে কুদসীর পার্থক্য

কোরআন হাদীসে কুদসী
১। কোরআন মজীদ জীবরাইল(আঃ) এর ছাড়া নাযিল হয়নি এবং এর শব্দ ভাষা নিশ্চিত ভাবে ‘লওহে মাহফুজ’ থেকে অবতির্ণ। ১।হাদীসে কুদসীর মূল বক্তব্য মাধ্যম আল্লাহর নিকট থেকে ইলহাম কিংবা স্বপ্নযোগে প্রাপ্ত।কিন্তু ভাষা রাসূল(সঃ) এর নিজস্ব।
২।নামাজে কোরআন মাজীদ’ই শুধু পাঠ করা হয়। কোরআন ছাড়া নামাজ সহী হয় না। ২। নামাজে হাদীসে কুদসী পাঠ করা যায় না অর্থাৎ হাদীসে কুদসী পাঠে নামাজ হয় না।
৩। অপবিত্র অবস্থায় কোরআন স্পর্শ করা হারাম। ৩। হাদীসে কুদসী অপবিত্র ব্যক্তি,এমন কি হায়েয নিফাস সম্পন্না নারীও স্পর্শ করতে পারে।
৪।কোরআন মাজীদ মু’জিজা ৪। কিন্তু হাদিসে কুদসী মু’জিজা নয়।
৫। কোরআন অমান্য করলে কাফের হতে হয়। ৫।হাদিসে কুদসী অমান্য করলে কাফের হতে হয় না।
৬।কোরআন নাযিল হওয়ার জন্যে আল্লাহ ও রাসূলের মাঝখানে জীবরাঈলের মধ্যস্থা অপরিহার্য। ৬। হাদিসে কুদসির জন্য জীবরাঈলের মধ্যস্থা জরুরী নয়।

এতক্ষণে আলোচনায় আমরা বুঝতে পারলাম যে হাদিস প্রধানতঃ দু’ভাগে বিভক্ত-

১. হাদিসে নব্বী-রাসূলে করীম(সাঃ)-এর হাদিস।

২. হাদিসে ইলাহী- আল্লাহ-হাদিস,আর এই হাদিসকেই হাদিসে কুদসী বলে।

শায়খ মুহাম্মদ আল-ফারুকী হাদিসকে দু’ভাগে ভাগ করেছেন।তিনি লিখেছেন-

“হাদীসে কুদসী তাই,যা নবী করীম(সঃ) তার আল্লাহ তায়ালার তরফ হতে বর্ণনা করেন।আর যা সেরূপ করেন না, তা হাদিসে নব্বী।’’(হাদিস সংকলনের ইতিহাস পৃঃ ৩৬ )

ওহী

‘ওহী’ অর্থ ইশারা করা,কিছু লিখে পাঠানো, কোন কথা সহ লোক পাঠানো,গোপনে অপরের সাথে কথা বলা,অপরের অজ্ঞাতসারে কোন লোককে কিছু জানিয়ে দেয়া।

যারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন কেন্দ্রে হাদিস সংকলন ও গ্রন্থ প্রণয়নের কাজ করেছেন,তারা হচ্ছেন-মক্কা শরীফের ইবনে জুরাইজ(১৫০ হি.)- মদীনায়, ইবনে ইসহাক (১৫১ হি.), ইমাম মালেক (১৭৯ হি.), বসরায়- রুবাই ইবনে সুবাইহ (১৬০ হি.),সায়ীদ ইবনে আবু আরুবা(১৫৬ হি.),হাম্মাদ ইবনে সালমা(১৭৬ হি.), কুফায় – সুফিয়ান আস সওরী(১৬১ হি.), সিরিয়ায়- ইমাম আওজায়ী(১৫৬ হি.) এবং খোরাসানে- জরীর ইবনে আবদুল হামীদ(১৮৮ হি.), ও আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক(১৮১ হি.)।

হযরত উমর ইবনে আবদুল আজীজ ১০১ হিজরির ২৫ রজব ইন্তেকাল করেন। তিনি মাত্র হাদীস দু’বছর পাঁচ মাস খলিফা ছিলেন। ইমাম শা’বী,ইমাম জুহুরী,ইমাম মকহুল দেমাকশী ও কাজী আবু বকর ইবনে হাজজের সংকলিত গ্রন্থাবলী তার খিলাফত কালের অমর অবদান।

‘কিতাবুল আসার’ নামক গ্রন্থখানি মুসলিম জাতির নিকট বর্তমানে রক্ষিত সব থেকে প্রাচীন গ্রন্থ। এটা আবু হানিফা(রাঃ) হযরত আবদুলাহ ইবনে মাসউদ(রাঃ) এর সময় প্রতিষ্ঠিত।

হাফেজ সুয়ুতী ইমাম আবু হানিফা সম্পর্কে লিখেছেন-“ ইমাম আবু হানিফার বিশেষ কীর্তি যাতে তিনি একক তা এই যে,তিনিই সর্বপ্রথম ইলমে শরীয়তকে সুসংবদ্ধ করেছেন এবং একে অধ্যায় হিসেবে সংকলিত করেছেন। কিন্তু এইরূপ গ্রন্থ প্রণয়নের ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফাকে সময়ের দিক দিয়ে কেউই অতিক্রম করে যেতে পারেননি।’’

এরপর ইমাম মালেক “আল মুয়াত্তা” হাদিস গ্রন্থখানি লেখেন।

মুহাম্মদ আবু জাহু নামক এযুগের একজন মিসরীয় লেখক লিখেছেন-“আব্বাসী খলীফা আবু জাফর আল মানসুর ইমাম মালেককে ডেকে বললেন-তিনি যেন তার নিজের নিকট প্রমাণিত সহীহরূপে সাব্যস্ত হাদিসসমূহ সংকলন করেন ও একখানি গ্রন্থাকারে তা প্রণয়ন করেন এবং সেটাকে যেন তিনি লোকদের ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ করার জন্য নির্দিষ্ট করেন।অতঃপর তিনি তার এই গ্রন্থ প্রণয়ন করেন এবং এর নাম নির্দিষ্ট করেন “আল মুয়াত্তা”।

মোটামুটি বলা চলে খলীফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ হাদিস সংকলনের যে জোয়ার তুলে দিয়ে যান তার ফলশ্রুতিতেই পরবর্তীতে আমরা হাদীসগুলো গ্রন্থাকারে পেয়েছি।

তৃতীয় হিজরী শতকে পাঁচটি শহরে ইলমে হাদিসের অপূর্ব উৎকর্ষ সাধিত হয়। ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ সম্মন্ধে লিখেছেন,“মক্কা,মদীনা,কুফা,বস্রাও সিরিয়া এ পাঁচটি শহরে ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানের পাদপীঠ।এই সব শহর থেকেই নবীর প্রচারিত জ্ঞান,ঈমান,কোরআন ও শরীয়ত সম্পর্কিত ইলম এর ফল্গুধারা উৎসারিত হয়েছে।”

হাদীস সংকলনের চুড়ান্ত পর্যায় হল বনু আব্বাসীয়দের খলীফা আল মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহ(২৩২ হি.)। আসলে তিনি সুন্নাতের প্রতি খুবই আকৃষ্ট ছিলেন। এমনকি তিনি হাদীস সংকলন ও শিক্ষা দানের ব্যাপারে এতদূর অগ্রসর হয়েছিলেন যে,সমস্ত মূসলিম জনতা তার জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতে থাকে। এমন কি এই সময় একটি কথা প্রচলিত হয়ে যায়-

“খলীফা তো মাত্র তিন জন মুরুতাদগণকে দমন ও হত্যা করার ব্যাপারে হযরত আবু বকর,যুলুম অত্যাচার বন্ধ করেন উমর ইবনে আবিদুল আজীজ এবং হাদিস ও সুন্নতের পুনরুজ্জীবনে ও বাতিল পন্থিদের দমন ও ধ্বংস সাধনে আল মুতাওয়াক্কিল।”(হাদিস সংকলনের ইতিহাস ৫২১ পৃঃ)।

অপরদিকে এই শতকেই আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত ছয়খানি সর্বাধিক বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ প্রণেতাদের পাই-১. ইমাম বোখারী ২. ইমাম মুসলিম ৩. ইমাম নাসায়ী ৪. ইমাম তিরমিযী ৫. ইমাম আবু দাউদ এবং ৬. ইমাম ইবনে মাজাহ।

হাদীস প্রচার ও বর্ণনানুযায়ী সাহাবীদের বিভাগ

হাদীস সংগ্রহ,সংরক্ষণ ও শিক্ষাদানের ওপর নির্ভর করে মোহাদ্দেসগণ সাহাবাদের চার ভাগে বিভক্ত করেছেন- মুকছিরীন,মুতাওচ্ছেতীন,মুকিল্লীন ও আকাল্লীন।

মুকছিরীনঃ যে সমস্ত সাহাবা এক হাজার বা ততোধিক হাদীস শিক্ষা দিয়েছেন তাদেরকে বলেন মুখছিরীন।

মুতাওচ্ছেতীনঃ যে সমস্ত সাহাবা পাঁচশত বা ততোধিক তবে তা এক হাজারের কম হাদিস শিক্ষা দিয়েছেন তাদেরকে মুতাওয়াচ্ছেতীন বলে।

মুকিল্লীনঃ যে সমস্ত সাহাবা চল্লিশ থেকে পাঁচশ হাদীস শিক্ষা দিয়েছেন তাদেরকে বলে মুকিল্লীন।

আকাল্লীনঃ যে সমস্ত সাহাবা চল্লিশের কম হাদীস শিক্ষা দিয়েছেন তাদেরকে বলে আকাল্লীন।

নিম্নে মুকছিরীন,মুতাওয়াচ্ছেতীন ও মুকিল্লীন সাহাবীদের নাম,মৃত্যু সন(হিজরী) ও তাদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা দেয়া হলো।আকাল্লীনদের নামের তালিকা অনেক লম্বা বলে তাদের নাম দেয়া হলো না।

মুকছিরীন

নাম মৃত্যু সন বর্ণিত হাদীস

১। হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) (৫৭ হি) ৫৩৬৪

২। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) (৫৭ হি) ২২১০

৩। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) (৬৮ হি) ১৬৬০

৪। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) (৭৩ হি) ১৬৩০

৫। হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) (৭৪ হি) ১৫৪০

৬। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ (৯১ হি) ১২৮১

৭। হযরত আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) (৭৪ হি) ১১৭০

মুতাওয়াচ্ছেতীন

১। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাছউদ (রাঃ) (৩২ হি) ৮৪৮

২। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) (৬৩ হি) ৭০০

৩। হযরত আলী মুরতাজা (রাঃ) (৪০ হি) ৫৮৬

৪। হযরত উমর ফারুখ (রাঃ) (২৩ হি) ৫৩৯

মুকিল্লীন

১। (উম্মুল ম’মীনীন) হযরত উম্মে ছালমা(রাঃ) (৫৯ হি) ৩৭৮

২। হযরত আবু মূসা আশ’আরী (রাঃ) (৫৪ হি) ৩৬০

৩। হযরত বারা ইবনে আজেব (রাঃ) (৭২ হি) ৩০৫

৪। হযরত আবুজর গিফারী (রাঃ) (৩২ হি) ২৮১

৫। হযরত সা’দ ইবনে আবি ওক্কাস (রাঃ) (৫৫ হি) ২১৫

৬। হযরত সাহল আনসারী (জুন্দব ইবনে কায়স রাঃ) (৯১ হি) ১৮৮

৭। হযরত উবাদা ইবনে সামেত আনসারী(রাঃ) (৩৪ হি) ১৮১

৮। হযরত আবু দ্বারদা (রাঃ) (৩২ হি) ১৭৯

৯। হযরত আবু কাতাদাহ আনসারী (রাঃ) (৫৪ হি) ১৭৫

১০।হযরত মো’আজ ইবনে জাবাল (রাঃ) (১৮ হি) ১৭৫

১১।হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ) (২১ হি) ১৬৪

১২। হযরত বোরাইদা ইবনে হাসীব (রাঃ) (৬৩ হি) ১৬৪

১৩। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) (৫২ হি) ১৫০

১৪। হযরত ওসমান গণী (রাঃ) (৩৫ হি) ১৪৬

১৫। হযরত জাবের ইবনে সামুরাহ (রাঃ) (৭৪ হি) ১৪৬

১৬।হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) (১৩ হি) ১৪২

১৭।হযরত মুগীরাহ ইবনে শো’অবা (৫০ হি) ১৩৬

১৮। হযরত আবু বাকরাহ (রাঃ) (৫২ হি) ১৩০

১৯। হযরত ইমরান ইবনে হোসাইন (রাঃ) (৫২ হি) ১৩০

২০। হযরত মু’আবীয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাঃ) (৬০ হি) ১৩০

২১। হযরত ওছমাহ ইবনে জায়েদ (রাঃ) (৫৪ হি) ১২৮

২২। হযরত ছাওবান (রাঃ) (৫৪ হি) ১২৪

২৩। হযরত নো’মান ইবনে বশীর (রাঃ) (৬৫ হি) ১২৪

২৪। হযরত সামুরা ইবনে জুন্দুব (রাঃ) (৫৮ হি) ১২৩

২৫। হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রাঃ) (৪০ হি) ১০২

২৬। হযরত জাবীর ইবনে আবদুল্লাহ বাজালী (রাঃ) (৫১ হি) ১০০

২৭। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু আওফা (রাঃ) (৮৭ হি) ৯৫

২৮। হযরত জায়িদ ইবনে সাবেত আনসারী (রাঃ) (৪৮ হি) ৯২

২৯। হযরত আবু তালহা (রাঃ) (৩৪ হি) ৯০

৩০। হযরত জায়দ ইবনে আরকাম (রাঃ) (৬৮ হি) ৯০

৩১। হযরত জায়দ ইবনে খালেদ (রাঃ) (৭৮ হি) ৮১

৩২। হযরত কা’ব ইবনে মালেক (রাঃ) (৫০ হি) ৮০

৩৩। হযরত রাফেয় ইবনে খাদীজ (রাঃ) (৭৪ হি) ৭৮

৩৪। হযরত সালমা ইবনে আকওয়া ((রাঃ) (৭৪ হি) ৭৭

৩৫। হযরত আবু রাফেয় (রাঃ) (৩৫ হি) ৬৮

৩৬। হযরত আওফ ইবনে মালেক (রাঃ) (৭৩ হি) ৬৭

৩৭। হযরত আদিয় ইবনে হাতেম তায়ী (রাঃ) (৬৮ হি) ৬৬

৩৮। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবি আওফা (রাঃ) ৬৫

৩৯। হযরত উম্মে হাবীবাহ উম্মুল মো’মেনীন (রাঃ) (৪৪ হি) ৬৫

৪০। হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) (৩৪ হি) ৬৪

৪১। হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ) (৩৭ হি) ৬৪

৪২।হযরত হাফসা উম্মুল মো’মেনীন (রাঃ) (৪৫ হি) ৬৪

৪৩। হযরত জোবাইর ইবনে মোতয়েম (রাঃ) (৫৮ হি) ৬০

৪৪। হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওছা (রাঃ) (৬০ হি) ৬০

৪৫। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা) (৭৪ হি) ৫৬

৪৬। হযরত ওয়াহেলা ইবনে আছকা (রাঃ) (৮৫ হি) ৫৬

৪৭। হযরত ওকবাহ ইবনে আমের (রাঃ) (৬০ হি) ৫৫

৪৮। হযরত ওমর ইবনে ওতবাহ (রাঃ) ৪৮

৪৯। হযরত কা’ব ইবনে আমর ((রাঃ) (৫৫ হি) ৪৭

৫০হযরত ফাজালা ইবনে উবায়েদ আসলামী (রাঃ) (৫৮ হি) ৪৬

৫১। হযরত মাইমুনাহ উম্মুল মো’মেনীণ (রাঃ) (৫১ হি) ৪৬

৫২। হযরত উম্মেহানী (হযরত আলীর ভাগ্নী) (রাঃ) (৫০ হি) ৪৬

৫৩। হযরত আবু জোহাইফা (রাঃ) (৭৪ হি) ৪৫

৫৪। হযরত বেলাল (রাঃ) (১৮ হি) ৪৪

৫৫। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রাঃ) (৫৭ হি) ৪৩

৫৬। হযরত মিকদাদ ইবনে আছওয়াদ (রাঃ) (৩৩ হি) ৪৩

৫৭। হযরত উম্মে আতীয়াহ আনসারী (রাঃ) ৪১

৫৮। হযরত হাকিম ইবনে হেজাম (রাঃ) (৫৪ হি) ৪০

৫৯। হযরত সালমা ইবনে হানীফ (রাঃ) ৪০

 

হাদীস বর্ণনার পার্থক্যের কারণ

নবী করীম (সাঃ) যতদিন পর্যন্ত সাহাবীদের মধ্যে জীবিত ছিলেন,ততদিন পর্যন্ত তিনি সাধারণভাবে তাদের সকলকেই দ্বীন-ইসলাম,খোদার কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দানে ব্যাপৃত ছিলেন।তখন যেমন রাসূলের নামে কোন মিথ্যা কথা প্রচার করার অবকাশ ছিল না,তেমনি ছিল না রাসূলের কোন কথাকে ‘রাসুলের কথা নয়’ বলে উড়িয়ে দেয়ার বা প্রত্যাখ্যান করার একবিন্দু সুযোগ। তখন মুনাফিকপগণও রাসূলের কোন কথার অপব্যাখ্যা করে ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করারও তেমন কোন সুযোগ পেত না। কেননা তেমন কিছু ঘটলেই সাহাবায়ে কেরাম রাসূলের নিকট জিজ্ঞেস করে সমস্ত ব্যাপার পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট করে নিতে পারতেন। ইতিহাসে বিশেষত হাদীস শরীফ সম্পর্কে এর অসংখ্য নিদর্শন বিদ্যমান রয়েছে। হযরত উমর ফারুখ(রাঃ) একবার হয়ত হযরত হিশাম ইবনে হাকীমকে সূরা আল ফুরকান নতুন পদ্ধতিতে পড়তে দেখে অত্যন্ত আশ্চর্য বোধ করে এবং তাকে পাকড়াও করে রাসূলের দরবারে নিয়ে আসলেন। অতঃপর নবী করীম(সাঃ) হযরত হিশামের পাঠ শুনে বলেন যে,এই ভাবেও পাঠ করা বিধি সম্মত। ফলে হযরত উমরের মনে সন্দেহ দূর হয়,এ কারণে এ কথা বলা যায় যে,রাসূলে করীম(সাঃ) তার জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরামের পারষ্পরিক সমস্ত মতবৈষম্যের মীমাংসা দানকারী ছিলেন। কোন বিষয়ে এক বিন্দু সন্দেহ বা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হলেই রাসূলকে দিয়ে তার অপণোদন করে নেয়া হত।

কিন্তু নবী করীম(সাঃ) ওফাতের পর এই অবস্থার বিরাট রকমের পরিবর্তন ঘটে।একদিকে যেমন ওহীর জ্ঞান লাভের সূত্র ছিন্ন হয়ে যায়,তেমনি অপরদিকে অসংখ্য নওমুসলিম মুর্তাদ হয়ে দ্বীন ইসলাম পরিত্যগ করতে উদ্যত হয়। এরূপ অবস্থায় ঘোলা পানিতে স্বার্থ শিকারের উদ্দেশ্যে কিছু সংখ্যক মুনাফিকও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন তারা যদি রাসূলের নামে কোন মিথ্যা কথা রটাতে চেষ্টা করে থাকে তবে তা কিছু মাত্র বিচিত্র বা বিস্ময়ের কিছু নয়।

কিন্তু প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর(রাঃ) এ সবের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেন। তিনি একদিকে যেমন পূর্ণশক্তি প্রয়োগ করে মুর্তাদ ও যাকাত অস্বীকার কারিদের মস্তক চূর্ণ করে দেন, অপরদিকে ঠিক তেমনি প্রবলভাবে মিথ্যাবাদীদের মিথ্যাকথা প্রচারের মুখে দুর্জয় বাধার প্রাচীর রচনা করেন। তারপর হযরত উমর ফারুক (রা)ও এর জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহন করেন। তিনি হাদিস বর্ণনার ব্যপারে অত্যন্ত কড়াকড়ি অবলম্বন করেন। হাদিসের বিরাট সম্পদকে বুকে ধরে বিপুল সংখ্যক সাহাবী অতন্দ্রপ্রহরীর মত সজাগ হয়ে বসে থাকেন। কোন হাদীস বর্ণনা করলে তা মুনাফিকদের হাতের ক্রিড়ানক হয়ে পড়তে পারে ও বিকৃত রূপ ধারণ করতে পারে,এই আশংকায় তারা সাধারণভাবে হাদিস বর্ণনা করা প্রায় বন্ধ করে দেন।কারো কারো মনে এই ভয় এতদুর প্রবল হয়ে দেখা দেয় যে,বেশি করে হাদিস বর্ণনা করতে গেলে বর্ণনার ব্যাপারে ভুল হয়ে যেতে পারে কিংবা সাধারণ মুসলমান হাদিস চর্চায় একান্তভাবে মশগুল হয়ে পড়লে তারা খোদার নিজস্ব কালাম কোরআন মজীদের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করতে পারে। এসব কারনে সাধারণভাবে সাহাবায়ে কিরাম হাদীস প্রচার ও বর্ণনা সাময়িকভাবে প্রায় বন্ধ করে রাখেন। শরীয়তের মাসলা মাসায়েলের মীমাংসা কিংবা রাষ্ট্র শাসন ও বিচার-আচার প্রভৃতি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারে যখন হাদিসের আশ্রয় গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়তো,কেবলমাত্র তখনি তারা পরষ্পরের নিকট হাদিস বর্ণনা করতেন।

এ পর্যায়ে আমরা বিশেষভাবে কয়েকজন সাহাবীর কথা উল্লেখ করতে পারি এবং বিপুল সংখ্যক হাদিস জানা থাকা সত্ত্বেও তাদের অপেক্ষা কৃত কম সংখ্যক হাদিস বর্ণনা করার কারণও তা থেকে অনুধাবন করতে পারি।

হযরত আবু বকর সিদ্দীক(রাঃ) নবী করীমের (সাঃ) আজীবনের সংগী, হযরত আবু উবাইদাহ, হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন প্রমুখ মহাসম্মানিত সাহাবীদের বিপুল হাদিস জানা থাকা সত্ত্বেও তাদের নিকট হতে খুব কম সংখ্যক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হযরত সায়ীদ ইবনে যায়দ বেহেশতবাসী হওইয়ার সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবীর মধ্যে অন্যতম,কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি মাত্র দু’টি কিংবা তিনটি হাদীস বর্ণনা করেছেন।হযরত উবাই ইবনে উম্মারাতা কেবল মাত্র একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন।

কোন কোন সাহাবী রাসূলের ইন্তেকালের পর খিলাফাতের দায়িত্ব পালনে এতই মশগুল হয়ে পড়েছিলেন যে, তার পক্ষে হাদিস বর্ণনার মত সুযোগ বা অবসর লাভ করা সম্ভব হয়নি। খোলাফায়ে রাশেদীন চারজন সম্মানিত সাহাবী এবং হযরত তালহা ও হযরত জুবাইর (রাঃ) এর বাস্তব দৃষ্টান্ত।

বহু সংখ্যক সাহাবীর অবস্থা ছিল এর ঠিক বিপরীত। তাদের ছিল বিপুল অবসর। হাদীস বর্ণনায় প্রতিবন্ধক হতে পারে এমন কোন ব্যস্ততাই তাদের ছিল না।ফলে তারা বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করতে সমর্থ হন। যেমন হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)।

কোন কোন সাহাবী নবী করীমের (সাঃ) সংস্পর্শে ও সংগে থাকায় অপেক্ষাকৃত বেশি সুযোগ পেয়েছিলেন।দেশে বিদেশে ঘরে ও সফরে সর্বত্র তার সংগে থাকার কারণে একদিকে যেমন অধিক সংখ্যক হাদিস সংগ্রহ করা তাদের পক্ষে সহজ ছিল তেমনি তার ইন্তেকালের পর ঐ হাদিসকে অপরের নিকট পূর্ন মাত্রায় বর্ণনার সুযোগও তাদের ঘটেছিলো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ),হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ),হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ ()রাঃ,হযরত আনাস ইবনে মালেক(রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর(রাঃ) প্রমুখ সাহাবীর নাম এ পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য। কিছু সংখ্যক সাহাবী রাসূলে করীমের জীবদ্দশায়ই কিংবা তার ইন্তেকালের অব্যবহিত পরেই ইন্তেকাল করেছেন বলে তাদের জীবনে অপরের নিকট হাদিস বর্ণনা করার কোন সুযোগই ঘটেনি।তাদের থেকে খুব কম সংখ্যক হাদিসই বর্ণিত হয়েছে।

রাসূলে করীমের (সাঃ) অন্তর্ধানের পর ইসলামী সমাজে নিত্য নব পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। তখন মুসলিম জনসাধারণের পক্ষে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রাসূলের (সাঃ) কথা জানা আবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। ফলে এই সময়ে জীবিত সাহাবীগণ বেশি সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করতে বাধ্য হয়েছেন।পরবর্তীকালের মুসলিমদের মধ্যে ইলমে হাদীস অর্জন করার প্রবল আগ্রহ জন্মে,তারা সাহাবীদের নিকট নানাভাবে রাসূল (সাঃ)-এর হাদীস শোনার আবদার পেশ করতেন।এই কারণেও সাহাবীগণ তাদের (রাঃ) নিকট সুরক্ষিত ইলমে হাদিস তাদের সামনে প্রকাশ করতে ও তাদেরকে শিক্ষাদান করতে প্রস্তুত হন। এ কারণেও অনেক সাহাবীর নিকট হতে বিপুল সংখ্যক হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

খেলাফাতে রাশেদার শেষ পর্যায়ে মুসলিম সমাজে নানাবিধ ফেতনার সৃষ্টি হয়। শীয়া এবং খারেজী দু’টি বাতিলি ফিরকা স্থায়ীভাবে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।এসময় তারা কিছু কিছু কথা রাসূলের হাদিস হিসাবে চালিয়ে দেতেও চেষ্টা করে। এ কারণে রাসূলের কোন কোন সাহাবী প্রকৃত হাদীস কম বর্ণনা করতে ও হাদীস বর্ণনায় অধিক কড়াকড়ি করতে বাধ্য হন। ঠিক এ কারণেই চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ)-র নিকট থেকে খুব কম সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হতে পেরেছে।

স্মরণ শক্তির পার্থক্য ও হাদিস লিখে রাখা বা না রাখাও হাদিস বর্ণনায় এই সংখ্যা পার্থক্য সৃষ্টির অন্যতম কারন। যারা হাদীস বেশি মুখস্ত করে কিংবা লিপিবদ্ধ করে রাখতে পেরেছিলেন-যেমন হযরত আবু হুরায়রা(রাঃ) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর(রাঃ)-তারা অপর সাহাবীদের অপেক্ষা অধিক হাদিস বর্ণনা করতে সমর্থ হয়েছিলেন।একই রাসূলের(সঃ) অসংখ্য সাহাবীদের বর্ণিত হাদিসে সংখ্যা পার্থক্য সৃষ্টির মূলে এইসব বিবিধ কার্বন নিহিত রয়েছে।কাজেই ব্যাপারটি যতই বিস্ময়কর হোক নাকেন,অস্বাভাবিক কিছুই নয়,তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।(হাদিস সংকলনের ইতিহাস ৩০১-৩০৫ পৃঃ)

হাদিস বর্ণনার পার্থক্যে কারন সম্মন্ধে উপরে যা বর্ণিত হলো, পয়েন্টাকারে বললে আমরা মোটামুটি এভাবে বলতে পারি-

১। হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে অধিকতর সতর্কতার কারনে ও মুনাফিকদের দ্বারা হাদিস বিকৃতির আশংকায় অনেক সাহাবা হাদিস বর্ণনা করা বন্ধ করে দেন।

২। বেশি বেশি হাদিস বর্ণনা করতে গেলে বর্ণনার ক্ষেত্রে ভুল হতে পারে এ ভয়ে অনেক সাহাবা হাদীস প্রচার ও বর্ণনা বন্ধ রাখেন।

৩। সাধারণ মুসলমান হাদিস চর্চায় বেশি মশগুল হয়ে পড়লে তারা আল্লাহর কালাম কোরআনের প্রতি গুরুত্ব কম দিতে পারে এ কারণে সাহাবায়ে কিরাম সাময়িকভাবে হাদিস সাময়িকভাবে প্রচার ও বর্ণনা বন্ধ রাখেন।

৪। খেলাফতের বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হাদিস প্রচার ও বর্ণনা করা অনেক সাহাবীর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ইসলামের প্রথম চারজন খলিফা, এবং হযরত তালহা(রাঃ), ও হযরত জুবাইর(রাঃ)-এর জ্বলন্ত উদাহরণ।

৫। অপরদিকে বহু সংখ্যক সাহাবীর ছিল প্রচুর অবসর। তাদের তেমন কোন ব্যস্ততা ছিল না বললেই চলে। এ জন্য তারা প্রচুর সংখ্যক হাদিস আমাদের উপহার দিতে পেরেছেন। যেমন- হযরত আবু হুরায়রা(রাঃ),হযরত আয়েশা(রাঃ),হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর(রাঃ) প্রমুখ।

৬।অনেক সাহাবীই রাসূল(সঃ)-এর সংস্পর্শে আসার এবং সংগে থাকার সুযোগ পেয়েছেন বেশি। সর্বদা রাসূল(সঃ)-এর ধারে কাছে থাকার কারণে এ সমস্ত সাহাবী অনেক বেশি হাদিস সংগ্রহ ও বর্ণনা করতে পেরেছেন।যেমন-হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ,হযরত আবু হুরায়রা,হযরত আনাস ইবনে মালেক প্রমুখ।

৭।আবার কিছু সংখ্যক সাহাবী রাসূলের(সঃ) ইন্তেকালের পর অল্প দিনের ব্যবধানে ইন্তেকাল করার হাদিস বর্ণনা করার তেমন কোন সুযোগ পাননি, ফলে তাদের থেকে খুব কম হাদীসই পাওয়া গেছে।

৮।নবী (সাঃ)-এর অনুপস্থিতিতে ইসলামী সমাজে নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব হয়।ফলে এ নতুন পরিস্থিতির সমাধান কল্পে হাদীস জানা জরুরী হয়ে পড়ে,তখন জীবিত সাহাবীদেরকেই বেশি হাদীস বর্ণনা করতে হয়।

৯।পরবর্তীকালে মুসলমানদের মধ্যে হাদীস সম্মন্ধে জানার প্রবল আগ্রহ দেখা দেয়।তারা সাহাবীদের নিকট থেকে হাদিস জানার আবদার পেশ করতেন।এ কারণেও অনেক সাহাবীর নিকট হতে বিপুল সংখ্যক হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

১০।খেলাফতে রাশেদার শেষ পর্যায়ে মুসলিম সমাজে নানাবিধ ফেতনার সৃষ্টি হয়।এ সময় মুনাফিকদের কিছু কিছু কথা রাসূলের হাদীস হিসাবে চালিয়ে দিতেও চেষ্টা করে। এ কারণে কোন কোন সাহাবী প্রকৃত হাদিস কম বর্ণনা করতে ও হাদীস বর্ণনার কড়াকড়ি করতে বাধ্য হন। এ কারণেই হযরত আলী(রাঃ)-এর নিকট হতে খুব কম হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

১১।স্মরণ শক্তির পার্থক্য ও হাদীস লিখে রাখা বা না রাখাও হাদিস বর্ণনার এ সংখ্যা পার্থক্যের সৃষ্টির অন্যতম কারণ।

বিভিন্ন যুগে হাদীস সমালোচনা

সত্যের মানদন্ডে যাচাই বাছাই করার জন্য বিভিন্ন যুগে হাদীসে সমালোচনা হয়েছে। সমালোচনায় বিভিন্ন যুগে যারা উল্লেখযোগ্য স্থান লাভ করেছেন তাদের নাম নিম্নে দেয়া হলো-

সাহাবীদের পর্যায়ঃ

১। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস(মৃ ৬৮ হি)

২। উবাদাহ ইবনে সামেত(মৃ ৩৪ হি)

৩। আনাস ইবনে মালেক(মৃ ৯৩ হি)

তাবেয়ীদের পর্যায়েঃ

১। সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যেব (মৃ ৯৩ হি)

২। আমের শা’বী (মৃ ১০৪ হি)

৩। ইবনে সিরিন (মৃ ১১০ হি)

দ্বিতীয় শতকের ব্যক্তিগণ হচ্ছেন

ইমাম শো’বা(মৃ ১৬০ হি),আনাস ইবনে মালেক(মৃ ১৭৯ হি),মা’মার(মৃ ১৫৩ হি),হিশাম আদ দাস্তাওয়ায়ী(মৃ ১৫৪ হি),ইমাম আওজায়ী(মৃ ১৫৬ হি),সুফিয়ান আস সাওরী(মৃ ১৬১ হি),হাম্মাদ ইবনে সালমা(মৃ ১৬৭ হি),লাইস ইবনে সায়াদ(মৃ ১৭৫ হি) ও ইবনুল মাজেশুন(মৃ ২১৩ হি)।

পরবর্তী পর্যায়ে যারা উল্লেখযোগ্য তারা হচ্ছেন

আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (মৃ ১৮১ হি), হুশাইম ইবনে কুশাইর (মৃ ১৮৮ হি), আবু ইসহাক আল ফারুকী (মৃ ১৮৫ হি), আল মায়াফী ইবনে ইমরান আল মুসেলী (মৃ ১৮৫ হি), বিশব ইবনুল মুফাজ্জাল (মৃ ১১৬ হি), ইবনে উয়াইনাহ (মৃ ১৯৭ হি.) তাঁদের পরে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন- ইবনে আলীয়া (মৃ. ১৯৩ হি.), ইবনে ওহাব (মৃ১৯৭ হি.) ও ওঅফীত ইবনে জাররাহ (মৃ ১৯৭ হি.)।

এ সময় দু’ব্যক্তি বিস্ময়কর প্রতিভা সম্পন্ন ছিলেন-১। ইয়াহিয়া ইবনে সাযিদুল কাতান(মৃ ১৮৯ হি), ও ২। আবদুর রহমান ইবনে মাহদী(মৃ ১৯৮ হি)

এরপর যারা উল্লেখযোগ্য তারা হচ্ছেন-ইয়াজীদ ইবনে হারুন(মৃ ২০৬ হি),আবু দাউদ তায়ালিসী(মৃ ২০৪ হি),আবদুর রাজ্জাক ইবনে হাম্মান(মৃ ২১১ হি) ও আসেম নবীল ইবনে মাখলাদ(মৃ ২১২ হি)। এরপর যারা কৃতিত্বের দাবী রাখেন তারা হচ্ছেন – হাদীস সমালোচনা বিজ্ঞানের গ্রন্থকারগণ।নিম্নে তাদের উল্লেখ করা হল-

ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ীন(মৃ ২৩৩ হি), আহমদ ইবনে হাম্বল(মৃ ২৪১ হি),মুহাম্মদ ইবনে সায়াদ(মৃ ২৩০ হি),আবু খায়সামা জুবাইর ইবনে হারব(মৃ ২৩৪ হি), আবু জাফর আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ নবীল আলী ইবনে মদীনি(মৃ ২৩৫ হি),মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ নুমাইর(মৃ ২৩৪ হি),আবুবকর ইবনে আলী শাহাবা(মৃ ২৩৫ হি), আবদুল্লাহ ইবনে আওর আল কাওইয়ায়ীরি(মৃ ২৩৫ হি),ইসহাক ইবনে রাহওয়ার ইমামে খুরাসান (মৃ ২৩৭ হি), আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ আম্মার আর মুসেলী(মৃ ২৪২ হি),আহমদ ইবনে সালেহ হাফেজে মিসর(মৃ ২৪৮ হি),হারুন ইবনে আবদুল্লাহ আল হাম্মাল(মৃ ২৪৩ হি)

এদের পর ইসহাক আল দাওসাজ(মৃ ৫১ হি),ইমাম দারেমী(মৃ ২৫৫ হি),ইমাম বোখারী(মৃ ২৫৬ হি), হাফেজ আল আজলী,ইমাম আবু জুরয়া(মৃ ২৬৪ হি),আবু হাতেম(মৃ ২৭৭ হি),ইমাম মুসলিম(মৃ ২৬১ হি),আবু দাউদ সিজিস্তানী (মৃ ২৭৫ হি),বাকী ইবন মাখলাদ (মৃ ১৭৬ হি),আবু জুরয়া দেমাশকী (মৃ ২৮১ হি)

এরপর আবদুর রহমান ইবনে ইউসুফ আল বাগদাদী,ইব্রাহীম ইবনে ইসহাক আল হারবী(মৃ ২৮৫ হি),মুহাম্মদ ইবনে আজ্জাহ (মৃ ২৮৯ হি),হাফেজ কুরতবা আবুবকর ইবনে আবু আসেম(মৃ ২৮৭ হি),আবদুল্লাহ ইবনে আহম্মদ(মৃ ২৯০ হি),সালেহ মাজরা(মৃ ২৯৩ হি),আবুবকর আল বাজ্জার(মৃ ২৯২ হি),মুহাম্মদ ইবনে নসর আল মারওয়ালী(মৃ ২৯৪ হি)।

সাহাবীদের ভারত আগমন

সম্ভবত ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর(রাঃ) এর আমলে সাহাবীদের ভারত আগমন ঘটে। যে সমস্ত সাহাবীদের ভারত আগমনের সন্ধান পাওয়া যায় তারা হচ্ছেন-

১। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উতবান(রাঃ)

২। হযরত আসেম ইবনে আমর আত তামীমী(রাঃ)

৩। হযরত যুহার ইবনে আল আবদী(রাঃ)

৪। হযরত সুহাইব ইবনে আদী(রাঃ) এবং

৫। হযরত আল হাকাম ইবনে আবিল আ’স আস সাকাফী(রাঃ)

হযরত উওমান (রাঃ) এর আমলে দু’জন সাহাবীর সন্ধান পাওয়া যায়। যারা ভারত বর্ষে আগমন করেন। তারা হচ্ছেন-

১। হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে মা’মর আততামীমী(রাঃ)ও ২> হযরত আবদুর রহমান ইবনে সামুরা ইবনে আবদে শাসস।

হযরত আমীর মুয়াবিয়ার যুগে আসেন-হযরত সিনান ইবনে সালমাহ,ইবনে আল মুহাব্বিক আল হুযালী।

উপরিউক্ত সাহাবী ভারত বর্ষের সীমান্তের শাসন কর্তা হয়ে আসেন।তদানিন্তন ইরাক শাসনকর্তা জিয়াদ তাকে এ দায়িত্ব দিয়ে পাঠান।

তাবেয়ীদের ভারত আগমন

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে বহু সংখ্যক তাবেয়ী ভারত আসেন।হযরত আমীর মুয়াবিয়ার যুগে যিনি প্রথম আসেন তিনি হচ্ছেন-হযরত মুহলাব ইবনে আবু সফরা।জানা যায় তিনি ৪৪ হিজরী সনে হযরত আবদুর রহমান ইবনে সামুরা সাহাবীদের সংগে একজন সেনাধ্যক্ষ হিসেবে এখানে পদার্পণ করেন।