ইকামাতে দ্বীন

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ইকামাতে দ্বীনের মর্ম

اقامة   শব্দটির আরবিতে কয়েকটি প্রতিশব্দ আছে:

نصب –تاسيس- انشاه-  رفع

رفع  অর্থ উপরে উঠান, খাড়া করা, তুলে ধরা।

انشاه অর্থ তৈরী করা, অস্তিত্বে আনা, স্থাপিত করা।

تاسيس অর্থ প্রতিষ্ঠিত করা, প্রতিষ্ঠান কায়েম করা।

نصب অর্থ স্থাপন করা-যেমন খুঁটি।

ইকামাত শব্দের সহজ বোধ্য অর্থ হলো কায়েম করা, চালু করা, খাড়া করা, অস্তিত্বে আনা, প্রতিষ্ঠিত করা ইত্যাদি।

কুরআনে পাকে اقيموا الصلوة কথাটি বহুবার ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ “নামায কায়েম কর। ” اقامة الصلوة (ইকামাতুস সালাত) মানে নামায চালু কর। ” ফরয নামাযের পূর্বে মুয়াযযিন ইকামাত দেয় বা তাকবীর বলে। এর শেষ দিকে বলা হয় قد قد قامة الصلوة قد নামায খাড়া হয়ে গেছে বা নামায শুরু হয়েছে।

নামাযের মাসায়ালা শেখা, নাময জানা বা নামাযের ওয়াজ করাকে ইকামাতে সালাত বলে না। বাস্তবে নামায চালু হয়ে যাওয়াকেই ইকামাতে সালাত বলে। কোন ব্যক্তির জীবনে নামায কায়েম হওয়ার অর্থ হলো যে, সে নিয়মিত, সময় মত, জামায়াতে সঠিক নিয়মে নামায আদায় করে। কোন মহল্লায় নাময কায়েম হওয়ার অর্থ মহল্লায় মসজিদে কায়েম হওয়া, পাঁচ ওয়াক্ত সেখানে জামায়াত চালু হওয়া এবং মহল্লার অধিকাংশ লোকের জামায়াতে শরীক হওয়া।

বাংলাদেশ কায়েম হওয়া অর্থ হলো বাস্তবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নামে একটি রাষ্ট্র স্থাপিত হওয়। একটা কারখানা কায়েম হওয়া অর্থ কারখানা চালু হওয়া। ঠিক তেমনি দেশে দ্বীন ইসলাম কায়েম হওয়া অর্থ হলো সরকার ও জনগণের যাবতীয় কাজ-কর্ম কুরআন-হাদীস অনুযায়ী চলা।

“ইকামাতে দ্বীন” এমন একটি পরিভাষা যার অর্থ বাংলায় বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা যায়। “আল্লার দ্বীন কায়েম করা” বা “দ্বীন ইসলাম কায়েম করা” বললে এর সহজ তরজমা হতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্র, ইসলামী হুকুমাত, ইসলামী সমাজ, নেযামে ইসলাম ইত্যাদির যে কোন একটা কথার সাথে “কায়েম করা” কথাটি যোগ করলে “ইকামাতে দ্বীন” পরিভাষাটিরই অর্থ বুঝায়।

ইকামাতে দ্বীনের মর্ম সঠিকভাবে বুঝবার জন্য বাস্তব উদাহরণ দরকার। আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের উদাহরণ দিলেই বিষয়টা সহজ হবে। সবাই একথা স্বীকার করতে বাধ্য যে, বাংলদেশে কুরআনের আইন ও রাসূলের আদর্শ কায়েম নেই। এ দেশটি ইসলামী রাষ্ট্র নয়। সরকারও ইসলামী নয়। দেশের ব্যবসা ও বাণিজ্য, ব্যাংক বীমা, আদালত ও ফৌজদারি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতি, দেশীয় ও বৈদেশিক নীতি ইত্যাদির কোনটাই ইসলামী বিধান দ্বারা পরিচালিত নয়। কিন্তু এসবই তো চলছে। স্বভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে যে, কোন আদর্শ, নীতি বা বিধান অনুযায়ী দেশের রাষ্ট্র, সরকার ও অন্যান্য সবকিছু চলছে?

কুরআনের পরিভাষায় ইসলামী বিধানকে (دين الحق) বলা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লার আনুগত্য করাই “একমাত্র সত্য” পথ। সমাজে একজন অন্যজনের আনুগত্য না করলে কোন সমাজই চলতে পারে না। ইসলামের দাবী হলো যে, أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ “জেনে রাখ, আল্লাহ-ই সৃষ্টি করেছেন এবং হুকুম করার অধিকারও তাঁরই। -(সূরা আল আরাফ: ৫৪) অর্থাৎ সবার কর্তব্য একমাত্র আল্লারই আনুগত্য করা। মানব সমাজে শান্তি ও সুশৃংখলা একমাত্র একজন মনিবের পূর্ণ আনুগত্যের উপরই নির্ভর করে।

আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সম্পূর্ণ  নিঃস্বার্থ হতে পারে না। আর কেউ নির্ভুলও নয়। সকলের মংগলে সত্য ও সঠিক বিধান শুধু তিনিই দিতে পারেন। তাই তার রচিত বিধান দ্বীন ইসলামই একমাত্র সত্য (الحق)। দ্বীনে হকের বিপরীত যা কিছু  সবই অসত্য, ভুল ও ক্ষতিকর। আল্লার আনুগত্যের বিরুদ্ধে আর যত প্রকার আনুগত্য রয়েছে তা সবই “দ্বীনে বাতিল” বা মিথ্যা আনুগত্য। হকের বিপরীত পরিভাষাই হলো বাতিল।

উপরোক্ত ব্যাখ্যা অনুযায়ী বাংলাদেশে যে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালু রয়েছে তা দ্বীনে বাতিল। দ্বীনে হক যেখানে কায়েম নেই সেখানে যেটাই চালু আছে অবশ্যই বাতিল। সে হিসেবে পুঁজিবদী সমাজ ব্যবস্থা, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও সরকার, সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিষ্ট ব্যবস্থা ইত্যাদি সবই “দ্বীনে বাতিল। ”

আল্লাহ বলেন:

ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ

অর্থ: “তোমরা পূর্ণরূপে ইসলাম গ্রহণ কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। ”-(সূরা আল বাকারা: ২০৮)

আল্লাহ বলতে চান যে, ইসলাম গ্রহণ করলে এর সবটুকুই গ্রহণ করতে হবে। তোমাদের ইসলাম গ্রহণে আমার কোন লাভ নেই। তোমাদের পছন্দ মতো ইসলামের একাংশ গ্রহণ করে অন্য অংশ ত্যাগ করলে ইসলাম গ্রহণ করা হলো না। আমার আনুগত্য করতে হলে সব ক্ষেত্রেই আমাকে মনিব হিসেবে মেনে নাও। যেখানেই তোমরা ইসলামকে বাদ দিবে সেখানেই তোমরা শয়তানের অনুসারী হবে।

এজন্যই কোন ব্যক্তি যদি ধর্মীয় ক্ষেত্রে ইসলামকে মানে কিন্তু রাজনৈতিক ময়দানে ধর্মনিরপেক্ষ হয় এবং অর্থনীতি ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রী বা পুজিবাদী হয় তাহলে সে ইসলামকে পূণরূপে গ্রহণ করেনি বলেই বুঝা যাবে। বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে বিসমিল্লাহ ও আল্লার প্রতি আস্থার কথা লেখা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ইসলামী রাষ্ট্র নয়। কারণ ‘দ্বীনে হক’ এ দেশে চালু নেই। যেটা চালু আছে সেটা সাধারণ যুক্তিতেই দ্বীনে বতিল, এ বাতিল ব্যবস্থা ইংরেজ আমল থেকেই রয়েছে। দ্বীনে বাতিলই এখানে দু’শ বছর থেকে বিজয়ী হয়ে আছে।

বাংলাদেশে দ্বীনে হকের অবস্থা

যেখানে দ্বীনে বাতিল কায়েম বা বিজয়ী আছে সেখানে দ্বীনে হকের অবস্থা কিরূপ হওয়া স্বাভাবিক?দ্বীনে হক সেখানে দ্বীনে বাতিলেরই অধীনে রয়েছে। অর্থাৎ দ্বীনে হক বাংলাদেশে ততটুকুই বেঁচে আছে যতটুকু দ্বীনে বতিল অনুমতি দিয়েছে। দ্বীনে হকের ততখনি অংশই চালু আছে যতটুকুতে দ্বীনে বাতিলের আপত্তি নেই। অর্থাৎ ইসলম এ দেশে ঐ পরিমাণেই টিকে আছে যেটুকুতে বাতিল বাধা দেয় না।

বাতিল সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিপূর্ণ ইসলামকে কখনও সহ্য করতে রাযী হতে পারে না। বাতিল সমাজের কর্তারা ইসলামের ততটুকু অংশকেই সহ্য করে যতটুকুতে দ্বীনে বতিলের কোন ক্ষতি না হয়। বাংলাদেশে ইসলামের যেসব খেদমত হচ্ছে তাতে বতিল যদি শংকিত হতো তাহলে এসবকে সহ্য করতো না। মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ, ওয়াজ ও তাবলীগ দ্বারা বাতিল সমাজ উৎখাত হবার কোনো ভয় নেই বলেই এসব ইসলামী কাজকে বাধা দেয়া হচ্ছে না। অর্থাৎ বাতিলের পক্ষ থেকে আপত্তি নেই বলেই এগুলো টিকে আছে। বাতিলের সাথে এ সবের কোন টক্কর বা সংঘর্ষ নেই।

বাংলাদেশে দ্বীন ইসলামের কী দশা তা সামান্য আলোচনা দ্বারাই স্পষ্ট হবে।  ইসলাম পূর্ণাংগ একমাত্র জীবন বিধান। ইসলামকে যদি বিরাট একটি দালানের সংগে তুলনা করা হয় তাহলে কালেমা, নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত সে বিরাট বিল্ডিং এর ভিত্তি মাত্র। রাসূলুল্লাহ (সঃ) একথাই বলেছেন: بنئ السلام على خمس অর্থাৎ কালেমা, নামায ইত্যাদি পাঁচটি জিনিস দ্বারা ইসলামী জীবন বিধানের ভিত্তি রচিত হয় মাত্র। এ ভিত্তিটুকুই শুধু ইসলাম নয়। ইসলামের মহান সৌধের সঠিক ধারণা আজ আলেম সমাজের মধ্যেও সকলের নেই। বাংলাদেশে ইসলামের গোটাবিল্ডিং এর তো কোন অস্তিত্বই নেই। শুধু ভিত্তিটুকুর অবস্থাই আলোচনা করে দেখা যাক যে বাংলাদেশে দ্বীে হকের অবস্থা কত করুণ:

কালেমা তাইয়্যেবা যে গোটা জীবনের চিন্তা ও কাজের ব্যাপারে নীতি-নির্ধারণ কথা এবং কালেমা কবূল করার অর্থ যে পুর্ণ জীবনে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করার ওয়াদা-একথা দ্বীনদার বলে পরিচিত মুসলমানদের মধ্যেও অনেকে জানে না। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও কালেমার এ ব্যাপক অর্থ শেখান হয় না। শিক্ষিত সমাজ যতি কালেমার এ মর্ম না জানে তাহলে এ দোষ কার?দেশের সরকার ও শিক্ষাব্যবস্থাই কি এ জন্য দায়ী নয়?

দ্বীন ইসলামের পয়লা সঠিক পাঠ-ই কালেমা তাইয়েবা। যে নীতি অনুযায়ী গোটা জীবন যাপন করতে হবে তা-ই যদি শেখার কোন ব্যবস্থা না হয় তাহলে মানুষ ইসলামকে জীবনে কি করে পালন করবে?

এরপর নামায হলো দ্বিতীয় ভিত্তি। আল্লাহ পাক মুসলিমদের উপর পাঁচ ওয়াক্তের নামায জামায়াতের সাথে ফরয করেছেন। ফরয মানে হলো অবশ্য কর্তব্য বা অপরিহার্য দায়িত্ব। আল্লাহ নামাযকে ফরযের গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের সমাজে নামাযের পজিশন কী? সাধারণভাবে এ দেশে নামায মুবাহ অবস্থায় আছে। অর্থাৎ করলে ক্ষতি নেই এবং না করলেও দোষ নেই। কোন কোন ক্ষেত্রে নামায পড়া মাকরূহ বা অপসন্দনীয়। পিয়ন জামায়াতে যেয়ে নামায পড়ে, বেনামাযী অফিসার এতে বিরক্ত হয়। কোথাও কোথাও নামায পড়া হারাম বা নিষিদ্ধ। ডিউটি থাকাকালে নামায কাযা করতে বাধ্য হতে হয়। দ্বীনে বাতিলের অধীনে নামাযের জন্য আল্লাহর দেয়া এ হুকুমের সাথে এরূপ ব্যবহার করাই স্বাভাবিক। যদি দ্বীনে হক এ দেশে কায়েম থাকতো তাহলে নামাযকে ফরয হিসেবেই মর্যাদা দেয়া হতো। সর্বত্র সবাই যাতে নামায ঠিক মতো আদায় করতে পারে সে ব্যবস্থা করা হতো। কর্তারা নিজে নামায ঠিক মতো আদায় করতো এবং নামায যে কালেমার নীতি অনুযায়ী জীবন যাপনের শিক্ষা দেয় তা নামাজীদের  জীবনে বস্তবে দেখা যেতো।

সমাজে রোযার অবস্থা কী?ইসলামের এ ভিত্তিটিও নামাযের মতোই ‘মুবাহ’ অবস্থায় আছে—অথচ আল্লাহ পাক রমযান মাসের রোযাকে ফরয করেছেন। দ্বীনে হক কায়েম থাকলে সমাজে এমন পরিবেশ সৃষ্টি হতো যার ফলে দিনের বেলা হোটেলের দরযায় পর্দা ঝুলিয়ে খওয়ার মতো মুনাফেকী করা কোন মুসলমানের পক্ষে সম্ভব হতো না।

রোযার উদ্দেশ্য যে নৈতিক উন্নয়ন, বর্তমানে সে নৈতিকতার কোন মূল্যই সমাজে নেই। প্রবৃত্তির দাসত্ব করার যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা করাই যেন দেশের নেতা ও কর্তাদের আসল কাজ। প্রবৃত্তিকে দমন করে বিবেকের শক্তি বৃদ্ধি কা রোযার অন্যতম বড় উদ্দেশ্য। ভাল ও মন্দের বিচার-জ্ঞান দিয়ে মানুষকে তৈরী করা হয়েছে। তাই মানুষকে বিবেকবান হিসেবে গড়ে তুলবার জন্যই রোযার প্রয়োজন। কিন্তু দ্বীনে বাতিলের নিকট বস্তুগত সুখ ও প্রবৃত্তির পূজা ই বড়। তাই “রমযানের পবিত্রতা রক্ষার” লোক দেখান কিছু অভিনয় চলে।

এবার হজ্জের অবস্থা দেখা যাক। যাদের হজ্জ করা উচিত তাদের উপর আল্লার নির্দেশ যে, মক্কা শরীফে যেয়ে হজ্জ আদায় করতে হবে। কিন্তু আল্লার এ আদেশটি দ্বীনে বাতিলেন অধীন। বাতিল যদি অনুমতি না দেয় তাহলে হজ্জে যাওয়া যাবে না। যদি দ্বীনে হক দেশে কায়েম থাকতো তাহলে যাদের হজ্জে যাবার ক্ষমতা আছে তাদেরকে সরকারীভাবে হজ্জে যাবার জন্য তাগিদ দেওয়া হতো।

যাকাতের অবস্থা আরও করুণ। প্রকৃতপক্ষে ইসলামে যাকাত ব্যবস্থা হলো সামাজিক নিরাপত্তার (social security) বিধান। যাদের প্রয়োজনের চেয়ে আয় কম এবং কোন না কোন কারণে যারা অভাবগ্রস্ত ও ঋণী হয়ে পড়েছে তাদের জন্য ইসলামী সরকারের দায়িত্ব হলো যাকাত দেয়ার যোগ্য লোকদের নিকট থেকে যাকাতের টাকা আদায় করে যাকাত গ্রহণের যোগ্য লোকদের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়া। যাকাত অন্যান্য ট্যাক্সের মতো নয়। যে কোন সরকারী কাজে যাকাতের টাকা খরচ করার অনুমতি নেই। কুরআনে খরচের যে আটটি খাতের উল্লেখ আছে তার বাইরে যাকাতের টাকা খরচ করার কোনো অধিকার সরকারের নেই। যাকাত ব্যবস্থা ঠিকমতো চালু করা হলে সমাজে ভিক্ষাবৃত্তি ও বেকার সমস্যা থাকতেই পারে না।

কিন্তু দ্বীনে হক চালু নেই বলে যাকাতের মতো মহান ব্যবস্থাটিও ইসলামের কলংক বলে ধারণা হওয়ার কারণ ঘটেছে। বর্তমান বাতিল সমাজ ব্যবস্থায় যে নিয়মে যাকাত চালু আছে তাতে মনে হয় যে, যাকাত যেন গরীবের প্রতি ধনীদের দয়ার ভিক্ষ। প্রকৃতপক্ষে ইসলামে যাকাত হলো ধনীদের উপর আল্লার ধার্য করা কর্তব্য এবং গরীবদের পক্ষে আল্লার বরাদ্দ করা অধিকার। ইসলামী সরকার যাকাত উসূল করে যথানিয়মে বিলি বন্টনের ব্যবস্থা করলে অত্যন্ত সম্মানের সাথে প্রাপকরা পেতে পারে। বর্তমানে যারা যাকাত পায় তারা অপমানজনকভাবেই দাতাদের অনুগ্রহ হিসাবে তা পাচ্ছে।

ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তিরই এখানে যে দুর্দশা তা থেকেই অনুমান করা যায় যে, গোটা ইসলামী জীবন বিধানের মর্যাদা এখানে কী। ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী সবার অন্তরে দ্বীনে হকের যত উচ্চ মর্যাদাই থাকুক, বাস্তবে এ দেশে যে দ্বীনে বাতিলের অধীনে ইসলামের নামটুকু মাত্র বেঁচেঁ আছে তা ইসলাম দরদীরাই উপলব্ধি করতে সক্ষম।

যেটুকু ইসলাম বেঁচে আছে তা দ্বীনি মাদ্রাসাগুলোরই বিশেষ অবদান। এসব মাদ্রাসা না থাকলে কুরআন ও হাদীসের কোন চর্চাই থাকতো না। মুসলিম জনগণের সাহায্য না  হলে এসব মাদ্রাসার অস্তিত্বই অসম্ভব হতো। বাতিলের অধীনে এটুকু বেঁচে থাকাটাও বড় সৌভাগ্যের কথা।

দ্বীনে হক কায়েম হলে বাতিলের অবস্থা কী হয়?

যেখানে দ্বীনে বাতিল কায়েম আছে সেখানে যেমন দ্বীনে হক বাতিলের অধীনে হয়ে থাকতে বাধ্য হয়, তেমনি দ্বীনে হক কায়েম হলে বাতিলকেই হকের অধীন হতে হয়। আল্লাহ পাক বাতিলকে খতম করার হুকুম দেননি। তিনি হককে বিজয়ী করার নির্দেশ দিয়েছেন। হক বিজয়ী হলে বাতিলকে ততটুকুই বেঁচে থাকার অধিকার ও সুযোগ দেয়া হবে যতটা হকের জন্য ক্ষতিকর নয়। যেমন বর্তমানে দ্বীনে হক ততটুকুই টিকে আছে যতটুকুতে বাতিলের আপত্তি নেই বা যতটুকু থাকলে দ্বীনে বাতিলের কোন ক্ষতি হয় না।

দ্বীনে হক কায়েম হলে বাতিল ধর্ম খতম হয়ে যাবে না। যারা অন্য ধর্ম পালন করতে চায় তাদেরকে বাধা দেয়া যাবে না। মন্দির, গির্জা ইত্যাদির হেফাযত করতে হবে। কারণ ধর্মের উপর শক্তি প্রয়োগ কুরআনে নিষেধ। ধর্ম মনের ব্যাপার। জোর করে ইসলাম কবুল করালে মনের দিক থেকে বিদ্রোহ থেকে যাবে। মনের উপর জোর খাটে না। তাই ইসলামী রাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রাখা জরুরী।

কিন্তু খৃস্টান বা ইয়াহুদীরা যদি ইসলামী রাষ্ট্রে সূদের ব্যবসার অনুমতি চায় বা কালচারের নামে প্রকাশ্যভাবে অশ্লীলতা ও নগ্নতা চালু করতে চায় তাহলে ইসলামী রাষ্ট্র এর অনুমতি দেবে না। এসর যেহেতু ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও নৈতিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে সেহেতু এসবকে সহ্য করা সম্ভব হবে না।

আল্লাহ পাক মানুষকে যে উন্নত নৈতিক সত্তা হিসেবে মর্যাদা দিতে চান তা একমাএ দ্বীনে হকের অধীনেই সম্ভব।  মানুষের মধ্যে পশুত্বের প্রবণতাতেক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে আরও আস্কারা দেয়ার জন্য দ্বীনে বাতিলের পক্ষ থেকে বস্তুগত অদ্ভুত দর্শন সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে মানুষ পশুর চেয়ে অধম ও জঘন্য চরিত্রের পরিচয় দিচ্ছে।

দ্বীনে হক বিজয়ী হলে মানুষকে সত্যিকার মানুষের মর্যাদায় উন্নীত করার জন্য আল্লাহ পাকের দেয়া বিধানকে বাস্তবে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে। বিশ্বনবী সেকালে দুনিয়ার সবচেয়ে অসভ্য ও নিকৃষ্ট মানব সমাজকে দ্বীনে হকের মাধ্যমেই ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ও সভ্যতম সমাজে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব

দ্বীনকে কায়েম করার দায়িত্ব কার? আল্লাহ পাক এ দায়িত্ব দিয়েই রাসূল (সঃ) কে পাঠিয়েছেন। যেমন কুরআন পাকের তিনটি সূরায় এ বিষয়ে পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে:

هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ

“তিনিই সে সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে হেদায়াত ও একমাত্র হক দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন যেন (সে দ্বীনকে) আর সব দ্বীনের উপর বিজয়ী করেন।” (সূরা আত তাওবা: ৩৩, সূরা ফাতহ: ২৮, সূরা আস সফ: ৯)

কিন্তু এ দায়িত্ব কি শুধু রাসূলেরই ! রাসূলের প্রতি যারা ঈমান এনেছিলের তারা কি শুধু নামায, রোযা ও অন্যান্য কতক ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করাই নাজাতের জন্য যথেষ্ট মনে করতেন?কুরআন ও হাদীস একথার সাক্ষী যে, প্রত্যেক ঈমানদারকেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর “ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব” পালনে জান ও মাল দ্বার পূর্ণরূপে শরীক হতে হতো। রাসূর (সঃ) এর ইমামতিতে মদীনর মসজিদে জামায়তে নামায় আদায়কারী এক হাজার লোক নিয়ে আল্লার রাসূল (সঃ) ওহুদের যুদ্ধে রওয়ানা হলেন। কিছুদূর যেয়ে আব্দুল্লাহ বিন উবাই এর নেতৃত্বে তিন শ’ লোক যুদ্ধে শরীক না হয়ে ফিরে এলো। আল্লাহ্‌ পাক এদেরকে মুনাফিক বলে ঘোষণা করলেন। তাবুকের যুদ্ধে তিনজনসাহাবী যথাসময়ে রওয়ানা না হওয়ায় এবং পরে রওয়ানা হবার নিয়ত তাদের থাকা সত্বেও রাসূলের নির্দেশে তাদেরক মুসলিম জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন ঘোষণা করা হলো। এমনকি তাদের বিবি বাচ্চাকে পর্যন্ত তাদের সাথে কথা বলা বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হলো। এ অবস্থায় দীর্ঘ পঞ্চাশ দিন তাওবা করার পর আল্লাহ পাক তাদেরকে ক্ষমা করলেন।

এ থেকে নিসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলের দায়িত্ব পালনে পূর্ণভাবে শরীক হওয়া ঈমানের অপরিহার্য দাবী। তাহলে বুঝা গেল যে, ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব প্রত্যেক মুসলিমেরই। রাসূলের এ মহান দায়িত্বে শরীক না হলে ঈমান আনার প্রয়োজনই কি ছিল? কুরআনে রাসূলের মুখ দিয়েই বলান হয়েছে যে:

 فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ

অর্থ: “আমাকে ভয় করে চল এবং আমার আনুগত্য কর। ” (সূরা শূয়ারা:১৫০)

অর্থাৎ রাসূলের পূর্ণ আনুগত্য করার মাধ্যমেই আল্লার আনুগত্য করা সম্ভব।

আল্লাহ পাক যত হুকুম করেছেন তা বাস্তবে মানব সমাজে তখনই চালু হতে পারে যখন দ্বীনে হক কায়েম হয়। কোন ফরযই দ্বীনে বাতিলের অধীনে ফরযের মর্যাদা পয় না। ইকামাতে দ্বীন ছাড়া কোন হারামই সমাজ থেকে উৎখাত হতে পারে না। তাই আল্লার রাসূল (সঃ)যত ফরয কায়েম করতে পেরেছিলেন তা ইকামাতে দ্বীনের ফলেই সম্ভব হয়েছিল। দ্বীন কায়েম করতে না পারলে কোন ফরযই সমাজে চালু করতে পারতেন না। সুতারাং ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্বটিই সব ফরযের বড় ফরয। ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্বকে অগ্রাহ্য করে নামায, রোযা, হজ্জ্ব, যাকাত ইত্যাদি কোন ফরযকেই ঠিকভাবে সমাজে কায়েম করা সম্ভব নয়। তেমনি দ্বীন কায়েম করা ছাড়া সমাজ থেকে খারাবী ও অন্যায়কে উৎখাত করা যায় না।

তাহলে একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব (ফরিযায়ে ইকামাতে দ্বীন) প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয। অর্থাৎ দ্বীনকে কায়েম বা বিজয়ী করার চেষ্টা করা “ফরযে আইন”। অবশ্য দ্বীন বিজয়ী হয়ে গেলে ইসলামী রাষ্ট্রের পরিচালক সরকারের উপরই দ্বীনকে কায়েম রাখার দায়িত্ব থাকে। তখন এটা সাধারণ মুসলিমদের জন্য “ফরযে কিফায়া” হয়ে যায়। কিন্তু দ্বীনে বাতিলকে পরাজিত করে দ্বীনে হককে বিজয়ী করার দায়িত্বটি অবশ্যই “ফরযে আইন”। আল্লার রাসূল (সঃ) কে اسوة حسنة (উৎকৃষ্টতম আদর্শ) ও সাহবায়ে কেরামকে অনুকরণ যোগ্য মনে করলে একথা স্বীকার করা ছাড়া উপায় নেই।

সব ফরযের বড় ফরয হিসেবে ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্বকে বুঝবার পর কারো পক্ষেই ইসলামের কতক মূল্যবান খেদমত করেই সন্তুষ্ট থাকা সম্ভব নয়। অবশ্য এ দায়িত্বের অনুভূতিই যাদের নেই তাদের কথাই আলাদা। নাজাত দেয়ার মালিক যে মহান আল্লাহ তিনিই তাদের হাল জানেন এবং তিনি কারো উপর অবিচার করবেন না -একথা নিশ্চিত্ কিন্তু আল্লাহ পাক যাদেরকে ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব (ফরিযা) বুঝবার যোগ্যতা দিয়েছেন তাদের পক্ষের এ বিষেয়ে অবহেলা করা স্বভাবিক নয়। মাদ্রাসা, খানকাহ ও তাবলীগের মাধ্যমে দ্বীনের যতটুকু খেদমত হচ্ছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকা তাদের পক্ষে অসম্ভব।

একথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, মাদ্রাসা, ওয়াজ, খানকাহ ও তাবলীগ দ্বারা দ্বীনের বড় বড় খেদমত হচ্ছে। এসব খেদমতই ইকামাতের দ্বীনের জন্য বিশেষ সাহয়ক্।  কিন্তু খেদমতগুলো দ্বারা আপনা আপনিই দ্বীন কায়েম হতে পারে না। দ্বীন কায়েমের কর্মনীতি (তারীকে কার) ও কর্মসূচী শুধু খেদমত পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে না। ইকামাতে দ্বীনের প্রচেষ্টা স্বাভাবিকভাবেই একটি বিপ্লবী আন্দোলনের রূপ লাভ করে। এ প্রচেষ্টাকেই তাই ইসলামী আন্দোলন বা “জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ ” বলা হয়।

রাসূল (সঃ) কি দায়িত্বের অতিরিক্ত কাজ করেছেন?

শেষ নবী ও বিশ্ব নবী (সঃ) বাতিলের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম করে নিজেও চরম নির্যাতন সহ্য করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও জান-মালের অবর্ণনীয় ক্ষতি স্বীকার করতে রাযী করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরিচালিত ইসলামী আন্দোলনের প্রথম তের বছরে একদল যোগ্য সহকমী তৈরী করার পর মদীনায় বিজয় যুগ শুরু হয়। এ বিজয়ও স্থিতিশীল হতে আট বছর লেগে যায়। কুরাইশদের নেতৃত্বে গোটা আরব শক্তি বারবার মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রটিকে  খতম করার চেষ্টা করেছে। ষষ্ঠ হিজরীর শেষভাগে হুদাইবিয়ার সন্ধির ফলে কুরাইশদের আক্রমণ বন্ধ হয় এবং অষ্টম হিজরীর রমযানে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে ইসলামী বিপ্লব স্থিতিশীল হয়।

গোটা আরবে ইসলামের বিজয় হবার পরও  পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যের  আক্রমণ থেকে ইসলামী রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য রাসূল (সঃ)-কে অনেক ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। চারপাশের সব রাষ্ট্রের কর্তাদেরকে তিনি ইসলাম কবুলের দাওয়াত দিয়েছেন এবং দাওয়াত কবুল না করলে ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনতা স্বীকার করার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রশ্ন হতে পারে যে, আল্লাহ দ্বীন ইসলামের যে দায়িত্ব রাসূলের উপর দিয়েছিলেন তার চেয়ে অতিরিক্ত কোন কাজ কি তিনি করেছেন? ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করা, এ রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য যুদ্ধ করা, এ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকার গঠন করা, দেশের প্রচলিত আইনের বদলে কুরআনের আইন চালু করা, ইনসাফপূর্ণ বিচার-ব্যবস্থা কায়েম করা, আল্লার দেয়া রিযক থেকে যাতে কেউ বঞ্চিত না থাকে এমন অর্থনৈতিক বিধান জারী করা ইত্যাদি অগণিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাজ তিনি করেছেন। এ কাজগুলো কি  ইসলামী দায়িত্ব হিসেবেই তিনি করেননি?

আল্লার রাসূলই হচ্ছেন দ্বীন ইসলামের আদর্শ। এসব কাজ যদি তিনি দ্বীনের দায়িত্ব হিসেবে নিজেই করে থকেন তাহলে এগুলোর গুরুত্বকে অবহেলা করলে দ্বীনদারীর ক্ষতি হবে কি না? বিস্ময়ের বিষয় যে, দ্বীনদারীর  দোহাই দিয়েই দ্বীনের এসব দায়িত্বকে অগ্রাহ্য করা হয়। বতিলকে পরাজিত করে দ্বীনে হককে বিজয়ী করার দ্বীনি দায়িত্বই যে আসল কাজ এবং সে কাজের যোগ্য হবার জন্যই যে, নামায, রোযা, যিকর ইত্যাদির দরকার, যদি দ্বীনদার লোকেরাই সে কথা না বুঝে তাহলে দ্বীন ইসলামকে বিজয়ী করার দায়িত্ব কারা পালন করবে?

মাদ্রাসায় যারা কুরআন ও হাদীসের ইলম বিতরণ করছেন, খানকায় যারা দ্বীনের তালকীন দিচ্ছেন, ওয়াযের মাহফিলে যারা জনগণের মধ্যে দ্বীনের আলো ছড়াচ্ছেন, তাবলীগের মারফতে যারা মানুষকে আখিরাতের ফিকর শিখাচ্ছেন-তারাই তো দ্বীনের প্রকৃত খাদেম এবং পতাকাবাহী। তাই ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব বুঝবার ক্ষমতা তাদেরই সবচেয়ে বেশী। তাই যারা দ্বীনের এতটুকু খেদমতও করে না তারা রাসূল (সঃ) এর ইকামাতে দ্বীনের কঠিন দায়িত্ব কী করে অনুভব করবে?

এজন্যই দ্বীনের সকল প্রকার খেদমতে নিযুক্ত সমস্ত মুখলিসীনে দ্বীনের নিকট আমার আকুল আবেদন যে, আপনারা ইকামাতে দ্বীনের এ যিম্মাদারী সম্পর্কে খোলা মনে চিন্তা-ভাবনা করে দেখুন। যদি আমি ভুল বুঝে থাকি কুরআন, হাদীস ও রাসূল (সঃ)-এর জীবন থেকে যুক্তি দিয়ে আমার ভুল  ধারণা দূর করতে সাহায্য করুন। আমাদের সবাইক আল্লারই নিকট হাযির হতে হবে। সেখানে যেন আমাদেরকে লজ্জিত হতে না হয় সেটাই বড় কথা।

সাধারণত এ দায়িত্ব পালন না করার অজুহাত হিসেবে কতক বড় বড় দ্বীনদার ব্যক্তির দোহাই দিয়ে বলে যে, তাঁরা কি এ দায়িত্বের কথা বুঝেননি? তাঁরা এ না করার কারণে কি আখিরাতে নাজাত পাবেন না? এ জাতীয় অজুহাত যারা তালাশ করেন তাদেরকে বুঝাবার সাধ্য কারো নেই। আল্লার রাসূল যদি আদর্শ হয়ে থাকতেন তাহলে তাঁকেই অনুসরণ করার চেষ্টা করতে হবে। অন্য কোন আলেম, বুযর্গ বা দ্বীনদার লোককে রাসূলের মুকাবিলায় দলীল হিসেবে পেশ করা একেবারেই অন্যায়।

আমাদরে প্রত্যেককেই আদালতে আখিরাতে নিজ নিজ কাজের হিসেব দিতে হবে। “ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব অমুক বড় আলেম পালন করেননি বলে আমিও পালন করা দরকার মনে করিনি”–এ খোঁড়া যুক্তি সেখানে কোন কাজে আসবে না। রাসূল (সঃ)-কে সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কিনা সে প্রশ্নই সেখানে করা হবে। এর উপরই নাজাত নির্ভর  করবে। কোন আলেমের দোহাই দিয়ে এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাবার কোন উপায়ই থাকবে না।

ইসলামী আন্দোলনের চিরন্তন কর্মপদ্ধতি

একথা সত্য যে, প্রত্যেক দেশের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অনুযায়ী সে দেশে ইসলামী আন্দোলনের বিস্তারিত কর্মসূচী রচিত হয়। কিন্তু আন্দোলনের মূল কর্মপদ্ধতি সবদেশে সর্বকালে একই। এটা এমন স্থায়ী কর্মপদ্ধতি যা আল্লার নবী ও রাসূলগণকে পর্যন্ত অনুসরণ করতে হয়েছে। দুনিয়ায় যে কোন আদর্শ কায়েমের এটাই একমাত্র স্বাভাবিক কর্মপদ্ধতি। এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নরূপ:

এক: আদর্শ যতই নিখুঁত হোক, কোন আদর্শ নিজে নিজে সমাজে কায়েম হতে পারে না। এমন একদল নেতা ও কর্মী বাহিনী তৈরী হওয়া প্রয়োজন যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগে ঐ আদর্শ বাস্তবে কায়েম করার যোগ্য।

দুই: এ ধরনের যোগ্য নেতা ও কমী দল আসমান থেকে নাযিল হয় না। মানব সমাজ থেকেই এদেরকে সংগঠিত করে গড়ে তুলতে হয়। আদর্শের আন্দোলনের পরিচালকগণ তাদেরকে সংগঠিত করে এক বিশেষ কর্মসূচীর মাধ্যমে তাদের মন, মগজ ও চরিত্র ঐ আদর্শ অনুযায়ী গড়ে তুলেন।

তিন: প্রত্যেক সমাজেই যেহেতু কোন বিধান প্রচলিত থাকে এবং সমাজপতিরা (রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব ) সে ব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে তাদের স্বর্থ কায়েম রাখে, সেহেতু নতুন কোন আদর্শের আন্দোলনকে তারা সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করে। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের সাথে কায়েমী স্বার্থের এ সংঘর্ষ প্রত্যেক নবীর জীবনেই দেখা গেছে। এ সংঘর্ষ অত্যন্ত স্বাভাবিক ও জরুরী। এ সংঘাতই কর্মীদের জন্য সত্যিকার পরীক্ষা। সমাজে সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েও এবং কায়েমী স্বার্থের জেল, জুলুম ও নির্যাতন বরদাশত করেও যারা আন্দোলনে টিকে থাকে তারাই এ আদর্শের যোগ্য বলে প্রমাণিত। এ স্বাভাবিক পরীক্ষা ছাড়া উপযোগী লোক বাছাই করার অন্য কোন উপায় নেই।

চার: আন্দোলনের যোগ্য নেতৃত্ব ও কর্মী বাহিনী তৈরীর এ চিরন্তন পদ্ধতি অবশ্যই সময় সাপেক্ষ। হঠাৎ অল্প সময়ে এটা কিছুতোই হতে পারে না। তাই বিশ্ব নবীকে দীর্ঘ ১৩টি বছর ব্যক্তি গঠন পর্যায়ে মদীনায় হিজরাতের পূর্ব পর্যন্ত কায়েমী স্বর্থের সাথে সংঘর্ষ করতে হয়েছিল। নবীর কর্মী বাহিনীকে শেষ পরীক্ষা দিতে হয়েছিল হিজরাতের মাধ্যমে। ইসলামের খাতিরে এমনভাবে যারা বাধ্য হয়ে বাড়ী-ঘর, আত্মীয়-স্বজন, ধন-সম্পদ ও জন্মভূমি  ত্যাগ করেছিলেন তাঁরা প্রমাণ দিলেন যে, তাঁদের হাতেই দ্বীন ইসলামের বিজয় সম্ভব। কারণ দুনিয়ার সবকিছুই একমাত্র আদর্শের জন্য তাঁরা ত্যাগ করতে পারেন। এভাবে আন্দোলনের মারফতে একদল ত্যাগী ও নিঃস্বার্থ কর্মীদল সৃষ্টি করতে বেশ কিছু সময় লাগা স্বভাবিক।

পাঁচ: ব্যক্তি গঠনের এ পর্যায় অতিক্রম করার পরই সমাজ গঠনের সুযোগ হতে পারে। ব্যক্তি গঠনের স্তরকে সংগ্রাম যুগও বলা যায়। সংগ্রাম যুগে তৈরী লোকদের হাতে কোথাও ক্ষমতা অর্পিত হলে আন্দোলনের বিজয় যুগ শুরু  হয় এবং তখনি সমাজ গঠন সম্ভব হয়। হিজরাতের পর মদীনায় এ সুযোগই রাসূল (সঃ) পেয়েছিলেন।

আদর্শ কায়েমের যোগ্য লোকের হাতে যে পর্যন্ত নেতৃত্ব না আসে সে পর্যন্ত আদর্শ কায়েম হতে পারে না। যারা ইসলামকে জানে না বা জানলেও নিজেদের জীবনে মানে না, তাদের দ্বারা কি করে ইসলাম কায়েম হতে পারে?যারা নিজেদের ব্যক্তি জীবনে ইসলাম কায়েমে ব্যর্থ তারা সমাজে ইসলামের খেদমতের যোগ্যতাই রাখে না।

ছয়: ইসলামের খেদমত ও ইসলামী আন্দোলনে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের সাথে প্রচলিত ক্ষমতাসীন ও কায়েমী স্বার্থের সংঘর্ষ অনিবার্য। কিন্তু ইসলামের যেসব খেদমত সম্পর্কে কায়েমী স্বার্থ বিচলিত নয় সে সবের সংগে তাদের সংঘাত হয় না। ইসলামের ঐসব খেদমত পরোক্ষভাবে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে ইসলামী আন্দোলনের সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এসব খেদমত প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থাকে বদলিয়ে দিতে পারে বলে আশংকা না করলে কায়েমী স্বার্থ তাদেরকে বাধা দেয় না। যদি কোন দাওয়াত ও কর্মসূচী সম্পর্কে কায়েমী স্বর্থের ধারণা হয় যে, তা দ্বারা তাদের পরিচালিত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনশক্তি গড়ে উঠবে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তারা সে আন্দোলনকে বরদাশত করে না। সত্যিকার পূর্ণাঙ্গ ইসলামী আন্দোলন প্রকৃতিগতভাবেই বিপ্লবাত্মক। আল্লার দাসত্ব ও রাসূল (সঃ)-এর নেতৃত্বের ভিত্তিতে ব্যক্তি, সমাজও রাষ্ট্রকে গঠন করার বিপ্লবীকর্মপদ্ধতি ও কর্মসূচীই রবীদের প্রধান সুন্নত। আল্লাহ ও রাসূল (সঃ)-আনুগত্যহীন সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনই ইসলামী আন্দোলনের লক্ষ্য। এ আন্দোলনকেই কুরআন পাকের ভাষায় ‘জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ’ বলা হয়।

সাত: ইসলামী আন্দোলন সঠিক কর্মপদ্ধতি ও কর্মসূচী নিয়ে দীর্ঘ সংগ্রাম যুগ অতিক্রম করা সত্ত্বেও এবং ইসলাম কায়েমের যোগ্য নেতৃত্ব ও কর্মীদল সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত বিজয় যুগ নাও আসতে পারে। অবশ্যই ঈমানদার ও সৎকর্মশীল এক জামায়াত লোক তৈরী হলেইসলামের বিজয়ের প্রথম শর্ত পূরণ হয়। কিন্তু যে সমাজে ইসলামী বিধান কায়েমের চেষ্টা চলে সে সমাজের বৃহত্তর জনসংখ্যা যদি আদর্শের সক্রিয় বিরোধী হয় তাহলে বিজয় সম্ভব নয়। রাসূলূল্লাহ (সঃ) এর তৈরী যে নেতৃত্ব ও কর্মীদল মদীনায় ইসলাম কায়েম করতে সক্ষম হলেন তারা মক্কায় কেন অক্ষম হলেন?মক্কার জনগণ সক্রিয়ভাবে ইসলাম বিরোধী ছিল বলেই সেখানে বিজয় আসেনি। এ থেকেই প্রমাণ হয় যে, ইসলাম বিরোধী জনতার উপর ইসলাম কায়েম করা যায় না। আল্লাহ পাক তাঁর দ্বীনের মহা নেয়ামত অনিচ্ছুক জনতার  উপর চাপিয়ে দেন না।

আল্লার অনেক রাসূল এ কারণেই দ্বীন ইসলামকে বিজয়ী করতে পারেননি। এটা তাদের ব্যর্থতা নয়। তাদের চেয়ে যোগ্য কে হতে পারে?ইসলাম কায়েমের যোগ্য লোক তৈরী হওয়ার শর্তটি মক্কায় পূর্ন হলেও জনগণের বিরোধী না হওয়ার শর্তটি সেখানে পূর্ণ হয়নি। এ দ্বিতীয় শর্তটি মদীনায় পূর্ণ হওয়ায় ইসলাম বিজয় লাভ করতে সক্ষম হয়।

একথা বিশেষভাবে লক্ষ্য করার বিষয় যে, ইসলামী আন্দোলনের কাজ হলে  প্রথম শর্ত পূরণের চেষ্টা করা-অর্থাৎ বাতিল শক্তির সাথে মুকাবিল করে সমাজের মধ্য থেকে একদল বিপ্লবী মুজাহিদ তৈরী করা। যদি এ শর্ত পূরণ হয় এবং  দ্বিতীয় শর্তও উপস্থিত থাকে তাহলে ঐ মুজাহিদ দলকে নেতৃত্ব দান করার দায়িত্ব আল্লাহ পাক নিজ হাতে রেখেছেন। কিভাবে কী পন্থায় কখন তিনি ক্ষমতা দান করবেন তা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে। ক্ষমতার আসনে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব আল্লারই। কোন অস্বাভাবিক ও কুটিল  পন্থায় নেতৃত্ব হাসিল করার চেষ্টা ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা হতে পারে না।

 وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ

অর্থ: তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার ও সৎকর্মশীল তাদেরকে দুনিয়ার খেলাফত দান করার ওয়াদা আল্লাহ করেছেন। ”-(সূরা আন নূর: ৫৫)

উপরোক্ত কর্মপদ্ধতি অনুসরণ না করে কোন না কোন প্রকারে ক্ষমতা হাসিল করলে যদি ইসলামকে কায়েম করার উদ্দেশ্য সফল হতো তাহলে রাসূল (সঃ)-কে মক্কার নেতারা ইসলামের দাওয়াত পরিত্যাগ করে বাদশাহী কবুল করার যখণ আহ্বান জানালেন তখন তিনি ক্ষমতা হতে নিয়ে কায়দা করে ইসলাম কায়েমের কথা নিশ্চয় বিবেচনা করতেন। একটি সমাজ ব্যবস্থাকে বদলিয়ে নতুন কোন ব্যবস্থা চালু করতে হলে ঐ সমাজ থেকেই নতুন আদর্শ কায়েমের উপযোগী একদল নিঃস্বার্থ লোককে তৈরী করতে হবে। আরও মজার ব্যাপর এই যে, এ ধরনের লোক অনৈসলামী সমাজে ইসলামী আন্দোলনের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। কারণ পার্থিব কোন স্বর্থের টানে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এগিয়ে আসা অস্বাভাবিক। যারা কায়েমী স্বার্থের বাধা ও যুলুমকে অগ্রাহ্য করে এগিয়ে আসে, তারাই নতুন আদর্শের উপযোগী। সংগ্রাম যুগেই এ দরনের লোক বাছাই করা সম্ভব। বিজয় যুগে সুবিধাবাদী লোকও আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। তখন নিঃস্বার্থ আদর্শবাহী বাছাই করা অত্যন্ত কঠিন। এজন্যই বিজয়ের পর আদর্শিক আন্দোলন ক্রমে ক্রমে স্বার্থপরদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইসলামী আন্দোলন ও ক্যাডার পদ্ধতি

যে কোন আদর্শ বাস্তবে কায়েম করতে হলে সে আদর্শে মন, মগয ও চরিত্র বিশিষ্টি নেতৃত্ব ও কর্মী বাহিনী তৈরী করতেই হবে। এ উদ্দেশ্যে যে সংগঠন কায়েম করা হয় এর নেতৃত্ব যদি আদর্শগত গুণাবলী ও যোগ্যতা ছাড়া শুধু রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক যোগ্যতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তাহলে এ জাতীয় সংগঠন দ্বারা কিছুতেই ঐ আদর্শ কায়েম হতে পারে না। তাই আদর্শ ভিত্তিক আন্দোলন উপযুক্ত নেতা ও কর্মীদল তৈরী করার জন্য কোন না কোন ক্যাডার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য।

মাদ্রাস, স্কুল ও কলেজে সব ছাত্রকে একই ক্লাসে ভর্তি করলে এবং একই মানের কাজ দিলে যেমন শিক্ষার উদ্দেশ্য সফল হতে পারে না, তেমনি সবধরনের লোককে সংগঠনে একই মানে হিসেব করলে মন, মগজ ও চরিত্র গঠনের লক্ষ্য হাসিল হতে পারে না। তাই প্রথমে সমর্থক, ক্রমে কর্মী ও সদস্যের দায়িত্ব গ্রহণ করার একটা স্বভাবিক ক্রমিক পর্যায় প্রয়োজন। এ জাতীয় পদ্ধতিকেই ক্যাডার সিষ্টেম বলে।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সংগঠনে ক্যাডার সিষ্টেম ছিল না বলে যারা মনে করেন তারা হিসেবে বিরাট ভুল করেন। রাসূলের প্রতি ঈমান আনার ফলে কায়েমী স্বার্থের পক্ষ থেকে যে চরম বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হতো তার ফলে আপনিতেই ক্যাডার পদ্ধতি গড়ে উঠেছিল। কে কে যুলুম-অত্যাচার সত্ত্বেও রাসূলকে ত্যাগ করতে রাযী হননি, আর কারা বিপদের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত হতে সাহস পাচ্ছিলেন না তা সে সময় সহজেই বাছাই করা সম্ভব ছিল।

বর্তমানে মুসলিম সমাজে ইসলামী আন্দোলন যদ্দিন ঐ রকম কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন না হয় তদ্দিন কৃত্রিমভাবেই ক্যাডার সিষ্টেম চালু করতে হবে। কিন্তু আসল ক্যাডার পদ্ধতি তখন গড়ে উঠবে যখন বাতিল শক্তির সাথে বিরোধ প্রকট হয়ে উঠবে। ঐ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবার পূর্বে ইসলামী আন্দোলনে কে কি পরিমাণ সক্রিয় এবং জান-মাল কে কতটুকু কুরবানী দিতে পারে এর বিভিন্ন মান নির্ণয়ের জন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই শ্রেণী বিন্যাস প্রয়োজন। কারণ বর্তমান মুসলিম সমাজে মুসলিম হবার দাবীদার সবাই। এর মধ্যে খুব পরহেযগার ব্যক্তিও হয়তো ইসলামী আন্দোলনের ব্যাপারে মোটেই যোগ্য নন। একজন ভালো মুহাদ্দিসও হয়তো আন্দোলনের ময়দানে এগুতে রাযী নন। মসজিদের একজন যোগ্য ইমাম হয়েও বাতিলের বিরুদ্ধে ময়দানে নামতে রাযী না ও হতে পারেন। এ ধরনের লোকদেরকে  ইসলামী আন্দোলনের সংগঠনে সংগঠনে সদস্য বলে স্বীকার করা দ্বারা ইকামাতে দ্বীনের কাজ অগ্রসর হতে পারে না। এজন্যই ক্যাডার সিষ্টেম ছাড়া লোক তৈরীর উদ্দেশ্য সফল হতে পারে না।

ক্যাডারের এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা সত্ত্বেও হক ও বাতিরের চরম সংঘর্ষের সময় কিছু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় লোকও দুর্বলতার পরিচয় দিয়ে পিছিয়ে পড়তে পারে, আবার অনগ্রসর কিছু লোক অগ্রসর হয়ে আসতে পারে। তখন-ই ক্যাডার পদ্ধতিটি স্বাভাবিক মানে পৌঁছবে।

হক ও বাতিলের সংঘর্ষ অনিবার্য কেন?

দুনিয়ায় যত নবী ও রাসূল এসেছেন তাঁদের সবাই দ্বীনে হক কায়েম করার দায়িত্বই পালন করে গেছেন। যে দেশে দ্বীনে হক কায়েম ছিল না সেখানে অবশ্যই বাতিল কায়েম ছিল। হক কায়েমের চেষ্টা করলে বাতিলের পক্ষ থেকে বাধা আসাই স্বাভাবিক। কারণ হক ও বাতিল একই সাথে চালু থাকতে পারে না। আলো ও অন্ধকারের সহ অবস্থান বাধা দিয়েছে একমাত্র আদম (আ) এবং সূলায়মান (আ) বাধার সম্মুখীন হননি। কারণ আদম (আ) এর সময় কোন মানুষই ছিল না, বাধা দেবে কে?আর সুলায়মান (আ) তাঁর পিতা দাউদ (আ) এর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের পরিচালক ছিলেন বলে তাঁকে বাধা দেয়ার মতো কোন বাতির শক্তি ছিলই না।

হকের আওতায় যে কালেমায়ে তাইয়েবার মারফতে পয়লা ঘোষণা করা হয় তার মধ্যে আল্লাহকে ইলাহ স্বীকার করার পূর্বে লা-ইলাহা বলে সমস্ত বাতিলকে অস্বীকার করা হয়। সমাজে ইলাহ বা মনিব বা হুকুমকর্তার দাবীদার বাতিল শক্তি কায়েম আছে বলেই পয়লা বাতিলকে অস্বীকার করা দরকার হয়। বাতিলকে মন-মগজে বলে কায়েম রেখে হককে স্বীকার করা অর্থহীন। তাই পয়লা লা-ইলাহা বলে সমস্ত বাতিল ইলাহকে অস্বীকার করে ইল্লাল্লাহ বলে একমাত্র আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

 فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىٰ

অর্থ: “যে তাগুতকে অস্বীকার করলো এবং আল্লার প্রতি ঈমান আনল সে-ই মযবুত রজ্জু ধারণ করেছে। ”-(সূরা বাকরা: ২৫৬, আয়াতুল কুরসী)

তাগুত অর্থ হলো আল্লার বিদ্রাহী শক্তি। কাফের আল্লাহকে অস্বীকার করে মাত্র। কিন্তু তাগুত মানুষকে আল্লার দাসত্ব করতে বাধা দেয় এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে তার আনুগত্য করতে বাধ্য করে। ফিরাউন এমনি ধরনের তাগুত ছিল বলেই মূসা (আ) কে ফিরাউনের নিকট পাঠাবার সময় আল্লাহ বললেন—

اذْهَبْ إِلَىٰ فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَىٰ

 “ফিরাউনের কাছে যাও, নিশ্চয়ই সে বিদ্রোহ করেছে। ”-(সূরা আন নাযিয়াত: ১৭)

ইসলাম বিরোধী শক্তি এক কথায় তাগুত। দ্বীনে বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বলা হয়যে, লা-ইলাহা বা কোন হুকুমকর্তাকে মানি না। অন্য সব কর্তাকে অস্বীকার করার পরই ইল্লাল্লাহ বলে আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ হিসেবে স্বীকার করা যায়। সুতারাং ইসলামের প্রথম কথাই বাতিলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এ কারণেই কালেমার দাওয়াত নিয়ে যে নবীই এসছেন তাগুত বা বাতিল তাকে স্বাভাবিকভাবেই দুশমন মনে করে নিয়েছে।

আল্লাহ পাক যাদেরকে নবী ও রাসূল হিসেবে বাছাই করেছেন তারা সবাই নিজ নিজ দেশে সৎ, বিশ্বাসী, সত্যবাদী ও অন্যান্য যাবতীয় মানবিক গুণের কারণে জনপ্রিয় ছিলেন। দ্বীনে হকের দাওয়াত দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত শেষ নবীও আল-আমীন ও আস-সাদেক বলে প্রশংসিত ছিলেন। কিন্তু أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ “আল্লার দাসত্ব কর ও তাগুতকে ত্যাগ কর। ”-(সূরা আন নাহল: ৩৬) বলে দাওয়াত দেয়ার পর নবীর সাথে তাগুতের সংঘর্ষ না হয়েই পারে না।

নবীর দাওয়াত শুনেই নমরূদ, ফিরাউন ও আবু জেহেলরা বুঝতে পারল যে, তারা দেশকে যে আইনে শাসন করছে ও সমাজকে যে নীতিতে চালাচ্ছে, তা বদলিয়ে নবী নতুন কোন ব্যবস্থা চালু করতে চান। ফিরাউন স্পষ্ট বললো: إِنِّي أَخَافُ أَن يُبَدِّلَ دِينَكُمْ “আমি আশংকা করি যে, (মূসা) তোমাদের দ্বীনকে বদলিয়ে দেবে। ”-(সূরা মুমিন:২৬)

যারা দেশ শাসন করে তারা আইন-কানুন এমনভাবেই বানায় যাতে শাসক শ্রেণীর স্বর্থ ঠিক থাকে। জনগণকে শোষণ করে শাষক গোষ্ঠীর প্রাধান্য বজায় রাখার উপযোগী আইন ও অর্থব্যবস্থাই চালু রাখা হয়। মানব রচিত আইনের বৈশিষ্ট্যই এটা, সুতারাং প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা বহাল রাখাই শাসকদের স্বার্থ। এজন্যেই এদেরকে কায়েমী ম্বার্থ বলা হয়। অর্থাৎ প্রচলিত ব্যবস্থা বহাল থাকলে যাদের স্বার্থ কায়েম থাকে তারাই কায়েমী স্বার্থ(Vested Interest)।

যখনই কোন নবী আল্লার দাসত্বের দাওয়াত দিয়েছেন তখনই এ কায়েমী স্বার্থ এটাকে তাদের স্বার্থের বিরোধী বলে বুঝতে পেরেছে। সে কারণেই তারা বাধা দেয়া জরুরী মনে করেছে। শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিই নয়, সামাজিক ও ধর্মীয় স্বার্থও নবীদেরকে সহ্য করেনি। ইব্রাহীম (আ)-এর  পিতা আযর ধমীয় নেতা ছিল। নমরূদের দরবারে তার রাজ-পুরোহিতের মর্যাদা ছিল। ধর্মের ব্যবসা নিয়ে নমরূদের অদীনে সুখেই ছিল। ইব্রাহীম (আ)-এর দাওয়াতে আযরের ধর্মীয় কায়েমী স্বার্থে আঘাত লাগল। শেষ নবী আশা করেছিলেন যে, ইয়াহুদী ও নাসারাদের ওলামা ও পীরেরা (কুরআনের ভাষায় আহবার ও রুহবান) হয়তো তাঁর দাওয়াত সহজেই কবুল করবে। কারণ আল্লাহ, আখেরাত, নবী, ওহী ইত্যাদির সাথে তারা আগেই পরিচিত। কিন্তু দেখা গেল যে, রাসূল (সঃ) এর সাথে যখন মক্কার রাজনৈতিক ও অথনৈতিক ও কায়েমী স্বার্থের সংঘর্ষ বাঁধল তখন ঐ আহবার ও রুহবারদের ধর্মীয় স্বার্থও তাদেরকে আবু জেহেলদের সাথেই সহযোগিতা করতে বাধ্য করল। এভাবেই হক ও বাতিলের সংঘর্ষ অবশ্যই অনিবার্য এবং হকের বিরুদ্ধে সকল প্রকার কায়েমী স্বার্থ একজোট হয়েই বিরোধিতা করে থাকে।

 কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, মুসলিম প্রধান দেশে মুসলিম শাসকদের সাথে ইসলামী আন্দোলনের এ ধরনের বিরোধ হবার কারণ কী?মুসলিম নামধারী হলেই সত্যিকার ইসলামপন্থী হয়ে যায় না। ইয়াযীদ মুসলিম শাসকই ছিল। কিন্তু ইসলামী আদর্শের ধারক ইমাম হুসাইন (রাঃ) কে ইয়াযীদ সহ্য করতে পারেনি। এ দেশে মুসলিম নামধারী নাস্তিক, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, কমিউনিষ্ট ও সোসালিষ্ট বহু নেতা ও দল আছে যারা ইসলামী আন্দোলনের চরম দুশমন।

আসল ব্যাপার হলো কায়েমী স্বার্থের সুবিধা ভোগ করছে তারা যখন বুঝতে পারে যে, ইসলামী আন্দোলন বিজয়ী হলে যে ধরনের আইন-কানুন ও সমাজ ব্যবস্থা চালু হবে তাতে তাদের বর্তমান প্রতিষ্ঠিত স্বার্থহবে তখনই তারা এ আন্দোলনের শক্র হয়ে যায়।

যে বাতিল শক্তি দ্বীনে হক কায়েমের পথে বাধা সৃষ্টি করে তা দু ধরনের হয়ে থাকে। প্রধান বাতিল শক্তি হলো সরকারী ক্ষমতাসীন শক্তি। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যাদের হাতে থাকে তারা ইকামাতে দ্বীনের আন্দোলনকে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। অনৈসলামী সমাজে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা দলের নেতৃত্বে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা যে চালু হতে পারে না সে কথা তারা ভালভাবেই জানে। ইসলামী রাষ্ট্রে তাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই তারা ইসলামী আন্দোলনের বিরোধী।

সমাজে ইসলামী আন্দোলনের বিরোধী আরও এক ধরনের শক্তি রয়েছে যারা সরাসরি বাতিল শক্তির মাধ্যে গণ্য হলেও হক ও বাতিলের সংঘর্ষে তারা হকের পক্ষে সক্রিয় হন না। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তারা বাতিলের সাথেই সহযোগিতা করেন। বাতিলের বিরুদ্ধে ময়দানে যারা সক্রিয় নয় তারা ঐ সংঘর্ষে শেষ পর্যন্তনিরপেক্ষ থাকতে পারেন না। এমনকি দ্বীনের খাদেম হয়েও এ জাতীয় ভূমিকা পালন করতে বাধ্য হন। ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব পালন করার হিম্মত যারা করেন না তারা এক পর্যায়ে বাতিলেরই সহায়ক প্রমাণিত হন।

দ্বীনি খেদমতের সাথে এ সংঘর্ষ হয় না কেন?

যে দেশে দ্বীনে হক কায়েম নেই সেখানে ইকামাতে দ্বীনের কাজ বা ইসলামী আন্দোলন চালালে কায়েমী স্বার্থ অবশ্যই বাধা দেবে। ইসলামী আন্দোলনকে দ্বীন বাতিলের জন্য ক্ষতিকর ও আপত্তিকর মনে করাই স্বাভাবিক। যদি কায়েমী স্বার্থ কোন ইসলামী খেদমতকে বিপজ্জনক মনে না করে তাহলে বুঝতে হবে যে, ঐ খেদমত যতই মূল্যবান হোক তা ইকামাতে দ্বীনের আন্দোলন নয়।

মাদ্রাসাসমূহ নিসন্দেহে দ্বীনের বিরাট খেদমত। কিন্তু মাদ্রাসার যে দাওয়াত ও কর্মসুচী তা বাতিল সরকার ও সমাজ ব্যবস্থাকে উৎখাত করবে বলে কায়েমী স্বার্থ মনে করে না। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা ভারতের দেওবন্দে অবস্থিত। ভারত সরকারের জন্য ক্ষতিকর মনে করে না। ১৯৮০ সালের মার্চ মাসে দেওবন্দ মাদ্রাসার শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে এক বিরাট আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঐ সম্মেলনে বক্তৃতা করেছেন। ইন্দিরা সরকার দেওবন্দ মাদ্রাসার দাওয়াত ও কর্মসূচীকে সে দেশের সমাজও রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য কোন প্রকার ক্ষতিকারক মনে করেননি।

দ্বীনের বিরাট খেদমত হিসেবে দেওবন্দ মাদ্রাসাসহ আমাদের দেশের ছোট বড় সব মাদ্রাসার নিকটই মুসলিম জাতি কৃতজ্ঞ। এ খেদমতের গুরুত্ব কোন মুসলিমই অস্বীকার করতে পারে না। এসব মাদ্রাসা নিশ্চয়ই ইসলামী আন্দোলনের সহায়ক। আন্দোলনের যোগ্য বহু আলেম এসব মাদ্রামা থেকে এসছেন। কিন্তু মাদ্রাসাগুলো নিজেরা প্রত্যক্ষভাবে ইকামাতে দ্বীনের আন্দোলন চালাচ্ছে না।

 তেমনিভাবে তাবলীগ জামায়াত দ্বীনের এক মহান খেদমতের আঞ্জাম দিচ্ছে। এ জামায়াত সারা দুনিয়ায়ই বিপুল সংখক লোককে আল্লাহ, রাসূল ও আখেরাতমুখী বানাচ্ছে। এ জামায়াতের কেন্দ্র ভারতের দিল্লীতে অবস্থিত। এ বিশ্ব জামায়াতের আমীর ও ভারতের নাগরিক। কিন্তু এ জামায়াতকে কোন দেশের সরকারই তাদের জন্য ক্ষতিকর মনে করে না। এমন কি চীন ও রাশিয়াতে পর্যন্ত এ জামায়াতকে যেতে বাধা দেয়নি। এ মহান জামায়াতের উছিলায় কমিউনিষ্ট দেশেও কালেমা-নামাযের পয়গাম এবং আল্লাহ, রাসূল ও আখেরাতের দাওয়াত পৌঁছতে পারছে–এটা খুবই আনন্দের কথা। এটাকে ছোট খেদমত মনে করা অন্যায়।

কিন্তু তাবলীগের দ্বারা যত বড় দ্বীনি খেদমতই হোক এ জামায়াতের দাওয়াত ও কর্মসূচীতেই ইকামাতে দ্বীনের কোন পরিকল্পনা নেই। মুসলিম সংখ্যালঘু দেশ-এমন কি কমিউনিষ্ট দেশেও এ জামায়াতকে কাজ করতে হচ্ছে। সুতরাং বাতিলের সাথে সংঘর্ষ এড়িয়ে দ্বীনের খেদমত করার যতটুকু সুযোগ নেয়া সম্ভব ততটুকুই এ জামায়াত নিচ্ছে।

সাড়ে চার বছর মনপ্রাণ লাগিয়ে এ জামায়াতে কাজ করার আমার সৌভাগ্য হয়েছে। এম. এ. পরীক্ষা দিয়েই তিন চিল্লায় (চার মাস) একটানা এ জামায়াতের সাথে থাকা কালেই নিজের জীবনকে ইসলামের জন্য উৎসর্গ করার জযবা ও প্রেরণা বোধ করি। সুতরাং আমার জীবনে তাবলীগ জামায়াতের সাথে আমার মহব্বত স্বাভাবিকভাবেই গভীর ও স্থায়ী।

বাংলাদেশ তাবলীগ জামায়াতের নেতৃস্থানীয় সবাইকে আমি অন্তর থেকে মহব্বত করি। কারণ এক সাথে কয়েক বছর এক জামায়াতে কাজ করার দরুন ব্যক্তিগতভাবে তাদের ইখলাস ও একাগ্রতা সম্পর্কে আমার সঠিক ধারণা হবার সুযোগ হয়েছে। তাদের কাউকে আমি অন্তরে উস্তাদ হিসেবে শ্রদ্ধা করি-যেমন হযরত মাওলানা আব্দুল আযীয, সাবেক আমীর, তাবলীগ জামায়াত, বাংলাদেশ। কেউ আমার শ্রদ্ধাভজন দ্বীনি মুরুব্বী যার কাছ থেকে ইসলামের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করার প্রেরণা পেয়েছি-যেমন ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মুকীত ভাই। নেতৃস্থানীয়রে মধ্যে বেশ কয়েকজন আছেন যাদেরকে ঘনিষ্ট সহকর্মী ও মহব্বতের বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলাম।

আমার ঐসব উস্তাদ, মুরুব্বী ও বন্ধুদের খেদমতে অত্যন্ত দরদের সাথে আকুল আবেদন জানাই যাতে তাদের নেতৃত্বে ¦ পরিচালিত এ মহান জামায়াত সম্পর্কে এ দেশের মুসলমানদের মধ্যে কেউ কোন ভূল ধারণার সৃষ্টি করতে না পারে। কেউ কেউ তাবলীগ জামায়াতের কাজকে হুবহু রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর পরিচালিত ইসলামী আন্দোলন বলে প্রচার করে থাকেন। বর্তমান কালের  মাদ্রাসগুলোতে কুরআন ও হাদীসেরই শিক্ষা হচ্ছে। কিন্তু তাই বলে কেউ যদি মনে করে যে, রাসূল (সঃ) এ ধরনের তাবলীগ জামায়াতের কাজ দ্বারা দ্বীনের বড় খেদমত হওয়া সত্ত্বেও এ ধারণা সৃষ্টি হতে দেয়া উচিত নয় যে, ঠিক এতটুকু কর্মসূচী নিয়েই রাসূল (সঃ) ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

দ্বীন ইসলামকে বিজয়ী করার যে কঠিন ও সংগ্রামপূর্ণ  আন্দোলন আল্লার রাসূল (সঃ) পরিচালনা করেছিলেন এবং যে কর্মসূচী নিয়ে তিনি বাস্তবে দ্বীনকে কায়েম করে গেছেন ঠিক সে আন্দোলনের কর্মসূচীই যদি তাবলীগ জামায়াত গ্রহণ করতো তাহলে বিনা বাধায় এবং বাতিলের সাথে কোন সংঘর্ষ ছাড়া এভাবে সব দেশে কাজ করা সুযোগ পেতো না। দুনিয়াময় দ্বীনের বুনিয়াদী শিক্ষাকে পৌঁছাবার প্রাথমিক কর্তব্য পালনের যে কর্মসূচী এ জামায়াত গ্রহণ করেছে তাতে সংঘর্ষ এড়িয়ে চলতে হলে বর্তমান কর্মসূচীই সঠিক। কিন্তু  আল্লার দ্বীনকে দুনিয়ায় বিজয়ী ও কায়েম করার জন্য  এটুকু কর্মসূচী যে কোনক্রমেই যথেষ্ট নয় সে কথা সবারই বুঝতে হবে। দাওয়াত ও কর্মসূচীকেই রাসূল (সঃ) এর আন্দোলন বলে ধারণা সৃষ্টি হয় তাহলে এ জামায়াত দ্বারা দ্বীনের যে পরিমান খেদমত হচ্ছে তার চেয়ে বেশী পরিমাণে দ্বীনের ক্ষতির আশংকা রয়েছে। যাদের মধ্যে এ ভূল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে তাদের আচরন থেকেই এ ক্ষতির ধরন ও পরিমাণ সম্পর্কে অনুমান করা যায়।

যারা তাবলীগ জামায়াতের ছয় উসূল বিশিষ্ট কর্মসূচী ও এ জামায়াতের কর্মপদ্ধতি (তারীকে কার) রাসূল (সঃ) এর মক্কী জীবনের দ্বীনি দাওয়াতের অনুরূপ বলে মনে করেন এবং এটুকু কাজের মাধ্যমে আল্লার যমীনে আল্লার দ্বীন কায়েম হয়ে যাবে বলে আশা করেন তাদের মধ্যে কয়েকটি ভুল ধারণা সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক:

এক: প্রথমত তারা ইসলামকে শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রেইসীমাবদ্ধ মনে করবে। জীবনের সকল ক্ষেত্রের জন্যই ইসলাম যে বিধান দিয়েছে তার কোন প্রয়োজনই মনে করবে না। ইসলামের অর্থনীতি, আইন ও রাজনীতি তাদের নিকট অপ্রয়োজনীয়ই মনে হবে।

দুইঃ ইসলামী রাষ্ট্র ও ইসলামী সরকার কায়েমের আন্দোলনকে তারা দুনিয়াদাবী  কাজ মনে করবে এবং যারা এ কাজ করে তাদেরকে ক্ষমতার লোভী বলেই ধারণা করবে।

তিনঃ বাতিলের সাথে সংঘর্ষে এড়ড়িয়ে দ্বীন কায়েমের ধারণা তাদের মধ্যে এমন মনোভাব সৃষ্টি করবে যে, বাতেল  ইসলামের যতটুকুতে আপত্তি করে না ততটুকু ইসলাম নিয়েই তারা সন্তুষ্ট থাকবে।

চারঃ এ ধারণার ফলে দ্বীনের আর যত প্রকার খেদমত আছে সেসবকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে। শুধু তাবলীগই দ্বীনের কাজ মনে হবে এবং অন্যান্য দ্বীনি খেদমতের মূল্য বুঝবারযোগ্যতাই তাদের থাকবে না।

পাচঃ নির্বাচনের সময় এ জাতীয় লোকেরা ইসলাম বিরোধী লোককে ভোট দিতেও আপত্তি করবে না। বরং ইসলামের আইন চালু করার দাবীতে যারা রাজনীতি করে তাদেরকে তারা অপছন্দ করবে। ইসলামের নামে রাজনীতি করাকে তারা দূষনীয় মনে করার কারণে ভোটের বেলায় তারা ঐসব লোককেই ভোট দেবে যারা ইসলামের কথা বলেই না।

ছয়ঃ তাদের এ ধারণাওঁ হতে পারে যে, তাবলীগ জামায়াত এমন সুন্দর কায়দায় দ্বীন ইসলামকে কায়েম করার চেষ্টা করছে যে, ইসলামের দুশমনরা টেরই পাচ্ছে না। এমন চমৎকার হিকমতের সাথে কাজ করা হচ্ছে যে,ইসলাম বিরোধীরা বাধা দেয়ারকোন উপায়ই তালাশ করে পাচ্ছে না।

এ রকম ধারণা হলে তা কতো মারাত্মক ! আল্লাহ পাক কি নবীদেরকে এমন হিকমত শেখাতে পারলেন না,যাতে তারা তাবলীগের মতো বিনা বাধায় কাজ করতে পারতেন?নবীগণ কি তাহলে এত যুলুম অত্যাচার অনর্থক সহ্য করলেন?

কেউ বলতে পারে যে, নবীরা কাফেরদের মধ্যে দাওয়াত দিচ্ছিলেন বলেইবাধা পেয়েছেন। আর তাবলীগ মুসলমানদের মধ্যেই কাজ করছে বলে বাধা নেই। মুসলমানদেরকে ব্যক্তিগতভাবে ভালো মুসলমান বানাবার

চেষ্টা করলে বাতিল থেকে বাধা আসবে কেন? কিন্তু দেশের আইন, শাসন ও সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তনের দাওয়াত ও কর্মসূচী নিয়ে কাজ করলে মুসলিম নামধারী শাসক শক্তি অমুসলিমদের মতোই বাধা দেবে।

এসব আশংকার কারণেই তাবলীগ জামায়াতের দায়িত্বশীলদের খেদমতে এত কথা আরয করতে বাধ্য হলাম। তাবলীগ জামায়াত ইকামাতে দ্বীনের আন্দোলন নয়। এ জামায়াত দ্বীনের মহা মূল্যবান খেদমতের এক বিশ্বজোড়া আন্দোলন। তাবলীগ সম্পর্কে এ ধারণাই আমি সঠিক বলে মনে করি। তাবলীগের দাওয়াত ও কর্মসূচীকে রাসূল (সাঃ) এর ইসলামী আন্দোলনের মতোই পূর্ণাঙ্গ বলে ধারণা হওয়াটা ইসলামী জীবন- বিধানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে। এর ফলে বিশ্ব নবীকে মাত্র একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে মনে করা হবে। আল্লাহ পাক এ জাতীয় ভুল ধারণা থেকে মুসলিম জাতিকে রক্ষা করুন।

প্রতি বছর তাবলীগের যে বিরাট বিশ্ব এজতেমা টংগীর বিস্তীর্ণ এক ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় তাতে বিভিন্ন সময়ে ১৫ থেকে ২৫ লাখ লোকের সমাগম হয়। এটা সত্যিই উৎসাহের ব্যাপার। আমিও এতে শরীক হই   এবং মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের প্রতি মহব্বতের এ দৃশ্য দেখে চোখ জুড়াই।

দ্বীনে বাতিলকে উৎখাত করে দ্বীনে হককে কায়েম করার দাওয়াত ও কর্মসূচী নিয়ে যদি এর দশ ভাগের এক ভাগ লোকও একত্র হয় তাহলে এ দেশের সরকার ও কায়েমী স্বার্থ অস্থির হয়ে যেতো। ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতন্ত্রী মহল পত্র পত্রিকায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হৈ চৈ শুরু করতো।

১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকায় একটি ইসলামী ছাত্র সংগঠনের মাত্র ১৫/২০ হাজার কর্মীর সম্মেলন ও মিছিল সমস্ত ইসলাম বিরোধী মহলে অদ্ভুত কম্পন সৃষ্টি করেছে। অথচ এ সংগঠনটি কোন রাজনৈতিক দল নয়। তারা ইকামাতে দ্বীনের কথা বলে এবং ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমে ছাত্র সমাজকে উদ্বুদ্ধ কেরে বলেই কায়েমী স্বার্থ এত বিচলিত।

সকল বাতিল শক্তি ও ইসলাম বিরোধি মহল ভাল করেই জানে যে, তাবলিগ নিছক ও নির্ভেজাল একটি ধর্মীয় জামায়েত এবং রাজনীতি,রাষ্ট্র ও সরকার নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না। সুতারাং তাদের সম্পর্কে চিন্তা ভাবনার কোন কারন নেই ও ঘাবড়াবার কোন হেতু নেই।

ঠিক একই কারনে পীর সাহেবানদের ওরস ও মাহফিলের লক্ষ লক্ষ মুসলমানের সমাবেশকে বাতিল শক্তি ভয় পায় না। এসব মাহফিলে ওয়াজ,তালকিন ও যিকর-এর মারফতে ইসলামের খেদমত নিশ্চই হচ্ছে। কিন্তু সেখানে ইকামাতে দ্বীনের কোন কর্মসূচী না থাকায় ইসলাম বিরোধী মহল চিন্তিত নয়।

এ কথা পরিষ্কার করার জন্যই উদাহরনস্বরূপ মাদ্রাসা,তাবলীগ,ও খানকার উল্লেখ করলাম। খেদমতে দ্বীনের সাথে বাতিল শক্তির সংঘর্ষ হয় না। একমাত্র ইকামাতে দ্বীনের দাওয়াত ও প্রোগ্রামের সংগেই এ সংঘর্ষ বাধে। সব নবীর জীবনেই একথা সত্য বলে দেখিয়ে গিয়েছে।

কুরআন মাজিদে যত নবী ও রাসূলের কথা আলোচনা হয়েছে তাতে দেখা যায় যে,সমকালীন ক্ষমতাসীন শক্তি ও ধর্মীয় কায়েমী স্বার্থ কোন নবীকেই বরদাশত করতে পারেনি। শুধু হযরত আদম (আঃ)ও হযরত সুলায়মান (আঃ) ছাড়া আর সব নবীর সাথেই বাতিল শক্তির সংঘর্ষ হয়েছে। ইকামাতে দ্বীনের কর্মসূচী নিয়ে কাজ করায় যদি নবীদেরকেই বাতিলের সাথে সংঘর্ষ করতে হয়ে থাকে তাহলে নবীর উম্মতের পক্ষে এ সংঘর্ষ এড়িয়ে এ ইসলামকে কায়েম করা কি করে সম্ভব হেতে পারে?

যারা বাতিলের সাথে সংঘর্ষ এড়িয়ে চলাকে হিকমাত মনে করেন তাদের চিন্তা করা উচিত যে, আল্লাহ পাক নবী রাসূলকে ঐ হিকমাতটা কেন শেখালেন না? আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার উদ্দেশ্যে যারা কাজ করতে চান তারা এ সংঘর্ষ এড়িয়ে চলার কথা ভাবতেই পারেন না। তারা দ্বীনের কোন না কোন দিকের খেদমত অবশ্যই করতে পারেন এবং তাদের সেই খেদমত ইকামাতে দ্বীনের সহায়কও হতে পারে। কিন্তু তাদের ঐ কাজটুকু প্রত্যক্ষভাবে ইকামাতে দ্বীনের কাজ হতে পারে না। তাদের ঐটুকু খেদমত দ্বারা দ্বীন কায়েম হয়ে যাবে না। দ্বীন কায়েমের জন্য আলাদা কর্মসূচী অবশ্যই দরকার।

ওলামায়ে কেরাম সবাই ইকামাতে দ্বীনে সক্রিয় নন কেন?

একথা সত্য যে,বাংলাদেশে কয়েক লক্ষ ওলামায়ে কেরাম আছেন। তারা বিভিন্ন প্রকার দ্বীনি খেদমতে নিযুক্ত রয়েছেন। ইকামাতে দ্বীনের দাবী অনুযায়ী তারা ইসলামী আন্দোলনে সক্রিয় হচ্ছেন না কেন-এ প্রশ্ন অবান্তর নয়। দীর্ঘ্কাল আলেম সমাজের গভীর সংস্পর্শে থেকে আমি এ প্রশ্নের জবাব তালাশ করেছি। আল্লাহপাকই সঠিক কারণ জানেন। কিন্তু এ প্রশ্ন এত প্রাসঙ্গিক যে,এর উত্তর না পেলে মুসলিম জনগনের পক্ষে ইসলামী আন্দোলনের গুরুত্ব সঠিক ভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না। আমার সামান্য পর্যবেক্ষনের ফলাফল এখানে প্রকাশ করতে চাই।

একঃ আমাদের দেশের মাদ্রাসাগুলো জনগনের চাঁদায় চলে। যেসব মাদ্রাসা সরকারী সাহায্য পায় তাও অতি সামান্য। মাদ্রাসার গরিব শিক্ষকগণকে মাদ্রাসার আর্থিক সমস্যা সমাধানেও সময় ও শ্রম দিতে হয়। যারা মাদ্রাসায় পড়তে আসে তারা প্রায় সবাই গরীবের সন্তান। বিনা খরচে বা সামান্য খরচে স্কুল কলেজে পড়ান সম্ভব নয় বলে গরীবদের জন্য মাদ্রাসাই একমাত্র সম্বল। ছাত্রদের বই-কিতাব মাদ্রাসাই জোগাড় করে। এমনকি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছাত্রদের খাওয়া থাকার ব্যবস্থা মাদ্রাসার পক্ষথেকেই করতে হয়।

মুসলিম শাসনআমলে শিক্ষার খরচ রাষ্ট্রই বহন করতো। বর্তমানেও সাধারন শিক্ষার (স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের )ব্যয় ভারের প্রধান অংশ সরকারই বহন করে। কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষা এর ব্যতিক্রম। জনগনের চাঁদার ভিত্তিতে মাদ্রাসাগুলো যে বেঁচে আছে সেটাই আল্লার বড় মেহেরবানী। এ অবস্থায় কুরআন হাদীসের যেটুকু হেফাজত মাদ্রাসা দ্বারা হচ্ছে এর শুকরিয়া আদায় করাও অসম্ভব। তাই মাদ্রাসায় শিক্ষার মান এমন উন্নত হওয়া সম্ভব নয় যেমন হওয়া উচিত। ফলে উন্নত মানের আলেম কমই হচ্ছে।

দুইঃ মাদ্রাসা শিক্ষা দ্বারা দুনিয়ার উন্নতির কোন আশা নেই বলে ধনী লোকেরা তো মাদ্রাসায় ছেলেদেরকে পাঠায়ই না। গরীবদেরও মেধাবী ছেলেদেরকে বেশির ভাগ স্কুলে পাঠায়। ফলে তুলনামূলকভাবে ভালো ছাত্র মাদ্রাসায় কমই আসে। যারা আসে তারাও মাদ্রাসা পাস করে বা শেষ না করেই দুনিয়ার চাপে কলেজমুখি হয়ে পড়ে।

তিনঃ বর্তমান পরিবেশে যারাই মাদ্রাসায় পড়ে তারা ইসলামের মহাব্বতেই পড়ে। দুনিয়ায় তারা যে বড় কিছু করার সুযোগ পাবে না সে কথা তারা জানে। মসজিদের ইমাম,মাদ্রাসার শিক্ষক,বড়জোর স্কুলের আরবী ও দ্বীনিয়াত শিক্ষক,কি নিকাহ-র কাযী ইত্যাদি সূযোগ ছাড়া বড় কিছু করা তাদের ভাগ্যে জুটবেনা বলে তারা ধরেই নেয়।

এ মানসিক অবস্থা নিয়ে যারা মাদ্রাসায় পড়তে বাধ্য হয় তারা শুধু আখেরাতের আশাই করে। মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার মুদাররিস হিসেবে দ্বীনের খেদমত করার সৌভাগ্য তারা যথেষ্ঠ মনে করতে বাধ্য হয়। তা ছাড়া মাদ্রাসার পরিবেশ ও জীবনের ভবিষ্যত সম্ভাবনা ছাত্রদের মধ্যে দেশ ও জাতির জন্য বড় কিছু করার সংকল্প সৃষ্টি করে না।

মাদ্রাসা পাস করার পর গরিব আলেমদের রুযী-রোযগার সমস্যা বড় হয়ে দেখা দেয়। খুব কম আলেমই এমন আছেন যারা নিজ নিজ দ্বীন পেশার (ইমামতি বা শিক্ষকতা) দায়িত্ব পালন করে ইসলামী আন্দোলনের জন্য যথেষ্ট সময় দিতে পারেন এবং সংগঠনের বড় দায়িত্ব নিতে পারেন।

চারঃ আর একটা বড় কারন রয়েছে যার ফলে ইসলামী আন্দোলন অনেক আলেমের নিকট সঠিক গুরুত্ব পাচ্ছে না। মাদ্রাসা শিক্ষায় ইসলামকে একটি বিপ্লবী আন্দোলন হিসেবে শেখাবার ব্যবস্থা নেই। শুধু ধর্মীয় শিক্ষা হিসেবেই ইসলামকে শেখান হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)মানব সমাজকে কিভাবে পরিবর্তন করলেন,কুরআন কিভাবে ২৩ বছর রাসূল (সাঃ)-এর আন্দোলনকে পরিচালিত করেছে,সেই কুরআন ও রাসূলের জীবন(হাদিস) থেকে বর্তমান যুগের ইসলামকে কায়েম করার জন্য কি করা দরকার,এসব দৃষ্টিভঙ্গীতে মাদ্রাসায় এখন পর্যন্ত ইসলামী শিক্ষা চালু হয়নি। ফলে তারা ইসলামকে একটা ধর্ম হিসাবেই জানতে পারছে মাত্র। মাদ্রাসা শিক্ষার মারফতে ইসলামী আন্দোলন সম্পর্কে ধারনা সৃষ্টি হচ্ছে না। ইকামাতে দ্বীনের দ্বায়ীত্ববোধও সে কারনে সৃষ্টি হচ্ছে না।

মাদ্রাসার উস্তাদগন ইসলামের যে পরিমান শিক্ষা দিচ্ছেন তার চেয়ে বেশি ছাত্ররা কি করে শিখবে? কিন্তু মাদ্রাসার যে মেধাবী ছাত্ররা দেশের ইসলামী আন্দোলনকে বুঝতে পারছে তা মাদ্রাসার বাইরের শিক্ষা। অবশ্য মাদ্রাসার ছাত্ররা যেহেতু আন্দোলনের দৃষ্টিভঙ্গি পেলে তারা আধুনিক শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক দ্রুত আন্দোলনমুখী হয়ে পড়ে। ইসলামকে একটি পরিপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা হিসেবে মাদ্রাসায় যদি শিক্ষা দেয়া হতো তাহলে আলেম সমাজ জাতীয় ব্যাপারে সর্বস্তরে ইসলামী নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হতেন।

পাঁচঃ সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারন রাসূল (সঃ)-কে স্রেষ্টতম আদর্শ মানা সম্পর্কে সঠিক ধরনার অভাব। ইকামাতে দ্বীনকে তো প্রকৃতপক্ষে আলেম সমাজের জীবনের আসল কর্মসূচী মনে করা উচিত। কিন্তু কেন এটা হয় নি? আমার ধারনায় এর মূল কারন আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে উসওয়াতুন হাসনা হিসাবে মানার অভাব। এ অভাবেরও কারন আছে। মুসলিম সমাজে একটা বড় রোগ দেখা দিয়েছে। যাকে কোন দিক দিয়ে দ্বীনের বড় খেদমত হিসাবে শ্রদ্ধা করা হয় তাকেই প্রায় উসওয়তুন হাসানা বা শ্রেষ্ট আদর্শের মর্যাদা দেয়া হয়। বুযুর্গ বলে মানলেই যেন তিনি রাসূলের স্থলাভিষিক্ত বা অন্তত কাছাকাছি বলে মনে করা হয়। তাই ইসলামের আদর্শ হিসেবে কোন আলেম বা পীরকে শ্রদ্ধা করতে গেলেই তাকে রাসূলের স্থলাভিষিক্ত মনে করতে শুরু করে।

একটি উদাহরন দিলেই কথাটা সহজ ভাবে বুঝা যাবে। উপমহাদেশের একটি কঠিন সময় হযরত মাওলানা কাশেম (রা) দেওবন্দে ইসলামী শিক্ষার আন্দোলন করেন,তখনকার তাঁর এই খেদমত নিশ্চই খুব মূল্যবান। তার প্রতি গোটা মুসলিম জাতি কৃতজ্ঞ। তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষন করাও স্বাভাবিক। কিন্তু কেউ যদি মনে করে যে, তিনি যে খেদমত করেছেন তার চেয়ে বড় দ্বীনি খেদমত আর হতে পারে না। সুতারাং তারই অনুকরনে একটি মাদ্রাসা কায়েম করাই আমার জীবনের উদ্দেশ্য-তাহলে এ ব্যক্তি হযরত নানতুভী (রঃ)-কে উসোয়াতুন হাসানার মর্যাদা দিল বলে বুঝা যায়। আল্লার রাসূল কি একটি মাদ্রাসা কায়েমের জন্য দুনিয়ায় এসেছিলেন? তিনি যে আল্লার পূর্ন দ্বীনকে সমাজে বিজয়ী করার কাজ করে গেলেন সে কাজটাকে কেন জীবনের উদ্দেশ্য মনে করা হয় না? যদি রাসূল (সঃ)-কে জীবনের সব ব্যপারে শ্রেষ্টতম আদর্শ মনে করা হতো তাহলে দ্বীনের আর সব খদেমগনের খেদমতকে রাসূলের ব্যাপক খেদমতের একটা অংশ মাত্র মনে করা হতো।

রাসূলুল্লাহ (সঃ)সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-কে নিয়ে দ্বীনের জন্য যা কিছু করে গেছেন তার সবটুকু আমাদের অবশ্য করনীয় কর্তব্য বলে মনে হয় না কেন? হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রা) যতটুকু করেছেন সেটা রাসূলের কাজের সবটুকু নয়। তাকে যদি আদর্শের মাপকাঠি মনে করা হয় তাহলে রাসূল আর মাপকাঠি থাকল কি করে? আদর্শের যে মান রাসূল (সঃ) দেখিয়ে গেছেন সেটাই একমাত্র স্ট্যান্ডার্ড  বা মান। যে সে মানের যতটুকুতে পৌছতে পারে তাকে সে মানেই শ্রদ্ধা করতে হবে। কিন্তু রাসূলের মানে যে কেউ পৌছাতে পারে না আর কাউকে সে রাসূলের সমান মানে শ্রদ্ধার আসন দেয়া যাবে না সে কথা সবার মনে পরিষ্কার থাকতে হবে।

About শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযম