কুরআন অধ্যয়ন সহায়িকা

৫:অধ্যয়ন এবং অনুধাবন

গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

আপনি কুরআনের পুরোপুরি ও সত্যিকার আশীর্বাদ এবং সম্পদ আহরণ করতে পারেন না যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি কুরআনের অর্থ অনুধাবনে আপনাকে সম্পূর্ণ নিয়োজিত না করছেন  এবং যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার স্রষ্টা কি বলছেন তা জানতে না পারছেন। এমনকি যারা বুঝে না, তারাও কুরআনের আশীর্বাদ পেতে পারে বলে আমরা আগে যা বলেছি এটা তার অস্বীকৃতি নয়। নিঃসন্দেহে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান আরবী জানে না এবং অনেকেরই নিজ ভাষায় অনুবাদগ্রন্থও নেই। তথাপি যদি তারা আন্তরিক একাগ্রতা, বিনয় ও ভালোবাসার সাথে কুরআন পাঠ করে, কুরআনের কিছু ঐশর্য লাভ থেকে তারা ব্যর্থ হবে না। কেননা, আপনি যাকে ভালোবাসেন, তার সহচর্য লাভ করেন আর যদি তার ভাষা নাও জানেন তথাপি অবশ্যই তার সাথে আপনার সম্পর্ক গভীর হতে বাধ্য। তবে সম্পর্ক বেশী মযবুত হবে যদি আপনি তার ভাষা বুঝেন।

পক্ষান্তরে কেবলমাত্র অর্থ বুঝাটাও কোন কাজে না আসতে পারে। অনেকেই রাসূল (সা) এর মুখ থেকে কুরআন শুনেছেন এবং প্রতিটি শব্দ বুঝেছেন, অথচ আরও বিপথগামী হয়েছেন। লক্ষ লক্ষ লোক আছে, যাদের ভাষা আরবী এবং কুরআন বুঝেছেন অথচ কুরআনের কোন প্রভাব তাদের জীবনে নেই। অসংখ্য মুসলিম ও অমুসলিম পন্ডিত যারা কুরআন অধ্যয়ন ও অনুশীলনে জীবনটাই কাটিয়ে দেন এবং যাদের পান্ডিত্যও নির্ভুল অথচ তাদের জীবনকে কুরআন স্পর্শ করতে পারে না।

তথাপি এতদসত্ত্বেও নিজেকে কুরআন অনুধাবনে নিয়োজিত করার জরুরী প্রযোজনীয়তা রয়েছে। কুরআন এসেছে হিদায়াত দিতে, স্মরণ করিয়ে দিতে, সতর্কবাণী ও উপশমকারী হিসেবে। এটা শুধুমাত্র সওয়াবের উৎস, পবিত্র শাস্ত্র, আধ্যাত্মিকতার প্রতীক, পবিত্রতার নিদর্শন অথবা পবিত্র ম্যাজিক নয়। কুরআন এসেছে আপনাকে আমূল পরিবর্তন করে দিতে এবং নব জীবনের দিকে পরিচালিত করতে। কিন্তু কুরআন বুঝটাই নবজীবন লাভের জন্য নিশ্চিত গ্যারান্টি নয়। তবে কুরআন বুঝা ব্যতীত কুরআনের সত্যিকার উদ্দেশ্য পূরণ এবং মানবতাকে কুরআনের পথে আহবান জানানো খুবই কঠিন কাজ হবে।

ব্যক্তিগত অধ্যয়ন

আমাদেরকে কেন নিজেদের উদ্যোগে কুরআন অনুধাবনে আত্মনিয়োগ করতে হবে এবং এ নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা ও বিবেচনা করতে হবে? এটাকি যথেষ্ট নয় যে, আমরা বিজ্ঞ লোকদের নিকট কুরআন পড়ি এবং শ্রবণ করি। না এটা হয় না। এতদসত্ত্বেও তা প্রয়োজনীয়। কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কুরআনের বক্তব্য কি, তা জানার জন্য আপনাকে অবশ্যই নিজেকেই চেষ্টিত হতে হবে। কুরআন কেবলমাত্র একটি গ্রন্থ নয়। অথবা কি করা যায় এবং কি করা যায় না, তার তালিকার কোন সংকলনও নয়। এই গ্রন্থ কেবলমাত্র আল্লাহ সম্পর্কেই এবং আপনার কাছে তিনি কি চান, সে সম্পর্কেই আপনাকে অবহিত করে না। এ গ্রন্থ আপনার ব্যক্তি-জীবনকে প্রভাবিত করতে চায়, আপনাকে একটি নতুন জীবন দান করতে চায় এবং আল্লাহর সাথে আপনার গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি করতে চায়। সুতরাং ধৈর্য বৃদ্ধি করা, আপনাকে পবিত্র করা, আপনার চরিত্র গঠন করা এবং আপনার ব্যবহার সংশোধন করা। উচিত আপনাকে অব্যাহতভাবে উৎসাহিত করা এবং আপনার মধ্যে অনেক উন্নতি সাধন করা।

এ সব কিছুই অর্জিত হতে পারে যদি আপনি কুরআনের সাধে অধ্যয়ন, অনুশীলন এবং অনুধাবনের একটি ব্যক্তিগত সম্পর্কে উপনীত হতে পারেন। এর বাণীসমূহের উপর গভীরভাবে ভেবে দেখা ব্যতীত আপনার হৃদয়, চিন্তা এবং আচরণ তার প্রতি সাড়া দিতে পারে না। নিজেকে কুরআনের পয়গামের চিন্তাভাবনায় নিমগ্ন করা ব্যতীত আপনি তা গ্রহণ করতে সক্ষম নন কিংবা ঐসব বাণী আপনার জীবনে প্রবেশ করতে পারে না। একটু চিন্তা করে দেখুন, চিন্তা ভাবনা ও অনুধাবনের প্রশ্ন যদি না থাকতো, তবে আপনাকে তারতীলের সাথে কুরআন পাঠ করার নির্দেশ দেয়া হলো কেন? আপনাকে বিরতি দিয়ে দিয়ে কুরআন পড়তে বলা হয়েছে। আপনি কুরআনে যা পড়ছেন তা যদি না বুঝেন তাহলে কি করে আপনি কুরআন যাতে গুরুত্ব দিয়েছে, তার প্রতি আন্তরিক, দৈহিক, মৌখিকভাবে সাড়া দিতে সক্ষম হবেন?

অধ্যয়নের বিপক্ষে যুক্তি

কিন্তু যদি কেউ অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং অধ্যয়নের যাবতীয় উপায়-উপকরণে সমৃদ্ধ হওয়া ছাড়াই নিজে নিজেই আল্লাহর কিতাব বুঝার ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হন, তাহলে কি ভুল করার বা বিপদগামী হওয়ার আশংকা নেই? হ্যাঁ, অবশ্যই এ আশংকা রয়েছে বিশেষ করে যখন আপনি সুস্পষ্টভাবে আপনার সীমাবদ্ধতা এবং লক্ষ্য সম্পর্কে জানেন না। কিন্তু যদি কুরআন বুঝার জন্য আদৌ চেষ্টা না করেন, তাহলে ক্ষতিটা অনেক বেশী আপনার জন্য এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য। কতিপয় যথার্থ সতর্কতা অবলম্বর করে নিজে নিজে কুরআন অধ্যায়নের ঝুঁকি অপসারণ করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে যে, এক্ষেত্রে কখনও আপনি আপনার সীমাবদ্ধতা এবং লক্ষ্য অতিক্রম করবেন না। কিন্তু এধরনের অধ্যয়ন পরিত্যাগ করে যে ক্ষতি হবে, তা পূরণ করা সম্ভব নয়।

কেউ কেউ যুক্তি প্রদর্শন করে থাকেন যে, নিজে নিজে কুরআনের মর্ম বুঝার প্রয়াস চালানো কি রাসূল (সা) এর হাদীসের লংঘন নয়? তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের খেয়ালখুশী মতো কুরআন ব্যাখ্যা করবে, তার স্থান হবে জাহান্নাম।’ (তিরমিযী)

খোলা মনে আল্লাহর হিদায়াত গ্রহণের পরিবর্তে পূর্ব প্রতিষ্ঠিত কোন ধারণা, ব্যক্তি মতামতের প্রমাণ বা সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যে যে অধ্যয়ন করা হয়ে থাকে, সেই ধরনের অধ্যয়ন সম্পর্কেই এ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। অথবা প্রয়োজনীয় জ্ঞান নেই এমন বিষয়ে ব্যাখ্যা দানের প্রবণতাকে বুঝানো হয়েছে। এ সম্পর্কে ইমাম গাযযালী (রহ) দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, অন্যথায় রাসূল (সা) তাঁর সাহাবীদেরকে কুরআন বুঝার জন্য উদ্ভুদ্ধ করতেন না, কিংবা এমন অর্থও তাঁরা করতেন না, যা তারা রাসূল (সা) থেকে শুনেননি, কিংবা তাদের পরস্পরের মধ্যে কুরআনের ব্যাখ্যা নিয়ে কোন মতপার্থক্যও হতো না।

ভয়ংকর পরিণতির আশংকায় অনেক ধর্মীয় নেতা বিজ্ঞ শিক্ষকের সাহায্য ছাড়া কুরআনের অনুবাদ পর্যন্ত পড়তে নিষেধ করে থাকেন। অথবা তাঁরা একাকী কুরআনের অধ্যয়নের এমনসব শর্ত আরোপ করেন, যা খুব কম সংখ্যক লোকই অনেকদিন পর্যন্ত চেষ্টার পর পূর্ণ করতে পারেন। তাদের সদিচ্ছা সত্ত্বেও এ ধরনের উপদেশ প্রকৃতপক্ষে শেষ পর্যন্ত আপনাকে কুরআনের মহান সম্পদ থেকে বঞ্চিত করবে। তাদের আশংকা স্বাভাবিক হলেও তাদের নিষেধাজ্ঞার কোন যুক্তি বা ভিত্তি নেই।

একটু চিন্তা করে দেখুন, তাঁরা কি একজন আরবকে কুরআনের শব্দিক অর্থ বুঝতে নিষেধ করতে পারে? তাহলে কেন একজন আরবের অনুবাদ পড়া উচিত নয়? তা ছাড়াও তাঁরা কি কাউকে অন্য বিষয়ে পড়ে তা থেকে অর্থ অনুধাবন বা সন্ধান করা থেকে বিরত করতে পারেন? তাহলে কেন কুরআন অধ্যয়ন করে বুঝার প্রয়াস চালাতে নিষেধ করা হবে? তাছাড়া মুসলিম ও কাফির নির্বিশেষে কুরআনের যে প্রথম অবতীর্ণ আয়াত সে সম্পর্কেই বা কি বলা যায়? তারা ছিল নিরক্ষর বণিক এবং বেদুইন, যাদের না ছিলো জ্ঞানার্জনের কোন উপায় উপকরণ। তথাপি অনেক কাফির কারও সাহায্য ছাড়াই শুধুমাত্র শুনে এবং এমনকি প্রথমবার শুনেই ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

একথা ঠিক যে, রাসূল (সা) এবং তাঁর সাহাবা কিরাম (রা) এর জীবনে কুরআনের তাৎপর্য দেখার এক অসাধারণ এবং সর্বোচ্চ সুবিধা তাদের ছিল যে সাহাবাগণ কুরআনের পথে ঈমান, দাওয়াত ও জিহাদের কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এতবসত্ত্বেও সেটা আমাদের জন্য নিরুৎসাহের কারণ হওয়া উচিত নয়। আমরা যদি প্রযোজনীয় শর্তাবলী পূরণ করতে সক্ষম হই, তাহলে কুরআন কেন তার দ্বার আমাদের জন্য উন্মুক্ত করবে না? বরং এক্ষেত্রে যার উপর বারবারগুরুত্ব দেয়া হয়েছে তা হলো, আমাদেরকেও সাহাবা কিরামের মতো ঈমান, দাওয়াত ও জিহাদের কঠোর পথে জীবন পরিচালনা করতে হবে।

শিক্ষকের পদতলে বসী ব্যতীত কুরআন বুঝার অন্যসব প্রয়াস নিষেধ করার বিপদগামিতার বিরুদ্ধে সতর্কতা নিহিত নয় বরং সঠিক দিক-নির্দেশনা পালনের মধ্যে রয়েছে এর প্রতিকার।

এর অর্থ অবশ্য আরবী ভাষা ও বিভিন্ন উলুম কুরআনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন, তাফসীর পাঠ, বিজ্ঞ এবং নির্ভরযোগ্য শিক্ষকের নিকট অধ্যয়ন, সমসাময়িক মানবীয় জ্ঞানের উপর দখল-এসবকে অস্বীকার করা নয়। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে তা নির্ভর করে আপনি কুরআন থেকে কি পেতে চান তার উপর। আপনার উদ্দেশ্য লাভের উপযোগী উপকরণ আপনার থাকতেই হবে। কিন্তু এজন্য আপনার কাছে যাবতীয় উপায় উপকরণ নেই বলেই কিংবা আপনি কোন শিক্ষকের কাছে যেতে পারেন না বলেই কুরআন অধ্যয়নের প্রয়োজন খতম করে দিতে পারেন না।

মনে করুন আপনি একটি দ্বীপে আছেন, আপনি আরবী ভাষা জানেন না, কিংবা তা শিখার কোন সুযোগ নেই। আপনার একজন ভালো শিক্ষক অথবা একটি ভালো তাফসীর নেই, কিংবা আপনি এর কোন একটি যোগাড়ও করতে পারেন না। নিঃসন্দেহে এমন পরিস্থিতিতে শুদ্ধ ভাবে কুরআন বুঝার সামথ্য অর্জনের প্রয়োজনীয়তা আপনার স্বীকার করা উচিত এবং এ জন্য যাবতীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু তথাপি কুরআন হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার জন্য হিদায়াত স্বরূপ।

সৌভাগ্যবশত আমরা কেউই এমন দ্বীপের অধিবাসী নই। অনুরূপ দ্বীপের অস্তিত্ব আমাদের কল্পনায় প্রধানত আমাদের অকর্মণ্যতা এবং অলসতা, অমনোযোগিতা ও নিষ্ক্রিয়তার জন্য অথবা কুরআন বুঝার জন্য কুরআনের সাহচর্য হচ্ছে আমাদের হৃদয় ও মনের জন্য তেমন আবশ্যক, যেমনটি দেহের জন্য খাদ্যের। যা স্মরন রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে এই যে, বাস্তবিকই কেউ যদি একটি দ্বীপে বাস করেন এবং তার হাতে একটি মাত্র কুরআনের কপি থাকে এবং তার শাব্দিক অর্থ তিনি কোনমতে বুঝেন, অথবা কেউ কুরআনের বিধিগুলো আয়ত্ত করেছেন তথাপি ব্যক্তিগতভাবে কুরআনের উপর গভীর চিন্তা গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করার প্রযোজনীয়তা ও চাহিদা থেকেই যায়।

কুরআনের বৈশিষ্ট্য

কুরআন হচ্ছে প্রত্যেকের জন্য হিদায়াত, তার শিক্ষক এবং বিজ্ঞ পরামর্শদাতা। অতএব, এটি বুঝার ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, অন্যথায় এটি রহস্যের প্রতীক ব্যতীত আর কিছুই নয়। কুরআনের আহবানের প্রতি হৃদয় ও মনকে উন্মুক্ত করার জন্য চেষ্টা-সাধনার গুরুতর কেন্দ্রিকতা, ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা সম্পর্কে কুরআন সুস্পষ্ট কথা বলেছে। কুরআন বুঝার ব্যাপারে আমাদের হৃদয় ও মনকে তালাবদ্ধ করে রাখার ত্রুটি আমাদের রয়ে গেছে।

তারা কি কুরআন সম্বন্ধে চিন্তা-গবেষণা করে নাই?

বা তাদের দিলসমূহে তালা পড়ে গিয়েছে? (৪৭:২৪)

অতএব, কুরআন বুঝার প্রতি আহবান কুরআনের প্রায় প্রতি পাতায় ছড়িয়ে আছে। কেন আপনি শুনবেন না? কেন দেখবেন না? কেন চিন্তা করবেন না? কেন আপনি বিচার-বিবেচনা করবেন না? কেন অনুধাবন করবেন না? কেন আপনি হৃদয়ে গ্রহণ করবেন না? যদি মানুষের প্রতি না হবে- যাদের শোনার, দেখার এবং চিন্তা করার যোগ্যতা ও ক্ষমতা আছে, তাহলে কার প্রাত এ আহবান?

এটা অত্যান্ত পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, বুঝার জন্যই কুরআন পাঠানো হয়েছে।

এটি এক বরকতময় কিতাব, (হে নবী!) আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যেন এই লোকেরা এর আয়াতগুলো সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে এবং জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেকবান লোকেরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। (সাদ-৩৮:২৯)

অনুরূপভাবে কুরআন মজীদ তাদেরকে মহান করুণাময়ের সত্যিকারের গোলাম বলে প্রশংসা করেছেঃ

যাদেরকে তাদের রবের আয়াত শুনিয়ে নসীহত করা হলো, তারা তাঁর উপর অন্ধ ও বধির হয়ে পড়ে থাকে না (আল ফুরকান- ২৫:৭৩)।

পক্ষান্তরে তাদেরকে পশুর চেয়ে অধম বলে ভৎসনা করে, যারা তাদের শ্রবণশক্তি, দৃষ্টি শক্তি এবং অন্তরকে কুরআন শ্রবণ, দর্শন ও বুঝার জন্য কাজে লাগায় নাঃ

তাদের দিল আছে, কিন্তু তার সাহায্যে তারা চিন্তা-ভাবনা করে না। তাদের চক্ষু আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা দেখে না। তাদের শ্রবণশক্তি আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শুনতে পায়না। তারা আসলে জন্তু-জানোয়ারের মতো, বরং তা থেকেও অধিক বিভ্রন্ত। এরা চরম গাফিলতির মধ্যে নিমগ্ন। (আল আরাফ- ৭:১৭৯)

আপনি কুরআনের সত্যিকারের রহমাত ও সম্পদ আহরণ করতে পারেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি এর অর্থ বুঝেন, আল্লাহ আপনাকে কি বলেছেন তা যতক্ষণ না বুঝেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে তা খুঁজে বের করতে নিয়োজিত করতে পারেন।

পূর্ব যুগের চর্চা

যে হাদীস তিন দিনের কম সময়ে কুরআন খতম করতে নিরুৎসাহিত করেছে, তাতেও স্পষ্টভাবে বুঝার প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করা হয়েছে। তখন তুমি তা বুঝতে পারবে না। যিনি অর্থ বুঝেন না, তার এ নির্দেশের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। ইমাম আল হাযযালী (রহ) তাঁর গ্রন্থ ইহয়িয়াই উলুমিদ্দীনে এ সম্পর্কে অনেক উদাহরণ দিয়েছেন যে, সাহাবাগণ কিভাবে কুরআন অধ্যয়ন-অনুধাবনের কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতেন।

আনাস ইবনে মালিক (রা) বলেন,”একজন প্রায়ই কুরআন তিলাওয়াত করে, কিন্তু কুরআন তাকে অভিশাপ দেয়, কারণ সে কুরআন বুঝে না।” আব্দুল্লাহ ইবনে উমারের (রা) মতে ইমানের চিহ্ন হচ্ছে কুরআন বোঝা। আমরা দীর্ঘদিন অতিবাহিত করেছি….. এমন এক সময় এসছে যখন আমি দেখি একজন লোককে সমস্ত কুরআন দেয়া হয়েছে তার ঈমান আনার আগেই, তিনি সূরা ফাতিহা থেকে কুরআনের শেষ পর্যন্ত সবগুলো পাতাই পাঠ করেন অথচ তিনি জানেন না কুরআনের নির্দেশ, এর সতর্কবাণী, ঐসব স্থানও চিনেন না যেখানে তাকে বিনয়ী হতে হয়। সে এটা ফেলে দেয় যেমন করে পালায়নকালে কেউ কোন কিছুকে দ্রুত ফেলে চলে যায়, সেভাবে। হযরত আয়েশা (রা) একদিন শুনলেন, একজন লোক কুরআনের সামনে বিড়বিড় করছে এবং বললেন লোকটি না কুরআন পাঠ করছেন, আর না চুপ থাকছেন। হযরত আলী (রা) বললেন, কুরআন অধ্যয়নে কোন কল্যাণ নেই যদি তা নিয়ে ভাবা না হয়, চিন্তা করা না হয়। আবু সুলাইমান আদ দারানী বলেন, আমি একটি আয়াত পড়ি এবং তা নিয়েই চার-পাঁচ রাত্রি কাটাই এবং পরবর্তী আয়াত পড়ি না যতক্ষণ পর্যন্ত এর উপর আমার চিন্ত-ভাবনা শেষ না হয়।

স্বাভাবিকভাবেই যদি কুরআন সব মানুষের জন্য হিদায়াত-গ্রন্থ হয়ে থাকে, তাহলে একটি দ্বীপবাসী মানুষ এর হিদায়াত যতটা গ্রহণ করতে পারে ততটাই পারে সেই বক্তি যিনি জ্ঞান চর্চায় নিমগ্ন। যদি এজন্য কোন বই বা শিক্ষক নাও থাকে, তাহলেও এটা আপনাকে পরিষ্কারভাবে জানতে হবে, ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগতভাবে এটা বুঝার জন্য, এর উপর চিন্তা-ভাবনার জন্য, আপনার জীবনের জন্য এর অর্থের অনুসন্ধান এবং আপনাকে কুরআন কি বলে তা জানার জন্য আপনাকে সময় নিয়োজিত করতে হবে।

ব্যক্তিগত অধ্যয়ন ঝুকি

এ ধরনের উদ্যোগে যে ঝুঁকি রয়েছে, তা পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত হওয়া উচিত এবং তা থেকে বাঁচার জন্য যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। আপনি কতিপয় দিক-নির্দেশ মেনে এ ঝুঁকি এড়াতে পারেন নিশ্চিতভাবেঃ

(১)মনে রাখতে হবে কুরআন বুঝা একটি ব্যপক ও বহুমুখী প্রক্রিয়া। এর রয়েছে বিভিন্ন ধরণ, দৃষ্টিকোণ, পরিমাণ ও স্তর। আপনাকে এর সবই জানা উচিত। হৃদয়ের পরিচর্যার জন্য বুঝা আর ধর্মীয় বিধান বের করার জন্য বুঝার মধ্যে রয়েছে অনেক পার্থক্য।

(২)নিজের অবস্থা মূল্যায়ন এবং অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে আপনার সীমাবদ্ধতা ও সামর্থ চিহ্নিত করুন। দৃষ্টান্তস্বরূপঃ কুরআনের হিদায়াত বা নির্দেশিকা সম্পর্কে আপনার উপলব্ধি, আরবী বুঝার ক্ষমতা, হাদীস ও রাসূলের জীবন চরিত্রের উপর দখল, উৎসসমূহে প্রবেশের ক্ষমতা।

(৩)আপনার উদ্দেশ্য সঠিকভাবে বুঝুন এবং আপনার অধ্যয়নের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। কোন অবস্থাতেই আপনার সীমাবদ্ধতা ও সামর্থ্যরে বাইরে যাবেন না।

দৃষ্টান্তস্বরূপঃ আপনি যদি আরবী ভাষা না জানেন, ব্যকরণগত ও আভিধানিক বিষয়ে গভীর গবেষণা করবেন না, নিজেকে সরাসরি শাব্দিক অর্থের মধ্যে সীমিত রাখুন। আপনার যদি অবতীর্ণ বা রদ হওয়া সম্পর্কে, প্রথম যুগের ফকীহদের রচনা সম্পর্কে জ্ঞান না থাকে, তবে কুরআন থেকে আপনার নিজস্ব ফিকাহ্ উদ্ভাবন শুরু অথবা কোন বিশেষ মতকে সমালোচনা বা সমর্থন করা আপনার উচিত হবে না।

(৪)আপনার অনুসন্ধানলব্ধ কোন বিষয় যা উম্মাতের সাধারণ ঐক্যমতের বিরোধী এমন কোন কিছুকে চূড়ান্ত মনে করবেন না বা প্রচারও শুরু করবেন না। এটা আপনার কোন মত পোষণের বিরোধিতার জন্য নয় কিংবা বিজ্ঞ জনের মতামত ভুল নয় একথা সমর্থন করার জন্যও নয় এবং এজন্য যে, কোন মতের বিরোধিতা করতে হলে বেশী না হলেও কমপক্ষে সমান গুণের অধিকারী হতে হবে।

এটা না আপনাকে দায়িত্বমুক্ত করতে পারে সেই কাজ করা থেকে, যা আপনি কুরআন থেকে সঠিক বলে জানেন এবং সেই কাজ এড়িয়ে চলতে যা সঠিক নয়।

(৫)যখনই আপনি নিজ উপসংহার সম্পর্কে সন্দিগ্ধ হবেন আপনার সীমিত জ্ঞানের কারণে, যা আপনি প্রায়শই হবেন, আপনার মতামতকে সন্দেহের মধ্যেই রাখুন যতক্ষণ না আপনি পূর্ণ তুলনামূলক অধ্যয়ন করছেন বা বিশ্বস্ত কুরআনের সুযোগ্য বিজ্ঞ পন্ডিতের সাথে তা আলোচনা করছেন।

বুঝার শ্রেণী বিভাগ

মোটামুটিভাবে আমরা কুরআন অধ্যয়নকে দুই শ্রেণীতে ভাগ করতে পারি। (১) তাযাক্কুর ও (২) তাদাব্বুর। যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছেঃ

যেন এই লোকেরা এর আয়াতগুলো সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে এবং জ্ঞানবুদ্ধি ও বিবেক সম্পন্ন লোকেরা এ থেকে সবক গ্রহণ করে। (সাদ- ৩৮:২৯)

তাযাক্কুর

তাযাক্কুর শব্দটি কুরআন শরীফে ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, বিভিন্ন রকম অনুবাদও করা হয়েছে। যেমনঃ উপদেশ গ্রহণ, উপদেশ আহরণ, স্মরণ করা, মনোযোগী হওয়া, হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করা। অতএব, এটা এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আপনি কুরআনের সাধারণ পয়গম এবং শিক্ষা হৃদয়ংগম করতে পারেন। এ পয়গাম আপনার জন্য কি অর্থ বহন করে এবং আপনার প্রতি তার দাবী কি আপনি তা উপলব্ধি করতে পারেন। এসব আপনি হৃদয় দিয়ে গ্রহন করুন হৃদয় ও মনের উন্মুক্ত সাড়া আনার জন্য। যা আপনি পান সে অনুযায়ী ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগান এবং পরিশেষে কি বাণী অন্য মানুষের সামনে আপনি উপস্থাপন করবেন তা নির্ধারিত করুন।

তাযাক্কুর হচ্ছে সেই এক ধরনের বুঝ, যা তার প্রয়োজনীয় প্রকৃতিতেই এমন যে, সেজন্য খুব উন্নতমানের পান্ডিত্যের প্রয়োজন পড়ে না। আপনি প্রতিটি শব্দের অর্থ জানতে নাও পারেন। সকল গুরুত্বপূর্ণ ও মূল শব্দের অর্থ উদ্ধার করতে হয়তো আপনি সক্ষম নন, আপনি প্রতিটি আয়াতের অর্থ নাও জানতে পারেন কিন্তু সাধারণ, সমগ্রিক ও বিশেষ পয়গাম, কিভাবে আপনি জীবন যাপন করবেন তা অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও স্বচ্ছভাবে জানা উচিত।

প্রকৃতপক্ষে যারা কুরআন সবচাইতে বেশী বুঝেছিলেন এবং উপকৃত হয়েছিলেন কুরআন থেকে, তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন এর প্রথম শ্রোতাগণ- তারা ছিলেন ন্যায় ব্যবসায়ী, কৃষক, মেষপালক, উষ্ট্র চালক এবং বেদুইন। তাদের হাতের নাগালের মধ্যে ছিল না কোন অভিধান বা তাফসীর গ্রন্থ আর না ছিল স্টাইল, রচনাশৈলী, ছন্দ, অলংকার শাস্ত্রের উপর গবেষণামূলক গ্রন্থাবলী। আর না তারা দর্শন, ইতিহাস, বূগোল, প্রত্নতত্ত্ব, নৃবিদ্যা অথবা সামাজিক ও ভৌতিক বিজ্ঞানের সকল জ্ঞানের অধিকারী। এতদসত্ত্বেও কুরআন বুঝার ক্ষেত্রে তারা ছিলেন সবচাইতে সফল। এর কারণ হচ্ছে, তারা কুরআনের বাণীকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেছিলেন এবং সে অনুযায়ী জীবন যাপন শুরু করেছিলেন। এক্ষেত্রে যারা প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেন, তাদের এমন ধরনের বুঝই হয় এবং এমন বুঝই তাদের প্রত্যেকেই পেতে পারে। কি পরিমাণে বা মাত্রায় তিনি গ্রহণ করতে পারেন তা নির্ভর করে তার উদ্যোগ এবং সামর্থ্যরে উপর। অবশ্য পান্ডিত্যের উপায়-উপকরণ এ প্রক্রিয়ায় অনেক নতুন দিক সংযোজন করে, গুরুত্ব বৃদ্ধি করে, নতুন দূরদৃষ্টি দান করে কিন্তু এসব অবশ্যই লাগবে এমন নয়।

তাযাক্কুরের অর্থ হলো কুরআন পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে যে, এটা বুঝা অতি সহজ। কুরআন প্রতিটি আন্তরিক অনুসন্ধানীর নাগালের মধ্যেই যদি তিনি শুধু উপলদ্ধি করেন যে, তিনি কি পাঠ করছেন এবং তার উপর চিন্তা ভাবনা করেন। আর তাযাক্কুর মানে কুরআন তাদের তদনুযায়ী পরিচালিত হতে আহবান জানায়, যারা শুনতে পারে, দেখতে পারে ও চিন্তা করতে পারে। এটা এই অর্থে যেঃ

আমরা এই কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ মাধ্যম বানিয়ে দিয়েছি। এ হতে উপদেশ গ্রহণের কেউ আছে কি? (আল কাসাস ৫৪:১৭)

হে নবী! আমরা এই কিতাবকে তোমার ভাষায় খুব সহজ বানিয়ে দিয়েছি। যেন এই লোকেরা নসীহত গ্রহণ করে। (আদ দুখান ৪৪:৫৮)

আমরা এই কুরআনে লোকেদের সম্মুখে নানা রকম ও নানা প্রকারের দৃষ্টান্ত ও উপমা পেশ করেছি, যাতে এদেশ হুঁশ হয়। (আয যুমার ৩৯:২৭)

এতে অত্যন্ত শিক্ষামূলক সবক রয়েছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য, যার দিল আছে কিংবা যে খুব লক্ষ্য দিয়ে কথা বলে। (কাফ ৫০:৩৭)

তাযাক্কুর কোন নিম্নস্তরের বুঝ নয়, এটি হচ্ছে কুরআনের মূল অপরিহার্য উদ্দেশ্য। আলো ও পথ-নির্দেশনা লাভের জন্য এবং তাযাক্কুরের মাধ্যমে নিরাময় লাভের নিমিত্ত আপনাকে সারাটি জীবন সংগ্রাম করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় আপনার ব্যক্তিগত অসংখ্য ফায়দা হাসিলের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

তাদব্বুর

তাদাব্বুর ভিন্ন ধরনের উপলব্ধি। এর তাৎপর্য হচ্ছে, প্রত্যেকটি শব্দ, আয়াত এবং সূরার পুরো অর্থ জানার চেষ্টা, শব্দসমূহ, উপমা-উৎপ্রেক্ষা, রূপকসমূহের অন্তর্নিহিত অর্থর অনুসন্ধান করা, মূল পাঠের সুসংগতি ও অন্তস্থিত ঐক্য আবিষ্কার করা, কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা, আভিধানিক জটিলতা সমূহ অবতরণ ও ঐতিহাসিক পটভূমিকার উপর গভীর গবেষণা, বিভিন্ন তাফসীরের তুলনামূলক অধ্যয়নের কর্মসূচী গ্রহণ করা। অতঃপর মানুষের সাথে তার আল্লাহর, তার সহযোগী অন্য মানুষের, তার নিজের সত্তার, তার পারিপার্শ্বিক জগতের সাথে সম্পর্কের সকল তাৎপর্য আবিষ্কার করা, ব্যক্তিও সমাজের জন্য আইন ও নৈতিকতা, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির বিধানসমূহ, ইতিহাস ও দর্শনের মূলনীতিসমূহ উদ্ভাবন করা এবং মানব জ্ঞানের বর্তমান স্তরের তাৎপর্য অনুধাবন করা।

এ ধরনের অধ্যয়নের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে বিভিন্ন উলুমুল কুরআনের ব্যাপক ও গভীর জ্ঞানের এবং এটাও নির্ভর করে আপনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের উপর।

তদাব্বুর এবং তাযাক্কুর সম্পূর্ণরূপে পৃথক নয় বা কুরআন বুঝার পারস্পরিক স্বতন্ত্র কোন প্রক্রিয়াও নয়। একটি আরেকটির সাথে সম্পর্কিত।

আপনার লক্ষ্য

আপনার লক্ষ্য কি হওয়া উচিত? স্বাভাবিক ভাবেই লক্ষ্য ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ভিন্ন হবে এমনকি কারও জন্য সময় থেকে সময়ে ভিন্ন হতে পারে। আমার মতে তাযাক্কুর প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্যকরণীয়, যারা কুরআন বুঝতে সক্ষম।

সুতরাং একজন সাধারণ শিক্ষিত মুসলমান যিনি তার সামর্থ ও সীমাবদ্ধতার আলোকে আল্লাহর প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টা করছেন, তার তাযাক্কুর হওয়া উচিত প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। চিরদিন আপনি এর সাথেই থাকবেন এবং কোন সময়ই এমন পর্যায়ে পৌছবেন না, যাতে আপনি তাযাক্কুর থেকে বিরত হতে পারেন।

আপনাকে স্মরণ রাখতে হবে-তাযাক্কুরে আপনি অবশ্যই আপনার মন ও হৃদযের যত্ন নিবেন, ঈমান বৃদ্ধির চেষ্টা করবেন, আপনার প্রতি কুরআনের পয়গামকে আবিষ্কার করতে ব্রতী হবেন, হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করতে এবং মুখস্থ করতে চেষ্টা করবেন। আপনার সমস্ত শ্রমের মাধ্যমে আপনার উচিত হবে আল্লাহর কন্ঠ শুনতে সক্ষম হওয়া। তিনি আপনাকে কি হতে বলেন বা কি করতে বলেন।

বুঝের স্তর ও রকম

আপনার কুরআন বুঝাটা বিভিন্ন স্তরের এবং বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে।

প্রথমঃআপনি আপনার জানা ভাষায় কোন বই পড়লে তার সহজ এবং আক্ষরিক অর্থ উপলব্ধি করতে যেভাবে সক্ষম হন অথবা যেমন আরবী জানা কোন লোক যেভাবে কুরআন বুঝতে পারে।

এমন বুঝ বা উপলব্ধি হতে পারে সর্বনিম্ন প্রয়োজন। এটি হবে অন্য সব স্তরে পৌঁছার চাবিকাঠি, কিন্তু এটাই পর্যাপ্ত নয়।

দ্বিতীয়ঃআপনি এটি বের করেন যে, পন্ডিত ব্যক্তিগণ কিভাবে এটা বুঝেছেন, হয় তাদের বর্ণনা শুনে অথবা ব্যাখ্যা পড়ে এবং অন্যান্য উৎস থেকে।

তৃতীয়ঃআপনি নিজে নিজেই অধ্যয়ন করুন এবং চিন্তা-ভাবনা করুন কুরআনের অর্থ আবিষ্কার করার জন্য এবং আত্মস্থ ও তাযাক্কুর অর্জন করার জন্য। যদি আপনার যোগ্যতা ও চাহিদা থাকে, তাহরে তাদাব্বুরও অর্জন করতে পারবেন।

চতুর্থঃআপনি এর অর্থ আবিষ্কার করুন এর বাণী মেনে এবং কুরআন যে দায়িত্ব, কর্তব্য ও মিশন আপনার উপর ন্যস্ত করেছে, তা পূরণ করে।

মৌলিক শর্তাবলী

আপনার প্রয়াস ফলপ্রসূ করার জন্য কতিপয় মৌলিক শর্ত পূরন করা উচিত।

একঃ আপনাকে এতটুকু আরবী শিখা উচিত যাতে আপনি অনুবাদের সাহায্য ছাড়াই কুরআনের অর্থ বুঝতে পারেন। এটি হচ্ছে প্রাথমিক স্তর এবং এর সবচাইতে প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত। এটা খুব কঠিন কাজ মনে হতে পারে। কিন্তু আমি জানতে পেরেছি অর্ধশিক্ষিত লোকও গভীর নিষ্ঠার সাথে গ্রহণ করে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এ কাজ সম্পাদন করেছে। একজন শিক্ষক কিংবা একটি ভালো বইয়ের সহযোগিতা পেলে কুরআন বুঝার জন্য পর্যাপ্ত আরবী শিখতে আপনার ১২০ ঘন্টার বেশী সময় লাগার কথা নয়।

কিন্তু আরবী শিক্ষার জন্য এ পরিমাণ সময় না পাওয়া পর্যন্ত কুরআন অধ্যয়নের প্রচেষ্টা বন্ধ করবেন না। একটি ভালো অনুবাদ গ্রন্থ নিন এবং আপনার প্রয়াস শুরু করুন। না বুঝে কুরআন তিলাওয়াতের চাইতে এটা উত্তম।

সমস্ত কুরআন পড়া

দুইঃ প্রথমে সমস্ত কুরআন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সরাসরি আক্ষরিক অর্থ বুঝে পড়ুন। যদি আপনি আরবী না জানেন একটি অনুবাদ ব্যবহার করুন।

কমপক্ষে এক মাসের মধ্যে একটি প্রথম পাঠ সমাপনের জন্য আপনার একটি বিশেষ প্রকল্প তৈরি করা উচিত। এ জন্য দৈনিক দুই ঘন্টার বেশী সময় লাগা উচিত নয়। এর পর আপনি ধীরে-সুস্থে পড়ার একটি পরিকল্পনা করতে পারেন যা আপনার সুবিধাজনক হয়। কিন্তু আপনাকে অবশ্যই এ ধরনের পড়া সারা জীবন অব্যাহত রাখতে হবে তা যেভাবেই আপনার জন্য সুবিধাজনক হোক না কেন, যেমনটি আপনি ইতোমধ্যেই কুরআন অধ্যয়ন-বিধি থেকে জেনেছেন।

গভীরভাবে অধ্যয়নে যাবার আগে গোটা কুরআনের একটি প্রাথমিক পাঠ অত্যন্ত জরুরী। এটি আপনাকে কুরআনের সামগ্রিক বাণী সম্পর্কে অবহিত করবে, এর রচনাশৈলী, বাচনভঙ্গি, যুক্তি ও রূপক সম্পর্কে এবং এর শিক্ষা ও বিধি সম্পর্কে কিছু ধারণা দিবে। নিয়মিত তিলাওয়াত করে আপনি কুরআনের সাথে পরিচিত হয়ে যান, এর সুসংগতি ও সংহতি সম্পর্কে অনুভব করুন এবং এটিকে একটি সামগ্রিক জিনিস হিসেবে দেখতে শুরু করুন। এতে কুরআনের সাধারণ কাঠামোর বাইরে কোন কিছু ব্যাখ্যায় বিপদ কম হবে। কুরআনের বিষয়বস্তু ও মূল পাঠের সাথে ঘনিষ্ঠ পরিচিতি ছাড়াই যারা সূচী বর্ণনাক্রম অনুযায়ী কুরআনের নিকট যান, তাদের ভুল হবার বা ভুল ব্যাখ্যা দেয়ার সমূহ আশংখা থেকে যায়।

নিয়মিত কুরআনের মূল পাঠের সাথে সম্পর্ক রাখা কুরআন বুঝার এক অপরিহার্য চাবি। এটি ব্যাপক সাহায্যে আসবে এমনকি শব্দ বা আয়াত বুঝার ক্ষেত্রেও। কুরআনের সাথে দীর্ঘস্থায়ী এবং অব্যাহত সহচর্য দানের মাধ্যমে আপনি দেখবেন অনেক সময় এমন মূল পাঠের সামনে এসছেন যেন হঠাৎ করে মনে হচ্ছে তা যেন আপনার সাথে কথা বলছে এবং আপনার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে।

অবশ্য কোন এক সময় আপনি বিভিন্ন লক্ষ্য হাসিলের জন্য বিভিন্নভাবে কুরআনের মাধ্যমে অগ্রসর হচ্ছেন। আপনি দ্রুতপঠন প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে পারেন অথবা নির্দিষ্ট একটি সময়ের মধ্যে শেষ করতে পারেন, অথবা একটি শব্দ বা একটি আয়াতের অর্থ পাওয়ার জন্য অর্থের উপর চিন্তা করার জন্য আপনি ঘন্টার পর ঘন্টা সময় লাগাতে পারেন। আপনি একটি অনুচ্ছেদ বারবার পাঠ করতে পারেন। কখনো দ্রুত আবার কখনো আস্তে। অথবা একটি বিশেষ বিষয়ে দিক-নির্দেশনা নেবার জন্য আপনি পৃষ্ঠাগুলোর উপর মাত্র নজর বুলিয়ে যেতে পারেন, যার সাথে আপনার আগেরই একটি পরিচিতি রয়েছে। আপনি নিজে নিজেই চিন্তা করতে থাকতে পারেন যা কম সময় নেবে, অথবা আপনি একটি তুলনামূলক অধ্যয়ন করতে চার বিভিন্ন তাফসীর অনুযায়ী যার একটি ক্ষুদ্র অংশও আপনার দীর্ঘ সময় লাগিয়ে দিতে পারে।

তাফসীর পাঠ

তিনঃ বুঝে-শুনে সমগ্র কুরআন মাজীদ একবার খতম করার পর আপনি নিয়মিত যতটুকু সম্ভব ধীরগতিতে তা পড়ে যাচ্ছেন। এমতাবস্থায় আপনি একটি সংক্ষিপ্ত অথচ নির্ভরযোগ্য তাফসীর বা অনুবাদ নিন এবং তা আগাগোড়া পড়ে ফেলুন। খুব কম সংখ্যক সংক্ষিপ্ত তাফসীরই আরবী, উর্দু ও অন্যান্য মুসলিম ভাষায় পাওয়া যায়। যদিও বা বর্তমান ইংরেজী ও ইউরোপীয় ভাষায় এসবের খুবই অভাব। যা হোক, যাই পাওয়া যায় না কেন, তা লাভজনকভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে, যদি সতর্কভাবে পড়া হয়।

নিজে নিজে পড়ার চাইতে একটি সংক্ষিপ্ত তাফসীর পাঠও কুরআন সম্পর্কে আপনাকে অনেক বেশী বিস্তারিত ধারণা দিতে সক্ষম। তাফসীর আপনাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন ভাষা, স্টাইল, যুক্তি, ঐতিহাসিক পটভূমি, বিস্তারিত অর্থের সাথে পরিচিত করাবে, যা আপনার নিজের চিন্তায় অনুসন্ধান লাভ সম্ভব নয়। এটি আপনার কিছু ভুলকেও সংশোধন করতে পারে।

যখনই আপনি বিস্তারিত কুরআন অধ্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, তখনই নিজেকে সংক্ষিপ্ত তাফসীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেষ্টা করুন। কমপক্ষে প্রাথমিকভাবে কখনও দীর্ঘ, বিস্তারিত গবেষণামূলক তাফসীর নিয়ে চিন্তা ভাবনা করবেন না। প্রায়ই তাদের দীর্ঘ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আল্লাহর বাণীর সাথে আপনার জীবন্ত ও প্রত্যক্ষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। আংশিক তাফসীর পড়ুন, যদি পূর্ণ তাফসীর পাওয়া না যায়। যখন ইসলামের উপর কোন সাহিত্য পড়েন, তখনও অধ্যয়নকালে বা উপসংহারে কুরআনকেন্দ্রিক যা পান, তার বিশেষ একটি নোট তৈরি করুন। এমনকি ব্যাপক ভাবে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের কাজ আপনার কুরআন বুঝার জন্য খুবই প্রয়োজনীয় সাহায্যে পরিণত হতে পারে।

মনে রাখবেন, ঈমানের পুষ্টি সাধন এবং কিভাবে জীবনযাপন করবেন তার প্রয়োজনীয় বাণী বিস্তারত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন ছাড়াই আপনি পারবেন। কেবলমাত্র কিছু সন্দেহ-সংশয় দূর করার জন্য, একটি চমৎকার বিষয়ের অনুসন্ধানের জন্য জটিল জট খোলার জন্য আপনার তাফসীরের সহযোগীতা প্রয়োজন হবে।

নির্ধারিত অংশ অধ্যয়ন

চারঃ আদর্শ হিসেবে আপনাকে প্রথম থেকেই কুরআন অধ্যয়ন শুরু করে শেষ পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হবে। একদিন অবশ্যই আসবে, আপনাদের মধ্য থেকে কেউ এমন উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

কিন্তু আমাদের অধিকাংশের জন্যই এমন দিন আসাটা সুদূর পরাহত কিংবা কোনদিন হয়তো আর আসবে না। এমতাবস্থায় আপনার অধ্যয়ন শুরু করা উচিত যত শীঘ্র সম্ভব।

তখন এ উদ্দেশ্যে নির্ধারিত অংশ, অনুচ্ছেদ, সূরা অথবা আয়াত নিন এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা সহকারে পাঠ করুন। কোন কোন সময় আপনার নিজের দাওয়াতী তৎপরতায় জড়িত থাকার কারণে এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য আপনি বিশেষ অংশ অধ্যয়ন করতে বাধ্য হন। কোন কোন সময় আপনার নিয়মিত অধ্যয়নও আপনাকে বিশেষ বিশেষ অনুচ্ছেদের মধ্যে নিক্ষেপ করতে পারে, যা আপনি গ্রহণ করতে পছন্দ করেন। কিন্তু আপনি একটি বৈজ্ঞানিক ও সুশৃঙ্খল সিলেবাসও অনুসরণ করতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শুরু করা এবং কিভাবে অধ্যয়ন করতে হবে তা জানা, কি দিয়ে শুরু করতে হবে তা নয়। এই বইয়ের শেষে কিছু অনুচ্ছেদের তালিকা পরামর্শ হিসেবে দেয়া হয়েছে।

অধ্যয়ন শুরু করার জন্য নির্ধারিত অনুচ্ছেদ বিভিন্নভাবে আপনার অনেক উপকারে আসবে। প্রথমঃ আপনি অনির্দিষ্ট কাল অপেক্ষা করার চাইতে তাযাক্কুরের অতীব প্রয়োজনীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কুরআনের ভূবনে সফরের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে অগ্রগতির সূচনা করবেন। দ্বিতীয়ঃ আপনি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, কুঞ্জিকা এবং পদ্ধতিসমূহ পেয়ে যাবেন,যা আপনাকে কুরআনের ঐসব অংশ বুঝতে সহায়তা করবে, যা আপনি খুব সহসাই বিস্তারিতভাবে পড়ার সুযোগ পাবেন না। কুরআন বিভিন্নভাবে তার বক্তব্য প্রকাশ করে থাকে। আল্লাহ এক অতি উত্তম কালাম নাযিল করেছেন। এটি এমন এক কিতাব যার সমস্ত অংশ সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং যাতে বারবার একই কথার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে (যুমার-৩৯:২৩)। তৃতীয়ঃ আপনাকে কুরআনিক কাঠামোর একটি পূর্ণরূপ বা চিত্র গড়ে তুলতে হবে, যা আপনার উপলব্ধিকে সঠিক পথে রাখার জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। চতুর্থঃ অন্যদের কাছে কুরআনের বাণী পৌঁছাতে আপনি উত্তমভাবে সুসজ্জিত হয়ে যাবেন।

নির্ধারিত অনুচ্ছেদ সমূহের বিস্তারিত অধ্যয়ন কোনক্রমেই সাধারণ পাঠের বিকল্প হতে পারে না। এর কল্যাণকারিতাই ভিন্ন প্রকৃতির এবং গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, নিয়মিত কুরআন পাঠ বা দীর্ঘ অংশ পড়া বাদ দিবেন না। বিস্তারিত পড়া এবং গোটাটার অবহেলা আপনাকে বিভ্রান্তিতে নিক্ষিপ্ত করতে পারে।

বারবার পড়া

পাঁচঃ যে অংশটুকু আপনার অধ্যয়নের জন্য আপনি নির্দিষ্ট করে থাকুন না কেন, আপনাকে তা বারবার পড়তে হবে। এটাকে একটি সাধারণ নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করে তা সর্বদা অনুসরণ করতে হবে। এর সাথে থাকুন, এর অনুসারে চলুন যতটা পারা যায়, এটা নিয়ে গভীরভাবে ভাবুন এবং একে আপনার হৃদয় ও মন দিয়ে গভীরভাবে ভাবতে দিন। এ ধরনের দীর্ঘস্থায়ী সাহচর্য কুরআন বুঝার এক অপরিহার্য অবলম্বন। কুরআনের বাণীসমূহ আপনার হৃদয়ে যতখানি গেঁথে যায়, যত বেশী বারবার তা আপনার ঠোঠে উচ্চারিত হয়, ততই সহজ হবে আপনার জন্য কুরআনের প্রতি মনোযোগী ও ধ্যানমগ্ন হওয়া। তখন শুধু মাত্র তিলায়াতের সময় বা অধ্যয়নের সমই নয় বরং আপনার প্রত্যাহিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআন আপনার কাছে তার অর্থ খুলে দেবে যখনই কোন আয়াত বা শব্দ আপনার মনে উদয় হবে।

অনুসন্ধিৎসু মন

ছয়ঃ একটি কৌতুহলী মন, অনুসন্ধিৎসু আত্মা, অর্থের জন্য উন্মুখ একটি হৃদয় তৈরী করুন। আপনি জানেন যে, কুরআন কখনও অন্ধবিশ্বাস চায় না, এটাও চায় না যে, আপনি চোখ-কান বন্ধ করে তালা লাগিয়ে কুরআন পাঠ করুন। চিন্তা-ভাবনা করার জন্য আহবান জানানো এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যাপক বিষয়বস্তু।

প্রশ্ন করা, স্মরণ করা জ্ঞান ও বুঝের চাবিকাঠি। অতএব, যতবেশী প্রয়োজন মনে হয়, তত বেশী প্রশ্ন উত্থাপন করুন। দৃষ্টান্তস্বরূপ এই শব্দ বা আয়াতের আক্ষরিক অর্থ কি? অন্য আর কি অর্থ হতে পারে? ঐতিহাসিক পটভূমিকা কি, কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে? প্রতিটা শব্দ, বাগধারা ও বাক্যের মূল পাঠ কি? এটি কিভাবে আসে এ পরের বাক্যের সাথে সংযুক্ত? কিভাবে অভ্যন্তরীণ শৃংখলা ও বিষয়বস্তুগত ঐক্য উপলব্ধি করা যেতে পারে? কি বলা হয়েছে? কেন বলা হয়েছে? সাধারণ এবং বিশেষ অর্থই বা কি? প্রধান বিষয়বস্তুসমূহ কি? কেন্দ্রীয় ভাবধারা কি? আমার জন্য/আমাদের জন্য এখন কি সংবাদ আছে? অধ্যায়নকালে আপনি আপনার প্রশ্নগুলো নোট করুন এবং তার জবাব খুঁজে বের করতে চেষ্টা করুন।

প্রশ্ন উত্থাপন করতে ভয় করবেন না। প্রশ্নোগুলোর জবাব সহসা অথবা কখনও আপনি নিজে অথবা কারো সঠিক সাহায্য নিয়ে না পেতে পারেন। তাতে কিছু যায়-আসে না। যে উত্তরই আপনি পান না কেন, তা আপনার জন্য লাভজনক। আপনার কিছুই ক্ষতির কারণ হবে না। যদি আপনি কিছু নিয়ম মেনে চলেন। প্রথমতঃ এমন প্রশ্ন করবেন না, যা মানুষের আয়ত্তের বাইরে, যা মুতাশাবিহাতের অন্তর্গত (আলে ইমরান-৩:৭)। যেমনঃ আরশ কেমন? দ্বিতীয়তঃ চুলচেরা বিষয়কে প্রশ্রয় দিবেন না। আপনার জীবন পথের সাথে সংগতিপূর্ণ নয় এমন বিষয়ে কোন প্রশ্ন করবেন না। তৃতীয়তঃ এমন উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবেন না, যার ভিত্তি যথাযথ প্রয়োজনীয় জ্ঞান বা সুস্থ যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। চতুর্থতঃ অনেক প্রশ্ন আছে, যার উত্তর আপনি খুঁজে পাবেন না, আপনার সর্বোত্তম চেষ্টা সত্ত্বেও যা আপনি বুঝবেন না। কিছু সময়ের জন্য আপনি সে সব প্রশ্ন বাদ রেখে কুরআনের অন্য বিষয়ের উপর মননিবেশ করুন। এক সময় আপনি একজন ভালো শিক্ষক অথবা বই পেয়ে যাবেন সে ব্যাপারে আপনার সাহায্যের জন্য। অথবা আপনি নিজেই এক সময় উত্তরটি পেয়ে যাবেন। কুরআনে এর অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে যে, এর প্রথম বিশ্বাসীগণ কিভাবে প্রশ্ন করতেন, সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ও শিক্ষণীয় কতিপয় ঘটনা যেখানে রাসূল (সা) এবং তার সাহাবাগণ (রা) জিজ্ঞাসাবাদ, কৌতুহল, প্রশ্ন ও চিন্তা-ভাবনায় উৎসাহিত করেছেন।

অধ্যয়নের জন্য সহায়ক

সাতঃ কিছু সহায়িকা রয়েছে, যা আপনার অধ্যয়নের জন্য প্রয়োজন হবে।

এগুলো আয়ত্তে আনার চেষ্টা করুন যতটা আপনার পক্ষে সম্ভব।

(১)আপনার নিজ ভাষায় একটি কুরআনের অনুবাদ সংগ্রহ করুন। এটি হচ্ছে আপনার নূন্যতম প্রয়োজন। সাধারণ পড়া এবং অধ্যয়ন উভয় ক্ষেত্রেই আপনাকে এটি ব্যবহার করতে হবে। একই কপি আপনি মুখস্ত করার জন্য কাজে লাগাতে পারেন যদি এটি নিয়ে চলাফেরার সুবিধা থাকে। কিন্তু এ ব্যাপারে যত্নবান হন যে, সারা জীবন মুখস্ত করার জন্য আপনি যেন একই কপি ব্যবহার করেন। অন্যথায় পুনঃপঠন অসুবিধাজনক হয়ে থাকে।

মনে রাখবেন যে, কোন অনুবাদই পারফেক্ট বা নিখুত নয়। প্রত্যেক অনুবাদেই রয়েছে অনুবাদকের নিজস্ব ব্যাখ্যার অংশ বিশেষ। কুরআনের কোন প্রামাণ্য হিসেবে গৃহীত অনুবাদ নেই এবং তা হওয়াও সম্ভব নয়।

(২)একই কপি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা সম্বলিত হতে পারে, অথবা আপনি আলাদাভাবে একটি সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু একটি আপনার থাকতেই হবে। একটি অনুবাদ এবং একটি নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থ আপনার প্রাথমিক প্রধান উদ্দেশ্যের জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত।

(৩)পণ্ডিতগণ শব্দ ও মূল বিষয়বস্তুর কি ভিন্ন অর্থ করেছেন তা জানার জন্য একাধিক অনুবাদ এবং তাফসীর গ্রন্থ আপনার জন্য কাজে লাগবে যদিও বা তা থাকাটা জরুরী নয়।

(৪)আরো উচ্চতর অধ্যয়নের জন্য আপনার কাছে কমপক্ষে একটি বিস্তারিত তাফসীর গ্রন্থ থাকা উচিত।

(৫)একটি ভালো আরবী অভিধান থাকা উচিত, কুরআনের অভিধান হলে আরও ভালো, যাতে করে আপনি শব্দার্থের গভীরে প্রবেশ করতে পারেন।

(৬)শব্দাবলী বা বিষয়সমূহের বর্ণনাক্রমিক সূচী যোগাড় করা উচিত।

অধ্যয়নের জন্য এধরনের কিছু সহায়িকার তালিকা এই বইয়ের পিছনে দেয়া হয়েছে।

কিভাবে অধ্যয়ন করতে হবে

নিম্নে নির্ধারিত অনুচ্ছেদ বিস্তারিতভাবে অধ্যয়নের জন্য একটি পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য এজন্য কোন নির্দিষ্ট বিধি নেই। মূলতঃ আপনি আপনার সামর্থ ও সীমাবদ্ধতার উপযোগী করে একটি নিজস্ব প্রক্রিয়া গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি কাজে লাগাতে পারেন। যা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে আপনাকে অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক পন্থায় অগ্রসর হতে হবে এবং চেষ্টা করুন নিন্মোক্ত ক্রমধারা অনুসরণ করতে।

প্রথমতঃ আপনি নিজের মতো করে গোটা অনুচ্ছেদটি পাঠ করুন। অতঃপর আপনার অধ্যয়নের সহযোগীতাকারীর সাথে পরামর্শ করুন, অথবা একজন যোগ্য শিক্ষকের নিকট থেকে এর অর্থ যতটা সম্ভব শিখে নিন। পরিশেষে উভয় দিক থেকে আপনার শিক্ষাকে সংযুক্ত করে একটি পুর্ণ বুঝ আপনি নিতে চেষ্টা করুন যতটা সম্ভব।

প্রথম স্তরঃ নিজেকে অবগত করুন এবং সমস্যাসমূহ চিহ্নিত করুন।

ধাপ-১:দ্রুত উপলব্ধি করুন মৌলিক শর্তাবলী এবং আন্তরিক অংশগ্রহণ থেকে কি আপনি স্মরন করতে পারেন। এটা অনুধাবন করুন যে, আল্লাহ আপনার সাথে আছেন এবং যা আপনি পাঠ করতে যাচ্ছেন, তা বুঝতে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করুন।

ধাপ-২:কমপক্ষে তিনবার অনুচ্ছেদটি পাঠ এবং এর অর্থ নিয়ে চিন্তা করুন। অথবা না দেখে এর মূল বিষয়বস্তু যতক্ষণ স্মরণ করতে না পারেন ততক্ষণ যতবার প্রয়োজন ততবার পাঠ করুন। তখন আপনি এটি আত্মস্থ করতে পারবেন এবং এর সম্পর্কে চিন্তা করতে সমর্থ হবেন যখনই আপনি চান।

নিয়মটি হলোঃ ব্যাখ্যা দেখা শুরুর পূর্বে শব্দ ও অর্থসমূহ প্রবাহিত হতে দিন।

ধাপ-৩:মূল পাঠ ছাড়াই যেসব প্রধান বিষয় বস্তু আপনি আয়ত্তে আনতে পারেন, তা নোট করুন। পরে তা মূল পাঠের সাথে মিলান এবং পুনরাবৃত্তি করুন।

ধাপ-৪:একটিও যদি বের করতে পারেন তো কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু নোট করুন।

ধাপ-৫:আপনার মতে একটি বক্তব্য বা বক্তব্য সমূহ রয়েছে এমন সংক্ষিপ্ত অনুচ্ছেদে তা বিভক্ত করুন।

ধাপ-৬:ঐসব শব্দ এবং বাগধারা আন্ডারলাইন করুন, যা আপনার মতে অর্থ বুঝার জন্য মূল বিষয়বস্তু।

ধাপ-৭:উপরে আমরা যেভাবে উল্লেখ করেছি, সেভাবে প্রশ্ন করুন।

দ্বিতীয় স্তরঃ যা আপনি পড়েছেন, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করুন। নিজে নিজেই প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে চেষ্টা করুন, অর্থ এবং বক্তব্য কি, তা বুঝতে চেষ্টা করুন।

ধাপ-৮:গুরুত্বপূর্ণ শব্দসমূহের কি অর্থ তা বের করুন।

ধাপ-৯:প্রতিটি বাগধারা বা বিবৃতির অর্থ নির্দিষ্ট করুন।

ধাপ-১০:ভেবে দেখুন কিভাবে তারা পরস্পর সম্পর্কিত, কিভাবে একটি অপরটির অনুবর্তী বা অগ্রবর্তী হয়, কি ঐক্য বা সুসংগতি রয়েছে তাদের মধ্যে।

ধাপ-১১:অর্থ বের করা ও বুঝার চেষ্টা করুন অনুচ্ছেদের সরাসরি মূল বিষয়বস্তুর মধ্য থেকে, সূরার বৃহত্তর বিষয়বস্তু এবং কুরআনের সামগ্রিক মূল বিষয়বস্তুর মধ্য থেকে।

ধাপ-১২:নির্দিষ্ট করুন এর বিভিন্ন বক্তব্য এবং শিক্ষা কি কি।

ধাপ-১৩:জিজ্ঞেস করুন, আমার এবং আমাদের কালের প্রতি এর বক্তব্য কি?

ধাপ-১৪:চিন্তা করুন আপনি, উম্মাহ এবং মানবতা এর প্রতি কিভাবে সাড়া দিতে পারে।

তৃতীয় স্তরঃ আপনার যে অধ্যয়ন সহায়িকা বা শিক্ষকই থাকুক না কেন, তাদের সাহায্যে দ্বিতীয় স্তরের ধাপ ৮-১৪ এর মাধ্যমে অর্থ বুঝার চেষ্টায় নিয়োজিত হন। আপনার নিজের বুঝকে পুনরধ্যয়ন, সংশোধন, সংযোজন, আধুনিকীকরণ করুন, সঠিক বলে অনুমোদন করুন অথবা প্রত্যাখান করুন।

চতুর্থ স্তরঃ এই ভাবে যে বুঝ পেলেন তা লিখে রাখুন অথবা হৃদয় ও মনে সংরক্ষণ করুন।

যেসব প্রশ্ন থেকে যায় তা লিপিবদ্ধ করুন। কোন বুঝকে পরিপূর্ণ এবং চূড়ান্ত হিসেবে নেবেন না। আপনি যতই অধ্যয়ন অব্যহত রাখবেন আরও অর্থ পেতে থাকবেন এবং পুনরধ্যয়নের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে থাকবেন।

কিভাবে অর্থ বুঝতে হবে

কুরআন বুঝার জন্য যে মূলনীতি ও নির্দেশিক্ অনুসরণ করা প্রয়োজন, তা পুরাপুরি বিস্তারিত আলোচনা করতে হলে বিরাট এক গ্রন্থ রচনা করতে হবে।

কুরআন বুঝার জন্য প্রচেষ্টাকালে সর্বদা স্মরণ রাখা উচিত এমন অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে নির্দেশিকা এখানে আমরা দিতে পারি।

 

About খুররম জাহ্‌ মুরাদ