কুরআন অধ্যয়ন সহায়িকা

৮: কুরআনের আলোকে জীবন যাপন

কুরআনের আনুগত্য

প্রথম থেকেই যদি আপনি পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পন করে আপনার জীবনকে আল্লাহর দেয়া কুরআন অনুযায়ী পুনগঠন ও পরিবর্তন না করেন, তাহলে কুরআন পাঠ আপনার কোন উপকারেই আসবে না, বরং তা ক্ষতি ও দুর্দশার কারণ হতে পারে। কর্মানুষ্ঠানের দৃঢ় ইচ্ছা ও প্রয়াস ব্যতীত হৃদয় ও আত্মার আবেদানুভূতি, কিংবা ভাবের উচ্ছ্বাস অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক সমৃদ্ধি আপনার কোন কাজেই আসবে না। যদি আপনার কাজের উপর কুরআনের কোন প্রভাব ফুটে না ওঠে এবং কুরআন যে নির্দেশ দিয়েছে আপনি তা প্রতিপালন না করেন এবং যা নিষিদ্ধ করেছে তা বর্জন না করেন, তাহলে আপনি কুরআনের নৈকট্য লাভ করতে পারবেন না।

কুরআনের প্রতিটি পাতায় রয়েছে আত্মনিবেদনের আহবান, পরিবর্তন ও কর্মানুষ্ঠানের ডাক। প্রতিটি স্তরেই পাঠককে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রতিশ্রুতির মুখোমুখি হতে হয়। যারা কুরআনের আহবানে সাড়া দিয়ে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণে ব্যর্থ হয়, তাদের কাফির, যালিম ও ফাসিক বলে ঘোষণা করা হয়েছে (আল-মায়িদা ৫:৪৪-৪৭)।

যাদেরকে আল্লাহর এ মহামন্ত্র দেয়া হয়েছে অথচ তারা তা বুঝে না কিংবা তদনুযায়ী কাজ করে না, তাদেরকে বর্ণনা করা হয়েছে এমন গাধা হিসেবে, যারা ওজন বহন করে কিন্তু তারা জানে না কি বহন করছে এবং তা থেকে না হতে পারে উপকৃত। তারা হচ্ছেদ সেই হতভাগা, যাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর নবী (সা) বিচারের দিন অভিযোগ করবেন:

” হো আমার আল্লাহ আমার জাতির লোকেরা এই কুরআনকে উপহাসের বস্তু বানিয়ে নিয়েছিল।” (আল-ফুরকান ২৫:৩০)

কুরআনকে এড়িয়ে চলা, পরিত্যাগ করা এবং এক পাশে রেখে দেয়ার অর্থ হচ্ছে কুরআন না পড়া, না বুঝ, কুরআন অনুযায়ী জীবন পরিচালনা না করা, এটাকে অপ্রাসংগিক এবং অতীতের বিষয় বলে মনে করা।

রাসূল (সা) কুরআন মেনে চলার ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং জোর দিয়েছেন।

আমার উম্মতের মধ্যে অনেক মুনাফিক হবে কুরআনের পাঠকদের মধ্য থেকে। (আহমাদ)

সেই ব্যক্তি বিশ্বাসীই নয়, যে কুরআন যা হারাম করেছে, তাকে হালাল বিবেচনা করে। (তিরমিষী)।

কুরআন পাঠ কর, যাতে তুমি নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার সামর্থ্য অর্জন করতে পার। এটা যদি তোমাকে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত না রাখে, তাহলে বুঝতে হবে সত্যিকার অর্থে কুরআন পাঠ করাই হয়নি (তাবরানী)।

রাসূল (সা) এর সাহাবীদের নিকট কুরআন শিক্ষার অথর্ ছিল, কুরআন পাঠ করা, এ নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করা, কুরআনের শিক্ষা বাস্তবায়িত করা।

বর্ণনা করা হয়েছেঃ

যারা কুরআন অধ্যয়ন নিয়োজিত ছিলেন তারা বলেছেন যে, হযরত উসমান ইবনে আফফান এবং আবদুল্লাহ ইবনে আফফান এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)-এর মতো লোক যাঁরা একবার দশটি আয়াত শিখলে আর সামনে অগ্রসর হতেন না যতক্ষণ পর্যন্ত তা বুঝতে এবং জীবনে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম না হতেন। তাঁরা বলতেন যে, তাঁরা কুরআন ও জ্ঞান একই সাথে শিখেছেন। আর এভাবেই অনেক সময় তাঁরা একটিমাত্র সূরা শিখতে বছরের পর বছর সময় লাগিয়ে দিতেন। (আল-ইতকান ফী উলুমিল কুরআন, সুয়ূতী)

আল-হাসান আল-বসরী বলেছেন, তুমি রাত্রিকে গ্রহণ করেছো একটি উটের মতো যাতে আরোহণ করে তুমি কুরআনের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করতে পারো। তোমার সামনে যারা আছেন, তারা এটাকে বিবেচনা করেছেন তাদের প্রভুর বাণী হিসেবে। তারা তার উপর চিন্তা করে রাতে এবং সে অনুযায়ী জীব-যাপন করে দিনে। (ইয়াহিয়া)

কুরআনের অধ্যয়ন তোমার হৃদয়ে বিশ্বাসকে মযবুত করে দেয়া উচিত, যে বিশ্বাস তোমার জীবনকে একটি বিশেষ রূপ দান করবে। এটা কোন পর্যায়ক্রমিক খন্ড খন্ড প্রক্রিয়া নয় যে, প্রথম কয়েক বছর আপনি কুরআন পাঠ করে কাটাবেন, তারপর বুঝার জন্য এবং বিশ্বাসকে মযবুত করার জন্য কয়েক বছর সময় নিবেন এবং তারপর মাত্র তা বাস্তবায়ন করবেন। গোটাটাই একটি একক প্রক্রিয়া। সবকিছু চলবে যুগপৎভাবে। যখনই আপনি কুরআন শ্রবণ করেন অথবা তিলাওয়াত করেন তা আপনার অন্তরে বিশ্বাস প্রজ্বলিত করে। আর যখনই আপনার হৃদয়ে বিশ্বাস জন্মে, তখনই আপনার জীবনে পরিবর্তনের সূচনা হয়।

যা আপনাকে অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে তা হচ্ছে- কুরআন অনুযায়ী জীবন ধারণের জন্য শর্ত হলো আপনার জীবনের একটি মুখ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ। আপনার চারদিকে যে ধরনের চিন্তা-ভাবনাই থাক না কেন, আপনার সমাজ আপনাকে যাই নির্দেশ করুক না কেন, অথবা অন্যরা যাই করুক না কেন, আপনাকে আপনার জীবনের গতিধারাকে সম্পূর্ণরূপে পাল্টে দিতে হবে। এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য অনেক বড় ত্যাগ প্রয়োজন। আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর বাণী কুরআনে বিশ্বাসী হিসাবে ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত না হচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কুরআনের সাথে সময় যতই দেন না কেন ফলাফল খুব ভালো আসবে না।

প্রথম মুহূর্ত থেকেই, প্রথম পদক্ষেপই এটা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, কুরআন তাদের জন্যই দিকদর্শন, যারা আল্লাহর নাফরমানির ক্ষতি থেকে নিজেদের বাঁচানোর জন্য প্রস্তুত, যারা আল্লাহর অসন্তোষ থেকে নিজেদের বাঁচাতে চায় এবং পরিণতিকে ভয় করে, তারাই হচ্ছেন মুত্তাকী (আল-বাকারা ২:১-৫)। কুরআন জ্ঞান এবং কর্মের মধ্যে, ঈমান এবং সৎ কাজের মধ্যে বিপরীতধর্মিতা স্বীকার করে না।

কুরআনী মিশনের পরিপূর্ণতা

কুরআন অনুযায়ী জীবন পরিচালনার অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে আপনার চারপাশের লোকদের নিকট কুরআনের বাণী পৌঁছানো। প্রকৃতপক্ষে যে মুহুর্তে মহানবী (সা) এর উপর প্রথশ ওহী নাযিল হলো, তখনই তিনি তা তাঁর লোকদের কাছে পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য অনুধাবন করেছিলেন। দ্বিতীয় ওহী আসলো এই নির্দেশসহ: জাগো এবং সতর্ক করো (আল-মুদ্দাসসির ৭৪:২)। অত:পর বিভিন্ন পর্যায়ে এটা নবী (সা) এর নিকট পরিস্কার করা হয় যে, কুরআন অন্যকে জানানো, শ্রবণ করানো এবং এর ব্যাখ্যা করা তাঁর প্রাথমিক দায়িত্ব, তার জীবনের মিশন। (আল-আনআম ৬: ১৯, আল-ফুরকান ২৫:১, আল-আনআম ১৯:৯৭, আল-আরাফ ৭:১৫৭)।

আমরা তাঁর অনুসারী হিসেবে, আল্লাহর কিতাবের অধিকারী হিসেবে আমাদের উপরও একই দায়িত্ব ও মিশন অর্পিত হয়েছে। কুরআন পাঠ মানেই হচ্ছে তার অন্যকে জানাতে বাধ্য, কুরআন শোনার অর্থ হচ্ছে অন্যকে শুনাতে হবে। অবশ্যই আমাদের এটা মানবজাতিকে জানাতে হবে এবং কুরআনকে গোপন রাখা যাবে না।

“এই আহলে কিতাবদের সেই ওয়াদা স্মরণ করিয়ে দাও, যা আল্লাহ তাদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলেন। তা এই যে, তোমাদেরকে কিতাবের শিক্ষা ও ভাবধারা লোকদের মধ্যে প্রচার করতে হবে, এটা গোপন করে রাখতে পারবে না। কিন্তু তারা কিতাবকে পিছনের দিকে ফেলে রেখেছে এবং সামান্য মূল্যে তাকে বিক্রয় করেছে, তারা যা করছে, তা কতই না খারাপ কাজ।” (আল-ইমরান ৩:১৮৭)

যদি আপনার হৃদয়ে এবং হাতে একটি প্রদীপ থাকে, তা অবশ্যই আলো বিচ্ছুরিত করবে। আপনার অন্তরে যদি আগুন থাকে, তা অবশ্যই প্রজ্বলিত হবে। সামান্য দুনিয়াবী স্বার্থে যারা তা করে না, প্রকৃতপক্ষে তারা আগুন দিয়ে তাদের পেট ভর্তি করছে।

“বস্তুত যারা আল্লাহর দেয়া কিতাবের আদেশ-নিষেধ গোপন করে এবং সামান্য বৈষয়িক স্বার্থের জন্য তাকে বিসর্জন দেয়, তারা মূলত: নিজেদের পেট আগুনের দ্বারা ভর্তি করে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ কখনই তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদেরকে পবিত্র বলেও ঘোষণা করবেন না। তাদের জন্য কঠিন পীড়াদায়ক শাস্তি নির্দিষ্ট রয়েছে।” (আল-বাকারা ২: ১৭৪) এবং তারা আল্লাহর অভিশপ্ত হওয়ার উপযোগীঃ

“যরা আমাদের নাযিল করা উজ্জ্বল আদর্শ ও জীবন ব্যবস্থা গোপন করে রাখবে অথচ আমরা তা সমগ্র মানুষের পথ-প্রদর্শনের জন্য নিজ কিতাবে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছি। নিশ্চিত জেনো, আল্লাহও তাদের উপর লানত করছেন, আর অন্যান্য সকল লানতকারীরাও তাদের উপর অভিশাপ নিক্ষেপ করছে।” (আল-বাকারা ২:১৫৯)

যতক্ষণ পর্যন্ত তারা দায়িত্ব পালন না করবেন:

“অবশ্য যারা এই অবাঞ্চিত আচরণ থেকে বিরত হবে ও নিজেদের কর্মনীতির সংশোধণ করে নিবে এবং যা গোপন করেছিলো তা প্রকাশ করতে শুরু করবে, তাদেরকে আমি মাফ করে দিব, প্রকৃতপক্ষে আমি ক্ষমাশীল, তওবা গ্রহণকারী ও দয়ালু।” (আল-বাকারা ২:১৬০)

কিন্তু তারা যদি এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সবার দ্বারাই তারা হবে অভিশপ্তঃ

“যারা কুফরীর আচরণ অবলম্বন করেছে এবং কুফরীর অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের উপর আল্লাহ, ফিরিশতা ও সমগ্র মানুষের অভিশাপ পড়বে।” (আল-বাকারা ২:১৬১)

আল্লাহ তাদের প্রতি ফিরেও তাকাবেন নাঃ

“আর যারা নিজেদের প্রতিশ্রতি এবং নিজেদের শপথ-প্রতিজ্ঞাসমূহ সামান্য নগণ্য মূল্যে বিক্রয় করে ফেলে পরকালে তাদের জন্য কোন অংশই নির্দিষ্ট নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ না তাদের সাথে কথা বলবেন, না তাদের প্রতি চেয়ে দেখবেন, আর না তাদেরকে পরিবত্র করবেন, বরং তাদের জন্য তো কঠিন ও উৎপীড়ক শাস্তি রয়েছে। (আলে-ইমরান ৩:৭৭)

নিজের দিকে তাকিয়ে দেখুন আজকের মুসলমানদের প্রতি তাকিয়ে দেখুন। কেন কোটি কোটি লোক রাত-দিন কুরআন পাঠ সত্ত্বেও আমাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় না? হয় আমরা কুরআন পড়ি এবং তা বুঝি না, অথবা যদি আমরা বুঝি, তা আমরা গ্রহণ করি না এবং তদনুযায়ী কাজ করি না, অথবা সম্পূর্ণটাই যখন পড়ি এবং অংশ বিশেষ পালন করি, তখন আমরা নিকৃষ্ট অপরাধের দায়ে একে গোপন রাখা এবং কুরআনের আলোকে বিশ্বের মানুষের সামনে না আনার অপরাধে দোষী।

“তাদের মধ্যে আরেকটি দল আছে, যারা উম্মী, আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞানই নেই। নিজেদের ভিত্তিহীন আশা-আকাংখা ও ইচ্ছা-বাসনাই তাদের একমাত্র সম্বল এবং অমূলক ধারণা-বিশ্বাস দ্বারা তারা পরিচালিত হয়। তাই সেই সব লোকের ধ্বংস নিশ্চিত, যারা নিজেদেরই হাতে শরীয়তের বিধান রচনা করে এবং তারপর লোকদের বলে যে, এর বিনিময়ে তারা সামান্য স্বার্থ লাভ করবে। বস্তুত: তাদের হাতের এই লিখনই তাদের ধ্বংসের কারণ এবং এর সাহায্যে তারা যা কিছু উপার্জন করে, তা তাদের ধ্বংসের উপকরণ।” (আল-বাকারা ২:৭৭-৭৮)

“তবে তোমরা কি কিতাবের একটি অংশ বিশ্বাস কর এবং অন্য অংশ অবিশ্বাস কর? জেনে রাখ, তোমাদের মধ্যে যাদেরই এরুপ আচরণ হবে, তাদের এতদ্ব্যতীত আর কি শাস্তি হতে পারে যে, তারা পার্থিব জীবনে অপমানিত এবং লাঞ্চিত হতে থাকবে এবং পরকালে তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির দিকে নিক্ষেপ করা হবে। তোমরা যা কিছু করছ, তা আল্লাহ মোটেই অজ্ঞাত নন।” (আল-বাকারা ২:৮৫)

এ সম্পর্কে আমাদের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা কুরআন অধ্যয়নের ফলে আমাদের উপর যা অর্পিত হয়েছে সেই কুরআনের সাক্ষ্যদাতা হিসেবে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সম্পর্কে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে না পারবো, ততক্ষণ পর্যন্ত কুরআনের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালিত হতে পারে না। কলংক, অমর্যাদা, অপমান এবং পশ্চাৎপদতা যা আমাদের ভাগ্যে পরিণত হয়েছে, তার একমাত্র কারণ কুরআন ও তার মিশনের প্রতি আমাদের আচরণ।

এই কিতাবের সাহায্যে আল্লাহ কিছু লোককে সম্মানিত করবেন এবং অন্যদেরকে করবেন অধ:পতিত। (মুসলিম)

হায় কতই না ভালো হতো যদি তারা তাওরাত, ইনজীল এবং আল্লাহর তরফ থেকে তাদের প্রতি নাযিল করা অন্যান্য কিতাবসমূহকে কায়েম করত, তবে আসমান ও যমীন থেকে তাদের রেযেক প্রদান করা হতো। (আল-মায়িদা ৫:৬৬)

কুরআনের উপর আমরা যত পাণ্ডিত্যই অর্জন করি না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা তা মেনে না চলবো, ততক্ষণ পর্যন্ত কুরআনের পূর্ণ অর্থ ও সঠিক তাৎপর্য বুঝতে এবং আবিস্কার করতে আমরা সফল হতে পারবো না। আল্লাহর নবী (সা) তাঁর সম্মানিত সাহাবা কিরামকে বলেনঃ

তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক থাকবে, যাদের নামাযের সাথে তোমরা নামাযকে তুলনা করবে, তোমার রোযার সাথে তাদের রোযা, তোমার সুকৃতির সাথে তাদের সুকৃতি, তোমাকে খুবই নিম্নস্তরের মনে হবে। তারা কুরআন পড়বে কিন্তু তা তাদের গলার নীচে প্রবেশ করবে না। (বুখারী)

আত্মসমর্পণ এবং মেনে চলাটা কেবলমাত্র কুরআনের সত্যিকার মিশন পূর্ণ করার জন্যই নয়। এটি কুরআন বুঝার এক নিশ্চিত কুঞ্জিকা বা চাবি। কুরআনের নির্দেশ মেনে চলে আপনি যে তাৎপর্য আবিস্কার করতে পারবেন, তা কেবলমাত্র চিন্তা-ভাবনা করে সম্ভব নয়। তখন আপনি কুরআনকে প্রত্যক্ষ করতে পারবেন। এ সম্পর্কে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ) অবিস্মরণীয় ভাষায় লিখেছেন, যা কোন দিন ভুলার মতো নয়।

‘কিন্তু কুরআন বুঝার এই সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যে কাজ করার বিধান ও নির্দেশ দিয়ে কুরআন এসেছে কার্যতঃ ও বাস্তবে তা না করা পর্যন্ত কোনও ব্যক্তি কুরআনের প্রাণসত্তার সাথে পুরোপুরি পরিচিত হতে পারে না। এটা নিছক কোন মতবাদ ও চিন্তাধারার বই নয়। কাজেই আরাম কেদারায় বসে বসে এ বইটি পড়লে এর সব কথা বুঝতে পারা যাবার কথা নয়। দুনিয়ায় প্রচলিত ধর্মচিন্তা অনুযায়ী এটি নিছক একটি ধর্মগ্রন্থ নয়। মাদ্রাসা ও খানকায় বসে এর সমস্ত রহস্য ও গভীর তত্ত্ব উদ্ধার করা সম্ভব নয়। শুরুতে ভূমিকায় বলা হয়েছে, এটি একটি দাওয়াত ও আন্দোলনের কিতাব। সে এসেই এক নীরব প্রকৃতির সৎ ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিকে নির্জন ও নিঃসংগ জীবন ক্ষেত্র থেকে বের করে এনে আল্লাহ বিরোধী দুনিয়ার মুকাবিলায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তার কণ্ঠে যুগিয়েছে বাতিলের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদের ধ্বনি। যুগের কুফরী, ফাসিকী ও ভ্রষ্টতার পতাকাবাহীদের বিরুদ্ধে তাকে প্রচন্ড সংঘাতে লিপ্ত করেছে। সচ্চরিত্রসম্পন্ন লোকদেরকে প্রতিটি গৃহাভ্যন্তর থেকে খুঁজে বের করে এনে সত্যের আহবায়কের পতাকাতলে সমবেত করেছে। দেশের প্রতিটি এলাকার ফিতনাবাস ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে বিক্ষুদ্ধ ও উত্তেজিত করে সত্যানুসারীদের সাথে তাদের যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছে। এক ব্যক্তির আহবানের মাধ্যমে নিজের কাজ শুরু করে খিলাফতে ইলাহীয়ার প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত পূর্ণ তেইশ বছর ধরে এই কিতাবটি এই বিরাট ও মহান ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করেছে। হক ও বাতিলের এই সুদীর্ঘ ও প্রাণান্তকর সংঘর্ষকালে প্রতিটি মনযিল ও প্রতিটি পর্যায়েই সে একদিকে ভাংগার পদ্ধতি শিখিয়েছে এবং অন্যদিকে পেশ করেছে গড়ার নকশা। এখন বলুন, যদি আপনি ইসলাম ও জাহিলিয়াত এবং দীন ও কুফরীর সংগ্রামে অংশগ্রহণই না করেন, যদি এই দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মনযিল অতিক্রম করার সুযোগই আপনার ভাগ্যে না ঘটে, তাহলে নিছক কুরআনের শব্দগুলো পাঠ করলে তার সমূদয় তত্ত্ব আপনার সামনে কেমন করে উদঘাটিত হয়ে যাবে?

কুরআনকে পুরোপুরি অনুধাবন করা তখনই সম্ভব, যখন আপনি নিজেই কুরআনের দাওয়াত নিয়ে উঠবেন, মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করার কাজ শুরু করবেন এবং এই কিতাব যেভাবে পথ দেখায়, সেভাবেই পদক্ষেপ নিতে থাকবেন। একমাত্র তখনই কুরআন নাযিল সময়কালীন অভিজ্ঞতাগুলো আপনি লাভ করতে সক্ষম হবেন। মক্কা, হাবশা (বর্তমান ইথিয়োপিয়া) ও তায়িফের মনযিলও আপনি দেখবেন। বদর ও উহুদ থেকে শুরু করে হুনাইন ও তাবুকের মনযিলও আপনার সামনে এসে যাবে। আপনি আবু জেহেল ও আবু লাহাবের মুখোমুখি হবেন। মুনাফিক ও ইয়াহুদীদের সাক্ষাতও পাবেন। ইসলামের প্রথম যুগের উৎসর্গিতপ্রাণ মু’মিন থেকে নিয়ে দুর্বল হৃদয়ের মু’মিন পর্যন্ত সবার সাথেই আপনার দেখা হবে। এটা এক ধরনের ‘সাধনা’ একে আমি বলি “কুরআনী সাধনা’। এই সাধন পথে ফুটে ওঠে এক অভিনব দৃশ্য। এর যতগুলো মনযিল অতিক্রম করতে থাকবেন, তার প্রতিটি মনযিলে কুরআনের কিছু আয়াত ও সূরা আপনা-আপনি আপনার সামনে এসে যাবে। তারা আপনাকে বলতে থাকবে- এই মনযিলে তারা অবতীর্ণ হয়েছিল এবং সেখানে এই বিধানগুলো এনেছিল। সে সময় অভিধান, ব্যাকরণ ও অলংকার শাস্ত্রীয় কিছু তত্ত্ব সাধকের দৃষ্টিতে অগোচরে থেকে যেতে পারে কিন্তু কুরআন নিজের প্রাণসত্তাকে তার সামনে উন্মুক্ত করতে কার্পণ্য করবে, এমনটি কখনও হতে পারে না। আবার এই সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত কুরআনের বিধানসমূহ, তার নৈতিক শিক্ষাবলী, তার অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিধি-বিধান এবং জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগ সম্পর্কে তার প্রণীত নীতি-নিয়ম ও আইনসমূহ বুঝতে পারবে না, যতক্ষণ না সে বাস্তবে নিজের জীবনে এগুলো কার্যকর করে দেখবে। যে ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনে কুরআনের অনুসৃতি নেই, সে তাকে বুঝতে পারবে না। আর যে জাতির সমস্ত সামাজিক প্রতিষ্ঠান কুরআন বিবৃত পথ ও কর্মনীতির দিকে চলে না তার পক্ষেও এর সাথে পরিচিত হওয়া সম্ভবপর নয়।

রাসূল (রা) নির্দিষ্টভাবে কি পড়েছেন বা জোর দিয়েছেন

কুরআন শরীফে এমন কিছু সূরা ও আয়াত রয়েছে, যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, নবী (সা) ঐসব সূরা ও আয়াত নির্দিষ্ট নামাযে অথবা বিশেষ পরিস্থিতিতে বেশী বেশী তিলাওয়াত করতেন, অথবা ঐসব সূরা ও আয়াতের চমৎকার বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী ব্যাখ্যা করে বিশেষভাবে উচ্চ প্রশংসা করতেন। ঐসব সূরা ও আয়াতের চমৎকার বৈশিষ্ট ও গুণাবলী ব্যাখ্যা করে বিশেষভাবে উচ্চ প্রশংসা করতেন। ঐসব সূরা ও আয়াত সম্পর্কে আপনার জানা উচিত।

নীচের যে হাদীস দেয়া হয়েছে, তা এটা প্রমাণের জন্য নয় যে, কুরআনের এক অংশ অপেক্ষা অন্য অংশ শ্রেষ্ঠ। আপনার উচিত হবে না যে, আপনি কুরআনের বাকী অংশ অবহেলা করেন এবং তার বিনিময়ে ঐ নির্দিষ্ট অংশ পাঠ করতে বা মুখস্থ করতে আপনি নিজেকে নিয়োজিত করেন। এই বাছাইকৃত অংশসমূহ এ জন্যই প্রয়োজনীয় যে, কারো পক্ষে সবকিছু প্রতিদিন মুখস্থ এবং পাঠ করা সম্ভব নয়। তাছাড়াও কেউ সাধারণতঃ একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিত পড়তে নিজেকে অভ্যস্থ করতে পারে। রাসূল (সা) এর অনুসরণ এবং তিনি যে পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার আশা করা ব্যতিত আর উত্তম কি হতে পারে।

এটা স্মরণ রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, রাসূল () সমস্ত কুরআন মজীদ রমযান মাসে কমপক্ষে একবার পড়তে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি সূরা বাকারা এবং আলে-ইমরানের মত দীর্ঘ অংশ রাত্রিকালীন নামাযে এক রাকাআতেও পাঠ করতেন।

রাসূল (সা) বিভিন্ন নামাযে যা তিলাওয়াত করতেন

জাবির ইবনে সামূরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) সূরা কাফ (৫০) এবং অনুরূপ সূরা তিলাওয়াত করতেন। (মুসিলম)

তিনি আল ওয়াকিয়া (৫৬) তিলাওয়াত করেছেন। (তিরমিযী)

আমর ইবনে হুরাইস (রা) বলেন, আমি তাঁকে আততাকবীর (৮১) তিলাওয়াত করতে শুনেছি। (মুসলিম)

আবদুল্লাহ ইবনে আস সাইব (রা) বলেন, তিনি যখন মক্কায় ছিলেন সূরা মুমিনূন-এর ৪৫ অথবা ৫০ আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করেছেন। (মুসিলম)

আবু হুরায়রা (রা) বলেন, তিনি সূরা কাফিরুন (১০৯) এবং ইখলাস (১১২) তিলাওয়াত করতেন। (মুসলিম)

উকবা ইবনে আমির (রা) বলেন, তিনি সূরা ফালাক (১১৩) এবং সূরা নাস (১১৪) তিলাওয়াত করতেন। (আহমাদ, আবু দাউদ)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, তিনি সূরা বাকারা (২:১৩৬) এবং  সূরা আলে ইমরানের (৩:৬৪) অংশবিশেষ তিলাওয়াত করতেন। (মুসলিম)

আবু বকর (রা) আল-বাকারা তিলাওয়াত করেছেন বলে বর্ণিত আছে। (মুয়াত্তা)

হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা) প্রায়ই সূরা ইউসুফ (১২) তিলাওয়াত করতেন। (মুয়াত্তা)

হযরত উমর ইবনে খাত্তাব সূরা ইউসুফ (১২) এবং সূরা আলহাজ্জ (২২) তিলাওয়াত করতেন।

হযরত উমর (রা) আবু মূসা (রা)-কে লিখেছিলেন তিওয়ালে মুফাসসাল অর্থাৎ সূরা মুহাম্মদ (৪৭) থেকে সূরা আল-বুরুজ পর্যন্ত তিলাওয়াত করার জন্য। (তিরমিযী)

হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন, ফজরের নামাজের আগের দুই রাকআতে নবী (সা) সূরা কাফিরুন এবং সূরা ইখলাস তিলাওয়াত করতেন। (ইবনে মাজাহ)

ফজরের নামায

হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেছেন, শুক্রবারের ফজরের নামাযে তিনি প্রথম রাকআতে সূরা আস-সাজ্বদাহ (৩২) এবং দ্বিতীয় রাকআতে আদ-দাহর (৭৬) তিলাওয়াত করতেন।

যোহর ও আসর নামায

হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রা)- এর বর্ণনা অনুযায়ী যোহর এবং আসরের নামাযে সূরা আল-লাইল (৯২) এবং অন্য এক বর্ণনা অনুযায়ী আল-আলা (৮৭) পড়তেন। (মুসলিম)

জাবির ইবনে সামুরার বর্ণনা মতে রাসূল (সা) সূরা আল-বুরুজ (৮৫) এবং আত-তারিক (৮৬) এবং অনুরুপ সূরা পাঠ করতেন।

হযরত উমর (রা) আবু মূসা (রা)-কে লিখেন আওসাতে মুফাসসাল অর্থাৎ সূরা আল-বুরুজ (৮৫) থেকে আল-বাইয়েনা (৯৮) পর্যন্ত পড়। (তিরমিযী)

মাগরিব নামায

উম্মে ফযল (রা) বলেন, মাগরিবের নামাযে আমি রাসূল (সা) কে আল-মুরসালাত (৭৭) পাঠ করতে শুনেছি। (বুখারী, মুসলিম)

জারীর ইবনে মুতইম বলেন, আমি তাকে সূরা তুর (৫২) পাঠ করতে শুনেছি। (বুখারী, মুসলিম)

আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বলেন, তিনি আল-কাফিরুন (১০৯), আল-ইখলাস (১১২) পড়তেন (ইবনে মাজাহ)। জাবির ইবনে সামুরাহ (রা) বলেন, বিশেষ করে শুক্রবার রাতে (শারহি সুন্নাহ)

আবদুল্লাহ ইবনে উতবাহ (রা) বলেন, তিনি সূরা আদ-দুখান তিলাওয়াত করতেন (নাসাঈ)

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তিনি সূরা আল-আরাফ (৭) পড়তেন। (নাসাঈ)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, মাগরিবের নামাযের পরের দুই রাকআতে তিনি সূরা কাফিরুন (১০৯) এবং ইখলাস (১১২) পড়তেন। (তিরমিযী)।

হযরত উমর (রা) আবু মূসা (রা)- কে লিখেছেন কাসরে মুফাসসাল অর্থাৎ সূরা আল-বাইয়েনা (৯৮) থেকে নাস (১১৪) পর্যন্ত পাঠ কর। (তিরমিযী)

ইশার নামায

জারীর (রা) বলেন, তিনি মুয়াজ ইবনে জাবালকে সূরা আশ-শামস (৯১), আদ-দুহা (৯৩), আল-লাইল (৯২) এবং আল-আলা (৮৭) এবং সূরা বাকারার চাইতে দীর্ঘ এমন সূরা পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। (বুখারী, মুসলিম)

হযরত আল-বারা (রা) বলেন, আমি তাকে সূরা ত্বীন (৯৫) পড়তে শুনেছি। (বুখারী, মুসলিম)

জুমআ এবং ঈদ

হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন, জুমআর নামাযে আমি তাঁকে প্রথম রাকআতে সূরা জুমআ (৬২) এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা মুনাফিকুন (৬৩) পড়তে শুনেছি। (মুসলিম)

হযরত নুমান ইবনে বশীর (রা) বলেন, রাসূল (সা) জুমআ এবং ঈদ উভয় নামাযেই সূরা আল-আলা (৮৭) এবং আল-গাসিয়াহ (৮৮) পাঠ করতেন এবং যদি জুমআ ও ঈদ একই দিনে পড়তেন, তবে একই সূরা দুটোতেই পড়তেন। (মুসলিম)

হযরত ওয়াফিক আল-লাইছী (রা) বলেন, তিনি ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের সূরা ক্বাফ (৫০) এবং সূরা কামার (৫৪) পড়তেন। (মুসলিম)

 

About খুররম জাহ্‌ মুরাদ