হাদীস সংকলনের ইতিহাস

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সাহাবীদের হাদীস প্রচার ও শিক্ষাদান

ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব পাল ব্যাপারে দেশে দেশে সাহাবিগণের মাধ্যমে কুরআনের সঙ্গে সঙ্গে হাদীস ও প্রচারিত হইয়াছে। এই পর্যায়ে আমরা সাহাবিগণের বিশেষভাবে হাদীস প্রচার সংক্রান্ত সাধনা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করিব।

কিন্তু সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে ‘সাহাবী’ কাহাকে বলে; কে সাহাবী, কে নয়; এ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ও মৌলিক আলোচনা এইখানে পেশ করা আবশ্যক।

ইমাম বুখারী ও আহমদ ইবন হাম্বল প্রমুখ প্রখ্যাত মুহাদ্দিসের মত এই যেঃ

******************************************************

যিনি রাসূল (স)-কে দেখিতে পাইয়াছেন, তাঁহার মধ্যে পার্থক্যবোধ বর্তমান ছিল, তাঁহার প্রতি ঈমানদার এবং ইসলামের উপরই তাঁহার জীবনাবসান ঘটিয়াছে, তিনিই সাহাবী। রাসূলের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ-বৈঠক দীর্ঘ হউক কি সংক্ষিপ্ত হইয়া থাকুক, তাঁহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করুন আর নাই করুন, তাঁহার সহিত মিলিয়া যুদ্ধ করুন আর না-ই করুন তিনিই সাহাবীরূপে গণ্য হইবেন।[*********************]

ইমাম বুখারী তাঁহার সহীহ গ্রন্হে লিখিয়াছেনঃ

যে মুসলমান রাসূলের সংস্পশ লাভ করিয়াছে কিংবা যে মুসলমান তাঁহাকে দেখিয়াছে, সে-ই রাসূলের সাহাবী।[************]

আবুল মুযাফফর আস সাময়ানী বলিয়াছেনঃ

******************************************************

হাদীস বিজ্ঞানিগণ এমন সকল লোককেই সাহাবী বলেন, যাঁহারা রাসূলের নিকট হইতে একটি হাদীস বা একটি কথাও বর্ণনা করিয়াছেন।[**************]

আল্লাহ নিজেই কুরআনের বিভিন্ন স্থানে সাহাবীদের প্রশংসা ও পরিচয় দান করিয়াছেন। এক জায়গায় অপেক্ষাকৃত বিস্তারিত ও অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁহার সঙ্গের লোক (সাহাবী)-গণ কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; তাঁহারা পরস্পরের প্রতি অনুগ্রহ ও ভালবাসাসম্পন্ন। তুমি তাহাদিগকে সব সময় রুকূ ও সিজদা দানকারী-বিনীত ও আল্লাহর সম্মুখে অবনত দেখিতে পাইবে। তাহারা সব সময়ই আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তোয় লাভের অভিলাষী। তাঁহাদের কপালদেশে সিজদার চিহ্ন অংকিত রহিয়াছে।[সূরা আল-ফাতহ, ২৯ আয়াত।]

অন্যত্র বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

আল্লাহ এই মু’মিন (সাহাবী-দের প্রতি বড়ই সন্তুষ্ট হইয়াছেন- যখন তাহারা বৃক্ষের নীচে বসিয়া (হে নবী) তোমার হাতে বায়’আত করিতেছিল। অতঃপর তাহাদের দিলের কথা আল্লাহ তা’আলা জানিতে পারিলেন।[ঐ, ১৮ আয়াত।]

সহীহ হাদীসেও সাহাবীদের ফযীলত সম্পর্কে রাসূলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা উদ্ধৃত হইয়াছে।

একটি হাদীসে রাসূল (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

তোমরা আমার সাহাবীকে গালাগাল করিও না। কেননা যাঁহার হস্তে আমার প্রাণ- সেই আল্লাহর শপথ, তোমাদের কেহ যদি ওহুদ পর্বত সমান স্বর্ণও দান করে, তবুও সে একজন সাহাবীর সমান বা তাহার অর্ধেক মর্যাদাও পাইতে পারিবে না।[মুসলিম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১০, বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১৮।]

বস্তুত এই সাহাবিগণের আপ্রাণ চেষ্টা-সাধনা ও অসীম-অতুলনীয় আত্মত্যাগের ফলে একদিকে যেমন ইসলাম প্রচার হইয়াছে অপরদিকে ঠিক তেমনি রাসূলে করীম (স)-এর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র পূর্ণ মাত্রায় সুরক্ষিতও রহিয়াছে। সাহাবিগণই কুরআন-হাদীসের জ্ঞান রাসূলের নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছেন, সেই সঙ্গে দুনিয়ার দিকে দিকে উহার অমিয়ধারা প্রবাহিত করিয়া বিশ্ববাসীকে চিরধন্য করার ব্যবস্থাও করিয়াছেন।

কাজেই হাদীসের প্রথম গ্রাহক, বাহক ও প্রচারক হওয়ার কারণে সাহাবিগণ বিশ্ব মুসলিমের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবেন, তাহাতে একবিন্দু সন্দেহের অবকাশ নাই।

বস্তুত হাদীস শিক্ষাকরা, সংরক্ষণ ও মুখস্থ করা এবং উহার প্রচার ও শিক্ষাদান সম্পর্কে রাসূলে করীম (স)- এর নির্দেশ পাইয়া সাহাবিগণ নিষ্ক্রিয় হইয়া বসিয়া থাকিতে পারেন নাই। বরং তাঁহারা নিজেরা যেমন হাদীসের প্রতি যথোপযুক্ত গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন, নিজেরা উহার শিক্ষালাভও করিয়াছেন, মুখস্থ করিয়াছেন, অনরূপভাবে হাদীস অনভিজ্ঞ লোকদের পর্যন্ত তাহা পৌঁছাইবার, তাহাদিগকেও হাদীস শিক্ষায় পূর্ণ শিক্ষিত করিয়া তুলিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াছেন। নবী করীম (স)- এর জীবদ্দশায় তো বটেই, তাঁহার ইন্তেকালের পরও তাঁহারা কুরআন মজীদের সঙ্গে সঙ্গে হাদীস প্রচারে  ও হাদীসের শিক্ষাদনে বিন্দুমাত্র গাফিলতি করেন নাই। হযরতের ইন্তেকালের পর সমগ্র ইসলামী রাষ্ট্রের দিকে দিকে এবং দূরবর্তী বহু অমুসলিম দেশে তাঁহারা ছড়াইয়া পড়েন এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্থানে ও পরিমণ্ডলে হাদীস ও ইসলামী জ্ঞান-বিস্তারে আত্মনিয়োগ করেন। এইখানে কয়েকজন বিশিষ্টি সাহাবীর হাদীস প্রচার এবং শিক্ষাদানের ঐতিহাসিক ও প্রামাণ্য বিবরণ পেশ করিতেছিঃ

১ হযরত আবূ ইদরীস খাওলানী (রা) বলেনঃ আমি হিমস শহরের মসজিদে অনুষ্ঠিত এক মজলিসে শরীক হইলাম। ইহাতে ৩২ জন সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। এখানে সমষ্টিগতভাবে হাদীসের চর্চা ও শিক্ষাদান করা হইতেছিল। একজন সাহাবী হাদীস বর্ণনা সমাপ্ত করিলে ইহার পর দ্বিতীয়জন হাদীস বর্ণনা শুরু করিতেন।[মুসনাদে আহমাদ, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২৮।]

২. নসর ইবন আসেমুল লাইসী বলেনঃ আমি কুফা শহরের জামে মসজিদে একটি জনসমাবেশ দেখিতে পাইলাম। সকল লোক নির্বাক ও নিশ্চল হইয়া এক ব্যক্তির দিকে গভীর অভিনিবেশ ও অধীর আগ্রহ সহকারে উম্মুখ ও নিস্পলক দৃষ্টিকে তাকাইয়া আছে। জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে পারিলাম যে, ইনি প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত হুযায়ফা ইবন ইয়ামান (রা) এবং তিনি হাদীসের শিক্ষা দান করিতেছেন।[মুসনাদে আহমদ, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮৬।]

৩. উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা) মদীনায় হাদীস শিক্ষা দানের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁহার নিকট এক সংগে শিক্ষার্থী লোকের সংখ্যা দুইশতেরও অধিক ছিল। তন্মধ্যে ৩৮ জন ছিলেন মহিলা। হযরত আবু মুসা আশ’আরী, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস, আমর ইবনুল আস প্রমুখ শদ্ধাভাজন সাহাবী তাঁহার দরসে হাদীসের মজলিসে নিমিত শরীক হইতেন।[তাযকিরাতুল হুফফায যাহবী, হযরত আবূ দারদা প্রসংগ।]

৪. কফা নগরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) নিয়মিতভাবে হাদীসের দরস দিতেন। তাঁহার দরসে অন্যূন্য চারি সহস্র ছাত্রশ্রোতা সমবেত হইত।[আসরারুল আনওয়ার প্রন্হ দ্রঃ।]

৫. হযরত আবুদ্দরদা (রা) [এই সাহাবীর নাম হইল উয়াইমির ইবন যায়দ, পৃষ্ঠা ৩২।] দামেশকে বসবাস করিতেন। তিনি যখন মসজিদে হাদীসের দরস দিতে উপস্থিত হইতেন, তখন তাঁহার সম্মুখে এত বিপুল সংখ্যক শ্রোতার সমাবেশ হইত যে, তাহাদের মাঝে তাঁহাকে মনে হইত যেন শাহানশাহ্ বসিয়া আছেন।[তাযকিরাতুল হুফফায, আবু দারদার প্রসঙ্গ।]

‘তাযকিরাতুল হুফফায কিতাবে উল্লেখ করা হইয়াছে, হযরত আবুদ্দারদার দরসের মজলিসে অন্তত ষোলশত ছাত্র রীতিমত যোগদান করিত।

৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) ইলমে হাদীসের মহাসমুদ্র আয়ত্ত করিয়াছিলেন; কিন্তু তাহা তিনি কেবলম্রাত নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন নাই, উহা দ্বারা তিনি সহস্র লক্ষ মুসলিমের জ্ঞান পিপাসা নিবৃত্ত করিতেন। ফলে তাঁহার দ্বারা হাদীসের ব্যাপক প্রচার সাধিত হয়। তিনি নবী করীম (স)- এর ইন্তেকালের পর ষাট বৎসরেরও অধিককাল জীবিত ছিলেন (মৃঃ৭৪ হিঃ)। এই দীর্ঘ জীবনে হাদীসের শিক্ষাদান ও প্রচার সাধনই ছিল তাঁহার প্রধান কাজ। [*****************] এই কারণে তিনি কোন চাকরি পর্যন্ত গ্রহণ করেন নাই। কেননা তাহাতে এই মহান কাজ ব্যাহত ও বাধাগ্রস্ত হইত।

তিনি মদীনা শরীফে স্থায়ীভাবে দরসে হাদীসের মজলিস অনুষ্ঠান করিতেন। বিশেষত হজ্জের সময় যখন বিপুল সংখ্যক মসলমান মদীনায় সমবেত হইতেন, তখন তিনি তাঁহাদের নিকট হাদীস পেশ করিতেন। ইহার ফলে মুসলিম জাহানের দুরতম কেন্দ্র পর্যন্ত রাসূলের হাদীস অতি সহজেই পৌঁছিয়া যাইত।[উসদুল গাবাহ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৮।]এতদ্ব্যতীত লোকদের ঘরে ঘরে পৌঁছিয়াও তিনি হাদীসের প্রচার করিতেন। ইয়াযীদ ইবন মুয়াবিয়ার শাসনামলে তিনি আবদুল্লাহ ইবন মুতীর ঘরে উপস্থিত হইলেন। তাঁহার জন্য বিছানা ও শয্যা ঠিক করিতে বলা হইলে হযরত আবদুল্লাহ ইব উমর (রা) বলিলেনঃ

******************************************************

আমি তোমার ঘরে বসিবার জন্য আসি নাই, শুধু একটি হাদীস শুনাইবার উদ্দেশ্যে আসিয়াছি। হাদীসটি আমি নবী করীম (স)-এর নিকট হইতে শুনিয়াছিলাম।

অতঃপর তিনি বলিলেন, আমি নবী করীম (স)-কে বলিতে শুনিয়াছিঃ

******************************************************

যে ব্যক্তি আমীরর তথা ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধানের আনুগত্য হইতে বিরত থাকে, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সম্মুখে এমন অবস্থায় উপস্থিত হইবে যে, তাহার সে কৈফয়ত দেওয়ার কিছুই থাকিবে না। আর যে লোক আমীরের নিকট বায়আত না করিয়া মরিবে, তাহার জাহিলিয়াতের মৃত্যু ঘটিবে।[মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১২৮। মুসনাদে আহমদ ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৫৪।]

৭.  হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) কথায় কথায় হাদীস প্রচার করিতেন ও লোকদিগকে হাদীসের শিক্ষাদান করিতেন। আলী ইবন আবদুর রহমান বলেনঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) আমাকে নামাযের মধ্যে পাথরকুচি লইয়া খেলা করিতে দেখিলেন। আমি নামায শেষ করিলে তিনি আমাকে এইরূপ করিতে নিষেধ করিলেন এবং বলিলেনঃ

******************************************************

রাসূল (স) যেইরূপ সুন্দরভাবে নামায পড়িতেন, তুমিও সেইভাবেই নামায পড়।

রাসূল (স) কিভাবে নামায পড়িতেন জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেনঃ

******************************************************

রাসূল (স) যখন নামাযে বসিতেন, তখন ডান হাত ডান রানের উপর রাখিতেন, এবং সবগুলি অংগুলি বন্ধ করিয়া লইতেন, এবং বৃদ্ধাঙ্গুলির পাশের অংগুলি দ্বারা ইশারা করিতেন। আর বাম হাত বাম রানের উপর স্থাপন করিতেন।[মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ, পৃঃ ৫৩ (তরজমা সহ)]

বহু দিন পর্যন্ত একটি বিশেষ হাদীস বর্ণনা না করায় সাহাবীদের মনে ভয় জাগ্রত হইত যে, ইহা বর্ণনা না করিলে ও উহাকে গোপন করিয়া রাখিলে গুনাহ করা হইবে। অতএব উহা আর গোপন রাখা যায় না। তখনই তিনি তাহা লোকদের নিকট বর্ণনা করিতেন। হযরত উসমান (রা) সম্পর্কে নিম্নোক্ত বর্ণনা হইতে ইহার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়ঃ

******************************************************

হযরত উসমান (রা) যখন অযূ করিলেন, তখন বলিলেনঃ আমি তোমাদের নিকট নিশ্চয়ই একটি হাদীস বর্ণনা করিব। অবশ্য যদি একটি আয়াত না থাকিত, তাহা হইলে আমি তাহা তোমাদিগকে কিছুতেই বলিতাম না। আমি শুনিয়াছি, নবী করীম (স) বলিতেছিলেনঃ কোন ব্যক্তি যদি অযূ করে, তাহার অযূ সর্বাঙ্গ সুন্দর করিয়া সম্পন্ন করে এবং নামায আদায় করে, তবে তাহার ও নামাযের মধ্যে যত গুনাহ হইবে, তাহা সব মাফ করিয়া দেওয়া হইবে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে নামায সম্পন্ন করিতে থাকিবে। হাদীসের বর্ণনাকারী উত্তরে বলেনঃ সে আয়াতটি হইল এইঃ ‘নিশ্চয়ই যাহারা আমার নাযিল করা কথাকে গোপন করে……………..’।[সহীহ বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮।

উদ্বৃত আয়াতটিকে হযরত উসমান (রা)- এর হাদীস গোপন করায় গুনাহ হওয়া সম্পর্কে প্রমাণ হিসাবে পেশ করা হএত এইকথা প্রমাণিত হয় যে, তিনি ওইসব সাহাবায়ে কিরাম হাদীসকে ‘আল্লাহর নিকট হইতে অবতীর্ণ কথা মনে করিতেন। অন্যথায় এই আয়াত যুক্তি হিসাবে পেশ করা এবং আয়াতে উল্লিখিত গুনাহ ও শাস্তির ভায়ে বহু দিনের বর্ণনা না করা হাদীসকে বর্ণনা করা এবং এই কথা বলা যে, এই আয়াত না থাকিলে আমি কিছুতেই এই হাদীস বর্ণনা করিতাম না-ইহার কোনই তাৎপর্য থাকিতে পারে না।]

মৃত্যুশয্যায় শায়িত থাকা অবস্থায়ও সাহাবায়ে কিরাম (রা) প্রয়োজনবশত রাসূল (স)-এর হাদীস বর্ণনা করিতেন। হাসান বসরী বলেন৬ হযরত মাম্বকাল মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিলেন, তখন সেখানে উবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদ উপস্থিত হইলেন। এই সময় হযরত মাম্বকাল বলিলেনঃ

******************************************************

আমি তোমাকে রাসূল (স)-এর নিকট হইতে শ্রুত একটি হাদীস শুনাইব। তিনি বলিয়াছেনঃ আল্লাহ যে বান্দকে জনগণের শাসন পরিচালনার দায়িত্ব দিবেন, সে যদি তাহাদিগকে সদুপদেশ দিয়া ও তাহাদের কল্যাণবোধ করিয়া তাহাদের হিফাজত না করে, তবে সে বেহেশতের সুগন্ধিটুকুও পাইবে না।[বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৫৮।]

হযরত আবূ আয়্যূব আনসারী (রা) মৃত্যূশয্যায় শায়িত থাকা অবস্থায় হাদীস প্রচারের দায়িত্বানুভূতিতে কম্পিত হইয়াছিলেন। মৃত্যুর প্রাক্কালে তিনি এমন দুইটি হাদীস বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন, যাহা তিনি পূর্বে কখনও বর্ণনা করেন নাই। তাঁহার ইন্তেকালের পর সাধারণ ঘোষনার মাধ্যমে হাদীস দুইটিকে মুসলিম জনগণের নিকট পৌঁছানো হয়।[মুসনাদে আহমদ, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৪।]

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) সম্পর্কেও এই ধরনের একটি ঘটনা ইবনে আবী শায়বাহ কর্তৃক উদ্ধৃত হইয়াছে। তিনি রোগশয্যায় শায়িত ছিলেন; তখন তিনি উপস্থিত লোকদের বলিলেনঃ

******************************************************

তোমরা আমাকে উঠাইয়া বসাইয়া দাও, কেননা রাসূল করীম (স)-এর রক্ষিত এক আমানত আমার নিকট সংরক্ষিত রহিয়াছে, আমি তাহা তোমাদের নিকট পৌঁছাইতে চাই।

অতঃপর তাঁহাকে বসাইয়া দেওয়া হইলে তিনি বর্ণনা করিলেনঃ

******************************************************

তোমাদের কেহ যেন তাহার নামাযেন মধ্যে এদিক-ওদিক না তাকায়। যদি কেহ তাকায়-ই তবে যেন ফরয নামায ছাড়া অন্য নামাযে করা হয়।[তাফসীরে রুহুল-মাআনী, ১৮ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩।]

আবুল আলীয়া তাবেয়ী বলেনঃ

******************************************************

আমরা বসরা শহরে রাসূল (স)-এর সাহাবীদের বর্ণিত হাদীসের বর্ণনা লোকদের নিকট শুনিতে পাইতাম; কিন্তু আমরা তাহাতে কিছুম্রাত সন্তুষ্ট বা পরিতৃপ্ত হইতে পারিতাম না, যতক্ষণ মদীনায় গমন করিয়া উহা তাঁহাদের নিজেদের মুখ হইতে শুনিয়া না লইতাম।[মুসনাদে দারেমী, পৃষ্ঠা ৭৪।]

বস্তুত মুসলিম জাহানের বিভিন্ন কেন্দ্র হইতে ইসলামী ইলম, হাদীস ও কুরআন শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে অসংখ্য মুসলমান সাহাবায়ে কিরামরে খিদমতে উপস্থিত হইত। তাঁহারা তাহাদিগকে সমাদরে ও সোৎসাহে গ্রহণ করিতেন এবং তাহাদের নিকট হাদসী পেশ কিরতনে। বিশেষত হযরত আবু হুরায়রা (রা) ও হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত হইয়াছে যে, তাঁহাদের দরবার হাদীস শিক্ষাথীদের বিপুল ভীড় জমিয়া যাইত। কোন বিষয়ে প্রশ্ন করা হইলে তাহার জওয়াব পাইতে যথেষ্ট বিলম্ব হইত।[মুসনাদে ইমাম আহমদ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯২; তিরমিযী আওয়াবুল ইলম।]

হযরত ইবন আব্বাস (রা) তাঁহার পুত্র আলী এবং দাস ইকরামাকে হযরত আবূ সাঈদ খুদরীর নিকট হাদীস শ্রবণের জন্য পাঠাইলেন। তাঁহারা যখন পৌঁছিল, তখন তিনি বাগানে ছিলেন। তাহাদিগকে দেখিয়া তিনি তাহাদের নিকট আসিয়া বসিলেন এবং হাদীস (বর্ণনা করিয়া) শুনাইলেন।[ঐ]

৮. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) ইলমে হাদীসের প্রচারে আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন। সমগ্র জীবনই তিনি হাদীস শিক্ষাদানের পরিমণ্ডলে অতিবাহিত করেন। রাসূলে করীম (স)-এর অপরাপর সাহাবিগণ যখন নানা যুদ্ধে ব্যস্ত হইয়াছিলেন, সেই সময় তিনি বসরার জামে মসজিদে রাসূল (স)-এর হাদীস প্রচার ও শিক্ষাদানের কাজে গভীরভাবে নিমগ্ন হইয়াছিলেন। তাঁহার হাদীস বয়ানের মজলিসে মক্কা, মদীনা, বসরা, কুফা ও সিরিয়া হইতে বিপুল সংখ্যক লোক উপস্থিত থাকিত। তিনি বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের অন্যতম। তাঁহার বর্ণিত ৮০ টি হাদীস সহীহ বুখারী শরীফে, ৭০ টি হাদীস সহীহ মুসলিম শরীফে এবং ‌১২৮ টি হাদীস বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্হে স্থান পাইয়াছে।

৯. হযরত উবায় ইবন কাম্বব (রা) হাদীসে বিশেষ ব্যুৎপত্তি রাখিতেন, যাহবী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স)-এর নিকট হইতে যাহারা অধিক সংখ্যক হাদীস শুনিয়াছেন, হযরত উবায় তাঁহাদের একজন।[তাযকিয়াতুল হুফফাজ-উবায় প্রসঙ্গ।] হাদীস প্রচারক বহু সাহাবীকেই প্রথমে তাঁহার নিকট শাগরেদী করিতে হইয়াছেন।

১০.  মদীনার শাসনকর্তা আমর ইবন সাঈদ মক্কায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়রের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করিতেছিলেন, তকন হযরত আবু শুরায়হ (রা) তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেনঃ

******************************************************

হে আমীর ! আমাকে অনুমকি দিন, আমি আপনাকে রাসূল (স)-এর একটি হাদীস শুনাইব, যাহা তিনি মক্কা বিজয়ের পরের দিন দাঁড়াইয়া বলিয়াছিলেন-আমার দুই কর্ণ তাহা শ্রবণ করিয়াছে, আমার অন্তঃকরণ তাহা হিফাজত  ও মুখস্থ করিয়া রাখিয়াছে এবং তিনি যখন কথা বলিয়াছিলেন, তখন তাঁহাকে আমার এই দুই চক্ষু দেখিতেছিল। অতঃপর মক্কার হেরেম হওয়ার ও অন্যান্য কথা সম্বলিত একটি হাদীস শুনাইয়া দেন।[বুখারী শরীফ ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা২১।]

হযরত আবূ শুরায়হার কথা হইতে প্রথমত এই জানা যায় যে, তিনি হাদীস পূর্ণমাত্রায় মুখস্থ ও হিফাজত করিয়া রখিয়াছিলন এবং দ্বিতীয়ত তিনি হাদীস বর্ণনার দায়িত্ব পালনে সবসময়ই প্রস্তুত থাকিতেন।

হযরত জাবির ইবনে আদুল্লাহ (রা)- ও মসজিদে নববীতে বসিয়া রীতিমত হাদীসের দরস দিতেন। আল্লামা সুয়ুতি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

মসজিদে নববীতেই হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহর একটি শিক্ষাদান কেন্দ্র ছিল। সেখানে লোকেরা একত্র হইয়া তাঁহার নিকট হইতে হাদীস শিক্ষা গ্রহণ করিত।[*************]

সাহাবায়ে কিরাম (রা) লোকদিগকে হাদীসের কেবল মৌখিক শিক্ষাদান করিয়াই ক্ষান্ত হইতেন না, বরং হাদীস যাহাতে লোকেরা মুখস্থ করে এবং উহাকে তাহারা নিজেদের স্মৃতিপটে চিরদিনের তরে মুদ্রিত ও সুরক্ষিত রাখিতে পারে, সেইজন্য ও তাহারা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করিতেন ও বিশেষ যত্ন লইতেন। হাদীস মুখস্থ করা সম্পর্কে সাহাবীদের নিজস্ব প্রচেষ্টার কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। এখানে আমরা দেখাইতে চেষ্টা করিব যে, সাহাবিগণের নিকট যাহারা হাদীস শিক্ষার্থে আসিতেন- তাঁহাদিগকে হাদীস মুখস্থ করাইবার জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করিতেন।

ইসলামের এই প্রথম যুগে মুসলমানগণ তাহাদের ছোট ছেলেমেয়েকে যেমন কুরআন মুখস্থ করার উদ্দেশ্যে বিশেষ বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করিতেন, অনুরূপভাবে হাদীস শিক্ষাকেন্দ্রে নিজেদের সন্তান-সন্ততিদিগকে প্রেরণ করিতেন। এতদ্ব্যতীত লোকদিগকে তাঁহারা হাদীস মুখস্থ করিবার জন্য বিশেষ তাকীদ করিতেন- সেইজন্য নানাভাবে উপদেশ দিতেন।

আবু নজরা নামক তাবেয়ী হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা)-কে বলিলেনঃ

******************************************************

আমরা আপনার নিকট হইতে যাহা শ্রবণ করি তাহা কি আমরা লিখিয়া লইব না?

ইহার জওয়াবে তিনি বলিলেনঃ

******************************************************

তোমাদের নবী করীম (স) আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করিতেন, আমরা তাহা মুখস্থ করিয়া স্মরণ রাখিতাম, অতএব তোমরাও আমাদের ন্যায় হাদীস মুখস্থ কর।[********************]

হাদীসের হর-হামেশা চর্চা করার এবং সেইজন্য উৎসাহ দানের ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরাম বিন্দুমাত্র ক্রটি করিতন না। তাবেয়ী যুগের ইলমে হাদীসের ইমাম ইকরামার উস্তাদে হাদীস হযরত ইবন আব্বাস (রা) তাহাকে কিভাবে হাদীস শিক্ষা দিয়াছেন, তাহার বিবরণ দান প্রসঙ্গে তিনি বলেনঃ

******************************************************

ইবন আব্বাস আমাকে কুরআন ও হাদীস শিক্ষাদানের জন্য আমার পায়ে বেড়ি পরইয়া দিতেন।[তাযকিরাতুল হুফফায, যাহবী, পৃষ্ঠা ৯০।]

হযরত আলী (রা) বলিতেনঃ

******************************************************

তোমরা খুব বেশী করিয়া হাদীস চর্চা করিতে থাক, তাহা না করিলে তোমাদের এই ইলম (হাদীস-জ্ঞান) বিলিন হইয়া যাইবে।[**************]

সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলিতেনঃ তোমরা পারস্পরিক হাদীস পর্যালোচনা ও চর্চা কর, কেননা কেবল চর্চা ও পর্যালোচনার মাধ্যমেই উহার সংরক্ষণ করা সম্ভব।[****************]

সাহাবী হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলিতেনঃ

******************************************************

তোমরা সব সময় হাদীস চর্চা ও স্মরণ করিতে থাক।

তাবেয়ী আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লাও তাঁহার হাদীসের ছাত্রদিগকে প্রায়ই বলিতেনঃ

******************************************************

অর্জিত হাদীস-জ্ঞান বারবার চর্চা, স্মরণ ও আবৃত্তির মাধ্যমেই জীবন্ত ও সংরক্ষিত থাকিতে পারে। অতএব তোমরা সকলে হাদীসের চর্চা, স্মরণ ও আবৃত্তি করিতে থাক।[**************]

অপর একটি বর্ণনায় এই কথাটি নিম্নরূপ বলা হইয়াছেঃ

হাদীস পারস্পরিক স্মরণ ও চর্চা কর, কেননা এইরূপ স্মরণ ও চর্চার মাধ্যমেই হাদীস জীবন্ত থাকিবে।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৭৮।]

এই সম্পর্কে হযরত ইবন আব্বাস (রা)-এর নিম্নলিখিত কথা অধিকতর স্পষ্ট। তিনি তাঁহার ছাত্রদের লক্ষ্য করিয়া বলিতেনঃ

******************************************************

তোমরা এই হাদীস পরস্পর মিলিত হইয়া চর্চা কর। তাহা হইলে ইহা তোমাদের নিকট হইতে বিলুপ্ত হইবে না। কেননা এই হাদীস কুরআন মজীদের ন্যায় সুসংবদ্ধ, সংকলিত ও সংরক্ষিত নয়। এই কারণে তোমরা ইহার ব্যাপক চর্চা না করিলে ইহা তোমাদের নিকট হইতে বিলীন হইয়া যাইবে।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৭৭।]

হযরত ইবন আব্বাসের নিম্নোক্ত বানীও এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলিতেনঃ

******************************************************

তোমরা যখন আমাদের নিকট হইতে কোন হাদীস শুনিতে পাও তখন তোরা পারস্পরিক উহার চর্চা কর।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৭৮।]

হযরত ইবন উমর (রা) তাঁহার ছাত্রদিগকে তাকীদ করিয়া বলিতেনঃ

******************************************************

তোমাদের কেহ যখন অপর লোকের নিকট হাদীস বর্ণনার ইচ্ছা করে, তখন যেন সে অবশ্যই উহা তিন তিনবার আবৃত্তি করিয়া লয়।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৭৮।]

উপরিউক্ত বিস্তারিত আলোচনা হইতে প্রমাণিত হয় যে, সাহাবায়ে কিরাম (রা) যেমন নিজেরা হাদীস মুখস্থ রাখিতে ও উহার ব্যাপক প্রচার করিতে চেষ্টা করিতেন অনুরূপভাবে তাবেয়ী যুগের যে সব লোক তাঁহাদের নিকট হাদীস শিক্ষা করিতেন তাহাদিগকে উহা মুখস্থ করিয়া রাখিতে, উহার চর্চা করিতে ও পরবর্তী লোকদিগকে উহার শিক্ষাদান করিতে বিশেষভাবে তাকীদ করিতেন।

 

About মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম