হাদীস সংকলনের ইতিহাস

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

হাদীস বর্ণনায় সংখ্যা পার্থক্যের কারণ

পূর্বের আলোচনায় দেখা গিয়াছে যে, হাদীস বর্ণনায় সাহাবীদের মধ্যে সংখ্যার দিক দিয়া বিরাট পার্থক্য রহিয়াছে। একই নবীর সাহাবী সত্ত্বেও কেহ বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন, আবার কেহ করিয়াছেন অতি নগণ্য সংখ্যক হাদীস। হাদীস বর্ণনায় এই বিরাট পার্থক্য সৃষ্টির কারণ কি, তাহা আমাদের বিশেষভাবে জানিয়া লওযা আবশ্যক।

নবী করীম (স) যতদিন পর্যন্ত সাহাবীদের মধ্যে জীবিত ছিলেন, ততদিন পর্যন্ত তিনি সাধারণভাবে তাঁহাদের সকলকেই দ্বীন-ইসলাম, আল্লাহর কিতাব হিকমতের শিক্ষা দানে ব্যাপৃত ছিলেন। তখন যেমন রাসূলের নামে কোন মিথ্যা কথা প্রচার করার অবকাশ ছিল না, তেমনি ছিল না রাসূলের কোন কথাকে ‘রাসূলের কথা নয়’ বলিয়া উড়াইয়া দেওয়ার বা প্রত্যাখ্যান করার এক বিন্দু সুযোগ। তখন মুনাফিকগণও রাসূলের কোন কথার অপব্যাখ্যা করিয়া ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার তেমন কোন সুযোগ পাইত না। কেননা তেমন কিছু ঘটিলেই সাহাবীয়ে কিরাম রাসূলের নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া সমস্ত ব্যাপারে পরিস্কার ও সুস্পষ্ট করিয়া লইতে পারিতেন। ইতিহাসে বিশেষত হাদীস শরীফে ইহার অসংখ্য নিদর্শন বিদ্যমান রহিয়াছে। হযতর উমর ফারূক (রা) একবার হযরত হিশাম ইবনে হাকীমকে সূরা আল-ফুরকান নূতন পদ্ধতিতে পড়িতে দেখিয়া অত্যন্ত আশ্চর্যোবোধ করেন এবং তাঁহাকে পাকড়াও করিয়া রাসূলের দরবারে লইয়া আসেন। অতঃপর নবী করীম (স) হযরত হিশামের পাঠ শ্রবণ করিয়া বলিয়াছেন যে, এইভাবেও উহা পাঠ করা বিধিসম্মত। ফলৈ হযরত উমরের মনের সন্দেহ দূরীভূত হয়। এ কারণে এই কথা বলা যায় যে, রাসূলে করীম (স) তাঁহার জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কিরামের পারস্পরিত সমস্ত মতবিষম্যের মীমাংসা দানকারী ছিলেন। কোন বিষয়ে একবিন্দু সন্দেহ বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হইলেই রাসূলের দ্বারা সাক্ষাতভাবে উহার অপনোদন করিয়া লওয়া হইত।

কিন্তু নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর এই অবস্থায় বিরাট পরিবর্তন ঘটে। একদিকে যেমন ওহীর জ্ঞান লাভের সূত্র ছিন্ন হইয়া যায়, তেমনি অপরদিকে অসংখ্য নও-মুসলিম মুর্তাদ হইয়া দ্বীন-ইসলাম পরিত্যাগ করিতে উদ্যত হয়। এইরূপ অবস্থায় ঘোলা পানিতে স্বার্থ শিকারের উদ্দেশ্যে কিছু সংখ্যা মুনাফিকও মাথাচাড়া দিয়া উঠে। তখন তাহারা যদি রাসূলের নামে কোন মিথ্যা রটাইতে চেষ্টা করিয়া থাকে, তবে তাহা কিছুমাত্র বৈচিত্র বা বিস্ময়ের কিছু নয়।

কিন্তু প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর (রা) ইহার সম্মুখে প্রবল প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেন। তিনি একদিকে যেমন পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করিয়া মুর্তাদ ও যাকাত অস্বীকারকারীদের মস্তক চূর্ণ করিয়া দেন, অপরদিকে ঠিক তেমনি প্রবলভাবে মিথ্যাবাদীদের মিথ্যা কথা প্রচারের মুখে দুর্জয় বাধার প্রাচীর রচনা করিয়া দেন। তাঁহার পর হযরত উমর ফারুক (রা)-ও ইহার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিন হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে অত্যন্ত কড়াকড়ি অবলম্বন করেন। হাদীসের বিরাট সম্পদ বক্ষে ধারণ করিয়া বিপুল সংখ্যক সাহাবী অতন্দ্র প্রহরীর মত সজাগ হইয়া বসিয়া থাকেন। কোন হাদীস বর্ণনা করিলে তাহা মুনাফিকদের হাতে ক্রীড়ানক হইয়া পড়িতে পারে ও বিকৃত রূপ ধারণ করিতে পারে- এই আশংকায় তাঁহারা সাধারণভাবে হাদীস বর্ণনা করা প্রায় বন্ধ করিয়া দেন। কাহারো মনে এই ভয় এতদূর প্রবল হইয়া দেখা দেয় যে, বেশী করিয়া হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে ভূল হইয়া যাইতে পারে কিংবা সাধারণ মুসলমান হাদীস চর্চায় একান্তভাবে মশগুল হইয়া পড়িলে তাহারা আল্লাহর নিজস্ব কালাম কুরআন মজীদের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করিতে পারে। এইসব কারণেও সাধারণভাবে সাহাবায়ে কিরাম হাদীস প্রচার ও বর্ণনা সাময়িকভাবে প্রায় বন্ধ করিয়া রাখেন। শরীয়াতের মাসলা-মাসায়েলের মীমাংসা কিংবা রাষ্ট্র শাসন ও বিচার-আচার প্রভৃতি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে যখন হাদীসের আশ্রয় গ্রহণ অপরিহার্য হইয়া পড়িত কেবলমাত্র তখন তাঁহারা পরস্পরের নিকট হাদীস বর্ণনা করিতেন।

এই পর্যায়ে আমরা বিশেষভাবে কয়েকজন সাহাবীর কথা উল্লেখ করিতে পারি এবং বিপুল সংখ্যক হাদীস জানা থাকা সত্ত্বেও তাঁহাদের অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করিবার কারণও তাহা হইতে অনুধাবন করিতে পারি।

হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) নবী করম (স)-এর আজীবনের সঙ্গী, হযরত আবূ উবায়দা, হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব, হযতর ইমরান ইবনে হুসাইন প্রমুখ মহাসম্মানিত সাহাবী বিপুল সংখ্যক হাদীস জানা থাকা সত্ত্বেও তাঁহাদের নিকট হইতে খুবই কম সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। হযরত সায়ীদ ইবনে যায়দ বেহেশতবাসী হওয়ার সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবীর মধ্যে অন্যতম; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও তিনি মাত্র দুইটি কিংবা তিনটি হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। হযরত উবাই ইবনে উম্মারাতা কেবলমাত্র একটি হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।

কোন কোন সাহাবী রাসূলের ইন্তেকালের পর খিলাফতের দায়িত্ব পালনে এতই মশগুল হইয়া পড়িয়াছিলেন যে, তাঁহার পক্ষে হাদীস বর্ণনার মত সুযোগ বা অবসর লাভ করা সম্ভব হয় নাই । খুলাফায়ে রাশেদীনের চারজন সম্মানিত সাহাবী এবং হযরত তালহা ও হযরত জুবাইর (রা) এই কারণের বাস্তব দৃষ্টান্ত।

বহু সংখ্যক সাহাবীর অবস্থা ছিল ইহার ঠিক বিপরীত। তাঁহাদের ছিল বিপুল অবসর। হাদীস বর্ণনার প্রতিবন্ধক হইতে পারে এমন কোন ব্যস্ততাই তাঁহাদের ছিল না। ফলে তাঁহারা বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করিতে সমর্থ হন। যেমন হযরত আবূ হুরায়রা (রা), হযরত আয়েশা (রা) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা)।

কোন কোন সাহাবী নবী করীম (স)- এর সংস্পর্শে ও সঙ্গে থাকার অপেক্ষাকৃত বেশী সুযোগ পাইয়াছিলেন। দেশে-বিদেশে, ঘরে ও সফরে সর্বত্র তাঁহার সঙ্গে থাকার কারণে একদিকে যেমন অধিক সংখ্যক হাদীস সংগ্রহ করা তাঁহাদের পক্ষে সহজ হইয়াছিল, তেমনি তাঁহার ইন্তেকালের পর উহাকে অপরের নিকট পূর্ণ মাত্রায় বর্ণনা করার সুযোগও তাঁহাদের ঘটিয়াছিল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), হযরত আবূ হুরায়রা (রা), হযতর যাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা), হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) প্রমুখ সাহাবীর নাম এই পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য। কিছু সংখ্যক সাহাবী রাসূলে করীম (স)-এর জীবদ্দশায়ই কিংবা তাঁহার ইন্তেকালের অব্যবহিত পরেই ইন্তেকাল করিয়াছিলেন বলিয়া তাঁহাদের জীবনে অপরের নিকট হাদীস বর্ণনা করার কোন সুযোগই ঘটে নাই। রাসূলের সঙ্গলাভ কিংবা তাঁহার সঙ্গে লাগিয়া থাকার সুযোগ যাঁহাদের বেশী ঘটে নাই, তাঁহাদের নিকট হইতেও খুব কম সংখ্যক হাদীসই বর্ণিত হইয়াছে।

রাসূলে করীম (সা)-এর অন্তর্ধানের পর ইসলামী সমাজে নিত্য নূতন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। তখন মুসলিম জনসাধারণের পক্ষে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রাসূলের কথা জানা আবশ্যকীয় হইয়া পড়ে। ফলে এই সময়ে জীবিত সাহাবীগণ বেশী সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করিতে বাধ্য হইয়াছেন। পরবর্তীকালে মুসলিমদের মধ্যে ইলম হাদীস অর্জন করার  প্রবল আগ্রহ জন্মে। তাঁহারা সাহাবীদের নিকট নানাভাবে রাসূলের হাদীস শ্রবণের আবদার পেশ করিতেন। এই কারণেও সাহাবিগণ তাঁহাদের নিকট সুরক্ষিত ইলমে হাদীস তাঁহাদের সামনে প্রকাশ করিতে ও তাঁহাদিগকে উহার শিক্ষাদান করিতে প্রস্তুত হন। এই কারণও অনেক সাহাবীর নিকট হইতে বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হইতে পারিয়াছে।

খিলাফতে রাশেদার শেষ পর্যায়ে মুসলিম সমাজে নানাবিধ ফিতনার সৃষ্টি হয়। শিয়া এবং খাওয়ারিজ দুইটি বাতিল ফিরকা স্থায়ীভাবে মাথাচড়া দিয়া উঠে। এই সময় তাহারা কিছু কিছু কথা রাসূলের হাদীস হিসাবে চালাইয়া দিতেও চেষ্টা করে। এই কারণে রাসূলের কোন কোন সাহাবী প্রকৃত হাদীস কম বর্ণনা করিতেও হাদীস বর্ণনায় অধিক কড়াকড়ি করিতে বাধ্য হন। ঠিক এই কারণেই চতুর্থ খলীফা হযতর আলী (রা)-এর নিকট হইতে খুবই কম সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হইতে পারিয়াছে।

স্মরণশক্তির পার্থক্য  ও হাদীস লিখিয়া রাখা বা না রাখাও হাদীস বর্ণনায় এই সংখ্যা পার্থক্য সৃষ্টির অন্যতম কারণ। যাঁহারা হাদীস বেশী মুখস্থ করিয়া কিংবা লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিতে পারিয়াছিলেন- যেমন হযরত আবূ হুরায়রা (রা) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা)- তাঁহারা অপর সাহাবীদের অপেক্ষা অধিক হাদীস বর্ণনা করিতেত সমর্থ হইয়াছিলেন। একই রাসূলের অসংখ্য সাহাবীদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা পার্থক্য সৃষ্টির মূলে এইসব বিবিধ কারণ নিহিত রহিয়াছে। কাজেই ব্যাপারটি যতই বিস্ময়কর হউক না কেন, অস্বাভাবিক কিছুই নয়, তাহা নিঃসন্দেহে বলা যায়।[মুহাম্মদ আবু জহু লিখিত ***************গ্রন্হের ৬৬,৬৭, এবং ১৪৭ ও ১৪৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।]

 

About মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম