হাদীস সংকলনের ইতিহাস

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ছয়খানি বিশিষ্ট হাদীসগ্রন্হ

হিজরী তৃতীয় শতকের প্রথমার্ধে মুসলিম জাহানের দিকে দিকে বিক্ষিপ্ত ও বিভিন্ন স্থানে রক্ষিত হাদীসসমূহ যখন ‘মূসনাদ’ আকারে সংগৃহীত ও গ্রন্হাবদ্ধ হইল, তখন পরবর্তীকালের মুহাদ্দিসগণ হাদীস যাচাই, ছাঁটাই-বাছাই ও সংক্ষিপ্ত আকারে কেবলমাত্র বিশুদ্ধ হাদীসের গ্রন্হ প্রণয়নের উদ্যোগী হইলেন। এই উদ্যোগের ফলেই এই শতকের মাঝামাঝি ও শেষার্ধে ছয়খানি সুবিখ্যাত সহীহ হাদীস গ্রন্হ জনসমক্ষে উপস্থাপতি হয়। এই ছয়খানি হাদীসগ্রন্হ সংকলনের ইতিহাস এবং প্রত্যেক খানি গ্রন্হের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য আমরা এখানে আলোচনা করিতে চাই।

সহীহুল বুখারী

এই ছয়খানি বিশুদ্ধতম হাদীস গ্রন্হের মধ্যে সর্ব প্রথম উল্লেখযোগ্য, সর্বাধিক খ্যাতিসম্পন্ন ও সর্বাপেক্ষা অধিক বিশুদ্ধ হাদীসপূর্ণ গ্রন্হ হইতেছে ইমাম বুখারী সংকলিত ‘সহীহুল বুখারী’। ইমাম বুখারী এই গ্রন্হ প্রণয়নের প্রেরণা তাঁহার বিশিষ্ট উস্তাদ ইসহাক ইবনে রাহওয়াইর মজলিস হইতে লাভ করিয়াছিলেন।[********************] তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি ইসহাক ইবনে রাহওয়াইর নিকট উপস্থিত ছিলাম। মজলিসে উপস্থিত তাঁহার লোকজনের মধ্য হইতে কেহ বলিলেনঃ কেহ যদি রাসূল (স) হইতে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদীস ও সুন্নাতসমূহের সমন্বয়ে এমন একখানি গ্রন্হ প্রণয়ন করিতেন, যাহা সংক্ষিপ্ত হইবে এবং বিশুদ্ধাতর দিক দিয়া চরম পর্যায়ে উন্নীত হইবে, তাহা হইলে খুবই উত্তম হইত এবং আমলকারীদের পক্ষেও শরীয়াত পালন করা সহজ হইত। সেইজন্য তাহাদিগকে মুজতাদিদের প্রতি মুখাপেক্ষী হইয়া থাকিতে হইত না।[********************]

এই কথা শ্রবণ করার সঙ্গে সঙ্গে ইমাম বুখারী (র) –এর মনে এইরূপ একখানি হাদীস গ্রন্হ প্রণয়নের বাসনা জাগ্রত হইল। উপরিউক্ত কথাটি যদিও ছিল এক সাধারণ পর্যায়ের, সম্বোধনও ছিল মজলিসে উপস্থিত সকল লোকদের প্রতি নির্বিশেষে; কিন্তু উহার বাস্তবায়ন সম্পর্কে ইচ্ছা জাগ্রত হইল এমন ব্যক্তির হৃদয়ে, বুখারী শরীফের ন্যায় এক অতুলনীয় হাদীসগ্রন্হ প্রণয়নের মর্যাদা লাভ আল্লাহ তা’আলা যাহার ভাগ্যলিপি করিয়া দিয়াছিলেন।

ইমাম বুখারী (র) বলেনঃ

******************************************************

এই কথাটি আমার হৃদয়পটে মুদ্রিত হইয়া গেল এবং অনুতিবিলম্বে আমি এই কিতাব প্রণয়নের কাজ শুরু করিয়া দিলাম।[********************]

বুখারী গ্রন্হ প্রণয়নে উদ্যেগী হওয়ার মূল ইমাম বুখারী হইতে অন্য একটি কারণেরও উল্লেখ করা হইয়াছে। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি রাসূলে করীম (স)-কে স্বপ্নে দেখিলাম। দেখিলাম আমি যেন তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান, আমার হাতে একটি পাখা যাহার দ্বারা আমি রাসূল (স)-এর প্রতি বাতাস করিতেছি ও মাছির আক্রমণ প্রতিরোধ করিতেছি। অতঃপর স্বপ্নের ব্যাখ্যাদানকারী কাহারো নিকট ইহার ব্যাখ্যা জানিতে চাহিলাম। ব্যাখ্যাদানকারী বলিলেন যে, তুমি রাসূলের প্রতি আরোপিত সমস্ত মিথ্যার প্রতিরোধ করিবে। বস্তুত এই স্বপ্ন ও ইহার এই ব্যাখ্যাদানকারী কাহারো নিকট ইহার ব্যাখ্যা জানিতে চাহিলাম। ব্যাখ্যাদানকারী বলিলেন যে, তুমি রাসূলের প্রতি আরোপিত সমস্ত মিথ্যার প্রতিরোধ করিবে। বস্তুত এই স্বপ্ন ও ইহার এই ব্যাখ্যাই আমাকে এই সহীহ হাদীস সম্বলিত বিরাট গ্রন্হ প্রণয়নে উদ্বুদ্ধ করেন।[********************]

গ্রন্হ প্রণয়নে উদ্বদ্ধ হওয়ার মূলে দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনায় দুই প্রকারে কারণের উল্লেখ হইলেও এই কারদ্বয়ের মধ্যে কোন মৌলিক বিরোধ নাই। ইহা খুবই সম্ভব যে, ইমাম বুখারী ইসহাক ইবন রাহওয়াইর মজলিস হইতে হাদীস গ্রন্হ প্রণয়ণের প্রেরণা ও বাসনা লইয়া চলিয়া আসার পর তিনি উহারই অনুকূল ও উহারই সমর্থনে এই শুব স্বপ্নটিও দেখিয়াছিলেন। এই স্বপ্নও এই কথাই তাঁহাকে জানাইয়া দিল যে, তিনি যে, বিশুদ্ধ হাদীসের সমন্বয়ে একখানি গ্রন্হ প্রণয়নের সংকল্প করিয়াছেন, তাহা রাসূলের দরবারেও মঞ্জুরীপ্রাপ্ত হইয়াছে এবং তাঁহার এই কাজ প্রকৃতপক্ষে রাসূলে করীম (স)-কে উহার তীব্র শরাঘত হইতে প্রতিরক্ষার কাজ হইবে।

ইতিপূর্বে বিভিন্ন অধ্যায় ও পর্যায়ে হাদীসের যেসব বিরাট বিরাট গ্রন্হ প্রণয়ন করা হইয়াছে, ইমাম বুখারী এই অভিনব গ্রন্হ প্রণয়নের ব্যাপারে সেইসব গ্রন্হ হইতে যথেষ্ট ফায়দা গ্রহণ করিয়াছেন এবং তাঁহার নিজের সংগৃহীত হাদীসসমূহ হইতে তাঁহার স্থাপিত কঠিন শর্তের মানদণ্ডে ওজন করিয়া হাদীসের এক বিরাট ও অমুল্য গ্রন্হ প্রণয়ন করিলেন।[********************]

পূর্ববর্তী হাদীস গ্রন্হসমূহে সহীহ, হাসান ও যয়ীফ প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকার গুণের হাদীস সন্নিবেশিত হইয়াছিল। একজন সাধারণ পাঠকের পক্ষে উহা হইতে কেবলমাত্র সহীহ হাদীস বাছাই করিয়া লওয়া বড়ই কঠিন ব্যাপার ছিল; বং ইহা সম্ভব হইত কেবলমাত্র বিশিষ্ট পারদর্শী ও হাদীস-শাস্ত্রজ্ঞানে ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের পক্ষে। অনুরূপভাবে বিশেষ একটি বিষয়ে শরীয়াতের বিশেষ নির্দেশ সম্পর্কে সমস্ত হাদীস একত্র করা বড় দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল। কেননা পূর্ববর্তী গ্রন্হাবলীর উদ্দেশ্যেই ছিল শুধুমাত্র রাসূলে করীম (স)-এর হাদীসসমূহ সংগ্রহ করা ও ধ্বংসের করাল গ্রাস হইতে তাহা রক্ষা করা। কাজেই তাহাতে একই বিষয়ের হাদীস একস্থানে সাজাইয়া দেওয়ার কাজ বড় একটা হয় নাই। ফলে উহা পাঠ করিয়া শরীয়াত সম্পর্কে রাসূলের বিস্তারিত কথা জানিবার কোন উপায় ছিল না। এই সমস্ত কারণই একত্র হইয়া ইমাম বুখারীকে নূতন প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে হাদীসের এক নবতর সকংলন প্রণয়নে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল।[********************]

ইমাম বুখারী এই হাদীস গ্রন্হ প্রণয়ণের কাজ শুরু করেন ‘বায়তুল হারাম’- আল্লাহর ঘরের অভ্যন্তরে বসিয়া। পরে উহার বিভিন্ন অধ্যায় ও ‘তারজুমাতুল বার’ সংযোজনের কাজ সম্পন্ন করেন মদীনায় মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে মিম্বর ও রাসূলের রওযা মুবারকের মধ্যবর্তী স্থানে বসিয়া।[********************]

হাদীসসমূহ লিখিবার সময় ইমাম বুখারী (র) এক অভূতপূর্ব ও বিস্ময়কর পদ্ধতি অবলম্বন করিয়াছেন। তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি এই সহীহ গ্রন্হে এক একটি হাদীস লিখিবার পূর্বে গোসল করিয়াছি ও দুই রাক’আত নফল নামায পড়িয়া লইয়াছি- ইহা ব্যতীত আমি একটি হাদীসও লিখি নাই।[********************]

প্রত্যেকটি হাদীস লিখিবার পূর্বে গোসল করা ও দুই রাক’আত নফল নামায পড়ার পদ্ধতি মক্কা ও মদীনা উভয় স্থানেই তিনি রক্ষা করিয়াছিলেন। এক একটি হাদীস লিখিবার পূর্বে তিনি সে সম্পর্কে সর্বতোভাবে সতর্কতাত অবলম্বন করিয়াছেন। হাদীসটি প্রকৃত রাসূলের হাদীস কি না এই সম্পর্কে দৃঢ়নিশ্চত না হইয়া তিনি একটি হাদীসও ইহাতে উদ্ধৃত করেন নাই। তিনি নিজেই এই সম্পর্কে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি প্রত্যেকটি হাদীস সম্পর্কে আল্লাহর নিকট হইতে ইস্তেখারার মারফত না জানিয়া লইয়া, নফল নামায না পড়িয়া ও উহার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে দৃঢ়নিশ্চিত ও অকাট্যভাবে বিশ্বাসী না হইয়া উহাতে আমি একটি হাদীসও সংযোজিত করি নাই।[********************]

বস্তুত ইমাম বুখারীর এই হাদীস গ্রন্হ প্রণয়ন পরিক্রমা যে কত কঠিন ও কঠোর সাধনার ব্যাপার ছিল, তাহা উপরিউক্ত সমূহ হইতে সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হইতেছে। একট চিন্তা করিলেই ইহার অন্তর্নিহিত বিরাট সত্য উপলদ্ধি করা যায়। এইরূপ অনন্যসাধারণ পরিশ্রম ও অক্নান্ত সাধনা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলিতে থাকে দীর্ঘ ষোলটি বৎসর পর্যন্ত। এ বিষয়ে ইমাম বুখারীর নিজের উক্তি হইলঃ

******************************************************

আমি এই গ্রন্হ প্রণয়ন কাজটি পূর্ণ ষোল বৎসরে সম্পূর্ণ করিয়াছি।[********************]

ইমাম বুখারী (র) বুখারী শরীফ প্রণয়নের কাজ শুরু করেন  মোট ছয় লক্ষ হাদীস সম্মুখে রাখিয়া। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

প্রায় ছয় লক্ষ হাদীস হইতে আমি এই বুখারী গ্রন্হ প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করি।[********************]

এই ছয় লক্ষ হাদীসের মধ্যে ইমাম বুখারীর নিজের সম্পূর্ণ মুখস্ত ছিল এক লক্ষ সহীহ হাদীস। ইমাম বুখারী (র) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি এক লক্ষ হাদীস মুখস্থ বলিতে পারিতাম।[********************]

বলা বাহুল্য ইহ সমগ্র সহীহ হাদীসের মোট সংখ্যা নহে এবং ইমাম বুখারী কেবল এই এক লক্ষ হাদীসই মাত্র মুখস্থ ছিল না, ইহা অপেক্ষা আরো অনেক হাদীসও তাঁহার মুখস্থ ছিল। তবে তাঁহার মুখস্থ হাদীসসমূহের মধ্যে কেবলমাত্র সহীহ হাদীসের সংখ্যাই হইতেছে এক লক্ষ। প্রায় দুই লক্ষ গায়ের সহীহ হাদীসও তাঁহার মুখস্থ ছিল।[********************]

ইমাম বুখারীর নিকট এই হাদীস প্রণয়নের সময়ে কতকগুলি হাদীস সঞ্চিত ছিল এবং সমস্ত সহীহ হাদীসই তিনি বুখারী গ্রন্হে সন্নিবেশিত করিয়াছেন কিনা, এই সম্পর্কে তাঁহার নিম্নোক্ত কথা হইতে সুস্পষ্ট ধারণা করা যায়। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি আমার এই হাদীস গ্রন্হে কেবল সহীহ ও বিশুদ্ধ হাদীসই সংযোজিত করিয়াছি। এতদ্ব্যতীত আরো বহু সহীহ হাদীস আমি ছাড়িয়া দিয়াছি। গ্রন্হের আকার দীর্ঘ ও বিরাট হওয়ার আশঙ্কায় তাহা এই গ্রন্হে শামিল করি নাই।[********************]

এই সম্পর্কে ইমাম বুখারীর আর একটি উক্তি উল্লেখযোগ্য। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি এই গ্রন্হে কেবলমাত্র সহীহ হাদীস সংযোজিত করিয়াছি। আর আমি যাহা রাখিয়া দিয়াছি, তাহার সংখ্যা সংযোজিত হাদীসের তুলনায় অনেক বেশী। আর ইহা করিয়াছি গ্রন্হের বৃহদায়তন হইয়া যাওয়ার আশঙ্কায় মাত্র।[********************]

এইভাবে ইমাম বুখারী যে গ্রন্হখানি সুসংবদ্ধ করিয়া বিশ্ববাসীর সম্মুখে উপস্থাপিত করিলেন, উহার নামকরণ হইয়াছেঃ

******************************************************

রাসূলে করীম (স)-এর যাবতীয় ব্যাপার- কাজকর্ম, সুন্নাত ও সমকালীন অবস্থা সম্পর্কে নির্ভূল সনদযুক্ত হাদীসসমুহের সংক্ষিপ্ত পূর্ণাঙ্গ সংকলন।[********************]

ইমাম এই গ্রন্হখানিকে আমার ও আল্লাহার মধ্যবর্তী ব্যাপারের জন্য একটি অকাট্য দলিলরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।[********************]

ইমাম বুখারী (র)-এর এই উক্তি যে কত সত্য এবং হাদীসের এই গ্রন্হ যে দ্বীন-ইসলামের এক অক্ষয় স্তম্ভ, বুখারী শরীফ পাঠ করিয়াছেন এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই তাহা অনুধাবন করিতে পারেন।

বুখারী শরীফে একাধিকবার উদ্ধৃত হাদীসসমূহ সর্বমোট হাদীস হইতেছে নয় হাজার বিরাশী (৯০৮২)-টি। উহার মুয়াল্লিক মুতাবি’আত বাদ দিলে হাদীসের সংখ্যা দাঁড়ায় সাত হাজার তিনশথ সাতানব্বই (৭৩৯৭)-টি। আর একাধিকবার উল্লেখিত হাদীস বাদ দিয়া হিসাব করিলে মোট হাদীস হয় দুই হাজার ছয়শত দুই (২৬০২)-টি। অপর এক হিসাব মতে, এই পর্যায়ে হাদীসের সংখ্যা হয় দুই হাজার সাতশত একষট্টি (২৭৬১)-টি।[********************]

কিন্তু আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (র) বুখারী শরীফের হাদীস সংখ্যা সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

বুখারী শরীফে সন্নিবেশিত সনদযুক্ত মোট হাদীস হইতেছে সাত হাজার দুইশত পঁচাত্তত (৭২৭৫)-টি। ইহাতে পুনরুল্লিখিত হাদীসসমূহ গণ্য। আর উহা বাদ দিয়া হিসাব করিলে হয় প্রায় চার হাজার হাদীস।[********************]

সংখ্যা গণনায় এই পার্থক্যের মূলে একটি প্রধান কারণ রহিয়াছেনঃ ইমাম বুখারীর এই মহামূল্য গ্রন্হের প্রণয়নকার্য যদিও ষোল বৎসরের মধ্যে সমাপ্ত হইয়াছিল, তথাপি ইহাতে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংযোজন, পরিবর্জনের কাজ ইহার পরও দীর্ঘদিন পর্যন্ত চলিতে থাকে। এই কারণে ইমাম বুখারীর নিকট হইতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছাত্র ইহা শ্রবণ করিয়াছেন বলিয়া তাঁহাদের নিকট রক্ষিত গ্রন্হের হাদীসের সংখ্যায় পার্থক্য সূচিত হইয়াছে। প্রথম পর্যায়ে ছাত্রদের নিকট সেই হাদীসসমূহই লিখিত রহিয়াছে, যাহা তখন পর্যন্ত  ইহাতে সংযোজিত হইয়াছিল। পরে উহাতে পরিবর্তন করা হইয়াছে, গ্রন্তকার প্রাথমিক সংকলন হইতে কোন কোন হাদীস বাদ দিয়া অনেক নূতন হাদীস ইহাতে শামিল করিয়াছেন। ফলে এই পর্যায়ে যাঁহারা উহা শ্রবণ করিয়াছেন, তাঁহাদের নিকট পূর্বের তুলনায় বেশী সংখ্যক ও নবসংযোজিত হাদীসও পৌছিঁয়াছে।[********************]

কথাটি নিম্নোক্ত আলোচনায় আরো সুস্পষ্টরূপে পরিস্ফূট হইবে। ইমাম বুখারীর নিকট হইতে তাঁহার এই হাদীসগ্রন্হ শ্রবণ করিয়াছেন শত সহস্র লোক। কিন্তু ইমাম বুখারীর যে কয়জন ছাত্রের সূত্রে ইহার বর্ণনার মূল ধারা চলিয়াছে, তাঁহারা হইতেছেন প্রধানতঃ চারজন।

১.         ইবরাহীম ইবনে মা’কাল ইবনুল হাজ্জাজ আন-নাসাফী (মৃঃ ২৯৪ হিঃ)

২.‌         হাম্মাদ ইবনে শাকের আন-নাসাফী (মৃঃ ৩১১ হিঃ)

৩.         মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ আল-ফারবারী (মৃঃ ৩২০)

৪.         আবূ তালহা মনসূর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে কারীমা আল বজদুভী (মৃঃ ৩২৯ হিঃ)

ফারবারী সহীহুল বুখারী গ্রন্হ ইমাম বুখারীর নিকট হইতে দুইবার শ্রবণ করিয়াছেন। একবার ফারবার নামক স্থানে ২৪৮ হিজরী সনে; যখন ইমাম বুখারী এখানে আগমন করিয়াছিলেন। আর দ্বিতীয়বার ২৫২ হিজরী সনে তিনি নিজে বুখারায় উপস্থিত হইয়া।[********************]

হাম্মাদ ইবনে শাকের বুখারী শরীফের যে সংস্করণ বর্ণনা করিয়াছেন, তাহা অপেক্ষা ফারবারী বর্ণিত সংস্করণে দুইশত হাদীস অধিক রহিয়াছে। আর ইবরাহীম ইবনে মা’কাল বর্ণিত সংস্করণ অপেক্ষা উহাতে তিনশত হাদীস বেশি। ইহা হইতে সুস্পষ্টরূপৈ প্রমাণিত হয় যে, বুখারী গ্রন্হে ইমাম বুখারী ক্রমশ হাদীসের সংখ্যা বৃদ্ধি করিয়াছেন এবং প্রথম পর্যায়ের ছাত্রদের নিকট হইতে বর্ণিত সংস্করণে পরবর্তীকালের ছাত্রদের বর্ণিত সংস্করণের তুলনায় কম হাদীস ছিল।[********************]

ইমাম বুখারী তাঁহার গ্রন্হ প্রণয়ন সমাপ্ত করার পর উহা তদানীন্তন অপরাপর শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসের সম্মুখে পেশ করেন। তাঁহাদের মধ্যে প্রধান হইতেছেন আলী ইবনে মাদানী, আহম্মদ ইবনে হাম্বল ও ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ীন (র)। তাঁহারা প্রত্যেকেই গ্রন্হখানি দেখিয়া

******************************************************

ইহাকে খুবই পছন্দ করিলেন, অতি উত্তম গ্রন্হ বলিয়া ঘোষণা করিলেন এবং উহা একখানি বিশুদ্ধ গ্রন্হ বলিয়া স্পষ্ট ভাষায় সাক্ষ্য দিলেন।[********************]

বুখারী শরীফের শ্রেষ্ঠত্ব ও বৈশিষ্ট্য ঘোষণা করিয়া প্রত্যেক যুগের আলিম ও মুহাদ্দিসগণ অনেক উক্তি করিয়াছেন। মওলানা আহমদ আলী উদ্ধৃত করিয়াছেনঃ

******************************************************

হাদীসের সমস্ত আলিম এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ একমত যে, গ্রন্হবদ্ধ হাদীসের কিতাবসমূহের মধ্যে সর্বাধিক সহীহ হইতেছে বুখারী ও মুসলিম গ্রন্হ। আর অধিকাংশের মতে এই দুইখানির মধ্যে অধিক সহীহ এবং জনগনকে অধিক ফায়দা দানকারী হইতেছে বুখারী শরীফ।[********************]

এই পর্যায়ে নিম্নোদ্ধৃত উক্তিটিও সর্বজনপ্রিয় ও সকলের মুখে ধ্বনিতঃ

******************************************************

আল্লাহর কিতাবের পর আসমানের নীচে সর্বাধিক সহীহ গ্রন্হ হইতেছে সহীহুল বুখারী।[********************]

ইমাম নাসায়ী বলিয়াছেনঃ

******************************************************

হাদীসের এই সমস্ত কিতাবের মধ্যে বুখারী গ্রন্হ অপেক্ষা অধিক উত্তম আর কোন গ্রন্হ নাই।[********************]

মুসলিম জাতি এই গ্রন্হখানির প্রতি অপূর্ব ও অতুলনীয় গুরুত্ব দান করিয়াছেন। মুসলিম মনীষিগণ ইহার অসংখ্য ও বিরাট শরাহ  গ্রন্হ প্রণয়ন করিয়াছেন। কাশফুজ্জুনূন প্রণেতা বলিয়াছেন, ইহার শরাহ গ্রন্হের সংখ্যা বিরাশিখানি। তন্মধ্যে ফতহুল বারী, কস্তালানী ও উমদাতুলকারীই উত্তম।[********************]

সহীহ মুসলিম শরীফ

ইমাম মুসলিমের সহীহ হাদীসগ্রন্হ হইতেছে ‘সহীহ মুসলিম’। ইমাম মুসলিম সরাসরি উস্তাদদের নিকট হইতে শ্রুত তিনলক্ষ হাদীস হইতে ছাঁটাই-বাছাই  ও চয়ন করিয়া এই গ্রন্হখানি প্রণয়ন করিয়াছেন।[********************]

হাদীস গ্রন্হ প্রণয়ন সমাপ্ত হইলে পর তিনি ইহা তদানীন্তন প্রখ্যত হাফেজে হাদীস ইমাম আবূ যুরয়ার সম্মুখে উপস্থাপিত করেন। ইমাম মুসলিম নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি এই গ্রন্হখানি ইমা আবূ যুরয়া রাযীর নিকট পেশ করিয়াছি। তিনি যে যে হাদীসের সনদে দোষ আছে বলিয়া ইঙ্গিত করিয়াছেন, আমি তাহা পরিত্যাগ করিয়াছি (গ্রন্হ হইতে খারিজ করিয়া দিয়াছি), আর যে যে  হাদীস সম্পর্কে তিনি মত দিয়াছেন যে, উহা সহীহ এবং উহাতে কোন প্রকার ক্রটি নাই, আমি তাহাই এই গ্রন্হে সন্নিবেশিত করিয়াছি।[********************]

ইহা হইতে প্রমাণিত হয় যে, ইমাম মুসলিম কেবলমাত্র নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধি বিবেচনার উপর নির্ভর করিয়াই কোন হাদীসকে সহীহ মনে করিয়া তাঁহার এই গ্রন্হে শামিল করেন নাই বরং প্রত্যেকটি হাদীসের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সমসাময়িক অন্যান্য মুহাদ্দিসের নিকটও পরামর্শ চাহিয়াছেন এবং সমসাময়িক মুহাদ্দিসগণ যে হাদীসের শুদ্ধতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ একমত হইয়াছেন, কেবল তাহাই তিনি তাঁহার এই অমূল্য গ্রন্হে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। এই সম্পর্কে তাঁহার নিজের উক্তিই অধিকতর প্রামাণ্য হইবে। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

কেবল আমার বিবেচনায় সহীহ হাদীসসমূহই আমি কিতাবে শামিল করি নাই। বরং এই কিতাব কেবল সেইসব হাদীসই সন্নিবেশিত করিয়াছি, যাহার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ একমত।[********************]

এইভাবে দীর্ঘ পনেরো বৎসর অবিশ্রান্ত সাধনা, গবেষনা ও যাচাই-ছাঁটাই পরিচালনার পর সহীহ হাদীসসমূহের এক সুসংবদ্ধ সংকলন তৈয়ার করা হয়।[********************]

এই গ্রন্হে সর্বমোট বারো হাজার  হাদীস সন্নিবেশিত হইয়াছে। একাধিকবার উদ্ধৃত হাদীসও ইহার অন্তর্ভূক্ত। আর তাহা বাদ দিয়া হিসাব করিলে মোট হাদীস হয় প্রায় চার হাজার।[********************]

এই হাদীস গ্রন্হে সন্নিবেশিত হাদীসসমূহের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে ইমাম মুসলিম (র) নিজেই দাবি করিয়া বলিয়াছেনঃ

******************************************************

মুহাদ্দিসগণ দুইশত বৎসর পর্যন্তও যদি হাদীস লিখিতে থাকেন, তবুও তাহাদিগকে অবশ্যই এই সনদযুক্ত বিশুদ্ধ গ্রন্হের উপর নির্ভর করিতে হইবে।[********************]

ইমাম মুসলিমের এই দাবি মিথ্যা নয়, উহা এক বাস্তব সত্যরূপেই পরবর্তীকালের মুহাদ্দিসদের নিকট প্রতিভাত হইয়া উঠিয়াছে। আজ প্রায় এগারো শত বৎসরেরও অধিক অতিক্রান্ত হইয়াছে, কিন্তু সহীহ মুসলিমের সমান মানের কিংবা উহা হইতেও উন্নত মর্যাদার কোন গ্রন্হ প্রণয়ন করা সম্ভব হয় নাই। আজিও উহার সৌন্দর্য ও বিশুদ্ধতা অম্লান হইয়া বিশ্বমানবকে বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন জ্ঞানের আলো দান করিতেছে। হাফেজ মুসলিম ইবনে কুরতবী সহীহ মুসলিম শরীফ সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

ইসলামে এইরূপ আর একখানি গ্রন্হ কেহই প্রণয়ন করিতে পারে নাই।[********************]

শুধু তাহাই নয়, পরবর্তীকালের কয়েকজন যুগ-শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসের মতে বুখারী শরীফের তুলনায় মুসলিম শরীফ অধিক বিশুদ্ধ ও শ্রেষ্ঠ।

কাযী ইয়ায একজন বড় মুহাদ্দিস। তিনি বলিয়াছেন যে, তাহার কয়েকজন হাদীসের উস্তাদ-যাঁহারা একজন অতি বড় মুহাদ্দিস, বুখারী অপেক্ষ মুসলিম শরীফকেই অগ্রাধিকার দিতেন।[********************]

হাফেজ ইবনে মানদাহ বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি আবূ আলী নিশাপুরীকে- যাঁহার মত হাদীসের বড় হাফেজ আর একজনও দেখি নাই- এই কথা বলিতে শুনিয়াছি যে, আকাশের তলে ইমাম মুসলিমের হাদীস-গ্রন্হ অপেক্ষা বিশুদ্ধতর কিতাব একখানিও দেখি নাই।[********************]

এই উদ্ধৃতি হইতে এই কথাও প্রমাণিত হয় যে, হাফেজ ইবনে মানদাহর এই মত। আর আবূ আলী কি রকমের মুহাদ্দিস ছিলেন তাহা মুসতাদরাক গ্রন্হ প্রণেতা হাকেম নিশাপুরীর প্রদত্ত পরিচিত হইতে স্পষ্ট ধারণা জন্মে। তিনি আবূ আলীর পরিচয় দান প্রসঙ্গে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

হাদীস গ্রন্হ মুখস্থ করা, বিষয়বস্তুর উপর দক্ষতাপূর্ণ সতর্কতা, হাদীস পর্যালোচনা ও হাদীসের গ্রন্হ প্রণয়নে তিনি যুগের একক ও অবিসংবাদী ছিলেন।[********************]

ইমাম মুসলিমের সংকলিত এই হাদীস গ্রন্হখানি তাঁহার নিকট হইতে বহু ছাত্রই শ্রবণ করিয়াছেন এবং তাঁহার সূত্রে ইহা বর্ণনাও করিয়াছেন। কিন্তু ঠিক যাহার সূত্রে এই গ্রন্হখানি বর্ণনা ধারা সর্বত্র- বিশেষভাবে এতদুদ্দেশ্যে সাম্প্রতিক যুগ পর্যন্ত চলিয়া আসিয়াছে, তিনি হইতেছেন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খ আবূ ইসহাক ইবারহীম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সুফিয়ান নিশাপুরী। তিনি ৩০৮ হিজরী সনে ইন্তেকাল করেন।

এই সম্পর্কে ইমাম নববী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

অবিচ্ছিন্ন সনদসূত্রে ইমাম মুসলিম হইতে এই গ্রন্হের বর্ণনা পরম্পরা এতদুদ্দেশ্যে ও সাম্প্রতিককালে কেবলমাত্র আবূ ইসহাক ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সুফিয়ানের বর্ণনার উপরই নির্ভরশীল।[********************]
এই ইবরাহীম ইবনে সুফিয়ানের সহিত ইমাম মুসলিমের এক বিশেষ সম্পর্ক স্থাপিত হইয়াছিল। তিনি সব সময়ই ইমাম মুসলিমের সাহচর্যে থাকিতেন ও তাঁহার নিকট হাদীস অধ্যয়ন করিতেন।

ইমাম মুসলিমের আর একজন ছাত্র আবূ মুহাম্মদ আহমদ ইবন আলী কালানসী। তাঁহার সূত্রেও সহীহ মুসলিম বর্ণিত হইয়াছে; এই সূত্রে বর্ণনা পরম্পরা যেমন সম্পূর্ণ নহে, তেমনি তাহা বেশি দিন চলিতেও পারে নাই।

সুনানে নাসায়ী

ইমাম নাসায়ী প্রথমে ‘সুনানুল কুবরা’ নামে একখানি হাদীস গ্রন্হ প্রণয়ন করেন। তাহাতে সহীহ ও দোষমুক্ত উভয় প্রকারের হাদীস সন্নিবেশিত হইয়াছিল। অতঃপর উহারই এক সংক্ষিপ্ত সংস্করণ তৈরী করেন। উহার নাম ‘আসসুনানুস সুগরা’। ইহার অপর এক নাম হইতেছে ‘আল-মুজতবা’- সঞ্চয়িতা’।

এই শেষোক্ত সঞ্চয়নে ইমাম নাসায়ী ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের গ্রন্হ প্রণয়ন রীতির অনুসরণ করিয়াছেন। এই উভয়েল প্রবর্তিত রীতির সমন্বয় ঘটিয়াছে ইমাম নাসায়ীর এই গ্রন্হে। হাফেজ আবূ আবদুল্লাহ ইবনে রুশাইদ (মৃঃ ৭২১ হিঃ) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

সুনানে পর্যায়ে হাদীসের যত গ্রন্হই প্রণয়ন করা হইয়াছে, তন্মধ্যে এই গ্রন্হখানি অতি আনকোরা রীতিতে প্রণয়ন করা হইয়াছে। আর সংযোজন ও সজ্জায়নের দৃষ্টিতেও উহা এক উত্তম গ্রন্হ। উহাতে বুখারী ও মুসলিম উভয়েরই রচনারীতির সমন্বয় হইয়াছে। হাদীসের ‘ইল্লাহ’ ও ইহাতে এক বিশেষ অংশে উদ্ধৃত হইয়াছে।[********************]

এই গ্রন্হখানির বিশুদ্ধতা সম্পর্কে ইমাম নাসায়ী নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

‘হাদীসের সঞ্চয়ন’–মুজতাবা নামের গ্রন্হখানিতে উদ্ধৃত সমস্ত হাদীসই বিশুদ্ধ।[******************** অবশ্য হাফেজ যাহবী এই সম্পর্কে ভিন্ন মত পোষন করেন। তিনি বলিয়াছেনঃ এই ‘আল-মুজতবা’ ইমাম নাসায়ীর কৃত নহে বরং তাঁহার ছাত্র ইবনে সামালী কৃত ********************]

বস্তুত ইমাম নাসায়ীর বর্ণিত হাদীসসমূহ সম্পর্কে প্রায় সকল শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসেরই মত এই যে, অন্যান্যের বর্ণিত হাদীসের তুলনায় শুদ্ধতার দিক দিয়া উহা অধিকতর নির্ভরযোগ্য হইবে।

হাফেজ ইমাম আবুল হাসান মুযাফেরী (মৃঃ ৪০৩ হিঃ) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

মুহাদ্দিসগণের বর্ণিত হাদীসসমূহ সম্পর্কে তুমি যখনি বিচার-বিবেচনা করিবে তখন একথা বুঝিতে পারিবে যে, ইমাম নাসায়ীর বর্ণিত হাদীস অপরে বর্ণিত হাদীসের তুলনায় শুদ্ধতার অধিক নিকটবর্তী হইবে।[********************]

ইমাম নাসায়ীর নিকট হইতে তাঁহার এই গ্রন্হ যদিও বহু ছাত্রই শ্রবণ করিয়াছেন, কিন্তু দশজন বড় মুহাদ্দিস এই গ্রন্হের ধারাবাহিক বর্ণনা করিয়াছেন।

ইমাম নাসায়ীর নিকট হইতে তাঁহার এই গ্রন্হ যদিও বহু ছাত্রই শ্রবণ করিয়াছেন, কিন্তু দশজন বড় বড় মুহাদ্দিস এই গ্রন্হের ধারাবাহিক বর্ণনা করিয়াছেন।

ইমাম নাসায়ীর এই গ্রন্হখানির শরাহ লিখিয়াছেন জালালুদ্দীন সুয়ূতী (মৃঃ ৯১১ হিঃ) ও মুহাম্মদ ইবনে আবদুল হাদীস আসসমদী (মৃঃ ১১৩৮ হিঃ)। সুয়ূতী লিখিত শরাহ গ্রন্হের নাম- ********************

সুনানে আবূ দাউদ

ইমাম আবূ দাউদ পাঁচ লক্ষ হাদীস হইতে ছাঁটাই-বাছাই ও চয়ন করিয়া তাঁহার এই গ্রন্হ সংকলন করেন। ইহাতে মোট চার হাজার আটশত হাদীস স্থান পাইয়াছে। এই হাদীসসমূহ সবই আহকাম সম্পর্কিত এবং উহার অধিকাংশই ‘মশহূর’ পর্যায়ের হাদীস।[********************] এই সম্পর্কে তাঁহার নিজের উক্তি এইঃ

******************************************************

আমি রাসূলে করীম (স)-এর পাঁচ লক্ষ হাদীস লিপিবদ্দ করিয়াছিলাম। তন্মধ্য হইতে ছাঁটাই-বাছাই কারিয়া মনোনীত হাদীস এই গ্রন্হে সন্নিবেশিত করিয়াছি।[********************]

মনে রাখা আবশ্যক যে, ইমাম আবূ দাউদ ফিকাহর দৃষ্টিভঙ্গিতে হাদীসসমূহ চয়ন করিয়াছেন। তিনি ইমা বুখারীর পরে অন্যান্য সিহাহ-সিত্তা প্রণেতাদের তুলনায় ফিকাহ সম্পর্কে অধিক ব্যাপক ও উজ্জ্বল দৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন। এই কারণে তাঁহার এই কিতাবখানি মূলত হাদীস সংকলন হইলেও কার্যত ফিকাহ শাস্ত্রের রীতিতে সজ্জিত হইয়াছে; ফিকাহর সমস্ত বিষয়ই ইহাতে আলোচিত হইয়াছে এবং সমসাময়িক ও পরবর্তি যুগের সকল ফিকাহবিদই তাঁহার সংকলিত হাদীস হইতে দলীল ও প্রমাণ সংগ্রহ করিয়াছেন। এই কারণেই ফিকাহবিগণ মনে করেনঃ

******************************************************

একজন মুজতাহিদের পক্ষে ফিকাহর মাসয়ালা বাহির করার জন্য আল্লাহর কিতাব কুরআন মজীদের পরে এই সুনানে আবূ দাউদ গ্রন্হই যথেষ্ট।[********************]

ফিকাহর দৃষ্টিতেই তিনি উহার অধ্যায় নির্ধারণ করিয়াছেন এবং তাহাতে এমন কথার উল্লেখ করিয়াছেন, যাহা উহার নিম্নে উদ্ধৃত হাদীস হইতে প্রমাণিত হয় এবং কোন না কোন ফকীহ সেই হাদীস হইতে উক্তরূপ মত গ্রহণ করিয়াছেন। ফলে ফিকাহবিদদের নিকট এই কিতাবখানি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছে।[********************]

এই বৈশিষ্ট্যের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়াই ইমাম হাফেজ আবূ জাফর ইবনে যুবাইর গরনাতী (মৃঃ ৭০৮ হিঃ) সিহাহ-সিত্তার সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে সুনানে আবূ দাউদ সম্পর্কে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

ফিকাহ সম্পর্কিত হাদীসসমূহ সামগ্রিক ও নিরংকুশভাবে সংকলিত হওয়ার কারণে সুনানে আবূ দাউদের যে বিশেষত্ব, তাহা সিহাহ-সিত্তার অপর কোন গ্রন্হেরই নাই।[********************]

সুনানে আবূ দাঊদের ব্যবহারিক গুরুত্ব ও মূল্য সম্পর্কে ইমাম গাযযালী ও স্পষ্ট ভাষায় বলিয়াছেন যে, ‘হাদীসের মধ্যে এই একখানি গ্রন্হই মুজতাহিদের জন্য যথেষ্ট’।[********************]

মুহাদ্দিস যাকারিয়া সাজী বলিয়াছেনঃ

******************************************************

ইসলামের মূল হইতেছে আল্লাহর কিতাব, আর ইসলামের ফরমান হইতেছে সুনানে আবূ দাউদ।[********************]

ইমাম আবূ দাউদ তাঁহার এই গ্রন্হখানির সংকলনকার্য যৌবন বয়সে সমাপ্ত করিয়া লইয়াছিলেন। এই সময় হাদীসের জ্ঞানে তাঁহার যে কি দক্ষতা অর্জিত হইয়াছিল, তাহা ইবরাহীম আল- হারবীর নিম্নোদ্ধৃত উক্তি হইতে স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

ইমাম আবু দাউদ যখন তাঁহার এই গ্রন্হখানি সংকলন করেন তখন তাঁহার জন্য হাদীসকে নরম ও সহজ করিয়া দেওয়া হইয়াছিল, ঠিক যেমন নরম করিয়া দেওয়া হইয়াছিল হযরত দাউদ নবীর জন্য লৌহকে।[********************]

গ্রন্হ সংকলন সমাপ্ত করার পর তিনি উহাকে তাঁহার হাদীসের উস্তাদ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের সম্মুখে উপস্থাপিত করেন। ইমাম আহমদ উহাকে খুবই পছন্দ করেন ও উহা একখানি উত্তম হাদীস গ্রন্হ বলিয়া প্রশংসা করেন।[********************]

অতঃপর ইহা সর্বসাধারণের সমক্ষে উপস্থাপিত করা হয়। আর আল্লাহ তা’আলা উহাকে এত বেশি জনপ্রিয়তা ও জনগনের নিকট মর্যাদা দান করিয়াছেন, যাহা সিহাহ সিত্তার মধ্যে অপর কোন গ্রন্হই লাভ করিতে পারে নাই। এইদিকে ইঙ্গিত করিয়া ইমাম আবূ দাউদের ছাত্র হাফেজ মুহাম্মদ ইবনে মাখলাস দুয়ারী (মৃঃ ৩৩১ হিঃ বলিয়াছেনঃ

******************************************************

ইমাম আবূ দাউদ যখন সুনান গ্রন্হখানি প্রণয়ন সম্পন্ন করিলেন এবং উহা লোকদিগকে পাঠ করিয়া গুনাইলেন, তখনি উহা মুহাদ্দিসদের নিকট (কুরআ মজীদের মতই) অনুসরনীয় পবিত্র গ্রন্হ হইয়া গেল।[********************]

এই গ্রন্হে সন্নিবেশিত হাদীসসমূহ সম্পর্কে ইমাম আবূ দাউদ নিজেই দাবি করিয়াছেনঃ

******************************************************

জনগণ কতৃক সর্বসম্মতভাবে পরিত্যক্ত কোন হাদীসই আমি ইহাতে উদ্ধৃত করি নাই।[********************]

ইমাম আবূ দাউদের নিকট হইতে তাঁহার এই গ্রন্হখানি ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় প্রায় নয়-দশজন বড় বড় মুহাদ্দিস কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছেন।[********************]

ইমাম আবূ দাউদ ২৭৫ হিজরী সনে সর্বশেষ বারের তরে এই গ্রন্হখানি ছাত্রদের দ্বারা লিখাইয়াছিলেন এবং এই বৎসরই ১৬ই শাওয়াল শুক্রবার দিন তিনি অনন্ত ধামে যাত্র করেন।[********************]

জামে তিরমিযী

ইমাম তিরমিযীর হাদীসগ্রন্হ ‘জামে তিরমিযী’ নামে খ্যাত। উহাকে ‘সুনান

 ও বলা হয়। কিন্তু প্রথমোক্ত নামই অধিকাংশ হাদীসবিদ গ্রহণ করিয়াছেন।[********************]

ইমাম তিরমিযী তাঁহার গ্রন্হখানি ইমাম আবূ দাউদ ও ইমাম বুখারী অনুসৃত গ্রন্হ প্রণয়ন রীতি অনুযায়ী তৈয়ার করিয়াছেন। প্রথমত উহাতে ফিকাহর অনুরূপ অধ্যায় রচনা করা হইয়াছে। তাহাতে ব্যবহারিক প্রয়োজনসম্পন্ন হাদীসসমূহ সন্নিবেশিত করিয়াছেন। কিন্তু সমগ্র গ্রন্হখানি কেবল ব্যবহারিক প্রয়োজন সম্বলিত হাদীস দ্বারাই পূর্ণ করিয়া দেন নাই বরং সঙ্গে তিনি বুখারী শরীফের ন্যায় অন্যান্য অধ্যায়ের হাদীসও উহাতে সংযোজিত করিয়া দিয়াছেন। ফলে গ্রন্হখানি এক অপূর্ব সমন্বয়, এক ব্যাপকগ্রন্হে পরিণত হইয়াছে। এই কারণে উহার ‘জামে তিরমিযী নাম সার্থক হইয়াছে। বিভিন্ন বিষয়ে জরুরী হাদীস উহাতে সুন্দরভাবে সজ্জিত করিয়া দেওয়া হইয়াছে। এই কারণে হাফেজ আবূ জাফর ইবনে যুবাই ( মৃঃ ৭০৮ হিঃ) সিহাহ-সিত্তা সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

ইমাম তিরমিযী বিভিন্ন বিষয়ের হাদীস একত্র করিয়া গ্রন্হখানি প্রণয়ন করায় যে বৈশিষ্ট্য লাভ করিয়াছেন, তাহাতে তিনি অবিসংবাদিত।[********************]

ইমাম তিরমিযী তাঁহার এই গ্রন্হ প্রণয়ন সমাপ্ত করিয়া তদানীন্তন মুসলিম জাহানের হাদীসবিদ লোকদের নিকট ইহা যাচাই করিবার জন্য পেশ করেন। এই সম্পর্কে তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি এই হাদীস সনদযুক্ত গ্রন্হখানি প্রণয়ন সম্পূর্ণ করিয়া উহাকে হিজাযের হাদীসবিদদের সমীপে পেশ করিলাম। তাঁহারা ইহা দেখিয়া খুবই পছন্দ করিলেন ও সন্তোষ প্রকাল করিলেনে। অতঃপর আমি উহাকে খুরাসানের হাদীসবিদদের খেদমতে পেশ করিলাম। তাঁহারাও ইহাকে অত্যন্ত পছন্দ করেন, সন্তোষ প্রকাশ করেন।[********************]

ইমাম তিরমিযী তাঁহার এই  গ্রন্হখানি সম্পর্কে নিজেই এক অতি বড় দাবি পেশ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

যাহার ঘরে এই কিতাবখানি থাকিবে, মনে করা যাইবে যে, তাঁহার ঘরে স্বয়ং নবী করীম (স) অবস্থান করিতেছেন ও নিজে কথা বলিতেছেন।[********************]

বস্তুত হাদীসগ্রন্হ-বিশেষত সহীহ হাদীসসমূহের কিতাবের ইহাই সঠিক মর্যাদা এবং ইহা কেবলমাত্র তিরমিযী শরীফ সম্পর্কেই সত্য নহে, সকল সহীহ হাদীসগ্রন্হ সম্পর্কেই একথা প্রযোজ্য ও অকাট্য সত্য।

তিরমিযী শরীফ সাধারণ পাঠকদের জন্য একখানি সুখপাঠ্য ও সহজ বোধ্য হাদীসগ্রন্হ। শায়খুল ইসলাম আল হাফেজ ইমাম আবূ ইসমাঈল আবদুল্লাহ আনসারী (মৃঃ ৪৮১ হিঃ) তিরমিযী শরীফ সম্পর্কে এক আলোচনা প্রসঙ্গে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমার দৃষ্টিতে তিরমিযী শরীফ বুখারী ও মুসলিম গ্রন্হদ্বয় অপেক্ষা অধিক ব্যবহারোপযোগী। কেননা বুখারী ও মুসলিম এমন হাদীসগ্রন্হ যে, কেবলমাত্র বিশেষ পারদর্শী আলেম ভিন্ন অপর কেহই তাহা হইতে ফায়দা লাভ করিতে সমর্থ হয় না। কিন্তু ইমাম আবূ ঈসা তিরমিযীর গ্রন্হ হইতে যে কেহ ফায়দা গ্রহণ করিতে পারে।[********************]

ইমাম তিরমিযী হইতে তাঁহার এই গ্রন্হখানি যদিও শ্রবণ করিয়াছেন বহু সংখ্যক লোক; কিন্তু উহার বর্ণনা পরম্পরা অব্যহত ও ধারাবাহিকভাবে চলিয়াছে মোট ছয়জন বড় বড় মুহাদ্দিস হইতে।[********************]

উপরে মোট পাঁচখানি প্রধান হাদীসগ্রন্হ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হইয়াছে। বিশ্বের হাদীসবিদ বড় বড় আলেমগণ এই পাঁচখানি হাদীসগ্রন্হের শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশিষ্টতা অকপটে ও উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করিয়াছেন এবং এই পর্যায়ে কাহারো কোন মতভেদ দেখা দেয় নাই। হাফেজ আবূ তাহের সলফী (মৃঃ ৫৭৬ হিঃ) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সকল হাদীসবিদ আলিমগণ এই পাঁচখানি গ্রন্হের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ একমত।[********************]

ষষ্ঠ গ্রন্হ কোনখানি?

কিন্তু এই পাঁচখানি গ্রন্হের পর ষষ্ঠ মর্যাদার গ্রন্হ যে কোনখানি তাহা লইয়া মুহাদ্দিসগণের মধ্যে মতভেদের সৃষ্টি হইয়াছে।[********************] প্রাথমিক পর্যায়ের মুহাদ্দিসগণ এবং শেষ পর্যায়ের অনেক হাদীসবিদই প্রধান হাদীস গ্রন্হ হিসাবে উপরোক্ত পাঁচাখানিকেই গণ্য করিয়াছেন। কিন্তু শেষ পর্যায়ের (মুতায়াখখেরীন) মুহাদ্দিসদের মধ্যে কেহ কেহ ইহার বিপরীত মত প্রকাশ করিয়াছেন। এই ছয়খানির মধ্যে ষষ্ঠ গ্রন্হ লইয়াও যথেষ্ট মতভেধ রহিয়াছে। কাহারো মতে সিহাহ সিত্তার ষষ্ঠ গ্রন্হ হইতেছে ইবনে মাজাহ শরীফ, আবার কাহারো মতে মুয়াত্তা ইমাম মালিক। কিন্তু এই পর্যায়ের হাদীসবিদদের দৃষ্টিতে ‘মুয়াত্তা’র তুলনায় ‘ইবনে মাজাহ’ অনেক উন্নত ও জনসাধারণের পক্ষে ব্যবহারোপযোগী। বিধায় ইহাই হইতেছে সিহাহ-সিত্তার ষষ্ঠ গ্রন্হ। হাফেজ আবুল ফযল ইবনে তাহের  মাখদাসী (মৃঃ ৫০৭ হিঃ) সর্বপ্রথম সিহাহ-সিত্তার ষষ্ঠ গ্রন্হ হিসাবে ‘ইবনে মাজাহর’ নাম ঘোষণা করেন।[********************] অতঃপর হাফেজ আবদুল গনী আলমাকদাসী ও এই কথাই মানিয়া লন।[********************] মুহাদ্দিস আবুল হাসান সনদী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

শেষ পর্যায়ের অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মত এই যে, ইবনে মাজাহ শরীফ-ই সিহাহ-সিত্তার ষষ্ঠ গ্রন্হ।[********************]

কোন কোন মুহাদ্দিস সুনানে ইবনে মাজাহ অপেক্ষা সুনানে দারেমীকে অধিকতর উন্নত ও দোষমুক্ত হাদীসগ্রন্হ বলিয়া মনে করেন। তাঁহারা সিহাহ-সিত্তার ষষ্ঠ গ্রন্হ হিসাবে উহার নাম পেশ করিয়াছেন। কিন্তু এই সব কথার কোনটিই গ্রহণযোগ্য নয়। সুনানে ইবনে মাজাহ যেকোন দিক দিয়াই মুয়াত্তা ও সুনানে দারেমী অপেক্ষা উন্নত। তাই এই ষষ্ঠ গ্রন্হ হিসাবে সুনানে ইবনে মাজাহই উল্লেখযোগ্য। ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লিকান (মৃঃ ৬৮১ হিঃ) ইবনে মাজাহ সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তাঁহার হাদীস গ্রন্হখানি সিহাহ-সিত্তার অন্যতম।[********************]

সুনানে ইবনে মাজাহ

সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীসের একখানি বিশেষ মূল্যবান গ্রন্হ। ইমাম ইবনে মাজাহ প্রণয়ন কার্য সমাপ্ত করিয়া উহাকে যখন তাঁহার উস্তাদ ইমাম আবূ যুরয়ার নিকট পেশ করিলেন, তখন উহা দেখিয়া তিনি বলিলেনঃ

******************************************************

আমি মনে করি, এই কিতাবখানি লোকদের হাতে পৌঁছিলে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রণীত সমস্ত বা অধিকাংশ হাদীসগ্রন্হই অপ্রয়োজনীয় হইয়া যাইবে।[********************]

বস্তুত ইমাম আবূ যুরয়ার এই ভবিষ্যদ্বাণী সার্থক ও সত্য প্রমাণিত হইয়াছে। এই গ্রন্হখানি দুইটি দিক দিয়া সমস্ত সিহাহ-সিত্তা গ্রন্হাবলীর মধ্যে বিশিষ্ট মর্যাদার অধিকারী। প্রথম, উহার রচনা, সংযোজন, সজ্জায়ন ও সৌকর্য। উহাতে হাদীসসমূহ এক বিশেষ সজ্জায়ন পদ্ধতিতে ও অধ্যায় ভিত্তিতে সাজানো হইয়াছে, কোথাও পুনারাবৃত্তি ঘটে নাই। অপর কোন কিতাবে কোন কিতাবে এই সৌন্দর্য দেখিতে পাওয়া যায় না। ইহা তৎপূর্বকালীন প্রায় সকল হাদীস গ্রন্হকেই জনপ্রিয়তা দিক দিয়া ম্লান করিয়া দিয়াছে। মুহাদ্দিস শাহ আবদুল আযীয দেহলভী (র) ‘ইবনে মাজাহ’ গ্রন্হের উচ্চ প্রশংসা করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

প্রকৃতপক্ষে সজ্জায়ন-সৌন্দর্য ও পূনারাবৃত্তি ব্যতীত হাদীসসমূহ একের পর এক উল্লেখ করা এবং এবং তদুপরি সংক্ষিপ্ত প্রভৃতি বিশেষত্ব এই কিতাবে যাহা পাওয়া যায়, অপর কোন কিতাবে তাহা দূর্লভ।[********************]

হাফেজ ইবনে কাসীর (র) ইবনে মাজাহ প্রণীত গ্রন্হটি সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

ইহা অত্যন্ত কল্যাণপ্রদ গ্রন্হ, ফিকাহর দৃষ্টিতে উহার অধ্যায়সমূহ খুবই সুন্দর ও মজবুত করিয়া সাজানো হইয়াছে।[********************]

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী বলিয়াছেনঃ

******************************************************

ইমাম ইবনে মাজাহর সুনান গ্রন্হ অত্যন্ত ব্যাপক হাদীস সমন্বিত এবং উত্তম।[********************]

এই গ্রন্হের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য এই যে, ইহাতে এমন সব হাদীস উল্লিখিত হইয়াছে, যাহা সিহাহ-সিত্তার অপর কোন গ্রন্হে উল্লিখিত হয় নাই। এই কারণে ইহার ব্যাবহারিক মূল্য অন্যান্য গ্রন্হাবলীর তুলনায় অনেক বেশি। আল্লামা আবুল হাসান সনদী বলিয়াছেনঃ

******************************************************

এই গ্রন্হকার ইহাতে হযরত মুয়ায ইবনে জাবালের রীতি অনুসরণ করিয়াছেন। অনেক কয়টি অধ্যায় তিনি এমন সব হাদীস উদ্ধৃত করিয়াছেন, যাহা অপর প্রখ্যাত পাঁচখানি সহীহ গ্রন্হে পাওয়া যায় না।[********************]

‘হযরত মুয়াযের রীতি অনুসরণ করার’ অর্থ এই যে, হযরত মুয়ায (রা) প্রায়ই এমন সব হাদীস বর্ণনা করিতেন, যাহা অন্যান্য সাহাবীর শ্রুতিগোচর হয় নাই। ইমাম ইবনে মাজাহ তাঁহার গ্রন্হে অন্যান্য গ্রন্হের মোকাবিলা এইরূপ অনেক হাদীস এককভাবে বর্ণনা করিয়াছেন। আল্লামা আবূল হাসান সনদী বলেনঃ – ******************** ‘হযরত মুয়ায লোকদিগকে অধিক ফায়দা দানের উদ্দেশ্যে এই কাজ করিতেন’।[********************]

সুনানে ইবনে মাজাহ ইমাম মুহাদ্দিস আবূ যুরয়ার উক্তি এই প্রসঙ্গে আলোচনার সূচনায়ই উল্লিখিত হইয়াছে। আবূ যুরয়া এই গ্রন্হখানিকে খুবই পছন্দ করিয়াছেন তাহা নিঃসন্দেহ; কিন্তু ইহাতে তাঁহার দৃষ্টিতে যতটুকু ক্রটি ধরা পড়িয়াছে তাহাও তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করিয়াছেন। এই সম্পর্কে আবূ যুরয়ার উক্তি উদ্ধৃত করিয়া বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

ইমাম আবূ যুরয়া বলিয়াছেনঃ আমি আবূ আবদুল্লাহ ইবনে মাজাহর হাদীস-গ্রন্হ অধ্যয়ন করিয়াছি। কিন্তু উহাতে খুব অল্প হাদীসই এমন পাইয়াছি যাহাতে কিছুটা ক্রটি রহিয়াছে। ইহা ছাড়া আর কোন দোষ আমি পাই নাই। অতঃপর এই পর্যায়ে তিনি প্রায় দশটির মত হাদীসের উল্লেখ করিলেন।[********************]

(যদিও এই উক্তির সনদ সম্পর্কে হাদীস-বিজ্ঞানিগণ আপত্তি তুলিয়াছেন।)

সে যাহাই হউক, ইমাম ইবনে মাজাহ অপরিসীম শ্রম-সাধনা এবং যাচাই-বাছাইর পর এই গ্রন্হখানির প্রণয়নকার্য সম্পন্ন করেন। লক্ষ-লক্ষ হাদীস হইতে বাছাই করিয়া চার হাজার হাদীসকে বিভিন্ন অধ্যায়ে সাজাইয়া দিয়াছেন। কিন্তু সিহাহ-সিত্তার অপর পাঁচখানি গ্রন্হের তুলনায় ইহাতে যয়ীফ হাদীসের সংখ্যা বেশী হওয়ার কারণে ছয়খানি হাদীসগ্রন্হের মধ্যে উহার স্থান সর্বশেষে। মুহাদ্দিস সনদী বলিয়াছেনঃ

******************************************************

যাহাই হউক, মর্যাদা ও সম্মানের দিক দিয়া ইবনে মাজাহর গ্রন্হ অপর পাঁচখানি গ্রন্হের নীচেও পরে অবস্থিত।[********************]

এমনকি উহা আবূ দাউদ ও সুনানে নাসায়ীরও পরেই গণ্য। আল্লামা মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম বলিয়াছেনঃ

******************************************************

সুনানে ইবনে মাজাহ আবূ দাউদ ও সুনানে নাসায়ীর পরে গণ্য হইবে।[********************]

কিন্তু ইহার অর্থ এই নয় যে, অপর পাঁচখানি হাদীসগ্রন্হে উদ্ধৃত প্রত্যেকটি হাদীসও বুঝ এককভাবে ইবনে মাজাহর বর্ণিত প্রত্যেকটি হাদীস অপেক্ষা উন্নত ও বিশুদ্ধতায় অগ্রগণ্য। কেননা ইবনে মাজাহ গ্রন্হে এমন সব হাদীসও উদ্ধৃত হইয়াছে, যাহা সহীহ বুখারীর হাদীসসমূহ অপেক্ষা অধিক সহীহ।

সুনানে ইবনে মাজাহ মোট ৩২টি পরিচ্ছেদ পনেরো শত অধ্যায় এবং চার হাজার হাদীস উদ্ধৃত রহিয়াছে।[********************]

ইবনে মাজাহ গ্রন্হে প্রধানত চারজন বড় মুহাদ্দিস ধারাবাহিক বর্ণনা পরম্পরা সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন। তাঁহারা হইতেছেনঃ

১। আবূল হাসান ইবনে কাত্তান

২। সুলাইমান ইবনে ইয়াযীদ

৩। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবনে ঈসা

৪। আবূ বকর হামেদ আযহারী।

 

About মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম