হাদীস সংকলনের ইতিহাস

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

Picture5

হাদীস সংকলনের ইতিহাস

মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রহ)


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

চলমান পেজের সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

পূর্ব –কথা

ইসলামী জীবন বিধান তত্ত্ব ও তথ্যগতভাবে দুইটি মৌল বুনিয়াদের উপর স্থাপিতঃ একটি পবিত্র কুরআন, অপরটি রাসূলের হাদীস। পবিত্র কুরআন ইসলামের একটি মৌল কাঠামো উপস্থাপন করিয়েছে আর রাসূলের হাদীস সেই কাঠামোর উপর একটি পূর্ণাঙ্গ ইমারত গড়েয়া তুলিয়াছে। তাই ইসলামী জীবন বিধানে পবিত্র কুরআনের পরই রাসূলের হাদীসকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হইয়াছে। হাদীসেই ইসলামী জীবন-বিধানের বিস্তৃত রূপরেখার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এই কারণে পবিত্র কুরআনের শিক্ষা ও মর্ম উপলদ্ধি এবং তদনুসারে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ গঠনের জন্য হাদীসের বিকল্প আর কিছুই হইতে পারে না।

পবিত্র কুরআনের শিক্ষানুসারে রাসুলে আকরাম (স)- এর জীবন ও কর্মধারা মুসলমানদের জন্য ‘উসয়ায়ে হাসানাহ’ বা সর্বোত্তম আদর্শ। মুসলমানদের জীবন. সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির সকল অঙ্গনেই এই আদর্শের পরিধি বিস্তৃত। এই আদর্শের সঠিক ও নির্ভূল বিবরণ সংরক্ষিত রহিয়াছে হাদীসের বিশাল ভাণ্ডারে। কাজেই প্রকৃত মুসলিম রূপে জীবন যাপন ও সর্বতোভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য হাদীসের ব্যাপকতর অধ্যয়ন এবং ইহার বিশুদ্ধতা ও প্রমাণিকতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানার্জন করা একান্তই আবশ্যক। হাদীস সম্পর্কে জ্ঞানার্জন না করা প্রকৃতপক্ষে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ থাকারই নামান্তর।

দুঃখের বিষয় যে, মুসলমানদের জীবনকে রাসূলে আকরাম (স)-এর জীবন ও কর্মধারা হইতে বিচ্ছিন্ন করা এবং ইসলামকে একটি নিস্প্রাণ ও স্থবির ধর্মে পরিণত করার লক্ষ্যে হাদীসের প্রামাণিকতা ও বিশুদ্ধতা এবং ইহার সঙ্কলন ও সংরক্ষণ সম্পর্কে একটা সন্দেহের ধূম্রজাল সৃষ্টির অপচেষ্টা চলিয়া আসিতেছে সুদীর্ঘকাল হইতে। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের সোনালী যুগের অবসানের পর ম’তাজেলা সম্প্রদায়ের উত্থানের মধ্য দিয়েই এই অপচেষ্টা শুরু হইয়াছে এবং পরবর্তীকালে ‘কুরআনপন্হী’র মুখোশ পরিয়া হাদীস-অবিশ্বাসীদের একটি গোষ্ঠি বিভিন্ন সময়ে মুসলমানদের মধ্যে সুকৌশলে বিভ্রান্তি সৃষ্টির এই হীন প্রয়াস চালাইয়াছে।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এই উপমহাদেশেও অনুরূপ একটি চক্রান্তকারী মহল হাদীস বিরোধী এক প্রচণ্ড অভিযান শুরু করিয়াছিল। তাহারা হাদীসের সংকলন, লিপিবদ্ধকরণ ও সংরক্ষণ সম্পর্কে নানা অবান্তর প্রশ্ন তুলিয়া ইহার প্রামাণিকতা ও বিশুদ্ধতা সম্পর্কে মুসলিম জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াইতে চাহিয়াছিল। দুঃখের বিষয় যে, তৎকালীন পাকিস্তানের দায়িত্বশীল ও প্রশাসনিক পর্যায়ের কিছু সংখ্যক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিও সরকারী ক্ষমতার পক্ষপুটে থাকিয়া এই ষড়যন্ত্রকে ইন্ধন যোগাইয়াছিল।

এই সর্বনাশা চক্রান্তের মুকাবিলার লক্ষ্যেই এই ভূখণ্ডের বিশিষ্ট হাদীস-বিশেষজ্ঞ শায়খুল ইসলাম হযরত আল্লামা মুহাম্মদ আবদুর রহীম ষাটের দশকের প্রথমভাগে ‘হাদীস সংকলনের ইতিহাস ‘ শীর্ষক এই বিশাল গ্রন্হখানি প্রণয়ন করিয়াছেন।

প্রায় অর্ধ যুগের ব্যাপক অধ্যয়ন ও গবেষনার ফসল এই মূল্যবান গ্রন্হে হাদীসের সংকলন, লিপিবদ্ধকরণ ও সংরক্ষণ এবং হাদীস শাস্ত্রের ইতিহাস সম্পর্কে হাদীস-বিরোধীদের সকল কূট প্রশ্নেরই তিনি বিস্তৃত ও পুংখানুপুংখ জওয়াব দিয়াছেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সহিত এতৎসম্পর্কিত যাবতীয় শোবাহ-সন্দেহের অপনোদন করিয়াছেন। আল্লাহর অশেষ শোকর যে, গ্রন্হটি ইতিমধ্যেই বাংলা ভাষায় হাদীস চর্চার ক্ষেত্রে অপরিহার্য পাঠ্যপুস্তকের মর্যাদা লাভ করিয়াছে।

বিগত ২৬ বৎসরে এই অনন্য গ্রন্হটির পাঁচটি সংস্করণ প্রকাশিত হইয়াছে। ইহার প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হইয়াছিল জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমী হইতে-১৯৭০ সনে। বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর ১৯৮০ হইতে ১৯৯২ সন পর্যন্ত ইহার তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম সংস্করণ প্রকাশিত হইয়াছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর সৌজন্যে। প্রকাশনার এই ধারাবাহিকতা হইতে নিঃসন্দেহে গ্রন্হটির অসাধারণ জনপ্রিয়তাই প্রতিভাত হইয়াছে। এক্ষণে মওলানা আবদুর রহীম রচনাবলী প্রকাশনার দায়িত্বে নিয়োজিত ‘খায়রুন প্রকাশনী’ গ্রন্হটির সুষ্ঠ প্রকাশনা ও বাজারজাতকরণের সার্বিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত ইহার পূর্বোকার সংস্করণের মুদ্রণ-প্রমাদগুলি সংশোধনের জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, গ্রন্হের এই সংস্করণটি বিদগ্ধ পাঠক সমাজে অধিকতর সমাদর লাভ করিবে।

মহান আল্লাহ এই অনন্য দ্বীনী খেদমতের জন্যে গ্রন্হকারকে জান্নাতুল ফিরদৌস নসীব করুন, ইহাই আমাদের সানুনয় প্রার্থনা।

মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান

চেয়ারম্যান

মওলানা আবদুর রহীম ফাউন্ডেশন

ঢাকাঃ আগস্ট, ১৯৯৭

ভূমিকা

মানব প্রকৃতির স্বভাবতই দুইটি পরস্পর-বিরোধী ভাবাধারা বিদ্যমান। একটি অপরের আনুগত্য স্বীকার করা আর দ্বিতীয়টি অন্য লোককে নিজের অনুগত বানাইয়া লওয়া। [Instincts of submission and gregariousness] অন্য কথায়, আনুগত্য স্বীকার ও আধিপত্য বিস্তার এই দুইটি গুণই মানুষের স্বভাবগত এবং এই গুণ দুইটি মানুষের মধ্যে সাধারণত প্রায় সমান মাত্রায় বিদ্যমান। মানুষের প্রকৃতি এক দিকে যেমন তাহাকে অপর লোকের উপর আধিপত্য বিস্তারের জন্য উদ্যোগী করিয়া তোলে, অপর দিকে ঠিক অনুরূপভাবেই তাহাকে অপর শক্তির নিকট আনুগত্যের মস্তক অবনমিত করিতে বাধ্য করে। যে লোক দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের উপর আধিপত্য বিস্তার করিয়া আছে, তাহাকেই দেখা যাইবে অপর কোন উচ্চতর বৃহত্তর শক্তির সম্মুখে অবনমিত মস্তকে। প্রভাব বিস্তার ও আনুগত্য স্বীকার এই উভয়বিধ ভাবধারাই মানুষের প্রকৃতি নিহিত বলিয়া মানুষ সমাজ জীবন যাপন করিতে ও বহু মানুষের সহিত মিলিত হইয়া সামাজিক দায়িত্ব পালন করিতে সক্ষম। এই ভাবধারা না থাকিল না সমাজ গড়িয়া উঠিতে পারিত, না সমাজের উপর মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে পারিত কোন রাষ্ট্রের প্রাসাদ।

মানব-প্রকৃতি ও মনস্তত্ত্বের গভীরতর অনুশীলনের ফলেই এই তত্ত্বের যথার্থ তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব। মানব-প্রকৃতি নিহিত এই দুই বিপরীতমূখী ভাবধারা যেমন অপ্রয়োজনীয় নয়, তেমনি নয় কোন দূষনীয়। সকল প্রকার স্বাভাবিক ভাবধারা, প্রবণতা ও আবেগ-উচ্ছাসের একটি স্বভাবসম্মত সীমা নির্দিষ্ট রহিয়াছে এবং সেই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকিলেই তাহা মানূষের জন্য কল্যাণকর হইতে পারে।

আনুগত্য ও প্রভাব বিস্তারের এই ভাবধারা কালভিত্তিক ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে বহুর সঙ্গে এক-এর সম্পর্কে-সম্বন্ধ ও যোগাযোগ সৃষ্টি করে। এই ভাবধারার প্রবাহ শুষ্ক ও স্তব্ধ হইয়া গেলে সভ্যতার অগ্রগতি ব্যাহত হইতে এবং জীবন-যন্ত্র বিকল হইয়া পড়িতে বাধ্য। দুনিয়ার কোন মতাদর্শ ও চিন্তাধারাই এই কারণে সম্পূর্ণ অভিনব ও অপূর্ব হইতে পারে না, বাহ্য দৃষ্টিতে তাহা যতই ‘আনকোরা’ ও ‘নতুন’ বলিয়া মনে হউক না কেন। বরং একটৃ সন্ধনী দৃষ্টিতে বিচার করিলেই উহার প্রত্যেকটির মূল শিকড় অতীতের গভীর তলদেশে খুজিঁয়া পাওয়া যাইবে। গবেষণা ও অনুসন্ধানের প্রতিভা সূক্ষ্ম ও ব্যাপক হইলে অতীতের অন্ধকারাচ্ছন্ন গর্তে প্রবাহমান এক চিরন্তন জীবন ঝর্ণার ফল্গুধারা লক্ষ্য করা কিছুমাত্র কঠিন নহে। বিজ্ঞানের কোন আবিষ্কারই এমন নহে, যাহার বীজ পূর্ববর্তী কোন আবিষ্কার-উদ্ভাবনীর ক্ষেত্রে হইতে সঞ্চারিত নয়। সভ্যতা সংষ্কৃতি এই উত্তুংগ প্রাসাদ আদিম প্রাচীনত্বের ধ্বংসস্তূপের উপরই দণ্ডায়ামন, তাহাতে সন্দেহ নাই।

এই কারণে দুনিয়ার কোন সংস্কৃতিবান জাতিই স্বীয় অতীতের সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া দীর্ঘকাল বাচিঁয়া থাকিতে পারে না। অতীতকাল জাতিকে একটি দৃঢ় ভিত্তিই দেয় না, ভবিষ্যতের চলার পথে দান করে বহুবিধ বাস্তব অভিজ্ঞতা-সঞ্জাত জ্ঞান-পাথেয়। অতীতের ভূল-ভ্রান্তি, পদস্থলন ও ঘাত –প্রতিঘান তাহাকে অধিকতর সতর্ক করিয়া তোলে। কিন্তু সেই জন্য জাতির মধ্যে নিরপেক্ষ ও উদার মননশীলতা এবং উপদেশ গ্রহণের অনুকূল মানবিক অবস্থা বর্তমান থাকা একান্তই আবশ্যক। ইতিহাস অধ্যয়নের গুরুত্ব এই দৃষ্টিতেই অনুধাবনীয়। ইহার সাহায্যে অতীতকে বর্তমানের পাশাপাশি স্হাপন করিয়া পারস্পরিক যাচাই ও তুলনা করা এবং উহা হইতে অর্জিত জ্ঞান-আলোকে অজ্ঞাত ভবিষ্যতের তিমিরাচ্ছন্ন দিগন্তকে উদ্ভাসিত করিয়া তোলা প্রত্যেক জাতির পক্ষেই সহজ।

উপরন্তু একটি জাতির ইতিহাস কেবল সেই জাতির জন্য। নয়, দুনিয়ার সকল মানব জাতির জন্যই তাহা অমূল্য সম্পদ। এই কারণে কুরআন মজীদ সংক্ষিপ্তভাবে হইলেও বহু প্রাচীন জাতির ইতিহাস উল্লেখ করে এবং সেইসব জাতির উত্থান-পতন ও কল্যাণ-অকল্যাণের মর্মস্পশী কাহিনী হইতে এক নির্ভুল ইতিহাস-দর্শন গড়িয়া তোলে। ফলে কুরআন সকল যুগের মানুষের জন্য কল্যাণ পথের দিশারী। কিন্তু ইহার কার্যকারিতা নির্ভর করে ঘটনার যথার্থতা, সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার উপর। এই গুণাবলী সঠিকভাবে অর্জিত হইলে আজিকার মানুষও  তাহা হইতে যেমন সঠিক পথের নির্দেশ লাভ করিতে পারে, তেমনি পারে ভবিষ্যতের দুর্গম পথে চলিবার বিপুল উদ্যম ও প্রেরণা লাভ করিতে।

মানুষের কল্যাণকামী ব্যক্তিদের বিভিন্ন শ্রেণী রহিয়াছে। তন্মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বাধিক উন্নতমানের কল্যাণকামী লোক হইতেছেন আল্লাহর প্রেরিত আম্বিয়ায়ে কিরাম। তাঁহারাই বিশ্বমানবতার উজ্জ্বলম আদর্শ। তাহারা সকল প্রকার পাপ-ক্রটি ও গুনাহ-নাফরমানীর কলুষতা হইতে চিরমুক্ত। তাঁহাদের চিন্তাধারা, দৃষ্টিকোণ, কথা ও কাজ-সবকিছুই সরাসরিভাবে আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। অতএব তাঁহারা সাধারণ মানুষের নিকট কেবল ভক্তি-শ্রদ্ধা পাওয়ারই যোগ্য পাত্র নহেন, আকীদা ও বিশ্বাস হইতে শুরু করিয়া জীবনের সকল পর্যায়ের সকল প্রকার কাজে ও কর্মে বাস্তবভাবে অনুসৃত হইবার যোগ্য।

সকল নবীই একই নূরানী কাফেলার অগ্রপথিক, একই মূলনীতি ও আদর্শভিত্তিক জীবন-ব্যবস্থার উদগাতা এবং প্রচারক; একই দ্বীনের প্রবর্তন। মানব-প্রকৃতিও চিরন্তনভাবে অভিন্ন ও অপরিবর্তনীয়। এই কারণে মানুষের প্রয়োজনীয় পথ-নির্দেশ এবং উহার মৌলিক ভাবধারা ও চূড়ান্ত আদর্শও অভিন্ন, চিরন্তন এবং অপরিবর্তনীয়। এই মৌলিক শাশ্বত আদর্শের নাম ‘দ্বীন’। আর দ্বীন-ইসলাম এই কারণেই বিম্ভমানবের জন্য চূড়ান্তভাবে প্রবর্তিত এক অখণ্ড জীবন বিধান। হযরত আদম (আ) হইতে শেষ নবী মুহাম্মদ (স) পর্যন্ত সকল নবীই দ্বীন ইসলামের বাহক প্রচারক ও প্রতিষ্ঠাকামী। নবী আগমনের ধারাবাহিকতায় হযরত মুহাম্মদ (স) সর্বশেষ পর্যায়। আল্লাহ তাঁহাকে যেমন সকলের শেষে প্রেরণ করিয়াছেন, তেমনি তাহাকে ধারণাতীতভাবে সামগ্রিক পূর্ণত্বও দান করিয়াছেন। মানবীয় গুণের দিক দিয়া যেমন, নবুওয়্যাতের যোগ্যতায়ও তিনি ছিলেন তেমনই এক অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। আল্লাহ তাহাকে উত্তরকালে সকল স্তরের ও সকল দিক ও ক্ষেত্রের জন্য উজ্জ্বলতর নিদর্শনরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন। তাঁহার প্রতি অবতীর্ণ শরীয়াত চিরকালের, সমগ্র মানুষের এবং ইহকাল-পরকাল উভয় ক্ষেত্রের সার্বিক কল্যাণ লাভের একমাত্র নিয়ামক। সময় ও স্থানের পরিধি বা আবর্তন-বিবর্তন উহাকে স্পর্শ করিতে অক্ষম। এই কারণে নবুয়্যাত তাহাতেই চূড়ান্তভাবে পরিণতি লাভ করিয়াছে। আর এই কারণেই তিনি ‘খাতামুন-নাবিয়্যীন, ‘রাহমাতুললিল আলামীন’।

পূর্বেই বলিয়াছি রাসূলে করীম (স) মানব জাতির জন্য এক পরিপূর্ণ আদর্শ। মানব জীবনের কোন একটি দিক বা একটি কাজ এমন নাই- হইতে পারে না- যে সম্পর্কে রাসূলে করীমের নিকট হইতে পথ-নির্দেশ লাভ করা যায় না। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবন, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক জীবন, পারস্পররিক লেন-দেন, সম্পর্ক সম্বন্ধ স্থাপন, আত্মীয়তা-শক্রতা, শিক্ষাদীক্ষা, দেশ শাসন ও ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক- যুদ্ধ ও সন্ধি- সবকিছু সম্পর্কেই সুস্পষ্ট আদর্শ বিদ্যমান রহিয়াছে রাসূলে করীম (স)-এর জীবনে।

রাসূলে করীম (স) ইসলামী আদর্শ প্রচার ও উহার প্রতিষ্ঠা প্রচেষ্টার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছেন। এইজন্য তাহাকে পরিচালনা করিতে হইয়াছে এক সর্বাত্মক সাধনা, এক ক্ষমাহীন অভিযান। ইহা কোন সহজসাধ্য কাজ নহে। ইহা যদি কেবল চিন্তার সূক্ষ্ম জাল রচনা কিংবা বাণীর যাদুমন্ত্র সৃষ্টির দ্বারাই স্মভব হইত, তাহা হইলে চিন্তা ও কল্পনার নির্লিপ্ত প্রশান্তির আসনে অধরূঢ় দার্শনিকদের দ্বারাই মন ও জীবনে অনুরূপ বিপ্লব সৃষ্টি সম্ভব হইত, সম্ভব হইত মৃত জাতির পুনর্গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনার দুরূহ কাজ। এই কাজ প্রকৃতপক্ষে নিয়ন্ত্রণ ও পথ-নির্দেশের মাধ্যমেই অতিবাহিত হয় একজন নবীর জীবন। আর ‘নবুওয়্যাত’ কোন উপার্জনযোগ্য বস্তু নহে, উত্তরাধিকারসূত্রে লভ্য কোন সম্পদও ইহা নয়। ইহা একান্তভাবে আল্লাহর দান। ইহাকে যাহারা সম্পূর্ণত কিংবা আংশিক উপার্জনযোগ্য বলিয়া মনে করে, তাহারা কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণার বিপরীত ধারণা পোষণ করে। আল্লাহ তা’য়ালা স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করিয়াছেনঃ

اللَّهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلًا وَمِنَ النَّاسِ আল্লাহ মানুষ ও ফেরেশতাদের মধ্য হইতে নিজেই রাসূল বাছাই ও মনোনীত করেন। (সূরা আল-হাজ্জ, আয়াতঃ ৭৫)

اللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ

আল্লাহ তাহার নবুওয়্যাত ও রিসালাত কোথায় কাহার প্রতি সংস্থাপন করিবেন, তাহা ততিন সকলের অপেক্ষা অধিক জানেন। (সূরা আন’আম, আয়াতঃ ১২৩)

এই কারণে নবী- আর আমাদের জন্য সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স)-ই চিরন্তন ও পরিপূর্ণ আদর্শ। জীবনের সকল ক্ষেত্রেই অনুসরণীয়। তাহার মাধ্যমে যে মহান পবিত্র কিতাব-কুরআন মজীদ- আমরা লাভ করিয়াছি, তাহাও যেমন আমাদের জন্য এক অক্ষয় আদর্শ, তেমনি তাহার কথা, কাজ ও সমর্থনের সমন্বয়ে গঠিত সুন্নাতও এক চির উজ্জ্বল দীপ-শিখা। আর ইহাই হইতেছে হাদীসের দার্শনিক ভিত্তি। ইহার উপর রচিত হয় ইসলামী জীবন বিধানের সর্বকালীন প্রাসাদ।

আজ হইতে চৌদ্ধশথ বৎসর পূর্বে আরবের সরজমীনে যে সভ্যতার ভিত্তি স্থাপিত হইয়াছিল, উহাতে সার্বভৌমত্যের একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন আল্লাহ তা’য়ালা এবং উহার নেতৃত্বের আসনে সমাসীন ছিলেন সর্বষশষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স)। কিন্তু এই সভ্যতা যেহেতু কেবল একচি দেশ ও একটি যুগের জন্যই ছিল না, উুহা ছিল বিশ্বের সকল দেশ, সকল সমাজ ও জাতি এবং সকল যুগের নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের জন্য স্থায়ী ও কল্যাণকর, এই কারণে সভ্যতার মূল ভিত্তিদ্বয়-আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও রাসূলের নেতৃত্বকে চিরন্তন সব্যরূপে শাশ্বত ও চিরন্তন করিয়া রাখার উদ্দেশ্যে বিশ্ব মানবতার নিকট দুইটি বিকল্প ব্যবস্থা সংরক্ষিত করা হয়। এই দুইটি ব্যবস্থঅ হইতেছে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতীক কুরআন মজীদ এবং রাসূলের একচ্ছত্র নেতৃত্বের বাস্তব রূপ ‘সুন্নাত’। এই দু্ইটির মাধ্যমে আল্লাহর বিধান রাসূলের আদর্শ তথা ইসলাম মানব সমাজে চিরন্তন সত্য ও চিরন্তন ব্যবস্থা হইয়া থাকিতে পারে, পারে দেশের সকল কালের জাতির মানুষ এই দুইটি স্থায়ী বুনিয়াদের ভিত্তিতে নতুন নতুন সমাজ ও সভ্যতা গড়িয়ে তুলিতে। এই কারণেই কুরআন মজীদ যেমন আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে অক্ষুণ্ন ও অপরিবর্তিতভাবে সংরক্ষিত হইয়াছে এবং বর্তমানেও মজুদ রহিয়াছে, ঠিক অনুরূপভাবে ধ্বংস ও বিলুপ্তির করাল গ্রাস হইতে রক্ষা করিয়া রাখা হইয়াছে রাসূলে করীমের আদর্শকে-সুন্নত বা হাদীসকে।

বস্তুত দেড় সহস্র বৎসরকালীন মুসলিম জাতি ইসলামের ভিত্তি হিসাবে কুরআন মজীদের সঙ্গে সঙ্গে হাদীসকেও স্বীকার করিয়া লইয়াছে এবং এই ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে অতীতকাল হইতে কোনরূপ মতভেদ সৃষ্টি হওয়া তো দূরের কথা, কোন কালের কোন মুসলমান একবিন্দু সন্দেহ কখনো পোষণ করন নাই। উপরন্তু কোন লোক যদি এই দুইটি ভিত্তিকে এক সঙ্গে স্বীকার করিতে ও মানিয়া লইতে অসম্মতি প্রদান

করিয়াছেন, মুসলিম সমাজে তাহাকে একবিন্দু স্বীকৃতি দিতেও কান মুসলমান প্রস্তুত হন নাই।

কিন্তু বর্তমানকালে মুসলমানদের মধ্যে এমন এক শ্রেণীর মুষ্টিমেয় লোক যত্রতত্র পরিদৃষ্ট হইতেছে, যাহারা কুরআন মজীদের সঙ্গে সঙ্গে রাসূলের সুন্নাতকে ইসলামের উৎস হিসাবে মানিয়া লইতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করিতেছে। আবার এমন কিছু লোকেরও অস্তিত্ব দেখা যাইতেছে, যাহারা হাদীস যথাসময়ে ও যথাযথভাবে সংরক্ষিত হইয়াছে কিনা, সে সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করিতেছে আর এই বিষয়ে পশ্চিমা পণ্ডিতদের মিথ্যা প্রোপাগান্ডায় প্রভাবান্বিত হইয়া পড়িতেছে। ইহার ফলে মুসলিম সমাজে ইসলামী আদর্শের নিভুলতা, বিশ্বস্ততা, চিরন্তনতা সম্পর্কে কাহারো-কাহারো মনে সন্দেহের উদ্রেক না হওয়াই ছিল অস্বাভাবিক ব্যাপার। অথচ মুসলিম সমাজের ই পুনরুক্থান ও পনর্জাগরণ পর্যায়ে ইসলামী আদর্শের ভিত্তি সম্পকের্ক এইরূপ সন্দেহ বা অবিশ্বাস গোটা জাতির পক্ষেই মারাত্মক হইয়া দেখা দিতে পারে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ‘হাদীস সংকলনের ইতিহাস’ সম্পর্কে ঐতিহসিক বিচার বিশ্লেষণ এবং ইহার স্বপক্ষে প্রামাণিক যুক্তি ও দলিলাদির ভিত্তিতে নিরপেক্ষ গবেষণা পরিচালনা একান্তই অপরিহার্য ছিল।

আরবী এবং উর্দু সাহিত্যে এই পর্যায়ে যথেষ্ট গবেষণা করা হইয়াছে বলা চলে। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে ইহার অভাব ইসলামী সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বাংলাভাষীদের বিশেষ দৈন্যের প্রমাণ। এই অভাব মোচন ও দীনতা বিদূলণ করার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সম্পদ বৃদ্ধি ও উন্নয় ন এবং হাদীস সম্পর্কে যাবতীয় সন্দেহ অপনোদনের উদ্দেশ্যে আমি বিগত চার বৎসরকাল ধরিয়া এই বিষয়ে ব্যাপক অধ্যাপনা ও গভীর গবেষণা চালাইয়া যে ফসল লাভ করিয়াছি, তাহাই অত্র গ্রন্হে সন্নিবেশিত করিয়া বিদগ্ধ পঠকদের সম্মুখে উপস্থাপিত করিয়াছি। ইহা আমার কোন দুঃসাহসিক পদক্ষেপ কিনা তাহা চিন্তাশীল পাঠকদেরই বিচার্য। বাংলা একাডেমীর আনুকূল্য এই বিরাট গ্রন্হ প্রথমবার মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইতেছে দেখিয়াআল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করিতেছি।

মুহাম্মদ আবদুর রহীম

১৭৩, নাখালপাড়া

মুস্তফা মনজিল

…………..১৯৬৫

نضر الله امرء سمع منا شىا

আল্লাহ ধন্য করিবেন সেই ব্যক্তিকে, যে আমার নিকট হইতে কোন কিছু শুনিল এবং উহা যেভাবে শুনিল সেই ভাবেই অপরের নিকট পৌঁছাইয়াদিল। কেননা শ্রোতার অপেক্ষা উহা যাহার নিকট পৌছায় সে-ই উহার অধিক সংরক্ষণকারী হইয়া থাকে। (তিরমিযী)

قَالَ  رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عليه وَسَلَّم نَضَر اللهُ عَبْدًا سَمِعَ مقَالتىْ فَحَفَظَهَا اوْوَ عَاهَا وَاَدَّها وَرَدَّهَا فَرُبَّ حَامِلِ فِقْهِ اَلَى مَنْ هُوَ اَفْقَهٌ مِنْهُ-    (ابو داؤد)

নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ আল্লাহ তা’য়ালা সেই লোকের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল উদ্ভাসিত করিবেন, চিরসবুজ, চিরতাজা করিয়ারাখিবেন, যে আমার কথা শুনিয়া মুখস্থ করিয়া রাখিবে কিংবা স্মৃতিপটে সংরক্ষিত রাখিবে এবং অপর লোকের নিকট তাহা পৌঁছাইবে। জ্ঞানের বহু ধারকই প্রকৃত জ্ঞানী নহে। তবে জ্ঞানের বহু ধারক উহা এমন ব্যক্তির নিকট পৌঁছায়, যে তাহার অপেক্ষা অধিক সমঝদার।                                 (আবূ দাউদ)

হাদীস সংকলনের ইতিহাস

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

হাদীসের সংজ্ঞা ও পরিচয়

কুরআন ও হাদীস ইসলামী জীবন-বিধানের মূল ভিত্তি। কুরআন যেখানে জীবন-ব্যবস্থার মৌলিক নীতি পেশ করে, সেখানে হাদীস হইতে লাভ করা যায় খুটিঁনাটি বিধানের বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও কুরআনী মূলনীতি বাস্তবায়নের কার্যকর পন্হা। কুরআন ইসলামের প্রদীপ স্তম্ভ, হাদীস উহার বিচ্ছুরিত আলোর বন্যা। আলোহীন প্রদীপ যেমন অবাস্তব, হাদীসকে অগ্রাহ্য করিলে কুরআনও তেমনি অর্থহীন হইয়া যায়। কুরআনকে বলা যায় ইসলামের বিরাট বৃক্ষের মূল ও কাণ্ড; হাদীস উহার শাখা ও প্রশাখা। শাখা-প্রশাখাহীন কাণ্ড ও মূল নিষ্ফল আবর্জনা মাত্র। কুরআন যেন ইসলামের জীবন প্রসাদ রচনার পরিকল্পনাসহ ইঞ্জিনিয়ার (রাসূল) প্রেরণের নিয়ম আল্লাহর বিধান নাযিল হওয়ার প্রথম দিন হইতেই কার্যকর। কালের যে-কোন স্তরে, পরিবর্তিত অবস্থার যে-কোন পর্যায়ে মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রাসাদ রচনায় ইঞ্জিনিয়ারের (রাসূলের) ব্যাখ্যা-বিশ্লষণ, বাস্তব কর্মের নির্দেশ, পরামর্শ ও উপদেশকে কখনই উপেক্ষা করা যাইতে পারে না।

ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে কুরআন যেন হৃৎপিণ্ড, আর হাদীস এই হৃৎপিণ্ডের সহিত সংযুক্ত ধমনী। ইসলামের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশাল ক্ষেত্রে এ ধমনী প্রতিনিয়ত তাজা তপ্ত শোণিত ধারা প্রবাহিত করিয়া উহার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে অব্যাহতভাবে সতেজ ও সক্রিয় করিয়া রাখে। হাদীস একদিকে যেমন কুরআনের নির্ভুল ব্যাখ্যা দান করে, অনুরূপভাবে উহা পেশ করে কুরআরে বাহক বিশ্বনবীর পবিত্র জীবন-চরিত, কর্মনীতি ও আদর্শ এবং তাঁহার কথা ও কাজ, হেদায়েত ও উপদেশের বিস্তারিত বিবরণ। এই কারণে ইসলামী জীবিন-বিধানে কুরআন মজীদের পরে পরেই এবং কুরআনের সঙ্গে সঙ্গেই হাদীসের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আল্লাহর দাসত্ব ও আনগত্য করা যেমন রাসূলের আনগত্য ও বাস্তব অনুসরণ ব্যতীত সম্ভব নয়, অনুরূপভাবে হাদীসকে বাদ দিয়া কুরআন অনুযায়ী আমল করা অসম্ভব। বস্তুর হাদীস ও হাদীস-জ্ঞান ইসলামী জীবন-ব্যবস্থা ও ইসলামী জ্ঞান-গবেষণার ক্ষেত্রে এক অমূল্য ও অপরিহার্য সম্পদ। এই পর্যায়ের প্রাথমিক আলোচনা হিসাবে এখানে আমরা হাদীসের সংজ্ঞা, পরিচয় এবং উহার প্রকার ও ক্ষেত্র সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করিব।

 

হাদীস শব্দের অর্থ

কুরআনে হাদীস শব্দের ব্যবহার এবং

হাদীসের কুরআনী ভিত্তি

‘হাদীস’ শব্দের বিশ্লেষণ করিয়া ইমাম রাগব ইসফাহানী লিখিয়াছেনঃ

اًلحَدِيثُ: وَاَلْحدِيْثُ كَوْنُ اَلشَّئِ بَعَدَ اَنْ لَّمْ تَكُنْ عِرضَاً كَاَنَ تَوْ اَوْجَدْ هَرَّا وكٌلُّ كَلاَمٍ يَبْلُعُ الْانْسَانَ مِنْ جَهَةِ الْسَّمْعِ اَوِ الْوَحِىْ فِىْ يَقْظَتِهِ اَوْ مَنَامِهِ حَدِيْثٌ-

‘হাদীস’ আর ‘হুদুস’ বলিতে বুঝায় কোন একটি অস্তিত্বহীন জিনিসের অস্তিত্ব লাভ করা, তাহা কোন মৌলিক জিনিস হোক কি অমৌলিক। আর মানুষের নিকট শ্রবণেন্দ্রিয় বা ওহীর সূত্রে নিদ্রায় কিংবা জাগরণে যে কোন কথা পৌঁছায়, তাহাকেই হাদীস বলা হয়।

অন্যত্র লিখিয়াছেনঃ

شَىَّ ىُلْقَى فِىْ رَوْعٍ اَحَدٍ مِنْ جِهَةِ الْملأَ

উচ্চতর জগত হইতে একজনের অন্তর্লোকে যাহা কিছু উদ্রিক্ত হয় তাহাই হাদীস।[مفردات راغب اصفهانى صفحه]

স্বপ্নকালীন কথাবার্তাকে কুরআন মজীদে ‘হাদীস’ বলা হইয়াছে। কুরআনে হযরত ইউসুফের জবানীতে বলা হইয়াছেঃ

وَعَلَّمْتَنِي مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ –

স্বপ্নের কথার ব্যাখ্যা তুমি আমাকে শিক্ষা দিয়াছ। (সুরা, ইউসূফ, আয়াত-১০১)

ইমাম রাগেব এই আয়াতের অর্থ প্রসঙ্গে লিখিয়াছেনঃ

اَىْ مَا يحَدِّثُ بِهِ الأِنسَانَ فِىْ نَوْمِهِ-

অর্থাৎ লোককে স্বপ্নযোগে যে সব কথা বলা হয়।[مفردات راغب صفع]

আল্লাহ্ তা’য়ালা কুরআন মজীদকে ‘হাদীস’ নামে অভিহিত করিয়াছেন। কুরআনে বলা হইয়াছেঃ

فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلَىٰ آثَارِهِمْ إِن لَّمْ يُؤْمِنُوا بِهَٰذَا الْحَدِيثِ أَسَفً ا [الكهف:٦]

তাহারা এই ‘কথা’র (কিতাব) প্রতি বিশ্বাস না করিলে, হে নবী, তুমি হয়ত নিজেকে চিন্তাক্লিষ্ট করিয়া তুলিবে।

অন্যত্র বলা হইয়াছেঃ

فَلْيَأْتُوا بِحَدِيثٍ مِّثْلِهِ إِن كَانُوا صَادِقِينَ [الطُّور:٣٤]

(তাহারা কুরআনকে আল্লাহর কিতাব না মানিলে) এইরূপ একখানি কিতাব আনিয়া পেশ করা তাহাদের কর্তব্য, যদি তাহারা সত্যবাদী হইয়া থাকে।

সূরা আয্-যুমার-এ বলা হইয়াছেঃ

اللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابًا مُّتَشَابِهًا

আল্লাহ তা’য়ালা পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ কিতাবরূপে অতীব উত্তম কালাম নাযিল করিয়াছেন।

এখানে হাদীসকে কিতাব বা কালাম অর্থে ব্যবহার করা হইয়াছে।

‘হাদীস’ শব্দের অর্থ কথা বা বাণী। কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতসমূহ ইহা কথা বা বাণী অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছেঃ

*********************************

অতঃপর তাহারা কোন কথাকে বিশ্বাস করিবে?

*************************************

এবং যখন নবী তাঁহার এক স্ত্রীর নিকট গোটন একটি কথা বলিলেন।

****************************

এই কথায় তোমরা কি আশ্চর্যান্বিত হইতেছ?

এই কয়টি আয়াতেই ‘হাদীস’حديث  শব্দটি ‘কথা’ বা ‘বাণী’ অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। কুরআন মজীদে নতুন সংবাদ, খবর ও নূতন কথা প্রভৃতি অর্থেও এই শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। যথাঃ

******************************************************

ইবরাহীমের (নিকট আগত) সম্মানিত অতিথিদের খবর তোমার নিকট পৌঁছাইয়াছে কি?

******************************************************

মূসার খবর জানিতে পারিয়াছ কি?

******************************************************

সেই সৈনিকদের কথা জানিতে পারিয়াছ কি?

******************************************************

সব কিছু আচ্ছন্নকারী কিয়ামাতের সংবাদ তোমার নিকট আসিয়াছে কি?

******************************************************

এখন এই কথার প্রতি তোমরা উপেক্ষা প্রদর্শন করিতেছ?

এই ‘হাদীস’ শব্দ হইতে নির্গত হইয়াছে ‘তাহদীস’تحديث  আর কুরআনে ইহা ব্যবহৃত হইয়াছে বর্ণনা করা, প্রকাশ করা ও কথা বলার অর্থে। যথা–

******************************************************

তুমি আল্লাহর নিয়ামতের কথা বর্ণনা করঃ

আল্লামা আবুল বাকা বলিয়াছেনঃ

******************************************************

‘হাদীস’ নাম হইল কথা বলার, সংবাদ দানের। [৪**************************************************]

মোটকথা আরবী অভিধান ও কুরআনের ব্যবহারের দৃষ্টিতে ‘হাদীস’ শব্দের অর্থ কথা, বাণী, সংবাদ, খবর ও ব্যাপার, বিষয়। নবী করীম (স) আল্লাহর পয়গাম পৌঁছাইবার উদ্দেশ্যে লোকাদের সাথে কথা বলিতেন, নিজের কথার সাহায্যে ইসলামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কথা, তথ্য ও তত্ত্বের ব্যাখ্যা দিতেন, নিগূঢ় তত্থ্ব বুঝাইয়া দিতেন, বক্তৃতা ও ভাষণের মাধ্যমে আল্লাহর কিতাবের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করিতেন, এইজন্য তাহা ‘হাদীস’ নামে অভিহিত হইয়াছে।

নবী করীম (স) নিজে ইসলামের যাবতীয় হুকুম আহকাম পাণ করিয়াছেন, আল্লাহর বিধান মোতাবেক কাজ করিয়েছেন এবং নিজের আমলের সাহায্যে আল্লাহর বিধানকে বাস্তবায়িত করিয়াছেন। এই কারণে তাঁহার বিভিন্ন আমলের বিবরণকেও ‘হাদীস’ নামে অভিহিত করা হইয়াছে।

নবী করীম (স) বিশেষ যত্ন ও চেষ্টার সাহায্যে সাহাবায়ে কিরাম (রা)- কে ইসলামের উন্নত আদর্শের ভিত্তিতে তৈয়ার করিয়াছেন, তাঁহাদের চরিত্র, চিন্তা, বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামের উন্নত মানে গঠন করিয়াছেন। এই কারণে সাহাবায়ে কিরামের যেসব কথা ও কাজাকে নবী করীম (স) অনুমোদন করিয়াছেন, সমর্থন করিয়াছেন, অন্তত তিনি যে সবের প্রতিবাদ করেন নাই, তাহারও নাম দেওয়া হইয়াছে ‘হাদীস’।

এক কথায় রাসূলের কথা, কাজের বিবরণ ও সমর্থন-অনুমোদনকেই হাদীস বলা হয়। একটি হাদীস হইতে প্রমাণিত হয়, নবী করীম (স) নিজেই ইহাকে ‘হাদীস’ নামে অভিহিত করিয়াছেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) তাঁহার নিকট জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কে, যে লোক কিয়ামতের দিন রাসূলের শাফা’আত লাভে ধন্য হইবে? ‘তখন নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি মনে করি, এই হাদীস সম্পর্কে তোমার পূর্বে আর কেহই আমাকে জিজ্ঞাসা করে নাই। বিশেষত এই কারণে যে, হাদীস শোনার জন্য তোমাকে সর্বাধিক চেষ্টিত ও আগ্রহান্বিত দেখিতে পাইতেছি। [৫****************************************************** ]

কুরআন মজীদ দ্বীন-ইসলামের সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্হ। ইহা সর্বশেষ নবীর প্রতি নাযিল হইয়াছে। রাসূলে করীম (স)-কে আল্লাহ তা’য়ালা ইসলামের নবী, ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রচারক ও প্রতষ্ঠাতা এবং মানবতার পথ-প্রদর্শক ও শিক্ষকরূপে প্রেরণ করিয়াছেন। রাসূল এই মহান পবিত্র গ্রন্হ ‘কুরআন মজীদ’ আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া লোকদেরকে শুনাইয়াছেন, বহু সংখ্যক সাহাবী তাহা সঙ্গে সঙ্গে মুখস্থ করিয়াছেন। সর্বোপরি রাসূল নিজের জীবনধারা, চিন্তা-বিশ্বাস, ও কর্ম আচরণ ও বাস্তব অনুসরণের মাধ্যমে ইসলামের মূল বিধান শিক্ষা, উপদেশ ও আদেশ-নিষেধকে বাস্তবায়িক করিয়া দেখাইয়া দিয়াছেন; অর্থাৎ একটি জাতিকে তিনি এই আদর্শের ভিত্তিতে পুরোপুরি গঠন করিয়াছেন। বস্তুত নবী করীমের মহান যিন্দেগী ছিল কুরআন মজীদের তথা ইসলামের বাস্তব রূপ, কুরআনী আদর্শের কর্মরূপ। অতএব, দ্বীন-ইসলাম সম্পর্কে রাসূলে করীমের যাবতীয় কথা, কাজ অনুমোদন ও সমর্থনকে ইসলামী পরিভাষায় বলা হয় ‘হাদীস’।

‘হাদীস’ একটি আভিধানিক শব্দমাত্র নয়। মূলত ইহা ইসলামের একটি বিশেষ পরিভাষা। সে অনুযায়ী রাসূলে করীমের যে কথা, যে কাজের বিবরণ কিংবা কথা ও কাজের সমর্থন ও অনুমোদন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত, ইসলামী পরিভাষায় তাহাই ‘হাদীস’ নামে অভিহিত হয়।

‘হাদীস’কে আরবী ভাষায় ‘খবর’ ও বলা হয়। কিন্তু পার্থক্য এই যে, ‘খবর’ শব্দটি হাদীস অপেক্ষা ব্যাপক অর্থবোধক। ‘খবর’ যুগপৎভাবে হাদীস ও ইতিহাস উভয়কেই বুঝায়।[৬****************************]

নবী করীমের কথা, কাজ, সমর্থন-অনুমোদন এবং তাঁহার অবস্থার বিবরণকে ‘হাদীস’ নামে অভিহিত করা কোন মনগড়া ব্যাপার নয়। কুরআন মজীদে ইহার অকাট্য প্রমাণ বিদ্যমাণ। আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীন যে নিখিল মানুষের জন্য এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত, তাহাতে সন্দেহ নাই। কুরআন মজী এই ‘দ্বীন’কে আল্লাহর নিয়ামতরূপে ঘোষণা করা হইয়াছে এবং নিয়ামতের প্রচার ও প্রকাশ করাকে ‘তাহদীস’ (বর্ণনা করা, প্রচার ও প্রকাশ করা) বলা হইয়াছে।

আল্লাহর নিয়ামতসমূহ সম্পর্কে আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

তোমাদের প্রতি আল্লাহর দেয়া নিয়ামত স্মরণ কর এবং তোমাদিগকে নসীহত করার উদ্দেশ্যে যে কিতাব ও যে বুদ্ধি-বিচক্ষণতা অবতীর্ণ করা হইয়াছে, তাহাও স্মরণ কর।

দ্বীন-ইসলামকে পূর্ণ ও পরিণত করার প্রসঙ্গেও আল্লাহ তা’আলা উহাকে একটি নিয়ামত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ইরশাদ করা হইয়াছেঃ

****************************************************** (সূরা-আল মায়েদা-৩)

আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ পরিণত করিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমর (দেয়া) নিয়ামত সম্পূর্ণ ও সমাপ্ত করিয়া দিলাম।

পূর্বোক্ত আয়াতদ্বয়ে দ্বীন-ইসলাম তথা কুরআন মজীদকে সুস্পষ্ট ভাষায় ‘আল্লাহর নিয়ামত’ বলিয়া ঘোষলা করা হইয়াছে। এই নিয়ামতের বর্ণনা ও প্রকাশ করার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতেঃ

****************************************************** (সূরা- আল ফাজর-১১)

তোমরা আল্লাহর নিয়ামতের বিবরণ দাও- প্রচার ও বর্ণনা কর। [আল্লামা বায়জীদ এই আয়াতের তাফসীরে লিখিয়াছেনঃ ******************************************************

‘এখানে নিয়মিত বলিতে নবুয়্যাতে বুঝানো হইয়াছে এবং তাহদীস করা অর্থ উহার প্রচার করা।

আল্লামা আ-লুসী লিখিয়াছেনঃ

‘নিয়ামত অর্থ কুরআন’ এ কথা অনেকেই বর্ণনা করিয়াছেন।]

এই দৃষ্টিতেই হযরত মুহাম্মদ (স) নবী ও রাসূল হিসাবে যে সকল কথা বলিয়াছেন ও যে সব কাজ করিয়াছেন, তাহার ভাষাগত বিবরণকে ইসলামী পরিবাষায় বলা হইয়াছে ‘হাদীস’। শুধু তাহাই নয়, তাঁহার সম্মুখে কোন সাহাবী কোন কথা বলিলে বা কোন কাজ করিলে তাহা যদি তিনি সমর্থন অনুমোদন করিয়া থাকেন অথবা উহার কোন প্রতিবাদ না করিয়া থাকেন, তাবে উহার বিবরণও ‘হাদীস’ নামেই অভিহিত হইবে। কেনন্ নবী করীম (স) সত্য ও ন্যায়ের প্রচার, প্রতিষ্ঠা এবং সকল অন্যায় ও মিথ্যার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করার দায়িত্ব লইয়াই দুনিয়ায় আগমন করিয়াছিলেন। তাঁহার সম্মুখে কোন মিথ্যা ইসলাম বিরোধী-ইসলামী ভাবধারার বিপরীত-উক্তি বা কাজ করা হইবে আর তিনি উহার প্রতিবাদ করিবেন না- তাহা হইতে সাহাবীদের বিরত রাখিবেন না; বরং নির্বাক ও নিস্তব্ধ হইয়া থাকিবেন, এ কথা ধারণা পর্যন্ত করা যায় না। আর বস্তুতই তাহা সম্ভবও নয়।

দ্বিতীয়ত অন্যায় ও পাপ অনুষ্ঠিত হইতে দেখিয়া চুপ ও নিষ্ত্রিুয় হইয়া থাকিলে রাসূলের মূল কর্তব্যই অসম্পাদিত থাকিয়া যায়। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করিয়াছেনঃ

 (সূরা আল-মায়েদা: আয়াতঃ ৬৭)               يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۖ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ

হে রাসূল, তোমার আল্লাহর নিকট হইতে তোমর প্রতি যাহা নযিল হইয়াছে, তাহা যথাযথরূপে পৌঁছাইয়া দাও, যদি তাহা না কর তবে তুমি আল্লাহর রিসালত পৌঁছাবার দায়িত্বই পালন করিলে না।

ইবনে জরীর তাবারী এই পর্যায়ে ইবনে জায়েদের একটি গুরত্বপূর্ণ কথা উদ্ধৃত করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

এই কথা বলা হইত যে, নবী করীম (স) যদি ওহীর মাধ্যমে নাযিল হওয়া কোন জিনিস গোপন করিতে চাহিতেন, তবে তিনি তাঁহার নিজের ‘ক্রটি’ সম্পর্কে অবতীর্ণ সূরা ‘আবাসা ওয়া-তাওয়াল্লা’কে অবশ্যই গোপন করিতেন। [৮****************************************************** ]

বস্তুত নবী করীমের সুরক্ষীত জীবন কাহিনী অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, তিনি জীবনের সংকটপূর্ণ মুহূর্তেও নবুয়্যতের দায়িত্ব পালন করিতে এবং অহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ আল্লাহর কালামকে যথাযথরূপে লোক-সমক্ষে প্রচার করিতে বিন্দুমাত্রও ক্রটি করেন নাই। এই ব্যাপারে তিনি কখনো উপেক্ষা বা দুর্বলতাও প্রদর্শন করেন নাই। ইসলামী দাওয়াতের সূচনায় ইসলাম প্রচারের অভিযান পরিত্যাগ করিলে সেরা সুন্দরী নারী, বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ ও আরবের নিরংকুশ রাজত্ব লাভের প্রলোভনকেও তিনি অম্লান বদনে ও তীব্র ঘৃণা সহকারে প্রত্যাখ্যান করেন। [৯******************************************************] অতএব তিনি কোন মুহূর্তেই যে দ্বীন প্রচার বন্ধ করিতে পারেন নাই, অন্যায়ের প্রতিবাদ হইতে বিরত থাকেন নাই এবং কোন ভূল ও ক্রটি কাহারো মধ্যে দেখিতে পাইলে উহার সংশোধন না করিয়া নিরস্ত হন নাই, তাহাতে একবিন্দু সন্দেহ থাকিতে পারে না। এই কারণে তাঁহার নিজের কথা, কাজ এবং তিনি যে কথা বা কাঝ সমর্থন করিয়াছেন- প্রতিবাদ করেন নাই, তাহার বিবরণ ‘হাদীস’ নাম অভিহিত হইয়াছে।

রাসূলের সম্মুখে সাহাবী কোন কাজ করিলে বা কোন কথা বলিলে তিনি যদি উহার প্রতিবাদ না করিয়া থাকেন, তবে উহার শরীয়াত সম্মত হওয়া সম্পর্কে সাহাবীগণ সম্পূর্ণ একমত ছিলেন এবং হযরতের এই সমর্তন অনুমোদন ও মৌনতাবলম্বনও কোন বিষয়ে শরীয়াতের নির্দেষ জানিবার জন্য অন্যতম সূত্ররূপে গণ্য হইত। এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যাইতে পারে। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) আল্লাহর নামে ‘হলফ’ করিয়া কোন কথা বলিলে মুহাম্মদ ইবনুল মুনকাদের আপত্তি জানাইলেন। বলিলেনঃ

******************************************************

আপনি আল্লাহর নাম করিয়া হলফ করিতেছেন?

উত্তরে তিনি বলিলেনঃ

******************************************************

আমি হযরত উমরকে নবী করীম (স)- এর সম্মখে আল্লাহর নামে হলফ করিতে শুনিয়াছি, কিন্তু নবী করীম (স) তাহা অপছন্দ করেন নাই, উহার প্রতিবাদ করেন নাই।[১০********************************************]

হাদীসের সংজ্ঞাদান প্রসঙ্গে প্রামাণ্য গ্রন্হাবলী হইতে কতকগুলি উক্তি এখানে উদ্ধৃত করা যাইতেছে। ইহা হইতে বিষয়টি অধিকতর স্পষ্ট হইবে।

ইমাম সাখাভী বলিয়াছেনঃ

******************************************************

অভিধানে ‘হাদীস’ (নূতন) ‘কাদীম’ (পুরাতন)-এর বিপরীত অর্থবোধক। আর মুহাদ্দিসদের পরিভাষায় (হাদীস বলিতে বুঝায়) রাসূলের কথা, কাজ, সমর্থন-অনুমোদন এবং তাঁহার গুণ; এমন কি জাগরণ ও নিদ্রাবস্থায় তাহার গতিবিধিও ইহার অন্তর্ভুক্ত।[১১****************************************************** ]

বুখারী শরীফের ভূমিকায় বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

হাদীস এমন জ্ঞান, যাহার সাহায্যে নবী করীম (স)-এর কথা, কাজ এবং তাঁহার অবস্থা জানা যায়।[১২**********]

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী ও নওয়াব সিদ্দীক হাসান লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

ইলমে হাদীস এমন বিশেষ জ্ঞান, যাহার সাহায্যে নবী করীম (স)- এর কথা কাজ ও অবস্থা জানিতে পারা যায়। [১৩************* রাসূলের কথা বলিতে বুঝায় ************ তাঁহার আরবী ভাষায় উচ্চারিত কথা। ইহা বিভিন্ন প্রকারের হইতে পারে। তাঁহার কাজ বলিতে বুঝায়ঃ**************************************]

মিশাকাতুল মাসাবীহ গ্রন্হের ভূমিকায় শাহ আবদূল আজীজ (র) লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

পূর্বকালের মনীষিগণ সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনের মুখের কথা ও কাজের বিবরণ এবং তাঁহাদের ফতোয়াসমূহের উপর ‘হাদীস নাম ব্যবহার করিতেন। আর দুইটি স্বতন্ত্র সূত্রে বর্ণিত একটি বিবরণকে তাঁহারা দুইটি হাদীস গণনা করিতেন। [১৪****************************************************** ]

নওয়াব সিদ্দীক হাসান (র)- ও এই কথাই বলিয়াছেন। তিনি হাদীসের সংজ্ঞাদান প্রসঙ্গে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

অনুরূপভাবে সাহাবীর কথা, কাজ ও সমর্থন এবং তাবেয়ীর কথা, কাজ ও সমর্থনকেও হাদীস নামে অভিহিত করা হয়।[১৫****************************************************** ]

তবে পার্থক্য এই যে, তিনি ইহাতে তাবে-তাবেয়ীগণের কথা ও কাজের বিবরণকে ‘হাদীস’ বলেন নাই। কিন্তু সাহাবা ও তাবেয়ীগণের ন্যায় তাবে-তাবেয়ীনের কথা, কাজ ও সমর্থনের বিবরণও যে কুরআন হাদীসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং বাস্তব রূপায়ণের দৃষ্টিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় জিনিস, তাহাতে সন্দেহ নাই। হাদীস ও তাফসীরের কিতাবসমূহে এই ধরনের প্রামাণ্য যে সব কথা সাহাবী, তাবেয়ী এ তাবে-তাবেয়ীন হইতে বর্ণিত হইয়িাছে, তাহাকেও এক সঙ্গে হাদীসের পর্যায়ে গণ্য করা হইয়াছে। যদিও ঐসবের পারিভাষিক নাম বিভিন্ন। প্রসিদ্ধ হাদীসবিদ হাফেয সাখাভী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

‘অনুরূপভাবে সাহাবা তাবেয়ীন ও অন্যান্য (তাবে-তাবেয়ী) –র আ-স-র ও ফতোয়াসমূহের প্রত্যেকটিকে পূর্ববর্তী মনীষিগণ ‘হাদীস’ নামে অভিহিত করিতেন’। [১৬******]

অন্যকথায়, নবী করীম (স) সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়ী এ তাবে-তাবেয়ীনের কথা, কাজ ও সমর্থনের বিবরণ যদিও মোটামুটিভাবে ‘হাদীস’ নামে অভিহিত হইয়া থাকে- কেননা এই সকলের কথা-কাজ সমর্থন একই মূল বিষয়কে কেন্দ্র করিয়াই চলিত; কিন্তু তবুও শরীয়াতী মর্যাদার দৃষ্টিতে এই সবের মধ্যে পার্থক্য থাকায় প্রত্যেকটির জন্য স্বতন্ত্র পরিভাষা নির্ধারণ করা হইয়াছে। যথা নবী করীমের কথা, কাজ ও সমর্থনকে বলা হয় ‘হাদীস’। সাহাবীদের কথা, কাজ ও সমর্থনকে বলা হয় আ-সা-র ((اثارএবং তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের কথা, কাজ ও সমর্থনের বিবরণকে বলা হয় ‘ফতোয়া’। কারণ কুরআন ও হাদীসের মূলকে ভিত্তি করিয়াই তাঁহাদের এই সব কাজ সম্পন্ন হইত। [এই তিন প্রকারের হাদীসের আরও তিনটি স্বতন্ত্র পারিভাষিক নাম রহিয়াছে; যথাঃ রাসূলের কথা, কাঝ ও সমর্থনের বিবরণকে বলা হয় মারফূ; সাহাবীদের কথা, কাজ ও সমর্থনের বিবরণকে বলা হয় মওকুফ এবং তাবেয়ীদের কথা, কাজ ও সমর্থনকে বলা হয় মকতু।

مقد مة صحيح بخارى ص -13]

 

হাদীস ও সুন্নাত

হাদীসের অপর নাম হইতেছে ‘সুন্নাত’। ‘সুন্নাত শব্দের অর্থ হইল চলার পথ, কর্মের নীতি ও পদ্ধতি। ইহা ফিকাহশাস্ত্রে প্রচলিত ও উহাতে ব্যবহৃত ‘সুন্নাত’ নহে।

ইমাম রাগেব লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

‘সুন্নাতুন্নবী’ বলিতে সে পথ ও রীতি-পদ্ধতি বুঝায়, যাহা নবী করীম (স) বাছাই করিয়া লইতেন ও অবলম্বন করিয়া চলিতেন। [১৮****] ইহা কখনো ‘হাদীস’ কখনো শব্দের সমার্থকরূপে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। ‘তা-জুল মাছাদির’ গ্রন্হে লিখিত হইয়াছেঃ

******************************************************

‘সুন্নাত’ অর্থ পথ নির্ধারণ। ‘মুয়ায তোমাদের জন্য পথ নির্ধারণ করিয়াছেন’।

এই হাদীসে ‘সুন্নত’ শব্দ এই অর্থেই ব্যবহৃত হইয়াছে। [*********১৯]

অন্য কথায় নবী করীম (স)-এর প্রচারিত যে উচ্চতম আইন বিধান (Supreme Law) আল্লাহ তা’য়ালার মত ও মর্জি প্রমাণ করে, প্রকাশ করে, তাহাই সুন্নত। আর কুরআনের ভাষায় ****** ‘মহান আদর্শ’ বলিতে এই জিনিসকেই বুঝানো হইয়াছে।রাসূলে করীমের যে ‘মহানতম আদর্শ’ অনুসরণ করিতে আল্লাহ তা’আলা নির্দেশ দিয়াছেন, তাহা এই হাদীস হইতেই জানিতে পারা যায়। এই কারণে মুহাদ্দিসগণ- বিশেষ করিয়া শেষ পর্যায়ের মুহাদ্দিসগণ- ‘হাদীস’ ও ‘সুন্নাত’ কে একই অর্থে ব্যবহার করিয়াছেন। [২০*********]  বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

‘সুন্নাত’ শব্দটি রাসূলের কথা, কাজ ও চুপ থাকা এবং সাহাবীদের কথা ও কাজ বুঝায়। [২১*********]

আল্লামা আল-জাজায়েরী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

‘সুন্নাত’ অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাসূলের নামে কথিত কথা, কাজ ও সমর্থন বুঝায়। ইহা বিশেষজ্ঞদের মতে হাদীসের সমার্থবোধক।[২২***********]

আল্লামা আবদুল আজীজ আল-হানাফী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

‘সুন্নাত’ শব্দটি দ্বারা রাসূলের কথা ও কাজ বুঝায় এবং ইহা রাসূল ও সাহাবীদের অনুসৃত বাস্তব কর্মনীতি অর্থেও ব্যবহৃত হয়। [২৩***********]

সফীউদ্দীন আল-হা’লী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

‘সুন্নাত’ বলিতে বুঝায় কুরআন ছাড়া রাসূলের সব কথা, কাজ ও সমর্থন অনুোদন। [২৪************]

এই পর্যায়ে মোট কথা হইল, ‘সুন্নাত’ শব্দটি সম্পর্ণরূপে ও সর্বতোভাবে ‘হাদীস’ শব্দের সমান নয়। কেননা ‘সুন্নাত’ হইল রাসূলের বাস্তব কর্মনীতি, আর ‘হাদীস’ বলিতে রাসূলের কাজ ছাড়াও কথা ও সমর্থন বুঝায়। [এই কারণে ইলমে হাদীসেও বলা হয়ঃ সুফিয়ান সওরী হাদীসের ইমাম, আওজায়ী সুন্নাতের ইমাম, হাদীসের ইমাম নহেন। আর মালিক ইবনে আনাস উভয়ের ইমাম। *****************]

 

হাদীসের বিষয়বস্তু

হাদীসের বিষয়বস্তু কি? কি বিষয় লইয়া উহাতে প্রধানত আলোচনা হইয়াছে? এ বিষয়ে ইলমে হাদীসের বিশেষজ্ঞ সকল মনীষীই একমত হইয়া লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

ইলমে হাদীসের বিষয়ব্সুত বাআলোচ্য বিষয় হইল রাসূলে করীম (স)- এর মহান সত্তা এ হিসাবে যে, তিনি আল্লাহ তা’য়ালার রাসূল।[২৬ ********************]

অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (স) আল্লাহ তা’য়ালার মনোনীত ও প্রেরীত ব্যক্তি-রাসূল হিসাবেও এই পদমর্যাদায় অীভষিক্ত থাকিয়া যাহা কিছু বলিয়াছেন, যাহা কিছু করিয়াছেন, যাহা কিছু বলার বা করার অনুমতি দিয়াছেন, সমর্থন জানাইয়াছেন তাহা এবং এ সবের মাধ্যমে রাসূলে-করীমের যে মহান সত্তা বিকশিত ও উদ্ভাসিত হইয়া উঠিয়াছে তাহাই ইলমে হাদীসের বিষয়বস্তু। হাদীসে এই সব বিষয়ই আলোচিত হইয়াছে এবং হাদীস পাঠ করিলে তাহা হইতে এব বিষয়ই জানিতে পারা যায়। রাসূলে করীমের জীবনব্যাপী বলা কথা, কাজ , সমর্থন এবং সাধনা সংগ্রামের বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য বিবরণও জানিবার একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য উপায় হইতেছে হাদীস।

বস্তুত হাদীস কোন সংকীর্ণ সীমাবদ্ধ, একদেশদর্শী ও ক্ষুদ্র পরিসর সম্পদ নহে। ইহা মূলতই অত্যন্ত ব্যাপক ও বিপুল ভাবধারা সমন্বিত, বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (স) এর মহান নেতৃত্বে আরবভূমিতে যে বিরাট বিপ্লবী আন্দোলন উত্থিত হইয়াছিল তাহার সম্যক ও বিস্তারিত রূপ হাদীস হইতেই সুপরিস্ফুট হইয়া উঠে। রাসূল জীবনের পূর্ণাঙ্গ কাহিনী, তাঁহার ও সাহাবায়ে কিরামের বিপ্লবাত্মক কর্মতৎপরতা, তাদনীন্তন সমাজ সভ্যতা ও আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁহার ব্যাপক ও মৌলিক সংশোধনীর এবং সাধিত সংস্কারের বিবরণও হাদীসের মধ্যেই সামিল।

হাদীসের এ ব্যাপকতা অনস্বীকার্য, ইহার যথার্থতা হৃদয়ঙ্গম করাও কিছুমাত্র কঠিন নহে। পূর্বকালের মনীষিগণও হাদীসের এ ব্যাপক রূপ বুঝিতে পারিয়াছেন। ইমাম বুখারী সংকলিত হাদীসি গ্রন্হ বুখারী শরীফ নামে খ্যাত হইলেও উহার আসল ও পূর্ণাঙ্গ নাম হইলঃ

******************************************************

রাসূলে করীমের কার্যাবলী ও তাঁহার সমসাময়িক যুগের সমস্ত অবস্থা ও ব্যাপারসমূহের বিশুদ্ধ সনদযুক্ত বিবরণের ব্যাপক সংকলন। [২৭****************]

হাদীসের অধ্যয়নের উদ্দেশ্য ও সার্থকতা

হাদীস অধ্যয়নের উদ্দেশ্য কি? কি লক্ষ্য লইয়া হাদীস অধ্যয়ন করা কর্তব্য এবং উহার অধ্যয়নের সার্থকতাই বা কি, ইহাও বিশেষ উল্লেখযোগ্য। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী প্রমুখ মনীষী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

উভয় কালের চরম কল্যাণ লাভই হইতেছে হাদীস অধ্যয়নের সার্থকতা।[২৮**********]

নওয়াব সিদ্দীক হাসান লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

ইহকাল ও পরকালের পরম কল্যাণ লাভই হইতেছে হাদীস অধ্যয়নের লক্ষ্য।[২৯**************]

আল্লামা কিরমানী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

******************************************************

‘কুরআনের পরে সকল প্রকার জ্ঞানের মধ্যে সর্বাধিক উন্নত, উত্তম এবং তথ্য ও তত্ত্বসমৃদ্ধ শ্রেষ্ঠ সম্পদ হইতেছে ইলমে হাদীস। ইহা এই কারণে যে উহার দ্বারাই আল্লাহর কালামের লক্ষ্য ও তাৎপর্য জানিতে পারা যায় এবং আল্লাহর যাবতীয় হুকুম-আহকামের উদ্দেশ্যও উহা হইতেই বুঝিতে পারা যায়। যেহেতু কুরআনের অধিকাংশই-এবং সবই-মোটামুটি ও নীতিকথা মাত্র. আর তাহা হইতে কেবল এজমালী কথাই জানিতে পারা যায়। [৩০]

মোটকথা হাদীষ হইল একটি সভ্যতার পতন এবং এক নবতর সভ্যতার অভ্যুদয়, উত্থান ও প্রতিষ্ঠালাভের ইতিহাস। এ দৃষ্টিতেই হাদীস অধ্যয়ন আবশ্যক।

হাদীসের সংজ্ঞাভিত্তিক শ্রেণীবিভাগ

হাদীসের উল্লিখিত সংজ্ঞা হইতে উহার তিনটি প্রাথমিক বিভাগ সুপরিস্ফুট হইয়া উঠে। তাহা হইতেছেঃ রাসূলের মুখ নিঃসৃত কথা, তাঁহার নিজের কাজ ও আচরণ এবং তাঁহার সম্মখে অনুমোদনপ্রাপ্ত কথা ও কাজের বিবরণ। সমস্ত হাদীসই এই তিন পর্যায়ে বিভক্ত। কিন্তু উহার বাস্তব গুরুত্ব, প্রয়োগ ও ব্যবহারিক মূল্যের দৃষ্টিতে এই তিন পর্যায়ের হাদীসের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। সর্বপ্রথম স্থান হইল রাসূলের কথার-কোন বিষয়ে রাসূল যাহা নিজে বলিয়াছেন ইসলামী জীবন ব্যবস্থঅর ইহাই প্রথম উৎস। ইহাকে বলা হজয় রাসূলের ‘কাওলী হাদীস’–(*************) ‘কথামূলক হাদীস’, যাহাতে রাসূলের নিজের কোন কথা উদ্ধৃত হইয়াছে।

দ্বিতীয় ভাগে হযরতের নিজস্ব কাজ-কর্ম ও আচার-আচরণের বিবরণ। রাসূল (স) যে দ্বীন ইসলাম লইয়া আসিয়াছিলেন, বাস্তবিক পক্ষে তিনি তাহা অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করিয়াছেন, সে অনুযায়ী প্রত্যেকটি কাজ আঞ্জাম দিয়াছেন। তাঁহার কাজ ও চরিত্রের ভিতর দিয়াই ইসলামের যাবতীয় বিধিবিধান ও রীতিনীতি সুপরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছে। তাঁহার একটি কাজও ইসলামী শরীয়াতের বিপরীত হইতে পারে নাই। এই কারণে তাঁহার প্রতিটি কাজই ইসলামী শরীয়াতের ভিত্তিরূপে গণ্য হইবার যোগ্য। আর যো হাদীসে রাসূলের রাসূল হিসাবে করা কোন কাজের বিবরণ উল্লিখিত হইয়াছে তাহাকে বলা হয় ‘ফে’লী হাদসী’ (*******)।

আর তৃতীয় হইল রাসূলে করীম (স) এর নিকট অনুমোদন ও সমর্থনপ্রাপ্ত (সাহাবাদের০ কথা ও কাজ। কেননা পূর্বেই বলা হইয়াছে, হযরতের সম্মুখে ইসলামী শরীয়াতের বিপরীত কোন কথা বলা হইলে বা কোন কাজ করা হইলে রাসূল (স) উহার প্রতিবাদ বা নিষেধ না করিয়া পারেন নাই। এই ধরনের কোন কথা বা কাজের বিবরণ হইতেও শরীয়াতেরে দৃষ্টিভঙ্গী নিঃসন্দেহে জানিতে পারা যায়। অতএব ইসলামী শরীয়াতের ইহাও একটি উৎস। যে হাদীসে এই ধরনের কোন ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, তাহা হইতেছে ‘তাকরীরী হাদীস] (**********)।

এখানে বিষয়টি অধিকতর সুস্পষ্ট ও সহজবোধ্য করিয়া তুলিবার উদ্দেশ্যে এই তিন পর্যায়ের তিনটি হাদীস উদ্ধৃত করা যাইতেছেঃ

******************************************************

হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেন; হযরত রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ ফাসিক ব্যক্তির প্রশংসা ও স্তুতি করা হইলে আল্লাহ তা’য়ালা অসন্তুষ্ট ও ক্রুব্ধ হন এবং এই কারণে আল্লাহর আরধ কাঁপিয়া উঠে। (বায়হাকী)

ইহাতে রাসূলের একটি বিশেষ কথার উল্লেখ হওয়ার কারণে ইহাকে বলা হয় ‘কাওলী হাদীস’।

******************************************************

হযরত আবূ মূসা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেনঃ আমি রাসূলে করীম (স)- কে মোরগের গোশত খাইতে দেখিয়াছে। (বুখারী ও মুসলিম)

এই হাদীসে রাসূলের একটি কাজের বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। এজন্য ইহা ‘ফে’লী হাদীস’।

******************************************************

হযরত ইবনে আবূ আওফা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেনঃ আমরা রাসূলে করীম (স)- এর সঙ্গে মিলিয়া সাতটি লড়াই করিয়াছি। আমরা তাঁহার সঙ্গে থাকিয়া জারাদ (ফড়িং জাতীয় চড়ই) খাইতাম। (বুখারী ও মুসলিম)

ইহা ‘তাকরীরী হাদীস’।

 

বিষয়বস্তুর দৃষ্টিতে হাদীসের প্রকারভেদ

বিষয়বস্তুর দৃষ্টিতে হাদীস কয়েক প্রকারের রহিয়াছে। ইমাম শাফেয়ী (র) বলিয়াছেনঃ হাদীস তিন প্রকারের। কুরআন মজীদে সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লিখিত যেসব বিষয়ে নবী করীম (স) নিজ ভাষায় ব্যাখ্যা এবং বিশ্লেষণ দান করিয়াছেন তাহা প্রথম প্র্রকারের হাদীস। কুরআন মজীদে মোটামুটি ও অবিস্তৃতভাবে অনেক আইন ও বিধানের উল্লেখ রহিয়াছে, রাসূলে করীম (স) তাহার বিস্তৃত রূপ পেশ করিয়াছেন ও উহার ব্যাখ্যা দিয়াছেন। অনেক সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট বিষয়কে তিনি মুসলিমদের সম্মুখে নিজ ভাষায় বিস্তারিত ও সুস্পষ্টরূপে তুলিয়া ধরিয়াছেন।ইহা দ্বিতীয় প্রকারের হাদীস। আর তৃতীয় প্রকারের হইতেছে সেসব হাদীস, যাহাতে রাসূলে করীম (স) কুরআনে অনুল্লিখিত অনেক বিষয়ের উল্লেখ করিয়াছেন। এই তিন প্রকারের হাদীস যেহেতু আল্লাহর নিকট হইতে রাসূলে করীমের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে লব্ধ জ্ঞানের আকর, সে কারণে ইহা সবই কুরআনের মতই নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাস্য। [কিতাবুর রিসালা-ইমাম শাফেয়ী (র)]

এই পর্যায়ে শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীর আলোচনার সারাংশ নিম্নে উদ্ধৃত হইলঃ

নবী করীম (স) হইতে বর্ণিত ও হাদীস-গ্রন্হসমূহে সংকলিত হাদীসসমূহ শরীয়াতী হুকুম গ্রহণের দৃষ্টিতে দুই প্রকারের। রিসালাতের বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্য রাসূলে করীম (স) যত কথাই বলিয়াছেন, তাহা প্রথম প্রকারের। ‘রাসূল যাহা দেন তাহা গ্রহণ কর এবং যাহা হইতে নিষেধ করেন, তাহা হইতে বিরত থাক’- আয়াতটিতে এ প্রকারের হাদীস সম্পর্কেই আল্লাহর নির্দেশ ঘোষিত হইয়াছে। পরকাল ও মালাকুতী জগতের আশ্চর্যজনক বিষয়াদি ও ঘটনাবলী সম্পর্কে রাসূল (স) যাহা বলিয়াছেন, তাহাও এই প্রকারের হাদীস। এই হাদীসসমূহ ওহীর সূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞান হইতে নিঃসৃত। শরীয়াতের বিধি-বিধান, ইবাদতের নিয়ম-প্রণালী এবং সমাজ ও জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থাপনার ব্যাখ্যা ও উহার পালনের জন্য উৎসাহ দান সম্পর্কিত হাদীসসমূহও এই পর্যায়ের। তবে উহা কিছু অংশ সরাসরি ওহীর সূত্রে প্রাপ্ত এবং কিছু অংশ স্বয়ং নবী করীমের ইজতিহাদ।অবশ্য নবী করীম (স)-এর রায় কখনো ভুলের উপর স্থায়ী হইয়া থাকিতে পারিত না। তাঁহার ইজতিহাদ আল্লাহর হুকুমের উপরই ভিত্তিশীল হইবে, ইহার কোন প্রয়োজন নাই। কেননা প্রায়ই এমন হইত যে, আল্লাহ তা’য়ালা তাঁহার নবীকে শরীয়াতের উদ্দেশ্য ও লক্ষ জানাইয়া দিতেন; শরীয়াত প্রণয়ন, উহার সহজতা বিধান ও আদেশ-নিষেধ নির্ধারণের নিয়ম-কানুন শিক্ষা দিতেন; নবী ওহীসূত্রে জানা এই আইন ও নিয়ম অনুযায়ী ওহীর সূত্রে লব্ধ উদ্দেশ্যাবলীর ব্যাখ্যা দান করিতেন। যেসব যুক্তিপূর্ণ ও কল্যাণময় বিষয় বিনা শর্তে পেশ করিয়াছেন, যাহার কোন সময় বা সীমা নির্দিষ্ট করা হয় নাই –যেমন উন্নত ও খারাপ চরিত্র-ইহাও রিসালাতের দায়িত্ব পালন পর্যায়ের  এবং ইহার অধিকাংশই ওহীর উৎস হইতে গৃহীত। তাহা এই অর্থে যে, আল্লাহ তা’য়ালা রাসূলকে সমাজ ও জনকল্যাণের নিয়ম-কানুন জানাইয়াদিয়াছেন, নবী সে নিয়ম-কানুন হইতে যুক্তি বা দলিল গ্রহণ করিয়াছেন এবং উহাকে মূলনীতি হিসাবে পেশ করিয়াছেন। আমলসমূহের ফযীলত, আমলকারীদের গুণ ও প্রশংসামূলক হাদীসও এই পর্যায়ে গণ্য। আমার মতে ইহার আধিকাংশই ওহীর সূত্রে প্রাপ্ত, আর কিছু অংশ তাঁহার ইজতিহাদের ফসল। দ্বিতীয় প্রকারের হাদীস রিসালাতের দায়িত্ব পালন পর্যায়ের নহে। রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি একজন মানুষ মাত্র, অতএব তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে আমি যখন কোন জিনিসের আদেশ করি, তখন তাহা তোমরা গ্রহণ করিও- পালন করিও। আর যদি আমার নিজের মতে কোন কাজের আদেশ করি তবে মনে রাখিও, আমি একজন মানুষ মাত্র।

এ বাণীতে রাসূলে করীম (স) দ্বিতীয় প্রকারের হাদীসের কথাই বুঝাইয়াছেন। মদীনার মুসলমানদিগকে অত্যাধিক ফসল লাভের আশায় পুরুষ খোরমা গাছের ডাল স্ত্রী খোরমা গাছের মধ্যে প্রবেশ করাইয়া দিতে দেখিয়া নবী করীম (স) ‘উহা না করিলে কোন ক্ষতি হইবে না’ বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছিলেন এবং বলিয়াছিলেনঃ

******************************************************

তোমরা ইহা না করিলে সম্ভবত ভালই হইত।

কিন্তু ইহা না করার দরুন পরবর্তী বছর অত্যন্ত কম পরিমাণে ফসল উৎপন্ন হয়। তখন নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

‘আমি একটা ধারণা পোষণ করিতাম, এবং তাহাই তোমাদিগকে বলিয়াছিলাম (ধারণার ভূল হইলে) তোমরা সেজন্য দোষ ধরিও না। কিন্তু আমি যখন আল্লাহর তরফ হইতে কোন কিছু বর্ণনা করি, তখন তোমরা তাহা অবশ্যই গ্রহণ করিবে। কেননা আমি আল্লাহর সম্পর্কে কোন মিথ্যা কথা বলি না’। [এই কয়টি হাদীসই মুসলিম শরীফের ২য় খণ্ডের ২৬৪ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত হইয়াছে।

****************************************************** ]

চিকিৎসা ও দ্রব্যগুণ ইত্যাদি সম্পর্কে রাসূলে করীম (স) যাহা কিছু বলিয়াছেন, তাহাও এই পর্যায়ের। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

হালকা সাদা কপোল বিশিষ্ট গাঢ় কৃষ্ণ ঘোড়া তোমরা অবশ্যই রাখিবে।

ইহা রাসূলের বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের আলোকে বলা কথা।

রাসূল (স) অভ্যাসবশত যাহা করিতেন- ইবাদত হিসাবে নয় কিংবা যাহা ঘটনাবশত করিয়াছেন- ইচ্ছামূলকভাবে নয়, তাহার কোন শরীয়াতী ভিত্তি নাই। হযরত জায়েদ ইবনে সাবিত (রা)-এর নিকট একদল লোক হাদীস শ্রবণের ইচ্ছ প্রকাশ করিলৈ তিনি বলিয়াছেনঃ ‘আমি রাসূলের প্রতিবেশী ছিলাম। তাঁহার প্রতি যখন ওহী নাযিল হইত তখন আমাকে তিনি ডাকিয়া পাঠাইতেন, আমি গিয়া তাহা লিখিয়া লইতাম। তাঁহার অভ্যাস ছিল, আমরা যখন দুনিয়ার বিষয় আলোচনা করিতাম, তখন তিনিও আমাদের সাথে দুনিয়ার কথা বলিতেন। আর যখন পরকালের কথা বলিতাম, তিনিও আমাদের সাথে পরকালের কথা বলিতেন। আমরা যখন খানাপিনার কথা বলিতাম তিনিও আমাদের সাথে তাহাই বলিতেন। এখন আমি কি তোমদিগকে রাসূলের এইসব হাদীস বলিব? এ কথাটি এ প্রসঙ্গেই উল্লেখযোগ্য।

এতদ্ব্যতীত রাসূলের সময়কালীন আংশিক কল্যাণের জন্য অনেক ব্যবস্থা প্রদান করা হইয়াছিল। সমস্ত মানুষের জন্য তাহা কোন চিরন্তীন বিধান ছিল না। ইহার দৃষ্টান্ত এইঃ যেমন কোন বাদশাহ এক সৈন্যবাহিনী সজ্জিত করিয়া উহার কোন নিদর্শন ঠিক করিয়া দেয়। এই দৃষ্টিতে হযরত উমর ফারূক (রা) বলিয়াছিলেনঃ

******************************************************

রমল করার আমাদের কি প্রয়োজন? ইহা আমরা এমন এক শ্রেণীর লোকদিগকে দেখাইবার জন্য পূর্বে করিতাম, যাহাদিগকে আল্লাহ তা’য়ালা ধ্বংস করিয়াছেন।

কিন্তু পরে তিনি স্পষ্ট বুঝিতে পারিলেন যে, ‘রমল’ করার অন্য কারণও থাকিত পারে এবং ইহা কিছুতেই পরিত্যাজ্য নহে।

যুদ্ধের বিশেষ পদ্ধতি এবং বিচার ফয়সালার বিশেষ রীতিনীতি ও ধরণ-ধাারণ সম্পর্কিত হাদীসসমূহও এই পর্যায়ের গণ্য।[হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা, ১ম খণ্ড, ১০২ পৃষ্ঠা হইতে উদ্ধৃত।]

যথাযথভাবে সত্য প্রমাণিত হইবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নাই। খেজুর গাছ সম্পর্কিত আরব দেশের প্রচলিত নিয়ম সম্পর্কে রাসূলের নিষেধবাণীও এই পর্যায়েরই কথা ছিল। ইমাম নববী এই প্রসঙ্গে আলোচনা করিতে গিয়া লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

বিশেষজ্ঞদের মতে নবীর এই কথা কোন বিষয়ে সংবাদ দানের পর্যায়ভুক্ত ছিল না; বরং ইহা তাঁহার একটি ধারণামাত্র ছিল।যেমন এই প্রসঙ্গের হাদীসসমূহে উল্লেখিত হইয়াছে। তাঁহারা ইহাও বলিয়াছেন যে, বৈষয়িক ব্যাপারে নবী করীমের মত ও ধারণা আন্যান্য মানুষের মত ও ধারণার মতই। কাজেই এইরূপ ঘটনা সংঘটিত হওয়া- অবাস্তব প্রমাণিত হওয়া- কোন অসম্ভব ব্যাপার নহে এবং ইহাতে কোন ক্রটি বা দোষের কারণ নাই।[নববী, শরহে মুসলিম ২য় খণ্ড, ২৬৪ পৃষ্ঠ]

রাসূলের ইজতিহাদ সম্পর্কে এই কথাও মনে রাখা আবশ্যক যে, যেসব বিষয়ে ওহী নাযিল হয় নাই, সে বিষয়ে রাসূলে করীম (স) ইজতিহাদ করিয়াছেন। এই ইজতিহাদ যদি নির্ভূল হইয়া থাকে, তবে আল্লাহ উহাকে প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকর হইতে দিয়াছেন; আর যদি তাহাতে মানবীয় কোন ভূল হইয়া থাকে, তবে আল্লাহ সে বিষয়ে রাসূলকে জানাইয়া দিয়াছেন ও সতর্ক করিয়া দিয়াছেন। কাজেই রাসূলের ইজতিহাদও সুন্নাতের পর্যায়ে গণ্য। হাদীসে এ সব ইজতিহাদের বিবরণ রহিয়াছে। অতএব হাদীস ও রাসূলের ইজতিহাদে কোন মৌলিক পার্থক্য বা বিরোধ নাই।[**************]

কিন্তু দ্বীন ও শরীঅত সম্পর্কিত ব্যাপারে- আকীদা, ইবাদত, নৈতিক চরিত্র, পরকাল, সামাজিক ও তমদ্দুনিক বিষয়ে- রাসূলে করীম (স) যাহা কিছু বলিয়াছেন, তাহা সবই ওহীর উৎস হইতে গৃহীত, তাহা চিরন্তন মূল্য ও স্থায়ী গুরুত্ব স’লিত এবং তাহা কোন সময়ই বর্জনীয় নহে।[হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা, ১ম খণ্ড**********]

 

হাদীসে কুদসী

হাদীসের আর এক প্রকার রহিয়াছে, যাহাকে ‘হাদীসে কুদসী’حديث قدسى    বলা হয়। ‘কুদসী’قدسى‘কুদস’قدسহইতে গঠিত ইহার অর্থ الظهر  পরিত্রতা, মাহনত্ব। আল্লাহর আর এক নাম ‘কুদ্দুস’قدوس  : মহান; পবিত্র। [*******]

এই ধরনের হাদীসকে ‘হাদীসে কুদসী’ বল হয় এইজন্য যে, উহার মূল কথা সরাসরিভাবে আল্লাহর নিকট হইতে প্রাপ্ত। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁহার নবীকে ‘ইলহাম’ কিংবা স্বপ্নযোগে যাহা জানাইয়া দিয়াছেন, নবী নিজ ভাষায় সে কথাটি বর্ণনা করিয়াছেন। উহা কুরআন হইতে পৃথক জিনিস। কেননা কুরআনের কথা ও ভাষা উভয়ই আল্লাহর নিকট হইতে ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ। প্রখ্যাত হাদীস ব্যাখ্যাতা আল্লাম মুল্লা আলী আল-কারী ‘হাদীসে কুদসী’র সংজ্ঞা দান প্রসঙ্গে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

******************************************************

হাদীসে কুদসী সেসব হাদীস, যাহা শ্রেষ্ঠ বর্ণনাকারী পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল পরম নির্ভরযোগ্য হযরত মুহাম্মদ (স) আল্লাহর নিকট হইতে বর্ণনা করেন, কখনো জিব্রাঈল (আ) এর মাধ্যমে জানিয়া, কখনো সরাসরি ওহী কিংবা ইলহাম বা স্বপ্নযোগে লাভ করিয়া। যে, কোন প্রকারের ভাষার সাহায্যে ইহা প্রকাশ করার দায়িত্ব রাসূলের উপর অর্পিত হইয়া থাকে। [৩৮************]

আল্লামা আবুল বাকা তাঁহার ‘কুল্লিয়াত’ গ্রন্হে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

******************************************************

কুরআনের শব্দ, ভাষা, অর্থ, ভাব ও কথা সবই আল্লাহর নিকট হইতে সুস্পষ্ট ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ; আর ‘হাদীসে কুদসী’র শব্দ ও ভাষা রাসূলের; কিন্তু উহার অর্থ, ভাব ও কথা আল্লাহর নিকট হইতে ইলহাম কিংবা স্বপ্নযোগে প্রাপ্ত।[৩৯**********]

আল্লামা তাইয়্যেবী-ও এই কথা সমর্থন করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

******************************************************

কুরআনের শব্দ ও ভাষা লইয়া জিব্রাঈল (আ) রাসূলে করীমের নিকট নাযিল হইয়াছেন। আর ‘হাদীসে কুদসী’র মূল কথা ইলহাম বা স্বপ্নযোগে আল্লাহ তাহা জানাইয়া দিয়াছেন। (এইজন্য হাদীসে কুদসী আল্লাহর কথারূপে পরিচিত হইয়াছে) কিন্তু এতদ্ব্যতীত অন্যান্য হাদীসকে আল্লাহর কথা বলিয়া প্রচার করেন নাই এবং তাঁহার নামেও সে সবের বর্ণনা করেন নাই।[৪০********]

কুরআন ও হাদীসে কুদসীর পার্থক্য

কুরআন ও হাদীসে কুদসীর মধ্যে যে পার্থক্য রহিয়াছে, তাহা নিম্নরূপঃ

ক) কুরআন মজীদ জিব্রাঈলের মাধ্যম ছাড়া নাযিল হয় নাই, উহার শব্দ ও ভাষা নিশ্চিতরূপে ‘লওহে মাহফুয; হইতে অবতীর্ণ। উহার বর্ণনা পরস্পরা মুতাওয়াতির, -অবিচ্ছিন্ন, নিশ্চিত ও নিঃসন্দেহ; প্রত্যেক পর্যায়ে ও প্রত্যেক যুগে।

খ) নামাযে কেবল কুরআন মজীদই পাঠ করা হয়, কুরআন ছাড়া নামায সহীহ্ হয় না, আর কুরআনের পরিবর্তে হাদীসে কুদসী পড়িলেও নামায হয় না।

গ) ‘হাদীসে কুদসী’ অপবিত্র ব্যক্তি হায়েয নিফাস সম্পন্ন নারীও স্পর্শ করিতে পারে, কিন্তু কুরআন স্পর্শ করা ইহাদের জন্য হারাম।

ঘ) হাদীসে কুদসী কুরআনের ন্যায় ‘মুজিযা’ নহে।

ঙ) হাদীসে কুদসী অমান্য করিলে লোক কাফির হইয়া যায় না- যেমন কাফির হইয়া যায় কুরআন অমান্য করিলে।[৪১***********]

শায়খ মুহাম্মদ আলী ফারুকী হাদীসকে দুই ভাগে ভাগ করিয়াছেন। এক, হাদীসে নববী- রাসূলে করীমের হাদীস; এবং দুই হাদীসে ইলাহী- আল্লাহর হাদীস। আর ইহাকেই বলা হয়, ‘হাদীসে কুদসী’। তিনি লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

‘হাদীসে কুদসী’ তাহা, যাহা নবী করীম (স) তাঁহার আল্লাহ তা’য়ালার তরফ হইতে বর্ণনা করেন, আর যাহা সেরূপ করেন না, তাহা হাদীসে নববী। [৪২************]

‘হাদীসে কুদসী’ কুরআন নয়; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও ইহাতে আল্লাহর কুদসী জগতের মনোমুগ্ধকর ঘ্রাণ মিশ্রিত রহিয়াছে। উহাও গায়েবী জগত হইতে আসা এক ‘নূর’। মাহন প্রতাপসম্পন্ন আল্লাহর দাপটপূর্ণ ভাবধারা উহাতেও পাওয়া যায়। ইহাই ‘হাদীসে কুদসী’। ইহাকে ‘ইলাহী’ বা ‘রব্বানী’ ও বলা হয়। [৪৩************]

প্রাচীনকালের হাদীস গ্রন্হাবলীতৈ হাদীসে কুদসীর বর্ণনা হয় এই ভাষায়ঃ

******************************************************

নবী করীম (স) আল্লাহর তরফ হইতে বর্ণনা করিতে গিয়া বলিয়াছেন………..

আর পরবর্তীকালের মুহাদ্দিগণ ইহা উদ্ধৃত করিয়াছেন এই্ ভাষায়ঃ

******************************************************

আল্লাহ বলিয়াছেন- যাহা নবী করীম (স) তাঁহার নিকট হইতে বর্ণনা করিয়াছেন……..।

বলা বাহুল্য, এই উভয় ধরনের কথার মূল বর্ণনাকারী একই এবং তিনি হযরত মুহাম্মদ (স)।[৪৪***********]

সনদ ও মতন

হাদীসের মূল কথাটুকু যে সূত্রে ও যে বর্ণনা পরস্পরা ধারায় গ্রন্হ সংকলনকারী পর্যন্ত পৌছিঁয়াছে, উহাকে ইলমে হাদীসের পরিভাষায় বলা হয় ‘সনদ’। উহাতে হাদীসের বর্ণনাকারীদের নাম একের পর এক সজ্জিত থাকে। এইজন্য বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

মূল হাদীস পৌছিঁবার পরস্পরা সূত্রই হইতেছে সনদ।[মুকাদ্দামা আল-হাদীস আল-মুহাদ্দিসূন, ২,৩,৪ পৃষ্ঠা।]

বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

হাদীসের সূত্র- উহার বর্ণনাকারী ব্যক্তিগণের পরস্পরাকে সনদ বলে।

******************************************************

হাদীসের মূল কথা ও উহার শব্দসমূহ হইতেছে ‘মতন’।

শায়খ আবদুল হক লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

সনদ সূত্র যে পর্যন্ত পৌছিঁয়াছে উহার পরবর্তী অংশকেই ‘মতন’ বলা হয়।

সনদ বা বর্ণনাকারীদের গুণগত পার্থক্যের দিক দিয়া হাদীসকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়। প্রথম ভাগে সেই সব হাদীস, যাহা ‘হাফেযে মুতকিন’ (নির্ভূলভাবে স্মরণ রাখিতে সক্ষম হাদীসের এমন হাফেয) লোকদের মাধ্যমে বর্ণিত হইয়াছে। দ্বিতীয় সেই সব হাদীস, যাহার বর্ণনাকারী অপ্রসিদ্ধ এবং স্মরণ ও সতর্কতার মধ্যম মানের লোক। আর তৃতীয় হইতেছে সে সব হাদীস, যাহা বর্ণনা করিয়াছে দুর্বল ও গ্রহণ অযোগ্য এবং অগ্রাহ্য লোকেরা। [৪৬*****************]

হাদীসসমূহের সনদভিত্তিক বিভাগ

হাদীসের সনদ- বর্ণনা পরম্পরা ধারা যে স্তর পর্যন্ত পৌছিয়াছে ও তাহা যেভাবে পৌছিঁয়াছে, এই দৃষ্টিতে হাদীসকে কয়েক ভাগে বিভক্ত করা হইয়াছে এব উহার প্রত্যেকটি ভাগেরে এক একটি পারিভাষিক নাম দেওয়া হইয়াছে। নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা যাইতেছেঃ

১। মারফূঃ যেসব হাদীসের বর্ণনা পরম্পরা রাসূল (স) পর্যন্ত পৌছিঁয়াছে, যে সূত্রৈ মাধ্যমে স্বয়ং রাসূলের কোন কথা, কোন কাজ করার বিবরণ কিংবা কোন বিষয়ের অনুমোদন বর্ণিত হইয়াছে, যে সনদের ধারাবাহিকতা রাসূলে করীম (স) হইতে হাদীস গ্রন্হ সংকলনকারী পর্যন্ত সুরক্ষিত হইয়াছে এবং মাঝখান হইতে একজন বর্ণনাকারীও উহ্য হইয়া যায় নাই তাহা ‘হাদীসে মারফূ’حديث نرفوع  নামে পরিচিত।

ইমাম নববী উহার সংজ্ঞা দিয়াছেন নিম্নোক্ত ভাষায়ঃ

******************************************************

‘মারফূ’ সেই হাদীস, যাহা বিশেষভাবে রাসূলের কথা-তিনি ছাড়া অপর কাহারো কথা নয়-বলিয়া বর্ণিত’।[৪৭********]

ইবনে সালাহ লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

যে কথা রাসূলের, অপর কাহারো নয়-কোন সাহাবীরও নয়, তাহাই ‘হাদীসে মারফূ’ নামে পরিচিত।[৪৮********]

দৃষ্টান্ত দ্বারা ইহা স্পষ্ট বুঝিতে পারা যাইবে। যেমন কোন সাহাবী বলিলেনঃ

******************************************************

রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি রাসূলে করীম (স)-কে এইরূপ বলিতে শুনিয়াছি-

এইরূপ বর্ণনাসূত্রে বর্ণিত হাদীসসমূহ ‘হাদীস মারফূ কাওলী’ নামে পরিচিত।

কিংবা কোন সাহাবী বলিলেনঃ

******************************************************

আমি রাসূলে করীম (স)-কে এইরূপ করিতে দেখিয়াছি।

ইহা ‘হাদীসে ‘মারফূ ফে’লী’ নামে পরিচিত। কেননা ইহা সাহাবীর বর্ণনাতে নবী করীমের কোন কাজের বিবরণ পেশ করে।

বা কোন সাহাবী বলিলেনঃ

******************************************************

আমি রাসূলে করীম (স)-এর উপস্থিতিতে এইরূপ কাজ করিয়াছি কিন্তু তিনি ইহার প্রতিবাদ করেন নাই।

ইহা ‘হাদীসে মারফূ ‘তাকরীরী’ নামে পরিচিত। নবী করীমের সামনে কোন কাজ করার এবং তাঁহার নিষেধ না করার কথা বলা হইয়াছে এই হাদীসে।

২।   যে সব হাদীসের বর্ণনাসূত্র (সনদ) ঊর্ধ্বদিকে সাহাবী পর্যন্ত পৌছিয়েঁছে-কোন সাহাবীর কথা কিংবা কাজ বা অনুমোদন যেসব সনদসূত্রে বর্ণিত হইয়াছে, তাহা ‘হাদীসে মওকুফ’ নামে অভিহিত। ইমাম নববী ইহার সংজ্ঞা দিয়াছেন এই ভাষায়ঃ

******************************************************

যাহাতে কোন সাহাবীর কথা বা কাজ কিংবা অনুরূপ কিছু বর্ণিত হয়- তাহা পরপর মিলিত বর্ণনাকারীদের দ্বারা বর্ণিত হউক কিংবা মাঝখানে কোন বর্ণনাকারীর অনুপস্থিতি ঘটুক- তাহা ‘মওকুফ হাদীস’।

৩।   যে সনদসূত্রে কোন তাবেয়ী’র কথা, কাজ বা অনুমোদন বর্ণিত হয়, তাহা ‘হাদীসে মকতু’ নামে পরিচিত। ইমাম নববী বলিয়াছেন **************** তাবেয়ী পর্যন্ত যাহার সূত্র পৌছিঁয়াছে, তাহাই ‘হাদীসে মকতু’।[৪৯**********]

৪।   যেসব হাদীসের সনদে উপর হইতে নিচ পর্যন্ত ধারাবাহিকতা পূর্ণরূপে রক্ষিত হইয়াছে, কোন স্তরেই কোন বর্ণনাকারী উহ্য হয় নাই, উহাকে ‘হাদীসে মুত্তাসিল’ ********** বলা হয়।

৫।   যেসব হাদীসের সনদের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় নাই, মাঝখানের কোন বর্ণনাকারী যদি উহ্য বা লুপ্ত হইয়া থাকে, তাহাকে ‘হাদীসে মুনকাতা’حديث منقطع   বলা হয়। [৫০************]

হাদীস বর্ণনাকারীদের নিজস্ব গুণ-পার্থক্যের দৃষ্টিতেও হাদীসের কতকগুলো বিভাগ হইয়া থাকে এবং উহাদের প্রত্যেকটিরই এক-একটি পারিভাষিক নাম দেওয়া হয়। যথাঃ

১।   যে হাদীসের বর্ণনাসূত্র ধারাবাহিক রহিয়াছে, সনদের প্রত্যেক স্তারের বর্ণনাকারীর নাম সঠিকরুপে উল্লিখিত হইয়াছে, বর্ণনাকারিগণ সর্বতোভাবে বিশ্বস্ত- সিকাহ, যাহাদের স্মরণ শক্তি অত্যন্ত প্রখর এবং যাঁহাদের সংখ্যা কোন স্তরেই মাত্র একজন হয় নাই, এইরূপ হাদীসকে পরিভাষায় ‘হাদীসে সহীহ’ ********* বলা হয়।

ইমাম নববী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

যে হাদীসের সনদ নির্ভরযোগ্য ও সঠিকরূপে সংরক্ষণকারী বর্ণনাকরীদের সংযোজনে পরম্পরাপূর্ণ ও যাহাতে বিরল ও ক্রটিযুক্ত বর্ণনাকারী একজনও নাই, তাহাই ‘হাদীসে সহীহ’।[৫১********]

২।   উপরিউক্ত সকল গুণ বর্তমান থাকার পর বর্ণনাকারীদের স্মরণ-শক্তি যদি কিছুটা দুর্বল প্রমাণিত হয়, তবে সেই হাদীসের পারিভাষিক নাম ‘হাদীসে হাসান’ (********)।

ইহার সংজ্ঞাদান প্রসঙ্গে ইমাম নববী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

যে হাদীসের উৎস সর্বজনজ্ঞাত ও যাহার বর্ণনাকারীগণ প্রখ্যাত, তাহাই হাদীসে হাসান।[৫২**********]

৩।   উপরিউক্ত সবরকমের গুণই যদি বণনাকারিদের মধ্যে কম মাত্রায় পাওয়া যায়, তবে তাহাদের বর্ণিত হাদীসকে ‘হাদীসে যয়ীফ’ *********** বলা হয়।

ইমাম নববী বলিয়াছেনঃ

******************************************************

যাহাতে সহীহ্ ও হাসান হাদীসের শর্তসমূহ পাওয়া যায় না তাহাই ‘যয়ীফ হাদসী’।[৫৪*******]

বর্ণনাকারীদের সংখ্যাভিত্তিক হাদীস বিভাগ

হাদীসের বর্ণনাকারীদের সংখ্যা সকল ক্ষেত্রে একই রূপ হয় নাই। বিভিন্ন হাদীসে বর্ণনাকারীদের সংখ্যা বিভিন্ন হইয়াছে। এই দিক দিয়া হাদীসের কয়েকটি বিভাগ এবং প্রত্যেকটি বিভাগের এক একটি পারিভাষিক নাম রহিয়াছে। এইখানে এই বিভাগগুলির সংক্ষিপ্ত বিবরণ উল্লেখ করা যাইতেছে।

১।   মুতাওয়াতির (*****) যে হাদীসের সনদের সকল স্তরেই বর্ণনাকারীদের সংখ্যা এত বেশী যে, তাঁহাদের সকলের একত্রিত হইয়া মিথ্যা কথা রচনা বা বলা স্বভাবতই অসম্ভব বলিয়া মনে হয়, এইরূপ হাদীসকে ‘হাদীসে মুতাওয়াতির’ বলা হয়। যেমন হাদীস ******************** সকল আমলের মূল্যায়ন নিয়ত অনুযায়ীই হয়। এই হাদীসটি সাত শতেরও অধিক সনদসূত্রে বর্ণিত হইয়াছে।[ ৩-شرح النخبة ص  মুহাদ্দিসগণ সাধারণত ‘মুতাওয়াতির’ হাদীসকে এই পারিভাষিক নামে অভিহিত করেন না। কেননা কোন হাদীসের ‘মুতাওয়াতির’ হওয়াটা সনদের আলোচনা পর্যায়ে গণ্য হয় না। তাহার কারণ এই যে, সনদশাস্ত্রে সাধারণত হাদীসের ‘সহীহ’ বা ‘যয়ীফ’ হওয়ার ব্যাপারটিই আলোচ্য- যেন হয় তদনুযায়ী আমল করা যায়, না হয় যেন উহা ত্যাগ করা যায়। উপরন্তু মুতাওয়াতির হাদীসের বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয় না। তদনুযায়ী আমল করা আলোচনা ব্যতিরেকেই ওয়াজিব। علوم الحديث ومصطله وشرح النخبة ج-3 ص- 150   ]

২। খবরে ওয়াহিদ (***********) যে হাদীসের বর্ণনাকারীদের সংখ্যা ও সনদ ‘মুতাওয়াতির’ হাদীস অপেক্ষা কিছুটা কম, তাহা ‘খবরে ওয়াহিদ’। এই ধরনের হাদীস তিন প্রকারের হইয়া থাকেঃ

ক.   সাহাবীদের পরবর্তী স্তরসমূহের কোন স্তরে বর্ণনাকারীদের সংখ্যা যদি তিনজন হইতে কম না হয়, তবে তাহা ‘হাদীসে মশহুর’ (*************)।

খ.   কোন স্তরেই যদি বর্ণনাকারীদের সংখ্যা দুইজনের কম না হয়, তবে তাহা ‘হাদীসে আযীয’ (**********)।

গ.   কোন স্তরে যদি বর্ণনাকারীদের সংখ্যা মাত্র একজন হয়, তবে সেই হাদীস ‘ হাদীসে গরীব’ (*************) নামে পরিচিত।

 

জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল সূত্র

জ্ঞান এবং বিদ্যার অর্থই হইতেছে অজানাকে জানা। যাহা অজ্ঞাত, যাহা মানুষের জ্ঞান-সীমার বহির্ভূত, তাহা জানিয়া লওয়া এবং উহার সকল দিক সম্পর্কে অবহিত হওয়াকেই বলা হয় জ্ঞান। বস্তুর জ্ঞান ও বিদ্যা হইতেছে আলো। আলোর স্ফুরণেই অন্ধকারের অবসান। জ্ঞান ও বিদ্যা মানব-মনের অজ্ঞতার পুঞ্জীভূত অন্ধকার বিদূরিত করিয়া দেয়, অন্তঃকরণকে করে আলোকোজ্জ্বল, জ্ঞানের মহিমায় সুষমামণ্ডিত।

কিন্তু কতগুলি তত্ত্ব ও তথ্যের সমারোহই জ্ঞান নয়। নির্ভরযোগ্য ও সংশয়াতীত সূত্রে লব্ধ সত্য তত্ত্ব ও তথ্যই হইতেছে প্রকৃত জ্ঞান। যে তত্ত্ব ও তথ্য সত্যভিত্তিক নয় এবং যাহা নির্ভযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত নয়, তাহা সংশয়াপন্ মানসলোককে মেঘমুক্ত করিতে পারে না, তাহা যেমন মানুষের কোন কল্যাণ সাধন করিতে পারে না, তেমনি ‘জ্ঞান’ নামে অভিহিত হওয়ারও সম্পূর্ণ অযোগ্য। এইরূপ জ্ঞানের উপর নির্ভর করিয়াজীবন-পথে পদবিক্ষেপ করা এবং অকুন্ঠিত চিত্তে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয় না। এই জন্য এমন জ্ঞান ও বিদ্যা মানুষের জন্য প্রয়োজন, যাহা সর্বতোভাবে সত্য ও নির্ভরযোগ্য, অকাট্য ও নিশ্চিত সূত্রে প্রাপ্ত। এইরূপ জ্ঞানই মানুষের মন ও মগজকে নিঃসংশয়, দৃঢ়-নিশ্চিত ও আলোকোদ্ভাসিত করিয়া তোলে। জীবন-পথের প্রতিটি বাঁক- প্রত্যেকটি চরাই-উতরাই পর্যন্ত দৃষ্টিপথে সমুদ্ভাসিত করিয়া দেয়। এইরূপ জ্ঞান ব্যতীত আমাদের না জৈব জীবন সঠিকরূপে চলিতে পারে, না মানুষ হিসাবে দুনিয়ায় বসবাস করা সম্ভব হয়।

কিন্তু এইরূপ জ্ঞান মানুষ কোথায় পাইবে? কোন সূত্রে এইরূপ জ্ঞান লাভ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব? ইহা এক কঠিন প্রশ্ন। এই সম্পর্কে একটু গভীরভাবেই আমাদিগকে বিচার-বিবেচনা ও আলোচনা-পর্যালোচনা করিয়া দেখিতে হইবে।

নির্ভূল, অকাট্য ও নির্ভরযোগ্য জ্ঞান-অর্জনের জন্য মানুষকে স্বাভাবিকভাবেই যেসব উপায় ও সূত্র দান করা হইয়াছে, তন্মধ্যে বাহ্যিক ও প্রাথমিক সূত্র হইতেছে মানুষের পঞ্চেন্দ্রিয়। কিন্তু এই পঞ্চেন্দ্রিয় একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্তই মানুষের জন্য পরিধির সমাপ্তি। উহার বহির্ভূত কোন জ্ঞানই মানুষকে দেওয়া সাধ্যাতীত। উপরন্তু পঞ্চেন্দ্রিয় লব্ধ জ্ঞান যে সর্বতোভাবে নির্ভূল ও সম্পূর্ণ সংশয়মুক্ত, তাহা নিশ্চঢ করিয়া বলা সম্ভব নয়। ইহা মানুষকে অনেক সময় নিতান্ত ভূল তথ্য পরিবেশন করে, মানুষকে প্রতারিতও করে কখনো কখনো। মানুষ রোগাক্রান্ত হইলে তাহার রুচিবিকৃতি ঘটে, মুখ বিস্বাদ হইয়া যায়, মিষ্টি হইয়া যায় তিক্ত। দ্রুতগতিশীল রেলগাড়ীর আরোহীর দৃষ্টি প্রতারিত হয়, দুই পার্শ্বের স্থায়ীভাবে দণ্ডায়মান দৃশ্যাবলী বিপরীত দিকে দুরন্ত বেগে ধাবমান বলিয়া মনে হয়। চলমান জাহাজ মনে হয় স্থির, দণ্ডায়মান। এক বিন্দু অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সরল ঋজু-পথে তীব্র গতিতে ছুটিয়া চলিলে উহা একটি একটানা জ্বলন্ত অগ্নিরেখা বলিয়া মনে হইবে, আর বৃত্তাকারে চলিলে মনে হইবে একটি অগ্নিবৃত্ত। দূর ঊর্ধ্বলোকরে বৃহদায়তন নক্ষত্ররাশিকে ক্ষুদ্রাকায় ও মিটমিট করা ক্ষীণ দ্বীপশিখা বলিয়া মনে হওয়া একটি সাধারণ ব্যাপার, কিন্তু তাহা প্রকৃত পক্ষেও কি সেইরূপ?

মানুষের জ্ঞানার্জনের দ্বিতীয় সূত্র হইতেছে অন্তর্নিহিত বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, চিন্তা-গবেষণা, যুক্তির ভিত্তিতে বিচার-বিবেচনা। ইহা মূলত প্রথম পর্যায়ের জ্ঞান-সূত্র লব্ধ তথ্যের ভিত্তিতেই জ্ঞা পরিবেশন করে। সংগৃহীত তথ্যের উপর অজনা জ্ঞানের প্রাসাদ নির্মাণ করে। আয়ত্তাধীন তথ্যবস্তু জগত হইতে সংগৃহীত হইলে উহার ভিত্তিতে লব্ধ জ্ঞান অনেকটা সন্দেহ বিমুক্ত হইতে পারে। আর বস্তু বিজ্ঞানের (Physical Science) মূল ক্ষেত্রে ইহাই। কিন্তু বস্তু-অতীত তথ্যভিত্তিক জ্ঞান নিছক ধারণা অনুমান ছাড়া আর কিছুই নয়। যাবতীয় মানব-রচিত মতাদর্শ ও দর্শন ইহারই উৎপাদন। ইহা যেমন সম্পূর্ণ সন্দেহমুক্ত নয়, তেমনি ইহাতে মতবৈষম্য সৃষ্টিরও যথেষ্ট অবকাশ বিদ্যমান। আধুনিক দার্শনিক চিন্তাধারা ও মতাদর্শ এই কারণেই চরমভাবে দুর্দশাগ্রস্ত।

বসউতু জগতের সহিত সম্পর্কহীন যে জ্ঞান, তাহার স্থান ইহার পর। ইহা যদিও বস্তু-অতীত জ্ঞান, তথাপি ইহা বস্তুনিষ্ঠ মন ও মগজের সূক্ষ্ম দর্পণের উপরই প্রতিফলিত ও প্রতিবিম্বিত হয়। প্রথম পর্যায়ের জ্ঞান যেমন প্রত্যক্ষ্যভাবে বস্তু নির্ভর, এই দ্বিতীয় পর্যায়ের জ্ঞানও তেমনি মানুষের মন ও আধ্যাত্মিক শক্তির সহিত সংশ্লিষ্ট।

এই শেষোক্ত জ্ঞানসূত্রের কয়েকটি স্তর রহিয়াছে- ফিরাসত, (Insight observation) হদস্, (Conjecture) কাশফ, ইলহাম ও ওহী। ফিরসাত অর্থ দূরদৃষ্টি অন্তদৃষ্টি- ইহা একটি স্বভাবজাত প্রতিভা। ইহার সাহায্যে যে সব কথাবার্তা বলা হয়, সাধারণ মানুষের মনে তাহা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। ইহার পর ‘হদস’। ইহা একান্তুভাবে মানস চর্চা ও মননশীলতার ফল, যাকে আরা বলি প্রজ্ঞা। কাশফ অর্থ উদঘাটন, কোন অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে অন্তর্লোকে জ্ঞানের স্ফূরণ হওয়াই হইল ‘কাশফ’। ইহার উত্তম দৃষ্টান্ত স্বপ্ন। তবে পার্থক্য এই যে, স্বপ্ন নিদ্রার মধ্যে সম্ভব; কিন্তু ‘কাশফ’ হয় জাগ্রত ও সচেতন অবস্থায়। ‘ইলহাম’ অর্থ, মনে কোন জ্ঞানে সঞ্চার হওয়া। কোন চেষ্ট যত্ন ব্যতীতই মানসপটে জ্ঞানের আলো জ্বলিয়া উঠা। ‘ওহী’ এই পর্যায়ের সর্বোচ্চ জ্ঞানসূত্র। লোকচক্ষুর অন্তরালে অদৃশ্য উপায়ে ব্যক্তিকে বিশেষ কোন লোকাতীত ও সন্দেহমুক্ত জ্ঞান দানই হইতেছে ‘ওহী’। জ্ঞানলাভ ও তত্ত্ব পরিবেশনের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক উপায় এবং জ্ঞান সূত্রের নির্ভরযোগ্য সর্বশেষ সীমা ইহাই।

 

ওহী

‘ওহী’ সম্পর্কে ব্যাপক ও প্রমাণ্য আলোচনা আবশ্যক। প্রামাণ্য গ্রন্হাবলী হইতে ‘ওহী’ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা এখানে পেশ করা যাইতেছে।

‘ওহী’ শব্দের আভিধানিক অর্থ নিম্নরূপঃ

******************************************************

‘ওহী’ অর্থ ইশারা করা, কিছু লিখিয়া পাঠানো, কোন কথাসহ লোক প্রেরণ, গোপনে অপরের সহিত কথা বলা, অপরের অজ্ঞাতসারে কাহাকেও কিছু জানাইয়া দেওয়া।[৫৬****************]

আবূ ইসহাক লুগভী বলেনঃ

******************************************************

সকল অভিধানেই ‘ওহী’ অর্থ গোপনে কিছু জানাইয়া দেওয়া’।

ইমাম রাগেব ইসফাহানী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

‘ওহী’ অর্থ দ্রুত গতিশীল ইশারা, ইঙ্গিত; ইহা ইশার-ইঙ্গিতে কথা বলা দ্বারাও সম্পন্ন হইতে পারে। ইহা এমন শব্দেও হইতে পারে যাহার কোন সঠিক রূপ নাই। আবার ইহা অঙ্গের ইশারা বা লিখনীর সাহায্যেও হইতে পারে।[৫৭**************]

কুরআন মজীদে বলা হইয়াছেঃ

***********************************************

তখন আল্লাহ তাহাদিগকে ইংগিত বলিলেন যে, সকাল ও সন্ধ্যায় তসবীহ কর।[সূরা মরিয়ম, ১১ আয়াত]

আল্লাহর যে বাণী নবীগণের মানসপটে নিক্ষেপ করা হয় তাহাকেও ‘ওহী’ বলা হয়।

শায়খ আবদুল্লাহ সারকাভী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

‘ওহী’ অর্থ ‘জানাইয়া দেওয়া’। আর শরীয়াতের পরিভাষায় ওহী হইল- আল্লাহ তাঁহার নবীগনকে কোন বিষয়ে কথা বলিয়া বা ফেরেশতা পাঠাইয়া কিংবা স্বপ্নযোগে অথবা ইলহামের সাহায্যে জানাইয়া দেওয়া। এই শব্দটি ‘আদেশ দান’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়।[৫৯**********]

বস্তুত ওহীর নিগূঢ় তত্ত্ব ও প্রকৃত রহস্য কি, তাহা আল্লাহ ছাড়া আর কেহই সঠিকরূপে জানেন না। আভিধানিক, ধর্ম বিজ্ঞান বিশারদ ও দার্শনিকগণ ইহার সংজ্ঞা দিতে ও ইহার তাৎপর্য ও পরিচয় বর্ণনা করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। তাহা হইতে ‘ওহী’ সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ও মোটামুটি ধারণা সহজেই জন্মে। শায়খ বু’আলী সীনা এই প্রসংগে যাহা বলিয়াছেন, তাহা আল্লামা আবুল বাকা’র ভাষায় নিম্নে উদ্ধৃত হইলঃ

******************************************************

আমরা ইন্দ্রিয় শক্তির সাহায্যে দ্রব্যাদি দেখিয়া থাকি, নবী অভ্যন্তরীণ ও অন্তর্নিহিত শক্তির সাহায্যে দেখেন। আমরা প্রথমে দেখি, তাহার পর সে সম্পর্কে জানিতে পারি। আর নবী প্রথনেই জানিতে পারেন, তাহার পর দেখেন। [৬০**********]

নবী করীমের প্রতি নিম্নলিখিত উপায়ে ওহী নাযিল হইতঃ

১।   সত্য স্বপ্নঃ নবুয়্যাত লাভের প্রথম পর্যায়ে নবী করীম (স) স্বপ্ন দেখিতে পাইতেন এবং তাঁহার এই স্বপ্ন অত্যন্ত ভাল হইত। প্রত্যেকটি স্বপ্নই নির্ভূল, সত্য ও বাস্তব প্রমাণিত হইত। হযরত আয়েশা (রা) বলেনঃ

******************************************************

রাসূলের প্রতি ওহী নাযিল হওয়া শুরু হয় সর্বপ্রথম নিদ্রাোযোগে ভাল ভাল স্বপ্নের মাধ্যমে। এই সময় তিনি যে স্বপ্নই দেখিতেন, তাহাই প্রভাত-আলোর মত বাস্তবে প্রতিফলিত হইত। [৬১**********]

মুসলিম শরীফের বর্ণনায় ********** ‘ভাল স্বপ্ন’-এর পরিবর্তে *********** ‘সত্য স্বপ্ন’ উল্লিখিত হইয়াছে।[৬২***********]

২।   দিলের পটে উদ্রেক হওয়াঃ একটি হাদীসে নবী করীম (স)-এর এই কথাটি উদ্ধৃত হইয়াছেঃ

******************************************************

জিব্রাঈল ফেরেশতা আমার মনের পটে এই কথা ফুকিয়া দিলেন যে, নির্দিষ্ট রিযিক পূর্ণরূপে গ্রহণ করা ও নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল পূর্ণ হওয়ার আগে কোন প্রাণীই মরিতে পারে না।[৬৩************]

এই হাদীসে ‘আমার মনের পটে ফুকিয়া দিলেন’ কথাটি ওহী নাযিল করার এক বিশেষ পন্হার নির্দেশ করে। আল্লামা ইবনে কাসীর লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

এই আয়াত হইতে ওহী নাযিল হওয়ার বিভিন্ন পন্হার অস্তিত্ব জানা যায়। ‘আল্লাহ তা’য়ালা কখনো কখনো নবী করীমের অন্তর্লোকে কোন কথা জাগ্রত করিয়াদিতেন যাহা আল্লাহর নিকট হইতে আসা সম্পর্কে কোন সন্দেহ করা যাইতে পারে না।[৬৪*************]

৩।   ঘন্টার ধ্বনির মত শব্দে ওহী নাযিল হওয়াঃ হযরত আয়েশা (রা) হযরত হারিস ইবনে হিশাম (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি নবী করীম (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ

******************************************************

আপনার নিকট ওহী কিভাবে নাযিল হয়?

ইহার জওয়াবে নবী করীম (স) ইরশাদ করেনঃ

******************************************************

কখনো ওহী আমার নিকট প্রচণ্ড ঘন্টার ধ্বনির মত আসে। ইহা আমার উপর বড় কঠিন ও দুঃসহ হইয়া থাকে। পরে ওহীর তীব্রতা ও প্রচণ্ডতা আমার উপর হইতে কাটিয়া যায়। এই অবসের যাহা বলা হইল তাহা সবই আমি আয়ত্ত ও মুখস্থ করিয়ালই।[৬৫*************]

এই কথা হইতে স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায় যে, সর্বপ্রকারের ওহীই অত্যন্ত দুঃসহ ব্যাপার হইলেও তন্মধ্যে এই প্রকারের ওহী রাসূলের উপর সর্বাধিক মাত্রায় দুঃসহ হইয়া পড়িত। এই প্রকারের ওহী সম্পর্কে রাসূলে করীম (স) নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি লৌহ ঘন্টার ধ্বনি শুনিতে পাই, তখন আমি চুপচাপ বসিয়া থাকি। এইরূপ ওহী যখনই নাযিল হয়, তখনই আমার মনে হয় যেন আমার জান কবজ হইয়া যাইবে।

এইরূপ অবস্থায় রাসূলৈর দেহ হইতে অজস্র ধারায় ঘর্মস্রোত প্রবাহিত হইত। কঠিন শীত ও প্রচণ্ড ঠাণ্ডার সময়ও ইহার ব্যতিক্রম হইত না। তখন কোন শক্তিশালী উষ্ট্রের পৃষ্ঠে আরোহী থাকিলেও উহা প্রচণ্ড চাপ অনুভব করিয়া বসিয়া পড়িত।

আল্লামা কিরমানী এই হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

ইহা হইতে জানা গেল যে, রাসূলের প্রতি যখন ওহী নাযিল হইত, তখন তিনি খুব বেশী কষ্ট ও তীব্র চাপ অনুভব করিতেন এবং তাঁহার প্রতি যাহা নাযিল হইত, উহার দুর্বহ ভাবে এক দুঃসহ যন্ত্রণা তাঁহাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিত। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁহার নিম্নোক্ত বানীতে ইহাই বলিয়াছেনঃ শীঘ্রই আমি তোমার উপর এক ভারি কথা নাযিল করিব। [৬৬************]

৪।  ফেরেশতা কোন এক ব্যক্তির বেশে রাসূলের নিকট উপস্থিত হইতেন এবং আল্লাহর নিকট হইতে প্রেরিত বাণী পৌঁছাইয়া কিংবা নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করিয়া চলিয়াযাইতেন। নবী করীম (স) নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

কখনো ফেরেশতা কোন ব্যক্তির রূপ ধারণ করিয়া আমার নিকট আসেন, তিনি আমার সহিত কথা বলেন এবং যাহ বলেন তাহা আমি ঠিকভাবে আয়ত্ত করিয়া লই। [বুখারী শরীফ, ১ম খন্ড, ১ম পৃষ্ঠা]

প্রসংগত উল্লেখযোগ্য যে, ফেরেশতা বিশেষভাবে হযরত দাহিয়া কালবী নামক সাহাবীর রূপ ধারণ করিয়া আগমন করিতেন। ইহার কারণ সম্পর্কে আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

অন্যান্য সাহাবীদের পরিবর্তে বিশেষভাবে দাহিয়া কালবীর রূপ ধারণ করিয়া ফেরেশতা আগমন করার কারণ এই যে, তিনিই সে সময়ের লোকদের মধ্যে সর্বাধক সুশ্রী সুন্দর চেহারাবিশিষ্ট ছিলেন।[৬৮***********]

নিতান্ত অপরিচিত ব্যক্তির বেশে ফেরেশতার আগমন এবং জরুরী কথা পৌঁছাইয়া দেওয়ার বিবরণও হাদীসে উল্লিখিত হইয়াছে। হযরত আবূ হুরায়রা কর্তৃক বর্ণিক এক দীর্ঘ বিবরণের শেষে রাসূল (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

এই ব্যক্তি জিব্রাঈল, জনগণকে তাহাদের দ্বীন শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে আসিয়াছেন।[মুসলিম শরীফ, ১ম খণ্ড, ২৯ পৃষ্ঠা ববীসহ।]

৫। জিব্রাঈল (আ)-এর নিজের ছবি-সুরত ও আকার-আকৃতি সহকারে রাসূলে করীম (স)-এর সম্মুখে উপস্থিত হওয়া ও ওহী পৌঁছাইয়া দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হইয়াছে। বুখারী শরীফে হযরত আয়েশা (রা) বর্ণিত প্রথম ওহী নাযিল হওয়া সম্পর্কিত হাদীসে বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

অতঃপর তাঁহার নিকট ফেরেশতা আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং বলিলেনঃ পড়।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, ১ম পৃষ্ঠা।]

দ্বিতীয়বারে ফেরেশতা দর্শনের বিবরণ রাসূলে করীম (স)- এর নিজস্ব ভাষায় নিম্নরূপঃ

******************************************************

আমি পথ চলিতেছিলাম, হাঠাৎ ঊর্ধ্বদিক হইতে একটি আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। আকাশের দিকে চোখ তুলিয়া তাকাইতেই দেখিতে পাইলাম সেই ফেরেশতা, যিনি ইতিপূর্বে হেরা গুহায় আমর নিকট আসিয়াছিলেন, তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি আসনে উপবিষ্ট। অতঃপর আল্লাহ তা’য়ালা সূরা মুদ্দাসসির নাযিল করেন।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, ৭৩৩ পৃষ্ঠা]

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, কুরআন মজীদ সম্পূর্ণ এই প্রকারের ওহীর মাধ্যমে নাযিল হইয়াছে। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

এই কুরআন নিঃসন্দেহে রাব্বুল আলামীন আল্লাহরই নাযিল করা, ইহা লইয়া জিব্রাঈল আমীন নাযিল হইয়াছে এবং ইহা (হে নবী) তোমার হৃদয়ের উপর অবতীর্ণ হইয়াছে, যেন তুমি লোকদের ভয় প্রদর্শন কারী হও। [এই আয়াতে ‘রুহুল আমীন’ বলিতে যে হযরত জিব্রাঈলকে বুঝানো হইয়াছে, তাহাতে দ্বিমত নাই। **********]

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী এই প্রসংগে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স) হইতে বর্তমান সময় পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও নিরবিচ্ছিন্ন বর্ণনা ধারা উদাত্ত কন্ঠে ঘোষণা করিতেছে যে, আমাদের নবী করীমের প্রতি কুরআন লইয়া যিনি আসিতেন, তিনি হইলেন হযরত জিব্রাঈল (আ) যে সবসময়ই শুধু কুরআন লইয়া আসিতেন, তিনি হইলেন হযরত জিব্রাঈল (আ)। এই ব্যাপারে কোন অস্বীকৃতি বা প্রতবাদ কেহই জানায় নাই, কেহ একবিন্দু দ্বিমতও পোষণ করে নাই।[৭৩***********]

বস্তুত জিব্রাঈল (আ) ফেরেশেতার মাধ্যমেই কুরআন মজীদ নাযিল হইয়াছে, ইহা সর্ববাদীসম্মত ও অকাট্য। কিন্তু জিব্রাঈল (আ) যে সবসময়ই শুধু কুরআন লইয়া আসিতেন, কুরআন ছাড়া দ্বীন-ইসলামের অপর কোন কথা লইয়া আসিতেন না, তাহাও কিছুমাত্র ঠিক নহে। কেননা হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনায় স্পষ্ট  দেখা যায়, তিনি স্বরূপে আল্লাহর নিকট হইতে রাসূলে করীমের নিকট উপস্থিত হইয়াছেন; কিন্তু কুরআনের কোন আয়াত বা সূরা লইয়া আসেন নাই, আসিয়াছেন দ্বীন-ইসলাম সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়াদি পেশ করার উদ্দেশ্যে। দৃষ্টান্তস্বরূপ এখানে একটি হাদীস উল্লেখ করা যাইতেছে।

হযরর উমর ফারূক (রা) বলেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স) যখন ‘আকীকা’ নামক উপত্যকায় অবস্থান করিতেছিলেন, তখন তাঁহাকে এই কথা বলিতে শুনিয়াছি, তিনি বলিতেছিলেনঃ আমার নিকট বিগত রাত্রে আল্লাহর নিকট হইতে একন আগমনকারী আসিয়াছেলেন এবং আমাকে বলিয়াছেনঃ এই বরকতপূর্ণ উপত্যকায় নামায পড় এবং বল যে, ইহা ‘হজ্জ’ কালীন ‘উমরা’।[৭৪*************]

এই হাদীসে ‘আগমনকারী’ বলিয়া নবী করীম (স) যে হযরত জিব্রাঈলকেই বুঝাইয়াছেন, তাহা সুস্পষ্ট। কিন্তু তিনি কুরআনের কোন আয়াত লইয়াআসেন নাই এবং নবী করীম (স)- কে কুরআনের কোন আয়াতও শোনাইয়া যান নাই। বরং তিনি আসিয়া ‘কেরান’ ধরনের ‘হজ্জ’ জায়েয হওয়া সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশ জানাইয়া গিয়াছেন। কিন্তু এই কথা কুরআনে সন্নিবেশিত হয় নাই। কুরআনে ‘হজ্জে কেরা’- এর কোন উল্লেখও নাই। তাহা হইলে কুরআন নাযিল করা ছাড়াও যে হযরত জিব্রাঈল (আ) কোন দ্বীনী কথা লইয়া রাসূলের নিকট আগমন করিতেন, তাহা প্রমাণিত হইত।

পাচঁখানি প্রধান সহীহ হাদীসের কিতাবের নিম্নোক্ত হাদীসটি উল্লেখ করা হইয়াছে, এই পর্যায়ে তাহাও উল্লেখ্য। হাদীসটি এইঃ

******************************************************

রাসূলৈ করীম (স) বলিয়াছেনঃ আমার নিকট জিব্রাঈল আসিলেন এবং আমার সাহাবিগণকৈ উচ্চস্বরে তাকরীর ও তাহলীল বলিতে আদেশ করার জন্য আমাকে নির্দেশ দিলেন।[৭৫***************]

ইমাম আহমদ ইবনে হা’ল (রা) তাঁহার মুসনাদে এই হাদীসটিকে উল্লেখ করিয়াছেন এই বলিয়াঃ

******************************************************

নবী করীমের নিকট জিব্রাঈল আসিলেন এবং বলিলেন।[৭৬**************]

৬।  পর্দার অন্তারাল হইতে রাসূলে করীমের সাথে স্বয়ং আল্লাহ তা’য়ালার কথা বলা এবং ওহী নাযিল করা। ইহাতে ফেরেশতার মধ্যস্থতার কোন অবকাশ থাকে না। আল্লাহ তা’য়ালা সরাসরিভাবে রাসূলে করীমের অন্তর্লোকে ওহী নাযিল করিয়া দেন। এই পর্যায়ে কুরআন মজীদে বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

আল্লাহ কোন লোকের সহিত কথা বলেন না, তবে তিনি ওহী নাযিল করেন কিংবা পর্দার অন্তরাল হইতে কথা বলেন।[ সূরা আশশুরা, ৫১ আয়াত।]

এই আয়াতের তাফসীরে আল্লামা ইবনে কাসীর লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

 পর্দার অন্তরাল হইতে কথা কথা বলার দৃষ্টান্ত, যেমন মূসা (আ) আল্লাহর সহিত কথাবার্তা বলার পর তিনি তাঁহাকে দেখিতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু আল্লাহ দর্শন না দিয়া  পর্দা ফেলিয়া দিলেন।[৭৮*************]

মি’রাজের রাত্রে আল্লাহ তা’আলা রাসূলে করীমের সহিত এইরূপ অন্তরালে থাকিয়াই কথা বলিয়াছিলেন। ইহা রাসূলের সম্পূর্ণ জাগ্রত ও সচেতন অবস্থায় সম্পন্ন হইয়াছিল। রাসূলে করীম (স) নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমাকে যখন মি’রাজে ঊর্ধ্বলোকে লইয়া যাওয়া হইল, তখন আল্লাহ তা’য়ালা আমাকে তাঁহার অতি নিকটবর্তী করিয়া লইলেন। এমন কি শেষ পর্যন্ত তাঁহার ও আমার মাঝে ধনুক ও তীরের মধ্যবর্তী দূরত্বটুকু অবশিষ্ট থাকে কিংবা তাহা হইতেও কম। তখন তিনি বলিলেনঃ ‘হে মুহাম্মদ‍‍!’ আমি বলিলামঃ ‘হে পরোয়ারদিগার, আমি আপনার অতি নিকটেই অবস্থিত’। [৭৯*****************]

নিদ্রিতাবস্থায়ও এইরূপ ‘ওহী’ নাযিল হওয়ার ঘটনা সংঘটিত হইয়াছে। নবী করীমের নিজের একটি বাণী হইতেই ইহা প্রমাণিত। তিনি ইরশাদ করেনঃ

******************************************************

আল্লাহ আমার নিকট এক উত্তম অনুপমরূপে আগমন করিলেন এবং বলিলেনঃ উচ্চতর জগত (ফেরেশতাকুল) কি বিষয় লইয়া বিতর্ক করিতেছে? [৮০****************]

মোটকথা, অদৃশ্য জগত হইতে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য জ্ঞান লাভের যে সূত্র, কুরআনের পরিভাষায় তাহাকেই বলা হইয়াছে ‘ওহী’। এই সূত্রে নবী রাসূলগণ যে জ্ঞান, তথ্য ও তত্ত্ব লাভ করেন, তাহার প্রতি তাঁহারা নিশ্চিত বিশ্বাসী হইয়া থাকেন। উহার সত্যতা সম্পর্কে তাঁহাদের মনে একবিন্দু উদ্রেক হয় না। এই বিশ্বাস ও সন্দেহহীনতা বস্তুজগত হইতে অর্জিন জ্ঞান অপেক্ষা শত-সহস্র গুণ অধিকতর নিশ্চিত ও দৃঢ় বিশ্বাসযোগ্য। এ উৎসলব্ধ জ্ঞান সম্পর্কেই কুরআন মজীদে উদাত্ত কন্ঠে বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

নবী নিেজর ইচ্ছা ও খাহেশমত কোন কথা বলে না, যাহা বলে তাহা অবতীর্ণ ওহী ভিন্ন আর কিছু নহে। [সূরা আন- নাজম, আয়াত ৩-৪।]

কুরআন মজীদ এই ওহী সূত্রে প্রাপ্ত আল্লাহর কালাম। কিন্তু কেবল কুরআন মজীদই এই সূত্রে পাওয়া একমাত্র জ্ঞান সম্পদ নহে; এতদ্ব্যতীত আরো বহু জ্ঞান ও তথ্য সরাসরি কিংবা ফেরেশতার মাধ্যমে নবী লাভ করেন। অবশ্য এ দুই শ্রেণীর জ্ঞানের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রহিয়াছে। কুরআন মজীদ পুরাপুরি আল্লাহর কালাম, অন্যান্য জ্ঞান ও তথ্য আল্লাহর নিকট হইতে ওহীর মাধ্যমে পাওায়া গেলেও তাহা আল্লাহর কালাম নহে। এই দ্বিতীয় পর্যায়ের জ্ঞান ও তথ্যের উদ্দেশ্য হইতেছে আল্লাহর নিজস্ব কালামা-কুরআন মজীদের নির্ভুল ও সঠিক ব্যাখ্যা এবং বিশ্লেষণ দান। এ কারণে এই উভয় প্রকারের সবকিছুই; আল্লাহর নিকট হইতেই প্রাপ্ত। এজন্য উহার প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও ভাষা সর্বতোভাবে সুরক্ষিত। উহাতে কোন প্রকার রদবদল বা পরিবর্তন-পরিবর্ধনের কোন অবকাশ থাকিতে পারে না।

পক্ষান্তরে হাদীসের শব্দ ও ভাষা নহে, কেবলমাত্র ভাব এবং মূল কথাটাই আল্লাহর নিকট হইতে প্রাপ্ত। এ কারণে কুরআন মজীদের সর্বাঙ্গীন সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

নিশ্চয়ই আমি কুরআন নাযিল করিয়াছি এবং আমিই উহার সংরক্ষণকারী।[সূরা আল-হিজর, আয়াত ৯।]

কিন্তু কুরআন ব্যতীত ওহী সূত্রে প্রাপ্ত অন্যান্য জ্ঞানের ভাষা ও শব্দ আল্লাহ কর্তৃক সুরক্ষিত নহে, উহার শব্দ ও ভাষা রাসূলের নিজস্ব, উহাকে কুরআনের ন্যায় সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহ নিজে গ্রহণ করেন নাই। তাহার উপর বেশি গুরুত্বও আরোপ করা হয় নাই। উহাকে কখানো ‘আল্লাহর বাণী’ ও বলা হয় নাই।

 

হাদীসের উৎস

পূর্বের আলোচনা হইতে একথা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা’আলা বিশ্বনবীল প্রতি যে ওহী নাযিল করিয়াছেন, তাহাই হইতেছে হাদীসের মূল উৎস। আল্লাহর প্রেরিত ওহী প্রধানত দুই প্রকারেরঃ প্রথম প্রকারের ওহীকে বলা হয় ‘ওহী’য়ে মতলু’- সাধারণ পঠিতব্য ওহী’ ইহাকে ওহীয়ে জ্বলীও বলা হয়। আর দ্বিতীয় প্রকারের ওহী ‘ওহীয়ে গায়র মতলূ; নামে পরিচিত। ইহা সাধারণত তিলাওয়াত করা হয় না। ইহার অপর এক নাম ‘ওহীয়ে খফী’–প্রচ্ছন্ন ওহী। ইহা হইতে জ্ঞান লাভ করার সূত্রে এবং এই সূত্রলব্ধ জ্ঞান উভয়ই বোঝানো হয়।

শরীয়াতের মূল ভিত্তি হিসাবে কুরআনের পরেই হাদীসের স্থান। আল্লাহর হেদায়েত ও নির্ভূল নির্ভরযোগ্য সত্য জ্ঞানের যে উৎস হইতে কুরআন মজীদ অবতীর্ণ, হাদীসেও ঠিক সেই উৎস হইতেই নিঃসৃত। কুরআন মজীদের ঘোষণা হইতেই এই কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

হে নবী! আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমাত নাযিল করিয়াছেন এবং তুমি যাহা জানিতেন না, তাহা তোমাকে শিক্ষা দিয়াছেন। [সূরা আন-নিসা, ১১৩ আয়াত।]

এই আয়াতের তাফসীরে আল্লামা ইবনে কাসীর লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

 আয়াতে উল্লিখিত আল-কিতাব অর্থ কুরআন মজীদ এবং হিকমত অর্থ সুন্নত বা হাদীসে রাসূল (এবং এই উভয় জিনিসই আল্লাহর নিকট হইতে আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ।) [তাফসীরে ইবনে কাসীর।]

নবী করীম (স)- এর নিম্নোক্ত বাণীও প্রমাণ করে যে, কুরআন এবং হাদীস উভয়ই একই স্থান ও একই সূত্র হইতে প্রাপ্ত। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমাকে কুরআন দেওয়া হইয়াছে এবং সেই সঙ্গে উহারই মত আর একটি জিনিস।[কাঞ্জুল উম্মাল, -শায়ক আলাউদ্দীন; আবূ দাউদ, কিতাবুস সুন্নাহ।]

‘উহার মত আর একটি জিনিস’ কথাটির অর্থ হাদীস ছাড়া আরি কিছু হইতে পারে না। কেননা দুনিয়ার মানুষ রাসূলে করীম (স)-এর হইতে এই দুইটি জিনিসই লাভ করিয়াছেন।

হযরত হাসসান ইবনে সাবিত (রা) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

জিব্রাঈল (আ) হযরতের নিকট সুন্নাত বা হাদীস লইয়া নাযিল হইতেন, যেমন নাযিল হইতেন কুরআন লইয়া এবং তাঁহাকে সুন্নাতও শিক্ষা দিতেন, যেমন শিক্ষা দিতেন কুরআন।[৮৬**********]

হাসন ইবনে আতীয়াতা বলিয়াছেনঃ

******************************************************

রাসূলে করীম (স) –এর প্রতি ‘ওহী’ নাযিল হইত এবং হযরত জিব্রাঈল তাঁহা নিকট সুন্নাত লইয়া হাযির হইতেন, যাহা প্রথম প্রকার ওহী কুরআনের-ব্যাখ্যা দান করে। [৮৭***********]

কুরআনের আয়াত ছাড়া শুধু হাদীস লইয়াও হযরত জিব্রাঈল নবী করীমের নিকট উপস্থিত হইতেন, একথা মুসলিম শরীফের একটি হাদীস হইতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। কিতাবুল জিহাদ- এ উল্লেখিত—

******************************************************

হাদীসে আত্মোনিবেদিত নিষ্ঠাবান মুজাহিদের গুনাহ মাফ হওয়া সম্পর্কে এক লম্বা কথা বর্ণনা করার পর রাসূলে করীম (স) বলিলেনঃ

জিব্রাঈল (আ) নিজেই আমাকে এই কথা বলিয়া গেলেন।

এই কথাটি এই পর্যায়ে খুবই স্পষ্ট ও অকাট্য।

বস্তুত নবী করীম (স) দ্বীন সম্পর্কিত যাবতীয় ব্যাপারে আল্লাহর নিকট হইতে নির্ভূল জ্ঞান লাভ করার পরই কথা বলিতেন। দ্বীন সম্পর্কিত কোন কথাই িতনি নিজস্ব আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে বলিতেন না। ইহা র বাস্তব প্রমাণ এই যে, তাঁহার নিকট দ্বীন-ইসলাম সংক্রান্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হইলে এবং সে বিষয়ে তাঁহার পূর্ব জ্ঞান না থাকিলে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই উহার কোন জওয়াব দিতেন না। বরং জিব্রাঈলের মারফতে আল্লাহর নিকট হইতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সঠিক জ্ঞান লাভের অপেক্ষায় থাকিতেন। তিনি এই উপায়ে যখন জানিতে পারিতেন, তখনই সেই জিজ্ঞাসার জওয়াব দান করিতেন। উহার দুইটি দৃষ্টান্ত পেশ করা যাইতেছেঃ

১। এক ইয়াহুদী পণ্ডিত নবী করীমের নিকট জিজ্ঞাসা করিলঃ পৃথিবীতে উত্তম স্থান কোনটি? ইহার সঠিক জওয়াব উপস্থিতভাবে নবী করীমের জানা ছিল না, সেই কারণে তিনি এই প্রশ্নের জওযাব সঙ্গে সঙ্গেই দিলেন না। পরে জিব্রাঈলেরে আগমন হইলে তিনি তাঁহার নিকট এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। জিব্রাঈল প্রথশত বলিলেনঃ ‘এই বিষয়ে প্রশ্নকারী ও যাহার নিকট প্রশ্ন করা হইয়াছে উভয়ই অজ্ঞ। এই বিষয়ে আল্লাহর নিকট হইতে জানিয়া জওয়াব দেওয়া যাইবে’। দ্বিতীয়বারে জিব্রাঈল আসিয়াবলিলেনঃ হে নবী, আমি এইবার আল্লাহর এতিই নিকটবর্তী হইয়াছি, যতটা আর কখনো হই নাই। আল্লাহ তা’আলা জিজ্ঞাসিত বিষয় সম্পর্কে ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

সর্বোপক্ষো নিকৃষ্ট হইতেছে হাট-বাজারের স্থান এবং সর্বাপেক্ষা উত্তম ও কল্যাণময় স্থান হইতেছে মসজিদসমূহ। [৮৯**************]

হযরত আবূ ইয়ালা একটন সাহাবী ‘ওহী’ কিভাবে নাযিল হয় এবং ‘ওহী’ নাযিল হওয়ার সময় রাসূলে করীমের অবস্থাটা কিরূপ হয় তাহা প্রত্যক্ষভাবে দেখিবার আগ্রহ প্রকাশ করেন। বিদায় হজ্জের সফরে তাহা প্রত্যক্ষ করা অপূর্ব সুযোগ ঘটে। নবী করীম (স) এই সময় ‘জেয়ের রেনা’ নামক স্থানে অবস্থান করিতেছিলেন। তখন একজন সাহাবী রাসূলে করীমের নিকট জিজ্ঞাসা করেনঃ ‘সুগন্ধি মাখিয়া উমরা পালনের জন্য ইহরাম বাঁধা জায়েয কিনা? [আল্লামা শারকাভী লিখিয়াছেনঃ প্রশ্নকারীর ছিলেন- আতা ইবনে মুনিয়া, হযরত ইয়ালার ভাই।]নবী করীম (স) সঙ্গে সঙ্গেই ইহার জওয়াব প্রদান করেন নি। তিনি অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকেন। অতঃপর রাসূল (স)-এর প্রতি ওহী নাযিল হয়। বুখারী শরীফে এই প্রসঙ্গে বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

তখন নবী করীম (স) নবী কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন। পরে তাঁহার প্রতি নাযিল হইল……………..।

এই সময় নবী করীম (স)- এর উপর কাপড় দ্বারা ছায়া করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। তখনই ইয়ালা উহার মধ্যে মাথা প্রবেশ করাইয়া দেখিলঃ

******************************************************

রাসূলের সমস্ত মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ করিয়াছে এবং তিনি বিকট শব্দে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করিতেছেন। [বুখারী শরীফ, ১ম খন্ড, কিতাবুল মানাসিক, ২০৮ পৃষ্ঠা এবং ঐ ২য় খন্ড, কিতাব ফাযায়েলুল কুরআন, ৭৪৫ পৃষ্ঠা।]

মুহাদ্দিসীনের মতে ওহী অবতরণের দুর্বহ ভারে এই সময় নবী করীমের ভীষণ শ্বাসকষ্ট হইতেছিল। আল্লামা শারাকাভী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

হাদীসে উল্লিখিত ‘গাতীত’ এমন এক প্রকারের বিকট শব্দ, যাহা ওহী নাযিল হওয়ার সময়ে উহার দুর্বহ ভারে অতি কষ্টে শ্বাস লওয়ার কারণে ধ্বনিত হইত। [ফতহুল মুবদী, ২য় খন্ড, ৮৯ পৃষ্ঠা।]

রাসূলে করীমের প্রতি ওহী নাযিল হওয়ার সময় এইরূপ কষ্ট অনুভূত হইত এবং সেইজন্য তাঁহার ভীষণ শ্বাস-কষ্ট হইত। পক্ষান্তরে এইরূপ শব্দ হইতে শুনিলে সকল সাহাবীই বুঝিতে পারিতেন যে, এখন রাসূলের প্রতি ওহী নাযিল হইতেছে।

বস্তুত কুরআন মজীদ জিব্রাঈলের মাধ্যমে ওহীর সূত্রে প্রাপ্ত পূর্ণাঙ্গ সত্য বিধান। কিন্তু এই ওহীর মাধ্যমে যত সত্য ও নির্ভুল তত্ত্বই লাভ হইয়াছে, তাহা সবই কুরআন মজীদে সন্নিবেশিত নহে। দ্বীন-ইসলামে এই ধরণের সত্য জ্ঞানের গুরুত্ব কুরআনের অব্যাবহতি পরেই, এই কারণে উহা কুরআনে সন্নিবেশিত না হইয়া ‘হাদীসে রাসূল’ হিসাবে সংরক্ষিত হইয়াছে। নবী-জীবনের ইতিহাসে এমন অসংখ্য ওহী নাযিল হওয়ার সন্ধান পাওয়া যায়, যাহা ত্রিশপারা কুরআন মজীদের কোথাও পরিদৃষ্ট হয় না। তবে উহা কি বিনষ্ট ও বিস্মৃতির অতল তলে নিমজ্জিত হইয়া গিয়াছে? উহা কি অপ্রয়োজনীয় ছিল? তাহা হইতে পারে না। বাস্তবিকই উহা বিনষ্ট হয় নাই। মানব জীবনের জন্য উহা একান্ত প্রয়োজনীয় ছিল বলিয়াচিরদিনের জন্য স্বতন্ত্রভাবে সংরক্ষিত হইয়াছে। মুসলিম জাতির জন্য ইহা এক চিরন্তন সম্পদ।

পরন্তু নবী করীম (স) গঠিত সমাজের লোকদের আল্লাহর কালাম কুরআন মজীদের প্রতি যেমন ঈমান ও গুরুত্ব বোধ ছিল, ওহীর কুরআন-বহির্ভূত অংশ-হাদীসের প্রতিও ছিল অনুরূপ আগ্রহ ও লক্ষ্য। বরং রাসূলে ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে করিামের নিকট কুরআন মজীদ সম্পূর্ণ লিপিবদ্ধ ও সংকলিত অব্স্থায় বর্তমান ছিল বলিয়া উহার কোন অনুসন্ধান-তৎপরতা অবল’নের প্রয়োজন দেখা দেয় নাই। কিন্তু রাসূলের হাদীসের ব্যাপারে এই প্রয়োজন দেখা দিয়াছিল। আর এইজন্য তাঁহাদের চেষ্টা ও সাধনার কোন অন্ত ছিল না। তাঁহারা রাসূলের অধিক নিকটবর্তী লোকদের নিকট এই পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদও করিয়াছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ দুইটি ঘটনার উল্লেখ করা যাইতে পারেঃ

******************************************************

কুরআনে সংকলিত ওহী ছাড়া ওহীর অপর কোন অংশ আপনার নিকট রক্ষিত আছে কি?[বুখারী শরীফ, প্রথম খন্ড, কিতাবুল জিহাদ, ৪২৮ পৃষ্ঠা।]

ইহার জাওয়াবে হযরত আলী কয়েকটি হাদীস পেশ করেন। ইহা হইতে প্রমাণিত হয়ঃ (ক) কুরআন ছাড়াও ওহী সুত্রে পাওয়া জ্ঞানের আরো অস্তিত্ব আছে। (খ) সব ওহীই কুরআন মজীদে সংকলিত বা উহার মধ্যে সামিল নয়। ওহীর আরো এমন অংশ রহিয়াছে, যাহা কুরআনের বাহিরে রহিয়াছে। তাহা আল্লাহর ‘কালাম’ না হইলেও আল্লাহর নিকট হইতেই জানিয়া লওযা জ্ঞান। (গ) কুরআন-বহির্ভূত ওহী রাসূলে করীমের মৌখিক কথা বাস্তবে করা কাজের বিবরণ হইতে জানা যায় এবং তাহাও ‘ওহী’– ওহীলব্ধ জ্ঞান, ইহা নিঃসন্দেহ। হযরত আবূ হুযায়ফা উহাকেও ‘ওহী’র মধ্যে গণ্য করিলেন, কিন্তু হযরত আলী (র) তাহাতে কোন রূপ আপত্তি করে নাই। তিনি বলেন নাই যে, সব ওহী- ওহীর মাধ্যমে পাওয়া সব জ্ঞানই- কুরআন মজীদে সংকলিত; উহার বাহিরে ওহীর কোন অংশ নাই।

কুরআন ও হাদীস বাহ্যত দুই জিনিস হইলেও মুলত উভয়ই ওহীর উৎস হইতে উৎসারিত। এই কারণে মৌলিকতা, যুক্তিভত্তিকতা, প্রামাণিকতা এবং অবশ্য অনুসরণীয় হওয়ার দিক দিয়া উভয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। কাজেই হাদীসের প্রতি কোন প্রকার উপেক্ষা প্রদর্শন করা এবং উহা রাসূলের কথা- আল্লাহর কথা নহে, অতএবং তাহা না মানিলেও চলিবে’ বলিয়া উহার গুরুত্ব হ্রাস করা কোন মুসলমানেরই নীতি হইতে পারেন না।

এই পর্যায়ে একটি কথা বিশেষভাবে মনে রাখিতে হইবে। তাহা এই যে, নবী করীম (স) তাঁহার প্রতি অবতীর্ণ কুরআনের ভিত্তিতে অনেক সময় ইজতিহাদও করিয়াছেন। কুরআনের মৌলিক ও ইজমালী নীতির দৃষ্টিাতে দ্বীনে বিস্তারিত রূপ সম্পকেৃ স্বীয় চিন্তা ও বিবেচনার ভিত্তিকে জনগণকে দিয়াছেন অনেক আদেশ- উপদেশ। শরীয়াতের দৃষ্টিতে তাহাও হাদীস- ‘রাসূলের সুন্নাত পর্যায়ে গণ্য। এই সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী (র) বলিয়াছেনঃ******************************************************

রাসূলে করীম (স) যাহা কিছু হুকুম দিয়াছেন তাহা সবই তাহাই, যাহা তিনি কুরআন হইতে বুঝিতে পারিয়াছেন। পরে কুরআন হইতে উহার সমর্থন বাহির করিয়াছেন।

মুল্লা আলী আলকারী লিখিয়াছেন, হাদীসকে নবী করীমের কথারূপে পরিচয় দেওয়া হয় এইজন্য যে,তিনিই উহা কুরআন হইতে বুঝিয়া লইয়াছেন।

******************************************************

এইজন্য যে, তিনি তাহা কুরআন হইতেই বুঝিয়া পাইয়াছেন এবং কুরআনের ভাবধারা হইতেই উহা বাহির করিয়াছেন।

 

কুরআন ও হাদীসের পার্থক্য

কুরআন ও হাদীস উভয়ই ওহীর উৎস হইতে উৎসারিত হইলেও এতদুভয়ের মধ্যে নানা দিক দিয়া পার্থক্য বিদ্যমান। পূর্ববর্তী আলোচনায় এই সম্পর্কে ইঙ্গিত করা হইয়াছে; কিন্তু বর্তমান পর্যায়ে উহার বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা আবশ্যক।

কুরআন মজীদ এক অপূর্ব মু’জিযা। ইহা কেবল শব্দ, ভাষা ও সাহিত্যের দিক দিয়াই মু’জিযা নহে; ইহার বিষয়বস্তু, আলোচন্য বিষয়ের ব্যাপকতা, প্রসারতা, গভীরতা ও সূক্ষ্মতা এবং উহার উপস্থাপিত মানব কল্যাণকর পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থাও এক অপূর্ব ও চরম বিস্ময়কর মু’জিযা।

প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বোত্তম কালাম হইতেছে কুরআন মজীদ, উহার অলৌকিক বৈশিষ্ট্যের কারণে উহা কালজয়ী, সর্বপ্রকার পরিবর্তণ, পরিবর্ধন ও সংশোধন-সংযোজন হইতে চিরসুরক্ষিত, বিনা অযুত উহা স্পর্শ ও পাঠ করা হারাম। নামাযে উহা সুনির্দিষ্টভাবে পাঠ করা অবশ্য কর্তব্য।

কিন্তু হাদীসসমূহ কুরআনের ন্যায় কোন মু’জিযা নহে। হাদীসৈর মূল কথাটিই শুধ ওহীর মাধ্যমে হযরতের স্বচ্ছ ও পবিত্র হৃদয়পটে প্রতিফলিত হইয়াছে, তিনি নিজ ভাষায় তাহা জনসমক্ষে পেশ করিয়াছেন। এজন্য উহার ভাষা’ মতলু’ নহে; উহার ভাষা ও শব্দের তিলাওয়ারত করা বাধ্যতামূল নহে, উহার মূল বক্তব্য ও ভাবধারা অনুসরণ করার জন্যই শরীয়াতে নির্দেশ দান করা্ হইয়াছে। এই কারণেই উহাকে ‘ওহীয়ে গায়ের মতলু’ নামে অভিহিত করা হয়। কিন্তু কুরআন মজীদের ভাব-শব্দ সব কিছুই আল্লাহর, আল্লাহর নিকট হইতে অবতীর্ণ।

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

ওহীয়ে ‘মতলূ’ হইতেছে কুরআন মজীদ। অপর প্রকার ওহী রাসূলে করীম (স) হইতে (বর্ণনাকারীদের সূত্রে) বর্ণিত। [৯৬**************]

আল্লামা মুহাম্মদুরল মাদানী লিখিয়াছেনঃ কুরআন হাদীসের পারস্পরিক কার্থক্য ছয়টি দিক দিয়া বিবেচ্য। প্রথম, কুরআন অলৌকি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মু’জিযা’ হাদীস তাহা নহে। দ্বিতীয়, কুরআন পাঠ না হইলে নামায বিশুদ্ধ হয় না, হাদীস সেরূপ নহে। তৃতীয়, কুরআন ও উহার সামান্য অংশও কেহ অস্বীকার করিলে সে নিশ্চিত কায়ির হইয়া যায়, কিন্তু বিশেষ কারণের ভিত্তিতে বিশেষ কোন হাদীস মানিয়া লইতে অস্বিকৃত হইলে কাফির হইতে  হয় না। চুতর্থ, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার জন্য আল্লাহ ও রাসূলের মাঝখানে জিব্রাঈরের মধ্যস্থতা, অপরিহার্য।; হাদীসের জন্য ইহা জরুরী নয়। পঞ্চম, কুরআনের প্রতিটি শব্দ ও কথা আল্লাহর নিজস্ব, হাদীসের শব্দ ও ভায়া রাসূলের নিজের এবং ষষ্ঠ, কুরআন  অযু ও পবিত্রতার সহিত স্পর্শ করা কর্তব্য, বিনা অযুতে স্পর্শ করা যায় না। হাদীস সম্পর্কে এরূপ কোন নির্দেশ নাই।[৯৭************]

অন্য কথায় চিঠি ও মৌখিক পয়গামের মধ্যে যে পার্থক্য, কুরআন ও হাদীসের মধ্যেও অনুরূপ পার্থক্য  বলা যায়। লোক মারফত মৌখিক পয়গম প্রেরণের ক্ষেত্রে মূল কথাটিই মুখ্য, ভাষা বা শব্দের তারতম্যে কিছুই আসে যায় না। কিন্তু চিঠির ব্যাপারটি এরূপ নহে। প্রথমত উহা চিঠি প্রেরকের নিজস্ব মর্জি অনুযায়ী রচিত হয় এবং দ্বিতীয়ত উহাতে নিজ মত ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী পূর্ণ ভাব প্রকাশক ভাষা ও শব্দ প্রয়োগ হইয়া থাকে। কিন্তু মৌখিক কথা প্রেরণ শব্দ ও ভাষার সেই বাধ্যবাধকতা থাকে না।

কুরআন ও হাদীরেস স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে যদিও এইরূপ পার্থক্য রহিয়াছে- কুরআনকে মনে করা যায় আল্লাহর নিজ লিখিত চিঠি আর হাদীস হইতেছে আল্লাহর মৌখিক পয়গাম; কিন্তু সেই সেঙ্গ এই কথাও মনে রাখা আবশ্যক যে, আল্লাহরর এই ‘চিঠি’ ও ‘মৌখিক পয়গাম’ উভয়েরই মুখপাত্র হইতেছেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স)। এই কারণে তাঁহার নিকট হইতে আল্লাহর লিখিত চিঠি (কুরআন) গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার মৌখিক পয়গাম (হাদীস)- ও জানিয়া লওয়া একান্ত আবশ্যক। আল্লাহর প্রেরিত এই দুইটি জিনিসই পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটিকে বাদ দিয়া অপরটি গ্রহণ করিলে মূল উদ্দেশ্যই বিনষ্ট হইতে বাধ্য।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি যখন কোন হাদীস বর্ণনা করি, তখন তোমাদের নিকট উহার কুরআন সমর্থিত হওয়ারই সংবাদ প্রকাশ করি।[৯৮***********]

ইবনে যুবায়র বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমার নিকট যে হাদীসই পৌছিঁয়াছে আমি আল্লাহর কিতাবে উহার সমর্থন ও উহার সত্যতার প্রমাণ পাইয়াছি। [৯৯**********]

শরীয়াতের ইমামগণের সর্বসম্মত মত হইলঃ

******************************************************

সমগ্র সুন্নাত ও হাদীস কুরআনেরই ব্যাখ্যা।

 

ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় হাদীসের গুরুত্ব

হাদীস ইসলামী মিল্লাতের এক অমুল্য সম্পদ, ইসলামী শরীয়াতের অন্যতম অপরিহার্য উৎস। ইহাকে বাদ দিয়াইসলামী জীবন-ধারা ধারণাতীত। হাদীসের গুরুত্ব নির্ধারণের পূর্বে স্বয়ং রাসূলে করীম (স)- এর গুরুত্ব এবং মর্যাদা (Position) নির্ধারণ একান্ত প্রয়োজন।

ইসলামের দৃষ্টিতে রাসূলের আদেশ –নিষেধ, তাঁহার যাবতীয় কাজ-কর্ম, কথাবার্তা- এক কথায় তাঁহার মূখ- নিঃসৃত বাণী ও গোটা কর্মময় জীবনই ইসলামী মিল্লাতের জ ন্য একান্ত অনুসরণীয় এক মহান আদর্শ। রাসূল প্রেরণের মূলে আল্লাহর উদ্দেশ্যেই এই ছিল যে, উম্মত তাঁহাকে পূর্ণ মাত্রায় অনুসলণ করিয়াচলিবে, তাঁহার হুকুম আহকাম পুরাপুরি পালন করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার বাস্তব জীবন ধারাকেও অনুসরণ করিয়া চলিবে। কুরআন মজীদ স্পষ্ট ভাষায় রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্য ঘোষণা করিয়া বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি রাসূল পাঠাইয়াঠি একমাত্র ইএ উদ্দেশ্যে যে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁহাকে অনুসরণ করা হইবে- তাঁহাকে মানিয়া চলা হইবে। [সূরা আন-নিসা, ৬৪ আয়াত।]

অপর এক আয়াতে রাসূলকে আনুগত্য ও অনুসরণ করিয়াচলার জন্য আল্লাহ তা’য়ালা স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়াছেন, বলিয়াছেনঃ

******************************************************

হে ঈমানদার লোকগণ, আল্লহ এবং তাঁহার রাসূলের আনুগত্য কর, তাঁহাদের আদেশ শ্রবণের পর তাহা অমান্য করিয়া পৃষ্ঠ-প্রদর্শন করিও না। তাহাদের মত হইও না, যাহারা বলে- আমরা শুনিয়াছি, কিন্তু কার্যত তাহারা শোনে না। [সূরা আল-আনফাল, আয়াত ২০ ও ২১।]

এখানে ঈমানদার লোকদের প্রতি প্রথমে আল্লাহর আনুগত্য করার আদেশ দান করা হইয়াছে, সেই সঙ্গে রাসূলেরও অনুসরণ বা আনুগত্য করিতে আদেশ করা হইয়াছে। আল্লাহর এবং রাসূলের আনুগত্য করিতে বলা হইয়াছে একই ******** ‘আনুগত্য কর’আদেশমূলক শব্দ দ্বারা। আল্লাহ এবং রাসূল উভয়কেই মানিয়া চলা মুসলমানের কতৃব্য ঘোষিত হইয়াছে এবং এই কর্তব্যের ব্যাপারে উভয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয় নাই। তবে বাহ্যত শুধু এতটুকুই পার্থক্য করা যাইতে পারে যে, আল্লাহর নাম প্রথমে উল্লিখিত হইয়াছে- অতএব তাহার আনুগত্য করিতে হইবে মূলত এবং প্রথমত, আর তাঁহার পরই আনুগত্য করিতে হইবে রাসূলের।

দ্বিতীয়ত আল্লাহর আনুগত্য করা যায় আল্লাহর কিতাব-কুরআন মজীদের আদেশ-নিষেধ মান্য করিয়া। আর রাসূলের আনুগত্য করিতে হয় রাসূলের আদেশ-নিষেধ ও অনুসৃত রীতি-নীতি পালন করিয়া। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ত্রিশ পারা কুরআন মজীদে বর্তমান; কিন্তু রাসূলের আদেশ-নিষেধ কোথায় পাওয়া যাইবে? তাহা পাওয়া যাইবে রাসূলের কথা, কাজ, সমর্থন সম্বলিত মহান সম্পদ-হাদীসের মাধ্যমে।

আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

বল হে নবী, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস, তবে আমাকে অনুসরণ করিয়াচল। তাহা হইলে আল্লাহও তোমাদের ভালবাসিবেন; তোমাদের গুনাহ মাফ করিয়া দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ গুনাহ মার্জনাকারী, দয়াশীল।[সূরা আল-ইমরান, ৩১ আয়াত।]

অর্থাৎ আল্লাহকে ভালবাসার অনিবার্য দাবি ও বাস্তব শর্ত হইতেছে রাসূলকে কার্যত অনুসরণ করিয়া চলা; আল্লাহর ভালবাসা ও তাঁহার নিকট হইতে গুনাহের মাজনা লাভের একমাত্র পথ ও উপায় হইতেছে রাসূল (স)- কে অনুসরণ করা। রাসূলকে অনুসরণ না করিলে আল্লাহর ভালবাসা ও তাহার নিকট গুনাহ মার্জনা লাভ স্ভব নহে। কেবল ইহাই নয়, রাসূলকে অনুসরণ করিয়া না চলিলে মানুষ ঈমানদারই হইতে পারে না, মুসলিম থাকিতে পারে না, বরং কাফির হইয়া যায়।

আল্লাহ তা’আলা বলিয়াছেনঃ

******************************************************

বল হে নবী, আল্লাহ ও রাসূলকৈ মানিয়া চল; যদি তাহা না করা তবে জানিয়া রাখ, আল্লাহ কাফিরদের ভালবাসেন না।[সূরা আল-ইমরান, ৩২ আয়াত।]

এই আয়াতেও আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহর পরে ও সঙ্গে সঙ্গেই রাসূলকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দেওা হইয়াছে। ফলে কেবল আল্লাহর আনুগত্য করিলেই চলিবে না, রাসূলেরও আনুগত্য করিতে  হইবে। আল্লাহর আনুগত্য না করিলে মানুষ যেমন কাফির হইয়া যায়, রাসূলের আনুগত্য না করিলেও মানুষ অনুরূপভাবেই কাফির হইয়া যাইবে। আয়াতের শেষাংশ এই কথা স্পষ্ট ভাষায়ই ব্যক্ত করিয়াছেন। সেই সঙ্গে এই কথাও বলা হইয়াছে যে, এই কাফিরদিগকে আল্লাহ কিছুমাত্র ভালবাসেন না- পছন্দ করেন না।

মুসলিম হওয়ার জন্য আল্লাহর সঙ্গে সঙ্গে রাসূলের আনুগত্য করা এইরূপ তাকীদ হওয়ার বিশেষ কারণ রহিয়াছে। প্রকৃতপক্ষে কেবলমাত্র আল্লাহর কালাম পৌঁছাইয়া দেওয়াই রাসূলের একমাত্র কাজ নহে। আল্লাহর কালাম ব্যাপক প্রচার করা, লোকদিগকে উহা বিশদভাবে বুঝাইয়া দেওয়া, উহার ভিত্তিতে লোকদের মন-মগজ চরিত্র ও জীবন গঠন করা এবং তদনুযায়ী এক আদর্শ সমাজ গঠন করাও রাসূলের কাজ, সন্দেহ নাই।

কুরআন মজীদে এই সম্পর্কে বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

সেই মাহন আল্লাহ-ই উম্মী লোকদের প্রতি তাহাদের মধ্যে হইতেই একজন রাসূল পাঠাইয়াছেন। রাসূল আল্লাহর আয়াতসমূহ তাহাদের সম্মুখে তিলাওয়াত করে, তাহাদিগকে পবিত্র-পরিশুদ্ধ ও সুসংগঠিত করে, তাহাদিগকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়- যদিও তাহারা ইহার পূর্বে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত ছিল। [সূরা জুময়া, আয়াত ২।]

আয়াতে নবী করীমের তিনটি সুস্পষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা ঘোষণা করা হইয়াছেঃ

প্রথম, কুরআনের আয়াতসমূহ পাঠ করা, পাঠ করিয়া লোকদিগকে শোনানো। দ্বিতীয়, জন-মনকে পবিত্র-পরিচ্চন্ন ও বিশুদ্ধকরণ, বিশেষ ও সুনির্দিষ্ট আদর্শের মানদণ্ডে তাহাদের লালন-পালন ও গঠন করা। শিরক ও চরিত্রহীনতার পংকিলতা হইতে তাহাদিগকে পরিশুদ্ধকরণ।

তৃতীয়, আল্লাহর কিতাব ও জরুরী জ্ঞান শিক্ষা দান, ইসলামী জ ীবনাদর্শ বাস্তাবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বুদ্ধি ও প্রতিভার বিকাশ সাধন, ‘সুন্নাত’ শিক্ষা দান।

আলোচন্য আয়াতে প্রথম ও তৃতীয় পর্যায়ে যে কাজের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে-আয়াত তিলাওয়াত করা ও কিতাবের তালীম দেওয়া- এই্ দুইটি কি একই ধরনের কাজ? একই ধরনের কাজ হইলে ইহা নিঃসন্দেহে পুনরুক্তি দোষে দুষ্ট। আর তাহা হইলে উভয় ক্ষেত্রে একই ধরনের শব্দ প্রয়োগ হওয়া উচিত ছিল। অথচ উভয় ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র শব্দের ব্যবহার হইয়াছে। ফলে অর্থের তারতম্যের কারণে ইহা দুইটি স্বাতন্ত্র কাজরূপেই প্রতিফলিত হইয়াছে। বস্তুত ‘আয়াত তিলাওয়াত’ ও ‘কিতাবের তালীম’ দুইটি আলাদা আলাদা কাজ, স্বতন্ত্র দায়িত্ব বিশেষ।

অতএব কুরআন তিলাওয়াত করা সঙ্গে সঙ্গে উহার কঠিন ও অভিনব পারিভাষিক শব্দসমূহের ব্যাখ্যা, নির্দেশিত বিষয়সমূহের বিশ্লেষণ, সংক্ষিপ্ত বিষয়গুলির বিস্তৃ রূপদান এবং স্বীয় কথা ও কাজের মাধ্যমে উহার বাস্তব রূপায়ণ ও প্রতিষ্ঠা- এ সবই রাসূলৈ করীমের দায়িত্ব ও কর্তব্যরূপে নির্দিষ্ট হইয়াছে।

আয়াতের শেষাংশে ‘কিতাব’ ও ‘হিকমাত’ শিক্ষাদানের কথা বলা হইয়াছে। ‘আল কিতাব’ অর্থঃ কুরআন মজীদ, কিন্তু ‘হিকমাত’ অর্থ কি?

কুরআন মজীদের বহুস্থানে ‘হিকমাত’ শব্দটি ‘আল-কিতাবের’ সঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে এবং সকল রাসূলকে যেমন কিতাব দেওয়া হইয়াছে, তেমনি হিকমাতও দান করা হইয়াছি বলিয়া স্পষ্ঠ ভাষায় ঘোষণঅ করা হইয়াছে। সূরা আল-আমরানে বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

স্মরণ কর, আল্লাহ নবীদের নিকট হএত প্রতিশ্রুতি লইয়াছেন যে, (আজ) তোমাদিগকে কিতাব ও হিকমাত দান করিয়াছি। [সূরা আল-ইমরান, ৮১ আয়াত।]

আয়াতে উল্লিখিত ‘কিতাব’ অর্থ যে আল্লাহর কালাম সম্বলিত আসমানী গ্রন্হ, তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু ‘হিকমাত’ শব্দের তাৎপর্য কি? ইহা দ্বারা আল্লাহ তা’য়ালা কি বুঝাইতে চাহেন? কিতাবের সাথে আল্লাহ রাসূলগণের প্রতি এমন আর কি জিনিস নাযিল করিয়াছেন, যাহাকে তিনি ‘হিকমাত’ নামে অভিহিত করিয়াছেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষণা ও অনুসন্ধান আবশ্যক।

অভিধানের দৃষ্টিতে ‘হিকমত’ শব্দের মূল হইতেছে *******, ইহার অর্থ ****************** ‘সংশোধন উদ্দেশ্যে কোন জিনিস বা কাজ হইতে নিষেধকরণ’। লাগামকে এই দৃষ্টিতেই ‘হাকামাতুন’ ****** বলা হয়; কেননা, উহা দ্বারা ঘোড়াকে বিদ্রোহ ও যথেচ্ছা গমন হইতে বিরত রাখা হয়। এই অর্থগত সামঞ্জস্যের কারণেই ‘হিকমাতে’র অর্থ করা হয়- *************** জিনিসগুলিকে যথোপযুক্ত স্থানে স্থাপন করা-রাখা এবং অনুপযুক্ত স্থানে রাখা, বন্দ করা।

‘তাজুল-উরুস’ অভিধানে ইহার অধিকতর বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

বিচার-মীমাংসার ক্ষেত্রে সুবিচার-ইনসাফ ও ন্যায়পরতাকে বলা হয় ‘হিকমাত’।

‘জিনিসসমূহের প্রকৃত নিগূঢ় তত্ত্ব ও হাকীকত (Reality) জানিয়া লওয়া এবং এই বিশুদ্ধ ও নির্ভুল জ্ঞানের দৃষ্টিতে আমল করা। এই কারণে ‘হিকমাত’ দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ জ্ঞানগত, আর অপর ভাগ বাস্তবমূলক বা কাজ সম্পর্কিত। [তাজুল ‘উরুস’‘হিকমাত’ শব্দের আলোচনা।]

ইমাম রাগেব ইসফাহানী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

হিকমাত হইতেছে জ্ঞান ও বুদ্ধির সাহায্যে প্রকৃত সত্য লাভ, সত্য লাভের যোগ্যতা ও প্রতিভা। অতএব আল্লাহর ‘হিকমাত’ হইতেছে সমস্ত জিনিস ভাল করিয়া জানা-চেনা এবং চূড়ান্ত বিধানের ভিত্তিতে নূতন জিনিস সৃষ্টি ও উদ্ভাবন। আর মানুষের ‘হিকমাত’ হইতেছে বস্তুজগতের বিষয়াদি সম্পর্কে পরিচিতি ও জ্ঞানলাভ এবং ভাল ভাল কাজ সম্পাদন।[১০৭]

লিসানুল আরব গ্রন্হে বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

কার্যত সর্বোত্তম ও উৎকৃষ্ট জিনিসসমূহ সম্পর্কে সূক্ষ্ম গভীর জ্ঞান লাভই হইতেছে হিকমাত।[১০৮]

ইমাম ইবনে জরীর তাবারী বিভিন্ন লোকের কথা উল্লেখ করার পর লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

হিকমাত সম্পর্কে আমার দৃষ্টিতে সঠিক কথা এই যে, হিকমাত হইতেছে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ সম্পর্কেত ইলম, যাহা রাসূলের বর্ণনা ছাড়া কিছুতেই লাভ করা সম্ভব নয় এবং উহার সম্পর্কে গভীর সূক্ষ্ম পরিচিতি লাভ করাও হিকমাত। উহার সহিত সামঞ্জস্যশীল আর যেসব জিনিস দ্বারা উহা লাভ করা যায়, তাহাও উহার অন্তুর্ভক্ত। আমার মতে ‘হিকমাত’ শব্দটি ‘হাকাম’ হইতে নির্গত হইয়াছে। উহার অর্থ হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকরণ। [১০৯**************]

ইমাম শাফেয়ী (র) লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

কুরআন সম্পর্কিত জ্ঞানে সর্বাধিক পারদর্শী আস্থাভাজন বিশিষ্ট লোকদের নিকট আমি শুনিয়াছি, তাঁহারা বলিয়াছেনঃ হিকমাত হইতেছে রাসূলে করীম (স)-এর সুন্নাত।[কিতাবুর রিসালা; ২৮ পৃষ্ঠা।]

অতঃপর তিনি লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

রাসূলের সুন্নাত হইতেছে সেই হিকমাত, যহা হযরতের দিল মুবারকে আল্লাহর নিকট হইতে উদ্রেক করা হইয়াছে।[কিতাবুর রিসালা; ২৮ পৃষ্ঠা।]

কুরআন মজীদের যেসব স্থানে ‘আল-কিতাবের’ সঙ্গে ‘আল-হিকমাতে’র উল্লেখ হইয়াছে, সেসব স্থানেই কিতাব অর্থ আল্লাহর নিজস্ব কালাম, যাহা রাসূলের প্রতি নাযিল হইয়াছে এবং যাহাতে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও উপদেশ নসীহত বর্ণিত হইয়াছে। আর ‘আল-হিকমাত’ অর্থ সে সবের নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে বিশুদ্ধ ও সঠিক জ্ঞান এবং সে নির্ভূল জ্ঞান অনুযায়ী সঠিক কাজ। বস্তুত এই নির্ভূল জ্ঞান ও তদনুযায়ী সঠিক কাজ করার যথেষ্ট বুদ্ধি প্রত্যেক রাসূলকেই দেওয়া হইয়াছে। নবী-রাসূলগণের ক্ষেত্রে ইহা আল্লাহর স্থায়ী ও নির্বিশেষ নিয়ম।

এই নিয়ম অনুযায়ী সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স) কেও আল-কিতাব কুরআনের সঙ্গে সঙ্গে ‘আল হিকমাত’ ও দেওয়া হইয়াছে। কুরআন মজীদের বহু সংখ্যক আয়াতে ইহা স্পষ্টভাষায় উল্লেখ করা হইয়াছে। এখানে একটি আয়াত উল্লেখ করা যাইতেছে। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

হে নবী, আল্লাহ তোমার প্রতি ‘আল-কিতাব’ ও ‘আল-হিকমাত’ নাযিল করিয়াছেন এবং তুমি যেসব কথা জানিতে না, তাহার শিক্ষা তোমাকে দান করিয়াছেন। আর ইহা তোমার প্রতি আল্লাহর এক বিরাট অনুগ্রহ।[সূরা আন-নিসা, ১১৩ আয়াত।]

কুরআনের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর দেওয়া এই ‘আল-হিকমাত’ নিশ্চিতরূপে কুরআন হইতে এক স্বতন্ত্র জিনিস। ইহার সুন্নাত এবং ইহার বিস্তৃত বিবরণ হাদীস সম্পদেই পুঞ্জীভূত রহিয়াছে।[হাদীসকে হিকমাত বলার তাৎপর্য কি, তাহা অনুধাবনীয়। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ ********************** সুন্নাত বা হাদীসকে হিকামত বলার তাৎপর্য এই যে, উহা দ্বারাই হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য করা হইয়াছে ***************** এবং কুরআনের মোটামুটি কথার উহার দ্বারা ব্যাখ্যা করা হইয়াছে।]

‘আল-হিকমাত বা সুন্নাতও যে আল্লাহর নিকট হইতেই অবতীর্ণ, তাহা পূর্বোক্ত আয়াত স্পষ্ট ভাষায় প্রমাণ করে। বস্তুত আল্লাহ তা’আলা বিশ্বমানবতার পথ-নির্দেশের জন্য এবং হিদায়আয়াতের পথে পরিচালনার উদ্দেশ্য কেবলমাত্র আল-কিতাব নাযিল করাই যথেষ্ট মনে করেন নাই; সেই সঙ্গে রাসূল ও রাসূলের সুন্নাতকেও আল্লাহর তরফ হইতে প্রেরণের প্রয়োজন মনে করিয়াছেন। অন্যথায় শুধুমাত্র ‘আল-কিতাব’ মানুষের প্রকৃত কোন কল্যাণ সাধন করিতে পারিত না।

কুরআন মজীদের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করাও রাসূলেরই অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। নিম্নোক্ত আয়াত এই দৃষ্টিতে সুন্নাত বা হাদীসের গুরুত্ব ঘোষণা করে। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

হে নবী, তোমার প্রতি এই কিতাব এই উদ্দেশ্যে নাযিল করিয়াছি যে, তুমি লোকদের জন্য অবতীর্ণ এই কিতাব তাহাদের সম্মুখে বয়ান ও ব্যাখ্যা করিবে এবং এই উদ্দেশ্যে যে, তাহারা ইহা চিন্তা ও গবেষণা করিবে’।[সূরা আন-নাহাল, আয়াত ৪৪; বয়ান’ করার তাৎপর্য ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে হাফেজ ইবনে আবুল বার বলিয়াছেনঃ নবী করীমের কুরআন ‘বয়ান’ করা দুই প্রকারের হইয়াছেঃ প্রথম, কুরআনের মোটামুটি কথার ব্যাখ্যা, যেমন পাঁচবারের নামায ও সময়, উহার সিজদা, রুকু ও অন্যান্য হুকুম আহকাম হইবে তাহা বলা এবং হজ্জের নিয়ম প্রণালী বর্ণনা করা। নবী করীম (স) যখন হজ্জ করিয়াছিলেন, তখন বলিয়াছিলেনঃ ************ ‘আমার নিকট হইতে তোমরা হজ্জের নিয়ম-কানুন গ্রহণ কর’। ইহার প্রয়োজন এই যে, কুরআনে তোম কেবল নামায, যাকাত ও হজ্জের মোটামুটি আদেশ দেওয়া হইয়াছে, এ সবের কোন ব্যাখ্যা করা হয় নাই-কোন বিস্তৃত রূপ দেওয়া হয় নাই। হাদীসই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ পেশ করে।(******************)]

আলোচ্য আয়াতের মূল প্রতিপাদ্য কথা এই যে, জনগণের সম্মযখে কুরআনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করাই রাসূলের প্রতি কুরআন নাযিল করা আসল উদ্দেশ্য। বস্তুত কোন বিষয়কে সঠিক রূপ ও পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝাইয়া দেওয়ার জন্য তিনটি কাজ একান্তই অপরিহার্যঃ

প্রথম, মুখের কথা দ্বারা উহার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা, আলোচনার মাধ্যমে প্রতিটি বিষয়ের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক রূপ উদঘাটিত করা।

দ্বিতীয়, নিজ জীবনের কাজ-কর্ম ও বাস্তব জীবনধারার সাহায্যে উহার ব্যবহারিক মূল্য ও গুরুত্ব উজ্জ্বল করিয়াতোলা।

তৃতীয়, লোকদের দ্বারা উহাকে কার্যকর ও বাস্তবায়িত করার জন্য চেষ্টা করা, সঠিকরূপে তাহারা উহার মর্মার্থ অনুধাবন ও অনুসরণ করিতেছে কিনা, সেদিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা; যাচাই ও পরীক্ষা কার্যে আত্মনিয়োাগ করা এবং সিঠকরূপে কার্যকর হইতে দেখিলে তাহাকে সমর্থন ও অনুমোদন দান, আর কোনরূপ ভূল-ক্রন্তি বা ক্রটি বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হইলে তাহার সংশোধন করা।

নবী করীম (স)- এর প্রতি কুরআন নাযিল হওয়ার এই উদ্দেশ্যে ঘোষিত হইয়াছে যে, তিনি কুরআনকে এই তিন-তিনটি দিক দিয়া সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল করিয়া জনসমক্ষে তুলিয়া ধরিবেন। রাসূলে করীম (স) তাঁহার তেইশ বছরের নবুয়তী জীবনে এই দায়িত্ব পূর্ণ মাত্রায় ও যথাযথরূপরে পালন করিয়াছেন। এই দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া তিনি যাহা কিছু বলিয়াছেন বা করিয়াছেন, তাহার নির্ভরযেগ্য রেকর্ডই হইতেছে হাদীস। অতএব হাদীস যে কুরআন সমর্থিত এবং কুরআন সমর্তন করে না এমন কোন জিনিস যে হাদীসে পাওয়া যায় না, তাহাতে তো সন্দেহ থাকিতে পারে না। ইমাম শাতেবী এ এ জন্যই লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

সুন্নাতে বা হাদীসে এমন জিনিসই পাওয়া যাইবে, কুরআন যাহার পূর্ণ সমর্থন করে। কুরআন সমর্থন করে না এমন কোন জিনিসই হাদীসে পাইবে না। [১১৫*********]

রাসূলে করীম (স) যে কুরআন মজীদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আয়াতের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করিয়াছেন, তাহার বাস্তব প্রমাণ হইতেছে হাদীস গ্রন্হসমূহের তাফসীর অধ্যায়সমূহ। যেসব আয়াতের সঠিক অর্থ সাহাবায়ে কিরাম (রা) বুঝিতে পারেন নাই এবং তাহার কারণে তাহারা কাতর হইয়া পড়িয়াছেন, রাসূলে করীম (স) সে সবের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করিয়া সাহাবাদের উদ্বেগ দূরীভূত করিয়াছেন। দৃষ্টান্ত-স্বরূপ কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটির উল্লেখ করা যাইতে পারে। আল্লাহ তা’য়ালার ইরশাদঃ

******************************************************

যাহারা ঈমান আনিয়াছে এবং তাহাদের ঈমানকে কোন প্রকার জুলুমের সহিত মিশ্রিত করে নাই………….

যখন নাযিল হয়, তখন ইহা সাহাবাদের পক্ষে বড়ই উদ্বেগের কারণ হইয়া পড়ে। তায়হারা ইহার সঠিক তাৎপর্য জানিবার জন্য রাসূলের নিকট জিজ্ঞাসা করিলেনঃ

******************************************************

আমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে তাহার ঈমানকে জুলুমের সহিত মিশ্রিত করে নাই?

এই প্রশ্ন শুনিয়া নবী করীম (স) বুঝিতে পারিলেন যে, সাহাবায়ে কিরামের নিকট এই আয়াতটি অত্যন্ত দুর্বোধ্য অনুভূত হইয়াছে। তখন নবী করীম (স) বলিলেনঃ

******************************************************

 তোমরা যেরূপ ধারণা করিয়াছে, আয়াতের অর্থ তাহা নহে। এখানে জুলুম অর্থ শিরক ছাড়া আর কিছু নয়। তোমারা কি শোন নাই, লোকমান তাহার পুত্রকে বলিয়াছেনঃ ‘হে প্রিয় পুত্র, আল্লাহর সাথে শিরক করিও না, নিশ্চয়ই শিরক এক বিরাট জুলুম সন্দেহ নাই। [সহীহ বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, কিতাবুত তাফসীর, ৭০৮ পৃষ্ঠা।]

রাসূলের নিকট উক্ত আয়াতের প্রকৃত ব্যাখ্যা জানিতে পারিয়াই সাহাবায়ে কিরাম সান্তনা লাভ করেন। এই কারণে কুরআন মজীরে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা জানিবার জন্যও বিশ্ব মুসলিম রাসূলের হাদীসের মুখাপেক্ষী। রাসূলের ব্যাখ্যা ব্যাতীত কুরআনের সঠিক তাৎপর্য জানিবার জন্য নির্ভরযোগ্য অপর কোন উপায়ই থাকিতে পারে না।

অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলিয়াছেনঃ

******************************************************

হে নবী, তোমার প্রতি এই কিতাব সত্যতা সহকারে নাযিল করিয়াছে এই উদ্দেশ্যে যে, আল্লাহর প্রদর্শিত নিয়ম পদ্ধতি অনুযায়ী তুমি লোকদের মধ্যে বিচার ফয়সালা করিবে।[সূরা আন-নিসা, ১০৫ আয়াত।]

আল্লাহ তা’আলা কিতাব নাযিল করিয়াছেন এই উদ্দেশ্যে যে, রাসূলে করীম (স) লোকদের মধ্যে বিচার ফয়সালা করিবেন, কিন্তু কোন পদ্ধতিতে তাহা করিবেন? ইহার উত্তরে বলা হইয়াছে-************ ‘যে পদ্ধতি আল্লাহ তোমাকে দেখাইয়াছেন’। তাহা হইলে মূল কিতাবও যেমন আল্লাহ নাযিল করিয়াছেন, তদনুযায়ী বিচার-ইনসাফ কায়েম করার নিয়ম পদ্ধতিও ওহীর মাধ্যমেই প্রাপ্ত। [তাফসীরে রুহুল মাআনী, ৫ম খণ্ড, ১৪০ পৃষ্ঠা। তাফসীরে বায়যাবী, ১ম খণ্ড, ২০৫ পৃষ্ঠা। উভয়ই ************* -এর তাফসীর করিয়াছেন ********* রূ ‘যাহা তোমাকে বুঝাইয়া দিয়াছেন এবং যে বিষয়ে তেমার নিকট ওহী পাঠাইয়াছেন’ বলিয়া।] এব ইহার বিবরণ হাদীসের মারফতেই লাভ করা যাইতে পারে।কুরআন মজীদি সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভার আল্লাহ তা’আলা নিজেই গ্রহণ করিয়াছেন। এই সম্পর্কে আল্লাহ নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

নিশ্চয়ই আমার উপর ন্যস্ত রহিয়াছে উহার সংগ্রহ এবং উহার পাঠ অধ্যয়ন। অতএব আমি যখন াঠ করি, তখন তুমি উহার পাঠ অনুসরণ কর। এতদ্ব্যতীত উহার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দানও আমারই কাজ।[সূরা আল-কিয়ামাহ, ১৭, ১৮, ১৯ আয়াত।]

এই আয়াত অনুযায়ী তিনটি কাজের দায়িত্ব আল্লাহ নিজেই গ্রহণ করিয়াছেনঃ কাজ তিনটি নিম্নরূপঃ

ক) কুরআন মজীন সঞ্চয়ন, সংগ্রহ ও সন্নিবদ্ধকরণ।

খ) কুরআন মজীদের পাঠ শিক্ষা দান।

গ) কুরআনের অর্থ, ভাব ও তাৎপর্য বুঝাইয়া দেওয়া।

কিন্তু এই তিনটি কাজ আল্লাহ তা’আলা কিভাবে সম্পন্ন করিলেন, তাহা বিচার্য। এই কথা সর্বজনবিদিত যে, আল্লাহ তা’আলা জিব্রাঈলের মারফতে কুরআন মজীদ রাসূলকে পড়াইয়া দিয়াছেন, জিব্রাঈলের পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে রাসূলকেও সেই পাঠের অনুসরণ করিতে বলিয়া রাসূলকে উহার অধ্যয়ন শিক্ষা দিয়াছেন এবং এইভাবে রাসূলের হৃদয়পটে পূর্ণাঙ্গ কুরআনকে সঞ্চিত ও সুসংবদ্ধ করিয়া দিয়াছেন। আল্লাহর তিনটি কাজের মধ্যে প্রথম দুইটি কাজ এইভাবেই সুসম্পন্ন হইয়াছে। কিন্তু তৃতীয় কাজটি কিভাবে সম্পন্ন করা হইল? আল্লাহ নিশ্চয়ই রাসূলকে কুরআনের অর্থ, ভাব, তাৎপর্য ও কঠিন অংশের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়াছেন এবং তাহা কুরআন হইতে স্বতন্ত্রভাবে করা হইয়াছে। বস্তুত এ প্রসঙ্গে আল্লাহর শিক্ষা দেওয়া যাবতীয় বিষয় হাদীসের মধ্যে সঞ্চিত হইয়া আছে।

ইসলামী জীবনাদর্শের প্রতি বিশ্বাসীদের জন্য হালাল-হারাম নির্ধারণের দায়িত্ব রাসূলের উপর অর্পিত হইয়াছে।রাসূল এই কাজ আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবেই আনজাম দিয়াছেন। কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

রাসূল ভাল কাজের আদেশ করেন; খারাপ কাজ হইতে লোকদিগকে বিরত রাখেন; লোকদের জন্য ভাল ও উৎকৃষ্ট জিনিস হালাল করিয়া দেন এবং খারাপ ও নিকৃষ্ট জিনিস হারাম ঘোষণা করেন।[সূরা আল-আরাফ, ১৫৭।]

অতএব রাসূলের যাতবীয় আদেশ-নিষেধ উপদেশ এবং তাঁহার ঘোষিথ হালাল ও হারাম বিশ্বাস করা ও মানিয়া চলা মুসলিম মাত্রেরই কর্তব্য। তাঁহার এই সমস্ত কাজের বিস্তারিত ‘রেকর্ড’ হাদীসের মধ্যে সঞ্চিত হইয়া আছে।রাসূলকে আল্লাহ তা’আলা মুসলিমদের পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদের চূড়ান্ত মীমাংসাকারী করিয়া পাঠাইয়াছেন। এই সম্পর্কে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতেঃ

******************************************************

তোমার আল্লাহর শপথ, লোকেরা কিছুতেই ঈমানদার হইতে পারিবে না, যদি না তাহারা –হে নবী- তোমাকে তাহাদের পারস্পরিক যাবতীয় ব্যাপারে বিচারক ও সিদ্ধান্তকারীরূপরে মানিয়া লয়, তোমার ফয়সালা সম্পর্কে মনে কুন্ঠাহীনতা বোধ করে এবং তাহা সর্বান্তকরণে মানিয়া লয়।[সূরা আন-নিসা, ৬৫ আয়াত।]

জীবনে সমগ্র ক্ষেত্রে রাসূলের আনুগত্য করাও প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য। এই সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলিয়াছেনঃ

******************************************************

হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের অনুগত হও এবং তোমাদের মধ্য হইতে দায়িত্বশীল লোকদেরও,,,,,,,,,,,,,,। কোন বিষয়ে তোমরা পরস্পর মতবিরোধ করিলে উহাকে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরাও।[সূরা আন-নিসা ৫৯ আয়াত।]

এই আয়াতে তিনটি বিভিন্ন সত্তার আনুগত্য করার স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ করা হইয়াছে। প্রথমে আল্লাহর আনুগত্য, দ্বিতীয় রাসূলের আনুগত্য এবং তৃতীয় মুসলিম দায়িত্বশীল লোকদের আনুগত্য। আল্লাহ ও রাসূলের প্রসঙ্গ স্পষ্ট ভাষায় দুই-দুইবার ******* ‘আনুগত্য’ বলার কারণে উভয় আনগত্যই মৌলিক ও স্বতন্ত্র মর্যাদা সম্পন্নরূপে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। এই নির্দেশ অনুসারে কুরআন মজীদ মানিয়া চলিলেই আল্লাহর আনুগত্য কার্যকর হইতে পারে। কিন্তু ‘রাসূলের আনগত্য কর’ এই আদেশ কার্যকর করার কি পথ?…………… এই জন্য হাদীসকে মানিয়ালওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোন উপায় হইতে পারে না। পক্ষান্তরে পারস্পরিক বিরোধী বিষয়ের চুড়ান্ত মীমাংসার জন্য আল্লাহর ও রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করিতে বলা হইয়াছে। আল্লাহ দিকে প্রত্যাবর্তন করা যায় আল্লাহর কিতাবের সাহায্য গ্রহণ করিলে, কিন্তু রাসূলের অবর্তমানে রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করার কি উপায় হইতে পারে? তাহার উপায় হইতেছে রাসূলের সুন্নাত বা হাদীসকে গ্রহণ করা। তাহা করা হইলেই আল্লাহর এই আদেশ পালন করা সম্ভব হইতে পারে। ইহা ছাড়া অন্য কোন উপায় নাই। এই জন্যই উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মায়মুন ইবনে মাহরান বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আল্লাহর প্রতি ফিরানোর অর্থ আল্লাহর কিতাবের প্রতি ফিরানো এবং রাসূলের প্রতি ফিরানোর অর্থ রাসূলে করীমের জীবদ্দশায় তাঁহার নিজের নিকট পেশ করা। আর আল্লাহ যখন তায়হার জান কবজ করিয়া লইলেন তখন ইহার বাস্তব অর্থ তাঁহার সুন্নাতের দিকে ফিরানো। [১২৩*********]

আল্লামা ইবনে হাজার আল-আসকালানী এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

যদিও প্রকৃতপক্ষে আনুগত্য পাইবার যোগ্য অধিকারী হইতেছেন একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। কিন্তু তাহা সত্বেত্বও রাসূলেরও আনুগত্য করার আদেশ নূতন করিয়া দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু পরবর্তী ‘উলীল আমর’ ******** এর পূর্বে ‘আনুগত্য কর’ নূতন করিয়াবলা হয় নাই। ইহার কারণ এই যে, মানুষ মানিয়া চলিতে বাধ্য শুধু দুইটি জিনিস, তাহা হইল ‘কুরআন ও সুন্নাহ’। কাজেই এখানে অর্থ হইবে এই, যেসব বিষয়ে কুরআনে স্পষ্ট ফয়সালা করিয়া দেওয়া হইয়াছে, তাহাতে আল্লাহর আনুগত্য কর, আর যাহা কুরআন হইতে জানিতে পারিয়া তোমাদিগকে বলিয়া দেওয়া হইয়াছে এবং যাহা সুন্নাতের দলিল দিয়া তোমাদের সামনে প্রমাণ করা হইয়াছে, তাহাতে রাসূলের আনুগত্য কর। ফলে আয়াতের মোট অর্থ দাঁড়াইল এইরূপঃ তিলাওয়াত করা হয় যে ওহী, তাহা হইতে তোমাদিগকে যে হুকুম দেওয়া হইবে, তাহা পালন করিয়া আল্লাহর আনুগত্য কর। আর যে ওহী কুরআন নয়, তাহা হইতে তোমাদিগকে যে হুকুম করা হইবে তাহা পালন করিয়া তোমরা রাসূলের আনুগত্য কর।[*****************************]

আল্লামা তাইয়্যেবী এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

আল্লাহর হুকুম ‘রাসূলের আনুগত্য কর’ কথায় আনুগত্যের আদেশের পুনরাবৃত্তি করার কারণে বুঝা গেল যে, রাসূলে করীম (স) স্বতন্ত্র স্বাধীন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ আনুগত্য পাওয়ার অধিকারী। আর ‘উলীল আমর’- এর ক্ষেত্রে এই শব্দটির পুনরুল্লেখ না হওয়ায় বুঝা গেল যে, ‘উলীল আ্মর’ এমনও হইতে পারে যাহার আনুগত্য করা ওয়াজিব নহে। [১২৫**************]

রাসূলে করীম (স) কে অমান্য করা হইরে তাহাতে কতখানি অপরাধ হইতে পারে? এই সম্পর্কে নিম্নোদ্ধৃত আয়াত হইতে অনেক তত্ত্বই জানিতে পারি। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা যখন পরস্পর পরামর্শে মিলিত হও তখন গুনাহের কাজ, সীমালংঘনমূলক কাজ ও রাসূলের নাফরমানী করার বিষয়ে পরামর্শ করিও না। বরং পরামর্শ কর নেক কাজ ও আল্লাহ ভীতিমূলক কাজ সম্পর্কে। আর আল্লাহকে ভয় করিয়া চল, যাঁহার নিকট তোমাদের সকলকেই একত্রিত করা হইবে।[সূরা মুযাদালাহ, আয়াত নং ৯]

এই আয়াতে রাসূলকে অমান্য করিতে স্বতন্ত্রভাবে নিষেধ করা হইয়াছে। একদিকে পাপ, সীমালংঘন ও রাসূলের অনানুগত্য বা নাফরমানীর কথা উল্লেখ করা হইয়াছে, অপরদিকে উল্লেখ করা হইয়াছে নেকী ও আল্লাহ ভীতিমূলক কাজের। ইহার অর্থ এই যে, রাসূলের অবাধ্যতা ও অনানুগত্য করিলে যেমন গোনাহ ও সীমালংঘন করা হয়, অনুরূপভাবে সকল কল্যাণ নেকী ও আল্লাহভীতি হইতেও বঞ্চিত ইতে হয়। আয়াতের শেষাংশে পরকালের কথা উল্লেখ করিয়াবলা হইয়াছে যে, রাসূলকে অমান্য ও অনানুগত্য করিলে কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি ভোগ করিতে হইবে।

রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণ মুসলিম জীবনের এক চিরন্তন কর্তব্য। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

অতএব তোমরা আল্লাহ এবং তাঁহার ‘উম্মী’ নবীর প্রতি ঈমান আন; যে নবী নিজে আল্লাহ এবং তাঁহার বাণীর প্রতি ঈমানদার এবং তোমরা তাহার অনুসরণ করিয়া চল। [সূরা আল-আরাফ, আয়াত ১৫৯]

অপর এক আয়াতে ইরশাদ হইয়াছেঃ

******************************************************

রাসূল তোমাদিগকে যাহা কিছু দান করে তাহা পূর্ণরূপে তোমরা গ্রহণ ও ধারণ কর; আর যাহা হইতে নিষেধ করে, তোমরা তাহা হইতে বিরত থাক। (রাসূলের আদেশ-নিষেধ মানিয়া চলার ব্যাপারে) আল্লাহকে ভয় কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।[সূরা আল-হাশর, আয়াত-৭]

রাসূলের আদেশ-নিষেধ অমান্য বা তাঁহার বিরোধিতা করিলে আল্লাত তা’আলা কঠোর শাস্তি দান করিবেন। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

রাসূলের আদেশের যাহারা বিরোধিতা করে, তাহাদের ভয় করা উচিত যে, তাহাদের উপর কোন বিপদ মুসীবত আসিতে পারে অথবা কোন পীড়াদায়ক আযাবে তাহারা নিক্ষিপ্ত হইতে পারে।[সূরা আন-নূর, আয়াত-৬৩]

রাসূলের ‘ইতায়াত’ বা আনুগত্য স্বীকার করা এবং বাস্তব জীবন তাঁহাকে অনুসরণের ভিত্তিতে যাপন করার উপরই মানুষের হিদায়াত ও কল্যাণ লাভ একান্তভাবে নির্ভরশীল।

আল্লাহ তা’আলা বলিয়াছেনঃ

******************************************************

তোমরা রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণ করিলেই হিদায়াত প্রাপ্ত হইবে।[সূরা আন-নূর, আয়াত- ৫৪]

আবার আল্লাহর আনুগত্যও নির্ভর করে রাসূলের আনুগত্যের উপর। অন্য কথায়, রাসূলের আনুগত্য না করিলে আল্লাহর আনুগত্য করা সম্ভব হইতে পারে না। এই কথাই স্পষ্ট ভাষায় বলা হইয়াছে নিম্নোক্ত আয়াতেঃ

******************************************************

যে লোক রাসূলের আনুগত্য করিবে, সে-ই ঠিক আল্লাহর আনুগত্য করিল।[সূরা আন-নিসা, আয়াত-৮০]

‘ইত্তিবা’ ও ‘ইতয়াতে’ রাসূল

উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে রাসূলেরও আনুগত্য ও অনুসরণ করার জন্য স্পষ্ট ভাষায় আদেশ করা হইয়াছে। আল্লাহর এই আদেশকে সঠিকরূপে অনুধাবন করার জন্য কুরআনে ব্যবহৃত ‘ইত্তিবা’ ও ‘ইতায়াত’ শব্দদ্বয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ আবশ্যক। এখানে আমরা এই শব্দ দুইিট সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করিব।

আরবী ভাষায় ‘ইত্তিবা’ (*******) বলা হয় কোন ব্যক্তির পিছনে পিছনে চলাকে। ইবনে মনজুর তাঁহার বিখ্যাত অভিধান গ্রন্হ ‘লিসানুল আরব’-এ বলিয়াছেনঃ

******************************************************

অভিধান ও ব্যাকরণ শাস্ত্রের ইমাম ফরা বলেনঃ ইত্তিবা বলিতে বুঝায়ঃ কোন ব্যক্তি অগ্রে অগ্রে চলে এবং তুমি তাহার পিছনে পিছনে চল। এখন তুমি যদি বল, আমি তাহার ‘ইত্তিবা’ করি, তবে বুঝাইবে যে, তুমি তাহার পদাংক অনুসরণ করিয়া পিছনে পিছনে চলিতেছ।[*****************]

‘তাজুল উরুস’ গ্রন্হে বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

‘তুব্বু’ বা ‘তুব্বু’ যেমন সুক্কারু, অর্থ ছায়া। উহাকে ছায়া বলা হয় এই জন্য যে, উহা সব সময়ই সূর্যের অনুসরণ করিয়া চলে। এই সম্পর্কের দৃষ্টিতে মধুমক্ষিকাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ও সর্বোক্তম (পুরুষ) মক্ষিকাকেও ‘তুব্বা’ বলা হয়। কেননা সমস্ত সাধারণ মক্ষিকা উহাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করিয়া চলে।[*******************]

ইমাম আবুল আল-আ-মদী উহার পারিভাষিক অর্থ বর্ণনা প্রসংগে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

‘মুতাবিয়াত-অনুসরণ- কখনো কথার ব্যাপারে হয়, কখনো কোন কাজ করা বা না করার ব্যাপারে হয়। কথার ব্যাপারে ‘ইত্তিবা’ হইতেছে কথার দাবি ও প্রকৃতি অনুযায়ী কাজ করা। আর কাজের ক্ষেত্রে ‘ইত্তিবা’ হইতেছে কাহারো কাজ দেখিয়া তাহা এমনভাবে করা ঠিক যেভাবে সে করিতেছে। এবং সে করিতেছে বলিয়াই সেই কাজ করা হইবে।[***************]

এই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যাইতে পারে যে, আল্লাহ তা’আলার নির্দেম অনুযায়ী রাসূলের ‘ইত্তিবা’ করার জন্য রাসূলের প্রত্যেকটি কথা এমনভাবে পালন করিতে হইবে, যেমনভাবে পালন করা তাঁহার কথার লক্ষ্য ও দাবি এবং রাসূলের কাজগুলিকে যেভাবে তিনি সম্পন্ন করিয়াছেন ঠিক সেইভাবেই সম্পন্ন করিতে হইবে। অন্যথায় রাসূলকে ‘ইত্তিবা’ করার আল্লাহর আদেশ পালন হইতে পারে না।

‘ইতায়াত’ (**********) শব্দটিও অনুরূপভাবে ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। আরবী ভাষায় ‘ইতায়াত’ বলা হয় কাহারো সম্মখে আনুগত্যের মস্তক অবনমিত করাকে, কাহারো হুকুম আহকামযথাযথরূপে পালন করাকে।

‘লিসানুল আরব’ গ্রন্হে উল্লেখ করা হইয়াছেঃ

******************************************************

‘তাহযীব’ নামক প্রামাণ্য অভিধান গ্রন্হে বলা হইয়াছে ************* কথাটির অর্থ কাহারো সম্মুখে আনুগত্যের মস্তক নত করিয়া দেওয়া। কেহ যদি অপর কাহারো আদেশ পালন করে, তখন বলা হয় ********** সে তাহার আনুগত্য করিল।[*****************]

ইমাম আবুল হাসান আল-আ-মদী ‘ইতায়াত’ শব্দর পারিভাষিক অর্থ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

কাহাকেও বড় জানিয়া বা বড় করার উদ্দেশ্যে যদি কেহ তাহার মত কাজ করে, তবে সে তাহার ‘অনুগত হইল’ বলা হয়।[******************]

‘ইত্তিবা’ ও ‘ইতায়াত’ শব্দদ্বয়ের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থের এই আলোচনা হইতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হইল যে, রাসূলের কথাও কাজকে পুরাপুরি মানিয়া লওয়া এবং যথাযথরূপে পালন করা এক কথায় তাহার পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য ও অনুসরণ করা মুসলিম মাত্রেরই কর্তব্য। আর রাসূলের যাবতীয় কথা ও কাজের বিবরণ যেহেতু হাদীসের মাধ্যমেই জানা যাইতে পারে, এজন্যই দ্বীন-ইসলামে হাদীসের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

এই প্রসঙ্গে কুরআন মজীদের আর একটি আয়াতের উল্লেখ করা আবশ্যক বোধ হইতেছে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

কোন বিষয়ে আল্লাহ ও রাসূলের ফযসালা এবং ফরমান আসার পর তাহা মানা-না- মানার ব্যাপারে মু’মিন পুরুষ ও স্ত্রীলোকের কোন ইখতিয়ারই থাকিতে পারে না। সে লোক  আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের নাফরমানী করে, সে পথভ্রষ্ট হইয়া ইসলাম হইতে বহুদূরে চলিয়া যায়।[সূরা আল-আহযাব, ৩৬ আয়াত।]

এই আয়াত হইতে একসঙ্গে তিনটি কথা জানা যায়। প্রথশ এই যে, কোন বিষয়ে আল্লাহর যেমন স্বাধীনভাবে কোন ফয়সালা করার বা ফরমান দেওয়ার অধিকার আছে, আল্লাহর রাসূলেরও ঠিক সেইরূপ অধিকার আছে। দ্বিতীয় এই যে, মু’মিন স্ত্রী-পুরুষ যেমন আল্লাহর ফরমান ও ফয়সালা মানিয়া লইতে বাধ্য, রাসূলের ফয়সালা ও ফরমানও অনুরুপভাবে মানিয়া লইতে বাধ্য। তৃতীয় এই যে, আল্লাহর ফরমান ও ফয়সালা না মানিলে যেমন মানুষ গোমরাহ ও কাফির হয়, রাসূলের ফয়সালা ও ফরমান না মানিলেও সেইভাবেই গোমরাহ ও কাফির হইতে হয়।

অতএব কুরআন মজীদের মত রাসূলের ফরমান ও ফয়সালা নির্ভরযোগ্য রেকর্ড-হাদীস- মানিয়া লওয়াও প্রত্যেক মুসলিমের ঈমানদার হওয়া এবং ঈমানদার হইয়া জীবন যাপন করার জন্য একান্তই অপরিহার্য।

 

হাদীসের অপরিহার্যতা

হাদীস কুরআন মজীদের ব্যাখ্যাদাতা ও বিশ্লেষণকারী। হাদীসের সাহায্য গ্রহণ ব্যতীত কুরআন মজীদের যথাযথ ব্যাখ্যা ও অর্থ করা, উহার সঠিক উদ্দেশ্য ও ভাবধারা নিরূপণ করা সুকঠিন। নবী করীম (স) এই জন্যই নিজ ইচ্চামত কুরআন ব্যাখ্যা সস্পর্কে কঠোর সাবধান বাণী উচ্চারণ করিয়া বলিয়াছেনঃ

******************************************************

যে ব্যক্তি নিজ ইচ্ছামত কুরআন মজীদের ব্যাখ্যা করে সে যেন জাহান্নামে নিজের আসন তালাশ করিয়া লয়।[তিরমিযী, আরওয়াবুত্তাফাসীর, ইবনে আক্কাস বর্ণিত।]

হাদীসে বর্ণিত আছেঃ

******************************************************

যে লোক নিজের ইচ্ছামত কুরআন মজীদের অর্থ করে, তাহার ব্যাখ্যা নির্ভূল হইলেও সে ভূল করে।[তিরমিযী, আবওয়াবুত্তাফাসীর, জুনদুব হইতে বর্ণিত।]

বস্তুত মানুষের বুদ্ধি যতই প্রখর, তীক্ষ্ণ ও সুদূরপ্রসারী হউক না কেন, তাহা অবশ্যই সীমাবদ্ধ। একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত পৌছিঁয়া উহা ব্যর্থ হইতে ও স্বীয় অক্ষমতা প্রকাল এবং প্রমাণ করিতে বাধ্য কিন্তু বুদ্ধবাদ বা বুদ্ধির পূজা কোন সীমা মানিয়ালইতে প্রস্তুত নয়। বুদ্ধি ও বিবেক-শক্তি যদি রাসূলের সুন্নাত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়, তাবে তাহা বুদ্ধিবাদ ও বিবেক-পূজার নামান্তর। এই বুদ্ধিবাদ ও বিবেক-পূজা মানুষকে আল্লাহর আনগত্যের সীমা লংঘন করিতে বাধ্য করে। উপরন্তু তাহাতে একদিকে যেমন কুরআনের অপব্যাখ্যা, ভূল ও বিপরীত ব্যাখ্যা হয় বলিয়া উহার উপর জুলুম করা হয় এবং মানুষ এই কারণেই কুরআন মানিয়া চলার সৌভাগ্য হইতে বঞ্চিত হইয়া যায়; অপরদিকে তেমনি কুরআন বিশ্বাসীদের মধ্যে কঠিন মতবৈষম্য সৃষ্টি ও বিভিন্ সাংঘর্ষিক মতাদর্শ বা দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভব হওয়ার ফলে মুসলিম সমাজ বহুধা বিভক্ত হইয়া পড়ে। অনেক লোক আবার এই সুযোগে কুরআন লইয়া স্বেচ্ছাচারিতা শুরু করে, কুরআনের ছত্রে ছত্রে নিজেদের মনগড়া ব া পরকীয় চিন্তার পাঠ গ্রহণ করিতে শুরু করে। রাসূলের হাদীস এই পথে প্রবল প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। ইহাই মানুষের সম্মুখে কুরআনী হিদায়াতের প্রশস্ত পথ উপস্থাপিত করে; গোমরাহী বিভ্রান্তি হইতে মানুষকে রক্ষা করে ও সঠিক সরল ঋজুপথে পরিচালিত করে।

নবী করীম (স) কুরআনের বাহক, কুরআন তাঁহারই উপর অবতীর্ণ হইয়াছে; কিন্তু তিনি কেবল কুরআনই মানুষের সম্মুখে পেশ করেন নাই, কুরআনকে ভিত্তি ও কেন্দ্র করিয়া তিনি ইসলামের এক পূর্ণাঙ্গ বিধান উপস্থাপিত করিয়াছেন। এই কারণে তিনি নিজে কুরআনের সঙ্গে সঙ্গে সুন্নাত ও হাদীসের গুরুত্বের কথা নানাভাবে ঘোষণা করিয়াছেন। এখানে আমরা এই প্রৃসংগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস উল্লেখ করা জরুরূ মনে করিতেছি।

হযরত মিকদাম ইবনে মা’দি কারাব (রা) বলিয়াছেন, নবী করীম (স) ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

সাবধান, আমাকে কুরআন দেওয়া হইয়াছে এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে উহারই মত আর একটি জিনিস। সাবধান, সম্ভবত কোন সুখী ব্যক্তি তাহার বড় মানুষির আসনে উপবিষ্ট হইয়া বলিতে শুরু করিবে যে, তোমরা কেবল এই কুরআনকেই গ্রহণ কর, ইহাতে যাহা হালাল দেখিবে তাহাকেই হালাল এবং যাহাকে হারাম দেখিবে তাহাকেই হারাম মনে করিবে। অথচ প্রকৃত ব্যাপার এই যে, রাসূল যাহা হারাম করিয়াছেন, তাহা আল্লাহর ঘোষিত হারামের মতই মাননীয়।[ইবনে মাজা, পৃষ্ঠা ৩, আবূ দাউদ, কিতাবুস সুন্নাহঃ *********************]

এই হাদীসটিই ‘সুনানে দারেমী’ গ্রন্হ নিম্নলিখিত ভাষায় উল্লেখ করা হইয়াছেঃ

******************************************************

সম্ভবত এক ব্যক্তি তাহার আসনে হেলান দিয়া বসিয়া আমার বলা কথার উল্লেখ করিবে এবং বলিবেঃ তোমাদের ও আমাদের মাঝে একমাত্র আল্লাহর কিতাব রহিয়াছে। উহাতে যাহাই হালাল পাইব, তাহাকেই হালাল মনে করিব, আর যাহা হারাম পাইব, তাহাকেই হারামরূপে গ্রহণ করিব। (অতঃপর রাসূল বলেন) সাবধান, আল্লাহর রাসূল যাহা হারাম করিয়াছেন, তাহা আল্লাহর নির্দিষ্ট করা হারামের মতই।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৭০।]

রাসূলের এই কথাটি অধিক সুস্পষ্ট হইয়া ফুটিঁয়া উঠিয়াছে নিম্নোক্ত হাদীসে। হযরত ইবরাজ ইবনে সারীয়া বলেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ তোমাদের একজন তাহার আসনে বসিয়া কি এই ধারণ করে যে, কুরআনে যাহার উল্লেখ আছে তাহা ব্যতীত আল্লাহ তা’আলা আর কিছুই হারাম করেন নাই? সাবধান, আল্লাহর কসম, আমিও কিন্তু অনেক আদেশ করিয়াছে, উপদেশ দিয়াছি এবং অনেক বিষয়ে নিষেধ করিয়াছি; আর তাহাও কুরআনের মতই মাননীয় কিংবা তাহারও অধিক কিছু।[আবূ দাউদ কিতাবুসসুন্নাহ ইহার সনদে আশয়াস ইবনে শু’বা একজন বর্ণনাকারী; কিন্তু তাঁহার বর্ণিত হাদীস গ্রহণ সম্পর্কে আপত্তি করা হইয়াছে।]

কুরআনের সঙ্গে সঙ্গে হাদীসও গ্রহণ করিতে হইবে এবং কোন বিশুদ্ধ হাদীসই যে কুরআনের খেলাফ হইতে পারে না, তাহা নিম্নোক্ত হাদীস হইতে প্রমাণিত হয়। হযরত সায়ীদ ইবনে যুবায়র (রা) একদা নবী করীম (স)- এর একটি হাদীস বর্ণনা করিলেন। উপস্থিত এক ব্যক্তি বলিলঃ

******************************************************

এই সম্পর্কে কুরআনে এমন কথা আছে যাহা এই হাদীসের বিপরীত।

তখন হযরর সায়ীদ বলিলেনঃ

******************************************************

আমি তোমার নিকট রাসূলের হাদীস বর্ণনা করিতেছি, আর তুমি আল্লাহর কিতাবের সহিত উহার বিরোধিতার কথা বল। অথচ রাসূলে করীম আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে তোমার অপেক্ষা অধিক ওয়াকিফহাল ছিলেন।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৭৭।]

হিদায়াতের পথে চলা ও গোমরাহী হইতে বাঁচিয়া থাকা কুরআন ও হাদীস উভয়ই মানিয়া ও পালন করিয়া চলার উপর নির্ভর করে। এই প্রসঙ্গে এখানে রাসূলে করীম (স) হইতে বর্ণিত দইটি হাদীসের উল্লেখ করা যাইতেছে। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, নবী করীম (স) ইরশাদ করিয়াছেন।

******************************************************

আমি তোমাদের মাঝে দুইটি জিনিস রাখিয়া যাইতেছে। এই দুইটি অনুসরণ করিতে থাকিলে অতঃপর তোমরা কখনও পথভ্রষ্ট হইবে না। তাহা হইতেছে আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাত (হাদীস) এবং কিয়ামতের দিন ‘হাওযে কাওসার’- এ উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত এই দুইটি জিনিস কখনই পরস্পর হইতে বিচ্ছিন্ন হইবে না।[মুস্তাদরাক হাকেম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩।]

বিদায় হজ্জের ভাষণে রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

দুইটি জিনিস, যাহা আমি তোমাদের মাঝে রাখিয়া যাইতেছি, তোমরা যতক্ষণ এই দুইটি জিনিস দৃঢ়ভাবে ধারণ করিয়া থাকিবে তোমরা কখনো গোমরাহ হইবে না। তাহা হইল, আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত।[ঐ, মালেক ইবনে আনাস বর্ণিত।]

ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় এই ভাষণের ভাষা এইরূপঃ

******************************************************

আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস রাখিয়া গেলাম যাহা তোমরা শক্তভাবে ধারণ করিয়া থাকিলে কস্মিনকালেও পথভ্রষ্ট হইবে না। তাহা হইল আল্লাহর কিতাব এবং তাঁহার নবী (স) –এর সুন্নাত।[তাফসীরে রুহুল মায়ানী, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৮।]

সীরাতে ইবনে হিশাম-এ বিদায় হজ্জের ভাষণের এই অংশ নিম্নোক্তরূপ ভাষায় বর্ণিত হইয়াছেঃ

******************************************************

হে মানব সমাজ, আমি তোমাদের নিকট এমন এক সম্পদ রাখিয়া গেলাম, তোমরা যদি তাহা খুব দৃঢ়তা সহকারে ধারণ কর, তবে কখনই গোমরাহ হইবে না। তাহা হইল, আল্লাহর কিতাব এবং তাঁহার নবীর সুন্নাত।

হযরত ইমরান ইবনে হুসায়ন (রা)-এর মজলিসে একজন লোক বলিলঃ

******************************************************

আপনি আমাদের নিকট কুরআন ব্যতীত অন্য কিছু বর্ণনা করিবেন না।

তখন হযরত ইমরান সে ব্যক্তিকে ডাকিয়া বলিলেনঃ

******************************************************

তুমি কি চিন্তা করিয়াদেখিয়াছ, তোমাকে ও তোমার সঙ্গী-সাথীদেরকে যদি কেবলমাত্র কুরআনের উপরই নির্ভরশীল করিয়াদেওয়া হয়, তাহা হইলে কি তুমি কুরআনে যেহরের চার রাকআত, আছরের চার রাকআত ও মাগরিবের তিন রাকআত নামাযের উল্লেখ পাইবে?

হজ্জের প্রসঙ্গ তুলিয়া বলিলেনঃ

******************************************************

 কেবল কুরআন মজীদেই কি তুমি সাতবার বায়তুল্লাহার তওয়াফ, সাফা-মারওয়ার তওয়াফ, আরাফার ময়দানে অবস্থান করা এবং পাথর টুকরা নিক্ষেপ করার বিধান দেখিতে পাও?

তিনি আরো বলিলেনঃ কুরআনে চোরের হাত কাটার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে, কিন্তু-

******************************************************

চোরের হাত কোন স্থান হইতে কাটিতে হইবে?…………… এইখান হইতে না এইখান হইতে, তাহা কি কুরআনে লেখা আছে?[****************]

সুন্নাত ও হাদীসের গুরুত্ব এবং অপরিহার্যতা এইসব যুক্তি হইতে স্পষ্টভাবে ফুটিয়া উঠে। প্রাথমিক যুগের মনীষিগণ ইহার গুরুত্ব পূর্ণ মাত্রায় স্বীকার করিতেন। সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীন সকলেই কুরআনের সঙ্গে সঙ্গে হাদীসকেও অবশ্য পালনীয় বিষয় হিসাবে গ্রহণ করিতেন। এই সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা যথাস্থানে পেশ করা হইবে। এখানে প্রসংগত আমরা পূর্ববর্তী মনীষীদের এমন কিছু উক্তির উল্লেখ করিব, যাহা হইতে হাদীস ও সুন্নাত মানিয়া লওয়ার গুরুত্ব সুস্পষ্ট হইয়া উঠিবে।

এই পর্যায়ে প্রথমত সাহাবী যুগের একটি ঘটনা উল্লেখ করা আবশ্যক। এক ব্যক্তি হযরত ইমরান ইবনে হুসায়ন (রা) কে বলিলেনঃ

******************************************************

আপনারা আমাদের নিকট এমন সব হাদীস বর্ণনা করেন, যাহার কোন মূল ভিত্তি আমরা কুরআনে খুজিঁয়া পাই না।

 ইহাতে হযরত ইমরান অত্যন্ত রাগান্বিত হন এবং প্রশ্নকারী ব্যক্তিকে সম্বোধন করিয়াবলিলেনঃ

******************************************************

প্রত্যেক চল্লিশ দিরহামে এক দিরহাম যাকাত দিতে হইবে, এত এত (প্রত্যেক চল্লিশটি) বকরীতে একটি বকরী দিতে হইবে ও এত এত (প্রত্যেক পচিঁশটি) উষ্ট্রে একটি উষ্ট্র দিতে হইবে- যাকাতের নিসাব কি তোমরা কুরআন মজীদে দেখিতে পাও?

অর্থাৎ যাকাত দানের স্পষ্ট আদেশ তো কুরআন মজীদে স্পষ্ট ভাষায় উদ্ধৃত হইয়াছে; কিন্তু উহার বিস্তারিত বিধান ও ব্যবস্থা কি কুরআনে উল্লিখিত হইয়াছে?

সেই ব্যক্তি বলিলেনঃ ‘না, তাহা কুরআনে পাওয়া যায় না’। তখন হযরত ইমরান বলিলেনঃ

******************************************************

তাহা হইলে যাকাতের এই বিস্তারিত বিধি-বিধান তোমরা কাহার নিকট হইতে জানিতে পারিলে? ইহা সবই তোমরা আমাদের (সাহাবীদের) নিকট হইতে পা্ইয়াছ, আর আমরা ইহা আল্লাহর নবীর নিকট হইতে (হাদীসের মাধ্যমে) লাভ করিয়াছি।[***************]

এই হাদীসের ভিত্তিতে মুহাদ্দিসগণ একবাক্যে যে মূলনীতি ও ফর্মূলা প্রমাণ করিয়াছেন, তাহা এইঃ

******************************************************

সমগ্র বিষয়েরই মূল বিধান কুরআনে উল্লিখিত; কিন্তু উহাদের শাখা-প্রশাখা খুটিঁনাটি (ও ব্যবহারিক নিয়মনীতি) সবই রাসূলের বর্ণনা হইতে জানা গিয়াছে।[******************]

মকহুল দেমাশকী বলিয়াছেনঃ

******************************************************

কুরআন হাদীস বা সুন্নাতের প্রতি অধিকতর মুখাপেক্ষী, সুন্নাত কুরআনের প্রতি ততটা নয়।[**********************]

ইমাম আওযায়ীও এই কথা বলিয়াছেন নিম্নোক্ত ভাষায়ঃ

******************************************************

আল্লাহর কিতাব ব্যাখ্যার জন্য সুন্নাত অধিক দরকারী কিন্তু সুন্নাত ব্যাখ্যার জন্য কুরআনের প্রয়োজন ততটা নয়।[***********]

ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর বলিয়াছেনঃ

******************************************************

সুন্নাত বা হাদীস কুরআনের তুলনায় অধিক ফয়সালাকারী, কুরআন সুন্নাতের বিপরীত ফয়সালা দিতে পারে না।[**************]

ইমাম আহমদ ইবনে হা’ল এই দুইটি কথার ব্যাখ্যাদান করিতে গিয়া বলিয়াছেনঃ

******************************************************

সুন্নাত বা হাদীস কুরআনের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণকারী এবং সুন্নাত উহার অর্থ প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করে।[********]

শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী হাদীসের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা নিম্নোক্ত ভাষায় ঘোষণা করিয়াছেনঃ

******************************************************

******************************************************

ইলমে হাদীস সকল প্রকার জ্ঞান-বিজ্ঞানের তুলনায় অধিক উন্নত, উত্তম এবং দ্বীন-ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের ভিত্তি। হাদীসের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী এবং তাহার সাহাবীদের হইতে নিঃসৃত কথা, কাজ ও সমর্থন বর্ণিত হইয়াছে। বস্তুত ইহা অন্ধকারের মধ্যে আলোকস্তম্ভ, ইহা যেন এক সর্বদিক উজ্জ্বলকারী পূর্ণ চন্দ্র। যে ইহার অনুসারী হইবে ও ইহকে আয়ত্ত করিয়া লইবে, সে সৎপথ প্রাপ্ত হইবে। সে লাভ করিবে বিপুল কল্যাণ। আর যে উহাকে অগ্রাহ্য করিবে, উহা হইতে বিমুখ হইবে সে পথভ্রষ্ট হইবে, লালসার অনুসারী হইবে, পরিণামে সে অধিক মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। কেননা নবী করীম (স) অনেক কাজ করিতে নিষেধ করিয়াছেন, অনেক কাজের আদেশ করিয়াছেন। পাপের পরিণাম সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করিয়াছেন, নেক কাজের সুফল পাওয়ার সুসংবাদ দিয়াছেন। তিনি অনেক দৃষ্টান্ত দিয়া লোকদের নসীহত দান করিয়াছেন। অতএব তাহা নিশ্চয়ই কুরআনের মত কিংবা ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ।[হুজ্জতুল্লাহিল বালিগা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১।]

শাহ দেহলভী আরো বলিয়াছেনঃ

******************************************************

সুন্নাত বা হাদীস কুরআনেরই ব্যাখ্যাদাতা এবং তাহা উহার কিছুমাত্র বিরোধিতা করে না।[***********************]

ইমাম আবূ হানীফার নিম্নোক্ত বাক্যটিও এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়ঃ

******************************************************

সুন্নাত বা হাদীসের অস্তিত্ব না হইলে আমাদের মধ্যে কেহই কুরআন বুঝিতে পারিত না।[**************]

এই প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত কথাটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যঃ

******************************************************

রাবিয়া (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলিয়াছেনঃ  ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা (হে নবী) তোমার প্রতি কুরআন নাযিল করিয়াছেন অতিশয় বিস্তারিতভাবে; কিন্তু উহাতে হাদীস ও সুন্নাতের জন্য একটি অবকাশ রাখিয়া দিয়াছেন। নবী করীম (স) সেই সুন্নাত ও হাদীস স্থাপন করিয়াছেন, যদিও তাহাতে ইজতিহাদ করা বা নিজের মত প্রয়োগের সুযোগও রাখিয়া দেওয়া হইয়াছে।[তাফসীরে দুররে মনসুর, তারিখুত্তাফসীর, পৃষ্ঠা ৪।]

ইমাম উবায়াদ লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

আল্লাহ ও রাসূলের হালাল-হারাম সম্পর্কিত হুকুমের মধ্যে পার্থক্য নাই। রাসূল এমন কোন হুকুম দিতেন না, যাহার বিপরীত কথা কুরআন হইতে প্রমাণিত হইত। বরং সুন্নাত (হাদীস) হইতেছে আল্লাহর নাযিল করা কিতাবের ব্যাখ্যাদাতা এবং কুরআনের আইন-বিধান ও শরীয়াতের বিশ্লেষণকারী।[কিতাবুল আমওয়াল-আবূ উবায়দ, পৃষ্ঠা ৫৪৪।]

হাদীস অমান্যকারী কাফির

ইসলামী ফিকাহর ইমামগণ সম্পূর্ণ একমত হইয়া ঘোষণা করিয়াছেন যে, হাদীস অমান্যকারী গুমরাহ, ইসলাম হইতে বাহির হইয়া যাওয়া লোক। ইসহাক ইবনে রাহওয়াই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

যে লোকের নিকট রাসূল করীম (স) হইতে কোন হাদীস পৌছিঁল, সে উহার সত্যতা যথার্ততা স্বীকার করে তাহা সত্ত্বেও সে যদি কোনরূপ কারণ ব্যতীত উহা প্রত্যাখান করে। তাহা হইলে তাহাকে কাফির মনে করিতে হইবে।

ইমাম ইবনে হাজম তাঁহার  ‘আল-আহাকাম’ গ্রন্হে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

কোন ব্যক্তি যদি বলে যে, আমরা শুধু তাহাই গ্রহণ করিব যাহা কুরআনে পাওয়া যায়-উহা ছাড়া আর কিছুই গ্রহণ করিব না, তাহা হইলে সে গোটা মুসলিম উম্মতের ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাফির।

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

খুব শীঘ্র এমন সব লোক আসিবে যাহারা কুরআনের প্রতি সন্দেহ লইয়া তোমাদের সহিত বিবাদ করিবে, তোমরা তাহাদিগকে সুন্নাত বা হাদীসের সাহায্যে পাকড়াও কর। কেননা সুন্নাতের ধারক বা হাদীস বিশারদ মহান আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে অধিক জ্ঞানের অধিকারী।*********************************

 

হাদীস ও রাসূলের ইজতিহাদ

নবী করীম (স) হইতে বিশ্বমানব দুইটি জিনিস লাভ করিয়াছে। একটি হইতেছে কুরআন মজীদ আর দ্বিতীয়টি সুন্নাত। কুরআন সরাসরি আল্লাহর কালাম, আল্লাহর নিকট হইতেই ওহীর মারফতে নাযিল হইয়াছে। আর সুন্নাতেরও মূল উৎস হইতেছে ওহী। রাসূলে করীম  (স) অনেক ক্ষেত্রে নিজেই ইজতিহাদ করিয়াছেন একথা সত্য; কিন্তু তাহাও ওহীবিহীন নহে। হয় উহার সহিত ওহীর সরাসরি সম্পর্ক রহিয়াছে, নয় উহা ওহী কর্তৃক সমর্থিত এবং অনুমতিপ্রাপ্ত। কাজেই রাসূলের ইজতিহাদকেও ইসলামের উৎস হিসাবে স্বীকার করিতে হইবে।

এই পর্যায়ে শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীর আলোচনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি এই বিষয়টির প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ দান প্রসঙ্গে লিখিয়াছেনঃ

হাদীসের কিতাবসমূহে রাসূল (স) হইতে যেসব হাদীস বর্ণিত ও উদ্ধৃত হইয়াছে, তাহা দুই প্রকারের। প্রথম প্রকারের হাদীস হইতেছে তাহা. যাহা রিসালাতের দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে বলা হইয়াছে। কুরআনের আয়াতঃ

******************************************************

‘রাসূল তোমাদিগকে যাহা কিছু দিয়াছেন তাহা গ্রহণ কর, আর যাহা হইতে নিষেধ করিয়াছেন তাহা হইতে বিরত থাক’- এই বিশাল পর্যায়ে এই ধরনের হাদীস গণ্য। এই ধরনের হাদীসের এক ভাগ তাহা, যাহাতে পরকালের অবস্থা ও মালাকুতী জগতের বিস্ময়কর বিষয় সম্পর্কে বলা হইয়াছে। এইসব বিষয়ের ভিত্তি হইতেছে ওহী। হাদীসসমূহে যে ভাবে শরীয়াতের হুকুম-আহকাম বর্ণিত হইয়াছে, ইবাদাতের আরকান ও নিয়মাবলীর বিশ্লেষণ রহিয়াছে, জীবন প্রণালীর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা সম্পর্কিত ব্যাখ্যা ও উপদেশ রহিয়াছে, তাহা এই প্রথম পর্যায়ের প্রথম ভাগের হাদীস। প্রথম পর্যায়ের এই হাদীসসমূহের এব দ্বিতীয় ভাগের কিছু হাদীস ওহীবদ্ধ; আর কিছু রাসূলে করীমের নিজের ইজতিহাদ-ভিত্তিক। কিন্তু স্মরণ রাখিতে হইবে যে, রাসূলে করীমের ইজতিহাদও ওহীর সমপর্যায়ভুক্ত। কেননা আল্লাহ তা’আলা তাঁহাকে ভূল ইজতিহাদ করিতে দেন নাই। তাঁহার ইজতিহাদ কখনো ভূল হইয়া গেলে সেই ভূলের উপর তাঁহাকে কায়েম থাকিতে দেন নাই। কোন প্রকার ভূল হইলে অনতিবিলম্বে আল্লাহর তরফ হইতে উহার সংশোধন ও বিশুদ্ধ হইয়া যাওয়া অপরিহার্য।[****************]

শাহ ওয়ালীউল্লাহ এই শেষ কথা কয়টি এই ভাষায় লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

এই প্রকারের হাদীসের কিছু অংশ ওহীমূলক, আর কিছু ইজতিহাদমূলক। তবে রাসূলে করীম (স)-এর ইজতিহাদও ওহীরই সমতুল্য। কেননা রাসূলের রায়কে ভূলের উপর স্থায়ী হইয়া থাকা হইতে আল্লাত তা’আল্অ তাঁহাকে রক্ষা করিয়াছেন।

 

হাদীসের উৎপত্তি

পূর্বোক্ত বিস্তারিত আলোচনা হইতে ইসলামী জীবনে হাদীসের স্থান এবং হাদীসের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। বর্তমান পর্যায়ে আলোচনা করিব কিভাবে হাদীস লাভ করিলেন, তাহাই হইবে এখনকার মূল আলোচ্য বিষয়।

নবী করীম (স) এর নিকট হইতে হাদীসের সর্বপ্রথম শ্রোতা হইতেছেন সাহাবায়ে কিরাম। দ্বীন-ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ও বিস্তারিত জ্ঞান লাভের জন্য তাঁহারা রাসূলেল দরবারে উদগ্রীব হইয়া বসিয়া থাকিতেন। তাঁহারা নবী করীম (স) কে চব্বিশ ঘন্টা পরিবেষ্টিত করিয়া রাখিতেন। তিনি কোথায়ও চলিয়া গেলে তাঁহারা ছায়ার মত তাঁহার অনুসরণ করিতেন।

রাসূলে করীম (স) জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ছিলেন ইসলামী বিধানের ব্যাখ্যাদাতা। কেবল মুখের কথায়ই নয়, নিজের কাজকর্ম ও সাহাবাদের কথা ও কাজের সমর্থন দিয়াও তিনি উহার বাস্তব ব্যাখ্যা দান করিতেন। সাহাবাগণ ইহার মাধ্যমেই হাদীসের মাহন সম্পদ সংগ্রহ এবং সঞ্চয় করিতেন। দ্বীন-ইসলামের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে যখনই কোন জটিলতা কিংবা অজ্ঞতা দেখা দিত। কোন প্রশ্নের উদ্রেক হইত, তখনই রাসূলের নিকট সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিয়াজওয়াব হাসিল করিতেন এবং সাহাবায়ে কিরাম (রা) একটি অমূল্য সম্পদ হিসাবে ইহার সংরক্ষণ করিতেন।

এতদ্ব্যতীত হাদীস উৎপত্তির আরো উপায় ইলমে হাদীসের ইতিহাসে সুস্পষ্টরূপে পরিলক্ষিত হয়। হযরত জিবরাঈল (আ) কখনো কখনো ছদ্মবেশে রাসূলের দরবারে উপস্থিত হইতেন এবং রাসূলের নিকট নানা বিষয়ে প্রশ্ন করিয়া ও উহার জওয়াব হাসিল করিয়া উপস্থিত সাহাবাদিগকে পরোক্ষভাবে শিক্ষাদান করিতেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত ‘হাদীসে জিবরাঈল’ নামের প্রখ্যাত হাদীসটি ইহার অকাট্য প্রমাণ। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, একজন অপরিচিত ও সুবেশী লোক রাসূলের দরবারে উপস্থিত হইয়া ইসলাম, ঈমান, ইহসান ও কিয়ামাত প্রভৃতি বুনিয়াদী বিষয়ে প্রশ্ন করেন। রাসূলে করীম (স) প্রত্যেকটি প্রশ্নের যথাযথ জওয়াব দান করেন। অতঃপর তিনি দরবার হইতে চলিয়া যান। রাসূলে করীম (স) উপস্থিত সাহাবাদের মধ্যে হযরত উমর ফারূক (রা) কে জিজ্ঞাসা করেনঃ

******************************************************

হে উমর, তুমি জান, এই প্রশ্নকারী লোকটি কে?

হযরত উমর (রা) স্বীয় অজ্ঞতা প্রকাশ করিলে রাসূলে করীম (স) নিজেই বলিলেনঃ

******************************************************

এই প্রশ্নকারী ছিলেন জিবরাঈল, তিনি তোমাদের নিকট তোমাদিগকে দ্বীন শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে আসিয়াছিলেন।[*******************]

অতঃপর আমরা প্রামাণ্য গ্রন্হাবলী হইতে এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ করিব, যাহা হইতে রাসূলের নিকট সাহাবাদের নানা বিষয়ে প্রশ্ন করা ও উহার জওয়াব হাসিল করার কথা প্রমাণিত হয়।

বস্তুত নবী করীম (স) এর নিকট সাহাবীদের সওয়াল করা অস্বাভাবিক ব্যাপর ছিল না। তিনি নিজেই তাহাদিগকে সওয়াল করিতেন, তাঁহার নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়া লইতে ও তদনুযায়ী কাজ করিতে বলিয়াছিলেন এবং এইজন্য সময় সময় তাকীদও করিতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেনঃ নবী করীম (স)-এর যামানায় এক ব্যক্তি আহত হইলে তাহাকে গোসল করিতে বলা হইল। পরে সে মারা যায়। এই ঘটনার কথা নবী করীম (স) শুনিতে পাইয়া ক্রুদ্ধস্বরে বলিলেনঃ

******************************************************

আল্লাহ‍‍! ঐ লোকগুলিকে খতম করুন। আমার নিকট জিজ্ঞাসা করিলে না কেন? জিজ্ঞাসা করাই কি সব অজ্ঞতার প্রতিবিধান নয়?[********************]

হযরত নাওয়াস ইবনে সালমান (রা) বলেনঃ আমি রাসূলের নিকট একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার জন্য দীর্ঘ একটি বৎসর পর্যন্ত মদীনায় অবস্থান করিয়াছি।

******************************************************

শেষ পর্যন্ত আমি তাঁহার নিকট ‘বিরর’ ও ‘ইসম’ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলোম। তিনি জওয়াবে বলিলেনঃ ‘বিরর’ হইতেছে নেক চরিত্র আর ‘ইসম’ তাহাই যাহা তোমার খটকা জাগায়-সংকোচের সৃষ্টি করে এবং তাহা লোকেরা জানুক ইহা তুমি পছন্দ কর না।[*****************]

কেবল মদীনায় উপস্থিত লোকেরাই যে রাসূলের নিকট প্রশ্ন করিতেন তাহা নহে; সুদূরবর্তী শহর ও পল্লী অঞ্চল হইতেও নও-মুসলিম লোকেরা দরবারে উপস্থিত হইয়া প্রশ্ন করিতেন। একদিন নবী করীম (স) সাহাবাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া মসজিদে নববীতে বসিয়াছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি উটের উপর সওয়ার হইয়া আসিয়া উপস্থিত হইল। রাসূলের নিকট প্রশ্ন করার অনুমতি চাহিয়া বলিলঃ

******************************************************

আমি আপনার নিকট প্রশ্ন করিব; প্রশ্ন করার ব্যাপারে আমি অত্যন্ত কঠোরতাও প্রদর্শন করিব, আপনি কিন্তু আমার সম্পর্কে মনে কোন কষ্ট নিতে পারিবেন না।

অতঃপর নবী করীম (স) তাহাকে প্রশ্ন করার অনুমতি দান করিলে সে আল্লাহ সম্পর্কে, সমগ্র মানুষের প্রতি রাসূলের রাসূল হিসাবে প্রেরিত হওয়া সম্পর্কে, পাঁচ ওয়াকত নামায, একমাসের রোযা এবং ধনীদের নিকট হইতে যাকাত আদায় করিয়া গরীবদের মধ্যে বন্টন করা ফরয হওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিল। রাসূলে করীম (স) উত্তরে বলিলেনঃ

******************************************************

হ্যাঁ, আল্লাহ তা’আলা এই সবই ফরয করিয়া দিয়াছেন।

শেষ কালে সেই লোকটি রাসূলের জওয়াবে উদ্ধুদ্ধ হইয়া বলিলঃ

******************************************************

আপনি যে দ্বীন লইয়া আসিয়াছেন, তাহার প্রতি আমি ঈমান আনিলাম। আমার নাম যিমাম ইবনে সা’লাবা; আমি আমার জাতির লোকদের প্রতিনিধি হইয়াই আপনার নিকট আসিয়াছি।

হযরত আনাম বলেনঃ  গ্রামদেশীয় এক ব্যক্তি আসিয়া রাসূলে করীম (স) কে জিজ্ঞাসা করিলঃ

******************************************************

আপনার প্রেরিত ব্যক্তি আমাদের নিকট গিয়া এই সংবাদ দিয়া আসিয়াছে যে, আপনাকে আল্লাহ তা’আলা রাসূল বানাইয়া পাঠাইয়াছেন বলিয়া আপনি মনে করেন, ইহা কি সত্য?

নবী করীম (স) উত্তরে ইহার সত্যতা স্বীকার করিয়া লন। অতঃপর সেই ব্যক্তি দ্বীন-ইসলামের কতগুলি মৌলিক বিষয়ে পূর্বে যাহা কিছু শুনিতে পাইয়াছিল তাহার সত্যতা সম্পর্কে রাসূলকে প্রশ্ন করে। রাসূল (স) তাহার সত্যতা বুঝাইয়া দিলে পর সে উদাত্ত কন্ঠে বলিয়া উঠেঃ

******************************************************

আপনাকে সত্য বিধানসহ যে আল্লাহ পাঠাইয়াছেন তাহার নাম শপথ করিয়া বলিতেছিঃ আপনার বিবৃত বিষয়সমূহে আমি কিছুই বেশি-কম করিব না।[****************]

আবদুল কায়স গোত্রের প্রতিনিধিদল নবী করীম (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া নিজেদের অসুবিধা সম্পর্কে বিবরণ দিতে গিয়া বলিলঃ ‘হে রাসূল, আমাদের ও আপনার মাঝে মুশরিক গোত্রের অবস্থিতি রহিয়াছে, এই কারণে যে চার মাস যুদ্ধ করা হারাম তাহা ব্যতীত অপর সময়ে আমরা আপনার নিকট উপস্থিত হইতে পারি না’। অতএবঃ

******************************************************

দ্বীন-ইসলামে মূল বিষয় সম্পর্কে আমাদিগকে এমন কিছু বলিয়া দিন, যাহা অনুসরণ ও সে অনুযায়ী আমল করিলে আমরা বেহেশতে দাখিল হইতে পারিব এবং আমাদের পিছনে অবস্থিত লোকদিগকে তদনুযায়ী আমল করার জন্য আমরা দাওয়াত জানাইব।[বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, ৬২৭ পৃষ্ঠা-************]

বনূ তামীম গোত্র ও ইয়েমেনবাসীদের পক্ষ হইতে একদল লোক রাসূলের দরবারে উপস্থিত হইয়া আরয করিলেনঃ

******************************************************

 আমরা আপনার নিকট দ্বীন-ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে আগমন করিয়াছি। এই সৃষ্টির মূলে ও প্রথম পর্যায়ে কি ছিল, সে সম্পর্কেও আমরা আপনাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, ১৫ পৃষ্ঠা।]

বসরার বনূ-লাইস ইবনে বকর ইবনে আবদ মানাফ ইবনে কিনানা হইতে কিছু সংখ্যক যুবক ও সমবয়সী লোক মদীনায় রাসূলের দরবারে আসিয়া প্রায় বিশ দিন পর্যন্ত অবস্থান করেন। তাঁহারা যখন নিজেদের দেশে প্রত্যাবর্তন করিবার জন্য উদ্বগ্ন হইয়া পড়িলেন, তখন নবী করীম (স) তাঁহাদিগকে বলিলেনঃ

******************************************************

 তোমরা ফিরিয়া যাও, তোমাদের পরিবার-পরিজনদের সহিত জীবন যাপন কর। তাহাদিগকে দ্বীন-ইসলামের শিক্ষা দান কর। তোমরা নামায পড়।(বুখারী)

মুসলিমের অপর বর্ণনায় ইহার পর রহিয়াছেঃ

******************************************************

 (যেমন ভাবে তোমরা আমাকে নামায পড়িতে দেখ) আর যখন নামায উপস্থিত হইবে, তখন তোমাদের একজন সকলের জন্য আযান দিবে এবং তোমাদের অধিক বয়স্ক ব্যক্তি ইমামতি করিবে।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, *****************]

 নবী করীম (স) এই যুবক দলকে বিশ দিন পর্যন্ত দ্বীন-ইসলামের অনেক কথাই হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়াছিলেন। শরীয়াতের হুকুম আহকাম ও ইবাদতের যাবতীয় নিয়ম-নীতিও শিক্ষা দিয়াছিলেন। ফলে একদিকে যেমন বহু হাদীসের উৎপত্তি হইয়াছে, অপরদিকে ঠিক তেমনি রাসূলের এই হাদীসসমূহ মদীনা হইতে সুদূর বসরা পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য সাহাবীদের মারফতে পৌছিঁতে ও প্রচারিত হইতে পারিয়াছে।

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেনঃ হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেনঃ আমরা রাসূলের দরবারে বসিয়াছিলাম। তিনি লোকদের সাথে কথা বলিতে ব্যস্ত ছিলেন। এমন সময় জনৈক আরব বেদুঈন আসিয়ারাসূলের নিকট জিজ্ঞাসা করিলঃ *************** ‘কিয়ামত কবে হইবে’? নবী করীম (স) তাঁহার কথা শেষ করিয়া বেদুঈনকে ডাকিয়া বলিলেনঃ

******************************************************

আমানত যখন বিনষ্ট করা শুরু হইবে তখন কিয়ামরে অপেক্ষা করিবে।

লোকটি জিজ্ঞাসা করিলঃ *************** আমানত কিভাবে নষ্ট করা হইবে?

নবী করীম (স) বলিলেনঃ

******************************************************

দায়িত্বপূর্ণ কাজ যখন অনুপযুক্ত ব্যক্তির উপর ন্যস্ত করা হইবে, তখন কিয়ামতের প্রতীক্ষার সময় উপস্থিত মনে করিবে।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, ১৪ পৃঃ।]

এইসব ঘটনা হইতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, কুরআনের বাহক হযরত মুহাম্মদ (স)- এর নিকট হইতে ইসলামের বিভিন্ন মৌলিক ও খুটিঁনাটি বিষয়ে জানিয়া লওয়ার তীব্র আকাঙ্খা এবং সেই জন্য চেষ্টা ও কষ্ট স্বীকার করিবার প্রবণতা সকল সহাবীর মধ্যেই বর্তমান ছিল। আর রাসূলে করীম (স) এইসব জিজ্ঞাসার জওয়াবে যত কথাই বলিয়াছেন, যত কজই করিয়াছেন এবং যত কথা ও কাজের সমর্থন করিয়াছেন, তাহার বিবরণ ইসলামী জীবন-ব্যবস্থার বিস্তৃত ব্যাখ্যার পর্যায়ভুক্ত এবং তাহাই হাদীস। এই সম্পর্কে আল্লাম বদরুদ্দীন আয়নী যাহা লিখিয়াছেন, তাহা এখানে উল্লেখ করা যাইতেছেঃ

******************************************************

সাহাবায়ে কিরাম রাসূলের নিকট অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য জিজ্ঞাসা করিতেন। নবী করীম (স) তাহাদিগকে একত্র করিতেন, তাহাদিগকে দ্বীনের শিক্ষাদান করিতেন। সাহাবাদের কিছু লোক রাসূলের নিকট প্রশ্ন করিয়াজওয়াব লাভ করিতেন, অপর কিছু লোক উহা স্মরণ করিয়া রাখিতেন, কিছু লোক তাহা অপরের নিকট পৌছাইয়া দিতেন, অপরকে জানাইতেন, এইভাবে আল্লাহ তা’আলা তাঁহার দ্বীনকে পূর্ণতারয় পরিণত করিয়া লন।[***********]

হাদীস শাস্ত্রের উৎপত্তি সম্পর্কে ইহা এক প্রামাণ্য ভাষণ, সন্দেহ নাই। এই প্রসঙ্গে ইমাম এবনে কাইয়্যেমের একটি উদ্ধৃতিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বনুল মুনফাতিক নামক এক কবীলার আগমন সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে তাহাদের এক প্রশ্নের উল্লেখ  করিয়াছেন এবং তাহার পর লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

******************************************************

ইহা হইতে প্রমাণ পাওয়া গেল যে, সাহাবাগণ রাসূলের সম্মুখে তাঁহাদের নানাবিধ প্রশ্ন ও শোবাহ-সন্দেহ পেশ করিতেন এবং তিনি তাঁহাদিগকে উহার জওয়াব দিতেন। ফলে তাহাদের মন সান্ত্বনা লাভ করিত। তাঁহার নিকট শক্ররাও প্রশ্ন করিত, যেমন করিত তাঁহার সাহাবিগণ। পার্থক্য এই যে, শক্ররা প্রশ্ন করিত ঝগড়া করা ও নিজেদের বাহদুরী প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে, আর সাহাবিগণ প্রশ্ন করিতেন দ্বীনের তত্ত্ব বুঝিবার জন্য, উহার প্রকালের জন্য এবং বেশী বেশী ঈমান লাভের উদ্দেশ্যে। আর রাসূল (স) তাহাদের সকলেরই জওয়াব দান করিতন। অবশ্য যেসব বিষয়ের কোন জওয়াব তাঁহার জানা ছিল না- যেমন কিয়ামত হওয়ার সময়- কেবল সে- সব বিষয়েরই তিনি জওয়ার দিতেন না।[****************]

নবী করীম (স) কেবল যে লোকদের সওয়ালেরই জওয়াব দিতেন এবং তাহাতেই হাদীসের উৎপত্তি হইত, তাহাই নয়। তিনি নিজে প্রয়োজন অনুসারে সাহাবিগণকে দ্বীন সম্পর্কে বিস্তারিত শিক্ষা দান করিতেন। হাদীসে এই পর্যায়ে বহু গটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। আমরা এখানে এই পর্যায়ের দুই একটি বিবরণের উল্লেখ করিতেছি।

১.  হযরত আবূ যায়দ আনসারী (রা) বলেনঃ “একদিন নবী করীম (স) আমাদের লইয়া ফজরের নামায পড়িলেন। পরে তিনি মিম্বরে উঠিয়া দাঁড়াইলেন ও আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দান করিলেন। জোহরের নামাযের সময় পর্যন্ত এই ভাষণ চলিল। তখন তিনি নামিয়া জোহরের নামায পড়িলেন। নাময পড়া হইয়া গেলে তিনি আবা মিম্বরে উঠিয়া দাঁড়াইলেন ও ভাষণ দিতে থাকিলেন। আসরেরর নামায পর্যন্ত তাহা চলিল। আসরের নামাযের সময় উপস্থিত হইলে তিনি নামিয়া আসরের নামায পর্যন্ত তাহা পড়িলেন। নামায পড়া হইয়া গেলে তিনি আবার মিম্বরে দাঁড়াইয়া ভাষণ দিতে লাগিলেন। এই ভাষণ সূর্যাস্তকাল পর্যন্ত চলিল। এই একদিন ব্যাপী দীর্ঘ ভাষণে তিনি আমাদের নিকট অতীত ও ভবিষ্যতের অনেক কথাই বলিলেন। শুধু বলিলেনই না, আমাদিগকে জানাইয়াদিলেন ও মুখস্থ করাইয়া দিলেন।[মুসনাদে আহমদ ইবন হা’ল, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৩।]

২.   হযরত হানযালা (রা) বলেনঠঃ আমরা একদিন রাসূল (স)- এর সঙ্গে ছিলাম। এই সময় তিনি আমদিগকে জান্নাত ও জাহান্নামের কথা সবিস্তারে বলিলেন। উহার ফলে এই দুইটি জিনিস আমাদের সামনে উজ্জ্বল উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল, যেন আমরা প্রত্যক্ষভাবে দেখিতে পাইতেছি……………….।[মুসনাদে আহমদ ইবন হা’ল, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৩।]

মাত্র দুইটি বর্ণনা এখানে উদ্ধৃত করা গেল, যদিও হাদীসের কিতাবে এই পর্যায়ের বহু কথারই উল্লেখ রহিয়াছে। এই দুইটি বিবরণ হইতেই এই কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হইতেছে যে, নবী করীম (স) প্রয়োজনে বুঝিয়ানিজ হইতেই অনেক সময় দ্বীন সম্পর্কে অনেক কথাই বলিতেন এবং সব কথাই সাহাবিগণ স্মরণ রাখিতেন ও অন্যান্য লোকদের নিকট এই হাদীস- কথাসমূহ তাঁহারা বর্ণনা করিতেন।

হাদীসের উৎপত্তি পর্যায়ে এই কথাও উল্লেখ্য।

 

হাদীস সংরক্ষণ

ইসলাম বিশ্বমানবের জন্য এক চিরন্তন জীবন- ব্যবস্থা। এইজন্য উহার প্রধান ও প্রাথমিক বুনিয়াদ কুরআন মজীদের হিফাযতের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তা’আলাই গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি ঘোষণা করিয়াছেনঃ

******************************************************

নিশ্চয়ই আমিই কুরআন নাযিল করিয়াছি এবং আমিই উহার সংরক্ষণকারী।[সূরা আল-হিজর, আয়াত- ৯।]

বস্তুত আল্লাহ তা’আলা কুরআন মজীদ নাযিল করার সঙ্গে সঙ্গে উহার পূর্ণ সংরক্ষণের সার্বিক ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা করিয়াছেন। জিবরাঈলের মারফতে রাসূলে করীমের নিকট কুরআন নাযিল হইয়াছে, তিনি সঙ্গে সঙ্গেই তাহা লোকদিগকে পাঠ করিয়া শোনাইয়াছেন। অতঃপর ইহাকে চিরতরে সংরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে দুইটি উপায় অবলম্বিত হইয়াছে। একদিকে সাহাবায়ে কিরাম কুরআন শ্রবণের সঙ্গে সঙ্গে তাহা মুখস্থ করিয়া লইয়াছেন। স্মরণ শক্তির মণিকোঠায় ইহার প্রতিটি শব্দ ও অক্ষর চিরদিনের তরে সুরক্ষিত করিয়া লইয়াছেন। [সূরা আল-আনকাবূত, ৪৯ আয়াতের ব্যাখ্যায় শাহ আবদুল কাদির লিখিত আলোচনা, **************** পৃষ্ঠা ১২৪।]

ফলে উহার একটি বিন্দুও বিলুপ্ত বা বিকৃত হইতে পারে নাই। এই উপায়ে সংরক্ষণে লাভের দিক দিয়াও কুরআন মজীদ আসামানী গ্রন্হাবলীর ইতিহাসে অতুলনীয় জিনিস, দুনিয়ার অপর কোন গ্রন্হই মুখস্থ করিয়া রাখাকে এক বিরাট সওয়াবের কাজ বলিয়া বিশ্বাস করেন। এই কারণে কুরআন মজীদ মুখস্থ করার রীতি আবহমানকাল হইতে চলিয়া আসিয়াছে। এমন কি, গ্রন্হাকারে লিপিবদ্ধ কুরআন যদি আজ বিলুপ্তও হইয়া যায়, তবুও হাফেজদের স্মৃতিপটে রক্ষিত কুরআন মজীদ তাহার স্থান দখল করিতে পারিবে। পুনরায় কুরআনকে লিখিতরূপ দান করা কিছুমাত্র অসুবিধার ব্যাপার হইবে না। ইহা যে কুরআন মজীদের এক মু’জিযা তাহাতে সন্দেহ নাই।

অপরদিকে কুরআন নাযিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নবী করীম (স) সর্বক্ষণ নিযুক্ত ওহী-লেখকদের দ্বারা তাহা লিখাইয়া লইয়াছেন। হযরত বরা ইবনে আজিব (রা) বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীসটি ইহার জ্বলন্ত প্রমাণঃ

******************************************************

নিষ্ক্রিয় মু’মিন লোক ও আল্লাহর পথে জিহাদকারী লোক কখনো সমান হইতে পার না- এই আয়াত যখন নাযিল হইল, তখন নবী করীম (স) বলিলেনঃ যায়দকে ডাকিয়া দাও এবং তাহাকে দোয়াত, তখতি ইত্যাদি লইয়া আসিতে বলিও। তিনি (যায়দ) যখন আসিলেন, তখন নবী করীম (স) বলিলেনঃ এই আয়াতটি লিখ……………।[বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৪৬।]

এইভাবে সমস্ত কুরআন মজীদ নবী করীম (স) এর জীবদ্দশায়ই নির্দিষ্ট লেখকের দ্বারা লিখিত হয়। প্রায় চল্লিশ জন সাহাবী কুরআন মজীদ লিখিবার জন্য নিযুক্ত ছিলেন। [***********] প্রায় ছাব্বিশ জন সাহাবী ছিলেন তাঁহাদের মধ্যে প্রখ্যাত। হযরত আবূ বকর, হযরত উমর, হযরত উসমান, হযরত আলী, হযরত যায়দ ইবনে সাবিত, হযরত আবদুল্লাহ ইবন সায়াদ, হযরত জুবাইর ইবনুল আওয়াম, হযরত খালিদ ইবন সায়ীদ, হযরত আমর ইবনুল আ’স, হযরত মুয়াবিয়া ইবন আবূ সুফিয়ান, হযরত উবাই ইবন কায়াব (রা) প্রমুখ তাহাদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। [তাবাকাতে ইবন সায়াদ, তারীখ-ই তাবারী, ***************************************]

এই উভয়বিধ উপায় অবলম্বিত হওয়ার ফলে কুরআন মজীদ সর্বপ্রকার বিকৃতিও বিলুপ্তির হাত হইতে চিরকালের তরে রক্ষা পাইয়াছে।

কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে কেবল কুরআন মজীদকে রক্ষা করাই দ্বীন ইসলাম রক্ষা ও স্থায়িত্বের জন্য যথেষ্ট ছিল না। এই কারণে আমরা দেখিতেছি, কুরআন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তা’আলা হাদীস সংরক্ষণেরও যথাযথ ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিলেন। হাদীস সংরক্ষণের ইতিহাসে আমাদের সামনে স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, কুরআন সংরক্ষণের জন্য প্রধানত দুইটি বাহ্যিক উপায় অবলম্বিত হইয়াছে, রাসূলের সুন্নাত তথা হাদীসও প্রধানত ঠিক সেই দুইটি উপায়ের সাহায্যেই সুরক্ষিত হইয়াছে। আর তাহা হইতেছে আল্লাহ তা’আলার কায়েম করা স্বাভাবিক ব্যবস্থা এবং মানুষের মানবিক প্রচেষ্টা ও ব্যবস্থাপনা। এই পর্যায়ে বিস্তারিত ও ঐতিহাসিক তথ্য ও তত্ত্বভিত্তিক আলোচনা পেশ করার জন্য আমরা এখানে চেষ্টা করিব।

স্বাভাবিক ব্যবস্থা

হাদীস সংরক্ষণের স্বাভাবিক ব্যবস্থা যাচাই ও পরীক্ষা করিয়া দেখিলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই ব্যবস্থাকে কার্যকর করিয়াছে বলিয়া মনে হয়। প্রথম, তদানিীন্তন আরবদের স্বাভাবিক স্মরণশক্তির তীক্ষ্ণতা ও প্রাখর্য। দ্বিতীয়, সাহাবায়ে কিরামের জ্ঞান-পিপাসা, জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানানুশীলনের অপূর্ব তিতিক্ষা এবং তৃতীয়, ইসলামী আদর্শ ও জ্ঞান বিস্তারের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ। এই তিনটি বিষয়েরই বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা যাইতেছে।

আরব জাতির স্মরণশক্তি

তদানীন্তন আরব জাতির স্মরণশক্তি বস্তুতই এক ঐতিহাসিক বিস্ময়। কুরআন এবং হাদীসের সংরক্ষণে ইহার যথেষ্ট অবদান রহিয়াছে। কুরআন মজীদ ইহাকে একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থা হিসাবে গণ্য করিয়াছে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

বরং এই কুরআন সুস্পষ্ট আয়াত সমষ্টি, ইহা জ্ঞানপ্রাপ্ত লোকদের মানসপটে সুরক্ষিত।[সূরা আল-আনকাবুত, ৪৯ আয়াত।]

এই আয়াতে সেকালের মুসলিম জ্ঞানী লোকদের স্মরণশক্তির দিকে সুস্পষ্ট ইংগিত রহিয়াছে এবং কুরআন মজিদ যে তাহাদের মানসপটে স্মৃতিশক্তির মাধ্যমে সুরক্ষিত ছিল, তাহাও ব্যক্ত করা হইয়াছে। আল্লামা বায়াযাবী এই আয়াতের তাফসীরে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

অর্থাৎ তাঁহারা কুরআনক এমনভাবে হিফয করিয়া রাখিতেন ও উহার সংরক্ষণ করিতেন যে, কেহই উহাকে বিকৃত বা রদবদল করিতে পারিত না।[তাফসীরে বায়যাবী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৯।]

ইতিহাস প্রমাণ করিয়াছে যে, তদানীন্তন আরব সমাজের লোকদের স্মরণশক্তি অসাধারণরূপে প্রখর ছিল, কোন কিছু স্মরণ করিয়া রাখার জন্য একবার শ্রবণই তাহাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। এই সম্পর্কে ইবন আবদুল বির লিখিত এই ঐতিহাসিক তথ্য উল্লেখযোগ্যঃ

******************************************************

আরব জাতি স্বভাবতই স্মরণশক্তিসম্পন্ন ছিল এবং উহা ছিল তাহাদের বিশেষত্ব ও বৈশিষ্ট্য।

******************************************************

তাহারা স্বাভাবিকভাবেই স্মরণশক্তি লইয়া জন্মগ্রহণ করিত।[****************]

******************************************************

এই কথা প্রসিদ্ধ ও সর্বজনবিদিত যে, আরব জাতি মুখস্থ করার ব্যাপারে বিশেষ শক্তি ও প্রতিভার বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ছিল। তাহাদের এক একজন লোক যে কাহারো দীর্ঘ কবিতা একবার শুনিয়াই মুখস্থ করিয়া ফেলিতে ও স্মরণ রাখিতে সক্ষম হইত।[***************]

হযরত ইবন আব্বাস (রা) উমর ইবন আবূ রাবিয়ানামক প্রসিদ্ধ আরব কবির এক দীর্ঘ কবিতা একবার মাত্র শ্রসণ করিয়া সম্পূর্ণ মুখস্থ করিয়া লইয়াছিলেন। [***************] রাসূলের সাহাবিগণও খালেস আরব জাতির লোক ছিলেন। তাঁহারা প্রথমে না কিছু লিখিতে পারিতেন, না পারিতেন কোন লিখিত জিনিস পাছ করিতে। ফলে তাঁহাদের সকলকেই কেবল স্মরণশক্তির উপর নির্ভরশীল হইয়া থাকিতে হইত। জাহিলিয়াতের যুগে তাঁহারা তাঁহাদের দীর্ঘ বংশতালিকা, পূর্বপুরুষদের অপূর্ব প্রশংসা ও গুণ-গরিমার কথা সবিস্তারে মুখস্থ করিয়া রাখিতেন। তাঁহাদের পরস্পরের মধ্যে যখন বংশ-গৌরবের প্রতিযোগিতা হইত, তখন তাঁহারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অতীত বংশ গৌরব ও স্তুতি গাঁথা একটানা মুখস্থ বলিয়া যাইতেন। তাঁহাদের প্রায় প্রত্যেকেই স্মরণশক্তির তীক্ষ্ণতার কারণে নিজ নিজ বংশের ভাষ্যকার বা মুখপাত্র ছিলেন।

আল্লাহ তা’আলা স্বাভাবিক স্মরণশক্তিসম্পন্ন এই আরব জাতিকেই হযরত মুহাম্মদ (স)-এর নবুয়্যাত ও প্রচরিত বাণীর সংরক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। প্রখর স্মরণশক্তিসম্পন্ন এইসব হৃদয়কে কুরআনের আয়াত ও রাসূলের হাদীস মুখস্থ রাখার জন্য পূর্ণ মাত্রায় প্রস্তুত করিয়াছিলেন। [***************************]

ঠিক এই কারণেই আমরা দেখিতে পাই যে, কুরআন মজীদ নাযিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহাবিগণ নবী করীম (স)- এর মুখে তাহা শুনিয়াই মুখস্থ করিয়া লইতে পারিতেন। এইভাবে পূর্ণ কুরআন মজীদ মুখস্থ করিয়ালওয়া এবং রাখা তাহাদের পক্ষে কিছুমাত্র কঠিন ব্যাপার ছিল না।

প্রসিদ্ধ তাবেয়ী কাতাদাহ ইবন দায়ামহ দাবি করিয়া বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আল্লাহ এই  জাতিকে স্মরণশক্তির এমন প্রতভা দান করিয়াছেন, যাহা কোন জাতিকেই দান করা হয় নাই। ইহা এক বিশেষত্ব, যাহা কেবল তাহাদিগকেই দেওয়া হইয়াছে এবং ইহা এমন এক সম্মান ও মর্যাদা যাহা দ্বারা শুধু তাহাদিগকেই সম্মানিত করিয়াছেন।[যুরকানী, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯৫।]ৱ

হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর একটি ঐতিহাসিক ঘটনা এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তিনি বিপুল সংখ্যাক হাদীসের হাফেজ ছিলেন। কিন্তু উমাইয়া বংশের শাসক খলীফা মারওয়ান ইবন হিকামের মনে এই সম্পর্কে সন্দেহের উদ্রেক হয়। তিনি হযরত আবূ হুরায়রার পরীক্ষা লওয়ার জন্য একটি কৌশল অবলম্বন করেন। একদিন হযরত আবূ হুরায়রাকে কিছু সংখ্যক হাদীস শোনাইবার জন্য অনুরোধ করিলেন। আবূ হুরায়রা (রা) তখন কিছু সংখ্যক হাদীস শোনাইয়া দেন। মারওয়ানের নির্দেশ মুতাবিক পর্দার অন্তরালে বসিয়া হাদীসসমূহ লিখিয়া লওয়া হয়। বৎসরাধিক কাল পরে একদিন ঠিক এই হাদীসসমূহই শোনাইবার জন্য হযরত আবূ হুরায়রাকে অনুরোধ করা হইলে তিনি সেই হাদীসসূহই এমনভাবে মুখস্থ শোনাইয়াদেন যে, পূর্বের শোনানো হাদীসের সহিত ইহার কোনই পার্থক্য হয় না। ইহা হইতে হযরত আবূ হুরায়রার স্মরণশক্তির প্রখরতা অনস্বীকার্যভাবে প্রমাণিত হয়।[কিতাবুল কুনী, ইমাম বুখারীকৃত, পৃষ্ঠা ৩৩।]

প্রসিদ্ধ হাদীস-সংকলক ইমাম ইবন শিহাব জুহরীও ছিলেন অসাধারণ স্মরণশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি। তিনিও একবার এক পরীক্ষার সম্মখীন হইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। তদানীন্তন বাদশাহ হিশাম তাঁহার পুত্রকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য কিছু সংখ্যক হাদীস লিখিয়া দিতে তাঁহাকে অনুরোধ করেন। জুহরী তখনি চারশত হাদীস লিখাইয়া দেন। দীর্ঘদিন পর সেই হাদীসসমূহ পুনরায় লিখাইয়া দেওয়ার জন্য অনুরুদ্ধ হইয়া তিনি আবার তাহা লিখিইয়া দেন। বাদশাহ এই উভয়বারে লিখিত হাদীসসমূহের তুলনামূলক পরীক্ষা করিয়া দেখিতে পান যেঃ

******************************************************

এই দ্বিতীয়বারে সেই হাদীসসমূহের একটি অক্ষরও বাদ পড়িয়া যায় নাই।[তাযকিরাতুল হুফফাজ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০১।]

ইহা যেম ইমাম জুহরীর অপরিসীম স্মৃতিশক্তির বাস্তব প্রমাণ, তাহাতে সন্দেহ নাই।

ইবনে শিহাব জুহরী বলিতেনঃ

******************************************************

আমি যখনি ‘বকী’ বাজারের নিকট যাতায়াত করিতাম, তখন আমার কর্ণদ্বয় এই ভয়ে বন্ধ করিয়া লইতাম যে, উহাতে কোন প্রকার অশ্লীল কথা যেন প্রবেশ করিতে না পারে। কেননা, আল্লাহর শপথ, আমার কর্ণে কোন কথা প্রবেশ করিলে আমি তাহা কখনো ভুলিয়া যাই না।[******************]

তিনি আরো বলেনঃ

******************************************************

আমি আমার খাতা বইতে হাদীস বা অন্য যাহা কিছু লিখিয়াছি, তাহই মুখস্থ করিয়াছি।[**************]

প্রসিদ্ধ তাবেয়ী ও বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী ইমাম শা’বী স্বীয় স্মরণশক্তি প্রখরতার পরিচয় ও বিবরণ দান প্রসঙ্গে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি কখনো কোন খাতা হইতে কোন হাদীস লিখি নাই এবং কখনো কাহারো নিকট হইতে কোন হাদীস একাধিকবার শ্রবণ করার প্রয়োজন বোধ করি নাই।[***************]

ইমাম অকী’ও অনুরূপ একজন আসামন্য স্মরণশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল তাঁহার সম্পর্কে বলেনঃ

******************************************************

তাঁহার মত হাদীস হিফযকারী লোক আমি আর দেখি নাই।[তারীখে খতবী, ১৩ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭৪।]

অপর এক মুহাদ্দিস তাঁহার সম্পর্কে বলেনঃ

******************************************************

‘অকী’র স্মরণশক্তি ছিল প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য।[তারীখে খতবী, ১৩ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭৪।]

প্রসিদ্ধ তাবেয়ী মুহাদ্দিস কাতাদাহর স্মরণশক্তিও ছিল অতুলনীয়। তাঁহার এই ঐতিহাসিক স্মরণ শক্তির প্রমাণ পাওয়া যায় ইতিহাসকার হাফিজ যাহবীর নিম্নোক্ত বর্ণনা হইতে। তিনি বলেনঃ

******************************************************

কাতাদাহ ছিলেন বসরাবাসীদের মধ্যে সর্বাধিক স্মরণশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি যে কথাই শুনিতেন, তাহাই স্রমণ করিয়ালইতেন। হযরত জাবিরের সংকলিত হাদীস গ্রন্হ তাঁহার সম্মুখে একবার পাঠ করা হইলে তিনি তাহা মুখস্থ করিয়া ফেলেন।[তাযকিরাতুল হুফফাজ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬।]

ইয়াহইয়া ইবনে কাতান বলেনঃ আমি সুফিয়ান সওরী অপেক্ষা অধিক স্মরণশক্তিসন্পন্ন লোক দেখি নাই। তাঁহার ত্রিশ হাজার হাদীস মুখস্থ ছিল। তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ

‘আমি যাহা কিছু একবার মুখস্থ করিয়াছে তাহা কখনই ভুলিয়া যাই নাই’।[তাযকিয়াতুল হুফফাজ, ১ম খণ্ড, ২৬ পৃষ্ঠা।]

সুফিয়ান ইবন উয়াইনার সাত সহস্র হাদীস কন্ঠস্থ ছিল এবং এজন্য তিনি কোন কিতাব রাখিতেন না।

ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল বলেনঃ রাজধানী বাগদাদে মুহাদ্দিস আবূ জুরয়া অপেক্ষা অধিক স্মরণশক্তিসম্পন্ন লোক দেখা যায় নাই। কেবলমাত্র কুরআন সম্পর্কেই দশ হাজার হাদীস তাঁহার মুখস্থ ছিল। বস্তুত স্মরণশক্তির দিক দিয়া তিনি ছিলেন অতুলনীয়।

কাযী আবূ বকর ইসফাহানী মাত্র পাঁচ বৎসর বয়সেই সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করেন।

ইমাম বুখারীর উস্তাদ মুহাদ্দিস ইসহাক ইবন রাহওয়া-এর স্মরণশক্তি অতিশয় তীক্ষ্ণ ছিল। অসংখ্য হাদীস তাঁহার কণ্ঠস্থ ছিল। তাঁহার শিক্ষার্থীদিগকে তিনি মুখস্থ কয়েক সহস্র হাদীস লিখিয়াই দিয়াছিলেন, ইহাতে তিনি একবারও কিতাব দেখার প্রয়োজন বোধ করেন নাই। তিনি নিজেই বলিতেনঃ ‘সত্তর সহস্র হাদীস আমার চোখের সম্মুখে সব সময় ভাসমান থাকে’।

মুহাদ্দিস আবু জুরয়া তাঁহার সম্পকের্ক বলিতেনঃ

তাঁহার (ইবন রাহওয়ার) মত স্মরণশক্তিসম্পন্ন লোক একজন দেখি নাই।[****************]

তদানীন্তন শাসনকর্তা আমীর আবদুল্লাহ তাঁহার স্মরণশক্তির বিস্ময়কর পরিচয় পাইয়া বলিয়াছিলেনঃ

******************************************************

আপনি অনেক বিষয় মুখস্থ করিয়া রাখিতে পারেন তাহা জানি, কিন্তু আপনার এই স্মরণশক্তির পরিচয় পাইয়া আমি আশ্চর্যান্বিত হইতেছি।[কিতাবুল-কুনী, ইমাম বুখারী কৃত, পৃষ্ঠা ৩৩]

পরবর্তী যুগের হাদীসবিদ ইমাম বুখারীর স্মরণশক্তিও কোন অংশে কম উল্লেখযোগ্য নয়। নওয়াব সিদ্দীক হাসান আবূ বকর ইবন আবূ ইতাব হইতে উল্লেখ করিয়াছেনঃ

******************************************************

ইমাম বুখারী বাল্যাবস্থায়ই সত্তর হাজার হাদীস সম্পূর্ণ মুখস্থ করিয়া লইয়াছিলেন।[************]

তাঁহার সম্পর্কে আরো উল্লেখ করিয়াছেনঃ

******************************************************

বর্ণিত আছে, তিনি একবার মাত্র কিতাব দেখিয়া তাহা সবই মুখস্থ করিয়া লইতেন।[*************]

মুহাম্মদ ইবন আবূ হাতেম বলিয়াছেনঃ দুইজন লোক আমার নিকট বলিয়াছেন যে, আমরা একত্রে হাদীস শ্রবণ করিতাম, ইমাম বুখারী তখন আমাদের মধ্যে বালক বয়সের ছিলেন। আমরা যাহা শুনিতাম তাহা সঙ্গে সঙ্গে লিখিয়া লইতাম; কিন্তু ইমাম বুখারী কিছুই লিখিতেন না। একদিন তাঁহাকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেনঃ তোমরা আমার প্রতি বড় অবিচার করিলে। আচ্ছা, তোমরা কি লিখিয়াছ তাহাই আমাকে শোনাও। অতঃপর আমাদের লিখিত পনেরো হাজারেরও অধিক হাদীস তাঁহাকে দেখাইলাম।

******************************************************

অতপর তিনি তাঁহার স্মরণশক্তিতে রক্ষিত এই সব হাদীসই মুখস্থ পড়িয়া শোনাইলেন। এমনকি তাঁহার মুখস্থ পাঠ শুনিয়া আমাদের লিখিত কিতাবগুলিকে সংশোধন করিয়া লইলাম।[*****************]

ইমাম বুখারী সম্পর্কে আর একটি ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখযোগ্য। তিনি বাগদাদ আগমন করিলে মুহাদ্দিসগণ তাঁহার নিকট উপস্থিত হইলেন ও আলাদা আলাদাভাবে মোট একশতটি হাদীস তাঁহার সম্মুখে এমনভাবে পেশ করিলেন যে, উহার প্রত্যেকটির সনদ উল্টাপাল্টা করিয়া দেওয়া হইয়াছে, একটির সনদ অপরটির সহিত জুড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। এইসব হাদীস সম্পর্কে ইমাম বুখারীর মতামত জানিতে চাহিলে তিনি এই হাদীসসমূহ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করিলেন। অতঃপর প্রত্যেকটি হাদীসকে সঠিকভাবে উল্লেখ করিয়া দেখাইয়াছেন যে, তাঁহারা উহাকে যেভাবে উল্লেখ করিয়াছিলেন, তাহাতে এই ভূল ছিল এবং কোন হাদীসের সনদ কোনটি-কোনটি নয়, তাহাও তিনি অকাট্যভাবে প্রকাশ করিয়া দিলেন। তাঁহার এই অপরিসীম স্মরণশক্তি দর্শনে সকলেই গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেন।

******************************************************

তাঁহার এই অপরিসীম স্মরণশক্তির কথা তাঁহারা স্বীকার করিলেন এবং এই ব্যাপারে তাঁহার বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব সকলেই বিশ্বাস করিলেন।[*************]

এই সব ঘটনা হইতে এই কথা প্রমাণিত হয় যে, এই যুগের মুসলিম মনীষীদের স্মরণশক্তি স্বাভাবত অত্যন্ত তীক্ষ্ন ও প্রখর ছিল। সাহাবাদের যুগ হইতে তাবে-তাবেয়ীন ও মুহাদ্দিসীনের যুগ পর্যন্ত ইহার কোন ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয় না। সেকালের আরবদের মধ্যেও যেমন এই বিস্ময়কর স্মরণশক্তি বর্তমান ছিল, অনারব মুসলিমদের মধ্যেও তাহার প্রকাশ দেখা গিয়াছে। বস্তুত মুসলিম উম্মতের প্রতি ইহা ছিল আল্লাত তা’আলার এক অপরিসীম ও মহামূল্য অনুগ্রহ। এই অনুগ্রহ ছিল বলিয়াই কুরআন এবং হাদীস ইসলামের এই ভিত্তিদ্বয় যথাযথভাবে সংরক্ষিত হইতে ও সুরক্ষিত থাকিতে পারিয়াছে।

এই যুগের এই বৈশিষ্ট্যের একটি জীবতাত্ত্বিক তাৎপর্যও রহিয়াছে। আল্লাহ তা’আলা মানবদেহে যতগুলি শক্তি ও সামর্থ্য দান করিয়াছেন, তন্মধ্যে কোন একটির ব্যবহার না হইলে কিংবা কোন একটি অঙ্গ অকেজো হইয়া পড়িলে অপরচির শক্তি বৃদ্ধি পায়। যাহার একটিমাত্র হাত, তাহার সে হাতে দুই হাতের শক্তি সঞ্চিত হয়। অন্ধ ও দৃষ্টিহীন ব্যক্তির আন্দাজ অনুমান ও অনুভূতির শক্তি অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পায়। ইসলামের প্রথম যুগের মুসলামানদের ব্যাপারে ইহার সত্যতা অস্বীকার করা যায় না। একালে সাধারণভাবে লেখাপড়ার বেশী প্রচলন ছিল না। মানুষ লেখনীশক্তির প্রয়োগ অপেক্ষা স্মরণশক্তির ব্যবহার বেশী করিত। ফলে এ্ই যুগে স্মরণশক্তির প্রয়োগ অপেক্ষা স্মরণশক্তির ব্যবহার বেশি করিত। ফলে এই যুগে স্মরণশক্তির বিস্ময়কর বিকাল পরিলক্ষিত হয়।কুরআন ও হাদীস সংরক্ষণের ব্যাপারে প্রাথমিক উপায় হিসাবে ইহা খুবই গুরত্বপূর্ণ স্থান দখল করিয়াছে।

 

হাদীস সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্য রাসূলের নির্দেশ

হযরত রাসূলে করীম (স)-এর জীবনব্যাপী কথা ও কাজের মাধ্যমেই ইসলামী জীবন ব্যবস্থার রূপায়িত হইয়া উঠিয়াছে। এই কারণে তাঁহার যাবতীয় কথা ও কাজ মুসলিম সমাজের নিকট মহামূল্য সম্পদ। সাহাবায়ে কিরাম রাসূলে করীম (স)-এর প্রত্যেকটি কথা মনোনিবেশ সহকারে শ্রবণ করিতেন এবং তাঁহার প্রত্যেকটি কাজ ও গতিবিধি সূক্ষ্ণ ও সন্ধানী দৃষ্টিতে লক্ষ্য করিতেন। ফলে রাসূলে করীমের কথা ও কাজ সাহাবাদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সঞ্চিত ও সঞ্জীবিত হয়।

কিন্তু এই ব্যাপারে কেবল স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক সংরক্ষণের উপরই সম্পূণূ নির্ভর করা হয় নাই। নবী করীম (স) নিজেও এই জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন।

নবী করীম (স) সাহাবায়ে কিরামকে ইসলাম সম্পর্কিত যাবতীয় কথা, আদেশ-নিষেধ ও উপদেশাবলী মনোনিবেশ সহকারে শ্রবণ করিতে যেমন বলিয়াছেন, উহাকে স্মরণ রাখিতে ও অন্য লোকদের পর্যন্ত উহাকে যথাযথভাবে পৌঁছাইয়া দিতেও তেমনি আদেশ করিয়াছেন। তিনি সাহাবাদের সম্বোধন করিয়া বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে চিরসবুজ চিরতাজা করিয়া রাখিবেন, যে আমার নিকট হইতে কোন কিছু শুনিতে পাইল ও তাহা অন্য লোকের নিকট যথাযথভাবে পৌঁছাইয়া দিল। কেননা পরে যাহার নিকট উহা পৌঁছিয়াছে সে প্রয়াশই প্রথম শ্রোতার তুলনায় উহাকে অধিক হিফাযত করিয়া রাখিতে সক্ষম হইয়াছে।[তিরমিযী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯০ (১৯৪০ সনের দিল্লী সংস্করণ) ইবন মাজা, ***************** দারেমী, আবুদ্দারদা হইতে বর্ণিত মুস্তাদরাক, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৭।]

হযরত আবুদল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) এ হাদীসটি অন্যভাবে বর্ণনা করিয়াছেন। তাঁহার বর্ণিত হাদীসটির ভাষা এইরূপঃ

******************************************************

আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে আলোকোদ্ভাসিত করিয়া দিবেন, যে আমার কথা শুনিয়া তাহা স্মরণ করিয়া লইল, উহাকে পূর্ণ হিফাযত করিল এবং অপরের নিকট উহা পৌঁছাইয়া দিল। অনেক জ্ঞান বহনকারী লোকই এমন ব্যক্তির নিকট উহা পৌঁছাইয়া দেয়, যে তাহার অপেক্ষা অধিক জ্ঞানী ও বিজ্ঞ।[শাফেয়ী ও বায়হাকী।]

এই সঙ্গে হযরত যায়দ ইবনে সাবিত (রা) বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীসটির ভাষাও লক্ষণীয়। তিনি বলেনঃ নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আল্লাহ তাহার জীবন উজ্জ্বল করিবেন, যে আমার কথা শুনিয়া উহাকে মুখস্থ করিল ও উহাকে সঠিকরূপে স্মরণ রাখিল এবং উহা এমন ব্যক্তির নিকট পৌঁছাইল যে তাহা শুনিতে পায় নাই।……………। [******************* তিরমিযী।]

আবদুল কায়স গোত্রের এক প্রতিনিধি দল রাসূল করীম (স)-এর নিকট উপস্থিত হইলে তিনি তাহাদিগকে ইসলামের মূল বিষয়াদি সম্পর্কে বিস্তারিত শিক্ষাদান করেন এবং তাহাদিগকে বলেনঃ

******************************************************

এই কথাগুলি তোমরা পুরাপুরি স্মরণ করিয়া রাখ, উহাকে পূর্ণরূপে সংরক্ষণ কর এবং তোমাদের পশ্চাতে যাহারা রহিয়াছে তাহাদিগকে এই বিষয়ে অবহিত কর।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, কিতাবুল ইলম, ১৯ পৃষ্ঠা।]

সাহাবায়ে কিরামের ভবিষ্যতের দায়িত্ব ও সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে রাসূলে করীম (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আজ তোমরা (আমার নিকট দ্বীনের কথা) শুনিতেছ, তোমাদের নিকট হইতেও তাহা শোনা হইবে (অন্য লোকেরা শুনিবে), আর তোমাদের নিকট হইতে যাহারা শুনিবে তাহাদের নিকট হইতেও (এই কথা) শোনা হইবে।[মুস্তাদরাক হাকেম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৫, হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণিত।]

অপর একটি হাদীসে নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

 ‘মুসলিম উম্মতের দ্বীন’ সম্পর্কে চল্লিশটি হাদীস যে ব্যক্তি মুখস্থ করিবে, সংরক্ষণ করিবে, আল্লাহ তা’আলা তাহাকে একজন ফিকাহবিদ বানাইয়া দিবেন এবং আমি কিয়ামতেন দিন তাহার জন্য শাফাআতাকরী ও সাক্ষী হইব।[মিশকাতুল মাসাবীহ, পৃষ্ঠা ৩৬, হযরত আবুদ্দারদা বর্ণিত।]

নবী করীম (স)-এর হাদীস সংরক্ষণ সম্পর্কিত এই নির্দেশাবলী ও উপদেশ বাণীর ফলে তদানীন্তন মুসলিম সমাজের প্রায় এক লক্ষ ব্যক্তিই রাসূলের মুখের বাণী ও কাজের বিবরণ সংরক্ষণ করিয়াছেন, মুখস্থ রাখিয়াছেন ও স্মৃতিপটে এমনভাবে জাগরূপ করিয়া রাখিয়াছেন যে, সাধারণত তাঁহারা কখন তাহা ভুলিয়া যান নাই। এই ব্যাপারে তাঁহাদের স্বভাবজাত স্মরণশক্তি তাঁহাদের যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছেন। তদুপরি রাসূলের এই আদেশাবলী উহাকে অধিকতর জোরদার করিয়া তুলিয়াছে। রাসূল (স) যখনই একটি কথা বলিতেন, উপস্থিত সাহাবিগণ তাহা কণ্ঠস্থ করিতে শুরু করিতেন, যেন ভুলিয়া না যান। হযরত সামুরা ইবেন জুবদুব (রা) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

রাসূলের যামানায় আমি বালক ছিলাম এবং তখনই আমি রাসূলের কথা মুখস্থ করিতাম।[মুসলিম শরীফ, ১ম খণ্ড, মুকাদ্দমা, পৃষ্ঠা ১০ নববীসহ।]

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমরা রাসূলের হাদীস মুখস্থ করিতাম, রাসূলের নিকট হইতে এইভাবে হাদীস মুখস্থ করা হইত।[মুসলিম শরীফ, প্রথম খণ্ড, মুকাদ্দমা, পৃষ্ঠা ১০ নববীসহ।]

মক্কা বিজয়ের পরের দিন নবী করীম (স) মুজাহিদীনের সামনে যে ভাষণ প্রদান করেন, তাহার শেষভাগে তিনি বলেনঃ

******************************************************

উপস্থিত লোকেরা যেন অনুপস্থিত লোকদের নিকট এই কথাগুলি পৌঁছাইয়া দেয়। বিদায় হজ্জ্বের ঐতিহাসিক ভাষণের শেষভাগে রাসূলে করীম (স) উদাত্ত কণ্ঠে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

 এখানে উপস্থিত লোকেরা যেন অনুপস্থিত লোকদের পর্যন্ত আমার এই কথাগুলি পৌঁছাইয়া দেয়। কেননা যাহাদের নিকট ইহা পৌঁছানো হইবে, তাহাদের অনেকেই আজিকার শ্রোতাদের অপেক্ষা অধিক হাদীস হিফাযতকারী হইতে পার।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১।]

বুখারী শরীফে কথাটি এই ভাষায় উদ্ধৃত হইয়াছেঃ

******************************************************

উপস্থিত লোকেরা অনুপস্থিত লোকদের পর্যন্ত এ কথাগুলি পৌঁছাইয়া দেয়। কেননা উপস্থিত লোক হয়ত ইহা এমন এক ব্যক্তি পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিবে, যে উহা তাহার অপেক্ষা বেশী হিফাজাত করিয়া রাখিতে সক্ষম হইবে।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬।]

ইবন আউনের সূত্রে বর্ণিত হাদীসটির শেষাংশ নিম্নরূপঃ

******************************************************

এমন হইতে পারে যে,আমার কথা স্মরণ করিয়া রাখার ব্যাপারে অনুপস্থিত ব্যক্তি উপস্থিত ব্যক্তি উপস্থিত ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক সক্ষম হইবে।[**************]

নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমার নিকট হইতে একটি আয়াত হইলেও তাহা অবশ্য বর্ণনা কর।[বুখারী শরীফ, মিশকাত, কিতাবুল ইলম……।]

মাযহারী ও মুল্লা আলী আল-কারী ইহার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করিয়া বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমার হাদীসসমূহ খুব অল্প পরিমাণ হইলেও প্রচার কর।[***********************]

নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

 আমার পরে লোকেরা তোমাদের নিকট হাদীস শুনিতে চাহিবে। যখন তাহারা তোমাদের নিকট এই উদ্দেশ্যে আসিবে, তখন তোমরা যেন তাহাদের প্রতি অনুগ্রহশীল হও এবং তাহাদের নিকট আমার হাদীস বর্ণনা কর।[মুসনাদে আহমাদ, মালিক ইবনে আনাস বর্ণিত। *****************]

তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

তোমরা ইলম শিক্ষা কর ও উহা লোকদিগকে শিক্ষা দাও। তোমরা ফারায়েয বা মিরাসী আইন শিক্ষা কর ও অন্যান্য লোকদিগকেও তাহা শিক্ষা দাও। তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং উহা লোকদিগকে শিক্ষা দাও। কেননা আমাকে একদিন চলিয়া যাইতে হইবে।[দারেমী শরীফ, পৃষ্ঠা ৪০]

একবার নবী করীম (স) দোয়া করিয়া বলিতেছিলেনঃ

******************************************************

হে আল্লাহ আমার খলীফাগণকে রহমত কর।

সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করিলেন।

******************************************************

হে রাসূল, আপনার খলীফা কাহারা?

উত্তরে নবী করীম (স) বলিলেনঃ

******************************************************

যাহারা আমার হাদীসসমূহ বর্ণনা করে ও তাহা লোকদিগকে শিক্ষা দেয় )তাহারাই আমার খলীফা)।[মুকাদ্দামায়ে দারেমী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫।]

নবী করীম (স) আরে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

দ্বীন সম্পর্কিত কোন বিষয়ে কাহাকেও যদি কিছু জিজ্ঞাসা করা হয় এবং সে তাহা গোপন রাখে-প্রকাশ না করে, তবে কিয়ামতের দিন তাহাকে জাহান্নমের আগুনের লাগাম পরাইয়া দেওয়া হইবে।[মুসনাদে আহমদ, আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবন মাজা-************]

এইসব নীতিগত কথা ছাড়াও নবী করীম (স) তাঁহার বিশেষ বিশেষ কাজ সম্পর্কে অপরাপর লোকগিদকে ওয়াকিফহাল করিবার জন্য উপস্থিত সাহাবিগণকে জোরালোভাবে তাগিদ করিতেন।

নিম্নোক্ত হাদীস হইতে এই কথার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। ইয়াসার বলেনঃ একদিন হযরত আবদুল্লহ ইবনে উমর (রা) আমাকে ফজর ‘উদয়’ হইয়া যাওয়ার পর নামায পড়িতে দেখিতে পান। তখন ইবনে উমর আমাকে বলিলেনঃ

******************************************************

আমরা এইভাবে একদিন নামায পড়িতেছিলাম। এমন সময় নবী করীম (স) আমাদের নিকট আসিলেন। তখন বলিলেনঃ তোমাদের যাহারা এইখানে উপস্থিত আছ তাহারা যেন অনুপস্থিত লোকদের নিকট আমার এই কথা পৌঁছাইয়া দেয় যে, ফজর হওয়ার পর দুই সিজদা ব্যতীত অন্য কোন নামায পড়া জায়েয নয়।[মুসনাদে আহমদ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৪।]

মালিক ইবনুল হুয়ায়রিস (রা) বলেনঃ আমরা কিছু সংখ্যক যুবক ও সমবয়স্ক লোক রাসূলে করীম (স)-এর দরবারে বিশ দিন ও রাত্র অবস্থান করার পর বাড়ি প্রত্যাবর্তন করার ইচ্ছা প্রকাল করিলাম। তখন তিনি বলিলেনঃ

******************************************************

তোমরা তোমদের ঘরের লোকদের নিকট ফিরিয়া যাও, তাহাদের সহিতই বসবাস করিত থাক, তাহাদিগকে (দ্বীন ইসলাম) শিক্ষা দাও এবং তাহা যথাযথ পালন করার জন্য আদেশ কর। [এই সময় রাসূল (স) কতকগুলি কাজের উল্লেখ করেন, যাহা আমি স্মরণ করিয়া লইলাম] এবংআমাকে তোমরা যেইভবে নামায পড়িতে দেখিয়াছ, ঠিক সেইভাবেই নামায পড়িও।[বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৭৬]

এই হাদীস হইতে জানা যায় যে, দূর-দূরান্তর হইতে নও-মুসলিমগণ রাসূল (স)- এর দরবারে ইসলাম সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে আগমন করিতেন। রাসূল (স) তাঁহাদিগকে ইসলামী আদর্শ ও শরীয়াত শিক্ষা দিতেন। তাহারা যাহা কিছু শুনিতে ও জানিতে পাইত তাহা স্মরণ রাখার জন্য এবং ফিরিয়া গিয়া নিজ নিজ এলাকার লোকদিগকে তাহা শিক্ষাদান ও প্রচার করার জন্য বিশেষভাবে তাগিদ করিতেন।

এভাবে রাসূল (স)- এর স্পষ্ট ও নীতিগত আদেশ-নির্দেশের ফলে দূর দূর অঞ্চলে অবস্থিত মুসলিমদের নিকট রাসূল (স)-এর হাদীস তীব্র গতিতে পৌঁছিয়া যায় এবং তৎকালীন প্রায় সকল মুসলমানই নির্ভরযোগ্য সূত্রে রাসূল (স)-এর হাদীস জানিতে পারে। হাদীস সংরক্ষণ ও প্রচার লাভের ইহাই ছিল প্রাথমিক ও স্বাভাবিক পন্হা।

 

পারস্পরিক হাদীস পর্যালোচনা ও শিক্ষাদান

সাহাবায়ে কিরাম নবী করীম (স)-এর নিকট হইতে হাদীস শ্রবণ করিয়া অবসর সময় সুযোগ ও প্রয়োজনমত একত্র হইয়া বসিতেন এবং পারস্পরিক চর্চা ও আলোচনায় লিপ্ত হইতেন। কোন কোন সময় হাদীস আলোচনার জন্য সাহাবাগণ নিজেদের মধ্যে বিশেষ বৈঠকের ব্যবস্থা করিতেন। এই ধরনের বৈঠক সাধারণত মসজিদে নববীতে অনুষ্ঠিত হইলেও কখনো কখনো সাহাবীদের বাড়িতেও অনুরূপ বৈঠক বসিত। েই বৈঠকসমূহে রাসূলে করীমের কথা, কাজ ও উপদেশাবলী সম্পর্কে প্রকাশ্য আলোচনা হইত। প্রধান প্রধান সাহাবিগণই এইসব বৈঠকে যোগদান করিতেন। পূর্বৈ কাহারো কোন বিষয়ে অজ্ঞতা থাকিলে এইসব বৈঠকের আলোচনা হইতে নির্ভরযোগ্যভাবে ও বিশ্বস্তসূত্রে তাঁহারা সেই বিষয়ে পূর্ণ ওয়াকিফহাল হইতে পারিতেন। কাহারো কোন বিষয়ে সন্দেহ থাকিলে তাহাও এই আলোচনার ফলে তিরোহিত হইয়া যাইত। এই ধরণের আলোচনা সভা-অনুষ্ঠান সম্পর্কে এখানে আমারা কয়েকটি প্রামাণ্য বিবরণ পেশ করিতেছিঃ

১.   হযরত আনাম (রা) বলেনঃ

আমরা রাসূল (স)- এর নিকট হাদীস শ্রবণ করিতাম. তিনি যখন মজলিস হইতে উঠিয়াচলিয়া যাইতেন, তখন আমরা বসিয়া শ্রুত হাদীসসমূহ পরস্পর পুনরাবৃত্তি করিতাম, চর্চা করিতাম, পর্যালোচনা করিতাম। আমাদের এক একজন করিয়াসবকয়টি হাদীস মুখস্থ শোনাইয়া দিত। এই ধরনের প্রায় বৈঠক হইতে আমরা যখন উঠিয়া যাইতাম, তখন আমাদের প্রত্যেকের সবকিছু মুখস্থ হইয়া যাইত।[**********]

২.    আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) বলেনঃ

একদিন নবী করীম (স) তাঁহার কোন এক হুজরা হইতে বাহির হইয়া আসিলেন এবং মসজিদে দুইটি জনসমাবেশ দেখিতে পাইলেন। একটিতে সমবেত লোকেরা কুরআন পাঠ করিতেছিল ও আল্লাহর নিকট দোয়া প্রার্থনা করিতে মগ্ন ছিল। আর অপরটির লোকেরা (হাদীস) শিক্ষা করিতেছিল ও শিক্ষা দান করিতেছিল। নবী করীম (স) বলিলেনঃ এই উভয় সমাবেশের লোকই কল্যাণের  কাজ করিতেছে। ইহারা (একদল লোক) কুরআন পাঠ করিতেছে ও আল্লাহকে ডাকিতেছেঃ আল্লাহ চাহিলে তিনি তাহাদিগকে প্রার্থিত জিনিস দান করিবেন, আর না চাহিলে দিবেন না। আর অপর দলের লোক জ্ঞান ও হাদীস শিক্ষা করিতেছে ও শিক্ষা দিতেছে। ********************* এবং আমি শিক্ষক হিসাবেই প্রেরিত হইয়াছি। আবদুল্লাহ ইবন আমর বলেনঃ ‘অতঃপর তিনি তাহাদের সহিতই বসিয়া গেলেন।[**********************]

ইলম চর্চায় নিযুক্ত লোকগণ যে রাসূলের হাদীস, কাজ-কর্ম ও উহার পরিপ্রেক্ষিতে দ্বীন-ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করিতে ও উপস্থিত লোকদিগকে তাহা শিক্ষা দিতেছিলেন, তাহাতে সন্দেহ নাই। নবী করীম (স)-এর জীবদ্দশায়ই এই ধরনের বৈঠক বসিত ও রাসূল (স) নিজে তাহাতে যোগদান করিতেন, লোকদিগকে ইলম হাদীস শিক্ষার জন্য বিশেষ উৎসাহ দান করিতেন, তাহা উপরিউক্ত দীর্ঘ বর্ণনা হইতে অকাট্যরূপে প্রমাণিত হইতেছে।

৩.   হযরত মু’আবিয়া বর্ণিত নিম্নোক্ত ঘটনা হইতে উপরের কথার আরো প্রমাণ মেলে। তিনি বলিয়াছেন৬

******************************************************

আমি একদিন নবী করীম (স)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি মসজিদে প্রবেশ করিয়া একদল লোককে উপবিষ্ট দেখিতে পাইলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেনঃ তোমরা কিসের জন্য বসিয়া আছ? তাহারা বলিলঃ আমরা ফরয নামায পড়িয়াছি, তাহার পর বসিয়া আল্লাহর কিতাব ও তাঁহার নবীর সুন্নাত সম্পর্কে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা করিতেছি।[মুস্তাদরাক-হাকেম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৪।]

হাদীস মুখস্থ করার পর উহা যাহাতে ভুলিয়া না যান, সাহাবায়ে কিরাম সেইদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখিতেন। এইজন্য অনেক সাহাবী নিজস্বভাবেই হাদীস চর্চা ও আবৃত্তি করিতে থাকিতেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর নিম্নোক্ত উক্তি হইতে তাহা প্রমাণিত হয়। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি রাত্রক তিন ভাগে ভাগ করিয়া লই। এক ভাগ রাত্র আামি ঘুমাই, এক ভাগ ইবাদতের মধ্যে অতিবাহিত করি, এক ভাগে আমি রাসূলের হাদীস স্মরণ ও মুখস্থ করিতে থাকি।[মুসনাদে দারেমী, *****************]

এই প্রসঙ্গে ‘আসহাবে সুফফা’র কথা উল্লেখ করা যাইতে পারে। বিশেষত হাদীসের প্রথম উৎপত্তিক্ষেত ও ধারক হিসাবে হাদীসের ইতিহাসে আসহাবে সুফফার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

সাধারণভাবে সকল সাহাবীই রাসূলের সাহচর্যে অধিক সময় অতিবাহিত করিতে চেষ্টা করিতেন। কিন্তু ‘সুফফার অধিবাসিগণ দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টাই রাসূলের দরবারে পড়িয়া থাকিতেন। মসজিদে নববীর সম্মুখস্থ চত্তরই ছিল তাঁহাদের আবাসস্থল। ইহাদের কোন ঘর-সংসার ছিল না, আয়-উপার্জনের তেমন কোন প্রয়োজনও ছিল না। তাই অন্যান্য সাহাবাদের তুলনায় তাঁহারা যে রাসূলের সাহচর্যে সর্বাধিক সময় ব্যয় করিতে পারিতেন, তাহাতে সন্দেহ থাকিতে পারে না।

ফলে মসজিদে নববী কার্যত একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হইয়াছিল। স্বয়ং নবী করীম (স) ছিলেন ইহার প্রধান অধ্যক্ষ আর প্রায় সকল সাহাবীই ছিলেন এখানকার শিক্ষার্থী। রাসূলের নির্দেশক্রমে বড় বড় সাহাবিগণ বিশেষ বিশেষ বিষয়ে শিক্ষাদানের কাজও করিতেন।

সুফফার বসবাসকারী সাহাবীদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে সে সংখ্যা যে কিছুমাত্র নগণ্য ছিল না, তাহাতে সন্দেহ নাই। ইবন আবদুল বার কর্তৃক এক কবীলা সম্পর্কে প্রদত্ত বর্ণনা হইতে এই প্রতিষ্ঠানের ব্যাপকতা সমন্ধে ধারণা করা যায়। তিনি লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তামীম প্রতিনিধি দলে সত্তর কি আশি জন লোক ছিল। তাহারা ইসলাম কবুল করিয়া দীর্ঘদিন পর্যন্ত মদীনায় অবস্থান করেন। এই সময়ে তাহারা কুরআন ও দ্বীন-ইসলাম শিক্ষা করিতেছিল।[**************]

মোটকথা আসহাবে সুফফার সাহাবিগণ দিন ও রাত্র রাসূলের সন্নিকটে থাকিয়াতাঁহার মুখ-নিঃসৃত বাণীসমূহ, তাঁহার কার্যাবলী, কর্মতৎপরতা, গতিবিধি ও চিন্তা-প্রবণতা এবং তাঁহার নিকট অনুমোদনপ্রাপ্ত কথা ও কাজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ও বিশেষ সতর্কতা সহকারে শ্রবণ, পর্যবেক্ষণ ও অনুধাবণ করিতেন। কোন একটি কথা- একটি সামান্য বিষয়ও – যাহাতে তাঁহাদের অজ্ঞতা থাকিয়া না যায়, সেজন্য সর্ব প্রযত্নে চেষ্টা করিতেন।[****************]

বস্তুত রাসূলের করীম (স)-এর দরবারে নিরবিচ্ছিন্নভাবে উপস্থিত থাকিতে পারা ছিল সাহাবিগণের নিকট সর্বাধিক কার্ম। এই পর্যায়ে হযরত সলীত (রা)- এর ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। রাসূলে করীম (স) তাহাকে একখণ্ড জমি চাষাবাদের জন্য দিয়াছিলেন। তিনি উহার চাষাবাদের কাজে বাহিরে চলিয়া যাইতেন এবং আবার ফিরিয়া আসিতেন। তখন তিনি তখন তিনি অন্যান্য সাহাবীর নিকট শুনিতে পাইতেন যে, তাঁহার অনুপস্থিতিতে কুরআনের অমুক অমুক আয়াত নাযিল হইয়াছে এবং রাসূলে করীম (স) এই এই কথা বলিয়াছেন। তখন তাহার মনে বিশেষ দুঃখ ও বঞ্চনার জ্বালা অনুভূত হইত। তিনি রাসূলে করীম (স)-এর নিকট গিয়া বলিলেনঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি আমাকে যে ভুমিখণ্ড দান করিয়াছেন, উহা ফিরাইয়া নিন। কেননা উহার কারণেই আমাকে দরবারে উপস্থিত থাকার পরম সৌভাগ্য হইতে বঞ্চিত থাকিতে হয়। ইহা আমি চাই না, ইহার কোন প্রয়োজনই আমার নাই।

******************************************************

 কোন সাহাবী যদি বিশেষ কারণে কোন দিন দরবারে উপস্থি হইতে না পারিতেন, তাহা হইলে তিনি অপর যে লোক সেই দিন দরবারে উপস্থিত ছিলেন, তাহার নিকট হইতে সব কথা জানিয়া লইতেন। হযরত উমর (রা) তাঁহার আনসারী ভাই ও প্রতিবেশী হযরত উতবান মালিকের সহিত এই প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হইয়াছিলেন যে, তাঁহাদের কেহ কোন দিন রাসূল (স)- এর দরবারে উপস্থি হইতে না পারিলে অপরজন তাঁহাকে সেই দিনের যাবতীয় বিষয়ে অবহিত করিবেন। হযরত উমরের ভাষায়ঃ

******************************************************

আমি যখন রাসূল (স)- এর দরবারে যাইতাম, তখন সেই দিনের ওহী ও অন্যান্য বিষয়ক খবর তাহাকে পৌছাইয়া দিতাম আর তিনি যখন যাইতেন তখন তিনিও এইরূপ করিতেন।[**************]

হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) হাদীস শিক্ষা লাভের জন্য বিশেষ আগ্রহশীল ছিলেন। তিনি দরবারে নববী হইতে কোন দিন বা কোন সময় অনুপস্থিত থাকিলে সেই সময়ে রাসূলে করীম (স) যেসব কথা বলিয়াছেন, যেসব কাজ করিয়াছেন এবং যেসব কথা ও কাজের অনুমোদন দান করিয়াছেন তাহা জানিবার জন্য সেই সময়ে যেসব সাহাবী উপস্থিত ছিলেন তাঁহাদের নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়া লইতেন।[**************] কোন হাদীস বা অপর কোন বিষয়ে তাঁহার অজানা থাকিলে তিনি স্বয়ং নবী করীম (স)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া সকল অজ্ঞতা ও শোবাহ-সন্দেহ দূর করিয়া লইতেন।[***************]

একবার লায়স বংশীয় এক ব্যক্তি হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) সূত্রে বলিল, নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

 তোমরা স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ কেবল সমান পরিামণে ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় করিও না।[বুখারী শরীফ, প্রথম খণ্ড পৃষ্ঠা ২৯১।]

এই কথাটি হযরত ইবন উমরের অজানা ছিল। তিনি তখনই আবূ সাঈদ খুদরীর নিকট উপস্থি হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেনঃ

******************************************************

আপনি রাসূল (স)- এর নিকট হইতে এই কি হাদীস বর্ণনা করিতেছেন?

সাহাবায়ে কিরাম (রা) নিজেরাও কুরআন হাদীস শিক্ষাদানের জন্য নিজ নিজ এলাকায় অনুরূপ শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করিয়াছিলেন। নবী করীম (স)- এর জীবদ্দশায়ই মদীনা শহরে নয়টি মসজিদ তৈরী হইয়াছিল। তাহাতে যেমন পাঁচ ওয়াক্ত জামা’আতের সহিত নামায পড়া হইত তেমনি প্রত্যেকটিতে দ্বীন-ইসলাম শিক্ষাদনেরও ব্যবস্থা ছিল।[******************] আবদুল কায়স গোত্রের আগত প্রতিনিধি দল এই স্বীকৃতিসহ নিজেদের দেশে প্রত্যাবর্তন করিয়াছিলেনঃ

******************************************************

আনসারগণ আমাদিগকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত শিক্ষা দিতেছিলেন।[***********]

ফরহাম ইবন মালিক (রা) ইয়ামেন হইতে ইসলামের শিক্ষা লাভের জন্য মদীনায় আগমন করেন। তাঁহার সম্পর্কে ঐতিহাসিক ইবন সায়াদ লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তিনি ইয়ামেন হইতে আগমন করেন এবং কুরআন, ইসলামের ফরযসময়হ ও শরীয়াতের বিধান শিক্ষা করেন। [*********]

এই প্রসঙ্গে হযরত আবূ হুরায়ারা কর্তৃক উক্ত নিম্নোক্ত কথাটিও উল্লেখযোগ্য। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি যে নিয়মিনভাবে রাসূল (স)-এর দরবারে উপস্থিত থাকিতাম তাহা সাহাবাদের ভাল করিয়াই জানা ছিল। এই জন্য তাঁহারা রাসূলে করীম (স)- এর হাদীস সম্পর্কে আমার নিকট জিজ্ঞাসা করিতেন ও জানিয়া লইতেন। তাঁহাদের মধ্যে হযরত উমর, উসমান, আলী, তালহা ও যুবায়র প্রমুখ উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি।[***************]

মদীনার বিভিন্ন অঞ্চলে সাহাবাগণ কর্তৃক স্থাপিত দ্বীন-শিক্ষার কেন্দ্রসমূহ সাধারণত দিনের বেলায়ই শিক্ষাদান করা হইত। সেই কারণে অনেক শ্রমজীবী ও বিভিন্ন পেশা-পালনকারী লোক ইহাতে শরীক হইতে ও ইলম হাসিল করার সুযোগ পাইতেন না। এইজন্য তাঁহারা নৈশ বিদ্যালয় ধরনের শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করিতে বাধ্য হন। এইসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

রাত্রির অন্ধকার যখন তাঁহাদিগকে ঢাকিয়া ফেলিত, তখন তাঁহারা মদীনায় অবস্থিত তাঁহাদের শিক্ষকদের নিকট চলিয়া যাইতেন। এবং সেখানে তাঁহারা সকালবেলা পর্যন্ত পড়াশোনার কাজে মশগুল হইয়া থাকিতেন।[************]

বলা বাহুল্য, এইসব কেন্দ্রে কুরআনে সঙ্গে সঙ্গে হাদীসেরও শিক্ষাদান করা হইত। ঠিক এই কারণেই অনেক সাহাবী রাসূলের নিকট হইতে বর্ণনা না করিয়া অপর কোন সাহাবীর সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন। হযরত আনাম ইবন মালিক (রা)- এর নিম্নলিখিত উক্তি হইতে ইহার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমরা তোমাদের নিকট যেসব হাদীস বর্ণনা করি, তাহার সবই আমরা সরাসরি রাসূলের নিকট হইতে শুনি নাই। বরং আমাদের (সাহাবীদের ) লোকেরা পরস্পরের নিকট হাদীস বর্ণনা করিতেন।[মুস্তাদরাক হাকেম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৫।]

হযরত বরা ইবন আজিব (রা) তাঁহার বর্ণিত হাদীসসমূহের মর্যাদা সম্পর্কে বলিতে গিয়া যে কথাটি বলিয়াছেন, তাহা হইতেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

 সব হাদীসই আমরা রাসূলের নিকট হইতে শুনি নাই বরং আমাদের সঙ্গী-সাথিগণও আমাদিগকে রাসূলের হাদীস শোনাইতেন। কেননা উট পালনের কাজ ও ব্যস্ততা আমাদিগকে রাসূলের দরবারে উপস্থিত হইতে দিত না।[তাবকাতে ইবন সাদ ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৩; মুসতাদরাক, ১ম খণ্ড, পৃষ্টা ৯৫।]

‘মুস্তাদরাক’ গ্রন্হে এই কথাটির ভাষা নিম্নরূপঃ******************************************************

আমরা সব হাদীসই রাসূলের নিকট হইতে শুনি নাই, বরং আমাদরে সঙ্গিগণ আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করিতন। আর আমরা উট চড়াইবার কাজে ব্যস্ত থাকিতাম।[মুস্তাদরাক হাকেম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৬]

এই দীর্ঘ প্রমাণমূলক আলোচনা হইতে একথাই প্রমাণিত হয় যে, যেসব সাহাবী নবী করীম (স)- এর নিকট হইতে হাদীস শুনিতে পাইতেন, তাঁহারা অপরাপর সাহাবীদের নিকট তাহা পৌঁছাইতেন এবং যাঁহারা সরাসরি রাসূরে নিকট হইতে হাদীস শ্রবণের সুযোগ পাইনত না, তাঁহারা অপর যেসব সাহাবী তাহা শুনিয়াছেন, তাঁহাদের নিকট হইতে শুনিয়া লইতেন। এইভাবে রাসূলে করীম (স)-এর প্রতেকটি হাদীস তাঁহার জীবদ্দশায়ই প্রায় সমস্ত সাহাবী পর্যন্ত গিয়াছিল।

 

হাদীসেন বাস্তব অনুসরণ

সাহাবায়ে কিরাম (রা) নবী করীম (স)-এর নিকট হইতে প্রাপ্ত হাদীস কেবল মুখস্থ রাখিয়া ও বৈঠকসমূহে উহার মৌখিক প্রচার ও পর্যালোচনা করিয়াই ক্ষান্ত থাকিতেন না। সেই সঙ্গে তাঁহারা উহাকে বাস্তবে রূপায়িত করিতেও যথাসাধ্য চেষ্টা করিতেন। নবী করীম (স) যখন কোন আকীদা ও নিছক তত্ত্বমূলক কথা বলিয়াছেন,তখন সাহাবায়ে কিরাম তাহা মুখস্থ করিয়া লইয়াছেন, মনে-মগজে উহাকে দৃঢ়ভাবে আসীন করিয়া লইয়াছেন এবং সেই অনুযায়ী নিজ নিজ আকীদা ও বিশ্বাস গড়িয়া তুলিয়াছেন। আর যখন কোন আদেশ-নিষেধমূলক উক্তি করিয়াছেন, কোন কাজ করার আদেশ বা কোন কাজ করিতেন নিষেধ করিয়াছেন, কোন শাসনতান্ত্রিক ফরমান জারী করিয়াছেন, তখন সাহাবায়ি কিরাম (রা) সঙ্গে সঙ্গে উহাকে কাজে পরিণত করিয়াছেন। উহাকে যতক্ষণ নিজেদের নৈমত্তিক অভ্যাসে পরিণত করা না গিয়াছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁহারা উহার চর্চা  ও অভ্যাস করিতে চেষ্টার একবিন্দু ক্রিট করেন নাই। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমাদের কেহ যখন দশটি আয়াত শিক্ষালাভ করিত, তখন উহার অর্থ ভালরূপে হৃদয়ঙ্গম করা ও তদনুযায়ী আমল করার পূর্বে সে আর কিছু শিখিবার জন্য অগ্রসর হইত না।[*************]

ইহার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, সাহাবায়ে কিরাম নবী করীম (স)- এর নিকট হইতে যাহা কিছু শিক্ষালাভ করিতেন, তাহা তাঁহারা প্রথমে আমলে আনিবার জন্যই সর্বপ্রযত্নে চেষ্টা করিতেন। ফলে রাসূলের প্রত্যেকটি কথা, আদেশ ও ফরমান সাহাবায়ে কিরাম কর্তৃক অনতিবিলম্বে কার্যকর ও বাস্তবায়িত হইত।

নবী করীম (স)- এর নিম্নলিখিত ধরনের অসংখ্য আদেশবাণী হইতেও এই কথারই প্রমাল মেলে যে, ইসলামের মৌলিক আইন-কানুন সাহাবাদের বাস্তব জীবনে রূপায়িত করিয়া তোলার দিকে নবী করীম (স) নিজে বিশেষ লক্ষ্য রাখিতেন। মুসলিমগণ ব্যক্তিগত জীবনে তাঁহার নির্দেশ মানিয়া চলে কিনা সেদিকে তিনি কড়া নজর রাখিতেন। ইসলামরে ব্যবহারিক আচার-আচরণ ও অনুসরণের উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করা হইত। ইসলামী আকীদা ও আইন মুসলমানদের অভ্যাসে ও স্বভাবে পরিণত করার জন্য বিশেষ যত্ন লওয়া হইত। দৃষ্টান্তস্বরূপ রাসূলের অসংখ্য আদেশমূলক বাণীর মধ্য হইতে এখানে দুইটি বাণীর উল্লেখ করা যাইতেছে। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

তোমরা আমাকে যেভাবে নামায পড়িতে দেখ, ঠিক সেইভাবেই নামায পড়।[সহীহ বুখারী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৭৬।]

হজ্জ উদযাপন সম্পর্কে নবী করীম (স) বিদায় হজ্জের ভাষণে ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

তোমরা আমার নিকট হইতে হজ্জ উদযাপনের নিয়ম-কানুন গ্রহণ কর। [[(ক). ******************* মুসলিম শরীফে কথাটি এইভাবে উল্লিখিত হইয়াছেঃ

******************************************************

তোমরা যেন তোমাদের হ্জ্জ উদযাপনের নিয়মাবলী গ্রহণ কর-জানিয়া লও।

এই হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

******************************************************

রাসূলের উক্ত কথার ভাবার্থ এই যে, আমার হজ্জ উদযাপনে আমি যেসব কথা, কাজ ও আল্লাহ সম্পর্কিত বিষয়াদি প্রয়োগ করিয়াছি, তাহা্ হজ্জের অনুষ্ঠান ও পরিচয়। তোমাদের জন্যও সেই নিয়ম ও অনুষ্ঠানাদি নির্দিষ্ঠ। অতএব তোমরা উহা আমার নিকট হইতে গ্রহণ কর, কবুল কর। উহা জানিয়া মুখস্থ করিয়া উহা সংরক্ষণ কর, তদনুযায়ী আমল কর, উহা অন্যন্য লোককেও শিক্ষা দাও। ইমাম নববী বলেনঃ হজ্জের অনুষ্ঠানাদি ও নিয়ম প্রণালীর ব্যাপারে ইহা অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ও উৎস। ইহা ঠিক ‘আমাকে যেমন নামায পড়িতে দেখ, তোমরা্ও সেইরূপ পড়’- এই রকমই একটি হুকুম।]]

এই ফরমানদ্বয় হইতে প্রথম প্রমাণিত হয়  যে, কুরআন মজীদে নাময, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি ইবাদত-বন্দেগীর সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকিলেও এইসবের বিস্তারিত নিয়ম- কানুন তাহাতে উল্লেখ করা হয় নাই। অতএব তাহা কুরআন-বাহক বিশ্বনবীর নিকট হইতেই গ্রহণ করিতে হইবে।

দ্বিতীয়ত, প্রত্যেকটি কাজের নিয়ম পদ্ধতি শিক্ষাদানের জন্য রাসূল (স) নিজে সেই কাজ করিয়া লোকদের সম্মুখে বাস্তব দৃষ্টান্ত পেশ করিতেন; কিভাবে কাজ করিতে হইবে, তাহা তিনি নিজে কাজ করিয়া দেখাইয়া দিতেন।

শুধু ইহাই নহে, ইবাদনের কাজে কাহারো কোন ভূল-ক্রটি পরিলক্ষিত হইলে রাসূলে করীম (স) তাহা সঙ্গে সঙ্গে সংশোধনও করিয়া দিতেন, ভূল ধরিয়া দিয়া তাহা শোধরাইবার জন্যও তাকীদ দিতেন। একদিন তিনি মসজিদে নববীতে একজন সাহাবীর নামায পড়া লক্ষ্য করিতেছিলেন। তিনি দেখিলেন, তাঁহার নামায ঠিক নিয়মে হইতেছে না। নামায সমাপ্ত করিয়া তিনি যখন রাসূলের নিকট আসিলেন, তখন তিনি বলিলেনঃ

******************************************************

তুমি ফিরিয়া যাও, আবার নামায পড়, কেননা তুমি নামায পড় নাই।

অর্থাৎ তোমার নামায পড়া হয় নাই, যেভাবে নামায পড়িতে হয় সেভাবে পড় নাই। অতএব পুনরায় নামায পড়। এইভাবে তিন অথবা চারবার নামায পড়িলেও যখন তাঁহার নামায ঠিক নিয়মে সম্পন্ন হইল না, তখন নবী করীম (স) নিজে বাস্তবভাবে নামায পড়ার নিয়ম-কানুন সবিস্তারে শিক্ষা দিলেন।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০।]

এইভাবে সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলের সম্মুখে ও সংস্পর্শে থাকিয়া ইসলামের আদর্শিক, নীতিগত ও বাস্তব শিক্ষা এবং ট্রেনিং লাভ করিতেন। কুরআনের আয়াত নাযিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাসূলের নিকট হইতে উহা তাঁহারাই সর্বপ্রথম শুনিতে পাইতেন। কুরআনের কোন আয়াতের ব্যাখ্যা ও বাস্তব রূপ সম্পর্কে রাসূল (স) কিছু ইরশাদ করিলে তাহা সর্বপ্রথম তাঁহাদেরই কর্ণগোচর হইত।

অপরদিকে সাহাবয়ে কিরাম (রা) নিজেরাও রাসূলের যাবতীয় কাজ-কর্ম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অবলোকন করিতে থাকিতেন, মন ও মগজ দ্বারা তাহা অনুধাবন করিতে চেষ্টা করিতেন। নিম্নোক্ত হাদীস কয়টি ইহার প্রমাণস্বরূপ উল্লেখ করা যাইতে পারেঃ

(ক) কিছু সংখ্যক লোক হযরত খাব্বার ইবনুল ইরত (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলঃ রাসূলে করীম (স) জুহরের নামাযে কুরআন পাঠ করিতেন কি? হযরত খাব্বাব বলিলেন, ‘হ্যা’। তখন তাহারা বলিলঃ

******************************************************

নামাযে রাসূলের কুরআন পাঠ করাকে আপনারা পিছনে থাকিয়া কিভাবে জানিতে পারিতেন?

উত্তরে তিনি বলিলেনঃ

******************************************************

তাহার শ্মশ্রুর নড়াচড়া দেখিয়াই আমরা ইহা জানিতে ও বুঝিতে পারিতাম।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৫; আবু দাউদঃ কিতাবুস সালাত, ১ম খণ্ড, মুস্তাদরাক হাকে, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭৯।]

(খ) হযরত আবূ সায়ীদ খুদরী (রা) বলেনঃ নবী করীম (স) জুহর ও আসরের নামাযে কতক্ষন দাঁড়াইয়া থাকিতেন, তাহা আমরা অনুমান করিয়া দেখিতাম। দেখিতাম, তিনি প্রথম দুই রাকা’আতে তিন আয়াত কুরআন পারে সমান সময় এবং শেষ দুই রাকা’আতে উহার অর্ধেক পরিমাণ সময় দণ্ডায়মান থাকিতেন।[মুসলিম শরীফঃ ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৫; আবূ দাউদ, কিতাবুস সালাত, ১ম খণ্ড।]

সাহাবায়ে কিরাম যে রাসূলের আমল দেখিয়াতদনুযায়ী কাজ করিতেন, তাহা নিম্নোক্ত হাদীস হইতে প্রমাণিত হয়ঃ

এক ব্যক্তি হযরত উমর (রা)- কে বলিলেনঃ ‘আমরা কুরআন মজীদে কেবল ভয়কালীন নামাযে (********) ও নিজ বাড়িতে অবস্থানকালীন নামাযের উল্লেখ দেখিতে পাই; কিন্তু সফরকালীন নামাযের কোন উল্লেখ কুরআন মজীদে পাই না। ইহার কারণ কি? উত্তরে তিনি বলিলেনঃ

আমরা দ্বীন সম্পর্কে কিছুই জানিতান না। এইরূপ অবস্থায় আল্লাহ তা’আলা হযরত মুহাম্মদ (স)-কে রাসূল করিয়া পাঠাইলেন; কাজেই এখন আমরা তাঁহাকে যেভাবে দ্বীনের কাজ করিতে দেখি, ঠিক সেইভাবেই উহা পালন করি।[মুসনাদে আহমদঃ ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৫।]

পূর্বোল্লিখিত হাদীসত্রয় হইতে নিম্নলিখিত কথাগুলি সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয়ঃ

(ক) দ্বীন সম্পর্কে কাজকমূ রাসূল নিজে যেভাবে করিতেন, সাহাবায়ে কিরামও তাহা ঠিক সেইভাবেই করিতেন; সাহাবায়ে কিরাম রাসূলের ক্থা ও কাজ উভয়েরই হুবহু অনুকরণ করিতেন এবং এইরূপ করিলেই দ্বীন পালিত হইল বলিয়া মনে করিতেন।

(গ) রাসূলে করীম (স) দ্বীনের কোন কাজ কিভাবে করিতেন তাহা লক্ষ্য করা ও অনুসরণ করার জন্য রাসূলে করীম (স) নিজেও সাহাবিগণকে তাকীদ করিতেন এবং সাহাবায়ে কিরামও নিজেদের দ্বীন পালনের গরযে তাহা পূরণ করিতেন। কেননা দ্বীন সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান লাভের একমাত্র উপায় ছিল রাসূলের কথা গ্রহণ ও অনুধাবন এবং তাঁহার কাজকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করা ও হাতে কলমে তাঁহার নিকট শিক্ষা গ্রহণ করা।

বস্তুত ইসলামের বিস্তারিত ও খুটিঁনাটি নিয়ম-কানুন জানার জন্য ইসলামের প্রথম সমাজ সাহাবায়ে কিরাম অপরিসীম চেষ্টা  ও অনুসন্ধিৎসা চালাইতেন। কুরআনী মূলনীতিসমূহের বুনিয়াদে ইসলামের বিস্তারিত ব্যবস্থা এইভাবে রচিত হইয়াছে।

সাহাবায়ে কিরাম (রা) এমন সব কাজেও রাসূলের হুবহু অনুসরণ করিয়া চলিতেন, যাহাতে রাসূলকে অনুস্মরণ করিয়া চলা শরীয়াত অনুযায়ী অপরিহার্যভাবে প্রয়োজন নহে। নবী করীম (স) একবার কেবলমাত্র একখানি চাদর পরিধান করিয়া নামায পড়িয়াছিলেন। প্রসিদ্দ সাহাবী হযরত জাবির একদিন তাহাই করিলেন। তাঁহার ছাত্রগণ তাহা দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেনঃ ‘আপনার নিকট অতিরিক্ত চাদর থাকা সত্ত্বেও আপনি নামাযের সময় উহা ব্যবহার করিলেন না কেন? উত্তরে তিনি বলিলেন, ‘নবী করীম (স) কর্তৃক এইরূপ রুখসত দেওয়া হইয়াছে বলিয়াই আমি এইরূপ করিলাম, যেন তোমরা এই সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হইতে পার’।[মুসনাদে ইমাম আহমদ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২৮।]

হযরত বরা ইবনে আযিব (রা) নামাযের প্রত্যেকটি কাজে রাসূলের সহিত সাদৃশ্য স্থাপনের জন্যে প্রণপণে চেষ্টা করিতেন। একদিন তিনি পরিবারবর্গের লোকদিগকে একত্র করিয়া বলিলেনঃ ‘নবী করীম (স) যেভাবে ওযু করিতেন ও নামায পড়িতেন, তাহা আজ আমি তোমাদিগকে দেখাইব। অতঃপর তিনি ওযু করিয়া জুহর, আসর, মাগরিব ও ইশার নামায জামা’আতের সহিত আদায় করিলেন ও প্রত্যেক কাজই নবীর অনুকরণে সম্পন্ন করিলেন। রাসূল (স) কিভাবে রুকূ সিজদা করিতেন, তাহাও তিনি করিয়া দেখাইলেন’।[মুসনাদে ইমাম আহমদ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৮ ও৩০৩।]

হযরত আনাস (রা) দশ বৎসর পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে রাসূলে করীম (স)-এর খিদমত করিয়াছেন। রাসূল (স)- কে যখন যেভাবে যে কাজ করিতে দেখিয়াছেন, তিনি সমগ্র জীবন সেই কাজ ঠিক সেইভাবেই সম্পন্ন করিয়াছেন। তাঁহার নামায পড়ার ধরন ও পদ্ধতি দেখিয়া হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলিতেনঃ ‘ইবনে উম্মে সলীম (আনাস) অপেক্ষা রাসূলের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সাদৃশ্যশীল নামায পড়িতে আর কাহাকেও দেখি নাই’। আইনুত্তামার নামক স্থানের বাহিরের ময়দানে তিনি একদা উষ্ট্রের পৃষ্ঠে আরোহী অবস্থায় নামায পড়িতেছিলেন। উষ্ট্র কেবলামুখী দাঁড়ানো ছিল না। ইহা দেখিয়া সাথিগণ আশ্চর্যান্বিত হইয়া ইহার তাৎপর্য জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি বলিলেন, ‘নবী করীম (স)-কে এইরূপ নামায পড়িতে না দেখিলে আমি কখনই এইরূপ পড়িতাম না’। আর একদিন তিনি একখানা কাপড়ের এক দিক পরিধান করিয়া ও অপর দিক গায়ে জড়াইয়া নামায পড়িলেন। নিকটেই একখানা চাদর পড়িয়াছিল। নামায পড়া শেষ হইলে ইবরাহীম ইবন রাবীয়া (তাবেয়ী) ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। উত্তরে হযরত আানস (রা) বলিলেনঃ ‘আমি নবী করীম (স)-কে ঠিক এইরূপেই নামায পড়িতে দেখিয়াছি’।ফরয কাজ ছাড়া ওয়াজিব ও সুন্নাতের ব্যাপারেও তিনি নবী করীমের হুবহু অনুকরণ ও অনুসরণ করিতেন। নবী করীম (স)- এর মহান পবিত্র জীবন, জীবনের প্রত্যেকটি কাজ ও পদক্ষেপ ছিল তাঁহার এবং তাঁহার ন্যায় সহস্র লক্ষ সাহাবীর নিকট হিদায়াতের উজ্জ্বলতম আলোকস্তম্ভ।

বস্তুত সাহাবীদের এইরূপ অনুসরণের মাধ্যমেই রাসূলের প্রত্যেকটি কথা ও কাজ এবং কাজের বিবরণ চিরদিনের জন্য সুরক্ষিত রহিয়াছে, রাসূলের তৈরী করা সমাজ তাহা কোন দিনই ভুলিয়া যাইতে পারে নাই। রাসূলের হাদীস সংরক্ষণের ইহা এক অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

 

ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব পালন

সাহাবায়ে কিরাম (রা) ইসলাম সম্পর্কে রাসূলের নিকট হইতে যাহা কিছু শিক্ষালাভ করিতেন, কুরআন ও হাদীসের যে জ্ঞান সম্পদই তাঁহারা আহরণ করিতেন, তাহা তাঁহারা কেবল নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ও কুক্ষিগত করিয়ারাখিতেন না; বরং একটি মৌলিক ও নৈতিক দায়িত্ব হিসাবেই তাহা জনগণের মধ্যে রাসূলের দরবার ও তাঁহার নিত্য সাহচর্য হইতে দূরে অবস্থিত মুসলিমদের মধ্যে প্রচার করিতে নিরন্তর ব্যস্থ হইয়া থাকিতেন। ইহা তাঁহাদের একটি প্রধান ধর্মীয় কর্তব্য ছিল। আর প্রকৃতপক্ষে ই দায়িত্ব পালনের জন্যই আল্লাহ তা’আলা নবী করীম (স)-এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মতকে গঠন করিয়াছিলেন। মুসলিম জাতির ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য বর্ণনা করিয়াকুরআন মজীদ উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করিয়াছেনঃ

******************************************************

এইভাবেই আমি তোমাদিগকে মধ্যম পন্হানুসারী উম্মত বানাইয়াছি, যেন তোমরা জনগনের পথপ্রদর্শক হও এবং রাসূল হইবে তোমাদের পথ প্রদর্শনকারী।[সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৪৩।]

কুরআনের এই ঘোষণা অনুযায়ী সাহাবায়ে কিরাম (রা) সত্যের বাস্তব প্রতীকরূপে নিজেদের জীবন ও চরিত্র গড়িয়া তোলার সঙ্গে সঙ্গে জনসাধারণকেও সত্য পথ প্রদর্শন এবং সত্যের দিকে আহবান জানাইবার দায়িত্ব ও কর্তব্য মর্মে অনুভব করিতেন। এই ব্যাপারে তাঁহারা কোন প্রকার বাধ্য বা কষ্ট ও ক্লান্তিকে বিন্দুমাত্র পরোয়া করিতেন না।কোন আঘাতই তাঁহাদিগকে এই পথ হইতে বিরত রাখিতে পারিত না। উপরন্তু দ্বীনের কোন কথা জানিতে পারিলে তাহা গোপন রাখিয়া অপর লোকদের নিকট তাহা প্রকাশ না করিয়া দুনিয়া হইতে চলিয়া যাওয়াকে তাঁহারা মারাত্মক অপরাধ বলিয়া মনে করিতেন। কেননা তাঁহারা কুরআনের নিম্নোক্ত ঘোষনার কারণে এই দিক দিয়া অন্যন্ত ভীত, শংকিত ও সন্ত্রস্ত হইয়া থাকিতেন। আল্লাহ তা’আলা বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি যে সুস্পষ্ট বিধান নাযিল করিয়াছি, জনগনের জন্য হিদায়াতের যে বাণী প্রেরণ করিয়াছে এবং আমি যাহার ব্যাখ্যাও কিতাবের মধ্যে করিয়া দিয়াছি, তাহার পর উহা যাহারা গোপন করিয়া রাখিবে, তাঁহাদের উপর আল্লাহ এবং সমস্ত অভিশাপ বর্ষণকারীরা অভিশাপ বর্ষণ করেন।[সূরা-আল- বাকারা, আয়াত ১৫৯]

এই কঠোর সতর্কবাণী শ্রবণের পর কোন সাহাবীই দ্বীন সম্পর্কিত একটি ছোট্র কথাও গোপন করিয়া রাখার মত দুঃসাহস করিতে পারেন না। কোন সাহাবীকে ইসলামের কোন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে তাঁহার জ্ঞানমত তাহার জওয়াব দেওয়া কর্তব্য মনে করিতেন। কেননা নবী করীমের নিম্নোক্ত বাণী তাঁহাদের স্মরণ ছিলঃ

******************************************************

কেহ কোন জ্ঞানে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হইলেও তাহা সে গোপন করিলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাহাকে আগুনের লাগাম পরাইয়া দিবেন।[মুস্তাদরাক হাকেম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০১।]

সেই কারণে একথা জোর করিয়াই বলা যাইতে পারে যে, নবী করীম (স) যে ইসলামী সমাজ গঠন করিয়াছিলেন, তাহা সামগ্রিকভাবে কুরআন হাদীস প্রচারের একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মত কাজ করিতেছিল। হৃৎপিণ্ড হইতে রক্ত উৎসারিত হইয়া সমগ্র দেহে-দেহের প্রতিটি ক্ষুদ্র-বৃহৎঅঙ্গে যেমন স্থায়ী ও স্বয়ংক্রিয় ধমনীর মাধ্যমে সঞ্চালিত ও প্রবাহিত হয়, ইসলামে হাদীস সম্পদও নবী করীমের নিকট হইতে উৎসারিত হইয়া প্রতিটি মুসলিমের অক্লান্ত চেষ্টা ও তৎপরতার ফলে মানব সমাজের দূরবর্তী কেন্দ্রসমূহে পৌঁছিয়াছে।

ইসলাম প্রচারের এই ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালন ছাড়াও নবী করীম (স)- এর জীবদ্দশায় সরকারী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেও হাদীস প্রচারিত হইয়াছে। কেননা নবী করীম (স) বিভিন্ন স্থানে ও দেশে ইসলাম প্রচারকার্যে ব্যক্তি ও দল প্রেরণ করিয়াছেন। এ পর্যায়ে আমরা কয়েকটি প্রসিদ্ধ ঘটনার উল্লেখ করিতেছি।

হযরত আবূ ইমাম বাহেলী (রা) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

রাসূলে করীম (স) আমাকে আমার নিজ কবীলা ও এলাকার লোকদের প্রতি তাহাদিগকে আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দান ও তাহাদের সম্মুখে ইসলামী শরীয়াতের বিধান পেশ করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিয়াছেন।[মুস্তাদরাক হাকেম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৪১।]

নবী করীম (স)-এর খিদমতে একদল আনসার অবস্থান করিতেন। তাঁহারা দিনের বেলা পানি বহন করিতেন, কাষ্ঠ সংগ্রহ করিতেন এবং তাহা বিক্রয় করিয়া সুফফার অধিবাসীদের জন্য খাদ্য ক্রয় করিতেন। আর রাত্রিবেলা কুরআন ও হাদীস অধ্যয়ন করিতেন। একবার কয়েজন মুনাফিক একত্র হইয়া রাসূলের নিকট বলিলঃ

******************************************************

আমাদিগকে কুরআন ও হাদীস শিক্ষাদান করিবে এমন কিছু লোক আমাদের সহিত পাঠাইয়া দিন।

নবী করীম (স) এই উদ্দেশ্যে উপরিউক্ত লোকদের মধ্য হইতে সত্তর জন লোককে তাহাদের সহিত প্রেরণ করেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, পথের মাঝখানেই মুনাফিকরা তাঁহাদের উপর আকস্মিক আক্রমন চালায় ও তাঁহাদিগকে শহীদ করিয়া দেয়।[সহীহ মুসলিম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৯। ********************]

হিজরতের প্রাক্কালে হযরত আবূ যর গিফারী (রা) নবী করীম (স)- এর নিকট মক্কা শরীফে ইসলাম কবুল করেন। নবী করীম (স) তাঁহাকে বলিলেনঃ

******************************************************

আমাকে খেজুরের দেশে চলিয়া যাইবার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। আমি মনে করি উহা ‘ইয়াসরিব’ বা মদীনা ছাড়া অন্য কোন দেশ হইবে না। এখন তুমি কি আমার পক্ষ হইতে তোমার নিজ গোত্র ও এলাকার লোকদিগকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার কাজ করিতে পারিবে?

আবূ যর গিফারী (রা) সানন্দে এই দায়িত্ব কবুল করিলেন ও নিজ দেশে পৌঁছিয়া লোকদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তিনি রাসূলে করীম (স)- এর নিকট হইতে ইসলামের যেসব কথা জানিয়া লইয়াছিলেন, তাহা তাঁহার কবীলা ও দেশের লোকদের নিকট প্রকাশ করিয়া বলিলেন। ফলে বহু লোক ইসলাম কবুল করেন।[সহীহ মুসলিম, ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা ২৭৬।******************]

অনুরূপভাবে কায়স ইবনে নাশিয়া আসলামী (রা) ইসলাম কবুল করার পর নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি নিজ গোত্র ও এলাকার লোকদিগকে বলিয়াছিলেনঃ

******************************************************

হে বনু সুলাইমের লোকেরা  ! আমি রোমান ও পারসিক জাতির সাহিত্য আরব কবিদের কবিতা, কুহানদের কাহিনী এবং হেমইয়ারের কাব্য শুনিয়াছি। কিন্তু মুহাম্মদের কালামের সহিত উহার কোনই তুলনা হইতে পারে না- উহা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ভাবধারার জিনিস। অতএব, তোমরা মুহাম্মদের প্রতি ঈমান আনার ব্যাপারে আমার অনুসরণ কর।[***************]

হযরত আমর ইবনে হাজম (রা) কে নবী করীম (স) নাজরান গোত্রের প্রতি প্রেরণ করিয়াছিলেন এই উদ্দেশ্যে যে-

******************************************************

তিনি তাহাদিগকে দ্বীন সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানদান করিবেন ও কুরআন শিক্ষা দিবেন।[*************]

হযরত মু’আয ইবন জাবাল (রা) কে নবী করীম (স) ইয়ামেনে পাঠাইয়াছিলেনঃ

******************************************************

ইয়ামেন ও হাজরা মাউতের অধিবাসীদের শিক্ষক হিসাবে।[******************]

‘কারবা’ ও ‘আদল’ নামরে দুইটি গোত্র হিজরতের তৃতীয় বৎসরে ইসলাম কবুল করিলে নবী করীম (স) তাহাদের জন্য ছয়জন শিক্ষক প্রেরণ করিলেনঃ

******************************************************

‘নবী করীম (স) আদল ও কাররা’ নামক গোত্রদ্বয়ের প্রতি দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান দান, কুরআন ও ইসলামী শরীয়াতের বিধান শিক্ষাদানের জন্য ছয়জন শিক্ষক প্রেরণ করেন। তাঁহারা হইলেনঃ মারসাদ ইবন আবী মারসাদ, আসেম ইবন সাবেত, হাবীব ইবন আদী, খালেদ ইবনুল বুকায়ার, যায়দ ইবন দাসনা এবং আবদুল্লাহ ইবন তারেক (রা)।[*******************]

মক্কা বিজয়ের পর সমগ্র আরব জাহান ইসলাম কবুল করার জন্য প্রস্তুত হইয়া উঠে। তখন লোকেরা নিজ নিজ কবীলা সর্দারদেরকে নবী করীম (স)-এর নিকট পাঠাইতে শুরু করে। তাহারা ইসলাম কবুল করিয়া নিজ নিজ কবীলা ও এলাকার লোকদের নিকট প্রত্যাবর্তন করে এবং তাহাদিগকে ইসলামের দাওয়াত দেয় ও ইসলামী জ্ঞান-কুরআন হাদীস প্রচার করে।[**************

এতদ্ব্যতীত বহু সংখ্যক সাহাবীকে নবী করীম (স) ব্যক্তিগত বা দলগতভাবে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেন।[**********************] তখন ইহাদের মাধ্যমে যেমন কুরআন মজীদ ও উহার ভাষ্য হিসাবে রাসূলের হাদীসও বিপুলভাবে প্রচার লাভ করিয়াছে।

নবী করীম (স) যেসব সাহাবীকে ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশে গভর্নর নিযুক্ত করিয়া পাঠাইয়াছেন, তাঁহারা শাসনকার্য সম্পাদনের জন্য কুরআনের সঙ্গে সঙ্গে হাদীসকেও অন্যতম ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন। এই প্রসংগে হযরত মু’আয ইবন জাবাল (রা)- এর সাথে তাঁহাকে ইয়ামেনের গভর্নর নিযুক্ত করিয়া পাঠাইবার সময়ে রাসূলে করীম (স)-এর যে কথোপকথন হইয়াছিল, তাহা বিশেষভাবে স্মরণীয়। নবী করীম (স) জিজ্ঞাসা করিলেনঃ তুমি কিসের ভিত্তিতে শাসনকার্য পরিচালনা করিবে? মু’আয বলিলেন, কুরআনের ভিত্তিতে। জিজ্ঞাসা করিলেনঃ সংশ্লিষ্ট বিষয়টি সম্পর্কে কুরআনে যদি কিছু না পাওয়া যায়, তখন? মু’আয বলিলেনঃ

******************************************************

রাসূলের সুন্নাতের ভিত্তিতে কার্য সম্পাদন করিব।

এই আলোচনার শেষভাগে রাসূলে করীম (স) অতিশয় সন্তোষ সহকারে আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করিলেন এবং হযরত মু’আযের বক্ষস্থলে হাত রাখিয়া বলিলেনঃ

******************************************************

যে আল্লাহ তাঁহার রাসূলের প্রেরিত ব্যক্তিকে আল্লাহর রাসূলের সন্তোষমূলক কাজ ও নীতি নির্ধারণ করার তওফীক দিয়াছেন, তাঁহারই প্রশংসা।[************************]

এই প্রসঙ্গে শেষ কথা এই যে, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রায় সর্বত্রই রাসূলের প্রেরিত লোকদের চেষ্টা ও যত্নে রাসূলের জীবদ্দশায়ই হাদীস পৌছিয়াছে। সর্বত্র উহার চর্চা শুরু হইয়া গিয়াছে।ইহার ফলে দূর-দূরান্তরে অবস্থিত মুসলিমগণ কুরআনের সঙ্গে সঙ্গে রাসূলের হাদীসের সহিত সম্যক পরিচয় লাভ করিতে সমর্থ হয়।

 

সাহাবীদের হাদীস প্রচার ও শিক্ষাদান

ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব পাল ব্যাপারে দেশে দেশে সাহাবিগণের মাধ্যমে কুরআনের সঙ্গে সঙ্গে হাদীস ও প্রচারিত হইয়াছে। এই পর্যায়ে আমরা সাহাবিগণের বিশেষভাবে হাদীস প্রচার সংক্রান্ত সাধনা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করিব।

কিন্তু সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে ‘সাহাবী’ কাহাকে বলে; কে সাহাবী, কে নয়; এ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ও মৌলিক আলোচনা এইখানে পেশ করা আবশ্যক।

ইমাম বুখারী ও আহমদ ইবন হাম্বল প্রমুখ প্রখ্যাত মুহাদ্দিসের মত এই যেঃ

******************************************************

যিনি রাসূল (স)-কে দেখিতে পাইয়াছেন, তাঁহার মধ্যে পার্থক্যবোধ বর্তমান ছিল, তাঁহার প্রতি ঈমানদার এবং ইসলামের উপরই তাঁহার জীবনাবসান ঘটিয়াছে, তিনিই সাহাবী। রাসূলের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ-বৈঠক দীর্ঘ হউক কি সংক্ষিপ্ত হইয়া থাকুক, তাঁহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করুন আর নাই করুন, তাঁহার সহিত মিলিয়া যুদ্ধ করুন আর না-ই করুন তিনিই সাহাবীরূপে গণ্য হইবেন।[*********************]

ইমাম বুখারী তাঁহার সহীহ গ্রন্হে লিখিয়াছেনঃ

যে মুসলমান রাসূলের সংস্পশ লাভ করিয়াছে কিংবা যে মুসলমান তাঁহাকে দেখিয়াছে, সে-ই রাসূলের সাহাবী।[************]

আবুল মুযাফফর আস সাময়ানী বলিয়াছেনঃ

******************************************************

হাদীস বিজ্ঞানিগণ এমন সকল লোককেই সাহাবী বলেন, যাঁহারা রাসূলের নিকট হইতে একটি হাদীস বা একটি কথাও বর্ণনা করিয়াছেন।[**************]

আল্লাহ নিজেই কুরআনের বিভিন্ন স্থানে সাহাবীদের প্রশংসা ও পরিচয় দান করিয়াছেন। এক জায়গায় অপেক্ষাকৃত বিস্তারিত ও অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁহার সঙ্গের লোক (সাহাবী)-গণ কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; তাঁহারা পরস্পরের প্রতি অনুগ্রহ ও ভালবাসাসম্পন্ন। তুমি তাহাদিগকে সব সময় রুকূ ও সিজদা দানকারী-বিনীত ও আল্লাহর সম্মুখে অবনত দেখিতে পাইবে। তাহারা সব সময়ই আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তোয় লাভের অভিলাষী। তাঁহাদের কপালদেশে সিজদার চিহ্ন অংকিত রহিয়াছে।[সূরা আল-ফাতহ, ২৯ আয়াত।]

অন্যত্র বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

আল্লাহ এই মু’মিন (সাহাবী-দের প্রতি বড়ই সন্তুষ্ট হইয়াছেন- যখন তাহারা বৃক্ষের নীচে বসিয়া (হে নবী) তোমার হাতে বায়’আত করিতেছিল। অতঃপর তাহাদের দিলের কথা আল্লাহ তা’আলা জানিতে পারিলেন।[ঐ, ১৮ আয়াত।]

সহীহ হাদীসেও সাহাবীদের ফযীলত সম্পর্কে রাসূলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা উদ্ধৃত হইয়াছে।

একটি হাদীসে রাসূল (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

তোমরা আমার সাহাবীকে গালাগাল করিও না। কেননা যাঁহার হস্তে আমার প্রাণ- সেই আল্লাহর শপথ, তোমাদের কেহ যদি ওহুদ পর্বত সমান স্বর্ণও দান করে, তবুও সে একজন সাহাবীর সমান বা তাহার অর্ধেক মর্যাদাও পাইতে পারিবে না।[মুসলিম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১০, বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১৮।]

বস্তুত এই সাহাবিগণের আপ্রাণ চেষ্টা-সাধনা ও অসীম-অতুলনীয় আত্মত্যাগের ফলে একদিকে যেমন ইসলাম প্রচার হইয়াছে অপরদিকে ঠিক তেমনি রাসূলে করীম (স)-এর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র পূর্ণ মাত্রায় সুরক্ষিতও রহিয়াছে। সাহাবিগণই কুরআন-হাদীসের জ্ঞান রাসূলের নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছেন, সেই সঙ্গে দুনিয়ার দিকে দিকে উহার অমিয়ধারা প্রবাহিত করিয়া বিশ্ববাসীকে চিরধন্য করার ব্যবস্থাও করিয়াছেন।

কাজেই হাদীসের প্রথম গ্রাহক, বাহক ও প্রচারক হওয়ার কারণে সাহাবিগণ বিশ্ব মুসলিমের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবেন, তাহাতে একবিন্দু সন্দেহের অবকাশ নাই।

বস্তুত হাদীস শিক্ষাকরা, সংরক্ষণ ও মুখস্থ করা এবং উহার প্রচার ও শিক্ষাদান সম্পর্কে রাসূলে করীম (স)- এর নির্দেশ পাইয়া সাহাবিগণ নিষ্ক্রিয় হইয়া বসিয়া থাকিতে পারেন নাই। বরং তাঁহারা নিজেরা যেমন হাদীসের প্রতি যথোপযুক্ত গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন, নিজেরা উহার শিক্ষালাভও করিয়াছেন, মুখস্থ করিয়াছেন, অনরূপভাবে হাদীস অনভিজ্ঞ লোকদের পর্যন্ত তাহা পৌঁছাইবার, তাহাদিগকেও হাদীস শিক্ষায় পূর্ণ শিক্ষিত করিয়া তুলিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াছেন। নবী করীম (স)- এর জীবদ্দশায় তো বটেই, তাঁহার ইন্তেকালের পরও তাঁহারা কুরআন মজীদের সঙ্গে সঙ্গে হাদীস প্রচারে  ও হাদীসের শিক্ষাদনে বিন্দুমাত্র গাফিলতি করেন নাই। হযরতের ইন্তেকালের পর সমগ্র ইসলামী রাষ্ট্রের দিকে দিকে এবং দূরবর্তী বহু অমুসলিম দেশে তাঁহারা ছড়াইয়া পড়েন এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্থানে ও পরিমণ্ডলে হাদীস ও ইসলামী জ্ঞান-বিস্তারে আত্মনিয়োগ করেন। এইখানে কয়েকজন বিশিষ্টি সাহাবীর হাদীস প্রচার এবং শিক্ষাদানের ঐতিহাসিক ও প্রামাণ্য বিবরণ পেশ করিতেছিঃ

১ হযরত আবূ ইদরীস খাওলানী (রা) বলেনঃ আমি হিমস শহরের মসজিদে অনুষ্ঠিত এক মজলিসে শরীক হইলাম। ইহাতে ৩২ জন সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। এখানে সমষ্টিগতভাবে হাদীসের চর্চা ও শিক্ষাদান করা হইতেছিল। একজন সাহাবী হাদীস বর্ণনা সমাপ্ত করিলে ইহার পর দ্বিতীয়জন হাদীস বর্ণনা শুরু করিতেন।[মুসনাদে আহমাদ, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২৮।]

২. নসর ইবন আসেমুল লাইসী বলেনঃ আমি কুফা শহরের জামে মসজিদে একটি জনসমাবেশ দেখিতে পাইলাম। সকল লোক নির্বাক ও নিশ্চল হইয়া এক ব্যক্তির দিকে গভীর অভিনিবেশ ও অধীর আগ্রহ সহকারে উম্মুখ ও নিস্পলক দৃষ্টিকে তাকাইয়া আছে। জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে পারিলাম যে, ইনি প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত হুযায়ফা ইবন ইয়ামান (রা) এবং তিনি হাদীসের শিক্ষা দান করিতেছেন।[মুসনাদে আহমদ, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮৬।]

৩. উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা) মদীনায় হাদীস শিক্ষা দানের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁহার নিকট এক সংগে শিক্ষার্থী লোকের সংখ্যা দুইশতেরও অধিক ছিল। তন্মধ্যে ৩৮ জন ছিলেন মহিলা। হযরত আবু মুসা আশ’আরী, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস, আমর ইবনুল আস প্রমুখ শদ্ধাভাজন সাহাবী তাঁহার দরসে হাদীসের মজলিসে নিমিত শরীক হইতেন।[তাযকিরাতুল হুফফায যাহবী, হযরত আবূ দারদা প্রসংগ।]

৪. কফা নগরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) নিয়মিতভাবে হাদীসের দরস দিতেন। তাঁহার দরসে অন্যূন্য চারি সহস্র ছাত্রশ্রোতা সমবেত হইত।[আসরারুল আনওয়ার প্রন্হ দ্রঃ।]

৫. হযরত আবুদ্দরদা (রা) [এই সাহাবীর নাম হইল উয়াইমির ইবন যায়দ, পৃষ্ঠা ৩২।] দামেশকে বসবাস করিতেন। তিনি যখন মসজিদে হাদীসের দরস দিতে উপস্থিত হইতেন, তখন তাঁহার সম্মুখে এত বিপুল সংখ্যক শ্রোতার সমাবেশ হইত যে, তাহাদের মাঝে তাঁহাকে মনে হইত যেন শাহানশাহ্ বসিয়া আছেন।[তাযকিরাতুল হুফফায, আবু দারদার প্রসঙ্গ।]

‘তাযকিরাতুল হুফফায কিতাবে উল্লেখ করা হইয়াছে, হযরত আবুদ্দারদার দরসের মজলিসে অন্তত ষোলশত ছাত্র রীতিমত যোগদান করিত।

৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) ইলমে হাদীসের মহাসমুদ্র আয়ত্ত করিয়াছিলেন; কিন্তু তাহা তিনি কেবলম্রাত নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন নাই, উহা দ্বারা তিনি সহস্র লক্ষ মুসলিমের জ্ঞান পিপাসা নিবৃত্ত করিতেন। ফলে তাঁহার দ্বারা হাদীসের ব্যাপক প্রচার সাধিত হয়। তিনি নবী করীম (স)- এর ইন্তেকালের পর ষাট বৎসরেরও অধিককাল জীবিত ছিলেন (মৃঃ৭৪ হিঃ)। এই দীর্ঘ জীবনে হাদীসের শিক্ষাদান ও প্রচার সাধনই ছিল তাঁহার প্রধান কাজ। [*****************] এই কারণে তিনি কোন চাকরি পর্যন্ত গ্রহণ করেন নাই। কেননা তাহাতে এই মহান কাজ ব্যাহত ও বাধাগ্রস্ত হইত।

তিনি মদীনা শরীফে স্থায়ীভাবে দরসে হাদীসের মজলিস অনুষ্ঠান করিতেন। বিশেষত হজ্জের সময় যখন বিপুল সংখ্যক মসলমান মদীনায় সমবেত হইতেন, তখন তিনি তাঁহাদের নিকট হাদীস পেশ করিতেন। ইহার ফলে মুসলিম জাহানের দুরতম কেন্দ্র পর্যন্ত রাসূলের হাদীস অতি সহজেই পৌঁছিয়া যাইত।[উসদুল গাবাহ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৮।]এতদ্ব্যতীত লোকদের ঘরে ঘরে পৌঁছিয়াও তিনি হাদীসের প্রচার করিতেন। ইয়াযীদ ইবন মুয়াবিয়ার শাসনামলে তিনি আবদুল্লাহ ইবন মুতীর ঘরে উপস্থিত হইলেন। তাঁহার জন্য বিছানা ও শয্যা ঠিক করিতে বলা হইলে হযরত আবদুল্লাহ ইব উমর (রা) বলিলেনঃ

******************************************************

আমি তোমার ঘরে বসিবার জন্য আসি নাই, শুধু একটি হাদীস শুনাইবার উদ্দেশ্যে আসিয়াছি। হাদীসটি আমি নবী করীম (স)-এর নিকট হইতে শুনিয়াছিলাম।

অতঃপর তিনি বলিলেন, আমি নবী করীম (স)-কে বলিতে শুনিয়াছিঃ

******************************************************

যে ব্যক্তি আমীরর তথা ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধানের আনুগত্য হইতে বিরত থাকে, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সম্মুখে এমন অবস্থায় উপস্থিত হইবে যে, তাহার সে কৈফয়ত দেওয়ার কিছুই থাকিবে না। আর যে লোক আমীরের নিকট বায়আত না করিয়া মরিবে, তাহার জাহিলিয়াতের মৃত্যু ঘটিবে।[মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১২৮। মুসনাদে আহমদ ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৫৪।]

৭.  হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) কথায় কথায় হাদীস প্রচার করিতেন ও লোকদিগকে হাদীসের শিক্ষাদান করিতেন। আলী ইবন আবদুর রহমান বলেনঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) আমাকে নামাযের মধ্যে পাথরকুচি লইয়া খেলা করিতে দেখিলেন। আমি নামায শেষ করিলে তিনি আমাকে এইরূপ করিতে নিষেধ করিলেন এবং বলিলেনঃ

******************************************************

রাসূল (স) যেইরূপ সুন্দরভাবে নামায পড়িতেন, তুমিও সেইভাবেই নামায পড়।

রাসূল (স) কিভাবে নামায পড়িতেন জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেনঃ

******************************************************

রাসূল (স) যখন নামাযে বসিতেন, তখন ডান হাত ডান রানের উপর রাখিতেন, এবং সবগুলি অংগুলি বন্ধ করিয়া লইতেন, এবং বৃদ্ধাঙ্গুলির পাশের অংগুলি দ্বারা ইশারা করিতেন। আর বাম হাত বাম রানের উপর স্থাপন করিতেন।[মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ, পৃঃ ৫৩ (তরজমা সহ)]

বহু দিন পর্যন্ত একটি বিশেষ হাদীস বর্ণনা না করায় সাহাবীদের মনে ভয় জাগ্রত হইত যে, ইহা বর্ণনা না করিলে ও উহাকে গোপন করিয়া রাখিলে গুনাহ করা হইবে। অতএব উহা আর গোপন রাখা যায় না। তখনই তিনি তাহা লোকদের নিকট বর্ণনা করিতেন। হযরত উসমান (রা) সম্পর্কে নিম্নোক্ত বর্ণনা হইতে ইহার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়ঃ

******************************************************

হযরত উসমান (রা) যখন অযূ করিলেন, তখন বলিলেনঃ আমি তোমাদের নিকট নিশ্চয়ই একটি হাদীস বর্ণনা করিব। অবশ্য যদি একটি আয়াত না থাকিত, তাহা হইলে আমি তাহা তোমাদিগকে কিছুতেই বলিতাম না। আমি শুনিয়াছি, নবী করীম (স) বলিতেছিলেনঃ কোন ব্যক্তি যদি অযূ করে, তাহার অযূ সর্বাঙ্গ সুন্দর করিয়া সম্পন্ন করে এবং নামায আদায় করে, তবে তাহার ও নামাযের মধ্যে যত গুনাহ হইবে, তাহা সব মাফ করিয়া দেওয়া হইবে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে নামায সম্পন্ন করিতে থাকিবে। হাদীসের বর্ণনাকারী উত্তরে বলেনঃ সে আয়াতটি হইল এইঃ ‘নিশ্চয়ই যাহারা আমার নাযিল করা কথাকে গোপন করে……………..’।[সহীহ বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮।

উদ্বৃত আয়াতটিকে হযরত উসমান (রা)- এর হাদীস গোপন করায় গুনাহ হওয়া সম্পর্কে প্রমাণ হিসাবে পেশ করা হএত এইকথা প্রমাণিত হয় যে, তিনি ওইসব সাহাবায়ে কিরাম হাদীসকে ‘আল্লাহর নিকট হইতে অবতীর্ণ কথা মনে করিতেন। অন্যথায় এই আয়াত যুক্তি হিসাবে পেশ করা এবং আয়াতে উল্লিখিত গুনাহ ও শাস্তির ভায়ে বহু দিনের বর্ণনা না করা হাদীসকে বর্ণনা করা এবং এই কথা বলা যে, এই আয়াত না থাকিলে আমি কিছুতেই এই হাদীস বর্ণনা করিতাম না-ইহার কোনই তাৎপর্য থাকিতে পারে না।]

মৃত্যুশয্যায় শায়িত থাকা অবস্থায়ও সাহাবায়ে কিরাম (রা) প্রয়োজনবশত রাসূল (স)-এর হাদীস বর্ণনা করিতেন। হাসান বসরী বলেন৬ হযরত মাম্বকাল মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিলেন, তখন সেখানে উবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদ উপস্থিত হইলেন। এই সময় হযরত মাম্বকাল বলিলেনঃ

******************************************************

আমি তোমাকে রাসূল (স)-এর নিকট হইতে শ্রুত একটি হাদীস শুনাইব। তিনি বলিয়াছেনঃ আল্লাহ যে বান্দকে জনগণের শাসন পরিচালনার দায়িত্ব দিবেন, সে যদি তাহাদিগকে সদুপদেশ দিয়া ও তাহাদের কল্যাণবোধ করিয়া তাহাদের হিফাজত না করে, তবে সে বেহেশতের সুগন্ধিটুকুও পাইবে না।[বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৫৮।]

হযরত আবূ আয়্যূব আনসারী (রা) মৃত্যূশয্যায় শায়িত থাকা অবস্থায় হাদীস প্রচারের দায়িত্বানুভূতিতে কম্পিত হইয়াছিলেন। মৃত্যুর প্রাক্কালে তিনি এমন দুইটি হাদীস বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন, যাহা তিনি পূর্বে কখনও বর্ণনা করেন নাই। তাঁহার ইন্তেকালের পর সাধারণ ঘোষনার মাধ্যমে হাদীস দুইটিকে মুসলিম জনগণের নিকট পৌঁছানো হয়।[মুসনাদে আহমদ, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৪।]

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) সম্পর্কেও এই ধরনের একটি ঘটনা ইবনে আবী শায়বাহ কর্তৃক উদ্ধৃত হইয়াছে। তিনি রোগশয্যায় শায়িত ছিলেন; তখন তিনি উপস্থিত লোকদের বলিলেনঃ

******************************************************

তোমরা আমাকে উঠাইয়া বসাইয়া দাও, কেননা রাসূল করীম (স)-এর রক্ষিত এক আমানত আমার নিকট সংরক্ষিত রহিয়াছে, আমি তাহা তোমাদের নিকট পৌঁছাইতে চাই।

অতঃপর তাঁহাকে বসাইয়া দেওয়া হইলে তিনি বর্ণনা করিলেনঃ

******************************************************

তোমাদের কেহ যেন তাহার নামাযেন মধ্যে এদিক-ওদিক না তাকায়। যদি কেহ তাকায়-ই তবে যেন ফরয নামায ছাড়া অন্য নামাযে করা হয়।[তাফসীরে রুহুল-মাআনী, ১৮ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩।]

আবুল আলীয়া তাবেয়ী বলেনঃ

******************************************************

আমরা বসরা শহরে রাসূল (স)-এর সাহাবীদের বর্ণিত হাদীসের বর্ণনা লোকদের নিকট শুনিতে পাইতাম; কিন্তু আমরা তাহাতে কিছুম্রাত সন্তুষ্ট বা পরিতৃপ্ত হইতে পারিতাম না, যতক্ষণ মদীনায় গমন করিয়া উহা তাঁহাদের নিজেদের মুখ হইতে শুনিয়া না লইতাম।[মুসনাদে দারেমী, পৃষ্ঠা ৭৪।]

বস্তুত মুসলিম জাহানের বিভিন্ন কেন্দ্র হইতে ইসলামী ইলম, হাদীস ও কুরআন শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে অসংখ্য মুসলমান সাহাবায়ে কিরামরে খিদমতে উপস্থিত হইত। তাঁহারা তাহাদিগকে সমাদরে ও সোৎসাহে গ্রহণ করিতেন এবং তাহাদের নিকট হাদসী পেশ কিরতনে। বিশেষত হযরত আবু হুরায়রা (রা) ও হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত হইয়াছে যে, তাঁহাদের দরবার হাদীস শিক্ষাথীদের বিপুল ভীড় জমিয়া যাইত। কোন বিষয়ে প্রশ্ন করা হইলে তাহার জওয়াব পাইতে যথেষ্ট বিলম্ব হইত।[মুসনাদে ইমাম আহমদ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯২; তিরমিযী আওয়াবুল ইলম।]

হযরত ইবন আব্বাস (রা) তাঁহার পুত্র আলী এবং দাস ইকরামাকে হযরত আবূ সাঈদ খুদরীর নিকট হাদীস শ্রবণের জন্য পাঠাইলেন। তাঁহারা যখন পৌঁছিল, তখন তিনি বাগানে ছিলেন। তাহাদিগকে দেখিয়া তিনি তাহাদের নিকট আসিয়া বসিলেন এবং হাদীস (বর্ণনা করিয়া) শুনাইলেন।[ঐ]

৮. হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) ইলমে হাদীসের প্রচারে আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন। সমগ্র জীবনই তিনি হাদীস শিক্ষাদানের পরিমণ্ডলে অতিবাহিত করেন। রাসূলে করীম (স)-এর অপরাপর সাহাবিগণ যখন নানা যুদ্ধে ব্যস্ত হইয়াছিলেন, সেই সময় তিনি বসরার জামে মসজিদে রাসূল (স)-এর হাদীস প্রচার ও শিক্ষাদানের কাজে গভীরভাবে নিমগ্ন হইয়াছিলেন। তাঁহার হাদীস বয়ানের মজলিসে মক্কা, মদীনা, বসরা, কুফা ও সিরিয়া হইতে বিপুল সংখ্যক লোক উপস্থিত থাকিত। তিনি বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের অন্যতম। তাঁহার বর্ণিত ৮০ টি হাদীস সহীহ বুখারী শরীফে, ৭০ টি হাদীস সহীহ মুসলিম শরীফে এবং ‌১২৮ টি হাদীস বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্হে স্থান পাইয়াছে।

৯. হযরত উবায় ইবন কাম্বব (রা) হাদীসে বিশেষ ব্যুৎপত্তি রাখিতেন, যাহবী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স)-এর নিকট হইতে যাহারা অধিক সংখ্যক হাদীস শুনিয়াছেন, হযরত উবায় তাঁহাদের একজন।[তাযকিয়াতুল হুফফাজ-উবায় প্রসঙ্গ।] হাদীস প্রচারক বহু সাহাবীকেই প্রথমে তাঁহার নিকট শাগরেদী করিতে হইয়াছেন।

১০.  মদীনার শাসনকর্তা আমর ইবন সাঈদ মক্কায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়রের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করিতেছিলেন, তকন হযরত আবু শুরায়হ (রা) তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেনঃ

******************************************************

হে আমীর ! আমাকে অনুমকি দিন, আমি আপনাকে রাসূল (স)-এর একটি হাদীস শুনাইব, যাহা তিনি মক্কা বিজয়ের পরের দিন দাঁড়াইয়া বলিয়াছিলেন-আমার দুই কর্ণ তাহা শ্রবণ করিয়াছে, আমার অন্তঃকরণ তাহা হিফাজত  ও মুখস্থ করিয়া রাখিয়াছে এবং তিনি যখন কথা বলিয়াছিলেন, তখন তাঁহাকে আমার এই দুই চক্ষু দেখিতেছিল। অতঃপর মক্কার হেরেম হওয়ার ও অন্যান্য কথা সম্বলিত একটি হাদীস শুনাইয়া দেন।[বুখারী শরীফ ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা২১।]

হযরত আবূ শুরায়হার কথা হইতে প্রথমত এই জানা যায় যে, তিনি হাদীস পূর্ণমাত্রায় মুখস্থ ও হিফাজত করিয়া রখিয়াছিলন এবং দ্বিতীয়ত তিনি হাদীস বর্ণনার দায়িত্ব পালনে সবসময়ই প্রস্তুত থাকিতেন।

হযরত জাবির ইবনে আদুল্লাহ (রা)- ও মসজিদে নববীতে বসিয়া রীতিমত হাদীসের দরস দিতেন। আল্লামা সুয়ুতি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

মসজিদে নববীতেই হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহর একটি শিক্ষাদান কেন্দ্র ছিল। সেখানে লোকেরা একত্র হইয়া তাঁহার নিকট হইতে হাদীস শিক্ষা গ্রহণ করিত।[*************]

সাহাবায়ে কিরাম (রা) লোকদিগকে হাদীসের কেবল মৌখিক শিক্ষাদান করিয়াই ক্ষান্ত হইতেন না, বরং হাদীস যাহাতে লোকেরা মুখস্থ করে এবং উহাকে তাহারা নিজেদের স্মৃতিপটে চিরদিনের তরে মুদ্রিত ও সুরক্ষিত রাখিতে পারে, সেইজন্য ও তাহারা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করিতেন ও বিশেষ যত্ন লইতেন। হাদীস মুখস্থ করা সম্পর্কে সাহাবীদের নিজস্ব প্রচেষ্টার কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। এখানে আমরা দেখাইতে চেষ্টা করিব যে, সাহাবিগণের নিকট যাহারা হাদীস শিক্ষার্থে আসিতেন- তাঁহাদিগকে হাদীস মুখস্থ করাইবার জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করিতেন।

ইসলামের এই প্রথম যুগে মুসলমানগণ তাহাদের ছোট ছেলেমেয়েকে যেমন কুরআন মুখস্থ করার উদ্দেশ্যে বিশেষ বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করিতেন, অনুরূপভাবে হাদীস শিক্ষাকেন্দ্রে নিজেদের সন্তান-সন্ততিদিগকে প্রেরণ করিতেন। এতদ্ব্যতীত লোকদিগকে তাঁহারা হাদীস মুখস্থ করিবার জন্য বিশেষ তাকীদ করিতেন- সেইজন্য নানাভাবে উপদেশ দিতেন।

আবু নজরা নামক তাবেয়ী হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা)-কে বলিলেনঃ

******************************************************

আমরা আপনার নিকট হইতে যাহা শ্রবণ করি তাহা কি আমরা লিখিয়া লইব না?

ইহার জওয়াবে তিনি বলিলেনঃ

******************************************************

তোমাদের নবী করীম (স) আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করিতেন, আমরা তাহা মুখস্থ করিয়া স্মরণ রাখিতাম, অতএব তোমরাও আমাদের ন্যায় হাদীস মুখস্থ কর।[********************]

হাদীসের হর-হামেশা চর্চা করার এবং সেইজন্য উৎসাহ দানের ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরাম বিন্দুমাত্র ক্রটি করিতন না। তাবেয়ী যুগের ইলমে হাদীসের ইমাম ইকরামার উস্তাদে হাদীস হযরত ইবন আব্বাস (রা) তাহাকে কিভাবে হাদীস শিক্ষা দিয়াছেন, তাহার বিবরণ দান প্রসঙ্গে তিনি বলেনঃ

******************************************************

ইবন আব্বাস আমাকে কুরআন ও হাদীস শিক্ষাদানের জন্য আমার পায়ে বেড়ি পরইয়া দিতেন।[তাযকিরাতুল হুফফায, যাহবী, পৃষ্ঠা ৯০।]

হযরত আলী (রা) বলিতেনঃ

******************************************************

তোমরা খুব বেশী করিয়া হাদীস চর্চা করিতে থাক, তাহা না করিলে তোমাদের এই ইলম (হাদীস-জ্ঞান) বিলিন হইয়া যাইবে।[**************]

সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলিতেনঃ তোমরা পারস্পরিক হাদীস পর্যালোচনা ও চর্চা কর, কেননা কেবল চর্চা ও পর্যালোচনার মাধ্যমেই উহার সংরক্ষণ করা সম্ভব।[****************]

সাহাবী হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলিতেনঃ

******************************************************

তোমরা সব সময় হাদীস চর্চা ও স্মরণ করিতে থাক।

তাবেয়ী আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লাও তাঁহার হাদীসের ছাত্রদিগকে প্রায়ই বলিতেনঃ

******************************************************

অর্জিত হাদীস-জ্ঞান বারবার চর্চা, স্মরণ ও আবৃত্তির মাধ্যমেই জীবন্ত ও সংরক্ষিত থাকিতে পারে। অতএব তোমরা সকলে হাদীসের চর্চা, স্মরণ ও আবৃত্তি করিতে থাক।[**************]

অপর একটি বর্ণনায় এই কথাটি নিম্নরূপ বলা হইয়াছেঃ

হাদীস পারস্পরিক স্মরণ ও চর্চা কর, কেননা এইরূপ স্মরণ ও চর্চার মাধ্যমেই হাদীস জীবন্ত থাকিবে।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৭৮।]

এই সম্পর্কে হযরত ইবন আব্বাস (রা)-এর নিম্নলিখিত কথা অধিকতর স্পষ্ট। তিনি তাঁহার ছাত্রদের লক্ষ্য করিয়া বলিতেনঃ

******************************************************

তোমরা এই হাদীস পরস্পর মিলিত হইয়া চর্চা কর। তাহা হইলে ইহা তোমাদের নিকট হইতে বিলুপ্ত হইবে না। কেননা এই হাদীস কুরআন মজীদের ন্যায় সুসংবদ্ধ, সংকলিত ও সংরক্ষিত নয়। এই কারণে তোমরা ইহার ব্যাপক চর্চা না করিলে ইহা তোমাদের নিকট হইতে বিলীন হইয়া যাইবে।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৭৭।]

হযরত ইবন আব্বাসের নিম্নোক্ত বানীও এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলিতেনঃ

******************************************************

তোমরা যখন আমাদের নিকট হইতে কোন হাদীস শুনিতে পাও তখন তোরা পারস্পরিক উহার চর্চা কর।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৭৮।]

হযরত ইবন উমর (রা) তাঁহার ছাত্রদিগকে তাকীদ করিয়া বলিতেনঃ

******************************************************

তোমাদের কেহ যখন অপর লোকের নিকট হাদীস বর্ণনার ইচ্ছা করে, তখন যেন সে অবশ্যই উহা তিন তিনবার আবৃত্তি করিয়া লয়।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৭৮।]

উপরিউক্ত বিস্তারিত আলোচনা হইতে প্রমাণিত হয় যে, সাহাবায়ে কিরাম (রা) যেমন নিজেরা হাদীস মুখস্থ রাখিতে ও উহার ব্যাপক প্রচার করিতে চেষ্টা করিতেন অনুরূপভাবে তাবেয়ী যুগের যে সব লোক তাঁহাদের নিকট হাদীস শিক্ষা করিতেন তাহাদিগকে উহা মুখস্থ করিয়া রাখিতে, উহার চর্চা করিতে ও পরবর্তী লোকদিগকে উহার শিক্ষাদান করিতে বিশেষভাবে তাকীদ করিতেন।

 

হাদীস বর্ণনায় সতর্কতা

নবী করীম (স) তাঁহার হাদীস প্রচার ও অপর লোকদের নিকট উহা বর্ণনা করার সুস্পষ্ট নির্দেম দিয়াছেন। কিন্তু এই প্রচার ও বর্ণনাকে তিনি অবাধ, স্বাধীন ও নিরংকুশ করিয়া দেন নাই। বরং তিনি হাদীস বর্ণনা ও প্রচারের ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতাবলম্বনের জন্য অত্যন্ত কড়া ভাষায় তাকীদ করিয়াছেন এবং তাঁহার নামে কোন মিথ্যা মনগড়া ও অসম্পূর্ণ কথা বর্ণনা ও প্রচার করিতে তীব্র ভাষায় নিষেধ করিয়াছেন। এখানে এই প্রসঙ্গে রাসূলে করীম (স)-এর কয়েকটি বাণী উল্লেখ করা যাইতেছে।

হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

যে ব্যক্তি ইচ্ছা করিয়া আমার সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলিবে, সে যেন তাহার আশ্রয় জাহান্নামে খুজিঁয়া লয়।

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেনঃ

******************************************************

যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক আমার সম্পর্কে মিথ্যা বলিবে, সে যেন জাহান্নাম তাহার আশ্রয় বানাইয়া লয়।

হযরত মুগীরা ইবন শু’বা বলেনঃ

******************************************************

আমি রাসূল (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি যে, আমার সম্পর্কে কোন প্রকার মিথ্যা কথা বলা অন্য কাহারো সম্পর্কে মিথ্যা বলার সমান নয়। কাজেই আমার সম্পর্কে যে মিথ্যা কথা ইচ্ছা করিয়া বলিবে, সে যেন জাহান্নামে তাহার আশ্রয় খুঁজিয়া লয়।[এই সব কয়টি হাদীস সহীহ মুসলিম ****************************১ম খণ্ড, ৭ম পৃষ্ঠা হইতে গৃহীত।]

বিভিন্ন সাহাবীর সামান্য শাব্দিক পার্থক্য সহকারে উল্লিখিত তিনটি হাদীসেরই মূল প্রতিপাদ্য কথা একই এবং তাহা এই যে, রাসূল (স) সম্পর্কে বা তাঁহার নামে কোনরূপ মিথ্যা কথা বলা কিংবা নিজের মনগড়া কথা রাসূলের নামে ও তাঁহার কথা বলিয়া চালাইয়া দেওয়া অত্যন্ত গুনাহের কাজ। নবী করীম (স) এইরূপ কাজ সম্পর্কে কঠোর নিষেধবাণী উচ্চারণ করিয়াছেন। হযরত মুগীরা (রা) বর্ণিত হাদীস হইতে জানা যায় যে, রাসূল (স) সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলা অপর কাহারো সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলার সমান নয়। কেননা রাসূল ও রাসূলের কথা আল্লাহ ও আল্লাহর কালামরে পরে পরেই ইসলামী শরীয়াতের সনদ ও জ্ঞান-উৎস। কাজেই এইখানে কোনরূপ মিথ্যার অনুপ্রবেশ হইলে গোটা শরীয়াতের ভিত্তিই দুর্বল ও অবিশ্বাস্য হইয়া পড়ে। আর ইসলামী শরীয়াতের ভিত্তি দুর্বল হইলে অতঃপর মানুষের মুক্তির কোন পথই আর উন্মুক্ত থাকে না। ইরশাদুস সারী শরহে বুখারী গ্রন্হে এই হাদীসটি সম্পর্কে বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

এই হাদীসটি বিশুদ্ধতা ও সনদ শক্তির অকাট্যতার দিক দিয়া চূড়ান্ত ও অনস্বীকার্য। মুহাদ্দিসীনের এক বিরাট জামা’আত এই হাদীসটিকে ‘মুতাওয়াতির’ হাদীস বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।[*****************]

ইমামুল হারামাইন আবুল মায়ালীর পিতা শায়খ আবূ মুহাম্মদ আল-জুয়াইনী বলিয়াছেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স) সম্পর্কে যে লোক ইচ্ছা করিয়া মিথ্যা বলিবে, সে কাফির হইয়া যাইবে।[ঐ]

বস্তুত হাদীস বর্ণনা সম্পর্কে রাসূলে করীমের এইসব কঠোর সাবধান বাণীর কারণে সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূল সম্পর্কে কোন কথা বলিতে অত্যন্ত ভয় পাইতেন, বলিতে গেলে অতিমাত্রায় সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করিতেন এবং প্রত্যেকেই নিজের জানা ও বহুবার শোনা কথাকে অপর সাহাবীর নিকট পুনরায় শুনিয়া উহার সত্যতা ও যথার্থতা যাচাই করিয়া লইতেন। ভূল হইলে তাহা সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করিয়া লইতেও একবিন্দু ক্রটি করিতেন না। এমনটি রাসূল সম্পর্কে কোন মিথ্যা বলা হইয়া যাওয়ার আশংকায় অনেক সংখ্যক সাহাবীই হাদীস বণনা করিতে সাহস পাইতেন না। আর যখন বর্ণনা করিতেন, তখন তাঁহারা ভয়ে থর থর করিয়া কাপিতেঁন। অত্যন্ত দায়িত্ব ও চেতনাবোধ সহকারে প্রত্যেকটি হাদীস ও হাদীসের প্রত্যেকটি কথা উচ্চারণ করিতেন।

এই কারনে সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়িগণ নির্ভরযোগ্য অকাট্যভাবে প্রমাণিত ও বর্ণনা পরম্পরা শৃঙ্খলের ধারাবাহিকতা অটুট ও অবিচ্ছিন্ন না হইলে কখনই কোন হাদীস কবুল করিতেন না। পরবর্তীকালের হাদীস সংগ্রহকারীদের নিকট নিম্নোক্ত নীতি সর্ববাদ সম্মতরূপে গৃহীতি হইয়াছেঃ

******************************************************

রাসূল সম্পর্কে একটি হাদীসও কাহারো ইচ্ছাপূর্বক মিথ্যা বলা প্রমাণ হইয়া গেলে সে ফাসিক সাব্যস্ত হইবে, তাহার বর্ণিত সমস্ত হাদীসই প্রত্যাহৃত হইবে এবং উহার কোনটিকেই শরীয়াতের দলীল হিসাবে গ্রহণ করা যাইবে না।[************ ১ম খণ্ড,  পৃষ্ঠা ৮।]

হাদীস বর্ণনায় সতর্কতাবল’ন সম্পর্কে এই নীতিমূলক আলোচনার পর সাহাবায়ে কিরামের জীবনের কতিপয় বাস্তব ঘটনার উল্লেখ করিয়া এই বিষয়টির উপর আলোকপাত করা আবশ্যক। আমরা এখানে কয়েকজন সাহাবীর কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করিতেছি।

১। হযরত যুবায়র (রা) আদৌ কোন হাদীস বর্ণনা করিতেন না। একদিন হযরত আবদুল্লাহ (রা) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ আপনি অন্যান্য সাহাবীদের মত হাদীস বর্ণনা করেন না কেন? তিনি বলিলেনঃ রাসূলের সাথে আমার যদিও বিশেষ সম্পর্ক ছিল, তবুও যেহেতু আমি রাসূলের নিকট শুনিয়াছি, তিনি বলিয়াছেনঃ যে ব্যক্তি আমার সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলিবে, সে যেন জাহান্নামে তাহার ঠিকানা বানাইয়া লয়। (এই ভয়ে হাদীস বর্ণনা করি না।)[আবূ দাউদ, কিতাবুল ইলম **********************]

২।  বহু সংখ্যক সাহাবী একাদিক্রমে অনেক বৎসর পর্যন্ত ***************- ‘রাসূল (স) বলিয়াছেন’ এইরূপ উক্তি করিতেন না। ইমাম শা’বী বলেনঃ আমি এক বৎসর পর্যন্ত হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমরের নিকট অবস্থান করিয়াছি। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে তিনি কোন হাদীস বর্ণনা করেন নাই। হযরত সায়ের  ইবন ইয়াযীদ (রা) বলেনঃ আমি হযরত তালহা ইবন আবদুল্লাহ হযরত সায়াদ, হযরত মিকদাদ ও আবদুর রহমান ইবন আওফ (রা)- এর সংস্পর্শে বহুদিন অবস্থান করিয়াছি; কিন্তু কাহাকেও কোন হাদীস বর্ণনা করিতে দেখি নাই। তাবে হযরত তালহা কেবলমাত্র উহুদ যুদ্ধের দিন সম্পর্কে হাদীস বর্ণনা করিতেন।[সহীহ বুখারী, ১ম খণ্ড, কিতাবুল জিহাদ, পৃষ্ঠা ৩৯৬।]

৩। হযরত সায়ের ইবন ইয়াযীদ (রা) বলেনঃ আমি মদীনা হইতে মক্কা পর্যন্ত হযরত সায়াদ ইবনে মালিক (রা)- এর সহিত একত্রে সফর করিয়াছি; কিন্তু এই দীর্ঘ পথের মধ্যে তাঁহার মুখ হইতে একটি হাদীসও শুনিতে পই নাই।[সুনানে ইবনে মাজাহ***************************]

৪। অনেক লোক সাহাবায়ে কিরামরে নিকট হাদীস শ্রবণের ইচ্ছা প্রকাল করিতেন, কিন্তু অনেক সময় তাঁহারা হাদীসি বর্ণনা করিতে অস্বীকার করিয়া বসিতেন। একবার কিছু লোক হযরত যায়দ ইবন আরকাম (রা) কে বলিলেনঃ আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করুন- হাদীস বর্ণনা করিয়া আমাদিগকে শোনান। ইহার উত্তরে তিনি বলিলেনঃ আমরা বৃদ্ধ হইয়াছি, ভুলিয়া গিয়াছি; হাদীস বর্ণনা করা বড়ই কঠিন কাজ।

৫। হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) কে একবার হাদীস বর্ণনা করিতে বলা হইলে তিনি জওয়াবে শুধু বলিলেন ‘ইনশা আল্লাহ’।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৪৬।]

অর্থাৎ তিনি হাদীস বর্ণনার দায়িত্ব এড়াইয়া যাইতে চাহিয়াছিলেন। (আর অনেক সাহাবীরই এইরূপ রীত ছিল।)। তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

রাসূলের এই বানী-‘আমার সম্পর্কে যে মিথ্যা বলিতে ইচ্ছা করিবে সে যেন জাহান্নামে তাহার আশ্রয় বানাইয়া লয়’–আমাকে তোমাদের নিকট অধিক হাদীস বর্ণনা করিতে নিষেধ করে।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১।]

ইহার অর্থ এই নয় যে, তিনি আদ্য কখনো হাদীস বর্ণনা করিতেন না। হাদীস বর্ণনা করিতেন; কিন্তু এই ব্যাপারে তিনি যারপরনাই সতর্কতা অবলম্বন করিতেন।[****************] তাঁহার সম্পর্কে বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

হযরত আনাস (রা) হাদীস বয়ান কারা সময় অত্যন্ত ভীত ও সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িতেন- তাঁহার অন্তর কাঁপিয়া উঠিত। এই কারণে তিনি হাদীস বর্ণনা করার পর বলিতেনঃ রাসূলে করীম (স) এইরূপ বলিয়াছেন কিংবা ঠিক যেরূপ তিনি বলিয়াছেন।[মুসনাদে ইমাম আহমদ, ৫ম খণ্ড পৃষ্ঠা ১৪০।]

যে সব হাদীসের মর্মোদ্ধারে ভূল হওয়ার আশংকা থাকিত, তাহা হযরত আনাস (রা) আদৌ বর্ণনা করিতেন না। এতদ্ব্যতীত রাসূলের নিকট হইতে সরাসরি শ্রুত হাদীসের মধ্যেও পার্থক্য করিতেন।[মুসনাদে ইমাম আহমদ, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪০।]

৬। হযরত উবাই ইবন কায়াব (রা) হাদীস বয়ান করিতেন, কিন্তু এই কাজে তিনি অপরিসীম সতর্কতা অবলম্বন করিতেন। তিনি যদিও রাসূলের খুবই প্রিয়পাত্র ছিলেন এবং জীবনের বেশীর ভাগ সময় তিনি রাসূলের সংস্পর্শেই অতিবাহিত করিতেন; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও তিনি রাসূলের খুব বেশী হাদীস বর্ণনা করেন নাই। তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মাত্র ৬৪ টি। [****************]

৭। হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) ইলমে হাদীসে বিরাট দক্ষতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও হাদীস বয়ান করিয়াছেনঃ সাহাবীদের সমাজে হাদীস বয়ান করার ব্যাপারে হযরত ইবন উমর (রা) অপেক্ষা অধিক সতর্ক আর কেহ ছিলেন না। তিনি হাদীস কম বেশি করিয়া বর্ণনা করাকেও ভয় করিতেন।[তাযকিরাতুল হুফফায, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪।]

আবু জাফর তাবেয়ীও এই কথারই প্রতিধ্বনি করিয়াছেন।[মুস্তাদরাক হাকেম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬১।]

সায়ীদ তাঁহার পিতার জবানীতে বলিয়াছেনঃ হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে ইবন উমর অপেক্ষা অধিক সতর্ক আমি আর কাহাকেও দেখি নাই।[*********************]

বস্তুত এই সতর্কতাবলম্বনের কারণেই তিনি সাধারণত হাদীস বর্ণনা করিতে রাযী হইতেন না।[***************]

৮। হযরত আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা)-ও খুব কম এবং কদাচিৎ হাদীস বর্ণনা করিতেন। তিনি রাসূল (স) সম্পর্কে মিথ্যা বলা সম্পর্কিত হাদীস সম্মুখে রাখিয়াই এই নীতি অবলম্বন করিয়াছিলেন। কিছু সংখ্যক লোক একবার তাঁহাকে বলেনঃ আপনাকে খুব কম হাদীস বর্ণনা করিতে দেখিতেছি, অথচ অমুক অমুক সাহাবী এবং হযরত ইবন মাসউদ (রা) যথেষ্ট সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করেন। অন্য কথায় রাসূলের সংস্পর্শে আপনার বিশিষ্ট স্থান থাকা সত্ত্বেও হাদীস বর্ণনায় আপনি এতদূর পশ্চাদপদ কেন? ইহার জওয়াবে তিনি বলিলেনঃ

******************************************************

শোন, ইসলাম কবুল করার পর আমি কখনো রাসূল (স)- এর নিকট হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া অবস্থান করি নাই। কিন্তু আমি রাসূল (স) কে বলিতে শুনিয়াছিঃ আমার সম্পর্কে যে মিথ্যা কথা বলিবে, সে যেন জাহান্নামে তাহার আশ্রয় করিয়া লয়।[মুসনাদে ইমাম আবু হানীফা (উর্দূঅনবাদ), পৃষ্ঠা ৭৩, বুখারীশরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১। বুখারীর বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদের নামের উল্লেখ নাই; কিন্তু ইবন মাজা’হর রেওয়ায়েতে তাঁহার উল্লেখ আছে।(****************) এবং ইসমাঈলীর  বর্ণনা ********** ‘যখন হইতে আমি ইসলাম কবুল করিয়াছি’ কথাটির উল্লেখ আছে, বুখারীতে তাহা নাই।]

বস্তুত এই ভয়ই ছিল তাঁহার কম সংখ্যক হাদীস বর্ণনার একমাত্র কারণ।

 

হাদীস লিখন

হাদীস সংরক্ষণের যে স্বাভাবিক ব্যবস্থার বিস্তারিত আলোচনা ইতিপূর্বে পেশ করা হইয়াছে, হাদীস সংরক্ষণের মূলে তাহাই একমাত্র উপায় ছিল না। বরং ইহা হইতেও অধিকতর দৃঢ় ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে হাদীস সংরক্ষিত হইয়াছে। হাদীস সংরক্ষণের এই ব্যবস্থা হইতেছে হাদীস লিখন।

হাদীস সম্পর্কে সাধারণ একটি ভূল ধারণা অনেক লোকের মনেই বদ্ধমূল দেখা যায়। হাদীসরে শক্রগণ উহাকে হাদীসের অমৌলিকত্ব ও অপ্রামাণিকতা প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে একটি যুক্তি হিসাবে পেশ করিয়া থাকে। তাহা এই যে, হাদীস নবী করীম (স)- এর জীবদ্দশায় লিপিবদ্ধ হয় নাই, হইয়াছে তাঁহার ইন্তেকালের শতাব্দীকাল পরে। অতএব তাঁহাদের মতে হাদীস বিশ্বাসযোগ্য নহে।

কিন্তু হাদীস সংরক্ষণের ইতিহাস সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করিলে একথা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, এই ধারণা আদৌ সত্য নহে, বরং ইহা শক্রদের অপপ্রচার ও মিথ্যা রটনা মাত্র। ইতিহাস ইহার তীব্র প্রতিবাদ করে।বস্তুত হাদীস সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি এতখানি ভিত্তিহীনি ও অপ্রমাণিত থাকিতে পারে না। ইহার সংরক্ষনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রকার সম্ভাব্য ব্যবস্থাই যথাসময়ে গ্রহণ করা হইয়াছে। ইহাকে যেমন মুখস্থ করা ও স্মরণ রাখা হইয়াছে, নানাভাবে ইহার চর্চা করা হইয়াছে; অনুরূপভাবে ইহার জন্য যথাসময়ে ও যথেষ্ট পরিমাণে লেখনী শক্তিরও ব্যবহার এবং প্রয়োগ হইয়াছে- আর সর্বোপরি এই সব ব্যবস্থার মধ্যে কোন একটিরই উপর একান্তভাবে নির্ভর করা হয় নাই, একটির উপর নির্ভর করিয়া অন্য সব উপায়ের প্রতি কিছুমাত্র উপেক্ষা প্রদর্শন করা হয় নাই। বরং একই সঙ্গে ও প্রায় একই সময় এই সব ব্যবস্থাই একটি শ্রেণী পরস্পরা নিমানুযায়ী কার্যকর করা হইয়াছে। হাদীস লিখন সম্পর্কে আমাদের বর্তমান পর্যায়ের আলোচনা হইতেই তাহা পাঠকদের সম্মুখে উজ্জ্বল হইয়া উঠিবে।

প্রথমেই উল্লেখ করিয়াছি, নবুয়্যাতের প্রথমকালে যখন কুরআন মজীদ নাযিল হইতেছিল, তখনই রাসূলে করীম (স) তাহা যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিবার জন্য বহু ‘ওহী লেখক’ নিযুক্ত করিয়াছিলেন।[************ এক বিবরণ অনুযায়ী ওহী লেখকদের সংখ্যা ছিল অন্ততপক্ষে চল্লিশজন।**********] হযরতের প্রতি কোন আয়াত বা সূরা নাযিল হইলেই তাহা একদিকে যেমন তিনি সমবেত ইসলামী জনতাকে একটি ভাষণের ন্যায় মুখস্থ পড়িয়া শোনাইতেন, অপরদিকে সেই সঙ্গে উক্ত ওহী লেখকদের দ্বারা তাহা সঠিকরূপে লিখাইয়ও রাখিতেন। ইহা ছিল রাসূলে করীমের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘সরকারী’ ব্যবস্থা। ইহার ফলেই রাসূলের জীবনের শেষভাগ পর্যন্ত কুরআন মজীদ পূর্ণ লিখিত ও সংরক্ষিত রূপ লাভ করিতে সমর্থ হয়।

কিন্তু এই সময় কেবল যে নির্দিষ্ট সংখ্যক ‘ওহী লেখক’-ই ওহী বা কুরআন লিখিয়া রাকিতেন, আর অপর কোন সাহাবী তাহা লিখিতেন না, তাহা নহে। বরং রাসূলে করীম কর্তৃক নিযুক্ত লেখক ছাড়া আরো বহু সাহাবী রাসূলের দরবারে উপস্থিত থাকিয়া নিজস্বভাবে কুরআনের আয়াত লিখিয়া রাখিতেন।

রাসূলে করীমের হাদীস লিখনের ব্যাপারেও আমরা তাহাই দেখিতে পাই। সেখানে কিছু সংখ্যক সাহাবী রাসূলের অনুমতিক্রমে এবং বহ লোক নিজস্বভাবে স্বকীয় উদ্যোগে হাদীস লিখিয়া রাখিতে শুরু করেন। কিন্তু প্রথম পর্যায়ে ইহাতে একটি অসুবিধা দেখা দেয়। তাহা এই যে, বহুসংখ্যক সাহাবী রাসূলের  নিকট হইতে যাহা কিছুই শুনিতে পাইতেন, তাহা আল্লাহর বাণী হউক কি রাসূলের নিজস্ব কথা- সবই একসঙ্গে ও একই পাত্রে লিখিতে শুরু করেন। ইহার ফলে কুরআন ও হাদীস সংমিশ্রিত হইয়া যাওয়ার এবং উহাদের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য করা কঠিন হইয়া পড়ার তীব্র আশংকা দেখা দেয়। আর ইহার পরিণাম যে কত ভয়াবহ, তাহা সহজেই বুঝিতে পারা যায়। নবী করীম (স) ইহাকে কিছুতেই সমর্থন করিতে পারেন না। এইরূপ লেখকদের লিখিত জিনিস দেখিয়া তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এই প্রসঙ্গে হযরত আবূ সাঈদ (রা) বর্ণিত হাদীসে বলা হইয়াছেঃ একদা কিছু সংখ্যক সাহাবী বসিয়া লিখিতেছ? তাঁহারা বলিলেনঃ *********** ‘আপনার নিকট হইতে যাহা শুনিতে পাই, তাহাই আমরা লিখিয়া লইতেছি। তখন তিনি বলিলেনঃ *********** আল্লাহর কিতাবের সংগে মিশাইয়া আর একখানা কিতাব লিখিত হইতেছে কি?

ইহার অথ এই যে, কুরআন ও হাদীস একত্র মিলাইয়া মিশাইয়া লিপিবদ্ধ করা ও উহাদের মধ্যে পার্থক্য করার কোন ব্যবস্থা না করা কুরআনের চিরস্থায়ী ও অক্ষুণ্নতার পক্ষে যেমন মারাত্মক, তেমনি মারাত্মক দ্বীন-ইসলামেন ভিত্তির দৃঢ়তা ও নির্ভরযোগ্যতার পক্ষেও। এই কারণে রাসূলে করীম (স) তাঁহাদিগকে আদেশ দিলেনঃ

******************************************************

এইরূপ লেকার নিয়ম তোমরা ত্যাগ কর। কেবলমাত্র আল্লাহর কিতাব খালিসভাবে লিপিবদ্ধ কর। উহার সহিত অন্য কিছুই মিলইও না।

ফলে এইসব সাহাবী কর্তৃক কুরআন ও হাদীস মিলাইয়া যাহা কিছু লিখিত হইয়াছিল, তাহা সব বিনষ্ট করিয়া দেওয়া হয়, অতঃপর কুরআনকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে লিপিবদ্ধ করা হইতে থাকে।[মুসনাদে ইমাম আহমদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭১, মজমায়ুজ জাওয়ায়িদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫২।]

রাসূলে করীমের এই কাজ ও কথার যৌক্তিকতা একটু চিন্তা করিলেই বুঝিতে পারা যায়। কুরআনকে যদি কোন একজন সাহাবীও হাদীসের সঙ্গে একত্র করিয়া লিখিয়া রাখিতেন, তাহা হইলে উত্তরকালে উহা কুরআন মজীদের নির্ভরযোগ্যতার বিরুদ্ধে এক চ্যালেঞ্জ হইয়া দাঁড়াইত। কুরআন মজীদকে বর্তমানের ন্যায় খালিসভাবে অবিকৃত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক মহান গ্রন্হ হিসাবে দুনিয়ার মানুষ কিছুতেই লাভ করিতে পারিত না; আল্লাহর কালাম এবং রাসূলের কথা ও কাজের বিবরণকে আলাদা আলাদাভাবে জানিতে ও চিহ্নিত করিতে সমর্থ হইত না। এই কারণে প্রতশ পর্যায়ে নবী করীম (স) কুরআন ব্যতীত অন্য কিছু লিপিবদ্ধ করিতে সাহাবাগণকে স্পষ্ট ও তীব্র ভাষায় নিষেধ করিয়াছিলেন; কিন্তু উহার মৌখিক প্রচার ও বর্ণনা করিতে রাসূলে করীম (স) আদৌ নিষেধ করেন নাই। নবী করীম (স)-এর বাণী নিম্নরূপঃ

******************************************************

আমার কোন কথাই লিখিও না। কুরআন ব্যতীত আমার নিকট হইতে অন্য কিছু কেহ লিখিয়া থাকিলে তাহা মুছিয়া ফেল। তবে আমার কথা বা আমার সম্পর্কে কথা মৌখিক বর্ণনা কর, তাহাতে দোষ নাই। কিন্তু মৌখিক বর্ণনায়ও যেন কোন প্রকার মিথ্যার প্রশ্রয় দেওয়া না হয়। বস্তুত যে আমার সম্পর্কে কোন মিথ্যা কথা বলিবে, সে যেন জাহান্নামে তাহার আশ্রয় গ্রহণ করে।[সহীহ মুসলিম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৪, আবু সাঈদ খুদরী বর্ণিতঃ *****************************]

হযরত আবূ সাঈদ বর্ণিত আর একটি হাদীস নিম্নরূপঃ

******************************************************

আমরা রাসূল (স)-এর নিকট (কুরআন ছাড়া অন্য কথা-হাদীস) লিপিবদ্ধ করিয়া রাখার অনুমতি চাহিয়াছিলাম; কিন্তু তিনি আমাদিগকে অনুমতি দেন নাই।[*****************]

হযরত যায়দ ইবন সাবিত (রা) হইতেও এই অর্থেরই একটি হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। তাহা এইঃ

******************************************************

রাসূলে করীম (স) আমাদিগকে (কুরআন ব্যতীত) কোন কিছুই না লিখিতে আদেশ করিয়াছেন।[ঐ]

কুরআন ব্যতীত কোন কিছু লিখিতে নিষেধ করার ও সেই ‘অন্য কিছু’ লিখিবার অনুমতি না দেওয়ার গভীর তাৎপর্য রহিয়াছে। রাসূলে করীম (স)- এর এইরূপ করার মুলীভুত কারণ কি, তাহা অবশ্যই প্রণধানযোগ্য।

ইহার প্রথশ কারণ কুরআনের সাথে অন্য জিনিস মিলাইয়া মিশাইয়া লিখায় ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার আশংকা। এই সময় পর্যন্ত মুসলমানগণ সাধারভাবে কুরআনের বিশেষ ভাষা, ভাব ও বাণী এবং উহার গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাবধারার সহিত পুরামাত্রায় পরিচিত হইতে পারেন নাই। কুরআন ও অ-কুরআনের মাঝে পার্থক্য করার মত তীক্ষ্ম দৃষ্টি ও বিবেক-বুদ্ধিও তাহাদের মধ্যে তখনও জাগ্রত হয় নাই। ইহার দ্বিতীয় কারণ এই যে, রাসূলে করীম (স)- এর এই নিষেধ ছিল সেই সব সাহাবীদের প্রতি, যাহাদের স্মরণশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর, যাঁহারা কানে শুনিয়া খুব সহজেই স্মৃতিপটে মুদ্রিত করিয়া লইতে পারিতেন, কিছু মাত্র ভুলয়া যাইতেন না। কেননা এই শ্রেণীর সাহাবিদণও যদি লেখনীর উপর নির্ভরশীল হওয়ার অভ্যাস করিতে শুরু করেন, তাহা হএল স্মৃতিশক্তির প্রাখর্য হ্রাস পাওয়ার নিশ্চিত আশংকা রহিয়াছে। এবং এইভাবে আল্লাহর এ মহান নিয়ামতের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন কিছুতেই উচিত হইতে পারে না।[***********************]

ইমাম নববী ও সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

******************************************************

হাদীস লিখিতে প্রথমত নিষেধ করা হইয়াছিল। কুরআন পরিচিত হওয়ার পূর্বে এই নিষেধ ছিল প্রত্যেকেরই জন্য। তখন কুরআন ব্যতীত অপর কোন কিছুই লিখিয়া রাখিতে নিষেধ করা হইয়াছিল কুরআনের সঙ্গে উহার মিশ্রিত হওয়ার ও তদ্দরুন সন্দেহ ও সংশয়  সৃষ্টি হওয়ার ভয়ে। পরে যখন কুরআন সর্বজনপরিচিত হ্য় এবং এই ভয়ের কারণ হইতে নিরাপত্তা লাভ হয় তখন উহা লিখিবার অনুমতি দেওয়া হয়।

আর দ্বিতীয়ত যাঁহাদের স্মরণশক্তি নির্ভরযোগ্য ছিল, তাঁহারা কেবল লেখনীর উপর নির্ভর করিয়া বসিতে পারে- এই ভয়ে তাঁহাদিগকে লিখিতে নিষেধ করা হয়। কিন্তু সে নিষেধের ফলে লেখা মূলতই হারাম ছিল না। যাঁহাদের স্মরণশক্তি নির্ভরযোগ্য ছিল না, তাঁহাদিগকে হাদীস লিখিয়া লওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।[*******************]

ইমাম খাত্তাবী এই প্রসঙ্গে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

মনে হয় হাদীস লিখিতে নিষেধ করা প্রথশ যুগের ব্যাপার ছিল। পরবর্তীকালে ইহা জায়েয করা হইয়াছে। আর নিষেধ করা হইয়াছিল কুরআনের সহিত মিশাইয়া একই কাগজে হাদীসি লিখিতে। কেননা তাহার ফলে কুরআন ও হাদীস সংমিশ্রিত হইয়া যাইত এবং তাহা পাঠকদের পক্ষে বড় সন্দেহের ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইত।[**********]

ইমাম নববী ও ইমাম খাত্তাবীর এই বিশ্লেষণ হইতে প্রমাণিত হয় যে, প্রথম পর্যায়ে সকলকেই কুরআন ব্যতীত অপর কিছু লিখিতে নিষেধ করা হইলেও তাহাতে ব্যতিক্রম ছিল। নবী করীম (স) সাহাবীদের স্মরণশক্তিকে পূর্ণ মাত্রায় প্রয়োজনীয় কাজে প্রয়োগ করিতে চাহিয়াছিনে। এই কারণে প্রচণ্ড স্মরণশক্তিসম্পন্ন লোকদিগকে হাদীস মুখস্থ করা পরিত্যাগ করিয়া কেবল লেখনী শক্তির উপর নির্ভরশীল হইতে নিষধ করিয়াছিলেন। কিন্তু যাঁহারা স্মরণশক্তি ও লেখনী উভয় শক্তির ব্যবহার করিতে চাহিয়াছেন, তাঁহাদিগকে তিনি হাদীস লিখিতে নিষেধ করেন নাই। বরং তাঁহাদিগকে অনুমতিই দিয়াছেন। নিম্নের হাদীস হইতেও এই কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ঃ

******************************************************

আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি রাসূলের নিকট আসিয়া বলিলেনঃ হে রাসূল ! আমি হাদীস বর্ণনা করিতে চাহি। এইজন্য আমি স্মরণশক্তির ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে লেখনীর ও সাহায্য গ্রহণ করিতে ইচ্ছা করিয়াছি, অবশ্য আপনি যদি তাহা পছন্দ করেন। তখন নবী করীম (স) বলিলেনঃ আমার হাদীস লিখিতে চাহিলে উহা স্মরণ রাখার সঙ্গে সঙ্গে লিখিয়অ রাখার কাজও করিতে পার।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৬৭।]

শুধু তাহাই নয়, নবী করীম (স)- এর দরবারে বহু সংখ্যক লেখনীধারক লোকই সব সময় উপস্থিত থাকিতেন এবং রাসূলের মুখে যে কথাই তাঁহারা শুনিতে পাইতেন, তাহাই লিখিয়া লইতেন- তাহাও এক ঐতিহাসিক সত্য। হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমরের নিম্নোক্ত কথা হইতেই তাহা প্রমাণিত হয়ঃ

******************************************************

আমরা বহু কয়জন লোক রাসূলের চতুর্থাংশে লেখার কাজে ব্যস্ত ছিলাম। এমন সময় রাসূলে করীম (স)-কে প্রশ্ন করা হইলঃ কনস্টান্টিনোপাল নগর প্রথম বিজিত হইবে, না রোম? উত্তরে তিনি বলিলেনঃ না হেরাক্লিয়াসের শহুর কনস্টান্টিনোপালই প্রথম বিজিত হইবে।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৬৮।]

এই বর্ণনায় প্রথম বাক্যটি প্রণিধানযোগ্য। ইহা হইতে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলে করীম (স) যখনই দরবারে বসিতেন, তখনই তাঁহার চারিপার্শ্বে লেখকগণও বসিয়া যাইতেন। আর এই সব দলীল-প্রমাণ হইতে এই কথাই স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, প্রথম পর্যায়ে প্রধানত কেবলমাত্র কুরআন মজীদই লিপিবদ্ধ হইতে থাকে। আর হাদীসি লেখার জন্য সরকারী পর্যায়ে কোন ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয় নাই। তখন হাদীস সাধারণভাবে মুখস্থ করা, মৌখিক চর্চা, বর্ণনা ও আলোচনার মাধ্যমেই সংরক্ষিত হয়। এইভাবে কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পর সাহাবিগণকে হাদীসলেখার সাধারণ অনুমতি দেওয়া হয়। তখন হাদীস সংরক্ষণের ব্যাপারে কুরআনের মতই সাহাবীদের স্মরণশক্তি, পারস্পরিক চর্চা ও বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে লেখনীশক্তিরও পূর্ণ ব্যবহার হইতে থাকে।[**************]

ইবনে কুতাইবা লিখিয়াছেনঃ

প্রথমে হাদীসি লিখিতে নিষেধ করেন এবং পরে লিখিয়া হিফাজত করার প্রযোজনীয়তা বুঝিতে পারেন।[************]

আল্লামা ইবন জাওযী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

প্রথমাবস্থায় লিখিতে নিষেধ করিয়াছেন। পরে লিখিবার অনুমতি দান করেন।[*************************]

এই পর্যায়ে তিনি সাহাবীদের লক্ষ্য করিয়া স্পষ্ট ভাষায় বলেনঃ

******************************************************

ইলমে হাদীসকে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখ।[***************]

ইলমে হাদীসকে লিখন সম্পর্কিত মূল মাসালাটি সম্পর্কে এক সংক্ষিপ্ত আলোচনা অবতারণা করা আবশ্যক। হাদীস লিখিয়া রাখা আদৌ জায়েয ছিল কিনা, সে বিষয়েও মতভেদ রহিয়াছে। আমাদের মতে হাদীস লিখিয়া রাখা শুধু জায়েযই নহে, ইহা ছিল দ্বীনের এক অতি জরুরী কাজ। স্বয়ং কুরআন মজীদ সবরকমের জরুরবী ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লেখনী ব্যবহারের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়াছেন। আল্লাহ তা’আল্লা ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

লেন-দেন ছোট হউক কি বড় ব্যাপার হউক, নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্তের জন্য তোমরা লিখিয়া রাখিতে একবিন্দু অবহেলা করিও না। লিখিয়া লওয়া আল্লাহর দৃষ্টিতে খুবই ইনসাফপূর্ণ, প্রমাণ রক্ষার জন্য সুষ্ঠু ও সন্দেহ হইতে বাচিঁবার জন্য অতি উত্তম ব্যবস্থা।[সূরা আল-বাকারা, ২৮২ আয়াত। মনে রাখা আবশ্যক যে, এই সূরাটি হিজরতের পর মদীনীয় জীবনের প্রথম অধ্যায়েই নাযিল হইয়াছিল এবং এই সময়ই সব লিখিয়া লইবার তাকীদ করায় হাদীস লিখিয়া রাখার কাজও সাহাবীগণ অবশ্যই করিয়া থাকিবেন। ফলে ইহাকে রাসূলে করীম (স) নিশ্চয়ই নিষেধ করেন নাই।]

ইমাম আবু হানিফা (র) এই আয়াতের ভিত্তিতে যুক্তি পেশ করিয়া বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আল্লাহ তা’আলা যখন সাধারণ লেনদেনের ব্যাপারও সন্দেহ সৃষ্টির আশংকা লিখিয়া লইতে আদেশ করিয়াছেন, আর ইলম –ইলমে হাদীস- মুখস্ত করিয়া রাখা যখন লেনদেনের কথা স্মরণ রাখা অপেক্ষা অনেক কঠিন, তখন এই সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টির ভয়ে তাহা লিখিয়া লওয়া বৈধ হওয়া অধিক প্রয়োজন ও সবচাইতে বেশী উপযুক্ত ব্যাপার।[*********************]

আল্লামা আবূ মলীহ অপর এক আয়াতের ভিত্তিতে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

লোকেরা মুহাদ্দিসগণকে হাদীস লিখিয়া রাখার জন্য দোষ দেয়। অথচ আল্লাহ তা’আলা নিজেই বলিয়াছেনঃ পূর্বের জাতিসমূহের অবস্থা আল্লাহর নিকট লিখিতভাবে সংরক্ষিত রহিয়াছে।[***************]

অথচ আল্লাহ তা’আলা না বিস্মৃত হন, না বিভ্রান্ত হন। এমতাবস্থায়, মানুষ ভূল-ভ্রান্তির প্রতিমূর্তি হইয়াও লিখার প্রয়োজন হইতে কিরূপে মুক্ত হইতে পারে?

অতএব, হাদীস লিখিয়া রাখা কোন কালেই সম্পূর্ণ হারাম ছিল না। শুরুতে উহাকে সাধারণভাবে মুলতবী রাখা হয়- যদিও এই সময় বিশেষ ব্যক্তিতে ইহার অনুমতিও দেওয়া হইয়াছিল।

এই পর্যায়ে যে মতভেদের উল্লেখ করা হইয়াছে, তাহার বিশেষ কোন মূল্য নাই। একেবারে প্রাথমিককাল ছাড়া সবসময়ই হাদীস লিখিয়া রাখা সম্পূর্ণ জায়েয ছিল।

ইবনুস সালাহ লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

পরে এই মতভেদ দূর হইয়া যায় এবং হাদীস লিখিয়া রাখা মুবাহ হওয়া সম্পর্কে সমস্ত মুসলমানই একমত হন। কেননা উহা যদি তখন লিখিত না হইত, তাহা হইলে শেষকালে উহা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হইয়া যাইত।[***************]

 

নবী (স) কর্তৃক লিখিত সম্পদ

ইসলামী আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে- মক্কী অধ্যায়ে – নবী করীম (স) কুরআন মজীদ ব্যতীত অন্যকিছু লিখিয়া রাখিবার অনুমতি দেন নাই। তাই হিজরতের পূর্বে মক্কী জীবনে কোন হাদীস লিখিত হইয়াছে বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তো হিজরতের পর মদীনীয় জিন্দেগী শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুরআন ছাড়াও হাদীসের বিরাট সম্পদ লিপিবদ্ধ হইতে থাকে। নিম্নলিখিত প্রমাণাদির ভিত্তিতে এই কথা জোর করিয়া বলা যাইতে পারে যে, মদীনীয় পর্যায়ে- নবুয়্যাতের এয়োদশ চতুর্দশ বৎসরে- কুরআন ও হাদীসের পারস্পরিক পার্থক্য বোধ সুস্পষ্ট হইয়া উঠার পর একদিকে যেমন হাদীস লিখিয়া লইবার সাধারণ অনুমতি প্রদান করা হয়, অন্যদিকে স্বয়ং নবী করীম (স) কর্তৃক লিপিবদ্ধ করানো বিপুল সংখ্যক সম্পদ মুসলমানদের হস্তে সঞ্চিত হয়। প্রসঙ্গত বলা যাইতে পারে যে, বদরের যুদ্ধ-বন্দীদের মুক্তির বিনিময়ে মদীনায় মুসলিম বালকদিগকে লেখাপড়া শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা হওয়ার পর[********************] হাদীস লেখা অধিকতর সহজ হয় এবং উহার মাত্রাও অধিক ব্যাপক হইয়া পড়ে। হযরত আবদুল্লাহ ইবন সাঈদ ইবনুল আ’স মদীনার মসজিদে নববীতে রীতিমত লিখা শিক্ষা দেওয়ার স্কুল খুলিয়া দিয়াছিলেন।[*********************] এতদ্বত্যতীত মদীনার নয়টি মসজিদে বালকদিগকে লেখাপড়া শিক্ষা দেওয়ারও ব্যবস্থা করা হইয়াছিল।[*****************] ফলে উত্তরকালে লিখা জানা বা লিখিতে সক্ষম লোকদের কোন অভাবই ছিল না।

ফলে জরুরী লিখার কাজ সম্পন্ন কারর জন্য নবী করীম (স) নিজের নিকট বহু ব্যক্তিকে নিযুক্ত করিয়াছিলেন এবং বহুসংখ্যক লেখক (লিখিতে সক্ষম) নানা বিষয়ের লিখন কার্য সম্পাদনের জন্য রাসূলের দরবারে সার্বক্ষণিকভাবে উপস্থিত থাকিতেন। আধুনিক ভাষায় বলিলে বলা যায়, তখন মদীনায় একটি পূর্ণাঙ্গ সচিবালয় গড়িয়া উঠিয়াছিল ও কাজ করিতেছিল। বিশেষ বিশেষ লিখার কাজ সম্পাদনের জন্য বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি নিযুক্ত ছিলেন। তাঁহাদের মধ্যে হযরত আলী (রা), হযরত উসমান (রা), হযরত যায়দ ইবন সাবিত (রা) [***************] ও হযরত উবাই ইবন কাব (রা) প্রমুখ সাহাবী কুরআন মজীদ লিপিবদ্ষ করণের কাজে দায়িত্বশীল ছিলেন। হযরত যুবায়র ইবনূল আওয়াম (রা) ও জহম ইবনুসসালত (রা) ছিলেন যাকাত-সাদাকাত-এর মাল-সম্পদের হিসাবরক্ষক। হযরত আবদুল্লাহ ইবনুল আরকাম (রা) ও আল-উলা ইবন উকবা (রা) জনগনের পারস্পরিক লেন-দেন ও চুক্তি প্রতিশ্রুতি সংক্রান্ত দলীল-দস্তাবিজ লিখিতেন। হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা) খেজুর ফসলের পরিমাণ ও তাহার উপর ধার্য যাকাতের পরিমাণ অনুমানপূর্বক লিখিয়া রাখিতেন। মুয়াইকীব ইবন আবূ ফাতিমাদসী (রা) রাসূলে করীমের প্রাপ্ত মালের বিবরণ লিপিবদ্ধ করিতেন।[******************] রাসূলে করীম (স)- এর সময়ে যেসব সাহাবী জিহাদে যোগদান করিতেন তাঁহাদের নাম-ধাম পরিচিতি লিখিয়া রাখারও ব্যবস্থা করা হইয়াছিল।[***************] লেখক হিনযিলা (রা) দরবারে প্রত্যেক অনুপস্থিত লেখকের স্থানে কাজ করিতেন। রাসূলে করীম (স)-এর সিলমোহরও তিনিই ধারণ ও ব্যবহার করিতেন।[***************************]

বিভিন্ন ভাষাভাষী লোকদের জন্য তাহাদের ভাষায় পত্রাদি লিখার কাজ করার জন্য রাসূলে করীম (স)-এর নির্দেশ অনুযায়ী তদানীন্তন সভ্য দুনিয়ায় প্রচলিত ভাষাসমূহ শিখিয়া লইয়াছেন বহু কয়জন সাহাবী। হযরত যায়দ ইবন সাবিত (রা) সুরীয়ানী ভাষা শিখিবার জন্য আদিষ্ট হইয়া উহা শিখিয়াছিলেন। এই ভাষায় লিখিত কোন পত্র রাসূলের নিকট আসিলে উহা পাঠ করিয়া লিখিত বিষয় সম্পর্কে রাসূলে করীম (স)- কে অবহিত করিতেন। রাসূলের দরবারে নিয়োজিনত লেখকদের সম্পর্কে বহু গ্রন্হও রচিত হইয়াছে। [***********************]

১। নবী করীম (স) মদীনায় হিজরত করিয়া স্থঅনীয়ভাবে বসবাস শুরু করার পর সর্বপ্রথম যেসব গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করেন, মদীনার ইয়াহুদী ও আশেপাশের খৃষ্টান এবং মদীনার আনসার ও মুহাজির মুসলমানদের পাস্পরিক অনাক্রমণ ও অন্যান্য শর্ত স’লিত এক দীর্ঘ চুক্তিনামা রচনা করা তাহার অন্যতম। উহার ভাষা ছিল এইঃ

******************************************************

মুহাম্মদ (স) আল্লাহর নবী ও রাসূল কর্তৃক কুরায়শ বংশের মু’মিন মুসলমান ও মদীনাবাসী যাহারা তাহাদের সঙ্গে মিলিত হইবে ও একত্রে জিহাদ করিবে, তাহাদের মধ্যে লিখিত চুক্তিনামা ইহা। সিদ্ধান্ত এই যে, তাহারা অন্যান্য লোকদের হইতে পৃথক এক স্বতন্ত্র উম্মত তথা জাতি হইবে।[***************]

এই চুক্তিনামা ইসলামের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক অমূল্য সম্পদ। ইহাতে মোট ৫২টি দফা সন্নিবেশিত হয়। ইহাতে মদীনা শরীফকে মুসলমানদের জন্য ‘হেরম’ ঘোষণা করা হয়।[কিতাবুল আমওয়াল, আবূ দউদ, পৃষ্ঠা ৩১১।] নিম্নোকত্ উদ্ধৃতি হইতে প্রমাণিত হয় যে, চুক্তিনামা যথারীতি লিখিত হইয়াছিল এবং ইসলামে ইহই সর্বপ্রথম লিখিত সম্পদঃ

******************************************************

হযরত ‘রাফে’ ইবন খাদীজা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে- তিনি বলেন, মদীনা একটি হেরেম। রাসূলে করীম (স) উহাকে হেরেম ঘোষণা করিয়াছেন। আমাদের নিকট এই চুক্তিনামা খাওলানী চর্মে লিখিত রহিয়াছে। [********]

হযরত আলী (রা) –এর নিকট এই লিখিত চুক্তিনামাখানি পরবর্তীকাল পর্যন্ত সুরক্ষিত ছিল। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমার নিকট আল্লাহর কিতাব এবং নবী করীম (স) হইতে প্রাপ্ত এই সহীফাখানি ছাড়া লিখিত সম্পদ আর কিছু নাই। সহিফাখানিতে লিখিত রহিয়াছেঃ মদীনা হেরেম। উহার সীমানা ‘আয়ের’ পাহাড় হইতে ঐ স্থান পর্যন্ত। এই হেরেমে যে কেহ কোন বিদ’আত উদ্ভাবন ও প্রচলন করিবে কিংবা কোন বিদ’আতকারীকে আশ্রয় দান করিবে, তাহারই উপর আল্লাহর ফেরেশতাদের এবং সমস্ত মানুষের লা’নত হইবে। তাহার নিকট হইতে কোনরূপ ব্যয় বা বিনিময় কবূল করা হইবে না। মুসলমানের প্রদত্ত নিরাপত্তা সর্বতোভাবে সমান মর্যাদায় গণ্য হইবে। কেহ যদি মুসলমানের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভংগ করে, তবে তাহার উপরও আল্লাহ, ফেরেশতা এবং সমস্ত মানুষের লা’নত। তাহার নিকট হইতে কোনরূপ ব্যয় বা বিনিময় গ্রহণ করা হইবে না।[**********************]

বস্তুত সভ্যতার ইতিহাসে এই চুক্তিনামাই একখানি প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্রের মর্যাদর অধিকারী এবং অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ দলীল।

১। রাসূলে করীম (স) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পর মুসলিম নাগরিকদের আদশুমারী গ্রহণ করেন। তিনি এ্ই উদ্দেশ্যে নিম্নোক্তদ্ধৃত ভাষায় এক ফরমান জারী করেনঃ

******************************************************

যে সব লোক ইসলাম কবুল করার কথা বলিয়াছে, তাহাদের নাম-ধাম আমার জন্য লিখিয়া দাও।

হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত হুযায়ফা (রা) বলেনঃ

******************************************************

অতঃপর আমরা রাসূলকে এক হাজার পাঁচশত ব্যক্তির নাম-ধাম ও পরিচয় লিখিয়া দিলাম।[*****************]

ইহাও রাসূলে করীম (স)- এর জীবন কালেরই এক লিখিত সম্পদ।

৩। তৃতীয় হিজরী সনের সফর মাসে বনী জামরা গোত্রের সাথে নবী করীম (স) এক সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তিনামাও লিখিত অবস্থায় পাওয়া গিয়াছে।[*****************]

অবশ্য নিম্নলিখিত দুইটি বিবরণ হইতে এই কথার ইংগিত পাওয়া যায় যে, হিজরতের অব্যবহিত পূর্বেও নবী করীম (স) অন্তত দুইটি ক্ষেত্রে লিখিত ফরমান দিয়াছিলেনঃ

(ক) তমীমদারীকে নবী করীম (স) এক লিখিত পরোয়ানা প্রেরণ করেন। [*****************]

(খ) হিজরত করিয়া মদীন যাওয়ার পথে নবী করীম (স) সুরাকার ইবন মালিক মুদলেজীকে এক নিরাপত্তালিপি লিখিয়া দিয়াছিলেন।[***************]

আল্লামা ইবন কাসীর উল্লেখ করিয়াছেনঃ

******************************************************

সুরাকা বলিলঃ আমার জন্য একটি দলীল লিখাইয়া দিন, যাহা আমার ও রাসূলের মধ্যবর্তী এই মুক্তির সিদ্ধান্তের প্রমাণ হইবে। অতঃপর নবী করীম (স) আমার জন্য হাড় বা পাতা বা ছেঁড়া কাপড়ে একটি লেখা তৈরী করাইয়া দিলেন।[****************]

৪। হযরত আবূ হুরায়ারা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, মক্কা বিজলেয়র বৎসর (৮ম হিজরী) খাজায়অ গোত্রের লোকগণ লাইস গোত্রের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। এই সংবাদ রাসূলে করীমের নিকট পৌঁছিলে তিনি তাঁহার জন্তু যানের পৃষ্ঠে সওয়ার থাকা অবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দান করেন। তাহাতে তিনি হেরেম শরীফের মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব, মাহাত্ম্য এবৃং নরহত্যার দণ্ড্ ও ‘দিয়ত’ সংক্রান্ত যাবতীয় হুকুম আহকাম বিস্তারিতভাবে বর্ণণা করেন। ভাষণ সমাপ্ত হইলে হযরত আবূ শাহ নামক জনৈক সাহাবী রাসূলে করীম (স)-কে বলিলেনঃ ****************************************************** হে রাসূল ! আমার জন্য ভাষণটি লিখাইয়া দিন। [আবূ শাহ যে রাসূল প্রদত্ত ভাষণটিই লিখিয়া দিতে বলিয়াছিলেন তাহার প্রমাণ এই যে, এই হাদীসের বর্ণনাকারী আলী ইবন মুসলিম ইমাম আওযায়ীকে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ  ************************* ‘হে রাসূল ! আমার জন্য ইহা লিখাইয়া দিন’ বলিয়া লিখাইয়া দিতে আবূ শাহ রাসূলে করীমকে বলিয়াছেন? ইমাম আওযায়ী বলিলেনঃ ********************** ‘রাসূলের দেওয়া যে ভাষণটি তিনি শুনিতে পাইয়াছিলেন ইহা তাহাই’। ******************************************************] তখন নবী করীম (স) তাঁহার আবেধন মঞ্জুর  করিয়া জনৈক সাহাবীকে বলিলেনঃ- ***************** এই ভাষণটি আবূ শাহকে লিখিয়া দাও।[**************]

৫। ঐতিহাসিক হাফিয ইবন আবদুল বার লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স)আমর ইবন হাজম ও অন্যান্যকে সাদকা, দিয়ত, ফরয ও সুন্নাত সম্পর্কে এক দস্তাবেজ লিখাইয়া দিয়াছিলেন।[***************]

আল্লামা শাওকানী বিভিন্ন স্থানে এই কিতাবখানিরই উল্লেখ করিয়াছেন। [***************] ইমাম মালিক (রা) এই কিতাবখানির উল্লেখ করিয়া বর্ণনা করিয়াছেনঃ

******************************************************

আবদুল্লাহ ইবন আবূ বকর ইবন হাজম হইতে কথাটি বর্ণিত হইয়াছে যে, নবী করীম (স) আমর ইবন হাজমের জন্য যে কিতাবখানি লিখাইয়া দিয়াছিলেন, তাহাতে লিখিত রহিয়াছে, কুরআন মজীদকে কেবল পবিত্র ব্যক্তিই স্পর্শ করিবে।[***************]

ইমাম বায়হাকী তাঁহার *************** গ্রন্হে এই কিতাবখানি সম্পর্কে নিম্নোক্ত বর্ণনার উল্লেখ করিয়াছেনঃ

******************************************************

আবূ বকর ইবন মুহাম্মদ ইবন হাজম হইতে বর্ণিত হইয়াছে। তিনি বলেনঃ ইহা নবী করীম (স) লিখিত সেই কিতাব, যাহা তিনি আমর ইবন হাজমকে ইয়েমেনে পাঠাইবার সময় লিখাইয়া দিয়াছিলেন। তাঁহাকে পাঠাইয়াছিলেন সেখানকার অধিবাসীদিগকে দ্বীন-ইসলামের গভীর জ্ঞান দান ও সুন্নাতের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে এবং তাহাদের নিকট হইতে যাকাত আদায় করার জন্য। ইহাতে তাঁহার জন্য নিয়োগপত্র ও প্রতিশ্রুতি এবং সেখানকার লোকদের মধ্যে তাঁহার দায়িত্ব পালনের বিষয়ও লিখিত ছিল।[******************]

হিজরী দশম সনে নবী করীম (স) হযরত আমর ইবন হাজম (রা)- কে নাজরান অধিবাসীদের শাসনকর্তা নিযুকত্ করেন। তিনি যখন নজরান এলাকার দিকে রওয়ানা  হইতেছিলেন, তাখন তাঁহাকে উক্ত দস্তাবেজখানা শাসনতান্ত্রিক আইন ও বিধান হিসাবে ব্যবহার করার জন্য প্রদান করা হয়।[***************]

ইমাম আবূ দাউদ উল্লেখ করিয়াছেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স) নাজরানবাসীদের সহিত সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং তাহাদের জন্য একখানি কিতাব লিখাইয়া দিলেন। [**************]

৬। এতদ্ব্যতীত নবী করীম (স) ইয়েমেনের অধিবাসীদের জন্য আর একখানি ‘দস্তাবেজ’ লিখাইয়া পাঠাইয়াছিলেন। উহার নাম ছিল ‘কিতাবুল জিরাহ’ (********)। ইহার সূচনায় লিখিয়ত হইয়াছিলঃ

******************************************************

ইহা আল্লাহ তা’আলা এবং তাঁহার রাসূলের তরফ হইতে প্রদত্ত ফরমানঃ হে ঈমানদার লোকেরা ! তোমরা তোমাদের ওয়াদা্ এ প্রতিশ্রুতিসমূহ পূরণ কর।[*****************]

এই ঘোষণাপত্র উষ্ট্রচর্মের লিখিত ছিল। হাফিয ইবন কাসীর লিখিয়াছেনঃ

এই গ্রন্হখানি ইসলামের প্রাথমিক ও পরবর্তীকালের সকল নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি কর্তৃক সমাদৃত, নিয়মিত পঠিত ও সকল গুরুত্বপর্ণ ব্যাপারে জ্ঞান উৎসরূপে পরিগণিত হইয়া আসিয়াছে। এমন কি-

******************************************************

রাসূলের সাহাবিগণ এই দস্তাবেজের দিকে সবসময়ই তাকাইতেন এবং উহার মুকাবিলায় নিজেদের রায় ও মতামত পরিহার করিতেন।[************]

৭ । বনু সকীফের প্রতিও তিনি এক সন্ধিনামা লিপিবদ্ধ করিয়া দিয়াছিলেন। উহার শুরুতে লিখিত ছিলঃ

******************************************************

ইহা সকীফ গোত্রের জন্য আল্লাহর রাসূলের লিখিত সন্ধিনামা।[********************]

৮। নবী করীম (স) সদকা ও যাকাত সম্পকের্ক একখানি পূর্ণাঙ্গ দস্তাবেজ লিখাইয়া লইয়াছিলেন। উহাকে ইসলামী রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের সরকারী দায়িত্বশীল কর্মচারীদের নিকট প্রেরণ করাই ছিল তাঁহার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তাহা পাঠাইবার পূর্বেই তিনি ইন্তেকাল করেন। পরে ইহা খিলাফতে রাশেদার কার্যপরিচালনার ব্যাপারে পুরাপুরি দিকদর্শন হিসাবে ব্যবহৃত হয়।[**************]

আল্লামা শওকানী এই দস্তাবেজখানি সম্পর্কে নিম্নোক্ত বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়াছেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স) সদকা সম্পর্কে একখানি কিতাব রচনা করাইয়াছিলেন। কিন্তু উহা তাঁহার কর্মচারীদের নিকট প্রেরণ করার পূর্বেই তিনি ইন্তেকাল করিয়া যান। তাঁহার পর হযরত আবূ বকর উহা বাহির করিয়া তদনুযায়ী আমল করেন। তাঁহার ইন্তেকালের পর হযরত উমর উহাকে বাহির করিয়া তদনুযায়ী কাজ করেন। হযরত উমরের ইন্তেকালের পর উহা তাঁহার এক অসিয়তের সহিত নথি করা অবস্থায় পাওয়া যায়। [******************]

ইমাম জুহরী এই দস্তাবেজখানি দেখিতে পাইয়াছেন এবং বলিয়াছেন, ইহা নবী করীমের সদকা সম্পর্কে লিখিত কিতাব। জুহরী সালেম ইবন আবদুল্লাহর নিকট উহার পাঠ গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং তিনি উহা নিজের মধ্যে আয়ত্ত করিয়া লইয়াছিলেন। উত্তরকালে উমর ইবন আবদুল আযীয খিলাফতের দায়িত্ব করিয়া হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমরের বংশধরদের নিকট হইতে উহা গ্রহণ করেন এবং উহার প্রতিলিপি তৈয়ার করাইয়া লন।[ ঐ, পৃষ্ঠা ১৯০ মুসনাদে ইমাম আহমদ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪।]

৯। হযরত মু’আয ইবন জাবাল (রা)- কেও সাদকা সম্পর্কে একখানি দস্তাবেজ লিখাইয়া দিয়াছিলেন। মুসা ইবন তালহা বলেনঃ

******************************************************

আমাদের নিকট নবী করীম (স)-এর নিকট হইতে প্রাপ্ত মু’আয ইবন জাবালের একখানি কিতাব রহিয়াছে।[মিশকাত, পৃষ্ঠা ১৫৯।]

এতদ্ব্যতীত নবী করীম (স)- এর লিখিত আরো বহুসংখ্যক সন্ধিচুক্তি ও অন্যান্য দলীল-দস্তাবেজ পাওয়া গিয়াছে। হাদীস বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সে সবের মূল্য অপরিসীম। এই ধরনের দস্তাবেজ সমূহের সংখ্যা হিসাবে করিলে তিন শতাধিক হইবে। ‘মিফতাহুল আকবা’ গ্রন্হে নবী করীম (স)- এর প্রেরিত ৩৬ খানা চিঠির প্রতিলিপির উল্লেখ করা হইয়াছে। টংক রাজ্যের তদানীন্তন অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রী সাহেবজাদা আবদুর রহীম খান ২৫০ খানা লিখিত দস্তাবেজের উল্লেখ করিয়াছেন।[**********]

১। হুদায়বিয়ার সন্ধিনামা।[কিতাবুল আমওয়ালঃ আবূ উবাইদ, পৃষ্ঠা ১৫৭-১৫৮; আল-বিদায়া আন-নিহায়া, ইবনে কাসীর, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৮; সহীহ বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭১; ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১০।]

২। বিভিন্ন কবীলা ও গোত্রের প্রতি বিভিন্ন সময়ের লিখিত ফরমান।[তাবাকাতে ইবনে সায়াদ, কিতাবুল আমওয়ালঃ আবূ উবাইদ, পৃষ্ঠা ২১।]

৩। বিভিন্ন দেশের বাদশাহ ও রাষ্ট্রনেতাদের নিকট লিখিত ইসলামী দাওয়াতের পত্রাবলী।[বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩১ কিতাবুল আমওয়ালঃ আবূ উবাইদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০-২৩।]

৪। আবদুল্লাহ ইবন হাকীম সাহাবীর নিকট রাসূলের প্রেরিত চিঠি। এই চিঠিতে মৃত জন্তু ইত্যাদি সম্পর্কে আইন লিখিত হইয়াছিল।[মুজিমুস সগীর তাবরানী।]

৫। ওয়ায়েল ইবন হাজার সাহাবীর জন্য নামায, মদ্যপান ও সুদ ইত্যাদি সম্পর্কে নবী করীম (স) বিধান লিখাইয়া দিয়াছিলেন।[ঐ।]

৬। জহাক ইবনে সুফিয়ান সাহাবীর নিকট রাসূলে করীম (স)-এর লিখিতও প্রেরিত একখানি হিদায়াতনামা বর্তমান ছিল, তাহাতে স্বামীর পক্ষ হইতে স্ত্রী কর্তৃক রক্তপাতের বদলা (*********) আদায় করার বিধান লিখিত ছিল।[আবু দাউদ।]

৭। ইয়েমেনবাসীদের প্রতি বিভিন্ন ফসলের যাকাত সম্পর্কে নবী করীম (স) কর্তৃক লিখিত ও প্রেরিত এক দস্তাবেজ।[********************]

৮। ইয়েমেনবাসীদের প্রতি রাসূলে করীম (স)- এর লিখিত অপর একখানি পত্র, যাহাতে লিখিত ছিলঃ

******************************************************

ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের মধ্যে যাহারা ইসলাম কবুল করিবে, তাহারা মু’মিন লোকদের মধ্যে গণ্য হইবে, তাহাদের অধিকার ও কর্তব্য মু’মিনদের সমান হইবে। আর যাহারা ইয়াহুদী বা খৃষ্টান থাকিয়া যাইবে, তাহাদিগকে তাহাদের ধর্মপালন হইতে  বিরত রাখার চেষ্টা করা হইবে না, তবে তাহারা ‘জিযিয়া’ আদায় করিতে বাধ্য থাকিবে।[কিতাবুল আমওয়ালঃ আবূ উবাইদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১।]

৯। হুযায়ফা ইবন আয়ামান (রা)-কে এক ফরমান লিখাইয়া দিয়াছিলেন। তাহাতে যাকাতের ফরযগুলি সম্পর্কে বিবরণ লিখিত ছিল।[তাবাকাতে ইবন সায়াদ।]

১০। আল-ইবনুল হাজারীকে রাসু করীম (স) যাকাতের মসলা লিখাইয়া দিয়াছিলেন।

১১। নবম হিজরী সনে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)- কে আমীরে হজ্জ নিযুক্ত করিয়া পাঠাইয়া দিয়াছিলেন এবং তাঁহাকে নবী করীম (স) হজ্জ্বের নিয়ম-পদ্ধতি লিখাইয়া দিয়াছিলেন।[তাফসীরে রুহুল মায়ানী, ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪ ******************** সীরাতে ইবন হিশাম, পৃষ্ঠা ৫৫৬।]

১২। সূরা তওবা নাযিল হওয়ার পর নবম হিজরী সনে মদীনা হইতে হযরত আলী (রা)- কে মক্কার বিশেষ পয়গাম সহকারে প্রেরণ করেন। তাঁহাক হজ্জ্বের সময় লোকদিগকে জানাইয়া দেওয়ার জন্য নিম্নোক্ত ঘোষণা লিখাইয়া দেনঃ

******************************************************

এই বৎসরের পর কোন মুশরিকই কা’বা ঘরের নিকটে যাইতে পারিবে না; উলঙ্গ হইয়া কেহ উহার তওয়াফ করিতে পারিবে না, বেহেশতে মু’মিন ব্যতীত কেহ দাখিল হইতে পারিব না এবং প্রত্যেকে প্রতিশ্রুতি পূরণ করিতে বাধ্য থাকিবে।[তাফসীরে আবুস সয়ুদ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫২, সীরাতে ইবন হিশাম (উর্দূ), পৃষ্ঠা ৫৫৩।]

১৩। উমর ইবন আকসা সুলামীকে এক লিখিত ফরমান পাঠানো হয়, তাহাতে সদকা ও জন্তুর যাকাত সম্পর্কিত আইন-কানুন লিখিত ছিল।

১৪। গালিব ইবন আবদুল্লাহকে এক ফরমান পাঠানো হয়, তাহাতে গনীমতের মাল সম্পর্কে বিস্তারিত মাসলা-মাসায়েল লিখিত হইয়াছিল।

১৫। সুমামা প্রতিনিধিদলকে রাসূলে করীম (স) ফরযসমূহ এবং সদকার মাসলা লিখাইয়া দিয়াছিলেন।

১৬। আবূ রাশেদুল আজদীকে নামাযের নিয়ম-কানুন ও আইন লিখাইয়া দেন।

১৭। নজরানাবাসীদের এক পাদ্রীর প্রতি রাসূলে করীম (স)- এর এক লিখিত ফরমান প্রেরণ করা হয়। উহাতে ইসলাম, ইসলামের দাওয়াত ও জিযিয়ার আদেশ লিখিত হয়।

১৮। ‘হাজরামাউত’-এর শাসনকর্তার নামে নামায, যাকাত ও গনীমনের মালের বিবরণ লিখিয়া পাঠানো হয়।

১৯। ‘দাওমাতুল জান্দাল’ অধিবাসীদের নামে জিযিয়া ও যাকাতের বিধান লিখিয়া পাঠানো হয়।[কিতাবুল আমওয়াল আবূ উবায়দ, পৃষ্ঠা ১৯৫।]

২০। দাওমাতুল জান্দাল ও কতনের অধিবাসীদের নাম ওশর সম্পর্কীয় মাসলা লিখিয়া পাঠানো হয়।

২১। হররা ও আজরাহ কবীলাসমূহের নামে জিযিয়ার বিধান লিখিয়া পাঠান হয়।

২২। বনু নাহাদ কবীলার নামে যাকাতের পশু সম্পর্কে নির্দেশ পাঠানো হয়।

২৩। বনূ হানীফা কবীলাকে জিযিয়ার মাসলা লিখিয়া পাঠানো হয়।

২৪। ‘হাজার’-বাসীদের প্রতি এক ফরমান পাঠানো হয়। উহাতে ইসলামের উপর মজবুত হইয়া দাঁড়াইতে ও শাসনকর্তার আনুগত্য করিতে বলা হয়।[ঐ, পৃষ্ঠা ২০০।]

২৫। ‘আয়লা’ ও ‘ইউহানা’ বাসীদিগকে আমন-নামা লিখিয়া দেওয়া হয়। ইবনে কাসীর লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

রাসূল তাহাদের জন্য একটি দস্তাবেজ লিখিয়া দেন। উহা তাহাদের নিকট রক্ষিত ছিল। উহার শুরুতে লিখিত হয়ঃ

******************************************************

দয়মায় মেহেরবান আল্লাহর নামে- ইহা আল্লাহ ও তাঁহার নবী মুহাম্মদের তরফ থেকে ‘ইউহানা’ ও ‘আয়লা’- বাসীদের জন্য দেওয়া এক আমানত।[কিতবুল আমওয়াল, পৃষ্ঠা ২০০, নূরুল ইয়াকীন পৃষ্ঠা ২৪৮।]

২৬। তমীমদারী কবীলাকে উপঢৌকন কবুল করা ও স্বর্ণ নির্মিত জিনিসপত্র ব্যবহার করা সম্পর্কে ইসলামী বিধান লিখিয়া দেওয়া হয়।

২৮। আম্মানের শাসনকর্তা জা’ফর ও আবদের নামে ইসলামের দাওয়াত, ‘ওশর’‘যাকাত’ ইত্যাদির মাসলা লিখিয়া পাঠানো হয়।

২৯। খালিদ ইবন জামাদকে ইসলামের ‘আরকান’ লিখিয়া দেওয়া হয়।

৩০। জুরয়া-ইবন সায়ফকে জিযিয়া ও যাকাতের বিধান লিখিয়া দেওয়া হয়।[কিতাবুল আমওয়াল, পৃষ্ঠা ২০১, ********]

৩১। রবীয়া ইবন যী-মারহাব হাজরীকে শুল্ক ইত্যাদির মাসলা লিখিয়া দেওয়া হয়।

৩২। শারহবীল, হারেস, নয়ীম, বনু আবদু-কালানকে গনীমতের মাল, ওশর ও যাকাতের মাসলা লিখিয়া দেওয়া হয়।

৩৩। মুসলিম জনগণের জন্য এক ফরমানে নবী করীম (স) ফল পরিপক্ক হওয়ার পূর্বে উহার বিক্রয় ও বায়তুল মালের এক-পঞ্চমাংশ আদায় করা পূর্বে গণীমতের মাল হইতে নিজেদের অংশ গ্রহণ ইত্যাদি সম্পর্কে ইসলামরে বিধি-বিধান লিখাইয়া দিয়াছিলেন।

৩৪। বিক্রয় করার পূর্বে পণ্যদ্রব্যের দোষ প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আদা ইবনে খালিদকে এক বয়ান লিখাইয়া দেওয়া হয়।

৩৫। হযরত উমর (রা)- কে সদকার মাসলাসমূহ লিখিয়া দেওয়া হয়।

৩৬। হযরত আবূ বকর (রা)- কে যাকাতের যাবতীয় হুকুম-আহকাম লিখিয়া দেন।

৩৭। তমীমদারী ইসলাম কবুল করিলে তাঁহার গ্রামরে একখণ্ড জমি লিখিয়া দেওয়া হয়। হযরত উমর (রা) খলীফা নিযুক্ত হওয়ার পর সেই লিখিত দস্তাবেজ তাঁহার নিকট পেশ করা হয় এবং তিনি উক্ত ভূমিখণ্ড তাঁহার জন্যই বরাদ্দ করেন।[কিতাবুল আমওয়াল-আবু উবাইদ, পৃ: ২৭৪]

৩৮। মজ্জায়া ইয়ামনীকে একখণ্ড জমি লিখিয়া দেওয়া হয় এবং ইহার জন্য দস্তাবেজ তৈয়ার করিয়া দেওয়া হয়। আবূ সা’লাবাত খুশানীকেও অনুরূপ দস্তাবেজ তৈয়ার করিয়া একখণ্ড জমি দেওয়া হয়।

৩৯। মতরফ ইবন কাহেন বাহেলীকে যাকাহের মাসলা-মাসায়েল লিখিয়া দেন।

৪০। মুনযির ইবন সাবীকে জিযিয়ার মাসলা লিখাইয়া দেওয়া হয়। অগ্নিপূজকদের প্রতি ইসলামের ভূমিকা সম্পর্কেও এক বয়ান লিখাইয়া দেওয়া হয়।[ঐ, পৃ: ২৮০ ও ২৮১ ***************]

৪১। ‘আকীদর’ বংশের লোকদিগকে এক ফরমান লিখাইয়া দেওয়া হয়। তখন পর্যন্ত রাসূল (স)-এর নবুয়্যাতী (সরকারী) স্ট্যাস্প তৈয়ার না হওয়ার কারণে উহার উপর হযরতের টিপসহি লাগানো হয়।[আল ইসাবাহ, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৩১।]

৪২। মুসাইলমাতুল কাযযাবের নামে রাসূলে করীম (স) এক ফরমান লিখাইয়া পাঠাইয়াছিলেন (এই ফরমানের আলোকচিত্র ১৮৯৬ সনে লণ্ডনের Picture Mahazine পত্রিকায় প্রকাশিত হয়)।

৪৩। খায়বারের ইয়াহুদীদের এলাকায় হযরত আবদুল্লাহ ইবন সাহল (রা)-কে মুতাবস্থায় পাওয়া যায়। তখন নবী করীম (স) ইয়াহুদীদিগকে উহার দিয়ত দেওয়া সম্পর্কে এক পত্র লিখিয়া পাঠান।[সীরাতে ইবনে হিশাম (উর্দু), পৃষ্ঠা ৪৭৩।]

৪৪। ইয়েমেনাবাসীদিগকে লিখিয়া পাঠানো হয় যে, মধুরও যাকাত দেওয়া কর্তব্য।

বায়হাকী উল্লেখ করিয়াছেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স) ইয়েমেনবাসীদিগকে লিখিলেন যে, মধু চাষকারীদের নিকট হইতে যাকাত লওয়া হইবে।[***********]

৪৫। হযরত মু’আয ইবন জাবাল (রা)-কে নবী করীম (স) নগদ টাকা ও স্বর্ণের যাকাত সম্পর্কে এক বিধান লিখিয়া পাঠানঃ

******************************************************

নবী করীম (স) মু’আয ইবনে জাবাল (রা)-কে লিখিয়া পাঠান যে, প্রতি দুইশত দিরহাম হইতে পাঁচ দিরহাম ও প্রতি কুড়ি মিসকাল স্বর্ণ হইতে অর্ধ মিসকাল যাকাত গ্রহণ করিবে।[******************* প্রথম খণ্ড, কিতাবুযযাকাত পৃষ্ঠা, ১৭৫, দারে কুতনী।]

৪৬। ইয়েমেনবাসীদের প্রতি প্রেরিত অপর এক ফরমান সম্পর্কে ইমাম দারেমী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স) ইয়েমেনের অধিবাসীদিগকে লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন যে, কুরআন মজীদকে কেবল পাক ব্যক্তিই স্পর্শ করিবে, বিবাহের মালিকানার বা স্বামীত্ব লাভের পূর্বে তালাক হইতে পারে না এবং খরিদ করিয়া লওয়ার পূর্বে গোলাম আযাদ করা যায় না।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ২৯৩।]

৪৭। আরবের সকল কবীলার নামেই নবী করীম (স) এক সময় দিয়তের মাসলা লিখাইয়া পাঠাইয়াছিলেন।[বুখারী, নাসায়ী, দারে কুতনী, নায়লুল আওতার, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪২।]

৪৮। খায়বারের দখলকৃত জমি ইয়াহুদিদের মধ্যে বন্টনের চুক্তিনামা লিখিত হয়।[ফতুহুল বুলদান, পৃষ্ঠা ৩৬-৪২।]

৪৯। নবী করীম (স) ‘হামাদান’ গোত্রের প্রতি এক পত্র হযরত আলী (রা)- এর মাধ্যমে পাঠাইয়াছিলেন। এই পত্র তাহাদিগকে পাঠ করিয়া শোনাইলে তাহারা সকলেই ইসলাম কবুল করে। আল্লামা ইবনে কাসীর লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

হযরত আলী তাহাদিগকে রাসূলে করীম (স)-এর পত্র পাছ করিয়া শোনাইলেন। তাহারা যখন সব শুনিলেন, তখন ‘হামদান’ গোত্রের সব লোক একত্রে ইসলাম কবুল কর।[****************]

৫০। জুরবা ও আযরাহবাসীদের নামেও রাসূলে করীম (স)-কে আমান-নামা লিখিয়া দেন।

আল্লামা ইবন কাসীর লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

রাসূলে করীম (স) জুরবা ও আযরাহবাসীদের জন্য আমান-নামা লিখিলেন। উহার শুরুতে বিসমিল্লাহ লেখার পর লিখিত হয়ঃ ইহা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের তরফ হইতে জুরবা ও আযরাহবাসীদের জন্য লিখিত দলীল, তাহারা আল্লাহর ও মুহাম্মদের নিকট হইতে প্রদত্ত আমান ও পূর্ণ নিরাপত্তার মধ্যে থাকিবে।[************** ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬-১৭।]

৫১। হেমইয়ারের বাদশাহদের প্রতি রাসূলের লিখিত পত্র।

আল্লামা ইবনে কাসীর লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

রাসূলে করীম (স) তাঁহাদের প্রতি পত্র লিখিলেন।[***************]

৫২। নবী করীম (স) নাজরানের বিশপ পাদ্রীর নামে এক পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাহাতে লিখিত ছিলঃ

******************************************************

আল্লাহর রাসূল ও নবী মুহাম্মদের তরফ হইতে নাজরানের বিশপের প্রতিঃ তুমি ইসলাম কবুল কর, আমি তোমার নিকট ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের আল্লাহর হামদ করিতেছি। অতঃপর আমি তোমাদিগকে বান্দার দাসত্ব হইতে মুক্ত হইয়া আল্লাহর দাসত্ব কবুল করার ও মানুষের বন্ধুত্ব পৃষ্ঠপোষকতা হইতে নিষ্কৃতি পাইয়া আল্লাহর বন্ধুত্ব-পৃষ্ঠপোষকতার আশ্রয় গ্রহণের আহবান জানাইতেছি। ইহা কবুল না করিলে তোমরা জিযিয়া দিতে বাধ্য থাকিবে। আর তাহাও অস্বীকার করিলে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিব।[****************]

 

সাহাবীদের লিখিত হাদীস সম্পদ

সাহাবীদের মধ্যে কিছু লোক জাহিলিয়াতের যুগেই লিখিতে ও পড়িতে জানিতেন এবং পূর্বে যেমন বলিয়াছি-বদর যুদ্ধে ধৃত মক্কার লেখাপড়া জানা লোকদের নিকট অনেক যুবক সাহাবীই শিক্ষা লাভ করিয়াছিলেন। ফলে তাহাদের অনেকেই নবী করীম (স)-এর নিকট শ্রুত হাদীস ব্যক্তিগতভাবে লিখিয়া রাখিতে সমর্থ ছিলেন। নবী করীম (স) সাধারণভাবে সকলকেই হাদীস লিখিতে প্রথম পর্যায়ে নিষেধ করিলেও উত্তরকালে ইহার জন্য তিনি সাধারণ অনুমতিই দান করেন। এমনকি, হাদীস লিখার পথে কোনরূপ অসুবিধা বা প্রতিবন্ধকতরা সৃষ্টি হইলে তাহা তিনি দূর করিয়া দিতেন।

এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ’স (রা) বলেনঃ

আমি নবী করীম (স)-এর নিকট শ্রুত প্রত্যেকটি কথাই হিফাযতের উদ্দেশ্যে লিখিয়া লইতাম। ইহা দেখিয়া কুরায়শ বংশের সাহাবিগণ আমাকে এই কাজ করিতে নিষেধ করেন। আমাকে তাঁহারা বলেনঃ

******************************************************

তুমি রাসূলে মুখে যাহাই শুনিতে পাও, তাহা সবই লিখিয়া রাখো? অথচ রাসূল (স) একজন মানুষ তো, তিনি কখনো সন্তোষ আর কখনো ক্রোধের মধ্যে থাকিয়া কথা বলেন?

আবদুল্লাহ বলেনঃ অতঃপর আমি হাদীসি লেখা বন্ধ করিয়া দেই এবং একদিন রাসূলের নিকট ব্যাপারটি উল্লেখ করি এবং বলিঃ

******************************************************

হে আল্লাহর রাসূল! কুরায়শরা বলে, তুমি রাসূলের সব কথাই লিখিতেছ? অথচ তিনি একজন মানুষ। সাধারণ মানুষের মতই তিনি কখনো কখনো ক্রদ্ধ হইয়া থাকেন।

রাসূলে করীম (স) আমার একথা শ্রবণের সঙ্গে সঙ্গে নিজের দুই ওষ্ঠের দিকে ইশারা করিয়া বলিয়া উঠিলেনঃ

******************************************************

তুমি লিখিতে থাক। যে আল্লাহর মুষ্টিবদ্ধ আমার প্রাণ, তাঁহার শপথ, আমার এই (মুখ) হইতে প্রকৃত সত্য কথা ছাড়া কিছুই বাহির হয় না।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৬৭। আবূ দাউদ; মুসনাদে আহমাদ মুস্তাদরাক-হাকেমের বর্ণনায় এই কথার পর উল্লেখ করা হইয়াছে। রাসূল বলিলেন-************ ‘অতএব লিখ; ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ১০৪; ইমাম আহমাদের উদ্ধৃতিতে বলা হইয়াছেঃ ************************** লিখ, যাহার হস্তে আমার প্রাণ তাঁহার শপথ, আমার হইতে ‘হক ছাড়া কিছুই প্রকাশিত হয় না। *****************************]

এই আদেশ শ্রবণের পর হযরত আবদুল্লাহ রাসূল (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ

******************************************************

হে রাসূল ! আপনার নিকট হইতে যাহা কিছুই শুনিতে পাই তাহা সবই কি লিখিয়া রাখিব?

রাসূল বলিলেনঃ ****** হ্যাঁ; আবদুল্লাহ পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেনঃ

**************************- ক্রদ্ধ ও সন্তোষ উভয় অবস্থায় বলা সব কথাই কি লিখিব?

তখন রাসূল (স) চুড়ান্তভাবে বলিলেনঃ

******************************************************

হ্যাঁ, এই সকল অবস্থায়ই আমি প্রকুত সত্য  ছাড়া আর কিছুই বলি না।[******************************************************]

এই বর্ণনা হইতে এক সঙ্গে দুইটি কথা সুস্পষ্টভাবে জানা যায়। প্রথম এই যে, নবীর কণ্ঠ হইতে কখনো সত্যোর বিপরীত কথা প্রকাশিত ও উচ্চারিত হয় নাই। কখনে সেরূপ কথা বলিয়া ফেলিলে বা বলিতে উদ্যত হইলেও আল্লাহর সামগ্রিক হেফাজতের সাহায্যে নবী সেই ভূল হইতে রক্ষা পাইয়া গিয়াছেন। উপরের উদ্ধৃতি হইতে সত্য কথা বলার ব্যাপারে নবীর অপ্রতুল দৃঢ়তা ও বলিষ্ঠ মানসিকতা প্রমাণিত হয়।

দ্বিতীয়ত, হাদীস লিখিয়া রাখা কেবল সঙ্গতই নয়, সেজন্য রাসূলের কেবল অনুমতিই ছিল না, সেই সঙ্গে হাদীস লিখিয়া রাখার সুস্পষ্ট ও অবাধ আদেশও তিনি করিয়াছিলেন। রাসূলের এই আদেশ বিশেষ কোন সময় বা অবস্থার মধ্যে সীমিত ছিল না। সকল সময় ও অবস্থায় বলা সব কথাই লিখিবার জন্য তিনি বলিষ্ঠ স্বরে অনুমতি দিয়াছিলেন।

কেননা, রাসূলে করীম (স) সর্বসাধারণ মুসলিমের জন্য সকল সময়ে ও সকল অবস্থায়ই অনুসরনীয় ছিলেন। তাঁহার প্রত্যেকটি অবস্থা ও প্রত্যেক সময়ের সকল কথা এবং সকল প্রকার কাজই ইসলামী শরীয়াতের অন্যতম উৎসরূপে গণ্য।

হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) রাসূলের সকল কথা লিপিবদ্ধ করিয়া যে হাদীস সংগ্রহ তৈয়ার করিয়াছিলেন নবী করীম (স) নিজেই উহার নামকরণ করিয়াছিলেন ‘সহীফায়ে সাদেকা’ (*************)। ইহা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ’সের অন্যন্ত প্রিয় গ্রন্হ ছিল।তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

জীবনের প্রতি মাত্র দুইটি জিনিসই আমাকে আকৃষ্ট করিয়াছে, তন্মধ্যে একটি হইতেছে ‘সাদেকা’ আর দ্বিতীয়টি হইতেছ আমার নিম্ন জনি। তবে ‘সাদেকা’ এমন একখানি গ্রন্হ, যাহা আমি নবী করীম (স)- এর নিকট হইতে (শুনিয়া) লিখিয়া লইয়াছি।[সুনানে দারেমী; পৃষ্ঠা ৬৭. – ************* জামে’ বয়ানুল ইলম-ইবনে আবদুল বার ************] ইহাতে এক হাজারটি হাদীস সংগৃহীত হইয়াছিল।[*********************]

হযরত আবদুল্লাহর ইন্তেকালের পর এই ‘সাদেকা’ গ্রন্হখানি তাঁহার পৌত্র শুয়াইব ইবন মুহাম্মদের হস্তগত হয়। তাঁহার নিকট হইতে পুত্র আমর সাদেকা’র হাদীসসমূহ লোকদের নিকট বর্ণনা করেন।

******************************************************

হাদীস গ্রন্হসমূহে আমর ইবনে শুয়াইব, তাহার পিতা হইতে………….. তাঁহার দাদা হইতে সূত্রে যত হাদীসই বর্ণিত হইয়াছে, তাহা সবই এই ‘সাদেকা সহীফা’ হইতে গৃহীত ও বর্ণিত।[তিরমিযী শরীফ, *********************- কিতাবুল  ইলম, দারেমী।]

মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল গ্রন্হে এই সহীফাখানি সম্পর্ণ শামিল হইয়াছে। ফিকাহর চারজন ইমামই এই গ্রন্হের হাদীস দলীল হিসাবে পেশ করিতেন।[যাদুল মায়াদ-ইবনুল কাইয়্যেম, ৩য় পৃষ্ঠা ৪৫৮।]

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেনঃ একজন আনসার সাহাবী রসালে করীম (স)-এর খিদমতে বসিয়া থাকিয়া তাঁহার বাণী শুনিতেন; তাহা তাঁহার খুবই ভাল লাগিত, পছন্দ হইত। কিন্তু তিনি কোন কথাই ভালভাবে স্মরণ রাখিতে পারিতেন না। সব কথা স্মরণ রাখার ব্যাপারে তিনি ছিলেন কতকটা ব্যতিক্রম। তাই একদিন তিনি তাঁহার এই অসুবিধার কথা রাসূলের নিকট প্রকাশ করিলে রাসূলে করীম (স) বলিলেনঃ ******************** ‘তোমার দক্ষিণ হস্তের সাহায্য গ্রহণ কর’। এই বলিয়া তিনি হাত দ্বারা লিখিবার কথা বুঝাইয়াছিলেন।[**************]

নবী করীম (স) সকল প্রকার ইলম –বিশেষভাবে ইলমে হাদীস লিখনের মাধ্যমে অক্ষয় ও চিরন্তন করিয়া রাখার জন্য আদেশ করেন।

তিনি বলেনঃ- ******************* ‘ইলম লিপিবদ্ধ করিয়া রাখ’। অপর এক বর্ণনায় উল্লেখ করা হইয়াছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) বলেনঃ নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

ইলমে হাদীস বন্দী করিয়া সংরক্ষিত কর?

আমরা জিজ্ঞাসা করিলামঃ

******************************************************

উহাকে কেমন করিয়া বন্দী করিব।

রাসূল বলিলেনঃ

******************************************************

উহাকে লিখিয়া লও।[মুস্তাদরাক, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৬।]

আবু তুফাইল আমের ইবনে ওয়াসিল বলেনঃ আমি একদিন হযরত আলীর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি হযরত আলী (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ

******************************************************

রাসূল আপনাকে বিশেষভাবে কোন জিনিস দান করিয়াছেন কি?

জওয়াবে হযরত আলী (রা) বলিলেনঃ

******************************************************

রাসূল বিশেষভাবে আমাকে এমন কোন জিনিস দিয়া যান নাই, যাহা সকল লোককে সাধারণভাবে দেন নাই। তবে  আমার এ্ই তরবারির খাপের মধ্যে যাহা লিখিথ অবস্থায় আছে, তাহা আমাকে তিনি বিশেষভাবে দান করিয়া গিয়াছেন।[জামে বায়ানুল ইলম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭২; মুস্তাদরাক-হাকেম, মুসলিম, শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬১।]

অপর এক বর্ণনায় কথাগুলি নিম্নরূপ ভাষায় বলা হইয়াছে। হযরত আলী (রা)-কে জিজ্ঞাসাকরার হইলঃ

******************************************************

রাসূল আপনার নকট গোপন করিয়া কি কিছু বলিয়া গিয়াছেন?

জওয়াবে হযরত আলী (রা) বলিলেনঃ

******************************************************

রাসূল আমাকে অন্য লোকদের হইতে লুকাইয়া একটি জিনিস ব্যতীত গোপনভাবে আর কিছুই দিয়া যান নাই। সেই জিনিসটি হইল এই যে, তিনি চারিট কথা আমাকে বলিয়া গিয়াছেন।[জামে বয়ানুল ইলম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭২ ; মুস্তাদরাক-হাকেম, মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬১।]

হযরত আবু হুযায়ফা (রা) হইতেও অনুরূপ ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে। তিনি বলেন, একদিন তিনি হযরত আলী (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ

******************************************************

আপনার নিকট কোন লিখিত জিনিস আছে কি? উত্তরে তিনি বলিলেনঃ

******************************************************

না। আল্লাহর কিতাব, মুসলিম ব্যক্তিকে প্রদত্ত বোধশক্তি এবং এই সহীফায় লিখিত জিনিস ব্যতীত আমার নিকট আর কিছুই নাই।

হুযায়ফা (রা) জিজ্ঞাসা করিলেনঃ

******************************************************

এই সহীফার মধ্যে কি কি লিখিত আছে?

হযতর আলী (রা) বলিলেনঃ

******************************************************

ইহাতে রক্তপাতের বদলা, বন্দী মুক্তিদান ও কাফির হত্যার শাস্তিস্বরূপ মুসলিম নিহত হইবে না- এই সব কথা লিখিত আছে।[বুখারী শরীফ, কিতাবুল ইলম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১।]

আবু তুফাইল বর্ণিত হাদীসের শেষভাগে বলা হইয়াছে, অতঃপর হযরত আলী (রা) তাঁহার কোষের মধ্য হইতে একখানি সহীফা বাহির করেন। তাহাতে নিম্নোক্ত কথাগুলি লিখিত ছিলঃ

******************************************************

যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অপর কাহারো উদ্দেশ্যে জন্তু বা প্রাণী যবেহ  করে, তাহার উপর আল্লাহর অভিশাপ; যে ব্যক্তি জমির বিভিন্ন অংশের চিহ্ন চুরি করে বা (অপর বর্ণনামতে ) পরিবর্তন করে, তাহার প্রতি আল্লাহর লা’নত; এবং যে ব্যক্তি কোন ইসলাম বিকৃতকারী বা বিদ’আত ব্যক্তিকে আশ্রয় দান করে, তাহার উপর আল্লাহর লা’নত।[মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৬২।]

এই সম্পর্কে বুখারী শরীফে বর্ণিত একটি হাদীসও এখানে উল্লেখযোগ্য। ইয়াযীদ ইবনে শরীফ বলেনঃ

******************************************************

হযরত আলী (রা) একদিন ‘আজুর’ নামক স্থানে মিম্বরের উপর দাঁড়াইয়া আমাদের সম্মুখে ভাষণ দিতেছিলেন। তাঁহার স্কন্ধে একখানি তরবারি ঝুলানো ছিল। উহার সহিত একটি ‘সহীফা’ ও লটকানো ছিল। তিনি বলিলেনঃ আল্লাহর শপথ, আমর নিকট পাঠযোগ্য কোন কিতাব- আল্লাহর কিতাব ও এই সহীফার লিখিত জিনিস ব্যতীত- নাই। এই বলিয়া তিনি সহীফাখানি খুলিয়া ধরিলেন। তাহাতে উষ্ট্রের দাঁত রক্ষিত দেখিলাম এবং লিখিত দেখিলামঃ মদীনা ‘আইর’ নামক স্থান হইতে অমুক পাহাড় পর্যন্ত হেরেম। এই স্থানে যদি কেহ কোন বিদ’আত- ইসলাম-বহির্ভূতকাজ করে, তবে তাহার উপর আল্লাহ ফেরেশতা ও সমগ্র মানুষের অভিশাপ। আল্লাহ তাহার কোন অর্থব্যয় বা বিনিময় কবুল করিবেন ন। উহাতে আরো লিখিত ছিলঃ সকল মুসলিমের ‘যিম্মা’ এক, উহার জন্য তাহাদরে সকলেই চেষ্টা করিবে। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের সহিত কৃত ওয়াদা ভংগ করিবে, তাহার উপর আল্লাহর ফেরেশতা ও সমগ্র মানুষের অভিশাপ। আল্লাহ তাহার কোন অর্থব্যয় বা বদলা গ্রহণ করিবেন না।

উহাতে ইহাও লিখিত ছিল৬ ‘যে ব্যক্তি স্বীয় পৈতৃক সম্পর্ক ব্যতীত অপর কাহারো সহিত পৈতৃক সম্পর্ক স্থাপন করিবে, তাহার উপর আল্লাহর, ফেরেশতাদের ও সমগ্র মানুষের অভিশাপ। তাহার নিকট হইতে কোন অর্থব্যয় বা বদলা গ্রহণ করা হইবে না’।[বুখারী, শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৮৪।]

হযরত হুযায়ফা (রা) বর্ণিত অপর একটি হাদীসও এই প্রসঙ্গেই উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেনঃ

******************************************************

আমি হযরত আলী (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলামঃআপনার নিকট আল্লাহর কিতাব লিখিত ওহী ব্যতীত ওহী’র আর কোন জিনিস আছে কি?

হযরত আলী ইহার জওয়াবে বলিলেনঃ

******************************************************

না, যে আল্লাহ বীজ দীর্ণ করেন ও মানুষকে সৃষ্টি করে, তাঁহার শপথ, আমি কুরআন ব্যতীত অহীর অপর কোন জিনিস জানি না। তবে জানি দুইিট জিনিস- একটি হইল বোধশক্তি, যাহা আল্লাহ তা’আলা এই কুরআন হইতে এক ব্যক্তিকে দান করেন; আর দ্বিতীয় জিনিস, যাহা এই সহীফায় লিখিত আছে।

হযরত হুযায়ফা (রা) জিজ্ঞাসা করিলেন৬ এই সহীফায় কি আছে? তখন হযরত আলী (রা) বলিলেনঃ ‘উহাতে দিয়ত’ বন্দীমুক্তির নিয়ম এবং কাফিরের বিনিময়ে কোন মুসলমানকে হত্যা করা হইবে না’ লিখিত আছে।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, কিতাবুল জিহাদ পৃষ্ঠা ৪২৮। এই হাদীস হইতে জানা যায় যে, সহীফাখানিতে কতকগুলি হাদীস লিখিত ছিল এবং তাহাও ওহীরই অংশ। দ্বিতীয়ত কেবল কুরআনই ওহীলব্ধ জিনিস নহে, হাদীসও ওহীলব্ধ জিনিস।]

হযরত আলী (রা)- এর এই ভাষণ সম্পর্কই আর একটি বর্ণনারও উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি বলেনঃ

******************************************************

আমরা নবী করীম (স)- এর নিকট হইতে কুরআন মজীদ ও এই সহীফায় লিপিবদ্ধ হাদীস ব্যতীত আর কিছুই লিখি নাই।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৫১।]

উপরে উল্লিখিত সমস্ত বর্ণনা ও আলোচনার সারকথা এই যে, হযরত আলী (রা) নবী করীম (স)-এর নিকট হইতে কুরআন মজীদ এবং হাদীস শরীফ লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন। উপরন্তু তিনি হাদীসের একটি সংকলনও তৈয়ার করিয়া লইয়াছিলেন। উহাতে কি ধরনের হাদীস লিখিত ছিল, তাহা উপরোল্লিখিত বিভিন্ন বর্ণনা হইতে জানা গিয়াছে। কিন্তু উহার সংখ্যা কত ছিল, তাহা কোথাও উল্লেখ করা হয় নাই।

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেনঃ

******************************************************

রাসূল (স)-এর সাহাবীদের মধ্যে আমর অপেক্ষা অধিক কেহ রাসূলের হাদীস বর্ণনা করেন নাই । তবে আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আ’স অধিক বর্ণনা করিয়াছেন। ইহার কারণ এই যে, তিনি হাদীস লিখিয়া রাখিতেনঃ কিন্তু আমি লিখিতাম না।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২। সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৬৭।]

হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আ’স (রা) যে রাসূলের হাদীসমূহ লিখিয়া রাখিতেন, তাহা ইতিপূর্বে প্রমাণিত হইয়াছে। তবে হযরত আবূ হুরয়ারার নিজ সম্পর্কিত উক্তি তাঁহার প্রথম জীবনের জন্য প্রযোজ্য, জীবনের শেষভাগের জন্য নয়। কেননা তিনি প্রথম পর্যায়ে রাসূলের হাদীস লিখিয়া রাখিতেন না, তখন উহা লিখিয়া রাখার প্রয়োজন বোধ করিতেন না। তিনি যাহা শুনিতে পাইতেন, তাহা মুখস্থ করিয়া রাখাকেই যথেষ্ট মনে করিতেন। আর তিনি অপরের তুলনায় অধিক স্মরণশক্তিসম্পন্নও ছিলেন। তাঁহার শক্তি সম্পর্কে হাদীসে বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

অপরে যাহা স্মরণ রাখিতে পারিতেন না, তাহা তিনি স্মরণ রাখিতে পারিতেন।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২।]

হযরত আবূ হুরায়রার স্মরণশক্তি অধিক হওয়া সম্পর্কে তাঁহার নিজের জবানীতেই একটি ঘটনার উল্লেখ করা হইয়াছে। মুসলিম শরীফে বর্ণিত হইয়াছে-একদিন নবী করীম (স) মজলিসে উপস্থিত লোকদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিলেনঃ

******************************************************

তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাহার কাপড় বিছাইয়া দিয়া আমার এই হাদীস শ্রবণ করিবে, তাহার পর উহাকে নিজের বুকের সাথে মিলাইবে, সে যাহা শুনিবে, তাহার কোন কথাই সে কখনো ভুলিয়া যাইবে না।

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেনঃ

******************************************************

এই কথা শুনিয়া আমি আমার স্কন্ধে রক্ষিত চাদরখানা বিছাইয়া দিলাম। রাসূল যখন তাহার কথা সম্পূর্ণ করিলেন, তখন চাদরখানাকে আমার বুকের সহিত লাগাইলাম। অতঃপর রাসূলের নিকট শোনা কোন হাদীসই আমি ভুলিয়া যাই নাই।[মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০২,*************]

স্মরণশক্তির এই প্রখরতা সত্ত্বেও তিনি শেষ পর্যন্ত হাদীস লিখিয়া রাখিতে শুরু করেন এবং তিনি বিপুল সংখ্যা হাদীস লিপিবদ্ধ করিয়া লন। তাঁহার লিখিত হাদীসের সংখ্যা ছিল পাঁছ সহস্রাধিক।[মুস্তাদরাক হাকেম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১১, ফতহুল বারী- ************* জামে’ বায়ানুল ইলম – ইবনে আবদুল বার, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৪।]

হযরত আবূ হুরায়রার নিকট হাদীস শিক্ষাপ্রাপ্ত হাসান ইবনে আমর ইবনে উমাইয়া জমরী একদিন তাঁহাকে (আবূ হুরায়ারাকে) একটি হাদীস মুখস্থ শোনান এবং বলেন, ‘ইহা আপনার নিকট হইতে শুনিয়াছে’। তখন আবূ হুরায়রা (রা) বলিলেনঃ আমার নিকচ হইতে শুনিয়া থাকিলে উহা নিশ্চয়ই আমার নিকট লিপিবদ্ধ রহিয়াছে। অতঃপর তিনি হাসানের হাত ধরিয়া নিজের ঘরে লইয়া গেলেন এবং তাঁহা লিখিত হাদীসসমূহের এক বিরাট স্তুপ দেখাইয়া বলিলেনঃ তোমার বর্ণিত হাদীসটি ইহাতে লিখিত রহিয়াছে।

হাসান বলেনঃ

******************************************************

তিনি (আবূ হুরায়রা) আমাকে বিপুল সংখ্যক কিতাব দেখাইলেন, উহাতে রাসূলের হাদীস লিখিত ছিল।[ফতহুল বারী গ্রন্হের ১ম খণ্ডের ১৮৪ পৃষ্ঠায় লিখিত রহিয়াছেঃ হযরত আবূ হুরায়রা কর্তৃক সংগ্রহীত হাদীস বিপুল পৃষ্ঠায় ছড়াইয়াছিল, ইবনে ওহাব ইহা দেখিয়াছিলেন।]

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে প্রায় আটশত কিংবা ততোধিক সাহাবী ও তাবেয়ী হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। [****************] ‘মুসনাদে আবী হুরায়রা’ নামক গ্রন্হখানি সাহাবীদের যুগেই সংকলিত হয়।[*********************]

হযরত আনাস (রা)- ও হাদীস লিখিয়া রাখিতেন। তিনি দশ বৎসর বয়সকালেই লিখিতে ও পড়িতে সক্ষম হইয়াছিলেন। তাঁহার পিতা তাঁহাকে রাসূলের খেদমতের জন্য পেশ করিয়া বলিয়াছিলেনঃ

******************************************************

হে রাসূল! এই আমার পুত্র, লিখিতে-জানা বালক।[****************]

তিনি রাসূলের খেদমতে ক্রমাগত দশ বৎসর কাল অতিবাহিত করেন। রাসূলের নিকট তিনি যাহা কিছু শুনিতেন, তাহা যে তিনি লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিবেন, তাহা আর বিচিত্র কি! সায়ীদ ইবন হেলাল বলেনঃ

******************************************************

আমরা আনাস ইবনে মালিক (রা)-কে হাদীস বর্ণনা করার জন্য শক্ত করিয়া ধরিলে তিনি একটি চোঙ বাহির করিয়া আনিতেন এবং বলিতেনঃ ইহা সেইসব হাদীস, যাহা আমি নবী করীম (স)- এর নিকট শুনিয়াছি এবং লিখিয়া লওয়ার পর ইহা তাঁহাকেই পড়িয়া শোনইয়াছি।[মুস্তাদরাক-হাকেম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭৩।]

ইহা হইতে জানা গেল যে, হযরত আনাস (রা) রীতিমত হাদীস লিখিয়া রাখিতেন। শুধু নিজে নিজে লিখিয়াই স্তুপ করিতেন না বরং উহা রাসূলকে পড়িয়া শোনাইতেন এবং ভূল-ক্রটি সংশোধন করিয়া লইতেন।[***********]

তিনি তাঁহার পুত্রদেরও হাদীস লিখিয়া রাখিতে আদেশ করিতেন। বলিতেনঃ

******************************************************

হে পুত্রগণ! এই ইলমে হাদীস লিপিবদ্ধ করিয়া রাখ।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৬৮।]

তিনি যখন বাহরাইনের শাসনকর্তা নিযুক্ত হইয়া তথায় গিয়াছিলেন, তখন হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) তাঁহার নিকট একখানি হাদীস সংকলন প্রেরণ করিয়াছিলেন। উহার শুরুতে লিখিত ছিলঃ

******************************************************

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম- ইহা সাদকার বিধান, রাসূল (স) মুসলমানদের প্রতি ইহা নির্ধারিত করিয়াছেন এবং আল্লাহ তাঁহার রাসূলকে ইহারই আদেশ দান করিয়াছেন।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৫। আবূ দাউদ-১৫৬৭ ন’র হাদীস।]

হযরত আনাসরে বর্ণিত হাদীসসমূহের মধ্যে এই সংকলনেরও যে বহু হাদীস রহিয়াছে, তাহাতে কোনই সন্দেহ নাই।

হযরত জাবির (রা)- ও হাদীসের একটি সংকলন সংগ্রহ করিয়াছিলেন।[*************]

হাসান বসরী  ও কাতাদাহ প্রমুখ তাবেয়ী যুগের মুহাদ্দিসগণ এই সংকলন হইতেই হাদীস গ্রহণ ও বর্ণনা করিতেন। এতদ্ব্যতীত সুলায়মান ইবনূল কায়স আবূ যুবায়র, আবূ সুফিয়ান ও শা’বী প্রমুখ তাবেয়ী্ও হযরত জাবিরের এই সংকলন হইতেই হাদীস বয়ান করিতেন। আবূ সুফিয়ান হযরত জাবির হইতে যত হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন, তাহা সবই এই সহীফা হইতে গৃহীত।[**************]

হযরত জাবিরের এই হাদীস সংকলনের কথা প্রায় সকল মুহাদ্দিসই উল্লেখ করিয়াছেন। হাফেয যাহবী কাতাদাহ ইবিনে দুয়ামাতা সম্পর্কে ইমাম আহমদ হইতে বর্ণনা করিয়াছেনঃ

******************************************************

কাতাদাহ বসরাবাসীদের মধ্যে অধিক স্মরণশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যাহাই শুনিতেন, তাহাই মুখস্থ করিয়া ফেলিতেন। একবার তাঁহার সম্মুখে হযরত জাবিরের হাদীস-সংকলন পাঠ করা হয় এবং তিনি সঙ্গে সঙ্গেই তাহা সম্পূর্ণ মুখস্থ করিয়া লন।[**************]

কাতাদাহ নিজেই বলিতেনঃ

******************************************************

আমি সূরা বাকারা অপেক্ষা জাবিরের সহীফা অধিক মুখস্থ করিয়াছিলাম।[***************]

ইহা হইতে প্রমাণিত হয় যে, হযরত জাবির (রা) হাদীসের এক সংকলন তৈয়ার করিয়াছিলেন এবং তাহাতে তাঁহার পরবর্তীকাল পর্যন্ত হাদীস শিক্ষার্থীগণ কর্তৃক রীতিমত পঠিত এবং তাহা হইতেই হাদীস বর্ণিত হইত।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)-ও হাদীস লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিতেন। ফলে তিনি বিপুল সংখ্যক হাদীসের এক সংকলন তৈয়ার করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। তাঁহার ইন্তেকালের পর এই সংকলন তাঁহার পুত্রদের নিকট সংরক্ষিত ছিল। তাঁহার পুত্র আবদুর রহমান একখানি হস্তলিখিত হাদীস সংকলন দেখাইয়া বলিতেনঃ ‘আল্লাহর শপথ, ইহা আব্বাজানের হস্তলিখিত হাদীস সংকলন।[*************]

হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব (রা)-ও হাদীস লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন। তাঁহার ইন্তেকালের পর এই হাদীস সংগ্রহখানি মীরাসী সূত্রে লাভ করেন তাঁহার পুত্র সালমান ইবনে সামুরা। ঐতিহাসিক ইবনে সিরীন বলেনঃ ‘সামুরার সংকলিত হাদীস গ্রন্হে বহুমূল্য ইলম সন্নিবেশিত রহিয়াছে।[****************]

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) যে সব হাদীস শুনিতে পাইয়াছিলেন, তাহা সবই গ্রন্হকারে সংকলিত করিয়াছিলেন। তায়েফের কিছু লোক তাঁহার নিকট শুনিয়া শুনিয়া এই পূর্ণ গ্রন্হখানি নকল করিয়া লইয়া গিয়াছিল।[****************] তিনি চিঠিপত্র লিখিয়াও হাদীস প্রচার করিতেন।[আবু দাউদ, কিতাবুল আকযীয়া] তাঁহার ইন্তেকালের পর তাঁহার পুত্র আলী ইবনে আদুল্লাহ বহু সংখ্যক হাদীস সংকলন উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেন।[***************] বর্ণিত হইয়াছেঃ

******************************************************

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) এক উট বোঝাই হাদীসগ্রন্হ রাখিয়া গিয়াছিলেন।[*************]

হযরত ইবনে আব্বাসের হাদীস লেখা সম্পর্কে নিম্নোক্ত বর্ণনা উল্লেখযোগ্য। আলকাতানী ‘তবাকাতে ইবনে সায়াদে’র সূত্রে আবূ রাফে’র স্ত্রী সালমা’র এই কথাটির উল্লেখ করিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি ইবনে আব্বাসকে কিছু লেখার তখতি লইয়া তাহার উপর আবূ রাফে হইতে রাসূলের কাজকর্ম সম্পর্কে কোন কথা লিখিতে দেখিয়াছি।[*********************]

আল-কাতানী ইহাও লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

ইবনে আব্বাস আবূ রাফে’র নিকট আসিতেন। বলিতেনঃ রাসূলে করীম (স) অমুক দিন কি করিয়াছেন? …………. ইবনে আব্বাস সঙ্গে এমন একজন লোক লইয়া আসিতেন, আবূ রাফে যাহা বলিতেন সে লিখিয়া লইত।[****************]

হযরত ইবনে আব্বাসের লিখিত হাদীস সম্পদ যে কত বিরাট ছিল, তাহা নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি হইতে অনুমান করা যায়। ইমাম মূসা ইবনে আকাবা বলেনঃ

******************************************************

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের গোলাম কারীব আমাদের সম্মখে তাঁহার (ইবনে আব্বাসের ) লিখিত হাদীস গ্রন্হসমূহের এক উষ্ট্রবোঝাই সম্পদ পেশ করে।[***************]

হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রা) হযরত মুয়াবিয়র (রা)-কে তাঁহার অনুরোধক্রমে বহুসংখ্যক হাদীস লিখাইয়া দিয়াছিলেন।[সহীহ বুখারী শরীফ,*********] ইমাম বুখারী (র) এই সম্পর্কে নিম্নোক্ত বর্ণনার উল্লেখ করিয়াছেনঃ

******************************************************

মুগীরা ইবনে শু’বার লেখক অররাদ বলেনঃ মুগীরা ইবন শু’বা মুয়াবিয়া (রা)-র প্রতি লিখিত  এক কিতাবে (পত্রে) আমার দ্বারা (অনেক হাদীস) লিখিয়াছিলেন।[সহীহ বুখারী শরীফ, ***********]

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ’স (রা) নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর অপর একখানি হাদীস সমষ্টি তৈয়ার করেন। ঐতিহাসিকদের এক বর্ণনায় জানা যায়, স্বয়ং নবী করীম (স)-ই তাহা করার জন্য তাঁহাকে নির্দেশ দিয়াছিলেন।[******************] উহার নাম ছিল ‘সহীফায়ে ইয়ারমুক।[******************]

হযরত সায়াদ ইবনে উবাদা আনসারীও হাদীসের একখানি সহীফা সংকলন করিয়াছিলেন। তাঁহার পুত্র এই ‘সহীফা’ হইতেই হাদীস বর্ণনা করিতেন।[***************] ইমাম বুখারী বলেনঃ

******************************************************

এই সহীফাখনি আবদুল্লাহ ইবনে আবু আওফার সহীফারই এক খণ্ড ছিল।[********************] তিনি নিজের হাতেই হাদীস লিখিতেন।

মোট কথা নবী করীম (স)-এর অনুমোদন, অনুমতি ও উৎসাহদানের ফলে সাহাবায়ে কিরাম ইসলামরে এই মহামূল্য সম্পদ-ইলমে হাদীস-সংরক্ষণ, লিখন ও সংকলনের জন্য সর্বাত্মকভাবে তৎপর হইয়াছিলেন। তদানীন্তন সমাজে ইলমে হাদীসের চর্চা একমাত্র পরকালীন সওয়ার লাভের উপায় হিসাবে করা হইত না, সামাজিক মর্যদা লাভ, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, অন্তর্নিহিত প্রতিভার বিকাশ সাধনের উদ্দেশ্যেও তখন ইহা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়রূপে গণ্য ছিল। এই কারণে নবী করীম (স)-এর অসংখ্য অপরিমেয় বাণী তাঁহার তৈরী করা সর্বাদিক বিশ্বস্ত নির্ভরযোগ্য সত্যবাদী ও আল্লাহ ভীরু সাহাবাদের দ্বারা চিরদিনের জন্য সংরক্ষিত হয়।

হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আ’স বলেন, আমি অল্প বয়সে সাহবাদের জিজ্ঞাসা করিয়াছিলামঃ

******************************************************

আপানারা রাসূলের হাদীস কেমন করিয়া বর্ণনা করেন? আপনারাতো শুনিয়াছেন, যাহা তিনি বলিয়াছেন। অথচ আপনারা রাসূলের হাদীসেই নিমগ্ন ছিলেন?

এই কথা শুনিয়া তাঁহারা হাসিয়া উঠিলেন। বলিলেনঃ ‘হে আমাদের ভাই-পুত্র, আমার তাঁহার নিকট হইতে যাহাই শুনিতাম, তাহা আমাদের নিকট কিতাবে লিখিত রহিয়াছে।[তিবরানী, কবীর-এবং *********************]

এই ঘটনা হইতে প্রমাণিত হয় যে, আবদুল্লাহ ইবনে আমর যখন অল্প বয়সের ছিলেন, তখনো সাহাবায়ে কিরাম হাদীস লিখিতেন। ইহা ইসলামী মদীনার প্রাথমিক যুগের কথা।

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) মাহমুদ ইবনে রবী’র নিকট হযরত উৎবান ইবনে মালিক বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীস শ্রবণ করেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ

******************************************************

হাদীসটি আমার খুবই মনঃপুত হয়।

তখন তিনি তাঁহার পুত্রকে বলিলেনঃ **********- ‘ইহা লিখিয়া লও’। তখন ইহা লিখিত হয়।[***************]

 

হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের শ্রেণীবিভাগ

[সংখ্যাভিত্তিক]

নবী করীম (স)- এর নিকট হইতে যাঁহারা সরাসরিভাবে হাদীস শ্রবণ করিয়াছেন এবং তাঁহার তরফ হইতে কিছু না কিছু হাদীসও বর্ণনা করিয়াছেন, তাঁহাদের সংখ্যা কিছুমাত্র কম নহে। এ সম্পর্কে হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবন চরিত-বিশেষজ্ঞ মুহাদ্দিস ইমাম আলী ইবনে আবু জুরয়া এক প্রশ্নের জওয়াবে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পূর্বে যাঁহারা তাঁহাকে নিজেদের চক্ষে দেখিতে পাইয়াছেন এবং তাঁহার বানী নিজেদের কর্ণে শ্রবণ করিয়াছেন, তাঁহাদের সংখ্যা স্ত্রী-পুরুষ মিলাইয়া লক্ষাধিক হইবে। তাঁহারা প্রত্যেকেই সরাসরি হযরতের নিকট হাদীস শুনিয়া কিংবা অপরের নিকট বর্ণনা পাইয়া হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।

বর্তমান যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীস বিজ্ঞানবিদ মিসরস্থ জামে আযহারের শিক্ষক মুহাম্মদ আবূ জাহু লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স) প্রায় এক লক্ষ্য চৌদ্দ হাজার সাহাবী রাখিয়া দুনিয়া ত্যাগ করে। তাঁহারা নবী করীম (স)-এর নিকট হাদীস শুনিয়া পাইয়া তাহা বর্ণনা করিয়াছেন। বলা হয়, তাঁহারা কোথায় থাকিতেন এবং কোথায় কেমন করিয়া তাঁহারা হাদীস শুনিতে পাইলেন? উহার জওয়াব এই যে তাঁহারা ছিলেন মক্কা ও মদীনার অধিবাসী, এই শহরদ্বয়ের মধ্যবর্তী এলকার লোক, সাধারণ আরব জনগণ আর যাঁহারা তাঁহার সহিত বিদায় হজ্জে উপস্থিত হইয়াছিলেন তাঁহারা। তাঁহারা সকলেই রাসূলে করীম (স)-কে নিজেদের চক্ষে দেখিতে পাইয়াছেন এবং তাঁহার জীবদ্দশায়ই তাঁহার নিকট হইতে হাদীস শুনিতে পাইয়াছেন।[*************]

মুহাদ্দিস আবূ জুরয়া প্রদত্ত এক বিবরণ অনুযায়ী সাহাবীদের [এবং নবী করীম (স)- হইতে কিছু না কিছু বর্ণনা করিয়াছেন, এমন লোকদের] সংখ্যা যদিও লক্ষাধিক ছিল কিন্তু যেসব সাহাব রীতিমত ও গণনাযোগ্য সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন, আল্লামা যাহবীর মতে তাঁহাদের সংখ্যা ছিল মাত্র এক শত পাঁচজন।[************] অবশ্য অনুসন্ধান করিলে এই সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাইতে পারে। মুসনাদে আবূ দাউদ তায়ালিসী দ্বিতীয় হিজরী শতকের শেষ ভাগে সংকলিত একখানি হাদিস গ্রন্হ, ইহাতেই প্রায় আড়াই শত সাহাবী হইতে বর্ণিত হইয়াছে।[****************] ‘উসুদল গাবাহ’ গ্রন্হে হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের সংখ্যা ৭৫৫৪ উল্লেখ করা হইয়াছে। তাঁহারা সকলেই রাসূলের নিকট হইতে সরাসরি হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন বলিয়া এই গ্রন্হে দাবি করা হইয়াছে। কিন্তু আল্লামা ইবনে হাজার ইহাতে আপত্তি জানাইয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন যে, সাহাবী নয়-এমন লোকেই ইহাকে গণ্য করা হইয়াছে।[****************]

আল্লামা যাহবীর মতে এই একশত পাঁচজন সাহাবীর মধ্যে আটাশজন সাহাবী হইতে বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে এই আটাশজন সাহাবীই হইতেছেন সর্বাধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী। সত্য কথা বলিতে কি, বিরাট হাদীস সম্পদের প্রায় অর্ধেক পরিমাণ এই আটাশজন সাহাবী হইতে বর্ণিত হইয়াছে। মুহাদ্দিসদের সিদ্ধান্ত এই যে, যাঁহারা চল্লিশটির কম হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন, তাঁহারা হইতেছেন, ‘কম হাদীস বর্ণনাকারী’। এই ভিত্তিতে অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী ও কম সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী হিসাবে সাহাবাদের চারটি ভাগে বিভক্ত করা যায়ঃ

ক) প্রথম ভাগের সাহাবীঃ যাঁহারা এক হাজার কিংবা ততোধিক হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।

খ) দ্বিতীয় ভাগের সাহাবীঃ যাঁহাদের নিকট হইতে পাঁচশত কিংবা তদুর্ধ্ব সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হইয়াছে।

গ) তৃতীয় ভাগের সাহাবীঃ যাঁহাদের হাদীসের সংখ্যা চল্লিশ কিংবা চল্লিশের অধিক।

ঘ) চতুর্থ ভাগের সাহাবীঃ যাঁহাদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা চল্লিশের ক।[***************]

কিন্তু ঊর্ধ্ব পাঁচশত হইতে নিম্ন সংখ্যা চল্লিশ পর্যন্ত হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের সংখ্যা সমধিক। সেই কারণে তাহাদিগকে আমরা আবার দুই পর্যায়ে বিভক্ত করিতে পারি। একশত হইতে পাঁচশত পর্যন্ত হাদীস বর্ণনাকারী প্রথম পর্যায়ের এবং চল্লিশ হইতে একশত হাদীস পর্যন্ত বর্ণনাকারীরা দ্বিতীয় পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।

এই ল্ডসীর অনুযায়ী হাদীস বর্ণনাকারী সমস্ত সাহাবীকে মোট পাঁচটি শ্রেণতে বিভক্ত করা চলেঃ

১। যাঁহাদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা হাজার কিংবা হাজারের অধিক।

২। যাঁহাদের বর্ণিত হাদীস পাঁচশত কিংবা পাঁচশতের অধিক, কিন্তু হাজার হইতে কম।

৩। যাঁহাদের বর্ণিত হাদীস একশত কিংবা একশতের অধিক, কিন্তু পাঁচশতের কম।

৪। যাঁহাদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা চল্লিশ কিংবা চল্লিশ কিংবা চল্লিশের বেশী কিন্তু একশতের কম।

৫। যাঁহাদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা চল্লিশ কিংবা চল্লিশের কম।

প্রথম ভাগ

অধিক সংখ্যক হাদীস বিজ্ঞানীর মতে প্রথম শ্রেণতে মাত্র ছয়জন সাহাবী গণ্য হইতে পারেন। তাঁহারা হইতেছেনঃ (১) হযরত আবূ হুরায়রা (রা) (২) হযরত আয়েশা (রা), (৩) হযরত আবদুল্লহ ইবন আব্বাস (রা), (৪) হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা), (৫) হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) এবং (৬) হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)। তাঁহাদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা সহস্রাধিক। কিন্তু শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (র) এই পর্যায়ে মোট আটজন সাহাবীকে গণ্য করিয়াছেন। তিনি ইহাদের সঙ্গে শামিল করিয়াছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আ’স (রা) ও হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা)-কে।[**************]

শাহ দেহলভীর এই মত হাদীস বিজ্ঞানের প্রথম শ্রেণীর মনীষীদের মতের বিপরীত। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রা)- ও প্রথমোক্ত ছয়জন সাহাবীকেই সর্বাধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী বলিয়া উল্লেক করিয়াছেন।[************]

বস্তুত মুহাদ্দিসরা সাধারণত হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা)-কে এই পর্যায়ে গণ্য করেন নাই’ যদিও তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা সহস্রাধিক।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী তাঁহার সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তিনি এক হাজার একশত সত্তরটি হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। তন্মধ্যে বুখারী ও মুসলিম- উভয় কিতাবে ৪৬ টি এবং স্বতন্ত্রভাবে বুখারী শরীফে ১৬ টি ও মুসলিমে অপর ৫২ টি হাদীস উল্লিখিত হইয়াছে।[**********]

শাহ ওয়ালীউল্লাহ (র) হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আ’স (রা)-কে কেন এই পর্যায়ভুক্ত করিতে চাহেন, তাহা বুঝা গেল না। কেননা নির্ভরযোগ্য হিসাব মুতাবিক তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মাত্র সাতশত।[**********] এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যাইতে পারে যে, সহস্র কিংবা সহস্রাধিক হাদীসের বর্ণনাকারী সাহাবীর সংখ্যা মাত্র সাতজন এবং তাঁহাদের বর্ণিত মোট হাদীসের সংখ্যা চৌদ্দ হাজার আটশত সত্তরটি।[***********]

এই ছয়-জন সাহাবী সম্পকের্ক এখানে খানিকটা বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা আবশ্যক বোধ হইতেছে। কেননা হাদীস সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস ও স্পষ্ট ধারণা সৃষ্টির জন্য এই আলোচনা অপরিহার্য।

হযরত আবূ হুরায়রা (রা)

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) সপ্তম হিজরী সনের মুহররম মাসে খায়বার যুদ্ধের সময় ইসলাম কবুল করেন এবং স্থানীয়ভাবে নবী করীম (স)-এর সঙ্গে ধারণা করেন। সেই সময় হইতেই নবী করীম (স)- এর ইন্তেকাল পর্যন্ত তিনি কখনো রাসূলের দরবার ও সঙ্গ ত্যাগ করিয়া যান নাই।[***********] ইহার মূলে তাঁহার উদ্দেশ্যে ছিল ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ও বিস্তারিত জ্ঞানার্জন।

ইবনে আবদুল বার লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

আবূ হুরায়রা খায়বরের যুদ্ধের বছর ইসলাম কবুল করেন। তিনি রাসূলে করীম (স)- এর সঙ্গেই এই যুদ্ধে শরীক হন। অতঃপর তিনি রাসূলের সঙ্গ ধারণ করেন। সব সময়ই তাঁহার সঙ্গে থাকিতেন। তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল ইলম হাসিল করা। ইহাতেই তিনি সন্তুষ্ট থাকিতেন ও তাঁহার ক্ষুধা নিবৃত্ত হইত। তাহার হাতে রাসূলের হাত বাঁধা থাকিত। তিনি যেখানে যাইতেন, আবূ হুরায়রা (রা)-ও সেখানে যাইতেন।[***************]

রাসূলে করীম (স) সাধারণত যেসব কথাবার্তা বলিতেন, অপর লোকের সওয়ালের জওয়াবে তিনি যাহা কিছু ইরশাদ করিতেন, ইসলাম ও কুরআনের বিভিন্ন বিষয়ে যাহা কিছু শিক্ষাদান করিতেন, কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করিতেন, বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণ ও বক্তৃতা দিতেন, রাসূলের দরবারে সর্বক্ষণ উপস্থিত থাকিয়া তাহা সবই তিনি গভীরভাবে শ্রবণ করিতেন ও মুখস্থ করিয়া রাখিতেন। সেই সঙ্গে তিনি নিজেও রাখিতেন। অন্য সাহাবিগণের অনেকেই পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাষাবাদের বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকিতেন বলিয়া তাঁহারা খুব বেশী সময় রাসূলের দরবারে অতিবাহিত করিত পারিতেন না। কিন্তু হযরত আবূ হুরায়রার এই ধরনের কোন ব্যস্ততাই ছিল না। এই কারণে অন্যান্যদের তুলনায় তিনি অধিক হাদীস শ্রবণের সুযোগ লাভ করিয়াছেলেন। বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করা তাঁহার পক্ষে বিচিত্র কিছুই নয়। এমতাবস্থায় হযরত আবূ হুরায়রা (রা) নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমার মুহাজির ভাইগণ অধিকাংশ সময়ে বাজারে ব্যবসায়ের কাজে ব্যস্ত থাকিতেন, আর আমি রাসূলের সঙ্গে লাগিয়া থাকিতাম। বাহিরে আমার কোন ব্যস্ততাই ছিল না। ফলে তাঁহারা যখন রাসূলের দরবারে অনুপস্থিত থাকিতেন আমি তখন সেখানে হাযিল থাকিতাম। তাঁহারা ভুলিয়া গেলে আমি তাহা স্মরণ রাখিতাম।

অপরদিকে আমার আনসার ভাইগণ তাঁহাদের ধন-সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা লইয়া ব্যস্ত থাকিতেন। কিন্তু আমি ছিলাম সুফফার একজন মিসকীন ও গরীব ব্যক্তি। ফলে তাঁহারা কোন বিষয় ভূলিয়া গেলেও আমি তাহা স্মরণ করিয়া রাখিতাম।[***************]

হযরত আবূ হুরায়রা (রা)- এর বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা ৫৩৪৭ টি। তন্মধ্যে বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্হে উল্লেখ করা হইয়াছে ৩২৫টি হাদীস, আর স্ববন্ত্রভাবে ৭৯ টি হাদীস কেবল বুখারী শরীফে এবং ৯৩টি হাদীস কেবল মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত হইয়াছে।[*****************]

ইমাম বুখারী ও বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

আটশতেরও অধিক সাহাবী ও তাবেয়ী তাঁহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।[************]

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) অন্য সাহাবীদের অপেক্ষা এত অধিক হাদীস কেমন করিয়া বর্ণনা করিতে পারিলেন, উপরিউক্ত তাঁহার নিজস্ব বিশ্লেষণ হইতে তাহা বিশদভাবেই জানিতে পারা যায়। এতদ্ব্যতীত তাঁহার নিম্নোক্ত বানী হইতেও এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা জন্মে। তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

এই আয়াত দুইটি যদি আল্লাহ তা’আলা তাঁহার কিতাবে নাযিল না করিতেন, তাহা হইলে আমি কখনই কোন হাদীস বর্ণনা করিতাম না। উহাতে আল্লাহ বলিয়াছেনঃ আমি যেসব সুস্পষ্ট যুক্তিপূর্ণ ও হিদায়অতের কথা  নাযিল করিয়াছে, তাহাকে যাহারা গোপন করিয়া রাখে- তাহাদের উপর আল্লাহর ও অন্যান্য অভিসম্পাতকারীদের অভিশাপ।[মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০২; বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, ২২ পৃষ্ঠা।]

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কমবেশী প্রায় তিন বৎসরকাল ক্রমাগতভাবে রাসূলের সঙ্গে থাকিয়া হাদীস শ্রবণ করিয়াছেন এবং তাহা স্মরণ করিয়া রাখিয়াছেন। তাহার ফলেই তাঁহার পক্ষে অন্য সাহাবীদের তুলনায় এত অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করা সম্ভব হইয়াছে। বিশেষত তাঁহাকে আল্লাহ তা’আলা এত প্রখর স্মরণশক্তি দান করিয়াছিলেন যে, তিনি যাহা কিছু শুনিতেন, তাহা কখনই ভুলিয়া যাইতেন না। যদিও তাঁহার এই অতুলনীয় স্মৃতিশক্তি রাসূলে করীমের দো’আ ও এক বিশেষ তদবীরের ফলেই অর্জিত হইয়াছিল। [************] তাঁহার সর্বাধিক হাদীস অর্জন ও অতুলনীয় স্মৃতিশক্তির কথা তদানীন্দন সমাজে সর্বজনবিদিত ও স্বকৃত ছিল। নিম্বোদ্ধৃত উক্তিসমূহ হইতে তাহা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়।

হযরত উবায় ইবন কা’ব (রা) বলেনঃ

******************************************************

আবূ হুরায়রা রাসূলের নিকট প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা করার ব্যাপারে বড় সাহসী ছিলেন। তিনি এমন সব বিষয়ে তাঁহাকে জিজ্ঞাসাবাদ করিতেন, যে বিষয়ে অপর কোন সাহাবী জিজ্ঞাসা করিতেন না।[***********]

আবূ আমের বলেনঃ আমি হযরত তালহার নিকট উপস্থি ছিলাম। এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহাকে বলিলঃ ‘হে  আবূ মুহাম্মদ!’ আবূ হুরায়রা রাসূলের হাদীসের বড় হাফেয, না তোমরা, তাহা আজ পর্যন্ত আমরা বুঝিতে পারিলাম না’। তখন হযরত তালহা (রা) বলিলেনঃ ‘তিনি [আবূ হুরায়রা (রা)] এমন অনেক কথাই জানেন, যাহা আমাদের জ্ঞান বহির্ভূত। ইহার কারণ এই যে, আমরা বিত্ত-সম্পত্তিশালী লোক ছিলাম, আমাদের ঘর-বাড়ি ও স্ত্রী-পরিজন ছিল, আমরা তাহাতেই অধিক সময় মশগুল থাকিতাম। কেবল সকাল ও সন্ধ্যার সময় রাসূল (স)-এর খিদমতে হাযির থাকিয়া নিজের নিজের কাজে চলিয়া যাইতাম। আর আবূ হুরায়রা (রা) মিসকীন ছিলেন, তাঁহার কোন জায়গা-জমি ও পরিবার –পরিজন ছিল না। এই কারণে তিনি রাসূলের হাতে হাত দয়িা তাঁহার সঙ্গে লাগিয়া থাকিতেন। আমাদের সকলেরই বিশ্বাস, তিনি আমাদের সকলের অপেক্ষা অধিক সংখ্যক হাদীস শুনিতে পাইয়াছেন। তিনি রাসূলের নিকট না শুনিয়াই কোন হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন, আমাদের কেহই তাঁহার উপর এই দোষারোপ করে নাই।[**************]

হযরত আয়েশা (রা) একবার তাঁহাকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেনঃ “কি রকমের হাদীস বর্ণনা করিতেছ? অথচ আমি রাসূল (স)- এর যেসব কাজ দেখিয়াছি ও যেসব কথা শুনিয়াছি, তুমিও তাহাই শুনিয়াছ? ‘ইহার জওয়াবে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলিলেনঃ “আম্মা! আপনি তো রাসূল (স)-এর জন্য সজ-সজ্জার কাজেই ব্যস্ত থাকিতেন আর আল্লাহর শপথ, রাসূলের দিক হইতে কোন জিনিসই আমার দৃষ্টিকে অন্যদিকে ফিরাইতে পারিত না”।[******************]

উমাইয়া শাসক মারওয়ানের নিকট হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কোন ব্যাপার অসহ্য হওয়ায় তিনি রাগান্বিত হইয়া একবার বলিয়াছিলেনঃ ‘লোকেরা বলে, আবূ হুরায়রা (রা) বহু হাদীস বর্ণনা করেন; অথচ নবী করীম (স)- এর ইন্তেকালের কায়েকদিন মাত্র পূর্বেই তিনি মদীনায় আসেন।

জওয়াবে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলিলেনঃ ‘আমি যখন মদীনায় আসি তখন আমার বয়স ছিল ত্রিশ বৎসরের কিছু বেশী। অতঃপর রাসূল (স)-এর ইন্তেকাল পর্যন্ত আমি তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে রহিয়াছি। তাঁহার সাথে বেগমদের মহল পর্যন্ত যাইতাম তাঁহার খিদমত করিতাম, তাঁহার সঙ্গে লড়াই-জিহাদে শরীক হইতাম, তাঁহার সঙ্গে হজ্জে গমন করিতাম। এই কারণে আমি অপরের তুলনায় অধিক হাদীস জানিতে পারিয়াছি। আল্লাহর শপথ, আমার পূর্বে যেসব লোক রাসূল (স)-এর সাহচর্যে আসিয়াছিলেন, তাঁহারাও রাসূল (স)-এর দরবারে আামার সব সময় উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করিতেন এবং আমার নিকট তাঁহারা হাদীস জিজ্ঞাসা করিতেন। হযরত উমর (রা) হযরত উসমান (রা), হযরত তালহা (রা) ও হযরত যুবায়র (রা) তাঁহাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।[************] তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ বলেনঃ

******************************************************

আবূ হুরায়রা  রাসূল (স)-এর নিকট হইতে এতসব হাদীস শুনিয়াছেন তাহা আমরা শুনিতে পরি নাই; ইহাতে কোনই সন্দেহ থাকিতে পারে না।[*************]

হযরত ইবন উমর (রা) হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-কে লক্ষ্য করিয়া একদিন বলিয়াছিলেনঃ

******************************************************

তুমি আমাদের অপেক্ষা রাসূল (স)-এর সাহচর্যে বেশ লাগিয়া থাকিতে এবং এই কারণে তাঁহার হাদীস তুমি আমাদের অপেক্ষা অধিক জানিতে ও মুখস্থ করিতে পারিয়াছ।[***********]

ইমাম যাহবী লিখিয়াছেন, হযরত উমর ফারুক (রা)- ও হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-কে একদিন এই কথাই বলিয়াছিলেন।[***********]

তাবয়িদের মধ্যে বহুসংখ্যক মনীষী হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর তীক্ষ্ম স্মরণশক্তি সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়াছেন। এখানে কয়েকজনের উক্তি উদ্ধৃত করা যাইতেছেঃ

আবূ সালেহ বলেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স)-এর সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) সর্বাধিক স্মরণশক্তিসম্পন্ন ও হাদীসের অতি বড় হাফেয ছিলেন।[*************]

সায়ীদ ইবনে আবুল হাসান বলিয়াছেনঃ

******************************************************

সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) অপেক্ষা অধিক হাদীস বর্ণনাকারী আর একজনও ছিলেন না।[*******]

ইমাম বুখারী (রা) হযরত আবূ হুরায়রা (রা) সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তাঁহার নিকট হইতে প্রায় আটশত মনীষী হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। তাঁহার যুগের হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন হাদীসের সবচেয়ে বড় হাফেয।[****************]

বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

হযরত আবু হুরায়রা (রা) সাহাবীদের মধ্যে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী-ইহাতে সকল হাদীসবিজ্ঞানীই একমত।[***************]

ইমাম শাফেয়ী (র) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আবূ হুরায়রা (রা) তাঁহার যুগের সমস্ত হাদীস বর্ণনাকারীর মধ্যে সর্বাধিক স্মরণশক্তিসম্পন্ন ও হাদীসের বড় হাফেয।[*************]

মুহাদ্দিস হাকেম বলিয়াছেনঃ

******************************************************

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) রাসূল (স)- এর সাহাবীদের মধ্যে অধিক স্মরণশক্তিসম্পন্ন ও হাদীসের অতি বড় হাফেয ছিলেন। তিনি রাসূল (স)-এর সঙ্গে অন্যান্যদের তুলনায় অনেক বেশী সময় অবস্থান করিয়াছেন। কেননা তিনি প্রয়োজনের দিক দিয়া পরিতৃপ্ত ছিলেন। তাঁহার হাত রাসূল (স)-এর হাতের মধ্যে থাকিত, রাসূল (স) যখন যেখানে যাইতেন তিনিও তখন সেখানে যাইতেন। রাসূলের ইন্তেকাল পর্যন্তই এই অবস্থা থাকে। আর এই কারণেই অন্যান্যের তুলনায় হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা অনেক বেশী হইয়াছে।[***************]

ইমাম আল-হাফিয বাকী ইবন মাখলাদ আন্দালুসী তাঁহার মুসনাদ গ্রন্হে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

আবূ হুরায়রার বর্ণিত পাঁচ হাজার তিন শত চুয়াত্তরটি হাদীস রহিয়াছে। সাহাবাদের মধ্যে অন্য কেহই এই পরিমাণ কিংবা ইহার কাছাকাছি পরিমাণ হাদীসও বর্ণনা করেন নাই।[********************]

মোটকথা তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা অধিক হওয়ার চারটি প্রধান কারণ রহিয়াছে। কারণ চারটি এইঃ

১। ইসলাম কবুল করার পর সব সময়ের জন্য রাসূল (স)-এর সঙ্গ ধারণ।

২। হাদীস শিক্ষা ও উহা মুখস্থ করিয়া রাখার জন্য আকুল আগ্রহ এবং শ্রুত কোন কথাই ভুলিয়া না যাওয়া।

৩। বড় বড় সাহাবীর সাহচর্য ও তাঁহাদের নিকট হাদীস শিক্ষার সুযোগ লাভ ইহাতে তাঁহার হাদীস জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করে ও পূর্বাপর সর্বকালের হাদীসই তিনি সংগ্রহ করিতে সমর্থ হন।

৪। নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর দীর্ঘ দিন পর্যন্ত বাঁচিয়া  থাকা, প্রায় ৭৪ বৎসর পর্যন্ত হাদীস প্রচারের সুযোগ লাভ এবং কোন প্রকার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদের ব্যস্ততা কবুল না করা।

এই সব কারণে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হাদীসের বড় হাফেয ও সাহাবীদের মধ্য অধিক হাদীসজ্ঞ এবং অধিক হাদীস বর্ণনাকারী ছিলেন। সাহাবিগণ বিচ্ছিন্নভাবে যাহা বর্ণনা করিতেন, সেই সব হাদীস হযরত আবূ হুরায়রার নিকট একত্রে পাওয়া যাইত। ফলে সকলেই তাঁহার নিকট জিজ্ঞাসা করিতেন ও তাহার উপর নির্ভর করিতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আবূ হুরায়রা (রা) মুসলমানদের জন্য রাসূল (স)-এর হাদীস হিফয করিয়া রাখিতেন।[***************]

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) যে হাদীসের অতি বড় আলিম ছিলেন, তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা যে অন্যান্যের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই বেশী হইবে এবং তাঁহার বর্ণিত হাদীস যে সর্বতোভাবে বিশ্বাষ্য ও নির্ভরযোগ্য, তাহা পূর্বোক্ত দীর্ঘ আলোচনা হইতে অকাট্যভাবেই প্রমাণিত হইতেছে। এতদসত্ত্বেও যাহারা হযরত আবূ হুরায়রার অধিক হাদীস বর্ণনার প্রতি কটাক্ষ করিয়াছেন, তাহাদের ধৃষ্টতা দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইতে হয়।

হযরত আয়েশা (রা)

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা) বিশ্বনবনী জীবন সংঙ্গিনী হিসাবে একাধারে দীর্ঘ নয়টি বৎসর অতিবাহিত করেন। আর রাসূল জীবনের এই বৎসর কয়টিই সর্বাধিক কর্মবহুল ও ইসলামী জীবন ব্যস্থার পূর্ণ প্রতিষ্ঠার সময়। হযরত আয়েশার আঠারো বৎসর বয়সকালে নবী করীম (স)-এর ইন্তেকাল হয়। অতঃপর প্রায় ঊনচল্লিশ বৎসর তিনি জীবিত থাকেন। এই কারণে একদিকে তিনি যেমন নবী করীম (স)-এর নিকট হইতে বিপুল সংখ্যক হাদীস সংগ্রহ করিতে পারিয়াছিলেন, অপরদিকে ঠিক তেমনি পারিয়াছিলেন উহার সুষ্ঠু প্রচার করিতে। নবী করীম (স)-এর বহু সংখ্যক সাহাবী এবং তৎপরবর্তী কালের বহু সংখ্যক তাবেয়ী তাহার নিকট হাদীস শ্রবণ করিতে পারিয়াছেন, পারিয়াছেন তাহার মুসনাদসূত্রে উহার বর্ণনা করিতে।[********]

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

হযরত আয়েশা (রা) একজন বড় ফিকাহবিদ সাহাবী ছিলেন এবং রাসূল (স)-এর নিকট হইতে যে ছয়জন সাহাবী সর্বাধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি তাঁহাদের একজন। তাঁহার সনদে দুই হাজার দুইশত দশটি হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। তন্মধ্যে বুখারী ও মুসলিম গ্রন্হদ্বয়ে সমানভাবে একশত চুয়াত্তরটি হাদীস উল্লেখ করা হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত আলাদাভাবে চুয়ান্নটি হাদীস বুখালী শরীফে এবং অপর আটান্নটি মুসলিম শরীফে উল্লিখিত হইয়াছে।[**********]

হযরত আনাস (রা)

পূর্বেই বলা হইয়াছে, হযরত আনাস (রা) দীর্ঘ দশ বৎসর কাল পর্যন্ত নবী করীম (স)-এর খিদমতে নিযুক্ত ছিলেন।[ঐ] রাসূলে করীম (স)-এর সান্নিধ্যে থাকিয়া তাঁহার অনেক কথা শুনিবার এবং অনেক কাজ লক্ষ্য করিয়া দেখিবার তিনি সুযোগ পাইয়াছিলেন। হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে যে কয়জন সাহাবী বিশেষ নীতি অবলম্বন করিতেন, তিনি তাহাদের অন্যতম। তিনি ইলমে হাদীসের বিশেষ খিদমত আঞ্জাম দিয়াছেন। বলিতে গেলে সমগ্র জীবনই তিনি হাদীস প্রচারের কাজে নিয়োজিত রহিয়াছেন । রাসূল (স)-এর ইন্তেকালের পর অন্যান্য সাহাবা যখন যুদ্ধ ও সংঘাতে নিমজ্জিত ঠিক সেই সময়ও তিনি হাদীস প্রচারে অক্লান্তভাবে মশগুল ছিলেন। শেষ জীবনে বসরার জামে মসজিদই ছিল তাঁহার হাদীস প্রচারের কেন্দ্র।

তাঁহারদ হাদীস প্রচারের মজলিসে মক্কা, মদীনা, বসরা, কুফা ও সিরিয়ার হাদীস শিক্ষাভিলাষী ছাত্রগণ আকুল আগ্রহ লইয়া শরীক হইতেন।

তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা কয়েক সহস্র। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনীর কথায়ঃ

******************************************************

তিনি নবী করীম (স) হইতে দুই হাজার দুইশত ছিয়াশিটি হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।[********************]

তন্ম্যে বুখারী শরীফে ৮৩টি মুসলিম শরীফে অপর ৯১টি হাদীস উল্লেখ করা হইয়াছে। আর ১৬৮ টি হাদীস বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্হেই উদ্ধৃত হইয়াছে। বসরা নগরে ইন্তেকালকারী সাহাবীদের মধ্যে তিনিই সর্বশেষ। তিনি প্রায় এক শতাব্দীকাল বাঁচিয়াছিলেন।[*****************]

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) রাসূল (স)-এর দরবারে খুবই ছোট বয়সেই সাহাবী ছিলেন। এই অল্প বয়স্কতার কারণে তিনি বদর যুদ্ধে যোগদান করিবার সুযোগ ইইতে বঞ্চিত হইয়াছিলেন।[*************] কিন্তু উহার পরবর্তী সকল ব্যাপারেই তিনি প্রত্যক্ষভাবে শরীক হইয়াছেন। ফলে তিনি নবী করীম (স)-এর সঙ্গে থাকার এবং তাঁহার হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের মধ্যে তিনি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদার অধিকারী। তাঁহার বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা ১৬৩০। তন্মধ্যে ‌১৭৩টি বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্হেই উদ্ধৃত। এতদ্ব্যতীত বুখারী শরীফে ৮১টি ও মুসলিম শরীফে ৩‌১ হাদীস উল্লেখ করা হইয়াছে।[****************] আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

আবূ হুরায়রার পরে সাহাবীদের মধ্যে তিনিই সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী।[*****************]

হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা)

হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসের খালা ছিলেন উম্মুল মু’মিনীন হযরত মায়মুনা (রা)। হযরত আবদুল্লাহ সাধারণত খালা আম্মার ঘরেই অবস্থান করিতেন। করিতেন এই কারণে যে, তিনি নবী করীম (স)-এর রাত্রিকালীন ইবাদত-বান্দেগী নিজ চক্ষে দেখিবার জন্য বিশেষ আগ্রহান্বিত ছিলেন।[**********] নবী করীম (স) তাঁহার জন্য দোয়া করিয়াছিলেন এই বলিয়াঃ

******************************************************

হে আল্লাম তুমি ইবন আব্বাসকে দ্বীন-ইসলাম সম্পর্কে বিশেষ সমঝদার বানাও এবং তাহাকে সে ব্যাপারের নিগূঢ় তত্ত্ব জানাইয়া দাও।[************]

ইহার ফলে তিনি যে বিপূল সংখ্যক হাদীস সংগ্রহ করিতে সমর্থ হইবেন, তাহা আর বিচিত্র কি! আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

ইবন আব্বাস (রা) নবী করীম (স) হইতে এক হাজার ছয়শত ষাটটি হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। তন্মধ্যে ৯৫ টি বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্হে্ উল্লিখিত হইয়াছে। আর কেবলমাত্র বুখারীতে একশত কুড়িটি এবং কেবল মুসলিমে ৪৯ টি হাদীস রহিয়াছে।[*******] সাহাবী তাবেয়ীনের মধ্যে। বিপুল সংখ্যক লোক তাঁহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। সকলে তাঁহাকে হাদীসের বিশেষ পারদর্শী বলিয়া জানিতেন।[**************]

হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা)

হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) ইলমে হাদীসে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। হাদীসের জন্য তিনি আজীবন সাধনা করিয়াছেন। হাদীস শিক্ষা, চর্চা ও প্রচারই ছিল তাঁহার জীবনের লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্যে তিনি বহু দূরবর্তী অঞ্চলের দুর্গমতম পথে বহু বৎসর পর্যন্ত সফর করিয়াছেন। তাঁহার সম্পর্কে মিশকাত-গ্রন্হ সংকলনক বলিয়াছেনঃ

******************************************************

তিনি প্রখ্যাত সাহাবীদের অন্যতম। যে কয়জন সাহাবী বেশী সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি তাঁহাদের একজন।[****************]

তিনি সরাসরি নবী করীম (স) হইতে যেমন হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন, তেমনি করিয়াছেন সাহাবাদের মধ্যমে। ওহুদের যুদ্ধে হযরত আবদুল্লাহ শহীদ হইলে হযরত জাবির রাসূল (স)-এর স্থায়ী সঙ্গ অবলম্বন করেন। তিনি দীর্ঘদিন জীবিত থাকেন। মুসলিম জাহানের বড় বড় শহর নগর সফর ব্যাপদেশে তিনি হাদীস বর্ণনাকারী বহু সাহাবীর সহিত সাক্ষাত লাভের সুযোগ পান । মসজিদে নববীতে তিনি দীর্ঘদিন হাদীস শিক্ষাদানের জন্য একটি ‘হলকা’ (চক্র) গঠন করেন। রাসূল (স)-এর পর তিনি ৬৪ বৎসর বাঁচিয়া থাকেন। এই দীর্ঘ জীবন তিনি হাদীস প্রচারেই অতিবাহিত করেন। তাঁহার বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা হইতেছে ‌১৫৪০। তন্মধ্যে বুখারী ও মুসলিম ষাটটি হাদীস মিলিতভাবে উল্লেখ করিয়াছেন। বুখারী আলাদাভাবে ২৬ টি এবং মুসলিম স্বতন্ত্রভাবে অপর ২৬ টি হাদীস উল্লেখ করিয়াছেন।[*******************]

দ্বিতীয় ভাগ

দ্বিতীয় ভাগে গণ্য পাঁচশত কিংবা পাঁচশতের অধিক হাদীস বর্ণনাকারী হিসাবে যে সাহাবীদের নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে, তাঁহারা হইতেছে মাত্র চার জন্য। তাঁহাদের নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া গেল

১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা):তিনি মক্কা শরীফে ইসলামী দাওয়তের প্রথম সময়েই ইসলাম কবুল করেন এবং রাসূল (স)-এর সঙ্গে প্রায় প্রতিটি যুদ্ধেই যোগদান করেন। তিনি রাসূল (স)-এর জুতারক্ষক ছিলেন। রাসূল (স) কে তিনি কাপড় পরাইয়া দিতেন।

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী তাঁহার সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

রাসূল (স) হইতে তিনি ৮৪৮টি হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। তন্মধ্যে বুখারী ও মুসলিমের উভয় কিতাবে ৬৪ টি হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত অপর ২১ টি বুখারী শরীফৈ এবং আরো ৩৫টি মুসলিম শরীফে উল্লিখিত হইয়াছে।[******************]

২. হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস (রা):আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী তাঁহার সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তিনি অত্যন্ত বড় আলিম ও ইবাদতের কাজে বড় পরিশ্রমী ছিলেন। তিনি হযরত আবূ হুরায়রা (রা) অপেক্ষা অধিক হাদীসের ধারক ছিলেন। কেননা তিনি হাদীস লিখিয়া লইতেন আর হযরত আবূ হুরায়রা (রা) (প্রথমে) লিখিতেন না। এতদসত্ত্বেও তাহার সনদে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা হযরত আবূ হুরায়রার সনদে বর্ণিত হাদীস অপেক্ষা অনেক কম।[****************]

তিনি হাদীস লিখিয়া রাখিতেন। মুজাহিদ বলেনঃ আবদুল্লাহর নিকট একখানি হাদীস সংকলন দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিরাম ইহা কি? তিনি বলিলেনঃ

******************************************************

ইহার নাম সাদেকা। রাসূল (স)-এর নিকট হইতে আমার শ্রুত হাদীসসমূহ ইহাতে লিখিত আছে। এই হাদীস শ্রবণে আমার ও রাসূল (স)-এর মাঝখানে অন্য কোন ব্যক্তি নাই।[***************]

৩. হযরত আলী (রা):খুলাফায়ে রাশেদীনের চতুর্থ খলীফা। পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ও স সময়ে রাসূলের সহচর হিসাবে অবস্থানকারী। রাসূলে করীম (স)-এর চাচাতো ভাই এবং জামাতা। বনি হাশিম বংশের প্রথম খলীফা ও তিনি।[*****************]

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী তাঁহার সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তাঁহার সনদে রাসূল (স) হইতে মোট ৫৮৬টি হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। তন্মধ্যে বুখারী-মুসলিম উভয়ই নিজ নিজ গ্রন্হে বিশটি হাদীস উল্লেখ করিয়াছেন। এতদ্ব্যতীত বুখারী ৯টি এবং মুসলিম অপর পনেরোটি হাদীস উল্লেখ করিয়াছেন।[************]

৪. হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা):  খুলাফায়ে রাশেদীনের দ্বিতীয় খলীফা। নবুয়্যাতের ষষ্ঠ বৎসরেই তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাহার ইসলাম গ্রহণের ফলে মক্কা শরীফে ইসলাম প্রবল শক্তি লাভ করে। ইসলামের জন্য তিনি সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেন।[*************] এক হিসাব মুতাবিক তাঁহার বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা হইতেছে ৫৩৯।[************]

তৃতীয় ভাগ

তৃতীয় পর্যায়ে মোট ২৬  জন সাহাবী গণ্য হইয়া থাকেন। তাঁহাদের নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিম্নে প্রদত্ত হইতেছেঃ

১. উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রা):তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ১৫৭টি । তন্মধ্যে দুইটি বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্হেই উল্লিখত আছে। মিশকাত গ্রন্হকার তাঁহার সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তাহার নিকট হইতে হযরত ইবন আব্বাস (রা), আয়েশা (রা) এবং তাঁহার নিজের কন্যা যয়নব, তাহার পুত্র উমর ও ইবনুল মুসাইয়্যিব হাদীস রিওয়ায়েত করিয়াছেন।

এতদ্ব্যতীত বহু সংখ্যক সাহাবী এবং তাবেয়ীও তাঁহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।[******************]

২। হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা): আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী তাঁহার সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তাঁহার বর্ণিত হাদীস তিনশ ষাটটি। তন্মধ্যে বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্হেই পঞ্চশটি হাদীস উদ্ধৃত হইয়াছে। এতেদ্ব্যতীত বুখারী শরীফে স্বতন্ত্রভাবে চারটি হাদীস ও মুসলিম শরীফে অপর পনরটি হাদীস উল্লেখ করা হইয়াছে। তাঁহার নিকট হইতে আনাস ইবন মালিক (র) ও তারেক ইবন শিহাব এবং আরো বহু সংখ্যক তাবেয়ী হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি সাহাবাদরে মধ্যে একজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরূপে গণ্য হইতেন।[**********]

৩। হযরত বরা ইবন আজেব (রা): বদরদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

রাসূলের নিকট হইতে তাঁহার সনদে তিনশত ও আরো পাঁচটি হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। তান্মধ্যে বুখারী ও মুসলিম- উভয় কিতাবে ২২টি হাদীস, কেবল বুখারী শরীফে পনেরোটিএবং কেবল মুসলিম শরীফে ছয়টি হাদীস উদ্ধৃত হইয়াছে।[*****************]

৪। হযরত আবূ যর গিফারী (রা): তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

প্রথম চারজন ইসলাম গ্রহণকারীর মধ্যে আমি চতুর্থ।[ঐ]

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী উল্লেখ করিয়াছেনঃ

******************************************************

তাঁহার সনদে রাসূলের নিকট হইতে ২৮১ টি হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। তন্মধ্যে বারোটি হাদীস বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্হে এবং এককভাবে বুখারী শরীফে ২টি ও মুসলিম  শরীফে ১৭টি হাদীস উদ্ধৃত হইয়াছে। বহু সংখ্যক সাহাবীও তাঁহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।[***********] তাবেয়ী ও তাঁহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।[**********]

হযরত সায়াদ বিন ইবনে আবূ ওয়াক্কাস (রা):দুনিয়ায় জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবীর মধ্যে তিনি একজন। ১৪ কি ১৭ বৎসর বয়সে তিনি ইসলাম কবুল করেন। তিনিই সর্বপ্রথম আল্লাহর দ্বীনের জন্য জিহাদে তীর নিক্ষেপ করেন। তাঁহার সম্পর্কে আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

রাসূলের নিকট হইতে তাঁহার বর্ণিত মোট হাদীস হইতেছে দু্ইশত সত্তরটি। তন্মধ্যে বুখারী ও মুসলিম উভয়ই পনেরোটি হাদীস উ্ল্লেখ করিয়াছেন। আর আলাদাভাবে বুখারীতে পাঁচটি ও মুসলিম-এ আঠারোটি হাদীস উল্লেখিত হইয়াছে।[***********]

৬। হযরত সহল ইবনে সায়াদ আনসারী (রা): তাঁহার পনেরো বৎসর বয়সের সময় রাসূলে করীম (স) ইন্তেকাল করেন এবং সাহাবীদের মধ্যে তিনিই সকলের শেষে মদীনায় ইন্তেকাল করেন।[**********] সকল সাহাবীর ইন্তেকালের পর একমাত্র তিনিই জীবিত ছিলেন বলিয়া ইলমে হাদীসের জন্য সকলে তাঁহার দিকেই প্রত্যাবর্তন করিত। তাঁহার বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা হইতেছে ১৮৮ টি। তন্মধ্যে ২৮ টি হাদীস বুখারী ও মুসলিম-উভয় গ্রন্হেই উল্লিখিত হইয়াছে।[*************]

৭। হযরত উবাদা ইবনে সাবিত (রা):মক্কা হইতে ইসলামের আওয়াজ মদীনারর যেসব লোকের কর্ণে প্রবেশ করে ও পরপর তিন বারের হজ্জের সময় অনুষ্ঠিত আকাবার বায়’আতে শরীক হন, তিনি তাঁহাদের একজন।[************]

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

রাসূলের নিকট হইতে তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ১৮১। তন্মধ্যে বুখারী ও মুসলিম-উভয় গ্রন্হে ছয়টি হাদীস উল্লেক করা হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত বুখারী অপর দুইটি হাদীস এবং মুসলিম অপর দুইটি হাদীস উল্লেখ করিয়াছেন।[*************]

৮। হযরত আবূদ্দরদা (রা):তিনি একজন বড় সম্মানিত সাহাবী। তাঁহার জ্ঞান, বুদ্ধি, মনীষা ও ইলমে হাদীসের উপর পূর্ণ পারদর্শিতা সুপ্রসিদ্ধ। হযরত আবূযর গিফারী (রা) তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া একদিন বলিলেনঃ

******************************************************

জমিনের উপর ও আসমানের নীচে তোমার অপেক্ষা বড় আলিম এখন আর কেহ নাই হে আবূদ্দরদা।[************]

৯। হযরত আবূ কাতাদাহ আনসারী (রা):তিনি হাদীসবর্ণনার ব্যাপারে অত্যাধিক মাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন করিতেন। রাসূলের প্রতি মিথ্যা কথা আরোপ করা সম্পর্কিত তীব্র বাণী শ্রবণের পরই তিনি এই নীতি অবলম্বন করিতে শুরু করেন।[ঐ, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯২।] এতদসত্ত্বেও তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ১০০।

১০। হযরত উবাই ইবন কায়াব (রা):তাঁহার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ইলমে হাদীসের খিদমতে অতিবাহিত হইয়াছে। খতীবুল উমরী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তিনি নবী করীম (স)-এর জন্য ওহী লেখক ছিলেন। রাসূলের যুগে যাঁহারা সম্পূর্ণ কুরআন মজীদ মুখস্থ করেন তিনি তাঁহাদের একজন্য। তাঁহার সূত্রে বহু সংখ্যক লোক হাদীস বর্ণনাকরিয়াছেন।[************]

১১। হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রা):দ্বিতীয়বারে অনুষ্ঠিত আকাবার বায়’আতে উপস্থিত সাতজনের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। বদর ও অন্যান্য সকল যুদ্ধেই তিনি শরীক ছিলেন। নবী করীম (স) তাঁহাকে বিচারপতি ও ইসলামের শিক্ষাদাতা হিসাবে ইয়েমেন প্রদেশে প্রেরণ করিয়াছিলেন।[************]

হযরত ইবন মাসউদ বলিয়াছেনঃ

******************************************************

মুয়ায সব কল্যাণের শিক্ষাগুরু এবং আল্লাহ ও রাসূলের অনুগত ছিলেন।[ঐ ৩৪১ পৃষ্ঠা।]

তাঁহার সম্পর্কে স্বয়ং নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

হালাল হারাম সম্পর্কে মুয়ায সকলের অপেক্ষা বেশী জানে।[**************]

তিনি আরো বলিয়াছেনঃ

******************************************************

কিয়ামতের দিন মুয়ায আলিম সমাজের ইমাম হিসাবে উপস্থিত হইবেন।[***************]

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর, ইবনে আব্বাস, ইবনে আবূ আওফা, আনাস ইবনে মালিক, আবূ ইমামাতা, আবূ কাতাদাহ, আবূ সালাবাতা, আবদুর রহমান ইবনে সামুরাতা, জাবির ইবনে সামুরাতা প্রমুখ সাহাবী তাঁহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।[*********************]

১২। হযরত নুমান ইবনে বশীর (রা): তিনি হিজরতের পরে আনসার বংশের প্রথম সন্তান। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তাঁহার সনদে একশত চৌদ্দটি হাদীস বর্ণিত হইয়াছে।[************]

১৩। হযরত আবূ বাকরাতা (রা):তিনি তায়েফ বিজয়ের পর রাসূলের সহিত আসিয়া যোগদান করেন। তাঁহার সম্পর্কে বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তিনি সাহাবাদের মধ্যে ইলমের দিক দিয়া অধিক পারদর্শী ছিলেন। ছিলেন সর্বাধিক নেক লোকদের অন্যতম। তিনি সব সময় ইবাদতের কাজে প্রাণপণ চেষ্টা করিতে থাকিতেন।[*************]

আইনী ইহাও লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তাঁহার সনদে নবী করীম (স) হইতে মোট ১৩৩ টি হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। তন্মধ্যে ৮টি হাদীস বুখারী ও মুসলিম- উভয় গ্রন্হে এবং অপর পাঁচটি বুখারী শরীফে ও অপর একটি মুসলিম শরীফে উল্লিখিত হইয়াছে।[*******]

১৪। হযরত জরীর ইবনে আবদুল্লাহ (রা):তিনি রাসূলে করীম (স)-এর ইন্তেকালের বৎসরই ইসলাম কবুল করেন। তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

আমি রাসূলের ইন্তেকালের চল্লিশ দিন পূর্বে ইসলাম কবুল করিয়াছি।[*********]

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তাঁহার বর্ণিত হাদীস একশতটি। তন্মধ্যে বুখারী ও মুসলিম উভয়ই আটটি হাদীস উল্লেখ করিয়াছেন এবং বুখারী ও মুসলিম ছয়টি আলাদা হাদীস উল্লেখ করিয়াছেন। মুসলিম শরীফের শরাহ নববী কিতাবে উল্লেখ করা হইয়াছে, তাঁহার বর্ণিত হাদীস দুইশত। তন্মধ্যে বুখারী এককভাবে উল্লেখ করিয়াছেন মাত্র একটি। কেহ বলিয়াছেন, ছয়টি।[************]

১৫। হযরত আবূ আইয়ুব আনসারী (রা):তিনি একজন অতি সম্মানিত সাহাবী। দ্বিতীয়বারের আকাবার বায়’আতে এবং বদর যুদ্ধে তিনি শরীক হইয়াছিলেন। মদীনায় উপস্থিত হইয়া রাসূলে করীম (স) প্রথমে তাঁহারই ঘরে  অবস্থান করিয়াছিলেন। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা একশত পঞ্চাশটি। তন্মধ্যে সাতটি হাদীস বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্হেই উল্লিখিত হইয়াছে। বুখারীতে ইহা ব্যতীত অন্য একটি হাদীসও রহিয়াছে।[**********]

১৬। হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা):তিনি খুলাফায়ে রাশেদীনের তৃতীয় খলীফা, আমীরুল মু’মিনীন। রাসূলের দুই কন্যারই পরপর তাঁহার সঙ্গে বিবাহ হইয়াছিল। বদরুদ্দীন আইনী তাঁহার সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তিনি রাসূলের নিকট হইতে ১৪৬টি হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। বুখারী তন্মধ্যে এগারটি নিজ কিতাবে উল্লেখ করিয়াছেন।[***********]

১৭। হযরত মুগীরা ইবনে শুবা (রা):সাহাবীদের মধ্যে ইলম-এর দিক দিয়া বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। হাদীসের কিতাবসমূহে তাঁহার বর্ণিত ১৩৩টি হাদীসের উল্লেখ রহিয়াছে। এতদ্ব্যতীত আরো একটি হাদীস বুখারী শরীফে  এবং অপর দুইিট মুসলিম শরীফে উল্লেখ করা হইয়াছে।[***********]

১৮। হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা):খতীবুল উমরী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তিনি সাহাবীদের মধ্যে বিশিষ্ট মনীষী এবং ফিকাহবিদদের অন্যতম।[***********]

১৯। হযরত উসামা ইবনে যায়দ (রা):তিনি নবী করীম(স)- এর পালিত পুত্র। ইসলামী জ্ঞানে তিনি বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। রাসূলের ইন্তেকালের সময় তাঁহার বয়স ছিল আঠার কিংবা বিশ বৎসর মাত্র। তবুও রাসূলে করীম (স)-এর বিপুল সংখ্যক বানী তাঁহার স্মৃতিশক্তিতে সুরক্ষিত ছিল। তাঁহার আমল ও চরিত্রও ছিল সকলের জন্য আদর্শ এবং অনুসরণীয়।[*************]

তাঁহার দ্বারা বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণিত ও প্রচারিত হইয়াছে। তাঁহার বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা হইতেছে ১২৮টি । তন্মধ্যে ১৫টি বুখারী ও মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত অপর দুইট হাদীস বুখারী শরীফে এবং অপর দুইটি মুসলিম শরীফে উল্লিখিত হইয়াছে।[*************]

২০। হযরত সওবান (রা):তিনি রাসূলে করীম (স)-এর ক্রীদাস ও তাঁহার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি সব সময়ই রাসুলে করীম (স)-এর সঙ্গে থাকিতেন। তিনি একদিকে যেমন হাদীস মুখস্থ করিতেন, স্মরণ রাখিতেন, তেমনি হাদীস প্রচারের দায়িত্বও তিনি পূর্ণ মাত্রায় পালন করিতেন।[************]

২১। হযরত বুরায়দা ইবনে হাসীব (রা):সাহাবীদের মধ্যে তিনি বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন। রাসূলের বিপূল সংখ্যক হাদীস তাঁহার কণ্ঠস্থ ছিল। তাঁহার বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা ১৬৪। তন্মধ্যে একটি মাত্র হাদীস বুখারী ও মুসলিম-উভয় গ্রন্হে উল্লিখিত হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত আরো ২টি হাদীস কেবলমাত্র বুখারী শরীফে ও ১১ টি কেবলমাত্র মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত হইয়াছে।[**********] তাঁহার বর্ণিত সব কয়টি হাদীসই সরাসরি রাসূলের নিকট হইতে শ্রুত।[***********]

২২। হযরত আবূ মাসউদ আকাবা ইবনে উমর (রা):আকাবার দ্বিতীয় বায়’আতের সময় তিনি ইসলাম কবুল করেন।দ্বীন-ইসলামের একজন উদ্যমশীল প্রচারক ছিলেন তিনি। সব কয়টি যুদ্ধেই তিনি শরীক ইয়াছিলেন। হাদীস প্রচারেও তিনি যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন। হাদীসের কিতাবসমূহে তাঁহার বর্ণিত ১০২টি হাদীসের উল্লেখ পাওয়া যায়।[***********]

২৩। হযরত জরীর ইবনে আবদুল্লাহ (রা):তিনি রাসূলের ইন্তেকালের প্রায় চল্লিশ দিন পূর্বে ইসলাম কবুল করেন। তাঁহার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা একশত। তন্মধ্যে আটটি হাদীস বুখারী ও মুসলিম-উভয়  গ্রন্হেই উল্লিখিত হইয়াচে। এতদ্ব্যতীত বুখারী শরীফে একটি হাদীস স্বতন্ত্রভাবে উল্লিখিত হইয়াছে, আর মুসলিম শরীফে উল্লিখিত হইয়াছে ছয়টি হাদীস। অবশ্য নববীর শরহে মুসলিম গ্রন্হে বলা হইয়াছে যে, হযরত জরীর হইতে দুইশত হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। তন্মধ্যে বুখারী শরীফে একটি এবং মসলিম শরীফে নয়টি হাদীস উল্লিখিত হইয়াছে।[************]

২৪। হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব ফরাজী (রা):তাঁহার সম্পর্কে মিশকাত সংকলক বলিয়াছেনঃ

******************************************************

তিনি হাফেজে হাদীস ছিলেন এবং রাসূলে নিকট হইতে অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারীদের মদ্যে তিনি অন্যতম। তাঁহার নিকট হইতেও বহু সংখ্যক লোক হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।[************]

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তাঁহার নিকট হইতে মোট একশত তেইশটি হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। তাহার মধ্য হইতে মাত্র চারিটি হাদীস বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হইয়াছে।[**************]

২৫। হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রা):তিনি হযরত সায়াদ ইবনে আবূ অক্কাসের ভাগ্নেয়। কুফা নগরে তিনি অবস্থান করিতেন এবং সেখানেই ৭৪ হিজরীতে তাঁহার ইন্তেকাল হয়। তাঁহার নিকট হইতেও বিপুল সংখ্যক লোক হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।[*****************]

২৬। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা):তিনি খুলাফায়ে রাশেদীনের প্রথম খলীফা। নবী করীম (স)-এর আজীবনের বন্ধু ও সহচর। জাহিলিয়াতের যুগ হইতে ইসলামী সমাজ কায়েম হওয়া পর্যন্ত কোথাও কোন অবস্থায়ই তিন বেশিী সময়ের জন্য রাসূলে করীম (স) হইতে বিচ্ছিন্ন হন নাই। তাঁহার সম্পর্কে  তাঁহার সম্পর্কে মিশকাত সংকলক লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

বহু সংখ্যক সাহাবী ও তাবেয়ীন তাঁহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। তবে রাসূলের ইন্তেকালের পর অল্পকাল মাত্র জীবিত থাকার কারণে তাঁহার নিকট হইতে খুব কম সংখ্যক হাদীসই বর্ণিত হইয়াছে।[**************

হযরত আবূ বকরের হাদীস বর্ণনা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার জন্য এই গ্রন্হের ‘খুলাফায়ে রাশেদীন ও হাদীস গ্রন্হ সংকলন’ আালোচনা দ্রষ্টব্য।]

উপরিউল্লিখিত সাহাবীদের প্রত্যেকের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা একশত কিংবা ততোধিক এবং ইহাদের সকলের বর্ণিত সর্বমোট হাদীস হইতেছে ৪৫৫৬টি।

চতুর্থ ভাগ

চতুর্থ ভাগের হাদীস বর্ণকারী সাহাবী হইতেছে ৩৩ জন। তাঁহাদের প্রত্যেকেরই নিকট হইতে চল্লিশ হইতে একশতটি হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। তাঁহাদের নামের পূর্ণ তালিকা এখানে পেশ করা হইতেছেঃ

(১) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবী আওফা (২) হযরত যায়দ ইবনে সাবিত (৩) হযরত যায়দ ইবনে আরকাম (৪) হযরতকায়াব ইবনে আসলামী (৫) হযরতযায়দ ইবনে খালেদুল জুহানী (৬) হযরতহযরত আবূ তালহা যায়দ ইবনে সহল (৭) হযরতহযতর রাফে’ ইবনে খাদীজ (৮) হযরতসালমা ইবনে আকাওয়া (৯) হযরতআবূ রাফে কিবতী (১০) হযরত আওফ ইবনে মালিকুল আশজায়ী (১১) হযরতআদী ইবনে হাতিম (১২) হযরতআবদুর রহমান ইবনে আওফ (১৩) উম্মল মুমিনীন হযরত উম্মে হাবীবা (১৪) হযরতআম্মার ইবনে ইয়াসার (১৫) হযরত সালমান ফারসী (১৬)  উম্মুল মুমিনীন হযরত হাবসা (১৭) হযরতহযরত বুরাইরা ইবনে মুতরিম কুবশী (১৮) হযরতআসমা বিনতে আবু বকর (১৯) হযরতওয়াসিলা ইবনে আসকা কানানী (২০) হযরত আকবা ইবনে আমের জুহানি (২১) হযরত ফুযালা ইবনে উবায়দা আনসারী (২২) হযরত উমর ইবনে উতবা (২৩) হযরত কায়াব ইবনে আমর আনসারী (২৪) হযরত ফুযালা ইবনে উবাইদ আসলামী (২৫) উম্মুল মুমিনীন হযরত মায়মুনা (২৬) হযরত উম্মে হানী (২৭) হযরত আবূ হুযায়ফা ইবনে মুগাফফাল (২৮) হযরত বিলাল ইবনে রিয়াহ তামীমী (২৯) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (৩০)হযরত মিকদান ইবনে  আসাদ কুফী (৩১) হযরত উম্মে আতীয়া আনসারীয়া (৩২) হযরত হাকীম ইবনে হাজার আসাদী এবং (৩৩) হযরত সালমা ইবনে হানীফ আনসারী (রা)।

পঞ্চম ভাগ

পঞ্চম ভাগের সাহাবীদের সংখ্যা পঞ্চান্ন। তাঁহাদের প্রত্যেকের নিকট হইতে চল্লিশ কিংবা চল্লিশ হইতেও কম সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। এখানে এই পর্যায়ের অপেক্ষাকৃত বেশী হাদীস বর্ণনাকারী ৪০ জনের নাম উল্লেখ করা যাইতেছে। তাঁহারা হইতেছেনঃ

(১) হযরত জুবাইর ইবনে আওয়াম (২) হযর ফাতিমা বিনতে কায়স (৩) হযতর খাব্বাব ইবনুল ইবত (৪) হযরত আয়াজ ইবনে হাম্মাদ তামীমী (৫) হযরত মালিক ইবনে রবীয়া সয়েদ (৬) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (৭) হযরত উম্মে কায়স বিনতে মহয (৮) হযরত ফজল ইবনে আব্বাস (৯) হযরত আমের ইবনে রবীয়া (১০) হযরত রবী বিনতে ময়ূদ (১১) হযরত উসাইদ ইবনে হুযাইর আশহালী (১২) হযরত খালিদ ইবনে অলীদ (১৩) হযরত উমর ইবন হারীস (১৪) হযরত খাওলা বিনতে হাকীম (১৫) হযরত সাবিত ইবনে জহাক (১৬) হযরত ওরওয়াহ ইবনে আবী জায়দুল আসাদী (১৭) হযরত মুয়াবিয়া ইবনে হাকীম সালামী (১৮) হযরত ইয়ামরা বিনতে সফওয়ান (১৯) হযরত ওরওয়াহ ইবনে মজরাস (২০) হযরত মজমা ইবনে ইয়াজীদ (২১) হযরত সালম  ইবনে কায়স (২২) হযরত কাতাদা ইবনে লুকমান (২৩) হযরত কুবাইসা ইবনে মুখরিক আমেরী (২৪) হযরত আসেম ইবনে আদী (২৫)  হযরত সালমা ইবনে নয়ীম আশজায়ী (২৬) হযরম মালিক ইবনে স’সায়া (২৭) হযতর মহজন ইবনে আদরা (২৮) হযরত সায়েব ইবনে ফালাহ (২৯) হযরত খাফাফ গিফারী (৩০)হযতর যু’ফজর হাবশী (৩১) হযরত মালিক ইবনে হুবাইর (৩২) হযরত যায়দ ইবনে হারিস (৩৩) হযরত সাবিত ইবনে আদীয়া (৩৪) হযরত কায়াব ইবনে আয়াজ আশ’আরী (৩৫) হযরত কুলসুম ইবনে হুসাইন গিফারী (৩৬) হযরত দাহইয়া কলবী (৩৭) হযরত জুদানা বিনতে ওহাব (৩৮) হযরত মালিক ইবনে ইয়াসার (৩৯) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জামরা এবং (৪০) হযরত কুলসুম ইবনে আলকামাহ (রা)।

অবশিষ্ট ১৫ জন অল্পবয়স্ক সাহাবী। তাঁহাদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা খুবই অল্প ও অনুল্লেখযোগ্য।

উপরে বিভিন্ন পর্যায়ে যে সাহাবীদের নাম উল্লেখ করা হইল, তাঁহাদের মোট সংখ্যা একশত পাঁচ। মুসলিম মিল্লাতের নিকট হাদীসের যে বিরাট মহান সম্পদ অক্ষয় ও অনির্বাণ আলোক-স্তম্ভ রহিয়াছে, ইহা তাঁহাদের বর্ণিত- তাঁহারদেরই অপরিসীম নিষ্ঠাপূর্ণ ও নিরবিচ্ছিন্ন চেষ্টা, সাধনা, অক্লান্ত শ্রম, অবিচল আল্লাহ-বিশ্বাষী ও চিরন্তন মানব কল্যাণ কামানার ফল, তাহাতে সন্দেহ নাই।[*******************]

 

হাদীস বর্ণনায় সংখ্যা পার্থক্যের কারণ

পূর্বের আলোচনায় দেখা গিয়াছে যে, হাদীস বর্ণনায় সাহাবীদের মধ্যে সংখ্যার দিক দিয়া বিরাট পার্থক্য রহিয়াছে। একই নবীর সাহাবী সত্ত্বেও কেহ বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন, আবার কেহ করিয়াছেন অতি নগণ্য সংখ্যক হাদীস। হাদীস বর্ণনায় এই বিরাট পার্থক্য সৃষ্টির কারণ কি, তাহা আমাদের বিশেষভাবে জানিয়া লওযা আবশ্যক।

নবী করীম (স) যতদিন পর্যন্ত সাহাবীদের মধ্যে জীবিত ছিলেন, ততদিন পর্যন্ত তিনি সাধারণভাবে তাঁহাদের সকলকেই দ্বীন-ইসলাম, আল্লাহর কিতাব হিকমতের শিক্ষা দানে ব্যাপৃত ছিলেন। তখন যেমন রাসূলের নামে কোন মিথ্যা কথা প্রচার করার অবকাশ ছিল না, তেমনি ছিল না রাসূলের কোন কথাকে ‘রাসূলের কথা নয়’ বলিয়া উড়াইয়া দেওয়ার বা প্রত্যাখ্যান করার এক বিন্দু সুযোগ। তখন মুনাফিকগণও রাসূলের কোন কথার অপব্যাখ্যা করিয়া ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার তেমন কোন সুযোগ পাইত না। কেননা তেমন কিছু ঘটিলেই সাহাবীয়ে কিরাম রাসূলের নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া সমস্ত ব্যাপারে পরিস্কার ও সুস্পষ্ট করিয়া লইতে পারিতেন। ইতিহাসে বিশেষত হাদীস শরীফে ইহার অসংখ্য নিদর্শন বিদ্যমান রহিয়াছে। হযতর উমর ফারূক (রা) একবার হযরত হিশাম ইবনে হাকীমকে সূরা আল-ফুরকান নূতন পদ্ধতিতে পড়িতে দেখিয়া অত্যন্ত আশ্চর্যোবোধ করেন এবং তাঁহাকে পাকড়াও করিয়া রাসূলের দরবারে লইয়া আসেন। অতঃপর নবী করীম (স) হযরত হিশামের পাঠ শ্রবণ করিয়া বলিয়াছেন যে, এইভাবেও উহা পাঠ করা বিধিসম্মত। ফলৈ হযরত উমরের মনের সন্দেহ দূরীভূত হয়। এ কারণে এই কথা বলা যায় যে, রাসূলে করীম (স) তাঁহার জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কিরামের পারস্পরিত সমস্ত মতবিষম্যের মীমাংসা দানকারী ছিলেন। কোন বিষয়ে একবিন্দু সন্দেহ বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হইলেই রাসূলের দ্বারা সাক্ষাতভাবে উহার অপনোদন করিয়া লওয়া হইত।

কিন্তু নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর এই অবস্থায় বিরাট পরিবর্তন ঘটে। একদিকে যেমন ওহীর জ্ঞান লাভের সূত্র ছিন্ন হইয়া যায়, তেমনি অপরদিকে অসংখ্য নও-মুসলিম মুর্তাদ হইয়া দ্বীন-ইসলাম পরিত্যাগ করিতে উদ্যত হয়। এইরূপ অবস্থায় ঘোলা পানিতে স্বার্থ শিকারের উদ্দেশ্যে কিছু সংখ্যা মুনাফিকও মাথাচাড়া দিয়া উঠে। তখন তাহারা যদি রাসূলের নামে কোন মিথ্যা রটাইতে চেষ্টা করিয়া থাকে, তবে তাহা কিছুমাত্র বৈচিত্র বা বিস্ময়ের কিছু নয়।

কিন্তু প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর (রা) ইহার সম্মুখে প্রবল প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেন। তিনি একদিকে যেমন পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করিয়া মুর্তাদ ও যাকাত অস্বীকারকারীদের মস্তক চূর্ণ করিয়া দেন, অপরদিকে ঠিক তেমনি প্রবলভাবে মিথ্যাবাদীদের মিথ্যা কথা প্রচারের মুখে দুর্জয় বাধার প্রাচীর রচনা করিয়া দেন। তাঁহার পর হযরত উমর ফারুক (রা)-ও ইহার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিন হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে অত্যন্ত কড়াকড়ি অবলম্বন করেন। হাদীসের বিরাট সম্পদ বক্ষে ধারণ করিয়া বিপুল সংখ্যক সাহাবী অতন্দ্র প্রহরীর মত সজাগ হইয়া বসিয়া থাকেন। কোন হাদীস বর্ণনা করিলে তাহা মুনাফিকদের হাতে ক্রীড়ানক হইয়া পড়িতে পারে ও বিকৃত রূপ ধারণ করিতে পারে- এই আশংকায় তাঁহারা সাধারণভাবে হাদীস বর্ণনা করা প্রায় বন্ধ করিয়া দেন। কাহারো মনে এই ভয় এতদূর প্রবল হইয়া দেখা দেয় যে, বেশী করিয়া হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে ভূল হইয়া যাইতে পারে কিংবা সাধারণ মুসলমান হাদীস চর্চায় একান্তভাবে মশগুল হইয়া পড়িলে তাহারা আল্লাহর নিজস্ব কালাম কুরআন মজীদের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করিতে পারে। এইসব কারণেও সাধারণভাবে সাহাবায়ে কিরাম হাদীস প্রচার ও বর্ণনা সাময়িকভাবে প্রায় বন্ধ করিয়া রাখেন। শরীয়াতের মাসলা-মাসায়েলের মীমাংসা কিংবা রাষ্ট্র শাসন ও বিচার-আচার প্রভৃতি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে যখন হাদীসের আশ্রয় গ্রহণ অপরিহার্য হইয়া পড়িত কেবলমাত্র তখন তাঁহারা পরস্পরের নিকট হাদীস বর্ণনা করিতেন।

এই পর্যায়ে আমরা বিশেষভাবে কয়েকজন সাহাবীর কথা উল্লেখ করিতে পারি এবং বিপুল সংখ্যক হাদীস জানা থাকা সত্ত্বেও তাঁহাদের অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করিবার কারণও তাহা হইতে অনুধাবন করিতে পারি।

হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) নবী করম (স)-এর আজীবনের সঙ্গী, হযরত আবূ উবায়দা, হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব, হযতর ইমরান ইবনে হুসাইন প্রমুখ মহাসম্মানিত সাহাবী বিপুল সংখ্যক হাদীস জানা থাকা সত্ত্বেও তাঁহাদের নিকট হইতে খুবই কম সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হইয়াছে। হযরত সায়ীদ ইবনে যায়দ বেহেশতবাসী হওয়ার সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবীর মধ্যে অন্যতম; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও তিনি মাত্র দুইটি কিংবা তিনটি হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। হযরত উবাই ইবনে উম্মারাতা কেবলমাত্র একটি হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।

কোন কোন সাহাবী রাসূলের ইন্তেকালের পর খিলাফতের দায়িত্ব পালনে এতই মশগুল হইয়া পড়িয়াছিলেন যে, তাঁহার পক্ষে হাদীস বর্ণনার মত সুযোগ বা অবসর লাভ করা সম্ভব হয় নাই । খুলাফায়ে রাশেদীনের চারজন সম্মানিত সাহাবী এবং হযরত তালহা ও হযরত জুবাইর (রা) এই কারণের বাস্তব দৃষ্টান্ত।

বহু সংখ্যক সাহাবীর অবস্থা ছিল ইহার ঠিক বিপরীত। তাঁহাদের ছিল বিপুল অবসর। হাদীস বর্ণনার প্রতিবন্ধক হইতে পারে এমন কোন ব্যস্ততাই তাঁহাদের ছিল না। ফলে তাঁহারা বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করিতে সমর্থ হন। যেমন হযরত আবূ হুরায়রা (রা), হযরত আয়েশা (রা) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা)।

কোন কোন সাহাবী নবী করীম (স)- এর সংস্পর্শে ও সঙ্গে থাকার অপেক্ষাকৃত বেশী সুযোগ পাইয়াছিলেন। দেশে-বিদেশে, ঘরে ও সফরে সর্বত্র তাঁহার সঙ্গে থাকার কারণে একদিকে যেমন অধিক সংখ্যক হাদীস সংগ্রহ করা তাঁহাদের পক্ষে সহজ হইয়াছিল, তেমনি তাঁহার ইন্তেকালের পর উহাকে অপরের নিকট পূর্ণ মাত্রায় বর্ণনা করার সুযোগও তাঁহাদের ঘটিয়াছিল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), হযরত আবূ হুরায়রা (রা), হযতর যাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা), হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) প্রমুখ সাহাবীর নাম এই পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য। কিছু সংখ্যক সাহাবী রাসূলে করীম (স)-এর জীবদ্দশায়ই কিংবা তাঁহার ইন্তেকালের অব্যবহিত পরেই ইন্তেকাল করিয়াছিলেন বলিয়া তাঁহাদের জীবনে অপরের নিকট হাদীস বর্ণনা করার কোন সুযোগই ঘটে নাই। রাসূলের সঙ্গলাভ কিংবা তাঁহার সঙ্গে লাগিয়া থাকার সুযোগ যাঁহাদের বেশী ঘটে নাই, তাঁহাদের নিকট হইতেও খুব কম সংখ্যক হাদীসই বর্ণিত হইয়াছে।

রাসূলে করীম (সা)-এর অন্তর্ধানের পর ইসলামী সমাজে নিত্য নূতন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। তখন মুসলিম জনসাধারণের পক্ষে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রাসূলের কথা জানা আবশ্যকীয় হইয়া পড়ে। ফলে এই সময়ে জীবিত সাহাবীগণ বেশী সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করিতে বাধ্য হইয়াছেন। পরবর্তীকালে মুসলিমদের মধ্যে ইলম হাদীস অর্জন করার  প্রবল আগ্রহ জন্মে। তাঁহারা সাহাবীদের নিকট নানাভাবে রাসূলের হাদীস শ্রবণের আবদার পেশ করিতেন। এই কারণেও সাহাবিগণ তাঁহাদের নিকট সুরক্ষিত ইলমে হাদীস তাঁহাদের সামনে প্রকাশ করিতে ও তাঁহাদিগকে উহার শিক্ষাদান করিতে প্রস্তুত হন। এই কারণও অনেক সাহাবীর নিকট হইতে বিপুল সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হইতে পারিয়াছে।

খিলাফতে রাশেদার শেষ পর্যায়ে মুসলিম সমাজে নানাবিধ ফিতনার সৃষ্টি হয়। শিয়া এবং খাওয়ারিজ দুইটি বাতিল ফিরকা স্থায়ীভাবে মাথাচড়া দিয়া উঠে। এই সময় তাহারা কিছু কিছু কথা রাসূলের হাদীস হিসাবে চালাইয়া দিতেও চেষ্টা করে। এই কারণে রাসূলের কোন কোন সাহাবী প্রকৃত হাদীস কম বর্ণনা করিতেও হাদীস বর্ণনায় অধিক কড়াকড়ি করিতে বাধ্য হন। ঠিক এই কারণেই চতুর্থ খলীফা হযতর আলী (রা)-এর নিকট হইতে খুবই কম সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হইতে পারিয়াছে।

স্মরণশক্তির পার্থক্য  ও হাদীস লিখিয়া রাখা বা না রাখাও হাদীস বর্ণনায় এই সংখ্যা পার্থক্য সৃষ্টির অন্যতম কারণ। যাঁহারা হাদীস বেশী মুখস্থ করিয়া কিংবা লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিতে পারিয়াছিলেন- যেমন হযরত আবূ হুরায়রা (রা) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা)- তাঁহারা অপর সাহাবীদের অপেক্ষা অধিক হাদীস বর্ণনা করিতেত সমর্থ হইয়াছিলেন। একই রাসূলের অসংখ্য সাহাবীদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা পার্থক্য সৃষ্টির মূলে এইসব বিবিধ কারণ নিহিত রহিয়াছে। কাজেই ব্যাপারটি যতই বিস্ময়কর হউক না কেন, অস্বাভাবিক কিছুই নয়, তাহা নিঃসন্দেহে বলা যায়।[মুহাম্মদ আবু জহু লিখিত ***************গ্রন্হের ৬৬,৬৭, এবং ১৪৭ ও ১৪৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।]

 

তাবেয়ীদের হাদীস সাধনা

নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবীদের যুগ সূচিত হয়। সাহাবায়ে কিরাম যেভাবে নবী করীমের নিকট হইতে কুরআন-হাদীস তথা ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষালাভ করিয়া বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন, সাহাবায়ে কিরামও ঠিক সেইভাবে তাঁহাদেরই পরবর্তী পর্যায়ের লোক তাবেয়ীদিগকে কুরআন-হাদীস এবং ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা দিয়াছেন। নবী করীম (স)-এর জীবদ্দশায় ইসলামী জ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে স্বয়ং নবীর যে মর্যাদা ছিল, নবী করীমের অন্তর্ধানের পর সাহাবায়ে কিরাম (রা) অনুরূপ দায়িত্বপূর্ণ মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। তাঁহারাও ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত চেষ্টার মারফতে তাবেয়ী যুগের মুসলিম জনগণকে ইসলামী জ্ঞানধারায় পরিষিক্ত করার জন্য কুরআন ও হাদীস জ্ঞানের অধিকতর পারদর্শী করিয়া তুলিবার কাজে ব্রতী হন। নবী করীম (স) যেভাবে মদীনায় প্রাথমিক পর্যায়ে এক বিরাট জ্ঞান-কেন্দ্র স্থাপন করিয়াছিলেন, উত্তরকালে সাহাবীদের অধিকাংশই ব্যক্তিগতভাগে ও নিজস্ব পরিমণ্ডলে এক-একটি জ্ঞান-চক্র রচনা করিয়াছিলেন এবং তাঁহাদের নিকট হইতে তাবেয়ী যুগের মুসলিমগণ কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান অর্জন করেন। কিন্তু তাবেয়ী কে? এ সম্পর্কে মৌলিক আলোচনা এখানেই হওয়া আবশ্যক। ঐতিহাসিক খতীব বাগদাদী এই সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তাবেয়ী তিনি,যিনি সাহাবীরে সংস্পর্শে রহিয়াছেন।

এই সংজ্ঞা অনুযায়ী সাহাবীর সহিত নিছক সাক্ষাৎ লাভই তাবেয়ী হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়; বরং সাহাবীর একত্রে কিছুকাল অতিবাহিত করাও জরুরী। কিন্তু বহুসংখ্যক মুহাদ্দিসের মত অন্যরূপ। তাঁহাদের মতেঃ

******************************************************

‘তাবেয়ী’ তিনি , যিনি কোন সাহাবীর সাক্ষাৎ পাইয়াছেন, যদিও তাঁহার সংস্পর্শে থাকেন নাই।

ইবনে হাব্বান এই ব্যাপারে সাহাবীর সহিত সাক্ষাতকালে তাবেয়ী’র মধ্যে বুদ্ধি ও ভালমন্দ জ্ঞানের উন্মেষ হওয়ার শর্ত আরোপ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেনঃ

******************************************************

সাক্ষাতের সময় যদি সে অল্প বয়স্ক হইয়া থাকে এবং যাহা কিছু শুনিয়াছে তাহার পূর্ণ হেফাযত ও সংরক্ষণে সমর্থ হইয়া না থাকে, তাহা হইলে সাহাবীর সহিত তাহার নিছক সাক্ষাৎলাভের কোন মূল নাই।[**************]

সাহাবীদের পর তাবেয়ীদের উচ্চমর্যাদা কুরআন মজীদেও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

এবং মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যাহারা ইসলাম কবুল করার ব্যাপারে অগ্রবর্তিতা লাভ করিয়াছে এবং যাহারা ঐকান্তিক আত্মোৎসর্গ ও সন্তোষ সহকারে তাহাদের অনুসরণ করিয়াছেন, আল্লাহ তাহাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তাহারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এবং আল্লাহ তাহাদের জন্য বাগান তৈরী করিয়া রাখিয়াছেন, যাহার নিম্নদেশ হইতে ঝরনাধারা প্রবাহিত রহিয়াছে।[সূরা আত-তাওরা, ২য় রুকূ, ১০০ নং আয়াত।]

কুরআনের এই আয়াতে মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের পরেই তাবেয়ীদের কথা বরা হইয়াছে। ইহারা ঈমান ও আমলের ব্যাপারে যেমন সাহাবায়ে কিরামরে অধীন, অনুরূপভাবে কালের দিক দিয়াও তাঁহারা সাহাবদের উত্তরসূরী। এই কারণেই প্রচলিত পরিভাষায় তাঁহাদিগকে ‘তাবেয়ীন’ (পরবর্তী বা অনুসারী) বলা হইয়াছে।

তাবেয়ীদের কথা হাদীসেও বিশেষ মর্যাদা সহকারে বলা হইয়াছে। রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

আমার সমকালীন লোকগণ (সাহাবী) আমার উম্মতের মধ্যে উত্তম। তাহাদের পর তাহারা, যাহারা তাহাদের সহিত মিলিতকালে অবস্থিত (তাবেয়ী’ন) তাহাদের পর তাহাদের সহিত মিলিতকালের লোকগণ (তাবে-তাবেয়ীন)।[মুসলিম শরীফ, কিতাবুল ফাজায়েল পৃষ্ঠা ৩০৯।]

বস্তুত সাহাবাদের পরবর্তী সময়ের মুসলিম জামা’আত- তাবেয়ীন মোটামুটিভাবে সাহাবীদেরই প্রতিবিম্ব ছিলেন। তাঁহারা একদিকে যেমন রাসূলের সাহাবীদের নিকট হইতে কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কিত যাবতীয় জ্ঞান অর্জন করেন, অপরদিকে তাঁহারা তদানীন্তন বিরাট মুসলিম সমাজের দিকে দিকে কোণে কোণে উহার ব্যাপক প্রচারাকার্য় সম্পাদন করেন। ইসলামী ইলমে সাহাবীদের নিকট হইতে গ্রহণ ও পরবর্তীকালের অনাগত মুসলিমদের নিকট উহা পৌঁছাইবার জন্য কার্যত তাঁহারাই মাধ্যম হইয়াছিলেন।[তাবেয়ীন-শাহ মুয়ীনউদ্দীন প্রণীত, ভূমিকা, পৃষ্ঠা ২-৩।]

এই তাবেয়িগণ সংখ্যায় ছিলেন অনেক- তাঁহাদের সংখ্যা নির্ভূলভাবে নির্ধারণ করাও সম্ভব নয়। কেননা নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কিরাম দুনিয়ার বিভিন্ন দিকে ছড়াইয়া পড়েন এবং-

******************************************************

সাহাবীদের মধ্য হইতে একজনের সঙ্গেও যাঁহার সাক্ষাৎ ঘটিয়াছে, তিনিই একজন তাবেয়ী।[****************]

এই কারণে সারা মুসলিম জাহানে বিশেষভাবে এবং সারা দুনিয়ায় সাধারণভাবে কত সংখ্যক তাবেয়ী হইয়াছিলেন, তাহা নিরূপণ করা বাস্তবিকই অসম্ভব। কিন্তু হাদীস সংকলনের ইতিহাসে কেবল সেইসব তাবেয়ীই উল্লেখযোগ্য, যাঁহারা নবী করীম (স)-এর পরবর্তী যুগে হাদীস শিক্ষা, হাদীস কণ্ঠস্থকরণ ও লিখনের সহিত কোন না কোন দিক দিয়া জড়িত ছিলেন। তাবেয়ীদের হাদীস সাধনা পর্যায়ে আমরা কেবল এই শ্রেণীর প্রখ্যাত তাবেয়ীদের সম্পর্কেই আলোচনা করিব।

তাবেয়ীদের যুগে হাদীস শিক্ষার যে ক্রমিক পদ্ধতি ছিল, তাহা নিম্নোক্ত বাক্যাংশ হইতে প্রমাণিত হয়ঃ

******************************************************

ইলমে হাদীস শিক্ষার পদ্ধতি এইরূপ ছিল যে, প্রথমে শ্রবণ করা হইত, পরে উহাতে মনোযোগ স্থাপন করা হইত, তাহার পর উহা মুখস্থ করা হইত, অতঃপর তদনুযায়ী আমল শুরু করা হইত এবং উহার পর তাহা প্রচার করার জন্য বাস্তব কার্যক্রম গ্রহণ করা হইত।[**************]

বস্তুত ঠিক এই পদ্ধতি ও ক্রমিক অনুযায়ীই সাহাবায়ে কিরাম (রা) তাঁহাদের শিষ্য- শাগরিদদিগকে হাদীসের শিক্ষা দান করিতেন এবং নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামী সমাজকেন্দ্রে জ্ঞান বিস্তারের আলোক-স্তম্ভ রচনা করিয়াছিলেন। ফলে এই যুগে বিপুল সংখ্যক লোক হাদীস শিক্ষা লাভ করার ও তদনুযায়ী নিজেদের জীবন গড়িয়া তুলিবার সুযোগ লাভ করেন। হাদীস মুখস্থ করা, হাদীস লিখিয়া রাখা এবং হাদীস গ্রন্হ সংকলন করা প্রভৃতি সকল কাজেই তাঁহারা পূর্ণমাত্রায় উদ্যোগী ও উৎসাহী হইয়াছিলেন। সেই সঙ্গে এই সকল বিষয়ে তাঁহারা পূর্ণ ব্যুৎপত্তি, কৃতিত্ব, যশ ও খ্যাতি লাভ করেন।

তাবেয়ী যুগে হাদীস চর্চার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে এখানে স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা করা যাইতেছে।

হাদীস মুখস্থকরণ

সাহাবায়ে কিরামের ন্যায় তাবেয়িগণও হাদীসের শিক্ষা গ্রহণ ও মুখস্থকরণের ব্যাপারে পূর্ণ উদ্যম, উৎসাহ, অপরিসীম আগ্রহ এবং নিষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছেন। তাঁহাদের নিকট কুরআন মজীদের পরে পরেই দ্বিতীয় জ্ঞন-উৎস ছিল এই হাদীস। কুরআনে তাঁহারা যেখানে ইসলামের মূল নীতি ও বিধানের পাঠ গ্রহণ করিতেন, হাদীসের মাধ্যমে তাঁহারা লাভ করিতেন ইসলাম সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান ও তথ্য।

তাবেয়ী যুগের মুসলমানগণ প্রথম পর্যায়ে হাদীস মুখস্থ করার প্রতিই সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন। যে হাদীসেই শুনিতে পাইতেন, তাহাই তাঁহারা মুখস্থ করিয়া ফেলিতেন। এই সময় পর্যন্ত আরব জাতির স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তির উপর পূর্ণমাত্রায় নির্ভরতা ছিল, কোন কিছু আয়ত্ত করিতে হইলে প্রথমত উহাকে মুখস্থ করাই ছিল তাঁহাদের চিরন্তন অভ্যাসগন রীতি। বিশেষত তখন পর্যন্ত লিখন-শিল্প তাহাদের মধ্যে বিশেষ বিস্তার, প্রসার ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ  করিতে পারে নাই।

কিন্তু এতদসত্ত্বেও হাদীস যে একেবারেই লিখিত হইত না, কেবল মুখস্থ করার উপরই সকলে নির্ভর করিতেন এমন কথাও নহে। বরং প্রকৃত অবস্থা এই ছিল যে, অধিকাংশ লোকই তখন মুখস্থ করিতেই অভ্যস্ত ছিলেন।যদি কেহ লিখিতেনও, তবুও তাহা লিখিতেন মুখস্থ করারই উদ্দেশ্যে, মুখস্থ না করিয়া কেবল লিখিয়া রাখার কোন রীতিই সেখানে ছিল না একথা বলা চলে। ইমাম মালিকের নিম্নোদ্ধৃত উক্তি হইতে এই সংক্রান্ত কাজের প্রকৃত অবস্থা জানা যায়। তিনি বলেনঃ

******************************************************

তখনকার লোক সাধারণত লিখিতে অভ্যস্ত ছিলেন না, তাঁহারা সাধারণত মুখস্থ করিতেই অভ্যস্থ ছিলেন। তাঁহাদের কেহ কোন জিনিস লিখিয়া লইলেও কেবল মুখস্থ করার উদ্দেশ্যেই লিখিতেন, আর মুখস্থ হইয়া গেলে পর উহাকে মুছিয়া ফেলিতেন।[***************]

মুহাম্মদ ইবনে সিরীন তাবেয়ী সম্পর্কে বলা হইয়াছে যে, প্রথমে হাদীস লিখিয়া লইয়া উহা মুখস্থ করা এবং মুখস্থ হওয়ার পর লিখিত জিনিস বিনষ্ট করাই ছিল তাঁহাদের হাদীস শিক্ষা গ্রহণের পদ্ধতি।[********************]

ঐতিহাসিক ইবনে আসাকির মুহাদ্দিস ইসমাঈল ইবনে উবায়দার একটি উক্তি উদ্ধৃত করিয়া এই যুগের হাদীস মুখস্থ করার গুরুত্ব সুস্পষ্ট করিয়া তুলিয়াছেন। মুহাদ্দিস ইসমাঈল বলিতেনঃ

******************************************************

আমারা যেভাবে কুরআন মুখস্থ করি, হাদসকেও ঠিক সেইভাবে মুখস্থ করা আমাদের কর্তব্য।[****************]

ঐতিহাসিক যাহবী প্রখ্যাত হাফেজে হাদীস ইবনে খুজায়মা সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

একজন কুরআন পাঠক যেমন করিয়া কুরআনের সূরাসমূহ মুখস্থ করেন, ইবনে খুজায়মাও ঠিক তেমনিভাবে ফিকাহ সম্পর্কিত হাদীসসমূহ মুখস্থ করিতেন।[****************]

খালিদ-আল-হাযযা তাবেয়ী বলিয়াছেনঃ আমি প্রথমে বড় বড় হাদীস লিখিয়া লইতাম এবং **********************************  যখন উহা মুখস্থ করিয়া লইতাম, তখন উহা মুছিয়া ফেলিতাম।[************]

তাবেয়ী ইসমাঈল ইবনে ইউনুসের জীবনী বর্ণনা প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক যাহবী লিখিয়াছেন যে, তিনি বলিতেনঃ

******************************************************

আমি কুরআনের সূরা যেভাবে মুখস্থ করিতাম ঠিক সেইভাবেই আবূ ইসহাক বর্ণিত হাদীসসমূহ মুখস্থ করিতাম।[**********************]

তাবেয়ী শহর ইবনে হাউসাবের জীবনী আলাচনা প্রসঙ্গে লিখিত হইয়াছে যে, আহমাদ আবদুল হামীদ ইবনে রহমানের নিকট তাঁহার (শহর) বর্ণিত সমস্ত হাদীস সংগৃহীত ছিল এবং

******************************************************

তিনি হাদীস এমনভাবে মুখস্থ করিতেন যে, মনে হইত তিনি কুরআনের কোন সুরা পাঠ করিতেছেন।[**************]

প্রখ্যাত মুসনাদ গ্রন্হ সংকলনকারী মুহাদ্দিস আবূ দায়ূদ তায়ালিসি দাবি করিয়া বলিতেনঃ

******************************************************

আমি ত্রিশ সহস্র হাদীস ‘ফর ফর’ করিয়া মুখস্থ পড়িতে পারি; অবশ্য ইহা আমার অহংকারের কথা নয়।[***********]

প্রসিদ্ধ তাবেয়ী কাতাদাহ মুহাদ্দিস সায়ীদ ইবনে আরারাহকে সূরা বাকারার প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত মুখস্থ পড়িয়া শোনাইলেন, তাহাতে একটিও ভূল হইল না। অতঃপর তিনি বলিলেনঃ

******************************************************

হযরত জাবির সংকলিত হাদীস গ্রন্হ (সংকলন) সুরা বাকারা অপেক্ষাও অধিক মাত্রায় আমার মুখস্থ রহিয়াছে।[*****]

এই যুগে হাদীস শিক্ষাদান কার্য কিভাবে সম্পাদিত হইত, তাহা নিম্নলিখিত বিবরণ হইতে বুঝিতে পারা যায়।

উরাওয়া ইবনে জুবাইর হযরত আয়েশা (রা)-এর বোনপো এবং ছাত্র ছিলেন। তাঁহার পুত্র হিশাম ইবনে উরওয়া বলেন যে, আমার পিতা আমাকে ও আমর অন্যান্য ভাইদের হাদীস শিক্ষা দিতেন। আবার আমাদের কাছে তাহা শুনিতে চাহিতেন এবং বলিতেনঃ

******************************************************

তোমরা যাহা পড়িয়াছ, তাহা আমাকে বারবার পড়িয়া শোনাও।

ইহার পর তিনি বলেনঃ

******************************************************

আমার পিতা আমার মুখস্থ করার শক্তির পরিচয় পাইয়া অত্যন্ত বিস্মিত এবং খুশী হইতেন।[*****************]

ইবরাহীম নাখারী তাবেয়ী তাঁহার হাদীসের ছাত্রদিগকে উপদেশ স্বরূপ বলিতেনঃ

******************************************************

তুমি যখন কোন হাদীস শ্রবণ করিবে, তখন উহা অপরের নিকট বর্ণনা করিবে।[***************]

তাবেয়ী যুগের প্রসিদ্ধ হাদীস সংগ্রহক ইমাম ইবনে শিহাব জুহরী সম্পর্কে বর্ণিত হইয়াছে, তিন এশার নামাযের পর অযু করিয়া হাদীস মুখস্থকরণ ও হাদীস আলোচনায় বসিয়া যাইতেন এবং ফযরের নামায পর্যন্ত একই বৈঠকে আসীন থাকিয়া হাদীস চর্চা করিতেন।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৭৯।]]

এই ইমাম জুহীর বলিয়াছেনঃ

******************************************************

উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহকে যখন আমি কোন হাদীস জিজ্ঞাসা করিতাম, তখন তিনি এমনভাবে হাদীস বর্ণনা শুরু করিতেন যে, তখন মনে হইত যেন একটি সমুদ্র ফুটিয়া বাহির হইয়াছে।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৮০।]

বস্তুত প্রথম হিজরী শতকের প্রায় শেষ পর্যন্তই আবর জাহানের মুসলিম আলিমগণ সাধারণত কোন কিছু লিখিয়া রাখার প্রতি মনোযোগী ছিলেন না, লিখিয়া রাখার পরিবর্তে মুখস্থ করিয়া রাখাই ছিল তাঁহারদের নিকট সহজতর কাজ।

এইরূপ পরিবেশ একালের সকল হাদীসবিদ তাবেয়ী কর্তৃক যে ব্যাপকভা হাদীস লিখিত হইবে, তাহা ধারণা করা যায় না। এই কারণে প্রথম হিজরী শতকে হাদীস লেখকদের তুলনায় হাদীস মুখস্থকারীদের সংখ্যা অনেক বেশী। এই যুগের এমন অসংখ্য মনীষীর নাম জীবনী গ্রন্হসমূহে উল্লিখিত হইয়াছে, যাহারা বিপুল সংখ্যক হাদীস- হাদীসের বিরাট বিরাট সংকলন- সম্পূর্ণ মুখস্থ করিয়া রাখিয়াছিলেন এবং তাঁহারা তাহা এমনভাবেই মুখস্থ পড়িয়া শোনাইতে পারিতেন যে, কোথাও একটি ভূলও পরিলক্ষিত হইত না।

হাদীস লিখন

সাহাবায়ে কিরাম যেমন হাদীস সংরক্ষণের জন্য উহা কেবর মুখস্থ করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, অনেক সাহাবী উহা লিখিয়া রাখার প্রয়োজনীয়তাও বোধ করিয়াছেন। অনুরূপভাবে তাবেয়িগণও হাদীস কেবল মুখস্ত করাকেই হাদীস সংরক্ষণের দায়িত্ব পালনের জন্য যথেষ্ট মনে করেন নাই, সেই সঙ্গে তাঁহাদের মধ্যে এমন লোকও ছিলেন, যাঁহারা উহাকে লিখিয়া রাখার গুরুত্ব পূর্ণমাত্রায় অনুভব করিয়াছিলেন। এক কথায় বলা যায়, সাহাবা ও তাবেয়ী- এই উভয় যুগে হাদীস কেবলমাত্র মুখস্থ করাই যদি যথেষ্ট মনে করা হইত এবং কেহই উহা লিপিবদ্ধ করার দিকে মনোযোগ না দিতেন, তাহা হইল রাসূলের হাদীসের বিরাট অংশের বিলুপ্ত হইয়া যাওয়ার আশংকা ছিল। এইজন্য মুখস্থ করার সঙ্গে সঙ্গে হাদীস লিখিয়া লওয়ার দিকেও যে এই উভয় যুগের বিশেষ বিশেষ লোকের দৃষ্টি নিবদ্ধ হইয়াছিল, ইহাকে মুসলিম জাতির প্রতি আল্লাহর এক অপরিসীম অনুগ্রহই বলিতে হইবে।

বস্তুত তাবেয়ীদের মধ্যে বহু লোক সাহাবীদের নিকট হইতে হাদীস শ্রবণ ও শিক্ষা লাভ করিয়া তাহা যথাযথ সতর্কতা, লক্ষ্য ও মনোযোগ সহকারে লিপিবদ্ধ ও সংকলিত করিয়াছেন। নিম্নোক্ত বর্ণনা হইতে তাহার বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যাইবে।

১। বশীর ইবনে নুহাইক তাবেয়ী হযরত আবূ হুরায়রার হাদীসের ছাত্র ছিলেন। তিনি বলেনঃ আমি হযরত আবূ হুরায়রার নিকট যত হাদীস শুনিতাম, তাহা সবই লিপিবদ্ধ করিয়া লইতাম। শেষকালে তাঁহার নিকট হইতে বিদায় লওয়ার সময় তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া লিখিত হাদীস-সমষ্টি তাঁহার নিকট পেশ করিলাম এবং তাহা সবই আদ্যোপান্ত পড়িয়া তাঁহাকে শোনাইলাম। বলিলামঃ- ********************* ‘ইহা সেই সমস্ত হাদীসের সমষ্টি, যাহা আমি আপনার নিকট হইতে শুনিয়াছি’। জওয়াবে হযরত আবূ হুরায়রা (রা বলিলেনঃ হ্যাঁ, ‘ঠিক আছে’। [সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৬৮।]

২। হযরত আবূ হুরায়রার অপর একজন ছাত্র হইতেছেন হাম্মাম ইবনে মুনাববাহ ইয়ামানী। তিনিও শ্রুত হাদীসসমূহ লিখিত আকারে সুসংবদ্ধ করেন। এই সংকলন ‘সহীফায়ে হাম্মাম ইবনে মুনাব্বাহ’ নামে খ্যাত। ইহাতে প্রায় একশত চল্লিশটি হাদীস সন্নিবেশিত রহিয়াছে। এই গ্রন্হের পাণ্ডুলিপি আজিও দামেশক ও বালিনের লাইব্রেরীতে সুরক্ষিত রহিয়াছে। উপমহাদেশের প্রখ্যাত গবেষক ও অনুসন্ধান-বিশারদ ডক্টর হামীদুল্লাহ ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দে প্রথম ইহার সন্ধান লাভ করেন। উহার ঠিক বিশ বৎসর পর ১৯৫৩ সনে দামেশকের আবরী পত্রিকা **************** তে উহাকে চার কিস্তিতে প্রকাশ করেন। ডক্টর হামীদুল্লাহর ঘোষণা হইতে ইহাও জানা গিয়াছে যে, তুরস্কের আনকারা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরীতে হাম্মাম ইবনে মুনাববাহর ছাত্র মা’মর ইবনে রাশেদ সংকলিত অপর একখানি হাদীস গ্রন্হের পাণ্ডুলিপিও বর্তমান রহিয়াছে।

মা’মর ইবনে রাশেদের ছাত্র এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের উস্তাদ আবদুর রাজ্জাক ইবনে হাম্মাম আস-সানয়ানী আল-ইয়ামনী (১২৫-২১১ হিঃ} সংকলিত এক হাদীস গ্রন্হও পাওয়া গিয়াছে। ইহা ‘মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক’ নামে খ্যাত।

এই হাদীস সংকলনসমূহ একদিকে যেমন নবী করীম (স)-এর জীবনকাল ও খিলাফতে রাশেদার আমলের হাদীস সংকলিত হওয়ার জীবন্ত নিদর্শন এবং প্রাচীনতম গ্রন্হসমূহের মূল উৎস।[এই সমস্ত বিবরণ ডঃ হামীদুল্লাহ সম্পাদিত ‘সহীফায়ে হাম্মাম ইবনে মুনাব্বাহ’র ভূমিকা হইতে গৃহীত।]

৩। সায়ীদ ইবনে জুবাইর তাবেয়ী বলেনঃ

******************************************************

আমি ইবনে উমর ও ইবনে আব্বাসের নিকট রাত্রিবেলা হাদীস শুনিতাম ও সওয়ারীর উপর বসিয়া তাহা লিখিয়া রাখিতাম।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ৬৮।]

তাঁহার অপর এক উক্তি হইতে জানা যায়, তিনি হযরত ইবনে আব্বাসের সাথে কোন এক রাত্রিবেলা মক্কার পথে চলিতেছিলেন। এই সময় ইবনে আব্বাস (রা) হাদীস বর্ণনা করিতনে এবং তিনি উহা লিখিয়া রাখিতেন। এইভাবে সকাল বেলা পর্যন্ত চলিতে থাকিত।[ঐ]

৪। তাবেয়ী সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা সম্পর্কে মুবারক ইবনে সায়ীদ বলেনঃ

******************************************************

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রাত্রিবেলা হাদীস শ্রবণ করিয়া প্রাচীরগাত্রে লিখিয়া রাখিতেন, সকাল বেলা উহার অনুলিপি তৈয়ার করিয়া উহা মুছিয়া ফেলিতেন।[সুনানে দারেমী।]

৫। হুজর ইবনে আদী’র সম্মুখে একদিন পানি দ্বারা ইস্তেঞ্জা করা সম্পর্কে একটি প্রশ্ন পেশ করা হয়। তিনি বলিলনঃ আমার সহীফাখানা লইয়া আস।

******************************************************

উহা আনা হইলে তিনি বিসমিল্লাহ বলিয়া পড়িতে লাগিলেন এবং বলিলেনঃ ইহা আমি হযরত আলী ইবনে আবূ তালিব হইতে শুনিয়াছি, তিনি বলিতেছিলেন যে, ‘পবিত্রতা হইতেছে অর্ধেক ঈমান’।[তাবাকাতে ইবনে সায়াদ ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৫৪।]

ইহা হইতে প্রমাণিত হয় যে, হযরত আলীর নিকট হইতে হাদীসসমূহের কোন লিখিত সংকলন হুজর ইবনে আদীর নিকট বর্তমান ছিল এবং কোন বিষয়ে প্রশ্ন করা হইলেই তিনি উহা খুলিয়া হাদীস পাঠ করিয়া তাহা হইতে জওয়াব শোনাইতেন।

৬। আবদুল আ’লা ইবনে আমরের নিকটও একখানি লিখিত হাদীস সংকলন রক্ষিত ছিল। তাঁহার সম্পর্কে বলা হইয়াছেঃ

******************************************************

আবদুল আ’লা যত হাদীস ইবনুল হানাফীয়া হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, আসলে তাহা সবই লিখিত পুস্তক আকারে পাওয়া একটি সমষ্টি ছিল। তিনি উহা তাঁহার নিকট হইতে পাইয়াছিলেন; কিন্তু হাদীসসমূহ তাঁহার জবানীতে শ্রবণ করেন নাই।[তাবাকাতে ইবনে সায়াদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৪।]

৭। ইমাম বাকের –এর নিকটও হাদীসের এক সংকলন গ্রন্হ বর্তমান ছিল। হযরত জা’ফর সাদেক বলেনঃ আমি আমার পিতার নামে যত হাদীস বর্ণনা করিঃ ************** তাহা সবই তাঁহার সংকলিত গ্রন্হে লিপিবদ্ধ পাইয়াছি ও তাহা হইতেই গ্রহণ করিয়াছি’।[তাহযীবুত তাহযীব, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৪।]

৮। হযরত মুয়াবিয়ার শাসন আমলে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত হাদীসসমূহের কয়েকটি সংকলন তৈয়ার করা হয। মারওয়ান ইবনে হাকাম হযরত যায়দ ইবনে সাবিত বর্ণিত হাদীস সমূহের সংকলন করেন।[সুনানে দারেমী।]

বস্তুত তাবেয়িগণ সাহাবীদের নিকট হইতে নানাভাবে হাদীস সংগ্রহ করিতেন। দূরবর্তী কোন সাহাবীর নিকট হইতে হাদীস জানিবার উদ্দেশ্যে তাঁহারা পত্রালাপও করিতেন এবং পত্রের মারফতে তাঁহারা রাসূলের হাদীস জানিয়া লইতেন। হযরত সায়াদ ইবনে আবূ ওয়াক্কাস (রা) বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীসে উহার সুস্পষ্ট প্রমাণ রহিয়াছে। আমের জুহরী আল-করশী (মৃত্যুঃ ১০৪ হিঃ) বলেনঃ

******************************************************

আমি হযরত জাবির (রা)- এর নিকট আমার গোলাম নাফে’র হস্তে এক পত্র প্রেরণ করিয়াছিলাম। তাহাতে লিখিয়াছিলাম যে, আপনি রাসূলের নিকট হইতে শুনিয়াছেন এমন কোন জিনিস আমাকে লিখিয়া পাঠান। উত্তরে তিনি (জাবির) আমাকে লিখিলেন যে আসলামীকে যে শুক্রবার ‘সংগেসার’ করা হয় সেই দিনের বৈকালে আমি রাসূলে করীমকে বলিতে শুনিয়াছিঃ দ্বীন-ইসলাম কিয়ামত পর্যন্ত কায়েম থাকিবে; কিংবা বলিয়াছেনঃ যতদিন তোমাদের উপর কুরায়শ বংশের বারোজন খলীফা নিযুক্ত না হইবে (ততদিন পর্যন্ত দ্বীন ইসলাম কায়েম থাকিবে)।[ সহীহ মুসলিম, ২য় খণ্ড, কিতাবূল ইমারাত, পৃষ্ঠা ১১৯।]

১০। রাজা ইবনে হায়াত বলেন যে, খলীফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিক আমার নিকট একটি হাদীস জিজ্ঞাসা করিয়া তাঁহাকে লিখিয়া পাঠাইবার জন্য তাঁহার এক কর্মচারীকে নির্দেশ দেন। কিন্তু-

******************************************************

উক্ত হাদীস আমার নিকট লিখিত না থাকিলে আমি উহা ভুলিয়া যাইতাম।[সুনানে দরেমী, পৃষ্ঠা ৬৯।]

১১। তাবেয়ী হাদীসবিদগণ পারস্পরিক পত্রালাপের মারফতে একজন অপরজনকে হাদীসের কথা জানাইতেন। ইয়াযিদ ইবনে আবূ হাবীব বলেনঃ

******************************************************

তাবেয়ী আতা আমাকে লিখিয়াছিলেন যে, তিনি হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা)- কে বলিতে শুনিয়াছেন যে, রাসূলে করীম (স)-কে মক্কা বিজয়ের দিন (মক্কায় থাকিয়া) বলিতে শুনিয়াছি যে, নিশ্চয় আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূল মদ্য, মৃত জন্তু, শূকর ও মূর্তি ক্রয়-বিক্রয় হারাম করিয়া দিয়াছেন।[*******************]

এই হাদীস লিখনে তাবেয়িগণও যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করিতেন, যাহার তাহার নিকট হইতে তাঁহারাও হাদীস লিখিয়া লইতেন না। ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ীন তাবেয়ী বলেনঃ

******************************************************

আমাকে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আবদুর রাজ্জাক বলিলেনঃ আমার নিকট হইতে কোন কিতাব ছাড়া অন্ততঃ একটি হাদীস হইলেও তাহা লিখিয়া লও।

তিনি হাদীসের বড় হাফেজ ছিলেন বটে। কিন্তু এই সময় (শেষ জীবনে) তিনি অন্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। এইজন্য আমি তাঁহার নিকট হইতে কোন হাদীস লিখিয়া লইতে রাযী হইলাম না, কেননা তাঁহার হাদীস ভূলিয়া যাওয়ার আশংকা ছিল ও কি বলিতে কি বলেন তাহারও ভয় ছিল। এইজন্য আমি তাঁহাকে স্পষ্ট ভাষায় বলিলামঃ *************** ‘না, একটি অক্ষরও আপনার নিকট হইতে শুনিয়া লিখিয়া লইব না’।[মুসনাদে ইমাম আহমদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭৪।]

আহলি বায়াত-এর হাদীস সংকলন

ইমাম হুসাইন (রা)-এর দৌহিত্র ও আলী ইবনুল হুসাইনের পুত্র ইমাম যায়দ ৮০ হিজরী সনের কোন এক সময় মদীনা-তাইয়্যেবায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আহলি বায়াত- এর লোকদের নিকট হইতে সুন্নাত ও হাদীসের যাবতীয় ইলম সংকলন করেন। তাঁহার সংকলিত হাদীস গ্রন্হের নাম ************** ইহাতে বিপুল সংখ্যক হাদীস সংকলিত হইয়াছিল। এই হাদীসমূহের অধিকাংশই হযরত আলী (রা)-এর সূত্রে নবী করীম (স)-এর নিটক হইতে বর্ণিত। কিছু সংখ্যক হাদীসের সূত্র হযরত আলী (রা) পর্যন্ত পৌছিয়া *********** হইয়া গিয়াছে। ইমাম হুসাইন ও হযরত আলী (রা)  ছাড়াও অন্যান্য বহু সূত্রে বিপুল সংখ্যক হাদীস তাঁহার নিকট হইতে বর্ণিত হইয়াছে। তাঁহার পিতা আলী ইবনুল হুসাইন বহু সংখ্যক  তাবেয়ী হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। সেই বর্ণনাসমূহ ইমাম যায়দ তাঁহার বড় ভাই ইমাম মুহাম্মাদ আল-বাকের এর নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছিলেন। কেননা তাঁহার পিতা আলী ইবনুল হুসাইন ৯৪ সনে ইন্তেকাল করেন। তখন তিনি মাত্র চৌদ্দ বৎসর বয়সের বালক ছিলেন। ইমাম আবূ হানীফা (র) ও অন্যান্য ফিকহী ইমামগণ তাঁহার নিকট হইতে হাদীস গ্রহণ ও বর্ণনা করিয়াছেন।[**********************]

 

কয়েকজন প্রখ্যাত তাবেয়ী মুহাদ্দিস

পূর্বোক্ত সাধারণ আলোচনার পর আমরা এখানে তাবেয়ী যুগের কয়েকজন বিশিষ্ট হাদীস বিশেষজ্ঞ সম্পর্কে বিশেষ ও সংক্ষিপ্ত আলোচনা করিব। তাবেয়ী যুগের হাদীস সাধনা কি বিরাট ও মহৎ সাধনা ছিল এবং তাহার ফলে কি ধরনের যোগ্যতা ও প্রতিভাসম্পন্ন লোক তৈয়ার হইয়াছিলেন, তাহা এই আলোচনা হইতে অধিক স্পষ্টভাবে জানিতে পারা যাইবে।

প্রথম হিজরী শতক হইতে দ্বিতীয় হিজরী শতকের প্রথমাধ্য পর্যন্ত সময়ে মুসলিম জাহানের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে বিভিন্ন বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। স্থানের উল্লেখসহ তাঁহার নাম ও মৃত্যুর সন নিম্নে উল্লেখ করা যাইতেছেঃ

মদীনাঃ (১) সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যিব- মৃত্যু ৯৩ হিঃ (২) উরওয়া ইবনুযযুরায়র- মৃত্যু ৯৪ হিঃ (৩) আবূ বকর ইবনে আবদুর রহমান ইবনুল হারিস- মৃত্যু ৯৪ হিঃ (৪) উবায়দুল্লাহ ইবনে উতবা- মৃত্যু ৯৯ হিঃ (৫) সালেম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমর- মৃত্যু ১০৬ হিঃ (৬) সুলায়মান ইবনে ইয়াসার- মৃত্যু ৯৩ হিঃ (৭) কাসেম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবূ বকর- মৃত্যু ১১২ হিঃ (৮) নাফে ‘মাওলা ইবনে উমর- মৃত্যু ১১৭ হিঃ (৯) ইবনে শিহাব জুহরী- মৃত্যু ১২৪ হিঃ (১০) আবুজ্জানাদ- মৃত্যু ১৩০ হিঃ।

মক্কাঃ (১) ইকরামা মাওলা ইবনে আব্বাস- মৃত্যু ১০৫ হিঃ (২) আতা ইবনে আবূ রিবাহ- মৃত্যু ১১৫ হিঃ (৩) আবু যুবায়র মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম – মৃত্যু ১২৮ হিঃ।

কূফাঃ (১) আশশা’বী আমের ইবনে শারাহবীল- মৃত্যু ১০৪ হিঃ (২) ইবরাহীম আন- নাখয়ী- মৃত্যু ৯৬ হিঃ (৩) আলকামা ইবনে কায়স ইবনে আবুল হাসান বসরী- মৃত্যু ১১০ হিঃ।

বসরাঃ (১) আল হাসান ইবনে আবূল হাসান আল-বসরী – মৃত্যু ১১০ হিঃ (২) মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন- মৃত্যু ১১০ হিঃ (৩)  কাতাবাদ ইবনে দায়ামাতা আদ- দওসী- মৃত্যু ১১৭ হিঃ।

সিরিয়াঃ (১) উমর ইবনে আবদুল আযীয – মৃত্যু ১০১ হিঃ (২) মফহুল – মৃত্যু ১১৮ হিঃ (৩) কুবাইচা ইবনে যুয়াইয়িব –মৃত্যু ৮৬ হিঃ। (৪) কায়াবুল আহবার- মৃত্যু ৩২ হিঃ।

মিসরঃ (১) আবুল খায়ের মারসাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইজনী- মৃত্যু ৯০ হিঃ এবং (২) ইয়াযিদ ইবনে আবূ হাবীব- মৃত্যু ১২৮ হিঃ।

ইয়ামনঃ (১) তায়ূস ইবনে কাইসান-আল ইয়ামানী আলহিময়ারী- মৃত্যু ১০৬ হিঃ (২) অহব ইবনে মুনাববাহ- মৃত্যু ১১০ হিঃ। [তাবেয়ীদের এই পূর্ণ তালিকা জামে’ আজহার – এর অধ্যাপক মুহাম্মদ আবূ জাহু প্রণীত *********************** গ্রন্হের ১৭৩ পৃষ্ঠা হইতে গৃহীত।]

‘আসমাইর রিজাল’ সম্পর্কীয় গ্রন্হসমূহে ইহাদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা উদ্ধৃত রহিয়াছে। এখানে মাত্র কয়েকজন সম্পর্কে খানিকটা বিস্তারিত আলোচনা দেওয়া যাইতেছে।

ইবনে শিহাব জুহরী

(আসল নাম মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম)

ইমাম জুহরী ইলমে হাদীসের সুবিখ্যাত মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি হযরত আনাস ইবনে মালিক, সহল ইবনে সায়াদ, সায়েব ইবনে ইয়াযিদ, শুবাইব আবূ জামীলা, আবদুর রহমান ইবনে সায়াদ, রবীয়াতা ইবনে আতাদ, মাহমুদ ইবনে রবী ও আবুত্তোফাইল প্রমুখ সাহাবায়ে কিরাম হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। অপরদিকে বিপুল সংখ্যক তাবেয়ী তাঁহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।

 ইলমে হাদীসে তিনি ছিলেন সর্ববাদীসম্মত ইমাম। তাঁহার বর্ণিত হাদীস ছিল তাঁহার অপূর্ব স্মৃতিশক্তির বাস্তব প্রমাণ।

আমর ইবনে দীনার তাঁহার সম্পর্কে বলিয়াছেনঃ

******************************************************

ইমাম জুহুরী অপেক্ষা হাদীসের অধিক প্রামাণ্য ও অকাট্য দলীল রূপে আমি আর কাহাকেও দেখিতে পাই নাই।

বস্তুত আল্লাহ তাঁহাকে অপরিসীম স্মরণশক্তি দান করিয়াছিলেন। ইমাম বুখারীর বর্ণনা মতেঃ

******************************************************

তিনি মাত্র আশিটি রাত্রে কুরআন মজীদ সম্পূর্ণ মুখস্থ করিয়াছেন।

তিনি নিজে স্বীয় স্মরণশক্তির পরিচয় দিয়া বলিয়াছেনঃ

******************************************************

কোন কিছু মুখস্থ করিয়া লওয়ার পর উহা আমি কখনও ভুলিয়া যাই নাই।[*******************]

হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয- এর আদেশক্রমে সর্বপ্রথম তিনিই রাসূল (স)-এর হাদীস সংগ্রহ ও গ্রন্হাবদ্ধ করেন। তাঁহার হাদীস সংগ্রহের বিরাট কাজ লক্ষ্য করিয়া ইমাম শাফেয়ী বলিয়াছেনঃ

******************************************************

ইমাম জুহরী না হইলে মদীনায় হাদীস সমূহ নিঃসন্দেহে বিলিন হইয়া যাইত।[*******************]

তিনি ১২৪ হিজরী সনে সিরিয়ার ‘শাগবাদ’ নামক গ্রামে ইন্তেকাল করেন ও সেখানেই তাঁহাকে সমাধিস্থ করা হয়। [*************************] তিনি সমগ্র হিজাজ অঞ্চলে প্রাপ্তব্য সুন্নাতে রাসূল (হাদীস) সংগ্রহ করিয়াছিলেন।

ইকারামা মওলা ইবনে আব্বাস

তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রা)- এর মুক্তিপ্রদত্ত ক্রীতদাস ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাসই তাঁহাকে কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা দান করেন। ইকরামা নিজেই বলিয়াছেনঃ

******************************************************

ইবনে আব্বাস তাঁহার পায়ে বেড়ী পরাইয়া আটকাইয়া রাখিয়া তাঁহাকে কুরআন ও হাদীস শিক্ষা দান করিতেন।[********************]

ইকরামা হযরত ইবনে আব্বাস ছাড়াও হাসান ইবনে আলী, আবূ কাতাদাহ, ইবনে উমর, আবূ হুরায়রা, আবূ সায়ীদুল খুদরী, মু’আবিয়া, ইবনে আমর ইবনুল আস প্রমুখ সাহাবীর নিকট হইতেও হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন। আবার বিপুল সংখ্যক তাবেয়ীও তাঁহার নিকট হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যিব তাবেয়ী’কে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিলঃ *********************** ‘হাদীসে আপনার অপেক্ষা অধিক বিদ্বান আর কেহ আছেন কি? উত্তরে তিনি বলিলেনঃ হ্যাঁ, আছেন এবং তিনি ইকরামা।[*******************]

সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যিব

তিনি হযরত উমর ফারুকের ফিলাফতের দ্বিতীয় কি চতুর্থ বৎসরে জন্মগ্রহণ করেন। [********************] এই সময় রাসূলে করীমের স্বর্ণযুগ অতিবাহিত হইয়া গিয়াছিল; কিন্তু তবুও ইসলামের বসন্তকাল সর্বত্র বিরাজিত ছিল। দুই-চারজন ব্যতীত প্রধান সাহাবীদের প্রায় সকলেই তখন পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। আর তাঁহারাই ছিলেন ‘ইলমে রিসালাতে’র প্রকৃত উত্তরাধিকারী। ইবনে মুসাইয়্যিবের ছিল অসীম জ্ঞান পিপাসা। তিনি সাহাবীদের নিকট হইতে কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান- অমৃত আহরণ করেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) ছিলেন তাঁহার শশুর। এই সম্পর্কের কারণে হযরত আবূ হুরায়রার নিকট হইতে হাদীস জ্ঞান অধিক মাত্রায় অর্জন করা তাঁহার পক্ষে সহজ হইয়াছিল। এই কারণে তাঁহার বর্ণিত অধিকাংশ হাদীসই মূলত হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত। [***********************] অপরদিকে তাঁহার স্বাভাবিক স্মরণশক্তি ছিল এতই তীক্ষ্ণ ও প্রবল যে, একবার যাহা শুনিতেন তাহা চিরদিনের তরেই তাঁহার স্মৃতিপটে মুদ্রিত ও রক্ষিত হইয়া  যাইত।[**************************] এইসব কারণে তাঁহার হাদীস- জ্ঞান অত্যন্ত গভীর ও প্রশস্ত হইয়াছিল।

উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ

তিনি ছিলেন প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের ভ্রাতা উতবার পৌত্র। ইসলামী জ্ঞানের কেন্দ্র ছিল তাঁহার ঘর ও পরিবার। এই পরিবেশে লালিত- পালিত হইয়া তিনি অপরিসীম জ্ঞানের অধিকারী হইয়াছিলেন। ইবনে সায়াদ তাঁহার সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তিনি বহু হাদীসের বর্ণনাকারী ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী ছিলেন।[*********************]

ইমাম জুহরী বলিয়াছেন, আমি সমসাময়িক প্রায় সকল হাদীসবিদের নিকট হইতেই প্রায় সবটুকু ইলম আহরণ করিয়াছি। কিন্তু উবায়দুল্লাহর ইলম ছিল অসীম ও অতলস্পর্শ সমুদ্র, তাঁহার নিকট যখন আসিতাম, তখনই সম্পূর্ণ নূতন ইলম লাভ করার সুযোগ হইত।[*******************] ইহা হইতে তাঁহার ইলমের গভীরতা, ব্যাপকতা ও প্রসারতা সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়।

উরওয়া ইবনুয যুবায়র

উরওয়া হাদীস ও ফিকাহ উভয় ধরনের ইলমেই গভীর ব্যুৎপত্তি ও পারদর্শিতা লাভ করিয়াছিলেন। আল্লামা ইবনে সায়াদ লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তিনি বহু হাদীস বর্ণনাকারী ছিলেন, ফিকাহর ইলমে ছিলেন বিশেষ পারদর্শী ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন। সকল বিপর্যয় হইতে তিনি সুরক্ষিত ও অত্যন্ত দৃঢ় ও বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন।[***************]

তাঁহার পিতা, ভাই, মা, খালা প্রভৃতি সকল নিকট-আত্মীয়ই হাদীস  জ্ঞান বিশেষ ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন ছিলেন। উরওয়া তাঁহাদের সকলের নিকট হইতেই হাদীস আহরণ করেন।[*************************] কিন্তু হযরত আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীসসমূহ তিনি প্রায় সম্যক পরিমাণে সংগ্রহ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। তিনি তাঁহার নিকট বারবার যাতায়াত করিতেন, আর আয়েশা (রা) ছিলেন সকলের অপেক্ষা অধিক বড় আলিমে হাদীস।[ঐ] উরওয়া নিজেই বলিয়াছেন, হযরত আয়েশার ইন্তেকালের পূর্বে-পূর্বে আমি তাঁহার সমূদয় ইলমে হাদীস আহরণ করিয়া পূর্ণরূপে সংরক্ষণ করিয়া লইতে সমর্থ হইয়াছিলাম।[ঐ] উরওয়া হযরত আয়েশা (রা) ছাড়াও অন্যান্য বড় বড় সাহাবীর নিকট হইতে বিপুল পরিমাণ হাদীস আহরণ করিয়া লইয়াছিলেন।[ঐ]

সালেম ইবনে আবদুল্লাহ

সালেম মদীনার শীর্ষস্থানীয় তাবেয়দের অন্যতম। তিনি ছিলেন ইলম ও আমল উভয়ের সমন্বয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমরের নিকট হইতেই তিনি বেশীর ভাগ হাদীস আহরণ করিয়াছিলেন। এতদ্ব্যতীত হযরত আবূ হুরায়রা, আবূ আইয়ূব আনসারী ও হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)- এর নিকট হইতেও তিনি হাদীসের জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন।[*********************] আল্লামা ইবনে সায়াদ তাঁহাকে ‘বহু হাদীস বর্ণনাকারী ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি; বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।[*****************]

সুলায়মান ইবনে ইয়াসার

তিনি উম্মুল মু’মিনীন হযরত মায়মুনার ক্রীতদাস ছিলেন। এই কারণে তিনি হযরত আয়েশা (রা) ও অন্যান্য সাহাবীদের নিকট যাতায়াত করা ও ইলমে হাদীস আহরণ করার বিরাট সুযোগ লাভ করিয়াছিলেন। ফলে তিনি মদীনার প্রধান আলিমদের মধ্যে গণ্য হইত পারিয়াছিলেন।[********************] ইমাম নববী লিখিয়াছেন, তাঁহার মর্যাদা ও ইলমী প্রাধান্য সর্ববাদী সমর্থিত ছিল।[ঐ পৃষ্ঠা ২৩৫।]

আতা ইবনে আবূ বিরাহ

তিনি ছিলেন হাবশী গোলাম। কিন্তু ইলম ও আমল, তাকওয়া ও পরহেযগারীর দিক দিয়া তিনি সৈয়দ বংশের তাবেয়ীদের মধ্যে গণ্য হইতেন। [********************] কুরআন, হাদীস, ফিকাহ প্রভৃতি জরুরী দ্বীনী ইলমে তিনি বিশেষ বুৎপত্তি লাভ করিয়াছিলেন। ইবনে সায়াদের ভাষায়ঃ

******************************************************

তিনি ফিাকহ জ্ঞানসম্পন্ন ও অধিক হাদীস বর্ণনাকারী ছিলেন। তিনি লোকদিগকে কুরআন শিক্ষা দিতেন।[********************]

তিনি ছিলেন হাদীসের প্রখ্যাত হাফেজ। ঐতিহাসিক যাহবী তাঁহাকে প্রথম শ্রেণীর হাফেযে হাদীসের মধ্যে গণ্য করিয়াছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবনে উমর, আবদুল্লাহ ইবনে আমর, ইবনে যুাবায়র, মু’আবিয়া, উসামা ইবনে যায়দ, জাবির ইবনে আবদুল্লাহ, যায়দ ইবনে আরকাম, আবদুল্লাহ ইবনে সায়েব, রাফে ইবনে খাদীজ, আবূ দারদা, আবূ সায়ীদ খদরী, আবূ হুরায়রা ও হযরত আয়েশা (রা) প্রমুখ প্রখ্যাত সাহাবী হইতে তিনি বিপুল সংখ্যক হাদীস আহরণ করেন।[********************]

তিনি হাদীসের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করিতেন। হাদীস বর্ণনার মাঝখানে অন্য কোন কথা বলা তিনি আদৌ পছন্দ বা বরদাশত করিতেন না।[********************]

ইমাম বাকের (রা) লোকদিগকে এই বলিয়া উৎসাহদান করিতেন যে, তোমরা যত পার আতা’র নিকট হইতে হাদীস গ্রহণ কর।[********************]

ইবরাহীম নাখরী

তিনি ছিলেন কূফা নগরের শ্রেষ্ঠ তাবেয়ীদের অন্যতম। তিনি ইলম ও আমলের পবিত্র পরিবেশে লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। তাঁহার চাচা আলকামা ও মামা আসওয়াদ উভয়ই কুফার প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ছিলেন।[********************] এই সুযোগে তিনি হযরত আয়েশা (রা)-এর খিধমতেও যাতায়াত করিতেন ও তাঁহার মজলিসমূহের যোগদান করিতেন।

এই কারণে ইবরাহীম ইলমে হাদীসে বিরাট যোগ্যতা অর্জন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। ইমাম নববীর মতে তাঁহার প্রামাণ্যতা, মর্যাদা ও ফিকাহ-জ্ঞান সম্পর্কে

সকলে একমত। হাদীসের হাফেয ছিলেন তিনি। ঐতিহাসিক যাহবী তাঁহাকে দ্বিতীয় স্তরের হাফেযে- হাদীসগণের মধ্যে গণ্য করিয়াছেন।[********************]

হাসান আল-বসরী

হাসান বসরী যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন বিপুল সংখ্যক সাহাবী ভূ-পৃষ্ঠে বাঁচিয়াছিলেন। তখনকার পরিবেশে সর্বত্র ইলমে রিসালাতের আওয়াজে মুখরিত ছিল।

ইবনে সায়াদ তাঁহার সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

হাসান বসরী বহু পূর্ণত্ব যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। অতি বড় আলিম ছিলেন, উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন, ফিকাহবিদ ছিলেন, ফিতনা হইতে সুরক্ষিত ছিলেন, বড় আবেদ ও পরহেযগার ছিলেন, জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, শুদ্ধভাষী, মিষ্টভাষী সুন্দর ও অমায়িক ছিলেন। [********************] বিশেষভাবে ইলমে হাদীসে তাঁহার গভীর ব্যুৎপত্তি ছিল।

হাফেয যাহবীর ভাষায় তিনি ছিলেন বড় বিজ্ঞ, ইলমের সমুদ্র।[********************] তিনি হযরত উসমান, আলী, আবূ মুসা আশ’আরী, আবদুল্লাহ ইবনে উমর, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আনাস ইবনে মালিক প্রমুখ বড় বড় সাহাবীর নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।[********************]

ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ

তিনি বিশিষ্ট তাবেয়ীদের অন্যতম। হাফেয যাহবী তাঁহাকে ইমাম ও ‘শায়খুল ইসলাম’ প্রভৃতি নামে উল্লেখ করিয়াছেন।[********************]

তিনি যদিও সাহাবী যুগের প্রায় শেষ পর্যায়ের লোক, কিন্তু তবুও তখনকার দিনের অবশিষ্ট সকল সাহাবী হইতেই পূর্ণরূপে ইলম হাসিল করিয়াছেন; হযরত আনাস ইবনে মালিক, কাসিম ইবনে মুহাম্মদ, আমর ইবনে সালমা ইবনে আবদুর রহমা, উরওয়া ইবনে যুবায়র ও সুলায়মান ইবনে ইয়াসার প্রমুখ সাহাবী ও বিশিষ্ট তাবেয়ীদের নিকট হইতে হাদীস শ্রবণ করিয়াছেন।[********************]

ফলে তিনি হাদীসের বড় হাফেয হইয়াছিলেন। আল্লামা ইবনে সায়াদ তাঁহার সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

তিনি বড়ই নির্ভরযোগ্য, বিশ্বাস্য, বেশী সংখ্যক হাদীসের বর্ণনাকারী, অকাট্য প্রমাণ্য ও প্রতিষ্ঠালব্ধ ছিলেন।

ইবনে মুবারক তাঁহাকে হাদীসের শ্রেষ্ঠ হাফেযদের মধ্যে গন্য করিয়াছেন। আবূ হাতিম তাঁহাকে ইমাম জুহরীর সমপর্যায়ের হাদীসবিদ বলিয়া জানিতেন। বস্তুত ইমাম জুহরী ব্যতীত আর যাঁহারা অক্লান্ত চেষ্টায় মদীনার বিক্ষিপ্ত হাদীসসমূহ সংগৃহীত ও সুরক্ষিত হইয়াছিল, তিনি ছিলেন এই ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ। ইয়াযিদ ইবনে হারুন বলেন যে, ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ তাঁহার বর্ণিত তিন সহস্র হাদীস মুখস্থ করিয়াছেন।[]

 

হাদীস লিখনে উৎসাহ দান

তাবেয়ী হাদীসবিদগণ তাঁহাদের নিকট হাদীস শিক্ষার্থীদিগকে হাদীস লিখিয়া লইতে বিশেষ উপদেশ দান করিতেন। সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যিবের হাদীসের ছাত্র আবদুর রহমান ইবনে হারমালাতা তাঁহার নিকট তাঁহার স্মরণশক্তির দুর্বলতার অভিযোগ করিলে তিনি তাঁহাকে সব হাদীস লিখিয়া লইবার উপদেশ দিয়াছিলেন।[********************] শা’বী তো তাঁহার ছাত্রদের নিকট রাসূলে করীমের কথিত এবং সাহাবা  ও তাবেয়ী’দের দ্বারা বহু বর্ণিত হাদীসটি বারবার আবৃত্তি করিতেন। সেই হাদীসটি হইলঃ

******************************************************

লেখার কাজ হইল হাদীসের ইলমকে ধরিয়া রাখা।[********************]

হাদীস লিখিয়া রাখার যে ফায়দা রহিয়াছে তাহা তিনি বিশেষভাবে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করিয়া বুঝাইয়া দিতেন। তিনি বলিতেনঃ

******************************************************

তোমরা আমার নিকট হইতে যেসব হাদীস শুনিতে পাও তাহা শোনার সঙ্গে সঙ্গে লিখিয়া লইবে- তাহা প্রাচীরগাত্রে লিখিতে হইলেও বিরত হইবে না।[********************]

তাঁহার সম্পর্কে জানা গিয়াছে যে, তিনি নিজেও বিশেষ বিশেষ হাদীস লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিতেন। সেই কারণেই তাঁহার ইন্তেকালের পর ফারায়েজ ইত্যাদি সম্পর্কিত হাদীসমূহ সংকলিত এক গ্রন্হ পাওয়া যায়।[********************]

মুজাহিদ ইবনে যুবায়র (মৃঃ ১০৩ হিঃ) লোকদের সঙ্গে লইয়া তাঁহার কক্ষে প্রবেশ করিতেন ও তাঁহাদের সামনে স্বীয় হাদীস সংকলনসমূহ পেশ করিতেন। তাহারা তাহা হইতে হাদীস নকল করিয়া লইত।[সুনানে দারেমী, পৃষ্ঠা ১২৮। ************]

আতা ইবনে আবূ রিবাহ (মৃঃ ১১৪ হিঃ) নিজেও হাদীস লিখিয়া রাখিতেন এবং অন্যদের তাহা করিতে উপদেশ দিতেন।[********************]

কাতাদাহ ইবেন দায়ামাতা হাদীস লিখন সম্পর্কে যে-কোন প্রশ্নকারীকে অসংকোচে ও জোরালো ভাষায় বলিতেনঃ

******************************************************

তোমাকে লিখিয়া রাখিতে কে নিষেধ করিতেছে? মহান আল্লাহ নিজেই সব কিছু লিখিয়া রাখার কথা ঘোষণা করিয়াছেন এই বলিয়াঃ কিয়ামত সম্পর্কিত ইলম আমার আল্লাহর নিকট লিখিত রহিয়াছে, অথচ তিনি না ভ্রষ্ট হন, না ভুলিয়া যান।[******************** আয়াতটি সূরা তা-হা’র ৫২ নং আয়াত।]

উমর ইবনে আবদুল আযীয

(জন্ম-৬১ হিঃ মৃত্যু-১০১ হিঃ)

উমর ইবনে আবদুল আযীয তাবেয়ী ইলমে হাদীসে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তিনি প্রথমত মদীনায় মুহাদ্দিস সালেহ ইবেন কাইসানের নিকট হাদীস ও দ্বীনী-ইল শিক্ষা সম্পর্ক স্থাপন, পারস্পরিক চর্চা ও আলোচনার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেন এবং হাদীসের অনন্যসাধারণ জ্ঞান ও ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ ‘আমি যখন মদীনা হইতে চলিয়া গেলাম, তখন আমার অপেক্ষা (হাদীসে) বড় আলিম আর কেহ ছিল না।[********************]

হাফেয যাহবী তাঁহার সম্পর্কে লিখিয়াছেনঃ

******************************************************

উমর ইবনে আবদুল আযীযী ইমাম, ফিকাহবিদ, মুজতাহিদ, সুন্নাত ও হাদীসে বিশেষ পারদর্শী, বিরাট মর্যাদাসম্পন্ন, লব্ধপ্রতিষ্ঠ হাদীস-অভিজ্ঞা, গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য হাদীস বর্ণনাকারী, হাদীসের হাফেয, আল্লাহর হুকুম পালনকারী, বিনয়ী ও আল্লাহ পরস্ত লোক ছিলেন।[********************]

উমর ইবনে আবদুল আযীয বিপুল সংখ্যক হাদীসের বর্ণনা করিাছেন। তিনি নিম্নোক্ত সাহাবী ও তাবেয়ী মুহাদ্দিসগণ হইতে হাদীস শিক্ষা ও বর্ণনা করিয়াছেনঃ

(১) উকবা ইবনে আমের (২) ইউসুফ ইবনে আবদুল্লাহ (৩) হযরত তমীমুদদারী (রা) (৪) হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) (৫) সালেম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমর (৬) হযরত মু’আবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা) (৭) হযরত আয়েশা (রা) (৮) আসমা বিনতে উমাইয়া (৯) খাওলা (১০) সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যিব (১১) আবদুল্লাহ ইবনে  কারুয (১২) আবান ইবনে উসমান (১৩)  আবূ বকর ইবনে আবদুর রহমান ইবনে হারিস ইবনে হিশাম (১৪) উরওয়া ইবনে যুবায়র (১৫) মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে রওফল (১৬) আবূ বুরাদাহ (১৭) আবূ সালমাহ (‌১৮) সায়ীদ ইবনে খালিদ (১৯) আমের ইবনে সায়াদ (২০) ইয়াহইয়া ইবনুল কাসিম (২১) কায়স ইবনে হারিস (২২) আবদুল আযীযী (উমরের পিতা) (২৩) আবদুল্লাহ ইবনে মওহাব (২৪) উবাদা ইবনে আবদুল্লাহ (২৫) ইবনে শিহাব জুহরী (২৬) রবী’ ইবনে সাবুরা (২৭) মুহাম্মদ ইবনে সাবিত ইবনে শুরাহবীল এবং আরো অনেক মুহাদ্দিসের নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন।[এ, এইচ, হালে সম্পাদিত ‘মুসনাদে উমর ইবনে আবদুল আযীয’–এর ভূমিকা।]

যত বিপুল সংখ্যক মরফু হাদীস তাঁহার কণ্ঠস্থ ছিল, তত আর কোন তাবেয়ীরই ছিল না। আইয়ূব সখতীয়ানী বলিতেনঃ

‘আমি যত লোকের সঙ্গেই সাক্ষাত করিয়াছি, উমর ইবনে আবদুল আযীয অপেক্ষা রাসূলে করীম হইতে অধিক হাদীস বর্ণনাকারী আর কাহাকেও দেখি নাই।[********************]

ইমাম মকহুল

ইমাম মকহুল প্রথম জীবন শুরু করেন ক্রীতদাস হিসাবে। এই অবস্থার মধ্যেও তিনি ইলম শিক্ষালাভে মনোনিবেশ করিয়াছিলেন। গোলামী মুক্তিলাভের পরই তিনি সমগ্র মুসলিম জাহানে পর্যটনে বাহির হইয়া পড়েন। ইসলামী রাজ্যের প্রত্যেকটি কেন্দ্রেই তিনি গমন করেন এবং সেখান হইতে সম্ভাব্য সমস্ত হাদীসজ্ঞান আয়ত্ত করিয়া লন। প্রথমে তিনি মিসরের জ্ঞান-সম্পদ অর্জন করেন।[********************] এবং তাহা নিঃশেষে আয়ত্ত করার পূর্বে তিনি মিসর হইত বাহিরে পদার্পণ করেন নাই।[********************]

অতঃপর তিনি মদীনা গমন করেন এবং সেখানে হইতে ইরাক চলিয়া যান। এই উভয় স্থান হইতে তিনি সমস্ত হাদীস-সম্পদ আহরণ করিয়া সিরিয়া রওয়ানা হইয়া যান। সিরিয়ার তদানীন্তন প্রত্যেক হাদীসবিদের নিকট হইতেই তিনি হাদীস শিক্ষালাভ করেন। মোটকথা, হাদীস শিক্ষালাভ ও সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি মুসলিম জাহানের প্রতিটি কেন্দ্রের অলি-গলি ঘুরিয়া বেড়াইয়াছেন। তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ ‘ইলমে হাদীসের সন্ধানে আমি সারা জাহান পরিক্রম করিয়াছি।[********************]

তিনি কয়েকজন সাহাবীর নিকট হইতে হাদীস শিক্ষা লাভ করিয়াছেন। তাঁহারা হইতেছেনঃ (১) হযরত আনাস (রা), (২) হযরত আবূ হিন্দদারী (রা) (৩) হযরত ওয়াসিলা ইবনে আসকা (রা) (৪) হযরত আবূ ইমাম (রা), (৫) হযরত আবদুর রহমান ইবনে গানাম (রা) (৬) হযরত আবূ জানদাল ইবনে সুহাইল (রা)।[********************]

এতদ্ব্যতীত সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, মুসরুক, যুবাইর ইবনে নুফাইর, কারীব আবূ মুসলিম, উরওয়া ইবনে যুবাইর, মগরী ইবনে কাসীর প্রমুখ বিশিষ্ট তাবেয়ীর নিকট হইতেও হাদীস শিক্ষা করেন।[********************]

ঐতিহাসিক ইবনে সায়াদের বর্ণনা মতে তিনি ১১২, ১১৩ কিংবা ১১৮ হিজরী সনে ইন্তেকাল করেন। তাঁহার জন্ম তারিখ সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। হাদীস ও ফিকাহ সম্পর্কে তিনি দুইখানি গ্রন্হ রচনা করেন। অথচ এই সময় পর্যন্ত গ্রন্হ প্রণয়নের কাজ সূচিতই হয় নাই।[********************]

ইমাম শা’বী

ইমাম শা’বী তাঁহার সময়কার অনন্য শ্রেষ্ঠ হাদীসবিদ তাবেয়ী। তিনি যখন পূর্ণ বয়স্ক হন তখন কূফা নগরে বিপুল সংখ্যক সাহাবী জীবিত ও বর্তমান ছিলেন। তাঁহাদের নিকট তাঁহার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। জীবনে তিনি প্রায় পাঁচশত সাহাবীর সহিত সাক্ষাত লাভের সৌভাগ্য অর্জন করিয়াছিলেন। তন্মধ্যে ৪৮ জন সাহাবীর নিকট হইতে তিনি রীতিমত হাদীস শিক্ষালাভ করিয়াছেন।[********************] হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমরের খিধমতে একাদিক্রমে দশ মাস পর্যন্ত থাকিয়া তিনি হাদীসের গভীর ও ব্যাপক শিক্ষা লাভ করিয়াছিলেন।[********************]

এই হাদীস শিক্ষালাভ ও সংগ্রহ করার জন্য তাঁহাকে প্রাণান্তকর পরিশ্রম ও কষ্ট স্বীকার করিতে হইয়াছে। তিনি কেমন করিয়া হাদীসের এই জ্ঞান-সমুদ্র আয়ত্ত করিয়াছিলেন, তাহা জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলিয়াছিলেনঃ সমস্ত চিন্তা –ভাবনা পরিত্যাগ করিয়া, দেশ-দেশান্তর পর্যটন করিয়া, গর্দভের ন্যায় শক্তি ব্যয় ও কাকের মত প্রত্যুষ জাগরণ সহ্য করিয়া।[********************] হাদীসে তাঁহার জ্ঞান যে কত ব্যাপক ও গভীর ছিল, তাহা তাঁহার নিজেরই একটি কথা হইতে প্রমাণিত হয়। তিনি বলিয়াছেনঃ

বিশ বৎসর পর্যন্ত আমি কাহারো নিকট হইতে এমন কোন হাদীস শুনিতে পাই নাই, সে সম্পর্কে আমি হাদীসের সেই বর্ণনাকারী অপেক্ষা অধিক ওয়াকিফহাল ছিলাম না।[********************]

তিনি ইমাম আবূ হানীফার কেবল উস্তাদই ছিলেন না, হাফেয যাহবীর মতে ******************** তিনি আবূ হানীফার প্রধান উস্তাদ ছিলেন।[ঐ]

 

হাদীস সংগ্রহের অভিযান

হাদীস শিক্ষালাভ এবং হাদীস সংগ্রহ-সংকলনের জন্য নিজেদের ঘরবাড়ি ও সাংসারিক উন্নতি-অগ্রগতির সমস্ত চিন্তা-ভাবনা পরিহার করিয়া দেশে বিদেশে দূর-দূরান্তরের দুর্গম ও পর্বতসংকুল পথ অতিক্রম করা মুসলিম মনীষীদের অনেকেরই এক পবিত্র ব্রত ছিল। কুরআন ও হাদীসে এই কাজের জন্য বিশেষ উৎসাহ দান করা হইয়াছে। এই কাজের অপরিসীম সওয়াবের কথাও সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষিত হইয়াছে। দ্বীন সম্পর্কীয় জ্ঞান আহরণের জন্য বিদেশ যাত্রা এবং তথা হইতে জ্ঞান সম্পদ অর্জন করিয়া নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করা ও নিজ দেশের জনগণকে ইসলামী জীবনাদর্শ গ্রহণের দাওয়াত দেওয়া বস্তুতই মুসলিম জাতির এক মহান পবিত্র দায়িত্ব। এই পর্যায়ে সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়ীন ওতৎপরবর্তীকালের জ্ঞান আহরণকারীদের অবিশ্রানত্ সাধনার বিস্ময়কর কাহিনী পাঠ করিলে মনে হয়, এক পবিত্র অপরিহার্য ব্রত ও দায়িত্ব মনে করিয়াই তাঁহারা এই কাজে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছিলেন। কুরআন মজীদ একদিকে হযরত মূসা নবীর জ্ঞান আহরণ উদ্দেশ্যে  ‘মাজমাউল বাহরাইন’ (দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থল) পর্যন্ত সফর করার ইতিবৃত্ত প্রচার করিয়াছে, অপরদিকে দ্বীনী জ্ঞান ও ব্যুৎপত্তি লাভের উদ্দেশ্যে বিদেশ সফরের জন্য নিম্নলিখিত রূপ তাকীদ পেশ করিয়াছেনঃ

******************************************************

সকল মু’মিনকেই একসঙ্গে ঘর হইতে বহির হইয়া পড়িতে হইবে না বটে; কিন্তু তাহা হইলেও তাহাদের প্রত্যেক দল ও সমাজ হইতে কিছু কিছু লোক দ্বীন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভের জন্য কেন ঘর হইতে বহির্গত হইবে না- এই উদ্দেশ্যে যে, তাহারা নিজেদের জাতির লোকদের নিকট ফিরিয়া আসিয়া তাহাদিগকে আল্লাহ সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করিবে? তাহা হইলেই এই আশা করা যায় যে, তাহারা সতর্ক হইবে ও ভয় করিয়া চলিতে শুরু করিবে।[সূরা তওবা, ১৫ রুকু, ১২২ আয়াত।]

কুরআনের এই সুস্পষ্ট নির্দেশের সমর্থন বেশ কিছু সংখ্যক হাদীসের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই পর্যায়ে সর্বপ্রথম হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত নিম্নোদ্ধৃত হাদীস উল্লেখযোগ্য।

 রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করিয়াছেনঃ

******************************************************

যে ব্যক্তি জ্ঞান-অন্বেষণের উদ্দেশ্যে কিছু পথও অতিক্রম করিবে আল্লাহ ইহার বিনিময়ে জান্নাতে যাওয়ার পথ তাহার জন্য সুগম করিয়া দিবেন।[বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬।]

হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, নবী করীম (স) বলিয়াছেনঃ

******************************************************

যে ব্যক্তি ইলম হাসিল করার উদ্দেশ্যে ঘর হইতে বাহির হইবে, তাহার ঘরে ফিরিয়া আসা পর্যন্ত তাহার এই সফর আল্লাহর পথের সফর হইবে।[তিরমিযী, ******************** সুনানে দারেমী।]

বলা বাহুল্য, এই পর্যায়ের যাবতীয় হাদীসে যে ইসলাম শিক্ষার উদ্দেশ্যে বাহির হইবার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হইয়াছে, তাহা কুরআন- হাদীস সম্পর্কিত ইলম। বিশেষভাবে হাদীসের ইলমও হইতে পারে।

(ক)

সাহাবীদের যুগ

নবী করীম (স)-এর জীবদ্দশাইতেই আরব দেশের বিভিন্ন গোত্র দূর-দূরান্ত হইতে তাঁহার দরবারে আসিয়া জমায়েত হইত ও প্রয়োজনীয় জ্ঞান-তথ্য সংগ্রহ করিয়া নিজ নিজ দেশে চলিয়া যাইত। ব্যক্তিগতভাবে নিকট দূরের সাহাবীদের সম্পর্কেও এই কথাই সত্য।

হযরত আকাবা ইবনুল হারেস (রা) তাঁহার নিজের বিাবহ সম্পর্কীয় একটি মাসলার রায় জানিবার উদ্দেশ্যে দূরবর্তী কোন স্থান হইতে মদীনায় আগমন করেন। আসিয়া হযরতের নিকট হইতে শরীয়াতের ফয়সালা জানিয়া লইয়া নিজের বাড়ির দিকে চলিয়া যান এবং সেই ফয়সালা অনুযায়ী স্ত্রীরূপে গৃহীত স্বীয় দুধমাকে পরিত্যাগ করেন।[বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯।] ইসলামের প্রথম যুগের ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনার কোন সীমা সংখ্যা নাই। কেননা তখন ইসলামকে জানিবার জন্য দূরবর্তী মুসলিমদের পক্ষে আর কোন উপায়ই ছিল না।

অবশ্য সুফফার অধিবাসিগণ স্থায়ীভাবে প্রায় চব্বিশ ঘন্টা সময়ই রাসূলের সন্নিকটে অবস্থান করিতেন এবং রাসূল (স)-এর নিকট হইতে জ্ঞানলাভ করার জন্য সর্বদা সচেষ্ট ও উন্মুখ হইয়া থকিতেন। নবী করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর তাঁহার সাহাবিগণের অনেকেই মুসলিম জাহানের বিভিন্ন কেন্দ্রে বিছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়েন। এই কারণে হাদীস-সম্পদ সংগ্রহের জন্য বিদেশ সফর ও দেশ-দেশান্তরে আঁতিপাতি করিয়া খুঁজিয়া বেড়াইবার প্রয়োজন দেখা দেয়। সাহাবীদের যুগ হইতে পরবর্তীকালের মুসলিমগণকে এক-একটি হাদীসের জন্য বিদেশ সফরের অপরিসীম কষ্ট ভোগ করিতে হইয়াছে। এই স্থান হাদীস শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।[********************]

বুখারী শরীফে উল্লেখ করা হইয়াছে, হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনাইসের নিকট হইতে একটি হাদীস শ্রবণের উদ্দেশ্যে একামাস দূরত্বের পথ অতিক্রম করিয়া গিয়াছিলেন। তিনি সংবাদ জানিতে পারিয়াছিলেন যে, সুদূর সিরিয়ায় অবস্থানকারী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস (রা) রাসূলে করীমের একটি হাদীস জানেন, যাহা অপর কাহারো নিকট রক্ষিত নাই। সংবাদ পাওয়া মাত্রই তিনি উষ্ট্র ক্রয় করিয়া সিরিয়ার পথে রওয়ানা হইয়া যান। একমাস কালের পথ অতিক্রম করিয়া সিরিয়ার গ্রামাঞ্চলের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছিয়া তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনাইসের সাক্ষাত লাভ করেন। তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেনঃ

******************************************************

তোমার নিকট হইতে আমার কাছে একটি হাদীস পৌঁছিয়াছে, যাহা তুমি রাসূলের নিকট হইতে শুনিয়াছ। আমার ভয় হইল যে, তোমার নিজের নিকট হইতে উহা নিজ কর্ণে শ্রবণ করার পূর্বেই হয়ত আমি মরিয়া যাইব (এই ভয়ে আমি অনতিবিলম্বে তোমার নিকট হাযির হইয়াছি)।[********************]

অতঃপর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস (রা) জিজ্ঞাসিত হাদীসটি মুখস্থ পাঠ করিয়া শোনাইলেন। হাদীসটি নিম্নরূপঃ

******************************************************

আমি রাসূলে করীম (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি যে, আল্লাহ তা’আলা বান্দাদিগকে হাশরের ময়দানে একত্রিত করিবেন এবং তাহাদিগকে এমন এক আওয়াচে সম্বোধন করিবেন, যাহা নিকট  ও দূরে অবস্থিত লোকেরা সমানভাবে শুনিতে পাইবে। আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা করিবেনঃ আমিই মালিক, আমিই বাদশাহ, আমিই অনুগ্রহকারী।[বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড- *************************** পৃষ্ঠা ১১১৪। তাযকিরাতুল হুফফায গ্রন্হে এই পর্যায়ে কিসাস সম্পর্কিত একটি হাদীসের উল্লেখ করা হইয়াছে, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩।]

হযরত মুসলিমা ইবনে মাখলাধ (রা) যখন মিসরে অবস্থান করিতেছিলেন, তখন ‘কিসাস’ সম্পর্কিত একটি হাদীস জানিবার জন্য হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বহু কষ্ট স্বীকারপূর্বক তাঁহার নিকট উপস্থিত হন এবং বলেনঃ ‘এই একটি হাদীস শিখিবার ঐকান্তিক আগ্রহ লইয়াই আমি আপনার নিকট আসিয়াছি এবং আমাদের একজনের মৃত্যুর পূর্বে আমি হাদীসটি জানিয়া লইতে চাহি।[********************]

হযরত ফুজলা ইবনে উবাইদ (রা)-এর নিকট মিসরে একজন সাহাবী দূরবর্তী স্থান হইতে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। ফুজালা তাঁহাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাইলেন। তিনি বলিলেনঃ আমি আপনার নিকট কেবল সাক্ষাত লাভের উদ্দেশ্যে আসি নাই। আসিয়াছি বিশেষ একটি উদ্দেশ্য লইয়া। আমি ও আপনি একত্রে রাসূলে করীমের নিকট হইতে একটি হাদীস শ্রবণ করিয়াছিলাম, সম্ভবত আপনার তাহা খুব ভালরূপে স্মরণ থাকিবে, আপনার নিকট হইতে তাহা নূতন করিয়া শুনিবার জন্যেই আমি এখানে উপস্থিত হইয়াছি।

অতঃপর ফুজালা প্রার্থিত হাদীসটি পেশ করেন এবং হাদীসটি জানিয়া লইয়া উক্ত সাহাবী নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।[দারেমী, আবূ দাউদ, মুসনাদে আহমদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২।]

হযরত মুয়াবিয়ার শাসন আমলে হযরত আবূ আইয়ূব আনসারী (রা) শুধুমাত্র একটি হাদীস শ্রবণের উদ্দেশ্যে মদীনা হইতে মিসরের নিভৃত পল্লীতে অবস্থানকারী হযরত আকাবা ইবনে আমের জুহানী (রা)-র নিকট উপস্থিত হন। আকাবা সংবাদ পাইয়া বাহিরে আসিলেন ও হযরত আইয়ূব (রা)-কে বক্ষে জড়াইয়া ধরিলেন। জিজ্ঞাসা করিলেনঃ

আবূ আইয়ূব! আপনি কি কারণে এত দূরে (আমার নিকট) আসিয়াছেন? তখন হযরত আবূ আইয়ূব (রা) বলিলেনঃ

******************************************************

মু’মিন ব্যক্তির ‘সতর’ (বিশেষ জিনিস গোপন রাখা) সম্পর্কে একটি হাদীস আম রাসূলের নিকট শুনিয়াছিলাম, কিন্তু এখন তোমার ও আমার ছাড়া উহার শ্রবণকারী আর কেহ দুনিয়ায় বাঁচিয়া নাই। (তাহাই তোমার নিকট হইতে নূতন করিয়া শ্রবণের বাসনা লইয়া আমি এত দূর আসিয়াছি)।

তখন হযরত আকাবা নিম্নলিখিত ভাষায় হাদীসটি বলিলেনঃ

******************************************************

যে ব্যক্তি  এই দুনিয়ায় কোন মু’মিন লোকের কোন লজ্জাকর, অপমানকর কাজ গোপন রাখিবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাহার গুনাহকে গোপন (মাফ) করিয়া দিবেন।

হযরত আবূ আইয়ূব বাঞ্চিত হাদীসটি শ্রবণ করিয়া বলিলেনঃ ******************** তুমি ‘ঠিকই বলিয়াছ, সত্যই বলিয়াছ’। অতঃপর তিনি উষ্ট্রযানে সওয়ার  হইয়া মদীনার দিকে এমন দ্রুততা সহকারে রওয়ানা হইয়া গেলেন যে, মিসরের তদানীন্তন শাসনকর্তা মুসলিমা ইবনে মাখলাদ তাঁহাকে প্রচুর পরিমাণে উপঢৌকন দেওয়ার আয়োজন করিয়াও তাহা তাঁহাকে দিতে পারিলেন না, সেজন্য তিনি একটু সময়ও বিলম্ব করিতে প্রস্তুত হইলেন না।[বায়হাকী, ইবনে মাজাহ, জামে বায়ানুল ইলম, মুসনাদে আহমদ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ******************** আল- হাদীস আল মুহাদ্দীসুন, পৃষ্ঠা ১১০।]

একদা নবী করীম (স) একটি হাদীস বর্ণনা করেন। তখন দরবারে উপস্থিত হযরত সায়েব ইবনে খাল্লাদ এবং হযরত আকাবা ইবনে আমেরও উহা শ্রবণ করেন। উত্তরকালে হাদীসটি সম্পর্কে হযরত সায়েবের মনে কিছুটা বিস্মৃতি ঘটে, উহার ভাষা সম্পর্কে কিছুটা সন্দেহের সৃষ্টি হয়। কিন্তু হাদীস সম্পর্কে একবিন্দু সন্দেহ মনের মধ্যে পোষণ করা কিছুতেই উচিত নয় মনে করিয়া তিনি মিসরে অবস্থানকারী হযরত আকাবার নিকট উপস্থিত হইয়া হাদীসটি শ্রবণ ও স্বীয় ভ্রম ও সন্দেহের অপনোদন করার জন্য উদ্যোগী হইলেন। প্রথমে তিনি মিসরের শাসনকর্তা মুসলিম ইবনে মাখলাদের নিকট উপস্থিত হইলেন। ইবনে মাখলাদ তাঁহাকে অতিথি হিসাবে পাইয়া বিশেষে সন্তুষ্টি সহকারে অভ্যর্থনা জানাইলেন। কিন্তু হযরত সায়েচ বলিলেনঃ আমি কোথাও বিলম্ব ‘করিতে প্রস্তত নহি, অনতিবিলম্বে আকাবার সহিত সাক্ষাত করা আবশ্যক। পরে তিনি আকাবার নিকট উপস্থিত হন এবং রক্ষিত হাদীসের সাহিত উহার তুলনা করিয়া লইলেন। অতঃপর উহার সঠিক সত্যতা ও ও যথার্থতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হইয়া সান্ত্বনা লাভ করিলেন।[********************]

কুরআন মজীদের কোন আয়াতের ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য সম্পর্কে সাহাবীদের মধ্যে মতভেদ হইলে বিশেষজ্ঞের নিকট হইতে উহার মীমাংসা লাভ করিবার উদ্দেশ্যেও দূরদেশে সফর করিতেন। হযরত সায়ীদ ইবনে যুবাইর (রা) বলেনঃ

******************************************************

কুরআনের আয়াতঃ ‘যে লোক কোন মু’মিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করিবে, জাহান্নামই তাহার পরিণতি হইবে’- সম্পর্কে কূফাবাসীদের মতভেদ হয়। তাই আমি ইবনে আব্বাসের নিকট চলিয়া গেলাম ও তাঁহাকে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিলাম। তিনি বলিলেনঃ ইহা সর্বশেষ নাযিল হওয়া আয়াত । কোন জিনিসই ইহাকে রদ বা বাতিল করিতে পারে নাই।[********************]

হযরত আবুদ-দরদ (রা) বলেনঃ

******************************************************

কুরআনের কোন আয়াত আমার নিকট দুর্বোধ্য হইলে ইহার ব্যাখ্যার জন্য যদি মক্কা হইতে পাঁচ রাত্রি পথ দূরে অবস্থিত এক ব্যক্তির নিকট যাইতে হইতে তবুও আমি তথায় যাইতাম।[********************]

সাহাবায়ে কিরামের একজন দূরবর্তী স্থানে অবস্থানকারী অপর এক সাহাবীর নিকট হইতে পত্রালাপের মাধ্যমেও রাসূলের হাদীস জানিতে ও সংগ্রহ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন।

হযরত মুয়াবিয়া দামেশক হইতে হযরত মুগীরার নিকট কূফা নগরে এক পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাহাতে লিখিয়াছিলেনঃ

******************************************************

আপনি রাসূলের নিকট যাহা কিছু শুনিতে পাইয়াছেন, তাহা আমাকে লিখিয়া পাঠান।

তখন হযরত মুগীরা লিখিয়া পাঠাইলেনঃ নবী করীম (স) নিম্নোক্ত দোয়া প্রত্যেক নামাযান্তে পড়িতেনঃ

******************************************************

আল্লাহ ছাড়া কেহ মা’বুদ নাই, তিনি এক ও একক। মালিকানা ও বাদশাহী কেবল তাঁহারই, তাঁহারই জন্য সমগ্র প্রশংসা, তিনি সর্বশক্তিমান। হে আল্লাহ ! তুমি যাহা দাও, তাহা কেহ দিতে পারে না। নিছক চেষ্টা করিয়া ইহার বিপরীত কিছু করা সম্ভব নয়। এই সঙ্গে তিনি ইহাও লিখিয়া পাঠাইলেনঃ

******************************************************

নবী করীম (স) অপ্রয়োজনীয় ও অর্থনীন তর্কবিতর্ক করিতে বারবার ও বেশী বেশী প্রশ্ন করিতে ও ধন-সম্পদ বিনষ্ট করিতে নিষেধ করিতেন। তিনি মায়ের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ বা খারাপ ব্যবহার করা এবং কন্যা সন্তানদের গোপনে হত্যা করা হইতেও নিষেধ করিতেন।[এই সমস্ত বিবরণ বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, ১০৮৩ ও ৭ম খণ্ড, ৯৫৮ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত হইয়াছে।]

খুলাফায়ে রাশেদুন নিজ নিজ খিলাফত আমলে খিলাফতের দায়িত্ব পালন হিসাবে বিভিন্ন স্থানের দায়িত্বশীল লোকদের নিকট প্রয়োজনীয় হাদীস লিখিয়া পাঠাইতেন।

আবূ উসমান বলেনঃ

******************************************************

আমরা উৎবা ইবনে ফারকাদ সেনাপতির সাথে (আজারবাইজান) অবস্থান করিতেছিলাম। তখন হযরত উমর ফারুকের চিঠি আমাদের নিকট (উৎবার নামে) আসিয়া পৌঁছিল। তাহাতে লিখিত ছিলঃ নবী করীম (স) বলিয়াছেন যে, রেশমী কাপড় সেই পুরুষই পড়িতে পারে, যাহার ভাগে পরকালে কিছু নাই।[বুখারী শরীফ, ২ূ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৬৭। ********************]

সাহাবায়ে কিরাম প্রয়োজনের সময় একজন অপরজনকে নিজ হইতেই রাসূল (স)-এর হাদীস লিখিয়া পাঠাইয়া দিতেন। উমর ইবনে উবায়দুল্লাহ যখন হারুরীয়া গমন করেন, তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবূ আওফা (রা) তাঁহাকে লিখিয়া পাঠানঃ

******************************************************

রাসূলে করীম (স) তাঁহার জীবনে কোন একদিন শক্রদলের সহিত মুকাবিলা হওয়ার অপেক্ষায় উদগ্রীব হইয়া বসিয়াছিলেন। শেষ পর্যন্ত সূর্য যখন ঢলিয়া পড়িল, তখন তিনি সংগের লোকদের সম্মুখে দণ্ডয়মান হইলেন। বলিলেনঃ হে লোকগণ ! তোমরা শক্রর সাথে মুকাবিলা ও সাক্ষাতের কামনা করিও না, বরং আল্লাহর নিকট শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য দোয়া কর। তাহার পরও শক্রর সহিত সাক্ষাত ঘটিলে অপরিসীম ধৈর্য সহকারে সংগ্রাম চালাইয়া যাও। জানিয়া রাখিও, ‘বেহেশত তলোয়ারের ছায়ার তলে অবস্থিত। অতঃপর নবী করীম (স) দাঁড়াইয়া নিম্নোক্ত দোয়া করিলেনঃ

হে আল্লাহ ! কিতাব নাযিলকারী, মেঘ পরিচালনাকারী, শক্র বাহিনীকে পরাজয়দানকারী! তুমি তাহাদিগকে পরাজিত ও পর্যুদস্ত কর এবং আমাদিগকে তাহাদের উপর জয়ী করিয়া দাও।[মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, ******************** পৃষ্ঠা ৮৪।]

সাহাবায়ে কিরাম (রা) একজন অপরজনের নিকট হইতে হাদীস জিজ্ঞাসা করিয়া উহার সত্যতা যাচাই করিয়া লইতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) একবার হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় আগমন করেন। তখন তাঁহার নিকট হইতে আয়েশা (রা)-র নিকট পৌঁছায়। পরের বারে হযরত আবদুল্লাহ আবার যখন হজ্জ করিতে আসেন, তখন হযরত আয়েশা (রা) তাঁহার বোন-পুত্র উরওয়াকে বলিলেনঃ

******************************************************

হে বোন-পুত্র! তুমি আবদুল্লাহর নিকট চলিয়া যাও এবং আমার নিকট তুমি তাঁহার নিকট হইতে যে বর্ণনা করিয়াছিলে, আমার জন্য উহা সত্যতা যাচাই করিয়া আস।

উরওয়া বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহর নিকট উপস্থিত হইয়া সেই হাদীসটি পুনরায় শুনিবার ইচ্ছা প্রকাশ করি। তিনি উক্ত হাদীসটি বিগত বৎসর যেইভাবে বর্ণনা করিয়াছিলেন, এইবারও ঠিক সেইরূপেই বর্ণনা করিলেন। আমি হযরত আয়েশার নিকট আসিয়া উহা প্রকাশ করিলে তিনি খুবই আশ্চর্যান্বিত হইয়া যান এবং বলেনঃ

******************************************************

আল্লাহর কসম আবদুল্লাহ ইবনে আমর সঠিকরূপে স্মরণ করিয়া রাখিয়াছেন।[বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৮৬।]

সাহাবায়ে কিরাম যে হাদীসের জন্য বিদেশ সফর করিতনে এবং উহা শিক্ষালাভ করার জন্য বহু কষ্ট স্বীকার ও তিতিক্ষা অবলম্বন করিতেন, তাহা হযরত ইবনে আব্বাসের নিম্নোক্ত উত্তি হইতেও সুস্পষ্টরূপে জানা যায়। তিনি বলেনঃ

******************************************************

আমাদের নিকট যখন অপর কোন ব্যক্তির বর্ণিত হাদীস পৌঁছিত, তখন যদি তাহার নিকট লোক পাঠাইয়া তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইতে চাহিতাম যে সে আসিয়া আমার নিকট হাদীস বর্ণনা করিবে, তবে তাহা আমি অনায়াসেই করিতে পারিতাম। কিন্তু তাহা না করিয়া আমি নিজেই তাঁহার নিকট যাইতাম ও তাঁহার ঘরের সম্মুখে শুইয়া পড়িতাম। সে যখন ঘর হইতে বাহির হইত, তখন সে আমার নিকট উক্ত হাদীস বর্ণনা করিত।[********************]

ইহা হইতে জানা যায় যে, সাহাবায়ে কিরাম (রা) অপর কোন সাহাবীর বর্ণিত হাদীস লোকমুখে শুনিয়াই সন্তুষ্ট হইতেন না ও সঙ্গে সঙ্গেই উহা নিঃসন্দেহে গ্রহণ করিয়া লইতেন না। বরং উহা সরাসরি মূল হাদীস বর্ণনাকারীর নিকট হইতেই শ্রবণ করিবার জন্য চেষ্টা করিতেন। এইজন্য তাঁহারা বর্ণনাকারীর ঘরের সম্মুখে গিয়া উপস্থিত হইতেন। কিন্তু তাঁহাকে ঘর হইতে ডাকিয়া বাহিরে আনা পছন্দ করিতেন না, বরং তিনি কখন নিজে ঘর হইতে বাহির হইবেন, সেইজন্য অপেক্ষা করিতেন। এই প্রতীক্ষা কত দীর্ঘ হইত তাহার অনুমান ইহা হইতে করা যায় যে, অপেক্ষমান লোকেরা প্রতীক্ষায় থাকিয়া থাকিয়া ক্লান্ত হইয়া পড়িতেন ও ঘরের সম্মুখে ক্লান্ত-শ্রান্ত হইয়া শুইয়া পড়িতেন। হাদীস সঠিকরূপে লাভ করার উদ্দেশ্যে সাহাবায়ে কিরামরে এই তিতিক্ষা সত্যই বিস্ময়কর।

(খ)

তাবেয়ীদের যুগ

সাহাবীদের যুগে হাদীস সংগ্রহ অভিযানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপরে পেশ করা ইহল। এই যুগে হাদীস সংগ্রহ পর্যায়ের যত কাজই সম্পাদিত হয়, উপরিউক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনা হইতে সে সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা অতি সহজেই করা যাইতে পারে। এক কথায় বলা যায় সাহাবীদের যুগে হাদীস সংগ্রহ অভিযান কেবল আরম্ভ করা হইয়াছে, তাবেয়ীদের যুগে এই কাজ অধিকতর উন্নত ও ব্যাপক ভিত্তিতে সাধিত হয়। বিশেষত, তাবেয়ী যুগের হাদীস বর্ণনাকারিগণ কেবল একজনের নিকট কিংবা নিজ শহরে অবস্থানকারী সাহাবীদের নিকট হাদীস শুনিয়াই ক্ষান্ত হইতেন না। এইজন্য তাঁহারা নিকট ও দূরে অবস্থিত বহু শহর-নগর-গ্রম সফর করিতে বাধ্য হইয়াছেণ। ইহাতে তাঁহারা একই হাদীস বহু সংখ্যক মূল বর্ণনাকারীর নিকট হইতে শুনিবার এবং বহু বর্ণনাকারীর নিকট হইতে বিপুল সংখ্যক হাদীস শুনিবার ও সংগ্রহ করিবার সুযোগ পাইয়াছেন। ইহার ফলে তাঁহাদের মনে হাদীসের ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মিত।[********************]

নিম্নে প্রদত্ত বিবরণ হইতে এই যুগের কাজ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইংগিত পাওয়া যাইতে পারে।

সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যিব বলেনঃ

******************************************************

কেবল একটি হাদীস লাভ করার উদ্দেশ্যে আমি একাদিক্রমে কয়েকদিন ও কয়েক রাত্রের পথ সফর করিতাম।[********************]

কূফা নগরে অবস্থানরত শ’বী তাবেয়ী একবার সন্তান ও দাস-দাসীকে ইলম শিক্ষাদান ও চরিত্রবান করিয়া তোলার সওয়াব সম্পর্কে এক দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেন। হাদীসটির বর্ণনা শেষ করিয়া তাঁহার ছাত্রদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিলেনঃ

******************************************************

এই হাদীসটি ভালভাবে গ্রহণ কর, ইহার বিনিময়ে তোমাদের কিছুই দিতে হইবে না, (কোন কষ্ট স্বীকার করিতে হইল না)। যদিও এমন এক সময় ছিল, যখন এক এক ব্যক্তিকে এতদপেক্ষাও অল্প কথার জন্য (ফা হইতে) মদীনা পর্যন্ত সফর করিতে হইত।[******************** মূল হাদীসটি বুখারীর ১ম খণ্ড কিতাবুল ইলম-এ উদ্ধৃত হইয়াছে।]

বুসর ইবনে আবদুল্লাহ হযরামী বলেনঃ

******************************************************

একটি হাদীসের জন্য বিভিন্ন শহর ঘুরিয়া বেড়াইবার প্রয়োজন হইলেও আমরা তাহাই করিতাম।[********************]

এখানে কয়েকজন প্রসিদ্ধ তাবেয়ীর হাদীস সংগ্রহ সাধনার বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা যাইতেছেঃ

প্রসিদ্ধ তাবেয়ী উবায়দুল্লাহ ইবনে আদী জানিতে