হাদিসের নামে জালিয়াতীঃ প্রচলিত মিথ্যা হাদীস ও ভিত্তিহীন কথা

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

২.১৫. শুভ, অশুভ, উন্নতি, অবনতি বিষয়ক

বিভিন্ন প্রচলিত ইসলামী গ্রন্থে এবং আমাদের সমাজে সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস আছে যে, অমুক দিন, বার, তিথি, সময় বা মাস অশুভ বা অযাত্রা ইত্যাদি। অনুরূপভাবে মনে করা হয় বিভিন্ন কাজের অশুভ ফল রয়েছে এবং এ সকল কাজের কারণে মানুষ দরিদ্র হয় বা মানুষের ক্ষতি হয়। এই বিশ্বাস বা ধারণা শুধু ইসলাম বিরোধী কুসংস্কারই নয়; উপরন্তু এইরূপ বিশ্বাসের ফলে ঈমান নষ্ট হয় বলে হাদীস শরীফে বলা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অশুভ, অযাত্রা, অমঙ্গল ইত্যাদি বিশ্বাস করতে এবং যে কোনো বিষয়ে আগাম হতাশা, নৈরাজ্যবাদ(PESSIMISM) অত্যন্ত অপছ্ন্দ করতেন। পক্ষান্তরে তিনি সকল কাজে সকল অবস্থাতে শুভ চিন্তা, মঙ্গল ধারণা ও ভাল আশা পছ্ন্দ করতেন।(বুখারী, আস-সহীহ ৫/২১৭১; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৭৪৫)। শুভ চিন্তা ও ভাল আশার অর্থ হলো আল্লাহর রহমতের আশা অব্যাহত রাখা। আর অশুভ ও অমঙ্গল চিন্তার অর্থ হলো আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন “অশুভ বা অযাত্রা বিশ্বাস করা বা নির্ণয়ের চেষ্টা করা শিরক, অশুভ বা অযাত্রা বিশ্বাস করা বা নির্ণয়ের চেষ্টা করা শিরক, অশুভ বা অযাত্রা বিশ্বাস করা বা নির্ণয়ের চেষ্টা করা শিরক”(তিরমিযী, আস-সুনান ৪/১৬০; ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১৩/৪৯১; হাকিম, আল মুসতাদরাক ১/৬৪; আবূ দাউদ, আস-সুনান ৪/১৭; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/১১৭০। তিরমিযী, ইবনু হিব্বান, হাকিম প্রমুখ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)।
এ বিষয়ে আরো অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তাই অমঙ্গলের কারণ। বান্দার জন্য অমঙ্গল ও ক্ষতির কারণ বলেই তো আল্লাহ তা বান্দার জন্য নিষিদ্ধ করেছেন। এ সকল কর্মে লিপ্ত হলে মানুষ আল্লাহর রহমত ও বরকত হতে বঞ্চিত হয়। আল্লাহর নিষিদ্ধ হারাম দুই প্রকারেরঃ (১) হক্কুল্লাহ বা আল্লাহর হক্ক সম্পর্কিত হারাম ও (২) হক্কুল ইবাদ বা সৃষ্টির অধিকার সম্পর্কিত হারাম। দ্বিতীয় প্রকারের হারামের জন্য মানুষকে আখিরাতের শাস্তি ছাড়াও দুনিয়াতে পার্থিব ক্ষতির মাধ্যমে শাস্তি পেতে হবে বলে বিভিন্ন হাদীসের আলোকে জানা যায়। জুলুম করা, কারো সম্পদ তার ইচ্চার বাইরে চাঁদাবাজি, যৌতুক বা অন্য কোনো অনৈতিক উপায়ে গ্রহণ করা, ওজন, পরিমাপ বা মাপে কম দেওয়া, পিতামাতা, স্ত্রী, প্রতিবেশী, দরিদ্র, অনাথ, আত্মীয়-স্বজন বা অন্য কোনো মানুষের অধিকার নষ্ট করা, কাউকে তার প্রাপ্য হতে বঞ্চিত করা, আল্লাহর কোনো সৃষ্টির বা মানুষের ক্ষতি করা বা সাধারণভাবে হক্কুল ইবাদ নষ্ট করা পার্থিব অবনতির কারণ।
কিন্তু আল্লাহর কোনো সৃষ্টির মধ্যে কোনো বার, তারিখ, তিথি, দিক ইত্যাদির মধ্যে অথবা কোনো মোবাহ কর্মের মধ্যে কোনো অশুভ প্রভাব আছে বলে বিশ্বাস করা কঠিন অন্যায় ও ঈমান বিরোধী। আমাদের সমাজে এ জাতীয় অনেক কথা প্রচলিত আছে। এগুলিকে সবসময় হাদীস বলা হয় না। কিন্তু পাঠক সাধারণভাবে মনে করেন যে, এগুলি নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (ﷺ) কথা। তা না হলে কিভাবে আমরা জানলাম যে, এতে অমঙ্গল হয়, এতে অমঙ্গল হয়? এগুলি বিশ্বাস করা ঈমান বিরোধী। আর এগুলিকে আল্লাহ বা তাঁরা রাসূলের (ﷺ) বাণী মনে করা অতিরিক্ত আরেকটি কঠিন অন্যায়।
২.১৫.১. সময়, স্থান বিষয়ক
১. শনি, মঙ্গল, অমাবস্যা, পূর্ণিমা ইত্যাদি
শনিবার, মঙ্গলবার, অমাবস্যা, পূর্ণিমা, কোনো তিথি, স্থান বা সময়কে অমঙ্গল অযাত্রা বা অশুভ বলে বিশ্বাস করা জঘন্য মিথ্যা বা ঘোরতর ইসলাম বিরোধী বিশ্বাস। অমুক দিনে বাঁশ কাঁটা যাবে না, চুল কাটা যাবে না, অমুক দিনে অমুক কাজ করতে নেই…..ইত্যাদি সবই ভিত্তিহীন ও মিথ্যা কুসংস্কার। এগুলি বিশ্বাস করলে শিরকের গোনাহ হবে।
২. চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ, রংধনু, ধুমকেতু ইত্যাদি
চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ, রংধনু, ধুমকেতু ইত্যাদি প্রাকৃতিক নিদর্শনাবলী বিশেষ কোনো ভাল বা খারাপ প্রভাব রেখে যায় বলে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট ও মিথ্যা কথা। অমুক চাঁদে গ্রহণ অমুক হয়, বা অমুক সময়ে রঙধনু দেখা দিলে অমুক ফল হয়, এই ধরনের কথাগুলি বানোয়াট। (ইবনু ইরাক, তানযীহ ১/১৭৮,১৭৯, ১৯১; শাওকানী, আল ফাওয়াইদ ২/৫৬৮)।
৩. বুধবার বা মাসের শেষ বুধবার
বুধবারকে বা মাসের শেষ বুধবারকে অমঙ্গল, অশুভ, অযাত্রা বা খারাপ বলে বা বুধবারের নিন্দায় কয়েকটি বানোয়াট হাদীস প্রচলিত আছে। এগুলি সবই মিথ্যা। আল্লাহর সৃষ্টি দিন, মাস, তিথি সবই ভাল। এর মধ্যে কোনো কোনো দিন বা সময় বেশি ভাল। যেমন শুক্রবার, সোমবার ও বৃহস্পতিবার বেশি বরকতময়। তবে অমঙ্গল, অশুভ বা অযাত্রা বলে কিছু নেই।(ইবুনল জাওযী, আল মাঊদূ‘আত ১/৩৭৪-৩৭৬; সুয়ূতী, আল লাআলী ১/৪৮১-৪৮৬; সাখাবী, আল মাকাদিস পৃ. ৩৬৪; মুল্লা আলী কারী, আল আসরার, পৃ. ১৯৯-২০০)।
২.১৫.২. অশুভ কর্ম বা অবনতির কারণ বিষয়ক
বিভিন্ন প্রচলিত পুস্তকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিম্নের কাজগুলি অশুভ, খারাপ ফলদায়ক বা দারিদ্র্য আনয়নকারী।
১. হাঁটতে হাঁটতে ও অযু ব্যতীত দরুদ শরীফ পাঠ করা।
২. বিনা অযুতে কুরআন কারীম বা কুরআনের কোনো আয়াত পাঠ করা।
এই কথা দুটি একদিকে যেমন ইসলাম বিরোধী বানোয়াট কথা, অপরদিকে এ কথার মাধ্যমে মুমিনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত হতে বিরত রাখা হয়। গোসল ফরয থাকলে কুরআন পাঠ করা যায় না। কিন্তু ওযু ছাড়া কুরআন তিলাওয়াত জায়েয। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণ ও ওযু ছাড়া মুখস্ত কুরআন তিলাওয়াত করতেন। ওযু অবস্থায় যিকর, দোয়া, দরুদ, সালাম ইত্যাদি পাঠ করা ভাল, তবে ওযু ও গোসল আবশ্যিক নয়। বরং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণের সুন্নাত হলো, হাঁটতে, চলতে, বসতে, শুয়ে ওযুসহ ও ওযুছাড়া সর্বাবস্থায় নিজের মুখ ও মনকে আল্লাহর যিকর, দরুদ ও দোয়া পাঠে রত রাখা।
৩. বসে মাথায় পাগড়ি পরিধান করা।
৪. দাঁড়িয়ে পায়জামা পরিধান করা।
৫. কাপড়ের আস্তিন ও আঁচল দ্বারা মুখ পরিষ্কার করা।
৬. ভাঙ্গা বাসনে বা গ্লাসে পানাহার করা।
৭. রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে খাওয়া।
৮. খালি মাথায় পায়খানায় যাওয়া।
৯. খালি মাথায় আহার করা।
১০. পরিধানে কাপড় রেখে সেলাই করা।
১১. ফুঁক দিয়ে প্রদীপ নেভানো।
১২. ভাঙ্গা চিরুনী ব্যবহার করা।
১৩. ভাঙ্গা কলম ব্যবহার করা।
১৪. দাঁত দ্বারা নখ কাঁটা।
১৫. রাত্রিকালে ঘর ঝাঁড়ু দেওয়া।
১৬. কাপড় দ্বারা ঘর ঝাঁড়ু দেওয়া।
১৭. রাত্রে আয়নায় মুখ দেখা।
১৮. হাঁটতে হাঁটতে দাঁত খেলাল করা।
১৯. কাপড় দ্বারা দাঁত পরিষ্কার করা।
এইরূপ আরো অনেক কথা প্রচলিত আছে। সবই বানোয়াট কথা। কোনো জায়েয কাজের জন্য কোনোরূপ ক্ষতি বা কুপ্রভাব হতে পারে বলে বিশ্বাস করা কঠিন অন্যায়। আর এগুলিকে হাদীস বলে মনে করা কঠিনতম অন্যায়।
২.১৫.৩. শুভ কর্ম বা উন্নতির কারণ বিষয়ক
মহান আল্লাহ বান্দাকে যে সকল কর্মের নির্দেশ দিয়েছেন সবই তার জন্য পার্থিব ও পারলৌকিক কল্যাণ, মঙ্গল ও উন্নতি বয়ে আনে। সকল প্রকার ফরয, ওয়াযিব, সুন্নাত, নফল-মুস্তাহাব কর্ম মানুষের জন্য আখিরাতের সাওয়াবের পাশাপাশি জাগতিক বরকত বয়ে আনে। আল্লাহ এরশাদ করেছেনঃ
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَىٰ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ
-“যদি জনপদবাসীগণ ঈমান ও তাকওয়া অর্জন করতো(আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ বর্জন করতো ও নির্দেশিত কাজ পালন করতো) তবে তাদের জন্য আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর বরকত-কল্যাণসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম।”(সূরা ৭, আরাফঃ আয়াত ৯৬)।
এভাবে আমরা দেখছি যে, সকল ঈমান ও তাকওয়ার কর্মই বরকত আনয়ন করে। তবে সৃষ্টির সেবা ও মানবকল্যাণমূলক কর্মে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি খুশি হন এবং এই ধরনের কাজের জন্য মানুষকে আখিরাতের সাওয়াব ছাড়াও পৃথিবীতে বিশেষ বরকত প্রদান করেন বলে বিভিন্ন হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে অনেক বানোয়াট কথাও বলা হয়। যেমন বলা হয় যে, নিম্নের কাজগুলি করলে মানুষ ধনী ও সৌভাগ্যশালী হতে পারে।
১. আকীক পাথরের আংটি পরিধান করা।
২. বৃহস্পতিবারে নখ কাটা।
৩. সর্বদা জুতা বা খড়ম ব্যবহার করা।
৪. ঘরে সিরকা রাখা।
৫. হলুদ রঙের জুতা পরা।
৬. যে ব্যক্তি জমরূদ বা আকীক পাথরের আংটি পরিধান করবে সে কখনো দরিদ্র হবে না এবং সর্বদা প্রফুল্ল থাকবে।
অনুরূপভাবে অমুক কাজে মানুষ স্বাস্থ্যবান ও সবল হয়, স্মরণশক্তি বৃদ্ধি পায়, অমুক কাজে স্বাস্থ্য নষ্ট হয় বা স্মরণশক্তি নষ্ট হয়, অমুক কাজে দৃষ্টিশক্তি বাড়ে, অমুক কাজে দৃষ্টিশক্তি কমে, অমুক কাজে বার্ধক্য আনে, অমুক কাজে শরীর মোটা হয়, অমুক কাজে শরীর দুর্বল হয় ইত্যাদি সকল কথাই বানোয়াট।

About ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর