হাদিসের নামে জালিয়াতীঃ প্রচলিত মিথ্যা হাদীস ও ভিত্তিহীন কথা

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

১.৬. মিথ্যার প্রকারভেদ

মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় ‘হাদীসের নামে মিথ্যা’ বলার বিভিন্ন প্রকার ও পদ্ধতি রয়েছে। এই অনুচ্ছেদে আমরা সেইগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করবো ইনশাল্লাহ।
১.৬.১. সনদে মিথ্যা
‘সনদ’ ও ‘মতন’ এর সম্মিলিত রূপই হাদীস। হাদীস বানাতে হলে সনদ জালিয়াতি অত্যাবশ্যক। আবার অনেক সময় সনদ জালিয়াতিই ছিল জালিয়াতের মূখ্য উদ্দেশ্য। মিথ্যাবাদীগণ তাদের উদ্দেশ্য ও সামর্থ্য অনুসারে সনদে জালিয়াতি করত। এসব জালিয়াতি কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়।
১.৬.১.১. বানোয়াট কথার জন্য বানোয়াট সনদ,
সনদ ছাড়া কোনো হাদীস গ্রহণ করা হতোনা। কাজেই একটি মিথ্যা কথাকে হাদীস বলে চালাতে হলে তার সাথে একটি হাদীস বলতে হবে। অধিকাংশক্ষেত্রে জালিয়াতগণ নিজেদের মনগড়াভাবে বিভিন্ন সুপরিচিত আলিমদের নামে সনদ বানিয়ে নিত। অথবা তাদের মুখস্ত কোনো সনদ বিভিন্ন বানোয়াট হাদীসের আগে জুড়ে দিত। আমরা ইতোপূর্বে আলোচিত বিভিন্ন বানোয়াট হাদীসে তা দেখতে পেয়েছি। এভাবে অধিকাংশ বানোয়াট হাদীসের সনদও মনগড়া। একটি উদাহরণ দেখুনঃ
ইমাম ইবনু মাজাহ বলেন, আমাকে সাহল ইবনু আবী সাহল ও মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল বলেছেন তাদেরকে আব্দুস সালাম ইবনু সালিহ আবুস সালাত হারাবী বলেছেনঃ আমাকে আলী রেযা, তিনি তাঁর পিতা মূসা কাযিম, তিনি তাঁর পিতা জাফর সাদিক, তিনি তাঁর পিতা মুহাম্মাদ বাকির, তিনি তার পিতা আলী যাইনুল আবেদীন, তিনি তাঁর পিতা ইমাম হুসাইন(রা), তিনি তাঁর পিতা আলী(রা) হতে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “ঈমান হলো অন্তরের মা’রিফাত বা জ্ঞান, মুখের কথা ও বিধিবিধান অনুসারে কর্ম করা।”
তাহলে অন্তরের জ্ঞান, মুখের স্বীকৃতি ও কর্মের বাস্তবায়নের সামষ্টিক নাম হলো ঈমান। কথাটি খুবই আকর্ষণীয়। অনেক তাবেয়ী ও পরবর্তী আলিম এভাবে ঈমানের পরিচয় প্রদান করেছেন। ইমাম মালিক, শাফেয়ী, আহমদ ইবনু হাম্বাল প্রমুখ এই মত গ্রহণ করেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানীফা বলেনঃ ঈমান মূলত মনের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতির নাম। কর্ম ঈমানের অংশ নয় বরং দাবি ও পরিণতি। ঈমান ও কর্মের সমন্বয়ে ইসলাম। এই হাদীসটি সহীহ হলে তা ইমাম আবু হানীফার মতের বিভ্রান্তি প্রমাণ করে। কিন্তু মুহাদ্দিসগণের নিরীক্ষায় হাদীসটি ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে।
পাঠক লক্ষ্য করুন। এই হাদীসের রাবীগণ রাসূলুল্লাহ(স) এর বংশের অন্যতম বুযুর্গ ও শিয়া মাযহাবের ১২ ইমামের ৭ জন। এজন্য সহজেই আমরা সরলপ্রাণ মুসলমানরা ধোঁকা খেয়ে যাই। কিন্তু রাসূলুল্লাহ(স) এর সুন্নাতের হেফাজতে নিয়োজিত মুহাদ্দিসগণকে এভাবে প্রতারণা করা সম্ভবপর ছিলনা। তাঁরা তাঁদের নিয়মে হাদীসটি নিরীক্ষা করেছেন। তাঁরা তাঁদের নিরীক্ষায় দেখেছেন যে, সনদে উল্লেখিত ৭ প্রসিদ্ধ ইমাম এর কোনো ছাত্র এই হাদীসটি বর্ণনা করেননি এবং অন্য কোনো সনদেও হাদীসটি বর্ণিত হয়নি।
শুধুমাত্র আব্দুস সালাম আবুস সালাত দাবি করলেন যে, ইমাম আলী রেযা(২০৩ হি) তাকে এই হাদীসটি বলেছেন। এভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রাসূলুল্লাহ(স) এর ইন্তিকালের ২০০ বছর পরে এসে আবুস সালত নামের এই ব্যক্তি হাদীসটি প্রচার করেছেন। মুহাদ্দিসগণ তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখেছেন যে, আব্দুস সালাম আবুস সালাত নামক এই ব্যক্তি অনেক হাদীস শিক্ষা করেছেন ও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তার বর্ণিত হাদীসের মধ্যে অনেক ভুল। তিনি এমন সব হাদীস বিভিন্ন মুহাদ্দিস বা আলিম এর নামে বলেন যা তাদের অন্য কোনো ছাত্র বলেননা। এতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি হাদীস ঠিকমত মুখস্ত রাখতে পারতেননা। তবে তিনি ইচ্ছাকৃত মিথ্যা হাদীস বলতেন কিনা তা নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বিধা রয়েছে। ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন ও কতিপয় ইমাম বলেছেন যে, তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ভাল ছিলেন বলেই দেখা যায়। শিয়া হলেও বাড়াবাড়ি করতেননা। কিন্তু তিনি অগণিত উল্টাপাল্টা ও ভিত্তিহীন(মুনকার) হাদীস বলেছেন যা আর কোনো বর্ণনাকারী কখনো বর্ণনা করেননি। তবে তিনি ইচ্ছা করে মিথ্যা বলতেননা বলে বুঝা যায়। অপরপক্ষে আল জুযানী, উকাইলী প্রমুখ ইমাম বলেছেন যে, তিনি মিথ্যাবাদী ছিলেন। (বিস্তারিতঃ ইবনু হাজার আসকালানী, তাহযীবুত তাহযীব ৬/২৮৫-২৮৬, তাকরীবুত তাহযীব, পৃ. ৩৫৫)।
যারা তিনি অনিচ্ছাকৃত ভুল বলে মন্তব্য করেছেন, তাঁরা হাদীসটিকে বাতিল, ভিত্তিহীন, খুবই যয়ীফ ইত্যাদি বলে অভিহিত করেছেন। আর যারা তাকে ইচ্ছাকৃত মিথ্যাবাদী বলে দেখেছেন, তাঁরা হাদীসটিকে মাওযূ বা বানোয়াট বলে অভিহিত করেছেন। (আল-বুসীরী, যাওয়াইদ ইবনু মাজাহ, পৃ.৩৭)।
অষ্টম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইবনুল কাইয়িম মুহাম্মাদ ইবুন আবু বাকর(৭৫১ হি) হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন এবং আমলকে ঈমানের অংশ বলে গণ্য করতেন। তাঁর মতে ঈমান হলো অন্তরের জ্ঞান, মুখের স্বীকৃতি ও বিধিবিধান পালন। তিনি এই মতের পক্ষে দীর্ঘ আলোচনার পরে বলেন, তবে এই বিষয়ে আব্দুস সালাম ইবনু সালিহ বর্ণিত যে হাদীসটি ইবনু মাজাহ সংকলন করেছেন, সে হাদীসটি মাউযূ, তা রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা নয়।(ইবনুল কাইয়েম, হাশিয়াত আবী দাউদ ১২/২৯৪)।
আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এই সনদের সকল রাবী অত্যন্ত প্রসিদ্ধ সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। এ হলো জাল হাদীসের একটি বৈশিষ্ট্য। অধিকাংশক্ষেত্রে জালিয়াতগণ তাদের জালিয়াতি চালানোর জন্য প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সনদ তৈরি করতো। তাদের এই জালিয়াতি সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিলেও নিরীক্ষক মুহাদ্দিসদের ধোঁকা দিতে পারতোনা। কারণ সনদে জালিয়াতের নাম থেকে যেতে। জালিয়াত যাকে উস্তাদ বলে দাবী করত, তার নাম থাকত। উস্তাদের অন্যান্য ছাত্রের বর্ণিত হাদীস এবং এই জালিয়াতের বর্ণিত হাদীসের তুলনা ও নিরীক্ষার মাধ্যমে মুহাদ্দিসগণ জালিয়াতি ধরে ফেলতেন।
জালিয়াতির আরেকটি উদাহরণ দেখুন। ইসমাঈল ইবুন যিয়াদ দ্বিতীয় হিজরী শতকের এজন হাদীস বর্ণনাকারী। তিনি বলেনঃ আমাকে সাওর ইবনু ইয়াযিদ (১৫৫ হি) বলেছেন, তিনি খালিদ ইবনু মা’দান থেকে(মৃ. ১০৩ হি), তিনি মু’আয ইবনু জাবাল থেকে বর্ণনা করেছেন, আমরা বললামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমরা কি বিনা ওযূতে কুরআন স্পর্শ করতে পারব? তিনি বলেনঃ হ্যাঁ, তবে যদি গোসল ফরয হয়ে থাকে তাহলে কুরআন স্পর্শ করবেনা। আমরা বললামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, তাহলে কুরআনের বাণী ‘পবিত্রগণ ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করেনা’ (সূরা ওয়াকিয়াঃ ৭৯) এর অর্থ কি? তিনি বলেনঃ এর অর্থ হলো- কুরআনের সাওয়াব মুমিনগণ ছাড়া কেউ পাবেনা।”
মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এই হাদীসটি বানোয়াট। হাদীসের ইমামগণ ইসমাঈল ইবু যিয়াদ(আবী যিয়াদ) নামক এই ব্যক্তির বর্ণিত হাদীসসমূহ সংগ্রহ করে অন্যান্য সকল বর্ণনার সাথে তুলনামূলক নিরীক্ষা করে দেখতে পেয়েছেন যে, এই ব্যক্তির বর্ণিত হাদীস কোনোটিই সঠিক নয়। তিনি একজন ভাল আলিম ছিলেন এবং মাওসিল নামক অঞ্চলের কাযী বা বিচারক ছিলেন। কিন্তু তিনি শু’বা(১৬০ হি), ইবনু জুরাইজ(১৫০ হি), সাওর(১৫৫ হি) প্রমুখ তৎকালীন বিভিন্ন সুপরিচিত মুহাদ্দিসের নামে এমন অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন যা তারা কখনো বলেননি বা তাদের কোনো ছাত্র তাদের থেকে বর্ণনা করেননি।
যেমন এখানে সাওর এর নামে হাদীসটি বলেছেন তিনি। সাওর দ্বিতীয় হিজরী শতকের সিরিয়ার অন্যতম প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও ফকীহ ছিলেন। তাঁর অগণিত ছাত্র ছিল। অনেকে বছরের পর বছর তাঁর কাছ হতে হাদীস শিক্ষা করেছেন। কোনো ছাত্রই তাঁর কাছ হতে হাদীসটি বর্ণনা করেনি। অথচ ইসমাঈল তার নামে হাদীসটি বললেন। অবস্থা দেখে মনে হয় তিনি ইচ্ছাপূর্বক এভাবে বানোয়াট হাদীস বলতেন। ইমাম দারকুতনী, ইবনু আদী, ইবনুল হিব্বান, ইবনুল জাউযী ও অন্যান্য ইমাম এ সকল বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, তাকে দাজ্জাল ও মিথ্যাবাদী বলেছেন। তার বর্ণিত সকল হাদীস, যা একমাত্র তিনিই বর্ণনা করেছেন, অন্য কেউ বর্ণনা করেননি, এরূপ সকল হাদীসকে তাঁরা মাওযূ বা বানোয়াট বলে গণ্য করেছেন।
এই ইসমাঈল বর্ণিত আরেকটি বানোয়াট ও মিথ্যা কথা যা তিনি রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেনঃ তিনি বলেনঃ আমাকে গালিব আল কাত্তান, তিনি আবু সাঈদ মাকরাবী থেকে তিনি আবু হুরাইরা(রা) হতে বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ভাষা হলো ফার্সী ভাষা, আর জান্নাতের অধিবাসীদের ভাষা হলো আরবী ভাষা।” (ইবনু আদী, আল কামিল ১/৫১০-৫১১, ইবনু হিব্বান, মাজরুহীন ১/১২৯)।
১.৬.১.২. প্রচলিত হাদীসের জন্য বানোয়াট সনদ
আমরা দেখেছি যে, অনেক সময় জালিয়াতের উদ্দেশ্য হতো নিজের স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য তারা প্রচলিত মতন বা বক্তব্যের জন্য বিশেষ সনদ তৈরি করত। এখানে একটি উদাহরণ উল্লেখ করছি।
ইমাম মালিক দ্বিতীয় হিজরী শতকের মুহাদ্দিসগণের অন্যতম ইমাম। তিনি তাঁর উস্তাদ নাফী থেকে আব্দুল্লাহ ইবনু উমারের সূত্রে রাসূলুল্লাহ (স) থেকে অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন। এজন্য “মালিক, নাফি থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার থেকে” অত্যন্ত সহীহ ও অতি প্রসিদ্ধ সনদ। এই সনদে বর্ণিত সকল মুহাদ্দিসগণের নিকট সংরক্ষিত।
তৃতীয় হিজরী শতকের একজন রাবী আব্দুল মুনইম ইবনু বাশীর বলেন, আমাকে মালিক বলেছেন, তিনি নাফি থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ থেকে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য তাদের সকলের সময়ে বরকত দান করুন।” [খালীলী, খালীল ইবনু আব্দুল্লাহ (৪৪৬ হি), আল ইরশাদ, পৃ. ৭]।
৫ম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আল্লামা খালীল ইবনু আব্দুল্লাহ আল খালীলী (৪৪৬ হি) বলেনঃ এটি একটি মাউদূ বা বানোয়াট হাদীস। আব্দুল মুনইম নামক এই ব্যক্তি ছিল একজন মিথ্যাবাদী জালিয়াত। ইমাম আহমদের পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন, আমি একদিন তোমার পিতাকে বললামঃ আমি আবদুল মুনইম ইবনু বাশীরকে বাজারে দেখলাম। তিনি বলেনঃ বেটা, সেই মিথ্যাবাদী জালিয়াত এখনো বেঁচে আছে? এই হাদীস এই সনদে একেবারেই ভিত্তিহীন ও অস্তিত্বহীন। কখনোই কেউ তা মালিক থেকে বা নাফি থেকে বর্ণনা করেনি। এই হাদীস মূলত সাখার আল গামিদী নামক সাহাবী রাসূলুল্লাহ(স) হতে বর্ণনা করেছেন।(খালীলী, আল ইরশাদ, পৃ. ৭)।
এখানে আমরা দেখছি যে, আল্লামা খালীলী হাদীসটিকে মাওযূ বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আবার তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে্, হাদীসটি অন্য সাহাবী থেকে বর্ণিত। তাঁর উদ্দেশ্য হলো, এই সনদে এই হাদীসটি মাউদূ। এই সনদ ও মতনের সম্মিলিত রূপটি বানোয়াট। তিনি সংক্ষেপে মুহাদ্দিসগণের নিরীক্ষার ফলাফলও বলে দিয়েছেন। ইমাম মালিকের অগণিত ছাত্রের কেউ এই হাদীসটি তাঁর সূত্রে এই সনদে বর্ণনা করেননি। একমাত্র আব্দুল মুনইম দাবি করেছে যে, ইমাম মালিক তাঁকে হাদীসটি বলেছেন। আর আব্দুল মুনইম এর বর্ণিত অন্যান্য সকল হাদীসের আলোকে মুহাদ্দিসগণ তার মিথ্যাচার ধরেছেন এবং তাকে মিথ্যাবাদী বলে চিহ্নিত করেছেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, এই হাদীসের মতনটি মিথ্যা। মতনটি অন্য বিভিন্ন সনদে সাখর আল গামিদী ও অন্যান্য সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে এবং মুহাদ্দিসগণের নিরীক্ষায় তা সহীহ বলে প্রমাণিত হয়েছে। (তিরমিযী, আস-সুনান ৩/৫১৭, ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/৭৫২)।
এভাবে আমরা দেখেছি যে, আব্দুল মুনইম একটি প্রচলিত ও সহীহ মতন এর জন্য একটি সুপ্রসিদ্ধ সহীহ সনদ জাল করেছে। আর সেই যুগে প্রসিদ্ধি অর্জনের জন্য এইরূপ বানোয়াট সনদের কি গুরুত্ব ছিল তা আমাদের যুগে এসে অনুধাবন করা অসম্ভব। মুহাদ্দিসগণ সাখার আল গামিদীর সূত্রে হাদীসটি জানতেন। কিন্তু তাঁরা যখনই শুনেছেন যে, অমুক শহরে এক ব্যক্তি মালিকের সূত্রে আব্দুল্লাহ ইবনু উমার থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তখন তাঁরা তার কাছে গিয়েছেন, তার হাদীস লিখেছেন ও নিরীক্ষা করেছেন। যখন নিরীক্ষার মাধ্যমে লোকটির জালিয়াতি ধরা পড়েছে তখন তারা তা প্রকাশ করেছেন। আবার অন্যান্য মুহাদ্দিস তার কাছে গিয়েছেন। মোটামুটি লোকটি বেশ মজা অনুভব করছে যে, কত মানুষ তার কাছে হাদীস শুনতে আসছে! কিভাবে সে সবাইকে বোকা বানাচ্ছে!! কিন্তু তার জালিয়াতি যে ধরা পড়বে তা নিয়ে সে মাথা ঘামায়নি। কোনো জালিয়াতই ধরা পড়ার চিন্তা করে জালিয়াতি করেনা।
ইবরাহীম ইবনুল হাকাম ইবনু আবান তৃতীয় হিজরী শতকের একজন হাদীস বর্ণনাকারী। তিনি এভাবে হাদীস বর্ণনায় কিছু জালিয়াতির আশ্রয় গ্রহণ করতেন। ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বাল এর মত প্রসিদ্ধ ইমামও তার কাছে হাদীস শিখতে গমন করেন। ইমাম আহমদ পরবর্তীকালে বলতেনঃ “ইবরাহীম ইবনুল হাকামের কাছে হাদীস শিখতে বাগদাদ হতে ইয়ামেনের এডেন পর্য্ন্ত সফর করলাম। সফরের টাকাগুলি ‘ফী সাবিলিল্লাহ’ চলে গেল।”(ইবনুল জাউযী, আদ-দুআফা ওয়াল মাতরূকীন ১/৩০)।

১.৬.১.৩. সনদের মধ্যে কম বেশি করা
রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা যেভাবে শুনতে হবে ঠিক অবিকল সেভাবেই বলতে হবে। সনদের মধ্যে কোনোরূপ কম বেশি বলাও তাঁর নামে মিথ্যা বলা। মুহাদ্দিসগণ এজন্য প্রচলিত সনদের মধ্যে কম বেশি করাকে বানোয়াটি ও জালিয়াতি বলে গণ্য করেছেন। মাউকূফ বা মাকতূ হাদীসকে অর্থাৎ সাহাবীর কথা বা তাবিয়ীর কথাকে মারফূ হাদীসরূপে বা রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা রূপে বর্ণনা করা, মুরসাল বা মুনকাতি হাদীসকে মুত্তাসিলরূপে বর্ণনা করা, সনদের কোনো একজন দুর্বল বর্ণনাকারীর পরিবর্তে অন্য একজন প্রসিদ্ধ বর্ণনাকারীর নাম ঢুকানো বা যে কোনো প্রকারে হাদীসের সনদের মধ্যে পরিবর্তন করা হাদীসের নামে মিথ্যাচার বলে গণ্য। এ ধরনের মিথ্যাচার ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত হতে পারে। ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচারী মিথ্যাবাদী বা জালিয়াত বলে গণ্য। অনিচ্ছাকৃত মিথ্যাচারী অগ্রহণযোগ্য, দুর্বল ও পরিত্যক্ত বলে গণ্য। এ বিষয়ে দুই একটি উদাহরণ দেখুন।
আবু সামারাহ আহমদ ইবনু সালিম ২য়-৩য় হিজরী শতকের একজন ‘রাবী’। তিনি বলেনঃ আমাদেরকে শরীক বলেছেন, আ’মাশ থেকে, তিনি আতিয়্যাহ থেকে তিনি আবু সাঈদ খুদরী থেকে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “আলী সকল সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ।”
হাদীসের ইমামগণ নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখেছেন যে, এই আবু সালামাহ আহমাদ ইবনু সালিম অত্যন্ত দুর্বল রাবী ছিলেন। তিনি বিভিন্ন আলিম ও মুহাদ্দিস থেকে তাদের নামে এমন সব হাদীস বর্ণনা করেছেন যা অন্য কেউ বর্ণনা করেননি। তার একটি মিথ্যা বা ভুল বর্ণনা হলো এই হাদীসটি। এই হাদীসটি শারীক ইবনু আব্দুল্লাহর অন্যান্য ছাত্রও বর্ণনা করেছেন। এছাড়া শারীকের উস্তাদ আ’মাশ থেকে শারীক ছাড়াও অন্য অনেকে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তারা বলেছেন, আ’মাশ থেকে, তিনি আতিয়্যাহ থেকে বলেছেন, হযরত জাবির বলতেনঃ “আমরা আলীকে আমাদের মধ্যে উত্তম বলে মনে করতাম।”
তাহলে আমরা দেখেছি যে, আবু সালামাহ ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে তিনটি বিষয় পরিবর্তন করেছেন।
প্র্রথমত, হাদীসটি আতিয়্যাহ জাবির থেকে বর্ণনা করেছেন, অথচ আবু সালামাহ আতিয়্যার উস্তাদের নাম ভুল করে আবু সাঈদ খুদরী বলে উল্লেখ করেছেন। এভাবে তিনি সনদের মধ্যে সাহাবীর নাম পরিবর্তন করেছেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি হাদীসটির সনদ বা মতনও পরিবর্তন করেছেন।
তৃতীয়ত, তিনি সনদের মধ্যে পরিবর্তন করে জাবির এর কথাকে রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা বলে চালিয়েছেন।
হাদীসটি মূলত জাবিরের(রা) নিজের কথা, অথচ তিনি একে রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর এটিই হলো সবচেয়ে মারাত্মক পরিবর্তন। কারণ এখানে রাসূলুল্লাহ(স) যা বলেননি তা তাঁর নামে বলা হয়েছে, যা অত্যন্ত বড় অপরাধ। কোনো সাহাবী, তাবেয়ী বা বুযুর্গের কথা বা জ্ঞানমূলক প্রবাদকে রাসূলুল্লাহ (স) এর কথা হিসেবে উল্লেখ করা মাওযূ বা বানোয়াট হাদীসের একটি বিশেষ প্রকার। আমরা একটু পরেই বিষয়টি আবার উল্লেখ করব, ইনশা আল্লাহ।(ইবনু আদী, আল কামিল ১/২৭৭-২৭৮)।
ইবরাহীম ইবনুল হাকাম ইবনু আবান তৃতীয় হিজরী শতকের একজন রাবী।তিনি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে জালিয়াতি করতেন। তবে সনদের মধ্যে। তৃতীয় শতকের মুহাদ্দিস আব্বাস ইবনু আব্দুল আযীম বলেনঃ ইবরাহীম ইবনুল হাকাম তার পিতার সূত্রে তাবিয়ী ইকরিমাহ থেকে রাসূলুল্লাহ(স) হতে কিছু হাদীস শিক্ষা করেন ও লিখেন। এই হাদীসগুলি তার পান্ডুলিপিতে এভাবে মুরসাল রূপেই লিখিত ছিল, কোনো সাহাবীর নাম ছিলনা। পরবর্তী সময় তিনি এগুলিতে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস, আবু হুরাইরা প্রমুখ সাহাবীর (রা) নাম উল্লেখ করে বর্ণনা করতেন। এই সনদগত মিথ্যাচারের ফলে তিনি গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেন। (ইবনু আদী, আল কামিল ১/২৪১-২৪২)।
১.৬.১.৪. সনদ চুরি বা হাদীস চুরি
হাদীস জালিয়াতির ক্ষেত্রে মিথ্যাবাদীদের একটি বিশেষ পদ্ধতি হলো-চুরি। ‘হাদীস চুরি’ অর্থ হলো, কোনো মিথ্যাচারী রাবী অন্য একজন রাবীর কোনো হাদীস শুনে সেই হাদীস উক্ত রাবীর সূত্রে বর্ণনা না করে বানোয়াট সনদে তা বর্ণনা করবে। চুরি কয়েক প্রকারে হতে পারেঃ
ক. ‘চোর’ জালিয়াত মূল সনদ ঠিক রাখবে। তবে যার নিকট হতে হাদীসটি শুনেছে তার নাম না বলে তার উস্তাদের নাম বলবে এবং নিজেই সে উস্তাদের নিকট শুনেছে বলে দাবী করবে।
খ. চোর জালিয়াত মূল সনদের মধ্যে কিছু পরিবর্তন করবে। সনদের মধ্যে একজন রাবীর নাম পরিবর্তন করে সে নতুন সনদ বানাবে।
গ. চোর জালিয়াত হাদীসটির মতন এর মত নতুন সনদ বানাবে। একজন দুর্বল বা মিথ্যাচারী রাবীর বর্ণিত কোনো হাদীস তার মুখে বা কোনো স্থানে শুনে তার ভাল লাগে। হাদীসটির আকর্ষণীয়তার কারণে তারও ইচ্ছা হয় হাদীসটি বলার। তবে হাদীসটি মূল জালিয়াতের নামে বললে তার সম্মান কমে যায়। এছাড়া এতে আকর্ষণীয়তা ও নতুনত্ব থাকেনা। সেজন্য সে এই জাল হাদীসটির জন্য আরেকটি জাল সনদ তৈরি করবে।
জাল হাদীস চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে চুরির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দুর্বল বা জাল হাদীস অনেক সময় ১০/১৫ টি সনদে বর্ণিত থাকে। এতগুলি সনদ দেখে অনেক সময় মুহাদ্দিস ধোঁকা খেতে পারেন। তিনি ভাবতে পারেন, হাদীসের সনদগুলি দুর্বল হলেও যেহেতু এতগুলি সনদে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে সেহেতু হয়ত এর কোনো ভিত্তি আছে। এক্ষেত্রে তাকে দুইটি বিষয় নিশ্চিত হতে হবে। প্রথমত, তাকে দেখতে হবে যে, প্রত্যেক সনদেই মিথ্যাবাদী রাবী আছে কিনা। যদি দেখা যায় যে, হাদীসটি নির্দিষ্ট কোনো যুগে নির্দিষ্ট কোনো রাবীর বর্ণনায় প্রসিদ্ধি লাভ করে। সেই যুগের মুহাদ্দিসগণ হাদীসটিকে সেই রাবীর হাদীস বলে চিহ্নিত করেছেন। এরপর কোনো কোনো দুর্বল বা জালিয়াত রাবী তা উক্ত রাবীর ওস্তাদ থেকে বা অন্য কোনো সনদে বর্ণনা করেছেন। এক্ষেত্রে বুঝা যাবে যে, পরের রাবীগণ ‘চুরি’ করেছেন।
এখানে চুরির কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করছি।
আমরা ইতোপূর্বে নেককারদের অনিচ্ছাকৃত মিথ্যার উদাহরণ হিসেবে তৃতীয় হিজরী শতকের মাশহুর আবিদ সাবিত ইবনু মূসা(২২৯ হি) বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ করেছি, যে হাদীসে বলা হয়েছেঃ ‘যার রাতের সালাত(তাহাজ্জুদ) অধিক হবে দিবসে তার চেহারা সৌন্দর্য্যময় হবে।’ এই হাদীসটি সর্বপ্রথম সাবিতই বলেন। মুহাদ্দিসগণ সাবিতের মুখে হাদীসটি শোনার পরে বিস্তারিত নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে, সাবিত ছাড়া ইতোপূর্বে কেউ হাদীসটি বলেননি। কিন্তু এই হাদীসটি সাবিতের মাধ্যমে পরিচিতি ও প্রসিদ্ধি লাভের পরে কোনো দুর্বল বা মিথ্যাচারী রাবী এই হাদীসটি সাবিতের উস্তাদ শারীক থেকে বা অন্যান্য সনদে বর্ণনা করেছেন। মুহাদ্দিসগণ এগুলিকে চুরি বলে চিহ্নিত করেছেন। এ সকল চোর জালিয়াতের একজন আব্দুল হামীদ ইবনু বাহর আবুল হাসান আসকারী, তিনি সাবিতের পরের যুগে দাবী করেন যে, তিনিও হাদীসটি শারীক থেকে শুনেছেন। ৪র্থ হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনু আদী বলেন, আমাকে হাসান ইবনু সুফিয়ান বলেছেন, আমাকে আব্দুল হামীদ ইবনু বাহর বলেছেন, আমাদেরকে শারীক বলেছেন, আ’মাশ থেকে, আবু সুফিয়ান থেকে জাবির থেকে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি রাত্রে সালাত(তাহাজ্জুদ) আদায় করে তবে দিনে তার চেহারা সৌন্দর্য্যময় হবে।’ ইবনু আদী বলেন হাদীসটি সাবিত ইবনু মুসা হতে প্রসিদ্ধ। তার থেকে পরবর্তীতে অনেক দুর্বল রাবী হাদীসটি চুরি করেছে। আব্দুল হামীদ তাদের একজন। (ইবনু আদী, আল কামিল ৫/৩২২)।
চতুর্থ হিজরী শতকের একজন জালিয়াত রাবী হাসান ইবনু আলী ইবনু সালিহ আল আদাবী। আল্লামা ইবনু আদী বলেনঃ আমি লোকটির নিকট হতে হাদীস শুনেছি ও লিখেছি। লোকটি হাদীস জাল করত ও চুরি করত। একজনের হাদীস অন্যজনের নামে বর্ণনা করত। এমন সব লোকের নাম বলে হাদীস বলতো যাদের কোনো পরিচয় জানা যায়না।
এরপর তিনি এই হাসান ইবনু আলীর হাদীস চুরির অনেক উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে ইবনু আদী বলেনঃ আমাকে হাসান ইবনু আলী আদাবী বলেন, আমাদেরকে হাসান ইবনু আলী ইবনু রাশিদ বলেছেন, তিনি শারীক থেকে, তিনি আ’মাশ থেকে, তিনি আবু সুফিয়ান থেকে, তিনি জাবির থেকে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ ‘যার রাতের সালাত অধিক হবে, দিবসে তার চেহার সৌন্দর্য্যময় হবে।’ ইবনু আদী বলেনঃ হাদীসটি সাবিত ইবনু মুসার হাদীস। সাবিতের পরে অনেক দুর্বল রাবী হাদীসটি চুরি করে বিভিন্ন রাবীর নাম দিয়ে চালিয়েছে। এই সনদে হাসান ইবনু আলী আল আদাবী হাদীসটিকে হাসান ইবনু আলী ইবনু রাশিদের নামে চালাচ্ছে। অথচ হাসান ইবনু আলী ইবনু রাশিদ প্রসিদ্ধ ও সত্যপরায়ণ রাবী ছিলেন, তিনি কখনোই এই হাদীসটি শারীক থেকে বা অন্য কোনো সনদে বর্ণনা করেননি। তাঁর পরিচিত কোনো ছাত্র হাদীসটিকে তাঁর থেকে বর্ণনা করেননি। (ইবনু আদী, আল কামিল ২/৩৩৮-৩৪১ আরো দেখুন ৬/৩০৩)।
২য় শতকের একজন দুর্বল রাবী ‘হুযাইল ইবনুল হাকাম’। তিনি বলেন, আমাকে আব্দুল আযীয ইবনু আবী রাওয়াদ(১৫৯ হি) বলেছেন, তিনি ইকরিমাহ থেকে, তিনি ইবনু আব্বাস থেকে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “প্রবাসের মৃত্যু শাহাদাত বলে গণ্য।” হাদীসটির একমাত্র বর্ণনাকারী এই হুযাইল নামক রাবী। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকের মুহাদ্দিসগণ বিস্তারিত সন্ধান ও নিরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন যে, এই হাদীসটি একমা্ত্র এই ব্যক্তি ছাড়া কোনো রাবী আব্দুল আযীয থেকে বা অন্য কোনো সূত্রে বর্ণনা করেননি।
এই যুগের অন্য একজন রাবী ইবরাহীম ইবনু বাকর আল আ’ওয়ার। তিনি এসে দাবী করলেন যে, তিনি হাদীসটি আব্দুল আযীয থেকে শুনেছেন। তিনিও বললেনঃ আমাদেরকে আব্দুল আযীয বলেছেন, ইকরিমাহ থেকে ইবনু আব্বাস থেকে ………। মুহাদ্দিসগণ নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করলেন যে, ইবরাহীম নামক এই ব্যক্তি হাদীসটি চুরি করেছেন। তাঁরা দেখলেন যে, ইবরাহীম আব্দুল আযীয হতে হাদীস শুনেননি। যখন হুযাইল হাদীস বলতেন তখনও তিনি বলেননি যে, তিনিও হাদীসটি শুনেছেন। হুযাইলের সূত্রে যখন হাদীসটি মুহাদ্দিসগণের মধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করে তখন তিনিও হাদীসটি হুযাইলের সূত্রে জানতে পারেন। এখন হুযাইলের সূত্রে হাদীসটি বললে তার মর্যাদা কমে যাবে! এজন্য তিনি হুযাইলের সনদ চুরি করলেন। হুযাইলের উস্তাদকে নিজের উস্তাদ দাবী করে তিনি হাদীসটি বলতে শুরু করলেন। (ইবনু আদী, আল কামিল ১/২৫৭)।
১.৬.২. মতনে মিথ্যা
জালিয়াতির প্রধান ক্ষেত্র হলো হাদীসের ‘মতন’ বা মূল বক্তব্য। মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে প্রচলিত মিথ্যা কথা মূলত দুই প্রকারের হতে পারেঃ জালিয়াত নিজের মনগড়া কথা রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে বলবে অথবা প্রচলিত কোনো কথাকে তাঁর নামে বলবে। উভয় প্রকারের মিথ্যা কথা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত হতে পারে।
১.৬.২.১. নিজের মনগড়া কথা হাদীস নামে চালানো
অনেক সময় আমরা দেখতে পাই যে, মিথ্যাবাদী রাবী নিজের মনগড়া কথা হাদীস নামে চালাচ্ছে। আল্লামা সুয়ূতী (৯১১ হি) উল্লেখ করেছেন যে, মাউযূ বা মিথ্যা হাদীসের মধ্যে এই প্রকারের হাদীসের সংখ্যা বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জালিয়াত প্রয়োজন ও সুবিধা অনুসারে একটি বক্তব্য বানিয়ে তা হাদীস নামে চালায়। (সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী ১/২৮৭)।
উপরে উল্লিখিত বিভিন্ন উদাহরণের মধ্যে আমরা এই প্রকারের অনেক জাল হাদীস দেখতে পেয়েছি। কুরআনের বিভিন্ন সূরার ফযীলতে বানানো, দেশ, জাতি, দল, মত ইত্যাদির পক্ষে বা বিপক্ষে বানানো জাল হাদীসগুলি সবই একই পর্যায়ের।
১.৬.২.২. প্রচলিত কথা হাদীস নামে চালানো
অনেক সময় দুর্বল রাবী বা মিথ্যাবাদী রাবী ভুলক্রমে বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো সাহাবী বা তাবেয়ীর কথা, অথবা কোনো প্রবাদ বাক্য, নেককার ব্যক্তির বাণী, পূর্ববর্তী নবীদের নামে প্রচলিত কথা, চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনো কথা, কোনো প্রসিদ্ধ পন্ডিতের বাণী বা অনুরূপ কোনো প্রচলিত কথাকে ‘হাদীসে রাসূল’ বলে বর্ণনা করেছেন। আল্লামা ইরাকী(৮০৬ হি) এই জাতীয় মাউদূ হাদীসের দুইটি উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। প্রথম উদাহরণ ‘দুনিয়ার ভালবাসা সকল পাপের মূল।’ আল্লামা ইরাকী বলেন, এই বাক্যটি মূলত কোনো নেককার আবিদের কথা। ঈসা(আ) এর কথা হিসেবেও প্রচার করা হয়। তবে রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা হিসেবে এর কোনো ভিত্তি নেই।
আর দ্বিতীয় উদাহরণ ‘পাকস্থলী রোগের বাড়ি আর খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ সকল ঔষধের মূল।’ কথাটি চিকিৎসকদের কথা। হাদীস হিসেবে এর কোনো ভিত্তি নেই। (সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী ১/২৮৭)।
উপরে ‘সনদের মধ্যে কম বেশি করা’ শীর্ষক অনুচ্ছেদে আমরা এই জাতীয় কিছু উদাহরণ দেখেছি। এই প্রকারের মিথ্যা বা জালিয়াতির আরো অনেক উদাহরণ আমরা দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেখতে পাব। এখানে আমাদের দেশে আলেমগণের মধ্যে প্রচলিত এইরূপ একটি হাদীসের কথা উল্লেখ করছি।
আমাদের দেশে প্রচলিত হাদীস বলে একটি কথাঃ “মুসলিমগণ যা ভাল মনে করবেন তা আল্লাহর নিকট ভাল।”
আমাদের দেশে সাধারণভাবে কথাটি হাদীসে নববী নামে পরিচিত। কথাটি মূলত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) এর। একে রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা বলে বর্ণনা করলে তাঁর নামে মিথ্যা বলা হবে। ইবনু মাসউদ(রা) বলেনঃ আল্লাহ তাঁর বান্দাদের হৃদয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। তিনি মুহাম্মাদ(স) এর হৃদয়কে সমস্ত সৃষ্টিজগতের মধ্যে সর্বোত্তম সর্বশ্রেষ্ঠ হৃদয় হিসেবে পেয়েছেন। এজন্য তিনি তাঁকে নিজের জন্য বেঁছে নেন এবং তাঁকে রিসালাতের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেন। এরপর তিনি মুহাম্মাদ(স) এর হৃদয়ের পরে অন্যান্য বান্দাদের হৃদয়গুলির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। তখন তিনি তাঁর সাহাবীগণের হৃদয়গুলিকে সর্বোত্তম হিসেবে পেয়েছেন। এজন্য তিনি তাঁদেরকে তাঁর নবীর সহচর ও পরামর্শদাতা বানিয়ে দেন, তাঁরা তাঁর দ্বীনের জন্য যুদ্ধ করেন। অতএব মুসলমানগণ [অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ(স) এর সহচর পরামর্শদাতা পবিত্র হৃদয় সাহাবীগণ) যা ভালো মনে করবেন তা আল্লাহর নিকটও ভাল। আর তাঁরা যাকে খারাপ মনে করবেন তা আল্লাহর নিকটও খারাপ।(আহমাদ, আল মুসনাদ ১/৩৭৯, হাকিম, আল মুসতাদরাক ৩/৮৩)।
কোনো কোনো ফকীহ বা আলিম ভুলবশত কথাটি হাদীসে নববী বলে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিসগণ হাদীসের সকল গ্রন্থ তালাশ করে নিশ্চিত হয়েছেন যে, হাদীসটি রাসূলুল্লাহ(স) হতে বর্ণিত হয়নি। আল্লামা যাইলায়ী আব্দুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (৭৬২ হি), ইবনু কাসীর ইসমাঈল ইবনু উমার (৭৭৪ হি), ইবনু হাজার আসকালানী আহমাদ ইবনু আলী (৮৫২ হি), সাখাবী, মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুর রাহমান (৯০২ হি) ও অন্যান্য মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদের(রা) কথা হিসেবে হাসান সনদে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা হিসেবে কোথাও বর্ণিত হয়নি।

১.৬.৩. অনুবাদে, ব্যাখ্যায় ও গবেষণায় মিথ্যা
হাদীসের নামে মিথ্যার আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো অনুবাদ ও ব্যাখ্যা। প্রচলিত বই পুস্তক ও ওয়ায নসীহত পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, আমরা সাধারণত হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে নিজেদেরকে ১০০% ঢালাও স্বাধীনতা প্রদান করে থাকি। হাদীসের মূল বক্তব্যকে আমরা আমাদের পছন্দমতো কম বেশি করে অনুবাদ করি, অনুবাদের মধ্যে আমাদের অনেক মতামত ও ব্যাখ্যা সংযোগ করি এবং সবকিছুকে ‘হাদীস’ নামেই চালাই। অথচ সাহাবায়ে কেরাম সামান্য একটি শব্দের হেরফের এর কারণ গলদঘর্ম হয়ে যেতেন!
কুরআন ও হাদীসের আলোকে কিয়াস ও ইজতিহাদ ইসলামী ফিকহের অন্যতম উৎস। যে সকল বিষয়ে কুরআন ও হাদীস স্পষ্ট কোনো বিধান দেওয়া হয়নি কিয়াস ও ইজতিহাদের মাধ্যমে সেগুলির বিধান নির্ধারণ করতে হয়। যেমন রাসূলুল্লাহ(স) উম্মাতকে সালাত শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু কোন কাজটি ফরজ, কোনটি মুস্তাহাব ইত্যাদি বিস্তারিত বলেননি। বিভিন্ন হাদীসের আলোকে মুজতাহিদ তা নির্ণয় করার চেষ্টা করেন। অনুরূপভাবে মাইক, টেলিফোন, প্লেন ইত্যাদি বিষয়ে কুরআন ও হাদীসে কিছু বলা হয়নি। কুরআন ও হাদীসের প্রাসঙ্গিক নির্দেশাবলীর আলোকে কিয়াস ও ইজতিহাদের মাধ্যমে এগুলির বিধান অবগত হওয়ার চেষ্টা করেন মুজতাহিদ।
তবে কিয়াস বা ইজতিহাদ দ্বারা কোনো গাইবী বিষয় জানা যায়না বা ইবাদত বন্দেগী করা যায়না। হজ্জের সময় ইহরাম পরিধানের উপর কিয়াস করে সালাতের মধ্যে ইহরাম পরিধানের বিধান দেয়া যায়না। অনুরূপভাবে মসজিদুল হারামে সালাতের ১ লক্ষগুণ সাওয়াবের কিয়াস করে তথায় যাকাত প্রদানের সাওয়াব ১ লক্ষগুণ বৃদ্ধি হবে বলা যায়না। অথবা আমরা বলতে পারিনা যে, রামাদানে যাকাত দিলে ৭০ গুণ সাওয়াব এবং রামাদানে মসজিদে হারামে যাকাত প্রদান করলে ৭০ লক্ষ গুণ সাওয়াব।
এখানে কিছু উদাহরণ উল্লেখ করছি। ইমাম তিরমিযী তাঁর সুনানগ্রন্থে জিহাদের ফযীলতের অধ্যায়ে নিম্নের ‘হাসান’ বা গ্রহণযোগ্য হাদীসটি সংকলন করেছেন। খুরাইম ইবনু ফাতিক (রা)বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “যদি কেউ আল্লাহর রাস্তায় কোনো ব্যয় করেন তবে তার জন্য সাতশত গুণ সাওয়াব লেখা হয়।”
ইমাম ইবনু মাজাহ সংকলিত একটি যয়ীফ হাদীসে বলা হয়েছে “যদি কেউ নিজে বাড়িতে অবস্থান করে আল্লাহর রাস্তায় খরচ পাঠিয়ে দেয়, তবে সে প্রত্যেক দিরহামের জন্য ৭০০ দিরহাম (সাওয়াব) লাভ করবে। আর যদি সে নিজে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং এই জন্য খরচ করে তবে সে প্রত্যেক দিরহামের জন্য ৭ লক্ষ দিরহাম (সাওয়াব) লাভ করবে। এরপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেনঃ ‘আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা বৃদ্ধি করে দেন।”(ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/৯২২)।
হাদীসটির একমাত্র বর্ণনাকারী ইবনু আবী ফুদাইক। তিনি বলেন, “খালীল ইবনু আব্দুল্লাহ নামক এক ব্যক্তি হাসান বসরীর সূত্রে হাদীসটি বলেছেন। মুহাদ্দিসগণ খালীল ইবনু আব্দুল্লাহ নামক এই ব্যক্তির বিশ্বস্ততাতো দূরের কথা তার কোনো পরিচয়ও জানতে পারেননি। এজন্য আল্লামা বুসিরী বলেনঃ “এই সনদটি দুর্বল; কারণ খলীল ইবনু আব্দুল্লাহ অজ্ঞাত পরিচয়।”
তাবিয়ী মুজাহিদ বলেনঃ আবু হুরাইরা(রা) একবার সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত ছিলেন। শত্রুর আগমন ঘটেছে মনে করে হঠাৎ করে ডাকাডাকি করা হয়। এতে সকলেই ছুটে সমুদ্র উপকূলে যান।তখন বলা হয় যে, কোনো অসুবিধা নেই। এতে সকলেই ফিরে আসলেন। শুধু আবু হুরাইরা দাঁড়িয়ে রইলেন। তখন একব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করেন, আবু হুরাইরা, আপনি এখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন? তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ(স) কে বলতে শুনেছিঃ “আল্লাহর রাস্তায় এক মুহুর্ত অবস্থান করা লাইলাতুল কাদরে হজরে আসওয়াদের নিকট কিয়াম(সালাত আদায় করা) করার চেয়ে উত্তম।” (ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১০/৪৬২)।
উপরের হাদীসগুলিতে আল্লাহর পথে ব্যয়, অবস্থান ইত্যাদির সাওয়াব উল্লেখ করা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর সকল আলিম একমত যে, এখানে আল্লাহর রাস্তায় বলতে অমুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মুসলিম রাষ্ট্রের যুদ্ধ বা জিহাদ বুঝানো হয়েছে। সকল মুহাদ্দিসই হাদীসগুলিকে জিহাদ বা যুদ্ধের অধ্যায়ে সংকলন করেছেন। এখানে আমরা অনুবাদে যদি ‘আল্লাহর রাস্তায়’ বলি বা ‘জিহাদ’ বলি তবে হাদীসগুলির সঠিক অনুবাদ হবে।
অন্য একটি সহীহ হাদীস কাব ইবনু আজরা(রা) বলেন, “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ(স) এর নিকট দিয়ে গমন করে। সাহাবীগণ লোকটির স্বাস্থ্য, শক্তি ও উদ্দীপনা দেখে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ লোকটি যদি আল্লাহর রাস্তায়(জিহাদে) থাকত! তখন রাসূলুল্লাহ(স) বলেনঃ যদি লোকটি তার ছোট ছোট সন্তানদের জন্য উপার্জনের চেষ্টায় বেরিয়ে থাকে তবে সে আল্লাহর রাস্তাতেই রয়েছে। যদি সে তার বৃদ্ধ পিতামাতার জন্য উপার্জনের চেষ্টায় বেরিয়ে থাকে তাহলে সে আল্লাহর রাস্তাতেই রয়েছে। যদি সে নিজেকে পরনির্ভরতা থেকে মুক্ত রাখতে উপার্জনের চেষ্টায় বেরিয়ে থাকে তাহলে সে আল্লাহর রাস্তাতেই রয়েছে।” (হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/৩২৫)।
এখানে অর্থ উপার্জনের জন্য কর্ম করাকে ‘আল্লাহর রাস্তায় থাকা’ বা ‘আল্লাহর রাস্তায় চলা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। অন্যান্য হাদীসে ইলম শিক্ষা, হ্জ্জ, সৎকাজে আদেশ, ঠান্ডার মধ্যে পূর্ণরূপে ওযু করা, মসজিদে সালাতের অপেক্ষা করা, নিজের নফসকে আল্লাহর পথে রাখার চেষ্টা করা ইত্যাদি কর্মকে জিহাদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমরা উপরের হাদীসগুলির সঠিক ও শাব্দিক অর্থ বর্ণনা করার পরে বলতে পারি যে, বিভিন্ন হাদীসে হালাল উপার্জন, ইলম শিক্ষা, সৎকাজে আদেশ, হজ্জ আদায় ইত্যাদি কর্মকেও ‘আল্লাহর রাস্তায় কর্ম’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। কাজেই আমরা আশা করি যে, এইরূপ কর্মে রত মানুষেরাও এ সকল হাদীসে উল্লেখিত জিহাদের সাওয়াব পেতে পারেন।
কিন্তু আমরা যদি সেরূপ না করে সরাসরি বলি যে, ‘হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, হালাল উপার্জনে এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে থাকা হাজরে আসওয়াদের নিকট লাইলাতুল কদরের সালাত আদায় অপেক্ষা উত্তম’, অথবা ‘সৎকাজে আদেশের জন্য র্যালি বা মিছিলে একটি টাকা ব্যয় করলে ৭০ লক্ষ টাকার সাওয়াব পাওয়া যাবে’….তবে তা মিথ্যাচার বলে গণ্য হবে। কারণ রাসূলুল্লাহ(স) কখনোই এভাবে বলেননি।
অনুরুপভাবে উপরের হাদীসগুলিতে আল্লাহর পথে যুদ্ধে ব্যয় করলে ৭০০ বা ৭ লক্ষ গুণ সাওয়াবের কথা বলা হয়েছে। অন্য হাদীসে বলা হয়েছেঃ “সালাত, সিয়াম ও যিকর(এগুলির সাওয়াব) আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার চেয়ে সাতশত গুণ বর্ধিত হয়।”
এ হাদীসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ বলেছেন যে, এ হাদীসে স্পষ্ট অর্থ হলো, ঘরে বসে সালাত, সাওম ও জিকির পালন করলে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য অর্থ ব্যয়ের চেয়েও সাতশত গুণ বেশি সাওয়াব পাওয়া যায়। কেউ কেউ এখানে কিছু কথা উহ্য রয়েছে বলেও মনে করেন। তাঁরা বলছেন, এই হাদীসের অর্থ হলো, ‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদরত অবস্থায়’ সালাত, সিয়াম ও যিকর পালন করলে সেগুলির সাওয়াব আল্লাহর রাস্তায় অর্থ ব্যয়ের চেয়ে সাতশত গুণ বর্ধিত হয়।(হাশিয়াতু ইবনুল কাইয়িম ৭/১২৭)।এখানে আমাদের দায়িত্ব হলো হাদীসটি শাব্দিক অর্থ বলার পরে আমাদেরকে ব্যাখ্যা পৃথকভাবে বলা।
এখানে বিভিন্নভাবে হাদীসের নামে মিথ্যা বলার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন কেউ গুণভাগ করে বলতে পারেন যে, ‘জিহাদে যেয়ে অর্থ ব্যয় করলে ৭ লক্ষ গুণ সাওয়াব। আর ঘরে বসে যিকর করলে তার ৭ শত গুণ সাওয়াব। এর অর্থ হলো ঘরে বসে যিকর করলে ৪৯ কোটি নেক আমলের সাওয়াব।’ তিনি যদি উপরের হাদীসগুলির সঠিক অনুবাদ করার পর পৃথকভাবে এই ব্যাখ্যা করেন তবে অসুবিধা নেই। কিন্তু তিনি যদি এই কথাটিকে হাদীসের কথা বলে বুঝান তবে তিনি হাদীসের নামে মিথ্যা বললেন। কারণ রাসূলুল্লাহ(স) কখনোই এভাবে বলেননি। তিনি আল্লাহর পথে খরচের চেয়ে ৭০০ গুণ বৃদ্ধি বলতে মূল সওয়াবের সাথে ৭০০ গুণ নাকি ৭০০ গুণের ৭০০ গুণ বুঝাচ্ছেন তাও স্পষ্ট করে বলেননি। কাজেই তিনি যা স্পষ্ট করে বলেননি, তা তাঁর নামে বলা যায়না। তবে পৃথকভাবে ব্যাখ্যায় বলা যেতে পারে।
অনুরূপভাবে যদি কেউ বলেন যে, ‘হাদীসশরীফে বলা হয়েছে, হালাল উপার্জনের জন্য কর্মরত অবস্থায়, হজ্জের সফরে থাকা অবস্থায়, ইলম শিক্ষারত অবস্থায়, দাওয়াতে রত অবস্থায়, সৎকাজের আদেশের জন্য মিছিলে থাকা অবস্থায় বা নফসকে শাসনরত অবস্থায় যিকর করলে ৪৯ কোটি গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়’ তবে তিনিও হাদীসের নামে মিথ্যা বললেন।
হাদীসের নামে মিথ্যা বলার একটি প্রকরণ হলো, অনুবাদের সময় শাব্দিক অনুবাদ না করে অনুবাদের সাথে নিজের মনমতো কিছু সংযোগ করা বা কিছু বাদ দিয়ে অনুবাদ করা। অথবা রাসূলুল্লাহ(স) যা বলেছেন তার ব্যাখ্যাকে হাদীসের অংশ বানিয়ে দেওয়া। আমাদের সমাজে আমরা প্রায় সকলেই এই অপরাধে লিপ্ত রয়েছি। আত্মশুদ্ধি, পীর মুরিদী, দাওয়াত-তাবলীগ, রাজনীতিসহ মতভেদীয় বিভিন্ন মাসলা মাসাইল এর জন্য আমরা প্রত্যেক দলের ও মতের মানুষ কুরআন ও হাদীস থেকে দলীল প্রদান করি। এই দলীল প্রদান খুবই স্বাভাবিক কর্ম ও ঈমানের দাবি। তবে সাধারণত আমরা আমাদের এই ব্যাখ্যাকেই রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে চালাই।
রাসূলুল্লাহ(স) দ্বীন প্রচার করেছেন আজীবন। দ্বীনের জন্য তিনি ও তাঁর অনেক সাহাবী চিরতরে বাড়িঘর ছেড়ে ‘হিজরত’ করেছেন। কিন্তু তিনি কখনোই দাওয়াতের জন্য সময় নির্ধারণ করে বিভিন্ন এলাকায় সফরে বাহির হননি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেকে হিজরত না করলেও অন্তত কিছুদিনের জন্য বিভিন্নস্থানে যেয়ে দাওয়াতের কাজ করেছেন। কিন্তু আমরা এই কর্মের জন্য যদি বলি যে, তিনি দাওয়াতের জন্য ‘বাহির’ হতেন, তবে পাঠক বা শ্রোতা নির্ধারিত সময়ের জন্য বাহির হওয়া বুঝবেন। অথচ তিনি কখনোই এভাবে দাওয়াতের কাজ করেননি। এতে তাঁর নামে মিথ্যা বলা হবে।
যদি আমরা বলি যে, ‘রাসূলুল্লাহ ও সাহাবীগণ মিলাদ মাহফিল করতেন’ তবে অনুরূপভাবে তাঁর নামে মিথ্যা বলা হবে। কারণ তাঁরা কখনোই শুধু ‘মিলাদ’ আলোচনা বা উদযাপনের জন্য কোনো মাহফিল করেননি। তবে রাসূলুল্লাহ(স) তাঁর জন্ম বিষয়ক দুই চারিটি ঘটনা সাহাবীদেরকে বলেছেন। এ সকল হাদীস সাহাবীগণ তাবেয়ীগণকে বলেছেন। এগুলির জন্য তাঁরা কোনো মাহফিল করেননি বা এগুলিকে পৃথকভাবে আলোচনা করেননি। আজ যদি কোনো মুসলিম ‘আনুষঙ্গিক আনুষ্ঠানিকতা’ ছাড়া অবিকল রাসূলুল্লাহ(স) ও সাহাবীগণের পদ্ধতিতে এসকল হাদীস বর্ণনা করেন, তবে কেউই বলবেননা যে, তিনি মিলাদ মাহফিল করেছেন। এতে আমরা বুঝি যে, মিলাদ মাহফিল বলতে যে অর্থ আমরা সকলেই বুঝি সেই কাজটি তিনি করেননি।
এজন্য্ আমাদের উচিত, রাসূলুল্লাহ(স) কি করেছেন বা বলেছেন এবং তা থেকে আমরা কি বুঝলাম তা পৃথকভাবে বলা। আমরা দেখেছি যে, একটি শব্দ হেরফের এর ভয়ে সাহাবীগণ কিভাবে সন্ত্রস্ত হয়েছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।

About ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর