ইসলামী আকীদা

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আমল হচ্ছে ঈমানের ভিত্তি

“আমানতু বিল্লাহ –আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি” কথার অর্থ হচ্ছে, আমি উত্তমরূপে জেনে নিয়েছি এবং তার উপর আমার দৃঢ় প্রত্যয় জন্মেছে।

“আসলামতু লাহু –আমি তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি” কথার অর্থ হচ্ছে, আমি আল্লাহর সামনে আমার মাথা আনত করে দিয়েছি; আনন্দের সাথে ও আন্তরিক একাগ্রতা সহকারে তাঁর সিদ্ধান্তের সামনে নতি স্বীকার করেছি।

শরীআতের দৃষ্টিতে ‘ঈমান’ এবং ‘ইসলাম’ শব্দদ্বয় সমার্থবোধক বা একে অপরের স্থলাভিষিক্ত অথবা পরস্পর পরিপূরক।

ইসলামের তাৎপর্য হচ্ছে, প্রতিটি ঈপ্সিত ইবাদত আঞ্জাম দেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করা। অর্থাৎ সত্যনিষ্ঠ মনে আল্লাহকে মেনে নেওয়া এবং তাঁর নির্দেশসমূহ কার্যকর করার নাম হচ্ছে ইসলাম।

ঈমানের তাৎপর্য হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার সঠিক পরিচয় লাভ করা এবং তাঁর যে কোন দাবি পূরণ করা।

অতএব ইসলামের মধ্যে প্রত্যয় ও বিশ্বাসের অর্থও পাওয়া যায় এবং ঈমানের মধ্যে আত্মসমর্পণের অর্থও নিহিত রয়েছে। সুতরাং ইয়াকীন বা বিশ্বাসশূন্য ইষলাম গ্রহণযোগ্য নয় এবং আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের ভাবধারা-শূন্য ঈমানও গ্রহণযোগ্য নয়। এ সম্পর্কে আল্লাহর বাণী নিম্নরূপঃ

(আরবী************************************************************************************)

এই বেদুইনরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। (হে মুহাম্মদ! তাদের) বল, তোমরা ঈমান আননি। বরং তোমরা বল, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। এখনও তোমাদের অন্তরে ঈমান প্রবেশ করতে পারেনি।–সূরা হুজুরাতঃ ১৪

এই আয়াতে যে ‘ইসলাম’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তার দ্বারা সেই ‘দীনে হক’ বোঝানো হয়নি যা নিম্নোক্ত আয়াতে বোঝানো হয়েছেঃ

(আরবী*************************************************************************************)

যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম অবলম্বন করতে চায়, তার কাছ থেকে সেই ধর্ম মোটেই গ্রহণ করা হবে না।–সূরা আলে-ইমরানঃ ৮৫

প্রথমোক্ত আয়াতে উল্লেখিত ‘ইসলাম’ দ্বারা সেই আনুগত্যকে বোঝানো হয়েছে যা একান্ত বাধ্য হয়ে গ্রহণ করা হয়েছে অথবা যা মুনাফিকীর ফলশ্রুতি। ঈমান যতক্ষণ প্রতিটি শিরা-উপশিরায় মজবুতভাবে বসে না যায় ততক্ষণ এই ইসলামের কোন নির্ভরযোগ্যতা নেই। অনুরূপভাবে যে ঈমানের সাথে শ্রবণ ও আনুগত্য পাওয়া যাবে এবং যা অবাধ্যতা ও অহংকারমুক্ত হবে সেই ঈমানই নির্ভরযোগ্য বিবেচিত হবে। কুরআনের বাণীঃ

(আরবী*************************************************************************************)

এরা বলে, আমরা আল্লাহ ও রাসূলের উপর ঈমান এনেছি এবং আমরা অনুগত হয়ে গেছি। এর পরও তাদের মধ্যে একদল লোক আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। এরা কখনো মুমিন নয়।–সূরা নূরঃ ৪৭

সাইয়্যেদুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম যে দীন নিয়ে এসেছেন, ‘ইসলাম’ শব্দটি তারই পরিচয় চিহ্ন। এটা এমন এক বাস্তবতা, যে সম্পর্কে দুনিয়ার সব জাতিই অবগত। যখন ‘ইসলাম’ শব্দের উল্লেখ করা হয়, তখন এই শিরোনাম থেকে সেই দীনেরই পরিচয় ফুটে উঠে যার স্থিতি কিতাব ও সুন্নাতে রাসূলের আনুগত্যের উপর নির্ভরশীল। এর প্রবেশদ্বার হচ্ছে কলেমায়ে তাওহীদ। যার ইচ্ছা সে-ই এই দরজা দিয়ে ইসলামে প্রবেশ করতে পারে। তবে শর্ত হচ্ছে তাকে ইসলাম আরোপিত যাবতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করতে হবে।

তবে ‘ঈমান’ শব্দটির ব্যাপার সম্পূর্ণ ভিন্নতর। সাধারণ ব্যবহার এবং বিশ্বব্যাপক পরিচিতির দিক থেকে শব্দটির মধ্যে যথেষ্ট প্রশস্ততা হয়েছে। ইহুদীবাদী, খৃষ্টবাদ, পৌত্তলিকতা, সমাজতন্ত্র এবং আরো যত ধর্ম েও মতবাদ রয়েছে সর্বত্রই এ শব্দটির ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু এই ব্যাপক পরিচিতির কারণে শব্দটির ইসলামী বৈশিষ্ট্য এবং শরীআতসম্মত অর্থের গুরুত্বের উপর কোন খারাপ প্রভাব পড়ে না। কেননা ইসলামে ‘ঈমান’ শব্দটির যে ব্যাপক অর্থ রয়েছে, এর সাথে যে সংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে এবং এর যে দাবি রয়েছে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের কাছে কোন ঈমান বিশুদ্ধ হতে পারে না –যতক্ষণ তা ইসলামের সমার্থবোধক না হবে বা এর আবশ্যকীয় উপাদান না হবে।

অবশ্য এই সাধারণ পরিচিতির ফলে একটি বিষয়ে অধিকতর শক্তিশালী হয়ে আমাদের সামনে আসে। তা হচ্ছে ইসলামে এমন কোন মতবাদ বা দর্শন গ্রহণযোগ্য নয় –যা ফরয ও ওয়াজিব পর্যায়ের দায়িত্বসমূহ পালনের অমনোযোগিতা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ভাবধারার জন্ম দেয়। এজন্যই কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহর সামনে মাথা নত না করে এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ না করে, তাহলে আমরা তাকে ধর্মদ্রোহী, ইসলামের শত্রু এবং ঈমান বিনষ্টকারী বরে চিহ্নিত করে থাকি। সে ঈমান মারেফাতের যত বড় দাবিদারই হোক না কেন।

ইবলীস শয়তাদের কি এ ব্যাপারে কোন সংশয় ছিল যে, আল্লাহ এক এবং তাঁর কোন শরীক নেই? তার কি এই বিশ্বাস ছিল না যে, কিয়ামতের দিন তাকে আল্লাহর দরবারে হাযির হতে হবে? কিন্তু সে যখন নাফরমানী করল, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার প্রতি সিজদার হুকুম হল, কিন্তু সে অমান্য করল। ফলে সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলার একত্বে বিশ্বাস তার কোন কাজে এল না। কেননা আল্লাহর কাছে আনুগত্য ও ইবাদত-শূন্য জ্ঞানের কোন মূল্য নেই। বিদ্রোহাত্মক মনোভাব সহকারে এরূপ নাফরমানী ঈমানদার ব্যক্তিকেও ঈমানের আওতা থেকে বহিস্কার করে দেয়।

হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মধ্যে এই বাস্তব সত্যের অনুভূতিই জাগ্রত ছিল। তাই তিনি ধর্মত্যাগী মুরতাদ সম্প্রদায় এবং যাকাত অস্বীকারকারী সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য করেননি। অথচ তারা নিজেদের ঈমানদার বলে দাবি করত। তাদের কাছে যাকাত চাওয়া হল। কিন্তু তারা তা দিতে অস্বীকার করল এবং অস্ত্র ধারণ করল। তারা যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়ে গেল, কিন্তু যাকাত দিতে প্রস্তুত হল না। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম খলিফা তাদের মস্তক ছিন্ন করে তাদেরকে অহংকারী ও বিদ্রোহী শয়তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্য সেনাবাহিনী পাঠালেন। এ ধরনের যাবতীয় ঘটনার ক্ষেত্রে এই একই হুকুম প্রযোজ্য।

যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি জানায়, তাঁর নির্দেশকে উপহাস করে, তিনি যেসব কাজ নিষিদ্ধ করেছেন তাতে লিপ্ত হয় এবং এতে গৌরব বোধ করে –তাহলে ইসলামের সাথে তার কি সম্পর্ক থাকল? এরূপ দৃষ্টিভঙ্গিকে ইসলাম বলার অর্থ হচ্ছে –নির্বুদ্ধিতাকে আভিজাত্য, উন্মাদনাকে প্রজ্ঞা, মিথ্যাকে সত্য এবং ছালার চটকে কিংখাব বলে প্রচার করা।

কোন কোন ফিকহবিদ অসাবধানতাবশতঃ লিখে দিয়েছেন যে, নামায ত্যাগকারীকে শাস্তিস্বরূপ হত্যা করা যেতে পারে, তাকে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) বলা যাবে না। এটা সঠিক কথা নয়। যে ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডকে গ্রহণ করে নেয় অথচ নামায পড়াকে গ্রহণ করে না, দীনের সাথে তার কি সম্পর্ক থাকতে পারে? দীনের সাথে যখন তার কোন সম্পর্ক নেই তখন তাকে মুসলমান বলার কি অর্থ আছে?

এখন আমলের সাথে ঈমানের সম্পর্ক কি? কুরআন ও হাদীস থেকে এ সম্পর্কে কি জানতে পারি? এর বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে।

আল্লাহর পরিচয় লাভ, আল্লাহ-ভীতি, শরীআতের আনুগত্য, আখিরাতের প্রস্তুতি, জবাবদিহির ভয় –এ হচ্ছে দীন ও শরীআদের প্রাণশক্তি। নিঃসন্দেহে দীনের শিক্ষার মধ্যে নৈতিক নীতিমালাও রয়েছে এবং সামাজিক আইন-কানুনও রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনের সাথেও এর সম্পর্ক রয়েছে এবং সামাজিক জীবনের সাথেও। জীবনের এমন কোন দিক ও বিভাগ নেই যেখানে এই নীতিমালা ও আইন-কানুন পরিব্যাপ্ত নয়।

ইসলামের যাবতীয় শিক্ষা যেমন একটি ইমারত এবং আকীদা-বিশ্বাস হচ্ছে এর স্তম্ভ। অথবা এগুলো হচ্ছে বাস্তব কর্ম –যার উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। এখন স্তম্ভ যদি ধ্বসে যায়, অথবা উদ্দেশ্য যদি দৃষ্টির অন্তরালে বিলীন হয়ে যায় তাহলে যাবতীয় নৈতিক বিধি-বিধান এবং সামাজিক ব্যবস্থা স্ব স্ব মূল্য ও মর্যাদা হারিয়ে বসবে। তা অন্য একটি বস্তুতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে এবং যার অবস্থা হবে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। যেমন কাগজীমুদ্রা স্বর্ণমুদ্রা হারিয়ে ফেললে তার বিনিময় মূল্য নিঃশেষ হয়ে যায়।

নিজের মধ্যে আল্লাহর অস্তিত্বের অনুভূতি জাগ্রত করা, বান্দার ওপর তাঁর নিরংকুশ কর্তৃত্ব এবং জীবনযাপনের জন্য আইন প্রণয়নে তাঁর একচ্ছত্র অধিকার এবং তাঁর নির্ধারিত বিধি-নিষেধের সীমাকে স্বীকার করে নেওয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে ধার্মিকতার প্রাণশক্তি। অতএব এই অনুভূতি এবং স্বীকৃতির দাবি এই যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের যেসব কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন আমরা তাই করব। তা কেবল এই উদ্দেশ্যে নয় যে, এর মধ্যে কল্যাণ নিহিত রয়েছে। বরং এ কারণেই যে, আল্লাহর অনুগত হওয়ার অবশ্যম্ভাবী দাবি তাই। এটাই হচ্ছে তাঁর অধিকার আদায়ের পন্থা। অবশ্য এর মধ্যে আমাদের জন্য কল্যাণের একটি দিকও রয়েছে।

একজন জড়বাদী বা নাস্তিকও তাঁর আচার-ব্যবহার এবং কার্যকলাপে সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার প্রতি দৃষ্টি রাখতে পারে। কিন্তু তার সত্য বলাটা ইবাদতের মধ্যে গণ্য হয় না। কেননা সে তার স্রষ্টার পরিচয় লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। অতএব সে তাঁর কাছে কোন সওয়াব বা প্রতিদান পাওয়ারও আশা রাখে না। কিন্তু মুমিন ব্যক্তি যখন সত্য কথা বলে তখন তার লক্ষ্য থাকে তার প্রতিপালক তাকে সত্য কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন।

(আরবী************************************************************************************)

তোমরা যারা ঈমান এনেছ –আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হয়ে যাও।–সূরা তাওবাঃ ১১৯

অতএব তার সত্যবাদিতার আসল কারণ এই যে, সে আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছে এবং এই ঈমান তাকে সত্যবাদিতার উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয়, যাবতীয় নেক আমল –তা ব্যক্তিগত পর্যায়ের হোক অথবা সমষ্টিগত পর্যায়ের –যখন তা ইসলামী শিক্ষার অঙ্গে পরিণত হয় বা মুমিন ব্যক্তির আচরণের অংশে পরিণত হয়, তখন তা জীবনের রঙ্গমঞ্চে প্রতীয়মান হয়ে উঠে। তার মধ্যে ঈমান ও প্রত্যয়ের গভীরতা সৃষ্টি হয় এবং তার জীবন আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হয়ে উঠে। আল্লাহর ওপর ঈমান যাবথীয় কাজে উৎসাহ যোগায় এবং আল্লাহ ভীতি হচ্ছে এর প্রাণ যা কখনো তা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না।

এখানে আমি মানব মস্তিষ্কপ্রসূত কতগুলো ব্যবস্থাপনার প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যেগুলো কতগুলো রসম-রেওয়াজ ও রীতি-নীতির উপর লোকদের একত্র করে, যার ফলাফল কখনো ভাল হয় আবার কখনো খারাপ হয়। অতঃপর লোকরো এই রসম-রেওয়াজ মেনে চলাকে কল্যাণ ও সৌভাগ্যের চাবিকাঠি মনে করতে থাকে। অথচ ঈমানের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। বরং তা মানুষের মধ্যে এমন প্রবণতা সৃষ্টি করে যার ফরে ভুলেও তার মনে আল্লাহর কথা জাগ্রত হয় না।

এই দলের লোকেরা ধর্মকে দুটি অংশে বিভক্ত করে ফেলেছে। আকীদা বিশ্বাস ও ইবাদতের বিষয়গুলো তার পশ্চাতে নিক্ষেপ করেছে। এর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। বাস্তব কর্মপন্থা এবং সামাজিক নীতিমালার উপর তারা যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করে, তার অনুশীলন করে এবং এর মূল্য ও মর্যাদা সম্পর্কে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে থাকে।

আমাদের জানা আছে যে, আল্লাহ তাআলা যেসব কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন –এর প্রতিটি কাজ করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং তাঁর অধিকার আদায় করা। কিন্তু যদি এসব কাজ করা হয় এবং এর লক্ষ্য যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন না হয়, তাহলে এসব কাজের কোন মূল্য নেই।

 পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে তা যতই কল্যাণকর হোক না কেন এং সাময়িকভাবে তার অবদান যত বড়ই হোক না কেন।

একটি ঈমানদার জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘ঈমান’ কখনো দ্বিতীয় স্তরের জিনিস হতে পারে না। আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান আমাদের প্রাণ ও খাদ্যে পরিণত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর প্রশংসায় চর্চা হবে, এটা আমাদের সমাজের আবেগময় শ্লোগানে পরিণত হবে এবং আমাদের জীবন-পাতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

একদল লোক আখিরাত ও বেহেশত-দোযখের কথা শুনে হাসে। তারা মনে করে এগুলো প্রাচীনকালের রূপকথা ছাড়া আর কিছুই নয়। এসব কাহিনীর দিন ফুরিয়ে গেছে, ওয়াজেব মাহফিলেই এসব কথা বিকাতে পারে। বাস্তবিকপক্ষে যেদিন আখিরাতের প্রসঙ্গ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করাটা সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়ে পড়বে এবং আখিরাতের কথাকে অর্থহীন মনে করা হবে, সেদিন ধর্ম বলতে কোন জিনিসের আর অস্তিত্ব থাকবে না।

এ কথা মুসলমানদের ভাল করে বুঝে নেওয়া উচিত। তাদের এ কথা ভাল করে বুঝে নেওয়া দরকার যে, পরকাল এবং পুরস্কার ও শাস্তির ব্যাপারটি হাসি-ঠাট্টার জিনিস নয়। আল্লাহ এবং আখিরাতের ব্যাপারে বেপরোয়া হয়ে জীবনযাপন করা মূলক সঠিক পথ পরিত্যাগ করা এবং মরীচিকার পেছনে ধাবিত হওয়ারই নামান্তর।

আমাদের মুসলমানদের কর্তব্য হচ্ছে আমাদের যাবতীয় কার্যক্রম ঈমানকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হবে এবং যে বস্তুবাদী সভ্যতা পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যকে গ্রাস করে ফেলেছে আমদেরকেও তার স্রোতে ভেসে যাওয়া চলবে না। এই সভ্যতা আল্লাহর প্রতি বিমুখ এবং ওহীর আলো থেকে বঞ্চিত। তা নিজের কুপ্রবৃত্তির পূজারী এবং ধর্মের প্রতি বিরাগী।

মৌলিক দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলমানদের ধারণা এই যে, আকীদা বিশ্বাস, ইবাদত ও নৈতিকতার সমষ্টিই হচ্ছে দীন। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক হচ্ছে, যাবতীয় নির্দেশের প্রাণ। আল্লাহর সাথে সম্পর্কটা যদি নির্ভেজাল হয়, তাহলে এটা মুক্তির উপায়ে পরিণত হবে। যদিও অন্যান্য দায়িত্ব হুবহু পালন করা সম্ভব নাও হয়।

এখানে কিছুক্ষণ থেমে আমরা এই বক্তব্যের মূল্যায়ন করতে চাই। মূল্যায়নের সময় আমরা মূল ঈমানের সাথে বাড়াবাড়িও করব না এবং ঈমানের অবশ্যম্ভাবী ফল –আমলের সাথেও বাড়াবাড়ি করব না। আমাদের পূর্বকালের বিশেষজ্ঞ আলেমগণ ঠিকই করেছেন। তাঁরা কাফিরদের প্রতিটি ভাল কাজকে মূল্যহীন বলেছেন। তাঁরা পরিস্কার বলে দিয়েছেন, নেকীর পাল্লায় তাওহীদ বা একত্ববাদের কলেমাই ভারী ও মূল্যবান।

তাদের দৃষ্টিকোণ ছিল সম্পূর্ণ স্বচ্ছ। আজো আমরা দেখতে পাই, যে ব্যক্তি আত্মসাতের অপরাধে অপরাধী তার এই অপরাধ তার অতীতের যাবতীয় অবদানকে ম্লান করে দেয়। যদি কখনো বলা হয় যে, অমুক ব্যক্তি জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সে দেশকে শত্রুদের হাতে বিক্রি করে দিয়েছে তাহলে তার ক্ষেত্রে ক্রোধ, ঘৃণা ও অবজ্ঞা ছাড়া আর কিছু নজরে আসবে কি? তার সম্পর্কে সকলের রায় কি এই হবে না যে, তাকে কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তি দেয়া হোক এবং তা দ্রুত কার্যকর করা হোক?

যদি বলা হয় যে, এই বেচারা তার মায়ের খুবই অনুগত ছিল, কর্মচারীদের প্রতি দয়াপরবশ ছিল, বন্ধুদের জন্য বসন্তের বাগান ছিল, তাহলে তার এই সৌন্দর্যমণ্ডিত গুণাবলীর প্রতি কি কোন গুরুত্ব দেওয়া হবে? যদি কেউ তার পক্ষে এ ধরনের সুপারিশ করতে আসে, তাহলে কি তার মুখ সুঁই দিয়ে সেলাই করে দেয়া হবে না? এসব গুণ তাকে মৃত্যু থেকে রক্ষা করতে পারবে না।

বাস্তবিকপক্ষে আমাদের পূর্ববর্তীগণ কাফিরদেরকে সেই দৃষ্টিতেই দেখেছেন, যে দৃষ্টিতে আজকের যুগে কোন দেশ বা জাতির বিশ্বাসঘাতককে দেখা হয়। তারা তার অতীতের কোন ভাল কাজের স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত হবে না। আমাদের দৃষ্টিতেও কাফিরদের কাজ ঘৃণা ও অবজ্ঞা পাবারই উপযুক্ত।

আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকারকারী, তাঁর দেওয়া নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী এবং আখিরাত ও জবাবদিহিকে মিথ্যা সাব্যস্তকারী নিঃসন্দেহে চরম বিশ্বাসঘাতক। এখন সে যাই করুক তার কোন মূল্য নেই। মহান আল্লাহ বলেনঃ

(আবরী*************************************************************************************)

আল্লাহ যাকে অপদস্ত করবেন তাকে কেউ সম্মানিত করতে পারে না।–সূরা হজ্জঃ ১৮

নিঃসন্দেহে এটা একটা বাস্তব সত্য। কিন্তু এখান থেকে একটা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে গেছে। তা ঈমান ও ঈমানদার সম্প্রদায়ের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করছে। সাধারণ মুসলমানরা মনে করে নিয়েছে যে, আল্লাহর সাথে যদি উত্তম সম্পর্ক থাকে তাহলে অবশিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যদি কিছুটা ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে যায় তাতে দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। তাদের চিন্তার পরিধি বৃদ্ধি পেতে পেতে এই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, এসব ফরয ছুটে গেলেও মূল ঈমানের দ্বারাই পার পাওয়া যাবে।

একদিকে তো অবস্থা বিরাজ করছে, অপরদিকে যেসব লোক ঈমানের পথ থেকে বিচ্যুত এবং স্রষ্টার সাথে যাদের কোন সম্পর্ক ছিল না তারা কতগুলো মানবিক বিষয়ে নিজেদের যোগ্যতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক দূর অগ্রসর হয়ে গেছে। যখন পৃথিবীর বুকে এ দুটি চিত্র প্রতীয়মান হয়ে গেল তখন এই দীনের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেল, মুদিনদের বৈশিষ্ট্য দুর্বল হয়ে পড়ল এবং গোটা পৃথিবীকে বিপর্যয়ের অন্ধকার গ্রাস করে ফেলল। প্রতিভাবান ও বিচক্ষণ লোকদের বুদ্ধিমত্তা ও অন্তর্দিষ্টি সহকারে এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় এগিয়ে আসা উচিত।

আমাদের ঈমানদারদের কর্তব্য হচ্ছে, প্রথমে নিজেদের সংশোধন করা, অতঃপর অন্যদের চিন্তা ও কর্মে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা। নিঃসন্দেহে ঈমান এই দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় নেকী এবং সর্বাধিক কল্যাণকর জিনিস। এটা অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। যেখানে ঈমান আছে সেখানে সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি রয়েছে, আর যেখানে ঈমান নেই সেখানে অন্ধকার আর অন্ধকার।

সৌন্দর্যমণ্ডিত ঈমানের বিভিন্ন দিক ও বিভাগ রয়েছে। তার মধ্যে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের পূর্ণ ভাবধারা বিরাজ করবে, নিজের নফসের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে, মানুষের সাথে ইনসাফপূর্ণ ও হৃদ্যতাপূর্ণ ব্যবহার করবে।

অতঃপর মুমিনরাই হবে এই দুনিয়ার শাসক, পরিচালক এবং সর্বময় কর্তা। এটা সেই ঈমান যা পুরস্কার, সম্মান ও শুভ পরিণতির অধিকারী হয়। এই সেই ঈমান যা সব সময় বিজয়ী হয়ে থাকে। যেকোন ময়দানেই হোক নাস্তিকতা ও ধর্মদ্রোহীতা তার উপর জয়যুক্ত হতে পারে না, তার সামনে টিকেও পারে না।

ঈমানকে অবনত করার জিনিস এই যে, আল্লাহর সাথে বান্দার একটা কৃত্রিম সম্পর্ক থাকবে, যা তাকে পূর্ণতার শিখরে আরোহণ করতেও উৎসাহিত করবে না, আর তাকে পতন থেকেও বাঁবাচে না। সে কতিপয় ফরয ইবাদতের বাহ্যিক রূপকেই যথেষ্ট মনে করে বসে থাকবে এবং তা তার ভেতরে ও বাইরে কোন আকর্ষণীয় ও সজীব আখলাক-চরিত্র সৃষ্টি করবে না। এই ধরনের বাহ্যিক ঈমান কখনো উন্নতি লাভ করতে পারে না। তা কোন প্রতিযোগিতার ময়দানে বিজয়ী হতে পারে না। যদিও আজ সর্বত্র এই পর্যায়ের ঈমানের ছবিই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। নাস্তিক্যবাদ যদি কখনো মাথা তোলে, অথবা এর প্রতারণা ও কুমন্ত্রণা কিছুটা সাফল্য লাভ করে, তাহলে এরূপ ক্ষেত্রে উল্লিখিত ধরনের ত্রুটিপূর্ণ ঈমানের দ্বারা মোকাবিলা করা কি সম্ভব? নাস্তিক্যবাদের ঝাণ্ডা এই ধরনের নিকৃষ্ট ও ঈমানদারদের ছাড়া আর কাদের মধ্যে উত্তোলিত হতে পারে?

একথা আমাদের কি করে আনন্দিত করতে পারে যে, এই উম্মাত ধর্মত্যাগী হয়ে জীবনযাপন করুক, তারা এমন একটি দীনের অনুসারী না হোক যা তাদের যাবতীয় বিষয়কে সঠিক খাতে প্রবাহিত করতে পারে এবং তাদেরকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে? যে মতবাদ ধ্বংসাত্মক মনোবৃত্তির জন্ম দেয়, উন্নত মানবীয় বৈশিষ্ট্যগুলো পরাভূত করে দেয়, নীচতার জন্ম দেয়, বিদআত, পথভ্রষ্টতা ও অশ্লীলতার প্রসার ঘটায় এবং মানবীয় যোগ্যতাকে পঙ্গু করে দেয় –মানুষের মাঝে এরূপ একটি মতবাদ বা জীবন দর্শনের প্রভাবশালী হওয়াটা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়।

আমাদেরকে ন্যায়নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যেতে হবে। আমরা যেন ইসলামের বিশেষত্বকে ভুলে না যাই যে, তা মানবজাতিকে যথেষ্ট সম্মান ও মর্যাদা দান করেছে, তা তাদেরকে উন্নত জীবন দান করেছে। এর অর্থ এই নয় যে, তা নির্বোধের মত অনুসরণ করতে হবে। বরং ইসলামের মঞ্চে মানুষ তার যোগ্যতা প্রদর্শন করবে এবং তা থেকে লাভবান হবে।

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ এক আল্লাহর বান্দা। তার কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহকে সঠিকভাবে জেনে নেওয়া এবং তাঁর আনুগত্য করা। মানুষকে এই পৃথিবীর নেতৃপদে আসীন করা হয়েছে। সে এই পৃথিবীর কাছ থেকে সেবা আদায় করতে এবং এর মধ্যে লুকায়িত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উপকৃত হবে। মানুষ পরস্পরের ভাই। প্রতিটি ভাল কাজে তার ভাইয়ের সহযোগিতা করা, তার সাথে ন্যায়নিষ্ঠ ব্যবহার করা এবং তার সাথে সহানুভূতিসুলভ আচরণ করা তার কর্তব্য।

ইসলামের সৌন্দর্য বর্ণনায় শায়খ ইসহাক হুসায়নীর কথা আমার কাছে খুবই পছন্দনীয়। তিনি বলেন, “মানব রচিত ধর্মই হোক অথবা আসমানী ধর্মই হোক” –আমরা যদি এর ইতিহাসের মূল্যায়ন করি তাহলে ইসলামের দুটি বৈশিষ্ট্য আমদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে।

এক. জীবন-দর্শনের ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গী অত্যন্ত ব্যাপক। ইসলাম জীবনকে বিভিন্ন উপাদানে সমষ্টি অথবা বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত ‘একক’ মনে করে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের আত্মিক দিক বস্তুগত দিকের তুলনায় কম গুরত্বপূর্ণ নয়। অনুরূপভাবে ব্যক্তিগত সংশোধন সামাজিক ইবাদতের ভিত্তি, তদ্রূপ কতিপয় নৈতিক মূল্যবোধ পারস্পরিক লেনদেন ও আচার-আচরণের ভিত্তি। জামাআত বা সমষ্টির যেসব অধিকার রয়েছে, ব্যক্তিরও অনুরূপ অধিকার রয়েছে।

যাবতীয় ভাল কাজ বিবেচনাযোগ্য এবং অনুসরণযোগ্য। একের সাহায্য ছাড়া অপরের মধ্যকার ঘাটতি পূরণ হতে পারে না। সংক্ষেপে বলতে গেলে –ইসলাম হচ্ছে দুনিয়া ও আখিরাতের পরিপূর্ণ সাফল্যের পয়গাম। সে এমন একটি উন্নত সমাজ এবং দৃষ্টান্তমূলক সমাজব্যবস্থা কায়েম করতে চায় যা সুখে-দুঃখে একে অপরের শরীক হবে, নেকী ও তাকওয়ার কাজে একে অপরের বাহু হবে এবং যা কল্যাণকর কাজে উৎসাহ যোগাবে এবং ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে বিরত রাখবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী**************************************************************************)

ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার স্ত্রীলোকেরা পরস্পরের সহযোগী। তারা পরস্পরকে ন্যায়ানুগ কাজে উদ্ধুদ্ধ করে এবং অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে।–সূরা তাওবাঃ ১১

দুইঃ ইসলাম গোটা মানবজাতিকে একই পরিববারভুক্ত মনে করে। ইসলামের দাবি হচ্ছে, তারা পরস্পর পরিচিত হবে, একে অপরের সহযোগিতা করবে এবং কেবল তাকওয়া বা আল্লাহভীতিকেই সম্মান, মর্যাদা ও আভিজাত্যের মাপকাঠি গণ্য করবে। অনুরূপভাবে ইসলাম আল্লাহর যাবতীয় পয়গামকে একই দৃষ্টিতে দেখে এবং নবী-রাসূলদেরকে পরস্পরের ভাই মনে করে। সে তাদের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য করে না।

“এ কারণেই ইসলামে পারস্পরিক আদান-প্রদানে রয়েছে ইনসাফ, সততা, ন্যায়নিষ্ঠা এবং দয়া, অনুগ্রহ ও সহানুভূতি। সে যেখানে জ্ঞানে পরিপূর্ণ কথা পায় নিয়ে নেয়, কল্যাণকর জিনিস যেখানেই পায় তার সমাদার করে। এ কারণেই সমগ্র মানবীয় সভ্যতার সুগন্ধি নিজের মধ্যে ধারণ করে নিয়েছে।

কুরআন মজীদে অসংখ্য আয়াত রয়েছে যা উত্তম চরিত্র-নৈতিকতার দিকে আহবান জানায়। তা সামাজিক সৌন্দর্যে সুসজ্জিত হওয়ার এবং সত্য ও ন্যায়নিষ্ঠাকে স্বভাবে পরিণত করে নিতে উৎসাহ দান করে। পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, দরিদ্র ও ইয়াতীমদের সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য বিশেষ জোর দেয়। অভাবগ্রস্তকে খাবার দেওয়া, দুর্বল ও অসুস্থদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন, ক্ষমা ও উদারতা প্রদর্শন এবং সন্ধি ও সমন্বয়কে অগ্রাধিকার দেয়। ধৈর্য, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, দান-খয়রাত এবং নেকী ও তাকওয়াভিত্তিক কাজে সহযোগিতাকে উৎসাহিত করে।

অনুরূপভাবে কুরআন মজীদে এমন অনেক আয়াত রয়েছে যা নৈতিক অবনতি ও নীচ মানসিকতাকে প্রতিরোধ করে। যেমন মুখ থেকে খারাপ কথা বের করা যাবে না, খারাপ ধারণা থেকে বেঁচে থাকতে হবে, মিথ্যা বলা যাবে না, খেয়ানত বা আত্মসাৎ করা চলবে না, জুলুম-নির্যাতন, বাড়াবাড়ি, বিদ্রোহ অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। অন্যায়ভাবে অপরের ধনসম্পদ কুক্ষিগত করা যাবে না, পিতৃহীনের সম্পদ ভোগ করা যাবে না, তাদের দাবিয়ে রাখা এবং তাদের উপর বিভিন্ন পন্থায় নির্যাতন করা যাবে না। ওজন ও পরিমাপে ফাঁকি দেওয়া চলবে না এবং অপব্যয় থেকে দূরে থাকতে হবে। এ বিষয়ে নবী করীম (সঃ)-এর হাদীস এবং সাহাবা ও খোলাফায়ে রাশেদীনের অসংখ্য বাণী রয়েছে। এ সবই কুরআনের মূলনীতি থেকে গ্রহণ করা হয়েছে এবং কুরআনের আয়াতের সমর্থক ও ব্যাখ্য।

উপরোক্ত মূল্যায়ন থেকে পরিস্কার হয়ে যায় যে, ইসলাম যেন এমন একটি আশ্চর্যজনক ঘর যা দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় কল্যাণের কেন্দ্রস্থল। এমন কোন কল্যাণ নেই যা এই কেন্দ্রে বর্তমান নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এমন অনেক জ্ঞানবান ব্যক্তি এবং বক্তা ও লেখক রয়েছেন, যারা এই দৃষ্টিকোণ থেকে দীনকে বুঝাবার চেষ্টা করেন না এবং সমাজকেও এর মাধ্যমে সংশোধন করার চেষ্টা করেন না।

হাঁ, এমন অনেক আলেমও আছে যার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের নামে ইমানের ক্ষতি সাধন করে এবং দীনের সাথে কার্যন বৈরী আচরণ করে। তারা কত বড় অন্যায় করে যখন তারা এই ধারণা বদ্ধমূল করে নেয় যে, দীন হচ্ছে একটি রুমাল বিশেষ, যার দ্বারা গুনাহগার লোকেরা নিজেদের অপরাধ মুছে নেয়, তারা ভুল করতে থাকে আর ঈমান তা দূরীভূত করে দেয়, তারা ইবাদতের ওয়াদা ভঙ্গ করতে থাকে আর ইসলামের দাবি তাদের সংযোগ রক্ষা করতে থাকে। বিগত আসমানী ধর্মের সাথে কোন রকম একটা সম্পর্ক বজায় থাকলেই তা মুক্তির জন্য যথেষ্ট ধর্মের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে তারা যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। কুরআনের ভাষায় তাদের বক্তব্যঃ

(আরবী**********************************************************************************)

তারা বলে, বেহেশতে ইহুদী ও খৃষ্টান ছাড়া আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। এটা তাদের ভিত্তিহীন আশা মাত্র।–সূরা বাকারাঃ ১১১

কুরআন মজীদ এ ধরনের যাবতীয় ধারণা-বিশ্বাসের শিকড় কেটে দেয় এবং মুক্তির সঠিক রাস্তা নির্ধারণ করে দেয়। আর তা হচ্ছে জীবন্ত ঈমান ও ঐকান্তিক আগ্রহ সহকারে নেক কাজ করা এবং আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হওয়া।

(আরবী*******************************************************************************)

তাদের বল, তোমাদের দাবিতে তোমরা সত্যবাদী হলে এর উপযুক্ত প্রমাণ পেশ কর। বরং সত্য  কথা হচ্ছে –যে ব্যক্তি নিজের সত্তাকে আল্লাহর আনুগত্যে সম্পূর্ণরূপে সোপর্দ করে দেবে এবং কার্যত সত্যনিষ্ঠা অবলম্বন করবে তার রবের কাছে তার জন্য প্রতিদান রয়েছে এবং এ ধরনের লোকদের জন্য কোন ভয় ও আশংকার কারণ নেই।–সূরা বাকারাঃ ১১১-১২

এক শ্রেণীর নিম্নমানের বক্তার অবস্থা এই যে, তারা যেকোন একটি রিওয়ায়াত (হাদীস) পেলেই তা নিয়ে উড়তে শুরু করে। প্রতিটি রিওয়ায়াতের একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র এবং একটি নির্দিষ্ট পটভূমি রয়েছে। কিন্তু তারা এটা বুঝতে চেষ্টা করে না এবং স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে সবখানেই তা ব্যবহার করতে থাকে। তারা এজন্য কিতাব ও সুন্নাতের গোটা ভাণ্ডারকে উপেক্ষা করে এবং ঈমানের মেজাজকেও বিবেচনা করে না। আর ঈমানের মেজাজ হচ্ছে মৃতের মধ্যে জীবন সঞ্চার করা এবং বিচ্ছিন্নতাকে শৃঙ্খলাপূর্ণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন করে দেওয়া। দৃষ্টান্তস্বরূপ ‘হাদীসে বিতাকা’ উল্লেখ করা যেতে পারে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমার সূত্রে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

(আরবী*****************************************************************************************)

কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা আমার উম্মাতের মধ্য থেকে এক ব্যক্তিকে সৃষ্টিকুলের সামনে নিয়ে আসবেন। অতঃপর তার গুনাহের নিরানব্বইটি দফতর তার সামনে খুলে ধরা হবে। চোখের দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রতিটি দফতর গুনাহে পরিপূর্ণ থাকবে। অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কি এর কোন একটি অপরাধ অস্বীকার করতে পার? অথবা আমার এই নথিপত্র সংরক্ষণকারীরা কি তোমার ওপর জুলুম করেছে? সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! এর কোনটিই নয়। আল্লাহ তাআলা পুনরায় জিজ্ঞেস করবেন, তোমার কি কোন ওজর আছে? সে বলবে, হে প্রভু! আমার কোন ওজর নেই। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, হাঁ, আমার কাছে তোমার কিছু নেক কাও রয়েছে। আর তোমার ওপর কোনরূপ জুলুম করা হবে না। অতঃপর এক টুকরা কাগজ বের হবে। তাতে লেখা থাকবেঃ ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ তাঁর বান্দাহ ও রসূল’। অতঃপর তিনি বলবেন, তোমাদের যাবতীয় কাজ ওজন করাতে যাও। সে তখন বলবে, হে প্রভু! এই নথিপত্রের সাথে এই কাগজের টুকরাটি কিসের? তিনি বলবেন, তোমার ওপর অবিচার করা হবে না। নবী করীম (সঃ) বলেন, অতঃপর নিরানব্বইটি দফতর এক পাল্লায় এবং কাগজের টুকরাটি অপর পাল্লায় রাখা হবে। কিন্তু পাপের বিরাট দফতর হালকা হয়ে যাবে এবং কাগজের টুকরাটি ভারী হয়ে যাবে। কোন কিছুই আল্লাহ তাআলার নামের সমকক্ষ হতে পারে না। -তিরমিযী, (৪১) আবওয়াবুল ঈমান, (১৭) বাব মা জাআ ফী মান ইয়ামূতু ওযা হুওয়া ইয়াশহাদু আন-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, নং ২৬৩৯; ইবন মাজাহ, যুহুদ অধ্যায় এবং মুসনাদে আহমাদ, ২য় খণ্ড।

হাদীসের তাৎপর্য সম্পূর্ণ পরিস্কার। যদি এ হাদীসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা হয়, তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার ওপর আরোপিত যাবতীয় দায়দায়িত্ব অকেজো হয়ে যায় এবং আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণীর কোন অর্থ থাকে নাঃ

(আরবী************************************************************************************)

ফাসাদকারী লোকদের কাজকে আল্লাহ তাআলা শুদ্ধ হতে দেন না। আল্লাহ তাঁর ফরমান দ্বারা সত্যকে সত্য হিসেবে প্রতিভাত করে দেখান, অপরাধী লোকদের পক্ষে তা যতই দুঃসহ হোক না কেন।–সূরা ইউনুসঃ ৮১, ৮২

এ হাদীসের সনদ যদি সহীহ হয় তাহলে আমাদের মতে এ হাদীস এমন মুশরিক ব্যক্তির প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, যে তার গোটা জীবনটাই পাপ কাজে শেষ করেছে। অতঃপর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ইসলাম গ্রহণ করেছে। কিন্তু পূর্বজীবনের অপরাধসমূহের প্রতিবিধান করার মত সময় পায়নি এবং ইতিমধ্যে তার জীবন প্রদীপ নিভে গেছে। অনন্তর এ হাদীস বলে দিচ্ছে যে, ঈমানের সাথে শেষ পরিণতির কতটা গুরুত্ব রয়েছে এবং আল্লাহর কাছে একত্ববাদের কি মর্যাদা রয়েছে।

এ ধরনের যাবতীয় হাদীস না বুঝে-শুনে সরলভাবে বর্ণণা করে বেড়ানো গোটা দীনকে ধ্বংস করে দেওয়ার সমার্থবোধক। এই জিনিসটি আজ ধর্মভীরুদের মধ্যে এমন লোকের সৃষ্টি করে দিয়েছে যারা ঈমানের ক্ষতি সাধন করেছে এবং এর মূল্য ও মর্যাদাকে হেয় করেছে।

আজ পৃথিবী এমন ঈমানের মুখাপেক্ষী যা তাকে বিশ্বপ্রভুর সামনে নিযে ঝুঁকিয়ে দেবে, তার প্রভুর বিশ্বাসভাজন ও অনুগত বানিয়ে দেবে এবং সংগ্রামের পথে পরিচালিত করবে। অন্যথায় লক্ষণ খুব ভাল দেখা যাচ্ছে না, বিপদের ঘনঘটা আকাশকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে।

ঈমান ও আমল (কাজ)

আচার-আচরণের সাথে নৈতিকতার যেরূপ সম্পর্ক রয়েছে আমলের সাথে ঈমানেরও অনুরূপ সম্পর্ক রয়েছে। কোন ব্যক্তি যখন মহামহিম আল্লাহর ওপর ঈমান আনে, আখিরাতের ওপর প্রত্যয় সৃষ্টি হয় এবং নবী-রাসূলগণের আনীত শিক্ষাকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করে নেয় তখন এসব জিনিস অবশ্যম্ভাবীরূপে তার মধ্যে গতি এবং কাজের প্রাণশক্তি ফুঁকে দেয়, তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান এবং তা লাভ করার জন্য গতিশীল করে তোলে এবং তার পদযুগল আল্লাহর পথে দৃঢ়ভাবে জমিয়ে দেয়। ঠিক সেভাবে যেভাবে একজন বীর সৈনিক ভীতিকর পরিস্থিতিতে নিজের বীরত্ব প্রদর্শন করে থাকে, অথবা একজন দানবীর ব্যয়ের ক্ষেত্রে নিজের দানশীলতার পরাকাষ্ঠা দেখায়, অথবা একজন সত্যবাদী লোক কথা বলার সময় যেভাবে ন্যায়নিষ্ঠা ও সত্যবাদিতার ওপর অবিচল থাকে।

এটা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার, বরং অসম্ভব ব্যাপার যে, কোন ব্যক্তি তার দীনকে এই স্তর থেকেও নিচে নামিয়ে দিতে পারে অথবা কিতাব ও সুন্নাতের এমন অর্থ বের করবে যা তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কিন্তু ইসলামের শত্রুদের অকল্যাণ হোক। যুদ্ধাস্ত্রের সাহায্যে উদ্দেশ্য হাসিল করতে ব্যর্থ হয়ে তারা চালবাজি ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছ, হিংস্র ছোবল বিস্তার করে যে কাজ উদ্ধার করতে পারেনি, মিশ্রির ছুরি দিয়ে তা উদ্ধার করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে তারা পরাজিত হয়েছে বটে, কিন্তু ইসলামকে তার নিজের ঘরে ধরাশায়ী করে রেখে গেছে।

তারা মুসলমানদের মধ্যে এমন লোক রেখে গেছে যারা আস্তিনেরসাপ হয়ে তাদের দংশন করছে। এরা তাদের সামনে ইসরামের চিত্রকে এমন ভঙ্গীতে পেশ করছে যে, তা কেবল একটি সহজ-সরল কলেমা যার কোন পৃষ্ঠপোষক নেই। এটা নযর-নিয়াযের এক জগত, এখানে জিহাদ ও কর্মচাঞ্চল্যের কোন প্রয়োজন নেই।

এই ভ্রান্ত ও নিরোপদ্রব দর্শনের ফল এই হল যে, বছরের পর বছর ধরে মুসলমান, ইহুদী ও কিবতীরা পাশাপাশি বসবাস করে আসছে এবং মেলামেশা করছে, কিন্তুতুমি কোনএকটি দিক থেকে তাদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে না (কে মুসলমান আর কে অমুসলমান)। তাদের কেউ মসজিদেও যায় না, কোন ফরযও আদায় করে না এবং আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি সম্মানও প্রদর্শন করে না। তাদের মধ্যে যদি কিছু পার্থক্য থেকে থাকে তাহলে এতটুকুই যে, ইহুদীরা শনিবারকে পবিত্র মনে করে এবং খৃষ্টানরা রবিবারে চার্চে যায়। আর নামসর্বস্ব মুসলমাদের ইসলামের সাথে ব্যস এতটুকুই সম্পর্ক আছে যে, তাদের ব্যর্থ সার্টিফিকেটে কারো নাম আবদুল্লাহ এবং কারে নাম আবদুর রহমান।

পরিতাপের বিষয় কোন মুসলিম আলেমই এই ব্যাপারটির প্রতি কোন গুরুত্বই দেন না। মানুষ যদি না বুঝে-শুনে কলেমা তৌহীদ পড়ে নেয় তাহলে তার একটি আশ্রয়স্থলের ব্যবস্থা হয়ে যায় এবং এখন সে সহজেই যেকোন ফরয পরিত্যাগ করতে পারে অথবা যেকোন হারাম কাজে লিপ্ত হতে পারে। এরা ধারণা করে নিয়েছে যে, ধর্ম এটাই শিখায়। তারা যা করছে তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

যেমন কোন সাধারণ্যে আত্মপ্রকাশ করল এবং তারা দলের গঠনতন্ত্র এবং উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য জনগণের সামনে পেশ করল। তাদের দলীয় গঠনতন্ত্রে এমন অনেক ধারা রয়েছে যার মাধ্যমে দলের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য এবং কর্মপন্থার পরিস্কার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এর মধ্যে যদি এমন একটি ধারাও থাকে যে, দলের যেকোন সদস্য ইচ্ছা করলে সংগঠনের মূলনীতি মানতেও  পারে বা নাও মানতে পারে, এর নির্দেশাবলীর আনুগত্য  করতেও পারে আবার নাও করতে পারে –তাহলে সব লোকই বলবে, এত পরিস্কার হাসিঠাট্টা ও উপহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। তাহলে আমরা ইসলাম সম্পর্কে কি করে ধারণা করতে পারি যে, তা নিজের আস্তিনে এমন কুঠার রাখে যা তার বুনিয়াদকে ধূলিসাৎ করে দেয়?

আমরা ইসলামের নির্দেশাবলীর মধ্যে এমন নির্দেশ কি করে খুঁজতে পারি যে তার সাথে তামাশা করার এবং বিপথগামী হওয়ার অনুমতি দিতে পারে? আমরা কি করে এরূপ দাবি করতে পারি যে, একনিষ্ঠ আমল একটি সৌন্দর্য বা বাহ্যিক রং বিশেষ, তার মধ্যে যদি কোন ত্রুটি হয়ে যায় তাহলে এতে কিছু অসুবিধা নেই? এটা সেসব নির্বোধ লোকেরই ধারণা যারা দীনকে হাসি-ঠাট্টার বস্তু বানিয়ে রেখেছে এবং যারা পার্থিব জীবনের ধোঁকায় নিমজ্জিত হয়ে আছে।

কুরআন মজীদের বাণীঃ

(আরবী*********************************************************************)

তারা নিজেদের দীনকে খেল-তামাশার বস্তুতে পরিণত করেছে, আর দুনিয়ার জীবন তাদেরকে প্রতারণার গোলক-ধাঁধায় নিমজ্জিত করে রেখেছে। -সূরা আরাফঃ ৫১

আল্লাহর নির্ধারিত সীমার সংরক্ষণ এবং ফরযসমূহ আদায়ের ক্ষেত্রে যে অনীহা চলছে তার শাস্তি কি তাদের ভোগ করতে হবে না? মুসলমানরা যখন তাদের দীন সম্পর্কে এরূপ ত্রুটিপূর্ণ ধারণায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ল তখন তাদের ওপর কত বিপদ এসেছে, কিয়ামতের ঘনঘটা তাদেরকে বেষ্টন করে ফেলেছে। যে জাতি আমলকে একটি ‘সওয়াবের কাজ মাত্র’ মনে করে তাদের দীন কি করে নিরাপদ থাকতে পারে? তারা দুনিয়াতে কি করে অবিচল থাকতে পারে? আল্লাহ তাআলা তো আমলকে জীবনের পয়গাম, মানব জীবনের দৈনন্দিন বৃত্তি এবং কল্যাণকর কাজে অগ্রগামিতাকে সৃষ্টির নিগূঢ় তন্তু ও হিসাব-নিকাশকে বুনিয়াদ ঘোষণা করেছেন। মহান আল্লাহর বাণীঃ

(আরবী**************************************************************************************)

তিনিই মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমাদের পরখ করতে পারেন যে, তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? তিনি সর্বশক্তিমান এবং ক্ষমাশীল।–সূরা মুলুকঃ ২

আল্লাহর কিতাবে এমন  কোন আয়াত নেই, যাতে কেবল ঈমানেরই উল্লেখ আছে। বরং প্রতিটি স্থানে ঈমানের সাথে নেক আমল অথবা তাকওয়া অথবা ইসলামেরও উল্লেখ আছে। এভাবে ঈমানের সাথে আমলের এতটা মজবুত সম্পর্ক রয়েছে যে, তার মধ্যে শিথিলতার কোন প্রশ্নই আসে না। যদি হিদায়াত ও গোমরাহীর মধ্যে তুলনা করা হয় তাহলে ঈমান ও আমলকে এক দাঁড়িতে রাখা হবে এবং কুফরকে অপর দাঁড়িতে রাখা হবে।

(আরবী**************************************************************************************)

আর অন্ধ ও চক্ষুস্মন ব্যক্তি কখনো সমান হতে পারে না এবং ঈমানদার নেককার লোক ও দুষ্কৃতিকারীও কখনো সমান হতে পারে না। -সূরা মুমিনঃ ৫৮

বহু জায়গায় ইসলাম ও তার পরিপূর্ণ তাৎপর্যের দিকে যতগুলো নির্দিষ্ট কাজের মাধ্যমে ইশারা করা হয়েছে। যেমনঃ

(আরবী*************************************************************************************)

সে ব্যক্তি দুর্গম পথ অতিক্রম করতে সাহস করেনি। তুমি কি জান সেই দুর্গম ঘাঁটি পথ কি? কোন গলা দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা। অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে কোন নিকটবর্তী ইয়াতীম বা ধূলিমলিন মিসকিনকে খাবার দান করা। -সূরা বালাদঃ ১১-১৬

বরং কুরআন মজীদে কোন কোন নেক আমলের প্রতি অমনোযোগীতাকে আত্মিক বিশ্বাসে শূন্যতা ও ঈমানশূন্য অন্তরের নিদর্শন বলে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন সূরা মাউনে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************************************************************************)

তুমি কি দেখেছ সেই ব্যক্তিকে, যে আখিরাতের শুভ পরিণতি ও শাস্তিকে অবিশ্বাস করে? এ তো সেই লোক, যে ইয়াতীমকে গলাধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং মিসকীনদের খাবার দান করতে উৎসাহিক করে না।–সূরা মাউনঃ ১-৩

কখনো ঈমানকে একটি গুণবৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হয়, যা আমলের সাথে সংযুক্ত হয়। তা সাধারণ মানবীয় চরিত্রের ওপর ছাপ রাখে এবং তার সংশোধন করে তাকে মহাপ্রভুর সাথে সম্পর্কযুক্ত করে দেয়। এভাবে প্রথমে আমলের উল্লেখ করা হয়। কেননা প্রথমে তারই অস্তিত্ব প্রকাশ পায়। অতঃপর ঈমানের উল্লেখপূর্বক বোঝানো হয় যে, কোন কাজ সঠিক ও গ্রহণযোগ্য হওযার জন্য ঈমান হচ্ছে শর্ত। যেমন নিম্নোক্ত আয়াত থেকে এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়ঃ

(আরবী*****************************************************************************)

অতঃপর যে ব্যক্তি নেক আমল করবে এই অবস্থায় যে, সে মুমিন –তার কাজের কোন অমর্যাদা করা হবে না। আমরা তা লিখে রাখছি।–সূরা আম্বিয়াঃ ৯৪

অতঃপর আখিরাতে এমন কি জিনিস হবে যার ওজন দেওয়া হবে? তা কি এই আমল নয় যা মানুষকে জান্নাত অথবা জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে? নাকি মৌখিক দাবি এবং অলীক ধারণা-বিশ্বাস?

(আরবী**********************************************************************************)

সেই দিন ওজন অনুষ্ঠানের ব্যাপারটি সুনিশ্চিত। যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই কল্যাণ লাভ করবে। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারা নিজেরাই নিজেদেরকে মহা ক্ষতির সম্মুখীন করবে। কেননা তারা আমাদের আয়াতসমূহের সাথে জালিমের ন্যায় আচরণ করেছে।–সূরা আরাফঃ ৮,৯

আমাদের সামনে এমন অনেক জাতির ইতিহাস বর্তমান রয়েছে যারা নিজেদের দুষ্কৃতির কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা লূত আলাইহিস সালামের জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। কেননা তারা অশ্লীলতা, যেনা-ব্যভিচার ও সমকামিতার মত গর্তিত কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। তিনি শুআইব আলাইহিস সালামের জাতিকে এইজন্য ধ্বংস করেছেন যে, তারা ওজন-পরিমাপে ফাঁকি দিত। নেবার বেলায় বেশি নিত, দেবার বেলায় কম দিত। এসব দুষ্কৃতিকারীর যে পরিণতি হয়েছে তা আমাদের সামনেই রয়েছে।

এখন যদি আমাদের এই উম্মাত দুষ্কর্মে লিপ্ত থাকে, তাহলে তাদেরকে কি এর পরিণতি ভোগ করতে হবে না? তাদের জন্য কি মুক্তির কোন বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে? ইসলাম পূর্বের শরীআত থেকে ভিন্নতর কোন নতুন শরীআত নয় যে, তা ঈমানকে বাধ্যতামূলক করে এবং কাজের দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয়। বরং কুরআন মজীদ আমাদের অতীত জাতিসমূহের করুণ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেন আমরা তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করি। অতঃপর আল্লাহর বাণী আমাদের সামনে রয়েছেঃ

(আরবী*************************************************************************************)

হে লোকেরা! তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোকে আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি যখন তারা জুলুমের আচরণ অবলম্বন করেছিল। তাদের কাছে তাদের নবী-রসূলগলণ সুস্পষ্ট নির্দেশসমূহ নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তারা আদৌ ঈমান আনেনি। এভাবেই আমরা পাপীদেরকে তাদের অপরাধের প্রতিফল দিয়ে থাকি। এখন তাদের পরে আমরা তোমাদেরকে পৃথিবীর বুকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছি, যেন আমরা দেখতে পারি তোমরা কি রকম কাজ কর।–সূরা ইউনুসঃ ১৩,১৪

এ যেন আমাদের পরীক্ষা চলছে। আমাদের প্রতিটি গতি ও স্থিতির পর্যবেক্ষণ চলছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের ওপর ঈমান ও আমল উভয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি দেখছেন আমরা এই দায়িত্ব কতটা পালন করছি। আল্লাহ তাআলা গোটা মানব জাতিকে এই বাস্তব সত্য সম্পর্কে অবহিত করে দিয়েছেন। তিনি তাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, নেক কাজ ও আল্লাহ ভীতিই হচ্ছে মুক্তির সোপান, কপটতা ও অবান্তর ধারণা-বিশ্বাস নয়। মহান আল্লাহর বাণীঃ

(আরবী************************************************************************************)

হে আদম সন্তান! তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকে যদি এমন রসূল আসে, যারা তোমাদেরকে আমার আয়াতসমূহ শুনাবে –তখন যে কেউ নাফরমানী থেকে বিরত থাকবে এবং নিজের আচার-আচরণকে সংশোধন করে নেবে, তার জন্য কোন দুঃখ বা ভয়ের কারণ নেই। কিন্তু যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা মনে করবে এবং এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক আচরণ গ্রহণ করবে, তারাই হবে দোযখী। সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে।–সূরা আরাফঃ ৩৫, ৩৬

চিন্তাশীল ব্যক্তিরা যখন সত্যের সন্ধান পেল এবং উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে ঈমান আনার ঘোষণা দিলঃ

(আরবী**********************************************************************************)

হে আমাদের রব! আমরা এক আহবানকারীর ডাক শুনতে পেয়েছি যিনি ঈমানের দিকে আহবান করেন যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ওপর ঈমান আন। অতএব আমরা ঈমান এনেছি।–সূরা আলে ইমরানঃ ১৯২

এবং যখন তারা বিনয়ের সাথে দয়াময় রহমানের কাছে কাতর প্রার্থনা করল যে, তিনি যেন তাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দেনঃ

(আরবী*************************************************************************)

হে আবাদের রব! আমাদের অপরাধগুলো ক্ষমা করে দাও, খারাপ কাজগুলোকে বিলীন করে দাও এবং নেককার লোকদের অন্তর্ভুক্ত করে আমাদের মৃত্যু দান কর।–সূরা আলে-ইমরানঃ ১৯২

এবং যখন তারা এই প্রার্থনা ও আবেগ সহকারে যমীনের বুকে বিজয় ও জাঁকজমক এবং আখিরাতের সাফল্য ও আল্লাহর সন্তোষ কামনা করলঃ

(আরবী**********************************************************************************)

হে আমাদের রব! আপ নআপনার রসূলের মাধ্যমে আমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছেন তা আমাদের দান করুন এবং কিয়ামতের দিন আমাদের অপদস্থ করবেন না-সূরা আলে-ইমরানঃ ১৯৪

তখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ঘোষণ করা হল যে, তাদের দোয়া কবুল হওয়ার শর্ত হচ্ছে কেবল তাদের আমল, তাদের কর্মতৎপরতা। শুধু প্রার্থনায় তাঁর এখানে কোন লাভ হয় না। আশা-আকাঙ্ক্ষা তখনই পূর্ণ হয় যখন তাঁর রাস্তায় চেষ্টা সাধনা করা হয়, আত্মোৎসর্গ করা হয়, দুঃখ-কষ্ট সহ্য করা হয় এবং তাঁর পক্ষ থেকে আরোপিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা হয়।

(আরবী**************************************************************************************)

উত্তরে তাদের রব বললেন, তোমাদের মধ্যে কারো কাজকে বিনষ্ট করে দেব না –সে পুরুষ হোক অথবা স্ত্রীলোক হোক। তোমরা পরস্পর পরস্পরের সহযোগী। অতএব যারা কেবলমাত্র আমার জন্য নিজেদের জন্মভূমি ত্যাগ করেছে, আমারই পথে নিজেদের বাড়িঘর থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে, নির্যাতিত হয়েছে এবং আমার জন্যই লড়াই করেছে ও নিহত হয়েছে –তাদের সকল অপরাধ আমি ক্ষমা করে দেব এবং তাদেরকে এমন বেহেশতে স্থান দেব যার নিচে দিয়ে ঝর্ণা প্রবাহিত হবে।–সূরা আলে-ইমরানঃ ১৯৫

ঈমান ও আমলের মধ্যে রয়েছে গভীর আন্ত-সম্পর্ক। একটি অপরটি থেকে পৃথক হতে পারে না। এটা এটা চূড়ান্ত সত্য, এই সত্যের সপক্ষে এত অধিক প্রমাণ রয়েছে যে, তার হিসাব নেওয়া সম্ভব নয়। কুরআন-হাদীস অধ্যয়ন করলে বাস্তব সত্য সামনে এসে যায়, প্রতিটি মুসলমানের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়ে যায় এবং চূড়ান্ত ভঙ্গীতে আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত নির্দেশ কানে বেজে উঠেঃ

(আরবী**************************************************************************************)

এই লোকদের বল, তোমরা কাজ করতে থাক। আল্লাহ তাঁর রসূল এবং মুমিনগণ সকলেই লক্ষ্য করবে যে, তারপর তোমাদের কর্মনীতি কিরূপ হয়। অতঃপর তোমাদেরকে তার কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে, যিনি গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছুই জানেন। তিনি তোমাদের জানিয়ে দেবেন তোরা কি সব কাজ করছিলে –সূরা তাওবাঃ ১০৫

উম্মীদের কিতাব সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই

এমন কতগুলো হাদীস রয়েছে যা সাধারণ লোকের বোধগম্য নয়। তারা এর ভুল অর্থ গ্রহণ করে দীনের নির্ধারিত মূলনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। সর্বসাধারণের মধ্যে এ ধরনের হাদীসগুলোর চর্চাই অধিক হয়ে থাকে। যেমন আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম উষ্ট্রীর ওপর সওয়ার ছিলেন এবং তাঁর পেছন দিকে মুআয রাদিয়াল্লাহু আনহু বসা ছিলেন। নবী করীম (সঃ) বললেনঃ

(আরবী************************************************************************************)

হে মুআয! তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি আপনার কাছেই উপস্থিত (এভাবে তিনবার) তিনি বললেন, যে ব্যক্তিই আন্তরিক সততা সহকারে সাক্ষ্য দেবে যে, ‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল’ –আল্লাহ তাআলা তাকে দোযখের জন্য হারাম করে দেবেন।

(আরবী********************************************************************)

মুআয (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি কি এ সম্পর্কে লোকদের অবহিত করব না, যাতে তারা আনন্দিত হতে পারে? তিনি বললেন, তাহলে লোকেরা এর ওপর ভরসা করে বসে থাকবে। অতঃপর মুআয (রাঃ) ইলম গোপন করার অপরাধ থেকে বাঁচার জন্য মৃত্যুর পূর্বে লোকদের তা অবহিত করেছেন।–বুখারী, মুসলিম ৱ

এ ধরনের আরো অনেক হাদীস আছে, যেগুলোকে হাতিয়ার বানিয়ে সাধারণ মুসলমানরা দীনের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্চে, ইসলামের স্তম্ভসমূহকে ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং আমল ও তার ফলাফলের গুরুত্বকে হ্রাস করে দিয়েছে। অথচ এ জাতীয় হাদীসকে ভিত্তি করে এ ধরনের কথা বলা কোন ক্রমেই সঠিক নয়।

হাফেজ মুনযিরী (রঃ) বলেন, “উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিশেষজ্ঞ আলেমের মতে, যেসব হাদীসে সাধারণভাবে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে অথবা দোযখের আগুন তার ওপর হারাম হয়ে যাবে –এগুলো ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ের হাদীস, যখন শুধু একত্ববাদের ওপর ঈমান আনার দাওয়াত দেওয়া হচ্ছিল। অতঃপর যখন ইসলামের ব্যাপক বিধিবিধান এসে গেল এবং যাবতীয় সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হল, তখন এসব হাদীস মানসুখ হয়ে যায়। এর সপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ বর্তমান রয়েছে। দাহ্ হাক, যুহরী, সুফিয়ান সাওরী প্রমুখ মনীষীর এই মত।

অপর একদল মনীষীর মতে রহিত হওয়ার দাবি করার প্রয়োজন নেই। কেননা দীনের যতগুলো রুকন (স্তম্ভ) রয়েছে এবং ইসলামের যতগুলো আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে –তা সবই এই কালেমার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর আনুগত্য করা ছাড়া এই সাক্ষ্য পরিপূর্ণ হতে পারে না। অতএব কোন ব্যক্তি এই কলেমাকে স্বীকার করে নেওয়ার পর যদি একগুঁয়েমী, হঠকারিতা অথবা তাচ্ছিল্যের সাথে কোন ফরযকে উপেক্ষা করে, তাহলে সে আমাদের মতে কাফির হয়ে যাবে এবং সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না”।

মুনযিরী আরো কিছু বক্তব্য নকল করেছেন। কিন্তু এর সবগুলোর মূল কথা এই যে, এসব হাদীসের বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়। আর বাহ্যিক অর্থ কিভাবে লওয়া যেতে পারে –যেখানে এমন অসংখ্য আয়াত এবং হাদীস রয়েছে, যা ঈমানের জন্য কিছু আমলকেও বাধ্যতামূলক করে দেয়? বাস্তবিকপক্ষে কোন স্তানে যে কথা অতি সংক্ষেপে বলা হয়েছে –অন্যত্র তার ব্যাখ্যা করে দেওয়া হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

(আরবী*******************************************************************)

আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, আমি যেন লোকদের (আরব মুশরিকদের) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি যাবত না তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল এবং নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয়। যদি তারা এসব কাজ করে, তাহলে তারা আমার থেকে তাদের রক্ত (জীবন) ও ধন-সম্পদকে নিরাপদ করে নিল। কিন্তু ইসলামের হক তাদের কাছ থেকে আদায় করা হবে। তাদের হিসাব-নিকাশ আল্লাহর যিম্মায়।–বুখারী, মুসলিম

এই হাদীসে কিছু আমলের কথাও উল্লেখ আছে, যা পূর্বোক্ত সাক্ষ্য সম্বলিত হাদীসে নেই। এই হাদীস আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বানীসমূহের ব্যাখ্যাঃ

(আরবী**************************************************************************************)

অতএব এখন যদি  তারা তওবা করে, নামায কায়েম করে এবং যাকাত দেয়, তাহলে তোমাদের দীনী ভাই –সূরা তাওবাঃ ৫

কলেমা শাহাদাত মূলক পরবর্তী পর্যায়ের আকীদা-বিশ্বাস ও কার্যাবলীর ভূমিকা স্বরূপ অথবা এর অগ্রদূত। এমন নয় যে, একা কালেমা শাহাদাত যথেষ্ট এবং এরপর আর কোন জিনিসের প্রয়োজন নেই। দূর্বলচেতা ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীসম্পন্ন লোকেরা তাই ধারণা করে থাকে।

এই কলেমার শব্দগুলো মূলত এমন একটি গবাক্ষরদ্বার যা বিরাট প্রশস্ত দুনিয়ায় পৌঁছে দেয়, যেখানে অন্তর নির্ভেজাল তৌহীদের নিগূঢ় রহস্যে বিহবল হয়ে যায়। তবে শর্ত হচ্ছে তাকে নিজের স্রষ্টার সামনে অবনত মস্তক হতে হবে, তাঁর সন্তোষ সক্রিয় হতে হবে, তাঁর অসন্তোষে ভীত-সন্ত্রস্ত হতে হবে, নিষিদ্ধ কার্যাবলী থেকে দূরে থাকতে হবে এবং ফরয কাজগুলো যথারীতি আদায় করতে হবে।

শিরকের আবর্জনা এমন কোন একটিমাত্র বাক্য নয় যে, তাতে শুধু মুখই মলিন ও অপবিত্র হয় আর তার পরিবর্তে অন্য কোন শব্দ বলে দিলেই আবার মুখ পবিত্র হয়ে যায়। শিরকের তাৎপর্য এই যে, অন্তর গায়রুল্লাহর বাসস্থানে পরিণত হয়ে যায় এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গায়রুল্লাহর অনুগত হয়ে যায়।

অতএব তৌহীদের বাণী যদি অন্তর ও মন-মগজে সংক্রমিত না হয়ে যায়, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যদি তার নেশা ছড়িয়ে না পড়ে এবং যদি মানুষকে সৎকাজ করার জন্য উত্তেজিত না করে, তাহলে এই ধরনের ঈমানের কি মূল্য আছে! কলেমা তৌহীদ হচ্ছে এমন একটি দূর্গ যার অভ্যন্তরে এসে গোটা মানবতার বাতিল প্রভূদের গোলামী থেকে মুক্তি পেতে পারে। এই মাবুদ কেবল খোদাই করা পাথরগুলোই নয়, বরং এমন প্রতিটি জিনিস যা আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ককে ছিন্ন করে দেয়, তাঁর সাথে আশা-নিরাশা, ভয়-ভীতি, সন্তোষ এবং তাকওয়া ও মহব্বতের সম্পর্ককে অটুট থাকতে দেয় না এবং এ হচ্ছে কুফরীর দরজা ও শিরকের দুঃখজনক পরিণতি।

আজ হাজার হাজার এমন মুসলমান রয়েছে –ইসলামের সাথে যাদের কোন সম্পর্ক নেই। তারা শয়তানের সাথী, আল্লাহর প্রতি বিমুখ, কুপ্রবৃত্তির পূজারী, ইবাদতের সাথে সম্পর্কহীন এবং তারা আল্লাহকে চরমভাবে ভুলে গেছে। তাদের আজকের মন-মানসিকতাকে জাহিলী যুগের মন-মানসিকতার সাথে তুলনা করলে উভয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য দেখা যাবে না। জাহিলী সমাজ যে ঔদ্ধত্য, একগুঁয়েমী ও হঠকারিতায় পরিপূর্ণ ছিল, বর্তমানেও তাই চলছে। তারা কলেমা পড়ে কিন্তু এর তাৎপর্য অনুধাবন করতে সক্ষম নয়, যদি বা বুঝে কিন্তু স্বীকার করে না।

মানবপ্রকৃতি তো তৌহীদের নর পরিবেষ্টিত পরিবেশে বিচরণ করে। কিন্তু তার পা যখন শয়তানের ফাঁদে পড়ে যায়, যখন তার মধ্যে প্রবৃত্তির মালিন্য জমা হয়ে যায় এবং ব্যক্তি পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়ে, যখন সে উন্নত দৃষ্টিভঙ্গী ত্যাগ করে নীচতার দিকে ঝুঁকে যায় –তখন সে পতনের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে যায়। সে উন্নত পর্যায় থেকে পতিত হতে হতে অবনতির নিম্নতর স্তরে পৌঁছে যায়।

(আরবী*************************************************************************************)

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করে, সে যেন আসমান থেকে পড়ে গেল।  অতঃপর তাকে হয় পাখি ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে, অথবা বাতাস তাকে নিয়ে গিয়ে এমন জায়গায় নিক্ষেপ করবে, যেখানে সে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে।–সূরা হজ্জঃ ৩১

কলেমা তৌহীদ কোন অনুর্বর যমনে অংকুরিত হওয়ার মত প্রাণহীন বীজ নয়। তা অত্যন্ত সজীব এবং সম্বাবনাময় চারাগাছ, যার শিকড় উর্বর অন্তরের তা এমন কাজের আকারে আত্মপ্রকাশ করে –ইসলাম যেসব কাজ করার জন্য উৎসাহিত করেছে, বারবার তাকিদ দিয়েছে এবং যেগুলোর আত্মপ্রকাশের ওপর নিজের অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব নির্ভরশীল গণ্য করেছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী*****************************************************************************************)

তোমরা কি দেখ না আল্লাহ তাআলা কোন জিনিসের সাথে কলেমা তাইয়্যেবার তুলনা করেছেন? এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে, যেন একটি ভাল জাতের গাচ, যার শিকড় মাটির গভীরে দৃঢ় নিবদ্ধ হয়ে আছে এবং এর শাখাগুলো আকাশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। প্রতি মুহুর্তে তা তার প্রতিপালকের নির্দেশে ফল দান করছে। এসব দৃষ্টান্ত আল্লাহ তাআলা এজন্য দিচ্ছে যেন লোকেরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।–সূরা ইবরাহীমঃ ২৪,২৫

এই কলেমা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতি উচ্চ ও উন্নত। এটা এমন কোন জিনিস নয় যে, কোন মুনাফিক অথবা ঠাট্টা-বিদ্রূপকারী ইচ্ছা করলেই নিজের স্বার্থে তা ব্যবহার করতে পারে। যে ব্যক্তির আমলের কোন পুঁজি নেই –স্রেফ মৌখিক দাবির মাধ্যমে সে কি পেতে পারে? মহান আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী****************************************************************************************)

কতিপয় লোক বলে, আমরা আল্লাহ এবং আখিরাতের দিনের উপর ঈমান এনেছি, কিন্তু আসলে তারা মুমিন নয়।–সূরা বাকারাঃ ৮

অতএব লোকদের কার্যাবলী যখন তাদের আভ্যন্তরীণ মালিন্যের অনুসন্ধান দেয়, যখন তারা প্রকাশ্যভাবেই দায়িত্ব এড়িয়ে যায়, যখন আমরা তাদের এমন স্থানে উপস্থিত পাই না যেখান থেকে একজন মুমিন বিচ্ছিন্ন হতে পারে না, আমরা তাদেরকে যখনই দেখতে পাই শয়তানের দোলনায় অথবা ইসলামের শত্রুদের সমাবেশে –তখন এই ধরনের ঈমানের দাবিদারদের প্রত্যাখ্যান করা আমাদের উপর ফরয। তারা নিজেদের ঈমানের সপক্ষে যতবারই শপথ করুক না কেন। পবিত্র কুরআনের বাণীঃ

(আরবী*********************************************************************************)

তারা আল্লাহার নামে শপথ করে বলে, আমরা তো তোমাদের মধ্যেকারই লোক। অথচ তারা কখনো তোমাদের মধ্যেকার লোক নয়। আসলে তারা তোমাদের ব্যাপারে ভীত-সন্ত্রস্ত লোক। তারা যদি আশ্রয় নেবার মত কোন স্থান কিংবা কোন গুহা অথবা ঢুকে বসার মত জায়গা পায়, তাহলে তারা সেখানে গিয়ে লুকিয়ে থাকবে।–সূরা তাওবাঃ ৫৬,৫৭

ইসলাম জীবনের প্রতিটি বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে পথনির্দেশ দান করেছে। তা আইন-কানুন অথবা আচার-ব্যবহার অথবা আখলাক চরিত্র হোক –প্রতিটি ব্যাপারেই তার পথনির্দেশ রয়েছে। অতএব মুমিনদের এখন একটি মাত্র ভূমিকাই হতে পারে। এ ছাড়া অন্য কিছু নয়। তা হচ্ছে ইসলামের পূর্ণ আনুগত্য এবং তার কাছে একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণ। কিন্তু বাস্তব অবস্থা যদি এর পরিপন্থী হয় এবং জীবনের কার্যকলাপ যদি অন্তরের গোমরাহীর অনুসন্ধান দেয় –তাহলে ঈমানের প্রশ্নটা একটি অলীক ধারণা ছাড়া আর কি হতে পারে? মহানবী (সঃ)-এর যুগে মুনাফিকদের চিহ্নিত করার এটাই ছিল মানদণ্ড। বর্তমানে যারা তাদের বন্ধু ও সহযোগী আমরা তাদের জন্য এই মানদণ্ড ব্যবহার করব।

কোন এক শঞরে দুটি কাপড়ের কারখানা রয়েছে। কারখানা দুটি সম্পর্কে আমি ভালভাবে অবগত। একটির পরিচালক বিদেশী এক ইংরেজ। সে সব সময়ই তৎপর থাকে –কখন জানি তার ওপর গোঁড়ামীর অপবাদ এসে যায়। অতএব সে মুসলমানদের জুমুআর নামাযের ছুটি দেয়।

অপরটির পরিচালক এক বংশানুক্রমিক মুসলমান। সে তার মুসলমানিত্বের মিথ্যা দাবির ওপর আশ্বস্ত। সে মনে করে, তার ওপর এ ধরনের কোন অপবাদ লাগানো যাবে না। অতএব সে তার কর্মচারীদের নামাযের জন্য এতটুকু সময়ও বরাদ্দ করে না, যতটুকু সময় ঐ ইংরেজ পরিচালক বরাদ্দ করে থাকে।

তুমি যদি এই ধর্মবিরোধী অথবা ধর্মীয় অসচেতনতা সম্পর্কে তার সাথে আলাপ করতে চাও, তাহলে নামায ও নামাযীদের জন্য এটা মোটেই কল্যাণকর হবে না। বরং তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলবে। এ ধরনের দুষ্ট প্রকৃতির লোক যাদের অন্তরে ইসলামের নির্দেশাবলীর প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধ নেই, তাদেরকেও  কি মুমিনদের কাতারে শামিল করা হবে?

এসব লোকের অবস্থা এই যে, তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য থেকে ইসলামী আইনও নিরাপদ থাকতে পারেনি। তারা ইসলামী আইনের ওপর এবং এর পতাকাবাহীদের ওপর নিকৃষ্ট পন্থায় আঘাত হেনে থাকে। উম্মাতের আলেমদের ঐকমত্য অনুযায়ী এরা ইসলামের গণ্ডিতে থাকার উপযুক্ত নয়।

এখন প্রয়োজন হচ্ছে যাচাই-বাছাই করে ইসলামী উম্মাতকে পরিচ্ছন্ন করা, যাতে এর মধ্যকার যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা দূরীভূত হয়ে যায়, খড়কুটাগুলো চিহ্নিত হয়ে যায়। যে ব্যক্তি মুসলমান তাকে মুসলমানই মনে করা হবে। আর যে ব্যক্তি কুফর ও নাস্তিক্যবাদের শিকার তার অবস্থাটাও সামনে এসে যাবে।

বাস্তব কর্মক্ষেত্র

এমন কতকগুলো হাদীস আছে যে সম্পর্কে সাধারণ মুসলমানরা ভ্রান্তির শিকার হয়েছে। এগুলোর ওপর আলোকপাত করা একান্ত প্রয়োজন। তার সঠিক অর্থ তুলে ধরতে হবে। এসব হাদীস ক্ষমা, শাস্তি, অপরাধ এবং তওবার সাথে সম্পর্কিত। আমরা আর কি করতে পারব, যদি উম্মাতের মধ্যে এমন সব উপাদানের প্রবাব পড়ে যায়, যারা মারাত্মক অপরাধ করে বসা কোন দূষণীয় ব্যাপার নয়, যারা চিন্তাভাবনা না করেই কুরআন-হাদীসের দলিল পেশ করে এবং এমন রহমতের আশা নিয়ে বসে আছে যা পাবার জন্য কিছুই করা হয়নি?

ইসলামী সভ্যতার মধ্যে এখান থেকেই বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে যখন কুরআন ও হাদীসকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে প্রয়োগ করা শুরু হয়েছে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাহায্যে সম্পাদিত কাজ হোক অথবা অন্তরের মধ্যে লুকায়িত আকীদা-বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণাই হোক –তার সাথে শরীআতের নির্দেশের সামঞ্জস্য সাধনের জন্য তারা নিকৃষ্ট পন্থায় গোঁজামিল দিতে লাগল। একদিকে তাদের আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে, নাস্তিকতা এবং অপরাধের জগতে তারা স্বাধীনভাবে বিচরণ করবে। অপরদিকে সালেহীন এবং সিদ্দিকীগণের জন্য যে মর্যাদা নির্ধারিত রয়েছে তাও আল্লাহর দরবারে তারাই পেয়ে যাক।

ইহুদী জাতিও এই ধরনের কলুষ মানসিকতার শিকার হয়ে পড়েছিল। কুরআন মজীদ কঠোর ভাষায় তাদের তিরস্কার করেছে। একদিকে তারা সামান্য পার্থিব স্বার্থের জন্য জীবন দিয়ে দিত, এর সাময়িক চাকচিক্যের পেছনে ছুটে বেড়াত। অপরদিকে তারা আখিরাতের সুযোগ-সুবিধা লাভের আশায় বসে আছে। তাদের আকাশ-কুসুম কল্পনা –তাদের এই নিকৃষ্ট কাজে কখনো তাওরাতের বিরোধিতা হয় না এবং তারা মূসা আলায়হিস সালামের প্রদর্শিত পথেই স্থির আছে –এটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। কুরআন মজীদ নিম্নোক্ত ভাষায় তাদের চিত্র তুলে ধরেছেনঃ

(আরবী*****************************************************************************************)

কিন্তু তাদের পরে এমন সব অযোগ্য লোক তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়, যারা আল্লাহর কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়ে এই নিকৃষ্ট দুনিয়ার যাবতীয় স্বার্থ সঞ্চয়ে লিপ্ত থাকে আর বলেঃ ‘আশা করা যায় আমাদের মাফ করে দেওয়া হবে’। সেই বৈষয়িক স্বার্থই যদি আবার তাদের সামনে এসে পড়ে তাহলে তখনি টপ করে তা হস্তগত করে। তাদের কাছ থেকে কিতাবের প্রতিশ্রুতি কি পূর্বে গ্রহণ করা হয়নি যে, আল্লাহর নামে তারা কেবল এমন কথাই বলবে যা সত্য ও যথার্থ? আর কিতাবে যা কিছু লেখা হয়েছে তা তারা নিজেরাই পড়েছে। -সূরা আরাফঃ ১৬৯

পুনরায় আল্লাহ তাআলা তাদের কাছে এ কথা পরিস্কার করে দিয়েছেন যে, নেককার লোকেরাই কেবল সওয়াব ও পুরস্কারের অধিকারী হবে। তাদের প্রাপ্য কখনো নষ্ট হবে না। যেসব লোক আল্লাহর কিতাবের উপর অবিচলভাবে কায়েম থাকে এবং যেসব ইবাদত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা করে –আল্লাহর কাছে তারাই হচ্ছে নেককার লোক। কুরআন মজীদ ঘোষণা করেছেঃ

(আরবী****************************************************************************************)

আখিরাতের বাসস্থান তো কেবল মুত্তাকী লোকদের জন্যই কল্যাণকর হবে। এতটুকু কথাও কি তোমরা বুঝতে পার না? যারা দৃঢ়ভাবে কিতাব ধারণ করে রেখেছে, নামায কায়েম করেছে –এই ধরনের নেক চরিত্রের লোকদের কর্মফল আমরা নিশ্চয়ই নষ্ট করব না।–সূরা আরাফঃ ১৬৯-৭০

কিন্তু কুরআনের ধারক মুসলমানগণ আজ কোথায় কুরআনের ওপর কায়েম আছে? আমাদের মুসলিম অঞ্চলসমূহে আজ হত্যাকাণ্ডের যতগুলো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে –ফিনল্যাণ্ডে (ইউরোপ) পঞ্চাশ বছরেও এতগুলো হত্যাকাণ্ডের অপরাধ সংঘটিত হয়নি। অথচ সেখানকার অধিবাসীরা ইসলামের সাথেও পরিচিত নয় এবং অন্য কোন ধর্মের সাথেও পরিচিত নয়।

যদিও এসব খুনখারাবির অসংখ্য কারণ রয়েছে, কিন্তু তবুও এ কথা কে অস্বীকার করতে পারে যে, ঈমান ও আমলের পারস্পরিক সম্পর্ককে যখন ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হয়েছে, মানুষের মনে যখন এই ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, অপরাধ শাস্তিকে অবধারিত করে না; অসংখ্য অপরাধে লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও মানুষ আল্লাহর কাছে পুরস্কৃত হতে পারে; নিষ্কর্মা লোকদের আশা-ভরসার হাদীস শুনানো হতে থাকল; কঠোরতার স্থলে নম্রতা এবং তরবারি স্থলে আদর দেখিয়ে কাজ আদায় করার চেষ্টা বলল –তখন থেকেই ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির পতন শুরু হয়ে গেল। মুসলিম উম্মতের আলোকবর্তিকা নিভু নিভু করে জ্বলতে থাকল এবং অন্যান্য সভ্যতা সামনে অগ্রসর হয়ে উন্নতির প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল।

এখন যেসব হাদীসের তাৎপর্য অনুধাবন করতে গিয়ে সাধারণ লোকেরা ভুল করে থাকে তা উল্লেখ করার পূর্বে ডঃ আবদুল আযীয ইসমাঈলের কয়েকটি বাক্য পাঠকদের সামনে তুলে ধরব। তিনি বলেনঃ

“এক ব্যক্তি তার প্রতিপালককে ভয় করে এবং তাঁর নির্দেশের প্রতি শ্রদ্ধ পোষণ করে, কিন্তু ঘটনাচক্রে কখনো মানসিক উত্তেজনার শিকার হয়ে পড়ে। সে সম্পূর্ণরূপে বিবেকশূন্য হয়ে পড়ে এবং এই অবস্থায় কাউকে হত্যা করে বসে। পুনরায় তার হুঁশ ফিরে আসলে –সে নিজের কৃতকর্মের জন্য চরমভাবে অনুতপ্ত হয়। অতএব এ এমন এক ব্যক্তি যে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাহায্যে অপরাধ করেছে, অন্যথায় তার অন্তর এবং তার বিবেক এ অপরাধ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। কেননা ডাক্তারী পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রচণ্ড উত্তেজনা অনেক সময় কোন কোন শক্ত গ্রন্থিতে অধিক পরিমাণে লালারস সৃষ্টি করে। এ ফলে রক্তের চাপ বেড়ে যায় এবং মস্তিষ্ক প্রভাবিত হয়ে পড়ে। কখনো কখনো এই উত্তেজনা স্নায়ুতে আকস্মিক বিক্ষুব্ধ অবস্থার সৃষ্টি করে অথবা অনুভূতি শক্তিকে শোকার্ত করে তোলে। এরূপ অবস্থায় মানুষের দ্বারা এমন কাজ সংঘটিত হয় যেগুলোকে স্বাভাবিক অবস্থায় সে চরমভাবে অপছন্দ করে।

এগুলো এমন অপরাধ যেখানে মানুষ তাকদীরের হাত অসহায় হয়ে যায়। আমরা যদি কোন অভিজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে এর রহস্যের মূল্যায়ন করাই তাহলে আখেরাতের দৃষ্টিকোণ থেকে হয়ত এর জবাবদিহির সীমা কতকটা পরিস্কার হয়ে যেতে পারে। এই রকমের অপরাধ প্রসঙ্গে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের বাণী নিম্নরূপঃ

(আরবী***********************************************************************************)

সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমরা যদি ভুল না করতে তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের তুলে নিতেন এবং তদস্থলে এমন এক জাতিকে নিয়ে আসতেন, যারা অপরাধ করতে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করত। অতঃপর তাদেরকে ক্ষমতা করে দেওয়া হত।

-মুসলিম-তওবা; তিরমিযী, জান্নাত, দাওআত; মুসনাদে আহমাদ-১ম, ২য় ও ৫ম খণ্ড

এ হাদীসের গুনাহ ও অপরাধ করার জন্য সাধারণভাবে আহবান জানানো হয়নি। আর দুষ্কর্ম ও অপরাধে লিপ্ত থাকাও জীবনের উদ্দেশ্য নয়। কেননা আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য পরিস্কারভাবে বলে দিয়েছেন।

(আরবী************************************************************************************)

যেন তিনি তোমাদের পরীক্ষা করে দেখতে পারেন যে, তোমাদের মধ্যে আমলের দিকে থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তি কে? –সূরা মূলকঃ ২

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেনঃ

(আরবী**************************************************************************************)

তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম জ্ঞানী, কোন ব্যক্তি সর্বাধিক আল্লাহ ভীরু এবং কোন ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যে সর্বদা সক্রিয়।

যে মানসিক প্রতিক্রিয়া নিজের স্রোতে মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় –এ হাদীস মূলত সেই প্রতিক্রিয়ার সাথে সম্পর্কযুক্ত। তা দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর সংকল্পকে তাকদীরের প্রচণ্ড অন্ধকারে একাকার করে দেয় এবং তা সম্পূর্ণ ধুলার মত উড়ে যায়। পুনরায় যখন সে অন্ধকার সমুদ্র থেকে বের হয়ে আসে এবং তার মাথা এর প্রভাবে চক্কর দিতে থাকে –তখন তার জন্য ‘যদি তোমরা ভুল না করতে’ বক্তব্যের মর্যাদা ঠিক তদ্রুপ –যেমন একটি তৃষ্ণার্ত ঠোঁট এবং দগ্ধিভূত আত্মার কাছে পানীয় জলের মর্যাদা। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য সান্ত্বতার বাণী যেরূপ শীতলতা এনে দেয় –এই হাদীসের মাধ্যমে মন-মস্তিষ্ক তদ্রূপ শীতলতা অর্জন করে থাকে। পেশাদার দুষ্কৃতিকারী এবং কাপুরুষদের কর্মধারার সাথে এ হাদীসের কোন সম্পর্ক নেই। যৌবনের পদস্খলন এবং মানসিক দুর্বলতা ও পরাজয়ের চিকিৎসার ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের এ হাদীসের একান্ত প্রয়োজন রয়েছে।

মানবদেহে গ্রন্থিগুলোর উত্তেজনার প্রভাব রয়েছে। প্রতিট গ্রন্থি নিজ নিজ পদার্থ গরম রক্তের সাথে মিশিয়ে দেয়। মানুষ তা সংবরণ করতে না পারলে হোঁচট খেয়ে যায়। খুব সম্ভব আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা এই যে, সৃষ্টির সেরা মানুষ দোজাহানের রাজাধিরাজের সামনে অসহায় গোলামের মত বসবাস করুক। সে তার কার্যকলাপ এবং আনুগত্যের অহংকারে ফেটে পড়ার পরিবর্তে আল্লাহ তাআলার গৌরব ও মর্যাদা এবং তাঁর সাহায্যের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখুক। যেসব লোক অসম শক্তি এবং অপরিসীম যোগ্যতার অধিকারী, যাদের সম্পর্কে ধারণা করা যায় যে, তারা গুনাহের আবর্তে হোঁচট খেয়ে পড়বে না –তারাই সাধারণত নিজেদের মধ্যে এ ধরনের অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে।

এই বক্তব্যের আলোকে আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত বাণীর তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারিঃ

(আরবী***************************************************************************************)

আদম সন্তানের জন্য যেনার অংশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। অবশ্যম্ভাবীরূপে সে তা পাবেই। দর্শন হচ্ছে চোখের যেনা, শ্রবণ হচ্ছে কানের যেনা, কথাবার্তা বলা হচ্ছে মুখের যেনা, স্পর্শ করা হচ্ছে হাতের যেনা, পায়ের যেনা হচ্ছে এ উদ্দেশ্যে হেঁটে যাওয়া, অন্তর তাতে লিপ্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে এবং লজ্জাস্থান এই আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণ করে দেয় অথবা তা ব্যর্থ করে দেয়।–বুখারী, মুসলিম

এই যে জিনিস নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে এগুলোই হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বহির্ভূত মানসিক উত্তেজনার কদর্য রূপ। মানুষের শক্তি ও ক্ষমতাবহির্ভূত অবস্থার দায়িত্ব হচ্ছে, সে অপরাধ ও দুষ্কর্ম থেকে পশ্চাদপসরণ করবে, ধোঁকা ও প্রতারণা ক্ষেত্রে তার অন্তর ধৈর্য ধারণ করবে, স্বভাব-প্রকৃতির মধ্যে যতই উত্তেজনা আসুক, সে আত্মনিয়ন্ত্রণ করবে।

কিন্তু কখনো কখনো এই চাপ চরম আকার ধারণ করে, এতই চরম যে, তার মুকাবেলা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অবশেষে মুমিন ব্যক্তির পদস্খলন ঘটে এবং সে নিজ ভূমিকায় অবিচল থাকতে পারে না। যেমন সমুদ্রে পতিত একজন সাঁতারু উত্তাল তরংগের মধ্যে হাত-পা মারতে থাকে, সে সামনে অগ্রসর হতে চেষ্টা করে, নিজের সর্বশক্তি নিয়োগ করে তীরে পৌঁছে যাওয়ার জোর প্রচেষ্টা চালায়। এক পর্যায়ে হঠাৎ সে অনুভব করতে পারে যে, তার সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের স্রোত অত্যন্ত তীব্র, এর মুকাবিলা করা সম্ভব নয়। যখন সে উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয় তখন যতই শক্তি প্রয়োগ করুক না কেন নিজের স্থান থেকে এক কদমও অগ্রসর হতে পারে না।

কর্মময় জীবনেও এরূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়ে থাকে –যখন এ ধরনের হাদীস আমাদের সামনে আসে, গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়ার অবাধ অনুমতি দেয়ার জন্য নয়, বরং গুনাহ থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য, এর মলিনতা থেকে পাক করার জন্য। এ সময় মানুষকে ইতিবাচক ইবাদতের দিকে আকৃষ্ট করা হয়। কেননা নেতিবাচক ইবাদতে যে পরাজয় হয়েছে তার চিকিৎসা ইতিবাচক ইবাদতের মধ্যেই রয়েছে। নিম্নের আয়াত থেকেও এই সত্য প্রতিভাত হয়ঃ

(আরবী***********************************************************************************)

তোমরা নামায কায়েম কর দিনের দুই প্রান্তে এবং কিছুটা রাত হওয়ার পর। ন্যায় কাজসমূহ অন্যায় কাজসমূহকে দূর করে দেয়। যেসব লোক আল্লাহকে স্মরণ করতে অভ্যস্ত –এটা তাদের জন্য একটি স্মারক বিশেষ।–সূরা হুদঃ ১১৪

শয়তান যদি কল্যাণকর কাজের দরজা একদিক থেকৈ বন্ধ করে দিতে চায় তাহলে অন্যদিক থেকে তা খুলে দেয়া হয়। এজন্যই বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************************************************************************)

এবং ধৈর্যধারণ কর, আল্লাহ সৎ কর্মশীল লোকদের কর্মফল কখনো বিনষ্ট করেন না।–সূরা হুদঃ ১১৫

বাস্তবিকপক্ষে অন্যায় কাজ পরিত্যাগ করার ক্ষেত্রে যে ব্যর্থতা আসে নেক কাজগুলো কেবল তার নিরাময়ই নয়, বরং এটাই একমাত্র উপায় যার মাধ্যমে গর্হিত কাজ পরিত্যাগ করা এবং এর মলিনতা থেকে পাক হওয়ার ব্যাপারে সফলকাম হওয়া যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে তা যতই কঠিন মনে হোক না কেন এটাই হচ্ছে ঈমানের পরিচয়। অবশ্য যদি কোন লোক গর্হিত কাজে ডুবে থাকে, নেক কাজ থেকে দূরে থাকে, আবার মুসলমান হওয়ার দাবিও করে তবে তার এ দাবি চূড়ান্তভাবেই মিথ্যা। পূর্বোক্ত হাদীসে এমন কোন জিনিস নেই যার থেকে তার ঈমানের পক্ষে সমর্থন পাওয়া যেতে পারে।

জাহিল মুর্খ লোকেরা আরো একটি হাদীস বর্ণনা করে থাকে এবং তার ভিত্তিতে বলে যে, আমলের কোন গুরুত্ব নেই। হাদীসের ভাষা নিম্নরূপঃ

(আরবী***********************************************************************************)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেন, এক ব্যক্তি বলল, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করবেন না। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ কোন ব্যক্তি আমার নামে শপথ করে বলছে, আমি অমুক ব্যক্তিকে ক্ষমা করব না? আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম এবং তোমার যাবতীয় আমল বিনষ্ট করে দিলাম।–মুসলিম

এটি সহীহ হাদীস। সুনানে আবু দাঊদেও এই ধরনের হাদীস এসেছে। তার ভাষা নিম্নরূপঃ

(আরবী********************************************************************************)

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইয়ে ওয়াসাল্লাম বলেনঃ নবী ইসরাঈল বংশের দুই ব্যক্তি ছিল। তারা পরস্পরের ভাই হত। তাদের একজন ছিল পাপী এবং অপর জন ছিল সৎলোক। পাপী ব্যক্তি যখনই কোন খারাপ কাজ করত, সৎ লোকটি তাকে বলত, এ কাজ পরিত্যাগ কর। পাপী লোকটি বলত, আমাকে আমার প্রভুর উপর ছেড়ে দাও। তোমাকে কি আমার উপর পর্যবেক্ষক করে পাঠানো হয়েছে? তখন নেককার লোকটি তাকে বলল, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তোমাকে কখনো ক্ষমা করবেন না। অথবা সে বলল, তিনি কখনো তোমাকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন না। আল্লাহ তাআলা তাদের উভয়কে মৃত্যু দান করলেন এবং তারা আল্লাহর দরবারে হাযির হয়ে গেল। আল্লাহ ইবাদতে মশগুল লোকটিকে বললেন, আমার হাতে যা রয়েছে তার উপর তোমার কর্তৃত্ব চলে কি? অতঃপর তিনি অপরাধীকে বললেন, চলে যাও এবং আমার অনুগ্রহে বেহেশতে প্রবেশ কর। তিনি অপর ব্যক্তি সম্পর্কে বললেন, তোমরা একে নিয়ে দোযখে চলে যাও।

বিশেষজ্ঞ আলেমদের সামনেও এ হাদীস এসেছে। এ হাদীসের ঠিক যে অর্থ হতে পারে তাঁরা তাই বুঝেছেন। তাঁরা হাদীসের অর্থ এই বুঝেছেন যে, যে ব্যক্তি নিজের আনুগত্য ও ইবাদত নিয়ে গর্ভ-অহংকালে লিপ্ত হয়, সে অনুতপ্ত পাপীর তুলনায় অধিক নিকৃষ্ট। আর এটাই হল সঠিক কথা। ধর্মীয় বেশভূষা ধারণকারী একদল লোক আছে যারা কিছু নামায-কালাম পড়ে মনে করে –তারা বান্দার ভাগ্য বণ্টনে আল্লাহর দরবারে প্রভাব বিস্তার করে আছে। সবার ভবিষ্যৎ তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে গেছে। বেহেশত-দোযখের চাবি তাদের হাতে এসে গেছে। আমি ধর্মীয় পরিমণ্ডলে অনেক জুব্বা সর্বস্ব ব্যক্তিকে দেখেছি যারা এই আকাশ-কুসুম কল্পনায় ডুবে আছে। এরা আন্তরিক নম্রতা, বিনয় ও ইখলাসের সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত।

যেসব লোক বাড়াবাড়ির পরিণতি ভয়ংকর হবে বলে পাপীদের ভয় দেখায় –এ হাদীস তাদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছে যে, এটা সংশোধনের উপযুক্ত পন্থা নয়। তোমরা খৃষ্টানদের প্রতি লক্ষ্য কর। কোন ব্যক্তি অপরাধ করে ভগ্ন হৃদয়ে গির্জায় গিয়ে উপস্থিত হয়। পোপ তাদের এখানে প্রচলিত পন্থায় তাকে তওবা করায়। তুমি যদি কোনভাবে তাদের অন্তরে ঢুকে যেতে পার তাহলে তুমি দেখতে পাবে, এই পাপীর অন্তর এবং মানসিকতাও এমন স্তরে পৌঁছে যেতে পারে যা পোপের স্থানের চেয়ে অতি উচ্চে।

এ সম্পকে আমার অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমাদের কোন কোন ধর্মীয় নেতার এখানে পাষাণ হৃদয় ও কর্কশ ব্যবহারের এমন দৃশ্য দেখা যায় –যার কারণে আমি সেখান থেকে দৌড়ে পালাই। পক্ষান্তরে এমন কিছু লোকও পাওয়া যায়, দীনের সাথে যাদের কোন সম্পর্ক নেই, ইসলামের সৌন্দর্য ও কল্যাণ সম্পর্কে যাদের কোন ধারণা নেই কিন্তু তারা অত্যন্ত ভদ্র, নম্র ও অমায়িক যে, মুহুর্তের মধ্যে মন জয় করে ফেলে। সে যাই হোক, এ হাদীস থেকে নিম্নোক্ত আয়াতের পরিপন্থী অর্থ কোনক্রমেই গ্রহণ করা সম্ভব নয়ঃ

(আরবী*************************************************************************************)

নিশ্চিতই আল্লাহভীরু লোকদের জন্য তাদের প্রভুর কাছে নিয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাত রয়েছে। আমরা কি অনুগত লোকদের অবস্থা অপরাধী লোকদের মত করব? তোমাদের কি হয়েছে, তোমাদের কি রকমের কথাবার্তা বলছ? তোমাদের কাছে এমন কোন কিতাব আছে, যার মধ্যে তোমরা পড় যে, নিশ্চয়ই সেখানে তোমাদের জন্য সেই সব জিনিসই রয়েছে যা তোমরা নিজেদের জন্য পছন্দ কর? অথবা তোমাদের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত এমন কিছু প্রতিশ্রুতি আমাদের উপর অবশ্যই পালনীয় হয়ে আছে যে, তোমরা যা বলছ তোমাদের সেসব কিছুই দেওয়া হবে? এদের জিজ্ঞেস কর, তোমাদের মধ্যে কে এর জন্য দায়িত্বশীল? –সূরা কালামঃ ৩৪-৪০

যেসব নির্বোধ জাহিল কুরআন ও হাদীসকে খেলার বস্তুতে পরিণত করেছে, আমরা তাদের জিজ্ঞেস করিঃ যদি তাদের দৃষ্টিশক্তি বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে থাকে এবং কুরআন ও হাদীস বুঝবার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে থাকে, তাহলে কোন সাহসে তারা ঈমান ও আমলের আন্ত-সম্পর্ক ছিন্নভিন্ন করছে এবং অপরাধের শাস্তি অবধারিত নয় বলে দাবি করছে?

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.