নামাজ রোজার হাকীকত

জামায়াতের সাথে নামায

আগের প্রবন্ধগুলোতে আমি শুধু নামাযের বৈশিষ্ট্য এবং উপকারিতার কথাই বলেছি। তা দ্বারা আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে, এটা কত বড় গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। এ নামায মনুষের মধ্যে জীবন ব্যাপী বন্দেগীর ভাবধারা কেমন করে জন্মায় এবং কেমন করে তাকে এ বন্দেগীর হক আদায়ের যোগ্য করে তোলে – সে কথাও অপনারা বুঝতে পেরেছেন। এক্ষণে আমি জামায়াতের সাথে নামায আদায়ের উপকারিতার কথা আপনাদেরকে বলবো। তা দ্বারা আপনারা খুব ভাল করে বুঝতে পারবেন যে, আল্লাহ দয়া ও অনুগ্রহ করে এ একই জিনিসের মধ্যে সবরকমের নিয়ামত কিভাবে জমা করে রেখেছেন। শুধু নামাযই আমাদের পক্ষে কম ছিল না;কিন্তু সেই সাথে জামায়াতের সাথে নামায আদায়ের আদেশ করবে আল্লাহ পাক এটাকে দ্বিগুণ উপকারিতার ভান্ডার করে দিয়েছেন এবং তাতে এক অপূর্ব শক্তি দান করেছেন, যা মানুষের মধ্যে আমূল পরিবর্তন সৃষ্টি করতে অতুলনীয়।

পূর্বেই বলেছি,জীবনের সর্বক্ষণ নিজেকে আল্লাহর বান্দাহ বলে মনে করা,অনুগত গোলামের ন্যায় মালিকের অধীন হয়ে থাকা এবং মালিকের হুকুম পালনের জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকার নামই হচ্ছে ইবাদাত, আর নামায মানুষকে এ ইবাদাতের জন্যই প্রস্তুত করে। এরূপ ইবাদাতের জন্য মানুষের মধ্যে যতগুলো গুণের দরকার, নামায তার সবই মনুষের মধ্যে সৃষ্টি করে। দাস হওয়ার অনুভূতি,আল্লাহ,তাঁর রাসূল এবং তাঁর কিতাবের প্রতি ঈমান,পরকালের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস,আল্লাহভীতি, আল্লাহকে ‘আলেমুল গায়েব’ বলে স্বীকার করা, তাকে সবসময়ই নিজের কাছে অনুভব করা, আল্লাহর হুকুম পালনের জন্য সর্বদা নিজেকে প্রস্তুত রাখা, আল্লাহর হুকুমগুলো ভাল করে জানা — নামায এ ধরনের বহু গুণই মনুষের মধ্যে সৃষ্টি করে এবং তাকে আল্লাহ তাআলার খাঁটি বান্দাহরূপে গড়ে তোলে।

একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারেন যে,মানুষ নিজে যতই গুণসম্পন্ন হোক না কেন,অন্যান্য মানুষ যতক্ষণ তাঁর সহযোগী ও সাহায্যকারী না হবে ততক্ষণ সে আল্লাহর বন্দেগীর ‘হক’ পূর্ণরূপে আদায় করতে পারবে না। মানুষ যাদের সাথে দিন-রাত জীবনযাপন করে সবসময় যাদের সাথে একত্রে কাজ করে,আল্লাহর ফরমাবরদারী করার ব্যাপারে তারা যদি সহযোগিতা না করে, তবে সে কিছুতেই আল্লাহর হুকুম পালনে সমর্থ হয় না।

মানুষ দুনিয়ায় একাকী আসেনি। একাকী থেকে সে কিছু করতেও পারে না। সে পাড়া-প্রতিবেশী ও সহকর্মী এবং জীবন পথের সঙ্গী-সাথীদের সাথে নানাভাবে জড়িত। আল্লাহর হুকুম আহকামও কোন নিসঙ্গ একটি মানুষের জন্য নয়, বরং সকল মানুষের জন্যে — জীবনের সকল প্রকার সম্পর্ক সম্বন্ধ সঠিকভাবে বজায় রাখার জন্যই তা আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে। এখন আল্লাহর হুকুম পালন করার ব্যাপারে যদি সবাই পরস্পরকে সাহায্য করে, সহযোগিতা করে, তবেই তারা এক সাথে আল্লাহর হুকুম পালনকারী হতে পারে। পক্ষান্তরে সকলে মিলে যদি আল্লাহর নাফরমানী শুরু করে কিংবা তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক যদি এমন হয় যে, আল্লাহর আদেশ পালনে পরস্পর সহযোগিতা না করে,তবে একজন লোকের পক্ষে সঠিকভাবে নিয়মিত আল্লাহর হুকুম পালন করা এবং আল্লাহর বিধান অনুসারে কাজ করা একেবারেই অসম্ভব।

আপনারা যদি বিশেষ লক্ষ্যের সাথে কুরআন পাঠ করেন,তাহলে জানতে পারবেন যে,আল্লাহ তাআলা কেবল আপনাকেই আল্লাহর অধীন ও অনুগত হতে এবং আল্লাহর হুকুম পালন করে চলতে বলেননি। বরং সেই সাথে আপনাক এ আদেশও দেওয়া হয়েছে, আপনি সমগ্র দুনিয়াকে আল্লাহর অধীন ও অনুগত করে দিবেন, দুনিয়াতে আল্লাহর আইন জারী করবেন। দুনিয়ার যেখানে যেখানে ‘শয়তানের’ আইন চলছে, তা বন্ধ করবেন এবং সে স্থানে এক ও লা-শরীক আল্লাহ তাআলার আইনের হুকুমাত কায়েম করবেন। আপনার প্রতি আল্লাহ এতে‌ যে, বিরাট খেদমতের আদেশ দিয়েছেন একজন লোকের পক্ষে এ কাজ সমাধা করা কিছুতেই সম্ভব হতে পারে না। এ মতে বিশ্বাসী কোটি কোটি মুসলমানও যদি হয় আর তারা বিভিন্ন ও বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকে — তাদের মধ্যে কোন যোগাযোগ বা সম্পর্ক না থাকে তবে তারাও ‘শয়তানের’ সুশৃংখলিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত শক্তিকে কিছুতেই পরাজিত করতে পারবে না। এজন্যই মুসলমানদের দলবব্ধ হওয়া ও পরস্পরকে সহায্য করা, একে অন্যের পৃষ্ঠ-পোষক ও সমর্থক হয়ে দাঁড়ান এবং সকলে একই উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য সম্মিলিতভাবে সংগ্রাম-সাধনা করা অপরিহার্য।

একটু গভীরভাবে দেখলে একথাও পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এতবড় বিরাট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য মুসলমানদের কেবল মিলিত ও একতাবদ্ধ হওয়াই যথেষ্ট নয়। তাদের মিলিত হতে হবে ঠিক পন্থা অনুসারে অর্থাৎ এমনভাবে মুসলমানদের একটি জামায়াত গঠন করতে হবে, যেন তাদের পরস্পরের সাথে সঠিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় — তাদের পরস্পরের সম্পর্কের মধ্যে যেন কোনরূপ দোষ-ত্রুটি না থাকে। তাদের মত, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মনীতির পূর্ণ ঐক্য বর্তমান থাকা চাই। তাদের একজন আমির ও নেতা হওয়া দরকার, তাদের মধ্যে সেই নেতার ইশারা অনুসারে কাজ করার অভ্যাস ও স্পৃহা থাকা চাই। তাদের কে নেতার হুকুম পালন করতে হবে আর তা কতদূরইবা করতে হবে এবং কোন কারণ‌ ঘটলে নেতার বিরোধিতাও করা যেতে পারে — তাও তাদের ভাল করে বুঝে নেয়া আবশ্যক। এ কথাগুলো মনে রাখুন এৰং জামায়াতের সাথে নামায পড়লে এসব গুরুত্বপূর্ণ ভাবধারা নামাযীদের মধ্যে কেমন করে জেগে উঠে তা চিন্তা করে দেখুন।

আযান শোনা মাত্রই সবকাজ-কর্ম ছেড়ে মসজিদের দিকে যাওয়ার হুকুম দেয়া হয়েছে। কাজেই আযানের সাথে সাথেই মুসলমানদের নিজ নিজ কাজ ত্যাগ করা এবং একই কেন্দ্রের (মসজিদ) দিকে সকলের অগ্রসর হওয়া একটি বিরাট সৈন্যবাহিনীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সৈন্য শিবিরে ‘বিউগলের’ আওয়ায হওয়ার সাথে সাথেই প্রত্যেকটি সৈনিক বুঝতে পারে যে, সেনাপতি সকলকে ডাকছেন। এ সময় সকলের মনে একই ভাব উদয় হয়। সেই ভাব হচ্ছে সেনাপতির নির্দেশ পালনের কর্তব্য ও দায়িত্ব। একথা মনে হওয়ার সাথে সাথে সকলে একই কাজ করে, অর্থাৎ যে যেখানে আছে সেখান হতে সে আওয়ায শোনা মাত্র নির্দিষ্ট স্থানের দিকে দৌঁড়াতে থাকে। সৈন্যদের জন্য এ পন্থা কেন গ্রহণ করা হয়ছে।? প্রথম এজন্য যেন আলাদাভাবে প্রত্যেকটি সৈনিকের মধ্যে হুকুম পালন করার এবং হুকুম পলনের জন্য সবসময়ই প্রস্তুত থাকার অভ্যাস হবে। দ্বিতীয়ত, সেই সাথে এ ধরনের সকল অনুগত সিপাহীদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী দল গঠিত হবে এবং সেনাপতির আদেশে একই সময় একই স্থানে সমবেত হওয়ার অভ্যাস হবে। এ অভ্যাসটি এজন্য দরকার যে, হঠাৎ কোন ঘটনা যদি দেখা দেয় তখন যেন সকল সিপাহী এই আওয়াযে এ‌কই স্থানে হাজির হয়ে কাজ করতে পারে। প্রত্যেক সৈনিক ব্যক্তিগতভাবে যদি খুব বড় বাহাদুর হয়, কিন্তু কাজের সময় ডাকলে অবিলম্বে উপস্থিত হয়ে যদি লড়াই করতে না পারে, তাহলে তাদের বাহাদুরীর কোন মূল্যই থাকে না । ডাক দেয়া মাত্র সৈন্যগন যদি একত্র না হয়ে বরং নিজ নিজ ইচ্ছামত একেক দিকে চলে যায়, তবে এ ধরনের হাজার বীর সৈনিককে শত্রুপক্ষের পঞ্চাশটি সৈনিকের একটি শৃংখলাবদ্ধ দল নাস্তানাবুদ করে দিতে পারে।

ঠিক এ নিয়মেই আযান শুনা মাত্রই কাজ-কর্ম ছেড়ে নিকটস্থ মসজিদে হাজির হবার জন্য মুসলমানকে আদেশ করা হয়েছে যেন সব মুসলমান মিলে আল্লাহর একটি সৈন্যদলে পরিনত হতে পারে। এভাবে দৈনিক পাঁচবার আযান শুনামাত্র হাজির হওয়ার অভ্যাস করানো হয় এজন্য যে, দুনিয়ার সকল প্রকার সৈনিকের তুলনায় এ খোদায়ী সেনাদের কর্তব্য অনেক বেশী, অনেক কঠোর। অন্যান্য ফৌজের পক্ষে বহুকাল পরে হয়ত যুদ্ধ করার প্রয়োজন পড়ে এবং কবে কোন্‌ সময় যুদ্ধ বাধবে সে জন্য বহু পূর্ব থেকেই এত সব ট্রেনিং দেয়া হয়। কিন্তু এ খোদায়ী ফৌজকে প্রত্যেক মুহূর্তেই শয়তানী শক্তির সাথে লড়াই করতে হয় এবং প্রত্যেকটি মুহূর্তেই সেনাপতির আদেশ পালনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। এজন্য মুসলমানদের দিন-রাতের মধ্যে পাঁচবার খোদায়ী ‘বিউগল’ —- আযানের আওয়াযে আল্লাহর শিবির মসজিদের দিকে ছুটতে হয়, বলতে হবে,দায়িত্ব ও কর্তব্যের তুলনায় তাদের প্রতি এটাকে অনেক অনুগ্রহ করা হয়েছে সন্দেহ নেই।

এ যাবত শুধু আযানের সৌন্দর্য ও সার্থকতার কথাই আলোচনা করা হয়েছে। আযান শুনে সকল মুসলমান মসজিদে হাজির হয়। কেবল সে জমায়েত হওয়ার মধ্যেই অনেক সৌন্দর্য-সার্থকতা নিহিত রয়েছে। এখানে মিলিত হয়ে মুসলমানগণ পরস্পরকে দেখতে পান, চিনতে ও পরিচয় লাভ করতে পারেন।

কিন্তু আপনারা পরস্পরের সাথে এই যে মিলিত ও পরিচিত হন, তা কোন্‌ সূত্রে?এ সূত্রে যে, আপনারা এক আল্লাহর বান্দাহ, এক রাসূলের অনুসরণকারী, এক কুরআন শরীফই আপনাদের সকলেরই কিতাব—- জীবন বিধান এবং আপনাদের সকলেরই জীবনের উদ্দেশ্য এক। সেই একই উদ্দেশ্য লাভ করার জন্য আপনারা মসজিদে একত্রিত হয়েছেন এবং এখান থেকে ফিরে যাওয়ার পর ও অপনারা প্রত্যেকেই সে একইে উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য চে‌ষ্টা করবেন;বস্তুত এ ধরনের পরিচয় এবং এরূপ সাহচর্য স্বাভাবিকভাবে আপনাদের মনে এ খেয়াল জাগিয়ে দেয় যে, আপনারা সকলেই একটি জাতির অন্তর্ভুক্ত একই ফৌজের সিপাহী আপনারা। আপনারা একে অপরের ভাই। দুনিয়ায় আপনাদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক, আপনাদের লাভ-লোকসানে সকলেই আপনারা শরীক ও আপনাদের পরস্পরের জীবন একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত।

আপনারা যখন পরস্পরের দিকে তাকাবেন তখন ঠিক চোখ-মন অন্তর খুলে উদার দৃষ্টিতে তাকাবেন। শত্রু যে দৃষ্টিতে দেখে থাকে আপনারা কারো প্রতি সেভাবে তাকান না বরং বন্ধু যেরূপ বন্ধুর দিকে তাকায়,ভাই যে চোখে ভাইয়ের দিকে তাকায়, ঠিক সেই দৃষ্টিতেই একজন অপরজেনের প্রতি তাকিয়ে থাকেন। এভাবে তাকাবার ফলে আপনি যখন কোন ভাইকে পুরাতন ও ছেড়া কাপড় পরিহিত দেখতে পাবেন, কাউকে বিশেষ চিন্তিত বিপদগ্রস্ত বা ক্ষুধার্ত দেখবেন,কাউকে দেখবেন অক্ষম-পঙ্গু,পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও অন্ধ তখন অপনার অন্তরে আপনা আপনিই সহানভুতি ও দয়ার উদ্রেক হবে। অপনারা ধনী লোকেরা গরীব ও অসহায় দুঃস্থদের দুঃখ অনুভব করবেন, ফকীর-মিসকিন লোকেরা ধনীদের কাছে পৌঁছে নিজেদের দুরবস্থার কথা বলার সাহস পবে। কারো সম্পর্কে যদি আপনি জানতে পারেন, যে সে অসুস্থ কিংবা বিপদগ্রস্ত বলে মসজিদে আসতে পারেন নি তখন তাকে দেখতে যাবার জন্য আপনার মনে আগ্রহ হবে। কারো মৃত্যুর সংবাদ পেলে জানাযা পড়তে যেতে পারেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করতে পারেন। বস্তুত এ কাজই আপনাদের পরস্পরের মধ্যে গভীর ভালবাসা ও সহানুভূতি সৃষ্টি করবে।

আর একটু ভেবে দেখুন — অপনারা যেখানে একত্র হন তা একটি পাক পবিত্র স্থান। এ পাক স্থানে মহান উদ্দেশ্য নিয়ে আপনারা একত্রিত হয়ে থাকেন। চোর-ডাকাত, শরাবী আর জুয়াড়ী দলও একস্থানে একত্র হয় বটে;কিন্তু তাদের সকলের মন অসৎ ইচ্ছায় পরিপূর্ণ থাকে। কিন্তু আপনাদের সমবেত হওয়াকে এদের সাথে তুলনা করা যায় না। কারণ এখানে আল্লাহর খাঁটি বান্দাগণই একত্রি হয়ে থাকেন — আল্লাহর ইবাদাতের জন্য আপনাদের এ সম্মেলন আল্লাহর ঘরে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।আল্লাহর সামনে বন্দেগী ও দাসত্বের খালেছ মনে স্বীকার করার জন্যই এখানে সকলে সমবেত হন। এমতাবস্থায় ঈমানদার লোকদের মনে আপনা আপনি নিজ নিজ গুনাহের জন্য লজ্জার অনুভূতি জেগে উঠে। অন্য দিকে যদি কোন মানুষ অন্য কারো সামনে কোন গুনাহের কাজ করে থাকে, আর সেই ব্যক্তি যদি মসজিদে হাজির হয়, তাহলে কেবল এতেই গুনাহগার ব্যক্তি লজ্জায় মরে যায়। উপরন্তু মুসলমানদের মনে পরস্পরকে উপদেশ দেয়ার ভাবও যদি বর্তমান থাকে এবং সে যদি দরদ ভালবাসা ও সহানুভূতির সাথে একজনের দোষত্রুটি কেমন করে দূর করা যায়, তা ভাল করে জেনে নেয়, তবে তাদের এ সম্মেলনের প্রতি আল্লাহর অশেষ রহমত ও বরকত নাযিল হবে— তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এভাবে জামায়াতে নামায পড়ার সুযোগে এক মুসলমান অন্য মুসলমানের দোষ-ত্রুটি সংশোধন করতে পারবেন— একজন অন্যজনের অভাব পূরণ করবেন। ফলে ধীরে ধীরে গোটা সমাজই সৎ‌ ও নেককার হতে পারবে।

মসজিদে কেবল মিলিত হওয়ার মধ্যেই এ বিরাট বরকত রয়েছে। এরপর জামায়াতের সাথে নামায পড়ার উপকারিতা ও বরকত যে কত অসীম তাও ভেবে দেখুন। নামাযীগণ সকলে একই সারিতে সমানভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাদের কেউ বড় নয়, কেউ ছোট নয়, কেউ উচ্চ নয়, কেউ নীচু নয়- আল্লাহর দরবারে, আল্লাহর সামনে সকল মানুষ একেবারে সমান। কারো হাত লাগলে বা কারো স্পর্শ লাগলে তাদের কেউ নাপাক হয়ে যায় না। এখানে অস্পৃশ্যতার কোনো অবকাশ নেই। তাদের সকলেই পাক এবং পবিত্র;কারণ এরা সকলেই মানুষ, সকলেই এক আল্লাহর বান্দাহ: একই দ্বীন ইসলামের অনুগামী। এ নামাযীদের মধ্যে বংশ, পরিবার, গোত্র, দেশ আর ভাষায় আদৌ কোনো পার্থক্য নেই। ব্যক্তিগতভাবে এদের কেউ সাইয়েদ, কেউ পাঠান, কেউ খাঁ সাহেব, কেউ হাওলাদার আর কেউ চৌধুরী সাহেবও হতে পারেন। আবার এদের একজন হয়ত এক দেশের অধিবাসী আর একজন অন্য দেশের অধিবাসী। কেউ এক ভাষায় কথা বলে, কেউ অন্য ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে এসব পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তার সকলে একই সারিতে দাঁড়িয়ে মিলিতভাবে আল্লাহর ইবাদাত করে। এর অর্থ এই যে, তারা সকলেই এক জাতির লোক। এখানে বংশ-গোত্র, দেশ-অঞ্চল ও জাতীয়তার প্রভেদ পার্থক্য একেবারে মিথ্যে। মানুষের পরস্পরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সম্পর্ক হচ্ছে আল্লাহর বন্দেগী, আল্লাহর ইবাদাত। এ ব্যাপারে আপনারা সকলেই যখন এক তখন অন্যান্য ব্যাপারেও আপনাদের ভিন্ন ভিন্ন ও বিচ্ছিন্ন হওয়ার কোনোই কারণ থাকতে পারে না।

আপনারা যখন সারি বেঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ান, তখন মনে হয় যেন একটি বিরাট সৈন্যবাহিনী বাদশাহের সামনে কর্তব্য পালনের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। কাতার বেঁধে দাঁড়ানোর এবং একত্রে মিলে ওঠাবসা করায় নামাযীদের মনে পরম ঐক্যভাবের সৃষ্টি হয়। এভাবে নামাযের ভিতর দিয়ে সকলকে আল্লাহর বন্দেগী করার অভ্যাস করানো হয়-তাদের সকলের হাত একত্রে ওঠবে, সকলের পা এক সাথে চলবে। তাতে পরিস্কার মনে হবে যে, নামাযীরা বিশজন কিংবা একশজন নয়-তারা একত্রে মিলে একটি অখন্ড মানুষে পরিণত হয়েছে।

জামায়াত ও কাতারবন্দী হওয়ার পরে কি করা হয়? সকল নামাযী একই ভাষায় আল্লাহর সামনে একই আরয জানায়: اِيَّاكَ وَاِيَّاكَ نَسْتَعِيْنُ হে আল্লাহ আমরা কেবল তোমারই ইবাদাত করি এবং কেবল তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। اِهْدِنَا الصِّرَاظَ الْمُسْتَقِيْمَ হে আল্লাহ আমাদেরকে সহজ সঠিক পথ দেখাও। رَبِّنَا لَكَ الْحَمْدُ হে আল্লাহ! সব তারীফ প্রশংসা কেবল তোমারই জন্য। اَلسَّلاَمُ عَلَيْنَا وَعَلى عِبَادِ اللهِ الصَّالِحِيْنَ ـ আমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের উপরও। তারপরে নামায শেষ করে একে অপরকে এ বলে সালাম করে اَلسَّلاَمُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ ـ এর অর্থ এই যে,নামাযীদের প্রত্যেকেই পরষ্পর কল্যাণকামী এবং সকলে মিলে একই মালিকের কাছে সকলের মঙ্গল দাবী করছে। কোনো নামাযী একাকী নয়, তাদের কেউই কেবলমাত্রই নিজের জন্য কল্যাণ কামনা করে না। বরং সকলের মুখে এ দোআ যে, হে আল্লাহ! আমাদের সকলেরই প্রতি তোমার অনুগ্রহ ও কল্যাণ বর্ষিত হোক, সকলকে একই সহজ ও সোজা পথে চলার তৌফিক দাও, সকলের ওপরেই শান্তি বর্ষিত হোক। নামায এভাবে সকল নামাযীর দিলকে পরস্পরের সাথে মিলিয়ে দেয়, সকলের মনে একই খেয়াল ও একই চিন্তাধারা জাগরিত করে,তাদের পরস্পরের মধ্যে গভীর ভালবাসা,ঐক্য ও মংগলাকাংক্ষার সৃষ্টি হয়।

কিন্তু মনে রাখবেন,জামায়াতের সাথে নামায ইমাম ছাড়া পড়া যায় না। দু’জন মিলে পড়লেও তাদের মধ্যে একজনকে ইমাম ও অপরজনকে মোকতাদী হতে হয়। জামায়াত শুরু হলে তা থেকে আলাদা হয়ে একাকী নামায পড়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বরং হুকুম রয়েছে যে, জামায়াত আরম্ভ হওয়ার পর যেই আসবে, তাকে সেই ইমামের পিছেনেই (একতেদা করে) দাঁড়াতে হবে। এসব কাজ কেবল নামাযের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, আসলে এটা দ্বারা একটি বড় শিক্ষা এই দেয়া হচ্ছে যে, মুসলমান হিসেবে জীবন যাপন করতে হলে এভাবে জামায়াতবন্দী হয়ে থাকতে হবে। আর আপনাদের মধ্যে একজন যদি ইমাম না হয় তাহলে আপনাদের সেই জামায়াত গঠনই হতে পারে না। জামায়াত গঠন হওয়ার পরেও তা থেকে আলাদা হয়ে থাকলে আপনাদের জীবন মোটেই ইসলামী জীবন নয়। মুসলিম জীবনরে সাথে এর আদৌ সম্পর্ক নেই।

এখানেই শেষ নয়। জামায়াতের সাথে নামায পড়ার মাধ্যমে ইমাম ও মোকতাদীদের মধ্যে একটা বিরাট মযবুত সম্পর্ক সৃষ্টি হয়-যার সাহায্যে প্রত্যেকটি মুসলমানই জানতে পারে যে, এ ছোট্ট মসজিদের বাইরে পৃথিবী নামক বিরাট মসজিদে “ইমামের” মর্যাদা কি? তার কর্তব্য কি? তাঁর কি কি “হক” আছে? সেই “বড় মসজিদের” ইমামের অনুসরণ আপনাকে কিভাবে করতে হবে, সে ভুল করলে আপনি কি করবেন? তার ভুলকে আপনি কতক্ষণ বরদাশত করবেন? কখন আপনি তার ভুল ধরতে পারবেন? আর তা শোধরাবার দাবী করতে পারবেন? আর কোন অবস্থায় ইমামকে পদচ্যুত করতে পারবেন? এ সমস্ত কথা

ছোটখাটোভাবে প্রত্যেক মুসলিমকে মসজিদের মধ্যে জামায়াতের সাথে নামায পড়ার ভিতর দিয়ে শিক্ষা দেয়া হয়। এক কথায় মসজিদে একটি ছোটখাট রাজ্য চালাবার নিয়ম-কানুন দৈনিক পাঁচবার শিক্ষা দেয়া হয় এবং তার অভ্যাস করানো হয়।

একথাগুলো বিস্তারিতভাবে বলার অবকাশ এখানে নেই। সংক্ষেপে কয়েকটি প্রয়োজনীয় কথা বলে রাখছি।

শরীয়াতের আদেশ এই যে, সমাজের লোকদের মধ্যে যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশী পরহেযগার হবে, ইলম যার বেশী হবে কুরআন শরীফ যে সকলের অপেক্ষা ভাল করে পড়তে ও বুঝতে পারবে এবং সেই সাথে যার উপযুক্ত বয়স হয়েছে, ঠিক তাকেই নামাযের ইমাম বানাতে হবে। কর্মক্ষেত্রে যারা জাতির নেতা হবে তাদের মধ্যে কি কি গুণ থাকা অবশ্য দরকার-উক্ত ব্যবস্থা দ্বারা পরিস্কারভাবে তারই শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

শরীয়াত আদেশ করেছে যে, জামায়াতের অধিকাংশ লোক যাকে ইমাম বানাতে রাজী নয় তাকে ইমাম নিযুক্ত করা অনুচিত। অল্পসংখ্যক লোকের অসম্মতি ধর্তব্য নয়, কারণ তা হয় না এমন লোক কখনো পাওয়া যায় না। কিন্তু জামায়াতের অধিকাংশ লোক যদি কোন ব্যক্তিকে অপছন্দ করে, তবে তাকে কিছুতেই ইমাম নিযুক্ত করা যেতে পারে না। এর দ্বারা জাতির ইমাম বা নেতা নির্বাচন করার নিয়ম শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

শরীয়াতে ব্যবস্থা করা হয়েছে যে, নামাযের ইমাম এমন ব্যক্তিকে বানাতে হবে, যে সকল নামাযীর অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে নামায পড়বে। কারণ নামাযীদের মধ্যে অনেক রুগ্ন, বৃদ্ধ, অসুস্থ আর দুর্বল লোকও থাকতে পারে। এমতাবস্থায় কেবল যুবক, শক্তিমান আর অবসর বিশিষ্ট মানুষদের প্রতি লক্ষ্য রেখে নামাযে লম্বা লম্বা কেরাত পড়লে এবং লম্বা লম্বা রুকূ সেজদা করতে থাকলে অন্যের পক্ষে অনেক কষ্ট ও অসুবিধা হতে পারে। তাই ইমামের মনে রাখতে হবে যে, নামাযীদের মধ্যে অনেক বৃদ্ধ আছে, রুগ্ন ও দুর্বল ব্যক্তি আছে, এবং এমন অনেক লোক আছে যারা তাড়াতাড়ি নামায পড়ে নিজ নিজ কাজে ফিরে যেতে চায়। হযরত নবী করীম (সা) এ ব্যাপারে অনেক সহানুভূতি দেখিয়েছেন। নামায পড়াবার সময় কোন শিশুর কান্নার আওয়ায শুনতে পেলেও তিনি নামায অনেক সংক্ষেপ করতেন। কারণ শিশুর মাতা (কিংবা পিতা) এ জামায়াতে শরীক থাকলে তার মনে কষ্ট হতে পারে-তাই নামাযের ব্যাঘাত হতে পারে। এ নিয়ম দ্বারা জাতির নেতৃবৃন্দকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, তাকে যখন “নেতা” বানানো হয়েছে তখন প্রত্যেক কাজেই জাতির সকল প্রকার লোকের প্রতি তার লক্ষ্য থাকা বাঞ্চনীয়। শরীয়াতের ব্যবস্থা এই যে, নামায পড়াবার সময় ইমামের যদি এমন কোনো অবস্থা হয়, যাতে সে আর নামায পড়াতে পারছে না, তাহলে অবিলম্বে তার সরে গিয়ে অন্য এক ব্যক্তিকে ইমাম পড়াতে পারছে না, তাহলে অবিলম্বে তার সরে গিয়ে অন্য এক ব্যক্তিকে ইমাম করে দেয়া আবশ্যক। এ থেকে এ নির্দেশ পাওয়া যায় যে, জাতির নেতা যখন নিজ কর্তব্য পালনে অক্ষম হবে, তখন সে নিজেই পদত্যাগ করে অন্য কোনো উপযুক্ত লোককে সেখানে নিযুক্ত করার ব্যবস্থা করবে। এটা করা তার পক্ষে ফরয। এ কাজে তার কোনো লজ্জা হওয়া উচিত নয়, এতে স্বার্থপরতাও নয়।

শরীয়াতের আদেশ এই যে, ইমাম যা করবে মোকতাদীগণও তার অনুসরণ করতে বাধ্য থাকবে। ইমামের কোনো কাজ করার আগে মোকতাদীর তা করা একেবারে নিষিদ্ধ। এমনকি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “ইমামের আগে কেউ রুকূ বা সিজদা করলে কিয়ামতের দিন তাকে গাধা বানিয়ে ওঠানো হবে”। নেতাকে অনুসরণ করে চলা অবশ্য কর্তব্য এখানে মুসলিম জাতিকে তাই শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

নামাযের মধ্যে ইমাম কোনো ভুল করলে অর্থাৎ যখন দাঁড়ান দরকার তখন বসলে, কিংবা যখন বসা দরকার তখন দাঁড়ালে “সুবহানাল্লাহ” বলে তার ভুল ধরে দেয়া মোকতাদীগণের পক্ষে অবশ্য কর্তব্য। “সুবহানাল্লাহ” অর্থ হচ্ছে “আল্লাহ তাআলা পাক ও মহান”। ইমামের ভুল ধরার সময় সুবহানাল্লাহ বলার তাৎপর্য এই যে, কেবল আল্লাহ তাআলাই সকল প্রকার ভুল-ত্রুটি হতে পবিত্র; তুমি মানুষ, তোমার ভুল হওয়া কোনো অসম্ভব ব্যাপার নয়। ইমামের ভুল ধরার জন্য ইসলামে এটাই নিয়ম করা হয়েছে।

এ নিয়মে যখনই ইমামের ভুল ধরা হবে, তখন কোনো প্রকার লজ্জা-শরমের প্রশ্রয় না দিয়ে তার নিজ ভুল সংশোধন করে নেয়া উচিত। অবশ্য ভুল ধরে দেয়ার পরেও ইমাম যদি নিসন্দেহে মনে করে যে, তার কোন ভুল হয়নি সে ঠিক কাজ করেছে, তখন সে নিজ বিশ্বাস অনুসারে যতারীতি নামায সমাধা করবে। এমতাবস্থায় জামায়াতের লোকদের পক্ষে ইমামের ভুলকে ভুল মনে করেও তার অনুসরণ করা কর্তব্য। নামায শেষ হওয়ার পরে ইমামের সামনে তার ভুল প্রমাণ করে পুনরায় নামায পড়াবার দাবী করার অধিকার সকল নামাযীরই আছে।

ইমামের সাথে জামায়াতের লোকদের এরূপ ব্যবহার মাত্র ছোটখাট ভুলের ব্যাপারে হবে। কিন্তু ইমাম যদি নবীর সুন্নাতের খেলাফ নামায পড়াতে শুরু করে কিংবা নামাযের মধ্যে জেনে বুঝে কুরআন শরীফ ভুল পড়ে অথবা নামায পড়াবার সময় কোনো কুফরী, শিরকী বা প্রকাশ্য গুনাহের কাজ করে বসে-তখন নামায ছেড়ে দিয়ে সেই ইমাম পরিত্যাগ করা প্রত্যেক নামাযীর পক্ষেই ফরয।

মুসলমান সমাজকে জাতীয় জীবনে তাদের নেতাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করতে হবে, নামায সম্পর্কে শরীয়াতের এসব হেদায়াত দ্বারা তা চমৎকারভাবে শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

জামায়াতের সাথে নামায পড়ার যেসব স্বার্থকতা ও সুফলের কথা এখানে বলা হলো-তা দ্বারা আপনারা পরিস্কারভাবে জানতে পারলেন যে,আল্লাহ তাআলার এ একটি কথা মাত্র ইবাদাত-যা দিন ও রাতে পাঁচবার মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য করতে হয়-তাতে মুসলমানদের জন্য দুনিয়া আখেরাতে সকল স্থানেই বড় কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তা দ্বারা বুঝতে পারা যায় যে,মাত্র এ একটি জিনিস মুসলমানকে যথার্থ ভাগ্যবান করে দিতে পারে এবং এটা কেমন করে মুসলমানকে আল্লাহর গোলামী এবং দুনিয়ায় নেতৃত্ব করার জন্য তৈরি করে দেয়। এখন আপনাদের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে যে,নামায যখন সকল কল্যাণে পরিপূর্ণ তখন বর্তমান সময় এর এতসব কল্যাণ কোথায় গেল? এ প্রশ্নের জবাব পরবর্তী প্রবন্ধে দেয়া হবে ইনশাআল্লাহ।

নামাযের ফল পাওয়া যায় না কেন ?

পূর্বের প্রবন্ধগুলোতে নামাযের যে উপকারিতা ও সুফল দানের কথা আমি নানাভাবে ব্যক্ত করেছি, সেই নামায থেকে বর্তমানে লোকেরা সেই রকম সুফল লাভে সক্ষম হচ্ছে না, এখানে এ প্রশ্নের জবাব দিতে চেষ্টা করবো। বর্তমান যুগে নামায পড়ার পরেও মুসলমান এত লাঞ্চিত ও দুর্বল কেন, তাদের চরিত্র উন্নত হচ্ছে না কেন, একটি অপরাজেয় শক্তিধর আল্লাহর সেনাবাহিনীতে পরিণত হচ্ছে না কেন, দুনিয়ার মধ্যে কাফেরদের বিপক্ষে তারা এত শক্তিহীন ও অবহেলিত কেন? এটা সত্যিই একটি কঠিন প্রশ্ন।

এ প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব এ হতে পারে যে, মুসলমানগণ আসলে নামাযই পড়ে না, আর পড়লেও ঠিক সেভাবে এবং সেই নিয়মে পড়ে না, যেভাবে আর যে নিয়মে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল পড়তে আদেশ করেছেন। কাজেই যে নামায ঈমানদার ব্যক্তিকে উন্নতির চরম সীমায় পৌঁছাতে পারে, আজিকার মুসলমানগণ বর্তমানের এ নামায হতে সেরূপ সুফল লাভের আশা করতে পারে না। কিন্তু আমি জানি, এতটুকু সংক্ষিপ্ত জবাবে আপনারা পরিতৃপ্ত হবেন না। কাজেই একটু বিস্তারিতভাবেই এর জবাব দেয়া আবশ্যক।

এই যে (মসজিদে) একটি দেয়াল ঘড়ি ঝুলছে, আপনি জানেন যে, এতে অনেক যন্ত্রাংশ একটি অন্যটির সাথে জড়িত রয়েছে। এতে যখন চাবি দেয়া হয়, তখন প্রত্যেকটি যন্ত্রাংশ নিজ নিজ কাজ শুরু করে এবং সেই সাথে বাইরের কাঁটায় ভিতরের যন্ত্রাংশগুলোর কাজের ফল প্রকাশ হতে থাকে। অর্থাৎ দু’টি কাঁটা ঘুরে ঘুরে সেকেন্ডর পর সেকেন্ড মিনিটের পর মিনিট বানিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বানাতে থাকে। এখন চিন্তা করে দেখুন, ঘড়ি বানাবার উদ্দেশ্য কি? ঠিকভাবে সময় জানানই যে তার একমাত্র উদ্দেশ্য, একথা সকলেই জানেন। এজন্যই সঠিক সময় নির্দেশ করতে পারে এমন সব ছোট ছোট যন্ত্রাংশ এর মধ্যে একত্র করা হয়েছে। তারপর সেগুলোকে পরস্পর জুড়ে দেয়া হয়েছে। যেন সবগুলো মিলে যথারীতি চলতে থাকে এবং প্রত্যেকটি অংশ যেন সঠিক সময় জানাবার জন্য যতটুকু কাজ করা দরকার ঠিক ততটুকু কাজ করে-বেশী নয়, কমও নয়। পুনরায় তাতে চাবি দিবার নিয়ম করা হয়েছে। কেননা, চাবি না দিলে যন্ত্রাংশগুলো থেমে যাবে, তা সঠিকভাবে কাজ করতে পারবে না। তাই নির্দিষ্ট সময়ের পরে চাবি দিয়ে তাকে গতিশীল করে দেয়া হয়। ফলে সবগুলো যন্ত্রাংশ চলতে শুরু করে। এগুলোকে যখন ঠিকভাবে জুড়ে দেয়া হয় এবং তাতে চাবি দেয়া হয়, ঠিক তখনই যে উদ্দেশ্যে তা তৈরী হয়েছে তা এ ঘড়ি দ্বারা লাভ করা যেতে পারে। কিন্তু যদি ঠিকমত চাবি দেয়া না হয়, তবে তা ঠিকভাবে সময় নির্দেশ করতে পারবে না। যদি চাবি দেয়াও হয়, কিন্তু নিয়মানুসারে না দেয়া হয়, তাহলে ঘড়ি বন্ধ হয়ে যাবে কিংবা চললেও ঠিকমত সময় নির্দেশ করতে পারবে না। যদি এর কোন কোনো অংশ বের করে দিয়ে চাবি দেয়া হয়, তবে সে চাবি দেয়ায় কোনো ফলই হবে না। আর যদি এর কোনো অংশ বের করে সেখানে সিঙ্গার সেলাই মেশিনের অংশ লাগিয়ে দেয়া হয় এবং চাবি দেয়া হয়, তথাপি তা সময় নির্দেশ করতে পারবে না; ওদিকে কাপড় সেলাই করার কাজও তার দ্বারা সম্ভব হবে না। এর সবগুলো যন্ত্রাংশ যদি একটিকে অন্যটি থেকে আলাদা করে এর মধ্যে রাখা হয়, তবে চাবি দিলেও তা চলবে না। প্রকাশ্যভাবে দেখতে গেলে তো বলতে হবে যে, ঘড়ির সব যন্ত্রাংশই এর মধ্যে আছে, কিন্তু যন্ত্রাংশ কেবল এর মধ্যে থাকলেই তো আর এর উদ্দেশ্য হাসিল হতে পারে না। কারণ, এদের পরস্পরের সাথে কোন যোগ নেই এবং শ্রেণীবিন্যাস করে সেগুলোকে ঠিকমত সাজানও হয়নি। তাই সেগুলো পরস্পর চলতে পারছে না। এখানে যেসব অবস্থার কথা বলা হলো তাতে যদিও ঘড়িটি কোনো কাজ করবে না এবং তাতে চাবি দেয়া নিষ্ফল হবে তবুও বাইরের লোক তা দেখে কিছুই বুঝতে পারবে না যে,এটা ঘড়ি নয় বা এতে রীতিমত চাবি দেওয়া হচ্ছে না। তারা তো বলবে যে , এটা দেখতে ঠিক ঘড়ির মতোই এবং সে জন্য ঘড়ি দ্বারা যে উদ্দেশ্য লাভ হয়, তাই পাওয়ার আশা করবে এজন্যই দূর থেকে তারা যখন দেখবে যে, আপনি ঘড়িতে ঠিক মত চাবি দিচ্ছেন, কাজেই ঘড়ি দ্বারা যেসকল সুফল লাভ করা যায় তা হতেও ঠিক তাই পাওয়ার আশা করবে। কিন্তু এর ভিতর যখন ঘড়ির ঠিক অবস্থা বর্তমান নেই তখন বাহির থেকে ঘড়ির মত দেখালে কি হবে? এর দ্বারা আসল ঘড়ির কাজ পাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।

ঘড়ির যে উদাহরণ আপনাদের সামনে পেশ করলাম, তা দ্বারা আপনারা সমস্ত ব্যাপারটা পরিস্কারভাবে বুঝতে পারলেন। ইসলামকে এ ঘড়ির মত মনে করুন, ঘড়ির উদ্দেশ্য যেমন সঠিক সময় নির্দেশ করা, তেমনি ইসলামেরও উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ এ দুনিয়াতে আল্লাহর খলীফা- আল্লাহর সৈনিকরূপে বসবাস করবে। নিজেরা আল্লাহর হুকুম অনুসারে চলবে, অন্যকেও আল্লাহর বিধানের অধীন পরিচালিত করবে।

কুরআন শরীফে একথাটি পরিস্কার বলা আছে:

كُنْتُمْ خَيْرَ اُمَّةٍ اُخْرِجََتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَ تَنْهَوْنَ عِنْ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ ط ـ عمران:

তোমরা সেই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, যাদেরকে সমগ্র মানুষের কল্যাণের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমাদের কাজ এই যে, তোমরা সকল মানুষকে ন্যায় কাজের আদেশ করবে, সকল অন্যায় কাজ থেকে মানুষকে ফিরাবে এবং আল্লাহর প্রতি মযবুতভাবে ঈমান রাখবে। সূরা ইমরান: ১১০

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَكُمْ وَّسَطًا لَتِكُوْنُوْا شُهَدَا ءَ عَلَى النَّاسِ ـ

আর এরূপে আমরা তোমাদেরকে (সর্বশ্রেষ্ঠ) জাতিতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা সকল মানুষ সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে পার।

সূরা আল বাকারা:১৪৩

وَعَدَ اللهُ الَّذِيْنَ امَنُوْا مِنْكُمْ وَعَمِلُوْا الصلِحتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِيْ الاَرْضِ النُوْر: 55

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনবে এবং নেক কাজ করবে তাদের কাছে আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, নিশ্চয়ই তিনি তাদের যমীনের বুকে তার খলীফা বানাবেন। সূরা আন নূর: ৫৫

وَقَاتِلُوْهُمْ حَتّى لاَتَكُوْنَ فِتْنَةٌ وَّيَكُوْنَ الدِّيْنُ كُلُّهُ لِلَّهِ ـ

এই কাফেরদের সাথে লড়াই করো, যেন শেষ পর্যন্ত ফেতনা খতম হয়ে যায় এবং দ্বীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহরই জন্য হয়ে যায়। সূরা আনফাল: ৩৯”এ উদ্দেশ্য সফল করার জন্য ঘড়ির যন্ত্রাংশের ন্যায় ইসলামেও অনেক কলকব্জা জমা করা হয়েছে। ইসলামের আসল উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সেগুলো যেমন দরকারী, তেমনি পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণও। ইসলামের মৌলিক মতবাদ, আকায়েদ, নৈতিক চরিত্রের নিয়ম-নীতি, কাজ-কারবার, আদান-প্রদানের কায়দা-কানুন, আল্লাহর হক, মানুষের হক, নিজের হক আর দুনিয়ার অন্য যেসব জিনিসের সাথে মানুষের সম্পর্ক রয়েছে সেগুলোর হক, কামাই-রোযগার এবং খরচ করার রীতিনীতি, যুদ্ধ-জিহাদের নিয়ম-পন্থা, সন্ধি-সমঝোতার নিয়ম প্রণালী, রাষ্ট্র পরিচালনার বিধান-পদ্ধতি এবং ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনতা স্বীকার করে বসবাস করার নিয়ম-এসবগুলোই ইসলামের অঙ্গ-ইসলামের ছোট ছোট যন্ত্রাংশ এবং এগুলোকে ঘড়ির যন্ত্রাংশের ন্যায় একটির সাথে অন্যটিকে এমনভাবে জুড়ে দেয়া হয়েছে যে, চাবি দিলেই তার সবগুলো ঠিকভাবে চলতে শুরু করে-আর এগুলো মিলিতভাবে চলার ফলে এর আসল উদ্দেশ্য ইসলামের প্রাধান্য ও প্রভুত্ব এবং দুনিয়ায় আল্লাহর বিধানের প্রতিষ্ঠা এমন সুন্দর ও ধারাবাহিকভাবে লাভ হতে থাকে, যেমন ঘড়ির যন্ত্রগুলো চলার ফলে বাইরের সময় নির্দেশকারী কাঁটা সঠিক সময় জ্ঞাপন করে। ঘড়ির বিভিন্ন অংশগুলোকে পরস্পর জুড়ে দেবার জন্য কয়েকটি লোহার পাত ও ছোট ছোট লোহার কাঁটা ব্যবহার করা হয়েছে। ঠিক তেমনি ইসলামের বিভিন্ন কাজকে পরস্পরের সাথে যুক্ত রাখার জন্য এবং সেগুলোর সামঞ্জস্যপূর্ণ শ্রেণী বিন্যাস করার জন্য জামায়াত গঠনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মুসলমানদের এ জামায়াতের এমন একজন নেতা হবে যার মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও বোধশক্তি এবং তাকওয়া-পরহেযগারীর বৈশিষ্ট্য বর্তমান থাকবে; জামায়াতের কর্মীগণ তার কথা মেনে চলবে, তার কথা অনুসারে কাজ করবে। নেতা তাদের মিলিত শক্তির সাহায্যে লোকদের ওপর ইসলামী আইন জারী করবে এবং তাদের ইসলামী আইনের বিরোধিতা হতে বিরত রাখবে। এভাবে ইসলামের সবগুলো অংশ যখন পরস্পর যুক্ত হবে সেগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ শ্রেণীবিন্যাস কায়েম করা হবে, তখন তাতে গতি আনার জন্য সেগুলোকে ঠিকমত চালাবার জন্য তাতে চাবি দেয়া আবশ্যক হয়। বস্তুত ইসলামী জীবনব্যবস্থায় নামায সেই চাবির কাজ করে। দিন-রাত পাঁচবার করে এ এ চাবি দেয়ার কাজ করতে হয়। তারপর এ ঘড়িকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করাও দরকার। সে জন্য রোযা ফরয করা হয়েছে। বছরে একবার করে ত্রিশ দিনের জন্য এটা সেই কাজ সমাধা করে। এ ঘড়িতে তেল দেয়া আবশ্যক, বছরে একবার যাকাত আদায় করে এ তেল দেয়ার কাজ করা হয়। এ তেল বাইর থেকে আমদানী করা হয় না, এ ঘড়িরই কোনো অংশ এটা তৈরি করে এবং অন্যান্য শুকনা অংশগুলোকে চলাবার যোগ্য করে দেয়। ঘড়িকে মাঝে মাঝে “ওভারহল” করারও দরকার হয়, জীবনে একবার হজ্জ করলে এ ওভারহলিং এর কাজ সম্পন্ন হয়।

এখন সকলেই বুঝতে পারেন, এ চাবি দেয়া, পরিস্কার করা, তেল দেয়া এবং ওভারহলিং করা ঠিক তখনি সার্থক হতে পারে, যখন এ ঘড়ির মধ্যে কেবল ঘড়িরই অংশগুলো পরস্পর যুক্ত ও সুবিন্যস্ত থাকবে, যেভাবে ঘড়ির নির্মাতা তা সাজিয়ে দিয়েছে। ঠিক এমন অবস্থায় চাবি দিলেই তা সঠিকভাবে চলতে পারে এবং ঠিকমত সময় নির্দেশ করতে পারে। একটু চিন্তা করলে বুঝতে পারবেন যে, বর্তমান সময় ইসলামের অবস্থা এদিক দিয়ে বড়ই খারাপ। প্রথমত যে জামায়াত গঠনের সাহায্যে ইসলামের সমস্ত অংশ পরস্পর জুড়ে দেয়া হয়েছিল, সেই জামায়াতের অস্তিত্ব এখন নেই। ফলে সব অংশগুলোই আলাদা আলাদা হয়ে গেছে। ঐক্য শক্তি বিলুপ্ত হয়েছে। এখন যার যা ইচ্ছা সে তাই করে যাচ্ছে। কেউ বাধা দেবার নেই, সঠিক পথ দেখাবার কেউ নেই। ইচ্ছা হলে ইসলামের আইন মেনে চলে, না হয় ইসলাম ত্যাগ করে ভিন্ন পথ অনুসরণ করে। আজকের মুসলমান এখানেই ক্ষান্ত হয়নি। বরং তারা এ ঘড়ির অনেকগুলো অংশ বের করে নিজ নিজ ইচ্ছামত অনেক অংশ এতে যোগ করেছে, যা কোনক্রমেই এ ঘড়ির অংশ হতে পারে না। কেউ “সিঙ্গার মেশিনের” অংশ ঢুকিয়ে দিয়েছে, কেউ “আটা কলের” এক অংশ তাতে লাগিয়ে দিয়েছে, আবার কেউ কেউ মোটর গাড়ীর কতক অংশ নিজের পছন্দ অনুসারে সন্ধান করে এনে এতে জুড়ে দিয়েছে। এখন এর একদিকে মুসলমান, অন্যদিকে সুদী কারবার চালাচ্ছে, ইন্সিওরেন্স কোম্পানীতে জীবন বীমা করেছে, ইংরেজী আইনের ভিত্তিতে গড়া আদালতে মিথ্যা মোকদ্দমা চালাচ্ছে। কাফেরদের অনুগত হয়ে তাদের খেধমত করছে। নিজেদের মেয়ে, বোন আর স্ত্রীদেরকে মেম বানাচ্ছে। নিজেদের সন্তানদেরকে জড়বাদী শিক্ষা দান করছে। এদিকে মার্কস ও লেলিনের অনুকরণ করাচ্ছে এবং অন্যদিকে বৃটেন ও আমেরিকার নীতিও স্বীকার করাচ্ছে। মোটকথা, ইসলাম বিরোধী অসংখ্য জিনিস এনে স্বয়ং মুসলমানগণই ইসলামের এ ঘড়ির সাথে জুড়ে দিয়েছে।

এসব অবাঞ্ছনীয় কাজ করার পরও যদি কেউ আশা করে যে, চাবি দিলেই ঘড়ি ঠিকমত চলবে, আর যে উদ্দেশ্যে ঘড়ি বানানো হয়েছে, সেই উদ্দেশ্যও এটা দ্বারা হাসিল হবে, আর পরিচ্ছন্ন করে তেল দেয়া এবং ওভারহলিং করায় যে ফল পাওয়া উচিত, তাও যদি কেউ এটা দ্বারা পেতে চায়, তবে তাকে চরম নির্বোধ ছাড়া কি-ই বা বলা যেতে পারে। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই অনায়াসে বুঝা যায় যে, বর্তমানে এ ঘড়ির (ইসলামের) যে দশা হয়েছে, তাতে জীবন ভর চাবি দিলে, সাফ করলে এবং তেল দিতে থাকলেও এর আসল উদ্দেশ্য কিছুতেই হাসিল হতে পারে না। কাজেই যতক্ষণ পর্যন্ত অন্য মেশিনের অংশগুলো এর মধ্যে থেকে বের করা না হবে এবং সেই স্থানে এর আসল অংশগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত ঠিকভাবে সাজিয়ে দেয়া না হবে-প্রথম ঘড়ি প্রস্তুত করার সময় যেমন সাজান হয়েছিল-ততক্ষণ পর্যন্ত এর দ্বারা প্রকৃত উদ্দেশ্য লাভ করার কোনো আশাই করা যায় না।

বিষয়টি খুব ভাল করে বুঝে নেয়া আবশ্যক। মুসলমানদের নামায, রোযা এবং হজ্জ ও যাকাত সম্পূর্ণরূপে নিষ্ফল হওয়ার কারণ এটাই। প্রথমত তাদের মধ্যে খুব কম লোকই রীতিমত নামায আদায় করে, রোযা রাখে, যাকাত দেয় ও হজ্জ করে। জামায়াতী বন্ধন ও শৃংখলা চূর্ণ হয়ে যাওয়ার ফলে সমাজের প্রত্যেকটি মানুষ একেবারে স্বেচ্ছাচারী হয়ে গিয়েছে। ইসলামের এ ফরযগুলো কেউ আদায় করছে কিনা তা জিজ্ঞেস করার কেউ নেই। অতপর যারা তা আদায় করে তারাইবা কিভাবে আদায় করে। আজ জামায়াতের সাথে নামায পড়ার প্রচলন প্রায় নেই, কোথাও জামায়াতের ব্যবস্থা থাকলেও সেখানকার মসজিদে এমন লোককে ইমাম নিযুক্ত করা হয়, যার দ্বারা দুনিয়ার অন্য কোনো কাজ সমাধা হতে পারে না-সেই যোগ্যতা ও তার নেই। যারা মসজিদের রুটি খায়, দ্বীনি ফরয পালন করাকে যারা একটি রোযগারের উপায় বলে মনে করে, যারা জ্ঞান ও ইলমের ক্ষেত্রে পশ্চাদপদ, নৈতিক শক্তিহীন এবং চরিত্রের দিক দিয়ে বড় অনগ্রসর, অধিকাংশ সেই শ্রেণীর লোকদেরকেই ধরে মসজিদের ইমাম বানিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ সকল মুসলমানকে আল্লাহর খাঁটি খলীফা আর দুনিয়ায় আল্লাহর সৈনিকে পরিণত করার উদ্দেশ্যেই এ ইমাম নিযুক্তির নিয়ম করা হয়েছিল। এভাবে নামায, রোযা, যাকাত ও হজ্জের যে অবস্থা আজকাল হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়।

এতসব সত্ত্বেও অনেকে বলতে পারে যে, আজকাল অনেক মুসলমান ফরয আদায় করছে, আপন আপন কর্তব্য যথারীতি পালন করছে। কিন্তু ওপরে যেমন বলা হয়েছে, ঘড়ির কতক অংশ বের করে দিয়ে সেই স্থানে অন্য মেশিনের কতকগুলো অংশ জুড়ে দেয়ার পরে তাতে চাবি দেয়া না দেয়া, সাফ করা না করা এবং তেল দেয়া না দেয়া একই কথা-সবই একেবারে নিষ্ফল এবং অর্থহীন। দূর হতে দেখলে তো এটাকে ঘড়ি বলেই মনে হবে। বাহির থেকে কেউ দেখে অবশ্যই বলবে যে, এটাই ইসলাম এবং আপনারা মুসলমান। আপনারা যখন এ ঘড়িতে চাবি দেন বা তা সাফ করেন, তখন দূর থেকে দেখে লোকগণ মনে করে যে, আপনারা ঠিক মতই চাবি দিচ্ছেন আর সাফ করছেন। কেউ বলতে পারে না যে, এটা নামায নয়, এটা রোযা নয় কিন্তু এর ভিতরে যে কি আছে, তা বাহির থেকে যারা দেখবে তারা কেমন করে বুঝবে?

আজ মুসলমানদের দ্বীনি কাজ-কর্ম নিষ্ফল হচ্ছে কেন? তার মূল কারণ আমি আপনাদের সামনে স্পষ্টভাবেই প্রকাশ করলাম। একথাও বুঝিয়ে দিলাম যে, মুসলমানগণ নামায পড়ে আর রোযা রেখেও আল্লাহর সৈনিক হতে পারছে না কেন; বরং তারা কাফেরদের খাদেম ও অন্ধভাবে তাদের পদাংক অনুসরণকারী এবং নানাভাবে মযলুম হচ্ছে কেন? যদি কিছু মনে না করেন তাহলে এটা অপেক্ষাও অনেক দু:খের কথা আমি বলতে পারি। বর্তমান দুরবস্থার জন্য মুসলমানদের দিলে নিশ্চয়ই দু:খ বা কষ্ট আছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এটাও সত্য যে, বর্তমান মুসলমানদের মধ্যে হাজারে নয়শত নিরানব্বইজন বরং তার চেয়েও বেশী লোক এমন রয়েছে যারা এ দুরবস্থা দূর করার জন্য চেষ্টা করতে মোটেই রাজি নয়। ইসলামের এ “ঘড়ির” ভিতরের কলকব্জা পরষ্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং প্রত্যেকেই নিজেদের মর্জী মত এক একটা নূতন অংশ এতে লাগিয়ে দিয়েছে, একে সংশোধন করতে অর্থাৎ অন্য মেশিনের অংশগুলো বের করে এবং এর আসল অংশগুলোকে যথাযথ সাজিয়ে একে ঠিক করতে আজ মুসলমানগণ সম্পূর্ণ নারাজ। এমনকি, কেউ তা করতে চাইলেও এরা তাকে বরদাশত পর্যন্ত করতে পারে না। কারণ অন্য মেশিনের জিনিসগুলো যখন এর মধ্য থেকে বের করা হবে, তখন প্রত্যেকেরই প্রিয় জিনিস বের হয়ে যাবে। কিন্তু অপর লোকদের প্রিয় জিনিস বের হয়ে যাবে; আর নিজে বাইরের যে অংশ এতে জুড়ে দিয়েছে তা তাতে থাকতে দেয়া হবে, এটা তো হতে পারে না। এভাবে তার আসল অংশগুলো যখন ঠিকমত সাজিয়ে মযবুত করে বাঁধা হবে তখন সেই সাথে নিজেরাও বন্দী হয়ে পড়বে বলে এদের ভয় হচ্ছে। কেননা, সকলকে শক্ত করে বাঁধলে একজনকেও নিশ্চয়ই মুক্ত ও অবাধ রাখা যেতে পারে না। আর এমন কষ্টকর ব্যাপার যা ইচ্ছে করে সহ্য করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য তারা চায় যে, এ ঘড়ি যেমন আছে তেমনি ঝুলতে থাকুক, আর দূর হতে লোকের দেখে এটাকে ঘড়ি মনে করে প্রতারিত হতে থাকুক। পক্ষান্তরে যারা এহেন অকর্মণ্য ঘড়িকে অত্যন্ত ভালোবাসে, তারা এতে খুব ঘন ঘন চাবি দিতে আর একে সাফ করতেই মশগুল। কিন্তু কোনো দিন ভুলক্রমে এর অংশগুলো ঠিকমত সাজাতে এবং অন্য মেশিনের জিনিসগুলো বের করে ফেলতে প্রস্তুত হবে না, এটা সত্যই দু:খের কথা।

আমি যদি আপনাদের এরূপ মতে সায় দিতে পারতাম তাহলে কোনো কথা ছিল না। কিন্তু আমি তা পারছি না। যে সত্য আমি জানতে পেরেছি, তার বিরুদ্ধে কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি নিশ্চয় করে বলতে পারি, বর্তমান অবস্থায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সাথে তাহাজ্জুদ, এশরাক, চাশত প্রভৃতি নামাযও যদি পড়া হয়, পাঁচ ঘন্টা করে দৈনিক কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করা হয়, রমযান শরীফ ছাড়াও বছরে অবশিষ্ট এগার মাসের সাড়ে পাঁচ মাসও যদি রোযা রাখা হয় তবুও কোনো ফল হবে না। তবে ঘড়ির মধ্যে তার আসল কলকব্জা রেখে ঠিকমত সাজানোর পরে সামান্য একটু চাবি দিলেই তা চলতে থাকবে, আর সঠিকভাবে সময়ও নির্দেশ করতে পারবে। তখন খানিকটা সাফ করা আর কয়েক ফোটা তেল দিলেও অনেক সুফল লাভ করা যাবে। অন্যথায় সারাজীবন ভরে চাবি দিলেও এ ঘড়ি কখনো চলবে না এবং এর দ্বারা আসল উদ্দেশ্য লাভ করাও যাবে না।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.