ওহাবী আন্দোলন

বিপ্লবী আহমদউল্লাহ

১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বনিকের তুলাদন্ডধারী বিদেশী ইংরেজ জাতি মুসলমানদের তখত ও তাজ হস্তগত করে, এবং ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে মাত্র ৭০- ৮০ বছরের মধ্যে সমগ্র পাক- ভারত উপমহাদেশে নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন করে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজরা নিরঙ্কুশ ভাবে পাক- ভারতকে নিজেদের সম্রাজ্যে পরিণত করে।

কিন্তু মুসলমানরা সহজে ইংরেজদের সামনে নতি স্বীকার করেনি। বাঙলায় মীর কাশিম, অযোধ্যায় শুজাউদ্দউলা, মহীশুরে হায়দার আলী ও টিপু সুলতান প্রাণপণে ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করলেন এবং পদে পদে তাদের অগ্রগতিতে বাধা দিলেন। টিপু সুলতান যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা গেলেন, তবু মান দিলেন না। কেবল মুসলিম শাসকরাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হননি, সাধারন শ্রেণীর মুসলমানরাও বাণীয়ার জাতি ইংরেজকে প্রীতির চক্ষে দেখেনি। তারাও সংঘবদ্ধ হয়ে ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হয়েছিল। ওহাবী আন্দোলন পাক- ভারতীয় ইতিহাসে এক বিপ্লবাত্মক অধ্যায়, এবং এই উপমহাদেশের আজাদীর সংগ্রামে ওহাবীদের প্রাথমিক উদ্যম স্বর্ণাক্ষরে লিখার যোগ্য। উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকেই ভারতীয় ওহাবীরা জেহাদের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহন করেন এবং ক্রমাগত ইংরেজ রাজশক্তিকে সশস্ত্র আঘাত হানতে থাকে। ইতিহাসের সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে, ওহাবীরা আজাদীর যুদ্ধের পরও প্রায় ৫০০ বছর মহারাণীর সম্রাজ্যে বিপ্লব সজীব রেখেছিল। এবং একথা বললে মোটেই অত্যুক্তি হবেনা যে, বিশ শতকের ভারতীয় সন্ত্রাসবাদীরা তাদের অনুসৃত নীতি ও কর্মধারার একনিষ্ঠ অনুসারী ছিল।

ওহাবী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহন করেছিল সকল শ্রেনীর মুসলমান- চাষি, মুটে, মজুর, দরজী, কশাই, মওলবী, মায় সরকারী আমলা পর্যন্ত। সরকারী আমলার মধ্যে দফতরী থেকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহন করেছিলেন। আমরা এখানের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মওলবী আহমদউল্লাহর জীবনীর উপর আলোকপাত করবো।

আহমদউল্লাহর পিতার নাম ছিল মওলবী ইলাহী বখশ। পাটনার অন্তর্গত সাদিকপুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৮০৫ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে আহমদউল্লাহর জন্ম হয়। পাটনার প্রবীণ বাসিন্দাদের মতে পাটনা শহরের বর্তমান মিউনিসিপ্যালিটির সদর অফিস যেখানে অবস্থিত, এককালে সেখানে শমদউল্লাহ আরবী, ফারসী ও উর্দু ভাষায় উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ইংরেজী ভাষাতেও তার প্রচুর দখল ছিল। তার পিতা ইলাহী বখশ একজন মশহুর আলেম ও সুবক্তা ছিলেন। মশহুর ওহাবীনেতা হযরত সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর তিনি একজন পাক্কা মুরীদ ছিলেন, এবং নিজের তিন পুত্র ইয়াহয়া আলী ফয়েজ আলী ও আহমদউল্লাহকে তার মুরীদ করেন। আহমদউল্লাহ প্রথম যৌবনেই ইংরেজ সরকারের শিক্ষা বিভাগে নিযুক্ত হন। ১৮৫৩ সালের ৬ই জুন তারিখের ৩০১ নং হুকুমনামা অনুযায়ী তিনি পাটনায় জনশিক্ষা কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন।

হযরত সৈয়দ আহমদের নেতৃত্বে পাক- ভারতে যে বিরাট মুজাহিদ বাহিনী গড়ে উঠে, তার সঙ্গে সদস্য ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সে আমলের বহু মুসলমান জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে সকল শ্রেণীর মুসলমান ছিলেন- এমনকি ইংরেজ সরকারের চাকুরির কিংবা খাস কন্ট্রস্কটরগণও গোপনে গোপনে এই মুক্তি আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহন করতেন। তাদের স্বপ্ন ছিল ক্রমবর্ধমান শিখ ও ইংরেজ রাজশক্তিকে নির্মূল করে পাক- ভারতে পুনরায় মুসলিম হুকুমত কায়েম করা। ১৮২৯ সালে সৈয়দ আহমদের নেতৃত্বে যে বিরাট মুজাহিদ বাহিনী শিখদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে জেহাদ ঘোষণা করে তার মোট সংখ্যা ছিল প্রায় দুই লক্ষ। এই বিরাট বাহিনীর জন্য লোক ও অর্থ সংগ্রহ হয়েছিল পাক- ভারতের প্রায় প্রত্যেক দেশ থেকেই- বিশেষতঃ বাংলা- বিহার- উড়িষ্যা, যুক্তপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশ থেকে। এই সংগ্রহ কার্য চলতো একটা সুনিয়ন্ত্রিত গোপন প্রতিষ্ঠানের মারফত এবং তার কার্যপকলাপ এতোই সাবধানে এবং সংগোপনে চলতো যে, ইংরেজ সরকারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও ১৮৫২ সালের পুর্বে তার সন্ধান পায়নি। এই গোপন প্রতিষ্ঠানের কার্যকলাপ ও তার সঙ্গে মওলবী আহমদউল্লাহর যোগাযোগ কতখানি ছিল, তার কিছুটা প্রমাণ পাওয়া যায় তৎকালীন বাংলা সরকারের নিকট মিস্টার র‍্যাভেনস ৯- ৫- ৬৫ তারিখে যে রিপোর্ট দাখিল করেন তার ১৬২ পৃষ্ঠার নিম্নলিখিত বর্ণনা থেকেঃ

“১৮৫২ সালে পাঞ্জাবের কর্তৃপক্ষ একটা ষড়যন্ত্রমূলক চিঠি হস্তগত করে। হিন্দুস্তানী ধর্মান্ধরা [মুজাহিদ বাহিনী] শৈল শিখর থেকে ভারতীয় চতুর্থ রেজেমেন্টের সঙ্গে যে একটা গোলযোগ পাকাতে চেষ্টা করেচ্ছিল, তার প্রমাণ এ থেকে পাওয়া যায়। দেখা যায় যে, এই ষড়যন্ত্রের উৎপত্তি হয় পাটনায়, এবং যে চিঠি ধরা পড়ে তাতে জানা যায় যে, সাদিকপুর পরিবারের বহু মওলবী এবং অস্ত্রসজ্জিত বহু কাফেলা তখন সীমান্তের দিকে রওয়ানা দিএছে। পেশোয়ারের একখানা সাক্ষরহীন চিঠিতে জানা যায় যে, মওলবী বিলায়েত আলী, ইনায়েত আলী, ফয়েজ আলী ও ইয়াহয়া আলী [ আহমদউল্লাহর দুই ভাই] এবং দিনাজপুরের জনৈক দরজী মওলবী করম আলী সুরাটের অন্তর্গত সিত্তানায় তাঁবু ফেলেছিলেন, এবং বাদশাহ সৈয়দ আকবরের সহযোগিতায় গভর্ণমেন্টের বিরুদ্ধে লড়াই করতে তৈরি হচ্ছিলেন। আমি পূর্বেই বলেছি যে, সৈয়দ আকবর সোয়াতের একজন সরকার মনোনীত রাজা ছিলেন। চিঠিতে এই রকম বর্ণনা ছিলঃ মওলবী বিলায়েত আলীর ভাই মওলবী ফরহাত আলী আযিমাবাদে মওলবী ফয়েজ আলীর ভাই আহমদউল্লাহ ও মওলবী ইয়াহয়া আপন আপন বাটিতে বসে নিজ নিজ মহল্লায় অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন এবং অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ পাঠাচ্ছিলেন। অন্যান্য চিঠি থেকে জানা যায় যে, সৈন্য ও রসদ পাটনা থেকে মীরাট ও রাওয়ালপিন্ডির মধ্য দিয়ে পাঠানো হত। এই দু জায়গায় আলাহিদা এজেন্ট নিযুক্ত থাকতো এবং তারা সীমান্তের জেহাদের জন্য রসদ সরবরাহের সব বন্দোবস্ত করত।

“পাঞ্জাব সরকারের অনুরোধক্রমে পাটনার ম্যাজিস্ট্রেট হোসেন আলী খাঁয়ের খানাতল্লাশী করে। সে ছিল আহমদউল্লাহর খানসামা এবং চিঠিপত্র তার নামেই চলাচল হত। আসলে কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক খানাতল্লাশীর দুদিন আগেই পাঞ্জাব থেকে ফেরতা একজন হাকিমের মারফত এ খবরটা জানাজানি হয়ে যায়, তার ফলে পাটনার ষড়যন্ত্রকারীরা সাবধান হয়ে যায় ও তাদের বাড়ীর যাবতীয় চিঠিপত্র নষ্ট করে ফেলে। যা হোক ১৮৫২ সালের ১০ই আগস্ট তারিখের রিপোর্টে ম্যাজিস্ট্রেট সরকারকে জানান যে, ওহাবীদের তখন বেশ সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছিল, এবং মওলবী বিলায়েত আলী, আহমদউল্লাহ ও তার ইলাহী বখশের বাড়িতে জেহাদের জন্য সর্বপ্রকার গুপ্ত মন্ত্রণা হত ও সেখান থেকে প্রচারকার্য চলতো। তিনি আরও জানান যে, ওহাবীদের স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সংযোগ ছিল, তার দরুন তাদের কার্যকলাপের কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তার কাছে যায়নি। মওলবী আহমদউল্লাহর বাড়ীতে ছয়- সাতশো সসস্ত্র লোক ম্যাজিস্ট্রেটের থানাতল্লাশীর বিরোধিতা করতে ও বিদ্রোহের নিশানা তুলতে প্রস্তুত ছিল।

“১৮৫২ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর তারিখের কাউন্সিল বৈঠকে একটা বিষয় লিপিবদ্ধ করা হয়- সেটা করা হয় পাঞ্জাব সরকারের লেখা অনুযায়ী এসব চিঠিপত্রের সম্পর্কে, এবং সীমান্তের আদিবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার প্রয়োজনীয়তাও তাতে স্বীকৃত হয়, কারন তারা বাঙালী ও হিন্দুস্থানি ওহাবীদের দ্বারা ক্রমাগত উত্তেজিত হচ্ছিলো। চতুর্থ দেশীয় রেজিমেন্টের মুন্সী মুহম্মদ ওয়ালীকে ফৌজদারীতে সোপর্দ করা হয় ও রাওয়ালপিন্ডিতে ১৮৫৩ সালের ১২ই মে তারিখে তার বিচার ও শাস্তি হয়। তখনও মওলবী আহমদউল্লাহ এবং পাটনার অন্যান্য অধিবাসীদের নাম পুনরায় সাক্ষ্য প্রমাণে ওঠে, তাদের দ্বারা সীমান্তে রসদ পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

“অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, সরকার কোন সক্রিয় পন্থা অবলম্বন করেন নি, এবং পাটনার ষড়যন্ত্রও নষ্ট করে দেন নি। রাজদ্রোহিতার দমন নিশ্চয়ই হত, আম্বালা অভিযানে কোন সৈন্য ক্ষয় হতনা এবং সরকারী কর্মচারীরা বহু পরিশ্রম ও অহেতুক লাঞ্চনা থেকে রেহাই পেতেন, কারণ ১৮৫২ সালের সশস্ত্র রাজদ্রোহী আহমদউল্লাহই হচ্ছেন এক সামান্য কেতাবওয়ালা ও ১৮৫৭ সালের ‘ওহাবী ভদ্রলোক’। মওলবী আহমদউল্লাহ যোগ্যতার সঙ্গে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত পাটনার জনশিক্ষা কমিটির সদস্য হিসেবে কার্য করেন। তারপর সারা পাক০ ভারতে আজাদীর আগুন জ্বলে উঠলে পাটনা শহরে বহু মুসলমানকে তদানীন্তন কমিশনার মিস্টার তেইলার ওহাবী সান্দেহে বন্দী করেন।আহমদউল্লাহ সাহেবও ‘ওহাবী ভদ্রলোক’ হিসেবে টেইলার সাহেবের কোপানলে পতিত হন। টেইলারের সন্দেহ এই যে, তথাকথিত ‘সিপাহী বিদ্রোহের’; সঙ্গে পাটনার এসব মুসলমানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তিনি বন্দীকৃত সকল মুসলমানকে একটা বাংলোতে নিজের তদারকে আঁটকে রাখেন এবং পৈশাচিকভাবে দৈনিকহারে কয়েকজনকে প্রকাশ্যে ফাঁসি ঝুলিয়ে দেন বাংলোর সামনের ময়দানে। এই ময়দানটা পাটনা শহরের মধ্যস্থলে অবস্থিত ও বর্তমানে বাকীপুর ময়দান নামে খ্যাত। কিন্তু ওপরওয়ালাদের কানে এ সংবাদ পৌছামাত্র অবিলম্বে অবশিষ্ট বন্দীদের খালাশ দিতে আদেশ দেওয়া হয় ও তার কৈফিয়ত তলব করা হয়। এভাবে সেবার টেইলার সাহেবের হাত থেকে আহমদউল্লাহর জীবন রক্ষা পায়। পরবর্তীকালে অবশ্য এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের জন্য টেইলারকে কমিশনারের পদ থেকে অপসারণ করে নিম্নপদে রাখা হয়। তিনি পদত্যাগ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

আজাদীর বিপ্লব প্রশমিত হলে ইংরেজরা মুসলিমদের উপর সদয় ব্যাবহার করে তাদের হৃদয় জয় করতে চেষ্টা করে। এই সময় আহমদউল্লাহ ইংরেজ সরকারের কৃপাদৃষ্টি পুনরায় আকর্ষণ করেন ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োজিত হন। কিন্তু তখনও পাটনার প্রধান কেন্দ্রস্থল থেকে মুলকা ও সিত্তানায় রীতিমত মুজাহিদ ও রসদ সরবরাহ চলতো। বলা বাহুল্য, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটঠ হয়েও আহমদউল্লাহ এই ব্যাপারে পূর্ণ সহায়তা করতেন এবং তারই তত্ত্বাবধানে বাংলা- বিহার থেকে মুজাহিদ ও রসদ সংগ্রহ পুর্ন উদ্যমে চলতো। তখনও তার বাড়ী ছিল এ ব্যাপারে প্রধান ঘাঁটি। সেখানে প্রতি জুম্মাদিনের মগরবের নামাযের পর মিলাদের মাহাফিল বসত এবং তার অছিলায় ওহাবীরা জমায়েত হয়ে সভা করত ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারিত করত। ওহাবীদের কার্যপদ্ধতি ছিল আশ্চর্য ধরনের। তারা চিঠিপত্রে সাংকেতিক ভাষা ব্যাবহার করত যার প্রকৃত অর্থ ওহাবী ব্যতীত অন্য কারও বোধগম্য ছিলনা। প্রত্যেক সত্যের একটা বিনামা পরিচয় ছিল। তারা যুদ্ধকে বলত ‘মুকাদ্দমা’, মোহরকে বলত ‘লাল- মোতি’। টাকাকড়ি প্রেরণ করা হত কেতাবের দাম হিসেবে। পরবর্তীকালে খাতাপত্র থেকে জানা যায়, শমদুল্লাহ এক বছরেই ২৬ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন, তাছাড়া কাসেদের মারফত নগদ মোহর কত পাঠানো হয়েছিল, তার হিসেব পাওয়া যায়নি।

সমগ্র বাংলা ও বিহার প্রদেশে আহমদউল্লাহর কর্মঠ ও বিশ্বস্ত গুপ্ত এজেন্ট ছিল। পূর্ব- বাংলার এজেণ্ট ছিলেন হাজী বদরউক্কিন নামক ঢাকার একজন মশহুর চামড়া ব্যাবসায়ী। তিনি পূর্বাঞ্চলের সমস্ত অর্থসংগ্রহ করে পাটনায় প্রেরণ করেন ফাগুলাল নামধারী জনৈক ব্যাবসায়ীর নাম বরাবর হুন্ডি দিয়ে। কলকাতা মুড়িগঞ্জ মহল্লায় আবদুল জব্বার নামক একজন এজেন্ট ছিলেন এবং মুকসেদ আলী নামক অন্য একজন এজেন্ট হাইকোর্টে মুখতারী করতেন। মুখতার সাহেবের পাটনাতেও একখানা বাড়ি ছিল। যশোর, ২৪ পরগনা, ফরিদপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, রংপুর, মুঙ্গের, ত্রিহুতি, আরাহ, বকসার বোরস, ইলাহাবাদ, খানপুর, মীরাট প্রভৃতি বড় বড় শহরে আহমদুল্লাহর এজেন্ট ছিল। একদল অভিজ্ঞ কাসেদ মারফত আহমদউল্লাহ ও এজেন্ট দের মধ্যে সাংকেতিক ভাষায় চিঠিপত্র ও টাকাকড়ি চলাচল হত। তাদের মারফতেই সিত্তানায় খবরাখবর আদান হত।

সমসাময়িক সরকারী কাগজপত্র থেকে এ তথ্যও সংগ্রহ করা যায় যে, আহমদউল্লাহ বাংলা, বিহার, আসাম ও উড়িষ্যা প্রদেশে জেহাদের জন্য যাকাত তোলার বিশেষ চেষ্টা করেন। একদল সুশিক্ষিত আলেম ও বক্তা নিয়োজিত থাকতেন মুসলমানদিগকে মিলাদ ও ওয়াজ- নসিহতের মাধ্যমে কাফেরদের বিরুদ্ধে জেহাদে উদ্বুদ্ধ করতে। মওলবী আহমদউল্লাহই ছিলেন ১৮৬০ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কর্ণধার, এবং নিজের দায়িত্বপূর্ণ সরকারী উচ্চপদের পূর্ণ সুযোগ গ্রহন করে তিনি নিরঙ্কুশ ভাবে এই আন্দোলন চালাতেন।

পাক- ভারতব্যাপী আজাদীর বিপ্লবে ওহাবী মুজাহিদরা সক্রিয় অংশগ্রহন করেছিল। কিন্তু প্রতিকূল অবস্থার জন্য এ বিপ্লব ফলপ্রসূ না হলেও মুজাহিদরা দমিত বা ভগ্নোৎসাহ হননি। বরং দ্বিগুন উদ্যমে তারা নতুন মুজাহিদ ও রসদ সংগ্রহ করতে লাগলেন। সমগ্র বাংলা প্রদেশ থেকে হাজার হাজার মুসলমান চাষি মুজাহিদ বাহিনীতে যোগদান করতে আহমদউল্লাহর বাসগৃহে জমায়েত হত ও সেখান থেকে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সিত্তানায় প্রেরিত হত। এই রকম একটি দলের চারজন বাঙালি মুসলমান আম্বালায় যাওয়ার পথে ১৮৬৩ সালে কর্ণাল জিলার পাঞ্জাবী সার্জেন্ট গুজান খানের হাতে ধরা পড়ে ও ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট তাদের হাজির করা হয়। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট তাদেরকে নিরীহ পথচারী বিবেচনা করে খালাস দেন। দুই মাস পরেই সীমান্তে একটা যুদ্ধ বাধে। তখন ধৃত বাঙালি মুসলমানের নিকট গৃহীত তথ্যের সত্যতা প্রমাণিত হয়। ইতিমধ্যে গুজান খাঁ আপন একমাত্র পুত্রকে সিত্তানায় গুপ্তচর হিসেবে পাঠিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করে যে, থানেস্বরবাসী জাফর খাঁ সীমান্তে মুজাহিদ ও রসদ প্রেরনে সক্রিয় অংশগ্রহন করছেন। কর্তৃপক্ষ এ সংবাদ পেয়েই জাফর খাঁর বাড়ি তল্লাশী করে ও বহু সন্দেহজনক কাগজপত্র হস্তগত করে। জাফর খাঁ [অপ্লাতক হন, কিন্তু আলীগড়ে পাটনাবাসী বহু ওহাবীর সঙ্গে ধরা পরেন। তারা জবানবন্দীতে প্রকাশ করেন যে, তারা সাদিকপুরের ইলাহী বখশের গুপ্তচর। তখনই পাটনায় টেলিগ্রাম পাঠানো হয় ইলাহী বখশকে বন্দী করতে ও তার খানাতল্লাশী করতে। জাফর খাঁর বাড়ি থেকে যেসব কাগজপত্র হস্তগত হয়, তার একটি চিঠিতে মুহম্মদ শফীকে সংবাদ পাঠানো হয়েছিল যে, জনৈক কাসেদ মারফত তিনশো ছোট বড় দানার একটি তশবীহ ও ছয়শো সফেদ দানার আরেকটি তসবীহ পাটনা থেকে পাঠানো হয়েছে। কিছুদিন পর থানেশ্বরবাসী হোসেন খাঁ নামক এক ব্যাক্তিকে আম্বালাগামী একটি আক্কাগাড়ী থেকে বন্দী করা হয় এবং তার পিরহানের ভিতর দুটি থলে থেকে পূর্বোক্ত তসবীহ সংখ্যার সোনার মোহর পাওয়া যায়। এসব তথ্য থেকে কর্তৃপক্ষ একটা ভীষণ ষড়যন্ত্রের সন্ধান পায় ও পাটনার ম্যাজিস্ট্রেট রাভেনশ সাহেবকে এ বিষয়ে পূর্ণ তদন্তের জন্য বিশেষ কর্মচারী নিয়োগ করে।

বলা বাহুল্য যে, তদন্ত আরম্ভ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আহমদুল্লাহ বন্দী হন ও চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হন। রাভেনশ সাহেবের তদন্ত অনুযায়ী তার বিচার ও দন্ড হয়, যদিও সাহেবের রিপোর্ট দাখিল হয় বিচারের পর ১৮৬৫ সালের ৫ই মে তারিখে। রাভেনশ আম্বালা বিচারের সাক্ষ্য প্রমাণ থেকে তদন্তের সূত্র গ্রহন করেন। এই আম্বালা বিচার শেষ হয় ১৮৬৩ সালে এবং বিচারের ফলে মুহম্মদ শফী, ইয়াহয়া আলী ও তারা ভাই আবদুল রহিম ও ভাইপো ব্যাংকার ইলাহী বখশ, পোদ্দার আবদুল গফুর ও আরও পাঁচজনের যাবজ্জীবন দীপান্তরের দণ্ডাদেশ হয়। ইলাহী বখশকে পাটনায় আনয়ন করা হয় এবং তার দীর্ঘ জবানবন্দী গ্রহন করা হয়। তাতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, আহমদুল্লাহ ছিলেন পাটনা কেন্দ্রে ওহাবী আন্দোলনের প্রাণশক্তি।

চার মাস তদন্তের পর র‍্যাভেনস সাহেব আহমদউল্লাহর বিরুদ্ধে প্রাথমিক রিপোর্ট দান করেন এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের সুদীর্ঘ তালিকা পেশ করেন। মিস্টার মনোরা নামক জনৈক প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট প্রাথমিক তদন্ত শেষ করে আহমদুল্লাহর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহিতা, রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র প্রভৃতি আট দফার চার্জ গঠন করেন ও দায়রায় সোপর্দ করেন। মিঃ আইনসাইল নামক দায়রা জজের এজলাসে সুদীর্ঘ কাল আহমদউল্লাহর বিচার হয়। মিঃ ম্যাকেঞ্জী আহমদউল্লাহকে চরম দন্ড ফাঁসির আদেশ দেন। এই দডাজ্ঞার বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে আপীল দায়ের হয়। মাননীয় বিচারপতি ট্রিভর ও লক ১৮৬৫ সালের ১৩ই এপ্রিল তারিখে রায় প্রদান কএন এবং ফাঁসির হুকুম পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন এর আদেশ দেন। মাননীয় বিচারপতি সাক্ষ্য- প্রমাণ আলোচনাকালে রায়ে এই মোট প্রকাশ করেছিলেনঃ

“আমাদের বিশ্বাস, পাটনায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার যে একটা প্রবল ষড়যন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল তা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের জন্য সাধারণ্যে সরকারের বিরুদ্ধে জেহাদ প্রচার করা হত, এবং সীমান্তে অজস্র ধারায় অর্থ ও মানুষ প্রেরন করা হত। আমাদের সম্মুখে আরও প্রমাণ আছে যে, এভাবে যেসব লোক প্রেরিত হয়েছিল তারা সিত্তানায় বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল ও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অস্ত্রধারণ করেছিল। থানেশ্বরের মুহম্মদ জাফর ও আম্বালার মুহম্মদ শফীর মারফত এসব বিদ্রোহীদের সাহায্যার্থে অর্থ ও হুন্ডি পাঠানো হত। সাক্ষ্য- প্রমাণ থেকে আমরা আরও লক্ষ্য করেছি যে, এই আসামী আহমদুল্লাহর হামেশাই পাটনার আবদুর রহিমের বাড়িতে হাজির থাকতো, অথচ সেখান থেকে ক্রমাগত জেহাদ ঘোষণা করা হত। আমরা নিঃসন্দেহ হয়েছি যে, এই ষড়যন্ত্রের ও প্রসারের সবরকম প্রচেষ্টায় আসামীর জ্ঞান ও সম্মতি ছিল, এবং যদিও এরুপ সত্য প্রমাণ নাই যে, আসামী কোনও বিশেষ কাজ দ্বারা ষড়যন্ত্রের সহায়তা করেছে, তবু একথা নিঃসন্দেহ যে, ষড়যন্ত্র প্রমাণিত হয়েছে, এবং তার সঙ্গে আসামীর সংযোগও প্রমাণিত হয়েছে। অতএব তার সহকর্মীরা একই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে যেসব অপরাধমূলক কাজ করেছে, সেসব প্রমাণিত হওয়ার দরুন তার বিরুদ্ধে এসব কাজ তারই দ্বারা সংঘটিত হিসেবে বিবেচিত হবে। আমাদের বিশ্বাস যে, আসামীর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধি আইনে ১২১ ধারার দ্বিতীয় অংশ মোতাবেক অভিযোগ যথেষ্টরূপে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু আমরা এরুপ দেখিনা যে, আসামীর সহকর্মীরা ষড়যন্ত্রে সক্রিয় অংশগ্রহন করার দরুন যেরূপ উচিত দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছে আসামী তার চেয়েও বেশি কিছু সক্রিয় অংশগ্রহন করেছিল। এজন্য আমরা তার বিরুদ্ধে দায়রা জজের প্রাণদণ্ডের আদেশ অনুমোদন না করে এই আদেশ দিলাম যে। তার যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হোক ও তার যাবতীয় বিষয়- সম্পত্তি রাজ- সরকারের বাজেয়াফত হোক”।

আহমদউল্লাহর বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিচারের এভাবে যবনিকাপাত হয়। প্রায় দু’ শো বছরব্যাপী পাক- ভারতীয় ব্রিটিশ শাসনে আর কোনও ম্যাজিস্ট্রেট রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার কাহিনী ইতিহাসে মেলেনা।

সেসন আদালতে আহমদউল্লাহর ফাঁসির হুকুম ও সমস্ত সম্পত্তি বাযেয়াফতের নির্দেশ দেওয়া হয় ১৮৬৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী। কিন্তু কলিকাতা হাইকোর্ট ১৩ই এপ্রিল ১৮৬৫ সালের হুকুমবলে ফাঁসির হুকুম রহিত করেন ও যাবজ্জীবন দীপান্তরের আদেশ দেন। তিনি ১৮৬৫ সালের জুন মাসেই নীত হন এবং ১৫ বছরের অধিককালে বন্দী জীবন সহ্য করে ১৮৮১ সালের ২২ই নভেম্বর মৃত্যু আলিঙ্গন করেন। তার কনিষ্ঠ ইয়াহয়া আলী পূর্বেই আন্দামানে প্রাণত্যাগ করেছিলেন। তার অন্তিম ইচ্ছা ছিল, ভ্রাতার পাশেই সমাহিত হওয়া কিন্তু স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তার এহেন নির্দোষ ইচ্ছাও পূরণ করেনি।

সাদিকপুর পরিবারের পারিবারিক বাসগৃহটি ছিল মহল্লার বিশিষ্ট স্থানে এবং পাটনায় মশহুর বাসগৃহ হিসেবে কীর্তিত হত। বাসগৃহটি ভূমিসাৎ করে সেখানে পাটনা মুন্সিপাল বাজার নির্মিত হয়। এই পরিবারেরই অন্যান্য ভূসম্পত্তি বিক্রয়লব্ধ অর্থবলে। কথিত আছে, ভূসম্পত্তি নিলাম দ্বারা ১২১৯৪৮ টাকা পাওয়া যায়, তার মধ্যে একা আহমদউল্লাহরই অংশ ছিল ৪২১১১ টাকা। ভাগ্যের এমনই নির্মম পরিহাস ছিল যে, যেদিন আহমদউল্লাহর পরিবারকে বাসগৃহ থেকে একবস্ত্রে উৎখাত করা হয়, সেদিন ছিল পবিত্র ও আনন্দময় ঈদের দিন। আহমদউল্লাহ এজন্যে এ শোকগাথা রচনা করেছিলেনঃ

চু শব- ঈ- ঈদ রা সেহর করকান্দ

হামা রা আয মাকান বদার করদান্দ;

মারা- ই- আয়েশ সাবে- মাতম শুদ।

ঈদ- ই- মা শুররা- ই- মুহররম শুদ।

‘ঈদের আনন্দময় দিন প্রভাত হল, আমরা সকলেই গৃহ হতে বিতাড়িত হলেম। আনন্দের সব উচ্ছাস শোকের রূপ নিল- আমাদের ঈদ মুহররমে পরিণত হল”!

তার জ্যেষ্ঠপুত্র আবদুল হামিদের শোকাচ্ছাস ছিলঃ

আহমদউল্লাহ বুদ মুজরিম- ই- শাহ

তিফলাক- ই- বেগুনাহরা চে গুনাহ।

আহমদউল্লাহ সরকারের চোখে অপরাধী ছিলেন, কিন্তু তার মাসুম সন্তানরা কি অপরাধ করেছিল?

এখানে একথাও উল্লেখযোগ্য যে, সাদিকপুর পরিবারের সুবৃহৎ পারিবারিক কবরগাহটি সরকারী হুকুমে চাষ দিয়ে উৎখাত করা হয় ও হিন্দুদের মধ্যে বন্দোবস্ত করে দেওয়া হয়।

 — সমাপ্ত —

About আবদুল মওদুদ