ওহাবী আন্দোলন

Picture13

ওহাবী আন্দোলন

আবদুল মওদুদ


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

প্রথম প্রবন্ধ

 [১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ আহমেদের মৃত্যুকাল পর্যন্ত]

কিছুকাল ধরে বাংলার মুসলমানরা সাধারনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। ‘পাইওনিয়ার’ পত্রিকার প্রবন্ধগুলো ‘ইংলিশম্যান’ নামক ইংরেজি পত্রিকাই ও ‘দূরবীন’ নামক ফারসি পত্রিকাই পুনরমোদিত হচ্ছে। ‘দূরবীন’ ই মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার্থে কলিকাতাই প্রকাশিত একমাত্র পত্রিকা। আবার ‘দূরবীনে’ জওয়াব হিসেবে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো ‘পাইওনিয়ার’ ও ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকার মারফত ইউরোপীয় সাধারনের দৃষ্টিগোচরে আসছে।

কিন্তু একদিকে ‘ইংলিশম্যান’ ও মুসলমান পত্রিকাগুলো সরকারকে যেমন চাপ দিচ্ছে মুসলমানদের বর্তমান অবনত অবস্থার উন্নয়নের জন্য ও দেশের প্রতিষ্ঠিত রাজ সরকারে তাদের ন্যায়সঙ্গত অংশ দেওয়ার জন্যে, তেমনিই অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ও এগিয়ে আসছে সাবধান করে দেয়ার জন্য যে, মুসলমানদের মধ্যে এক শ্রেণীর সূচিন্নিত বিদ্রোহী লোক আছে; আর তারা সমগ্র মুসলমান সম্প্রদায়ের কতখানি সহানুভূতি ভোগ করে আজও তা অজানা রয়ে গেছে। ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকাই [দুসরা আগস্ট, ১৮৭০] এই রকম মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে;

“ফারাজী ও ওহাবী মজহাবগুলো নিজেরা বড় রকমের আন্দোলন গড়ে তোলার মত শক্তিশালী না হলেও [আমরা অবশ্য তাও বিশ্বাস করিনে] সদাপ্রস্তুত মূলকেন্দ্র হিসেবে ভয়ংকর প্রতিষ্ঠান, কারণ সেগুলোকে কেন্দ্র করে যতো সব অসন্তোষ, ঘৃণা ও উচ্চাশা পুঞ্জীভূত হয়। আর অনুকূল অবস্থায় সেই সবকে এই বিশাল ও বিভিন্ন সম্প্রদায়সংকুল সম্রাজ্জের হরেক রকম পরস্পরবিরোধী মতাবলম্বীদের থেকে পৃথক করা শক্ত হয়ে পরে। বর্তমান সরকার যতই পারদর্শী ও শুভাকাঙ্ক্ষী হোক, ততোটা বুদ্ধিমান নয় বলেই এসবের সংখ্যা খুব বেড়ে গেছে। আরও দুর্ভাগ্য এই যে, নানারকম নীরব চেষ্টাই তারা বিদেশিকে এদেশে ডেকে আনতে পারে, কিংবা তাদের আসার পথ সুগম করে দিতে পারে। এ বিষয়ে আমাদের উদ্বেগতা হয়ত বাড়াবাড়ি হতে পারে, কিন্তু আমরা কেমন করে ভুলবো যে, বাংলাদেশে উদ্ভুত হয়েও ফারাজী মজহাবের নাম শোনা যাচ্ছে এমন সব দেশীয় রাজ্যের মধ্যেও, যেখানে তাদের দেখা পাওয়া মোটেও চিন্তা করা যায়না; অথচ সেই সব রাজ্যেও তারা নিজেদের আওতায় ও প্রভাবে পতিত বাশিন্দাদের নিজেদের মত দীক্ষিত করে নিচ্ছে। আর ওহাবীরা তো ছড়িয়ে আছে সাড়া ভারতময়; আমাদের উত্তর- পশ্চিম সীমান্তে ও হায়দ্রাবাদের মতো শক্তিশালী ও সদা উত্তপ্ত মুসলমান রাজ্যেও তাদের সংখ্যা খুবই বেশি। অথচ আমরা আজও জানিনে, তাদের সংখ্যা কত, অবস্থাই বা কি, সম্ভাবনা কি, প্রভাবই বা কতোখানি এবং কারাই বা তাদের নেতা। বাংলাদেশে বিস্তর ফারাজী পল্লী আছে; কিন্তু তাদের সংখ্যা, সংগঠন, রাজনীতি ও ধর্ম আমরা ও সরকারের আজও তিমিরে রয়ে গেছি। এতে দারুণ শৈথল্যই প্রকাশ পায়। ওহাবীরা খুবই বিপিদজনক সম্প্রদায় এবং সারা ইসলামিস্থানে বিস্তৃত, অথচ ফারাজী হল স্থানীয় সম্প্রদায়। ওহাবী আন্দলন জন্ম নিয়েছিল ইসলামের উৎস মূল আরব দেশে এবং বর্তমানে সমগ্র মুসলিম জগতে ছড়িয়ে পড়েছে। ওহাবী প্রচার করা খ্রিস্টান মিসনারির মতোই অসংখ্য ও তেমনই ধর্মনিষ্ঠ, আবার তাদের শিক্ষাও জেসুটদের মতোই বিধর্মী রাজশক্তির বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন। অতএব জেসুটদের মতোই ওহাবীরা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে সক্ষম। বিরুদ্ধবাদী হলেও ওহাবীরা গোঁড়া মতবাদিদের চোখে কোঠর সংযমসীলতার জন্যে স্রদ্ধার পাত্র এবং ওহাবীদের উগ্র ধরমান্তারন দরুন নিজেরা ধর্মীয় সব অনুশাসন পালনে অক্ষমতা- হেতু কিছুটা ধর্মীয় শিথিলতার জন্যেও যেন ওহাবীদের সম্মুখে লজ্জিত। জেসুটদের মতোই ওহাবীদের আছে নিজস্ব সংগঠন; তাদের প্রচারকদিগকেও রীতিমত টাকা পয়সা দেওয়া হয় এবং এই সব টাকা পয়সা আসে সংসারী লোকদের কাছ থেকে আদায়কৃত সাধারণ মূলধন থেকে। ওহাবী সম্প্রদায়ের লোকেরা একটা সুনির্দিষ্ট পথ ঠিক করে নিয়ে সাধারণ জনগনের সাথে মিশে নীরবে কাজ করে যায়। কেউ কেউ দৈনন্দিন বেচা কেনার কাজ করে, কেউবা কখন কাফেরদের আদালতে কেরানীগিরির কাজও করে। কিন্তু কখনো তারা নিজেদের ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য কিংবা রাজনৈতিক লক্ষ্য ভুলে না। তারা অলক্ষে আরও সুচারুভাবে এসব উদ্দেশে কাজ করে যায়। টাকা পয়সার সাহায্য দিয়ে নতুন মতাবলম্বী সংগ্রহ করে এবং দূরের ও নিকটের সহকর্মীদের সাথে নিবিড় সংযোগ রেখে ভারত কিংবা আরবেই হোক জিহাদ পরিচালনা করে। এই আন্দোলনটা নিঃসন্দেহে সবদিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ; কারণ তার একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে, পৃথিবীতে ইসলামের রাজনৈতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করা আর এই উদ্দেশে ইসলামের অনুসারীদের আদিম ইসলামে ফিরিয়ে নিয়ে যেয়ে ধর্মীয় পুনরুজ্জীবিত করা। আমরা হইত এইরকম কোন কর্মসূচীর সম্ভাবনা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে পারি। কিন্তু আমাদের কখনয় বিস্মিত হওয়া উচিত নয় ইতিহাসের এই প্রধান ও দুঃখজনক শিক্ষা যে, কোনও বিস্তৃত ও বড় বরবরতার হাতে সভ্যতা চিরস্থায়ী হতে পারেনা। আর তার চেয়ে বেশি না হলেও ধর্মান্ধতা হচ্ছে সমান বিপজ্জনক। আমাদের আরও স্মরণ রাখা উচিত যে, মুসলমান ধর্মের এই দুটিই ধ্বংসাত্মক প্রবনতা আছে। বর্তমানে জগতের ভবিষ্যৎ প্রগতি বিষয়ে যদিও আমরা নিরাশ না হতে পারি, তাহলেও আমাদের এই বিশ্বাস থাকা উচিত যে, ওহাবী আন্দোলনকে যদি আমাদের বুকের উপর শক্তি সঞ্চয় করতে দেয়া হয়, তাহলে উপযুক্ত সময়ে সীমান্তের ও বাহিরের বিরুদ্ধ শক্তিগুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সেটা রাষ্ট্রের সমূহ বিপদ ঘটাতে পারে। অতএব সরকারের উচিত কাজ হচ্ছে ফারাজী ও ওহাবীদের সম্বন্ধে এবং আরও যেসব সম্প্রদায় ভারতের ভিতরে ও বাহিরে রাজনৈতিক উচ্চাশা পোষণ করে, সে সবের তন্নতন্নভাবে তদন্ত করা। কারণ মুসলমানদের মধ্যে ধর্মের বন্ধনেই রাজনৈতিক সম্বন্ধ গজায়।। অথচ অন্যান্য জাতির মধ্যে গোত্রীয় সম্বন্ধ হল বড় কথা। ফারাজী ও ওহাবীরা বাকি মুসলমানদের কতোখানি সহানুভূতি ভোগ করে, সঠিকভাবে বলা শক্ত। হইত তাদের কতগুলি ধর্মীয় নীতি গোঁড়া মুসলমানদের খুবই অপ্রীতিকর, কিন্তু তাদের সকলের মধ্যে রয়েছে একই ধর্ম বন্ধন। তাছাড়া এই সম্প্রদায় দুটির রাজনৈতিক লক্ষণ তো সকল মুসলমানদের কাছে পরম আদরনীয়। আর মানুষ হিসেবে তারা সদ্য রাজ্যহারা হয়ে শোকান্নিত এবং একটা আক্রমণাত্মক ধর্মের অনুসারী হয়ে তারা খ্রিস্টান, হিন্দু, ইহুদী, বৌদ্ধ কাফেরদের বিরুদ্ধে জেহাদ করা অবশ্য কর্তব্য হিসেবে গণ্য করে।“ এখানে যেসব প্রশ্ন তোলা হয়েছে, বর্তমান প্রবন্ধে সেসবের আংশিক জওয়াব দেয়ার চেষ্টা করা হবে। তবে ওহাবী ও গোঁড়া সুন্নিদের মাঝে যেসব বিষয়ে পার্থক্য আছে, সে সবের খুঁটিনাটি আলোচনা যথাসম্ভব বাদ দেয়া যাবে।

ভারতীও মুসলমানদের দুটি সম্প্রদায়ে ভাগ করা যায়ঃ সুন্নী ও শিয়া। সুন্নীরা মুসলমানদের ধর্মে বিশ্বাস করে সমস্ত আবেগ ও অনুভূতি দিয়ে আর শিয়ারা একই ধর্মে বিশ্বাস করে জ্ঞানের তথা যুক্তির ভিত্তি মূলে।

শিয়ারা আনন্দ পায় অনুষ্ঠান, ধর্মীয় শোভাযাত্রা প্রভৃতি ধর্মীয় বাহ্যিক আড়ম্বর প্রদর্শনে। সুন্নীরা এসব আড়ম্বর অনুষ্ঠানকে তাদের ধর্মের বিপরীত হিসেবেই মনে করে এবং ইসলামের আদি সহজ সরল পথেই চলার চেষ্টা করে। শিয়ারা আরও গভীর বিশ্বাস করে যে, তীর্থ পথে যাওয়াই ও মৃত ওলী- দরবেশদের মাজার জিয়ারতে অশেষ পুণ্যলাভ হয়, অথচ সুন্নীরা কম বিশ্বাস করে যে, একমাত্র তীর্থযাত্রাই কোনও পুণ্য সঞ্চয় হয়, কিংবা ওলী- দরবেশদের মাজারে এভাবে ধন্না দিয়ে কোন কিছু পার্থিব সুফল পাওয়া যায়। এই দুটি সম্প্রদায়ের আবার প্রত্যেকটি বহু মজহাবে বিভক্ত এবং প্রত্যেক মজহাবের আবার নীতিগত ও আচার আনুষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য আছে। তবে সমস্ত শিয়া সম্প্রদায় সুন্নী সম্প্রদায়ের প্রতিটি মজহাবের উপর বিদ্বেষভাবাপন্ন, আবার সুন্নীরাও শিয়া সম্প্রদায়ের সব মজহাবকেই একই বিদ্বেষ দৃষ্টিতে দেখে থাকে। এরকম ধর্মীয় বিশ্বাসের পার্থক্য হেতু বিদ্বেষ ভাবটা আরও তীব্র হয়ে উঠে তাদের পয়গম্বরের জামাতা আলীর সঙ্গে অন্য খলীফাদের রাজনৈতিক বিরোধ স্মৃতিতে উদয় হলেই। আর তার অভিব্যাক্তি হয় প্রায়ই প্রকাশ্য ঝগড়া- ফ্যাসাদ, অত্যাচার- উৎপীড়নে এবং দুই সম্প্রদ্যায়ের বাহাসে বক্তৃতাই। ধর্মীয় সব উপলক্ষেই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষটা আরও বেশি প্রকাশ হয়ে পরে। পাটনা, মুর্শিদাবাদ, ঢাকা ও আরও যেসব জায়গায় শিয়া সংখাবহুল, সেই সবখানে মুহররম মাসের প্রথম দশ দিন শিয়ারা খুবই জাকজমকের সঙ্গে মহররম উৎসব পালন করে। আর তখন শান্তি ভঙ্গ যাতে না হয়, তার জন্যে বড় ব্যস্ত থাকতে হয় সরকারকে।

মুসলমান ধর্মের মূল ভিত্তি হচ্ছে, কুরআন, মুহম্মাদের বাণী ইত্যাদি অর্থাৎ সুন্নী মুসলমান ধর্মতাত্ত্বিকদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ইজমা এবং কুরআন ও হাদীস থেকে গৃহীত মীমাংসা বা কিয়াস।

মুহাম্মাদের জীবদ্দশায় কুরআন ছিল একমাত্র প্রামাণ্য গ্রন্থ। যার নির্দেসানুসারে সব রকম সমস্যার সমাধান হত এবং প্রত্যেক নয়া সমস্যার জন্য পূর্বে বিধান না থাকলে নয়া ওহী নাযিল হত। আল্লাহ্‌র বাণী একমাত্র মুহাম্মাদের কাছে পৌঁছাত, অতএব তারই গোচরীভূত বিষয়সমূহের মধ্যেই ওহীর দ্বারা মীমাংসা হত। এই অসুবিধাটা প্রথম লক্ষ্য করা গেল, যখন নিকটবর্তী গোত্রসমুহে নতুন ধর্ম প্রচারের জন্য দূত পাঠানো হতে লাগল তারাও একে একে নতুন ধর্ম গ্রহণ করতে লাগল। মুহাম্মাদের মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা যখন বিভিন্ন দেশে শাসন বিস্তার করতে লাগল তখন তাদের রিতি- নীতি আরবদের থেকে পার্থক্য হেতু তাদের সঙ্গে ব্যাবহার সম্বন্ধে কুরআনের বিধান সমূহের ন্যূনতা আরও বেশি করেই দেখা দিল। আর এই জন্য পয়গম্বরের বাণী ও কাজ কর্ম এসব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় দিশা হয়ে উঠল।

পয়গম্বরের বাণী ও কাজের কর্ম দ্বিতীয় শতকের পূর্বে শুরু হইনি। আর এই কর্ম চলেছিল তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে লড়াই চলা কালে। সংগ্রহকারীরা ছিলেন নিঃসন্দেহে সৎ ও ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং সুন্নার বিশুদ্ধতা নিরূপণ কালে তারা কথকের চরিত্র দ্বারা ও নিজের ঐশী প্রেরণা দ্বারা চালিত হতেন। কোন হাদিসের সত্যাসত্য নিরুপনের জন্য গোপন সাক্ষ্য কখনো গৃহীত হতোনা। সমকালীন লোকদের এই ধরনের সাক্ষ্য গ্রহণও অধর্মের কাজ না হলেও প্রগলভতা হিসেবে বিবেচিত হত। ধর্মভীরু লোকদের কথিত প্রত্যেক হাদিসই খাটি হিসেবে গৃহীত হত, তা যতই অসম্ভব হোক না কেন। আবার যাদের ধর্মীয় বিশ্বাস দুর্বল, তাদের কথিত প্রত্যেক হাদিসই পরিত্যাক্ত হত। কিন্তু এইটা যাচাই করে দেখা হতনা হাদিসটির কতটুকু মুহাম্মাদের নিজস্ব আর কতটুকু বা কথিত অসাবধানকৃত সংযোগ। কিংবা এটাও অনুসন্ধান করে দেখা হতোনা যে, প্রত্যেক হাদিসের উৎপত্তির সময় ও পরবর্তীকালের বর্ণনাকারীদের সময়ের মধ্যে অবস্থার কি রয়েছে।

এরকম মুখে মুখে প্রচারিত পুঞ্জিকৃত হাদিস থেকে যা আশা করা উচিত, সেই রকমই রচিত কাহিনী থেকে সংগ্রহ হয়েছে। অথচ সেগুলো খাটি হিসেবে স্বীকৃত হলেও অনেক স্থলে পরিষ্কার ভাবে বিরোধী। কিন্তু এসব অসংগতি ও অনৈক্য সত্ত্বেও তাদের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ দূরে থাক, ইসলামি বিশ্বাসীদের দৃঢ়তা আরও প্রবল হয়ে উঠে। এসব অনৈক্যকে ধরা হয়ে মুহাম্মাদের সুদূরপ্রসারী জ্ঞান, কারণ তিনি নিজের অনুসারীদের মুক্তির জন্য শুধু একটিমাত্র সংকীর্ণ পথ খোলা রাখেননি। আর পরস্পর বিরোধীগুলোকে বলা হত – এসব হচ্ছে ইসলামের প্রথম অবস্থার নিয়ম, কিন্তু পরে মুহাম্মাদ কর্তৃক সংশোধিত বা নাকচ করা রূপ। এজন্নেই দেখা যায় মুহাম্মাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়াই নামাজ পড়ছেন। কখনো একবার মাত্র তিনি কান পর্যন্ত হাত উঠিয়েছেন, কখনো উঠিয়েছেন একাধিকবার। কখনো তিনি নামাজ শুরু করেছেন জোরে ‘বিসমিল্লাহ্‌’ বলে, আবার অন্য সময় বলেছেন মনে মনে। তার সাহাবারা তাকে অনুসরণ করবার আগ্রহে তাকে যেভাবেই নামাজ পরতে দেখেছেন ঠিক সেই ভাবেই নামাজ আদায় করে গেছেন, আর তাত দরুন পরবর্তীকালের জন্যেও রেখে গেছেন অনৈক্য।

হিজরির প্রথম শতকের শেষ ভাগ থেকে তৃতীয় শতকের মধ্য ভাগ পর্যন্ত চারজন মশহুর মুসলমানি আইনের ব্যাখ্যাতার আবির্ভাব ঘটে। তারা প্রত্তেকেই প্রত্যেকটি হাদিসের সভ্যতার মান সম্বন্ধে বিভিন্ন মত পোষণ করেন। তারা প্রত্যেকেই ইসলামের এক- একটি মজহাবের প্রতিষ্ঠাতা।

প্রথম – আবু হানিফাঃ তার জন্ম ৮০ হিজরিতে ও মৃত্যু ১৫০ হিজরিতে। তিনি হানাফী মজহাবের স্রষ্টা, আর ভারতীয় মুসলমানদের প্রায় সমস্তই হচ্ছে এই মজহাবের অন্তর্ভুক্ত।

দ্বিতীয় – আবু আবদুল্লাহ শাফীঃ প্রায় ১৫০ হিজরিতে জন্ম ও মৃত্যু ২০৪ হিজরিতে। তিনি শাফী মজহাবের প্রতিষ্ঠাতা।

তৃতীয় – মালিকঃ ৯৫ হিজরিতে জন্ম ও মৃত্যু ১৭৯ হিজরি। তার অনুসারীরা ‘মালিকী’ নামে কথিত।

চতুর্থ – ইবনে হামবলঃ জন্ম ১৪৪ ও মৃত্যু ২৪১ হিজরি। তিনি ‘হামবলী’ মজহাবের প্রতিষ্ঠাতা। আরবে এদের সংখ্যা বেশি দেখা যায়।

এই চার মজহাবের প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন নিঃসন্দেহে অত্তন্ত ধর্মনিষ্ঠ ও স্বধর্মের আইন- কানুন সম্মন্ধে তাদের জ্ঞান ছিল সুগভীর। প্রত্যেকেই প্রচুর গবেষণা করে মত নির্ধারণ করেন যে, আইনের বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যাখ্যা দরকার এবং কতকগুলি হাদীস অন্যগুলির চেয়ে জোরালো, আর এজন্যই তারা নিজ নিজ বিশ্বাস অনুসারে মত প্রচার করে গেছেন। তার ফলাফল এই হয়েছে যে, বহু তুচ্ছ ও বহু দরকারি বিষয়ে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে আবু হানিফা মত প্রচার করেছেনঃ হাদীসের গুরুত্ব বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত করা যায় যে, নামাজে প্রথমে চুপে চুপে ‘বিসমিল্লাহ্‌’ উচ্চারণ করা উচিত,নামাজের প্রথমে হাত দুটি কান পর্যন্ত উঠানো উচিত এবং নামাজ পরা কালে হাত দুটি বুকের উপরে আড়াআড়ি ভাবে রাখা উচিত। অন্য দিকে শাফী বলেছেনঃ ‘বিসমিল্লাহ্‌’ জোরে উচ্চারণ করতে হবে নামাজের কালে মাঝে মাঝে হাত দুখানা কান পর্যন্ত উঠাতে হবে এবং নামজ পড়ার সময় হাত দুটি বুকের উপর জোরানো থাকবে। আবার আবু হানিফা বলেঞ্জে, কোন মানুষ নিরুদ্দেশ হলে নব্বই বছর গত না হলে তাকে মৃত ধরা যাবেনা এবং এই সময়ের মধ্যে তার স্ত্রীর দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ নাজায়েজ হবে; অন্যদিকে মালিকী মজহাবের মতানুসারীর পক্ষে মাত্র চার বছর পরেই দ্বিতীয় বিবাহ জায়েজ হবে।

সুন্নী সম্প্রদায়ের এই চারটি মজহাবকে পৃথক ধর্মমত ধরা সংগত হবেনা, সেগুলি বরং খাটি মুসলমান ধর্মের চারটি শাখা। প্রত্যেক মজহাবপন্থীরা তাদের বিধি- বিধান ও আচার- অনুষ্ঠান অবশ্যই মেনে চলতে বাধ্য এবং আরও বিশ্বাস করতে বাধ্য যে, এসব পালনেই তার নাজাত বা মুক্তিলাভ সম্ভব। প্রত্যেক মজহাবের আইন- কানুন তার জন্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এক মজহাব থেকে অন্য মজহাবে পরিবর্তন প্রায় হয়না, আর যদি বা হয় তবে তা নিন্দার চখে দেখা হয়। এই পুনর্দিক্ষাও খুবই বিশেষ ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, আর তাও হয় যখন তাদের মধ্যে খুবই কম পার্থক্য দেখা যায়।

এসব থেকে স্বত্বই লক্ষণীয় যে, মুসলমানদের ধর্মীও ব্যাপারে ব্যাক্তিগত যুক্তি বিচারের স্বাধীনতা নেই। তারা অবশ্যই কুরআন ও হাদীস গ্রন্থ পরবে, কিন্তু তার বেশি তারা অগ্রসর হতে পারবেনা, কিংবা আপন মজহাবের মত বিরোধী কোন স্বাধীন ব্যাখ্যা গ্রহনের অধিকার নেই। অথচ দেখা যাচ্ছে যে, মজহাবগুলোর প্রতিষ্ঠাতারা বিভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছিলেন এবং এই থেকেই প্রমাণিত হয় যে, তারা প্রত্যেকেই এই অধিকার ভোগ করেছেন এবং এই জন্য পূর্ববর্তী ব্যাখ্যা তার শিক্ষা মেনে চলেননি। অথচ কার্যত মুসলমান জনসাধারণ ব্যাক্তিগত ব্যাখ্যা করার চেষ্টাও করতে পারবেনা এবং চার ইমামে কোন একজনের মতাবলম্বী হতে বাধ্য। আমরা পরে দেখাব যে, ওহাবীরা এটাকেই অন্য সব বিষয়ের মতো প্রথমেই অস্বীকার করেছিল।

 ‘ওহহাবী’ শব্দে প্রথমে যথার্থ ভাবে একদল আরব মুসলমানকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। আর শব্দটার উৎপত্তি হচ্ছে সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতার নাম শেখ আবদুল ওহাব থেকে। তিনি গত শতাব্দীর প্রথম দিকে আরব দেশের নজদ অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। বসরার মাদ্রাসায় তিনি শিক্ষা লাভ করেন পরে ভ্রাম্যমাণ সউদাগর হিসেবে দামেসক, পারস্য উপসাগরের উপকূলবর্তী শহরগুলোতে এবং পারশ্যেও সফর করেন। বহু বছর সফরের পর তিনি আরব প্রত্যাগমন করেন নিজ প্রদেশের রাজধানী দারিয়ায় বসবাস কায়েম করেন। সেখানে তিনি সংস্কার কাজ শুরু করেন এবং নিজের বিশেষ মতবাদও প্রচার করতে থাকেন। তিনি শিক্ষা দেন যে, মুসলমানদের উচিত হযরতের জীবদ্দশায় ও তার পরের খেলাফতের আমলে ইসলামের যেরূপ ছিল, তারই অনুসারী হওয়া; প্রত্যেক মুসলমানের উচিত একমাত্র আল্লাহর উপর এবং তারই উপর অকুণ্ঠ নির্ভর করা, হযরত মুহম্মদ কিংবা কোন ওলী- মর্যাদা এভাবে অযাথা বাড়িয়ে না তোলা, যাতে আল্লাহ্‌র মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা হয়। হযরতের পর থেকে যেসব অনুষ্ঠান, উৎসব ও নিয়ম উদ্ভূত হয়েছে সেসব একেবারে পরিহার করা এবং সর্বোপরি ইসলামের শৈশাবস্থায় ইসলাম যেমন তরবারির মুখে প্রচারিত হয়েছিল, তেমনিভাবে ইসলাম জারী করা।

তার শিক্ষা দারিয়ার সরদার শেখ মুহম্মদ ইবন সউদ গ্রহণ করেন এবং তার মুরীদ হন। তার কন্যাকেও ইবন সউদ শাদী করেন। গত শতকের মধ্যভাগে আবদুল ওহহাবের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর তার একমাত্র পুত্র মুহম্মদ ইবন সউদের মুরুব্বিয়ানায় মধ্য আরবের শাসক হয়ে উঠেন। তারপর ওহাবী রাজ্য বহু ভাগ্য বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে, কিন্তু আমাদের বর্তমান আলোচনার পক্ষে সেসবের কোন প্রয়োজন নাই।

দেখা যায় যে, বর্তমান শতকের প্রথম ভাগে ওহাবী মতবাদ আরব প্রত্যাগত বহু হাজীর দ্বারা ভারতে আমদানী করা হয়েছে। আর এতা সুনিশ্চিত যে, ফরিদপুরের বাশিন্দা ও মশহুর দুদু মিয়ার পিতা হাজী শরীয়তউল্লাহ্‌ কর্তৃক এই ধরনের মতবাদ নিম্নবঙ্গে প্রচারিত হয়েছিল। তার অনুসারীদের বলা হয় ফারাজী। নানা কারণে ভারতে ফারাজীদের প্রভাব যৎসামান্যই। কিন্তু শরীয়তউল্লাহ্‌র শিক্ষার ফল এই দাড়ায় যে, লোকে হিন্দুস্থানের বাশিন্দা সৈয়দ আহমদের মতবাদ গ্রহণ করবার প্রকাশ করতে থাকে। এসব মতবাদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এত বেশি যে, এখানে সেসবের বিস্তৃত আলোচনার দরকার আছে।

সৈয়দ আহমদের জন্ম হয় ১২০১ হিজরির মুহররম মাসে, আউধের রায়বেরেলীতে। তার বাল্য জীবন সম্মন্ধে খুব অল্পই জানা যায়। তবে মনে হয়, ছেলেবেলাতেই তিনি গৃহত্যাগ করেন ও আমীর খান পিণ্ডারির ফৌজে প্রবেশ করেন। এই আমীর খান পরবরতীকালে টঙ্কের নওয়াব হন। ফৌজে সৈয়দ আহমদের পদবী কি ছিল, সে সম্মন্ধে মতভেদ আছে, তবে তার অনুসারীদের এই বিষয়ে মৌনভাব দেখে মনে হয়, তিনি কোন নামকরা দায়িত্বভার পাননি। ১৮১৭ খৃষ্টাব্দে আমির খানের ফৌজ ভেঙে দেয়া হলে সৈয়দ আহমদ দিল্লীতে গমন করেন এবং মশহুর শাহ্‌ আবদুল আজীজের মুরীদ হন।

এই সময়ে শাহ্‌ আবদুল আজীজ হিন্দুস্থানের শ্রেষ্ঠ আলেম হিসেবে গণ্য হতেন। তার পান্ডিত্তের খ্যাতি হিন্দুস্থানের বাইরেও ছড়িয়ে পরেছিল।

এবং আরবের পন্ডিত সম্রাজ্জ তাকে ‘শামসুল হিন্দ’ খেতাব দান করেন। ভারতীয় মুসলমানদের উপর তার প্রভাব ছিল অপরিসীম। শরীয়তের জটিল প্রশ্নে তার ফতোয়া আজও অভ্রান্ত হিসেবে স্বীকৃত হয়। আর তার নাম যে কোন দলের শক্তিস্থম্ভ হিসেবে গণ্য হওয়ার দরুন ওহাবীরা ও হানাফীরা তাকে নিজ নিজ মজহাবের সমর্থনকারী হিসেবে নিজেদের দলে টানাটানি করে থাকে। প্রত্যেক মজহাবই নিজের সুবিধার জন্য দলেরই চরম মতানুসারী ছিলেননা এবিং অনেকটা উদার সনাতন পন্থী [যদি এমন কথা বলা চলে] ছিলেন। তিনি ছিলেন মুকাল্লদ, আর এজন্য চার ইমামের মর্যাদা সর্বদাই রক্ষা করতে চেষ্টা করতেন।

আরবের ওহাবী আন্দোলন ও তার মতবাদ তার অজানা থাকার কথা নয়। আর হইত সে সবের প্রভাবে তিনিও স্বীকার করতেন যে, তার সুন্নী সম্প্রদায়ের কিছুটা সংস্কার দরকার। তার চেষ্টাও ছিল যে, শিয়া ও হিন্দুদের সংশ্রবে থাকার দরুন যেসব রীতি- নিতী, আচার- অনুষ্ঠান সুন্নীদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, সেসবের রদ- রহিত হওয়া উচিত। কিন্তু তার বেশি দূর সংস্কার তিনি চাননি এবং তার শেষ জীবনের দিকে সৈয়দ আহমদের মতামত যখন খুবই প্রবল হয়ে উঠেছিল, তখন তিনি সেসবের অস্বীকার করেন। আর তার সেসব আত্মীয় এই আন্দোলনে যোগদান করেছিল, তাদের বঞ্চিত করে তিনি এক অনাত্মীয়কে উত্তরাধিকারী করে যান। সমকালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি ইংরেজ সরকারের প্রতি উদার মনোভাবই প্রকাশ করতেন। তিনি ইংরেজি শিক্ষা করার এবং নয়া বিজেতাদের অধীনে চাকরি গ্রহণ করার উপযোগিতা স্বীকার করতেন। বর্তমানকালের বহু মুসলমানের ভাব বিবেচনা করলে তার এসব মতবাদ নিশ্চয়ই প্রগতিমূলক ছিল।

সৈয়দ আহমদ কয়েক বছর দিল্লীতে অবস্থান করেন এবং শাহ্‌ আবদুল আজীজের পরিবারে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। তার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ হয়ে উঠে শাহ্‌ আবদুল আজীজের ভাইপো মওলবী মুহম্মদ ইসমাইল ও তার জামাতা মওলবী আবদুল হাই। তারা দুজনেই ছিলেন মশহুর আলেম এবং সৈয়দ আহমদের প্রতি একান্ত অনুরক্ত মুরীদ এবং জীবনের শেষ পর্যন্ত তার সহচর ছিলেন।

এই দুই মহাপন্ডিতের মধ্যে মুহম্মদ ইসমাইল ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ রচনা করেন ১২৩৩ হিজরিতে [১৮১৮ খৃষ্টাব্দে]। এটি ভারতের মুসলমানদের কাছে কুরআনের মতোই শ্রদ্ধার বস্তু। তাতে দেখা যায় যে, সৈয়দ আহমদ যেন স্বপ্নাদেশ পেয়ে মুরশিদের স্থান গ্রহণ করতে বাধ্য হন এবং নিজের মতবাদ প্রচারের উদ্দেশে মুরীদ করতে থাকেন। মওলবী মুহম্মদ ইসমাইল ও মওলবী আবদুল হাই হন তার প্রথম মুরীদ। তাদের প্রভাবে ও ব্যাক্তিত্তে অন্য বহু লোক সৈয়দ আহমদের মুরীদ হয়ে যায় এবং তিনি একজন ধর্মীও শিক্ষক হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেন। বহু মশহুর আলেম তার খাদিম হয়ে তাকে অসম্ভব সম্মান দেখাতে থাকেন এবং তারই শিক্ষার বরখেলাপ হলেও কখন তারা তার পালকি বহন করতেন, আবার কখন বা তার পালকির দুপাশে পায়ে ছুটাছুটি করতেন। তারা তাকে সম্বোধন করতেন ‘আমীরুল মুমেনিন’,’ইমাম হানাফী’,’ইমাম মেহেদী’ বলে এবং প্রচার করতেন যে, তিনি ইমাম ও পয়গম্বরের পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। ১২৩৫ হিজরিতে [১৮২০ খৃঃ] তিনি মওলবী আবদুল হাই ও

মওলবী মুহম্মদ ইসমাইলকে নিয়ে দিল্লী ত্যাগ করেন এবং সাড়া ভারতে সফর করতে বের হয়ে পরেন ধর্মীও সংস্কার আনার জন্য এবং শিখদের বিরুদ্ধে জেহাদ বা ধর্মীয় যুদ্ধ ঘোষণা করতে উত্তেজিত করতে। কারণ, শিখরা তখন পাঞ্জাবের মুসলমানদিগকে উৎপীড়ন করত এবং স্বাধীনভাবে তাদের ধর্ম পালনে বাধা দিত। বিশেষ করে শিখরা আজান দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। আর এটাই ছিল মুসলমানদের বিদ্রোহ ঘোষণা করার পক্ষে উপযুক্ত কারণ। তিনি প্রথমে গমন করেন সাহারানপুরে, সেখান থেকে যান রামপুরে ও বহু পাঠানের সরদার ফয়জুল্লাহ খানের সঙ্গে কিছুদিন অবস্থান করেন। তারপর তিনি কলিকাতার পথে রউনা হন গোরখপুর, জৌনপুর প্রভৃতি স্থানের ভিতর দিয়ে এবং পথে বহু মুরীদকে দীক্ষা দান করেন।

তিনি পাটনায় হাজির হন বিশাল এক নৌবহর ও ৫০০ লোকের উপর উৎসাহী মুরীদানকে সঙ্গে নিয়ে এবং এখানে অবস্থান করেন কয়েকদিন। তিনি প্রতমে থাকেন মীর আশরাফের মাজারে এবং পরে থাকেন মাদ্দপা মসজিদে। সাদিকপুরের মওলবী বেলায়েত আলী, মওলবী ইনায়েত আলী, মওলবী ফরহাত হোসেন, মওলবী ইলাহী বখশ ও তার পুত্র মওলবী আহমদ উল্লাহ্‌ তার মুরীদ হন। পাটনার বহু বাসিন্দাও তার শিষ্য হয়ে যায়। অতঃপর তিনি কলকাতা রউনা হন। কিন্তু তার পূর্বে তিনি শাহ্‌ মুহম্মদ হোসেন,বেলায়েত আলী ও ইনায়েত আলীকে পাটনায় তার খলীফা নিযুক্ত করে যান এবং তার হয়ে মুরিদ করতে ও শিখদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত জেহাদের জন্য রসদ সংগ্রহ করতেও ভার দিয়ে যান। পাটনা থেকে কলকাতায় তিনি নৌবহর নিয়ে সফর করেন এবং গঙ্গা নদীর দুপাশের বহু জায়গায় তা মত প্রচার করতে করতে যান। কলিকাতায় তিনি হাজির হন ১৮২১ খৃঃ শেষের দিকে এবং এখানে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে আশ্চর্য সাফল্য লাভ করেন। কলিকাতা ও বারাসতের বাসিন্দারা দলে দলে তার নিকট জমা হতে থাকে। তাদের মধ্যে তিতুমীরও তার মুরীদ হন। এই তিতুমীর পরে ১৮৩১ খৃঃ বারাসতে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা তুলেছিলেন। এই সময়ে সৈয়দ আহমদ অসংখ্য অনুগামী ও জাকাত হিসেবে অর্থ সংগ্রহ করেন। তার বিশেষ শিক্ষা- আদিম ও সহজ সরল ইসলামে আমদানিকৃত সবরকম বেদাত বর্জন করতে হবে এবং এই শিক্ষাটি মুসলমানদের মধ্যে দৃঢ়মূল হয়ে যায়। যেসব টাকা পয়সা আগে উৎসবে ব্যায় করা হত, এখন থেকে সেসব একটিমাত্র খাতে – শিখদের বিরুদ্ধে জেহাদের জন্য সঞ্চিত হতে লাগলো।

১৮২২ সালে প্রথম দিকে সৈয়দ আহমদ বহু মুরীদ নিয়ে মক্কা গমন করেন এবং তথায় হজ্জ পালন করে মদীনায় উপস্থিত হন। এখানে তুর্কি কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধতা করে এবং তার মতবাদীরা যেসব প্রচার করত, সেসব সহ্য করতেও অস্বীকার করে। তারা পূর্বেই আরবের ওহাবীদের নিকট বহু নির্যাতন সহ্য করেছিলো। এখন যেসব মওলবী ধর্মীয় সংস্কারের কথা প্রচার করতেন, অনেকেই আটক হয়ে পরেন।

১৮২৩ সালের অক্টোবর মাসে সৈয়দ আহমদ কলিকাতায় ফিরে আসেন। পথে বোম্বাইয়ে তিনি কয়েকদিন অবস্থান করেন ও বহু মুরীদ করেন। ডিসেম্বর মাসে তিনি জন্মস্থান রায়বেলির উদ্দেশে যাত্রা করেন এবং পথে পাটনা ও গোয়ালিয়ারে অবস্থান করেন।

পাটনায় শাহ্‌ মুহম্মদ হোসেন এক বিশাল মুজাহীদ বাহিনী নিয়ে তার সঙ্গে মিলিত হন। তার খলিফাদের এক মজলিস হয় এবং বহু পূর্বে পরিকল্পিত কাজের জন্য মানুষ ও টাকা পয়সা সরবরাহের ব্যাবস্থা করা হয়। এতা মনে করা হয়েছিল যে, সৈয়দ আহমদের ও তার সহকর্মীদের এসব কার্যকলাপ হইত সরকারকে ভীতিগ্রস্ত করবে, অন্তত সরকারের হস্তক্ষেপের দরকার হবে। এতা নিশ্চয়ই সকলের মনে আছে যে, কয়েক বছর পূর্বে ইংল্যান্ড রোমান ক্যাথলিক যাজকতন্ত্র স্থাপনের স্থাপনের চেষ্টা হলে সাধারনের খুবই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল এমং একটা নিষেধাজ্ঞা মূলক দন্ডবিষয়ক আইন প্রবর্তনের দরকার হয়েছিল। অথচ তখন রোম ও দেশে কোন রাষ্ট্রীয় শক্তি স্থাপনের ইচ্ছা করেনি, কিংবা ইংরেজ ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের রাজভক্তিতে সন্দেহ হওয়ার এতটুকু কারণ উপস্থিত হইনি। আর ভারতে সাড়া দেশটা সৈয়দ আহমদের খলীফাদের মধ্যে ভাগ- বাটোয়ারা হয়ে গেল এবং ব্রিটিশ সরকারের স্বার্থের প্রতিকূলে একটা সরকারও বাস্তব ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলো; কিন্তু শাসন কর্তৃপক্ষ এই প্রতিষ্ঠানটির সম্বন্ধে চল্লিশ বছর ধরে কিছুই জানতে পারলনা- এথেকেই প্রমাণ হয় যে, তারা শাসিত জাতি সম্বন্ধে কত অজ্ঞ ছিল। সৈয়দ আহমদ অতঃপর টংকে উপস্থিত হন এবং পুরান নায়ক আমীর খাঁর সঙ্গে কিছুকাল অতিবাহিত করেন। আমীর খাঁর পুত্র তার মুরীদ হন। টংক থেকে তিনি মরুভূমি অতিক্রম করে সিন্ধুতে উপস্থিত হন ও খয়েরপুরের মীর রুস্তম খাঁর অতিথি হন। এখানে বহু মুজাহিদ তার সঙ্গে যোগদান করেন। অতঃপর তিনি উত্তর- পশ্চিম সীমান্তের পাহাড় অঞ্চলে প্রবেশ করেন এবং কাবুলে কান্দাহারের পারবত্যবাসিদের মধ্যে জেহাদ প্রচার করতে থাকেন শিখদের বিরুদ্ধে। কিন্তু কোন বিশেষ ফল না হওয়াই তিনি খিলজিদের অঞ্চলে প্রবেশ করেন এবং ১৮২৬ সালের শেষের দিকে পেশোয়ার ও সিন্ধুনদের মধ্যবর্তী ইউসুফজাই পাহাড়ে প্রবেশ করেন।

ইউসুফজাই আদিবাসীরা বহু বছর ধরে লক্ষ করেছিলো যে, শিখরা একের পর এক প্রদেশ আফগানদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছিল, আর তার দরুন তারা নিজেদের আজাদী সম্বন্ধে খুবই উদ্বিগ্ন ছিল। ১৮২৩ সালে পেসোয়ারার শাসনকর্তা ইয়ার মুহম্মদ খা রণজিৎ সিংহ কে কর দিতে স্বীকার করেন। কিন্তু এতা তার ভাই আজীম খাঁর মনঃপূত হলনা। তিনি ইয়ার মুহম্মদ খাকে পেশোয়ার থেকে বিতাড়িত করে দেন এবং শিখদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন। মার্চ মাসে শিখদের ও পাহাড়িয়া আদি জাতিদের মধ্যে নওশেয়ার একটি যুদ্ধ হয় কিন্তু কোন ফল হয়না। শেষে আদি জাতিরা তাদের সরদার মুহম্মদ আজীম খা কর্তৃক পরিত্যাক্ত হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পরে। শিখরা পেশোয়ার দখল করে ফেলে ও লুটপাট করে খাইবার পর্যন্ত হাজির হয়। কিন্তু পেশোয়ার নিজেদের দখলে রাখা শক্ত বিবেচনা করে ইয়ার মুহম্মদকে জায়গীর হিসেবে দান করে।

এই পরিস্থিতে ইউসুফজাই আদিবাসীরা নিজেদের আজাদী রক্ষার উদ্বেগে ও শিখদের শায়েস্তা করার মতলবে সৈয়দ আহমদকে দুহাত বাড়িয়ে গ্রহণ করল এবং তার কর্তৃত্বও মেনে নিল। তখন তিনি তাদের সাহায্য নিয়ে শিখদের থাকোরায় আক্রমণ করেন, কিন্তু পরাজিত হয়েও অক্ষত ফিরে আসেন। ক্রমে ক্রমে শক্তি সঞ্চয় করতে লাগলেন এবং ইয়ার মুহাম্মদও তার সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হলেন ও ইউসুফজাই আদীজাতিদের আজাদী স্বীকার করলেন। অবস্থা এভাবেই থেকে গেলো ১৮২৯ সাল পর্যন্ত; কিন্তু তখন সৈয়দ আহমদ পেসোয়ারার দিকে অগ্রসর হলেন এবং ইয়ার মুহম্মদ তাকে বিষ প্রয়োগ করতে চেষ্টা চেয়েছিলেন। একটা যুদ্ধ হল, ইয়ার মুহম্মদ নিহত হল এবং তার অনুগামীরা বিধ্বস্ত হল। পেশোয়ার কোন রকমে রক্ষা পেল- শের সিংহ ও ভেন্তুরার একদল সিখ বাহিনী নিয়ে উপযুক্ত সময়ে উপস্থিত হওয়ার দরুন। ১৮৩০ সালে জুন মাসে সৈয়দ আহমদ জেনারেল আলারডের অধীন একদল শিখ বাহিনীকে আক্রমণ করেন কিন্তু এবারও পরাজিত হন। শীঘ্রই তিনি ইয়ার মুহম্মদ খাঁর উত্তরাধিকারী সুলতান খাঁর বিরুদ্ধে পেশোয়ার আক্রমণ করেন এবং সুলতান মুহম্মদকে বিতাড়িত করে পেশোয়ার দখল করতে সক্ষম হন। তার এই সামরিক জয় পরোক্ষ শিখদের পক্ষে মঙ্গলকরই হয়েছিল। সৈয়দ আহমদ আক্রমক হিসেবে জয়ী হয়ে পেসোয়ারের শাসক হয়ে উঠলেন, কিন্তু শাসন বিষয়ে তার ধর্মান্ধতা শেষ পর্যন্ত তার প্রথম সম্প্রদায়ের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আশা- ভরসা সব নষ্ট করে দিল। তার প্রথমকাজ হল খলীফা খেতাব ধারন করা ও নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করা এবং নামাংকিত তংকা জারি করা- ‘আহমদ ইসলামের রক্ষক’ তার তরবারির উজ্জ্বলে কাফেরদের ধ্বংস সাধিত হয়। আরও তিনি আরবের ওহাবীদের পদাংক অনুসরণ করে দাবি করলেন। তার প্রজারা মুহম্মদ ও তার খলীফাদের আমলে জাকাত ফেতরা আদায় দেবে। এই সময় আরও চেষ্টা করা হয় পেশোয়ারের গোঁড়া হানাফী মুসলমানদের তার দলভুক্ত করতে। এজন্য শিক্ষিত মুসলমানদের এক বিরাট জলসা ডাকা হয় এবং পারস্পরিক অনেক ছাড়- রিয়াত করা হয়। মওলবী ইসমাইল ত্যাগ করলেন ব্যাক্তিগত ব্যাখ্যা করার অধিকার ও ‘রাফিয়াদান’ করা এবং একজন মুকল্লদ হানাফী হিসেবে স্বীকৃত হলেন। আর হানাফীরা সৈয়দ আহমদের প্রচারিত বেদাত ও শেরক সম্বন্ধ মতবাদ স্বীকার করল এবং জেহাদের সাহায্যার্থে জাকাত প্রভৃতি আদায় করতেও স্বীকৃত হল। ধর্মান্ধদের আবেগের অতিসহ্য শীঘ্রই প্রকট হয়ে উঠল। আবদুল ওহহাবের উত্তরাধিকারীরা মদিনায় পয়গম্বরের মাজার ভেঙে দিয়েছিলো। আর সৈয়দ আহমদের অনুগামীরা পেশোয়ারের মাজার গুলোও ভেঙে ফেলতে লাগলো এবং ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় তরবারির সাহায্যে যেমন ধর্ম প্রচারিত হয়েছিল, সেইরকম তারাও পার্শ্ববর্তী হিন্দুদের সঙ্গে শান্তির বাস করতে অস্বীকার করল। অতএব এই মতবাদটাই জোরেশোরে প্রচারিত হতে লাগলো যে, যারা পুতুল পুজকদের সঙ্গে বিরোধ করতে চায়না তারা নিজেরাই পুতুল পুজক হয়ে গেছে। পাঞ্জাবকে ‘দারুল হরব’ বা দুশমনের দেশ হিসেবে আখ্যা দিয়ে জয় করার জন্য জেহাদ ঘোষণা করা হল।

প্রথমবস্থা থেকেই ধর্মান্ধদের সরকারের সাফল্যের সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। কারণ এতার লক্ষ ছিল পৃথিবীর ইতিহাস থেকে বার বছর মুছে ফেলা এবং একটা বিদেশী জাতকে মুহম্মদের সমকালীন আরববাসীদের স্বভাব, রীতিনীতি ও আচার- অনুষ্ঠানের অনুসারী হতে বাধ্য করা। ধর্মীয় অনুরাগ থাকা সত্ত্বেও শীঘ্রই স্থানীয় বাসিন্দারা অসন্তুষ্ট হয়ে এবং সৈয়দ আহমদের বিরুদ্ধে দোষারোপ করতে লাগলো যে, তিনি পাহাড়ি আদি জাতিদের মেয়েদের সঙ্গে তার ভারতীয় অনুচরদের শাদী দিচ্ছেন। ১৮৩০ সালে নভেম্বর মাসে তিনি বাধ্য হলেন সুলতান মুহম্মদ খাঁর হাতে পেশোয়ার ছেড়ে দিতে, তবে সুলতান মুহম্মদ খা তাকে কর দিতে রাজি হলেন। অতঃপর সৈয়দ আহমদ সিন্ধুনদ অতিক্রম করে পূর্ব তীরে উপস্থিত হলেন শিখদের জয় করতে। কিছুকাল তিনি খণ্ডযুদ্ধ চালাতে লাগলেন, কিন্তু কোন ফল হয়নি। ১৮৩৯ সালের মে মাসে বালাকোটে একদল শিখ বাহিনী অতর্কিতে তাকে আক্রমণ করে এবং সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস করে দেয়। সৈয়দ আহমদ ও মুহম্মদ ইসমাইল শহীদ হন।

অন্যকিছু বলার পূর্বে এখানে সৈয়দ আহমদের ব্যাক্তিগত বর্ণনা, তার মতবাদ ও সেগুলি লোকপ্রিয় হওয়ার কারণগুলির আলোচনা করা যেতে পারে। তিনি ছিলেন মাঝারি গঠনের ব্যাক্তিত্বশালী মানুষ, আর সাড়া বুক ছেয়ে দাড়ি থাকার দরুন তাকে আরও ভারিক্কী মানুষ মনে হত। ১৮২০ সালে যখন তিনি নিম্নবঙ্গ সফর করেন তখন তার বয়স ছিল প্রায় ছত্রিশ বছর। তার পোশাক ছিল মাথায় সাদা কাপড়ের পাগড়ী, বুক পর্যন্ত খোলা কুর্তা ও পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত নামানো সাদা চোস্ত পাজামা। সবগুলোই ছিল সুতি কাপড়ের। সমকালীন উত্তর ভারতীয় মুসলমানদের রেওয়াজ অনুযায়ী তিনি হিন্দুস্থানে প্রচলিত চার তরিকার ফকিরীতে বিশ্বাসী ছিলেন। তার স্বভাব ছিল গম্ভীর, সান্ত ও সংবেদনশীল। মুরীদানের সঙ্গে ‘বয়েত’ বা দীক্ষা দেওয়াকালীন সময় ব্যাতিত তিনি খুব কম আলাপ করতেন। বারাসতের মুরীদানের সংখ্যা এত বেড়ে উঠে যে, তিনি পাগড়ী খুলে দিয়ে টা ছুইয়ে মুরীদ করার রেওয়াজ করেন। তিনি স্বভাবতই মৌন থাকতেন এবং মুসলমান আইনে অজ্ঞতার দরুন ধর্মীয় আলোচনা পরিহার করতেন। এজন্য যখনই কোন বাকযুদ্ধ উপস্থিত হত, তখন তিনি নীরব দর্শকের ভুমিকা পালন করতেন আর তার দুই শিষ্য মওলবী আবদুল হাই ও মওলবী মুহম্মদ ইসমাইল বিপক্ষ দলের সঙ্গে বাকযুদ্ধ চালাতেন। তার অনুগামীদের ও তারও বিশ্বাস ছিল যে, আকৃতিতে ও স্বভাবে তিনি ছিলেন পয়গম্বর সাহেবের সমান। তার প্রায় ভাবাবেশ বা মূর্ছা হত [ তা যে কি বলা শক্ত] এবং তিনি ও তার মুরীদান বিশ্বাস করতেন যে, পয়গম্বর সাহেবের মতোই তখন আল্লাহর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ- সংযোগ ঘটতো। সংক্ষেপে বলা যায়, তিনি দরদী, সান্ত ও অশিক্ষিত ছিলেন, মাঝে মাঝে তার স্নায়ুবিকার ঘটতো। তিনি নিজেকে পূর্ব এশিয়ার মুসলমানদের ইমাম হিসেবে দাবী করতেন এবং তার সমর্থনে অদ্ভুত যুক্তিও খাড়া করতেনঃ কোন মানুষই কোন দেশে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি, যদি তার অনুপ্রেরণার সঙ্গে কিছুটা পাগলামি মেশানো না থাকে।

ধর্মীয় আলোচনায় কিছুতেই অংশগ্রহণ না করার নীতি গ্রহণ করার দরুন সৈয়দ আহমদ বাস্তবপক্ষে কিসে বিশ্বাসী ছিলেন তা ধারণা করা শক্ত। গোঁড়া সুন্নীরা ও তার নিকট- অনুগামীরা বিশ্বাস করত যে, তিনি আদর্শিক মানুষ; তাবে সুন্নীরা আরও বলত যে, তিনি ভিন্ন জাতীয় মতবাদ প্রকাশ করতেননা, তার খাদেম মওলবিরা যাই বলুক না কেন; অথচ তার মুরীদানরা কখনই একথা স্বীকার করতেন্না। তার বানী সমুহের সংগ্রহ হিসেবে ‘সিরাতুল মুস্তাকিমের’ উল্লেখ করা হয়। এখানে মওলবী ইসমাইলের রচনা, তবে এখানে তার মুরশিদদের সঠিক বাণীই উদ্ধৃত হয়েছে, বলা হয়ে থাকে। নিম্নবঙ্গের মুসলমানরা কিতাবটি খাটি না বলে সন্দেহ প্রকাশ করে থাকে এবং বলে যে, মওলবী মুহম্মদ ইসমাইল নিজের মতবাদ প্রকাশ করার আগ্রহাতিশয্যে সেগুলিই কিতাবখানির মধ্যে তার মুরশিদের বাণী হিসেবে চালিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বইখানার বিষয়বস্তু থেকে ও সৈয়দ আহমদের মুরীদানের সাক্ষ্য থেকে ধারণা হয়, বইখানা খাটি হিসেবেই প্রকাশিত হয়েছে। একজন ফকিরের নিকট যেমন আশা করা যায়, তেমনই তার শিক্ষার বহুলাংশ সেই দিকটা খুলে দেখায়, কিভাবে একজন তত্ত্বজিজ্ঞাসু ওলীর [সন্ত পুরুষ] মর্যাদায় উন্নীত হতে পারেন। তার শিক্ষার মৌল ভিত্তি হচ্ছে, চরম অদৃষ্টবাদ ও এক আল্লাহে অকুণ্ঠ বিশ্বাস। মানুষের কিছুই করার যোগ্যতা নেই তার নিজের প্রচেষ্টাই; তাকে একান্ত ভাবে নির্ভর করতে হবে এক আল্লাহ্‌র উপরেই এবং মানুষের জন্মের বহু পূর্বেই তিনি এই তার সব কর্মধারা ও মরজগতে তার পরিনতি অমোঘ বিধানে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। আসলে মানুষ স্বাধীন সত্ত্বা নয়; কিন্তু তাদের স্বাধীন ইচ্ছা আছে, এই ধারণার বশবর্তী হয়েই তারা নিজ নিজ কর্ম ফলের জন্য নিজেদের দায়ী মনে করে থাকে। পৃথিবীর ইতিহাসে যুগে যুগে আল্লাহ্‌ করুণা করে মানুষের জন্য ইমাম বা নেতা পাঠিয়ে থাকেন। তাদের দায়িত্ব হল মানুষকে মুক্তির পথে চালনা করা। গত যুগের পয়গম্বররা- ঈসা, মুহম্মদ সকলেই এই শ্রেণীর মানুষ ছিলেন। কিন্তু মুহম্মদের ওফাতের পর থেকে নবুয়তের ধারা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী যে ইমাম আসেন তার মর্যাদা ওলীর উপরে কখনও উঠতে পারেনা। এসব অবশ্য তত দরকারী বিষয় নয়। তাবে ওলী হচ্ছেন পয়গম্বরের পরবর্তী মর্যাদার মানুষ; ঠিক যেন ছোট ভাইয়ের মতো। ইমাম ধাপে ধাপে মুহম্মাদের শিখানো তরীকাই নাজাতের পথে অগ্রসর হন। তবে ইমাম সময়ে সময়ে আল্লাহ্‌র সঙ্গে মিশে যান, তখন ঐশী গুণ তার মধ্যে এসে যায়; আর তখন তিনি হয়ে উঠেন সর্বদর্শী এবং কেরামত দেখাবার অধিকারী হন। এরকম ইমাম চেনার কতগুলি নির্দিষ্ট চিহ্ন আছে। তিনি সৈয়দ হবেন এবং নীচ অবস্থায় জন্ম হবে। প্রথমে ইমাম হিসেবে তার মর্যাদা স্বীকৃত হবেনা, কিন্তু ক্রমে ক্রমে ইমামের চিহ্ন প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং শেষে তিনি ইমাম হিসেবে স্বীকৃত হবেন। তাখন সব মুসলমানই তাকে দুনিয়ায় তাকে আল্লাহ্‌র খলীফা হিসেবে মেনে নিবে এবং তার কাজ হবে তাদের মধ্যে ঐক্য আনায়ন করা ও তাদের ঈমান রক্ষা করা।

শাস্ত্রীয় বচনের দিক থেকে এসব বিবেচনা করলে সৈয়দ আহমদের ইমামত এতোই চিহ্নিত যে, সন্দেহের অবকাশই থাকেনা। তিনি জন্মেছেন সৈয়দকুলে ও অখ্যাত অবস্থায়। মুহম্মদ যেমন বেহেশতে মুসার সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন, তেমনি সৈয়দ আহমদ সেই দুই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা ফকিরের সাক্ষাৎ পান, যাদের তরিকায় তিনি বিশ্বাসী। আর খোদ আল্লাহ্‌ যেমন মুহম্মদের কাঁধে হাত রেখে তার মর্যাদা উন্নীত করেন, সেই রকম মুহম্মদও তার কাঁধে হাত রেখে তার মর্যাদা উন্নীত করেন; অতএব সৈয়দ আহমদ নিশ্চয়ই যুগের ইমাম, কিংবা তার চেয়েও বেশি ইমাম হুমাম অর্থাৎ ইমামকুলের শিরোমণি। আর মুহম্মদ যেমন ছিলেন শেষ নবী, তেমনি সৈয়দ আহমদের সঙ্গে সঙ্গে ইমামের ধারাও শেষ হয়ে যায়।

মুসলমানদের মধ্যে একটি সর্ববাদিসম্মত কাহিনী চালিত আছে যে, মুহম্মদের মৃত্যুর পর থেকে রোজ- কিয়ামত পর্যন্ত খলীফা ইসলামের শাসক হবেন। কিন্তু বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে মতবিরোধ থেকে গেছে, এই পর্যন্ত কতজন খলীফা উদিত হয়েছেন। শিয়ারা বিশ্বাস করে যে, এগারো ইমাম গত হয়েছেন এবং দ্বাদশ ইমাম মুহম্মদ আবুল কাসিম ২৫০ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। শিয়ারা বিশ্বাস করেনা যে, তার মৃত্যু হয়েছে; বরং তাদের ধারণা যে, তিনি কোন গুপ্ত স্থানে লুকিয়ে আছেন এবং উপযুক্ত সময় উপস্থিত হলেই তিনি পুনরায় উদিত হবেন ও মুসলমানদিগকে পুনরায় কাফেরদের বিরুদ্ধে চালনা করবেন। সুন্নীদের মধ্যে বিভিন্ন মত বর্তমান আছেঃ কোন দল মনে করে, ছয় জন খলীফা গত হয়েছেন, কোন দল বলে চারজন; তবে এতা নিশ্চিত যে, রোজ- কিয়ামতের আগে ছয়জন খলীফা উদিত হবেন; কিন্তু সেকাল কখন আসবে, সেটা অজ্ঞাত। সৈয়দ আহমদ দাবী করতেন যে, তিনি এইরকম একজন খলীফা এবং এই দাবীর সমর্থনে এইসব যুক্তি খাড়া করতেন; তিনি কি সৈয়দ নন এবং সেই হিসেবে মুহম্মদের বংশধর নন? তার জামাতা হযরত আলীর ও কন্যা ফাতেমার বংশধর নন? এই দুজনকি স্বপ্নে তাকে দেখা দেননি ও সন্তান হিসেবে আদর করেন কি? একজন তাকে গোসল করিয়েছেন ও অন্যজন তাকে লেবাস পরিয়েছেন। এরপর আর কি বেশি প্রমাণের দরকার যে, তিনি ইমাম ও খলীফাদের আসনের অধিকারী? এতেই ত অধিকার স্বীকৃত হয় যে, তিনি আমিরুল মুমেনীন অর্থাৎ মোমেন মুসলমানদের চালক। তার পূর্বে ত সুন্নীদের মধ্যে আর কোন ইমাম এই খেতাব গ্রহণ করেননি, এ খেতাবতো একমাত্র খলীফাদের ও অন্য মুসলমান স্বাধীন শাসকদের দ্বারাই গৃহীত হত। এভাবে খলিফার ভুমিকা সৈয়দ আহমদের মনে গেথে গেলো এভাবেই চালিত হয়ে তিনি ভারতকে বিভক্ত করে নিজের খলীফা নিযুক্ত করলেন জাকাত প্রভৃতি ধর্মীয় কর আদায় করতে শেষে তিনি পেশোয়ারে আযাদীও ঘোষণা করেছিলেন।

কিন্তু সব মানুষই সমান নয়, আর সকলেই ইমামের মর্যাদায় হওয়ার স্পর্ধাও করতে পারেনা। এজন্য সাধারন মানুষের ঈমান ও ধর্ম পালনের জন্য কতকগুলি মোটামুটি নিয়ম নির্দেশিত হওয়ার দরকার। সৈয়দ আহমদের ধর্মীয় নীতিগুলো ছিল একজন ফকিরের মতো, যার বিশ্বাস ছিল যে, তিনি মুহম্মদেরই জীবনধারা সর্বাংশে অনুকরণ করতে চেষ্টা করেছেন। সুন্নীদের মতোই ধর্মীয় মৌল ভিত্তি গুলোকে স্বীকার করে নিয়ে তিনি নির্দেশ দেন যে, এই মৌল ভিত্তিগুলোর মধ্যে একমাত্র কুরআনই অভ্রান্ত; আর হাদীস ত ওহীর মতো নাযিল হয়নি, অতএব মুহম্মদের সাহাবাদের মতামতের বা আলেমদের সিদ্ধান্তের মতো তাতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা, তবে মাত্রায় হইত কম হতে পারে। এই ভ্রান্তির সম্ভাবনা কি করে এড়ানো যায়? মুহম্মদ তাহাদিগকেই একমাত্র নাজাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যারা পরবর্তী কুরআন ও হাদীস দ্বারা চালিত হবেন। অতএব সবচেয়ে নিরাপদ হচ্ছে তার উম্মতদের সিদ্ধান্ত পরিহার করা, তা তারা যতই ধর্মনিষ্ঠ হন। আবার কামালিওত হাসিল করতে হলে আরও কিছু বর্জন করা দরকার। যদিও মুহম্মদ এই যুগের মুসলমানদিগকে কুরআন ও হাদীস ছাড়া অন্য কিছুর উপর নির্ভর করতে নিষেধ করেছেন, তবুও এ থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায়না যে, হাদীস মানতেই হবে। ঈমানের মূলভিত্তি হিসেবে হাদীস দরকারী বটে, তবু আজকাল লক্ষ্য করা যায় যে, লোকে হাদিসকে কুরআনের তুল্যমূল্য হিসেবেই বিবেচনা করে। অতএব সবচেয়ে নিরাপদ হচ্ছে হাদিসকে ত্যাগ করে কুরআনকেই আঁকড়ে ধরা। সৈয়দ আহমদ যখন পাটনায় মুহম্মদ হোসেনকে তার খলীফা নিযুক্ত করেন, সেই সনদ থেকেই তার শিক্ষার অসম্পূর্ণ হলেও মোটামুটি যথার্থ পরিচয় নিচে দেয়া হলঃ

“করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে বলছিঃ যারা সাধারণভাবে আল্লাহ্‌র রাহে চলতে চায় এবং বিশেষ করে সৈয়দ আহমদের যেসব বন্ধু উপস্থিত আছে বা অনুপস্থিত আছে, তারা সকলেই জানুক যে, ধর্মনিষ্ঠ ওলীদের হাতে বয়েত বা দীক্ষা গ্রহণ করার উদ্দেশ্য হল আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি সাধন করা, আর তার উপায় হচ্ছে তার পয়গম্বরদের হুকুম বা বিধান মেনে চলা। যে কেউ মনে করে যে, তার রসূলের হুকুম না মেনেও আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি বিধান করা চলে, সে মিথ্যুক ও প্রতারিত। তার দাবীও মিথ্যা ও গ্রহনের অযোগ্য। রসূলের হুকুম দুটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীলঃ

প্রথমঃ কোন সৃষ্টিতে আল্লাহ্‌র গুণ আরোপিত না করা [ শিরক ]

দ্বিতীয়ঃ রসূলের সময় বা তার পরবর্তী খলীফাদের সময় যেসব নীতি বা আচার-অনুষ্ঠান ছিলনা, সেসব আমদানী বা অনুসরণ না করা [ বেদাত ] ।

প্রথমটি হচ্ছে এরকম বিশ্বাস না করা যে, ফেরেশতা, জীন, মুরশিদ, ওস্তাদ, শাগরেদ, পয়গম্বর বা পীর কারও মুসিবত বা বিপদ দূর করতে পারেন। এরুপ কোন সৃষ্টির নিকট নিজের ইচ্ছা বা আশা- আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য ধরা না দেয়া; তাদের কারও ভাল বা মন্দ করার ক্ষমতা আছে, এতা অবিশ্বাস করা; আল্লাহ্‌র ক্ষমতার নিকট তাদের প্রত্যেককেই নিজের মতো অসহায় মনে করা, বরং তাদেরেকে আল্লাহ্‌র প্রিয়জন মনে করা। জীবনের ঘটন- অঘটন নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাদের আছে কিংবা আল্লাহ্‌র গুণ জ্ঞান দ্বারা অবহিত আছেন, এরকম বিশ্বাস করাই হল চরম ধর্ম বিগর্হিত [কুফর] কোন সত্য- সন্ধ মুসলমান এরুপ কোন মতবাদে জড়িত হতে পারেননা।

 “দ্বিতীয়টি সম্বন্ধে বলা যায় যে, ধর্মে নতুনত্ব বা বেদাত আমদানী না করা হচ্ছে, রসূলের জীবদ্দশায় যেভাবে এবাদত- বন্দেগী করা হত ও তার তার জীবনে যেসব রীতি- নীতি চলিত ছিল সেগুলি আঁকড়ে ধরে থাকা; সব রকম বেদাত বর্জন করা, যেমন বিয়ে- শাদীতে আনন্দ- উৎসব, শোকোতসব, মাজার সাজানো, কবরে সৃতিসৌধ তোলা, মৃত্যু বার্ষিকীতে ফাতেহায় অঢেল খরচ করা, তাজিয়া তৈরি করা প্রভৃতি এবং এসব রেওয়াজ একেবারে বন্ধ করে দিতে প্রাণপণ চেষ্টা করা। একজন প্রথমে এসব রেওয়াজ ত্যাগ করবে এবং তারপর অন্য সব মুসলমানকে শেখাবে যে, তার পক্ষে অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে রসুলের হুকুম ও আল্লাহর বিধান মেনে চলা। যা করতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন শুধু তাই পালন করা এবং যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকা। এসব আমার মনে বিশেষ ভাবে গেথে গেছে; অতএব যারা আল্লাহর সন্ধান করে, তাদের চোখের সামনে এসব তুলে ধরা দরকার এবং পরস্পর হাতে হাত মিলিয়ে এসব আঁকড়ে থাকা উচিত; আর বিশেষ ভাবে উচিত শেখ মুহম্মদ হোসেনের হাতে হাত মিলিয়ে থাকা, কারণ তিনি আমার হাতে হাত মিলিয়ে এসব পালন করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন। আমিও তাকে তোমাদের কাছে সুপারিশ করছি যে, তিনি আমার হয়ে তোমাদিগকে হেদায়েত বা সৎ শিক্ষা দিবেন। শেখ মুহম্মদ হোসেনের উচিত উপরের বিধি মেনে চলা, এসব বিধান সম্যকভাবে পালনকাজে আল্লাহ্‌র দিকে তনুমন নিয়োজিত করা; শিরক ও বেদাতের যে সব মালিন্য দেহে জমে আছে, সেসব একেবারে মুছে ফেলা তার হাতে হাত মিলিয়ে একযোগে কাজ করার প্রতিজ্ঞা গ্রহণে সকলকে আহ্বান করতে চেষ্টা করা।“

শিরক ও বেদাতের প্রতিই ছিল তার তীব্র ঘৃণা। তিনি তার অনুগামীদের নিষেধ করেছিলেন, যারা এর কোন একটিতে অনুরক্ত, তাকে বিবাহ না করতে। তাদের অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে, প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার করা; কারণ আল্লাহ্‌ আদেশ দিয়েছেন, “তোমরা সাবধান হয়ে যাও, যেহেতু হেদায়েত করলে মোমেন বান্দার উপকার হয়”। আল্লাহ্‌ আর বলেছেন, “তোমরা মানুষকে হেদায়েত করে যাও, যেন তার দ্বারা তাদের উপকার হয়। যারা আল্লাহ্‌কে ভয় করে, তাদের সতর্ক করা উচিত; কিন্তু কট্টর কাফেররা এসব থেকে পালিয়ে যাবে, আর তারা দোযখের ভীষণ আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে। সেখানে তারা মরবেওনা, বাচবেওনা। যেখানে অনুরোধে কাজ হয়না, সেখানে ত তরবারি আছেই, যার ব্যাবহার শুধু উপযুক্ত নয়, দরকারী বলে মনে করা হত। আর এসব মতবাদ শুধু ফাকা আওয়াজ হিসেবে মনে হত না। আমরা দেখেছি সৈয়দ আহমদ তার কর্মজীবনের শেষের দিকে পেশোয়ারের একটি বড় মাজার ভেঙ্গে দিয়েছিলেন, আর তার অনুগামীরা পাটনায় তলোয়ার হাতে নিয়ে একটা মুহররমের মিছিল আক্রমন করেছিল ও তাজিয়া নষ্ট করে দিয়েছিল।

সব মুসলমানই স্বীকার করে যে, শিরক মহাপাপ, অতএব সৈয়দ আহমদের মতবাদ এমন কিছু নতুন শিক্ষা দেয়নি। কিন্তু তার শিক্ষার ধরনটা ছিল আপত্তিকর। হানাফীরা বিশ্বাস করে যে, তখনই শিরক মহাপাপ করা হয়, যখন কেউ সজ্ঞানে আল্লাহ্‌ ব্যাতিত অন্য কারও উপর ইলাহিগুণ আরোপ করে। কিন্তু নয়া সংস্কার পন্থীরা আর বেশি দূর গিয়েছিল এবং তুচ্ছ ব্যাপারকেও তার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলাছিল। যেমন, আল্লাহ্‌কে বলা হয় সবকিছুর দাতা [বখশ দেনেওয়ালা]; অতএব যদি কারও নামের একাংশ হয় ‘বখশ’ তাহলে তার অন্য অংশটা আল্লাহ্‌র নিরানব্বইটা নামের মধ্যে একটা হতেই হবে। ইলাহী বখশ বেশ শুদ্ধ নাম, কিন্তু ছেলের নাম মুহম্মদ বখশ রাখা হলে আল্লাহ্‌র সিফত বাগু মুহম্মদের উপর আরোপ করা হয়, এবং তার ফলে নামদাতা এ দুনিয়া থেকে কাফের হিসেবে মরণ বরন করে এবং পরকালে অনন্ত শাস্তি ভোগ করে। এরকম বহু উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। বেদাত আমদানী সম্মন্ধে রসূলের একটি হাদীসের নজীর দেয়া হয় যে, তিনি বলে গেছেন, যে কেউ ইসলামে নতুনত্ব [বেদাত] আমদানী করবে সে হবে অভিশপ্ত। মুসলমান আলেমদের মতানুযায়ী এই হাদিসটির কতকটা আক্ষরিক ব্যাখ্যা করা হয়। তারা মনে করেন যে, মুহম্মদের জীবদ্দশায় আরবে যেসব রীতি- নীতি ছিল, এই হাদিসটির দ্বারা তার রদবদল একেবারে নিষিদ্ধ হয়ে গেছে; অতএব তাদের সিদ্ধান্ত যে, ধর্মের বিপরীত কোন পরিবর্তন করা চলেনা। সভ্যতার উন্নতির জন্য কিংবা ইসলামের মহিমার জন্য নতুনত্তের আমদানী নিষিদ্ধ নয়। যেমন, একধরনের নতুনত্ব হচ্ছে, আরবী ব্যাকরণ পড়া এবং আরবী অভিধান সম্পাদনা করা কিংবা তার ব্যাবহার করা, কিন্তু কুরআনের মর্মার্থ গ্রহণে তা অত্যন্ত দরকারী। আর এক রকম হচ্ছে, স্কুল- কলেজ স্থাপন করা ধর্মীয় শিক্ষার জন্য, এটা বাধ্যতামূলক না হলেও অনুসরণ করা উচিত। আরও একপ্রকার বেদাত দূষণীয় নয়, যেমন মুহম্মদের চেয়ে ভাল খাওয়া ও পরা। কিন্তু একরকম বেদাত, মসজিদে ছবি টাঙ্গানো নিষিদ্ধ। কিন্তু সৈয়দ আহমদ বেদাত শব্দের এই ব্যাখ্যা দেননি। তিনি মনে করতেন, তিনি রসূলের কদমে কদম মিলিয়ে চলেছেন, আর এজন্য চেষ্টা করতেন যে, হিজরির প্রথম শতকের রীতি- নীতি তের শতকের মানুষের দিশারী হবে। যেসব রেওয়াজ, যতোই নির্দোষ হক না কেন,ধর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হলেই তা মুহম্মদ ও তার পরবর্তী খলীফাদের আমলে চলিত না থাকলে তিনি সোজাসুজি বর্জন করতেন। মোমেন মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্য হল, উপরোক্ত যুগের লোকের জীবন নিখুঁতভাবে অনুসরণ করা। ধর্মের জন্য মাত্রাধিক উৎসাহ, তার সদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলেও দূষণীয়;আবার তেমনি ধর্মের জন্য উৎসাহ না থাকাও পাপ। যতোই তুচ্ছ হোক, কোন বেদাতই নিষেধাজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া হতোনা। শোকের চিহ্ন হিসেবে কালো, সবুজ কিংবা নীল বস্ত্র পরা, পাকা কবর তোলা; উট, খচ্চর কিংবা গাধায় চড়তে লজ্জাবোধ করা; কাউকে অত্যধিক সম্মান দেখানো, কিংবা তা না পাওয়ার জন্য বিরক্তবোধ করা এ সমস্তই ধর্মের বড় রকম বিরুদ্ধতা হিসেবে গণ্য করা হত এবং অনুরোধে বা বল প্রয়োগে বন্ধ করে দেওয়া হতো।

এসব ছাড়াও কতগুলি নিয়ম প্রবর্তন করা হয়েছিল, যেগুলি পালন করলে নাজাত পাওয়া যেতে পারে। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত, হিন্দুস্তানের কোন না কোন ফকিরী তরিকার সভ্য হওয়া; আল্লাহ্‌র এই বাণী স্মরণ রাখাঃ “হে সত্য- বিশ্বাসিগণ আল্লাহ্‌কে ভয় কর, তাহলে তোমরা সুখী হবে”। এই নির্দেশকে দিশারী হিসেবে গ্রহন করলে, এটা পরিষ্কার হয়ে উঠে যে, প্রত্যেক মানুষের সাধনা করা উচিত- আল্লাহ্‌কে ভয় করা, ঈমানে শক্ত হওয়া এবং আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভ করা [ এটা একমাত্র সম্ভব যুগের ইমাম সাহেবের, কিংবা কোন পীরের মুরীদ হয়ে], আর কাফেরদের বিরুদ্ধে জেহাদ করা। প্রত্যেকটি নির্দেশ প্রথানুসারে পালন করতে হবে। আল্লাহ্‌কে ভয় না করলে ঈমান শক্ত হয়না। আর মুরশিদের সাক্ষাৎ না পেলে তার জেহাদ করাও হয়না। সৈয়দ আহমদ বিশেষ ভাবে জোর করতেন নামাজ আদায় করতে, জাকাত প্রভৃতি ধর্মীয় কর আদায় করতে ও জেহাদে যোগদান করতে। সৈয়দ আহমদ নিজে ছিলেন পেশাদার সৈনিক, আর মালবের আমীর খান পিণ্ডারির নেতৃত্বে তিনি বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এজন্য তিনি জেহাদের গৌরব সম্মন্ধে আলোচনা করতে আনন্দ অনুভব করতেন। জেহাদ কাফের ও মোমেন মুসলমানদের মধ্যে প্রাচীর তুলে দেয়; আর মুসলমানরা কাফেরদের সংস্পর্শ থেকে বেঁচে যেয়ে হৃদয়ে পবিত্র হয়ে উঠে ও দ্রুতগতিতে দরবেশের মর্যাদায় উন্নীত হয়। তিনি মুজাহিদের প্রসংসা কীর্তনে কখনও ক্লান্তি অনুভব করতেননা। তারা তো আল্লাহ্‌র নায়েব; তিনি নিজের জীবদ্দশায় জেহাদের প্রয়োজনীয়তা সম্মন্ধে বিশেষ জোর দেন এবং তার মুরীদান ও বংশধরদের জন্য এই চরম নির্দেশ দিয়ে যান যে, তারা যেন যে, রোজ- কেয়ামত পর্যন্ত জেহাদ চালাতে কখনও বিরত না হয়। ‘সিরাতুল মুস্তাকিমের’ নীচের উদ্ধৃতি থেকে জেহাদের পক্ষে যুক্তির মোটামুটি এই পরিচয় মেলেঃ

“জেহাদ হচ্ছে অসীম সুফলের কাজ। বৃষ্টি যেমন মঙ্গল করে মানব জাতির, প্রাণীর ও উদ্ভিদ- জগতের, সেই রকম জেহাদে সকল মানুষ উপকৃত হয়। এই উপকার সাধিত হয় দুরকমে- সাধারণভাবে, যার দরুন সব মানুষ, এমনকি পৌত্তলিকরাও এবং বিধর্মীরাও, আর প্রাণী- জগত ও বৃক্ষলতা উপকৃত হয়; আর বিশেষ ভাবে যার দরুন কয়েক শ্রেণী মাত্র উপকৃত হয় এবং বিভিন্ন অনুপাতে হয়। সাধারন উপকার সম্বন্ধে বলা যায় যে, এসব হল স্বর্গীয় আশিসধারা, যেমন যথাসময়ে প্রচুর বর্ষণ, সবজি ও শস্যের প্রচুর আমদানি এবং সুখের সময়; এসবের ফলে মানুষ অভাবমুক্ত ও দৈবদুর্বিপাক থেকে নিশ্চিত হয়, অথচ তার ধন সম্পদ উথলে উঠে। আর শিক্ষিতের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়, বিচারকের ন্যায় বিচার হয়, মামলাকারীদের বিবেকজ্ঞান বর্ধিত হয় এবং ধনবানরা আরও দানশীল হয়।

আবার এসব আসিসধারা শতগুণে বেড়ে উঠে যখন ইসলামের মহিমা স্বীকৃত হয়, শক্তিশালী বাহিনীর অধিকারী মুসলমান শাসকদের গৌরব বৃদ্ধি হয় এবং তারা সকল দেশে শরীয়তী আইন বলবত ও ঘোষণা করেন। কিন্তু একবার এই দেশটার [ভারতের] দিকে তাকাও স্বর্গীয় আশিসধারা সম্বন্ধে তার ভাগ্যের সঙ্গে তুরস্ক বা তুর্কীস্তানের তুলনা কর। শুধু তাই নয় ১২৩৩ হিজরির [১৮১৮ খৃঃ] হিন্দুস্তানের বর্তমান বিবেচনা কর, যখন তার বেশির ভাগই দারুল হরব হয়ে গেছে, আর তার সঙ্গে দু’তিন শতক আগের ভারতের তুলনা কর এবং তার সে আমলের সঙ্গে এ আমলের স্বর্গীয় আসিসধারা ও শিক্ষিতের সংখ্যা বৈষম্যটা লক্ষ কর।“

জেহাদের বিশেষ সুফলের সংখ্যা এত বেশি যে, প্রত্যেকটি উল্লেখ করা সম্ভব নয়। সেগুলির বেশির ভাগই হচ্ছে সেসব পুরস্কার, যা ধর্মার্থে নিবেদিত প্রাণ মুসলমানদের ইসলাম প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। একটির অবশ্য বিশেষ উল্লেখ এখানে প্রয়োজন, কারণ যাদের বিরুদ্ধে জেহাদ চালানো হয়, তাদের সম্বন্ধে তার বৈশিষ্ট্য আছে। এরকম হয়তো ধারনা করা যেতে পারে যে, মুসলমানদের পক্ষে জেহাদের সাফল্য নিঃসন্দেহে উপকারজনক হলেও, যাদের বিরুদ্ধে জেহাদ হয়, তাদের উপকার হয় কিনা, তা খুবই সন্দেহজনক। এরকম ধারনা করা ভুল। কাফের হওয়ার দরুন তারা বরাবরই পাপের মধ্যে জীবন- যাপন করে এবং ক্রমাগত আল্লাহ্‌র বিরোধিতা করে। তারা যতো বেশি দিন এই দুনিয়ায় বাস করবে, তত ভীষণ শাস্তি তাদের পরকালে ভোগ করতে হবে। অতএব, তাদের আয়ু কমিয়ে দিলে ভবিষ্যতের শাস্তি থেকে একেবারে নিষ্কৃতি না পেলেও তার তীব্রতা কমানো হবে।

কুরআনে দান করার প্রয়োজনীয়তা সোচ্চার ভাবে ঘোষিত হয়েছে। দান দুরকমের- বাধ্যতামূলক ও স্বেচ্ছামূলক দান, মুসলমানি আইন অনুসারে অবশ্য দেয় এবং তার পরিমাণ, কন কন সম্পত্তির উপর দেয়, কোন শ্রেণীর লোককে এটা আদায় দিতে হবে, সবই আইনে নির্দিষ্ট। জাকাত ইউরোপের ‘টাইথের’ মত, তবে তার পরিমাণ ও কোন সম্পত্তির উপর দেয়, সবই ভিন্ন। সাধারণভাবে বলা যায় যে, জাকাত দিতে হয় চান্দ্র বছরের উদ্ধৃত্ত সম্পত্তির মুল্যের উপর আড়াই টাকা হারে। জাকাত দেওয়ার নিয়ম মুহম্মদ বিশেষ ভাবে প্রবর্তন করেন এবং যখনই কোন গোত্র ইসলাম গ্রহন করত, তখনই তারা একজন ধর্মীয় শিক্ষক ও মাশুল আদায়কারী এক সঙ্গে গ্রহন করত। আবু বকরের সময় জাকাত না দেয়া রাজদ্রোহের তুল্য অপরাধ গণ্য হতো এবং আপত্তিকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার উপযুক্ত কারণ বিবেচিত হতো। এসব ধর্মীয় কর প্রকৃত পক্ষে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব হিসেবে বিবেচিত হতো এবং অভাবগ্রস্ত মুসলমানদের ও ধর্মীয় যুদ্ধে যোগদানকারীদের সাহায্যেই ব্যায় করা হতো। কিন্তু ক্রমে ক্রমে মুসলমান রাজ্য বিস্তৃতির ফলে অন্যান্য যেসব মাশুল ও করাদি আদায় করা হতো, তাই রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহে যথেষ্ট বিবেচিত হতো। এজন্য জাকাত ইত্যাদি ধর্মীয় কর সরকার কর্তৃক আদায়ের ব্যাবস্থা পরিত্যক্ত হয় এবং সেসব আদায় দেয়ার দায় লোকের বিবেক জ্ঞানের উপর ছেড়ে দেয়া হয়। সৈয়দ আহমদের কর্মজীবনের বহু পূর্বেই এসব ধর্মীয় কর আদায়ের সরকারী ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায় এবং ধর্মনিষ্ঠ মুসলমানরা এসব দ্বারা ফকির, গরীব ছাত্র ও মুসাফিরদের সাহায্য করতে থাকেন। সৈয়দ আহমদের নীতি অনুসারে এই নিয়ম আপত্তিকর বিবেচিত হয়। এসব ধর্মীয় কর আল্লাহ্‌র রাহে দেয়, অতএব মুসলমান রাষ্ট্রে শাসন কর্তৃপক্ষকে দেওয়া বিধেয়। কিন্তু মুসলমানেরা যখন অমুসলমান রাষ্ট্রে বাস করে, তখন সেসব কর সমকালীন ইমাম বা ধর্ম নেতাকে আদায় দেয়া উচিত, কারণ তিনি হচ্ছেন দুনিয়ায় আল্লাহ্‌র খলীফা। সৈয়দ আহমদ নিজেকে হিজরি তের শতকের ইমাম মনে করতেন এবং ন্যায্য অধিকার হিসেবে সেসব কর দাবী করতেন।

সৈয়দ আহমদ যখন বাংলাদেশ সফর করতে থাকেন, তখন বাংলাদেশে তার খলীফারা তার সাহায্যার্থে প্রাণপণ চেষ্টা করতেন। পাটনা হয় তাদের প্রধান কর্মকেন্দ্র এবং শাহ্‌ মুহম্মদ হোসেন স্থানীয় নেতা হিসেবে চিহ্নিত হন। অসংখ্য পুস্তক ও ইশতিহার মুদ্রিত ও প্রচারিত হতে থাকে। এভাবে সুরক্ষিত হয়ে এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ভারতীয় মুসলমানদের একত্রিত ও ভারত উদ্ধার করতে শিক্ষা দিতে থাকে। তারা এ উদ্দেশ্যে টাকা পয়সা সংগ্রহ করতে থাকে এবং সৈয়দ আহমদের ইমাম মেহেদী দাবীটা প্রতিষ্ঠিত করতেও চেষ্টা করতে থাকে।

জৌনপুরের মওলবী কেরামত আলী চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও বরিশাল জেলায় সফর করতে লাগলেন। পাটনার মওলবী ইনায়েত আলী মধ্য বাংলায় তার কর্মব্যবস্থা নিয়োজিত করলেন এবং পাবনা, ফরিদপুর, রাজশাহী, মালদহ ও বগুড়ায় প্রচারকার্য চালাতে লাগলেন। তার ভাই বেলায়েত আলী কিছুকাল বাংলাদেশে তার সাহায্য করেছিলেন, কিন্তু তার প্রধান কর্মক্ষেত্র ছিল মধ্যভারত, হায়দ্রাবাদ ও বোম্বাই।

সকল মুসলমানই স্বীকার করেন যে, রোজ- কেয়ামত কখন হবে, একমাত্র আল্লাহ্‌ই জানেন। তবে সেদিন ঘনিয়ে আসার কয়েকটি বিশেষ চিহ্ন আছে এবং বহু মশহুর আলেম ইসলাম ধর্মের দিক দিয়ে সেগুলির নির্দেশ দিতে চেষ্টা করেছেন, যেমন চেষ্টা করেছেন ডক্টর কিউমিং সাহেব খ্রিস্টানদের জন্য। এসব চিহ্নকে আবার ছোট বড় হিসেবে ভাগ করা হয়। ছোট চিহ্ন হল, মুসলমানদের ঈমান নষ্ট হওয়া, ছোট জাতের বড় বড় পদ ও মর্যাদা লাভ করা, মানুষ রিপুর পরবশ হওয়া, সংগ্রাম- সংঘাত ও রাজদ্রোহ বৃদ্ধি পাওয়া, তুর্কীদের সঙ্গে যুদ্ধ, ভূমিকম্প ও দুর্ভিক্ষের আধিক্য। আর বড় চিহ্ন হল, ইমাম মেহেদীর আবির্ভাব। তিনি হবেন হযরত মুহম্মদের বংশধর এবং তার নাম ও পিতার নাম হবে হযরত মুহম্মদের নাম ও তার পিতার নাম। তিনি খোরাসানে জন্মগ্রহণ করবেন। কিন্তু তার প্রথম কর্মজীবন মানবচক্ষুর অন্তরালে থাকবে। শেষে তিনি মদিনায় উদিত এবং সমগ্র আরব দেশের শাসক হবেন। অতঃপর কনস্টাটিনোপল পুনর্দখল করবেন, তার পূর্বেই সেটা নাসারাদের কর্তৃত্বে চলে যাবে। কিন্তু নবরিজিত রাজ্যসমূহের স্থিতিস্থাপকতা সাধনের পূর্বেই খৃস্টশত্রু ও তার অনুচরদের আবির্ভাব হবে এবং মেহেদী এ সংবাদ পেয়ে দামেস্কে উপস্থিত হবেন। তখন দামেস্কের পূর্বে একটা সারা কিল্লাহর নিকটে হযরত ঈসা পৃথিবীতে নেমে আসবেন এবং মুসলমানদের তার শত্রুর বিরুদ্ধে চালনা করে খৃস্টশত্রুকে নিহত করবেন ও তার বাহিনীকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিবেন।

সৈয়দ আহমদের মুরিদরা শিক্ষা দিত যে, ইমাম মেহদী সম্পর্কিত এই ধারনা সাধারনের ভ্রান্তি প্রসূত। তিনি আরব ও তুরস্ক বিজয়ী খলীফার চেয়ে নিশ্চয়ই বড় হবেন। অন্যপক্ষে ইমাম মেহদী হবেন মধ্যবর্তী ইমাম, তিনি হযরত মুহম্মদের মৃত্যু ও হযরত ঈসার আবির্ভাবের মধ্যবর্তী সময়ে উদিত হবেন এবং ভারাতীয়দের সাহায্যে ও তাদের বাহুবলে সারা বিশ্ব জয় করবেন। তারা আরও শিক্ষা দিত যে, গোঁড়া সুন্নীরা ইমাম মেহদীকে একজন মশহুর নেতা হিসেবে বেশি বিবেচনা করাই হযরত কর্তৃক ভবিষ্যতবাণীতে উল্লেখিত নেতাদের বিষয় চিন্তা করেনি, আর এজন্য সুন্নীরা হাদিসটির অপব্যাখ্যা করে ফেলেছে। হযরত মুহম্মদ ঘোষণা করেছিলেন যে, হযরত মূসার মৃত্যুর পর বারোজন পয়গম্বর যেমন পর পর জন্মগ্রহণ করে তার ধর্মকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন ও সুদৃঢ় ভিত্তি মূলে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, সেই রকম বারোজন খলীফাও তার মৃত্যুর পর উদিত হবেন এবং ইসলাম ধর্মকে অনুরূপ উজ্জীবিত করবেন। এরকম প্রত্যেক খলীফার ইতিকাহিনীর ইংগিত দেওয়া হয়েছে হাদিসে। তারা সকলেই সমান মর্যাদার হবেনা, কিন্তু প্রত্যেকেই তাদের মর্যাদানুযায়ী ধর্মীয় দুর্নীতি গুলির সংস্কার সাধন করবেন, মুসমান জনসাধারণকে সমগ্রভাবে ঐক্যসূত্রে বেঁধে ফেলবেন এবং হযরত মুহম্মদের সমকালীন ইসলাম বিস্তার করবেন। সেই খলীফাদের একজন হবেন ইমাম মেহদী। রসূল বলেছেনঃ তোমরা যখন খোরাসান থেকে কল পতাকা আসতে দেখবা, তোমরা তাদের সঙ্গে মিলিত হউ। কারণ তাদের সঙ্গে আল্লাহ্‌র মেহদী আছেন। কিন্তু একথা পরিষ্কার যে, রোজ- কেয়ামতের সময় ইমাম মেহদী উদিত হবেন না, তিনি আসবেন মুহম্মদ ও ঈসার মধ্যবর্তী কালীন সময়ের ঠিক মাঝামাঝি কালে। মুহম্মদ আরও এক সময় বলেছিলেন যে, তার পরেই খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে টা বজায় থাকবে ত্রিশ বছর কাল এবং ইমাম মেহদী আসবেন তার পরবর্তীকালে। অন্য এক সময় তিনি বলেছিলেন যে, তার সময়ে যেমন সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই রকম হযরত ঈসার সময় টা লয় পাবে এবং মেহদী আসবেন মাঝ সময়।

এরকম ভবিষ্যৎ বাণীও করা হয়েছিল যে, রসূলের ঠিক পরবর্তী খলীফাদের পর একদল সুলতান হবেন, যারা পার্থিব সুখ- সম্ভোগে মত্ত হয়ে ধর্মকে বিকৃত করে ফেলবেন ও মানুষকে খেলাফতের আদর্শ থেকে বিপথে নিয়ে যাবেন। কিন্তু কালক্রমে তারাও স্বেচ্ছাচারী শাসকদের হাতে কঠোরভাবে লাঞ্চিত ও উৎপীড়িত হবে। তখন আসমান থেকে বৃষ্টি হবে না এবং মাটিতে ফসল ফলবেনা। তারপর খরাসানের পূর্বদিগস্থ দেশ থেকে একটি দরিদ্র জাতির আবির্ভাব হবে। তারা পাহাড় অঞ্চলে প্রবেশ করবে এবং জন্য স্বেচ্ছাচারী শাসকের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। কিন্তু তার পূর্বেই মেহদীর জন্ম হবে। বাল্যকালে তিনি অখ্যাত থাকবেন। কিন্তু সেই মানুষটা যখন একটা রাজ্য জয় করবে, তখন তিনি উদিত হবেন ও তাদের ইমাম হিসেবে গৃহীত হবেন। তিনি হিন্দুস্থান জয় করবেন। এবং পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে পারস্য জয় করবেন আর যতদিন তিনি জেরুজালেমের উপর নিশান উত্তোলন না করছেন, ততদিন তিনি ক্ষান্ত হবেননা।

মেহদীর আবির্ভাব সম্বন্ধে যেসব চিহ্ন জড়িত, সেগুলি নিঃসন্দেহে সাক্ষ্য দেয় যে, হিজরি তের শতকেই তার জন্ম হবে। দিল্লীর বাদশাহের শক্তি হিন্দুজাতি মারহাট্টাদের নিকট মাথা নত করেছে। মধ্যভারত অত্যন্ত বিশৃঙ্খল অবস্থায় পতিত। আউধ ও বাংলার সুন্নী মুসলমানরা বহুকাল শিয়া শাসনাধীনে থাকার দরুন ধর্মীয় নিষ্ঠায় শিথিল হয়ে গেছে এবং হিন্দু রেওয়াজ গ্রহন করেছে। কিছুকাল হল খৃস্টান শক্তি [ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, লর্ড ওয়েলেসলী ও হেসটিংসের দক্ষতায়] ভারতে একচ্ছত্র হয়ে উঠেছে ও মালবের পাঠান দস্যুদের সব আশা- ভরসা নির্মূল করে দিয়েছে। আর শেষ কথা এই যে, পাঞ্জাবে শিখরা আজান দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। চারদিক থেকেই রসূলের ভবিষৎবাণী ফলিত হওয়ার চিহ্ন দেখা দিয়েছে। অতএব মেহদীর আবির্ভাবের সময় হয়ে গেছে, আর এজন্য সৈয়দ আহমদের দাবীতে কোন সন্দেহ থাকতে পারেনা। তিনি সৈয়দ এবং হযরত মুহম্মদের বংশধর। তার নাম আহমদ,আর আল্লাহ্‌র বাণী থেকে এটা পরিষ্কার যে, আহমদ ও মুহম্মদ একই নাম। তার জন্ম হয়েছে ১২০১ হিজরিতে, অর্থাৎ হিজরির তের শতকের প্রারম্ভে। তিনি মুরশিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। স্বভাবে তিনি রসূলের মতোই আর তার বাল্যকাল অখ্যাত ভাবেই কেটেছিল। তিনি খোরাসানের পূর্বদিকে অবস্থিত পার্বত্য অঞ্চলে প্রবেশ করেছেন একদল অনুচর নিয়ে ভারতের অমুসলমান শাসকদের সঙ্গে জেহাদ করার জন্য।

সৈয়দ আহমদের শিষ্যরা যে সিদ্ধান্তে এসেছিল, টা অবশ্য বিতর্কমূলক। তারা এ সিদ্ধান্তে এসেছিল নিতান্তই স্বেচ্ছাকৃত ভাবে এবং যেসব হাদীস তাদের পূর্বকল্পিত সিদ্ধান্তের অনুকূল ছিল, সেগুলি জোড়াতালি দিয়ে। কিন্তু এসব করেও সেসব হাদিসের সঙ্গে সংগতি রাখা গেলনা, যেগুলি দ্বার্থহীন। রসূল ঘোষণা করেছিলেন যে ইমাম মেহদীর পিতার নাম হবে তার নামে এবং তিনি হবেন আরবের শাসক। প্রথম শর্তটি সৈয়দ আহমদের শিষ্যরা একেবারে বর্জন করল আর শেষেরটি সম্বন্ধে তারা বিনা যুক্তিতেই দেখাতে চাইল যে, তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে তার অসংগতি নাই। অবশ্য আরও কতগুলি পৃথক কারণ ছিল, যার দরুন এই মতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। রাজশক্তি হিসেবে নিজেদের পতন ভারতীয় মুসলমানরা প্রত্যক্ষ করল, আর এশিয়া মাইনরে যুদ্ধ বিগ্রহের কহিনীও তাদের অবিদিত ছিলনা। তারা স্বপ্ন দেখত নিজেদের শান্তিময় ও সার্বভৌম শাসনাধিকারের, আর ইমাম মেহদীর আবির্ভাব ব্যতীত অন্য কোন উপায়ে তার সম্ভাবনা দেখতনা। বহু সুন্নী প্রকাশে বলাবলি করত, তার উদয় হবে হিজরি তের শতকে [১৭৮৬- ১৮৮৬ খৃঃ] আর শিয়ারা আরও নির্ভুল হয়ে দেখাতে চাইতো যে, হিজরির ১২৬০ সালে [১৭১৮ খৃঃ] তিনি উদিত হবেন। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে যেতে লাগলো, কিন্তু ইমাম মেহদীর আবির্ভাব হওয়ার অন্যতম প্রধান চিহ্ন খ্রিস্টান শক্তির দ্বারা কন্সটন্টিনোপলের বিজয় দেখা গেলনা, আর এজন্য তাদের আশাও ক্ষীণ হয়ে আসতে লাগলো। সহসা সৈয়দ আহমদের আবির্ভাবে কতগুলো চিহ্ন তো মিলে গেলো, অতএব হাদীস সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ জনসাধারণ তাকে ইমাম মেহদীর প্রকৃত মর্যাদায় বরন করে নিল। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের সম্মানের খাতিরে একথা বলতেই হয় যে, তারা এ মিথ্যা দাবীর তীব্র বিপক্ষতা করেছিলেন। সৈয়দ আহমদের দাবীর পোষকতাই নানা ধর্মীয় জাল ভবিষ্যৎবাণীও সৃষ্টি হয়েছিল। তাদের মধ্যে নিম্নের কাঁদিসটি মশুরঃ

আমি আল্লাহ্‌র কুদরত দেখছি, দুনিয়ার অবস্থা দেখছি,

আমি জ্যেতিষবলে দেখছি না, অনুপ্রেরণাই দেখছি।

আমি দেখছি চোখ মেলে খোরাসান, মিসর, সিরিয়া, ইরানের দিকে,

আমি সবখানেই কেবল বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধ দেখছি।

দুনিয়ায় বহু পরিবর্তন আসছে—

হাজারের মধ্যে আমি একটাই বিশেষ লক্ষ করছি।

আমি একটা আশ্চর্য কাহিনী শুনছি,

আমি এই দুনিয়াই দুঃসময় প্রত্যক্ষ করছি।

চারিদিকে দেখছি বিশাল বাহিনী লড়ছে, আর লুঠ করছে,

আমি দেখছি হীন বংশের লোক অকেজো শিক্ষা নিয়ে

আজ মোল্লা মওলবী আলখাল্লা পরছে।

আমি দেখছি সরদার ব্যাক্তি বন্ধুরা সব

সব জাতির মধ্যে লাঞ্চিত ও অবনত হচ্ছে।

প্রত্যেকেই দুবার করে নওকরী পাবে, আবার হারাবে;

দারিদ্রে ভুগবে, তারপর আবার নওকরি মিলবে।

আমি দেখছি, তুর্কীরা ও ইরানীরা সংগ্রামে- সঙ্ঘাতে মেতেছে।

আমি দেখছি সব শ্রেণীর লোকেরা শঠ ও প্রবঞ্চক হয়ে উঠছে।

আমি দেখছি, ধর্মনিষ্ঠ লোকেরা দেশত্যাগী হয়েছে,

আর দেশগুলো দুষ্টু লোকের আবাস হয়ে উঠেছে

শুধু একটিমাত্র সুখময় স্থান থাকবে-

কারণ আমি বিপদবারনকে প্রত্যক্ষ করছি।

বহু বহু বছর গত হলে পর-

আবার এ দুনিয়া সুন্দর হয়ে উঠবে।

আমি সিরিয়ায় একজন সুসিক্ষিত শাসককে দেখছি।

সমকালীন অবস্থার বিপরীতে আমি দেখছি,

একটা যুগকে, যেটা স্বপ্নময় বলে মনে হয়।

আমি দেখছি বারশো বছর গত হলে পর

পৃথিবীতে বহু আশ্চর্য ঘতনা ঘটবে।

আমি দেখছি, দুনিয়াই সুখের আয়নাখানাই

মরচে ধরে গেছে, বিবর্ণ ধুল;অয় হয়ে গেছে।

আমি দেখছি, জালিমের সীমাহীন অত্যাচার।

আমি দেখছি, সারাটা পৃথিবী ভরে গেছে

বিবাদ বিসম্বাদে, অত্যাচারে ও দুঃখ যন্ত্রণায়।

আমি দেখছি, মুনিবরা আজ গোলাম বনে গেছে,

আর গোলামরা সব মুনিবের জায়গা দখল করেছে।

আমি দেখছি মানুষ দুঃখে ও বিপদে চুপ করে রয়েছে।

নতুন আশরাফী তৈরি হবে কম সোনা দিয়ে।

আমি দেখছি দুনিয়ার সব শাসকরা আজ

পরস্পরের বিরুদ্ধে সারিবদ্ধ হয়ে দাড়িয়ে গেছে।

চাঁদ তার চাঁদনী হারিয়ে আধার হয়ে যাবে,

সূর্যটাও হারিয়ে ফেলবে তার তেজ।

আমি দেখছি, সুদূরের সউদাগররা

সফরকালে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

আমি দেখছি তুর্কীরা অত্যাচারিত হচ্ছে।

আমি দেখছি তরুলতা সব ফলহীন শুষ্ক হয়ে গেছে।

আমি প্রত্যক্ষ করছি ঐক্য, সহিষ্ণুতা ও সাবধানতার প্রয়োজনীয়তা।

দুঃখ করোনা, আমি বন্ধুকে প্রত্যক্ষ করছি, সে আসছে।

শীতের প্রখরতা কেটে গেলে পর

বসন্ত আসে সুর্যের সব গরিমায় প্রদিপ্ত হয়ে।

তার সাধনা সফল হলে পর তিনি এ জীবন থেকে চলে যাবেন,

আমি দেখছি তার পুত্র পিতাকেমনে রাখবে।

আমি পুত্রের রাজগি প্রত্যক্ষ করছি।

আমি দেখছি মহৎ বংশে তার জন্ম,

তিনি সারা দুনিয়ার শাহানশাহ।

আকৃতি ও স্বভাবে তিনি রসূলের সমতুল।

আমি দেখছি তিনি সুশিক্ষিত ও গম্ভীর প্রকৃতির,

আমি অনুভব করছি, ঈমানের বাগিচা

পুষ্পের মধুর সৌরভে পরিপূরিত।

আমি বন্ধুর হাতে দেখছি ঈমানের ফুল।

শোন বন্ধু শোন! এই সুলতান চল্লিশ বছর রাজত্ব করবেন।

আমি দেখছি পাপীর পতন, সে নিষ্পাপ ইমামের

দৃষ্টি থেকে নিজেকে লুকোতে চাইছে।

হে গাজীবর! যারা দুশমনকে হত্যা করে, তিনি তাদের বন্ধু।

তিনি তাদের ভালোবাসেন, তাদের সব কাজ সমর্থন করেন।

আমি দেখছি সত্যধর্ম ও ইসলামের মহিমা

উজ্জীবিত ও শক্তিময় হয়ে উঠছে প্রতিদিন।

আমি প্রত্যক্ষ করছি নওশেরওয়ার ধন দওলত,

আর সেকেন্দার শাহের অগণিত সম্পদ।

সত্য ইমাম আবার উদিত হবেন

আর সারা জাহানে রাজত্ব করবেন।

আমি দেখছি ও পড়ছি আহমদ।

অক্ষরগুলো শাহের নাম উদ্ভাসিত করে তুলছে।

আমি দেখছি দ্বীনের পথ হবে একমাত্র পথ,

আর পৃথিবী হবে উর্বরা।

আমি নিশ্চয় করে বলছি, তার দ্বারা

সারা দুনিয়াই শান্তি নেমে আসবে।

আমি দেখছি মেহদীকে ও ঈসাকে,

প্রত্যেকেই নিজের যুগে শাহীতে বরিত হয়েছেন।

আমি সারা দুনিয়াকে দেখছি দ্বিতীয় মিসর হয়ে গেছে,

আমি সেখানে দেখছি ন্যায় শাসনের কিল্লাহ।

আমি শাহের অধীনে দেখছি সাত জন আগন্তুককে,

আর তারা সকলেই উপযুক্ত মানুষ।

আমি দেখছি আল্লাহ্‌ সকলকেই করুণা করেছেন।

আমি দেখছি নিষ্ঠুর লোকের তরবারিগুলো কোষবদ্ধ,

তাদের সব মর্চে ধরে গেছে, ভোতা ও অকেজো হয়ে পড়েছে।

আমি দেখছি নেকড়ে, মেষ, বাঘ ও হরিণ

শান্তিতে সব এক সাথে বাস করছে।

আমি দেখছি, তুর্কীবাহিনী নীরবে বসে আছে,

আর তাদের দুশমনরা অলস হয়ে যাচ্ছে।

আর আমি দেখছি নিয়ামতুল্লাহকে,

সকলের থেকে নির্জনে একাকী বসে আছে।

এই রকম ছিল এই বিস্তৃত পুনরুজ্জীবনের মোটামুটি রূপ। অথচ দেখা যাচ্ছে যে, সমকালীন ব্রিটিশ সরকার সে সম্বন্ধে কিছুই ওয়াকিফহাল ছিলেননা। বাস্তবে এ পর্যন্ত প্রকাশিত নথিপত্র থেকে যতদূর দেখা যায়, এখনও পর্যন্ত ওহাবী মতবাদ সম্বন্ধে সরকারের কোন ধারণাই নাই। মিস্টার রেভেন্স যেসব সরকারী নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন, তার ১২৭ পৃষ্ঠায় এরকম দেখতে পাওয়া যায়ঃ

সৈয়দ আহমদের শিষ্যরা সাধারন ভাবে ওহাবী পরিচিত হলেও তারা এ উপাধি বর্জন করে এবং জিজ্ঞাসিত হলে নিজেদের হানাফী হিসেবে পরিচয় দেয়। বহুদিকে ফারাজী সম্পদ্রায়ের সঙ্গে তাদের অনেক মিল রয়েছে, আর ফারাজীরা সম্ভবতঃ বেশী গোঁড়া হানাফী। তবে পার্থক্যটা মনে হয় এই যে, হানাফীরা সৈয়দ আহমদকে বলে সৎ ও ধর্মনিষ্ঠ মানুষ। তাকে ইমাম হিসেবে স্বীকার করেনা; আর বলে যে তিনি মৃত। অন্যদিকে ওহাবীরা ও তার শিষ্যরা ঘোষণা করে যে, তিনি ইমাম; আর নিজেই শিষ্যমণ্ডলীকে বলেছিলেন, তিনি কিছুদিনের মত অন্তর্হিত হয়ে যাবেন, কিন্তু পুনরায় উদিত হবেন; তিনি কখনও মৃত নন। মুসলমানদের মধ্যে যারা বেশী অশিক্ষিত, তাদের মধ্যে সৈয়দ আহমদ ও ইমাম মেহদী সমন্ধে ধারনা খুবই গোলমেলে; কারণ সব শ্রেণীর মুসলমানের ধারনা যে, ইমাম মেহদী আসবেন মহাপ্রলয় ও শেষ বিচারের দিন সমাগত হবেন। আর ভুল ধারণাটার কিছুটা ওহাবীরা অস্বীকার করলেও তারা এতিকে পরোক্ষ ভাবে জিইয়ে রেখেছে তাদের অশিক্ষিত শিষ্যদের ধর্মীয় উন্মাদনা বাড়িয়ে তোলার জন্য। কারণ তাদের আশা আছে বিধর্মীদের উপর বিজয় লাভের ও দুনিয়াবী শক্তি ও শাসন প্রতিষ্ঠার, দ্বীন ইসলাম জারীর ও শেষে বেহেশতে সুখ লাভের।“ কিন্তু মওলবীদের পুথপত্রগুলি, যেগুলিকে খুবই সাবধানে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি থেকে গোপন রাখা হতো, তা থেকে মোটেই সন্দেহ থাকেনা যে, তাদের পৃথক মতামত কি ছিল। মিস্টার রেভেনস সম্ভবত লক্ষ করেননি, তার রিপোর্টের ১৪৭ পৃষ্ঠায় মুহম্মদ জাফরের রোজ নামচার তর্জমায় এই উক্তি টুকু আছেঃ

 ‘আমি হচ্ছি মুনশি তোফায়েল আলী মারফত মওলবী বেলায়েত আলী শাহের ঘনিষ্ঠ মুরীদ ও খাদিম। এখনও পর্যন্ত সৈয়দ আহমদের উপর আমার দ্বিধাহীন বিশ্বাস যে, তিনি মাঝামাঝি যুগের ইমাম আমার আরও বিশ্বাস যে, তিনি বেঁচে আছেন। হাদিসের উক্তি মতে যুগের ইমামকে স্বীকার না করে যে কেউ মৃত্যুবরণ করবে, ষে অজ্ঞতার পরলোকে যাবে। যেসব লোক সৈয়দ আহমদের ইমামত অস্বীকার করে, তারা সকলেই ধর্মভ্রষ্ট। আল্লাহ্‌ পাপীদের সঠিক পথে চালনা করুন ইমামের অভিব্যাক্তির আলোকধারায় তারা অভিষিক্ত হোক।‘

কিন্তু এই সম্প্রদায়ের মতবাদ বহু পূর্বেই ডক্টর হার্কটস মাদ্রাজ তার “কানুন-ই -ইসলাম” পুস্তকে লোকচক্ষে তুলে ধরেছিলেন। তার গ্রন্থের ২৫০ পৃষ্ঠার এই সম্প্রদায়কেই নিঃসন্দেহে তিনি উল্লেখ করে বলেছেনঃ

“গায়ের মেহদীরা প্রত্যেক জিলায় বা শহরে একটা জামাতখানা তৈরি করে এবং লায়লাতুল কদরের রাত্রিতে সকলেই সেখানে সমবেত হয় মেহদীর ‘দোগানা’ বা দু-রাকাত নামাজ আদায় করে। তারপর তারা সমবেত কণ্ঠে তিনবার পরতে থাকে- ‘আল্লাহু ইলাহুনা মুহাম্মাদুন নবীয়ুনা আল- কুরআন মেহদী আমান্না ওয়া সাদ্দাকনা” অর্থাৎ আল্লাহ্‌ সর্বশক্তিময়, হযরত মুহম্মদ আমাদের নবী এবং কুরআন ও মেহদী খাটি ও সত্য। তারপর তারা এই বলে শেষ করে- ‘ইমাম মেহদী এসেছিলেন ও চলে গেছেন, যারা এতে অবিশ্বাস করে তারা কাফের।‘ সুন্নীরা এসব শুনে এমনভাবে ক্ষেপে উঠে যে, তারা প্রথমে ছোট ছেলেদের লেলিয়ে দেয় খেলাচ্ছলে তাদের উপর ঢিল ছুরতে, তারপর নিজেরাই তলোয়ার নিয়ে হামলা করে। বিপক্ষ দল অন্য দিকে মনে করে যে, এমন পবিত্র রজনীতে মৃত্যু শাহাদাতের মর্যাদা এনে দিবে তারা জীবনকে তুচ্ছ করে আত্মরক্ষারথে দাড়িয়ে যায়। উপরোক্ত কারনে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিসদৃশ ঘৃণা আজ পর্যন্ত বর্তমান রয়েছে, আর এজন্য প্রত্যেক বছরেই বহু জীবনপাত হয়ে যায়। এই লেখকও এই রকম দু’তিনটি ভীষণ মারামারিতে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই গায়ের মেহদীদের জয়ী হতে দেখেননি। তিনি আরও লক্ষ করেছেন যে, এসব মারামারিতে তদন্ত রিপোর্টের বর্ণনানুযায়ী মৃতেরা বরাবরই মাটির দিকে মুখ রেখে পরে থাকে। সাধারন লোকেরা যখন এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঘোষণা দেই যে, এটা হচ্ছে তাদের ধর্মে বিশ্বাসহীনতা , তখন তারা প্রতিবাদ করে- ‘না না তা নয়; আমাদের শহীদরা সেজদায় পরে আছে” এই শত্রুতার প্রকৃত কারণ হচ্ছে এইঃ সুন্নীরা ও শিয়ারা আশা করে যে, মেহদী ভবিষ্যতে উদিত হবেন। অন্যদিকে গায়ের মেহদীরা মনে করে যে, সৈয়দ মুহম্মদ জিয়নপুরী [জয়পুরী] হচ্ছেন ইমাম মেহদী। তিনি ইতিমধ্যেই দুনিয়াই আবির্ভূত হয়েছিলেন ও চলে গেছেন এবং আর উদিত হবেননা। তারা মেহদীকে পয়গম্বরের মতোই স্রদ্ধা করে এবং বলে যে, যারা তাকে অস্বীকার করে, তারা নিঃসন্দেহে দোযখে যাবে। এজন্য তাদের বলা হয় গায়ের মেহদী [মেহদী বিহীন], অথচ তারা নিজেদের বলে প্রকৃত মেহদীওয়ালে কিংবা দায়েরাওলে। শেষেরটি বলার কারণ এই যে, ‘পীর- ই- দস্তগীর’ এর উপর তাদের কোন আস্থা নেই। অধিকাংশ গায়ের মেহদী হচ্ছে পাঠান আদিজাতিদের মধ্যে; কিন্তু সুন্নী শিয়াদের তুলনায় তারা এতোই সংখ্যাল্প যে, ‘গমের আটায় লবণের ছিটার মতো’।

ভারতীয় কৃষক সম্প্রদায়কে এ আন্দোলনে যোগদান করতে প্রলুব্ধ করার উদ্দেশ্য এই অশিক্ষিত লোকদের স্বার্থ, গর্ব ও গোঁড়ামিকে উত্তেজিত করার জন্য সবরকম যুক্তি খাড়া করা হয়েছিল। তাদের বলা হয়েছিল, তারাই হচ্ছে আল্লাহ্‌র নির্দেশিত প্রাচ্যদেশীয় জাতি, যারা সারা পৃথিবী জয় করবে এবং ভবিষ্যতে সৈয়দ আহমদের শাসনাধীনে তারাও শান্তিতে বাস করবে। মুসলমানদের মধ্যে ক্ষমতা আসবে এবং সব রকম পার্থিব বিভেদ লয় প্রাপ্ত হবে। দুর্ভিক্ষ আর হবেনা এবং অভাব- অনটনও আর থাকবেনা। আসমান থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বারিধারা বর্ষিত হবে, দুনিয়া শস্য- শ্যামলা হয়ে উঠবে। তা ছাড়া ভারতে জেহাদের বিষয়ে ভবিষ্যৎবাণী পরিষ্কার ভাবেই করা হয়েছে এবং মুহম্মদ তার ধর্মানুসারীদের ধনপ্রাণ দিয়েই এই জেহাদ সমর্থন করতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন। জেহাদে যারা মৃত্যু বরন করবে, তারা শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে; আর যারা প্রাণে বাঁচবে, তারা অবশ্যই নাজাত বা মুক্তিলাভ করবে। যারা এ বিষয়ে নিরুৎসাহী, তাদের কি শাস্তি হবে, তারও উল্লেখ করতে মওলবীরা পিছু হটেননি। এই শ্রেণীর লোকদের মৃত্যু হবে পাপী হয়েই এবং তারা অবিশ্বাসীদের সঙ্গে সমান শাস্তি লাভ করবে।

উত্তর- পশ্চিম অঞ্চলের বাশিন্দাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক মুজাহেদিন এসেছিল। দক্ষিণাত্যের বাশিন্দাদের ধর্মীয় উদ্দীপনা এতখানি বর্ধিত করা হয়েছিল যে, মেয়েরা পর্যন্ত গহনা বিক্রি করে আন্দোলনের টাকা দান করেছিলেন। বাঙালীরা প্রথমে পিছনে পড়েছিল; তারা স্বভাবতই ভীরু এবং উত্তর- পশ্চিম অঞ্চলের বাশিন্দাদের চেয়ে অধিককাল স্থায়ী সরকারের অধীনেও ছিল; এজন্য তাদের মধ্য থেকে কম সংখ্যক মুজাহেদীন এসেছিল। কিন্তু কালক্রমে তাদের বুদ্ধিমত্তার প্রাধান্য সবাইকে ছাড়িয়ে গেলো এবং আন্দোলনটার অনেকখানি বাঙালি মুসলমানদের উজ্জীবনের রূপ গ্রহণ করেছিল।

মোটের উপর আন্দোলনটা সফল হয়েছিল। সব শ্রেণীর মানুষের অভাব পূরনার্থে তা কার্যযকরী হয়েছিল। মুজাহিদরা শহীদ হওয়ার সুযোগ লাভ করল, আর শান্তিপ্রিয় লোকরা চাদা আদায় দিয়েই নাজাত ও মুক্তিলাভের পথ খুজে পেল।

মওলবীদের সাম্যনীতি ও ধর্মীয় ঐক্যের প্রচারনায় ছিল নিঃসন্দেহে আন্দোলনটি সাধারনের জনপ্রিয় হওয়ার একটা প্রধান কারণ। তারা শিক্ষা দিলেন যে, প্রত্যেক মুসলমানই পরস্পরকে দেখবে ভাই- ভাই হিসেবে। পদমর্যাদাসিক্ত ও প্রভাবশালী লোকদের বাহ্যিক অধিক সম্মান দেখানো হচ্ছে মুসলমান ধর্মে বেদাত, কারণ পয়গম্বরের জীবদ্দশায় এমন কোন রেওয়াজ ছিলনা, অতএব এটি বর্জন করা উচিত। প্রত্যেক মুসলমান তার পদমর্যাদায় যাই হোক না কেন, সাধারন নিয়মের ;আসসালামুআলায়কুম’ সম্বোধনেই তাকে সন্তুষ্ট হতে হবে। আর যারা বিধর্মী, তা সে হিন্দুই হোক বা খৃস্টানই হোক, তাকে কোন সম্মান দেখাতে হবেনা।

সৈয়দ আহমদ কর্তৃক পেশোয়ার জয়ের সংবাদটা দ্রুতগতিতে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়লো। মওলবীরা তার প্রয়োজনীয়তা বেশী করেই বাড়িয়ে দিলেন এবং আন্দোলনটাকে নতুন ভাবে জাগিয়ে তুললেন। কিন্তু হটাত যেন আন্দোলনটা নিভে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিল। উত্তর- পশ্চিম ভারত থেকে ক্রমাগত পলাতকের দল আসতে লাগলো সৈয়দ আহমদের মৃত্যুবার্তা নিয়ে এবং তার অনুগামীদের ছত্রভঙ্গ হওয়ার দুঃসংবাদ নিয়ে।

দ্বিতীয় প্রবন্ধ

বারাসতে সৈয়দ আহমদের শিষ্যদের মধ্যে একজন ছিলেন নিসার আলী ওরফে তিতুমীর। তার বাস ছিল চাদপুর গ্রামে। সাধারন গ্রামীণদের চেয়ে তিনি ছিলেন উচ্চকুলের ও সম্ভ্রান্ত জোতদার মুনশী আমীরের সঙ্গে তার বিবাহসূত্রে আত্নীয়তা ছিল। তিনি ছিলেন একজন খারাপ ও বেপরোয়া স্বভাবের লোক। ১৮১৫ সালে তিনি কলকাতায় পেশাদার কুস্তিগির হিসেবে বাস করতেন। পরে তিনি নদীয়ায় জমিদারদের লাঠিয়াল নিযুক্ত হন। একটা মারামারিতে জড়িত হয়ে তিনি কারাদণ্ড ভোগ করেন। কারাবাস থেকে খালাস পেয়ে তিনি ঘটনাক্রমে দিল্লীর শাহী বংশের একজনের দৃষ্টিপথে আসেন ও তার অনুচর হয়ে মক্কায় হজ্জ করতে যান। সেখানে সৈয়দ আহমদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সৈয়দ আহমদ পূর্বেই ১৮২২ সালে তথায় গমন করেছিলেন। তিনি সৈয়দ আহমদের মুরীদ হন। ১৮২৭ সালে তিনি ভারতে প্রত্যাগমন করেন পূর্বের বাসগ্রামের অনতিদূরে অবস্থিত হায়দারপুরে বসবাস করতে থাকেন। এখানে তিনি ওহাবী মতে সংস্কার প্রচার করতে থাকেন। সৈয়দ আহমদের মতো তিনি পীরপূজার নিন্দা করতেন, মাজার তৈরির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তোলেন, মৃত ব্যাক্তিদের নামে দান- খয়রাতের উপযোগিতা অস্বীকার করতেন, নিজের মুরিদদের দাড়ি রাখতে বলতেন এবং তাদের এমন এক বিশেষ ধরনের পোশাক পরতে বলতেন যাতে সহজেই তাদের কাফেরদের থেকে পৃথকভাবে চেনা যায়। তাছাড়া তাদের তিনি নির্দেশ দিতেন নিজেদের মজহাব ছাড়া অন্য লোকদের সঙ্গে মেলামেশা না করতে। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি হয়ে উঠলেন তিন চারশো ভক্ত অনুগামীদের ধর্মীয় নেতা এবং তার প্রভাব বিস্তৃত হয়ে পড়লো ইছামতী নদীর পার্শ্ববর্তী নারিকেলবেড়িয়া গ্রামের চারপাশের অঞ্চলে, প্রায় আঠারো- কুড়ি মাইল দীর্ঘ ও বারো- চৌদ্দ মাইল প্রশস্ত এলাকা জুড়ে।

এই মজহাবের উত্তরোত্তর বুদ্ধি হানাফী কৃষক সম্প্রদায় ও হিন্দু জমিদারকুল অত্যন্ত অসন্তোষ ও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছিল। চাষিরা প্রতিবাদ করতো এই নয়া মজহাবের অনুসারীরা তাদের বহু স্রদ্ধাহ অনুষ্ঠান ও আচার নীতি সম্বন্ধে নিতান্তই শ্রদ্ধাহীন ভাবে কথা বলার জন্য। আর প্রাচীনপন্থী জমিদারেরা সহজেই তাদের বিরুদ্ধে চাষিদের অভিযোগ শুনতেন এবং এই নয়া মজহাবের বৃদ্ধি রোধ করতে সর্বশক্তি ব্যায় করতেন। কারণ তারা মোটেই তাদের সম্মান দেখাত না এবং এমন একটা দৃঢ় ঐক্যভাব দেখাতো, যার দরুন তারা নিজেদের স্বার্থ ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা করতেন।

সৈয়দ আহমদের ১৮২৯- ৩০ সালের বিরাট বিজয় তার বাংলাদেশের অনুগামীদের উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। তারা নিজেদের আন্দোলনের সাফল্য সম্বন্ধে আরও প্রত্যয়ী হয়ে উঠলো। অতঃপর তারা নীরবে ও গোপনে কাজ করার এ পর্যন্ত অনুসৃত অভ্যাসটা ত্যাগ করলো এবং প্রকাশ্যে অন্য ধর্মের উপর অনুদারতা জাহির করতে লাগলো। ১৮৩০ সালের আগস্ট মাসের বারাসতের জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেটের গোচরে আসে যে, পাঞ্জাবে মালিক নামে একজন ওহাবিকে তার জমিদার জরিমানা করেছেন ও আটক করেছেন। কারণ সে মোহররমের সময় একটা মশহুর মাজার ভেঙ্গে ফেলেছিল। ১৮৩১ সালের প্রথম ভাগে পুর্ব বাংলায় গোলযোগ ওঠে এবং এপ্রিল মাসে ফরিদপুরের হাজী শরীয়তুল্লাহর অনুগামীরা, যারা সৈয়দ আহমদের প্রচারিত মতবাদের অনুরূপ মত পোষণ করতো, প্রকাশ্যে একটা গ্রামের উপর হামলা চালায় ও লুঠতরাজ করে, কারণ সে গ্রামের জনৈক বাসিন্দা তাদের মজহাবে যোগদান করতে স্বীকৃত হয়নি।

ইছামতী নদীর তীরে অবস্থিত পুর্ণার জমিদার ছিলেন কৃষ্ণরায়। ১৮৩১ সালে জুন মাসে কৃষ্ণরায়ের অত্যাচারে অবস্থা ঘোরালো হয়ে উঠলো। তিনি তার ওহাবী প্রজাদের উপর মাথাপিছু আড়াই টাকা করে কর বসালে এতাকে দাড়ির উপর কর হিসাবে জাহির করে জ্বালাটা আরও বাড়িয়ে তুললেন। বিনা প্রতিবাদে তিনি পূর্ণা গ্রামে কর আদায় করলেন এবং তারপ পার্শ্ববর্তী গ্রাম সরফরাজপুরে কর আদায় করতে গমন করলেন। কিন্তু এখানে তার প্রচেষ্টা দুর্ভাগ্যক্রমে সফল হল না। তিতুমীরের একদল অনুগামী এখানে পূর্ব থেকেই জমায়েত ছিল। একথা বলা শক্ত যে, তারা পূর্বপরিকল্পনা অনুসারেই কিংবা ঘটনাক্রমে সেখানে হাজির ছিল। যা হোক তারা প্রতিবাদ জানালো এবং কর আদায়কারী পিয়াদাদের ধরে আটক করে রাখল। পরিস্থিতির সংবাদ সঙ্গে সঙ্গে জমিদারকে জানানো হয়। তার ক্ষমতার এরকম প্রকাশ্য অবমাননায় তিনি ক্ষেপে উঠেন এবং দু’ তিনশো অনুচর সংগ্রহ করে নিজেই সরফরাজপুর গমন করেন। একটা দাংগা বেঁধে যায়, কয়েকখানা ঘর লুঠ করা হয় ও একটা মসজিদ পুড়িয়ে ফেলা হয়। তারপর উভয় পক্ষই বারাসত থানায় পুলিশের কাছে ঘটনার বিষয়ে এজাহার দেয়। জমিদারের লোকেরা তিতুমীরের অনুগামীদের বেআইনি কয়েদ ও আটক রাখার ও নিজেদেরই মসজিদ পোড়ানোর জন্য দায়ী করে। থানায় মুহরি সঙ্গে সঙ্গে অকুস্থলে হাজির হন ও তদন্ত শুরু করেন। জমিদার পলাতক হলেন এবং কিছুদিন আত্মগোপন করে সাত জুলাই তারিখে বারাসতের জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেটের নিকত আত্মসমর্পণ করেন। তখন তিনি প্রকাশ করেন যে, ঘটনার বিষয় তিনি কিছুই জানেননা এবং দাংগার সময় তিনি সত্যি সত্যি কলিকাতায় ছিলেন। ইতিমধ্যে বারসতের থানার দারোগা ঘটনার তদন্তের ভার গ্রহণ করেন তার হাতের কারসাজিতে সমস্তই সহসা ভিন্ন চেহারা ধারন করলো। তখন মামলার আসল ফরিয়াদীরা ও সাক্ষীরা নিজেরাই মসজিদ পুড়িয়ে দেওয়ার ও জমিদারকে মিথ্যা অপরাধে জড়িত করার দোষে দায়ী হয়ে গেল। তিতুমীরের অনুগামীরা পলাতক হল এবং তাদের আসল মামলার সাক্ষী দিতে হাজির হলনা, কারণ তাহলে তারাই আটক হয়ে পড়বে। এভাবে অবস্থাটা চরম ভাবে সফল হয়ে গেলো জমিদারের পক্ষে। দারোগা তাদের বিরুদ্ধে গরহাজির রিপোর্ট দিলেন এভাবে জমিদারের বিরুদ্ধে রাহাজানি ও ঘর জ্বালানির মামলাটা সাক্ষের অভাবে ফেসে গেলো। শেষ পর্যন্ত তিনি উভয়পক্ষকেই কোর্টে সোপর্দ করলেন মারামারি করার অপরাধে। মামলাটিতে যেভাবে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করা হয়েছিল, তাতে মনে হয়, দারোগা অসহায় অবস্থায় পড়েছিলেন। তিতুমীরের অনুগামীরা দরখাস্ত দিয়ে নিবেদন করে যে, ঘটনার পর আঠারো দ্বীন পর্যন্ত কোন পাল্টা মামলা দায়ের করা হয়নি; তারা দারোগার ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ আনল এবং অভিযোগের সপ্রমাণে সাক্ষীদের নামে সমন জারীর প্রার্থনা করলো। কিন্তু তাদের এসব দরখাস্তে মোটেই কর্ণপাত করা হয়নি। মামলাটা কিছুকাল চলার পর উভয়পক্ষকেই খালাস দেয়া হয়। ওহাবীরা কিন্তু দারোগার বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করে এবং কয়েক মাস পরে তিনি সহসা তাদের কবলে পরলে তারা তাকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে।

মামলা শেষ হওয়ার পর উভয়পক্ষ ঘরে ফিরল। কিন্তু তারপর তিতুমীরের অনুগামীদের উপর ভীষণ উৎপীড়ন করা হতে লাগলো। এরকম প্রকাশ হতে লাগলো যে, জমিদার প্রতিপক্ষকে জব্দ করার মতলবে বাকী খাজনার দায়ে তাদের আটক করতে থাকেন। তিনি দেওয়ানী আদালতে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বাকী খাজনার মামলা দায়ের করতে লাগ্লেন। ২৫ শে সেপ্টেম্বর তারিখে মুসলমানরা তাদের মামলায় জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেটের হুকুমের বিরুদ্ধে আপীল দায়ের করতে কলকাতায় গেলো। কিন্তু জজ সাহেব তখন বাকেরগঞ্জ মামলার সুনানি সুনতে গিয়েছিলেন। এজন্য তারা কিছুই করতে পারলনা।

পুর্বে না হলেও, ঠিক এই সময়ে তিতুমীর জেহাদ ঘোষণার সংকল্প করলেন। কিছুকাল পূর্বে মিসকিন সাহ নামক একজন ফকীর তার সঙ্গে যোগ দেন ও তার বাড়ীতেই বসবাস করতে থাকেন। মিসকিন শাহের অন্যান্য মুরিদরাও জমায়েত হতে লাগলো, এই মজহাবের অন্যান্য লোকদের নিকট হতে চাঁদা আদায় হতে লাগলো এবং চাউল ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয় করে নারিকেলবাড়িয়ায় মইজুদ্দিন বিশ্বাসের বাড়িতে জমা হতে লাগলো। সম্ভবত ২৩ শে অক্টোবর তারিখে তিতুমীর তার অনুগামীদের একটা ভোজ দেওয়ার উছিলায় জড়ো করলেন এবং মাসের শেষের দিকে তার বহু অনুচর নানা রকম অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে জমায়েত হতে লাগলো।

কয়েকদিন কেটে গেলো নারিকেলবাড়িয়া গ্রামখানিকে ঘিরে একটা মজবুত বাঁশের কিল্লাহ নির্মাণ করতে। ইতিমধ্যেই এই জমায়েতের সংবাদ পূর্ণার জমিদারের কর্ণে পৌঁছাল। তিনি বেশ অনুধাবন করলেন যে, আক্রমণের প্রথম চোট উদ্যত হবে তার উপরেই। এজন্য তিনি সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করলেন কিন্তু কোনও ফল হলনা। ৬ই নভেম্বর তারিখের সকালবেলায় প্রায় পাঁচশো ধর্মান্ধ পূর্ণা আক্রমন করতে চলল। তারা প্রথমে একজন ভ্রাম্মনকে হত্যা করলো, তারপর গ্রামবাসীদের দুটি গরুকে ধরে জবেহ করলো। বাজারের মাঝখানে তার রক্ত দিয়ে একটি হিন্দু মন্দির অপবিত্র করলো এবং অঙ্গ- প্রত্যঙ্গগুলো তাচ্ছিল্ল্যভাবে ঝুলিয়ে দিল দেব মূর্তির সম্মুখে ও বাজারের কোণে কোণে। এসব করার পর তারা সব দোকানপাট লুট করে ও পথবাহী স্মিথ নামে একজন দেশীয় খৃষ্টানকে ধরে মারধর করে এবং যেসব মুসলমান তাদের মজাহবে যোগ দেইনি, তাদের বেইজ্জত করে। অতঃপর তারা প্রকাশ্যে ঘোষণা করলো যে, কোম্পানীর শাসন খতম হয়ে গেছে; এবং দাবী করলো যে, শাহী ক্ষমতা একমাত্র মুসলমানদেরই প্রাপ্য ও জন্মগত অধিকার; তা ইউরোপীয়রা অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে ফেলেছিল। মনে হয়, এসব ভুমিকা ইচ্ছা পূর্বক ও সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবেই করা হয়েছিল। বাঙালীরা বিরাট একদলে জমায়েত হলে যেসব হৈ- চৈ ও গোলযোগ উপস্থিত হয়, তার কিছুই হয়নি, বিদ্রোহীরা জঙ্গি নিয়েমানুবর্তিতা মেনে চলেছিল এবং গোলাম মাসুমের নেতৃত্বে সামরিক কায়দায় সারি বেঁধে কুচকাওয়াজ করতে করেত চলেছিল।

পরদিন সকালে তারা নদীয়া জিলার ভিতরে হামলা করে এবং লাউঘাটা গ্রামে প্রবেশ করে। এই গ্রামে তাদের সম্প্রদায়ের লোকদের সংখ্যা কিছু বেশী। তারা প্রথমে হিন্দুদের বস্তিতে একটা গরু জবেহ করে। তখন হিন্দু রায়তরা বাধা দেয় ও একটা দাংগা বেঁধে যায়। এই দাংগায় গ্রামের হিন্দু মোড়ল নিহত হয় এবং তার ভাই ও আরও কয়েকজন আহত হয়। তারপর বিদ্রোহীরা তাদের সদর কর্মকেন্দ্র নারিকেলবাড়িয়ায় প্রত্যাগমন করে। তার পরের কয়েকদিন কেটে গেলো লাউঘাটার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যে দারোগা তদন্ত করতে এসেছিলেন তাকে খেদিয়ে ফিরিয়ে দিতে রামচন্দ্রপুর ও হুগলী গ্রাম দুটি লুট করতে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের হিন্দুদিগকে অপমান করতে ও বল পূর্বক ইসলামে দিক্ষীত করতে। ১৪ তারিখে তারা শেরপুরের জনৈক সম্ভ্রান্ত মুসলমানের বাড়ি লুট করে এবং বলপূর্বক তার কন্যার সঙ্গে নিজেদের দলপতির শাদী দিয়ে দেয়।

মনে হয়, এ পর্যন্ত বেসামরিক কর্তৃপক্ষের আন্দোলনটার গুরুত্ব সম্বন্ধে কোন ধারণাই জন্মাইনি। অথচ পরিস্থিতির এমন সব অবস্থা হয়েছিল, যা থেকে প্রথমেই খাটি সংবাদ পাওয়া নিশ্চয়ই উচিত ছিল। আক্রান্ত এলাকাটি নদীয়া ও বারাসত জিলার অংশ নিয়ে বিস্তৃত। তার মাঝে মাঝে অনেক নীল কুঠি ছড়িয়ে ছিল এবং বাগুন্ডির সরকারী লবণগোলাও ছিল অনতিদূরে অবস্থিত। ২৮শে অক্টোবর তারিখে প্রথমেই বারাসতের ম্যাজিস্ট্রেট সংবাদ পান যে, তিতুমীরের অনুগামীরা নারিকেলবাড়িয়ায় জমায়েত হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটাকে তিনি এতোই তুচ্ছ ভাবলেন যে, তিনি মনে করলেন জান দুয়েক বরকন্দাজ দিয়েই জমায়েতটাকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া যাবে। কয়েকদিন আর কোন সংবাদ পাওয়া গেলো না। কয়েকজন লোক মারফত যা কিছু সামান্য খবর মিলল, তাতে জানা গেলো যে, বিদ্রোহীরা কয়েকটা খুন করেছে। তখন তিনজন জমাদারকে ত্রিশ জন বরকন্দাজ দিয়ে নির্দেশ দেওয়া হল বারাসতের ম্যাজিস্ট্রেটকে সাহায্য করতে। কিন্তু এই সামান্য লোকবল নিয়ে তিনি বিদ্রোহের মোকাবিলা করতে অক্ষমতা জানালেন। তবে নদীয়া ও বারাসতের বাশিন্দাদের সৌভাগ্য এই যে, সেখানে আরও এমন সব ব্যাক্তি ছিলেন, যারা আন্দোলনটাকে তিচ্ছ ভাবেননি। ১১ই ও ১২ই নভেম্বর তারিখে বিদ্রোহীদের সদর কর্মকেন্দ্রে নিকটবর্তী নীলকুঠির ভারপ্রাপ্ত সহকারী কর্মচারী মিঃ পিরন কলিকাতাবাসী তার মালিক স্টরমকে পত্র পাঠান। তাতে তিনি ১০ই তারিখে অনুষ্ঠিত নৃশংস ঘটনা সম্বন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। স্থানীয় বেসামরিক কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তার অনুযোগ তোলেন এবং একথাও পরিষ্কার ভাবে জানান যে, গোলযোগ নিবারণ করতে কোন সক্রিয় পন্থা অবলম্বন করা না হলে সরকার ভীষণ বিপদ্গ্রস্থ হবে। মিঃ স্টরম তখনই যথাবিহীত ব্যাবস্থা করলেন। ১৩ই তারিখে তিনি নদীয়াই ও বারাসাতের ম্যাজিস্ট্রেটদ্বয়কে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে পত্র দিলেন এবং তার কর্মচারীর পত্রগুলি ডেপুটি গভর্নরের নিকট পাঠিয়ে দিলেন বিবেচনার জন্য। প্রথমে সরকার বিদ্রোহের অস্তিত্বই বিশ্বাস করতে চাইলেন না। তারা তো কোন সংবাদই পাননি, যা থেকে তাদের বিশ্বাস জন্মাতে পারে যে, এ ধরনের বিদ্রোহ হতে পারে। অতএব তারা সম্ভাবনা সম্বন্ধে কোন সংবাদ না পাওয়ায় এতদূর ভীষণ বিদ্রোহের ঘটনা অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। কিন্তু এই ভ্রান্তি ঘুচে গেলো যখন সরকারী রিপোর্ট বারাসাতের ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট থেকে একই ধরনের পত্র পাওয়া গেলো।

তখন আশু প্রস্তুতি চলতে লাগলো বিদ্রোহ দমন করতে। কলকাতা সামরিক বাহিনীর একটা অংশ বাগুন্ডির যশোর লবণগোলায় পাঠিয়ে দেয়া হল মিঃ আলেকজান্ডারকে নির্দেশ দেওয়া হল সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে ও বিদ্রোহ দমনে অগ্রসর হতে। তিনি ১৪ই তারিখে রওয়ানা হলেন এবং বাগুন্ডিতে সহযোগিতার জন্য বারাসতে সব রকম বন্দোবস্ত করে ফেললেন। বেলা ৯ টার সময় তিনি বাদুরিয়ায় পৌঁছলেন। এটা বিদ্রোহের শিবির থেকে ৬ মাইল দূরে ছিল। সেখানে দারোগা বহু বরকন্দাজ ও চৌকিদার নিয়ে তার সঙ্গে যোগ দিলেন। সমগ্র বাহিনীর সংখ্যা দাঁড়ালো একশো কুড়িজন। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর তারা শত্রুর সন্ধানে অগ্রসর হলেন। তারা দেখলেন যে, পাঁচ- ছয়শো লোক নানা অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নারিকেলবাড়িয়া গ্রামের সামনের ময়দানে যুদ্ধার্থে দাঁড়িয়ে গেছে এবং গোলাম মাসুম অশ্বপৃষ্ঠে তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বাঙালীরা সাধারনত ভীরু জাত। মিঃ আলেকজান্ডার ও তার দলবল কোন ভীষণ বিরুদ্ধতার আশংকা করেননি। তারা নিশ্চিত ভেবেছিলেন, ওহাবীরা সামরিক বাহিনী দেখলেই ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। এই ধারনার বশবর্তী হয়ে সিপাহীদের নির্দেশ দেওয়া হয় ফাকা আওয়াজের টোটা ভরতে। আর মিঃ আলেকজান্ডার রক্তপাত এড়াবার ইচ্ছায় একাই অগ্রসর হয়ে দেশী লোকদের ভর্তসনা করতে গেলেন। কিন্তু তার কথায় কোন কর্ণপাত করা হলনা। বিপক্ষরা তাকে ও তার দলবলকে ইটপাটকেল ও সমান স্তরের অস্ত্র দিয়ে আক্রমন করলো এবং পরে গোলাম মাসুম বাহিনী নিয়ে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পরলে সিপাহীরা ফাকা গুলি ছুড়ল। কিন্তু দুশমনরা সঙ্গে সঙ্গে তাদের ঘিরে ফেলল ও কেটে খন্ড খন্ড করে ফেলতে লাগলো। কলকাতা সামরিক বাহিনীর জমাদার, দশজন সিপাই ও তিনজন বরকন্দাজ নিহত হয়। বারাসতের দারোগা, কলোঙ্গা থানার জমদার ও কয়েকজন বরকন্দাজ গুরুতর ভাবে আহত হন ও বিদ্রোহীদের হাতে বন্দী হন। তারা তাদের নিজেদের কিল্লাই ধরে নিয়ে যাই ও দারোগাকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে। মিঃ আলেকজান্ডার বহু কষ্টে বেঁচে যান। তিনি প্রাণ নিয়ে পলায়ন করতে লাগলেন, আর বিদ্রোহীরা নাঙ্গা তলোয়ার হাতে তাকে তারা করে ফিরতে লাগলো। শেষে তিনি বাদুরিয়ায় উপস্থিত হন ও একটা নৌকা ধরে যশোরের লবণগোলায় সূর্যাস্তের সময় পৌঁছালেন। তার মুখে যুদ্ধের বিশদ বিবরণ শুনে সেখানকার রেসিডেন্ট মিস্টার বারবারের চোখে- মুখে কি পরিমাণ আতংক দেখা দিয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়। তিনি তো সকালে মিঃ আল্রকজান্ডারকে রওয়ানা করে দিয়েছিলেন এই ভরসাই যে, সিপাইদের উপস্থিতিই গোলযোগ নিবারণের জন্য যথেষ্ট হবে। এখন পরিষ্কার হয়ে গেলো যে, বিদ্রোহটা যা ভাবা হয়েছিল তার চেয়েও গুরুতর এবং কালক্ষেপ করা মোটেও সমীচীন হবেনা। লবণগোলায় যা কিছু টাকা পয়সা ছিল সমস্তই তাড়াতাড়ি একটা নৌকাই উঠিয়ে ফেলা হল এবং মিঃ আলেকজান্ডারের জিম্মায় সুন্দরবন হয়ে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হল।

বিপদের উপর বিপদ উপস্থিত হল। ১০ই নভেম্বর তারিখে নদীয়ার ম্যাজিস্ট্রেট সংবাদ পেলেন বিদ্রোহীরা লাউঘাটা আক্রমণ করেছে। ১২ই তারিখে সোজা তাদের অক্ষমতা জানালো সাহায্য ব্যতীত বিদ্রোহের মোকাবিলা করতে। একজন দারোগা ও কুড়িজন বরকন্দাজ পাঠিয়ে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করা হল। তারপর পুলিশের নিকট থেকে আর কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি। কিন্তু ১৪ই তারিখে মিঃ স্টর্মের পত্র এসে গেলো। তখন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব তাড়াতাড়ি যা পারলেন পুলিশ সংগ্রহ করে তাদের নিয়েই দাঙ্গাবাজদের নমন করতে অগ্রসর হলেন। সেখানে মিঃ এনড্রুজ নামে একজন নীলকর সাহেব তার চারজন ও যেসব কর্মচারী সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল, তাদের নিয়েই তার সঙ্গে যোগ দিলেন। মোটেই কালক্ষেপ করা হলনা এবং প্রায় দু’ তিনশো সশস্ত্র বাহিনী ইছামতী নদীর নীচের দিকে অগ্রসর হল বিদ্রোহীদের আক্রমণ করতে। তারা ১৬ই তারিখের বিকেল পাঁচটায় বাদুরিয়ার কুঠিতে উপস্থিত হয়ে দেখল, বিদ্রোহীরা ঐ দ্বীন সকালবেলায় কুঠিটিকে লুণ্ঠন ও ধ্বংস করে দিয়েছে। মিঃ পিরণ বারাসতের ম্যাজিস্ট্রেটকে যে সংবাদ দিয়েছিলেন, এটা হল তার প্রতিশোধ গ্রহণ।

মিঃ আলেকজান্ডারের পরাজয়ের সংবাদও এসে গেলো। কিন্তু বিদ্রোহীদের ক্ষমতা কতখানি এবং তাদের উদ্দেশ্যই বা কি, সে সম্বন্ধে ভাসা ভাসা খবর আসতে লাগলো। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আরও শক্তি সাহায্য না পাওয়া পর্যন্ত আর অগ্রসর হতে প্রথমে রাজি হলেননা। কিন্তু সংবাদদাতারা তাকে মতলব করেই জানালো, বিদ্রোহীরা এমন কিছু সংখাধিক নয়, বা উপযুক্ত অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত নয়, যার দরুন বিজয় লাভের সন্দেহ থাকতে পারে। এভাবে প্রতারিত হয়ে তিনি আক্রমণ করাই স্থির করলেন। ১৭ তারিখের সকালে ইউরোপীয় হাতির উপর সওয়ার হয়ে বাহিনী নিয়ে নারিকেলবাড়িয়ার দিকে অগ্রসর হলেন। সেখান থেকে দূরত্ব ছিল মাত্র চার মাইল। পথে বাঙালীরা একে একে সরে পড়তে লাগলো এবং দলটি যখন নারিকেলবাড়িয়া গ্রামের খোলা ময়দানে উপস্থিত হল, তখন দেখা গেলো যে, মাত্র কুড়ি বা ত্রিশ জন উত্তর ভারতীয় বরকন্দাজ ব্যাতিত প্রত্যেক দেশীয় লোক অদৃশ্য হয়ে গেছে। অথচ তারা দেখল যে, বিদ্রোহীরা প্রায় এক হাজার লোক, রীতিমত যুদ্ধ সজ্জায় দাড়িয়ে আছে এবং খোদ তিতুমীর তাদের নেতৃত্ব করছেন। এরকম পরিস্থিতে আক্রমণ করা সমীচীন নয় ভেবে ইউরোপীয়রা পিছনে হটতে লাগলো। কিন্তু যেই তারা পিছন ফিরল, তখনই বিদ্রোহীরা দ্রুত গতিতে তাদের ধাওয়া করলো ধরে ফেলে নদীয়া ফৌজদারি কোর্টের নাজিরকে ও দুজন বরকন্দাজকে হত্যা করলো। বেচারারা পালিয়ে বাচতে পারেনি। বাকী সকলেই প্রাণপণে ধাবমান হয়ে ইছামতী নদীর তীরে পৌঁছালো ও বহু কষ্টে নৌকা ধরতে পারল। তারপর তারা ঝাকে ঝাকে গুলি ছুরতে লাগলো, কিন্তু কোন ফল হয়নি। বিদ্রোহীরা একজন মাত্র মারা গেলো ও একজন আহত হল। মিঃ আলেকজান্ডারের পরাজয়ের পর ধর্মান্ধদের বিশ্বাস জন্মেছিল যে, তারা আল্লাহ্‌ কর্তৃক দুশমনের গুলি থেকে বিশেষ হেফাজতে রক্ষিত ও নিরাপদ। তাদের এ বিশ্বাস আরও দৃরভূত হল, যখন তারা দেখল যে, নদীয়াই ম্যাজিস্ট্রেটের বাহিনী তাদের খুব কম ক্ষতি করতে পেরেছে। অতএব তারা অসম সাহসে সামনে অগ্রসর হল এবং ইউরোপীয়দের নৌকাগুলি ঘিরে ফেলতে ও উপরে উঠতে চেষ্টা করতে লাগলো। অবস্থা তখন বেগতিক দেখে ইউরোপীয়রা নৌকাগুলি নদীর অপারে ফেলে দৌড়াতে লাগলো এবং এক মাইল তফাতে রাখা হাতিগুলির উপর উঠে পালিয়ে গেলো। প্রায় ২৬ মাইল এসে তারা একটা বড় নীলকুঠিতে আশ্রয় পায়। একটি হাতি, একটি পানশী, একটা বজরা ও অন্যান্য নৌকা বিদ্রোহীদের হাতে পড়লো। বিদ্রোহীরা পর পর দুটি যুদ্ধে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে হারিয়ে জয়লাভ করে উল্লসিত হয়ে উঠে ও আরও লুণ্ঠন চালাতে থাকে। তারা হুগলীর নীলকুঠি আক্রমণ করে এবং ম্যানেজারকে সপরিবারে বন্দী করে, তারপর তাদের নারিকেলবাড়িয়ার কিল্লায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তিতুমীর ও মিসকিন শাহের সামনে হাজির করা হয়। তারা বন্দীদের নিকট অবিলম্বে বিনাশর্তে তাদের হুকুমত মেনে নিতে দাবি জানান। ম্যানেজার বুদ্ধিমানের মতো সম্মত হলেন। তিনি জিম্মি হতে রাজি হলেন এবং ভারতীয় শাসকরূপে তাদের অধীনে নীল চাষ করতে সম্মত হলেন। তখন তারা তার বশ্যতাই সন্তুষ্ট হয়ে তাকে মুক্তি দিলেন। বেসামরিক কর্তৃপক্ষ একেবারে অকেজো হয়ে পড়লো এবং বিদ্রোহীরা তাদের সমস্ত নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে উত্তরের কৃষ্ণনগরের দিকে অগ্রসর হতে ইচ্ছা করলো। তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ও জমিদারদের উপর ইশতেহার জারী করে নির্দেশ দিল তাদের হুকুমত মেনে নিতে এবং তাদের অভিযানকালে রীতিমত রসদ যোগাতে। কিন্তু শীঘ্রই তাদের রাজ্য জয়ের স্বপ্নটা ভেঙ্গে গেলো।

মিঃ আলেকজান্ডার ১১ই নভেম্বর কলকাতায় পৌঁছেন এবং নিজের পরাজয়ের কাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করেন। জুরুরি অবস্থায় মোকাবিলা করতে সরকার আর মোটেই কালক্ষেপণ করেনি। দেশীয় পদাতিক বাহিনীর দশম রেজিমেন্টের একটা অংশ, মুতি কামান সহ অশ্ব চালিত সাঁজোয়া বাহিনী এবং দেহরক্ষী দলের একটা অংশকে নির্দেশ দেওয়া হয় অবিলম্বে মিঃ আলেকজান্ডারের সাথে যোগ দিতে। এই বাহিনী ১৭ই তারিখের সন্ধার পর বারাসত থেকে অগ্রসর হতে থাকে ও পরদিন সকাল ১১ টার সময় সমগ্র অশ্বারোহী ও সাঁজোয়া বাহিনী নারিকেলবাড়িয়ার সামনে উপস্থিত হয়। পদাতিক বাহিনী অশ্বারোহী বাহিনীর সঙ্গে সমান তালে অগ্রসর হতে পারেনি, এজন্য অশ্বারোহী বাহিনী সারাদিন গ্রামটির সম্মুখে অবস্থানের পর সন্ধ্যার সময় পিছনে ফিরে আসে ও পদাতিক বাহিনীর সাথে মিলে ছাউনি ফেলে। ১৯ তারিখে সমগ্র বাহিনী একযোগে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলো। তারা দেখল, বিদ্রোহীরা রীতিমত সজ্জিত হয়ে যুদ্ধার্থে ময়দানে উপস্থিত আছে এবং তাদের সম্মুখে গত রাতের নিহত একজন ইউরোপীয়নের খন্ডিত দেহ ঝুলান আছে। অশ্বারোহী বন্দুকধারীরা বিদ্রোহীদের অসম সাহসে আক্রমন সহ্য করতে লাগলো। কিন্তু বার বার গোলার আঘাতে তাদের দলের লোক অত্যধিক নিহত হওয়াই তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লো ও কিল্লাহর ভিতরে আশ্রয় নিল। তাদের প্রায় ষাট সত্তর জন নিহত ও সমান সংখ্যক আহত হয়। কিল্লাহটি তোপের মুখে অধিকার করা হয়।

কিল্লাহর ভিতরে বিদ্রোহীদের বন্দী করে আনা কয়েকজঙ্কে পাওয়া যায়, আর পাওয়া যায় স্থানীয় গ্রামগুলি ও নীলকুঠিগুলি থেকে লুট করে আনা প্রচুর মালামাল। এগুলো বিজয়ী সিপাহীরা লুট করে নেয়। তিতুমীর যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হন, টার সহকারী গোলাম মাসুমসহ সাড়ে তিনশো বিদ্রোহীকে বন্দী করা হয়। আলীপুর কোর্টে তাদের বিচার হয়। বিচারে গোলাম মাসুমের ফাঁসির আদেশ হয় ও প্রায় ১৪০ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। পরবর্তীকালে মিঃ কলভিন বিদ্রোহের স্থানীয় কারণসমূহের একটি বিস্তৃত রিপোর্ট দাখিল করেন। তারা উপর সরকার নিম্নলিখিত মন্তব্য করেই যথাকর্তব্য সমাধা করেনঃ

‘মিঃ কলভিনের রিপোর্ট থেকে সন্তোষজনক ভাবে লক্ষ করা যায় যে, বিদ্রোহটা সর্বতোভাবেই সামান্য ব্যাপার ছিল এবং কোন সময়েই তা আদি উৎপত্তিস্থান থেকে বাইরে ছড়িয়ে পরেনি। আরও জেনে সন্তোষ লাভ করা যায়, দেশের কনে প্রভাবশালী ও বিত্তশালী ব্যাক্তি এই বিদ্রোহের সঙ্গে যোগ দেয়নি। কিন্তু যতোই সন্তোষের বিষয় হোক না কেন, এসব অবস্থা থেকে নিশ্চয়ই অবাক হতে হয় যে, এমন সব কার্যকলাপে এতোখানি তীব্রতা ও নৃশংসতা হতে পারে”।

এ ধরনের মন্তব্য লিপিবদ্ধ করেই সরকার এই বিদ্রোহের উপর যবনিকা টেনে দিলেন। সরকার বিদ্রোহীদের ভাব্লেন, মাত্র অবিবেচক লোক, যাদের কাজের কোন কৈফিয়ত থাকতে পারেনা। তাদের ধর্মীয় মতবাদ কি ছিল এবং কি জন্য তারা এরকম ভীষণ অপরাধজনক কাজে লিপ্ত হল, সে সম্বন্ধে কোন তদন্ত করা প্রয়োজনীয় বিবেচিত হয়নি, কারণ, এই শ্রেণীর লোকদের কাছে টার চেয়ে বেশী কিছু বেশী আশা করা যায়না। তারপর প্রায় চল্লিশ বছর গত হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও এই বিদ্রোহের ইতিহাস পাঠকালে কেউ সরকারের চরম উদাসীনতাই আশ্চর্য না হয়ে পারে না। ১৮২২ সালে সৈয়দ আহমদ ভারতের বর্তমান অমুসলমান শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন এতোটুকু বাধাগ্রস্থ না হয়ে এবং ১৮২৭ সালে তিনি শিখদের বিরুদ্ধে জেহাদ আরম্ভ করেন। বাংলাদেশ থেকে অজস্র মানুষ ও টাকা পয়সার সাহায্য প্রকাশ্যভাবেই তার নিকট পাঠানো হতো। এ বিষয়ে কোন গোপনীয়তা অবলম্বন করা হতো না। সরকার নিশ্চয়ই পাঞ্জাবে তার বিজয়গুলি সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন। তবুও যখন তার অনুগামীরা আত্মবলে বলীয়ান হয়ে কলকাতা থেকে মাত্র ত্রিশ মাইল দূরে বিদ্রোহের ঝান্ডা উড়িয়ে দিল তখন সেতাকে মাত্র দুর্বোধ্য গোলযোগ হিসেবে উড়িয়ে দেয়া হল। আর বিদ্রোহীদের আখ্যা দেয়া হল নির্বোধ ও অবিবেচক এবং কোন ষড়যন্ত্র বা অভিসন্ধি সাধনে অক্ষম।

সৈয়দ আহমদের মৃত্যু সংবাদ যখন পাটনায় পৌছালো, তখন মওলবী ইনায়েত আলী দাক্ষিণাত্যে ও নিম্নবঙ্গে প্রচারকার্যে ব্যাস্ত ছিলেন। তারা তৎক্ষণাৎ পাটনায় প্রত্যাবর্তন করলেন এবং অতঃপর কি কর্তব্য হবে, সে বিষয়ে গভীর আলোচনা করলেন। সৈয়দ আহমদের মৃত্যু ভীষণ দুর্ভাগ্য বিবেচিত হয়েছিল। শুধু নেতা হিসেবেই ছিল তার ক্ষতি অপরিসীম। তিনি ছিলেন যুদ্ধ বিশারদ এবং আমীর খানের অধীনে তিনি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, তার ফলে সৈন্য যোজনায় তার পারদর্শিতা জন্মেছিল। আর কোন নেতা তার অভাব পূরণের উপযুক্ত ছিলেননা। মওলবী ইসমাইলও বালাকোটের যুদ্ধে তার সঙ্গে শহীদ হন, আর মৌলবি আব্দুল হাই কিছু পূর্বেই দিল্লীতে জান্নাতবাসী হন। কিন্তু পাটনায় মওলবীদের বিবেচনায়, সৈয়দ আহমদের মৃত্যুর দরুন অবস্থার সঠিক গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে সমকালীন পরিস্থিতি লক্ষ করা দরকার। তার অনুগামীরা প্রথম থেকেই দুটি বিরুদ্ধ দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, আর এজন্য এ দুটির মধ্যেই ঐক্য সাধনই ছিল জীবনব্যাপী প্রচেষ্টা। স্বীকৃত ইমাম হিসেবে তার মর্যাদা এবং সম্প্রীতি আনায়নে অসীম ক্ষমতার বলে তিনি এ বিষয়ে সফলকাম হয়েছিলেন। কিন্তু সামান্য কারনেই তাদের মধ্যে পুনরায় বিচ্ছেদ ঘটতে পারে, তারও যথেষ্ট চিহ্ন দেখা যেত। একদিকে তার শিষ্যদের এক বিরাট অংশ নেতৃত্ব করতেন মওলবী আবদুল হাই ও মওলবী কেরামত আলী জৌনপুরি। তাদের বিরুদ্ধ দলের নেতৃত্ব করতেন মওলবী ইসমাইল, যিনি চার ইমাম- আবু হানিফা, আবু শাফী, মালিক ও ইবনে হাম্মালকে অনুসরণ করার সার্থকতা বরাবরই অস্বীকার করতেন এবং ব্যাক্তিগত ভাবে ব্যাখ্যা করার অধিকার চরমভাবেই প্রতিষ্ঠিত করতেন। সৈয়দ আহমদ ছিলেন মধ্যপন্থী। তিনি সর্ববিধ ধর্মীয় বিধি ও আচার- অনুষ্ঠান পালন করতেন হানাফী মজহাবের অনুসারী হিসেবে কিন্তু সামঞ্জস্য বিধানের জন্য একটি নয়া ফকীরের তরিকা সৃষ্টি করে নীরবে মওলবী ইসমাইলের অনুসারীদের সমর্থনও করতেন। তার এই মুহম্মদী তরিকার চিন্তা মৌলিক কিছু নয়। আসলে সকল মুসলমানই মুহম্মদী দ্বীন অর্থাৎ মুহম্মদের ধর্মের অনুসারী। আবদুল ওহাব যখন আরবে প্রচারকার্য আরম্ভ করেন, তখন তিনি প্রচলিত সকল মজহাবকে অস্বীকার করেন এবং নিজেকে কেবল মুসলমান হিসেবে প্রচার করেন। তিনি নিজেকে একজন নয়া ধর্ম প্রবর্তক হিসেবে জাহির করতে, কিংবা একটা নয়া মজহাব সৃষ্টি করতে কুন্ঠবোধ করতেন। একজন ফকীরের ধর্মে এত গভীর জ্ঞানের দরকার নায়। যেসব মশহুর প্রতীকী ফকীরি প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠাতার কোন একটি বৈশিষ্টের জন্যই সে নামে অখ্যাত হয়েছে, যেমন কাদিরীয়া নামাঙ্কিত হয়েছে প্রতিষ্ঠাতা আবদুল কাদিরের নামানুসারে। সৈয়দ আহমদ দাবী করতেন, তিনি মুহম্মদেরই পদাংকের অনুসারী, আর এজন্য তিনি নতুন শাখার জন্ম দেন মহাম্মদি তরিকা অনুসরণ করে। আর তার উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের জন্য সেসব আচার- নিতি প্রবর্তন করা, যেসব মুহম্মদের সময় প্রচলিত ছিল। এই রকম পরিস্থিতে তার মৃত্যু আন্দোলনটিকে ধ্বংসের মুখে এনে দেয়। আরও দুর্ভাগ্য এই যে, হানাফী আলেমরা ঘোষণা করলেন, ইমামের দ্বারাই জেহাদ চালানো সম্ভব, অতএব সৈয়দ আহমদের মৃত্যু হয়ে থাকলে জেহাদ বন্ধ করতে হবে। এসব বিষয় পাটনার মওলবীদের নিশ্চয়ই চিন্তান্বিত করে থাকবে, কারণ তারাই ছিল সৈয়দ আহমদের একনিষ্ঠ অনুসারী। সৈয়দ আহমদের মুরশিদ হিসেবে আবির্ভাব হওয়ার বহু পূর্বে তারা জনৈক আবদুল হকের মুরীদ ছিলেন। তিনি ছিলেন বেনারসবাসী গোঁড়া ওহাবী। তার প্রথম জীবনে নাম ছিল গোলাম রসূল। কিন্তু ওহাবী মতে দীক্ষা নেওয়ার পর তিনি এই ধর্ম বিগর্হিত নাম বর্জন করে নাম গ্রহণ করেন আব্দুল হোক। তারপর তিনি মক্কায় গমন করেন। সেখানে বিরুদ্ধ মতবাদ পোষণের দরুন তিনি তুর্কী কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে পতিত হন। তাকে বন্দী করার আদেশ দেওয়া হয়, কিন্তু গোপনে তিনি নজদে পলায়ন করেন। তখন নজদ ছিল আরবের মদ্ধে ওহাবী অঞ্চল। নজদে কিছুকাল বসবাস করে তিনি বেনারসে প্রত্যাবর্তন করেন। এখানে তিনি নজদী শেখ হিসেবে সুপরিচিত হন এবং মুরিদ করতে আরম্ভ করেন। মওলবী বিলায়েত আলী তার প্রথম দলের মুরীদ।

আরও উল্লেখযোগ্য যে, সৈয়দ আহমদ বিশেষভাবে ছোটখাটো বিভেদগুলি এড়িয়ে চলতেন। তার ধর্মীয় শিক্ষার মোটামুটি সার কথা এই যে, তিনি ছিলেন একান্তভাবে আল্লাহ্‌নির্ভর, আর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, তিনিই ইমাম মেহদী- হিজরি তের শতকের একমাত্র নেতা। তার যেসব খলীফা এসব মতবাদ প্রচার করতেন, তাদের মধ্যে বিলায়েত আলী ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ। তিনি সাধারণে এ মতবাদ কেবল মুখেই প্রচার করতেননা, এর সমর্থনে একখানা পুস্তিকাও রচনা করেছিলেন। এখন সৈয়দ আহমদ যদি সত্যই মৃত হন তাহলে দুনিয়া তাকে ভন্ড আখ্যা দিবে। এজন্য প্রথম থেকেই তিনি সৈয়দ আহমদের মৃত্যুর খবর অস্বীকার করতেন। তার মুরশিদের কয়েকটি বাণী তার স্মরণ হল, আর সেসবের বলে তিনি এসব মিথ্যা বিবেচনা করতেন। সৈয়দ আহমদ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তিনি বহু জয়লাভ করবেন, আর কাফেররা যতবারই পরাজিত হবে, ততবারই তারা তার মৃত্যু সংবাদ রটনা করবে তার অনুগামীদের হতোদ্যম করতে ও তাদের উৎসাহে ভাটা দিতে। এখন তো সেই অবস্থায় উপস্থিত হয়েছে। মাত্র কয়েকদিন আগে সৈয়দ আহমদ ছিলেন পেশোয়ারের শাসক; এখন গুজব আসছে যে, তিনি মৃত ও তার অনুগামীরা ছত্রভঙ্গ। এসব অবিশ্বাস ও বিশ্বাসের যোগ্য নয়। এ সম্বন্ধে যা কিছু সন্দেহ ছিল সবই অবশ্য দূর হয়ে গেলো কয়েকদিন পরে উত্তর- পশ্চিম থেকে খবর পাওয়ায়, আর তার দ্বারা মওলবীদের প্রথম ধারনা সঠিক হওয়ার বিশ্বাসও ঘনীভূত হয়ে গেলো।

সৈয়দ আহমদ যখন বালাকোটে পরাজিত হন তখন মওলবী কাসিম একদল বাহিনী নিয়ে মুজফফরাবাদ আক্রমন করতে ব্যাস্ত ছিলেন। সৈয়দ আহমদের মৃত্যুতে সেই অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। মওলবী কাসিম ফিরে আসেন, যুদ্ধ থেকে পলাতক জ্বিহাদীদের একত্রিত করেন এবং সৈয়দ আহমদের পরিবারদের নিয়ে সিত্তানায় গমন করেন। এই গ্রামের মালিক ছিলেন সৈয়দ আহমদের অন্তরঙ্গ বন্ধু সৈয়দ আকবর। সেখানে মওলবীদের এক আসরে বসে এবং স্থিরীকৃত হয় যে, আপাতত জেহাদ বনায়ের অঞ্চলের তখতাবন্দেই সীমাবদ্ধ থাকবে, কারণ এই গ্রামটিতে সৈয়দ আহমদের বংশ ছিল অত্যন্ত ক্ষমতাশীল। অতঃপর তদন্ত শুরু হয় কীভাবে সৈয়দ আহমদ মৃত্যু মুখে পতিত হন। কোন কোন জিহাদি প্রকাশ করে, তারা তাকে শহীদ হতে স্বচক্ষে দেখেছে। আবার অনেকে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করলো, তিনি মরেননি। তারা সাক্ষ্য দিল, ভীষণ যুদ্ধের সময় একটা ধূলিমেঘ ইমাম সাহেবকে ঘিরে ফেলে; তারপর আর তাকে জীবিত দেখা যায়নি, তার মৃতদেহও পাওয়া যায়নি। মওলবী কাসিম ছিলেন শেষের দলের। তিনি শীঘ্রই অন্যান্য খলীফার নিকট পত্র পাথালেন। তার মধ্যে তিনি বালাকটের বিপর্যয়ের বিস্তৃত বিবরণ দিলেন, মুজাহিদদের ইমাম সাহেব অদৃশ্য হওয়ার দরুন বর্তমান শোচনীয় অবস্থা জানালেন সাহায্য চেয়ে পাঠালেন আরও মানুষ ও টাকা পয়সার। এ থেকেই পাটনার মৌলবিদের সৈয়দ আহমদের সম্পর্কে বিশ্বাস আরও দৃঢ়ীভূত হল। তারা ভাবলেন তিনি তো জিবন্দসাতেই নিজের অদৃশ্য হওয়ার ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন। অতএব তারা নতুন উদ্যমে জেহাদ প্রচার করতে লাগলেন। তারা প্রচার করতে লাগলেন যে, আল্লাহ্‌ ইমাম সাহেবকে লোকচক্ষু থেকে গোপন করে একটা পর্বত গুহায় লুকিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু তার অনুগামীরা যখন একত্রিত হয়ে ধর্মে আন্তরিকতা স্বরূপ ঐক্যভাবে জেহাদ পরিচালনা করবে তখন আবার তিনি উদিত হবেন ও পূর্বের মতো তাদের বিজয়ের পথে চালনা করবেন। এসব প্রচারনা স্রবনেচ্ছু সাধারণের উপর প্রভাব বিস্তার করলো। যে আন্দোলনটা বালাকোটে ধংস হয়ে গেছে বলে মনে হয়েছিল, সেটা আবার নয়া উদ্যমে জেগে উঠলো।

একজন ইউরোপীয়র নিকট এটা নিশ্চয়ই অবিশ্বাস হবে যে, মাত্র এরকম উক্তি সহজে বিশ্বাস করা যাবে এবং সেটাকে জেহাদের উদ্দেশে্য কাজেও লাগানো যাবে। সে স্বভাবতই ধারনা করবে যে, এরকম আজগুবি ও অবিশ্বাস কাহিনী শোনার আগে লোক নিশ্চয়ই সম্ভাব্য বলিষ্ঠ প্রমাণ চাইবে। আর সাধারন বুদ্ধিসম্পন্ন কোন মানুষকে এরকম মায়াকাহিনি বিশ্বাস করান নিশ্চয়ই অসম্ভব, কোন পরিমাণ সাক্ষেই তা সম্ভব নয়। কিন্তু মুসলমানের নিকট এর কিছুই অবিশ্বাস নয়। তার সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পুরাকাহিনীর সঙ্গে এর দস্তুর মতো সংগতি আছে এবং প্রথম শুনেই সম্ভব ছাড়া আর কিছু মনে হবে না। এজন্য সামান্য মাত্র সাক্ষেই সে বিশ্বাস করে বসবে। আর এরকম ঘটনা তো পূর্বেও ঘটেছিল। একথা সকলেরই জানা যে, হযরত ইউনুস কিছুকাল অদৃশ্য হয়েছিলেন এবং একটা বিরাট মাছের পেটে লুক্কায়িত ছিলেন। হযরত মুসাও অদৃশ্য হয়েছিলেন, যখন তিনি সিনাই পর্বতে উঠে ‘তউরাত’ গ্রহণ করেছিলেন। মহান নেতা জুলকারনাইন ইয়াজুজ ও মাজুজকে বন্দী করে তারা তাদের দ্বারা পৃথিবী ধংস বন্ধ করেছিলেন তিনিও প্রায় একই অবস্থায় অদৃশ্য হয়ে গেছিলেন তাদের ধর্মহীন অনুগামীদের শাস্তিদানের উদ্দেশে্য এবং পুনরায় তাদের আবির্ভূত হতে অনুমতি দিয়েছিলেন যখন তারা অনুতাপ করেছিলেন ও স্ব স্ব ধর্মমতে নিষ্ঠাবান হয়েছিলেন। হযরত ঈসাও মরনের হলাহল পার করেননি। এখনও তিনি আসমানে জীবিত আছেন এবং পুনরায় খ্রিস্ট শত্রুর সাথে যুদ্ধ করতে ধরাধামে উদিত হবেন। ভারতীয় মুসলমানরা পরিস্কারভাবেই ধর্মভ্রষ্ট হয়ে গেছে। অতএব এটা এমন কিছু অযৌক্তিক ধারনা নয় যে, মধ্যবর্তী ইমাম সাহেব সমভাবেই অদৃশ্য হয়ে গেছেন।

সৈয়দ আহমদের ক্রমাগত অনুপস্থিতে একজন সর্দার নির্বাচন করা অপরিহার্য হয়ে পরে জেহাদ পরিচালনা করার জন্য। এই নির্বাচনের ভার ছিল ভারতীয় খলীফাদের উপর। তারা দলে দলে দিল্লীতে একত্রিত হলেন ও মওলবী নাসিরুদ্দিনকে নির্বাচন করেন। আরও ঠিক করা হল যে, তিনি টংক ও সিন্ধুর মধ্য দিয়ে অভিযান চালিয়ে বনায়েরের তখতাবন্দে অবস্থিত মুজাহিদ দলে যোগদান করবেন।

নাসিরুদ্দিন মাত্র কয়েকজন অনুগামীসহ দিল্লী ত্যাগ করেন। টংকে বহু নও মুজাহিদ তার সঙ্গে যোগ দেয় এবং তিনি বহু অস্ত্র সস্ত্র ও টাকা পয়সা সাহায্য পেলেন। সেখান থেকে তিনি সিন্ধুর শিকারপুরে গমন করেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন যে, শিখদের সঙ্গে মোকাবিলা করার উপযুক্ত বাহিনী সংগ্রহ না হওয়া পর্যন্ত তিনি নড়বেননা। ১৮৩৩ সালে সৈয়দ আহমদের পরিবারবর্গ এবং তখতাবন্দে পলাতক তার বাকি সৈন্যরা নাসিরুদ্দিনের সঙ্গে যোগ দিল। মুজাহিদরা সিন্ধুতে প্রধান বাহিনীর সঙ্গে থেকে গেলো, কেবল সৈয়দ আহমদের পরিবার টংকে ফিরে গেল। সিন্ধুর আমীররা ছিলেন ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী গোঁড়া এবং তারা অমুসলমান শাসকদের উপর খড়গহস্ত ছিলেন। তারা আমাদের দূতদের ঘৃণা করতেন এবং তাদের সঙ্গে অপমানকর ব্যাবহার করতেন। তারা শিখদের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে ভীতির চোখে দেখতেন, আর রণজিৎ সিংহ ছিল তাদের ও ওহাবীদের প্রধান শত্রু। আর এটাও ছিল সর্বজনবিধিত যে, রণজিৎ সিন্ধু আক্রমনের শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। এজন্য আমীররা সম্ভবতঃ ওহাবী নেতাদের সাহায্য চেয়ে থাকবেন অধিকৃত অঞ্চল রক্ষা করতে। কারণ যাই হোক না কেন, নাসিরুদ্দিন শিকারপুরেই অবস্থান করতে লাগলেন এবং পাহাড়িয়া অঞ্চল থেকে জেহাদ চালানোর ইচ্ছা আপাতত ত্যাগ করলেন। ক্রমে ক্রমে তার বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি হতে লাগলো। সারা বাংলাদেশ থেকে অজস্র নয়া মুজাহিদ ও টাকা পয়সা আসতে লাগলো। তবু তিনি নিষ্ক্রিয় বসে থাক্লেন এবং হাজারার বিরুদ্ধে একটা উল্লখের অযোগ্য অভিযান ছাড়া আর কখনও শিখদের বিরুদ্ধে জেহাদ করেননি। কিন্তু উত্তেজনার সময় ঘনীভূত হতে লাগলো। লর্ড অকল্যান্ড যখন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলেন শাহ্‌ সুজাকে কাবুলের লোকদের উপর জোড় করে বাদশাহ করতে, তখন দোস্ত মুহম্মদ ইংরেজদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করলেন ও ওহাবীদের আমন্ত্রণ করলেন এই জেহাদে যোগ দিতে। নাসিরুদ্দিন দোস্ত মুহম্মদকে সাহায্য করতে রাজি হলেন, কিন্তু অনেক মওলবী তার বিরুদ্ধে গেলেন এবং নিজেদের অনুচর নিয়ে দেশে ফিরে গেলেন। প্রায় এক হাজার লোক নাসিরুদ্দিনের সঙ্গে থাকল। তাদের নিয়েই তিনি কাবুল যাত্রা করলেন দাদুরের নিকট গেলে তিনশো বাছা বাছা যোদ্ধা পাঠালেন আমীরকে সাহায্য করতে। তাদের পাঠানো হল গজনীর রক্ষা ব্যাবস্থায় সাহায্য করতে। কিন্তু ইংরেজ বাহিনী কিল্লাহটি আক্রমন ও দখল করার সময় তাদের সকলকেই ধংস করে দেয়। তারপর কাবুল শীঘ্রই ইংরেজদের হস্তাগত হল, আর হতোদ্যম ওহাবীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে হিন্দুস্থান ও বাংলাদেশে নিজের নিজের বাড়িতে ফিরে গেলো।

সিন্ধু হতে ওহাবীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে গোলাম কাসিম পাহাড়িয়া অঞ্চলে ফিরে গেলেন ও সৈয়দ আহমদের খলীফা হিসেবে প্রচারকার্য চালাতে লাগলেন। তিনি প্রধানত বাস করতেন কাগানের কাওয়াই নামক স্থানে। কাগানের আমীর জামীন শাহ্‌ ও নওবত শাহ্‌ তার মুরীদ হন। কাবুল থেকে ওহাবীরা আপন আপন গৃহে ফিরে যাওয়ার কিছুকাল পরেই গোলাম কাসিম নেতাদের নিকট সংবাদ পাঠান, ইমাম পুনরায় উদিত হয়েছেন এবং ইচ্ছা জানিয়েছেন যে, পুনরায় শিষ্যদের সঙ্গে তিনি মিলিত হয়ে শিখদের বিরুদ্ধে জেহাদ চালনা করবেন। সৈয়দ আহমদের নামাংকিত হয়ে বিভিন্ন খলীফার নিকট চিঠি পাঠানো হল, তাদের আহব্বান জানানো হল অনুগামীদের নিয়ে মুরশিদের সঙ্গে যোগদান করতে। পাটনার খলিফারা শীঘ্রই এই আহব্বানে সাড়া দিলেন এবং বৃটিশ ভারত থেকে পুনরায় দলে দলে কাফেলা পাহাড়িয়া অঞ্চলে আসতে লাগলো। ইনায়েত আলী শীঘ্রই উপস্থিত হলেন ও নেতৃত্বভার গ্রহণ করলেন এবং তার পরিচালনায় জেহাদীরা শিখদের আক্রমন করলো ও বালাকোট থেকে বিতাড়িত করে দিল।

বালাকোটের পার্শ্ববর্তী গ্রাম কাগান। নজফ খাঁ সেখানকার শাসনকর্তা ও ওহাবীদের বন্ধু। শিখরা তার এলাকা হস্তগত করে নেওয়ায় এখন তিনি ইনায়েত আলীর সাহায্য প্রার্থনা করলেন। যেসব মওলবী ইনায়েত আলীর সঙ্গে যোগদান করেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন হায়দরাবাদের মওলবী জয়নুল আবেদিন। বিলায়েত আলী যখন প্রথম দক্ষিণাত্য সফর করেন তখন তার সঙ্গে জয়নুল আবেদীনের পরিচয় হয়। জয়নুল আবেদীন তার প্রচারকার্যে মুগ্ধ হন এবং গোঁড়া ধর্মান্ধ হয়ে উঠেন। তিনি ছিলেন বলিষ্ঠ মানসের আবেগপ্রবণ মানুষ এবং সর্বশক্তি দিয়ে এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তার উৎসাহ লক্ষ করে বিলায়েত আলী তাকে পূর্ব বাংলার জেলাগুলিতে প্রচারকার্যে পাঠিয়ে দিলেন। সিলেট ও ঢাকা জেলায় তার শিষ্যসংখার আধিক্য থেকেই প্রচারক হিসেবে তার সাফল্যের প্রমাণ মিলে। পাহাড়িয়া অঞ্চলে ইমাম সাহেবের সঙ্গে যোগদানের আদেশ পেয়েই তিনি তাড়াতাড়ি রওনা হয়ে গেলেন এবং পিছনে চলল তার এক হাজার অনুগামী, নজর এড়াবার জন্য তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে যায়। সেখানে উপস্থিত হলে একদল জিহাদি দিয়ে তাকে পাঠানো হল শিখদের বিরুদ্ধে নজফ খাঁ কে সাহায্য করতে। কিন্তু পরাজিত হয়ে তিনি বালাকোটে ফিরে আসেন। অতঃপর তিনি সেনা নায়কের কাজ ত্যাগ করেন এবং যুদ্ধ বিগ্রহ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

এ পর্যন্ত ইমাম সাহেব স্বয়ং আবির্ভূত হয়ে জেহাদীবাহিনী চালানোর ভার গ্রহণ করেননি। তার সম্বন্ধে বলা হতো যে, তিনি কাওয়াইএর নিকট কোন একটা পাহাড়ের গুহায় বাস করেন। কিন্তু পাহাড়টিকে কঠিন পাহারায় ঘিরে রাখা হতো এবং কোন জেহাদীকে তার ধারে কাছে যেতে দেয়া হতোনা। কিন্তু জয়নুল আবেদীন একবার মুরশিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন। তখন সব ভয় ও বাধা তুচ্ছ করে গুহায় তার মুরশিদের অবস্থান করার কথা, সেখানে জোর করে প্রবেশ করলেন এবং তিনি সেখানে দেখলেন, খড়ে তৈরি তিনটি মাত্র মূর্তি সেখানে বিদ্যমান। একটি সৈয়দ আহমদের ও দুটি তার খাদিমদের।

ধর্মীয় উৎসাহে তীব্র আঘাত লাগলো। তিনি এই অভিশপ্ত স্থান দ্রুতবেগে ত্যাগ করলেন এবং অনুগামীদের এই ভয় দেখিয়ে জেহাদ করতে নিষেধ করলেন যে, মওলবী কাসিম ও মওলবী কাদিরের মতো মূর্তি পূজকদের সঙ্গে থেকে জেহাদ করা হল কাফেরের কাজ। এই সময় তিনি কলকাতায় জনৈক বন্ধুর নিকট নিম্নলিখিত যে পত্রখানি লিখেন, তাতে লোককে সৈয়দ আহমদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে যে ধোঁকাবাজি করা হয়েছিল, তার পরিচয় পাওয়া যায়ঃ

‘আসসালামু- আলাইকুম- আল্লাহ্‌র শান্তি ও আশিস আপনার উপর বর্ষিত হোক। অধীনের আরজ এই যে, বিলায়েত আলীর শিক্ষায়, ঈমানে ও ইসলামে কোন রকম বেদাত আমদানী করা এ অধীন অবিমিশ্র পাপ হিসেবেই বিবেচনা করে এবং সেসব বর্জন করা ধর্মীয় নির্দেশ হিসেবেই গণ্য করে। এই ধারনার বশবর্তী হয়ে আমরা পীর মওলবী বিলায়েত আলীর সততায় নির্ভর করতুম, আর এজন্য যুক্তিবহির্ভূত একটা বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে আমি একটা অতি পরিচিত স্থানে যায়। সেখানে যেয়ে ইমাম হুমামের উপযুক্ত কোন কিছুরই অস্তিত্ব সেখানে নেই। অন্যপক্ষে কাসিম কাজ্জার দ্বারা প্রবঞ্চিত করিমা আলী আমাদের শিবিরে আসে মোল্লা কাদিরের দ্বারা প্রেরিত হয়ে এবং বলেন, আমেরুল মুমেনিন শেখ ওয়ালী মুহাম্মদকে এতদূর মিথ্যুক বলেছেন যে, সে বলে বেড়াই, যদি রণজিৎ সিংহ কবর থেকে উঠে আসে ও অনুতাপ করে, তাহলে ইমাম সাহেব তার রাজতখতে বসাবেন এবং শূন্যে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াবেন, ঠিক যেমন ফিরতেন বাদশাহ সোলায়মান। মোল্লা কাদির ঈদ- উজ- জোহার পূর্বে বলেছিলেন পয়গম্বর সাহেব ও সমস্ত আলী ইমাম সাহেবের সঙ্গে বসেছিলেন ও তাকে বলেছিলেন, ওঠ! কাফেরবিহীন যে বালাকোটে এসে গেলো’। তখন ইমাম বললেন, “আল্লহর হুকুম ছাড়া আমি উঠতে পারিনে”। শেষে পয়গম্বর সাহেব নিজেই তাকে উঠতে বললেন, কিন্তু তিনি জওয়াব দিলেন, “বান্দার সে ক্ষমতা নেই”।

“মোল্লা কাদির সৈয়দ আহমদের একটি মূর্তি তৈরি করেছিলেন এবং সেটি কোনও মানুষকে দেখাবার আগে সকলের নিকট থেকে এই প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন যে, কেউ তার হাতে হাত মিলাতে কিংবা তার সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করবেনা, কারণ এরকম চেষ্টা করলেই ইমাম সাহেব পুনরায় চৌদ্দ বছরের জন্য অদৃশ্য হয়ে যাবেন। সব মানুষই দারুণ অভিভুত হয়ে দূর থেকে প্রাণহীন মূর্তিটাকে দর্শন করতো এবং সালাম করতো। কিন্তু জওয়াব মিলত না। এদিকে লোকেরা তার হস্তমর্দন করতে উৎসুক হয়ে উঠত। কিছুদিন গত হওয়ার পর লোকেরা একটা ছলনায় সন্দেহ করতে লাগলো এবং ইমামের হস্তধারণ করতে জিদ করতে লাগলো। কিন্তু মোল্লা কাদের তাদের সন্দেহ দূর করতে চেষ্টা করলেন এবং বললেন, কেউ যদি আগে খবর না দিয়ে ইমাম সাহেবের হস্তধারণ করতে চেষ্টা করে, তাহলে মিয়া আব্দুল্লাহ সাহেব তাকে পিস্তল ছুঁড়বে। কিছুকাল পরে মোল্লা দেখলেন, আমি মোটেই ভিত নই, আর লোকেরা ইমাম সাহেবের হস্তধারণ না করে ক্ষান্ত হবে না। তখন তিনি বলতে লাগলেন যে, ইমাম হুমাম এই আদেশ দিয়েছেনঃ লোকেরা আমায় দেখেই সন্তুষ্ট নয়, তারা আমার হস্তমর্দন করতে চায় আমার সঙ্গে কথাও বলতে চায়। তাদের যে অনুগ্রহ দেখানো হয়েছে, তা পেয়ে তারা ধন্য নয়। এজন্য ন্যায়বান আল্লাহ্‌ তাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন, আর আমি যতদিন মুজাহিদ বাহিনীর নেতা হিসেবে যোগদান না করছি, ততদিন আমি আর তাদের সামনে উপস্থিত হচ্ছিনা। এরপর মূর্তিটাকে আর দেখা যায়নি। আরও কিছুদিন পর মোল্লা তোরাব এবং কাবুল ও কান্দাহার থেকে কয়েকজন সম্ভ্রান্ত ব্যাক্তি উপস্থিত হন এবং এই প্রতারণা প্রকাশ করে দেন। তখন বহু অনুনয় বিনয়ের পর মোল্লা কাদিরকে রাজী করান হল মূর্তিটাকে একবার সকলকে দেখাতে। তারা মূর্তিটাকে পরীক্ষা করে দেখলে, সেটা ছাগলের চামড়ায় ঘাসে ভর্তি এবং কয়েকখানা কাঠ, চুল প্রভৃতি দিয়ে মানুষের অবয়ব তৈরি করা হয়েছে। তখন এই বান্দা কাসিম কাজ্জাবকে এর কারণ জানাতে বলেন। সে বলে, এটা ঠিক বটে, তবে ইমাম হুমাম একটা কেরামত দেখিয়েছেন, আর সেজন্যই এসব অবিশ্বাসী লোকদের সম্মুখে তৈরি মূর্তিতে আবির্ভূত হয়ছেন। এরপর মোল্লা কাদির এরকম বলতে থাকেনঃ হুজুর এখন আমার উপর নারাজ হয়েছেন। এজন্য আমার বাড়ি আশা ছেড়ে দিয়েছেন কিন্তু মিয়া চিশতী সাহেব এখনও মাঝে মাঝে আসেন। মওলবী খোদাবখশ এর রাখাল ছেলেকে ধরে প্রহার করেন ও তারই জুতাজোড়া নিয়ে ফরাক্কাবাদ যান। এইসব হল লোকের মূর্তি পূজা ও কুফুরীর সামান্য নমুনা মাত্র। আমি প্রথমে মূর্তিটাকে যেমন দেখেছি, তারই সঠিক বর্ণনা আপনাকে জানালুম। এখন এসব লোকের মিথ্যা ও ভুল স্পষ্ট দিবালোকের মতো পরস্কার হয়ে গেছে। আর আমি তাদের সঙ্গ ত্যাগ করে পাপ থেকে বেঁচেছি। এই সঙ্গে আমি বদি- উজ- জামান ও মওলবী রজব আলীকে সালাম জানাচ্ছি”।

জয়নুল আবেদীন কলিকাতা ফিরে গেছেন এবং ওহাবী মতবাদ একেবারে ত্যাগ করেছেন। তার অনুগামীরাও তার পথ অনুসরণ করলেন। আর তার দরুন তৃতীয় বার পরিস্থিতি এমন হল, যেন ওহাবী আন্দলন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে। কিন্তু পাটনার মওলবীদের অদ্ধ্যবসায় বলে আবার সব বাধা দূরীভুত হল এবং অল্প দ্বীনের মধ্যেই সম্প্রদায়টা পুনরায় উজ্জীবিত হোএ উত্তর- পশ্চিম অঞ্চলে এতোখানি শক্তিশালী হয়েছিল, যেমনটি ছিল ঠিক সৈয়দ আহমদেরই জীবনকালে।

তৃতীয় প্রবন্ধ

রণজিৎ সিংহের মৃত্যুর পর পাঞ্জাব রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। পরবর্তী প্রত্যেক সরকার ছিল নামে মাত্র শক্তিধর, রাষ্ট্রের সমস্ত কর্তৃত্ব ছিল খালসা সৈন্যদের হাতে। শেষ পর্যন্ত লাহোরের দরবার স্থির করলো, তার রাজনৈতিক সত্তা রক্ষা করার একমাত্র উপায় হচ্ছে বিদ্রোহপরায়ন খালসা বাহিনীকে যুদ্ধ করতে বাধ্য করা। এই বিবেচনায় শিখরা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। কিন্তু যুদ্ধে শিখরা দারুণভাবে পরাজিত হয়, খালসা বাহিনী আংশিক ভাবে ধংস হয় লাহরে একজ রেসিডেন্টের অধীনে দেশীয় সরকারের পতন হয়। শেষের কয় বছরের ভীষণ গোলযোগের সময়টা ছিল জেহাদের পক্ষে অত্যন্ত অনুকূল এবং ওহাবীরাও খুব বিজয়ের আশা করতো। তারা বালাকোট দখল করে নেয় এবং মুজাফফরবাদ দ্বিতীয় বার আক্রমনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এমন সময় জয়নুল আবেদীনের দলত্যগে আন্দোলনটা সাময়িক ভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়। সমকালীন জেহাদীদের প্রধান নেতা ছিলেন রিন জনঃ বিলায়েত আলী, ইনায়েত আলী ও মকসুদ আলী; আর তারা সকলেই ছিলেন বিহারের অধিবাসী। ইনায়েত আলীর ইচ্ছা ছিল মওলবী কাদিরকে সমর্থন করার। কিন্তু মকসুদ আলী সোজা জানিয়ে দিলেন যে, সৈয়দ আহমদের পুনরাবির্ভাবের কাহিনী যদি অস্বীকার করা না হয়, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই জেহাদ ত্যাগ করে বাংলাদেশে ফিরে যাবেন। তখন বিলায়েত আলীকে নেতা নির্বাচন করা হল ও জেহাদ পুনরায় শুরু করা হল। মুজাফফরবাদের দ্বিতীয় অভিযানও সাফল্যমণ্ডিত হল। শিখদের দক্ষিন্মুখে বিতাড়িত করে জ্বিহাদীরা তাদের পশ্চাৎধাবন করলেন। তখন একদল পাঠান এই বিজয়বার্তা শুনে জেহাদিদের পক্ষাবলম্বন করে। শিখরা নওশেরায় একবার বাধা দেবার চেষ্টা করে, কিন্তু পুনরায় পরাজিত হয়। সিন্ধু নদীর পূর্ব থেকে হরিপুর থেকে কাগান এবং সিত্তানা থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ওহাবীরা অত্যল্পকালেই নিজেদের অধিকার স্থাপন করে। কিন্তু খালসা বাহিনীর ধ্বংস এবং তার দরুন ব্রিটিশ সরকারের আশ্রয়ে একটা নয়া শিখ শক্তির প্রতিষ্ঠা হওয়ায় ওহাবীদের পক্ষে নিজের অধিকার সুদৃঢ় রাখা অসম্ভব হয়ে পরে এবং ১৮৪৭ সালে হরিপুরের নিকট মিঃ এগনিট এর নিকট সমগ্র মুজাহিদবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। কেবলমাত্র মীর আওলাদ আলী ও তার কিছু অনুগামীসহ সিত্তানায় পলায়ন করে। মওলবী ইনায়েত আলী ও মওলবী বেলায়েত আলী রাজবন্দী হিসেবে জন্মস্থানে প্রেরিত হয়। সেখানে উপস্থিত হলে তারা প্রত্যেকে দশ হাজার টাকা মুচলেকা দিয়ে খালাস পান এই শর্তে যে, চার বছর তারা পাটনা শহর ত্যাগ করতে পারবেননা। কিন্তু মুচলেকা শর্ত পালনের দিকে লক্ষ রাখা হয়নি, মাত্র কয়েক মাস তারা নিষ্ক্রিয় থেকে পুনরায় সিত্তানায় আশ্রয়প্রাপ্ত মীর আওলাদ আলীর সঙ্গে চিঠি পত্র যোগাযোগ শুরু করেন এবং উত্তর- পশ্চিম অঞ্চলে হৃত অধিকার পুনরুদ্ধার করতে চেষ্টিত হন।

১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহীর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খবর পান যে, ইনায়েত আলী পুনরায় সেখানে উপস্থিত হয়েছেন ও মুজাহিদ সংগ্রহ করছেন, অথচ পূর্বে তাকে একবার এই জেলা থেকে বহিষ্কার করে দেয়া হয়েছিল রাজদ্রোহ অপরাধে ও বিদ্রোহ প্রচার করার কাজে। তদন্ত আরম্ভ হলেই তিনি আত্মগোপন করেন ও পাটনায় পলায়ন করেন। তখন তাকে গ্রেফতার করার জন্য পাটনার ম্যাজিস্ট্রেট এর নিকট পরঅয়ানা পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি রাজশাহী থেকে উধাও হয়ে গেলেও তার প্রভাব অক্ষুণ্ণ থাকে। কয়েকদিনের মধ্যেই রাজশাহীর ম্যাজিস্ট্রেট তার সিদ্ধান্তের জন্য দুঃখিত হন এবং ১৮৫০ সালের মার্চ মাসে তিনি এতদসংক্রান্ত মামলায় এই হুকুম দেনঃ পুলিশ রিপোর্টে দেখা যায় যে, ইনায়েত আলী নিরীহ ব্যাক্তি, তাকে গ্রেফতার করার দরকার নেই, তার বিরুদ্ধ ফরিয়াদ কে পুলিশের নিকট সোপর্দ করা হোক মিথ্যা অভিযোগ আনয়নের কারণ দর্শাতে। এই হুকুমের নকল পাটনার ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট পাঠানো হয়। তিনি কিন্তু পাটনায় মওলবীদের কার্যকলাপের বিষয় রাজশাহীর ম্যাজিস্ট্রেটের চেয়ে সম্যক অবগত ছিলেন। এজন্য তিনি বিশ্বাস করতে চাইলেননা যে, ইনায়েত আলী নিরীহ লোক। তিনি পুনরায় ইনায়েত আলীর নিকট এক হাজার টাকা মুচলেকা নেন এই শর্তে যে, তিনি পাটনা পরিত্যাগ করতে পারবেননা। তার কার্যকলাপ সম্বন্ধে বাংলার কর্তৃপক্ষ সতর্ক হয়েছেন লক্ষ করে ইনায়েত আলী গোপনে উত্তর- পশ্চিম অঞ্চলে পলায়ন করে সিত্তানায় জেহাদিদের সঙ্গে মিলিত হলেন এবং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার প্রতিনিধি হিসেবে এই ওহাবী বসতির মুজাহিদ বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহন করেন। ১৮৫০ সালের শেষ ভাগে বিলায়েত আলী সীমান্ত প্রদেশের দিকে সফর আরম্ভ করেন নিজের পরিবারবর্গ ও আশিজন অনুগামী নিয়ে। পথে তিনি বড় শহরে প্রচারকার্য চালান। দিল্লীতে প্রচারকার্য অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং কথিত আছে যে, এই সময় তিনি বাদশাহের নিকটও জেহাদ প্রচার করেন ও সমর্থন লাভ করেন।

দিল্লী থেকে পূর্বের মতো ধীর মন্থর গতিতে অগ্রসর হয়ে তিনি সিত্তানায় পৌঁছালেন জেলা প্রশাসকের নিকট হতে কোনও বাধা না পেয়ে। কেবল মাত্র এক জায়গায় কুববলের নিকট পুলিশ তাদের মালবাহী উট গুলকে ধরে পেশোয়ারের ডেপুটি কমিশনারের নিকট চালান দেয়, কিন্তু নির্দেশ দেন উটগুলোকে অবিলম্বে মালিকদের নিকট ফিরিয়ে দিতে।

বিলায়েত আলী ও ইনায়েত আলী চার বছর পূর্বে গ্রেফতার হয়ে পুলিশ প্রহরায় পাটনা প্রেরিত হয়েছিলেন, অথচ তারাই নির্ভয়ে ও নিরাপদে সাড়া ভারত পরিভ্রমণ করে ফিরলেন, এটা নিশ্চয়ই ভারতে ব্রিটিশ শাসনের এক আশ্চর্য বিষয় বটে। এ থেকেই শাসক ও শাসিতের মধ্যে পার্থক্যটা সহজে নজর পরে- তখন শাসকরা বিপজ্জনক সম্প্রদায়ের সম্বন্ধে কতটুকুই বা খবর রাখতেন। সৈয়দ আহমদের যুদ্ধবিগ্রহ, বারাসতের বিদ্রোহ, হরিপুর ধর্মান্ধদের প্রতিরোধ ও শেষে আত্মসমর্পণ সমস্তই শেষ হয়ে গেলে ভুলে যাওয়া হল। আর তারপর সহসা রূঢ়ভাবে সরকার জাগ্রত হল শেষ সময়ে, যখন মওলবীরা সিত্তানায় ফিরে গেছেন এবং পার্বত্য আদিবাসীদের উত্তেজিত করে তুলছেন।

বিলায়েত আলীর উপস্থিতিতে শক্তি বৃদ্ধি না হয়ে অনৈক্য সৃষ্টি হল। ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভাইয়ের মতো তার জাতক্রোধ ছিলনা। তার ধর্মীয় উৎসাহ ততোখানি বন্য অন্ধ প্রকৃতির মতো ছিলনা, যার দরুন ধর্মীয় দুর্বলতাবশত মানুষ আত্মসংযম হারিয়ে ফেলে এবং পার্থিব পরিনামদর্শিতাও বর্জন করে। তিনি সফর করে ফিরেছেন মধ্যভারতে, দক্ষিনাত্যে, সিন্ধুতে ও বোম্বাইতে এবং তার দরুন ভায়ের চেয়ে আরও সঠিকভাবে তিনি ব্রিটিশ শক্তির গুরুত্ব পরিমাপ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই শক্তিই মারাঠা বর্গীয়দের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে, মুসলমান পীন্ডারীরদের শায়েস্তা করেছে, সিন্ধুর আমীরদের দমন করেছে, শিখদের ধংস করে দিয়েছে। এজন্য তিনি কাফেরের দেশ থেকে পলায়ন করে নিজের বিবেককে প্রবোধ দিয়েছেন ও শান্তিতে থাকতে চেয়েছেন যতদিন না সৈয়দ আহমদ পুনরায় উদিত হন কিংবা নিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনাময় অনুগামীদের সংখ্যা বর্ধিত হয়। তিনি বোঝালেন যে, উপস্থিত অল্প সংখ্যক জেহাদিদের নিয়ে ভারত জয় করা একেবারেই অসম্ভব এবং আরও দেখালেন যে, কোনও রকম নিষ্ফল প্রচেষ্টায় মাত্র ব্রিটিশ সকারের চোখ খুলে দেওয়ায় হবে। আর যদি সে সরকার একবার তাদের কার্যকলাপ সম্বন্ধে বিশেষভাবে ওইয়াকিফহাল হয়ে উঠে তাহলে সরকার তাদের সব রকম রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দেবে এবং প্রজাদেরও জিহাদ সমর্থন করতে নিষেধ করবে। কিন্তু ইনায়েত আলী সংকর্ণমনা গোঁড়া এবং ভাইয়ের চেয়ে কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। এজন্য তার নিকট এরূপ পন্থা ভ্রমাত্মক বিবেচিত হল- এ যেন ইসলামে ও সৈয়দ আহমদের কাজে আস্থাহীনতা মাত্র। খোদ পয়গম্বর সাহেব ইমাম মেহদীর চেয়ে উচ্চস্তরের না হয়েও মাত্র কয়েকজন অনুসারী নিয়ে সারা আরবদেশ জয় করেছিলেন। যা একবার ঘটেছে তা পুনরায় ঘটতে পারে। এখন শুধু দরকার বিশ্বাসের, তাহলে সুফল নিশ্চিত। এভাবে তিনি ভায়ের বিরুদ্ধে জেহাদের পক্ষে ওকালতি করলেন এবং অনিচ্ছুক ভাইকে সরদারী ছেড়ে দিতে গররাজী হলেন। ফলে বসতিতে একটা গোলযোগের সৃষ্টি হয়। বাঙালীরা সমর্থন করলো তাদের পীর সাহেব ইনায়েত আলীর দাবী, আর সংখ্যাবহুল হিন্দুস্থানিরা পক্ষ নিল তার ভায়ের। ঝগড়া তীব্রতর হয়ে উঠলো এবং পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়ালো যে, জেহাদিরা ভারত অধিকারের কথা ত্যাগ করে আত্মকলহেই শক্তি অপচয় করতে প্রস্তুত হল। এমন সময় বিলায়েত আলীর শুভবুদ্ধিতে বিরোধটা মীমাংসা হয়ে গেলো। তিনি বিবেদমান দুই দলের সামনে উপস্থিত হয়ে আল্লাহ্‌র নিকট এই মোনাজাত করলেন, তিনি যেন দুর্দিনে মুসলমানদের করুণা করেন ও ভায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করে দেন। শত্রু- মিত্র তার আচরণে অভিভূত হয়ে পরেন এবং অস্ত্র ত্যাগ করেন। তখন ইনায়েত আলী নিজের অবস্থা সম্বন্ধে নিরাশ হয়ে ভায়ের পক্ষে খেলাফতের দাবী ত্যাগ করেন এবং নিজের অল্প সংখ্যক অনুচর নিয়ে সোয়াতের আখুন্দের নিকট আশ্রয় লাভের আশায় প্রস্থান করেন। আখুন্দ তার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। আখুন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইনায়েত আলী বনায়ের নদীর উপর তীরবর্তী গ্রাম মুদদখলে বসবাস করতে থাকেন। আর নিজের অভিলাষ পূরণের সুযোগের অপেক্ষায়ও করতে লাগলেন। ভাগ্য তার উপর সুপ্রসন্ন ছিল। কয়েক মাসের মধ্যেই বিলায়েত আলী রোগভোগের পর জান্নাতবাসী হন। তখন জেহাদি বাহিনীর নেতৃত্বের একমাত্র বাধাও অপসারিত হয়ে গেলো। এখন ওহাবীদের অর্থাৎ ব্রিটিশ প্রজাদের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন দেখা দিল, তারা শাসকদের অধীনে শান্তিতে বাস করবে কিংবা শাসকদের ধর্মের শত্রু বিবেচনায় তাদের নির্মূল করাই অবশ্য কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করবে। এ পর্যন্ত একথা বলা উচিত হবেনা যে, তারা বিনা উত্তেজনায় সরকারের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অস্ত্রধারণ করেছে। কয়েকবছর ধরে তারা সিন্ধুতে নিস্ক্রিওভাবে বসে ছিল এবং যদিও তারা কাবুল যুদ্ধে দোস্ত মুহম্মদ খানের সঙ্গে যোগদান করেছিল এবং আমাদের বিরুদ্ধে গজনীতে যুদ্ধও করেছিল, তারা স্থানীয় চাপে পরেই তা করতে বাধ্য হয়েছিল। আর তখন পরিস্থিতিও ছিল অন্য রকম। কাবুলে যুদ্ধের আসল উদ্দেশ্য ছিল একটা মুসলিম রাজ্যকে উৎখাত করা, এজন্য ওহাবীরা আক্রমকদের বাধা দিয়ে নিজ সম্প্রদায়ের ভাইদের সাহায্য করেছিল একটা বিধর্মী শক্তির বিনা কারনে আক্রমণের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা কালে।

ইসলামের শিক্ষার ধারনানুযায়ী স্রষ্টা এমন কোনও সত্তা নন, যিনি মানুষের ছোটখাটো অভিযোগের উর্ধে থেকে কেবলমাত্র অপরিবর্তনীয় বিধান দান করেন। বরং তিনি হচ্ছেন তাদের মহান শিক্ষক, করুণাময় পিতা, যিনি মানুষের সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষাকে উপযোগি করেন এবং প্রত্যেক মুশকিলে ও সমস্যায় সাহায্যদান করেন। তার বিধিবিধান একেবারেই চরমভাবে দেওয়া হয়নি, বরং ভিন্ন ভিন্ন যুগে মানবীয় বিভিন্ন স্তরে ধারনা শক্তির উপযোগী করেই দেওয়া হয়েছে এবং যখনই এসবের উপযোগিতা শেষ হয়ে গেছে, তখনই সেগুলিকে রদ করে দেয়া হয়েছে। সর্বকালের জন্য অপরিবর্তনীয় বিধিসমূহের ভিত্তিমূলে ধর্ম প্রতিষ্ঠিত নয়; ধর্ম যুগে যুগে ক্রমোন্নতির পথে এগিয়ে চলেছে। হযরত ইব্রাহিম, হযরত মুসা ও হযরত ঈসার দ্বারা এবং শেষ নবী হযরত মুহাম্মদের সময় পূর্ণ লাভ করেছে। হযরত মুহম্মদের সময় পর্যন্ত এই ধারা ধর্মীয় অনুদাতার অনুকূলে ছিলনা। শক্তিকে শক্তি দ্বারা প্রতিরোধ করা ধর্মের অজানা! ধর্মবিশ্বাসীর কর্তব্য ছিল, অহিংস বাধ্যতা দেখিয়ে প্রতিরোধ করে যতদিন সম্ভব ধর্মের অনুশীলন করা। আর যখনই ধর্ম আর পৃথিবীর মধ্যে যেকোনো একটা বেছে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিলনা তখনই তার কর্তব্য ছিল ঘর ত্যাগ করা এবং এমন এক দেশে হিজরত করা, যে দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করা যায়। হযরত মুসা এই পন্থা অবলম্বন করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে ইসলামের প্রথম যুগেও এই নিতি অনুসৃত হয়েছিল। মক্কার প্রথম দীক্ষিত মুসলমানদের উপর উৎপীড়ন শুরু হলে তারা মিসরের দক্ষিণে পলায়ন করে আশ্রয় লাভ করেছিল এবং তারপর স্বয়ং হযরত মুহম্মদ মদিনায় হিজরত করেন এই নীতিকে মুসলমানদের আদর্শ হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যে, যখন দেশে মুসলমানদের ধর্মচারন প্রাণসংশয়ের কারণ হবে, তখনই সে দেশ ত্যাগ করে অন্য দেশে চলে যাবে। তরবারির মুখে ধর্ম প্রচারের বোধ তখন হযরত মুহম্মদের হয়নি। আর এ জন্য তিনি কোরায়েশদের এই প্রস্তাব অস্বীকার করেছিলেন যে, তারা তার আল্লাহ্‌কে এক বছর পূজা করবে, যদি রিনি তাদের দেবতাদের এক বছর পূজা করেন, তাহলেও তার অস্বীকৃতি চরম উদারবাণীতে প্রকাশিত হয়েছিলঃ ‘বলো, হে অবিশ্বাসীগণ! আমি তার পূজা করবনা, যার পূজা তোমরা কর, আএ তোমরা তা পূজা করবেনা, যার পূজা আমি করি। তোমাদের ধর্ম তোমাদেরই থাক, আর আমার ধর্ম থাক আমারই’। কিন্তু যতোই তিনি মক্কাবাসীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরতে লাগলেন, ততোই তার ধর্মমতে দীক্ষিত মুসলমানরা বিপজ্জনক রাষ্ট্রীয় অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হতে লাগলো, আর এজন্য নও মুসলিমরা উৎপীড়ন এড়াবার উদ্দেশ্যে জন্মস্থান ত্যাগ করে মদিনায় পয়গম্বরের সাথে মিলিত হতে লাগলো। ক্রমে ক্রমে মুহম্মদের অনুসারী বিভিন্ন জাতের লোক ইসলামের একসূত্রে আবদ্ধ হয়ে একটা ঐক্যবদ্ধ সম্প্রদায়ে গ্রথিত হতে লাগলো, এবং তার শাসনও বিস্তৃত হতে লাগলো তাদের বাসভূমির সমগ্র এলাকা জুড়ে। তাদের সংখ্যা যতোই বাড়তে লাগলো হযরত মুহম্মদও সেই অনুপাতে কম উদার হতে লাগলেন। শেষে এক ঐশী বিধানের বলে পূর্বের উদারনৈতিক বিধানকে মাত্র চার মাসে সীমাবদ্ধ করে এই আদেশ দেয়া হল যে, তারপর মুসলমানরা বিধর্মীদের সঙ্গে সামাজিক সম্মন্ধ বান্ধ করে দিবে এবং তাদের ধর্মও প্রচার করতে পারবে তরবারির মুখে। এই নীতির বলে মুসলমানরা যে কোন দেশে বাস করুক না কেন, ধর্মের সুত্র ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেল, আর বিধর্মীরা ধর্মীয় ও জাতীয় যতোই পার্থক্য থাক না কেন তাদের মধ্যে, সমানভাবে মুসলমানদের দুশমন হয়ে গেলো। আর তার দরুন মুসলমানদের চোখে সাড়া দুনিয়াটা ভাগ হয়ে গেলো ‘দারুল ইসলাম’ অর্থাৎ শান্তির আবাস, যার বিস্তৃতি হচ্ছে সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্রের আর ‘দারুল হরব’ অর্থাৎ দুশমনের দেশ, যার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে সব অমুসলমান রাজ্য। প্রত্যেক ‘দার’ অর্থাৎ দেশের অধিবাসীরা অন্যটিতে বাস করতে পারে তার জাতীয়তা ত্যাগ না করেও। কিন্তু মুসলমান দারুল হরবের অধিবাসী হয়ে গেলে তাকে দারুল ইসলামে প্রত্যাবর্তন করার স্বদিচ্ছা প্রকাশ করতেই হবে। অন্যথায় সে হবে ধর্মত্যাগী। কারণ মুসলমান আইন কোন অমুসলমানকে স্থায়ীভাবে একজন ‘হরবী’ অর্থাৎ দুশমনের প্রজা হিসেবে স্বীকার করেনা।

মুসলমান আইনের বিধানদাতারা এ বিষয়ে একমত যে, মুসলমান কর্তৃক শাসিত প্রত্যেক দেশই দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু তাদের মধ্যে দ্বিমত থেকে গেছে যে, এককালীন দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত বর্তমান ব্রিটিশ ভারত বিধর্মী শক্তি কর্তৃক বিজিত হওয়ার দরুন দারুল হরব হয়ে গেছে কিনা। এই প্রশ্নের জবাব যদি ব্রিটিশ সরকারের অনুকূলে যায়, তাহলে মুসলমানরা জেহাদ করার অধিকার হারিয়ে ফেলে। আর যদি জওয়াবটা প্রতিকূল হয়, তাহলে মুসলমানরা গোলমেলে অবস্থায় পরে যায়। কারণ সরকার বিরোধ না করলে তাদের সক্রিয় বাধ্যবাধকতা হয় না। কিন্তু এ দেশ থেকে হিজরত বা পলায়ন করা অবশ্য কর্তব্য হয়ে পরে। স্থায়ীভাবে এদেশবাসী মুসলমান তার সর্ববিধ ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে, সে পাপে জীবনযাপন করবে, তার বিবাহ সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন অর্থাৎ বিবি তালাক হয়ে যাবে এবং তার সন্তানরা হবে জারজ। এ ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে গোঁড়া মানুষদের উপর কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তা যদি ইউরোপীয় পাঠকরা সম্যক অনুধাবন করতে চান তাহলে তারা ক্ষণকাল চিন্তা করে দেখুন, ইউরোপবাসীদের- দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরা যাক আইরীশদের উপর কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে, যদি তাদের বিশ্বাস করতে বলা হয় যে, তাদের রাজনৈতিক ক্ষোভ ছাড়া তাদের বিবাহ অসিদ্ধ হবে, সন্তানরা হবে জারজ ও প্রার্থনা হবে মূল্যহীন। যতদিন তারা ইংল্যান্ড শাসিত দেশে বাস করবে।

হানাফী সম্প্রদায়ের বিধানমতে দারুল ইসলাম সারুল হরবে পরিণত হয়ে যায় তিনটি শরতেঃ

প্রথম- বিধর্মী কর্তৃত্বের সাধারন প্রকাশ এবং তার মধ্যে মুসলিম কর্তৃত্বের প্রকাশ না থাকা।

দ্বিতীয়- দারুল হরবে এমন ভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়া যে, কোনও মধ্যবর্তী মুসলিম শহর বা কওমের অস্তিত্ব না থাকা।

তৃতীয়- তার মধ্যে কোন ধর্মনিষ্ঠ মুসলমান উপস্থিত না থাকা।

প্রথম শর্তটি ব্রিটিশ ভারতে উপস্থিত, কিন্তু দ্বিতীয় ও তৃতীয় টি নাই। ব্রিটিশ ভার উত্তর- পশ্চিমে মুসলমান রাজ্যর সঙ্গে মিলিত হয়ে আছে। আর তার মধ্যে এমন সব মওলবী উপস্থিত, যারা জ্ঞান- গরিমায় ও ধর্মনিষ্ঠাই দূর- দূরান্তে খ্যাতিমান। হানাফীরা এখনও এদেশকে দারুল ইসলাম বিবেচনা করে থাকে। কিন্তু ওহাবী আন্দলন শুরু হওয়ার পর থেকে মওলবী মুহম্মদ ইসমাইলের অনুগামীরা মনে করতেন যে, মাত্র প্রথম শর্তটি উপস্থিত প্রয়োজন। আর এজন্য প্রচার করতেন যে, ভারত দারুল হরব হয়ে গেছে। তারা কল্পনা করতেন যে, ইংরেজদের অধীনে ভারতীয় মুসলমানদের অবস্থা হচ্ছে ঠিক মিশরে ইসরাইলীদের মতো অবস্থা। আর এজন্য তারা দ্বিতীয় মুসার আবির্ভাব আশা করতেন। ইংরেজরা হচ্ছে বর্তমান যুগের ফেরাউন, অতএব তাদের অধিকার থেকে পলায়ন মিশর থেকে পলায়নের মতই প্রয়োজনীয়। তবে উৎপীড়িত মুসলমানদের জন্য সান্ত্বনা এই যে, ব্রিটিশ সরকারের ধ্বংস অবধারিত। তার স্থায়িত্ব মাত্র এক বছর- ঠিক যতদিন ইসরাইলীরা মিসরে দাসত্ত ভোগ করেছিল। এই দাবী সপ্রমাণ করতে ওহাবীরা পিছপা হয়নি। তারা এই সম্বন্ধে ভবিষ্যৎবাণী জাল করে, ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারপত্র ছাপিয়ে অজ্ঞ অসন্ধিগ্ধ মুসলমান ভাইদের মধ্যে বিতরণ করতঃ

সত্য কাহিনী শোনঃ একজন বাদশাহ হবেন, তার নাম তাইমুর, ত্রিশ বছর তিনি শাহী করবেন। মর্দান শাহ হবেন তার উত্তরাধিকারি, তিনিও দুনিয়াই ত্রিসগ বছর শাসন করবেন। যখন তিনি এ দুনিয়া ছেড়ে যাবেন, তখন আবু সাঈদ হবেন জিন ও মানুষের বাদশাহ। তারপর বাদশাহ হবেন ওমর শাহ, হিন্দুস্তানের তখত তার অধীনে আসবে। কাবুলে শাহ মহামতি বাবুর হবেন হিন্দুস্তানের বাদশাহ, আর দিল্লী হবে রাজধানী। তার উত্তরাধিকারি হবেন সিকান্দার, তার পরে তখত পাবেন ইব্রাহীম। তখন দুনিয়াই নামবে বিপর্যয়। তারপর হুমায়ন তখতে উন্নীত হবেন। তার আমলে হবে আফগানদের অভ্যুদয়- এই বংশের শাহ হিন্দুস্তান দখল করবেন, তার নাম মহামতি শের শাহ।

হুমায়ন ইরানে পালিয়ে আশ্রয় নিবেন মুহম্মদের বংশধরদের, সেখানে তার সম্মান হবে। ইরানের শাহ হবেন তার প্রতি সদয়, তার মর্যাদা ও সম্মান বাড়িয়ে দিবেন। যখন তিনি হিন্দুস্তানে অভিযান করবেন হুমায়ুন কে তখতে বসাতে, তখন শের শাহ গত হবেন, তার ছেলে হবেন্সাহ। হুমায়ুন সহজেই ফিরে পাবেন হিন্দুস্থানের তখত। তারপর আকবর হবেন হিন্দুস্থানের বাদশাহ। তার পুত্র জাহাঙ্গীর হবেন উত্তরাধিকারি, তিনি সাড়া দুনিয়ার রক্ষক। যখন তিনি এ দুনিয়া ছেড়ে যাবেন, শাহজাহান শাহী করবেন ত্রিশ বছর বা আরও বেশী। তার কনিষ্ঠতর পুত্র হবেন উত্তরাধিকারি, তিনিও শাহী করবেন ত্রিশ- চল্লিশ বছর। তারপর ইমাম একেবারে লুপ্ত হবে, সত্য নষ্ট হবে, মিথ্যা মাথা তুলে দাঁড়াবে, বন্ধুরা হবে পরস্পরের দুশমন। তিনি শাসন করবেন কুড়ি থেকে ত্রিশ বছর। তার কনিষ্ঠতর পুত্র হবেন উত্তরাধিকারি। তার আমলে ঈমান আবার তাজা হবে, তার নাম হবে বাদশাহ মুজান শাহ। তার শাহীতে মানুষ থাকবে আরাম- আয়েসে। আর ন্যায়বিচার তার রাজ্যে বিরাজ করবে। আবার শান্তি নেমে আসবে তার সময়ে। দুঃখ দূর হবে, সুখ দেখা দিবে সর্বত্র। তার শাহী থাকবে এগারো বছর। তারপর হবেন আর একজন বাদশাহ, তখন নাদির শাহ করবেন হিন্দুস্থানে অভিযান, তার তরবারি দিল্লীতে রক্তস্রোত বইয়ে দিবে। তারপরে অভিযান করবেন আহমদ শাহ, তার হাতে শাহী বংশ উৎখাত হয়ে যাবে। এই বাদশাহ ফৌত হলে পরে আগের বংশ আবার তখত পাবে। তখন শিখেরা হবে শক্তিশালী, আর করবে অত্যাচার- উৎপীড়ন প্রায় চল্লিশ বছর ধরে। তারপর নাসারারা সাড়া হিন্দুস্থান জয় করবে, তাদের শাহী হবে মাত্র একশো বছর। তাদের আমলে দুনিয়াই নেমে আসবে ভীষণ উৎপীড়ন। তাদের ধ্বংস করতে পশ্চিমে এক শাহ উদয় হবেন, তিনি যুদ্ধ করবেন নাসারাদের সঙ্গে। এই যুধে অগণিত শহীদ হয়ে যাবে। পশ্চিমের শাহ জয়ী হবেন জেহাদের তরবারিতে, আর ঈসার অনুসারীরা হবে পরাজিত। আবার ইসলাম আবাদ হবে চল্লিশ বছর। তারপর এক বেঈমান জাতি আসবে ইস্পাহান থেকে।এই স্বেচ্ছাচারীদের ধ্বংস করতে ঈসা আসবেন আসমান থেকে নেমে, আর আসবেন মেহদী। এসব ঘটবে যখন রোজ- কেয়ামত শুরু হবে দুনিয়াই। এই কাসিদা লেখা হল পাঁচশো হিজরিতে। পশ্চিমের শাহ আসবে বারশ সত্তর হিজরিতে। নেয়ামতউল্লাহ জানতেন আল্লাহ্‌র অনন্ত রহস্য, তার ভবিষ্যৎ বাণী একদিন সফল হবেই।

হিজরত করার অনুকূলে যেসব প্রচারনা করা হতো, নীচের উদ্ধৃতিই তার উপযুক্ত প্রমানঃ

‘পরম দয়ালু ও করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে, আল্লাহ্‌ পরম মঙ্গলময়। তিনি রাব্বুল- আলামিন- সাড়া বিশ্বের মালিক। আল্লাহ্‌র করুণা ও নিরাপত্তা হযরত মুহম্মদ, তার রাসুল, তার বংশধরদের ও সাহাবীদের উপর বর্ষিত হোক। এখন সকল মুসলমান অবহিত হোক যে, তাদের কর্তব্য হচ্ছে, কাফের শাসিত দেশ ত্যাগ করা, কারণ সেখানে মুসলমান আইন নির্দিষ্ট বিধিবিধান শাসনশক্তি প্রতিপালিত হতে বাধা দেয়। তারা যদি দেশ ত্যাগ না করে, তাহলে মৃত্যুকালে আজরাইল যখন তাদের দেহ থেকে আত্মা বিচ্ছিন্ন করবেন, তখন তিনি তাদের এই প্রশ্ন করবেন, আল্লাহ্‌র রাজ্য কি এত প্রশস্ত ছিলনা যে, তোমরা গৃহত্যাগ করে অন্যত্র বাস করতে পারনি? আর এই কথা বলে তিনি তাদের অসেস যন্ত্রণা দিয়ে দেহ থেকে আত্মা বিচ্ছিন্ন করবেন। তারপর তারা কবরের ভিতর ভোগ করবে অশেষ যন্ত্রণা ও তাদের রেহাই নাই। শেষে রোজ- কিয়ামতের সময় তাদের দোজখে ফেলে দেয়া হবে এবং সেখানে তারা শাস্তি ভোগ করবে অনন্ত কাল ধরে। আল্লাহ্‌ করুন! কোন মুসলমান যেন কাফেরদের রাজ্যে মৃত্যু আলিঙ্গন না করে। যদি তার কফেরের রাজ্যে মৃত্যু ঘটে, তাহলে মৃত্যুকালে তার অশেষ যন্ত্রণা ভোগ হয়। তারপর তার ভাগ্যে আসে কবরের ভিতরে অশেষ শাস্তি, আর রোজ- কিয়ামতে তার যে শাস্তি হয়, তা মানুষের অচিন্তনীয়। ভাইগন! এখনও মরণ আসেনি। এখনও তোমরা পলায়ন করতে পার। সেই দেশে যাও যেখানের শাসক মুসলমান এবং মোমেন মুসলমানদের সঙ্গে বাস কর। তুমি যদি জীবিতকালে স্বদেশে উপস্থিত হউ, তাহলে তুমি সাড়া জীবন যত পাপ করেছ, সব মাফ হয়ে যাবে। তোমরা রুযীর কথা মোটেই ভেবনা। আল্লাহ্‌ সকলেরই আহার যোগান। তুমি যেখানেই যাবে, সেখানেই তোমার আহার যোগাবেন। আল্লাহ্‌ কখনও কাউকে অনাহারে বা বিবসনে রাখেননা। বা তুমি তো আল্লাহ্‌র হুকুমে গৃহত্যাগ করে যাচ্ছ, আল্লাহ্‌ তোমাকে কুরআনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিরাট সম্ভাবনাময় উন্নতির ও তার অনন্ত করুণার। তবু তোমার ভয় কিসের? আসমান ও জমিনের মালিক তো সর্বদাই আছেন তোমার সাথে। তুমি যে দেশে যাচ্ছ, সেখানেই তোমার রুজির হিল্লে হয়ে যাবে। এ চিন্তা মনেই এননা। সে দেশে চলে যাও আর এখানে যে পেশা চালাচ্ছ, তাই সেখানে শুরু করে দাও। আল্লাহ্‌ সবারই আহার যোগান। তোমার মনে শান্তি আন। যেখানেই তুমি যাবে, সেইখানেই সম্মানের সঙ্গে তিনি আহার যুগিয়ে দিবেন, আর তোমার সব গুনাহ মাফ করে দিবেন। তুমি এ জীবন আরাম- আয়েশে কাটিয়ে যাবে আর মরণকাল আজরাইল তোমায় এতটুকু যন্ত্রণা না দিয়ে তোমার দেহ থেকে আত্মা বিচ্ছিন্ন করে দিবেন। আর তোমার কোনও গোর আজাব হবেনা। রোজ- কিয়ামতে তোমার কোনও ভয়ের কারণ নাই। তুমি দোযখের যন্ত্রণা থেকেও মুক্তি পাবে।

“পুরাকাহিনীতে আছে যে, একজন ইসরাইলী অন্যায়ভাবে নিরানব্বইটা খুন করে। তারপর এক সাধুর নিকট যেয়ে অপরাধ স্বীকার করে ও জিজ্ঞাসা করে কিভাবে ের মুক্তিলাভ হবে। সাধু পুরুষ বললেন, কেউ যদি যদি অন্যায়ভাবে একজন লোককেও খুন করে, তাহলে তার পরিত্রাণ নাই। তোমার পাপের ক্ষমা নাই, তোমাকে দোজখে যেতেই হবে। একথা শুনে ইসরাইলী বলল, ‘আমাকে দেখছি দোজখে যেতেই হবে, এটা ধ্রুবসত্য। তাহলে তোমাকেও খুন করে খুনের সংখ্যাটা শত পূর্তি করি’। একথা বলে সে সাধু পুরুষকে খুন করলো। তারপর সে আরেক সাধুর নিকট গিয়ে স্বীকার করলো, সে একশোটি খুন করেছে, এখন কিভাবে তার মুক্তিলাভ হবে। সাধুর জওয়াব হল, অকপট মনে তওবাহ বা অনুশোচনা করে ও হিজরত করে মুক্তিলাভ করে যাবে। একথা শুনেই সে তওবাহ করলো ও নিজের দেশ ত্যাগ করে বিদেশে যাত্রা করলো। পথেই কিন্তু তার মৃত্যু এল ঘনিয়ে এবং করুণার দূত ও শাস্তির দূত তার দেহ থেকে আত্মা বিচ্ছিন্ন করতে উপস্থিত হলেন। করুণার দূত [রহমতের ফেরেশতা] বললেন, দেহ থেকে আত্মা বিচ্ছিন্ন করার অধিকার তারই আছে, কারণ লোকটি তওবাহ করেছে ও হিজরত করেছে। শাস্তির দূত [গজবের ফেরেশতা] স্বীকার করলেন, লোকটি যদি অন্য রাজ্যে পৌছাতে পারত, তাহলে শাস্তির দূতেরই অধিকার হতো একাজ করার। কিন্তু তিনি নিজেরই অধিকার দাবী করলেন, এই যুক্তি দিয়ে যে, লোকটি এখনও তার দেশেই থেকে গেছে এবং তার মৃত্যু ঘটাতে চাইলেন। কারণ লোকটি হিজরত সমাধা করতে সমর্থ হয়নি। তখন দূত দুটি লোকটি যেখানে শুয়েছিল, সে জায়গাটি মেপে দেখলেন এবং ফলে জানা গেলো যে, লোকটির একখানা পা সীমানা অতিক্রম করে অন্য দেশে পড়েছে। তখন শান্তির দূত নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে ঘোষণা করে সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু ঘটিয়ে দিল, আর লোকটিও আল্লাহ্‌র অনুগৃহীত মানুষের দলভুক্ত হয়ে গেলো। তোমরা শুনলে কিভাবে হিজরত মৃত্যুর পরও পুরস্কৃত হয়। অতএব তোমার আল্লাহ্‌র নিকট প্রার্থনা কর তিনি যেন তোমাদের হিজরত করার সামর্থ্য দেন। আর তোমরা অতি শীঘ্রই হিজরত কর, নাহলে কাফেরদের দেশেই তোমাদের মৃত্যু হতে পারে। এদেশে মৃত্যু হলে তোমাদের অশেষ দুর্গতি হবে। মরণ যখন এসে যায় তখন তওবাহ করার সময় থাকেনা। যা করবার এখনি করে ফেল”।

হিজরতের মতবাদ শুধু ইসলাম ধর্মেরই বিশেষত্ব নয়, খ্রিস্টান ধর্মেও রয়েছে সমান মতবাদ। যে ক্রুসেডার তীর্থযাত্রী জেরুজালেমে অস্থিরক্ষা করার আশা পোষণ করে, আর যে রোমান ক্যাথলিক জীবনের শেষ দিনগুলো রোমে কাটিয়ে দিতে চাই, তারা একই প্রর্বত্তিতে উদ্বুদ্ধ হয় জীবনের শেষ দিনগুলো এমন কোন পবিত্র স্থানে অতবাহিত করতে, যেখানে পাপের প্রলোভনে পরার কম সম্ভাবনা। গোঁড়া মুসলমানও হিজরত করাকে এরকম একটা প্রবৃত্তিতে দেখে থাকে। তারা আশা করে থাকে মক্কা বা মদীনাশরীফে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার। কিন্তু তারা এটাকে মুক্তিলাভের জন্য প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করতে দিধা করে। আর এজন্য তারা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল, যখন তারা দেখল যে, একটা বিরুদ্ধবাদী সম্প্রদায় অজ্ঞ জনসাধারণকে বিশ্বাস করাতে চায়ছে যে, তাদের এই মতবাদের সমর্থন করে মক্কাবাসীরাও। ১৮৩৩ সালে মওলবী কেরামত নামে একজন ও সৈয়দ আহমদের জনৈক খলীফার ‘কাতুল-ইমাম’ থেকে নীচের উদ্ধৃতিটা এই বিষয়ের উপর সমকালীন সবচেয়ে উন্নত মত হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারেঃ

“আরও একটি বিষয় সম্বন্ধে আলোচনা করে দরকার, কারণ তাতে বহু উপকার পাওয়া যেতে পারে; যদি পয়গম্বরদের কোন উম্মত মুশ্রিকদের দ্বারা কিংবা নাস্তিকদের দ্বারা উৎপীড়িত হয় এবং অবিশ্বাসীদের দেশে শরীয়াতের আইন পালন করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠে তাহলে সে আশ্রয় নেয় কোন এক মুসলিম রাজ্যে, বিশেষত মক্কা ও মদীনা শরিফে। কিন্তু ওহাবী যদি সেসব জায়গায় প্রবেশ করে, তাহলে তাদের স্থানীয় বাশিন্দারা শাস্তি দিয়ে থাকে। সেসব দেশে হিন্দুস্থানের মতো নয় যে, একজন কারও এততুকু বিনা আপত্তিতে যা ইচ্ছা সেখানে করতে পারে। এজন্য ওহাবী যখন দেখে যে, সেসব দেশের লোক তাদের বিপক্ষে ও তাদের শাস্তি দিতে প্রস্তুত, তখন তারা কোন বিধর্মীর দেশেও আশ্রয় খুঁজবে। বহু ওহাবী এমনতর করেছে। আল্লাহ্‌ আমাদের হেফাজত করুন! এটা কেমন খারাপ মজহাব যে, তার অনুসারীরা দারুল- ইসলামে বাস করতে পারেনা, তাদের কাফেরের দেশেও ছুটাছুটি করতে হয়। অতএব তাদের মজহাবের কেউ যদি তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, কেন তুমি কাফেরের দেশে বাস করছ, তাহলে তাকে জওয়াব দাওঃ কাফেরের রীতিনীতি দেখে মন হতবুদ্ধি হয়ে যায়। আর তোমাদের মজহাবই তো এমন মনোবৃত্তি জাগিয়ে তুলেছে। শুধু পারেনি মক্কা, মদীনা ও দারুল ইসলামের অন্যান্য শহরে। কারও দৃষ্টি ঠিকভাবে সংযত রাখা যায়না। তোমরা যারা ওহাবী এবং ঐ সব স্থানে সফর করেছ, তোমরাই বুকে হাত দিয়ে এই প্রশ্নটা করে দেখ। এদেশে বসবাসের সওয়ালে তোমাদের ও আমার মধ্যে নিশ্চয়ই পার্থক্য আছে। আমি এখানে আছি বটে, কিন্তু আমার মন পরে আছে ওখানে। এবং আমার একান্ত কামনা যে, আল্লাহ্‌ আমায় একদিন দারুল ইসলামে নিয়ে যাবেন কিংবা এদেশটাকে দারুল ইসলামে পরিণত করে দিবেন। আর আমি বিশ্বাস করি ওখানকার মানুষগুলো সৎ, উত্তম, ধর্মে নিষ্ঠাবান ও ঈমানে বলিষ্ঠ। কিন্তু তোমরা রাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে, তাদের আচার- নীতিতে ও ফতোয়ায় সন্তুষ্ট নও। এখন কি তাদের আখ্যা দাও স্বেচ্ছাচারী বলে। আর তোমাদের আরও অনেকে বলে থাকে যে, মক্কা ও মদীনার লোকদের উপর বিশ্বাস করা চলেনা, তারা দশ টাকার বিনিময়ে মিথ্যা ফতওয়া দিয়ে বসে থাকে” ।

ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা যখন বেনারসে বা গয়ায় তীর্থ করতে যায়, তখন তারা বিদায়ের পূর্বে তাদের সম্পত্তির শেষ ব্যাবস্থা করে যায়। বহু লোক মনে করতো হিজরত করা কঠিন কাজ। এখন রেলপথ বসান হয়েছে, ভারত ও আরবের বন্দরগুলোতে জাহাজের যাতায়াতও সহজ হয়েছে। তার দরুন মক্কা শরীফে হিজরত করতে যাওয়ার লোকদের উৎসাহ বেড়েছে। কিন্তু তার ফলেই মুসলমানদের চিরতরে ভারত ছাড়ার ইচ্ছা জেগেছে কিনা, তা বলা শক্ত। শাহ আবদুল আজীজ ছিলেন ভারতে বহু শতাব্দীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মোমেন মুসলমান। কিন্তু তিনি দিল্লীতেই বাস করেছেন এবং সেখানেই মৃত্যু বরণ করেছেন। তার উত্তরাধিকারী মওলবী ইসহাক হিজরত করেছেন। আর সমকালীন হানাফীদের নেতা মওলবী কুতবউদ্দিনের রচনাসমূহ বিবেচনা করে ধারনা হয় যে, আজকাল গোঁড়া মুসলমানরা হিজরত সম্বন্ধে এরকম ধারনা করে, যা ওহাবীদের প্রচারিত মতবাদ থেকে খুব কমই পৃথক। আর তার তুলনায় মওলবী কেরামত আলীর মতামত অনেক উদার। দিল্লীতে ১৮৬৭ সালে মুদ্রিত তার ‘ইমাম তাফাসীর’ গ্রন্থের ২৫৩ পৃষ্ঠায় তিনি বলেছেনঃ

“আল্লাহ্‌র রাসুল বল্লেনঃ ‘আমি সেসব মুসলমানদের উপর নারাজ যারা মুশ্রিকদের মধ্যে বাস করে’। সাহাবারা একথা শুনে রসূলকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহ্‌র রসূল! আপনি কেন নারাজ হলেন? রসূল বললেন, ঈমানের একটা বড় চিহ্ন এই যে, মুশরিকরা ও মুসলমানরা একে অপরের থেকে দূরে থেকেও দেখতে পাবেনা এবং কাফেরদের থেকে মুসলমানরা এত দূরে থাকবে যে, তারা কেউ কারও ঘরের আগুনও দেখতে পাবেনা। কাফেরদের মধ্যে বাস করার প্রশ্নই উঠেনা। কারণ তার ফলে ইসলাম দুর্বল হয়ে পরে। এই দুর্বলতা আসে কাফেরদের রীতিনীতি লক্ষ করে।

সংক্ষেপে বলতে চাই, ভাইসব! আমাদের উচিত বর্তমান অবস্থার জন্য ক্রন্দন করা। কারণ আল্লাহ্‌র রসূল আমাদের উপর বিরূপ রয়েছেন আমরা কাফেরদের দেশে বাস করছি বলে। যখন খোদ রসূল আমাদের বিরূপ রয়েছেন তখন আমরা কার শরণাপন্ন হব? আল্লাহ্‌ যাদের সামর্থ্য দিয়েছেন, তাদের উচিত হিজরত করা, কারণ এদেশে আগুন জলে উঠেছে। আমরা যদি সত্য কথা বলি, তাহলে আমাদের ফাঁসি যেতে হয়; আর যদি চুপ করে থাকি, তাহলে ধর্মচ্যুতি হয়”।

কুরআন থেকে উদ্ধৃত নিম্নলিখিত বাণীগুলি থেকে বিধানের অব্যার্থতা সৎ ও ধর্মীয় কাজের ও ধইর্যের শ্রেষ্ঠত্ব সুপরিস্ফুট; কুরআনের বিভিন্ন বাণীতেও এসব পালনের বিধান দেওয়া আছে। তার উপকারিতার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছেঃ

“হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ্‌কে ভয় কর, তোমাদের প্রত্যেকের উচিত আগামীদিনের পূর্বে যেসব দেখেছ সেগুলি পুনরায় দেখা।

তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় কর, নিশ্চয়ই তিনি অবগত আছেন তোমরা যা করছ।

যে আল্লাহ্‌কে ভয় করে, তাকে নিশ্চয়ই তিনি সকল বিপদ থেকে বাচান; আর তাকে যোগান, যখন তা পাওয়ার মোটেই সম্ভাবনা থাকেনা।

যারা ধর্মচারন করে তাদের অতি নিকটে তিনি সঞ্চয় করে রেখেছেন বেহেশত, যার নীচে দিয়ে অনন্তকাল স্থায়ী নহর বয়ে যায়, আর যেখানে আছে পবিত্র ও ধর্মশীলা তরুণীগণ যাদের উপর আল্লাহ্‌ দয়ালু।

আল্লাহ্‌ তার সৃষ্ট প্রাণীগণের অবস্থার প্রত্যক্ষ সাক্ষী।

মওলবী কুতুবউদ্দিন, যার ফতওয়া তার মুরিদরা অভ্রান্ত হিসেবে বিশ্বাস করে বলেছেন যে, তাদের তিনটির যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে; শাহাদত, হিজরত কিংবা পরলোকে অনন্ত শাস্তি। আর সরকারী কর্মচারীরা যেমন তাচ্ছিল্লভাবে দেশীয় ভাষায় সাহিত্যের বিচার করে থাকেন, তার প্রতি বিদ্রূপ করেই তিনি তার পুস্তকের শেষে বলেছেন যে, তার কিতাবখানি আইনানুসারে রেজিস্ট্রি করাও হয়েছে।

হানাফী সম্প্রদায়ের মুখ্য ব্যাক্তি যদি এ ভাষা ব্যাবহার করে থাকেন, তাহলে ব্রিটিশ সরকার সম্ভবতঃ আর ধারনা করতে পারে না যে, হানাফী ও ওহাবীদের মধ্যে কোনও রকম মতভেদ আছে, অথচ আমরা এতকাল তাই ভেবে আসছি। বর্তমানে এমন অনেক চিহ্ন বিদ্যমান, যা থেকে লক্ষ করা যায় যে, এককালে এই দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যা কিছু পার্থক্য ছিল, তা আংশিক ভাবে ক্ষয়িত হয়েছে। আর আমাদের সামনে যে পুস্তকটি আছে, তাও লেখক এমন প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, বাস্তবিক পক্ষে উভয় সম্প্রদায় একই মতামত পোষণ করে। আর আমরা একথাও জোর করে বলতে পারিনা যে, অসন্তুষ্ট হওয়ার কোনও কারণও নায়। বহু বছর ধরে মুসলমানরা অবহেলিত হয়ে আসছে, কিংবা আমাদের সন্দেহদগ্ধ প্রজা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তাদের শিক্ষা- সংস্কৃতির প্রতি অবহেলা দেখানো হয়, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত মুসলমানদের ব্যাক্তিগত দাতব্য সম্পত্তিগুলোও কোন কোন ক্ষেত্রে অন্য কাজে লাগানো হয়। আমাদের বিশ্বাস, বিবেচনা ও উদারনীতি অবলম্বন করে নিশ্চয়ই এই অবহেলা দূর করা হবে। যা হোক, আমরা এই বিষয়টার আর অধিক আলোচনা করতে পারিনে; কারণ এমনিতেই আমরা এই নিবন্ধে অনেক দূরে গেছি, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ওহাবীদের অনুসরণ করা। অতএব আমরা প্রসঙ্গটা এখানেই ত্যাগ করছি এই আশা নিয়ে যে, আমাদের কোনও পাঠক হয়তো সাধারণের উপকার্থে অগ্রসর হবেন, ব্রিটিশ অধিকারে পর হতে ভারতীয় মুসলমানদের ধর্মীয় মতামতের যে বিভিন্ন স্তরে যে বিকাশ দেখা গেছে সে সম্বন্ধে আলোচনায় প্রবৃত্ত হতে।। কারণ এ সম্বন্ধে কেবলমাত্র মুসলমান পাঠকদের জন্য যেসব পুঁথি- পুস্তক মুদ্রিত আছে সেসব যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে বলতে হয় যে, এটি ক্রমেই সরকারের বিরুদ্ধে অসহনীয় ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

ইনায়েত আলী মুজাহিদ বাহিনীর সরদার হয়েই ইংরেজদের বিরুদ্ধে তার বহু আকাঙ্ক্ষিত জেহাদ শোসনার সক্রিয় পন্থা অবলম্বন করতে চেষ্টিত হলেন। তিনি বাংলাদেশের খলীফাদের তাগিদ দিলেন এই উদ্দেশ্যর জন্য সর্বসক্তি ব্যায় করতে এবং প্রচার করতে যে সৈয়দ আহমদের আবির্ভাব আসন্ন। আর ওহাবী প্রচারকরা সাড়া দেশটায় পুনরায় অসন্তোষের আগুন জ্বেলে তুলল ও এভাবে বিদ্রোহ প্রচার করতে লাগলোঃ

“যারা অন্যকে হিজরত বা জেহাদ থেকে বিরত করতে চেষ্টা করবে, তারা মুনাফেক ও কপট বিশ্বাসী। সকলেরই এ বিষয়ে অবহিত হওয়া দরকারঃ যে দেশে ইসলাম ব্যাতীত অন্য কোনও ধর্মের প্রাধান্য সে দেশে হযরত মুহম্মদের ধর্মীয় বিধিবিধান চালু হওয়া সম্ভব নয়। তখন মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে একতাবদ্ধ হওয়া এবং জেহাদ করা। বর্তমান সময়ে এদেশ থেকে হিজরত করা একান্ত কর্তব্য হয়ে পড়েছে। আলেমরা এ বিষয়ে সঠিক ফতোয়ায় দিয়েছেন। এখন যারা এ কাজ করতে নিষেধ করে, মোমেন মুসলমানরা শোনো, তাদের উচিত ভোগাসক্তির দাস হিসেবে নিজেদের ঘোষণা করা। যারা একবার ইসলামের দেশে চলে যেয়ে আবার ফিরে আসে বিবেক বিসর্জন দিয়ে এবং আর হিজরত করতে অনিচ্ছুক, তাদের জানা উচিত যে, তাদের বিগত সমস্ত পুণ্যফল বিফল হয়ে গেছে। যদি সে এদেশ থেকে হিজরত না করে মারা যায়, তাহলে সে নাজাত ও মুহতিলাভ থেকে বঞ্চিত হবে। এ জামানার মওলবী, পীর ও হাজীদের ইতিহাস পর ও জান; এবং ভেবে দেখ, তাদের মধ্যে কে এদেশ থেকে হিজরত করেছেন এবং বিবেক বিসর্জন দিয়ে ফিরে এসেছেন। কে বাস করছেন কাফেরদের সঙ্গে এবং কেই বা হিজরত বা জেহাদ করতে নিষেধ করছেন”।

যেসব লোক হিজরত করতে কিংবা জেহাদে যোগদান করতে অক্ষম তাদের উপদেশ দেওয়া হতো নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ করতে এবং কাফের শাসকদের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক না রাখতে। আর এভাবেই সরকারের মধ্যেই অন্য শক্তি সঞ্চয় করে সম্পূর্ণভাবে বিরুদ্ধাচরণ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। বিধর্মীদের সাহায্য গ্রহণ করা অনুচিত। তাদের আদালত সুদের

ডিক্রি দেয়, অতএব সেগুলো বর্জন করা উচিত। আর মুসলমান ভাইয়ে ভাইয়ে যেসব ঝগড়া- বিবাদ হয়, সেগুলি নেতাদের দ্বারা মীমাংসা করে নেয়া উচিত। হযরত মুহম্মদের আইন হিসেবে এসব অজ্ঞ লোক যা ভাবে, টি প্রয়োগ করে। কারণ আল্লাহ্‌ কি নির্দেশ করেননি, “আর আল্লাহ্‌র নামে বলছি, তারা তখন পুনঃবিশ্বাসী হবেনা, যতক্ষণ তোমাকে তাদের বিরোধের বিচারক না করছে, এবং তুমি যা বিচার করে দিবে, তাই গ্রহণ করতে তারা অন্তরে কষ্ট অনুভব না করছে এবং সর্বোতভাবে নির্ভর করে তা মেনে না নিচ্ছে”?

ইনায়েত আলীর সমর্থনে ব্রিটিশ ভারতে ওহাবীদের যে কার্যকলাপ চলেছিল, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া আছে মিঃ র‍্যাভেন্স কর্তৃক বাংলা সরকারকে প্রদত্ত রিপোর্টের ১৫২ পৃষ্ঠায়। নীচে তার কিছুটা উদ্ধৃতি দেয়া হলঃ

“পাঞ্জাব সরকার ১৮৫২ সালে বিদ্রোহাত্মক চিঠিপত্রের একখানি চিঠি আটক করে ফেলে। তাতে প্রকাশ হয়ে পরে, পার্বত্য অঞ্চলে যেসব হিন্দুস্থানি ধর্মান্ধ থাকতো, তারা কীভাবে রাওইয়ালপিন্ডীতে অবস্থিত ভারতীয় রাজকীয় বাহিনীর চতুর্থ রেজিমেন্ট কে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে প্ররোচিত করেছিল। এই ষড়যন্ত্রের উৎপত্তি হয় পাটনায়। আর যেসব চিঠিপত্র আটক করা হয়, তাতে উল্লেখ ছিল যে, সাদিকপুরের মওলবীরা ও বহু কাফেলা লোক অস্ত্র সজ্জে সজ্জিত হয়ে তখন সীমান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই রকম একখানা স্বাক্ষরহীন ও তারিখবিহীন চিঠি লেখা হয় পেশোয়ার থেকে। তাতে বলা হয়েছিল, মওলবী বিলায়েত আলী এবং আজীমাবাদের মওলবী ইলাহী বখশ সাহেবের পুত্রগন মওলবী ইনায়েত আলী, মওলবী ফয়েজ আলী, মওলবী ইয়াহইয়া আলী এবং দিনাজপুরের মওলবী করম আলী [ তিনি একজন দরজী ছিলেন ] তখন সিত্তানায় অবস্থান করতেন সোয়াতের আকবর বাদশাহের সঙ্গে, এবং তাদের উদ্দেশ্য ছিল সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। এই সৈয়দ আকবর শাহের সম্বন্ধে আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, তিনি ছিলেন সোয়াত উপত্তকার নির্বাচিত শাসক। চিঠিটা লেখা ছিল এই মর্মেঃ আজীমাবাদের মওলবী বিলায়েত আলীর ভাই মওলবী ফরহাত আলী এবং মওলবী ফয়েজ আলী এবং মওলবী ইয়াহয়া আলী ও মওলবী আহমদউল্লাহ তাদের বাড়ীতে ও গ্রামে অন্যান্য লোকের নিকট থেকে চাদা আদায় করতেন এবং অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করতেন। অন্যান্য চিঠিতে জানা যাই, মানুষ ও অস্ত্রাদি পাটনা থেকে মিরাট ও রাওইয়ালপিন্ডির মধ্য দিয়ে চালান দেয়া হতো এসব জায়গায় লোক নিযুক্ত থাকতো সীমান্তে জেহাদের জন্য সেগুলি পৌঁছে দিতে।

“পাঞ্জাব সরকারের প্রদর্শনে পাটনার ম্যাজিস্ট্রেট মওলবী আহমদউল্লাহর খানসামা হোসেন আলী খানের বাড়ি তল্লাশি করেনঃ কারণ এরকম সন্দেহ হয় যে, চিঠিপত্র সেখান দিয়েই আদান- প্রদান হতো। এ খবর পাওয়া যায় একজন দেশীয় ডাক্তার বা হেকিমের মারফত। তখন পাটনার ষড়যন্ত্রকারীরা সাবধান হয়ে যায় এবং বাড়ীর সব চিঠিপত্র নষ্ট করে দেয়। যাহোক, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব রিপোর্ট পাঠান, ওহাবী সম্প্রদায় তখন বেড়েই চলেছে এবং জেহাদ প্রচার করা হয় মওলবী বেলায়েত আলী, মলিবি আহমদউল্লাহ ও তার পিতা ইলাহী বংশের বাড়ীতে। তিনি আরও রিপোর্ট পাঠান যে, স্থানীয় অহাবীদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে পুলিশের, আর তার দরুন ওহাবীদের গতিবিধি সম্বন্ধে নির্ভরযোগ্য সংবাদ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি মওলবী আহমদউল্লাহ ছয়- সাতশো সশস্ত্র লোক তার বাড়ীতে জমায়েত রেখেছিলেন। এবং দরকার হলে এ সম্বন্ধে ম্যাজিস্ট্রেটের আরও তদন্ত প্রচেষ্টায় বাহুবলে বাধা দিতে ও বিদ্রোহের নিশান তুলতে প্রস্তুত ছিলেন।

“বিষয়টি তদানীন্তন বড়লাট বাহাদুর লর্ড ডালহৌসির নিকট পেশ করা হল ১৮৫২ সালের ২০শে আগস্ট। তিনি তখন বিষয়টিতে এই মন্তব্য লিপিবদ্ধ করেন যে, পাটনা ও সীমান্তের মধ্যে বিদ্রোহাত্মক চিঠিপত্র আদান- প্রদান সম্বন্ধে সরকার ওইয়াকিফহাল এবং তিনি এ নির্দেশ দেন যে, পাটনার বিদ্রোহীদের উপর যেন কড়া নজর রাখা হয়।

“১৮৫২ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর কাউন্সিলর বৈঠকে আরেকটি মন্তব্য লিপিবদ্ধ হয় এই চিঠিপত্র সম্বন্ধে পাঞ্জাব সরকারের চিঠির উল্লেখ করে, এবং সীমান্তের আদি জাতিদের সঙ্গে যুদ্ধাভিযানের প্রজোনীয়তা বিষয়ে; কারণ বাঙালি হিন্দুস্থানি ধর্মান্ধরা তখন তাদের ক্ষেপীয়ে তুলেছিল। একটা ফৌজদারি মামলা হয় চতুর্থ দেশীয় পদাতিক বাহিনীর মুনশী মুহম্মদ ওয়ালীর বিরুদ্ধে রাওয়ালপিন্ডীতে এবং বিচারে তিনি ১৮৫৩ সালের ১২ই মে দন্ডিত হন। তখন মওলবী আহমদউল্লাহ ও পাটনার বহু আদিবাসীদের নাম সাক্ষে উঠে যে, তার সীমান্তের ধর্মান্ধদের নিকট রসদ সরবরাহ করেন।

“বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, সরকার তখন কঠিন নীতি অবলম্বন করেননি এবং পাটনার ষড়যন্ত্র ভেঙ্গে ফেলেনি। তাহলে রাজদ্রোহের দমন হয়ে যেতো। আম্বালা অভিযানে কোনও সৈন্যক্ষয় হতোনা এবং সরকারী কর্মচারীরাও বহু পরিশ্রম ও অহেতুক ভর্তসনা থেকে বেঁচে যেত। কারণ ১৮৬২ সালের রাজদ্রোহী আহমদউল্লাহ হচ্ছেন ১৮৫৭ সালের সামান্য পুস্তক বিক্রেতা ‘ওহাবী ভদ্রলোক’।

এদিকে ইনায়েত আলী উত্তর- পশ্চিমে নিশ্চেষ্ট থাকেননি। পাঠান অধিবাসীদের সাহায্য লাভের জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন এবং সোয়াতের আখুন্দ ও সিত্তানায় সৈয়দ সাহেবের সহানুভূতি লাভেও সক্ষম হয়েছিলেন। এমন সময় অবস্থাগতিকে তাকে অসময়ে ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হতে হয়। সিত্তানার অদূরে সিন্ধুনদির দক্ষিণ তীরে আম্বের করদরাজ্য অবস্থিত। সমতল ভূমি ও সিত্তানা থেকে সেখানে সহজেই যাওয়া যাই এবং বিলায়েত আলীর জীবদ্দশায় নও- মুজাহিদদের কাফেলা আম্বের ভিতর দিয়ে সিত্তানায় যাতায়াত করতো। কিন্তু ইনায়েত আলী যখন আদিবাসীদের জেহাদের পক্ষে একত্রিত করেন, তখন আম্বের শাসক জাহাদাদ খান এই উদ্যমে যোগ দিতে অস্বীকার করলেন এবং ইংরেজদের সঙ্গে মিলিত হয়ে মুজাহিদদের তার এলাকার ভিতর দিয়ে পথ দিতে অস্বীকার করলেন। ১৮৫২ সালের প্রথম ভাগে জেহাদিদের একটা কাফেলা জোর করে আম্বের ভিতর দিয়ে অতিক্রম করতে চেষ্টা করলে তাদের লুট কড়া হয়। ছিন্নবেশে ও অনাহারে তারা সিত্তানায় তারা উপস্থিত হল। ইনায়েত আলী এতে অপমান বোধ করেন এবং সোয়াতের আখুন্দের ও সিত্তানায় সৈয়দদের সাহায্য দাবী করলেন। ওহাবীরা ছোট বড় যে কাজই করুক, ধর্মের নামে করে থাকে। মওলবীদের একটা মজলিস ডাকা হয়। জাহাদাদ খান কাফের বিবেচিত হন ও তাকে জেহাদ করে উৎখাত করা পুন্যের কাজ হিসেবে ফতওয়া জারী করা হল। আখুন্দ সাহেব সাহায্য নিয়ে অগ্রসর হওয়ার উৎসাহ দেওয়ায় ইনায়েত আলী পার্বত্য অঞ্চল থেকে নীচে আম্বের দিকে অগ্রসর হলেন এবং বিনা বাধায় আসুরা নামক গ্রামটি দখল করে নিলেন। তারপর তিনি আসুরা ও আম্বের মধ্যবর্তী নিম্ন গিরিমালা অতিক্রম করলেন। জাহাদাদের সৈন্যদের কিল্লাহর মধ্যে বিতাড়িত করলেন এবং উপত্যকাটি দখল করে অবরুদ্ধ লোকদের সব যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দিলেন। তারা আর প্রতিরোধ করা অনর্থক দেখে একখানা কুরআন নিশান হিসেবে উর্ধে করে সন্ধি প্রার্থনা করলো। কিছু দেরি করে জাহাদাদ খান ইনায়েত আলীর মুরিদ হতে ও তার অধীনে রাজ্য শাসন করতে রাজি হলেন এই শর্তে যে, আক্রমক- বাহিনী উপত্যকা থেকে সরে যাবে এবং সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত আসুরার অপেক্ষা করবে। কূটনীতিতে বাঙালি পাঠানের মতো ধুরন্দর ছিলেননা। জাহাদাদ খান কালক্ষেপণের দুরভিসন্ধিতে বশ্যতা স্বীকারের ভান করেছিলেন মাত্র। তিনি যুদ্ধ শুরু হওয়ার সংবাদ পাওয়া মাত্র একজন দূত পাঠিয়েছিলেন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে সাহায্য ভিক্ষা করে। এখন সাহায্য না আসা পর্যন্ত সন্ধির শর্তবিষয়ে টালবাহানায় সময় কাটাতে লাগলেন। তিনি দুদিন ধরে ওহাবীদের এটা সেটা কুচকাওয়াজে ব্যাস্ত রাখলেন, কিন্তু তৃতীয় দিন সকাল বেলায় দেখা গেলো যে, আসুরার উল্টা দিকে পূর্ব তীরে ব্রিটিশ বাহিনী শ্রেণীবদ্ধ ভাবে দাড়িয়ে আছে। তারা দ্রুত গতিতে নদি পার হল এবং আসুরা ও সিত্তানার মধ্যবর্তী গিরিপর্বতটি দখল করে ওহাবীদের কিল্লাহ থেকে বিছিন্ন করার চেষ্টা করলো। এদিকে জাহাদাদ মুখোশ খুলে ফেলে উত্তর দিকে নিম্নে অগ্রসর হয়ে আম্বের পথপার্সের পাহাড়ে ছাউনি ফেলে সেদিকে ওহাবীদের গতিবিধি একেবারে বন্ধ করে দিলেন। ধর্মান্ধরা সমূহ বিপদ দেখে সিত্তানার দিকে পলায়ন করলেন, আর তখন তাদের বাহিনী ও ব্রিটিশ বাহিনীর মধ্যে এক উত্তেজনাময় দৌড় শুরু হলে, কে আগে গিরিপর্বতটি দখল করবে। ওহাবোরাই সেখানে প্রথমে পৌছাতে সমর্থ হল এবং ইনায়েত আলীর অধীনে ওহাবীদের প্রধান বাহিনী পলায়ন করতে সক্ষম হল। কিন্তু দিনাজপুরের করম আলীর চালনায় পশ্চাদরক্ষী দল একেবারে ধ্বংস হয়ে গেলো।

ওহাবীদের এই পরাজয়ে ইনায়েত আলী সাবধান হয়ে গেলেন এবং পরবর্তী কয়েক বছর সীমান্তে আর গোলযোগ হয়নি। তিনি ভ্রাতার মতো বুদ্ধিমানের নীতিই অবলম্বন করলেন এবং অনুচরদের সংঘবদ্ধ করতে এবং কাফের ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঘৃণার জ্বলে উঠে দারুণ পরিশ্রম করতে লাগলেন। জেহাদিদের দৈনিক দুবেলা করে ড্রিল করান হতো এবং প্যারাডের মতো তাদের জেহাদের মহিমা কীর্তন করে গান করান হতো। আর শুক্রবার নামাজের পর তাদের শ্রবন করান হতো বেহেশতে তাদের জন্য কত সুখ মজুদ আছে। আরও বলা হতো ব্রিটিশ ভারত সরকারের নির্দিষ্ট সময় সমাগত হওয়া পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করতে বলল।

নীচে উদ্ধৃত সঙ্গীতটাই বোধ হয় ওহাবীদের সবচেয়ে প্রিয় ও অতিপুরাতন ছিল। এটাকে বলা হতো ‘রিসালা- ই- জিহাদ’ বা যুদ্ধ সঙ্গীতঃ

প্রথমে আল্লাহ্‌র মহিমা গায়, তিনি সব প্রশংসার উর্ধে,

আমি রসূলের প্রশংসা করি ও জেহাদের গান গায়।

জেহাদ ধর্মের যুদ্ধ, তাতে ক্ষমতার লালসা নাই,

হাদিস ও কুরআনে তার মহিমা ঘোষিত। আমি কিছু বলছি শুন,

পায়ে যার জেহাদের ধুলি আছে, দোজখে তার শাস্তি নাই,

যে এক মুহূর্তও আল্লাহ্‌ থেকে সরে যায়, বেহেশতে তার স্থান নাই।

রসূলের বাণী এই হাদিসটি শুন-

‘তরবারির ছায়ায় বেহেশত রয়েছে।

যে প্রসান্ত চিত্তে জেহাদে এক পয়সাও খরচ করে,

অতঃপর সে তার সাতশো গুন বদলা পাবে।

আর যে জেহাদে দান করে ও নিজেও শরীক হয়

আল্লাহ্‌ তাকে সাত হাজার গুন বদলা দিবেন।

আল্লাহ্‌র রাহে যে একজন মুজাহিদকে সজ্জিত করে,

সে নিশ্চয়ই শহীদের পুরষ্কার লাভ করে।

যে জেহাদে সাহায্য করেনা, কিংবা শরীক হয়না,

এই দুনিয়াতেই তার কঠিন শাস্তি অবধারিত।

জেহাদে যে নিহত হয়, সে মরণ তো মরণ নয়,

সে হাসতে হাসতে বেহেশতে চলে যাবে।

কেন তুমি আল্লাহ্‌র পথে জীবন বিলিয়ে দিচ্ছনা?

আল্লাহ্‌র হুকুম, শহীদের সব ছেলেই মাফ পেয়ে যাবে।

তাদের গর- আযাব মাফ হয়ে যায়, রোজ- কেয়ামত বা রোজ হাশরে তাদের ভয় নেই।

আল্লাহ্‌ ভালোবাসেন শুধু তাদের, যারা

জেহাদের ময়দানে অচঞ্চল হয়ে দাড়িয়ে থাকে।

হে মোমেনগণ! জেহাদের মহিমা শুনলে, যাও যুদ্ধে যাও,

তোমার পরিবার, তোমার সম্পত্তি এসব কিছু ভেবো না।

ধন- জন- পরিবার- ঘর, সব কিছুরই বাসনা ত্যাগ করো,

যাও যুদ্ধের ময়দানে, আল্লাহ্‌র রাহে চল।

মরণের পরে ধন- পরিবার নিয়ে কবরে যাবে না,

সাবধান, দোযখের শাস্তি থেকে রেহাই নাই তোমার।

যদি তোমার বরাতে থাকে, নিশ্চয়ই ঘরে ফিরবে,

আর যদি শহীদ হও, তাহলে বেহেশতে চলে যাবে।

আজ দুনিয়াতে ইসলামে বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়েছে,

আর কাফেরদের ধর্ম সে স্থলে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আগের দ্বীনের মুসলমানরা যদি জেহাদ না চালাতেন,

তাহলে হিন্দুস্থানের বাসিন্দা কীভাবে মুসলমান হতো?

ইসলামের শক্তি সবকালেই ছিল তরবারির মুখে;

তারা যদি নিষ্ক্রিয় থাকতেন, ইসলাম অজ্ঞাত রয়ে যেত।

আর কতকাল ঘরে নিষ্ক্রিয় বাসে থাকবে,

এতে কোন লাভ নায়, শেষে তোমায় অনুতাপ করতে হবে।

অতএব ভীরু হয়ো না, ইমামের সঙ্গে যোগ দাও।

আর কাফেরদের দলনে তৎপর হও।

আল্লাহ্‌র মহিমা গাও, তিনি এক মহান ব্যাক্তি পাঠিয়েছেন

আমাদের মধ্যে তেরশ হিজরির মধ্যে।

মুসলমানরা ইমামবিহিন হয়ে অশেষ দুর্দশা পাচ্ছিলো,

শেষে রসূলের বংশেই এক ইমাম উদয় হলেন।

বন্ধুরা শোনো, আমি নিগম কথা বলছি,

তলোয়ার চালানোর সময় এসে গেছে।

মওলবী সা’ ব! গ্রন্থ ছাড় আর তলোয়ার ধর,

আর যাও ছুটে যাও জেহাদের ময়দানে।

সময় এসেছে এখন প্রাণ কুরবানী দেয়ার;

তর্ক ছাড়, সব ছাড়, শুধু তলোয়ার মুঠি ধর।

তুমি তো নেতা, তুমি সৎ আদর্শ দেখাও

তুমি আগুয়ান হলে বহু পরিজন তোমার সঙ্গী হবে।

তোমার ‘চিলা’ ছাড় এখন জেহাদের ডাক পড়েছে!

হে তরুন! বাঘের মতো সাহসী ও রুস্তমের মতো বীর তুমি,

এখন আগুয়ান না হও যদি, বীরত্বে কী লাভ?

তুমি নিহত করো বা নিহত হও, সমান লাভ;

একজন কাফের হত্যা করলে তুমি জয়ী হলে;

আর যদি তুমি নিহত হও, শাহাদাত লাভ করলে।

একদিন তুমি সব আনন্দ ছেড়ে যাবে,

মরণ সেদিন তোমায় এখান থেকে মুছে ফেলবে।

শোন বন্ধু শোন! মরণ যখন হবেই হবে,

তখন তুমি কেন নিজেকে আল্লাহ্‌র রাহে বিলিয়ে দিচ্ছনা?

হাজার মানুষ যুদ্ধে যায়, আর অক্ষত হয়ে ফিরে আসে,

হাজারো মানুষ তো ঘরে বসেই মৃত্যুবরণ করে।

হে জ্ঞানী ভাই! মৃত্যুর ভয় অবধারিত, তবে কিসের ভয়?

মরণ না এলে মানুষ মরেনা, অবধারিত ক্ষনের আগেও মরেনা।

মরণ যখন আসে তখন ঘরে থাকলেও রেহাই নাই।

তুমি পথের শ্রমে বিমুখ? এসব ভয় ছাড়;

তুমি পুরুষ, তুমি নিজের আরাম আয়েশ ভুলে যাও।

পুরুষ সব কিছুর অভ্যাস সহজে করতে পারে,

সে আরাম- আয়েশের অভ্যাসও ছেড়ে দিতে পারে।

চেয়ে দেখ হাজারো মুজাহিদ ঘর ছেড়ে বাইরে এসেছে।

আর এতটুকু দ্বিধা না করে যুদ্ধে প্রাণ দিতে তৈরি হয়েছে।

আশ্চর্য যে তোমরা নিজেদের মুসলমান বলছ।

তবু আল্লাহ্‌র ডাক পড়লে প্রতারণা করছ।

তোমরা দুনিয়াই মশগুল হয়ে পড়েছ,

স্ত্রী- পুত্র- কন্যার চিন্তায় নিজের স্রষ্টাকে ভুলে গেছ।

কতদিন স্ত্রী- পুত্র নিয়ে ঘরে থাকতে পারবে?

আজ যদি আল্লাহ্‌র রাহে প্রাণ কুরবানি দাও

কাল তুমি বেহেশতে অনন্ত সুখ লাভ করবে।

ঘরে বসে মৃত্যু- যন্ত্রণা ভোগ করা আর

আল্লাহ্‌র রাহে জীবন দেয়া, কোনটা ভাল?

আল্লাহ্‌র রাহে যদি জীবন বিলিয়ে না দাও,

তোমার অনুতাপ হবে, রসূলকে কীভাবে মুখ দেখাবে?

এক কাজ করো, মন প্রাণ দিয়ে ইমামের আজ্ঞানুবর্তী হও,

তা না হলে তোমার তরবারি ধরাই বৃথা হবে।

যদি কোনও স্বেচ্ছাচারী লোক জেহাদে যায়,

সে যত নিহত করবে, সবার জন্য দায়ী হবে, তার শ্রম বৃথা যাবে।

যারা আল্লাহ্‌কে জানে আর রসূলকে জানে,

তারা বিনা দ্বিধায় ইমামের আজ্ঞানুবর্তী হবে।

এসব উপদেশ মুসলমানদের পক্ষে যথেষ্ট,

এখন আল্লাহ্‌র নিকট মুনাজাত করে শেষ করি।

হে আসমান- জমীনের স্রষ্টা! হে আমাদের প্রভু!

মুসলমানকে জেহাদ করতে শক্তি দান করো!

তাদের বাহুকে শক্তিশালী করো,

আর তাদের জয়ী করে তোমার ওয়াদা পূরণ করো!

ভারতের প্রান্তে প্রান্তে ইসলামের মহিমা গাও,

আর সব ধ্বনি ছাপিয়ে শুধু শোনাও ‘আল্লাহ্‌’ আল্লাহ্‌!

পঞ্চপঞ্চাশত্তম দেশীয় পদাতিক বাহিনী হোটিমর্দানে বিদ্রোহ করলে বিদ্রোহীরা পার্বত্য অঞ্চলে পলায়ন করে ও সোয়াতের উপত্তকায় আশ্রয় গ্রহণ করে। তাদের বৃহদংশ আখুন্দের নিকট উপস্থিত হলে তাদের তিনি পর্বতমালা অতিক্রম করে কাশ্মীরে উপস্থিত হতে সাহায্য করেন, যাতে তারা হিন্দুস্থানে নিজের দলের সাথে যোগ দিতে পারে। তাদের কেউ কেউ ইনায়েত আলীর সঙ্গে যোগ দিল মুঙ্গল- আন্নায়। এটি সিত্তানা থেকে একদিনের পথের দূরবর্তী মহাবনের মাথার উপর একটা সুরক্ষিত কিল্লাহ। তিনিও তাদের সাদরে গ্রহণ করলেন, কিন্তু দাবী করলেন যে, তাদের ওহাবী মতাবলম্বের হতে হবে। অতঃপর তিনি সোয়াত থেকে সৈয়দদের সর্দার মুবারক শাহ কে তলব করলেন এবং নিজের সমগ্র বাহিনী নিয়ে নিম্নে অবতরণ করে সীমান্তের একটা গ্রাম চিনঘাউতে ছাউনি ফেললেন। তারপর দ্রুত প্রস্তুতি চলতে লাগল ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্গত ইউসুফজাই অঞ্চল আক্রমন করার।

ইউসুফজাই অঞ্চলের পূর্বদিকে এবং চিনঘাইএর অনতিদূরে, নওয়াখিল্লা গ্রাম অবস্থিত। তার বাশিন্দাদের সুনাম নিকটবর্তি অঞ্চলে মোটেই ঈর্ষাজনক ছিলনা। অশিক্ষিত, ধর্মান্ধ ও সীমান্তের বাশিন্দাদের স্বভাবজাত চঞ্চলমতির জন্য তারা শাসক পরিবর্তন করতে মোটেই অনিচ্ছুক ছিলনা। আর ইনায়েত আলীও তার প্রতি তাদের সদিচ্ছার বিষয় সম্যক অবগত ছিলেন। এজন্য তিনি দুশো মুজাহিদ এবং মুবারক শাহের ১২০ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে আফ্রিদি মির্জা মুহম্মদ রিসালদারের নেতৃত্বে পাঠিয়ে দিলেন গ্রামখানি দখল করে নিতে। আফ্রিদি মির্জা নওয়াখিল্লায় উপস্থিত হয়ে তার ও নিকটবর্তী গ্রাম শেখজানার মধ্যস্থলে ছাউনি ফেললেন। কিন্তু জেহাদিদের সাফল্য খুব ক্ষণস্থায়ী হয়। কারণ হোটিমর্দান থেকে একটি ব্রিটিশ বাহিনী তাদের আক্রমন করে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দেই এবং তাদের নায়ককে বন্দী করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়। তার একমাস পর ইনায়েত আলী সমগ্র বাহিনী নিয়ে ব্রিটিশ এলাকার সিমান্তস্থিত গ্রাম নারিঞ্জি দখল করে নেন। এই আক্রমণের সংবাদ শীঘ্রই পেশাওরে পৌঁছালে তথাকার ডেপুটি কমিশনার কিছু সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হন জেহাদিদের সীমান্তের বাহিরে বিতাড়িত করতে। তখন একটা যুদ্ধ বাধে। কিন্তু ওহাবীরা বনায়ের ও সোয়াতের আদিজাতিদের বলিষ্ঠ সাহায্যে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠে। দ্বিতীয় আক্রমণটা সফল হয় এবং ওহাবীরা বিপুল ক্ষতি স্বীকার করে পলায়ন করে এবং চিনঘাই ও বাগে আশ্রয় নেয়। পরপর দুবার বিতাড়িত হয়ে ইনায়েত আলী বুঝলেন যে, একা তার দ্বারা বিজয়ের কোনও সম্ভাবনাই নায়। তখন তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন সীমান্তের আদিজাতিদের ইংরেজদের বিরুদ্ধে একজোট করতে। তিনি আপোষের নীতি অবলম্বন করলেন এবং পার্বত্য আদিজাতির সর্দারগণকে প্রচুর ইনাম পাঠালেন। আর একজন অবিবেচক কিন্তু সাহসী কমিশনার নাওইয়াখিল্লায় ছাউনি ফেললে তাকে সহসা পরাজিত করে বিজয়টাকে ইনায়েত আলী কাফেরদের উপর অবধারিত বিজয় হিসেবে অহেতুক সর্দারদের চোখে বাড়িয়ে তুলেন এবং যুদ্ধে লুণ্ঠিত সমস্ত দ্রব্য তাদের মধ্যে বিতরণ করে দেন। সংক্ষেপে তিনি পাঠানদের ধর্মান্ধতা ও লোলুপতা বৃদ্ধি করতে সব পন্থা অবলম্বন করেন ও তাদের জেহাদ করতে প্ররোচিত করেন। কিন্তু পাটনার কমিশনার সাবধানতা ও প্রচেষ্টায় ইনায়েত আলীর সব অভিসন্ধিই পন্ড হয়ে যায় এবং তার ফলে সম্ভবত একটা সীমান্ত- যুদ্ধ এড়ানো গেলো। সিন্ধু নদের পারাপারের সব ক্ষেত্রেই কড়া পাহারা রক্ষিত হল এবং তার দরুন নিম্নঅঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা কড়া শক্ত হয়ে দাঁড়ালো। পাটনায় তার সব আত্মীয় স্বজনকে বন্দী করা হয় এবং তার ফলে বার বার সাহায্য প্রত্যাশা করেও কোন সাহায্য পাওয়া যায়নি। তার অর্থও ফুরিয়ে গেলো এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী করতে তিনি ব্যাক্তিগত সম্পত্তিও নামমাত্র মূল্যে দিতে বাধ্য হলেন। চিনঘায়ে আর অবস্থান করা সমীচীন নয় দেখে তিনি রুগ্ন দেহে ও হতোদ্যম হয়ে অভুক্ত অনুচরদের নিয়ে সিত্তানায় বন্ধুভাবাপন্ন সৈয়দদের সঙ্গে যোগ দিতে অগ্রসর হলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তিনি সেখানে পৌছাতে পারেননি। পথেই পর্বতমালার মধ্যে তিনি মৃত্যু আলিঙ্গন করেন। আর ১২ দিন পর ব্রিটিশ বাহিনী সিত্তানা ও মুংগলয়ান্না পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়।

পরিশিষ্ট

ওহাবী আন্দলনে’র রূপরেখা

বিশ্বনবীর ওফাতের পর মাত্র আশী বছরের মধ্যে [৬৩২- ৭১২ খৃঃ] পশ্চিমে হিসপানী শেষ, পূর্বে সিন্ধ হিন্দুদেশ’ পর্যন্ত সমকালীন জ্ঞাত পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশী অঞ্চলে আরব সম্রাজ্জের বিস্তৃতি বিশ্ব ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়। চীনদেশের সীমান্ত থেকে অতলান্ত মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত সমগ্র ভূ- ভাগ মরুচর যাযাবর আরবজাতির পদানত, পারশে্যর খসরু ও রোমান সীজারের জন- প্রবাদ মুখর সম্রাজ্জ্য শক্তি পর্যুদস্ত এবং বাগদাদে এমন একটি শক্তিধর ও উচ্চধর সংস্কৃতি ধন্য শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যার তুলনা তখনও পৃথিবীতে দেখা যায়নি।

এসব বিজয়- অভিযান ও সাম্রাজ্জ বিস্তৃতির অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ বেশুমার সম্পদসম্ভার ও অগণিত বিদেশী বিলাস সামগ্রী আরবে আমদানী হতে থাকে। কৃপণসভাবার প্রকৃতির মরুদুলালরা অতি শীঘ্রই তাদের সহজ সরল রুক্ষ স্বভাব ত্যাগ করে বিলাস- ব্যসনের শ্রোতে হাবুডুবু খেতে লাগল। ইরানী তন্বী রূপসী বাদী ও সিরাজীর আদর আরবের ঘরে ঘরে দেখা যায়। এসবের বিষময় ফলে মুসলমানের জাতীয় জীবনে যে ব্যাভিচারিতার আমদানি হয়, তার প্রতিচ্ছবি কুটির থেকে শুরু করে দামেস্কের ও বাগদাদের খলীফার রাজ প্রাসাদে অতি বীভৎস রূপে দেখা দেয়। শতাব্দী ধরে বিভিন্ন মুসলিম রাজপরিবারের এসব বিলাস- ব্যসন চলতে থাকায় মুসলমান সমাজের মধ্যে এগুলি যেন গা সওয়া হয়ে যায়। এজন্য দেখা যায়, আঠারো শতকে তুর্কীর সুলতানরা হজ্জের সময় মক্কা ও মদিনায় যেমন মুক্তহস্তে দান করতেন, তেমনি প্রকাশ্য রাজপথে সুরা ও আফিমের সঙ্গে বারবিলাসিনীদেরও শোভাযাত্রা করতেন- কারও শাসনবানীতে এসব সংযত হতো না।

এসব ছাড়াও আরও বহু শরীয়ত বিরুদ্ধ রীতিনীতি মুসলমানের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে ঢুকে পরে। নানা দেশ বিজয়ের ফলে নানা জাতি ও নানান ধর্মের সংস্পর্শে মুসলমানরা আসতে বাধ্য হয়। পারিপার্শ্বিক পরিবেশে।

প্রভাব, আন্তর্জাতিক আদান- প্রদানের কারণ এবং বিভিন্ন জাতির নও- মুসলিমদের পূর্ব- পুরুষের আচার নীতি ইসলাম গ্রহনের পরও অনুসরণ করার কারনে মুসলমানের জীবনে এসব বেদাত বা শরীয়ত বিরুদ্ধ আচার নীতি সংক্রমিত হয়েছিল। আর কালক্রমে এসব নয়া রিতি নীতির কয়েকটি মুসলমান সমাজ ও ধর্মীয় জীবনে একটা ধর্ম সম্মত অনুমোদনও লাভ করেছিল। এরূপ সচল ও সমাজ আচরণীয় হওয়া সম্ভব হয়েছিল ইজমার প্রয়োগে। ইজমার কাজ ছিল, যা প্রথমে বেদাত হিসেবে অধর্মীও হিসেবে বিবেচিত হতো, তাকে সচল ও সমাজ আচরণীয় করে শরীয়ত সম্মত করা। অতএব ইজমার সহজ অর্থ হচ্ছে যে, যা কিছু মুসলমানদের মধ্যে শাস্ত্রকারদের অনুমোদনে বা বিনা আপত্তিতে গৃহীত হয়েছে, সেগুলি কুরআন ও হাদিসের পরেই ইসলামী বিধি নিষেধ হিসেবে গৃহীত হয়। ইজমার দরকার হয়েছিল, অমুসলমানদের সাহচার্যে যেসব নয়া রীতিনীতি মুসলমানদের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছিল, খাঁটি শরীয়ত পন্থী না হলেও সেগুলিকে মুসলমানদের মধ্যে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দরুন শরীয়তি অনুমদন দেওয়া। উদাহরণ হিসেবে পীরপুজা ও পীর মতবাদের আনুষঙ্গিক সকল রকম রেওয়াজের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এখানে একথাও অবশ্যস্বীকার্য, ইজমার বেনামীতে কত বেদাত অনাচার ইসলামে প্রবেশাধিকার পেয়েছে হিসেব করাও একটা শক্ত ব্যাপার।

এসবের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম সাবধান বাণী ঝংকৃত হয়েছিল তের- চৌদ্দ শতকে ইবনে তাইমিয়ার [৬৬১ হিজরি/ ১২৬৩ খ্রিঃ- ৭২৮ হিজরি/ ১৩২৮খ্রি] কণ্ঠে। ইসালামি অনুশাসনে ইজমার প্রয়োগ নিষেধ করে তিনি প্রচার করেন যে, কুরআনের বিধি ব্যাবস্থা আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করতে হবে এবং তার বাধ্য করতে হলে কুরআনেরই আশ্রয় নিতে হবে। হামবলী মজহাবের একনিষ্ঠ অনুসারী ইবনে তাইমিয়া যাবতীয় বেদাতের বিরুদ্ধে ফতওয়া দান করেন এবিং পীরবাদ ও তার আনুষঙ্গিক সব অনুষ্ঠানকে নিছক পৌত্তলিকতা বলে ঘোষণা দেন। ইসলামে ‘পিউরিটানিক’ বা অতিনৈতিক মতবাদের গোড়াপত্তন হয় ইবনে তাইমিয়ার শিক্ষা থেকেই।

অতঃপর আঠারো শতকে আরেক ধর্মসংস্কারকের আবির্ভাব হয়, তার নাম মুহম্মদ ইবনে আবদুল ওহাব। উল্লেখ্য যে, এই চার শতাব্দীর ব্যাবধানে ইসলামে আয়ত্তে বহু বেদাতের এবং নানা অনাচারের প্রবেশালাভ হয়। হাজীদের মধ্যেও নানা গর্হিত আচরন এবং পবিত্র মক্কা ও মদিনা শহরে বহু নাটকীয় ধরনের পূজা পদ্ধতির প্রাদুর্ভাব ঘটে। তুর্কী ও ইরানীর বদৌলতে ইসলামে বহু সংস্কার ও আবর্জনা জমে উঠে। তারা বাদীড় বেনামিতে অসংখ্য রমণীয় সাহচর্যেই পরিতিপ্ত হতোনা, প্রকাশ্যে বারবিলাসিনী ও নৃত্যবাদ্যকুশলা রমণী নিয়ে মাতামাতি করতো, সুরা ও আফিমের প্রভাবে রাজপথেই মাতলামি করতো এবং আরও বহু নীতি ও রুচি বিগর্হিত পাপ কর্মে লিপ্ত থাকতো। এসব অনাচার, ব্যাভিচারের মূলোচ্ছেদ করাই ছিল আবদুল ওহহাবের জীবনব্যাপী সাধনা। এবং তার এই ভূমিকাকেই তার দুশমনরা, বিশেষত ইউরোপীয়রা ওহাবী আন্দোলন নামে চিহ্নিত করেছে। তবে তার আন্দোলনের শেষ পরিণতি অনুধাবন করলে দেখা যায় যে, মূলতঃ ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন হলেও বিশ শতকে এর দ্বারাই আরবী ন্যাশনালিযম পুর্ণভাবে দানা বেঁধে উঠেছিল। ইসলামের প্রথম যুগের মতো আবদুল ওহহাবও চেয়েছিলেন, সবরকম পৌত্তলিক অনাচারের মূলোৎপাটন করে খাটি তাওহীদ বানীর মহমা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে। এবং আরবের সবরকম রাষ্ট্রনৈতিক গোলযোগের অবসান ঘটিয়ে শুধু ইসলামী সাম্য ও মৈত্রী নীতির সূত্রে সমগ্র আরবভূমিকে এক রাষ্ট্রে বেঁধে দিতে।

আবদুল ওহাবের এই দ্বিবিধ ভূমিকার আলোচনা পৃথকভাবে করাই প্রশস্ত।

প্রথমে মুহম্মদ ইবনে আবদুল ওহহাবের চরিতালোচনা করা যাক। সম্ভবত ১১১৫ হিজরিতে [১৭০৩ খ্রিঃ] আরবের উয়াইনা অঞ্চলে তামিম গোত্রের একটি শাথা বানু- সিনান বংশে তার জন্ম হয়। মদিনায় সুলায়মান অল কুর্দি ও মুহম্মদ হায়াত অল সিন্ধির নিকট তিনি শিক্ষালাভ করেন। তার জীবনের অধিককাল দেশভ্রমণে কেটেছে। প্রথমে তিনি চার বছর বসরার কাযী হুসেনের বাড়ীতে গৃহশিক্ষক ছিলেন। পরে পাঁচ বছর তিনি বাগদাদে বসবাস করেন এবং সেখানকার জনৈকা ধনবতী বিধবাকে শাদী করেন। এ স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি পুনরায় পথে বের হন এবং এক বছর কুর্দিস্থানে ও দু বছর হামাদানে অবস্থান করার পর ইসপাহানে উপস্থিত হন। তখন নাদির শাহের শাসন শুরু হয়েছে [ ১১৪৮ হিঃ, ১৭৩৬ খ্রিঃ]। এখানে তিনি চার বছর অবস্থান করেন এবং এরিস্টটলের দর্শন ও সুফীতত্তে উচ্চজ্ঞান লাভ করেন। এক বছর তিনি সুফী- মতবাদে বহু ছাত্রকে শিক্ষা দান করেন। পরে তিনি কুম শহরে গমন করেন এবং হামমবলী মজহাবের একজন গোঁড়া সমর্থক হন। শেষে তিনি জন্মভূমিতে অত্যাগমন করেন এবং প্রকাশ্যে নিজের মতবাদ প্রচার করতে থাকেন। ‘কিতাব- অল- তাওহীদে’ তার বিশেষ মতবাদগুলি বিধৃত আছে। তার অনুগামীর দল বর্ধিত হলেও তার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন আরম্ভ হয়। এমনকি তার সহোদর ভ্রাতা সুলায়মান তাকে আক্রমন করে একটি পুস্তিকা প্রচার করেন। তাকে কেন্দ্র করে বিবাদ ও রক্তপাত হওয়ায় স্থানীয় শাসক তাকে বহিষ্কার করেন। তখন তিনি সপরিবারে দারিয়াপল্লীতে উপস্থিত হন। দারিয়ার আমির মুহম্মদ ইবনে সউদ তাকে আদরের সঙ্গে গ্রহণ করেন ও তার নিকট দীক্ষা নিয়ে তার মতবাদ প্রচারে উৎসাহী হয়ে উঠেন।

শীঘ্রই আবদুল ওহহাবের প্রচারনা রাজনৈতিক রূপ গ্রহণ করে এবং রাষ্ট্রীয় অগ্রগতি ইসলামের প্রথম যুগের রাজ্য- বিস্তারের মতোই বিস্ময়কর হয়ে উঠে। ইবনে সউদের নেতৃত্বে একটা শক্তিশালী আরবলীগ গঠিত হয়, এবং দারিয়াকে কেন্দ্র করে সউদী অধিকার বর্ধিত হতে থাকে। ‘কিতাব- অল- তাওহীদের’ শিক্ষাদানের সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্রের শিক্ষাদানও চলতে থাকে। ফলে রিয়াদের শেখের সঙ্গে ১৭৪৭ সালে সংঘর্ষ উপস্থিত হয়। এ সংঘর্ষ চলে প্রায় আটাশ বছর ধরে এবং ইবন সউদ ও তার মৃত্যুর পর [ ১৭৬৫ খ্রিঃ] তার সুযোগ্য পুত্র আবদুল আযীয ইঞ্চি ইঞ্চি করে সমগ্র রিয়াদ অধিকার করেন। ১৭৬৬ সালে আবদুল ওহহাব মক্কা শরীফের নিকট একজন প্রতিনিধি প্রেরন করে নিজের মতবাদ গ্রহণ করতে আহ্বান করেন। মক্কার শরীফ আবদুল ওহহাবের মতবাদ ইমাম হামবলের মজহাবের মতানুসারী বিবেচনা করে সেসব শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রচারের নির্দেশ দেন। কিন্তু ১৭৩৩ সালে রিয়াদের শাসক দাহহাম আবদুল ওহহাবের তীব্র প্রতিবাদ করে, কিন্তু আবদুল আযীযের নিকট পরাজিত হয়ে পলায়ন করে। দলে দলে বেদুইনরা আবদুল ওহহাবের পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে যুদ্ধের পর যুদ্ধে তার শিরেই বিজয়মাল্য শোভিত হয়। উত্তরে কাসিম থেকে দক্ষিণে খরজ পর্যন্ত সমগ্র নেজদ ভূমিতে আবদুল আজীজের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করে আবদুল ওহহাব ১৭৮৭ খৃষ্টাব্দে জান্নাতবাসী হন।

আবদুল আজীজ ও তার পুত্র সউদ অমিত বিক্রমে অভিযান চালাতে থাকেন। ১৭৯১ সালে মক্কায় হামলা চালানো হয়, ইরাকের নানাস্থানে বার বার অভিযান চলতে থাকে। তুর্কী সুলতান নতুন শক্তির অভ্যুদয়ে সংকিত হয়ে বাগদাদের পাশাকে নির্দেশ দেন, আর প্রশ্রয় না দিয়ে নবজাগ্রত সক্তিকে ধ্বংস করে দিতে। কিন্তু ১৭৯৭ সালে বাগদাদের পাশা উদের হাতে বিশেষভাবে লাঞ্চিত হন এবং এশিয়াস্থ সমগ্র তুর্কী অধিকার সউদের হাতে চলে যায়। ১৮০৩ সালে গালিব মক্কা থেকে পলায়ন করেন এবং সউদ সদলবলে তথায় প্রবেশ করেন। সাময়িকভাবে সউদের বাহিনী মক্কা থেকে বহিষ্কৃত হয়; কিন্তু তিনি নতুন বিক্রমে পুনরায় হেজাজ আক্রমেন এবং ১৮০৪ সালে মদিনা, ১৮০৬ সালে মক্কা ও পরে জেদ্দা সম্পূর্ণভাবে দখল করেন। পরবর্তী কয়েক বছরে সমগ্র জাজিরাতুল আরব তার পদানত হল। ১৮১১ সালে ওহাবী সম্রাজ্জ উত্তরে আলেপ্প থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত এবং পারশ্য উপসাগর অ ইরাক সীমান্তের পরবর্তী পূর্বে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

সউদের বেদুইন বাহিনীর বিরুদ্ধে এই সময় সমগ্র ইসলাম জগতে তীব্র আন্দোলন চলতে থাকে এবং এ আন্দোলনের প্রায় সমস্ত টুকু তুর্কীরা অ তাদের ইউরোপীয়র বন্ধুরা চালতে থাকে। তুর্কী সম্রাজ্জের অন্ধকারময় ভবিষ্যৎ লক্ষ্য করেই এই বিরুদ্ধ আন্দোলন এবং আলোড়ন, ক্ষোভ অ আতংক সৃষ্টি করা হয়েছিল। প্রচার করা হয়েছিল যে, ইসলামের কেন্দ্রস্থল পুন্যময় মক্কা অ মদিনা শহর দুটির অধিবাসী আবদুল ওহহাবের মতবাদ গ্রহন করতে অস্বীকার করলে নির্মম ভাবে নিহত হয়েছিল, সমস্ত মাজার ও মকবেরা উৎখাত করা হয়েছিল; এমনকি হযরত মুহম্মদের রওজা মোবারকও রেহাই পায়নি। ১৮০২ সালে কারবালা দখল করে সউদি বেদুইনরা সমস্ত মাজার ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং অধিবাসীদের হত্যা করেছিল। মসজিদে মসজিদে যেসব কারকার্য ছিল ও বহুমূল্যবান জিনিস শোভাবর্ধন করত, সেসবই বিলুপ্ত ও লুণ্ঠিত হয়েছিল। দীর্ঘ এগারো শতাব্দী ধরে নানা দেশ থেকে মুসলিম সুলতান, বাদশাহ ও ভক্তবৃন্দ স্বদেশের জন্য যেসব বহুমূল্য ও দুষ্প্রাপ্য উপঢৌকন ভক্তির নিদর্শন হিসেবে পাঠিয়েছিলেন, সে সমস্তই মরুবাসী বেদুইনরা লুণ্ঠিত ও হস্তগত করেছিল।

আবদুল ওহহাবের অনুসারীদের এসব কাজ দারুণ মহাপাপ হিসেবে গণ্য হতে থাকে সারা মুসলিম জগতে; তাদের বিরুদ্ধে রোষ ও ক্ষোভ পূঞ্জীভূত হয়ে তারা মুসলিম জাহানের আতংক হয়ে উঠে। তুর্কীর সুলতান কাবাশরীফ ও মক্কা মদিনার রক্ষক হিসেবে ‘ওহাবীদলনে’ অগ্রসর হন- সারা মুসলিম জাহান তার স্বপক্ষে দন্ডায়মান হয়। মিসরের পাশা মুহম্মদ আলির উপর ‘ওহাবী’ ধ্বংসের ভার অর্পিত হয়। তিনি ইউরোপীয় প্রণালীতে সুশিক্ষিত সৈন্য পুত্র তুসুনকে প্রেরণ করেন হেজাজ অধিকার করতে। ১৮১২ সালে মদিনা ও ১৮১৩ সালে মক্কা মিসর বাহিনী দখল করে। মুহম্মদ আলি স্বয়ং ১৮১৩ সালে মিসরবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহন করেন। ১৮১৪ সালের পহেলা মে সউদ ইন্তেকাল করেন। তার পুত্র আবদুল্লাহ তত সাহসী বীর ছিলেন না। তিনি তুসুনের সঙ্গে সন্ধি করেন এই শর্তে যে, তিনি অটোমান সুলতানের বশ্যতা স্বীকার করবেন ও মিসরবাহিনী নেজদ ত্যাগ করে যাবে। কিন্তু মুহম্মদ আলি এ সন্ধি ভঙ্গ করে ১৮১৬ সালে পুনরায় নেজাদ আক্রমণ করতে প্রেরণ করেছিলেন ইবরাহিম পাশাকে। ইবরাহিম তীব্র যুদ্ধের পর ১৮১৮ সালের মে মাসে উপস্থিত হন দারিয়ায় এবং সেপ্টেম্বর মাসে রাজধানীটি ভূমিসাৎ করেন। আবদুলাহ বন্দী হয়ে কনস্টান্টিনোপলে প্রেরিত হন, সেখানে সাধারন অপরাধীর ন্যায় তার শিরচ্ছেদ করা হয়। আরবের মরীচিকার মতোই সহসা চক্ষু ঝলসিয়ে দিয়ে ‘ওহাবীদের’ বিশাল সম্রাজ্জ ক্ষাত্র শক্তি কোথায় যে মিলিয়ে গেল- তার কোনও অস্তিত্বই রইল না।

কিন্তু আরব জাতীয়তা- জ্ঞানের যে দীপশিখা আবদুল ওহহাব ও ইবনে সউদ প্রজ্বলিত করেছিলেন, তা ছিল অনির্বান এবং পরবর্তী এক শতাব্দী ধরে সঞ্জীবিত করে রেখেছিল সমগ্র আরব উপদ্বীপটিকে তুর্কী সাম্রাজ্জিক শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে। শেষে বিশ শতকের প্রথম পাদে ১৯০৪ সালে আবদুল আযীয ইবনে আব্দুর রহমান সম্পূর্ণভাবে নেজাদের তাবৎ অংশে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেন, যা তার পিতামহ একদা নিরংকুশ ভাবে অধিকার করেছিলেন। পরবর্তী দুই দশক ব্যাপী ক্রমাগত যুদ্ধ- বিগ্রহে তিনি ও তার পুত্র ইবনে সউদ সমগ্র হেজাজ দখল করেন- ১৯২৪ সালের অক্টোবর মাসে মক্কা, ১৯২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মদিনা ও জেদ্দা অধিকৃত হয়। এভাবে প্রায় সমগ্র জাজিরাতুল আরব [ কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমিরী অধিকার ব্যাতীত] ‘সউদী আরব’ নামাংকিত আরবী জাতীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এখানে আরও উল্লেখ্য যে, আবদুল ওহহাবের আরব জাতীয়তা জ্ঞান মধ্যপ্রাচ্যের আরবী ভাষাভাষী দেশগুলিকে এভাবে সন্দীপিত করে তুলেছিল যে, এক এক করে যুক্তমিসর গনরাস্ট্র, জর্দান, সিরিয়া, ইরাক প্রভৃতি স্বাধীন সার্বভউম রাষ্ট্রগুলি পৃথিবীর মানচিত্রে গৌরবময় স্থান অধিকার করে নিয়াছে।

আবদুল ওহহাবের ধর্মীয় শিক্ষা ও মতবাদের আলোচনায় প্রথমেই বলে রাখা ভাল, আরবদেশে ‘ওহাবী’ নামাংকিত কোনও মজহাব বা তরিকার অস্তিত্ব নেই। এ সংজ্ঞাটির প্রচলন আরব দেশের বাইরে এবং মতানুসারীদের দুশমন, বিশেষত তুর্কী ও ইউরোপীয়দের দ্বারা ‘ওহাবী’ কথাটির সৃষ্টি এবং তাদের মধ্যেই প্রচলিত। কোনও কোনও ইউরোপীয় লেখক, যেমন নীবর আবদুল ওহাবকে পয়গম্বর বলেছেন। এসব উদ্ভট চিন্তারও কোনও যুক্তি নেই। প্রকৃতপক্ষে তিনি কোনও মজহাব সৃষ্টি করেন নি, চার ইমামের অন্যতম ইমাম হামমবলের মতানুসারী ছিলেন তিনি, এবং তার প্রযত্ন ছিল বিশ্বনবীর ও খুলাফায়ে রাসেদীনের আমলে ইসলামের যে রূপ ছিল, সেই আদিম সহজ সরল ইসলামের প্রত্যাবর্তন করা। তার আরও শিক্ষা ছিল যে, ধর্ম কোনও শ্রেণীবিশেষের একাধিকার নয়, কোনও যুগবিশেষের মধ্যেই সীমিত নয়- প্রত্যেক ‘আলিম’ বা শিক্ষিত ব্যাক্তির অধিকার আছে কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা দেওয়ার। তার শিক্ষা ও মতবাদ প্রধানত ইবনে তাইমিয়া ও তার শিষ্যদের বিভিন্ন পুঁথিতে বিধৃত মতবাদের দ্বারা প্রভাবিত, যদিও আবদুল ওহহাব অনেক বিষয়ে তাদের সঙ্গে একমত নন।

বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদের শিক্ষানুসারী আবদুল ওহহাব মরণের পর প্রত্যেক জীবের পুরষ্কার না হয় শাস্তিলাভের দিকে বিশেষ জোর দেন এবং আল্লাহর বিচার দিনে তওবার উপর অকুন্ঠ নির্ভর করতে বলেন। তিনি নামায ও রোজার দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখতেন এবং এ দুটির অমান্যকারীকে কখনও ক্ষমা করতেন না। যাবতীয় ধর্মীয় বিধিনিষেধ অনন্যমনে পালন করার প্রতিও তিনি খুবিই জোর দিতেন। সংক্ষেপে তার শিক্ষার মূলমন্ত্র ছিল আল্লাহর প্রতি এবং একমাত্র আল্লাহর প্রতিই অকুন্ঠ নির্ভর ও একান্ত বিশ্বাস এবং এজন্য চায় কঠোর সংযমের সঙ্গে জীবনযাপন। খাওয়া- পরায়, পোশাকে সাসারিক জীবনের সর্বস্তরে বিলাসিতা ও সৌখিনতা একেবারে নিষিদ্ধ হয় এবং সুরা অয়াফিম বিষবত পরিত্যাক্ত হয়। তার শিক্ষাসমূহ কালক্রমে একটা ধারাবাহিক রূপ গ্রহন করে এবং তার বিরুদ্ধবাদীরা সেটিকেই ‘ওহাবী’ অপভ্রংশে প্রচারিত করে।

আবদুল ওহহাবের শিক্ষাসমূহ ‘কিতাব আল তাওহীদে’ বিশদভাবে বিধৃত হয়েছে এবং সংক্ষেপে সেগুলি এইঃ

১: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত বা আরাধনা পাপ এবং যারাই অন্য কারও উপাসনা করে, তারা বধার্হ।

২; অধিকাংশ মানুষই তাওহীদ বা একেশ্বরবাদী নয়, তারা অলি বা সন্তদের মাজারে গমন করে ও আশীস প্রার্থনা করে; তাদের এসব আচার কুরআনে বর্নিত ‘মক্কার মুসরেকিনদের’ মত।

৩: ইবাদাতকালে নবী, ওলী, ফেরেশতাদের নাম গ্রহন করে প্রার্থনা করা ‘শিরক’ বা বহু দেবার্চনার মতোই নিন্দনীয়।

৪: আল্লাহ ব্যাতীত অন্য কারও মদ্ধবর্তিতার আশ্রয় গ্রহন করা শিরক মাত্র।

৫: আল্লাহ ব্যাতীত অন্য কারও নিকট উৎসর্গ বা মানত করা শিরক মাত্র।

৬: কুরআন, হাদীস এবং যুক্তির সহজ ও অবশ্যম্ভাবী নির্দেশ ব্যাতীত অন্য জ্ঞানের আশ্রয় করা কুফর বা অবিশ্বাস মাত্র।

৭: কদর বা আল্লাহর অমোঘ বিধানে সন্দেহ প্রকাশ বা অবিশ্বাস করা ধর্মবিরুদ্ধতা [ ইলহাদ]।

৮: কুরআনের ‘তা’ বিল বা উপাদানগত ব্যাখ্যাদান ধর্মবিরুদ্ধতা।

ইবনে হামবল থেকে আবদুল ওহহাবের বিরুদ্ধ মতবাদ নিম্নলিখত বিষয়ে সুস্পষ্টঃ

১: জামাতে নামাজ আদায় করা অবশ্যকর্তব্য।

২: তামাক সেবন নিষিদ্ধ এবং এরূপ অপরাধে চল্লিশের অনধিক বেত্রদন্ড যথেষ্ট। দাড়ী কামানো প গালি দেওয়ার শাস্তি কাযীর ইচ্ছানুযায়ী।

৩: অপ্রকাশ্য মুনাফার, যেমন ব্যাবসায়িক মুনাফার উপর জাকাত দিতে হবে। ইমাম হামবল মাত্র প্রকাশ্য মুনাফার উপর যাকাত দিতে বলেছিলেন।

৪: কেবলমাত্র কালেমার উচ্চারণই মোমেন বা বিশ্বাসী হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়, যাতে তার জবেহ বা জীব হালাল হতে পারে। তার চরিত্র নিখুত কিনা, তারও অনুসন্ধান করা উচিত।

আবদুল ওহহাবের অনুসারীদের মদ্ধে এসব প্রথার প্রচলন দেখা যায়ঃ তসবিহ গননার নিষেধ, কারন এ আচরণটি বৌদ্ধদের নিকট থেকে নেওয়া। তার বদলে আঙ্গুলের গিঁঠে গিঁঠে আল্লাহর নাম গণনা করা উচিত। মসজিদে, মাজারে যেসব নকশার কাজ ছিল সেসব তুলে ফেলা হয়েছে। তুর্কীদের প্রবর্তিত মিনারও সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তার বদলে অতি সাধারন ও অলংকারশূণ্য মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। ‘রওয়াত- অল- আফফার’ গ্রন্থে আবদুল ওহহাবের সময়ে কতকগুলি রেওয়াজ মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত থাকার উল্লেখ আছে, সেগুলি পৌত্তলিক বা প্যাগান- রীতির অনুসরনমাত্র। যেমন কবরে ফুল দেওয়া, দীপ জ্বালানো, খাবার দেওয়া, বৃক্ষ পূজা করা। বলা বাহুল্য, এসব আচার- রেওয়াজ একেবারে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে সুন্নাহ পরিত্যাগ করার অপবাদ একেবারে ভিত্তিহীন। তবে তিনি আবু হোরায়রা বর্ণিত বহু হাদীসে সন্দেহ করতেন এবং মিলাদুন- নবীর জনসমাবেশ করে সীরাতুন নবীর প্রচলিত উৎসব বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে মুতাকাল্লামুনদের গ্রন্থাদির বহুতসব করার অপবাদও ভিত্তিহীন। কিন্তু মাজারে- মকবেরায় সমস্ত সমাধিসৌধ অ অলংকরণ নষ্ট করে দিতে তিনি উপদেশ দিয়েছিলেন। জুবাইলার জায়েদ- বিন- খাত্তাবের কবরের উপর নির্মিত সমাধিসৌধ তিনি নিজে ধ্বংস করেছিলেন এবং বর্তমানকালে তার অনুসারীরা, মদিনায় অলবাকী অঞ্চলে এ কাজ করেছে ব্যাপকভাবে।

আবদুল ওহহাবের শিক্ষাসমূহ নিরাসক্তভাবে অনুধাবন করলে মনে হয়, যেসব বেদাত শিরক অ কুফরের প্রশ্রয় দেয় এবং ইলহাদ বা ধর্মবিরুদ্ধ , সেসবের উতখাতকরনে তিনি বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। আল্লাহর তাওহীদ জ্ঞানে এতোটুকু অন্যভাবে অ অনুভূতির প্রশ্রয় দেওয়া তার স্বভাব বিরুদ্ধ ছিল। তার মৌল শিক্ষায় ছিল লা- শরীফ আল্লাহয় একান্ত অ অকুণ্ঠ নির্ভর এবং স্রষ্টা অ মানুষের মধ্যে যাবতীয় মধ্যস্থতার অস্তিত্ব বা চিন্তার বিলোপ সাধন- ওলী ও পীরদের প্রতি মুসলমানের পূজা, এমনকি হযরত মুহম্মদেরও আধা ঐশ্বরিক রূপকল্পনার বিলোপসাধন। কবরে সৌধ নির্মাণ তার মতে পৌত্তলিকদের শেষ চিহ্ন মাত্র, এজন্য সেসব ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, যাতে মুসলমানরা সেগুলিকে ভক্তিস্রদ্ধা দেখাতে বা সেখানে গিয়ে নিজের মঙ্গলকামনা করতে না পারে। কারন এরূপ মনোবৃত্তিই হল শিরক ও কুফরীর নামান্তর মাত্র। এই বিশ্বাসে চালিত হয়েই উনিশ শতকের প্রথম দশকে কারবালা, মদিনা ও মক্কার মাজার- মকবেরা উৎখাত করা হয়েছিল এবং সৌধ ও মিনারগুলি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। যেমন হয়েছিল ১৯২৫- ২৬ সালে বর্তমান সউদী সাসন কর্তৃপক্ষের আমলে।

আবদুল ওহহাব ছিলেন ইজতেহাদের প্রধান সমর্থক। কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা বা নির্দেশের প্রত্যক্ষ বিপরীত বা পরিপন্থী না হলে যুগ ও পরিবেশের কারনোদ্ভুত সমস্যার সমাধান ইজতেহাদের বলে হওয়া উচিত। এ প্রত্যয়ে তিনি সুদৃঢ় ছিলেন। এবং তার মতানুসারী বর্তমান সউদী আরবের শাসন কর্তৃপক্ষও এ প্রত্যয়ে আস্থাবান। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, বর্তমান কালের ব্যাবসা- বাণিজ্যিক প্রসার ও মালামাল চলাচলের বিভিন্ন উপায় উদ্ভূত হওয়ায় মালামাল ইনসিউর করার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যস্বীকার্য। আবদুল ওহহাবের একান্ত পাওবন্দ রাজা আব্দুল আজীজ কাণ্ডজ্ঞানের অনুসারী হয়ে ইনসিউর করার প্রয়োজনীয়তা সম্যক অনুধাবন করেন এবং মক্কার বর্তমান মুফতী বিপক্ষতা করলেও ইনসিউর নীতি গ্রহণ করেছেন।

বর্তমান যুগে ধর্ম ও বিজ্ঞানের ঘাত- প্রতিঘাত শিক্ষিত মনকে অহরহ আলোড়িত করছে, এবং এ দুটির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানে জ্ঞানদীপ্ত মনে চিন্তার উদয়ে অন্ত নেই। নেজাদী উলেমা সম্প্রদায় দর্শন ও তর্কশাস্ত্রের শিক্ষা নিষেধ করেন, আরও করেন জ্যেতিস সাস্ত্রের বিবিধ শিক্ষা- তার মধ্যে পৃথিবীর ঘূর্ণন নীতিও একটি। তারা সঙ্গীত ও চিত্রকলায় শিক্ষা দানও নিষেধ করেন, এবং এ সম্বন্ধে হাদীসের বাণীকে চূড়ান্ত হিসেবে মত পোষণ করেন। তবে অনেকে বর্তমানকালের ফটোগ্রাফির সম্বন্ধে উদার মত পোষণ করেন। নেজাদী উলেমা বৈজ্ঞানিক বিষয়কে- তা সে যতই নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠিত হোক না- কুরআন ও হাদিসের শিখার অনুগামী হিসেবে গ্রহণ করেন। এক কথায়, নেজাদীরা শিক্ষাকে গোঁড়া ভাবেই গ্রহণ করে থাকেন, এবং এ সম্বন্ধে কোন যুক্তিতর্ক ও শিথিল মনোভাব সহ্য করতে প্রস্তুত নন। মনে রাখা উচিত, আবদুল ওহহাব ধর্মীয় বিষয়ে কঠিন অনমনীয় নীতি অনুসরণ করতেন।

উনিশ শতকে আবদুল ওহহাবের মতানুসারীদের রাষ্ট্রিক প্রচেষ্টা অকৃতকার্য এবং রাজশক্তি নষ্ট হয়ে গেলেও তার পিউরিটানিক সংস্কারধর্মী আন্দোলন বেচে থাকলো। ইসলাম প্রচারের পূর্ব জাহেলী জামানায় যেমন যুগ যুগ সঞ্চিত অনাচার, কুসংস্কার ও অধর্মের আবর্তে পরে মানুষ দিগভ্রস্ট হয়ে পড়েছিল, সেই রকম আবদুল ওহহাবের দৃষ্টিতে মুসলমানরা গোমরাহীর পথে এত বেশী অগ্রসর হয়েছিলেন যে, তারা আল্লাহ ও মানুষের মধ্যে ব্যাবধান সৃষ্টি করে ফেলেছিল- তার ফলে তাদের ঈমান ও আমান দুইই বরবাদ হতে বসেছিল। নয়ারুপে ইসলামী প্রাণধারায় তার আন্দোলন মুসলমানদের অন্তরমন ভরিয়ে দিয়েছিল, সেজন্য তার আন্দোলনের রাজশক্তি নষ্ট হয়েও তার শিক্ষার মহিমা দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল- মিসর, তুরান, ইরান, পাকভারত, এমনকি জাভা- মালয়াতেও তার শিক্ষার বাণী আলোড়ন জাগিয়ে তুলেছিল।

পাকভারত উপমহাদেশে আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্থে মুসলমানদের ভাগ্যবিপর্যয় শুরু হয়েছিল। সাড়ে পাঁচশো বছর ধরে এদেশটার শাসন দন্ড একচ্ছত্রভাবে পরিচালনা করলেও তাদের রাষ্ট্রিক নিরাপত্তা নিরংকুশ হয়নি। প্রতিবেশী হিন্দুজাতি বিদেশী বণিকজাতি ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্র করে এদেশটার শাসন কার্য থেকেই মুসলমানদের বঞ্চিত করেনি, তাদের আর্থিক, ধর্মীয়, সামাজিক, শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিপর্যয়েরও সূচনা করেছিল। এক কথায়, মুসলমানদের ঈমান ও আমান নিরংকুশ করে শত শত বছর ধরে বহির্বিশ্বে যে পাকভারত ছিল দারুল ইসলাম নামে পরিচিত, সেখানে বিধাতার অভিশাপ হিসেবে তার শিরে উদ্যত হয়েছিল বিদেশী শাসকের অত্যাচার ও ক্ষয়ক্ষতির দুঃখের বোঝা। সংক্ষেপে বলতে হয়, ১৭৫৭ এর পর পাক- ভারতীয় মুসলমানের ভাগ্যে সূচিত হয়েছিল ঘনতমসাবৃত পতন যুগ।

কিন্তু এ উপমহাদেশের মুসলমানরা অসহায় ক্লীবের মত ভাগ্যের এই বিপর্যয় মেনে নেয়নি নির্বিকারভাবে। তারা পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করেছিল যে, দিল্লীর মুঘল বাদশাহীর নাভিশ্বাস শুরু হয়েছে। মারাঠারা ‘হিন্দু- পাদ- পাদশাহী’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমগ্র ভারতে ‘এক ধর্ম পাশে’ বেধে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে। বাংলাদেশে পলাশীর প্রান্তরে জয়লাভ করে বিদেশী বেনিয়ার জাত ইংরেজরা সারা উপমহাদেশের রাজদন্ড অধিকার করার জন্য লোলুপ্ত হাত প্রসারিত করছে এবং পাঞ্জাবে শিখ সম্প্রদায় ও নতুন রাজ্জস্থাপনের আশায় মেতেছে। ১৮০৩ সালে দিল্লী অধিকার করে ইংরেজরা বিশা পাকভারতের বিভিন্ন অংশ নিজেদের নিরঙ্কুশ দখলে আনয়ন করায় ব্যাস্ত হয়ে উঠেছে, বিশাল জমিদারীর ছিটমহলগুলোকে শায়েস্তা করে করায়ত্ত করার মতোই উদ্যম উৎসাহ নিয়ে। মুসলমানের তখন মোহ ভেঙে গেছে যে, তার আর শাহী বাদশাহী তো নেই-ই, তার ঈমান- আমানও সংশয়িত হয়ে উঠেছে।

মুসলমানের এই আত্মসচেতনতা জাগ্রত হওয়ার ফলে তার পরবর্তী জীবনও আবর্তিত হয়েছে দ্বিমুখী সংগ্রামে সংস্কার আন্দোলনে। তার ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে সংস্কার সাধন কর তাকে যেমন খাঁটি মুসলমানে রূপান্তর করে সংহতি আনয়নের সাধনা করা হয়েছে, তেমনি ক্ষাত্র শক্তির আশ্রয় নিয়ে এ উপমহাদেশে পুনরায় ইসলামী শাসন প্রবর্তিত ও প্রতিষ্ঠিত করে এটিকে দারুল ইসলামে কায়েম করে তার ঈমান- আমানও নিঃসংশয় করবার রক্তক্ষয়ী মরণপণ সাধনা চলছে।

প্রথমেই সশস্ত্র জেহাদী আন্দোলনের কথা আলোচনা করা প্রশস্ত। কারন এটাই ছিল বাহ্যত সবচেয়ে তীব্র ও পরিচালন ও পরিণাম ছিল পাক- ভারতীয় মুসলমানদের ভাগ্যাকাশ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি অর্থপুর্ন।

নিঃসন্দেহে মুসলমানের এ বোধ, এ উপলব্ধি প্রথম থেকেই জন্মেছিল, ইংরেজ ক্রমশ সমগ্র পাক- ভারত দখল করে ফেলবে এবং নিরংকুশ সম্রাজ্জের প্রতিষ্ঠা করে সমগ্র হিন্দুস্থানবাসিকেই স্বদেশে পরাধীন গোলামের জাতিতে পরিণত করবে। কিন্তু সমকালীন সমস্ত আলেম ও ধর্মনেতার মধ্যে দিল্লীর শাহ আব্দুল আজিজই উনিশ শতকের প্রথম ভাগে প্রকাশ্যে ফতোয়া জারি করেনঃ বিদেশীর শাসনাধীন হিন্দুস্থান হচ্ছে দারুল হরব, যেখানে জেহাদ করা বা বিধর্মী অত্যাচারের হাত থেকে যেখান থেকে হিজরত করাই খাঁটি মুসলমানের পক্ষে ফরজ। এই উপলব্ধির দরুনই মুসলমানরা বারে বারে বিক্ষোভ, বিদ্রোহে ফেটে পড়েছে ইংরেজ শক্তির উপর। ১৭৫৭ এর পর পুরো একশতকেরও বেশি এই বিদ্রোহের অনলে দেশটিকে রাঙিয়ে রেখেছিল মুসলমানরা। এবং তারিই চরম বিস্ফোরণরূপে দেখা দিয়েছিল ১৮৫৭ সালের সারা দেশব্যাপী বিপ্লবের বহ্নিবন্যা। কিন্তু তার পরও ছিল ১৮৬৪ সালের সীমান্ত অভিযান। পাবনা ও রংপুরের ১৭৬৫ সালের ফকির বিদ্রোহ দিয়ে এ সংগ্রাম অধ্যায়ের ভূমিকা; মাঝখানে তিতুমীরের বিদ্রোহ, হাজী শরীয়তুল্লাহ ও তার পুত্র দুদু মিয়ার আন্দোলন; সৈয়দ আহমদের শহীদের অভ্যুদয় ও বালাকোটের যুদ্ধ; পাটনায় শাহ্‌ ইনায়েত আলী ও শাহ্‌ বেলায়েত আলীর সংগঠন ও কার্যকলাপ;সিত্তানা, মূলকা, পঞ্জতরের ঘটনাসমূহে প্রভৃতি দিয়ে এর বিস্তৃতি। এবং ১৮৬৪ সালের সীমান্তের অভিযান ও সর্বসেস পাটনা, আম্বালার ষড়যন্ত্র মামলায় সে সশস্ত্র সংগ্রাম অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি।

উনিশ শতকের তৃতীয় পাদ পর্যন্ত মুসলমানদের উদ্যম উৎসাহের মূলকথা হচ্ছে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে জেহাদ বা সশস্ত্র বিদ্রোহ। সৈয়দ আহমদের নেতৃত্বে যে জেহাদি সংগঠন হয়, তার প্রথম আক্রমন উদ্যত হয় উদ্ধত ও অত্যাচারী শিখদের বিরুদ্ধে। শিখেরা রণজিৎ সিংহ এর নেতৃত্বে পাঞ্জাবে একটা শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে মুসলমানদের উপর অকথ্য অত্যাচার শুরু করেছিল; এমনকি আযান দেওয়া পর্যন্ত বান্ধ করে দিয়েছিল। শিখদের বিরুদ্ধে জেহাদে প্রথমে বিজয়ী হলেও সৈয়দ আহমদ শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও শহীদ হ বিশিষ্ট আলেম ও সহকর্মী শাহ্‌ মুহম্মদ ইসমাইলের সঙ্গে [মে ১৮৩১]। কিন্তু পাটনার ইনায়েত আলী ও বিলায়েত আলী মুমূর্স জেহাদী আন্দোলনকে সংগঠন শক্তি বলে পুনরুজ্জীবিত করে তোলেন, ধূলা থেকে জেহাদী ঝাণ্ডা আকাশে তুলে ধরেন। এই সহোদর ভ্রাতৃদ্বয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে সারা পাকভারতে আবার জেহাদীরা জেগে উঠে। তারা বাংলাদেশে ও দক্ষিণ ভারতে সফর করে মুজাহিদ ও রসদ সংগ্রহ করেন। তাদের উদ্দীপনাময়ী বক্তৃতায় মহিলারাও শরীরের গয়না খুলে জেহাদ ভাণ্ডারে দান করত। বাঙালি মুসলমানরা কূটবুদ্ধির সঙ্গে উত্তর ভারতের মুসলমানের ক্ষাত্রশক্তি মিলিত হয়ে অভাবনীয় তেজের স্ফুরণ হয়। সম্মুখ লড়ায়ে বাঙালিরা দুর্দান্তভাবে লড়ত। আম্বালা অভিযানে প্রমাণিত হয়েছে যে, তারা উপেক্ষণীয় নয় এবং ক্ষেত্র উপস্থিত হলে ভীরু বাঙ্গালিও আফগানের ন্যায় হিংস্র ভাবে লড়তে পারে। সিলেট মালদহ, রংপুর থেকে শুরু করে সারা বাংলাদেশের কৃষকসম্প্রদায় নিষ্ঠার সঙ্গে এই শতাব্দীর সংগ্রামে সৈন্য ও রসদ যুগিয়েছেন। তখন বাঙালি মুসলমানের পরিবারের প্রত্যেক সমর্থ যুবাটি হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যেত হাজার হাজার মাইল দূরে সীমান্তাস্থ জিহাদী শিবিরে। প্রতিটি মুসলমান পরিবার থেকে মুষ্টিভিক্ষা নিষ্ঠার সঙ্গে আদায় করা হত জেহাদ্ভান্ডারে। আর জেহাদ শিবিরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জমায়েত হয়েছে মুসলমান সমাজের সর্বশ্রেণীর লোক- সর্বোচ্চ অভিজাত বংশের মওলানা, জঙ্গী কনট্রাক্টর, সিপাহী, সাধারণ চাষি, কসাই নির্বিশেষে। যুদ্ধের ময়দানে ও জেহাদের শিবিরে প্রত্যেক ক্ষেত্রে পথে- প্রান্তরে ছড়িয়ে আছে বাঙালি মুসলমানের পূত অস্থি। মালদহ, পাটনা, আম্বালার বিচারালয়ে আসামীর কাঠগড়ায় বাঙালি, বিহারী, পাঞ্জাবী, সরহদ্দী মুসলমান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে একই লক্ষের অনুসারী হয়ে।

বাংলাদেশের বুকেও সশস্ত্র বিদ্রোহানল জ্বলে উঠেছিল মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীরের নেতৃত্বে, এবং ইংরেজ রাজশক্তির কেন্দ্রস্থল কলকাতা থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে একটা বৃহৎ অঞ্চলে কিছুকাল ইংরেজের শাসন খতম করে দিয়ে তিতুমীর আপন হুকুম কায়েম করেছিলেন। তার নির্মিত বাহাদুরপুরের নিকটবর্তী নাড়িকেল বেরিয়ার বাঁশের কিল্লা আজ ইতিহাসে স্থন লাভ করেছে। এখানে প্রকাশ্য ময়দানে যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি শহীদ হন [ ১৮ই নভেম্বর ১৮৩১]। তার অনুচরদের বিচার হলে সিপাহসালার মাসুম খার ফাঁসির হুকুম হয় এবং ১৪০ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড হয়। আজাদীর সংগ্রামে প্রথম বাঙালি শহীদের গৌরব তার, অন্য কারও নয়।

সশস্ত্র না হলেও সামাজিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক আন্দোলন তুলেছিলেন আজী শরীয়তুল্লাহ ও তার উপযুক্ত পুত্র দুদু মিয়া ওরফে মহসীন। যে মেনোবৃত্তিতে চালিত হয়ে শরীয়তুল্লাহ জুম্মার ও দুই ঈদের নামাজ অসিদ্ধ হিসেবে প্রচার করেছিলেন, তা ছিল ব্যাহত ও বাস্তবত ইংরেজের হুকুমতকে অস্বীকার করারই নামান্তর মাত্র। যেসব বেদাত আচার ও প্রথা তিনি তার ‘ফারাজী’ অনুগামীদের বর্জন করতে বলেছিলেন, সেসবের মধ্য দিয়েই বর্ণহিন্দু জমিদার শ্রেণী ও ইংরেজ সরকার মুসলমান কৃষক সমাজের দেহমনের উপর কর্তৃত্ব করে আসছিল। এবং একই উদ্দেশ্যে তিতুমীরও তার ‘হিদায়েতী’ দলকে শিক্ষা দিতে আরম্ভ করলে পূর্ণিয়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায় এই বিপ্লবী দলকে শাস্তি দিতে অগ্রসর হন। তখন অন্য সব জমিদার, ইংরেজ নীলকর ও কোম্পানী সরকার একযোগে তার সহযোগিতা করেছিল। কৃষক শ্রেণীর আন্দোলনে স্বাভাবিক উগ্রতা ও আক্রোশ ছিল, সেজন্য আইন ও শৃঙ্খলার রক্ষক সরকার দুদু মিয়াকে ডাকাত ও কৃতঘ্ন দেশদ্রোহী অপরাধে ১৮৫৯ সাল পর্যন্ত বার বার কারান্তরালে নিক্ষেপ করেছিল।

কালক্রমে বাঙালি জ্বিহাদীরা আহলে- হাদীস, লা- মজহবী, মওয়াহেদ, মুহম্মদী, গায়ের মুকাল্লিদ প্রভৃতি নামে চিহ্নিত হয়েছিল। কিন্তু তাদের আকিদা ও শিক্ষার সঙ্গে মুজাহিদের বিশেষ পার্থক্য না থাকায় ইয়াহইয়া আলী তাদের সকলকে জেহাদ আন্দোলনে সংযুক্ত করেন। তারপর দেখা যায়, সীমান্ত প্রদেশের ইনকেলাবী সমর ঘাটিতে অথবা ইংরেজ সরকারের ফৌজদারি আদালতে আসামীর কাঠগড়ায় ফারাজী ও অন্যান্য নামে চিহ্নিত বাঙালি মুজাহিদরা উত্তর ভারতের মুজাহিদ বাহিনীর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে পরস্পরের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। শিখ ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে জেহাদ লড়তে বাঙালি মুসল্মানেরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেছিল এবং অগণিত সৈন্য ও অর্থ পাঠিয়ে নিজিদের কর্তব্য পালনে তৎপর হয়েছে। সেকালীন বাংলাদেশের প্রত্যেক শহরে তাদের অর্থ ও সৈন্য সংগ্রহের ঘাটি ছিল, এবং কর্তৃপক্ষের নজড় এড়িয়ে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে তারা যুদ্ধের এ দুটি অতি প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করত। সরবরাহকারীদের মধ্যে মালদহের রফিক মিয়া ও তার পুত্র আমীরউদ্দিনের নাম ইতিহাসের অন্তর্গত আছে। বাংলাদেশ থেকে কত মুজহিদ পাঠানো হয়েছিল, তার সঠিক সংখ্যা নির্ণয়ের কোনও প্রামাণ্য দলিল বা তথ্য মেলে না; তবে মাত্র একটি ইনকেলাবী ঘাটির ৪৩০ জনের মধ্যে শতকরা ১০ জন মালদহ কেন্দ্র থেকেই পাঠানো হয়েছিল। বাংলাদেশের মুসলমানরা জেহাদি আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে কতখানি অংসগ্রহন করেছিল তার বিস্তৃত ও যথাযথ ইতিহাস প্রণয়ন আজও হয়নি।

সৈয়দ আহমদ শহীদের নেতৃত্বে পাক- ভারতের যে জেহাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার প্রথম আক্রমন উদ্যত হয়েছিল রণজিৎ সিংহ এর শিখরাজ্যের উপরে। পরে ব্রিটিশ সকার এই আন্দোলনকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে এবং ক্রমে ক্রমে ইংরেজদের সঙ্গে মুজাহিদদের সংঘর্ষ বাধে। এই সংঘর্ষে আধুনিক অস্ত্রসজ্জে সজ্জিত ও সুশিক্ষিত ব্রিটিশ বাহিনি কঠোর হস্তে জেহাদিদের দমন করে ও তাদের ঘাটি গুলো নির্মূল করে দেয়। কিন্তু তাতে জেহাদী আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়নি। সারা হিন্দুস্থান কে দারুল হরব ঘোষণা করে জেহাদ করবার অথবা এদেশ থেকে হিজরত করার বাণী সৈয়দ আহমদের খলিফারা প্রচার করে বেড়াতে লাগলো, সীমান্ত প্রদেশে একটা ইনকেলাবী সমর ঘাটি স্থাপন করে সারা উপমহাদেশ থেকে অর্থ ও সৈন্য আমদানী করতে লাগলো। তাদের শায়েস্তা করতে ইংরেজ সরকারকে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যায় করতে হয়েছে, তিনটি ভীষণ যুদ্ধ করতে হয়েছিল এবং বহু বৎসর ধরে তাদের অত্যাচারে উৎপীড়িত ও সশংকিত থাকতে হয়েছে। সমুদ্যত অস্ত্র ও আইনের শৃঙ্খল পর্যাপ্ত না হওয়ায় দেশপ্রসিদ্ধ আলেমদের, এমনকি মক্কা শরীফের চার প্রসিদ্ধ মজহাবের প্রধান মুফতীদের ফতোয়া প্রচারেরও দরকার হয়েছিল ভারতীয় বিশেষত বাঙালি মুসলমানদের ধর্মবুদ্ধিকে প্রভাবিত করবার জন্য। বিদেশী ও বিধর্মীদের শাসনাধিকারে চলে গেলেও এ দেশটাকে দারুল ইসলাম হিসেবে মেনে নিয়ে এখানে শান্তিতে ও নিরুপদ্রবে বসবাস করতে ধর্মীয় অনুমোদনও এসব ফতওয়ার দ্বারা লাভ করা হয়েছিল।

যাহোক, একথা অবশ্য স্বীকার্য যে, পাক- ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে উনিশ শতকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ‘ওহাবী’ নামাংকিত জেহাদী আন্দোলন এক বিশিষ্ট অধ্যায়। পলাশীর পর থেকে পাক- ভারতের বিভিন্ন স্থানে যে প্রতিরোধ দেখা দিয়েছিল, তার প্রকাশ হত মুসলমানদের দ্বারা। কোন রাজা, বাদশাহ বা রাজপুরুষের স্বার্থে এ আন্দোলন প্রচারিত হয়নি। বিধর্মী ও বিদেশী শাসনব্যাবস্থার বিরুদ্ধে পাক- ভারতীয় মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া থেকে এর জন্ম। এ জিহাদি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে এদেশের বিভিন্ন অংশের উচ্চ- নীচু, ধিনী- দরিদ্র সব শ্রেণীর মুসলমান; এবং একে সংগঠন করেছিল ও পরিচালনা করে নেতৃত্ব দিয়েছিল এ যুগের ধিকৃত ও ধর্মধাস্ত্রবিদ মুসলিম আলেম সমাজ। ব্যাক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধির জন্য রাজবংশের কয়েকজন এসে যোগ দিলেও এ আন্দোলনের কোন সময় এর শক্তি কোন নওয়াব রাজার স্বার্থে কেন্দ্রীভূত হয়নি। দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত না করলে ধর্মীয় সংস্কার করা যায়না। এবং দারুল ইসলামের প্রতিষ্ঠা করতে হলে সর্বাগ্রে বিধর্মী রাজশক্তির উচ্ছেদ প্রয়োজন, মুসলমানদের এ বোধ ও এ উপলব্ধি সম্যক জন্মেছিল। এবং এ বোধ জন্মানোর সঙ্গে আন্দোলনের রূপও বদলে তীব্রতর হয়েছিল। অবশ্য আন্দোলনের নেতাদের মনে দারুল ইসলামের কোনও পরিকল্পনা সুস্পষ্ট ভাবে দানা বেধেছিল কিনা, বলা শক্ত কিন্তু একথা অনস্বীকার্য, এই মনস্বী নেতাদের মনে কোন দুর্বলতা ছিলনা। কোনও স্বার্থবুদ্ধির নীচতা তাদের বিবেককে, তাদের শুভবুদ্ধিকে মোটেও আচ্ছন্ন করেনি।

মুসলমানদের এ অনমনীয় মনোভাবকে লক্ষ করেই হান্টার সাহেব বলেছেনঃ

‘আমাদের অধিকার একটি চিরস্থায়ী ষড়যন্ত্র এবং আমাদের সীমান্তে একটা স্থায়ী বিদ্রোহী শিবির’। তার ‘ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ নামাংকিত গ্রন্থটির রচনা সূচিত হয় তদানীন্তন গভর্ণর জেনারেল লর্ড মিয়ো কর্তৃক [১৭৬৯- ৭২ খৃঃ] উপস্থাপিত একটি প্রশ্নের জওয়াব হিসেবেঃ ভারতীয় মুসলমানরা কি ধর্মীয় অনুজ্ঞা হেতু মহারাণীর [ ভিক্টোরিয়া] বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বাধ্য? যদিও গ্রন্থটি রচনা করার উদ্দেশ্য ছিল পাক- ভারতীয়, বিশেষত বাঙালি মুসলমানের উপর ইংরেজদের অন্যায় অত্যাচার সমূহের একটা সাফাই প্রস্তুত করা, তবু তার প্রথম দুটি অধ্যায়ের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে সদ্য রাজ্য হারা একটা বিরাট জাতির অপরিসীম ক্ষোভ ও বিদ্বেষ বহ্নি। হান্টার বলেছেনঃ ভারতীয় মুসলমানরা ভু বছর ধরেই রয়ে গেছে ভারত ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে একটা মহাবিপদের উৎস। নানা কারণেই তারা আমাদের শাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা কর আসছে; এবং যেসব পরিবর্তনকে নমনীয় ভাবাপন্ন হিন্দুরা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছে, সেগুলিকে মুসলমানরা তাদের উপর তীক্ষ্ণ অবিচার হিসেবেই বিবেচনা করে।

১৮৫৭ সালের মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে জেহাদি আন্দোলনের যোগাযোগ ছিল, একথা অনেক ঐতিহাসিকই স্বীকার করেন, কিন্তু তার বিস্তারিত তথ্য এখনও গবেষণার অপেক্ষায় আছে। বিলায়েত আলী বাদশাহ বাহাদুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, এ প্রমাণ পাওয়া যায়। দীর্ঘ এক শতক ধরে জেহাদী মুসলমানরা ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে যে বারে বারে ছোটখাটো বহু বিস্ফোরণ ও প্রতিরোধের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করছিল, তার সঙ্গেই বহু দিনের ধূমায়িত অসন্তোষ সর্বভারতীয় বিরাট ও ব্যাপক আকারে ফেটে পড়েছিল, এ কথাটি অস্বীকার করা যায় না। বাইরের অবস্থা শান্ত বিবেচিত হলেও আসলে সারা দেশটা বাবুদের স্তূপ হয়েছিল এবং জনগণের পুঞ্জিভূত অসন্তোষই বিস্ফোরণে মূর্ত হয়েছিল। মাওলানা আহমদ উল্লাহ, মওলবী ফজলে হক খয়রাবাদী প্রমুখ এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ব্যাক্তিগত স্বার্থবেশে নয়, ইংরেজ শাসন উচ্ছেদের দুর্বার বাসনা নিয়ে। আর এ আন্দোলনে মুক্তি সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিল মুসলমানরাই; এজন্য সংগ্রাম শেষে ইংরেজ রাজশক্তি নির্মমভাবে চন্ডনিতি ও সন্ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছিল মুসলমানদের শির লক্ষ্য করে। সীমাহীন নির্মমতা দেখিয়ে কুখ্যাত হডসন শাহাজাদাদের হত্যা করেছে; নীল গর্ব করে বলেছে, বিনাবিচারে শত শত মুসলমানকে ঈদ- উল- আযহার দিনে ফাঁসি দিয়েছে, হত্যা করেছে। মুসলমানদের অভিজাতদের শুয়োরের চানড়ায় জীবন্ত সেলাই করে হত্যা করা হয়েছে। জোর করে তাদের শুকরের গোশত খাওয়ানো হয়েছে।

আফসোস এই যে, সে জেহাদ আন্দোলনের, সে মুক্তি সংগ্রামের পুর্ণাঙ্গ ইতিহাস আজও রচিত হয়নি। সে অগণিত জনসমষ্টি ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ পর্যন্ত বিদ্রোহে, সমরে, ফাঁসির মঞ্চে জীবন পাত করে গেছে। আজ তার অলক্ষে এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের পশ্চাতে এ দাবী নিয়ে- তাদেরও মহৎ আত্মত্যাগের মর্যাদা দিতে হবে।

সরকারী মামলাসমূহে কঠোর শাস্তি দান করা হলেও জেহাদী আন্দোলন একেবারে স্তব্ধ করে দেওয়া সম্ভব হয়নি। সীমান্তের জেহাদী ঘাটির অস্তিত্ব একেবারে বিলুপ্ত হয়নি, এবং পাক- ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গুপ্ত সংগঠন মারফত অর্থ ও মুজাহিদ প্রেরণও বন্ধ হয়ে যায়নি। প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ বন্ধ হয়ে গেলেও কোনও কালেই জেহাদি আন্দোলনের বিভীষিকা দূরীভূত হয়নি। ১৮৯০ সালেও অলিভার সাহেব সীমান্তে জেহাদী ঘাঁটির অস্তিত্ব দেখেছিলেন, এবং তখনও তার আতংক স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সশংকিত করে রেখেছিল।

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বময় আরম্ভ হলে তুরস্ক ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। তখন সরহদী জেহাদী ঘাঁটিতে তৎপরতা লক্ষিত হয়। ১৯১৫ সালে সীমান্তে কয়েকবার সংঘর্ষ বাধে; তার মধ্যে রুস্তম ও শবকদর এলাকার যুদ্ধ তীব্র ছিল। যুদ্ধশেষে কালো পোশাক পরিহিত ১২ জন জেহাদীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। উক্ত সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে ১৫ জন যুবছাত্র এবং পেশোয়ার ও কোহাটের অনেক ছাত্র মুজাহিদের সঙ্গে যোগ দেয়; পরে তারা কাবুল যাত্রা করে। ১৯১৭ সালের জানুয়ারী মাসে দেখা যায়, রংপুর ও ঢাকা জেলার ৮ জন মুসলমান মুজাহেদিন দলে যোগ দিয়েছে। উক্ত সালের মার্চ মাসে দুজন বাঙালি মুসলমান মুজাহিদ শিবিরে ৮০০০ টাকা গোপনে বহন করার সময় উত্তর- পশ্চিম সীমান্তের এক ঘাঁটিতে ধরা পরে। তারা বহু পূর্ব থেকে জেহাদী আন্দোলনে যুক্ত ছিল।

এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়, মুসলমান জাতির এক অংশ তখনও ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনে লিপ্ত ছিল। তাছারা আরও একদল মুসলমান বিদেশী রাষ্ট্র কাবুল ও তুর্কীর সাহায্যে ইংরেজ বিতারনের ষড়যন্ত্র করত। তাদের নেতা ছেলেন দেওবন্দ মাদ্রাসার মাওলানা ওবায়দুল্লাহ এবং তার সহকর্মী ছিলেন মওলানা মাহমুদ হাসান। তারা হেজাজে ও কাবুলে পাক- ভারতীয় মুসলিম প্রবাসীদের নেতৃত্ব দিয়ে সংঘবদ্ধ করতেন এবং কাবুলের আমঈরের সাহায্যে বিদ্রোহ চালাবার ষড়যন্ত্র করতেন। কাবুলে একটা সামরিক সরকারও তারা প্রতিষ্ঠা করেন, এবং মওলানা ওবায়দুল্লাহ ছিলেন তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। এই ষড়যন্ত্রের কয়েকখানি চিঠি সিন্ধের একজন মুজাহিদ নেতার নিকত প্রেরিত হয়েছিল। চিঠিগুলি পরিচ্ছন্ন ফারসীতে হলদে রঙের রেশমী কাপড়ে লেখা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিঠিগুলি ধরা পরে ও বিখ্যাত ‘রেশমী চিঠির ষড়যন্ত্র’ ফাঁস হয়ে যায়। এসব বিবরণ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে একদল পাক- ভারতীয় মুসলমান তুরস্ক, হেজাজ ও কাবুলের সাহায্যে এদেশে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালাবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল।

এখানে জেহাদী আন্দোলন সাহিত্য সম্বন্ধে কিছুটা আভাস দেয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না। হেজাজে আবদুল ওহহাব যখন নিজের মতবাদ প্রচার করেন, তখন সেখানে কোনও ছাপাখানা ছিলনা। এজন্য তার রচিত ‘কিতাব অল- তাওহীদ’ ও অন্যান্য প্রচার পুস্তিকা হাতে লেখা অবস্থায় জনসমাজে প্রচার করা হত। পাক- ভারতের জেহাদী আন্দোলন সংক্রান্ত পুথি পত্রিকা ছাপা হয়ে বা লিথোকপি প্রস্তুত করে প্রচারিত হত। এজন্য প্রচার কার্য আরও ব্যাপক হওয়ার সুযোগ ছিল। হান্টার সাহেব তার ‘ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ গ্রন্থে তেরখানি ও ‘ওহাবী’ গ্রন্থের নামোল্লেখ করেছেন, তাদের কোনটি আরবী, কোনটি ফারসী ও কোনটি উর্দু ভাষায় রচিত। পুঁথিগুলির সম্বন্ধে তার মন্তব্য হল, ‘পদ্যে ও গদ্যে লেখা ওহাবী পুঁথিগুলির- যার প্রত্যেকটিতে ইংরেজের বিরুদ্ধে জেহাদের জ্বলন্ত প্ররোচনা আছে- ক্ষুদ্রতম খানিও একখানি বৃহৎ গ্রন্থের মর্যাদায় উন্নীত হওয়ার যোগ্য’। জেহাদি আন্দোলনের নেতা সৈয়দ আহমদের শিক্ষা ও বাণী সংকলন ও ব্যাখ্যা করে শাহ ইসমাইল শহীদ প্রথমে ‘সিরাতুল মুসতাকিম’ নামক ফরাসী ভাষায় গ্রন্থ রচনা করেন। এখানিতে জেহাদ আন্দোলনের মূলতত্বগুলি শক্তিশালী লেখকের হাতে প্রাঞ্জল্ভাবে ফুটে উঠেছে। মুসলমান সমাজের সংস্কার মানস নিয়েও গ্রন্থখানিতে বিভিন্ন বিষয়ে বিসদ আলোচনা আছে। এখানিকে কেউ বলেছেন ‘ওহাবীদের ম্যানিফেস্টো’ কেউ বলেছেন বাইবেল। বলা বাহুল্য, এখানি সৈয়দ আহমদের পন্থীদের মধ্যে প্রচারিত ও সবচেয়ে প্রিয় পাঠ্য ধর্মগ্রন্থ।

একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, জেহাদ সম্পর্কিত সাহিত্য পূর্ণভাবে বিকশিত হয়। গদ্যে, কবিতায়, লোককথায়, সবদিকেই তার অপূর্ব উন্নতি হয়। এ সম্বন্ধে যত পুস্তিকা লেখা হয়েছে তার পূর্ণ পরিচয় দিতে চেষ্টা করলে একখানা প্রকাণ্ড গ্রন্থ রচনারই দরকার পরে। এসব পুস্তকের শিরোনাম থেকে তার বিষয়বস্তুর পরিচয় মেলে। রিসালা- ই- জেহাদ, কাসিদা, শিররওকায়া, আসার- মাশহার, তাকিয়াতুল ইমাম, নাসিহাতুল মুসলেমীন, হিদায়াতুল- মুমেনীন, তানবীর- উল- আইনাইন,তামবিহ- উল- গাফেলীন, চিলিহ হাদিস প্রভৃতি নামাংকিত অসংখ্য পুস্তক রচিত হয় এবং ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এসব কিতাবের ভাষা আরবী, ফারসী ও উর্দু হলেও তাদের কয়েকটি মুসলমানী বাঙলাতেও তর্জমা করা হয়েছিল। তাম্বিহোল- মোমেনীন নামক গ্রন্থটি মুসলমানি বাংলায় [ অর্থাৎ মিস্ররীতির বাংলায়] পদ্যে রচিত হয়েছিল জনৈক ওমর শাহ্‌ কর্তৃক ও ১৮৮০ সালে ঢাকায় মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। বলা বাহুল্য, এসব ওহাবী পুস্তিকা ইংরেজ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। তবুও সেগুলি হাতে লেখা অবস্থাতেই প্রচারিত হত এবং তাদের পাঠক সংখ্যা অত্যন্ত বেশি ছিল।

এখানে প্রশ্ন জাগে, কোন ভাষায় বাংলাদেশের জেহাদ আন্দোলনের প্রচারকার্য চালান হত? এ সম্বন্ধে কোন প্রামাণ্য দলিল হাতের কাছে না থাকলেও এ কথা অসংকোচ বলা চলে যে, জনগণের সম্মুখে প্রচার চলত মুসলমানি বাংলা ভাষাতেই; কিন্তু লেখা পড়ার সমস্ত কাজ ফারসী ও উর্দু ভাষাতেই করা হত। বাংলার বাইরে থেকে যেসব প্রচারক বাংলায় আসতেন, তারা বহুদিন এদেশে বাস করে এদেশের ভাষা ও আদব- কায়দা রিতিমতভাবে আয়ত্ত করে প্রচারকার্য হাতে নিতেন। লক্ষ্মৌবাসী আবদুর রহমান সাহেব বাংলাদেশে প্রচারের জন্য আদিষ্ট হয়ে মালদহ জেলায় হিজরত করেন এবং সেখানেই শাদি করে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। এভাবে তিনি বাঙালী মুসলমানদেরই একজন হয়ে জেহাদ প্রচার করেছিলেন। সে আমলে শিক্ষিত মুসলমান সমাজের সংযোগসূত্র উত্তর ভারতের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ থাকায় বাঙালী মুসলমান মাত্রই উর্দু ও ফরাসী প্রাথমিক অবস্থা থেকেই স্বভাবতই শিক্ষা করত। এ থেকে আমাদের দৃঢ় ধারনা জন্মেছে যে, বাংলাদেশে জেহাদ আন্দোলনের লেখাপড়ার কাজটা এ দুটি ভাষার সাহায্যেই হত। উদাহরণস্বরূপ, সাধারন সংগঠন কার্যে ‘দীন- কি- সরদার’ ‘দুনিয়া- কি- সরদার’, ‘ডাক- কি- সরদার’ প্রভৃতি উপাধি থেকেই আমাদের যুক্তির পোষকতা মেলে।

চলতি শতকে প্রথমেই বঙ্গভঙ্গ রদ নিয়ে আন্দোলনকালে বাংলাদেশে হিন্দু যুবকদের দ্বারা যে সন্ত্রাসবাদের উদ্ভব হয়, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তার ভূমিকার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপ, সংগঠন শক্তি, প্রাচরনা গুপ্তসমিতি, গুপ্তচরবৃত্তি, গুপ্ত শব্দ সংকেত এবং গুপ্ত ভাবে অর্থ ও অস্ত্রাদি চলাচলের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া প্রভৃতি বিশেষ ভাবে আলোচনা করলে ওহাবী চিহ্নিত উনিশ শতকের মুসলিম জিহাদিদের কথায় স্মরণে আসে। কারন এসব ক্রিয়া কর্মে দুটি দলের অনেক মিল আছে, যা থেকে নিরাসক্ত মনে স্বতই প্রশ্ন জাগে- জেহাদিদের আদর্শের অনুকরণ করে বিশ শতকের বাঙালী হিন্দু সন্ত্রাসবাদ সংগঠিত হয়েছিল কিনা। তবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, জেহাদিদের কর্মধারা ছিল সাধারন মানুষের অপরাধ ও পাপাচার বোধের সঙ্গে পূর্ণ সঙ্গতি রেখে, এবং তাদের সব প্রচেষ্টাই ছিল প্রকাশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে। ডাকাতি, অর্থ লুণ্ঠন, গুপ্ত খুন জখম প্রভৃতি কর্ম ছিল জেহাদিদের স্বপ্নেরও অগোচর। কিন্তু দুটি আন্দোলনের কর্মীদের চারিত্রিক ঋজুতা প দৃঢ়টা, কর্তব্য কর্মে নিষ্ঠা ও দলগত অকুণ্ঠ বশ্যতা ছিল। বিস্ময়কর। জেহাদি আন্দোলন সম্বন্ধে আরও বলা যায় যে, এটি কোন বিদেশী দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়নি কোনও সময়ে কোনও বিদেশী সাহায্য নির্ভর ছিলনা। আরা এ আন্দোলনের ব্যাপকতা ও তীব্রতা সম্বন্ধে ডক্টর চৌধুরী স্বীকার করেন যে, ‘ব্রিটিশ শাসন আমলে যেসব আন্দোলনের উদ্ভব হয়েছে, সেসবের মধ্যে ওহাবী আন্দোলন ছিল তীব্রভাবেই ব্রিটিশ বিরুদ্ধ, তার সর্বস্তরেই এই তীব্র বিরোধিতা পরিলক্ষিত হত’।

পাক- ভারতীয় জেহাদি আন্দোলনের পরিক্রমা শেষে একথা বলা যায় যে, এ আন্দোলনের দুটি বিশেষ লক্ষ ও কর্মসূচী ছিলঃ [১] ধর্মীয়- সামাজিক সংস্কার ও [২] রাজনৈতিক, অর্থাৎ বিদেশী শাসন উচ্ছেদ পূর্বক ইসলামী শাসন কায়েম করা। ধর্মীয়- সামাজিক সংস্কার প্রধানতঃ শুরু হয়েছিল শাহ্‌ ওয়ালী উল্লাহর সময় থেকে, এবং তার পুত্র আবদুল আজীজের সময় ‘তরিকা- ই- মুহম্মদীয়া’ সংস্কার আন্দোলনের মারফত। সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর এদিকে কর্মসূচী ছিল মুসলমানের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে যেসব বেদাত অনুপ্রবেশ করেছিল, সেগুলির মূলোৎপাটন করা। বলাবাহুল্য, এই সমাজ ও ধর্মীয় সংস্কার কর্মে কোন বাধা উপস্থিত হয়নি। যদিও সৈয়দ আহমদকে একবার আদিবাসী মোল্লা ও স্বার্থভোজীদের তীব্র প্রতিবাদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল।

জেহাদিদের সশস্ত্র আন্দোলন ছিল নিঃসন্দেহে শিখ ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে এবং এদেশটাকে দারুল হরব থেকে দারুল ইসলামে পরিণত করার মহান ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। প্রসঙ্গত এখানে পরিচ্ছন্ন হওয়া উচিত যে, কোনও রাজা- বাদশাহ বা আমীর- ওমরাহের স্বার্থে বা নেতৃত্বে এ আন্দোলন পরিচালিত হয়নি এবং ব্যাক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধির জন্য পরে রাজবংশের কয়েকজন যোগ দিলেও এ আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসের কোন সময়ই এর শক্তি কোন রাজা- বাদশাহ বা আমীরের স্বপক্ষে কেন্দ্রীভূত হয়নি। এ আন্দোলনকে পরিচালনা ও সংগঠন করেছিলেন ধর্ম শাস্ত্রবিদ মুসলিম আলেম সমাজ এবং এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে পাক- ভারতের বিভিন্ন অংশের মুসলমান। আলেম সমাজ এ প্রত্যয়ে দৃঢ় ছিলেন যে, দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত না হলে খাঁটি ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয়না কিংবা ইসলামেরও সংস্কার করা যায়না এবং দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সর্বাগ্রে বিধর্মী বিদেশী রাজশক্তির উচ্ছেদ প্রয়োজন। এই প্রয়োজনীয় দিক নির্ণ্যে সৈয়দ আহমদ বা তার অনুসারীদের বিন্দুমাত্র সংশয় ছিলনা। এ সম্বন্ধে নজীর হিসেবে উপস্থিত করা যায় তার কর্তৃক গোয়ালিয়রের মহারাজা দৌলতরাও সিন্ধীয়ার শ্যালক রাজা হিন্দুরাওকে লিখিত এক পত্র থেকেঃ

মহাশয় পরিস্কার ভাবে জ্ঞাত আছেন যে, দূর দেশের বিদেশী লোকেরা এখন আমাদের দেশের ও যমানার শাসক পদে বরিত হয়েছে এবং ব্যাবসায়ীরা ও পণ্যবিক্রেতারা এখন আমাদের প্রভুপদে উন্নীত হয়েছে- কিন্তু একদল জেহাদি দুর্বল হলেও পার্থিব লোকসানের কথা চিন্তা না করে এই বিদেশীদের উৎখাত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে— যতো শীঘ্রই হিন্দুস্থান এসব বিদেশী দুশমনের হাত থেকে মুক্ত হয়ে ও জেহাদিদের মনস্কামনা পূর্ণ হবে, তত শীঘ্রই এ দেশের শাসনভার পূর্বতন মালিকদের হস্তেই ফিরে যাবে এবং তাদের শক্তি ও কর্তৃত্ব বৃদ্ধি করা হবে।

তার আরও একটি পত্রের অংশ বিশেষ হতে পাওয়া জায়ঃ

আমার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, জেহাদ কায়েম করা ও হিন্দুস্থানে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করা—– যেসব বিধর্মী খ্রিস্টান ভারত অধিকার করেছে তারা অত্যন্ত ধূর্ত ও প্রবঞ্চক—— দুষ্ট প্রকৃতির ইংরেজরা ও হতভাগ্য মুশরেকরা ভারতের বিভিন্ন অংশে কর্তৃত্ব স্থাপন করেছে। তারা সিন্ধু নদের তীর হতে সমুদ্রোপকূল পর্যন্ত সমস্ত ভূভাগে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে।

সৈয়দ আহমদের চিঠিপত্রের এসব উধৃতাংশ হতে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকেনা যে, তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ বিতারন। তিনি অবশ্য প্রথমেই শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এবং শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেই তিনি নিহত হন। তার কারণ এই ছিল যে, পাঞ্জাব অধিপতি রণজিৎ সিংহ বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করেছিল এবং প্রত্যক্ষ ভাবে মুসলমানদের ধর্মেকর্মে বাধা দিতে অগ্রসর হয়েছিলেন। এমনকি তার হুকুমে পাঞ্জাবে আযান দেয়াও নিষিদ্ধ হয়েছিল।

একজন আধুনিক হিন্দু লেখক পাক- ভারতে ব্রিটিশ বিদ্বেষী যেসব আন্দোলন আঠারো ও উনিশ শতকে উদ্ভব হয়েছিল, সেসবের মূল্যায়নকালে ওহাবী আন্দোলন সম্পর্কে এ মতামত প্রকাশ করেছেনঃ

ওহাবী আন্দোলনের প্রতি গণশক্তির সহানুভূতির নিদর্শন মেলে ঢাকা থেকে পেশোয়ারা পর্যন্ত সমগ্র দেশের অর্থ ও জেহাদী সংগ্রহ পূর্বক এ আন্দোলনকে পুষ্টিদান করায়। এখানে এ কথাও স্বীকার করতেই হয় যে, ভারতে ব্রিটিশ শাসনে যে সমস্ত আন্দোলনের উদ্ভব হয়েছে, তাদের মধ্যে ওহাবী আন্দোলন ছিল সর্বাপেক্ষা নির্দয়ভাবে ব্রিটিশ বিদ্বেষী এবং তাদের এ ভূমিকা শেষ দিন পর্যন্ত প্রচেষ্টায় অব্যাহত ছিল।

জেহাদীদের আত্মত্যাগ অতুলনীয়। জগত ও জীবন সম্পর্কে অন্যসব চিন্তা ও বিবেচনা বিসর্জন দিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী এসব আত্মভোলা জেহাদীরা একমন ও একপ্রাণ হয়ে একমাত্র ব্রিটিশের উৎখাত মানুষে জীবন ও যৌবন কোরবাণীর যে অনন্য ও অপূর্ব নিদর্শন রেখে গেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তার তুলনা নেই। তবুও আক্ষেপের সঙ্গে স্বীকার করতেই হয়, এ আন্দোলন নিষ্ফল হয়েছিল- বারে বারে ইংরেজ শক্তিকে উদ্ধত খজোর মত আঘাত করেও ইংরেজকে এদেশ থেকে উৎখাত করার সাধনা জেহাদীদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এবং তার কারণ গুলি ছিল নিম্নরূপঃ

[১] জেহাদিদের মধ্যে সংগঠন ও পরিচালনা শক্তি বিজ্ঞানসম্মত ছিলনা। জেহাদিদের প্রতিজ্ঞায় ও সংকল্পে কোন খাদ না থাকলেও ধর্মীয় খুঁটিনাটি মতবিভেদ ও তজ্জনিত মনকষাকষি নেতৃত্বদানে অনেক সময়ে দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। ‘রাফেয়াদান’, ‘লা- মযহবী’, ‘গায়ের মাকাল্লিদ’, ‘আহলে হাদীস’ প্রভৃতি ধর্মীয় প্রশ্নে নেতৃবৃন্দের উৎকট রেষারেষি ও মনকষাকষিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আলেম নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিভেদ দেখা দেওয়ায় প্রকৃত জেহাদের ক্ষেত্রে বাধা- অসুবিধাই সৃষ্টি করেছে। এই প্রসঙ্গে খোদ বিলায়েত আলী ও ইনায়েত আলী সহোদর ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ স্মরণীয়।

ঘাতকতা প্রতারণার দ্বারা জেহাদী আন্দোলনের উপর কুঠারাঘাত করেছে। লক্ষ করে দেখা গেছে যে, পাহাড়ি অধিবাসীরা কখনও দলীয় স্বার্থের উর্ধে উঠে নিঃস্বার্থ ভাবে জেহাদের জন্য দন্ডায়মান হয়নি; সুবিধাবাদী ও অর্থগৃধুর ভূমিকা নিয়ে জেহাদীদেরই সর্বনাশ সাধনে উৎসাহী হয়েছে, পাহাড়ি অধিবাসীদের নিয়ে জেহাদ করার এটাই সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্বল দিক ছিল।

[৩] জেহাদী আন্দোলনের লোক ও রসদ সরবরাহ হত সারা পাক- ভারতের দূরদূরান্তে প্রত্যেক অঞ্চল হতে- হাজার হাজার মাইল দূরবর্তী রংপুর, মালদেহ, সিলেট, চট্টগ্রাম প্রভৃতি বাংলাদেশের অঞ্চল থেকে এবং সূদুর হায়দারাবাদ থেকেও। এসব লোক ও রসদ সরবরাহ হত সুপ্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ শাসনাধিকারের অভ্যন্তর দিয়ে; এবং তার দরুন রসদ ও লোক সরবরাহ টা বরাবরই বিপদসংকুল ছিল এবং যেকোনো সময়ে যুদ্ধের অতি প্রয়োজনীয় দুটি উপকরণ বন্ধ হয়ে যেত, কিংবা যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল।

[৪] সর্বশেষে বলা যায়, জেহাদীদের অস্ত্র ছিল পুরানো প্রণালীর। এজন্য আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত ও কারিগরি বিদ্যায় অনেক উন্নত ইংরেজদের অস্ত্রের বিরুদ্ধে জেহাদিদের অস্ত্র তুলনামূলক একেবারেই নিম্ন মানের ছিল। মালকায় জেহাদিদের যে পুরানো আমলের বাবুদের কারখানা ছিল এবং হস্ত নির্মিত বংশদন্ডের বন্দুকসমূহ প্রস্তুত করা হত, সেগুলির আধুনিক বিজ্ঞান কারিগরি বিদ্যার শ্রেষ্ঠ নিদর্শনরূপে নির্মিত এনফিল্ড রাইফেলের সঙ্গে মোটেই তুলনা করা চলেনা। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংঘাতে প্রাচ্যের এই অস্ত্রশস্ত্র শোচনীয় দুর্বলতা ও অক্ষমতাই যে পাশ্চাত্যকে প্রাচ্যের উপর সাফল্লের সৌভাগ্য দান করেছে তার পরিণতি দেখা গেছে চীনের সঙ্গে সংগ্রামে, ১৮৫৭ এর বিপ্লবে এবং জেহাদীরাও এই অক্ষমতার স্বীকারে পরিণত হয়েছে। আশ্চর্য এই যে, এই বিসদৃশ ও অসম অবস্থাটা মুসলমান ধর্মীয় নেতারা কোনও সময়ে অনুধাবন করতে পারেনি, এবং নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র আধুনিক ধরনের উন্নয়ন করতে কিংবা যুদ্ধকালে আধুনিক কলা- কৌশল অনুসরণ করতে চেষ্টা করেননি।

এবার ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের আলোচনা করা যাক।

পাক- ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় সংস্কারের সম্বন্ধে আলচনার প্রথমেই স্মরণ করতে হয় শাহ্‌ ওয়ালী উল্লাহর নাম। কারণ আঠারোশ শতকের মাঝামাঝি তিনিই প্রথমে এ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। মনে রাখা ভাল যে, ঠিক এই সময়ে আবদুল ওহহাব হেজাজে তার ধর্মীয় সংস্কার প্রচেষ্টায় ব্যাস্ত ছিলেন। শাহ্‌ ওয়ালী উল্লাহ মক্কায় হজ্ব পালন করতে গিয়েছিলেন এবং শাহ্‌ আবু তাহির নামে এক মশহুর আলেমের নিকট কিছুকাল শিক্ষালাভ করেন। মক্কা থেকে ১৭৩০ সালে প্রত্যাবর্তনের পর তার কর্মজীবনের শুরু হয়। এমন কোন প্রমাণ মেলে না যে, আবদুল ওহহাব এর সঙ্গে শাহ্‌ ওয়ালী উল্লাহর কোন সাক্ষাৎ হয়েছিল। শাহ্‌ ওয়ালী উল্লাহ লক্ষ্য করেছিলেন, শরীয়তী ইসলামের প্রতি সুফীদের উদাসীনতা ও অবজ্ঞা ইসলাম ও মুসলিম সমাজ জীবনের শৃঙ্খলার পক্ষে ক্ষতিকর হয়েছিল। তাদের আচরিত ও বহু প্রচারিত ইসলামবিরুদ্ধ মতবাদের অনুপ্রবেশ মুসলিম ধর্মজীবনকে কলুষিত করেছিল। পেশাদার সুফীর প্রাদুর্ভাব ও কবরপূজার প্রথাও ক্রমাগত বেড়েই চলেছিল। শাহ্‌ ওয়ালী উল্লাহ অবশ্য তাসাউফের উচ্ছেদ চাননি, তার লক্ষ্য ছিল সুফীদের সংস্কার। তিনি সূফীবাদকে সংস্কার করে তা সমাজের কল্যাণে লাগাতে চেয়েছিলেন। পেশাদার পীর- ফকির ও কবরপুজা, কেরামতি ইত্যাদির বিরুদ্ধে তার ‘ওসিয়তনামায়’ বহু যুক্তি ও নির্দেশ আছে, কিন্তু এ সম্বন্ধে জোর জবরদস্তি করা তিনি অন্যায় মনে করতেন।

শাহ্‌ ওয়ালী উল্লাহর সুযোগ্য পুত্র শাহ্‌ আবদুল আজীজ বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি, মুক্তবুদ্ধি ও ধর্মীয় উদারনীতির শিক্ষা দিয়ে সমাজ সংস্কারের দিকে জোর দেন। তার শিক্ষায় অনুপ্রাণিত সৈয়দ আহমদ যে ‘তারগীব- ই- মুহম্মদীয়া’ নামক সংস্কার আন্দোলন আরম্ভ করেন, তার বিস্তারিত কর্মসূচী মেলে ‘সিরাতুল মুসতাকিম’ নামক পুস্তকে; সৈয়দ আহমদ প্রথমে মুরিদদের বহুল প্রচলিত চারটি প্রধান সূফী তরিকায়- চিশতিয়া, কাদেরীয়া, নকশবন্দিয়া ও সোহরাওইয়ার্দীয়া- দীক্ষা দিয়ে পরে মুহম্মদি তরিকায় দিক্ষা দিতেন। তার তরিকার অনুসারী লোক এখনও আছে। তিনি ঈমানের দৃঢ়টা সাধনের ও ধর্মাচরনের উপরেই বেশি জোর দিতেন; তার আদর্শিক সংস্কারযোগ্য বিষয়গুলি মোটামুটি এইঃ ঈমানকে দুর্বল করে এমন সব অভ্যাস, যেমন শরীয়তের বিধানকে অবজ্ঞা করা বা উপেক্ষা করা, পৌত্তলিক ও নাস্তিকসুলভ কথাবার্তা বা আচরণের প্রশ্রয়, আল্লাহ ও নবী সম্বন্ধে অসম্মানজনক কথা বার্তা, কর্মফলের জন্য মানুষ ও আল্লাহর দায়িত্ব নিয়ে অর্থহিন চুলচেরা বিতর্ক, কদাচারী শিথিলবিশ্বাসী সুফীদের প্রভাবে পীরপুজা, কবরপূজা, শিরণী দেওয়া প্রভৃতি আচরন যা থেকে ঈমানের ক্ষতি ও অপব্যায় হয় প্রচুর। সামাজিক কুসংস্কারেরও উল্লেখ আছে। বিয়েশাদী, নামকরন, খাতনা প্রভৃতি পারিবারিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে উৎসব আরম্বর করা অনাবশ্যক- কারণ সেসবেও অর্থের অপব্যায় হয়। দাফন উপলক্ষে নানারকম ব্যায়বহুল ও নিরর্থক অনুষ্ঠান। বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধাচরণ- এ কুপ্রথা রদ করতে সৈয়দ আহমদ নিজেই জ্যেষ্ঠভ্রাতার বিধবাকে বিবাহ করেছিলেন।

উত্তর ভারতে শরীয়ত বিরুদ্ধ রীতিনীতি মুসলমান সমাজে কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছিল, আল্লামা ইকবালের একটি উক্তি থেকেই তা বোঝা যায়ঃ ‘নিশ্চয়ই আমরা হিন্দুয়ানীতে হিন্দুদের ছাড়িয়ে গেছি। আমরা দুরকম জাতিভেদের কবলে পড়েছি- মজহাবী বিভেদ ও সামাজিক জাতিবিভেদ। আমরা এসব হিন্দুদের থেকে শিক্ষা করেছি, না হয় উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছি। এটিই হচ্ছে একটি নীরব উপায়, যার দ্বারা বিজিত জাতি বিজেতার উপর চরম প্রতিশোধ নেয়’। মনে রাখা ভাল, ইকবাল এ খেদোক্তি করেছিলেন সৈয়দ আহমহের ওফাতের প্রায় ১০০ বছর পরে এবং তার দ্বারা মুসলমান সমাজের সংস্কার সাধনেরও পর। শাহ্‌ আবদুল আজীজ ও তার উপযুক্ত শিষ্য ‘তাগরীব- ই- মুহম্মদীয়া’ আন্দোলনের মারফত ইচ্ছা করেছিলেন, যেসব বেদাত, চালচলন ও আচারনিতি সাধারন মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ লাভ করেছে, সেগুলির মূলোৎপাটন করা ও খাঁটি ইসলামী শিক্ষাদর্শে তাদের উদ্বুদ্ধ করে তোলা। এই আন্দোলনের ফলে বহু লোক ইসলামের সত্যিকার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শরীয়ত বিরুদ্ধ ও কুসংস্কারমূলক অভ্যাস পরিত্যাগ করে। এক সুপরিকল্পিতও উপায়ে সারা পাক- ভারতে এই আন্দোলন বিস্তৃত করা হয় এবং একাজে একদল নিঃস্বার্থ ও অক্লান্তকর্মী নিয়োগ করা হয়।

সৈয়দ আহমদ পাটনায় তার আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল করেন। এখন থেকেই তার খলিফারা পাক- ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে প্রচারকার্য চালাতেন। তার হুকুমে খলিফা মুহম্মদ আলী সর্বপ্রথমে পূর্ব বাংলায় জেহাদী আন্দোলন শুরু করেন। তখন বাংলাদেশের অনেকে নামেমাত্র মুসলমান থাকায় তাদের খাওয়া- পরায়, সামাজিক ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে তাদেরকে মুসলমান হিসেবে সনাক্ত করাই কঠিন ছিল। মুহম্মদ আলী তাদের ইসলামী বিধি ব্যাবস্থা শেখাতে লাগলেন এবং তাদের হিন্দুয়ানী আচার ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম চালাতে লাগলেন। ১৮২০ সালে সৈয়দ আহমদের চারজন খাস খলিফার অন্যতম মওলবী বিলায়েত আলী এদেশ হিজরত করেন এবং জেহাদী আন্দোলনের বিশেষ অনুশাসন ও শিক্ষাগুলি এদেশে প্রয়োগ করতে জোর দেন। নামাজে সুরা ফাতেহা পাঠ শেষে প্রত্যেকবার উপর দিকে হাত তোলার ও উচ্চকণ্ঠে ‘আমীন’ বলবার বিধি তিনিই এদেশে প্রবর্তন করেন। তার শিক্ষার সারমর্ম ছিল, কোরআনের পরেই হাদিস মুসলমানের একমাত্র অনুসরনীয় ব্যাবস্থাপত্র। এদেশে জেহাদী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় প্রচারক ছিলেন মওলবী ইনায়েত আলী, মওলানা কেরামত আলী, মওলানা জয়নুল আবেদীন ও মওলানা সৈয়দ মুহম্মদ জামাল- উল- লায়ল আরাবী। ইনায়েত আলীর কর্মক্ষেত্র ছিল মালদহ, রাজশাহী, বগুরা,নদীয়া ও ফরিদপুর জিলাগুলিতে। জয়নুল আবেদীনের কর্মক্ষেত্র ছিল ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা ও সিলেট জিলায়। তাদের শিক্ষার মহিমায় পূর্ব ও উত্তর বাংলার অনেক অনেক মুসলমান জেহাদ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠে এবং পাক্কা শরীয়ত অনুসারী ইসলাম আমল করতে শেখে। চাষি ও মধ্যবিত্ত লোকদের মধ্যে তাদের প্রচারকার্য বেশ ব্যাপকভাবেই হয়েছিল। তাদের প্রচারণায় বাংলার মুসলমান যেন হারানো সম্বিৎ ফিরে পেল এবং কত বড় তাহজীব ও তমদ্দুনের তারা অধিকারী তাই সম্যক উপলব্ধি করে তাদের ধর্মীয় জোশ শতগুণে বর্ধিত হয়েছিল।

উনিশ শতকে যে তিনজন মহাপ্রাণ বাংলাদেশের মুসলমানের জীবনের সামগ্রিকভাবে সংস্কারসাধন করতে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, তাদের নাম হাজী শরীয়ত উল্লাহ্‌, শহীদ তিতুমীর ও মওলানা কেরামত আলী। তাদের প্রত্যেকেরই কর্মভূমি ছিল নিরক্ষর পল্লীবাসী কৃষক ও কারিগর মুসলমান সমাজে- তিতুমীরের চব্বিশ পরগণা, নদীয়া, যশোর ও ফরিদপুরে এবং দুজনের সমগ্র বাংলায়। তাদের প্রচেষ্টায় ইসলামের পুনরুজ্জীবনের কাহিনী বিস্ময়কর ও শিক্ষাপ্রদ। একদিকে ধর্মীয় সংস্কার করে তারা ইসলামের আদি সূচিতা পুননির্ণয় করেন; অন্যদিকে রাজনৈতিক ভূমিকায় তিতুমীর ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জেহাদ করেন। তাদের অর্থনৈতিক আন্দোলনও মুসলমানদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি সাধিত হয়।

এই ধর্মীয় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে হলে আমাদের ইতিহাসের আরও পশ্চাতে তাকাতে হবে। বাংলা যখন মুঘল বাদশাহীর সুবাহ হিসেবে ঢাকার নওয়াব নাজিমের শাসনাধীনে ছিল [১৬১২—১৭০৪ খৃঃ] তখন তাদের নিয়োজিত কাজী মুফতী ও মুহতাসিব নামাংকিত বিশেষ কর্মচারীরা থাকতেন। তাদের বিশেষ কর্তব্য ছিল, মুসলমানের ধর্মীয় জীবন শরীয়ত মোতাবেক নিয়ন্ত্রন করা এবং তাদের শিক্ষা ও কালচার উন্নয়ন করা। তাদের অধীনে পল্লী অঞ্চলে নায়েব থাকতেন; তারা মুসলমানের ধর্মসম্পর্কিত সমস্যার সমাধান করতেন, বিয়ে- শাদী পড়াতেন, জানাযা, জুম্মার নামাজের ইমামতি করতেন। পলাশির যুদ্ধর পর এসব পদ বিলুপ্ত হয়ে যায় ইংরেজ শাসনামলে। ম্যারেজ- রেজিস্টার নামে কাযীদের অস্তিত্ব রাখা হল, কিন্তু সমাজের উপর আর তাদের পূর্বের মত কর্তৃত্ব রইল না। পীর, ফকীর, খন্দকার নামে মুসলমান নেতাদের প্রাদুর্ভাব ঘটলো, কিন্তু তাদের প্রভাব রইল নিজ নিজ শিষ্যদের মধ্যেই সীমিত। আরও দুঃখের কথা, তারা আপন আপন ডালরুটি রোজগারেই ব্যাস্ত থাকলেন, মুসলমান জনগণের ধর্মীয় জীবনের খবরদারী করার মহৎ কর্তব্যটা বিস্মৃত হলেন। তার ফল এই হল যে, মুসলমান ধর্মীয় জীবনে বহু বেদআতের অনুপ্রবেশ ঘটলো, এবং আরও আক্ষেপের কথা হল যে, এসব লোক স্বার্থান্ধ হয়ে এসব বেদআত প্রশ্রয় দিতে থাকেন।

এরূপ বেদনাদায়ক পরিস্থিতি ছিল পলাশীর যুদ্ধের পর ষাট বছরেরও উপর। বাংলার মুসলমানরা বিপথগামী হল, প্রতিবেশী হিন্দুর প্রভাবে ও অনুকরণে বহু কুসংস্কার ও বেদআত এর তারা অনুসারী হয়ে পড়ল। বহু হিন্দুধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সামাজিক- অসামাজিক আচার প্রচ্ছন্নভাবে মুসলমানদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে এবং কালক্রমে তাদের ধর্মের অঙ্গীভূত হয়ে উঠে। অনেক নওমুসলমান দুর্বলতা ও অশিক্ষার কারণে পুর্বের দেবদেবীর পূজায় ও কুসংস্কার পালনে অভ্যস্ত থাকে। আবার অনেকে সুবিধা মতো সেগুলিকে ইসলামী পোশাক পড়িয়ে ধর্মীয় মর্যাদাশক্তি করে ফেলে। মা বরকত, ওলা বিবি, শীতলাবিবির পূজা দেয়া, সিন্নি দেওয়া [হরিলুটের মত], তবররুক বিতরন করা মুসলমান সমাজে প্রচলিত হয়ে যাই। কোরআনের আয়াত লিখিত কিংবা হিন্দুধর্মের মন্ত্রলিখিত তাবিজ পরার প্রথা, কলেরা বসন্ত মহামারীর সময় কিন্দুর অনুকরণে মাটির পাত্রে এসব আয়াত বা মন্ত্র লিখে বাড়ির দরজায় টাঙানো, তেলপরা, নুনপরা, কালিজিরাপরা প্রভৃতি খাওয়ার রেওয়াজ মুসলমানদের মধ্যে বেশ চলিত হয়ে উঠে।

এসব ইসলাম বিরুদ্ধ প্রথা ও আচারের বিরুদ্ধে প্রথমে প্রবল আপত্তি হয়ে উঠে হাজী শরীয়তুল্লাহর কণ্ঠে। ফরিদপুর জিলার এক দরিদ্র অখ্যাত কুলে জন্মগ্রহণ করেও তিনি বাল্যকালেই তিনি সুদূর মক্কায় গমন করেন এবং ২০ বছর সেখানে বসবাস করে আরবী ভাষা, তফসীর, কাদিস প ফিকাহ পাঠ করে একজন মশহুর মুহাদ্দিস হিসেবে পরিচিত হন। ১৮১৮ সালে নিজের গ্রামে ফিরে এসে তিনি সমাজ সংস্কারে আত্মনিয়োগ করেন। প্রথমে স্বযিলা তার প্রচারক্ষেত্র ছিল, পরে ঢাকা জিলায় নয়াবাড়িতে তার কর্মকেন্দ্র স্থাপিত হয়। ক্রমে ক্রমে পাবনা, ময়মনসিংহ, নোয়াখালি, বরিশাল প্রভৃতি জিলার কৃষক এবং হস্ত ও কুটির শিল্প সমাজে তার শিক্ষা প্রচারিত হতে থাকে। হিন্দু জমিদারেরা তার অর্থনৈতিক আন্দোলনে ভীত হয়ে তাকে বাধা দিতে থাকে কিন্তু আপন কর্তব্যে নিষ্ঠা ও সংকল্পে দৃঢ়টার জোরে তিনি এসব বাধা তুচ্ছ করে সংস্কার কর্মে জীবনপাত করেন। তার প্রধান শিক্ষা ছিল, ‘ফরয’ অর্থাৎ অবশ্যপালনীয় ধর্মানুস্থানের অনুগামী করা। এজন্য তার শিষ্যদের বলা হয় ‘ফারায়েযী’। তিনি পীর মুরীদদের বদলে অস্থাদ- সাগরেদ সম্মন্ধ প্রবর্তন করেন ও ‘বয়েত’ গ্রহণ নিষিদ্ধ করেন। তার আর একটি শিক্ষা, এদেশ দারুল হরব হয়ে যাওয়ায় এখানে জুম্মার ও দুই ঈদের নামাজ অসিদ্ধ। মুহররম মাসে তাজিয়া উৎসব করা, গীতবাদ্য করা, বিবাহাদি উৎসবে অনর্থক অর্থব্যায় করারও তিনি বিরুদ্ধ ছিলেন। তার প্রধান শিক্ষা ছিল, ‘তওবাহ’ অর্থাৎ সর্বপ্রকার পাপাচার ও বেদআত থেকে নিবৃত্তিই প্রধান কাম্য।

তার পুত্র দুদু মিয়া ওরফে মুহম্মদ মুহসীন পিতার আরদ্ধ কার্য আরও বলিষ্ঠ ও সংঘবদ্ধভাবে আরম্ভ করেন। তিনিও বাল্যকালে কিছুকাল মক্কায় বাস করে আরবী ভাষা, তফসীর, হাদিস, ফিকাহ প্রভৃতি ভাল করে শিক্ষা করেন। তার সংগঠন শক্তি এরূপ ছিল যে, তার আদেশ পালনে ৬০ হাজার কর্মী সর্বদা প্রস্তুত থাকতো। তার আন্দোলন প্রধানত ছিল অর্থনৈতিক- অত্যাচারী জমিদার, নীলকর ও মহাজনদের বিরুদ্ধে। হিন্দু জমিদার ও নীলকররা তার অনুগামী মুসলমানদের উপর যে অকথ্য নির্যাতন চালাত, তার তুলনা নেই। দরিদ্র কৃষকদের দাড়িতে দাড়িতে বেধে নাকে মরিচের গুড়া দেয়া হত; শ্যামচাদের প্রহারে জর্জরিত করত। দাড়ি রাখার জন্য, শাদী, খাতনার উতসবকালে পৃথক কর আদায় করতে হত। কিন্তু মুসলমান রায়তকে দুর্গা, কালী, সরস্বতী পূজা উপলক্ষে চাদা দিতে বাধ্য করা ও জমিদারীর মধ্যে গো- কোরবানি নিষিদ্ধ করার মত অত্যাচার ছিল দুদু মিয়ার চোখে একেবারে অসহ্য। তিনি সব অন্যায় ও ইস্লামবিরুদ্ধ কর আদায় দেওয়া একেবারে নিষিদ্ধ করেন।

তিতুমীরের ভূমিকা প্রধানত সশস্ত্র বিদ্রোহ হলেও তার পটভূমিকা ছিল সামাজসংস্কার। তিনিও মক্কায় যান এবং সেখানে সৈয়দ আহমদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। দেশে প্রত্যাগমন করে তিনি সংস্কারকর্মে তিনি প্রথম আত্মনিয়োগ করেন এবং তার শিষ্যদের দাড়ি রাখতে ও শরীয়ত পাওবন্দ হতে শিক্ষা দেন। রায়তদের অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্টে ব্যাথিত হয়ে তিনি জমিদারদের বিরুদ্ধে দাড়ান। পুর্নার জমিদার কৃষ্ণদেব রায় দাড়ি রাখার জন্য আড়াই টাকা ধার্য করেন, তখন জমিদারদের সঙ্গে তার বিরোধ বাধে। সে বিরোধ পরে নীলকরদের ও সরকারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে রূপ নেয়। তার শিষ্যদের বলা হত মওলবী বা হেদায়াতী।

মওলানা কেরামত আলীর জন্ম জৌনপুরে এবং তিনি ছিলেন শাহ্‌ আবদুল আজীজের প্রত্যক্ষ ছাত্র। সৈয়দ আহমদের একনিষ্ঠ অনুগামী হিসেবে তিনি শিখদের বিরুদ্ধে জেহাদে যোগ দেন। বালাকোটের যুদ্ধের পর কেরামত আলী বাংলাদেশে হিজরত করেন ১৮৩৫ সালে এবং সেখানেই বাকি জীবন সংস্কারকর্মে অতিবাহিত করেন। রংপুরে তার কর্মকেন্দ্র স্থাপিত হয়, পূর্ববাংলা হয় তার কর্মক্কখেত্র। উল্লেখযোগ্য যে, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তার বিরোধ ছিলনা এবং দ্ব্যার্থহীনভাবে তিনি ফতোয়া দিতেন, পাক- ভারত মুসলমানের পক্ষে দারুল ইসলাম। কেরামত আলী ছিলেন শুদ্ধচিত্ত সাধু মানুষ, ইসলামী শাস্ত্রে অগাধ পন্ডিত। তার সংস্কার কর্ম ছিল শান্ত ও নির্বিরোধি। ধর্মীয় সংস্কারই ছিল তার একমাত্র ভূমিকা এ সাধনায় তার কর্মপন্থা ছিল দ্বিমুখীঃ প্রথম, পূর্ববাংলার মুসলমান সমাজে যেসব বেদআত ঢুকে পড়েছে, সেগুলি নিঃশেষে নির্মূল করা, এজন্য তিনি ‘রদ্দেবিদা’ নামে পুস্তিকা রচনা করেন। দ্বিতীয়, বাউল প্রভৃতি যেসব সম্প্রদায় ইসলাম থেকে দূরে সরে গেছে, সেগুলিকে সুশিক্ষা দিয়ে সংশোধন করে পুনরায় ইসলামের গণ্ডিতে আনায়ন করা; এজন্য তিনি ‘হিদায়াত- অল- রাফিদীন’ নামে একখানি গ্রন্থ রচনা করেন। মওলানা সাহেব দিবারাত্র পূর্ববাংলার গ্রামে গ্রামে ফিরেছেন প্রতিটি মুসলমানকে হিদায়েত করার দুর্বার বাসনা নিয়ে। চল্লিশ বছর তিনি নিরলসভাবে এ মহান ব্রতে অবিচলিত ছিলেন। তিনি ‘ওহাবী’ ছিলেননা, যদিও তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সৈয়দ আহমদ একজন মুজাদ্দিদ ছিলেন। এই অজাতশত্রু নিরভিমানী ন্যায়দর্শী উদার মহৎপ্রাণ উনবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের মুসলমানের ভাগ্যে ছিলেন আল্লাহর নিয়ামত স্বরূপ।

উনবিংশ শতাব্দীতে পাক- ভারতের মুসলমানদের মধ্যে আন্দোলনের যে জোয়ার এসেছিলো উপরে তার যথাযথ রূপ বর্ণনার প্রয়াস করা হয়েছে। লক্ষণীয় যে, সশস্ত্র আন্দোলনটাকে ‘জেহাদী- আন্দোলন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; কারণ এ আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, শিখ ও ব্রিটিশ রাজশক্তির উচ্ছেদ সাধন করে পাক- ভারতকে দারুল ইসলাম রূপে কায়েম করা। ধর্মরাস্ট্র হিসেবে স্থাপিত না হলে ইসলামী ঈমান ও আমান প্রতিষ্ঠিত করা যায় না এবং ধর্মীয় সংস্কার সাধনও সম্ভব নয়- এটাই ছিলে সেকালীন মুসলমান নেতাদের বিশ্বাস আর ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার কর্মে তারা কায়েমী স্বার্থভোজীদেরও সঙ্গে সংঘাতে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন অর্থনৈতিক কারণে। এজন্য এ আন্দোলন রাজনৈতিক, সামাজিক ও আর্থিক রূপের সংমিশ্রণ ঘটেছিলো। যদিও সামগ্রিক ভাবে এ আন্দোলনকে ‘জেহাদী আন্দোলন’ হিসেবে চিহ্নিত করাই প্রশস্ত।

কিন্তু নেহাত মতলববাজিতে সুবিধার জন্য এ আন্দোলনকে ‘ওহাবী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এবং বিদেশী শাসক ইংরেজরা মুসলমানদের সশস্ত্র আন্দোলনকে লোকচক্ষে হেয় করবার হীন মনোবৃত্তিতে ‘ওহাবী’ নামাংকৃত করেছেন। আসলে হেজাজে আঠারো শতকে মুহম্মদ বিন আবদুল ওহহাব যে পিউরাটানিকা বা অতিনৈতিক আন্দোলনের সূত্রপাত করেন, তার সঙ্গে পাক- ভারতীয় মুসলমানদের আন্দোলনের অনেক পার্থক্য রয়েছে। পাক- ভারতীয় আন্দোলনকারীরা কখনও নিজেদের ‘ওহাবীদের’ সঙ্গে তুলনা করেননি। এ দেশী আন্দোলনের জনক হাজী শাহ্‌ ওইয়ালীউল্লাহ, শাহ্‌ আবদুল আজোজ, সৈয়দ আহমদ শহীদ, হাজী শরীউতুল্লাহ বা তিতুমীর কেউই আবদুল ওহহাবের বা তার অনুগামীদের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসেনি।

ইসলামের চারটি মজহাবের যেকোনো একটির অনুসারী হওয়া সুন্নী মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু আবদুল ওহহা্ব ইমাম হামবলের অনুসারী হলেও তার অনুগামীরা বরং কুরআন- হাদিসেরই একান্ত অনুসারী। পাক- ভারতীয় জেহাদিরা নিষ্ঠার সঙ্গে মজহাব পন্থী ছিলেন। পীর- ফকিরী, কবর- মাজার জিয়ারতের বিরুদ্ধাচরণ করা আরবী ওহাব- পন্থীদের প্রধান নীতি। এগুলিকে তারা পুত্তলিকা জ্ঞান করে এবং বিশ্বাসে তারা ১৮০৪ সালে মদিনায় বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদের মাজার পর্যন্ত ভেঙে ফেলেছিল। এ দেশীয় জেহাদীরা কখনও কবর মাজার জিয়ারতের বিরুদ্ধতা করেনি। তাছারা বাংলাদেশে যে সংস্কারধর্মী আন্দোলন মুসলমানদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল, তার সঙ্গে হেজাযী আন্দোলনের কোনও সামঞ্জস্য ছিলনা। হয়তো আরবী আন্দোলনের সঙ্গে পাক- ভারতীয় জেহাদীদের ধর্মীয় সংস্কার প্রচেষ্টায় কিছুটা মিল ছিল, কিন্তু সেহেতু জেহাদী আন্দোলনকে ‘ওহাবী’ হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। জেহাদী আন্দোলনকে ইংরেজরা ‘ওহাবী’ বলে আখ্যায়িত করেছে পাক- ভারতীয় মুসলমানদের সহানিভূতি নষ্ট করে তাদের প্রতি বিতৃষ্ণা ও বিদ্বেষ জাগাবার দুরভিসন্ধিমূলে। এবং ইংরেজরা এ প্রয়াসে এক শ্রেণীর মোল্লা- মওলবীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার করেছিল প্রচারণা কার্যে। কিন্তু দুটি আন্দোলনকে একধর্মি বলে চিহ্নিত করা কখনও যুক্তিনির্ভর বা সমীচীন নয়।

উপরোক্ত মতামতের পোষকতায় প্রখ্যাত, ঐতিহাসিক রমেশ্চন্দ্র মজুমদারের এ উক্তিটি উদ্ধৃতির যোগ্যঃ

“আরব দেশে ওহাবী আন্দোলনের উদ্ভব হয়। কিন্তু ভারতবর্ষের যে অনুরূপ আন্দোলন হয়, তাহার সহিত ওহাবীদের কোন সম্মন্ধ ছিল এমন কোন প্রমাণ নাই। মনে রাখতে হবে যে, রায়বেরেলীর সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী যখন ভারতে এ আন্দোলনের প্রবর্তন করেন তখনও তিনি আরব দেশে যাননি। তাহার দল অনেকটা দৃঢ়প্রতিস্থ হইবার পর তিনি মক্কা গমন করেন। ভারতে তিনি এক বিরাট সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তাহা প্রথমে শিখ ও পরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যে তুমুল সংগ্রাম করে, তাহাই এ আন্দোলনের প্রধান কীর্তি। ইহার সহিত ওহাবী মতের কোনও সম্মন্ধ নাই। ধর্মমূলক হইলেও ইহার সহিত বিনষ্ট মুসলমান রাজশক্তি উদ্ধারের আশা- আকাঙ্ক্ষা ছিল না- তাহা বলা যায়না। সুতরাং এই আন্দোলনকে এক হিসেবে ব্রিটিশ রাজত্বে মুসলমানদের প্রথম মুক্তিসংগ্রাম বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে”।

আযাদীর অমর মুজাহিদঃ সৈয়দ আহমদ শহীদ

 [১২০১- ১২৪৬ হিঃ ১৭৮৬- ১৮৩১ খ্রীঃ]

দুশো বৎসরের ঘৃণ্য বিদেশী গোলামির বিষময় ফলে এদেশীয় লোকদের দাস- মনোভাব এতোখানি চরমে উঠে যে, তারা মহৎ ব্যাক্তি ও মহৎ কাজ সম্পর্কে একদম বিরুতসাহ ও নির্বিকার হয়ে পড়ে। আর এই মনোভাব বেশি লক্ষ্য করা যায় সৈয়দ আহমদ শহীদ সম্পর্কে; অথচ এক হিসেবে তিনিই ভারতে সত্যিকারভাবে স্বাধীন ইসলামী গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার জন্য নিজের জীবনও দান করেন।

সারা পাক- ভারতে যেসব আলেম ও ধর্মনেতারা আবির্ভাব হয়েছে, তাদের মধ্যে কারও প্রকাশ্যে এই ঘোষণা দেওয়ার সৎসাহস ছিল না যে, বিদেশীর শাসনাধীন ভারত হিজরত করাই প্রত্যেক খাঁটি মুসলমানের পক্ষে অবশ্য কর্তব্য। দিল্লীর শাহ্‌ আবদুল আযীযই উনিশ শতকের প্রথম ভাগে প্রকাশ্যে ফতোয়া জারী করে এই অভিমত প্রকাশ করেন।

স্বৈরাচারীর প্রভাব থেকে মুসলিম- ভারতকে মুক্ত করার আকুল আগ্রহে শাহ্‌ আবদুল আযীয প্রবর্তন করেন মশহুর সমাজ সংস্কার আন্দোলন ‘তাগরিব- ই- মুহম্মদীয়া’। এর উদ্দেশ্য ছিল, যেসব ইসলাম বিরুদ্ধ কুসংস্কার, চাল- চলন ও রীতিনীতি সাধারন মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশালাভ করেছে, সেগুলির মূলোৎপাটন করা ও খাঁটি ইসলামী শিক্ষাদর্শে তাদের উদ্বুদ্ধ করা। এই আন্দোলনের ফলেই বহু লোক ইসলামের সত্যিকার ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নানা রকম বেদআত পরিত্যাগ করতে হবে। এক সুপরিকল্পিত নিয়মে শাহ্‌ সাহেব সারা ভারতে এই আন্দোলন শুরু করেন, এবং এ কাজে একদল নিঃস্বার্থ ও অক্লান্তকর্মা লোক নিয়োগ করেন। কালক্রমে শীঘ্রই ‘তাগরিব- ই- মুহম্মদীয়া’ আন্দোলন স্বাভাবিকভাবে অত্যাচারী শিখ ও ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আজাদীর আন্দোলনে পরিণত হয়।

কিন্তু জেহাদ আন্দোলনকে লোকপ্রিয় করে তুলতে এবং ব্যাস্তভাবে জেহাদী অভিযান পরিচালিত করতে সবচেয়ে বেশি উৎসাহী ছিলেন শাহ্‌ আবদুল আযীযের ভাইপো ইসমাইল শহীদ ও তার মুর্শেদ সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী। সৈয়দ আহমদও শাহ্‌ আবদুল আযীযের মুরীদ ছিলেন।

১৭৮৬ খৃস্টাব্দে এক মশহুর সূফী পরিবারে সৈয়দ আহমদের জন্ম হয়। তার পূর্বপুরুষ সৈয়দ ইবনউল্লাহ রায়বেরেলীর প্রান্তভুমে বাদশাহ আওরঙজেব আলমগীরের সময় বাসস্থান কায়েম করেন। সেখানে তিনি হযরত ইব্রাহীমের মত নিজের বংশের জন্য একটা মসজিদও নির্মাণ করেন। তিনি একজন বেশ হৃষ্টপুষ্ট স্বাস্থ্যবান বালক ছিলেন; তার দৈহিক শক্তি ও মনোবল ছিল অসাধারণ। কিন্তু লেখাপড়ায় তার বিশেষ মনোযোগ ছিলনা, তার দরুন তার পিতার চিন্তার অন্ত ছিলনা। তার কৈশোরে আশপাশের গ্রামে কিংবা সায় নদীতীরে সমবয়সীদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন, এবং কপাটি খেলা, মল্লক্রীড়া, সাঁতার ও ঘোড়দৌড় এ প্রচুর আনন্দ পেতেন। কিন্তু খেলাধূলায় যেমন তার তীব্র নেশা ছিল, লোকসেবায়েও তার তেমনি প্রচুর আগ্রহ ছিল। গরীব গ্রামবাসীদের ছোটখাটো কাজ করে দিতে পারলে তার আনন্দের সীমা থাকতনা। অথচ তার স্বভাবের দরুন মুরব্বিদের মাথাব্যাথার অন্ত ছিলনা, কারণ, তার মত একজন আশরাফুল কুলোদ্ভবের এসব কাজ করা মর্যাদার হানিকর ছিল। কিন্তু এসব তুচ্ছ পারিবারিক রুচি ও নীতির কাছে নতি স্বীকার করা তার স্বভাব বিরুদ্ধ ছিল। তিনি বেপরয়াভাবে লোক- সেবায় ও সমাজ উন্নয়ন কাজে লিপ্ত ছিলেন আবার খেলাধুলায়েও মশগুল থাকতেন। এভাবে তার জীবনের ১৭ বছর কেটে গেল, তিনি বেশ ব্যাক্তিত্বশালী ও সংবেদনশীল তরুন হয়ে উঠেন। কিন্তু তার কেতাবী শিক্ষা লাভ কিছুই হল না।

যখন তার বয়স ১৭ বছর, তখন তার পিতার মৃত্যু হয়। তার দু’তিন বছর পর কয়েকজন বন্ধু নিয়ে এই গেঁয়ো তরুন সভ্যতাভিমানী লক্ষনউ শহরে উপস্থিত হলেন দুনিয়ার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার জন্য এবং সম্ভব হলে কোন চাকুরী জোগাড়ের উদ্দেশ্যে। সে সময়টা ছিল খুব টানাটানি ও অভাবে। তিনি তার পিতার জনৈক মুরীদের নিকট আশ্রয় পেলেন। কিন্রু শহরের জীবনের উচ্ছৃঙ্খলা ও অসারতায় তার বিতৃষ্ণা জন্মে গেল। তিনি শীঘ্রই এই শহর ত্যাগ করে দিল্লী চলে গেলেন। এভাবে দুনিয়াবী শান- শওকতের তৎকালীন লীলানিকেতন লখনউ শহর, তার থেকেও পিছন ফিরলেন।

অনেকখানি রাস্তা পায়ে হেটে ক্লান্ত হয়ে তিনি শাহ্‌ আবদুল আযীযের দরবারে এসে জোর গলায় জানালেন- ‘আসসালামু আলায়কুম’। ২০ বছরের যুবকের মুখে এই বলিষ্ঠ সম্ভাষণ ‘আদাব ও তসলিমাত’ অভ্যস্ত শহরে ভদ্রশ্রেণীর কানে খুবীই অদ্ভুত শোনাল। কিন্তু তার নিরভিমান সারল্য সহজ ও ব্যক্তিত্বশালী চেহারা ও গভীর দৃষ্টিতে ‘শেখুল হিন্দ’ মুগ্ধ হলেন এবং সহজেই অনুধাবন করলেন যে, তার নতুন শিষ্য পালিশহীন হীরার একটি টুকরা।

উর্দু ভাষায় কোরআন শরীফের প্রথম তর্জমাকারী আবদুল কাদি তখন আকবরী মসজিদের মশহুর মাদ্রাসায় অধ্যাপনা করতেন। মসজিদের বহির্দেশে বহু কুটুরীতে অবস্থান করে শাহ্‌ আবদুল কাদিরের নিকট বিদ্যাশিক্ষা আরম্ভ করেন। কিন্তু তাসাউফ তত্ত্বে তাকে শিক্ষা দেয়ার ভার গ্রহণ করলেন খোদ শাহ্‌ আবদুল আযীয সাহেব।

মাত্র দুই বছরের সাধনায় তিনি ইসলাম জগতের অসামান্য মনীষা হিসেবে বিকশিত হয়ে উঠলেন। এই সময়ের একটি দৃষ্টান্তে তার আধ্যাতিক গুরু লক্ষ্য করলেন যে, ইসলামের মৌলিক শিক্ষা গ্রহনে তার পরম জ্ঞান অসাধারণ। সফী সাধনানুযায়ী শাহ্‌ আবদুল আযীয তার মুরীদকে শিক্ষা দিলেন যে, পীর মুর্শেদের চিন্তায় মনের এতোখানি একাগ্রতা আনতে হবে যে, তার ব্যাক্তিত্ত্বের মধ্যেই নিজেকে বিলীন করে দিতে হবে। তিনি আপত্তি তুলে প্রমাণ চাইলেন যে, এ পদ্ধতি কেন পৌত্তলিকতার পর্যায়ে পরবেনা? শাহ্‌ সাহেব তার সাধু সন্দেহের মুক্ত প্রকাশে ও বিষয়টার তাত্ত্বিক সূক্ষজ্ঞানে বিস্ময় মুগ্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেলেন। শীঘ্রই শাহ্‌ আবদুল হক প্রকাশ্যে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, সৈয়দ আহমদের কেতাবী শিক্ষার প্রয়োজন নেই, কারণ আল্লাহ তাকে এতোখানি পরম জ্ঞান দান করেছেন যে, কেতাবী শিক্ষা তার কাছে তুচ্ছ ব্যাপার। এরপর থেকে তাঁকে অধ্যয়ন করতে না দিয়ে স্বাধীন এবাদত- বন্দেগীতে মশগুল থাকতে দেয়া হয়। কথিত আছে যে, এই সময় সৈয়দ আহমদ স্বপ্ন ও অন্য উপায়ে তার উপর আল্লাহর অপার করুণার যেসব বাস্তব চিহ্ন পান, সে অন্য কোন দরবেশের পক্ষে এত অল্প সাধনায় লাভ করা সম্ভব হয়নি।

অতঃপর ১৮০৮ সালে সৈয়দ আহমদ মাতৃভূমি রায়বেরেলীতে ফিরে আসেন ও জোহরা বিবিকে শাদী করেন। পর বছর তার একটি কন্যা সন্তান জন্ম হয়। প্রায় দু বছর গৃহবাস করে তিনি দিল্লীতে ফিরে যান। কিন্তু সেখানে বেশিদিন না কাটিয়ে তিনি মধ্য ভারতে টংক গমন করেন ও নওয়াব আমীর খাঁর অধীনে সামরিক বিভাগে চাকরি গ্রহণ করেন। আল্লাহর পথে মুজাহিদ ও সংস্কারক হতে হলে উপযুক্ত সামরিক শিক্ষালাভের দরকারও তার ছিল।

নওয়াব আলী খা তখন ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। এবং তৎকালীন ডামাডোলের সময় একটা বিশিষ্ট স্থানও অধিকার করেছিলেন। সে দরুন সৈয়দ আহমদের আশা হল যে, তাঁকে দিয়ে ইসলামের কাজ করানটা অনেক সহজ হবে। অতএব, সৈয়দ আহমদ নওয়াব সাহেবের অধীনে সাময়িকভাবে সামরিক কাজে নিযুক্ত হলেন ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কাজের ভার পেলেন। তাছাড়া তিনি নওয়াবের বিশ্বাসও অর্জন করেন এবং খাস পরামর্শদাতা হিসেবে তার পাশে পাশে থাকলেন। এভাবে প্রায় ৬ বছর তিনি বিশ্বস্তভাবে নওয়াবের সেবা করলেন। কিন্তু নওয়াব সাহেব যখন মধুপুর আক্রমণের সুবিধার্থে ইংরেজের সাহায্য গ্রহনে লালায়িত হলেন, তখন সৈয়দ আহমদেরও টংকে থাকা দুষ্কর হয়ে উঠলো। তিনি বার বার নওয়াব সাহেবকে বোঝাতে চাইলেন যে, একবার ইংরেজের অর্থ গ্রহণ করলে তার পক্ষে আর তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারন করা অসম্ভব হয়ে উঠবে। কিন্তু তিনি দেখলেন যে, ইংরেজের বিপুল অর্থের প্রলোভন ত্যাগ করা নওয়াবের পক্ষে সুকঠিন। সুতরাং তিনি নীরবে দিল্লী ফিরে গেলেন। কিন্তু তার হেফাজতে ও শিক্ষাধীনে ন্যস্ত শাহাজাদাকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন।

১৮১৮ সালে মে মাসে সৈয়দ আহমদের তৃতীয় বার আগমন এক গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায়। তখন তিনি আধ্যাতিক সাধনামর্গের শিখরে উঠেছেন। তার প্রস্তুতির সময় শেষ হয়ে এখন গঠনমূলক কাজের পালা শুরু হয়েছে। আগের মত তখনও তিনি আকবরী মসজিদের কুটুরীতেই থাকতেন। সেখানেই হাজার হাজার লোক ভিড় জমাতো তার উপদেশ শুনতে ও সঠিক পথের অনুবর্তী হতে। তার আধ্যাতিক সাফল্যের কামালিয়াতের কাহিনী নানামুখে শহরময় ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু শাহ্‌ আবদুল আযীয ও শাহ্‌ আবদুল কাদিরের মত মহৎ ব্যাক্তির সামনে সাধারন লোক তাঁকে গ্রহণ করতে কিছুটা দ্বিধাবোধ করল।

তারপর একদিন দেখা গেল শাহ্‌ আবদুল আযীযের জামাতা শাহ্‌ আবদুল হাই ও ভাইপো শাহ্‌ ইসমাইল তার পেছনে নামায পড়ছেন। তার ফল এই দাঁড়ালো যে, লোকে তার শিষ্য হতে ব্যাকুল হয়ে উঠলো এবং তার সেবায় তারা এতোখানি দেহমন সমর্পন করল যে, ১২- ১৩ বছর পরে তার সঙ্গে একই সময়ে বালাকোটের ময়দানে যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দিল [১৮৩১ খৃঃ]।

মশহুর আলেম ও শ্রদ্ধেয় মানুষ হিসেবে আমদুল হাই ও শাহ্‌ ইসমাইলের প্রচুর খ্যাতি ছিল। অতএব, সৈয়দ আহমদকেই মুর্শেদ হিসেবে তারা গ্রহণ করায় সাধারন লোকও তাদের অনুবর্তী হল। তাছাড়া তাদের বংশেই শাহ্‌ আবদুল আযীযের মত সুবিখ্যাত আধ্যাত্মিক গুরু থাকা সত্ত্বেও তারা সৈয়দ আহমদকে গ্রহণ করেছেন দেখে লোকের বিস্ময়ের অবধি রইলো না। এইসব কারণে সারা মধ্যভারতে বিদ্যুৎগতিতে সৈয়দ আহমদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। চারিদিক থেকে জনসাধারন তাঁকে আহ্বান জানাল। তিনি ওস্তাদ আবদুল আযীযের অনুমতি নিয়ে এসব জায়গার সফর করতে আরম্ভ করলেন।

দোয়াব অঞ্চলের গাযিয়াবাদ, সাইমাম মীরাট, মুজফফরপুর, সাহারানপুর, দেওবন্দ প্রভৃতি স্থানে সৈয়দ আহমদ ব্যাপকভাবে সফর করলেন [১৮১৯]। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, তিনি যেখানেই গেছেন, অলৌকিকভাবে জীবনে বিপ্লব এনেছেন। তাদের অন্তরের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। তার উপস্থিতিতেই যেন আল্লাহর আশীস ও করুনা ঝরে পরত। ঘোর পাপীও তওবা করল, পথহারা মানুষ দিশা খুজে পেল এবং সাধুলোক মহত্তর জীবন অনুশীলনে মতুন প্রেরণা লাভ করেছিল। তার জনৈক জীবনীকার আবদুল আহাদ বলেন যে, প্রায় চল্লিশ হাজার হিন্দু ও অন্যান্য বিধর্মী তার শিক্ষার শিক্ষার মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। এই সফরকালেই সৈয়দ আহমদ শিখদের হাতে মুসলমানদের নির্যাতনের কাহিনী প্রথম শুনেন, তার অন্তর মন সমবেদনায় ভরে উঠলো। ১৮১৯ সালে তিনি শেষবারের মত দিল্লীতে ফিরে গেলেন এবং শীঘ্রই স্বদেশে গমন করেন। সেখানে প্রথম তার অগ্রজের মৃত্যিসংবাদ পেলেন।

এখানে তিনি কিছুকাল অতিবাহিত করেন। সেখানে এই খোদাভক্তদের জীবনযাত্রা ছিল আদর্শস্থানীয় এবং দর্শকদের শিক্ষার যোগ্য। দুর্ভিক্ষ প্রপীড়িত অঞ্চলে প্রায় সত্তর- আশি জন লোক সায় নদীর তীরে সৈয়দ বংশের পুরনো মসজিদের চারিধারে নিজ হাতে কুটির তৈরী করে বাস করতেন। সে বছর [১৮১৯ খৃঃ] গ্রীষ্মকালে জোর বৃষ্টি নামলো এবং নদী গুলতে প্রবল প্লাবন এলো। খাবার হয়ে পড়ল দুর্মূল্য ও দুষ্প্রাপ্য। কিন্তু সৈয়দ সাহেব নির্বিকার চিত্তে তার আশিজন খোদাপ্রিয় ও খোদাভক্ত সঙ্গী নিয়ে এবাদত বন্দেগীতে, লোকসেবা ও প্রচারকার্যে দিন রাত ব্যাস্ত থাকলেন। তার তখনকার কর্মব্যাস্ততায় হযরত ‘সারমান- অব দি মাউন্টের’ বিখ্যাত উপদেশাবলীর আক্ষরিক প্রতিপালনই লক্ষ্য করা যায়ঃ তোমার নিজের জীবনে কি খাবে কি পান করবে সে বিষয়ে কোন চিন্তা কর না- এমনকি দেহের চিন্তাও করনা যে, কি পরবে। কিন্তু আল্লাহর প্রেমে রাজ্যের প্রতিষ্ঠা কর তোমার এসবই হবে।

ইসলাম জগতের এতগুলো জ্ঞান- জ্যাতিস্কের যেখানে সমাবেশ ছিল, সেখানে শিক্ষার চর্চা বাদ যেতে পারেনা। সেখানে ছিলেন হুজ্জাতুল ইসলাম মওলানা মুহুম্মদ ইসমাইল- অসীম পান্ডিত্য সত্ত্বেও যিনি আজীবন ছায়ার ন্যায় নীরবে সৈয়দ সাহেবের মত অশিক্ষিত পীরের অনুগামী হতেন; শেখুল- ইসলাম মওলানা আবদুল হাই, কুতব- ই- ওয়াখত মওলানা মুহম্মদ ইউসুফ, শেখুল- মাশারখ হাজী আবদুল রহীম, এবং শেখুল শেখ ও আরও অনেকে। তারা সবাই শিক্ষা ও মর্যাদার মোহ ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় সৈয়দ সাহেবের তল্পীবাহক ও পদানুসারী হয়েছিলেন। এসব মনীষীর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ও খোদ সৈয়দ সাহেবের উদ্দীপনাময় হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতাবলী বাস্তবিকই মন ও আত্নার খোরাক ছিল। সৈয়দ সাহেবের নির্দেশক্রমে মওলানা ইসমাইল কর্তৃক সে সবের অনেকাংশ ‘সিরাত- উল- মুস্তাকিমে’ লেখা হয়েছে। প্রাতঃকালে প্রচারনা, দিবাভাগে কঠোর দৈহিক পরিশ্রম অ সারারাত্রি তহজ্জুদ অ এবাদাতে জাগরন- এসব ছিল এই খোদাভক্তদের দৈনন্দিন সাধারন কর্মসূচি। ইস্লামের খাঁটি গণতন্ত্র নিয়মে তারা মসজিদের মেঝেয় বসে একত্র খানাপিনা করতেন। সৈয়দ সাহেবের সাহচার্যে পূণ্য সঞ্চয় অ আল্লাহর করুনাভিক্ষা ছাড়া তাদের আর কোনও খেয়াল ছিলনা। একই উদ্দেশ্য সাধনে তারা পরস্পরের উপদেশ- নির্দেশঅ অসংকোচে গ্রহণ করতেন। শাহ ইসমাইল অন্যসব মহৎ ব্যাক্তির দুর্বলতাও অসংকোচে দেখিয়ে দিতেন, এমনকি তার পীরকেউ রেহাই দেননি। তিনি অসংকোচে সৈয়দ সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ কলেন যে, তার বংশে বিধবাদের পুনরায় বিবাহ না দেওয়ার শরীয়তী বরখেলাপ রয়ে গেছে। সৈয়দ সাহেব তৎক্ষণাৎ তার মতের যৌক্তিকতা স্বীকার করলেন, এবং তার পরিবারের এই ইসলাম বিরুদ্ধ প্রথা রহিত করতে চেষ্টিত হলেন; আর তার প্রমাণ হিসেবে নিজেই প্রথমে তার জ্যাস্থভ্রাতার বিধবাকে পুনর্বিবাহ করলেন।

সৈয়দ সাহেবের শিক্ষার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্ম থেকে ভণ্ডামি অ জাঁকজমক দূর করা। এবং জীবনের প্রত্যেক স্তরে বিশ্বনবীর সহজ সরল জীবনধারা অনুসরণ করা। ধর্মবিশ্বাসে তিনি ছিলেন তওহীদপন্থী, আল্লাহর একত্বে অকুণ্ঠ বিশ্বাসী- সবরকম শিরক যেমন পীর আওলিয়ার বিশ্বাস একেবারে ত্যাগ করা, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সুন্নার পাওবন্দ হওয়া এবং হযরতেরই একান্ত অনুসারী হওয়া। মোট কথা, তিনি ধর্মীয় আচার- অনুষ্ঠান পালনের চেয়ে প্রকৃত সাধু জীবন যাপনের দিকেই বেশি জোর দিতেন- কারন তার ফলেই মানুষ একটা মহৎ লক্ষের দিকে অগ্রসর হতে পারে এবং কেবলমাত্র আল্লাহর করুণারই ভিখারী হয় এ কথায় সন্দেহের অবকাশ নেই যে, তিনি নিজের ইচ্ছা ও আশা- আকাঙ্ক্ষাকে আল্লাহর ইচ্ছার উপর এতদূর সমর্পন করেছিলেন যে, কাজে ও বিশ্রামে, অনুরাগে ও বিরাগে সব সময় তিনি আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী চলতে প্রস্তুত থাকতেন।

সৈয়দ সাহেব যখন হজ্জে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন ও তার শরীক হতে সকলকে অনুরোধ জানালেন, তখন দলে দলে স্ত্রী- পুরুষ তার পাশে জমায়েত হতে লাগলো। ১৮২০ সালে ঈদের নামাজের পর প্রায় ৪০০ জনের একটি কাফেলা তার সঙ্গে সাঙ্গে রওয়ানা হল। এলাহাবাদে পৌঁছাবার পূর্বেই কাফেলাটি ৭০০ জনের হয়ে দাঁড়াল। নদী পারাপার হতে নৌকার অভাবে তার গতি শিথিল হল, তার উপর পথে নানা শহর থেকে আমন্ত্রণ আসতে লাগলো সেখানে তশরিফ নেওয়ার জন্য। এতে তার একটা সুবিধা হল যে, বহুস্থানে তিনি তার বাণী প্রচারের অবকাশ পেলেন। তিনি মানুষকে সহজ, সরল ও মহৎ জীবনের পথে আহ্বান করলেন, এবং হজ্জের প্রয়োজনীয়তা প্রচার করলেন। হাজার হাজার লোক তার নিকত বয়াত গ্রহণ করল এবং তার শিক্ষা বুকে ধারন করল। এখান থেকে কলকাতা ও সেখান থেকে মক্কাশরীফ পর্যন্ত তার আসা- যাওয়া প্রশংসামুখর সফরের বিশদ বিবরণ দেওয়া অসম্ভব। এখানে এইটুকুই বলা যথেষ্ট যে, হেজাজে ১৪ মাস অবস্থানের পর তিনি ১৮২৩ সালে রায়বেরেলীতে ফিরলেন। সুদীর্ঘ পথে লক্ষ লক্ষ মানুষকে খাঁটি ইসলামের মানুষ করে ও তাদের ঈমান বা ধর্ম বিশ্বাসকে সুসংস্কৃত করে, আর অসামান্য সম্মানের পশরা মাথায় নিয়ে।

পাক- ভারতে প্রত্যাগমন করে ১৮২৩ সালে প্রথমভাগে সৈয়দ সাহেব আত্মনিয়োগ করলেন শিখদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবার উপযুক্ত মানুষ অ অর্থসংগ্রহ করতে। তিনি দেশের প্রত্যেক ধর্মনেতার নিকট পত্র পাঠালেন ফরয হিসেবে জেহাদের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে অ জেহাদের জন্য সর্বতোভাবে সাহায্য করতে। এরকম একখানি চিঠিতে তিনি নওয়াব সুলেমান জাকে লিখেছেনঃ

আমাদের বরাতের ফেরে হিন্দুস্থান কিছুকাল খৃষ্টান অ হিন্দুদের শাসনে এসেছে, এবং তারা মুসলমানদের উপর ব্যাপক ভাবে নির্যাতন শুরু করেছে। কুফরী অ বেদাতীতে দেশ ছেয়ে গেছে এবং ইসলামী চালচলন প্রায় উঠে গেছে। এসব দেখেশুনে আমার মন ব্যাথায় ভরে গেছে, আমি হিজরত করতে ও জেহাদ করতে মনস্থির করেছি।

তিনি হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন এবং তার দরুন বরাবর প্রচার করেছিলেন যে, প্রকৃত মুসলিম সমাজ সংগঠন করতে হলে শক্তি ও রাজ্যশক্তি প্রতিষ্ঠার দরকার। তিনি সীমান্তে কাজ শুরু করেন এই উদ্দেশে যে, কর্মকেন্দ্র স্থাপন করতে হলে একটা স্বাধীন এলাকার দরকার। তাছাড়া তিনি ভেবেছিলেন যে,সীমান্তের যুদ্ধপ্রিয় গোত্রগুলি তার বিশেষ সহায়ক হবে।

এভাবে ভারতের প্রত্যেক অংশে জেহাদের প্রস্তুতি ও প্রচারণা শেষ করে সৈয়দ আহমেদ ১৮২৬ সালে রায়বেরেলী ত্যাগ করেন। তারপর জীবনের বাকি ৬ বছর ধরে চলল আল্লাহর সত্য মহিমা প্রচার ও পাঞ্জাবে নির্যাতিত মুসলমানদের উদ্ধারের জন্য বিরামহীন প্রত্যক্ষ সংগ্রাম।

চারদিক থেকে টাকাকড়ি আসতে লাগলো। যুদ্ধের অস্ত্র, সরঞ্জাম ও ঘোড়াও আসতে লাগলো। হাজার হাজার মুজাহিদ তার ঝাণ্ডার নীচে জমায়েত হতে লাগলো। ১৮২৬ সালের শেষের দিকে এই বাহিনী যখন যাত্রা শুরু করল, তখন তার সংখা দাঁড়ালো ১২ হাজার। পরবর্তীকালে আরও মুজাহিদ ছোট ছোট দলে এসে যোগ দিল। তার অনুরক্ত মুরীদ টংকের নওয়াব এই মুজাহিদ বাহিনীকে প্রথম টংকে দাওয়াত দিলেন, এবং জেহাদের যাবতীয় আঞ্জাম নিজের তত্ত্বাবধানে শেষ করে কয়েক মাসের মুজাহিদ বাহিনী বেরেলী থেকে টংকে, তারপর মারিভানের মরুভূমি পার হয়ে সিন্ধুর মুরুভুমিতে, তারপর হায়দরাবাদ ও শিকারপুর হয়ে বোলানপাসের ভিতর দিয়ে আফগানিস্থানের কান্দাহারে এবং নওশেরার নিকটে উপস্থিত হল। পথে অসুবিধা ও দুঃখ কষ্টও কম ছিলনা। তবে শুক্কুরের পর থেকে পূর্বকার গঙ্গানদী বেয়ে তালমাওন থেকে কলকাতা পর্যন্ত নৌকায় যাত্রা বিজয় যাত্রার মত সর্বাঙ্গ সুন্দর হয়েছিল। চারিদিক থেকে সরদারগণ, শাসকগণ, স্থানীয় কর্মচারীগন এবং সাধারন লোক তাকে আনুগত্য জানিয়েছিল- কেউ বা নজরানা দিয়ে, কেউ বয়াত গ্রহণ করে, আবার কেউ বাহিনীতে যোগ দিয়ে। গযনী কাবুল ও পেশোয়ার পার হয়ে বাহিনী নওশেরায় হাজির হলে পর শিখদের প্রকাশ্যে আহ্বান জানানো হল ইসলাম গ্রহণ করার জন্য, অথবা বশ্যতা স্বীকার করতে অথবা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে। শীঘ্রই এক নৈশ যুদ্ধে মাত্র ৯০০ মুজাহিদ বাহিনী এক বৃহৎ শিখ বাহিনীকে এমন সহজে পরাস্ত করল যে, সারা সীমান্ত প্রদেশে প্রশংসায় মুখর হয়ে উঠলো। অতঃপর বহু স্থানীয় সরদারগণ বিশেষ করে ইউসুফজায়ীরা সৈয়দ সাহেবের সঙ্গে যোগ দিলো।

কিছুদিন পর শের সিংহ ও একজন ফরাসী জেনারেলের অধীনে প্রায় ৩০ হাজার শিখ সৈন্য নিএ পেশোয়ারের মোহাম্মদ খাঁ ও তার ভ্রাতাদের নিকট কর দাবী করল। খুবী খাঁ মনপুরী আক্রমণ করতে শিখ বাহিনীর সাহায্য চাইলেন, এবং তিন হাজার শিখ সৈন্য তার সাহায্যার্থে অগ্রসর হল। কিন্তু মুজাহিদবাহিনি মনপুরী রক্ষার্থে অগ্রসর হলে শিখরা পঞ্চতরে সরে পরল। এবং সেখান থেকেও খন্ডযুদ্ধে পরাজিত হয়ে পলায়ন করল।

শিখদের বিরুদ্ধে এই বিরাট সাফল্য সাধারন লোকের উপর প্রভাব বিস্তার করল, এবং গরহি- ইমাজির প্রায় ১০ হাজার যুদ্ধপ্রিয় লোক সরওইয়াব খাঁর অধীনে সৈয়দ সাহেবকে ইমাম হিসেবে গ্রহণ করল। এমনকি পেশোয়ারবাসী তাকে নওশেরায় ঘাঁটি করতে ও শিখদের বিরুদ্ধে সামগ্রিক ভাবে অভিযান চালাতে আহ্বান জানালো। এই সময়ে প্রায় এক লক্ষ মুজাহিদ তার ঝাণ্ডার নীচে জমায়েত হয়। কিন্তু শেখ সেনাপতি বুধসিংহের প্রলোভন পেশোয়ারের সরদারগণকে বশোভুত করে ফেলল। এমনকি তারা যুদ্ধের পুর্বে সৈয়দ সাহেবকে গোপনে বিষ দানও করে ফেলে। যা হোক, সৈয়দ সাহেব তীব্র বমি করে অলৌকিক ভাবে রক্ষা পেলেন এবং অচৈতন্য অবস্থাতেই হাতির পিঠে চড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করেন। কিন্তু সম্মুখ সমরেও পেশোয়ারের সরদারগণ শিখদের সঙ্গে যোগ দেয়, এবং এভাবে মনোবল হারিয়ে মুজাহিদরা পরাজিত হন।

এভাবে মারাত্মক আঘাত খেয়ে মুজাহিদ বাহিনীর অবস্থা সঙ্গিন হয়ে পরল। তখন তাদেরকে তিনটি দুশমনের মোকাবিলা করতে হয়- শিখ, পেশোয়ারের বিশ্বাসঘাতক সরদারগণ ও হুন্দের দুর্গ মালিক খুবী খাঁ। সৈয়দ সাহেব তখন সমগ্র সরহদ এলাকায় সফর করে ফিরলেন, এবং নাবিরা ও সোয়াতের দরবারেও উপস্থিত হলেন। টংকের নওয়াবকে এই সময়ের লেখা একটি চিঠি থেকে জানা যায় যে, প্রায় তিন লক্ষ লোক তখন তার নিকট বয়াত গ্রহণ করেন।

যুদ্ধশিবিরের জীবন ছিল বড়ো আশ্চর্য ধরনের। পারস্পরিক সাহায্য- সেবা, এবং সর্বোচ্চ নৈতিক ও ধর্মীয় জীবনাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রত্যেকেই সেখানে বাস করত। তার দরুন যারা যুদ্ধ শেষে জীবিত ছিল, তারা যেখানেই গেছে, সেখানেই নয়া জীবনের উজ্জ্বল আদর্শ বহন করে নিয়ে গেছে।

স্থানীয় মুজাহিদরা অবশ্য আপন আপন গৃহে বাস করত। প্রবাসী মুজাহিদদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজারের মত, তারা বলাকোটের আশেপাশে বাস করত। তাদের মধ্যে তিনশো বাস করত সৈয়দ সাহেবের সঙ্গে পঞ্চতর শরের মধ্যে, এবং বাকী ৭০০ জন বাস করত আশেপাশের গ্রামগুলিতে। তাদের রসদ যোগান হত সারা ভারতব্যাপী ‘তগরীব- ই- মুহম্মদীয়া’ প্রতিষ্ঠানের গোপন কর্মকুশলতায়। শাহ্‌ আবদুল আজীজের দুই মশহুর পৌত্র মওলানা ইসহাক ও মওলানা ইয়াকুব ছিলেন তার কর্ণধার। দূর দূর অঞ্চল থেকে কাফেলার দল আসতো মানুষ নিয়ে, টাকা, রসদ ও চিঠিপত্র নিয়ে। এভাবে সারা ভারত থেকে যা আসতো তা এবং যুদ্ধে যা লুট করা হত সবই বায়তুল মালে রাখা হত। আর তার হেফাজতকারী ছিলেন শাহ্‌ ওইয়ালীউল্লাহর ভাইপো মুজাহিদ বাহিনীর কুতব মওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ। তিনি এতদূর ন্যায়নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষভাবে সব কিছু ভাগ করতেন যে, খোদ সৈয়দ সাহেবও একজন সাধারন মুজাহিদের চেয়ে বেশি অংশ পেতেন না। স্থানীয় বাশিন্দারা মুজাহিদদের সর্বতোভাবে সাহায্য করত- অবশ্য তাদের অবস্থাও ছিল শোচনীয়। যেখানে বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি ছিল সেই পঞ্জতরের শাসকদের, বিশেষত ফতেহ খাঁ ও আশরাফ খাঁর নাম উল্লেখযোগ্য। সবরকম দৈহিক কাজ- যেমন, মেথরের কাজ থেকে ঘোরামীর কাজ সবই মুজাহিদদের করতে হত, অথচ তাদের মধ্যে দিল্লী আগ্রার এমন বহু শরীফ লোক ছিলেন, যাদের জীবন কেটে গেছে আরাম আয়েশ প্রতিপত্তি ও মর্যাদার সঙ্গে। তবু তারা এসব কাজ হাসিমুখে করতেন কেবল আল্লাহ প্রীতিতে মশগুল হয়ে। তাদের জীবনও ছিল বড় কষ্টের। যখনই বাইরের রসদে টানাটানি পড়ত ও স্থানীয় লোকদের সাহায্য মিলত না, তখন জীবন হয়ে উঠত আরও দুঃখময়। সাইদুর যুদ্ধের পর শীতকালটা বড়ো কঠিন সময় হয়ে পড়েছিল। প্রায়ই মুজাহিদগণকে গাছের ডাল, পাতা ও ঘাস খেয়ে কাটাতে হত। অথচ তাদের দেখে ভ্রম হত যেন সবাই উৎসব করতে এসেছে। এত হাসি, এত আনন্দ নিয়ে তারা নিজের নিজের কাজ সমাধা করে যেত।

ভদ্রতা ও সামাজিক সদ্ব্যাবহার, নৈতিক ও ধর্মীয় আচার- অনুষ্ঠান তারা কখনও অবহেলা করতনা। প্রত্যেকেই যেন সেবা করতে ও ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকত। তারা জেহাদ করত অত্যাচারীর বিরুদ্ধে আর সেই সঙ্গে জেহাদ করত হীন মনোবৃত্তির বিরুদ্ধেও। কুকথা, কুচিন্তা ও কুকাজ তারা সর্বোতভাবে পরিহার করত। মশহুর আলিম ও ফাযিলদের সাহচার্যে অশিক্ষিত দলও শিক্ষিত হয়ে উঠলো। শাহ্‌ ইসমাইল প্রতিদিনই কোরআনের তাফসীর শোনাতেন, ফলে শ্রোতারা পরবর্তীকালে সারা ভারতে তার বাণী ছড়িয়েছিল।

এই সময়ের মধ্যে শিখদের সঙ্গে যুদ্ধ লেগেই থাকত। তাতে বাংলা, বিহার ও মধ্যপ্রদেশের হালকা গঠনের মুজাহিদরা বেশ কৃতিত্বের সঙ্গেই শক্তিমত্তা প্রকাশ করত- শিখ ও বিশ্বাসঘাতক পাঠান গোত্রগুলি সমানভাবে তাদের হাতে মার খেত। পেশোয়ারের দুররানী সরদারেরা এরপর প্রকাশ্যভাবেই শিখদের সঙ্গে যোগ দিলো, কারন শিখদের টাকার লোভ তারা দমন করতে পারলনা। তারা বারে বারে মুজাহিদদের বিরুদ্ধে হামলা চালাত, কিন্তু প্রত্যেকবারই তারা প্রতিহত হত। খুবী খাঁ প্রকাশে স্থানীয় লোকদের মুজাহিদদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে লাগলেন।

সৈয়দ সাহেব প্রথমে স্থির করলেন যে, খুবী খাকে শায়েস্তা করতে হবে। তিনি শাহ্‌ ইসমাইলকে মাত্র ১৫০ জন মুজাহিদ নিয়ে হুন্দ কিল্লাহ অধিকার করতে পাঠালেন। শাহ্‌ ইসমাইল রাত্রির অন্ধকারে অন্তরালে দুর্গদ্বারে উপস্থিত হলেন এবং প্রভাতে দ্বার খোলা হলেই নাটকীয়ভাবে প্রবেশ করে তিনি কিল্লাহ দখল করে ফেললেন। খুবী খাঁ নিহত হলেন। শাহ্‌ ইসমাইল দৃঢ়ভাবে সব গোলযোগ দমন করলেন। খুবী খাঁর ভাই ইয়ার মুহম্মদের সঙ্গে মিলিত হয়ে এক বিরাট বাহিনী নিয়ে হুন্দ কিল্লাহ পুনর্দখল করতে অগ্রসর হলেন। পঞ্জতরের শাসক আশরাফ খাঁর দুই পুত্র ইসলাম খাঁ ও ফতেহ খাঁর অনুরোধে সৈয়দ সাহেব নিজে হুন্দের দুই- তিন মাইল দূরে ছাউনি ফেললেন। বিপক্ষদলের ৩০০ অশ্বারোহী সৈন্য কিল্লাহ আক্রমণ করল কিন্তু বিফল মনোরথ হল। তখন দুই পক্ষ হারয়ানার প্রান্তরে সৈন্য বিন্যাস করল। শাহ্‌ ইসমাইলও কিল্লাহর ভার মওলানা মযাহার আলীর হাতে দিয়ে সৈয়দ সাহেবের সঙ্গে মিলিত হন। একটা আপোশের কথাবার্তা চলল, কিন্তু কন মীমাংসা হল না। তখন মুজাহিদরা ক্ষিপ্রগতিতে তাদের উপর হামলা চালায় ও দুশমনদের কামান দখল করে ফেলে। তার দরুন শত্রু পক্ষ সহজেই পরাজিত হল। এই সময় বহু মালামাল মুজাহিদদের হাতে পড়ল। কিন্তু স্থানীয় বাশিন্দারাই বেশিরভাগ মাল লুট করে নিয়ে পালায়। ইয়ার মুহম্মদ খাঁ নিহত হয়। আমীর খাঁর ভাগ্যও অনুরূপ হল। তখন শিখরা ও পেশোয়ারের সুলতান মুহম্মদ সৈয়দ সাহেবের বাকি প্রতিদ্বন্দী রয়ে গেলো।

অতঃপর সৈয়দ সাহেব কাশ্মীরে প্রধান ঘাঁটি স্থাপন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু আম্বের পায়েন্দা খাঁ বাধা দিতে চেষ্টা করলে শাহ্‌ ইসমাইল আম্ব অধিকার করেন এবং সেখানেই প্রধান ঘাঁটি স্থাপন করেন। ইতিমধ্যে শিখ নেতা রাজা রণজিৎ সিংহ একটা শান্তির প্রস্তাব পাঠান। তবে তার দূতের পেছনে একজন ফরাসী সেনাপতি ও শের সিংহ একদল বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। কিন্তু মুজাহিদ বাহিনীকে একরোখা দেখে তারা পিছু হটাই যুক্তিযুক্ত মনে করে। তখন ইয়ার খাঁ স্থানীয় সরদারের সঙ্গে মিলিত হন এবং দূররানী গোত্র এক জোট হয়ে প্রায় বার হাজার সৈন্য নিয়ে মুজাহিদ বাহিনীকে আক্রমণ করে। তারপরও সন্ধির সলাপরামর্শ চলে ১৮৩০ সালের শেষ রাত্রি পর্যন্ত। কিন্তু তাও ব্যার্থতায় পর্যবসিত হয়। তখন মুজাহিদ বাহিনী প্রাণপণে শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করে ও বিধ্বস্ত করে ফেলে এবং যায়দার যুদ্ধের মত তাদের সব কামানও দখল করে।

অতঃপর নির্বিঘ্নে পেশোয়ারে প্রবেশ করতে সৈয়দ সাহেবের আর কোন বাধা হল না। সকলেই তাকে সাদরে গ্রহণ করল। তিনিও একটা বিশাল অঞ্চলে শরীয়তী শাসন প্রবর্তন করার পূর্ণ সযোগ পেলেন। আম্ব থেকে মর্দান পর্যন্ত তার অধিকার স্বীকৃত হল।

কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতার চরম মার তখনও হয়নি। সব রকম চালাকি ও চতুরতা খাঁটিয়ে সুলতান মুহম্মদ সৈয়দ সাহেবের ক্ষমা ভিক্ষা করলেন। সৈয়দ সাহেবও তার কথায় ভুললেন এবং শরীয়রতের বিধান অনুযায়ী শাসন চালাবার শপথ গ্রহণ করায় তাকে ক্ষমাও করলেন। মওলানা শাহ্‌ মযহার আলী কাজী নিযুক্ত হলেন। এ থেকে প্রমাণ হয় সৈয়দ সাহেবের কোন উচ্চাশা ছিলনা, শুধু আল্লাহর বাণী প্রচার করা এবং শরীয়তী শাসন প্রবর্তন করাই তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। শুধু রাজনৈতিক গরজেই তিনি একজন স্থানীয় শাসক নিযুক্ত করেছিলেন। অন্যথায় সামাজিক হিংসারই প্রশ্রয় দেয়া হত।

যা হোক, এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আল্লাহর দেওয়া অধিকারের প্রতিষ্ঠা করতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন, এবং ইসলামী সমাজ ও আইন কানুন প্রবর্তনে বিশেষ চেষ্টিত হলেন। পেশোয়ারের নিযুক্ত কাজী সাহেব ও আরও বহু কর্মী সারাদেশে প্রচারকের আগ্রহ নিয়ে দিনরাত কাজ চালাতে লাগলেন। কিন্তু আফসোস এই যে, স্থানীয় লোকের জড়তা ও বহুদিনের কুসংস্কার তাদের উচ্চমান কর্মব্যাস্ততার বিরুদ্ধে দাঁড়ালো; তাদের অনৈতিক উচ্ছৃঙ্খলতা, কু- আচার ও বর্বর প্রকৃতির প্রতি স্থানীয় দেশাচার ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের সমর্থন ছিল। অতএব সংস্কারের দল যখন এগুলোকে নির্মূল করতে চেষ্টিত হল, স্থানীয় লোকেরা করল অসহযোগ, এবং অজ্ঞতা ও ক্ষমতালোভী মোল্লার দল করল তীব্র বিরোধিতা। তার দরুন একটা ক্রুদ্ধ আক্রোশ সৈয়দ সাহেবের প্রতি ফেটে পড়ল। বিশ্বাসঘাতক সুলতান মুহম্মদও তার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করল- এক রাত্রিতে সৈয়দ সাহেবের নিঃস্বার্থ কর্মীদল চক্রান্তমূলক নিহত হলেন!

এই বিষম বিপদে সৈয়দ সাহেব চরম আঘাত পেলেন। মাত্র এক আঘাতেই তিনি কতকগুলি মহৎ সৎকর্মী হারালেন এবং একটি বিস্তৃত অঞ্চল থেকেও বঞ্চিত হলেন। আর তার ফলে একটা আদর্শ সমাজ গঠনের আশাও বিলীন হয়ে গেলো। এভাবে মোহভঙ্গ হওয়ার দরুন বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি স্থির করলেন যে, এই নিষ্ফলা নিমকহারামের দেশ ত্যাগ করে কাশ্মীরেই কর্ম কেন্দ্র স্থাপন করা উচিত। নওয়াব উযির- উদ্দউলাকে বালাকোট থেকে ১২৪৬ হিজরীতে ১৩ই জিলকদ তারিখের [১৮৩১ খৃঃ] লেখা শেষ চিঠিতে তিনি বলেছিলেনঃ পেশোয়ারের লোকেরা এতই হতভাগ্য যে, তারা জেহাদে আমাদের মুজাহিদ বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিলনা, উপরন্তু তারা প্রলোভনে পরে গেলো এবং সারা দেশময় নানা কাজে আমাদের যেসব মহৎ লোক ব্যাস্ত ছিলেন, তাদের অনেককেই হত্যা করে ফেলল। আমাদের আসল সৈন্যবাহিনী অবশ্য অক্ষত ছিল এবং আল্লাহর রাহে শহীদদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতেও তারা তৎপর ছিল। সেখানে আমাদের অবস্থানের আসল উদ্দেশ্য ছিল যে, বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জেহাদে বহুসংখ্যক স্থানীয় মুসলমানের সাহায্য ও সহানুভূতি পাওয়া যাবে, কিন্তু বর্তমানে আর যখন কোন আশা নেই, তখন আমরা স্থির করলাম যে, সেখান থেকে পাখলির পাহাড়ী অঞ্চলেই স্থান বদল করব। এখানকার বাশিন্দারা অবশ্য আমাদেরকে দুহাত বাড়িয়ে গ্রহণ করেছে, জেহাদে যোগ দিয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে এবং বসবাস করতে আমাদের জমিজায়গাও দান করেছে। এখন আমাদের ঘাঁটি এমন নিরাপদ স্থানে অবস্থিত যে, আল্লাহর মরজি দুশমনরা আমদের সন্ধানও পাবেনা। তবে আমাদের মুজাহিদরা বের হলেই যুদ্ধ বেধে যাওয়া সম্ভব। এবং দুতিন দিনের মধ্যেই এমন একটা কিছু করার ইচ্ছাও তাদের আছে। আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস যে, করুণাময় আল্লাহ তাদের ভাগ্যে জয়ের দরওয়াজা খুলে দেবেন। আল্লাহর রহমত আমাদের উপর বজায় থাকলে এবং এই হামলায় আমরা জয়ী হতে পারলে ইনশাল্লাহ ঝিলাম পর্যন্ত অঞ্চল ও সারা কাশ্মীরটা আমাদের অধিকারে চলে আসবে। ইসলামের তরক্কীর জন্য ও মুজাহিদ বাহিনীর সাফল্যের জন্য মেহেরবানী করে দিনরাত আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করুন।

এই সময় শের সিঙ্ঘের সৈন্যবাহিনী মুজাহিদদের মুখোমুখি ছিল। তিনি মুজাহিদ বাহিনীকে নির্মূল করার জন্য সামগ্রিক শক্তি প্রয়োগে শেষ হামলা করতে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। সে আমলে বালাকোটে যাওয়ার দুটি রাস্তা ছিল তার একটি জঙ্গলে এত ভর্তি হয়ে উঠেছিল যে, স্থানীয় দু’ একজন বাশিন্দা ছাড়া অন্য কেউ তার অস্তিত্বেও জ্ঞাত ছিলনা। এবং দ্বিতীয় পথটি এমন একটা সংকীর্ণ গিরিসংকটের মধ্যে দিয়ে ও সেতুর উপর দিয়ে ছিল যে শত্রুপক্ষকে খুব সহজেই বাধা দেওয়া সম্ভব ছিল। এই দুটি পথই খুব সাবধানে পাহারা দেয়া হল। কিন্তু কয়েকজন বিশ্বাসঘাতক গোপনে শিখদেরকে জঙ্গলাকীর্ণ পথটির সন্ধান দিলো। তার ফলে শিখরা অতর্কিতে মুজাহিদ বাহিনীকে বেষ্টন করে ফেলল। কিন্তু কিছুমাত্র দমিত না হয়ে মুজাহিদরা বীরবক্রমে যুদ্ধ করল। এবং যে মহান ব্রতের জন্য তারা আজীবন সংগ্রাম করে আসছিলো, তার জন্যই অবশেষে জীবনদান করল। খোদ সৈয়দ সাহেবও তার বাহিনীর পুরোভাগে জেহাদ করতে করতে শহীদ হন। [ ১৮৩১ খৃঃ, মে ]

এভাবে এই উপমহাদেশে একটি আজাদ ইসলামী রাষ্ট্র গঠনপ্রয়াসী সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ শহীদের জীবনাবসান হয়। জীবনে তিনি নির্মম ভাবে বিশ্বাসঘাতকের হাতে প্রতারিত হয়েছেন, আর মরণের পরেও তিনি উপেক্ষিত হয়েছেন। কিন্তু তার অনুসৃত বৃহৎ আন্দলন স্তব্ধ হয় নাই। এই বিধন যজ্ঞের পরেও যারা বেচে ছিলেন, তাদের অনেকেই টংকে অথবা বিহারশরীফের সাতানায় সৈয়দ সাহেবের বিশ্বস্ত খাদেমের নেতৃত্বে এই আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে পাঞ্জাবে সম্রাজ্জবাদী ইংরেজরা যখন শিখদের ন্যায় অত্যাচার শুরু করে, তখন মুজাহিদদের সর্বরস তাদের উপর উদ্যত হয়। কিন্তু তার দরুন তাদের ভাগ্যে জোটে কারাবাস, উৎপীড়ন ও ফাঁসিকাষ্ঠ মৃত্যুবরণের নির্মম শাস্তি, এবং তারও চেয়ে হীনতম ছিল নিম্নশ্রেণীর মোল্লা ও তথাকথিত আলেমদের দ্বারা এসব সংগ্রামী অগ্রপথিকদের নামে অযথা কুৎসা রটনা ও মিথ্যা ভাষণ। তাদের আন্দোলন নাকি ওহাবী আন্দোলনের নামান্তর এবং জেহাদ ঘোষণাও নাকি শরীয়ত বিরুদ্ধ। অবশ্য স্যার সৈয়দ আহমদের সদিচ্ছা প্রণোদিত বন্ধুদের ভূমিকা অনভিপ্রেত ছিলনা; কারণ, তারা বাস্তবিকই এসব বীর মুজাহিদের কার্যকলাপ এমন ভাবে সমর্থন করতে চেয়েছিলেন যে, তারা ইংরেজদের ক্ষতি বা অনিষ্টকামী নয় এবং তারা বিদেশী শাসকদের প্রতি অনুরক্ত ও বিশ্বাসীও বটে। বর্তমান পরিস্থিতে অবশ্য এরকম ছলনাময় ভূমিকার কোন দরকার নেই। এখন সময় এসেছে এসব বীর মুজাহিদের গৌরবোজ্জ্বল অসমসাহসিক কার্যাবলিকে স্বীকৃতি দেওয়া ও শ্রদ্ধা করা কারণ তারাই প্রকৃতপক্ষে এই উপমহাদেশে বহু পূর্বেই পাকিস্তানের বুনিয়াদ স্থাপনে সব রকম অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেহাদ করেছিলেন। যদিও সৈয়দ সাহেবের প্রতিষ্ঠান মারফত পাকিস্তান হাসিল হয়নি, তবু একথা অনস্বীকার্য যে, তার মধ্যেই ছিল বীজমন্ত্র; আর ওয়াকিবহাল ব্যাক্তি মাত্রেই হৃদয়ঙ্গম করবেন যে, রায়বেরেলীর সৈয়দ আহমদ শহীদের দান ছিল এই চেতনা উজ্জীবনে অপরিসীম।

 

বালাকোটের বিপর্যয়ের পটভূমি

বালাকোটের বিপর্যয় আকস্মিক নয়, অভাবনীয়ও নয়। সাম্প্রতিককালে যেসব প্রামাণ্য ঐতিহাসিক তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, সেসব থেকে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, ১৮৩১ সালের ৬ই মে [ ২৪শে জিলকদ, ১২৪৬ হিজরী] তারিখে বালাকোটে সৈয়দ আহমদ ও শাহ্‌ ইসমাইল শহীদ কয়েক’ শ মুজাহেদিন নিয়ে যে মৃত্যুযজ্ঞের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তা ছিল কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনার মতই পূর্বনির্দিস্ট অবশ্যম্ভাবী ঘটনা। মুজাহিদদের আজাদী আন্দোলনের প্রায় পৌনে এক শতক ব্যাপী কর্মতৎপরতার প্রথম বিপর্যয় ঘটে বালাকোটে দ্বিতীয় বিপর্যয় ঘটে ১৮৫৭ সালের আজাদী সংগ্রামে। আর তার শেষ পরিণতি হয়েছিল ১৯১৯ সালের খেলাফত আন্দোলনে।

একথা সর্ববাদীস্বীকৃত যে, এ আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন ভারতীয় আলেম সম্প্রদায়, যারা পরবর্তীকালে গোঁড়া, সংকীর্ণমনা, অপরিনামদর্শী ও প্রতিক্রিয়াশীল ‘মোল্লা’ হিসেবে ধিকৃত ও উপহাসিত হয়েছেন। কিন্তু একথা আজ তর্কের বিষয় নয় যে, পাক- ভারতে প্রথম বিদ্রোহ- বহ্নি প্রজ্বলিত হয়েছিল এবং প্রত্যক্ষ ভাবে এই বিদ্রোহ আন্দোলনকে সংগঠন ও পরিচালনা করেছিলেন মুসলিম আলেম সম্প্রদায়। বস্তুত পাক- ভারতীয় বাসিন্দাদের আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মচেতনার উদগাতা হিসেবে এই আলেম সমাজকে বিবেচনা করা অত্যুক্তি হলেও আংশিক ভাবে বাস্তব অবস্থাকেই স্বীকার করা হয়। কোনও রকম স্বার্থসিদ্ধির বাসনাউ চারিত না হয়ে এই আলেম সমাজ আজাদীর ঝাণ্ডা উর্ধে তুলে ধরেছিলেন ইসলাম রক্ষা, ধর্ম ও সমাজ- সংস্কার এবং ধর্মরাস্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে। হয়তো তাদের মানসে কোন বাস্তব ধর্মরাস্ট্রের চিত্র বা পরিকল্পনা দানা বাধেনি এবং এই বিদ্রোহ আন্দোলন উপযুক্তভাবে সংগঠন ও পরিচালনা করবার সঠিক পরিকল্পনাও রচিত হয়নি। হয়তো তাদের ধর্মবুদ্ধি ও ইসলাম প্রীতি সমকালীন সমস্যাসমূহের মোকাবিলা করতে বাস্তব ও যুগোপযোগী পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনে অক্ষম ছিল। কিন্তু একথা নিঃসন্দেহে সত্য যে, এই আলেম সমাজই- যাদের নেহাত সুবিধার জন্য সমকালীন শক্তিলোভী শাসকসম্প্রদায় ‘ওহাবী’ নামে চিহ্নিত করেছিল- পলাশীর পর ১৮৫৭ এর সারা ভারতব্যাপী বিপ্লবের পূর্বে ও পরবর্তীকালের আম্বালা ও সিয়াকোহ অভিযানের যুগ পর্যন্ত পাক- ভারতীয় জনগণের অন্তরে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, বিক্ষোভ ও আসন্তোসের তীব্র বহ্নি ধূমায়িত ও প্রজ্বলিত রেখেছিলেন। তাদের দেশপ্রেমে খাদ ছিল না, সে দেশপ্রেম নকল বা সৌখিন ছিলনা। বাস্তব সত্যোপলব্ধির আন্তরিকতার উপরেই ছিল তার জ্বলন্ত প্রতিষ্ঠা।

পাক- ভারতীয় মুসলমানদের এই রাষ্ট্রীয় চেতনার চেতনার মূল উদগাতা ছিলেন শাহ্‌ ওয়ালীউল্লাহ। তার হাতেই মুসলমানদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন সংস্কারের যে কাজ আরম্ভ হয়, তার উপযুক্ত পুত্র ‘শামসুল হিন্দ’ শাহ্‌ আবদুল আজীজের সময় যে কাজ আরও প্রসারিত ও কর্মমুখর হয়ে উঠে। তারিই দুই উপযুক্ত শিষ্য সৈয়দ আহমদ ও শাহ্‌ ইসমাইলের হাতে এই আন্দোলনের ক্ষাত্রশক্তি উজ্জীবিত হয়ে উঠে, এবং প্রত্যক্ষ সংগ্রামের রূপ গ্রহণ করে। তাদের অস্ত্র প্রথমে উদ্যত হয় ক্ষমতাগর্বী শিখদের উপর; কারণ শিখরাই তখন মুসলমানদের ঈমান ও আমান বিপন্ন করে তুলেছিল। এজন্য এই জাতীয় সংগ্রামের প্রথম পর্যায়ে আমরা লক্ষ্য করি, মুজাহিদরা শিখদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছে।

এই জেহাদের প্রথম স্তরে মুজাহিদরা আশ্চর্যমূলক জয়লাভ করলেও এমন একটা মরাত্মক ভুল করে বসে, যার দরুন ১৮২৯ সালের প্রথম ভাগে তাদের অবস্থা আশ্চর্যরুপ সুবিধাজনক হলেও শীঘ্রই সঙ্গীন ও সংকট জনক হয়ে উঠে, এবং শেষে বালাকোটের বিপর্যয়ে তাদের সব আশা ভরসার সমাধি হয়ে যায়। এই মারাত্মক ভুলটিকে ঐতিহাসিকগণ চিহ্নিত করেন, আন্দোলনের রূপটিকে ‘ইমারত- ই- জেহাদ’ বা জেহাদের ডাক থেকে ‘ইমারত- ই- শরীয়ত’ বা শরীয়তী শাসনের জিগীরে পরিবর্তন করা।

এই মারাত্মক পরিবর্তিত পদক্ষেপের পূর্বে সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর জন্য শ্রদ্ধার আসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাক- ভারতীয় প্রত্যেক মুসলমানের অন্তরে। আবার সে আসন সবচেয়ে নিরংকুশ ছিল সীমান্তবাসী আদি জাতিদের মধ্যে। আদি জাতিরা তখন তাকে এতোখানি শ্রদ্ধা করত ও ভালবাসত যে, ১৮২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে যখন তিনি পেশোয়ার থেকে সিন্ধুনদের পশ্চিম দিকে অবস্থিত সাম্মা সমতল ভূমিতে অবতরণ করেন, তখন স্ত্রী- পুরুষ নির্বিশেষে সেখানকার প্রত্যেকটি মানুষ ‘সৈয়দ বাদশার’ ঘোড়ার পায়ের ধূলিতে চুমা দিতে থাকে, এবং তার উটের কাপড়খানিকে টুকরা টুকরা করে সংগ্রহ করে ‘তবররুক’ হিসেবে তাবিজ বাঁধবার জন্য। যদিও এই প্রথম কাফেলার গাজীদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৫০ জন, তবুও তারা স্থানীয় সরদারের সহায়তায় শিখদের উপর ঝাপিয়ে পরে এবং আকোরা ও হুজরোর নৈশ আক্রমণে আশ্চর্য সাফল্য অর্জন করে। তার দু’তিন মাস পরে সিন্ধুনদের তটস্থ ছন্দে স্থানীয় বাশিন্দারা সৈয়দ বাদশার নিকট ‘ইমামাত- ই- জেহাদের’ বয়েত বা শপথ গ্রহণ করেন। তার ফলে ১৮২৭ সালের সাইদুর যুদ্ধের সময় সৈয়দ আহমদ প্রায় ৮০ হাজার আদিবাসী বাহিনী সংগ্রহ করতে সক্ষম হন, তার ৬০ হাজার ছিল ইউসুফজাই ও বজউর এলাকার এবং বাকী ২০ হাজার ছিল পেশোয়ার ও হাসতননগরের শাসক ভ্রাতৃদ্বয় ইয়ার মুহম্মদ ও সুলতান মুহম্মদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে।

গাজীরা যদি সাইদুর যুদ্ধে জয়লাভ করত, তাহলে শিখদের সিন্ধুনদের পূর্ব দিকে বিতাড়িত করে দেওয়া সহজ হত এবং তার ফলে হাজারা জিলা শিখদের হামলা থেকে একেবারে নিরাপদ করে সমগ্র উত্তর- পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ শিখদের অত্যাচার থেকে একেবারে রক্ষা করা সম্ভবপর হত। কিন্তু গাজীদের ভাগ্যই ছিল বিরূপ। তার কারণ এই নয় যে, গাজীরা সংখ্যায় শক্তিমত্তায় শিখদের চেয়ে দুর্বল ছিল। তার কারণ ছিল দুররানী সরদার ইয়ার মুহম্মদের দারুণ বিশ্বাসঘাতকতা এবং আদিবাসী বাহিনীর মধ্যে নিয়মানুবর্তিতার অভাব। স্থানীয় শিখ ও ইংরেজ লেখকদের সাক্ষ্যেই একথা পরিস্কারভাবে প্রমাণিত হয়েছে। যুদ্ধজয় যখন প্রায় নিশ্চিত, এই সঙ্গীন কঠিন মুহূর্তে ইয়ার মুহম্মদ বিষ প্রয়োগ করে সৈয়দ আহমদকে অজ্ঞান করে ফেলেন এবং তার দরুন মুজাহিদ বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে যায়। আর ইয়ার মুহম্মদও খটক পার্বত্য অঞ্চলের কূটনৈতিক অবস্থাপূর্ণ স্থানটি পরিত্যাগ করে ভ্রাতা সুলতান মুহম্মদ সহ শিখদের সঙ্গে যোগদান করেন এবং মুজাহিদ শিবিরের সমস্ত গুপ্তসংবাদ ফাঁস করে দেন। তাদের পলায়নের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র ৮০ হাজার আদিবাসী বাহিনী যেন কর্পুরের মত চারিদিকে মিলিয়ে গেলো, যুদ্ধক্ষেত্রে মাত্র ৯০০ মুজাহিদ টিকে রইল। গাজীরা অবশ্য প্রাণ তুচ্ছ ক্রে বীরবিক্রমে যুদ্ধ চালাতে থাকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজয় বরন করতে বাধ্য হয়।

সাইদুর যুদ্ধিক্ষেত্রে আদিবাসী বাহিনীর পাঁচটি স্বাভাবিক দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠেঃ

[১] আদিবাসী সরদারেরা, বিশেষত সরদাররা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়, আর তার প্রধান কারন ছিল তাদের সর্বদাই স্বার্থান্ধ মনোবৃত্তি।

[২] আদিবাসীরা দুর্ধর্স যোদ্ধা ছিল সত্যি, কিন্তু তার নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলার মোটেই ধার ধারত না। এর জন্য হুন্দ, জায়দা, পঞ্জতর প্রভৃতির খানরা দৃঢ়ভাব অবলম্বন করেও অনুগামীদের সঙ্গিন মুহূর্তে ইতস্তত পলায়ন প্রতিরোধ করতে পারতেন না।

[৩] আকোরা ও হজরোর যুদ্ধকালে লক্ষ্য করা গেছে যে, আদিবাসীরা অত্যন্ত লুন্ঠনপ্রিয়। এমনকি ভীষণ যুদ্ধের সংকট মুহূর্তেও তাদের এ মনোবৃত্তি প্রদমিত করা সম্ভব হতনা। আর এজন্য প্রায়ই যুদ্ধ জয়ের সুযোগ নষ্ট হয়ে যেত।

[৪] আধিবাসিরা প্রায়ই যুদ্ধকালে সংখ্যাল্প গাজীদেরকে পুরোভাগ থাকতে বাধ্য করত এবং নিজেরা যথাসম্ভব নিশ্চেষ্ট থাকত।

[৫] মুজাহিদরা ছিল সংখায় অল্প এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নবাগত। আর তার দরুন আদিবাসীদের যুদ্ধকালীন বা শান্তির সময় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে ছিল সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ।

সাইদুর যুদ্ধক্ষেত্রে আদিবাসীদের এসব চারিত্রিক দুর্বলতা যদি মুজাহিদ নেতারা সম্যকভাবে অনুধাবন করে সেগুলির সংশোধন ও দূরীকরণ করবার এবং উপযুক্ত যুদ্ধকৌশল অবলম্বন করার চেষ্টা করতেন, তাহলে হয়ত এই পরাজয়ের শোচনীয় ধাক্কা কেটে উঠতে পারতেন। কিন্তু এসকল কিছু ছিল তাদের অজানা। তার দরুন এসবের পরিবর্তে তারা নিজেরা আরম্ভ করলেন কঠোর কৃচ্ছ্র- সাধন ও নিয়ম পালন এবং আদিবাসীদের ধর্মীয় অনুরাগ উদ্দীপনা করবার সবরকম উপায় অবলম্বন। রণনীতির ও রাজনৈতিক নিয়মানুসারে তখন কর্তব্য ছিল শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রেই গঠন নয়, রাষ্ট্রীয় ও রণচাতুর্যের সম্পূর্ণ নয়ানীতি অনুসরণ করে অবস্থার সুশৃঙ্খলা আনয়ন করা। সৈয়দ আহমদ ও তার খলিফা তখন যেরূপ আশ্চর্য প্রভাব বিস্তার করেছিলেন অনুগামীদের উপর, তার দরুন এমন অবস্থা আনয়ন করা মোটেই কঠিন ছিলনা। সৈয়দ বাদশাহ ও শাহ্‌ ইসমাইল তখন জনগণের নয়নমণি এবং সদাররাও ছিলেন একান্ত বশংবদ। আকোরা ও সাইদুর যুদ্ধক্ষেত্রে মুজাহিদ বাহিনী যে নির্ভিকতা, ধর্মের জন্য প্রাণের তুচ্ছতা ও নিয়মানুবর্তিতা দৃষ্টান্ত দেখিয়েছিল তার দরুন সাধারণ আদিবাসীদের চোখে তাদের শ্রদ্ধাও বেড়ে গিয়েছিল। আদিবাসীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বলীর শ্রদ্ধা করা এমন কি ধার্মিকের চেয়েও। শাহ্‌ ইসমাইল ছিলেন মুজাহিদ নেতাদের মধ্যে ধর্মনিষ্ঠার ও বলবীর্যের মূর্ত প্রতীক। এমন ব্যাক্তিত্বের উপস্থিতিতে শুধু প্রয়োজন ছিল আদিবাসীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্যক অনুধাবন করা এবং তার সুবিধা গ্রহণ করা। কিন্তু মুজাহিদ নেতাদের এখানেই ছিল শোচনীয় দুর্বলতা। আর তার দরিন একের পর এক নির্মম পরাজয় ও ব্যার্থতার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের।

তাদের ভুলের সংখ্যাও ছিল মাত্রাবিহীন। মুজাহিদরা প্রথমকালে কোন ছাউনি প্রস্তুত করতনা। অথচ পরবর্তীকালে যখন তাদের প্রভাব একেবারে ক্ষয়িত হয়ে যায়, তখন তারা ইসমত ও চমরকন্দে নিজস্ব ছাউনি করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত তারা সরদারের গৃহেই আতিথ্যগ্রহন করে কাজ চালিয়ে নিত। তার দরুন স্বাভাবিকভাবেই নানা রকম অবাঞ্ছিত জটিল অবস্থার হতো।

সৈয়দ আহমদ প্রথম তার কর্মকেন্দ্র স্থাপন করেন হুন্দের দুর্ধর্ষ ইউসুফজাই সরদার খাদি বা গাদী খানের মেহমান হিসাবে। পরে পঞ্জতরের ফতেহ খানের ধর্মপ্রিতি ও জায়দার আশরাফ খানের ভক্তি- শ্রদ্ধা তাকে আকৃষ্ট করে এবং কোনও উপযুক্ত কারন না দেখিয়ে তিনি সহসা পঞ্জতরে কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তন করেন। অথচ এ দুজন সর্দার ছিলেন খাদি খানের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। আর এজন্য খাদি খান সৈয়দ আহমদের উপর বিরূপ হয়ে উঠেন। আরও এক সমস্যা ছিল যে মুজাহিদদের সংখ্যা ক্রমাগতই বর্ধিত হতে থাকত, আর তার দরুন তাদের আহার ও আশ্রয় যোগানো এক রকম অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত; ফলে সবচেয়ে অতিথিবৎসল সরদারকেও নাজেহাল হয়ে পড়তে হতো।

যা হোক, এই সৈয়দ আহমদ একদল মুজাহিদ সোয়াত, চামলা ও বনায়ের সফর করলেন ‘হিদায়াত’ বা ধর্মশিক্ষা দানের উদ্দেশ্য নিয়ে। অন্য দিকে শাহ্‌ ইসমাইল বাকী মুজাহিদের বৃহৎ বাহিনী নিয়ে অভিযান চালাতে লাগলেন শিখদের অধিকার থেকে আম্ব ও হাজরা মুক্ত করতে। শাহ্‌ ইসমাইলের এ উদ্যম কিছুটা সফল হয় এবং সাময়িকভাবে তিনি কয়েকটি কিল্লাহ অধিকার করে ফেলেন দুশমনের কবল থেকে।

মুজাহিদদের ইতিহাসে এটাই ছিল গৌরবমণ্ডিত কাল। তাদের কর্মকেন্দ্র প্রথমে পঞ্জতরে ও পরে খেহরে থাকাকালে তাদের একাধিপত্য বিস্তৃত হয়ে পরে হাজারা, আশ্ব, সোয়াত ও দক্ষিণে নওশেরা ও আকোরা পর্যন্ত। সৈয়দ আহমদ এই সময় কিছুকাল একদল বেতনভোগী সৈন্য রাখতেও সক্ষম হয়েছিলেন এবং তখন একমাত্র দুররানী সরদাররা ব্যাতীত আর কারও সাধ্য ছিলনা তার কর্তৃত্ব অস্বীকার করার।

‘সৈয়দ বাদশার’ও তখন ছিল গৌরবমণ্ডিত সময়। তখন তার বশ্যতা স্বীকার করতেন এবং অনুগামী হিসেবে গর্ববোধ করতেন সমকালীন এসব আদিবাসী সরদারগণঃ আম্বের পায়েন্দা খান, মজফফরবাদের জবরদস্ত খান্দ ও নজব খান, জায়দার আশরাফ খান, সরবলন্দ খান তালোনী, আগরোরের গফুর খান, হাবিবুল্লাহ খান, শেবার আনন্দ খান, মিশকার খান, পঞ্জতরের ফতেহ খান, খানখেলের আমানউলাহ খান, ভাতগ্রামের নাসির খান, কাগান ও সিত্তানার সৈয়দগণ, তেহকালের আরবার বাহরাম, চারগলায়ের মনসুর খান, তুংগীর মাহমুদ খান, আলাদন্দের ইনায়াতউল্লাহ খান ইত্যাদি। হুন্দের খাদি খান যদিও অসন্তুষ্ট ছিলেন, তবুও তিনি সৈয়দ বাদশার বশ্যতা অস্বীকার করার সাহস পেতেন না।

তখন ছিল শিখদের বিরুদ্ধে ছোটখাটো অভিযান চালানোর চেয়ে ব্যাপক আক্রমণ করবার উপযুক্ত সময়। তার ফলে দুররানী সরদাররা ও পেশোয়ারের ইয়ার মুহম্মদ শিখদের সঙ্গে গোপনে ষড়যন্ত্র চালাবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো এবং সহজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত। কিন্তু সৈয়দ আহমদ অন্য পন্থা অবলম্বন করতে চেয়েছিলেন। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, বরকাজই দুররানিদেরকে শায়েস্তা করে পশ্চাদভাগ নিরঙ্কুশ করাই যুক্তিযুক্ত হবে। তার এ কাজের যৌক্তিকতা সম্বন্ধে হয়তো মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু পরিণামে তার পক্ষে অসুবিধাই সৃষ্টি হয়েছিল।

ইয়ার মুহম্মদ ও সুলতান মুহম্মদ শিখদের আজ্ঞাবহ হয়ে এবং তাদের সহযোগ সিন্ধু রাজপুতনার মধ্য দিয়ে পাক- ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে মুজাহিদ শিবিরে টাকা ও অন্যান্য রসদ সরবরাহের পথে বারবার বাধা সৃষ্টি করেছিলেন। এজন্য দুররানিদেরকে শায়েস্তা করতে মুজাহিদ নেতারা প্রথমেই পেশোয়ার দখল করতে চেষ্টা করলেন। শাহ্‌ ইসমাইলের পক্ষে এটি ছিল একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেশোয়ার দখল করা সম্ভব হয়নি। তারা উত্মনজাই পর্যন্ত অগ্রসর হল এবং সরদায়ের ছ’ খানি বিরাট কামান দখল করে নিল। কিন্তু এ যুদ্ধজয়ে পশ্চিম দিকের বিপদ দূরীভূত না হয়ে নানা অসুবিধার সৃষ্টি হল। এখন ইয়ার মুহম্মদ প্রকাশে্য সৈয়দ সাহেবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। আর তার ভাই সুলতান মুহম্মদ বিশ্বাসঘাতকতা করে মুজাহিদদের সর্বনাশ সাধনের উদ্দেশ্যে শিখদের সঙ্গে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন।

ঠিক এই সময়ে মুজাহিদ শিবিরে আত্মকলহ শুরু হয়ে গেলো, যার ফল হল অত্যন্ত বিষময়। শাহ্‌ ওয়ালীউল্লাহ আন্দোলনের অন্যতম নেতা মাওলানা মাহবুব আলী মুজাহিদদের জীবনধারার কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি তুললেন শরীয়তের প্রশ্ন নিয়ে এবং শেষে বিরক্ত হয়ে শিবির ত্যাগ করে দিল্লী ফিরে গেলেন। উত্থাপিত প্রশ্নে হয়তো সত্য উভয় দিকেই ছিল এবং মাওলানা মাহবুব আলীকে একক দোষী করা নিশ্চয়ই সমীচীন হবে না। কিন্তু আত্মকলহের ফলে এই হল যে, দিল্লী থেকে মুজাহিদ শিবির একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। অথচ তখন দিল্লীই ছিল এই আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। শাহ্‌ আবদুল আজীজের মৃত্যুর পর তার গদ্দিনশীন শাহ্‌ ইসহাক মুজাহিদদেরকে সাহায্য পাঠাবার সবরকম চেষ্টা কতেন। কিন্তু মাহবুব আলীর মত নেতৃস্থানীয় মাওলনা প্রত্যাবর্তনে আন্দোলনটাই অনেকখানি আঘাতপ্রাপ্ত হল। অতঃপর ভারত থেকে মুজাহিদ শিবিরে মানুষ ও রসদ প্রেরণ একেবারে বন্ধ হয়ে গেলো। এবং সীমান্ত থেকে প্রাপ্ত সাহায্য ছাড়া সৈয়দ সাহেবের আর কোন উপায় রইল না। তিনি কিছুদিন একদল বেতনভোগী সৈন্য পোষণের ব্যাবস্থা করেছিলেন, কিন্তু অর্থাভাবে তাকে এই সৈন্যদলও ভেঙে ফেলতে হয়।

দিল্লী থেকে মুজাহিদ শিবির বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার পর আরও কয়েকটি সংকটজনক অবস্থার সৃষ্টি হয়। অতঃপর পঞ্জতর অন্যান্য স্থানের উপর দিল্লীর নৈতিক প্রভাব একেবারে ক্ষয়িত হয়ে যায়। তার উপর ১৮২৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে অন্যতম মশহুর আলেম ও নেতা মাওলনা আবদুল হাই এর সহসা মৃত্যু হওয়ায় মুজাহিদ শিবিরের এক বিরাট ব্যাক্তিত্বের তিরোধান হয়। তার ফলে তাদের মনোবলও অনেকখানি দুর্বল হয়ে যায়। গোলাম রসুল মেহের প্রমুখ লেখকেরা ‘মনজুরা’ ও ‘ওয়াকেয়ার’ ঐতিহাসিক তথ্য থেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, দিল্লীর তেমন কিছু প্রান সঞ্জীবনী ছিলনা মুজাহিদ শিবিরের উপর। কিন্তু এসব একদেশদর্শী বিবরণীর উপর নির্ভর না করে যদি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যাবতীয় প্রাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্য থেকে আলোচনা করা হয়, তাহলে কোন সন্দেহ থাকেনা যে, দিল্লীই ছিল মুজাহিদ শিবিরের প্রধান প্রান সঞ্জীবনী সূত্র এবং এ সূত্র ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর মুজাহিদরা স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পরে।

কিন্তু অবস্থা চরমভাবেই খারাপ হয়ে উঠে আর একটি বেদনাদায়ক কারনে। তখন শিবিরে বাস করতেন ইয়ামেন দেশাগত আল্লামা শওকতী নামক একজন জবরদস্ত আলেম। তার প্রভাবে ও উদ্দীপনায় মাওলানা মুহম্মদ আলী রামপুরী, বিলায়েত আলী আজিমাবাদী ও আওলাদ হোসেন কনৌজী বেদাত- অবেদাতের প্রশ্ন তুলে মুজাহিদ শিবিরকে দ্বিবিভক্ত করতে উদ্যত হলেন। তখন অনন্যোপায় হয়ে সৈয়দ আহমদ ও শাহ্‌ ইসমাইল এই তিন জন উগ্রপন্থী মাওলানা কে শিবির থেকে বের করে ভারতে চালান দেন। কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান না হয়ে আরও জটিল হয়ে উঠলো। তারা একজন হায়দ্রাবাদ, মাদ্রাজ ও যুক্তপ্রদেশে হাজির হয়ে নিজ নিজ কর্মকেন্দ্র গড়ে তুলেন এবং নতুনভাবে মজহাবী বিরোধের সৃষ্টি করতে থাকেন। তার ফল এই হল যে, নয়া উদ্যমে তারা বেদাতী আলেমদের নামে ফতওয়া প্রচার করতে লাগলেন; আর সেই ফতোয়াগুলোকে ক্ষমতাগর্বী দুররানি সুলতান মুহম্মদ নিরীহ মুজাহিদদের বিরুদ্ধে ব্যাবহার করতে থাকেন। অথচ মুজাহিদরা কোন ওহাবী বা আহলে- হাদীস মতবাদের অনুসারী ছিলনা। বরং একথা সত্য যে, মুজাহিদ বাহিনী তখন পর্যন্ত এবং পরে নাসিরউদ্দিন দেহলভীর সময়ে ও ১৮৫২ সালে মাওলানা বিলায়েত আলীর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত শাহ্‌ ওয়ালীউল্লাহর মৌল আন্দোলনের সঙ্গে নিবিড়ভাবেই জড়িত ছিলেন। একথাও সঠিক বলা যায়না যে, ওয়ালীউল্লাহর আন্দোলনের সঙ্গে পরবর্তীকালে চিহ্নিত আহলে- হাদীস কিংবা তথা কথিত ওহাবী আন্দোলনের বিচ্ছিন্নতা ঘটেছিল।

তবে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, মুজাহিদ বাহিনীর উপর অন্তত ১৮৪০ সাল পর্যন্ত সুপন্ডিত ‘মওলানা’ ও ধর্মনিস্থ ‘সুফী’ দের প্রভাব বরাবরই ছিল অব্যাহত ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী; আর তারা ছিলেন সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী, শাহ্‌ ইসমাইল, শাহ্‌ আবদুল হাই, ‘কুতুব- ই- ওয়াক্ত’ ইউসুফ ফুলাতী, নিজামউদ্দিন চিশতী, ইমামউদ্দিন বাঙালি, ওয়ালী মুহম্মদ ফুলাতী, নাসিরউদ্দিন মাঙ্গালরী ও নাসিরউদ্দিন বেহলভীর মত সর্বজন মন্য আলেম ও সুফী। শাহ্‌ আবদুল আজীজের গদ্দিনশীন ও ওয়ারিস শাহ্‌ ইসহাক মুজাহিদ বাহিনীকে বরাবরই সাহায্য করে গেছেন ১৮৩৮ সালে তার হেজাজে হিজরত করা পর্যন্ত। তবে তিনিও সৈয়দ আহমদ কর্তৃক বহিষ্কৃত উপরোক্ত তিনজন মাওলানা মজহাবী বিরোধের প্রতিরোধ করতে সক্ষম হননি।

আমাদের এখানে উদ্দেশ্য নয় এই মজহাবি বিরোধের বিশ্লেষণ করা। ওহাবী হিসেবে চিহ্নিত সম্প্রদায়ের কিংবা মওলবী নজির হোসেন দেহলবীর অনুসারীর আজাদী সংগ্রামের ভূমিকা অস্বীকার করার অর্থই হবে প্রকৃত ও বাস্তব ঘটনার সত্যতা অস্বীকার করা। আবার তেমনই ভুল হবে মজহাবি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মুজাহিদ আন্দোলনকে মৌল ওয়ালীউল্লাহ আন্দোলনের একাংশ হিসেবে বিবেচনা না করে পৃথক দেখা।

যা হোক, কাহিনীর মূল সূত্রে ফিরে আসা যাক। আমরা পূর্বেই বলেছি যে, পঞ্জতরে অবস্থিত মুজাহিদ শিবিরের দিল্লী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াটা খুবই মারাত্মক ছিল। তার ফলে মুজাহিদ শিবির ১৮২৮ সাল থেকে ১৮৩১ সাল পর্যন্ত ভারতীয় মুসলমানদের চিন্তাধারা থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে। তখন শাহ্‌ শিবকাতুল্লাহ রাশদী প্রতিষ্ঠিত সিন্ধুকেন্দ্র ও সিন্ধুনদের অপর তীরস্থ টংক রাজ্যই মুজাহিদদের প্রধান সাহায্যের উৎস ছিল।

১৮২৯ সালে মুজাহিদ শিবিরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, যেটি মোটেই সময়োপযোগী হয়নি এবং যার ফলে এই বিচ্ছিন্ন ভাবটা আরও সঙ্গিন হয়ে পরে। সেটি হল পঞ্জতরকে কেন্দ্র করে ‘ইমারত- ই- শরীয়ত’ বা শরীয়তের শাসন প্রবর্তন করা।

একথা স্বীকার করতে হবে যে, আদর্শ হিসেবে এটি একটি উৎকৃষ্ট ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। সমকালীন অবস্থা বিবেচনা করলে একথা অনস্বীকার্য যে, ক্ষমতাগর্বী শিখদের এবং রাজ্যলোলুপ ব্রিটিশের সঙ্গে সর্বাত্মক মুকাবিলা করতে হলে আদিবাসী এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা স্থাপন ও সামাজিক ধর্মীয় সংস্কারসাধন ছিল প্রথম কর্তব্য। তখনকার সীমান্ত এলাকা ছিল আদিবাসীদের গোত্রে গোত্রে ও মানুষে মানুষে অহরহ রক্তক্ষয়ী কলহ- দ্বন্দের এক শোচনীয় লীলাভূমি। আঞ্চলিক বাসিন্দাদের শৌর্যবীর্য ও যুদ্ধপ্রিয়তা ছিল অতুলনীয়, কিন্তু শতাব্দী ধরে তারা গোত্রীয় আত্ম কলহে মগ্ন থাকায় সে শক্তি ও সাহস শোচনীয়ভাবে অপব্যয় হয়ে হয়ে অবক্ষয় হয়ে পড়েছিল। বাশিন্দারা অবশ্য ছিল ইসলামে দৃঢ় বিশ্বাসী এবং আজাদী সংগ্রামের নির্ভীক যোদ্ধা। কিন্তু তাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন আরবের ইসলামপূর্ব ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’র চেয়ে কোনও অংশে উন্নত ছিল না।

এই রকম পরিস্থিতে সহসা ‘শরীয়তী শাসন’ প্রবতন কত দূর সমীচীন হয়েছিল, বিবেচনাযোগ্য। ইতিহাসে শিক্ষা ও দূরদর্শিতার মাপকাঠি বিচার করলে মনে হয়, এই পরিবর্তন সময়োপযোগী হয়নি। সাহসা কোন জাতির জীবনধারায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন সম্ভব হয় না। ক্রমে ক্রমে জাতীয় জীবনের ধারাকে পরিবর্তন সংশোধিত করতে হয় লোকমানসের সঙ্গে তাকে উপযোগী ভাবে গড়ে তোলবার চেষ্টা করে। লোকমানসকে উপেক্ষা করে রাতারাতি পরিবর্তন করতে গেলে সংশয় ও মানসিক দ্বন্দ্বের ফলে জনমন তার প্রতি বিমুখই হবে, অন্তরের সঙ্গে তা গ্রহণ করতে পারেনা। লোকমানস ও পরিবেশকে অবহেলা করে দ্রুত জীবনধারার পরিবর্তন সাধনের প্রচেষ্টা বহু ক্ষেত্রেই ব্যার্থ ও নিষ্ফল হয়ে গেছে।

বর্তমানক্ষেত্রে আদিবাসীদের সংস্কার ও মন- মেজাজের দিকে লক্ষ্য রেখে ক্রমে ক্রমে সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে সংস্কার সাধন ও শরীয়তী শাসন প্রবর্তন প্রচেষ্টা সবচেয়ে সমীচীন নিতি ছিল। তখন শিখরা বলদৃপ্ত হয়ে মুসলমানদেরকে কোণঠাসা করে ফেলে শিখসম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখছিল। অন্যদিকে বিদেশী বণিকজাতি তুলাদণ্ড পরিত্যাগ করে। রাজদণ্ড ধারক পূর্বক সমগ্র উপমহাদেশে ব্রিটিশ সম্রাজ্জ স্থাপনের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিল। আদিবাসী সরদারের মধ্যে মোটেই ঐক্য ও সদ্ভাব ছিলনা। সমকালীন রাজনৈতিক অবস্থা সম্যক অনুধাবন করে ও বিবেচনা করে মুজাহিদ নেতাদের একমাত্র কর্তব্য ছিল, জনমানসকে এতোটুকু বিক্ষুদ্ধ ও প্রতিকুল না করে সমস্ত আদিবাসীদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করা, শিখ ও ব্রিটিশ শক্তির সম্যক পরিচয় উদঘাটন করে সমগ্র সরদারকে এক পতাকার তলে আনা ও সর্বত্মক জনযুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং জনমানস শিক্ষিত করার সঙ্গে একটু একটু করে শরীয়তী নিয়ম- কানুন প্রবর্তিত করে শরীয়তী শাসন প্রবর্তনের দিকে লক্ষ্য দেয়া। শিখদের বিরুদ্ধে একটা নিঃসন্দেহে যুদ্ধজয় এবং সম্মিলিতভাবে যুদ্ধজয় করার মনোবৃত্তি সৃষ্টি করার মধ্যেই ছিল তখন মুজাহিদদের শক্তিসঞ্চয় ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব স্থাপনের উপযুক্ত কৌশল। তার ফলে যে আবেগ উত্তেজনা সৃষ্টি হতো, মুজাহিদদের যে মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হতো, তার দ্বারাই উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত করা যেত ক্রমে ক্রমে লোক জীবনকে শরীয়তী পন্থী করে নিয়ে প্রকৃত শরীয়তী শাসন প্রবর্তন করার।

মুজাহিদ কর্তৃপক্ষের এরূপ দূরদৃষ্টি ছিলনা। এজন্য শরীয়তী শাসন প্রবর্তনই প্রথম প্রধান কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হল। আদিবাসী চরিত্র অভিজ্ঞ হিতাকাঙ্ক্ষী পঞ্জতরের ফতেহ খান ও জায়দার আশরাফ খান এরূপ পন্থা সহসা অনুসরণ করার বিরুদ্ধে বার বার উপদেশ জানালেন জোরালো যুক্তি দেখিয়ে। কিন্তু তাদের সব উপদেশ ও সাবধানবাণী অগ্রাহ্য হল। অবশ্য প্রধান সরদার উদ্বিগ্ন ও দ্বিধাগ্রস্ত হয়েও সৈয়দ আহমদের প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্য স্বীকার করে কিছু দিন চুপ চাপ রয়ে গেলেন।

এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহনে পাঠান সরদারদের সাবধানবাণীর চেয়ে শেষ পর্যন্ত পাঠান আলেম সম্প্রদায়ের জিদই প্রবল হয়েছিল। ১৮২৯ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারী বাদ জুমা এক আজীম উশ শান জলসা বসে। সে জায়গায় শরীক হন প্রায় ২০০০ আলেম, কয়েকহাজার আদিবাসী এবং সোয়াত ও সাম্মা অঞ্চলের সমস্ত সরদার। বহু বাক- বিতণ্ডার পর সর্বসম্মতিক্রমে এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ঃ

[১] ইমামের নিকট বয়েত বা আনুগত্য স্বীকার করার পর তার না- ফরমানী করা গুনাহ কবীরা ও শক্ত অপরাধ।

[২] দলত্যাগীকে সৎপথে আনয়নের সব রকম চেষ্টা আপোষে ব্যার্থ হলে তার সঙ্গে জেহাদ জায়েজ।

[৩] এরকম জেহাদে যারা মৃত্যু আলিঙ্গন করে, তারা বেহেশতে শহীদের মর্যাদা পায় এবং বিরুদ্ধবাদীরা অনন্ত কাল দোজখে নিক্ষিপ্ত হয়।

বলাবাহুল্য, এরকম জালসা মাঝে মাঝে বসত ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো। পরবর্তী ২০শে ফেব্রুয়ারী জলসায় সৈয়দ মুহম্মদ হাব্বান নামে একজন স্থানীয় মশহুর আলেম নিযুক্ত হলেন কাজী- উল- কুজজাত এবং কুতুবউদ্দিন নাঙ্গাশারী নামে একজন স্থানীয় মোল্লা হলেন প্রধান কোতোয়াল।

পূর্বেই উক্ত হয়েছে যে, সাম্মা ও সোয়াতের সরদারগণ বিশেষত হুন্দের খাদি খান, জায়দার আশরাফ খান প্রথম থেকেই শরীয়তী শাসনের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছিলেন।ফতেহ খান অবশ্য বিনা প্রতিবাদে এসব সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু এ সময় তিনি যা বলেছিলেনঃ

এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা খুবই কঠিন কাজ। শরীয়তী শাসন প্রবর্তনের প্রধান লক্ষ্য হল, সব রকম ক্ষমতা ও ধনসম্পত্তি ত্যাগ করা। তার দরুন আমাদের জীবিকা উপার্জনের উপায় নষ্ট হয়ে যাবে। আর আমাদের মধ্যে বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত বহু রীতি ও প্রথাও বাতিল হয়ে যাবে। তবুও আমি সব রকম ঝুকি নিতে প্রস্তুত আছি। আমি অকুণ্ঠভাবে ইমামের আনুগত্য স্বীকার করে নিচ্ছি; কারন আমাদের শিক্ষায় হচ্ছে যে, এ পথেই আল্লাহর করুণা মিলবে ও মৃত্যুর পর নাজাত মিলবে।

শেষ পর্যন্ত আশরাফ খান, খাদি খান ও ফতেহ খান প্রমুখ আদিবাসী সরদারগণ একখানি একরারনামা সহি করলেন ও অঙ্গীকার করলেনঃ

[১] উলেমা জলসায় তারা যে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছেন, বিনা প্রতিবাদে তা পালন করতে সর্বদা প্রস্তুত থাকবেন।

[২] তারা সৈয়দ আহমদকে ইমাম হিসেবে স্বীকার করলেন এবং বিনা প্রতিবাদে সর্বদাই তার হুকুম মেনে চলবেন বলে স্বীকৃত হলেন।

[৩] যেসব বেদাত আদিবাসীদের মধ্যে চলিত আছে, তারা সেগুলি বর্জন করলেন এবং ভবিষ্যতে তারা কুরআন ও সুন্নার নির্দেশ মুতাবেক চলতে বাধ্য থাকবেন।

নয়া পদ্ধতিতে যে হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হল, তা আধুনিক পরিভাষায় একটি যুক্তরাজ্য, যেখানে প্রত্যেক সরদারের থাকবে সুশাসন এবং স্থানীয় শাসনকার্যে এক রকম দ্বৈত শাসন থাকবে, যাতে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শক্তির নির্দেশ বলবত থাকবে।

শরীয়ত সাসনে এসব নিয়ম গৃহীত হয়ঃ

[১] একমাত্র খলিফার জেহাদ ঘোষণা করার অধিকার থাকবে এবং এজন্য তিনি ‘ওশর’ [ উৎপন্ন ফসলের দশমাংশ] ও জাকাত আদায়ের হকদার হবেন।

[২] দেওয়ানী ও ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তির জন্য শরীয়তী আদালতে প্রতিষ্ঠিত হবে।

[৩] একটি বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সেখান থেকে মুজাহিদ ও অন্যান্য সকলের মধ্যে সমান হিসসায় মালামাল বণ্টন করা হবে।

[৪] স্বায়ত্তশাসনের অধিকারী আদিবাসীদের মধ্যে কোনও বিরোধ উপস্থিত হলে তার চরম নিষ্পত্তির অধিকার থাকবে খলিফার।

[৫] সকল প্রকার বেদাত বাতিল বলে গণ্য হবে।

[৬] একটি ‘ইহতিসাব’ [পুলিশ] দফতর গঠিত হবে এবং তার কর্তব্য হবে সাধারণের নৈতিক ও ধর্মীয় জীবন নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রত্যেক সমর্থ মুসল্মাঙ্কে ‘সিয়াম’ [রোজা] ও ‘সালাত’ [নামাজ] পালন করতে বাধ্য করা।

[৭] শিক্ষার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব হবে সরকারের উপর। প্রত্যেক মহল্লায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং কেবলমাত্র কুরআন, হাদীস ও ফিকহ শিক্ষা দেয়া হএব।

[৮] সব মুজাহিদ ও সব কর্মচারীকে গণ্য করা হবে আল্লাহর রাহে স্বেচ্ছাসেবক ও পদমর্যাদা নির্বিশেষে সকলকে সমান আহার ও বসন দেওয়া হবে,

[৯] কয়েকজন নেতৃস্থানীয় আলেম ও সরদার নিয়ে একটি ‘মজলিস- ই- শুরা’ গঠিত হবে।

সামাজিক ন্যায়নীতি ও সাম্যনীতির দিক দিয়ে বিবেচনা করলে একথা নিঃসন্দেহ যে, এ ছিল এক আদর্শিক পদ্ধতি, যা বিশ্বনবী ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সাশনপদ্ধতির আদর্শেই গঠিত হয়েছিল। এ শাসনব্যাবস্থায় উচ্চ- নীচ, শিক্ষিত- অশিক্ষিত, ধনী- দরিদ্র কোন ভেদাভেদ একেবারেই ছিলনা। খোদ খলিফাও সাধারণ ভান্ডার থেকে বরাদ্দ পেতেন হীনতম ব্যাক্তির মতই মাত্র দৈনিক এক সের আটা, মোটা কাপড়ের দু’ খানি পোশাক ও একখানি কম্বল। তার কোনও বিশেষ ভাতা ছিলনা, সুবিধা ছিলনা বা আইনের চোখে রেহাই ছিলনা। তিনি ‘মজলিস- ই- শুরা’র নির্দেশমত শাসন চালাতে বাধ্য থাকতেন এবং প্রয়োজন হলে তার মতের বিরুদ্ধেও ঐ সিদ্ধান্ত চরম হিসেবে গণ্য হতো।

এরকম গণকল্যাণভিসারী সামাজিক ব্যাবস্থার প্রথমে বেশ সুফলই দেখা গিয়েছিল। আদিবাসী অধ্যুষিত সীমান্ত এলাকায় আইন- শৃঙ্খলার বালাই ছিল না। কিন্তু ইতিহাসে এই প্রথম এলাকাটিতে আইন ও শৃঙ্খলা স্থাপিত হল। মানুষের জীবনও হল মর্যাদাশিক্ত, আর বিনা কারণে কিংবা অতি তুচ্ছ কারণে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা চলতনা। শতাব্দী ধরে যেসব আদিবাসীদের পারিবারিক বিরোধ ও রক্তের প্রতিশোধ নিয়ে মারামারি কাটাকাটি চলত, সহসা সেসব বন্ধ হয়ে গেলো। শরীয়তী আইন প্রবর্তনের পূর্বে আদিবাসীদের মধ্যে এ রীতি চলিত ছিল যে, কেউ যদি কোনও অপরাধ করে, তা সে যতই গুরুতর হোক না কেন, যদি সে কোনও গোত্রের নিকট আশ্রয় লাভ করত, তাহলে আর কেউ তার কেশ স্পর্শ করতে পারতোনা এবং এরকম চেষ্টা করলে সারা গোত্রটি অপরাধীর আশ্রয়দাতা হিসেবে তাকে রক্ষা করত তার ফলে বংশাবলীক্রমে বহু শতাব্দী ধরেও খুনখারাবী চলত। এখন অপরাধীরা এরকম নির্ভরযোগ্য আশ্রয় লাভে বঞ্চিত হল। বরং সকলের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ালো, অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদানে সাহায্য করা।

আদিবাসীদের মধ্যে এমন অনেক রেওয়াজ ছিল, যা নীতি- বিগর্হিত, সামাজিক শৃঙ্খলা বিপরীত ও শরীয়তের বরখেলাপ। যেমন বলপুর্বক বিবাহ করা, বিবাহার্থে কন্যা বিক্রয় করা, সাধারণ জিনিসপত্রের মত বিধবাগনকে ওয়ারিশানের মধ্যে ভাগ- বাঁটোয়ারা করে নেওয়া, চারের অধিক স্ত্রী গ্রহণ করা,বলপূর্বক স্ত্রীকে স্বামীর নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন করা, বিধবাদের পুনরায় বিবাহ না দেওয়া, মৃতের নাজাতের জন্য মোল্লাদের নির্দিস্ট অর্থ দেয়া, ইচ্ছামত চুক্তি ভঙ্গ করা ইত্যাদি। এসব অদ্ভুত প্রথা প্রচলিত থাকার দরুন আদিবাসীদের নীতিজ্ঞান ছিল নিম্নস্তরের ও জীবন হয়ে উঠেছিল অভিশপ্ত। যাহোক, এসব কুপ্রথা যতই প্রাচীন ও সর্বজন- গ্রাহ্য হোক, নিশ্চয়ই শরীয়তের বরখেলাপ এবং কোন শরীয়তপন্থী এসব কুপ্রথার প্রচলন সহ্য করতে পারতোনা। অতএব এসব কুপ্রথার বিলোপ সাধন সকল ন্যায়নিষ্ঠ ও ধর্মনিস্ট ব্যাক্তিরই কাম্য। কিন্তু এ কাজ একদিনে করা নিশ্চয়ই যুক্তিযুক্ত ছিলনা। আদিবাসীরা ছিল অশিক্ষিত এবং বহু শতাব্দী যাবত প্রচলিত এসব প্রথাকে তারা ধর্মীয় অনুশাসনের মতই পালন করত। অতএব এখানে উচিত ছিল, ধীরে ধীরে জনমানসকে এসব কুপ্রথার কুফল সম্বন্ধে শিক্ষিত ও অবহিত করে তোলা এবং ক্রমে ক্রমে এগুলির বাতিল করার চেষ্টা করা, যেন জনমানস সহসা বিক্ষুদ্ধ না হয়ে ওঠে। কিন্তু কাজে প্রকৃত তাই করা হয়েছিল। এতোটুকু দূরদর্শিতা বা সবধানতা অবলম্বন না করে মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতিকে শীঘ্রই ক্ষুদ্ধ ও উত্তেজিত করে তোলা হয়েছিল। আর তার দরুন কল্যাণভসারী হোক, এই সংস্কার সাধনের প্রচেষ্টায় আদিবাসীগণ শরীয়তী শাসনের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়ে উঠেছিল।

তাছাড়া আরও একটি প্রবল কারন ছিল। শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে সকলকে একটি কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বের অধীন করা হয়েছিল। অথচ আদিবাসীদের মজ্জাগত প্রবৃত্তিই ছিল কারও হুকুমের তাঁবে না হওয়া। তাদের নিকট স্বাধীনতা ছিল স্বেচ্ছাচারিতা। যারা এতোটুকু নিয়ন্ত্রণ বা নিয়মিতকরন মোটেই বরদাশত করতে পারতোনা। কিন্তু কোনও সভ্য সরকারই বল্পাহীন স্বেচ্ছাচারিতার প্রশ্রয় দিতে পারে না। এজন্য শরীয়তী শাসনকর্তৃপক্ষের যখন আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইল, তখন আদিবাসীরা ক্রোধে ফেটে পড়ল।

অতএব দেখা যাচ্ছে যে, এ নয়া প্রবর্তিত সমজব্যাবস্থা যতই ভাল ও আদর্শিক হোক, বাস্তব ক্ষেত্রে তা ফলপ্রসূ হয়নি। এবং মুজাহিদ আন্দোলনের পক্ষে তা শুভও হয়নি।

প্রথম আঘাত এল খাদি খানের নিকট থেকে। মানেরী নামক গ্রামের স্বত্বাধিকার নিয়ে বিরোধটা উঠে। এই গ্রামখানি একটি আদিবাসী গোত্রের প্রায় নব্বই বছর ধরে আইনত মালিকদের বলপূর্বক বেদখল করে নিজেদের নিরংকুশ স্বত্বে ভোগ করত। এ নিয়ে বহু মারামারি ও রক্তপাত হয়েছিল। আদিবাসীদের প্রথা অনুযায়ী যারা একবার রক্তের বিনিময়ে কোনও জমি দখল করে তাতে তাদের স্বত্বাধিকার জন্মে যায় এবং আর তাদেরকে বেদখল করা চলেনা। সৈয়দ আহমদের নিকট মানেরী গ্রামের আদি মালিকরা গ্রামখানির স্বত্বা দাবী করল এবং তিনি ইসলামী আইনানুযায়ী গ্রামটি তাদেরকে প্রত্যার্পনের নির্দেশ দিলেন। এতেই খাদি খান বিদ্রোহী হয়ে উঠেন, কারন তিনি বিপক্ষদলের সাহায্যকারী ছিলেন।

খাদি খান ক্রোধে লিপ্ত হয়ে শত্রু শিবিরে যোগ দিলেন। তিনি শিখদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন, এবং একদল ধিখ বাহিনীকে পঞ্জতর মুজাহিদ বাহিনী আক্রমণ করতে সাহায্য করেন। কিন্তু শিখদের আক্রমণ কার্যকর হয়নি। তাদেরকে গাজীরা সহজেই বিতাড়িত করে।

অতঃপর সৈয়দ আহমদ আলেমদের ও খানদের একটি মজলিস আহ্বান করেন দলত্যাগীদেরকে কাফের হিসেবে ফতোয়া দিতে এবং তাদের হত্যা করা শরীয়তসম্মত রূপে ঘোষণা করতে। বলা বাহুল্য, এর লক্ষ্য ছিল স্বয়ং খাদি খান ও তার দলবল। মজলিশে এ নিয়ে তুমুল বাক- বিতণ্ডা হয় ও খাদি খানের প্রতি সহানুভূতিশীল খানরা মজলিশ ত্যাগ করেন। এরপর খাদি খান ও তার দলভুক্ত সদাররা প্রকাশ্যে শিখদের সঙ্গে যোগ দেয়। মুজাহিদরা তখন সিন্ধু নদের অপর তীরস্থ আটক আক্রমণ করবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, কিন্তু খাদি খানের বিরুদ্ধতা ও শিখদের উপযুক্ত সময়ে সতর্ক থাকার ফলে মুজাহিদদের এ পরিকল্পনা ব্যার্থ হয়ে যায়।

সৈয়দ আহমদ অবশ্য শান্তিপূর্ণ উপায়ে খাদি খানের সমগে একটা আপোষ মীমাংসা করতে বার বার চেষ্টা করেছেন। এজন্য উভয় পক্ষে কয়েকটা বৈঠক হয় এবং খাদি খান এক পক্ষে সৈয়দ আহমদ ও শাহ্‌ ইসমাইল অন্য পক্ষে নেতৃত্ব দেন। খাদি খানকে ইসলামের দোহাই দিয়ে, ন্যায় ও নীতির দোহাই দিয়ে পুনরায় মিলিত হতে আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু হুন্দের খান বরাবরই একরোখা রয়ে গেলেন। তার জওয়াবও ছিল পরিস্কার ও অর্থপূর্ণ। তিনি ‘ইমারত- ই- শরীয়ত’ সোজাসুজি অস্বীকার করেন এবং ‘মোল্লাদের’ ফতোয়ার বিরোধিতা করেন ও বলেন যে এগুলি আদিবাসীদের উপর বলবত হতে পারেনা। কারণ সরদারই এসব অঞ্চলের মালিক ও শাসক এবং তারা কারও হুকুমের তাবেদার নয়। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ব্যংগভরে বলেনঃ

মোল্লারা তো আমাদের এটোয়াটো খুঁটে খায়। আমরা ভিক্ষে দিই,অশর দিই, ইসকাত দিই, আর তাই তারা কুঁড়িয়ে খেয়ে বাচে। শাসননীতি তারা কি বোঝে? আমরা তাদের ফতোয়া মানি আমাদের সুবিধামাফিক। কিন্তু তাদের হুকুম আমরা মোটেই গ্রাহ্য করিনা। আমাদের শক্তি আছে, সাহস আছে, সামর্থ্য আছে আর আছে সমস্ত আদিবাসীরা আমাদের পিছনে। আমরা কারও অধীন নয়। মোল্লারা আমাদের প্রজা, আমরা তাদের প্রজা নয়।

এভাবে বিরোধটা দাঁড়ালো চরমে। খাদি খান পুনরায় শিখদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। জেনারেল ভেন্ডুরার অধীনে একটি শিখ বাহিনী হুন্দের খানের প্রদর্শিত পথে পুনরায় মুজাহিদ শিবিরে আক্রমণ করল। কিন্তু এবারও আক্রমকরা পরাজিত হল।

সৈয়দ আহমদ তখনও আশা ছাড়েনি। তিনি খাদি খানের সঙ্গে মিলন হবার শেষ চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোনও কাজ হলনা। শাহ্‌ ইসমাইল এবার শর্ত দিলেন, কেবলমাত্র ‘তওবা’ করেই খাদি খান পুনরায় ফিরতে পারবেন। কিন্তু জেদী খান উত্তর দিলেনঃ আমি তো কোনও পাপ করিনি। আমরা দেশের শাসক, সৈয়দ বাদশার মত ‘মোল্লা’ ‘মওলবী’ মানুষ নয়। আমাদের জীবনই পৃথক ধরনের। আমরা পাঠানরা সৈয়দ বাদশার শরীয়তী পথে চলতে অভ্যস্ত নই, প্রস্তুত নই।

তখন মুজাহিদ কর্তৃপক্ষ উপায়ন্তর না দেখে হুন্দের আপদ নিশ্চিহ্ন করাই সাব্যস্ত করেন। প্রাচীনকালে ভারতবিজয়ী আলেকজান্ডারের আমল থেকে শিখদের কাল পর্যন্ত যে মশহুর কিল্লাটি এই উপমহাদেশের প্রবেশপথে অবস্থিত ছিল, এক অতর্কিত আক্রমনে মুজাহিদরা সেটা দখল করে ফেলে এবং খোদ খাদি খানও যুদ্ধে নিহত হন।

নানা কারণে এই বিজয় গুরুত্বপূর্ণ। শাহ্‌ ইসমাইলের যুদ্ধকৌশল, রণনীতির জ্ঞানের এটি একটি চূড়ান্ত পরিচয়। হুন্দ কিল্লাহটির অবস্থান ছিল সিন্ধুনদের মুখে সমগ্র পাঞ্জাব ও ভারতে প্রবেশদ্বারপথে। এরূপ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিতির দরুন অতঃপর আদিবাসী এলাকা বার বার শিখদের হামলা থেকে নিশ্চিত হল। এরকমও সম্ভাবনা দেখা দিলো যে, ভবিষ্যতে শিখদের সীমান্ত বিজয় স্বপ্ন একেবারে বিলীন হয়ে গেছে মুজাহিদদের হাতে। কিন্তু আফসোস এই যে, মুজাহিদদের অদৃষ্টই ছিল অপ্রসন্ন। খাদি খানের মৃত্যুতে এমন কয়েকটি ঘটনার সূত্রপাত হয় যার ফলে শোচনীয় বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে।

খাদি খানের মৃত্যুর পর মুজাহিদ কর্তৃপক্ষ তার স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আটক করে গোলমাল নিবারণের অজুহাতে। তার দরুন খাদি খানের শ্যালক ও জায়দার নয়া সরদার মুকাররব খাঁর মুজাহিদদের উপর খড়গহস্ত হয়ে উঠেন, অথচ ইতিপূর্বে তার পিতা আশরাফ খান বরাবরই মুজাহিদদের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন। মুকাররব পলায়ন করে শত্রুপক্ষে যোগ দিলেন। সৈয়দ বাদশাহ তার কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে জায়দার সরদার নিযুক্ত করেন।

এদিকে খাদি খানের ভাই আমীর খান উপস্থিত হলেন পেশোয়ারের দুররানি সরদার ইয়ার মুহম্মদের দরবারে। ইয়ার মুহম্মদ মুজাহিদশিবিরে হামলা করবার সুযোগের প্রতীক্ষা করছিলেন। তিনি আমীর খানকে সঙ্গে নিয়ে শিখদের দরবারে উপস্থিত হলেন ও মিত্রমূলক সন্ধি করলেন। নিজের বিশ্বস্ততার প্রমাণ সরূপ তিনি হুন্দের কিল্লাহ শিখদের অর্পন করলেন, নিজের পুত্রকে জামীন হিসেবে লাহোরে শিখদের দরবারে প্রেরণ করলেন এবং অতিপ্রিয় অশ্বিনী ‘লায়লা’কে উপহার দিলেন রণজিৎ সিংহকে। বলাবাহুল্য, বহু দিন থেকেই রণজিৎ সিংহের এই বিখ্যাত অশ্বিনীর উপর লোলুপ দৃষ্টি ছিল। শিখরা ইয়ার মুহম্মদকে অনেক যুদ্ধাস্ত্র দান করল। এভাবে সুসজ্জিত হয়ে স্বজাইদ্রোহী বিশ্বাসঘাতক দুররানি সরদার মুজাহিদ শিবির আক্রমণ করতে অগ্রসর হলেন।

১৮২৯ সাকের ৪ সেপ্টেম্বর জয়দার বিখ্যাত যুদ্ধ আরম্ভ হয়। শাহ্‌ ইসমাইল একটি ক্ষুদ্র মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে দুররানি সরদারের মুকাবিলা করেন। এই যুদ্ধে তার রণচাতুর্থ চরমভাবে প্রকাশ হয়। ইয়ার মুহম্মদ নিহত হন এবং তার সৈন্যবাহিনী একেবারে বিধ্বস্ত হয়। মুজাহিদরা ছয়টি বৃহৎ কামান সহ তার সমস্ত সমরোপকরন হস্তাগত করে।

জয়দার যুদ্ধ মুজাহিদ সংগ্রামের এক স্মরণীয় অধ্যায়। ইয়ার মুহম্মদ খান মৃত এবন কুচক্রী সুলতান মুহম্মদ অবস্থার চাপে মুজাহিদদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য। মুজাহিদদের শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আপাতত কেউ আর সাহসী নয়। গুরুত্বপূর্ণ কিল্লাহ হুন্দ হস্তাগত হওয়ায় এবং কুচক্রী দুররানি সরদারেরা একেবারে বিধ্বস্ত হওয়ায় সিন্ধুনদের পূর্ব দিক শিখদের হামলা থেকে একেবারে সুরক্ষিত হয়ে উঠে। এদিকে নিশ্চিত হয়ে শাহ্‌ ইসমাইল তখন পূর্ব- উত্তর দিকের পুখলি অঞ্চলে অর্থাৎ হাজারা ও বর্তমান আজাদ কাশ্মীরের মুজফফরবাদ জিলায় দৃষ্টিপাত করেন। সৈয়দ আহমদ এবার স্বয়ং মুজাহিদ বাহিনীর সঙ্গে রইলেন। প্রথমে তারবেলায় আক্রমণ করা হয় এবং শিখদের হাত থেকে খাববল অধিকার করে নেওয়া হয়। তখন পরিস্কার বোঝা গেলো যে, এই অভিযানে আম্বের শাসক পায়েন্দা খানের সঙ্গে সাহায্যের শর্তাবলী সম্বন্ধে আলোচনা চলতে লাগলো। ঠিক এই সময় সক্রিয় সাহায্য ব্যতীত জয়লাভ করা অসম্ভব। অতএব পায়েন্দা খানের সঙ্গে সংবাদ পাওয়া গেলো যে, মুজাহিদ বাহিনীর অনুপস্থিতির সুযোগে সুলতান মুহম্মদ অতির্কিতে হামলা চালিয়ে হুন্দ দখল করে নিয়েছে ও পঞ্জতরে আক্রমনের চেষ্টা করছেন। তখন সৈয়দ আহমদ তাড়াতাড়ি পঞ্জতরে ফিরে আসেন ও শাহ্‌ ইসমাইলের উপর অভিযান চালাবার ভার দিয়ে।

পায়েন্দা খান শুধুমাত্র সাহায্য প্রত্যাখ্যান করেননি, তিনি বাধা দিতেও প্রস্তুত হলেন। শাহ্‌ ইসমাইল তাকে কানেরী, আশরা, কোটারিয়া ও আম্বের যুদ্ধে একে একে পরাজিত করেন ও সন্ধি করতে বাধ্য করেন। পায়েন্দা খানের সঙ্গে সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার পর সৈয়দ আহমদ সাময়িকভাবে আম্বের মধ্যে কর্মকেন্দ্র স্থাপন করেন।

অতঃপর শিখদের অধিকারে অবস্থিত ফুলরার দিকে মুজাহিদ বাহিনী অগ্রসর হয়। তখন শিখরা একটি সন্ধির প্রস্তাব করে। তারা পশ্চিম দিকের সমস্ত অঞ্চল সৈয়দ আহমদকে ছেড়ে দিতে রাজি হয় এই শর্তে যে, মুজাহিদরা হাজারা জিলায় কোনও হামলা চালাবেনা এবং একটিমাত্র অশ্ব শিখদেরকে বশ্যতা স্বীকারের চিহ্নস্বরূপ দান করবে! বলা বাহুল্য, এ প্রস্তাব ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান হয়।

শাহ্‌ ইসমাইল পুখলির দিকে অভিযান চালাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। চারদিকের পরিস্থিতি সবই অনুকূলে ছিল মুজাহিদ পক্ষে। কিন্তু সহসা রুর আঘাতের মত সংবাদ এলো, সাম্মার আদিবাসীরা ‘ওশর’ আদায় করতে অস্বীকার করেছে ও বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।

এ সংবাদ বজ্রঘাতের মতই মুজাহিদ শিবিরে পৌঁছে। সৈয়দ আহমদ শীঘ্রই একদল বাহিনীসহ কাজী সৈয়দ হাব্বানকে পঞ্জতরে পাঠান পরিস্থিতি আয়ত্তে আনতে। কিন্তু তার ফলে অবস্থা এমন সঙ্গীন হয়ে উঠে যে, পরবর্তীকালে সৈয়দ বাদশার পতন ও অনিবার্য হয়ে যায়।

কাজী সৈয়দ হাব্বান খুবই গোঁড়া মোল্লা হলেও বেশ কর্মকুশল ছিলেন। তিনি প্রথমেই শিখদেরকে সুলতান মুহম্মদ কর্তৃক ন্যস্ত হুন্দের কিল্লাহটি অধিকার করেন। তারপর তিনি প্রচন্ড তেজে বিদ্রোহী সরদারগণকে শায়েস্তা করতে অগ্রসর হন। তিনি বিদ্যুতগতিতে ঝাঁপিয়ে পরেন খালাবত, মারখাজ, থান্তকুই, টপ্পা অত্মাননামাহ, চার্গালাই, সুদ্দুম, শেখজানা, ইসমাইলিয়া, নবাকলাই প্রভৃতি কবিলার উপর। তাদের সরদাররা ও মোল্লারা সামান্য যুদ্ধেই বশ্যতা স্বীকার করেন। কেবলমাত্র হোতিমর্দান আয়ত্তের বাইরে রইলো।

কাজী হাব্বানের এ কৃতিত্ব স্বীকার করতেই হবে যে, তিনি এই উপদ্রুত অঞ্চলে অতি শীঘ্র কঠোর হস্তে শান্তি ও শৃঙ্খলা আনয়ন করেন। তার কর্যক্রমেও এতোটুকু অন্যায়ের প্রশ্রয় ছিলনা। কিন্তু তা ছিল কঠোর ও জবরদস্তিমূলক। তাতে এতোটুকু দয়ামায়ার স্পর্শ থাকত না। শক্তি ও জবরদস্তি দিয়ে মানুষের মন জয় করা সম্ভব না। কিন্তু দুটি মিষ্টি কথা, শান্তির কথা কিংবা হার্দ্যনীতির বালাই কাজী সাহেবের মোটেই ছিলনা। অতি তুচ্ছ অপরাধে, এমনকি নগ্ন দেহে কেউ পুকুরে- নদীতে গোসল করলেও তাকে বেত্রাঘাত করা হতো, জরিমানা আদায় দিতে হতো। ‘কন্যাপণ’ আদায় না দেওয়ার জন্য যেসব পিতা বিবাহিত কন্যাদেরকে ঘরে আটকে রাখত বহু কালের চলিত প্রথা হিসেবে, সেসব কন্যাকে বলপূর্বক স্বামীর নিকট পাঠিয়ে দেয়া হতো। তরুণী বিধবাদের জোরপূর্বক পুনর্বিবাহ দেওয়া হতো। সেনাবাহিনীর কেউ সামান্য কিছু জোরপূর্বক গ্রাম থেকে আদায় করলে যেমন অপরাধীকে শাস্তি দেয়া হতো, তেমনি ওশরের কড়াক্রান্তি পর্যন্ত আদায় করে গ্রামবাসীদেরকে উত্যক্ত করা হতো। মৃতের নাজাত ক্রয়ের জন্য ওয়ারীশানের নিকট থেকে মোল্লারা যেসব ‘ইসকত’ আদায় করতেন বহুকালীন প্রথা হিসেবে, তা একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ নিয়ে কোন মোল্লা সাহেব তর্ক তুললে তাকে রীতিমত প্রহার করা হতো এবং ‘আসতগাফার’ ও ‘কালেমা’ পড়ানো হয় ধর্মত্যাগীকে ইসলামে দীক্ষিত করার মত।

এসব জবরদস্তিমূলক কাজের জন্য সারা অঞ্চলে বিরক্তি ও চাপা বিদ্রোহের ঢেউ উঠতে থাকে। মোল্লারা ব্যাক্তিগতভাবে অশর ও ইসকাত আদায় করে নিজেরাই ভোগ করতেন। কিন্তু সরকার অশর আদায় করায় ও ইসকাত একেবারে বন্ধ হওয়ায় মোল্লাদের রুজি- রোজগারের পথও বন্ধ হয়ে যায়, অথচ তাদের জীবিকার কোনও দ্বিতীয় ব্যাবস্থা করা হল না। তার দরুন প্রথমে যে মোল্লাদের আগ্রহে ও সহযোগিতায় শরীয়তী শাসন প্রবর্তিত হয়েছিল, এখন তারাই একযোগে এই শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। আর সরদারদের বিদ্রোহের হেতু পূর্বেই বিশদ হয়েছে। এভাবে কাজী হাব্বানের জবরদস্তি শাসনে বাহ্যিক শান্তভাব দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে সিন্ধুনদের পশ্চিমভাগে সমগ্র সাম্মা অঞ্চলে ও পেশোয়ারে বিদ্রোহের বহ্নি জ্বলে উঠেছিল।

এরকম জঙ্গি শাসনে অঞ্চলটিকে শায়েস্তা করে কাজী হাব্বান নিশ্চিত মনে অগ্রসর হলেন হোতি ও মরদান দমন করতে। কারন হোতির সরদার আহমদ খান ও মরদানের সরদার রসুল খান ওশর আদায় দিতে অস্বীকার করেছিলেন। মুজাহিদ বাহিনী এই অভিযানও জয়ী হয়েছিল, কিন্তু হাজী হাব্বান নিজেই নিহত হন।

বিপদ কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি। পেশোয়ারের সুলতান মুহম্মদ প্রায় ৮ হাজার অশ্বারোহী ও চার হাজার পদাতিক বাহিনী সংগ্রহ করে চামকানির নিকট যুদ্ধার্থে প্রস্তুত হলেন। পঞ্জতর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিল এবং সৈয়দ আহমদ পুনরায় আম্ব থেকে কর্মকেন্দ্র সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হলেন। প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্র হল মাআর তোরার মধ্যবর্তী সমতলভূমি। শাহ্‌ ইসমাইলের অপূর্ব রণচাতুর্য আর একবার কার্যকরী হল এবং সংখ্যায় কম হয়েও মুজাহিদ বাহিনী আবার জয়ী হল। হোতি ও মরদান পুনরায় অধিকৃত হল। সুলতান মুহম্মদ অতি কষ্টে পেশোয়ার পলায়ন করে আত্মরক্ষা করেন। কিন্তু পেশোয়ারও মুজাহিদদের অধিকার পথে এসে গেলো। তখন অনন্যোপায় হয়ে ‘তওবাহ’ করে সুলতান মুহম্মদ আত্মসমর্পন করলেন ও সন্ধি প্রার্থনা করলেন।

সৈয়দ আহমদ সুলতান মুহম্মদের চাতুরীতে ও মিষ্ট কথায় পুনরায় ভুললেন। এবং একটা মারাত্মক ভুল করে বসলেন। মুজাহিদ কর্তৃপক্ষ যে পরিমান সাহসী, নির্ভীক ও রণনিপুণ ছিলেন, তার উপযুক্ত কিছু পরিমানেও রাজনীতির কূটচাল বুঝতেন না।

সীমান্তে দীর্ঘকাল বাস করেও তারা এই দুররানি সরদারের কূটনৈতিক কুবুদ্ধি এতোটুকু অনুধাবন করতে সক্ষম হন নি। সুলতান মুহম্মদ বার বার বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। তবুও তারা কুচক্রী স্বভাবের সম্যক পরিচয় পান নি। এজন্য যখনই অনন্যোপায় হয়ে সময় কাটাবার মতলবে সুলতান মুহম্মদ সন্ধি প্রার্থনা করলেন, সৈয়দ আহমদ সহজেই তার প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেলেন। শাহ্‌ ইসমাইল ও অন্যান্য শুভানুধ্যায়ীরা বার বার সৈয়দ আহমদকে বুঝালেন এই বিষধর সর্প প্রকৃতির দুররানি সরদারের কাতর বাক্যে বিগলিত না হতে। তারা একটি একটি করে সুলতান মুহম্মদের পূর্বতন বিশ্বাসঘাতকতার চিত্র তার সামনে তুলে ধরেন। এমনকি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃদ্বয় আযীম খান ও আমীর দোস্ত মুহম্মদের সঙ্গে তিনি কি ভাবে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, সে সব নজীরও তুলে ধরেন। কিন্তু সরলমনা সৈয়দ আহমদ এসব মোটেই আমল দিলেন না। তিনি করুণা দেখিয়ে পেশোয়ার প্রত্যার্পন করলেন সৈয়দ মুহম্মদকে। সুলতান মুহম্মদের আনুগত্য স্বীকারে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে নিজের একান্ত অনুগত কাজী মজহার আলীকে পেশোয়ারে রেখে ফিরে এলেন নিজের স্থায়ী কর্মকেন্দ্র।

সুলতান মুহম্মদ পেশোয়ারের গদি ফিরে পেয়ে নিজের মূর্তি ধরলেন। এবার অতি গোপনে বাকাপথে তিনি মুজাহিদ সংগঠনের সর্বনাশ সাধনে তৎপর হলেন। প্রথমে তিনি ব্রিটিশ ভারতে কয়েকজন ভাড়াটিয়া আলেমের এক ‘মজহার’ বা প্রচারপত্র সংগ্রহ করলেন। এতে সৈয়দ আহমদের একটি দলকে একটি অভিযানপ্রয়াসী কাফেরের দল ও সুন্নাত জামাতের বহির্ভুত হিসেবে ফতওয়া দেওয়া হয়েছিল। এসব আলেমের অনেকেই ছিলেন ইংরেজের বৃত্তিভোগী। সৈয়দ আহমদের দলত্যাগী কয়েকজন পূর্বতন অনুসারীও ছিলেন এই ফতোয়ার সমর্থক। আমরা পূর্বেই বলেছি যে, তার দল ত্যাগ করে বিলায়েত আলী আজীমাবাদী, মুহম্মদ আলী রামপুরী ও আওলাদ হোসেন দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতে মুজাহিদ আন্দোলনের বিরুদ্ধে মহহাবি প্রশ্ন তুলে বিদ্বেশবীজ ছড়াচ্ছিলেন। তাদেরই অবিমৃষ্যকারিতায় মুজাহিদ আন্দোলন ওহাবী আন্দোলন হিসেবে স্বার্থান্ধ বিদেশী শাসকদের দ্বারা চিহ্নিত হয় এবং হানাফী- ওহাবী মতবিরোধের প্রবল তরঙ্গ তোলা হয়। যাহোক, একথা অনস্বীকার্য যে, মজহাবি বিরোধই আর একবার ইতিহাসে সপ্রমাণ করল যে, মুসলমানদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে মুসলমানরাই, বাইরের শত্রুর চেয়েও।

এরকম সর্বনাশা ফতওয়া হস্তগত করে সুলতান মুহম্মদ কয়েকজন মোল্লা সংগ্রহ করলেন এবং মুজাহিদ সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রচার কার্যে পাঠিয়ে দিলেন। মোল্লারা গ্রামে গ্রামে সফর করে অশিক্ষিত অধিবাসীদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলতে লাগলো মুজাহিদদের বিরুদ্ধে। এই বিদ্বেষ প্রচারনার খবর যথাসময়ে সৈয়দ আহমদের কানে পৌঁছাল। কিন্তু সুলতান মুহম্মদ সৈয়দ সাহেবের সঙ্গে বাহ্যিক ও মৌখিক এমন সদ্ভাব বজায় রেখে চলতেন যে, তিনি এসব সুলতান মুহম্মদের বিরুদ্ধবাদীদের মিথ্যা গুজব হিসেবে উড়িয়ে দিলেন।

এভাবে মুজাহিদদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারকার্য চালিয়েই সুলতান মুহম্মদ ক্ষান্ত থাকেন নি, তাদেরকে ব্যাপকভাবে হত্যা করবার এক গোপন পরিকল্পনাও তিনি প্রস্তুত করেছিলেন। এজন্য তিনি গোপন সাংকেতিক শব্দও ব্যাবহার করতেন। তার একটি ছিল ‘খুন্দরুশ কোবী’ অর্থাৎ জোয়ার ভাঙার প্রস্তুতি। একটি নির্দিষ্ট রাত্রে সমস্ত মুজাহিদকে একযোগে হত্যা করে ফেলাই হল এই সাংকেতিক কথার ইংগিত। এ সম্বন্ধে সৈয়দ আহমদকে পূর্বেই সাবধন করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি এ সংবাদও বিশ্বাস করতে পারেন নি।

নির্দিষ্ট দিন- ক্ষন উপস্থিত হলে সুলতান মুহম্মদ কাজী মজহার আলীকে ডেকে পাঠালেন পরামর্শ গ্রহনের অছিলায়। কাজী সাহেব সুলতানের দরবারে উপস্থিত হলেই সংকেত দেওয়া হয় এবং দশ বারো জন ঘাতক সহসা তাকে কেটে কেটে খন্ড খণ্ড করে ফেলে। কাজী মজহার হত্যাকাণ্ড ছিল মোল্লা প্রচারিত বিদ্রোহের প্রধান ইংগিত। সেই রাত্রেই সারা অঞ্চলব্যাপী মুজাহিদরা যখন নিশ্চিতমনে কউ ইশার নামাজে, কেউ ঘুমে, আবার কেউ গল্প গুজবে মত্ত ছিল, তখন তাদেরকে একযোগে হামলা করে হত্যা করে ফেলা হয় এবং ঘোড়া ও খচ্চর দিয়ে তাদের মৃতদেহগুলি পিষে ফেলা হয়। এভাবে খন্দরুশ কোবীর বীভৎস অভিনয় চলে সাম্মা, হশতনগর ও পেশোয়ারের সারা অঞ্চলে। এখানে প্রায় কয়েক হাজার মুজাহিদ মৃত্যু আলিঙ্গন করেন।

এ সংবাদ বজ্রঘাতের মতই পঞ্জতরে পৌঁছাল। তখন মাত্র এই এলাকা ব্যাতীত সমগ্র আদিবাসী অঞ্চল হিংসায় মেতে উঠেছে মোল্লা ও মালিকদের প্ররোচনায়। সৈয়দ আহমদ পরিণতির গুরুত্ব সম্যক বিবেচনা করে আম্ব ও পুখলি অঞ্চল থেকে মুজাহিদ বাহিনী পঞ্জতরে ফিরিয়ে আনেন। এত দিনে তার চৈতন্য হল এবং বেশ বুঝলেন যে, গত চার বছর ধরে মুজাহিদ বাহিনী কঠোর কৃচ্ছতা ও পরিশ্রম করে যা কিছু করতে সক্ষম হয়েছিল, সবই ব্যার্থতায় পর্যবসিত হল। এই গুরুতর অবস্থায় কি করা সমীচীন, সে বিষয়ে পরামর্শ করার জন্য অনুগত সরদারদের এক জলসা ডাকা হয়। কোনও কোনও সরদার প্রতিশোধ নেয়ার পক্ষে মত দিলেন। কিন্তু ফতেহ খানের মত জবরদস্ত সরদার কোনও ভরসা দিতে পারলেন না। সব দিক বিবেচনা করে তিনি সৈয়দ আহমদকে যুক্তি দিলেন শীঘ্রই পঞ্জতর ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে।

ভারাক্রান্ত মনে, ভগ্নহৃদয়ে সৈয়দ আহমদ বাকী মুজাহিদদের একত্রিত করলেন, এবং ৯০০ অনুচর সহ দ্বিতীয় হিজরত শুরু করলেন পঞ্জতর ত্যাগ করে পুখলির দিকে। ১৮৩১ সালের ফেব্রুয়ারী মাস। তখন কঠোর শীত ও তার যাত্রাপথ ছিল দুর্গম গিরিপথ দিয়ে। আম্বের শাসক পায়েন্দা খান তাকে সজাপথে ছাড় দেন নি। এজন্য মুজাহিদদেরকে উত্তর দিকে দুরতিক্রম্যা পথ বেছে নিতে বাধ্য হল। এ পথে তাদেরকে বহু হিমবাহ অতিক্রম করতে হয়েছে আঁকাবাঁকা ভঙ্গুর গিরিপথে সাচচুন হয়ে কাড়ান উপত্যকার প্রবেশমুখে বালাকটে উপস্থিত হন। বহু ভারবাহী পশু পথে মারা পড়েছে, বহু আসবাব পত্র নষ্ট হয়েছে। শ্রান্ত, ক্লান্ত, মৃতপ্রায় মুজাহিদরা এপ্রিল মাসের শেষ দিকে বালাকোটে উপনীত হন। তাদের গন্তব্য স্থান ছিল মুজাফফরবাদ। কিন্তু সৈয়দ আহমদ তখন যেন অন্য ভাবে বিভোর। তিনি মনস্থির করে ফেলেছে যে, শিখদের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেই যুদ্ধ করবেন এবং শহীদ হয়ে মুসলমানদের অর্জিত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবেন। পুখলির দিকে গমনপথে তিনি বহুবার অনুগামীদেরকে ‘নসিহত’ দেওয়ার সময় এ অভিমত সুস্পষ্টভাবে ব্যাক্ত করেছেন। হাজারা অঞ্চল তখন সর্বদাই অন্তর্বিদ্রোহ দ্বারা আক্রান্ত থাকতো এবং অস্থিরমতি সরদাররা শিখদের অনুচর হিসেবে নিজেদের সর্বনাশ নিজেই ডেকে আনত। পুখলি সে সময় ঘন ঘন শিখদের বিদ্রোহের শিকার হত। এই রকম একটা অভিযানে সৈয়দ আহমদ তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে শহীদ হবেন, এ অভিপ্রায় তিনি বহুবার মুজাহিদদের নিকট প্রকাশ করেছেন।

কিন্তু তার নিয়তই ছিল বালাকোটের ময়দানে শহীদী সম্মান লাভ করা। জেনারেল শের সিংহ এক বৃহৎ শিখ বাহিনী নিয়ে খোরারীর সরদার সজফ খানের প্রদর্শিত গুপ্তপথে বালাকতে উপস্থিত হলেন ও মুজাহিদ বাহিনীকে ঘেরাও করলেন। সজফ খান অবশ্য প্রতিদ্বন্দী সরদারেরই বিনাশ চেয়েছিলেন, সৈয়দ আহমদের মৃত্যু চাননি কিংবা তার বাহিনিকেউ ফাঁদে ফেলতে চাননি। কিন্তু অবস্থা সঙ্গীন দেখে তিনি সৈয়দ আহমদকে বাচাতে চাইলেন এবং অবস্থার গুরুত্ব ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়ে মুজাহিদদেরকে একটি গুপ্তপথেরও সন্ধান দিলেন প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে। শেষ পর্যন্ত কাগান উপত্যকার দিকে পালিয়ে যাওয়ার একটি নিরাপদ পথও খোলা ছিল মুজাহিদদের সামনে। এবং তারা ইচ্ছা করলে পাহাড়ের অপর পাশে দ্রুত পালিয়ে যেয়ে আত্মরক্ষা করতেও পারতেন। কিন্তু কোন মুজাহিদের তখন এই মনোবৃত্তি জাগেনি। তারা সত্যের জন্য, ন্যায়ের জন্য হাজার হাজার মাইল দূরে এসেছেন, প্রয়োজন হলে জান কুরবানী দিতে। আর বালাকোটের শহীদী দরগাহে যখন সে সুযোগ উপস্থিত হয়েছে, তখন কন মুজাহিদ সে সুযোগ অবহেলা করতে পারেন?

১৮৩১ সালের ৬ই মে এই যুদ্ধ শুরু হয়। এটাকে ঠিক যুদ্ধ বলা চলেনা। শিখপক্ষে ২০ হাজার সুসজ্জিত সুশিক্ষিত সৈন্য। আর পথশ্রমে ক্লান্ত, ক্ষুতপিপাসার্ত ও সুলতান মুহম্মদ শাহের বিশ্বাসঘতকতায় ভগ্নোৎসাহ প্রায় ৯০০ মুজাহিদ। এ ছিল মৃত্যু- অভিসারীদের বহ্নিবন্যায় মুক্তিস্নান। দুর্মদাবেগে তারা ঝাপিয়ে পড়লেন ‘জীবন- মৃত্যু মিশেছে যেথায় মত্ত ফেনিল স্রোতে’। শাহাদাত বরণ করলেন সঙ্গীসহ সৈয়দ আহমদ ও শাহ্‌ ইসমাইল।

আমাদের আজাদী- জেহাদের প্রথম অধ্যায় এখানেই শেষ।

আজাদীর অমর সৈনিক মাওলনা মুহম্মদ আলী একদা বলেছিলেনঃ মুসলমানের জীবনকাহিনীর বিস্তৃতি মাত্র তিনটি অধ্যায়েঃ হিজরত, জেহাদ ও শাহাদাত। সৈয়দ আহমদ ও শাহ্‌ ইসমাইলের জীবন এই তিনটি অধ্যায়ের মূর্ত প্রতীক।

বিপ্লবী আহমদউল্লাহ

১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বনিকের তুলাদন্ডধারী বিদেশী ইংরেজ জাতি মুসলমানদের তখত ও তাজ হস্তগত করে, এবং ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে মাত্র ৭০- ৮০ বছরের মধ্যে সমগ্র পাক- ভারত উপমহাদেশে নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন করে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজরা নিরঙ্কুশ ভাবে পাক- ভারতকে নিজেদের সম্রাজ্যে পরিণত করে।

কিন্তু মুসলমানরা সহজে ইংরেজদের সামনে নতি স্বীকার করেনি। বাঙলায় মীর কাশিম, অযোধ্যায় শুজাউদ্দউলা, মহীশুরে হায়দার আলী ও টিপু সুলতান প্রাণপণে ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করলেন এবং পদে পদে তাদের অগ্রগতিতে বাধা দিলেন। টিপু সুলতান যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা গেলেন, তবু মান দিলেন না। কেবল মুসলিম শাসকরাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হননি, সাধারন শ্রেণীর মুসলমানরাও বাণীয়ার জাতি ইংরেজকে প্রীতির চক্ষে দেখেনি। তারাও সংঘবদ্ধ হয়ে ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হয়েছিল। ওহাবী আন্দোলন পাক- ভারতীয় ইতিহাসে এক বিপ্লবাত্মক অধ্যায়, এবং এই উপমহাদেশের আজাদীর সংগ্রামে ওহাবীদের প্রাথমিক উদ্যম স্বর্ণাক্ষরে লিখার যোগ্য। উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকেই ভারতীয় ওহাবীরা জেহাদের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহন করেন এবং ক্রমাগত ইংরেজ রাজশক্তিকে সশস্ত্র আঘাত হানতে থাকে। ইতিহাসের সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে, ওহাবীরা আজাদীর যুদ্ধের পরও প্রায় ৫০০ বছর মহারাণীর সম্রাজ্যে বিপ্লব সজীব রেখেছিল। এবং একথা বললে মোটেই অত্যুক্তি হবেনা যে, বিশ শতকের ভারতীয় সন্ত্রাসবাদীরা তাদের অনুসৃত নীতি ও কর্মধারার একনিষ্ঠ অনুসারী ছিল।

ওহাবী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহন করেছিল সকল শ্রেনীর মুসলমান- চাষি, মুটে, মজুর, দরজী, কশাই, মওলবী, মায় সরকারী আমলা পর্যন্ত। সরকারী আমলার মধ্যে দফতরী থেকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহন করেছিলেন। আমরা এখানের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মওলবী আহমদউল্লাহর জীবনীর উপর আলোকপাত করবো।

আহমদউল্লাহর পিতার নাম ছিল মওলবী ইলাহী বখশ। পাটনার অন্তর্গত সাদিকপুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৮০৫ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে আহমদউল্লাহর জন্ম হয়। পাটনার প্রবীণ বাসিন্দাদের মতে পাটনা শহরের বর্তমান মিউনিসিপ্যালিটির সদর অফিস যেখানে অবস্থিত, এককালে সেখানে শমদউল্লাহ আরবী, ফারসী ও উর্দু ভাষায় উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ইংরেজী ভাষাতেও তার প্রচুর দখল ছিল। তার পিতা ইলাহী বখশ একজন মশহুর আলেম ও সুবক্তা ছিলেন। মশহুর ওহাবীনেতা হযরত সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর তিনি একজন পাক্কা মুরীদ ছিলেন, এবং নিজের তিন পুত্র ইয়াহয়া আলী ফয়েজ আলী ও আহমদউল্লাহকে তার মুরীদ করেন। আহমদউল্লাহ প্রথম যৌবনেই ইংরেজ সরকারের শিক্ষা বিভাগে নিযুক্ত হন। ১৮৫৩ সালের ৬ই জুন তারিখের ৩০১ নং হুকুমনামা অনুযায়ী তিনি পাটনায় জনশিক্ষা কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন।

হযরত সৈয়দ আহমদের নেতৃত্বে পাক- ভারতে যে বিরাট মুজাহিদ বাহিনী গড়ে উঠে, তার সঙ্গে সদস্য ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সে আমলের বহু মুসলমান জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে সকল শ্রেণীর মুসলমান ছিলেন- এমনকি ইংরেজ সরকারের চাকুরির কিংবা খাস কন্ট্রস্কটরগণও গোপনে গোপনে এই মুক্তি আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহন করতেন। তাদের স্বপ্ন ছিল ক্রমবর্ধমান শিখ ও ইংরেজ রাজশক্তিকে নির্মূল করে পাক- ভারতে পুনরায় মুসলিম হুকুমত কায়েম করা। ১৮২৯ সালে সৈয়দ আহমদের নেতৃত্বে যে বিরাট মুজাহিদ বাহিনী শিখদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে জেহাদ ঘোষণা করে তার মোট সংখ্যা ছিল প্রায় দুই লক্ষ। এই বিরাট বাহিনীর জন্য লোক ও অর্থ সংগ্রহ হয়েছিল পাক- ভারতের প্রায় প্রত্যেক দেশ থেকেই- বিশেষতঃ বাংলা- বিহার- উড়িষ্যা, যুক্তপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশ থেকে। এই সংগ্রহ কার্য চলতো একটা সুনিয়ন্ত্রিত গোপন প্রতিষ্ঠানের মারফত এবং তার কার্যপকলাপ এতোই সাবধানে এবং সংগোপনে চলতো যে, ইংরেজ সরকারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও ১৮৫২ সালের পুর্বে তার সন্ধান পায়নি। এই গোপন প্রতিষ্ঠানের কার্যকলাপ ও তার সঙ্গে মওলবী আহমদউল্লাহর যোগাযোগ কতখানি ছিল, তার কিছুটা প্রমাণ পাওয়া যায় তৎকালীন বাংলা সরকারের নিকট মিস্টার র‍্যাভেনস ৯- ৫- ৬৫ তারিখে যে রিপোর্ট দাখিল করেন তার ১৬২ পৃষ্ঠার নিম্নলিখিত বর্ণনা থেকেঃ

“১৮৫২ সালে পাঞ্জাবের কর্তৃপক্ষ একটা ষড়যন্ত্রমূলক চিঠি হস্তগত করে। হিন্দুস্তানী ধর্মান্ধরা [মুজাহিদ বাহিনী] শৈল শিখর থেকে ভারতীয় চতুর্থ রেজেমেন্টের সঙ্গে যে একটা গোলযোগ পাকাতে চেষ্টা করেচ্ছিল, তার প্রমাণ এ থেকে পাওয়া যায়। দেখা যায় যে, এই ষড়যন্ত্রের উৎপত্তি হয় পাটনায়, এবং যে চিঠি ধরা পড়ে তাতে জানা যায় যে, সাদিকপুর পরিবারের বহু মওলবী এবং অস্ত্রসজ্জিত বহু কাফেলা তখন সীমান্তের দিকে রওয়ানা দিএছে। পেশোয়ারের একখানা সাক্ষরহীন চিঠিতে জানা যায় যে, মওলবী বিলায়েত আলী, ইনায়েত আলী, ফয়েজ আলী ও ইয়াহয়া আলী [ আহমদউল্লাহর দুই ভাই] এবং দিনাজপুরের জনৈক দরজী মওলবী করম আলী সুরাটের অন্তর্গত সিত্তানায় তাঁবু ফেলেছিলেন, এবং বাদশাহ সৈয়দ আকবরের সহযোগিতায় গভর্ণমেন্টের বিরুদ্ধে লড়াই করতে তৈরি হচ্ছিলেন। আমি পূর্বেই বলেছি যে, সৈয়দ আকবর সোয়াতের একজন সরকার মনোনীত রাজা ছিলেন। চিঠিতে এই রকম বর্ণনা ছিলঃ মওলবী বিলায়েত আলীর ভাই মওলবী ফরহাত আলী আযিমাবাদে মওলবী ফয়েজ আলীর ভাই আহমদউল্লাহ ও মওলবী ইয়াহয়া আপন আপন বাটিতে বসে নিজ নিজ মহল্লায় অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন এবং অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ পাঠাচ্ছিলেন। অন্যান্য চিঠি থেকে জানা যায় যে, সৈন্য ও রসদ পাটনা থেকে মীরাট ও রাওয়ালপিন্ডির মধ্য দিয়ে পাঠানো হত। এই দু জায়গায় আলাহিদা এজেন্ট নিযুক্ত থাকতো এবং তারা সীমান্তের জেহাদের জন্য রসদ সরবরাহের সব বন্দোবস্ত করত।

“পাঞ্জাব সরকারের অনুরোধক্রমে পাটনার ম্যাজিস্ট্রেট হোসেন আলী খাঁয়ের খানাতল্লাশী করে। সে ছিল আহমদউল্লাহর খানসামা এবং চিঠিপত্র তার নামেই চলাচল হত। আসলে কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক খানাতল্লাশীর দুদিন আগেই পাঞ্জাব থেকে ফেরতা একজন হাকিমের মারফত এ খবরটা জানাজানি হয়ে যায়, তার ফলে পাটনার ষড়যন্ত্রকারীরা সাবধান হয়ে যায় ও তাদের বাড়ীর যাবতীয় চিঠিপত্র নষ্ট করে ফেলে। যা হোক ১৮৫২ সালের ১০ই আগস্ট তারিখের রিপোর্টে ম্যাজিস্ট্রেট সরকারকে জানান যে, ওহাবীদের তখন বেশ সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছিল, এবং মওলবী বিলায়েত আলী, আহমদউল্লাহ ও তার ইলাহী বখশের বাড়িতে জেহাদের জন্য সর্বপ্রকার গুপ্ত মন্ত্রণা হত ও সেখান থেকে প্রচারকার্য চলতো। তিনি আরও জানান যে, ওহাবীদের স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সংযোগ ছিল, তার দরুন তাদের কার্যকলাপের কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তার কাছে যায়নি। মওলবী আহমদউল্লাহর বাড়ীতে ছয়- সাতশো সসস্ত্র লোক ম্যাজিস্ট্রেটের থানাতল্লাশীর বিরোধিতা করতে ও বিদ্রোহের নিশানা তুলতে প্রস্তুত ছিল।

“১৮৫২ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর তারিখের কাউন্সিল বৈঠকে একটা বিষয় লিপিবদ্ধ করা হয়- সেটা করা হয় পাঞ্জাব সরকারের লেখা অনুযায়ী এসব চিঠিপত্রের সম্পর্কে, এবং সীমান্তের আদিবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার প্রয়োজনীয়তাও তাতে স্বীকৃত হয়, কারন তারা বাঙালী ও হিন্দুস্থানি ওহাবীদের দ্বারা ক্রমাগত উত্তেজিত হচ্ছিলো। চতুর্থ দেশীয় রেজিমেন্টের মুন্সী মুহম্মদ ওয়ালীকে ফৌজদারীতে সোপর্দ করা হয় ও রাওয়ালপিন্ডিতে ১৮৫৩ সালের ১২ই মে তারিখে তার বিচার ও শাস্তি হয়। তখনও মওলবী আহমদউল্লাহ এবং পাটনার অন্যান্য অধিবাসীদের নাম পুনরায় সাক্ষ্য প্রমাণে ওঠে, তাদের দ্বারা সীমান্তে রসদ পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

“অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, সরকার কোন সক্রিয় পন্থা অবলম্বন করেন নি, এবং পাটনার ষড়যন্ত্রও নষ্ট করে দেন নি। রাজদ্রোহিতার দমন নিশ্চয়ই হত, আম্বালা অভিযানে কোন সৈন্য ক্ষয় হতনা এবং সরকারী কর্মচারীরা বহু পরিশ্রম ও অহেতুক লাঞ্চনা থেকে রেহাই পেতেন, কারণ ১৮৫২ সালের সশস্ত্র রাজদ্রোহী আহমদউল্লাহই হচ্ছেন এক সামান্য কেতাবওয়ালা ও ১৮৫৭ সালের ‘ওহাবী ভদ্রলোক’। মওলবী আহমদউল্লাহ যোগ্যতার সঙ্গে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত পাটনার জনশিক্ষা কমিটির সদস্য হিসেবে কার্য করেন। তারপর সারা পাক০ ভারতে আজাদীর আগুন জ্বলে উঠলে পাটনা শহরে বহু মুসলমানকে তদানীন্তন কমিশনার মিস্টার তেইলার ওহাবী সান্দেহে বন্দী করেন।আহমদউল্লাহ সাহেবও ‘ওহাবী ভদ্রলোক’ হিসেবে টেইলার সাহেবের কোপানলে পতিত হন। টেইলারের সন্দেহ এই যে, তথাকথিত ‘সিপাহী বিদ্রোহের’; সঙ্গে পাটনার এসব মুসলমানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তিনি বন্দীকৃত সকল মুসলমানকে একটা বাংলোতে নিজের তদারকে আঁটকে রাখেন এবং পৈশাচিকভাবে দৈনিকহারে কয়েকজনকে প্রকাশ্যে ফাঁসি ঝুলিয়ে দেন বাংলোর সামনের ময়দানে। এই ময়দানটা পাটনা শহরের মধ্যস্থলে অবস্থিত ও বর্তমানে বাকীপুর ময়দান নামে খ্যাত। কিন্তু ওপরওয়ালাদের কানে এ সংবাদ পৌছামাত্র অবিলম্বে অবশিষ্ট বন্দীদের খালাশ দিতে আদেশ দেওয়া হয় ও তার কৈফিয়ত তলব করা হয়। এভাবে সেবার টেইলার সাহেবের হাত থেকে আহমদউল্লাহর জীবন রক্ষা পায়। পরবর্তীকালে অবশ্য এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের জন্য টেইলারকে কমিশনারের পদ থেকে অপসারণ করে নিম্নপদে রাখা হয়। তিনি পদত্যাগ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

আজাদীর বিপ্লব প্রশমিত হলে ইংরেজরা মুসলিমদের উপর সদয় ব্যাবহার করে তাদের হৃদয় জয় করতে চেষ্টা করে। এই সময় আহমদউল্লাহ ইংরেজ সরকারের কৃপাদৃষ্টি পুনরায় আকর্ষণ করেন ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োজিত হন। কিন্তু তখনও পাটনার প্রধান কেন্দ্রস্থল থেকে মুলকা ও সিত্তানায় রীতিমত মুজাহিদ ও রসদ সরবরাহ চলতো। বলা বাহুল্য, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটঠ হয়েও আহমদউল্লাহ এই ব্যাপারে পূর্ণ সহায়তা করতেন এবং তারই তত্ত্বাবধানে বাংলা- বিহার থেকে মুজাহিদ ও রসদ সংগ্রহ পুর্ন উদ্যমে চলতো। তখনও তার বাড়ী ছিল এ ব্যাপারে প্রধান ঘাঁটি। সেখানে প্রতি জুম্মাদিনের মগরবের নামাযের পর মিলাদের মাহাফিল বসত এবং তার অছিলায় ওহাবীরা জমায়েত হয়ে সভা করত ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারিত করত। ওহাবীদের কার্যপদ্ধতি ছিল আশ্চর্য ধরনের। তারা চিঠিপত্রে সাংকেতিক ভাষা ব্যাবহার করত যার প্রকৃত অর্থ ওহাবী ব্যতীত অন্য কারও বোধগম্য ছিলনা। প্রত্যেক সত্যের একটা বিনামা পরিচয় ছিল। তারা যুদ্ধকে বলত ‘মুকাদ্দমা’, মোহরকে বলত ‘লাল- মোতি’। টাকাকড়ি প্রেরণ করা হত কেতাবের দাম হিসেবে। পরবর্তীকালে খাতাপত্র থেকে জানা যায়, শমদুল্লাহ এক বছরেই ২৬ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন, তাছাড়া কাসেদের মারফত নগদ মোহর কত পাঠানো হয়েছিল, তার হিসেব পাওয়া যায়নি।

সমগ্র বাংলা ও বিহার প্রদেশে আহমদউল্লাহর কর্মঠ ও বিশ্বস্ত গুপ্ত এজেন্ট ছিল। পূর্ব- বাংলার এজেণ্ট ছিলেন হাজী বদরউক্কিন নামক ঢাকার একজন মশহুর চামড়া ব্যাবসায়ী। তিনি পূর্বাঞ্চলের সমস্ত অর্থসংগ্রহ করে পাটনায় প্রেরণ করেন ফাগুলাল নামধারী জনৈক ব্যাবসায়ীর নাম বরাবর হুন্ডি দিয়ে। কলকাতা মুড়িগঞ্জ মহল্লায় আবদুল জব্বার নামক একজন এজেন্ট ছিলেন এবং মুকসেদ আলী নামক অন্য একজন এজেন্ট হাইকোর্টে মুখতারী করতেন। মুখতার সাহেবের পাটনাতেও একখানা বাড়ি ছিল। যশোর, ২৪ পরগনা, ফরিদপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, রংপুর, মুঙ্গের, ত্রিহুতি, আরাহ, বকসার বোরস, ইলাহাবাদ, খানপুর, মীরাট প্রভৃতি বড় বড় শহরে আহমদুল্লাহর এজেন্ট ছিল। একদল অভিজ্ঞ কাসেদ মারফত আহমদউল্লাহ ও এজেন্ট দের মধ্যে সাংকেতিক ভাষায় চিঠিপত্র ও টাকাকড়ি চলাচল হত। তাদের মারফতেই সিত্তানায় খবরাখবর আদান হত।

সমসাময়িক সরকারী কাগজপত্র থেকে এ তথ্যও সংগ্রহ করা যায় যে, আহমদউল্লাহ বাংলা, বিহার, আসাম ও উড়িষ্যা প্রদেশে জেহাদের জন্য যাকাত তোলার বিশেষ চেষ্টা করেন। একদল সুশিক্ষিত আলেম ও বক্তা নিয়োজিত থাকতেন মুসলমানদিগকে মিলাদ ও ওয়াজ- নসিহতের মাধ্যমে কাফেরদের বিরুদ্ধে জেহাদে উদ্বুদ্ধ করতে। মওলবী আহমদউল্লাহই ছিলেন ১৮৬০ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কর্ণধার, এবং নিজের দায়িত্বপূর্ণ সরকারী উচ্চপদের পূর্ণ সুযোগ গ্রহন করে তিনি নিরঙ্কুশ ভাবে এই আন্দোলন চালাতেন।

পাক- ভারতব্যাপী আজাদীর বিপ্লবে ওহাবী মুজাহিদরা সক্রিয় অংশগ্রহন করেছিল। কিন্তু প্রতিকূল অবস্থার জন্য এ বিপ্লব ফলপ্রসূ না হলেও মুজাহিদরা দমিত বা ভগ্নোৎসাহ হননি। বরং দ্বিগুন উদ্যমে তারা নতুন মুজাহিদ ও রসদ সংগ্রহ করতে লাগলেন। সমগ্র বাংলা প্রদেশ থেকে হাজার হাজার মুসলমান চাষি মুজাহিদ বাহিনীতে যোগদান করতে আহমদউল্লাহর বাসগৃহে জমায়েত হত ও সেখান থেকে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সিত্তানায় প্রেরিত হত। এই রকম একটি দলের চারজন বাঙালি মুসলমান আম্বালায় যাওয়ার পথে ১৮৬৩ সালে কর্ণাল জিলার পাঞ্জাবী সার্জেন্ট গুজান খানের হাতে ধরা পড়ে ও ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট তাদের হাজির করা হয়। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট তাদেরকে নিরীহ পথচারী বিবেচনা করে খালাস দেন। দুই মাস পরেই সীমান্তে একটা যুদ্ধ বাধে। তখন ধৃত বাঙালি মুসলমানের নিকট গৃহীত তথ্যের সত্যতা প্রমাণিত হয়। ইতিমধ্যে গুজান খাঁ আপন একমাত্র পুত্রকে সিত্তানায় গুপ্তচর হিসেবে পাঠিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করে যে, থানেস্বরবাসী জাফর খাঁ সীমান্তে মুজাহিদ ও রসদ প্রেরনে সক্রিয় অংশগ্রহন করছেন। কর্তৃপক্ষ এ সংবাদ পেয়েই জাফর খাঁর বাড়ি তল্লাশী করে ও বহু সন্দেহজনক কাগজপত্র হস্তগত করে। জাফর খাঁ [অপ্লাতক হন, কিন্তু আলীগড়ে পাটনাবাসী বহু ওহাবীর সঙ্গে ধরা পরেন। তারা জবানবন্দীতে প্রকাশ করেন যে, তারা সাদিকপুরের ইলাহী বখশের গুপ্তচর। তখনই পাটনায় টেলিগ্রাম পাঠানো হয় ইলাহী বখশকে বন্দী করতে ও তার খানাতল্লাশী করতে। জাফর খাঁর বাড়ি থেকে যেসব কাগজপত্র হস্তগত হয়, তার একটি চিঠিতে মুহম্মদ শফীকে সংবাদ পাঠানো হয়েছিল যে, জনৈক কাসেদ মারফত তিনশো ছোট বড় দানার একটি তশবীহ ও ছয়শো সফেদ দানার আরেকটি তসবীহ পাটনা থেকে পাঠানো হয়েছে। কিছুদিন পর থানেশ্বরবাসী হোসেন খাঁ নামক এক ব্যাক্তিকে আম্বালাগামী একটি আক্কাগাড়ী থেকে বন্দী করা হয় এবং তার পিরহানের ভিতর দুটি থলে থেকে পূর্বোক্ত তসবীহ সংখ্যার সোনার মোহর পাওয়া যায়। এসব তথ্য থেকে কর্তৃপক্ষ একটা ভীষণ ষড়যন্ত্রের সন্ধান পায় ও পাটনার ম্যাজিস্ট্রেট রাভেনশ সাহেবকে এ বিষয়ে পূর্ণ তদন্তের জন্য বিশেষ কর্মচারী নিয়োগ করে।

বলা বাহুল্য যে, তদন্ত আরম্ভ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আহমদুল্লাহ বন্দী হন ও চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হন। রাভেনশ সাহেবের তদন্ত অনুযায়ী তার বিচার ও দন্ড হয়, যদিও সাহেবের রিপোর্ট দাখিল হয় বিচারের পর ১৮৬৫ সালের ৫ই মে তারিখে। রাভেনশ আম্বালা বিচারের সাক্ষ্য প্রমাণ থেকে তদন্তের সূত্র গ্রহন করেন। এই আম্বালা বিচার শেষ হয় ১৮৬৩ সালে এবং বিচারের ফলে মুহম্মদ শফী, ইয়াহয়া আলী ও তারা ভাই আবদুল রহিম ও ভাইপো ব্যাংকার ইলাহী বখশ, পোদ্দার আবদুল গফুর ও আরও পাঁচজনের যাবজ্জীবন দীপান্তরের দণ্ডাদেশ হয়। ইলাহী বখশকে পাটনায় আনয়ন করা হয় এবং তার দীর্ঘ জবানবন্দী গ্রহন করা হয়। তাতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, আহমদুল্লাহ ছিলেন পাটনা কেন্দ্রে ওহাবী আন্দোলনের প্রাণশক্তি।

চার মাস তদন্তের পর র‍্যাভেনস সাহেব আহমদউল্লাহর বিরুদ্ধে প্রাথমিক রিপোর্ট দান করেন এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের সুদীর্ঘ তালিকা পেশ করেন। মিস্টার মনোরা নামক জনৈক প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট প্রাথমিক তদন্ত শেষ করে আহমদুল্লাহর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহিতা, রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র প্রভৃতি আট দফার চার্জ গঠন করেন ও দায়রায় সোপর্দ করেন। মিঃ আইনসাইল নামক দায়রা জজের এজলাসে সুদীর্ঘ কাল আহমদউল্লাহর বিচার হয়। মিঃ ম্যাকেঞ্জী আহমদউল্লাহকে চরম দন্ড ফাঁসির আদেশ দেন। এই দডাজ্ঞার বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে আপীল দায়ের হয়। মাননীয় বিচারপতি ট্রিভর ও লক ১৮৬৫ সালের ১৩ই এপ্রিল তারিখে রায় প্রদান কএন এবং ফাঁসির হুকুম পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন এর আদেশ দেন। মাননীয় বিচারপতি সাক্ষ্য- প্রমাণ আলোচনাকালে রায়ে এই মোট প্রকাশ করেছিলেনঃ

“আমাদের বিশ্বাস, পাটনায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার যে একটা প্রবল ষড়যন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল তা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের জন্য সাধারণ্যে সরকারের বিরুদ্ধে জেহাদ প্রচার করা হত, এবং সীমান্তে অজস্র ধারায় অর্থ ও মানুষ প্রেরন করা হত। আমাদের সম্মুখে আরও প্রমাণ আছে যে, এভাবে যেসব লোক প্রেরিত হয়েছিল তারা সিত্তানায় বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল ও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অস্ত্রধারণ করেছিল। থানেশ্বরের মুহম্মদ জাফর ও আম্বালার মুহম্মদ শফীর মারফত এসব বিদ্রোহীদের সাহায্যার্থে অর্থ ও হুন্ডি পাঠানো হত। সাক্ষ্য- প্রমাণ থেকে আমরা আরও লক্ষ্য করেছি যে, এই আসামী আহমদুল্লাহর হামেশাই পাটনার আবদুর রহিমের বাড়িতে হাজির থাকতো, অথচ সেখান থেকে ক্রমাগত জেহাদ ঘোষণা করা হত। আমরা নিঃসন্দেহ হয়েছি যে, এই ষড়যন্ত্রের ও প্রসারের সবরকম প্রচেষ্টায় আসামীর জ্ঞান ও সম্মতি ছিল, এবং যদিও এরুপ সত্য প্রমাণ নাই যে, আসামী কোনও বিশেষ কাজ দ্বারা ষড়যন্ত্রের সহায়তা করেছে, তবু একথা নিঃসন্দেহ যে, ষড়যন্ত্র প্রমাণিত হয়েছে, এবং তার সঙ্গে আসামীর সংযোগও প্রমাণিত হয়েছে। অতএব তার সহকর্মীরা একই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে যেসব অপরাধমূলক কাজ করেছে, সেসব প্রমাণিত হওয়ার দরুন তার বিরুদ্ধে এসব কাজ তারই দ্বারা সংঘটিত হিসেবে বিবেচিত হবে। আমাদের বিশ্বাস যে, আসামীর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধি আইনে ১২১ ধারার দ্বিতীয় অংশ মোতাবেক অভিযোগ যথেষ্টরূপে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু আমরা এরুপ দেখিনা যে, আসামীর সহকর্মীরা ষড়যন্ত্রে সক্রিয় অংশগ্রহন করার দরুন যেরূপ উচিত দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছে আসামী তার চেয়েও বেশি কিছু সক্রিয় অংশগ্রহন করেছিল। এজন্য আমরা তার বিরুদ্ধে দায়রা জজের প্রাণদণ্ডের আদেশ অনুমোদন না করে এই আদেশ দিলাম যে। তার যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হোক ও তার যাবতীয় বিষয়- সম্পত্তি রাজ- সরকারের বাজেয়াফত হোক”।

আহমদউল্লাহর বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিচারের এভাবে যবনিকাপাত হয়। প্রায় দু’ শো বছরব্যাপী পাক- ভারতীয় ব্রিটিশ শাসনে আর কোনও ম্যাজিস্ট্রেট রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার কাহিনী ইতিহাসে মেলেনা।

সেসন আদালতে আহমদউল্লাহর ফাঁসির হুকুম ও সমস্ত সম্পত্তি বাযেয়াফতের নির্দেশ দেওয়া হয় ১৮৬৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী। কিন্তু কলিকাতা হাইকোর্ট ১৩ই এপ্রিল ১৮৬৫ সালের হুকুমবলে ফাঁসির হুকুম রহিত করেন ও যাবজ্জীবন দীপান্তরের আদেশ দেন। তিনি ১৮৬৫ সালের জুন মাসেই নীত হন এবং ১৫ বছরের অধিককালে বন্দী জীবন সহ্য করে ১৮৮১ সালের ২২ই নভেম্বর মৃত্যু আলিঙ্গন করেন। তার কনিষ্ঠ ইয়াহয়া আলী পূর্বেই আন্দামানে প্রাণত্যাগ করেছিলেন। তার অন্তিম ইচ্ছা ছিল, ভ্রাতার পাশেই সমাহিত হওয়া কিন্তু স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তার এহেন নির্দোষ ইচ্ছাও পূরণ করেনি।

সাদিকপুর পরিবারের পারিবারিক বাসগৃহটি ছিল মহল্লার বিশিষ্ট স্থানে এবং পাটনায় মশহুর বাসগৃহ হিসেবে কীর্তিত হত। বাসগৃহটি ভূমিসাৎ করে সেখানে পাটনা মুন্সিপাল বাজার নির্মিত হয়। এই পরিবারেরই অন্যান্য ভূসম্পত্তি বিক্রয়লব্ধ অর্থবলে। কথিত আছে, ভূসম্পত্তি নিলাম দ্বারা ১২১৯৪৮ টাকা পাওয়া যায়, তার মধ্যে একা আহমদউল্লাহরই অংশ ছিল ৪২১১১ টাকা। ভাগ্যের এমনই নির্মম পরিহাস ছিল যে, যেদিন আহমদউল্লাহর পরিবারকে বাসগৃহ থেকে একবস্ত্রে উৎখাত করা হয়, সেদিন ছিল পবিত্র ও আনন্দময় ঈদের দিন। আহমদউল্লাহ এজন্যে এ শোকগাথা রচনা করেছিলেনঃ

চু শব- ঈ- ঈদ রা সেহর করকান্দ

হামা রা আয মাকান বদার করদান্দ;

মারা- ই- আয়েশ সাবে- মাতম শুদ।

ঈদ- ই- মা শুররা- ই- মুহররম শুদ।

‘ঈদের আনন্দময় দিন প্রভাত হল, আমরা সকলেই গৃহ হতে বিতাড়িত হলেম। আনন্দের সব উচ্ছাস শোকের রূপ নিল- আমাদের ঈদ মুহররমে পরিণত হল”!

তার জ্যেষ্ঠপুত্র আবদুল হামিদের শোকাচ্ছাস ছিলঃ

আহমদউল্লাহ বুদ মুজরিম- ই- শাহ

তিফলাক- ই- বেগুনাহরা চে গুনাহ।

আহমদউল্লাহ সরকারের চোখে অপরাধী ছিলেন, কিন্তু তার মাসুম সন্তানরা কি অপরাধ করেছিল?

এখানে একথাও উল্লেখযোগ্য যে, সাদিকপুর পরিবারের সুবৃহৎ পারিবারিক কবরগাহটি সরকারী হুকুমে চাষ দিয়ে উৎখাত করা হয় ও হিন্দুদের মধ্যে বন্দোবস্ত করে দেওয়া হয়।

 — সমাপ্ত —

About আবদুল মওদুদ