খিলাফতে রাশেদা

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

খিলাফতে রাশেদার রাশেদার রাষ্ট্র-রূপ

হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর এক ব্যক্তি তাঁহাকে ******- ‘হে আল্লাহ্‌র খলীফা’ বলিয়া সম্বোধন করিলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলিয়া উঠিলেনঃ ‘আমি আল্লাহ্‌র খলীফা নহি,আমি আল্লাহ্‌র রাসূলের খলীফা’।

ঐতিহাসিকগণ খলীফার এই উক্তিকে তাঁহার স্বভাবসুলভ অতুলনীয় বিনয় ও স্বীয় তুচ্ছতাবোধের অকাট্য প্রমাণ মনে করিয়া লইয়াছেন। কিন্তু রাষ্ট্র-বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কথাটির বিশ্লেষণ করিলে ইহা হইতে ‘খিলাফতে’র গভীর তাৎপর্য সুস্পষ্ট হইয়া উঠে।বস্তুতঃপ্রাথমিক যুগে মুসলমানদের হৃদয়ে খিলাফতের যে রাষ্ট্ররূপ উদ্ভাসিত হইয়া উঠিয়াছিল,হযরত আবূ বকরের এই উক্তি তাহারই সম্প্রকাশক।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর পূর্বে ও পরে কালের স্রোতে শত শত বৎসর অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে।এই সুদীর্ঘ কালের মধ্যে শত-সহস্র রাজা-বাদশাহ ও দেশ শাসক আসিয়াছে ও দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চ হইতে বিদায় নিয়াছে। তাহাদের সম্পর্কে সমসাময়িক লোকদের ও প্রজা-সাদারণের দাবি ছিল,তাহারা ভূ-পৃষ্টে আল্লাহ্‌র স্থলাভিষিক্ত। এই কারনে তাহারা যে সম্ভ্রম-মর্যাদা ও পবিত্রতার অধিকারী, পৃথিবীর বুকে তাহা অন্য কাহারোই থাকিতে পারে না।মিশরের ফিরাউনী রাজা-বাদশাহদের আত্মাভিমান ও দাম্ভিকতা ঐতিহাসিক ব্যাপার হইয়া রহিয়াছে।একজন ফিরাউন *****(আরবী) ‘আমি তোমাদের প্রধান ও শ্রেষ্ঠ প্রভু’ বলিয়া যে দাবি করিয়াছিল, কুরআন মজিদেও তাহার উল্লেখ রহিয়াছে।দূর অতীতকাল হইতে বর্তমান সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রকর্তাদের অধিকাংশই এইরূপ মানসিকতার পরিচয় দিয়া আসিয়াছে। বর্তমান কালেও ইহার দৃষ্টান্ত কিছুমাত্র বিরল নহে।এই ব্যাপারে যাহা কিছু অপূর্ণতা ছিল,প্রত্যেক যুগের তোষামোদকারী ধর্মযাজক ও পুরোহিতরা তাহার সম্পূর্ণ করিয়া তুলিতে একবিন্দু ত্রুটি করে নাই।রাজা –বাদশাহ ও দেশ শাসককে তাহারা ‘পূজ্য’ ও ‘আরাধ্য’ করিয়া তুলিয়াছে যুগে যুগে, দেশে দেশে। মিসর,বেবিলন,পারস্য,ভারতবর্ষ ও অন্যান্য বহু দেশের অবস্থাই ছিল এইরূপ।এইসব দেশের অধিকাংশ রাজা-বাদশাহ ও সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি নিজেকে ধরনী তলে ‘খোদার প্রতিনিধি’ বা ‘খোদার ছায়া’ মনে করিত।তাহাদের অসহায় দরিদ্র প্রজাসাধারণও তাহাদিগকে অনুরূপ মর্যাদা দানে কিছুমাত্র ত্রুটি করিত না।

মধ্যযুগের ইউরোপেও পাদ্রীরা রাজা-বাদশাহদের ইঙ্গিতে ও নির্দেশেই তাহাদিগকে মহান,সম্মানার্হ ও পবিত্র বলিয়া উচ্চতম মর্যাদা দান করিতেও কিছুমাত্র সংকোচ বোধ করিত না। এই মর্যাদা তাহারা আল্লাহ্‌র নিকট হইতে পাইয়াছে বলিয়াই পাদ্রীরা প্রচারণা চালাইত।ইহার ফলে তাহাদের ক্ষমতা হইত অপ্রতিদ্বন্দ্বী-সকল প্রশ্ন,আপত্তি ও সমালোচনার অনেক ঊর্ধ্বে, জনগণের নাগালের বাহিরে; তাহারা ‘খোদার প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি’ রূপে বিবেচিত হইত।তাহাদের মুখনিঃসৃত প্রতিটি কথাই ‘খোদার নিকট হইতে অবতীর্ণ প্রত্যাদেশ’ রূপে গণ্য হইত।তাহাদের আদেশ-নিষেধ সরাসরি আল্লাহ্‌র প্রত্যক্ষ আদেশ-নিষেধ সমতুল্য এবং অবশ্য-মান্য মনে করা হইত।এই কারনে উহা অমান্য করা,প্রত্যাখ্যান করা বা উহার প্রতি বিন্দুমাত্র অবজ্ঞা প্রদর্শন করাও মহাপাপের শামিল হইয়া যাইত এবং তাহা ছিল কার্যতঃঅসম্ভব। পঞ্চদশ শতাব্দী-এবং কোন কোন জাতিতে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত-এই অবস্থাই বিরাজিত ছিল।এই সময় পর্যন্তকার ইউরোপ যদিও জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও শিল্প-কুশলতায় অনেক উন্নতি লাভ করিয়াছিল; কিন্তু অন্ধ বিশ্বাসের যে ঠুঁলি তাহাদের চক্ষুর উপর বসাইয়া দেওয়া হইয়াছিল, তাহা তখনো অপসারিত হয় নাই। উত্তরকালে ব্যক্তিক ও মানসিক স্বাধীনতা এবং সাম্যবাদের অগ্রসেনারা এইসব মানব ধ্বংসকারী ও মানবিক মর্যাদা হরণকারী রসম-রেওয়াজের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের আওয়াজ তুলিয়া আকাশ-পাতাল মথিত করেন এবং উহার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ করিতে বাধ্য হন।অবশ্য এই অভিযানে হাজার হাজার মানুষকে মহামূল্য জীবনও উৎসর্গ করিতে হইয়াছিল।

রাজা-বাদশাহদের এই পদ-পবিত্রতা ও মহাসম্মানের ভাবধারা বিশ-জাতিসমূহের মধ্যে শত শত বৎসর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।আজিকার ইউরোপ এই ভাবধারা হইতে মুক্তিলাভ করিয়াছে খুব বেশি দিন হয় নাই। এই প্রেক্ষিতে প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীকি (রা)- এর উপরোক্ত ক্ষুদ্র উক্তিতে নিহিত বিনয় ও আত্ম-স্বার্থহীনতা বিচার্য। একটি লোক তাঁহাকে ‘খলিফাতুল্লাহ্’- আল্লাহ্‌র খলীফা বা আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি বলিয়া সম্বোধন করিলে তিনি তাহা মানিয়া লইতে স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করেন এবং বলেনঃ ‘আমি আল্লাহ্‌র খলীফা নহি। আমাকে রাসূলের খলীফা বলিয়া অভিহিত করতে পার’।

‘রাসূলের খলীফা’ কথাটিও কোনরূপ ব্যক্তিগত দাপট-প্রতাপ,শান-শওকাত ও শ্রেষ্ঠত্ব-বড়ত্ব বা নিরংকুশ কর্তৃত্ব প্রকাশকারী নয়।উহার মূল তাৎপর্য হইল আল্লাহ্‌র বিধানের ভিত্তিতে তাঁহারাই নির্ধারিত সীমা-সরহদের মধ্যে থাকিয়া মুসলমানদের নেতৃত্ব দান ও রাষ্ট্র পরিচালনায় রাসূলে করীম(স)-এর স্থলাভিষিক্ত বা প্রতিনিধি হওয়া মাত্র।কিন্তু যেসব বিষয়-ব্যাপার কেবলমাত্র রাসূলের জন্য নির্দিষ্ট, সেসব ক্ষেত্রে তাঁহার ‘স্থলাভিষিক্ত’ হওয়ার কোন প্রশ্নই উঠিতে পারে না,উহার চিন্তা বা ধারণাও ইহাতে স্থান পায় নাই।প্রথম খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর প্রদত্ত প্রথম নীতি-নির্ধারণী ভাষণের একাংশ হইতেই তাঁহার এই কথার সত্যতা প্রতিভাত হইয়া উঠে।ভাষণের সেই অংশটি এইঃ

‘আমাকে খিলাফতের এই দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছে বটে;কিন্তু আমি নিজেকে এই গুরুদায়িত্ব পালনের কিছুমাত্র যোগ্য মনে করি না। আল্লাহ্‌র শপথ!আমার ঐকান্তিক বাসনা ছিল,তোমাদের মধ্য হইতে অপর ব্যক্তি এই দায়িত্ব গ্রহন করিবে।এখন তোমাদের কেহ যদি মনে করে যে,রাসূলে করীম(স) যে যে কাজ করিয়াছেন সেইসব কাজও আমি করিব,তাহা হইলে মনে রাখিও, এই ধারণা বা আশার কোন ভিত্তি নাই।রাসূলে করীম(স) আল্লাহ্‌র বান্দাহ ছিলেন,ইহাতে কোন সন্দেহ নাই।কিন্তু সেই সঙ্গে আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁহাকে মহান নবুয়্যাত ও রিসালাতের নিয়ামত দানে ধন্য করিয়াছিলেন এবং সরবপ্রকার গুনাহ্-খাতা হইতে তাঁহাকে মুক্ত ও পবিত্র ঘোষণা করিয়াছিলেন’।

‘আমিও আল্লাহ্‌রই বান্দাহ। কিন্তু তোমাদের মধ্য হইতে কাহারও তুলনায় আমি উত্তম ব্যক্তি নহি।তোমরা আমার প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিবে।যদি দেখিতে পাও,আমি আল্লাহ্‌ ও রাসূলের প্রদর্শিত পথে চলিতেছি, তাহা হইলে তোমারও আমার অনুসরণ করিতে থাকিবে।কিন্তু তোমার যদি আমাকে ‘সিরাতুল-মুস্তকীম’ হইতে বিচ্যুত ও বিভ্রান্ত দেখিতে পাও তাহা হইলে আমার ভুল ধরাইয়া দিয়া আমাকে সঠিক, সত্য ও সোজা পথে পরিচালিত করিবে’।

বলা নিষ্প্রয়োজন,হযরত রাসূলে করীম (স)-এর ইন্তেকালের পর হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) মুসলিম জনতার নেতৃত্ব ও ইসলামী রাষ্ট্র-সংস্থা পরিচালনার দায়িত্ব নিজ হইতে গ্রহন করেন নাই।উদার-উন্মুক্ত পরিবেশে প্রকাশ্য নির্বাচন এবং গণ-সন্তোষ ও সমর্থন অর্জিত হওয়ার পরই তিনি এই কাজে ব্রতী হইয়াছিলেন। আল্লাহ্‌ তা’আলা যেভাবে নিজের পক্ষ হইতে নিজের বাছাই ও মনোনয়নের মাধ্যমে হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে নবী ও রাসূল বানাইয়াছিলেন,তেমনিভাবে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক(রা) কিংবা পরবর্তী খলিফাত্রয় আল্লাহ্‌ কর্তৃক মনোনীত হন নাই। তাহারা আল্লাহ্‌ প্রেরিতও ছিলেন না। অন্যান্য মানুষের তুলনায় তাঁহাদের আদর্শিক শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশিষ্টতা সর্বজনজ্ঞাত ও অবশ্য স্বীকৃতব্য; কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশিষ্টতা আল্লাহ্‌ কর্তৃক ঘোষিত নয়।দ্বিতীয়তঃইহা তাঁহাদের তাকওয়া পরহেজগারী সদগুণাবলীর অনিবার্য পরিণতি মাত্র।খিলাফতের কারণেও এই বিশিষ্টতা অর্জিত হয় নাই,রাসূল যেমন বিশিষ্ট হইয়াছিলেন নবুয়্যাত ও রিসালাতের কারণে।বস্তুতঃখলীফা পদ নিছক বৈষয়িক, খোদায়ী (Divine) নয়।উহার সহিত অলৌকিক ও খোদায়ীর আদেশ ও নির্দেশ দানের অধিকারী ছিলেন,যাহা আল্লাহ্‌র নাজিল করা বিধান-ভিত্তিক এবং রাসূলের উপস্থাপিত শিক্ষা ও ব্যাখ্যার সহিত সঙ্গতিপূর্ণ।আল্লাহ্‌র বিধান-পরিপন্থী ও রাসূলের শিক্ষা ও ব্যাখ্যার সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ কোন নির্দেশ দেওয়ার কোন অধিকার যেমন তাঁহাদের ছিল না,তেমনি মুসলমান জনগণও সেই ধরনের কোন নির্দেশ মানিয়া লইতে আদৌও বাধ্য নয়। প্রথম খলীফা নিজেই তাঁহার প্রথম ভাষণে এই কথাটি সুস্পষ্ট করিয়া দিয়া বলিয়াছেনঃ********(আরবী)

আমার আনুগত্য করিতে থাকিবে যতক্ষণ আমি আল্লাহ্‌ এবং তাঁহার রাসূলের আনুগত্য করিয়া চলিতে থাকিব।কিন্তু আমি নিজেই যদি(আল্লাহ্‌ ও তাঁহার রাসূলের)নাফরমানী করি,তাহা হইলে আমার আনুগত্য করা তোমাদের কর্তব্য নয়।

পরবর্তী খলীফাদের উপাধি

হযরত আবূ বকর (রা)-এর পর হযরত উমর ফারুক(রা) খলীফা নিযুক্ত হইলেন। কিন্তু তিনি নিজে ‘খলীফায়ে রাসূল’-‘রাসূলের খলীফা’নামে অভিহিত হইতে সম্মত হইলেন না। এই বিষয়ে সমাজের লোকদের সহিত পরামর্শ করা হয়।শেষ পর্যন্ত তিনি ‘আমীরুল মু’মিনীন’- ‘মুসলিম জনগণের রাষ্ট্রনেতা ও পরিচালক’ সম্বোধনে সম্মত হইলেন।পরবর্তী খলীফাদ্বয়ও এই সম্বোধনেই ভূষিত হইয়াছেন। ‘খলীফা’ শব্দে অভিহিত হইতে তাঁহারা রাযী হন নাই এইজন্য যে,উহা মানিয়া লইলে ‘খলীফায়ে রাসূল’-‘রাসূলের খলীফা’ এইরূপ সম্বোধনে অভিহিত হইতে হইত। আর ইহার ফলে পরবর্তী খলীফার সম্বোধনে এই শব্দটির পুনরাবৃত্তি ঘটিত তিনবার কিংবা ততোধিকবার আর ইহা অত্যন্ত বিদঘুটে,অশ্রুতি মধুর,অমার্জিত এবং নিতান্তই অশোভন হইয়া পড়িত।

হযরত উমর(রা)-এর ‘খলীফায়ে রাসূল’উপাধিতে ভূষিত হওয়ার পরিবর্তে ‘আমিরুল মু’মিনীন’ নামে সম্বোধিত হইতে সম্মৎ হওয়ার মূলে আরো একটি কারন নিহিত ছিল।হযরত আবূ বকর সিদ্দিকী (রা) যখন বলিয়াছিলেন,আমি আল্লাহ্‌র খলীফা নহি,আল্লাহ্‌র রাসূলের খলীফা’, তখন শব্দটি উহার আভিধানিক অর্থে (স্থালাভিষিক্ত)ব্যবহৃত হইয়াছিল এবং লোকদিগকে পরিস্কার ভাষায় জানাইয়া দেওয়া হইয়াছিল যে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে রাসূলে করীম(সা)-এর স্থলাভিষিক্ত হওয়াই তাঁহার একমাত্র মর্যাদা। আভিধানিক অর্থ ছাড়া অন্য কোন অর্থে তখন এই শব্দটি ব্যবহৃত হইয়া থাকিলে উহার পরিবর্তে হযরত উমর(রা)-এর ‘আমিরুল মু’মিনীন’ শব্দ ব্যবহারে সম্মত হওয়ার কোনই কারন ছিল না।

‘আমীরুল মু’মিনীন’ পরিভাষা গ্রহনের অন্তরালে আরও একটি কারণ বিদ্যমান ছিল। ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থা তখন সমগ্র আরব উপদ্বীপ ও অন্যান্য বিপুল বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এক ব্যাপক বিপ্লব সৃষ্টি করিয়াছিল। এই বিপ্লবের গতি যেমন ছিল তীব্র,তেমনি ব্যাপক ও সর্বাত্মক।সমগ্র পৃথিবীর মানুষ সে বিপ্লবের রূপ দর্শনে বিস্ময়-বিমুগ্ধ ও হতবাক হইয়াছিল। কিন্তু আল্লাহ্‌র কিতাব ও রাসূলের সুন্নাতে এই পর্যায়ে কেবলমাত্র কতকগুলি মূলনীতিই দেওয়া হইয়াছিল,বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি বিধান তাহাতে ছিল না। অবশ্য কুরআনে শু’রা- পারস্পরিক পরামর্শ গ্রহণকে রাষ্ট্র-ব্যবস্থার মৌল ভিত্তি ও বাস্তব কর্মপন্থারূপে ঘোষিত হইয়াছে।আল্লাহ্‌ তা’আলা রাসূলে করীম(স) কে লক্ষ্য করিয়া বলিয়া দিয়াছেনঃ*******(আরবী) ‘হে নবী, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় যাবতীয় ব্যাপারে লোকদের সহিত পরামর্শ কর’। মুসলমানদের আচরণ পদ্ধতি ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ও একস্থানে বলা হইয়াছে,******(আরবী) তাহাদের যাবতীয় জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সুসম্পন্ন হইয়া থাকে’।

এই দৃষ্টিতে খিলাফতে রাশেদার প্রত্যেক খলীফাকে যাবতীয় জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যাদি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ও ভিত্তিতে পারস্পরিক পরামর্শক্রমে সম্পন্ন করিতে হইত।এই কারণে তাঁহাদের মর্যাদা এক-একজন সেনাধ্যক্ষ হইতে ভিন্নতর কিছু ছিল না। সেনাধ্যক্ষ যুদ্ধসংক্রান্ত যাবতীয় কাজের ব্যাপারে মৌল হেদায়েত ও নির্দেশ মূল ক্ষমতাধর ব্যক্তির নিকট হইতেই লাভ করিয়া থাকে।কিন্তু যুদ্ধকালীন সৈন্য পরিচালনা(Operation) ও যুদ্ধ ময়দানের ক্রিয়াকলাপ ইত্যাদি সবকিছুই সেনাধ্যক্ষকে নিজেকেই এবং নিজের একক দায়িত্বেই সম্পন্ন করিতে হয়। খিলাফতে রাশেদাকেও রাষ্ট্র ও দেশ সংক্রান্ত যাবতীয় কার্য সমসাময়িক পরিস্থিতি অনুযায়ী শরীয়াতের সীমার মধ্যে থাকিয়া ও রাসূলে করীম(সা)-এর আদর্শ সম্মুখে উদ্ভাসিত রাখিয়া আদর্শবাদী জননেতাদের পরামর্শক্রমে নিজেকেই আঞ্জাম দিতে হইত।প্রথম খলীফা কোন ব্যাপারে বিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে কোন বিশেষ কর্মনীতি গ্রহন করিয়া থাকিলে দ্বিতীয়,তৃতীয় বা চতুর্থ খলীফাকে ও হুবহু ঠিক সেই কর্মনীতিই গ্রহন করিতে হইবে-অবস্থা ও পরিবেশ পরিস্থিতি যতই পরিবর্তিত হউক না কেন-এমন কোন বাধ্যবাধকতা অবশ্যই ছিল না। এই কারণেই দ্বিতীয় খলীফা ‘খলীফায়ে রাসূল’ ইত্যাদি ধরনের উপাধি গ্রহনের পরিবর্তে সম্পূর্ণ নূতন এবং দায়িত্ব ও পদমর্যাদা সহিত পুরাপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ উপাধি ‘আমিরুল মু’মিনীন’ গ্রহন করাই সমীচীন মনে করিয়াছিলেন।

হযরত আবূ বকর (রা) তাঁহার খিলাফত আমলের অত্যল্প সময়ের মধ্য সমগ্র আরব দেশে যে বিপ্লবের সৃষ্টি করিয়াছিলেন, উহার প্রতি পর্যবেক্ষকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপে একথা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, নম্রতা, কোমলতা ও ক্ষমতাশীলতা এবং কঠোরতা ও অনমনীয়তার ক্ষেত্র ভিন্ন ভিন্ন হইয়া থাকে এবং কঠোরতার স্থানে কঠোরতা ও অনমনীয়তার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন হইয়া থাকে এবং কঠোরতার স্থানে কঠোরতা ও নম্রতা-নমনীয়তার স্থানে নম্রতা-নমনীয়তা অবলম্বিত না হইলে রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় পর্যায়ের কোন কাজই সুষ্ঠু ও যথার্থরূপে সম্পন্ন হইতে পারে না। শুধু হযরত আবূ বকর(রা)ই নহেন, পরবর্তী তিনজন খলীফার সাফল্য ও অসাধারণ শক্তি-সামর্থের পশ্চাতেও এ নিগূঢ় তত্ত্বই নিহিত যে, তাঁহারা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সঠিক ও নির্ভুল পদক্ষেপ গ্রহনে সম্পূর্ণ সক্ষম ছিলেন।

সমসাময়িক আরবের রাজনৈতিক ব্যবস্থা

রাসূলে করীম (স)-এর সময় আরবদেশ অসংখ্য প্রকারের ধর্মমতের লীলাক্ষেত্রে পরিণত হইয়াছিল।উহার উত্তর-দক্ষিণ অংশ পরস্পর হইতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। একাংশের অধিবাসীদের কোন সম্পর্ক অপরাংশের জনগণের সহিত ছিল না। উভয় অংশের লোকদের সাধারণ অবস্থাও কিছুমাত্র অভিন্ন ছিল না। ইয়েমেন ইরানীদের কর্তৃত্বাধীন ছিল। খৃষ্টধর্ম ও মূর্তি পূজার ধর্ম সেখানে পাশাপাশি চলিতে ছিল। তাহাদের হেমায়ারী ভাষা কুরাইশদের ভাষা হইতে সম্পূর্ণ ভিন্নতর ছিল। উপরন্তু ইয়েমেন ছিল কয়েক শতাব্দী কাল ধরিয়া সভ্যতা ও সংস্কৃতি পাদপীঠ। পক্ষান্তরে হিজাজের লোকেরা ছিল অসভ্যতা ও যাযাবরত্তের প্রতীক।এই অঞ্চলে মক্কা,ইয়াসরীব(মদীনা) ও তায়েফ-মাত্র এই তিনটি স্থান ছিল ‘শহর’ নামে অভিহিত হওয়ার যোগ্য। আর হিজাজের বিশাল অঞ্চলের মধ্যে অবস্থান ছাড়া এই তিনটি শহরের মধ্যে পারস্পরিক কোন সম্পর্ক বা সাদৃশ্য ছিল না। অবশ্য এই শহরত্রয়ের লোকদের মধ্য আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপিত ছিল। কিন্তু এই তিনটি শহরের প্রশাসন ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ গোত্রবাদ ভিত্তিক এবং পরস্পরক বিচ্ছিন্ন। মক্কায় মূর্তি পূজার প্রাবল্য ও ব্যাপকতার সঙ্গে সঙ্গে খৃস্টবাদেরও আনুকূল্য ছিল। মদীনায় ইয়াহুদী গোত্রসমূহ বাহ্যতঃ পরাক্রমশালী হইলেও মূর্তি পূজারীদের সংখ্যা ছিল গরিষ্ঠ। এই বিশাল আরব উপদ্বীপে যখন তাওহীদের বাণী ধ্বনিত হইল এবং আল্লাহ্‌ তা’আলা আরবের চতুর্দিকে দ্বীন-ইসলামকে প্রসারিত করিতে চাহিলেন, তখন তিনি উহার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ করিয়া দিলেন। ইয়েমেন পারসিকদের দাসত্ব হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিল।তৎসঙ্গে সমস্ত বৈদেশিক প্রভাব-প্রতিপত্তি হইতেও তাহারা সম্পূর্ণ মুক্ত হইয়া গেল।মক্কা বিজয়ের পর সমগ্র আরবদেশে ইসলাম তীব্র গতিতে প্রচারিত হইতে লাগিল।হিজাজের পর অন্যান্য আরব অঞ্চলেও ইসলাম প্লাবনের মতই বিস্তার লাভ করিল।এইভাবে অতি অল্প সময়ের মধ্যে সমগ্র আরব উপদ্বীপ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় লাভে ধন্য হইল। এই বিশাল অঞ্চলের সমস্ত জনতা একই আদর্শে দীক্ষিত হইয়া গেল।রাসূলে করীম(স)-এর প্রতি ঈমান এবং তাঁহার প্রচারিত দিন-ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসাবে গ্রহণের ব্যাপারে সমগ্র আরব অভিন্ন ও ঐক্যবদ্ধ হইয়া উঠিলেও প্রতিটি গোত্র নিজ নিজ স্থানে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম মর্যাদায় অভিষিক্ত ছিল। অবশ্য ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ‘রুকন’-যাকাত-মদীনার রাজধানীতে পাঠাইতে সব অঞ্চলের লোকেরাই সমানভাবে বাধ্য ছিল।

দ্বীন ও ধর্মের ঐক্য ও একত্ব আরবদের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিপ্লব সৃষ্টির হিসেবে কাজ করিয়াছে।মদীনার চতুর্দিকে বসবাসকারী গোত্রসমূহ রাসূলে করিম(স)-এর সহিত মিত্রতার চুক্তি সম্পন্ন করিয়া লইয়াছিল।তিনি যখন মক্কা বিজয়ের অভিযানে যাত্রা করিলেন,তখন এইসব গোত্র চুক্তি অনুযায়ী কাফেলার সহিত শামিল হইয়াছিল।মক্কা বিজয়ের পর সেখানকার গোত্রসমূহ সাগ্রহে ইসলাম গ্রহন করিল।অতঃপর তাহারাও ইসলামের বিজয় অভিযানসমূহে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করিল।হুনাইন ও তায়েফ যুদ্ধে ইহারা যথারীতি অংশ গ্রহন করে। এইভাবে ইসলাম যখন চতুর্দিকে বিস্তার লাভ করিল, তখন নবী করীম(স) আরব গোত্রসমূহের লোকদিগকে কুরআন মজীদ ও দ্বীনী বিষয়াদি শিক্ষা দানের জন্য লোক নিযুক্ত করিয়া চতুর্দিকে পাঠাইয়া দিলেন।কুরআন শরীফ ও দ্বীন-ইসলাম শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে যাকাত আদায়ের দায়িত্বও কর্মচারীদের উপর ন্যস্ত করা হইল।অত্যল্প সময়ে সৃষ্ট এই দ্বীনী বিপ্লবের প্রভাবে সমগ্র অঞ্চলে রাজনৈতিক বিপ্লব সৃষ্টিও অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল।দ্বীন ও ধর্মের দিক দিয়া সমগ্র আরব এক ও অভিন্ন হইয়া উঠার পর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক দিয়াও এক অভিন্ন সত্তা ও সংস্থায় পরিণত হওয়া ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক পরিণতি। কিন্তু আরব বেদুঈনরা এই ধরনের রাজনৈতিক বিপ্লবের সহিত কিছুমাত্র পরিচিত ছিলনা। রাসূলে করীম(স)-এর অন্তর্ধানের পর তাঁহার স্থলাভিষিক্তেরও অনুরুপভাবে আনুগত্য স্বীকার করিতে হইবে,ইহা ছিল তাহাদের চিন্তা-ভাবনার অতীত।তাহার মনে করিত,রাসূলে করীম (স) উপস্থাপিত শিক্ষা,দ্বীন ও আদর্শ তো তাহাদের মন-মগজ ও জীবনে দৃঢ়মূল হইয়া বসিয়া আছে। ইসলামের পূর্নাঙ্গ বিধান তো তাহারা পালন করিয়া চলিবেই। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দিক দিয়া তাহারা হইবে সম্পূর্ণ স্বাধীন।প্রতিটি গোত্রই পূর্বের ন্যায় বাহিরের রাষ্ট্র ও সরকারের সর্ব প্রকার প্রভাব হইতে থাকিবে সম্পূর্ণ মুক্ত ও বন্ধনহীন।

বস্তুতঃরাসূলে করীম (স)-এর অন্তর্ধানের পর আরব উপদ্বীপের দিকে দিকে যে বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলিত হয়, তাহার মূলে ছিল স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতার এই অনমনীয় ভাবাধারারই প্রাবল্য। অধিকাংশ আরব গোত্রেরই অবস্থা ছিল এইরূপ। কিন্তু প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) চাহিয়াছিলেন, আরব গোত্রসমূহ রাসূলে করীম (স)-এর জীবদ্দশায় যেরূপ ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন হইয়াছিল, সেই অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হইতে দেওয়া হইবে না। কিন্তু আরব গোত্রসমূহ তাহাদের হৃত রাজনৈতিক স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার হইবে বলিয়া মনে-প্রাণে আশা করিয়াছিল। হযরত আবূ বকর (রা) তাঁহার সাচ্চা ঈমানী শক্তির বলে বলিয়ান হইয়া আপন সংকল্পে অবিচল থাকিলেন।মুসলমান হিসাবে প্রত্যেক স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করুক এবং ইসলামের উপস্থাপিত ঐক্য ও সংহতির আদর্শ সকলেই পুরোপুরি মানিয়া চলুক, ইহাই ছিল তাঁহার আন্তরিক বাসনা।তিনি স্পষ্টতঃজানাইয়া দিলেন যে, রাসূলের জীবনকালে যাকাত, ওশর ও খারাজ বাবদ যে সম্পদ মদীনায় প্রেরিত হইত, তাহা অবশ্যই আদায় করিতে হইবে। কিন্তু আরব গোত্রসমূহ সেজন্য প্রস্তুত হইতে পারিতে ছিল না। তাহারা স্পষ্ট ভাষায় বলিতে শুরু করিল, রাসূলে করীম (স)-এর ব্যাপারে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নতর।তিনি আল্লাহ্‌র রাসূল ছিলেন।তাঁহার প্রতি অহী নাযিল হইত। তাঁহার পুর্ণাঙ্গ আনুগত্য স্বীকার করা মুসলিম মাত্রেই কর্তব্য ছিল। কিন্তু এখন অবস্থার পরিবর্তন হইয়াছে। এখন তদনুসারে রাষ্ট্র ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনিতে হইবে। কিন্তু এই চিন্তা ও মানসিকতা কোনক্রমেই ইসলামী রাষ্ট্র সংস্থা গড়িয়া উঠার অনুকূল ছিল না।হযরত আবূ বকর (রা)প্রবল শক্তিতে এই নৈরাজ্যমূলক মানসিকতা নির্মূল করিয়া দিলেন।এই পর্যায়ে তিনি যে গভীর বিচক্ষণতাপূর্ণ ও বুদ্ধিসম্মত পন্থা গ্রহন করিয়াছিলেন, তাঁহার ফলে সমগ্র আরবদেশ একটি অভিন্ন রাষ্ট্র-সংস্থার অধীনে সুসংগঠিত ও সুসংবদ্ধ হইয়া উঠিল।তিনি দেশ শাসন,রাষ্ট্র পরিচালনা ও যুদ্ধ-সন্ধির ব্যাপারে সমগ্র গোত্রসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করিয়া লইলেন। সকল পর্যায়ের লোকদের সহিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে পরামর্শ গ্রহণের নীতি কার্যকর করিলেন। ফলে সকল গোত্রই নিজদিগকে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনায় সমান অংশীদার মনে করিতে শুরু করিল।প্রতিটি ব্যক্তি ও গোত্র সর্বক্ষেত্রে সমান গুরুত্ব, মর্যাদা ও অধিকার লাভ করিতে পারিয়া বিপুল উৎসাহ –উদ্দিপনা সহকারে রাষ্ট্র-সংস্থার আনুগত্যে নিজেদের সোপর্দ করিল।খলীফাই ছিলেন এই আনুগত্যের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি সত্তা। তাঁহার যে কোন আদেশ ও নিষেধ পালনতাহাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য,এই ব্যাপারে তাহাদের মধ্যে আর কোন মতদ্বৈততা থাকিল না।

খিলাফতের রাষ্ট্র-রূপ

ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার আদর্শিক পরিচিতি কি?উহা কোন্ ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা? উহা কি নিরেট থিওক্রাসী(Theocracy), যেখানে কোন আল্লাহ্‌প্রিয় ব্যক্তি স্বয়ং কিংবা যাজক সম্প্রদায় শাসন কার্য পরিচালনা করেন? কিংবা উহা আধুনিক পরিভাষা অনুযায়ী একটি গণতান্ত্রিক(Democrative) অথবা কোন স্বৈরতান্ত্রিক(Autocracy) শাসন? কিংবা উহা এক ধরনের রাজতন্ত্র? এই প্রশ্ন একালের বহু চিন্তাবিদকে পর্যন্ত বিভ্রান্ত করিয়াছে। কিন্তু ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞানও যাঁহাদের আছে, তাঁহারা এই ধরনের প্রশ্নে কিছুমাত্র বিচলিত হইতে পারেন না। কেননা খিলাফত যে কোনক্রমেই পোপতন্ত্র বা থিওক্রাসী ধরনের শাসন ব্যবস্থা নয়, তাহা বুঝিবার জন্য বিশেষ পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন হয় না। প্রাচীন কালের ফিরাউন কিংবা আধুনিক ইউরোপসহ দুনিয়ার অন্যান্য রাজা-বাদশাহরা যে ধরনের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করিয়াছে ও করিতেছে, খিলাফতের শাসনব্যবস্থার সহিত উহার দূরতম সম্পর্ক বা সামান্যতম সাদৃশ্যও খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।আধুনিক ধরনের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও উহাকে বলা যাইতে পারে না- যদিও সর্বজনীন মূল্যবোধ এবং জনগণের অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতার সুযোগ-সুবিধা উহাতে ছিল পূর্ণমাত্রায় কার্যকর,যা পাশ্চাত্যের ধর্মহীন গনতন্ত্রে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না।

কোন একজন খলিফাও নিজেকে আল্লাহ্‌ কর্তৃক মনোনীত, আল্লাহ্‌র সহিত বিশেষ সম্পর্কের অধিকারী কিংবা আল্লাহ্‌র নিকট হইতে প্রত্যক্ষ বিধান-ওহী- লাভ করার কোন দাবি কখনও করেন নাই। এইরূপ দাবি উত্থাপনকে তাঁহারা সম্পূর্ণ হারাম মনে করিতেন। কেননা প্রকৃতপক্ষেও ইহা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। রাসূলে করীম (স)- এর ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গে ওহী নাজিলের ধারা চিরতরে বন্ধ হইয়া গিয়াছে। অতঃপর দুনিয়ার মানুষের নিকট জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য মাত্র দুইটি ভিত্তিই অবশিষ্ট রহিয়াছে। একটি আল্লাহ্‌র কিতাব আর দ্বিতীয়ত রাসূলের সুন্নাত। আল্লাহ্‌ তা’আলা বিশ্ব মানবের জন্য সার্বিক ও পূর্ণাঙ্গ বিধান হিসেবে সর্বশেষ নবীর মাধ্যমে কুরআন মজীদ নাজিল করিয়াছেন। আর রাসূলে করীম (স) আল্লাহ্‌র সেই বিধানকে দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করিয়াছেন। কুরআন অনুযায়ী রাসূলে করীম (স)-এর কাজ কুরানেরই বাস্তব ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যা কুরানের ন্যায় চিরন্তন ও চির অনুসৃতব্য। খলীফা বা রাষ্ট্র চালক এই দুইটি বিধান অনুসরন করিয়া চলিতে বাধ্য। ইহাদের নির্ধারিত সীমা একবিন্দু লংঘন করার অধিকার কাহারও নাই। সাধারণ মানুষ একজন রাষ্ট্র চালককে মানিয়া চলিতে বাধ্য কেবলমাত্র এইজন্য যে, এই আনুগত্য রাষ্ট্র চালকের নিজস্ব গুণ বা অধিকারের জন্য নয়। ব্যক্তিগত গুণ-মর্যাদা বা অধিকারের কারণে কোন লোকই কাহাকেও মানিয়া চলিতে বাধ্য নয়। সে যদি আল্লাহ্‌র বিধান ও রাসূলের সুন্নাত অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করে- আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করে, তবে কেবলমাত্র এইজন্যই তাহাকে মানিয়া লইতে সকলে বাধ্য। কেননা এই আনুগত্য মূলত আলাহর আনুগত্য-আল্লাহ্‌র বিধান পালনের মাধ্যমে।প্রসঙ্গত স্মর্তব্য যে, আল্লাহ্‌র বিধান ও রাসূলের সুন্নাতের ব্যাখ্যাদানের একচেটিয়া অধিকার কাহারও নাই-এমন কি খলিফারও নয়। কুরআন-সুন্নাহর পারদর্শী যে কোন লোক উহা ব্যাখ্যাদানের অধিকারী। খলীফার এমন কোন ব্যাখ্যাও মানিয়া লওয়া যাইতে পারে না, যাহা আজ পর্যন্ত অন্য কোন বিশেষজ্ঞ কর্তৃকই স্বীকৃত হয় নাই। কাজেই কুরআন ও সুন্নাহর নামে নিজের মনগড়া বিধান চালু করা ইসলামী রাষ্ট্রশাসকের পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব হইতে পারে না। কেননা উহার অমূলকত্ত ও ভিত্তিহীনতা গোপন করার সাধ্য কাহারো নাই। খলীফার কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী কোন নির্দেশ পালন করিতে কোন লোকই বাধ্য নয়। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক(রা)-এর উপরোদ্ধৃত ভাষণসমূহে এই কথাই উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষিত হইয়াছে। পরবর্তী খলিফাগণও নিজ নিজ ভাষায় এই কথার প্রতিধ্বনি বারবার করিয়াছে।

ইসলাম নির্ধারিত এই কর্মনীতি ও রাষ্ট্র শাসন পদ্ধতি পোপতন্ত্র তো নয়ই,ইহা গনতন্ত্র, রাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্রও নয়। কেননা পোপতন্ত্রে পাদ্রি-পুরোহিতরা আল্লাহ্‌র নামে নিজেদের মনগড়া শাসন চালায়। সে সম্পর্কে অন্য কাহারও কোন মন্তব্য করার অধিকার নাই। রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রে তো জনসাধারণ সকল প্রকার মানবিক ও মৌলিক অধিকার হইতেই সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত থাকিতে বাধ্য হয়। আর তথাকথিত গনতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে চলে দল-প্রধান বা দলের প্রভাবশালী লোকদের অথবা ক্ষমতা দখলকারী মুষ্টিমেয় কোটারীর চরম স্বেচ্ছাচারিতা। ইসলামী খিলাফতে আল্লাহ্‌র বিধান ও রাসূলের সুন্নাত মানিয়া চলার ব্যাপারে শাসক ও শাসিত, খলীফা ও জনগন সকলেই সমানভাবে বাধ্য;বরং যে ব্যক্তি এই মান্যতার দিক দিয়া অন্যদের তুলনায় অধিক অগ্রসর,সে-ই হয় এই রাষ্ট্রের খলীফা। খিলাফতের পদে নিযুক্ত হইয়া কোন ব্যক্তি কুরআন-সুন্নাহর বিধানও নিজ ইচ্চামত জারী করিতে পারে না। সেজন্য কুরআন-সুন্নাহ্ বিশেষজ্ঞদের সহিত পরামর্শ করিতে সে বাধ্য। কিন্তু পোপতন্ত্রে ধর্মযাজকরাই নিরংকুশ ক্ষমতার মালিক। তাহারা কাহারও সহিত কোন ব্যাপারে পরামর্শ করিতে বাধ্য নয়। তাহাদের কোন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কেহ প্রশ্ন তুলিতে পারে না; বরং তাহাদের কার্যাবলীর বিরূপ সমালোচনা করার পরিণতি অপঘাতে মৃত্যুবরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। সাধারণ লোক সেখানে নিকৃষ্টতম গোলামের জীবন যাপন করিতে বাধ্য। পক্ষান্তরে ইসলামী খিলাফতে প্রত্যেকটি মানুষই স্বাধীন। সেখানে সমালোচনা করার শুধু অধিকারই দেওয়া হয় নাই, উহা প্রতিটি নাগরিকের দ্বীনী কর্তব্য বলিয়াও ঘোষিত হইয়াছে।

স্মর্তব্য যে, কুরআন ও সুন্নাহ ইসলামী খিলাফতের ভিত্তি বটে;কিন্তু উহাতে কেবলমাত্র মূলনীতি পেশ করা হইয়াছে। বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি বিষয় উল্লেখ হইতে ইচ্ছা করিয়াই বিরত থাকা হইয়াছে। কোথাও তেমন কিছু উল্লেখিত হইয়া থাকিলেও অপরিহার্য ছিল বলিয়াই তাহা করা হইয়াছে। সেখানে তাহা উল্লেখিত না হইলে কুরআন ও সুন্নাতের বাস্তবায়ন সম্ভব হইত না। ইসলামী খিলাফতের যাবতীয় কাজ সেই সব মূলনীতির ভিত্তিতে সুসম্পন্ন করা হয়। সেসব মূলনীতির ভিত্তিতে বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি বিষয় স্থির করা সর্বসাধারণ মানুষের দায়িত্ব এবং এই ব্যাপারে কাহারও একচেটিয়া অধিকার নাই। বস্তুতঃএই কারণেই ইসলামের জীবন ও রাষ্ট্রাদর্শ চিরন্তন ও শাশ্বত মূল্য লাভ করিতে পারিয়াছে।

কুরআন ও সুন্নাহ প্রদত্ত মূলনীতিসমূহ কালজয়ী।সর্বকালে সর্বাবস্থায় এবং সর্বদেশেই উহার ভিত্তিত আদর্শ মানব সমাজ গঠন করা শুধু সম্ভব নয় অবশ্য কর্তব্যও। সে সব মূলনীতি ছাড়া আদর্শ সমাজ গঠনের স্বপ্ন কোনদিনই বাস্তবায়িত হইতে পারেনা। মুসলমান যতদিন সেসব মূলনীতির ভিত্তিতে ব্যক্তি ও সমাজ গঠন করিয়াছে এবং বাস্তবে উহা অনুসরণ করিয়া চলিয়াছে, ততদিন তাহারা যে ক্রমশঃধাপে ধাপে উন্নতির দিকে ধাবিত হইয়াছে, ইতিহাসই উহার অকাট্য প্রমাণ। কিন্তু যখনি সে মূলনীতিসমূহ ব্যক্তিগত ও জাতীয় পর্যায়ে পরিত্যক্ত হইয়াছে, উহার পরিপন্থী নীতি ও আদর্শ মানিয়া চলিতে শুরু করিয়াছে,তখনি তাহাদের পতন সূচিত হইয়াছে। বর্তমান বিশ্বের মুসলমানদের বাস্তব অবস্থা ইহারই জীবন্ত সাক্ষী।

আল্লাহ্‌র কিতাব ও রাসূলের সুন্নাতের ব্যাখ্যাদানের একচেটিয়া অধিকার বিশেষ এক শ্রেণীকে দেওয়া হইলে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থাও ‘থিওক্রাটিক বা যাযকতন্ত্রও’ হইয়া যাইত; কিন্তু ইসলামে যে পৌরোহিত্যবাদ নাই, বিশেষ এক শ্রেণীর কোন একচেটিয়া কর্তৃত্বও ইহাতে স্বীকৃত নয়, একথা সর্বজনবিদিত। এখানে প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বীয় যোগ্যতা বলে কুরআন ও সুন্নাহ অধ্যয়ন, চিন্তা-গবেষণা, বিচার-বিবেচনা এবং ফলাফল ও সিদ্ধান্ত গ্রহন অধিকারী। এই ব্যাপারে নির্বিশেষে সকলেরই সমান অধিকার রহিয়াছে। -শুধু তাহাই নয়,এই অধিকার প্রয়োগ করার জন্য সর্বসাধারণকে স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশও দান করা হইয়াছে। কাজেই ইহার সহিত পোপতন্ত্রের(Papacy) যে দূরতম সম্পর্ক বা সাদৃশ্যও নাই, তাহা বলাই বাহুল্য।

ইসলামী খিলাফতে প্রত্যেক নাগরিককে শাসন কর্তৃপক্ষের প্রকাশ্য সমালোচনার অধিকার দেওয়া হইয়াছে। তাহাদের কাজকর্মের প্রতি তীক্ষ্ণ সজাগ দৃষ্টি রাখা এবং কুরআন ও সুনাহর আলোকে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি গোচরীভূত হইলে সঙ্গে সঙ্গে উহার প্রতিবাদ করা ও উহার প্রতিকারের জন্য বাস্তব কর্মপন্থা গ্রহণ করা প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য বলিয়া ঘোষিত হইয়াছে। এই শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালকগন নিজেদের জন্য কোন বিশেষ আইন রচনা করিয়া কোন বিশেষ অধিকার ভোগ করার সুযোগ পাইতে পারে না।খিলাফতে রাশেদার আমলে কুরআন ও সুন্নাহর বিধান শক্তভাবে পালন করার ফলে ইসলামী সমাজ এই ধরনের যাবতীয় অবাঞ্চিত ও কলঙ্কজনক আচরণ হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র রহিয়াছে।তখন জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব এবং যাবতীয় অর্থ সম্পদ ছিল এক মহান আমানত। এই আমানতে বিন্দুমাত্র খিয়ানত করিলেও কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি ভোগ করিতে হইবে, এই বিশ্বাস প্রত্যেকের মনে ইস্পাতের ন্যায় দৃঢ়মূল হইয়াছিল।

খিলাফতে রাশেদার চারজন খলীফাই জাতি ও রাষ্ট্রের অর্পিত আমানতসমূহ অত্যন্ত সযত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করিয়াছেন,সে সবের যথাযথ ব্যয়-বণ্টন ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করিয়াছেন এবং নিঃছিদ্র একনিষ্ঠতা, ঐকান্তিকতা, নিঃস্বার্থতা ও উচ্চমানের তাকওয়া-পরহেজগারীর বাস্তব নিদর্শন উপস্থাপিত করিয়াছেন। একালের লোকদের দৃষ্টিতে তাহা আজগুবী,অস্বাভাবিক ও অকল্পনীয় মনে হইলেও খিলাফতে রাশেদার ব্যাপারে উহাই ছিল বাস্তব সত্য। বস্তুতঃখিলাফত ও নেতৃত্ব তাঁহাদের মনে ও চরিত্রে বিন্দুমাত্র বিকৃতি ঘটাইতে পারে নাই; বরং তাহাদের তাকওয়ার মান ও মাত্রা পূর্বের তুলনায় অধিক বৃদ্ধি করিয়া দিয়াছে।জনগণের ধন-সম্পদ হইতে অন্যায় ফায়দা লাভ,ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নিজ বংশ ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বিধানের চিন্তা তাঁহাদের মনে-মগজে মুহূর্তের তরেও স্থান লাভ করিতে পারে নাই। খিলাফতের কঠিন দায়িত্ব অর্পিত হওয়ার মুহূর্ত হইতেই তাঁহারা নিজেদের ব্যক্তিসত্তা ও বংশ-পরিবারবর্গকে বেমালুম ভুলিয়া গিয়া আল্লাহ্‌র দ্বীনের মর্যাদা রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় কার্যাবলী সুসম্পাদনে নিজেদের সমগ্র শক্তি নিয়োজিত করিয়া ছিলেন।সর্বক্ষেত্রে ও সর্বব্যাপারে ইনসাফ ও পরিপূর্ণ সুবিচার প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁহাদের কর্মব্যস্ততার চরমতম লক্ষ্য। দুর্বল ও অভাবগ্রস্ত লোকদের সাহায্য দানের তুলনায় অধিক প্রিয় ব্যস্ততা তাঁহাদের নিকট আর কিছু ছিলনা।

যে রাষ্ট্র-ব্যবস্থা এই প্রকৃতির হয়, সেখানে স্বৈরাচার ও অত্যাচার-জুলুমের নাম-চিহ্ন পর্যন্ত থাকিতে পারে না। যে-রাষ্ট্রের কর্ণধার ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাবৃন্দ নিজদিগকে সাধারণ লোকের ঊর্ধ্বে মনে করেন না, মনে করেন সর্বসাধারণের খাদেম,উহাকে না পোপতন্ত্র বলা যাইতে পারে, না স্বৈরতন্ত্র। আধুনিক কালের তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্রের সহিতও ইহার কোন সাদৃশ্য পাওয়া যাইতে পারে না। একথা সত্য যে, বর্তমানের ন্যায় সেকালে সাধারণ বয়স্ক ভোটাধিকারের(Adult suffrage) ভিত্তিতে খলীফা চতুষ্টয় নির্বাচিত হন নাই। যে অস্থির ও অশান্তিময় পরিস্থিতিতে এক এক ব্যক্তি খলীফা পদে বরিত হইয়াছেন, তাহাতে এই ধরনের নির্বাচনের কথা কল্পনাও করা যায় না। তৎসত্ত্বেও তদানীন্তন সমাজে তাঁহারাই যে সর্বাধিক আস্থাভাজন ব্যক্তি ছিলেন এবং ঐধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইলে তাঁহারাই যে নির্বাচিত হইতেন,ইহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করা যায় না।খলীফা নির্বাচনে সাধারণতঃমুহাজির ও আনসার গোত্রের লোকেরাই অংশ গ্রহন করিতেন।আরবের তৎকালীন পরিস্থিতিতে অন্যান্য গোত্রের লোকদের সহিত এ ব্যাপারে পরামর্শ গ্রহণ করারও প্রয়োজন মনে করা হইত না তবে এই নির্বাচন গোত্রীয় গোপন যোগ-সাজশেরও পরিণতি ছিল না। আনসার ও মুহাজিররা কার্যতঃতদানীন্তন আরবের প্রায় সমস্ত গোত্রের মুসলিম জনতার প্রতিনিধিস্থানীয় ছিলেন।তাঁহাদের মতই ছিল সাধারণভাবে সমস্ত আরব মুসলিম জনতার রায়। রাসূলে করিম(স)-এর কিংবা পরবর্তী খলীফাদের এক একজনের আকস্মিক অন্তর্ধানের পর যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, প্রত্যেক খলীফার নির্বাচনের মাধ্যমে তৎকালীন জরুরী পরিস্থিতিতে, অনতিবিলম্বে সেই শূন্যতা পূরণই অপরিহার্য এবং সর্বাধিক জরুরী কাজ হইয়া দেখা দিয়াছিল মুসলিম জাতির সম্মুখে।

এতৎসত্ত্বেও প্রত্যেক খলীফাই সমাজের সাধারণ আস্থাভাজন ব্যক্তিদের সহিত পরামর্শ করিয়াই রাষ্ট্র পরিচালনা করিয়াছেন। কেহই নিজের একক ও যুক্তিহীন মতের ভিত্তিতে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নাই জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারসমূহে। খলীফাদের নির্বাচনে আত্মীয়তা কিংবা বংশমর্যাদা কোন কার্য-কারণ(Factor) হইয়া দেখা দিতে পারে নাই। তাঁহাদের কেহই এই পদের জন্য প্রার্থী হন নাই। এই পকদে নিযুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে তাঁহাদের কেহ জনমত অনুকূলে আনার কোন অভিযান চালানোর আত্মনিয়োগ করেন নাই; বরং প্রত্যেকই নিজের পরিবর্তে অন্য কোন যোগ্যতর ব্যক্তিকে নির্বাচিত করাইবার জন্য চেষ্টা চালাইয়াছেন। এই পর্যায়ে প্রথম খলীফার নির্বাচন-কালীন কথাবার্তা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় চিরদিন উজ্জ্বল হইয়া থাকার অধিকারী। কোন কোন খলীফার নির্বাচনে প্রথম দিক দিয়া কিছুটা মত-বিরোধ দেখা দিলেও উত্তরকালে সেই মতবিরোধ বা বিরুদ্ধতার কোন অস্তিত্ব দেখা যায় নাই; বরং সকলেই অন্তর দিয়া সে নির্বাচনকে মানিয়া লইয়াছেন এবং নির্বাচিত খলীফার সহিত আন্তরিক সহযোগিতা করিয়াছেন। ইসলামী নির্বাচন নীতির এই বৈশিষ্ট্য তুলনাহীন।এই সমাজে স্থায়ী সরকারপক্ষ এবং স্থায়ী বিরোধীদল(Opposition) বলিতে কিছুই ছিলনা। এখানে সকলেই মিলিতভাবে ন্যায় ও সত্যের সমর্থক ও সহযোগিতাকারী এবং সকলেই অন্যায় ও ভুলনীতির বিরোধী, প্রতিবাদকারী। খলিফাগণ জনগণের অধিকার ও রাষ্ট্রের কল্যাণে পারস্পরিক পরামর্শের গুরুত্ব কত বেশি স্বীকার করিতেন, প্রথম খলীফার প্রাথমিক ভাষণের নিম্নোদ্ধৃত কথাগুলি হইতেই তাহা সুস্পষ্ট হইয়া উঠেঃ

আমি তোমাদের শাসক নিযুক্ত হইয়াছি, কিন্তু আমি তো তোমাদের তুলনায় উত্তম নহি। আমি যদি ন্যায়পথে চলি, তাহা হইলে আমার আনুগত্য ও অনুসরণ করিবে। কিন্তু ন্যায়ের পথ হইতে যদি আমার পদস্থলন হয় ও অন্যায় পথে চলিতে শুরু করি, তাহা হইলে তোমারা আমাকে ঠিক করিয়া দিবে, সঠিক পথে চালাইবে। আমি যত দিন আল্লাহ্‌ ও তাঁহার রাসূলের আনুগত্য করিতে থাকিব, ততদিন তোমারাও আমার আনুগত্য করিতে থাকিবে;কিন্তু আমিই যদি আল্লাহ্‌ ও তাঁহার রাসূলের নাফরমানী করি, তাহা হইলে আমার আনুগত্য করা তোমাদের কর্তব্য নয়।

শাসকের সহিত জনগণের গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক এবং শাসককে সঠিক পথে পরিচালন ও সমালোচনার অধিকারের এইরূপ উদার-উদাত্ত স্বীকৃতির কোন দৃষ্টান্ত বর্তমান গনতন্ত্রবাদী যুগের তথাকথিত রাষ্ট্রসমূহের কোথাও দেখা যায় কি?খিলাফতে রাশেদার গোটা শাসন-কালই ছিল আধুনিক ভাষায় বলিতে গেলে নিতান্তই জরুরী অবস্থার যুগ(Emergency Period)ছিল। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে জনগণের মৌলিক অধিকার কখনোই হরণ করা হয় নাই। শু’রা-পরামর্শ গ্রহণ ব্যবস্থা-সব সময়ই সুষ্ঠু রূপে কার্যকর রহিয়াছে। শু’রা-পার্লামেন্ট-ভাঙ্গিয়া দিয়া বিশেষ ক্ষমতা(Special power)নিজ হাতে গ্রহণ করার অধিকার খিলাফতের ভিত্তি –কুরআন ও সুন্নাহ-কাহাকেও কোন অবস্থায়ই দেয় নাই।

খলিফাগনের দৃষ্টিতে সব মুসলমানই ছিল সমান অধিকার ও সমান মর্যাদাসম্পন্ন;বৈষয়িক মান-মর্যাদার কারণে কেহই অন্যদের উপর প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার লাভ করিতে পারিত না। প্রাক্তন মুর্তাদদের সম্পর্কে প্রথম খলীফা প্রথমে এই নির্দেশ জারী করিয়াছিলেন যে, সামরিক অভিযানসমূহে তাহাদিগকে যোগদান করিতে দেওয়া যাইবে না। কেননা তখনও তাহাদের ব্যাপারে পূর্ণ আস্থা ও নিশ্চিন্ততা লাভ করা যায় নাই। কিন্তু তাহাদের সম্পর্কে সন্দেহ ও সংশয় দূরীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাহাদিগকে ইসলামী মুজাহিদ বাহিনীর মধ্যে শামিল হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। ইরান অভিযানে তাহাদেরকে কাজে লাইগাবার জন্য হযরত উমর ফারুক(রা) কে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল। ইহা খিলাফতে রাশেদার উদার,নীতিনিষ্ঠ ও বিদ্বেষমুক্ত দৃষ্টিকোণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়।

আরবের রাজনৈতিক একত্ব

প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) তাঁহার অন্যান্য বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টির সাহায্যে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করিয়া তোলেন। ইহার ফলে পরবর্তী খলিফাগণের পক্ষে সেই ভিত্তির উপর একটি বিশাল রাষ্ট্রপ্রাসাদ নির্মাণ করা এবং সমগ্র আরব উপদ্বীপকে একটি মাত্র রাজনৈতিক এককে(Unit) পরিণত করা খুবই সহজসাধ্য হয়। হযরত আবূ বকর (রা)-এর ক্ষমা,সহিষ্ণুতা ও ত্যাগ-তীতিক্ষামূলক নীতির দরুণ সমগ্র আরব উপদ্বীপকে ঐক্যবদ্ধ করার পথ সুগম হইয়াছিল। প্রথম দিকের সাময়িক বিশৃঙ্খলা প্রশমিত হওয়ার পর বিদ্রোহী-অপরাধী লোকেরা তাঁহার নিকট ক্ষমা লাভ করিয়া আন্তরিকতা সহকারে খিলাফতের আনুগত্য স্বীকার করে। শু’রা ব্যবস্থা সারাদেশের রাজনৈতিক ঐক্য ও সংহতিকে অধিকতর দৃঢ় ও শক্তিশালী করিয়া তোলে। ইহারই ফলে ইরাক ও সিরিয়া বিজয় সহজতর হইয়া যায়।

এই সময়কার আরব জনগণের চিন্তা-চেতনা ও মননশীলতা শু’রা ও গণ- অধিকারসম্পন্ন রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনুকুল হইয়াছিল। ইসলামের অভ্যুদয় ও প্রকাশ আরব দেশে ঘটিয়াছিল। ইসলামী শরীয়াত-কুরআন ও সুন্নাহ-আরবী ভাষায় সন্নিবেশিত ছিল। সর্বশেষ রাসূল আরব দেশে প্রেরিত হইয়াছিলেন। আরব-গোত্রসমূহ বেদুঈন কিংবা নগরবাসী যাহাই হউক না কেন,স্বাধীনতা ও স্বরাজের জন্য ছিল অধীর ব্যাকুল। তাহাদের নিকট ইহাপেক্ষা অধিক প্রিয় ও আকর্ষণীয় জিনিস আর কিছুই ছিল না। মরুচারীদের মধ্যে সাম্য ও সমতার ভাবধারা পুরাপুরি সংক্রমিত হইয়াছিল। ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষন এই ভাবধারাকে অধিক স্বচ্ছতা ও পরিপক্কতা দান করে। কেননা ইসলামই প্রকৃত সাম্য ও সমতার পূর্ণাঙ্গ আদর্শ উপস্থাপন করিয়াছে। কুরআন মজীদ এই সাম্য ও সমতার বাণী উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করিয়াছে। কুরআনের ঘোষণানুযায়ী বংশ মর্যাদা বা ধন-সম্পদের আধিক্য ও প্রাচুর্যের নয়, আল্লাহ্‌র ভয় (তাকওয়া) ও আল্লাহ্‌র দ্বীন পালনই মর্যাদা ও সম্মানের মানদণ্ড। বর্তমান যুগে সর্বত্র গণতন্ত্রের জয়ধ্বনি উচ্চারিত। কিন্তু প্রকৃত মানবিক মূল্যবোধ ও ভাবধারা খিলাফতে রাশেদার আমলেই সমুজ্জ্বল প্রতিভাত হইয়াছে। মানবতা, ভ্রাতৃত্ব,প্রেম-প্রীতি,স্বাধীনতা ও সাম্য বর্তমান গণতন্ত্রের স্ফীত কণ্ঠে সমুচ্চারিত। কিন্তু ইহার প্রকৃত বাস্তবায়ন কেবলমাত্র খিলাফতে রাশেদার আমলের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্রষ্টব্য। ইসলামের পবিত্র শিক্ষা প্রতিটি মু’মিনকে অপর মু’মিনের একনিষ্ঠ ‘ভাই’ ও সত্যিকার কল্যাণকামী বানাইয়া দিয়াছিল। কোন লোক নিজের জন্য যাহা পছন্দ করে, অপর ভাইয়ের জন্য তাহাই পছন্দ না করা পর্যন্ত ঈমানদার হইতে পারে না-রাসূলে করীম(স)-এর ঘোষণা একটা সাধারণ ও মূল্যহীন কণ্ঠধ্বনি ছিল না। ইহা ছিল মানবাধিকারের সপক্ষে এক ঐতিহাসিক ঘোষণা। এই গভীর বুদ্ধিসম্মত ঘোষণাকে বাস্তবায়িত করিয়া তোলা না হইলে কোন রাষ্ট্রই প্রকৃত জনকল্যাণমুখী চরিত্র লাভ করিতে পারে না এবং এই ঘোষণাকে আলোক-মশালরূপে গ্রহণ করিয়া সাধারণ জনগণকে পরস্পরের কল্যাণকামী ও সহানুভূতিশীল রূপে গড়িয়া না তোলা পর্যন্ত কোন গণকল্যাণকামী রাষ্ট্রের পক্ষে বিন্দুমাত্র সাফল্য লাভ অসম্ভব। বস্তুতঃবর্তমান গণতন্ত্রবাদী রাষ্ট্রসমূহের চরম হাস্যকর ব্যর্থতা এবং খিলাফতে রাশেদার পূর্ণ সাফল্যের মূলে এই তত্ত্বই নিহিত। বলা নিষ্প্রয়োজন, রাসূলে করীম(স)-এর এবম্বিধ মহামূল্য বাণীসমূহকে ভিত্তি করিয়াই ইসলামই রাষ্ট্রের বিরাট প্রাসাদ রচনা করা হযরত আবূ বকর (রা)-এর পক্ষে সম্ভবপর হইয়াছিল। আর এই বানীসমূহের পূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করিয়া সমকালীন বিশ্বরাষ্ট্র-দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত-খিলাফতে রাশেদার মহান ব্যবস্থা পরিচালনা করিয়া সমগ্র বিশ্বকে বিস্মিত-বিমুগ্ধ করা পরবর্তী খলিফাত্রয়ের পক্ষে সম্ভবপর হইয়াছিল।

ইসলামী রাষ্ট্র-নীতির অন্তর্নিহিত শক্তি

খিলাফতে রাশেদার রাষ্ট্র-ব্যবস্থা কেবলমাত্র আরব উপদ্বীপ নামক ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ হইয়া থাকে নাই। উহা সে ভূ-খণ্ডের সীমা অতিক্রম করিয়া অত্যল্প কালের মধ্যেই বাঁধ-ভাঙা বন্যার মত চতুর্দিকের দূর দূর-অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ও সম্প্রসারিত হইয়া পড়ে। কিন্তু একটি আরব রাষ্ট্রের পক্ষে বিশাল অনারব এলাকায় সম্প্রসারিত হওয়া কি নিছক কতিপয় সামরিক অভিযানের পরিণতি ছিল? ইতিহাসের ইহা একটি জটিল প্রশ্ন। এই প্রশ্নের জবাব বিশ্লেষণ একান্তই আবশ্যক।

বস্তুতঃ ইসলাম এক সর্বজনীন বিপ্লবী বাণী লইয়া দুনিয়ার বুকে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। সে বানীর ব্যাপক প্রচার ও প্রসার এবং উহার অনুকূলে নীরব জনমত গড়িয়া উঠাই ইসলামের জয়জয়কার ও দেশের পর দেশ ইসলামের পতাকাতলে আশ্রয় লওয়ার এক বিস্ময়কর ইতিহাস সৃষ্টি করিয়াছে। এই বিজয়সমূহকে বৃক্ষের বৃন্ত-সংলগ্ন পাকা ফল এক টোকায় পাড়িয়া লওয়া কিংবা সদ্য-ভূমিষ্ঠ সন্তানের নাড়ি কাটিয়া দেওয়ার সহিত তুলনীয়। ইসলামী আদর্শবাদ প্রথমে ক্ষেত্র প্রস্তুত করিয়াছে, পথ সুগম করিয়া লইয়াছে এবং পরিণামে ইসলামী বিপ্লব সৃষ্টির সব বাধা-প্রতিবন্ধকতা দূর হইয়া গিয়াছে। এই ভাবেই মুসলমানদের পক্ষে দুনিয়ার বিশাল অঞ্চলে ইসলামী রাষ্ট্রকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর গড়িয়া তোলা সম্ভবপর হইয়াছিল।

ইসলামী ইতিহাসের প্রাথমিক পর্যায় সম্পর্কে অবহিত কোন ব্যক্তির নিকটই একথা গোপন থাকিতে পারে না যে, ইসলামের মুজাহিদদের সাফল্য কোন সাময়িক বা দুর্ঘটনামূলক ব্যাপার ছিল না। এই বিজয় ছিল ঘটনা-প্রবাহের এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতার অবিচ্ছিন্ন অংশ। মূলতঃ ইসলাম দুনিয়ায় যে বিপ্লব সৃষ্টি করিয়াছিল, তাহা ছিল অবধারিত। কেননা ইসলামের মূল আদর্শেই বিপ্লবের অগ্নিবাস্প নিহিত রহিয়াছে। এই দুর্জয় শক্তির বিস্ফোরিত হওয়া ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার।

ইসলামের মূল আকীদা- এক আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কাহাকেও মানি না, ভায় করিনা, অন্য কাহারও নিকট একবিন্দু নতি স্বীকার করি না এবং রাসূলে করীম (স)ই আল্লাহ্‌র প্রেরিত রাসূল, আমাদের একমাত্র পথনির্দেশক- এই দৃঢ় প্রত্যয়ই ইসলামকে এ বিশ্ববিজয়ী শক্তি দান করিয়াছে। আকীদা-বিশ্বাসের এই বলিষ্ঠতাই সাধারণ মানুষকে বিপ্লবী বানাইয়া দিয়াছিল। প্রকৃতপক্ষে মন ও মানসের এই স্বাধীনতা ইসলামের এক বিরাট অবদান। সেই সঙ্গে ধর্ম ও মতাদর্শের ব্যাপারে কোনরূপ বলপ্রয়োগ ছিল খিলাফতে রাশেদার সম্পূর্ণ নীতিবিরুদ্ধ। ইসলাম গ্রহণের জন্য সারা দুনিয়ার মানুষকে আহ্বান জানানো হইয়াছে বটে; কিন্তু নিজের ধর্মবিশ্বাস পরিবর্তন করার জন্য ইসলাম কাহাকেও বাধ্য করে না। তবে ইসলামের আদর্শ সম্পর্কে লোকেরা গুরুত্ব সহকারে চিন্তা-বিবেচনা করিবে, দুনিয়ার অন্যান্য ধর্ম ও মতাদর্শের সহিত উহার তুলনামূলক আলোচনা ও অধ্যয়ন করিয়া উহার বৈশিষ্ট্য নিরপেক্ষভাবে স্বীকার করিবে, ইসলামের ইহা এক বলিষ্ঠ আশাও বটে। কেননা তাহা হইলে ইহা গ্রহণ না করিয়া কেহ যে থাকিতে পারিবে না, এই সম্পর্কে ইসলাম নিঃসন্দেহ। বস্তুতঃইসলাম মানব প্রকৃতির সহিত পুরাপুরি সামঞ্জস্যশীল এক পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান। সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ হিসেবে একমাত্র ইসলামকেই গ্রহণ করিতে পারে, এই বিষয়ে ইসলামের কোন সংশয় নাই।

ইসলামের মুক্তি ও স্বাধীনতার এই বিপ্লবী বাণীই দুনিয়ার অন্যান্য ধর্ম ও মতাদর্শের পক্ষে কঠিন চ্যালেঞ্জ হইয়া দেখা দিয়াছে। কেননা আকীদা-বিশ্বাস ও কর্মনীতি গ্রহণের স্বাধীনতা দেওয়া হইলে ইসলামের নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গ আদর্শই যে সর্ব শ্রেণীর মানুষকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করিবে, মানুষ নিজের ভুল ধর্ম ও মতাদর্শ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ত্যাগ করিবে, ইহা ইসলামী দাওয়াত ও আন্দোলনের এক পরীক্ষিত সত্য। আর ইহার পরে দুনিয়ার অপরাপর ধর্ম ও মতাদর্শের যে অপমৃত্যু ঘটিবে, তাহা সন্দেহাতীত। ইসলামের পূর্ণাঙ্গ আদর্শ প্রচারে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে যে বাধার সৃষ্টি করা হয়, উহার মূলে একমাত্র এই কারণই নিহিত রহিয়াছে।

ইসলাম মনের স্বাধীনতা(Freedom of mind)-র যে বিপ্লবী আদর্শ দুনিয়ার সম্মুখে পেশ করিয়াছে, খিলাফতে রাশেদার আমলে তাহা পুরাপুরি কার্যকর ও বাস্তবায়িত হইয়াছে। এই আমলে বহুদেশ অধিকৃত হইয়াছে বহু জনপদ ইসলামের অধীনতা মানিয়া লইয়াছে; কিন্তু একজন লোককেও জোরপূর্বক স্বীয় ধর্মমত পরিত্যাগ করিতে বাধ্য করা হয় নাই। কাহাকেও সে জন্য প্রলোভিত করা হয় নাই। যে লোক স্বেচ্ছায় ও সোৎসাহে ইসলাম কবুল করিয়াছে, সে অন্যান্য সব মুসলমানের মতই সমান মর্যাদা ও অধিকার লাভ করিয়াছে। পক্ষান্তরে যে লোক স্বীয় পূর্বত্ন ধর্ম ও মতাদর্শে অবিচল থাকিতে চাহিয়াছে, তাহাকেও সেইরূপ থাকিবার জন্য পূর্ণ অধিকার দেওয়া হইয়াছে। সে যাহাতে নিজস্ব ধর্ম পালনের সঙ্গে সঙ্গে স্বীয় ধন-মান ও প্রানের নিরাপত্তা সহকারে বসবাস করিতে পারে, সেজন্য ইসলামী খিলাফত পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছে। বিনিময়ে তাহাদের সামর্থ্যনুযায়ী একটা বিশেষ ‘কর’(Tax) গ্রহণ করা হইয়াছে। এই কর কোন রূপ জরিমানা ছিল না। তাহাদের সার্বিক নিরাপত্তার নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রকে যে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইত, ইহা ছিল সে ব্যাপারে এক বিশেষ ধরনের চাঁদা। ইহাকে আরবী পরিভাষায় ‘জিজিয়া’বলা হয়। এই শব্দের অর্থঃ বদলা বা বিনিময়। আর বস্তুতঃ ইহা ছিল তাহার ধর্ম,ধন-মাল, মান-সম্ভ্রম ও প্রাণের নিরাপত্তা বিধানের জন্য খিলাফত কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থার বিনিময় মূল্য মাত্র। যেখানে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব পালনে খিলাফত অক্ষম হইয়াচে,সেখানে ইহা গ্রহণ শুধু বন্ধই করা হয় নাই,পূর্ব গৃহীত করও ফেরত দেওয়া হইয়াছে। ইসলামী ইতিহাসের পৃষ্ঠায় একথা সুস্পষ্টভাবে ও স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রহিয়াছে।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর প্রতি বিশ্বাসী ও তাঁহার জন্য উৎসর্গীকৃত প্রাণ লোকদের হাতে প্রতিষ্ঠিত এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত ছিল ব্যক্তি স্বাধীনতা, মৌলিক মানবীয় অধিকার, নির্বিশেষে সাম্য ও ভ্রাতৃসুলভ প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার উন্নত নীতিমালা ও আদর্শের উপর। ইহা ছিল রোমান রাজতন্ত্রবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের এক রাষ্ট্র ব্যবস্থা। অন্যদিকে সাধারণ মানবীয় কল্যাণের দৃষ্টিতে আধুনিকতম তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাও উহার তুলনায় অত্যন্ত দীন-হীন। বস্তুত অনারব লোকদিগকে আরবের অধীন-অনুগত বানানো খিলাফতে রাশেদার কোন লক্ষ্য ছিল না। তদানীন্তন রোমান ও পারসিকদের নিকৃষ্টতম দাসত্ব হইতে মুক্ত করিয়া আরবদের দাসত্ব নিগড়ে উহাদিগকে বন্দী করাও ছিল না উহার উদ্দেশ্য; বরং মানুষকে সর্বপ্রকার মানবিক ও বৈষয়িক গোলামী হইতে পরিপূর্ণ মুক্তিদান, একমাত্র সৃষ্টিকর্তার বন্দেগী ও রাসূলের নেতৃত্ব স্বীকার করিয়া দ্বীন-ইসলামের মহান বিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ স্বাধীন পরিবেশে জীবন যাপন ও বিকাশ-বর্ধনের অবাধ-উদার ও উন্মুক্ত সুযোগ করিয়া দেওয়াই ছিল উহার যাবতীয় চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও সাধনা-সংগ্রামের চরমতম লক্ষ্য। ইসলামের সুমহান আদর্শে ঐকান্তিক বিশ্বাস এবং পরস্পরের গভীর ভ্রাতৃত্ব ও একনিষ্ঠ প্রেম-প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াই ছিল উহার একমাত্র উপায়। খিলাফতে রাশেদার আমলে বিজয়ী ও বিজিত বলিতে কোন শ্রেণী-বিভেদ ছিল না। সর্বশ্রেণী- সকল স্তর ও পর্যায়ের মানুষের সেখানে পুরাপুরি সমান অধিকার ও মর্যাদালাভে ধন্য হইয়াছিল। ভাষা,গোত্র ও অঞ্চলের ভিত্তিতে তাহাদের মধ্যে কোন পার্থক্য ও তারতম্য ছিল না। এমন কি ইরাক ও সিরিয়ার অমুসলিম এবং নাজরান ও আরবের অন্যান্য এলাকার খৃষ্টানদের মধ্যেও কোনরূপ পার্থক্য সৃষ্টি হইতে দেওয়া হয় নাই। মুসলমানগণ তাহাদের মধ্যে ইসলাম প্রচারের কাজ করিতেন বটে; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও যাহারা নিজেদের পৈতৃক ধর্মে অবিচল থাকিতে চাহিত, তাহাদিগকে সেইরূপ থাকারই পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হইয়াছিল। খিলাফতে রাশেদার আমলে ধর্ম গ্রহণের ব্যাপারে কুরআনের নিম্নোদ্ধৃত ঘোষণাদ্বয় পুরামাত্রায় কার্যকর ছিলঃ

******(আরবী)

দ্বীন ও ধর্মের ব্যাপারে কোনরূপ বল প্রয়োগ বা জোরজবরদস্তির স্থান নেই।

যে লোক হেদায়েত গ্রহণ করে, উহার কল্যাণে সে নিজেই লাভ করিবে। আর যে লোক পথভ্রষ্ট হইয়া থাকিতে চাহে, উহার ক্ষতি ও অকল্যাণ তাহাকেই ভোগ করিতে হইবে। হে রাসূল আপনি লোকদিগকে বলিয়া দিন,তোমাদের পর্যন্ত সত্যের বাণী পৌঁছাইয়া দেওয়াই আমার কাজ; গ্রহণ করা বা না করা তোমাদের নিজেদের দায়িত্ব। তোমাদের হেদায়েত বা গুমরাহীর কোন দায়িত্ব আমার উপর বর্তায় না।

 

About মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম