খিলাফতে রাশেদা

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-এর খিলাফত

প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-এর মহান জীবন বহু উজ্জ্বল কীর্তিকলাপে পরিপূর্ণ। বিশেষতঃ তাঁহার সোয়া দুই বৎসরের স্বল্প মিয়াদী খিলাফত আমলে চেষ্টা-সাধনার যে গগনস্পর্শী পিরামিড রচিত হইয়াছে, তাহা কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষয় ও অম্লান হইয়া থাকিবে। বিশ্বনবীর ইন্তেকালের অব্যবহিত পরই জাহিলিয়াতের সূচিভেদ্য অন্ধকারে গোটা আরব দেশ-তথা ইসলাম জগত আচ্ছন্ন হইবার উপক্রম হয়। বহু প্রধান ও প্রভাবশালী গোত্র ইসলামী হুকুমতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। নবুয়্যাতের মিথ্যা দাবিদারগণ বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহের পতাকা উড্ডীন করে। যাকাত দিতে অস্বীকারকারীরা শুধু যাকাত দান হইতেই বিরত থাকে নাই, দারুল-খিলাফত মদীনা মুনাওয়ারাকেও লুণ্ঠন করিবার জন্য হুঙ্কার ছাড়ে। এককথায় বলা যায়, ইসলামের প্রচণ্ড মার্তণ্ড অস্তগামী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আকস্মাৎ উহার প্রদীপ্ত দীপশিখা শেষরাত্রের তৈলহীন প্রদীপের ন্যায় নির্বাণোন্মুখ হইয়া পড়ে। কিন্তু রাসূলের স্থলাভিষিক্ত ও মহান খলীফার দূরদৃষ্টি,সাহসিকতাপূর্ণ মনোবল, রাজনৈতিক সূক্ষ্মবুদ্ধি ও অসাধারণ ধৈর্য-স্থৈর্যের ফলে ইসলামের চেরাগ শুধু চির নির্বাণের কবল হইতেই রক্ষা পায় নাই, হেদায়েতের সেই উজ্জ্বল মশাল দ্বারা সমগ্র আরবকে উদ্ভাসিত করিয়া তোলে। এইজন্যই বলিতে হয় যে, বিশ্বনবীর অন্তর্ধানের পর যে মহান ব্যক্তি ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাকে ধ্বংসের কবল হইতে রক্ষা করিয়াছেন এবং মুসলিম জাহানের উপর যাহার অপরিশোধ্য ঋণ রহিয়াছে, তিনি হইতেছেন প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)।

দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা)-এর খিলাফতকালে অনেক বড় বড় কীর্তি-কাণ্ড সম্পাদিত হইয়াছে, বহুতর কঠিন ও জটিল বিষয়ের সুমীমাংসা হইয়াছে। এমন কি রোমক ও ইরানের বিশাল সাম্রাজ্য পর্যন্ত ইসলামী সয়লাবের আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া গিয়াছে। ইহা সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য, যাহা কেহই অস্বীকার করিতে পারে না। কিন্তু ইসলামী খিলাফতের বুনিয়াদ সংরক্ষণ, সমগ্র ইসলামী উম্মাহর হৃদয়মনে অপ্রতিরোধ্য বিপ্লব ও আত্মোৎসর্গের প্রচণ্ড ভাবধারার জাগরণ, খিলাফতে ইলাহীয়ার সংগঠন-সংযোজন ও শৃঙ্খলা স্থাপন কাহার দ্বারা সম্ভব হইয়াছে? সর্বোপরি ধ্বংসের ঝঞ্জা-বাত্যা হইতে ইসলামী সমাজ-রাষ্ট্রকে কে বাঁচাইয়াছে?- এইসব প্রশ্নের জওয়াবে কেবলমাত্র আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-এর নামই উচ্চারণ করা যাইতে পারে। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা আবূ বকর সিদ্দীক (রা) এর খিলাফতকালের কার্যকলাপ ও ইসলামের আকাশস্পর্শী বিস্তারের যাচাই ও পর্যালোচনা উপস্থাপনের চেষ্টা করিব।

খিলাফতের পরামর্শ-ভিত্তিক চরিত্র

একথা অনস্বীকার্য যে, নবুয়্যাতের আদর্শে ইসলামী খিলাফতের প্রথম ভিত্তি স্থাপন করেন হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)। প্রথমতঃতাঁহার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় প্রকাশ্য জনমতের ভিত্তিতে। পরন্তু তিনি যতগুলি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করিয়াছেন,উহার প্রত্যেকটির পশ্চাতেই ইসলামী নাগরিক-জনতার আস্থাভাজন ও স্বাভাবিক প্রতিনিধি মর্যাদাসম্পন্ন শ্রেষ্ট সাহাবিগণকে স্বতঃস্ফূর্ত রায় বর্তমান ছিল। এই জন্য তিনি উপরোক্ত শ্রেণীর সাহাবিগণকে দারুল খিলাফত হইতে দূরে যাইবার অনুমতি দান করেন নাই কখনও। রাসূলে করীম (স) উসামা বাহিনীর সহিত যাইবার জন্য হযরত উমর ফারুক (রা)-এর নাম তালিকাভুক্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু প্রথম খলীফা এতদপেক্ষাও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য তাঁহাকে মদীনার বাহিরে যাইবার অনুমতি দেন নাই; উসামার নিকট হইতে ইহার অনুমতি তিনি নিজেই গ্রহন করিয়াছিলেন।

সিরিয়া আক্রমণের প্রয়োজন দেখা দিলে বিষয়টিকে তিনি প্রথমে সাহাবাদের বিশিষ্ট জামায়াতের নিকট পরামর্শের জন্য পেশ করেন। বিস্তারিত আলোচনার পর হযরত আলী (রা)-এর একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ-ঘোষণা করার ব্যাপারেও অনুরুপভাবে পরামর্শ গ্রহন করা হয়। অবশ্য একথাও সত্য যে, উমর ফারুক (রা)-এর খিলাফতকালের ন্যায় তখন মজলিসে শুরা সুষ্ঠুরুপে গঠিত ছিলনা; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও কোন জাতীয় রাষ্ট্রীয় ও দ্বীনী গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বিশিষ্ট সাহাবীদের মত ও রায় গ্রহণে কোন সময়ই অবহেলা করা হয় নাই।

আভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ব্যবস্থা

রাষ্ট্রের স্বরূপ ও ধরণ নির্ধারণের পর দেশের আভ্যন্তরীণ শাসন-শৃঙ্খলা উন্নততর করা এবং গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহ বণ্টন ও পদাধিকারীদের সুষ্ঠু নির্বাচন অত্যন্ত জরুরী কাজ। হযরত আবূ বকর (রা)-এর খিলাফতকালে দেশজয় বা রাজ্য বিস্তারের কেবলমাত্র সূচনা হইয়াছিল; কাজেই তাঁহার খিলাফতকে কেবল আরব উপদ্বীপ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ মনে করিতে হইবে। তিনি আরব উপদ্বীপকে কয়েকটি প্রদেশ ও জেলায় বিভক্ত করিয়াছিলেন। মদীনা, মক্কা, তায়েফ, সানয়া,নাজরান, হাযরামওত,বাহরাইন ও দওমাতুল জান্দাল প্রভৃতি স্বতন্ত্র প্রদেশ ছিল। প্রত্যেক প্রদেশেই একজন করিয়া কর্মাধ্যক্ষ(আজিকার ভাষায় গভর্নর) নিযুক্ত ছিলেন।সকল প্রকার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন তাঁহার কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। দারুল খিলাফতেও প্রত্যেক বিভাগেরই একজন করিয়া প্রধান নিযুক্ত ছিলেন। দৃষ্টান্ত স্বরূপ উল্লেখ করা যাইতে পারে, হযরত আবূ উবাইদা (রা) সিরিয়ায় সেনাপতি নিযুক্ত হওয়ার পূর্বে অর্থ উজীর পদে অভিষিক্ত ছিলেন, হযরত উমর (রা)ছিলেন বিচারপতি আর হযরত উসমান ও হযরত জায়দ বিন সাবেত (রা) খিলাফত-দরবারের সেক্রেটারি পর্যায়ের কর্মকর্তা ছিলেন।

শাসনকর্তা ও অফিসার নির্বাচনে হযরত আবূ বকর (রা) সব সময়ই নবী করীম (স)-এর যুগের অনুরূপ পদাধিকারী লোকদের প্রাধান্য দিতেন এবং যিনি পূর্বে যে কাজ করিয়াছেন, তাঁহার দ্বারা সেই কাজ লইতে চেষ্টা করিতেন।ফলে তাঁহাকে প্রায় কোন বিভাগেই অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ লোক নিয়োগজনিত অসুবিধার সম্মুখীন হইতে হয় নাই।

হযরত আবূ বকর (রা) একজনকে যখন কোন দায়িত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করিতেন, তখন সাধারণতঃ তাঁহাকে উপস্থিত করিয়া তাঁহার দায়িত্ব ও কর্তব্য বিস্তারিতভাবে বুঝাইয়া দিতেন এবং অত্যন্ত প্রভাবশীল ও মর্মস্পর্শী ভাষায় তাকওয়া,ন্যায়নীতি ও সর্বক্ষেত্রে সুবিচার অবলম্বনের জন্য উপদেশ দান করিতেন। এখানে আমর-বিন আস ও অলীদ বিন আকাবা (রা)-কে যাকাত আদায়কারী নিয়োগকালীন প্রদত্ত উপদেশের অংশ-বিশেষ উল্লেখ করা যাইতেছেঃ

প্রকাশ্যে ও একাকীত্বে আল্লাহ্‌কে ভয় কর। আল্লাহ্‌কে যে ভয় করে, আল্লাহ্‌ তাহার জন্য এমন একটি পথ ও রিযিক লাভের এমন উপায় সৃষ্টি করিয়া দেন,যাহা কাহারও ধারণায় আসিতে পারে না। আল্লাহ্‌কে যে ভয় করে, আল্লাহ্‌ তাহার গুনাহ মাফ করিয়া দেন এবং তাহার নেক কাজের ফল দ্বিগুণ ও ততোধিক পরিমাণ দান করেন। জনগণের কল্যাণ কামনা ও খেদমত নিঃসন্দেহে উত্তম তাকওয়ার কাজ।

এমন গুরুত্বপূর্ণ পথে তোমরা অগ্রসর হইতেছ, যেখানে দ্বীনের প্রতিষ্ঠা ও খিলাফতের দৃঢ়তা সাধনের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র গাফেলতি বা আতিশয্য ও অবহেলার কোনই অবকাশ নাই। কাজেই অবসাদ ও উপেক্ষার কদর্য অভ্যাস পরিত্যাগ কর।

ইয়াজিদ বিন সুফিয়ানকে সিরিয়ার শাসনকর্তা নিযুক্তির সময় তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া বলিয়াছিলেনঃ

হে ইয়াজিদ! তোমার বহু সংখ্যক নিকটাত্মীয় রহিয়াছে;তোমার রাষ্ট্রক্ষমতার দ্বারা তাহাদিগকে অনেক স্বার্থোদ্ধারের সুযোগ করিয়া দিতে পার। কিন্তু জানিয়া লইও, ইহাই আমার সবচেয়ে বড় ভয়। নবী করীম (স) ইরশাদ করিয়াছেনঃ

মুসলমানদের শাসনকর্তা যদি কাহাকেও বিনা অধিকারে শুধুমাত্র প্রীতি হিসাবে মুসলমানদের উপর কর্তৃত্বসম্পন্ন অফিসার নিযুক্ত করে, তবে তাহার উপর আল্লাহ্‌র অভিশাপ বর্ষিত হয়। আল্লাহ্‌ তাহার কোন ওযর কিংবা প্রায়শ্চিত্ত কবুল করেন না। এমন কি শেষ পর্যন্ত থাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করিবেন।

শাসকদের প্রতি কড়া দৃষ্টি

সরকারের আইন-কানুন যতই উত্তমভাবে রচিত ও বিধিবদ্ধ হউক না কেন, কিন্তু দায়িত্তসম্পন্ন শাসকদের উপর যদি কড়া দৃষ্টি রাখা না হয় এবং জনগণের তীক্ষ্ণ সমালোচনার সুষ্ঠু ও অবাধ ব্যবস্থা না থাকে, তাহা হইলে গোটা শাসন ব্যবস্থা চূর্ণ-বিচূর্ণ ও কর্তৃপক্ষের প্রতি জনগণের স্বাভাবিক আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হইতে বাধ্য। এই কারণেই প্রথম খলীফার স্বাভাবিক বিনয়, নম্রতা, ক্ষমাশীলতা, সহিষ্ণুতা ইত্যাদি মহৎ গুনাবলী থাকা সত্ত্বেও স্থান বিশেষে তাঁহাকে বিশেষ কঠোরতা,পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তীব্র সমালোচনার মাধ্যমে খাঁটি, ভেজাল ও সদাসদ নির্ণয়ের দুঃসাধ্য কাজ করিতে হইয়াছে। ব্যক্তিগত ব্যাপারসমূহে অতিশয় নম্রতা ও বন্ধুতাবলম্বনই ছিল তাঁহার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য; কিন্তু সেই সঙ্গে দ্বীনী, প্রশাসনিক ও খিলাফত সংক্রান্ত ব্যাপারে তিনি বিন্দুমাত্র ত্রুতি-অবহেলা বরদাশত করিতেন না। এই কারণে শাসনকর্তাদের মধ্যে যখনি কোন অবাঞ্ছনীয় ত্রুটি পরিলক্ষিত হইত, তখন অত্যন্ত কঠোরতা অবলম্বন করিয়াই তিনি উহার শাস্তি বিধান করিতেন।

দণ্ড বিধানে নম্রতা

হযরত আবূ বকর (রা) ব্যক্তিগতভাবে অপরাধীদের প্রতি অতিশয় নম্র ও সহানুভূতিসূচক ব্যবহার করিতেন। নবী করীম (স)-এর জীবদ্দশায় এক ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার কথা তাঁহার নিকট স্বীকার করে। তিনি সহানুভূতিশীল হইয়া তাহাকে তওবা করিতে ও এই অপরাধের কথা বলিয়া না বেড়াইতে উপদেশ দিলেন; কিন্তু অপরাধী শরীয়াতের নির্দিষ্ট দণ্ডবিধান হইতে আত্মরক্ষা করিতে প্রস্তুত না হওয়ায় নবী করীম (স)-এর দরবারে হাযির হইয়া নিজ ইচ্ছায় অপরাধ স্বীকার করিয়া এই দণ্ড গ্রহন করে।

খিলাফতের আমলেও হযরত আবূ বকর (রা)-এর এই প্রকৃতিই বর্তমান ছিল। নবুয়্যাতের মিথ্যা দাবিদার আশয়াস বিন কায়েস গ্রেফতার হইয়া তাঁহাদের দরবারে আসে। শেষ পর্যন্ত সে তওবা করিয়া প্রান ভিক্ষা চায়। হযরত আবূ বকর (রা) তাহাকে কেবল মুক্তিই দান করেন নাই, নিজের সহোদর ভগ্নীর সহিত তাহার বিবাহও সম্পন্ন করেন। বস্তুতঃরাজনৈতিক দৃষ্টিতে খলীফার প্রধান দায়িত্ব হইল জনগণের নৈতিক চরিত্র ও জান-মালের সংরক্ষন। এই দিক দিয়া যদিও তখন পর্যন্ত কোন পুলিশ বিভাগ স্থায়ীভাবে কায়েম ছিল না, তথাপি এই বিভাগটি তখনো নবী করীম (স)-এর স্থাপিত ব্যবস্থা অনুযায়ীই পরিচালিত হইতেছিল। অবশ্য হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা)কে পাহারাদারী ও নিরাপত্তা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত কড়া হইয়াছিল ও কয়েকটি বিশেষ বিশেষ অপরাধের দণ্ডও নির্ধারণ করা হইয়াছিল। এই ব্যাপারে তাঁহাকে ইসলামী পার্লামেন্টের মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবা-সম্মেলনে কুরআন হাদীসের ভিত্তিতে পরামর্শ গ্রহন ও ইজতিহাদ করিতে হইয়াছে।

মোটকথা, জনজীবনের শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান ও রাজপথসমূহকে সকল প্রকার বিপদ হতে মুক্ত ও নিরাপদ রাখার দিকে প্রথম খলীফা বিশেষ লক্ষ্য আরোপ করিতেন। এই কাজে কেহ বিন্দুমাত্র বাধা ও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করিলেও তাহাকে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিদান করিতেন। কিন্তু কোথাও শরীয়াতের দণ্ড-বিধানের সীমা কখনই লঙ্ঘন করিতেন না।

খিলাফতের অর্থ বিভাগ

নবী করীম (স)-এর যুগে অর্থ বিভাগ পরিচালনার জন্য কোন সুষ্ট ও সুসংগঠিত ব্যবস্থা ছিল না। বিভিন্ন সূত্র হইতে ধন-সম্পদ প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই তিনি উহা অভাবগ্রস্ত জনগণের মধ্যে বণ্টন করিতে দিতেন। হযরত আবূ বকর (রা) এর আমলে এই ব্যবস্থার কোন রদবদল করা হয় নাই। তিনি তাঁহার খিলাফতের প্রথম বৎসরেই মুক্ত ক্রীতদাস, স্ত্রী-পুরুষ এবং উচ্চ-নীচ সকল শ্রেণীর লোকদিগকে মাথাপিছু বিশ দিরহাম দান করিয়াছিলেন। ধন-বণ্টনের ব্যাপারে এইরূপ সমতা রক্ষা সম্পর্কে জনৈক সাহাবী আপত্তি পেশ করিলে তিনি জওয়াবে বলিয়াছিলেনঃ ‘লোকদের মর্যাদা ও গুন-গরিমার মধ্যে পার্থক্য অনস্বীকার্য; কিন্তু ধন-বণ্টনের ব্যাপারে কমবেশী হওয়ার সহিত উহার কি সম্পর্ক থাকিতে পারে?’ তাঁহার খিলাফতের শেষভাগে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ‘বায়তুলমাল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়; কিন্তু উহাতে কখনো বিপুল পরিমাণ সম্পদ বা অর্থ সঞ্চিত হতে পারে নাই। ফলে বায়তুলমালের সংরক্ষণ ও পাহারাদারীর কোন ব্যবস্থা গ্রহণেরই প্রয়োজন দেখা দেয় নাই। একবার জনৈক সাহাবী এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে উত্তরে তিনি বলিয়াছিলেনঃ ‘উহার হেফাজতের জন্য একটি তালা-ই যথেষ্ট’। তাঁহার ইন্তেকালের পর হযরত উমর ফারুক (রা)-এর নেতৃত্বে ‘সানাই’ নামক স্থানে অবস্থিত বায়তুলমাল পরীক্ষা করিয়া দেখা হয় এবং উহাতে মাত্র একটি দিরহাম অবশিষ্ট রহিয়াছে বলিয়া প্রমানিত হয়। ইহা দেখিয়া জনগণ বলিয়া উঠিলঃ ‘আল্লাহ্‌ আবূ বকরকে রহম করুন’।

সামরিক ব্যবস্থা

নবী করীম (স) –এর আমলে কোন সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল সৈন্যবাহিনী ছিল না। যুদ্ধের আওয়াজ শ্রুত হইলেই সমগ্র মুসলিম জনতা উহাতে যোগদানের জন্য প্রবল উৎসুক্যের সহিত নবী করীম (স)-এর সম্মুখে সমবেত হইতেন। হযরত আবূ বকর (রা)-এর আমলেও মোটামুটি এই প্রথাই চালু ছিল। অবশ্য তিনি একটি নূতন ব্যবস্থা চালু করিয়াছিলেন। তাহা এই যে, যখন কোন বাহিনী কোন বিশেষ অভিযানে প্রেরণ করিতেন, তখন সমগ্র সৈন্যদিগকে নান উপ-বাহিনীতে বিভক্ত করিয়া উহার প্রতিটির জন্য এক একজন সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত করিয়া দিতেন। এইভাবে আমীরুল উমারা বা ‘কমান্ডার-ইন চীফ’ নিয়োগের প্রথাও প্রথম খলীফার আমলেই সূচিত হইয়াছিল এবং হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদই সর্বপ্রথম এই গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যধিক সম্মানিত পদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন।

বস্তুতঃ সৈন্যবাহিনীকে এইভাবে সুসংবদ্ধ ও সন্নিবেশিত করার ফলে মুসলিম মুজাহিদীনের পক্ষে রোমকদের সুসংবদ্ধ সৈন্যবাহিনীর মুকাবিলা করা অতিশয় সহজ হইয়াছিল।

সৈনিকদের চরিত্রগঠন ও প্রশিক্ষন ব্যবস্থা

নবী করীম (স) ও খিলাফতে রাশেদার আমলে সংঘটিত প্রতিটি যুদ্ধ-সংগ্রাম আল্লাহ্‌র সন্তোষ বিধান ও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যই চালিত হইয়াছে। এই কারণে এই উদ্দেশ্য আত্মোৎসর্গীকৃত জনতার নৈতিক চরিত্রের উন্নতি বিধানের দিকে তখন বিশেষ গুরুত্ত সহকারে দৃষ্টি দেওয়া হইত। ফলে ইসলামী বাহিনী নৈতিক চরিত্রের দিক দিয়া সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্টত্তের অধিকারী হইয়াছিল। নবী করীম (স)-এর পরে হযরত আবূ বকর (রা) ও সামরিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে এই দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখিয়াছেন। বিশেষ বিশেষ অভিযানে সৈন্যবাহিনী প্রেরণের সময় তিনি সেনাধ্যক্ষর সহিত বহুদূর অগ্রসর হইয়া যাইতেন ও মূল্যবান উপদেশ দান করিয়া তাহাকে বিদায় দিতেন। সিরিয়া অভিযানে প্রেরণের সময় সেনাধ্যক্ষর নিম্নোক্তরুপে উপদেশ দিয়াছিলেনঃ

তোমার এমন লোকদের সাক্ষাত পাইবে, যাহারা আল্লাহ্‌র উপাসনায় আত্মনিয়োগ করিয়া রহিয়াছেন। তাহাদের উপর আক্রমন করিবে না। এতদ্ব্যতীত আরও দশটি উপদেশ তোমাদিগকে দিতেছিঃ কোন স্ত্রী, শিশু ও বৃদ্ধ লোককে হত্যা করিবে না, ফলবান গাছ কর্তন করিবে না, কোন জনপদ বা আবাদ স্থানকে জনশূন্য করিবে না। ছাগল ও উষ্ট্র খাদ্য-প্রয়োজন ব্যতীত কখনো জবেহ করিবে না। খেজুর বাগানে অগ্নিসংযোগ করিবে না। গণিমতের মাল কোনরূপ অপহরণ করিবে না এবং কাপুরুষ ও সাহসহীন হইবে না।

যুদ্ধের সরঞ্জাম সংগ্রহ

হযরত আবূ বকর (রা) যুদ্ধের সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা কার্যকর করিয়াছিলেন। বিভিন্ন সূত্রে সরকারী ফান্ডে যাহা কিছু জমা হইত, উহা হইতে একটি মূল্যবান অংশ তিনি পরিবহন ও অস্ত্র ক্রয়ের কাজে ব্যয় করিতেন। কুরআন মজীদে গণিমতের মালে আল্লাহ্‌, রাসূল ও নিকটাত্মীয়দের জন্য যে অংশ নির্দিষ্ট করা হইয়াছে, তাহা সবই এই সামরিক প্রয়োজন পূরণের খাতে ব্যয় করা হইত। নবী করীম (স) অন্যান্য জরুরী কাজের পর এই খাতেই অবশিষ্ট সম্পদ ব্যয় করিতেন।

উষ্ট্র ও অশ্ব পালনের প্রথম খলীফা ‘বকী’ নামক স্থানে একটি বিশেষ চারণভূমি নির্দিষ্ট করিয়াছিলেন। এখানে হাজার হাজার সরকারী জন্তু প্রতিপালনের ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। সদকা ও যাকাত বাবদ আদায়কৃত সরকারী জন্তু এখানেই রাখা হইত।

সামরিক কেন্দ্রসমূহ পর্যবেক্ষণ

হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) বার্ধক্যজনিত দুর্বলতার ফলে নানা দুশ্চিন্তা ও মনোবেদনায় ভারাক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজেই সামরিক ছাউনীসমূহ পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করিতেন এবং সৈনিকদের মধ্যে বাস্তব ও আধ্যাত্মিকতার দিক দিয়া কোন ত্রুটি –বিচ্যুতি দেখিতে পাইলে সঙ্গে সঙ্গে উহার সংশোধনও করিয়া দিতেন। কোন একটি বিশেষ অভিযান উপলক্ষে ‘জরফ’ নামক স্থানে বিপুল সংখ্যক সৈন্য সমাবেশ করা হয়। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) উহা পরিদর্শন করিতে গেলেন। তিনি ‘বানুফজারাহ’ নামক স্থানে অবস্থিত তাঁবুতে উপস্থিত হইতে মুজাহিদগণ দাঁড়াইয়া তাঁহার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিল। এখানে তিনি বিভিন্ন গোত্র হইতে আগত সৈনিকদের মধ্যে পারস্পরিক আভিজাত্য ও শ্রেষ্টত্তের গৌরববোধ লক্ষ্য করিলেন। তিনি উপদেশের সাহায্যে বংশীয় ও গোত্রীয় আভিজাত্য এবং পারস্পরিক হিংসা-দ্বেষ অবদমিত করিয়া সকলের মধ্যে ইসলামী সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগাইবার জন্য চেষ্টা করিলেন।

অনৈসলামী প্রথার প্রতিরোধ

নবীদের প্রচারিত ধর্মমত ও জীবন ব্যবস্থার উত্তরকালে বিকৃত হইয়া যাওয়ার মূলে সবচেয়ে বড় কারণ হইল লোকদের মধ্যে ক্রমশঃ বিদয়াতের প্রচলন ও প্রশ্রয় লাভ। ইহার ফলে, বিদয়াতী ব্যবস্থাসমূহই মূল ধর্মের স্থান লাভ করে ও আসল ধর্ম বিলুপ্ত হয়। হযরত আবূ বকর (রা)-এর আমলে ইসলামী সমাজে বিদয়াতের কোন বিশেষ সূচনা পরিলক্ষিত হয় নাই। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও কখনও এবং কোথাও তেমন কিছু দেখা গেলেই তিনি অনতিবিলম্বে উহা দূর করিতে চেষ্টিত হইতেন।

কুরআন ও হাদীস সম্পর্কে হযরত আবূ বকর (রা)-এর ভূমিকা

নবুয়্যাতের মিথ্যা দাবিদারদের সহিত সংঘটিত লড়াইসমূহে বহুসংখ্যক হাফিজে কুরআন মুজাহিদ শহীদ হন। বিশেষতঃইয়ামামার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে এত বেশিসংখ্যক হাফিজে কুরআন শাহাদত বরণ করেন যে, তাহাতে দায়িত্তসম্পন্ন সাহাবীদের মনে কুরআন মজীদের বিলুপ্ত হইয়া যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়। এই জন্য অবিলম্বে কুরআন মজীদ সংগ্রহ, প্রণয়ন ও সন্নিবেশিত করার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে দেখা দেয়।

বস্তুতঃকুরআন মজীদের আয়াত ও সূরাসমূহ বিশেষ বিশেষ সময়ে ও বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নাজিল হইয়াছে এবং নবী করীম (স)-এর নির্দেশে তাহা সঙ্গে সঙ্গেই নির্দিষ্ট সাহাবীদের দ্বারা লিখিত হইয়াছে। খর্জুর পত্র, উষ্ট্রের চামড়া, অস্থি, পাথর ও কাষ্ঠের উপরই তাহা সুস্পষ্টরুপে লিখিত ছিল। হযরত আবূ বকর (রা)-এর নির্দেশে তাহা একত্রে সন্নিবেশিত করা হয় ও একখানা সুসংবদ্ধ গ্রন্থের রূপ দান করা হয়। ইসলামী দৃষ্টিতে ইহা যে কত বড় কীর্তি ছিল, তাহা সহজেই অনুমেয়।

হাদীস সম্পর্কে হযরত আবূ বকর (রা)-এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সতর্কতাপূর্ণ। তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় বলিয়াছেন যে, কোন হাদীসের সত্যতা সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাসী ও সর্ব প্রকারের সন্দেহ বিমুক্ত না হইয়া উহা রেওয়ায়েত করা ঠিক নহে। তিন নিজে কখনো কোন হাদীসকে উহার একাধিক সমর্থক ও সাক্ষী না পাইলে গ্রহন করিতেন না।

ইসলামী আইন বিভাগ স্থাপন

ইসলামী আইন সম্পর্কে গবেষণা, অনুসন্ধান ও বিচার-বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ কার্য সম্পাদনের জন্য হযরত আবূ বকর (রা) একটি বিশেষ বিভাগ স্থাপন করেন। হযরত উমর, হযরত উসমান, হযরত আলী, হযরত আবদুর রাহমান বিন আউফ, হযরত মুয়াজ বিন জাবাল, হযরত উবাই বিন কায়াব, হযরত জায়েদ বিন সাবেত (রা) প্রমুখ শ্রেষ্ঠ মনিষী ও চিন্তাবিদগণ এই কাজে নিযুক্ত ছিলেন। জনগণের জিজ্ঞাসিত ফতোয়ার জওয়াব দান করাও ইঁহাদেরই দায়িত্ব ছিল।

ইসলাম প্রচার

রাসূলের প্রতিনিধি মর্যাদাসম্পন্ন খলীফার অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল ইসলামী আদর্শ প্রচার। এই দিকে হযরত আবূ বকর (রা)-এর প্রথম হইতেই বিশেষ লক্ষ্য ও দৃষ্টি ছিল। বস্তুতঃইসলামী আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রসমূহ ছিল সত্যের জন্য আত্মোৎসর্গীকৃতপ্রাণ হযরত আবূ বকর (রা)-এর আপ্রান প্রচেষ্টার ফসল। কিন্তু খিলাফতের গুরুভার অর্পিত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই এইদিকে তাঁহার অধিক প্রবণতা ও তৎপরতা দেখা দেয়। ফলে সমস্ত আরবদেশ ইসলাম প্রচারের বলিষ্ঠ ধ্বনিতে মুখরিত হইয়া উঠে। চতুর্দিকে প্রেরিত মুজাহিদদিগকে ইসলাম প্রচারের জন্য হযরত আবূ বকর (রা) নির্দেশ দিলেন। বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত আরব গোত্রসমূহে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাইবার জন্য তিনি বিশেষ প্রতিনিধি দল প্রেরণ করিলেন। তাঁহারা পূর্ণ একাগ্রতা ও ঐকান্তিক নিষ্ঠা সহকারে এই কাজ সম্পন্ন করিতেন। ইহার ফলে দূর-নিকটের সকল মূর্তিপূজক ও খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী ইসলামে দীক্ষিত হয়। হযরত খালেদ (রা)-এর ইসলামী দাওয়াতে সাড়া দেয় ইরাক, আরব ও সিরীয় সীমান্তবর্তী আরব গোত্রসমূহ।

নবী করীম (স)-এর ওয়াদাসমূহ পরিপূরণ

নবী করীম (স)-এর আমলের ঋণসমূহ পরিশোধ করা ও প্রদত্ত ওয়াদা-প্রতিশ্রুতিসমূহ যথাযথভাবে পালন করাও খিলাফতের অন্যতম দায়িত্ব ছিল। হযরত আবূ বকর (রা) প্রথম অবসরেই এ কাজগুলি সম্পন্ন করেন। বিশেষতঃ ‘বাহরাইন’ বিজয়ের ফলে বিপুল ধনসম্পদ হস্তগত হইলে পর তিনি সাধারণভাবে ঘোষণা করিয়া দিলেন যে, নবী করীম (স)-এর নিকট কাহারো পাওনা থাকিলে কিংবা তাঁহার কোন ওয়াদা অপূর্ণ থাকিলে আমার নিকট হইতে তাহা পূরণ করা যাইতে পারে।

নবী করীম (স)-এর পরিবারবর্গ ও আত্মীয়দের সহিত ব্যবহার

নবী করীম (স)-এর পরিবারবর্গ ও নিকটাত্মীয়দের সহিত ‘ফিদাকের’ বাগানকে কেন্দ্র করিয়া প্রথমে তাঁহার সহিত কিছুটা ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হইলেও তিনি তাঁহাদের সহিত সকল সময় অত্যন্ত হৃদ্যতা,সহানুভূতি, ও শ্রদ্ধাপূর্ণ ব্যবহার করিয়াছেন। উম্মাহাতুল মু’মিনীনের সুখ-শান্তি বিধান ও তাঁহাদের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের দিকে তাঁহার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল। এতদ্ব্যতীত অন্যান্য লোকদের সম্পর্কে রাসূলে করীম (স) যেসব অসীয়ত করিয়া গিয়াছেন, তিনি পূর্ণ সম্মান ও ভক্তিসহকারে সেইগুলি পূরণ করিয়াছেন।

যিম্মি প্রজাদের অধিকার রক্ষা

নবুয়্যাতের যুগে ইসলাম রাষ্ট্রে যে সব বিধর্মীদের আশ্রয়দান করা এবং লিখিত চুক্তিনামার মাধ্যমে যাহাদের সহিত বিশেষ সন্ধি করা হইয়াছিল, হযরত আবূ বকর (রা) তাহাদের যাবতীয় অধিকার যথাযথরূপে রক্ষা করিয়াছেন। অনুরুপভাবে তাঁহার খিলাফত আমলে বিজিত দেশসমূহে অমুসলিম যিম্মী প্রজাদের তিনি মুসলিম প্রজাদের প্রায় সমান অধিকার দান করিয়াছিলেন। ‘হীরা’র খৃষ্টান অধিবাসীদের সহিত যে চুক্তি-নামা স্বাক্ষরিত হইয়াছিল, তাহা নিম্নরুপঃ

তাহাদের খানকাহ ও গীর্জাসমূহ ধ্বংস করা হইবে না, প্রয়োজনের সময়ে আশ্রয় গ্রহণের উদ্দেশ্যে নির্মিত কোন প্রাসাদও চূর্ণ করা হইবে না। ঘণ্টা বাজানো ও শিঙ্গা ফুকাইতে বাধা দেওয়া হইবে না। তাহাদের বিশেষ উৎসব অনুষ্ঠানের সময়ে ক্রুশ মিছিল বাহির করিতে নিষেধ করা হইবে না।

দীর্ঘ চুক্তিনামা হইতে এখানে মাত্র কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হইল। ইহা হইতে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পরধর্ম-সহিষ্ণুতার উজ্জ্বল নিদর্শন দেখিতে পাওয়া যায়।

প্রথম খলীফার আমলে জিজিয়া ও সাধারণ করের পরিমাণ ছিল অত্যন্ত কম। উপরন্তু তাহা কেবল সামর্থ্যবান লোকদের উপর ধার্য করা হইত। ‘হীরা’ অঞ্চলের সাত সহস্র অধিবাসীর মধ্যে এক সহস্র অধিবাসীকেই সকল প্রকার জিজিয়া কর হইতে নিষ্কৃতি দেওয়া হইয়াছিল আর অবশিষ্ট লোকদের উপরও মাথাপিছু বার্ষিক মাত্র দশ দিরহাম কর ধার্য করা হইয়াছিল। উল্লেখিত চুক্তিতে ইহারও উল্লেখ ছিল যে, কোন যিম্মী বৃদ্ধ, অক্ষম ও দরিদ্র হইয়া গেলে তাহার নিকট হইতে কোন করই গ্রহন করা হইবে না; উপরন্তু বায়তুলমাল হইতে তাহার ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা হইবে। দুনিয়ার ইতিহাসে এইরূপ অপক্ষপাত প্রজাপালন ও উদার আচরণের কোন দৃষ্টান্ত খুঁজিয়া পাওয়া যায় কি?

 

About মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম