বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

নবম অধ্যায়

ওয়াবেল পরিকল্পনা ১৯৪৫

দেশাই-লিয়াকত চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার পর, ব্রিটিশ সরকারের সাথে আলাপ আলোচনার জন্যে ভাইসরয় মে মাসে লন্ডন গমন করেন। অতঃপর তিনি সরকারের পক্ষ থেকে অচলাবস্থা দূরীকরণের জন্যে একটি প্রস্তাব নিয়ে ভারতে ফিরে আসেন।

ভারত সচিব ১৪ই জুন হাউস অব কমন্সে এক বিবৃতির মাধ্যমে ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনতান্ত্রিক সমস্যার সমাধান কল্পে একিট প্রস্তাব পেশ করেন। প্রস্তাবে বলা হয়, ভাইসরয় তাঁর কার্যকরী কাউন্সিল এমনভাবে পুনর্গঠিত করবেন যাতে তিনি ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে কিছু লোককে তাঁর কাউন্সিলর মনোনীত করতে পারেন। এতে প্রদান সম্প্রদায়গুলোর ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব থাকবে মুসলমান ও বর্ণহিন্দুর সমানুপাতে। এ কাউন্সিলে ভাইসরয় ও সেনাপ্রধান ব্যতীত সকলে হবেন ভারতীয়। এ কাউন্সিল পুর্গঠনে সকলের সহযোগিতা লাভের পর সকল প্রদেশ থেকে ৯৩ ধারা প্রত্যাহার করা হবে যাতে জনপ্রিয় মন্ত্রীসভা গঠিত হতে পারে।

একই দিনে এ প্রস্তাব ব্যাখ্যা করে ভাইসরয় লর্ড ওয়াবেল দিল্লী থেকে এক বেতার ভাষণ দান করেন। গান্ধী এবং কংগ্রেস কাউন্সিলে মুসলমান ও বর্ণহিন্দুর সমসংখ্যক প্রতিনিধিত্ব মেনে নিতে অস্বীকার করেন।

শিমলা সম্মেলন

ভাইসরয় তাঁর চেষ্টা অব্যাহত রাখার জন্যে ২৫শে জুন শিমলার সকল দলের সম্মেলন আহ্বান করেন। সম্মেলনে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের এবং অন্যান্য দলের একুশ জন যোগদান করেন –যাদের মধ্যে মুসলিম লীগের জিন্নাহ ও লিয়াকত আলীসহ ছয় জন ছিলেন। সম্মেলনে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে চরম মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, এমন কোন ব্যবস্থা, সাময়িক বা স্থায়ী হোক, কংগ্রেস মেনে নিতে পারেনা –যা তার জাতীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে, এক জাতীয়তাদাবের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করে এবং কংগ্রেসকে একটি সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানে পর্যবসিত করে। জিন্নাহ বলেন, পাকিস্তান ব্যতীত অন্য কোন কিছুর ভিত্তিতে গঠিত শাসনতন্ত্র লীগ মেনে নিতে পারে না। ২৬ এবং ২৭ তারিখেও আলোচনা অব্যাহত থাকে। ইউপি-এর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জি বি পন্তের (PANT) সাথে জিন্নাহর আলাপ আলোচনা চলছিল বিধায় ২৭ তারিখের বৈঠক অল্প সময় পর মুলতবী করা হয়। অতঃপর ২৮ ও ২৯ তারিখে সম্মেলনের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। জিন্নাহ-পন্ত আলেচনা ব্যর্থহয় বলে জানা যায়। ভাইসরয় আলোচনার একটা ভিন্ন পথ অবলম্বন করে সম্মেলনে যোগদানকারী প্রত্যেক দলকে একটি করে নামের তালিকা দাখিল করতে অনুরোধ করেন যারা হবেন ভাইসরয়ের কাউন্সিলের সদস্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ উভয়েরই ৮ জন থেকে ১২ জনের নামের একটি করে তালিকা পেশ করবেন।

তেসরা জুলাই কংগ্রেস তার নামের তালিকা ভাইসরয়ের নিকটে প্রেরণ করে। ৬ই জুলাই মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে পরদিন জিন্নাহ ভাইসরয়-এর কাছে নিম্নোক্ত প্রস্তাব পেশ করেনঃ

১। মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে নামের তালিকা গ্রহণ করার  পরিবর্তে ভাইসরয়-এর সাথে জিন্নাহর ব্যক্তিগত আলোচনার  পর কাউন্সিলের জন্যে প্রতিনিধি নির্বাচন করা হবে।

২। কাউন্সিলের সকল মুসলিম সদস্য মুসলিম লীগ বেছে নেবে।

৩। কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সিদ্ধান্ত থেকে মুসলিম স্বার্থ সংরক্ষণের  জন্যে ফলপ্রসূ রক্ষাকবচের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

শেষবারের মতো ১১ই জুলাই ভাইসরয় ও জিন্নাহর মধ্যে আলাপ আলোচনার পর ভাইসরয় বলেন, মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে চারজন মুসলিম সদস্য কাউন্সিলে নেয়া হবে এবং পঞ্চম ব্যক্তি হবেন এবং পঞ্চম ব্যক্তি হবেন একজন অ-লীগ পাঞ্জাবী মুসলমান।

একথার পর জিন্নাহ বলেন, লীগ সরকারের সাথে কাউন্সিল গঠনে সহযোগিতা করতে পারেনা। অতএব ভাইসরয়-এর শিমলা সম্মেলনও ব্যর্থ হয়।

ব্যর্থতার কারণ

শিমলা সম্মেলনের ব্যর্থতার একই কারণ যা কংগ্রেস-লীগ সমঝোতার সকল প্রচেষ্টা বানচাল করে দিয়েছে। তাওহীদ, রেসালাত ও আখেরাতে বিশ্বাসী মানুষ, তাওহীদ, রেসালাত ও আখেরাত অস্বীকারকারীর সাথে মিলে এক জাতি হতে পারে না কিছুতেই। তাই মুসলমানগণ একটি স্বতন্ত্র জাতি –মুসলীমলীগের এ দাবী অকাট্য সত্য যা এ উপমহাদেশের বুকে অসংখ্য ঘটনার দ্বারা প্রমাণিত। অতএব জিন্নাহ যদি দাবী করেন যে, যেহেতু মুসলমানগণ একটা স্বতন্ত্র জাতি, সেহেতু ভাইসরয়-এর কাউন্সিলে মুসলিম প্রতিনিধি মনোনয়নের অধিকার মুসলিম জাতির প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন মুসলিম লীগের, তাহলে তা নীতিগতভাবে সকলের মেনে নেয়া উচিত। আর মুসলমাগণ একটি স্বতন্ত্র জাতি হওয়ার কারণেই তাদের জন্যে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবী করা হয়েছে এবং তার জন্যে সংগ্রাম অব্যাহত আছে। কিন্তু কংগ্রেসের অন্যায় ও অবাস্তব দাবী হচ্ছে উপমহাদেশের সকল হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে এক জাতি এবং তার প্রতিনিধিত্বকারী কংগ্রেস। দেশের ভবিষ্যৎ শাসন ক্ষমতা কংগ্রেস দাবী করে এবং তা হতে পেলে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শাসনের অধীনে মুসলমানদের নির্মূল করা যাবে। মুসলমানদের এ আশংকা কল্পনাপ্রসূত নয়, প্রমাণিত সত্য। এ সত্য কংগ্রেস মেনে নিতে রাজী নয়। ভাইসরয় ও কংগ্রেসের দাবীর সমর্থনে জিন্নাহর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হলে ব্যর্থ হলে সম্মেলন ব্যর্থ হয়।

সাধারণ নির্বাচন

জাপানের আত্মসমর্পণের পর ১৫ই আগষ্ট, ১৯৪৫ বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যায়।

তার পূর্বে জুলাইয়ের শেষ দিকে ইংলন্ডের সাধারণ নির্বাচনের লেবার-পার্টি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাব করে। বহু পূর্ব থেকেই লেবার পার্টির সাথে কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং এবারের নির্বাচনের ফলাফল কংগ্রেসকে খুবই উল্লসিত করে। এর থেকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য কংগ্রেস তৎপরতা শুরু করে। ব্রিটিশ পলিসিই ছিলভারতে অখন্ডতার পক্ষে এবং এ ইস্যুটিতে লেবার পার্টির বেশী বেশী সমর্থন কংগ্রেস লাভ করবে বলে আশা করে। আর এ ইস্যুটিই কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে বিরাট দূরত্ব সৃষ্টি করে রেখেছিল। কংগ্রেসের দাবী মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে এক জাতি এবং অখন্ড ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের শাসন। পক্ষান্তরে মুসলিম লীগের দাবী, মুসলমানগণ একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জাতি এবং সে কারণেই তাদের জন্যে হতে হবে একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র। এ দুই বিপরীতমুখী দাবীর চূড়ান্ত ফয়সালার জন্যে বছরের শেষে শীতের মওসুমে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভার জন্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়।

নির্বাচনে মুসলিম লীগের দাবী পুরোপুরি স্বীকৃতি লাভ করে। কেন্দ্রীয় আইনসভার সকল মুসলিম আসন মুসলিম লীগ লাভ করে। প্রাদেশিক আইন সভাগুলোর ৪৯৫ মুসলিম আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ লাভ করে ৪৪৬টি আসন। হিন্দু প্রধান প্রদেশগুলোতে কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং তা ছিল অতি স্বাভাবিক। বাংলায় ১১৯টি মুসলিম আসনের মদ্যে মুসলিম লীগ লাভ করে ১১৩টি। এ, কে ফজলুল হক মুসলিম লীগের ছয়টি আসন হাতছাড়া হয়। এখানে হুসেন শহীদ সুহরাওয়ার্দী মন্ত্রীসভা গঠন করেন।

পাঞ্জাবে ৮৬টি মুসলিম আসনের মধ্যে ৭৯টি মুসলিম লীগ হস্তগত হয়। সিন্ধূতেও মুসলিম লীগ মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। সীমান্ত প্রদেশে সীমান্ত গান্ধী নামে কথিত চরম কংগ্রেসপন্থী আবদুল গাফফার খানের প্রচন্ড প্রভাবের দরুন মুসলিম লীগ ৩৬টি আসনের মধ্যে ১৭টি লাভ করে এবং ডাঃ খান মন্ত্রীসভা গঠন করেন।

তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে এ সাধারণ নির্বাচনে এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, একমাত্র  মুসলিম লীগই ভারতের প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এতে কংগ্রেসের মুসলিম লীগ বিরোধিতা তীব্রতর আকার ধারণ করে। মুসলিম লীগের প্রতিনিধিত্বমূলক বৈশিষ্ট্য মেনে নিয়ে তার সাথে একটা রাজনৈতিক সমঝোতায় উপনীত হওয়ার পরিবর্তে কংগ্রেস মুসলমানদের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টির পলিসি অবলম্বন করে এবং মুসলমানদের আস্থাশীল প্রতিনিধিদের হাতে, এমনটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশেও রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। এর ফলে সাম্প্রদায়িক মতভেদ তীব্রতর হয় এবং উভয়ের মধ্যে আপস নিষ্পত্তি অসম্ভব হয়ে পড়ে।

পাঞ্জাব সম্পর্কে কংগ্রেসের গৃহীত পলিসি তার বৈরিতাপূর্ণ মানসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পাঞ্জাবে মুসলিম লীগ ৮৬ মুসলিম আসনের মধ্যে ৭৯টি লাভ করে। এ দলে মাত্র দশজন সদস্য, তার মধ্যে ৩ জন অমুসলিম। কংগ্রেস ৫১, আকালী শিখ ২২। সর্বৃহৎ দল মুসলিম লীগেরই মন্ত্রীসভা গঠন অত্যন্ত ন্যয়সংগত ছিল। হিন্দু ও শিখদের নিয়ে মুসলিম লীগ মন্ত্রীসভা গঠন করতে পারতো। কিন্তু কংগ্রেসের অন্ধ মুসলিম বিদ্বেষ এবং শিখদের অপরিণামদর্শিতার ফলে তা সম্ভব হয়নি। কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট আবুল কালাম আজাদ এবং বলদেব সিংহ, কংগ্রেস এবং আকালী শিখদলের সহযোগিতায় মন্ত্রীসভা গঠনের জন্যে ইউনিয়নিস্ট দলের নেতা খিজির হায়াতকে প্ররোচিত ও সম্মত করেন। এ নীতিহীন জোট গঠন করা হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঞ্জাবে মুসলিম লীগকে ক্ষমতা গ্রহণ থেকে দূরে রাখার উদ্দেশ্যে। আবুল কালাম আজাদ পাঞ্জাবে অমুসলিম লীগ মন্ত্রীসভা গঠন করতে পারাই অত্যন্ত আত্মতৃপ্তি লাভ করেন ও গর্ববোধ করেন। (Maulana Abul Kalam Azad: India Wins Freedom, p.137)

কংগ্রেসের পাঞ্জাব মন্ত্রীসভায় যোগদানের  নিন্দা করেন জওহরলাল নেহরু এবং গান্ধী আবুল কালাম আজাদকে সমর্থন করে বলেন, কংগ্রেসের দৃষ্টিতে এর চেয়ে ভালো সমাধান আর কিছুই ছিল না। (The Emergence of Pakistan: Choudhury Muhammad Ali, p.49)

About আব্বাস আলী খান