বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

ত্রয়োদশ অধ্যায়

গণপরিষদ

জুলাই ১৯৪৬-এর শেষে গণপরিষদের ২৯৬ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। নয়টি আসন ব্যতীত সকল সাধারণ আসনে কংগ্রেস জয়ী হয় এবং পাঁচটি আসন ব্যতীত সকল মুসলিম আসনে লীগ জয়ী হয় এবং পাঁচটি আসন ব্যতীত সকল মুসলিম আসনে লীগ জয়ী হয়। গণ পরিষদের প্রথম অধিবেশন ৯ই ডিসেম্বর ১৯৪৬ হওয়ার কথা। কিন্তু লীগ এতে অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি একে বৈধ বলে স্বীকার করতে রাজী না যতোক্ষণ না কেবিনেট মিশনের ১৬ই মে’র বিবৃতির ১৯ অনুচ্ছেদের মুসলিম লীগ কর্তৃক ব্যাখ্যা কংগ্রেস মেনে নিয়েছে। এ ব্যাখ্যা মেনে নেয়ার জন্য ভাইসরয় কংগ্রেসকে অনুরোধ করেন। এ অনুরোধের পুরস্কার এভাবে দেয়া হলো যে গান্ধী ও নেহরু বাইসরয়কে অপসারণের জন্যে বৃটিশ সরকারের নিকটে তারবার্তা ও পত্র প্রেরণ করেন। উপায়ান্তর না দেখে ভাইসরয় কেবিনেট মিশন পরিকল্পনার অধীন গণপরিষদে যোগদানের জন্য ২০ শে নবেম্বর আমন্ত্রণ জানান। সংগে সংগেই জিন্নাহ এটাকে মারাত্মক ধরনের ভুল পদক্ষেপ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ভাইসরয় ভয়ংকর পরিস্থিতি ও তার বাস্তবতা উলব্ধি করতে ব্যর্থ হন এবং কংগ্রেসকে খুশী করার চেষ্টা করছেন। ৯ই ডিসেম্বর গণপরিষদের অধিবেশনে কোন লীগ প্রতিনিধি যোগদান করেন নি।

এরূপ পরিস্থিতিতে শেষ চেষ্টা করার উদ্দেশ্যে বৃটিশ সরকার দুজন কংগ্রেস এবং দুজন লীগ নেতাকে লন্ডন আমন্ত্রণ জানান। ভাইসরয়ের পরামর্শক্রমে একজন শিখ প্রতিনিধিকেও আমন্ত্রণ জানান হয়।

দুসরা ডিসেম্বর ১৯৮৭ লর্ড ওয়াভেল নেহরু জিন্নাহ লিয়াকত আলী খান এবং বলদেব সিং সহ লন্ডন যাত্রা করেন। চারদিন যাবত আলাপ আলোচনা চলে।

কংগ্রেস এবং লীগের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য কেবিনেট মিশনের ১৬ই মে’র বিবৃতির ব্যাখ্যা নিয়ে অর্থাৎ প্রদেশগুলোর গ্রুপিং নিয়ে। কেবিনেট মিশন স্বয়ং সে ব্যাখ্যাই করে যা মুসলিম লীগের ব্যাখ্যা। কিন্তু নেহরু এ ব্যাখ্যা কিছুতেই মেনে নিতে রাজী হন না। চরম রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।

কংগ্রেসের একগুঁয়েমি ও হঠকারিতার কারণে কোন আপোস মীমাংসা না হওয়ায় ৬ই ডিসেম্বর বৃটিশ সরকার এক বিবৃতি প্রকাশ করেন। বিবৃতির শেষ অনুচ্ছেদে বলা হয়, সর্বসম্মত কার্যধারার ভিত্তিতে কোন সিদ্ধান্ত ব্যতীত গণপরিষদের সাফল্য আশা করা যায় না। গণপরিষদ যদি এমন কোন সংবিধান রচনা করে যার রচনাকালে ভারতবাসীর বিরাট সংখ্যক লোকের কোন প্রতিনিধিত্ব নেই, তাহলে বৃটিশ সরকার এ ধরনের কোন সংবিধান অনিচ্ছুক জনগোষ্ঠীর উপর বলপূর্বক চাপিয়ে দিতে পারেনা।

সরকারের উপরোক্ত বিবৃতি এবং কেবিনেট মিশনের ২৫শে মে’র বিবৃতি কংগ্রেসের মধ্যে কোনরূপ পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়। নেহরু ও বলদেব সিং গণপরিষদে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যে ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন। জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী আরও কিছুদিন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন। লন্ডনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে জিন্নাহ বলেন, কংগ্রেস যদি ১৬ মে প্রকাশিত বিবৃতির বৃটিশ সরকারের ব্যাখ্যা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মেনে নেয়, তাহলে লীগ কাউন্সিলকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানাব। লন্ডনের এক বক্তৃতায় জিন্নাহ দেখিয়ে দেন যে পাকিস্তানের জনসংখ্যা পৃথিবীর যে কোন রাষ্ট্রের জনসংখ্যা অপেক্ষা অধিক। আমরা ভারতের তিন চুতর্থাংশের উপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিচ্ছি। পাকিস্তান মেনে নিতে কংগ্রেসের আপত্তি এ জন্যে যে তারা সমগ্র ভারত চায়। তাহলে আমরা আর থাকি কোথায়? এখন সমস্যা এই যে, বৃটিশ সরকার কি তাদের বেয়নেটের বলে হিন্দুসংখ্যাগরিষ্ঠেত কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চান? তা যদি হয় তাহলে বলব তোরা তোমাদের মানসম্ভ্রম, ন্যায়পরতা ও সুবিচার ও সাধু আচরনের সর্বশেষ কণাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। [Some Recent Writings of Mr. Jinnah, Vol 2-ed. By Jamiluddin Ahmad, (Lahore, Muhammad Ashraf 1947) –pp.496-508; Chowdhury Mohammad Ali The Emergence of Pakistan, pp.91-92)।

একদিকে ভারতে কংগ্রেস তীব্র কণ্ঠে দাবী করতে থাকে যে লীগ গণপরিষদে যোগদান না করলে তাদেরকে অন্তবর্তী সরকার থেকে বহিস্কার করা হোক, অপরদিকে বৃটিশ সরকারের ৬ই ডিসেম্বরের ঘোষণা অদূর ভবিষ্যতে এক নতুন রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ইংগিত বহন করে।

কেবিটেন মিষন সেক্রেটারিয়েটের সাথে সংশ্লিষ্ট ই, ডব্লিউ, আর লুম্বী বলেন, বৃটিশ সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রথম ঘোষণা যে কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা পরিহার করা হবে। ক্রিপস প্রস্তাবের পর এটাই ছিল প্রথম সরকারী ঘোষণা যার মধ্যে কোন না কোন প্রকারে পাকিস্তানের ইংগি আভার ছিল। হাউস অব কমন্সে ভাষণ দানকালে ক্রিপস সরকারী ঘোষণার শেষ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, গণপরিষদে যোগদানের জন্যে লীগকে যদি সম্মত করা না যায়, তাহলে দেশের যে সব অঞ্চলে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ সেগুুলোকে কোন সিদ্ধান্ত দ্বারা বাধ্য করা যাবেনা। (E.W.R. Lumby, op.cit, p.129; I.H. Wuershi The Struggle for Pakistan, pp.184-

এখন একটা প্রশ্ন রহইলো এবং তা এই যে কংগ্রেস লীগকে সরকার থেকে বহিস্কার করে দেয়ার দাবীতে এতো অনমনীয় কেন। এর কারণ কয়েকটি। অন্তর্বর্তী সরকারকে কংগ্রেস জাতীয় সরকার বলে অভিহিত করতো এবং এর দায়িত্ব ছিল সামষ্টিক। নেহরুকে এ সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনে রকা হতো। বৃটেনেও কংগ্রেসপন্থী ও বামপন্থী প্রেসগুলো একই সুরে একই গীত গাইতো। যেমন, দি নিউ স্টেটস ম্যান –এ সরকারকে সামষ্টিক দায়িত্বসম্পন্ন একটি কেবিনেট বলে অভিহিত করে যার প্রধানমন্ত্রী নেহরু –(7 September 1946)। ভারতে মাউন্ট ব্যাটেনের চীফ অব ষ্টাফ লর্ড ইসমে নেহরুকে ডেপুটি প্রাইম মিনিষ্টার বলে উল্লেখ করেন –(The Memories of General the Lord Ismay, London, 1960,p.418)। তার উক্তি ছিল অত্যন্ত হাস্যকর। কারণ নেহরুD y. Prime Minister হলে ভাইসরয় কি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন?

লীগ কাউন্সিলারগণ নেহরুকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেন একনকি নন-লীগ ব্লকের প্রধানও না। জিন্নাহ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ভাইসরয়ের একজেকিউটিভ কাউন্সিল ব্যতীত আর কিছু ছিলনা। রাজনৈতিক দিক দিয়ে এটাকে পুনর্গঠিত করা হয়। ভাইসরয় তার বিশেষ ক্ষমতাসহ ছিলেন এর প্রধান। নেহরু শুধুমাত্র কাউন্সিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার কাজ ছিল ভাইসরয়ের অনুপস্থিতিতে শুধুমাত্র সভাপতিত্ব করা।  কাউন্সিলারদের অধিক কোন ক্ষমতা ও মর্যাদা তাঁর ছিলনা।

এতে নেহরুর অহমিকা ক্ষতবিক্ষত হয় যার জন্যে লীগকে বহিস্কারের অন্যায় আবদার করতে থাকেন। (I.H.Quershi: The Struggle for Pakistan, pp.282-283)।

About আব্বাস আলী খান