দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস

Slide1

দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস

ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার

অনুবাদ: এম. আনিসুজ্জামান


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

প্রথম পরিচ্ছেদ

সীমান্তে বিদ্রোহী শিবির

বাংলার মুসলমানরা আবার এক বিচিত্র রূপ ধারণ করেছে। আমাদের সীমান্তে বিদ্রোহীদের উৎপাত চলেছে বহু বছর যাবত। তারা একেক দল ধর্মান্ধকে পাঠিয়েছে, যারা আমাদের শিবির আক্রমণ করেছে, গ্রাম পুড়িয়েছে, আমাদের প্রজাদের হত্যা করেছে এবং আমাদের সেনাবাহিনীকে তিন-তিনটি ব্যয়বহুল যুদ্ধে লিপ্ত করেছে। আমাদের সীমান্তের ওপারে মাসের পর মাস ধরে গড়ে ওঠা শত্রু বসতির লোক নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে। বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক মোকদ্দমার বিচার থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, আমাদের প্রদেশসমূহের সর্ব বিস্তারিত হয়েছে এক ষড়যন্ত্রের জাল, পাঞ্জাবের উত্তরে অবস্থিত জনহীন পর্বতরাজির সঙ্গে উষ্মমন্ডলীয় গঙ্গা অববাহিকার জলাভূমি অঞ্চলে যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে রাজদ্রোহীদের নিরবচ্ছিন্ন সমাবেশের মাধ্যমে। সুসংগঠিত প্রচেষ্টায় তারা ব-দ্বীপ অঞ্চল থেকে অর্থ ও লোক সংগ্রহ করে এবং দুই হাজার মাইল দূরে অবস্থিত বিদ্রোহী শিবিরে তা চালান করে দেয় আমাদেরই তৈরি করা রাস্তা দিয়ে। তীক্ষ্ণবুদ্ধি এবং বিপুল সম্পদের অধিকারী বহু লোক এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। সুকৌশলে অর্থ পাচারের এমন এক পদ্ধতি তারা প্রয়োগ করেছে, যাতে রাজদ্রোহের চরম বিপদসংকুল অভিযান রূপান্তরিত হয়েছে নিরাপদ ব্যাংক ব্যবসার আদান-প্রদানে।
মুসলমানদের মধ্যে যারা অপেক্ষাকৃত অধিক ধর্মান্ধ তারা এইভাবে রাজদ্রোহিতামূলক প্রকাশ্য তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। আর এই বিদ্রোহের প্রতি নিজেদের কর্তব্য সম্পর্কে প্রকাশ্যেই শলা-পরামর্শ করছে গোটা মুসলমান সম্প্রদায়। বিগত নয় মাস যাবত বাংলার প্রধান প্রধান সংবাদপত্রগুলোর পৃষ্ঠাসমূহ ভর্তি হয়েছে রানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া সম্পর্কে মুসলমানদের কর্তব্য সম্পর্কিত আলোচনায়। উত্তর ভারতের মুসলমান আইন-বিশারদ ব্যক্তিগণের সমষ্টিগত অভিমত সর্বপ্রথম প্রচারিত হয় একটি ফতোয়া রূপে। এর পরেই বাংলার মুসলমানরা এই বিষয়টি সম্পর্কে এক প্রচারপত্র বিতরণ করে। এমনকি ভারতের বিভিন্ন মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র যে শিয়া সম্প্রদায় তারাও এই প্রচার অভিযান থেকে বিরত থাকে পারেনি। মুসলমানদের মধ্যে যারা অপেক্ষাকৃত রাজানুগত তারা এই রাজদ্রোহ থেকে নিবৃত্ত থাকলে তাদের আখিরাত নষ্ট হবে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য যেভাবে গলদঘর্ম হয়ে চেষ্টা করেছিল, তা দেখে ইঙ্গ-ভারতীয় সংবাদপত্র কয়েকমাস হাসি সম্বরণ করতে পারেনি। কিন্তু মুসলমান আইন-বিশারদ পণ্ডিতদের সার্বিক ফতোয়া জারির পর আমাদের দেশবাসী নিশ্চিতরূপে উপলব্ধি করেন যে, বিষয়টা একদিকে যেমন গুরুতর তেমনি অপরদিকে নিতান্তই হাস্যকর। মুসলমানদের প্রণীত ও প্রচারিত যাবতীয় প্রচার পত্রাদি থেকে একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ভারত সাম্রাজ্য এক বিপদ সংকুল অবস্থা অতিক্রম করছে। বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন প্রত্যেকটি মানুষ বর্তমান অবস্থায় অবশ্যই উপলব্ধি করবেন যে, মুসলমানদের মধ্যে যারা অপেক্ষাকৃত অধিক বেপরোয়া তারা বহু বছর যাবত প্রকাশ্য রাজদ্রোহিতায় লিপ্ত আছে। পক্ষান্তরে সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের চিন্তাধারা সর্বকালের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক প্রশ্নে আলোড়িত হচ্ছে। মুসলমান আইনে বিদ্রোহকে আনুষ্ঠানিক ও প্রকাশ্যভাবে একটি অবশ্য কর্তব্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কোন-না কোনভাবে যেন প্রত্যেকটি মুসলমানের প্রতি নির্দেশ জারি হয়েছে বিদ্রোহের প্রশ্নে তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করাবার। স্ব-ধর্মাবলম্বীদের কাছে স্পষ্ট করে তাকে বলতে হবে, আমাদের সীমান্তের বিদ্রোহী শিবিরের প্রতি তার সমর্থন আছে কিনা, তাকে চূড়ান্তভাবে স্থির করতে হবে সে ইসলামের একাগ্র অনুসারীর ভূমিকা পালন করবে না রানীর শান্তিকামী প্রজার ভূমিকা পালন করবে। এই প্রশ্নে মুসলমানরা যাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, সেজন্যে তারা কেবলমাত্র ভারতের মুসলমান আইন-বিশারদগণের সঙ্গেই নয়, মক্কার পণ্ডিতগণের সঙ্গেও শলা-পরামর্শ করেছে। ভারতীয় মুসলমানদের বিদ্রোহে যোগদান করা-না কারার প্রশ্নটি আরবের পবিত্র নগরীর ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে মাসের পর মাস যাবত আলোচিত হয়েছে।
আমাদের মুসলমানদের প্রজাদের মধ্যে এই অসন্তোষের আলোচনা প্রসঙ্গে আমি আর তিনটি প্রবণতা বিষয় তুলে ধরতে চাই। প্রথম যেসব ঘটনার ফলে আমাদের সীমান্তে বিদ্রোহী উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল সংক্ষেপে তার বিবরণ দান করব এবং সেই বিদ্রোহী উপনিবেশ ব্রিটিশ শক্তিকে ক্রমাগতভাবে যেসব বিপদে জড়িয়ে ফেলেছিল তার কতকগুলো পাঠকদের কাছে উপস্থাপিত করব। দ্বিতীয় অধ্যায় যে রাজদ্রোহী সংগঠনের মাধ্যমে বিদ্রোহীরা ভারত সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ এলাকাসমূহ থেকে অর্থ ও জনবলের অবিরাম সরবরাহ লাভ করত সে সম্পর্কে আলোচনা করব। তারপর এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির দরুন যেসব আইনগত বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে সেগুলো বিবৃত করব। বিদ্রোহের প্রবক্তারা তাদের নীতি কথার যে বিষ ছড়াতো মুসলমান জনসাধারণ কিভাবে তা সাগ্রহে পান করত, আর মুষ্টিমেয় কিছু লোক তাদের পবিত্র আইনের সঠিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিদ্রোহে যোগদানের কর্তব্য থেকে অব্যাহতি লাভের জন্য কিভাবে আকুল প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হত, এই আলোচনা থেকে তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কিন্তু কেবলমাত্র এই আলোচনা করেই যদি বক্তব্য শেষ করি, তাহলে শুধু অর্ধেক সত্য উদঘাটিত হবে। ভারতের মুসলমানরা বহুদিন থেকে ভারতে ব্রিটিশ শক্তির প্রতি একটা অবিরাম বিপদের উৎসরূপে বিদ্যমান ছিল এবং এখনো আছে। কোন না কোন কারণে তারা আমাদের প্রবর্তিত ব্যবস্থা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে। অপেক্ষাকৃত নমনীয় হিন্দু সম্প্রদায় যেসব পরিবর্তন সানন্দচিত্তে মেনে নিয়েছে, মুসলমানরা সেগুলোকে মনে করেছে মহা অন্যায়। সুতরাং ইংরেজ শাসনাধীনে মুসলমানদের অসন্তোষের প্রকৃত কারণ এবং এই অসন্তোষ দূরীকরণের উপায় সম্পর্কে আমি আলোকপাত করব এ গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ে।
পাঞ্জাব সীমান্তে বিদ্রোহী শিবিরের গোড়াপত্তন করে সৈয়দ আহমদ (ব্রিটিশ ভারতের রায় বেরিলী জেলার বাসিন্দা, জন্ম ১২০১ হিজরি, মোহররম, খ্রীঃ ১৭৮৬) অর্ধ শতাব্দী আগে আমরা পিন্ডারী শক্তিকে নির্মূল করার ফলে যে কয়জন তেজস্বী পুরুষ ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল, সৈয়দ আহম তাদের অন্যতম। কুখ্যাত এক দস্যুর (আমীর খান পিন্ডারী, পরবর্তীকালে টংকের নওয়াব) অশ্বারোহী সৈনিক হিসেবে সে জীবন আরম্ভ করে এবং বহু বছর যাবত মালওয়া অঞ্চলের আফিম সমৃদ্ধ গ্রামসমূহে লুটতরাজ চালায়। রঞ্জিত সিংহের নেতৃত্বে উদীয়মান শিখ শক্তি তাদের মুসলমান প্রতিবেশীদের উপর যে কঠোর নির্দেশ জারি করে তার ফলে মুসলমান দস্যুদের কার্যকলাপ বিপদসংকুল হয়ে পড়ে এবং লাভজনক থাকে না। পক্ষান্তরে শিখদের গোড়া হিন্দুয়ানীর দরুন উত্তর ভারতের মুসলমানদের উৎসাহে ইন্ধন সৃষ্টি হয়। সৈয়দ আহমদ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। দস্যুবৃত্তি ত্যাগ করে ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সে দিল্লীতে চলে যায় মুসলমান আইনের একজন সুবিখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তির (শাহ আবদুল আজিজ) কাছে পবিত্র শাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য। তিন বছর সেখানে শিক্ষানবিসীর পর সে নিজেই একজন প্রচারক হিসাবে কাজ শুরু করে। ভারতীয় মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসে যেসব কুসংস্কার অনুপ্রবেশ করেছিল, সাহসের সঙ্গে সেগুলোর বিরুদ্ধে সে আক্রমণ চালাবার ফলে দুর্ধর্ষ একদল ভক্ত অনুসারী তার পশ্চাতে সমবেত হয়। সর্বপ্রথম সে তার প্রচার অভিযান শুরু করে রোহিলাদের (রোহিলাখন্ডের অন্তর্গত রামপুরার সন্নিকটে ফয়জুল্লাহ খানের জায়গীরে) বংশধরগণের মধ্যে। পঞ্চাশ বছর পূর্বে এই রোহিলাদিগকে নির্মূল করার জন্য অর্থের বিনিময়ে অন্যায়ভাবে আমাদের সেনাবাহিনীকে নিয়োগ করা হয়েছিল। রোহিলাদের করুন ইতিহাস ওয়ারেন হেষ্টিংসের চরিত্র এক অনপনেয় কালিমা লেপন করে রেখেছে। বিগত পঞ্চাশ বছর যাবত রোহিলাদের বংশধররা মৃত্যুপণ করে তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে। এখনো আমাদের সীমান্তের বিদ্রোহী উপনিবেশে নিয়োজিত হচ্ছে শ্রেষ্ঠ অসিচালক রোহিলা বীরেরা। ভারতে আমরা যেসব অন্যায় করেছি, অন্যান্য ক্ষেত্রের ন্যায় রোহিলাদের ক্ষেত্রেও আমরা লাভ করেছি সে অন্যায়ের উপযুক্ত প্রতিদান।
১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ধর্মীয় নেতা ধীরে ধীরে দক্ষিণ অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকে। আধ্যাত্মিক মর্যাদার স্বীকৃতিস্বরূপ শিষ্যরা এই ভ্রমণকালে তার সেবাযত্ন করতে থাকে। সম্ভ্রান্ত এবং বিদ্বান লোকরা পর্যন্ত সাধারণ ভৃত্যের মত নগ্নপদে তার পাল্কীর পাশে পাশে দৌড়ে অগ্রসর হয়। পাটনায় দীঘ যাত্রা বিরতিকালে তার অনুগামীরা সংখ্যা এত বেড়ে যায় যে, তাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য রীতিমত একটা সরকার গঠনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। যাত্রা পথে অবস্থিত বড় বড় শহরে ব্যবসায়ীদের মুনাফার উপর কর আদায়ের জন্য সে প্রতিনিধি নিয়োগ করে কাফেলার আগে তাদের পাঠিয়ে দেয়। তদুপরি সে মুসলমান সম্রাটদের প্রাদেশিক গভর্নর নিয়োগের অনুকরণে আনুষ্ঠানিক ফরমান জারি করে চারজন খলিফা নিয়োগ করে (মৌলভী বেলায়েত আলী, মৌলভী এনায়েত আলী, মৌলভী মরহুম আলী ও মৌলভী ফরহাত হোসেন)। এইভাবে পাটনায় একটি স্থায়ী আস্তানা স্থাপনের পর সে কলকাতা অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকে। গঙ্গার গতিপথ অনুসরণ করে অগ্রসর হওয়ার সময় সে বহু লোককে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে এবং পথিপার্শ্বের সকল বড় বড় শহরে তার প্রতিনিধি নিয়োগ করে। কলকাতায় এত অধিক সংখ্যক লোক তার চারপাশে সমবেত হয় যে, প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা করে মুসাফাহা করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে মাথার পাগড়ী খুলে লম্ব করে ছড়িয়ে দিয়ে সে ঘোষণা করে যে, পাগড়ীর যে কোন অংশ স্পর্শ করলেই সে ব্যক্তি তার শিষ্যত্ব লাভ করবে। ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে সে হজ্জ করতে মক্কা গমন করেন। এইভাবে হজ্জের পবিত্র আবরণে সে তার প্রাক্তন দস্যু চরিত্রকে সম্পূর্ণরূপে আচ্ছাদিত করে পরবর্তী বছর অক্টোবর মাসে বোম্বাই হয়ে ফিয়ে আসে। বোম্বাই শহরেও ধর্ম প্রচারক হিসেবে সে কলকাতার মতই বিরাট সাফল্য অর্জন করে। কিন্তু ইংরেজদের একটি প্রেসিডেন্ট শহরের শান্তিপূর্ণ অধিবাসীবৃন্দ অপেক্ষাও উপযুক্ত ক্ষেত্র এই দস্যু দরবেশের সম্মুখে বিরাজমান ছিল। উত্তর ভারতে প্রত্যাবর্তনের পথে তার নিজের জেলা বেরিলীতে সে বহুসংখ্যক অশান্ত প্রকৃতির লোককে (শাহ মোহাম্মাদ হোসেন কর্তৃক দীক্ষিত) শিষ্য তালিকাভুক্ত করে নেয়। ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে সে পেশোয়ার সীমান্তের অসভ্য পার্বত্য অধিবাসীদের মধ্যে উপস্থিত হয় এবং পাঞ্জাবের শিখ অধ্যুষিত সমৃদ্ধ শহরগুলোতে পবিত্র জিহাদের বাণী প্রচার করতে থাকে।
পাঠান উপজাতীয়রা উন্মত্ত আগ্রহসহকারে তার আবেদনে সাড়া দেয়। মুসলমানদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা দুর্দান্ত এবং সর্বাধিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন এই পাঠানরা ধর্মীয় অনুমোদনক্রমে তাদের হিন্দু প্রতিবেশীদের লুণ্ঠন করার সুযোগ পেয়ে অতিমাত্রায় আনন্দিত হয়। তখন পাঞ্জাব ছিল আধুনিককালের হিন্দু গোত্রসমূহের মধ্যে সর্বাধিক পরাক্রমশালী শিখদের শাসনাধীন। সীমান্তবাসী ধর্মান্ধ মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় নেতার কাছে আশ্বাস লাভ করে যে, জিহাদে যারা বেচে থাকবে তারা ঘরে ফিরতে পারবে লুণ্ঠিত সম্পদের মোটা পরিমাণ বখরা নিয়ে। আর যাদের মৃত্যু হবে তারা সেই মুহূর্তেই ঈমানদার হিসেবে বেহেশতে স্থান লাভ করবে। কান্দাহার ও কাবুল অতিক্রম করে অগ্রসর হওয়ার পথে সে জনসাধারণকে জাগ্রত করতে থাকে এবং সুকৌশলে বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে সম্প্রীতি (প্রধানত ইউসুফজাই ও বাবাকজাই উপজাতি) স্থাপনের মাধ্যমে তাদের উপর নিজের প্রতিপত্তি সুসংহত করে। ধনলিপ্সা চরিতার্থ করার জন্য তাদের ব্যাপক লুঠতরাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ধর্মের ক্ষেত্রে তাদের আশ্বাস দেওয়া হয় যে, শিখ থেকে আরম্ভ করে চীনাবাসী পর্যন্ত দুনিয়ার সকল অবিশ্বাসীদের ধ্বংস সাধন করার জন্য সে ঐশ্বরিক আদেশ লাভ করেছে। পার্বত্য এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বৈষয়িক মনোবৃত্তিসম্পন্ন উপজাতীয় প্রধানদের সে প্রতিবেশী শিখ শক্তিকে দমন করার প্রয়োজনীয়তার কথা বিশদভাবে বুঝাতে থাকে এবং এই প্রসঙ্গে হিন্দু রঞ্জিত সিংহের সঙ্গে অতীতে তীব্র ঘৃণাজনিত তার তিক্ত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে। এইভাবে ধর্মীয় ইশতেহার সাফল্যমণ্ডিত করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পর সে ধর্মপ্রাণ সকল মুসলমানের প্রতি জিহাদে যোগদানের জন্য আল্লাহর নামে আনুষ্ঠানিকভাবে আহবান জানায়। এই বিচিত্র প্রচারপত্রে বলা হয় ঃ শিখ জাতি দীর্ঘকাল যাবত লাহোরে এবং অন্যান্য স্থানে প্রভুত্ব করে আসছে। তাদের নির্যাতনের পরিমাণ সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। হাজার হাজার মুসলমানকে তারা অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে এবং আরো হাজার হাজার মুসলমানের উপর তারা নিক্ষেপ করেছে স্তূপীকৃত লাঞ্ছনা। মসজিদ থেকে তারা আযান দিতে দিচ্ছে না এবং গরু জবাই করা তারা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। তাদের এই অবমাননাকর স্বৈরাচার অবশেষে যখন অসহ্য হয়ে ওঠে, তখন হযরত সৈয়দ আহমদ (রঃ) ঈমান রক্ষার করার একমাত্র উদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত হয়ে মুষ্টিমেয় কয়েকজন মুসলমানকে সঙ্গে নিয়ে কাবুল ও পেশোয়ার অভিমুখে রওনা হন। সেখানে গিয়ে তিনি নিঃস্পৃহতার নিদ্রায় মগ্ন মুসলমানদিগকে জাগ্রত করেন এবং সক্রিয় হয়ে ওঠার জন্য তাদের সাহস উজ্জীবিত করেন। আল-হামদু লিল্লাহ! তার এই আহবানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার মুসলমান আল্লাহর রাহে জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়েছে। ১৮২৬ (২০ শে জমাদিউস সানি, ১২৪২হিঃ) খ্রিস্টাব্দের ২১শে ডিসেম্বর বিধর্মী শিখদের বিরুদ্ধে এই জিহাদ শুরু হবে। ইতিমধ্যে উত্তর ভারতের যেসব শহরে এই পীর বহুলোককে মুরিদ করে রেখে এসেছিল। সেসব স্থানে চর পাঠিয়ে জিহাদের আহবান প্রচার করা হয়। উপরে যে ইশতেহারটি উদ্ধৃত করা হল সেটা অযোধ্যা প্রদেশে প্রকাশিত একটি পুস্তিকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। (কনৌজের জনৈক মৌলভী প্রণীত তারগিব-উল-জিহাদ। )
অতঃপর শিখদের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধ মুসলমানদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে কে জয়লাভ করে তা সঠিক বলা যায় না। উভয় নির্মম হত্যাকাণ্ড চালায়। মুসলমান মুজাহিদ এবং শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যে তখন যে তিক্ত ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছিল, এখনো স্থানীয় বহু আচার-আচরণে তার নিদর্শন পাওয়া যায়। রঞ্জিত সিংহ সীমান্ত সুরক্ষিত করার জন্য এমন কয়েকজন সুদক্ষ সেনাপতিকে নিয়োগ করে যারা নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী ভেঙ্গে যাওয়ার পর বিশ্বর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিলেন। পেশোয়ারের কৃষকদের মুখে ভাগ্যবান ইতালীয় সেনাপতি জেনারেল অভিতাবিলির (জাতীয়তা ও নামের বানান যেরূপ প্রচলিত আছে, সেরূপ ব্যবহার হয়েছে) নাম এখনো শুনতে পাওয়া যায়। মুসলমানরা সমতল এলাকায় একাদিক্রমে হামলা চালাতে থাকে এবং যেখানেই তারা হামলা করে সেখানেই হত্যা ও অগ্নি সংযোগের ধ্বংসলীলা সাধন করে। পক্ষান্তরে গ্রামবাসী বীরা শিখরা সামগ্রিকভাবে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে পার্বত্য ধর্মান্ধদের পরাভূত করে এবং জানোয়ারের মত তাড়া করে তাদের পার্বত্য নিবাসে ফেরত পাঠায়। সেকালের ক্রোধোন্মত্ততার ফলে যে ভয়াবহ ভূমি রাজস্ব প্রথার সৃষ্টি হয়েছিল। রক্তের বিনিময়ে ভূমিস্বত্ব তার নমুনা এখনো বিদ্যমান আছে। সীমান্তের হিন্দু অধিবাসীরা আজো গর্বের সঙ্গে প্রদর্শন করে সেকারের পত্তনি পাট্টা, যার বলে তাদের গ্রাম পত্তন দেওয়া হয়েছিল হোসেন খেল উপজাতীয়দের একশো মাথা বার্ষিক খাজনার বিনিময়ে।
নিয়মিত যুদ্ধে সুশৃঙ্খল শিখ বাহিনীর সঙ্গে কোলাহলময় মুসলমান সৈন্যদের কোন তুলনা ছিল না। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে মুসলমান ধর্মীয় নেতা তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে শিখদের একটি পরিখা বেষ্টিত শিবির আক্রমণ করে। শিখরা বহু সংখ্যক মুসলমান হত্যা করার পর এই আক্রমণ প্রতিহত হয়। কিন্তু সমতলবাসী শিখ সেনাপতি তার এই বিজয় অব্যাহত রাখতে পারে না। ধর্মান্ধ মুসলমানরা সিন্ধু নদীর অপর পারে গিয়ে তাদের তৎপরতা চালাতে থাকে। গেরিলা যুদ্ধে সাফল্যের দরুন তাদের প্রতাপ এতটা বৃদ্ধি পায় যে, শিখ সর্দার তখন আক্রমণকারী উপজাতীয়দের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করতে বাধ্য হয়। ১৮২৯ সালে সমতলবাসীরা তাদের সীমান্ত রাজধানী পেশোয়ারের নিরাপত্তা রক্ষা করার ব্যাপারে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন সেখানকার গভর্নর (গভর্নর মুসলমান হলেও রঞ্জিত সিংহের হাতের পুতুল ছিল) মুসলমান নেতাকে বিষ প্রয়োগের দ্বারা যুদ্ধ অবসানের হীন অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। এই গুজব ছড়িয়ে পড়ার ফলে পার্বত্য মুসলমানদের উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে তারা সমতল অঞ্চলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং কাফের সৈন্যবাহিনীকে নিধন করে ও তাদের সেনাপতিকে মারাত্মকভাবে জখম করে। তবে রাজপুত্র শের সিংহ এবং জেনারেল ভেনতুরার অধীনস্থ সৈন্যবাহিনী কোন প্রকারে পেশোয়ার রক্ষা করতে সমর্থ হয়। এর ফলে মুসলমান ধর্মনেতার প্রভাব কাশ্মীর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। উত্তর ভারতের অসন্তুষ্ট রাজন্যবর্গের সৈন্যবাহিনী তার শিবিরে সমবেত হয়। শিখ রাষ্ট্রপ্রধান রঞ্জিত সিংহ তখন তার কতিপয় শ্রেষ্ঠ কুশলী সেনাপতির অধীনে দ্রুত সেখানে একদল সৈন্য প্রেরণ করে। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে একবার পরাজিত (জেনারেল এলার্ড এবং হরিসিং নমওয়ার অধীন শিখ সৈন্যবাহিনীর দ্বারা) হলও মুসলমান বাহিনী বিপুল পরাক্রমে সমতল এলাকা পদানত করে। ঐ বছর শেষ হওয়ার পূর্বেই পাঞ্জাব রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজধানী পেশোয়ার শহরের পতন ঘটে।
এখানেই শুরু হয় ধর্মীয় নেতার জীবনের শীর্ষস্থান লাভের মোড় পরিবর্তন। সে নিজেকে খলিফা বলে ঘোষণা করে এবং স্বনামে মুদ্রার প্রবর্তন করে ও তাতে এই বাণী খোদিত করে ন্যায়পরায়ণ আহমদ, ঈমানের রক্ষক, যার শানিত তরবারির ঝলকানিতেই কাফের ধ্বংস হয়। অপরদিকে পেশোয়ারের পতনের দরুন যে বিহ্বলতার সৃষ্টি হয়, তার ফলে রঞ্জিত সিংহ তার অতুলনীয় কূটনীতি সমর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে, ধূর্ত শিখ প্রধান প্রধান ক্ষুদ্র মুসলিম রাজন্যবর্গের কাছে তাদেরই স্বার্থ রক্ষার আবেদন জানিয়ে তাদের সৈন্যদলকে মুজাহিদ বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। মুসলমান ধর্মীয় নেতা তখন মুক্তিপণের বিনিময়ে পেশোয়ারের দখল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তাছাড়া তার অনুগামীদের মধ্যে যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুরু হয়েছিল সেটা অনতিকাল মধ্যেই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তার নিয়মিত সেনাবাহিনী গঠিত হয়েছিল হিন্দুস্তানি ধর্মান্ধ মুসলমান আর ভারতের অন্যান্য প্রদেশের সেই সব মুসলমানদের নিয়ে, যারা সুদিনে দুর্দিনে সর্বদা আপন ভাগ্য গ্রথিত করেছিল নেতার ভাগ্যের সঙ্গে এবং যাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল তাকে ত্যাগ করা। অবশ্য সীমান্তে বহু সংখ্যক পাঠান মুজাহিদ বাহিনীতে যোগদান করার ফলে এই বাহিনীর কলেবর স্ফীত হয়। পাঠানরা একদিকে যেমন ছিল শৌর্যশালী, অপরদিকে তেমনি তাদের ছিল পার্বত্য জাতিসুলভ অহংকার এবং ধনলিপ্সা। একবার যুদ্ধের প্রাক্কালে (সাইদুর নিকটবর্তী স্থানে শিখদের সঙ্গে যুদ্ধের প্রাক্কালে যারাকজাই উপজাতীয়রা দলত্যাগ করেছিল) সীমান্তবাসী উপজাতীয়দের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপজাতি দলত্যাগ করেছিল। পরবর্তীকালে ধর্মান্ধরা তাদের উপর কঠোর প্রতিশোধ গ্রহণ করে। ধর্মীয় নেতা তার হিন্দুস্তানি অনুগামীদের উপর সর্বদা নির্ভর করতে পারত। ফলে সে তাদের প্রতি উদার নীতি গ্রহণের প্রয়োজনবোধ করে। প্রথমে সে তার হিন্দুস্তানি অনুগামীবৃন্দের ভরণপোষণের জন্য কেবল সীমান্তবাসী অনুগামীদের উপর তিথ কর প্রয়োগ করে। সীমান্তবাসীরা ধর্মীয় কার্যে চাঁদা হিসাবে নির্বিবাদে এই করভার বহন করে। কিন্তু পরে এই করভারে জর্জরিত উভয় পক্ষ উম্মান্বিত হয়ে উঠলে ধর্মান্ধ গৃহদাহকারীর প্রতিভা, সম্মিলিত রাজ্যের নিরপেক্ষ শাসনকর্তার প্রতিভা নয়। সুতরাং সীমান্তের উপজাতীয়দের উপর তার যে আশ্চর্য প্রভাব সৃষ্টি হয়েছিল, অনতিকাল পরই তা বিনষ্ট হতে শুরু করে।
ক্ষমতার যতই ভাটা পড়তে থাকে ক্রমান্বয়ে ততই তার কঠোরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অবশেষে পার্বত্য জাতির হৃদয়ের কোমলতম তন্ত্রীতে একদিন সে আঘাত করে। পার্বত্য উপজাতিদের প্রচলিত বিবাহ প্রথা অনুসারে তারা বিবাহের নামে কার্যত সর্বোচ্চ পণ-দানকারীর কাছে মেয়ে বিক্রি করত। সৈয়দ আহমদের দুর্বুদ্ধি হল এই বিবাহ প্রথার সংস্কার সাধনের চেষ্টা করার। তার ভারতীয় অনুগামী দল নিজেদের বাড়িঘর ত্যাগ করে তার সঙ্গে চলে এসেছিল এবং স্ত্রীরাও তাদের সঙ্গে ছিল না। নেতা ফরমান জারি করল যে, সেইদিন থেকে বারোদিনের মধ্যে কোন উপজাতীয় মেয়ের বিবাহ না হলে সেই মেয়ে তার (নেতার) অনুচরদের সম্পত্তি বলে গণ্য হবে। এর ফলে উপজাতীয়রা ক্ষিপ্ত হয়ে তা হিন্দুস্তানি অনুচরবর্গকে হত্যা করে। নেতার প্রাণ রক্ষায় অতি অল্পের জন্য (পাঞ্জাতার থেকে পাকলী উপত্যকায় পলায়ন) কিন্তু তার রাজত্বের অবসান ঘটে। ১৮৩১ সালে ধর্মীয় নেতা তার একজন প্রাক্তন অনুচরকে সাহায্য করার সময় রাজপুত্র শের সিংহের অধীনস্থ সেনাবাহিনীর দ্বারা অতর্কিতভাবে আক্রান্ত হয়ে নিহত হন। (বালাকোট, মে, ১৮৪১ খ্রীঃ, ভারত সরকারের পররাষ্ট্র দফতর থেকে তথ্য সংগৃহীত)
উপরে বর্ণিত আন্দোলনের ধর্মীয় চরিত্র সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা এই গ্রন্থের পরবর্তী একটি অধ্যায়ে করা হয়েছে। ভারতেই হোক বা অন্য কোন দেশেই হোক কোন ধর্মীয় নেতাই জনসাধারণের হৃদয় জাগ্রত করতে পারে না, যদি তার নিজ উদ্দেশ্যের মহত্ত্ব ও অকপটতা সম্পর্কে সে নিজেই আস্থাশীল না হয়। পরবর্তী অধ্যায়ে আমি সৈয়দ আহমদের জীবনের অপেক্ষাকৃত মহৎ দিকগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করব। ইতিমধ্যেই আমি ধর্মান্ধ বসতি গোড়াপত্তন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ইতিহাসের বর্তমান পর্যায়ে অর্থাৎ আমাদের আপন সীমান্তে বিদ্রোহী শিবির পর্যায়ে উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত বাকী ইতিহাস আমি অতি সংক্ষেপে আলোচনা করতে চাই। ধর্মীয় নেতার প্রধান অনুচরদের মধ্যে দুই ভাই ছিল, যাদের পিতামহ ছিল কুখ্যাত এক নরহন্তা (বোনাইরের তখতবন্দ নিবাসী জামিন শাহ) । অবশেষে নিজের জীবন রক্ষার জন্য সে সিন্ধুর ওপারে পার্বত্য এলাকায় পলায়ন করে এবং তদঞ্চলে সিত্তানা নামক স্থানে দরবেশরূপে আস্তানা স্থাপন করে। এই মুহাজির দরবেশ ক্রমান্বয়ে পার্বত্য উপজাতিসমুহের শ্রদ্ধা অর্জন করতে থাকে। যে স্থানে দরবেশের আস্তানা স্থাপিত হয়েছিল পার্বত্য অধিবাসীবৃন্দ সেই স্থানটি নিরপেক্ষ আশ্রম হিসেবে দরবেশকে দান করে। এইসব উপজাতীয়রা প্রায়ই পরস্পরের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে থাকে। সুতরাং তাদের নিজেদের জন্য এরূপ একটি আশ্রমের ব্যবস্থা করা খুবই সুবিধাজনক সৎকার্য। এই দরবেশের অন্যতম পৌত্র (সৈয়দ ওমর শাহ) ছিল ধর্মীয় নেতার খাজাঞ্চি। আস্তানাসহ সিত্তানা গ্রামটির উত্তরাধিকার লাভ করেছিল সে। ধর্মীয় নেতার মৃত্যুর পর তার অবশিষ্ট মুরিদানকে সে সিত্তানায় ডেকে নিয়ে আশ্রয়দান করেছিল।
প্রায় অনুরূপ সময় সোয়াত রাজ্যের ধর্মীয় প্রধান ব্রিটিশ শক্তির অগ্রগতি দেখে শঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং সেখানে একটি রাজকীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেকে শক্তিশালী করতে বদ্ধপরিকর হয়। তদনুসারে সে উপরোক্ত দরবেশের অপর পৌত্রকে (সৈয়দ আকবর শাহ) সেখানে আমন্ত্রণ করে এবং তাকে সোয়াতের রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে। এইভাবে এই ধর্মীয় প্রধান স্বীয় রাজ্যের প্রজাদের স্বাভাবিক শৌর্যবীর্য অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য তাদের আশ্বাস দেয় যে, মুজাহিদ বাহিনীর একজন বীরকে তারা সেনানায়ক হিসেবে পেয়েছে। সুতরাং ভবিষ্যতে ইংরেজ অথবা হিন্দু কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহে যারা প্রাণ হারাবে, তারা অর্জন করবে শাহাদাতের সওয়াব। অবশ্য সোয়াত উপজাতির সে আশংকা কোনদিন বাস্তবে পরিণত হয়নি। তাদের রাজা নির্বিঘ্নে রাজত্ব করার পর কোন উত্তরাধিকারী নির্বাচন না করেই ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তার পুত্র (সৈয়দ মুবারক শাহ) বর্তমানে সেখানকার পারিবারিক প্রধান। সিত্তানার ধর্মান্ধ সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব এবং সোয়াতের টলটলায়মান তথাকথিত রাজসিংহাসনের সে দাবীদার।
এইভাবে ধর্মান্ধ সম্প্রদায় সীমান্ত প্রদেশে তাদের দ্বিমুখী প্রতিপত্তি স্থাপন করে এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন সীমান্ত উপজাতীয়দের মধ্যে চর নিয়োগ করে জিহাদের অঙ্গার জ্বলন্ত রাখতে থাকে। কার্যক্রমে এইসব মুজাহিদ নগণ্য দস্যুদলে পরিণত হলেও মাঝে মাঝেই তারা হিংস্র মুজাহিদ বাহিনীর রূপ ধারণ করত। আমরা পাঞ্জাব অধিকার করার আগে পর্যন্ত তাদের হিন্দু প্রতিবেশীদের উপর তারা সীমাহীন ধ্বংসলীলা আর হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। প্রতি বছর তারা ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন জেলা থেকে গোড়া মুসলমানদিগকে তাদের দলভুক্ত করত। ব্রিটিশ প্রজাবৃন্দ যাতে ধর্মান্ধ উপনিবেশে সমবেত হতে না পারে সে জন্য কোনই সতর্কতা গ্রহণ করা হয়নি। এই ধর্মান্ধরা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে শিখদের উপর আক্রোশ চরিতার্থ করত। আর শিখ সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল অনিশ্চিত। তারা কখনো ছিল আমাদের বন্ধু আবার কখনো চরম শত্রু। উত্তর-পশ্চিম ভারতে অবস্থিত বিরাট নীল কারখানার মালিক এক ইংরেজ ভদ্রলোক আমাকে বলেছেন যে, তার কারখানার চাকরিতে নিযুক্ত ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে একটা প্রচলিত প্রথা ছিল সিত্তানা শিবিরের চাঁদা দেয়ার জন্য তাদের আয়ের একটা নির্দিষ্ট অংশ পৃথক করে রেখে দেওয়ার। আর এদের মধ্যে যারা অপেক্ষাকৃত বেপরোয়া চরিত্রের লোক ছিল, তারা কম-বেশি কিছু না কিছু সময়ের জন্য ধর্মান্ধ নেতাদের অধীনস্থ বাহিনীতে কাজ করতে যেত। তার হিন্দু কর্মচারীরা যেমন পিতার বাৎসরিক শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য প্রায়ই কেউ না কেউ ছুটির আবেদন করত, ১৮৩০ থেকে ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত সময়ে মুসলমান কর্মচারীরা তেমনি ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে মুজাহিদ বাহিনীতে যোগদানের জন্য কেউ না কেউ কয় মাসের ছুটি প্রার্থনা করত।
আমাদের শৈথিল্যের জন্যই আমাদের মুসলমান প্রজাবৃন্দ প্রতিবেশী শিখদের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধদের দলে যোগদান করতে পারত। এই শৈথিল্যের জন্য আমাদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। পয়গম্বর (prophet) (prophet কথাটি দ্বারা আমি অবশ্যই সৈয়দ আহমদকে বুঝিয়েছি, প্রকৃত পক্ষে সৈয়দ আহমদ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ইমাম এবং ধর্মীয় দৃষ্টিতে ওলি হযরত মোহাম্মাদ (সাঃ) এর আর কেউ পয়গম্বর (prophet) হননি) আমাদের ভূখণ্ডে এবং শিখ সীমান্তে তার ধর্মীয় নেতৃত্বের উত্তরাধিকার প্রথা প্রবর্তন করেছিল। এই আন্দোলন তাদের কাছে ছিল কোন নেতা ব্যক্তির জীবন ও মৃত্যুর ন্যায় দৈব ঘটনার আওতা বহির্ভূত। সুতরাং তার নিজের মৃত্যুকেও তার মুরিদবৃন্দ তাদের ধর্মবিশ্বাস প্রচারের সুবিধার জন্য একটি দৈব অবদান বলে মনে করত। ১৮২১ সালে পাটনায় সৈয়দ আহমদ যে দুইজন খলিফা বা প্রতিনিধি নিয়োগ করেছিল তারা তীর্থ ভ্রমণের জন্য সীমান্তে এসে অবগত হয় যে, তাদের নেতার তিরোধান এক অলৌকিক ঘটনা; প্রকৃত পক্ষে তার মৃত্যু ঘটেনি। যথাসময়ে সে মুজাহিদ বাহিনীর নায়করূপে আবার অবতীর্ণ হবে এবং ইংরেজ কাফেরদিগকে ভারত থেকে বিতাড়িত করবে। সুতরাং ১৮২০-২২ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ আহমদ গঙ্গা অববাহিকার পথ অনুসরণ করে কলকাতা অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার সময় যেসব প্রধান শহরে প্রচারকার্য চালিয়েছিল, তার খলিফাগণ সেই সব শহর থেকে অর্থ ও লোকজন সংগ্রহ, বিশেষ করে অর্থ সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছিল। ফলে আমাদের ভূখণ্ড থেকে অসন্তুষ্ট লোকজনের এক অবিরাম স্রোতধারা ধর্মান্ধ উপনিবেশের দিকে অগ্রসর হয়েছে। আত্মগোপনকারী ঘাতক, পলাতক কয়েদি, ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার দরুন সমাজ থেকে বিতাড়িত অপব্যয়ী ব্যক্তিরা আইনের চোখে অমার্জনীয় অপরাধী বিশ্বাসঘাতকরা সকলেই ব্রিটিশ শাসনাধীন সমভূমি অঞ্চল থেকে পালিয়ে উত্তরাঞ্চলের এডুনাল গুহায় সমবেত হয়েছে। অবশ্য এদের অপেক্ষা উৎকৃষ্ট শ্রেণীর মুহাজিরও ছিল। খ্রিষ্টান সরকারের শাসনাধীনে নির্বিবাদে বসবাস করতে অপারগতা প্রত্যেকটি অতি উৎসাহী মুসলমান বদ্ধপরিকর হয়ে সিত্তানা শিবিরে পাড়ি দেয়। তাদের আক্রোশের শিকার হয়েছিল প্রধানত শিখ অধ্যুষিত গ্রামগুলো। তবে ইংরেজ কাফেরদের উপর প্রচন্ড আঘাত হানার প্রত্যেকটি সুযোগ তারা গ্রহণ করত উল্লসিত চিত্তে। কাবুল যুদ্ধে আমাদের শত্রুপক্ষকে সাহায্য করার জন্য তারা এক বিরাট বাহিনী প্রেরণ করেছিল। তাদের মধ্যে এক সহস্র যোদ্ধা আমাদের বিরুদ্ধে আমরণ যুদ্ধ করেছে। একমাত্র গজনীর পতনের সময়ই তিনশত মুজাহিদ ইংরেজদের বেয়নেটের মুখে শাহাদাত প্রাপ্তির আনন্দ লাভ করেছিল।
পাঞ্জাব সংযুক্তির পর ধর্মান্ধদের প্রচন্ড কোপ শিখদের উপর থেকে অপসৃত হয়ে শিখদের স্থলাভিষিক্ত ইংরেজদের উপর নিপতিত হতে লাগল। সিত্তানায় আস্তানাকারী সৈন্যদলের দৃষ্টিতে হিন্দু এবং ইংরেজ উভয়েই সমান কাফের এবং তরবারির আঘাতে তাদের নির্মূল করাই ছিল মুজাহিদ বাহিনীর কাজ। শিখদের উপর মুজাহিদ বাহিনীর হামলাজনিত যে বিশৃংখলার প্রতি অতীতে আমরা ইন্ধন যুগিয়েছি, কিংবা অন্তত পক্ষে আমরা যে উপেক্ষার দৃষ্টিতে দেখেছি, সে বিশৃংখলা এখন আমাদের ঘাড়ে এসে পড়েছে বিস্বাদ উত্তরাধিকাররূপে।
পাটনা আদালতের নথিপত্র থেকে দেখা যায় যে, তথাকার খলিফাদ্বয় (ইনায়েত ও বিলায়েত আলী) নিজেদের ধর্মান্ধ অনলবর্ষী বক্তারূপে সুপরিচিত ছিলেন। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে স্যার হেনরী লরেন্স এ মর্মে এক বিবরণী (১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই এপ্রিল তারিখে ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যবিবরণী) লিপিবদ্ধ করেন যে, উক্ত খলিফাদ্বয় পাঞ্জাবে ধর্মযোদ্ধা (পোজাৎ বা মাজাহিদীন পরবর্তীকালে যারা ওয়াহাবী নামে আখ্যায়িত) হিসাবে সুপরিচিত ছিল, এবং সেই জন্য তাদের গ্রেফতার করে পুলিশের হেফাজতে পাটনায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেট তাদের কাছ থেকে এবং তাদের স্বধর্মীয় দুজন উচ্চ বিত্তশীল লোকের কাছ থেকে ভবিষ্যৎ সদাচরণের মুচলেকা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে আমি তাদের দেখেছি সমতল বঙ্গের রাজশাহী জেলায় রাজদ্রোহমূলক প্রচারকার্য চালাতে। একাধিকবার এই অপরাধ করার দরুন তারা দুইবার রাজশাহী জেলা থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে (১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৩ শে ফেব্রুয়ারি তারিখে ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যবিবরণী) পাটনায় তাদের স্বগৃহে অবস্থান করার জন্য জামিন মুচলেকা দ্বারা এই দুই খলিফাকে (ইনায়েত ও বিলায়েত আলী) যতই আবদ্ধ রাখা হোক না কেন, ১৮৫১ সালেই তাদের আবার দেখা গিয়েছে পাঞ্জাব সীমান্তে রাজদ্রোহের অগ্নি উদগীরণ করতে। (১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে ১২ই মে তারিখে বোর্ড অব রেভিনিউ এর কার্যবিবরণী)
১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে মুজাহিদরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবে রূপায়িত করার উপযোগী বলে বিবেচনা করে। আমাদের ভূখণ্ড থেকে বহু অর্থ ও লোকজন সিত্তানা শিবিরে পাচার হয়ে যায়। আমাদের সৈন্যদলের সঙ্গে বিদ্রোহমূলক পত্রালাপের একটি ঘটনা পাঞ্জাব কর্তৃপক্ষের কাছে ধরাও পড়ে। রাওয়ালপিন্ডিতে অবস্থিত চতুর্থ নেটিভ পদাতিক বাহিনী ছিল ধর্মান্ধ উপনিবেশের নিকটবর্তী। মুজাহিদ বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য আমাদের সেসব বাহিনী প্রেরণ করা হত, তাদের অন্যতম ছিল এই পদাতিক বাহিনী। ধর্মান্ধ নেতৃবৃন্দ সুকৌশলে এই বাহিনীতে ভাঙ্গানি দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। যে সব চিঠি ধরা পড়েছিল, তা থেকে প্রমাণিত হয় যে, বাংলা থেকে লোকজন ও অস্ত্রশস্ত্র বিদ্রোহী শিবিরে চালান দেওয়ার জন্য তারা একটি নিয়মিত সংগঠন স্থাপন করেছিল। একই সময় পাটনার ম্যাজিস্ট্রেট রিপোর্ট (১৯ শে আগস্ট, ১৮৫২) দিয়েছিলেন যে, শহরে বিদ্রোহীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ব্রিটিশ ভারতের এই প্রাদেশিক রাজধানী শহরের নেতৃস্থানীয় অধিবাসীরা প্রকাশ্য রাজদ্রোহ প্রচার করছিল। ধর্মান্ধদের সাথে পুলিশের গোপন আঁতাত স্থাপিত হয়েছিল। একজন বিদ্রোহী নেতার (মৌলভী আহমদুল্লাহ ) গৃহে সাতশ লোকের এক সমাবেশে সেই নেতা অস্ত্রবল প্রয়োগের দ্বারা ম্যাজিস্ট্রেটের তদন্ত অনুষ্ঠান প্রতিরোধ করার সংকল্প ঘোষণা করেন।
সীমান্তের ধর্মান্ধ শিবিরে অর্থ ও লোকজন সরবরাহ করার জন্য নিজ এলাকার অভ্যন্তরে এতবড় একটি রাজদ্রোহী সংগঠনের অস্তিত্বের প্রতি চোট বন্ধ করে থাকা ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দের শরৎকালে লর্ড ডালহৌসি এ সম্পর্কে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিবরণী লিপিবদ্ধ করেন। তার প্রথমটিতে তিনি অভ্যন্তরীণ সংগঠনটির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দান করেন। আর দ্বিতীয়টিতে সীমান্তের উপজাতীয়দের বিরুদ্ধে একটি সীমান্ত যুদ্ধের সম্ভাব্যতা সম্পর্কে আলোচনা করেন। কারণ হিন্দুস্তানি ধর্মান্ধরা উপজাতীয়দের মনে কাফেরদের প্রতি বদ্ধমূল ঘৃণার আগুনে ইন্ধন যুগিয়ে তাকে আরেকবার উত্তপ্ত করে তুলেছিল। ঐ বছরই উপজাতীয়রা আমাদের মিত্র আম্বরাজ্য আক্রমণ করলে আম্বাধিপতির সাহায্যে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। ১৮৫৩ সালে বিশ্বাসঘাতকদের সঙ্গে পত্র আদান-প্রদানের দায়ে আমাদের বাহিনীর কতিপয় দেশীয় সৈনিককে দণ্ডিত করা হয়।
যেসব অপমান, আক্রমণ ও হত্যার পরিণতি হিসেবে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের সীমান্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয় তার বিস্তারিত বিবরণ দিতে চাই না। ধর্মান্ধরা সে সময় সীমান্তের উপজাতীয়দের সদাসর্বদা ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে বৈরী ভাবাপন্ন করে রাখত। একটি মাত্র ঘটনা থেকে এ সম্পর্কে অনেক কথা জানা যাবে। ১৮৫০ থেকে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত আমরা ষোলটি অভিযান পরিচালনা করতে বাধ্য হয়েছিলাম এবং তাতে মোট ৩৩০০০ নিয়মিত সৈন্য প্রেরণ করতে হয়েছিল। ১৮৫০ থেকে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানের সংখ্যা উঠেছিল কুড়িতে এবং তাতে নিয়োজিত নিয়মিত সৈন্যের সংখ্যা ছিল ৬০০০০। তাছাড়া ছিল আরো বহুসংখ্যক অনিয়মিত অতিরিক্ত সৈন্য ও পুলিশ। এ সময় সিত্তানা উপনিবেশ থেকে ক্রমাগতভাবে সীমান্ত এলাকায় ধর্মীয় গোঁড়ামির উসকানী দতে থাকা হলেও তারা আমাদের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে চলেছে। যেসব উপজাতীয়দের তারা আমাদের বিরুদ্ধে উসকানী দিয়েছে তাদের হয়ত গোপনে সাহায্য করেছে তারা। কিন্তু তারা নিজে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সাহস পায়নি। কিন্তু ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে তারা আমাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য আঁতাত (বিশেষ করে ইউসুফজাই ও পাঞ্জুতার উপজাতীয়দের) গঠন করেছে, এমনকি তাদের অসাধু উদ্দেশ্যে সাধনের জন্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষর সাহায্য দাবি করার দুঃসাহস পর্যন্ত দেখিয়েছে। আমাদের অস্বীকৃতিতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা সদর্পে আমাদের ভূখণ্ড আক্রমণ করেছে এবং এ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার লেফটেন্যান্ট হর্নের শিবিরে রাত্রিকালে হামলা করলে তিনি কোন রকমে পালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন। এই হামলার প্রতিশোধ গ্রহণে বিলম্ব করা আর সম্ভব ছিল না। জেনারেল স্যার সিডনী কটন অবিলম্বে ৫০০০ সৈন্য (গোলন্দাজ ২১৯, অশ্বারোহী ৫৫১ পদাতিক ৪১০৭ মোট ৪৮৮৭ নিয়মিত সৈন্য) নিয়ে পাহাড় অঞ্চলে প্রবেশ করেছিলেন। ধর্মান্ধ শিবির আমাদের সীমান্তে যে কতিপয় যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল, এটাই ছিল তার প্রথম। এ সম্পর্কে সংক্ষেপে এটুকু উল্লেখ করে আমি এ ধরনের যুদ্ধের নিদর্শনরূপে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় যুদ্ধটি সম্পর্কে আলোচনা করব। প্রাথমিক কিছু অসুবিধা অতিক্রম করার পর আমাদের সৈন্যরা বিদ্রোহ সমর্থনকারীদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়, দুইটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ ভস্মীভূত করে অথবা উড়িয়ে দেয় এবং সিত্তনায় অবস্থিত বিশ্বাসঘাতকদের বসতি ধ্বংস করে ফেলে। ধর্মান্ধরা অবশ্য পশ্চাদপসরণ করে মহাবন পর্বতের অন্তরালে আশ্রয় গ্রহণ করে। এ যুদ্ধে তাদের শক্তি কিছুমাত্র খর্ব হয়না এবং পার্শ্ববর্তী উপজাতীয়রা (আমাজাই উপজাতি) অনতিকাল মধ্যেই মূলকা নামক স্থানে বিদ্রোহীদের নতুন বসতি স্থাপন করতে দেয়।
অবশ্য ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী ছাড়াও ধর্মান্ধ শিবিরের অন্য শত্রু ছিল অতিমাত্রায় ধর্মীয় আত্মবিশ্বাসের দরুন তারা পার্শ্ববর্তী উচ্চভূমি এলাকার অধিবাসী বিভিন্ন গোত্রের কাছ থেকে ঘন ঘন টিথ্‌ বা দশমাংশ কর আদায় করত। যে ব্যক্তি প্রচারক এবং কর আদায়কারী হিসেবে কাজ করত তার ব্যক্তিগত প্রভাব অনুসারে ঐসব অধিবাসীদের কেউ কেউ জুলুমের কাছে নতি স্বীকার করে কর প্রদান করত, কেউ ফাকি দিতে, আবার কেউবা কর দিতে অস্বীকার করত। এইভাবে পার্বত্য অধিবাসীদের মধ্যে সর্বদা একটা উত্তেজনার কারণ বিদ্যমান থাকত। এর ফলে এইসব পার্বত্য অধিবাসী স্বয়ং ধর্মীয় নেতা সৈয়দ আহমদের কাছ থেকে আস্তে আস্তে কিভাবে দূরে সরে গিয়েছিল এবং অবশেষে কিভাবে ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে নেতার মৃত্যু হয়েছিল, সে বিষয়ে ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। পার্বত্য অধিবাসীদের কোন গোত্র দশমাংশ কর দিতে অস্বীকার করলে ধর্মান্ধ শিবির থেকে বিপল সংখ্যক লোক দল বেধে এসে অবাধ্য গোত্রের জমি থেকে ফসল কেটে নিয়ে চলে যেত। এই ধর্মীয় কর আদায়ের বিরুদ্ধে উপজাতীয়দের প্রতিরোধের ফলে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে সিত্তানা আক্রান্ত হয় এবং ধর্মান্ধ নেতা (উৎমনজাই উপজাতি কর্তৃক সৈয়দ উমর শাহ নিহত হয়) নিহত হয়। এইভাবে একদিকে স্যার সিডনী কটনের অভিযান এবং অন্যদিকে পরম মিত্রদের দল ত্যাগের ফলে বিদ্রোহী ঘাটি খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়ায় দুই বছর তারা চুপচাপ থাকে। যে উপজাতি (উৎমনজাই উপজাতি) দশমাংশ কর আদায়কারীদিগকে প্রতিহত করে এবং ধর্মান্ধ নেতাকে হত্যা করে আমরা সিত্তানার সকল জমি তাদের মধ্যে বণ্টন করে দিই। এই উপজাতি এবং আরেক প্রভাবশালী উপজাতির (জাদুন উপজাতি) কাছ থেকে আমরা এরূপ প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিই যে, তারা আর কখনো তাদের ভূখণ্ডে ধর্মান্ধদের প্রবেশ করতে দিবে না এবং অন্য যে কোন উপজাতি ধর্মান্ধদের ডেকে আনার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। এছাড়া তারা আরও অঙ্গীকার করে যে, ধর্মান্ধরা অথবা কোন দুষ্কৃতিকারী দেশ ব্রিটিশ সীমান্তে লুণ্ঠন অভিযানে যেতে চাইলে তাদের এলাকা অতিক্রম করে যেতে দিবে না।
কিন্তু দুই বছর যেতে না যেতেই বিদ্রোহীরা আবার কুসংস্কারাচ্ছন্ন পার্বত্য উপজাতীয়দের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়। স্যার সিডনী কটন ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহীদের তাড়া করলে মহাবনের অভ্যন্তরে মুলকা নামক যে স্থানে তারা আশ্রয় গ্রহণ করেছিল, ১৮৬১ সালে সেখান থেকে তারা অগ্রসর হয় এবং তাদের পুরাতন ঘাটি সিত্তানা থেকে কিছু ঊর্ধ্বে তাদের অবস্থান (সিরি নামক স্থানে) সুদৃঢ় করে। এই ঘাটি থেকে তারা নিম্নাঞ্চলে আমাদের গ্রামসমূহের উপর হামলা চারাতে থাকে। যেসব উপজাতি বিদ্রোহীদের বাধা দিবে বলে ইতিপূর্বে অঙ্গীকার করেছিল, তাদের এলাকার ভিতর দিয়েই বিদ্রোহীরা তাদের হামলা পরিচালনাকালে অবাধ চলাচলের সুবিধা লাভ করে। আবার আগের অবস্থা ফিরে এসেছে সদর্পে একথা ঘোষণা করার জন্যই যেন ধর্মান্ধরা আমাদের রাওয়ালপিন্ডি জেলায় নেমে আসে এবং শক্তিশালী একটি থানার নজরের মধ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে সর্বসাধারণের চলাচলের রাস্তায় দুইজন পথচারীকে হত্যা করে (১৮৬১খ্রিস্টাব্দের ১৪ই ফেব্রুয়ারি) এর তিন সপ্তাহ পর তারা আরেকবার আমাদের এলাকায় নেমে আসে এবং তিনজন ধনী ব্যবসায়ীকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর এই বন্দীদের মুক্তিদানের শত হিসেবে ১৫৫০ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে আমাদের অফিসারদের কাছে পত্র পাঠায় ঠান্ডা মেজাজে। এই অর্থের অর্ধেক প্রাপ্য ছিল ধর্মান্ধ নেতারা। এর অব্যবহিত পরেই ১৮৬১খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে লোক অপহরণের আরেকটি ঘটনা ঘটে। সীমান্ত কর্তৃপক্ষ এই মর্মে রিপোর্ট দেয় যে, সেখানকার পরিস্থিতি আবার (১৮৫৮ খ্রিঃ) লজ্জাকর অশান্তিপূর্ণ পর্যায়ে ফিরে গেছে। ব্রিটিশ অফিসারগণ আমাদের মিত্র উপজাতীয়দের প্রতি ধর্মের ও ভীতির দোহাই দিয়ে যে আবেদন নিবেদন জনায় তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। উপজাতীয়দের বেশ কয়েকটা গ্রামের ভাগ্য আমাদের দয়ার উপর নির্ভর করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তথাকার অধিবাসীরা তাদের স্ব ধর্মীয়দের সঙ্গেই নিজেদের ভাগ্য জড়িত করে এবং প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া আমাদের উপায়ান্তর থাকে না। এমতাবস্থায় আমরা শত্রু উপজাতীয়দের বিরুদ্ধে কড়া অবরোধ ব্যবস্থা আরোপ করি, যার ফলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাতের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কেউ সীমানা লঙ্ঘন করা মাত্রও তাকে আমরা বন্দী করে রাখি। এর ফলে তাদের কিছুটা সুবুদ্ধির উদয় হয়। আবার তারা আমাদের সঙ্গে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয় এবং বিদ্রোহীদের তারা সিত্তানা অঞ্চল ছেড়ে অভ্যন্তরবর্তী আস্তানা মুলকায় ফিরে যেতে বাধ্য করে।
কিন্তু তথাপি আমাদের অবাধ্য হিন্দুস্তানি প্রজারা বিশ্বাসঘাতকদের শিবিরে ক্রমাগত সমবেত হতে থাকে। ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহীদের সংখ্যা এতই বৃদ্ধি পায় যে, পাঞ্জাব সরকার আরেকটি সীমান্ত যুদ্ধ সংঘটনের পরামর্শ না দিয়ে পারে না। বস্তুত ঃ পরিস্থিতি এমন আকার দারণ করে যাতে ভারত সচিব দৃঢ় অভিমত (১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের ৭ই এপ্রিলের পত্র) প্রকাশ করেন যে, আজ হোক কাল হোক বিদ্রোহীদের অস্ত্রবলে বিতাড়িত করতেই হবে। কেননা যতদিন তারা আমাদের সীমান্তে অবস্থান করবে ততদিনই তারা আমাদের জন্য বিপদের স্থায়ী উৎস হিসেবেই বিদ্যমান থাকবে। যাহোক, তৎক্ষণাৎ কোন অভিযান আরম্ভ করা অসম্ভব ছিল। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলের প্রথম দিকে বিদ্রোহীরা আবার আমাদের এলাকায় প্রবেশ করে হত্যা ও লুটতরাজ চালাতে থাকে। ঐ বছর জুলাই মাসে তারা সাহসের সঙ্গে সিত্তানা ঘাটি পুনর্দখল করে নেয়। এবং আমাদের মিত্র রাজ্য আম্বের শাসনকর্তার কাছে ভীতি প্রদর্শনমূলক পত্র প্রেরণ করে। পার্শ্ববর্তী এলাকার উপজাতীয়রা আবার ধর্মান্ধতার বেদিমূলে তোদের আনুগত্যকে বিসর্জন দিয়ে আমাদের সঙ্গে সম্পাদিত তাদের অঙ্গীকার পত্র হাওয়ায় নিক্ষেপ করে। সীমান্তে বিদ্রোহীরা আরেক দফা সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে পড়ে। অবশেষে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ৭ই সেপ্টেম্বর ধর্মান্ধ বাহিনী ব্রিটিশ এলাকায় প্রবেশ করে এবং আমাদের গাইড কোরের উপর নৈশ হামলার মাধ্যমে প্রকাশ্যে যুদ্ধ আরম্ভের ইঙ্গিত দান করে। এর এক সপ্তাহ পরেই তারা আমাদের মিত্ররাজ্য আম্বের উপর আক্রমণ চালিয়ে কৃষ্ণ পর্বতের গায়ে অবস্থিত গ্রামসমূহ ধ্বংস করে এবং ফাঁড়ি রক্ষী বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। একই মাসে তারা তানাওয়ালে অবস্থিত আমাদের মিত্র বাহিনীকে আক্রমণ করে এবং একজন দেশীয় অফিসারকে সসৈন্য হত্যা করে। কিন্তু কেবল আমাদের মিত্রদের উপর আক্রমণ করেই তারা ক্ষান্ত হয় না, সিন্ধু নদীর তীরে অবস্থিত (নওয়াগিরানে অবস্থিত) আমদের প্রহরী বাহিনীর উপরও তারা গুলি চালায়। অবশেষে প্রকাশ্যে ঘোষণা পত্র দিয়ে তারা ইংরেজ কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং সকল নিষ্ঠাবান মুসলমানের প্রতি মুজাহিদ বাহিনীতে যোগদানের আহবান জানায়।
সুতরাং যে পরিস্থিতিতে ১৮২৭-৩০ খ্রিস্টাব্দে ধর্মান্ধ মুজাহিদ বাহিনী পাঞ্জাব দল করেছিল এবং তাদের কাছে সীমান্ত রাজধানীর পতন ঘটেছিল পুনরায় সেই পরিস্থিতির উদ্ভব হল। এমতাবস্থায় যুদ্ধ এড়াবার সম্ভাবনা আর একেবারেই থাকল না। তবে এসব সীমান্ত সংঘর্ষের সামরিক গুরুত্ব ছিল খুবই নগণ্য। অধিকতর শক্তিশালী পক্ষের গৌরব এতে সামান্যই প্রতীয়মান হত। ব্রিটিশ ভারতের ন্যায় একটি বিশাল সামরিক শক্তিসম্পন্ন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কতিপয় অসভ্য উপজাতীয় ঐক্যজোটের সংঘাত ঘটলে সে উপজাতীয়রা যতই সাহসী এবং ধর্মীয় প্রেরণায় যতই উদ্বুদ্ধ হোক না কেন, সে সংঘাতের পরিণতি সম্পর্কে সন্দেহের কোন অবকাশ থাকে না। তদুপরি এ ধরনের সংঘর্ষে একটা বিষয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটে অবধারিতরূপে, সেটা হচ্ছে আক্রমণের পর প্রচন্ড পাল্টা আক্রমণ। প্রতিশোধমূলক এই পাল্টা আক্রমণের সমাপ্তি ত্বরাান্বিতই হোক আর বিলম্বিতই হোক, এর যে পরিণতি হয়, সেটা একজন খ্রিস্টানের পক্ষে নিতান্ত পীড়াদায়ক। সুতরাং আমি ধর্মান্ধ উপনিবেশের বিরুদ্ধে আমাদের একটি মাত্র অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ এখানে লিপিবদ্ধ করব। তা থেকে দেখা যাবে যে, শান্তিকালেও বিশ্বাসঘাতক শিবির বছরের পর বছর ধরে আমাদের সীমান্তে অবমাননার কারণ হিসাবে বিরাজ করেছে। আর যুদ্ধকালে এই শিবির আমাদের সৈন্যবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে। যখন আমরা তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করেছি, তখন তারা ক্রমাগতভাবে দুর্বৃত্ত দল পাঠিয়েছে আমাদের প্রজাবৃন্দ ও মিত্রদের অপহরণ ও হত্যা করার জন্য। যখন আমরা অস্ত্রবলে তাদের নির্মূল করতে চেষ্টা করেছি, তখন তারা আমাদের নেতাদের হতবুদ্ধি করে দিয়েছে, আমাদের সৈন্যবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে এবং কিছুকাল যাবত ব্রিটিশ ভারতের সীমান্ত বাহিনীকে উপেক্ষা করে চলেছে। বিশ্বাসঘাতক এবং মুহাজিরদের একটি উপনিবেশ আমাদের সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরের ধর্মান্ধ রাজদ্রোহীদের সহায়তার অতিশয় গোঁড়ামি প্রসূত ঘৃণার বশবর্তী হয়ে লৌহ বমকেও উপেক্ষা করতে পারে কিরূপে সেটা বোধগম্য। কিন্তু একটা সুশিক্ষিত সেনাবাহিনীর সংঘবদ্ধ আক্রমণের ধাক্কা তারা কিরূপে সামলাতে পারত মুহূর্তের জন্যও তা কল্পনা করতে পারা দুঃসাধ্য। এর ব্যাখ্যা করতে হলে বিদ্রোহীদের নেতা দেশের যে অংশে তার যুদ্ধংদেহী অনুসারীদের সদর দফতর স্থাপন করেছিল, তথাকার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দান করা প্রয়োজন।
সিন্ধু উপত্যকার সর্বোত্তরে ব্রিটিশ রাজমুকুটের প্রতি আনুগত্য সম্পন্ন সর্বশেষ উপজাতির আবাসভূমির সীমান্তে দাড়িয়ে আছে হিন্দুদের পবিত্র পর্বতশৃঙ্গ। সুপ্রাচীনকালে আর্য অভিযাত্রীরা তাদের দক্ষিনাভিমুখী অভিযাত্রা পথে যেসব প্রাকৃতিক দৃশ্যের সৌন্দর্যে অভিভূত হত, তার সর্বোত্তম ছিল মহাবন যার আক্ষরিক অর্থ বিশাল বনানী। পবিত্র পর্বতকেই তারা এই নামে আখ্যায়িত করেছিল। সিন্ধুর পশ্চিম তীরে অবস্থিত ৭৪০০ ফুট উচ্চ এই পর্বতমালা ও শৃঙ্গরাজি আজও মহাবন বা বিশাল বনানী নামে পরিচিতি। ইহুদীদের কাছে সিনাই এর যে গুরুত্ব বিদ্রোহীদের কাছে এই শৃঙ্গরাজির গুরুত্ব ছিল সেই রকম। সংস্কৃত কাব্য বিধৃত হয়েছে উক্ত শৃঙ্গরাজির প্রতি প্রাচীন যুগের হিন্দু সম্প্রদায়ের অগাধ ভক্তি, ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের তীর্থক্ষেত্ররূপে বিবেচিত হয়েছে এই মহাবন যুগের পর যুগ। পবিত্র এই শৃঙ্গমালায় একাকী অর্জুন যুদ্ধ করেছে দেব শ্রেষ্ঠ মহাদেবের বিরুদ্ধে। এ যুদ্ধে পরাজিত হলেও দেবীর বরে অক্ষয় তূন লাভ করেছে অর্জুন। কথিত আছে যে, ছোট ছোট দেবতারাও উপবাস ও নির্জনবাসের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির পবিত্রতা অর্জনের কৃচ্ছ্রসাধনা করত এই মহাবনে। সুতরাং মহাবনের শীতর ছায়াতলে অস্থি সমাহিত করতে পারা ছিল কোন প্রাচীন মুনিঋষির জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয়। (সাত বছর আগে Calcuta review-এ প্রকাশিত আমার প্রবন্ধ এখানে এবং দ্বিতীয় অধ্যায় ব্যবহার করেছি)
প্রাচীন হিন্দুদের এই তীর্থভূমিতে এখন বসবাস করে উগ্র এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন কতিপয় মুসলমান উপজাতি। সিন্ধুর পূর্বতীরে কৃষ্ণপর্বত এখন যাদের দখলে, সেই ক্ষুদ্র রাজন্যবর্গও দুর্ধর্ষতা এবং ধর্মান্ধতার দিকে থেকে কোন অংশে কম নয়। এবটাবাদের অগ্রগামী ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর সদাসতর্ক দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে হচ্ছে এদের প্রতি। অবশ্য দশমাংশ কর এবং অনুরূপ ধর্মীয় জুলুমের ফলে ধর্মান্ধ ঔপনিবেশিকদের সঙ্গে এদের কোন স্থায়ী ঐক্য স্থাপিত হতে পারে না। কিন্তু ধর্মীয় উত্তেজনায় ফেটে পড়া এইসব উপজাতীয়দের পক্ষে স্বাভাবিক। আর আমাদের সীমান্তের অভ্যন্তরে সমৃদ্ধিশালী হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামসমূহে লুটতরাজের সুযোগ পেলেই তারা উল্লাসিত হয়ে পড়ে। মুসলমান অধ্যুষিত সোয়াত রাজ্যের অপর নাম ধর্মীয় রাজ্য। সেখানকার অধিবাসী সংখ্যা ৯৬০০০। এই জনসংখ্যার প্রতিটি মানুষ আবাল্য লালিত হয় ব্রিটিশ কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার এক বংশানুক্রমিক আশংকার মধ্যে। তাদের মনে সৃষ্টি হয় এক বদ্ধমূল বিশ্বাস কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে; যে ইমাম পতাকা তলে সমবেত হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রাণ হারালে শাহাদাত লাভ করা যায়; তার নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধে চরম ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে আমাদের এই শিক্ষা হয়েছিল যে, ধর্মান্ধ শিবিরের বিরুদ্ধে কোন অভিযান পরিচালনার অর্থ হবে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা সাহসী গোত্রসমুহের ঐক্যবদ্ধ ৫৩০০০ যোদ্ধার (প্রত্যেক উপজাতি থেকে সহজেই যত সংখ্যক সৈন্য সংগৃহীত হতে পারে তার হিসাব নিয়েছি পররাষ্ট্র দফতরের নথিপত্র থেকে। সীমান্ত গেজিটিয়ারের ভারপ্রাপ্ত কর্নেল ম্যাক গ্রেগরের হিসাবের সঙ্গে এই হিসাব মিলিয়ে নিয়েছি। এ হিসাব মতে ১২টি উপজাতি থেকে মোট ৫৩০০০ সৈন্য সংগ্রহীত হতে পারে) সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া। দেশের দুর্গম পরিবেশের দরুন উপজাতীয়দের মেজাজ এবং পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয় সীমান্তের অফিসারদের পক্ষে সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব ছিল না। আর বিদ্রোহীরা কোন যুদ্ধে পরাজিত হওয়া মাত্রই পশ্চাদপসরণ করে মহাবনের গভীর নিভৃত অঞ্চলে আত্মগোপন করলেই রক্ষা পেত।
১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১৮ অক্টোবর জেনারেল স্যার নেভিল চেম্বারলিনের অধীনে ৭০০০ সৈন্য সমৃদ্ধ (নিয়মিত পদাতিক ৫১৫০; নিয়মিত অশ্বারোহী ২০০; গোলন্দাজ ২৮০; এবং সিভিল কমিশনারের অধীনে ১০০০ এরে ঊর্ধ্বে) এক ব্রিটিশ বাহিনী যুদ্ধ যাত্রা করে। এই বাহিনীর সঙ্গে ছিল বিরাট সাঁজোয়া বহর, আর রসদ বহনের জন্য ছিল ৪০০০ খচ্চর এবং অন্যান্য ভারবাহী পশু, সারা পাঞ্জাব তছনছ করে সেই রসদ সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরের দিন সন্ধ্যায় এই সৈন্যবাহিনীর একটি বূহ্য জংগলাকীর্ণ বৃক্ষ আচ্ছাদিত বিপদসংকুল এক গিরিপথে উপস্থিত হয়। এই গিরিপথ আম্বেলা পাস নামে অভিহিত। আমাদের আক্রমণ ঘাটি সুরক্ষিত করা হয়েছিল শক্তিশালী সৈন্যবেষ্টনী (দারবান্দ, তরবেলা, টোপি, রুস্তুম বাজার, এবং মর্দানে ইউরোপীয় ও দেশীয় পদাতিক, অশ্বারোহী, পার্বত্য উপজাতীয় গুর্খা ও পাঞ্জাবী পদাতিক সৈন্য সমাবিষ্ট ছিল) দ্বারা। এই বেষ্টনীর পশ্চাতে ছিল অশ্বারোহী, পদাতিক গোলন্দাজ বাহিনীর সৈন্য পরিপূর্ণ সীমান্ত ঘাটিসমূহ (পেশোয়ার, রাওয়ালপিন্ডি, কোহাট, বানু, ডেরা ইসমাইল খা প্রভৃতি সীমান্ত ঘাটিতে বহু সুসজ্জিত গোলন্দাজ, পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য সমাবিষ্ট ছিল) আক্রমণকারী সৈন্যবাহিনীর পশ্চাতে উপরোক্ত সামরিক ঘাটিসমুহের সমর্থন ছিল। এটা খুবই সৌভাগ্যের বিষয়। কারণ ২০ শে অক্টোবর জেনারেল চেম্বারলিন লক্ষ্য করলেন যে, যেসব উপজাতিকে তিনি মিত্র বলে মনে করেছিলেন, তারা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। দুদিন পর তিনি সরকারের কাছে এই মর্মে তারবার্তা প্রেরণ করেন যে, গিরিপথ থেকে বের হওয়ার আগে তার সৈন্যবাহিনীর বিশ্রাম প্রয়োজন। ২৩ শে অক্টোবর উপজাতীয়রা প্রকাশ্য বিরোধীতা শুরু করে, বোনাইর উপজাতীয়রা এই দিন একটি ব্রিটিশ পরিদর্শক বাহিনীকে আক্রমণ করে। এর অল্প কয়েকদিন পরেই সোয়াত রাজ্যের ধর্মীয় প্রধান (আবদুল গফুর নামক) শত্রুপক্ষে যোগদান করে। ইতিমধ্যে সীমান্তে আরো সৈন্য প্রেরণের আবেদন সম্বলিত তারবার্তার পর তারবার্তা সরকারের হস্তগত হতে থাকে। আমাদের সৈন্যবাহিনী বিপদসংকুল গিরিপথে আটকা পড়ে থাকে। ফিরোজপুর রেজিমেন্টর একটি অংশকে সীমান্তে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। পেশোয়ার থেকে আরো এক রেজিমেন্ট পদাতিক বাহিনীকে দ্রুত পশ্চিম দিকে প্রেরণ করা হয়। শিয়ালকোট থেকে ৯৩তম হাইল্যান্ডার বাহিনী ও লাহোর থেকে ২৩শ ও ২৪ শ দেশীয় পদাতিক বাহিনীও দ্রুত অগ্রসর হয়। তিন সপ্তাহের মধ্যেই পাঞ্জাবের সেনানিবাসসমূহ এমনভাবে সৈন্যহীন হয়ে পড়ে যে লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে গার্ড দেওয়ার জন্য মাত্র চব্বিশজন বেয়নেটধারী সৈন্য যোগাড় করা মিয়ামিরের সেনাপতির পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
ইতিমধ্যে উপজাতীয়রা চারদিক থেকে আমাদের সৈন্যবাহিনীকে ঘেরাও করে ফেলতে থাকে। অগ্রসর হওয়া আমাদের বাহিনীর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর পশ্চাদপসরণ করা পরাজয়বরণ অপেক্ষাও খারাপ বলে প্রতীয়মান হয়। বাল্যকাল থেকেই পার্বত্য যুদ্ধে শিক্ষাপ্রাপ্ত উপজাতীয়দের জন্য আমাদের এই অবস্থা হয় খুবই সুবিধাজনক। আমাদের সৈন্যবাহিনী যে সংকটাপন্ন অবস্থায় পতিত হয়েছিল সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে জনৈক অফিসারের রোজনামার নিম্নোক্ত অংশ থেকে:
২০ তারিখ মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন দলগুলোকে ফিরিয়ে নেওয়ার পর ক্লান্ত সৈন্যদল যুদ্ধ করতে করতে শিবিরের প্রত্যাবর্তন করতে থাকে। অনেক রাত হয়ে যায় তাদের শিবিরে প্রত্যাবর্তন করতে। শত্রুপক্ষও যথেষ্ট শক্তিশালী। তারা আমাদের বূহ্য ভেদ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ইতিমধ্যে আমাদের সৈন্যরা প্রস্তুত হয়ে নিয়েছে শত্রুর মোকাবেলা করতে। এনফিল্ড রাইফেল এবং মাউন্টেন ট্রেন গানের প্রচন্ড গুলি বর্ষণের সম্মুখীন হয় শত্রুরা। রাত্রের এই আক্রমণকালে এক অদ্ভুত এবং চমৎকার দৃশ্যের অবতারণা হয়। সম্মুখে অন্ধকার জঙ্গল। ডানে ও বামে সারিবদ্ধ মাউন্টেন ট্রেন-গানগুলো মাঝে মাঝে জ্বলে উঠছে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত। আর মাঝখানে অপেক্ষাকৃত অনুজ্জ্বল পদাতিক বাহিনী ছড়িয়ে আছে সমগ্র উপত্যকায়। আচমকা প্রচন্ড হুংকার-আল্লাহু আকবর। গাছের আড়াল থেকে সশব্দে ঝলকে অনেকগুলো দেশী বন্দুক। চকচক করতে থাকে ঘূর্ণায়মান শাণিত তরবারিগুলো। একদল কালো মানুষ এগিয়ে আসে খোলা জায়গাটা ছাড়িয়ে। বেয়নেটের প্রায় কাছাকাছি এসে আক্রমণ করে তারা তারপর আলোর ঝলকানি আর সোরগোল। পাথরের উপর টিনের বাক্স-পেটরা গড়াগড়ির শব্দ। কানের কাছে গাছের পাতার সরসরানি, দুর্বোধ্য সংলাপ। মাঝে মাঝে সমগ্র ছাউনিতে জ্বলে উঠছে গোলাগুলির তীব্র অগ্নিশিখা কোথাও। সম্মুখ দিক থেকে কিছু ক্ষীণ কন্ঠের গোঙ্গানী আর পাঠানসুলভ ভঙ্গীতে পানির জন্য চিৎকার শুনে বুঝা যায় যে, গোলাগুলি ফলদায়ক হয়েছে। এই মুহূর্তে আবার অন্য কোন দিক থেকে দুএকটি গুলির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। পাহাড় থেকে কয়েকটি পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ শুনতে পেয়ে উৎকর্ণ দেশীয় সৈন্যরা বুঝতে পারে যে শত্রুরা আমাদের এক পাশ থেকে আক্রমণের চেষ্টা করছে। সুতরাং এই আক্রমণের মোকাবেলা করার জন্য আমাদের দেশীয় সৈন্যরা মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গুলী বর্ষণ শুরু হয় আবার আমাদের রাইফেল থেকে। অন্ধকার পর্বতগাত্র সচকিত হয়ে ওঠে গোলাগুলির শব্দে। সে শব্দ ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে হাজার গুণে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র উপত্যকায় এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। তারপর আরেকটি চিৎকার এবং আক্রমণ, রাইফেলের গুরু গর্জন। আবার আগের মত স্তব্ধতা। আবার একদল কালো মানুষ আসে আস্তে কতকগুলো ভারী বোঝা বহন করে নিয়ে গেল, আমাদের তাঁবু শ্রেণীর ভেতর দিয়ে। বুঝা গেল, এবারের গুলিবর্ষণও বৃথা যায়নি।
অল্পক্ষণের মধ্যেই ছাউনির মধ্যভাগ থেকে ভেসে এল একটি কণ্ঠস্বর, একটি আদেশ। সবাই স্তব্ধ হল সে আদেশ শুনতে, সবাই প্রস্তুত সে আদেশ পালন করতে। আদেশ হল গুলিবর্ষণ বন্ধ কর। শত্রুরা এগিয়ে আসুক আমাদের বেয়নেট পর্যন্ত এবং তারপর বাকী কথাগুলো শোনা গেল না। কিন্তু বুঝতে কারোই বাকী রইল না শেষ কথাগুলো কি। প্রত্যেকেই থেমে রইল, অপেক্ষা করতে থাকল গভীর নীরবতায়। পূর্ব মুহূর্তের সোরগোলের সঙ্গে কি আশ্চর্য তফাৎ এই নীরবতার সম্মুখে ছোট্ট টিলার উপর দাড়িয়ে আছেন দীর্ঘকায় জেনারেল। তার আজ্ঞাধীন সেনাবাহিনীর মাথার উপর দিয়ে দেখা যাচ্ছে তাকে। তার একাগ্র দৃষ্টি নিবন্ধ রয়েছে সম্মুখের ঘনান্ধকারের দিকে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় অনেক। মাঝে মাঝে ইতস্তত: দু একটি গোলাগুলির শব্দ থেকে বুঝতে পারা যাচ্ছিল সম্মুখের জঙ্গলে শত্রুবাহিনী তখনও উপস্থিত। কিন্তু তাদের সংখ্যা সম্পর্কে কোন ধারণা করতে পারছিলাম না আমরা। অল্পক্ষণের মধ্যেই সে বিক্ষিপ্ত গুলিবর্ষণও বন্ধ হয়ে গেল। অনেকক্ষণ পর আমরা ওদের পায়ের শব্দ আর পাহাড় তেকে পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম। ওরা ফিরে যাচ্ছে। আহত আর নিহত সৈনিকদের ওরা বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল নিশ্চয়ই। তা না হলে আরো সন্তর্পণে চলাফেরা করত ওরা। (Calcutta Review, Vol. I. xxix p. 201)
প্রতিদিনের বিলম্বের ফলে শত্রুপক্ষের সাফল্যর আশা এবং ধর্মান্ধসুলভ প্রেরণা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। নতুন সৈন্য এসে শক্তিবৃদ্ধি সত্বেও আমাদের জেনারেল অগ্রসর হওয়া অসম্ভব মনে করছিলেন। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী গিরিপথের মধ্যে সর্বতোভাবে নাজেহাল অবস্থায় আটকা পড়ে থাকতে লাগল। চুমলা উপত্যকা পর্যন্ত অগ্রসর হওয়ারও সাহস ছিল না তাদের। ইতিমধ্যে বাজুর উপজাতীয়রা শত্রুপক্ষের সাথে যোগ দেয়ায় তাদের শক্তিবৃদ্ধির ফলে শত্রুরা একযোগে আমাদের সম্মুখভাগে, বাম পার্শ্বে ও পশ্চাতের যোগাযোগ রক্ষাকারী দলের উপর আক্রমণের হুমকি দিতে লাগল। ৮ই নভেম্বর তারিখে পাঞ্জাব সরকার উদ্বেগের সঙ্গে জানতে চাইলেন যে, নতুন ১৬০০ পদাতিক সৈন্য প্রেরিত হলে জেনারেল মুলকায় অবস্থিত ধর্মান্ধদের উপনিবেশ বিধ্বস্ত করার জন্য অগ্রসর হতে পারবেন কিনা। ১২ তারিখে সরকার উত্তর পেলেন যে, আরো ২০০০ পদাতিক এবং কিছুসংখ্যক বন্দুক পাওয়া না গেলে সম্মুখে অগ্রসর হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে জেনারেল হতাশাব্যাঞ্জকভাবে আরো জানালেন যে, মধ্যবর্তী এলাকার উপজাতীয়দিগকে বশে আনতে না পারা পর্যন্ত মুলকা আক্রমণ করা সমুচিত হবে না।
সমগ্র সীমান্তে তখন আগুন জ্বলছে। ৪ নভেম্বর পাঞ্জাব সরকার দেখতে পেলেন ছাউনিতে সৈন্য সংখ্যা সাংঘাতিকভাবে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়েছে। ফলে ভাইসরয়ের অনুগামী বাহিনী থেকে কিছু সৈন্য ধার নিয়ে তাড়াহুড়া করে বন্দুকধারী ৭ম বাহিনী সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হল, জেনারেল পশ্চাৎবর্তী যোগাযোগ রক্ষাকারী দলের উপর শত্রু আক্রমণের ভয় ছিল। সুতরাং এই দলকে রক্ষা করার জন্য অশ্বারোহী ও পদাতিক সামরিক পুলিশের একটি শক্তিশালী দল পাঠিয়ে দেয়া হল। (পাঞ্জাব সরকারের চিঠি ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৮৬৪) ) যানবাহন সরঞ্জাম হিসেবে পাঞ্জাব অঞ্চল থেকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে ৪২০০টি উট এবং ২১০০ খচ্চর সংগ্রহ করে অতি দ্রুত পাঠিয়ে দেয়া হল। ১৪ নভেম্বর নাগাদ পরিস্থিতি আরো গুরুতর আকার ধারণ করল। ভারতে অবস্থিত ব্রিটিশ বাহিনীসমূহের প্রধান সেনাপতি দ্রুত লাহোরে উপস্থিত হয়ে পরিচালনার ভার স্বহস্তে গ্রহণ করলেন।
আসল কথা, আমাদের আক্রমণ পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল মূল পরিকল্পনা ছিল, গিরিপথের মধ্যে দিয়ে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে গিরিপথের পরবর্তী উন্মুক্ত উপত্যকা দখল করে নেওয়া (পাঞ্জাব সরকারের চিঠি, ১ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৪) ভারত সরকারের হুকুম ছিল, ১৫ই নভেম্বরের মধ্যে সমগ্র অভিযান সমাপ্ত করা। কিন্তু ১৪ই নভেম্বরে দেখা গেল যে, আমাদের সৈন্যবাহিনীর পক্ষে গিরিপথ অতিক্রম করা অসম্ভব। উন্মুক্ত উপত্যকায় উপনীত হওয়া গেলে আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারা যেত এবং তাহলে সেখানে একাদিক্রমে অনেকগুলো অভিযান পরিচালনা করা যেত। কিন্তু তার পরিবর্তে বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চলে আমাদের আমাদের আত্মরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করতে হল। উক্ত তারিখেই পাঞ্জাব সরকার আবেদন জানালেন যে, ১৫০০ সৈন্যের একটি অতিরিক্ত ব্রিগেড সীমান্তে পাঠাতে হবে। ১৯ তারিখে জেনারেল চেম্বারলেনের তারবার্তা থেকে এইরূপ আশংকার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেল যে, সীমান্তে আরো সৈন্য পাঠাত বিলম্ব হলে হয়ত সব হারাতে হবে। ১৮ তারিখে শত্রুরা প্রচন্ড আক্রমণ চালিয়ে আমাদের একটি ঘটি দখল করে নেয়। কয়েকজন অফিসার ছাড়াও আমাদের ১১৪ জন্য সৈন্য হতাহত হয় এবং আমরা পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হই। পরের দিন শত্রুরা আমাদের আরো একটি ঘাটি দখল করে নেয়। পরে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের এই ঘাটি পুনর্দখল করতে হয়। এই যুদ্ধে জেনারেল স্বয়ং মারাত্মকভাবে আহত হন। তাছাড়া ১২৮ জন সৈন্য ও কতিপয় অফিসার হতাহত হয়। আহত ও অসুস্থ অবস্থায় আমাদের যেসব সৈন্যকে ফেরত পাঠান অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে, ২০ তারিখে তাদের সংখ্যা দাড়ায় ৪২৫ জনে। জেনারেল কর্তৃক প্রেরিত ১৯ তারিখের তারবার্তার উপসংহার ছিল এই রকম: একমাস যাবত আমাদের সৈন্যরা দিবারাত্রি কঠোর পরিশ্রমে ক্লান্ত। এই অবস্থায় শত্রুপক্ষের নতুন আক্রমণের মোকাবেলা করতে গিয়ে আমাদের সৈন্য ক্ষয় হচ্ছে খুব বেশী রকম। শত্রু আক্রমণের মোকাবেলা করা এবং রসদ সরবরাহ ও আহতদের পশ্চাৎভাগে পাঠাবার জন্য যানবাহনের ব্যবস্থা করা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। আমাদের সম্মুখভাগের ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত সৈন্যদের সাহায্যের জন্য যদি আরো কিছুসংখ্যক নতুন সৈন্য প্রেরণ করতে পারেন, তাহলে সম্মুখের ক্লান্ত সৈন্যদের বিশ্রামের জন্য সমতল এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া যাবে এবং পশ্চাৎ থেকে সমর্থন যোগাবার জন্য তাদের ব্যবহার করা যাবে। অত্যন্ত জরুরী।
আমাদের সম্মুখে তখন এক বিরাট রাজনৈতিক বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়েছে। উপর্যুপরি আক্রান্ত হওয়ার দরুন আমাদের সৈন্যবাহিনী ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় যেকোনো মুহূর্তে তারা আতঙ্কগ্রস্ত হতে পারে এবং তাহলে বহু সৈন্যর প্রাণহানি ও অবশেষে ঐ গিরিপথের মধ্যে দিয়ে বিতাড়িত হতে পারে। এরকম একটি ব্যর্থ অভিযানে প্রাণহানির সংখ্যা কোন একটি মাত্র বড় যুদ্ধের তুলনায় কম হলেও সীমান্তে আমাদের মর্যাদা হানি করেছে এবং এমন রাজনৈতিক বিপর্যয়ের আশংকা সৃষ্টি করেছে যার পরিণতি সম্পর্কে কোন ভবিষ্যদ্বাণী করা অসম্ভব। এমতাবস্থায় পাঞ্জাব সরকার স্থির করলেন যে, জেনারেল চেম্বারলেন যদি প্রয়োজন বোধ করেন, তবে গোটা সৈন্যবাহিনীই পারমেটলিতে পশ্চাদপসরণ করবে। কিন্তু পাঞ্জাব সরকারের এই হুশিয়ারির মধ্যে ব্রিটিশ সৈন্যদের অনমনীয় সংকল্পকে ছোট করে দেখা হয়েছিল। ২২ তারিখে প্রাপ্ত তারবার্তায় জানা গেল যে, সৈন্যবাহিনী তাদের ঘাটি রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর এবং যতই কষ্টসাধ্য হোক না কেন চূড়ান্ত সাফল্য সম্পর্কে জেনারেল নিশ্চিত।
পরের দিন ২৩শ দেশীয় পদাতিক বাহিনীর একটি অংশ কিছুসংখ্যক ইউরোপীয় সৈনিক সহ শিবিরে উপস্থিত হল। শত্রুপক্ষ ইতিমধ্যেই আমাদের বিরুদ্ধে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। আমাদের শিবিরে আরো নতুন সৈন্যের উপস্থিতি উপজাতীয়দের মধ্যে এক অবর্ণনীয় ভীতির সঞ্চার করল। সামরিক শক্তিসম্পন্ন এবং অফুরন্ত সম্পদের অধিকারী বিশাল সাম্রাজ্যের যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে শুরু করল তারা। পরের শুক্রবার (সপ্তাহের এই দিনটিতেই ধর্মান্ধরা সাধারণত যুদ্ধ আরম্ভ করত) কোন আক্রমণ হল না। কিন্তু আমরা অগ্রসর হতে পারলাম না তা সত্ত্বেও। ২৮শে নভেম্বর পাঞ্জাব সরকার কর্তৃক প্রণীত কার্যবিবরণীতে সৈন্যবাহিনীর নিশ্চল অবস্থার নিন্দা করা হল এবং অগ্রসর হওয়ার জন্য তাগিদ দেওয়া হল। আমাদের শিবিরে নতুন সৈন্যদল উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে পার্বত্য এলাকাসমূহ থেকে বহু সংখ্যক উপজাতীয় দলে দলে শত্রুশিবিরে সমবেত হতে লাগল। তন্মধ্যে একজন উপজাতীয় সর্দারই ৩০০০ সৈন্য নিয়ে এল। আর একজন দরবেশ ৫০০ ধর্মান্ধ যোদ্ধা প্রেরণ করে, যারা যুদ্ধে যোগদান করে শহীদ অথবা গাজী হওয়ার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে।
আমাদের সকল নতুন সৈন্যদল ৫ই ডিসেম্বর এসে উপস্থিত হয় এবং আবার আমাদের অগ্রাভিযান শুরু করার জন্য জরুরী তাগিদ আসে। এখন আমাদের নিয়মিত সৈন্যর সংখ্যা ৯০০০। ৯৩তম পার্বত্যবাহিনী এবং অনুরূপ আরো কয়েকটি রেজিমেন্ট এর অন্তর্ভুক্ত শক্তিশালী একটি ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী শত্রুর আক্রমণে বিব্রত অবস্থায় পাল্টা আক্রমণে অপারগ হয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ গিরিপথের খাঁচায় আবদ্ধ হয়ে থাকবে এটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু পার্বত্য উপজাতীয়দের উপর ধর্মান্ধ শিবিরের বিরাট প্রভাবের যথার্থ গুরুত্ব আমরা দেই নাই। ধর্মবিশ্বাসে অনুপ্রাণিত হয়ে যেসব লোক ধর্মান্ধ শিবিরে যোগদান করেছিল, তাদের অন্তরে ছিল লুঠতরাজ করে ধনসম্পদ লাভের আশা অথবা শাহাদাত লাভের আশা। ধর্মান্ধতা যাদের অপেক্ষাকৃত কম তাদের মনে ভয় ছিল, যদি তাদের ভূখণ্ড ব্রিটিশ কর্তৃক আক্রান্ত হয়, বা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। উপজাতীয়রা উৎসাহ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনুপ্রাণিত হয়ে একটি সুশিক্ষিত সৈন্যবাহিনীর সকল প্রচেষ্টাকে উপেক্ষা করে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সীমান্তের পরিস্থিতি সম্পর্কে জনৈক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ছির এই রকম: উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছিল দূর থেকে দূরান্তরে। পেশোয়ার সীমান্তের মুসলমানরা শব্দ নামক স্থানে আক্রমণাত্মক তৎপরতায় লিপ্ত হচ্ছিল আবার। ১৮৫২ সালে পরলোকগত লর্ড ক্লাইভের কাছে পরাজয়বরণের পর এই প্রথম তারা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিল্ কোহাট থেকেও গুজব শুনতে পাচ্ছিলাম যে, ওয়াজীরি এবং উৎমনখেল উপজাতীয়রা সেখানে প্রত্যাশিতভাবেই হামলা চালাচ্ছিল। কাবুল ও জালালাবাদ থেকে আগত গুপ্তচরেরা সোয়াত উপজাতীয়দের ধর্মীয় নেতা আখুন্দের সঙ্গে ছিল। তার সঙ্গে ৬০০০ সৈন্যসহ যোগদান করেছিল ধের সর্দার গাজান খা। ৫ই ডিসেম্বর শবকদরের নিকটবর্তী স্থানে শত্রুরা আমাদের এলাকায় হামলা করেছিল। (পেশোয়ার বিভাগের কমিশনার মেজর জেমস)
কিন্তু পার্বত্য উপজাতীয়দের মধ্যে ঐক্য সাধারণত খুবই ক্ষণস্থায়ী হয়ে থাকে। সুতরাং অস্ত্রবলে আমরা যে সাফল্য লাভ করতে পারেনি কূটনীতির মাধ্যমে ঐক্যজোটে ভাঙ্গন ধরিয়ে আমাদের সে উদ্দেশ্য সফল হতে লাগল। পেশোয়ারের কমিশনার ২৫ শে নভেম্বর তারিখেই বোনাইর উপজাতির কিছু অংশকে সপক্ষে টেনে নিতে সমর্থ হয়েছিল। তারপর ২০০০ লোকের আরেকটি দলকে তিনি যুদ্ধ থেকে ফিরে যেতে প্রবৃত্ত করেন এবং সোয়াতের নেতাকেও তিনি সম্মত করেছিলেন তার অনুসারীবৃন্দকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে। এই ভাঙ্গনের আভাস পেয়ে ছোট খাটো আরো কয়েকজন উপজাতীয় সর্দার তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। অবশিষ্ট যারা থাকে, তাদের মধ্যে সংক্রমিত হয় পারস্পরিক অনাস্থার বীজ। এই অনাস্থা ফলপ্রসূ হওয়ার উপযোগী বলে মনে হয় ১০ ডিসেম্বরের মধ্যেই। বোনাইর উপজাতীয়দের প্রতিনিধি কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, কিন্তু কোন সমঝোতায় উপনীতি হতে পারে না। ১৫ তারিখে লুলুতে আমাদের সৈন্য আক্রমণের ফলে তাদের আলোচনা ত্বরান্বিত হয়েছিল। এই আক্রমণে শত্রুদের ৪০০ সৈন্য নিহত হয়। ১৬ তারিখে আমরা আম্বালা গ্রামটি জ্বালিয়ে দেই এবং সেখানে উপজাতীয়দের ২০০ লোক হতাহত হয়। সেই রাত্রে বোনাইল উপজাতি তাদের মনস্থির করে ফেলে এবং কমিশনার সাহেবের কাছে উপস্থিত হয়ে তার নিদেশ প্রার্থনা করে। বোনাইরদের এই দলত্যাগ ধর্মান্ধদের আদর্শের প্রতি মরণ আঘাত হানে। এরপর প্রতি মুহূর্তেই কোন না কোন উপজাতি ধর্মান্ধ শিবির ত্যাগ করতে থাকে। বাজৌর ও ধের থেকে আগত উপজাতীয়রা পালিয়ে যায়। সোয়াতের সৈন্যরা সকলেই শিবির ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে। এইভাবে পর্বত গাত্রের কুয়াশার মতই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় উপজাতীয়দের ঐক্যজোট। বিদ্রোহী ঘাটির প্রধান সম্বর বোনাইর উপজাতি ধর্মান্ধদের আস্তানার মধ্যেই পুড়িয়ে মারার জন্য আমাদের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। অতঃপর এক সপ্তাহেও কম সময়ের মধ্যেই বোনাইর উপজাতির সমর্থন ও পরিচালনায় একটি শক্তিশালী ব্রিটিশ বিগ্রেড পার্বত্য পথে নিরাপদে অগ্রসর হয়ে মুলকায় অবস্থিত বিদ্রোহী উপনিবেশ আক্রমণ করে এবং সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত করে। অতঃপর ২৩ ডিসেম্বরের এই বাহিনী দুভাগ্যকবলিত আম্বেলা গিরিপথে প্রত্যাবর্তন করে। ২৫ ডিসেম্বর গোটা সৈন্যবাহিনী পুনর্বার সমতলভূমি অঞ্চলে ফিরে আসে। ফেরার সময় তাদের একটি বন্দুকের গুলিও খরচ করতে হয়নি।
ব্রিটিশ সৈনিকদের অসংখ্য সমাধিতে পরিপূর্ণ মারাত্মক সেই গিরিপথ ইতিমধ্যে ছেড়ে এসেছি আমরা। কমপক্ষে আমাদের ৮৪৭জন সৈন্য হতাহত হয়েছে। যুদ্ধ আরম্ভের সময় নিয়মিত সৈন্য সংখ্যা ছিল ৯০০০। সুতরাং হতাহত হয়েছিল মোট সৈন্য সংখ্যার প্রায় দশমাংশ। কেবলমাত্র গিরিপথেই উপরোক্ত সংখ্যক সৈন্য হতাহত হয়েছিল। তুদপরি ঠান্ডা লেগে যারা অকর্মণ্য হয়ে পড়েছিল এবং রোগাক্রান্ত হয়ে যারা মারা গিয়েছিল তাদের সংখ্যা উপরোক্ত অংকের মধ্যে ধরা হয়নি। অভিযানের ফলাফল সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দান প্রসঙ্গে পাঞ্জাব সরকার বলেছিলেন যে, পার্বত্য এলাকায় যুদ্ধ ইতিপূর্বে আর কখনো এতোটা প্রচন্ড আকার ও প্রকৃত ধারণ করেনি। ধর্মান্ধরা বিভিন্ন উপজাতির এক শক্তিশালী ঐক্যজোট গঠনে সমর্থ হয়েছিল যে, এই সব ধর্মান্ধরা মোটেই নিরীহ এবং দুর্বল ধর্মপ্রচারক মাত্র ছিল না। ভারতে আমাদের শাসন কায়েম রাখার ব্যাপারে এরা ছিল স্থায়ী বিপদের উৎস। এরা যে ধর্মযুদ্ধের কথা ক্রমাগত প্রচার করছিল, সীমান্তের সকল উপজাতি সম্ভবত তাতের অনুপ্রাণিত হয়েছিল। এই সংকটাবস্থা আরো তীব্র আকার ধারণ করেছিল এই কারণে যে, ঠিক ঐ সময় ভারতীয় সাম্রাজ্যের কোন দায়িত্বশীল শাসন প্রধান ছিল না। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড এলপিন মরণাপন্ন অবস্থায় নিভৃত পর্বতাঞ্চলে অবস্থান করছিলেন। তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তিনি কোনই কাজকর্ম করতে পারছিলেন না।
এই যুদ্ধে আমাদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তবে এর ফলে পরবর্তী চার বছর সীমান্তে নির্বিঘ্নে শান্তি বিরাজ করে। এই যুদ্ধে ধর্মান্ধ শিবিরের অর্ধেকের পতন ঘটেছিল। পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর অন্যান্য উপজাতীয়রা বিদ্রোহী উপনিবেশের ধ্বংসাবশেষকে ভাল চোখে দেখছিল না। কারণ বিদ্রোহীরা তাদের পার্বত্য উপত্যকা অঞ্চলে যুদ্ধের ঝড় বইয়ে দিয়েছিল। বিশ্বাসঘাতক সর্দাররা নিজেদের এতটা বিপন্ন বলে মনে করেছিল যে, তাদের দুইজন (মোহাম্মাদ ইসহাক ও মোহাম্মাদ ইয়াকুব) ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে সীমান্তস্থিত আমাদের অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছিল কিন্তু আরেকজন নেতা (মৌলভী আবদুল্লাহ) এই প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেয় এবং বিদ্রোহীদের উদ্দীপনাকে পুনর্বার জাগ্রত করতে আরম্ভ করে। কিন্তু ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগ পর্যন্ত তারা আমাদের ভূখণ্ডে ধ্বংস অভিযান চালাবার প্রশ্নে আত্মকলহে লিপ্ত ছিল। ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে ৭০০ যোদ্ধা নিয়ে গঠিত বিদ্রোহী বাহিনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং উপজাতীয়দের ঐক্যজোটের ভিত্তি স্থাপন করার চেষ্টা করে। কিন্তু ১৮৬৩ খ্রিঃ আমরা বিদ্রোহীদের যে শাস্তি দিয়েছিলাম সেকথা স্মরণ করে তাদের পক্ষেও এ ধরণের যুদ্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবু ক্রমে ক্রমে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মান্ধতা উপজাতীয়দের শুভবুদ্ধি হরণ করতে থাকে। তারা আগরর উপত্যকায় আমাদের একটি ফাঁড়ি আক্রমণ করে। সরকারীভাবে লিপিবদ্ধ তথ্য থেকে জানা যায় যে, অনুরূপ আক্রমণের বিরুদ্ধে অবিলম্বে যে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছিল তা না করা হলে আবার উপজাতীয়দের এক বিরাট ঐক্যজোটের মোকাবেলা করতে হত আমাদের। এবার অবশ্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ একটি মুহূর্ত নষ্ট না করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। উপজাতীয়দের শায়েস্তা করার জন্য সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ সৈন্য প্রেরণের অনুমোদন দান করেন ৮ই সেপ্টেম্বর। ভারতের প্রধান সেনাপতির তত্ত্বাবধানে এবং জেনারেল ওয়াইল্ড, সি-বি- এর প্রত্যক্ষ পরিচালনাধীনে আমাদের সৈন্যবাহিনী ৩০শে অক্টোবর তারিখে রওয়া হয়। একই সময় আমরা উপজাতীয়দের মধ্যে একটি ঘোষণা জারি করলাম। তাতে বলা হল, যেসব উপজাতির উপর কোন রকম অত্যাচার বা নির্যাতন করা হয়নি, তাদেরও কেউ কেউ ব্রিটিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করেছে এবং এবং অস্ত্র শস্ত্র ও পতাকা নিয়ে আমাদের এলাকায় প্রবেশ করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। এইরূপ অন্যায় আচরণের প্রতিবিধান করা অবশ্য কর্তব্য। ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট বহুদিন যাবত তোমাদের এই অন্যায় আচরণ সহ্য করেছেন। কিন্তু আর সহ্য করা সম্ভব নায়। অতএব উপরোক্ত অন্যায় আচরণের জন্য এতদ্বারা তোমাদের কৈফিয়ত তলব করা হচ্ছে।
এই অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ এখানে দিতে চাইনা। জুলাই মাসে পাঞ্জাব সরকারের কাছ থেকে কতকগুলো জরুরী তারবার্তা পাওয়া যায়। এসব তারবার্তায় পাঞ্জাব সরকার ঝড়ের হুশিয়ারি জ্ঞাপন করেন। সেনাবাহিনীর কোয়াটার মাষ্টার জেনারেল লিখেছিলেন (সামরিক বিভাগের সেক্রেটারীর কাছে লিখিত পত্র তাং ৫ই নভেম্বর ১৮৬৮) উপরোক্ত হুশিয়ারি এতই জরুরী এবং সাহায্যের আবেদন এতই অনিবার্য ছিল যে, সরকার বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করা সমীচীন মনে করেন নি। কেননা, বিদ্রোহীরা কার্যত আমাদের সেনাবাহিনীর কিছু অংশকে অবরুদ্ধ করেছিল। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে প্রধান সেনাপতি এবার পাঞ্জাবের সামরিক ঘাটিগুলো দুর্বল করলেন না অথবা সীমান্তবর্তী ফাঁড়িগুলো থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করলেন না। বরং তিনি উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ থেকে কয়েক রেজিমেন্ট সৈন্য নিয়ে আসলেন। আক্রমণকারী দলটি গঠিত হয় ৬০০০ থেকে ৭০০০ নিয়মিত সৈন্য নিয়ে। তাছাড়াও সীমান্ত এলাকায় অবস্থানকারী মোট সৈন্য সংখ্যাও দ্বিগুণ করা হল। বলতে গেলে ভারতে অবস্থিত ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর সর্বশ্রেষ্ঠ অংশকেই ধর্মান্ধ পার্বত্য উপজাতীয়দের বিরুদ্ধে সমাবেশ করা হল। (রাওয়ালপিন্ডি থেকে গোলন্দাজ অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী এবোটাবাদে প্রেরিত হল; লাহোর থেকে পদাতিক বাহিনী এবোটাবাদে প্রেরিত হল; শিয়ালকোট থেকে পদাতিক বাহিনী দারবান্দে প্রেরিত হল; দূরবর্তী পার্বত্য ঘাটি বাকলোহ এবং ধর্মশালা থেকে গুর্খা বাহিনী নিয়ে আসা হল; কানপুর, আলিগড়, অমৃতসর, লাহোর, ক্যাম্বেলপুর থেকে অশ্বারোহী ও হুসার বাহিনী রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেরণ করে রিজার্ভ গঠন করা হল: পেশোয়ার এবং নওশেরাতেও সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত রাখা হল। ) আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসের শ্বাসরোধকর গরমেও আমাদের সৈন্যদল এমন দ্রুত মার্চ করে অগ্রসর হতে লাগল, যা স্বাস্থ্যকর নাতিশীতোষ্ণ এলাকাতেও সচরাচর দেখা যায় না। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মাইন স্থাপনকারী বাহিনী এবং সেতু ও সড়ক নির্মাণকারী বাহিনী উনত্রিশ দিনে ছয়শ মাইল পথ অতিক্রম করে। অভ্যন্তরীণ প্রদেশসমূহ থেকে বিপুল সংখ্যক সৈন্যবাহিনী উত্তরদিকে অগ্রসর হতে দেখে উপজাতীয়রা সম্পূর্ণরূপে দমে যায় এবং ঐক্যজোট গঠনের জন্য তাদের সব পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যায়। প্রভূত অর্থ ব্যয় করে আমরা আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জিত একটি পূর্নাঙ্গ সৈন্যবাহিনী কৃষ্ণ পর্বতে সমাবিষ্ট করে ফেলি। সীমান্ত এলাকার বিদ্রোহীরা আমাদের এই সৈন্যসমাবেশের মোকাবেলা করতে সাহস পায় না। এ সম্পর্কে কোয়াটার মাস্টার জেনারেল লিখেছিলেন ১০০০০ ফুট উচ্চ পর্বতে যুদ্ধরত ইউরোপীয় এবং দেশীয় সৈন্য সমন্বয়ে গঠিত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর পরিচালক সেনাপতির নিজের জন্যে কোন তাঁবু ছিল না। (সামরিক দফতরের সেক্রেটারীর কাছে কোয়াটার মাষ্টার জেনারেলের পত্র ৫ই নভেম্বর, ১৮৬৮) যাই হোক, আমরা এই অশান্তির যথার্থ কারণ নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয়েছি। এই অভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ ও আশু কারণ ধর্ম অন্য কিচু ছিল, সে সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণী দান প্রসঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, এই অভিযানের মাধ্যমে হিন্দুস্থানি ধর্মান্ধদের বিতাড়িত করতেও পরিনি, অথবা আত্মসমর্পণ করে হিন্দুস্থানে তাদের স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য করতেও পারিনি। (পাঞ্জাব সরকারের পত্র ৬ই নভেম্বর, ১৮৬৮)
আমাদের সীমান্ত অঞ্চলে ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহী শিবির গঠন থেকে শুরু করে ১৮৬৮ খ্রিঃ তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সর্বশেষ অভিযান পর্যন্ত ইতিহাস আলোচনা করলাম। ওয়াহাবীদের যুদ্ধাত্মক তৎপরতা ভারতের সর্বত্র যে বিস্তার লাভ করেছিল তার ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে এই ক্ষুদ্র গ্রন্থের কলেবরে বিরাট আকার ধারণ করবে। তবে একথা সত্য যে, তাদের কার্যকলাপ কেবলমাত্র পাঞ্জাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, প্রায় ৩০ বছর আগে দক্ষিণ ভারতের কেন্দ্রস্থলে ধর্মান্ধদের একটি সংগঠন যেন বেশ পাকাপোক্তভাবে খুঁটি গেড়ে বসেছিল। স্যার বাটল ফ্রিয়ারের কাছ থেকে জানা যায় যে, হায়দ্রাবাদের নিজামের যে ভ্রাতাকে সিংহাসনে বসাবার সিদ্ধান্ত করা হয়েছিল, সেও তৎকালীন ওয়াহাবী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল। পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে না গেল নবনির্মিত কামান বন্দুকসহ সর্বপ্রকার অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদের এক বিপুল ভাণ্ডার উক্ত সংগঠনের নেতাদের হস্তগত হত এবং আধা স্বাধীন দেশীয় রাজন্যবর্গ আর দক্ষিণ ভারতের সামরিক প্রদানদের মধ্যে অনেকেই ওয়াহাবীদের দলে ভিড়ে তাদের শক্তিশালী করত এর ফলে শিখ শাসনাধীন সীমান্ত এলাকার উপর ক্রমাগতভাবে দুর্যোগ ঘটেছে। এবং তারই তিক্ত উত্তরাধিকার বর্তেছে আমাদের উপর। ধর্মান্ধদের দ্বারা সীমান্তে বিরামহীন অশান্তি বিরাজমান রাখা ছাড়াও তিনবার উপজাতীয়দের বৃহদাকার ঐক্যজোট সংগঠিত হয়েছে এবং প্রত্যেকবারই ব্রিটিশ ভারতকে একেকটি যুদ্ধের মাধ্যমে তার মোকাবেলা করতে হয়েছে। একের পর এক ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট সীমান্তের এই ধর্মান্ধদেরকে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের জন্য এক স্থায়ী বিপদ বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু এদের নির্মূল করার জন্য আমাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এই ধর্মান্ধ শিবির এখন পর্যন্ত আমাদের অবাধ্য প্রজাদের এবং সীমান্তের ওপারে অবস্থিত আমাদের শত্রুদের আশা ভরসার কেন্দ্রস্থল হয়ে বিরাজ করছে। মধ্য এশিয়ার রাজন্যবর্গের মধ্যে সর্বদাই যে আত্মকলহ লেগে আছে যে কোন মুহূর্তে আমরা তাতে জড়িত হয়ে পড়ব কিনা জানি না। কিন্তু এই বছর শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি আফগান যুদ্ধে আমাদের জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান রয়েছে। এই যুদ্ধ যখন শুরু হবে শীঘ্রই হোক আর বিলম্বেই হোক, তা শুরু হবেই তখন আমাদের সীমান্তে অবস্থিত বিদ্রোহী উপনিবেশ আমাদের শত্রুপক্ষে বহু সহস্র সৈন্যের যোগান দিবে। আমাদের ভয় কেবলমাত্র বিশ্বাসঘাতকদের জন্যেই নয়। আমাদের সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত রাজদ্রোহী জনতা এবং সীমান্তে অবস্থিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন উপজাতীয়দের জন্যেও আমাদের ভয়। কেননা এরা উভয়েই বারে বারে জোটবদ্ধ হয়ে ধর্মযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের বিরুদ্ধে। বিগত নয় শতাব্দী যাবত উত্তর দিক থেকে আক্রমণে অভ্যস্ত হয়েছে ভারতের জনসাধারণ। এশিয়ার বিভিন্ন জাতিকে একটি ধর্মযুদ্ধে সংঘবদ্ধ করতে সক্ষম কোন নেতার অধীনে পশ্চিমা মুসলমান যাযাবরদের সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহী শিবির কি পরিমাণ শক্তিশালী হবে কেউ বলতে পারে না।

About ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার