দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস

আরেকটি পছন্দ মাফিক ভবিষ্যদ্বাণী

নিয়ামত উল্লাহর গান
(গীতিকাব্যটি থেকে মাত্র কয়েকটি পংক্তি আমি উল্লেখ করলাম, ১৮৬৫ সালের ওয়াহাবী মামলার সরকারী রেকর্ড থেকে গীতিকাব্যটি পাওয়া গেছে)
(তার মাজারকে পবিত্র মনে করা হোক)
এ সত্য আমি বলে যাচ্ছি যে একজন রাজ্য আসবেন,
তার নাম তৈমুর তিনি শাসন করবেন ত্রিশ বছর।
(এরপর তার উত্তরাধিকারীদের একটা তালিকা দেওয়া হয় এবং শাহজাহানের শেষ বংশধর পর্যন্ত তালিকাটি দীর্ঘ)
তারপর আর একজন রাজা আসবেন।
নাদির ভারত অভিযান করবেন, এবং
তার তরবারি দিল্লীকে ক্ষত বিক্ষত করবে।
তারপর শুরু হবে আহমদ শাহ এর অভিযান, এবং
তিনি আগের রাজবংশ ধ্বংস করবেন।
এই রাজার মৃত্যুর পর পূর্ববর্তী রাজবংশ
আবার ক্ষমতা পাবেন।
এই সময় শিখরা প্রবল হয়ে উঠবে, এবং তারা
নানা নিষ্ঠুর কাজে মেতে উঠবে।
শিখদের এ অনাচার চল্লিশ বছর চলবে
তারপর হিন্দুস্থান চলে যাবে ন্যাজারেথ নগরবাসীদের দখলে
আর তারা শাসন করবে একশ বছর।
তাদের শাসনে বিশ্ব অত্যন্ত নির্যাতিত হবে;
এবং তাদের ধ্বংসের জন্য পাশ্চাত্যে আরেক রাজ আসবেন।
ন্যাযারাথ শাসকের বিরুদ্ধে এই রাজা যুদ্ধ ঘোষণা করবেন
আর এ যুদ্ধে অগণিত লোক মারা যাবে।
এক বিরাট ধর্মযুদ্ধে পাশ্চাত্যের রাজা অস্ত্রবলে জয়ী হবেন
এবং যীশুর অনুসারীরা হবে পরাভূত।
ইসলাম জারি থাকবে চল্লিশ বছর;
তারপর ইস্পাহান থেকে উদ্ভূত হবে এক অবিশ্বাসী উপজাতি বংশ।
এই সব উৎপীড়কদের বিতাড়নের উদ্দেশ্যে
ধরায় আবির্ভূত হবেন ঈসা। এবং
আকাঙ্ক্ষিত মেহেদী আসবেন। আর
এ সবই ঘটবে বিশ্বের শেষ সময়।
এই কবিতার রচনাকাল ৫০০ হিজরিতে (১১৭৪-১১৭৫খ্রীষ্টাব্দে)।
পাশ্চাত্যের রাজার আবির্ভাব হবে ১২৭০ হিজরিতে (১৮৫৩-১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে);
আল্লাহর রহস্য সব নিয়ামত উল্লাহ জানতো;
তার এ ভবিষৎবাণী লোকে বাস্তব প্রত্যক্ষ করবে।
ভারতীয় ওহাবীরা তাদের নেতার ঐশ্বরিক মিশন প্রতিষ্ঠিত করার পর ছোটখাটো প্রশ্ন থেকে সরাসরি ধর্মযুদ্ধের মতবাদের প্রশ্নে সরে যায়। তাদের সকল প্রচার পুস্তিকায় ধর্মযুদ্ধকে খাটি মুসলমানদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসাবে দেখানো হয়। তাদের প্রথম দিকের পুস্তকে এতদসংক্রান্ত বিধিবিধানের নিম্নরূপ বর্ণনা দেওয়া হয়: মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের উপায় হচ্ছে ধর্মযুদ্ধ, বৃষ্টি যেমন মানুষ পশু গাছ-পালার জন্য উপকারী, তেমনি কাফেরদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মানুষও উপকৃত হয়। এই উপকার দুই প্রকারেরঃ সাধারণ- এতে সব মানুষ, এমনকি পৌত্তলিক ও বিধর্মীদের এবং জন্তু জানোয়ারের ও লতাগুল্মকে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ- এতে কেবল বিশেষ শ্রেণীর লোকে অংশ গ্রহণ করতে পারে এবং তাদের অংশগ্রহণের বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে। সাধারণ সুবিধার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর রহমত অর্থাৎ মৌসুমি বৃষ্টি; জনসাধারণ দুর্যোগ দুর্বিপাক থেকে মুক্তি পাবে এবং তাদের সম্পদ বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া শিক্ষিত লোকের সংখ্যা বাড়বে, বিচারকরা ন্যায় বিচার করবেন, মামলাকারীরা বিবেকের দ্বারা চালিত হবে, ধনীদের উদারতা বৃদ্ধি পাবে। মুহাম্মদ (সঃ) এর ধম যখন সবাই মেনে নেবে, সারা দুনিয়ায় যখন মুসলমানি শাসন চালু হবে এবং মুসলমান রাজার শাসনে ইসলামী বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠিত হবে, কেবল তখনই আল্লাহর রহমত স্বরূপ উপরোক্ত সুযোগ সুবিধা মানুষ লাভ করতে পারবে। কিন্তু আল্লাহর রহমতের প্রেক্ষিতে তুরস্ক অথবা তুর্কিস্তানের তুলনায় এদেশের অবস্থাটা একবার খতিয়ে দেখ। বর্তমানে ১২৩৩ হিজরিতে (১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে) ভারতের অবস্থাটা ঠিক কোন পর্যায়ে এসেছে, তাও একবার পরোখ করে দেখ। এর বৃহত্তর অংশ শত্রু দেশে (দারুল-হার্ব)পরিণত হয়েছে; অথচ দুই বা তিনশ বছর আগে ভারতের অবস্থা অন্য রকম ছিলো। ফলে সেই সময়ের তুলনায় আল্লাহর রহমত এবং শিক্ষিত লোকের সংখ্যা বর্তমানে নিদারূনভাবে হ্রাস পেয়েছে।
তাদের সর্বাধিক জনপ্রিয় সংগীত একই ভাবধারায় বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। আমাদের সীমান্তে অবস্থিত বিদ্রোহী প্রশিক্ষণ শিবিরে প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় এই সঙ্গীতের তালে তালে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয় এবং ভারতের কেন্দ্রস্থল থেকে নতুন সংগ্রহীত সেসব বিদ্রোহীরা ব্রিটিশদের নিমিত রাজপথ দিয়ে সীমান্ত শিবিরের দিকে যাচ্ছে তাদেরও মুখে মুখে ধ্বনিত হচ্ছে এই সঙ্গীত:
“প্রথমে, আমি আল্লাহর মহত্ব কীর্তন করছি
যার প্রশংসার কোন সীমা নেই;
তারপর আল্লাহর নবীর গুণকীর্তন করে আমি
ধর্মযুদ্ধের উপর এই গানটি লিখেছি:
ধমের জন্য ধর্মযুদ্ধ চালাতে হবে এবং সেখানে,
ক্ষমতার লালসা থাকবে না।
পবিত্র ধর্মগ্রন্থে এ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে
তার কিছুটা এখানে উল্লেখ করেছি।
কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সকল মুসলমানের
জন্য অপরিহার্য কর্তব্য।
অন্য সব কাজের আগে এই কাজে শরিক হও।
যে কেউ এই কাজে ঈমানের সাথে এক পয়সা দান করবে
সে তার সাতশত গুন সওয়াব পাবে।
এবং যে কেউ অর্থ সাহায্য দিয়ে নিজেই যুদ্ধে যোগ দেবে
আল্লাহ তাকে সাত হাজার গুন সওয়াব দান করবেন।
আল্লাহর রাহে যুদ্ধ করতে যে কেউ একজন
মুজাহিদকে সুসজ্জিত করবে
সে শহীদ পুণ্যের অধিকারী হবে;
তার ছেলেমেয়েদের গোর আযাব হবে না;
রোজ হাশরের কষ্টও তাদের স্পর্শ করবে না।
অতএব কাপুরুষতা বর্জন করে ঈশ্বরিক
ইমামের অনুসারী হওএবং কাফেরদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়।
আল্লাহর অশেষ প্রশংসা, কারণ
হিজরি তেরশ সনে তিনি একজন ইমাম পাঠিয়েছেন (১৭৮৬-১৮৮৬খ্রীষ্টাব্দে)।
হে বন্ধু, তোমাকে মরতে যখন হবেই, তখন আল্লাহর রাহে
জীবন উৎসর্গ করাই কি শ্রেয় নয়?
হাজার লোক যুদ্ধে যোগ দিয়ে
অক্ষত দেহে ফিরে আসে।
আবার হাজার হাজার লোক ঘরে বসে
মৃত্যু বরণ করে।
দুনিয়ার স্বার্থ চিন্তায় তুমি বিভোর,
তাই আল্লাহকে ভুলে গিয়ে শুধু
স্ত্রী-পুত্র-কন্যার ভাল-মন্দ নিয়েই তুমি ব্যতিব্যস্ত থাক।
কিন্তু কতদিন থাকতে পারবে
স্ত্রী পুত্র কন্যাদের মাঝে?
মৃত্যুকে এড়িয়ে চলবে কতদিন?
আল্লাহর রাহে যদি এ দুনিয়ার মায়া ছাড়তে পার,
তবে তো অনন্তকাল ভোগ করবে বেহেশতের সুখ।
ভারতের ইসলাম জারির সংগ্রামে শরিক হও,
যাতে এদেশে আল্লাহ আল্লাহ ছাড়া।”
আর কোন নাম ধ্বনিত না হয়, (রিসালা-জিহাদ বা ওয়াহাবী যুদ্ধ সঙ্গীত, ক্যালকাটা রিভিউ ৭ম খন্ড, ৩৯৬ পৃঃ দ্রঃ)
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ সম্পর্কে ওয়াহাবীদের রচিত গদ্য বা পদ্য সম্পর্কে যত সংক্ষিপ্তাকারেই সাজানো হোক না কেন, তাতেই একখণ্ডের বই হয়ে যাবে। ব্রিটিশ শক্তির পতন এবং ধর্মযুদ্ধের দায়িত্ব সম্পর্কে নানা রকমের ভবিষ্যদ্বাণীতে পূর্ণ বহু পুস্তক-পুস্তিকা তারা রচনা করেছে। এইসব পুস্তকের শিরোনাম থেকেই বুঝা যাবে যে, সেইগুলো কতটা রাজদ্রোহমূলক। আমি নিচের তেরটা বইয়ের নামোল্লেখ করছি, এর অনেকগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাগ ভাগ করে লেখা, যাতে করে তা গোপনে হাতে হাতে প্রচার করা সম্ভব হয় ((১) সিরাতুল মুস্তাকিম বা সোজা পথ, আমীরুল মুমেনীন বা বিশ্বাসীদের নেতা ইমাম সৈয়দ আহমদে বাণী থেকে সংগৃহীত, দিল্লীর মৌলভী মোহাম্মাদ ইসমাইল ফার্সি ভাষায় এ বইটি লেখেন এবং কানপুরের মৌলভী আবদুল জব্বার হিন্দুস্থানিতে অনুবাদ করেন, (২) কাসিদা বা কাব্যগ্রন্থ, কাফেরদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধে দায়িত্ব বিশ্লেষণ এবং যারা সে দায়িত্ব পালন করবে তাদের সওয়াব বা উপকারের বর্ণনা দিয়ে এ পুস্তকটি লিখেছেন কানপুরের মৌলভী করম আলী, (৩) শির-ই ওয়াকেয়া কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংক্রান্ত রচনা যুদ্ধে কারা অংশ নেবে এবং কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে তার পূর্ণ ব্যাখ্যা এতে রয়েছে অবশ্য, এই পুস্তকটিতে বলা হয়েছে যে, কাফেররা যখন মুসলমানদের উপর নিপীড়ন চালাবে কেবল তখনই ধর্মযুদ্ধ করা প্রয়োজন, (৪)নেয়ামত উল্লাহ রচিত ভবিষ্যদ্বাণীমূলক কাব্যগ্রন্থ এতে এই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে, ব্রিটিশ শক্তি ধ্বংস হবে এবং পশ্চিম থেকে আগত একজন রাজা ইংরেজদের দাসত্ব থেকে ভারতীয় মুসলমানদের উদ্ধার করবেন, (৫) তাওয়ারিখ কাইসার রুম অথবা নিসবাহ উস সারি, নতুন মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল ওয়াহাবের জীবনেতিহাস এতে তুর্কী বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ ও নির্যাতনের বিবরণ দেয়া হয়েছে (৬)মৌলভী মোহাম্মাদ আলী প্রণীত আসার মাহসার বা রোজ কেয়ামতের আলামত বইটি হিজরি ১২৬৫ সালে (১৮৪৯ খ্রিঃ) মুদ্রিত হয়, এই কাব্যগ্রন্থটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়, এতে ভবিষ্যদ্বাণী করে বলা হয়েছে যে, পাঞ্জাব সীমান্তের অদূরে খাইবার পার্বত্য এলাকার একটা যুদ্ধ হবে এবং এতে ইংরেজরা প্রথমে মুসলমানদের পরাভূত করবে এবং তারপর মুসলমানরা তাদের প্রকৃত ইমাম খুঁজে নেবে, তারপর চারদিনের এক যুদ্ধে ইংরেজ শক্তি চূড়ান্তভাবে পরাজিত হবে এবং সরকারের নাম নিশানা বলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না এরপর ইমাম মেহদী আবির্ভূত হবেন এবং ভারতের শাসন ক্ষমতা পুনরুদ্ধারকারী মুসলমানরা তার সাক্ষাৎ লাভের জন্য দলে দলে মক্কার ছুটে যাবে,এই ঘটনার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটবে রমজান মাসে চন্দ্র ও সূর্য উভয়ের একত্র অদৃশ্য হওয়ার মধ্য দিয়ে (৭)তাকিয়াতুল ইমান অথবা বিশ্বাস দৃঢ়ীকরণ, দিল্লীর মৌলভী মোহাম্মাদ ইসমাইল এই বইটির রচয়িতা,(৮)একই লেখকের তাজকিরুল এখওয়াই অথবা ভ্রাতৃত্বমূলক আলাপ আলোচনা,(৯)কানপুরের মৌলভী করম আলী প্রণীত নিসহাত-উল-মুসলেমীন বা মুসলমানদের প্রতি উপদেশ (১০)আওলাদ হোসেন প্রণীত হেদায়েত উল মোমেনীন বা বিশ্বাসীদের প্রতি উপদেশ (১১)তানবির উল আয়নাইন বা দৃষ্টি পরিচ্ছন্নকরণ আরবী গ্রন্থ, (১২)তাম্বি-উল-গাফেলী বা কর্তব্যে অনীহার বিরুদ্ধে তিরস্কার: উর্দু গ্রন্থ,(১৩)চিহিল হাদীস অথবা ধর্মযুদ্ধ সম্পর্কে মুহাম্মদ (সঃ)এর চল্লিশটি উপদেশবাণী)।
অন্যান্য পুস্তিকাগুলো ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। শুধু পুস্তিকার পাঠকরাই তার বিষের শিকার হয় তা নয়, দলে দলে প্রচারকরা বাংলার জেলায় জেলায় গিয়ে জনমত বিষিয়ে তোলে এবং লোকদেরকে রাজদ্রোহমূলক কাজের দীক্ষা প্রদান করে।
ব্রিটিশ ভারতের শহরগুলোতে এসব বই প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে এবং এর মধ্যে সেগুলো যত বেশি উগ্র ও রাজদ্রোহমূলক সেইগুলো কেনার দিকেই লোকের বেশী ঝোঁক। কিন্তু ওয়াহাবী দলপতি বিদ্রোহের আগুন ছড়াবার জন্য চার স্তরবিশিষ্ট যে সংগঠনকে কাজে লাগাচ্ছেন, উত্তেজক বই পুস্তক হচ্ছে তার একটা দিক মাত্র। এ ছাড়াও প্রথমত পাটনায় তাদের কেন্দ্রীয় প্রচার কেন্দ্র রয়েছে। এখান থেকে একবার ব্রিটিশ কর্তৃত্ব অস্বীকার করা হয় এবং পরপর অনেকগুলো ফৌজদারি মামলার মাধ্যমে এ চক্রটিকে ভেঙ্গে দেয়া সম্ভব হলেও আজও তারা সমগ্র বাংলার বিরাট প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। ১৮২১ সালে ইমাম পাটনার তার কতিপয় খলিফা নিয়োগ করেন এবং এভাবে তিনি অদম্য মনোবল ও অসীম সাহসী ব্যক্তিদের বেছে নিয়ে তাদের উপর সংগঠনের বিভিন্ন দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। আমরা দেখেছি, বিভিন্ন সময়ে তাদের উদ্দেশ্যে যখন প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে তখনও তারা অদম্য মনোবলের সাথে ভস্মস্তূপের মধ্যে থেকে বার বার ধর্মযুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ বের করে আনতে সক্ষম হয়েছেন। মিশনারিদের মত অক্লান্ত, নিজের সম্পর্কে নির্লিপ্ত নিষ্কলঙ্ক চরিত্র, ইংরেজ বিধর্মীদের বিতাড়নের চরম লক্ষ্যে অবিচল, অর্থ ও লোক সংগ্রহে সক্ষম একটি সুষ্ঠু সংগঠন গড়ে তোলার কাজে সুদক্ষ পাটনার খলিফারা সমগ্র ওয়াহাবী জামাতের কাছে আদর্শ দৃষ্টান্তস্থানীয় হয়ে রয়েছেন। তারা যে শিক্ষা পেয়েছেন তার বেশির ভাগই ত্রুটিমুক্ত এবং এ শিক্ষার বলে বলীয়ান হয়ে স্বদেশের হাজার হাজার লোককে তারা পবিত্র জীবনযাপনের এবং আল্লাহ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা গড়ে তোলার দীক্ষায় দীক্ষিত করতে পেরেছেন। কিন্তু কেবলমাত্র নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে একটা বিরাট সম্প্রদায়কে দীর্ঘদিন একতাবদ্ধ করে রাখা যায় না। পুনরুজ্জীবনের ধর্মীয় মতবাদে শীঘ্রই চিড় ধরতে শুরু করে। এমনকি প্রথম দিকের নেতাদের আমলেও আন্দোলনে ভাটা পড়ার লক্ষণ পরিদৃষ্ট হয়, এবং পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার জন্যে খলিফাদের ক্রমাগত কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিদ্বেষকে কাজে লাগাতে হয়।
পরিস্থিতি বাস্তবতা পাটনার নেতাদের চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে এবং পরিবর্তিত অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য তাদের প্রচারের ধরনও কিছুটা বদলে নেন। জাগ্রত বিবেকের বিভীষিকার উপর নির্ভরশীলতা পরিহার করে তারা এখন ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভারতীয় মুসলমানদের চিরাচরিত বিদ্বেষের উপর নিভর করাকে অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন। সুতরাং মুসলমানদের মহৎ চিত্তবৃত্তির পরিবতে তাদের ধর্মান্ধতাকে কাজে লাগাবার দিকেই তারা ঝুঁকে পড়েন। সময় যত এগিয়ে যেতে থাকে ততই তারা রাজদ্রোহমূলক প্রচারণার তীব্রতা বৃদ্ধি করতে থাকেন। পাটনার প্রচার কেন্দ্রকে তারা বিদ্রোহী আদান প্রদানের ঘাটিতে পরিণত করেন। সশস্ত্র এলাকাটাকে দেয়াল দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় এবং বহির্বাটীসহ অভ্যন্তর ভাগে অনেকগুলো কামরা সংযুক্ত করা হয় যার এক কক্ষের সাথে অন্য কক্ষের সংযোগ হিসেবে একটা করে ছোট দরজা রাখা হয়। এছাড়া প্রাচীরাভ্যন্তরে গোপন আদালতও বসানো হয়। প্রথম দিকের খলিফারা অস্ত্রের সাহায্যে ম্যাজিস্ট্রেটের গ্রেফতারী পরোয়ানার মোকাবিলা করার হুমকি দেন। কিন্তু পরবর্তীরা অনেকগুলো ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ এবং সংকীর্ণ বহির্গমন পথকে আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে বেছে নেন। সরকার যখন বিদ্রোহীদের এই আড্ডাখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত করেন, তখন অট্টালিকাটির পরিকল্পনার নকশা সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ঠিক যেন একটা সুরক্ষিত নগরীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাওয়া হচ্ছে। জেলার প্রচারকরা উক্ত শিবিরে দলে দলে ধর্মান্ধ লোকদের পাঠাতে থাকে। পাটনার নেতাদের শিক্ষা ও বক্তৃতার জোরে এদের উৎসাহের তীব্রতা আরো বৃদ্ধি পাওয়ার পর এদের অধিকাংশকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে সীমান্ত শিবিরে পাঠানো হতে থাকে। অধিকতর প্রতিশ্রুতিশীল যুবকদের আরো দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা করে পাটনায় রেখে দেয়া হয়; এবং রাজদ্রোহের বিদ্যায় পারদর্শিতা লাভের পর তাদেরকে নিজ নিজ প্রদেশে প্রচার কার্যে পাঠানো হয়।
পাটনার খলিফাদের যা কিচু উত্তম গুণাবলী ছিল তার যথার্থ চিত্র তুলে ধরতে আমি খুবই আগ্রহী ছিলাম। এক প্রশংসনীয় নৈতিক চরিত্র গঠন পদ্ধতির মধ্য দিয়ে কাজ শুরু করে ক্রমান্বয়ে তারা তাদের শিক্ষার আধ্যাত্মিক দিকগুলো বর্জন করেন এবং দ্রুত বিলীয়মান উদ্দেশ্যকে সঞ্জীবিত করার উপায় হিসেবে মানুষ মনে জঘন্য প্রবণতার উপর আবেদন সৃষ্টি করতে থাকেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রচারকরা কি ধরনের প্রচারণায় আত্মনিয়োগ করে তার কিছু বিবরণ আমি পরে দেব তবে প্রচারকরা কি জাতীয় প্রশিক্ষণ লাভ করেন তার কিছু নমুনা এখানে পেশ করছি। প্রচারকরা নিরবচ্ছিন্ন গুরুত্বের সাথে বলতে থাকেন যে, ভারতীয় মুসলমানরা যদি দোজখের হাত থেকে রেহাই পেতে চায় তবে তাদের সামনে একটিমাত্র পথই খোলা আছে- কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অথবা বিধর্মী শাসিত দেশ ত্যাগ করে চলে যাওয়া (জিহাদ অথবা হিজরত) । কোন সত্যিকার মুসলমান আত্মার অপমৃত্যু না ঘটিয়ে আমাদের সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে পারে না। সবাই জেনে রাখুক যারা অন্যকে ধর্মযুদ্ধ থেকে বিরত করবে অথবা দেশ ত্যাগ করে পালাবে তারা মুনাফেক। যে দেশে অমুসলমানরা শাসন চালায় সেখানে মোহাম্মদী ধমের বিবি-বিধান কার্যকরী হতে পারে না। সেখানে সকল মুসলমানের অপরিহার্য কর্তব্য হচ্ছে ঐক্যবদ্ধভাবে বিধর্মীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো। যুদ্ধে অংশগ্রহণের সক্ষমতা যাদের নেই তাদের উচিত দেশ ত্যাগ করে কোন মুসলিম রাষ্ট্রে চলে যাওয়া। বর্তমান সময়ে ভারতের মুসলমানদের পক্ষে দেশ ত্যাগ করে যাওয়া একটা গুরুতর কর্তব্য, যে তা করতে অস্বীকার করবে সে রিপুর দাস ছাড়া আর কিছু নয় কেউ যদি হিজরত করে আবার ফিরে আসে তবে জেনে রাখা উচিত যে, তার অতীতের সৎকাজ কোন কাজে আসবে না তার মৃত্যু যদি ভারতে হয় তবে সে তো নাজাত পাবে না।
“ভ্রাতৃবৃন্দ, আমাদের বর্তমান অবস্থার জন্য ক্রন্দন করা উচিত, কারণ বিধর্মীদের শাসনে বাস করার জন্য আল্লাহর রাসূল আমাদের উপর ক্রুদ্ধ হয়েছেন। আল্লাহর রাসূলই যখন আমাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন তখন আশ্রয়ের জন্য আমরা আর কার দিকে তাকাব? আল্লাহ যাদেরকে সঙ্গতি দিয়েছেন তাদের অবিলম্বে দেশ ত্যাগ করা উচিত, কারণ এখানে আগুন জ্বলে উঠছে। সত্য কথা বললে আমাদের ফাঁসিতে লটকানো হবে, আর মুখ বুঝে থাকলে আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ক্ষুণ্ণ হবে” (১৮৬৭ সালে দিল্লীতে মুদ্রিত জাযা তাফাসের ক্যালকাটা রিভিউ, ৭ম খন্ড, ৩৯১ পৃঃ, ৩৯৩ পৃষ্ঠার মম অবলম্বনে প্রথম অনুচ্ছেদটি রচিত হয়েছে) ।
রাজদ্রোহমূলক সাহিত্য এবং পাটনার কেন্দ্রীয় প্রচার কেন্দ্র ছাড়াও সকল জেলার পল্লী এলাকায় মত প্রচারের জন্য ওয়াহাবীদের একটি স্থায়ী সংগঠন সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। স্থানীয় প্রচারকরা কখনও কখনও নিজেদেরকে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও দুর্দান্ত প্রকৃতির মানুষ হিসেবে প্রমাণিত করেছে, কিন্তু তাদের প্রতি উপযুক্ত শ্রদ্ধা প্রদর্শন ব্যতিরেকে তাদের সম্পর্কে কিছু বলা আমি সঙ্গত মনে করতে পারছি না। “তাদের অধিকাংশই অত্যুৎসাহী যুবক হিসেবে জীবন শুরু করেছে, অনেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ধর্মীয় উৎসাহ উদ্দীপনা অটুট রেখেছে। পাটনার নেতাদের কাছ থেকে লব্ধ প্রশিক্ষণের গুনেই তাদের এই অদম্য ধর্ম প্রীতির সৃষ্টি হয়েছে। শহরের সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে নিদিষ্ট সংখ্যক বন্ধু বান্ধবের মধ্যে জীবনযাপনে অভ্যস্ত সভ্য মানুষের পক্ষে উন্মুক্ত পল্লী অঞ্চলে কষ্টদায়ক জীবনের অভিযাত্রায় নিয়োজিত ওয়াহাবী প্রচারকদের কঠোর ব্রত সম্যক উপলব্ধি করা কদাচিৎ সম্ভব। আমরা সবাই মনে করি যে, নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের মাধ্যমেই আত্মার পবিত্রতা অজিত হয় এবং সম্ভবত খালি পায়ে বন জঙ্গল ও পাহাড় পর্বত অতিক্রমকারী তীর্থযাত্রী গৃহাভ্যন্তরে কর্মব্যস্ত মানুষের চেয়ে নিজেকে অনেক বেশি পবিত্র ও বিশুদ্ধ আত্মার বলে মনে করতে পারে।” আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে, ওয়াহাবী প্রচারকরা নিশ্চিতভাবেই স্বজাতীয়দের মধ্যে সর্বাধিক আধ্যাত্মিক গুণাবলীর অধিকার এবং ন্যুনতম স্বার্থবুদ্ধি প্রণোদিত বলে নিজেদেরকে প্রমাণ করেছেন। ইংরেজরা বিশ্বাস করে আনন্দিত বোধ করে যে, বর্তমানের তুলনায় তাদের পূবপুরুষরা মেরী ইংল্যান্ডের উন্মুক্ত পরিবেশে অনেক বেশি জীবনযাপন করেছে; এবং বর্তমান যুগের জীবন যুদ্ধে ব্যাপৃত ইংরেজ কেবলমাত্র ছেলেবেলাকার স্মৃতি রোমন্থন করে উপলব্ধি করতে পারে যে, বিরাট খ্রিস্টান রূপক কাহিনীর তীর্থযাত্রীরা কিভাবে দলে দলে ধ্বংস নগরী থেকে বহির্গত হয়ে বন-উপবন ও গিরিপথ লঙ্ঘন করে পবিত্র নগরীতে অভিযাত্রা করেছিল।
পরমাত্মার সন্ধানে নিয়োজিত সাধকের বনাঞ্চলে বসবাসের চরম অভিব্যক্তি দেখা গেছে প্রাচীন ভারতে। শীত প্রধান দেশের মানুষের গৃহাভ্যন্তরে জীবনযাপনের জন্য যা প্রয়োজন এদেশের সুসম প্রাকৃতিক পরিবেশে জীবন-যাপনকারী মানুষের জন্য তার প্রয়োজন করে না। প্রাচীন সংস্কৃত শাস্ত্রমতে উচ্চকুলশীল ব্যক্তিরা সন্তান-সন্ততি প্রতিপালনের দায়িত্ব শেষ করার পর, পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বনবাসে গমন করবে। তাদের প্রতিটি জনপ্রিয় প্রাচীন কাহিনী সেই সব দৃশ্য মানসপটে অঙ্কিত করে যেখানে লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন বনাঞ্চলে স্রোতস্বিনী নদী তীরে অবস্থিত পর্ণকুটিরে বাস করছে এক বনবাসী, আর এ সব কাহিনীর শ্রেষ্ঠ অভিব্যক্তি দেখতে পাওয়া যায় মনোরম বনানী পরিবৃত পশুপালনরত কুমারী শকুন্তলার জীবন কাহিনীতে। নিঃসঙ্গ জীবনের প্রতি ভারতের এই চিরায়ত আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ওয়াহাবীদের জীবনেও ঘটেছে এবং এই ধারাকে তারা দক্ষতার সাথে নিজেদের জীবনে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। এমনকি কৃতকর্মের জন্য আইনের খড়গের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য কিংবা উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থতাজনিত হতাশার কারণ তারা আধ্যাত্মিক বিশুদ্ধতা লাভের উপায় হিসেবে হয় কোন শহরের নিজন কক্ষে আশ্রয় নিয়েছে অথবা বনাঞ্চলে কিংবা পার্বত্য এলাকার নিঃসঙ্গ পরিব্রাজকের পথ বেছে নিয়েছে। পথ পরিক্রমণকারী নিষ্কলঙ্ক চরিত্রের ওয়াহাবী গ্রামের সরল বাসিন্দাদের সবিস্ময় দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পারে না। বছরের অধিকাংশ সময় তারা কোন মানব গৃহের শরণাপন্ন হয় না। দূরবর্তী প্রদেশ থেকে আগত ওয়াহাবী পরিব্রাজক কদাচিৎ দু-একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী ছাড়া নিঃসঙ্গভাবে পথ অতিক্রম করে চলে যায়। ব্যবহারিক জীবনের প্রতি অনীহা এবং বাহ্যিক আড়ম্বরহীনতা তাকে সাধারণ মানুষ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা প্রকৃতির ভিন্ন মানুষে পরিণত করেছে। সুতরাং গ্রামবাসীরা স্বাভাবিক কারণেই তার চার পাশে জড়ো হয় এবং তার সান্নিধ্য লাভের পর তারা খালের পানি নিয়ে বিরোধ কিংবা সীমানা নিয়ে আত্মকলহের কথা ভুলে যায়। ওয়াহাবী প্রচারক সরাসরি তাদেরকে রাজদ্রোহের মন্ত্র শুনাবে না। কিন্তু এমন মতবাদের কথা শুনাবে যাতে করে আমলকারীরা রাজদ্রোহের লক্ষ্যে পৌছাতে পারে। তাদের প্রচারিত মতবাদ, বেকনের চমৎকার উপমা উদ্ধৃত করে বলা যায়, মানুষকে দয়া মায়া বা প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে না; মানুষকে শান্তির পায়রার পরিবতে হিংস্র শকুনি ও বাজপাখিতে পরিণত করে। অবশ্য তাদের কেউ কেউ এ জাতীয় বিষাক্ত প্রচারণা থেকে বিরত রয়েছে। ১৮৭০ সালে বাংলার ধর্মান্ধ পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলো সফরের সময় আমি অনুরূপ এক ব্যক্তির কথা জানতে পারি এবং সেই অভিজ্ঞতার পর থেকে কোন ওয়াহাবীকে রাজদ্রোহী হিসেবে বর্ণনা করিতে আমার মন ব্যথিত হয়। একজন ওয়াহাবী প্রচারক একটি প্রত্যন্ত পল্লীতে প্রবেশ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার গ্রামবাসী তার কাছে জমায়েত হয়। পার্শ্ববর্তী হিন্দু অধিবাসীরা এতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দূরবর্তী জেলা সদর কার্যালয়ে ঘটনার খবর দিয়ে সাহায্য চেয়ে পাঠায়। কিন্তু ওয়াহাবী প্রচারকটি তার মুসলিম শ্রোতাদের দুর্নীতি দুষ্ট জীবনযাপন এবং শিকারি কার্যকলাপের নিন্দা করে ধর্মযুদ্ধের প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে সরাসরি অস্বীকার করেন। গ্রামবাসীরা তার কাছ থেকে শুধুমাত্র নৈতিক উপদেশ শুনে খুশি হতে পারেনি এবং হতাশ মনে যে যার ঘরে ফিরে যায়। জেলা সদরে নালিশ করার জন্য যে হিন্দুটি গিয়েছিল, ইতিমধ্যে সে ফিরে এসে দেখতে পারে যে, তথাকথিত রাজদ্রোহের গুরুকে তার স্বধর্মীয়রা ত্যাগ করে চলে গেছে এবং প্রতিবেশী হিন্দুদের প্রদত্ত চাল ও লাকড়ির উপর নির্ভর করা ছাড়া তার আর গত্যন্তর নেই।
সাধারণত বলা যায় যে, ওয়াহাবী প্রচারকরা যেসব জেলা অতিক্রম করে যাতায়াত করে থাকে সেখানকার স্থানীয় ব্রিটিশ অফিসারদের কাছ থেকে তাদের ভীত হওয়ার মত বিশেষ কারণ নেই; এবং এটাও ঠিক যে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতের সম্মুখবর্তী ছায়াঘেরা প্রাঙ্গণই হচ্ছে তাদের প্রচারকার্য চালাবার প্রিয় ময়দান। প্রথম যে প্রচারকটির সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা জন্মে, তিনি তো কমিশনারের সার্কিট হাউসের সম্মুখবর্তী রাস্তায় শিবির গড়েছিলেন। একটা পিপুল গাছের নিচে একদল মুসলমানের সাথে এই বৃদ্ধ প্রচারক কথা বলেছিলেন। তার কাছাকাছি ছিল একটি খর্বাকৃতির রুগ্ন ঘোড়া, যার কৃশ গ্রীবার উপর মস্ত একটা মাথা, এবং সে তার একগুচ্ছ লেজ নেড়ে গায়ের মাছি তাড়াচ্ছিল। দুর্দশাগ্রস্ত ঘোড়াটির চারটি পা ঘারে তৈরী দড়ি দিয়ে বাধা ছিল এবং পথচারীদের দিকে হতাশ দৃষ্টি মেলে সে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছিল। গৌরবর্ণের বৃদ্ধ প্রচারকটির লম্ব সাদা দাড়ি ছিল। তিনি ফিসফিস করে কথা বলছিলেন, কিন্তু এ সত্বেও তার উচ্চারণ ভঙ্গী প্রমাণ করে যে, উত্তর ভারত থেকেই তিনি এসেছেন। দেখে বুঝা গেল যে, তিনি আন্তরিক উদ্যমের সাথে কথা বলছেন, কিন্তু তার আট কি দশটি শ্রোতা নির্বোধ দৃষ্টি মেলে তার কথা শুনছিল এবং কথা শেষ হওয়ার পর তারা ঠিক ইংল্যান্ডের কোন ধর্মানুষ্ঠানে যোগদানকারীদের মত স্বাধীনভাবে রাজপথ অতিক্রম করে চলে যায়। সেটা ছিল মে মাস এবং বৃদ্ধ প্রচারক আসন্ন উৎসবের ত্রুটি সম্পর্কে তীব্র ভাষায় নিন্দা করছিলেন। কারো মনে আঘাত লাগতে পারে সে দিকে ভ্রুক্ষেপহীনভাবে তিনি তার শ্রোতাদের বলেন যে, তারা তো পুরানো মনের উপর নতুন পোশাক পরিধান করবে। কোরআনের সহজ সরল সত্যবাণী হৃদয়ঙ্গম না করা পর্যন্ত তারাতো বাঙ্গালী কাফেরদের মতই ঢোল-করতাল বাজিয়ে উৎসব করবে এবং মহররমের সকল উৎসব তার নকল যুদ্ধ, উৎকট মাতম ধ্বনি আদিম মাতামাতি- এ সবই তো আল্লাহ ও তার রাসূলের কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয়।
পশ্চিম বাংলার নিজন গ্রামের মুসলমানরা এমন মাটিতে বাস করে যা নাকি কোন সংস্কারকের বীজ বচনের জন্য মোটেই উর্বর নয়; এবং দেখা গেল বৃদ্ধের কথা শুনে উঠে যাওয়ার পর শ্রোতারা তার সাথে একমত হতে পারেনি, যদিও তাদের নিজেদের মধ্যে মতের বিভিন্নতা ছিল। একজন মন্তব্য করল: এ লোকটা চায় না যে, আমরা আমাদের বাপের কবরে বাতি জ্বালাই। আর একজনের মন্তব্য: আমাদের মেয়েদের বিবাহানুষ্ঠানে বাদ্য বাজনা এবং মহিলাদের নাচ গান তিনি বন্ধ করতে বলেন। তৃতীয় ব্যক্তির মন্তব্যটা কিঞ্চিৎ অনুকূল। এ সত্বেও কোরআনের ৭৭ হাজার ৬শ ৩৯টি শব্দ তার মুখস্থ। তিনিই ঠিকই বলেছেন যে, “কোরআন আমাদেরকে শুধু আল্লাহর উপাসনার শিক্ষাই দিয়েছে, সত্যি তিনি একজন আইনের ডাক্তার।” তৃতীয় ব্যক্তির মত খণ্ডন করেন যিনি, তিনি একজন মোল্লা বা মসজিদের মুয়াজ্জিন। প্রামান্যতার সাথে স্বীয় বক্তব্য পেশ করে তিনি আলোচনার যবনিকা টানলেন। তিনি বললেন, এই লোকটা হচ্ছে একজন জাল ইমামের সাগরেদ, ঐ জাল ইমাম অস্ত্রবলে পবিত্র নগরী দখল করেছিল। হজ্জের পথ বন্ধ করে দিয়েছিল এবং পবিত্র কাবাগৃহের দরজার উপর লিখেছিল এক আল্লাহ ছাড়া আর কেউ উপাস্য নেই এবং সউদ তার প্রেরিত নবী (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু সউদ রাসুলুল্লাহ) ।
মোট কথা, প্রচারকের উপদেশ একেবারে মাঠে মারা যায় এবং তিনি নিজেও তা জানতেন; সমেবত জনতা প্রস্থান করার পর মাত্র দুই ব্যক্তি সেখান থেকে গেল; তাদের শরীরে কাদামাটি মাখা ছিল এবং মনে হয় তারা প্রচারকটির সহযাত্রী। কিছুক্ষণের মধ্যে বৃদ্ধ প্রচারক ঘুমিয়ে পড়লে কর্দমাক্ত দুব্যক্তি পালাক্রমে তাকে বাতাস করতে থাকে। অভুক্ত ঘোড়াটি তার চার পাশের শুকনো ঘাস চিবানো শেষ করে গাছের ছায়ায় দাড়িয়ে ঘুমিয়ে নিল। সন্ধ্যায় আবহাওয়া ঠান্ডা হলে তারা সকলের অগোচরে সেখান থেকে প্রস্থান করে বৃদ্ধ ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে এবং কর্দমাক্ত দুই সহযাত্রী তার পাশ দিয়ে পায়ে হেটে।
এটা অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে, ভারতীয় ওয়াহাবীরা একটা বিরাট সম্প্রদায়ের এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ-মাত্র। অকৃতকার্য ওয়াহাবী প্রচারকটি হচ্ছেন এই মুহূর্তে গোটা এশিয়ার পরিভ্রমণরত হাজার হাজার একনিষ্ঠ মানুষের একজন প্রতিনিধি। কখনও লোকের কাছে তিনি স্বীকৃতি পান, আবার কখনওবা কোন মসজিদে তাকে অবজ্ঞা করা হয়। তিনি বিভিন্ন ভাষায় কথা বলেন, কিন্তু তিনি হচ্ছেন একজন উৎসর্গিত প্রাণ সংস্কারক। মুহাম্মদ (সা:) এর ধর্মমতকে পরিশুদ্ধ করাই যার জীবনের ব্রত, যেমন হিল্ডব্রান্ডের পাদ্রীরা রোমের চার্চকে পরিশোধিত করেছিলেন।
ভারতে ব্রিটিশ সরকারের এটা একটা দুর্ভাগ্য যে, ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনকে বিধর্মী বিজেতাদের বিরুদ্ধে উত্তেজনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যের সাথে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। সব দেশে মুসলমানরা তাদের ধর্মবিশ্বাসের প্রাথমিক নীতিগুলো কার্যকরী করতে প্রয়াসী হলে সেটা অনিবার্যভাবে শাসক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের রূপ পরিগ্রহ করে। এমনকি সর্বাধিক রক্ষণশীল মুসলিম রাষ্ট্রকেও বেসামরিক প্রশাসনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য ঐসব নীতির পুনর্বিন্যাস করতে হয়েছে। ইসলামের শক্ত ঘাটি মক্কা সম্পর্কেও বলা যায় যে, সারা বিশ্বের মধ্যে সেখানকার মুসলমানদের সবচেয়ে ঘৃণা ও ভয়ের চোখে দেখা হয়। শেষের কয়েকটি পাতায় আমি একজন নম্র স্বভাবের ওয়াহাবী প্রচারকের বিষয় উল্লেখ করেছি; কিন্তু তাদের অধিকাংশই নিম্নশ্রেণীর স্বধর্মীয়দের ধর্মান্ধতাকে রাজদ্রোহের কাজে লাগিয়ে বেচে আছেন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মুসলমানদের পুরনো বিদ্বেষের কিছু নমুনা এখানে পেশ করছি। ধর্মযুদ্ধ হচ্ছে, মুসলমানদের প্রাথমিক কর্তব্য; কেউ যদি বলে যে, বর্তমানে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা অবাস্তব পরিকল্পনা, তখন জওয়াব দিয়ে বলা হয়, তাহলে দেশ ত্যাগ করে যাওয়াই একমাত্র বিকল্প ব্যবস্থা। বিধর্মী সরকারের শাসন যতদিন চলবে ততদিন এদেশ এবং এদেশের মাটিতে যা কিছু গজায় তার সবকিছুতেই অপবিত্র মনে করা হয়। ধর্মযুদ্ধের অপরিহার্যতা সম্পর্কে ওয়াহাবীরা যেসব গদ্য বা পদ্য রচনা করেছে তার কিছু নমুনা ইতিপূর্বেই আমি পেশ করেছি। অনন্তকালের শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য বিধর্মী শাসিত দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য পূর্ববঙ্গের অজ্ঞ কৃষকদের উসকানী দেয়ার উদ্দেশ্যে ওয়াহাবীরা যেসব যুক্তি প্রয়োগ করে থাকে তার কিয়দংশ এখানে উদ্ধৃত করছি:
“পরম ক্ষমাশীল করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। তিনিই হচ্ছেন সারা বিশ্বজগতের পালনকর্তা প্রভু। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সঃ) এর উপর, তার সকল আসহাব, বংশধর ও অনুসারীদের উপর আল্লাহর অশেষ করুণা ও শান্তি বর্ষিত হোক। সকলেই অবগত আছেন যে, কোন দেশ যদি বিধর্মী শাসকের অধীনস্থ হয়ে পড়ে এবং শাসনশক্তি যদি মুসলমানি আইন কার্যকরী করতে বাধা দেয় তাহলে মুসলমানদের পক্ষে সে দেশ থেকে হিজরত করা অপরিহার্য কর্তব্য। এর ব্যতিক্রম হলে মৃত্যুর সময় আত্মা যখন দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে তখন অশেষ শাস্তি ভোগ করতে হবে। দেহ থেকে আত্মাকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে আজরাইল উপস্থিত হয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন: তোমাদের এই বাস্তুভিটা ত্যাগ করে অন্য দেশে বসবাসের জন্য আল্লাহর রাজ্য কি পর্যাপ্ত ছিল না? এবং একথা বলে কঠিন আযাবের সাথে তিনি তাদের দেহ থেকে আত্মা বিচ্ছিন্ন করবেন। তারপর তাদের উপর শুরু হবে বিরামহীন গোর আযাব এবং মহা বিচারের দিনে তাদেরকে দোজখে নিক্ষেপ করা হবে, যেখানে তারা অনন্তকাল ধরে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহ করুন মুসলমানদের যেন বিধর্মী শাসিত দেশে মৃত্যুবরণ না করতে হয়।”
“তোমরা এখনই হিজরত কর। এমন দেশে চলে যাও যার শাসক মুসলমান এবং সেখানে মুসলমানদের শাসনে জীবনযাপন কর। জীবিত অবস্থায় সেখানে পৌছাতে পারলে তোমাদের জীবনের সকর পাপ মাফ হয়ে যাবে। জীবনধারণের উপকরণ সম্পর্কে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ো না; আল্লাহই রিজিকের ব্যবস্থা করবেন।”
“পবিত্র গ্রন্থে লেখা আছে, একজন ইসরাইলী নিরানব্বইটি মানুষকে হত্যা করার পর জনৈক আল্লাহওয়ালা সাধু ব্যক্তির কাছে গিয়ে সকল অপরাধ স্বীকার করে এবং কি করে তার পাপমোচন হবে তা জানতে চায়। উত্তরে আল্লাহওয়ালা ব্যক্তিটি বলেন: যদি কেউ অন্যায়ভাবে একজন মানুষও হত্যা করে তবে তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে তোমার পাপ মাফ হবে না এবং তোমাকে অবশ্যই দোজখে যেতে হবে। একথা শুনে ইসরাইলী ব্যক্তিটি বলল, আমার দোজখ গমন যখন সুনিশ্চিত তখন আমি একশটি হত্যা পুরা করার জন্য আপনাকেও হত্যা করব। সে তখন ঐ সাধু ব্যক্তিকে হত্যা করে এবং তারপর আর একজন সাধু ব্যক্তির কাছে গিয়ে একশটি নরহত্যার কথা স্বীকার করে কিভাবে এই পাপমোচন হবে তা জানতে চায়। আল্লাহওয়ালা সাধু ব্যক্তি জওয়াবে বললেন, অনুতাপ করে এবং বিধর্মীদের দেশ ত্যাগ করে অন্য দেশে চলে গিয়ে। একথা শুনার পর সে তার কৃতকার্যের জন্য তওবা করে এবং স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে যাত্রা করে। পথিমধ্যে সে মৃত্যুর সম্মুখীন হয় এবং তার জান কবজ করার জন্য ক্ষমার ফেরেশতা ও শাস্তির ফেরেশতা উভয়ে হাজির হন। ক্ষমার ফেরেশতা বলেন যে, তিনিই ঐ লোকটির জান কবজ করবেন, কারণ সে তার পাপ কাজের জন্য অনুশোচনা করেছে, এবং হিজরত সম্পন্ন করেছে। শাস্তির ফেরেশতা বলেন যে, লোকটি যদি ভিন দেশে যেয়ে পৌছাতে পারত তাহলে ক্ষমার ফেরেশতা তার জান কবজ করতে পারতেন, কিন্তু যেহেতু লোকটি বিশ্বাসীদের দেশে গিয়ে পৌঁছে হিজরত সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছে, সুতরাং তিনিই তার জান কবজ করার অধিকারী, এবং দেহ থেকে আত্মাকে বিচ্ছিন্ন করার সময় তিনি তাকে কষ্টও দেবেন। অতঃপর লোকটি যে জমিনে শয্যাশায়ী ছিল ফেরেশতা দুজন সেটাকে মেপে দেখেন যে, তার এক পা সীমানা অতিক্রম করে ইসলামী রাজ্যের অভ্যন্তরে পড়েছে। এরপর ক্ষমার ফেরেশতা দাবি করেন যে, তিনিই জান কবজের অধিকারী এবং তদানুসারে কোন কষ্ট না দিয়ে তিনি লোকটির আত্মাকে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করেন এবং মৃত্যুর পর লোকটির আল্লাহর অনুগ্রহভাজনদের অন্তর্ভুক্ত হয়। ধর্মীয় কারণে হিজরতকারীরা পরলোকে কিরূপ পুরস্কার লাভ করবেন তা তোমরা শুনেছ। সুতরাং আল্লাহর রহমতের জন্য প্রার্থনা কর। যাতে করে অনতিবিলম্বে হিজরত সম্পন্ন করে কাফেরদের দেশে মৃত্যু বরণের শোচনীয় পরিণতি থেকে রেহাই পেতে পার (ক্যালকাটা রিভিউ, ৭ম খন্ড, ৩৮৮-৩৮৯পৃষ্ঠা থেকে সংগৃহীত) ।
অজস্র রাজদ্রোহমূলক সাহিত্য, পাটনায় অবস্থিত কেন্দ্র প্রচার কেন্দ্রে এবং সারা বাংলার আনাচে কানাচে প্রচারকদের আনাগোনা ছাড়াও জনগণের কাছে রাজদ্রোহমূলক কাজের উৎসাহ সৃষ্টির জন্য ওয়াহাবীরা একটি চতুর্থ সংগঠনও গড়ে তুলেছে। প্রাথমিক খলিফারা যেসব এলাকায় অনুকূল সাড়া পাওয়া যাবে, সেখানেই প্রচারকদের স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছিলেন। এইভাবে পল্লিবাংলার বিভিন্ন স্থানে এক ধরনের বিদ্রোহী কলোনি গড়ে উঠেছে। জেলায় জেলায় গড়ে উঠা এইসব বিদ্রোহী কলোনি যাতে স্বয়ং-সম্পূর্ণভাবে কাজ চালাতে পারে সে জন্য অর্থ লোক সংগ্রহের নিজস্ব সংগঠন তাদের আছে এবং পাটনার কেন্দ্রীয় প্রচার কেন্দ্রের সাথে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। ১৮৭০ সালে অনুরূপ একটি জেলা কেন্দ্র ভেঙ্গে দেওয়া হয় এবং নিরপেক্ষ বিচারের পর কেন্দ্রীয় প্রধান প্রচারকের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও যাবতজীবন দ্বীপান্তরে দণ্ডিত করা হয়। এই মামলায় উদঘাটিত সাক্ষ্যপ্রমাণ যে কোন বৈদেশিক সরকারের জন্য শিক্ষণীয়। কারণ এতে তারা দেখতে পাবেন যে, ব্রিটিশ ভারতীয় সরকারের চেয়ে তাদের নিজস্ব প্রশাসনিক সংহতি কম বিপন্ন নয়।
প্রায় ত্রিশ বছর পূর্বে এক খলিফা (লক্ষৌর অধিবাসী আবদুর রহমান, প্রথম আমলের অন্যতম খলিফা বেলায়েত আলী তাকে খলিফা পদে নিযুক্ত করেন), ধর্মীয় প্রচারের উদ্দেশ্যে দক্ষিণ বঙ্গের মালদহ জেলায় আসেন। জায়গাটা অনুকূল দেখে তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন এবং স্থানীয় একটি মেয়েকে বিবাহ করে তিনি স্কুল শিক্ষকের পেশা গ্রহন করেন। ছোট ভূস্বামীদের ছেলেমেয়েরা বিদ্যার্জনের জন্য ঐ শিক্ষিত ব্যক্তির শরণাপন্ন হয় এবং এভাবে জেলায় ভূস্বামী পরিবারগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থানীয় লোকদের মধ্যে তিনি জোরে সরে রাজদ্রোহমূলক প্রচার চালাকে থাকেন। ধর্ম যুদ্ধের জন্য নিয়মিত চাঁদা উঠাতে থাকেন এবং সীমান্তের বিদ্রোহী শিবিরে সরবরাহের উদ্দেশ্যে পাটনায় প্রচারকেন্দ্রে প্রতি বছর নিয়মিত অর্থ ও লোক পাঠাতে থাকেন। তার একজন চাঁদা আদায়কারী(রফিক মণ্ডল) ছিলো নিম্ন শ্রেণীর চাষী। কিন্তু তিনি তাকে শিক্ষিত করে তুলে প্রভাবশালী ও অত্যুৎসাহী সাগরেদে পরিণত করেন। সংগ্রহীত চাঁদার এক-চতুর্থাংশ তাকে পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া হত এবং ক্রমান্বয়ে সে একজন গ্রাম্য মাতব্বরের মর্যাদায় উন্নীত হয়। অনেক বছর ধরে এই কাজে লিপ্ত থাকার পর ১৮৫৩সালে তার সম্পর্কে ম্যাজিস্ট্রেটের সন্দেহের উদ্রেক হয়। ফলে তার গৃহ তল্লাশী করা হয় এবং এমন সব চিঠি প্রাপ্ত উদ্ধারপ্রাপ্ত হয় যা থেকে তার তার রাজদ্রোহমূলক কার্যকলাপ এবং ধর্মযুদ্ধের জন্য সীমান্ত শিবিরের সাথে তার যোগাযোগ প্রমাণ পায়। অল্প কিছুদিন আগেই উক্ত সীমান্ত শিবির থেকেই পাঞ্জাবে অভ্যুত্থান ঘটাবার চেষ্টা চলে (১৮৫২ সালে একটি ভারতীয় পদাতিক বাহিনীকে বিদ্রোহীরা বশীভূত করে এবং বিদ্রোহীদের তৎপরতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত পাটনার ম্যাজিস্ট্রেট রিপোর্ট পেশ করেন, তারপর পাটনার শহরে বিদ্রোহী শক্তির প্রাধান্য বিনষ্ট করার জন্য কর্তৃপক্ষ সশস্ত্র ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়)।
জেলা কেন্দ্রে পরিচালককে গ্রেফতার করা হয়, কিন্তু ছোটখাটো বিদ্রোহাত্মক কার্যকলাপ সম্পর্কে আমাদের নমনীয় নীতির বদৌলতে অল্প দিনের মধ্যেই তিনি মুক্তি পেয়ে যান। অবশ্য অল্প কয়েকদিনের কারাবাসের ফলশ্রুতি হিসাবে তিনি বিদ্রোহী তৎপরতার জন্য চাঁদা সংগ্রহের কাজ থেকে ইস্তফা দিয়ে ঐ কাজের দায়িত্ব তার ছেলের (মালদহ জেলার মৌলভী আমিরুদ্দীন) উপর ন্যস্ত করেন। উত্তরাধিকারী নিজেকে এই দায়িত্বের উপযুক্ত বলে প্রমাণ করেন। তার বিরুদ্ধে আনীত মামলায় সরকার পক্ষের ভারপ্রাপ্ত অফিসারের নিরপেক্ষ মন্তব্য (১৮৭০ সালের মালদহ মামলায় সরকারী নথির সাথে পেশকৃত রিপোর্ট) উদ্ধৃত করে বলা যায়: প্রথম থেকে বিচারের সময় পর্যন্ত ধর্মযুদ্ধের জন্য লোক সংগ্রহ করার কাজে তিনি আন্তরিক নিষ্ঠার পরিচয় দেন। জেলা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনরূপ বাধা না পেয়েই তিনি এসব কাজ করেন। ভারতে কর্তব্যরত ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের শাসিত জনসাধারণের ধর্মবিশ্বাস এবং কুসংস্কার হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকাই সঙ্গত মনে করেন। সুতরাং ধর্মীয় আবরণে রাজদ্রোহমূলক কাজ চালানো বেশ সহজ। কিন্তু ১৮৬৫ সালে পাটনার মামলায় (মামলায় সেশন আদালত রাজদ্রোহের দায়ে মৌলভী আহমদুল্লাহকে প্রাণদণ্ড দণ্ডিত এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নিদেশ দেয়। পরে প্রাণদণ্ডাজ্ঞার পরিবর্তে যাবতজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ তথ্য প্রকাশিত হয় যে, ষড়যন্ত্রের সাথে মালদাহ জেলা কেন্দ্রের প্রত্যক্ষ অবদান ছিল। এই হুশিয়ারি সত্বেও সীমান্তে শিবিরের যুদ্ধে সাহায্যের জন্য তিনি অর্থ ও লোকজন সংগ্রহ অব্যাহতভাবে চালিয়ে যান। তিনি গ্রামে গ্রামে সফর করে বিদ্রোহের মন্ত্র প্রকাশ্যে প্রচার করেন এবং ১৮৬৮ সালে জনসাধারণের মধ্যে নিরুৎসাহের ভাব দেখতে পেয়ে উৎসাহ পুনরুজ্জীবিত করার কাজে তাকে সাহায্য করার জন্য পাটনা থেকে খলিফার পুত্রকে আনিয়ে নেন। তার কার্যসীমা তিনটি পৃথক জেলা (সমগ্র মালদাহ জেলা এবং মুর্শিদাবাদ ও রাজশাহী জেলার অংশসহ) পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হয় এবং গঙ্গা নদী দিয়ে কয়েকদিনের নৌভ্রমণে যতগুলো গ্রাম ও দ্বীপ অতিক্রম করতে হয়, তার সবগুলোতে বসবাসকারী মুসলমান কৃষকরা তার নিয়ন্ত্রণে এসে যায়। যাদেরকে রিক্রুট করে তিনি সীমান্তে শিবির পাঠান তাদের সঠিক সংখ্যা কখনও নিরূপণ করা সম্ভব নয়। তবে দেখা গেছে যে, সীমান্তে একটি বিদ্রোহী উপকেন্দ্রে উপস্থিত ৪৩০ জন যোদ্ধার শতকরা দশভাগেরও বেশী তার এলাকা থেকে প্রেরিত হয়েছে।
তার প্রবর্তিত অর্থ সংগ্রহ ব্যবস্থাটা সহজ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিলো। গ্রামগুলোকে বিভিন্ন আর্থিক এলাকায় বিভক্ত করে প্রত্যেক এলাকার জন্য একজন করে প্রধান ট্যাক্স আদায়কারী নিয়োগ করা হয়। এই অফিসারটি আবার প্রতি বাড়ি থেকে কর সংগ্রহের জন্য প্রতি গ্রামে একজন করে আদায়কারী নিয়োগ করেন। তাদের আদায়কৃত তিনি হিসাব মিলিয়ে নিয়ে জেলা কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিতেন। প্রতি গ্রামে একজন করে ট্যাক্স আদায়কারী নিয়োগ করা হয় এবং তার মধ্যে একজন মৌলবি (দীন-কে সরদার) থাকতেন যিনি নামাজে ইমামতি করা ছাড়াও কর আদায় করতেন। একজন জেনারেল ম্যানেজার (দুনিয়া-কে সরদার) রাখা হয় যিনি মুসলমানদের দুনিয়াবি কাজের তদারক করতেন। এ ছাড়াও একজন অফিসার (ডাক-কে-সরদার) থাকতেন যার কাজ ছিলো বিপদজনক চিঠিপত্র বিলিবন্টন ও রাজদ্রোহমূলক কাজের খবরাখবর আদান-প্রদান করা।
চার রকমের চাঁদা সংগ্রহ করা হত। প্রথমটি ছিল, চান্দ্র বছরে কোন লোকের অধিকারে যত রকমের সম্পত্তি থাকতো তার শতকরা আড়াইভাগ কর হিসেবে আদায় করা। একে বলা হত আইনসংগত চাঁদা (যাকাত) এবং প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এই অর্থ কাফেরদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধে ব্যয়িত হয়। কেবলমাত্র নিদিষ্ট সীমার অতিরিক্ত সম্পদের মালিকদের উপর এই কর ধার্য করা হয় এবং পাটনার খলিফা (এনায়েত আলী) সীমান্ত শিবির থেকে প্রত্যাবর্তনের পর দেখতে পান যে, এই অর্থ ধর্মযুদ্ধ চালাবার জন্য যথেষ্ট নয়। দুঃস্থ লোকদের সাহায্যের জন্য এতকাল ধরে মসজিদে যেসব দানখয়রাত জমা করা হত তিনি তা বাজেয়াপ্ত করে ধর্মযুদ্ধে ব্যয় করার ব্যবস্থা করেন। মুসলমানদের সর্বশ্রেষ্ঠ বার্ষিক উৎসব উপলক্ষে ধর্মীয় কর্তব্য হিসাবে এই দান সংগৃহীত হত। একমাস কৃচ্ছতা ও উপবাস (রমযান) পালনের পর ধর্মীয় আনন্দোৎসব (ঈদুল ফিতর অথবা রমযান কি ঈদ) উদযাপিত হয়: ধর্মপ্রাণ মুসলমান মনে করে, ঈদের নামায পড়ার জন্য মসজিদে যাওয়ার আগেই গরীবদের মধ্যে দানখয়রাত বিতরণ করতে হবে, নইলে তার গত ত্রিশ দিনের কৃচ্ছতা ও উপবাস আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। এই দান খয়রাতকে (ফিতরা) পাটনার খলিফা ধর্মযুদ্ধের কাজে নিয়োজিত করেন। এর পরেও তিনি এমনি একটা নতুন কর ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেন, যার আওতা থেকে দরিদ্রতম ব্যক্তিও রেহাই পেতে পারেনা। তিনি নিদেশ জারি করেন যে, প্রত্যেক পরিবারের কর্তা তার পরিবারের সদস্যদের প্রত্যেকের প্রতিবারের খাদ্যে থেকে একমুষ্টি করে আলাদা করে রাখবেন (মুঠি) এবং প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজান্তে তা গ্রাম্য আদায়কারীর কাছে জমা দিবেন। এভাবে সংগৃহীত খাদ্যশস্য বিক্রি করে লব্ধ অর্থ ধর্মযুদ্ধের কাজে পাঠানো হত। অবশ্য, ধর্মীয় ট্যাক্স আদায়কারীদের যত প্রকারের কর আদায়ের ক্ষমতা ছিল, উপরোল্লিখিতগুলো তার একটা ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। নব দীক্ষিত ব্যক্তিদের উৎসাহ উদ্দীপনায় যাতে ভাটা না পড়ে সেদিকে খলিফার সজাগ দৃষ্টি ছিল। আদায়কারীরা তাদের অধিকারের বস্তু হিসেবে নিয়মিত যে কর আদায় করতেন তার উপরেও তিনি আর এক ধরনের অতিরিক্ত মাশুল ধার্য করেন। যাকে নিয়মিত আদায়কৃত স্বেচ্ছাধীন চাঁদা হিসেবে অভিহিত করা হয়। প্রধান ট্যাক্স আদায়কারী বছরের শেষে তার এলাকাবাসী গ্রামসমূহ সরেজমিনে সফর করে নিশ্চিত হতেন যে, প্রত্যেক পরিবার গত বারো মাসে দেয় প্রতিটি কর ও চাঁদা ঠিকমত পরিশোধ করেছে।
সারা বাংলা জুড়ে কর আদায় ও লোক সংগ্রহ কাজে নিয়োজিত জেলা কেন্দ্রগুলোও সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে এবং দৃষ্টান্ত হিসেবে যে হতভাগ্য লোকটির প্রসঙ্গ আমি উল্লেখ করেছি তার মতো আরো বহু লোক ঐ কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। দক্ষিণ বঙ্গ থেকে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত অভিমুখে যে বড় রাজপথটি চলে গিয়েছে তার উপরেই তার সদর দফতর অবস্থিত এবং রাজদ্রোহমূলক কাজের প্রচারকরা যাতায়াতের সময় এটাকে তাদের বিশ্রাম শিবির হিসেবে ব্যবহার করে। সীমান্ত যুদ্ধে যে দুজন খলিফা (এনায়েত আলী ও মাকসুদ আলী) প্রাণ ত্যাগ করেন, তারাও এই বিশ্রাম শিবিরে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। বিদ্রোহী শিবিরের বর্তমানের অন্যতম নায়ক (ফৈয়াজ আলী) পথ অতিক্রমের সময় ঐ বিশ্রাম শিবিরে তার আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া পাটনা প্রচারকেন্দ্রের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন জেলা কেন্দ্রের নেতারাও সেখানে তার সাথে থেকেছেন। যে শহরে (নারায়ণপুর) তার এই কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয় সেটা আগে গঙ্গা নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ছিল। জায়গাটা জেলা সদর দফতর ও পুলিশ ফাঁড়ির বেশ দুরে। এমনকি, পরে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দরুন শহরটি ধ্বংস হওয়ার পর তাদের কাজের বিস্তৃতি সাধনের পথ আরো প্রশস্ত হয়। স্রোতের তোড়ে গঙ্গার দক্ষিণ তীরের এই জায়গাটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া ওয়াহাবী অধ্যুষিত গ্রামগুলোর কোন চিহ্নই আর অবশিষ্ট রইল না। বাসিন্দারা সব অন্যত্র চলে যায়; কেউ গিয়ে বসতি করে নদীর বাম তীরের নতুন চরে। অন্যরা অদূরবর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চর এলাকায় গিয়ে বাস্তুভিটা গড়ে তোলে। কিন্তু তারা সেখানে গিয়ে বসতি গেড়েছে, সেখানটাই বিদ্রোহী কার্যকলাপের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। নদীতে নতুন চর জেগে ওঠা মাত্রই সেটা ওয়াহাবী পল্লীতে পরিণত হয়ে রাজদ্রোহের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
সহজেই অনুমান করা যেতে পারে যে, স্থায়ী ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এসব বিদ্রোহী তৎপরতা ভারত সরকারের উৎকণ্ঠার যথেষ্ট কারণ সৃষ্টি করেছে। গত সাত বছরে ক্রমাগত একের পর এক রাজদ্রোহীরা গ্রেফতার হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছে। আমাদের সীমান্তে যেমন একের পর এক ধর্মযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তেমনি দেশের ভিতরেও বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা রুজু হয়েছে। বহু দূরবর্তী জেলাসমুহ থেকে ধৃত বিপুল সংখ্যক বন্দী এই মুহূর্তে বিচারের অপেক্ষায় হাজতে বাস করছে। একমাস পূবে এই বইটির প্রথম খন্ড প্রকাশিত হওয়ার পর পাঁচজন বিদ্রোহীর আরেকটি দল সেশন আদালত কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছে। যারা বিচারাধীন রয়েছে তাদের ছাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা তা এই মুহূর্তে বলা যায় না। কারণ ইতিমধ্যেই যারা দণ্ডিত হয়েছে তাদের অনেকের সাথে এদের নামের মিল দেখা যাচ্ছে। এসব রাষ্ট্রীয় মামলা ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দুর্ঘটনার স্বরূপ উদঘাটন করলেও মামলার বিবরণ থেকে প্রাপ্ত প্রমাণাদির বিস্তারিত উল্লেখ ব্যতিরেকে বাংলার বিদ্রোহী ষড়যন্ত্রের এই পুরানো ব্যাধির সাথে বিস্তারিতভাবে পরিচিত হওয়া সম্ভবপর নয়। সুতরাং যে সকল আসামীর বিচার এখনও শেষ হয়নি তাদের প্রসঙ্গ না টেনে (কারণ তাদের সম্পর্কে আলোচনা কররে বিচারকার্য ব্যাহত হওয়ার আশংকা রয়েছে) যেসব মামলার বিচার শেষে হয়ে গেছে তার একটি নিয়ে এখানে আমি কিছু আলোচনা করব,
১৮৬৪ সালের মামলাটা ছিল ১৮৬৩ সালের ধর্মযুদ্ধের স্বাভাবিক ফলশ্রুতি পূর্ববর্তী কয়েক বছরের অনেক মামলার মত এটা মুষ্টিমেয় ভারতীয় সিপাহীর বিদ্রোহ কিংবা দু-চারজন রাজদ্রোহীর বিক্ষিপ্ত কার্যকলাপের মত ছোটখাটো ব্যাপার ছিল না; বরং এটা ছিল বিভিন্ন প্রদেশে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা। যাদের কার্যকলাপের গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের উপযোগী দক্ষ সংগঠন রয়েছে। ১৮৬৪ সালের জুলাই মাসে আম্বালার সেশন জজ স্যার হাবার্ট এডওয়ার্ডস একটি রাষ্ট্রীয় মামলার রায় প্রদান করেন; রায় ঘোষণার আগে মামলাটির বিশ বার শুনানী হয়। মামলায় মহামান্য রানীর এগারজন মুসলমান প্রজার বিরুদ্ধে ঘোরতর রাজদ্রোহের অভিযোগ আনীত হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে মুসলমান সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর প্রতিনিধিরা ছিল। যেমন অত্যন্ত উচ্চ বংশোদ্ভূত ধর্মগুরু; একজন সামরিক কন্ট্রাক্টর ও কসাই খানার মালিক; একজন দলিল লেখক; একজন সৈনিক; একজন পেশাদার প্রচারক; একজন গৃহভৃত্য; এবং একজন কৃষক। একজন ইংরেজ কৌসুলি আদালতে তাদের পক্ষ সমর্থন করেন এবং আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের যাবতীয় সুযোগ তাদের ছিল। বিচারকের সাহায্যকারী হিসেবে ছয়জন ভারতীয় জুরী ছিলেন। বিচার শেষে অভিযুক্তদের আটজন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অবশিষ্ট তিনজন আইনের সর্বশেষ দন্ড লাভ করে।
ভারতের বিরাট উত্তরাঞ্চলীয় প্রেসিডেন্সীর অধিবাসদের মধ্যে গাত্র বর্ণ ও ভাষাগত বৈচিত্র্য রয়েছে; এবং একজন ইতালীয়ের পক্ষে ইংরেজী পরিচয় দিয়ে লন্ডন অতিক্রম করা যত সহজ, একজন বাঙ্গালীর পক্ষে পাঞ্জাবী পরিচয় দিয়ে পেশোয়ার অতিক্রম করা তেমন সহজ নয়। ১৮৫৮ সারের সীমান্ত সংঘর্ষে আমাদের অফিসাররা লক্ষ্য করেন যে, যুদ্ধে নিহতদের অনেকের চেহারায় দক্ষিণ বঙ্গের জলাভূমি অধ্যুষিত এলাকার কাল বা শ্যামল বর্ণের সৌসাদৃশ্য রয়েছে। এ নিদর্শনের অনুবর্তন তৎক্ষণাৎ সম্ভব হয়নি। অভিযান শেষে অনিয়মিত অশ্বারোহীদের সংখ্যা হ্রাস করা হয় এবং যোগ্য লস্করদের অনেককে অশ্বারোহী পুলিশ বাহিনীতে ভর্তি করা হয়। তাদের একজন ছিল পাঞ্জাবী মুসলমান (গুজান খান) এবং অতিশীঘ্র সে আম্বালার নিকটবর্তী একটা জেলায় (কর্নেল) সার্জেন্ট পদে উন্নীত হয়। ১৮৬৩ সালের মে মাসে একদিন সকালে টহল দানের সময় সে উত্তরের মহাসড়ক দিয়ে গমনরত চারজন বিদেশীকে দেখতে পায়। তাদের খর্বাকৃতি, কালচে রং এবং নাতিদীর্ঘ দাড়ি দেখে বৃদ্ধ সৈনিকটির মনে পড়ে যায় যে, ১৮৫৮ সালের যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত বাঙ্গালী বিদ্রোহীদের যে সকল লাশ সে দেখেছিল তাদের আকৃতিও ঠিক এই রকম ছিল। সে তাদের সাথে কথাবার্তা শুরু করে তাদের গোপন তথ্য কিছু অবগত হয় এবং জানতে পারে যে, তারা মুলকা থেকে আগত বাঙ্গালী প্রচারক, বিদ্রোহী শিবিরে পাঠাবার জন্য নতুন করে অর্থ ও লোকজন সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তারা নিজ প্রদেশে ফিরে যাচ্ছে।
দীর্ঘদেহী উত্তরাঞ্চলীয় সৈনিকটি তৎক্ষণাৎ উক্ত চারজন রাজদ্রোহীকে গ্রেফতার করে। তারা মুসলমান ভাই হিসেবে তার কাছে আবেদন জানিয়ে বলে যে, তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হলে উৎকোচ হিসেবে সে যা চাইবে তাই দেওয়া হবে এবং পার্শ্ববর্তী থানেশ্বর বাজারে জাফর খান নামক জনৈক দূতের মারফত উৎকোচ প্রদানের প্রস্তাব করে। কিন্তু বৃদ্ধ সৈনিকটি নিমকহারামি করতে সম্মত না হয়ে ধৃত ব্যক্তিদের তৎক্ষণাৎ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সোপর্দ করে। সন্দেহের কোন অবকাশ নেই যে, ম্যাজিস্ট্রেট তাদেরকে সঙ্গে সঙ্গে হাজতবন্দী করে বিচারে সোপর্দ করলে গোটা ষড়যন্ত্রটা উদঘাটিত হয়ে পড়ত এবং তার ফলে ধর্মান্ধরা আর আমাদের মূল বাহিনীর উপর হামলা করার সুযোগ পেত না এবং একটা বড় রকমের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রেহাই পেতে পারত। কিন্তু সে সময় গোটা সাম্রাজ্য শান্তি বিরাজিত ছিল থানেশ্বর একটা অভ্যন্তরীণ শান্ত জেলা; বড় রকমের রাজদ্রোহ ছিল বিরল ঘটনা এবং অর্থ আদায়ের জন্য ভারতীয় পুলিশ কর্তৃক মিথ্যা অভিযোগ আনয়ন ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। সুতরাং ম্যাজিস্ট্রেট উক্ত চারজন শান্তিপ্রিয় পথিককে বিচারে সোপর্দ করতে অস্বীকার করে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিলেন যার ফলে দোষ প্রমাণের শতকরা নিরানব্বই ভাগ সম্ভাবনা আছে এমন লোকেরা খালাস পেয়ে যায়। আর সেটা ছিল অনুরূপ একশতম ঘটনার মধ্যে একটি।
ধৃত লোকগুলো মুক্তি পাওয়ায় অশ্বারোহী পুলিশের সার্জেন্ট ভয় পেয়ে যায়। তার রিপোর্ট সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে এ কথা ভেবে তার পাঞ্জাবী মনে ভীষণ আঘাত রাগে এবং তখনও সে এই বিশ্বাসে অবিচল ছিল যে, সাম্রাজ্যের উপর এক ভীষণ বিপদ নেমে আসছে।
সে এমন একটা পরিকল্পনা উদ্ভাবন করে যা নাকি স্পার্টানদের সহিষ্ণুতা এবং রোমকদের প্রভুভক্তি সংক্রান্ত কিংবদন্তীকে প্রায় ছাড়িয়ে যায়। ছুটি মঞ্জুর না করিয়ে চাকরি ছেড়ে যাওয়া দলত্যাগের শামিল; কিন্তু সুদূর উত্তরে স্বগ্রামে তার ছেলে ছিল এবং একমাত্র পারিবারিক মর্যাদা ছাড়া দুনিয়ার আর যে কোন বস্তুর চেয়ে ছেলেটি ছিল তার সর্বাধিক প্রিয়। তার গ্রাম এবং সীমান্তের মধ্যবর্তী এলাকায় আমাদের অনেকগুলো ঘাটি ছিল এবং প্রত্যেক ঘাটির সৈনিকরা সন্দেহভাজন পথিক ও আত্মগোপনকারী বিদ্রোহীদের ধরার জন্য সদা সর্তক ছিল। সীমান্তের অপর পার্শ্বে ছিল ধর্মান্ধ বিদ্রোহীদের ঘাটি, যারা তখন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হামলা চালাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। কাজেই কোন সন্দেহভাজন নবাগতকে দেখতে পেলে তারা নিঃসন্দেহে তাকে সরকারী বাহিনীর গুপ্তচর মনে করে হত্যা করবে এটা ছিল অবধারিত। আমাদের বাহিনীর নজর এড়িয়ে যেতে পারলেও সীমান্তের ওপারে ওয়াহাবীদের হাতে ধরা পড়লে তার ছেলে যে রেহাই পাবে না একথা সম্যক অবগত হওয়া সত্ত্বেও বৃদ্ধ সিপাই পারিবারিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার প্রাণপ্রিয় ছেলেকে মুলকা গমনের নিদেশ দিয়ে বলে যে, বাইরের বিদ্রোহীদের সাহায্যার্থে আমাদের এলাকার মধ্যে যে সব রাজদ্রোহী কর্মরত রয়েছে তাদের নাম সংগ্রহ না করে সে যেন ফিরে না আসে।
পিতার চিঠি পেয়ে ছেলেটি পরের দিনই গ্রাম ত্যাগ করে। অন্তর্ধানের পর তাকে কী যে দুঃখকষ্ট সইতে হয়েছে তা শুধু তার স্বজনরাই জানে। কিন্তু পরে প্রমাণিত হয়েছে যে, ছেলেটি আমাদের ঘাটিতে প্রহরারত সৈনিকদের দৃষ্টি এড়িয়ে সীমান্ত শিবিরে গিয়ে পৌছাতে সক্ষম হয় এবং তারপর ওয়াহাবীদের চোখে ধুলো দিয়ে তাদের সাথে মিশে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহের পর ক্লান্ত হয়ে রোগজীর্ণ শরীরে একদিন সন্ধ্যায় কয়েকশ মাইল অভ্যন্তরে পিতার কুটিরে ফিরে আসে। সে এই গোপন তথ্য সংগ্রহ করে ফিরে আসে যে, থানেশ্বরের সেই মুনশী জাফর, লোকে যাকে খলিফা বলে ডাকে সে হচ্ছে ওয়াহাবী এজেন্ট এবং বাঙ্গালীদের সীমান্ত শিবিরের গমনাগমনে সাহায্য করা, তাদেরকে রাইফেল ও রসদ যোগানোই হচ্ছে তার কাজ। স্মরণ থাকতে পারে যে এই জাফরই হচ্ছে থানেশ্বর বাজারের সেই দলিল লেখক যে নাকি উপরোল্লিখিত চারজন পথিককে ছেড়ে দেয়া হলে সার্জেন্টকে ঘুষের টাকা সরবরাহ করত।
উপরোক্ত দৃঢ়চেতা পাঞ্জাবী পিতার কর্তব্যনিষ্ঠার মত আর কোন হৃদয়স্পর্শকারী ঘটনা আমার জানা নেই। সেদিন এমন একজন কর্তব্যনিষ্ঠ সিপাই যে গর্বভরে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে নীরবে বিড়বিড় করতে করতে প্রতিদিনের টহলদান কার্য সমাধা করেছে এবং ছেলের ভাগ্যে কি ঘটল না ঘটল সেই চিন্তায় প্রতি মাসে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বিদেশী প্রভুদের স্বার্থ রক্ষা এবং পারিবারিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে গিয়ে সে তার প্রাণ প্রিয় ছেলেকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
থানেশ্বর বাজারের দলিল লেখক জাফরের ব্যক্তিগত জীবনের ইতিহাস বেশ চিত্তাকর্ষক। অত্যন্ত দরিদ্রের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও চরিত্র গুণে সে তার শহরের প্রধান ব্যক্তি (লস্করদার, অথবা সরকারী অফিসারদের তদারককারী শহরের অর্থনৈতিক প্রতিনিধি) হিসেবে নিজের মর্যাদা উন্নীত করে। একদিন জনৈক পেশাদার ওয়াহাবীর বক্তৃতা শুনার সুযোগ তার ঘটে এবং এতে করে এই প্রতিপত্তিশালী লোকটির ধর্মীয় অনুভূতি জাগ্রত হয়, মসজিদে বিরাজমান কুসংস্কারাচ্ছন্ন আনুষ্ঠানিকতার প্রতি তার মন বিরূপ হয়ে ওঠে এবং জন বুনিয়ানের মত তার মানসনেত্রও নিদ্রোত্থিত হয়। অল্প দিনের মধ্যে সে নিজেকে ওয়াহাবী পরিচয় দিয়ে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনে নিজের সকল কর্মশক্তি উৎসর্গ করে।
নব দীক্ষিত এই ওয়াহাবী আত্মবিশ্লেষণে এবং আত্মানুসন্ধানে ব্যাপৃত হয়ে পড়ে। সে নিজের ধর্মীয় অভিজ্ঞতার উপর লিখতে শুরু করে এবং তার এ রচনাটি রাষ্ট্রীয় মামলায় পেশকৃত অন্যতম, চিত্তাকর্ষক দলিলে পরিগণিত হয়।
১৮৭৮ হিজরির ১৮ই যিলহজ্জ (জুন, ১৮৬২) মঙ্গলবার আমি এই বইটি লিখতে শুরু করি। কবে এ লেখা শেষ করতে পারব তা আল্লাহর মর্জির উপর নির্ভরশীল। বই লেখার জন্য কোন বিশেষ পদ্ধতি আমি অনুসরণ করিনি; ধম ও দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ত যেসব ঘটনার সাথে আমি জড়িত হতে পেরেছি কেবল সেই সব অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করছি। আমি এটা জানিয়ে দিতে চাই যে, এই দুনিয়া একটা ক্ষণস্থায়ী জায়গা, মানুষ, জ্বীন, গাছ-পালা, পশু-পক্ষী সবই নিদিষ্ট সময়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। একমাত্র আল্লাহই চিরঞ্জীবী। এ দুনিয়ার কোন বাসিন্দা যদি হাজার বছরও জীবিত থেকে থাকে তবু শেষ বিদায়ের সময় কেবল মনস্তাপ ছাড়া আর কিছুই সে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে না। আমার নিজের অবস্থাটা নিয়ে বর্ণনা করছি, দশ বছর বয়স পর্যন্ত বিদ্যার্জনের কোন সুযোগ আমি পাইনি। পিতার মৃত্যুর সময় আমর বয়স ছিল দশ কি বার বছর। আর আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতার বয়স তখন মাত্র ছমাস। এরপর আমরা মায়ের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠি, কিন্তু তিনি ছিলেন অশিক্ষিতা এবং ধর্মীয় শিক্ষাও তার তেমন কিচু ছিল না। বাল্যকালে লেখাপড়া শিখার কোন চিন্তা না করে আমি ভবঘুরের মত নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে থাকি; কিন্তু কিছুটা জ্ঞানোদ্রকে হওয়ার পর আমি পড়ালেখা শুরু করি।
১৮৫৬ সালে নিজেকে দলিল লেখকদের দলভুক্ত করি এবং অত্যল্প-কালের মধ্যে দেখতে পেলাম যে, সকল দলিল লেখক ও উকিলরা আইনের বিভিন্ন ধারা ও কার্যবিধি সম্পর্কে আমার পরামর্শ গ্রহন করছে এবং আমি তাদের শীর্ষস্থানীয় হয়ে উঠলাম। দলিল লেখকরা ছিল এক ধরনের আনরেজিষ্টার্ড ক্ষুদে আইনজীবী। তারা ম্যাজিস্ট্রেট কোটে মামলাকারীদের দরখাস্ত লিখে দিত এবং এজন্য ৬ পেন্স থেকে ২ শিলিং পর্যন্ত ফি পেত। জাফর প্রচুর অর্থ আয় করত; কিন্তু বিধর্মীর আদালতে লব্ধ আয় কোন কাজে আসবে না বলে তার মনে ধারনা সৃষ্টি হয়। এই জীবিকা গ্রহণের ফলে আমি আমার ধর্মবিশ্বাসের প্রচুর ক্ষতি করেছি। এই জীবিকা গ্রহণ না করলেই আমার ধর্মাত্মা গ্লানিমুক্ত থাকত। উপাসনা আরাধনার পথে আমার জীবিকা প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়ায় বলেই আমার ধারনা। যখন আদালতের কাজ থেকে দু-একদিনের জন্য বিশ্রাম পেতাম তখনই আমার মন ভাল থাকত। অবিশ্বাসী মুসলমান কামচারীদের সাথে নিছক সম্পর্ক স্থাপন করে আমার যে মর্যাদা অর্জিত হয় সেটা ছিল আমার আত্মবনতির কারণ।
এই জীবিকার প্রতি অনীহা থাকা সত্ত্বেও এ পেশায় জাফরের খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার কতিপয় প্রতিপত্তিশালী ভূস্বামী পরিবার তাকে তাদের পারিবারিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করে। তাকে খুব নিষ্ঠাবান বলে মনে হয় এবং পার্থিব জীবনের এই অস্থায়ী সাফল্যকে সে কখনও পারমার্থিব ও অনন্ত কল্যাণের বাধাস্বরূপ হতে দেয়নি। যে কেউ তার সান্নিধ্যে এসেছে সেই তার বশীভূত হয়ে পড়েছে এবং মুহাম্মদ (সা:) এর মত সেও নিজের পরিবারের সদস্যদের সংস্কার সাধনের মধ্য দিয়ে কাজ শুরু করেন। এদের মধ্যে একজন হচ্ছে তার কেরানী; চরম কার্যপদ্ধতি অনুসরণের সময়ও সে তার প্রতি বিশ্বস্ত ছিল। আম্বালার সেশন আদালতে অন্যান্য স্ব ধর্মীয়দের মত এই কেরানীটিও সাক্ষী হিসেবে জাফরের সঙ্গে ছিল।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ শুরু হবার পর জাফর তার বারোজন সর্বাধিক বিশ্বস্ত অনুচরকে বিদ্রোহী শিবিরে প্রেরণ করে। চারিত্রিক বিশুদ্ধতা অর্জনের শিক্ষার প্রতি জাফর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করে এবং তার ফলে সর্বাধিক বিপজ্জনক রাজদ্রোহমূলক কাজের গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারে তাকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত বলে মনে করা হত। দিল্লীতে বিদ্রোহীদের সকল আশা ভরসার পতন ঘটার পর সে থানেশ্বরে তার আইন ব্যবসায়ের জায়গায় ফিরে আসে এবং আল্লাহ কেন অবিশ্বাসীদের জয়ী করলেন তা নিয়ে চিন্তায় নিমগ্ন হয়। দলিল লেখকের গ্লানিকর জীবিকার প্রতি তার বিদ্বেষ আরো বৃদ্ধি পায়। প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছে এবং অতঃপর গুপ্ত ষড়যন্ত্রের দ্বারা কিছু করা যায় কিনা তা দেখতে বাকী রইল। ব্যাপকভাবে সংগঠিত ওয়াহাবী সংস্থার একজন সদস্য হিসেবে জাফর যোগ দিল। যে জীবিকার প্রতি তার মনে অনীহা জমেছিল, এখন গুপ্ত তৎপরতার বদ্যৗলতে সে পেশার প্রতি ধর্মীয় অনুমোদন প্রাপ্ত হল। জাফর নিজেই লিখেছে জেনে রাখা উচিত যে, গুপ্ত উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কোন এক ব্যক্তির নিদেশে আমি এটা করেছি। (স্যার হাবার্ট এডওয়ার্ডস দন্ড প্রদানের সময় জাফরের চরিত্র বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন: এই আসামীর চরম শত্রুতামূলক মানসিকতা, রাজদ্রোহমূলক কার্যকলাপ এবং নাশকতামূলক কাজের দক্ষতার দ্বিতীয় নজির নেই। সে একজন শিক্ষিত লোক এবং তার গ্রামের প্রধান ব্যক্তি। নিঃসন্দেহে তার অপরাধ ক্ষমার অতীত। ১৮৬৪ সালের আম্বালা বিচারের সরকারী রেকর্ড থেকে সংগৃহীত) ।
উপরের বর্ণিত কোন এক ব্যক্তি হচ্ছেন পাটনার মৌলভী ইয়াহিয়া আলী, যিনি ছিলেন ভারতীয় ওয়াহাবী সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক পরিচালক। আর আলোচ্য গুপ্ত উদ্দেশ্যটা হচ্ছে ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সংঘর্ষ শুরু করার, উদ্দেশ্যে সংগৃহীত লোকদেরকে অস্ত্রশস্ত্রসহ গোপনে মহাবনে অবস্থিত বিদ্রোহী কলোনিতে প্রেরণ করা।
আমি ইতিপূর্বেই পাটনার কেন্দ্রীয় প্রচার কেন্দ্রের বিষয় উল্লেখ করেছি। ইয়াহিয়া আলী ছিলেন ঐ কেন্দ্রের তদানীন্তন প্রধান পরিচালক। ১৮৬৪ সালের মামলা শুরু হওয়ার বহু পূব থেকেই বিদ্রোহী তৎপরতার ঘাটি হিসেবে ঐ কেন্দ্রটি সারা ভারতে পরিচিত ছিল। বেশ বড় আকারের ফটকসহ কেন্দ্রের ইমারতগুলো সাদিকপুর লেনের বাম দিকে অবস্থিত এবং এর শেষ অংশ সদর রাস্তা থেকে অনেকটা ভিতর পর্যন্ত চলে গিয়েছে। ইমারতের বাইরের দিকটা ভাঙ্গাচোরা ধরনের; ভারতের অধিকাংশ ইটের বাড়ি বর্ষাকালের পর ঠিক অনুরূপ জরাজীর্ণ রূপ ধারণ করে এবং তার ফলে প্রাচ্যের জাঁকালো অট্টালিকা সম্পর্কে আমরা পাশ্চাত্যের লোকেরা যেসব কথা শুনে এসেছি তার সাথে এগুলো সামঞ্জস্যহীন হয়ে পড়ে। একটা সাদামাটা মসজিদ ছিল এই তৎপরতার কেন্দ্র-বিন্দু সেখানে প্রতিদিন নিদিষ্ট সময় অন্তর নামায পড়া এবং প্রতি শুক্রবার জুমার নামায অন্তে খুতবা পড়া বা বক্তৃতা দেয়া হত। এই বক্তৃতায় কাফেরদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধের উপর সবিশেষ গুরুত্ব দেয়া হত। সেই সঙ্গে ধমের প্রতি নিষ্ঠাবিহীন কাজের নিষ্ফলতা বর্ণনা করে আধ্যাত্মিক জীবনের সাফল্যের জন্য শ্রোতাদের তাকিদ দেয়া হত। পয়গম্বরের সহজ সরল প্রার্থনা রীতির সাথে প্রচলিত জটিল রীতিনীতির ও আড়ম্বরপূর্ণ ধর্মীয় কার্যকলাপের বৈপরীত্য বর্ণনা করে সবশেষে শ্রোতাদেরকে যুদ্ধ অথবা হিজরতের জন্য তাকিদ দেয়া হত।
সাধারণভাবে বলা যায় যে, তারা যে উচ্চস্তরের আধ্যাত্মিক জীবনের প্রতি শ্রোতাদের আকৃষ্ট করতে প্রয়াসী ছিলেন তা মানুষের সাধারণ ক্ষমতার অতীত; এবং শ্রোতারা এসব নসিহত গভীর নিষ্ঠার সাথে শ্রবণ করলেও কেবল এর স্মৃতিটুকু ছাড়া আর কিছুই তারা পালন করতে পারত না। অধিকন্তু, অন্যান্য মসজিদের ইমামরা সাদিকপুর মসজিদের বক্তাদের জ্ঞান ও উচ্চস্তরের বাগ্মিতাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হলেও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি ও সার্বিকভাবে প্রচলিত রীতিনীতির বিরুদ্ধরাচরণকারী হিসেবে তাদেরকে নিন্দা করতেন।
প্রধান ইমাম ও খলিফা ইয়াহিয়া আলী শক্ত অথচ নমনীয় হাতে সকল প্রচারকার্য পরিচালনা করতেন। দক্ষিণ বঙ্গের প্রচারকরা নতুন সংগৃহীত যেসব লোকদের এই কেন্দ্র পাঠাতেন তাদেরকে অত্যন্ত সহৃদয়তার সাথে গ্রহণ করা হত। এদের অধিকাংশকে তিনি ট্রেনিং দিয়ে প্রচারকার্যের উপযোগী করে গড়ে তুলতেন; অবশিষ্টদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব একজন সহকর্মীর উপর ন্যস্ত ছিল, যিনি বিস্তারিত ধর্মীয় শিক্ষার দিকে না গিয়ে, কেবল ন্যুনতম শিক্ষা দিয়ে তাদেরকে সীমান্ত শিবিরে পাঠাবার উপযোগী করে তুলতেন। (আবদুল গফফার) এ সহকর্মীটি ছিলেন প্রচার কেন্দ্রের কোষাধ্যক্ষ এবং গোটা সংগঠনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। প্রধান ইমাম অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার সময় তিনিই ছাত্রদের আধ্যাত্মিক শিক্ষা প্রদান করতেন। এছাড়াও দৈনন্দিন বৈষয়িক কাজের দায়িত্বও তিনি নির্বাহ করতেন। সকল কাজই তিনি প্রগাঢ় নিষ্ঠা ও গভীর আন্তরিকতার সাথে সম্পন্ন করেছেন এবং সবশেষে স্বীয় গুরুর সাথে আলাদা মামলায় আসামীর কাঠগড়ায় উপস্থিত হয়েছেন।
প্রধান ইমাম ইয়াহিয়া আলীর উপর বহুবিধ কাজের দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল। ভারতে ওয়াহাবী সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক পরিচালক হিসেবে তাকে অধীনস্থ প্রচারকদের সাথে নিয়মিত পত্রালাপ করতে হত। তাকে এক ধরনের গোপন ভাষায় চিঠি তৈরী করতে হত এবং এ গোপন ভাষাটা তারই আবিষ্কার। প্রচুর অর্থ সীমান্তের বিদ্রোহী শিবিরে নিয়মিত পাঠাবার ব্যবস্থাটাও তাকেই পরিচালনা করতে হত। মসজিদে নামাযে ইমামতি করা, ধর্মান্ধ ব্যক্তিদের রাইফেলগুলো পরীক্ষা করে তাদের হাতে তুলে দেওয়া, ছাত্রদের মাঝে ধর্মীয় বক্তৃতা প্রদান করা এবং ব্যক্তিগত পড়াশুনার মাধ্যমে আরবী ধর্মগুরুদের প্রবর্তিত তত্ত্বজ্ঞান আরো গভীরভাবে রপ্ত করা এই সবই ছিল তার দৈনিক কর্মসূচীর অন্তর্গত।
কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের সর্বাধিক জটিল যে কাজটি ছিল তা হচ্ছে পাটনার প্রচার কেন্দ্র থেকে লস্করদের সীমান্ত শিবিরে প্রেরণ করা। বাংলার নব দীক্ষিত লস্করদের পথিমধ্যে হাজারো সমস্যার সম্মুখীন হতে হত। পাঞ্জাব ও সীমান্ত প্রদেশ হয়ে অকুস্থলে গমনের জন্য তাদেরকে প্রায় দুইহাজার মাইল পথ পায়ে হেটে অতিক্রম করতে হত এবং পথিমধ্যে তাদের দৈহিক গড়ন দেখে গ্রামের লোকেরা সহজেই বুঝতে পারত যে তারা বিদেশী। সুতরাং প্রধান ইমাম গমন পথের বিভিন্ন নিদিষ্ট স্থানে ওয়াহাবী আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করে প্রতিটি কেন্দ্রের দায়িত্ব একজন করে বিশ্বস্ত অনুচরের উপর ন্যস্ত করেন। এতে অন্যান্য প্রদেশ থেকে সংগৃহীত ওয়াহাবীরা গোটা ভ্রমণপথে বিশ্বাস সাহায্যকারী পেয়ে যায় এবং তাদের সহায়তায় নিরাপদে সীমান্তের বিদ্রোহী শিবিরে গিয়ে পৌছুতে সক্ষম হয়। পথিমধ্যে-স্থিত এসব আশ্রয় শিবিরের ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন সামাজিক স্তরের লোক হরেও তারা সবাই ছিল ব্রিটিশ উৎখাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এছাড়া তারা সবাই স্ব স্ব এলাকার ওয়াহাবী কমিটির প্রেসিডেন্ট ছিল। এই লোকগুলোকে বাছাই করার ব্যাপারে ইয়াহিয়া আলী অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন; কারণ চরম বিপর্যয়ের সময়ও এদের একটি লোককেও ভীতি বা লোভ দেখিয়ে তাদের নেতার বিরুদ্ধে কাজে লাগানো সম্ভবপর হয়নি।
সর্বোপরি, ইয়াহিয়া আলী সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবারের সাথে পাটনার ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক ভাল ছিল। তার পরিবারের এক ব্যক্তি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে একটি অনারারী পদে নিযুক্ত ছিলেন, আবার অন্য একদল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সীমান্ত শিবির থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। সেশন জজ স্যার হাবার্ট এডওয়ার্ডস এই লোকটিকে প্রাণদণ্ড প্রদানের সময় তার সম্পর্কে যে হৃদয়গ্রাহী শব্দ ব্যবহার করেছেন তা কোন বিচারকের রায়ে কদাচিৎ দেখতে পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন: এই মামলায় যে বিরাট রাজদ্রোহের অভিযোগ আনীত হয়েছে তার মূল নায়ক যে ইয়াহিয়া আলী তা প্রমাণিত হয়েছে। ভারতে অর্ধচন্দ্রের (ইসলামী) শাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে পাটনার মসজিদে তিনি ধর্মবিষয়ক প্রচারণায় নিয়োজিত ছিলেন। অর্থ সংগ্রহ এবং মুসলমানদের জিহাদ (কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ) পরিচালনার জন্য তিনি বহু সংখ্যক অধস্তন এজেন্ট নিয়োগ করেছেন। হাজার হাজার স্বদেশবাসীকে তিনি রাজদ্রোহের কাজে নিয়োজিত করেছেন। ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপের দ্বারা তিনি ভারতের ব্রিটিশ সরকারকে সীমান্ত যুদ্ধের মত এমন একটা সংঘর্ষের মধ্যে নিক্ষেপ করেছেন যেখানে শত শত লোক নিহত হয়েছে। তিনি একজন উচ্চ শিক্ষিত লোক এবং কৃত অপরাধ সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশের কোন সুযোগ তার নেই। পূব পরিকল্পনা মোতাবেক অবিচল বিশ্বাসের সাথেই তিনি এই রাজদ্রোহমূলক বিদ্রোহ সংগঠিত করেছেন। জন্মগতভাবে তিনি একটি অবাধ্য ধর্মান্ধ পরিবারের লোক।
তিনি একজন ধর্মীয় সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, কিন্তু বাংলায় হিন্দুদের মধ্যে ব্রাক্ষণসমাজের সংস্কারকরা যে পদ্ধতিতে কাজ করেছে সেভাবে যুক্তি ও বিবেকের দ্বারা চালিত না হয়ে তিনি রাজনৈতিক বিপ্লবের মাধ্যমে লক্ষ্যে উপনীত হবার উদ্দেশ্যে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন; অথচ এই সরকারই সম্ভবত ভারতীয় মুসলমানদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করেছে।
যড়যন্ত্রের দুই মূল নেতা হিসেবে দলিল লেখক জাফর এবং প্রধান ইমাম ইয়াহিয়া আলী ১৮৬৪ সালের মামলায় বন্দীদের মধ্যে প্রথম কাতারে ছিলেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রমূলক কাজের ব্যাপারে এদের প্রতিভা দিল্লীর কসাই মোহাম্মাদ শফির কাছে ম্লান হয়ে পড়ে। এই কসাইটি পাঞ্জাবের ব্রিটিশ সৈন্যদের মাংস সরবরাহ করত। সে ছিল উত্তর ভারতের এক প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে। ওয়ারেন হেষ্টিংস ও লর্ড কর্নওয়ালিসের যুদ্ধের সময় থেকেই সরকারের সাথে এই পরিবারের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। মোহাম্মাদের প্রপিতামহ ও পিতামহ উভয়েই ছিল অতি ক্ষুদ্র রাখাল বা পশুপালক এবং গবাদিপশুর দালালী করে ও সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলে তারা যথেষ্ট উন্নতি হাসিল করে। সেটা ছিল এমন একটা সময় যখন সম্পদ সঞ্চয়ের চেয়ে বরং সম্পদ আহরণের সুযোগই ছিল বেশী। যুদ্ধের দরুন পণ্য মূল্য বৃদ্ধি পায়, এবং আমাদের সেনাবাহিনীকে ক্রমাগত স্থান থেকে স্থানান্তর নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় সেনা দফতরকে উত্তর ভারতের গবাদিপশু বিক্রেতাদের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে হয়। আলোচ্য রাজদ্রোহীর পূবপুরুষদের পারিবারিক সৌভাগ্য সম্ভবত ১৭৬৯ সালের দুর্ভিক্ষের সময় খুলে যায়। আর এই দুর্ভিক্ষ ইংল্যান্ডের জনসাধারণকে ভারতের প্রতি তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে প্রথম সচেতন করে তোলে। শতাব্দীর শেষ যুগে তার পিতামহ অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ মর্যাদা প্রাপ্ত হন। তিনি তখন যুদ্ধ দফতরের ভারপ্রাপ্ত অফিসারের পূর্ণ সন্তুষ্টি বিধান করে বড় রকমের ঠিকাদারিতে নিয়োজিত। মোহাম্মাদের পিতা পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত এই ঠিকাদারি ব্যবসাকে আরো উন্নত করে তোলেন। ছোটখাটো পশু পালকদের অর্থ দাদন দেয়ার পরেও তার হাতে প্রচুর পুঁজি থেকে যেত এবং তা তিনি উচ্চ সুদে লগ্নী দিতেন। পুত্র পিতার বিরাট বৈভবের উত্তরাধিকারী হয় এবং ভারতীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেও এই ব্যবসায়ে যথেষ্ট শ্রীবৃদ্ধি সাধন করে: কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের অর্থ ও পাইকারি মাংস সরবরাহকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সে আম্বালা জেলের কয়েদী হিসেবে কষ্টদায়ক কারাকক্ষে নিজের স্থান করে নেয়।
প্রধান ইমাম যেমন ষড়যন্ত্রের মূল নায়ক ছিলেন, তেমনি এই লোকটি ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের দক্ষিণ হস্তস্বরূপ।
হিন্দুস্থানের প্রায় প্রতিটি প্রধান শহরে তার এজেন্সি ছিল এবং গ্রেট নথ রোড বরাবর সাতটি প্রধান ব্রিটিশ সেনানিবাসে সে মাংস সরবরাহ করত। রক্ত সূত্র হোক আর বাণিজ্যিক সূত্রেই হোক, পাঞ্জাবের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর সাথে তার সম্পর্ক ছিল; উত্তর ভারতের সর্বত্র বহুসংখ্যক অধস্তন ব্যবসায় কেন্দ্র সে গড়ে তোলে, এবং এই বাণিজ্যিক সূত্রেই সীমান্তের অপর পারের উপজাতীয় মেষ পালকদের সাথে তার যোগসূত্র স্থাপিত হয়। মাংস সরবরাহের দরুন প্রতি বছর সে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে কয়েক লক্ষ পাউন্ড আয় করে। বাণিজ্যিক লেন দেনের ব্যাপারে সে খুব নিয়মানুবর্তী এবং বিনয়ী ছিল এবং সে এমনভাবে যুদ্ধ দফতরের অফিসারদের হাত করে ফেলে যে, রাণীর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটাবার ষড়যন্ত্রের দায়ে অভিযুক্ত হবার পরেও সে ব্রিটিশ সেনানিবাসে মাংস সরবরাহের চুক্তি রিনিউ করতে সমর্থ হয়।
এভাবে আমাদের ভৃত্য হিসেবে যে বিরাট প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী হয় তাকেই সে আমাদের ধ্বংসের কাজে ব্যবহার করে। ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের সেই ছিল অর্থের যোগানদার। সেনাবাহিনীকে মাংস সরবরাহের উদ্দেশ্যে আমাদের সরকার তাকে যে অর্থ দিতেন তাই সে বিদ্রোহী শিবিরের পোষকতা কাজে লাগাত। অন্যদের মত ধর্মীয় উদ্দীপনা তার ছিল না, এমন কোন ধর্মান্ধতাও তার ছিল না যা বিপজ্জনক কাজে টেনে নিয়ে যেতে পারে।
সাধু সজ্জনদের মত আত্মোৎসর্গের মন্ত্রেও সে দীক্ষিত ছিল না। সে ছিল অতি তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী পেশাদার ঠিকাদার এবং উচ্চ মুনাফা অর্জন ছাড়া এই ধ্বংসাত্মক কাজে তার জড়িয় পড়ার অন্য কোন কারণ ছিল না বরে মনে হয় না। সে ভেবেছিল, সরকারী মহলের সাথে তার যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে তার বদৌলতেই সে বিপদ এড়িয়ে এ কাজ চালিয়ে যেতে পারবে।
পক্ষান্তরে দলিল লেখক জাফরের এবং প্রধান ইমাম ইয়াহিয়া আলীর মধ্যে মিথ্যা আনুগত্যের ছলনা ছিল না এবং আমাদের হাতে ধরা পড়ার পর বিন্দুমাত্র অনুকম্পাও তারা চায়নি। গভীর নিষ্ঠা ও প্রত্যয়ের সাথেই তারা এই ধ্বংসের পথে পা বাড়ায়, যে ধ্বংসের শিক্ষা তারা পেয়েছে ভুয়া ধর্মীয় দীক্ষা থেকে। ষড়যন্ত্রের যোগ্য মূল্যও তারা পেয়ে গেছে এবং ইতিহাস হয়ত তাদের এ দুর্ভাগ্যের জন্য ভাবাবেগপূর্ণ অনুশোচনাই প্রকাশ করবে কিন্তু মোহাম্মাদ শফির জন্য অনুরূপ অনুশোচনা প্রকাশের কোন কারণ থাকবে না। ক্ষতি করার উদ্দেশ্যেই সে আমাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করেছিল রাজদ্রোহমূলক কাজের সাথে নিজের ব্যবসাকে জড়িত করে সে বিদ্রোহীদের কাছ থেকে মুনাফা অর্জন করেছে। সে তাদেরকে অর্থ লগ্নী দিয়ে সুদ আদায় করেছে।
১৮৬৪ সালের রাষ্ট্রীয় মামলায় যেসব ধর্মীয় নেতাকে আসামীর কাঠগড়ায় উঠানো হয় সে তাদের সমগোত্রীয় ছিল না এবং তাদের মত তার অপরাধ লঘু ছিল না; রোমান প্রজাতন্ত্রের পতনের মধ্য দিয়ে এবং সিকারোর বাগ্মিতার ফলশ্রুতিতে যেসব ভীষণ দুরাত্মা লোকের সৃষ্টি হয় সে ছিল তাদেরই সমগোত্রীয়। ওপিয়ানিকাসের হৃদয়হীনতা এবং লিটুলাসের সতর্কতার একত্র সমন্বয়ে তার চরিত্র গঠিত হয়। দস্যুরা চরম বিপর্যয়ের মধ্য না পড়া পর্যন্ত সে তার কৃতকর্মের ঘোর পরিণতি উপলব্ধি করতে পারেনি।
আম্বালার আদালতে আসামীর কাঠগড়ায় দিনের পর দিন এক সাথ দণ্ডায়মান চারজন প্রধান ষড়যন্ত্রকারীর (প্রধান ইমাম ইয়াহিয়া আলী; পাটনার প্রচার কেন্দ্রের কোষাধ্যক্ষ আবদুল গফফার থানেশ্বরের দলিল লেখক জাফর নতুন রিক্রুটদের পাঞ্জাবের পথে বিদ্রোহী শিবিরে পাঠানোর দায়িত্ব যে পালন করেছে; এবং ব্রিটিশ সেনানিবাসের মাংস সরবরাহকারী মোহাম্মাদ শফি সেনাবাহিনীর কন্ট্রাক্টর হিসেবে যে তার বিশেষ সুযোগ সুবিধাকে ব্রিটিশ সৈন্যদের গতিবিধি সম্পর্কে বিদ্রোহীদের গোচরীভূত করার কাজে ব্যবহার করেছে) বিবরণ আমি বর্ণনা করেছি। বাকী আট ব্যক্তি সম্পর্কে বিচারকের রায়ে যে কথা বলা হয়েছে তার উদ্ধৃতি দেয়া ছাড়া আমি নিজের থেকে কিছু বলতে চাই না। বিচারকের রায়ে বলা হয়েছে: এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, আসামী রহিমের বাড়িতে রাজদ্রোহের ষড়যন্ত্র পরিচালিত হয়। বাঙ্গালী মুজাহিদরা তার ঘরে জমায়েত হয়ে অবস্থান করত। তার ভৃত্য আগন্তুকদের টাকা পয়সা জমা রাখত, তাদেরকে খাওয়াতো এবং বিদায়ের সময় টাকাকড়ি ফেরত দিয়ে দিত। আর তার ভগ্নীপতি ইয়াহিয়া আলী তার বাড়ীতে এসে আগন্তুকদের বিদ্রোহের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করত। তার কর্মদক্ষতা ইয়াহিয়া আলীর মত ছিল না, তবু সে তার সাধ্যানুযায়ী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে।
ইলাহী বখশের বিরুদ্ধে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, পাটনার মৌলভীরা বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত তহবিল তার মারফত কোষাধ্যক্ষ জাফরের কাছে পাঠাতো এবং জাফর সে টাকা মুলকায় ও সিত্তানায় বিদ্রোহী শিবিরে প্রেরণ করত।
প্রমাণিত হয়েছে যে, পাটনার হুসাইনী ইলাহী বখশের ভৃত্য; রাজদ্রোহের কাজে অর্থ লেনদেনের উদ্দেশ্য ইলাহী বখশ তাকে নিয়োগ করে; ইয়াহিয়া আলীর নিদেশে আব্দুল গফফারের কাছ থেকে প্রচুর স্বর্ণের মোহর পেয়ে সে নিজের কাছে গচ্ছিত রাখে; এই স্বর্ণের মোহরগুলো আস্তিনের মধ্যে সেলাই করে সে পাটনা থেকে দিল্লী নিয়ে যায় এবং নিদেশ মোতাবেক তা আসামী জাফরের কাছে হস্তান্তর করে। আরো প্রমাণিত হয়েছে যে, সে ৬০০০ টাকা মানি অর্ডার করে পাঠায় এবং এই সব রাজদ্রোহমূলক তৎপরতা সম্পর্কে সে সম্পূর্ণ সচেতন ছিল।
কাজী মিঞাজানের বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে যে, সে বাংলায় রাজদ্রোহের প্রচার এবং মুজাহিদ সংগ্রহের কাজ করেছে। পাটনার ষড়যন্ত্রকারী দল ও পার্বত্য অঞ্চলের ধর্মান্ধদের এজেন্ট হিসেবে সে কাজ করেছে। অর্থ সংগ্রহ করে পাঠানো এবং চিঠিপত্র আদান প্রদানের কাজও সে করেছে। পাটনা ও মুলকা থেকে প্রেরিত গুরুতর রাজদ্রোহমূলক যেসব চিঠি তার ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তাতে দেখা যায় যে, তার তিন চার রকমের ছদ্মনাম ছিল।
আবদুল করিমের বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে যে, সে মোহাম্মাদ শফির (মাংস সরবরাহকারী) গুপ্তচর হিসেবে রাজদ্রোহমূলক কাজের জন্য পাটনা থেকে টাকাকড়ি বহন করে নিয়ে যেত এবং এসব বিষয়ে ইয়াহিয়া আলীর সাথে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
থানেশ্বরের হুসেইনীর বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে যে, রাজদ্রোহমূলক কাজের জন্য আসামী মোহাম্মাদ জাফর ও মোহাম্মাদ শফির মধ্যে যে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছে এবং রাণীর শত্রুদের কাছে পাঠাবার উদ্দেশ্যে জাফরের কাছ থেকে ২৯০ খন্ড স্বর্ণ (স্বর্ণের মোহর) নিয়ে মোহাম্মাদ শফির পৌঁছে দেয়ার সময় তাকে হাতে নাতে গ্রেফতার করা হয়।
আবদুল গফফারের (২নং) (ইতিপূর্বে যে আবদুল গাফফারের কথা বলা হয়েছে এই ব্যক্তি সে নয়) বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে যে, সে পাটনার ইয়াহিয়া আলীর শিষ্য ছিল থানেশ্বরে বিদ্রোহী সংগ্রহের কাজে বন্দী জাফরের সাহায্যকারী হিসেবে ইয়াহিয়া আলী একে নিয়োগ করে সে সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে এবং রাজদ্রোহমূলক ব্যাপারে ইয়াহিয়া আলীর সাথে পত্র বিনিময় করে। (১৮৬৪ সালের এই মামলার ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে আমি ১৮৬৪ সালে আমার রচিত একটি নিবন্ধ থেকে সাহায্য নিয়েছি। সরকারী নথিপত্র এবং আদালতের কাগজপত্রের সত্যায়িত কপি থেকে ঘটনার বিবরণ সংগৃহীত হয়েছে।
মামলার বিচারকার্য থেকে যে তিনটি সর্বাধিক বিস্ময়কর ব্যাপারে উদঘাটিত হয় তা হচ্ছে: ব্যাপক এলাকা জুড়ে সংগঠন গড়ে তোলার ব্যাপারে সংগঠকদের বিচক্ষণতা; কর্মতৎপরতা পরিচালনা কালে গোপনীয়তা রক্ষায় কর্মীদের দক্ষতা, এবং তাদের পরস্পরের প্রতি সার্বিক বিশ্বস্ততা। তাদের সাফল্যের মূলে অনেকাংশে ছিল ছদ্মনাম গ্রহণের ব্যবস্থা এবং খবর আদান-প্রদানের জন্য এক ধরনের গুপ্ত ভাষার প্রবর্তন। (তাদের গুপ্ত ভাষায় যুদ্ধকে বলা হয় মামলা; আল্লাহকে বলা হয় মামলার তদ্বিরকারী; স্বনের মোহরকে বড় লাল পাথর অথবা দিল্লীর স্বর্ণখচিত জুতা অথবা বড়লাল পাখী বলা হতো; স্বনের মোহার পাকানোকে লাল পাপড়িওয়ালা বড় গোলাপ পাঠানো এবং টাকাকড়ি পাঠানোকে বই বা জিনিসপত্র পাঠানো বলা হতো; ড্রাফট ও মানী অর্ডারকে সাদা পাথর এবং অর্থের পরিমাণকে গোলাপের সাদা পাপড়ির পরিমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হতো।) এটা বিশ্বাস না করে পারা যায় না যে, ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের কর্তব্যকে আল্লাহর কাজ মনে করে অবিচল দৃঢ়তা ও গভীর আত্মপ্রত্যয়ের সাথে জীবনবাজী রেখে তা সম্পাদন করেছে কেবল উপরে বর্ণিত মাংসের ঠিকাদারই ছিল একমাত্র ব্যতিক্রম। ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে অগ্রনায়ক যারা ছিল, এমনকি তাদেরকেও শহীদ হবার সুযোগ না দিয়ে ব্রিটিশ সরকার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। প্রদেশের সর্বোচ্চ আদালত মামলার আপীল আবেদন ধৈর্যের সাথে শ্রবণের পর আসামীদের কৃত অপরাধ সম্পর্কে স্যার হাবার্ট এডওয়ার্ডসের সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে গণ্য করলেও এমনকি চরম অপরাধকারীদের বেলায়ও প্রাণদন্ডাজ্ঞা হ্রাস করে যাবজ্জীবন কারাবাসের নির্দেশ দেন। (আপীলের শুনানীর পর পাঞ্জাবের জুডিশিয়াল কমিশনার প্রদত্ত রায়ের ১৮২-১৮৪ অনুচ্ছেদে দ্রষ্টব্য। তারিখ, ২৮ আগস্ট, ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে)
বিদ্রোহীদের উৎসাহ প্রশমনে ১৮৬৪ সালের মামলা খুব বেশী কাজে আসেনি, এমনকি ১৮৬৩ সালের প্রতিশোধাত্মক ব্যবস্থার উপরও এর যেমন প্রভাব পড়েনি। তাদের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের জন্য সীমান্তের গোলযোগ কয়েকটা বছরের জন্য থেমে যায়, কিন্তু ইত্যবসরে আমাদের সীমানার অভ্যন্তরে ধর্মযুদ্ধের প্রচারণা জোরে-সোরে শুরু হয়ে যায়। পূর্ববঙ্গের প্রতিটি জেলা বিদ্রোহীদের তৎপরতায় আলোড়িত হয় এবং পাটনা থেকে সুদূর সমুদ্রোপকূল পর্যন্ত সমগ্র গাঙ্গেয় উপত্যকার মুসলমান কৃষকরা ধর্মযুদ্ধের অংশ হিসেবে শুক্রবারে জুমার নামায পড়া বন্ধ রাখে। খবর আদান-প্রদানে অসুবিধা দেখা দেওয়ায় সীমান্ত শিবিরের প্রকৃত অবস্থা অবগত হতে না পারায় অভ্যন্তরে ভাগের বিদ্রোহীদের উৎসাহে কিছুটা ভাটা পড়ে এবং তার ফলে কিছুটা নমনীয় কর্মসূচী অনুসরণের দিকে তাদের ঝোঁক দেখা যায়। গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ এলাকার ধর্মান্ধ মুসলমানরা নিজেদেরকে ওয়াহাবী না বলে ফারায়েজী (ফারায়েজীরা মুসলমানদের পাঁচটি কর্তব্যের মধ্যে মাত্র প্রথম দুটিকে কোরআন ও হাদীস মোতাবেক অবশ্য পালনীয় কর্তব্য বলে মনে করে। (আরবী ফারাইজা, বহু বচনে ফারায়েজ, অর্থাৎ ফরজ-এর সমতুল্য শব্দ থেকে ফারায়েজী নামের উৎপত্তি) যা পালন না করলে মানুষ কাফের হয়ে যায়। (দ্বিতীয়) ওয়াজিব; যা পালন করলে মানুষ গোনাহগার মুসলমানে পরিণত হয়। (তৃতীয়) সুন্নত, যা পালন না করলে আল্লাহর আক্রোশ নিপতিত হয়, (চতুর্থ) মুস্তাহাব যা পালন না করলে গোনাহ হবে না, কিন্তু পালন করলে সওয়াব পাওয়া যায়। (পঞ্চম) মুবাহ; যা পালন করা। অপ্রয়োজনীয়। ফারায়েজীরা বর্তমানে দাবী করছে যে, তাদের মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা তিতুমিয়া নয়, শরফাত উল্লাহ (শরিয়াত উল্লাহ) যিনি ১৮২৮ সালে ঢাকায় প্রচার কার্যে অবতীর্ণ হন, তিনি হচ্ছেন এ মতের প্রতিষ্ঠাতা)অর্থাৎ ইসলাম ধমের অনাবশ্যকীয় আচারানুষ্ঠানাদি বর্জনকারী হিসেবে পরিচিত করে। এরা নিজেদেরকে নয়া মুসলমান বলে পরিচয় দেয় এবং কলকতার পূব দিকের জেলাসমূহে এদের সংখ্যা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পায়। আমরা আগেই দেখেছি ১৮৩১ সালে একজন সাধারণ স্থানীয় নেতা তিন থেকে চার হাজার লোককে একত্রিত করে কিভাবে কলকাতা থেকে প্রেরিত একটি মিলিশিয়া বাহিনীকে হঠিয়ে দেয় এবং কেবল মাত্র নিয়মিত সেনাবাহিনী গিয়ে তাকে দমন করতে সক্ষম হয়।
১৮৪৩ সালে এই সম্প্রদায়টি এতই বিপদজনক হয়ে উঠে যে, তাদের সম্পর্কে তদন্তের জন্য সরকারকে বিশেষ তথ্যানুসন্ধান নিয়োগ করতে হয়, বাংলার পুলিশ প্রধান কর্তৃক প্রদত্ত রিপোর্টে বলা হয় যে, মাত্র একজন প্রচারক প্রায় আশি হাজার অনুগামীর এক বিড়াট দল গড়ে তুলেছে এবং তারা প্রত্যেকে ব্যক্তিগত সাথকে গোটা সম্প্রদায়ের স্বার্থ বলে বিবেচনা করে, তাদের কেউ বিপদে পড়লে তাকে রক্ষার জন্য যে কোন অন্যায় কাজ করতেও দ্বিধা করে না, (বাংলার পুলিশ কমিশনারের পত্র নং ১০০১; তারিখ ১৩ই মে ১৮৪৩)
পরবর্তী খলিফারা বিশেষত: ইয়াহিয়া আলী পূর্ববঙ্গের ফারায়েজীদের উত্তর ভারতীয় ওয়াহাবীদের সাথে একত্রীভূত করে, গত তের বছর যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিহতদের মধ্যে এক বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় মামলায় আটক বন্দীদের মধ্যে উভয় সংস্থার লোকদেরকে পাশাপাশি অবস্থান করতে দেখা গেছে,
১৮৬৪ সাল থেকে ১৮৬৮ সালের মধ্যে ধর্মযুদ্ধের জন্য আগের মতই কর আদায় করা হয় এবং ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করার জন্য একটা বিশেষ সংস্থার গঠন করতে হয়, বর্তমানে একটি মাত্র প্রদেশের ওয়াহাবীদের নজর রাখা এবং তাদের তৎপরতাকে সীমার মধ্যে রাখতে গিয়ে সরকারকে যে অর্থ ব্যয় করতে দেখা যাচ্ছে তার পরিমাণ স্কটল্যান্ডের এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি ব্রিটিশ জেলার বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ ও ফৌজদারি অপরাধ দমনের কাজে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয় তার সমান, ষড়যন্ত্র এত ব্যাপক এলাকা জুড়ে বিস্তার লাভ করেছে এর যে কোথায় শুরু তা বুঝা দুষ্কর হয়ে পড়েছে, প্রতিটি জেলা কেন্দ্রে হাজার হাজার পরিবারের মাঝে অসন্তোষের বিষ চড়াচ্ছে, কিন্তু এই তৎপরতার একমাত্র সম্ভাব্য সাক্ষী হচ্ছে এর কর্মীরা যারা তাদের নেতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার চেয়ে বরং মৃত্যুকে শ্রেয় বলে মনে করে,
আমাদের এলাকার ভেতরে পুলিশি তৎপরতা এবং সীমান্ত এলাকার সামরিক ফাঁড়িগুলোতে সৈন্যদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়া সত্বেও ১৮৬৮ সালে ধর্মান্ধ বিদ্রোহীদের ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপ পুনরায় সাম্রাজ্যকে বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন করে, ঐ বছরেই মালদহ জেলা কেন্দ্রে বাংলার ষড়যন্ত্রমূলক প্রচার চালানোর জন্য নিভয়ে পাটনার খলিফার পুত্রকে বাংলায় নিয়ে আসে, সংকটের ব্যাপকতার তুলনায় আইন আদালত কর্তৃক অনুসৃত সাধারণ ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত মনে হয় এবং তার ফলে বিশেষ ধরনের অপরাধের মোকাবেলার জন্য সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়, সুদূর ১৮১৮ সালেই আইনসভা কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে, বিপুল সংখ্যক বিজিত জনগণের উপর শাসন কার্যে নিয়োজিত মুষ্টিমেয় বিদেশী সরকারকে কী ভীষণ বিপদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সুতরাং আইনসভা শাসন বিভাগকে ষড়যন্ত্রমূলক কাজে নিয়োজিত যে কোন লোককে আটক করার ক্ষমতা প্রদান করে। এ ধরনের জাতীয় বিপদ উপস্থিত ইংল্যান্ডে হেবিয়াস কপাস আইনের প্রয়োগ স্থগিত রাখা হয়; কিন্তু ভারতে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণের মানে সামরিক আইন প্রয়োগের মত পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়া। বর্তমান ঘটনায় দেখা যাচ্ছে যে, কেবলমাত্র মুসলমান সম্প্রদায়ই এ ব্যাপারে দায়ী; এবং পূব বাংলায় মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তারা ভারতের মোট জনসংখ্যার এক দশমাংশ মাত্র। সুতরাং এখানে হেবিয়াস কপাস স্থগিত করণের অনুরূপ কোন আইন জারি করা হলে হিন্দুরা ন্যায়সঙ্গতভাবেই এই অভিযোগ তুলবে যে, এদেশের প্রকৃত মৌল অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও তাদের চরম শত্রু মুসলমানদের অবাধ্যতার জন্য তাদেরকেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এমনকি মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকেও এই অভিযোগ উঠবে যে, ওয়াহাবীদের দমনের জন্য জারিকৃত সাধারণ বিধি নিষেধের আওতায় সুন্নি ও শিয়াদের নিক্ষেপ করা হয়েছে।
ইংলন্ডবাসীরা জানে না অথচ ভারতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত একটি বদভ্যাসের দরুন উপরোক্ত অবিচারের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে বাঙ্গালীরা ব্যক্তিগত বিরোধ বা শত্রুতা মিটাবার জন্য অপ্রয়োজনীয় হিংসাত্মক পন্থার পরিবতে বরং আইনের আশ্রয় নিতে বেশী অভ্যস্ত। একজন ইংরেজ যে উদ্দেশ্যে ঘোড়ার চাবুক কিংবা একজন ক্যালিফোর্নিয়াবাসী ছোরা ব্যবহার করে, সেই একই উদ্দেশ্যে বাঙ্গালীরা আদালতের শরণাপন্ন হয়। ব্যক্তিগতভাবে কাউকে জব্দ করার জন্য ফৌজদারি মামলা দায়ের করারই যথেষ্ট এবং হেবিয়াস কপাসের অনুরূপ আইনের সুযোগ ভারতে সাময়িকভাবে বাতিল করা হলে প্রতিটি লোক তার দুশমনদের করুণার পাত্রে পরিণত হবে। ভারতে কি পরিমাণ মিথ্যা মালা দায়ের হয়ে থাকে তা এদেশের পুলিশের বিরাট রোজগার থেকে সহজে অনুমান করা চলে এবং বাঙ্গালীরা যে কোন ছুতানাতায় মামলা রুজু করার মত প্রাথমিক অভিযোগ তৈরী করতে বেশ সিদ্ধহস্ত। সুতরাং এখানে হেবিয়াস কপাসের অধিকারের উপর সরকারীভাবে হস্তক্ষেপ করা হলে মিথ্যা মামলা রুজু করার হিড়িক পড়ে যাবে। সে অবস্থায় রাজদ্রোহের মিথ্যা অভিযোগে কারাগারে নিক্ষিপ্ত সওয়ার ভয়ে নির্দোষ ব্যক্তিরা সর্বদা তটস্থ হয়ে থাকবে। এবং অসদুদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রতিশোধ পরায়ণ লোকেরা হাতে স্বর্ণ পেয়ে যাবে।
তথাপি, হেবিয়াস কপাস সাময়িকভাবে বাতিল করার ফলে ইংল্যান্ডে রাণীর মন্ত্রীরা যে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে থাকেন ভারতেও যদি বিদ্রোহের সময় শাসন বিভাগের হাতে অনুরূপভাবে গ্রেফতারের ক্ষমতা অর্পণ না করা হয় তাহলে এদেশে ব্রিটিশ শাসন এক মাসও নিরাপদে কার্যকর হতে পারবে না। সেইজন্য আইনসভা শাসন বিভাগের হাতে অনুরূপ ধরনের বিশেষ ক্ষমতা অর্পণ করেছে, তবে এ ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক প্রতিবিধানও সন্নিবেশিত হয়েছে। কেবলমাত্র সর্বোচ্চ সরকারী কর্তৃপক্ষ মানে বড়লাট ও তার শাসন পরিষদ। আইনের উপক্রমণিকায় এর প্রয়োগ কেবলমাত্র রাজনৈতিক অপরাধের ক্ষেত্রেই সীমিত করা হয়েছে। আলোচ্য ধারায় বলা হয়েছে যে, কেবলমাত্র বিদেশী শক্তিসমূহের সাথে সম্পাদিত ব্রিটিশ সরকারের মৈত্রী চুক্তিকে রক্ষা করা ব্রিটিশ সরকারের আশ্রিত দেশীয় রাজ্যসমূহের এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা। এবং বৈদেশিক হামলা অথবা অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ থেকে ব্রিটিষ ডোমিনিয়নগুলোর নিরাপত্তা রক্ষার উদ্দেশ্যেই এ আইন ব্যবহৃত হবে। (১৮১৮ সালের ৩নং রেগুলেশনের প্রথম ধারা) আটক বন্দীরা যাতে সদ্ব্যবহার পেতে পারে তজ্জন্য আইনে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আইন বেশ সতর্কতার সাথে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদীদের থেকে এদের পৃথক মর্যাদার অধিকারী করেছে এবং এদের আটকাবস্থাকে হাজতবাস না বলে ব্যক্তিগত বিধিনিষেধ বলে অভিহিত করেছে। তারা সরকারের কাছ থেকে ভাতাও পেয়ে থাকে। গভর্নর জেনারেলের কাছে সরাসরি আবেদন বা দরখাস্ত করার অধিকারও তাদের রয়েছে। (ঐ, ৫ম ধারা)আটকের মাত্রানুসারে সংশ্লিষ্ট রাজবন্দীর স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে কিনা, এবং প্রদত্ত ভাতা সামাজিক মর্যাদা অনুসারে তার নিজের ও পরিবারের ভরণপোষণ চালাবার জন্য যথেষ্ট কিনা, এসব বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত অফিসার সরকারী কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট প্রদানে বাধ্য। (ঐ, ৪থ ধারা) তার সম্পত্তি সাধারণত নিজের কিংবা তার পরিবারের এখতিয়ারে থাকবে।কিন্তু তার সম্পত্তি সরকারী নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে সে অবস্থায় বকেয়া ভূমিরাজস্ব আদায় অথবা দেওয়ানী আদালতের ডিক্রির কারণে সম্পত্তি বিক্রয়ের উপর বাধানিষেধ আরোপিত থাকবে। বন্দীকে যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘদিন আটক থাকতে না হয় তার জন্য প্রতিবিধেয়ক ব্যবস্থাও আইনে রাখা হয়েছে। বন্দীর আটকাদেশ অব্যাহত রাখা হবে না সংশোধন করা হবে, সে সম্পর্কে বড়লাটের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্থে তার আচরণ, স্বাস্থ্য এবং প্রদত্ত সুযোগ সুবিধা সম্বন্ধে সংশ্লিষ্ট ভারপ্রাপ্ত অফিসার সরকারের উচ্চতম কর্তৃপক্ষের কাছে বছরে দুবার করে রিপোর্ট প্রধানে বাধ্য। (১৮১৮ সালের ৩ নং রেগুলেশনের ৪থ ধারা)
১৮৫৮ সালের বিদ্রোহের সাথে জড়িত ব্যক্তি ও জাতিসমূহের উপর যদি এই আইন প্রয়োগ করা হতো, তাহলে ১৮৬৩ সালের ধ্বংসাত্মক সীমান্ত যুদ্ধ এড়াতে ব্রিটিশ সরকার সক্ষম হতেন। মাত্র অল্প সংখ্যক লোককে সুপরিকল্পিতভাবে আটক করে রাখতে পারলে আমরা আম্বিয়ালা গিরিপথের সংঘর্ষে নিহত বা আহত প্রায় হাজার খানেক সৈন্যের প্রাণ রক্ষা করতে এবং বহু লক্ষ পাউন্ড ব্যয়ের হাত থেকে বাচাতে পারতাম। এমনকি উক্ত সংঘর্ষের পরেও যদি ১৮৬৪ সালের রাষ্ট্রীয় মামলায় উদঘাটিত ষড়যন্ত্র জাল এই আইনের ব্যাপক প্রয়োগের দ্বারা আমরা ছিন্নভিন্ন করে ফেলতাম, তাহলে ১৮৬৮ সালের ব্ল্যাক মাউন্টেন অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা বিনষ্ট করাও হয়ত আমাদের পক্ষে সম্ভব হতো। কিন্তু অন্যত্র যে কারণের বিষয় আমি উল্লেখ করেছি (পল্লী বাংলার বার্ষিক ঘটনা বিবরণী, ১ম খন্ড, ২৪১ পৃঃ ৪থ সংস্করণ) তার ফলেই ভারত সরকার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনা করে সক্রিয় হতে দ্বিধান্বিত হয়েছে এবং এতে করে সরকার তার নিজের শাসনব্যবস্থাকেই মাঝে মাঝে বিপন্ন করে তুলেছে। আমাদের শাসন কর্তৃত্ব যদি সাময়িকভাবেও বানচাল হয় তাহলে ভারতে ইংল্যান্ডের স্বার্থ এবং ব্রিটিশ শাসন কায়েম হওয়ার পর থেকে এদেশের রেলপথ নির্মাণ, খাল খনন এবং অন্যান্য উৎপাদনমূলক কাজে ব্রিটিশ পুঁজিপতিরা যে কোটি কোটি ষ্টার্লিং ব্যয় করেছে তার সবই ভণ্ডুল হয়ে যাবে। সীমান্ত এলাকার ব্যয়বহুল যুদ্ধ এবং আমাদের সীমানার অভ্যন্তরে বিচার বিভাগ প্রদত্ত কঠোর সাজা এসব কিছুই ধর্মান্ধদের যুদ্ধোন্মাদনা দমনে ব্যর্থ প্রতিপন্ন হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সরকার ১৮৬৮ সালে অপরাধীদের গ্রেফতারের কঠোর ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে বাধ্য হয়।
নিরপরাধ ব্যক্তিদের ক্ষতির কারণ না ঘটিয়ে এবং জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি না করেই এই আইনটি কার্যকরী করা যেতে পারে। প্রত্যেক জেলার নেতৃত্ব-স্থানীয় রাজদ্রোহীদের তালিকা কয়েক বছর আগেই সরকারের হাতে এসেছে; এবং দুদিন আগে বা পরে তাদেরকে গ্রেফতার করা হবে এটাই হিন্দু জনসাধারণ আশা করেছিল। রাজদ্রোহের প্রধান নায়কদের গ্রেফতার করা হয়: তারা তাদের অনুসারীদের উপর যে প্রভাব বলয় গড়ে তোলেন তা ভেঙ্গে দেওয়া হয় এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ধর্মযুদ্ধে অর্থ সাহায্যকারীদের নাম ও পরিচয় উদঘাটিত হয়। যেসব ধনী ব্যক্তিরা বিদ্রোহীদের গোপনে অর্থ যোগান দিয়ে এসেছে, যেমন ১৮৬৪ সালের রাষ্ট্রীয় মামলার অন্যতম আসামী সেই সামরিক কন্ট্রাক্টর, তাদেরকে খুঁজে বের করার মত তথ্য প্রমাণ সরকারের হস্তগত হয়।
শত শত মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত বিভিন্ন জেলায় গত সাত বছরে আরো পাঁচটি রাষ্ট্রীয় মামলা দায়ের হয়েছে। এই সব মামলার আসামীদের সবাই একই ষড়যন্ত্রমূলক লক্ষ্য সামনে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছিল। প্রতিটি মামলার শুনানী থেকে অনুরূপ আরো অনেক ঘটনার সূত্র আবিষ্কৃত হয়। এবং দেশের দূরবর্তী এলাকার অন্তত: অর্ধডজন ষড়যন্ত্রের আখড়ার তথ্য তল্লাশী না করে একজন ষড়যন্ত্রকারীরা সন্ধান পাওয়াও সম্ভব ছিল না। ১৮৬৪ সালের আম্বালা মামলায় প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ ১৮৬৫ সালের পাটনা মামলাকে প্রয়োজনীয় করে তোলে এবং এর সামগ্রিক ফলশ্রুতি ১৮৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মালদহ মামলা ও অন্যান্য গ্রেফতারকে সম্ভব করে। এর প্রতিটি মামলা অন্যটির উৎপত্তিতে সাহায্য করেছে; যেমন ১৮৭০ সালের অক্টোবর মাসের রাজমহল মামলা এবং ১৮৭১ সালের সেই বিরাট মামলা যার মাধ্যমে অতি সম্প্রতি আরো একদল ধর্মান্ধ ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড লাভ করেছে। সাজাপ্রাপ্ত বিদ্রোহী বা অপরাধের দায়ে যারা এখন বিচারাধীন রয়েছে তাদের কারো বিরুদ্ধেই গণ-অসন্তোষ উসকে দেয়ার কোন ইচ্ছা আমার নেই। অনুরূপ মামলার নিষ্পত্তি আদালতের শান্ত পরিবেশে সম্পন্ন হওয়া উচিত; সাম্প্রতিক মামলার পর যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তা কারো জন্যই কল্যাণকর হতে পারে না। কিন্তু ওয়াহাবীদের বিরুদ্ধে আনীত মামলার স্বরূপ পাঠকদের সামনে তুলে ধরার জন্য আমি এখানে দুএকটি প্রাসঙ্গিক ঘটনার জের টানতে চাই। পাঠক হয়ত জানেন না যে, এসব মামলায় দক্ষ ইংরেজী ব্যারিস্টাররা উচ্চ ফিস দাবি করে থাকেন এবং প্রতিটি মামলার সামগ্রিক ব্যয় নির্বাহের জন্য রাষ্ট্রকে প্রভূত আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রাথমিক তদন্ত সম্পূর্ণ করতে প্রায় দুমাস লেগে যায়। সর্বশেষ মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রাথমিক তদন্তের পর সেশন জজের এজলাসে এক মাস তিন সপ্তাহ শুনানী চলে। শুনানীর জন্য আদালতকে আটত্রিশ দিন এজলাসে বসতে হয়, ১৫৯ জন সাক্ষীকে জেরা করা হয় এবং বিভিন্ন ভাষায় লিখা বিপুল সংখ্যক প্রামান্য দলিলপত্র পরীক্ষা করতে হয়। সেশন আদালতের কাজ শেষ হওয়ার পর মামলাটি এখন কলকাতা হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। সেখানে মামলা শেষ হতে আরো কতদিন লাগবে এবং কত অর্থ যে ব্যয় হবে তা আগের থেকে অনুমান করে বলা কারো পক্ষেই সম্ভবপর নয়।
সহজেই অনুমান করা যেতে পারে যে, এইসব মামলার প্রত্যেকটির বিচার সম্পূর্ণ হতে এক বছরের মত সময় লাগে এবং এই দীঘ সময়কালে মামলার বিষয়কে কেন্দ্র করে ধর্মান্ধ জনগণের মধ্যে উত্তেজনার সঞ্চার হয়ে আমাদের শাসনের বিরুদ্ধে কিরূপ গণ অসন্তোষ জাগ্রত হয়।সর্বশেষ মামলাটি হাইকোর্টে আসার ঠিক পূব মুহূর্তে একজন মুসলমান ঘাতক বাংলার প্রধান বিচারপতিকে তার ট্রাইব্যুনাল কক্ষের সিঁড়ির উপর ছুরিকাঘাত করে। আমি যখন এই লাইনগুলো লিখছি ঠিক সেই সময় মুসলমান ও ইংরেজ উভয়ের মধ্যে এমন ভয়ঙ্কর উত্তেজনার সৃষ্টি হয় যা সিপাহী বিদ্রোহের পর আর কখনও হয়নি। ভারতীয়দের মধ্যে আবার প্রচন্ড উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এবং বিস্ফোরিত প্রতিহত করতে হলে যথেষ্ট প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তা দেখাতে হবে। যে ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক পরিস্থিতি উদ্ভব হয়েছে, তাতে করে আতঙ্কমুক্ত হয়ে বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ লিখার কাজ চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভবপর হচ্ছে না। ব্রিটিশ ভারতে সংঘটিত অপরাধ নিবারণের যথেষ্ট ক্ষমতা ব্রিটিশ ভারতের আদালতসমূহের রয়েছে। শাসন বিভাগের হাতে গ্রেফতারের যে ক্ষমতা ইতিমধ্যেই ন্যস্ত করা হয়েছে তাকে আরো শক্তিশালী করে তোলা যুক্তিযুক্ত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এটা আইন পরিষদের ঠান্ডা পরিবেশে বিচার বিবেচনার বিষয়, একটা ক্রুদ্ধ সম্প্রদায়ের হঠকারী সিদ্ধান্তের বিষয় নয় এমন একটা সম্প্রদায় যারা এখনও পর্যন্ত আকস্মিক ও বিরাট বিপর্যয়ের দুঃখ ভুলতে পারেনি।
ইতিমধ্যে অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তা থেকে উদ্ভূত মামলা ধর্মান্ধ ওয়াহাবীরা যে বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য সচেষ্ট রয়েছে তার বিপদ সম্পর্কে মুসলমানদের সজাগ করে তুলেছে। ধর্মান্ধদের সম্প্রাদায়িক ষড়যন্ত্র থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার দৃঢ় সংকল্প তারা প্রকাশ করেছে। তাদের প্রত্যেক ফেরকা ধর্মযুদ্ধ সম্পর্কে শাস্ত্রকারদের প্রামাণ্য সিদ্ধান্ত সম্বলিত পুস্তিকা প্রকাশ (ফতোয়া) করেছে এবং এতে ওয়াহাবীদের রাজদ্রোহমূলক কার্যকলাপের নিন্দা করা হয়েছে। এই আগ্রহোদ্দীপক প্রামান্য দলিলগুলো নিয়ে পরবর্তী পরিচ্ছেদে আমি আলোচনা করব। ধর্মান্ধদের ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত যে ভেঙ্গে পড়েছে তার নিদর্শন তাদের নিজেদের অবস্থা থেকেই পাওয়া যাচ্ছে তাদের প্রধান নেতারা ইতিমধ্যেই গ্রেফতার হয়েছে এবং অবশিষ্টদের ও বুঝতে পেরেছে যে,সক্রিয় হলে তাদেরকেও একই পরিণামের সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু গুরুত্বহীন বলে মনে হলেও সীমান্তের সশস্ত্র শিবিরগুলো এখনও টিকে আছে এবং সময় মত সেগুলো হয়ত বিরাট ধর্মীয় মহাসম্মেলনের রূপ পরিগ্রহ করবে। আজ সকালেই (সিমলা, ১৪ই জুন, ১৮৭১ (প্রথম পরিচ্ছেদ) আমি এই পরিচ্ছেদ রচনার কাজ শেষ করার সময় একটি নির্ভরযোগ্য ভারতীয় সংবাদপত্রের খবরে জানতে পারলাম যে, ব্ল্যাক মাউন্টেনের উপর বিদ্রোহী শিবির থেকে আরেকটি আক্রমণ পরিচালিত হয়েছে। ৪ঠা জুন স্থানীয় অধিবাসীদের দৃঢ় প্রতিশোধ সত্ত্বেও একদল সশস্ত্র উপজাতি হামলা চালিয়ে তিনটি গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে (১২ই জুনের পাইওনিয়ার পত্রিকা, ১৪ই জুন পত্রিকাটি সিমলায় পৌছায়) ঘটনার সংবাদপ্রাপ্তির চার ঘন্টার মধ্যে আমাদের নিকটবর্তী সেনানিবাস থেকে তৃতীয় পাঞ্জাব পদাতিক বাহিনী এবং ৪থ পাঞ্জাব অশ্বারোহী বাহিনীর একটা দল অকুস্থলে যাত্রা করে; এবং তারপর ফলাফল কি দাঁড়িয়েছে তা এখনও জানা যায়নি।ঘটনার কারণ ধর্মীয় না অন্য কিছু সে সম্বন্ধেও কোন তথ্য এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কেবল এটাই আমরা জেনেছি যে, ব্রিটিশ ভারতের সকল সংবাদপত্র গত কয়েক সপ্তাহ যাবত আরেকটি আফগান যুদ্ধের সম্ভাব্যতা নিয়ে জল্পনা কল্পনা চালাচ্ছে। আমাদেরকে যদি অনুরূপ কোন পরীক্ষার মধ্যে আবার পড়তে হয়, তাহলে আমাদের সীমানার মধ্যেকার ওয়াহাবী ষড়যন্ত্রর মূলোচ্ছেদ করতে পারলে সীমান্তের অপর পারের বিপদ উৎরানো সহজ হবে।

About ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার