দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস

তিনটি শর্ত যার ফলে একটা ইসলামী দেশ দারুল –হার্ব বা শত্রুদেশে পরিণত হয়

আলোচ্য পুস্তিকায় ৩য় পৃষ্ঠায় ফতোয়া-য়ে-আলমগীরী থেকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছেঃ
১। যখন বিধর্মী শাসন নির্বিচারে জারি করা হয় এবং ইসলামী অনুশাসন পালন করা যায় না।
২। যদি দারুল-হার্বভূক্ত কোন দেশের সীমান্তে দেশটির অবস্থান হয়ে থাকে। এবং তার ফলে সংশ্লিষ্ট দেশটি ও দারুল-হার্বভূক্ত দেশের মধ্যেকার কোন বিষয়ে দারুল ইসলামের কোন শহর থেকে হস্তক্ষেপ না করা যায়।
৩। কোন মুসলমান যখন ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। এবং কোন জিম্মি (মুসলমান শাসনের শর্তাবলী স্থায়ীভাবে মেনে চলার শর্তে অঙ্গীকারবদ্ধ বিধর্মী) যখন ইসলামী শাসনে যেসব শর্ত মেনে চলেছে তা আর মানতে পারছে না।
সিরাজিয়া ইমদাদিয়াসহ সকল প্রাচীন শাস্ত্রকারদের মতানুসারেঃ-
১। বিধর্মীদের শাসন যখন নির্বিচারে জারি করা হয়।
২। দেশটি যদি দারুল-হার্ব এর এতটা সন্নিহিত হয় যে, তার এবং দারুল-হার্ব এর মাঝে আর কোন দারুল ইসলাম থাকে না এবং তাতে দারুল ইসলাম থেকে ঐ দেশে সাহায্য আসার আর কোন উপায় থাকে না।
৩। যখন মুসলমানরা ও জিম্মিয়া আমান-ই-আউয়াল (একটি বিশেষ অর্থবোধক শব্দ যার অর্থ পরে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে ) ভোগ করতে পারে না।(সুন্নি পুস্তিকাটির বিষয়বস্তু বিশ্লেষণের জন্য আমি যে সকল কিতাব এবং ফতোয়া ও যুক্তি সংগ্রহ করতে পেরেছি তজ্জন্য আমি কলকাতা মোহামেডান কলেজের প্রফেসর ব্লকম্যাণের কাছে ঋণী। ভারত সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের জন্য প্রফেসর ব্লকম্যান এখনও ইউরোপ একজন ভারত সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞরূপে সমাদৃত)
অধিকতর প্রামাণ্য প্রাচীন কিতাবে উল্লিখিত তিনটি শর্ত ভারতের বেলায় প্রযোজ্য। (আবু হানিফার মতে উপরোক্ত তিনটি শর্ত পূরণ হলেই তবে কোন ইসলামী দেশ শত্রুদেশে পরিণত হবে। তার দুই শিষ্য (সাহেবান) ইমাম মোহাম্মাদ ও ইমাম ইউসুফের মতে তিনটির মধ্যে যে-কোন একটি শর্ত পূরণ হলেই যথেষ্ট। কলকাতার সুন্নিরা সাহেবানদের মত খণ্ডন করার জন্য আবু হানিফার মত সমর্থন করে ঠিক কাজই করেছেন (পুস্তিকার ৪র্থ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য) কিন্তু আমি দেখতে চাই যে, তিনটি শর্তের সবগুলোই এখন ভারতের বেলায় প্রযোজ্য এবং তার ফলে আবু হানিফা এবং তার শিষ্যদের মতানুসারে ভারত এখন দারুল হার্বে পরিণত হয়েছে) প্রথমটি সম্পর্কে বলা যায় যে, ফতোয়া-য়ে-আলমগীরী থেকে এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যে, বিষয়ে আবু হানিফার বা অন্য কোন প্রাচীন প্রামাণ্য পুস্তকে কিছু উল্লেখ নেই। প্রথম শর্তে শুধু এ কথাটাই বলা হয়েছে যে, বিধর্মীদের শাসন যদি নির্বিচারে জারি হয়ে থাকে, এবং এ শর্তটি বর্তমানে ভারতের বেলায় হুবহু প্রযোজ্য। দ্বিতীয় শর্তের বেলা ও প্রথমটির পরিশিষ্ট হিসেবে পুস্তিকায় অনেক কিছু বাদ পড়ে গেছে। প্রাচীন কিতাব অনুসারে ভারত একটা শত্রুদের দেশে পরিণত হয়েছে। কারণ এই দেশ ও ইংল্যান্ডের মাঝে (সংশ্লিষ্ট দারুল হার্ব) হস্তক্ষেপ করার মত এমন কোন দেশ নেই যেখান থেকে সৈন্য পাঠিয়ে ভারতের দারুল হার্ব পরিণত হওয়ার পথে বাধার সৃষ্টি করা যায়। ইংল্যান্ড যখন ভারত জয় করে তখন তারা এখানে আসার জন্য সমুদ্রপথ ব্যবহার করে; এবং হামাবী ও তাহাতাবীতে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, সমুদ্র হচ্ছে দারুল হার্ব। ফলে ইংল্যান্ড ও ভারতের মাঝে প্রধান যোগসূত্র হিসেবে এখনও পর্যন্ত কেবল সমুদ্রপথই রয়েছে এবং মধ্যবর্তী এমন কোন ইসলামী দেশ নেই যারা হিন্দুস্থানে সৈন্য পাঠাতে পারে। মুসলমান দেশ কাবুল হিন্দুস্থানের সীমান্তে অবস্থিত হলেও এ বিষয়ে তার কিছুই করণীয় নেই। অথচ আবু হানিফার উল্লিখিত শর্ত অনুসারে ইভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে এমন একটা ইসলামী দেশ থাকা চাই যেখান থেকে সংশ্লিষ্ট দেশটিকে দারুল হার্বে পরিণত করার চেষ্টা পণ্ড করার জন্য সৈন্য পাঠিয়ে হস্তক্ষেপ করা চলে। কিন্তু কেহই এরূপ দাবী করবে না যে, কাবুল ইংল্যান্ড ও ভারতের মাঝে যোগসূত্রকারী মধ্যবর্তী দেশ কিংবা ভারতের মুসলমান প্রজাদের সাহায্য করার মত কোন শক্তি তার আছে।
কিন্তু পুস্তিকায় উল্লেখিত তৃতীয় শর্তটিই সর্বাধিক মারাত্মক ভ্রান্ত ধারনা সৃষ্টি করেছে। এই শর্তটির সমগ্র শক্তি আমান-ই-আউয়াল শব্দের অর্থের উপর নির্ভর করছে, এবং পুস্তিকায় এই শব্দটির অর্থ করা হয়েছে ধর্মীয় স্বাধীনতা। কিন্তু শব্দটি আসলে কি বুঝাতে চেয়েছে উপরোক্ত অর্থে তা পরিষ্কার হয়নি। আক্ষরিক অর্থে আমান মানে নিরাপত্তা; এবং আমান-ই-আউয়াল এর অর্থ জোমি-উর-রুজুম এ যা বলা হয়েছে তা হচ্ছে মুসলমানরা নিজেদের শাসনামলে যে ধরনের ধর্মীয় নিরাপত্তা ও পূর্ণ মর্যাদা ভোগ করেছে তার পূর্ণাঙ্গ পুনরুজ্জীবন; এই মতটির প্রামান্যতা নিয়ে কলকাতার সুন্নিরাও কোন বিতর্কে অবতীর্ণ হতে চাইবেন না এবং এহেন প্রামাণ্য মত অনুসারে একটি দেশ তখনই শত্রু দেশে পরিণত হয়- (১) যখন মুসলমান ও জিম্মিরা (তাদের অধীনস্থ বিধর্মীরা) কেবল ততটুকু আমান (ধর্মীয় মর্যাদা) ভোগ করতে পারে যেটুকু বিধর্মীরা তাদেরকে অনুমোদন করে; এবং (২) নিজেদের শাসনামলে তারা যে পূর্ণ ধর্মীয় মর্যাদা ভোগ করেছে এবং বিধর্মী প্রজাদের যতটা ধর্মীয় মর্যাদা তারা তখন অনুমোদন করেছে তা যখন বর্তমান থাকে না। এটা সুস্পষ্ট যে, উপরোক্ত দুটি ধারাই বর্তমানে ভারতের বেলায় প্রযোজ্য। বর্তমানে ভারতে খ্রিস্টান শাসকরা যতটা অনুমোদন করে মুসলমানরা ঠিক ততটুকু আমান বা ধর্মীয় মর্যাদা ভোগ করার অধিকারী। মাত্রার দিক থেকে তাদের বর্তমান ধর্মীয় মর্যাদা তাদের নিজেদের শাসনামলের তুলনায় অনেক কম। ব্রিটিশ সরকার মুসলমানদের কাছ থেকে কর আদায় করে এবং সে করের টাকা দিয়ে খ্রিস্টানদের গির্জা নির্মাণ ও খ্রিস্টান যাজক সম্প্রদায়ের ব্যয় বহন করে। বিভিন্ন জেলায় ও প্রদেশে মুসলমান গভর্নরদের জায়গায় খ্রিস্টান গভর্নর নিয়োগ করা হয়েছে। মুসলমান বিচারক ও আইন অফিসারদের (কাজী; ১৮৬৪ সালের একাদশতম আইন জারি করে এই পদ বিলোপ করা হয়। এ সম্পর্কে পরে আরো আলোচনা করব) পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। আদালতে ইংরেজি ভাষা চালু করা হয়েছে।মুসলমান আমলের সকল কার্যবিধি ও ফৌজদারি আইন রহিত করা হয়েছে। ১৮৬৮ সালের চতুর্দশতম আইন (ভারতীয় সংক্রামক ব্যাধি আ ইন) জারি করে দুর্ভাগ্য কবলিত মহিলাদের স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মুসলমান শাসকরা যেমন আইন প্রয়োগ করে মুসলিম আইনশাস্ত্র অনুযায়ী সকলকে মসজিদে যেতে এবং অন্যান্য ধর্মানুষ্ঠানে যোগ দিতে বাধ্য করতে পারে, আমাদের পক্ষে সেরূপ কিছু করা সম্ভব হয়নি। মনে রাখা দরকার যে, ইসলামের নাগরিক ও ধর্মীয় আইন এবং মুসলমানদের নাগরিক ও ধর্মীয় মর্যাদা অবিভাজ্য। আমাদের আদালতে প্রবর্তিত স্ট্যাম্প, আমাদের বিধি-বিধানে নির্দিষ্ট সময় সীমা, পাওনা অর্থের উপর সুদ প্রদানের জন্য আমাদের বিচারকদের নির্দেশাবলী এবং আইন আদালতের কার্যবিধি ও ধর্মীয় সহনশীলতার ব্যাপারে আমাদের প্রবর্তিত যাবতীয় ব্যবস্থাটাই মুসলমানি আ ইনের বিরোধী এবং মুসলমানরা নিজেদের শাসনামলে যে আমান বা মর্যাদা ভোগ করে এসেছে তার উপর হস্তক্ষেপকারী। জিম্মি ও খ্রিস্টানসহ ভারতের মুসলমান বাদশাহদের আমলের বিধর্মী প্রজাদের ধর্মীয় মর্যাদা ও বর্তমানে যথেষ্ট পরিবর্তিত হয়েছে। খ্রিষ্টান জিম্মিরা আর প্রজা নয়। তারা এখন বিজেতা ও শাসক। হিন্দু জিম্মিদের আর রাজনৈতিক কর (জিজিয়া) দিতে হয় না এবং তাদের ধর্মীয় রাজনৈতিক ব্যাপারে আমরা শত হস্তক্ষেপ করেছি, যেমন অগ্নি পানি ইত্যাদির মাধ্যমে পরীক্ষা করার রীতি রহিত করেছি, সতীদাহ বিলোপ করেছি, বর্ণভেদ প্রথা আমলে আনিনি এবং খ্রিষ্টান ধর্মে ধমান্তরিতকরণকে আইন সিদ্ধ করেছি। সংক্ষেপে বলা যায় যে, মুসলমান ও জিম্মি উভয়ের আমান-ই-আওয়াল বা সাবেক মর্যাদা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়েছে। এবং এমনকি আবু হানিফার তৃতীয় শর্তানুসারেও ভারত শত্রুদেশে (দারুল-হার্ব) পরিণত হয়েছে।
কতিপয় ঘটনার নজির টানলে দেখা যাবে যে,বিতর্কিত বিষয়টি বারংবার পরিক্ষীত হয়েছে। গ্রীস যতদিন তুরস্কের অধীনে ছিল ততদিন সেটা ছিলো ইসলামী দেশ। কিন্তু অর্ধশতাব্দী আগে তারা মুসলমানি শাসন শৃঙ্খলা ছুড়ে ফেলার পর গ্রীসকে শত্রু দেশ হিসেবে বিবেচনা করে আসা হচ্ছে এমনকি সেখানে বহু সংখ্যক মুসলমান অধিবাসী থাকা স্বত্বেও। দানিউব তীরবর্তী প্রদেশ সমূহে দক্ষিণ স্পেন এবং অন্য যেসব দেশে অনুরূপভাবে সরকার প্রবর্তিত হয়েছে তাদের বেলায় একই কথা প্রযোজ্য। আবু হানিফার প্রখ্যাত শিষ্য ইমাম মোহাম্মদের মাবসুত কিতাবে শাস্ত্রীয় বিধানটি এভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে: কোন ইসলামী দেশ বিধর্মীদের অধিকারে চলে যাওয়ার পরেও যদি মুসলমান গভর্নর ও মুসলমান বিচারকদের (কাজী)চাকরি অপরিবর্তিত থাকে এবং বিধর্মীরা যদি নিজস্ব বিধিবিধান প্রবর্তিত না করে তাহলে দেশটি ইসলামী দেশ হিসাবে পরিগণিত হবে। আমরা মুসলমান গভর্নরদের বহাল রাখেনি। মুসলমান আইন অফিসারদের পথ আমরা বিলোপ করেছি। আমরা আমাদের নিজস্ব আইন কানুন চালু করেছি। এবং এসব কারণে ভারতীয় মুসলমানদের বিরাট সংখ্যা গরিষ্ঠ অংশ যে মতে বিশ্বাস করে তদানুসারে ভারত আর ইসলামী দেশ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে না।ওয়াহাবীদের কার্যকলাপ শুরু হয়েছে। এই ঘোষণা প্রচারের মাধ্যমে যে ভারত শত্রু দেশে পরিণত হয়েছে এবং এর শাসকদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ পরিচালনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কলকাতা পুস্তিকায় প্রথমোক্ত দাবিটি অস্বীকার করে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, ভারত শত্রুদেশে পরিণত হয়নি এবং এটা এখন ইসলামী দেশ হিসাবে বিরাজিত। কিন্তু এই দাবির সমর্থনে পুস্তিকাটি প্রামাণ্য তথ্যাবলী পেশ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তার ফলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মভীরু মুসলমানদের উপর এটা কোনরূপ প্রভাব বিস্তার কেরতে পারবে না। অথচ এদেরকে আমাদের পক্ষে টেনে আনা কতইনা গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর ভারতের আইনশাস্ত্রবিদরা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষিতে তাদের বক্তব্য হাজির করেছে। ওয়াহাবীদের প্রথম বক্তব্য বিষয়কে তারা অস্বীকার করেনি। ভারত আর ইসলামী দেশ নয়, ওয়াহাবীদের এই বক্তব্য অস্বীকার না করলেও ধর্মযুদ্ধ পরিচালনার বাধ্যবাধকতাসমূহকে তারা অস্বীকার করেছেন।
আমার মতে সমস্যাটির সমাধানের এটাই হচ্ছে প্রকৃষ্ট উপায়। মক্কার আইনশাস্ত্রবিদদের মতানুসারে ভারত যদি এখনও ইসলামী দেশ থাকতো তাহলে গোঁড়া মুসলমানের বিরাটংশ বিদ্রোহের বাধ্যবাধকতা স্বীকার করে নেওয়া তাদের কর্তব্য বলে মনে করত। ভারত যদি আইনগতভাবে এখনও ইসলামী দেশ থেকে থাকে তাহলে আমাদের মুসলমান প্রজাদের উপরোক্ত অংশটা এদেশকে কার্যকরীভাবে ইসলামী দেশে পরিণত করার জন্য আমাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত করবে। সকল শাস্ত্রীয় কিতাবে লেখা আছে: বিধর্মীরা যদি ইসলামী দেশে (বিলাদ-উল-ইসলাম) ঢুকে পড়ে এবং কোন শহর দখল করে বসে তাহলে সেই বিধর্মী শাসকশক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করা প্রতিটি মুসলমান নর-নারী ও শিশুর জন্য অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাড়ায়। (ফরজ আইন) এটা এমন একটা প্রতিষ্ঠিত বিধান যে, রুশীয়রা বোখারায় প্রবেশের সাথে সাথে মুসলমান প্রজারা তাদের বাদশাহকে রুশীয়দের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধের ঘোষণা করতে বাধ্য করে। কাজে কাজেই ভারত যদি এখনও ইসলামী দেশ থেকে থাকে তাহলে প্রতিদিনই এখানে বিদ্রোহের নতুন নতুন ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। আমাদের ধর্মীয় সহনশীলতায় একটা বড় রকমের অপরাধ বলেই সাব্যস্ত হবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ (এবং বৃহত্তম রকমের অপরাধের কথা উল্লেখ না করেও) বলে চলে যে, মুসলমান শাস্ত্র বিধানে বলা হয়েছে যে, কোন ইসলামী দেশের মুসলমান শাসক বা বাদশাহ যদি সত্য ধর্ম প্রচারের বা সংরক্ষণের জন্য চেষ্টা না করে তবে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা আইন সঙ্গত হয়ে দাঁড়ায়। আকবরের শাসনামলে যিনি হিন্দুদের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শনের জন্য ইসলামী আইনের সংস্কার সাধন করেন, বিদ্রোহ করার উদ্দেশ্যে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয় এবং তা থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ দেখা দেয়। ভারত যদি এখনও অনৈসলামিক দেশে পরিণত না হয়ে থাকে তবে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা আরো বেশী করে অপরিহার্য হবে, কারণ ইংরেজরা মুসলমানি বিধি বিধানের উপর শত প্রকারের হস্তক্ষেপ করেছে। মুসলমান আইন অফিসারদের বরখাস্ত করেছে এবং সমগ্র ইসলামী কার্যবিধি বিলোপ করেছে।অতএব মক্কার আইনশাস্ত্রবিদদের আমি ঘোরতর সন্দেহের দৃষ্টিতে না দেখে পারছি না।কলকাতার মোহামেডান লিটারেরী সোসাইটি যেক্ষেত্রে ভারতকে ইসলামী দেশ হিসেবে বর্ণনা করে। সুতরাং বিদ্রোহ বেআইনি বলে রায় দিয়েছে মক্কার আইনশাস্ত্রবিদরা সেক্ষেত্রে মুসলমানদের করনীয় কর্তব্য সম্পর্কে নিশ্চুপ থেকে ধর্মান্ধ শিবিরের হাতকেই শক্তিশালী করেছেন কারণ এই চুপ থাকাকে ঠিক বিপরীত অর্থে ধরে নেওয়া হবে যে,সুতরাং বিদ্রোহ করি ই হচ্ছে অপরিহার্য কর্তব্য।
এ স্বত্বেও ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে এমন একটা শ্রেণী আছে যারা অনুরূপ অর্থ আরোপ করবে না। তাদের কাছে এটা সন্তুষ্টির কারণ হবে যে কলকাতার মোহামেডান সোসাইটি এতগুলো প্রখ্যাত আইনশাস্ত্রবিদদের (জৌনপুরের মৌলবি কেরামত আলী শেখ আহমদ এফেন্দিআল আনসারী মৌলবি আবদুল হাকিম এছাড়াও রয়েছেন মৌলবি আবদুল লতিফ খান বাহাদুরের মত ইংরেজি শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত একজন বাস্তব বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব) মুখ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করিয়েছেন যে,ভারত এখনো বিশ্বাসীদের দেশ এবং সে কারণে বিদ্রোহ অবাঞ্ছিত। কারণ খৃষ্টানদের মত মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যেও মতবাদের বিতর্ক অব্যাহতভাবে চালু রয়েছে। এই শ্রেণীটার মনোভব সম্পর্কে পাঠককে অবহিত করার জন্য আমি নিচের (শেখ আহমদ এফেন্দি আল আনসারী (মদিনার একজন সম্মানিত বাসিন্দা এবং পয়গম্বরের অন্যতম সাহাবী আবু আইয়ুব আনসারীর বংশধর) গত কিছু দিন যাবত তিনি এই শহরে বসবাস করছেন। এবং সভায় বক্তৃতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন যে তিনি সোসাইটির সদস্য নন। তবে এ সভায় উপস্থিত হতে পেরে তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছেন এবং অনুমতি পেলে কিছু বলতে চান, কারণ লৌকিক বিষয় ও ধর্মীয় এবাদত বন্দেগীসহ মুসলমানদের জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এ সভায় আলোচনা হচ্ছে এবং যেহেতু তিনি গত কয়েক বছর যাবত এদেশে এসে বসবাস করছেন তাই এ সকল বিষয় নিজের মতামত ব্যক্ত করার আগ্রহ পোষণ করেছেন।
সভায় সভাপতি জওয়াবে বলেন যে, সভা কৃতজ্ঞতার সাথে তাঁর বক্তৃতা শ্রবণ করবে এবং তার মতামতকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করবে।
প্রখ্যাত শেখ অথবা বলেন যে, ইতিপূর্বে তিনি আরোও অনেক দেশ সফর করেছেন এবং দুবার কনস্টান্টিনোপল গিয়েছেন। প্রথমবার যখন তিনি সেখানে যান তখন সেদেশের শাসক ছিলেন সুলতান মাহমুদ খান এবং সে সময় তিনি দু বছর সেখানে সময় অতিবাহিত করেন। দ্বিতীয়বার যখন যান তখন বর্তমান শাসক সুলতান আবদুল আজিজ খান সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং তখন তিনি চোদ্দ মাস সেখানে অতিবাহিত করেন। তিনি মিশর সিরিয়া এবং এ শয় তুরস্কের বিভিন্ন অংশেও সফর করেছেন। ভারতে এটা চতুর্থ সফর। প্রায় ২৯বছর আগে তিনি সর্ব প্রথম ভারতে আসেন। এবং প্রায় সাড়ে সাত বছর ধরে তিনি বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করেন। তিনি দিল্লীতে আড়াই বছর মরহুম আমজাদ আলী শাহ-এর রাজত্বকালে দুবছর নমাস লক্ষ্মৌতে ছিলেন। লক্ষ্মৌতে তিনি পরলোকগত রাজার আতিথ্য গ্রহণ করেন। রাজা তার প্রতি সব সময় প্রগাঢ় সহৃদয়তা ও অতিথিপরায়ণতা প্রদর্শন করেন। দক্ষিনোত্যের হায়দ্রাবাদে দুবছর কাটিয়ে তিনি বরোদা গমন করেন। বরোদা থেকে তিনি আফগানিস্তান যান এবং সেখানকার বিভিন্ন স্থানে চার কি সাড়ে চার বছর ভ্রমণ করেন। আফগানিস্তানে তার ভ্রমণের সহযাত্রী ছিলেন কাবুলের আমীর দোস্ত মোহাম্মদ খানের ভ্রাতা এবং কাবুলে অবস্থান কালে তিনি বাদশাহের আতিথ্য গ্রহণ করেন। আরো দুবার তিনি ভারতে আসেন কিন্তু কেবল মাত্র দক্ষিনোত্যের হায়দ্রাবাদে ও সিন্ধু প্রদেশে অবস্থান করে চলে যান। প্রায় একবছর হলো তিনি এবার ভারতে এসেছেন এবং মুম্বাই, ভূপাল, রামপুর, এলাহাবাদ, পাটনা, গয়া প্রভৃতি স্থান হয়ে সর্বশেষ কলকাতায় আসেন। এবারও প্রত্যেক জায়গায় তার প্রতি আন্তরিক আতিথেয়তা দেখানো হয়, বিশেষ করে বূপালের মহামান্যা বেগম এবং রামপুরের নওয়াব যে গভীর সহৃদয়তা ও অতিথেয়তা দেখিয়েছেন সে জন্য তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা তাঁর জানা নেই। তাঁর এই ভ্রমণকাহিনী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার কারণ এই যে, বিভিন্ন দেশে এবং ভারতে চার বার ভ্রমণের ফলে যে বিচিত্র অভিজ্ঞতা তিনি সঞ্চয় করেছেন তার ফলে এই সভায় বিশিষ্ট বক্তারা যেসব অভিমত প্রকাশ করেছেন, বিশেষ করে ইংল্যান্ডের রাণী ও তুরস্কের মহামান্য সুলতানের মাঝে প্রতিষ্ঠিত সম্পর্কে সেক্রেটারি মহোদয় যে বিবৃতি পেশ করেছেন, তার সমর্থনে তিনি দুকথা বলার অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছেন। সত্য কথা বলতে কি সুলতানে সাথে দুনিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে ব্রিটিশ জাতির সম্পর্ক অনেক বেশী ঘনিষ্ঠ। বক্তা এমন একটা বক্তব্য সাম্প্রতিক ঘটনার উল্লেখ করেন যা সুলতানের সাথে ব্রিটিশ জাতির মধুর সম্পর্কের পরিচয় বহন করে। কিছুদিন পূর্বে মিসরের খেদিব সুলতানের প্রতি অবাধ্যতা ও অনানুগত্যের মনোভাব প্রকাশ করেন। এনিয়ে গুরুতর পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ায় উপক্রম করে এবং সুলতান খেদিবের কাছে এমন একটা অপমানজনক ফরমান জারী করেন যেটা মেনে নিলেই শুধু খেদিবের অবাধ্যতা সুলতান ক্ষমা করতে পারেন। সুলতানের ফরমান মানতে খেদিব ইতস্তত: করেন। এবং আদ্যে তিনি ফরমানটি গ্রাহ্য করবেন না এরূপ মনোভাব দেখাতে থাকেন। কিন্তু কিছু করার আগে তিনি ফরমানটি ব্রিটিশ কন্সাল জেনারেলের গোচরে এনে তার উপদেশের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন এবং কন্সাল জেনারেলও সঙ্গে সঙ্গে তাকে প্রয়োজনীয় উপদেশ দান করেন। ব্রিটিশ কন্সাল জেনারেল খেদিবকে জানিয়ে দেন যে, ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার কাছ থেকে তিনি এই নির্দেশ লাভ করেছেন যে, খেদিব যদি উক্ত রাজকীয় ফরমান মান্য না করেন তাহলে এথেন্স অবস্থিত ব্রিটিশ নৌবহরকে তারযোগে খবর দিয়ে অবিলম্বে আলেকজান্দ্রিয়া উপস্থিত হওয়ার জন্য যেন নির্দেশ দেয়া হয় একথা শোনার পর খেদিব অনমনীয়তা পরিহার করে বিদ্রোহের পরিকল্পনা পরিত্যাগ করেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ফরমানের অপমানজনক শর্তগুলো মেনে নিয়ে সুলতানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করেন। সুলতানের প্রতি ব্রিটিশ জাতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও প্রগাঢ় বন্ধুত্বের এটা একটা জ্বলন্ত প্রমাণ। ব্রিটিশরা ইতিমধ্যেই সুলতানের বৈদেশিক শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। যদিও খেদিবকে দমনের সম্পূর্ণ ক্ষমতা সুলতানের ছিল, তথাপি ব্রিটিশরা চাননি যে সুলতান একটা গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে জড়িয়ে পড়েন। এটা লক্ষণীয় যে, ঐ সময় মিশরের খেদিবের সাথেও ব্রিটিশদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। কিন্তু উপরোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের কারণ এই ছিল যে, ব্রিটিশরা সুলতানের সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে আসছে এবং তাই প্রয়োজনের সময় তারা সুলতানের স্বার্থ রক্ষার জন্য খেদিবের বন্ধুত্ব পরিত্যাগ করে। ব্রিটিশরা যদি সুলতানের সাহায্যে এগিয়ে না আসতো তাহলে হয়ত খেদিব সুলতানের শক্তিকে খাটো করে দেখত এবং সে অবস্থায় কি যে অঘটন ঘটত তা সহজেই অনুমেয়। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক গৃহীত ত্বরিত ব্যবস্থার ফলে সুলতান এবং খেদিব উভয়ের যুদ্ধ পরিণতি থেকে রেহাই পেয়ে যান। ইসলামের সুলতানের সাথে আন্তরিক বন্ধুত্ব প্রদর্শন করেছে তাদের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করতে চায় তাদের চেয়ে বড় শত্রু আর কে আছে? তাছাড়া ব্রিটিশ ভারত যে দারুল ইসলাম যে সম্পর্কে এই সভায় উপস্থিত বিশিষ্ট পণ্ডিত ব্যক্তিদের প্রামাণ্য উদ্ধৃতি ছাড়াও পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনার সর্বাধিক পণ্ডিত নেতাদের একটা ফতোয়া রয়েছে এদেশের যাবতীয় পরিস্থিতি বিচার-বিবেচনার পর উপরোক্ত সর্বজন শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় নেতারা ব্রিটিশ ভারতকে দারুল ইসলাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন। এবং এরপর এ বিষয়ে আর কিছু কথা বলার থকতে পারে না।
উক্ত ফতোয়ার বরে একজন আরব দ্বিধামুক্ত মনে এদেশে এসেছেন এবং ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে নিশ্চয়তা লাভের উদ্দেশে কোন আবেদন পেশ ছাড়াই যতদিন ইচ্ছা এদেশে অবস্থান করতে পারবেন। এছাড়া প্রায় ২৯বছর আগে তিনি যখন প্রথম এদেশে আসেন তখন লক্ষ্নৌ ও দিল্লিতে শত শত বিজ্ঞ মুসলিম ধর্মীয় নেতার সাথে তার সাক্ষাত হয় তখন তিনি তাদের কাউকে তিনি ভারতকে দারুর হার্ব হিসেবে ঘোষণা করতে শোনেননি। তাদের সবাই এদেশকে দারুল ইসলাম হিসেবে অভিহিত করেন এবং দারুল ইসলামে করণীয় সব কিছুই প্রতিপালিত হয়। বক্তা নিজের অভিজ্ঞতায় বলতে পারেন যে, তখন যেমন এখনও তেমনি প্রতি শুক্রবারে জুমুআর নামাজ এবং বছরে দুটি ঈদের নামাজ আদায় করা হচ্ছে এমন কোন পরিবর্তন ঘটেনি যার ফলে দেশটির দারুল ইসলাম চরিত্র পাল্টে যেতে পারে। বিজ্ঞ শেখ এমন সৎ ব্যক্তিদের সাথে এদেশ সফর করেছেন যাতে করে ভারতের মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে কি ঘটেছে না ঘটেছে তা বুঝতে তাকে বেগ পেতে হয় নি।)
জনৈক শেখের বক্তৃতা উদ্ধৃত করেছি। যে সভায় আলোচ্য পুস্তিকাটি গৃহীত হয় সেখানেই তিনি এই বক্তৃতা প্রদান করেন। ইংরেজরা ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা চালিত হয়ে ভারতের ঘটনাবলীকে প্রায় ভুল অর্থে দেখে থাকে। তাদের জানা উচিত যে, তাদের এশিয় প্রজারা,সংখ্যায় যারা ব্রিটিশ দীপপুঞ্জর মোট জনসংখ্যার ছয়গুণ, তারাও ভারতীয় স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে একই অজ্ঞতার দ্বারা চালিত হয়ে ইউরোপীয় রাজনীতির অপব্যাখ্যা করতে পারে।
নানা ত্রুটি বিচ্যুতি থাকা স্বত্বেও কলকাতার সিদ্ধান্তটি বিত্তবান ও শান্তি প্রিয় মুসলমানদের কাছে গ্রহণীয় হতে পারে। কিন্তু উত্তর ভারতীয় ইন শাস্ত্রবিদদের প্রামাণ্য ঘোষণা অধিকতর সুদূর প্রসারী তাৎপর্য বহন করে। এতে ভারত একটি শত্রু দেশ,ওয়াহাবীদের এই বক্তব্য মেনে নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু তারপর যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে মুসলমানদের কর্তব্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে যে, তাদের উচিত শান্তিপ্রিয় প্রজা হিসেবে নির্বিবাদে বসবাস কর। তাদের এ সিদ্ধান্তটি আমি পরিশিষ্টে তুলে দিয়েছি এবং এখানে শুধু বিষয়টির অধিকতর দৃষ্টি আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করছি।
বর্তমানে উনিশ শতকের শেষ অর্ধাংশ যাবত যে বিষয়টা ভারতীয় মুসলমানদের মনে তোলপাড় সৃষ্টি করে চলেছে, আঠারো শতকের অর্ধাংশ যাবত প্রায় সেই একই প্রশ্ন তাদের মনে উত্থিত হয়েছিল। মারাঠি পৌত্তলিকরা ভারতের মুসলমান সাম্রাজ্যকে কাবু করে ফেলে। অনেক প্রদেশের যেখানে আগে মুসলমান শাসনকর্তা বা মুসলমানি আইন অনুসারে তাদের হিন্দু সহকারীরা শাসনকার্য পরিচালনা করতেন সেগুলো পৌত্তলিক রাজবংশের হাতে চলে যায়। সুতরাং গোঁড়া মুসলমানদের মনে বিজেতাদের অধীনে তাদের মর্যাদা এবং শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ব্যাপারে তাদের দায়িত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নটি সঙ্গে সঙ্গে উত্থিত হয়। তারা এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, মারাঠারা যদি শুধুমাত্র রাজস্বের এক চতুর্থাংশ (চৌথ)নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে এবং প্রশাসনের অন্য কোন ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করে তবে ভারত ইসলামী দেশ হিসেবেই পরিগণিত হবে। মুসলমান বিচারক ও আইন অফিসারদের (কাজী)কাজে তারা কোনরূপ হস্তক্ষেপ করেনি। কোন মুসলমান গভর্নর মারা গেলে তদস্থলে তারা আর একজন মুসলমান গভর্নর নিয়োগ করেছে। তথাপি দূরবর্তী মারাঠা রাজদরবারে উপঢৌকন প্রেরণের বিনিময়ে এসব পদ বংশগত উত্তরাধিকারিত্বে স্বীকৃতি লাভ তাদের অধিকারের বিষয় বলে মনে করা হয়। তৎকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য সিদ্ধান্তটি (এই ফতোয়াটির জন্যও আমি আবার প্রফেসর ব্লকম্যানের কাছে আমার ঋণ স্বীকার করছি। তারনুয়াহর ওমরের বংশোদ্ভূত মৌলভী তাকিউদ্দিন মুহাম্মদ সাবিরের পুত্র কাজী মুহাম্মদ হামিদ; তদীয় পুত্র মৌলভী শেখ আলী তদীয় পুত্র কাজী মুহাম্মদ আলীর মূল আরবী কেতাব থেকে প্রফেসর ব্লকম্যান এ দলিলটি সংগ্রহ করেন। বইটির নাম আহকামূল আরাজী বা ভূমি রাজস্ব বিধি। এতে প্রধানত ইসলামে জায়েজ সম্পত্তি নিয়ে আলোচিত হয়েছে।)ছিল নিম্নরূপ: ধরে নেয়া যাক যে, কোন ইসলামী দেশ বিধর্মী শাসকের হাতে চলে গেছে।কিন্তু ঐ শাসক মুসলমানদের শুক্রবারের জুমার নামায আদায় করা ও দুটি ঈদ উৎসব উদযাপনের অনুমতি দিয়ে আসছে। মুসলমানি আইন এবং মুসলমান কাজীও সে অব্যাহত রেখেছে। এসত্ত্বেও মুসলমান গভর্নর নিযুক্তির জন্য বিধর্মী শাসকের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। দুঃখের বিষয় হলেও অনুরূপ দেশ আমাদের সময়কালে আমরা দেখতে পাচ্ছি, যেখানে বিধর্মী শাসক মুসলমান গভর্নর নিয়োগ করে এবং জুমার নামায ও ঈদ উৎসব উদযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়ে থাকে। বিধর্মীরা (মারাঠারা) আমাদের কতিপয় প্রদেশ দখল করে নিয়েছে। সুতরাং অনুরূপ অবস্থায় ধর্মীয় আইনশাস্ত্রের বিধান কি, তা জানা প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য।
বাস্তব সত্য হচ্ছে এই যে, অনুরূপ কোন মুসলমান প্রদেশ বিধর্মী শাসকের দখলে চলে গেলেও নিম্নোক্ত কারণে তা ইসলামী দেশ হিসেবেই বিবেচিত হবে: যেহেতু এর সন্নিহিত আর কোন শত্রুদেশ নেই; যেহেতু বিধর্মীদের আইন সেখানে প্রবর্তিত হয়নি: যেহেতু গভর্নর ও বিচারক পদে মুসলমানরাই অব্যাহত রয়েছে যারা ইসলামী আইন মোতাবেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে; এবং যেহেতু এমন বিধর্মীরাও সেখান সব বিষয়ে মুসলমানি আইনের শরণাপন্ন হয় এবং মুসলমান আইন অফিসাররাই বিধর্মীদের অপরাধের বিচার করে থাকে।
ভারতের ইসলামী দেশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার জন্য উপরের যেসব বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করা হয়েছে তার একটিও বর্তমানে বজায় নেই। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধিকর্তারা প্রথম দিকে এটা বুঝতে পেরেছিলেন বলেই মুসলমানি প্রশাসনের উপর তারা কোনরূপ হস্তক্ষেপ করেনি। তারা এদেশের আইন হিসেবে মুসলমানি বিধিবিধান অব্যাহত রাখে,আইন প্রয়োগের জন্য মুসলিম আইন অফিসারদের নিয়োগ করে এবং চোট বড় সব বিষয়েই তারা দিল্লীর মুসলমান বাদশাহর নামেই কাজ চালিয়ে যায়। সার্বভৌম ক্ষমতা গ্রহণের ব্যাপারে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এতটা ভীত ছিল যে, মুসলিম প্রশাসনের অবর্ণনীয় দুর্নীতির কারণে মুসলমানদের তার দেশের শাসনকার্য পরিচালনার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার দীর্ঘদিন পরেও তারা মুসলমান বাদশাহর অধীনস্থ হিসেবেই নিজেদেরকে প্রদর্শন করে।এই ভণিতা শে পর্যন্ত কিরূপ অবমাননাকর পরিহাসে পর্যবসিত হয় এবং আমাদের রেজিমেন্ট যখন দরিদ্র পেনশনভোগীদের মাসিক ভাতা পরিশোধ করছিলেন তখনও আমরা কেন দিল্লীর বাদশাহর নামাঙ্কিত (১৭৭৩ সালের পর নিম্নোক্ত বাক্যগুলো খোদিত থাকে- শাসকের নাম অনুসারে সামান্য পরিবর্তন সাপেক্ষে মোহাম্মাদী ধর্মের রক্ষক, আল্লাহর আশীর্বাদ পুষ্ট বাদশাহ শাহ আলমের নামাঙ্কিত এই মুদ্রা সাতটি স্তর প্রচলিত হলো। মুদ্রার অপর পিঠে সিংহাসনারোহণের ১৯তম বার্ষিকীতে মুর্শিদাবাদে মুদ্রতি) মুদ্রা চালু রেখেছিলাম সেব বিবরণ ইতিহাসের বিষয়। যারা কখনও ভারতে পদার্পণ করেননি এমন সব ব্যক্তিরা (মার্শম্যান এবং মিডোজ টেইলর প্রণীত দুখণ্ড বাদে। মাউন্ট ষ্টুয়ার্ট এলফিন স্টোনের রচনা আলোচ্য সময়ের নয়।)এতদিন যাবত ভারতের ইতিহাস রচনা করেছেন বলেই ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উপরোক্ত নমনীয় নীতির কারণ ইংল্যান্ডে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা হয়নি। প্রকৃত সত্য এই যে, মাত্র দশ বছরের মধ্যেই যদি আমরা সার্বভৌমত্ব গ্রহণ করতাম তাহলে ১৮৫৭ সালের চেয়েও ভয়াবহ মুসলমান বিদ্রোহের মোকাবিলা আমাদের করতে হত। কারণ সেক্ষেত্রে মুসলমানদের যাবতীয় মর্যাদায় রাতারাতি পরিবর্তন ঘটত এবং মুসলমানদের দেশ জবর-দখলকারী বিধর্মী শাসক শক্তি হিসেবেই আমরা পরিগণিত হতাম। ভারতীয় মুসলমানদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বিদ্রোহ করাকেই তাদের অপরিহার্য ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করত, কারণ আমি আগেই দেখিয়েছি যে, অনুরূপ পরিস্থিতিতে প্রত্যেক মুসলমান নরনারী ও শিশুর প্রাথমিক কর্তব্য হচ্ছে বিধর্মী শাসকের উপর আঘাতন হেনে তাকে বিতাড়িত করা। (ইমাম মোহাম্মদের মাবসুত দ্রষ্টব্য)
ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের প্রশংসনীয় উদারনীতি, এবং মুসলমান রাজশক্তিকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে বিলুপ্ত হতে দেওয়া এবং এ নিয়ে তাড়াহুড়ো না করার যে সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছিল তার ফলেই উপরোক্ত বিপদজনক পরিস্থিতির উদ্ভব এড়ানো সম্ভব হয়েছে। ভারত দৃষ্টির অগোচরেই ইসলামী দেশ থেকে শত্রুদের (অর্থাৎ দারুল ইসলাম থেকে দারুল হার্বে পরিণত হওয়া) রূপান্তরিত হয়। রাজকীয় ও জেলাসমূহের মহাফেজখানায় সংরক্ষিত দলিলপত্র বহু বছর যাবত অধ্যয়নের পরেও আমার পক্ষে বুজা সম্ভব হয়নি যে, ঠিক কোন বছর বা কোন যুগে ভারতেই এই রূপান্তর বাস্তবায়িত হয়েছে। মুসলমান বাদশাহর নামমাত্র কর্তৃত্বের অবসান ঘটাবার বহু পূর্বেই আমরা অধস্তন মুসলিম গভর্নরদের চাকরির অবসান ঘটিয়েছি। বাদশাহর নামমাত্র কর্তৃত্ব প্রহসনে পরিণত হওয়ার পরেও দীর্ঘদিন ধরে, এমনকি ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত, আমাদের মুদ্রা তার নামেই প্রচলিত থাকে। (কোম্পানি কর্তৃক প্রচলিত টাকায় সর্বপ্রথম ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ রাজের প্রতিকৃতি এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম মুদ্রিত হয়।)
কিন্তু আমাদের টাকার উপর ব্রিটিশ রাজের প্রতিকৃতি মুদ্রিত হওয়ার পরেও মুসলিম কার্যবিধির অনেক কিছু এবং মুসলমানি আদালতের ভাষা আমরা অব্যাহত রাখি। পরে এগুলোও আস্তে আস্তে বিলোপ করা হয়। কিন্তু ১৮৬৪ সালের পরেই শুধু আমরা সেই বলিষ্ঠ নীতি গ্রহণ করি (আমার মতে অবিজ্ঞোচিত কাজ) যার ফলে নতুন আইন (১৮৬৪ সালে একাদশতম আইন) প্রণয়ন করে মুসলমান আইন অফিসারদের চাকরি খতম করা হয়। এই আইনটি ছিল নতুন ভারত সাম্রাজ্যের কাঠামো গড়ে তোলার সর্বশেষ কাজ, যার মধ্যে দিয়ে ভারত শত্রুদেশে রূপান্তরিত হয় এবং যেটা গড়ে তুলতে ঠিক একশ বছর লেগেছে (১৭৬৫ থেকে ১৮৬৪) এভাবে মুসলমানি শাসন ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর আমাদের মুসলিম প্রজাদের সামনে নতুন ধরনের বাধ্যবাধকতা দেখা দিতে শুরু করে। ভারত শত্রুদেশে রূপান্তরিত হওয়ার পূর্বে ইসলামী দেশের বাসিন্দা হিসেবে মুসলমানদের দায়িত্ব স্তিমিত থেকে যায়। আমি আগেই বলেছি যে, এই দায়িত্বগুলোর অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য হচ্ছে বিধর্মী বিজেতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। কিন্তু পরিবর্তনটা বাস্তব রূপ পরিগ্রহের পর আরো কিছু নতুন দায়িত্ব সামনে এসে যায়। মুসলমানদের মর্যাদা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এ পরিবর্তনের জন্য বর্তমান বংশধররা দায়ী নয়; এবং তার ফলে শাসন থেকে রাতারাতি অধিকারচ্যুত হয়ে হৃত অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে তারা বাধ্য নয়। তাদের অবস্থাটা ঠিক মুস্তামিন ধরনের অর্থাৎ তারা নিরাপত্তা প্রয়াসী। তাই ব্রিটিশ শাসকদের কাছ থেকে তারা কতিপয় নাগরিক ও ধর্মীয় সুযোগ সুবিধা (আমান) লাভ করেছে। মুসলমান শাসনামলের পূর্ববর্তী সম্পূর্ণ মর্যাদা (ফতোয়-ই-আলমগীরী ব্যতীত সিরাজিয়া, ইমাদিয়া ও অন্যান্য সকল কেতাবে বর্ণিত আমান-ই-আউয়াল।) নয়; কিন্তু জীবন ও ধনসম্পত্তির এবং আর্থিক নিরাপত্তার অনেক কিছু তারা লাভ করেছে। ব্যক্তিগত নামাজ আদায় করা এবং প্রকাশ্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির উপর কোনরূপ হস্তক্ষেপ করা হয়নি। এবং তাদের ধর্মীয় সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। এই নাগরিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বিনিময়ে তারা প্রজা হিসেবে বর্তমান মর্যাদা মেনে নিয়েছে, ঠিক যেমন গত পঞ্চাশ বছর ধরে তাদের পূর্ব পুরুষরা মেনে নিয়েছিলো।আগের মত তারা আর ইসলামী দেশের মুসলমান নাগরিক নয়, তারা এখন শত্রু দেশের মুসলমান প্রজা, তাই আগের মত ইসলামী দেশের বিধর্মী শাসক শক্তিকে উৎখাতের জন্য বিদ্রোহের বাধ্যবাধকতা তাদের আর নেই- এখন শত্রু দেশের প্রজা হিসেবে তাদের কর্তব্য হল শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ পেশায় নিয়োজিত থাকা।
সুতরাং শাসক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার দায়িত্বের অবসান হয়েছে। নিজেদের ধর্মীয় বিধানুযায়ী বর্তমান মুসলমান বংশধররা স্থিতাবস্থা মেনে চলতে বাধ্য। বর্তমান অবস্থার জন্য তারা দায়ী নয়। সুতরাং ঐশ্বরিক বিধান অনুসারে এবং সশস্ত্র বিদ্রোহের ফলে সত্য ধর্ম যে মারাত্মক পরিণতির সম্মুখীন হবে তা পরিহারের জন্য তারা ধর্মযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব থেকে মুক্ত। শাসক ও শাসিতের পারস্পরিক সম্পর্ক মেনে চলতে এবং যতদিন আমরা তাদের ধর্মীয় অন্যান্য অধিকারে স্বীকৃতি দেব (আমান) ততদিন প্রজা হিসেবে যাবতীয় দায়িত্ব পালন করতে তারা বাধ্য।
অবশ্য ইংরেজ গভর্নররা যদি তাদের নামাজ, প্রকাশ্য প্রার্থনা অনুষ্ঠান ও অন্যান্য আইন সঙ্গত অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করে, কিংবা মসজিদ নির্মাণ, তীর্থ যাত্রা, মাজার যিয়ারত এবং ইসলামী পারিবারিক আইন প্রতিপালনের উপর বাধা নিষেধ আরোপ করে, তাহলে তাদের পক্ষে বিদ্রোহ করা আইনসংগত হবে। কিন্তু সে অবস্থায় বিদ্রোহ আইনসংগত হলেও যদি তা অবাস্তব বলে বিবেচিত হয় তাহলে দেশত্যাগ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠবে। কোন কোন অবস্থায় মুসলমান হিজরত করবে। তার বিবরণ শাহ আবদুল আজিজের নির্দেশনামায় রয়েছে এবং মুসলমানদের সমুদয় শাস্ত্রীয় কেতাবেও লেখা আছে।
পরবর্তী অধ্যায়ে আমি দেখাবো যে, আমরা উপরোল্লিখিত শোচনীয় অবস্থার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছি। কারণ, শাসকদের প্রতি আমাদের মুসলমান প্রজাদের কর্তব্য নির্দেশ করাই শুধু নয়, সেই সাথে তাদের প্রতি শাসকদের কর্তব্য নির্দেশ করাও এই ক্ষুদ্র পুস্তক রচনার উদ্দেশ্য উত্তর ভারতের আইন শাস্ত্রবিদদের সিদ্ধান্ত পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে যার ঐতিহাসিক তাৎপর্যের উপর আমি আলোকপাত করছি,সেই শ্রেণীর লোকের উপর প্রভাব বিস্তার করবে সমঝোতা সৃষ্টির জন্য যাদের শুভেচ্ছা লাভ করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যতদিন আমরা তাদের অধিকার ও ধর্মীয় সুযোগ সুবিধাগুলোর উপর শ্রদ্ধাশীল থাকব কেবল ততদিনই তাদের উপর এই প্রভাব অব্যাহত থাকবে। অনেক ওয়াহাবী এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের এক বিরাট অংশ বিশ্বাস করে যে, ভারত এখন শত্রুদেশ। কিন্তু তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যারা বাস্তব বুদ্ধির অধিকারী অতীতের হারানো মর্যাদা নিয়ে অন্তরজ্বালা অনুভব করলেও বর্তমান অবস্থায় করণীয় কর্তব্যসমূহ মেনে চলতে আগ্রহী। কোরআনের মর্মকথা হচ্ছে এই যে, মুসলমানরা বিজেতা জাতি, কোন অবস্থাতেই বিজিত নয়। আগেই উল্লেখ করেছি যে, বেসামরিক নীতির ক্ষেত্রে কোরআন বহু পূর্বেই অসম্পূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে; এবং মুসলমান জাতিগুলোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য কোরআনের ভিত্তিতে এক ধরনের আইন কানুন ও বিধি-ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। আমাদের মুসলমান প্রজাদের কাছ থেকে উৎসাহব্যঞ্জক আনুগত্য আশা করলে হতাশ হতে হবে। কিন্তু আমরা যুক্তিসঙ্গত ভাবে আশা করতে পারি যে, যতদিন আমরা তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব নিঃসঙ্কোচে পালন করে যাব ততদিন আল্লাহ তাদেরকে যে অবস্থায় ফেলেছেন সেটাকে মেনে নিয়ে তারাও আন্তরিকভাবে আমাদের প্রতি তাদের কর্তব্য পালন করবে।
দূরদৃষ্টিসম্পন্ন আইনশাস্ত্রবিদরা ভারতীয় মুসলমানদের মর্যাদার এই পরিবর্তন বহু পূর্বেই আচ করতে পেরেছিলেন এবং সে পরিবর্তনটা এই পুরোপুরি বাস্তবরূপ পরিগ্রহ করেছে। মাঝে মাঝে এমন সব ফতোয়া জারি হয়েছে যাতে প্রমাণিত হয় যে, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ধীরে চলার নীতি সত্ত্বেও বিপ্লব একেবারে দৃষ্টির অগোচর থেকে হঠাৎ এসে যায়নি। একটি ফতোয়ায় ঘোষণা করা হয় যে, মুসলমান বিচারকরা (যাদেরকে আমরা বিলোপ করেছি) যতদিন আইন প্রশাসনের কর্তৃত্বে থাকবে ততদিন ভারত ইসলামী দেশ বলেই বিবেচিত হবে। কিন্তু ভারত ভাস্কর শাহ আবদুল আজিজ এবং তদীয় ভ্রাতুষ্পুত্র মৌলভী আবদুল হাই এর ফতোয়া দুটিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন প্রশাসনের সব কিছু ক্রমান্বয়ে আমাদের হাতে নিয়ে আসছিলাম তখন আমাদের সঙ্গে তাদের কি ধরনের সম্পর্ক হবে তা নিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। সুতরাং তারা এতদসংক্রান্ত সর্বশ্রেষ্ঠ ভারতীয় পণ্ডিতদের পরামর্শ প্রার্থী হন এবং উপরোক্ত দুজন শীর্ষস্থানীয় আলেম সঙ্গে সঙ্গেই তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। তাদের সে সিদ্ধান্তের হুবহু উদ্ধৃতি নিচে দেওয়া হল:
আবদুল আজিজ ঘোষণা করেন, কোন মুসলমান দেশ যখন বিধর্মীদের অধিকারে চলে যায় এবং সে দেশের মুসলমানদের পক্ষে ও প্রতিবেশী জেলা সমূহের জনসাধারণের পক্ষে বিধর্মী দখলদারদের বিতাড়ন করা যদি অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং কোনদিন সম্ভব হবে বলেও যদি যুক্তিসঙ্গত আশা না থাকে; এবং বিধর্মীদের ক্ষমতা যদি এমন মাত্রায় বাড়তে থাকে যে,তারা নিজেদের খুশিমতো ইসলামী আইন কানুন বাতিল করা বা বহাল রাখার শক্তি লাভ করে;এবং বিধর্মীদের অনুমতি ছাড়া দেশের রাজস্ব আদায় করা যদি কারও পক্ষ সম্ভব না হয়;এবং মুসলমান বাসিন্দারা যদি আগের মত নিরাপদে বসবাস করতে না পারে; তবে সে দেশটি রাজনৈতিকভাবে শত্রুদেশে (দারুল হার্ব) পরিণত হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে।
আমাদের শক্তি সংহত হওয়ার পর মুসলিম আইনশাস্ত্রবিদদের ভারত দারুল হার্ব এই সিদ্ধান্ত অধিকতর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবদুল আজিজের বংশধর মৌলবি আবদুল হাই নিম্নোক্ত স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন; কলকাতা থেকে দিল্লী পর্যন্ত গোটা ভারতে এবং মূল হিন্দুস্থানের সন্নিহিত দেশ সমূহে (অর্থাৎ উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে) বিস্তারিত খ্রিস্টান সাম্রাজ্যে এখন শত্রুদেশ (দারুল হার্ব)কারণ পৌত্তলিকতা (কুফর ও শিরক) এখন সর্বত্র অবাধে চালু হয়েছে এবং আমাদের পবিত্র আইন আর কার্যকরী হচ্ছে না। যখনই কোন দেশে অনুরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তখন সে দেশটা দারুল হার্ব-এ পরিণত হয়। পরিস্থিতির সামগ্রিক বিবরণ দেওয়া দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার; কিন্তু সকর আইনশাস্ত্রবিদরা এ বিষয়ে একমত যে, কলকাতা এবং তার অধীনস্থ এলাকাগুলো শত্রুদেশ (দারুল হার্ব)।
এই সব সিদ্ধান্ত বাস্তব ফল প্রসব করেছে। ওয়াহাবীরা জ্ঞানের চেয়ে উৎসাহ যাদের বেশি, ভারত যথার্থই একটি শত্রুদেশে পরিণত হওয়ার বাস্তবতা থেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে শাসক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অপরিহার্য কর্তব্য। অধিকতর শিক্ষিত মুসলমানরা বর্তমান অবস্থাটা দুঃখের সাথে স্বীকার করে নিয়ে বিদ্রোহ করার সন্তোষজনক পরিবেশ নেই বলে মনে করছে। তারা মনে করে যে, তাদের ধর্মীয় সুযোগ সুবিধাটাই শুধু আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেমন, ইসলামী দেশে, যেখানে পূর্ণ ধর্মীয় মর্যাদা বজায় রয়েছে, শুক্রবারে জুমার নামায অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। ভারতে শুধু যে, ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অনেকে জুমার নামায আদায় করে না তাই নয়, এমন কি অনেক মসজিদে জুমার নামায পড়তেই দেওয়া হয় না।কলকাতার দুইজন প্রখ্যাত মুসলমান, মোহামেডান কলেজের পরলোকগত হেড প্রফেসর (মৌলভী মোহাম্মাদ ওয়াজিব) এবং সাবেক প্রধান মুসলিম আইন অফিসার (কাজী-ই-কুজাত ফজলুর রহমান) শুক্রবারে জুমার নামাযে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকেন। তারা মনে করেন যে, ভারত শত্রুদেশে পরিণত হওয়ায় তাদের উপরোক্ত ধর্মীয় সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।কিন্তু তারা ব্রিটিশ সরকারের অনুগত ও মাননীয় কর্মচারী হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেন। ভারত শত্রুদের পরিণত হয়েছে এই মতে বিশ্বাস-স্থাপনকারী মুসলমানদের অনেকেই জুমার নামাযে যোগদান থেকে বিরত রয়েছে, কারণ তাদের মতে এসব ধর্মীয় সুযোগ সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এর ফলে মুসলমানদের আধ্যাত্মিক জীবনের যে ক্ষতি হচ্ছে তা যখন বুঝতে পারবে তখন অধিকাংশ মুসলমান ওয়াহাবদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। উত্তর ভারতে আইনশাস্ত্রবিদরা এই ঐতিহাসিক পটভূমিকায় সর্বশেষ যে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন তা হাজার হাজার ধর্মান্ধ মানুষকে শাস্তি প্রদানে সক্ষম হবে।
মুসলমান সমাজে এতদিন ধরে যে বাদানুবাদ চলে আসছে তাই ফলশ্রুতি হিসেবে আমাদের শাসনের প্রতি তাদের মৌন সম্মতির লক্ষণ দেখা দিয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু ইসলামের অনমনীয় মতাদর্শে বিশ্বাসী কোন ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছ থেকে এই মৌন সম্মতি পাওয়াটাই যথেষ্ট। খ্রিস্টান সমাজের মত মুসলমান সমাজেও সম্পূর্ণ স্বাধীন বিবেকের লোক খুব কমই আছে এবং কোন প্রতিষ্ঠিত সরকার কেবলমাত্র দুনিয়া লোভী লোকদেরই সর্বদা নিজের কাজে ব্যবহার করতে পারে। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে যে সব তরুণ ভারতীয়, আমাদের এ্যাংলো ইন্ডিয়ান স্কুলগুলো থেকে লেখাপড়া শেষ করে বেরিয়ে গেছে, তারা সবাই তাদের বাপ-দাদাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেছে। পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানভিত্তিক বাস্তবতার সম্মুখীন হয়ে এশিয়ার বড় বড় ধর্মগুলো অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়েছে। সন্দেহবাদী এই উদীয়মান বংশধররা ছাড়াও আয়েশি জীবনযাপনে অভ্যস্ত বিত্তবান শ্রেণীও আমাদের পক্ষে রয়েছে, যারা নিয়মিত প্রার্থনা করে মনোরম পোশাকে সজ্জিত হয়ে মসজিদে গমন করে, এবং এতসব ব্যাপার নিয়ে কদাচিৎ মাথা ঘামায়। এই শ্রেণীর মুসলমানরা আমাদের পক্ষে রয়েছে এটা গুরুত্বপূর্ণ বটে, কিন্তু ভারতে আমাদের অবস্থানের জন্য এটা খুবই দুঃখজনক সর্বোত্তম ব্যক্তিরা আমাদের পক্ষে নেই। এতদিন তারা আমাদের ঘোর বিরোধী ছিল, এবং এটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, বিরোধিতা করাকে অপরিহার্য কর্তব্য বলে তারা আর এখন মনে করছে না। বর্তমানে আমরা তাদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশী যা আশা করতে পারি তাহলে অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু একটা সৎ সরকারের পক্ষে ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা থেকে উৎসারিত উচ্চকণ্ঠ সমর্থনকারীদের চেয়ে বরং ধর্মীয় কর্তব্যের প্রতি অবিচল আস্থাশীল ব্যক্তিদের মৌন সমর্থনের উপর নির্ভর করাই অধিকতর নিরাপদ। (সরকারী যদি মুসলমান আইনশাস্ত্রবিদদের মতামতের উপর বিষয়টি নিষ্পত্তির ভার অর্পণ করাকে যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন তাহলে নিম্নোক্ত প্রশ্নটি তাদেরকে স্থায়ীভাবে যেকোনো পক্ষে ধরে রাখবেন। এ ব্যবস্থাটা বর্তমানে সুখকর বলে মনে না হলেও আনুগত্যকে জনসমর্থনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করাবার সাথে এটাই হবে সর্বোত্তম ব্যবস্থা।)

প্রশ্ন
বিজ্ঞ ভদ্রমহোদয়গণ এবং ইসলামী আইনের ব্যাখ্যাতাবৃন্দ:
নিম্নোক্ত বিষয়ে আপনাদের মতামত প্রদান করুন:
ইংরেজ শাসনে থাকাকালে ভারতের উপর যদি কোন মুসলমান শাসক আক্রমণ পরিচালনা করেন তবে সে অবস্থায় ইংরেজদের আমান প্রত্যাখ্যান করে আক্রমণকারীকে সাহায্য করা ভারতীয় মুসলমানদের কর্তব্য বলে কি আপনি মনে করেন?

About ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার