ইসলামে শক্তির উৎস

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

চার

আফ্রিকায় ইসলামের প্রসার

আমি আগেই বলেছি, মুসলমানদের মধ্যে কখনোই নিয়মিত ধর্ম প্রচারক সংগঠনের অস্তিত্ব ছিল না। এর সবচেয়ে বড় কারণ এই যে, মুসলমানদের ধর্ম প্রচারের কাজকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর মধ্যে সীমিত রাখেনি বরং প্রত্যেক মুসলমানের উপর এটা সমানভাবে ফরয করে দিয়েছে যে তারা যেন ধর্ম সেবায় নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে। খৃষ্টানদের মধ্যে যেমন একটি বিশেষ দল ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা দল ধর্মীয় কাজে অংশগ্রহণও করেনা সে ব্যাপারে কোনো আগ্রহও রাখে না, তেমনিভাবে যদি মুসলমানদের মধ্যেও কোনো বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর সৃষ্টি করা হতো তাহলে হয়তোবা ইসলাম প্রচারের আগ্রহ শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় সংখ্যক লোকের মধ্যেই সীমিত থেকে যেত এবং সাধারণ মুসলমানরা তা থেকে একেবারেই বঞ্চিত থাকতো।

ইসলাম একটা গণতান্ত্রিক ধর্ম। ইসলামের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র সৎকাজই হলো শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড। সুতরাং এই ধর্ম কল্যান ও সৌভাগ্যের দুয়ারও সকলের জন্য উন্মুক্ত না রেখে পারে না। এজন্যই পৃথিবীতে ইসলামই একমাত্র ধর্ম যার অনুসারীদের মধ্যে নিজ ধর্মকে প্রচার করার আগ্রহ সবচেয়ে বেশী ও প্রবল এবং যার অনুসারীদের প্রতিটি ব্যক্তিই মূলতঃ একজন প্রচারক। আমরা ইতিপূর্বে এ প্রচারাগ্রহের ব্যাপকতা ও সর্বসাধারণ মুসলমানের মধ্যে এর উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছি। এবারে আমরা দেখবো, কিভাবে এ সর্বাত্মক প্রচারাগ্রহ দেশের পর দেশ জয় করেছে এবং কাদের হাতে ইসলাম এমন ব্যাপক প্রসার লাভ করতে পেরেছে। উপমহাদেশ, ইরান, মিশর ও আরব বিশ্বের কথা থাক। কেননা এসব জায়গায় মুসলমানরা এক সময় ক্ষমতাসীনও হয়েছিল। তাই ইসলামের বিরোধীরা বলতে পারে যে হয়তো বা এসব দেশে ইসলামের প্রসারে শক্তি প্রয়োগেরও কিছু ভূমিকা রয়েছে।

আমরা আফ্রিকা, চীন ও মালয়েশিয়ার দৃষ্টান্ত বিবেচনা করবো। এসব দেশে ইসলাম যে কখনোই শক্তিপ্রয়োগ করার সুযোগ পায়নি সে কথা ইসলামের চরম শত্রুও স্বীকার করবেন। সর্বোপরি তাতার দেশসমূহ এবং তুর্কীস্তানের বিষয় বিশেষভাবে আলোচনা করা দরকার। কেননা এসব দেশ সম্পর্কে ইতিহাসের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত এই যে, এখানে নিরস্ত্র ইসলাম সশস্ত্র কুফরীর মোকাবিলা করে তাকে পরাজিত করেছে। এসব দৃষ্টান্ত তুলে ধরে আমরা পাঠকগণকে দেখাতে চাই, ধর্মীয় নিষ্ঠার অধিকারী মুসলমানরা এ পবিত্র ধর্মের কি রকম সেবা করেছেন। আর আমরা যদি এমনি ধরনের ধর্মীয় উদ্দীপনা নিয়ে কাজে লেগে যাই তাহলে আমরা অতি সহজেই ইসলামের প্রচার ও হেফাজতের দায়িত্ব পালন করতে পারি। এ প্রসঙ্গে আমরা সর্বপ্রথম আফ্রিকার বিষয় উত্থাপন করবো।

আফ্রিকায় ইসলামের সূর্যোদয়

যেসব নও-মুসলিম ‘বারবার’ জাতীয় লোকদের বাণিজ্যোপলক্ষ্যে পশ্চিম সুদানে আসা-যাওয়া করতেন তারাই সর্বপ্রথম সেখানে ইসলাম প্রচার করেন। এ ‘বারবার’ গোত্রসমূহের মধ্যে লামতোনা ও জাদ্দালা নামীয় গোত্রদ্বয় ইউসুফ বিন তাশফিনের আমলে প্রায় সমগ্র পশ্চিম সুদানকে ইসলামের আলোকে আলোকিত করে দেন। হিজরী পঞ্চম শতকে এ ‘বারবার’ বণিকগণই তৎকালীন নিগ্রো রাজ্য ঘানাকে ইসলামে দীক্ষিত করেন। এরপর সুদানের প্রাচীনতম রাজ্য সংঘাইও তাদের হাতে ইসলামে দীক্ষিত হয়। হিজরী ৬ষ্ঠ শতক তাদের প্রভাব দূর-দূরান্তে পৌঁছে যায়। এ সময়ে প্রখ্যাত বাণিজ্যিক শহর টামবাকটো ইসলামের সবচেয়ে বড় প্রচার কেন্দ্রে পরিণত হয়। নিগ্রোরা বাণিজ্যোপলক্ষে এখানে আসতো এবং ‘বারবার’ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ইসলামের অমূল্য সম্পদ নিয়ে সমগ্র সুদান ও নাইজেরিয়ায় ছড়িয়ে দিতো। এসব লোকের মধ্যে ইসলামের প্রতি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা এতবেশী ছিল যে, ইবনে বতুতা যখন সেখানে পৌঁছেন তখন তাদের সম্পর্কে লিখেনঃ

“এরা কুরআনের প্রেমিক। আর নামাযের প্রতি তারা এমন নিষ্ঠাবান ও নিবেদিত প্রাণ যে, জুমআর দিন সকাল বেলা গিয়ে মসজিদে না বসলে জায়গা পাওয়া অসম্ভব”।

এ নও-মুসলিশ জাতিসমূহের মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় ইসলাম প্রচারক জাতি ছিল মণ্ডেদু জাতি। নিজেদের আদত অভ্যাস ও সদাচরণের জন্য এঁরা ছিলেন সমগ্র আফ্রিকায় অত্যন্ত খ্যাতিমান জাতি। এঁদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো মধ্য-আফ্রিকার সবচেয়ে প্রতিভাবান, কর্মঠ ও ব্যবসায়ী জাতি রূপে পরিচিত হাউসা জাতি এদেরই চেষ্টার ফলে ইসলাম গ্রহণ করেন। হাউসা জাতি প্রায় সমগ্র সুদান ও নাইজেরিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর একক কর্তৃত্বশীল এবং গায়েনা থেকে কায়রো পর্যন্ত এদের ব্যবসায়ী কাফেলার নিয়মিত যাতায়াত। ইসলামের প্রসারে এ ব্যবসায়ী জাতির মূল্যবান অবদানের কথা পরে আলোচিত হবে।

পূর্ব সুদানে ইসলাম প্রচার করেন মিশরীয় বণিকগণ। বিশেষভাবে মিশরে যখন ফাতেমী খেলাফতের পতন ঘটে তখন বহু আরব পালিয়ে সুদানে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাঁরা এ অঞ্চলে দূরদূরান্তে ইসলাম প্রচার করেন। তিউনিস ও তানজানিয়ার আরব বণিকগণও এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের কর্তব্য সম্পাদন করেন। বিশেষতঃ দক্ষিন-পশ্চিম সুদানে ইসলাম প্রচার তাঁদেরই একক অবদান। পরবর্তীকালে আহমদ নামক একজন আরব “দারাকোর”-এ ইসলামী শাসন ব্যভস্থাও প্রতিষ্ঠা করেন –যা কয়েক শ’বছর পর মুহাম্মদ আলী পাশা নিজ রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া পর্যন্ত বহাল থাকে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে মধ্য আফ্রিকার মুসলশানদের মধ্যে ইসলাম প্রচারের জন্য এক নতুন জাগরণের সৃষ্টি হয়। এ জাগরণের ডাক প্রথম আসে শেখ ওসমান দানফেদিও’র পক্ষ থেকে। তিনি শেখ আবদুল ওয়াহাব নাজদীর শিক্ষায় প্রভাবিত হয়ে আমর বিল মা’রূফ ও নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা)-এর সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করেন।বিশেষতঃ ফুলবী সম্প্রদায়ের মধ্যে তিনি এমন ইসলামী উদ্দীপনার সৃষ্টি করেন যে, তারা ইসলামের খেদমতের জন্য আত্মৎসর্গের মনোভাব নিয়ে কাজ শুরু করেন। তারা প্রাচীন ‘গোবার’ রাজ্য থেকে শেরক ও মূর্তিপূজা উচ্ছেদ সাধন করে সমগ্র ‘হাউসাল্যাণ্ড’-কে কুফরী থেকে পবিত্র করেন। ১৮১৬ সালে যখন ওসমান দানফোদিও ইন্তেকাল করেন তিনি ‘হাউসাল্যাণ্ড’-এর সার্বভৌম বাদশাহ ছিলেন এবং তার গোটা সাম্রাজ্যের কোথাও শেরক ও মূর্তিপূজার নাম নিশানা পযন্ত ছিলো না। ১৯০০ সালে ইংরেজরা এ ইসলামী সাম্রাজ্যের অবসান ঘটায়। ক্নিতু ফুলবী ও হাউসা জাতির ইসলাম প্রচারের স্পৃহা তাতে বিন্দুমাত্রও ম্লান হয়নি। এর জ্বলন্ত প্রমাণ এই যে, এ বিংশ শতাব্দীতেই তারা ‘ইউরোবা’ অঞ্চল থেকে মূর্তিপূজার উচ্ছেদ ঘটিয়ে সেখানে ইসলামের আলো বিস্তার করেন। তারা নাইজার নদীর দক্ষিণ তীর পর্যন্ত সত্য দ্বীনের প্রসার ঘটান। ‘উজিবু’ অঞ্চলে তারা ১৮৯৪ সালে প্রথম প্রচারকার্য শুরু করেন এবং কয়েক বছরেই এত অগ্রগতি অর্জন করেন যে, ১৯০৮ সালে সেখানকার এক শহরে বিশটি এবং অপটিতে বারোটি মসজিদ নির্মিত হয়।

এমনিভাবে নাইজার নদীর দক্ষিণ তীরে তারা ১৮৯৮ সালের পর ইসলাম প্রচার শুরু করেন এবং ১৯১০ সালের মধ্যেই প্রায় সব কটি গোত্র আল্লাহর দ্বীনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন।

আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল মুসলমানদের আর একটি প্রচার ক্ষেত্র। গায়েনা, সিয়েরালিওন, লাইবেরিয়া ও মাণ্ডী-[এটি সিয়েরালিওন থেকে প্রায় ১০০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত একটি অঞ্চল] প্রভৃতি উপকূলীয় অঞ্চলে আজ থেকে প্রায় সোয়াশ’ বছর আগে মুসলিম বণিকগণ ইসলাম প্রচারের কাজ আরম্ভ করেন এবং অল্প দিনের মধ্যেই সেখানকার অন্ধত্ব ও মূর্খতাকে সভ্যতায় রূপান্তরিত করেন। ১৮০২ সালে সিয়েরালিওনের এক ইংরেজ কোম্পানী বৃটিশ কমন্স সভায় একটি আবেদন পত্র পেশ করে। তাতে লেখা হয়েছিলঃ

“এখান থেকে প্রায় ৪০ মাইল দূরে আজ থেকে ৭০ বছর আগে কতিপয় মুসলিম বণিক এসে বসতি স্থাপন করে। অন্যান্য জায়গায় মুসলমানদের মত তারা এখানেও মাদ্রাসা ইত্যাদি স্থাপন করে ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তার করতে আরম্ভ করে এবং এরূপ সংকল্প গ্রহণ করে যে, যে ব্যক্তি ইসলাম পগ্রহণ করবে তাকে দাস হিসেবে বিক্রী করা হবে না। অল্প দিনের মধ্যেই একানে উন্নতমানের কৃষ্টি ও সভ্যতার চিহ্ন পরিস্ফুট হতে আরম্ভ করে। লোক সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। সেই সাথে প্রাচুর্যও বেড়ে যায়। ক্রমে এ এলাকায় ইসলামের প্রভাব সবকিছুর ওপর বিজয়ী হয়ে উঠে। লোকেরা দলে দলে মুসলমানদের ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে। মনে হয়, শীঘ্রই গোটা অঞ্চল ইসলামে দীক্ষিত হয়ে যাবে”।

সিয়েরালিওনে ইসলাম প্রচার সম্পর্কে ডঃ ভেমার লিখেছেনঃ

“এখানকার মুসলমানদের মধ্যে ইসলাম প্রচারের জন্য কোনো বিশেষ দল নির্দিষ্ট নেই বরং এদের প্রতিটি ব্যক্তি ইসলাম প্রচারকারী। যেখানেই ৫/৬জন মুসলমানের বসতি হয়েছে, সেখানেই একটা মসজিদ হয়ে গেছে। আর সেই ক্ষুদ্র ঘরটি ঐ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এদের নিয়ম কানুনও খুব সহজ। যে ব্যক্তি কালেমা পড়ে। নামায পড়া ও মদ ত্যাগ করার অঙ্গীকার করে সে তাদের বিশ্বজোড়া পরিবারে সদস্য হয়ে যায়”।

গায়েনায় ইসলামের সবচেয়ে সক্রিয় প্রচারক হাউসা সম্প্রদায়ের বণিকগণ তাঁদের মার্জিত সামাজিক আচার-পদ্ধতি ও বিশিষ্ট রীতিনীতি অসভ্য গোত্রগুলোকে তাদের দিকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে এবং সাফল্যের সাথে তারা তাদেরকে ইসলামে দীক্ষিত করে। দাহোমী ও আশানতিতে খুব অল্পদিন হয় কাজ শুরু হয়েছে। এজন্য সমগ্র পশ্চিম আফ্রিকায় শুধুমাত্র এ দু’টি অঞ্চলেই এখনো পর্যণ্ত সামান্য কিছু কুফর ও মূর্তিপূজার চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। লাগোসে মুসলমানদের শক্তি অত্যন্ত প্রবল। এখানে তাদের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের মধ্যে ফুলবী, হাউসা ও মণ্ডেদু –এ তিন সম্প্রদায়েরই কিছু না কিছু লোক রয়েছে। বাণিজ্যোপলখ্ষে তাঁদের অনেক দূর-দুরান্তে যেতে হয়। এজন্য তাদের কল্যাণেই সমগ্র নাইজেরীয় উপকূল ও গোণ্ডকোষ্ট ইসলামের আলোয় আলোকিত হচ্ছে। সেনেগালের মোহনা থেকে লাগোস পর্যন্ত দীর্ঘ দু’হাজার মাইল ব্যাপী উপকূলে বলতে গেলে এমন একটি বসতিও নেই যেখানে অন্ততপক্ষে একটি মসজিদ ও একজন মৌলভী নেই। এসব এলাকায় বসবাসরত প্রতিটি মুসলমান তা সে ব্যবসায়ী হোক কিংবা বৃটেন ফ্রান্স কিংবা বেলজিয়ামের কর্মচারী হোক যে কোনো কাফের ও মূর্তিপূজারীর সাথে সাক্ষাত হলেই সবার আগে তার কাছে কুরআনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়াকে সে তার সর্বপ্রথম দায়িত্ব বলে মনে করে। এমন প্রচণ্ড প্রচার স্পৃহা খৃষ্টান মিশনারীদের সমস্ত আকাঙ্ক্ষাকে চূর্ণ করে দিয়েছে”।

পূর্ব আফ্রিকাও আরব বণিকদের মাধ্যমেই ইসলামের মত শ্রেষ্ঠ নেয়ামত লাভ করে। বিংশ শতাব্দী পর্যণ্ত তারা সমগ্র ঝাঞ্চ উপকূলে ইসলামের আলো বিস্তার করেন এবং স্থানে স্থানে মুসলিম বসতি স্থাপন হয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃত প্রচার কার্য শুরু হয় তখন যখন জার্মানী, ইংল্যাণ্ড ও ইটালী প্রভৃতি এসব দেশে উপনিবেশ কায়েম করে এবং দেশের অভ্যন্তরে পৌঁছুবার সমস্ত ব্যবস্থঅ সম্পন্ন করে। সে সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন প্রতিষঠার জন্য ঐসব উপনিবেশের মুসলমানদের সাহায্য নেয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। ফলে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিচার বিভাগ, শিক্ষাঙ্গন, রাজস্ব –মোটকথা প্রতিটি বিবাগে মুসলমাদেরকে ভর্তি করা হয়। তারা আফ্রিকার অভ্যন্তরভাগে পৌঁছে ইসলাম প্রচারে সর্বাধিক সক্রিয় হয়ে উঠে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে তারা বোন্দী ও ভদেণ্ড গোত্রকে প্রায় পুরোপুরিভাবে মুসলমান বানিয়ে ফেলে। ১৯০৫ সালের পর তারা পশ্চিমে টাঙ্গানাইকা, উত্তরে ওসাম্বারা ও দক্ষিণে নায়াসা পর্যন্ত কুরআনের শিক্ষা বিস্তারের কাজে ছড়িয়ে পড়েন। ১৮৯১ সালে ওয়াসাম্বারাতে একজনও মুসলমান ছির না বরং কোনো মুসলমানের উপস্থিীতকে ঘৃণার চোখে দেখা হতো। কিন্তু নিয়মিত সরকার প্রতিষ্ঠা হতেই এবং মুসলিম ফিসারদের সেখানে যাওয়ার পর থেকেই লোকেরা উক্ত অফিসারদের সংস্পর্শে এসে একে একে মুসলমান হতে আরম্ভ করলো। যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো মুসলমান শিক্ষক নিযুক্ত ছিল সেখানেও ইসলাম ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। এভাবে নায়সাল্যাণ্ডেও দশ বছরের মধ্যে ইসলামের বিস্ময়কর অগ্রগতি হয়েছে। খৃষ্টান মিশনারীরা স্বীকার করে থাকেন যে, এসব এলাকায় মুসলশান হওয়া মানুষ হওয়ারই নামান্তর।

কেপ উপনিবেশে ইসলাম প্রচার করেছেন মালয় দ্বীপপুঞ্জের মুসলিম বণিকগণ। এরা হল্যাণ্ড সরকারের কর্তৃর্ত্বাধীন বলে অনেক দিন ধরে ওখানে থেকেছেন এবং অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে ইসলাম প্রচার করেছেন। ১৮০৯ সালে কোলব্রুক লিখেছিলেনঃ

“আমাদের মিশনারীদের সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও মুসলিম প্রচারকগণ কৃষ্ণকায় দাসগণকে ও স্বাধীন লোকদেরকে সাফল্যের সাথে মুসলমান বানিয়ে ফেলছে। আমাদের প্রচারকরা বহু সময় ও টাকা খরচ করে অতি কষ্টে মুষ্টিমেয় সংখ্যক লোককে খৃষ্টান বানায়। কিন্তু মুসলিম প্রচারকগণ বিনা পরিশ্রমেই বিপুল সংখ্যক লোক হস্তগত করতে সক্ষম হচ্ছে”।

বিগত ৫০/৬০ বছরে বাইরের মুসলমানরাও ঐসব এলাকায় পৌঁছে গেছে এবং তারা ইসলাম প্রচারে নতুন প্রাণশক্তির সঞ্চার করেছে। বর্তমানে বিশেষভাবে ক্লেরামতিন্টে ইসলাম প্রচারের গতি অধিকতর বেগবান। এখানে বিপুল সংখ্যক ইয়াতীম ও অনাথ বালক-কিশোর ইসলাম গ্রহণ করেছে।

-[আফ্রিকায় ইসলামের যে অবস্থা এ অধ্যায়ে আলোচিত হলো তা এই রচনা প্রকাশিত হবার সময়কার অর্থাৎ এখন থেকে ৫০ বছর আগেকার ঘটনা। বর্তমানে আফ্রিকায় ইসলামের অবস্থা এর চেয়ে অনেক বেশী সংহত, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। -অনুবাদক]

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.