ইসলামে শক্তির উৎস

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সাত

বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের ডাক

এই দীর্ঘ ইতিহাস বর্ণনা আমি শুধু গাল-গল্পের খাতিরেই করিনি। এর উদ্দেশ্য শুধু এই, আমি প্রমাণ করতে চাই যে, ইসলামের ধর্মীয় ও পার্থিব শক্তির মূল উৎসই হচ্ছে কল্যাণের দিকে আহবান জানানো, সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখা। এর ওপরই ইসলামের গোটা জীবনী মক্তির নির্ভরতা। আর এ কাজের জন্যই আল্লাহ তাআলা মুসলিম নামক জাতিকে সৃষ্টি করেছেন। যেহেতু কোনো বাণীর স্বভাবগত দাবীই এই যে তাকে ইপ্সিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেয়া হোক। সে জন্য তাবলীগ বা প্রচার ইসলামের প্রকৃতির ই দাবী। ইসলাম আসলে আল্লাহ তা’আলার একটি বাণী এবং এ বাণী প্রেরিত হয়েছে ভূ-মণ্ডলের প্রতিটি আদম সন্তানের কাছে। তাই যে ব্যক্তির কাছেই এ বাণী পৌঁছে যাবে, সে ঐ বাণীকে যতবেশী আদম সন্তানের নিকট সম্ভব পৌঁছে দেয়ার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকৈ নির্দেশিত ও দায়িত্বশীল। এ সত্যই কুরআনে কারীমের নিম্নলিখিত আয়াতে বিঘোষিত হয়েছেঃ

كُنتُم خَيرَ أُمَّةٍ أُخرِجَت لِلنّاسِ تَأمُرونَ بِالمَعروفِ وَتَنهَونَ عَنِ المُنكَرِ وَتُؤمِنونَ بِاللَّهِ

“তোমরাই বিশ্বের সেই শ্রেষ্ঠতম জাতি যাকে মানবজাতির কল্যাণের জন্য আবির্ভূত করা হয়েছে। তোমরা ভালো কাজের আদেশ দেবে, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী থাকবে”।–(আলে ইমরানঃ১১০)

এই একটি মাত্র উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্যই আল্লাহ তাআলা মুসলিম জাতিকে সৃষ্টি করেছেনঃ

وَلتَكُن مِنكُم أُمَّةٌ يَدعونَ إِلَى الخَيرِ وَيَأمُرونَ بِالمَعروفِ وَيَنهَونَ عَنِ المُنكَرِ ۚ

“তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক অবশ্য থাকা চাই যারা কল্যাণের দিকে ডাকবে, ভালো কাজের আদেশ করবে ও মন্দ কাজ থেকে বিরথ রাখবে”।–(সূরা আলে ইমরানঃ১০৪)

এ দায়িত্বশীলতার অনুভূতি ইসলামের ১৩শ’ বছরের জীবনে যে বিস্ময়কর ফল দেখিয়েছে তার একটি অতি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলোতে দেয়া হয়েছে। এ বর্ণনাটুকু অধ্যয়ন করে পাঠক এ বিষয়টা উপলব্ধি করে থাকবেন যে, যে মুসলামনগণ নিজেদের মুসলমানিত্বের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন তারা।

ادعُ إِلىٰ سَبيلِ رَبِّكَ بِالحِكمَةِ وَالمَوعِظَةِ الحَسَنَةِ

“বুদ্ধিমত্তা ও উত্তম উপদেশাবলী প্রয়োগ করে আল্লাহর পথে ডাকো” এই খোদায়ী নির্দেশ অতি নিপুনভাবে বাস্তবায়িত করেছেন। আর এ নির্দেশ অনুসারে তারা শুধুমাত্র উপদেশ প্রদান ও প্রচারের শক্তি দ্বারাই বিশাল এক ভূ-খণ্ডকে ইসলামের কাছে নতি স্বীকার করিয়েছেন। আফ্রিকায় বিশাল মহাদেশে কোনো প্রকার লোভ প্রদর্শন জোর-জবরদস্তি এবং ধোঁকা-প্রতারণা ছাড়াই যেভাবে কোটি কোটি মানুষ ইসলামে দীক্ষিত হয়েছে, চীনে কোনো প্রকার বস্তুগত ও এক নায়কমূলক শক্তি প্রয়োগ ছাড়াই যেভাবে একের পর এক জনবসতিসমূহ ইসলামের বশ্যতা স্বীকার করেছে, মালয় দ্বীপপুঞ্জে নিরস্ত্র ও শক্তিহীন বণিকদের হাতে যেভাবে চার-পঞ্চমাংশ জনসংখ্যা এক আল্লাহর অনুগত হয়েছে এবং তাতার ভূমির মুসলিম হন্তা ও খুনি অসভ্যদেরকে দুর্বল নারীগণ ও নিৎসম্বল দরবেশগণ যেভাবে ইসলামের সামনে মাথা নত করিয়ে দিয়েছে, তার শিক্ষাপ্রদ ইতিবৃত্ত আমরা ঐ দায়িত্বানুভূতির ফল দেখানো উদ্দেশ্যেই আমাদের মুসলিম ভাইদের সামনে পেশ করলাম। এটা পেশ করার উদ্দেশ্য হলো, আমাদের ভাইদের মধ্যেও যেন ঐ দায়িত্বানুভূতি কোনো করম জাগ্রত হয়।

১৮৫৭ সালের পরবর্তী প্রচারমূলক তৎপরতা

১৮৫৭ সালের ব্যর্থ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতের মুসলমানদের ইসলামী সম্ভ্রববোধে যে মর্মান্তিক আঘাত লাগে, সে আঘাত কিছু দিনের জন্য তাদের ধর্মীয় অনুভুতিকে জাগিয়ে তোলে এবং তার কারণে ১৮৮৫ সালের পর প্রায় চল্লিশ বছর পর্যন্ত ইসলাম প্রচারের কাজ খুবই দ্রুততার সাথে হতে থাকে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, অমুসলিম কর্তৃত্বের প্রভাবে সেই ধর্মীয় অনুভূতি এবং সেই প্রচারস্পৃহা শেষ হয়ে যায়। ইসলামের সেবায় যে ব্যাপক জাগরন কিছু দিনের জন্য সৃষ্টি হয়েছিল তা পারস্পরিক কুফরী ফতোয়া বিনিময়ে ও পারস্পরিক দাঙ্গা ফাসাদে ব্যয়িত হতে থাকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ অর্ধেক ইতিহাস অধ্যয়ন করলে এ বিস্ময়কর ঘটনা আমাদের চোখে পড়ে যে, তৎকালে ইসলাম প্রচারের কোনো নিয়মিত ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও নও-মুসলিমদের সংখ্যা প্রতি বছর ১০ হাজার থেকে শুরু করে ছয় লাখ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে। তখন ওলামা ও ওয়ায়েজীনের একটি বড় দল সৃষ্টি হয়। তারা নিজেদের জীবন ইসলাম প্রচারের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন এবং ব্যক্তিগত ক্ষমতা শহরে শহরে ঘুরে হাজার হাজার মানুষকে ইসলামে দীক্ষিত করেন। তাছাড়া সাধারণ মুসলমানদের মধ্যেই ইসলাম প্রচারের এমন প্রেরণা জাগে যে, অফিসের কর্মচারীদের থেকে শুরু করে সাধারণ দোকানদার পর্যন্ত ইসলাম প্রচারে রত থাকতো। লাহোরের আঞ্জুমানে হেমায়েতে ইসলামের পুরনো রিপোর্টে দেখা যায়, তৎকালে স্কুল-মাদ্রসার শিক্ষক, সরকারী কর্মচারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এমনটি একজন উট গাড়ীর চালক পর্যন্ত ইসলাম প্রচারে রত থাকতো।

বর্তমা্ন অবস্থা

এ যুগে ইসলাম প্রচারের এত ধীর গতির কারণ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, এর পুরো দায়িত্বই আমাদের শৈথিল্য ও ধর্মীয় উদাসীনতার ওপর বর্তায়। নয়তো একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইসলাম আগে যা ছিল এখনো তাই আছে। এর প্রকৃতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি, আসতে পারেও না। তবে আমাদের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। আমাদের চরিত্র পাল্টে গেছে। আমাদের আবেগ অনুভূতি বদলে গেছে। এ কারণেই আজকের এই আধোগতি। সুতরাং আজ  উপমহাদেশে ইসলামের প্রচার নিয়ে যে নাজুক সমস্যা দেখা দিয়েছে তার সমাধান কেবল সভা-সমিতি করলেই হবে না, কেবল পত্র-পত্রিকা বের করলেই হবে না, কেবল হৈ-হল্লা করে সময় নষ্ট করলেও কোনো কাজ হবে না। এর আসল সমাধান হলো, আমাদের মুসলমানদেরকে মুসলমান বানাতে হবে, তাদের মধ্যে সঠিক ইসলামী উদ্দীপনা ও প্রাণ শক্তির সঞ্চার করতে হবে; তাদের জীবনকে সঠিক ইসলামী ছাঁচে ঢালাই করতে হবে। তাদের মধ্য থেকে সমস্ত বাতিল আকীকা-বিশ্বাস, বেদাতী রসম-রেওয়াজ ও ভ্রান্ত আদত অভ্যাসগুলো দূর করতে হবে। শত শত বছর ব্যাপী একটি অংশীবাদী জাতির সাথে বাস করতে করতে তাদের মধ্যে এসব জিনিস জন্মেছে। আমাদের যত্নবান হতে হবে মুসলমাদের মধ্যে এমন ধর্মীয় উদ্দীপনার সৃষ্টি করতে যা প্রতিটি মুসলমানকে ইসলামের সক্রিয় প্রচারকে পরিণত করবে।

আমি বারবার জোর দিয়ে বলেছি যে, মুসলমানরা কোনোদিনও খৃষ্টানদের মন মিশনারী সতিনি বানিয়ে ইসলাম প্রচার করেনি। অবশ্য তার অর্থ এই নয় যে, আমরা সংঘবদ্ধতার সাথে কাজ করার বিরোধী। আসল কথা হরো এ কাজটা শুধুমাত্র একটি বা কয়েকটি দলের করণীয় নয়। বরং সে জন্য মুসলমানদের মধ্যে ইসলামকে প্রচারিত ও প্রসারিত করার এক সর্বব্যাপী ও সার্বজনীন উদ্দীপনার সৃষ্টি হওয়া চাই –যেন প্রত্যেক মুসলমান নিজেকে এ মহিমান্বিত কাজের জন্য দায়িত্বশীল মনে করতে আরম্ভ করে।

শুধু প্রচারক দল না সর্বজনীন প্রচার স্পৃহা?

সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে যদি এ সর্বাত্মক প্রচার স্পৃহা ও প্রচার উদ্দীপনা জাগ্রত না হয় এবং শুধুমাত্র একটা বা কয়েকটা সমিতি বানিয়ে তাদের ওপর এ কাজের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, তাহরে একথা সুনিশ্চিতভাবে জেনে রাখতে হবে যে, অমুসলিমদের মোকাবিলায় আমরা কখনোই সফলকাম হতে পারবো না। কেননা সব জায়গায় মুসলমানদের সার্বজনীন প্রচার স্পৃহাই সফলকাম হয়েচে। আফ্রিকায় যদি মুসলমানদের এ সার্বজনীন প্রচার স্পৃহা না থাকতো এবং শুধুমাত্র কতিপয় সমিতিকেই তাবলীগ ও প্রচারের কাজে নিয়োগ করে ক্ষান্ত থাকা হতো তাহলে তাদের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী ও বিত্তশালী খৃষ্টান সমিতিগুলোর মোকাবিলায় তারা কেয়ামত পর্যন্তও এমন সাফল্য লাভে সক্ষম হতো না, যে সাফল্য তাদের বাস্তবিকই অর্জিত হয়েছে এবং যা দেখে সমগ্র খৃষ্টান জগত বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেছে। এমনিভাবে মালয় দ্বফপুঞ্জেও যদি সর্বস্তরের বণিক ও পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপক ধর্ম প্রচার স্পৃহা সক্রিয় না থাকতো এবং শুধুমাত্র মাঝে মাঝে আগমনকারী আরব ও ভারতীয় ওয়ায়েজীন ও ওলামাই ইসলামের দাওয়াত দেয়ার দায়িত্ব পালন করতেন তাহলে ভূমধ্য সাগরের কিনার থেকে আজতক বেশী করে আযানের শ্বদ পৌত্তলিক ও খৃষ্টান সাম্রাজ্যবাদীদের সম্মিলিত প্রতিরোধ সত্ত্বেও শোনা যাচ্ছে, তা সম্ভবত শোনা যেতো না। এটা সত্যি কথা যে, ইসলাম প্রচার একটা ফরযে কেফায়া। এ কাজ সম্পাদনে কোনো একটা দল আত্মনিয়োগ করলেই সমগ্র উম্মতের জন্য তা যথেষ্ট। কিন্তু শরিয়তের এ উদার বিধান শুধু মুসলমানদের স্বাচ্ছন্দের জন্য তাদেরকে ধর্ম সেবার দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে দেয়া ও বেপরোয়া করে দেয়ার জন্য নয়। এ উদারতার অর্থ হলো, দায়িত্বটা তো সকল মুসলমানদের উপরই বর্তায় এবং সবারই তা করণীয়। কিন্তু অন্ততঃ পক্ষে এমন একটা দল অবশ্যই থাকা উচিত যা সবসময় আবশ্যিকভাবে এটা করতে থাকবে। আার সেই দলীট যে ওলামা ও পুণ্যবান লোকদেরই দল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

অতএব আমার মতে ইসলাম প্রচারের সর্বোত্তম পন্থা এই যে, অমুসলিমদের ডাক দেয়ার পরিবর্তে স্বয়ং মুসলমানদেরকেই ডাক দিতে এবং তাদের মধ্যে এমন ধর্মীয় জাগরণ ও প্রেরণার সৃষ্টি করতে হবে যেন প্রত্যেক মুসলমান এক একজন প্রচারকে পরিণত হয়। এতে করে শুধু যে ইসলাম প্রচারের দায়িত্বই অতি উত্তমভাবে সমাধা হবে তা নয়, বরঞ্চ সেই সাথে আমাদের অনেকগুলো ধর্মীয় রোগও আরোগ্য হবে।

কয়েকটি সংস্কার-প্রস্তাব

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রচারাভিজ্ঞতার আলোকে যে কয়টি সংস্কার প্রক্রিয়া আমার দৃষ্টিতে এ দেশে ইসলাম প্রচারে সহায়ক হবে, তা আমি এখানে উল্লেখ করছি। আশা করি মুসলিম নেতৃবৃন্দ এগুরো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবেনঃ

(ক) শ্রেণী বৈষম্যের বিলোপ সাধন

হিন্দুদের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশে থাকার কারণে মুসলমানদের মধ্যে যে শ্রেণী বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে, তার বিলোপ সাধন করতে হবে। ইসলামের একটি মৌলিক আকীদাই এই যে, কোনো মানুষ জন্মগতভাবে অপবিত্র বা নীচ নয়। এ আকীদাই মুসলিম সমাজে নিখুঁত সাম্য এনে দিয়েছে এবং এ বিশ্বাসই তার সাফল্যের এক বিরাট কারণ। এখন এ নীতিটাকে পুনরায় আমাদের সকল ব্যাপারে একটা মৌলিন নীতি হিসেবে গণ্য করতে হবে।

(খ) বংশগত বৈষম্যের বিলোপ সাধন

আমাদের দেশে সাধারণভাবে নও-মুসলিমদের, যারা পুরুষানুক্রমিকভাবে মুসলমান –তাদের চেয়ে নিকৃষ্ট মনে করা হয়। এটা সম্পূর্ণ অনৈসলামী আচরণ। এটা অত্যন্ত কঠোরভাবে নির্মূল করতে হবে। নও-মুসলিম স্ত্রী ও পুরুষের সাথে বিয়ে-শাদীর প্রথা পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। আমাদের দেশের অভিজাত লোকেরা এটা এড়িয়ে চলেন। কিন্তু আমাদের শ্রেষ্ঠতম অভিজাত ব্যক্তিও নিজেকে হযরত রসূলুল্লাহ (স)-এর চেয়ে অভিজাত বলে দাবী করতে পারে না –যিনি দু’জন নও-মুসলিম হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) এবং হযরত ওমর ফারুক (রা)-এর মেয়ে বিয়ে করেছিলেন এবং অন্য দু’জন নও-মুসলিম হযরত ওসমান (রা) ও হযরত আলী (রা)-কে নিজের মেয়ে দিয়েছিলেন।

(গ) ইসলামী ভ্রাতৃত্বের উজ্জীবন

মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী সৌভ্রাতৃত্বের মনোভাব জাগিয়ে তুলতে হবে যেন অমুসলিমরা তা দেখে ইসলামী সমাজে প্রবেশ করতে আগ্রহী হয়।

(ঘ) সাধারণ ধর্মীয় ও নৈতিক অবস্থার সংশোধন

মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ জীবনের সংশোধনের জন্য হয়তো বা কোনো গভীরতর সংস্কার আন্দোলনের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অন্ততঃপক্ষে তাদের বাহ্যিক জীবনে এতটা চমক সৃষ্টি করা আবশ্যক যাতে করে অমুসলিমরা আপনা থেকেই তাদের দিকে আকৃষ্ট হয়। উদাহরণ স্বরূপ, জামায়ত সহকারে নামায পড়া ও রোযা রাখা, শেরকী ও বেদাতী রসম-রেওয়াজ ও শরীয়তের নিষিদ্ধ সমস্ত কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার জন্য সবাইকে উপদেশ দিতে হবে, বিশেষতঃ মুসলমানদের মধ্যে নৈতিক অপরাধ নির্মূল করার সর্বাত্মক চেষ্টা চারাতে হবে। কেননা মুসলমানদের নৈতিক অবস্থা উন্নত হলে অমুসলিমদের মনে তাদের প্রতি শ্রদ্ধার ভাব জাগবে।

(ঙ) ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ও প্রচারমূলক তৎপরতায় উৎসাহ প্রদান

জুমআর দিনের ওয়াজ, নৈশ সভা ও শিক্ষঅ প্রতিষ্ঠান এবং পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে মুসলমাদেরকে ধর্মীয় শিক্ষা দিতে হবে। ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের পার্থক্য সহজ তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। বিশেষতঃ শিক্ষক, সরকারী কর্মচারী ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ আন্দোলন চালু করা খুবই ফলপ্রসু। কেননা তারা জনগণের সাথে বেশী করে মেলামেশা করার সুযোগ পান এবং তার অত্যন্ত সফলতার সাথে প্রচারের কাজ চালাতে সক্ষম।

শেষ কথা

এ একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ কাজ করতে হলে আমাদের ওলামা ও পীর সাহেবানদের নিজ নিজ হুজরা ও খানকা থেকে বেরুতে হবে। ওলামাদের দায়িত্ব ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। কুরআনে তাদেরকে যে ‘খোদাভীরু’ খেতাব দেয়া হয়েছে এবং হাদীসে যে তাদেরকে বনী ইসরাঈলের নবীদের সাথে তুলনা করা হয়েছে –সেই মূল্যমান মর্যাদা তাদেরকে এমনিতেই দেয়া হয়নি। বরং তাদের ওপর এ উম্মতের সংশোধন ও হেদায়াতের এক অতি বড় দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। সে দায়িত্ব পালনে বিন্দুমাত্র ত্রুটি হলেও তাঁরা আল্লাহর কঠোর পাকড়াও থেকে রেহাই পাবেন না। তবে আমি হযরত পীর হাসেবান ও সুফী সাহেবানদেরকেও তাঁদের গুরুদায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আজ তারা যে মহিমান্বিত আসনগুলোতে সমাসীন, সেগুরো একদিন আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর পথে ডাকার মহান কাজেই নিয়োজিত ছিল। তারা শুধু তাদের পূর্ববর্তীদের আধ্যাত্মিক মহত্ব ও পার্থিব লাভেরই উত্তরাধিকারী নন, বরং তারা অনেকগুলো দায়িত্ব ও কর্তব্যেরও উত্তরাধিকারী। এ দায়িত্ব ও কর্তব্যের অনুভূতি পূর্ববর্তী সুফি ও পীর সাহেবানদের মধ্যে এত তীব্র ছিল যে, তারা অন্য কোনো বিষয়ের কথা ভাবতেও অবসর পেতেন না। একজন মুসলমানকে মুরিদ করার পর তার সংশোধনের ব্যাপারে যে দায়িত্ব পীর হাসেবানদের ওপর অর্পিত হয় তা যদি এখনো তারা অনুভব করেন তাহলে মুসলমানদেরব হু সমস্যার সমাদান হতে পারে। বড় বড় গদ্দীনশীন ও পীর সাহেবানদের মুরিদদের সংখ্যা কমপক্ষে এক থেকে দেড় কোটি হবে। এই বিপুল সংখ্যক মুসলমানের ওপর তাদের এমক প্রভাব যে, তাদের ইশারাই তাদের চরিত্র ও জবিনকে পাল্টে দিতে পারেন, এত বিপুল সংখ্যক মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী প্রেরণার সৃষ্টি করতে পারলে মাত্র কয়েখ বছরে এ দেশের চেহারাই পাল্টে যেতে পারে। এমতাবস্থায় এই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিগণ তাদের শান্তির নীড় থেকে বেরিয়ে এই দুর্যোগ মুহুর্তে আল্লাহ ও তার সত্য দ্বীনের জন্য কিছু পরিশ্রম করবেন এ আশা কি আমরা করতে পারি না?

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.