জীবন সায়াহ্নে মানবতার রূপ

হযরত ওস্মানের শাহাদাত

ইসলামরে ইতিহাসে অন্তর্বিরোধের একটি কলঙ্কজনক রেখা ফুটিয়া রহিয়াছে। এই রেখার সূত্রপাত সর্বপ্রথম হযরত ওসমানের রক্ত দ্বারা ঘটিয়াছে এবং এর ফলে ইসলামের পূর্ণ মর্যাদা চিরকালের জন্য সমাহিত হইয়া যায়।
হযরত ওসমানের শাহাদাতের মূল ভিত্তি হইতেছে, কোরায়শ গোত্রের বনী হাশেম ও বনী উমাইয়ার বংশগত বিদ্বেষ। এই বিদ্বেষের পূর্ণ ব্যাখ্যা করা ছাড়া তাঁহার শাহাদাতের উপর পূর্ণ আলোকপাত সম্ভব নহে। এই জন্য সর্বপ্রথম আমরা এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করিতে চেষ্টা করিব।
হযরত ইসমাঈল (আ) –এর বংশধর হযরত রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আালাইহে ওয়া সাল্লামের প্রপিতামহ আবদুল মানাফের ব্যক্তিত্ব ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ইহার চারি পুত্র ছিলেন : নওফাল, মোত্তালেব, হাশেম ও আবদুলশ শামস। বনী হাশেম ও বনী উমাইয়ার পারস্পরিক বিদ্বেষের অর্থ হইতেছে হাশেম ও আবদুশ শামসের সন্তানদের পারস্পরিক অনৈক্য।
হাশেম যদিও আবদুশ্ শামসের ছোট ছিলেন, তথাপি যোগ্যতা ও দানশীলতার জন্য গোত্রে নেতৃত্ব লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। ইনি রোম সম্রাট ও হাবশার নরপতি নাজ্জাশীর সহিত বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করিয়াছিলেন। অতঃপর তিনি কাবা গৃহের সব দায়িত্বও প্রাপ্ত হন। হাশেমের এই উন্নতি তাঁহার ভ্রাতুষ্পুত্র আবদুশ শামসের পুত্র উমাইয়া ভালভাবে গ্রহণ করিতে পারিতেছিলেন না। এক সময় তিনি পিতৃব্য হাশেমের সহিত যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ দিয়াছিলেন। যুদ্ধের শর্ত ছিল, পিতৃব্য হাশেম ভ্রাতুষ্পুত্র উমাইয়ার মধ্যে সর্বপ্রথম বিতর্ক হইবে। খোজাআ গোত্রের জনৈক গণক ব্যক্তি বিতর্কের রায় প্রদান করিবেন। যিনি পরাজিত হইবেন তাঁহাকে বিজয়ী ব্যক্তিকে পঞ্চাশটি কৃষ্ণ চক্ষুবিশিষ্ট উষ্ট্র প্রদান করিতে হইবে এবং দশ বৎসর নির্বাসিত জীবন যাপন করিতে হইবে।
রসূলে খোদার (সা) নবুওয়তপ্রাপ্তির সময় পাঁচ ব্যক্তি বনী হাশেমের প্রধান ছিলেন। হাশেমের পুত্র আবদুল মোত্তালেব, অর্থাৎ রসূলে খোদার (সা) পিতামহ, তাঁহার পিতৃব্য আবু তালে, হযমযা, আব্বাস ও আবু লাহাব। সমসাময়িক বনী উমাইয়া গোত্রের নেতৃত্ব করিয়াছিলেন তিন ব্যক্তি, আবু সুফিয়অন, আফ্ফাপন ও হাকাম।
হযরত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ (সা) চল্লিশ বৎসর বয়সে নবুওয়ত প্রাপ্তিহর কথা ঘোষণা করেন। যেহেতু তিনি বনী হাশেমের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, এই জন্য বনী উমাইয়া গোত্রীয়গণ বংশগহত বিদ্দেষের বশবর্তী হইয়া প্রথমাবস্থায়ই তাঁহার বিরোধিতা শুরু করি, আর তাহাদের প্রতিপক্ষ বনী হাশেম তাঁহার সহাযোগিতা করে। পিতামহ আবদুল মোত্তালে রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে লালন-পালন করিয়াছেলেন। পিতৃব্য আবু তালেব তাঁহার বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা করিয়াছিলেন। তাঁহার পিতৃব্যপুত্র হযরত আলঅ (রা) সর্বপ্রথম তাঁহার উপর ঈমান আনয়ন করিয়াছিলেন। পিতৃব্য হযরত হামযা (রা)ও অল্প দিন পরই তাঁহার উপর ঈমান আনিয়াছিলেন এবং বিশেষভাবে সহায়তা করিতে থাকেন। তাঁহার অন্য পিতৃব্য হযরত আব্বাস (লা) যদিও দেরীতে ঈমান আনিয়অছিলেন, তথাপি সর্বাবস্থায়ই তিনি রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের বিশেষ সহায়তা করিতেন। সংক্ষেপে বলিতে গেলে, বনী হাশেমের একমাত্র আবু লাহাবই রসূলে খোদার সহিত শত্রুতা করিয়াছিলেন। তাহা ছাড়া হযরত আব্বাস, হযরত হামযা, হযরত আবু তালে, হযরত আলী, হযরত আকিল (রা) প্রমুখ বিশিষ্ট হাশেমীগণ প্রায় সকলেই ঈমান আনিয়াছিলেন। ইহারা সকলেই আল্লাহর রসূলের পিতৃব্য অথবা পিতৃব্যপুত্র ছিলেন।
পূর্বেই বলা হইয়াছে, ঐ সময় তিন ব্যক্তি বনী উমাইয়া গোত্রের নেতৃত্ব করিতেছিলেন। আবু সুফিয়অন, আফ্ফান ও হাকাম। ইহাদের পর ইহাদের সন্তানগণই গোত্রের নেতৃত্ব প্রাপ্ত হন। ইহারা ছিলেন আবু সুফিয়অনের পুত্র আমির মোয়াবিয়া, আফ্ফানের পুত্র হযরত ওসামান এবং হাকামের পুত্র মারওয়ান। আফ্ফানের পুত্র হযরত ওসমান প্রথমাবস্থায়ই ইসলাম গ্রহণ করেন। অবশিষ্ট প্রায় সকলেই মোটামোটিভাবে রসূল- খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইচে ওয়া সাল্লামের শত্রুতা বরিতে থাকেন। এইখানে উল্লেখযোগ্য, আমির মোয়াবিয়া, হযরত ওসমান এবং মারওয়ান- এই তিন জনই উমাইয়ার প্রপৌত্র। হযরত ওসমানের শাহাদাতের কারণ সাধারণভাবে এই তিন জনের পরস্পরের সম্পর্কে মধ্যে নিহিত রহিয়াছে।
বনী উমাইয়া ও হাশেমের বংশতালিকা লক্ষ্য করিলে দেকা যাইবে, উমাইয়া হাশেমের সহিত সংঘর্ষ করিয়াছেন, আবু সুফিয়ান রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সহিত যুদ্ধ করিয়াছেন, আমি মোয়াবিয়া ও হযরত আলীর মধ্যে যুদধ হইয়াছে, ইয়াজিদ হযরত ইমাম হোসাইনকে শহীদ করিয়াছেন। আবু সুফিয়ানের সন্তানদের মধ্য হইতে বনী ইমাইয়ার খেলাপত শুরু হয়, যাহা হযরত আব্বাসের সন্তানগণ আব্বাসিয়া খেলাফত কায়েম করিয়া উৎখাত করেন।
উপরে বলা হইয়াছে, রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের মক্কার জীবনে বনী হাশেম সাধারণতঃ তাঁহার সহযোগিত এবং বনী উমাইয়া তাঁহার শত্রুতা করিয়াছে। এই অবস্থাতেই হযরত ওসমান (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। এই ঘোর শত্রুতার মধ্যে ওসমানের পক্ষে উমাইয়া শিবির ত্যাগ করিয়া হাশেমী শিবিরে যোগদান করা বিশেষ সত্যপ্রীতি ও সাহসিকতারর ব্যাপার ছিল। এই ব্যাপারটাই হযরত ওসামানের মর্যাদগা ও ঈমানের দৃঢ়তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তাঁহর কিছুকাল পর বনী উমাইয়অর অন্যান্য লোকও ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। রসূলে খোদা সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ইহাদের এমনভাবে গ্রহণ করিয়াছিলেন যাহাতে বনী হাশেম ও বনী উমাইয়া গোত্রের দীর্ঘকালের শত্রুতা মুছিয়া গিয়াছিল। ইসলামের ছায়াতলে আসিয়া বনী হাশেম ও বনূ উমাইয়া পরস্পর ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হইয়া গিয়াছিলেন এবং পরস্পরে প্রতিযোগিতা করিয়া ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন।
হযরত ওসমানের নির্বাচন
মানবতার নবীর বিদায়ের পর হযরত আবু বকর (রা) খলিফা নির্বাচিত হন। এই সময়টা বিশেষ শান্তির সহিত অতিবাহিত হয়। অতঃপর হযরত ওমর (রা) খলিফা নির্বাচিত হন। তাঁহার যমানাও সাফল্যের সহিত সমাপ্ত হয়। হিজরী ২৩ সনে যিলহজ্জ মাসের একেবারে শেষের দিকে হযরত ওমর ফারুক (রা) ইন্তেকাল করেন এবং অসিয়ত করিয়া যান, হযরত আলী, হযরত ওসমান, হযরত যুবাইর, হযরত তালহা, হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং আবদুর রহমান ইবনে আউফ- এই ছয় ব্যক্তি তিন দিনের মধ্যে কাহাকেও খলিফা নির্বাচিত করিবেন। উক্ত ছয় ব্যক্তির মধ্যে দুই দিন বিতর্ক চলিল, কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভবপর হইল না। তুতীয় দিন হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) প্রস্তাব করিলেন, আমাদের মধ্যে তিন ব্যক্তি যদি এক জনের পক্ষে দাবী ত্যাগ করি, যাহাতে ছয়ের বিতর্ক তিনের মধ্যে চলিয়া আসে, তাহা হইলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশেষ সুবিধা হইবে। এই প্রস্তাব অনুযায়ী হযরত যুবাইর হযরত আলীর পক্ষে, হযরত তালহা হযরত ওসমানের পক্ষে এবং হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফের পক্ষে দাবী পরিত্যাগ করিলেন।
হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) বলিলেন, আমি স্বয়ং খেলাফতের দাবী ত্যাগ করিতেছি। অতঃপর বিতর্ক হযরত ওসমান ও আলীর মধ্যে আসিয়া সীমাবদ্ধ হইল। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ যেহেতু স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হইয়া দাবী ত্যাগ করিয়াছিলেন, এই জন্য অবশিষ্ট উফয়ে মিলিয়া তাঁহার উপরই মীমাংসার দায়িত্ব অর্পণ করিলেন। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) সাহাবীণকে মসজিদে সমবেত করিয়া সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিলেন এবং খেলাফতের জন্য হযরত ওসমানের নাম প্রস্তাব করিলেন। সর্বপ্রথম তিনিই হযরত ওসমনের হাতে বায়আত করিলেন। অতঃপর হযরত আলীও বায়আত করিয়া ফেলিলেন। এরপর জনসাধারণ বায়আতের জন্য আগাইয়া আসিল। এইভাবে বনী উমাইয়ারই একজন সম্মানিত ব্যক্তি রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের খলিফা নির্বাচিত হইলেন। ইহা ২৪ হিজরী সনের ৪ঠা মহররমের ঘটনা।
প্রতিকূল অবস্তার সৃষ্টি
হযরত ওসমানের খেলাফতের প্রথম ছয় বৎসর নিতান্ত শান্তির সহিতই অতিবাহিত হয়, কিন্তু দ্বিতীয় ছয় বৎসরে যেন দুনিয়ার পরিবেশই পরিবর্তিত হইয়া যায়। এই পরিবর্তনের একমাত্র কারণ ছিল, সাহাবায়ে কেরামের যে পবিত্র জামাত রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের মোবারক সাহচর্য হইতে ঐক্য ও জীবনদর্শনের শিক্ষা লাভ করিয়াছিলেন, তাঁহারা ধীরে ধীরে দুনিয়া হইতে বিদায় হইয়া যাইতেছিলেন। পরবর্তী যে জনমণ্ডলী এই মহান জামাতের উত্তরাধিকার লাভ করিতেছিলেন, আত্মত্যাগ ও খোদাভীরুতার দিক দিয়া তাঁহারা পূর্ববর্তীদের সার্থক উত্তরাধিকার লাভ করিতে সমর্থ হইতেছিলেন না। রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণের সবচাইতে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল- তাঁহাদের জীবন-মরণ নিবেদিত ছিল একমাত্র আল্লাহর জন্য। যেহেতু তাঁহার স্বার্ধবুদ্ধির ঊর্ধ্বে ছিলেন, এই জন্য কোন প্রকার অন্তর্বিরোধ ও মনকষাকষি তাঁহাদিগকে স্পর্শ করিতে পারিত না, কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে যাঁহারা ময়দানে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, তাঁহারা ততটুকু নিষ্ঠাবান ও স্বার্থহীন ছিলেন না। ফলে পরস্পরের মধ্যে স্বার্থের প্রশ্নে সংঘাত স্বাভাবিকভাবেই দেখা দিতে থাকে। যাঁহারা অন্তরে তওহীদের জ্যোতি যত অধিক হয় ততই তিনি স্বর্থপরতা, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রবঞনচনা ও মোনাফেকী হইতে দূরে থাকিতে সমর্থন হন। যে সমস্ত লোক এই সমস্ত গ্লানি ও বিচ্যুতি হইতে যত বেশী পবিত্র হইবেন তাঁহার পরস্পর তত বেশী ঐক্য বন্ধনে আবদ্ধ হইতে সমর্থ হইবেন, কিন্তু তওহীদের জ্যোতি যতই হ্রাসপ্রাপ্ত হইতে শুরু করে, ততই স্বার্থ ও সংঘাত-বুদ্ধি আসিয়া সেই স্থান পূরণ করিতে শুরু করে। ফলে পরস্পরের আন্তরিক ঐক্য বিনষ্ট হইতে থাকে। এই আন্তরিক ঐক্য বিনষ্টের পরিণতিস্বরীপই ইসলামী খেলাফতের মজবুত দুর্গ অল্প দিনের মধ্যে ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছিল।
হযরত ওসমানের যুগে নিম্নোক্ত তিন প্রকার মতবিরোধ সৃষ্টি হয়ঃ
(ক) বনী উমাইয়া ও বনী হাশেমের মধ্যে মতবিরোধ
হাশেমীগণ নিজেদের রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উত্তরাধিকারী মনে করিতেন। পূর্ববর্তী গোত্রীয় অনৈক্যের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর রসূলের খেলাফত তাহাদে গোত্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বী উমাইয়া বংশের কাহারো অধীন হউক, উহা তাঁহার মনে-প্রাণে মানিয়া লইতে পারিতেছিলেন না।
(খ) কোরায়শ ও অ-কোরায়শদের মধ্যে অনৈক্য
মুসলমানদের সংখ্যা দিন দিন বিপুল পরিমাণে বর্থিত হইয়া গিয়াছিল। ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তৃতির ব্যাপারে কোরায়শদের সঙ্গে সঙ্গে আরবরে অন্যান্য গোত্রের লোকও সমানভাবে অংশ গ্রহণ করিয়াছিলেন। এই জন্য অ-কোরায়শগণ ইহা চাহিতেন না, নেতৃত্বের মুকুট কেবলমাত্র কোরায়শগণের মস্তকেই শোভিত হউক।
(গ) আরব-অনারবে অনৈক্য
ইসলামের জ্যোতি আরবের বাহিরে সিরিয়া, গ্রীস ও মিসর পর্যন্ত যাইয়া পৌঁছিয়াছিল। ইহুদী খৃষ্টান অগ্নিউপাসক প্রভৃতি বিভিন্ন ধর্মের অগণিত লোক ইসলামে দীক্ষিত হইয়াছিলেন। ইসলামী ঐক্যের ভিত্তিতে তাঁহারাও অধিকারের ক্ষেত্রে নিজ দিগকে আরবদের সমঅধিকারী বলিয়া দাবী করিতেন। আরবদের একচ্ছত্র অধিকার তাঁহারা সহ্য করিতে পাতিতেছিলেন না। এক কথায়, বনী হাশেমের অন্তর বনী উমাইয়ার সহিত একত্রিত হইতেছিল না। এক কথায়, বনী হাশেমের অন্তর বনী উমাইয়ার সহিত একত্রিত হইতেছিল না। আরবের সাধারণ অধিবাসী কোরায়শদের আর অনারব জাতিগুলি আরবদের আধিপত্য বরদাশ্ত করিতে পারিতেছিল না। এইভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, অনৈক্য ও শত্রুতার বীজ ধীরে ধীরে বিস্তুত হইয়া যাইতেছিল।
(ঘ) ধ্বংসাত্মক শক্তির সংগঠন
সর্বপ্রথম কুফায় ধ্বংসাত্মক শক্তি দানা বাঁধিয়া উঠে। আশ্তার নাখয়ী নামক জনৈক অনারব প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রচার শুরু করেন, ইসলামী বিধানমতে মুষ্টিমেয় কোরায়শের পক্ষে সমগ্র মুসলিম জাতিকে পদানত রাখার কোন অধিকার নাই। সাধারণ মুসলমানগণ সকলে মিলিয়া রাজ্য জয় করিয়াছেন, এই জন্য ইসলামী রাষ্ট্রে প্রত্যেক মুসলিমের নেতৃত্ব করার অধিকার রহিয়াছে। অনারবগণ আশতার নাখয়ীর এই মতবাদ অতি সহজেই গ্রহণ করিতে শুরু করে। ইহাদের প্রচেষ্টায় একটি ষড়যন্ত্রকারী দল গড়িয়া উঠে। উহারা কুফার শাসনকর্তা সায়ীদ ইবনুল আস (রা)-এর বিরুদ্ধে নানা প্রকার অপপ্রচার শুরু করে। সায়ীদ ইবনুল আস অপপ্রচারকারীগণকে দমন করার জন্য হযরত ওসমানের অনুমতিক্রমে উহাদের দশ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে সিরিয়ায় নির্বাসিত করেন। ইহার ফলে বসরায়ও একটি বিপ্লবী দল গড়িয়া উঠে। কুফা ও বসরায় আশ্তার নাখয়ী যে কাজ শুরু করিয়াছিল, আবদুল্লাহ ইবনে সাবা পূর্বেই মিসরে তাহা শুরু করিয়া দিয়াছিল। আবদুল্লাহ ইবনে সাবা জনৈক নও মুসলিম, যে পূর্বে ছিল ইহুদী। বসরা ও কুফার বিপ্লবীদের কথা জানিতে পারিয়া সে অত্যন্ত উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। অল্প দিনের মধ্যে সে বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক শক্তির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করতঃ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, হযরত ওসমানকে খেলাফতের পদ হইতে বিচ্যত করিয়া বনী উমাইয়ার শক্তি চিরতরে বিনষ্ট করিয়া দেওয়া হউক। আবদুল্লাহ ইবনে সাবা চারিদিকে অতি দ্রুততার সহিত তাহার প্রচারক দল প্রেরণ করিয়া দিল। তাহার প্রচারকরা বাহ্যিক ধার্মিকতার বেশ ধরিয়া প্রথমে সাধারণ মুসলমানদের আস্থা অর্জন করিত। অতঃপর হযরত ওসমান (রা) ও তাঁহর শাসনকর্তাদের বিরুদ্ধে নানাপ্রকার অপপ্রচার করিয়া সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করিয়া তুলিত। তাহারা ইসলামের দোহাই দিয়া সাধারণ মুসলমানদের অন্তরে খলিফার প্রতি সম্ভ্রমবোধ শিথিল করিয়া ‍দিয়াছিল।
বিপ্লবী প্রচারণা এতদূর সাফল্য লাভ করিয়াছিল যে, মোহাম্মদ ইবনে আবু হোযাইফা এবং মোহম্মদ ইবনে আবু বকরের ন্যায় লোক পর্যন্ত অপপ্রচারকারীদের দলে ভিড়িয়া পড়িলেন। পরিস্থিতি এই পর্যন্ত আসিয়া গড়াইল যে, খোদ মদীনার অবস্থাও বিশেষভাবে পরিবর্তিত হইতে শুরু করিল। একদিন হযরত ওসমান (রা) জুমার খুৎবা দিতে দাঁড়াইয়া আল্লাহর প্রশংসা কীর্তন শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে এক ব্যক্তি দাঁড়াইয়া বলিতে লাগিল,- ওসমান, আল্লাহর কিতাব অনুসরণ করিয়া চল। হযরত ওসমান (লা) নিতান্ত নম্রভাবে বলিলেন, আপনি বসিয়া পড়ুন, কিন্তু লোকটি খুৎবার ভিতরে আবার উঠিয়া দাঁড়াইল এবং পূর্ব কথার পুনরাবৃত্তি করিল। হযরত ওসমান (রা) তাহাকে পুনরায় বসিয়া পড়ার জন্য অনুরোধ করিলেন। সে বসিয়া পড়িল এবং আবার উঠিয়া দাঁড়াইল। ধৈর্য ও নম্রতার প্রতিমূর্তি হযরত ওসমান (রা) তাহাতেও উত্তেজিত হইলেন না। নিতান্ত নম্রভাবে বলিলেন, আপনি বসিয়া পড়ুন এবং খুৎবা ‍ুনুন. তিন্দু যেহেতু এইসব একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ভিত্তিতে করা হইয়াছিল, এজন্য এইবার লোকটির বিরাট একদল সমর্থক উঠিয়া দাঁড়াইয়া হযরত উসমানকে ঘিরিয়া ফেলিল এবং নির্মমভাবে প্রস্তর নিক্ষেপ করিতে লাগিল যে, আল্লাহর রসূলের খলিফা আঘাতে জর্জরিত হইয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িলেন, কিন্তু হযরত ওসমানের কি অপরিসীম ধৈর্য, তিনি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদিগকে কিছুই বলিলেন না; বরং সবাইকে ক্ষমা করিয়া দিলেন।
বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের অপবাদ
বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের তরফ হইতে হযরত ওসমানের উপর পাঁচটি অপবাদ আরোপ করা হয়। যথা-
(১) তিনি বিশিষ্ট সাহাবীগণকে রাখিয়া নিজের অযোগ্য আত্মীয়-স্বজনদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করিয়াছেন।
(২) তিনি তাঁহার আপন লোকদে মধ্যে বায়তুল মালের অর্থ বণ্টন করিতেছেন।
(৩) তিনি হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা) কর্তৃক লিখিত কোরআন ব্যতীত অবশিষ্ট সমস্ত কপি জ্বালাইয়া দিয়াছেন।
(৪) তিনি কতিপয় সাহাবাকে অপদস্থ করিয়াছেন এবং কতিপয় নূতন নূতন বেদআতের সৃষ্টি করিয়াছেন।
(৫) মিসর হইতে আগত প্রতিনিধিদলের সহিত প্রকাশ্য বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছেন।
উপরোক্ত অভিগোগুলি ছিল সম্পূর্ণরূপে ষড়যন্ত্রপ্রসীত। যথা-
(১) সাহাবীগণের সরকারী দায়িত্ব হইতে পদচ্যুতি ছিল নিতান্তই শাসনতান্ত্রিক ব্যাপার।
(২) আপন লোকদিগকে তিনি যাহা কিছু দিয়াছিলেন তাহা সম্পূর্ণ তাঁহার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হইতে দেওয়া হইয়াছিল।
(৩) তিনি কোরআনের যে কপি সংরক্ষিত করিয়াছিলেন, তাহা হযরত আবু বকর (রা) কর্তৃক সংগৃহীত ও সংকলিত ছিল। সুতরাং ইহার চাইতে নির্ভুল কপি আর কি হইতে পারে?
(৪) যে সমস্ত বেদাআতের কথা বলা হইত, তাহা সম্পূর্ণই ইজতেহাদী ব্যাপার। সুতরাং এইগুলিকে বেদআত কিছুতেই বলা চলে না।
(৫) মিসরীয় প্রতিনিধিদলের বিবরণ আমরা পরে দিতেছি।
শাসনকর্তাদের সম্মেলন
হযরত ওসমান (রা) রাষ্ট্রব্যাপী ধ্বংসাত্মক শক্তির ব্যাপক অভ্যুদয়ের কথা জানিতে পারিয়া প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের এক সম্মেলন আহ্বান করিলেন। সম্মেলনে তাঁহাকে নিম্নোক্ত পরামর্শ দেওয়া হইল।
আবদুল্লাহ ইবনে আমের : কোন দেশে সৈন্য প্রেরণ করতঃ লোকদিগকে জেহাদে নিয়োজিত করিয়া দেওয়া হউক। ইহাতে বিশৃঙ্খলা আপনা হইতেই দূর হইয়া যাইবে।
আমির মোয়াবিয়াঃ প্রত্যেক প্রদেশের শাসনকর্তা নিজ নিজ প্রদেশ রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করুন।
আমর ইবনুল আস : আপনি সুবিচার করুন, অন্যথায় খেলাফত হইতে পদত্যাগ করুন, কিন্তু সম্মেলন শেষে হযরত আমর ইবনুল আস (রা) হযরত ওসমনের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া নিবেন করিলেন, আমি বিদ্রোহীদের আস্থা অর্জন করার জন্য এই প্রস্তাব করিয়াছিলাম, কিন্তু এখন হইতে আমি উহাদে গোপন কার্যকলাপ সম্পর্কে আপনাকে অবহিত করিতে থাকিব। সম্মেলন সমাপ্ত হওয়ার পর হযরত ওসমান (রা) সবদিক বিবেচনা করতঃ তিনটি কর্মপন্থা গ্রহণ করিলেন।
(১) কূফার শাসনকর্তা সাদ ইবনুল আসকে পদচ্যুত করিয়া তদস্থলে হযরত আবু মূসা আশ্‌আরীকে প্রেরণ করিলেন।
(২) প্রত্যেক প্রদেশের শাসন-ব্যবস্থা সম্পর্কে তদন্ত করার জন্য একটি তদন্ত কমিশন প্রেরণ করিলেন।
(৩) সাধারণভাবে ঘোষণা করিয়া দিলেন, হজ্বের প্রত্যেকেই স্ব-স্ব অভিযোগ পেশ করিবেন, ঐগুলির যথাযোগ্য প্রতিকার করা হইবে।

বিদ্রোহীদের মদীনা আক্রমণ
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীরা সংস্কার চাহিত না। এই জন্য হযরত ওসমান (রা) যখন শাসন-ব্যবস্থা ব্যাপক সংস্কারে হাত দিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে উহারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া মদীনার দিকে অগ্রসর হইতে শুরু করিল। পথে উহারা নিজদিগকে হজ্বযাত্রী বলিয়া পরিচয় দিতেছিল। মদীনার নিকটবর্তী হইয়াই উহারা সৈনিকের বেশ ধারণ করতঃ বিভিন্ন স্থানে শিবির স্থাপন করিল। বিদ্রোহীদে খবর পাইয়া হযরত ওসমান (রা) হযরত তালহা, হযরত ‍যুবাইর, হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং হযরত আলীকে একে একে প্রেরণ করতঃ বিদ্রোহীদিগকে নিজ নিজ এলাকায় ফিরিয়া যাওয়ার জন্য উপদেশ দিলেন। তিন তাহাদিগকে নিশ্চয়তা দিলেন, তাহাদের প্রত্যেকটি সঙ্গত দাবী-দাওয়া পূরণ করা হইবে। পরিস্থিতি বিবেচনার জন্য মসজিদে সভা আহ্বান করা হইল। তালহা ইবনে আবদুল্লাহ (রা) দাঁড়াইয়া খলিফার সহিত কঠোর ভাষায় কথোপকথন করিলেন। হযরত আয়েশা সিদ্দিকার তরফ হইতে পয়গাম আসিল, আবদুল্লাহ ইবনে আবি সারাহর মত ব্যক্তি, যাহার উপর সাহাবী হত্যার অভিযোগ রহিয়াছে, তাহাকে আপনি কেন মিসরের শাসনকর্তৃত্বের পদ হইতে অপসারণ করিতেছেন না। হযরত আলীও এই মত সমর্থন করিলে খলিফা বলিলেন, মিসরের বিক্ষোভকারীরা স্বয়ং তাহাদের শাসনকর্তা নির্বাচিত করুক, আমি তাহাকেই আবদুল্লাহ ইবনে আবি সারাহর স্থানে নিযুক্ত করিব। বিদ্রোহীদের পক্ষ হইতে মোহাম্মাদ ইবনে আবু বকরের নাম প্রস্তাব করা হইল। হযরত ওসমান (রা) তাঁহার নামে ফরমান লিখিয়া দিলেন। মোহাম্মাদ ইবনে আবু বকর কিছু সংখ্যক মোহাজের ও আনসারকে সঙ্গে লইয়া মিসরের পথে রওয়ানা হইয়া গেলেন। ব্যাপারটা তখনকার মত এখানেই মিটিয়া গেল।

এই ঘটনার কিছু দিন পর আবর প্রচারিত হইল, বিদ্রোহীরা পুনরায় মদীনায় প্রবেশ করিয়াছে। মুসলমানগণ বাহির হইয়া দেখিলেন, মদীনার অলিতে-গলিতে ‘প্রতিশোধ’ ‘প্রতিশোধ’রব উঠিয়াছে। মদীনাবসীগ বিদ্রোহীদের নিকট এইরূপ আশ্চর্যজনক প্রত্যাবর্তনের কথা জিজ্ঞাসা করিলে পর তাহারা হযরত ওসমানের উপর এমন অদ্ভুত অভিযোগ উত্থাপন করিল যে, সকলেই স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। তাহারা বলিতে লাগিল, মোহাম্মদ ইবনে আবু বকরের কাফেলা তৃতীয় মঞ্জিলে পৌঁছিলে দেখা গেল, জনৈক সরকারী উষ্ট্রারোহী দ্রুত মিসরের দিকে গমন করিতেছে। মোহাম্মদ ইবনে আবু বররের সঙ্গীগণ তাহাকে ধরিয়া ফেলিলেন। তাহারা লোকটিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‍তুমি কে এবং কোথায় যাইতেছ? উত্তরে লোকটি বলল, আমি আমীরুল মোমেনীনের ক্রীতদা, মিসরের শাসনকর্তার নিকট গমন করিতেছি। লোকেরা মোহাম্মদ ইবনে আবু বকরকে দেখাইয়অ বলিলেন, ইনি মিসরের শাসনকর্তা। লোকটি বলিল, ইনি নন, এই বলিয়া সে পুনরায় চলিতে শুরু করিল। লোকেরা তাহাকে পুনরায় ধরিয়া ফেলিল এবং তল্লাশি লইলে একটি পত্র পাওয়া গেল। পত্রটিতে হযরত ওসমানের সীলমোহর লাগানো ছিল এবং লেখা ছিল- “মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর ও তাহার সহিত অমুক অমুক যখনই তোমার নিকট পৌঁছিবে, সঙ্গে সঙ্গে তাহাদিগকে হত্যা করিয়া ফেলিবে এবং প্রত্যেক অভিযোগকারীকে দ্বিতীয় নির্দেশ পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বন্দী করিয়া রাখিবে।”
বিদ্রোহীরা বলিতে লাগিল, হযরত ওসমান (রা) আমাদের সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছেন। আমরা উহার প্রতিশোধ গ্রহণ করিব। হযরত আলী, হযরত তাল্‌হা, হযরত যুবাইর, হযরত সাদ (রা) প্রমুখ অনেক সাহাবী সমবেত হইলেন। বিদ্রোহীগণ হযরত উসমানের বলিয়া কথিত পত্রটি তাহাদের সম্মুখে রাখিল। হযরত ওসমান (রা)-ও তথায় গমন করিলেন এবং কথাবার্তা শুরু হইল।
হযরত আলী (রা) বলিলেন : আমীরুল মোমেনীন, এই গোলাম কি আপনার?
হযরত ওসমান (লা) বলিলেন : হ্যাঁ আমার।
হযরত আলী (রা) পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন : এই উষ্ট্রীও কি আপনার?
হযরত ওসমান (রা) জওয়াব দিলেন : হ্যাঁ আমারই।
হযরত আলী (রা) জিজ্ঞাসা করিলেন : পত্রে অংকিত এই সীলমোহর কি আপনার?
হযরত ওসমান (রা) বলিলেন : হ্যাঁ সীলমোহরও আমারই।
হযরত আলী (রা) বলিলেন : এই পত্রও কি আপনি লিখিয়াছেন?
হযরত ওসমান (রা) জওয়াব দিলেন : আমি আল্লাহকে উপস্থিত জানিয়অ এই শপথ করিতেছি, এই পত্র আমি নিজে লিখি নাই, অন্য কাহাকেও লিখার নির্দেশ দেই নাই, এমনটি এই সম্পর্কে আমি কিছুই জানিও না।
হযরত আলী (রা) বলিলেন : আশ্চর্যের বিষয়, পত্রবাহক গোলাম আপনার, বাহনের উষ্ট্রী আপনার, পত্রে অংকিত সীলমোহরও আপনার। অথচ আপনি পত্রের মর্ম সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
হযরত ওসমান (রা) বলিলেন, আল্লাহর শপথ, আমি নিজে এই পত্র লিখি নাই, কাহাকেও লিখিতেও বলি নাই, উহা মিসরে প্রেরণ করিতেও বলি নাই।
পত্রের লিপি পরীক্ষা করিয়া দেখা গেল, উহা মারওয়ানের হস্তাক্ষর। এই সময় মারওয়ান হযরত ওসমানের গৃহে অবস্থান করিতেছিল। লোকেরা দাবী তুলিল, আপনি মারওয়ানকে আমারদের হাতে ছাড়িয়া দিন, কিন্তু হযরত ওসমান (রা) হাতা করিতে অস্বীকার করিলেন। ইহাতে করিয়া হাঙ্গামা শুরু হইয়া গেল। অধিকাংশ লোকের ধারণা হইল, হযরত ওসামন (রা) কখনও মিথ্যা শপথ করিতে পারেন না। প্রকৃতেই তিনি এই সম্পর্কে কিছু জানেন না, কিন্তু কেহ কেহ বলিতে লাগিল, তিনি মারওয়ানকে আমাদের হাতে কেন ছাড়িয়া দিতেছেন না? আমরা অনুসন্ধান করিয়া প্রকৃত তথ্য উদ্ধার করিয়া লইব। যদি মারওয়ান অপরাধী প্রমাণিত হয়, তবে তিনি উহার শাস্তি ভোগ করিবেন। হযরত ওসমানের ধারণা ছিল, মারওয়ানকে বিদ্রোহীদের হাতে তুলিয়া দিলে উহারা তাঁহাকে হত্যা করিয়া ফেলিবে। এই জন্য তিনি মারওয়ানকে তাহাদের হাতে তুলিয়া দিতে অস্বীকার করিলেন।
ইহার পর বিদ্রোহীরা হযরত ওসমানের গৃহ অবরোধ করিয়া খেলাফত হইতে তাঁহার পদত্যাগ দাবী করিতে লাগিল। হযরত ওসমান (রা) জওয়াব দিলেন, যে পর্যন্ত আমার শেষ নিঃশ্বাস অবশিষ্ট থাকে, আমি আল্লাহ প্রদত্ত এই মর্যদা ত্যাগ করিতে পারি না। রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের নির্দেশ মোতাবেক জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করিয়া যাইব।
দীর্ঘ চল্লিশ দিন ধরিয়া অবরোধ চলিল! খলিফার গৃহে খাদ্য পানীয় সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করিয়া দেওয়অ হইল। বিদ্রোহীদের ধৃষ্টতা তখন এমন চরমে উঠিয়াছিল। যে, বিশিষ্ট সাহাবীগণকে পর্যন্ত তাহারা তোয়াক্কা করিত না। একদিন মুসলিম জননী হযরত উম্মে সালামা (রা) কিছু খাদ্য পানীয় লইয়া রওয়ানা হইলে হতভাগারা তাঁহাকে পর্যন্ত বিমুখ করিয়া ফিরাইয়া দিল।
হযরত ওসমান (রা) হযরত আলীকে ডাকিয়া পাঠাইলেন, কিন্তু বিদ্রোহীরা তাঁহাকে গৃহে প্রবেশের অনুমতি দিল না। হযরত আলী (রা) মাথার পাগড়ি খুলিয়া খলিফার নিকট প্রেরণ করতঃ খালি মাথায় ফিরিয়া আসিলেন, যাহাতে খলিা পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করিতে পারেন।
মদীনার সকল কাজকর্ম হযরত আলী, হযরত তাল্‌হা ও যুবাইরের দায়িত্বে ন্যস্ত থাকিত, কিন্তু এই বেদনাময় হাঙ্গামায় তাঁহাদের সকল আওয়াও ব্যর্থ হইয়া গিয়াছিল। খলিফার গৃহে অবরুদ্ধদের অবস্থা শোচনীয় হইয়া উঠিল, তখন হযরত ওসামন (রা) স্বয়ং গৃহের ছাদে দাঁড়াইয়া বলিতে লাগিলেন- “তোমাদের মধ্যে কি আলী রহিয়াছেন?” লোকেরা বলিল, না। পুনরায় বলিলেন, “এই জনতার মধ্যে সাদ রহিয়াছে কি?” লোকেরা উত্তর করিল, না, তিনিও নাই। এইবার তিনি একটু দমিয়া গেলেন। কিছুক্ষণ ভাবিয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমাদের মধ্যে এমন কেহ আছে কি- যে আলীর নিকট যাইয়া বলিবে যেন এখানকার পিপাসার্তদের পানি পান করাইবার ব্যবস্থা করেন!” এক ব্যক্তি নায়েবে রসূলের এই বেদান-বিধুর আবেদন শুনিয়া তৎক্ষণাৎ দৌড়াইয়া হযরত আলীর নিকট এই পয়গাম পৌছাইলে পর তিনি মশক পানি প্রেরণ করিলেন। এই পানি এমন সাধ্য-সাধনার পর পৌছানো হইল যে, ইহাতে বনী হাশেম ও বনী উমাইয়া গোত্রের কয়েকজন গোলামকে শোচনীয়রূপে আহত হইতে হইল। এইাবর মদীনাব্যাপী খবর প্রচারিত হইল, মারওয়ানকে যদি বিদ্রোহীদের হাতে সমর্পণ করা না হয় তবে হযরত ওসমানকে হত্যা করিয়া ফেলা হইবে। এই খবর শুনিয়া হযরত আলী (রা) হযরত হাসান ও হোসাইনকে নির্দেশ দিলেন, তোমরা যাইয়া উন্মুক্ত তরবারিসহ খলিফার দ্বারে দাঁড়াইয়া থাক, যেন কোন বিদ্রোহী তাঁহার গৃহে প্রবেশ করিতে না পারে। হযরত তালহা, হযরত যুবাইর (রা) প্রমুখ কতিপয় বিশিষ্ট সাহাবী স্বীয় সন্তানগণকে খলিফার গৃহ প্রহরা দেওয়ার জন্য প্রেরণ করিলেন।
বিদ্রোহীদের প্রতি হযরত ওসমানের আবেদন
হযরত ওসমান (রা) কয়েকবারই বিদ্রোহীদিগকে বুঝাইতে চেষ্টা করেন। একবার গৃহের ছাদে আরোহণ করিয়া বলিতে লাগিলেন, “লোকসকল, ঐদিনের কথা স্মরণ কর, যখন মসজিদে নববী নেহায়েত ক্ষুদ্র ছিল। আল্লাহর রসূল (সা) বলিয়াছিলেন, এমন কেহ আছে কি, যে মসজিদ সংলগ্ন স্থানটুকু খরিদ করিয়া মসজিদের নামে ওয়াকফ করিয়া দেয় এবং বিনিময়ে জান্নাতে ইহার চাইতে উৎকৃষ্ট জায়গার অধিকারী হয়। তখন কে রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের এই নির্দেশ পালন করিতে অগ্রসর হইয়াছিল?
লোকেরা বলিল, আপনি তাহা পালন করিয়াছিলেন।
হযরত ওসমান (রা) বলিলেন, তোমরা কি আমাকে আজ সেই মসজিদে নামাজ পড়িতে বারণ করিতেছ?
আবার বলিলেন- আমি তোমাদিগকে আল্লাহর দোহাই দিয়া বলিতে্যিছ, তোমরা ঐ সময়ের কথা স্মরণ কর, যখন মদীনায় ‘বীরে মাউনা’ ব্যতীত পানীয় জলের আর দ্বিতীয় কোন ব্যবস্থা ছিল না। সমস্ত মুসলমান তখন পানীয় জলের অভাবে কষ্টভোগ করিতেছিলেন। তখন কে রসূলুল্লাহ (সা) –এর নির্দেশে এই কূপ খরিদ করিয়া মুসলমানদের মধ্যে ওয়াক্ফ করিয়া দিয়াছিলেন?
জওয়াব আসিল- আপনিই করিয়াছিলেন।
হযরত ওসমান (রা) বলিলেন,- আর আজ সেই কূপের পানি হইতে তোমরা আমাকে বঞ্চিত করিতেছ?
আবার বলিলেন,- মুসলিম বাহিনীর সাজসরঞ্জাম কে বর্ধি করিয়াছিল?
লোকেরা বলিল,- আপনি।
অতঃপর বলিলেন, “আমি তোমাদিগকে খোদার কসম দিয়া জিজ্ঞাসা করিতেছি, তোমাদের মধ্যে এমন কেহ আছে কি যে সত্যের সমর্থন করিব এবং বলিবে, একদা আল্লাহর রসূল (সা) যখন ওহুদ পর্বতে আরোহণ করিলেন তখন পর্বত কাঁপিতে লাগিল। আল্লাহর রসূল (সা) যখন ওহুদ পর্বতে আরোহণ করিলেন তখন পর্বত কাঁপিতে লাগিল। আল্লাহর রসূল পর্বতের উপর পদাঘাত করিয়া বলিলেন, “হে ওহুদ, স্থির হও! তোমার উপর এখন একজন নবী, একজন সিদ্দিক এবং দুইজন শহীদ রহিয়াছেন, তখন আমিও আল্লাহর রসূলের সঙ্গে ছিলাম।”
লোকেরা বলিতে লাগিল,- আপনি সত্য বলিতেছেন।
পুনরায় বলিতে লাগিলেন,- লোকসকল, আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে বল, হোদায়বিয়া নামস স্থানে রসূলুল্লাহ (সা) যখন আমাকে দূত হিসাবে কোরায়শদের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন, তখন কি ঘটিয়াছিল? ইহা কি সত্য নয়, তখন আল্লাহর রসূল (সা) স্বীয় এক হাতকে আমার হাত বলিয়া তাহাতে তোমাদের বায়আত গ্রহণ করিয়াছিলেন্য?
জনতার মধ্য হইতে আওয়াজ আসিল, আপি সত্য বলিতেছেন!
কিন্তু আক্ষেপের বিষয়, আল্লাহর রসূলের প্রতিভুর এহেন মর্যাদার কথা নিজ মুখে স্বীকার করার পরও বিদ্রোহীদের অন্তর হইতে দুর্বুদ্ধি প্রশমিত হইল না। হজ্বের মওসুম তখন অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই শেষ হইয়া যাইতেছিল। বিদ্রোহীদের ভয় ছিল, হজ্ব সমাপ্ত হইলে পর মুসলমানগণ মদীনার দিকে আসিতে থাকিবেন। তখন তকাহাদের দুরভিসন্ধি কার্যকর হইতে পারিবে না। এই জন্য বিদ্রোহীরা হযরত ওসমানকে হত্যা করার কথা ঘোষণা করিয়া দিল। হযরত ওসমান (রা) নিজ কর্ণে এই ঘোষণা শুনিতে পাইয়া বলিতে লাগিলেন, “লোকসকল, কোন্ অপরাধে তোমরা আমার রক্তের জন্য পিপাসিত হইয়াছ? ইসলামী শরীয়তে কোন ব্যক্তিকে হত্যার তিনটি মাত্র কারণ রহিয়াছে। যদি সে ব্যভিচার করে, তবে তাহাকে প্রস্তর মারিয়া নিহত করা হয়। যদি সে ইসলাম ত্যাগ করে, তবে এই অপরাধে তাহাকে হত্যা করা চলে। অথবা যদি কেহ কাহাকেও ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে, তবে সেই হত্যার অপরাধে তাকাতেও হত্যা করা যাইতে পারে। এখন তোমরা আল্লাহর ওয়াস্তে বল, আমি কি কাহাকেও হত্যা করিয়াছি? তোমরা বি আমার উপর ব্যভিচারের অভিযোগ উত্থাপন করিত পার? আমি কি রসূলুল্লাহ (সা)-এর দ্বীন পরিত্যাগ করিয়াছি? তোমরা শুনিয়া রাখঃ আমি সাক্ষ্য দিতেছি আল্লাহ এক হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সা) তাঁহর বান্দ ও প্রেরিত রসূল (সা)। অতঃপর তোমাদের পক্ষে আমাকে হত্যা করার কোন্ সঙ্গত কারণটি অবশিষ্ট রহিয়াছে?”
নায়েবে রসূলের ধের্য
অবস্থা যখন শোচনীয় হইয়অ উঠিল, তখন হযরত মুগীরা ইবনে শোবা (রা) খলিফার নিকট উপস্থিত হইয়অ বলিতে লাগিলেন, এই পরিস্থিতিতে আমি আপনাকে তিনটি পরামর্শ দিতেছিঃ আপনার সমর্থক যথেষ্ট পরিমাণ বীর যোদ্ধা এখানে মওজুদ রহিয়াছে, আপনি জেহাদের নির্দেশ দিন। অগণিত মুসলিম সত্যের সহযোগিতা করিতে প্রস্তুত রহিয়াছেন। যদি এই পরামর্শ গ্রহণ না করেন তবে গৃহের সদর দরজা ভাঙ্গিয়া অবরোধ হইতে বাহির হউন এবং মক্কায় চলিয়া যান। যদি তাহাও পছন্দ না করেন তবে আপি সিরিয়া চলিয়া যান। সেখানকার লোক বিশ্বস্ত, তাহারা আপনাকে সাহায্য করিবে।
কিন্তু ধৈর্যের প্রতিমূর্তি হযরত ওসমান (রা) বলিলেন, আমি মুসলমানদের সহিত যুদ্ধ করিতে পারি না। আমি রসূলুল্লঅহ সাল্লাল্লাহ আলাইহে ওয়া সাল্লামের খলিফা হইয়া কিরূপে মুসলিম জাতির রক্ত প্রবাহিত করিব। আমি সেই খলিফা হইতে চাই না, যিনি মুসলিম জাতির মধ্যে রক্তারক্তির সূচনা করিবেন। আমি মক্কাতেও যাইতে পারি না। কেননা, আমি রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের মুখে শুনিয়াছি, কোরায়শদের কোন ব্যক্তি পবিত্র কাবা প্রাঙ্গণে রক্তপাত করাইবে। তাহার উপর অর্ধ দুনিয়ার আযাব হইবে। আমি আল্লাহর রসূলের এই ভীতিপূর্ণ বাণীর উদগাতা হইতে পারি না। বাকী রহিল সিরিয়ায় যাওয়ার কথা। রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সঙ্গসুখ এবং হিজরতের পবিত্র ভূমি পরিত্যাগ করিয়া যাওয়া আমার পক্ষে কি করিয়া সম্ভব? পরিস্থিতি যখন আরো শোচনীয় হইয়া উঠিল তখন তিনি আবু সাওর আল-ফাহমীকে ডাকিয়া বেদনা-বিধুর কণ্ঠে বলিতে লাগিলেন, মহান আল্লাহর উপর আমার বিশেষ ভরসা রহিয়অছে। আমার দশটি আমানত তাঁহার নিকট রক্ষিত আছেঃ
(১) ইসলাম গ্রহণের দিক দিয়া আমি চতুর্থ মুসলমান। (২) আল্লাহর রসূল আমার নিকট স্বীয় কন্যা বিবাহ দেন। (৩) একজনের মৃত্যু হইলে পর দ্বিতীয় আর এক কন্যা আমাকে দান করেন। (৩) আমি জীবনে কখনও গান করি নাই। (৫) কখনও আমি অন্যায়ের ইচ্ছাও পোষণ করি নাই। (৬) যখন হইতে আমি আল্লাহর রসূলের হাতে বায়আত করিয়াছি, তাহার পর হইতে আমার সেই দক্ষিণ হস্ত কখনও লজ্জাস্থানে লাগাই নাই। (৭) মুসলমান হওয়া অবধি প্রত্যেক জুমার দিন আমি একটি করিয়া ক্রীতদাসকে মুক্তি দিয়াছি। ঘটনাক্রমে কখনও ক্রীতদাসের অভাব হইলে আমি পরে উহার ক্ষতিপূরণ করিয়াছি। (৮) আমি বর্বর যুগে অথবা মুসলমান হওয়ার পর কখনও ব্যভিচার করি নাই। (৯) বর্বর যুগে অথবা মুসলমান হওয়ার পর কখনও আমি চুরি করি নাই। (১০) আল্লাহর রসূলের পবিত্র জীবৎকালেই আমি কোরআন পাক হেফ্জ করিয়া ফেলিয়াছিলাম।
ক্রমে পরিস্থিতির আরও অবনতি দেখা দিল। এই সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা) খেদমতে সাতশত মোজাহেদ উপস্থিত রহিয়াছেন। আপনি নির্দেশ দিন আমরা বিদ্রোহীদের সহিত শক্তি পরীক্ষা করিতেছি। জওয়াব দিলেন, আমি আল্লাহর দোহাই দিয়া বলিতেছি; আমার জন্য একজন মুসলমানও যেন রক্তপাত না করেন। গৃহে বিশটি ক্রীতদাস ছিল, তাহাদিগকে ডাকিয়া বলিলেন, অদ্য হইতে বলিতে লাগিলেন, আমীরুল মোমেনীন, আল্লাহর রসূলের আনসারগণ দ্বারে উপস্থিত আছেন, তাঁহারা পুনরায় সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পালন করিত চাহেন। তিনি জওয়াব দিলেন, যদি যুদ্ধ করিতে চাও তবে আমি কিছুতেই অনুমতি দিতে পরি না। অদ্য আমার সবচাইতে বড় সহযোগিতা হইবে, আমার জন্য যেন কেহ তরবারি কোষমুক্ত না করে।
হযরত আবু হোরায়রা (রা) উপস্থিত হইলেন এবং নিতান্ত বিনয়ের সহিত জেহাদের অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। তিনি জানিতেন, নায়েবে রসূলের সামান্য অনুমতির সঙ্গে সঙ্গেই লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে তাঁহার পতাকাতলে একত্রিত হইয়া আত্মোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিবে, কিন্তু খলিফা বলিলেন, আবু হোরায়রা, তুমি কি সমস্ত দুনিয়ার মানুষ এমনকি আমাকেও হত্যা করিতে পারিবে? হযরত আবু হোরায়রা (রা) বলিলেন, কোন মুসলমানই এইরূপ করিতে পারি না। তখন খলিফা বলিলেন, যদি তুমি একটি মানব সন্তানকেও অযথা হত্যা কর, তবে তুমি যেন দুনিয়ার সকল মানুষকে- গোটা মানবতাকে হত্যা করিলে। এই উক্তি দ্বারা খলিফা সূরা মায়েদার একটি আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করিতেছিলেন। হযরত আবু হোরায়রা (রা) এই উক্তি শ্রবণ করিয়া সঙ্গে সঙ্গে চলিয়া আসিলেন।
শাহাদাত
আল্লাহর রসূল (সা) হযরত ওসমান (রা) সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, সাধারণ মুসলমানগণ বিদ্রোহীদের ধ্বংসাত্মক অভিযানে মধ্যে অশ্রু নয়নে তাহাই দেখিতেছিলেন। একমাত্র হযরত ওসমানই নির্বিকার চিত্তে আল্লাহর রসূলের অন্তিম বাণীর বাস্তবতা অবলোকন করার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন। জুমার দিন সুর্যোদয়ের পূর্বেই তিনি রোজার নিয়ত করিলেন। এই দিন সকালের দিকে স্বপ্ন দেখিলেন, আল্লাহর রসূল (সা) হযরত আবু বকর সিদ্দিক ও হযরত ওমর সমভিব্যহারে তশরীফ আনিয়াছেন এবং বলিতেছেন- ওসমান (রা), শীঘ্র চলিয়া আস। আমি এখানে তোমার ইফতোরের অপেক্ষায় বসিয়া আছি। চক্ষু খোলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিবিকে ডাকিয়া বলিলেন, আমার শাহাদাতের সময় নিকটবর্তী হইয়াছে। বিদ্রোহীরা এখনই আমাকে হত্যা করিয়া ফেলিবে। বিবি বলিলেন,- না, না, এইরূপ কিছুতেই হইতে পারে না। তিনি বলিলেন, আমি এখনই স্বপ্নে দেখিয়াছি। এই কথার পর বিছানা হইতে উঠিয়া একটি নূতন পাজামা আনাইয়া পরিধান করিলেন এবং কোরআন সম্মুখে লইয়া তেলাওয়াতে বসিয়া গেলেন।
ঐদিকে সেই সময় মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর তীর নিক্ষেপ করিতে শুরু করিলেন। একিট তীর আসিয়া খলিফার দ্বারে দণ্ডায়মান হযরত হোসাইনের শরীরে বিদ্ধ হইল। হযরত হোসাইন (রা) গুরুতররূপে আহত হইলেন। আর একটি তীর গৃহের অভ্যনএত মারওয়ানের শরীরে যাইয়া লাগিল। হযরত আলীর গোলাম কাম্বরও মাথায় আধাত পাইলেন। হযরত হোসাইনকে আহত হইতে দেখিয়া মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর ভীত হইয়া উঠিলেন। তিনি স্বীয় দুই সঙ্গীকে উদ্দেশ করিয়া বলিতে লাগিলেন- বনী হাশেম যদি হযরত হোসাইনের আহত হওয়ার খবর পায়, তবে আমাদের সমগ্র পরিকল্পনা বানচাল হইয়া যাইবে। তাঁহারা হযরত ওসমানের কথা ভুলিয়া হযরত হোসাইনের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ না করিয়া ছাড়িবে না। সুতরাং এই মুহূর্তে কার্য উদ্ধার করিয়া ফেলা উচিত। মোহাম্মদ ইবনে আবু বকরের এই পরামর্শমত সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন বিদ্রোহী দেওয়ার উল্লঙ্ঘন করিয়া গৃহের অভ্যন্ত প্রবেশ করিল। ঘটনাচক্রে খলিফার ঘরে তখন যে কয়জন মুসলমান উপস্থিত ছিলেন, সকলেই উপরে বসিয়া অপেক্ষা করিতেছিলেন। হযরত ওসমান (রা) তখন একাকী নীচে বসিয়া কোরআন তেলাওয়াত মশগুল ছিলেন। বিদ্রোহীদের সহিত গৃহে পবেশ করতঃ মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যবহার করিলেন। তিনি হযরত ওসমানের পবিত্র দাড়ি আকর্ষণ করিয়া তাঁহাকে সজোরে মাটিতে ফেলিয়া দিলেন। আমীরুল মোমেনীন ওসমান (রা) তখন বলিতে লাগিলেন- ভ্রাতুষ্পুত্র, আজ হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) জীবিত থাকিলে এই দৃশ্য কিছুতেই পছন্দ করিতেন না। এই কথা শুনিয়া মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর লজ্জিত হইয়া পিচু হটিয়া গেলেন, কিন্তু কেননা ইবনে বেশর একটি লোহার শলাকা দিয়া খলিফার মস্তকদেশে এক নিদারুণ আঘাত হানিল। আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর রসূলের এই সম্মানিত প্রতিভূ বিছানায় গড়াইয়া পড়িলেন এবং বলিতে লাগিলেনঃ “বিসমিল্লাহ, আল্লাহর উপর ভরসা করিতেছি।” দ্বিতীয় আঘাত করিল সাওদান ইবনে আমরান। দ্বিতীয় আঘাতে রক্তের ফোয়ারা বহিয়া চলিল। আমর ইবনে হোমকের নিকট এই নৃশংসতা যথেষ্ট মনে হইল না। হতভাগ্য নায়েবে রসূলের বুকের উপর আরোহণ করতঃ খড়গ দ্বারা আঘাতের পর আঘাত করিতে শুরু করিল। এই সময় অন্য এক নির্দয় তরবারি দ্বারা আঘাত করিল। এই আঘাতে বিবি হযরত নায়েলার তিনটি আঙ্গুল কাটিয়া গেল। এই ধস্তাধস্তির মধ্যেই আমীরুল মোমেনীনের পবিত্র আত্মা জড়দেহ ছাড়িয়া অনস্ত শূন্যে মিলাইয়া গেল। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন।
নৃশংসতার এই পাশবিক দৃশ্য কেবলমাত্র হযরত নায়েলা সচক্ষে দর্শন করিলেন। তিনি হযরত ওসমানকে নিহত হইতে দেখিয়া ঘরের ছাদে আরোহণ করতঃ চিৎকার করিয়া বলিতে লাগিলেন, আমীরুল মোমেনীন শহীদ হইয়া গিয়াছেন। খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমীরুল মোমেনীনের বন্ধুরা ছুটিয়া আসিয়া দেখিলেন, হযরত ওসমানের রক্তাক্ত দেহ বিছানায় পড়িয়া রহিয়াছে। এই খবর প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মদীনাবাসীগণ ঊর্ধ্বশ্বাসে খলিফার গৃহের দিকে ছুটিয়া আসিলেন, কিন্তু তখন সব শেষ হইয়া গিয়াছিল। হযরত আলী (রা) কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া হযরত হাসান ও হোসাইনকে শাসন করিতে লাগিলেন, কিন্তু সময় অতিবাহিত হইয়া গিয়াছিল। হযরত ওসমান (রা) রক্তের ফোয়ারায় ডুবিয়া গৃহের অভ্যন্তরে পড়িয়া রহিয়াছিলেন, কিন্তু তখনও অবরোধ ঠিকমত চলিতেছিল। দীর্ঘ দুই দিন পর্যন্ত খলিফাতুল মুসলেমনীনের পবিত্র লাশ গোর-কাফন ব্যতীত গৃহে পড়িয়া রহিল। তৃতীয় দিন কতিপয় ভাগ্যবান মুসলমান এই শহীদের রক্তাক্ত লাশ দাফন-কাফনের জন্য আগাইয়া আসিলেন। মাত্র সতের জন লোক জানাযার নামায পড়িলেন। এইভাবে আল্লাহর কিতাবের সর্বশ্রেষ্ঠ সেবক, সুন্নতে রসূলের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেমিককে জান্নাতুল বাকীতে নিয়া সমাহিত করা হইল।
দুর্ঘটনার সময় ওসমান (রা) কোরআন তেলাওয়াত করিতেছিলেন। তাঁহার সম্মুখে পবিত্র কোরআন খোলা অবস্থায় পড়িয়াছিল। হযরত ওসমানের পবিত্র রক্ত কোরআন পাকের নিম্নলিখিত আয়াতখানা রঞ্জিত করিয়া দিয়াছিলঃ
“আল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট। তিনি প্রাজ্ঞ. তিনি সব শোনেন।”
জুরামর দিন আছরের সময় তিনি শহীদ হইলেন। হযরত জুবাইর ইবনে মোত্য়েম জানাযার নামায পড়াইলেন। হযরত আলী (রা) দুই হাত ঊর্ধ্বে তুলিয়া বলিতে লাগিলেন, “আমি ওসমানের রক্তপাত হইতে সম্পূর্ণ নির্দোষ!” সায়ীদ ইবনে যায়েদ (রা) বলিলেন, “তোমাদের ধৃষ্টতার প্রতিফলস্বরূপ ওহুদ পর্বত ফাটিয়া পড়ার কথা।” হযরত আনাস (রা) বলিলেন, হযরত ওসমানের জীবদ্দশা পর্যন্ত আল্লাহর তরবারি কোষবদ্ধ ছিল। তাঁহার শাহাদাতের পর অদ্য এই তরবারি কোষমুক্ত হইবে এবং কেয়ামত পর্যন্ত উহা কোষমুক্তই থাকিবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, যদি হযরত ওসমানের রক্তের প্রতিশোধ দাবী করা না হইত তবে মানুষের উপর আকাশ হইতে প্রস্তর বর্ষিত হইত হযরত সামুর (রা) বলেন, হযরত ওসমান-হত্যার জের কেয়ামত পর্যন্ত বন্ধ হইবে না এবং ইসলামী খেলঅফত মদীনা হইতে এমনভাবে বহিস্কৃত হইবে, যাহা কেয়ামত পর্যন্ত আর কখনও মদীনায় ফিরিয়া আসিবে না।
কাব ইবনে মালেক (রা) শাহাদাতের খবর শুনিলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার মুখ হইতে কয়েকটি কবিতা বাহির হিইয়া আসিল। যাহার মর্ম হইল-
“তিনি তাঁহার উভয় হস্ত বাঁধিয়া রাখিতেন, গৃহের দরজাও বন্ধ করিয়া দিলেন। মনে মনে বলিলেন, আল্লাহ সব কিচুই জানেন। তিনি তাঁহর সঙ্গীদিগকে বলিলেন, শত্রুদের সহিত যুদ্ধ করিও না। আজ যে ব্যক্তি আমার জন্য যুদ্ধ না করিবে, সে আল্লাহর শান্তির ঝায়ায় থাকিবে।”
“ওহে দর্শকগণ! হযরত ওসমানে শাহাদাতের ফলে পরস্পরের ভালবাসা কেমন করিয়া নষ্ট হইয়া গেল। আর আল্লাহ তাহার জায়গায় পরস্পরের উপর শত্রুতার বোঝা চাপাইয়া দিলেন।”
“হায়! ওসমানের পর মঙ্গল এমনভাবে অন্তর্হিত হইবে, যেমন তীব্র ঘূর্ণিবাত্যা আসিয়া সঙ্গে সঙ্গে অনর্হিত হইয়া যায়।”
মুসলিম জাহানের প্রতিক্রিয়া
হযরত ওসমানের শাহাদাতের খবর মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র মুসলিম জাহানে ছড়াইয়া পড়িল। এই সময় হযরত হোযাইফা (রা) এমন কথা বলিয়াছিলেন, পরবর্তী সমস্ত ঘটনাই তাঁহার সেই কথার ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছে। তিনি বলিয়াছিলেন, “হযরত ওসমানের শাহাদাতের ফলে মুসলিম জাহানে এমন এক বিপর্যয় নামিয়া আসিয়াছে, কেয়ামত পর্যন্তহ যাহা রুদ্ধ হওয়ার নহে।”
হযরত ওসমানের রক্তাক্ত জামা ও হযরত নায়েলার কাটা আঙ্গুলি বনী উমাইয়ার তদানীন্তন বিশিষ্ট নেতা, সিরিয়ার শাসনকর্তা হযরত আমির মোয়াবিয়ার নিকট পাঠাইয়া দেওয়া হইল। খলিফাতুল মুসলেমীনের এই রক্তাক্ত জামা যখন খোলা হইল, তখন চারিদিক হইতে কেবল ‘প্রতিশোধ’ ‘প্রতিশোধ’ আওয়াজ উঠিল। বনী উমাইয়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ সকলে যাইয়া আমির মোয়াবিয়ার নিকট সমবেত হইলেন। এখানে এই কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, হযরত আলীর খেলাফত হইতে শুরু করিয়া ইমাম হোসাইনের শাহাদাত এবং আমির মোয়াবিয়ার পর উমাইয়া ও আব্বাসিয়া খেলাফতের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যতদুলি দুর্ঘটনার সৃষ্টি হইয়াছে, প্রত্যেকটি স্থানেই হযরত ওসমানের পবিত্র রক্ত ক্রিয়াশীল দেখিতে পাওয়া যায়। হযরত ওসমানের এই শাহাদাত এমন একটি দুর্ঘটনা, যদ্দ্বারা ইসলামের ভাগ্যই পরিবর্তিত হইয়া গেল। জঙ্গে জামালে যাহা কিছু হইয়াছে, তাহাও এই রক্তের জের মাত্র। তৎপর কারবালাতে যাহা কিছু অনুষ্ঠিত হইয়াছে তাহাও এই ঘটনারই দুঃখজন পরিণতি। তৎপর উমাইয়া বনাম আব্বাসিয়া প্রশ্নে যে সমস্ত দুঃখজনক ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহাও এই বিভ্রান্তি বা বেদনাদায়ক অপকর্মেই স্বাভাবিক পরিণতি মাত্র। হযরত ওসমানের শাহাদাতের প বনী উমাইয়া ও বনী হাশেরেম গোত্রীয় বিদ্বেষের আগুন আবার নূতনভাবে জ্বলিয়া উঠিল এবং ইসলামের যে বিদ্যৎসম শক্তি একদা সমগ্র দুনিয়ার শান্তির সমৃদ্ধির শপথ লইয়া অগ্রসর হইয়াছিল, তাহা এমনভাবে বিপর্যস্ত হইল যে, অতঃপর আর কখনও সেই বিপর্যয় সামলাইয়া উঠা সম্ভবপর হয় নাই।

About মাওলানা আবুল কালাম আযাদ