জীবন সায়াহ্নে মানবতার রূপ

ইমাম হোসাইনের শাহাদাত

জগতে মানবীয় মর্যাদা ও খ্যাতির সহিত সত্যের বারসাম্য খুব অল্পই রক্ষিত হইতে দেখা যায়। আশ্চর্যের বিষয়, যে ব্যক্তি ব্যক্তত্ব, মর্যাদা, খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে যত বেশী উন্নত হন, তাঁহাকে কেন্দ্র করিয়াই তত বেশী অলীক কল্প-কাহিনীর সৃষ্টি হইতে দেখা যায়। এই জন্য ইতিহাস-বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনকারী ইবনে খুলদুন বলিতে বাধ্য হইয়াছেন, যে ঘটনা দুনিয়ায় যতবেশী খ্যাত ও জনপ্রিয় হইবে, কল্প-কাহিনীর অলীকতা ততবেশী তাহাকে আচ্ছন্ন করিয়া তুলিবে। পাশ্চাত্যের কবি গ্যাটে এই সত্যটাই অন্য কথায় বলিয়াছেন। তিনি বলেন, “মানবীয় মর্যাদার শেষ স্তর হইতেছে কল্প-কাহিনীতে রূপান্তরলাভ।”

ইসলামের ইতিহাসে হযরত ইমাম হোসাইনের অপরিসীম ব্যক্তিত্বের কথা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। খোলাফায়ে রাশেদীনের পর যে মর্মান্তিক ঘটনা ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতকি ক্ষেত্রে সবচাইতে বেশী প্রভাব বিস্তার করিয়াছে, তাহা হইতেছে হযরত ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের ঘটনা। কোন প্রকার অত্যুক্তির আশ্রয় গ্রহণ না করিয়াই বলা চলে, দুনিয়ার কোন দুর্ঘটনাই বোধ হয় দিবেনর পর দিন মানব সন্তানের এত অধিক অশ্রু বিসর্জন করাইতে সমর্থ হয় নাই। বিগত তেরশত বৎসরে মধ্যে তেরশত মহররম চলিয়া গিয়াছে; আর প্রত্যেক মহররমই এই বেদনার স্মৃতিকে তাজা করিয়া যাইতেছে। হযরত ইমাম হোসাইনের পবিত্র দেহ হইতে যে পরিমাণ রক্ত কারবালা প্রান্তরে প্রবাহিত হইয়াছিল, তাহার প্রত্যেকটি বিন্দুর পরিবর্তে দুনিয়ার মানুষ দুঃখ-বেদনা ও মাতম-অশ্রুর এক একটি সয়লাব প্রবাহিত করিয়াছে।
এতদসত্ত্বেও ভাবিতে আশ্চর্যবোধ হয়, ইতিহামের এত বড় একটি প্রসিদ্ধ ঘটনাকে ইতিহাসের চাইতে কল্প-কাহিনীর বেড়াজাল বেশী আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছে। আজ যদি কোন সত্যসন্ধানী কেবলমাত্র ইতিহাসের কষ্টি-পাথরে বিচার করিয়া এই বিখ্যাত ঘটনাটি পাঠ করিতে চাহেন, তবে তাঁহাকে প্রায় নৈরাশ্যই বরণ করিতে হইবে! বর্তমানে এই বিষয়ের উপর যত প্রচলিত বই-পুস্তক দেখিতে পাওয়া যায়, তাহার অধিকাংশই মাতম-জারির আবেগ হইতে সৃষ্টি। এইগুলির উদ্দেশ্যও কেবল মাতম-জারি সৃষ্টি করা মাত্র। এমনকি ইতিহাসের আরণে বর্ণনা করা বিষয়বস্তু, যাহা ইতিহাসের নামেই সংকলিত হইয়াছে, তাহারও অধিকাংশই ইতিহাস নহে। মাতমের মজলিসী বিষয়বস্তুই ইতিহাসের রূপ ধারণ করিয়াছে মাত্র। আজ দুনিয়ার যে কোন ভাষায় তালাশ করিয়াও কারবালার ঘটনার উপর একটি সত্যিকারের ইতিহাস পুস্তক খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। এই ব্যাপারে অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তি মাত্রকেই নিরাশ হইতে হয়।
রসূরলে খোদা (সা)-এর আহলে বায়ত প্রথম হইতেই নিজদিগকে খেলাফতের প্রকৃত দাবীদার মনে করিতেন। আমির মোয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের ইন্তেকালের পর খেলাফতের মসনদ শূন্য হয়। ইয়াযিদ ইবনে মোয়াবিয়া পূর্ব হইতেই খেলাফতের উত্তরাধিকারী ঘোষিত হইয়াছিলেন। তিনি তাঁহার খেলাফতের কথা ঘোষণা করিয়া দিলেন এবং হযরত হোসাইন ইবনে আলীর নিকটও আনুগত্য প্রকাশ করিয়া বায়আত গ্রহণের নির্দেশ প্রেরণ করিলেন। আমীরুল মোমেনীন হযরত আলী (রা) কুফায় তাঁহার রাজধানী স্থাপন করিয়াছিলেন। এই জন্য সেখানে আহলে বায়তের সমর্থকের সংখ্যা বেশী ছিল। কুফাবাসীরা হযরত ইমাম হোসাইনকে লিখিলেন, আপনি এখানে আগমন করুন, আমরা আপনার সহযোগিতা করিব। হযরত হোসাইন (রা) তাঁহার পিতৃব্য মুসলিম ইবনে আকীলকে কুফাবাসীর বায়আত গ্রহণ করার জন্য প্রেরণ করিলেন এবং স্বয়ং কুফা যাত্রার আয়োজন করিতে লাগিলেন।
বন্ধদের পরামর্শ
হযরত হোসাইনের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবগণ এই কথা শুনিতে পাইয়া সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিলেন। তাঁহারা কুফাবাসীদের বিশ্বাসঘাতকতা ও সুযোগ-সন্ধানী চরিত্র সম্পর্কে বিশেষভিাবে জ্ঞাত ছিলেন। তাই সকলে মিলিয়া এই সফরের বিরোধিতা করিতে লাগিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (লা) বলিলেন, “জনসাধারণ এই কথা শুনিয়া অস্থির হইয়া উঠিয়াছে যে, আপনি ইরাকে রওয়ানা হইতেছেন, আমাকে প্রকৃত ঘটনা খুলিয়া বলুন।”
হযরত হোসাইন (রা) জওয়াব দিলেন, “আমি সিদ্ধান্ত করিয়া ফেলিয়অছি; আজ অথবা আগামীকল্যই যাত্রা করিতেছি।” এই কথা শুনিয়া আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) উচ্চকণ্ঠে বলিতে লাগিলেন, আপনি কি এমন লোকদের নিকট গমন করিতেছেন, যাহারা শত্রুকে বাহির করিয়া দিয়া রাষ্ট্রের শক্তির উপর পূর্ণ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করিতে সমর্থ হইয়াছে? যদি এইরূপ হইয়া থাকে তবে আপনি আনন্দিত চিত্তেই যাইতে পারেন। যদি এইরূপ না হইয়া থাকে, তাহাদের কর্মচারীরা যদি এখনও স্ব-স্ব রাজকার্য করিয়অ যাইতে থাকে, তবে তাহাদের আপনাকে আহবান করা প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধের প্রতিই আহবান করার নামান্তর মাত্র। আমার খয় হয়, শেষ পর্যন্ত উহারা আপনাকে ধোকা দিয়া না বসে! সর্বোপরি শত্রুকে শক্তিশালী দেখিয়া শেষ পর্যন্ত আপনার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ শুরু করিয়া না দেয়।” কিন্তু ইমাম হোসাইন এই সমস্ত কথায় কোন প্রকার কর্ণপাত না করিয় স্বীয় সিদ্ধান্তে অটল রহিলেন।
হযরত ইবনে আব্বাসের উদ্বেগ
হযরত হোসাইনের যাত্রার সময় নিকটবর্তী হইলে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) পুনরায় দৌড়াইয়া আসিলেন। বলিতে লাগিলেন, “প্রিয় ভাই, আমি চুপ করিয়া থাকিতে চাহিয়াছিলাম, কিন্তু আপনাকে আমি নিশিচত ধ্বংসের মুখে যাত্র করিতে দেখিতেছি। ইরাকবাসীরা চরম বিশ্বাসঘাতক। ইহাদের নিকটেও যাইবেন না। আপনি এখানেই অবস্থান করুন। কেননা, হেজাযে আপনার চাইতে বড় আর কেহ নাই। ইরাববাসীরা যদি আপনাকে ডাকে, তবে তাহাদিগকে বলূন, সর্বপ্রথম তাহারা শত্রুদিগকে দেশ হইতে বিতড়িত করিয়া পরে যেন আপনাকে আহ্বান করে। যদি আপনি হেজায হইতে যাইতেই চান তবে ইয়ামান চলিয়া যান। সেখানে মজবুত দুর্গ ও দুর্গম পর্বতমালা রহিয়াছে। দেশ প্রশস্ত এবং অধিবাসীগণ সাধারণতঃ আপনার পিতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সেখানে আপনি শত্রুদের কবল হইতে অনেকটা দূরে থাকিতে পারিবেন এবং দূত ও পত্র মারফত অন্যান্য এলাকায় আপনার দাওয়াত প্রেরণ করতঃ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করিতে সমর্থ হইবেন।”
কিন্তু হযরত হোসাইন জওয়াব দিলেনৎ “ভ্রাতা! আমি জানি, তমি আমার হিকাকাঙ্ক্ষী, কিন্তু আমি স্থির সিদ্ধান্ত করিয়া ফেলিয়াছি।”
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলিলেন, “যদি আমার কথা একান্তই না মানেন তবে স্ত্রীলোক ও শিশুদিগকে সঙ্গে লইয়া যাইবেন না। আমার সন্দেহ হয়, আপনিও হয়ত শেষ পর্যন্ত হযরত উসমানে ন্যায় নিজের পরিবার –পরিজনের সম্মখেই শহীদ হইবেন।”
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর পুনরায় তিনি বলিতে লাগিলেন, আপনার কেশ আকর্ষণ করিয়া চিৎকার করার পর লোক একত্রিত হইলে আপনি এই সর্বনাশা ইচ্ছা পরিত্যাগ করিবেন বলিয়া যদি আমার আস্থা জন্মিত, আল্লাহর শপথ করিয়া বলিতেছি, আমি শেষ পর্যন্তহ আপনা কেশই আকর্ষণ করিতাম।– (ইবনে জরীর)
কিন্তু এতকিছুর পরও হযরত ইমাম হোসাইন (রা) স্বীয় সিদ্ধান্তে অটল রহিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনে জাফরের পত্র
অনুরূপভাবে আরও অনেকেই হযরত ইমাম সাহেবকে কুফা যাত্রা হইতে নিরস্ত করার পেষ্টা করেন। তাঁহার চাচাতো ভাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর পত্র লিখিলেন,-
“আপনাকে আল্লাহর দোহাই দিতেছি, এই পত্র পাঠমাত্র স্বীয় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করুন। কেননা, এই পথে আপনার জন্য ধ্বংস এবং আপনার পরিবার-পরিজনের সর্বনাশ নিহিত রহিয়াছে। আপনি যদি নিহত হন তবে পৃথিবীর নূর চিরতরে নিভিয়া যাইবে।এইক্ষণে একমাত্র আপনিই হেদায়াতের পতাকা এবং ঈমানদারদের সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। যাত্রার জন্য তাড়াহুড়া করিবেন না। আমি আসিতেছি!” –(ইবনেস জরীর, কামেল, মাকতাল ইবনে আহ্‌নাফ ইত্যাদি)
ওয়ালীর পত্র
আবদুল্লাহ পত্র লিখিয়া ক্ষান্ত হইলেন না, ইয়াযিদের নিয়োজিত মক্কার ওয়ালী আমর ইবনে সাঈদ ইবনুল আসের নিকট গমন করতঃ বলিলেন, হোসাইন ইবনে আলীকে পত্র লিখ এবং সর্বদিক দিয়া তাঁহাকে শান্ত করিয়া দাও। আমর বলিলেন, আপনি স্বয়ং পত্র লিখিয়া আনুন, আমি উহাতে সীলমোহর দিয়া দিতেছি। আবদুল্লাহ ওয়ালীর তরফ হইতে এই পত্র লিখিলেন,- “আমি দোয়া করি যেন আল্লাহ আপনাকে এই পথ হইতে সরাইয়া দেন, যে পথে নিশ্চয় ধ্বংস নিহিত রহিয়াছে এবং প্রার্থনা করি, যেন সেই পথে পরিচালিত করেন, যে পথে আপনার নিকট প্রেরণ করিতেছি তাঁহাদের সহিত ফিরিয়া আসুন। আমার এখানে আপনার মতবিরোধ ও সংঘর্ষের পথ হইতে আল্লাহ তাআলার পানাহ ভিক্ষা করি। আমি আপনার সর্বনাশকে ভয় পাই। আবদুল্লাহ ইবনে জাফর ও ইয়াহইয়া সায়ীদকে আপনার জন্য মঙ্গল রাখিয়াছেন। জন্য শাস্তি, নিরাপত্ত, শ্রদ্ধা ও সদ্ব্যবিহারের প্রতিশ্রুতি রহিল। আল্লাহ সাক্ষী। তিনিই এই জন্য প্রতিশ্রুতির নেগাহ্‌বান।” এতদসত্ত্বেও হযরত হোসাইন (রা) স্বীয় সংকল্পে অটল রহিলেন।
ফারাযদাকের সহিত সাক্ষাত
মদীনা হইতে হযরত হোসাইন (রা) ইরাকের পথে রওয়ানা হইয়া গেলেন। সাফ্‌কাহ নামস স্থানে আহলে বায়ত-ভক্ত বিখ্যাত করিব ফারাযদাকের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইল। হযরত ইমাম জিজ্ঞাসা করিলেন,- “তোমাদের ঐ দিককার লোকদের কি মতামত?” ফারাযদাক জবাব দিলেন, “লোকদের অন্তর আপনার প্রতি আর তরবারি বনী উমাইয়ার প্রতি।” হযরত ইমাম বলিলেন,- সত্য বলিতেছ, কিন্তু এখন পরিণাম একমাত্র আল্লাহর হাতে। তিনি যাহা চান তাহাই হইয়া থাকে। আমার প্রতিপালক প্রতিমুহূর্তেই কোন না কোন নির্দেশ দিয়া থাকেন, যদি তাঁহার ইচ্ছা আমার অনুকূল হয় তবে তাঁহার প্রশংসা-কীর্তন করিব। আর যদি আমার আশার প্রতিকূল হয় তবুও আমার নিষ্ঠা এবং নিয়তেহর পুণ্য কোথাও যাইবে না। এই কথা বলিয়া আবার সোয়ারী সম্মুখের দিকে চালাইতে লাগিলেন। -(ইবনেস আকীল)
মুসলিম ইবনে আকীল
হযরত ইমাম হোসাইন (রা) ফররুদ নামস স্থানে পৌঁছিয়া শুনিতে পাইলেন, তাঁহার নায়েম মুসলিম ইবনে আকীলকে কুফাস্থ ইয়াযিদের শাসনকর্তা ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ প্রকাশ্যে হত্যা করিয়া ফেলিয়াছে। তেমন কেহ তাঁহার সহযোগিতা করিতেও আগাইয়া আসে নাই। এই খবর শুনিয়া বার বার তিনি ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন পড়িতে লাগিলেন। কোন কোন সঙ্গী বলিলেন, এখনও সময় আছে, আমরা আপনার এবং আপনার পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে আল্লাহর দোহাই দিয়া বলিতেছি; এখনও ফিরিয়া চলুন। কুফায় আপনার সাহায্যকারী একটি প্রাণীও নাই। সকলেই আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়াইবে।
এই কথা শুনিয়া হযরত ইমাম একটু থামিয়া ফিরিয়া যাওয়ার কথা ভাবিতে লাগিলেন, কিন্তু মুসলিম ইবনে আকীলের স্বজনগণ দাঁড়াইয়া বলিতে লাগিলেন, আল্লাহর শপথ, আমরা কিছুতেই ফিরিব না। আমরা প্রশোধ গ্রহণ করিব অথবা স্বীয় ভ্রাতার ন্যায় মৃত্যুবরণ করিব। এই কথা শুনিয়া হযরত ইমাম সঙ্গীগণের প্রতি চোখ তুলিয়া চাহিলেন এবং দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিতে লাগিলেন- অতঃপর আর জীবনের কোন স্বাদই অবশিষ্ট রহিল না। -(ইবনে জরীর)
সঙ্গীদের প্রত্যাবর্তন
একদল বেদুঈন হযরত ইমামের সহিত কুফায় রওয়ানা হইয়াছিল। তাহারা মনে করিতেছিল, কুফায় যাইয়া বিশেষ আরাম পাইবে। হযরত ইমাম উহাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভালভাবেই ওয়াকেফহাল ছিলেন। পথে একস্থানে সকলকে সমবেত করিয়া বলিতে লাগিলেন, “লোকসকল, আমার নিকট ভয়ানক খবর আসিয়াছে। মুসলিম ইবনে আকীল, হানি ইবনে ওরওয়া এবং আবদুল্লাহ ইবনে বুকতির নিহত হইয়াছেন। আমাদের কোন সাহায্যকারী অবশিষ্ট নাই। যাহার আমার সঙ্গ ছাড়িতে চাও, স্বচ্ছন্দে চলিয়া যাইতে পার, আমি কখনও তাহাদের উপর বিরক্ত হইব না।” এই কথা শোনার পর বেদুঈনগণ ধীরে ধীরে তাঁহাকে ছাড়িয়া চলিয়া গেল।– (ইবনে জরীর)
হোর ইবনে ইয়াযিদের আগমন
কাদেসিয়া পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কুফার শাসনকর্তা ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের কর্মচারী হোসায়ম ইবনে নোমায়র তামিমীর তরফ হইতে হোর ইবনে ইয়াযিদ এক সহস্র সৈন্যসহ আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহাদের উপর নির্দেশ ছিল, হযরত হোসাইনের সহিত লাগিয়া থাকিয়া তাহাকে যেন ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের সম্মুখে লইয়া আসে। ইতিমধ্যেই জোহরের নামাযের সময় হইল। হযরত ইমাম হতবন্দ পরিধান করতঃ চটি পায়ে ও চাদর গায়ে দিয়া সঙ্গীগণ এবং হোরের সৈন্যদের সম্মুখে আসিয়া বক্তৃতা দিলেন-
“লোকসকল, আল্লাহর সম্মুখে এবং তোমাদের সম্মুখে আমার কৈফিয়ত হইতেছে; আমি এখানে নিজ ইচ্ছায় আগমন করি নাই। আমার নিকট তোমাদের পত্র পৌঁছাইয়াছে; কাসেদ আসিয়াছে। আমাকে এই মর্মে বার বার আহ্বান জানানো হইয়াছে, আমাদের কোন ইমাম নাই। আপনি আসুন যে আল্লাহ আমাদিগকে আপনা মাধ্যমে একত্রিত করেন। এখনও যদি তোমাদের মনের সেই অবস্থা থাকিয়া থাকে তবে শোন, আমি আসিয়া পড়িয়াছি। যদি তোমরা আমার হাতে শপথ গ্রহণ করিতে আসিয়া থাক তবে আমি শান্ত মনে তোমাদের শহরে যাইতে প্রস্তুত আছি। আর যদি তোমরা আমার আগমনে অসন্তুষ্ট হইয়া থাক তবে আমি যেখান হইতে আসিয়াছি সেখানেই চলিয়া যাইতেছি।” হযরত ইমামের এই বক্তৃতার কেহ কোন প্রকার জওয়াব দিল না। দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর লোকেরা মোয়াজ্জেনকে আজান দেওয়ার কথা বলিল। হযরত উমাম হোর ইবনে ইয়াযিদকে জিজ্ঞাসা করিলেন,- “তোমরা কি পৃথকভাবে নামায পড়িকে?” হোর বলিল, না; আপনি ইমামত করুন, আমরা আপনার পশ্চাতে নামায পড়িব। সেখানেই তিনি আসরের নামাযও পড়িলেন। শত্রু-মিত্র সকলে মিলিয়া একতেদা করিল। নামাযো পর তিনি পুনরায় খুৎবা দিলেনঃ
“লোকসকল, যদি তোমরা খোদাভীরুতার পথে থাকিয়া থাক, আর হকদারদের হক সম্পর্কে সচেতন থাকিয়া থাক, তবে উহা খোদার সন্তুষ্টির কারণ হইবে। আমরা রসূলে- খোদার সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আহ্‌লে বায়ত, বর্তমান শাসন কর্তৃপক্ষের চাইতে রাষ্ট্রক্ষমতার বেশী হকদার। উহাদের হুকুমত করার কোন অধিকার নাই। উহারা লোকের উপর অত্যাচার করিয়া রাজত্ব করিতেছে, কিন্তু তোমরা যদি আমাকে অপছন্দ কর, আমার মর্তবা সম্পর্কে সচেতন না থাক এবং তোমরা অসংখ্য পত্রে ও প্রতিনিধি মারফত আমকে যে কথা শুনাইয়াছিলে, তোমাদের বর্তমান মতামত তাহার বিপরীত হইয়া গিয়া থাকে, তবে আমি ফিরিয়া যাইতে প্রস্তুত আছি।”
এই কথা শুনিয়া হোর বলিল,- আপনি কোন্‌ পত্রের কথা বলিতেছেন? এই সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। হযরত ইমাম হোসাইন (রা) ওক্‌বা ইবনে আশ্‌আসকে কুফাবাসীদের পত্রে বোঝাই দুইটি থলি বাহির করিয়া আনিতে নির্দেশ দিলেন। ওক্‌বা থলি ঝাড়িয়া পত্রের স্তুপ বাহির করিলেন। এইগুলি দেখিয়া হোর বলিল, যাহারা এই সমস্ত পত্র লিখিয়াছে আমরা দাগারা নই। আমিদিগকে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে যেন আপনাকে কুফার শাসনকর্তা ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের নিকট পৌছাইয়া দেওয়া হয়।
হযরত ইমাম বলিলেন,- “কিন্তু উহা মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সম্পূর্ণ অসম্ভব।” অতঃপর তিনি যাত্রার নির্দেশ দিলেন, কিন্তু শত্রুরা রাস্তা বন্ধ করিয়া দিল। হযরত ইমাম রাগান্বিত হইয়া হোরকে বলিলেন,- হতভাগ্য! কি চাও? হোর উত্তর দিল, আল্লাহর শপথ, যদি আপনি ব্যতীত অন্য কোন আরব আমাকে এইরূপ কথা বলিত তবে তাহার কল্যাণ ছিল না, কিন্তু আমি আপনাকে কটু কথা বলিতে পারিব না।
হযরত ইমাম বলিলেন, “তুমি কি চাও?”
হোর জওয়াব দিল, আমি আপনাকে ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিঘাদের নিকট লইয়া যাইতে
হযরত ইমাম বলিলেন, কিন্তু আমি আর তোমাদের সহিত যাইতেছি না। হোর বলিল, আমি আপনার পিছন ছাড়িতেছি না। কথা যখন বেশী বাড়িয়া চলিল তখন হোর বলিল, আমাকে আপনার সহিত সংঘর্ষে লিপ্তহ হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় নাই। যদি আপনার উহা পছন্ত না হয় তবে আপনি এমন এক পথে যাত্রা করুন যাহা কুফা অথবা মদীনায় যায় নাই। আমি ইবনে যিয়াদকে লিখিয় জানাইয়া দেই। অথবা আপনিও যদি চান তবে ইয়াযিদ কিংবা ইবনে যিয়াদকে এই মর্মে লিখিতে পারেন। এইভাবে হয়ত আমি এই ব্যাপারে চরম পরীক্ষা হইতে নিষ্কৃতি পাইয়া যাইব। হযরত ইমাম এই কথায় সম্মত হইয়া অন্য পথে যাত্রা করিলেন।– (ইবনে জরীর, কামেল)
আর একটি বক্তৃতা
পথিমধ্যে হযরত ইমাম আরও কয়েক স্থানে বক্তৃতা দেন। বায়জা নামক স্থানে পৌঁছিয়া শত্রু-মিত্রকে উদ্দেশ করিয়া বলিতে লাগিলেনঃ
“লোকসকল, রসূলুল্লাহ (সা) বলিয়াছেন, কেহ যদি এমন শাসনকর্তা দেখিতে পায় যে অত্যাচার করে, আল্লাহ নির্ধারিত সীমারেখা লঙ্ঘন করে, নবীর সুন্নতের বিরোধিতা করে, আল্লাহর বান্দদের উপর অন্যায় ও উদ্ধতভাবে রাজত্ব করে, আর এইরূপ দেখার পরও যদি কথায় কাজে তাহার বিরোধিকা না করে, তবে আল্লাহ্‌ তাহাকে ভাল পরিণাম দিবেন না। দেখ উহারা শয়তানের অনুসারী এবং আল্লাহর অবাধ্য হইয়া গিয়াছে। চারিদিকে অন্যায়-অনাচার চলিয়াছে। আল্লাহর আইন অচল করিয়া দেওয়া হইয়াছে। জাতীয় সম্পদ, গনীমতের মাল উহারা অন্যায়ভাবে গ্রাস করিতেছে। আল্লাহর নির্ধারিত হালালকে হারাম এবং হারামকে হালালে পরিণত করা হইতেছে। উহাদের এই উদ্ধত অন্যায়কে সত্য ও ন্যায়ে রূপান্তরিত করার আমিই সর্বাপেক্ষা হকদার। তোমাদের অগণিত পত্র ও কাসেদ বায়আতের পয়গামসহ আমার নিকট পৌঁছিয়অছে। তোমরা শপথ করিয়অছ, আমার সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করিবে না। যদি তোমরা সেই প্রতিশ্রুতি পালন কর তবে উহাই তোমাদের জন্য হেদায়তের পথ। কারণ, আমি হোসাইন ইবনে আলী (রা) ইবনে ফাতেমা- রসূলুল্লাহ (সা)-এর দৌহিত্র। আমার জীবন তোমাদের জীবনের সহিত রহিল। আমর পরিবার-পরিজন তোমাদের পরিবার-পরিজনের সহিত রহিল। আমাকে তোমাদের আদর্শরূপে গ্রহণ কর! আমার পক্ষ হিইতে মুখ ফিরাইয়া নিও না, কিন্তু যদি তোমাদের প্রতিশ্রুতি পালন না কর, আর আমার তরফ হইতে মুখ ফিরাইয়া লও, অবশ্য ইহাও তোমাদের পক্ষে কোন বিচিত্র ব্যাপার হইবে না।
তোমরা আমার পিতা, ভ্রতা ও পিতৃব্য-পুত্র মুসলিমের সহিত তাহাই করিয়াছ। যাহারা তোমাদের উপর ভরসা করে, তাহারা নিঃসন্দেহে প্রতারিত, কিন্তু স্মরণ রাখিও, তোমরা নিজেদেরই ক্ষতি করিয়াছ এবং এখনও নিজেরেদই ক্ষতি করিবে। তোমরা নিজেদের অংশেই হারাইয়াছ। নিজেদের ভাগ্য বিপর্যস্ত করিয়াছ। যাহারা বিশ্বাসঘাতকতা করিবে, তাহার নিজেদের বিরুদ্ধেই বিশ্বাসঘাতকতা করিবে। আশ্চর্য নয়, খোদা শীঘ্রই আমাকে তোমাদের হইতে নির্ভরহীন করিয়া দিবেন। আল্লাহ তোমাদিগকে শান্তি সমৃদ্ধি দান করুন।” –(ইবনে জরীর, কামেল)।
অন্য একটি বক্তৃতা
অন্য এক স্থানে এইরূপ বক্তৃতা প্রদান করিলেন- “পরিস্থিতি কোথায় গড়াইয়াছে তাহা তোমরাও অনুধাবন করিয়াছ। দুনিয়া খালি হইয়া গিয়অছে, মুখ ফিরাইয়া লইয়াছে। পুণ্য হইতে জগৎ খালি হয়িা গিয়াছে। সামান্য অংশ অবশিষ্ট রহিয়অছে। আমার তুচ্ছ জীবন এখনও বাকী আছে। চারিদিকে বিভীষিকা পাখা বিস্তার করিয়াছে, আর অন্যায় অসত্যের উপর প্রকাশ্যে আমল করা হইতেছে। এমন কেহ নাই যে আজ সত্যের প্রতি হস্ত সম্প্রসারণ করে। সময় আসিয়অছে যখন মুমিন সত্যের পথে আল্লাহর ইচ্ছা কামনা করিবে, কিন্তু আমি শহীদের মৃত্যুই কামনা করি। জালেমের সহিত জীবিত থাকাই একটি মহাপাপ।”
হযরত ইমামের এই বক্তৃতা শ্রবণ করিয়া যোবায়র ইবনুল কাইয়েন বাজালী উঠিয়া বলিলেন,-“তোমরা কিছু বলিবে কি, না আমি বলিব?” সকলে বলিল, তুমি বল।
যোবায়ল বলিতে লাগিলেন,- হে রসূলের (সা) বংশধর! আল্লাহ আপনার সহায়তা করুন। আপনার বক্তৃতা শ্রবণ করিয়াছি। আল্লাহর শপথ, দুনিয়া যদি চিরস্থায়ীও হয় আর এখানে যদি আমাদের চিরকাল বসবাস করারও ব্যবস্থা হয়, তবুও আপনার জন্য আমরা এই দুনিয়া ত্যাগ করিতে পারি। অনন্ত জীবনে আপনার সঙ্গসুখ লাভের জন্য আপনার সহিত মৃত্যুবরণকে শ্রেষ্ঠ মনে করিব।
হোরের হুমকি
হোর ইবনে ইয়াযিদ সব সময়ই হযরত ইমামের সঙ্গে সঙ্গে আসিতেছিল। সে বার বার বলিতেছিল,- “হে হোসাইন (রা), নিজের ভবিষ্যত সম্পর্কে খোদাকে স্মরণ করুন। আমি জোরের সহিত বলিতেছি, আপনি যদি যুদ্ধ করেন তবে অবশ্যই নিহত হইবেন।”
একবার হযরত ইমাম রাগান্বিত হইয়া বলিলেন- “তুমি আমাকে মৃত্যুর ভয় দেখাইতেছ? তোমাদের দুঃসাহস কি এই পর্যন্ত পৌছিবে যে, শেষ পর্যন্ত আমাকে হত্যা করিবে? আমি ভাবিয়া পাই না, তোমাকে জি জওয়াব দিব,” কিন্তু আমি ঐ কথাই বলিব- রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের এক সাহাবী জেহাদে যাওয়ার পথে ভ্রাতার শাসানী শুনিয়া যাহা বলিয়াছেন-
“এবং যখন সে জীবন দান করতঃ সৎকর্মশীলদের সাহায্যকারী হইল এবং প্রতারক জালেম ধ্বংসোন্মুখের নিকট হইতে দূরে সরিয়া যাইতেছিল।”
চারি জন কুফাবাসীর আগমন
আজীবুল হাজানাত নামাক স্থানে চারি জন কুফাবাসী আরোহীকে আসিতে দেখা গেল। তাহাদের অগ্রে অগ্রে তেরমাহ ইবনে আদী কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন। তাহার আবৃত্তিকৃত কবিতার অর্থ হইল-
-“হে আমার উষ্ট্রী. আমার কঠোরতায় ভীত হইও না, সূর্যোদয়ের পূর্বেই সাহসে ভর করিয়া অগ্রসর হও।”
“সর্বোৎকৃষ্ট ভ্রমণকারীদিগকে লইয়া চল, সর্বোৎকৃষ্ট ভ্রমণে চল এবং শেষ পর্যন্ত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের নিকট পৌঁছাও।”
“তাঁহারা সম্মানিত, স্বাধীনচেতা; প্রশস্ত বক্ষ, আল্লাহ তাঁহাদিগকে সর্বদা নিরাপদ রাখুন।”
হযরত হোসাইন (রা) এই কবিতা শ্রবণ করিয়া বলিতে লাগিলেন-“ আল্লাহর শপথ, আমার এই আশাই ছিল, আল্লাহ্‌ আমাদের সহিত মঙ্গল দান করার ইচ্ছা রাখেন, নিহত হই অথবা জয়যুক্তই হই।”
হোর ইবনে ইয়াযিদ আগন্তুকদিগকে দেখিয়া হযরত উমামকে বলিতে লাগিলেন, উহারা কুফার লোক, আপনার সঙ্গী নয়। আমি উহাদিগকে বাধা দান করিব এবং এখান হইতেই ফিরাইয়া দিব।
হযরত ইমাম বলিলিন, “তোমরা অঙ্গীকার করিয়াছ, ইবনে যিয়াদের পত্র আসার পূর্ব পর্যন্ত আমার কোন কর্মে বাধা দিবে না। যদিও আমার সঙ্গে আসে নাই, কিন্তু ইহারা আমার আমার সাথী। যদি তাহাদের সহিত কোন দুর্ব্যবহার কর তবে আমি তোমার সহিত যুদ্ধ করিব।” এই কথা শুনিয়া হোর চুপ হইয়া গেল।
কুফাবাসীদের অবস্থা
হযরত ইমাম আগন্তুকদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন- “কুফাবাসীদিগকে কি অবস্থায় ছাড়িয়া আসিয়াছ?” তাঁহারা জওয়াব দিলেন,- “শহরের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণকে ঘুষ প্রদান করিয়া বাধ্য করিয়া ফেলা হইয়াছে। জনসাধারণের অন্তর অবশ্য আপনার দিকে তবে তাহাদে সকলের কদরবারিই আপনার বিরুদ্ধে উত্তোলিত হইবে।” –(ইবনে জরীর)
ইতপূর্বে হযরত ইমাম কায়স ইবনে মুহেরকে দূতরূপে কুফায় প্রেণ করিয়াছিলেন। ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ তাঁহাক হত্যা করিয়া ফেলিয়াছিল। তখন পর্যন্ত হযরত ইমাম এই খবর জানিতেন না। তিনি আগন্তুকরেদ নিকট দূতের খবর জিজ্ঞাসিা করিলেন তাঁহার সমস্ত ঘটন বর্ণা করেন। দূতের নিহত হওয়ার খবর শুনিয়া হযরত ইমামের চক্ষু অশ্রু প্লাবিত হইয়া উঠিল। তিনি পাঠ করিতে লাগিলেন- “তাহাদের মধ্যে কিচু লোক মৃত্যুবরণ করিয়াছেন আর কিছু লোক মৃত্যুর অপেক্ষা করিতেছেন, কিন্তু এই অবস্থায়ও তাঁহারা সত্যের পথে দৃঢ় রহিয়াছেন, অন্য পথ অবলম্বন করেন নাই। হে খোদা, আমাদের জন্য এবং তাঁহাদের জন্য জান্নাতের পথ খুলিয়া দাও। তোমার রহমত ও পুণ্যের স্থানে আমাদিগকে ও তহাদিগকে একত্রিত কর।”
তেরমাহ ইবনে আদীর পরামর্শ
তেরামাহ ইবনে আদী বলিতে লাগিলেন, “আল্লাহর শপথ, আমি চক্ষু বিস্ফোরিত করিয়া দেখিতেছি, কিন্তু আপনার সহিত কাহাকেও দেখিতে পাইতেছি না। আপডনার পশ্চাতে যাহার লাগিয়অ রহিয়াছে, তাহারাই যদি ঝাঁপাইয়া পড়ে, তবে এই কাফেলার কেহই নিষ্কৃতি পাইবে না। তদুপরি কুফার উপকণ্ঠে একমাত্র হোসাইনের সহিত লড়াই করার জন্য এতবড় এক জনতাকে অপেক্ষা করিতে দেখিয়া আসিয়অছি যে, এত লোক আমি কখনও একত্রে দেখি নাই। আমি আপনাকে আল্লাহর দোহাই দিয়া বলিতেছি, যদি সম্ভব হয় তবে আর এক পা-ও অগ্রসর হইবেন না। আপনি যদি এমন স্থানে যাইতে চান যেখানে শত্রুরা আপনার নাগাল পাইবে না, তবে আমর সঙ্গে চলুন। আমি আপনকে আজা নামক দুর্গম পার্বত্য এলাকায় লইয়অ যাইব, খোনে অন্ততঃ সহস্র ‘তাই’ গোত্রীয় লোক আপনার পতাকাতলে আসিয়া সমবেত হইবে। যে পর্যন্ত তাহাদের জীবন অবশিষ্ট থাকিবে, আপনার দিকে চক্ষু তুলিয়া দেখাও কাহারও পক্ষে সম্ভবপর হইবে না।”
হযরত ইমাম জওয়াব দিলেন- “আল্লাহ তোমাকে ইহার সৎ পরিণাম দান করুন, কিন্তু আমার আর উহাদের মধ্যে চুক্তি হইয়াছে, আমি উহাদের নিকট হইতে একপদও অন্যদিকে চালনা করিতে পারি না। উহাদের আর আমার অবস্থা কোথায় গিয়া শেষ হয় তাহা এখনও কিছু বলা যায় না।”
নিদারুণ স্বপ্ন
এতদিন হযরত ইমামের অন্তরে স্থির বিশ্বাস জন্মিয়াছিল, তিনি নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হইতেছেন। ‘কাসরে বনী মাকাতেল’ নামস স্থানে পৌঁছিয়া তিনি সামান্য তন্দ্রাগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন। জাগ্রত হইয়া বার বার ‘ইন্না লিল্লাহি’ পড়িতে লাগিলেন। ত৭াহপার পুত্র আলী আকবর জিজ্ঞাসা করিলেন- ইন্না লিল্লাহ পড়ার অর্থধ কি আব্বা? হযরত ইমাম বলিলেন, বৎস, এখন একটু তন্দ্রাগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম। স্বপ্নে দেখি, একজন আশ্বারোহী ছুটিয়া আসিতেছেন এবং বলিতেচেন,- “লোক স্মুখে অগ্রসর হইতেছে আর মৃত্যু তাহাদের সঙ্গে চলিয়াছে।” আমি বুঝিতে পারিয়অছি, এতদ্বারা আমাদের মৃত্যু সংবাদই শোনা হইয়াছে।
আলী আকবর বলিলেন, আল্লাহ আপনাকে এমন মন্দ দিন না দেখান। আমরা কি সত্য পথে নই? হযরত ইমাম বলিলেন, নিশ্চয় আমরা সত্য পথে রহিয়াছি। এই কথা শুনিয়অ তিনি চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলিন, “যদি আমরা সত্য পথিই থাকি তবে মৃত্যুর আর কোন পরোয়া নাই।” হযরত ইমামের এই পুত্রই কারবালার ময়দানে শহীদ হইয়াছিলেন। -(ইবনে জরীর)।
ইবনে যিয়াদের পত্র
প্রত্যূষে হযরত ইমাম পুনরায় যাত্রা শুরু করিলেন। এইবার তিনি সঙ্গী সাথীগণকে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত করিয়া দিতে চেষ্টা করিলেন, কিন্তু হোর উহাতে বাধা দান করিতে লাগিল। ইতিমধ্যে কুফার দিক হইতে জনৈক অশ্বারোহীকে ছুটিয়া আসিতে দেখা গেল। লোকটি অস্ত্রে সুসুজ্জিত ছিল। আগন্তুক হযরত হোসাইনের তরফ হইতে মুফ ফিরাইয়া নিল এবং হোরকে সালাম দিল। সে হোরের সম্মুখে ইবনে যিয়াদের পত্র পেশ করিল। পত্রে লেখা ছিল, “হোসাইনকে কোথাও টিকিতে দিও না। খোলা ময়দান ব্যতীত কোথাও যেন তিনি বিশ্রাম করিতে না পারেন। আমার এই কাসেদই তোমার কার্য পরীক্ষা করার জন্য শেষ পর্যন্ত তোমার সঙ্গে থাকিবে।”
হোর পত্রের মর্ম সম্পর্কে হযরত ইমামকে জ্ঞাক করাইয়অ বলিল, “এখন আমি নিরুপায়। তৃণ-গুল্মহীন প্রান্তর ব্যতীত এখন আর কোথাও আপনাকে শিবির স্থাপন করিতে দিতে পারি না।” যোবায়ের ইবনে কাইয়ের নিবেদন করিলেন, পরে যে বিরাট বাহিনী আসিতেছে তাহাদের চাইতে এখন আমাদের সহিত যাহারা চলিয়াছে, উহাদের সহিত যুদ্ধ করা সহজ, কিন্তু হযরত ইমাম যুদ্ধ করিতে অস্বীকার করিলেন। তিনি বলিলেন, “আমি আমার পক্ষ হইতে যুদ্ধ করিতে চাহি না।” যোবায়র বলিলেন, “তবে সম্মুখের ফোরাত তীরবর্তী ঐ লোকালয়ে চলুন। তথায় আমরা শিবির স্থাপন করিয়া অবস্থান করিতে থাকিব।” হযরত ইমাম জিজ্ঞাসা করিলেন, এই স্তানের নাম কি? যোবায়র বলিলেন , ‘আকর’ (আক্‌র অর্থ কন্টকাকীর্ণ বা ফলহীন)। এই কথা শুনিয়া হযরত ইমাম ম্লান মুখে বলিলেন- “আক্‌র হইতে আল্লাহর পানাহ চাই।”- (ইবনে জরীর)
কারবালা প্রান্তরে
শেষ পর্যন্ত হযরত ইমাম তৃষ-গুল্মহীন এক শুষ্ক প্রান্তরের মধ্যে ছিল পার্বত্য এলাকা। স্থানটির নাম জিজ্ঞাসা করিয়া জানা গেল, ‘কারবালা’। হযরত ইমাম বলিলেন, কারব (যাতনা) ও বালা (বিপদ)। ইহা হিজরী ৬১ সনের ২রা মহররমের ঘটনা। -(আল-ইমামাতু ওয়াস সিয়াসাতু)
দ্বিতীয় দিন আমর ইবনে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস চারি হাজার কুফাবাসী সৈন্য লইয়া আসিয়া পৌঁছিলেন। আমর এই অভিযানে আসিতে চাহিয়াছিলেন না। একাধিকবার তিনি এই মাহাপরীক্ষা হইতে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ তাঁহাকে জোর করিয়া প্রেরণ করিয়াছিল।
আমর ইবনে সাদ কারবালায় পৌঁছিয়া কাসেদ প্রেরণ করিয়া হযরত ইমামকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি এখানে কেন আগমন করিয়াছেন? হযরত ইমাম হোর ইবনে ইয়াযিদের নিকট যে জওয়াব দিয়াছিলেন, পুনরায় সেই জওয়াবই দিলেন। তিনি বলিলেন, “অগণিত পত্র ও কাসেদ মারফত তোমরা আমাকে আহবান করিয়াছ। এখন আমার আগমন তোমাদের পছন্দ না হইয়া থাকে, তবে আমি ফিরিয়া যাইতে প্রস্তুত আছি।”
হযরত ইমামের উত্তর শুনিয়অ আমর ইবনে সাদ সন্তুষ্ট হইলেন। তিনি মনে করিলেন, হয়ত সহজেই এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারিবেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি পত্র লিখিয়া ইবনে যিয়াদকে এই কথা জানাইয়া দিলেন। পত্র পাঠ করিয়া ইবনে যিয়াদ বলিতে লাগিল, “এখন হোসাইনকে বল, সর্বপ্রথম যেন তিনি সপরিবারে ইয়াযিদ ইবনে মোয়াবিয়ার হাতে আনুগত্যের শপথ করেন। অতঃপর আমরা তাঁহার সম্পর্কে ভাবিয়া দেখিতে পারি।” হোসাইনের শিবিরে যেন এক ফোঁটা পানি পৌঁছাইতে না পারে। যেরূপ হযরত ওসমান পানি হইতে বঞ্চিত ছিলেন।
নিরুপায় হইয়া আমর ইবনে সাদ পানির ঘাটে পাঁচশত সৈন্য মোতায়েন করিলেন্ হযরত ইমামের শিবিরে পানি বন্ধ হইয়া গেল। হযরত ইমাম স্বীয় ভ্রাতা হযরত আব্বাস ইবনে আলীকে ত্রিশ জন অশ্বারোহী ও বিশ জন পদাতিকসহ পানি আনিতে নির্দেশ দিলেন। হযরত আব্বাস পানির ঘাটে পৌঁছিলেন প্রতিরোধকারী বাহিনীর সেনাপতি আমর ইবনে হাজ্জাজের সহিত সংঘর্ষ হইল,কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ মশক পানি সংগ্রহ করিতে সমর্থ হইলেন।
আমর ইবনে সাদের সহিত সাক্ষাত
সন্ধার সময় হযরত ইমাম হোসাইন (রা) আমর ইবনে সাদের সহিত সাক্ষাত করিতে বলিয়া পাঠাইলেন। দুই পক্ষের বিশ জন করিয়অ অশ্বারোহীসহ মধ্যবর্তী এক স্থানে রাত্রিবেলা মিলিত হইলেন। দীর্ঘক্ষণ উভয়ের মধ্যে গোপনে আলোচনা চলিল। আলোচনা সম্পূর্ণ গোপন ছিল, কিন্তু লোকদের মধ্যে প্রচার ইয়া গেল, হযরত ইমাম সাদকে বলিয়াছিলেন, চল আমরা উভয়ে স্ব-স্ব সৈন্যদল ত্যাগ করিয়া ইয়াযিদের নিকট চলিয়া যাই। এই কতার প্রত্যুত্তরে আমর ইবনে সাদ বলিয়াছিলেন, যদি আমি এরূপ করি তবে আমার গৃহ খনন করিয়া ফেলা হইবে।
হযরত ইমাম বলিয়াছিলেন, তোমার ধ্বংস করা গৃহ আমি মেরামত করিয়া দিব। আমর বলিয়াছিলেন, আমার সর্বস্ব বাজেয়াপ্ত করিয়া লওয়া হইবে। হযরত ইমাম বলিয়াছিলেন, আমি আমার হেজাযের সম্পত্তি দ্বারা তোমার সকল ক্ষতিপূর্ণ করিয়অ দিব, কিন্তু আমর এই প্রস্তাবে সম্মত হন নাই। -(ইবনে জারীর)
অতঃপর আরও তিন-চারি বার উভয়ের মধ্যে সাক্ষাত হয়। হযরত ইমাম সর্বশেষে তিনটি প্রস্তাব পেশ করিলেন-
১. আমাকে সেখানে ফিরিয়া যাইতে দাও, যেখান হইতে আমি আসিয়াছি।
২. স্বয়ং ইয়াযিদের সহিত আমাকে বোঝাপড়া করিতে দাও।
৩. অথবা আমাকে মুসলমানদের কোন লোকালয়ে পাঠাইয়অ দাও। সেখানকার লোকদের যে পরিণাম হয় আমারও তাহাই হইবে।
আমরের পত্র
কয়েকবার সাক্ষাতের পর আমর ইবনে সাদ ইবনে যিয়াদের নিকট পুনরায় পত্র লিখিলেনঃ খোদা গোলমাল ঠাণ্ডা করিয়া দিয়াছেন! পরস্পরের অনৈক্য দূর করিয়অ ঐক্য প্রতিষ্ঠা করিয়া দিয়াছেন। জাতির এই সমস্যা সহজ হইয়া আসিয়াছে। হোসাইন আমার সহিত তিন শর্তের যে কোন একটি মানিতে সম্মত হইয়াছেন। এর মধ্যে তোমার জন্যও মঙ্গল।
ইবনে যিয়াদ এই পত্র পাঠ করিয়া অনেকটা প্রভাবান্বিত হইয়া আমর ইবনে সাদের প্রশংসা করিতে লাগিল এবং বলিতে লাগিল, আমি এই প্রস্তাব মঞ্জুর করিতেছি, কিন্তু শিমার যিল জোশান এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করিয়া বলিতে লাগিল, “হোসাইন সম্পূর্ণরূপে আমাদের হাতে আসিয়া পৌঁছিয়াছেন। এমতাবস্থায় যদি তিনি আমাদেরা পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার না করিয়া ফিরিয়া যান, তবে আশ্চর্য নয় যে, পুনরায় তিনি শক্তি সঞ্চয় করিয়া আমাদের শক্তি নিঃশেষ করিয়া দেওয়ার প্রায়াস পাইবেন। এখন যে পর্যন্ত তিনি পূর্ণভাবে আমাদের আনুগত্য স্বীকার না করেন, সেই পর্যন্ত তাঁহাকে ছাড়িয়া দেওয়া যুক্তিযুক্ত হইবে না। আমি জানিতে পারিয়াছি, আমর এবং হোসাইন রাত ভরিয়অ পরস্পর আলোচনা করিয়া থাকেন।”
ইবনে যিয়াদের উত্তর
ইবনে যিয়াদ শিমারের যুক্তিই শেষ পর্যন্ত মানিয়া লইল এবং শিমারকেই পত্রের জওয়াবসহ প্রেরণ করিল। পত্রের মর্ম ছিল নিম্নরূপঃ “হোসাইন যদি সপরিবারে নিজেকে আমাদের নিকট সমর্পন করেন, তবে যুদ্ধ করিও না। তাঁহাকে ছহি-ছালামতে আমার নিকট পাঠাইয়া দিও। যদি তিনি আত্মসমর্পণ না করেন তবে যুদ্ধ ব্যতীত গত্যন্তরন নাই।” শিমারকে মৌখিক নির্দেশ দিয়াছিলেন, “আমর ইবনে সাদ যদি আমার নির্দেশ ঠিকমত পালন না করেন, তবে তাহাকে সরাইয়া নিজেই সৈন্যবানিহীর দায়িত্ব গ্রহণ করিও এবং হোসাইনের মাথা কাটিয়া আমার নিকট লইয়া আসিও।”
ইবনে যিয়াদের পত্রে আমর ইবনে সাদকে বিশেষভাবে শাসাইয়া দেওয়া হইল। তাহার পত্রে লিখা ছিল, “আমি তোমাকে এই জন্য প্রেরণ করি নাই যে, হোসাইনকে রক্ষা কর এবং আমার নিকট তাহার জন্য সুপারিশপত্র প্রেরণ কর। দেখ! আমার নির্দেশ পরিষ্কার। যদি তিনি আত্মসমর্পণ করেন তবে নিরাপদে আমার নিকট প্রেরণ কর। আর যদি অস্বীকার করেন তবে বিনা দ্বিধায় আক্রমণ কর, রক্ত প্রবাহিত কর। দেহ টুকরা টুকরা করিয়া ফেল। কেননা, তিনি ইহারই যোগ্য। মৃত্যুর পর তাহার মৃত দেহ অশ্বের খুরে পিষ্ট করিয়া মাটির সহিত মিশাইয়া ফেল। কেননা, তিনি বিদ্রোহী, আমাদের দলত্যাগী। আমি শপথ করিয়াছি তাহাকে অবশ্যিই হত্যা করিব। যদি তুমি আমার এই নির্দেশ পালন কর তবে পুরস্কারের ভাগী হইবে। আর যদি অমান্য কর, তবে নিহত হইবে।
শিমার বিন যিল জোশান ও হযরত হোসাইন (রা)
শিমার ইবনে যিল জোশান সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য যে, তাহার ফুফী উম্মুল বানীন বিন্‌তে খুররাম হযরত আলীল অন্যতমা পত্নী ছিলেন। ইহার গর্ভেই হযরত ইমাম হোসাইনের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা আব্বাস, আবদুল্লাহ, জাফর ও ওসমান জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইহারা সকলেই হযরত হোসাইনের সহিত সহিত যুদ্ধে শামিল ছিলেন। এ সম্পর্কে শিমার এই চারি ভ্রাতার এবং তাঁহার সম্পর্কে খোদ হযরত হোসাইনের সহিত যুদ্ধে শামিল ছিলেন। এ সম্পর্কে শিমার এই চারি ভ্রাতার এবং তাঁহার সম্পর্কে খোদ হযরত হোসাইনের ফুফাতো ভাই হইত। কুফা হইতে যাত্রার সময় শিমার ইবনে যিয়াদের নিকট আবেদন করিয়াছিল যেন তাহার আত্মীয় চতুষ্টয়কে নিরাপত্তা দেওয়া হয়। ইবনে যিয়াদ শিমারের প্রার্থনা মঞ্জুর করিয়াছিল। কারবালঅয় পৌঁছিয়া শিমার উক্ত চারি জনকে ডাকিয়া তাঁহাদের নিরাপত্তার কথা শুনাইয়া দিল। শুনিয়া তাহারা বলিতে লাগিলেন, আক্ষেপের বিষয়, তুমি আমাদের জন্য নিরাপত্তর ব্যবস্থা করিয়াছ, অতচ রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের মহামান্য বংশধরের জন্য নিরাপত্তা নাই।”
শিমার আমর ইবনে সাদকে ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের পত্র পৌঁছাইয়া দিল। তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রাণভয়ে ইবনে যিয়াদের নির্দেশ পালন করিতে শুরু করিলেন।
সৈন্য পরিচালনা শুরু
আসর নামাযের পর আমর ইবনে সাদ সৈন্যদিগকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। সৈন্যদল নিকটবর্তী হেইলে ইমাম শিবির হযরত আব্বাস বিশ জন আশ্বারোহীসহ অগ্রসর হইলেন। আমর ইবনে সাদ অগ্রসর হইয়া বলিলেন, ইবনে যিয়অদের পত্র আসিয়া পৌঁছিয়াছে- পত্রের বিবরণ এইরূপ। হযরত আব্বাস হযরত ইমামকে খবর দেওয়ার জন্য শিবিরের দিকে ফিরিয়া আসিলেন। ইতিমধ্যে উভয়পক্ষের উৎসাহী ব্যক্তিদের মধ্যে মৌখিক বচসা শুরু হইয়া গেল। বর্ণনাকারীগণ এই সমস্ত লিপিবদ্ধ করিয়াছেন।
হযরত ইমামের পক্ষ হইতে হাবীব ইবনে নাজ্জার বলিলেন, “আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম লোক হইবে তাহারা, যাহারা হযরত রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আওলাদ ও কুফার তাহাজ্জুদ-গোজার লোকদের হাত রঞ্জিত করিয়া তাঁহার নিকট উপস্থিত হইবে।”
ইবনে সাদের শিবির হইতে ওরওয়া ইবনে কায়স উত্তর দিল, শাবাশ, নিজেদের মহিমাকীর্তন করিতে থাক। মুখ ভরিয়অ নিজেদের পবিত্রতার কথা ঘোষণা কর। যুহাইর ইবনে কাইয়েন বলিলেন, “হে ওরওয়া, স্বয়ং খোদা এই মানুষগুলিকে পবিত্র করিয়া দিয়াছেন এবং হেদায়েতের সরল পথ প্রদর্শন করিয়াছেন। খোদাকে ভয় কর এবং এই পবিত্র লোকগুলির হত্যার পথে ভ্রান্ত দলের সাহায্যকারী হইও না।” ওরওয়া বলিতে লাগিল, “হে যোহায়ল, তুমি তো এই পরিবারের সমর্থক ছিলে না। ইতিপূর্বে তুমি কি ওসমানপন্থী ছিলে না?” যোহায়ল বলিলেন, “হ্যা, এই কথা সত্য, হোসাইনকে কখনও কোন পত্র লিখি নাই বা কোন কাসেদ তাঁহার নিকট প্রেরণ করি নাই। তবে ভ্রমণ করার সময় তাঁহার সহিত আমার সাক্ষাত হইয়া গিয়াছে। আমি তাঁহাকে দেখামাত্র রসূলুল্লাহ (সা)-এর কথা এবং তাঁহার প্রতি আল্লাহর রসূল সকাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের ভালবাসার কথা স্মরণ হইয়া গিয়াছে। আমি উপলব্ধি করিতে পারিলাম, তাঁহারা কত শক্তিশালী শত্রুর সম্মুখে গমন করিতেছেন। খোদা আমার অন্তরে তাঁহার প্রতি ভালবাসা জন্মাইয়া দিলেন। আমি মনে মনে বলিতে লাগিলাম, আমি ইহার সহযোগিতা করিব এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের যে অধিকার তোমরা হরণ করিয়া বসিয়া আছ তাহা উদ্ধার করার চেষ্টা করিব।”
হযরত ইমাম ইবনে যিয়াদের পত্রের মর্ম শুনিতে পাইয়া বলিতে লাগিলেন, যদি সম্ভবপর হয়, তবে উহাদিগকে আজকের মত ফিরিয়া যাইতে বল- যেন আজকের মত প্রাণ ভরিয়া আল্লাহর এবাদত করিয়া লইতে পারি। তাঁহার দরবারে প্রার্থনা ও গোনাহের মাফী চাহিয়অ নিতে পারি। কেননা, তিনি জানেন, আমি তাঁহার এবাদত ভালবাসি। তাঁহার কিতাব ভক্তিভরে পাঠ করি। হযরত আব্বাস সৈন্যদলকে এই উত্তর শুনাইয়অ দিলেন। সৈন্যগণ সেই দিনের মত পিছাইয়া গেল।– (ইবনে জরীর, ইয়াকুবী)
সঙ্গী-সাথীদের দৃঢ়তা
শত্রু সৈন্যগণ চলিয়া যাওয়ার পর হযরত ইমাম রাত্রি বেলায় সঙ্গী-সাথীগণকে খুৎবা দিলেনঃ আল্লাহর প্রশংসাকীর্তন করিতেছি। সুখে-দুঃখে, বিপদে-সম্পদে সর্বাবস্থায়ই তাঁহার শুকরিয়অ আদায় করি। ইলাহী, তোমার শোকর, তুমি আমাদের ঘরকে নবুওয়তের আলো দ্বারা সম্মানিত করিয়াছ। কোরআনের প্রজ্ঞা দান করিয়াছ। ধর্ম হৃদয়ঙ্গম করার ক্ষমতা দিয়াছ এবং আমাদিগকে দর্শন, শ্রবণ ও শিক্ষা গ্রহণ করার যোগ্যতা দান করিয়াছ। অতঃপর ভাইসব, আজকে ভূপৃষ্ঠে আমার সঙ্গী-সাথীদের চাইতে ভাল লোক আরও আছে কিনা তাহা আমার জানা নাই। আমার পরিবার-পরিজনের চাইতে অধিক সমবেদনাশীল পরিবার-পরিজনও আজকের দুনিয়ায় আর কাহারও আছে কিনা সেই কথাও আমি জানি না। ভাইসব, তোমাদের সকলকে আল্লাহ আমার পক্ষ হইতে যোগ্য পরিণামফল দান করুন। আমার মনে হয় আগামীকল্যই আমার ও উহাদের মধ্যে শেষ ফয়সালা হইয়া যাইবে। অনেক চিন্তা-ভাবনার পর আমার অভিমত এই যে, তোমরা সকলেই রাত্রের অন্ধকারে ‍চুপি চুপি বাহির হইয়া যাও। আমার পরিবার-পরিজনের হাত ধরিয়া যে যে দিকে পার নিরাপদে স্থানে চলিয়া যাও। আমি সন্তুষ্টিচিত্তে তোমাদিগকে বিদায় দিতেছি। আমার পক্ষ হইতে আর কোনই অভিযোগ থাকিবে না। উহারা কেবল আমকেই চায়, আমর জীবন লইয়া উহারা তোমাদের কথা ভুলিয়া যাইবে।
এই কথা শুনিয়অ হযরত ইমামের পরিবার নিতান্ত অধীর হইয়অ উঠিলেন। হযরত আব্বাস বলিতে লাগিলেন- “কেন? আপনার পরও আমাদের জীবিত থাকার লোভে? আল্লাহ যেন আমাদিগকে সেই দুর্দিন না দেখান।”
হযরত ইমাম ইবনে আকীলের আত্মীয়-স্বজনকে বলিলেন, “হে আকীলের আত্মীয় স্বজন, মুসলিম ইবনে আকীলের হত্যাই যথেষ্ট হইয়াছে, তোমরা চলিয়া যাও। আমি হৃষ্টচিত্তে তোমাদিগকে দিতেছি।”
তাঁহারা বলিতে লাগিল, জনসাধারণ কি বলিবে; এই কথাই বলিবে নাকি যে, উহারা তাহাদের নেতা এবং পর্যন্ত নিক্ষেপ করি নাই, বর্শা বা তরবারি পর্যন্ত চালাই নাই। না না, আল্লাহর শপথ, এইরূপ হইবে না। আমরা আপনার জন্য জান-মাল, পরিবার-পরিজন সবকিছুই কোরবান করিয়অ দিব। আপনার সঙ্গে থাকিয়া যুদ্ধ করিব, আপনার যে পরিণাম দাঁড়ায় আমাদেরও তাহা হইবে। আপনার পর যেন খোদা আমাদিগকে আর জীবিত না রাখেন।
হযরত ইমামের অন্যান্য সঙ্গী-সাথীগণও উঠিয়া দাঁড়ালেন। মুসলিম ইবনে আওসাজা আসাদী বলিলেন, “আমরা আপনাকে ছাড়িয়া যাইব? অথচ আপনার প্রতি আমাদের কর্তব্য এখনও সমাপ্ত হয় নাই। আল্লাহর শপথ, কিছুতেই নহে। আমি আমার বর্শা শত্রুদের বক্ষে ভাঙ্গিব। হস্তদ্বয় যে পর্যন্ত কবজির সহিত থাকে সেই পর্যন্ত তরবারি চালনা করিব। হাত খালি হইয়া গেলে প্রস্তর নিক্ষেপ করিতে করিতে মৃত্যুর কোলে লুটাইয়া পড়িব।”
সাদ ইবনে আবদুল্লাহ আল-হানাফী বলিলেনম, “যে পর্যন্ত খোদার নিকট এই কথা প্রমাণিতহ না হয় যে, আমরা খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আমানত পূর্ণভাবে রক্ষা করিতে পারিয়অছি; সেই পর্যন্ত আমরা আপনাকে ত্যাগ করিতে পারি না। আল্লাহর শপথ, এই কথা যদি জানিতে পাই যে, আমাকে হত্যা করিয়অ জ্বালাইয়া দেওয়া হইবে, আমার দেহের প্রজ্বলিত ছাই ভষ্ম বাতাসে উড়ানো হইবে, একবার নায়, সত্তর বার আমার উপর এই পৈশাচিক অত্যাচার করা হইবে, তথাপি আপনার সঙ্গ ত্যাগ করিব না।”
যোহায়র ইবনে কাইয়েন বলিলেন, আল্লাহর শপথ, আমাকে যদি সহস্রবারও করাত দ্বারা কর্তন করা হয়, তথাপি আপনার সহচর্য ত্যাগ করিব না। আমার জীবন দিয়াও যদি আপনার এই পবিত্র খান্দানের একটি শিশুও বাঁচিয়া থাকে, তবুও উহা আমর জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয় হইবে।– (ইবনে জরীরন, কামেল ইত্যাদি)
হযরত যয়নবের অস্থিরতা
হযরত যয়নুল আবেদীন হইতে বর্ণিত আছে, আমার পিতার শাহাদাতের পূর্বরাত্রে আমি বসিয়া ছিলাম। আমার ফুফী হযরত যয়নব আমার নিকটেই বসিয়া ছিলেন। তখন হঠাৎ করিয়া পিতা আমাদের তাঁবুতেই সকল সঙ্গী-সাথীগণকে সমবেত করিলেন। তাবুতে হযরত আবু জর গেফারীর গোলাম হোধবী তরবারি ধার দিতেছিলেন, আর আমার পিতা কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন- (আরবী*****)
-“হে যমানা, আক্ষেপ তোর জন্য! তুই কত বড় পরম বন্ধু। সকাল-সন্ধা তোর হাতে কত ধ্বংস হইতেছে। যমানা কাহাকেও খাতির করে না, কাহারও নিকট হইতে কোন প্রকার প্রতিদানও গ্রহণ করে না। আমার সকল সমাধান আল্লাহর হাতে। প্রত্যেক জীবিত বস্তুই তো মৃত্যুর দিকে ধাবিত হইতেছে।”
পিতা তিন বারিবার এই কবিতাটি আবৃত্তি করিলেন। আমার অন্তর কাঁপিয়া উঠিল; চক্ষু অশ্রুভারাক্রান্ত হইয়া উঠিল, কিন্তু অতিকষ্টে আমি অশ্রু সংবরণ করিলাম। বুঝিতে পারিলাম, বিপদ কিছুতেই দূর হইতেছে না। আমার ফুফী এই কবিতা শ্রবণ করিয়া অধীর হইয়া ছুটিয়া আসিলেন এবং ক্রন্দন ও বিলাপ করিতে লাগিলেন। এই অবস্থা দেখিয়া হযরত ইমাম বলিতে লাগিলেন, ভগ্নী! এ কি শুরু করিলে! শেষ পর্যন্ত এরূপ না হয় যে, প্রবৃত্তি আর শয়তানের অধৈর্য আমাদের উপর জয়যুক্ত হইয়া যাইবে।” ফুফী বলিলেন, “যেখানে আপনি নিজ হস্তে নিহত হইতে যাইতেছেন, সেখানে কিরূপে ধৈর্য ধরা যায়।” হযরত ইমাম বলিলেন, “খোদার মীমাংসা এইরূপ।” এই কথা শুনিয়া তাঁহার অধীরতা আরও বর্ধিত হইল। দুঃখে শোকে তিনি একেবারে কাতর হইয়া পড়িলেন।
এই অবস্থা দেখিয়া হ৮যরত ইমাম ধৈর্য ও দৃঢ়তা সম্পর্কে দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। ভগ্নীকে সম্বোধন করিয়অ বলিলেন, “ভগ্নী, খোদাকে ভয় কর। খোদার মহান শক্তি দেখিয়া সান্ত্বনা গ্রহণ কর। দুনিয়ার প্রত্যেক জীবের জন্য মৃত্যুকে রহিয়অছে। আকাশের ফেরেশতারাও চিরকাল বাঁচিয়া থাকিবে না। প্রত্যেক বস্তুরই ধ্বংস হইবে। তারপরও মৃত্যুর কথা ভাবিয়া এমন দুঃখ ও অধীরতা কেন? দেখ, আমাপদের এবং প্রত্যেক মুসলমানের জন্য রসূলে খোদা জীবন সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ! তাঁহার জীবন হইতে আমরা সর্বাবস্থায় ধৈর্য, দৃঢ়তা এবং খোদার বিধানের উপর ভরসা রাখারই শিক্ষা পাই। কোন অবস্থাই আমাদের এই পথ পরিত্যাগ করা উচিত নহে।”
এবাদতের রাত্রি
হযরত ইমাম শিবিরের সকলকে লইয়া এ রাত্রিটি নামায, দোয়া ও রোনাজারি করিয়া কাটাইয়া দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, শত্রুসৈন্যরা সারা রাত্রি আমাদের শিবিরের চারিদিকে চক্রাকারে ঘুরিয়া বেড়াইয়াছে। হযরত হোসাইন (রা) তখন উচ্চঃস্বরে কোরআনের আয়াত পড়িতেছিলেন, আয়াতের অর্থ হল- “শত্রুরা মনে করে, আমাদের একটু বিরাম তাহাদের পাপের বোঝা আরও বর্ধিত হয়। আল্লাহ মুমিনদিগকে এরূপ অসহায় অবস্থায় ফেলিয়া রাখিবেন না। তিনি পবিত্রকে অপবিত্র হইতে পৃথক করিয়অ দিবেন।”
শত্রুদের জনৈক অশ্বারোহী সৈন্য এই আয়াত শ্রবণ করতঃ চিৎকার করিয়া বলিতে লাগিলঃ “কাবার প্রভুর শপথ, আমরাই পবিত্র, তোমাদের নিকট হইতে আমাদিগকে পৃথক করিয়া নেওয়া হইয়াছে।”
শিমারের ধৃষ্টতা
শত্রুসৈন্যদের মধ্য হইতে শিমার যিল জোশান অশ্বারোহণ করিয়া বাহির হইল। ইমাম বাহিনীর চারিদিকে প্রদক্ষিণ করিয়া আসিয়া বলিতে লাগিল, “হে হোসাইন, কেয়ামতের পূর্বেই তুমি আগুন জ্বালাইয়া ফেলিয়াছ!” হযরত ইমাম জবাব দিলেন, “হে রাখাল সন্তান, তুইই আগুনের বেশী যোগ্য!” মুসলিম ইবনে আওসাজা নিবেদন করিলেন, আমাকে অনুমতি দিন, তীর নিক্ষেপ করিয়া পাপিষ্ঠকে শেষ করিয়া দেই। হতভাগ্য বড় কায়দায় আসিয়াছে। হযরত ইমাম নিষেধ করিয়া বলিলেন, “না না, আমি প্রথম যুদ্ধ করিতে চাহি না।” –(ইবনে জরীর)
আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ
শত্রুবহিনীকে অগ্রসর হইতে দেখিয়া হযরত ইমাম হাত তুলিয়া আল্লাহর দরবারে দোয়া করিতে লাগিলেন, “ইলাহী, সব বিপদে তোমার ইপরউ ভরসা। যে কোন সংকটে তুমিই আমার পৃষ্ঠপোষক। কত কঠোর বিপদ আসিয়াছে, অন্তর দুর্বল হইয়া আসিয়অছে, ভাবনা শক্তি স্থবির হইয়া গিয়াছে, বন্ধুরা বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে, শত্রুরা আনন্দের জয়ধ্বনিতে মত্ত হইয়াছে, কিন্তু আমি সর্বাবস্থায় কেবল তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করিয়াছি, তুমি সব সময় আমার প্রতি সাহায্যের হাত প্রশস্ত করিয়াছ। তুমিই সর্বকল্যাণের অধিকারী, তুমিই দয়ার একমাত্র মালিক। আজরেক ‍দিনেও তোমারই অনুগ্রহ ভিক্ষা করিতেছি।” –(শরহে নাহজুল বালাগাহ)
শত্রুর সম্মুখে বক্তৃতা
শত্রুবাহিনী একেবারে নিকটবর্তী হইলে পর হযরত ইমাম একটি উষ্ট্রীর উপর দাঁড়াইয়া কোরআন সম্মুখে রাখিয়া বক্তৃতা দিতে শুরু করিলেন, “লোকসকল, আমার কথা শোন, তাড়াহুড়া করিও না। আমাকে কিছু বলিতে দাও। আমার কৈফিয়ত গ্রহণযোগ্য হয়, তোমরা যদি উহা গ্রহণ করিয়া আমার শত্রুতা হইতে বিরত হও, তবে উহা তোমাদের পক্ষে সৌভাগ্যের বিষয় হইবে। আর যদি আমার কৈফিয়ত যোগ্য বলিয়া গ্রহণ করিত না পার বা ন্যায়বিচার করিতে না চাও, তবে আমার আর কোন আপত্তি থাকিবে না। তোমরাপ সকলে মিলিয়া তখন আমার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িও। আমাকে সামান্য সময় না দিয়াই সকলে আক্রমণ করিও। আমি সর্বাবস্থায়ই কেবলমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা রাখি। তিনি সৎকর্মশীলদের পৃষ্ঠপোষক।”
হযরত ইমামের বক্তৃতা শুনিয়া আহলে বায়তসহ শিবিরের সকলে অস্থির হইয়া উঠিলেন।…. তাঁবুর ভিতর হইতে ক্রন্দনের আওয়াজ আসিতে শুরু করিল। হযরত ইমাম স্বীয় ভ্রাতা হযরত আব্বাস ও পুত্র আলীকে প্রেরণ করিয়া সকলকে শান্ত হওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং বলিলেন, এখনও তাহাদের অনেক ক্রন্দন বাকি রহিয়া গিয়াছে। অতঃপর তিনি চিৎকার করিয়া বলিতে লাগিলেন, “আল্লাহ ইবনে আব্বাসকে দীর্ঘজীবী করুন।” হযরত ইবনে আব্বাস শেষ পর্যন্ত পরিবার-পরিজনকে মদীনায় রাখিয়া আসিতে বলিয়াছিলেন। এই মুহূর্তে তাঁবুর ভিতর হইতে ক্রন্দনের আওয়াজ শুনিয়া হযরত ইবনে আব্বাসের কথা স্মরণ হইল। অতঃপর পুনরায় বক্তৃতা করিতে শুরু করিলেন, “লোক সকল, আমার বংশমর্যাদার কথা স্মরণ কর। ভাবিয়া দেখ আমি কে? এরপর আঁচলে মুখ লকাইয়া অন্তরকে জিজ্ঞাসা কর। ভাবিয়া দেখ, তোমাদের পক্ষে আমার মর্যাদার সম্পর্ক কর্তন করা, আমাকে হত্যা করা সমীচীন হইবে কি? আমি কি তোমাদের মহামান্য নবী- কন্যার পুত্র, তাঁর পিতৃব্য-পুত্রের সন্তান নই? সাইয়েদুশ-শোহাদা হযরত হামযা কি আমার পিতার পিতৃব্য ছিলেন না? হযরত জাফর তাইয়ার কি আমার পিতৃব্য নহেন? তোমরা কি আল্লাহর রসূলের প্রখ্যাত বাণী শোন আপই, আমার ও আমার ভ্রাতা সম্পর্কে যে তিনি বলিতেন, ‘জান্নাতের শ্রেষ্ঠ যুবক হইবনে হাসান ও হোসাইন।’ আমার এই ভাষণ যদি সত্য হয়, অবশ্যই ইহা সত্য কেননা আল্লাহর শপথ করিয়া বলিতে পারি, জ্ঞান হওয়ার পর হইতে এই পর্যন্ত আমি কখনও মিথ্যা কথা মুখে উচ্চারণ করি নাই।
বল, ইহার পরও কি নাঙ্গ তরবারি হাতে তোমাদের পক্ষে আমার সম্মুখীন হওয়া উচিত হইবে? যদি তোমরা আমার কথার উপর বিশ্বাস স্থাপন করিতে না পার, তবে তোমাদের মধ্য হইতে কাহারও নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া উহার সত্যাসত্য পরীক্ষা করিয়া লও। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ আনসারীকে জিজ্ঞাসা কর! আবু সায়ীদ খুদরীর নিকট জিজ্ঞাসা কর; সাহল ইবনে সাদ সায়েদীকে জিজ্ঞাসা কর, যায়েদ ইবনে আরকাম অথবা আনাস ইবনে মালেকের নিকট জানিয়া লও। তাঁহার বলিয়া দিবেন, ত৭াহার আমার এবং আমার সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সা)-কে এইরূপ বলিতে শুনিয়াছেন কিনা? এই কথাও কি আমার রক্ত প্রবাহ বন্ধ করিতে পারে না? আল্লাহর শপথ, এই মুহূর্তে ভূ-পৃষ্ঠে আমি ব্যতীত আর কোন নবী-দুহিতার পুত্র অবশিষ্ট নাই। আমি তোমাদের নবীর দৌহিত্র। তোমরা কি কাহারও হত্যার অপরাধে আমার জীবন নাশ করিতে চাও। আমার অপরাধ কি?”
কুফাবাসীদের উদ্দেশে
হযরত ইমাম জনতাকে বার বার জিজ্ঞাসার করিলেন, কন্তিু কেহ কোন প্রকার উত্তর দিল না, অতঃপর তিনি বিশিষ্ট কুফাবাসীদের এক একজনের নাম ধরিয়া ডাকিতে শুরু করিলেন, “হে আশআস ইবনে বারী, হে হেজাব ইবনে জাবেন, হে কায় ইবনে আশআস, হে ইয়াযিদ ইবনে হারেস, তোমরা কি আমাকে লিখ নাই, ফল পাকিয়া গিয়াছে, যমীন শস্যশ্যমল হইয়া উঠিয়াছে, নহর উপচাইয়া উঠিয়াছে, এমতাবস্থায় আপনি যদি কুফায় আগমন করেন তবে নিজের শক্তিশালী বাহিনীর নিকট আগমন করিবেন। শীঘ্র আসুন!
এই কথা শুনিয়া উহারা মুখ খুলিল, বলিতে লাগিল, কখনও নয়। আমরা কখনও আপনাকে এমন কথা লিখি নাই।
হযরত ইমাম চিৎকার করিয়া উঠিলেন, “সুবহানাল্লাহ, কত বড় মিথ্যা কথা। আল্লাহর শপথ, তোমরাই এই কথা লিখিয়াছিলে।”
অতঃপর তিনি আবার বলিতে লাগিলেন- “লোকসকল, তোমরা যখন আমাকে অপছন্দ করিতে শুরু করিয়াছ তখন আমাকে ছাড়িয়া দাও। আমি যেখান হইতে আসিয়াছিলাম সেখানে ফিরিয়া যাই।”
এই কথা শুনিয়া কায়স ইবনে আশআস বলিতে লাগিল, ইহা কি ভাল নয় যে, আপনি আপনার জ্ঞাকিদের নিকট আত্মসর্পন করুন; তাঁহারা আপনি যাহা কামনা করেন, আপনার সহিত তদ্রুপ ব্যবহারই করিবেন। তাঁহাদের পক্ষ হইতে আপনার কোন অপকার করা হইবে না।
হযরত ইমাম জবাব দিলেন, তোমরা সকলে একই থলির উপাদানবিশেষ। তোমরা কি চাও, বনী হাশেম তোমাদের নিকট মুসলিম ইবনে আকীল ব্যতীত আরও একটি খুনের প্রতিশোধ দাবী করুক।? কখনই নহে! আল্লাহর শপথ, আমি হীনভাবে নিজেকে উহাদের হাতে সমর্পণ করিতে পারি না।
কুফাবাসীদের প্রতি যোহায়রের আবেদন
যুহাইর ইবনে কাইয়েন অশ্ব ছুটাইয়া সম্মুখে অগ্রসর হইলেন এবং চিৎকার করিয়া বলিতে লাগিলেন, “কুফাবাসীগণ, আল্লাহর আযাবকে ভয় কর। প্রত্যেক মুসলমানের উপর তাহার ভাইয়ের প্রতি উপদেশ দেওয়ার অবশ্য কর্তব্য। দেখ, এখন পর্যন্ত আমরা সকলেই ভাই ভাই। সকলে একই ধর্ম এবং একই পথের উপর রহিয়াছি। যে পর্যন্ত তরবারি কোষমুক্ত না হয়, তোমরা আমাদের নসীহত ও হিতাকাঙ্ক্ষার অধিকারী রহিয়াছ, কিন্তু তরবারির সম্মুখে আসার পরই পরস্পরের এই ভ্রাতৃবন্ধন কাটিয়া যাইবে এবং আমরা পরস্পর পৃথক দুইটি দলে বিভক্ত হইয়া যাইব। দেখ, আল্লাহ তোমাদের এবং তোমাদের নবীর সন্তানদের মধ্যে এক অগ্নি পরীক্ষা গ্রহণ করিতেছেন। আমি তোমাদিগকে রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আহলে বায়াতের সহযোগতা এবং ভ্রান্ত ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য আহবান জানাইতেছি। বিশ্বাস কর, এই শাসকদের দ্বারা কখনও তোমাদের মঙ্গল সাধিত হইবে না। ইহারা তোমাদের চক্ষু অন্ধ করিয়া দিবে, হস্তপদ কাটিয়া ফেলিবে। তোমাদের চেহারা বিনষ্ট করিয়া দিবে, তোমাদগকে হাতে পায়ে বাঁধিয়া বৃক্ষশাখে ফাঁসিতে ঝুলাইবে। উহার সৎকর্মশীলদের একজন একজন করিয়া হত্যা করিয়া ফেলিবে। আদি, হানী ইবনে আমর প্রমুখের বেদনাময় ঘটনা এখনও তেমন পুরাতন হয় নাই যে, তোমরা তাহা ভুলিয়া গিয়াছ।”
কুফাবসীগণ এই বক্তৃতা শ্রবণ করিয়া যোহায়রকে গালি দিতে এবং ইবনে যিয়াদের প্রশংসাবাদ করিতে শুরু করিল। উহারা উদ্ধত কণ্ঠে জবাব দিল, “আল্লাহর শপথ! হোসাইনকে হত্যা অথবা আমাদের আমীরের নিকট বন্দী করিয়া না নেওয়া পর্যন্ত আমরা অন্য কথা চিন্তা করিব না।” যোহায়র উত্তর দিলেন, ভাল কথা! যদি ফাতেমা তনয় অপেক্ষা সুমাইয়ার পুত্র ইবনে যিয়াদ তোমাদের অনুগ্রহপ্রাপ্তির বেশী যোগ্য হইয়া থাকে, তবে অন্ততঃ রসূল-সন্তানের এতটুকু সম্মান রক্ষা কর, তাঁহাকে তোমরা হত্যা করিও না। তাঁহাকে এবং তাঁহার জ্ঞাতি ইয়াযিদ ইবনে মোয়াবিয়াকে পরস্পর বুঝাপড়া করিতে ছাড়িয়া দাও। যেন তাঁহার পরস্পর পরস্পরের সহিত মীমাংসা করিয়া লওয়ার সুযোগ পান। আমি শপথ করিয়া বলিতে পারি, ইয়াযিদকে খুশি করার জন্য হযরত হোসাইনের রক্ত প্রবাহিত করা মোটেও জরুরী নহে।” –(ইবনে জরীর)
হোর ইবনে ইয়াযিদের মত পরিবর্তন
আদী ইবনে হারমালা বর্ণনা করেন, ইবনে সাদ যখন সৈন্যবাহিনীকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন তখন হোর ইবনে ইয়াযিদ জিজ্ঞাসা করিলেন, “সেনাপতি, আপনি কি সত্যই হযরত হোসাইনের সঙ্গে যুদ্ধ করিবেন?” ইবনে সাদ উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ। এমন যুদ্ধ, যদ্বারা অন্ততঃ এতটুকু হইবে যে, মস্তক উড়িয়া যাইবে, হাত কাটিবে।”
হোর বলিলেন, “যে তিনটি শর্ত তিনি পেশ করিয়াছেন, তন্মধ্যে কোন একটাও কি গ্রহণযোগ্য নহে?”
ইবনে সাদ বলিলেন, “খোদার শপথ, আমার ক্ষমতা থাকিলে আমি অবশ্যই উহা মঞ্জুর করিতাম, কিন্তু কি করিব; তোমাদের শাসনকর্তা মঞ্জুর করেন না।” এই কথা শোনার পর হোর নিজ স্থানে ফিরিয়া আসিলেন। তাঁহার নিকট কোররা ইবনে কায়েস নামক স্বীয় গোত্রের এক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। হোর তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি ঘোড়াকে পানি পান করাইয়াছ? পরে কোররা বলিয়াছেন, হোরের এই প্রশ্ন শুনিয়াই আমি বুঝতে পারিয়াছিলাম, তিনি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করিতে চাহেন না, বরং আমাকে কোন প্রকারে বিদায় করিতে চান যেন আমি পরে তাঁহার বিরুদ্ধে কোন প্রকার অভিযোগ করিতে না পারি। সুতরাং “আমি ঘোড়াকে পানি পান করাই নাই, এখন আমি যাইতেছি; এই কথা বলিয়া অন্যদিকে চলিয়া গেলাম। আমি চলিয়া যাওয়ার পরই তিনি হযরত ইমাম হোসাইনের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতে শুরু করিলেন।”
তাঁহার স্বগোত্রীয় মোহাজের ইবনে আওস জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কি হোসাইনকে আক্রমণ করিতে চাও? এই কথা শুনিয়া হোর চুপ করিয়া গেলেন। মোহাজেরের সন্দেহ হইল। তিনি বলিতে লাগিলেন, তোমার মৌন ভাব সন্দেহজনক। আমি কোন যু্দ্ধেই তোমার এই অবস্থা দেখি নাই। যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কুফার সর্বশ্রেষ্ঠ বীরপুরুষ কে? তবে তোমার নাম ব্যতীত আামার মুখে অন্য কোন ব্যক্তির কথা আসিবে না, কিন্তু এই সময় তুমি এ কি শুরু করিলে?” হোর গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলেন, “খোদার শপথ, আমি বেহেশ্‌ত অথবা দোযখের পথ গ্রহণ করা সম্পর্কে ভাবিতেছিলাম। আল্লাহর শপথ, আমি বেহেশ্‌তই বাছাই করিয়াছি। তৎপর আমাকে টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিলেও আর ভাবনা নাই।” এই কথা বলিয়াই তিনি দ্রুত হযরত ইমামের সৈন্যবাহিনীতে যাইয়া মিশিয়া গেলেন। হযরত হোসাইনের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিতে লাগিলেন, হে মহামান্য রসূল-সন্তান, আমি হতভাগ্যিই আপনাকে ফিরিয়া যাইতে দেই নাই। সারা পথ আপনার পশ্চাতে থাকিয়া এই ভয়ানক স্থানে অবতরণ করিতে আপনাকে বাধ্য করিয়াছি। খোদার শপথ, আমার ধারণাও ছিল না, উহারা আপনার কোন শর্তই মঞ্জুর না করিয়া এই পর্যন্ত যাইয়া পৌছিবে। আল্লাহর শপথ, যদি এই কথা আমি জানিতে পারিতাম, তবে কখনও এই কাজ করিতাম না। আমি স্বীয় কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হইয়া আপনার নিকট তওবাহ করার জন্য উপস্থিত হইয়াছি। আপনার পদতলে উত্সর্গ হইয়া আমি স্বীয় পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবো; আপনার ধারণায় আমার তওবার পক্ষে কি উহা যথেষ্ট হইবে? হযরত ইমাম বলিলেন, খোদা তোমার তওবা কবুল করুন, তোমাকে ক্ষমা করুন, অতপর তোমার নাম কি? তিনি বিনীতভাবে বলিলেন, ‘হোর ইবনে ইয়াযিদ‘।
হযরত ইমাম বলিলেন, “হোর (স্বাধীন)? তোমার মাতা তোমাকে যেরূপ স্বাধীন নাম রাখিয়াছেন, তেমনি দুনিয়া ও আখেরাতে তুমি স্বাধীনই থাকিবে।”
কুফাবাসীদের প্রতি হোরের আবেদন
অতপর হোর শত্রুবাহিনীর সম্মুখে যাইয়া বলিতে লাগিলেন, লোকসকল, হোসাইনের পেশকৃত শর্তগুলির মধ্য হইতে যে কোন একটি মানিয়া নিয়া এই মহাপরীক্ষা হইতে কেন মুক্তি লাভ করিতেছ না?
লোকেরা জবাব দিল, আমাদের নেতা আমর ইবনে সাদ উপস্থিত আছেন, তিনিই উত্তর দিবেন। আমর বলিলেন, আমার আন্তরিক ইচ্ছা ছিল এইগুলি মঞ্জুর করার।
অতপর হোর কুফাবাসীকে লক্ষ্য করিয়া নিতান্ত উত্তেজনাময় বক্তৃতা দিলেন। কুফাবাসীদের বিশ্বাসঘাতকতার কথা উল্লেখ করিয়া সকলকে ধিক্কার দিলেন, কিন্তু কুফাবাসীগণ তদুত্তরে তীর বর্ষণ শুরু করিল। নিরুপায় হইয়া তিনি তাঁবুর দিকে ফিরিয়া আসিলেন।
যুদ্ধ শুরু
এই ঘটনার পর আমর ইবনে সাদ ধনুক উঠাইয়া ইমাম বাহিনীর প্রতি তীর নিক্ষেপ করতে বলিতে লাগিলেন, তোমরা সাক্ষী থাকিও; সর্বপ্রথম তীর আমি নিক্ষেপ করিয়াছি। অতপর ব্যাপকভাবে তীর বর্ষিত হইতে লাগিল। কিছুক্ষণ তীর বৃষ্টি হওয়ার পর যিয়াদ ইবনে আবিহে, আবদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের গোলাম ইয়াসার ও সালেম ময়দানে আসিয়া ইমাম বাহিনীকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করিল। প্রচীন যুদ্ধনীতিতে উভয়পক্ষের দুই একজন বাহির হইয়া মল্লযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার প্রচলন ছিল। ইমাম শিবির হইতে হাবীব ইবনে নাজ্জার এবং বারীর ইবনে হাজবীর বাহির হইতে চাইলেন, কিন্তু হযরত ইমাম তাহাদিগকে যাইতে নিষেধ করিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া কালবী দাঁড়াইয়া অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। প্রশস্ত বক্ষ, বলিষ্ঠদেহী এই লোকটি কুফা হইতে আসিয়া হযরত ইমামের মুষ্টিমেয় বাহিনীতে যোগ দান করিয়াছিলেন। হযরত ইমাম তাঁহার দিকে ভাল করিয়া দেখিলেন এবং বলিলেন, তুমি নি**সন্দেহে যোগ্য ব্যক্তি, তুমি যাইত পার। আবদুল্লাহ সামান্যতেই শত্রু শিবিরের উভয় মল্লযোদ্ধাকে হত্যা করিয়া ফেলিলেন। তাঁহার স্ত্রী শিবিরের সম্মুখে যষ্টিহস্তে দাঁড়াইয়া যুদ্ধে উত্সাহ দিতেছিলেন। স্বামীকে জয়যুক্ত হইতে দেখিয়া আনন্দাতিশয্যে ময়দানের দিকে ছুটিয়া চলিলেন। হযরত ইমাম এই বীর নারীকে বিরত করিয়া বলিলেন, আল্লাহ আহলে বায়তের তরফ হইতে তোমাকে ইহার প্রতিফল দার করুন; তবে স্ত্রীলোকদের জন্যে যুদ্ধের ময়দানে নহে।
মল্লযোদ্ধাদের নিপাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইবনে সাদের দক্ষিণ ভাগের রক্ষীদল ইমাম বাহিনীর উপর আক্রমন চালাইয়া দিল। ইমাম বাহিনী দৃঢ়হস্তে বর্শা ধারণা করিলেন। তাঁহাদের এই দৃঢ়তার সম্মুখে শত্রুবাহিনীর ঘোড়সওয়ার বাহিনী অগ্রসর হইতে পারিল না। নিরুপায় হইয়া ফিরিয়া যাইতে লাগিল। ইমাম বাহিনী এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করিলেন। শত্রুদের কয়েকটি লোক হতাহত হইল।
ব্যাপক আক্রমন
দেখিতে দেখিতে তুমুল যুদ্ধ বাধিয়া গেল। উভয়পক্ষ হইতে দুই একজন করিয়া বীর বাহির হইয়া আসিতে লাগিল এবং পরস্পরের মধ্যে অস্ত্রের বাহাদুরী দেখাতেই লাগিল, কিন্তু সৈন্যদের যে কেহই ইমাম বাহিনীর সম্মুখে আসিতেছিল, তরবারির আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হইয়া ভূ-শয্যায় লুটাইয়া পড়িতেছিল। এই অবস্থা দেখিয়া শত্রু বাহিনীর অন্যতম সেনাপতি আমর ইবনে হাজ্জাজ চিত্কার করিয়া বলিতে লাগিল, “মূর্খের দল, কাহাদের সহিত যুদ্ধ করিতেছ, বুঝিতেছ না? তাহারা জীবনের মায়া ত্যাগ করিয়া ময়দানে অবতীর্ণ হইয়াছে। বিক্ষিপ্তভাবে উহাদের সম্মুখে গেলে আর ফিরিয়া আসিতে পারিবে না। এইভাবে আর কেহ অগ্রসর হইও না। তাহারা মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রাণী, প্রস্তর নিক্ষেপ করিলেও মিসমার হইয়া যাইবে। এই যুক্তি আমর ইবনে সাদের মনপূত হইল। সে বিক্ষিপ্ত আক্রমন বন্ধ করিয়া ব্যাপকভাবে যুদ্ধ শুরু করার নির্দেশ দিল। চারদিকে হইতে শত্রুসৈন্যরা পঙ্গপালের ন্যায় ইমাম বাহিনীর উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল। কিছক্ষণ পর আক্রমণের তীব্রতা কিছুটা স্তিমিত হইয়া দেখা গেল, ইমাম বাহিনীর বিখ্যাত বীর মুসলিম ইবনে আওসাজা আহত হইয়া ভূমিতে গড়াগড়ি যাইতেছেন। তখনও তাঁহার শ্বাস অবশিষ্ট ছিল। হযরত ইমাম ছুটিয়া গিয়া লাশের নিকট পৌছিলেন। দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিতে লাগিলেন, মুসলিম, তোমার উপর খোদার রহমত হউক। তাহাদের কিছু আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছেন আর কিছু অপেক্ষা করিতেছেন। মুসলিমই ইমাম বাহিনীর তরফ হইতে প্রথম শহীদ
অতপর দ্বিতীয় আক্রমণ শুরু হইল শিমারের নেতৃত্বে। মাত্র বত্রিশ জন ঘোরসওয়ার ইমাম বাহিনীর পক্ষ হইতে প্রতিরোধ করিতে দাঁড়াইলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই শত্রুবাহিনী অনুভব করিল, এই তেজবীর্যের সম্মুখে টিকিয়া থাকা সম্ভব নয়। সঙ্গে সঙ্গে আরও পাঁচশত তীরন্দাজ আমদানী করল আক্রমণ তীব্রতর করা হইল। অল্পক্ষণের মধ্যেই চারদিকের তীরবৃষ্টির সম্মখে মুষ্টিমেয় ইমাম বাহিনীর ঘোড়াগুলি অচল হইয়া গেল। অশ্বারোহী সৈন্যগণ নিরুপায় হইয়া পাদাতিকরূপে ময়দানে অবতরণ করিতে বাধ্য হইলেন।
হোরের বীরত্ব
আইয়ুব ইবনে মাশরাহ বর্ণনা করেন, হোর ইবনে ইয়াযিদের ঘোড়া আমি স্বয়ং আহত করিয়াছিলাম। তীরের পর তীর বর্ষণ করিয়া ঘোড়াকে একেবারে অচল করিয়া দেওয়ার পর হোর মাটিতে লাফাইয়া পড়িলেন। তারবারি হস্তে হোরকে তখন ভীষণমূর্তি সিংহের ন্যায় দেখাইতেছিল। বিদ্যুত গতিতে তরবারি চালনা করিতে করিতে তিনি কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন, “তোমরা আমার অশ্ব বিনষ্ট করিয়া দিয়াছ, ইহাতে কি আসে যায়? আমি সম্ভ্রান্ত সন্তান, সিংহের চাইতে ভয়ানক।
তাঁবুতে অগ্নিসংযোগ
যুদ্ধ ভীষণ গতিতে চলিতেছিল। দ্বিপ্রহর গাড়াইয়া চলিতেছিল, কিন্তু শত্রুবাহিনী কিছুতেই জয়যুক্ত হইতে পারিতেছিল না। কেননা, ইমাম বাহিনী তাঁবু কেন্দ্র কারিয়া একস্থানে থাকিয়া যুদ্ধ চালাইতেছিলেন। এই অবস্থায় আমর ইবন সাদ ইমাম শিবিরে আক্রমন চালাইল, কিন্তু মাত্র কয়েকজন সৈন্য এই আক্রমন প্রতিরোধ করিয়া ফেলিলেন। এইবার শত্রুগণ তাঁবুতে অগ্নিসংযোগ করিয়া দিল। ইমাম বাহিনী অধির হইয়া উঠিলেন। হযরত ইমাম বলিতে লাগিলেন, তাবু জ্বালাইয়া দাও। ইহাতে আমরা আরও একত্রিত হইয়া প্রতিরোধ করিতে সুযোগ পাইব। পরিণামে হইলও তাহাই।
উম্মে ওয়াহাবের শাহাদাত
এই সময় যোবায়ের ইবনে কাইয়েম শিমারের উপর ভীষণ ভাবে আক্রমন চালাইয়া দিলেন। শত্রুবাহিনীর পদ শিথিল হইয়া আসিল, কিন্তু এই পর্বতপ্রমাণ শত্রুব্যূহের সম্মুখে মুষ্টিমেয় কয়েকটি মানুষ আর কতক্ষণ টিকিয়া থাকিবেন। সামান্য সময় অতিবাহিত হইতে না হইতেই শত্রু সৈন্যদের বিরাট একদল আসিয়া শূন্যস্থান পূর্ণ করিয়া ফেলিল। ততক্ষণে ইমাম বাহিনীর অনেকেই শাহাদাতের পেয়ালা পান করিয়া লইয়াছেন। কয়েকজন বিখ্যাত বীর চিরনিদ্রায় ঢালিয়া পড়িয়াছিলেন। কুফার বিখ্যাত বীর আবদুল্লাহ ইবনে উমায়র পর্যন্ত নিহত হইয়া গিয়াছিলেন। তাঁহার বীর পত্নী উম্মে ওয়াহাবও স্বামীর সঙ্গে শহীদ হইয়া গেলেন। তিনি ময়দানে বসিয়া আহত স্বামীর পরিচর্যা করিতেছিলেন এবং বলিতেছিলেন, তোমার জন্য জান্নাত মোবারক হউক। এই বীর মহিলাকে শিমার হত্যা করিয়া ফেলিল।
নামাযে বাধাদান
আবু তামামা আমর ইবনে আবদুল্লাহ ইমাম বাহিনীর অসহায় অবস্থা দর্শন করিয়া হযরত ইমামর নিকট নিবেদন করিলেন, “শত্রুরা একেবারেই নিকটবর্তী হইয়া গিয়াছে। আল্লাহর শপথ, যে পর্যন্ত আমার শরীরের রক্তবিন্দু অবশিষ্ট থাকিবে, আপনার কোন ক্ষতি হইতে দিব না। তবে আমার শেষ আরজু; নামায পড়ার পর প্রভুর দরবারে হাজির হইতে চাই।”
হযরত ইমাম বলিলেন, “শত্রুদের বল, আমাদিগকে নামাযের সময় দিক, কিন্তু শত্রুরা এই আবেদন মঞ্জুর না করিয়া যুদ্ধ চালাইয়া যাইতে লাগিল।”
হাবীব ও হোরের শাহাদাত
ইমাম বাহিনীর উপর চরম সংকট নামিয়া আসিতেছিল। শত্রুবাহিনী সর্বশক্তি নিয়োগ করিয়া মহা উল্লাসে অগ্রসর হইয়া আসিতেছিল। দেখিতে দেখিতে ইমাম বাহিনীর অন্যতম সেনাপতি হাবীব ইবনে হাজ্জারও নিহত হইলেন, হাবীবের পরই মহাবীর হোর কবিতা আবৃত্তি করিতে করিতে শত্রুব্যূহে প্রবেশ করিলেন, আর ফিরিয়া আসিলেন না।
যোহায়রের পতন
দেখিতে দেখিতে যোহরের সময় শেষ হইয়া আসিল। হযরত ইমাম মুষ্টিমেয় সঙ্গী-সাথীসহ নামায আদায় করিলেন। নামাযের পর শত্রু বাহিনীর চাপ আরও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া গেল। যোহায়র ইবনে কাইয়েন বীরত্বগাঁথা গাহিয়া ময়দানে অবতরণ করিলে। তিনি হযরত ইমামের বাহুতে হাত রাখিয়া গাহিতে লাগিলেন, “চল, তোমাকে আল্লাহ হেদায়েত দান করিয়াছেন। তুমি আজ স্বীয় মাতামহ আল্লাহর রাসূলের (সা) সহিত সাক্ষাত করিবে।” হাসান, আলী মোরতাজা আর বীর যুবক জাফর তাহম্মরের সহিত সাক্ষাত হইবে। যিন্দা শহীদ আসাদুল্লাহ হামযাও মিলিত হইবেন।
তত্পর বীরবিক্রমে শত্রুব্যূহে প্রবেশ করতঃ শত্রু নিপাত করিতে করিতে শাহাদাত বরণ করিলেন।
ধীরে ধীরে ইমাম বাহিনী নিঃশেষিত হইয়া আসিতেছিল। অবশিষ্টরা অবস্থা সঙ্গীন দেখিলেন, শত্রুর প্রতিরোধ আর সম্ভবপর নহে। বীরগণ সিদ্ধান্ত কারিলেন, একে একে লড়াই করিয়া হযরত ইমামের সম্মুখেই প্রাণ বিলাইয়া দিবেন। গেফারী গোত্রের দুই ভাই বীরত্বগাঁথা গাহিতে গাহিতে অগ্রসর হইলেন-
“বনী গেফার ও নাযার কবিলা এই কথা ভালভাবেই জানিয়া ফেলিয়াছে, আমরা তারবারির আঘাতে পাপীদের টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিব।”
“হে জাতি, তারবারি ও বর্শার সাহায্যে সম্ভ্রান্তদের সহযোগিতা কর।”
ইহাদের পর দুই জন জাবের গোত্রীয় তারুণ আসিয়া ক্রন্দন করিতে শুরু করিল। হযরত ইমাম স্নেহভরে বলিলেন, “বত্সগণ, কাঁদিতেছ কেন? কায়েক মুহূর্ত পরই তোমাদের চক্ষু চিরতরে শীতল হইয়া যাইবে। ভ্রাতৃদ্বয় ভগ্নকণ্ঠে বলিতে লাগিলেন, “আমরা জীবনের ভয়ে ক্রন্দন করিতেছি না; শত্রুরা আপনাকে ঘিরিয়া ফেলিয়াছে। অথচ আমরা আপনার কোনই উপকারে আসিতে পারি নাই।” তত্পর হইয়া বীরত্বের সহিত শত্রুসৈন্যের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। বার বার মুখে বলিতেছিলেন, হে রাসূল সন্তান, আপনার উপর আল্লাহ শান্তি বর্ষণ করুন। অল্পক্ষণের মধ্যেই এই দুই বাহাদুরের পতন হইল।
ইহাদের পর হানযালা ইবনে আশআস আসিয়া হযরত ইমামের সম্মুখে দাঁড়াইলেন। তিনি চিত্কার করিয়া বলিতে লাগিলেন, “হে জাতি, আমার ভয় হয়, আদ ও সামুদের ন্যায় তোমরাও চরম দুর্দিনের সম্মুখীন না হও। হোসাইনকে হত্যা করিও না! খোদা তোমাদের উপর আযাব নাযিল করিবেন।” শেষ পর্যন্ত ইনিও শহীদ হইয়া যান।
একে একে সকল সঙ্গীই চির বিদায় গ্রহণ করিলেন। এইবার বনী হাশেম ও নবী বংশের পালা আসিল। সর্বপ্রথম হযরত ইমামের পুত্র আলী আকবর ময়দানে অবতরণ করিলেন। মুখে বলিতেছিলেন, “আমি আলী ইবনে হোসাইন ইবনে আলী, কাবার প্রভুর শপথ, আমি নবী করীম (সা) এর নিকটবর্তী হওয়ার বেশী অধিকারী। খোদার শপথ, পিতৃপরিচয়হীন ব্যক্তিগণ আমাদের উপর রাজত্ব করিতে পারিবেনা।”
ইনিও বীরত্বের সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। শেষ পর্যন্ত মুররা ইবনে মালকাজ আল-আবাদী নামক এক দুর্বৃত্তের আঘাতে শহীদ হন। জনৈক বর্ণনাকারী বলেন, আমি দেখিতে পাইলাম, প্রভাতী সূর্যকিরণের ন্যায় এক পরমা সুন্দরী মহিলা তাঁবু হইতে ছুটিয়া বাহির হইলেন। তিনি চিত্কার করিতে করিতে বলিতেছিলেন “হায় আমার ভাই, হায় আমার ভ্রাতুষ্পুত্র!!“ আমি জিজ্ঞাস করিলাম, ইনি কে? লোকেরা উত্তর দিল, হযরত যয়নব বিনতে ফাতেমা (রা), কিন্তু হযরত হোসাইন তাঁহার হাত ধরিয়া তাঁবুর ভিতর রাখিয়া আসিলেন। তত্পর আলী আকবরের লাশ আনিয়া তাঁবুর সম্মুখে শোয়াইয়া দিলেন। (ইবনে জারীর)
শহীদ নওজোয়ান
অতপর আহলে বায়ত ও বনী হাশেমের অন্যান্য ব্যক্তিগণও বীরবেশে প্রাণ ত্যাগ করিতে লাগিলেন। ইতিমধ্যে এক অপূর্ব সুদর্শন তরুণ ময়দানে অবতরণ করিলেন। তাঁহার পরিধানে হালকা জামা ও পায়ে হালকা ধরণের চটি ছিল। তরুণ যোদ্ধার চেহারা এমন সুন্দর ছিল যে, দ্বাদশীর চাঁদ বলিয়া ভ্রম হইতেছিল। সিংহের মত বীরবিক্রমে তিনি ময়দানে অবতরণ করিয়া শত্রু বাহিনীর উপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। আমর ইবনে সাদ ইযদী তাঁহার মাথায় তারবারির আঘাত করিল। তরুণ ‘হায় চাচা‘ বলিয়া মাটিতে লুকাইয়া পড়িলেন। আওয়াজ শুনিয়া হযরত হোসাইন (রা) ক্ষুধার্ত বাজপক্ষীর ন্যায় ছুটিয়া গেলেন এবং বিদ্যুদ্বেগে তরবারি চালনা করিতে করিতে আক্রমণকারীর দিকে অগ্রসর হইলেন। হযরত ইমামের তরবারীর আঘাতে হতভাগ্য আক্রমণকারীর দক্ষিণ হস্ত কাটিয়া মাটিতে পড়িয়া গেল। সে চিত্কার করিয়া সঙ্গীগণকে ডাকিতে শুরু করিল। একদল শত্রুপক্ষীয় সৈন্য আসিয়া আক্রমণকারীকে বাচাইতে চাহিল, কিন্তু উহাদের পদতলেই সে পিষ্ট হইয়া গেল।
বর্ণনাকারী বলেন, ময়দান পরিষ্কার হইলে পর দেখিতে পাইলাম, হযরত হোসাইন (রা) তরুণের শিয়রে দাঁড়াইয়া আছেন। যন্ত্রণায় তরুণ হস্তপদ ইতস্তত নিক্ষেপ করিতেছেন। হযরত হোসাইন (রা) বলিতেছেন, যে তোমাকে হত্যা করিয়াছে তাহার সর্বনাশ হউক। কাল কেয়ামতের ময়দানে সে তোমার নানাকে কি জবাব দিবে? তোমার চাচার জন্য ইহার চাইতে বড় আক্ষেপ আর কি হইতে পারে, তুমি তাঁহাকে ডাকিলে আর সে আসিতে পারিল না, অথবা আসিলেও তোমার কোন উপকারে আসিল না। আফসোস! তোমার চাচার শত্রু অনেক হইয়া গিয়াছে, কিন্তু কোন বন্ধু অবশিষ্ট নাই! অতপর তিনি এই তরুণের লাশ তাঁবুর নিকট আনিয়া আলী আকবরের সহিত শোয়াইয়া দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি লোকদিগকে জিজ্ঞাস করিলাম, তরুণটি কে? সকলে জবাব দিল, ইনি কাসেম ইবনে হাসান (রা)।
সদ্যেজাত শহীদ
এরপর হযরত হোসাইন (রা) আবার নিজ স্থানে আসিয়া দাঁড়াইলেন। এই সময় তাঁহার এক পুত্রসন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। তাঁবুর ভিতর হইতে সদ্যেজাত শিশুকে আনিয়া তাঁহার কোলে দেওয়া হইল। তিনি শিশুর কানে আজান দিতে লাগিলেন। এমন সময় হঠাৎ একটি তীর আসিয়া শিশুর কণ্ঠনালীতে বিধিঁয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে কচি শিশুর প্রাণ-বায়ু বাহির হইয়া গেল। হযরত হোসাইন (রা) শিশু শহীদের কণ্ঠ হইতে তীর টানিয়া বাহির করিলেন। হাতে তাজা খুন লইয়া তাঁহার সর্বশরীর ছিটাইয়া দিতে দিতে বলিতে লাগিলেন, আল্লাহর শপথ, খোদার নিকট তুমি হযরত সালেহ আলাইহিস সালামের উষ্ট্রীয় চাইতেও প্রিয়। আর মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর দৃষ্টিতে হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম হতেও প্রিয়। ইলাহী, আমার উপর হইতে তুমি যখন বিজয়ের হাত উঠাইয়া লইয়াছ তখন যাহাতে মঙ্গল হয় তাহাই কর।–(আইয়ুব : ইবনে জারীর)
বনী হাশেমের শহীদগণ
এই ভাবে একে একে অধিকাংশ বনী হাশেম গোত্রীয়গণ শহীদ হইয়া গেলেন। ইহাদের মধ্যে ঐতিহাসিকগণ নিম্নলিখিত ব্যক্তিগণের নাম লিপিবদ্ধ করিয়াছেন : (১) মোহাম্মদ ইবনে আবি সায়ীদ ইবনে আকীল। (২) আবদুল্লাহ ইবনে মুসলিম ইবনে আকীল। (৩) আবদুল্লাহ ইবনে আকীল। (৪) আবদুর রহমান ইবনে আকীল। (৫) জাফর ইবনে আকীল। (৬) মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে জাফর। (৭) আওন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে জাফর। (৮) আব্বাস ইবনে আলী। (৯) আবদুল্লাহ ইবনে আলী। (১০) ওসমান ইবনে আলী। (১১) মোহাম্মদ ইবনে আলী। (১২) আবু বকর ইবনে আলী। (১৩) আবু বকর ইবনুল হাসান। (১৪) আবদুল্লাহ ইবনে হাসান। (১৫) কাসেম ইবনে হাসান। (১৬) আলী ইবনে হাসান। (১৭) ওবায়দুল্লাহ ইবনে হাসান।
বীর বালক
একে একে সবাই শেষ হইয়া গিয়াছিলেন। ইহার পর ছিল হযরত হোসাইনের পালা। তিনি সম্পুর্ণ একাকী ময়দানে দণ্ডায়মান ছিলেন। শত্রুরা তীব্রবেগে ছুটিয়া আসিতেছিল, কিন্তু কেহই আঘাত করিতে সাহস পাইতেছিল না। প্রত্যেকেই চেষ্টা করিতেছিল যেন এই মহাপাপের বোঝা তাহার স্কন্ধে পতিত না হয়। শিমার সৈন্যগণকে উত্তেজিত করিতেছিল। চারদিক হইতে শত্রুরা তাকে ঘিরিয়া ফেলিল। আহলে রাসূল (সা) –এর তাঁবুতে স্ত্রীলোকগণ এবং কয়েকজন অল্প বয়স্ক শিশু মাত্র অবশিষ্ট ছিলেন। তাঁবুর ভিতর হইতে একটি বালক হযরত ইমামকে এইরূপ শত্রু পরিবেষ্টিত দেখিয়া উত্তেজনায় আত্মহারা হইয়া গেল। সে তাঁবুর খুঁটি ভাঙ্গিয়া শত্রুসৈন্যের দিকে দিশাহারাভাবে ছুটিয়া চলিল। হযরত যয়নব ছুটিয়া আসিয়া বালকটিকে ধরিয়া ফেলিলেন। হযরত ইমামও বালককে দেখিতে পাইয়া ভগ্নীকে বলিলেন, ইহাকে জোর করিয়া ধরিয়া রাখ। আসিতে দিও না, কিন্তু ক্ষিপ্ত বালক হযরত যয়নবের হাত ছাড়াইয়া হযরত হোসাইনের পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইল। ঠিক এই মুহূর্তেই বাহর ইবনে কা‘ব নামক এক পাপিষ্ঠ হযরত ইমামের উপর তারবারি উঠাইল। উহা দেখিতে পাইয়া বালক চিত্কার করিয়া বলিতে লাগিল, হে পাপিষ্ঠ, আমার চাচাকে হত্যা করিতে চাস? এই কথা শুনিয়া পাষণ্ড অবোধ বালকের উপর উত্তোলিত তরবারি ছাড়িয়া দিল। বালক হাত দিয়া আঘাত প্রতিরোধ কারিতে চাইল, কিন্তু হাতখানা তত্ক্ষণাৎ কাটিয়া ভূ-লুণ্ঠিত হইয়া গেল। যন্ত্রণায় বালক চিত্কার করিয়া উঠিল। হযরত ইমাম বীর বালককে বুকে জড়াইয়া বলিতে লাগিলেন, “ধৈর্য্য ধর! আল্লাহ তোমাকে তোমার পূণ্যাত্মা আপনজনদের নিকট পৌছাইয়া দিবেন, হযরত রাসূলে খোদা (সা), হযরত আলী, হযরত জাফর ও হযরত হাসান (রা) পর্যন্ত।”
হযরত ইমামের শাহাদাত
এইবার হযরত ইমামের উপর সর্বদিক হইতে আক্রমণ শুরু হইল। হযরত ইমাম ভীষণ বেগে তরবারি চালনা করিতে লাগিলেন। যেদিকে তিনি যাইতেছিলেন, শত্রু সৈন্যদের কাতারের পর কাতার পরিষ্কার হইয়া যাইতেছিল। আবদুল্লাহ ইবনে আম্মার নামক এক ব্যক্তি এই যুদ্ধে শরীক ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন, আমি বর্শা দ্বারা হযরত হোসাইন কে আক্রমণ করি। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমি তাহার নিকট পৌছিয়া গিয়াছিলাম। ইচ্ছা করিলেই আমি তাঁহাকে হত্যা করিতে পারিতাম, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই এই ধারণার বশবর্তী হইয়া ফিরিয়া আসিলাম, এই মহাপাপ কেন কাঁধে লইতে যাইব? দেখিতে পাইলাম, ডান বাম সবদিক হইতেই তাহার উপর আক্রমণ চলিতেছে, কিন্তু তিনি যেদিকে ফিরিতেন, শত্রুরা সেই দিক হইতেই পলায়ন করিতে থাকিত। হযরত ইমাম তখন গায়ে জামা ও মাথায় পাগড়ি পরিধান করিয়া রাখিয়াছিলেন। আল্লাহর শপথ, আমি ইতিপূর্বে এমন প্রশস্ত হৃদয় মানুষ আর কখনও দেখিনাই, যাহার চক্ষের সম্মুখে আত্মীয়, বান্ধব পরিবার-পরিজন সকলেই একে একে প্রাণ দিল। সেই দুঃখসাগরে সন্তরণরত মানুষটিই এমন দৃঢ়তা ও বীরত্ব সহকারে যুদ্ধ করিতেছিলেন যে, যেদিকে অগ্রসর হইতেছিলেন, শত্রুসৈন্যগণ ব্যাঘ্রতাড়িত মেষপালের ন্যায় ছুটিয়া প্রাণরক্ষা করিতেছিল। দীর্ঘক্ষণ এই অবস্থা চলিল। এই সময় হযরত ইমামের ভগ্নী হযরত যয়নব চিত্কার করিতে করিতে তাঁবু হইতে বাহির হইয়া আসিলেন, তিনি বলিতেছিলেন, হায়! হায়!! আকাশ যদি মাটিতে ভাঙ্গিয়া পড়িত! ইতিমধ্যে আমর ইবনে সাদ হযরত ইমামের একবারে নিকটে পৌছিয়া গেলেন। হযরত যয়নব বলিতে লাগিলেন, আমর, আবু আবদুল্লাহ (হযরত হোসাইন) কি তোমাদের সম্মখেই নিহত হইয়া যাইবেন। আমর তাঁহার দিক হইতে মুখ ফিরাইয়া নিলেন, কিন্তু অশ্রুতে তাহার দাড়ি ও গণ্ডদেশ ভাসিয়া গেল।
যুদ্ধ করিতে করিতে হযরত ইমাম ভীষণভাবে পিপাসিত হইয়া গেলেন। পানির জন্য তিনি ফোরাতের দিকে চললেন, কিন্তু শত্রুরা তাঁহাকে অগ্রসর হইতে দিল না। একটি তীর আসিয়া তাঁহার কণ্ঠদেশে বিদ্ধ হইল। হযরত ইমাম তীরের ফলক টানিয়া বাহির করিয়া ফেলিলেন। হাত উপরে তুলিবার সময় তাঁহার উভয় হাত রক্তে ভরিয়া উঠিল। তিনি রক্ত আকাশের দিকে ছিটাইতে ছিটাইতে খোদার শোকর আদায় করিতে করিতে বলিতে লাগিলেন, “ইলাহী, আমার অভিযোগ একমাত্র তোমারই দরবারে। দেখ দেখ, তোমার রাসূল দৌহিত্রের সহিত কি ব্যবহার হইতেছে।”
হযরত ইমাম ফোরাতের পথ ছাড়িয়া তাঁবুর দিকে ফিরিয়া আসিতে লাগিলেন। শিমার একদল সৈন্যসহ এই দিকেই তাঁহার পথ রুদ্ধ করিয়া দিল। হযরত ইমাম অনুভব করিলেন, পাপিষ্ঠরা তাঁবু লুণ্ঠন করিতে চাহে। বলিতে লাগিলেন, “তোমাদের মধ্যে যদি ধর্মের কোন মমতা অথবা শেষ বিচারের কোন ভয় নাও থাকিয়া থাকে, তবু অন্তত মানবতার দিকে চাহিয়া হইলেও কুফার এই অসভ্যদের কবল হতে আমার তাঁবুটি রক্ষা করিও।” শিমার উত্তর দিল, “আচ্ছা তাই করা হইবে, আপনার তাঁবু রক্ষা করা হইবে।”
সময় অতিবাহিত হইয়া চলিয়াছিল। বর্ণনা কারী বলেন, শত্রুরা ইচ্ছা করিলে বহু পূর্বেই তাঁহাকে হত্যা করিয়া ফেলিতে পারিত, কিন্তু এই পাপ কেহ বহন করিতে চাহিতেছিল না। শেষ পর্যন্ত শিমার চিত্কার করিয়া বলিতে লাগিল, দেরী করিতেছ কেন? শীঘ্র কাজ শেষ করিয়া ফেলিতেছ না কেন? ইহার পর আবার চারদিক হইতে আক্রমণ শুরু হইল। হযরত ইমাম উচ্চস্বরে বলিতে লাগিলেন, “আমাকে হত্যা করার জন্য কেন একে অপরকে উত্তেজিত করিতেছ? আল্লাহর শপথ, আমার পর এমন কোন লোক থাকিবে না যাহাকে হত্যা করিলে আল্লাহ আজকের চাইতে বেশী অসন্তুষ্ট হইবেন।”
শেষ সময় নিকটবর্তী হইল। জোরআ ইবনে শরীফ তামিমী তাঁহার বাম হস্তে আঘাত করিল, তত্পর পার্শ্বদেশে তরবারি চালাইল। হযরত ইমাম বেদনায় অস্থির হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইতে চাহিলেন। এতদ্দর্শনেই শত্রুরা পিছাইয়া যাইতে লাগিল। ইতিমধ্যেই সেনান ইবনে আনাস আখরী আসিয়া বর্শা মারিল। হযরত ইমাম মাটিতে লুটইয়া পড়িলেন। পাপিষ্ঠ অন্য এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দিল, “মাথা কাটিয়া ফেল।” লোকটি অগ্রসর হইল, কিন্তু সাহসে কুলাইল না। পাপাচারী দাঁতে দাঁত পিষিয়া বলিতে লাগিল, “তোর হাত নষ্ট হইয়া যাউক!“ এই কথা বলিয়া নিজেই লাফাইয়া পড়িল এবং হযরত ইমামের মাথা কটিয়া দেহ হইতে পৃথক করিয়া লইল। জাফর ইবনে মোহাম্মদ ইবনে আলী বর্ণনা করেন, নিহত হওয়ার পর দেখা গেল, হযরত ইমামের শরীরে ৩৩ টি তীর ও ৪৩ টি তরবারীর আঘাত রহিয়াছে।
মহাপাতকী
হযরত ইমামের হন্তা সেনান ইবনে আনাসের মস্তিষ্কে একটু বিকৃতি ছিল। হযরত ইমামকে হত্যা করার সময় উহার চরিত্রে এক আশ্চর্যের অবস্থা দেখা দিয়াছিল। যে কেহ হযরতের লাশের নিকটবর্তী হইতে চাহিত, তাহাকেই সে আক্রমণ করিত। সে ভয় পাইতেছিল, ইতিমধ্যে অন্য কেহ তাহার মস্তক কাটিয়া না নেয়। পাপাত্মা শেষ পর্যন্ত মস্তক কর্তন করিয়া খাওলা ইবনে ইয়াযিদ আসবেহী নিকট অর্পণ করিল। স্বয়ং দৌড়াইয়া গিয়া আমর ইবনে সাদের নিকট চিত্কার করিয়া বলিতে লাগিল- “আমাকে স্বর্ণ-রৌপ্য দিয়া ডুবাইয়া দাও, আমি মস্ত বড় বাদশাহকে হত্যা করিয়াছি! আমি এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করিয়াছি যাঁহার পিতা-মাতা সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তাঁহার বংশমর্যাদা সবচাইত ভাল।”
আমর ইবনে সাদ উহাকে তাঁবুর ভিতরে ডাকিয়া নিয়া রাগান্বিত হইয়া বলিতে লাগিলেন, চুপ কর! তুই একটি আস্ত পাগল! তত্পর লাঠি দ্বারা উহাকে আঘাত করিতে করিতে বলিলেন, “পাগল কোথাকার, এমন কথা বলিতেছিলে! খোদার শপথ, ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ শুনিতে পাইলে এখনই তোকে হত্যা করিত।”-(ইবনে জারীর)
হত্যার পর
হত্যার পর কুফাবাসীরা হযরত ইমামের শরীরের কাপড় পর্যন্ত খুলিয়া লইয়া গেল! তত্পর ইমাম পরিবারের তাঁবুর দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল।
তাঁবুতে হযরত যয়নুল আবেদীন অসুস্থ অবস্থায় পড়িয়া ছিলেন। ইতিমধ্যে শিমার একদল সৈন্যসহ তাঁবুতে পৌছিয়া বলিতে লাগিল, ইহাকেও কেন হত্যা করিয়া ফেলিতেছ না? শিমারের সঙ্গীরা বলিল, শিশুদের কেন আর হত্যা করিবে? এমন সময় আমর ইবনে সাদ আসিয়া নির্দেশ দিলেন, কেহ যেন স্ত্রী-লোকদের তাঁবুর দিকে অগ্রসর না হয়, অথবা এই রুগ্ন বালককে কিছু না বলে। যদি কেহ তাঁবুর কোন কিছু লুণ্ঠন করিয়া থাক তবে এখনই ফিরাইয়া দাও।
এই কথা শুনিয়া হযরত যয়নুল আবেদীন রুগ্ন কণ্ঠে বলিতে লাগিলেন, “আমর ইবনে সাদ, আল্লাহ তোমাকে সত্পরিণাম দান করুন। তোমার নির্দেশেই আমি এখনকার মত বাঁচিয়া গেলাম।”
আমর ইবনে সাদের উপর নির্দেশ ছিল, হযরত হোসাইনের লাশ যেন ঘোড়ার পদতলে পিষ্ঠ করিয়া ফেলা হয়। হত্যার পর এখন লাশের পালা আসিল। আমর ডাকিয়া জিজ্ঞাস করিলেন, কে এই কাজের জন্য প্রস্তুত আছ? দশ ব্যক্তি প্রস্তুত হইল এবং ঘোড়া ছুটাইয়া পবিত্র লাশ পিষিয়া ফেলিল। এই যুদ্ধে ইমামের পক্ষে ৭২ জন শহীদ হইলেন। ইবনে যিয়াদের ৮৮ ব্যক্তি নিহত হইল।–(ইবনে জারীর, কামেল, ইয়াকুবী)
দ্বিতীয় দিন আমর ইবনে সাদ যুদ্ধের ময়দান হইতে ফিরিয়া চলিলেন। আহলে বাইতের হত্যাবশিষ্ট শিশু ও স্ত্রীলোকগণকে সঙ্গে লইয়া কুফায় রওনা হইয়া গেলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী কোররা ইবনে কায়স বর্ণনা করেন, আহলে বায়তের স্ত্রীলোকগণ হযরত হোসাইন (রা) এবং অন্যান্য শহীদের পিষ্ট বিক্ষিপ্ত লাশ দেখিয়া সমস্বরে রোদন করিয়া উঠিলেন! চারদিক থেকে হায় হায় রব উঠিল! আমি ঘোড়ার গতি পরিবর্তন করিয়া তাঁহাদের নিকটবর্তী হইলাম। জীবনে আমি এত সুন্দরী স্ত্রীলোক আর কোথাও দেখি নাই। আমি হযরত যয়নব বিনতে ফাতেমা (রা) এর বিলাপ কখনও ভুলিতে পারিব না। তিনি বলিতেছিলেন : “মোহাম্মদ (সা) তোমার উপর আকাশের ফেরেশতাদের দরূদ ও সালাম! চাহিয়া দেখ, তোমার হোসাইন বালুকারাশির উপর পড়িয়া রহিয়াছেন। মাটি ও রক্তে সর্বাঙ্গ রঞ্জিত হইয়া গিয়াছে। সোনার শরীর টুকরা টুকরা হইয়া গিয়াছে। আর তোমার আদরের কন্যারা আজ বন্দী! তোমার বংশধর নিহত। মরুভূমির বাতাস তাহাদের উপর ধুলা নিক্ষেপ করিতেছে।” বর্ণনাকারী বলেন, হযরত যয়নবের এই বিলাপ শুনিয়া শত্রু-মিত্র এমন কেহ ছিল না যাহার চক্ষু অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠে নাই।– (ইবনে জারীর)
শহীদানের সকল মস্তক কাটিয়া একত্রিত করা হইয়াছিল। শিমার, কায়স ইবনে আশআস, আমর ইবনে হাজ্জজ, আস মোররা ইবনে কায়স প্রভৃতি মিলিয়া এই মস্তকগুলি ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের নিকট লইয়া গেল।
ইবনে যিয়াদের সমীপে শির মোবারক
মোবারক ইবনে মোসলেম খাওলা ইবনে ইয়াযিদের সহিত হযরত হোসাইনের শির ইবনে যিয়াদের নিকট লইয়া আসিয়াছিল। তাহার বর্ণনা : হযরত হোসাইনের শির মোবারক ইবনে যিয়াদের সম্মুখে রাখা হইল। দরবার ঘরে অসংখ্য দর্শকের ভীড় ছিল। ইবনে যিয়াদ একটি যষ্টি দ্বারা বার বার হযরত হোসাইনের ওষ্ঠদ্বয়ে আঘাত করিতেছিল। এই দৃশ্য দেখিয়া সাহাবী হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা) চিত্কার করিয়া বলিতে লাগিলেন : “ইবনে যিয়াদ, এই পবিত্র ওষ্ঠদ্বয় হইত যষ্টি সরাইয়া লও! আমার এই দুই চক্ষু অসংখ্যবার রাসূলে খোদা (সা) কে নিজ মুখে এই পবিত্র ওষ্ঠ চুম্বন করিতে দেখিয়াছি।” এই কথা বলিয়া তিনি শিশুর ন্যায় ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। এই কথা শুনিয়া ইবনে যিয়াদ রাগান্বিত হইয়া বলিতে লাগিল, “খোদা তোমাকে আরও রোদন কারান, যদি তুমি বৃদ্ধ স্থবির হইয়া না যাইতে, তবে এখনই তোমার মস্তক উড়াইয়া দিতাম।”
হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা) এই কথা বলিতে বলিতে দরবার হইতে বহির হইয়া গেলেন, “আরববাসীগণ, আজকের পর হইতে তোমরা গোলামীর শিকলে আবদ্ধ হইয়া গেলে। তোমরা হযরত ফাতেমার পুত্রকে হত্যা করিয়াছ। আর ইবনে মাজানাকে (ইবনে যিয়াদ) নিজেদের শাসনকর্তা নির্বাচিত করিয়াছ। সে তোমাদের সৎ ব্যক্তিদিগকে হত্যা করিয়া দুষ্ট প্রকৃতির লোকদিগকে বশ করিয়া লইয়াছে। তোমরা হীনতা গ্রহণ করিয়া লইয়াছ। যাহারা হীনতা অব অবলম্বন করে, তাহাদিগকে আল্লহ ধ্বংস করেন।”
কোন কোন বর্ণনায় এই দুষ্কর্ম ইয়াযিদের বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যষ্টি দ্বারা হযরত হোসাইনের মুখে আঘাতের ধৃষ্টতা ইবনে যিয়াদেরই অপকীর্তি!
ইবনে যিয়াদ ও হযরত যয়নব
বর্ণনাকারী বলেন, আহলে বায়তের শিশু ও স্ত্রীলোকগণকে যখন ইবনে যিয়াদের সম্মুখে উপস্থিত করা হয়, তখন হযরত যয়নব নিতান্ত জীর্ন পোশাক পরিহিত ছিলেন। তাঁহাকে চেনা যাইতেছিল না। কয়েকজন পরিচারিকা তাঁহাকে ঘিরিয়া রাখিয়াছিল। ইবনে যিয়াদ জিজ্ঞাস করিল, ইনি কে? কিন্তু তিন বার জিজ্ঞার করার পরও তিনি চুপ করিয়া রহিলেন। শেষ পর্যন্ত জনৈক পরিচারিকা বলিল, “হযরত যয়নব বিনতে ফাতেমা (রা)।” পাপিষ্ঠ ওবায়দুল্লাহ চিত্কার করিয়া বলিল, “সেই আল্লহার প্রশংসা যিনি তোমাদিগকে অপদস্থ ও ধ্বংস করিয়াছেন এবং তোমাদের নামে অপমানের কলঙ্ক লেপন করিয়াছেন।” এই কথা শুনিয়া হযরত যয়নব বলিলেন, “সহস্র প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি মোহাম্মদ (সা) দ্বারা আমাদিগকে সম্মান দান করিয়াছেন এবং আমাদিগকে পবিত্রতার মর্যাদা দিয়াছেন। তুই যেইরূপ বলিয়াছিস সেইরূপ নয়। পাপী সর্বাবস্থায়ই হীন লাঞ্ছিত। পাপীর নামেই কলঙ্কের ছাপ পড়িয়া থাকে।” ইবনে যিয়াদ বলিল, তুমি দেখ নাই, খোদা তোমার খান্দানের সহিত কি ব্যবহার করিয়াছেন?
হযরত যয়নব বলিলেন, “ইহাদের ভাগ্যে শাহাদাতের মৃত্যু লিখা ছিল, এই জন্য তাঁহারা বধ্যভূমিতে পৌছিয়া গিয়াছিলেন। সত্বরই আল্লাহ তাঁহাদের সহিত তোমাকেও একস্থানে একত্রিত করিবেন। তোমরা পরস্পর আল্লাহর দরবারেই এই ব্যাপারে বুঝাপড়া করিতে পারিবে।”
ইবনে যিয়াদ রাগে অস্থির হইয়া উঠিল। তাহার ক্রোধ দেখিয়া আমর ইবনে হারীস বলিলেন, “আমীর, আত্মহারা হইবেন না। এ তো নারী মাত্র। নারীর কথায় রাগান্বিত হইয়া উঠা উচিত নহে।”
কিছুক্ষণ পর ইবনে যিয়াদ পুনরায় বলিল, “ আল্লাহর তোমাদের বিদ্রোহী সরদার এবং তোমাদের পরিবারের দাম্ভিকদের তরফ হইতে আমার অন্তর শীতল করিয়াছেন।” এই কথা শুনিয়া হযরত যয়নব আত্মসম্বরণ করিতে পারিলেন না। তিনি রোদন করিয়া উঠিলেন। বলিতে লাগিলেন, “ওবায়দুল্লাহ, তুমি আমাদের নেতাকে হত্যা করিয়াছ। সমস্ত খান্দান সমূলে ধ্বংস করিয়া দিয়াছ। এই পবিত্র পরিবারকে সমূলে উত্পাটিত করিয়া দিয়াছ। ইহাতে যদি তোমার অন্তর শীতল হইয়া থাকে, তবে তাহাই হউক।”
ইবনে যিয়াদ মৃদু হাসিয়া বলিল, “ইহা বীরত্বের ব্যাপার। তোমার পিতাও বীর ও কবি ছিলেন।”
হযরত যয়নব বলিলেন, নারীর পক্ষে বীরত্বের কথায় ফল কি? বিপদ আমাকে বীরত্বের কাহিনী বিস্মৃত করিয়া দিতে বাধ্য করিয়াছে। আমি যাহা বলিয়াছি উহা অন্তরের আগুন মাত্র।
ইমাম যয়নুল আবেদীন
অতপর ইবনে যিয়াদের দৃষ্টি হযরত আলী যয়নুল আবেদীন ইবনে হোসাইনের দিকে নিবদ্ধ হইল। তিনি অসুস্থ ছিলেন। ইবনে যিয়াদ জিজ্ঞাস করিল, তোমার নাম কি? ইমাম বলিলেন : আলী ইবনে হোসাইন। ইবনে যিয়াদ আশ্চর্যান্বিত হইয়া জিজ্ঞাস করিল, আলী ইবনে হোসাইনকে কি আল্লাহর এখনও নিহত করেন নাই?
যয়নুল আবেদীন কোন উত্তর দিলেন না। ইবনে যিয়াদ বলিল, উত্তর দাও না কেন? তিনি জবাব দিলেন, আমার আর এক ভাইয়ের নামও আলী ছিল। লোকেরা ভুলক্রমে তাহাকে হত্যা করিয়াছে। ইবনে যিয়াদ বলিল, লোকেরা নহে, আল্লাহ হত্যা করিয়াছেন।
এই কথা শুনিয়া হযরত যয়নুল আবেদীন কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করিলেন, আয়াতের অর্থ- “আল্লাহ জীবনসমূহকে মৃত্যু দেন তাহার নির্দিষ্ট সময়ে। আল্লাহর নির্দেশ ব্যতীত কোন জীবই মৃত্যুবরণ করিতে পারে না।”
কোরআনের আয়াত শ্রবণ করিয়া ইবনে যিয়াদ চিত্কার করিয়া বলিতে লাগিল, তবে খোদা এখনই তোমার মৃত্যু দান করিতেছেন। এই কথা বলিয়া তত্ক্ষণাৎ তাহাকে হত্যা করিতে উদ্যত হইল। হযরত যয়নব অধীর কণ্ঠে চিত্কার করিয়া উঠিলেন এবং বলিতে লাগিলেন, “আমি তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়া বলিতেছি, যদি তুমি মুমিন হইয়া থাক এবং এই বালককে সত্যই হত্যা করিতে চাও, তবে ইহার সঙ্গে আমাকেও হত্যা করিয়া ফেল।”
ইমাম যয়নুল আবেদীন উচ্চ স্বরে বলিলেন, “হে ইবনে যিয়াদ, এই স্ত্রীলোকদের সম্পর্কে যদি তোমার অন্তরে সামান্য মর্যাদাবোধও থাকিয়া থাকে, তবে আমার মৃত্যুর পর ইহাদের সঙ্গে কোন খোদাভীরু লোককে প্রেরণ করিও, যিনি ইসলামী রীতি-নীতি অনুযায়ী ইহাদের সহিত ব্যবহার করিবেন।”
ইবনে যিয়াদ দীর্ঘক্ষণ ধরিয়া হযরত যয়নবকে দেখিতেছিল। লোকদিগকে সম্বেধন করিয়া বলিতে লাগিল, রক্তের সম্পর্ক কি আশ্চার্যের জিনিস! স্ত্রীলোকটিকে দেখিয়া মনে হয়, সত্যই সে বালকের সহিত মৃত্যুবরণ করিতে প্রস্তুত। থাক, বালককে ছাড়িয়া দাও এবং উহাকেও স্ত্রীলোকদের সহিত যাইতে দাও।–(ইবনে জারীর, কামেল)
ইবনে আফিফের শাহাদাত
এই ঘটনার পর ইবনে যিয়াদ কুফার জামে মসজিদে জনসাধারণকে সমবেত করিয়া খুতবা দিতে শুরু করিল। সর্বপ্রথম সে সেই খোদার প্রশংসা করিল যিনি ‘সত্য‘ প্রকাশ করিয়াছেন এবং সত্যপন্থীদিগকে জয়যুক্ত করিয়াছেন। “আমীরুল মোমেনীন (?) ইয়াযিদ ইবনে মোয়াবিয়া এবং তাঁহার জামাত জয়যুক্ত হইয়াছে এবং মিথ্যাবাদী (?) হোসাইন ও তাহার সঙ্গীদিগকে ধ্বংস করিয়াছেন….।”
এই কথা শুনিয়া আবদুল্লাহ ইবনে আফীফ ইহুদী (ইনি হযরত আলীর একজন বিখ্যাত শিষ্য ছিলেন। জঙ্গে জামালে ইহার দুই চক্ষু অন্ধ হইয়া গিয়াছেল) উঠিয়া বলিতে লাগিলেন, “খোদার শপথ হে ইবনে মারজানা, মিথ্যাবাদীর সন্তান মিথ্যাবাদী তো তুই। হযরত হোসাইন ইবনে আলী (রা) নহেন। এই কথা শুনিয়া ইবনে যিয়াদ তাঁহার গর্দান উড়ইয়া দেয়।”
ইয়াযিদের সম্মুখে
তত্পর ইবনে যিয়াদ হযরত ইমাম হোসাইনের শির মোবারক একটি বংশদণ্ডে বিদ্ধ করিয়া জাহর ইবনে কায়সের হাতে ইয়াযিদের নিকট প্রেরণ করিল। গার ইবনে রবিয়া বলেন : জাহর ইবনে কায়স যে সময় উপস্থিত হয়, তখন আমি ইয়াযিদের দরবারে উপস্থিত ছিলাম। ইয়াযিদ জিজ্ঞাস করিলেন, খবর কি?
জাহর বলিতে লাগিল : “হোসাইন ইবনে আলী (রা) আঠার জন আহলে বায়ত এবং ষাট জন সঙ্গীসহ আমাদের নিকট উপস্থিত হন। আমরা অগ্রসর হইয়া তাঁহাকে প্রতিরোধ করিলাম এবং বলিলাম, আমাদের নিকট যেন আত্মসমর্পণ করেন, অন্যথায় আমরা যুদ্ধ করিব, কিন্তু আত্মসমর্পণ করার চাইতে তিনি যুদ্ধ করিতে চাইলেন। শেষ পর্যন্ত আমরা সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাহাকে আক্রমণ করিলাম। চারিদিকে হইতে যখন অগণিত তরবারি তাহাদের উপর পড়িতে লাগিল, তখন তাহারা চরিদিকে এমন ভাবে পলায়ন করিতে লাগিলেন যেমন বাজের আক্রমণ হইতে আত্মরক্ষার জন্য কবুতর পলায়ন করিতে থাকে। তত্পর আমরা উহাদের সকলকে নিশেষ করিয়া ফেলিলাম। এই পর্যন্ত তাহাদের দেহ সূর্যতাপ ও বাতাসের দ্বারা বোধ হয় শুষ্ক ও শৃগালের খাদ্যে পরিণত হইয়াছে।”
বর্ণনাকারী বলেন, এই কথা শুনিয়া ইয়াযিদের চক্ষু অশ্রু প্লাবিত হইয়া উঠিল। তিনি বলিতে লাগিলেন, “হোসাইনকে হত্যা করা ব্যতীতও আমি তোমাদের আনুগত্যে সন্তুষ্ট হইতে পারিতাম। ইবনে সুমাইয়ার (ইবনে যিয়াদ) উপর আল্লাহর অভিসম্পাত হউক। খোদার শপথ, যদি আমি সেখানে উপস্থিত থাকিতাম, তবে অবশ্যই হোসাইনকে ক্ষমা করিয়া দিতাম। আল্লাহ হোসাইনকে রহমতের কোলে আশ্রয় দিন।” কাসেদকে তিনি কোন প্রকার পুরষ্কার দিলেন না। – (ইবনে জারীর, কামেল, তারীখে কবীর, যাহবী)
ইয়াযিদের গোলাম কাসেম ইবনে আবদুর রহমানের বর্ণনা : হযরত হোসাইন (রা) এবং আহলে বায়তের শহীদানের শির যখন ইয়াযিদের সম্মুখে রাখা হইল, তখন তিনি এই মর্মে একটি কবিতা আবৃত্তি করিতে লাগিলেন,:
“তরবারী এমন লোকের মস্তকও দ্বিখণ্ডিত করিয়াছে, যাঁহারা আমার অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। অথচ উহারাই সত্য বিস্মৃত জালেম ছিল।” তত্পর বলিলেন “আল্লাহর শপথ হে হোসাইন, আমি যদি সেখানে থাকিতাম, তবে কখনও তোমাকে হত্যা করিতাম না।”
দামেশকে
হযরত হোসাইনের শির প্রেরণ করার পর ইবনে যিয়াদ আহলে বায়তকেও দামেশকে প্রেরণ করিল। পাপাত্মা শিমার এবং মাহযার ইবনে সালাবা এই কাফেলার সরদার ছিল। ইমাম যয়নুল আবেদীন সমগ্র রাস্তায় চুপ করিয়া রহিলেন। কাহাকেও কিছু বলিলেন না। ইয়াযিদের প্রাসাদের দ্বারে উপস্থিত হইয়া ইবনে সালাবা চিত্কার করিয়া বলিতে লাগিল, আমরা আমীরুল মোমেনীনের নিকট পাপী নীচদিগকে হাযির করিয়াছি।
এই কথা শুনিয়া ইয়াযিদ রাগান্বিত হইয়া বলিতে লাগিলেন, মাহযারের মাতার চাইতে অধিক নীচ ও দুষ্ট সন্তান বুঝি আর কোন মাতা জন্ম দেন নাই। তত্পর ইয়াযিদ সিরিয়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিগণকে দরবারে আহ্বান করিলেন। আহলে বায়তকেও বসাইলেন এবং সম্বেধন করিয়া বলিতে লাগিলেন, “হে আলী, তোমার পিতাই আমার সাথে সম্পর্ক কর্তন করিয়াছেন। তিনি আমার অধিকার বিস্মৃত হন। আমার রাজত্ব কাড়িয়া নেওয়ার চেষ্টা করেন। এই ব্যাপারে আল্লাহ তাহার প্রতি যে ব্যবহার করিয়াছেন তাহা তোমরা দেখিয়াছ।”
এই কথার উত্তরে হযরত ইমাম যয়নুল আবেদীন কোরআনের আয়াত পাঠ করিলেন : “তোমাদের এমন কোন বিপদ নাই যাহা পূর্বে লিখিয়া রাখা হয় নাই। ইহা আল্লাহর পক্ষে নিতান্ত সহজ এই জন্য যে, তোমরা যাহাতে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়া আক্ষেপ না কর এবং সাফল্য লাভ করিয়া আত্মাভিমানী হইয়া না যাও। আল্লাহ অহঙ্কারী দাম্ভিকদিগকে পছন্দ করেন না।” এই উত্তর ইয়াযিদের মনপূত হইল না। তিনি স্বীয় পুত্র খালেদ দ্বারা এর উত্তর দিতে চাহিলেন, বল না কেন- “তোমাদের উপর এমন কোন বিপদ আসে নাই, যাহা তোমাদের হস্তদ্বয় সঞ্চয় করে নাই এবং আল্লাহ অধিকাংশকে ক্ষমা করেন।”- (কোরআন)
অতপর ইয়াযিদ অন্যান্য শিশু ও স্ত্রীলোকদের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। তাহাদিগকে ডাকিয়া নিজের নিকট বসাইলেন। তাহাদের বিষাদ-মলিন চেহেরা দেখিয়া আক্ষেপ করিয়া বলিতে লাগিলেন, খোদা ইবনে যিয়াদের সর্বনাশ করুন। যদি তোমাদের সহিত তাহার কোন প্রকার সম্পর্ক থাকিত তবে এই অবস্থায় সে তোমাদিগকে আমার নিকট প্রেরণ করিত না।
হযরত যয়নবের স্পষ্টবাদিতা
হযরত ফাতেমা ইবনে আলী হইতে বর্ণিত আছে, আমরা যখন ইয়াযিদের সম্মুখে নীত হইলাম তখন ইয়াযিদ আমাদের উপর অনুকম্পা প্রদর্শন করিলেন। আমাদিগকে তিনি কিছু দিতে চাহিলেন। তখন এক সুদর্শন সিরীয় তরুণ দণ্ডায়মান হইয়া বলিতে লাগিল, আমীরুল মোমেনীন, এই মেয়েটিকে আমাকে দিয়া দিন। এই বলিয়া সে আমার দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করিল। আমি তখন নিতান্ত অল্পবয়স্কা ছিলাম। আমি বড় বোন হযরত যয়নবকে আঁকড়াইয়া ধরিলাম। হযরত যয়নব উচ্চস্বরে বলিলেন, তুই নীচ! ইহার উপর তোর অথবা ইয়াযিদের কোনই অধিকার নাই।”
এই কথা শুনিয়া ইয়াযিদ রাগান্বিত হইয়া গেলেন। বলিতে লাগিলেন, তুমি বাজে বকিতেছ; আমি ইচ্ছা করিলে এখনই ইহা করিতে পারি। যয়নব বলিলেন, “কখনও নহে। আল্লাহ তোমাদিগকে এই অধিকার কখনও দেন নাই। যদি তুমি আমাদের দ্বীন হইতে বিচ্যুত হইয়া যাও অথবা আমাদের দ্বীন ছাড়িয়া অন্য দ্বীন গহণ কর, তবে অবশ্য অন্য কথা।”
এই কথা শুনিয়া ইয়াযিদ আরও বেশী রাগান্বিত হইয়া উঠিলেন। বলেতে লাগিলেন, দ্বীন হইতে তোমার পিতা ও ভ্রাতা বাহির হইয়া গিয়াছেন।
হযরত যয়নব দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলিলেন, “আল্লাহর দ্বীন হইতে, আমার ভ্রাতার দ্বীন হইতে, আমার পিতা ও মাতামহের দ্বীন হইতে তুমি ও তোমার পিতা হেদায়াত প্রাপ্ত হইয়াছেন।”
ইয়াযিদ চিত্কার করিয়া উঠিলেন, “খোদার দুশমন, তুমি মিথ্যাবাদিনী।” হযরত যয়নব বলিতে লাগিলেন, “তুমি জোর করিয়া শাসক হইয়া বসিয়াছ! উদ্ধত আত্মগরিমায় অপরকে গালি দিতেছ! গায়ের বলে খোদার সৃষ্ট জীবকে অবনত করিয়া রাখিতেছ।”
হযরত ফাতেমা বিনতে আলী (রা) বলেন, এই কথা শুনিয়া বোধহয় ইয়াযিদ লজ্জিত হইয়া গেলেন। অতপর আর কিছু বলিলেন না, কিন্তু সেই সিরীয় তরুণটি পুনরায় উঠিয়া দাণ্ডায়মান হইল এবং সেই কথা বলিতে লাগিল। এইবার ইয়াযিদ রাগান্বিত হইয়া বলিলেন, দূর হ হতভাগা! খোদা তোকে মৃত্যুর সওগাত দান করুন।”
ইয়াযিদের পরামর্শ
দীর্ঘক্ষণ দরবারে নিরবতা বিরাজ করিল। তত্পর ইয়াযিদ সিরীয় আমীরদের সম্বেধন করিয়া বলিলেন, ইহাদের সম্পর্কে কি পরামর্শ দাও! কেহ কেহ মন্দ কথা উচ্চারণ করিল, কিন্তু নোমান ইবনে বেশর বলিলেন, ইহাদের সহিত তদ্রূপ ব্যবহারই করুণ, আল্লাহর রাসূর ইহাদেরকে এই অবস্থায় দেখিয়া যাহা করিতেন। এই কথা শুনিয়া হযরত ফাতেমা বিনতে আলী (রা) বলিলেন, ইয়াযিদ, ইহারা সকলেই রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের কন্যার সমতুল্য।
এই কথা শুনিয়া ইয়াযিদের অন্তরও গলিয়া গেল। তিনি ও দরবারের সকলে অশ্রু সংবরণ করিতে পারিলেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি নির্দেশ দিলেন, ইহাদের থাকার জন্য পৃথক ব্যবস্থা করিয়া দাও।
ইয়াযিদ পত্নির শোক
ততক্ষাণে এই ঘটনার খবর ইয়াযিদের অন্তপুরে গিয়া পৌছিল। ইয়াযিদ-পত্নি হেন্দা বিনতে আবদুল্লাহ অধীর হইয়া বাহিরে চলিয়া আসিলেন। মুখে নেকাব দিয়া দরবারে আসিয়া ইয়াযিদেকে সম্বেধন করিয়া বলিতে লাগিলেন, “আমীরুল মোমেনীন, হোসাইন ইবনে ফাতেমা বিনতে রাসূল (সা) এর শির আসিয়াছে বলিয়া শুনিতে পাইলাম।
ইয়াযিদ বলিলেন, হ্যাঁ, তোমরা প্রাণ ভরিয়া ক্রন্দন কর! মাতন কর! বিলাপ কর! রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের দৌহিত্র এবং কোরায়শ গোত্রের সবচাইতে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য মাতন কর। ইবনে যিয়াদ বড় তাড়াহুড়া করিয়াছে। তাঁহাকে হত্যা করিয়া ফেলিয়াছে। খোদা উহাকেও হত্যা করুন।”
আত্মপ্রসাদ
তত্পর ইয়াযিদ দরবারীদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতে লাগিলেন, তোমরা জান কি এই বিপর্যয় কিসের ফল? উহা হোসাইনের ভুলের পরিণাম। তিনি ভাবিয়াছিলেন, আমার পিতা ইয়াযিদের পিতার চাইতে উত্তম ব্যক্তি। আমার মাতা ইয়াযিদের মাতার চাইতে উত্তম মহিলা। আমার মাতামহ ইয়াযিদের মাতামহ হইতে উত্তম ব্যক্তি এবং আমি স্বয়ং ইয়াযিদ হইতে উত্তম। সুতরাং আমি ইয়াযিদের চাইতে রাজত্বের বেশী হকদার। অথচ তাহার পিতা আমর পিতার চাইতে উত্তম- এই কথা ভাবা তাহার উচিত ছিল না। কারণ মোয়াবিয়া ও আলীর মধ্যে লড়াই হইয়াছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুনিয়া দেখিয়াছে, কাহার পক্ষে ফয়সালা দেওয়া হইয়াছে।
তাহাছাড়া তাঁহার মাতা আমার মাতার চাইতে নিঃসন্দেহে উত্তম ছিলেন। হযরত ফাতেমা বিনতে রাসূল (সা) আমার মাতার চাইতে অনেক গুণেই শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তাঁহার মাতামহও আমার মাতামহের চাইতে উত্তম ছিলেন। খোদার শপথ, আল্লাহ ও আখেরাতর উপর বিশ্বাসী কোন ব্যক্তিই অন্য কাহাকেও রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের চাইতে উত্তম অথবা তাহার সমকক্ষ বলিয়া বিশ্বাস করিতে পারেনা, কিন্তু হোসাইনের ইজতেহাদে ভুল হইয়াছে। তিনি এই আয়াত ভুলিয়া গিয়াছিলেন, আল্লাহ রাজত্বের মালিক, তিনি যাহাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন, যাঁহাকে ইচ্ছা রাজত্ব হইতে বঞ্চিত করেন। যাঁহাকে ইচ্ছা সম্মান দেন, যাহাকে ইচ্ছা অপদস্থ করেন। তাঁহার হতেই মঙ্গল, তিনি সব কিছুর উপর মহাশক্তিমান।– (কোরআন)
অতপর আহলে বায়তের সম্মানিত মহিলাগণকে ইয়াযিদের অন্তঃপুরে প্রেরণ করা হইল। অন্তঃপুরবাসিনীগণ তাহাদিগকে এইরূপ দুরাবস্থায় দেখিয়া আত্মহারা হইয়া রোদন করিতে লাগিলেন।
প্রতিকারের চেষ্টা
কিছুক্ষণ পর ইয়াযিদ অন্তঃপুরে আসিলে ফাতেমা বিনতে আলী (রা) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়াযিদ, রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের কন্যাগণ কি এই পরিবারের বাঁদীতে পরিণত হইবেন? ইয়াযিদ বলিলেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্রী! এইরূপ কেন ভাবিতেছ? ফাতেমা বলিলেন, খোদার শপথ, আমাদের কানের একটি বালিও অবশিষ্ট রাখা হয় নাই।
ইয়াযিদ বলিলেন, তোমাদের যে পরিমাণ ক্ষতি হইয়াছি আমি তাহার দ্বিগুণ দিব। তত্পর যে যাহা বলিলেন, তাহার দ্বিগুণ তিন গুণ দেওয়া হইল। তারপর হইতে ইয়াযিদ প্রত্যহ খাওয়ার সময় হযরত যয়নুল আবেদীনকে সঙ্গে লইয়া খাইতে বসিতেন। একদিন তিনি হযরত হোসাইনের শিশুপুত্র আমরকেও ডাকিয়া নিলেন। খাইতে বসিয়া স্বীয় পুত্র খালেদকে দেখাইয়া আমরকে জিজ্ঞেস করিলেন, “তুমিও কি উহার সহিত লড়াই করিবে?“
অবুঝ শিশু বলিয়া উঠিল : “এই কথা নয়, আমার হাতে একটি ছোরা এবং উহার হাতে একটি ছোরা দিয়া দেখুন কেমন লড়াই শুরু করি।”
ইয়াযিদ হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিলেন এবং আমরকে কোলে তুলিয়া লইয়া বলিলেন- “সাপের বাচ্চা সাপই হইয়া থাকে।
ইয়াযিদ আহলে বায়তকে কিছুদিন মেহমানের যত্নে রাখিলেন। সর্বদা দরবারে তাহাদের আলোচনা করিতেন এবং বলিতেন : কি ক্ষতি ছিল, যদি আমি কষ্ট স্বীকার করিয়া হোসাইনকে আমার ঘড়ে ডাকিয়া আনিতাম, তাঁহার দাবীদাওয়া সম্পর্কে ভাবিয়া দেখিতাম, ইহাতে আমার শক্তি যদি কিছুটা খাটোও হইয়া যাইত, তথাপি অন্ততঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সম্পর্কের মর্যাদা তো রক্ষা হইত। ইবনে যিয়াদের উপর আল্লাহর অভিশাপ, হোসাইনকে সে যুদ্ধ করিতে বাধ্য করিয়াছে। হোসাইনতো আমার সাথে বোঝাপড়া করিতে সম্মত অথবা মুসলমানদের সীমান্ত পার হইয়া জেহাদ করিতেও প্রস্তুত হইয়াছিলেন, কিন্তু ইবনে যিয়াদ তাঁহার কোন কথাই মানিল না, তাঁহাকে হত্যা করিয়া ফেলিল। তাঁহাকে হত্যা করিয়া আমাকে সে সমগ্র জাতির সম্মুখে অভিশপ্ত করিয়া দিল। খোদার অভিশাপ ইবনে যিয়াদের উপর! খোদার অভিশাপ ইবনে যিয়াদের উপর!!
আহলে বায়তের বিদায়
আহলে বায়তকে মদীনার পথে বিদায় দেওয়ার সময় ইয়াযিদ হযরত যয়নুল আবেদীনকে আবার বলিলেন, “ ইবনে যিয়াদের উপর খোদার উপর অভিশাপ! আল্লাহর শপথ, আমি যদি হোসাইনের সম্মুখে থাকিতাম, তবে তিনি যে কোন শর্ত পেশ করিতেন, আমি তাহাই মঞ্জুর করিয়া নিতাম। আমি যে কোন সম্ভাব্য উপায়ে তাঁহার জীবন রক্ষা করার চেষ্টা করিতাম। এইরূপ করিতে যাইয়া আমার কোন পুত্রের জীবন নাশ করিতে হইলেও দ্বিধা করিতাম না, কিন্তু যাহা ঘটিয়াছে, বোধহয় তাহাই আল্লাহর ইচ্ছা ছিল। দেখ, আমার সহিত সর্বদা পত্রালাপ করিও। যে কোন প্রয়োজন মুহূর্তে আমাকে খবর দিও।”
আহলে বায়তের বদান্যতা
আহলে বায়তকে ইয়াযিদ বিশ্বস্ত লোক ও সৈন্য সমভিব্যহারে মদীনায় প্রেরণ করিয়াছিলেন। কাফেলার সরদার সমগ্র পথে এই সম্মানিত পরিবারের সহিত নিতান্ত সম্ভ্রমপূর্ণ ব্যবহার করেন। মদীনায় পৌছার পর হযরত যয়নব বিনতে আলী ও হযরত ফাতেমা বিনতে হোসাইন হাতের কঙ্কণ খুলিয়া সেই ব্যক্তির নিকট প্রেরণ করিলেন এবং বলিয়া পাঠইলেন, “ তোমার সত্কর্মের এই পুরস্কার। আমাদের নিকট ইহার চাইতে বেশী কিছু নাই যে তোমাকে দান করিব।” লোকটি অলঙ্কার ফেরত দিয়া বলিল, আমি দুনিয়ার পুরস্কারের লোভে আপনাদের সেবা করি নাই। আল্লাহর রাসূলকে স্মরণ করিয়াই এই সেবা করিয়াছি।
মদীনায় মাতম
আহলে বায়তের মদীনায় পৌছার বহু পূর্বেই এই হৃদয়বিদারক খবর মদীনায় পৌছিয়া গিয়াছিল। বনী হাশেমের অন্তঃপুরবাসিনীগণ পর্যন্ত এই খবর শুনিয়া বিলাপ করিতে করিতে পথে বাহির হইয়া আসিতেন। হযরত আকীল ইবনে আবু তালেব-কন্যা সকলের অগ্রে অগ্রে আসিতেছিলেন এবং বলিতেছিলেন :
“নবী যখন তোমাদিগকে প্রশ্ন করিবেন, তখন কি জবাব দিবে? হে আমার শেষ উম্মত, তোমরা আমার পরে আমার আওলাদ ও খান্দানের সহিত কি ব্যবহার করিয়াছিলে? ইহাদের কতক বন্দী হইলেন আর কতক রক্ত-স্নাত হইয়া পড়িয়া রহিলেন।”
মর্সিয়া
হযরত হোসাইনের শাহাদাতের শোকবহ ঘটনা স্মরণ করিয়া অনেকেই মর্সিয়া রচনা করেন। সোলায়মান ইবনে কাত্তানের মর্সিয়াই সমধিক প্রসিদ্ধ লাভ করিয়াছিল :
“খান্দানে মোহাম্মদ (সা) এর গৃহের নিকট দিয়া আমি যাইতেছিলাম, তাঁহারা এমন করিয়া আর কখনই ক্রন্দন করেন নাই, যেমন কাঁদিলেন যেদিন তাঁহাদের মর্যাদায় হস্তক্ষেপ করা হইল।”
“খোদা ইহাদের গৃহ ও তাহার অধিবাসীদের বিচ্ছিন্ন না করুন, যদিও এখন গৃহগুলি অধিবাসী হইতে শূন্য হইয়া পড়িয়া আছে।”
“কারবালায় হাশেমী বীরদের শাহাদাত মুসলিম দুনিয়ার মস্তক হেঁট করিয়া দেয়াছে।”
“এই নিহতদের উপর দুনিয়ার আশা-ভরসা বাঁধা ছিল, কিন্তু সেই আশা-ভরসা আজ বিপর্যয়ে রূপান্তরিত হইয়াছে। হায়, এই বিপদ কত কঠিন! তোমরা কি দেখ না হোসাইনের বিচ্ছেদে ভূমি পর্যন্ত কেমন রুগ্ন হইয়া গিয়াছে। ভূমি কম্পন করিতেছে, তাঁহার বিরহে আকাশও রোদন করিতেছে, আকাশের সেতারারাও মাতম করিতেছে এবং সালাম প্রেরণ করিতেছে।”

About মাওলানা আবুল কালাম আযাদ