মাওলানা মওদুদী (র)

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

হিজরত আন্দোলনও মাওলানা মওদূদী

খেলাফত আন্দোলন ব্রিটিশের অনমনীয় মনোভাব লক্ষ্য করে ভারতের আলেম সমাজ ঘোষণা করেন যে, ভারত ‘দারুল হরব’ এবং এখান থেকে হিজরত করা মুসলমানের দ্বীনী দায়িত্ব। ১৯২০ সালে মাওলানা আবুল কালাম আযাদ রাঁচী জেল থেকে মুক্তি লাভ করার পর হিজরত আন্দোলন শুরু করেন।

সে সময়ে আফগানিস্তানের বাদশাহ আমীর আমানুল্লাহ খান এক জনসভায় বলেন যে, ভারতীয় মুসলমান হিজরত করে আফগানিস্তান চলে যেতে পারে। মাওলানা আযাদের কথায় মুসলমানগণ চক্ষু বন্ধ করে হিজরতের জন্যে ব্যাকুল হয়ে পড়েন। হিজরত কমিটি গঠিত হয় এবং দিল্লীতে দস্তুর মতো তার দফতর কায়েম করা হয়। হাজার হাজার ধর্মভীরু মুসলমানপরিবার নামমাত্র মূল্যে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে হিজরত কমিটির দফতরে পৌঁছতে থাকেন। শুধু আগস্ট মাসেই আঠারো হাজার লোক হিজরত করে আফগান সীমান্ত অতিক্রম করে। প্রায় পাঁচ লক্ষ মুসলমান হিজরতের নামে তাদের বহু মূল্যবান সম্পদ হাতছাড়া করে।

মওদূদী ভ্রাতৃদ্বয় (আবুল আ’লা মওদূদী ও তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আবুল খায়ের মওদূদী) হিজরতের উদ্দেশ্যে দিল্লী হিজরত কমিটির দফতরে হাজির হন। মাওলানার জনৈক পরিচিত বন্ধু মিঃ তোজাম্মেল হোসেন ছিলেন সেক্রেটারী। তার সাথে মাওলানার দীর্ঘ আলোচনা হয়। আলোচনায় মাওলানা জানতে পারেন যে, হিজরতের পশ্চাতে কোন সুচিন্তিত ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা বা স্কীম নেই। শত সহস্র লোক আফগানিস্তানে চলে যাচ্ছেন, অথচ আফগান সরকারের সাথে এ ব্যাপারে কোনই আলাপ-আলোচনা করা হয়নি। হিজরতের ব্যাপারে মুফতী কেফায়েতুল্লাহ, মাওলানা আহমদ সাঈদ প্রমুখ জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের নেতৃবৃন্দ পরম আগ্রহী ছিলেন। মাওলানা মওদূদী (বালক মওদূদী) তাঁদের সাথে সাক্ষাত করে বলেন যে, কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা ব্যতিরেকে হিজরত অবাস্তব ও ক্ষতিকর হবে। তাঁরা ত্রুটি স্বীকার করেন এবং বালক মওদুদীকে এ বিষয়ে পরিকল্পনা পেশ করতে অনুরোধ জানান।

মাওলানা মওদূদী প্রস্তাব করেন যে, সর্বপ্রথম আফগান সরকারের সাথে আলোচনা করে এ কথা জেনে নেয়া যাক যে, ভারত থেকে হিজরতকারীগণের পুনর্বাসনের ইচ্ছা তাঁদের আছে কিনা এবং থাকলে তার পদ্ধতি ও কর্মসূচী কি হবে। অতঃপর দিল্লীস্থ আফগান রাষ্ট্রদূতের সাথে সাক্ষাত করে জানা গেল যে, তাঁরা ইতোমধ্যেই এ নিয়ে বিব্রত হয়ে পড়েছেন। যারা ভারত থেকে চলে গেছেন তাঁদেরকে বিদায় করে দিতে সরকার যদিও দ্বিধাবোধ করছেন, কিন্তু তাদের ব্যয়ভার বহন করা সরকারের সাধ্যের অতীত হয়ে পড়েছে। এরপর হিজরত পরিকল্পনার অকাল মৃত্যু ঘটে।

কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা ব্যতিরেকে শুধুমাত্র ধর্মীয় ভাবপ্রবণতার বশবর্তী হয়ে তদানীন্তন আলেম সমাজ হিজরতের ফতোয়া দিয়ে কয়েক লক্ষ মুসলমানকে নিঃস্ব বাস্তুহারায় পরিণত করেন। মাওলানা মওদূদীর দূরদর্শিতা ও সময়োচিত হস্তক্ষেপের ফলে আরও কয়েক লক্ষ মুসলমান বিপদ থেকে বেঁচে যান।

বালক মওদূদীর এ অসাধারণ প্রতিভা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও দূরদর্শিতা মাওলানা মুহাম্মদ আলী ও জমিয়ত নেতৃবৃন্দকে স্তস্তিত ও আকৃষ্ট করে। যার ফলে তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণে বালক মওদূদীকে বারবার অনুরোধ জানান।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মওদূদী

তাজুদ্দীন নামক মধ্য প্রদেশের জনৈক মহৎ ব্যক্তি উপরে বর্ণিত ‘আনজুমানের প্রাণস্বরূপ ছিলেন। তিনি জব্বলপুর থেকে ‘তাজ’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং তাঁরই একান্ত অনুরোধে মওদূদী ভ্রাতৃদ্বয় উক্ত পত্রিকার সম্পাদনা-ভার গ্রহণ করেন। সেকালে পত্রিকার প্রকাশনা অতি দুস্কর ছিল। ফলে কিছুকাল পর ‘তাজের’ প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর মওদূদী ভ্রাতৃদ্বয় জব্বলপুর থেকে দিল্লী চলে যান। এ সময়ে মাওলানা মওদূদী সাংবাদিকতার প্রতি এতখানি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি ইংরেজী ভাষা শিক্ষা করতে বাধ্য হন। অতঃপর জনৈক মুহাম্মদ ফাযেলের নিকট তিনি ইংরেজী শিখতে আরম্ভ করেন। ইংরেজীর প্রাথমিক পুস্তকাদি পাঠ না করে প্রথমেই তিনি তৎকালীন ম্যাট্রিকুলেশন মানের পুস্তকাদি পড়তে শুরু করেন। অসাধারণ মেধাশক্তির বলে মাত্র ছ’মাসের মধ্যে তিনি ইংরেজীতে এতখানি জ্ঞান লাভ করেন যে, যে কোন ইংরেজী সংবাদপত্র অথবা পুস্তক পাঠ করলে মোটামুটি তার মর্ম উপলব্ধি করতে পারতেন। দু’বছর যাবৎ তিনি ইংরেজী ভাষা অধ্যয়ন করেন। শিক্ষকের সাহায্য ব্যতিরেকেই তিনি বিভিন্ন গ্রন্থাদি শুধু অভিধানের সাহায্যে অধ্যয়ন করে প্রভূত জ্ঞান সঞ্চয় করতে থাকেন।

জনাব তাজুদ্দীন পুনরায় জব্বলপুর থেকে ‘তাজ’ প্রকাশ করে মাওলানাকে তার সম্পাদনা-ভার অর্পণ করেন। মাওলানার প্রচেষ্টায় ‘তাজ’ সাপ্তাহিক পত্রিকা থেকে একটি বিশিষ্ট দৈনিকে পরিণত হয়। এ সময় থেকে তিনি রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে পড়েন। জব্বলপুরে সেকালে মুসলমানদের নেতৃত্ব দেয়ার কেউ ছিল না। তাই মাওলানাকে বিভিন্ন জনসভায় বক্তৃতা করে মুসলমানদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে হয়েছিল।

জব্বলপুরে অবস্থানকালে মাওলানার মধ্যে আত্মনির্ভলশীলতা, কর্তব্যনিষ্ঠা দায়িত্বজ্ঞান প্রভৃতি সদগুণাবলীর বিকাশ ঘটে। এ সময়ে সম্পূর্ণ নিজের উপর নির্ভর করে তিনি বিরাট গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পারতেন। কিন্তু জব্বলপুরেও তার অধিক দিন থাকা সম্ভব হলো না। ‘তাজের’ একটা সম্পাদকীয় প্রবন্ধের জন্য সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারের রোষানল প্রজ্জ্বলিত হয়। ‘তাজের’ সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রকাশকের বিরুদ্ধে সরকার মামলা দায়ের করেন। কিন্তু ঘোষণাপত্রে তাজুদ্দীন সাহেব স্বয়ং উক্ত পত্রিকার একাদিক্রমে সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক থাকায় মাওলানা মামলা থেকে অব্যাহতি পান। কিন্তু এজন্য তাঁর বিবেক তাঁকে দংশন করতে থাকে। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, এখন থেকে অপরের অধীনে কোন দায়িত্বপূর্ণ কাজ তিনি গ্রহন করবেন না। সকল গুরুদায়িত্ব নিজ স্কন্ধে বহন করে কাজ করবেন বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেন।

ঊনিশ শ’ বিশ সালের শেষভাগে তিনি দিল্লী যান। ১৯২১ সালের প্রথম দিকে মাওলানা মুফতী কেফায়েতুল্লাহ ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা আহমদ সাঈদের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁরা জমিয়তের পক্ষ থেকে ‘মুসলিম’ নাম দিয়ে একটা পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং মাওলানা মওদূদীর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে তার সম্পাদক নিযুক্ত করেন। ১৯২৩ সাল পর্যন্ত পত্রিকাটি সুচারুরূপে চলতে থাকে এবং মাওলানা শেষ পর্যন্ত তার সম্পাদনা করেন।

ঊনিশ শ’ ষোল সাল থেকে একুশ সাল পর্যন্ত পাঁচ-ছয় বছরকাল মাওলানাকে বিরাট অগ্নিপরীক্ষার ভেতর দিয়ে চলতে হয়। পিতার দুরারোগ্য ব্যাধি, জীবিকার্জনের নিষ্ঠুর তাড়না, সহায়হীনতা প্রভৃতি কারণে মাওলানা যথোপযুক্ত জ্ঞান সঞ্চয়ের সুযোগ পাননি। ১৯২১ সাল থেকে দিল্লীতে নিশ্চিত মনে তিনি সংবাদপত্র পরিচালনা ও অবসর সময়ে জ্ঞানার্জনে মন দেন। বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী উলামায়ে কেরামের নিকট আরবী সাহিত্য, হাদীস, তাফসীর ফেকাহ, মানতেক (তর্কশাস্ত্র), দর্শন প্রভৃতি অধ্যয়ন করে গভীর পাণ্ডিত্য লাভ করেন।

মাওলানা আব্দুস সাত্তার নিয়াযী ছিলেন তৎকালীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীন। কুরআন, হাদীস ও আরবী ভাষায় তাঁর গভীর জ্ঞান-গরিমা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তিনি আমল আখলাকে ছিলেন একেবারে দরবেশ। সাইয়েদ মওদূদী প্রতিদিন ফজর নামাযের পূর্বে এক ঘন্টা করে তাঁর কাছে আরবী ব্যাকরণ (নাহু ও সারফ), মা’কুলাত, মায়ানী ও বালাগাত শিক্ষা লাভ করেন।

অতঃপর ১২ই জানুয়ারী (১৯২৬) বাইশ বছর বয়সে সাইয়েদ মওদূদী দিল্লীর দারুল উলুম ফতেহপুরীর শিক্ষক মাওলানা মুহাম্মদ শরীফুল্লাহ খানের নিকট থেকে ‘উলুমে আকলিয়া ও আদাবিয়া ও বালাগত’ এবং ‘উলুমে আসলিয়া ও ফরুইয়া’ বিদ্যার সনদ হাসিল করেন।

পরবর্তী বছর (১৯২৭) উক্ত দারুল উলুমের শিক্ষক মাওলানা আশফাকুর রহমান কান্ধলভীর কাছে থেকে সাইয়েদ আবুল আ’লা হাদীস, ফেকাহ ও আরবী আদবে সনদ হাসিল করেন।

উপরন্তু ১৯২৮ সালে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী মাওলানা আশফাকুর রহমান কান্ধলভীর কাছে থেকে জামে তিরমিষী ও মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেকের সমাপ্তির সনদ হাসিল করেন।

উল্লেখ্য, মাওলানা শরীফুল্লাহ খানের কাছে মাওলানা মওদূদী তাফসীরে বায়যাবী, হেদায়া, ইলমে মায়ানী ও বালাগতও শিক্ষা করেন।

এভাবে সাত-আট বছর দিল্লী অবস্থানকালে সাংবাদিকতার সাথে সাথে অসাধারণ মেধাশক্তি ও প্রজ্ঞাবলে মাওলানা মওদূদী তাঁর শিক্ষাজীবনের অসমাপ্ত শিক্ষা সমাপ্ত করেন এবং আরবী ভাষা, হাদীস, তাফসীর, ফেকাহ প্রভৃতিতে গভীর পাণ্ডিত্য লাভ করেন।

ঊনিশ শ’ তেইশ সালে ‘মুসলিম’ ব্ন্ধ হওয়ার পর মাওলানা মওদূদী হায়দারাবাদ রওয়ানা হন। কিন্তু পথিমধ্যে ভূপালে যাত্রা ভঙ্গ করে সেখানে দেড় বছরকাল নিবিষ্টচিত্তে অধ্যয়নে রত হন। ১৯২৪ সালে তিনি পুনরায় দিল্লী গমন করেন। ওই সময়ে পাকভারতের সিংহপুরুষ মরহুম মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহরের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। মাওলানা মুহাম্মদ আলী তখন ‘হামদর্দ’ পত্রিকা পরিচালনা করছিলেন। তিনি তরুণ উদীয়মান সাংবাদিক মাওলানা মওদূদীকে উক্ত পত্রিকার কার্যভার গ্রহণ করতে অনুরোধ জানান।  ঠিক এই সময়ে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পক্ষ থেকে ‘আল জমিয়ত’ পত্রিকা প্রকাশ করার অভিপ্রায়ে মাওলানা আহমদ সাঈদ মাওলানা মওদূদীকে আহবান জানান। মাওলানা মুহাম্মদ আলীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও মওদূদীর স্বাধীন মন অন্যের অদীনতা স্বীকার বাধা দান করলো। অতএব তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ‘আল জমিয়ত’ পত্রিকার সম্পাদনা ভার গ্রহণ করাই সমীচীন মনে করলেন। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুষ্ঠূভাবে তিনি অর্ধ সাপ্তাহিক ‘আল জমিয়ত’ পরিচালনা করেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি বিভিন্ন বিষয়ের মূল্যবান গ্রন্থও রচনা করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশনা ‘আল জিহাদু ফিল ইসলাম’ এবং ‘দওলতে আসফিয়া ও হুকুমতে বরতানিয়া’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

‘আল জিহাদু ফিল ইসলাম’

মাওলানা মওদূদীর ‘আর জিহাদু ফিল ইসলাম’ গ্রন্থ প্রণয়নের কিছু ঐতিহাসিক পটভূমিকা আছে।

ইংরেজী ১৯২৬ সালের শেষ ভাগে শুদ্ধি আন্দোলনের প্রবর্তক ও নেতা স্বামী শ্রদ্ধানন্দ এক মুসলমান আততায়ীর হাতে নিহত হন। এর ফলে হিন্দু ভারত অতিমাত্রায় বিক্ষুদ্ধ হয়ে পড়ে। মুসলমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক অভিযান শুরু হয় হিন্দুদের পক্ষ থেকে। তারা প্রচার করেন যে, ইসলাম তার অনুগামীদেরকে নরহত্যায় উদ্বুদ্ধ করে। এমন কি মিঃ গান্ধী পর্যন্ত এক বিবৃতির মাধ্যমে মন্তব্য করেন যে, অতীতে তরবারীর সাহায্যেই ইসলাম প্রচারিত হয়েছে এবং বর্তমান কালেও তাই হচ্ছে। ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের প্রচারণা ভারতের আকাশ বাতাস মুখরিত করে তোলে এবং বিদেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা-হাঙ্গামার সূত্রপাত হয়। মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর এ সমস্ত ভিত্তিহীন এবং উস্কানীমূলক প্রচারণা বন্ধ করতে গিয়ে অতীব দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “আহা! আজ যদি ভারতে এমন কোন মর্তে মুজাহিদ আল্লাহর বান্দা থাকতো, যে তাদের এসব হীন প্রচারণার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে পারতো, তাহলে কতই না ভাল হতো!”

তরুণ মুজাহিদ মাওলানা মওদূদী জামে মসজিদের উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন। পূর্বেই বলা হয়েছে যে, এ সময়ে তিনি ‘আল জমিয়ত’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তাঁর মন-মস্তিস্ক এবং শিরায় শিরায় প্রবাহিত হলো জিহাদের অনুপ্রেরণা। তিনি হিন্দুভারত ও অন্যান্য ইসলাম-দুশমনদের জবা দেয়ার জন্য দৃঢ়-সংকল্প হলেন। অতঃপর ১৯২৭ সালের প্রথম থেকেই তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে “আল জিহাদু ফিল ইসলাম” শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশ করতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তা বিরাট গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়।

ডঃ ইকবাল গ্রন্থখানি সম্পর্কে নিম্নোক্ত মন্তব্য করেন-

“জেহাদ, যুদ্ধ ও সন্ধি সম্পর্কে ইসলামী আইন-কানুন সম্বলিত এ গ্রন্থখানা অভিনব ও চমৎকার হয়েছে। প্রত্যেক জ্ঞানী ও সুধী ব্যক্তিকে গ্রন্থখানি পাঠ করতে অনুরোধ করি।”

মাওলানার নিজ হাতে লেখা গ্রন্থখানি তাঁর আপন চরিত্রের উপরও কম প্রভাব বিস্তার করেনি। তিনি এ বিষয়ে নিম্নরূপ মন্তব্য করেন-

“এ গ্রন্থখানির দ্বারা আমি নিজে সর্বাপেক্ষা বেশী উপকৃত হয়েছি। গ্রন্থখানি রচনা করার সময়ে আমার অন্তরে দ্বীনী মর্যাদাবোধ অপেক্ষা জাতীয় মর্যাদাবোধের আবেগ অনুরাগ প্রবলতর ছিল। কিন্তু গ্রন্থ প্রণয়ন ও তৎসংক্রান্ত তথ্যানুসন্ধানকালে ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার আদেশ নিষেধগুলো সম্পর্কে মনোযোগ সহকারে পুঙ্খানুপুঙ্খ অধ্যয়ন করার সুযোগ আমার হয়েছিল। তার ফল এই হয়েছিল যে, আমার মনের মধ্যে কেবল মাত্র যে শরীয়তের বিধান সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান এবং তার সত্যতা সম্পর্কেই পূর্ণ প্রত্যয় (Conviction) জন্মেছিল তা নয় বরঞ্চ আল্লাহর শাসন-সংবিধানকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যে একটা অদম্য প্রেরণার উন্মেষও আমার মনের মধ্যে হয়েছিল। উপরন্তু এ বিষয়ে সংগ্রাম করার কর্মপদ্ধতিও আমি অবগত হয়েছিলাম। এরপর সাংবাদিকতার তদানীন্তন প্রচলিত পন্থা পরিত্যাগ করতে মনস্থ করলাম। এজন্যে ‘আল জমিয়ত’ পত্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলাম। তখন এরূপ সংকল্প করলাম যে, ভবিষ্যতে যদি কোনদিন সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করি, তবে একমাত্র এই শর্তে করব যে, তাকে ‘দ্বীনে হক’ প্রচারের অস্ত্র স্বরূপই ব্যবহার করব। এরপর দীর্ঘ পাঁচ বছর শুধু অধ্যয়ন ও জ্ঞান চর্চায় কাটিয়ে দিলাম।”

ঊনিশ শ’ আটাশ সালের পূর্বে মাওলানা মওদূদী জার্মান ভাষা শিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাস শিক্ষা করার পর তাঁর শিক্ষক দিল্লী থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ায় তাঁরা আশা অপূর্ণ থেকে যায়।

এ সময়ে ‘আল জমিয়ত’ পত্রিকার কর্তৃপক্ষ জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সাথে মাওলানার মৌলিক মতবিরোধ শুরু হয়। জমিয়তে উলামা ভারতীয় কংগ্রেসের অন্ধ সমর্থক হয়ে পড়েছিল। যে সময়ে মাওলানা মুহাম্মদ আলী প্রমুখ দেশবরেণ্য নেতৃবৃন্দ কংগ্রেসের একগুঁয়েমি , দ্বিমুখী নীতি ও ইসলাম বিরোধী মনোভাবের জন্য একে পরিত্যাগ করেছিলেন, সে সময়ে সেই কংগ্রেসের তল্পিবাহক হয়ে থাকা জমিয়তে উলামার মর্যাদার পক্ষে অত্যন্ত অশোভনীয় এবং তারই জন্যে ১৯২৮ সালে তিনি উক্ত পত্রিকার সম্পাদনা-ভার চিরদিনের জন্যে পরিত্যাগ করেন।

 

মাওলানার স্বাধীন জীবন

সাংবাদিকতা পরিত্যাগ করার পর মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী গ্রন্থ সংকলন ও রচনার কাজে আত্মনিয়োগ করতে মনস্থ করেন। কিন্তু যে সমস্ত বিষয়ে তাঁর গ্রন্থ রচনার কামনা ছিল, সে সম্বন্ধে তথ্যাদি সংগ্রহের জন্যে আবশ্যকীয় মূল্যবান গ্রন্থ দিল্লীতে দুষ্প্রাপ্য ছিল বলে তাঁকে পুনরায় হায়দারাবাদে চলে যেতে হয়। ১৯২৮ সালের আগষ্ট মাস পর্যন্ত সেখানে থাকেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি তারিখে আস-সলজুক (সলজুকীয় ইতিহাস) প্রণয়ন করেন এবং ইবনে খলকনের ইতিহাসেন ‘মিসরে ফাতেমীয় খলিফাগণ’ অংশের অনুবাদ করেন এবং আগষ্ট মাসেই অসুস্থ হয়ে দিল্লী চলে যান।

পূর্ণ আরোগ্য লাভ করতে কয়েক মাস লাগে। অতঃপর তিনি কয়েক মাস ভুপালে অবস্থান করে তাঁর বহু বাঞ্চিত “দাক্ষ্যিণাত্যের ইতিহাস” প্রণয়নের অবশ্যকীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করেন। ১৯৩১ সালের জুলাই মাসে তিনি আবার হায়দারাবাদ গমন করেন এবং উপরিউক্ত গ্রন্থ প্রণয়নের আত্মনিয়োগ করেন।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সাইয়েদ আবুল খায়ের মওদূদী পূর্ব থেকেই হায়দারাবাদে ছিলেন। তিনি “উসমানিয়া দারুওররমা”র সভ্য ছিরেন। মাওলানা মওদূদী হায়দারাবাদে ক’বছর স্বীয় ভ্রাতার সঙ্গেই বসবাস করেন।

ঊনিশ শ’ বত্রিশ সালে মাওলানা মওদূদী উসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দারুত্তরজমার (Department of Translation)- পক্ষ থেকে আল্লামা সদরুদ্দীন সিরাজীর “আলআসফারুল আরবায়া” নামক আরবীগ্রন্থের অনুবাদ করেন। বইটি আরবী ভাষায় দর্শন শাস্ত্রের একটি অতি জটিল গ্রন্থ।

আরবী গ্রন্থখানির পূর্ণ নাম ছিল “আলহিকমাতুল মুতাআলিয়া ফি আসফারিল আকলীয়া”। কিন্তু আরবী ভাষাবিদগণের নিকটে তা শুধু ‘আসফারুল আরিবায়া’ নামেই খ্যাত ছিল। আরভী ভাষার সুপণ্ডিতগণ মন্তব্য করেছেন যে, গ্রন্থখানি এত জটিল ও কঠিন ছিল যে, তার অনুবাদ করা তো দূরের কথা, বিশুদ্ধভাবে তা পাঠ করার লোকও সেকালে সমগ্র ভারতে পাঁচ-দশজনের বেশী ছিল না।

যা হোক গ্রন্থখানির সার্থক এবং সন্তোষজনক অনুবাদের জন্যে অনুবাদ বিভাগ থেকে মাওলানাকে মোটা অংকের পারিশ্রমিক দেয়া হয়।

এ অনুবাদলব্ধ বিরাট অর্থ মাওলানার প্রতিভা বিকাশের সহায়ক হয়। অর্থ হাতে পেয়ে মাওলানা তা দিয়ে “ENCYCLOPAEDIA BRITANICA” -এর সমূদয় খণ্ডগুলো ক্রয় করেন। শুধু তাই নয় এ অর্থের একটা মোটা অংশ তাঁর পরবর্তীকালে প্রকাশিত “তর্জুমানুল কোরআনের” জন্যে নির্দিষ্ট করে রাখেন এবং বাকী অংশের দ্বারা হাদীস, তাফসীর, ফেকাহ ও অন্যান্য মূল্যবান গ্রন্থ খরিদ করেন।

মাওলানার সংগ্রামী জীবন

ইংরেজী ১৯৩২ সাল থেকে মাওলানা মওদূদীর জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আধুনিক ধ্বংসোন্মুখ জগতের বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট মানব সমাজকে একটা বিজ্ঞানসম্মত সরল ও সুষ্ঠু পথের সন্ধান দেবার জন্যেই মাওলানা তাঁর সারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তা কোন জ্ঞানী এবং সুস্থ বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তি অস্বীকার করতে পারে না। সত্য কথা বলতে কি, তাঁর জীবনব্যাপী সাধনা পাপতাপ দগ্ধ জগতের বুকে বলিষ্ঠ ইসলামী আন্দোলন এবং মানব সমাজের একটা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিপ্লবেরই শুভ সূত্রপাত করেছে।

ঊনিশ শ’ বত্রিশ সালে মাওলানা দাক্ষিণাত্যের হায়দারাবাদ থেকে “তর্জুমানুল কোরআন” নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করেন। তখন থেকেই তিনি পৃথকভাবে বসবাস শুরু করেন। মুয়ায্যামশাহী মার্কেটের সন্নিকটে একটি দোতলা বাড়িতে একজন কর্মচারী নিয়ে সেখান থেকে উক্ত পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন। তিনি তখনও ছিলেন অবিবাহিত।

একটি পত্রিকা প্রকাশ করা যেমন কথা নয়। এর জন্য প্রয়োজন আর্থিক স্থিতিশীলতা। কিন্তু বলতে কি, তাঁর কোন আর্থিক সঙ্গতিই ছিল না। না ছিল সহায়-সম্পদ, না পৈত্রিক বাড়ী-ঘর, আর না কোন নিয়মিত মাসিক আয়-উপায়। এ নিয়ে তাঁর বড় ভাইয়ের সঙ্গে অনেক আলাপ-আলোচনা হয়। এমন আর্থিক দৈন্যের ভেতর দিয়ে একটা মাসিক পত্রিকা প্রকাশের সংকল্পের কথা শুনে বড় ভাই বিচলিত হন। তিনি অবশেষে উসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ গ্রেডের একটি প্রফেসারীর পদ মাওলানার জন্যে সংগ্রহ করে তাঁকে পত্রিকা প্রকাশের দুঃসাহস ও ঝুঁকি থেকে বিরত থাকতে বলেন। বড় ভাই ছোট ভাইকে এ বিষয়ে সম্মত করার জন্য ছ’ঘন্টা ধরে বুঝাতে থাকেন। এরপরও মাওলানা ধীর গম্ভীর স্বরে বড় ভাইয়ের নিকট আবেদন জানান-

“আর সময় নষ্ট করা যেতে পারে না। আমার দৃঢ় প্রত্যয় আছে যে, যদি আমার কথায় আন্তরিকতা থাকে, তা হলে আমার অনুপ্রেরণা বিফলে যাবে না।”

তিনি আরও বলেন, “অবস্থা বড়ই সঙ্গিন হয়ে পড়েছে। আমি দেখতে পাচ্ছি যে, প্লাবন আসতে আর বিলম্ব নেই। এ প্লাবন ১৮৫৭ সালের ইংরেজ শাসনের প্লাবন থেকে বেশী মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক হবে। এ বিপদ থেকে মুসলমানদেরকে সাবধান করে দেয়া আমি আমার কর্তব্য মনে করি। আমার সাধ্যমত তাদের কোন না কোন খেদমত করার চেষ্টা আমি করব।”

ছোট ভাইয়ের অকাট্য যুক্তি ও অটুট মনোবল দেখে বড় ভাই নিরস্ত হলেন। উসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লোভনীয় মোটা বেতনের চাকরির লোভ সংবরণ করে মাওলানা মওদূদী পত্রিকার মাধ্যমে জাতির খেদমতে আত্মনিয়োগ করলেন। লেখনীর মাধ্যমে একটা বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা করলেন।

এটা অবশ্য অনস্বীকার্য যে, কোন আদর্শভিত্তিক আন্দোলন বিজ্ঞানসম্মত প্রণালীতে পরিচালিত করতে হলে প্রধানত তিনটি বিষয়ের একান্ত প্রয়োজন হয়।

প্রথমত, যে বিষয়ের আন্দোলন করতে হয়, সে সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান ও দৃঢ় প্রত্যয় একং আন্দোলন পরিচালনা করার বিজ্ঞানসম্মত কর্মপন্থা আয়ত্ত করতে হয়।

দ্বিতীয়ত, যে আদর্শ প্রচারিত হবে, একদিকে তারই ভিত্তিতে স্বীয় চরিত্র গঠন করতে হয় এবং অপরদিকে তা মানবসমাজে প্রচার করতে হয়।

তৃতীয়ত, উক্ত আদর্শে পূর্ণ চরিত্রবান কতিপয় ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি জামায়াত বা দল গঠন করে সে আদর্শ রূপায়ণের জন্য জীবন-মরণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়।

যে কোন আন্দোলনকে সফলকাম করার এটাই হচ্ছে একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত সুষ্ঠু পন্থা। মাওলানা মওদূদীর জীবনকেও আমরা এই তিন ভাগে বিভক্ত দেখতে পাই।

প্রথমত, শৈশবকল থেকে ১৯৩২ সালের পূর্ব পর্যন্ত-এ সুদীর্ঘকাল তাঁর ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন, কোরআন-হাদীস, ফেকাহ, জেহাদ, যুদ্ধ ও সন্ধি, ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ, বৈদেশিক ও আন্তর্জাতিক নীতি প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে কেটে যায়। তাছাড়া তিনি আধুনিক জগতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথেও পরিচিত হন।

অতঃপর ১৯৩২ সালে তাঁর জীবনের দ্বিতীয় স্তর শুরু হয়। এসময় তিনি “তর্জুমানুল কোরআন” নামক মাসিক পত্রিকার মাধ্যমে ইসলামী আদর্শ মানব সমাজে তুলে ধরেন।

তৃতীয় স্তরে অর্থাৎ ১৯৪১ সালে কতিপয় আদর্শবান ও চরিত্রবান লোকের সমন্বয়ে একটা ইসলামী জামায়াত বা দল গঠিত হয়। এ দলটি ১৯৭১ সাল পর্যন্ত গোটা ভারত-পাকিস্তানে এবং একাত্তরের পর থেকে অবশিষ্ট পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে বিশিষ্ট কর্মপন্থা অনুযায়ী একটানা ইসলামী আন্দোলন পরিচালনা করে আসছে। এই দলটিই ‘জামায়াতে ইসলামী”  নামে অভিহিত। পাকিস্তানে ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর সামরিক শাসন জারী হওয়ার পর অন্যান্য দলের ন্যায় এটাকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৯৬২ সালের থেকে পুনরায় জামায়াত কাজ শুরু করে।

যা হোক, ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত ও প্রকাশিত মাসিক “তর্জুমানুল কোরআন” এ যাবত নিয়মিত সুচারুরূপে চলে আসছে। এই পত্রিকাটির মাধ্যমে তিনি দেশ ও জাতিকে যে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন এবং ১৯৪১ সালের প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর মাধ্যমে পাহাড়ের মত অটল অচল ইসলামের কিছু সাচ্চা সৈনিক যে তিনি তৈরি করেছেন, তা কারো কাছে অজানা নেই।

মাওলানার সত্যানুসন্ধিৎসা ও বিপ্লবী চিন্তাধারা একটা বিপ্লবেরই ঘোষণা করছিল এবং সে বিপ্লব ছিল পূর্ণ ইসলামী, সামাজিক, অর্থনৈ তিক, রাজনৈতিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক। তিনি পরিপূর্ণরূপে উপলব্ধি করেছিলেন যে, তাঁর অবলম্ব্তি পথ কন্টকাকীর্ণ, বিপদ-সংকুল ও নিঃসঙ্গ। তবু সত্যের আহ্বান তাঁকে পাগল করেছিল। একাধারে পাশ্চাত্য ধর্মহীন পুঁজিবাদী সভ্যতা মানব সমাজকে নিষ্পেষিত করছে এবং তারই প্রতিক্রিয়াস্বরূপ অপরদিকে কমিউনিজম বা সাম্যবাদের মায়া-মরীচিকা মানবের মৌলিক অধিকার হরণ করে তাঁকে পশুর খোঁয়াড়ে আবদ্ধ করছে। ইসলামী শিক্ষাবিবর্জিত মুসলমান কওম মানসিক বিভ্রান্তির প্লাবনে ভেসে চলেছে। ঠিক এ সংকট সন্ধিক্ষণেই মাওলানা মওদূদী কোরআনে করীম ও সুন্নাতের রাসূলের মশাল জ্বালিয়ে মানুষকে সত্য পথের দিকে আহ্বান জানালেন। তাঁর পরিস্কার জানা ছিল, এ পথ নয় কুসুমাস্তীর্ণ, বরঞ্চ অতি বন্ধুর, অতি বিপদ-সংকুল। তবু এ পথেই তিনি ছুটেছিলেন নির্ভীক চিত্তে। প্রথমত, বন্ধু-বান্ধব উপহাস করলো পাগল বলে। আত্মীয়০-স্বজন দূরে সরে দাঁড়ালো হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সহযাত্রীগণ থমকে গেল পথিমধ্যে। কিন্তু থেমে গেল না তাঁর যাত্রা। মন্দীভূত হলো না তাঁর গতি, দমে গেলো না তাঁর হৃদয়-মন।

আল্লাহর পথে জিহাদ

মাওলানা তাঁর প্রথম প্রকাশনা “আল জিহাদু ফিল ইসলাম’ গ্রন্থের মাধ্যমেই আল্লাহর পথে জেহাদ শুরু করেন। এ হলো লেখনীর দ্বারা জেহাদ শুরু করেন। এ হলো লেখনীর দ্বারা জেহাদ।

গ্রন্থখানার বিষয়বস্তু সম্পর্কে আলোচনা এখানে সম্ভব নয়। এটা তাঁর প্রাথমিক জীবনে প্রণীত হলেও এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাঁর যে গভীর পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যায়, তা ভূমিকাদৃষ্টেই বেশ উপলব্ধি করা যায়। তাঁর খোদাভীতি, খোধাপ্রেম এবং ইসলামের বিজয় গৌরব ও প্রাধান্য বিস্তারের অদম্য অনুপ্রেরণার পরিচয় এ গ্রন্থের প্রতি পৃষ্ঠায় মূর্ত উঠেছে। তিনি গ্রন্থখানির প্রথম সংস্করণে যে ভূমিকা লিপিবদ্ধ করেন, পাঠকগণের অবগতির জন্য তা উদ্ধৃত করছিঃ

“আধুনিক যুগে ইউরোপ রাজনৈতিক স্বার্থের খাতিরে ইসলামের প্রতি যে সব মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অপবাদ আরোপ করেছে, তার মধ্যে মারাত্মক অপবাদ এই যে, ইসলাম এটা রক্তক্ষয়ী ধর্ম এবং এটা তার অনুসারীদেরকে রক্তমন্ত্রে দীক্ষিত করে। এ সকল অপবাদের মূলে যদি কোন সত্য নিহিত থাকতো, তাহলে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভাবে তা ঠিক ঐ সময়েই আরোপিত হত, যখন মুসলমানদের দিগবিজয়ে দুনিয়া কেঁপে উঠেছিল। প্রকৃতপক্ষে সেই সময়েই এ ধরণের সন্দেহের উদ্রেক হতে পারতো যে, উক্ত বিজয়-অভিযান রক্তক্ষয়ী ধর্মীয় শিক্ষারই পরিণাম ফল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ইসলামের গৌরব-রবি অস্তমিত হওয়ার বহুকাল পরে উক্ত অপবাদ উত্থাপিত হয়েছে। অপবাদের এই স্বকল্পকল্পিত প্রতিমায় এমন এক সময়ে আত্মা ফুৎকারিত হয়, যখন ইসলামের তরবারি ভোঁতা হয়ে পড়েছে। পক্ষান্তরে ঠিক সেই সময়ে ইউরোপের নগ্ন তরবারি নিষ্পাপ মানব সন্তানের তাজা রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল। বিরাটকায় অজগর যেমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীব-জন্তুকে দংশন ও গলধঃকরণ করে, ইউরোপও তেমনি সে সময়ে দুর্বল জাতিগুলোকে টপাটপ গিলে ফেলছিল। সেকালে জগতে যদি কারো কণামাত্রও শুভবুদ্ধির উদয় হতো, তা হ’লে অবশ্যই প্রশ্ন উঠত যে, যারা স্বয়ং দুর্বলের তাজা রক্তের পৃথিবীতে রক্তের নদী প্রবাহিত করছে এবং অন্যান্য জাতির প্রতি দস্যুবৃত্তি করছে, ইসলামের প্রতি দোষারোপ করার কোন অধিকার কি তাদের আছে? বরঞ্চ তারা নিজেরাই ছিল সে দোষে দোষী। তাদের যাবতীয় ইতিহাস মন্থন ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিতর্কের পশ্চাতে এরূপ দুরভিসন্ধিই কি ছিল না যে, জগতের ঘৃণা ও ক্রোধের যে প্রবল বন্যা তাদের দিকে প্রবাহিত হওয়ার  উপক্রম হয়েছিল, তার গতিবেগ ইসলামের দিকে প্রবাহিত করবে? কিন্তু মানবের এ এক স্বাভাবিক দুর্বলতা যে, যখন সে যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয় বরণ করে, তখন সে শিক্ষাক্ষেত্রেও পরাভূত হয়। যার অসির আঘাতে সে পরাস্ত হয়, তার মসির আঘাতও সে বরাদাশত করতে পারে না। এ জন্যেই প্রত্যেক যুগে জগতে ঐ সকল চিন্তা ও মতবাদ প্রভাব বিস্তার করে, যা তরবারির আশ্রয়পুষ্ট হয়ে আত্মপ্রকাশ করে। বস্তুত এ ব্যাপারে জগতের চোখে ধূরি নিক্ষেপ করতে ইউরোপ সাফল্য লাভ করলো। ফলে দাস মনোভাবাপন্ন জাতিসমূহ ইসলামী জেহাদ সম্পর্কে উত্থাপিত ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি বিনা বিচারে ও বিনা চিন্তা-গবেষণায় আসমানী ‘ওহী’র ন্যায় ধ্রুব সত্য বলে গ্রহণ করলো।

বিগত শতাব্দীতে এবং বর্তমান কালেও মুসলমানদের পক্ষ থেকে বারাংবার উপরিউক্ত অভিযোগগুলোর প্রত্যুত্তর দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে এত অধিক আলোচনা হয়েছে যে, বিষয়টি এখন এক প্রকার বাহুল্য ও পরিত্যক্ত বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু এসব প্রত্যুত্তরে আমি যে সব ত্রুটি লক্ষ্য করেছি, তা এই যে, ইসলামের আত্মপক্ষ সমর্থনকারীগণ যেন প্রতিপক্ষের দ্বারা অভিভূত হয়ে আসামীর কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান এবং অপরাধীর ন্যায় সাফাই পেশ করতে প্রস্তুত। কোন কোন মহাত্মা এতদূরও অগ্রসর হয়েছেন যে, মামলাকে স্বপক্ষে মজবুত করার জন্যে ইসলামী শিক্ষা ও রাজনীতি রদবদল ও সংশোধন করে ফেলেছেন। উপরন্তু প্রতিপক্ষের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে যে সকল বিষয় তিনি আপন বিবেচনায় মারাত্মক মনে করেন, তা ইসলামের ইতিহাস থেকে অপসারিত করতে চেষ্টিত হয়েছেন। যাতে করে তা বিরোধীদের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে। যাদের মধ্যে আবার এসব ত্রুটি দেখা যায় না, তাঁদের জবাবও অসম্পূর্ণ রয়ে যায়-এ কারণে যে, তাঁরা জেহাদ ও ইসলামী যুদ্ধ সম্পর্কে ইসলামী শিক্ষার পূর্ণ আলোকপাত করেন না। তাঁরা যেন এসব বিষয় ধামাচাপা দিতে সচেষ্ট, যার ফলে এ সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ রয়ে যায়।

বিভ্রান্তি দূর করার জন্যে প্রয়োজন হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন ও বাণীকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে আল্লাহরই পথে জেহাদ ও যুদ্ধ বিগ্রহ সম্পর্কিত ইসলামী শিক্ষা ও আইন-কানুনকে কোরআন, সুন্নাহ ও ফেকাহ শাস্ত্রের আলোকেই বিশ্লেষণ করা। এসব আইন কানুনের কোনটিরই কণামাত্র পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা চলবে না। ইসলামের মূল উদ্দেশ্যে ও শিক্ষাকে পরিবর্তনের কোন চেষ্টা করা চলবে না। নিজের ধারণা-বিশ্বাস যে অপরের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী নতুন করে প্রচার করতে হবে এ বিষয়ে আমার মৌলিক মতভেদ রয়েছে। পৃথিবীতে এমন কোন সমস্যাই নেই, যে সম্পর্কে সকলে একই দৃষ্টিভঙ্গিসহ একমত হবে। প্রতিটি দলের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি আছে এবং তাকেই সে অভ্রান্ত মনে করে। আমরা অপরের দৃষ্টিভঙ্গির খাতিরে নিজস্ব মৌলিক বিশ্বাস যতই রঞ্জিত করে উপস্থাপিত করিনা কেন, বিভিন্ন মতবাদের লোক তার সাথে একমত হবে তা কখনো সম্ভব নয়। অতএব উৎকৃষ্টতর পন্থা এই যে, আমরা আমাদের বিশ্বাস ও মতবাদ, সমস্যাবলী, শিক্ষা ও রাজনীতির সত্যিকার চিত্রটিই পরিস্ফুট্‌ করব এবং উৎকৃষ্টতম পন্থায় জগতকে  আপন  দৃষ্টিভঙ্গি  সম্পর্কে অবহিত করব। অতঃপর সেটা তাদেরই জ্ঞান বিবেকের উপর ছেড়ে দেব। যদি সে তা গ্রহণ করে অতি উত্তম। যদি গ্রহণ না করে তাতেও আমাদের কোন পরোয়া নেই। সত্যের আহ্বান ও প্রচারণার এটাই একমাত্র সুষ্ঠু পন্থা। আম্বিয়ায়ে কেরাম (আঃ) এবং দৃঢ় সংকল্প সত্যাশ্রয়ী মহাপুরুষগণ এ পথই অবলম্বন করেছেন।

আমি বহুদিন যাবৎ এর আবশ্যকতা অনুভব করছিলাম। কিন্তু এ অনুভূতি থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারিনি। তার একমাত্র কারণ সময়ের অভাব। কেননা, সাংবাদিকের ভাগ্যে, সময় ও অবসর বলতে কমই ঘটে থাকে, তা সর্বজনবিদিত। কিন্তু ১৯২৬ সালের ডিসেম্বর মসের শেষের দিকে এক ঘটনা ঘটে গেল, যা আমাকে বহু অসুবিধার ভেতর দিয়েও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য করলো। ঘটনাটি এই যে, শুদ্ধি আন্দোলনের নেতা স্বামী শ্রদ্ধানন্দ নিহত হন। এরই সুযোগে নির্বোধ ও সংকীর্ণমনা লোকেরা ইসলামী জেহাদ সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়াতে থাকে। কারণ দুর্ভাগ্যবশত এ হত্যাকান্ডের জন্য একজন মুসলমান অভিযুক্ত হয় এবং সংবাদপত্রে এই বলে প্রচারণা চালানো হয় যে, উক্ত ব্যক্তি স্বামী শ্রদ্ধানন্দকে তার ধর্মীয় দুশমন বলেই হত্যা করেছে। উপরন্তু এও প্রচার করা হয় , যে, এ কাজের জন্য সে বেহেশত লাভ করবে বলে তার বিশ্বাস ছিল। প্রকৃত রহস্য তো অন্তর্যামীই জানেন। তবে জনসাধারণের কাছে ঘটনার এরুফ চিত্রই প্রকাশ করা হয়েছিল। এ কারণেই সাধারণভাবে ইসলাম বৈরীদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। অতঃপর আলেমদের ঘোষণা, ইসলামী প্রচার পুস্তিকা প্রকাশ এবং সমাজের মনীষীবৃন্দের সর্বসম্মত বিবৃতি বিশ্লেষণ সত্ত্বেো তারা ঘটনাটিকে স্বাভাবিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে সমগ্র মুসলিম জাতি এবং ইসলামী শিক্ষাকে এ হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী করলো। পবিত্র কোরআনের বিরুদ্ধেও তারা এরূপ অপবাদ রটালো যে, এটা মুসলমানদেরকে এমন ধর্মান্ধ বানিয়ে দেয় যে, তারা প্রত্যেকটি কাফেরকে হত্যা করা বশ্য কর্তব্য বলে মনে করে এবং এর দ্বারা জান্নাতবাসী হওয়ার আশাও পোষণ করে। কতক প্রগলভ ব্যক্তি এতদূর পর্যন্ত মন্তব্য করে বসে যে, যতদিন কোরআনের শিক্ষা প্রচলিত থাকবে, ততদিন শান্তি স্থাপিত হবে না। অতএব মানব জাতিকে এর বিলোপ সাধনের জন্য সচেষ্ট হতে হবে। এ সমস্ত ভ্রান্ত মতবাদ এত অধিক পরিমাণে প্রচারিত হয় যে, সুস্থ মস্তিস্ক ব্যক্তিও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। এমন কি হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্বশেষ্ঠ বিচক্ষণ ব্যক্তি গান্ধীজীও উক্ত প্রচারণায় প্রভাবান্বিত হয়ে মন্তব্য করে বসলেনঃ

“ইসলাম এমন এক পরিবেশে জন্মলাভ করেছে যে, তার সকল সিদ্ধান্ত তরবারির দ্বারাই সম্পন্ন করা হতো এবং এখনো তা করা হচ্ছে।”

যদিও এসব প্রচারণা কোন সত্যানুসন্ধান ও দার্শনিক আলোচনাপ্রসূত ছিল না বরঞ্চ প্রচারকদের ওস্তাদগণ আবহমানকাল থেকে তাদেরকে যা শিক্ষাদান করেছিল অবিকল তাই তারা তোতাপাখির মতো আওড়াচ্ছিল, তথাপি একটা অসাধারণ ঘটনা এসব অন্ধবিশ্বাসের মধ্যে এমন এক রং লাগিয়ে দিলো যার দ্বারা অজ্ঞ লোক সহজেই প্রতারিত হতে পারে। বস্তুত এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণা ইসলাম প্রচার কার্যে সর্বদাই বাধার সৃষ্টি করেছে। এরূপ অবস্থাতেই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষাকে উজ্জ্বলতর করার প্রয়োজন হয়, যেন মেঘচ্ছটার অবসানে রবিকর তার উজ্জ্বল কিরণরশ্মিসহ উদিত হতে পারে। এ জন্যেই সংবাদপত্র চালাবার পরে যে অবসর টুকু পেতাম, তাই এ বিষয়ে প্রবন্ধ লেখার কাজে ব্যয় করতে লাগলাম। সঙ্গে সঙ্গে “আল জমিয়ত” পত্রিকার মাধ্যমেও তা প্রকাশ লাভ করতে লাগলো।

প্রথমত, এ বিষয়ে একটা সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ লিখতেই মনস্থ করেছিলাম। কিন্তু আলোচনা শুরু হওয়ার পর প্রসঙ্গক্রমে বিষয়বস্তুর বিভিন্ন দিকে আলোকপাত করার প্রয়োজন হয়ে পড়লো বলে সংবাদপত্রের স্তম্ভ এর জন্য নিতান্তই অপর্যাপ্ত হলো। অতএব বাধ্য হয়ে তেইশ-চব্বিশ সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর সংবাদপত্রে এর প্রকাশ বন্ধ করে দিলাম। তারপর বিষয়টি পরিপূর্ণরূপে এই গ্রন্থাকারে প্রকাশ করছি। যদিও এ গ্রন্থে বিভিন্ন বিষয়ের বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হয়েছে, তথাপি সময়ের অভাবে অনেক বিষয় অসমাপ্ত রাখতে বাধ্য হলাম। যেসব বিষয়ে এক একটি অধ্যায় রচিত হোওয়া উচিত ছিল, তা সংক্ষেপে দু’এক ছত্রে শেষ করেছি। এ গ্রন্থ প্রণয়নে যে বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি রেখেছি তা হচ্ছে এই যে, এর কোথাও নিজের অথবা কারো ব্যক্তিগত মন্তব্য সন্নিবেশিত করিনি। বরঞ্চ সমগ্র মৌলিক ও খুটিঁনাটি বিষয় কোরআনে পাকের আলোকেই লিপিবদ্ধ করেছি। কোথাও এর বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন বোধ করলে, হাদীস গ্রন্থাবলী, নির্ভরযোগ্য ফেকাহের গ্রন্থাবলী এবং নির্ভরযোগ্য সঠিক তাফসীরগুলোর সাহায্য গ্রহণ করেছি। এসব দেখে প্রতিটি পাঠক যেন বুঝতে পারেন যে, বর্তমান জগতের সাথে তাল রেখে এ গ্রন্থে কোন নতুন বিষয় সৃষ্টি করা হয়নি। বরঞ্চ এতে যা কিছু বলা হয়েছে তার সবটুকুই আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (সাঃ) এবং আম্বিয়ায়ে কেরামেরত (আঃ) বাণীর ভিত্তিতেই বলা হয়েছে।

যে সকল অমুসলমান নিছক বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হয়ে ইসলামের প্রতি অন্ধ দুশমনি পোষণ করেন না, তাদের কাছে আমার নিবেদন, তাঁরা যেন এ গ্রন্থের মাধ্যমে যুদ্ধ সম্পর্কিত প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা লাভ করার চেষ্টা করেন। অতঃপর এর বিরুদ্ধে কিছু বলার থাকলে যেন তা বলেন। এর পরেও যদি কারও মনে কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে, তা দূর করার চেষ্টা করব।

দিল্লী

১৫ই জুন, ১৯৭২ সাল।     আবুল আ’লা।

 

About আব্বাস আলী খান