আদাবে জিন্দেগী

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ইবাদতের সৌন্দর্য

মসজিদের আদবসমূহ

১. যে স্থানে মসজিদ নির্মিত হয়েছে আল্লাহর কাছে সেই স্থান হলো পৃথিবীর সর্বোত্তম স্থান, আল্লাহকে যারা ভালোবাসে তারা মসজিদকেও ভালোবাসে। কিয়ামতের ভয়ানক দিন, যে দিন কোনো ছায়া থাকবেনা সেদিন আল্লাহ তাআলা মসজিদের সাথে আত্মার সম্পর্ক সৃষ্টিকারী ব্যক্তিকে নিজের আরশের ছায়ায় স্থান প্রদান করবেন।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যার অন্তর মসজিদের সাথে থাকে সে আরশের ছায়ায় স্থান পাবে।

২. মসজিদের খেদমত করবে এবং ইবাদত চালু রাখবে, মসজিদের খেদমত করা ও আবাদ রাখা ঈমানের আলামত। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন

“আল্লাহর মসজিদসমূহকে তারাই আবাদ রাখে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে।”

৩. ফরজ নামাযসমূহ সর্বদা মসজিদে জামাআতের সাথে আদায় করবে। মসজিদের শৃংখলার দ্বারা নিজের সমগ্র জীবনকে শৃংখলিত করবে। মসজিদ এমন একটা কেন্দ্র যে, মুমিনের সমগ্র জীবন আবর্তিত হয় মসজিদকে কেন্দ্র করে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : “মুসলমানদের মধ্যে এমনি কিছু লোক আছে যারা মসজিদে আবদ্ধ থাকে এবং মসজিদ থেকে নড়ে না, ফিরিশতাগণ এমন সব লোকের সাথী হয়। যদি এরা অনুপস্থিত থাকে তখন ফিরিশতাগণ তাদেরকে তালাশ করতে থাকে। অসুস্থ হলে ফিরিশতাগণ দেখতে যান, কোনো কাজ করতে থাকলে ফিরিশতাগণ সাহায্য করেন, এসব ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার রহমতের হকদার। (মুসনাদে আহমদ)

৪. মসজিদের নামাযের জন্যে আনন্দ উৎসাহের সাথে যাবে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “সকাল সন্ধ্যায় নামাযের জন্যে যাওয়া হলো জেহাদের জন্যে যাওয়ার সমতুল্য।” তিনি এও বলেন, “যারা ভোরে আঁধারের ভেতরে মসজিদে যায় কিয়ামতের দিনের ঘোর অন্ধকারে তাদের সাথে থাকবে উজ্জল আলোকবর্তিকা।” তিনি আরো বলেন, “জামায়াতের সাথে নামায আদায়ের জন্যে মসজিদে যাতায়াতকারী ব্যক্তির প্রতিটি কদমে একটি নেকী যোগ করে একটি গুনাহ মিটিয়ে দেয়া হয়।” (ইবনে হাব্বান)

৫. মসজিদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবে, মসজিদ নিয়মিত ঝাড় দেবে। খড়কুটা আবর্জনা পরিষ্কার করবে। সুগন্ধি (আতর বা আগরবাতি) লাগাবে বিশেষতঃ জুমাবার দিন। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “মসজিদ ঝাড় দেবে, মসজিদকে পবিত্র ও পরিষ্কার রাখবে, মসজিদের আবর্জনা বাইরে ফেলবে, মসজিদে সুগন্ধি বিশেষত: জুমার দিন মসজিদকে সুগন্ধি দ্বারা সুরভিত করা বেহেশতে প্রবেশের সহায়ক। অর্থাৎ উপরোক্ত আলামতসমূহ বেহেশতে প্রবেশকারীর আমল।” (ইবনে মাজাহ)

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এও বলেন, মসজিদের আবর্জনা পরিষ্কার করা সুন্দর আঁখি বিশিষ্ট হুরদের মোহর। অর্থাৎ এ আমলকারী বেহেশতে হুরদের পাবে। (তিবরানী)

৬. মসজিদে ভয়ে ভীত ও নরম স্বভাবে যাবে। মসজিদে প্রবেশ করার সময় ‘আসসালামু আলাইকুম’ (আল্লামা ইবনু হাজার আসকালানী রচিত ‘মুনাব্বেহাত’) বলবে এবং চুপচাপ বসে আল্লাহর যিকির করবে যেন আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব তোমার অন্তরে বিরাজিত থাকে, হাসতে হাসতে অথবা কথা বলতে বলতে অমনোযোগিতার সাথে মসজিদে প্রবেশ যারা করে তাদের অন্তরে বিন্দুমাত্র আল্লাহর ভয় নেই, এটা অমনোযোগী ও বেয়াদবের কাজ। কোন কোন লোক ইমামের সাথে রুকুতে শরীক হওয়ার জন্য এবং রাকাআত পাবার জন্য মসজিদের দিকে দৌড়ে যায়, এটাও মসজিদের সম্মান ও মর্যাদার পরিপন্থী। জামাআতে রাকাআত পাওয়া যাক বা না যাক ভদ্রতা.  মাহাত্ম্য ও বিনয়ের সাথে মসজিদের দিকে যাবে এবং দৌড় দেয়া হতে বিরত থাকবে।

৭. মসজিদে প্রশান্ত চিত্তে বসবে এবং ঈমান আকীদার খেলাফ দুনিয়াদারী সংক্রান্ত কথাবার্তা বলা হতে বিরত থাকবে। মসজিদে হৈ চৈ অথবা হাসি ঠাট্টা করা, বাজার দর জিজ্ঞেস করা বা বলা, দুনিয়ার অবস্থার ওপর ব্যাখ্যা প্রদান করা এবং বেচাকেনার বাজার গরম করা মসজিদের মর্যাদার বিরোধী। মসজিদ আল্লাহর ইবাদতের ঘর এবং তাতে শুধু ইবাদতই কাম্য।

৮. মসজিদে এমন ছোট শিশুদেরকে নিয়ে যাবে না যারা মসজিদের মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞ, ফলে তারা হয়তো মসজিদে পেশাব পায়খানা করবে অথবা থুথু ফেলবে।

৯. মসজিদকে যাতায়াতের পথ হিসেবে ব্যবহার করবে না। মসজিদের দরজায় নামায পড়বে অথবা আল্লাহর যিকির করবে এবং পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করবে।

১০. মসজিদের বাইরে কোন জিনিস হারিয়ে গেলে মসজিদে প্রচার করবে না, মসজিদে নববীতে কেউ যদি এমন ঘোষণা দিত তা হলে রাসূল (সা) অসন্তুষ্ট হতেন এবং এ কথাগুলো বলতেন,

আরবী (*********)

‘আল্লাহ তোমাকে তোমার হারিয়ে যাওয়া বস্তু ফিরিয়ে না দিক’।

১১. মসজিদে প্রবেশ করার সময় প্রথমে ডান পা রাখবে এবং দুরূদ ও সালাম পেশ করার পর প্রবেশের দোআ পড়বে।

রাসূল(সা) বলেন, তোমাদের কেউ যদি মসজিদে আসে তবে প্রথমে নবীর উপর দুরূদ পাঠ করবে তারপর এ দোয়া পাঠ করবে-

আরবী (*******)

‘আয় আল্লাহ! আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাসমূহ খুলে দিন।’

মসজিদে প্রবেশ করার পর দু’রাকাত নফল নামায পড়বে, এ নফল গুলোকে তাহিয়্যাতুল মসজিদ বলে। অনুরূপ সফর হতে আসার পর সর্বপ্রথম মসজিদে গিয়ে দু রাকাত নফল নামায পড়বে তারপর বাড়ি যাবে। রাসূল (সা) যখনই সফর থেকে আসতেন তখনই মসজিদে গিয়ে নফল নামায পড়তেন। তারপর বাড়ী যেতেন।

১২. মসজিদ হতে বের হওয়ার সময় বাম পা বাহিরে রাখবে এবং এ দোয়া পড়বে।

আরবী (*********)

‘ আয় আল্লাগ! আমি তোমার বদান্যতা ও অনুগ্রহ কামনা করি।’

১৩. মসজিদে রীতিমত আযান ও জামাআতের সাথে নামায আদায়ের নিয়্যত করবে এবং ইমাম ও মুয়াযযিন এমন লোকদেরকে নিয়োগ করবে যারা দীন ও চারিত্রিক দিক হতে সকলের থেকে মোটামুটি উত্তম। যথাসম্ভব চেষ্টা করবে যে, এমন লোক যেন আযান ও ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন, যিনি পারিশ্রমিক ব্যতিরেকে স্বেচ্ছায় পরকালের পুরস্কারের আশায় এ সকল দায়িত্ব পালন করে যাবেন।

১৪. আযানের পর এ দোয়া পাঠ করবে। রাসূল (সা) বলেন, “যে ব্যক্তি আযান শুনে এ দোয়া করবে কিয়ামতের দিন সে অবশ্যই আমার শাফায়াতের হকদার হবে।”

আরবী (************)

“আয় আল্লাহ! এই পূর্ণ আহবান ও প্রতিষ্ঠালাভকারী সালাতের মালিক। মুহাম্মদ (সা) কে নৈকট্য ও ফযিলত দান কর এবং তাঁকে সেই প্রশংসিত স্থান দান কর যার প্রতিশ্রুতি তুমি তার সাথে করেছো। নিশ্চয়ই তুমি ভঙ্গ করোনা অঙ্গীকার।”(বুখারী)।

১৫. মুয়াযযিন যখন আযান দিবেন তখন শ্রোতা মুয়াযযিনের শব্দগুলি পুনরাবৃত্তি করবে অবশ্য মুয়াযযিন যখন “হাইয়্যা আলাস সালাহ ও হাইয়্যা আলাল ফালাহ’’ বলে শ্রোতা তখন “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যূল আযীম” বলবে। ফজরের আজানে মুয়াযযিন যখন “আছ্ছালাতু খাইরুম মিনান নাওম” বলে শ্রোতা তখন বলবে “ছাদ্দাকাতা ওয়া বারাকাতা”-‘তুমি সত্য বলেছো এবং পূণ্যের কথা বলেছো।”

১৬. তাকবীর দাতা যখন ‘ক্বাদ কামাতিচ্ছালাহ, বলে তখন শ্রোতা “আকামাহুল্লাহ ওয়া আদামাহা” (আল্লাহ সর্বদা উহাকে প্রতিষ্ঠিত রাখুক) বলবে।

১৭.  মহিলারা মসজিদে যাবার পরিবর্তে ঘরে নামায আদায় করবে। একবার আবু সাঈদ হুমাইদী (রা) এর স্ত্রী রাসূল (সা) এর নিকট বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার আপনার সাথে নামায পড়ার খুবই ইচ্ছা। তিনি বললেন, আমি তোমাদের আগ্রহ সম্পর্কে অবগত আছি কিন্তু তোমাদের ঘরের মধ্যে নামায পড়া মসজিদের নামায পড়া হতে অধিক উত্তম। দালানে নামায পড়া বারান্দায় নামায পড়া অপেক্ষা উত্তম। অবশ্য মহিলাগণ মসজিদের আবশ্যকীয় বিষয়সমূহ পূরণ করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে পারে। পানি ও বিছানার ব্যবস্থা করবে, সুগন্ধি ইত্যাদি প্রেরণ করবে এবং মসজিদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক বহাল রাখবে।

১৮.  পিতারা বুদ্ধিমান ছেলেদেরকে সাথে করে মসজিদে নিয়ে যাবে. মাতাগণ ছেলেদেরকে উৎসাহ দিয়ে দিয়ে মসজিদে পাঠাবে যেনো তাদের মধ্যে মসজিদে যাবার আগ্রহ অধিক পরিমাণে সৃষ্টি হয়। মসজিদে তাদের সাথে অত্যন্ত নম্র, মমতা ও স্নেহপূর্ণ আচরণ করবে। তারা যদি মসজিদে অসতর্ক ব্যবহার বা দুষ্টুমি করে বসে তা্হলে ধমক বা তিরস্কার না করে বরং স্নেহ ও মমতা দ্বারা বুঝিয়ে দেবে এবং পুণ্যের প্রশিক্ষণ দিবে।

নামাযের আদবসমূহ

১. নামাযের মধ্যে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার পরিপূর্ণ খেয়াল রাখবে। অযু করলে মিসওয়াক করবে। রাসূল (সা) বলেন, “কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের পরিচয় হবে তাদের কপাল ও অযুর স্থানগুলি দেখে, ঐ স্থানগুলো নূরের আলোকে ঝলমল করতে থাকবে। সুতরাং যারা আলো বাড়াতে চায় তারা যেন আলো বাড়িয়ে নেয়।”

২. পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, মর্যাদাশীল, সুরুচিপূর্ণ কাপড় পরিধান করে নামায আদায় করবে।

পবিত্র কুরআনে আছে- আরবী (***********)

“হে আদমের সন্তানগণ! প্রত্যেক নামাযের সময় তোমরা পোশাকে সুসজ্জিত হয়ে যাবে।”

৩. ওয়াক্তের নির্দিষ্ট সময়ের ভিতর নামায আদায় করবে। আল্লাহ পাক বলেন-

আরবী(*********)

“ওয়াক্তের নিয়মানুবর্তিতার সাথে মুমিনদের ওপর নামায ফরয করা হয়েছে।”

হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) একদা রাসূল (সা) কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ। আল্লাহর নিকট (বান্দাহর) কোন আমল বেশি প্রিয়? জবাবে তিনি বললেন, “সময়মত নামায আদায় করা। ” রাসূল (সা) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছেন, যে ব্যক্তি ঐ নামাযগুলোকে নির্ধারিত সময়ে ভালভাবে অযু করে বিনয় ও নম্রতার সহিত একাগ্রচিত্তে আদায় করবে তাহলে আল্লাহর ওপর তার এ অধিকার বর্তায় যে, তিনি (আল্লাহ) তাকে ক্ষমা করেন আর যে ব্যক্তি নামাযে ত্রুটি করে আল্লাহর ওপর তার মাগফিরাত ও নাযাতের কোন দায়িত্ব থাকে না, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে আযাব দেবেন আর ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমাও করে দিতে পারেন। (মুয়াত্তা মালেক)।

 ৪. নামায সবসময় জামাআতের সাথে আদায় করবে। যদি কখনো জামাআত ছুটে যায় তা হলেও ফরয নামায মসজিদেই আদায় করার চেষ্টা করবে। অবশ্য সুন্নাত ও ফরয নামাযগুলো ঘরে পড়াই উত্তম।

রাসূল(সা) এরশাদ করেনঃ “যে ব্যক্তি একাধারে ৪০ দিন যাবৎ তাকবীরে উলার সাথে ফরয নামায জামাআতে আদায় করে তাকে দোজখ ও নেফাক হতে নিরাপত্তা দান করা হয়।” (তিরমিযি)।

রাসূল(সা) এও বলেন, লোকেরা যদি জামাআতের সাথে নামায আদায় করার সাওয়াব ও পুরস্কার সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত হতো তাহলে তারা হাজারো অসুবিধা সত্ত্বেও জামাআতের জন্য দৌড়ে আসত। জামাআতের প্রথম কাতার ফিরিশতাদের ছফের সমতুল্য। একাকী নামায পড়া অপেক্ষা দুজনের নামায উত্তম। সুতরাং লোক যত বেশী হয় ততই এ জামাআত আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় হয়। (আবু দাউদ)।

৫. নামায শান্তি ও স্বস্তির সঙ্গে পড়বে এবং রুকু, সিজদা ধীরস্থিরতার সাথে আদায় করবে। রুকু হতে উঠার পর স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে যাবে। অতঃপর সেজদায় যাবে। অনুরূপভাবে দু’সেজদার মাঝেও বিরাম করবে এবং এ দো‘আও পাঠ করবে।

আরবী (*********)

“আয় আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা কর, দয়া কর, আমাকে সঠিক পথ দেখাও, আমার দুরবস্থা দুর করে দাও, শান্তি দাও এবং আমাকে জীবিকা দান কর।” (আবু দাউদ)।

রাসূল (সা) বলেন, “যে ব্যক্তি নামায ভালভাবে আদায় করে, নামায তার জন্য দোয়া করে যে, ‘আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করুক। যেভাবে তুমি আমাকে হেফাজত করেছ।’

রাসূল (সা) আরো বলেন,  “নিকৃষ্টতম চুরি হলো নামাযের চুরি। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! (মানুষ) নামাযের মধ্যে কিভাবে চুরি করে? তিনি বললেন, “রুকু সেজদা অপূর্ণ অথবা অসম্পূর্ণ করে নামাযে চুরি করে।”।

৬. আযানের আওয়ায শোনামাত্রই নামাযের প্রস্তুতি আরম্ভ করে দেবে। অযু করে আগেভাগেই মসজিদে পৌছে যাবে এবং নীরবতার সহিত কাতারে বসে জামাআতের অপেক্ষা করবে। আযান শুনার পর অলসতা, দেরী করা ও গড়িমসি করতে করতে নামাযের জন্য যাওয়া মুনাফিকের  আলামত।

৭. আযান আগ্রহের সাথে দেবে। রাসূল(সা) কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে এমন কিছু কাজ শিক্ষা দিন যা আমাকে বেহেশতের দিকে নিয়ে যাবে। তিনি তাকে বললেন, “নামাযের জন্য আযান দেবে।” তিনি আরো বলেন, মুয়াযযিনের আযান যে পর্যন্ত পৌছে এবং যারা শুনে তারা সবাই কিয়ামতের দিন মুয়াযযিনের পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। যে ব্যক্তি জঙ্গলে বকরী চরায় এবং আযানের সময় হলেই উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে আযান দেয় আর চারিদিকে যে পর্যন্ত সে আযানের আওয়াজ পৌছবে, কিয়ামতের দিন সেখানের সকল বস্তুই তার জন্য সাক্ষ্য দিবে। (বুখারী)।

৮. ইমাম হলে নামাযের সকল নিয়ম কানুন ও শর্তসমূহ যথাযথ পালন করে নামায পড়বে এবং মুক্তাদির সুবিধা অসুবিধার দিকে লক্ষ্য রেখে সুন্দরভাবে ইমামতির দায়িত্ব পালন করবে। রাসূল(সা) বলেন, “যে ইমাম নিজের মুক্তাদিদের ভালভাবে নামায পড়ান আর এ কথা মনে রেখে নামায পড়ান যে, আমি আমার মুক্তাদিদের নামাযের জামিন। সে তার মুক্তাদিদের নামাযের সওয়াবের একটি অংশ পাবে। মুক্তাদিগণ যতটুকু সওয়াব পাবে, ইমামও ততটুকু সওয়াব পাবেন। মুক্তাদিদের পুরস্কার ও সওয়াবের মধ্যেও কোন কম করা হবে না। (তিররানী)।

৯. নামায এমন বিনয় ও নম্রতার সাথে পড়বে যে, অন্তরে আল্লাহ তায়ালার মহিমার ভীতি প্রকাশ পায় এবং ভয় ও নীরবতা বিরাজ করে, নামাযে বিনা কারণে হাত পা নাড়ানো, শরীর চুলকানো, দাঁড়ি খিলাল করা, নাকে আঙ্গুলী প্রবেশ করানো, কাপড় সামলানো অত্যন্ত শিষ্ঠাচার বিরোধী কাজ। এ থেকে দৃঢ়তার সাথে বিরত থাকা উচিৎ।

১০. নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভ করবে। নামায এমনভাবে আদায় করবে যে যেনো নামাযি আল্লাহকে দেখছে। অথবা কমপক্ষে এতটুকু ধারণা রাখবে যে, আল্লাহ তাকে দেখছেন।

রাসূল(সা) বলেন, “বান্দাহ নিজের প্রতিপালকের নিকটতর যখন সে তাঁর সেজদাহ করে সুতরাং তোমরা যখন সেজদাহ করবে তখন বেশী বেশী দোআ করবে।” (মুসলিম)।

১১. নামায আগ্রহের সাথে পড়বে। জোর-জবরদস্তির পদ্ধতিতে নামায প্রকৃত নামায নয়। এক ওয়াক্ত নামায পড়ার পর অপর ওয়াক্ত নামাযের জন্য আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করবে। একদিন মাগরিবের নামাযের পর কিছু সাহাবী এশার নামাযের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। এমতাবস্থায় রাসূল(সা) তাশরীফ আনলেন, এমনকি দ্রুতগতিতে চলার জন্য তিনি হাঁপাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, “তোমরা খুশী হয়ে যাও।তোমাদের প্রতিপালক আকাশের একটি দরজা খুলে তোমাদেরকে ফিরিশতাদের সামনে পেশ করলেন এবং গর্ব করে বললেন, দেখ আমার বান্দারা এক নামায আদায় করছে আর দ্বিতীয় নামাযের জন্য অপেক্ষা করছে।” (ইবনু মাজাহ)।

১২. অমনোযোগী ও উদাসীনদের মত তাড়াতাড়ি নামায পড়ে শুধুমাত্র মাথা থেকে বোঝা হাল্কা করবে না অর্থাৎ যিম্মা খালাস করবে না। বরং হুজুরে ক্বালব এর সাথে (একাগ্র মনে) আল্লাহকে স্মরণ করবে এবং মন, মস্তিষ্ক অনুভূতি, আকর্ষণ, চিন্তাধারা ও কল্পনা প্রত্যেক কর্ম দ্বারা পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে রুজু হয়ে পূর্ণ একাগ্রতা ও ধ্যানের সাথে নামায আদায় করবে। যে নামাযে আল্লাহর স্মরণ হয় উহাই হলো প্রকৃত নামায, মুনাফিকদের নামায আল্লাহর স্মরণ শূণ্য।

১৩. এছাড়া নামাযের বাইরেও নামাযের কিছু হক আছে। অর্থাৎ পূর্ণ জীবনকে নামাযের আয়না হিসেবে তৈরী করবে। পবিত্র কুরআনে আছে, “নামায নির্লজ্জতা ও নাফরমানী হতে ফিরিয়ে রাখে।” রাসূল(সা) একটি ফলপ্রসূ উদাহরণের মাধ্যমে এটাকে পেশ করেছেন এভাবে, তিনি শুকনো গাছের ডালকে জোরে জোরে নাড়লেন, নাড়ার কারণে ডালে লেগে থাকা (শুকনো) পাতাগুলো ঝড়ে পড়লো। অতঃপর তিনি বললেন, এ শুকনো ডাল থেকে পাতাগুলো যে ভাবে ঝরে পড়লো ঠিক এমনিভাবেই নামাযী ব্যক্তির গুনাহগুলোও নামাযের দ্বারা ঝরে যায়। এরপর তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াতটি তেলাওয়াত করলেনঃ

আরবী (*********)

‘‘আর নামায কায়েম করো দিনের উভয় অংশ অর্থাৎ ফজর ও মাগরিব এবং রাতের কিছু অংশ অতিবাহিতের পর অর্থাৎ এশায়। নিশ্চয়ই নেক কাজসমূহ খারাপ কাজসমূহকে মুছে দেয়। এবং ইহা উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উত্তম।” (নাসায়ী)।

১৪. নামাযে ধীরে ধীরে কুরআন পাঠ করবে, নামাযের অন্যান্য তাসবীহগুলোও পূর্ণ মনোযোগ, অন্তরের আসক্তি, মানসিক উপস্থিতির সাথে পড়বে, বুঝে সুঝে পড়লে মনের আগ্রহ বাড়ে এবং এই নামায প্রকৃত নামায হয়।

১৫. নিয়মিত নামায পড়বে, কখনও বাদ দিবে না। মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য হচ্ছে সে নিয়মিত নামায পড়ে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেন,

আরবী (********)

‘‘কিন্তু নামাযী তারাই যারা নিয়মিত নামায আদায় করে।’’

১৬. নিয়মিত ফরয নামায আদায়ের সাথে সাথে নফল নামাযেরও গুরুত্ব দিবে এবং বেশী বেশী নফল নামায পড়ার চেষ্টা করবে। রাসূল (সা) বলেন, “যে ব্যক্তি ফরয নামায ব্যতীত দিন রাত ১২ রাকাত নামায আদায় করবে তার জন্যে বেহেশতে একটি ঘর তৈরী করে দেয়া হবে।” (ইহা দ্বার ঐ সকল সুন্নাত নামায বুঝানো হয়েয়ে যা ফরয নামাযের সাথে পড়া হয়। যেমনঃ ফজরে ২, জোহরে ৬, মাগরিবে ২, এশায় ২ রাকাত সুন্নাত)।

১৭. সুন্নাত ও নফল নামায মাঝে মাঝে ঘরে পড়বে। রাসূল (সা) বলেনঃ “মসজিদে নামায পড়ার পরও কিছু নামায ঘরে পড়বে। আল্লাহ তায়ালা এ নামাযের অসীলায় তোমাদের ঘরে সুখ শান্তি দান করবেন।” (মুসলিম)।

রাসূল(সা) নিজেও সুন্নাত ও নফল নামাযসমূহ অধিকাংশ সময় ঘরে পড়তেন।

১৮. ফজরের নামায পড়ার উদ্দেশ্যে যখন ঘর হতে বের হবে তখন এ দোআ পাঠ করবে।

আরবী (***********)

‘‘ আয় আল্লাহ! আমার অন্তরে নূর(আলো) সৃষ্টি করে দিন। আমার চোখে নূর, আমার কানে নূর, আমার ডানে নূর, আমার বামে নূর, আমার পিছনে নূর, সামনে নূর, আমার মধ্যে শুধু নূরই সৃষ্টি করে দিন। আমার শিরা উপশিরায় নূর, আমার গোশতে নূর, আমার রক্তে নূর, আমার আত্মায় নূর সৃষ্টি করে দিন। আমার জন্য নূর সৃষ্টি করে দিন এবং আমাকে নূর দ্বারা ভূষিত করে দিন। আমার উপরে এবং নীচে নূর সৃষ্টি করে দিন। আয় আল্লাহ! আমাকে নূর দান করুন।” (হেছনে হাছীন)।

১৯. ফজর ও মাগরিবের নামায থেকে অবসর হয়েই কথাবার্তা বলার পূর্বে নিম্নের দোয়াটি সাতবার পড়বে- আরবী (*****)

আয় আল্লাহ! আামাকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা করুন।

রাসূল (সা) বলেনঃ ‘‘ফজর ও মাগরিবের নামাযের পর কারো সাথে কথা বলার পূর্বে সাতবার এ দোআ পাঠ করবে, যদি ঐ দিন অথবা ঐ রাতে মরে যাও তবে তুমি জাহান্নাম থেকে নাজাত পাবে।” (মেশকাত)।

২০. প্রত্যেক নামাযের পর তিনবার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলে এ দোআ পাঠ করবে।

আরবী (********)

“ইয়া আল্লাহ! তুমি সর্বময় শান্তি, শান্তির ধারা তোমারই পক্ষ হতে, হে মহিমান্বিত, মহান দাতা! তুমি মঙ্গল ও প্রাচুর্যময়।” (মুসলিম)।

হযরত সাওবান (রা) বলেন, রাসূল(সা) নামায হতে সালাম ফিরিয়ে তিনবার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলে উপরোক্ত দোয়া পাঠ করতেন। (মুসলিম)।

২১. জামাআতের নামাযে ছফগুলো যথাসাধ্য ঠিক রাখার চেষ্টা করবে, ছফ সোজা রাখবে এবএবং দাঁড়ানোর সময় এমনভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবে যাতে কোন ফাঁক না থাকে। সামনের ছফ পূর্ণ না হতেই পিছনের ছফে দাঁড়াবে না। একবার এক ব্যক্তি জামায়াতের নামাযে এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল যে, তার কাঁধ ছফের বাইরে ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) দেখতে পেয়ে সতর্ক করে দিলেন। “আল্লাহর বান্দাগণ! নিজেদের ছফগুলোকে সোজা ও ঠিক রাখতে চেষ্টা করবে নতুবা আল্লাহ তায়ালা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে দিবেন।” (মুসলিম)।

অন্য এক জায়গায় রাসূল (সা) বলেনঃ যে ব্যক্তি নামাযের ছফকে সঠিকভাবে যুক্ত করলো আল্লাহ তায়ালা তাকে যুক্ত করবেন, আর যে ব্যক্তি ছফকে ছেদ করলো আল্লাহ তাকে ছেদ করবেন।  (আবু দাউদ)।

২২. শিশুদের কাতার বয়স্ক পুরুষদের পিছনে করবে। অবশ্য ঈদের মাঠ ইত্যাদিতে যেখানে পৃথক করলে অসুবিধার সৃষ্টি হতে পারে বা শিশু অপহরণের আশঙ্কা থাকে এসব ক্ষেত্রে পিছনে পাঠানোর দরকার নেই, বরং নিজেদের সাথেই রাখবে। মহিলাদের কাতার একেবারে পিছনে হবে অথবা পৃথক হবে যদি মসজিদে তাদের জন্য পৃথক স্থান তৈরি করা থাকে। অনুরূপ ঈদের মাঠেও মহিলাদের জন্য পৃথক পর্দাশীল স্থানের ব্যবস্থা করবে।

কুরআন পাঠের সহীহ তরীকা

১. স্বাচ্ছন্দ্যে ও আগ্রহের সাথে মনোযোগ দিয়ে কুরআন মজীদ পাঠ করবে এবং বিশ্বাস রাখবে যে, কুরআন মজীদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন অর্থ আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন। রাসূল (সা) বলেন, “আমার উম্মতের জন্য সর্বোত্তম ইবাদত হলো কুরআন পাঠ।”

২. বেশীরভাগ সময় কুরআন পাঠরত থাকবে আর বিরক্ত হবে না। রাসূল(সা) বলেছেনঃ আল্লাহ বলেন, “যে বান্দাহ কুরআন পাঠে এতই ব্যস্ত যে, সে আমার কাছে কিছু প্রার্থনার সুযোগই পায় না তখন আমি তাকে প্রার্থনা ব্যতিরেকেই প্রার্থনাকারীদের হতে বেশি দেব।”

৩. পবিত্র কুরআন শুধু হেদায়াত লাভের উদ্দেশ্যেই পাঠ করবে। লোকদের নিজের আসক্ত করা, নিজের সুমধুর স্বরের প্রভাব বিস্তার করা এবং নিজের ধার্মিকতার খ্যাতি লাভের উদ্দেশ্যে নয়। এসব হলো অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের উদ্দেশ্য এবং এসব উদ্দেশ্যে কোরআন তেলাওয়াতকারী হেদায়াত লাভ হতে মাহরুম থাকে।

৪. তেলাওয়াতের পূর্বে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয়ে নিবে। এবং পবিত্র ও পরিষ্কার স্থানে বসে কুরআন তেলাওয়াত করবে।

৫. তেলাওয়াতের সময় কেবলামুখী হয়ে দুই জানু বিছিয়ে তাশাহুদে বসার ন্যায় বসবে এবং মাথা নত করে গভীর মনোযোগ, একাগ্রতা, অন্তরের আসক্তি ও অন্তর্দৃষ্টির সাথে তেলাওয়াত করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

আরবী (******)

“আপনার নিকট যে কিতাব পাঠিয়েছি বড়ই বরকতময় যেনো তারা আয়াতসমূহ নিয়ে গবেষণা করে এবং জ্ঞানীগণ তা হতে উপদেশ গ্রহণ করে।”

৬. (কুরআন পাঠে) তাজবীদ ও তারতীলের যথাসম্ভব খেয়াল রাখবে। অর্থাৎ কুরআন পাঠের নিয়মানুযায়ী হরফগুলোকে যথাস্থান হতে উচ্চারণ করে ধীর স্থিরভাবে তা পাঠের চেষ্টা করবে।

রাসূল(সা) বলেনঃ ‘‘কন্ঠস্বর ও উচ্চারণ রীতি অনুযায়ী কুরআনকে সুসজ্জিত করো।” (আবু দাউদ)।

রাসূল(সা) প্রতিটি হরফকে পরিষ্কার করে ও প্রতিটি আয়াতকে পৃথক পৃথক করে পড়তেন।

রাসূল (সা) বলেন, “কুরআন পাঠকারীকে কিয়ামতের দিন বলা হবে, যে ধীরগতিতে ও সুমধুর কন্ঠস্বরে সুসজ্জিত করে দুনিয়ায় কুরআন পাঠ করতে ঐভাবে পাঠ কর এবং প্রতিটি আয়াতের বিনিময়ে এক স্তর উপরে উঠতে থাকো, তোমার বাসস্থান তোমার তেলাওয়াতের শেষ আয়াতস্থলে। (তিরমিযী)।

৭. কুরআন বেশী জোরেও পড়বে না এবং একেবারে চুপে চুপেও পড়বে না বরং মধ্যম আওয়াজে পাঠ করবে। আল্লাহর নির্দেশঃ আরবী (*******)

“নামাযে বেশী জোরেও পড়বে না এবং চুপেও পড়বে না, উভয়ের মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করবে।”

৮. যখনই সুযোগ পাবে তখনই কুরআন তেলাওয়াত করবে কিন্তু শেষ রাত তাহাজ্জুদেও কুরআন পাঠের চেষ্টা করবে। এ সময়ে তেলাওয়াত কুরআন পাঠের সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন আর একজন মুমিন ব্যক্তির পক্ষে তেলাওয়াতের সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভের আকাঙ্খা থাকাই উচিত।

৯. তিন দিনের কমে কুরআন শরীফ খতমের চেষ্টা করিবে না। রাসূল (সা) বলেন, “যে ব্যক্তি তিন দিনের কমে কুরআন পাঠ শেষ করলো সে নিশ্চিত কুরআনের অর্থ বুঝে নি।”

১০. কুরআনের মাহাত্ম্য ও মর্যাদার অনুভূতি রাখবে আর যে বাহ্যিক পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার সম্মান করেছ অনুরূপ পঁচা দুর্গন্ধময় চিন্তাধারা, খারাপ চেতনা এবং নাপাক উদ্দেশ্য হতে পাক ও শুদ্ধ করে নিবে। যে অন্তর পঁচা ও নাপাক চিন্তাধারায় জড়িত, সে অন্তরে আল্লাহর কুরআনের মহানত্ব ও মর্যাদা স্থান পেতে পারে না আর সে অন্তর কুরআনের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও যথার্থতা বুঝতে সক্ষম নয়। হযরত ইকরামা (রা) যখন কুরআন শরীফ খুলতেন, তখন অধিকাংশ সময় অজ্ঞান হয়ে যেতেন এবং বলতেন, “ইহা আমার গৌরব ও মহান আল্লাহর বাণী।”

১১. পৃথিবীতে মানুষ যদি হেদায়াতপ্রাপ্ত হয় তাহলে আল কুরআন দ্বারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত হবে। এ দৃষ্টিতেই চিন্তা ভাবনা করবে এবং এর মূল রহস্য ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বুঝার চেষ্টা করবে। দ্রুত তেলাওয়াত করবে না বরং বুঝে বুঝে পড়ার অভ্যাস করবে েএবং চিন্তা ও গবেষণা করার চেষ্টা করবে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস(রা) বলতেন, আমি বাকারাহ ও আল ইমরান এর মত বড় বড় সূরা না বুঝে তাড়াতাড়ি পড়ার চেয়ে আলকারিআহ ও আলকদর এর মত ছোট সূরা বুঝে ধীরগতিতে পাঠ করা বেশী উত্তম বলে মনে করি। রাসূল (সা) একবার সারা রাত এক আয়াত বারবার পাঠ করছিলেন-

আরবী (*******)

(আয় আল্লাহ) “আপনি যদি তাদেরকে আযাব দিন তাহলে তারা আপনার বান্দাহ। আর আপনি যদি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন তাহলে আপনি মহা পরাক্রমশালী ও মহা বিজ্ঞানী।”

১২. প্রবল আগ্রহের সাথে কুরআন তেলাওয়াত করবে। মনে করবে, এর নির্দেশাবলীর আলোকে আমার জীবনে পরিবর্তন আনতে হবে এবং তার হেদায়াতের আলোকে আমার জীবন গড়তে হবে। অতঃপর হেদায়াত মোতাবেক নিজের জীবন গঠন ও অসতর্কতা বশত ত্রুটি বিচ্যূতি থেকে জীবনকে পবিত্র করার জন্য নিয়মিত চেষ্টা করবে। কুরআন আয়না স্বরূপ মানুষের প্রতিটি দাগ ও কলঙ্ক তা মানুষের সম্মুখে তুলে ধরবে। এখন ঐ সকল দাগ ও কলঙ্ক থেকে তোমার জীবনকে পাক ও পবিত্র করা তোমার দায়িত্ব।

১৩. কুরআনের আয়াত হতে সুফল লাভের চেষ্টা করবে। যখন রহমত দয়া, মাগফিরাত (ক্ষমা) এবং জান্নাতের চিরস্থায়ী পুরস্কারের বিষয় পাঠ করবে তখন আনন্দ ও খুশী প্রকাশ করবে। আর যখন আল্লাহর ক্রোধে এবং গযব ও জাহান্নামের ভীষণ আযাবের বিষয় পাঠ করবে তখন শির ভয়ে কাঁপতে থাকবে, চক্ষু হতে অচেতন ভাবে অশ্রু প্রবাহিত হবে, তওবা ও লজ্জার ভাবধারায় কাঁদতে থাকবে মুমিন ও নেক্কার বান্দাহদের সফলতার কথা কুরআন পাঠের সময় চেহারা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠবে এবং বিভিন্ন জাতিসমূহের ধ্বংসের কাহিনী পাঠের সময় চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়বে, শান্তির প্রতিজ্ঞা ও ভীতির প্রদর্শনমূলক আয়াত পাঠ করে অন্তর ভয়ে কম্পমান হবে এবং সু সংবাদ জাতীয় আয়াত পাঠ করে অন্তর কৃতজ্ঞতার আবেগে প্রফুল্ল হয়ে উঠবে।

১৪। তেলাওয়াত শেষে দোআ করবে। হযরত ওমর ফারূক (রা) তেলাওয়াতের পর এ দোআ করতেন।

আরবী (************)

“ইয়া আল্লাহ! কিতাবের যে অংশ পাঠ করি এতে চিন্তা ও গবেষণা করার তাওফীক দান করো। আমাকে বুঝার ও হৃদয়ঙ্গম করার শক্তি দাও। রহস্যগুলো উপলব্ধি করার এবং আমাকে বাকী জীবন  তার ওপর আমল করার তাওফীক দাও। নিশ্চয় তুমি সকল বস্তুর ওপর ক্ষমতাবান।”

জুমুআর দিনের আমলসমূহ

১। শুক্রবারে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, ওযু গোসল ও সাজ সজ্জার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা করবে।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল(সা) বলেছেন, “কেউ জুমুআর নামায পড়তে আসলে, তার গোসল করে আসা উচিত।” (বুখারী ও মুসলিম)।

হযরত আবূ হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেন, “প্রত্যেক মুসলমানের উপর আল্লাহর এ অধিকার যে, সে প্রতি সপ্তাহে গোসল করবে এবং মাথা ও শরীর সুন্দরভাবে পরিষ্কার করবে।”

হযরত আবু সাঈদ (রা) বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন, “প্রত্যেক বালেগ পুরুষের পক্ষে প্রত্যেক শুক্রবার গোসল করা কর্তব্য, আর সম্ভব হলে মেসওয়াক করা ও সুগন্ধি লাগানোও উচিত।” (বুখারী, মুসলিম)।

হযরত সালমান ফারসী (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেনঃ

“যে ব্যক্তি জুমআর দিন গোসল করলো, কাপড় চোপড় পরিষ্কার করল এবং নিজের সাধ্যমত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা করলো, তারপর তেল ও সুগন্ধি ব্যবহার করলো তারপর দ্বিপ্রহরের পর মসজিদে গিয়ে এভাবে বসলো যে, দু’জন লোককে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে নি অর্থাৎ দু’জনের মাঝখানে জোর করে প্রবেশ করে নি, তারপর নির্ধারিত নামায আদায় করলো, ইমাম যখন মিম্বরের দিকে যান, তখন সে চুপচাপ বসে খুতবা শুনতে লাগল, তা হলে সে এক জুমআ হতে অন্য জুমআ পর্যন্ত যত গুনাহ করেছে তার ঐ সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।” (বুখারী)।

২. জুমুআর দিন যিকির, তাসবীহ, কুরআন তিলাওয়াত, দোআ খায়ের, ছদকা, খয়রাত, রোগী দেখা, জানাযায় অংশগ্রহণ করা ও অন্যান্য নেক কাজ বেশী বেশী করা ভাল।

হযরত আবূ হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন, “দিনসমূহের মধ্যে শুক্রবার হলো সর্বোত্তম দিন, এদিন হযরত আদম (আ) কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এদিন তাঁকে বেহেশতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং আল্লাহর খলীফা নিযুক্ত করা হয়েছে  এবং এদিনই কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে।” (মুসলিম)।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন, “এমন পাঁচটি কাজ আছে যে ব্যক্তি একই দিনে ঐ পাঁচটি কাজ করবে আল্লাহ তাকে বেহেশতবাসী বলে লিখে দিবেন।” সেগুলো হলোঃ

            ১. রোগী দেখা

            ২. জানাযায় শরীক হওয়া

            ৩. রোযা রাখা

            ৪. জুমুআর নামায আদায় করা

            ৫. গোলাম আযাদ করা। (ইবনু হিব্বান)।

প্রকাশ থাকে যে, এই পাঁচটি কাজ সম্পাদন করা শুক্রবারেই সম্ভব।  ‍শুক্রবার ছাড়া জুমুআর নামায হয় না।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) দ্বারা আরো একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেন, “যে ব্যক্তি জুমুআর দিনে সূরা কাহাফ পাঠ করবে, তাহার জন্য উভয় জুমুআর মধ্যবর্তী সময়ে একটি নূর চমকিতে থাকবে।” (নাসায়ী)।

হযরত আবূ হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেন, “যে ব্যক্তি জুমুআর রাতে সূরায়ে ‘দোখান’ তেলাওয়াত করে তার জন্য ৭০ হাজার ফিরিশতা ক্ষমা প্রার্থনা করে অতঃপর তার সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।” (তিরমিযী)।

রাসূল (সা) বলেন, “জুমআর দিন এমন এক কল্যাণকর সময় আছে সে সময়ে যা প্রার্থনা করা হয় তাই কবুল হয়।” (বুখারী)।

কিন্তু এ সময় কোনটি? এ সম্পর্কে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এ সময় সম্পর্কে বিভিন্নমুখী রেওয়ায়াত অত্যন্ত প্রসিদ্ধঃ

 (১) ইমাম খুতবা দেওয়ার জন্য যখন মিম্বরে এসে বসেন তখন হতে নামায হওয়া পর্যন্ত সময়।

 (২) জুমুআর দিনের শেষ সময় যখন সূর্য অস্ত যেতে থাকে। উভয় সময় আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত আদব ও কাকুতি মিনতির সাথে দোআর মাধ্যমে অতিবাহিত করবে। নিজের অন্যান্য দোআর সাথে এ দোআ করলেও ভাল হয়। দোআটি হলোঃ

আরবী (**********)

“আয় আল্লাহ! আপনি আমার পালনকর্তা। আপনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, আমি আপনার বান্দাহ এবং আমি আমার সাধ্যানুযায়ী আপনার সাথে কৃত ওয়াদা ও চুক্তি অনুযায়ী হাজির আছি। আপনি আমাকে সকল নেয়ামত দান করেছেন, আমি সে সব স্বীকার করি। আমার পূণ্যসমূহও আমি সমর্থন করি। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করুন। কেননা, আপনি ছাড়া আর কোন ক্ষমাকারী নাই। আমি যা কিছু করেছি তার অনিষ্টতা হতে আপনার আশ্রয় কামনা করছি।”

৩। জুমআর নামাযের গুরুত্ব প্রদান করা উচিত। জুমুআর নামায প্রত্যেক বালেগ, সুস্থ, মুকীম, হুশ জ্ঞান সম্পন্ন মুসলমান পুরুষের উপরই ফরয। কোন স্থানে যদি ইমাম ব্যতীত আরো দু’জন লোক হয় তাহলেও জুমুআর নামায আদায় করবে। রাসূল(সা) বলেন, “লোকদের উচিত তারা যেন কখনও জুমুআর নামায তরক না করে, নতুবা আল্লাহ তাদের অন্তরে সিলমোহর লাগিয়ে দিবেন। ফলে তারা হেদায়াত হতে বঞ্চিত হয়ে ভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।” (মুসলিম)।

হযরত আবূ হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেন, “যে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে অর্থাৎ জুমুআর জন্য গোসল করে ও কাপড় চোপড় পরিষ্কার করে জুমুআর নামায পড়ার জন্য মসজিদে উপস্থিত হয় এবং নির্ধারিত সুন্নাত আদায় করে চুপচাপ বসে (খোতবা শুনতে) থাকে, ইমাম খুতবা হতে অবসর হলে ইমামের সাথে ফরয নামায আদায় করে তখন তার এক জুমুআ হতে আরেক জুমুআ পর্যন্ত আরো তিন দিনের সকল গুনাহ মাফ করে করে দেওয়া হয়।”

হযরত ইয়াযিদ বিন মরিয়ম বলেন, আমি জুমুআর নামাযের জন্য যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে আবায়া বিন রেফায়ার সাথে দেখা হলো । তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাচ্ছ? আমি উত্তর দিলাম, জুমুআর নামায পড়তে। তিনি বললেন, তোমাকে ধন্যবাদ। এটাইতো আল্লাহর রাস্তা। রাসূল (সা) বলেছেন, “যে বান্দাহর পা আল্লাহর পথে ধূলায় মলিন হলো তার উপর (জাহান্নামের) আগুন হরাম।”

৪। জুমুআর নামাযের আযান শোনামাত্রই মসজিদের দিকে চলে যাবে। কাজ কারবার ও অন্যান্য ব্যস্ততা বন্ধ করে দিবে এবং পূর্ণ একাগ্রতার সাথে খুতবা শোনা ও নামায আদায়ের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। নামায আদায়ের পর আবার কাজ কারবারে লেগে যাবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ এরশাদ করেন, আরবী (**********)

“হে, মুমিনগণ! জুমুআর দিন যখন তোমাদেরকে নামাযের জন্য আহবান করা হয়, তখন তোমরা দ্রুতগতিতে আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং বেচা কেনা ছেড়ে দাও, তোমরা যদি জ্ঞানী হও তবে তোমাদের এটা করাই উত্তম। অতঃপর যখন নামায শেষ হয়ে যাবে তখন যমিনে কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর দান অন্বেষণে লেগে যাও। অতঃপর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর যাতে তোমরা সফলকাম হও।”

একজন মুমিন যে সকল আয়াত দ্বারা হেদায়াতপ্রাপ্ত হয় তা হলোঃ

১. একজন মুমিনকে মনেপ্রাণে জুমুআর নামাযের গুরুত্ব প্রদান করা  এবং আযান শোনামাত্র মসজিদের দিকে যাওয়া উচিত।

২. আযান শোনার পর মুমিনের পক্ষে ব্যবসায় বাণিজ্য অথবা পার্থিব কোন  কাজে ব্যস্ত থাকা এবং আল্লাহ হতে গাফেল হয়ে খাঁটি দুনিয়াদার হয়ে যাওয়া জায়েয নয়।

৩.  মুমিনের পূণ্যের রহস্য হলো, সে দুনিয়ায় আল্লাহ বান্দাহ ও গোলাম এবং আল্লাহর পক্ষ হতে কোন ডাক আসলে একজন প্রভুভক্ত ও অনুগত গোলাম হিসেবে নিজের সর্বপ্রকার পার্থিব উন্নতির চিন্তা ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিবে এবং কার্যত এটা প্রমাণ করবে যে, দীনের প্রয়োজনে পার্থিব উন্নতি উৎসর্গ করা ধ্বংস ও অকৃতকার্যতা নয় বরং পার্থিব উন্নতির লালসায় দীন ধ্বংস করাই প্রকৃত অকৃতকার্যতা।

৪. পার্থিব ব্যাপারে শুধু এ মনোভাব ঠিক নয় যে, মানুষ দীনদার হতে গিয়ে দুনিয়া বিমুখ হয়ে পার্থিব কাজে একেবারে অকেজো প্রমাণিত হবে। বরং নামায হতে অবসর হওয়া মাত্রই আল্লাহর যমীনে ছড়িয়ে পড়বে। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ায় জীবিকা অর্জনের জন্য যে সকল উপায় এবং উপকরণ দান করেছেন তা হতে পূর্ণ ফায়দা লাভ করবে এবং নিজের যোগ্যতাকে পূর্ণ কাজে লাগিয়ে নিজের জীবিকা তালাশ করে নেবে। কেননা মুমিনের জন্য বৈধ নয় যে, সে নিজের আবশ্যকতা পূরণের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে, আবার এটাও ঠিক নয় যে, সে নিজের অধীনস্থদের জরুরত পূরণে ত্রুটি করবে আর তারা অস্থিরতা ও নৈরাশ্যতার শিকার হবে।

৫. শেষ জরুরী হেদায়াত এই যে, মুমিন পার্থিব ধাঁধায় ও কাজে এমনভাবে জড়িয়ে পড়বে না যে, নিজে আল্লাহ হতে গাফিল হয়ে যাবে, বরং তাকে সর্বদা একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, তার জীবনের প্রধান পুঁজি ও প্রকৃত রত্ন হলো আল্লাহর স্মরণ।

হযরত সায়ীদ বিন জুবাইর (রহঃ) বলেন, শুধু মুখে তাসবীহ, তাহমীদ, তাহলীল, তাকবীর ইত্যাদি উচ্চারণ করার নামই আল্লাহর যিকির নয় বরং আল্লাহর আনুগত্যে নিজের জীবন গঠন করার নামই আল্লাহর যিকির বা স্মরণ।

৬. জুমুআর নামাজের জন্য তাড়াতাড়ি মসজিদে পৌছে যেতে এবং মসজিদে গিয়ে প্রথম ছফে (সারিতে) স্থান লাভ করার চেষ্টা করবে। হযরত আবু হুরাইরাহ থেকে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেন, যে ব্যক্তি জুমুআর দিন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এমনভাবে গোসল করলো, যেমন গোসল করে পবিত্রতা হাসিলের জন্য, অতঃপর মসজিদে গিয়ে পৌছল তাহলে সে যেনো একটি উট কুরবানী করলো, যে ব্যক্তি এর দ্বিতীয় সময়ে পৌছল সে যেন একটি গরু কুরবানী এবং যে ব্যক্তি তারপর ৩য় সময়ে পৌছলো সে যেন একটি সিংওয়ালা দুম্বা কুরবানী করলো, এবং যে ব্যক্তি ৪র্থ সময়ে গিয়ে পৌছলো সে যেন আল্লাহর রাস্তায় একটি ডিম দান করলো। অতঃপর খতীব বা ইমাম যখন খোতবা পাঠের জন্য দাঁড়ান তখন ফিরিশিতারা মসজিদের দরজা ছেড়ে দিয়ে খোতবা শোনা ও নামায পড়ার জন্য মসজিদের এসে বসেন। (বুখারী, মুসলিম)।

হযরত ইরবায বিন সারিয়া হতে বর্ণিত, রাসূল(সা) প্রথম কাতারের লোকদের জন্য তিনবার আর ২য় সারির লোকদের জন্য একবার মাগফিরাতের দোআ করতেন। (ইবনু মাজাহ, নাসায়ী)।

হযরত আবু হুরাইরাহ (রা) বলেন, মানুষের প্রথম কাতারের পুরস্কার সম্পর্কে সঠিক জানা নেই। যদি প্রথম কাতারের সাওয়াব ও পুরস্কারের কথা জানতে পারতো তা হলে প্রথম সারির জন্য লটারীর সাহায্য নেয়া লাগতো। (বুখারী, মুসলিম)।

৭. জুমুআর নামায জামে মসজিদে পড়বে এবং যেখানে জায়গা পাবে সেখানেই বসে পড়বে। মানুষের মাথা ও কাঁধের উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে না। এর দ্বারা মানুষ শারীরিক কষ্ট ও মানসিক দুঃখ অনুভব করে এবং তাদের নীরবতা, একাগ্রতা ও মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটে।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি এক মুসলমান ভাইয়ের সুবিধার্থে প্রথম কাতার ত্যাগ করে দিয়ে ২য় সারিতে আসে আল্লাহ তাআলা তাকে প্রথম সারির দ্বিগুণ পুরস্কার ও সওয়াব দান করবেন। (তিবরানী)।

৮. খোতবা নামায হতে সংক্ষিপ্ত করবে। কেননা, খোতবা মূলতঃ উপদেশবাণী যার দ্বারা ইমাম লোকদেরকে আল্লাহর ইবাদতের উপর উৎসাহ প্রদান করেছেন। কিন্তু নামায শুধু ইবাদতই নয় বরং সর্বোত্তম ইবাদত। সুতরাং কখনো খোতবা বেশ লম্বা চওড়া হবে কিন্তু নামায তাড়াতাড়ি সংক্ষিপ্ত করবে এটা ঠিক নয়। (মুসলিম)।

রাসূল (সা) বলেন, “নামায দীর্ঘ করা আর খোতবা সংক্ষিপ্ত করা বুদ্ধিমান ইমামের কাজ। সুতরাং তোমরা নামায দীর্ঘ করবে আর খোতবা সংক্ষিপ্ত আকারে দেবে।” (মুসলিম)।

৯. খোতবা অত্যন্ত চুপচাপ, মনোযোগ, একাগ্রতা আবেগ ও আগ্রহের সাথে শুনবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের যে সকল নির্দেশ জানা হলো সর্বান্তকরণে তার আমল করবে।

“খতীব খোতবা দেয়ার জন্য বের হয়ে আসলে তখন কোন নামায পড়া ও কথা বলা জায়েয নেই।”

১০. দ্বিতীয় খোতবা আরবীতে পড়বে। তবে প্রথম খোতবায় মুক্তাদিদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কিছু নির্দেশ, উপদেশ, পরামর্শ ও সতর্কবাণী মাতৃভাষায় দেওয়ার চেষ্টা করবে। রাসূল(সা) যে খুতবা দিয়েছেন তা দ্বারা বুঝা যায় যে, খতীব মুসলমানদেরকে অবস্থা অনুযায়ী কিছু উপদেশ ও পরামর্শ দিবেন। এ উদ্দেশ্য তখনই সফল হতে পারে যখন বক্তা শ্রোতাদের জন্য মাতৃভাষায় ভাষণ দিবে।

১১. জুমুআর ফরয নামাযে সূরায়ে ‘আল আলা’ ও ‘আলগাশিয়া’ পাঠ করা অথবা সূরায়ে ‘মুনাফিকুন’ ও ‘জুমুআ’ পাঠ করা উত্তম ও সুন্নাত। রাসূল(সা) জুমুআর নামাযে বেশিরভাগ সময় এ সকল সূরা পড়তেন।

১২. জুমুআর দিন রাসূল (সা) এর উপর দুরূদ ও সালাম পেশ করার বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে।

রাসূল(সা) বলেন, “জুমুআর দিন আমার ওপর বেশী বেশী করে দুরূদ পেশ করবে। এদিন দুরূদ পাঠের সময় ফেরেশতা উপস্থিত হয় এবং এ দুরূদ আমার কাছে পৌছে যায়।” (ইবনে মাজাহ)।

জানাযার নামাযের নিয়ম কানুন

১. জানাযার নামাযে অংশগ্রহণের চেষ্টা করবে। জানাযার নামায হলো মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাতের দোআ আর মৃত ব্যক্তির অধিকার। অজু করতে করতে জানাযা শেষ হয়ে যাবার আশংকা থাকলে তায়াম্মুম করেই নামাযে দাঁড়িয়ে ‍যাবে।

রাসূল (সা) বলেন, “জানাযার নামায পড়বে। সম্ভবতঃ ঐ নামাযের দ্বারা তোমরা চিন্তাগ্রস্ত হবে, চিন্তান্বিত ব্যক্তি আল্লাহর ছায়ায় থাকে এবং চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তি সকল নেক কাজকে অভ্যর্থনা জানায়।” (হাকেম)।

রাসূল (সা) বলেন যে, যে মৃত ব্যক্তির ওপর মুসলমানদের তিন কাতার জানাযার নামায পড়ে তার জন্য বেহেশত ওয়াযিব হয়ে যায়। (আবু দাউদ)।

২. জানাযার নামাযের জন্য মৃত ব্যক্তির খাট এমনভাবে রাখবে যেন, মাথা উত্তর দিকে, পা দক্ষিণ দিকে এবং মুখমন্ডল কেবলার দিকে থাকে।

৩. জানাযার নামাযে মৃত ব্যক্তির সিনা বরাবর দাঁড়াবে।

৪. জানাযার নামাযে সর্বদা কাতার বেজোড়সংখ্যক রাখবে। লোক কম হলে এক কাতার করবে, আর লোক বেশি হলে তিন, পাঁচ, সাত…। লোক যত বেশী হবে কাতারও তত বেশী করবে কিন্তু সংখ্যায় বেজোড় থাকতে হবে। ইমাম ছাড়া ৬ জন লোক হলে তখন তিন কাতার করবে।

৫. জানাযা আরম্ভ করতে নিয়্যত করবে এভাবে-“আমি পরম করুণাময় মহান দয়ালু আল্লাহর নিকট এ মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাত কামনায় নামাযে জানাযা পড়ছি।” ইমাম ও মুক্তাদি উভয়ই এ নিয়্যতই করবে।

৬. জানাযার নামাযে ইমাম যা পড়বে মুক্তাদিও তাই পড়বে। মুক্তাদি নীরব থাকবে না। অবশ্য ইমাম তাকবীরসমূহ উচ্চস্বরে বলবে আর মুক্তাদি বলবে চুপি চুপি।

৭. জানাযা নামাযে চার তাকবীর বলবে। প্রথম তাকবীর বলার সময় হাত কান পর্যন্ত নিয়ে যাবে, তারপর হাত বেঁধে সানা পড়বে।

“আরবী (*******)

“হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র ও মহান, আপনার গুণগানের সাথে, আপনার নাম উত্তম ও প্রাচুর্যময়, আপনার মহানত্ব ও মহত্ব অনেক ঊর্ধে্ব, আপনার প্রশংসা মহিমান্বিত, আপনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই।”

সানা পাঠের পর দ্বিতীয় তাকবীর বলবে, এ তাকবীরে হাত উঠাবে না এবং মাথা দ্বারা ইশারাও করবে না। দ্বিতীয় তাকবীর বলার পর এই দুরূদ শরীফ পাঠ করবে।

আরবী (*****)

“ইয়া আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদ (সা) ও তাঁর বংশধরদের উপর রহমত নাযিল কর। যেমন তুমি ইবরাহীম (আ) ও তাঁর বংশধরদের উপর করেছ। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসিত মহিমান্বিত। আয় আল্লাহ! তুমি মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর বংশধরদের উপর বরকত দান করো। যেমন ইবরাহীম (আ) ও তাঁর বংশধরদের উপর দান করেছ। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।”

এখন হাত না উঠিয়ে তৃতীয় তাকবীর বলবে এবং মাসনুন দোআ পাঠ করবে। অতঃপর চতুর্থ তাকবীর বলে উভয় দিকে সালাম ফিরাবে।

৮. মৃত ব্যক্তি যদি বালেগ পুরুষ অথবা মহিলা হয় তবে তৃতীয় তাকবীরের পর এ দোয়া পাঠ করবে।

আরবী (*********)

“আয় আল্লাহ! আমাদের জীবিত, মৃত, উপস্থিত, অনুপস্থিত, ছোট, বড়, পুরুষ, মহিলা সবাইকে মাফ করে দাও। আয় আল্লাহ! তুমি আমাদের যাকে জীবিত রাখবে তাকে ইসলামের সাথে জীবিত রাখ আর যাকে মৃত্যু দান করবে তাকে ঈমানের সাথে মৃত্যু দান করো।”

মৃত যদি নাবালক ছেলে হয় তাহলে এ দোআ পাঠ করবে।

আরবী (*********)

“আয় আল্লাহ! ঐ শিশুকে আমাদের জন্য মক্তির খুশীর ও আনন্দের উপকরণ কর, তাকে আমাদের জন্য পুরস্কার ও আখেরাতের সম্পদ কর এবং আমাদের জন্য এমন সুপারিশকারী কর যার সুপারিশ আখেরাতে গৃহীত হয়।”

আর মৃত যদি নাবালেগ মেয়ে হয় তাহলে এ দোআ পাঠ করবে, এ দোআর অর্থও পূর্বের ছেলের জন্য পাঠকৃত দোআর অনুরূপ।

আরবী (*******)

৯. জানাযার সাথে যাবার সময় নিজের শেষ ফল সম্পর্কে চিন্তা করবে এবং মনে করবে যে আজ তুমি যেমন অন্যকে মাটির নিচে দাফন করতে যাচ্ছ ঠিক তেমনি একদিন অন্যরাও তোমাকে মাটিতে দাফন করতে নিয়ে যাবে। এ শোক ও চিন্তায় তুমি অন্ততঃ এ সময়টুকু পরকালের ধ্যানে মগ্ন থাকার সৌভাগ্য লাভ করবে এবং পার্থিব জটিলতা ও কথাবার্তা হতে রক্ষা পাবে।

মৃতপ্রায় ব্যক্তির সাথে করণীয়

 ১. মৃতপ্রায় ব্যক্তির নিকট গেলে মৃদু উচ্চঃস্বরে কলেমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” পাঠ করবে, তাকে পড়তে বলবে না। রাসূল (সা) বলেন, যখন মৃত্যু আসন্ন ব্যক্তির নিকট বসবে তখন কলেমার যিকির করতে থাকবে। (মুসলিম)।

২. অন্তিমকালে মৃত্যুযন্ত্রণার সময় সূরায়ে ইয়াসীন তেলাওয়াত করবে। রাসূল (সা) বলেন, “মৃত্যু আসন্ন ব্যক্তির পাশে সূরা ইয়াসীন পাঠ করো।” (আলমগীর ১ম খন্ড)।

গোসল না দেয়া পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির নিকট কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করবে না। যার উপর গোসল ফরয এমন নাপাক ব্যক্তি এবং হায়েয নেফাসওয়ালী স্ত্রীলোকও মৃত ব্যক্তির নিকট যাবে না।

৩. মৃত্যু সংবাদ শুনে, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” (আমরা সবাই তাঁরই জন্য এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী) পাঠ করবে। রাসূল (সা) বলেন, যে ব্যক্তি কোন বিপদের সময় “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” পাঠ করবে তার জন্য তিনটি পুরস্কার।

  প্রথমতঃ তার উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হয়।

  দ্বিতীয়তঃ সত্যের খোঁজ ও অন্বেষণে পুরস্কার প্রাপ্ত হয়।

  তৃতীয়তঃ তার ক্ষতিপূরণ করে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত বস্তু হতে উত্তম বস্তু দান করা হয়।

৪. মৃতের শোকে চিৎকার ফুৎকার ও বিলাপ করা হতে যথাসম্ভব বিরত থাকবে। অবশ্য শোকে অশ্রুপাত করা স্বাভাবিক ব্যাপার।

রাসূল (সা) এর ছেলে ইবরাহীমের (রা) মৃত্যু হলে তাঁর চক্ষু হতে অশ্রু প্রবাহিত হয়, অনুরূপ তাঁর দৌহিত্রের [জয়নব (রা) এর ছেলে] মৃত্যুতেও তার চক্ষু মুবারক হতে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগলো। জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কাঁদছেন? তিনি উত্তর দিলেন, এটা দয়া। যা আল্লাহ তাআলা বান্দার অন্তরে আমানত রেখেছেন, আল্লাহ সেসব বান্দাহকে দয়া করেন যারা দয়াকারী অর্থাৎ যারা অন্যকে দয়া করে আল্লাহও তাদেরকে দয়া করেন।

তিনি বলেছেন যে, “যারা মুখে থাপ্পড় দেয়, জামার বুকের অংশ ছিঁড়ে এবং অন্ধকার যুগের ন্যায় বিলাপ করে তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।”

৫. নিঃশ্বাস ত্যাগের পরপরই মৃতের হাত পা সোজা করে দিবে, চক্ষু বন্ধ করে দেবে। একটি রুমাল চোয়ালের নিচ দিয়ে মাথার উপর বেঁধে দিবে। পায়ের উভয় বৃদ্ধাঙ্গলী একত্র করে রশি দ্বারা বেঁধে এবং চাদর দ্বারা ঢেকে রাখবে এবং পড়তে থাকবে “বিসমিল্লাহি আলা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহ” আল্লাহর রাসূলের মিল্লাতের উপর।” লোকদেরকে মৃত্যুর সংবাদ পৌছে দিবে এবং কবরে রাখবার সময়েও ঐ দোআ পাঠ করবে।

৬. এ সময় মৃত ব্যক্তির গুণের কথা বর্ণনা করবে, দোষের কথা বর্ণনা করবে না।

রাসূল (সা) বলেন, “নিজেদের মৃত ব্যক্তিদের গুণের কথা বর্ণনা করবে, এবং দোষের কথা হতে মুখ বন্ধ রাখবে।” (আবু দাউদ)।

তিনি বলেছেন যে, “যখন কোন ব্যক্তি মারা যায় এবং চতুর্দিকের পড়শীগণ তার ভাল হওয়ার সাক্ষ্য দেয় তখন আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করলাম আর যে সকল দোষের কথা তোমরা জানতে না তা আমি মাফ করে দিলাম।” (ইবনু হাব্বান)।

একবার রাসূল (সা) এর সাক্ষাতে সাহাবায়ে কেরাম এক মৃত ব্যক্তির প্রশংসা করলো, তিনি বললেন, “তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেলো। হে লোক সকল! তোমরা পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষী, তোমরা পৃথিবীতে যাকে ভাল বলো নিশ্চয়ই  আল্লাহ তাকে বেহেশত দান করেন আর তোমরা যাকে মন্দ বলো আল্লাহ তাকে দোজখে ফেলেন। (বুখারী, মুসলিম)।

তিনি আরো বলেছেন,  তোমরা যখন কোন রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখতে যাও অথবা কারো জানাযায় অংশগ্রহণ করো তবে সর্বদা মুখে ভাল কথা বলবে। কেননা, ফিরিশতাগণ তোমার কথার উপর আমীন (কবুল করো) বলতে থাকেন। (মুসলিম)।

৭. মৃত্যু শোকে ধৈর্য্ ও সহনশীলতা প্রমাণ দিবে। কখনো অকৃতজ্ঞতাসুলভ কোন শব্দ মুখে আনবে না। রাসূল(সা) বলেন, “যখন কোন ব্যক্তি নিজের সন্তানের মৃত্যুতে ধৈর্য্যধারণ করে, তখন আল্লাহ তায়ালা নিজে ফিরিশতাগণকে জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি আমার বান্দাহর সন্তানের প্রাণ হরণ করেছো? ফিরিশতাগণ উত্তরে বলেন, প্রতিপালক! আমরা আপনার আদেশ পালন করেছি। পুনরায় আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা কি আমার বান্দাহর কলিজার টুকরারও প্রাণ হরণ করেছ? তারা উত্তরে বলেন, জ্বী হ্যাঁ। পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করেন, তখন আমার বান্দাহ কি বলেছে? তারা উত্তরে বলেন, প্রতিপালক! সে আপনার শুকরিয়া প্রকাশ করেছে এবং ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পাঠ করেছে। তখন আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাদেরকে বলেন, আমার ঐ বান্দাহর জন্য বেহেশতে একটি ঘর তৈরি করো এবং ঐ ঘরের নাম নাম ‘বাইতুল হামদ’ (শোকরের ঘর) রাখো”।  (তিরমিযী)।

৮. মৃতের গোসল ও ধোয়াতে দেরী করবে না। গোসলের জন্য সামান্য বরই পাতা দিয়ে সামান্য গরম করে নেয়া ভাল। মৃত ব্যক্তিকে পবিত্র ও পরিষ্কার তক্তা বা খাটে শোয়াবে, কাপড় খুললে নিম্নাঙ্গ যেন লুঙ্গি দ্বারা ঢাকা থাকে। অতঃপর অযু করাবে, অযুতে কুলি করানো ও নাকে পানি দেওয়ার দরকার নেই। গোসল করাবার সময় নাকে ও কানে তুলা দিবে যেনো ভিতরে পানি প্রবেশ না করে। তারপর মাথা সাবান বা অন্য কোন জিনিস দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে দেবে। বাম দিকে কাত করে শুইয়ে ডান পাশে মাথা থেকে পা পর্যন্ত পানি ঢেলে পরিষ্কার করবে। অতঃপর ভিজা লুঙ্গি সরিয়ে দিয়ে শুকনা লুঙ্গি বা চাদর দ্বারা নিম্নাঙ্গ ঢেকে দিবে, অতঃপর এখান হতে উঠিয়ে খাটে বিছানো কাফনের উপর শুইয়ে দিবে।

রাসূল(সা) বলেন, যে ব্যক্তি মৃত ব্যক্তিকে গোসল দিল এবং তার দোষ গোপন করলো আল্লাহ তাআলা ঐরূপ বান্দাহর ৪০টি কবীরা গুনাহ মাফ করে দেন এবং যে ব্যক্তি মৃতকে কবরে নামিয়ে রাখলো সে যেনো তাকে হাশর পর্যন্ত থাকার ঘর তৈরি করে দিল। (তিবরানী)।

৯. কাফন মধ্যম মানের সাদা কাপড় দিয়ে তৈরি করবে। মূল্যবান কাপড় দিবেনা অথবা খুব নিম্নমানের কাপড়ও দিবে না। পুরুষের জন্য কাফনে তিন কাপড় দিবে। (১) চাদর,  (২) তহবন্দ বা ছোট চাদর, (৩) জামা বা কাফনী। চাদর লম্বায় দেহের উচ্চতা হতে একটু বেশী রাখবে যেনো মাথা ও পা উভয় দিক হতে বাঁধা যায়, প্রস্থে এতোটুকু রাখবে যেনো মৃতকে ভাল করে জড়ানো যায়। এছাড়া মহিলাদের মাথা পেচানোর জন্য ঘোমটা জাতীয় (যার দৈর্ঘ্য এক গজের কিছু বেশি, প্রস্থে এক গজের কিছু কম এবং বগল হতে হাঁটু পর্যন্ত) একটি সীনাবন্ধও দিতে হবে।

রাসূল(সা) বলেন, যে ব্যক্তি কোন মৃতকে কাপড় পরিধান করাল আল্লাহ তাআলা তাকে বেহেশতে রেশমী পোশাক পরিধান করাবেন। (হাকেম)।

১০. কফিন কবরস্থানের দিকে একটু দ্রুতগতিতে নিয়ে যাবে। রাসূল (সা) বলেন, “জানাযায় তাড়াতাড়ি করো।” হযরত ইবনে মাসঊদ (রা) রাসূল (সা) কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! কফিন কি গতিতে নিয়ে যাবো? তিনি বললেন, তাড়াতাড়ি তবে দৌড়ের গতি হতে কিছুটা কম। যদি ভাল লোক হয় তাহলে ভাল পরিণামের দিকে দ্রুত পৌছে দাও আর যদি দুষ্ট লোক হয় তাহলে তাড়াতাড়ি তাকে দূর করে দাও। (আবু দাউদ)।

১১. কফিনের সাথে পায়ে হেঁটে যাবে।

রাসূল(সা) এক কফিনের সাথে পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন যে, কিছু লোক জানোয়ারের পিঠে চড়ে যাচ্ছে। তিনি তাদেরকে ধমকালেন, তোমাদের কি লজ্জা হয় না যে, আল্লাহর ফেরেশতাগণ পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন অথচ তোমরা প্রাণীর পিঠের ওপর?

রাসূল(সা) আবু ওয়াহেদী (রা) এর দাফনের সময় পায়ে হেঁটে যান এবং আসার সময় অশ্বারোহণ করে আসেন।

১২. যখন কফিন দেখতে পাবে তখন দাঁড়িয়ে যাবে আর যদি তার সাথে শরিক হওয়ার ইচ্ছে না হয় তা হলে সামনে এগিয়ে যাওয়া পর্যন্ত কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে।

রাসূল(সা) বলেন, তোমরা যখন কফিন (আসতে) দেখবে তখন দাঁড়িয়ে যাবে আর যারা তার সাথে যাবে তারা তা মাটিতে না রাখা পর্যন্ত বসবে না।

রাসূল (সা) বলেন, মুসলমানের ওপর মুসলমানের একটি হক হলো যে, সে মৃতের সাথে যাবে। তিনি এও বলেছেন, যে ব্যক্তি জানাযায় শরীক হলো, জানাযায় নামায পড়ল  সে এক ক্বীরাত সমতুল্য সাওয়াব পায়। নামাযের পর যে দাফনে অংশগ্রহণ করলো তাকে দু’ক্বীরাত সাওয়াব দেওয়া হয়। কোন এক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, ক্বীরাত কত বড়? তিনি বললেন, ক্বীরাত দু’পাহাড়ের সমতুল্য। (বুখারী মুসলিম)।

১৩. মৃতের কবর লম্বায় উত্তর দক্ষিণে খনন করবে। মৃতকে কবরে রাখার সময় কেবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে নামাবে। মৃত ব্যক্তি যদি হালকা পাতলা হয় তাহলে তাকে নামাবার জন্য দু’জনই যথেষ্ট। নতুবা তিন অথবা ততোধিক লোক নামাবে। নামানোর সময় মৃতকে কেবলামুখী করে নামাবে এবং কাফনের গিরাগুলি খুলে দিবে।

১৪. মহিলাকে কবরে নামাবার সময় পর্দার ব্যবস্থা করবে।

১৫. কবরে মাটি ফেলার সময় মাথার দিক হতে আরম্ভ করবে এবং উভয় হাতে মাটি নিয়ে তিনবার কবরের ওপর ফেলবে। প্রথমবার মাটি ফেলার সময় পাঠ করবে ‘মিনহা খালাকনাকুম’ (এ মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি) , ২য় বার মাটি ফেলার সময় পাঠ করবে, “ওয়া ফীহা নুয়ীদুকুম” (আর আমি তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তন করেছি), ৩য় বার মাটি ফেলার সময় পাঠ করবে, “ওয়া মিনহা নুখরীজুকুম তারাতান উখরা” (আর এ মাটি থেকেই দ্বিতীয় বার উঠাবো)।

১৬. দাফন করার পর কিছুক্ষণ কবরের পাশে অপেক্ষা করবে, মৃতের জন্য মাগফিরাতের দোআ করবে। কুরআন শরীফ হতে কিছু পাঠ করে উহার সওয়াব মৃতের রূহের উপর বখশিয়ে দেবে, উপস্থিত লোকদেরকে দোআযে এস্তেগফার করানোর জন্য উৎসাহ দেবে।

রাসূল (সা) নিজে দাফনের পর দোআয়ে মাগফিরাত করতেন এবং অন্যদেরকেও তা করার নির্দেশ করতেন। এ সময়টি হিসাব নিকাশের সময় তোমাদের ভাইয়ের জন্যে দোআয়ে মাগফিরাত কর। (আবু দাউদ)।

১৭. বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন অথবা পাড়া প্রতিবেশীর কেউ মারা গেলে তাদের ঘরে দু’এক বেলার খানা পাঠিয়ে দেবে। কেননা, তারা এ সময় শোকে কাতর থাকে। তিরমিযী শরীফে আছে, হযরত জাফর (রা) এর শহীদ হওয়ার সংবাদ আসার পর রাসূল(সা) বললেন, জাফরের (রা) ঘরের লোকদের জন্যে খানা তৈরী করে দাও। কেননা ওরা আজ শোকাহত।

১৮. মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক পালন করবে না। অবশ্য কোন মহিলার স্বামী মারা গেলে সে তার জন্যে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে। যখন উম্মুল মোমেনীন উম্মে হাবীবার পিতা আবু সূফিয়ান (রা) মারা যান তখন উম্মুল মুমিনীন বিবি জয়নাব (রা) তার কাছে শোক প্রকাশের জন্য গেলেন। হযরত উম্মে হাবীবা জাফরান ইত্যাদি মিশ্রিত সুগন্ধি আনলেন এবং তা হতে কিছু নিজের দাসীকে লাগাতে দিলেন আর কিছু নিজের মুখমন্ডলে মাখলেন। অতঃপর বললেন, আল্লাহ সাক্ষী, আমার সুগন্ধী লাগানোর কোন আবশ্যকতা ছিল না। কিন্তু আমি রাসূল(সা) কে বলতে শুনেছি যে, যে মহিলা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে সে কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক পালন করবে না। অবশ্য স্বামী শোকের ইদ্দত হলো চার মাস দশ দিন। (আবু দাউদ)।

১৯. মৃতের পক্ষ হতে সাধ্যমত দান খয়রাত করবে। অবশ্য এ ব্যাপারে সুন্নাত বিরোধী রসম রেওয়াজ থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকার চেষ্টা করবে।

কবরস্থানের নিয়ম

১. মৃতের সাথে কবরস্থানে যাবে এবং দাফন করার কাজে অংশগ্রহণ করবে। মাঝে মধ্যে এমনিতেই কবরস্থানে যাবে। কেননা এতে পরকালের স্মরণ তাজা হয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য প্রস্তুতির আবেগ সৃষ্টি হয়।

রাসূল(সা) এক মৃতের সাথে কবরস্থানে গেলেন এবং কবরের পাশে বসে এতো কাঁদলেন যে, (চোখের পানিতে) মাটি ভিজে গেল। অতঃপর সাহাবায়ে কেরামকে সম্বোধন করে বললেন, ভাইসব! এদিনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। (ইবনু মাজহা)।

অন্য একবার তিনি কবরের নিকট বসে বললেন, কবর প্রতিদিন অত্যন্ত ভয়ঙ্কর শব্দে চিৎকার দিয়ে বলে, হে আদম সন্তানগণ! তোমরা কি আমাকে ভুলে গিয়েছ! আমি একাকিত্বের নির্জন ঘর! আমি অচেনা অপরিচিত ও আতঙ্কময় স্থান। আমিহিংস্র পোকামাকড়ের ঘর! আমি সংকীর্ণ ও বিপদসঙ্কুল স্থান! যাদের জন্য আল্লাহ আমাকে উন্মুক্ত ও সুপ্রশস্ত করে দিয়েছেন সে সকল সৌভাগ্যগণ ব্যতীত অন্য সকল লোকের জন্য আমি এরূপ কষ্টদায়ক। তিনি বলেন, কবর হয়তো জাহান্নামের গর্তসমূহ হতে একটি গর্ত অথবা জান্নাতের বাগানসমূহ হতে একটি বাগান।  (তিবরানী)।

২. কবরস্থানে গিয়ে উপদেশ গ্রহণ করবে এবং কল্পনাবিলাসী মানসিকতা ত্যাগ করে মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করার অভ্যাস গড়ে তুলবে। একবার হযরত আলী(রা) কবরস্থানে গেলেন, হযরত কামিলা(রা)ও তার সাথী ছিলেন, কবরস্থানে গিয়ে তিনি একবার কবরগুলোর দিকে তাকালেন এবং তিনি কবরবাসীদেরকে সম্বোধন করে বললেন, হে কবরবাসী! হে পরিত্যক্ত জীর্ণ কুটিরে বসবাসকারী! হে ভয় সংকুল একাকীত্বে বসবাসকারী! তোমাদের কি সংবাদ বলো? আমাদের সংবাদ তো তোমাদের সম্পদ বন্টন হয়ে গিয়েছে, তোমাদের সন্তানেরা ইয়াতীম হয়ে গিয়েছে। তোমাদের স্ত্রীরা গ্রহণ করেছে অন্য স্বামী, এতো হলো আমাদের সংবাদ। এখন তোমরাও তোমাদের কিছু সংবাদ শুনাও! এ বলে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, অতঃপর তিনি কামিলের দিকে দেখে বললেন, হে কামিলগণ এ কবরবাসীদের যদি বলার অনুমতি থাকতো তাহলে তারা বলতো, “উত্তম সম্পদ হলো পরহেজগারী”। এ কথা বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন, অনেকক্ষণ পর্যন্ত কাঁদলেন। তারপর বললেন, হে কামিল! কবর হলো আমাদের সিন্ধুক! মৃত্যুর পরই তা বুঝা যায়।

৩. কবরস্থানে প্রবেশ করার সময় এ দোআ পাঠ করবে।

আরবী (*********)

‘‘তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হউক, হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলিমগণ! অবশ্যই আমরা শীঘ্রই আল্লাহর ইচ্ছায় তোমাদের সাথে মিলিত হবো, আমি আল্লাহর নিকট তোমাদের ও আমাদের জন্য (আযাব ও গযব হতে) নিরাপত্তার প্রার্থনা করছি।”

অমনোযোগী লোকদের মত কবরস্থানে হাসি ঠাট্টা এবং দুনিয়াদারীর কথাবার্তা বলবে না। কবর পরকালের প্রবেশদ্বার, এ প্রবেশদ্বারকে নিজের ওপর প্রভাবিত করে কান্নার চেষ্টা করবে।

রাসূল(সা) বলেন, “আমি তোমাদেরকে কবরস্থানে যেতে নিষেধ করেছিলাম (যেন তাওহীদ তোমাদের অন্তরে দৃঢ় হয়) কিন্তু এখন তোমাদের ইচ্ছে হলে তোমরা যেতে পার। কেননা কবর নতুনভাবে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।” (মুসলিম)।

৫. কবর পাকা করা ও সজ্জিত করা হতে বিরত থাকবে। রাসূল(সা) এর ওপর যখন মৃত্যুযন্ত্রণা উপস্থিত হলো তখন ব্যথা যন্ত্রণায় তিনি অত্যন্ত অস্থির ছিলেন। কখনও তিনি চাদর মুড়ি দিতেন, আবার কখনও ফেলে দিতেন। এ অসাধারণ অস্থিরতার ভেতর হযরত আয়েশা(রা) শুনতে পেলেন, পবিত্র মুখ হতে একথা বের হচ্ছে, ইহুদী ও খৃস্টানদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত ও লা’নত-তারা তাদের নবীদের কবরসমূহকে ইবাদতগাহ বানিয়েছে।”

৬. কবরস্থানে গিয়ে ইছালে ছাওয়াব করবে এবং আল্লাহর নিকট মাগফিরাতের দোআ করবে। হযরত সুফিয়ান(রা) বলেন, জীবিত লোকেরা যেমন পানাহারের মুখাপেক্ষী অনুরূপভাবে মৃত লোকেরাও দোআর অত্যন্ত মুখাপেক্ষী।

 এক বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহ তাআলা বেহেশতে এক নেককার বান্দাহর মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। সে বান্দাহ তখন জিজ্ঞেস করে, হে প্রতিপালক! আমার এ মর্যাদা কিভাবে বাড়লো? আল্লাহ বলেন, তোমার ছেলেদের কারণে। তারা তোমার জন্য মাগফিরাতের জন্য দোআ করেছে।

কুসুফ ও খুসুফের আমল

১. সূর্য অথবা চন্দ্রগ্রহণ লাগলে আল্লাহকে স্মরণ করবে এবং তা থেকে উদ্ধারের জন্য দোআ করবে। তাসবীহ, তাহলীল ও দান খয়রাত করবে। এ সকল নেক আমলের বরকতে আল্লাহ তায়ালা বিপদ-আপদ দূর করে দেন।

“হযরত মুগীরাহ বিন শোবাহ হতে বর্ণিত। রাসূল (সা) বলেছেন, “সূর্য চন্দ্র আল্লাহর দুটি চিহ্ন মাত্র। কারো মৃত্যু অথবা জন্মের কারণে গ্রহণ লাগে না। তোমরা যখন দেখবে যে গ্রহণ লেগেছে তখন সূর্য চন্দ্র পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাআলাকে ডাক, তার নিকট দোআ কর এবং নামায পড়।” (মুসলিম)।

২. যখন সূর্যগ্রহণ লাগবে তখন মসজিদে গিয়ে জামায়াতের সাথে নামায আদায় করো। অবশ্য ঐ নামাযের জন্য আযান ও ইকামত লাগবে না। এভাবেই মানুষদের অন্য উপায়ে একত্রিত করবে। যখন চন্দ্রগ্রহণ লাগবে তখন একাকী নফল নামায পড়বে, জামায়াতে পড়বে না।

৩. সূর্য গ্রহণের সময় যখন দু’রাকাআত নফল নামায জামায়াতের সাথে পড়বে তখন ক্বেরাআত দীর্ঘ করবে। সূর্য পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত নামাযে রত থাকবে এবং ক্বেরাআত উচ্চস্বরে পড়বে।

রাসূল(সা) এর যুগে একবার সূর্যগ্রহণ লাগলো। ঘটনাক্রমে ঐদিন তার দুগ্ধপোষ্য শিশু ইব্রাহীম (আ) এরও ইন্তিকাল হয়। লোকেরা বলতে শুরু করলো যে, যেহেতু মুহাম্মদ (সা) এর পুত্র হযরত ইব্রাহীম(আ) এর মৃত্যু হয়েছে তাই সূর্যগ্রহণ হয়েছে। তখন রাসূল(সা) লোকদেরকে একত্রিত করলেন, দু’রাকাআত নামায পড়লেন। এ নামাযে অত্যন্ত লম্বা ক্বিরাআত পড়লেন, সূরায়ে বাকারাহ সমতুল্য কুরআন পাঠ করলেন।রুকু সিজদাও অত্যন্ত দীর্ঘ সময় পড়লেন, নামায হতে অবসর হলেন, ইত্যবসরে গ্রহণ ছেড়ে গেল।

অতঃপর তিনি লোকদের বললেন, চন্দ্র ও সূর্য্ শুধুমাত্র আল্লাহর দুটি চিহ্ন। এদের মধ্যে কারো মৃত্যু বা কারো জন্মের কারণে গ্রহণ লাগে না। তোমাদের যখন এমন সুযোগ আসে তখন তোমরা আল্লাহকে স্মরণ রাখো। প্রার্থনা করো, তাকবীর ও তাহলীলে (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু যিকিরে) ব্যস্ত থাক, নামায পড় এবং দান ছদকা করো। (বুখারী, মুসলিম)।

হযরত আবদুর রহমান বিন সামুরাহ বলেছেন, রাসূল (সা) এর যুগে একবার সূর্যগ্রহণ লাগলো। আমি মদীনার বাইরে তীর নিক্ষেপ প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলাম। তাড়াতাড়ি তীরগুলো ফেলে দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম, দেখব আজ এই দুর্ঘটনায় রাসূল (সা) কি আমল করেন। সুতরাং আমি রাসূল (সা) এর খেদমতে হাজির হলাম। দেখতে পেলাম তিনি নিজের দু’হাত উঠিয়ে আল্লাহর হামদ ও তসবীহ, তাকবীর ও তাহলীল এবং দোআ ফরিয়াদে ব্যস্ত আছেন। অতঃপর তিনি দু’রাকাআত নামায পড়লেন। উভয় রাকাআতে লম্বা লম্বা দুটি সূরা পড়লেন এবং সূর্য পরিষ্কার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নামাযে ব্যস্ত রইলেন।

সাহাবায়ে কেরামও কুসূফ ও খুসূফের (সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ উভয়টিকে কুসূফ বলে। শুধু চন্দ্র গ্রহণকে খুসূফ বলে। খুসূফের বিপরীতে যখন কুসূফ বলা হয় অথবা খুসূফের সাথে যখন কুসূফ বলা হয় তখন কুসূফ দ্বারা শুধু সূর্যগ্রহণ বুঝায়)নামায পড়তেন। একবার মদীনায় গ্রহণ লাগলো। তখন হযরত আবদুল্লাহ বিন যোবাইর নামায পড়লেন। আরেকবার গ্রহণ লাগলো এবং হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস লোকদেরকে একত্রিত করে জামাআতের সাথে নামায আদায় করলেন।

৪. কুসূফ নামাযের প্রথম রাকাআতে সূরা ফাতিহার পর সূরা আনকাবুত আর দ্বিতীয় রাকাআতে সূরা রূম পাঠ করবে। এ সূরাগুলো পাঠ করা সুন্নাত। অবশ্য জরুরী নয়, অন্য সূরাও পাঠ করা যায়।

৫. কুসূফের নামাযে যদি মহিলারা অংশগ্রহণ করতে চায়, আর তা যদি সহজও হয় তাহলে তাদেরকে শরীক করবে। শিশুদেরকে নামাযে শরীক হতে উৎসাহ দান করবে যেনো প্রথম হতেই তাদের অন্তরে তাওহীদের শিক্ষা হয়ে যায় এবং তাওহীদ বিরোধী কোন চেতনাও তাদের অন্তরে স্থান না পায়।

৬. যে সকল সময়ে নামায পড়া শরীয়তে নিষিদ্ধ অর্থাৎ সূর্য উদয়, অস্ত এবং ঠিক দ্বিপ্রহরের সময় যদি সূর্যগ্রহণ হয় তাহলে নামায পড়বে না। অবশ্য যিকির ও তাসবীহ পাঠ করবে এবং গরীব মিসকিনদের জন্য দান খয়রাত করবে। সূর্য উদয় ও ঠিক দ্বিপ্রহরের পরও যদি গ্রহণ স্থায়ী হয় তাহলে ঐ সময় নামায পড়বে।

রমযানুল মুবারকের আমলসমূহ

১. রমযানুল মুবারকের উপযুক্ত মর্যাদাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য শাবান মাসেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নিবে এবং শাবান মাসের ১৫ তারিখের আগেই অর্থাৎ প্রথম পনের তারিখের মধ্যে অধিক পরিমাণে রোযা রাখবে। হযরত আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) শাবান মাসে অন্য সব মাস হতে বেশি রোযা রাখতেন।

২. অত্যন্ত গুরুত্ব ও আগ্রহের সাথে রমযানুল মুবারকের চাঁদ দেখার চেষ্টা করবে।  এবং চাঁদ দেখে এই দোআ পাঠ করবে।

আরবী (******)

“আল্লাহ মহান! আয় আল্লাহ! এ চাঁদকে আমাদের জন্য নিরাপদ ঈমান, শান্তি ও ভালবাসার চাঁদ হিসেবে উপস্থাপন করো। যা তুমি ভালবাস ও যাতে তুমি সন্তুষ্ট এ মাসে আমাদেরকে তা করার তাওফীক দাও। (হে চাঁদ!) আমাদের প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক একই আল্লাহ।”

৩. রমযান মাসে ইবাদতের সাথে বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করবে। ফরয নামায ব্যতীত নফল নামাযেও বিশেষ গুরুত্ব দিবে এবং বেশি বেশি নেকী অর্জনের চেষ্টা করবে। এ মহান ও প্রাচূর্যময় মাস আল্লাহ তাআলার বিশেষ দান ও দয়ার মাস। শা’বানের শেষ তারিখে রাসূল (সা) রমযান মাসের বরকতের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ তোমাদের জন্য এমন এক মহান মর্যাদা ও বরকতপূর্ণ মাস আসছে যাতে এমনি এক রাত আছে যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। আল্লাহ তাআলা ঐ মাসের রোযা ফরয করে দিয়েছেন এবং রাত্রি জাগরণকে (তারাবীহ এর সুন্নাত) নফল করে দিয়েছেন এবং যে ব্যক্তি এ মাসে মনের আনন্দে নিজ ইচ্ছায় কোন একটি নেক আমল করবে সে অন্য মাসের ফরয আদায়ের সমতুল্য সাওয়াব পাবে। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরয আদায় করবে আল্লাহ তাআলা তাকে অন্য মাসের ৭০টি ফরয আদায় করার সমতুল্য সওয়াব দান করবেন।

৪. সারা মাসের রোযা মনের আনন্দ, আগ্রহ ও গুরুত্বের সাথে রাখবে। যদি কখনও রোগের কারণে বা শরয়ী কোন ওজরবশতঃ রোযা রাখতে অক্ষম হও তা হলেও রমযান মাসের সম্মানে খোলাখুলি পানাহার হতে বিরত থাকবে এবং এমন ভাব দেখাবে যেন রোযাদারের মত দেখায়।

৫. কুরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে গুরুত্ব প্রদান করবে। এ মাসের সাথে কুরআনের বিশেষ সম্পর্ক আছে। পবিত্র কুরআন এ মাসেই অবতীর্ণ হয়েছে এবং অন্যান্য আসমানী কিতাবও অবতীর্ণ হয়েছে এ মাসের প্রথম অথবা তৃতীয় তারিখে। হযরত ইবরাহীম (আ) এর ওপর কয়েকটি ছহীফা বা ছোট কিতাব অবতীর্ণ হয়। এ মাসের ১২ অথবা ১৮ তারিখে হযরত দাউদ (আ) এর ওপর যবুর কিতাব অবতীর্ণ হয়।  এ বরকতময় মাসের ৬ তারিখে হযরত মূসা (আ) এর ওপর তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ হয়। এ বরকতময় মাসেরই ১২ অথবা ১৩ তারিখে হযরত ঈসা(আ) এর ওপর ইঞ্জিল অবতীর্ণ হয়। সুতরাং এ মাসে বেশি বেশি পবিত্র কুরআন পাঠের চেষ্টা করবে। হযরত জিবরাঈল (আ) প্রতি বছর এ মাসে রাসূল (সা) কে পূর্ণ কুরআন পাঠ করে শোনাতেন, রাসূল(সা) হতে শুনতেন এবং নব্যুয়তের শেষ বছর তিনি রাসূল(সা) এর কাছ হতে দু’বার পালাক্রমে শুনান ও শুনেন।

৬. পবিত্র কুরআন ধীরে ধীরে থেমে থেমে এবং বুঝে সুঝে পড়তে চেষ্টা করবে। অধিক তেলাওয়াতের সাথে সাথে বুঝার এবং ফল লাভেরও চেষ্টা করবে।

৭. তারাবীহর নামাযে পূর্ণ কুরআন শুনার চেষ্টা করবে। রমযান মাসে একবার পূর্ণ কুরআন শোনা সুন্নাত।

৮. তারাবীহর নামায বিনয়, মিনতি, আনন্দ, ধৈর্য ও আগ্রহের সাথে পড়বে, যেনতেনভাবে বিশ রাকাআতের গণনা পূর্ণ করবে না এবং নামাযকে নামাযের মতই পড়বে যেনো জীবনের ওপর ইহার ষোলআনা প্রভাব পড়ে, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত হয় এবং আল্লাহ তাওফীক দিলে তাহাজ্জুদ পড়ারও চেষ্টা করবে।

৯. দান খয়রাত করবে। গরীবদের, বিধবাদের, এতিমদের খোঁজখবর রাখবে, গরীব ও অভাবীদের সাহরী ও ইফতারের ব্যবস্থা করবে। রাসূল (সা) বলেন, “রমযান সহানুভূতির মাস।” (অর্থাৎ গরীব ও অভাবগ্রস্থদের সাথে সহানুভূতির দ্বারা অর্থনৈতিক ও মৌখিক উভয় প্রকার সহযোগিতা করাই আসল উদ্দেশ্য। তাদের সাথে কথাবার্তা ও আচরণে নম্র ব্যবহার করবে। কর্মচারীদের শ্রম লাঘব করে আরাম দেবে এবং আর্থিক সাহায্য দেবে। হযরত ইবনে আব্বাস(রা) বলেন যে, রাসূল (সা) দানশীল ও দয়ালুতো ছিলেনই তবুও রমযান মাসে তাঁর দানশীলতা আরো অধিক বেড়ে যেতো। যখন জিব্রাইল (আ) প্রতিরাতে এসে কুরআন পাঠ করতেন ও শুনতেন তখন ঐ সময় তিনি তীব্রগতি সম্পন্ন বাতাস হতে তীব্র গতিময় দানশীল ছিলেন।

১০. শবেকদর বা সম্মানিত রাতে খুব বেশী নফল নামায পড়ার চেষ্টা করবে এবং কুরআন তিলাওয়াত করবে। এ রাতের গুরুত্ব হলো, এ রাতেই পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে।

পবিত্র কুরআনের সূরা ক্বদরে আল্লাহ পাক বলেনঃ

“নিশ্চয়ই আমি এ কুরআনকে লাইলাতুল ক্বদরে অবতীর্ণ করেছি। আপনি জানেন লাইলাতুল ক্বদর কি? লাইলাতুল ক্বদর হলো হাজার মাস হতেও উত্তম। ঐ রাতে ফেরেশতাগণ ও জিব্রাঈল (আ) আল্লাহর নির্দেশে প্রতিটি কাজ সুচারূরূপে পরিচালনার জন্য অবতীর্ণ হয়। তাঁরা ফজর অর্থাৎ সুবহে ছাদিক পর্যন্ত অপেক্ষা করে।” (সূরা ক্বদর)।

হাদীসে আছে যে, শবেক্বদর রমজানের শেষ দশ রাতের যে কোন এক বেজোড় রাতে (গোপন) আছে। সে রাতে এ দোআ পড়বে।

আরবী (*******)

“আয় আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমাকে ভালবাসেন। সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।”

হযরত আনাস (রা) বলেছেন, এক বৎসর রমযান সামনে রেখে রাসূল (সা) বলেন, তোমাদের নিকট এমন একটি মাস আসছে যার মধ্যে এমন রাত আছে যা হাজার মাস হতেও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাত হতে বঞ্চিত থাকলো সে রাতের সকল প্রকার উত্তম ও প্রাচুর্য থেকে মাহরূম বা বঞ্চিত হলো। (ইবনু মাজাহ)।

১১. রমযানের শেষ দশদিন এতেকাফ করবে, রাসূল (সা) রমযানের শেষ দশদিন এতেকাফ করতেন।

হযরত আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) রমযানের শেষ দশ দিন রাতে ইবাদত করতেন এবং তাঁর স্ত্রীদেরকেও ঘুম হতে জাগাতেন এবং পূর্ণ উদ্যম ও আন্তরিক একাগ্রতার সহিত ইবাদতে মগ্ন হয়ে যেতেন।

১২. রমযান মাসে মানুষের সহিত অত্যন্ত নম্র ও দয়াপূর্ণ আচরণ করবে। কর্মচারীদের কাজ সহজ করে দিবে এবং মেটাবার চেষ্টা করবে। খোলা মনে তাদের প্রয়োজনসমূহ পূরণ করে দিবে এবং ঘরের লোকদের সাথেও দয়া ও দানশীলতার আচরণ করবে।

১৩.  অত্যন্ত বিনয়, খুশী ও আগ্রহের সাথে বেশী বেশী করে দোআ পাঠ করবে। “দুররে মানসুর” গ্রন্থে আছে যে, যখন রমযান আসতো তখন রাসূল (সা) এর স্বরূপ পরিবর্তন হয়ে যেতো, নামায বেশী বেশী পড়তেন, দোআয় অত্যন্ত বিনয় প্রকাশ করতেন এবং অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়তেন।

১৪. ছাদক্বায়ে ফিতর আগ্রহ ও পূর্ণ মনোযোগ সহকারে আদায় করবে।  ঈদের নামাযের আগেই ছাদকা আদায় করবে এবং এতটুকু আদায় করবে যে, অভাবী ও গরীব লোকেরা যেন ঈদের জরুরী জিনিসপত্র যোগাড় করার সুযোগ পায় এবং তারাও যেন সকলের সাথে ঈদের মাঠে হাসিমুখে যেতে পারে আর ঈদের খুশিতে শরীক হতে পারে।

হাদীসে আছে যে, রাসূল (সা) উম্মতের উপর  ছদক্বায়ে ফিতর এজন্য আবশ্যকীয় (ওয়াযিব) করে দিয়েছেন যেন রোযাদার ব্যক্তি রোযা থাকা অবস্থায় যেসব অনর্থক ও অশ্লীল কথাবার্তা বলেছে তার কাফফারা হয়ে যায় এবং গরীব মিসকিনদের খাদ্যের সংস্থান হয়। (আবু দাউদ)।

১৫. রমযানের বরকতময় দিনসমূহে নিজে বেশী বেশী নেকী অর্জনের সাথে সাথে অন্যকেও অত্যন্ত আবেগ ও উদ্বেগ, নম্রতা ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে নেকী এবং ভাল কাজের দিকে উৎসাহিত করবে যাতে ভাল পরিবেশে আল্লাহর ভয়, উত্তম অভিরুচি ও ভাল কাজের প্রতি আকর্ষণ বিরাজ করে এবং সম্পূর্ণ সমাজ রমযানের অমূল্য বরকতের দ্বারা উপকৃত হতে পারে।

রোযার আদব কায়দা ও নিয়ম-কানুন

১. রোযার বিরাট সওয়াব ও মহান উপকারিতার প্রতি লক্ষ্য রেখে পূর্ণ উৎসাহ ও আগ্রহের সাথে রোযা রাখার চেষ্টা করবে, ইহা এমন একটি ইবাদত যার পরিপূরক অন্য কোনো ইবাদত গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। এ কারণেই সকল জাতির উপর রোযা ফরয ছিলো।

সূরা আল বাকারায় আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

হে মুমিনগণ তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করা হয়েছিল, তোমরা যেন মুত্তাকী হতে পারো।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোযার এ মহান উদ্দেশ্যকে বর্ণনা করেছেন এভাবে:

“যে ব্যক্তি রোযা রেখেও মিথ্যা বলা, মিথ্যার উপর আমল করা ছেড়ে দেয়না এমন ব্যক্তির ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত থাকাতে আল্লাহর কিছু আসে যায় না।” (বুখারি)

তিনি আরো বলেছেন-

“যে ব্যক্তি দৃঢ় ঈমান ও এহতেসাবের[3] সাথে রমযানের রোযা রাখলো তার পেছনের সম্পূর্ণ গুনাহ খাতা মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারি)

২. রমযানের রোযা খুব গুরুত্বের সাথে রাখবে, কোনো রোগ অথবা শারীরিক কোনো ওযর ব্যতীত কখনো রোযা ছাড়বে না।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি কোনো রোগ অথবা শরয়ী কোনো ওযর ব্যতীত রমযানের একটি রোযা ত্যাগ করে তারা সারা জীবনের রোযাও ঐ এক রোযার ক্ষতিপূরণ হবেনা। (তিরমিযি)

৩. রোযার রিয়া ও লোক দেখানো থেকে বাঁচার জন্যে পূর্বের মতো হাসি-খুশি ও সক্রিয়ভাবে কাজে লেগে থাকবে, নিজের চাল-চলনে কখনও রোযার দুর্বলতা ও অলসতা প্রকাশ করবেনা।

৪. রোযার মাসে সকল প্রকার খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার পরিপূর্ণ চেষ্টা করবে। কেননা, রোযার উদ্দেশ্যই হলো জীবনকে পবিত্র করা। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “রোযা ঢাল স্বরূপ, যখন তোমরা রোযা রাখো মুখে কোনো নির্লজ্জ কথা বলোনা এবং হাংগামা করোনা। কেউ যদি গালাগালি করে বা ঝগড়া মারামারি করতে উদ্যত হয় তাহলে ঐ রোযাদারের বলা উচিত, আমি তো রোযাদার (আমি কিভাবে গালির উত্তর দিতে পারি অথবা ঝগড়া ফ্যাসাদ মারামারি করতে পারি?)” (বুখারি, মুসলিম)

৫. হাদিসসমূহে রোযার যে পুরস্কারের কথা ঘোষণা করা হয়েছে তার আকাঙ্খা করবে, বিশেষত: ইফতারের নিকটবর্তী সময়ে দোয়া করবে যে, আয় আল্লাহ! আমার রোযা কবুল করো, আমাকে ঐ সকল সওয়াব ও পুরস্কার দান করো যা তুমি দেওয়ার অংগীকার করেছো।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: রোযাদার বেহেশতে এক বিশেষ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, সে দরজার নাম হলো ‘রাইয়্যান’[4]। রোযাদারদের প্রবেশ করা যখন শেষ হয়ে যাবে তখন ঐ দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। অতঃপর আর কেউ ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারি)

তিনি আরো বলেছেন, “কিয়ামতের দিন রোযা রোযাদারের জন্যে সুপারিশ করবে এবং বলবে, হে প্রতিপালক! আমি এ রোযাদারকে দিনের বেলায় পানাহার ও অন্যান্য স্বাদের জিনিস থেকে বিরত রেখেছি।

“আয় আল্লাহ! তুমি তার পক্ষে আমার সুপারিশ কবুল করো। আর অমনি আল্লাহ তায়ালা তার সুপারিশ কবুল করবেন।” (মেশকাত)

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন, রোযাদার ইফতারের সময় যে দোয়া করে তা কবুল করা হয়, রদ করা হয়না। (তিরমিযি)

৬. রোযার কষ্টকে হাসি মনে সহ্য করবে, ক্ষুধা অথবা পিপাসার কষ্ট অথবা দুর্বলতার অভিযোগ করে রোযার মর্যাদা ক্ষুন্ন করবেনা।

৭. সফরে অথবা কঠিন রোগের কারণে রোযা রাখা সম্ভব না হলে ছেড়ে দেবে এবং অন্য সময়ে তার কাযা করবে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেন,

“যে রুগ্ন অথবা সফরে থাকবে সে অন্য সময় অবশ্যই রোযার সংখ্যা পূর্ণ করবে।” (আল বাকারা : ১০৪)

হযরত আব্বাস রা. বলেছেন: “আমরা যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সফরে থাকতাম তখন আমাদের মধ্য থেকে কিছু লোক রোযা রাখতো আর কিছু রোযা রাখতোনা। তবুও রোযাদাররা রোযা না রাখা লোকদের উপর আপত্তি করতোনা এবং রোযা না রাখা লোকেরাও রোযাদারদের উপর কোনো অভিযোগ করতোনা।”

৮. রোযার মধ্যে গীবত ও কুদৃষ্টি থেকে বিশেষভাবে বিরত থাকবে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “রোযা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে গণ্য এবং যে পর্যন্ত পরনিন্দা গী্বত না করে। আর যখন সে কারো গীবত করে বসে তখন তার রোযার মধ্য ফাটল সৃষ্টি হয়। (আদ্দাইলামী)

৯. আগ্রহের সাথে হালাল রুজি অন্বেষণের চেষ্টা করবে। হারাম রুজি দ্বারা লালিত শরীরের কোনো ইবাদতই (আল্লাহর দরবারে) কবুল হয়না।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “হারাম রুজি দ্বারা গঠিত শরীর জাহান্নামেরই উপযুক্ত।”

১০. সাহরী অবশ্যই খাবে, রোযা রাখা সহজ হবে এবং দুর্বলতা ও অলসতা সৃষ্টি হবেনা। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “সাহরী খাবে, কারণ সাহরী খাওয়াতে বরকত আছে।” (বুখারি)

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন: “সাহরী খাওয়াতে বরকত আছে। কিছু পাওয়া না গেলে কমপক্ষে কয় ঢোক পানি পান করবে। সাহরী খানেওয়ালাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার ফিরিশতাগণ সালাম প্রেরণ করেন। (আহমদ)

তিনি বলেছেন: “দুপুরে কিছুক্ষণ আরাম করে রাত্রি জাগরণের সুযোগ অর্জন করো এবং সাহরী খেয়ে দিনের রোযা রাখার শক্ত অর্জন করো।” (ইবনে মাজাহ)

সহীহ মুসলিমে আছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: আমাদের ও পূর্ববর্তী আহলে কিতাবদের রোযার মধ্যে পার্থক্য শুধু সাহরী।

১১. সূর্য অস্ত যাওয়ার পর ইফতারে দেরি করবেনা। কেননা রোযার মূল উদ্দেশ্য হলো আনুগত্যের অভ্যাস সৃষ্টি করা, ক্ষুধা নয়।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: মুসলমানগণ যতোদিন তাড়াতাড়ি ইফতার করবে ততোদিন ভালো অবস্থায় থাকবে। (বুখারি)

১২. ইফতারের সময় এ দোয়া পড়বে:

اَللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ اَفْطَرْتُ – مًسْلِم

“আয় আল্লাহ আমি তোমার জন্যে রোযা রেখেছি এবং তোমারই রিযিক দ্বারা ইফতার করেছি।” (মুসলিম)

“পিপাসা দূর হলো শিরাগুলো সতেজ হলো, আল্লাহ চাইলে সওয়াবও অবশ্যই পাওয়া যাবে। (আবু দাউদ)

১৩. কারো বাড়িতে ইফতার করলে এ দোয়া পাঠ করবে:

اَفْطَرَ عِنْدَكُمُ الصَّائِمُوْنَ وَاَكَلَ طَعَامَكُمُ الْاَبْرَارُ وَصَلَّتْ عَلَيْكُمُ الْمَلَائِكَةُ

“তোমাদের এখানে রোযাদাররা ইফতার করুক! তোমাদের খাদ্য নেক লোকেরা গ্রহণ করুক এবং ফিরিশতারা রহমতের দোয়া করুক।” (আবু দাউদ)

১৪. অন্যদেরও ইফতার করাবার চেষ্টা করবে, এতে অনেক সওয়াব। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমযান মাসে কোনো রোযাদারকে ইফতার করায় তার প্রতিদানে আল্লাহ তায়ালা তার জীবনের সম্পূর্ণ গুনাহ মাফ করে দেন এবং তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে নাজাত দেন। ইফতার করালে রোযাদারের সমতূল্য সওয়াব পাবে। এতে রোযাদারের সওয়াবের কোনো ঘাটতি হবেনা”। সাহাবাগণ আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের এতো সম্পদ কোথায় আছে যে, রোযাদারকে ইফতার করাবো? আর তাকে আহার করাবো? তিনি বললেন, একটি খেজুর অথবা এক চুমুক পানি বা দুধ দিয়ে ইফতার করানো যথেষ্ট। (ইবনু মাজাহ)

যাকাত ও সাদাকার বিবরণ

১. আল্লাহর রাস্তায় যা কিছু দান করবে তা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যেই করবে। অন্য কোনো উদ্দেশ্য যুক্ত করে নিজের পবিত্র আমলকে নষ্ট করবে না। এমন আকাঙ্খা কখনো রাখবে না যে, যাদেরকে দান করেছো তারা দানকারীর অনুগ্রহ স্বীকার করবে অথবা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, মুমিনগণ নিজের আমলের প্রতিদান বা পুরস্কার শুধু আল্লাহর নিকটই চায়। পবিত্র কুরআনে মুমিনের মনের আবেগ এভাবে প্রকাশ করেছেন:

“আমরা তোমাদের একান্তভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যেই খাওয়াচ্ছি, এজন্যে তোমাদের প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা চাইনা।”

২. লোকিকতা, বাগাড়ম্বর ও লোক দেখানো কাজ থেকে বিরত থাকবে, রিয়া ভালো আমলকেও ধ্বংস করে দেয়।

৩. যাকাত প্রকাশ্যভাবে দেবে। যেনো অন্যের মধ্যেও ফরয আদায়ের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তবে অন্যান্য (নফল) সাদাকা গোপনে দেবে। আল্লাহর নিকট ঐ আমলেরই মূল্য আছে যা একান্ত আন্তরিকতার সাথে করা হয়। কিয়ামতের মাঠে যখন কোনো ছায়া থাকবেনা সেদিন আল্লাহ ঐ বান্দাহকে নিজের আরশের নিচে ছায়া দান করবেন। যে অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে আল্লাহর পথে দান করেছে। এমনকি তার বাম হাতও জানেনি ডান হাতে কি খরচ করেছে।

৪. আল্লাহর পথে দান করার পর উপকারের কথা বলে বেড়াবেনা। আর যাদেরকে দান করা হয়েছে তাদেরকে কষ্টও দেবেনা। দান করার পর অভাবগ্রস্ত ও গরীবদের সাথে তুচ্ছ আচরণ করা, তাদের আত্ম-মর্যাদায় আঘাত হানা, তাদেরকে উপকারের কথা বলে বলে তাদের অন্তরে কষ্ট দেয়া, এটা চিন্তা করা যে, তারা তার উপকার স্বীকার করবে এবং তার সামনে নত হয়ে থাকবে, এগুলো অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ। মুমিনের অন্তর এ ধরনের হওয়া উচিত নয়।

এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

“হে মুমিনগণ! উপকারের কথা বলে গরীব-দুঃখীদের অন্তরে কষ্ট দিয়ে ঐ ব্যক্তির ন্যয় ধ্বংস হয়োনা যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্যে ব্যয় করে।”

৫. আল্লাহর পথে দান করার পর অহংকার ও দৌরব করবেনা। লোকদের ওপর নিজের প্রাধান্য বিস্তার করবেনা বরং একথা চিন্তা করে সংশয় পোষণ করবে যে, আল্লাহর দরবারে এ দান কবুল হলো কি হলো না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“তারা দান করে, যাই দান করে বস্তুতঃ কখনো তাদের অন্তর এ জন্যে ভীত  যে, তারা তার প্রভুর নিকট প্রত্যাবর্তনকারী।”

৬. দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের সাথে নম্র আচরণ করবে, কখনো তাদেরকে ধমক দেবেনা, তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করবেনা, তাদের হীনতা প্রকাশ করবেনা, ভিক্ষুককে দেবার মতো কিছু না থাকলেও নম্র ও ভদ্র ব্যবহার দ্বারা অপারগতা প্রকাশ করবে যেন সে কিছু না পেয়েও দোয়া দিতে দিতে বিদায় হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে বলেন, তোমরা যদি তাদের থেকে বিমুখ হতে বাধ্য হও, তোমার প্রতিপালকের দয়ার আশায় তাহলে তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বলো। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে অন্যত্র বলেছেন, “ভিক্ষুককে ধমক দিওনা”।

৭. আল্লাহর পথে উন্মুক্ত মনে ও আগ্রহের সাথে খরচ করবে। সংকীর্ণমনা, বিষন্ন মন, জবরদস্তি ও জরিমানা মনে করে খরচ করবেনা। ভাগ্যবান ও সফলকাম তারাই হতে পারে যারা কৃপণতা, সংকীর্ণতা হীনমন্যতা থেকে নিজের অন্তরকে পবিত্র রাখতে পারে।

৮. আল্লাহর পথে হালাল মাল খরচ করবে। আল্লাহ শুধু হালাল ও পবিত্র মালই কবুল করেন। যে মুমিন আল্লাহর পথে দান করার আকাঙ্খা রাখে তার পক্ষে কি করে সম্ভব হতে পারে যে, তার রুজির বা মালের মধ্যে হারামের মিশ্রণ থাকবে?

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেছেন,

“হে মুমিনগণ! (আল্লাহর পথে) তোমাদের হালাল রুজি থেকে ব্যয় করো।”

৯. আল্লাহর পথে উত্তম মাল ব্যয় করবে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা কখনো নেকী অর্জন করতে পারবে না, যে পর্যন্ত তোমাদের অতীব প্রিয় বস্তু আল্লাহর পথে ব্যয় না করবে।”

ছদকা দেয়া মাল পরকালের চিরস্থায়ী জীবনের জন্যে জমা হচ্ছে, একজন মুমিন কি করে চিন্তা করতে পারে যে, তার চিরস্থায়ী জীবনের জন্যে সে খারাপ ও অকেজো মাল সঞ্চয় করবে?

১০. যাকাত ওয়াজিব হয়ে যাওয়ার পর দেরি না করে তাড়াতাড়ি আদায় করার চেষ্টা করবে এবং ভালো করে হিসেব করে দেবে, আল্লাহ না করুন যেন কিছু বাকি থেকে না যায়।

১১. যাকাত সামাজিকভাবে আদায় করবে এবং ব্যয়ও সামাজিকভাবেই করবে। যেখানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠত নেই সেখানে মুসলমানদের সমিতিসমূহ ‘বায়তুল মাল’ প্রতিষ্ঠা করে তার সৎ ব্যবস্থা করবে।

হজ্জের নিয়ম ও ফযিলত সমূহ

১. হজ্জ আদায় করার ব্যাপারে দেরি ও গড়িমসি করবেনা। আল্লাহ তায়ালা যখনই এ পছন্দনীয় ফরয কার্য সমাধা করার সুযোগ দান করেন তখন প্রথম সুযোগেই রওয়ানা হয়ে যাবে। জীবনের কোনো ভরসা নেই যে, এ বৎসর থেকে অন্য বৎসর পর্যন্ত দেরি করতে পারবে।

পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে-

“মানুষের উপর আল্লাহর এ অধিকার যে, যারা তাৎর ঘর (বাইতুল্লাহ) পর্যন্ত যাতায়াতের সামর্থ রাখে সে যন বাইতুল্লাহর হজ্জ করে, আর যে এ হুকুমকে অস্বীকার করে, (তাদের জেনে রাখা উচিত যে) আল্লাহ সমগ্র বিশ্ববাসীদেরও মুখাপেক্ষী নন।”

হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি হজ্জ করার ইচ্ছা করে তাকে তাড়াতাড়ি হজ্জ করার উচিত। কেননা, সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে, তার উটনী হারিয়ে যেতে পারে এবং তার এমন কোনো জরুরত এসে যেতে পারে যে, তার হজ্জ করা অসম্ভব হয়ে যেতে পারে। (ইবনু মাজাহ)

অর্থাৎ সামর্থ্য হবার পর অনর্থক দুমনা করা উচিত নয়, একথা কারোর জানা নেই যে, আগামিতে এ সকল উপকরণ, সামর্থ্য ও সহজলভ্যতা থাকবে কি থাকবে না। আল্লাহ না করুন আবার বায়তুল্লাহর হজ্জ থেকে মাহরূমই থেকে যেতে হয়। আল্লাহ প্রত্যেক মুমিন বান্দাহকে মনস্থির করার সুযোগ দেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ জাতীয় লোকদের অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সাবধান করে দিয়েছেন। হাদিসে আছে-

“যে ব্যক্তিকে কোনো রোগে অথবা কোনো আবশ্যক অথবা কোনো যালিম শাসক বাধা দেয়নি অথচ সে এতদসত্বেও হজ্জ করেনি তা হলে সে ইহুদী অথবা খৃষ্টান হয়ে মরুক সেটা তার ইচ্ছা।” (সূনানে কুবরা-৪)

হযরত ওমর রা. বলেছেন, যে ক্ষমতা থাকা সত্বেও হজ্জ করেনি, আমার ইচ্ছা হয় যে, তাদের উপর জিযিয়া কর আরোপ করি, কারণ সে মুসলমান নয়, সে মুসলমান নয়।

২. আল্লাহর ঘরের যিয়ারত ও হজ্জ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যেই করবে, অন্য কোনো দুনিয়াদারির উদ্দেশ্যে পবিত্র উদ্দেশ্যকে মলিন করবেনা।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন,

“যারা তাদের প্রতিপালকের মাহাত্ম্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সম্মানিত ঘরের দিকে যাচ্ছে তাদেরকে বিরক্ত করোনা।” (আল বাকারা)

“শুধু আল্লাহর উদ্দেশ্যেই হজ্জ ও ওমরাহ সম্পূর্ণ করো।” (আল বাকারা)

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘হজ্জে মাবরুর’[5]-এর প্রতিদান বেহেশত থেকে কম নয়। (মুসলিম)

৩. হজ্জে যাওয়ার কথা প্রচার করবে না, চুপে চুপে চলে যাবে এবং আসবে। প্রচার প্রপাগাণ্ডা এবং লোক দেখানোমূলক সন্দেহযুক্ত রসম রেওয়াজ ও রীতিনীতি থেকে দূরে থাকবে, এমনিভাবে প্রতিটি আমল তো আমলে সালেহ ও আমলে মকবুল হওয়ার জন্যে আমলের মধ্যে এমন কোনো প্রকার প্রবৃইত্তর আকাঙ্খার মিশ্রণ ব্যতীত শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে হওয়া জরুরি। তাছাড়ার বিশেষ করে হজ্জ-এর প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরি এ জন্যে যে, ইহা আধ্যাত্মিক বিপ্লব, আত্মা ও চারিত্রিক পরিশুদ্ধির শেষ চিকিৎসা, যে আধ্যাত্মিক রোগী এর পরিপূর্ণ চিকিৎসা ব্যবস্থা দ্বারা আরোগ্য লাভ না করতে পারলো অন্য কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা দ্বারা আরোগ্য লাভ তার জন্যে সহজ নয়।

৪. হজ্জে যাওয়ার সামর্থ না হলেও আল্লাহর ঘর যিয়ারতের আশা, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা পাকে সালাম ও দরূদ পেশের আকাঙ্খা ও হজ্জ থেকে সৃষ্ট ইবরাহি আ.-এর আন্তরিক আবেগ এবং উদ্যম দ্বারা নিজের বক্ষকে উন্নত সমৃদ্ধ ও আলোকময় রাখবে।

হজ্জ ও ওমরাহ পালনকারী ব্যক্তি আল্লাহর বিশেষ মেহমান, তারা আল্লাহর নিকট দোয়া করলে তা আল্লাহ কবুল করেন এবং মাগফিরাতের দোয়া করলে আল্লাহ মাফ করে দেন। (তিবরানী)

৫. হজ্জের জন্যে উত্তম পাথেয় সাড়ম্বরে নিয়ে যাবে। উত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া, এ পবিত্র সফরে আল্লাহর নাফরমানী থেকে রক্ষা পেতে এবং আল্লাহর দান ও বরকত দ্বারা ধন্য হতে পারবে সে সকল বান্দাহই যারা সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে মহব্বতের আবেগ রাখে। পবিত্র কুরআনে আছে-

“পাথেয়  সংগ্রহ করো, উত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি।”

৬. হজ্জের  ইচ্ছা করা মাত্রই হজ্জের জন্যে মানসিক প্রস্তুতি শুরু করে দেবে। হজ্জের ইতিহাসকে স্মরণ করে পুরানো ইতিহাসকে নবরূপ দান করবে এবং হজ্জের এক একটি রুকন সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা করবে, আল্লাহর দীন এবং হজ্জের এ সকল আরকান দ্বারা মুমিন বান্দাহর অন্তরে যেসব আকর্ষণ সৃষ্টি করতে চায় ঐগুলো বুঝার চেষ্টা করবে। তারপর একজন বোধশক্তি সম্পন্ন মুমিন হিসেবে পূর্ণ একীনের সাথে হজ্জের রুকনসমূহ আদায় করে এ সকল মূলতত্ব অনুধাবন করার ও তদনুযায়ী নিজের জীবনে পরিবর্তন সাধনের চেষ্টা করবে, যে কারণে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“আল্লাহকে তেমনিভাবে স্মরণ করো যেভাবে স্মরণ করার জন্যে তিনি তোমাদেরকে হেদায়াত করেছেন এবং তোমরা তো এর পূর্বে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।”

এ উদ্দেশ্যে পবিত্র কুরআনের ঐ সকল অংশ গভীর দৃষ্টিতে পাঠ্যাভ্যাস করবে যে সকল অংশে হজ্জের মূলতত্ত্ব, গুরুত্ব ও হজ্জের দ্বারা সৃষ্ট আকর্ষণসমূহের বর্ণনা করা হয়েছে, এতদোদ্দেশ্যে রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিসসমূহ এবং ঐ সকল গ্রন্থ পাঠ করা যেগুলোতে হজ্জের ইতিহাস ও হজ্জের রুকনসমূহের মূলতত্ত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

৭. হজ্জের সময় পাঠের জন্যে হাদিসের কিতাবসমূহে যে সকল দোয়া পাওয়া যায় ঐগুলো মুখস্ত করে নেবে এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভাষায় আল্লাহর কাছে তাই চাইবে যা তিনি পূর্বেই চেয়েছিলেন।

৮. হজ্জের পরিপূর্ণ হেফাজত করবে এবং খেয়াল রাখবে যে, আমার হজ্জ ঐ সকল দুনিয়া পূজারীদের হজ্জের ন্যায় না হয়ে যায় যাদের জন্যে পরকালে কোনো অংশ নেই। কেননা, তারা পরকাল থেকে চোখ বন্ধ করে সবকিছু দুনিয়ার জন্যেই চায়, তারা যখন বায়তুল্লাহে পৌঁছে তখন তারা এরূপ দোয়া করে “আমাদের প্রতিপালক আমাদের যা দেবার দুনিয়াতেই তা দাও। আল্লাহ বলেন: আর তাদের জন্যে পরকালে কোনো অংশ নেই।

হজ্জের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতের সৌভাগ্য ও সফলতা অন্বেষণ করো। আল্লাহর কাছে দোয়া করো, আয় আল্লাহ! আমি তোমার দরবারে এ জন্যে এসেছি যে, তুমি আমাকে দুনিয়াতে ও আখেরাতে সফলকাম ও উদ্দেশ্যপূর্ণ করো। আর সর্বদা এ দোয়া পাঠ করতে থাকো,

رَ‌بَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَ‌ةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ‌

“আয় আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এ দুনিয়ায়ও উপকার করো এবং পরকালেও উপকার করো এবং আমাদেরকে দোযখের শাস্তি থেকে রা করো। (আল বাকারা)

৯. হজ্জ্বের সময় আল্লাহর নাফরমানীর পর্যায়ে পড়ে এমন কাজ করবেনা, কেননা হজ্জের সময় আল্লাহর ঘরে আল্লাহর মেহমান হিসেবে গিয়েছ। আল্লাহর সাথে ইবাদতের চুক্তিপত্র নবায়ন করতে গিয়েছ, হাজরে আসওয়াদে হাত রেখে তুমি যেন আল্লাহর হাতে হাত রেখে চুক্তি করছো আর উহাতে (হাজরে আসওয়াদে) চুমু খেয়ে যেন আল্লাহর আস্তানায় চুমু খাচ্ছো। বারবার তাকবীর ও তাহলীল সমৃদ্ধ আওয়াজে তুমি যেন প্রভু ভক্তির প্রকাশ করছো। এমতাবস্থায় চিন্তা করো। সাধারণ একটি পাপের ও ভুলের মিশ্রণও কতো বড় মারাত্মক ও ন্যক্কারজনক কাজ। আল্লাহ নিজ দরবারে উপস্থিত প্রত্যাশী বান্দাহদেরকে হুঁশিয়ার করে বলছেন, ‘ওয়ালা ফুসুকা’ সাবধান! (এ দরবারে আসতে আল্লাহর নাফরমানী সুলভ কোনো কথা বা কাজ করবেনা।”

১০. হজ্জের সময় ঝগড়া ফ্যাসাদ ও লড়াই বিবাদের কথা ও কর্ম ত্যাগ করবে। সফরের সময় যখন স্থানে স্থানে ভীড় হয়, কষ্ট হয়, কদমে কদমে স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটে, কদমে কদমে আবেগে আঘাত লাগে এমতাবস্থায় আল্লাহর মেহমানের কাজ হলো, সে উন্মুক্ত মনে নিজের উপর অপরকে প্রাধান্য দেবে এবং প্রত্যেকের সাথে মা, মার্জনা ও দাতাসুলভ ব্যবহার করবে। এমনকি চাকরকেও ধমক দেবেনা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেন:

وَلَا جِدَلَ فِىْ الْحَجِّ হজ্জে লড়াই ঝগড়ার কথা হবেনা।

১১. হজ্জ্বের সময় কামোদ্দীপক কথাবার্তা বলবেনা। সফরের সময় যখন আবেগে উত্তেজিত এবং দৃষ্টি এলোমেলো হবার বেশি আশংকা দেখা দেয় তখন অধিক সাবধান হয়ে যাও এবং দুষ্টাত্মা শয়তানের দুষ্টামী থেকে বাঁচার জন্যে চেষ্টা করবে। স্ত্রী যদি সাথে থাকে তাহলে তার সাথে শুধু বিশেষ সংশ্রব থেকেই বিরত থাকবেনা, এমনকি কামভাবের উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে এরূপ আচার-আচরণ থেকেও বিরত থাকবে। আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে বলেন:

“হজ্জ্বের মাসসমূহ সকলেরই জানা, যে ব্যক্তি এ নির্ধারিত মাসসমূহে হজ্জ্বের নিয়ত করেছে তাকে কামভাব উত্তেজনা আচার-আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে।” (বুখারি, মুসলিম)

“যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার এ ঘর যিয়ারত করতে এসেছে এবং নির্লজ্জতা ও কামভাব উত্তেজক কথাবার্তা থেকে বিরত রয়েছে এবং পাপাচার ও অন্যায় আচরণ করেনি সে এমন পাক পরিষ্কার হয়ে বাড়ি প্রত্যাবর্তন করে যেমন সে মায়ের পেট থেকে পরিষ্কার হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল। (বুখারি, মুসলিম)

১২. আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে পুরোপুরি সম্মান করবে। কোনো আধ্যাত্মিক ও গোপনীয় মূলতত্ত্বকে অনুভব করার এবং স্মরণ করিয়ে দেবার জন্যে যা চিহ্ন হিসেবে নির্ধারিত করে দিয়েছেন তাকে ‘শায়ীরাহ’ বলে। ‘শাআয়ের’ হলো তার বহু বচন। হজ্জের ধারায় প্রতিটি বস্তুই কোনো না কোনো মূলতত্ত্বকে অনুভব করার জন্যে চিহ্ন হিসেবে নির্ধারিত করে দিয়েছেন। এ সকল বস্তুকে অবশ্যই সম্মান করবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“হে মুমিনগণ! আল্লাহর নিদর্শন সমূহকে এবং সম্মানিত মাসসমূহকে এবং কুরবানির বস্তুকে, যে সকল জন্তুকে গলায় পট্টি বেঁধে কুরবানির জন্যে নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে সেগুলোকে, আর যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির ও মহাত্ম্য লাভের অন্বেষায় বাইতুল হারাম বা খানায়ে কা’বা যিয়ারতের মনস্থ করেছে তাদেরকে অসম্মান করোনা।” (আল মায়েদাহ)

সূরায়ে হজ্জে আছে:

“যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের সম্মান করে সেটা নিশ্চয়ই তার অন্তরে আল্লাহ ভীতির পরিচয় বা নিদর্শন।”

১৩. হজ্জের রুকনসমূহ আদায়কালে অত্যন্ত বিনয়, নম্রতা, নিঃসহায় ও নিঃসম্বলতা প্রকাশ করবে, আল্লাহর নিকট বান্দাহর বিনয়তা ও অসহায়তা বেশি পছন্দনীয়। রসূল সা.- কে কোনো এক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হাজী কে? উত্তরে বললেন,‘যার চুল বিপ্তি ময়লা হয় এবং ধূরা মাটিতে ভরা হয়।”

আমি উপস্থিত, আয় আল্লাহ! আমি উপস্থিত, তোমার কোনো শরিক নেই, আমি উপস্থিত, নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা তোমারই প্রাপ্য এবং সকল নেয়ামত তোমরই, বাদশাহী তোমারই, তোমার কোনো শরীক নেই।”

১৫. আরাফতের ময়দানে উপস্থিত হয়ে তওবা ও এস্তেগফার করবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক আদেশ করেছেন:

“অতপর তোমরা (মক্কাবাসীগণ) সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করো, সেখান থেকে অন্যান্য লোকেরা প্রত্যাবর্তন করে, আর আল্লাহর নিকট মাগফিরাত কামনা করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ মহান মাশীল ও দয়াবান।” (আল বাকারা)

রসূল সা. বলেছেন:

আল্লাহ তায়ালার নিকট আরাফতের দিন সকল দিন থেকে উত্তম। এ দিন দুনিয়া ও আসমানের বিশেষভাবে তাওয়াজ্জুহ প্রকাশ করে ফিরিশতাদের সম্মুখে নিজের হাজী বান্দাহদের বিনয় ও নম্রতার উপর গৌরব করে ফিরিশতাদেরকে বলেন, ফিরিশতাগণ! তোমরা দেখ, আমার বান্দারা প্রচণ্ড খর রৌদ্রতাপে আমার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে, এরা বহুদূর থেকে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে, আমার রহমতের আশা তাদেরকে এখানে উপস্থিত করেছে, বস্তুত: তারা আমার আযাব দেখেনি’ (আল্লাহ) এ গৌরব প্রকাশের লোকদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রেহাই দেয়ার হুকুম প্রদান করেন। আরাফাতের দিন এতো লোককে মাফ করে দেন যে, এতো লোককে আর কোনো দিন মাফ করা হয়না। (ইবনু হাব্বান)

১৬. মিনায় পৌছে কুরবানি করবে, যেভাবে আল্লাহর দোস্ত ইবরাহিম আ. নিজের প্রাণপ্রিয় সন্তান হযরত ইসমাঈল আ.-এর গলায় ছুরি চালিয়েছিলেন। কুরবানির এ আবেগসমূহকে নিজের মন ও মস্তিষ্কের উপর এভাবে প্রভাবিত করবে যে, জীবনের প্রতিটি েেত্র কুরবানি পেশ করার জন্যে প্রস্তুত থাকবেও জীবন বস্তুত: এ চুক্তির বাস্তব উদাহরণ হয়ে যাবে যে:

إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّـهِ رَ‌بِّ الْعَالَمِينَ – لَا شَرِ‌يكَ لَهُ

“নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্যে যিনি সারা জগতের প্রতিপালক, তাঁর কোনো শরিক নেই।”

১৭. হজ্জের দিনসমূহ সর্বদা আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত থাকবে এবং অন্তরকে কখনো এ স্মরণ থেকে অমনোযোগী হতে দেবেনা। আল্লাহকে স্মরণই প্রত্যেক ইবাদতের মূল রত্ম। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, وَذْكُرُوا اللهَ فِىْ اَيَّامٍ مَعْدُوْدَاتٍ  “গণনার এ কয়েক দিন আল্লাহকে স্মরণ করো।” (আল বাকারা)

فَإِذَا قَضَيْتُم مَّنَاسِكَكُمْ فَاذْكُرُ‌وا اللَّـهَ كَذِكْرِ‌كُمْ آبَاءَكُمْ أَوْ أَشَدَّ ذِكْرً‌ا

“অতপর তোমরা যখন হজ্জের সব রুকন আদায় করলে তখন তোমরা পূর্বে এ সময় যেমন তোমাদের বাপ-দাদাদের স্মরণ করতে এখন তদ্রুপ আল্লাহকে স্মরণ করো, আরো বেশি করে স্মরণ করো।”

হজ্জের রুকন সমূহের উদ্দেশ্যই হলো এ সকল দিনে নিয়মিত আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকা এবং সকল দিনে আল্লাহর স্মরণ এভাবে অন্তরে দাগ কেটে যায় যেন পুনরায় জীবনের আত্মগর্ব বা আত্ম-অহংকার ও টানাটানির মধ্যেও কোনো বস্তু আল্লহর স্মরণ থেকে অমনযোগী করতে না পারে। অন্ধকার যুগে লোকেরা পূর্বের প্রথা অনুযায়ী হজ্জ আদায় করার পর মক্কায় একত্রিত হয় নিজেদের বাপ-দাদাদের গৌরব বর্ণনা করো তাঁর যিনি প্রকৃতপে গৌরবময়।

১৮. আল্লাহ্র ঘরের ভক্তের মতো তাওয়াফ করবে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, “আর বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করা উচিত।”

রসূল সা. বলেন: “আল্লাহ তায়ালা প্রতিদিন বান্দাহদের জন্যে ১২০টি রহমত নাযিল করেন, তন্মধ্যে তাওয়াফকারীদের জন্যে ৬০ রহমত, সালাত আদায়কারীদের জন্যে ৪০টি রহমত এবং যারা শুধু বাইতুল্লাহর প্রতি সুদৃষ্টি নিপে করে থাকেন তাদের জন্যে ২০ রহমত।” (বায়হাকি)

রসূল সা. আরো বলেছেন: “যে ব্যক্তি ৫০ বার বাইতুল্লাহর তাফয়াফ করেছে সে গুনাহ থেকে এমন পবিত্র হয়েছে যে, যেনো তার মা তকে আজই প্রসব করেছে।”

 

About মাওলানা ইউসুফ ইসলাহী