ইসলামের নৈতিকতা ও আচরণ

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

দশম অধ্যায়ঃ জুমাবারে করণীয়

১. শুক্রবার ইসলামের দৃষ্টিতে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হলেও সেটা ইহুদিদের মত ইসলামি সাবাথ নয়; কারণ ইসলামে সাবাথ-এর অস্তিত্ব নেই। [***]
২. জুমার নামাজে যাবার আগে মুসলমানদের অবশ্যই যতদূর সম্ভব অজু সহকারে গোসল করতে হবে। ফরজ না হলেও গোসল করা মুস্তাহাব এবং একটি পরিচ্ছন্ন দিকও রয়েছে। অজু উত্তম হলেও গোসল করা চমৎকার।
৩. এইদিন সম্ভব হলে সর্বোত্তম পোশাক পরিধান ও প্রসাধনী ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া সুগন্ধি কেশ তৈলও ব্যবহার করা যায়।
৪. দাঁত পরিষ্কার এবং মুখের দুর্গন্ধ দূর করর জন্য ব্রাশ বা মিসওয়াক ব্যবহার করতে হবে। অন্যান্য দিনের তুলনায় শুক্রবার জুম্মার নামাজে রওয়ানা হওয়ার আগেই এ ব্যাপারে প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন।
৫. নামাজে রওয়ানা হবার আগে হাত-পায়ের নখ কাটতে হবে এবং পোশাকাদি পরিচ্ছন্ন ও দাঁড়ি-গোফ সুবন্যস্ত রয়েছে কিনা- সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে।
৬. শিশু-নারী-বৃদ্ধ, অসুস্থ এবং পীড়িত ছাড়া শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ।
৭. একাধিক মসজিদ থাকলেও শুক্রবার জুমার নামাজ একটি মসজিদে একত্রে পড়া উত্তম।
৮. শুক্রবার মসজিদে যতদূর সম্ভব তাড়াতাড়ি যাবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সম্ভব হলে গাড়িতে না চড়ে মসজিদে হেঁটে যাওয়াই শ্রেয়।
[*** সাবাথ (Sabbath) ইহুদিদের শনিবারের বিশ্রাম ও প্রার্থনা দিবস। এদিন তাদের জন্য মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু তারা তা অমান্য করায় তাদের প্রতি গজব নাজিল হয়- অনুবাদক।]
৯. মসজিদে প্রবেশের পর ১৬ অধ্যায়ে বর্ণিত আচরণবিধি অবশ্যই মেনে চলা আবশ্যক।
১০. মসজিদে বিরক্তিকর কিছু না করাই উত্তম। যেমন দু’জনের মধ্যে ঠাসাঠাসি করে দাঁড়ানো অথবা কাউকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়ে সবার কারো অধিকার নেই। সাম যাওয়ার জন্য নামাজিদের বিনীত অনুরোধ করতে হবে।
১২. মসজিদে থাকাকালে মুসল্লিদের এমন ভাবে বসা চলবেনা যাতে তার ঝিমুনী আসে, ঘুম ধরে, যার ফলে তার অজু নষ্ট হয়ে যায়।
১৩. কোন মুসল্লি যদি নিজেকে তন্দ্রাচ্ছন্ন বলে দেখতে পায়, তাহলে তার স্থান ত্যাগের চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে সে তার পার্শ্ববর্তী লোকের সাথে স্থান পরিবর্তন করবে।
১৪. কোন মুসুল্লী এমনভাবে বসবেনা, যাতে করে তার নাভী ও হাঁটুর মধ্যবর্তী শরীরের অংশ অনাবৃত হয়ে পড়ে।
১৫. মহানবী (সা.) শুক্রবার জুমার নামাজের আগে মুসল্লিদের মসজিদে চক্রাকারে বসতে নিষেধ করেছেন; কারণ এর ফলে লাইন সোজা করা যায় না এবং স্থান সংকীর্ণ হয়ে পড়ে।
১৬. মিম্বর থেকে খুতবা দানের সময় ইমামের সামনাসামনি বসা উচিত।
১৭. খোদার রহমত কামনায় সানুনয় ভঙ্গিতে হাত উপরে উঠানো ইমামের উচিত নয়।
১৮. জুমার নামাজ শেষ হলে মসজিদ ত্যাগ করার জন্য নামাজিদের তাড়াহুড়া করা বা দরজায় ভীর জমানো বাঞ্ছনীয় নয়।
১৯. আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ইসলামে সাবাথ-এর কোন অস্তিত্ব নেই। সুতরাং শুক্রবার সারাদিন কাজ বন্ধ করার কোন প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নামাজের সময় কাজ বন্ধ রাখঅ।
২০. খুতবা শুরুর পর থেকেই মুসুল্লিদের ইমামের প্রতি মনোনিবেশ করতে হবে এবং খুতবা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নীরব থাকতে হবে। জুমার নামাজে হালকা মেজাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উপস্থিত হওয়া নামাজের লক্ষ্যের পরিপন্থী।
২১. শুধু শুক্রবার রোজা রাখা উচিত নয়। তবে বৃহস্পতিবার অথবা শনিবার সহযোগে শুক্রবার রোজা রাখা যেতে পারে।
২২. শুক্রবার সফর বাতিল করার কোন প্রয়োজন নেই বা করা উচিত নয়।
২৩. শুক্রবার মহানবী (সা.)কে স্মরণ করার উত্তম সময় এবং “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মদ ওয়া আলা আলে মুহাম্মদ” (হে আল্লাহ, মুহাম্মদ (সা.)এর প্রতি ও তাঁর পরিবারের প্রতি তুমি রহমকরো) বলে (অর্থাৎ দরুদ শরীফ পাঠ করে) তাঁর রুহের প্রতি সওয়াব পৌঁছানো উচিত।
২৪. প্রতি শুক্রবার কুরআনের সূলাহ ‘কাহফ’ পাঠ করা প্রয়োজন।

শুক্রবারের জুমার খুতবা

১. শুক্রবার সবসময় কালো কাপড় পড়ার রেওয়াজ ইমামকে পরিহার করতে হবে।
২. মিম্বরে আরোহণ করার পূর্বে বা পরপরই ইমামকে নামাজিদের উদ্দেশ্যে সালাম দিতে হবে।
৩. খুতবা দানের সময় ইমামকে নামাজিদের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।
৪. খুতবার আলোচ্য বিষয় প্রাসঙ্গিক হতে হবে, চলতি সমস্যা এবং সমাধারে সাথে সংশ্লিষ্ট হতে হবে।
৫. জুমার খুতবা দু’ভাগে বিভক্ত। প্রতিভঅগে ইমামকে মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা দিতে হবে। মাঝখানে বিরতির সময় তাকে অল্প কিছুক্ষণেল জন্য বসতে হবে।
৬. ইমাম সাহেবের কণ্ঠস্বর হবে সুস্পষ্ট তবে বক্তব্য শোনানোর জন্য তার চিৎকার করা উচিত নয়। তার ভাষা হবে সহজ, সরল এবং সহজবোধ।
৭. খুতবার সময় কাউকে স্বাগত জানানো অথবা কোন ঘোষণা দেওয়ার জন্য ইমামের খুতবার ব্যাঘাত ঘটানো উচিত নয়।
৮. ইমাম খুতবা বা নামাজ দীর্ঘায়িত করবেনা। মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে তা সারতে হবে। কার্যতঃ খুতবার সংক্ষিপ্ততা ইসলাম সম্পর্কে ইমামের জ্ঞান ও উপলব্ধির পরিচয়বাহী।
৯. সানি খুতবা তথ্যশূন্য হওয়া উচিত নয়।
১০. খুতবা হচ্ছে একটি বাণী এব তা কোন কর্ম সম্পাদন নয়। ইমাম বাকপটুতা অথবা কাব্যিক ছন্দ পরিহার করবেন। তিনি এমন সুরে বা আওয়াজে বলবেন না, যাতে সংগীতের সুরমুর্ছনার রেশ থাকে।
১১. খুতবার মধ্যে দোয়া করার সময় ইমামের হাত উঠানো উচিত নয়। আঙ্গুল প্রসারিত করে মুনাজাত করাই শ্রেয়।
১২. ইমাম পূর্বাহ্নেই তার খুতবা তৈরি করে রাখবেন। তার দোয়াও হবে স্বতঃস্ফুর্ত এবং তা মুখস্থ হবে না। [বাংলাদেশে অধিকাংশ ইমাম সাধারণতঃ কোন বই থেকে খুতবা পাঠ করে থাকেন। অবশ্য কোন কোন বিজ্ঞ ইমমা আছেন, যারা খুতবা নিজেরা তৈরি করে আনেন- অনুবাদক]
১৩. নামাজের লাইন সোজা না হওয়া পর্যন্ত ইমাম তার নামাজ শুরু করবেন না।

About ড. মারওয়ান ইবরাহীম আল-কায়সি