ইসলামের নৈতিকতা ও আচরণ

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

পঞ্চদশ অধ্যায়ঃ সামাজিক জীবন

সুষ্ঠু সামাজিক সম্পর্ক

ইসলামি সমাজের কতিপয় বিধিবিধান মানা হলে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক সমন্বিত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে- প্রথমতঃ অন্যের প্রতি কর্তব্য, দ্বিতীয়তঃ অপরিহর্য ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট অর্জন করা এবং তৃতীয়তঃ ব্যক্তির খারাপ দিকগুলো পরিহার করা।

অন্যদের প্রতি কর্তব্য

১. কথা বলা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ এবং সামাজিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সুতরাং কি বলা হচ্ছে এবং কিভাবে বলা হচ্ছে তা খুব বিজ্ঞতার সাথে বিবেচনা করে বলতে হবে।
২. সততা ব্যক্তিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে এবং সামাজিক বন্ধন গড়ে তুলতেও সহায়তা করে। এটা একজন ভাল মুসলমানের অপরিহার্য গুণ।
৩. কথাবার্তার সময় অমায়িক মৌখিক অভিব্যক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা অন্যের প্রতি ব্যক্তির কর্তব্যের অংশ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
৪. লোকদের কর্মের ভিত্তিতেই মুসলমানকে তাদের বিবেচনা করতে হবে। যারা তার সাথে সদ্ব্যবহার করে তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করতে হবে। কোন মানুষ অন্যের গোপন ইচ্ছা ও চেতনা জানতে পারেনা- এটা বিচারের ভার আল্লাহর। কিন্তু যার অসততা ধরা পড়ে, সে সদিচ্ছা প্রকাশ করলেও তাকে বিশ্বাস করা যায়না।
৫. সম্মান ও সহৃদয়তার সাথে অন্যের সহিত সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
৬. ওয়াদা করার আগে মুসলমানকে নিশ্চিত হতে হবে যে, তিনি এ ওয়াদা রক্ষা করতে পারবেন। অজুহাত দিয়ে এই ওয়াদা খেলাপ করা যাবেনা। ভাবলে চলবেনা যে, এই অজুহাতই যথেষ্ট। এ অজুহাত অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে গেল, একথা ভাবলে তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা সৃষ্টি হবে।
৭. একই সঙ্গে বহু প্রতিশ্রুতি দেয়া অথবা বহু লোকের প্রতিশ্রুটি দেয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ হয়তো তিনি এতগুলো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবেন না।
৮. অন্যান্যের প্রতি সামাজিক কর্তব্যের ম্যে রয়েছে: তারা পীড়িত হলে তাদের দেখতে যাওয়া এবং মৃত্যুবরণ করলে তাদের দাফন কাফনে অংশ নেয়া।
৯. যে জনসাধারণকে ধন্যাদ দেয়না সে খোদার শুকরিয়া আদায় করেনা (হাদিস)।[আবু দাউদ, তিরমিজি] কারো প্রতি কৃত উপকারের জন্য তাকে ধন্যবাদ দেয়ার উত্তম উপায় হচ্ছে তাকে বলা: ‘জাযাকাআল্লাহ্ খায়রান’ (আল্লাহ তোমাকে পুরস্কৃত করুন)।
১০. কোন ব্যক্তি হারাম বা অনাকাঙ্ক্ষিত কোন বিষয় ছাড়া সাহায্য চাইলে মুসলমানের উচিত তাকে সাহায্য করা। কেউ সহযোগিতা চাইলে তাকে দ্বিধাহীন চিত্তে সাহায্য করতে হবে।
১১. দাওয়াত গ্রহণ করা উচিত। কোন বিয়ের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়।
১২. কোন মুসলমানের পোশাক, শরীর বা মুখ থেকে পিঁয়াজ বা রসুনের ন্যায় বস্তুর দুর্গন্ধ ছড়িয়ে অন্যদের অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলা উচিত নয়।

অপরিহার্য ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য

সাধারণভাবে বলতে গেলে সচ্চরিত্রের কোন ভাল গুণ নেই। সর্বোত্তম লোকেরাই সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। আর খাবার লোকেরা মন্দ চত্রের অধিকারী। সচ্চরিত্রের কয়েকটি দিক তুলে ধরছি, যা সকলের কাঙ্ক্ষিত। একজন মুসলমানের জিন্দেগি হবে নিম্নরূপঃ
১. বিনয়ী হতে হবে এবং কোনরূপ গর্ব করলে চলবে না।
২. কোন আস্থার আসনে বসানো হলে, সেই আস্থা অক্ষুন্ন রাখা দরকার।
৩. সর্বদা সত্য কথা বলবে এবং নির্দেশ মত কাজ করতে হবে।
৪. মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের প্রতি স্নেহদৃষ্টি, দয়া ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে।
৫. যার সহায়তা প্রয়োজন তাকে সাহায্য করা এবং সাহায্য না চাইলেও সুঃস্থকে সহায়তা দেয়া প্রয়োজন।
৬. ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের আসনে থেকে ক্ষমা করা উচিত।
৭. অপরের সৎ চিন্তাকে মূল্য দেয়া উচিত।
৮. অন্যের প্রতি বন্ধুসুলভ হওয়া এবং তাদের সাথে বন্ধুর মত ব্যবহার করা কর্তব্য।
৯. অপরের পরামর্শ চাইলে আন্তরিকভাবে পরামর্শ দেয়া প্রয়োজন।
১০. যে যার সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, তার সথে সে ব্যাপারে কথা বলবে না। জরুরি বা প্রয়োজন না হলে অন্যের কাছ থেকে কোন কিছু কখনও চাইবে না।
১২. ওয়াদা অক্ষুন্ন রাখা।
১৩. কর্তার রাগ প্রশমিত করা এবং নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত হওয়া।
১৪. যারা ইসলামের চর্চা করে, তাদের প্রতি তার সম্পর্কের বিশেষ গুরুত্ব দেয়া।
১৫. সর্বতা ধৈর্যশীল হওয়া।
১৬. আগে যার সাথে ঝগড়া হয়েছে, তাকে সম্ভাষণ জানিয়ে আন্তরিকতা প্রদর্শন করা।
১৭. দায়িত্বদানকারী অথবা নিয়োগকারীর পরিবার ও আত্মীয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
১৮. মিতচারী হওয়া।
১৯. খোদা যা দিয়েছেন, তা নিয়েই সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত হওয়া।
২০. তুচ্ছ বিষয় ছেড়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোনিবেশ করা।
২১. দুষ্ট লোকদের মোকাবেলায় দূরদর্শীতার পরিচয় দিতে হবে।
২২. অন্যের সাথে উপহার বিনিময় করা।
২৩. যে ভাল কাজ করতে চায় তাকে ভাল কাজের দিকে পরিচালিত করা।
২৪. বিবাদমান পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করা।
২৫. কাজ সম্পদানের আগে সে সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করে নেয়া।
২৬. অন্যের প্রতি সদয় হওয়া।
২৭. অন্যান্যরা তাকে যা গোপন করতে বলে সেটা এবং অন্যদের ব্যাপারে সে যা জানতে পেরেছে তা গোপন করা।
২৮. কোন মুসলমান মনক্ষুন্ন হয়েছে, এমন কাজ করলে সেজন্য ক্ষমা প্রার্থন করা।
২৯. যে দুর্ব্যবহার করেছে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া, যেন সে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে পড়ে।
৩০. প্রফুল্লচিত্তে আরেকজনের সাথে সাক্ষাৎ করা।
৩১. ভাল লোক হলে তাদের সাথে মেলামেশা করা। অন্যথা নির্জনতা অবলম্বন করাই শ্রেয়।
৩২. কারো অনুপস্থিতিতে সমালোচনা করা হলে তার পক্ষে কথা বলা।
৩৩. যে পথ হারিয়েছে তাকে পথ দেখানো বিশেষতঃ ক্ষীণ দৃষ্টিসম্পন্ন লোকদেরকে পথ দেখানো।
৩৪. সহজ হতে হবে; তবে বুদ্ধি বিবেচনাহীন হওয়া চলবে না।
৩৫. দানশীল হতে হবে, তবে অমিতব্যয়ী হওয়া যাবে না।
৩৬. দুর্বলের প্রতি সদয় এবং পিতামাতার প্রতি শদ্ধাশীল হতে হবে।
৩৭. কারো সম্পর্কে তথ্যাদি জানার জন্য সে গালিগালাজ বা গালমন্দ করলে প্রতিশোধ না নেয়া অথবা তার সম্পর্কে কিছু জানার জন্য গালিগালাজ না করা।

ব্যক্তিগত খারাপ বৈশিষ্ট্য

সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে সাফল্য অর্জন করতে চাইলে ব্যক্তিগত চরিত্রের কতিপয় নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য পরিহার এবং একই সঙ্গে কতিপয় ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যের চর্চা করতে হবে। নিম্নে নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের একটি তালিকা দেওয়া হলো যা মুসলমানকে পরিহার করতে হবে:
১. অত্যন্ত ভয় পাওয়া, উত্তেজিত বা আকস্মিকভাবে ক্ষুব্ধ হওয়া।
২. অন্যদের সাথে খারাপ সম্পর্ক রাখা।
৩. সংশ্লিষ্ট নয় এমন বিষয়ে কথা বলা।
৪. ক্ষুব্ধতা বা ক্রোধ প্রকাশ করা (বিশেষত সেটা যদি কোন গরিব মানুষের পক্ষ থেকে হয়; তবে ঐবেক্তি হয়তো নিজেকে বড় ভাবতে পারে, অন্যদের চোখে সে কার্যতঃ তা নয়)।
৫. কাউকে অপবাদ দেয়া।
৬. অন্য লোকের আলোচনা শুনতে যাওয়া যারা চায়না যে সে এই আলোচনায় অংশ নিক অথবা তারা তাকে এড়াতে চায়।
৭. দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করা।
৮. ভিন্ন লোকের বংশধরদের গালি দেওয়া।
৯. সহযোগী কোন মুসলমানের ‍দুর্ভাগ্যে সন্তুষ্টি প্রকাশ করা।
১০. বংশের মৃত পূর্বপুরুষ অথবা পদস্থ আত্মীয়-স্বজনের ব্যাপারে গর্ব করা।
১১. অন্যদের দোষত্রুটি বের করার জন্য প্রচেষ্টা চালানো।
১২. কোন মুসলমানের সাথে বিরোধ থাকলে, তিন দিনের বেশি কথা না বলা ও এড়িয়ে যাওয়া।
১৩. নিজে দুষ্টের শিরোমনি হয়ে অন্যের প্রতি অপবাদ দেওয়া।
১৪. কোন মুসলমানের ব্যাপারে এমন কিছু বলা, যা তিনি (স্ত্রী বা পুরুষ) পছন্দ করেন না, যদিও তা সত্য হয়।
১৫. অন্যের প্রতি সন্দেহপ্রবণ হওয়া।
১৬. অন্যের ব্যাপারে অনুসন্ধিৎসু হওয়া।
১৭. গোয়েন্দাগিরি করা।
১৮. কোন পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির জন্য অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া।
১৯. অন্যদের হিংসা করা।
২০. অন্যান্য মুসলমানদের ঘৃণা করা।
২১. কারো অগোচরে নিন্দা করা।
২২. অন্যদের প্রতি অসততার কাজ করা, প্রতারণা বা বিভ্রান্ত করা।
২৪. আত্মপ্রবঞ্চনা বা আত্মপ্রতারণা করা।
২৫. ধন-লোলুপ এবং কৃপণ হওয়া।
২৬. কাপুরুষ হয়ে নিজের ভয়ভীতি দূর করতে না পারা এবং বিপদ থেকে পালিয়ে যাওয়া।
২৭. সব সময় অসন্তুষ্ট থাকা ও অভিযোগ করা এবং কোন ব্যাপারে সন্তুষ্ট না হওয়া।
২৮. নিজের সাহায্য সহায়তা, দান-দক্ষিণা ও উদারতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
২৯. নিজে স্বারথপর হয়ে অন্যের কথা না ভেবে নিজস্ব প্রয়োজন ও কল্যাণের প্রতি প্রধানতঃ চিন্তাভাবনা করা ও আগ্রহী হওয়া।
৩০. অন্যকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে থাকা।
৩১. কোন ব্যক্তির উপস্থিতিতে তার প্রশংসা ও স্তুতিবাদ করা।
৩২. পাপিষ্ঠ প্রকৃতির অথবা বিত্তবান বা উচ্চ পদে অসীন ব্যক্তিদের প্রতি অনাহুত সম্মান প্রদর্শন।
৩৩. উচ্চস্বরে কথা বলা।
৩৪. অন্যের প্রতি কঠোর বা রূঢ় ব্যবহার করা।
৩৫. নিজের প্রশংসা করা অথবা নিজেকে অযাচিতভাবে বড় করে তুলে ধরা।
৩৬. নিথ্যা বলা।

কথা বলা ও শোনা

কথা বলা যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এবং তা ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশও বটে।
১. প্রত্যেক মুসলমানের মিতভাষী হওয়া উচিত এবং এটি একটি উত্তম গুণ। হাদিসে বলা হয়েছে, কেউ হয় ভাল কথা বলবে অথবা নীরব থাকবে।
২. নীরব থাকাকে দোষ হিসেবে বিবেচনা করে কোন মুসলমান শুধু কথা বলার খাতিরেই কথা বলা উচিত নয়। দোষটা হচ্ছেঃ খারাপ কথা বলা এবং বেশি কথা বলা। যা ভাল তা বলা তার কর্তব্য, নতুবা চুপ থাকা দরকার। চুপচাপ থাকা নিঃসন্দেহে ভাল গুণ, কিন্তু এমনটি করা যাবেনা যাতে মানুষ বিরক্ত হয়।
৩. মুসলমানদের অবশ্যই সত্যনিষ্ঠ হতে হবে এবং কেউ খুশি হোক বা বেজার হোক সত্য কথা বলতে হবে। তিক্ত হলেও তাকে সত্য কথা বলতে হবে।
৪. মুসলমানদের কথা বলার আগে সতর্ক চিন্তা করতে হবে এবং এমন কথা বলা উচিত নয়, যাতে তাকে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষশা চাইতে হয়।
৫. বক্তৃতায় অনাড়ম্বর ও স্বচ্ছ ভাষা ব্যবহার করা উচিত। বক্তৃতায় অতিরিক্ত সতর্ক ভাব এবং কৃত্রিমতা পরিহার করতে হবে। ভাষাগত দক্ষতা প্রদর্শন অথবা বক্তা অন্যদের চাইতে বেশি জ্ঞানের অধিকারী এটা প্রদর্শনের জন্য অদ্ভূত অলংকারযুক্ত শব্দ ব্যবহার করা উচিত নয়।
৬. যাদের সাথে কথা বলা হচ্ছে, তাদের প্রতি হৃদ্যতাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকানো সৌজন্যের নিদর্শন।
৭. প্রতিটি ঘটনার সাথে একটি নির্দিষ্ট বিষয় সম্পৃক্ত থাকে। এজন্যে আলোচিত বিষয় ও ঘটনার মধ্যে শিষ্টতা ও যথার্থতা থাকতে হবে।
৮. প্রত্যেক মুসলমান যা বলছে তা সত্যতা ও নির্ভুলতার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে।
৯. বক্তৃতা শ্রবণরত লোকেরা যদি বক্তার বক্তব্য অনুধাবন করতে না পারে এবং বক্তৃতার পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন হয়, তাহলে বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করা ভদ্রতার নিদর্শন।
১০. দ্রুত কথা বলা উচিত নয়। অতি ধীরে বা অতি দ্রুত কথা বলা, অতি উচ্চ বা অত্যন্ত মৃদুস্বরে কথা বলা উচিত নয়। এর ফলে শ্রোতারা বিতৃষ্ণ হয়ে পড়ে।

বক্তৃতার গ্রহণযোগ্য ভাষা

১. কথ্য ও অশালীন শব্দ যতদূর সম্ভব পরিহার করতে হবে।
২. বিদেশী শব্দ ও পরিভাষা পরিহার করা উচিত।
৩. প্রত্যেকের উচিত শ্রুতিমধুর, গ্রহণযোগ্য এবং নৈতিক প্রকাশভঙ্গি অর্জন করা।
৪. মুসলমানের পক্ষে কারো প্রতি অভিশাপ দেওয়া শোভন নয়।
৫. প্রত্যেক মুসলমানের অপশব্দ বা আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করা অনুচিত। তাকে গালিগালাজপূর্ণ ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। কটুবাক্য বা অশালীন প্রকাশভঙ্গির জন্য যদি কেউ কারো থেকে দূরে থাকে, সেটা সেই ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের প্রতি কালিমাস্বরূপ।
৬. মৃত ব্যক্তিদের গালিগালাজ করা অন্যায় এবং জীবিতদের প্রতি গালিগালাজের ন্যয় তা একইভাবে নিষিদ্ধ।
৭. নিজের ভাগ্যের প্রতি দোষারোপ করা এবং খোদার প্রতি অবিচার করার অভিযোগ মুসলমানদের জন্য দোষণীয় এবং তা পরিহার করতে হবে।
৮. বিশেষভাবে মুসলমানকে অথবা সাধারণভাবে সকল নীচু চোখে দেখা খারাপ বিষয়।
৯. নিজের প্রতি, নিজের সন্তানর প্রতি, গৃহ ভৃত্যদের প্রতি অভিসম্পাত দেওয়া নিষিদ্ধ।
১০. এমন কতিপয় বক্তব্য যা ইসলামের মৌলিক নীতির পরিপন্থী, যেমন, এমন কিছু বলা যাতে খোদার শরিকানা প্রকাশ রে- সেগুলো পরিহার করতে হবে। কোন মুসলমান কখনও বলবেনা: “খোদার ইচ্ছা ও এবং অমুক অমুকের ইচ্ছা হলে।” বরং তার বলা উচিত “একমাত্র খোদা যদি ইচ্ছা করেন, তাহলে অমুকের মাধ্যমে এটা পারে।” সে কখনো বলবেনা: “খোদা ও তুমি ছাড়া আমার কোন ভরসা নেই” বরং বলবে: “খোদা ছাড়া আমার কোন ভরসা নেই; তারপর আল্লাহ চাইলে, তোমরা রয়েছো।” সে কখনো বলবেনা: “আমি অমুকের শপথ করে বলছি।”
১১. বায়ু, বৃষ্টি বা অন্যান্য প্রাকৃতিক ঘটনার প্রতি দোষারোপ করা নিষেধ; কারণ এগুলো খোদার নির্দেশে সম্পাদিত হয়। বৃষ্টি বা বায়ুকে গালিগালাজের পরিবর্তে বলা যায়: “হে খোদা এগুলোকে রহমত হিসেবে দাও, শাস্তি হিসেবে নয়”। তাছাড়া পোষা মোরগকে গালি দেয়া উচিত নয়, কারণ এরা লোকজনকে ফজরের নামাজের জন্য জাগিয়ে দেয়।
১২. কোন মহিলার উচিত নয় অন্য মহিলার সঙ্গে খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে অন্তরঙ্গ হওয়া এবং তারপর তার নিজ স্বামীর কাছে অথবা কারো কাছে প্রকাশ করা।
১৩. কোন মুসলমান কোন আলোচ্য বিষয়ে তার জ্ঞানের প্রাধান্য প্রদর্শনের চেষ্টা করবে না, সে বরং বারংবার ‘আমি’ শব্দ উচ্চারণ পরিহার করবে।
১৪. কোন কাজের জন্য কাউকে দোষারোপ করার ব্যাপারে নমনীয় হতে হবে এবং অন্য লোকের সামনে তা না করাই ভাল।
১৫. কোন মুসলমান, যত ভাল হোকনা কেন, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে অন্যের ঈমান আকিদা বা চরিত্রের প্রতি কালিমা লেপন বা গালিগালাজ করবে না।
১৬. কোন মুসলমানের এমন কিছু বলা উচিত নয়, যাতে কারো মনোকষ্ট বা কারো ব্যাপারে ভুল রায় হতে পারে অথবা ভুল উদ্ধৃতি দেয়া হয়ে যেতে পারে। এমন বিষয় যাতে অন্যেরা বিব্রত হয়, তা না করা ও না বলাই ভাল।
১৭. কোন মুসলমান যেমন তার বক্তৃতায় অন্যের প্রতি দোষারোপ বা গালিগালাজ করবে না, তেমনি সে নিজের প্রতিও দোষারোপ বা গালিগালাজ করবে না।
১৮. কোন মুসলমান অন্য কোন ব্যক্তিকে তার উপস্থিতিতে কখনো প্রশংসা করবে না। যদি সে এটা না পারে, তাহলে তার প্রকাশবঙ্গিতে মধ্যম পন্থা অনুসারী হবে। কারণ শুধু খোদাই কাইকে নিষ্কলুষ আখ্যায়িত করতে পারে।
১৯. মুসলমানদের কাজ হচ্ছে: যারা অহরহ অন্যের সমালোচনা করে তাদের থামিয়ে দেওয়া।
২০. অন্যদের সাথে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক গোপনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা উচিত নয়। এটা একজনের মধ্যে সীমিত রাখাই শ্রেয়।
২১. কোন মুসলমান তৃতীয় কোন ব্যক্তির খারাপ দিক বলতে চাইলে তার অনুমতি দেবেনা। তার চাইতে বরং সদিচ্ছা নিয়ে অন্যেদের সাথে মেলামেশা ও সাক্ষাৎ করা উচিত। যদি সে অন্য লোকদের সম্পর্কে উল্টাপাল্টা বক্তব্য শুনতে পায়, তাহলে তার দায়িত্ব হচ্ছে: কথিত ব্যক্তির স্বপক্ষে বক্তব্য রাখা।
২২. কোন কাজ করার পর মুসলমানের এটা প্রকাশ করা উচিত নয় যে, সেই এটা সম্পাদন করেছে অথবা অন্যভাবে বলার চেষ্টা করা যে, সে এটা সম্পাদন করেছে।
২৩. অনেকক্ষণ ধরে বক্তৃতিা করা বদঅভ্যাস। বক্তৃতাকালে মধ্যমপন্থা অনুসরণ করা শ্রেয়।
২৪. কোন মুসলমান যে জিনিসের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, সে ব্যাপারে কথা না বলাই ভাল।
২৫. অন্যদের একান্ত আলোচনার সময় আড়িপাতা নিষেধ।
২৬. সহযোগী মুসলমানদের মধ্যেই ‘ভাই’ শব্দের ব্যবহার সীমিত রাখতে হবে।
২৭. কোন মুসলমানকে কাফের বলা বা তার ঈমান নাই বলা- সম্পূর্ণ নিষেধ।
২৮. কোন ব্যক্তি থেকে যদি কেউ কিচু জানতে চায়, তাহলে প্রথমে তাকে সালাম সম্ভাষণ জানাবে, ঐ সময় কি ধরনের কাজে ব্যেস্ত- তা বিবেচনা করবে, তারপর প্রয়োজনীয় বিষয়ে কথা বলবে।
২৯. কোন মুসলমান যখন নবী করিম (সা.) সম্পর্কে কথা বলবে অথবা তার সাক্ষাতে নবী (সা.) এর কথা বলা হয়, তখনই সে বলবে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তার প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক)- এটা বলা সুন্নত।
৩০. কোন মুসলমান খোদার ইচ্ছার উল্লেখ ছাড়া ভবিষ্যতের ঘটনা সম্পর্কে নির্দেশাত্মক পরিভাষা ব্যবহার করবেনা, বলবে: ইনশাআল্লাহ (খোদা যদি ইচ্ছা করেন)।
৩১. কোন মুসলমান অন্য কোন ব্যক্তির সমালোচনা বা গালিগালাজ বা তার দোষ ত্রুটি বলবেনা, যদিও ঐ ব্যক্তি তাকে সমালোচনা বা গালিগালাজ করে এবং তার দোষত্রুটি ধরিয়ে দেয়।

শ্রবণ

মুসলমানদেরকে:
১. যতদূর সম্ভব ভদ্রতার সঙ্গে অন্যের কথা শুনতে হবে।
২. অন্যেরা যখন কথা বলবে, তখন তাদের বাধা না দেওয়া উচিত।
৩. যে ব্যক্তির সাথে কথা বলা হচ্ছে, তার মুখোমুখি হয়ে কথা বলা উচিত এবং তার বক্তব্য আগ্রহের সাথে শোনা উচিত। আলোচিত বিষয়ে আগ্রহ না থাকলেও নিজেকে ধৈর্য ধরতে হবে যদি বিষয়টি ইসলাম, তার নীতি অথবা নবী করিম (সা.) এর বিরোধী না হয়। এক্ষেত্রে হয় কথা বলা বন্ধ করবে অথবা সঙ্গ ত্যাগ করবে।
৪. যে ব্যক্তির সাথে সে একমত নয়, এমন ব্যক্তির সাথে যুক্তিহীন কথাবার্তায় জড়িয়ে পড়া উচিত নয়।

শপথ করা

১. যতদূর সম্ভব শপথ করা এবং শপথ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
২. মুসলমানরা শুধু আল্লাহ, তার কোন সিফাতের নামে শপথ নেবে। নবী, নামাজ, কাবা অথবা কুরআনের ন্যায় কোন কিছুর নামে শপথ নিতে পারেনা।
৩. খারাপ কাজে আল্লাহর নামে শপথ করা মহাপাপ।
৪. কথায় কথায় খোদার নামে কসম করা উচিত নয়।
৫. যদি কোন মুসলমান কোন কিছু সম্পাদনের বা কোন কিছু থেকে বিরত থাকার শপথ নেয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে দেখে যে, কিছু কাজ করাই উত্তম, তাহলে তার শপথ পূরণ না করা উচিত এবং সেজন্যে কাফফারা আদায় করা উচিত।
৬. মুসলমানদের কর্তব্য হচ্ছে: শপথ পূরণ করা। সুতরাং শপথ নেয়ার আগে তাকে নিশ্চিত হতে হবে যে, অঙ্গীকার পূরণের সামর্থ্য তার আছে।
৭. ‘তুমি যদি এটা না কর বা ওটা না কর, তাহলে বউ তালাক দেব’- এ ধরনের হুমকি দেওয়া অরুচিকর এবং মুসলমানের জন্য অশোভনও বটে। এ ধরনের তুচ্ছ ও শিশুসুলভ প্রসঙ্গে বিয়ের প্রসঙ্গ টেনে আনা উচিত নয়।
৮. কোন কোন ক্ষেত্রে, মেযন ব্যবসা বা আর্থিক লেনদেন, শপথ করা উচিত নয়।
৯. ওয়াদাভঙ্গ করা চলবেনা। কোন মুসলমান যদি ওয়াদাভঙ্গ করে, তাহলে ১০ জন দুঃস্থ ব্যক্তিতে খাওয়াতে হবে অথবা এদের প্রতে্যককে এক প্রস্থ কাপড় দিয়ে কাফফারা আদায় করতে হবে। যদি সে আর্থিকভাবে এ কাফফারা আদায়ে সমর্থ নয় হয়, তাহলে তাকে উপর্যুপরি তিনদিন রোজা রাখতে হবে।
১০. কোন মুসলমান যদি ইসলামের নিষিদ্ধ কাজ করার শপথ নেয়- যেমন যে বস্তুর মালিক সে নয়, তা নিয়ে নেয়া- তাহলে তার উচিত শপথ ভঙ্গ করা।
১১. কোন কোন সুলমান যদি ইসলাম বিরোধী কোন কাজ সম্পাদন করতে শপথ নেয়, তাহলে তার শপথ পূরণ না করা এবং কাফফারা আদায় করা কর্তব্য।

নজর (ইচ্ছা পূরণের সাথে শপথকে সংশ্লিষ্ট করা)

১. কারো প্রতি খোদার অনুগ্রহের প্রতিদানে খোদার রাহে কোন কিছু সুনির্দিষ্ট কাজর করার অনুমতি রয়েছে, তবে এ ব্যপারে উৎসাহিত করা হয়নি।
২. কোন বিশেষ কাজের জন্য মানত করা শুধু খোদার রাহেই করা যেতে পারে।
৩. খোদার রাহে মানত করলে তা অবশ্যই পূরণ করবে এবং অন্যের নামে মানত করা হলে তা পূরণের ব্যাপারে এড়িযে যাবে।
৪. কোন ব্যক্তি আল্লাহর রাহে কোন জন্তু মানত করলে, সে যদি প্রাথমিক পর্যায়ে এর গোশত খাওয়ার নিয়ত না করে থাকে, তাহলে এই মাংস খাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

হাসি

কোন চমৎকার জিনিস দর্শন, কোন সুখবর শুনে বা কৌতুকচ্ছলে আমরা হেসে থাকি।
১. অন্যেরা হাসছে এজন্য হাসতে হবে, তা ঠিক নয়। হাসির কারণ থাকতে হবে।
২. উচ্চশব্দে বা অরুচিকর শব্দে হাসি দেয়া উচিত নয়।
৩. অট্টহাসির চাইতে যে হাসিতে দাঁতের কিয়দাংশ মাঁড়ি পর্যন্ত দেখা যায়, সেরূপ স্মিতহাসি বা মুচকি হাসি উত্তম।
৪. হাসির উচ্চস্বর নিয়ন্ত্রণ রা খা উচিত; উচ্চ শব্দ করা বাঞ্ছনীয় নয়।
৫. হাসির জন্য হাসা- বিশেষতঃ তা যদি মিথ্যার জন্য হয়- তাহলে মুসলমানদের হাসা অনুচিত।
৬. কোন জনসমষ্টির মধ্যে কোন ব্যক্তি যদি এমন থাকে, যে কোন মূল্যে হাসানো যার কাজ, তাহলে মুসলমানদের এরকম মজলিশে বসা উচিত নয়।
৭. অন্য ব্যক্তিকে উপহাসের জন্য হাসা নিষেধ।

কাঁদা

১. সঙ্গতকারণ এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবেই কান্না আসা উচিত।
২. আবেগ দমন করা যাচ্ছেনা বলে কাঁদা কাপুরুষের কাজ। তথাপি সংযতভাবে কাঁদা যায়, তবে তা অতিরিক্ত বা উচ্চস্বরে চিৎকার দিয়ে নয়।

তামাশা

১. সবসময় গুরুগম্ভীর থাকা, একঘেঁয়েমী পরিহারের জন্য বিভিন্ন মানুষের সাথে হাসি তামাশায় অংশ নেয়া ভাল।
২. হাসি তামাশার সময় পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে অভদ্র বা পীড়াদায়ক ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়।
৩. অতিরিক্ত গাম্ভীর্য এবং বেশি হাসি তামাশা পরিত্যাজ্য; কারণ এর ফলে আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার এবং অন্যের অনুভূতির আঘাত লাগার সম্ভাবনা থাকে।
৪. অন্যের অনুভূতিতে যাতে আঘাত না লাগে, সেজন্যে তামাশার মূল বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।
৫. তামাশার সাথে অতিরিক্ত অঙ্গভঙ্গি বা শারীরিক কসরত প্রদর্শন চলবে না।
৬. তামাশাচ্ছলে অন্যের জিনিসপত্র নেয়া যাবেনা।
৭. তামাশাচ্ছলেও মিথা বলা যাবেনা।

অন্যদের সাথে সাক্ষাৎকালে আচরণ

১. তাকে হাসতে হবে। কারণ যে কোন সফল সাক্ষাতে জন্য হাসি অপরিহার্য। তবে শুধু পার্তিব সম্পদের অধিকারী লোকদের দেখে হাসা উচিত নয়।
২. অন্য মুসলমানদের সম্ভাষণ জানাতে তাকে অগ্রণী ভূীমকা পালন করতে হবে।
৩. ব্যক্তি যেই হোকনা কেন এবং উপলক্ষ্য যাই হোক, সম্ভাষণ জানানোর সময় কারো প্রতি মাথা নত করা চলবেনা।
৪. অন্য লোকদের সাথে সাক্ষাতকালে এবং সম্ভাষণের পর ডান হাত প্রসারিত করে করমর্দন করতে হবে। এর ফলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বাড়ে।
৫. বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়, এমন বক্তির সাথে করমর্দন করা চলবে না।
৬. কারো হাতে ময়লা থাকলে এবং কেউ এ অবস্থায় করমর্দন করতে চাইলে বিনীতভাবে করমর্দন না করার জন্য ক্ষমা চেয়ে কারণ ব্যাখ্যা করবে।
৭. প্রত্যেক সাক্ষাতে করমর্দন করার জন্য বিব্রত হলে চলেবে না।
৮. পুরুষের সাথে পুরুষ এবং নারীর সাথে নারী করমর্দন করবে। যদি কোন নারী পুরুষের সাথে অথবা পুরুষ নারীর সাথে করমর্দন করতে চায়; তাহলে তাকে (নারী/পুরুষ) ক্ষমা চাইতে হবে।
৯. সাক্ষাৎকালে পরিবার সম্পর্কে বার বার প্রশ্ন উত্থাপন সময় ক্ষেপণের কাজ এবং তা একঘেঁয়েমী হতে পারে। এজন্য তাকে এ ধরনের কাজ এড়িয়ে যেতে হবে।
১০. কো ব্যক্তির সাথে সাক্ষাতের পর সম্ভাষণ না জানিয়ে কথাবার্তা শুরু করলে তার সাথে কথা নাবলার অধিকার যে কারে রয়েছে।
১১. বসে থাকা অবস্থায় কারো সাথে করমর্দনের জন্য দাঁড়ানো অপরিহার্য নয়। অবশ্য এমন কতিপয় উপলক্ষ আছে যেমন কেউ সফর থেকে ফিরে আসার পর সাক্ষাৎ হলে দাঁড়ানো যেতে পারে।
১২. দেখা সাক্ষাৎ শেষ হলে পুনরায় করমর্দন করে বলতে হবে ‘ আসসালামু আলাইকুম’ (তোমার উপা খোদার রহম হোক)।
১৩. যে ব্যীক্ত সংক্রিামক ব্যাধিতে আক্রান্ত তার সাথে করমর্দন করা আবশ্যক নয়।
১৪. মোনাজা করার পর করমর্দন করা সুন্নত নয় বরং বলবে ‘তাকাব্বাল আল্লাহ’ (আল্লাহ আমাদের মোনাজাত কবুল করুন)।

সম্ভাষণ জানানোর আদব

১. সম্ভাভণ জানানোর অভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ফলে বন্ধুত্ব ও পরিচিতি বাড়ে। এটা হৃদ্যতা ও সৌজন্যের কাজও বটে।
২. যে ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে বা গাড়িতে যাচ্ছেন, তিনি হাঁটারত ব্যক্তিকে, চলমান ব্যক্তি বসা অবস্থার লোককে এবং ছোট দল বৃহৎ দলকে সম্ভাষণ জানাবে। কম বা বেশি একই বয়সের ‍দু’ব্যক্তি দেখা পেল, তাহলে যে কেউ প্রথমে সম্ভাষণ জানাতে পারে।
৩. সম্ভাষণ জানাতে যারা দ্বিধান্বিত হয়না, তারাই উত্তম লোক, সেজন্যে উল্লিখিত বিধিবিধান পালনের ব্যাপারে নমনীয়তা আবশ্যক।
৪. অন্যদের সম্ভাষণ জানাতে হবে ‘আসসাল্লামু আলাইকুম’ (আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক) বলে।
৫. আসসালামু আলাইকুম বলার পরই সুপ্রভাত, শুভ সন্ধ্যা, ‘হ্যালো’ প্রভৃতি শব্দে সম্ভাষণ জানানো যেতে পারে।
৬. যে কোন সম্ভাষণের জবাব একইভাবে বা তার চেয়ে ভালভাসে দেওয়া হচ্ছে সৌজন্যের দাবি। জবাবে কমপক্ষে বলতে হবে ‘ওয়া আলাইকুমস সালামৎ (আপনার উপর শান্তিবর্ষিত হোক); আদর্শ ও পূর্ণাঙ্গ জবাব হচ্ছে ‘ওয়া আলাইকুমস সালাম ও রাহমাতুল্লাহ ওয়াবারাকাতুহু (আপনার উপর খোদার রহমত ও করুণা বর্ষিত হোক)।
৭. মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে কালবিলম্ব না করে সম্ভাষণের জবাব দেয়া; অবশ্যবিলম্বের যৌক্তিক কারণ থাকলে সেটা ভিন্ন কথা।
৮. কোন মুসলমান অন্যকে সম্ভাষণ জানালে, অথবা অন্যরা তাকে সম্ভাষণ জানালে, তার সম্ভাষণ বা জবাবি সম্ভাষণ স্পষ্ট করে শ্রুত হতে হবে।
৯. কোন মুসলমান যদি মনে করে, কোন কারণে অন্য লোকেরা তার ‘সালাম’ শুনতে পায়নি, তাহলে তাকে পুনরায় অথবা তৃতীয়বার সালাম দিতে পারে। তবে এর অধিক নয়।
১০. নির্দিষ্ট সময়ের পর কোন কোন লোকের সাথে সাক্ষাৎ হলে পুনরায় সম্ভাষণ জানানোর বিষয়টিকে একঘেঁয়েমী মনে করা ঠিক নয়।
১১. হাতের আঙ্গুল বা তালু প্রদর্শন করে অথবা মাথা নুইয়ে লোকদের সম্ভাষণ জানানো অবশ্যই পরিহার করতে হবে।
১২. চেনা অচেনা সকলকে সম্ভাষণ জানাতে হবে মুসলমাদের। এর ফলে পরিচিত ও বন্ধুদের সংখ্যা বাড়ে। তবে বাজার-ঘাটে বা জনাকীর্ণ রাস্তায় যেসব লোকজনের সাথে দেখা হয়, তাদের সকলকে সম্ভাষণ জানানো ঠিক নয়।
১৩. একজন লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে কোন মুসলমানের কারো কারো নাম বা উপাধি করে ডাকা উচিত নয়। সৌজন্যের খাতিরে সাধারণভাবে সকলকে সম্ভাষণ জানাতে হবে যাতে করে সকলেই সম্ভাষিত হয়।
১৪. একদল লোক সম্ভাষণ জানালে সাধারণ সম্ভাষণের মাধ্যমে তার প্রত্যুত্তর দিতে হবে এবং এক্ষেত্রে বিশেষ কারো নাম উল্লেখ করা চলবে না।
১৫. কোন মুসলমানের পাশ দিয়ে কেউ অতিক্রম করলে এবং সে সম্ভাষণ জানিয়েছে কিন সন্দেহ হলে তার জবাব দেয়ার প্রয়োজন নেই।
১৬. যদি কেউ একদল লোককে সম্ভাষণ জানায়, এবং এই দলের কোন সদস্য তার প্রত্যুত্তর দেয় তাহলে তাই যথেষ্ট; তবে দলের সকল সদস্য জবাব দিলে ভাল হয়।
১৭. মুসলমান বা অমুসলমান যেই হোকনা, কেন, কেউ সম্ভাষণ জানালে তার জবাব দেয়া প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।
১৮. কোন মুসলমানের কারো সাথে দেখা হলে, তার যদি সন্দেহ হয় যে, সে সম্ভাষণের জবাব দেবে কি-না, তাহলে তাকে সম্ভাষণ জানানো তার দায়িত্ব নয়।
১৯. সম্ভাষণ জানানোর সুপারিশ করা হলেও কোন কোন ক্ষেত্রে সম্ভাষণ এড়িয়ে যেতে হবে, যেমন, কেউ পায়খানা প্রস্রাব করাকালে অথবা ঘুমালে বা ঝিমুতে থাকলে।
২০. মুসলমান-অমুসলমান নির্বিশেষে কোন মিশ্রিত দলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করা কালে মুসলমানকে বলতে হবে ‘আসসালামু আলাইকুম’ (তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক)।
২১. এস্তেঞ্জাকালে কেউ সম্ভাষণ জানালে পায়খানা থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত মুসলমান জবাব দেবেনা।
২২. কোন মুসলমান বাড়ি ফিরে তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি সম্ভাষণ জানাতে অবহেলা প্রদর্শন করবে না।
১৩. ছেলেমেয়েদের পাশ দিয়ে যাবার সময় তাদের সম্ভাষণ জানানো উত্তম যদিও শিশুদের উচিত আগে সালাম জানানো।
২৪. যদি কোন ব্যক্তি কোন মুসলমানের কাছে কাউকে পাঠায়, এমন বার্তা নিয়ে যাতে সালাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তাহলে সে তাদের উভয়কে বলবে ‘আসসালামু আলাইকা ওয়া আলাইহে (তোমার ও তার উপর শান্তি বর্ষিত হোক)।
২৫. কোন মুসলমানের কাছে বার্তা পাঠালে তাকে লিখিতভাবে সম্ভাষণ জানানো যায়, আসসালামু আলা মানএত্তেবা আল হুদা’ (যারা হেদায়াতের পথে আছে তাদের প্রতি সালাম) বলে।
২৬. একদল লোকের সামনে হাজির হওয়া অথবা কোন ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করার সময় সম্ভাষণ জানাতে হবে। বিদায়কালে সাক্ষাতের পর পুনরায় সম্ভাষণ জানাতে হবে। বিদয়কালে সম্ভাষণ জানানোর গুরুত্ব রয়েছে সবিশেষ, বিশেষ করে দু’পক্ষ যেখানে যুক্তিতর্ক প্রদর্শন করেছে অথবা আলোচনাকালে মতানৈক্য হয়েছে; সেক্ষেত্রে বিদায় সম্ভাষণ জানানোর অর্থ হচ্ছে তাদের মনোকষ্ট আর নেই এবং উভয় সুসম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে আগ্রহী।
২৭. অন্যান্য মুসলমানদের স্বাগত জানানোর সময় মৌখিকভাবে (টেলিফোনে বা লিখিতভাবে (পত্র ইত্যাদি) শুরু ও শেষ করতে হবে আসসালামু আলাইকুম বলে।
২৮. অমুসলমানদের সম্ভাষণ জানানো অনৈসলামিক নয়, তবে এক্ষেত্রে মুসলমানদের পরিভাষায় অর্থাৎ আসসালামু আলাইকুম বলা যাবে না।

অপরের বাসগৃহে প্রবেশের সময় অনুমতি প্রর্থনা

১. অনুমতি না নিয়ে কোন মুসলমানের পক্ষে কারো গৃহে প্রবেশ করা উচিত নয়। পিতামাতার ন্যায় যারা ঘনিষ্ঠজন তাদের কাছ থেকেও অনুমতি নেয়া সৌজন্র বিশেষ। কারণ গৃহে লোকজন এমন কোন পোশাক বা অবস্থায় থাকতে পারে যা তারা অন্যকে দেখাতে রাজি নয়। বিশেষ করে এটা মহিলাদের বেলায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মহিলাদের কাপড় চোপড় ঠিক করতে, চুল ঢাকতে সময় দেয়া প্রয়োজন।
২. কাউকে স্বাগত জানানোর জন্য দরজা খোলা হলে সেই ফাঁকে গৃহে উঁকি দেয়া নিষিদ্ধ।
৩. কোন বাড়িতে প্রবেশের আগে অনুমতি চাওয়ার পূর্বে যেই জবাব দিকনা কেন, দর্শনার্থীর উচিত প্রথমে তাকে স্বাগত জানানো। ভিতরে প্রবেশের জন্য অনুমিত চাওয়র ধরন হবে এমন, ‘আসসালামু আলাইকু, আমি (আপনার নাম বলুন) কি ভিতরে আসতে পারি’? প্রথমে সম্ভাষণ না জানালে গৃহে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া যুক্তিসঙ্গত।
৪. দরজা খোলার আগে দর্শনার্থীকে যদি তার পরিচয় বলতে হয়, তাহলে তা অবশ্যই দিতে হবে। শুধু এতটুকু বলা ‘এই যে, আমি’- ঠিক নয়।
৫. প্রবেশের অনুমতি দেওয়া না হলে, অনুমতির জন্য তিনবার পুনরাবৃত্তি করা যাবে। এরপরে ও যদি অনুমতি দেয়া না হয়, তাহলে দর্শনার্থী সাক্ষাত করতে চান, তিনি তাকে স্বাগত নাও জানাতে পারেন। সুতরাং যদি বলা হয়, তিনি ব্যস্ত আছেন এবং মেহমানদের স্বাগত জানাবেন না, তাহলে তার অপমানবোধ করা উচিত নয়।
৬. দরজায় করাঘাত করা বা বেল বাজানো, সম্ভাষণ জানানোও ভেতরে প্রবেশের অনুমতির বিকল্প নয়।
৭. দরজায় মৃতু টোকা দিতে হবে, কারণ গৃহে কেউ ঘুমিয়ে থাকতে পারে অথবা অসুস্থ হতেও পারে। তিনবার করাঘাত করার পরেও যদি কোন সাড়া না মেলে তাহলে দর্শনার্থীর স্থান ত্যাগ করা উচিত।

বন্ধুদের বাড়িতে

মোলাকাত এবং বিনিময়ের (exchange of visits) ফলে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সম্পর্ক জোরদার হয় এবং তা সুস্থ সমাজ জীবনের প্রধান উপাদান হিসেবে গণ্য হয়। এর ফলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দূর হয়, যার স্থান ইসলামে নেই।
১. ইসলামের পদ্ধতিতে হচ্ছে: কোন মুসলমান তার মেজবানকে তার সফরের ইচ্ছা সম্পর্কে জানাবে। পূর্ব নির্ধারিত সময়সূচি ছাড়া কারো সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে এবং তিনি কোন কারণে তাকে স্বাগত জানাতে অনিচ্ছুক হলে, তার বিষণ্ণ হওয়া উচিত নয়।
২. পূর্ব-নির্ধারিত সাক্ষাৎ অবশ্যই ত্বরিৎ সম্পাদন করতে হবে। পূর্বে নির্ধারিত সময়সূচি পরিবর্তন করার বা বাতিল করার ন্যায়সংগত কারণ থাকলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের উচিত তা অন্যপক্ষকে জানিয়ে দেওয়া।
৩. রাতের বেলা (এশার নামাজের পর) বা দিবসের ঘুমের সময় ছাড়া অন্য সময় পরিদর্শন করতে যাওয়া উচিত।
৪. পূর্ব-নির্ধারিত হলে মেহমানকে স্বাগত জানানো মেজবানের কর্তব্য। তদুপরি মেহমানকে স্বাগত জানাতে না পারার দরুণ মেজবানের ক্ষমা চাওয়ার অধিকার রয়েছে। এক্ষেত্রে মেহমানকে অপমানবোধ করলে চলবে না।
৫. ব্যক্তিগত স্বার্থ বা অন্যান্য স্বার্থপরতা থেকে এই মোলাকাতকে মুক্ত রাখতে হবে। এই মোলাকাতের উদ্দেশ্য হবে মুসলমানদের সাথে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক জোরদার করা।
৬. যে মহিলার স্বামী বাড়িতে নেই, সেক্ষেত্রে ‘মহরম’ মানুষ ছাড়া তার বাড়িতে যাওয়া পুরুষদের উচিত নয়।
৭. পূর্ব-নির্ধারতি হলেও কোন মুসলমান অনুমতি না পাওয়া এবং তাসে সম্ভাষণ না জানানো পর্যন্ত মেজবানের গৃহে প্রবেশ করবে না।
৮. মোলাকাতকারীকে স্মরণ রাখতে হবে যে, তিনি কারো বাড়িতে গেছেন। এজন্য নিজের জন্য কিছুটা বিব্রতকর হলেও তাকে মেজবানের পরিকল্পনার সাথে সমন্বয় করে চলতে হবে।
৯. যারা মোলাকাত করতে আসে শুধু তাদের বাড়িতেই মোলাকাত সীমিত রাখা মুসলমানের উচিত নয়।
১০. মেহবান কখনও মেজবানের সামনে ইমামতি করবেনা অথবা তার অনুমতি ছাড়া মেজবানের নির্দিষ্ট স্থানে বসবেনা।
১১. অন্য পরিবারের সঙ্গে মোলাকাতকালে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ। প্রয়োজন হলেই মেহমান মেজবানের স্ত্রী বা কন্যদের সাথে কথা বলতে পারে। মেজবানের স্ত্রী সঠিক পোশাকে আবৃত হয়ে মেহমানদের আপ্যায়ন করতে পারে।
১২. স্বামী আপত্তি করলে স্ত্রীর উচিত নয় কারো সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া।
১৩. মেজবানের বা তার পরিবারের সদস্য কর্তৃক ইসলামি শিক্ষার সুস্পষ্ট লংঘণ হলে মেহমানের উচিত চলে যাওয়া। এ ধরনের আচরণ উত্তম মুসলমানদের কাছে অগ্রহণযোগ্য ও অসহনীয়। এক্ষেত্রে মেজবানের আচরণের ব্যাপারে মেহমানকে সবর করতে হবে।
১৪. কোন মুসলমান কারো সাথে মেহমান হিসেবে থাকতে চাইলে তিনদিনের বেশি আতিথ্য প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। এর বাইরে যা প্রাপ্য তা অনুদান হিসেবেই পাওয়া। কারো বোঝা হয়ে দাঁড়ায়- এরূপ অবস্থা সৃষ্টি পর্যন্ত মেহমানের অবস্থা করা উচিত নয়।
১৫. মেজবান কোন কিছু খেতে দিলে চিকিৎসাগত কারণ অথবা রোজা না থাকলে অসম্মতি জানানো অভদ্রতার শামিল। এক্ষেত্রে ক্ষশা চেয়ে প্রত্যাখ্যানের কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে।
১৬. মোলাকাতকারী যদি পেশাব পায়খানা করতে চায়, তাহলে মেজবানকে জানিয়ে স্থান ত্যাগ করবে।
১৭. অন্যদের সাথে মোলাকাত করতে গেলে অনুরোধ ছাড়া দীর্ঘসময় অবস্থান করা উচিত নয়। দীর্ঘকাল অবস্থান এবং অতিরিক্ত কাল ক্ষেপণ করে নিজেকে নির্বোধ প্রমাণিত করা সুষ্ঠু ইসলামি আচরণের মধ্যে পড়েনা।
১৮. বিদায়ের প্রাক্কালে মেহমান অবশ্যই মেজবানকে আপ্যাপয়নের জন্য ধন্যবাদ দেবে। তিনি বিদায় নেয়ার জন্য অনুমতি চাইবেন এবং অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। অতঃপর মেজবানের কাছ থেকে বিদায় নেবেন।
১৯. কোন মুসলমান অন্যের সঙ্গে মেহমান হিসেবে অবস্থানকালে যদি রোজা রাখতে চায়, তাহলে মেজবানকে তার ইচ্ছার কথা জানানো সৌজন্য বিশেষ।
২০. যদি কোন বন্ধু বা আত্মীয় দেখা সাক্ষাৎ করতে না আসে, তাহলে কোন মুসলমানের উচিত নয় একই আচরণ করা। সে তা সাথে মোলাকাত করবে এবং তার মোলাকাতের জন্য অপেক্ষা করবে না।
২১. মুসলমানদের উচিত নয় শুধু বিশেষ উপলক্ষে মোলাকাত সীমিত রাখা। আগেই বলা হয়েছে, মোলাকাত বা বিনিময়ের ফল সব সময় ফলপ্রসু হয়ে থাকে।

মেহমানদের স্বাগত জানানো

১. মুসলমানদের উচিত তার মেহমানদের আন্তরিকতার সাথে এবং সহাস্যে স্বাগত জানানো। মেহমানের প্রতি সম্মান ও আপ্যায়ন করা ইসলামের দৃষ্টিতে অ্যতম কর্তব্য।
২. মেজবানের উচিত মেহমানের কাছ থেকে বিরক্তির সকল উৎস দূরে সরিয়ে রাখা।
৩. মেহমানকে কোন প্রকার কর্তব্য সম্পাদন করতে বলা অভদ্রতা।
৪. বেশ ক’দিনের জন্য আগমন ও অবস্থানের জন্য মেহমানের কোন দাওয়াতের প্রয়োজন নেই। তবে তার আসার ব্যাপারে মেজবানকে আগাম জানিয়ে দেয়া ভাল। মেহমান তিনদিন অবস্থান করার পর চলে যেতে পারে।
৫. কোন মুসলমানের কাছে মেহমান মোলাকাত করতে আসলে সামর্থ্য অনুযায়ী সমাদান করা এবং তাকে খাদ্য ও পানীয় দেয়া কর্তব্য। অবশ্য তার সাথে মোলাকাত করতে গেলে এই ব্যবহার পাওয়া যাবে কিনা সেটা বিবেচ্য নয়।
৬. মোলাকাত শেষ হলে মেহমানের বিদায়ের প্রাক্কালে মেজবানকে তার সাথে বহির্দরজা পর্যন্ত সঙ্গ দিতে হবে এবং তাকে বিদায় জানাতে হবে।

লোকদের আপ্যায়ন

১. কোন মুসলমান তার সাফল্যের ব্যাপারে গর্ব করার ইচ্ছা না থাকলে অন্যান্য লোকদের আমন্ত্রণ জানাতে পারে।
২. শুধু ধনী ও প্রভাবশালী লোকদের নিমন্ত্রণ করলে চলবেনা, গরিব ও অভাবগ্রস্তদেরও আমন্ত্রণ জানাতে হবে।
৩.অন্যান্যদের দাওয়াত দেওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও ভাল মুসলমানদের আপ্যায়নের জন্য দাওয়াত দিতে হবে। মুসলমানদের দাওয়াত দেয়ার ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে আপ্যায়নের ফলাফল যেহেতু বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করা, সেজন্য এর লক্ষ্য মুসলমানদের মধ্যে সীমিত রাখা উচিত।
৪. আপ্যায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবেশিীদেরও আমন্ত্রণ জানানো উচিত।
৫. আমন্ত্রিত মেহমানদের প্রতি উদারতা প্রদর্শন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; তবে এক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও বাহুল্য পরিহার করতে হবে।
৬. মেহমানদের স্বাগত জানানোর কলাকৌশলের ক্ষেত্রে পঞ্চদশ অধ্যায়ে বর্ণিত বিধান অনুসরণ করতে হবে।
৭. খাবার দেয়ার সাথে সাথে মেহমানরা খেতে শুরু করতে পারলেও তাদের প্রতি বিসমিল্লাহ বলে খাবার শুরু করতে বলা উত্তম।
৮. মেহমানদের পানাহার করতে বলা এবং অতিরিক্ত না খাওয়ার কথা বলা অভদ্রতা বিশেষ; তবে বিশেষ ধরনের খাবার গ্রহণের জন্য পীড়াপীড়ি করা উচিত নয়।
৯. মুসলমানদের বক্তৃতা দেবার কালে নিজের উদারতা বা মহত্বের অথবা পরিবেশিত খানাপিনা সম্পর্কে প্রশংসা না করার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
১০. বিশেষ বিশেষ সময়ে আমন্ত্রণ জানানো সীমিত করা উচিত নয়। আমন্ত্রণ যেকোন সময় করা যেতে পারে।
১১. মেহমান যাতে এ ধারণা করতে না পারে যে, সে কি পরিমাণ খাচ্ছে তার প্রতি লক্ষ্য রাখা অথবা সে অনেক বেশি খাচ্ছে, এরকম চিন্তা ভাবনা মেজবানের রয়েছে।
১২. আকস্মিকভাবে কোন মেহবান এসে গেলে মুসলমানদের কর্তব্য হচ্ছে তার সুষ্ঠু মেহমানদারিত করা।

খাবার জন্য আমন্ত্রিত হলে

১. কোন মুসলমানকে খাবারেরর জন্য আমন্ত্রণ করা হলে তা গ্রহণ করা উচিত। বিবাহ উৎসবের আমন্ত্রণ অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে (যদি এতে নিষিদ্ধ কিছু না থাকে)।
২. কেউ যদি আপ্যায়নের জন্য এমন আমন্ত্রণ জানায়, যা হচ্ছে শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থে, তবে তা গ্রহ করা উচিত নয়।
৩. কেউ নফল রোজা রাখা অবস্থায় আমন্ত্রিত হলে রোজা ভঙ্গ করা অথবা এই আমন্ত্রণ রক্ষা করার স্বাধীনতা করার স্বাধীনতা তার রয়েছে।
৪. কারো বাড়িতে খাবার জন্য আমন্ত্রিত হলে কোন মুসলমানের উচিত নয় এমন কাউকে সাথে নেয়া যে আমন্ত্রিত নয়।
৫. যদি কেউ কোন মুসলমানের অনুসরণ করে এবং তার মেজবানে বাড়িতে যাওয়ার সময় সম্মতি ছাড়াই সহযোগী হয় সেক্ষেত্রে মেজবানকে বিষয়টি জানিয়ে রাখা কর্তব্য। মেজবান তার ইচ্ছানুসারে অনাকাঙ্ক্ষিত মেহমানকে গ্রহণ বা বর্জন করতে পারেন।
৬. খাবার পরিবেশন করা হলে তাড়াহুড়া করে খাবার টেবিলে যাওয়া ভদ্রোচিত ব্যাপার নয়। উত্তম পদ্ধতি হচ্ছেঃ তার ডানের ব্যক্তিকে অনুসরণ করা।
৭. প্রতিযোগিতার লক্ষ্যে ভোজ উৎসবের আয়োজন করা হলে এই আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া অনুচিত।
৮. নৈতিক দুর্নীতিবাজ কোন ব্যক্তির আমন্ত্রণ শুধু এজন্য গ্রহণ করা উচিত নয় যে, তাকে না বলা একটা সমস্যা। তাকে ইসলামের পথে ফিরিয়ে আনার ইচ্ছা থাকার শর্তে আমন্ত্রণ গ্রহণ করা যেতে পারে।
৯. খেতে বসে ৪নং অধ্যায়ে বর্ণিত রীতিনীতি মানতে হবে।
১০. পরিবেশিত খাদ্যের মধ্যে এমন খাদ্যবস্তু অথবা পানীয় থাকলে, যা ইসলামে নিষিদ্ধ, যেমন মদ বা শূকরের মাংস, তাহলে মেজবানকে ওগুলো সরিয়ে নেয়া অথবা চলে যাওয়ার কথা বলতে হবে। এগুলো সরিয়ে নেয়া না হলে তৎক্ষনাৎ সে স্থান ত্যাগ করা উচিত।
১১. মেহমান দাওয়াতের জন্য মেজবানকে ধন্যবাদ দেবেন এবং তার জন্য খোদার রহমত কামনা করবেন। নিম্নোক্ত দোয়া করা যেতে পারে: “আকালো তা’মুকুম আল আবরর ওয়া সাল্লাহ আলায়কুম আল মালাইকা ওয়া আফতারা ইন্দাকুম আস-সায়েমুন” (সালেহ লোকেরা তোমার মাধ্যমে অংশ নিক, ফেরেস্তারা তোমার জন্য দোয়া করুক এবং রোজাদারগণ তোমার সাথে ইফতার করুক)।

অসুস্থদের দেখতে যাওয়া

১. অসুস্থদের দেখতে গেল, তাদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করলে, তারা অধিকতর স্বস্তিবো্ধ করেন। এজন্যে সামাজিক সম্পর্ক জোরদার ও বিকাশ লাভ করে। সুতরাং শুধু বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনই নয় বরং যারা দূর সম্পর্কের আত্মীয় ও স্বল্প পরিচিত, সেসব অসুস্থ লোকদেরকেও দেখতে যাওয়া উচিত।
২. অসুস্থদের দেখতে যাওয়ার জন্য সময় নির্ধারণ করে নিলে ভাল হয়, তবে তা জরুরি নয়। অসুস্থরা হাসপাতালে থাকলে রোগী পরিদর্শনের সময়সূচি মেনে চলতে হবে এবং সেখানে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা থাকলে- তাও মেনে চলতে হবে।
৩. অসুস্থতার ধরনের উপর পরিদর্শনের প্রকৃতি ও সময়ের পরিমাণ নির্ভর করে। অসুস্থদের দেখার ব্যাপারে চিকিৎসকের নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে অথবা তাদের সংক্ষিপ্ত সময়ে দেখা যেতে পারে। চিকিৎসকদের অনুমতি থাকলে অসুস্থদের পাশে দীর্ঘ সময় কাটানো আবশ্যক, যাতে করে তারা অনুধাবন করতে পারে যে, তার প্রতি অবহেলা করা হচ্ছে না।
৪. পরিদর্শনকারী রোগীর পাশেই বসতে হবে এবং তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে হবে।
৫. রোগী পরিদর্শনকালে তার আরোগ্যের জন্য দোয়া করা উচিত। এই অসুস্থতা পাপ মোচনের জন্যেও হতে পারে। রাসূলে করিম (সা.) রোগী পরিদর্শনকালে বলতেন: “লা-বা’স ত্বাগুর ইনশাআল্লাহ” (কোন ক্ষতির কারণ নেই, যদি আল্লাহর ইচ্ছা হয় সংশোধন করা)।
৬. রোগী পরিদর্শনকারীকে সতর্কতার সঙ্গে সান্ত্বনার বাক্য বেছে বেছে বলতে হবে; ভাগ্যের প্রতি আপত্তিকর কোন মন্তব্য, অসুস্থতাকে পাপ হিসেবে উল্লেখ করা অথবা এমন কোন কথা বলা, যা রোগীর উপর খারাপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে- ইত্যাদি বলা গুনাহ। তার চেয়ে এই অসুস্থতা খোদার দেওয়া নিয়তির অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে উৎসাহিত করা এবং খোদা সকলের মঙ্গল করুণ- এরূপ ধারণা রাখতে বলা আবশ্যক।
৭. পীড়িত ব্যক্তির অবস্থা নৈরাশ্যকর অবস্থায় উপনীত হলে বলতে হবে “ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন” (নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং তার দিকেই আমরা ফিরে যাব)।
৮. কোন মুসলমানের অসুস্থ ব্যক্তিকে তার সাহচর্য থেকে বঞ্চিত রাখা উচিত নয়। অসুস্থ ব্যক্তি তার ব্যাপারে ঘনিষ্ঠতাবোধ করলে তার কাছে যখনি প্রয়োজন হয় যাওয়া দরকার।
৯. রোগীর প্রতি উদ্বেগ শুধু রোগী দেখার মধ্যেই সীমিত রাখলে হবে না। সময়ে সময়ে তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে তার পরিবারের কাছে খোঁজ-খবর নিহে হবে।
১০. বন্ধু, প্রতিবেশী বা আত্মীয় অমুসলিম হলেও, অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যেতে হবে। ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্যও এটা প্রয়োজন।
১১. কুষ্ঠ রোগী বা এ ধরনের রোগ বা পঙ্গু ব্যক্তির প্রতি অপলক দৃষ্টিতে তাকানো উচিত নয়, যদি তারা এতে অপমানবোধ করে।

গ্রুপ বৈঠক

১. সামাজিকতার খাতিরে শুধু সময়ক্ষেপ এড়াতে হবে। সময় অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ, যা বিনষ্ট করা চলবে না। বরং প্রয়োজনীয় কাজে তা ব্যয় করতে হবে। বন্থু-বান্ধব নির্বাচনের ব্যাপারেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
২. সমবেত হওয়ার স্থানও মর্যাপূর্ণ হওয়া চাই; যেমন ব্যক্তি-মালিকানাধীন বাড়ি এবং মসজিদ, রাস্তা বাজার নয়।
৩. মেলামেশার সময় কারো শরীর, কাপড় চোপড় বা মুখ থেকে দুর্গন্ধ বেরুলে তাকে এড়িয়ে যেতে হবে।
৪. বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা এবং গ্রহস্বামীকে স্বাগত জানানো। ডান থেকে শুরু করে সকলের সাথে তার মোসাহাফা করতে হবে এবং তা শেষ করে সেখানেই বসে পড়তে হবে।
৫. কোন সমাবেশে যোগ দিলে কোন ব্যক্তিকে তার জন্য নির্ধারিত স্থানে আসন নিতে হবে, নতুবা তাকে যে কোন খালি জায়গায় বসতে হবে।
৬. সমাবেশস্থলে কোন ব্যক্তি তার আসন কারো পক্ষে ছেড়ে দিতে চাইলে এটা গ্রহণ না করার জন্য সে বিনীতভাবে ক্ষমা চাইবে এবং সেই স্থলেই বসবে অথবা কাউকে উঠিয়ে দেওয়া ছাড়াই জয়গা করে দিবে অথবা পর্যাপ্ত স্থান থাকলে সেখানে বসবে।
৭. নিজে বসার লক্ষ্যে কাউকে তার আসন ত্যাগের জন্য বাধ্য না করা, যদিও সে শিশু হয়- এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
৮. অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত দু’ব্যক্তির মাঝখানে বসা শোভনীয় নয়, কেননা তারা হয়তো একান্তভাবে আলাপ করছে অথবা কোন গোপন কথা বলছে।
৯. কারো প্রতি পিছন ফিরে বসা উচিত নয় এজন্যে যে, এই বসাকে কেউ কেউ অশ্রদ্ধা বা অসম্মান হিসেবে ধরে নিতে পারে।
১০. সমাবেশে আরো লোকজন আসলে যারা পূর্ব থেকে বসা ছিল, তারা নবগাতদের জন্য জায়গা করে দেবে।
১১.কোন সমাবেশে কেউ যোগ দিলে তাকে স্মরণ রাখতে হবে যে, যারা উপস্থিত তারা কেউ তার জন্যে দাঁড়াবেনা।
১২. যদি কেউ ফিরে আসে এবং প্রয়োজনে তারা আসন ছেড়ে বাইরে যায়, তাহলে এই আসনের অধিকার তার-ই এবং অন্যদের উচিত নয় এই আসন দখল করা।
১৩. কোন স্থানে তিন ব্যক্তি থাকলে, এর মধ্যে দু’জন তৃতীয়জনের সামনে একান্তে আলোচনা করবে না।
১৪. দু’ব্যক্তি একান্ত আলোচনায় মত্ত থাকাকালে নবাগত কেউ আসলে, আমন্ত্রিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আলোচনায় যোগ দেবে না।
১৫. তিনের অধিক মানুষ উপস্থিত থাকলে, এদের দু’জন একান্ত বা ঘনিষ্ঠভাবে আলাপ করতে পারে।
১৬. অন্যদের কথা শোনা ভদ্রতা বিশেষ এবং বাধা না দেওয়া বা অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা উচিত নয়।
১৭. কোন ব্যক্তির বসা অবস্থায় বিনীতভাবে এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বসা উচিত।
১৮. সমবেত লোকদের আল্লাহর যিকির করা এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর উপর দরুদ শরীফ পড়া উত্তম কাজ। [সমন্বয়ে যিকির করা কোন শর্ত নয়। বরং মনে মনে আল্লাহর যিকির করা ও দরুদ শরীফ পড়া প্রয়োজন। সভা সমাবেশেও এরূপ করা যেতে পারে- অনুবাদক]
১৯. কোন মুসলমান কারো অনুপস্থিতিতে পরচর্চা করতে দেখলে তার উচিত বিনীতভাবে তাদের নিবৃত্ত করা। তারা কথা না শুনলে তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে স্থান ত্যাগ করতে হবে।
২০. সমবেতস্থলে যা বলা বা করা হয়, তা নোট করা এবং হালাল ও হারামের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
২১. মানুষ ব্যক্তিগতভাবে যেসব গোপনীয় কথা বলে, তাতে আস্থার ব্যাপার নিহিত থাকে এবং এসব ব্যাপারে বিশ্বস্ত থাকা অতীব ন্যায়সঙ্গত।
২২. এশার নামাজের পর শিক্ষামূলক অথবা কোন অতিথির সৌজন্য ছাড়া বৈঠকাদি করা অনুচিত।
২৩. যেসব বৈঠকাদি সমাবেশ মজলিশে অনেক হৈ চৈ বা অর্থহীন কথাবার্তা হয়, সেগুলোর শেষ পর্যায়ে এবং স্থানত্যাগের আগে নিম্নোক্ত দোয়া পড়া উচিত: সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আনতা আসতাগফিরুকা ওয়া আতুবু আলায়কা (হে আল্লাহ, আমি তোমার সর্বাত্মক উপস্থিতি লক্ষ্য করছি এবং তোমার প্রশংসা করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তুমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই।)

কিভাবে বসতে হবে

১. বসার সময় অন্যদের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল হলে চলবেনা। অন্যদের সামনে পা ছড়িয়ে দেয়া অথবা অন্যদের চাইতে উঁচু আসনে বসা উচিত নয়।
২. বসার যে কোন ভঙ্গিতে শরীরের গোপন অংশ ঢেকে রাখতে হবে।
৩. বসার সময় বাঁ হাত পিছনে ফেলে অন্যের হাতে উপর ঠেস দিয়ে বসা অনুচিত।
৪. কোন ব্যক্তি তার দেহের একাংশ সূর্যালোকে এবং অপরাংশ ছায়ায় রেখে বসবে না।
৫. মেঝেতে বসে আহার করা উত্তম।

গৃহের বাইরে মহিলাদের আচরণ

১. যে নারী সুগন্ধী, মেক-আপ অথবা প্রসাধনী ব্যবহার করেছে, মেক-আপ অপসারিত না হওয়া পর্যন্ত এবং প্রসাধনীর গন্ধ থাকা পর্যন্ত গৃহ ত্যাগ করা সমীচীন নয়।
২. কোন নারী তার স্বামী অথবা ‘মহরম’ পুরুষ না হলে তার বাড়িতে রাত কাটাবে না।
৩. কোন নারী ও পুরুষ ‘মহরম’ না হলে অথবা স্বামী স্ত্রী না হলে তাদের নিভৃতে থাকার অনুমতি নেই।
৪. কোন মহিলার প্রতি পুরুষের হঠাৎ দৃষ্টি পড়লে চোখ ফিরিয়ে নিতে হবে। আকস্মিক দৃষ্টিপাত অনুমোদনযোগ্য, তবে দ্বিতীয়বার তাকাননো নিষিদ্ধ।
৫. নারী ও পুরুষের মেলামেশা অথবা সামাজিক আচরণ দু’ধরনের:
ক) এক ধরনের মেলামেশা হচ্ছে প্রকাশ্যে এবং তা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর মধ্যে সীমিত নয় এবং সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে প্রচলিত, যেমন রাজপথ, বাজার এবং মসজিদ। এসব ক্ষেত্রে মেলামেশার অনুমতি রয়েছে; তবে উপর্য্যুক্ত শর্তাবলী পূরণ করতে হবে।
খ) বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কর্মস্থালের মত বিশেষ সীমিত স্থানসমূহে নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা হারাম এক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের পৃথকীকরণ প্রয়োজন।
৬. বাড়ির বাইরে কোন মহিলা পুরুষের সাথে কথা বললে তা আকর্ষণীয় স্বরে হবেনা বরং তা হবে যথাযথ এবং সংক্ষিপ্ত।
৭. পুরুষের জন্য অনুমোদিত সকল ব্যবসা মহিলারা করতে পারেন। বাড়ি এবং পরিবারের কোন মহিলার মূল দায়িত্ব পালনে অসুবিধা সৃষ্টি না হলে, স্বামী রাজি হলে এবং পুরুষদের সাথে মেলামেশা না করতে হলে মহিলা চাকুরিও করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, একজন মহিলা কোন বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে বা ডাক্তার হতে পারেন।
৮. বাড়ির উদ্দেশ্য কর্মস্থল ত্যাগ করার আগে ৫নং অধ্যায়ে বর্ণিত ইসলামি পোশাক এবং হিজাব পরার ব্যাপারে মহিলাদের স্মরণ রাখতে হবে।
৯. ইসলামে গৃহকে মহিলাদের জন্য কারাগার হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই। যুক্তিসঙ্গত কারণে একজন মহিলার যতক্ষণ বাইরে থাকা প্রয়োজন, ততক্ষণ সে বাইরে থাকতে পারে।

উৎসব পালন

উৎসব পালন সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধি হচ্ছে: (ক) নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা চলবেনা। (খ) কোন মুসলমান আর্থিকভাবে সচ্ছল হলেও জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান এবং অপব্যয় করা যাবে না।
২. খৃষ্টানদের বড়দিন, নববর্ষ, মাতৃ দিবস (Mother`s Day), পিতৃ দিবস (Father’s Day), শ্রম দিবস (Labou Day), বিবাহ বার্ষিকী, জন্ম দিবস- এ ধরনের উৎসবের স্থান ইসলামে নেই। এবং এগুলো হচ্ছে ভিন্ন সংস্কৃতির অনুকরণ।
৩. বাহির থেকে বেশ কিছু উৎসবকে ইসলামে চালু করা হয়েছে, যেমন নবীর জন্মদিন, মহানবী (সা.) এর ইসলা ও মিরাজ (মক্কা থেকে রসূল (সা.) এর একরাতে জেরুজালেমে গমন এবং সপ্ত আসমানে গমন), মহানবী (সা.) এর হিজরত ইত্যাদি।
৪. নিষিদ্ধ উৎসব পালনের চাইতে মুসলমানদের নিজ নিজ গ্রাম, শহর বা জেলা শহরে গিয়ে দেখা সাক্ষাৎ, বর্তমান ও ভবিষ্যত সংক্রান্ত বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা অথবা সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা অথবা কুরআন শরীফ অধ্যয়ন এবং আল্লাহর যিকির করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে।

আত্মীয়-স্বজনের সাথে আচরণ

আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ করা এবং তাদের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
২. আত্মীয়-স্বজনদের সাথে মোলাকাত করার কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই, তবে তারা যাতে অবহেলিত মনে করতে না পারে, সেজন্যে এসব মোলাকাত যথাসম্ভব ঘন ঘন হওয়া প্রয়োজন।
৩. আত্মীয়-স্বজনের সাথে যখনই মোলাকাত হবে, তখনই তাদের কুশলাদি জিজ্ঞেস করতে হবে।
৪. মুসলমানদের স্মরণ রাখতে হবে যে, তাদের দরিদ্র ও অভবগ্রস্থ আত্মীয়-স্বজনের প্রতি তার দায়িত্ব রয়েছে। এর জন্য মাঝে মধ্যে তাদের সহযোগিতা করতে হবে এবং তারেদ প্রয়োজনীয় দ্রব্য উপহার দিতে হবে।
৫. যদি কোন মসিলমানের দুধ-মাতা থাকে, তাহলে তাকে স্মরণ রাখতে হবে যে, তার আরো একটি পরিবার রয়েছে।
৬. আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে তাদের মোলাকাতের অপেক্ষা না করে নিজেদেরই যাওয়া উচিত।
৭. আত্মীয়-স্বজনদের একটি অপরাধের জবাব আরেকটি অপরাধের মধ্যদিযে দেয়া উচিত নয়। এ ধরনের জবাব না দেয়া নৈতিক সাহসের পরিচয় বহন করে।
৮. মুসলমানদের উচিত খালাকে তাদের মায়েরই মতই আচরণ করা।
৯. চাচাকে পিতামা মত আচরণ করা উচিত।
১০. পুরুষ আত্মীয়-স্বজনদের সাথে (মহরম পুরুষ ছাড়া) মহিলারা বসতে পারে যদি-
(ক) শিষ্টাচার বজায় রেখে তারা আচরণ করে।
(খ) কোন আত্মীয়ের সাথে একা কথা বলা বা আলোচনা না করে।

প্রতিবেশীর সাথে আচরণ

১. প্রতিবেশীর সাথে আচরণের প্রথম কথা হলো: উচ্চ স্বরে কথা বলা অথবা উচ্চ নিনাদের উৎসব আয়োজন (বিশেষতঃ রাতে) করার মত উপদ্রব বা নৈতিক ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা।
২. প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় প্রতিবেশীর বাড়িতে গমন গুরুত্বপূর্ণ; বিশেষ করে জন্ম, মৃত্যু, অসুস্থতা ও বিবাহের ন্যায় বড় বড় ঘটনায় প্রতিবেশীর কাছে যাওয়া প্রয়োজন।
৩. নবীর (সা.) শিক্ষা অনুসারে প্রতিবেশীর প্রতি উদার হওয়া দরকার। প্রতিবেশীকে মাঝে মধ্যে খাবার খেতে আমন্ত্রণ জানানো এবং খাবার পাঠানো উচিত।
৪. প্রতিবেশীর সন্তানের প্রতি কোন প্রকার অসদাচরণ করা অন্যায়। লক্ষ্য রাখতে হবে, সন্তানদের বিরোধ যেন তাদের পিতামাতার মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি না করে।
৫. প্রতিবেশী ও তার পরিবারের বিশেষ অধিকার রয়েছে মুসলমানদের উপর বিপদ আপদের সময় তাদের সাহায্য করা হচ্ছে ইসলামি আচরণের দাবি।
৬. কোন মুসলমান যদি জানতে পারে যে, তার প্রতিবেশী আর্থিক সংকটে রয়েছে, তাহেল সে সাহায্যের অনুরোধের জন্য অপেক্ষা না করে সামর্থ্য অনুযয়ী তাকে সাহায্যের প্রস্তাব দিবে।
৭. প্রতিবেশীর গোপন কথা, গোপন রাখতে হবে অথবা এমন তথ্য যা সে বাইরে শুনেছে, তা গোপন রাখতে হবে।
৮. প্রতিবেশী সম্পর্কে ভাল তথ্য দিতে হবে, তার সম্পর্কে খারাপ কথা বললে তা খণ্ডন করবে, কারণ তার সাথে তার সম্পর্ক বিশেষ দৃষ্টি দানে দাবি রাখে।
৯. মহিলা প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা গৃহবধূর দায়িত্ব।
১০. প্রতিবেশী যদি আত্মীয় হয়, তাহলে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১১. শুধু নিকটবর্তী প্রতিবেশীর সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখলে চলবেনা; বরং দূরের প্রতিবেশীর সঙ্গেও তা রাখতে হবে।

উপহার

ব্যক্তির মধ্যে উপহার বিনিময়কে ইসলামে উৎসাহিত করা হয়েছে এজন্য যে, এর ফলে সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়। সুতরাং কোন মুসলমান আর্থিকভাবে সচ্ছল হলে, সে তার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকে উপহার দেয়ার চেষ্টা করবে। পাশাপাশি তাকে নিম্নোক্ত বিধান মেনে চলতে হবে:
১. অন্যদের উপহার দেয়ার চাইতে আত্মীয়-স্বজনদের উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
২. বাহুল্য উপহার দেয়ার চাইতে বিস্তর অর্থ খরচ এবং সেগুলো নির্বাচনে অনর্থক সময়ক্ষেপণ করার ফলে উপহার বিনিময় সীমিত করে দেয়; এমনকি এর ফলে উপহার বিনিময় বন্ধ হয়ে যায়।
৩. বৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ থেকেই শুধু উপহার ক্রয় করা উচিত।
৪. অন্যদের উপহার প্রদানের উদ্দেশ্য হতে হবে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং জোরদার করা। পার্থিব সুবিধাবলাভ বা ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের আশায় উপহার প্রদান ঘুষের শামিল, যা কঠোভাবে নিষিদ্ধ।
৫. উপহার প্রদানকালে এমন আলোচনা পরিহার করতে হবে, যার ফলে গ্রহীতার মনে উপহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
৬. উপহার পাওয়ার পর মুসলমানদের উচিত তা খুলে দেখা এবং সন্তোষ প্রকাশ করা; সম্ভব হলে দাওয়াত জানিয়ে, পত্রলিখে অথবা মৌখিকভাবে ধন্যাদ জ্ঞাপন করা। উপহার দাতা উপস্থিত থাকলে তার জন্য দোয়া করা উচিত।
৭. কাউকে উপহার প্রদান এবং পরে তা ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলা ভদ্রতা নয়। অবশ্য পিতামাতার বা তাদের দাদা দাদীরা সন্তানকে উপহার দিয়ে ফেরত নিলে সেটা ভিন্ন কথা।
৮. উপহার পাওয়ার পর কোন উপলক্ষে বদলী উপহার দেওয়া সৌজন্য বিশেষ।
৯. কোন মুসলমান এমন কারো উপহার গ্রহণ করবে না, যে তার কাছ থেকে তার কর্তৃত্বের সুযোগ নিতে বা সুবিধা আদায় করতে চায় বা কোন উপায়ে প্রভাবিত করতে চায়। কার্যতঃ এ ধরনের উপহার বাস্তবিক পক্ষে ঘুষের শামিল।
১০. মদের বোতল বা শূকরের মাংসের ন্যায় নিষিদ্ধ জিনিস কোন মুসলমান উপহার হিসেবে নিতে পারে না।
১১. উপযুক্ত কোন কারণে উপহার নিতে না চাইলে তার কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। এক্ষেত্রে উপহার দাতার অপমানিত হওয়া যৌক্তিক নয়।
১২. সন্তানদের উপহার দানের ক্ষেত্রে এজনকে আরেকজনের উপর প্রাধান্য দেয়া চলবে না।
১৩. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা এই যে, উপহার দেয়াকে উৎসাহিত করা হয়েছে, এটা বাধ্যতামূলক নয়। উপহার প্রদান করা প্রয়োজন, এটা বিশ্বাস ভুল। এ ধরনের ভুল জনগণের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ ব্যাহত করতে পারে। বিশেষ করে যেসব লোক আর্থিকভাবে সচ্ছল নয়, তারা উপহার দান এড়িয় যাবার জন্য দেখা সাক্ষাৎ করতে চাইবে না।

About ড. মারওয়ান ইবরাহীম আল-কায়সি