ইসলামের নৈতিকতা ও আচরণ

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

তৃতীয় অধ্যায়ঃ পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা

 

মানুষের প্রগতি ও তার মানব-প্রকৃতির অন্যতম গুণ এবং জীবজন্তু থেকে পার্থক্যকারী চিহ্ন হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা।

অপবিত্রতা

মুসলমানকে অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকতে এবং নিজেকে, নিজের কাপড় চোপড় ও তার বাসস্থান অথবা পারিপর্শ্বিক পরিবেশ নাপাক ময়লা থেকে অবশ্যই পরিচ্ছন্ন রাখবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এসব অপবিত্র বিষয়ের মধ্যে রয়েছে বমি উদ্রেককারী ওষধ, স্তন্যপায়ী প্রাণীর অগ্রগন্থির তরল পদার্থ, প্রস্রাব, মাদক জীবজন্তুর ‍দুধ। মাছ ও কীট পতঙ্গ এবং ভেড়া, ছাগল ও হাতীর পশম ছাড়া জীবন্ত কোন প্রাণীর কেটে ফেলা অঙ্গ অপবিত্র। ইসলামি বিধান মোতাবেক জবেহ করা ছাড়া সকল জন্তু হারাম। এসব হারাম জিনিসের কোন অংশ যদি কোন মুসলমানের শরীরে বা কাপড়ে পড়ে তাহলে তা ‍ধুয়ে ফেলা ফরজ।

গোসল করা

১. নানা করণে মানবদেহের পরিচ্ছন্নতা অপরিহার্য। রোগ বালাইয়ের মোকাবেলায় শরীর রক্ষা করা ছাড়াও সমাজের লোকদের সাথে মেলামেশা জন্য এটা প্রয়োজন।
২. সুতরাং বার বার গোসল করাই দুর্গন্থ থেকে বাঁচবার উপায়।

কোথায় গোসল করবেন

১. পুরুষেরা একটি পর্দা টানিয়ে অথবা জাঙ্গিয়া পরিধান করে পাবলিক গোসলখানায় গোসল করতে পারে।
২. গোসলখানা তৈরি হলে সেখানে পেশাক করা যথার্থ নয়; কার এর ফলে ঐ স্থান দূষিত হবে। স্থানটি পাকা মেঝে হলে এবং পায়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকবেল পেশাব করা নিষিদ্ধ নয়।

গোসল কখন ফরজ হয়

সমগ্র শরীর ধুয়ে ফেলা নিম্নোক্ত কারণে জরুরি হয়ে পড়েঃ
১. বীর্যপাতের পর, ঘুমের সময় অথবা স্বপ্নে বীর্যপাত হলেও, তা থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য।
২. মহিলাদের ক্ষেত্রে যৌন সংক্রান্ত কোন স্বপ্ন দেখলে এবং সেই সাথে তরল পদার্থের চিহ্ন পেলে, মহিলাদে রক্তস্রাব শেষ হলে এবং প্রসূতি অবস্থারি মেয়াদ শেষ হলে।
এছাড়া বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রেও গোসল করা জরুরি। এর মধ্যে ইসলাম দু’টি ঈদ, ইসলাম গ্রহণ এবং প্রতি শুক্রার জুমার নামাজের আগে গোসল করা প্রয়োজন।

গোসলের নিয়ম

প্রত্যেক মুসলমানকে নিম্নোক্ত বিধি মানতে হবেঃ
১. গোসলের আগে তাকে নিশ্চিত হতে হবে যে, সে অন্যদের থেকে নিজেকে আড়াল করেছে।
২. পরিষ্কার স্থানে কাপড় চোপড় ও তোয়ালে রাখতে হবে।
৩. প্রথম পর্যায়ে গোসলের আগে অপবিত্রতা,ময়লা ধুয়ে ফেলতে হবে।
৪. তিনবার হাত ধুতে হবে।
৫. কুলি করতে হবে এবং পরিষ্কার করতে হবে।
মুখমণ্ডল ও হাত ধুতে হবে।
৭. ডানদিক থেকে শরীরের ওপর পানি ঢালতে হবে।
৮. শরীর ও চুলের সকল অংশে পানি পৌছানো নিশ্চিত করতে হবে এবং হাত ও পায়ের আঙ্গুলগুলোর মধ্যে পানি প্রবেশ করাতে হবে।
সাবান ব্যবহারকালে পরিষ্কার পানি দিয়ে শরীর ধুয়ে ফেলতে হবে, যাতে সাবানের কোন চিহ্ন শরীরে না থাকে। ফরজ গোসলের সময় এটা জরুরি।
১০. বাথ’টাবে গোসল করা যেতে পারে; তবে শর্ত হলো শাওয়ারের সাহায্যে দেহের সব অপবিত্রতা ধুয়ে মুফে ফেলতে হবে।

শরীরের কোন কোন অংশের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ

শরীরের যেসব স্থানে প্রধানতঃ ময়লা জমে, সেসব স্থান পরিষ্কার করা জরুরি। যেমন :
১. প্রয়োজন বোধে চুল ছেঁটে ফেলা।
২. বগল ও নিম্নাঙ্গের চুল সপ্তাহান্তে (অনুর্ধ্ব ৪০ দিনে) তুলে ফেলা; এটা সম্ভব না হলে সেভ করতে হবে।
৩. নখ কাটা। নখ কাচা জরুরি হয়ে পড়লে মুসলমানদেরকে প্রথমে ডান হাত, তারপর বাম হাত এবং এরপর ডান পা এবং তারপর বাম পায়ের নখ কাটতে হবে।
শরীরের অন্যান্য অংশ বিশেষ করে মুখমণ্ডল, মাথা, হাত ও পা পরিচ্ছন্ন রাখা বিশেষ জরুরি। এরূপ করলে শরীর ও মন বিশেষভাবে সতেজ থাকবে; তদুপরি শরীরের এসব অংশ অন্যান্যৗ অংশ অন্যান্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বেশি কাজে লাগে। অন্যদের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মুখ ব্যবহার করা হয় বলে মুখ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে সবিশেষ গুরুত্বপ দিতে হবে। ****১
মুখ পরিষ্কার রাখা এবং স্মিত হাসির জন্য দুটো পরিপূরক পন্থা রয়েছে।
১. খাবার পর খিলার ব্যবহার করা।
২. মুখের ডান দিক থেকে মিসওয়াক বা টুথব্রাশ ব্যবহার করা।
এই পদ্ধতির কোনটাই একে অপরের বিকল্প নয়, একে অপরের পরিপূরক; যত্রতত্র টুথব্রাশ নিয়ে যাওয়া অবান্তর ও কঠিন; তবে মিসওয়াক যেকোন স্থানে
[ ****১ দেখা গেছে পেছন দিকের (পাছা) চাইতে মুখ গহবরে অনেক বেশি সূক্ষ্ম জীবাণূ থাকে। এজন্যৗ দন্তবিদরা মুখ পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন। বিশেষ করে আহার গ্রহণের পর দাঁতে কো কিছু লেগে না থাকে, সেজন্য দাঁত ব্রাশ করতে হবে।]
সহজেই নিয়ে যাওয়অ যায়। তদুপরি কারো সাথে সাক্ষাতের আগে মুখের দুর্গন্ধ পরিশোধন অথবা কর্মস্থল থেকে ফিরে আসার পর মিসওয়াক সহজেই ব্যবহার করা যায়।

মানুষের প্রসাধনী ও সাজসজ্জা

নারী ও পুরুষের জন্য এ ব্যাপারে বিশেষ বিধিমালা এবং উভয়ের জন্য সাধারণ বিধিমালা রয়েছে।

চুল

১. মাথার চুলের একাংশ ছেঁটে ফেলা এবং আরেকাংশ না ছাঁটা কশবিন্যাসের ইসলামি নীতি নয়। হয় সব চুল ফেলে দিতে হবে অথবা সব রেখে দিতে হবে।
২. চুলের পরিচর্যা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, চুল আঁচড়ানো, তেল ব্যবহার করা, চিরুনী পরিষ্কার রাখা ইসলামি আজরণ। তবে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়।
৩. কেশবিন্যাসের বিশেষ কোন ইসলামি স্টাইল নেই। তবে মহানবী তিন ধরনের কেশবিন্যাস করতনঃ ওয়াপরা (কানের নীচ ছাড়িয়ে চুল), লিমমা (কানের লতির নীচ পর্যন্ত চুল) এবং জুম্মা (কাধ পর্যন্ত বিস্তৃত চুল)।

দাঁড়ি

১. দাঁড়ি একজন পুরুষের মুখমণ্ডলের সৌন্দর্যের উপকরণ। সুতরাং দাঁড়ি কেটে ফেলা উচিত নয়।
২. দাঁড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও সুবিন্যস্ত করে রাখতে হবে।
৩. কোন ব্যক্তির তার দাঁড়িতে পাকা চুলের জন্য লজ্জিত হওয়া উচিত নয় এবং সেগুলো তুলে ফেলাও সঙ্গত নয়।

সুগন্ধি

১. সর্বোত্তম সুগণ্ধি হচ্ছে কস্তুরী বা মোশ্ব আঁতর। প্রত্যেক লোককে মাঝে মাঝে সুগন্ধি ব্যবহার করতে হয়। কেউ যদি তাকে সুগন্ধি ব্যবহার করতে দেয়, তাহলে তা গ্রহণ করা উচিত এবং প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়, কেননা এটা এক উত্তম জিনিস।

গোঁফ

১. গোঁফ খুব বড় হতে দেওয়া উচিত নয়। উপরের ওষ্ঠাধর যাতে দৃশ্যমান হয় সেজন্য গোঁফ খাট রাখতে হবে।

সীল মোহরযুক্ত আংটি

১. কোন মুসলমান বিয়ে বা বাগদত্তা না হলেও তার পক্ষে আংটি ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে।
২. পুরুষদের জন্য সোনার আংটি পরা নিষিদ্ধ। মূলতঃ মেডিকেল বা ডেন্টাল কারণ ছাড়া পুরুষরা ব্যবহার করতে পারবে না।
৩. লোহা ও সোনা ছাড়া যে কোন ধাতু দিয়ে আংটি তৈরি করা যেতে পারে।
৪. আংটি বাম অথবা ডান হাতের আঙ্গুলে ব্যবহার করা যেতে পারে।

মহিলাদের মেকআপ ও রূপচর্চা

১. কোন রকম পরিবর্তন বা সংযোজন ছাড়াই যেমন তেমন সৌন্দর্য স্বাভাবিকভাবে রেখে দেওয়া উচিত।
২. মহিলার রূপচর্চা করতে পারে; তবে তা করতে হবে বাড়িতে। একজন মহিলা বাড়িত তার স্বামীর সামনে নিজেকে সৌন্দর্যময়ী করে তুলতে পারে। মুখমণ্ডলে প্রসাধনী ব্যবহার করে, নিজেকে পরিচ্ছন্ন রেখে এবং আকর্ষণীয় সুগন্ধি ব্যবহারের মাধ্যমে।
৩. মহিলারা মেহেদী দিয়ে হাত রঞ্জিত করতে পারে।
৪. একজন মহিলা তার মহরম পুরুষ আত্মীয়ের সমানে সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারে।

চুল

১. নারীদেরকে তাদের জুল পরিচ্ছন্ন ও সুবিন্যস্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। মূলতঃ মহিলাদের চুল হচ্ছে পুরুষের দাঁড়ির ন্যায় সৌন্দর্যের একটি উপকরণ।
২. কোন মহিলার যদি ছোট চুল থাকে, তাহলে তার পরচুলা ব্যবহার করা উচিত নয়। অন্য কোন মহিলা তার মাথায় পরচুলা লাগাতে সাহায্য করতে বললে তার তা প্রত্যাখ্যান করা উচিত।

মুখমণ্ডল ও হাত

১. মহিলাদের মুখমণ্ডল পরিচ্ছন্ন রাখতে বিশেষ যত্ন নেয়া উচিত।
২. কোন মহিলার মুখমণ্ডলে চুল গজালে এ জন্য তার লজ্জিত হওয়া বা সেগুলো তুলে ফেলার চেষ্টা করা উচিত নয় বা তুলে অন্য মহিলাকে দেবেনা। প্রকৃতির জন্য তার লজ্জিত হওয়ার কোন কারণ নেই।
৩. কোন মহিলা অন্য কোন মহিলাকে উল্কি এঁকে দেবেনা বা নিজে উল্কি আঁকবে না।
৪. কোন মহিলার উচিত হবে না তার ভ্রু তোলা।
৫. নখ বড় বরা যাবে রনা; সেগুলো ঘন ঘন কাটতে হবে।
৬. গৃহের বাইরে মহিলাদের প্রসাধন নিষিদ্ধ, তবে চোখে কাজ দেওয়া যেতে পারে।
৭. সৌন্দর্য বিধানের জন্য তাঁদের অগ্রভাগ সুচালো করা এবং তার মধ্যে ফাঁক রাখার অনুমতি নেই।
৮. মহিলাদের মুখ পরিচ্ছন্ন ও নীরোগ রাখতে হবে।

প্রসাধনী

১. মহিলারা গৃহাভ্যন্তরেই প্রসাধন করতে পারে; তবে এ সময় কোন আগন্তুক বা গায়ের মহরম পুরুষ থাকলে চলবে না।
২. কোন মহিলা প্রসাধন শোবিথ হয়ে প্রসাধনীর গন্ধ দূর না করে তার বাড়ির বাইরে যাওয়া চলবে না। এমন কোন রূপচর্চা করা যাবে না, যাতে পর পুরুষ আকৃষ্ট হয়। কেননা সমাজকে দূষিত করার ধাপ এখান থেকেই শুরু হয়।

নারী-পুরুষের জন্য সাধারণ নির্দেশ

১. পাকা চুল কালো ছাড়া যে কোন রং করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে পছন্দনীয় রং হচ্ছে উজ্জল লাল ও মেহেদী।
২. মাঝে মাঝে চোখে সুরমা দেয়া যেতে পারে, কেননা একটি দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি এবং চোখতে সৌন্দর্যশালী করে তোলে।

About ড. মারওয়ান ইবরাহীম আল-কায়সি