ইসলামের নৈতিকতা ও আচরণ

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

পঞ্চম অধ্যায়ঃ পোশাক

মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ও সামাজিক মত বিনিময়ের ক্ষেত্রে পোশাক পরিচ্ছদ গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলেও ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে তা শুধু ‘মাধ্যম’ হিসে্বেই রয়ে গেছে এবং তা ‘লক্ষ্য’ নয়। পোশাকের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রাথমিকভাবে মানবেদেহ আবৃত করা এবং তাপ বা ঠাণ্ডা থেকে শরীরকে রক্ষা করা।
সমাজের সকল মানুষকে বিশেষ ধরনের পোশাক পরতে হবে- এরকম কোন কথা নেই। বরং একই ধরনের পোশাক পরা ইসলামি শিক্ষার অনুকুল নয়। তবে পোশাকের ব্যাপারে সাধারণ রূপরেখা দেওয়া হয়েভে। এর কতিপয় রূপরেখা নর-নারী উভয়ের জন্য অভিন্ন; বাকীগুলো নারী অথবা পুরুষের জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট।

সাধারণ নীতি

১. অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে মুসলমানদের পোশাকের পার্থক্য থাকা উচিত। পোশাকের বা অন্য কোন ক্ষেত্রে অমুসলমানদের অনুকরণ করা চলবেনা।
২. নর ও নারীর পোশাকের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখতে হবে। কোন পুরুষের নারীর পোশাক পরিধান করা অথবা নারীর পুরুষের পোশকা পরিধান করা নিষিদ্ধ।
৩. ঔদ্ধত্য এবং অহংকার প্রকাশ পায়- এমন কাপড় পড় নিষিদ্ধ। মূলতঃ যে কোন প্রকার ঔদ্ধত্য ও অহংকার প্রকাশের অনুমতি নেই। অবশ্য, চাল-চলনে সৌন্দর্যবোধ ও স্মার্টনেস ঔদ্ধত্যের বহিঃপ্রকাশ নয়। চাল-চলনের মাধ্যমে কেউ খোদাকে সন্তুষ্ট করতে চাইলে এবং শুকরিয়া আদায় কারতে চাইলে তা মেনে নেয়া যায়।
৪. পুরুষের কমপক্ষে তার নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রাখা উচিত। আর মহিলাদের হাত ও মুখমণ্ডল ছাড়া সমগ্র দেহ পোশাকেঢেকে রাখতে হবে।
৫. নারী ও পুরুষের উল্লিখিত পোশাক স্বচ্ছ (সূক্ষ্ম) কাপড়ের হবে না।
৬. ইউনিফরম নিষিদ্ধ নয়। পেশাদার লোক (সৈনিক, পুলিশ) পেশাগত কারণে পোশাক পরতে পারে। তবে আলেম বা ইসলামি পণ্ডিতদের উচিত নয় বিশেষ ধরনের পোশাক পরে নিজেদের আলাদা বৈশিষ্ট নিরূপণ করা। ‘মোল্লা’ বা ‘পুরোহিত’ সৃষ্টি করার এমন পদ্ধতি ইসলাম অনুমোদন করে না।
৭. নতুন পোশাক পরা জরুরি নয়, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরলেই চলে। কাপড় সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে এবং ময়লা পোশাক পরা চলবে না।
৮. বিশেষ কোন রঙ্গের পোশাক পরা জরুরি নয়। সাদা কাপড় মুসলমানদের আদর্শ পোশাক।
৯. সহজে পরা ও খলে রাখা যায়, এমন পোশাক উত্তম।
১০. মুসলমানরা যখন নতুন পোশাক কিনবে, তখন এই পোশাক কেনার তওফিক দেওয়ার জন্য খোদার শুকরিয়া আদায় করবে।
১১. কাপড় পরিধান শুরু করতে হবে ডান দিক থেকে এবং খুলতে হবে বাম দিক থেকে। উভয়ক্ষেত্রে খোদাকে স্মরণ করতে হবে। তারপর পোশাক ঝুলিয়ে বা ভাজ করে রাখতে হবে।

পুরুষের পোশাক

১. পোশাকের ব্যাপারে উল্লিখিত সাধারণ নীতিমালার প্রতি অবশ্যই দৃষ্টি রাখতে হবে।
২. পুরুষদের জন্য রেশকি, বুটিদার রেশমি, কারুকার্যখচিত রেশমি অথবা চার আঙ্গুলের বেশি রেশমি পাড়ের কাপড় পরা নিষিদ্ধ। তবে পুরুষদের বেলায় স্বাস্থ্যগত বা চিকিৎসাগত কারণে রেশমের কাপড় পরার অনুমতি রয়েছে।
৩. পুরুষদের জাফরান বা হলুদ রং বিশিষ্ট পোশাক পরতে নিষেধ করা হয়েছে। অবশ্য মহিলাদের এসব পোশাক পরার ব্যাপারে অসুবিধা নেই।
৪. যে ধরনের পোশাক পরা অন্য জাতির অনুকরণের নামান্তর, তা অনৈসিলামিক এবং নিষিদ্ধ।
৫. পুরুষদের পোশাক:
(ক) শার্টের নীপে পরতে হয় গেঞ্জিজাতীয় কাপড় যা প্রধানতঃ সূতা দিয়ে তৈরি।
(খ) শরীরের নিম্নাঙ্গ ঢেকে রাখার জন্য আণ্ডারওয়ার।
(গ) দু’খন্ড কাপড়ের স্যুট দেঞের নিম্নাংশ আবৃত করার জন্য একখণ্ড পোশাক এবং শরীরের ঊর্ধ্বাংশ ঢেকে রারখার জন্য আরেক খণ্ড। নিম্নাংশেল কোন কাপড় পায়ের গিরার নীচে যাবে না। গেঞ্জি অথবা উপরের পোশাকের আস্তিন প্রশস্ত হবেনা অথবা কব্জি ছাড়িয়ে যাবেনা। কারণ এ ধরনের জামা পরা হয় অহংকার প্রদর্শনের জন্য।
(ঘ) পাগড়ী অথবা টুপির আকারে মস্তকাবরণী।
৬. ক্রীড়া ও সাঁতারের পোশাক:
পুরুষদের খেলাধুলার পোশাক হবে নগ্নতা ঢেকেজ রাখার জন্য, সাধারণ নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ- নাভি থেকে হাটু পর্যন্ত আবৃত রাখা, শরীরের এ অংশ যাতে অন্যের সৃষ্টি গোচর না হয়। সুতরাং খেলাধুলার পোশাক এমন হওয়া উচিত যাতে অতিরঞ্জনের বহিঃপ্রকাশ না ঘটে অথবা পুরুষের অবয়ব ধরা না পড়ে।

মহিলাদের পোশাক

মহিলাদের পোশাকের সাধারণ রূপরেখা নিম্নে বর্ণিত হলো:
১. মহিলাদের পোশাক একই সঙ্গে বেশ ক’টি শর্তপূরণ করতে হবে, মেযন:
(ক) মুখমণ্ডল ও হাত ব্যতীত সমগ্র শরীর কাপড়ে ঢেকে রাখতে হবে।
(খ) পোশাক এত পাতলা বা স্বচ্ছ হওয়া চলবেনা, যাতে তার শরীর প্রকাশিত হয়ে পড়ে।
(গ) মূল পোশাকটি হবে ঝুলন্ত বা প্রলম্তিত। এর অর্থ হচ্ছে নারীদেরকে অবশ্য ‘টাইট’ পোশাক পরিহার করতে হবে যাতে তার বক্ষ, পা বা হাত এবং শরীরের আকৃতি বুঝা না যায়।
(ঘ) নিজস্ব সাংস্কৃতিক সত্তা সংরক্ষণের তাগিতে অমুসলিম নারীতের পোশাক অনুকরণ করতে মানা করা হয়েছে।
(ঙ) নারীসত্তা বজায় রাখতে পুরুষদের পোশাকের অনুকরণ করতে মানা করা হয়েছে।
(চ) যে পোমাক অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তা পরিহার করতে বলা হয়েছে।
(ছ) ঘরের বাইরে অথবা অভ্যন্তরে বহিরাগতদের সাথে সাক্ষাৎকালে পোশাকে সুগন্ধি ব্যবহার করতে মানা করা হয়েছে।
২. মুসলিম নারীদের পোশাক তিনখণ্ডে বিভক্তঃ কামিজ, নেকাব এবং আলখেল্লা।
(ক) কামিজ: এটা মাথা, মুখমণ্ডল ও হাত ব্যতীত সারা দেহ ঢেকে রাখার জন্য একটি পোশাক। এটা অবশ্যই লম্বা হতে হবে, যাতে করে মহিলাদের পা পর্যন্ত ঢেকে যায়। এরূপ পোশাক যা সারা শরীর ঢেকে ফেলে। সুতরাং হাঁটু পর্যন্ত তা সীমিত রাখা এবং লম্বা মোজার সাহায্যে পা ঢাকা উচি নয়। কামিজের আস্তিন প্রশস্ত হবেনা।
(খ) নেতাক: এটা একটি মুখাবরণ যা মহিলাদের মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়; এটা সূক্ষ্ম জালের মত হবেনা; তবে যে কোন সামগ্র দিয়ে তৈরি হতে পারে। তবে এটা স্বচ্ছ সামগ্রী হওয়া উচিত নয়।
(গ) আলখেল্লা: এমন একটি পোশাক যা সারাদেগ ঢেকে রাখে এবং মাথা থেকে কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসে। ফলে মহিলারেদ মাথা ও কাঁধের আকার গোপন থাকে।

জুতো

১. পুরুষের জন্য তৈরি বা ডিজাইনের জুতো মেয়েদের ব্যবহার করা উচিত নয। একইভাবে মেয়েদের জুতোও পুরুষদের ব্যবহার করা উচিত নয়।
২. ক্রেতা আর্থিক দিক থেকে স্বচ্ছল হলে প্রয়োজননানুসারে নতুন জুতো কেনা যেতে পারে। তবে এর জন্য অমিতব্যয়ী হওয়া অথবা এদ্দরুণ অহংকার প্রকাশ করা যাবেনা।
৩. জুতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, অবশ্য এজন্য বাড়াবাড়ি ঠিক নয়।
৪. ডান পায়ে আগে জুতো পরতে হবে এবং খোলার সময় বাম জুতো আগে খুলতে হবে। উভয় ক্ষেত্রে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হবে।
৫. জুতো পরার সময় পরখ করে দেখতে হবে, রাতে অথবা যেসমূ এটা ব্যবহার করা হয়নি, সে সময় এর মধ্যে কোন ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গ লুকিয়ে আছে কিনা।
৬.মোজা-জুতো খুলে রাখার সময় তা এমন স্থানে রাখতে হবে যাতে করে উৎকট গন্ধে অন্যরা বিরক্ত না হয়।

About ড. মারওয়ান ইবরাহীম আল-কায়সি