ইসলামের নৈতিকতা ও আচরণ


Warning: Division by zero in /home/icsbook/public_html/wp-content/plugins/page-links-single-page-option/addons/scrolling-pagination/scrolling-pagination-functions.php on line 47

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ইসলামের আবির্ভাবের প্রথম দু’শতাব্দীর মধ্যে ‘আদব’ (adab) পরিভাষাটিতে নৈতিক ও সামাজিকতার সম্পর্ক ছিল। মূল ‘দব’ এর অর্থ হচ্ছে: বিস্ময়কর জিনিস অথবা প্রস্তুতি বা ভোজ। এই অর্থে ‘আদব’ এর ল্যাটিন সমার্থক হচ্ছে urbane, যার অর্থ সভ্যতা, সৌজন্য, নগরীর কৃষ্টি। এর বিপরীত অর্থ: বেদুঈদনদের অশিষ্টতা।[প্রাগুক্ত।] সুতরাং কোন কিছুর আদব এর অর্থ হচ্ছে, ঐ জিনিসের ভাল দিক। আদবের বহুর বচন হচ্ছে : adab । সুতরাং Adab al-Islam এর অর্থ হচ্ছে: ইসলামের স্বীকৃত সদাচরণ, যা তার শিক্ষা এবং নির্দেশাবলি থেকে উৎসারিত। এটিকে এই অর্থে আলোচনা করা হবে।

উৎস

ইসলাম ছাড়া অন্যান্য সংস্কৃতিতে আচরণ নির্ধারিত হয় স্থানীয় পরিস্থিতির দ্বারা এবং এজন্য এসব অবস্থার পরিবর্তনের সাথে তার সম্পর্ক থেকে যায়। W.G. Sumner এর মতে পৌনঃপুনিক প্রয়োজনে ব্যক্তির জন্য আচরণ এবং গোষ্ঠীর জন্য প্রথার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এসবের ফলাফল বা পরিণতি কখনও সচেতন কিছু হিসেবে প্রতিভাত হয়না। [W.G. Sumner, Folkways, New York: Blaisdell PublishingCo. ৬ষ্ঠ সংস্করণ, ১৯৬৫, পৃঃ-৪১।]
এই অর্থে ইসলামি আচরণ ও প্রথা ‘অসচেতন’ নয়। এগুলো ইসলামের দু’টো মূল উৎস কুরআন ও সুন্নাহ থেকে গৃহীত। সুন্নাহ হচ্ছে : রাসূলের (সা.) কথা, কাজ ও পরোক্ষ অনুমোদনের সমষ্টি, কড়াকড়ি অর্থে খোদার অনুপ্রেরণায় যা অনুপ্রাণিত।
কুরআন ও সুন্নাতে বিভিন্ন যুগে মানব সমাজে উদ্ভূত নানা সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যাপক নীতিমালা রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে ইসলামে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিনিময় ও গতানুগতিক আচরণের বিধান রয়েছে। ইসলাম শুধু আধ্যাত্মিক ও আইনগত আচরণের মধ্যে সীমিত নয়; এতে মানব জীবনের ও সম্পর্কের সকল শাখায় মানদণ্ড ও মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রথার ব্যাপারে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। এই সার্বিক বিষয়ের অংশ হিসেবে ইসলামের ব্যাপকলক্ষ্যবস্তু থেকে ইসলামি আদম গৃহীত এবং তার ব্যাপক ধারণা ও মূল্যবোধ প্রতিফলিত।
ইসলামের ‘আদব’-কে সামগ্রিক বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ধারণা করা বা রূপায়ণ করা যাবেনা। বরং ইসলারেম অন্যান্য বিষয়ের সাথে তাদের অন্তঃসম্পর্কের দিকটি সব সময়েই স্মরণে রাখতে হবে। একইভাবে ইসলামি আদবের আওতায় বিভিন্ন বিষয়কে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা চলবে না এজন্য যে, এগুলোও ঘনিষ্ঠভাবে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এ ব্যাপারে একটি বাস্তব উদাহরণ উল্লেখ করা যায়। মুসলমানকে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যেতে হয়, যাতে করে সে ফজরে নামাজের জন্য শিগগিরই জাগতে পারে।
ইসলামের আদম কায়দার ব্যাপারে যে ওহির আদেশ রয়েছে- এর ধর্মীয় রূপ যথাযথ আনুগত্যের সৃষ্টি করে। এর ধর্মীয় প্রকৃতি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এসব আদব কায়দা পুঙ্খানুপুঙ্খ পালন বাধ্যতামূলক। ইসলামি আদবের প্রধান প্রধান নীতি থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, ইসলামের সুনির্দিষ্ট আদব ‘হারাম’ থেকে হালাল নির্বাচনে কমবেশি নমনীয়তা রয়েছে। প্রথমটি আইনের দ্বারা স্বীকৃত; দ্বিতীয়টি মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যদের অনুমোদন ব্যতিরেকে অপরাধীদের কোন প্রকার আনুষ্ঠানিক বিচার বা শাস্তি দেয় না। তৃতীয় পর্যায়ের আদব লেহাজ রয়েছে এমন ধরনের যা লঙ্ঘন করলেও তা গ্রাহ্য করা হয় না।
ইসলামি আদবের ওহির উৎস থেকে একথা প্রতীয়মান হয় না যে, এই পদ্ধতি হবে কঠোর ও অনমনীয়। ইসলাম এমন কোন আদর্শ নয়- যা মানব-অভিজ্ঞতার অগম্য অথবা বিদ্যমান বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রয়োগের যোগ্য নয়। বরং এই পদ্ধতির প্রকতি এমন যে, এটা বহু ক্ষেত্রে নমনীয়দ; আবার অনেক ক্ষেত্রে দৃঢ়ভাবে সুস্থিত। ইসলাম যার ধারক; সেই মানবিক যুক্তিবিন্যাসে নমনীয়তার উপাদন নিহিত এবং এগুলোকে তার সাধারণ সূত্রের মধ্যে গণ্য করা যায়।
ইসলারেম দুটি মূল উৎস কুরআন ও সুন্নাহতে বিভিন্ন বিস্তারিত বিধান ছাড়াও সাধারণ নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে; যাতে জীবনের দিক তথা ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক- প্রভৃতি সকল বিষয়ের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনাও রয়েছে। এসব সাধারণ নীতিমালার কোনটাই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের আওতায় নেই। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। নিত্য নতুন পরিস্থিতিতে নতুন নতুন সমস্যার বিধিামালা প্রণয়নের জন্য ইজতিহাদের মাধ্যমে ইসলামের ব্যবস্থা রয়েছে। ইজতিহাদ হচ্ছে: ইসলামের মূল ভাবধারার অনুসরণে এবঙ অপরবির্তনীয় সাধারণ নীতিমালার আওতায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তে পৌঁছার লক্ষ্যে ব্যক্তির নিজস্ব যুক্তির সুশৃঙ্খল প্রয়োগ। সুতরাং ঐতিহাসিক পরিবর্তনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার দায়িত্ব, যোগ্যতাসম্পন্ন পণ্ডিতদের বিশ্বাস ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ইসলামি শিক্ষা আঞ্জাম দিতে পারে। ইসলামের শিক্ষা বাস্তাবিকপক্ষে মানবপ্রকৃতি ও মানবিক প্রয়োজনের সাথে সুপরিচিত। ইসলাম জীবনের বাস্তবতাকে স্বীকার করে সর্বাধিক বাস্তব উপায়ে তার মোকাবেলা করে।
অতএব, বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতির উপযোগী করে ইসলামের সাধারণ নীতিমালাকে বাতিল অথবা সমন্বয় সাধানের প্রয়োজন পড়ে না। ইসলামি আদবের বাস্তবতা ও ব্যবহারিক দিক সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, সকল মুসলমানের জন্য রমজানের পুরো মাস রোজা রাখা ফরজ। তথাপি ইসলম (মুসাফিরদের সমস্যার কথা বিবেচনা করে।) মুসাফিরদের রোজা রাখা মওকুফ করেছে, তবে সফর শেষ হবার পর এই রোজা পূরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে প্রসূতি বা যে সব মহিলার মাসিক হয়েছে এবং যারা মারাত্মকভাবে পীড়িত তাদেরকে এই রোজা পালন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ফরজ। তথাপি কতিপয় হাদিস মোতাবেক মুসাফিরদেরকে কোন কোন ওয়াক্ত একত্রে মি েপড়ার এবঙ চার রাকাত নামাজের ‘কসর’ হিসেবে দু’রাকাত পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় গ্রুপের রীতি ও পরিস্থিতি অনুসারে আদবের সংক্ষিপ্ত, চূড়ান্ত ও বিস্তারিত প্রয়োগের অনুমতি দিয়েছে ইসলাম। তবে শর্ত হলোঃ পোশাক পরিচ্ছদ ও খাদ্য গ্রহণ সংক্রান্ত প্রধান নীতিমালা মেনে চলতে হবে। ইসলামি আদবের উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ দৈনন্দিন জীবন সুশৃঙ্খল, ছন্দময়, মর্যাদাপূর্ণ ও পবিত্র করা। দৈনন্দিন জীবনকে জটিল করে তোলার জন্য এগুলো কোন লোক দেখানা বা আইনানুগ প্রথা নয়।

বৈশিষ্ট্য : বোধগম্যতা ও নৈতিকতা

ইসলাম প্রত্যেক মুসলমানের জীবনের প্রতিটি দিক নির্ধারণ করে দিয়েছে। অমুসলমানদের পক্ষে এই অপরিহার্য বিষয়টি অনুধাবন করা খুবই জটিল ব্যাপার। বিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে ইসলাম তার সকল আচরণ ও ব্যবহার যাচাই করার মানদণ্ড দিয়েছে। ইসলাম অন্যান্য ব্যক্তির সাথে, সার্বিকভাবে সমাজের সাথে, প্রাকৃতিক জগতের সাথে তার সম্পর্ক এবং খোদ নিজের ব্যাপারেও তার সম্পর্ক নির্ধারণ করে দিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তির যথেচ্ছাচার অথবা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তির যথেচ্ছাচার অথবা সমাজের পারিপার্শ্বিক অবস্থার বল্গাহীন দাবির বিপরীতে বহু দৃষ্টান্ত পেশ করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূ, শুধু ইসলাম- অনুমোদিত পন্থায় খাদ্য প্রস্তুতি বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে। বলা যায়, কোন মুসলমান শূকরের গোস্ত খেতে পারেনা। একজন মুসলিম মহিলার প্রকাশ্যে হাঁটুর নিম্নভাগের পা উন্মুক্ত রাখা উচিত নয়, কারণ ইসলামে তার অনুমতি নেই। মদের ন্যায় যে সব পণ্য মুসলমানদের জন্য নিষেধ; সেগুলো উপহার হিসেবেও বিনিময় করা যাবেনা। কোন মুসলমান বিবাহ উৎসবে আমন্ত্রিত হলে, তাকে সে দাওাত কবুল করতে হবে (অবশ্য যদি সে শারীকিরভাবে সুস্থ থাকে), কেননা তার জন্য এরূপ করা বাধ্যতামূলক। মৃত্যুশয্যায় পোশিক (উল্লিখিত) ইচ্ছা ইসলামি শিক্ষার বিরোধী হলে তা পূরণ করা যাবে না। যেমন মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের মধ্যে অতিরিক্ত সম্পদ বরাদ্দ অথবা তার দেহ পুড়িয়ে ফেলার অনুরোধ পুরণ করা যাবে না।
ইসলারেম আদব হচ্ছে: একটি সমন্বিত বিধান। সামজিক আচরণের প্রতিটি দিক এর অন্তর্ভুক্ত। এটা পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা তথা ইসলামের অংশ। ইসলামের বিভিন্ন অংশ যেমন একটি অখণ্ড জীবনব্যবস্থা তথা ইসলামের অংশ। ইসলামের বিভিন্ন অংশ যেমন একটি অখণ্ড সত্তা গড়ে তোলে, তেমনি বাদবাকী বিচ্ছিন্ন করে ইসলামি আদবের প্রয়োগ তার সর্বাত্মক রূপায়ণ ঘটাবে না; এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে তা অর্থহীন হয়ে পড়বে। এই গ্রন্থালোচিত আচরন ও প্রথাসমূহকে মুসলমানদের জন্য উপযোগী বিবেচনা করা হয়েছে। যাদের সত্যিকার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামে অনুমোদিত শুদ্ধ আচরণের নীতি অবলম্বন করবে। ইসরারেম বিভিনন দিক যেমন আদর্শি, আধ্যাত্মিক, আইনগত, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক- প্রভৃতি পরস্পর সমন্বিত এবং একে অপরের পরিপূরক। দৃষ্টান্ত হিসেবে বা যায়, মুসলমানদের ঈমান এবং অপরিহার্য বিষয় যে, ঈমনি চেতনায় বাইরের চাপ ছাড়াই ইসলামের নৈতিক, আইনগত ও অন্যান্য বিধান মেনে চলার অনুপ্রেরণা যোগায়। একইভাবে এসব বিধিবিধান স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে পালনের মাধ্যমে তার ঈমান বৃদ্ধি পায়; অধ্যাত্মচেতনা থেকে সামাজিক কর্মকাণ্ডের পথ উন্মুক্ত করে দেয় এবং দু’টিকে একটি শক্তিশারী স্থিতিশীল সম্পর্কের বাঁধনে সংযুক্ত করে। আরো সুনির্দিষ্টবাবে ইসলারেম একক শক্তির বিকাশ দেখা যাবে, মহিলাদের ক্ষেত্রে আচরণেল ব্যাপারে। ইসলামি সমাজ মুসলিম মহিলাদের ব্যাপারে ইসলামি ধারণার অনুসরণে এই আচরণবিধি প্রণীত।
ইসলামি আদবের ব্যাপকতার পাশাপাশি সৌজন্যের (Etiquette) সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলনীয়। **৪ ইসলামের আচরণ বিভিন্ন উপলক্ষে ‍শুধু সৌজন্যের বিধিমালা নয়, বরং সাধারণ কর্মকাণ্ড থেকে ব্যাপক সামাজিক উৎসবের সার্বিকব মানবিক সম্পর্কের আওতাভুক্ত। পশ্চিমা ‘etiquette’ এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে: (রাজকীয় পরিষদবর্গ ছাড়িয়ে তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌছলেও) উচ্চ শ্রেণীর লোকদের সুরক্ষা করা। **৫ এর বিপরীতে ইসলামি আদবের সত্যিকার উদ্দেশ্য হচ্ছে: তার ধর্মীয় চরিত্র ও প্রকৃতি অনুধাবন। মানুষের দৈনন্দিন কর্মপদ্ধতিতে খোদার স্মরণ থেকেই এর উৎপত্তি; এর উদ্দেশ্য হচ্ছে: খোদার স্মরণ (যিকির) অব্যাহত রাখা এবং সঠিক পথে চলতে সহায়তা করা। ইসলামের আচরণের
৪. ফরাসি শব্দ Une etiuette থেকে etipuette এর উৎপত্তি। এর অর্থ হচ্ছে: নতুন নতুন পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্র আচরণের একটি ব্যাপক বিধিমালা, আদলতে যার মোকাবেলা করা যেতে পারে। Academic American Encyclopedia, Dunbury: Grolier Inc, 1942, Vol. 7, P-258,
৫. Dsther & Aresty, Encyclopedia American, Danbury, Americab Corporation, 1979, Vor.10, 0-635
সকল ঘটনায় খোদার রহমহত তালাশ করা এটা থেকে সুস্পষ্ট হয়। ঘুম থেকে জেগে ওঠে শোওয়ার সময় পর্যন্ত মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনের সবক করতে হয় খোদার নাম নিয়ে। খাবার গ্রহণ, পানি পান, নতুন কাপড় চোপড় ক্রয় অথবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনার সময় খোদার প্রতি শুকরিয়া ও তার প্রশংসা করতে হয়। এমনকি এস্তেঞ্জা করার আগেও তাকে খোদার নাম নেয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পায়খানায় প্রবেশের সময় এই দোয়া পড়ার কথা বলা হয়েছে: “হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে শয়তান ও অশ্লীলতা থেকে আশ্রয় চাই।” পায়খানা ছেড়ে আসার সময়ও তাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে বলা হয়েছে। সফরকালে খোদার যিকর করা এবং পূর্ণতা ও নির্দেশনার জন্য খোদার রহমত কামনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, ইসলামের দু’টি বড় উৎসব হচ্ছে (দু’টি প্রধান ফরজ কাজ)- রমজান মাসে রোজা রাখা এবঙ মক্কা শরীফে গিয়ে হজ্ব সমাপনান্তে সামাজিক উৎসব পালন।
জাতির আত্মবিশ্বাস ও শক্তির স্তম্ভ হচ্ছে নৈতিকতা, যা ইসলামি আদবের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এর পাশাপাশি কোন জাতির পত ও ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে দুর্নীতি ও নৈতিকতা বিরোধী কাজ। নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব আরোপের ফলে প্রায়ই ইসলামি জীবনব্যবস্থাকে আপাতঃদৃষ্টিতে কঠোর অথবা মৌলবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। একজন লেখক বলেছেন, নৈতিকতার কোন কোন ব্যাপারে ইসলাম আমাদের কালের বিশেষ কতিপয় জীবনব্যবস্থার চাইতে অধিকতর কঠোর ও অধিকতর বিশুদ্ধ। **৬ তবে কোন জাতির সুস্থতার ক্ষেত্রে নৈতিকতাকে গুরুত্ব দিয়ে অবৈধ যৌন সম্পর্ক এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য দুর্নীতির সকল পথ রুদ্ধ করে দিয়ে মান নির্ধারক ইসলাম সঠিক দায়িত্ব পালন করেছে। ব্যক্তিগত এবং সামষ্টিক মানবিক পুণ্যের বিনিময়ে বস্তুগত আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করা যাবে না। তাছাড়া রাজনতিকেও (অনৈসলামিক চিন্তাধারায় এটা অনৈতিকতার সাথে সম্পর্কহীন গণ্য করা হয়) ইসলামের লক্ষ্য তথা মানবিক চরিত্র ও মানবতার বিকাশের উপযোগী হতে হবে।
৬. Mohommad Hamidullah, Introduction to Islam, the Holy Quran Publishing House, 1977, P-155]
মানবতার আদর্শ ‘আমলে সালেহ’ বা পূণ্যকর্মের উপর স্থাপিত। এই পরিবাষাটি ধর্মীয় চিন্তার ক্ষেত্রে যে অর্থের ধারক, তার বাইরেও তা বিস্তৃত। ইসরামি আকিদা ও আইনের অনুমোদিত মানবিক কার্যক্রমের (অপরে সঙ্গে সম্পর্কের, সজীব ও নির্জীব পরিবেশের ক্ষেত) বহুদিক এর আওতাভুক্ত। এক্ষেত্রে মহানবীর (সা.)-এর জীনব থেকে বহু বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যেছে; যেমন- দু’জনের মধ্যে ন্যায়বিচার করা, কাউকে ঘোড়া চড়তে (বা গাড়িতে উঠতে) সাহয্য করা, উত্তম বাক্য বিনিময় করা, পথ কন্টকমুক্ত করা, বেওয়ারিশ কুকুর ও বিড়ালকে পানি পান করানো, অন্যকে স্বাগত সম্ভাষণ জানাতে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করা, আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করা ইত্যাদি। এমনকি স্ত্রীর সাথে প্রেমপূর্ণ ভাষায় কথা বলাও উত্তম কাজ হিসেবে বিবেচিত। আদর্শ মুসলিম ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিনয়, সৌজন্য এবং সহজ সরল আচরণ। আচার ব্যবহারে কোন প্রকার গৌরব ও ঔদ্ধত্য মেনে নেয়া যায়না। করণ তাকওয়া এবং সৎকর্ম ছাড়া কোন মানুষের ওপর অন্য মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।
একইভাবে যে পোশাক পরলে অহংকার প্রদর্শিত হয়, সামাজিক মর্যাদা ভড়ং ধরা পড়ে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। খাদ্য গ্রহণে নম্র ও ভদ্র পরিবেশ বজায় রাখা আবশ্যক। খাবার গ্রহণ কালে সোফায় হেলান দেওয়া নিষিদ্ধ। খাবার গ্রহণকালে বসে খাওয়া বিনম্রতার লক্ষণ। গৃহের আসবাবপত্র সাজানোর মধ্যেও ভদ্রতা ও সংযমের বহিঃপ্রকাশ থাকতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মেঝে থেকে অনেক উঁচুতে বিছানা পাতা যাবেনা। হাঁটার সময় প্রফুল্ল থাকা, স্বাগত সম্ভাষণ ও বক্তৃতাকালে কোন প্রকার বড়ত্বের বহিঃপ্রকাশ থাকা উচিত নয়।
ইসলাম বৈষয়িক ও ধর্মীয় জীবনের সকল পর্যায়ে পরিমিত ও স্বাভাবিক আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। উগ্রপন্থা, বাড়াবাড়ি, খামখেয়ালিপনা, অস্বাভাবিক আচরণ, অস্থিরতা এবং জটিলতাকে পরিহার করতে হবে। ইসলামি আদবে কোন কোন আনুষ্ঠানিকতার ওপর গুরুত্ব দানের উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলিম সমাজের বিরাট জনগোষ্ঠীর কাছে তার ব্যবহার সহজতর করে তোলা। আচর আচরণের স্বাভাবিকতারকে সামাজিক উত্তেজনা হ্রাস এবং সামাজিক সম্পর্ক জোরদার করার মাধ্যমে হিসেবে গণ্য করা হয়।
পশ্চাত্যের আদব কায়দার উৎপত্তি ইউরোপের রাজদরবারে। রাজদরবার ও অভিজাত শ্রেণীর সাথে ব্যবহারের জন্যই এর উদ্বাবন করা হয়েছে। **৭ সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে আদবকায়তার বিষয়টি জানাজানি হয়ে পড়লে তার অর্থের তাৎপর্য হ্রাস পেতে থাকে। বর্তমানে গ্রুপ থেকে গ্রুপে পাশ্চাত্যের আদবকায়তা কম-বেশি হয়। তথাকথিত ‘হাই সোসাইটির’ সদস্যরা অপেক্ষাকৃত স্বল্পবিত্তের লোকদের তুলনায় আদবকায়দার জটিল ও অনমনীয় ধারা অনুসরণ করে। এর ফলে শ্রেণীভেতে পদ্ধতি থেকেই যাচ্ছে।
ইসলামে আদবের প্রসঙ্গটি ভিন্ন। এ উদ্দেশ্য সামাজিক শ্রেণীর অনুসারে সমাজের বিভক্তি নয়। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর মারফত জারিকৃত বিধিমালা কেন বিশেষ গ্রুপের দ্বারা প্রণীত নয় অর্থাৎ ধনী ও ক্ষমতাশালী লোকদের দ্বারা অন্য গ্রুপের অধিকার ‘সংরক্ষিত’ বিবেচনা করা কোন কারণ নেই। এ অধিকার মুসলিম সমাজের সকলের জন্য উন্মুক্ত। ইসলামে আদবকায়দার রকমারি নিয়মের কোন অস্তিত্ব নেই।
মুসলিম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং তাদের ঐক্য প্রকাশের বাহন হিসেবে ইসলামি আদবের ভূমিকা স্পষ্ট; কিন্তু ইসরামি আদব মুধু আচরণের সংগতি বা সামঞ্জস্য বজায় রাখা নয়; বরং তা হচ্ছে সঠিক আচরণের সংগতি বা সামঞ্জস্য বজায় রাখা। ইসলামে সদাচরণের ধারণাকে সৎ কাজের ধারণা থেকে পৃথক করা যাবে না, যেমন যাবেনা ঈমান ও এবাদতের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা। একটি সমৃদ্ধশালী আদর্শ সমাজে ঈমান ও সৎ কাজের অত্যন্ত প্রয়োজন, কারণ এখানে দায়িত্ব পারস্পরিক ও ভাগাভাগি করে নিতে হয়। আর পরকালে বেহেশতে দাখিল হওয়ার জন্য ঈমান ও সৎবকর্ম হচ্ছে মু্ক্তি ও নাজাতের অপরিহার্য শর্ত। পবিত্র কুরআন শরীফের বহু সংখ্যক আয়াতে প্রকৃত মুসলানের বৈশিষ্ট্য হিসেবে ঈমান ও সৎকর্মকে সম্পর্কযুক্ত করা হয়েছে।

লক্ষ্য

ইসলামে যেটা কেন্দ্রীয় ও অপরিহার্য, তা নির্ধারিত হয় ইসলামের লক্ষ্যের সাথে তার বিস্তৃত সম্পর্কের দ্বারা। এর মধ্যে রয়েছে
% | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | % | সম্পুর্ণ বই এক পেজে »

About ড. মারওয়ান ইবরাহীম আল-কায়সি