ইসলামের দৃষ্টিতে জন্ম নিয়ন্ত্রন

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ক্ষয়ক্ষতির  খতিয়ান

প্রকৃতির সঙ্গে যারা এ ধরনের ধোঁকাবাজি করে, প্রকৃতি কি তাদেরকে কোন সাজা না দিয়েই ছেড়ে দেয় অথবা কোন সাজা দিয়ে থাকে? কোরআন মজিদ বলে যে, এদের অবশ্যই সাজা দেওয়া হয় এবং সে সাজা হচ্ছে এই যে, এ ধরনের কাজে যারা লিপ্ত হয়, তারা লাভবান হবার পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত হয়:

(আরবী*************)

-“যারা অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার দরুন আল্লাহ প্রদত্ত রিজিককে আল্লাহরিই প্রতি মিথ্যা দোষারোপ করে নিজেদের জন্য হারাম [পুরাত তফসীরকারগণ (আরবী******) এর অর্থ হালাল খাদ্যকে নিজেদের জন্যে  হারাম করে নেয়া বলে লিখেছেন। এর কারণ এই যে, তাঁদের জামানায় জন্মনিয়ন্ত্রণের কোন আন্দোলনের অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু আল্লাহ  তায়ালার জ্হান যেহেতু অতীত ও ভবিষ্যতের ওপর সমভাবে বিস্তৃত, সেজন্যে তিনি এমন ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করেছেন,  যার অর্থ শুধুামাত্র হালাল খাদ্যকে হারাম মনে করার  মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিটি নেয়ামতই এর মধ্যে শামিল হয়েছে। অভিধান ও পারিভাষিক অর্থ অনুসারে ‘রিজিক’ শুধু খাদ্যই নয়, বরং প্রতিটি দান এর অন্তর্ভুক্ত। সন্তান দানও রিজিকেরই এক অংশ; ার যেহেতু এখানে সন্তান  হত্যার পর পরই রিজককে নিজেদের জন্যে হারাম  করে নেয়ার কথা বলা হয়েছে, সেজন্য পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে,  সন্তান হত্যাকারিগণ যেভাবে  ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ঠিক সেভাবেই সন্তানের জন্মকে নিজেদের জন্যে হারাম করে নেয়, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।] করে দিয়েছে এবং সন্তানদের হত্যা করেছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” আল-আনয়াম-১৪০

এ আয়াতে সন্তান হত্যার সঙ্গে সঙ্গে বংশধররূপ নেয়ামতকে নিজের জন্যে হারাম করে নেয়াকেও ক্ষতি বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে। এ ক্ষতি কোন্‌ কোন্‌ দিক দিয়ে প্রকাশিত হয়,  তাই এখন দেখা দরকার।

একঃ দেহ ও আত্মার ক্ষতি

সন্তানের জন্ম ও বংশ বৃদ্ধি যেহেতু সরাসরি দেহ ও আত্মার সঙ্গে সংযুক্ত, সেজন্যে সর্বপ্রথম জন্মনিয়ন্ত্রণের ফলে দেহ ও আত্মার ওপর দিকে কি প্রভাব পড়ে তাকে তা অনুসন্ধান করা  দরকার।

ওপরে আলোচনা কর হয়েছে যে, সৃষ্টিকে পুরুষ ও স্ত্রী দুটি পৃথক শ্রেণীতে বিভক্ত করার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে  সন্তান জন্মানো, বংশ  বৃদ্ধি ও সৃষ্টি রক্ষা। এ কথাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, পুরুষ ও স্ত্রী উভয় শ্রেণীর প্রকৃতিগত প্রেরণা সন্তান জন্মানোকেই উৎসাহিত করে। বিশেষত মানব জাতির মধ্যে নারী গোষ্ঠীর মনে স্বাভাবিক ভাবেই সন্তানের ভালোবাসার  ও  কামনার এক প্রবল প্রেরণা স্থান পেয়েছে। উপরন্তু মানবদেহে যৌনগ্রন্থি কি পরিমাণ ‍সদূর প্রসরী ও গভীর প্রভাব বিস্তার করে থাকে এবং এ  গ্রন্থিগুলো মানুষকে স্বজাতির সেবায় উদ্বুদ্ধ করা, সৌন্দর্য সুষমা, কর্মতৎপরতা ও বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধি করার ব্যাপারে  কিভাবে দ্বিমুখী দায়িত্ব পালন করে থাকে, তাও ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, বিশেষত নারী সম্পর্কে আপনি জানতে পেরেছেন যে, তার দেহের  সকল যন্ত্রপাতিই  মানব বংশের খেদমতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। তার সৃষ্টির সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যই এটি এবং  তার প্রকৃতি তার নিকট আপনি উপভোগ করতে এবং এর স্বাভাবিক প্রতিফলের দায়িত্ব এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করবে (যদিও এর ফল লাভ করার জন্যে তার দেহের প্রতিটি অন-পরমাণূ আগ্রহান্বিত) তখন তার দেহের আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা ও যৌনগ্রন্থির কর্মশক্তি অব্যাহত না হওয়া অসম্ভব।

বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিবৃত্তি এ সিদ্ধান্তেরই সমর্থক। ১৯২৭ সালে গ্রেট বৃটেনের National Birth Rate Commission (জাতীয় জন্মহার কমিশন) জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণথেকে যে রিপোর্ট প্রকাশ করে, তাতে লেখা হয়েছিল:

“জন্মনিয়ন্ত্রণের উপকরণাদি ব্যবহার  করার ফলে দৈহিক ব্যবস্থায় বিশৃংখলা ‍সৃষ্টি হতে পারে। সাময়িকভাবে নপুসংকত্ব অথবা পুরুষত্বের দুর্বলতা দেখা দেয়াও অসম্ভব নয়। কিন্তু সাধারণভাবে বলা যায় যে, েএসব উপকরণ ব্যবহারের ফলে পুরুষের দেহে তেমন কোন মন্দ প্রতিক্রিয়ার আশংকা নেই। অবশ্য সর্বদাই এ আশংকা বর্তমান থাকবে যে, জন্মরোধকারী উপকরণাদি ব্যবহারের ফলে পুরুষ যখন দাম্পত্য জীবনের পূর্ণ আনন্দ উপভোগ করা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়বে তখন তার পারিবারিক সুখ বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং সে অন্য উপায়ে সুখানুভূতিকে পরিতৃপ্ত করতে চেষ্টা করবে। এর ফলে তার স্বাস্থ্য বিনষ্ট হবে, এমন কি ঘৃণিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকাও আছে।”

পুনঃ নারী সমাজ সম্পর্কে কমিশন বলে:

“যদি স্বাস্থ্যগত কারণে জন্মনিরোধ প্রয়োজন হয়ে পড়ে এবং সন্তান জন্মাহার সীমাতিরিক্তরূপে বেশি হয়, তাহলে জন্মনিরোধ সন্দেহহাতীতরূপে নারীদেহের জন্যে উপকরী হবে। কিন্তু এ সব অপরিহার্য প্রয়োজন ছাড়া জন্মনিরোধ প্রবর্তন করার ফলে নারীদেহের আভ্যন্তরীন ব্যবস্থায় চরম বিশৃংখলা দেখা দেয়্ তার মেজাজ ক্ষিপ্ত ও খিটখিটে হয়ে ওঠে। মানসিক চাহিদার পূর্ণ পরিতৃপ্তি না হওয়ার দরুন স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্কে অবনতি ঘটতে থাকে, বিশেষত যারা ‘আজল করে’[স্ত্রীসংগমকাল চরমানন্দের পূর্ব মুহূর্তে পুরুষাঙ্গকে স্ত্রী-অঙ্গ থেকে বের করে বাইরে বীর্যপাত করা।] (Coius interruptus) থাকে সে দম্পতির এ- অবস্থা দেখা যায়।”

ডাঃ মেরী সারলেইব (Dr. Mary Scharlieb) তার দীর্ঘ ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা এভাবে পেশ করেন:

“জন্মনিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য ‘পেশারী’ (Pessaries), জীবাণুনাশক ঔষধ, রবারের থলে টুপী অথবা অন্য কোন উপকরণ ব্যবহারের ফলে তৎক্ষণাৎই কোন ক্ষতি হয় না। কিন্তু বেশ কিছুকাল যাবৎ এসব ব্যবহারের ফলে মধ্যবর্তী বয়সে পৌঁছতে না পৌঁছতেই নারীদেহের স্নায়ুতন্ত্রীতে বিশৃংখলা (Nerbous istability) দেখা দেয়। নিস্তেজ অবস্থা, নিরানন্দ মনোভাব, উদাসীনতা, খিটখিটে মেজাজ, রুক্ষতা, বিষণ্ণতা, নিদ্রাহীনতা, চিন্তার অস্থিরতা, মন ও মস্তিষ্কের দুর্বলতা, রক্তচলাচল হ্রাস, হাত পা অবশ হওয়া, শরীরে বিভিন্ন স্থানে ব্যথা, অনিয়িমত মাসিক ঋতু ইত্যাদি হচ্ছে এ ব্যবস্থার অনিবার্য পরিণতি।”

অন্যান্য ডাক্তারের মতে জন্মনিরোধ উপকরণ ব্যবহারের ফলে জরায়ুর স্থানচ্যুতি (Falling of the Womb) জীবাণু সংরক্ষণে অক্ষমতা এবং প্রয়াশ মস্তিষ্ক বিকৃতি, হৃদকম্পন ও উন্মাদরোগ পর্যন্ত দেখা দিয়ে থাকে। এছাড়া দীর্ঘকাল যাবৎ যে নারীর সন্তান হয় জন্মায় না তার সন্তান ধারণোপযোগী প্রত্যঙ্গাদিতে এ ধরনের শৈথিল্য ও পরিবর্তন দেখা দেয় যে, পরবর্তীকালে সে গর্ভধারণ কলেও গর্ভ ও প্রসবকালে তাকে অত্যন্ত কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়। [ডাঃ আর্ণাল্ড লুরাণ্ড (Lurand)] তাঁর Life Shortening Habits and Rejuvenation গ্রন্থে জন্মনিরোধ প্রণালীর বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। এ গ্রন্থ ১৯২২ সালে ফিলিডেলফিয়া থেকে মুদ্রিত হয়েছে।]

প্রফেসার লিউনার্ভবিল, এম. বি. একটি প্রবন্ধে লিখেন:

“সাবালকত্ব প্রাপ্তি সময় নারীদেহে যেসব পরিবর্তন সাধিত হয়, তা সবই সন্তান ধারণের জন্যে। পুনঃপুনঃ নারীকে সন্তান ধারণের যোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্যে মাসিক ঋতু হয়। যৌন সম্পর্কহীন অথবা জন্মরোধকারী নারীর দৈহিক তন্ত্রীগুলো ঋতুকালে উত্তেজিত হয়ে পুনরায় ঋতুশেষে আচ্ছন্ন হয়। এ স্বাভাবিক চাহিদা অপূর্ণ থাকা এবং সন্তান ধারণের জনে উদগ্রীব অঙ্গগুলোর নিষ্ক্রিয় রাখার অনিবার্য পরিণতি স্বরূপ গর্ভ ধারণোপযোগী প্রত্যঙ্গসমূহে উত্তেজনা ও বিশৃংখলা সৃষ্টি, অনিয়মিত ঋতু ও ঋতুকালে নানাবিধ কষ্ট, স্তন ঝুলে পড়া, মুখের কমনীয়তা ও সৌন্দর্যের বিদায় গ্রহণ এবং মেজাজে রুক্সতা ও উদাসীনতা দেখা দিয়ে থাকে। মনে রাখতে হবে যে, মানুষের জীবনে তার যৌন গ্রন্থিটিই  মানুষের দেহে পুরিপুষ্টতা, সৌন্দর্য ও তৎপরতা সৃষ্টি করে। এখান থেকেই মানবীয়  চরিত্রের  বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়। প্রাপ্তবয়ষ্কা হবার অব্যবহতি পূর্বে যখন গ্রন্থিগলো সতেজ হয়ে ওঠে  তখন যেভাবে মানুষের প্রজনন ক্ষমতা সৃষ্টি হয় ঠিক সেভাবেই সৌন্দর্য, কমনীয়তা, বুদ্ধিমত্তা, দৈহিক শক্তি, যৌবন ও কর্মশক্তি পয়দা হয়। যদি এসব অংগের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ করা না হয় তাহলে এরা তাদের অন্যান্য দায়িত্ব পালনেও শিথিল হয়ে পড়ে। বিশেষত নারীকে গর্ভ ধারণ থেকে বিরত রাখার অর্থ  হচ্ছে তার সমগ্র দৈহিক যন্ত্রকে বিকল ও নিরর্থক করে দেয়।”

ইতিপূর্বেও আমরা ডক্তর আসওয়াল্ড শোয়াজের মন্তব্য আলোচনা করেছি। তিনি লিখেন:

“এটা একটা স্বতঃসিদ্ধ জৈবিক আইন যে, দেহের প্রতিটি অঙ্গ তৎপ্রতি অর্পিত প্রাকৃতিক দায়িত্ব পালনের জন্যে সর্বদা উদগ্রীব। আর যদি তাদের এসব দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করা হয়, তা হলে অনিবার্যরূপেই জটিরতা ও বিপদ দেখা দেবে। নারীদেহ গর্ভ ধারণ ও সন্তান জন্মানোর জন্যেই সৃষ্টি। যদি নারীকে তার ঐ দৈহিক ও মানসিক চাহিদা পূরণ করা থেকে বিরত রাখা হয়, তাহলে তার দেহ ও মনে নৈরাশ্য ও পরাজয়ের প্রভাব পড়তে বাধ্য। েএছাড়া সন্তান প্রসবের দুরুন তার দৈহিক যন্ত্রে যে দুর্বলতা সৃষ্টি হয়, তার প্রতিকারিই হচ্ছে মাতৃত্বের আস্বাদ ও সন্তান লাভজনিত মানসিক তৃপ্তি।” [The Psychology of Sex. London 1951 page, 17.]

জন্মনিরোধ যে নারীর প্রতি একটি নির্মম যুলুম এ বিষয়ে  সন্দেহের অবকাশমাত্র নেই। এ ব্যবস্থা নিজের প্রকৃতির সঙ্গে তার বিবাদ বাধিয়ে দেয় এবং এর ফলে তার দেহ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহের সকল ব্যবস্থা বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

একদিকে তো জন্মনিরোধ ব্যবস্থাটি প্রাকৃতিক ব্যবহার বিরুদ্ধ সরাসরি বিদ্রোহ এবং এর ক্ষতিও অপূরণীয়। তদুপরি জন্মনিরোধের জন্যে যেসব পন্থা অবলম্বন করা হয় তা নর ও নারী উভয়ের, বিশেষত নারী দেহে এমন প্রভাব বিস্তার কর যে, সমগ্র জীবন সে  এ প্রভাব বিস্তার করে যে, সমগ্র জীবন সে এ প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে না বরং তার সমগ্র দৈহিক সত্তারই ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।

জন্মনিয়ন্ত্রণের বহু পুরাতন ও গুরুত্বপূর্ণ পন্থ হচ্ছে গর্ভপাত (Abortion) গর্ভনিরোধের (Contraceptives) উপায়-উপাদানের অনেক উন্নতি সত্ত্বেও আজ অবধি দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে বহুলাভে গর্ভাপাত ব্যবস্থা চালু আছে। কোন কোন দেশে শুধু গর্ভপাতের জন্যেই ক্লাব এবং ক্লিনিক  খোলা হয়েছে। এর কারণ, গর্ভনিরোধকারী উপকরণাদির কোন একটিও সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য নয়। এসব উপকরণ  ব্যবহার সত্ত্বেও অনেক সময় গর্ভসঞ্চার হয়ে যায় এবং নিজের ভবিষ্যত বংশধরদের প্রতি বিরোধ মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিগণ তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দুনিয়ায় আগমনেচ্ছু সন্তানটিকে হত্যা করে ফেলে। জন্ম নিয়ন্ত্রণের সমর্থকগণ  সাধারণত দাবি করেন যে, ‘পরিবার পরিকল্পনা’ গর্ভপাতের  হার হ্রাস করে দেয়। কিন্তু প্রকৃত সত্য এর বিপরীত। Paul H. Gcbhard- এর উক্তি  মুতাবেক আমেরিকায় বর্তমানে শতকরা ৮ জন নারী বিয়ের পূর্বে এবং শতকরা ২০ থেকে ২৫ জন বিয়ের পরে গর্ভাপাতের পন্থা অবলম্বন করে থাকে। [Cebhard Paul H. Pregnancy. Birth and Abortion,New York, 2958 P.P.56 & 119.]  জাপানে দ্বিতীয়  মহাযুদ্ধের পর  মার্কিন  সুপ্রীম কমাণ্ডারের  তত্ত্বাবধানে জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করা হয়। কিন্তু  গভর দৃষ্টি সহকার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, সেদেশে এ আন্দোলনের ফলে গর্ভপাত অস্বাভাবিকরূপে বেড়ে গিয়েছে। ১৯৫০ সালে শতকরা  ২৯/টি পরিবারের মধ্যে এ অবস্থা জারী হয়েছিল। ১৯৫৫ সালে এ সংখ্যাঁ শতকরা ৫২তে পৌঁছেছে। প্রফেসর সাউভী (Sauby)-এর মতে জাপানে প্রতি বছর ১২ লক্ষ  গর্ভপাত হয় এবং বেআইনী গর্ভপাতকে এর  মধ্যে গণনা করলে (২০ লক্ষের কম কিছুতেই নয়) এ সংখ্যা অনেক বেশি হবে। [McCormack Arther, Peoplie, Space, Food. Londonn 1960, Page 67]

জাপানের বিখ্যাত দৈনিক মাইনীচির (Mainichi) উদ্যোগে যে সার্ভে করা হয় তা থেকে জানা যায় যে, যারা জন্ম নিয়ন্ত্রণ কর থাকে  তাদের  মধ্যে গর্ভপাতের সংখ্যা- জন্মনিয়ন্ত্রণ যারা করে না- তাদের  তুলনায় ছয়গুণ বেশি। [ঐ ৮৬, পৃঃ ১৯ নং  টীকা।]

ইংলণ্ড  সম্পর্কে রয়েল কমিশনও এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, জন্ম নিয়ন্ত্রণকারী পরিবারগুলোর মধ্যে অন্যদের তুলনায় ৮.২৭ গুণ বেশি গর্ভপাত হয়ে থাকে।

আমেরিকার প্রিন্ট ইউনিভার্সিটির প্রফেসার আইরীন বি টিউবার (Irene B. Teauber)  ব্যাপক অনুসন্ধানের পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, গর্ভনিরোধ  উপকরণাদির আগমনের সঙ্গে সঙ্গে গর্ভপাতের সংখ্যাও বেড়ে গিয়াছে এবং এটা বর্তমানে শুধু বিবাহিতা নারী পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়, বরং কুড়ি বছরের নিম্ন বয়স্কা বালিকাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। [McCormack-এর উল্লিখিত বইয়ের ৬৭ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।]

গর্ভপাত যে নারীর স্বাস্থ্য ও তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গাদির স্বাভাবিক ব্যবস্থার জন্যে ধ্বংসাত্মক এ বিষয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অধিক সংখ্যক বিশেষজ্ঞই একমত। আমরা এখানে শুধু ডাঃ ফ্রেড্রীক টোসেগের  মতামত উদ্ধৃত করবো। তিনি এ বিষয় সম্পর্কিত চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতামত  নিম্নের ভাষায় পেশ করেছেন:

“নারীর গর্ভকাল পর্ণত্বে পৌঁছার পূর্বে যদি গর্ভস্থ সন্তানক স্থানচ্যুত (Abortion) করা হয় অর্থাৎ আধুনিক পরিভাষায় বলতে গেলে, গর্ভপাত ঘটানো হয়, তাহলে মানব বংশকে তিন ধরনের  ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়্যঃ প্রথমত, এক অজ্ঞাত সংখ্যক  মানব বংশকে দুনিয়াতে আসার আগেই হত্যা করা হয়।

দ্বিতীয়, গর্ভপাতের সঙ্গে সঙ্গে ভাবী মাতাদের এক বিরাট সংখ্যা  মৃত্যুর কোলে আশ্রয় নেয়।

তৃতীয়, গর্ভপাতের ফলে বিপুল সংখ্যক নারীর দেহে এমন সব রোগের প্রভাব দেখা দেয়, যার ফলে ভবিষ্যতে সন্তান  জন্মানোর  সম্ভাবনা অনেকখানি নষ্ট হয়ে যায়।” [Taussing, Fredrik J., “The Abortion Problem” Proceeding or the Conference of National Committee on Maternal Health, Baltimore 194 Page-49.]

গর্ভপাত ছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণের অপরাপর উপায় হচ্ছে, জন্মনিরোধ (Contraceptives); কিন্তু এগুলো সম্পর্কেও  বিশেষজ্ঞদের অভিমত এই যেঃ

(১) এসব উপায়-উপাদানের কোনটাই অব্যর্থ ও নির্ভরযোগ্য নয় এবং

(২) কোন একটি উপকরণও এমন নেই যেটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের  দৃষ্টিতে দেহের জন্য ক্ষতিকর নয়।”

ডাঃ ক্লেয়ার ফোলসোম (Clair E. Folsome) এর ভাষায়:

“আমাদের আজ পর্যন্ত জন্মনিরোধের উপযোগী সহজ,  সস্তা ও দেহের জন্যে ক্ষতিকর নয়- েএমন কোন উপায় জানা নেই।” [***৬০]

জন্মনিরোধের সকল পন্থাই মানসিক জটিলতা ‍সৃষ্টি করে এর ফলে শুধু যে চিন্তার বিপর্যয় দেখা দেয় তাই  নয়, বরং যৌন ক্রিয়া থেকে স্বাভাবিকভাবে মানুষ যে সুখানুভব করে থাকে সে আস্বাদটুকুও বিনষ্ট হয়ে যায়। [***৬১]

ডাঃ স্যাতিয়াওতি তার, ‘পরিবার  পরিকল্পনা’ (Family Planning) নামক গ্রন্থে নিম্ন ভাষায় এ  তথ্য পেশ  করেছেন:

“কোন কোন অবস্থায় জন্মনিয়ন্ত্রণের ফলাফল অত্যন্ত  ক্ষতিকর  হয়ে থাকে। মনের শান্তি  বিদায় গ্রহণ করে এবং  তদস্থলে অস্থিরতা দেখা দেয়।  দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে এক প্রকার  চাঞ্চল্য অনুভূত হয়। ঘুম মোটেই হয় না। উম্মা ও মূর্ছা রোগের আক্রমণ হয়। মস্তিষ্ক বিকৃত হয় নারী বন্ধ্য- হয়ে যায় এবং ‍পুরুষ তার পুরুষত্ব হারিয়ে ফেলে।” (পাকিস্তান টাইম, ২১-৯-৫৯: ৪র্থ পৃষ্ঠা।)।

আজকার জন্মনিরোধ বাটিকার (Contraceptive Pill) মহাত্ম্য খুব প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু এর ক্ষতিকর শক্তিও কারো অজানা নয় এবং একে ক্ষতিকর  নয় বলে প্রচার  করা, তথ্য সম্পর্কে ধোঁকাবাজি মাত্র। মেক্‌কার মুকের ভাষায় বিষয়টি নিম্নরূপ:

“যদিও এখানে জন্মনিরোধ  বটী সম্পর্কে চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সঠিক মতামত প্রদানের সময় হয় নি, তবও এ কথা স্পষ্টভাবে জানা থাকা  দরকার যে, এটা অব্যর্থ ও সফল হতেই পারে না। এছাড়া পরবর্তীকালে নারীদেহ এর ক্ষতিকর  প্রভাব দেখা দেয়ার খুবই আশংকা রয়েছে। এর কারণ হচ্ছে, এর অনিবার্য  পরিণতি স্বরূপ তার মাসিক ঋতু (Menstrual Cycle) অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় নারীদের এমন  গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থির ব্যবস্থাপনায় রদবদর ঘটানোর পর কোন অপ্রীতিকর  অবস্থা দেখা দেবে না, এ কথা কি করে বিশ্বাস করা যেতে পারে?”

এসব বটী সম্পর্কে বৃটিশ ইনসাইক্লোপেডিয়া অব মেডিক্যাল প্রাক্‌টীসের পরিশিষ্ট থেকে আরও একটি প্রমাণিক তথ্য পাওয়া যায়। ডাঃ জি.  আই. সাইয়ার (G.I. Swyer)  মন্তব্য করেন যে,

“এ  ব্যবস্থা অবলম্বনের ফলে দীর্ঘকাল স্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাবের আশংকা কিছুতেই আমরা অস্বীকার করতে পারি না। এ ব্যবস্থার সব  চাইতে বড় ত্রুটি  এইযে,  কুড়িটি জন্মনিরোধ বটী প্রতি মাসে সুপরিকল্পিত উপায়ে ব্যবহার করতে হয়। পরন্তু বটীগুলোর উচ্চ মূল্য এবং হেদে এর প্রতিকূল প্রভাব এ ধরনের প্রতিকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস করে দিয়েছে।” [আমেরিকায় এ ধরনের একটি বটীর দাম ৫০ সেন্ট অর্থাৎ প্রায় সোয়া দুই টাকা। আমাদের দেশে পৌঁছতে পৌঁছতে এর মূল্য আরো কিছু বেশি  হয়ে যাবে। এ বটীর ব্যবহারের  দরুন প্রত্যেকটি নারীর প্রতি বছর ১২০ ডলার বা ৫৪০ টাকা খরচ করতে হবে (কারোনেট পত্রিকা ১৯৬০  অক্টোবর সংখ্যা, ১১ পৃঃ)। পাকিস্তানে জনপ্রতি বার্ষিক আয় ২৫০ টাকা। এমতাবস্থায় এত  দামী ঔষধ কয়জন ব্যবহার করতে পারে? পাকিস্তানের মোট নারী সমাজ থেকে অন্তত ৫০ লাখ বাছাই করে নিয়ে এ বটি ব্যবহার করালে এখানে আমাদের বর্ষিক খরচ করতে হবে অর্বুদ ৭০ কোটি টাকা।]

এক সম্প্রতিক খবরে জানা যায় যে, লন্ডনের বিখ্যাত ডাক্তার রেনেল্ড ডিউকস্‌-এর মত অনুসারে জন্মনিরোধের  উল্লিখিত বটীগুলো দেহের পক্ষে ভয়ানক  ক্ষতিকর। এর ফলে শুধু মাথা ঘোরা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদিতে ব্যাথাই সৃষ্টি  হয় না, উপরন্তু ক্যানসারর মত ধ্বংসাত্মক  রোগের আক্রমণাশাংকাও এতে পুরো মাত্রায় রয়েছে। [Swyer, Dr, G. L. “Contrzception, (1) Pshycogy Ovulation with Special  Reference to Oral contraception” in British Encyclopedia of Medicall Practice. Interim Supplement, July. 1959, P-2.]

এসব তো  হলো জন্মনিরোধ পদ্ধতির ক্ষতিকর। কিন্তু এ ক্ষতির ঝুঁকি গ্রহণ করার পরও এ দ্বারা জন্মনিরোধ সার্থক হবার কোন নিশ্চয়তা নেই। ইংলিশ কমিশন অন্‌ স্টোরিলাইজেশন (গর্ভনিরোধ কমিশন) ইংলণ্ড-এর রিপোর্টের ভাষায়: জন্ম নিরোধ উপকরণাদি উদ্বেগজনকভাবে নিশ্চিত।’ সুইডেনের ডাঃ এম. একব্যান্ড (Dr. M. Ekbald) কৃত পরীক্ষায়  জানা গেছে যে,  ৪৭৯ জন মহিলার মধ্যে শতকরা  ৩৮ জন জন্মনিরোধক উপকরণ ব্যবহার করা সত্ত্বও গর্ভবতী হয়েছে। [Exbald, Martin, “Induced Abortion on  Psychic Grounds Stockholm, 1955, PP. 18, 19, 99-102] অর্থাৎ সর্বপ্রকার বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়েও সন্তান  জন্মের বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন নিশ্চয়তা নেই।

এসব  ক্ষতি ছাড়া অপর একটি বড় ক্ষতির দিক হচ্ছে এই যে, জন্মনিরোধক পন্থা অবলম্বন করে  গর্ভনিরোধ সম্পর্কে অবগত হবার পর যৌন-আকাঙ্খা সীমানা লংঘন  করে অগ্রসর হতে থাকে। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর যৌনদাবি সংযমের সংগত সমিা-ডিঙিয়ে বেড়ে যেতে থাকে িএবং স্বামী-স্ত্রর মধ্যে  শুধু একটা  পাশব সম্পর্কে বাকী থেকে যায়। এতে শুধু যৌন- প্রেরণা ছাড়া আর কিছু থাকে না। এ অবস্থা স্বাস্থ্য ও চরিত্র উভয়েরই জন্য ক্ষতিকর। ডাঃ ফোরাস্ট  লিখেন:

পুরুষের স্বামীত্বের গতিধারা যদি নিছক যৌন লালসা তৃপ্ত করার পথে ধাবিত হয় এবং এক আয়ত্তে রাখার যদি কোন ব্যবস্থা না থাকে,  তাহলে এর অপবিত্রতা, পাশবিকতা ও বিষতুল্য ক্ষতির পরিমাণ অগণিত সন্তান জন্মানোর চেয়েও অধিকতর ক্ষতিকর হবে।

দুইঃ সামাজিক  ক্ষতি

জন্মনিরোধ ব্যবস্থার ফলে পারিবারিক জীবনে যে ক্ষতির প্রভাব পড়ে, তা প্রসঙ্গক্রমে ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে এর যে প্রভাব সকলের আগে পড়ে তা হচ্ছে এই যে, দেহের স্বাভাবিক  চাহিদা পূর্ণরূপে তৃপ্ত হতে না পারার দরুন নিজেদের অজ্ঞাতসারেই  তাদের মধ্যে অনাত্মীয়তা সৃষ্টি হতে না পারার দরুন  নিজেদের  অজ্ঞতসারেই  তাদের মধ্যে অনাত্মীয়তা  সৃষ্টি হতে থাকে এবং তা  ক্রমশ পারস্পরিক সদ্ভাব ও ভালভাসা হ্রাস, নিরাসক্তি ও অবশেষে ঘৃণা, অসন্তোষ পর্যন্ত সৃষ্টি করে, বিশেষত এসব উপকরণ ব্যবহারের ফলে  নারীদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ  যে বৈকল্য দেখা দেয় এবং তার মেজাজ দিন নি যেভাবে রুক্ষ  হয়ে ওঠে, তাতে দাম্পত্য জীবনের সকল সুখ-শান্তি বিদায় নেয়।

এসব ছাড়া আরও একটি বৃহত্তর  ক্ষতিও সাধিত হয়, আর সেটি  বস্তুতান্ত্রিক উপকরণের চেয়ে আত্মিক উপকরণের দরুণই অধিকতর প্রকাশ পায়। দৈহিক দিন থেকে তো স্মামী  ও স্ত্রীর সম্পর্কে রূপান্তরিত করার প্রধান উপকরণ হচ্ছে সন্তান  লালন-পালনের ক্ষেত্রে উভয়ের সম্মিলিত দায়িত্ব । আর এ দায়িত্ব পালনের জন্যে পরস্পরের মধ্যে যে সহযোগিতা থাকে,  তাই উভয়ের মধ্যে  গভীর সদ্ভাব ও ভালবাসা সৃষ্টি করে। জন্মনিয়ন্ত্রণ এ গভীর আত্মিক সম্পর্ক সৃষ্টির পথে বাধা দান করে। এর অপরিহার্য ফলস্বরূপ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন দায়িত্ববোধ ও শক্তিশালী বন্ধন স্থাপিত হয় না এবং এদের সম্পর্ক জৈবিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠতেই পারে না।  এ জৈবিক  সম্পর্কে ফলে কিছুকাল যাবৎ একে অপরকে ভোগ করার পর উভয়ের সম্ভোগস্পৃহা দ মে যায়। আর এ নিছক পাশবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নর-নারী প্রত্যে নর-নারীর জন্যে  সমান। এমতাবস্থায় নিছক জৈবিক  ক্ষুধা পূরণ করার জন্যে কোন নির্দিষ্ট নারী-পুরুষের পারস্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকার কোন কারণ থাকতে পারে না। সন্তানই স্বামী-স্ত্রীকে চিরদিন একত্রে থাকতে বাধ্য করে। সে সন্তানই যদি না থাকে তাহলে উভয়ের একত্রে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এজন্যেই ইউরোপ ও আমেরিকায় দাম্পত্য জীবন অত্যন্ত দুর্বল হয়ে যাচ্ছে এবং জন্মনিরোধ আন্দোলন প্রসারের সঙ্গে তালাকের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে, বরং সেখানে দাম্পত্য ও পারিবারিক  জীবন  চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন।

তিনঃ নৈতিক ক্ষতি

নানাবিধ কারণ জন্মনিয়ন্ত্রণ চরিত্রের ক্ষতি সাধন করে থাকে:

(১) জন্মনিয়ন্ত্রণ নর-নারী ব্যভিচারের অবাধ সনদ দিয়ে দেয়। কেননা জারজ  সন্তান পয়দা হয়ে দুর্ণাম রচনা বা সামাজিক লাঞ্ছনার ভয় আর থাকে না। এজন্যে উভয় পক্ষই অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনে উৎসাহ পেয়ে থাকে। [ডঃ ওয়েষ্ঠার মার্ক (Dr. Wester Marck) তার বিখ্যাত Future of Marriabe in Western Civilization (পাশ্চাত্য সভ্যতায় বিয়ের ভবিষ্যৎ) গ্রন্থে এ কথা স্বীকার করেন, “গর্ভনরোধবিদ্যা বিয়ের হার বাড়াতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে এও একটি অনস্বীকার্য সত্য যে, এ দ্বারা  বিয়ের বন্ধন ছাড়া নর-নারী মিলনের (Extra Matrumonial Intercourse) পথও অত্যন্ত প্রশস্ত হয়ে যায় এবং এর ফলে আমাদের  জামানায়ই বিয়ে সম্পর্কে সংকীর্ণ ও অন্ধকার ভবিষ্যতের স্পষ্ট চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়।”]

(২) ভোগ-লালসা ও আত্মপূজা সীমাতিরিক্ত পরিমাণে বেড়ে যায় এবং চারিত্রিক রোগ মহামারীর মত বিস্তার লাভ করে।

(৩) যেসব দম্পতির সন্তান জন্মায় না, তাদের চরিত্রে অনেকগুলো গুণ ‍সৃষ্টি হতে পারে না- যেগুলো শুধু সন্তান লালন-পালনের  মধ্য দিয়েই সম্ভব। সন্তান লালণ-পালনের মাধ্যমে মাতা-পিতার মনে ভালবাসা, ত্যাগ ও কোরবানীর মনোভাব  জন্ম নেয়। পরিণাম চিন্তা, ধৈর্য, দৃঢ়তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ইত্যদি উচ্চাঙ্গের গুণাবলী ও কে ব্যবস্থাতেই বিকাশ লাভ করে। সন্তানের দরুন মাতা-পিতা সরল সামাজিক জীবন যাপন করতে এবং শুধু নিজেরই আরাম- আয়েসের চেষ্টায় স্বার্থান্ধ না হতে বাধ্য হয়।  জন্মনিয়ন্ত্রণ এসব  চারিত্রিক গুণাবলী বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করে। আল্লাহতায়ালা নিজের সৃষ্টি ও প্রতিপালন কার্যের িএক অংশ মানুষের নিকট অর্পণ করেন এবং এভাবেই মানুষের জন্যে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হবার সুযোগ ঘটে। জন্মনিয়ন্ত্রণের অনুসারী হলে মানুষ এত বড় উচ্চ সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়।

(৪) জন্মনিরোধের দরুন শিশুদের নৈতিক শিক্ষাও অপূর্ণ থেকে যায়। যে শিশু ছোট ও বড় ভাইবোনদের সঙ্গে চলাপেরা ও খেলাদুলা করার সুযোগ পায় না তার অনেক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিকাশ লাভ করার অবকাশ ঘটে না। শুধু  মাতাপিতাই শিশুদের চরিত্র গঠন করে না বরং এরা নিজেরাও  পরস্পরের চরিত্র গঠনে সাহায্য করে থাকে। এদের একত্রে থাকা ও মেলামেশা, ভালাবাসা, ত্যাগ, সাহায্য ও সহযোগিতা ইত্যাদি ধরনের অনেক গুণাবলী সৃষ্টিরসহায়ক হয় এবং পরস্পরের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে অনেক নৈতিক  দুর্বলতা দূর করে দেয়। যারা একটি শিশু বা দু’টি শিশু জন্মানো পর্যন্ত নিজেদের সন্তান সংখ্যা সীমিত করে দেয় তাদের সন্তানকে উত্তম নৈতিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়। [শুধু তাই নয় ‘মনস্তত্ব বিশেষজ্ঞদের একদল তো এ কথাও বলেন যে, এর ফলে শিশুদের মন মগজের সুষ্ঠু বিকাশে বাধা সৃষ্টি হয় এবং দুটি শিশুর বয়সের পার্থক্য বেশি হলে নিকটস্থ ছোট শিশু না থাকার দরুন বড় শিশুটির মস্তিষ্কে (Neurosist) অনেক ক্ষেত্রে রোওগ সৃষ্টি হয়। দেখন, David M. Levy-র গ্রন্থ Matcemal Over Protection, নিউইয়র্ক ১৯৪৩।

প্রফেসার আর্ণল্ড গ্রেন এ বিষয়ে অন্য ‍দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত প্রসঙ্গে চলেন, শিশুদের নিকটস্থ বয়সের সঙ্গী না থাকা অন্য কোন দোষের সঙ্গে শিশুদের অনেক অসুবিধায় ফেলে দেয় এবং চীৎকার ও গোলমাল জাতীয ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত হয়। দেখুন, The Middle Class Male Child and Neurosis- by Amold Green S A Modern Introduction to Family –রচনা-নার্মন বেইল ও আজরা দ্যগল, প্রকাশ লণ্ডন ১৯৬১, ৫৬৮ পৃঃ]

চারঃ বংশগত ও জাতীয় ক্ষতি

এযাবৎ যারা শুধু ব্যক্তিগতভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণকারীদের যে ক্ষতি স্বীকার করতে হয় তা বলা হলো। এখন এ ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে বংশ ও জাতি কি কি  ক্ষতির সম্মুখীন হয় তা আলোচনা করা যাক।

(ক) নেতৃত্বের অভাব: মানব সৃষ্টির জন্যে আল্লাহতায়ালা যে মহান ব্যবস্থা কায়েম রেখেছেন, তাতে পুরুষের দায়িত্ব নারীদেহে নিজের বীর্য পৌঁছিয়ে দেয়া। এরপর আর কিছু মানুষের আয়ত্বাধীন থাকে না। সব কিছুই আল্লাহ কৌশল সমোপযোগিতা ও ইচ্ছার অধীন। পুরষ যতবার নারীর সঙ্গে মিলিত হয়,  ততবারই তার দেহ থেকে নারীদেহে যে পরিমাণ শুক্রকীট প্রবেশ করে তার সংখ্যা  ৩০ থেকে ৪০ কোটি। এ  কীটগুলো নারীর ডিম্বকোষে প্রবেশ করার জন্যে প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয়। এদের প্রতিটিই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্ব রয়েছে। এগুলোর মধ্যে  দুর্বল মস্তিষ্ক ও নির্বোধ যেমন থাকে, তেমনি  বুদ্ধিমান ও বিজ্ঞজনও থাকে। এগলোর মধ্যে এরিস্টটল, ইবনে সীনা, চিঙ্গীজ, নেপোলিয়ন, স্যাকসপিয়র, হাফেজ, মীরজাফর, মীরসাদেক এবং নিষ্ঠা ও সভ্যতার প্রতিমূর্তি সবই বিদ্যমান থাকে। এদের থেকে বিশেষ ধরনের শুক্রকীট বাছাই করে বিশিষ্ট ডিম্বকোষের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে এক বিশাল ধরনের মানব-শিশু পয়দা করে মানুষের ক্ষমতার বাইরে। এখানে শুধু আল্লাহতায়ালার মনোনয়নই কাজ করে এবং কোন সময় জাতির মধ্যে কোন ধরনের লোক পাঠাতে হবে, এটাও তিনি ফয়সালা করে থাকেন। মানুষ তার কার্যকলাপের পরিণতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। এমতাবস্থায় যদি সে আল্লাহর ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করে, তাহলে এর পরিণতি অন্ধকারে লাঠি ঘুরানোর মতই হতে বাধ্য। অন্ধকারে লাঠি ঘুরানোর ফলে সাপ, বিচ্ছু মরবে কি অপর কারো মাথা ফাটবে অথবা কোন মূল্যবান বস্তু নষ্ট হয়ে যাবেতা জানার উপায় নেই। জন্মনিরোধকারী মানুষ এ ব্যবস্থা গ্রহণ করার ফলে হয়তো বা  জাতির একজন বিচক্ষণ সেনাপতির জন্ম বন্ধ করার কারণ হতে পারে এ নিজের সীমা অতিক্রম করে আল্লাহর ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের সাজাস্বরূপ  জাতির মধ্যে নির্বোধ, বেঈমান, বিশ্বাসঘাকের জন্ম হতে থাকাও বিচিত্র নয়। বিশেষতঃ জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রথা সাধারণ্যে চালূ হ’বার পর তো নেতৃত্ব দানকারী জনশক্তির অভাব সৃষ্টি হওয়া সুনিশ্চিত।

অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, অধিক সংখ্যক জনশক্তিসম্পন্ন পরিবারই অধিকতর সাফল্য অর্জন করে। পক্ষান্তরে জনশক্তির দিক থেকে ছোট পরিবারকে তুলনামূলকভাবে ব্যর্থতার সম্মুখীন হ’তে দেখা গেছে। অধ্যাপক ক্লার্ক লিখেছেন:

যদিও একটি বড় পরিবারকে শিক্ষিত করে তোলা নিঃসন্দেহে ব্যয় সাপেক্ষ, তবুও একটি নতুন শিশুর জন্মদান করে মাতাপিতা পূর্ববর্তী সন্তানদের স্বার্থ  ক্ষুন্ন করে বলে অভিযোগ নেহায়েত ভুল। মনে হচ্ছে অনেক গবেষণার পর ফ্রান্সের নিঃ ব্রেসার্ড যা উপলব্ধি করেছেন আধুনিক মাতাপিতাগণ তা বুঝতে শুরু করেছেন। উল্লিখিত তথ্যবিদ, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন উচ্চ শ্রেণীর পেশাধারী অধিক সংখ্যক সন্তানসম্পন্ন পরিবারগুলো গতি- প্রকৃতি, জীবিকা ইত্যাদি সম্পর্কে অধ্যয়ন করেন এবং যে সব পরিবারে সন্তান সংখ্যা কম তাদের তুলনা করে এ সিদ্ধান্তে পৌছেন যে, অধিক সংখ্যক সন্তানসম্পন্ন পরিবার যাদের জন্ম তার কম সংখ্যক সন্তান উৎপাদনকারী পরিবারকে লোকদের তুলনায় জীবনের কর্মক্ষেত্রে অধিকতর সাফল্য অর্জন করে থাকে। [দৈনিক লণ্ডন টাইমস-এর ১৫ই মার্চ ১৯৫৯ সংখ্যা Too small Families (অতি ক্ষুদ্র পরিবারগুলো) শীর্ষক প্রবন্ধ।]

(খ) ব্যক্তি স্বার্থের বেদী মুলে জাতীয় স্বার্থের কোরবাণী

জন্মানিরোধ আন্দোলনে সাধারণত প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজ নিজ অবস্তা, বাসনা ও প্রয়োজন অনুসারে কি পরিমাণ সন্তান জন্মাবে অথবা মোটেই সন্তান জন্মানা উচিত কি না এ বিষয়ে ফয়সালা করে থাকে। এ ফয়সালা করার সময় জাতীয় অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্যে সর্বনিম্ন কত সংখ্যক শিশু দরকার তা হিসাব করা হয় না। এ বিষয়ে সঠিক ফয়সালা করা ব্যক্তি বিশেষের সাধ্য সীমা বহির্ভূত। এছাড়া ব্যক্তির পক্ষে জাতীয় স্বার্থের খাতিরে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করা সম্ভব নয়। ফলে নতুন শিশুর জন্ম পুরোপুরি নির্ভর হয়ে পড়ে এবং জন্মহার দ্রুত তমে যেতে শুরু করে যে, কোন একবিশেষ পর্যায়ে তাকে বাধান দান করার কোন শক্তিই জাতির হাতে থাকে না। যদি ব্যক্তির স্বার্থপরতা বাড়তে থাকে এবং জন্মনিরোধের অনিবার্য কুফলগুলোও অব্যাহত  গতিতে প্রসার লাভ করে চলে তা হলে ব্যক্তিস্বার্থের কোরবানীগাহে যে জাতীয় স্বার্থকে জবাই করা হবে, তাতে তার সন্দেহ কি? এমন কি একদিন ঐ জাতির অসিত্বই মিটে যেতে পারে।

(গ) জাতীয় আত্মহত্যা

জন্মনিরোধ প্রবর্তনের ফলে যে জাতির সংখ্যা হ্রাস পেতে শুরু  করে সে জাতি সর্বদা ধ্বংসের প্রতীক্ষায় থাকে। মহামারী বা বড় ধরনের কোন যুদ্ধে যদি বেশী সংখ্যক লোক মারা যায় তাহলে জাতি শুধু মানুষের অভাবেই আত্মরক্ষা করতে পারে না। কারণ নিহত লোকদের স্থান পূরণের জন্যে প্রয়োজনীয় জনবল তখনি উৎপন্ন  করার কোন উপায় জাতির হাতে থাকে না। [হাল জামানায় আণবিক অস্ত্র এ আশংকা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হিরোশিমায় যে আণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তার শক্তি ছিল ২০ হাজার টন টি এন টি। এতে জাপানের ৭৮,১৫০ জন লোক মারা যায়, ৩,৭৪২৫ জন আহত হয় এবং ১৩,০৮৩ জন নিখোঁজ হয়। আজকাল দশ কোটি টি, এন, টি শক্তি বিশিষ্ট বোমা তৈরি হচ্ছে। আর এ বোমা হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত বোমার তুলনায় পাঁচ হাজার গুণ অধিক শক্তিসম্পন্ন।] এরই তরুন দু’হাজার বছর পূর্বে গ্রীক জাতি ধ্বংস হয়েছিল গ্রীক দেশে গর্ভপাত ও সন্তান হত্যার প্রথা এতটা বিস্তারলাভ করেছিল যে, এর ফলে জনসংখ্যা কমে যেতে শুরু হয়েছিল। ঐ সময়ই যুদ্ধ-বিগ্রহ শুরু হয়ে যায় এবং এতেও অনেক লোক মারা যায়। এ উবয পথে জনসংখ্যা এতটা কমে গেলো যে, গ্রীক জাতি আর টাল সামলাতে পারলো না। অবশেষে তাকে নিজের ঘরেই গোলামীর জীবন যাপন করতে হয়। আজদের পাশ্চাত্যো জগৎ ঠিক এই ধরনের বিপদকেই ঘরে ডেকে এনেছে। সম্ভবত আত্মহত্যার মাধ্যমে এ জাতিকে বরবাদ করে দেয়া আল্লাহরই ইচ্ছা। কিন্তু আমরা কেন অন্যের দেখাদেখি নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনবো?

পাঁচঃ আর্থিক ক্ষতি

জন্মনিরোধ প্রথা আর্থিক উন্নয়নের সহায়ক হবে- এ ধারণা অভিজ্ঞতা ও গবেষণা দ্বারা অমূলক প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞগণের এ ধারণা দিন দিন বেড়ে চলেছে যে, জনসংখ্যা হ্রাস প্রাপ্তি অর্থনৈতিক দুরাবস্থার প্রধান কারণ। এটা এজন্যে হয় যে, ‍উৎপাদনকারী জনসংখ্যা (Producing Population) তুলনায় ব্যবহারকারী জনসংখ্যা (Consuming Population) কমে যায় এবং এর অপরিহার্য পরিণতিস্বরূপ উৎপাদনকারী জনসংখ্যার মধ্যে বেকারত্ব বিস্তার লাভ করতে থাকে। উৎপাদনকারী জনসংখ্যা শুধু যুবকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। পক্ষান্তরে ব্যবহারকারী জনসংখ্যার মধ্যে বৃদ্ধ, শিশু ও অক্ষম লোকও শামিল থাকে। উৎপাদনে এদের কোনই অংশ থাকে না। যদি এদের সংখ্যা হ্রাস পায় তাহল সামগ্রিকভাবে সম্পদ ব্যবহারকারীদের সংখ্যা হ্রাস পাবে। সম্পদের খরিদ্দার কমে গেলে যে অনুপাতে সম্পদের উৎপাদন ও উৎপাদনকারী উভয়েই কমে যেতে বাধ্য হবে। এজন্যেই জার্মানী ও ইটালীর অর্থনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞগণের এক প্রভাবশালী দল জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন।

সম্প্রতি বৃটেন ও আমেরিকার একদল বিশেষজ্ঞও এ ধরনের মত প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে ল্ড কেনীস (Lord Keynes), প্রফেসার  হানসান (Alvin H. Hansen), প্রফেসার কলিন ক্লার্ক প্রফেসার জি.ডি.এইচ. কোল (G.D.H. Colde)- এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কেনীস হানসান গ্রুপের মতামত সম্পর্কে প্রফেসার জোশেফ স্পেংলার নিম্নলিখিত মন্তব্য করেন:

“বুঝা গেলো যে, জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়তে (Upsurge) শুরু করলে সমাজের অর্ঝনৈতিক তৎপরতা অনেক বেড়ে যায়। যে সময় সম্প্রসারণকারী শক্তি গুণী (Expansive) সংকোচনকারী শক্তি (Contractive Forces) তুলনায় অধিকতর শক্তিশালী হয় তখন অর্থনৈতিক তৎপরতা বিশেষভাবে বেড়ে যায়। পরন্তু পর বিপরীত অবস্থায়ও অনুরূপ ফ ফলবে। মনে হচ্ছে যে, কেনীস হানসান কর্তৃক পেশকৃত বেকারত্ব বৃদ্ধির কারণ হয়ে উঠেছে। এর কারণ হচ্ছে, এই যে, জন্মহার ধারাবাহিকভাবে [মূল শব্দটি হচ্ছে  Tapering যাদ্বারা বোঝা যায় যে, কোন  বস্তু ওপরের দিকে সম্প্রসারিত এবং নিম্নদিকে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে নিম্ন বিন্দুতে পৌঁছে- যথা একটা উল্টা ত্রিভূজ।] কমে যাওয়ার ফলে একদিকে পুঁজি বিনিয়েঅগের (Investment) প্রয়োজন হ্রাস পায়; কারণ বাড়তি জনসংখ্যার দরুনই পুঁজি বিনিয়োগ ব্যবস্থা উন্নত হয়। অপর দিকে এ ব্যবস্তার ফলে জনশক্তিকে পুর্ণরূপে কাজে নিয়োগ (Full Employment) সম্পর্কিত বহুবিধ পুঁজি বিনিয়োগ তৎপরতায় বাধার সৃষ্টি হয়।” [Spengler Joshefh. J: ‘Population Theory’: A Survey of Contemporary Economics Vol. II: Illinols’ 1952p-116]

“বর্তমান সমাজে অধিক শিল্প সম্ভবত জনসংখ্যা দ্বারাই উপকৃত হবে। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, বর্তমান অর্থনৈতিক  সংস্থাগুলো এমভাবে কাজ করছে যে, যদি জনসংখ্যা বেড়ে যায় এবং বাজার সম্প্রসারিত হয় তাহলে সংস্থা অধিকতর ভালভাবে চলতে পারবে এবং মাথা পিছু আয় বাড়বে বই কমবে না। যদি উত্তরে আমেররিকা ও পশ্চিম ইউরোপ ঘনবসতিপূর্ণ না হ’তো তাহলে আধুনিক শিল্পগুলো অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতো এবং উৎপাদন খরচ অনেক বেশী পড়তো। এমনকি এসব শিল্পে উক্ত অবস্থায় গড়ে ওঠতে পারতো কিনা এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।”

জন্মনিয়ন্ত্রণের যেসব প্রামাণ্য বিবরণ পূর্বে পেশ করা হয়েছে তাকে কোরআন মজিদে নিম্নলিখিত আয়াতের আংশিক তফসীর বলা চলে:

“যারা অজ্ঞতাবশত ভালমন্দ বিবেচনা ব্যতীতই সন্তানদের ধ্বংস করে দিয়েছে এবং আল্লহার দানকে নিজেদের জন্য হারাম করে নিয়েছে তারা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শামিল হবে।”

েএছাড়া সেই আয়াতের ব্যখ্যাও ভালভাবে উপলব্ধি করা যায়, তাতে বলা হয়েছে:

(আরবী**********)

“আর যখন যে হাতে পায়, তখন আল্লাহর দুনিয়ায় বিপর্য সৃষ্টি িএবং ফল-শস্য ও সন্তান-সন্ততি ধ্বংস করার পরিকল্পনা করে।” আল-বাকারাহ্ ২-৫

পূর্বোক্ত আলোচনা স্মরণ করলেই বুঝতে পারা যায় যে, আল্লাহ তায়ালা ফল শস্য ও সন্তান ধ্বংসকে কি জন্যে দুনিয়ার বিপর্যয় সৃষ্টি বলে আখ্যা দিয়েছেন। এ আলোচনা নিম্নবর্ণিত আয়াতের মর্ম স্পষ্টভাবে বোঝা যেতে পারে।

(আরবী************)

“তোমরা অভাবের আশংকায় সন্তানকে হত্যা করো না। আমরা তাদের ও তোমাদের রিজিকের ব্যবস্থা করে থাকি। তাদের হত্যা করা নিসন্দেহে মহাপরাধ।”

এ আয়ত পরিষ্কার বলছে যে, অর্থনৈতিক সংকটের দরুন সন্তান হ্রাস করা নির্বুদ্ধিতা মাত্র।

এরপর আমি জন্মনিয়ন্ত্রণের সমর্থনে যেসব  যুক্তি পেশ করা হয় সেগুলো নিয়ে আলোচনা করবো। এ প্রসঙ্গে জন্মনিয়ন্ত্রণের সপক্ষে যেসব হাদীস পেশ করা হয় তারও সঠিক অর্থ বর্ণনা করবো।

জন্মনিয়ন্ত্রণের সমর্থনে যেসব যুক্তি পেশ করা হয় তাদের অনেকগুলো পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্তৃকি সৃষ্ট অবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। জন্মনিয়ন্ত্রণের সমর্থকদের  মতে সামাজিক অবস্থার বর্তমান ধারা সভ্যতার প্রচলিত ধরন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বর্তমান মূলনীতি পরিবর্তনযোগ্য নয়। অবশ্য এগুলোর  দরুন যে সব  সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তার সমাধান আবশ্যক, আর সমাধানের একমাত্র সহজ ও সরল পথই হচ্ছে জন্মহার নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু আমাদের বক্তব্য এই যে, যেসব সমস্যা সমাধারনের জন্যে প্রাকৃতিক আইনের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রস্তাব গ্রহণ করতে হচ্ছে ইসলামের সাংস্কৃতিক নীতি এবং সমাজ ও অর্থনীতিতে ইসলামী আইন জারী করে সে সব সমস্যরই মূলোৎপাটন করা যেতে পারে।

এ বিষয়ে আগের আলোচনায় যথেষ্ট আলোকপাত করা হয়েছে। এখন আমি শুধু ঐ সব যুক্তি নিয়ে আলোচনা করবো যেগুলো বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করার পরিবর্তে মানুষের সাধারণ অবস্থার ওপর নজর রেখে জন্মনিয়ন্ত্রণের সমর্থক গণ তাদের পুস্তক-পুস্তিকা ও বক্তৃতাবলীতে আবৃত্তি করে থাকে।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.